Sunday, February 8, 2026

নারীর নিরাপত্তায় প্রতিটি দলে আচরণবিধি থাকা উচিত: জাইমা রহমান

প্রকাশ ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ রাজনীতিতে যেসব নারী সক্রিয়, নিজ অঙ্গনে তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের একটি আচরণবিধি থাকা উচিত বলে মনে করেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমান।

আজ রোববার রাজধানীর বিস মিলনায়তনে এক গোলটেবিল বৈঠকে এ কথা বলেন জাইমা রহমান। ‘গণতন্ত্রের সংগ্রামে নারী: অবদান ও আগামীর বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই গোলটেবিল আয়োজন করে উইমেন ইন ডেমোক্রেসি (উইন্ড)।

জাইমা রহমান তাঁর ভাবনাটি তুলে ধরে বলেন, ‘সেফটির দিক থেকে যদি কোনো নারী নেত্রী বা স্টুডেন্ট লিডারের কিছু হয়, তাহলে দলগুলো লিগ্যাল কোড অব কনডাক্টের মাধ্যমে নারীকে প্রটেক্ট করবে। অর্থাৎ যদি নারীর কিছু হয়, দল দায়িত্বটা নেবে যে আমরা উনাকে প্রটেক্ট করব, উনার পাশে থাকব।’

লন্ডনে আইনে পড়াশোনা করে আসা জাইমা রহমান ১৭ বছর পর দেশে ফিরে এরই মধ্যে আসন্ন সংসদ নির্বাচনে বাবা তারেক রহমানের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে নিজেকে অনেকটাই যুক্ত করেছেন।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নাতনি জাইমা মনে করেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে অবস্থান করে নেওয়াটা পুরুষের জন্য সহজ হলেও নারীদের জন্য কঠিন। সেই কারণেই নারীদের এগিয়ে আনতে রাজনৈতিক দলগুলোর বড় ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

জাইমা রহমান বলেন, নারীদেরকে উঠে আসার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোকে সহায়তা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ করে দিতে হবে। সব দলকে এই দায়িত্বটা নিতে হবে।

‘একদম ছায়ার মতো, তালগাছের ছায়ার মতো যদি কেউ না থাকে মেন্টর, তাহলে ওই ছোট গাছটা কীভাবে আবার বড় হবে?’ বলেন জাইমা রহমান।

রাজনীতিতে নারীদের উঠে আসার ক্ষেত্রে তাঁদেরকে অর্থনৈতিকভাবেও সহায়তার ওপরও জোর দেন জাইমা রহমান। তিনি বলেন, ‘তাঁদেরকে সুযোগ দেওয়া উচিত দাঁড়ানোর জন্য। যাঁর মেধা আছে দাঁড়ানোর জন্য কোনো একটা সংসদীয় আসন বা স্থানীয় সরকারে।’

সহায়তার পাশাপাশি নারীনেত্রীদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি বলেও মন্তব্য করেন জাইমা রহমান।

‘নারীরা কি এখন ফিরে যাবে’

‘উইমেন ইন ডেমোক্রেসি’র এই গোলটেবিলে অংশ নিয়ে একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নারীদের নেতৃত্বের জায়গা থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালানোর প্রবণতার বিষয়টি তুলে ধরেন।

ফারাহ কবির বলেন, ‘এত দিন বিভিন্ন জায়গায় নারীরা নেতৃত্বে ছিলেন, কিন্তু গত ১৮ মাসে নতুন করে মনে হয়েছে, এসব নারী কি এখন সবাই ফিরে যাবে? এভাবে ডিভাইড অ্যান্ড রুলের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।’

তাই দেশের মানুষকে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তাঁরা কী ধরনের নেতৃত্ব চায়, বলেন ফারাহ কবির।

দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়ে ফারাহ কবির বলেন, এই ‘নোংরা সংস্কৃতির কারণে’ নারীদের বলা হয়, তাঁরা এখানে নেতৃত্ব দিতে পারবেন না। এই সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে নারীদেরও এগিয়ে আসতে হবে। নারীদের রাজনীতিতে অংশ নিতে হবে।

বিগত সময়ে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো রাজনীতিতে নারীদের এগিয়ে আনার ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রাখেনি বলেও অভিযোগ করেন ফারাহ কবির।

গোলটেবিলে অংশ নিয়ে আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, জুলাই সনদ ও গণভোটে বৈষম্য নিরসনের প্রতিশ্রুতি থাকলেও কীভাবে এই প্রতিশ্রুতিকে আরও শক্তিশালী করা হবে, তা পরিষ্কার করে বলা হয়নি।

সারা হোসেন বলেন, সম্প্রতি অনেক নারী বক্তব্য দিয়েছেন, তাঁরা পুরুষের অধীন থাকতে চান। পুরুষ তাঁদের পরিচালক, এটা তাঁরা মেনে নিয়েছেন। ওই নারীদের এই বক্তব্যকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা উচিত । তাহলে এসব বক্তব্য আর আলোচনায় আসবে না।

দেশের বিদ্যমান আইনে অনেক অর্জন আছে উল্লেখ করে স্বৈরাচারের দোহাই দিয়ে সব আইনকে যাতে মুছে দেওয়া না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান সারা হোসেন।

আইনজীবী সারওয়াত সিরাজ শুক্লা গোলটেবিলে বলেন, গত ১৮ মাসে মেয়েরা একটা খেলায় এগিয়ে এসেছে, তা হলো আত্মরক্ষার খেলায়। বর্তমানে অনলাইনে ও অফলাইনে নারীদের স্লাটশেমিং ও হয়রানি আগের চেয়ে অনেক বেশি বেড়েছে।

শ্রমিক নেতা কল্পনা আক্তার বলেন, ‘আমরা চাই নির্বাচনে যারাই জয়ী হয়ে আসুক, তাঁরা যেন নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকেন। কারণ, যতবার নারীদের পেছানোর চেষ্টা করা হবে, নারীরা লড়ে যাবে। আমাদের দুই পা পিছিয়ে দিলে আমরা চার পা এগিয়ে আসব।’

মুক্তিযোদ্ধা লুৎফা হাসান রোজি বলেন, সমান অধিকারের জন্য যে পরিবেশ দরকার, তা বাংলাদেশের সমাজে এখনো নেই। সমাজে এই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে নারীকে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আসতে হবে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক উমামা ফাতেমা এই আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, গণ–অভ্যুত্থানে যেসব নারী এগিয়ে এসেছিলেন, পাঁচ আগস্টের পর তাঁদের বাদ দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও এখন নারীদের বিভিন্নভাবে প্রশ্নের মুখোমুখি করছে।

নারীদের বিরুদ্ধে যে সাইবার বুলিং হয়, তার বিরুদ্ধে কীভাবে ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা বন্ধে সবাইকে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান উমামা ফাতেমা।

ডাকসুর কার্যকরী সদস্য হেমা চাকমা বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পরও নারীদের অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। নারী যখন বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখে, সেটাকে ‘সেলিব্রেট’ করা হয় না। বরং তারা কী করছে, কী পরছে, সেটা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা করা হয়। কথা বলতে গেলে চুপ করিয়ে রাখা হয়।

টিভি উপস্থাপক কাজী জেসিনের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক মির্জা তাসলিমা, ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী তাসলিমা আখতার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাহরিন ইসলাম খান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শামীমা সুলতানা, সাংবাদিক জায়মা ইসলাম, ডাকসুর গবেষণা ও প্রকাশনা সম্পাদক সানজিদা আহমেদ তন্বি প্রমুখ।

‘গণতন্ত্রের সংগ্রামে নারী: অবদান ও আগামীর বাংলাদেশ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে জাইমা রহমান। আজ রোববার রাজধানীর বিস মিলনায়তনে
‘গণতন্ত্রের সংগ্রামে নারী: অবদান ও আগামীর বাংলাদেশ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে জাইমা রহমান। আজ রোববার রাজধানীর বিস মিলনায়তনে। ছবি: খালেদ সরকার

গাদ্দাফির ছেলের মৃত্যুর চেয়ে বড় বিস্ময় ছিল তাঁর বেঁচে থাকা by কারাম নামা

লিবিয়ার ক্ষমতাচ্যুত শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির ছেলে সাইফ আল ইসলামের পরিণতি দেখে বিস্মিত হওয়ার তেমন কোনো কারণ নেই। যে অভিযানে তিনি নিহত হয়েছেন, তা এখনো রহস্যে ঘেরা। তবে তাঁর পরিণতি অপ্রত্যাশিত নয়।

গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাস একবার বলেছিলেন, লিবিয়া থেকে সব সময় নতুন কিছু আসে। এটি কোনো বিস্ময়ের প্রতিশ্রুতি ছিল না। বরং ছিল সতর্কবার্তা। লিবিয়া এমন এক অঞ্চল, যেখানে বিশৃঙ্খলা বারবার নতুন রূপে ফিরে আসে। আজকের লিবিয়ায় যা দেখা যাচ্ছে, সেটিও পুরোনো ট্র্যাজেডিরই পুনরাবৃত্তি।

সাইফ আল ইসলামের মৃত্যুর চেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো তিনি এত দিন বেঁচে ছিলেন কীভাবে!

সাইফের বাবা মুয়াম্মার গাদ্দাফি, ভাই মুত্তাসিম নিহত হয়েছেন। পরিবারের অন্য সদস্যরা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। ২০১১ সালের পর থেকে লিবিয়া যা দেখেছে, তা ছিল পূর্বানুমেয়। একটি সমাজকে ইচ্ছাকৃতভাবে ভেঙে ফেলার পর তাঁকে এমন অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল, যেখানে সবাই খুব ছোট ছোট টুকরার জন্য লড়াই করছে।

সাইফ আল ইসলামের বেঁচে থাকা কোনো ব্যক্তিগত শক্তি বা রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার ফল ছিল না। তিনি টিকে ছিলেন একটি ভঙ্গুর শক্তির ভারসাম্যের কারণে। সাইফ ছিলেন একটি সম্ভাবনা, কোনো বাস্তব বিকল্প নন। দেশীয় ও বিদেশি নানা পক্ষ তাঁকে একটি তুরুপের তাস হিসেবে ধরে রেখেছিল। চাপ সৃষ্টি, দর-কষাকষি কিংবা ব্ল্যাকমেলের কাজে এই তাস ব্যবহৃত হয়েছে; কোনো জাতীয় রাজনৈতিক প্রকল্পের জন্য নয়।

২০১১–পরবর্তী লিবিয়ার কখনোই একজন প্রেসিডেন্ট দরকার ছিল না। তাদের দরকার ছিল আরও কিছু তাস। বিশৃঙ্খল খেলায় যত বেশি তাস, তত সুবিধা। একটি তাসের কাজ শেষ হয়ে গেলে তাকে সরিয়ে ফেলা খেলাটিরই অংশ।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, সাইফ আল ইসলামের হত্যাকাণ্ড ২০১১ সালের পর থেকে লিবিয়ায় চলমান সহিংসতার ধারার সঙ্গেই মিলে যায়। যে রাষ্ট্র শক্তি বা বৈধতার একচেটিয়া মালিক হতে পারেনি, সেখানে স্থায়ী সুরক্ষা নেটওয়ার্কের বাইরে থাকা যে কেউই ঝুঁকির মুখে থাকে। রাজনৈতিক প্রতিশোধ, গোত্রগত প্রতিহিংসা কিংবা অন্যদের উদ্দেশে বার্তা পাঠানো—সবকিছুই এখানে ভূমিকা রাখে।

একসময় সাইফকে হত্যা করতে কেউ আগ্রহী ছিল না। কারণ, তাঁর মৃত্যুর প্রভাব বহন করতে কেউ রাজি ছিল না। সেই ভারসাম্য বদলে যাওয়ার পর তাঁর মৃত্যু একটি জটিল সমীকরণের বাস্তব সমাধান হয়ে ওঠে।

গাদ্দাফির শাসন লিবিয়ার সমাধান ছিল না। আবার ২০১১ সালের পর যারা ক্ষমতা দখল করেছে—মিলিশিয়া ও রাষ্ট্র লুটেরারাও কোনো সমাধান নয়। আসলে তারা সমাধান হতে চায়ওনি। ব্যক্তিগত, আঞ্চলিক ও গোত্রগত স্বার্থ সব সময়ই লিবিয়ায় জাতীয় স্বার্থের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে। লিবিয়া আজ অনেকটা রোমান দার্শনিক এমিল সিওরানের উক্তির মতো অবস্থায় আছে। তিনি বলেছিলেন, যে জাতি নিজের ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারে না, তাকে শাস্তি হিসেবে নিজের অতীত বারবার পুনরাবৃত্তি করতে হয়।

