Tuesday, March 31, 2026

পৃথিবীর শেষ প্রান্তভাগের গ্রামটির মানুষ কীভাবে বাঁচে

গ্রিনল্যান্ডের ইতোকোর্তোরমিত গ্রামটি প্রতিবছর নয় মাস বরফে ঢেকে থাকে। পৃথিবীর উত্তর প্রান্তভাগের জীবনধারা কেমন, তা এই জায়গায় গেলে বোঝা যায়।

পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত বিশ্বব্যবস্থায় সত্যিকারের দুর্গম জায়গায় ভ্রমণের অভিজ্ঞতা পাওয়াটা খুবই বিরল। একই সঙ্গে পৃথিবীর সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন অঞ্চলগুলোর মানুষেরা কীভাবে জীবন যাপন করে, তা জানতে পারাটা আরও বিরল অভিজ্ঞতা।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক আলোকচিত্রী কেভিন হল সেই বিরল অভিজ্ঞতাই লাভ করেছেন। বিবিসিতে লেখা এক নিবন্ধে তিনি সে অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন।

ইতোকোর্তোরমিত হলো ছোট একটি গ্রাম। সেখানে ৩৭০ জন মানুষের বসবাস। গ্রামের ঘরগুলো বর্ণিলভাবে রং করা।

গ্রামটিতে নেই কোনো সড়ক। সেখানে পৌঁছানোর উপায় হলো হেলিকপ্টার, নৌকা (গ্রীষ্মকালে) ও স্নোমোবাইল নামের যানে চড়া। এ ছাড়া প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে নের্লেরিট ইনাট বিমানবন্দরগামী ফ্লাইটে চড়েও যাওয়া যায়। এ ফ্লাইট সপ্তাহে দুবার হয়। এর মধ্যে একটি আসে আইসল্যান্ড থেকে, আর অন্যটি পশ্চিম গ্রিনল্যান্ড থেকে।

ইতোকোর্তোরমিতের খুব কাছাকাছি কোনো গ্রাম বা শহর নেই। এর সবচেয়ে নিকটবর্তী শহরের অবস্থান প্রায় ৮০০ কিলোমিটার দূরে। গ্রামের আশপাশের এলাকা বরফময়। সেখানকার হিমশৈলে বাস করে মেরুভালুক (পোলার বিয়ার), মাস্ক অক্স আর লাখ লাখ সামুদ্রিক পাখি।

বছরের নয় মাস গ্রামটি সাগরের পানিজমা বরফে ঢাকা থাকে। ইতোকোর্তোরমিতের আদিবাসী গোষ্ঠী ইনুইটরা তখন কুকুরে টানা স্লেজ বাহন ব্যবহার করে বরফের ওপর ভ্রমণ করে এবং শিকারের খোঁজ করে।

২০২৫ সালে গ্রামটির শতবর্ষ উদ্‌যাপিত হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এখানে জনসংখ্যা কমতে দেখা গেছে। কিছু হিসাব অনুসারে, ২০০৬ সালের পর জনসংখ্যা প্রায় ৩৫ শতাংশ কমে গেছে।

কারণ হচ্ছে, পূর্বসূরিদের শিকারনির্ভর জীবনধারা থেকে বের হয়ে নতুন ধরনের পেশার খোঁজে কিংবা পড়াশোনা করতে তরুণেরা শহরে চলে যাচ্ছেন। তা ছাড়া, উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে আশপাশের সাগরের বরফ জমতে বেশি সময় নিচ্ছে এবং দ্রুত গলে যাচ্ছে।

এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র বারবারই ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছে। সব মিলে ইতোকোর্তোরমিত এখন দুটো বড় সমস্যার মুখোমুখি। একটি হলো জলবায়ু পরিবর্তন এবং অন্যটি হলো ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা।

আলোকচিত্রী কেভিন হল লিখেছেন, ইতোকোর্তোরমিতে প্রচণ্ড শীতের মধ্যে ভ্রমণ করাটা শুধু রোমাঞ্চকর অভিযানই ছিল না, এটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং অভিজ্ঞতাগুলোর একটি।

কেভিন প্রথমে আইসল্যান্ড থেকে ফ্লাইটে করে নের্লেরিট ইনাট বিমানবন্দরে পৌঁছান। এর পর তিনি জমে থাকা বরফের ওপর পাঁচ দিন কাটিয়েছেন। সেখানকার তাপমাত্রা মাইনাস ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যেত।

কেভিন হল লিখেছেন, ‘আমি কুকুরে টানা স্লেজ বাহনে ভ্রমণ করেছি, তাঁবু ও শিকারিদের ছোট কুটিরে ঘুমিয়েছি। সেখানে ছিল না বিছানা, চলমান পানিপ্রবাহ, উষ্ণতা বা অন্য কোনো সুবিধা। আমি ঘণ্টায় ৮০ মিটার গতির বাতাস আর তুষারঝড়ের মধ্যে ৪৫ কিলোমিটার এলাকা স্নোমোবাইলে পার হয়েছি।’

কেভিনের মতে, এটি নিতান্তই একটি ফটোগ্রাফি অভিযান ছিল না, বরং এটি পৃথিবীর সবচেয়ে দূরবর্তী অঞ্চলে মানুষের জীবনযাপনের বিরল চিত্রটা একঝলক দেখার সুযোগ দিয়েছে। এ ছাড়া ইতোকোর্তোরমিতের বাসিন্দারা কীভাবে দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে সংগ্রাম করছেন, তা–ও জানার সুযোগ হয়েছে।

চরম ঠান্ডার সঙ্গে বসবাস

কেভিন হলের জন্য এই ভ্রমণের ব্যবস্থা করেছিলেন খ্যাতিমান আলোকচিত্রী জোশুয়া হোলকো। তিনি ওগে ড্যানিয়েলসেন ও মানাসে টুকো নামের দুজন স্থানীয় ইনুইট গাইডের ব্যবস্থা করেন। কুকুরে টানা স্লেজে করে কেভিনসহ তিনজন আলোকচিত্রীকে নের্লেরিট ইনাট বিমানবন্দর থেকে ইতোকোর্তোরমিতে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁদের লক্ষ্য ছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে নির্জন ও বিস্ময়কর মেরুপ্রকৃতির ছবি তোলা।

ভ্রমণের শুরুর দিকের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে কেভিন হল লিখেছেন, ‘প্রথম রাতেই আমরা বিমানবন্দরের কাছাকাছি ছোট ছোট তাঁবুতে ক্যাম্প করি। তখন তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তাপমাত্রা ক্রমাগত নামছিল।

ড্যানিয়েলসেন ও টুকো বরফের ওপর জমে থাকা কড মাছ কাঠমিস্ত্রির মতো করে করাত দিয়ে কেটে নেন এবং গলানো বরফের পানি গরম করে সেখানে তা (মাছ) সেদ্ধ করেন। তাঁরা বললেন, রাতের খাবার প্রস্তুত। মাছ সুস্বাদু ছিল, যদিও অনেক কাঁটা ছিল। কিন্তু আমাদের আসল চিন্তা ছিল, সামনে কী অপেক্ষা করছে।’

কেভিন লিখেছেন, তিনি এর আগে কখনো এমন শীত অনুভব করেননি। রাতে যখন তাঁরা গুটিসুটি মেরে শুয়ে ছিলেন, তখন প্রবল বাতাসে তাঁবু কাঁপছিল। স্লেজ টানার কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ করছিল।

কেভিন বলেন, তাঁর ধারণা, উত্তর মেরু অঞ্চলের শিয়াল বা ভালুক তখন সেদিক দিয়ে চলাচল করছিল। তাপমাত্রা আরও কমতে থাকলে তাঁর পায়ে টান ধরে যায়।

