Showing posts with label ব্যাংক. Show all posts
Showing posts with label ব্যাংক. Show all posts

Friday, November 8, 2024

জব্দের আগেই ব্যাংক খালি করেন লোটাস কামাল: তারল্য সংকটে তুলতে পারেননি পুরো অর্থ by এ জেড ভূঁইয়া আনাস

সরকার পরিবর্তনের আভাস পেয়েই গত জানুয়ারি থেকে নিজেদের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব খালি করে বিদেশে পালিয়েছেন আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ওরফে লোটাস কামাল ও তার পরিবার। গত জানুয়ারি থেকে তারা ব্যাংক থেকে তুলে নিয়েছেন সাড়ে ৬০০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) জব্দ করা ব্যাংক হিসাবে অবশ্য পাওয়া গেছে ৮০ কোটি টাকার বেশি। মূলত ব্যাংকে তারল্য সংকটের কারণে পুরো অর্থ তুলে নিতে পারেননি। অভিযোগ আছে, সাবেক এই মন্ত্রী ব্যাংক, পুঁজিবাজার ও সরকারি প্রকল্প থেকে লুটেছেন হাজার হাজার কোটি টাকা। সাম্রাজ্য গড়েছেন দুবাই, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে।

২০০৮ সাল থেকে টানা ১৬ বছর কুমিল্লা-১০ (নাঙ্গলকোট, সদর দক্ষিণ ও লালমাই উপজেলা) আসনের এমপি ছিলেন আবু হেনা মোহাম্মদ (আ হ ম) মুস্তফা কামাল। তিনি পরিচিত লোটাস কামাল নামে। আওয়ামী লীগের হয়ে পাঁচবার সংসদ সদস্য হওয়া এই চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ক্রিকেট সংগঠকও। সব পরিচয় ছাপিয়ে লোটাস কামাল একজন বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদ। অথচ তার হাতেই দেশের অর্থনীতি বলা চলে পঙ্গুত্ব বরণ করেছে। শেখ হাসিনা সরকারের পতন আঁচ করতে পেরে গত ১৫ জুলাই লোটাস কামাল ও নাফিসা কামাল দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। এর আগেই তাদের ব্যাংক থেকে তুলে নিয়েছেন সিংহভাগ অর্থ। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে গত ২২ আগস্ট লোটাস কামাল, তার স্ত্রী কাশমিরী কামাল ও মেয়ে নাফিসা কামালের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করে বিএফআইইউ।

তথ্য বলছে, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে ২০১০ সালের পুঁজিবাজার কারসাজি, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর সিন্ডিকেট থেকে শুরু করে ব্যাপক দুর্নীতি ও লুটপাট করেছেন কামাল দম্পতি। মেয়ে নাফিসা কামাল বাবার প্রভাব খাটিয়ে গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। বিভিন্ন সময় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকায় কোনো সংস্থাই এসব অনিয়মের বিষয়ে টুঁ শব্দও করতে পারেনি। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বিএফআইইউতে তাদের বিরুদ্ধে শত শত অভিযোগ জমা হয়েছে। একই সঙ্গে তদন্তে বেরিয়ে আসছে ব্যাপক অনিয়মের প্রমাণ।

ব্যাংক থেকে তুলে নেন ৬৫০ কোটি টাকা:

ব্যাংকে তারল্য সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে গত বছরের শেষ দিক থেকেই টালমাটাল অবস্থায় ছিল আওয়ামী লীগ সরকার। বিশেষ করে নির্বাচনে বিএনপিসহ বড় দলগুলো অংশগ্রহণ না করায় সরকারের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা ছিল আগে থেকেই। এজন্য লোটাস কামাল, স্ত্রী কাশমিরী কামাল ও মেয়ে নাফিসা কামাল গত জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ব্যাংক থেকে প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন। ব্যক্তিগত হিসাব থেকে তুলে নেওয়া এসব অর্থের বেশিরভাগই পাঠিয়েছেন দেশের বাইরে। গত জানুয়ারি মাসে কামাল পরিবারের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে স্থায়ী আমানত ছিল ৭৩০ কোটি টাকা। তবে গত ২২ আগস্ট তাদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করে বিএফআইইউ। এ কারণে তিনজনের ব্যক্তিগত হিসাবে থাকা ৮২ কোটি টাকা তুলে নেওয়া সম্ভব হয়নি।

মালয়েশিয়ার কর্মী পাঠানোর সিন্ডিকেট:

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সূত্রে জানা যায়, লোটাস কামাল এবং তার পরিবারের সদস্যরা একটি বৃহৎ পাচার চক্রের নেতৃত্ব দিয়েছেন। এই চক্রটি মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর নামে সরকার নির্ধারিত অতিরিক্ত ফি হিসেবে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। তারা শ্রমিকদের কাছ থেকে ভুয়া চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করেছে।

প্রায় চার বছর বন্ধ থাকার পর ২০২২ সালের জুলাইয়ে যখন মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলে, তখন কর্মী পাঠানোর জন্য রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচনের দায়িত্ব পায় মালয়েশিয়া। তাদের কাছে ১ হাজার ৫২০টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা পাঠিয়েছিল প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। কিন্তু মাত্র ২৫টি এজেন্সির নাম নির্বাচন করা হয়। এজেন্সি বাছাইয়ের ক্ষেত্রে নীতিমালা ছিল না। দেখা গেছে, সাবেক অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল ও তার পরিবার, সাবেক তিন এমপির পাশাপাশি আওয়ামী লীগ নেতা, সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর এবং এ খাতের নতুন অনেক প্রতিষ্ঠান বিপুলসংখ্যক কর্মী পাঠিয়েছে। সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের স্ত্রী কাশমিরী কামালের অরবিটালস এন্টারপ্রাইজ ৭ হাজার ১৫২ জন ও মেয়ে নাফিসা কামালের মালিকানাধীন অরবিটালস ইন্টারন্যাশনাল ২ হাজার ৭০৯ জন শ্রমিক পাঠিয়েছে। মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠাতে সরকার নির্ধারিত জনপ্রতি ব্যয় ৭৯ হাজার টাকা। সিন্ডিকেটটি নিয়েছে কর্মীপ্রতি ৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা।

অন্যদিকে, অনেক শ্রমিক মালয়েশিয়ায় গিয়ে নানা জটিলতায় কাজ পাননি কিংবা কেউ কেউ ঋণ করে গিয়ে খালি হাতে ফিরে এসেছেন। চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের দুর্দশা নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের (ওএইচসিএইচআর) ওয়েবসাইটে একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। যেখানে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের অনেকেরই মানবেতর ও অমর্যাদাকর পরিস্থিতির মধ্যে দিন যাপনের বিবরণ উঠে আসে।

শেয়ারবাজার কারসাজি:

২০১০ সালে শেয়ারবাজার কারসাজিতে মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন লোটাস কামাল। লোটাস কামাল তখন বিভিন্নভাবে শেয়ারবাজারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এবং সস্তায় শেয়ার কেনার পর তা বিদেশে পাচার করেছিল। ওই সময় লোটাস কামাল এবং তার চক্র প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। দুদক এরই মধ্যে এই তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধান শুরু করেছে। দুদকের উপপরিচালক নুরুল হুদার নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি অনুসন্ধান টিম এ ব্যাপারে কাজ করছে।

নির্বাচনী হলফনামায় অসংগতি:

নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামায় নিজের সম্পদের চেয়ে স্ত্রীর সম্পদ বহু গুণ বেশি দেখানোর অভিযোগ উঠেছে লোটাস কামালের বিরুদ্ধে। গত ৭ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের আগে জমা দেওয়া এই হলফনামায়, কামালের অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৪১ কোটি ৯০ লাখ ৫৩ হাজার টাকা হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, স্ত্রীর সম্পদ দেখানো হয়েছে ৬২ কোটি ২৭ লাখ ১৯ হাজার টাকা। নিজের স্থাবর সম্পদের আর্থিক মূল্য ২ কোটি ৩০ লাখ হলেও, স্ত্রীর স্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৫ কোটি ৪২ লাখ ৬৪ হাজার টাকা বলে হলফনামায় জানানো হয়েছে। কামাল তার হলফনামায় উল্লেখ করেছেন, স্ত্রী, দুই মেয়ে এবং পাঁচ নাতি-নাতনিকে দান করে কিছু সম্পদ কমিয়েছেন। এর মধ্যে, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির উদ্যোক্তা শেয়ারের ২ কোটি ৪ লাখ ৫ হাজার টাকার অংশ তিনি তার মেয়ে নাফিসা কামালকে দিয়েছেন, এবং স্ত্রী, মেয়ে ও পাঁচ নাতি-নাতনিকে দিয়েছেন প্রায় ৩১ কোটি টাকার সম্পত্তি।

তবে সূত্র জানায়, কামালের হলফনামায় উল্লিখিত সম্পদের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। তিনি যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, সিঙ্গাপুরসহ কয়েকটি দেশে স্বজনের নামে হাজার কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

৫০০ কোটি টাকার সম্পদের খোঁজ পেয়েছে দুদক:

সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের (লোটাস কামাল) নামে-বেনামে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার সম্পদের খোঁজ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদক লোটাস কামাল ও তার পরিবারের সদস্যদের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের ব্যাপারে প্রকাশ্যে অনুসন্ধান শুরু করেছে।

দুদকের গোপন অনুসন্ধান অনুযায়ী, ঢাকার নিকুঞ্জে জোয়ারসাহারায় রয়েছে আধুনিক বাণিজ্যিক ভবন ‘লোটাস কামাল টাওয়ার’। বাড্ডা ও উত্তরায় রয়েছে তার বহুতল বাড়ি ও দামি ফ্ল্যাট। বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রয়েছে মোটা অঙ্কের টাকা। বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে শেয়ারবাজারে। ৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রমাণ মিলেছে সঞ্চয়পত্রে। লোটাস কামাল প্রপার্টিজ ও অরবিটাল এন্টারপ্রাইজসহ বিভিন্ন কোম্পানিতে বিপুল বিনিয়োগ করেছেন লোটাস কামাল। এ ছাড়া, স্ত্রী কাশমিরী কামালের নামে ঢাকার গুলশান, বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকায় প্লট-ফ্ল্যাট কিনেছেন তিনি। গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায় তার নিজের ও স্ত্রীর নামে রয়েছে বিপুল পরিমাণ জমি। স্ত্রীর নামে বিভিন্ন ব্যাংকে রয়েছে নগদ অর্থ। আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও শেয়ারেও বিনিয়োগ রয়েছে কাশমিরী কামালের। লোটাস কামাল প্রপার্টিজ ও সৌদি বাংলাদেশ কন্ট্রাকটিং কোম্পানিসহ বিভিন্ন কোম্পানিতে ২৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন কাশমেরী। তার সঞ্চয়পত্র রয়েছে প্রায় ৪০ কোটি টাকার। তিনটি দামি গাড়ির মালিক তিনি। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে লোটাস কামালের প্রায় ৮০ কোটি টাকা থাকার তথ্য পেয়েছে দুদক। আয়কর নথিতে স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মূল্য প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কম দেখিয়েছেন তিনি। লোটাস কামাল ও তার পরিবারের সদস্যদের সম্পদ খুঁজতে এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক, সরকারি-বেসরকারি সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, রাজউক, ঢাকা ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশন, গণপূর্ত অধিদপ্তর, রেজিস্ট্রার অফিস এবং ভূমি অফিসে চিঠি দিয়েছে দুদক।

লুট করতে প্রকল্প অনুমোদন:

পরিকল্পনামন্ত্রী থাকাকালে লোটাস কামাল কুমিল্লা জেলা অন্তর্ভুক্তি শর্তে শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার স্থাপন প্রকল্পের অনুমোদন দেন। ২০১৮ সালে, কামালের বাড়ির পাশেই সাড়ে ১০ একর জমিতে প্রতিষ্ঠিত হয় এই আইটি সেন্টার। ২০১৩ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত কুমিল্লাসহ সাত জেলায় প্রায় ৫৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলেও, স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পের কাজ গ্রামীণ এলাকায় কোনো কার্যকর ফল বয়ে আনেনি। একাধিক সূত্রের দাবি, প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণ, সরঞ্জাম সরবরাহ এবং অন্যান্য কাজে কামালের গড়া সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের কমিশন আদায় হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালে ১৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে কুমিল্লায় নলেজ পার্কের নির্মাণকাজ শুরু হলেও, প্রকল্পটি শুধু জমি অধিগ্রহণের পর সীমানা দেয়াল ছাড়া আর কোনো দৃশ্যমান কাজ হয়নি।