২০২১ সালে সাবহা থেকে যখন সাইফ আল ইসলাম প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন, তখন সেটি ছিল একধরনের স্বীকারোক্তি। লিবিয়া আর এমন দেশ নেই, যেখান থেকে রাজধানী ছেড়ে পালানো যায়। ত্রিপোলি তাঁর জন্য ছিল না, বেনগাজিও আর নিরাপদ ছিল না। তাই তিনি বেছে নেন মরুভূমি। সেখান থেকেই তাঁর বাবার উত্থান হয়েছিল এবং সেখানেই তাঁর পতন ঘটে। সাবহা কোনো সাধারণ শহর নয়, এটি একটি রাজনৈতিক ভূগোল। লিবিয়ানরা একে ‘নরকের রাস্তা’ বলে।

সাইফ আল ইসলাম এ জায়গাকেই তাঁর রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের মঞ্চ বানাতে চেয়েছিলেন। এটি ছিল তাঁর বাবার শেষ প্রচেষ্টার পুনরাবৃত্তি। কিন্তু বাস্তব লিবিয়া অবস্থান করছে জিনতান ও সাবহার মাঝখানে। লিবিয়া এমন একটি ভাঙা দেশ, যেখানে কেবল ছোট ছোট আনুগত্য টিকে আছে। পূর্ণ বৈধতা নেই কারওই।

যাঁরা লিবিয়ার জাতীয় ভবিষ্যতে বিশ্বাস করেন, সাইফ আল ইসলামকে পছন্দ করুন বা না করুন, তাঁরা জানতেন—তিনি তাঁর বাবার মতো একই ভুল আবার করতেন। জাতির বদলে গোত্রের ওপর ভরসা করতেন।

সাইফ আল ইসলামকে গাদ্দাফি হিসেবে নয়, মরুভূমির মানুষ বা সির্তের সন্তান হিসেবেও নয়, বরং একজন লিবিয়ান হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে হতো। কিন্তু লিবিয়ায় জাতি গঠনের পথ শুরু হওয়ার আগেই বন্ধ হয়ে যায়।

২০০০–এর দশকের শুরুতে সাইফ আল ইসলাম নিজেকে পশ্চিমা রাজধানীগুলোতে শাসনের গ্রহণযোগ্য মুখ হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। তিনি লকারবি মামলা নিষ্পত্তিতে ভূমিকা রাখেন। বুলগেরীয় নার্সদের মুক্তি নিশ্চিত করেন। লন্ডন, প্যারিস ও রোমে ঘুরে বেড়ান সংস্কারপন্থী হিসেবে। তাঁর বাবা তাঁকে চলাচলের কিছু স্বাধীনতা দিলেও প্রকৃত পরিবর্তনের ক্ষমতা দেননি।

একসময় যেসব লিবিয়ান অভিজাত তাঁর ওপর আশা রেখেছিলেন, তাঁরাও সরে দাঁড়ান। তাঁরা বুঝতে পারেন, সাইফের জাতীয় প্রকল্প কেবল কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ২০১১ সালে পূর্ব লিবিয়ায় বিদ্রোহ শুরু হলে গাদ্দাফি ঘোষণা দেন, সাইফ আল ইসলাম বেনগাজিতে গিয়ে আলোচনা করবেন। কিন্তু তিনি কাউকেই বিশ্বাস করাতে পারেননি। যেমনটি তাঁর বাবা নিজের পতনের সময়টিও বুঝতে পারেননি।

সাইফের ভাই মুত্তাসিম যুদ্ধ করে মারা যান; তাঁর বাবা যেমনটি চেয়েছিলেন। আরেক ভাই সাদি নাইজারে পালিয়ে যান। পরে তাঁকে প্রত্যর্পণ করা হয় এবং কারাভোগের পর ২০২১ সালে মুক্তি পান। সাইফ আল ইসলাম যুদ্ধ নয়, বেঁচে থাকাকে বেছে নিয়েছিলেন। তিনি মৃত্যু এড়াতে পেরেছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক শূন্যতা থেকে বেরোতে পারেননি।

মৃত্যুর আগে লিবিয়ার নির্বাচনী মানচিত্র ছিল খুবই স্পষ্ট। ত্রিপোলিতে তাঁর কোনো ভোট ছিল না। মিসরাতায় তাঁর উপস্থিতি ছিল না। বেনগাজিতে ছিল সামান্য সমর্থন। বাকি ছিল দক্ষিণাঞ্চল ও কিছু শহর, যেগুলো এখনো গাদ্দাফি আমলের রাজনীতির প্রতি অনুগত। ধরুন তিনি যদি দক্ষিণে জিততেনও, তাতেও তিনি লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট হতেন না। বরং বিভাজনই আরও পুনরুত্পাদিত হতো। ২০১১ সালের পর অন্য সবার মতো তিনিও একই ফাঁদে পড়েছিলেন। সেটি হলো একটি একীভূত জাতীয় প্রকল্পের অনুপস্থিতি।

সাইফ আল ইসলামের কাছে জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গির জন্য প্রয়োজনীয় হাতিয়ার, সমর্থন ও বৈধতা ছিল না। ইতিহাস তাঁর বিপক্ষে ছিল। ভূগোল তাঁর প্রতি নির্মম ছিল। বিশ্বও তাঁকে কখনো গ্রহণ করেনি। যেসব রাষ্ট্র আরও কম বিতর্কিত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে, তারা তাঁর ক্ষেত্রে সফল হতে পারেনি।

১৯১১ সালে লিবিয়া নিয়ে ইতালীয় ইতিহাসবিদ লুইজি ভিলারি লিখেছিলেন, এই ভূমি কাউকে ক্ষমতা দেয় না। কেবল নিয়ন্ত্রণের একটি ভ্রম দেয়। সেই ভ্রম আজও টিকে আছে। সাইফ আল ইসলাম লিবিয়ার সমস্যার উত্তর ছিলেন না। যেমন উত্তর নন আবদুল হামিদ দবেইবা, খলিফা হাফতার, ফাতি বাশাঘা, আলি জেইদান বা আরেফ আল নায়েদ। তবে তাঁর মৃত্যু পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। যখন লিবিয়ানরা এখনো নির্বাচন আয়োজনেই একমত হতে পারেনি, তখন ফলাফল নিয়ে তারা কীভাবে একমত হবে?

সবচেয়ে বিতর্কিত চরিত্রদের একজন সরে যাওয়ায় অনিশ্চয়তা কমেনি, বরং বেড়েছে। লিবিয়ায় অতীতে ঐক্য কঠিন ছিল। আজও কঠিন। আগামীকাল তা আরও কঠিন হবে।

* কারাম নামা, ব্রিটিশ-ইরাকি লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- মিডিল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি
সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি। ফাইল ছবি: রয়টার্স

নিপাহ ভাইরাস এসেছে নতুন তিন বিপদ নিয়ে by পার্থ শঙ্কর সাহা

দেশে নিপাহ ভাইরাসের তিনটি নতুন ও ভীতিকর বৈশিষ্ট্য দেখা দিয়েছে। প্রথমত, গত দুই বছরে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত শতভাগ রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এর আগে এ রোগে ৭০ শতাংশের বেশি আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু হতো।

দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমে এলেও এটি এখন আগের চেয়ে বেশি এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হলো, দেশে প্রথমবারের মতো গরমকালে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

নিপাহ ভাইরাস নতুন বিপদ নিয়ে হাজির হলেও খেজুরের রস বিক্রি ও পান বন্ধ হচ্ছে না। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে খেজুরের রস বিক্রির প্রচার দেদার চলছে।

জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, নিপাহ ভাইরাস রোধে খেজুরের রস বিক্রি বন্ধ করা দরকার। এ নিয়ে কঠোর আইনের দরকার। কিন্তু সে বিষয়ে কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

মারাত্মক ও সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ হলো নিপাহ। এ রোগের বাহক টেরোপাস (ফল আহারি) গোত্রের বাদুড়। বাদুড় থেকে মানুষে এই রোগের সংক্রমণ হয়। বাদুড়ের মুখের লালা বা মল-মূত্র দ্বারা খেজুরের রস বা তালের রস, আধা খাওয়া ফল ইত্যাদির মাধ্যমে নিপাহ ভাইরাস ছড়াতে পারে। এ রোগের প্রধান লক্ষণগুলো হলো জ্বরসহ মাথাব্যথা, খিঁচুনি, অজ্ঞান হওয়া, মানসিক অবস্থার পরিবর্তন (আবলতাবল বা ভুল বলা), কোনো কোনো ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট। সংক্রমিত প্রাণী বা মানুষের শারীরিক সংস্পর্শে এ রোগ ছড়ায়।

মৃত্যু শতভাগ

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২০০১ সালে মেহেরপুরে প্রথম নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত হয়। এরপর নওগাঁয় ২০০৩ সালে রোগী শনাক্ত হয়। তবে এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব হয় ফরিদপুর জেলায়, ২০০৪ সালে। সে বছর ফরিদপুরে নিপাহ ভাইরাসে ৩৫ জন আক্রান্ত হন, তার মধ্যে ২৭ জনের মৃত্যু হয়।

বাংলাদেশে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মোট ৩৪৭ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ২৪৯ জন রোগী মারা গেছেন। বাংলাদেশে এই রোগে আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুহার ৭২ শতাংশের বেশি। কিন্তু আইইডিসিআর বলছে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে নিপাহ রোগে আক্রান্ত সব রোগীই মারা গেছেন।

আইইডিসিআরের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শারমিন সুলতানা প্রথম আলোকে বলেন, ২০২৪ সালে ৫ জন এবং ২০২৫ সালে চারজন রোগী নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হন। তাঁরা সবাই মারা যান। এর আগে কোনো বছরে শতভাগ মৃত্যু হয়নি।

গরমেও মৃত্যু

খেজুরের রস থেকে ছড়ায় নিপাহ ভাইরাস। আর খেজুরের রস মূলত শীতের সময়ই পাওয়া যায়। এতে আক্রান্ত ও মৃত্যুও তাই এ সময়ই হয়। কিন্তু দেশে প্রথমবারের মতো গত বছর (২০২৫) গরমের সময় একজনের মৃত্যু হয় নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে। গত বছরের আগস্টে তাঁর মৃত্যু হয়। এর ফলে নিপাহ এক ভিন্ন ও ক্ষতিকর বৈশিষ্ট্য নিয়ে হাজির হয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বাদুড়ে খাওয়া পেয়ারা খাওয়ার ফলে ওই ব্যক্তি নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন বলে মনে করা হয়। অর্থাৎ খেজুরের রসের বাইরে অন্য ফল খাওয়ার ফলেও নিপাহ ছড়াচ্ছে। আবার দেখা যাচ্ছে, নিপাহ এখন শীতকাল ছাড়াও গরমেও ছড়াচ্ছে। এটা শঙ্কাজনক।

বাড়ছে বিস্তৃতি

যদি বাংলাদেশের মানচিত্রকে উলম্বভাবে ভাগ করা হয়, তাহলে দেখা যায় যে দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলেই নিপাহ ভাইরাসের বিস্তৃতি ছিল। এখনো উত্তরের জেলা নওগাঁ, মধ্যাঞ্চলের ফরিদপুর ও পশ্চিমাঞ্চলের মেহেরপুর এলাকায় এর বিস্তৃতি বেশি। কিন্তু দিন দিন নিপাহ নতুন নতুন জেলায় ছড়িয়ে গেছে। গত বছর ভোলা জেলায় প্রথমবারে মতো নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত হয়। আবার ২০২৪ সালে শরীয়তপুরে এ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী পাওয়া যায়।

আইইডিসিআরের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শারমিন সুলতানা প্রথম আলোকে বলেন, এখন পর্যন্ত দেশের ৩৫ জেলায় নিপাহ ভাইরাসের রোগী পাওয়া গেছে। নতুন নতুন এলাকায় এখন ছড়িয়ে পড়ছে এ ভাইরাস। এটা একটা বিপদের লক্ষণ।

খেজুরের রস নিরাপদ রাখার ভুল দাবি

নেট বা জাল দিয়ে ঢেকে বাদুড়ের মুখের সংস্পর্শ ঠেকানোর যে কথা বলা হয়েছে, তাকে পুরোপুরি অবাস্তব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। আইইডিসিআরের সঙ্গে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ মিলে নিপাহ ভাইরাস সার্ভিলেন্স বা পর্যবেক্ষণ করে। এই সার্ভিলেন্সের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সৈয়দ মঈনুদ্দীন সাত্তার প্রথম আলোকে বলেন, বাদুড়ের প্রস্রাব ধরে রাখার প্রকোষ্ঠ অনেক ছোট। তাই যখন বাদুড় রস পান করে, তখনই প্রস্রাব করতে থাকে। আর নেট দিয়ে পানি কী ধরে রাখা সম্ভব? কোনোটাই সম্ভব নয়। তাই রস নিরাপদ রাখার যে কথা বলা হচ্ছে, তা শতভাগ ভুল।

আইন হচ্ছে না

নিপাহ ভাইরাস থেকে সুরক্ষায় খেজুরের কাঁচা রস পান বন্ধ করা দরকার বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের কথা, বিজ্ঞাপন দিয়ে এর বিক্রিও বন্ধ করতে হবে। এর জন্য আইন দরকার। আইইডিসিআরের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে এ বিষয়ে একাধিকবার বলা হয়েছে বলে জানান ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এ বিষয়ে একমত। কিন্তু একটি আইন করতে যে ধরনের উদ্যোগ দরকার, তা আর হয়নি।

তিন বোনের এক স্বামী এবং...