কেভিন হলের মতে, এটা ছিল সত্যিকার অর্থেই ঠান্ডায় দীক্ষা নেওয়ার মতো এক অভিজ্ঞতা।

জাতীয় প্রতীক

পরদিন সকালে নাশতার পরপরই ড্যানিয়েলসেন ও টুকো তাঁদের সঙ্গে থাকা মালামাল গুছিয়ে নিতে শুরু করেন। তাঁরা ব্যাগ, কুলার বক্স, ক্যামেরার কেস, কুকুরের খাবারসহ আরও বিভিন্ন জিনিসপত্র স্লেজে তুলে শক্ত করে বেঁধে ফেলেন।

এরপর একেকটি স্লেজে দুজন করে বসলেন। সামনে ছিলেন একজন গাইড, যিনি স্লেজটানা কুকুরগুলোকে পরিচালনা করতেন। পরবর্তী ছয় দিন ধরে প্রতিটি স্লেজে নিযুক্ত ১২টি গ্রিনল্যান্ড স্লেজ কুকুর ৪৫০ কিলোগ্রামের বেশি বোঝা টেনে নিয়েছে। প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত দৌড়েছে তারা।

এই আদুরে প্রাণীগুলোকে গ্রিনল্যান্ডের ইনুইট ভাষায় ‘কিম্মিত’ নামে ডাকা হয়। ইনুইটদের আদিগোষ্ঠীর মানুষেরা বড় ও হাস্কি জাতের এই কুকুরকে প্রায় এক হাজার বছর আগে সাইবেরিয়া থেকে গ্রিনল্যান্ডে নিয়ে এসেছিল বলে ধারণা করা হয়। বর্তমানে এগুলো গ্রিনল্যান্ডে একধরনের জাতীয় প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

এক সকালে স্লেজে করে ইতোকোর্তোরমিত গ্রাম থেকে ১০ কিলোমিটার পশ্চিমের দিকে যাওয়ার সময় কেভিন হলরা দূরের একটি পাহাড়ের চূড়ায় চারটি মাস্ক অক্সকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন।

মাস্ক অক্স দেখতে কেমন, সেটার বর্ণনা দিয়ে কেভিন হল লিখেছেন, প্রায় ৪০০ কেজি ওজনের এই প্রাগৈতিহাসিক চেহারার প্রাণীগুলোর গাল থেকে বেরিয়ে থাকা ছোট শিং আর শক্ত বাতাসে উড়তে থাকা লম্বা কালো-বাদামি লোমের আবরণ—সব মিলিয়ে তারা যেমন ভয়ংকর, তেমনি দারুণ ফটোজেনিক।

কেভিন হল ও তাঁর সঙ্গীরা স্লেজ থেকে নেমে অত্যন্ত সতর্কভাবে এগোতে শুরু করেন। কারণ, হোলকো তাঁদের আগেই সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে বরফযুগের এই জীবাশ্মসদৃশ প্রাণীগুলো খুব সহজেই চমকে ওঠে এবং আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে। খুব দ্রুত নড়াচড়া করলে তারা পালিয়ে যাবে, আবার খুব কাছে গেলে সোজা তেড়ে আসতে পারে।

কেভিন লিখেছেন, ‘বিশালাকার প্রাণীগুলোর ছবি তুলতে প্রায় এক ঘণ্টা কাটানোর পর তারা ধীরে ধীরে পাহাড়ি পথের আরও উঁচু দিকে উঠে যেতে শুরু করল। হয়তো তারা জানত, ইতোকোর্তোরমিত এলাকায় তাদের স্থানীয়ভাবে সুস্বাদু খাদ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।’

শিকারি

তৃতীয় দিনে কেভিন হলকে ড্যানিয়েলসেন জানালেন যে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে তাঁর একটি কুঁড়েঘর আছে। সেখানে দুটি রাত কাটানোর আমন্ত্রণ জানান তিনি। কুঁড়েঘরটির অবস্থান এমন এক জায়গায় যে আমন্ত্রণ পাওয়ামাত্রই কেভিন হল রাজি হয়ে যান। কারণ, তাঁর মনে হলো, ওখানে গেলে জমে থাকা বরফের ওপর মেরুভালুকের দেখা পাওয়া যেতে পারে।

ড্যানিয়েলসেনের কুঁড়েঘরটি ছিল উজ্জ্বল নীল রঙে রাঙানো। ভেতরে আছে ছোট একটি সোফা, একটি চেয়ার, একটি সিঙ্ক, একটি চুলা আর একটি টয়লেট।

ড্যানিয়েলসেন যদিও আয়ের বাড়তি উৎস হিসেবে গাইডের কাজ করেন, তবে শিকার করাই তাঁর আসল ভালোবাসা, পেশা ও বংশানুক্রমিক ঐতিহ্য। সেখানকার আইনে শিকারিদের শিকার করা প্রাণীর মাংস বা চামড়া বিক্রি করার অনুমতি নেই। মাস্ক অক্সের ক্ষেত্রে তো সেগুলো দেশের বাইরে নেওয়াও নিষেধ।

আইন অনুযায়ী, শিকার করা মাংস কেবল পরিবারের খাবার ও পোশাকের প্রয়োজনে ব্যবহার করা যায়, ঠিক যেমনটা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে হয়ে আসছে।

ড্যানিয়েলসেনের কুঁড়েঘর থেকে কেভিন হলরা প্রায় ২০ কিলোমিটার পূর্ব দিকে যাত্রা শুরু করেন। পাঁচ দিন ভ্রমণের পর তাঁরা ক্যাপ হোপে পৌঁছান। এটি ইতোকোর্তোরমিত থেকে ১৪ কিলোমিটার পশ্চিমে ছোট একটি বসতি। সেখানে প্রায় ২০টি পুরোনো কুঁড়েঘর রয়েছে। রাতে তাঁরা সেখানেই ঘুমিয়েছেন।

পরদিন সকালে দেখা মিলল মেরুভালুকের। ড্যানিয়েলসেন দুরবিন দিয়ে তাকিয়ে হঠাৎ চিৎকার করলেন, ‘পোলার বিয়ার! পোলার বিয়ার!’ কেলভিনরা তখন ছবি তোলার প্রস্তুতি নেন। ভালুকটি প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে বরফের ওপর দাঁড়িয়ে ২০ মিনিট কাটায়, তারপর ধীরে ধীরে চলে যায়।

আলোকচিত্রী জোশুয়া হোলকোর কাছ থেকে গল্প শুনে আরেক ধরনের মেরুভালুকের ছবি তুলতে চেয়েছিলেন কেভিন হল। সাদা লোমের ওই মেরুভালুককে ‘আর্কটিক অঞ্চলের ভূত’ নামে ডাকা হয়। কারণ, তাদের সাদা লোম এত নিখুঁতভাবে আশপাশের পরিবেশের সঙ্গে মিশে যায় যে এদের খালি চোখে দেখা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে কেভিন হল ওই ভালুকদের দেখা পাননি।

পৃথিবীর প্রান্তভাগের জীবনধারা

কেভিন হলের তথ্য অনুসারে, পায়ে হেঁটে ইতোকোর্তোরমিত গ্রামের পুরোটা ঘুরে বেড়াতে আধা ঘণ্টার মতো সময় লাগে। এখানে আছে একটি গির্জা, ছোট একটি ট্রাভেল এজেন্সি, পুলিশ স্টেশন, একটি বার, একটি অতিথিশালা, একটি হেলিপোর্ট এবং পিলেরুইসোক নামের একটি ছোট সুপারমার্কেট। এই সুপারমার্কেটে প্রতি মৌসুমে মাত্র দুটি জাহাজে করে পণ্য আসে।

দোকানের প্রায় ফাঁকা তাক ঘুরে দেখে আমার চোখে পড়ে, সবকিছুর দাম অস্বাভাবিক বেশি। তখন ভাবি, যেখানে কাজের সুযোগ খুব কম, সেখানে স্থানীয় মানুষ এসব জিনিস কিনে কীভাবে চলে?