এ ছাড়া, ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের জুলাই পর্যন্ত কুমিল্লার সদর দক্ষিণ, নাঙ্গলকোট ও আদর্শ সদর উপজেলায় ৪২টি খাল খননের জন্য ১৯ কোটি ৬৮ লাখ টাকা বরাদ্দ হলেও, কামালের নির্দেশে তার সিন্ডিকেট কাজ না করেই পুরো অর্থ আত্মসাৎ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই ঘটনায় গত ১৪ অক্টোবর আদালতে মামলা দায়ের করেছেন সদর দক্ষিণ জেলা কৃষক সমবায় ঐক্য পরিষদের সভাপতি মুহম্মদ আখতার হোসাইন। মামলায় কামালের ছোট ভাই গোলাম সারোয়ার, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাবলু, এপিএস মিজানুর রহমান, জনপ্রতিনিধিসহ ৪৮ জনকে আসামি করা হয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে লোটাস কামালের মোবাইল ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।

জব্দের আগেই ব্যাংক খালি করেন লোটাস কামাল
জব্দের আগেই ব্যাংক খালি করেন লোটাস কামাল



Saturday, September 28, 2024

ক্ষুদ্র ঋণের প্রেক্ষাপট ও প্রতিহিংসার সুদ বিতর্ক by প্রভাস চন্দ্র দাস

গ্রামীণ ব্যাংক শুধুমাত্র ২০% হারে একক ঋণ বিতরণ কার্যক্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই (এখানে বলে রাখা ভালো-২০% হিসাবে গড় পদ্ধতিতে ১০ হাজার টাকায় ১ হাজার টাকা সুদ চার্জ হয়), প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য ঋণের সুদ সংক্রান্ত আলোচনাও এর সঙ্গে প্রধান বিবেচ্য বিষয়, যেমন- সদস্যের সন্তানদের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিতকরণে কোচিং ও শিক্ষাঋণ বাবদ প্রদেয় ঋণের শিক্ষাকালীন সময়ের জন্য (৪/৫ বছর) কোনো সুদ ধার্য করা হয় না, শিক্ষা শেষে ৪/৫ বছরের মধ্যে পরিশোধকালীন সময়ের জন্য মাত্র ৫% হারে সুদ ধার্য করা হয়। সদস্যদের আবাসন সুবিধা নিশ্চিতকরণে প্রদেয় ঋণের সুদহার ৮% এবং ভিক্ষুকদের আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার জন্য দেশব্যাপী সুদমুক্ত ঋণ কর্মসূচির মাধ্যমে ‘সংগ্রামী সদস্য কর্মসূচি’- নামে কার্যক্রম চলমান রয়েছে ...

মহাজনী ঋণের কঠোর ও নির্মম নির্যাতনের শিকার প্রান্তিক দরিদ্র মানুষকে বাঁচানোর অনুভূতি থেকেই ক্ষুদ্র ঋণের এ ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয় বলে ব্যাপক জনশ্রুতি রয়েছে। জামানত সাপেক্ষে ঋণ প্রদানের সনাতনী ব্যাংকিং ব্যবস্থার এক বিপরীত ধারণার মধ্যদিয়েই ১৯৭৬ এ একটি প্রয়োগিক প্রকল্প এবং ১৯৮৩ সালে প্রকল্প থেকে এক স্বাধীন সত্তা নিয়ে গ্রামীণ ব্যাংকের আবির্ভাব ঘটে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে অর্থনীতির মারপ্যাঁচে দরিদ্র মানুষ মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছেন না এমন বাস্তবতার তথ্য খুঁজতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী জোবরা গ্রামকেই গবেষণার ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিলেন। বাঁশ দিয়ে মোড়া তৈরির কারিগর সুফিয়া খাতুন মহাজনের কাছ থেকে ৫ টাকা ঋণ নিয়ে দিনভর শ্রমে তৈরি মোড়া মহাজনের বেঁধে দেয়া মূল্যেই তার নিকট বিক্রি করতে বাধ্য হতেন। বিষয়টির গভীরে গিয়ে দেখতে পেলেন, ওই গ্রামের ৪২ জন এমন দরিদ্র মানুষ মহাজনের কাছ থেকে ৮৫৬ টাকা ঋণ নিয়ে একইভাবে কাজ করতেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূস ওই টাকা পরিশোধ করে তাদেরকে মহাজনের হাত থেকে মুক্ত করে নিজের গবেষণালব্ধ তত্ত্বের ব্যবহারিক বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিলেন। এরপরের ধারাবাহিক ঘটনাক্রম দেশ-বিদেশের অনেকেরই অজানা নয়। প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন শেষে ১৯৮৩ এর পরে গ্রামীণ ব্যাংকের দ্রুত সফল সম্প্রসারণে পৃথিবীর দৃষ্টি বাংলাদেশের দিকে নিবদ্ধ হয়। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের সঙ্গেই সামাজিক ব্যবসার এক ইতিবাচক ধারণার কথা ড. ইউনূস এর মুখে প্রায়শই উচ্চারিত হয়ে আসছে। অপার সম্ভাবনার এদেশের সম্পদ ব্যবহার করে গরিবের মালিকানায় দেশের অবকাঠামো ও শিল্প-কলকারখানা প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে বৃহৎ এ জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন সম্ভব।

রাষ্ট্রীয় কর্মপরিকল্পনায় যুক্ত হয়েছে ক্ষুদ্র ঋণ
ক্ষুদ্র ঋণ এখন আর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে মুখ লুকিয়ে থাকার মতো খাটো কোনো ভূমিকায় নেই। লাখ লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগের বিশাল এ বাজার এখন মোটাদাগে প্রান্তিক অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে। ক্ষুদ্রঋণের জয়-জয়কার প্রচারে বহির্বিশ্বের গভীর আগ্রহ এবং ভূয়সী প্রশংসার দৃশ্যমান পুরস্কার অর্জনে  প্রতিহিংসাপরায়ণ মানুষগুলোর মনস্তত্ত্বে একটা বড় ঝাঁকুনি লেগেছিল, যার ফলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং রাজনৈতিক মঞ্চে সস্তা সমর্থন আদায়ে গ্রামীণ ব্যাংক ও এর প্রতিষ্ঠাতাকে নিয়ে চলছিল অহরহ অপপ্রচার। অথচ ২/৩ দশকে ক্ষুদ্রঋণের প্রভাব দারিদ্র্যবিমোচন ও জাতীয় অর্থনীতিতে বেশ গুরুত্ববহ ভূমিকায় আবির্ভূত হয়েছিল বলেই রাষ্ট্রীয় কর্মপরিকল্পনায় ক্ষুদ্রঋণকে যুক্ত করতে হয়েছে।

অনেকটা রাজনৈতিক স্বীকৃতি লাভ করেছিল
এদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের অনুভূতিকে পুঁজি করে বিগত সরকার প্রধান কর্তৃক ‘সুদখোর’ হিসেবে ট্যাগ লাগিয়ে নোবেল লরিয়েট ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে খাটো করার প্রবণতা বিশেষ এক গোষ্ঠীর কাছে আনন্দের খোরাক জোগালেও দেশজুড়ে এমন মন্তব্যের সমালোচনায় মানুষ সরব ছিল। বাস্তবে দেশের সকল ক্ষুদ্রঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে সর্বনিম্ন হারে গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণসেবা পরিচালিত হলেও সুদখোরের তকমা লাগানোর প্রবণতা শুধু রাজনৈতিক সুবিধাবাজদের দখলেই ছিল না এটি অনেকটাই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি লাভ করেছিল। জাতীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক বিষয়সংশ্লিষ্ট অনেক সভা-সেমিনারে গ্রামীণ ব্যাংকের সুদ এবং সুদখোর বিষয়ক আলোচনা যেন আলোচ্যসূচিতেই ঠাঁই করে নিয়েছিল। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে খুশি করতে পারলেই নিজের পদ-পদবি উন্নয়নের হীন মানসিকতা চরিতার্থ করার লালসায় জ্ঞানপাপী অনেক বড় বড় আমলাদেরও জিহ্বা আড়ষ্ঠ হতে দেখিনি অমন কুৎসিত শব্দে বিশ্বনন্দিত এ মানুষটিকে কটাক্ষ করতে। গ্রামীণ ব্যাংকের সুদ সংক্রান্ত এ বিতর্কিত ইস্যুটি রাজনৈতিক অঙ্গনে বিভিন্ন মতাবলম্বীদের মুখে এখনো বেশ সাড়ম্বরে উচ্চারিত হয়, যা নতুন প্রজন্ম সঠিক হিসেবেই মনে করে আসছে। গ্রামীণ ব্যাংক একটি রাষ্ট্রীয় বিধিবদ্ধ ব্যাংক হলেও অনেক শিক্ষিত মানুষ এবং আমলাগণ আলোচনার টেবিলে এনজিও আখ্যায়িত করে বেশ তৃপ্তবোধ করতেন, এটি জেনে বললে অন্যায় এবং না জেনে বললে ওই পদ-পদবির অযোগ্য বলেই আমার সাধারণ ধারণা। এ সংক্রান্ত সঠিক বিষয়টি সকলের কাছে খোলাসা করার জন্যই মূলত এ লেখার আগ্রহ।

সুদ বিতর্কের অবসান হোক
বিনিয়োগকৃত প্রাপ্ত পুঁজির খরচের সঙ্গে ১০% সুদ যোগ করলে নির্ধারিত সুদকে সবুজ, ১৫% যোগ করলে হলুদ এবং এর উপরে উঠলে তাকে লাল সুদ বলা যেতে পারে। এক্ষেত্রে গ্রামীণ ব্যাংক যে ঋণ প্রদান করে আসছে তার সুদ সবুজ, সর্বনিম্ন এবং যৌক্তিক পর্যায়, উপরন্তু গ্রামীণ ব্যাংকের লাভ-লোকসানের মালিক ঋণগ্রহীতা সদস্যগণ নিজেরাই। ড. মুহাম্মদ ইউনূস ছিলেন গ্রামীণ ব্যাংকের একজন বেতনভুক কর্মকর্তা মাত্র। অথচ তাকে একদিকে প্রতিষ্ঠানের এমডি অপরদিকে সুদখোর বলে অনেক বড় কর্তাই নিজেদের জ্ঞান-গরিমাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।
গ্রামীণ ব্যাংক শুধুমাত্র ২০% হারে একক ঋণ বিতরণ কার্যক্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই (এখানে বলে রাখা ভালো-২০% হিসাবে গড় পদ্ধতিতে ১০ হাজার টাকায় ১ হাজার টাকা সুদ চার্জ হয়), প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য ঋণের সুদ সংক্রান্ত আলোচনাও এর সঙ্গে প্রধান বিবেচ্য বিষয়, যেমন- সদস্যের সন্তানদের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিতকরণে কোচিং ও শিক্ষাঋণ বাবদ প্রদেয় ঋণের শিক্ষাকালীন সময়ের জন্য (৪/৫ বছর) কোনো সুদ ধার্য করা হয় না, শিক্ষা শেষে ৪/৫ বছরের মধ্যে পরিশোধকালীন সময়ের জন্য মাত্র ৫% হারে সুদ ধার্য করা হয়। সদস্যদের আবাসন সুবিধা নিশ্চিতকরণে প্রদেয় ঋণের সুদহার ৮% এবং ভিক্ষুকদের আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার জন্য দেশব্যাপী সুদমুক্ত ঋণ কর্মসূচির মাধ্যমে ‘সংগ্রামী সদস্য কর্মসূচি’ নামে কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এখন সামগ্রিকভাবে গ্রামীণ ব্যাংক গড়ে সর্বোচ্চ ১০% হারে সুদ গ্রহণ করছে। এক্ষেত্রে সুদের ব্যবসা, সুদখোর বা রক্তচোষা হিসেবে প্রচারণার মূলে যে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা এটি বোধকরি আর বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না।

সুষ্ঠু ও সৎ ব্যবস্থাপনাই সাফল্যের মূল ভিত্তি
মার্কস এঙ্গেলসের স্লোগান ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ আর আমাদের আজকের স্লোগান ‘পৃথিবীর ভালো মানুষ এক হও’। ড. মুহাম্মদ ইউনূস সেখান থেকেই শুরু করেছিলেন, যেখানে বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ মিল্টন ফ্রিডম্যান শেষ করেছিলেন, তিনি রক্ষণশীল আর ড. ইউনূস উদারমনা। ফ্রিডম্যান রাষ্ট্র ও বাজার ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতেন আর ড. ইউনূস এগিয়েছেন উদ্যোগ আর সংগঠনকে কেন্দ্র করে, ইফেকটিভ প্রয়োজনের যে চলমান মতবাদ তার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে মাইক্রোক্রেডিটের জনক ড. মুহাম্মদ ইউনূস এক বৈপ্লবিক মনোভাব নিয়ে এগিয়েছেন এবং প্রমাণ করেছেন সুষ্ঠু ও সৎ ব্যবস্থাপনাই গ্রামীণ ব্যাংকের বিশ্বব্যাপী সাফল্যের মূল ভিত্তি।

গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় বড় বাধা দুর্নীতি
ইতিপূর্বে রাষ্ট্র ও রাজনীতির সৃষ্ট দারিদ্র্য ও বৈষম্য পাশাপাশি একই সমান্তরালে প্রবাহিত হলেও আজকের সে বৈষম্য যোজন দূরত্ব তৈরি করেছে। গ্রামীণ ব্যাংক এই অসাধ্য কাজটি করলেও অর্থনীতিতে কৃষক-শ্রমিকের শ্রমের সৃষ্ট সম্পদ লুণ্ঠনের হাত থেকে রক্ষা করা না গেলে দারিদ্র্যবিমোচনের এ কর্মপ্রবাহ নিবৃত হবে না। সরকারি ব্যয়নীতি, দুর্নীতি আর পাহাড়সম খেলাপি ঋণসহ নিরন্তর লুটপাট হওয়ায় লাখ লাখ কোটিপতিতে দেশ ভরে গেছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস এখন দেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনকালে তার কল্পিত সংস্কার কতোখানি বাস্তবায়ন করে যেতে পারবেন তা সময় বলে দেবে, তার চিন্তা-চেতনা মুক্তি দিশারী হলেও এক বা দু’চারজন মহৎপ্রাণ মানুষ মিলে অনিয়মের যে মজবুত প্রাচীর গড়ে উঠেছে তা ভেঙে চুরমার করে নতুনের গোড়াপত্তন মোটেই সহজ কাজ নয়, তবুও এ গভীর সংকট মোকাবিলা করে একটি সুন্দর সকাল জাতির কাছে অর্পণ করতে না পারলে সমগ্র বিষয়টি সেই পুরনো দেয়ালেই চুনকাম করার মতো হাস্যকর হয়ে উঠবে। এক শ্রেণির রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী আর আমলাদের যোগসাজশে লুণ্ঠন হওয়া দেশের গণতন্ত্র আর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় সকলকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে পূর্ণ সহযোগিতায় এগিয়ে আসতে হবে, তাহলেই হয়তো নতুন প্রজন্মের হাতে আমরা তাদের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ তুলে দিতে পারবো।

লেখক:  উন্নয়ন কর্মী

 mzamin

সাউথইস্ট ব্যাংকে ফিরলেন কাশেম, আজিম ও রেহানা

সাউথইস্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে ফিরেছেন সাবেক চেয়ারম্যান এম এ কাশেম ও পরিচালক আজিম উদ্দিন আহমেদ ও রেহানা রহমান। গত ২০২২ সালে তারা পর্ষদ থেকে বাদ পড়েছিলেন। সরকার পরিবর্তনের পর তারা পর্ষদে যুক্ত হন । গত বুধবার ব্যাংকটির ২৯তম বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) অংশ নেন।

গত ৫ই আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রাস্টি পদ ফিরে পান এম এ কাশেম, আজিম উদ্দিন আহমেদ, রেহানা রহমানসহ ১২ জন ট্রাস্টি। তাদের ২০২২ সালের আগস্টে ট্রাস্টি বোর্ড থেকে বাদ দেয়া হয়। পদ ফিরে পাওয়ার পর আজিম উদ্দিন আহমেদ এরই মধ্যে ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান হয়েছেন।

এম এ কাশেম, আজিম উদ্দিন আহমেদ ও রেহানা রহমান নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ড থেকে বাদ পড়ার পরপরই সাউথইস্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকেও বাদ পড়েন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি পদ ফিরে পাওয়ার পর তারা এখন সাউথইস্ট ব্যাংকের পরিচালক পদও ফিরে পেলেন। এর মধ্যে এম এ কাশেম নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান হয়েছেন। তিনি ব্যবসায়ী শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সাবেক সভাপতি।

বুধবার সাউথইস্ট ব্যাংকের ২৯তম বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে চেয়ারম্যান আলমগীর কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। সভায় চেয়ারম্যান আলমগীর কবির, বে লিজিং অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের প্রতিনিধি মনিরুজ্জামান খান ও এশিয়া ইন্স্যুরেন্সের প্রতিনিধি রফিকুল ইসলাম পরিচালক পদ থেকে পদত্যাগ করেন। আলমগীর কবির আর ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে না থাকারও ঘোষণা দেন। এজিএমে অংশ নেননি আঞ্জুমান আরা শহীদ। তিনিও পরিচালক পদ হারাচ্ছেন।

এজিএমে সাউথইস্ট ব্যাংক ২০২৩ সালের শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ১০ শতাংশ লভ্যাংশ অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে ৬ শতাংশ নগদ ও ৪ শতাংশ বোনাস শেয়ার বা স্টক লভ্যাংশ।

এদিকে ব্যাংকটির ওয়েবসাইট থেকে পরিচালকদের নাম সরিয়ে ফেলা হয়েছে। একজন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, পুরোনো তিন পরিচালক পর্ষদে যুক্ত হয়েছেন। বিভিন্ন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। সেটি সম্পন্ন হলেই ওয়েবসাইটে আবার পরিচালকদের নাম প্রকাশ করা হবে।

এজিএমে ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান আকিকুর রহমান, প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এম এ কাশেম, সাবেক চেয়ারম্যান আজিম উদ্দিন আহমেদ, পরিচালক দুলুমা আহমেদ, জোসনা আরা কাশেম, রেহানা রহমান ও নাসির উদ্দিন আহমেদ; প্রতিনিধি পরিচালক রফিকুল ইসলাম, স্বতন্ত্র পরিচালক মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নুরুদ্দীন মো. ছাদেক হোসাইন অংশ নেন।

mzamin


Friday, September 27, 2024

সেভেন স্টার গ্রুপে জিম্মি প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক by এম এম মাসুদ

দুর্নীতিগ্রস্ত সাত কর্মকর্তার হাতে জিম্মি রাষ্ট্রমালিকানাধীন প্রবাসীদের জন্য বিশেষায়িত ব্যাংক প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক। এরা সবাই ব্যাংকে ‘সেভেন স্টার গ্রুপ’ নামে পরিচিত। ব্যাংকে ‘স্বাধীনতা ব্যাংকার্স পরিষদ’ নামধারী একটি সংগঠন আছে তাদের। এই সংগঠনটি বিধিবহির্ভূতভাবে পদোন্নতি, ব্যাংক থেকে বিভিন্ন অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ, বদলি বাণিজ্য ও কেনাকাটার অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। পাশাপাশি এদের প্রায় সবাই অবৈধভাবে নিয়োগ পেয়েছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ একটি প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। প্রতিবেদনের একটি কপি মানবজমিনের হাতে এসেছে।

সেভেন স্টার গ্রুপ নামের পরিচিতিরা হলেন- কামাল হোসেন, আসমা হক, ফরহাদ হোসেন, হাসনা হেনা, মো. সাইফুল ইসলাম, মাসুদুর রহমান ও সৈয়দ ইমরান। এদের বাঁচাতে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ জানিয়েছেন একাধিক কর্মকর্তা।

ব্যাংকের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠাকালে ব্যাংকটির দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অস্থায়ী ও দৈনিক ভিত্তিতে কয়েকজন ইন্টার্ন কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেয়া হয় প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের নিজস্ব সার্ভিস রুল তৈরি করতে। সার্ভিস রুল তৈরি না হওয়া পর্যন্ত কর্মসংস্থান ব্যাংকের সার্ভিস রুল অনুসরণ করতে বলা হয়। কিন্তু ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ওই নির্দেশনা মানেনি, নিয়োগ দিয়েছে পছন্দের ব্যক্তিদের। সরকারি চাকরিবিধির চেয়ে বেশি বয়স হওয়া সত্ত্বেও এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্ত পূরণ না করেও অনেকে নিয়োগ পান। এসব কর্মকর্তার সম্মিলিত চক্রই এখন ব্যাংকের কলকাঠি নাড়ছে। অনিয়মের মাধ্যমে চাকরি পাওয়া ওই কর্মকর্তাদের অনেকে এখন আর্থিক অনিয়মে জড়িয়ে পড়ছেন।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, একজন শাখা ব্যবস্থাপক, যিনি ঋণ ইস্যু করে নিজেই অর্থ তুলে নিয়েছেন। এ ছাড়া ওই শাখার পিয়নের নামে ইস্যু করেছেন প্রবাসী কর্মীর ঋণ। এভাবে নামে-বেনামে ঋণ তৈরি করায় তা ফেরত আসছে না। খেলাপি ঋণের উচ্চহারের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

জানা গেছে, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের প্রথম পর্যায়ে সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেয়া একজন হচ্ছেন হাসনা হেনা পারভীন, যার জন্ম-তারিখ ১৯৭৪ সালের ১০ই সেপ্টেম্বর। ২০১১ সালের ১৩ই এপ্রিল তিনি ওই ব্যাংকে যোগ দেন। শিক্ষাগত জীবনে চারটিতেই দ্বিতীয় শ্রেণি। নিয়োগের বয়সসীমা সর্বোচ্চ ৩০ বছর হলেও তাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে ৩৭ বছর বয়সে। পারভীনের সঙ্গে আরও যেসব কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে, তাদের বেশির ভাগ কর্মীর বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা বা চাকরি লাভের শর্ত মানা হয়নি।

সূত্র জানায়, এসব কর্মকর্তাকে প্রথম পর্যায়ে দৈনিক হাজিরার ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। তখনো প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক আইন পাস হয়নি। ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠাকালে তাদের অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু স্থায়ী নিয়োগ দেয়ার সময়ে তাদের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। ব্যাংকের অডিটের সময়ে এটিসহ কয়েকটি বিষয় বেরিয়ে আসে। এর মধ্যে ব্যাংকটির বরিশাল শাখায় সৈয়দ মেহেদী হাসানকে কখনো দৈনিক এবং কখনো অফিসার ও এক্সিকিউটিভ অফিসার হিসেবে বেতন-ভাতা দেয়া হয়েছে। আবার এক মাসের ব্যবধানে তাকে সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার হিসেবে বেতন দেয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে সাতজনের বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। এরা পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি ব্যতীত, জেলা কোটা, মেধা কোটা ও অন্যান্য কোটা পরিপালন ছাড়াই প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকে নিয়োগ পেয়েছেন। এর মধ্যে সেভেন স্টার গ্রুপের সদস্য কামাল হোসেন চাকরির বয়স না থাকা ও কম্পিউটার অপারেটর হয়েও ব্যাংকটিতে প্রিন্সিপাল অফিসার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। তিনি ২০১১ সালে সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন। গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ। তিনি বছরের পর বছর ব্যাংকের ক্রয় বিভাগে কর্মরত আছেন। ক্রয় বিভাগের সকল অবৈধ কাজের সঙ্গে জড়িত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এবছর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাকে শুদ্ধাচার পুরস্কারে ভূষিত করেছে। এতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাদের পরীক্ষণকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। স্বাধীনতা ব্যাংকার্স পরিষদের কমিটিতে তিনি শেখ কামাল পাশা নামে পরিচিত। কমিটিতে তিনি সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রয়েছেন। তার নাম ঠিক আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন নাম ঠিক আছে। কিন্তু তিনি কমিটিতে নেই বলে অস্বীকার করেন।

সেভেন স্টার গ্রুপের আরেক সদস্য আসমা হক। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাতি বৌ হিসেবে পরিচয় দিতেন। তিনি অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত এবং এজিএম হিসেবে সদ্য পদোন্নতিপ্রাপ্ত হয়েছেন, যা গত জুন মাসের আফিস আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি ২০১১ সালে সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন। বিভিন্ন অপকর্ম থেকে বাঁচাতে প্রধান কার্যালয় থেকে গত ৮ই আগস্ট কেরানীগঞ্জ শাখায় শাখা ব্যবস্থাপক হিসেবে বদলি করা হয় তাকে।