ভারতের উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদে ১৬ বছরের কম বয়সী তিন বোনের আত্মহত্যার ঘটনায় তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই নতুন ও অজানা তথ্য সামনে আসছে। পুলিশ জানিয়েছে, মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়া ও তা বিক্রি করে দেয়ার পর থেকেই তিন বালিকা তীব্র মানসিক চাপে ভুগছিল। তাদের পিতা চেতন কুমার বিদ্যুতের বিল পরিশোধের জন্য মেয়েদের মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে সেগুলো বিক্রি করে দেন। তিনি দাবি করেন, মেয়েরা অতিরিক্তভাবে কোরিয়ান কনটেন্ট, বিশেষ করে কোরিয়ান বিনোদন ও অনলাইন গেমিং দেখিয়ে দেয় যে তারা মারাত্মকরকম আসক্ত হয়ে পড়েছিল। চেতন কুমার পেশায় একজন স্টক ব্রোকার। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তার ঋণের পরিমাণ প্রায় ২ কোটি রুপি। চরম আর্থিক সংকটের মধ্যেই তিনি পরিবার চালাচ্ছিলেন। এ খবর দিয়ে অনলাইন এনডিটিভি বলছে- তদন্তে জানা গেছে, ঘটনার রাতে তিন বোন তাদের মায়ের মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে সক্ষম হয়। তবে তারা যে কোরিয়ান অ্যাপ ও কনটেন্ট দেখতে চেয়েছিল, সেগুলোতে প্রবেশ করতে পারেনি। এ কারণে নিশিকা (১৬), প্রাচী (১৪) ও পাখি (১২) এই তিন বালিকা অনলাইন গেম খেলতে এবং তাদের কোরিয়ান বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। ফরেনসিক দলও নিশ্চিত করেছে যে মায়ের মোবাইল ফোনে কোনো কোরিয়ান কনটেন্টসংক্রান্ত অ্যাপ পাওয়া যায়নি।

পুলিশ জানিয়েছে, চেতন কুমারের তিন স্ত্রী রয়েছেন এবং তিনজনই আপন বোন। তারা হলেন নিশিকার মা সুজাতা, প্রাচী ও পাখির মা হেনা এবং তৃতীয় স্ত্রী টিনা। তদন্তে উঠে এসেছে, আত্মহত্যাকারী তিন বালিকা তাদের পিতাকে বেশি পছন্দ করতো। সম্ভবত এ কারণেই তারা আত্মহত্যার নোটে পিতার উদ্দেশে লিখে গেছে। কিন্তু কোথাও মায়েদের নাম উল্লেখ করেনি। হাতের লেখা আত্মহত্যার নোট, আঙুলের ছাপ এবং সংশ্লিষ্ট বার্তাগুলো ফরেনসিক পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট হাতে আসেনি। এদিকে আইএমইআই নম্বর ব্যবহার করে সাইবার ক্রাইম বিভাগ সেই ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে, যাদের কাছে এসব মেয়ের মোবাইল ফোন বিক্রি করা হয়েছে। উদ্দেশ্য মোবাইলগুলো থেকে কোরিয়ান অ্যাপ ও ডাটা উদ্ধার করা।

তিন বোনের ঘর থেকে উদ্ধার হওয়া নয় পৃষ্ঠার একটি পকেট ডায়েরি থেকে জানা গেছে, কোরিয়ান সংস্কৃতি ও বিনোদনের প্রতি গভীর আকর্ষণ ছিল তাদের। পারিবারিক অশান্তি ও মানসিক টানাপোড়েনে ভুগছিল তারা। পুলিশের মতে, এই বিষয়গুলো আত্মহত্যার পেছনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটিকে বর্তমানে আত্মহত্যা হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে তদন্তে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে- পিতার দাবি অনুযায়ী অনলাইন গেমিং ও কোরিয়ান কনটেন্টে আসক্তির বিষয়টি। পারিবারিক ও আর্থিক সংকট। অতীতের ঘটনাগুলোর সঙ্গে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না।
তদন্তে আরও জানা গেছে, ২০১৫ সালে চেতন কুমারের এক লিভ-ইন সঙ্গী সাহিবাবাদ থানাধীন রাজেন্দ্র নগর কলোনির একটি ফ্ল্যাটের ছাদ থেকে পড়ে রহস্যজনকভাবে মারা যান। সে সময় পুলিশ ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করে তদন্ত বন্ধ করে দেয়। ওদিকে নিহত তিন বোনের মরদেহ বুধবার দিল্লির নিগম বোধ ঘাটে দাহ করা হয়েছে।

https://mzamin.com/uploads/news/main/202370_Abul-1.webp

সড়কে বিশৃঙ্খলা: জবাবদিহিমূলক নতুন সড়ক সংস্কৃতির সন্ধানে by সাজেদুল হক

ঢাকার পরিবহনব্যবস্থার সংকট কেবল একটি ‘সেক্টরাল’ সমস্যা নয়। এটি এক গভীর শাসনব্যবস্থার সংকট। আমাদের রাস্তাগুলোর বিশৃঙ্খলা কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি আমাদের প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা, দুর্নীতি ও নীতিবিচ্ছিন্নতার অনিবার্য ফলাফল। ঢাকার পরিবহনব্যবস্থার সংকট নিয়ে দুই পর্বে লিখেছেন সাজেদুল হক। আজ প্রকাশিত হলো দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব।

রাস্তায় গর্ত, বাসরুটের বিশৃঙ্খলা, অবৈধ পার্কিং, ট্রাফিক সিগন্যালের বিকল অবস্থা এবং ঘন ঘন সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মধ্যে একধরনের বিশেষ মিল আছে; এসবের দায়ভার সব সময়ই ‘অন্য কারও’।

বাংলাদেশের পরিবহনব্যবস্থার প্রতিটি অংশ—সড়ক নির্মাণ, আইন প্রয়োগ, চালকের লাইসেন্স, যানবাহনের ফিটনেস, নগর-পরিকল্পনা, জরুরি সেবা, জনসচেতনতা—এই সবই বর্তমানে ভিন্ন ভিন্ন মন্ত্রণালয়, সংস্থা বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হাতে দেওয়া আছে। কিন্তু কোনো সংস্থা এককভাবে এই বহুমুখী সমস্যাগুলোর সমাধান করার জন্য পর্যাপ্ত ক্ষমতা, অর্থায়ন বা সমন্বয়ের সুযোগ পায় না।

আমাদের পরিবহনসংকট এত জটিল ও ব্যাপক যে কোনো এক দপ্তরের মাধ্যমে তা মোকাবিলা করা এখন আর সম্ভব নয়। তবু আমরা যেন একাধিক অঙ্গের জটিল রোগবালাইকে বিচ্ছিন্ন সব চিকিৎসা দিয়ে সারানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি। যদি আমরা সত্যিই আমাদের যোগাযোগব্যবস্থাকে সংস্কার করতে, নাগরিকদের জীবন বাঁচাতে এবং রাস্তায় স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে চাই, তবে প্রয়োজন সরকারের সর্বোচ্চ দপ্তরের নির্দেশনায় এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় একটি সম্মিলিত উদ্যোগ।

আজকের আলোচনার কেন্দ্রে রাখছি দুটি বিষয়। একটি হলো জবাবদিহি ও কার্যকর প্রশাসনিক সংস্কার। আরেকটি হলো আমাদের সড়ক ব্যবহারের সংস্কৃতির পরিবর্তন। এর কারণ হলো, কাঠামোগত ব্যর্থতা আর সংস্কৃতিগত বিশৃঙ্খলা একে অপরকে পুষ্ট করে আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় আমাদের বর্তমান নগর পরিবহনের সংকট।

সমন্বয়হীন প্রশাসনিক ব্যবস্থা আর জবাবদিহির অভাব

বাংলাদেশের পরিবহনব্যবস্থার বড় সমস্যা হলো অকার্যকর দায়িত্বের বিভাজন। এর কিছুটা বিশ্লেষণ আমরা আগের পর্বে দেখেছি। বিআরটিএ ড্রাইভারদের লাইসেন্স দেয় এবং গাড়ি নিবন্ধন করে, কিন্তু তাঁরা রাস্তায় আইন প্রয়োগ করতে পারে না। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করে, কিন্তু সড়ক নকশা বা বাস রুট নির্ধারণে তাঁদের কোনো ভূমিকা নেই। সিটি করপোরেশন রাস্তা সংস্কার ও ফুটপাত মেরামতের কাজ করে, কিন্তু গণপরিবহন পরিকল্পনা থেকে তাঁরা প্রায়ই বাদ থাকে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দুর্ঘটনার পর জরুরি সেবা বা ট্রমা কেয়ার সিস্টেমের কোনো অংশ নয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও গণমাধ্যমকে এ ব্যাপারে কোনো ধরনের সচেতনতা বা শিক্ষামূলক কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না।

এসবের ফলাফল হচ্ছে প্রশাসনিক ভাঙন। এক বিভাগের উদ্যোগ অন্য বিভাগের উদাসীনতায় থেমে যায়। যেমন সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন স্কুল বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত পৌঁছায় না, আইন প্রয়োগ হয় বিচ্ছিন্নভাবে আর পরিকল্পনা কাগজে আটকে থাকে।

এ অবস্থায় দুর্নীতি ও স্বার্থান্বেষী মহল সহজেই প্রভাব বিস্তার করে। মালিক সমিতি বা শ্রমিক সংগঠনের চাপ, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় আর ঘুষের সংস্কৃতি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে বারবার বিফল বা স্তিমিত করে। এর ফলে জনগণের জীবন ঝুঁকিতে থেকেও কার্যকর কোনো জবাবদিহি নেই।

যে কারণে বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপগুলো ব্যর্থ হয়

বাংলাদেশে ট্রাফিক ও পরিবহন সংস্কারের বিভিন্ন কার্যক্রম বারবার ঘোষিত হয়েছে, কিন্তু এসবের অধিকাংশই হয় ক্ষণস্থায়ী। কখনো এক সপ্তাহের হেলমেট অভিযান, কখনো হঠাৎ ফিটনেস চেক, আবার কখনো বাসরুট পুনর্গঠনের নির্দেশনা। এসব পদক্ষেপ কখনো স্থায়ী ফল আনে না।

কারণ, এগুলোতে থাকে না দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, আন্তপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়, কিংবা স্পষ্ট জবাবদিহি। ফলে কার্যক্রম ব্যর্থ হলে কেউ দায় নেয় না; সাফল্য পাওয়া গেলে হলে কেউ তা টিকিয়ে রাখতে চায় না এবং পরিসংখ্যানভিত্তিক অগ্রগতি মাপার কোনো ব্যবস্থা হয় না। এভাবে এসব ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে একধরনের ‘প্রতিক্রিয়াশীল প্রশাসন’। অর্থাৎ যখন কোনো দুর্ঘটনা বা জনরোষ তৈরি হয় তখন শুরু হয় হঠাৎ অভিযান, তারপর আবার নীরবতা।