সবশেষে কেভিন হল লিখেছেন, বাইরে বেরিয়ে অনেক বাড়ির পাশে ঝুলতে থাকা মেরুভালুকের চামড়া আমাকে এই সম্প্রদায়ের শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। আমি এই অভিযানে এসেছিলাম বন্য প্রাণীর অনন্য ছবি তুলতে। এ যাত্রায় তথাকথিত ‘আর্কটিক অঞ্চলের ভূত’দের দেখা না পেলেও তাতে আফসোস নেই। কারণ, এর চেয়ে বেশি কিছু আমি পেয়েছি। পৃথিবীর সবচেয়ে দূরবর্তী একটা স্থানে মানুষ কীভাবে জীবন চালিয়ে যায়, তা আমি উপলব্ধি করতে পেরেছি।’

ইতোকোর্তোরমিত গ্রাম
ইতোকোর্তোরমিত গ্রাম। ছবি: এএফপি ফাইল ছবি

নৈতিক মানদণ্ডে বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রের অবস্থান কোথায় by নুরুল হুদা সাকিব ও মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান

১৯৯৪ সালে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে একটি আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জন মেজর ‘জনজীবনে নৈতিক মানদণ্ড’ নির্ধারণের লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করেন। লর্ড নোলানের নেতৃত্বে গঠন করা সেই কমিটি তাদের প্রথম প্রতিবেদনে ‘জনজীবনের সাতটি নীতি’ উপস্থাপন করে, যা মূলত জনসেবায় যুক্ত ব্যক্তিদের জন্য নৈতিক দিকনির্দেশনা হিসেবে প্রণীত।

লর্ড নোলান এই নীতিগুলোকে জনজীবনে সততা, দায়িত্ববোধ ও স্বচ্ছতার ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেন, যাতে জনসেবার কাজে যাঁরা সম্পৃক্ত, তাঁরা নিজেদের আচরণে এসব মূল্যবোধ ধারণ করতে পারেন। এই সাত নীতি যথাক্রমে সততা, নৈতিকতা, নিরপেক্ষতা, জবাবদিহি, নিঃস্বার্থতা, স্বচ্ছতা ও নেতৃত্ব। এগুলো এখন বিশ্বের বহু দেশের প্রশাসনিক নীতিশিক্ষার ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

বাংলাদেশেও বিভিন্ন সময় নোলান কমিটির এই নীতিগুলো নিয়ে আলোচনা শোনা গেছে। যুক্তরাজ্যের মতো যদিও এখানে আনুষ্ঠানিকভাবে এই নীতিগুলো গ্রহণ করা হয়নি। এরপরও জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল, তথ্য অধিকার আইন, দুর্নীতি দমন ও সুশাসনের বিভিন্ন নীতিমালায় এগুলোর প্রভাব স্পষ্ট।

এসব নীতি আমাদের প্রশাসন/আমলাতন্ত্রে নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ভিত্তি গঠনে সহায়ক হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু বাস্তব প্রেক্ষাপটে চিত্রটি ভিন্ন। আমলাতন্ত্রে রাজনৈতিক প্রভাব, দলীয় আনুগত্যভিত্তিক নিয়োগ ও নৈতিক শিথিলতা প্রশাসনিক কাঠামোকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। নোলান কমিটির সাতটি নীতির আলোকে বাংলাদেশের প্রশাসন পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয়, কীভাবে জনসেবামুখী প্রশাসন ধীরে ধীরে ক্ষমতাকেন্দ্রিক ও স্বার্থান্বেষী ব্যবস্থায় রূপ নিয়েছে।

ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার ও প্রশাসনিক সংস্কৃতি

বাংলাদেশের মূল প্রশাসনিক কাঠামো বা আমলাতন্ত্র হলো রাষ্ট্র পরিচালনার মূল চালিকা শক্তি। কিন্তু এই কাঠামো কতটা জনস্বার্থে নিবেদিত? নোলান কমিটির দেওয়া সরকারি দায়িত্বে নৈতিকতার সাতটি নীতি গ্রহণ করে বিশ্বজুড়ে অপরাপর দেশসমূহ সংস্কার ও পরিবর্তনের পথে হাঁটতে পারলেও বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই নীতিগুলোর প্রতিফলন কতটা ঘটেছে?

বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রের শিকড় ঔপনিবেশিক আমলে প্রোথিত। ব্রিটিশ প্রশাসনের উদ্দেশ্য ছিল জনগণের সেবা নয়; বরং শাসন ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ক্ষমতা সংরক্ষণ। পাকিস্তান আমলেও সেই কেন্দ্রীকৃত ও কর্তৃত্বমূলক প্রশাসনিক ধারা অব্যাহত থাকে।

স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় কাঠামো বদলালেও প্রশাসনের মৌলিক চরিত্রে তেমন পরিবর্তন আসেনি। শাসক পরিবর্তিত হলেও শাসনের ধরন রয়ে গেছে প্রায় একই। ফলে জনসেবার চেতনা স্থান করে নিয়েছে ক্ষমতার আনুগত্য ও প্রভাবের রাজনীতি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দলীয় প্রভাব, আনুগত্যের বিনিময়ে পদোন্নতির সংস্কৃতি এবং ‘ফাইলনির্ভর’ প্রশাসনিক জটিলতা।

সততা ও নৈতিকতার কাঠামোগত অবমূল্যায়ন

নোলানের প্রথম দুটি নীতি—সততা ও নৈতিকতা; জনসেবায় ন্যায্যতা, দায়বদ্ধতা ও নৈতিক সাহসের প্রতীক। কিন্তু বাংলাদেশের প্রশাসনিক বাস্তবতা এ নীতিগুলোর প্রায় বিপরীত চিত্র উপস্থাপন করে।

যেমন পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তা সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ সত্ত্বেও তিনি কর্মজীবনে একাধিক রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ও পদোন্নতি পেয়েছেন। সরকারি দায়িত্বে থেকে ব্যবসায়িক প্রভাব বিস্তার ও অবৈধ সম্পদ গঠনের অভিযোগে অভিযুক্ত হলেও প্রশাসন তাঁর বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। ২০২০-২১ সালে সততাসহ নানা গুণের কারণে তিনি রাষ্ট্রীয় শুদ্ধাচার পুরস্কার পান।

অপর দিকে দুদকের কর্মকর্তা শরীফ উদ্দিনের ঘটনা সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরে। বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অনুসন্ধান করায় তাঁকে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। সম্প্রতি আদালত অবশ্য চাকরিচ্যুতি বেআইনি ঘোষণা করে তাঁকে পুনর্বহালের নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু এটি আমাদের প্রশাসনে সৎ কর্মকর্তাদের পরিণতির বিষয়ে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে রইল।

এই দুই বিপরীত ঘটনা দেখায়, বাংলাদেশে সততা ও নৈতিকতা শুধু উপেক্ষিত নয়; বরং কাঠামোগতভাবে দুর্বল করে রাখা হয়েছে। দুর্নীতিবাজেরা পুরস্কৃত হন আর নৈতিক সাহস দেখানো কর্মকর্তারা শাস্তি পান। ফলে প্রশাসনে এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে সততার চেয়ে আনুগত্য ও আপসকেই নিরাপদ পথ হিসেবে দেখা হয়।

নিরপেক্ষতার সংকট অথবা দলীয় আনুগত্যে পেশাদারত্বের অবক্ষয়

নোলানের তৃতীয় নীতি হলো নিরপেক্ষতা। অর্থাৎ দল–মতনির্বিশেষে যোগ্যতা ও ন্যায়ের ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া, যা বাংলাদেশের প্রশাসনিক বাস্তবতায় আজ বিলুপ্তপ্রায়। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রশাসন ক্রমে একদলীয় আনুগত্যভিত্তিক কাঠামোয় পরিণত হয়, যেখানে কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও সুবিধা নির্ধারিত হতো তাঁদের রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে।