স্বাধীনতা ব্যাংকার্স পরিষদের সভাপতি ফরহাদ হোসেন। তিনিও ওই সাতজনের একজন। বাড়ি ফরিদপুর। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগসাজশ করে অবৈধভাবে নিয়োগ পাওয়ার পরও তিনি ব্যাংকটিতে সদ্য পদোন্নতিপ্রাপ্ত এজিএম। স্বাধীনতা ব্যাংকার্স পরিষদের সদস্য হাসনা হেনা। সদ্য পদোন্নতিপ্রাপ্ত এজিএম। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগসাজশ করে অবৈধভাবে নিয়োগ পাওয়ার পরও দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শাখার শাখা ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত আছেন।

আরেক সদস্য স্বাধীনতা ব্যাংকার্স পরিষদের যুগ্ম সম্পাদক মো. সাইফুল ইসলাম। তিনি প্রিন্সিপাল অফিসার। বাড়ি ফরিদপুর। তিনি প্রায় এক যুগ ধরে প্রধান কার্যালয়ের মানবসম্পদ বিভাগে কর্মরত ছিলেন। সমপ্রতি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাকে বাঁচানোর জন্য ব্যাংকের কাকরাইল শাখায় বদলি করেছে।
স্বাধীনতা ব্যাংকার্স পরিষদের দপ্তর সম্পাদক সৈয়দ ইমরান। তিনিও সদ্য পদোন্নতিপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল অফিসার। বাড়ি ফরিদপুর। ব্যাংকটিতে যোগদানের পর থেকেই ব্যবস্থাপনা পরিচালকের একান্ত সচিব হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মূলত তার মাধ্যমেই স্বাধীনতা ব্যাংকার্স পরিষদ ব্যাংকের প্রধান কর্মকর্তার সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করে সকল ধরনের অনৈতিক সুবিধা আদায় করতেন। ব্যাংকে সকল অবৈধ কর্মকাণ্ডের মূলহোতা হিসেবে সুপরিচিত। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাকে বাঁচানোর জন্য সমপ্রতি প্রধান শাখার দ্বিতীয় কর্মকর্তা হিসেবে বদলি করা হয়েছে।

স্বাধীনতা ব্যাংকার্স পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক মাসুদুর রহমান। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তার ছিল বিশেষ সখ্য। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, স্বাধীনতা ব্যাংকার্স পরিষদ সমর্থিত এই গ্রুপটি বিধি-বহির্ভূতভাবে পদোন্নতি নিয়েছে। এমনকি এক বছরে দু’বার পদোন্নতি ও ইনক্রিমেন্ট নিয়েছে। ব্যাংক থেকে বিভিন্ন অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ, বদলি বাণিজ্য, গ্রুপিং তৈরি করা, পছন্দের প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যাংকের কেনাকাটা করার সঙ্গে জড়িত ছিল।

অভিযোগ রয়েছে- ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৮০ কোটি টাকার কেনাকাটা হয়েছে। ওই ক্রয়ে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে বলে একটি নিরপেক্ষ অডিট ফার্ম দিয়ে নিরীক্ষার দাবি তোলা হয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়, ব্যাংকের বিভিন্ন পদে ১১৮ জন অবৈধ নিয়োগের বিষয়ে বাণিজ্যিক অডিটের আপত্তির বিষয়ে ব্যাংক কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বরং বর্তমান ম্যানেজমেন্ট বিভিন্নভাবে তাদের স্বার্থ রক্ষা করে চলেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের আদেশ মোতাবেক, ব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য লোকবল নিয়োগের ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান ব্যাংকের চাকরি প্রবিধানমালা অনুসরণের নির্দেশনা প্রদান করা হলেও উল্লিখিত ১১৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্র তা করা হয়নি। এই অবৈধভাবে নিয়োগকৃতরাই এখন ব্যাংকের হর্তাকর্তা। আরও অভিযোগ আছে প্রবাস গমনেচ্ছুদের নামে ঋণ ইস্যু করে নিজেই সেই ঋণের অর্থ তুলে নিয়েছেন ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক। ব্যাংকের পিয়নের নামেও ইস্যু করা হয়েছে বিদেশগামীদের ঋণ।

নিয়োগ ও বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মজিবর রহমান ব্যস্ততার কথা জানিয়ে কথা বলতে চাননি।
উল্লেখ্য, বিদেশগামী ও প্রবাসীদের সুবিধার জন্য ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় ব্যাংকটি। বিশেষ উদ্দেশ্য পূরণে গঠিত এ ব্যাংকটি সামপ্রতিক সময়ে তফসিলি ব্যাংক হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানার এ ব্যাংকটি তফসিলভুক্ত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকেও অভিযোগ জমা হয়েছে ব্যাংকটির কর্মকর্তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া ও নিয়োগপ্রাপ্তদের যোগ্যতা নিয়ে। 

mzamin

Tuesday, September 24, 2024

ঋণ সুবিধার জন্য চার উপদেষ্টা ও গভর্নরকে বেক্সিমকো’র চিঠি

ঋণ পরিশোধের মেয়াদ বাড়াতে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইম্পোর্ট কোম্পানি লিমিটেড (বেক্সিমকো) গ্রুপ। ঋণ সুবিধা চালুর   আবেদন জানিয়ে সম্প্রতি অর্থ উপদেষ্টা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্তৃপক্ষ বরাবর পাঠানো চিঠিতে এ আবেদন জানিয়েছে দেশের অন্যতম এ শিল্পগোষ্ঠী। চিঠিতে দুই বছরের স্থগিতাদেশ সহ ১০ বছর সময় চেয়েছে বেক্সিমকো কর্তৃপক্ষ।

অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের কাছে এই চিঠি দিয়েছে বেক্সিমকো’র টেক্সটাইল ও অ্যাপারেল বিভাগ।
ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওসমান কায়সার চৌধুরী স্বাক্ষরিত গত ১৯শে সেপ্টেম্বর পাঠানো চিঠিতে বেক্সিমকো’র সব দেনা সুদমুক্ত ব্লক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করার অনুরোধ করা হয়। সুদমুক্ত ব্লক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করার অর্থ হলো কোম্পানিকে তার দেনা পরিশোধে বিলম্বের জন্য কোনো সুদ দিতে হবে না।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের জুন শেষে জনতা ব্যাংকের কাছে বেক্সিমকো’র মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৫,০০০ কোটি টাকা। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান বেক্সিমকো’র ভাইস চেয়ারম্যান, যিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। বেক্সিমকো গ্রুপে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ কর্মরত।
আবেদনপত্রে বলা হয়, গত ৫ই আগস্ট বিগত সরকার পতনের পর বেক্সিমকো’র রপ্তানিভিত্তিক পণ্য, কারখানা এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোগুলোয় দুর্বৃত্তরা অগ্নিসংযোগ ও ব্যাপক লুটতরাজ চালিয়েছে। এর ফলে বেক্সিমকো’র হাতে কোনো কার্যকরী মূলধন অবশিষ্ট নেই, যা দিয়ে রপ্তানি কার্যক্রম চালু রাখা সম্ভব। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির কিছু গ্রাহক তাদের ক্রয়াদেশ (অর্ডার) বিকল্প গন্তব্যে স্থানান্তর শুরু করেছে এবং উৎপাদন ক্ষমতার তুলনায় এখন বেক্সিমকো’র কাছে পণ্যের ক্রয়াদেশ অনেক কম। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে কোম্পানি তার গ্রাহকদের চিরতরে হারাবে। বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে কর্মী ছাঁটাইয়ের পাশাপাশি অন্যান্য ব্যয় হ্রাসের পদক্ষেপ নিতে হবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিদ্যমান ও ভবিষ্যতের সব রপ্তানি ঋণপত্রের (এলসি) বিপরীতে প্রয়োজনীয় ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্র খোলার (প্রাথমিক রপ্তানি ঋণপত্রের নিরাপত্তা হিসেবে) ক্ষেত্রে জনতা ব্যাংকের সহযোগিতা চেয়েছে বেক্সিমকো গ্রুপ। আবেদনপত্রে প্রতিটি রপ্তানি ঋণপত্রের বিপরীতে স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা কাপড় ও আনুষঙ্গিক উপকরণ সরবরাহের ক্ষেত্রে ১০ মার্জিনে বিল ডিসকাউন্ট সুবিধা ও প্যাকিংয়ে ১৫ শতাংশ ক্রেডিট সুবিধা চাওয়া হয়েছে।
এছাড়া, সংশ্লিষ্ট রপ্তানি আয় থেকে সুদ ও অন্যান্য চার্জ সমন্বয়ের পর মেয়াদপূর্ণ অর্থ (ম্যাচিউরিটি অ্যামাউন্ট) প্রদানের অনুরোধ করেছে বেক্সিমকো। সাধারণত ঋণ বা ক্রেডিট সুবিধার মেয়াদ শেষে মেয়াদপূর্তির অর্থ প্রদান করা হয়। এক্ষেত্রে, রপ্তানিকারকের নেয়া ঋণ বা অগ্রিম যেমন ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি বা প্যাকিং ক্রেডিটকে বোঝানো হয়।
বেক্সিমকো জনতা ব্যাংকের কাছ থেকে ৫৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আগস্টের জন্য ৬৯ কোটি ৫ লাখ টাকা কর্মীদের বেতন হিসেবে পরিশোধ করেছে। তবে সেপ্টেম্বরের ৬৫ কোটি টাকার কর্মীদের বেতন কীভাবে দেয়া হবে তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কর্তৃপক্ষ। এ পর্যন্ত প্রাপ্ত ও প্রাপ্য রপ্তানি আয় থেকে এ পরিমাণ অর্থ সমন্বয় করতে জনতা ব্যাংকের কাছে বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছে বেক্সিমকো।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বেক্সিমকো ২০২৪ সালের ১৪ই মে’র পর থেকে বেক্সিমকো জনতা ব্যাংকের কাছ থেকে কোনো ধরনের ক্রেডিট সুবিধা পায়নি।

Wednesday, September 4, 2024

গ্রামীণ ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান আব্দুল হান্নান চৌধুরী

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরীকে গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। গতকাল অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, গ্রামীণ ব্যাংক আইন, ২০১৩ এর ধারা অনুযায়ী, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিক্সের অধ্যাপক ড. আবদুল হান্নান চৌধুরীকে গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ডের পরিচালক ও চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী তার যোগদানের তারিখ থেকে পরবর্তী তিন বছরের জন্য এই পদে দায়িত্ব পালন করবেন। জনস্বার্থে জারিকৃত এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।

এর আগে গত ২০শে আগস্ট গ্রামীণ ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান একেএম সাইফুল মজিদের নিয়োগ চুক্তি বাতিল করে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। এরপর থেকে ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের পদ শূন্য ছিল। সাইফুল মজিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের (আইবিএ) শিক্ষক। তাকে ২০২০ সালের ১৬ই মার্চ প্রথম এই পদে নিয়োগ দেয় সরকার। প্রথমে দুই বছরের জন্য নিয়োগ দেয়ার পর তাকে দুই বছর করে আরও দুইবার পুনর্নিয়োগ দেয়া হয়। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সর্বশেষ গত এপ্রিলে তাকে পুনর্নিয়োগ দেয়।

গত রোববার সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ফারহানা ফেরদৌসীকে গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক হিসেবে মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিনের নিয়োগ বাতিল করা হয়।
বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের হাত ধরে ১৯৮৩ সালে গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়।

দারিদ্র্যবিমোচনের মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখায় ২০০৬ সালে গ্রামীণ ব্যাংক ও ড. ইউনূস নোবেল পুরস্কার পান। পরবর্তী সময়ে বয়সসীমা অতিক্রম করে গেছে-এই যুক্তিতে ২০১১ সালে ড. ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে অপসারণ করা হয়।

এরপর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার বিভিন্ন মামলা করে। চলতি বছরের ২রা জানুয়ারি শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের করা মামলায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ (গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান হিসেবে) চারজনকে ছয় মাস করে কারাদণ্ড দেয়া হয়। একই সঙ্গে সবাইকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। যদিও মুহাম্মদ ইউনূসকে কারাগারে যেতে হয়নি। এরপর গত ৭ই আগস্ট শ্রম আদালতের দেয়া কারাদণ্ড থেকে খালাস পান ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