জাতীয় টাস্কফোর্স কেমন হওয়া উচিত


আমাদের পরিবহন অবকাঠামোর সংস্কার ও বিস্তারের জন্য প্রয়োজন একটি সর্বোচ্চ পর্যায়ের জাতীয় উদ্যোগ। একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করা আবশ্যক, যা প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দপ্তরের অধীনে থাকবে এবং কাজ করবে।

এ রকম একটি জাতীয় পরিবহন সংস্কার ও সড়ক নিরাপত্তা টাস্কফোর্সের সভাপতি হিসেবে থাকতে হবে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বা সচিবালয়ের প্রতিনিধিকে। সদস্য হিসেবে থাকতে পারেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (ট্রাফিক পুলিশ), স্থানীয় সরকার বিভাগ, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ (ডিজিটাল মনিটরিং ও অটোমেশন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় (সচেতনতা ও শিক্ষা কার্যক্রম), স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় (ট্রমা ও জরুরি সেবা সমন্বয়), সিটি করপোরেশন এবং ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটির প্রতিনিধি। এ ছাড়া সিভিল সোসাইটি ও একাডেমিক বিশেষজ্ঞদেরও (পরামর্শক) অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

এই টাস্কফোর্সের কার্যক্রমে ট্রাফিক আইন প্রয়োগের দুর্বলতা মোকাবিলায় প্রাথমিকভাবে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমানে ট্রাফিক পুলিশ সাধারণ পুলিশ ইউনিট থেকে বদল হয়, যা প্রশিক্ষণ ও ধারাবাহিকতার অভাব তৈরি করে। একটি বিশেষায়িত, স্থায়ী কর্মী ও আধুনিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ট্রাফিক পুলিশ বাহিনী গঠন অপরিহার্য। এটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং এই টাস্কফোর্সের মধ্যে সমন্বয় রেখে কাজ করবে।

টাস্কফোর্সের কাজ

টাস্কফোর্সের কাজ হবে জাতীয় পরিবহন এবং সড়ক নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন; বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও পৌরসভার মধ্যে নীতিমালাগত জোট এবং সমন্বয় বজায় রাখা; স্পষ্টভাবে লক্ষ্য, কর্মক্ষমতা সূচক এবং সময়সীমা নির্ধারণ, বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ ও অগ্রগতি নিয়ে ত্রৈমাসিক রিপোর্ট প্রকাশ; স্বচ্ছ তহবিল সংগ্রহ, সুষ্ঠু ক্রয় প্রক্রিয়া নিশ্চিতকরণ, কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ড তৈরি (যেখানে দুর্ঘটনা, আইন লঙ্ঘন, সচেতনতা কর্মসূচির তথ্য নাগরিকেরা দেখতে পাবেন); আইন প্রয়োগ, চালক প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল টিকেটিং, তথ্য ব্যবস্থাপনা, বাস কিংবা গণপরিবহনের রুট ইত্যাদির জন্য জাতীয় মান নির্ধারণ।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো এই টাস্কফোর্সের আইনগত ক্ষমতা থাকতে হবে, যাতে কেবল পরামর্শক নয়, বাস্তবায়নের দায়িত্বশীল সংস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে।

সংস্কারের আন্তর্জাতিক দৃষ্টান্ত

বেশ কিছু উন্নয়নশীল দেশ এ ধরনের সংস্কারের জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ এরই মধ্যে নিয়েছে এবং ফলে ভালো ফলও পেয়েছে। ভিয়েতনামের ট্রাফিক নিরাপত্তা কমিটি গঠিত হয়েছিল ১৯৯৭ সালে, যার নেতৃত্বে থাকেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী এবং যা ভিয়েতনামের পরিবহনব্যবস্থার বার্ষিক ফলাফল পর্যালোচনা করে। উপরন্তু দেশটির প্রদেশগুলো সরাসরি এই কমিটিকে রিপোর্ট করে—যাতে তথ্যের বিচ্যুতি না হয়।

ইথিওপিয়া দাতাদের সমন্বয়ে ও আন্তমন্ত্রণালয় নেতৃত্বে একটি জাতীয় শহর পরিবহন নীতি গঠন করেছে, যা জমি ব্যবহার, দূষণ, সড়ক নিরাপত্তা এবং জনপরিবহন সংস্কার নিয়ে একত্রে কাজ করে।

ভারতের জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা পরিষদ এমন একটি উদাহরণ, যার চেয়ারম্যান হিসেবে থাকেন দেশটির পরিবহনমন্ত্রী। এই পরিষদের রাজ্য প্রশাসন স্তরে অংশগ্রহণ ও বিচার বিভাগীয় নজরদারি রয়েছে। এই পরিষদ নতুন আইন প্রণয়ন, ডিজিটাল আইন প্রয়োগ এবং সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাসে এখন পর্যন্ত সফলতা দেখিয়েছে।

এ উদাহরণগুলো প্রমাণ করে যে রাষ্ট্র যখন সড়ক নিরাপত্তাকে বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবে না দেখে শাসনব্যবস্থায় অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করে, তখন সত্যিকার অর্থে বাস্তব পরিবর্তন সম্ভব।

প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলো কেমন হতে পারে

জাতীয় নির্দেশিকা জারি: উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় ট্রাফিক নিরাপত্তাকে জরুরি ঘোষণা করা। সরকারি গেজেট ব্যবহার করে ও রাজনৈতিক দৃশ্যমানতা বজায় রেখে ৯০ দিনের মধ্যে এই টাস্কফোর্স গঠন। নগর পরিবহনে জড়িত সব সংস্থা, প্রকল্প এবং তাদের বাজেটের একটি চিত্র তৈরি এবং এদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দূরীকরণের প্রস্তুতি।

কেন্দ্রীয় সড়ক নিরাপত্তা ড্যাশবোর্ড চালু করা: স্বচ্ছতা ও জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে একটি রিয়েল টাইম ড্যাশবোর্ড তৈরি করতে হবে, যা সব নাগরিকের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এতে সড়ক অবস্থা, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন, দুর্ঘটনা, আইন প্রয়োগ কার্যক্রম এবং জনসচেতনতা প্রচারের তথ্য থাকবে।

বিশেষ করে একটি সহজবোধ্য সামগ্রিক অগ্রগতি সূচক বা ‘পরিবহন স্বাস্থ্য সূচক’ থাকবে, যা সংস্কার কার্যক্রমের সামগ্রিক প্রভাব পরিমাপ করে জনগণকে জানাবে। এই ড্যাশবোর্ডকে নিয়মিত হালনাগাদ করা হলে এই প্ল্যাটফর–সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার জবাবদিহি বাড়বে এবং নাগরিকেরা জানতে পারবে কীভাবে প্রতিটি পদক্ষেপ নিরাপদ ও কার্যকরভাবে রাস্তায় ভূমিকা রাখছে। যেসব মন্ত্রণালয় সমন্বিত কর্মক্ষমতা সূচকে ভালো করবে, তাদের বাজেটের মাধ্যমে সমন্বয়ের প্রণোদনা প্রদান করা।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সংস্থাদের প্রয়োজনমতো সংশ্লিষ্ট করা: পরিবহন শ্রমিক সমিতি, বেসরকারি বাসমালিকেরা, সিভিল সোসাইটি, করপোরেট লজিস্টিক কোম্পানি, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদিকেও এই সংস্কার সম্পাদন এবং পর্যবেক্ষণের কাজে সাহায্য করতে হবে।

নাগরিক সংস্কৃতির সংস্কার

যত বড় কাঠামোই তৈরি করা হোক, তা সফল হবে না, যদি না আমাদের নাগরিক আচরণ বদলায়। বর্তমানে বাংলাদেশের রাস্তায় প্রভাবশালী মানেই জয়ী। লাল বাতি মানা হয় না, অ্যাম্বুলেন্স আটকে থাকে, পথচারী হয় বিপন্ন। একটি নতুন সড়ক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে পথচারীর অধিকার সংরক্ষিত হবে; অ্যাম্বুলেন্সকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে; শিশুরা নিরাপদে বাইসাইকেল চালাতে পারবে; বয়স্করা নিশ্চিন্তে ফুটপাতে হাঁটতে পারবে; এসব শুধু দুর্ঘটনা কমাবে না, নাগরিক জীবনে সহমর্মিতা ও আস্থাও ফিরিয়ে আনবে।

সবার অংশগ্রহণ প্রয়োজন

এই পরিবর্তন শুধু রাষ্ট্রের একক দায়িত্ব নয়। প্রয়োজন বহুপক্ষীয় অংশগ্রহণ।

সরকার: সচেতনতামূলক প্রচারণা, স্কুল পাঠ্যক্রমে সড়ক নিরাপত্তা, স্থায়ী ট্রাফিক পুলিশ বাহিনী।

বেসরকারি খাত: রাইড শেয়ার ও করপোরেট যানবাহনে নিরাপদ চালনা নীতি, সঠিক পার্কিং ব্যবস্থাপনা।

গণমাধ্যম: ভিআইপি গাড়ির কীর্তন আর স্তুতি বন্ধ করা, আর মানবিক গল্প প্রচার।

তরুণ সমাজ ও নাগরিক সংগঠন: ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের চেতনা দীর্ঘ মেয়াদে কাজে লাগানো, ট্রাফিক আইল্যান্ড এবং ফুটপাতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান
: সাপ্তাহিক খুতবা বা বক্তব্যে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে বার্তা অন্তর্ভুক্ত করা।

প্রযুক্তি খাত: দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানের তথ্য, ড্রাইভার স্কোরকার্ড, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ঝুঁকির পূর্বাভাস।

সংস্কারকে দৃশ্যমান করতে হবে

জনসাধারণের আস্থা অর্জনের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো অগ্রগতিকে দৃশ্যমান করা। ওপরে প্রস্তাবিত কেন্দ্রীয় সড়ক নিরাপত্তা ড্যাশবোর্ডে একটি সংস্কারের অগ্রগতির সূচক থাকতে পারে, যা নিয়মিত হালনাগাদ করা হবে এবং যা দেখাবে কার্যক্রমের অগ্রগতি। যেমন: প্রশিক্ষণ, আইন বাস্তবায়ন, সচেতনতামূলক প্রচারণা কীভাবে সড়ক নিরাপত্তা উন্নত করছে এবং যানজট, দুর্ঘটনা কিংবা মানুষের হতাশা কমাচ্ছে। যখন মানুষ দেখবে, তখন বিশ্বাস গড়ে উঠবে; তারাও অংশগ্রহণ করতে অনুপ্রাণিত হবে; আচরণ বদলাতে মনোযোগী হবে। দৃশ্যমানতা সংস্কারকে গ্রহণযোগ্য করবে আর গ্রহণযোগ্যতা সেই সংস্কারকে গতিশীল করবে।

শেষ কথা

রাষ্ট্রকে কখনো না কখনো ভাবতেই হয়, নগরের সড়ক এবং উন্মুক্ত স্থানগুলোয় নাগরিকদের কী দেওয়া উচিত অথবা সর্বসাধারণের এসব থেকে কি পাওয়ার কথা? আমরা তো আমাদের রাস্তাঘাটকে দৈনন্দিন অবিচার বা নৈরাজ্যের প্রতীক হয়ে থাকতে দিতে পারি না। এই লেখায় নীতি, অনুশীলন এবং জনমনের ভাবনাকে নতুনভাবে দেখার একটি উপায় তুলে ধরেছি।

কিন্তু এই সবই অর্থহীন হবে যদি আমরা বর্তমান বিশৃঙ্খলতার ব্যাপারে নিষ্ক্রিয় থাকি। কারণ, দিন শেষে সড়ক ও যানজট আসল সমস্যা নয়—এসবের ব্যাপারে অবজ্ঞাই হলো মূল সমস্যা। এবং আমরা সবাই মিলে এর থেকে বেরিয়ে আসার পথ বেছে নিতে পারি। এটি শুধু যানজট কিংবা সড়কের প্রশ্ন নয়, বিশ্বায়নের এই যুগে এটি আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্ন। সিদ্ধান্ত এখন আমাদের হাতে।