বিশেষ করে ২০২৪ সালের পাতানো নির্বাচনে অনেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা প্রকাশ্যে ক্ষমতাসীন দলের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করেছেন, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় দলীয় প্রার্থীদের সহায়তা দিয়েছেন—এমন অভিযোগ একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে আসে। অন্যদিকে ভিন্ন রাজনৈতিক মতাবলম্বী বা নিরপেক্ষ কর্মকর্তারা বঞ্চনা, বদলি, এমনকি প্রশাসনিক নিপীড়নের মুখে পড়েছেন।

ফলে প্রশাসন ধীরে ধীরে একটি দলীয় আনুগত্যনির্ভর কাঠামোতে পরিণত হয়েছে, যেখানে পেশাগত দক্ষতা নয়; বরং রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতাই সাফল্যের পূর্বশর্তে পরিণত হয়েছে, যা নোলানের নিরপেক্ষতার নীতির পরিপন্থী।

জবাবদিহির ভাঙা কাঠামো ও সামষ্টিক বিপর্যয়

নোলানের চতুর্থ নীতি জবাবদিহি আজ বাংলাদেশের প্রশাসনিক বাস্তবতায় প্রায় অকার্যকর। অধিকাংশ তদারকি প্রতিষ্ঠানই স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতিগ্রস্ত সিন্ডিকেটে আবদ্ধ। ফলে অভ্যন্তরীণ জবাবদিহির ব্যবস্থা দিয়ে অসৎ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বাহ্যিক তদারকি সংস্থা যেমন দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।

অপেক্ষাকৃত দুর্বল কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিলেও প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তি বা মহলের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার বহু উদাহরণ রয়েছে। অন্যদিকে ন্যায়পালসহ স্বাধীন জবাবদিহি প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুপস্থিতি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতে আমাদের সামষ্টিক ব্যর্থতাকে আরও প্রকট করেছে। ফলে প্রশাসনে দায়বোধের পরিবর্তে বাধাহীন দুর্নীতির সংস্কৃতি শক্তিশালী হয়েছে।

জনস্বার্থ নয়, ব্যক্তিস্বার্থই মুখ্য

নোলানের নীতিসমূহের অন্যতম নীতি হলো নিঃস্বার্থতা, অর্থাৎ সরকারি দায়িত্ব পালনে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থ যেন প্রভাব ফেলতে না পারে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রশাসনে এই নীতি প্রায় অনুপস্থিত।

২০২৫ সালের শুরুতে অন্তর্বর্তী সরকার ৫৫০ কর্মকর্তাকে অতিরিক্ত বা ‘সুপারনিউমারারি’ পদে পদোন্নতি দেয়, যা অনুমোদিত শূন্য পদের চেয়ে বহুগুণ বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, এসব পদোন্নতির পেছনে যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য বা ব্যক্তিগত সম্পর্ক বড় ভূমিকা রেখেছে।

এতে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নষ্ট হচ্ছে এবং প্রশাসনিক দক্ষতা ও ন্যায্যতা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ দেখা দিচ্ছে। ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজের প্রেরণা হয়ে দাঁড়ায় নিজের অবস্থান রক্ষা, জনস্বার্থ নয়।

রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার জালে স্বচ্ছতা ও নেতৃত্বের সংকট

বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রে স্বচ্ছতা ও নেতৃত্ব—নোলান নীতির এই দুটি মৌলিক মূল্যবোধ এখন মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে। স্বচ্ছতার অর্থ হলো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যেন খোলামেলা প্রক্রিয়ায়, জবাবদিহির মাধ্যমে গৃহীত হয় এবং জনস্বার্থে পরিচালিত হয়।

কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রভাব ও অভ্যন্তরীণ পৃষ্ঠপোষকতা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে অস্বচ্ছ করে তুলছে। ২০২৪ সালে কক্সবাজারের ভূমি অধিগ্রহণ দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত এক কর্মকর্তাকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরিচালক হিসেবে নিয়োগের উদ্যোগ তার স্পষ্ট উদাহরণ। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এ ঘটনাকে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও নৈতিক নেতৃত্বের পরিপন্থী হিসেবে আখ্যা দেয়।

যখন অভিযোগে জড়িত ব্যক্তিরাও গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হন, তখন নেতৃত্বের নৈতিক মানদণ্ড ভেঙে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে নেতৃত্ব মানে দায়িত্ব ও সততার প্রতীক হওয়ার পরিবর্তে ক্ষমতাবানদের আনুগত্য প্রদর্শনের উপায়ে পরিণত হয়। ফলে প্রশাসনে স্বচ্ছতা দুর্বল হয় এবং প্রকৃত নেতৃত্বের বদলে গোষ্ঠীনির্ভর আনুগত্যের সংস্কৃতি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে ২০০৯ সালের তথ্য অধিকার আইন নাগরিকদের প্রশাসনিক তথ্য জানার সাংবিধানিক অধিকার দিলেও বেশির ভাগ দপ্তর এখনো গোপনীয়তাকে একটি ‘প্রতিরক্ষামূলক দেয়াল’ হিসেবে ব্যবহার করছে। ফলে দেখা যায়, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও খরচের স্বচ্ছতা যেখানে গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত হওয়া উচিত, সেখানে ‘গোপনীয়তা’ নীতিকে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক স্বার্থরক্ষার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

কীভাবে পরিবর্তন সম্ভব

বাংলাদেশের প্রশাসনে নৈতিকতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হলে শুধু আইন বা নির্দেশনা নয়, প্রয়োজন বাস্তব ও কাঠামোগত পরিবর্তন।

প্রথমত, নৈতিকতা ও জনসেবা মনোভাবকে প্রশাসনিক প্রশিক্ষণের মূল ভিত্তি করতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (বিপিএটিসি) ও পাবলিক সার্ভিস একাডেমির প্রশিক্ষণগুলোতে আইন, নীতি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ওপর জোর দেওয়া হলেও নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের চর্চা প্রায় অনুপস্থিত।

যুক্তরাজ্যে সিভিল সার্ভিসের প্রশিক্ষণে ‘এথিক্যাল লিডারশিপ’ বা নৈতিক নেতৃত্ব মডিউল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যেখানে কর্মকর্তারা বাস্তব জীবনের নৈতিক দ্বন্দ্ব নিয়ে আলোচনা করেন। যেমন রাজনৈতিক চাপ এলে কীভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত বজায় রেখে তা থেকে উত্তরণ করা যায়। অনুরূপভাবে দক্ষিণ কোরিয়ার অ্যান্টি করাপশন অ্যান্ড সিভিল রাইটস কমিশন (এসিআরসি) কর্মকর্তাদের জন্য নৈতিকতার ওপর নিয়মিত কর্মশালা আয়োজন করে সেখানে ব্যক্তিগত সততা, জনস্বার্থ রক্ষা ও নৈতিক নেতৃত্বকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শেখানো হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এ ধরনের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি প্রবর্তন করা গেলে কর্মকর্তাদের মানসিকতা ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করবে।

দ্বিতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে হবে। পদোন্নতি, বদলি ও মূল্যায়নে রাজনৈতিক প্রভাব দূর করে সততা, কর্মদক্ষতা ও নাগরিক সেবার মানদণ্ডে কর্মকর্তাদের বিচার করতে হবে। উদাহরণ হিসেবে সিঙ্গাপুরের সিভিল সার্ভিসকে নেওয়া যেতে পারে। সেখানে কর্মকর্তাদের বেতন উচ্চ হলেও প্রতিটি সিদ্ধান্ত স্বচ্ছ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হয়।