গ্রামীণ ব্যাংকের ওয়েবসাইটের তথ্যানুসারে, ব্যাংকের প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন অধ্যাপক ইকবাল মাহমুদ। এরপর যথাক্রমে মো. কায়সার হোসেন, মো. হারুনুর রশিদ, আকবর আলি খান, অধ্যাপক রেহমান সোবহান, মো. তবারক হোসেন, খন্দকার মোজাম্মেল হক এবং এ কে এম সাইফুল মজিদ এই ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে খন্দকার মোজাম্মেল হক ২০১১ সালের ২৭শে জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের ৭ই আগস্ট পর্যন্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ২০১১ সালের ১১ই মে পর্যন্ত গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। তাকে সরানোর পর নুরজাহান বেগম, মো. শাহজাহান, এ এস এম মহিউদ্দিন, রতন কুমার নাগ, বাবুল সাহা, আবুল খায়ের মো. মনিরুল হক, জাহাঙ্গীর হোসেন হাওলাদার, মো. আব্দুর রহিম খান এবং মো. মোসলেম উদ্দিন এই ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন নূর মোহাম্মদ।

Friday, August 30, 2024

বাংলাদেশ ব্যাংক: অভিযুক্তরা বহাল তবিয়তে by এমএম মাসুদ

দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের দুর্নীতিবাজ প্রায় অর্ধশত কর্মকর্তার একটি তালিকা নবনিযুক্ত গভর্নর আহসান এইচ মুনসুরের দপ্তরে দেয়া হয়েছে। অনৈতিক কাজে জড়িত এসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিষয়ে তদন্ত করে শাস্তি চাওয়া হয়েছে। তালিকায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ঢাকা, চট্টগ্রাম শাখা ও খুলনা শাখাসহ বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কর্মকর্তাদের নাম রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ একটি প্রতিবেদনে দুর্নীতিবাজ এসব কর্মকর্তার নাম উঠে এসেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে কর্মকর্তাদের লুটপাটের ফিরিস্তি উঠে এসেছে। সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারে ছত্রছায়ায় লুটপাটের সিন্ডিকেট গড়েন এসব কর্মকর্তা। এছাড়া দেশের বাইরের গোয়েন্দা সংস্থার কাছে তথ্য পাচারসহ নানা কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। অন্যদিকে গত দেড় দশকে সৎ, বিশ্বস্ত এবং হাইলি টেকনিক্যাল কর্মকর্তাদের ওএসডি করে রাখা হয়েছিল এবং শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক হারায় নিজস্ব ঐতিহ্য।
এ বিষয়ে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এক বৈঠকে বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতকে সাজানোকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছি।

প্রতিবেদনে দুর্নীতিবাজ কর্মকতাদের আমলনামা। তালিকায় আছেন যারা:

নির্বাহী পরিচালক মো. মেজবাউল হক: বর্তমানে তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র। নগদের সকল অনিয়ম ও মানিলন্ডারিংয়ে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করে বিশাল সম্পদের মালিক হয়েছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র জয় ও আইসিটি মন্ত্রী পলকের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট প্রজেক্ট- ‘বিনিময়’, আইডিটিপি’সহ বেশ কয়েকটি প্রজেক্ট নিয়েছেন, যা কোনো কাজে না আসলেও বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন এবং বিদেশ ট্যুর পেয়েছেন। এফএসএসএসপিডি’র পরিচালক থাকাবস্থায় বিভিন্ন শিল্প গ্রুপের অনুকূলে বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ ছাড়করণের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ উপার্জন করেছেন। ওই অর্থে ৪ কোটি টাকায় ধানমণ্ডি লেক-এর পাশে একটি ফ্ল্যাট ক্রয় করেছেন।

নির্বাহী পরিচালক মো. আনারুল ইসলাম: দুর্নীতিবাজ সাবেক ডিজি এস কে সুর চৌধুরী ও ব্যাংক খেকো পিকে হালদার-এর প্রত্যক্ষ সহযোগী। গ্রামীণ ব্যাংকের কথিত দুর্নীতি তদন্তের আদিষ্ট প্রতিবেদন প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ২০২১-২০২৩ সাল পর্যন্ত ডিপার্টমেন্ট অব অফ সাইট সুপারভিশনের দায়িত্বে থাকাকালে এস আলম গ্রুপের সকল ঋণ জালিয়াতিতে সহযোগিতা করেছেন এবং বৃহৎ ঋণ অনুমোদন করেছেন। এস আলম ভেজিটেবল অয়েল মিলসসহ গ্রুপভুক্ত ৩টি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকার ঋণের এনওসি প্রদান করেছেন। এ ছাড়া অবৈধ অর্জিত অর্থে তিনি গাজীপুরে রিসোর্ট ও বাংলো বাড়ি করেছেন।

নির্বাহী পরিচালক দেবদুলাল রায়: বাংলাদেশ ব্যাংকের সবচেয়ে ক্ষতিকর ও ক্ষমতাধর ব্যক্তি দেবদুলাল। বাংলাদেশ ব্যাংকের যাবতীয় তথ্য তিনিই দেশের বাইরে পাচার করতেন। তিনি প্রতিবেশী দেশের গোয়েন্দার এজেন্ট হিসেবে সর্বমহলে পরিচিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের আইসিটি’র নির্বাহী পরিচালক হিসেবে তিনি অপর নির্বাহী পরিচালক মেজবাউল হক’কে সঙ্গে নিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পুত্র জয় ও আইসিটি মন্ত্রী পলকের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট প্রজেক্ট ‘বিনিময়’ হাতিয়ে নিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।

নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসাইন চৌধুরী: বিএফআইউ’র পরিচালক থাকাকালে তিনি এস আলম, সাদ মুসা-সহ সকল শীর্ষ অপরাধীর অনিয়ম-সম্বলিত অসংখ্য মামলা গায়েব করেছেন। মার্কেন্টাইল ব্যাংক, প্রধান শাখায় কুলিয়ারচর সি ফুড-এর বিপুল পরিমাণ রপ্তানি প্রণোদনা জালিয়াতির মামলাও তিনি গায়েব করেছেন।

নির্বাহী পরিচালক সাইফুল ইসলাম: এস আলম কর্তৃক ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংকসহ অন্যান্য ব্যাংকের বোর্ড দখলের নেপথ্যের কারিগর তিনি।

খুলনা অঞ্চলের নির্বাহী পরিচালক এস এম হাসান রেজা: ডিএফইআই’র পরিচালক থাকাকালে গ্রুরুত্বপূর্ণ অসংখ্য জালিয়াতি গোপন করেছেন। খুলনা অফিসের সকল অনিয়ম ও দুর্নীতি তার আদেশে হতো। শেখ হেলালের ক্ষমতার দাপটে তিনি অত্যন্ত ক্ষমতাবান।

পরিচালক মো. আরিফুজ্জামান: এস আলম গ্রুপের আশির্বাদ নিয়ে চট্টগ্রাম অফিসে আগমন এবং পরিচালক (সুপারভিশন) হিসেবে পদায়ন লাভ করেন। পরিদর্শন প্রতিবেদন তার মনমতো না হলে বিভিন্ন ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে তা পরিবর্তন করতে পরিদর্শন দলকে বাধ্য করেছেন। এ কাজে তিনি সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত পরিচালকদেরকে (বিশেষ করে শোয়াইব চৌধুরী, শংকর কান্তি ঘোষ) ব্যবহার করেন। ফরেন এক্সচেঞ্জের বিভিন্ন কেস (বিশেষ করে রি-ফাইন্যান্স, ডিসকাউন্টিং) অনুমোদন করাতে তিনি নির্মলেন্দু পারিয়াল ও মো. সাজ্জাদ হোসাইন চৌধুরীকে ব্যবহার করতেন।

অতিরিক্ত পরিচালক মো. শোয়াইব চৌধুরী: পরিদর্শন প্রতিবেদনে গুরুতর অনিয়ম উল্লেখ করলেও কখনো ক্লাসিফিকেশন ও প্রভিশনিং করেননি। চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন ব্যাংকে চাকরি প্রদান, বদলি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি চট্টগ্রাম অফিসের পোস্টিংও নিয়ন্ত্রণ করছেন। স্টেশন সিনিয়রিটি অনুযায়ী তার পোস্টিং চট্টগ্রাম অফিসের বাইরে হওয়ার কথা থাকলেও তাকে শারীরিক অসুস্থতার দোহাই দিয়ে এস আলম গ্রুপের জন্য চট্টগ্রাম অফিসেই রাখা হয়। চট্টগ্রাম অফিসের সাবেক অফিসার বোরহান উদ্দিন সঞ্চয়পত্রের সূত্রে নগদ ১৩ লক্ষাধিক টাকা ঘুষসহ ধরা পড়লেও সে সময় নির্বাহী পরিচালক জহুরুল হুদার মাধ্যমে ছেড়ে দিতে ভূমিকা রাখেন তিনি।

অতিরিক্ত পরিচালক মো. আব্দুল আহাদ: চট্টগ্রাম অফিসে নির্বাহী পরিচালকের পিএ হিসেবে বহাল থাকায় এস আলমের খাস দালাল হিসেবে কাজ করে সুবিধা নিতো। কোনো পরিদর্শন প্রতিবেদন এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন ব্যাংকের বিরুদ্ধে গেলে তিনি সেটার ছবি তুলে এস আলম গ্রুপের লোক (আকিজ, মিফতা) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকে থাকা এস আলমের অন্যান্য দালালদের নিকট প্রেরণ করতেন। নিজের স্ত্রী ও অন্যান্য আত্মীয়দের এস আলম গ্রুপের ব্যাংকে চাকরি দিয়েছেন। এজেন্ট হিসেবে এস আলম গ্রুপের লোকদের সঙ্গে সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করতেন তিনি।

অতিরিক্ত পরিচালক নির্মলেন্দু পারিয়াল, যুগ্ম পরিচালক মো. সাজ্জাদ হোসাইন চৌধুরী ও সৈয়দ সাইফুর রহমান: তারা বিভিন্ন ধরনের উপহার ও সুবিধাদি প্রাপ্তি ও প্রেস্টিজিয়াস পোস্টিং পাওয়ার জন্য আব্দুল আহাদ ও শোয়াইব চৌধুরীসহ নির্বাহী পরিচালকদের ফরমায়েশ মোতাবেক ফরেন এক্সচেঞ্জ বিষয়ক মামলাগুলো অনুমোদন দিয়েছেন (বিশেষ করে এস আলম গ্রুপের রি-ফাইন্যান্স, ডিসকাউন্টিং)। কোনো কর্মকর্তা বিধি বহির্ভূত কাজ না করতে চাইলে তাকে পিএমএস এর ভয় দেখিয়ে কাজ করতে বাধ্য করতেন। এদের মধ্যে সৈয়দ সাইফুর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংক চট্টগ্রাম অফিসের অন্যতম দুর্নীতিবাজ ডিজিএম মোহা. সোহরাব হোসাইনের (অবসরের পরে বর্তমানে এস আলম গ্রুপের দালালির পুরস্কার হিসেবে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে কর্মরত) ডানহাত ছিলেন এবং এস আলমের জামাতা বেলালের কোম্পানি ইউনিটেক্স গ্রুপের সিএফও আরিফের সঙ্গে যুগ্ম পরিচালক রেজাউল করিমের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করিয়ে দেন।

যুগ্ম পরিচালক রেজাউল করিম: রেজাউল অতিরিক্ত পরিচালক আব্দুল আহাদের আত্মীয়। তার শ্বশুর চট্টগ্রাম অফিসের সাবেক উপ-মহাব্যবস্থাপক কাশেমসহ তার স্ত্রী, ভায়রা এবং শ্যালিকাসহ অনেক নিকটাত্মীয় এস আলমের দালালি করে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে চাকরি পাইয়ে দিয়েছেন। এস আলমের জামাতা বেলালের কোম্পানি ইউনিটেক্স গ্রুপের সিএফও আরিফ এবং এস আলম গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক সুব্রত কুমার ভৌমিকের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং এদের বিভিন্ন দাবি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক চট্টগ্রাম অফিসে বিভিন্ন লবিং চালাতেন। এরই সূত্র ধরে এস আলম গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক সুব্রত কুমার ভৌমিকের নামে ক্রয়সীমার অতিরিক্ত সঞ্চয়পত্র উদঘাটিত হওয়ার পরেও তিনি বিধি লংঘন করে কোনো সুদ কর্তন না করে পূর্ণ টাকা প্রদান করেন।

সহকারী পরিচালক শান্তনু শাওন: শাওন সহকারী পরিচালক হলেও চট্টগ্রাম অফিসে ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘদিন নির্বাহী পরিচালকের পিএ-এর দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত পরিচালক মো. আব্দুল আহাদের অন্যতম আশীর্বাদপুষ্ট, যার মাধ্যমে আহাদ আইবিবি’র কার্যক্রম ইচ্ছেমাফিক তার নিয়ন্ত্রণ মেনে নেয়া ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করেন।