সাজেদুল হক, উন্নয়নবিশেষজ্ঞ ও প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ ট্রাফিক অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট ফোরাম
- মতামত লেখকের নিজস্ব

সড়কে বিশৃঙ্খলা: জবাবদিহিমূলক নতুন সড়ক সংস্কৃতির সন্ধানে

অপহরণকারীদের উদ্দেশে মার্কিন সংবাদ উপস্থাপিকা: টাকা দেব, আমাদের মাকে ফিরিয়ে দিন

মার্কিন সংবাদ উপস্থাপক সাভানাহ গাথরি’র মা ন্যান্সি গাথরিকে অপহরণ করা হয়েছে। শনিবার অপহরণকারীদের উদ্দেশে সাভানাহ বলেছেন, তার ৮৪ বছর বয়সী মা ন্যান্সি গাথরি’কে নিরাপদে ফিরিয়ে দিলে পরিবার অর্থ দিতে প্রস্তুত। অ্যারিজোনার এই বাসিন্দাকে খুঁজে পাওয়ার জন্য তীব্র অনুসন্ধান সপ্তম দিনে গড়িয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় সাভানাহ বলেন, আমরা আপনাদের বার্তা পেয়েছি এবং বুঝেছি। এখন আমরা আপনাদের কাছে অনুরোধ করছি, আমাদের মাকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিন যাতে আমরা তার সঙ্গে আবার একসঙ্গে থাকতে পারি।

এটাই আমাদের শান্তি পাওয়ার একমাত্র উপায়। এটি আমাদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান এবং আমরা টাকা দেব।
এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এপি। ফিনিক্সে এফবিআই দপ্তরের মুখপাত্র কেভিন স্মিথ জানান, গাথরি যে বার্তার কথা বলেছেন, সেটি শুক্রবার বিকেলে টুকসনভিত্তিক টেলিভিশন স্টেশন কেওএলডি’তে পাঠানো হয়েছে। কেওএলডি জানায়, ওই দিন সামাজিক মাধ্যমে গাথরি মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ইমেইল তারা পেয়েছিল। তবে এফবিআই তদন্ত চালিয়ে যাওয়ায় তারা বার্তার নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু প্রকাশ করেনি। সপ্তাহজুড়ে একাধিক সংবাদমাধ্যম এমন কিছু চিঠি পেয়েছে, যেগুলোকে সম্ভাব্য মুক্তিপণ দাবি হিসেবে ধরা হচ্ছে। অন্তত একটি চিঠিতে অর্থ দাবি করা হয় এবং বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ও পরবর্তী সোমবার সন্ধ্যাকে সময়সীমা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, চিঠিগুলো কতটা বিশ্বাসযোগ্য তা নিশ্চিত করা যায়নি। তবে সব তথ্যই গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। একটি চিঠিতে ন্যান্সি গাথরির অ্যাপল ঘড়ি এবং তার বাড়ির একটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ ছিল বলেও জানানো হয়।

শনিবার প্রকাশিত ভিডিওটি ছিল এ সপ্তাহে অপহরণকারীদের উদ্দেশে করা পরিবারের তৃতীয় আবেদন। তদন্তকারীদের ধারণা, গত সপ্তাহান্তে টুকসনের বাইরে অবস্থিত নিজের বাড়ি থেকে ন্যান্সি গাথরিকে জোরপূর্বক নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পিমা কাউন্টির শেরিফ ক্রিস ন্যানোস জানান, তার বাড়ির বারান্দায় পাওয়া রক্তের নমুনা ডিএনএ পরীক্ষায় ন্যান্সি গাথরির সঙ্গে মিলেছে। এখনো কোনো সন্দেহভাজনকে চিহ্নিত করা হয়নি এবং কাউকেই তদন্তের বাইরে রাখা হয়নি। শেরিফ শুক্রবার জানান, ন্যান্সি গাথরির বাড়ির একটি ক্যামেরা তার নিখোঁজ হওয়ার দিন কাউকে ধারণ করতে না পারায় তিনি হতাশ।

তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, বাড়ির ডোরবেল ক্যামেরাটি রবিবার ভোরেই বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। কিছুক্ষণ পর সফটওয়্যার ডাটায় বাড়ির ভেতরে নড়াচড়ার রেকর্ড পাওয়া যায়। তবে ন্যান্সি গাথরির সক্রিয় সাবস্ক্রিপশন না থাকায় কোনো ভিডিওচিত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ন্যানোস এপি’কে বলেন, বিষয়টি উদ্বেগজনক ও হতাশাজনক। ওদিকে শুক্রবার এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তদন্ত খুব ভালোভাবেই এগোচ্ছে। তিনি আরও বলেন, আমাদের কাছে কিছু শক্তিশালী সূত্র আছে বলে মনে হচ্ছে। খুব শিগগিরই কিছু তথ্য সামনে আসতে পারে।

শুক্রবার তদন্তকারীরা আবার ন্যান্সি গাথরির এলাকায় তল্লাশি চালায়। শেরিফের দপ্তর সামাজিক মাধ্যমে জানায়, তদন্তকারীদের কাজের সুবিধার জন্য তার বাড়ির সামনের রাস্তা সাধারণ মানুষের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে এবং সেখানে অবস্থান করা সাংবাদিকদের সরে যেতে বলা হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের সংগঠন ক্যাটালিনা ফুটহিলস অ্যাসোসিয়েশন একটি চিঠিতে জানায়, এলাকায় তাৎক্ষণিকভাবে আবার অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। সংগঠনের সভাপতি লিখেছেন, আমরা সবাই সম্মিলিতভাবে বিস্ময় ও দুঃখের মধ্যে একসঙ্গে আছি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করা, ক্যামেরার ছবি শেয়ার করা এবং নিজের সম্পত্তিতে তল্লাশি চালাতে দেয়ার জন্য আপনাদের আন্তরিক ধন্যবাদ।

https://mzamin.com/uploads/news/main/202372_Abul-3.webp

পর্নো খুঁজতে গিয়ে নিজেই শিকার

শুরু হয়েছিল একেবারে সাধারণ একটি পর্নো ভিডিও খোঁজার মধ্য দিয়ে। সেটাই অচিরেই পরিণত হয় এক ভয়ংকর দুঃস্বপ্নে। হংকংয়ের বাসিন্দা এক ব্যক্তিকে প্রতিবেদনে ছদ্মনামে এরিক বলা হয়েছে। তিনি ২০২৩ সালে চীনের দক্ষিণাঞ্চলের শহর শেনঝেনে তার প্রেমিকা এমিলির সঙ্গে একটি হোটেলে অবস্থান করছিলেন। ঘটনার কয়েক সপ্তাহ পর, এরিক নিয়মিত যেসব প্রাপ্তবয়স্কদের ভিডিও সাইটে ঢুঁ মারতেন, সেখানেই হঠাৎ একটি ভিডিও তার চোখে পড়ে। শুরুতে সবই স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল। কিন্তু মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তার বুক ধক করে ওঠে। ভিডিওর ঘরটা অদ্ভুতভাবে পরিচিত। বিছানার অবস্থান, দরজার কোণ, লাগেজ রাখার জায়গা- সবকিছু হুবহু মিলে যাচ্ছে। আর তারপরই সবচেয়ে ভয়ংকর উপলব্ধি: ভিডিওর মানুষ দু’জন তিনি নিজেই এবং তার প্রেমিকা। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি।

গোপন ক্যামেরায় এক ঘণ্টার ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিওতে দেখা যাচ্ছিল হোটেল রুমে প্রবেশ করছেন তারা। ব্যাগ রাখছেন। পরে একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলো- সবই রেকর্ড হয়েছে একটি লুকানো ক্যামেরায়। এই রেকর্ডিংয়ের বিষয়ে তারা কেউই জানতেন না। সম্মতি তো দূরের কথা, ক্যামেরার অস্তিত্বই তাদের অজানা ছিল। অথচ সেই ভিডিও ইতিমধ্যেই অনলাইনে আপলোড হয়ে গেছে এবং হাজার হাজার মানুষ তা দেখে ফেলেছে। এরিক বিবিসিকে বলেন, এই অভিজ্ঞতা ছিল ‘ভয়াবহ ও স্তম্ভিত করে দেয়ার মতো’। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে তাদের সবচেয়ে ব্যক্তিগত সময় গোপনে রেকর্ড করা হয়েছে। এই ভাবনাটাই তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়। সবচেয়ে বিরক্তিকর বিষয় হলো এরিক স্বীকার করেন, তিনি আগে স্পাই-ক্যামেরা পর্নো দেখতেই বেশি আগ্রহী ছিলেন। তার যুক্তি ছিল, এই ভিডিওগুলো বাস্তব মনে হয়। মানুষ জানে না যে তাদের ফিল্ম করা হচ্ছে। সাধারণ পর্নো খুব সাজানো, খুব অভিনয় করা মনে হয়। অর্থাৎ, যে অজান্তে রেকর্ড হওয়ার বিষয়টাই তাকে আকর্ষণ করত, শেষ পর্যন্ত সেই ফাঁদেই তিনিই নিজে আটকে পড়লেন। একদিন ভিডিও দেখতে দেখতেই হঠাৎ তিনি বুঝতে পারেন স্ক্রিনে যে মানুষটা আছে, তিনি নিজেই সেটা। এরিক যখন এমিলিকে বিষয়টি জানান, শুরুতে তিনি বিশ্বাসই করেননি। ভেবেছিলেন, এটা হয়তো কোনো খারাপ রসিকতা। কিন্তু ভিডিও দেখার পর এমিলির প্রতিক্রিয়া বদলে যায় সম্পূর্ণভাবে। তিনি আতঙ্কে ভেঙে পড়েন। তার সবচেয়ে বড় ভয় ছিল,  পরিচিত কেউ কি ইতিমধ্যে ভিডিওটি দেখে ফেলেছে? বন্ধু, আত্মীয়, সহকর্মী- কারও চোখে কি এটা পড়েছে? এই ভয় তাদের সম্পর্কেও গভীর প্রভাব ফেলে। ভয়, লজ্জা আর মানসিক আঘাতে তারা কয়েক সপ্তাহ একে অপরের সঙ্গে কথাই বলেননি।

ল্যাডবাইবেল-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনার পর থেকে তাদের দৈনন্দিন জীবনও বদলে গেছে। বাইরে গেলে প্রায়ই ক্যাপ পরে থাকেন। হোটেলে থাকা যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলেন। সবসময় একটা অজানা নজরের ভয় কাজ করে। এরিক বলেন, এই অভিজ্ঞতা তার দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে। তিনি আর স্পাইক্যাম পর্নো দেখতে পারেন না। যেসব সাইটে আগে যেতেন, সেগুলোতে এখন আর ঢোকেন না।

চীনে পর্নো তৈরি ও প্রচার আইনত নিষিদ্ধ হলেও, বাস্তবে স্পাইক্যাম পর্নো গত দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রচলিত। এই ভিডিওগুলো সাধারণত হোটেল রুম, ভাড়া করা অ্যাপার্টমেন্ট, এমন জায়গায় ধারণ করা হয়, যেখানে মানুষ ব্যক্তিগত সময় কাটায়। ২০২৪ সালের এপ্রিলে চীনা সরকার নতুন নিয়ম জারি করে। এর আওতায় হোটেল মালিকদের নিয়মিত রুম পরীক্ষা করতে হবে। লুকানো ক্যামেরা খোঁজার দায়িত্ব তাদের ওপর বর্তায়। কিন্তু বাস্তবে সমস্যার খুব একটা সমাধান হয়নি।

বিবিসির এক অনুসন্ধানে জানা গেছে চীনের বিভিন্ন হোটেল রুম থেকে ১৮০টিরও বেশি লুকানো ক্যামেরা উদ্ধার করা হয়েছে। এখনও অসংখ্য নতুন স্পাই-ক্যাম ভিডিও অনলাইনে বিক্রি হচ্ছে। হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন অজান্তেই এই অপরাধের শিকার হচ্ছেন। 

https://mzamin.com/uploads/news/main/202243_Abul-10.webp

ঢাকার পরিবহনব্যবস্থার সংকটের কারণ কী by সাজেদুল হক

ঢাকার পরিবহনব্যবস্থার সংকট কেবল একটি ‘সেক্টরাল’ সমস্যা নয়। এটি এক গভীর শাসনব্যবস্থার সংকট। আমাদের রাস্তাগুলোর বিশৃঙ্খলা কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি আমাদের প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা, দুর্নীতি ও নীতিবিচ্ছিন্নতার অনিবার্য ফল। ঢাকার পরিবহনব্যবস্থার সংকট নিয়ে দুই পর্বে লিখেছেন সাজেদুল হক। আজ প্রকাশিত হলো প্রথম পর্ব।