‘হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা আইন’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের নিরাপদভাবে অনিয়ম প্রকাশে উৎসাহিত করা যেতে পারে। যেমনটি হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে। একই সঙ্গে ই-গভর্ন্যান্স ও ওপেন ডেটা প্ল্যাটফর্ম চালুর মাধ্যমে নাগরিকদের তথ্য প্রাপ্তি ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা দরকার। ভারতের ‘আরটিআই অনলাইন’ বা এস্তোনিয়ার ই–গভর্নমেন্ট মডেল এর সফল উদাহরণ।

পরিশেষে শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা যদি নিজেদের আচরণে স্বচ্ছতা ও নৈতিক নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, তবে সেটি নিচের স্তরের কর্মচারীদের জন্যও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠবে। নৈতিক সংস্কৃতির এ রূপান্তর সময়সাপেক্ষ, কিন্তু এটি ছাড়া প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতার পুনর্গঠন সম্ভব নয়।

নৈতিকতার পথে ফেরা

বাংলাদেশের প্রশাসন ‘দক্ষ’, কিন্তু এই দক্ষতার প্রায় সবটুকু জনসেবার চেয়ে নির্দেশ পালনে বেশি ব্যবহৃত হয়। নোলানের সাতটি নীতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জনসেবা মানে কেবল নির্দেশ মানা নয়; বরং বিবেকবান হওয়া। যদি ব্রিটিশ প্রশাসন নোলানের নীতিসমূহের বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে নিজেদের পুনর্গঠিত করতে পারে, তবে বাংলাদেশও পারবে। এ জন্য দরকার নৈতিক প্রশাসনিক কাঠামো। যেখানে ক্ষমতার চেয়ে সততা, আনুগত্যের চেয়ে দায়িত্ব এবং ভয়ের চেয়ে ন্যায়ের মূল্য বেশি হবে।

আমলাতন্ত্রকে জনসেবায় ফিরিয়ে আনতে হলে আমাদের কাগুজে নীতির চেয়ে বাস্তব আচরণ ও সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। নৈতিকতা আইন দিয়ে চাপিয়ে দেওয়া যায় না। এটি গড়ে তুলতে হয় নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত, নাগরিকের দাবি ও প্রশাসনের আন্তরিকতার মাধ্যমে।

* নুরুল হুদা সাকিব, অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
* মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান, স্বাধীন গবেষক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
- মতামত লেখকদের নিজস্ব

নৈতিক মানদণ্ডে বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রের অবস্থান কোথায়

দাঁত দিয়ে জাহাজ টেনে তুললেন মাহরুস

মিশরের এক কুস্তিগীর দাঁত দিয়ে ৭০০ টন (৬৩৫,০০০ কেজি) ওজনের জাহাজ টেনে তুলেছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি বিশ্ব রেকর্ড গড়ার আশা করছেন। তিনি হলেন ৪৪ বছর বয়সী আশরাফ মাহরুস। তিনি ‘কাবোঙ্গা’ নামে পরিচিত এবং মিশরীয়দের কাছে ‘স্ট্রংম্যান’ নামেও খ্যাত। গত শনিবার লোহিত সাগরের হুরগাদা বন্দরে এই অবিশ্বাস্য কাণ্ড ঘটান তিনি। একটি জাহাজ টানার পর মাহরুস দাঁত দিয়ে একসঙ্গে আরও দুটি জাহাজ টানেন। এগুলোর মোট ওজন ছিল প্রায় ১১৫০ টন (১০,৪৩,০০০ কেজি)। এ খবর দিয়েছে অনলাইন স্কাই নিউজ। মাহরুস বলেন, আমি এসেছি বিশ্ব রেকর্ড ভাঙতে। আল্লাহর অশেষ রহমতে আমি দুটো জাহাজ টানতে পেরেছি, যাতে আমার বন্ধুরা ও পুরো বিশ্ব বুঝতে পারে, আল্লাহ আমাকে আশীর্বাদ করেছেন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষ বানিয়ে। মিশরের বন্দরনগরী ইসমাইলিয়ার এই কুস্তিগীর জানান, তিনি নিজের এই প্রচেষ্টার ভিডিও ও ছবি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস-এ পাঠাবেন।

বর্তমানে এই রেকর্ডটি ২০১৮ সালে একজন ব্যক্তি দাঁত দিয়ে ৬১৪ টন (৫,৫৭,০০০ কেজি) ওজনের জাহাজ টেনেছিলেন। এর আগেও মাহরুস একাধিক বিশ্ব রেকর্ডের মালিক। ২০২৫ সালের মার্চে তিনি দাঁত দিয়ে ২৭৯ টন (২,৫৩,১০৫ কেজি) ওজনের ট্রেন প্রায় ১০ মিটার (৩৩ ফুট) টেনে নিয়ে যান এবং গিনেস কর্তৃপক্ষ তাকে সবচেয়ে ভারী রেল টানার রেকর্ডধারী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তাকে আরও দুইটি প্রশংসাপত্র দেয়া হয়- সবচেয়ে ভারী লোকোমোটিভ টান এবং দ্রুততম ১০০ মিটার সড়কযান টান-এর জন্য। এর তিন বছর আগে, তিনি দাঁত দিয়ে ১৫,৭৩০ কেজি ওজনের ট্রাক টেনে বিশ্ব রেকর্ড গড়েন। শনিবারের চ্যালেঞ্জের আগে মাহরুস প্রতিদিন ছয় ঘণ্টা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তার খাদ্যতালিকায় ছিল প্রচুর প্রোটিন ও আয়রনসমৃদ্ধ খাবার। প্রতিদিন অন্তত এক ডজন ডিম, দুইটা সম্পূর্ণ মুরগি এবং ৫ কেজি মাছ। ৬ ফুট ৩ ইঞ্চি (১.৯ মিটার) লম্বা ও ১৫৫ কেজি (৩৪১ পাউন্ড) ওজনের এই শক্তিশালী মানুষ বলেন, ছোটবেলাতেই তিনি নিজের অস্বাভাবিক শক্তির প্রমাণ পেয়েছিলেন। নয় বছর বয়সে তিনি টাকার বিনিময়ে ভারী জিনিস টানতেন। একবার খেলতে গিয়ে বন্ধুর হাত ভেঙে ফেলেছিলেন শুধুমাত্র টান দেয়ার সময়! ছোটবেলা থেকেই তিনি খেলাধুলা ভালোবাসতেন- কুংফু, কিকবক্সিং শিখেছেন। এমনকি কায়রোতে নিজের রেসলিং টিম গঠন করেন।

তার বন্ধুরা একবার দেখেছিলেন, তিনি জিমের এক ফাঁকা প্রাঙ্গণে বিশাল ট্রাকের টায়ার পরপর দশবার উল্টে দেন, এমনকি এক আঙুলে একটি গাড়ি ঠেলে দেন। তখনই বন্ধুরা তাকে বিশ্ব রেকর্ডের চেষ্টায় উৎসাহ দেন। মাহরুস বলেন, তিনি কোনো সাপ্লিমেন্ট খাবার খান না। কিন্তু প্রতিদিন দুইবার ব্যায়াম করেন এবং যথেষ্ট ঘুমান। তার পরবর্তী লক্ষ্য আরও অবিশ্বাস্য। তিনি মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসির কাছে অনুমতি চাইবেন একটি সাবমেরিন টানার জন্য। ভবিষ্যতে তিনি শুধু চোখের পাতার পেশি দিয়ে বিমান টানার পরিকল্পনাও করছেন! মাহরুস বিশ্বাস করেন, তিনি যেসব বস্তু টানেন, সেগুলোর সঙ্গে আগে কথা বলা জরুরি। এতেই নাকি বস্তুটির সঙ্গে তার হৃদস্পন্দনের একধরনের সংযোগ তৈরি হয়। তার ভাষায়, আমি যে জিনিসটি টানব, তাকে আমার শরীরের অংশ মনে করি। তখন সেটি আমার হৃদস্পন্দনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোয়- এটাই আমার সাফল্যের রহস্য।

mzamin

ঈদে শিশুদের জন্য কী পোশাক এল by ফারদীন–ই–হাসান ফুয়াদ

থিমভিত্তিক নকশায় মেয়ে ও ছেলেশিশুদের জন্য ফ্যাশন হাউসগুলো এনেছে সালোয়ার-কামিজ, ফ্রক, গাউন, পাঞ্জাবি, কাবলি, শার্ট, টি-শার্ট! আর ঈদ যেহেতু গরমে হচ্ছে, তাই স্টাইলের পাশাপাশি স্বস্তির দিকটাও খেয়াল রাখা হয়েছে।