পরিচালক চৌধুরী লিয়াকত আলী: সাবেক ডিজি মনিরুজ্জামানের সকল অপকর্মের মূল দোসর লিয়াকত। তিনি অসংখ্য বৃহৎ জালিয়াতির মামলা গোপন করে ফেলেছেন।

পরিচালক আবু হেনা হুমায়ূন কবীর: সকল বৃহৎ শিল্প গ্রুপের বেনিফিসিয়ারি কবীর। তাদের সকল অভিযোগ থেকে সহজ নিষ্পত্তি দিতে তাকে এফআইসিএসডি’তে পদায়ন করা হয়েছে।

পরিচালক আবু সালেহ মোহাম্মদ শাহাব উদ্দিন ও মোহাম্মদ মহসিন হোসাইনি: এই দুইজন বসুন্ধরা, প্রাণ-আরএফএল, সিটি ইত্যাদি গ্রুপকে বিপুল পরিমাণ ওভারসিজ ইনভেস্টমেন্ট করার সুযোগ প্রদান করেছেন। এস আলম, সাদ মুসা, থার্মেক্স, সামিট পাওয়ার, ওরিয়ন’সহ সকল শীর্ষ অর্থপাচারকারীর সহায়তা করেছেন। এ ছাড়া মহসিন এস আলমের ছেলের বিয়েতে অংশগ্রহণ করেছেন। ওই বিয়েতে অংশগ্রহণের জন্য তিনি বিএফআইইউ’র নামে চট্টগ্রামে ট্রেনিং প্রোগ্রাম প্রণয়ন করে বাংলাদেশ ব্যাংকের খরচে ভ্রমণ করেছেন।

পরিচালক ইসতেকুমাল হোসাইন: সাবেক গভর্নরের আমলে ৪২ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে ব্যাংকে বিতরণের অন্যতম শীর্ষ কুশীলব তিনি। এ ছাড়া ঋণ ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্ট হতে এস আলমের ব্যাংকগুলোতে লিকিউডিটি সাপোর্ট তার প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় দেয়া হয়েছে। তিনি প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় তথ্য পাচার করতেন। ২০১৪ সালে এডি নিয়োগে প্যানেলভুক্তদের তথ্য প্রকাশ করে চাকরিচ্যুতির পর্যায়ে গিয়েছিলেন। তবে সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপে তখন রক্ষা পান।

অতিরিক্ত পরিচালক এ কে এম নুরুন্নবী: বিএফআইইউ’তে থাকা অবস্থায় সাবেক ডিজি মাসুদ বিশ্বাস এবং রাজী হাসানের ব্যক্তিগত বিভিন্ন কাজ করে দিয়ে তাদের আস্থাভাজন ছিলেন। বর্তমানে এফআইসিএসডি’তে বিভিন্ন ব্যাংকের দুর্নীতি আড়াল করার কাজে লিপ্ত রয়েছেন।

অতিরিক্ত পরিচালক গোলাম মহিউদ্দিন: অত্যন্ত ক্ষমতাবান এই কর্মকর্তা বাংলাদেশ ব্যাংকে সকল নষ্ট চক্রের কমন বেনিফিসিয়ারি। তিনি প্রতিবাদী এবং সৎ কর্মকর্তাদের শাস্তিমূলক বদলি করে থাকেন। পরিদর্শনে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের ফোন করে তিনি পরিদর্শনকে প্রভাবিত করতেন। সিনিয়ররাও ভয়ে থাকতো।

অতিরিক্ত পরিচালক মো. সদরুল মুক্তাদির: তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের অসংখ্য কর্মকর্তার পোস্টের স্ক্রিনশট নিয়ে ম্যানেজমেন্ট বরাবর উপস্থাপন করে তাদের শাস্তির মুখোমুখি করেছেন।

যুগ্ম পরিচালক মো. রোকন উজ জামান: দেশের চাঞ্চল্যকর সব মানিলন্ডারিং মামলার তদন্তে সাবেক দুই ডিজি’র আমলে এই রোকনকে নিয়োজিত করা হতো। তারপর তিনি ‘উপরের নির্দেশে’ অধিকাংশ মামলা গায়েব করে দিতেন এবং অবশিষ্ট সকল মামলায় মূল দোষীকে আড়াল করেছেন।

অতিরিক্ত পরিচালক শওকত আলী ও অতিরিক্ত পরিচালক শংকর কান্তি ঘোষ, যুগ্ম পরিচালক মেহেদী হাসান ও সুনির্বান বড়ুয়া, মোহাম্মদ আব্দুস সালাম, উপ-পরিচালক মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিন ও প্রিটুল বড়ুয়া: তারা ডিবিআই-৪ এ কর্মকালীন সময়ে বিভিন্ন সময়ে এস আলম গ্রুপভুক্ত ব্যাংকগুলো পরিদর্শন করে বেনামি ঋণ সৃষ্টিতে প্রশ্রয় দিয়েছেন, অনিয়ম লুকিয়েছেন, বিনিময় গ্রহণ করেছেন ও সৎ কর্মকর্তাদের কাজে বাধা দিয়েছেন। তারা নিয়ম মেনে ঋণ ক্লাসিফাই করতে দেননি। তারা সিন্ডিকেটের ফরমায়েশি পরিদর্শন প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। এদের মধ্যে মেহেদী হাসান পুরস্কার হিসেবে নিজ স্ত্রীর জন্য ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংকের চাকরিও বাগিয়ে নিয়েছেন।

যুগ্ম পরিচালক মো. জিয়া উদ্দিন বাবলু: এস আলম গ্রুপের ব্যাংকের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আসলে তিনি আব্দুল আহাদ-শোয়াইব চৌধুরী সিন্ডিকেটের গ্রিন সিগনাল পেলে উপস্থাপন করতেন।

যুগ্ম পরিচালক রুপেশ বড়ুয়া: আব্দুল আহাদ, শোয়াইব চৌধুরী সিন্ডিকেটের অপরিহার্য হওয়ায় তাকে ডিবিআই হতে ডিএবি-তে ট্রান্সফার অর্ডার করার পরেও তা বাতিল করা হয়েছে। এস আলম গ্রুপভুক্ত বাংকের পাশাপাশি ইউসিবিএল খাতুনগঞ্জ শাখার বিগত কুইক সামারি রিপোর্ট আব্দুল আহাদ, শোয়াইব চৌধুরী সিন্ডিকেটের পছন্দসই হওয়ায় তিনি তার স্ত্রীর জন্য একটি চাকরিও বাগিয়ে নিয়েছেন।

যুগ্ম পরিচালক জোবাইদুল ইসলাম: তিনি রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আব্দুল আহাদ ও শোয়াইব চৌধুরীকে প্রটেক্ট করেছেন। গত ৫ই আগস্টের পর আব্দুল আহাদ ও শোয়াইব চৌধুরীকে ট্রান্সফারের দাবি উঠলে তিনি তার সর্বোচ্চ সামর্থ ব্যবহারপূর্বক নগ্নভাবে তা ঠেকাতে সচেষ্ট হন এবং দাবি উত্থাপনকারী কর্মকর্তাদের সি/ডি ক্যাটাগরির কর্মচারী দ্বারা পেটানোর হুমকি প্রদান করেছেন।
যুগ্ম পরিচালক আবু হোসাইন মো. জামশেদ উদ্দিন ও অনির্বাণ চাকমা, উপ-পরিচালক রুবেল চৌধুরী ও

খোরশেদুল আলম: এদের মাধ্যমেই এস আলম গ্রুপের ঋণ ও বেনামি ঋণ রয়েছে- এমন শাখাগুলো পরিদর্শন করানো হয়। সবচেয়ে খারাপ ঋণ আছে- এমন ব্যাংক শাখা পরিদর্শনপূর্বক সবচেয়ে ভালো রিপোর্ট দেয়ার বিষয়ে তাদের মধ্যে একটা নীরব প্রতিযোগিতাও বিদ্যমান ছিল। ইসলামী ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখার ডিসেম্বর/২০২৩ ভিত্তিক (কুইক সামারি) পরিদর্শন করার প্রতিযোগিতায় আবু হোসাইন মো. জামশেদ উদ্দিন জয়লাভ করে আব্দুল আহাদ ও শোয়াইব চৌধুরী সিন্ডিকেট তথা এস আলম গ্রুপের মনোনীত নির্বাহী পরিচালক ও পরিচালকের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম হন।

Tuesday, August 27, 2024

বাংলাদেশ ব্যাংক: অভিযুক্তরা বহাল তবিয়তে by এমএম মাসুদ

দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের দুর্নীতিবাজ প্রায় অর্ধশত কর্মকর্তার একটি তালিকা নবনিযুক্ত গভর্নর আহসান এইচ মুনসুরের দপ্তরে দেয়া হয়েছে এবং অনৈতিক কাজে জড়িত এসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিষয়ে তদন্ত করে শাস্তি চাওয়া হয়েছে। তালিকায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ঢাকা, চট্টগ্রাম শাখা ও খুলনা শাখাসহ বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কর্মকর্তাদের নাম রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে দুর্নীতিবাজ এসব কর্মকর্তার নাম উঠে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে কর্মকর্তাদের লুটপাটের ফিরিস্তি উঠে এসেছে। এতে কিছু কর্মকর্তার ভয়াবহ লুটপাট, স্বেচ্ছাচারিতা আর জাতীয় নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থবিরোধী কাজে জড়িয়ে পড়ার গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারে ছত্রছায়ায় লুটপাটের সিন্ডিকেট গড়েছেন বেশকিছু কর্মকর্তা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, দুর্নীতির এই মূল হোতারা বেপরোয়া হয়ে দেশের সম্পদ লুটেরাদের কাছে দিতে সহযোগিতা করছে। ফলে সীমাহীন লুটপাট, দেশের বাইরের গোয়েন্দা সংস্থার কাছে তথ্য পাচারসহ নানা কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে। এতে গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ ব্যাংক তার নিজস্ব স্বকীয়তা হারিয়েছে। পরিণত হয়েছে নখ-দন্তহীন প্রতিষ্ঠানে।
বিপর্যস্ত আর্থিক খাতের করুণ পরিণতির জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যর্থতাকে দায়ী করছেন অর্থনীতিবিদ ও খাত সংশ্লিষ্টরা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্দেশ্য হলো দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অনিয়ম আর দুর্নীতি বের করে শাস্তির আওতায় আনা। কিন্তু খোদ কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেই লুটপাটের চিত্র বেড়িয়ে এসেছে। অনেকটা রক্ষকই ভক্ষক হয়েছে।

এ বিষয়ে গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে ফোন দেয়া হলে তিনি ফোন ধরেননি। তবে সম্প্রতি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এক বৈঠক শেষে তিনি বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতকে সাজানোকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছি। আমরা যেটাই করি না কেন, যারা দোষী, তাদের ধরা হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা দায়ী থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাও দায়ী থাকলে দেখা হবে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিএফআইইউসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঢেলে সাজাতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি দুর্নীতি ও অর্থপাচার নিয়ন্ত্রণ এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করতে হবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নতুন চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান বলেন, বিগত সময়ে আর্থিক খাতে যারা লুটপাট ও অর্থ পাচার করেছেন, যারা দুর্নীতি করেছেন; তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। বলেন, অর্থ পাচার নিয়ে বিএফআইইউ কাজ করছে, এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টলিজেন্স সেল (সিআইসি) কাজ করছে।