২৯ জুলাই ২০১৮, ঢাকার এয়ারপোর্ট রোড। জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাস বেপরোয়া গতিতে আরেকটি বাসকে ওভারটেক করার চেষ্টা করে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকা ছাত্রছাত্রীদের ওপর উঠে যায়। ঘটনাস্থলেই মারা যায় রাজীব ও দিয়া নামে শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী।

বাসটির রুট পারমিট ছিল না। চালকের বৈধ লাইসেন্স ছিল না। এটি কেবল একটি দুর্ঘটনা ছিল না, এটি ছিল রাষ্ট্রের সবচেয়ে মৌলিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার একটি উদাহরণ।

এরপর যা ঘটেছিল, তা ছিল আমাদের জন্য এক নির্ণায়ক সময়। হাজারো শিক্ষার্থী, অনেকেই ইউনিফর্ম পরে সড়কে নেমে এসেছিল। কিন্তু তারা সড়কে কোনো ভাঙচুর করেনি।

শিক্ষার্থীরা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করল, ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা করল, জেব্রা ক্রসিং এঁকে দিল। তারা দলবদ্ধ হয়েছিল নিরাপদ সড়কের দাবিতে।

কিছু সময়ের জন্য তখন মনে হয়েছিল, বহুদিনের অবহেলিত বিষয়টি অবশেষে রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারে উঠে আসতে শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস, মন্ত্রীদের জরুরি বৈঠক—সবই হলো। কিন্তু ছয় বছর পার করে বাস্তবিক অর্থে কিছুই বদলাল না।

আমাদের দেশের সড়ক ও যানজটের অবস্থা এখন আর কেবল যন্ত্রণাদায়ক নয়; এটি আজ দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় বিপর্যয়, জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি মারাত্মক ঝুঁকি আর কোটি মানুষের প্রতিদিনকার জীবনযাত্রার মান নষ্ট করার কারণ।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার যানজট প্রতিবছর অর্থনীতিতে ৩৭ হাজার কোটি থেকে ৫৫ হাজার কোটি টাকা (৩ দশমিক ৫ থেকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ক্ষতি করে। এটি জিডিপির ৫ থেকে ১০% হারানোর সমান।

শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, যানজটের স্বাস্থ্যঝুঁকিও মারাত্মক। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালে পরিবেশদূষণ, বিশেষ করে যানবাহনজনিত বায়ুদূষণ বাংলাদেশে ৭৮ হাজার থেকে ৮৮ হাজার মানুষের অকালমৃত্যুর জন্য দায়ী ছিল, যা জিডিপির প্রায় ৪% ক্ষতির সমান।

গড় গতির কথা ভাবলে দেখা যায়, এক দশক আগে যেখানে ঢাকায় যানবাহনের গড় গতি ছিল ২১ কিমি/ঘণ্টা, আজ তা নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৫ কিমি/ঘণ্টায়।

আমাদের শহরের সড়কগুলো এখন বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক ও বিশৃঙ্খল সড়কব্যবস্থা হিসেবে পরিগণিত হয়। ২০১৮ সালের ছাত্রদের
দাবি আর আন্দোলনের পর একই ফিটনেসবিহীন বাস, একই অদক্ষ ও প্রশিক্ষণহীন ড্রাইভার, একই ধরনের আইনভঙ্গকারী মানসিকতা—সব চলছে আগের মতোই।

যারা একদিন শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে রাস্তায় নেমেছিল, তারা আজ শ্রেণিকক্ষে ফিরে গেছে। কিন্তু যে অবস্থা তাদের আন্দোলনে নামতে বাধ্য করেছিল, সেটি থেকে আমরা ন্যূনতম মুক্তিও পাইনি।

প্রতিদিনের দুর্ভোগ ও অর্থনীতির ক্ষয়

সাধারণ নাগরিকের জন্য ঢাকা শহরে যাতায়াত করা এখন এক অন্তহীন যন্ত্রণা। আট কিলোমিটার পথ যেতে লাগে দেড় ঘণ্টা, কখনো কখনো এমন অভিজ্ঞতারও মুখোমুখি হতে হয়েছে। অফিসগামীদের ভোরে বেরোতে হয়, ফিরতে হয় গভীর রাতে। স্কুলপড়ুয়া শিশুদের সঙ্গে সময় কাটানোর বদলে অভিভাবকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হয় যানজটে। প্রতিদিনের এই চাপ থেকে ধীরে ধীরে জন্ম নেয় হতাশা, ক্লান্তি আর একধরনের নীরব ক্ষোভ।

এসবের ভেতর আরেক উদ্বেগের বিষয় হলো, অবস্থার পরিবর্তন নিয়ে কারও যেন আর কোনো আশা বা দাবির জায়গা নেই। এই বিশাল ক্ষয়ক্ষতি জেনেও নাগরিকদের মনে গেঁথে গেছে একধরনের আত্মসমর্পণের চিন্তা: ‘এটাই নাকি মেগাসিটিতে বাস করার মূল্য’।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমাদের যানবাহনের চালকেরা যখন বিদেশে যান কিংবা দেশের ভেতরই সেনানিবাসের মতো নিয়ন্ত্রিত এলাকায় প্রবেশ করেন, তখন তাঁরা অনায়াসে সব নিয়ম মেনে চলেন। এ থেকে স্পষ্ট যে সড়কের বিশৃঙ্খলার পেছনে ব্যক্তিগত অসচেতনতা যেমন আছে, তেমনি আছে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা।

পরিবহনবিষয়ক দপ্তরগুলোর সমন্বয়হীনতা

সড়কের বিশৃঙ্খলা নিয়ে আমাদের এই সংকট কেবল যানজটে সীমাবদ্ধ নয়, এটি এক গভীর প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রতিফলনও বটে। ঢাকার ভেতর সড়ক ব্যবস্থাপনায় জড়িত প্রধান তিনটি সংস্থা হলো ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি), ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটি (ডিটিসিএ) এবং বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)।

নিয়ম অনুযায়ী সংস্থাগুলোর সমন্বিতভাবে কাজ করার কথা। কিন্তু বাস্তবে এসব প্রতিষ্ঠান যার যার মতো বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ সড়ক নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু রোড ডিজাইন বা রুট পরিকল্পনায় তাদের কোনো ভূমিকা নেই।

রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি লাইসেন্স ও রেজিস্ট্রেশন দেয়, কিন্তু মাঠপর্যায়ে আইন প্রয়োগের ক্ষমতা আবার তাদের নেই।

ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটি সমন্বয়কারী সংস্থা হলেও এর কার্যকর কর্তৃত্ব নেই বললেই চলে।

ঢাকার বাইরে গেলেও পরিস্থিতি একই রকম। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) হয়তো রাস্তা নির্মাণ করে। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের। উপরন্তু এসব বিষয়ে নীতিনির্ধারণী কর্তৃত্ব ছড়িয়ে রয়েছে সড়ক পরিবহন, স্বরাষ্ট্র, স্থানীয় সরকার ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের ভেতর।

ফলাফল হলো প্রতিটি সংস্থা আলাদা আলাদা নীতি নিচ্ছে; একে অন্যের বিরোধী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে আর নাগরিকেরা আটকে থাকছেন বিশৃঙ্খলার জালে।

যদি ঢাকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থানের দিকে তাকাই, যেমন মিরপুরের কালশী ফ্লাইওভার, সেখানে দেখি রোড মার্কগুলো কেমন এলোমেলো। অনেক রাস্তায় ট্রাফিক সাইন ভুল কিংবা অদৃশ্য।

প্রশ্ন থেকে যায়, এই প্রকল্পে অংশ নেওয়া প্রকৌশলীদের এসব রাস্তার সাইন আর মার্কগুলো করার জন্য পর্যাপ্ত প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ ছিল কি না? এমনকি বিমানবন্দর সড়কের মতো উচ্চনিরাপত্তাসম্পন্ন এলাকার কাছাকাছিও সঠিক রোডমার্ক নেই। এর ফলে অভিজ্ঞ চালকেরাও বিভ্রান্ত হন। এগুলো কেবল দৃষ্টিকটু নয়, বরং প্রতিষ্ঠানগত দায়িত্বহীনতার প্রতিচ্ছবি।

দুর্নীতি ও অরাজকতা

প্রতিষ্ঠানগত বিশৃঙ্খলার পেছনে আরও একটি বিষয় কাজ করে; সেটা হলো দুর্নীতি। হাজার হাজার যানবাহনের চালক ভুয়া লাইসেন্স নিয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন; কেউ টাকা দিয়ে, কেউ রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায়। ফিটনেসবিহীন বাস, অনিরাপদ মিনিবাস সবই চলে অবাধে।

পরিবহনমালিকদের লবি প্রায়ই রাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত। ফলে কোনো সংস্কার কার্যত তাঁদের ইচ্ছার বাইরে যেতে পারে না। এই দায় এড়ানোর সংস্কৃতিই আমাদের ট্রাফিক–ব্যবস্থার বিশৃঙ্খলার মূল চালিকা শক্তি এবং জনগণের আস্থা ধ্বংসের ভিত্তি।

বিআরটিএ যেখানে পরিবহন খাতের একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা, তারাই দীর্ঘদিন ধরে ‘দুর্নীতির আখড়া’ হিসেবে পরিচিত। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যেমন পুলিশ ও মোবাইল কোর্ট, তারাও পক্ষপাতদুষ্ট নজরদারি ও চাঁদাবাজিতে জড়িত, এমন অভিযোগ রয়েছে। গণপরিবহনব্যবস্থার বিশৃঙ্খলার পেছনে কাজ করছে এক শক্তিশালী পরিবহন সিন্ডিকেট, যাদের সঙ্গে রাজনৈতিক দল ও স্থানীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।

কিন্তু পরিস্থিতি সব সময় এমন ছিল না। মাত্র দুই-তিন দশক আগেও ঢাকার রাস্তায় নিয়মকানুনের কিছুটা হলেও ছোঁয়া ছিল। পুলিশের উপস্থিতি নিয়মিত দেখা যেত, লাইসেন্স বা ফিটনেস–সংক্রান্ত কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ছিল তুলনামূলক বেশি আর গণপরিবহনব্যবস্থাও কিছুটা হলেও নিয়মতান্ত্রিক ছিল।

এখনকার মতো এমন চরম বিশৃঙ্খলা ও আইনভঙ্গের দৃষ্টান্ত তখন এত ব্যাপক ছিল না। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও অব্যাহত দুর্নীতি ধীরে ধীরে নিয়মশৃঙ্খলার ভিত্তিগুলো ভেঙে দিয়েছে। আজ আমরা যা দেখছি, তা হঠাৎ ঘটে যাওয়া নয়, বরং দীর্ঘদিনের অবক্ষয়ের ফল। যত দিন না আমরা এই মুনাফাভিত্তিক দুষ্টচক্র ভেঙে ফেলতে পারব, তত দিন পর্যন্ত যেকোনো সংস্কার, তা যত ভালো পরিকল্পিত বা সদিচ্ছাসম্পন্নই হোক না কেন, ব্যর্থই হয়ে যাবে।

নীতি ও বাস্তবতার ব্যবধান

এসবের মধ্যেও যখনই কোনো নীতি প্রণয়ন করা হয়, বাস্তব প্রেক্ষাপট থেকে তা হয় প্রায়ই বিচ্ছিন্ন। একদিকে শহরজুড়ে বাস রুট রেশনালাইজেশনের মতো পরিকল্পনা করা হলো, যার মাধ্যমে ‘ঢাকা নগর পরিবহন’ নামক ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলে আনার উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল রুটগুলো একীভূত করা, শৃঙ্খলা আনা।

কিন্তু সেই উদ্যোগ আটকে গেল মালিকদের চাপে। সরকারকেও শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে হলো। এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব অংশীদারের মতামত নিয়ে এ ধরনের পরিকল্পনায় তাঁদের ব্যবসায়িক বা স্বার্থের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করে অগ্রসর হওয়া উচিত।