গরমে আরামদায়ক কাপড়

ঈদপোশাকে প্রধানত সুতি, লিনেন ও ভিসকস—এই তিন ধরনের কাপড় প্রাধান্য পেয়েছে। তবে সুতি কাপড়ই সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া ডাবল জর্জেট, সাটিন সিল্ক, সিল্কও ব্যবহার করা হয়েছে।

মেয়েশিশুদের জন্য আছে সালোয়ার-কামিজ, ফ্রক, টিউনিক, ঘাগরা-চোলি, ওয়ান–পিস, টু–পিস ও থ্রি–পিস স্যুট। আরও আছে সারারা, খাটো কামিজ, ফারসি এবং লেহেঙ্গা ধাঁচের স্কার্ট। আগে ফ্রক ও টিউনিকের চাহিদা বেশি থাকলেও এবার সালোয়ার-কামিজ আর ঘাগরা-চোলির দিকেই ঝোঁক বেশি।

ছেলেশিশুদের জন্য আছে পাঞ্জাবি, পায়জামা, কাবলি, টি-শার্ট, পোলো শার্ট ও ফতুয়া। এ ছাড়া আছে হাফহাতা, ফুলহাতা এবং থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট।

পোশাকে উজ্জ্বল রং

গরমকে মাথায় রেখে পোশাকের রং বাছাই করা হয়েছে। মেয়েশিশুদের পোশাকে প্রাধান্য পেয়েছে উজ্জ্বল রং। ফিরোজা, লাল, কমলা, গোলাপি ও বেগুনির বিভিন্ন শেড ব্যবহার করা হয়েছে।

ছেলেশিশুদের ঈদপোশাকগুলো মোজাইক থিমে করা হয়েছে। নীল, ধূসর, বাদামি এবং রাস্টিক অরেঞ্জ রংগুলো প্রাধান্য পেয়েছে। শার্ট ও পাঞ্জাবির জন্য ব্যবহার করা হয়েছে সুতি এবং ভিসকস কাপড়। পাঞ্জাবির মোটিফে আছে স্ট্রাইপ, সঙ্গে আছে রঙিন কোটি।

নকশা

শিশুদের আগ্রহোদ্দীপক বিষয়গুলো স্ক্রিন প্রিন্টের মাধ্যমে ছেলেশিশুদের শার্টে তুলে আনা হয়েছে। শার্ট ও টি-শার্টে বিভিন্ন ধরনের কার্টুন এবং অ্যানিমেশন চরিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের প্যাচওয়ার্কও করা হয়েছে। আজরাক ও বোহো থিমকে কেন্দ্র করে পোশাকে নকশা এসেছে।

পাঞ্জাবিতে আজরাক থিমের প্রিন্টে নকশা করা হয়েছে। এতে জারদৌসি, কারচুপির কাজও আছে। বোহো থিমে শার্ট, টি-শার্ট, পোলো শার্ট এবং মেয়েদের টপ নকশা করা হয়েছে। স্পিডবোট, তরমুজ, কলা—এসব মোটিফ কমিকধাঁচে শিশুদের পোশাকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

কাট ও প্যাটার্ন

মেয়েশিশুদের পোশাকের প্যাটার্নে লেয়ারিং, ফ্লেয়ার গুরুত্ব পেয়েছে। স্তরভিত্তিক নকশাও আছে। যেমন অরগাঞ্জা কিংবা টিস্যু কাপড়ের সঙ্গে জর্জেট, ভিসকস বা সাটিন কাপড়ের স্তর। হাতায় এসেছে বৈচিত্র্য—পাফ হাতা, লেয়ারড হাতা, সার্কুলার হাতা, বেলুন আকৃতি দেখা যাচ্ছে। মেয়েশিশুদের পোশাকে এমব্রয়ডারি, কাচের কাজ, জারদৌসি এবং কারচুপির কাজ করা হয়েছে।

শিশুদের পোশাকে স্টাইলের পাশাপাশি স্বস্তির দিকটাও খেয়াল রাখা হয়েছে। মডেল: জারিস বিন জায়েদ, আমায়রা রহমান। পোশাক: ক্লাব হাউস
শিশুদের পোশাকে স্টাইলের পাশাপাশি স্বস্তির দিকটাও খেয়াল রাখা হয়েছে। মডেল: জারিস বিন জায়েদ, আমায়রা রহমান। পোশাক: ক্লাব হাউস। ছবি: কবির হোসেন

শহরের কাছেই পাহাড়–ঝরনা ও সাগর–হ্রদ, ঘুরে আসুন এক দিনে by কৃষ্ণ চন্দ্র দাস

পাহাড় বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে ঝরনার পানি। পাশেই আঁকাবাঁকা হ্রদ। একটু দূরে সমুদ্রসৈকত ঘেঁষে ছোটাছুটি করছে নৌকা। এমন সব দৃশ্যের দেখা মেলে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে। পাহাড়–ঝরনা ও সাগর–হ্রদ সবকিছুই রয়েছে এই উপজেলায়। ফলে সীতাকুণ্ডে ভ্রমণে এসে খুব অল্প সময়েই মুগ্ধ হন পর্যটকেরা।

সীতাকুণ্ডে বেড়ানোর উপযুক্ত সময় বর্ষা থেকে শীত মৌসুম। বর্ষায় পানিতে টইটম্বুর থাকে ঝরনা। তবে এ সময় ভ্রমণ কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাই শীত মৌসুমকেই নিরাপদ ভ্রমণ ও ট্রেকিংয়ের উপযুক্ত সময় হিসেবে বেছে নেন পর্যটকেরা। শীতল আবহাওয়ার কারণে এ সময় পাহাড়, জঙ্গল ও বনবাদাড়ে ঘুরে বেড়াতে ক্লান্তি লাগে না। সহজেই পাহাড়ে বেয়ে ওপরে ওঠা যায়।

সীতাকুণ্ডের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ক। মহাসড়কের পূর্ব পাশে সারি সারি পাহাড়। আর সেখানেই রয়েছে ঝরনা ও হ্রদ। পাহাড়গুলোয় হনুমান–বানরসহ বন্য প্রাণীর ছোটাছুটি, ঝিঁঝি পোকার ডাক ও পাখির কলতান উপভোগ করা যায়। আর পশ্চিম দিকে সমুদ্রসৈকত। সেখানে বসে উপভোগ করা যায় লাল কাঁকড়ার ছোটাছুটি, সাগরের গর্জন ও মাছ ধরার নৌকাসহ মনোরম নানা দৃশ্য।

সীতাকুণ্ড উপজেলাটি চট্টগ্রাম নগরের পাশেই। ফলে চট্টগ্রাম নগর থেকে মাত্র এক দিনেই সীতাকুণ্ডের পাহাড়–ঝরনা ও সাগর–হ্রদের দৃশ্য উপভোগের সুযোগ রয়েছে। তবে সময় থাকলে দুই থেকে তিন দিনের ভ্রমণের পরিকল্পনাও নিতে পারেন। একটু আগেভাগে কোথায়, কীভাবে যাবেন—এসব ঠিক করে রাখলে ভ্রমণ যেমন আনন্দদায়ক হবে, তেমনি খরচও কম হবে।