প্রতিবেদনে দুর্নীতিবাজ কর্মকতাদের আমলনামা। তালিকায় আছেন যারা:
বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক কামাল হোসাইন: আওয়ামী লীগ সরকার আসার পরপরই সরকারের উচ্চ পর্যায়ের ইচ্ছাতে ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে কামাল হোসাইন বিএফআইইউতে পদায়ন পেয়েছেন এবং একটানা ১৫ বছর সেখানেই ছিলেন। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের বিভিন্ন ব্যক্তির এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে সরকারের আস্থাভাজন এবং প্রবল ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠেন। তিনি কখনই বদলি হন না। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ হ্যাকের ঘটনায় তিনি তৎকালীন গভর্নরকে মিসগাইড করেছেন এবং অর্থ উদ্ধারকে জটিল করে দিয়েছেন। এ ছাড়া প্রধান কার্যালয় থেকে যে কর্মকর্তাগণ এস আলমের ছেলের বিয়েতে অংশগ্রহণ করেছেন তিনি তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি চার্টার্ড প্লেনে করে ওই বিয়েতে অংশগ্রহণ করেন। তার ওই বিয়েতে অংশগ্রহণের ছবি ও ভিডিও ইউটিউবে এখনো রয়ে গেছে। সকল গভর্নরের সময়েই এস আলম গ্রুপের পিএস আকিজ উদ্দিন তাকের গভর্নর এবং ডেপুটি গভর্নরের সঙ্গে গ্রুপটির বাংলাদেশ ব্যাংকের এজেন্ট হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতেন।
অতিরিক্ত পরিচালক মাসুদ রানা: ২০০৬ সালের মার্চ থেকে একটানা ১৯ বছর ধরে বিএফআইইউতে রয়েছেন মাসুদ রানা। তিনিও কখনো বদলি হন না। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা থেকে মানি লন্ডারিংয়ের বিষয়ে প্রাপ্ত তথ্য যাচাই করে সেখান থেকে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের লোকদের তালিকা থেকে বাদ দিতেন। তাছাড়া দেশের মানি লন্ডারিংয়ের সব চক্রের তিনি প্রত্যক্ষ সহায়তাকারী। প্রতিবেশী দেশের গোয়েন্দা সংস্থার কাছে তথ্য পাচারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
যুগ্ম পরিচালক সেউলি শাহা: বিএফআইইউ’র বিভিন্ন কর্মকর্তার তথ্য সংগ্রহ করেন এবং প্রতিবেশী দেশের গোয়েন্দা সংস্থার কাছে তথ্য পাচারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সংস্থাটির এজেন্ট হিসেবে কাজ করেন। সকল কর্মকর্তা বদলি হলেও তিনিও বদলি হন নাই।

যুগ্ম পরিচালক মো. আশরাফুল আলম: মহাদুর্নীতিবাজ এই আশরাফুল সাবেক দুই ডেপুটি গভর্নরের (ডিজি) পক্ষে সকল ব্যাংকে ‘ফান্ড কালেক্টর’-এর ভূমিকা পালন করেছেন। সকল ব্যাংকের বিভিন্ন ছুতায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি দিয়ে পত্র প্রেরণ করেন এবং তারপর একেক ক্ষেত্রে একেক হারে অর্থ বিনিময়ে তা সমাধান করে দিতেন তিনি।
যুগ্ম পরিচালক আসাদুজ্জামান খান ও মো. শাহনেওয়াজ মুরাদ: এরা দু’জন হলুদ ও নীল দলের দুইজন আইকনিক নেতা। এরা ইউনিটে কোনো কাজ করেন না। স্ব স্ব দলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করে থাকেন। সারাদিন ঘোরাঘুরি করে তথ্য সংগ্রহ করেন এবং দুষ্টচক্রের নিকট তথ্য পাচার করে থাকেন।
যুগ্ম পরিচালক সৈকত কুমার সরকার: সৈকত প্রশ্নফাঁস জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত বলে অভিযোগ রয়েছে। তার অধ্যয়নকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউজিসি’র অনুমোদন নেই। তিনি বিএফআইইউ’র বিগত দুই ডিজির পক্ষ হতে বিভিন্ন ব্যাংকে লবিংয়ে ব্যস্ত থাকতেন।
যুগ্ম পরিচালক ইবনে আহসান কবীর ও মো. মুশফিকুল ইসলাম: মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগপ্রাপ্ত এই দুই কর্মকর্তা খেলাধুলা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করে থাকেন এবং তথ্য পাচার করে আর্থিক সুবিধা ভোগ করেন। এ ছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে প্রাপ্ত অভিযোগসমূহ সমাধানের ব্যবস্থা করে থাকেন।
নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান: এস আলমের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। এস আলমের মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর অনিয়ম ঢাকতেন এবং রিপোর্টে সন্নিবেশন ঠেকাতে তিনি নিজ আজ্ঞাবহ পরিদর্শন দল পাঠাতেন। তিনি চার্টার্ড বিমানে করে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত এস আলমের ছেলের বিয়েতে সপরিবারে অংশগ্রহণ করেছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চট্টগ্রাম অফিসের যেসব কর্মকর্তা তার চাহিদামাফিক পরিদর্শন প্রতিবেদন করেননি তাদেরকে শাস্তিমূলক পোস্টিং ও পিএমএস খারাপ দিতে বাধ্য করেছেন। তার ছেলেকে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে চাকরির ব্যবস্থা করেছেন। তার পিএ আব্দুল আহাদ তার সকল অপকর্মের দোসর। তাকে সে সর্বদা সঙ্গে রাখতেন। এস আলম গ্রুপের সহায়তায় সে তার সর্বময় ক্ষমতা ব্যবহার করেছেন। প্রধান কার্যালয়ে পরিচালক হিসেবে কর্মরত থাকাবস্থায় এস আলমের ঋণ মওকুফে জড়িত ছিল।

Monday, March 27, 2017

প্রশ্নটি করেছিলেন সাইফুর রহমান by আকবর আলী খান

Do you think the Batku (dwarf) sitting in Banga Bhavan is running your country?
প্রশ্নটি করেছিলেন আমাকে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী মরহুম এম সাইফুর রহমান। প্রশ্নটির তাৎপর্য বুঝতে হলে ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে বলতে হয়। ১৯৯১ সালের শেষ দিকে আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ দূতাবাসে 
 অর্থনৈতিক পরামর্শক (Economic Minister) পদ থেকে বদলি হয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে যোগ  দেই। অর্থ বিভাগে যোগ দেয়ার দুই-তিন দিন পর অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান আমাকে ডেকে পাঠান। তিনি কোনো একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিভিন্ন অনিয়ম সম্পর্কে তার মতামত ব্যক্ত করেন এবং তাকে অপসারণ করে তার জায়গায় জ্যেষ্ঠতম উপব্যবস্থাপনা পরিচালককে নিয়োগ দেয়ার সুপারিশ করে ফাইল পেশ করতে পরামর্শ দেন। আমি অফিসে ফিরে আসি এবং সংশ্লিষ্ট অনুবিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সন্তুষ্ট হই যে, মন্ত্রীর অভিযোগসমূহের অনেকাংশেরই সত্যতা রয়েছে। আমি যুগ্ম সচিবকে অবিলম্বে মন্ত্রীর নির্দেশ অনুসারে ফাইল প্রস্তুত করতে অনুরোধ করি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ফাইল আমার টেবিলে চলে আসে। নথিতে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের জন্য একটি সারসংক্ষেপ পেশ করা হয়। স্মরণ করা যেতে পারে যে, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পরিবর্তন সংক্রান্ত ফাইল রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করতে হতো। কিন্তু এরশাদের পতনের পর সংবিধান সংশোধন করে মন্ত্রিসভাশাসিত সরকার সাংবিধানিকভাবে চালু করা হয়। সংবিধান সংশোধন হলেও তখনো কার্যবিধিমালা সংশোধিত হয়নি। সংবিধান সংশোধনের আগের পাঠে কার্যবিধিমালায় নির্দেশ ছিল যে, ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির অনুমতি লাগবে। যেহেতু তখনো সংবিধান ও কার্যবিধিমালার মধ্যে অসংগতি ছিল, সেহেতু এই ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির অনুমতির প্রয়োজন আছে কিনা, সে সম্পর্কে ক্যাবিনেট ডিভিশনের নির্দেশনা চাওয়া হয়। আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে ক্যাবিনেট বিভাগ জানায় যে, যত দিন পর্যন্ত কার্যবিধিমালা সংশোধিত না হবে, ততদিন পর্যন্ত এই ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির অনুমতি নিতে হবে। যুগ্ম সচিব আমাকে নথি দেখালেন। আমি সন্তুষ্ট হয়ে রাষ্ট্রপতির জন্য তৈরি করা সারসংক্ষেপ অর্থমন্ত্রীর কাছে পাঠিয়ে দিই। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান তার ‘অবাক বাংলাদেশ বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি’ শীর্ষক বইয়ে এসব কথা লিখেছেন। তিনি আরো লিখেছেন- পরের দিন মন্ত্রী অফিসে আসার পর তার ব্যক্তিগত সহকারী আমাকে খবর দিলেন যে, আমি যেন মন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে অবিলম্বে দেখা করি। আমি মন্ত্রীর কক্ষে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অর্থমন্ত্রী আমাকে প্রশ্ন করলেন, আমি কেন রাষ্ট্রপতির জন্য সারসংক্ষেপ পেশ করলাম? দেশে যে মন্ত্রিসভাশাসিত রাষ্ট্রব্যবস্থা চালু হয়েছে, সেটা সম্পর্কে কি আমি অবগত নই? সেই প্রসঙ্গেই তিনি ইংরেজিতে প্রশ্ন করলেন যে, আমি কি মনে করি বঙ্গভবনে উপবিষ্ট বাঁটকু সত্যি সত্যিই দেশ পরিচালনা করছেন? আইন মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে এ কাজ করা হয়েছে বলার পর তার রাগ গিয়ে পড়লো আইন মন্ত্রণালয়ের ওপর। তিনি আইন সচিবকে টেলিফোনে গালিগালাজ করলেন এবং আমাকে বললেন যে, নথি রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো যাবে না। আমি বললাম, আপনি লিখে দেন যে, প্রধানমন্ত্রীর জন্য সারসংক্ষেপ পেশ করা হোক। তিনি লিখে দিলেন এবং তদানুসারে আবার নথি তার কাছে ফিরে গেল এবং তার ও প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি নিয়ে ব্যবস্থা গৃহীত হলো।
বিভাগীয় কাজের সমাধান ঠিকই হলো, কিন্তু আমার মনে একটা বড় খটকা জেগে উঠলো। তদানীন্তন অর্থমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির সম্পর্কে ভালো ছিল না। তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি খর্বাকৃতির ছিলেন। কিন্তু বাঁটকু শব্দটি ব্যবহার করে অর্থমন্ত্রী শুধু খর্বাকৃতিকেই পরিহাস করেননি, এর ভেতর অর্থমন্ত্রীর রাজনৈতিক দর্শনও নিহিত ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, মন্ত্রিসভাশাসিত রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির ভূমিকা গৌণ। মন্ত্রিসভার সদস্যরা যদি দৈত্যের মতো ক্ষমতাবান হন, তাহলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা নেহাত                বাঁটকুর মতো।
অথচ এ অবস্থা কিন্তু সব সময় ছিল না। ১৯৭৩ সালে আমি যখন বৃত্তি নিয়ে কানাডাতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে যাই, তখন রাষ্ট্রপতি ছিলেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। তার সময়ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা নিয়ে একটি প্রশ্ন উঠেছিল, যার সঙ্গে দুর্ভাগ্যবশত আমিও জড়িয়েছিলাম।
ঘটনাটি ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-সম্পর্কিত। তত দিনে দেশে কলাবরেটরদের শাস্তি দেয়ার জন্য আইন পাস হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন শিক্ষকের হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতার বিভিন্ন অভিযোগ আসতে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন তখন ড. মোজাফফর আহমদ চৌধুরী। তার মতে, এসব অভিযোগ সঠিক ছিল না এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে তদন্ত করার জন্য পুলিশের কর্মকর্তারা উপযুক্ত নন। কাজেই তিনি বঙ্গবন্ধুর কাছে একটি নথি নিয়ে যান। সেখানে প্রস্তাব করা হয় যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কলাবরেটর’ আইনে পুলিশ কোনো তদন্ত করবে না। এ বিষয়ে তদন্তের ভার দেয়া হবে চ্যান্সেলর কর্তৃক নিযুক্ত একটি কমিটিকে। মোজাফফর আহমদ চৌধুরী এ ফাইল স্বাক্ষরের জন্য সরাসরি গণভবনে নিয়ে যান। বঙ্গবন্ধু তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ইউসুফ আলী সাহেবকে ডেকে পাঠান। ড. চৌধুরী ও প্রফেসর ইউসুফ আলীর সঙ্গে পরামর্শ করে বঙ্গবন্ধু প্রস্তাবিত কমিটির সদস্যদের তালিকাও মৌখিকভাবে অনুমোদন করেন। তারপর শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এ সম্পর্কে নথি অবিলম্বে পেশ করার জন্য নির্দেশ দেন।
আমি তখন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে উচ্চশিক্ষা, শিক্ষা সংস্কার, সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও যুবসংক্রান্ত বিষয়ের উপ-সচিব। শিক্ষামন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে ফিরে এসে আমাকে ডেকে পাঠান এবং অনুমোদিত কমিটির তালিকাটি আমার হাতে দিয়ে এ সম্পর্কে একটি সারসংক্ষেপ প্রস্তুত করতে নির্দেশ দেন। আমি শিক্ষামন্ত্রীকে জানাই যে, এ ধরনের কমিটির আইনগত বৈধতা পরীক্ষা করার প্রয়োজন রয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে এবং এখন আর আইন মন্ত্রণালয়ের কোনো পরামর্শের প্রয়োজন নেই। তিনি আমাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নথি তৈরি করতে বলেন।
আমি আমার অফিসে ফিরে আসি এবং শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশ অনুসারে একটি বিজ্ঞপ্তির খসড়া প্রস্তুত করে টাইপিস্টকে টাইপ করার জন্য দিই। তারপর আমি আমার বক্তব্য লিখি। সেই নোটে আমি লিখি, শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশক্রমে আমি এই বিজ্ঞপ্তির খসড়া পেশ করছি। তবে বিষয়টি আইনসম্মত কিনা, সে সম্পর্কে আমার মনে প্রশ্ন রয়েছে এবং সেই প্রশ্নগুলোও অতি সংক্ষেপে আমি নোটে লিখি এবং সবশেষে লিখি যে, শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশ অনুসারে বিজ্ঞপ্তি অনুমোদনের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলরের কাছে পাঠানোর জন্য নথি পেশ করা হলো। আমার স্বাক্ষর করার পর শিক্ষাসচিব এবং শিক্ষামন্ত্রী কিছু না লিখে শুধু স্বাক্ষর করে ফাইল প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠিয়ে দেন। প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকেও ত্বরিতগতিতে রাষ্ট্রপতির কাছে ফাইলটি পাঠানো হয়।
আশা করা হচ্ছিল যে রাষ্ট্রপতির অফিস থেকে ফাইলটি একদিনের মধ্যে বেরিয়ে আসবে। দুই-তিন দিন পরও যখন ফাইলটি ফেরত আসে না, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শিক্ষামন্ত্রীর কাছে জানতে চান যে, ফাইলের কী হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী আমাকে বঙ্গভবনে যোগাযোগ করার নির্দেশ দেন। আমি বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির একান্ত সচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি আমাকে জানান যে, তারা ফাইল পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রপতির কাছে দাখিল করেছেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতি এই ফাইল স্বাক্ষর করেননি। আমি শিক্ষামন্ত্রীকে এই তথ্য জানিয়ে দেই। দিন দশেক পর হঠাৎ শিক্ষামন্ত্রী আমাকে ডেকে পাঠান। তিনি আমাকে বললেন যে, রাষ্ট্রপতি তাকে ডেকেছিলেন। রাষ্ট্রপতি তাকে প্রশ্ন করেন, যে বিজ্ঞপ্তি আমার কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠিয়েছেন, সেই বিজ্ঞপ্তির সঙ্গে যে নোট আছে, তা পড়েছেন কি? শিক্ষামন্ত্রী বললেন, স্যার, পড়েছি। এটি একজন উপ-সচিব লিখেছেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধা এবং আবেগপ্রবণ।
রাষ্ট্রপতি বললেন, মোটেও আবেগপ্রবণ নন, তার এই নোট পড়ে আমার মনেও প্রশ্ন জাগে এবং এ বিষয়ে আমি হাইকোর্ট লাইব্রেরি থেকে বই এনে পড়াশোনা করেছি। আমার ধারণা, তিনি যা লিখেছেন, সেটা সঠিক এবং আমি এই কমিটির অনুমোদন করতে পারবো না। আপনি মেহেরবানি করে বঙ্গবন্ধুকে জানিয়ে দেবেন। ইউসুফ আলী সাহেব বঙ্গবন্ধুর কাছে যান। বঙ্গবন্ধু তাকে বলেন, রাষ্ট্রপতি একজন সাবেক বিচারপতি এবং তিনি যদি এটা আইনসম্মত মনে না করেন, তাহলে এটা না করাই ভালো। সুতরাং ফাইলটি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক অস্বাক্ষরিত অবস্থায় শিক্ষামন্ত্রী ফেরত নিয়ে আসেন। তিনি ফাইলটি আমার হাতে দিয়ে বললেন যে, এ বিষয়ে আর কিছু করার নেই। তিনি আরো বললেন, রাষ্ট্রপতি আপনাকে সাহসী নোট লেখার জন্য অভিনন্দন জানাতে আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন। অবশ্য বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীও শেষ পর্যন্ত মর্যাদা নিয়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে টিকে থাকতে পারেননি। তার পদত্যাগের সঙ্গে সঙ্গেই রাষ্ট্রপতির পদের অবমূল্যায়ন শুরু হয়।
রাষ্ট্রপতির ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার বিভাজন বাংলাদেশের সাংবিধানিক বিবর্তনের একটি বড় বিষয়। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা মাত্রাতিরিক্তভাবে বেড়ে গেছে। ক্ষমতার দিক থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ফ্রান্সের বুরবন সম্রাট, রাশিয়ার জার ও মোগল বাদশার সঙ্গে তুলনীয়। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা বাড়ছে। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম হওয়ার কারণ নেই। তবে এই ক্ষমতা বৃদ্ধির একটি সীমা থাকা প্রয়োজন রয়েছে। এ প্রসঙ্গে Thomas Paine যথার্থই বলেছেন-
No country can be called free which is governed by an absolute power and it matters not whether it be an absolute royal power or an absolute legislative power as the consequences will be the same to the people.
প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা অবশ্যই বাড়াতে হবে। কিন্তু এ ক্ষমতা বাড়িয়ে স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠা করা চলবে না। রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতার বিভাজন অবশ্যই থাকতে হবে। কাজেই প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দেশে saparation of power বা ক্ষমতার বিভাজনের বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে। এই নিবন্ধে সুশাসন ও নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এটি চারটি খণ্ডে বিভক্ত। সূচনা খণ্ডের পর দ্বিতীয় খণ্ডে বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও তার সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তৃতীয় খণ্ডে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সম্পর্কে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের মধ্যে সাংবিধানিক ক্ষমতার ভারসাম্যের ওপর কোনো প্রভাব পড়েছে কি-না, সে সম্পর্কেও আলোচনা করা হয়েছে। সর্বশেষ খণ্ডে নির্বাহী বিভাগের পুনর্গঠন সম্পর্কে কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে।