অন্যদিকে নীতিনির্ধারকেরা নিজেরা থাকেন সাধারণ নাগরিকের ভোগান্তি থেকে বিচ্ছিন্ন। ভিআইপি বহর নিয়ে সাইরেন বাজিয়ে সড়ক খালি করে নীতিনির্ধারকেরা চলে যান, একজন সাধারণ নাগরিকের অ্যাম্বুলেন্স হয়তো তখন ট্র্যাফিক জ্যামে আটকে থাকে।

বিলম্ব, ঝুঁকি অথবা অস্বস্তি—সাধারণ মানুষকে পরিবহনব্যবস্থার কারণে এসব যেভাবে পোহাতে হয়, নীতিনির্ধারকদের গাড়ির কাচ ভেদ করে তা ঢুকতে পারে না। ফলে তৈরি হয় এক বিশাল দূরত্ব, যা শুধু প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের অভাবে নয়, বরং অভিজ্ঞতার বিচ্ছিন্নতার কারণেও গভীরতর হয়।

পরিবহন খাতের দায়িত্বে যাঁরা, তাঁদের বিবেচনায় অগ্রাধিকার পায় সেই সব কাজ, যেগুলো সংবাদমাধ্যমে আলোচনায় আসে সহজে বা খবরের শিরোনাম হয়। বাংলাদেশে বাস্তবতা হলো, বেশির ভাগ পরিবহন প্রকল্পে ব্যবহারযোগ্যতার চেয়ে দৃশ্যমানতাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়।

সমস্যার মূলে অকার্যকর শাসনব্যবস্থা

ঢাকার পরিবহনব্যবস্থার সংকট কেবল একটি ‘সেক্টরাল’ সমস্যা নয়। এটি এক গভীর শাসনব্যবস্থার সংকট। আমাদের রাস্তাগুলোর বিশৃঙ্খলা কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি আমাদের প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা, দুর্নীতি ও নীতিবিচ্ছিন্নতার অনিবার্য ফলাফল।

২০১৮ সালের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছিল যে পরিবর্তন সম্ভব। কিন্তু এই বোঝা শিক্ষার্থীদের একার নয়। রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই দায়িত্ব নিতে হবে। প্রশ্ন হলো, কে এই দায়িত্ব নেবে? ব্যর্থ হলে তাদের জবাবদিহি কে করবে?

যদি আমরা সত্যিই সুষ্ঠু নাগরিক সড়কব্যবস্থা চাই, তবে প্রথমে আমাদের এই বিরাজমান শাসনব্যবস্থার ভাঙনকে স্বীকার করতে হবে। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং শাসনব্যবস্থার প্রতি বিশ্বাস পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হলে আমাদের সবার আগে রাস্তায় বিরাজমান এই দুর্নীতির সংস্কৃতির মুখোমুখি হতে হবে। কারণ, যানজট বা দুর্ঘটনা কেবল উপসর্গ; আসল রোগ হলো দুর্বল শাসন ও দপ্তরগুলোর সমন্বয়হীনতা।

* সাজেদুল হক, উন্নয়নবিশেষজ্ঞ ও প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ ট্রাফিক অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট ফোরাম
- মতামত লেখকের নিজস্ব

যানজটে স্থবির রাজধানীর বনানী এলাকার একটি সড়ক
যানজটে স্থবির রাজধানীর বনানী এলাকার একটি সড়ক। ফাইল ছবি: প্রথম আলো

বিএনপির প্রার্থী বললেন, দয়া করে ১২ তারিখ পর্যন্ত চাঁদাবাজি করবেন না

চট্টগ্রাম–১৩ (আনোয়ারা ও কর্ণফুলী) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সরওয়ার জামাল নিজাম ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চাঁদাবাজি বন্ধ রাখার জন্য প্রকাশ্যে চাঁদাবাজদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। গতকাল শুক্রবার রাতে আনোয়ারা উপজেলার চাতরী এলাকায় একটি নির্বাচনী কার্যালয় উদ্বোধনের সময় এ অনুরোধ জানান তিনি। তাঁর এই বক্তব্যের ৫৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, এমন কেউ একজন ভিডিওটি ধারণ করেছেন।

গতকাল রাত ১০টার পর নির্বাচনী কার্যালয় উদ্বোধনের ওই অনুষ্ঠানে স্থানীয় বিএনপির নেতা–কর্মী, ভোটার ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। ভিডিওতে সরওয়ার জামাল নিজামকে বলতে শোনা যায়, এই চাতরী হলো আনোয়ারার প্রাণকেন্দ্র। আনোয়ারার হেডকোয়ার্টার হলো এটি এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক এলাকা। এখানকার ব্যবসা–বাণিজ্য ও মানুষের আয়ের ওপর পুরো এলাকার অর্থনৈতিক গতিশীলতা নির্ভরশীল।

সরওয়ার জামাল নিজাম আরও বলেন, ‘এখানে নৈরাজ্য, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি চলছে। আমি অনুরোধ জানাব, আপনারা যাঁরা চাঁদাবাজি করছেন, দুই হাত জোড় করে বলছি, ১২ তারিখ পর্যন্ত আপনারা চাঁদাবাজি করবেন না।’ বিএনপির গায়ে কালিমা লেপনের চেষ্টা হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

এ বিষয়ে জানতে বিএনপির প্রার্থী সরওয়ার জামাল নিজাম ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ইদ্রিস মিয়ার মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও তাঁদের পাওয়া যায়নি।

চট্টগ্রাম–১৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী সরওয়ার জামাল নিজাম ছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জামায়াতে ইসলামীর মাহমুদুল হাসান, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মোহাম্মদ এমরান, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের এস এম শাহজাহান, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মু. রেজাউল মোস্তফা, খেলাফত মজলিসের মোহাম্মদ ইমরান ও জাতীয় পার্টির আবদুর রব চৌধুরী।

চট্টগ্রামের আনোয়ারার চাতরীতে নির্বাচনী কার্যালয় উদ্বোধন উপলক্ষে বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম ১৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী সরওয়ার জামাল নিজাম
চট্টগ্রামের আনোয়ারার চাতরীতে নির্বাচনী কার্যালয় উদ্বোধন উপলক্ষে বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম ১৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী সরওয়ার জামাল নিজাম। ছবি: ভিাডিও থেকে নেওয়া।

১০০ দিনে ১০০ ম্যারাথন, বাবার স্মরণে ৪ হাজার ২০০ কিলোমিটার দৌড়ালেন এই নারী

যুক্তরাজ্যের গ্রেটার ম্যানচেস্টারের বাসিন্দা এক নারী প্রয়াত বাবার স্মরণে ১০০ দিনে দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশে ১০০টি ম্যারাথন দৌড়েছেন।

এই নারীর নাম হানা কক্স, বয়স ৪১ বছর। বাবার মৃত্যুর পর তিনি তাঁর বাবার জন্মভূমি ভারত ঘুরে দেখার সিদ্ধান্ত নেন। এ জন্য তিনি ৪ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘ইনল্যান্ড কাস্টমস লাইন’ বেছে নেন।

তবে হানা শুরুতে দৌড়ে নয়; বরং গাড়িতে চড়ে এ পথ পাড়ি দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু ২০২৫ সালের মে মাসে দৌড় শুরু করার পর তিনি পুরো পথই দৌড়ে পার করার সিদ্ধান্ত নেন। এ জন্য ১০০ দিন ধরে তাঁকে টানা ১০০টি ম্যারাথন দৌড়াতে হয়েছে।

গত সোমবার হানা দৌড় শেষ করেন। ৪ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ পথ সফলভাবে দৌড়ে পার করার পর বিবিসি রেডিও ম্যানচেস্টারকে তিনি বলেন, ‘এ অনুভূতি অসাধারণ। আমি কখনোই একজন দৌড়বিদ ছিলাম না। আমার ধারণা, যাঁরা আমাকে চেনেন, তাঁদের বেশির ভাগই বিশ্বাস করতে পারবেন না, আমি কাজটা করেছি।’

ঐতিহাসিক ‘ইনল্যান্ড কাস্টমস লাইন’ ধরে হানা তাঁর শেষ গন্তব্যে পৌঁছান বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে। একসময় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই লাইন ধরে পণ্য আনা-নেওয়া করত।

হানা বলেন, ‘ভারতের ভেতর দিয়ে দৌড়ানো সব সময়ই চাপের। ইন্দ্রিয়গুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। আপনাকে প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে সচেতন থাকতে হবে।’

যুক্তরাজ্যের এই নারী আরও বলেন, ‘দৃশ্যপট ভিন্ন, যানবাহনের চলাচলও আলাদা। আমি চেষ্টা করেছি নির্দিষ্ট পথ ধরে এগোতে, কিন্তু আমার শরীর প্রতিদিনই আলাদা অনুভব করেছে।’

এটা শারীরিকভাবে কত চ্যালেঞ্জের, সে বর্ণনা দিতে গিয়ে এই নারী বলেন, এটা মোটেও যন্ত্রণাহীন ছিল না।

হানা বলেন, স্কোলিওসিস ও অটোইমিউন রোগ নিয়েও তিনি এ দৌড় শেষ করেছেন। টানা এক সপ্তাহ তীব্র গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিসে ভুগতে ভুগতে দৌড়েছেন।

শেষ তিন দিন হানাকে ভয়াবহ যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে বলেও জানান তিনি।

হানা বলেন, ‘আমার বাঁ পায়ে বেশ খারাপভাবে চোট লেগেছে, আমি হাসপাতালে যাব। তবে হ্যাঁ, আমি ভালোই আছি, আজ দৌড়াতে হচ্ছে না বলে খুশি।’

হান্নার এই যাত্রার অনুপ্রেরণা ছিলেন তাঁর প্রয়াত বাবা ডেরিক কক্স। ডেরিকের জন্ম ভারতের কলকাতায়। তিনি ১৯৫৩ সালে যুক্তরাজ্যে চলে যান। ২০১১ সালে তিনি মারা যান।

হানার পূর্বপুরুষেরা অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান। তাঁদের কেউ কেউ ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে কাজ করেছেন।

হানা বলেন, ‘আমি সেই দেশের সঙ্গে কিছুটা সংযোগ তৈরি করতে চেয়েছিলাম, যেন আমি ১৭৯৯ থেকে আমার পরিবারের ইতিহাস অনুসরণ করতে পারি। আমি ইনল্যান্ড কাস্টমস লাইন নামে একটা কিছু থাকার কথা শুনেছি। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সময় এটি ভারতের মধ্য দিয়ে বয়ে চলা একটি বড় কাস্টমস লাইন ছিল।’

হানা ‘ইনল্যান্ড কাস্টমস লাইন’ নিয়ে ইন্টারনেটে ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করেন। কিন্তু তেমন কোনো তথ্য পাননি। তিনি ২০১৪ সাল থেকে এ পথ নিয়ে গবেষণা শুরু করেছিলেন। ১২ বছর পর এখন তিনি মনে করেন, তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি এ পথ পুরোটা পাড়ি দিয়েছেন।

এখন পর্যন্ত হানার ‘প্রজেক্ট সল্ট রান’ বিভিন্ন পরিবেশ সংস্থার জন্য ৭৫ হাজার পাউন্ডের বেশি তহবিল সংগ্রহ করেছে।

‘ইনল্যান্ড কাস্টমস লাইন’ ধরে দৌড়ানোর সময় হানা কক্স
‘ইনল্যান্ড কাস্টমস লাইন’ ধরে দৌড়ানোর সময় হানা কক্স। ছবি: হানা কক্সের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া