সীতাকুণ্ডে ভ্রমণের ক্ষেত্রে পাহাড় ট্রেকিং ও ঝরনা–হ্রদ সকালে ঘুরে দেখাই ভালো। তাহলে বিকেলে সমুদ্রসৈকতে ঘুরে বেড়ানো যায়। সাগরপাড়ে বসে দেখা যায় সূর্যাস্তের দৃশ্য।

সীতাকুণ্ডে মোট আটটি ঝরনা রয়েছে। ঝরনাগুলো হলো সহস্রধারা–১, রূপসী ঝরনা, সুপ্তধারা, সহস্রধারা–২, মধুখাইয়া, বাড়বকুণ্ডের অগ্নিকুণ্ড, বাঁশবাড়িয়া বিলাসী ঝরনা ও কুমারীকুণ্ড। এর মধ্যে সহজেই সহস্রধারা–২ ঝরনাটিতে যেতে পারেন পর্যটকেরা। কিন্তু অন্য সাতটি ঝরনায় যেতে হলে পর্যটকদের পাহাড় ডিঙিয়ে যেতে হয়। পাহাড় ডিঙিয়ে ঝরনার কাছে যাওয়ার রোমাঞ্চকর যাত্রা পর্যটকেরা বেশ উপভোগ করেন। সীতাকুণ্ডে ঘুরে বেড়ানোর মতো তিনটি সমুদ্রসৈকত রয়েছে। এর মধ্যে আকিলপুর ও বাঁশবাড়িয়া সমুদ্রসৈকত বালুময়। এর বাইরে গুলিয়াখালী সৈকতটি ম্যানগ্রোভ বনযুক্ত।

কম পরিশ্রমে ঝরনা, হ্রদ ও সমুদ্রসৈকত দেখতে এক দিনের ভ্রমণের পরিকল্পনায় রাখতে পারেন সহস্রধারা ঝরনা–২ ও লবণাক্ষ হ্রদ ও গুলিয়াখালী সমুদ্রসৈকত। তবে কিছুটা পরিশ্রম করলে এর সঙ্গে বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্কের সুপ্তধারা ঝরনা ও সহস্রধারা ঝরনা–১ ঘুরে আসা যায়। সীতাকুণ্ডে পর্যটকদের জন্য কিছুটা কষ্টকর যাত্রা হয় চন্দ্রনাথ পাহাড় ও মন্দির, রূপসী ঝরনা ও বিলাসী ঝরনায় যাওয়ার ক্ষেত্রে। তবে সুবিধা হলো সীতাকুণ্ডের সব পর্যটন স্পটই মাত্র ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে।

সীতাকুণ্ডে যাওয়া ও থাকা

ঢাকা কিংবা চট্টগ্রাম থেকে যেকোনো বাসযোগে সীতাকুণ্ড পৌর সদরের বাসস্ট্যান্ডে নামতে হবে। চট্টগ্রাম নগর থেকে যেতে খুব একটা সময় লাগে না। তাই দূরের পর্যটকেরা চট্টগ্রাম নগরে রাতযাপন করে সীতাকুণ্ডে ঘুরে বেড়াতে পারেন। তবে সীতাকুণ্ডেও বিভিন্ন মানের ১৯টি হোটেল রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে ১০টি হোমস্টে। ৩০০ থেকে ১ হাজার টাকার মধ্যেই কক্ষ ভাড়া পাওয়া যায়।

ভ্রমণ পরিকল্পনা–১

ঝামেলা এড়িয়ে কম পরিশ্রমে এক দিনের পরিকল্পনায় রাখতে পারেন সহস্রধারা ঝরনা–২, লবণাক্ষ হ্রদ ও গুলিয়াখালী সৈকতে ঘুরে বেড়ানো। লবণাক্ষ হ্রদ ও সহস্রধারা ঝরনা–২ যেতে সীতাকুণ্ড পৌর সদর থেকে মিনিবাস কিংবা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ছোট দারোগাহাট নামতে হবে। এরপর হেঁটে কিংবা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় সূর্য মন্দির যেতে হবে। তারপর টিকিট কেটে লবণাক্ষ হ্রদে বেড়াতে পারেন। নৌকায় ভ্রমণ করতে করতে একসময় পৌঁছে যাবেন সহস্রধারা ঝরনা–২–এ। সেখানে ঝরনার পানিতে নিজেকে ভিজিয়ে নিতে পারেন। তবে হ্রদের পানিতে না নামায় উত্তম। কারণ, হ্রদটি অত্যন্ত গভীর এবং পানিও ঠান্ডা। এই ঝরনা দেখার যাত্রা সকাল ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে করাই ভালো। এরও আগে যেতে পারেন। যেতে সময় লাগতে পারে আধা ঘণ্টা থেকে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা। তবে যেভাবেই যান না কেন, ফিরতে হবে বেলা দেড়টার মধ্যে।

সীতাকুণ্ডে যদি হোটেল ভাড়া নেন, তবে এর আশপাশে দুপুরের খাবার সেরে হালকা বিশ্রাম নিলে ক্লান্তি কম হয়। বিশ্রাম শেষে পৌর সদরের নামার বাজার সড়কের মাথায় গিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় গুলিয়াখালী সৈকতের উদ্দেশে রওনা দিতে হবে। বেলা সাড়ে তিনটার মধ্যে গুলিয়াখালী বেড়িবাঁধে পৌঁছাতে পারলে সুবিধা হয়। এরপর হেঁটে কিংবা নৌকায় মূল সৈকতে যাওয়া যায়। সূর্যাস্ত পর্যন্ত সেখানে কাটিয়ে ভ্রমণ শেষ করতে পারেন।

ভ্রমণ পরিকল্পনা–২

পাহাড় ট্রেকিং, দুটি ঝরনা ও সমুদ্রসৈকত দেখতে এ পরিকল্পনাটি করতে পারেন। এটিতে রয়েছে বোটানিক্যাল গার্ডেন, সুপ্তধারা ঝরনা ও বাঁশবাড়িয়া সৈকতে ঘুরে বেড়ানো। এটিও শুরু করার উত্তম সময় সকাল ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে।
সীতাকুণ্ড পৌর সদরের মন্দির সড়কের মাথা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় যেতে হবে বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্কের ফটক। এরপর টিকিট কেটে ভেতরে প্রবেশ করলেই পাহাড় ট্রেকিং শুরু। কিছুদূর গেলে দেখা মিলবে সুপ্তধারা ঝরনার। এরপর সেখান থেকে পাহাড় বেয়ে আরও এক হাজার ফুট ওপরে উঠলে দেখা মিলবে সহস্রধারা ঝরনা–১। সেখান থেকে বেলা আড়াইটার মধ্যে ফিরতে হবে। এরপর হালকা বিশ্রাম শেষে রওনা দিতে হবে বাঁশবাড়িয়া সৈকতের উদ্দেশে। ইকোপার্কের গেট থেকে কিংবা সীতাকুণ্ড বাসস্ট্যান্ড থেকে ৮ ও ১৭ নম্বর মিনিবাসে বাঁশবাড়িয়া বাজারে নামতে হবে। এরপর মহাসড়ক পার হয়ে সৈকত সড়কের মাথা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় যাওয়া যায় সমুদ্রসৈকতে। বিকল্প হিসেবে পৌর সদরের কলেজ রোডের মাথা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে বাঁশবাড়িয়া সৈকতে যাওয়া যায়। সে ক্ষেত্রে সিএনজিচালিত অটোরিকশার ভাড়া দরদাম করে নিতে হবে।