বাংলাদেশের নির্বাচন ‘মেক-অর-ব্রেক’ পরীক্ষা

রবার্ট ল্যান্সিং ইনস্টিটিউটের পর্যবেক্ষণঃ ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ও প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের পর ১২ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। এই নির্বাচনকে ব্যাপকভাবে একটি ‘মেক-অর-ব্রেক’ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। রূপান্তরকালীন প্রক্রিয়া কি একটি প্রতিযোগিতামূলক ও বৈধ রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পৌঁছাবে, নাকি দেশ আবারও একটি অস্থির, হাইব্রিড ব্যবস্থায় আটকে পড়বে পরীক্ষাটা হলো তার। আওয়ামী লীগ নির্বাচন থেকে নিষিদ্ধ থাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুনভাবে বিন্যস্ত হয়েছে। একদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা। অন্যদিকে জামায়াত ও মিত্রদের কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ইসলামপন্থী ব্লক (এনসিপিসহ)। ছোট দলগুলো নির্দিষ্ট আসনে ‘স্পয়লার’ (ভোটে ভাঙন ধরানো) ভূমিকা রাখতে পারে। ভোটপূর্ব সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হলো সহিংসতা ও ভয়ভীতি। একাধিক সূত্রে নির্বাচনকালীন হত্যা ও সংঘর্ষের খবর পাওয়া যাচ্ছে। উচ্চ নিরাপত্তা পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ভোটার উপস্থিতি ও আসনভিত্তিক ফলাফল অনেকাংশে স্থানীয় পর্যায়ের বলপ্রয়োগের ওপর নির্ভর করতে পারে। বাংলাদেশে অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে এসব পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের দেলাওয়ারভিত্তিক রবার্ট ল্যান্সিং ইনস্টিটিউট। তাদের ওয়েবসাইট ল্যান্সিং ইনস্টিটিউটে এ বিষয়ে দীর্ঘ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিদেশি প্রভাব সবচেয়ে দৃশ্যমান ভারতকেন্দ্রিক মেরুকরণ ও তথ্যযুদ্ধে। পাশাপাশি চীন বঙ্গোপসাগর সংক্রান্ত প্রবেশাধিকার ও অবকাঠামো অর্থায়ন ঘিরে কৌশলগত প্রতিযোগিতায় সক্রিয়। যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টি মূলত স্থিতিশীলতা, গণতান্ত্রিক বৈধতা এবং উগ্রবাদ ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে।

ওই রিপোর্টের বাকি অংশ এখানে তুলে ধরা হলো-
ভোটের আগের পরিস্থিতি: কেন এই নির্বাচন আলাদা, রূপান্তরকালীন শাসন
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ভোট হচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যালটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘জুলাই সনদ’ সংস্কার প্যাকেজের ওপর গণভোট। যার মধ্যে রয়েছে সাংবিধানিক, নির্বাচনী ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার।

অন্তর্ভুক্তির সংকট
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় নির্বাচন একদিকে বেশি প্রতিযোগিতামূলক (একদলীয় আধিপত্য নেই), অন্যদিকে বেশি ভঙ্গুর (একটি বড় ভোটব্যাংকের আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক সক্রিয়তা নেই)। এতে দুটি ঝুঁকি তৈরি হয়েছে-

ক) নির্বাচন পরবর্তী বিতর্ক ও ‘ভোটাধিকার হরণ’-এর অভিযোগ, রাজপথে আন্দোলন।

খ) ফলাফলকে অবৈধ প্রমাণে আগ্রহী শক্তির সহিংসতা ও নাশকতা
নিরাপত্তা পরিবেশ

ভোটের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই রাজনৈতিক সহিংসতা, কর্মী হত্যার খবর এবং উগ্রবাদী হামলার আশঙ্কা উঠে এসেছে- যা সামগ্রিক স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

প্রধান ঘরোয়া রাজনৈতিক শক্তি
ক) বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মূল বার্তা: নির্বাচনীয় বৈধতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, হাসিনা যুগের শাসনব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা এবং শৃঙ্খলা ও অর্থনীতি পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি।

কাঠামোগত সুবিধা: আওয়ামী লীগবিরোধী বিস্তৃত জনমত এবং আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ায় বিএনপি এখন ‘ডিফল্ট’ বৃহৎ বিকল্প। একাধিক জরিপে জাতীয় পর্যায়ে বিএনপি এগিয়ে।

খ) জামায়াতে ইসলামী ও মিত্র ইসলামপন্থী ব্লকের মূল বার্তা: আইনশৃঙ্খলা ও নৈতিক শাসন; পাশাপাশি সংস্কার প্যাকেজকে বাধ্যতামূলক করার দাবি এবং আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের পক্ষে চাপ।

নির্বাচনী যুক্তি: কিছু জরিপে তরুণ ও নতুন ভোটারদের মধ্যে জামায়াতের সমর্থন তুলনামূলক বেশি। ভৌগোলিকভাবে কেন্দ্রীভূত ভোটে তারা আসন জিততে পারে, এমনকি মোট ভোটে পিছিয়েও।
গ) ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি’র (NCP) / ‘নতুন আন্দোলন’
ভূমিকা: ২০২৪ পরবর্তী নাগরিক ও সংস্কারপন্থী অংশের রাজনৈতিক মাধ্যম। স্থানীয়ভাবে ‘কিংমেকার’ হতে পারে এবং জুলাই সনদ বিতর্কে প্রভাব ফেলতে পারে।
ঘ) জাতীয় পার্টি ও ছোট জোট (বাম/প্রগতিশীল)
ভূমিকা: আসনভিত্তিক স্পয়লার, নির্বাচন-পরবর্তী জোট দরকষাকষির হাতিয়ার এবং ভোটের বৈধতা নির্ধারণে প্রভাবক।
ঙ) আওয়ামী লীগ নেটওয়ার্ক (নির্বাচনের বাইরে)
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘অংশগ্রহণহীন’ শক্তি আওয়ামী লীগ। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, অনেক আওয়ামী লীগ নেতা নির্বাসনে। বিশেষ করে ভারতে অবস্থান করছেন এবং অস্থিরতা বা জনবিমুখতা তৈরি হলে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ খুঁজছেন তারা।

বিদেশি প্রভাব ও স্বার্থ
ভারত
স্বার্থ: সীমান্ত স্থিতিশীলতা, নদীর পানি ও যোগাযোগ, বাংলাদেশে ভারতবিরোধী রাজনৈতিক উত্থান ঠেকানো এবং ঢাকার নিরাপত্তা দিকটি ধরে রাখা।
প্রভাবের ধরন: ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেটওয়ার্ক এবং ভারতের ভূমিকা নিয়ে বাংলাদেশের ভেতরের ক্ষোভ রাজনৈতিক বয়ানে কেন্দ্রীয় হয়ে উঠেছে। এর প্রভাব মিডিয়া ও রাজপথের সহিংসতায় পড়ছে।
ইঙ্গিত: ফলাফল যদি ‘ভারতবিরোধী’ হিসেবে দেখা হয়, বা সহিংসতার দায় সীমান্তপারের শক্তির ওপর পড়ে, তাহলে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক আরও কঠিন হবে।

চীন
স্বার্থ: অবকাঠামো, জ্বালানি, বন্দর, পরিবহন ও পানি ব্যবস্থাপনায় ধারাবাহিকতা; বঙ্গোপসাগরে কৌশলগত প্রবেশাধিকার বজায় রাখা।
প্রভাব: সরাসরি নির্বাচন হস্তক্ষেপ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প ও অর্থায়নের মাধ্যমে কাঠামোগত প্রভাব। যে সরকারই আসুক, এই দায়বদ্ধতা বহন করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন
স্বার্থ: বিশ্বাসযোগ্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, স্থিতিশীলতা, উগ্রবাদ ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ, শ্রম ও মানবাধিকার এবং আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খলা।
সংকেত: মার্কিন দূতাবাসের নিরাপত্তা সতর্কতা নির্বাচনকালীন সহিংসতা ও উগ্রবাদী হুমকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।
ইইউ: নির্বাচন পর্যবেক্ষণে সক্রিয় ভবিষ্যৎ সহযোগিতার জন্য বৈধতাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে।

উপসাগরীয় দেশসমূহ (পরোক্ষ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ)
প্রবাসী শ্রম, রেমিট্যান্স ও বিনিয়োগ প্রত্যাশা নতুন সরকারের নীতিগত সক্ষমতাকে সীমিত করবে। বিশেষত সহিংসতা বিনিয়োগ আস্থা ক্ষুণ্ন করলে।
জরিপ অনুযায়ী সম্ভাব্য ফলাফল
জরিপের সারাংশ: একাধিক জরিপে বিএনপি প্রথম, জামায়াত উল্লেখযোগ্য এবং অন্যান্য দল জাতীয় ভোটে অনেক পিছিয়ে। কিছু প্রতিবেদনে সাবেক আওয়ামী লীগ সমর্থকদের বিএনপিমুখী হওয়া এবং তরুণদের মধ্যে জামায়াতের প্রতি ঝোঁকের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
আসন রূপান্তরের সমস্যা বাংলাদেশের প্রথম পাস্ট-দ্য-পোস্ট ব্যবস্থায়-
বিরোধী ভোট ভাগ হলে বিএনপি বড় আসন বোনাস পেতে পারে।
জামায়াত ভৌগোলিকভাবে কেন্দ্রীভূত সমর্থনে জাতীয় ভোটের চেয়ে বেশি আসন পেতে পারে।
সহিংসতা ও ভয়ভীতি প্রান্তিক আসনে ফল উল্টে দিতে পারে।
সবচেয়ে সম্ভাব্য ফল
বিএনপি সবচেয়ে বড় দল হিসেবে উঠে আসবে এবং এককভাবে বা ছোট দল নিয়ে সরকার গঠনে এগিয়ে থাকবে।

বিকল্প নজরদারি দৃশ্যপট: জামায়াত নেতৃত্বাধীন ব্লক প্রত্যাশার চেয়ে ভালো করলে জোট দরকষাকষি হবে এবং সামাজিক নীতিতে ডানদিকে চাপ বাড়বে।

পরিণতি ও প্রভাব
অভ্যন্তরীণ শাসন: বৈধতা নির্ভর করবে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ ও গণভোটের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর। বিতর্কিত নির্বাচন আবারও পুরোনো চক্রে ফিরিয়ে নিতে পারে।
বিএনপি জিতলে: ‘স্বাভাবিকীকরণ’-এর চেষ্টা থাকবে, তবে ইসলামপন্থী চাপ, নিরাপত্তা খাত সংস্কার ও প্রতিশোধের রাজনীতি বড় চ্যালেঞ্জ।
ইসলামপন্থী ব্লক শক্তিশালী হলে: শিক্ষা, নাগরিক সমাজ, নারী অধিকার ও মিডিয়া পরিবেশে চাপ বাড়বে; পশ্চিমা উদ্বেগ তীব্র হবে।
পররাষ্ট্রনীতি
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কই হবে প্রথম পরীক্ষা, দেশীয় রাজনীতিতে ‘সার্বভৌমত্ব’ দেখানোর চাপ বনাম বাস্তব সহযোগিতার প্রয়োজন।
চীনা প্রকল্পগুলো ‘স্টিকি’ থাকবে-হঠাৎ প্রত্যাহার অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল।
যুক্তরাষ্ট্র/ইইউ সম্পৃক্ততা বৈধতার ওপর নির্ভরশীল- বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন দরজা খুলবে, সহিংসতা নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি বাড়াবে।
নিরাপত্তা ও সামাজিক সংহতি
নির্বাচনকালীন সহিংসতার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব থাকতে পারে-প্রতিশোধ, স্থানীয় সশস্ত্র পৃষ্ঠপোষকতা ও ভয়ভীতির স্বাভাবিকীকরণ। সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও সাম্প্রদায়িক বয়ান সহজেই রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হতে পারে, বিশেষ করে ভারতকেন্দ্রিক মেরুকরণে।
সম্ভাব্য দৃশ্যপট
১) ভিত্তিমূলক দৃশ্যপট: বিএনপি জয় + নিয়ন্ত্রণযোগ্য জোট
ফল: বিএনপি সরকার; নির্বাচিত সংস্কার; ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি।
ঝুঁকি: স্থানীয় সহিংসতা ও ইসলামপন্থী দরকষাকষি সংস্কারের গভীরতা কমায়।
২) উচ্চ ঝুঁকি: বিতর্কিত ভোট + রাজপথে উত্তেজনা
ফল: কারচুপি/ভয়ভীতির অভিযোগ; দীর্ঘ প্রতিবাদ; শাসন অচলাবস্থা।
লাভবান: স্পয়লার শক্তি, বিশেষত নির্বাচন-বহির্ভূত আওয়ামী লীগ নেটওয়ার্ক।
৩) ডানদিকে সরে যাওয়া: জামায়াত-নেতৃত্বাধীন ব্লক ‘কিংমেকার’
ফল: সামাজিক নীতিতে রক্ষণশীল চাপ; পশ্চিমা অংশীদারদের সঙ্গে টানাপোড়েন; পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি তীব্র।

mzamin