ভ্রমণ পরিকল্পনা–৩

ভূমি থেকে ১ হাজার ২০০ ফুট ওপরে পাহাড়ের চূড়ায় থাকা চন্দ্রনাথ মন্দির ও সমুদ্রসৈকত ভ্রমণে এ পরিকল্পনাটি নিতে পারেন। এ ক্ষেত্রে ভ্রমণ সকাল সাতটা থেকে আটটার মধ্যে শুরু করতে পারলে ভালো হয়। পাহাড় বেয়ে ওঠানামায় চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা সময় লেগে যেতে পারে।

শুরুতেই পৌর সদরের মন্দির সড়কের মাথা থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশা কিংবা সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিয়ে ৩ নম্বর সেতু পর্যন্ত যেতে হবে। পথে অসংখ্য মঠ ও মন্দির দেখা যাবে। এরপর হেঁটে পাহাড়ে ওঠার পালা। পাহাড়টির একেবারে চূড়ায় রয়েছে চন্দ্রনাথ মন্দির। দ্বিতীয় বৃহত্তম চূড়ায় বিরূপাক্ষ মন্দির। চূড়ায় ওঠার সময় পথে পথে বানরের দেখা মিলতে পারে। শোনা যাবে পাখিদের কিচিরমিচির। বিরূপাক্ষ মন্দিরের কাছাকাছি গেলে মেঘের ছোঁয়াও পাওয়া যেতে পারে। চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার পর ক্লান্ত–পরিশ্রান্ত শরীরে চারদিকে সবুজ পাহাড় দেখতে দেখতে চোখ জুড়িয়ে যাবে। এরপর ফিরে এসে আকিলপুর সৈকতে বেড়াতে পারেন। সে ক্ষেত্রে পৌর সদর থেকে ৮ ও ১৭ নম্বর মিনিবাসে ছোট কুমিরা বাজারে নামতে হবে। সেখান থেকে অটোরিকশায় সমুদ্রসৈকতে যাওয়া যায়।

ভ্রমণ পরিকল্পনা–৪

সূর্যাস্ত দেখা ও নৌকায় ভ্রমণের জন্য যেতে পারেন ভাটিয়ারী লেক ও সানসেট পয়েন্ট। এ দুটি পর্যটনকেন্দ্র সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত। চট্টগ্রাম নগর থেকে মাত্র ছয় কিলোমিটার দূরে ভাটিয়ারী বাজার। সীতাকুণ্ড থেকে এর দূরত্ব ২৫ কিলোমিটার। সেখান থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় শুরুতেই আপনি যেতে পারেন ভাটিয়ারী হ্রদে। এই যাত্রা দুপুরে শুরু করলেও পারবেন। সেখানে কিছুক্ষণ নৌকায় ভ্রমণ করে সেনাবাহিনী পরিচালিত সানসেট রেস্তোরাঁয় সময় কাটানো যায়। রেস্তোরাঁটি পাহাড়ের টিলায়। সেখান থেকেও সুন্দর সূর্যাস্ত উপভোগ করা যায়। একই দিনে আপনি চাইলে সকালে কিংবা বিকেলে কুমিরা জেটি ঘুরে আসতে পারেন। ৭০০ মিটারের জেটিতে দাঁড়িয়ে সাগরের দৃশ্য দেখে মনোরম বিকেল কাটানো যায়। এ ছাড়া সেখান থেকে দেখা যায় জাহাজভাঙার কাজ। উপকূলের কিছু কারখানায় পুরোনো জাহাজ কাটা হয়।

ভ্রমণ পরিকল্পনা–৫

সীতাকুণ্ড ভ্রমণে অগ্নিকুণ্ড মন্দির, অগ্নিকুণ্ড ঝরনা ও সৈকত ভ্রমণও রাখতে পারেন পরিকল্পনায়। এর জন্য ভ্রমণ শুরু করতে হবে সকালে। সীতাকুণ্ড সদর কিংবা চট্টগ্রাম নগর থেকে বাসযোগে বাড়বকুণ্ড বাজারে পৌঁছাতে হবে। সেখান থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা কিংবা ব্যাটারিচালিত রিকশায় যাওয়া যাবে অগ্নিকুণ্ড মন্দিরের একেবারে কাছে। এরপর ছোট্ট একটি পাহাড় বেয়ে ওপরে উঠলে অগ্নিকুণ্ড মন্দির। সেখানে দেখা যাবে পানির ওপরে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। মন্দিরের কাছেই অগ্নিকুণ্ড ঝরনা। তবে শীতকালে এই ঝরনায় পানি থাকে না। অগ্নিকুণ্ড মন্দির থেকে ফিরে এসে বিকেলে যেকোনো একটি সমুদ্রসৈকতে ভ্রমণের মতো পর্যাপ্ত সময় থাকে।

পাশেই মিরসরাই

সীতাকুণ্ডের মতো ঝরনা–হ্রদ রয়েছে পাশের উপজেলা মিরসরাইয়েও। সেখানে মুহুরী প্রজেক্ট, মহামায়া হ্রদ, খৈয়াছাড়া ঝরনা, রূপসী ঝরনা, ডোমখালী সমুদ্রসৈকত, মেলখুম ট্রেইলসহ বেশ কিছু পর্যটন স্পট রয়েছে। সীতাকুণ্ডের সঙ্গে চাইলে পাশের উপজেলা মিরসরাইয়ের এসব পর্যটনকেন্দ্রও ভ্রমণের পরিকল্পনায় রাখা যায়।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সহস্রধারা ঝরনা। সম্প্রতি তোলা
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সহস্রধারা ঝরনা। সম্প্রতি তোলা। ছবি: প্রথম আলো

চেরনোবিলে রহস্যজনক নীল কুকুর

ইউক্রেনের চেরনোবিল নিষিদ্ধ অঞ্চলে বসবাসকারী কয়েকটি কুকুর সম্প্রতি হঠাৎ করেই পুরোপুরি নীল রঙের হয়ে গেছে। তা নিয়ে এখন স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক ও বিজ্ঞানীরা বিস্মিত ও উদ্বিগ্ন। ক্লিন ফিউচারস ফান্ডের অংশ ডগস অব চেরনোবিল নামের একটি অলাভজনক সংস্থা জানায়, তারা সম্প্রতি কুকুরগুলোকে নির্বীজ করার জন্য ধরতে গিয়েই এই অদ্ভুত রঙ পরিবর্তন লক্ষ্য করে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ইউপিআই। সংস্থাটি ইনস্টাগ্রামে লিখেছে, আমরা বর্তমানে চেরনোবিল এলাকায় কুকুর ধরার কাজ করছি। হঠাৎ তিনটি কুকুরকে পুরোপুরি নীল অবস্থায় দেখতে পেলাম। আমরা এখনো জানি না ঠিক কী ঘটছে। স্থানীয়দের দাবি, এক সপ্তাহ আগেও কুকুরগুলোর শরীরে কোনো নীল দাগ ছিল না।

চেরনোবিল নিষিদ্ধ অঞ্চলে এখন প্রায় ৭০০টি কুকুর বসবাস করছে। এরা মূলত সেই পোষা প্রাণীদের বংশধর, যাদের মালিকরা ১৯৮৬ সালে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর এলাকা খালি করার সময় ফেলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। তবে সংস্থাটি বলেছে, কুকুরগুলোর এই নীল রঙের কারণ তেজস্ক্রিয় বিকিরণ নয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের মতে, সবচেয়ে সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো- কুকুরগুলো কোনো রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শে এসেছে, যেমন কোনো লিক হওয়া পোর্টেবল টয়লেটের নীল তরল।  এদিকে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কুকুরগুলো সম্পূর্ণ সুস্থ ও সক্রিয় আছে, যদিও তাদের শরীরের রঙ অস্বাভাবিক। কর্মীরা নীল কুকুরগুলোকে ধরার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন, যাতে পরীক্ষার মাধ্যমে এ রহস্যের সঠিক কারণ নির্ণয় করা যায়।

mzamin