Saturday, January 29, 2011

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অব্যবস্থাপনা

রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে এসবের প্রতিকার চেয়ে অবশেষে অর্থমন্ত্রীর শরণাপন্ন হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে লেখা এক দাপ্তরিক চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান ঋণ অনুমোদন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদোন্নতিতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পরিচালকদের অযাচিত হস্তক্ষেপে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর এই উদ্বেগ মোটেই অমূলক নয়।
দীর্ঘদিন ধরেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা চলছিল। এর জন্য পূর্বাপর সরকারের ভুল নীতি যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। সামরিক সরকারগুলো রাজনৈতিক স্বার্থে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকসহ সব সরকারি প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করেছে। নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে মোটা অঙ্কের ঋণ মঞ্জুর করে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়িয়েছে।
আশা করা গিয়েছিল, গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। বিশেষ করে, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ঘোষণাপত্রে যখন দিনবদলের কথা ফলাও করে প্রচার করা হয়েছিল, দেশবাসী সত্যিকারভাবে দিনবদলই চেয়েছিল। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে যেভাবে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা জেঁকে বসেছে, তাতে মনে হয় রথ উল্টো দিকেই ধাবিত হচ্ছে। মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়। নতুন সরকার এসে নতুন পর্ষদ করবে, সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু তাতে ব্যাংকিং বিষয়ে অনভিজ্ঞ সদস্যের সংখ্যা বেশি হলে তা প্রতিষ্ঠানের জন্য কল্যাণকর হতে পারে না। যেকোনো ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্ব আইন বা বিধি দ্বারাই নির্ধারিত। পর্ষদ নীতিগত সিদ্ধান্ত নেবে। কাকে ব্যাংক-ঋণ দেওয়া হবে, কাকে দেওয়া হবে না, কাকে কোথায় বদলি করা হবে, কাকে পদোন্নতি দেওয়া হবে, সেসব ব্যাপারে পরিচালকদের কিছু বলার থাকতে পারে না। কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া পরিচালকেরা এসব আইন-কানুনের তোয়াক্কা করেন না। তাঁরা গায়ের জোরে সবকিছু চালাতে চান। কোনো কোনো পরিচালক সদলবলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কক্ষে গিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে কাজ আদায় করিয়ে নেন বলেও অভিযোগ আছে। এ ধরনের জবরদস্তি কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চলতে পারে না। অতীতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে অনেক লোকসান গুনতে হয়েছে জবরদস্তির কারণে। এখন এসব প্রতিষ্ঠানকে দেশি-বিদেশি বেসরকারি ব্যাংকের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই টিকে থাকতে হবে।
অতএব, পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুপারিশ অনুযায়ী পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। যাঁরা ব্যাংকিং বিষয়ে অভিজ্ঞ, কেবল তাঁদের নিয়েই পরিচালনা পর্ষদ গঠন করতে হবে। দলীয় লোকদের দিয়ে আর যা-ই হোক, ব্যাংক চলতে পারে না। আশা করি, অর্থমন্ত্রী রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সমস্যাটি অনুধাবন করবেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। ব্যাংকিং খাত পরিচালনার ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী সরকার দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির যে কুদৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল, তার পুনরাবৃত্তি হবে দুর্ভাগ্যজনক। অতএব, সব দলীয় লোক বাদ দিয়ে পেশাদারি ব্যক্তিদের নিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের বিকল্প নেই। যেকোনো মূল্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। ব্যাংক চালাতে হবে আইন ও বিধি অনুযায়ী, কারও খেয়ালখুশি মতো নয়।

Wednesday, December 8, 2010

গ্রামীণ ব্যাংক বিতর্ক

গ্রামীণ ব্যাংক এবং এর প্রতিষ্ঠাতা শান্তিতে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে সাম্প্রতিককালে যে বিতর্ক দেখা দিয়েছে, তা যেমন অনাকাঙ্ক্ষিত, তেমনি শিষ্টাচারের সীমাও অতিক্রম করেছে বলে আমাদের ধারণা। যেসব ব্যক্তি তাঁদের কর্ম ও সাধনা দিয়ে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছেন, মুহাম্মদ ইউনূস নিঃসন্দেহে তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। যেকোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির সমালোচনা হওয়া উচিত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে। গয়রহ অভিযোগ এনে কোনো সিদ্ধান্তে আসা বা মন্তব্য করা হলে সেটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি অবিচারই করা হয়।
সম্প্রতি নরওয়ের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ক্ষুদ্রঋণের ওপর নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রচারের পর এই বিতর্কের সূচনা হয়েছে। ওই প্রামাণ্যচিত্রের বরাত দিয়ে দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, মুহাম্মদ ইউনূস ১৯৯৭ সালে গ্রামীণ ব্যাংককে নোরাডের দেওয়া ১০ কোটি ডলারের তহবিল এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ কল্যাণে স্থানান্তর করেছেন, যা নিয়ে নরওয়ে সরকারের সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল। এ খবর প্রকাশিত হওয়ার পর গ্রামীণ ব্যাংকের পক্ষ থেকে একটি ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে। তারা বলেছে, বিষয়টি ১৯৯৮ সালেই নিষ্পত্তি হয়ে গেছে এবং নরওয়ে সরকার তাদের যুক্তি মেনে নিয়েছে।
রোববার সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করেছেন, সেটি অনভিপ্রেত। তদন্তের আগেই কাউকে দোষারোপ করা যায় না। এ ব্যাপারে সরকারের মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতারাও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য রেখেছেন। জাতীয় সংসদের আইন দ্বারা পরিচালিত গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদে ক্ষুদ্র গ্রাহক প্রতিনিধিদের পাশাপাশি সরকারেরও তিনজন প্রতিনিধি আছেন। প্রতিষ্ঠানটি যদি এতই অনিয়ম করে থাকে, সরকার আগে তদন্ত করল না কেন? প্রশ্ন হলো, তহবিল স্থানান্তরে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, কিংবা এর মাধ্যমে মুহাম্মদ ইউনূস ব্যক্তিগত সুবিধা নিয়েছেন কি না? তহবিল স্থানান্তর করে তিনি সুবিধা নিয়েছেন, সেই দাবি কিন্তু নরওয়ের টেলিভিশন বা প্রামাণ্যচিত্রের নির্মাতাও করেননি।
দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে ক্ষুদ্রঋণের উপযোগিতা নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে এবং আছেও। তবে স্বীকার করতে হবে, প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যাঁরা ঋণ পাওয়ার যোগ্য নন, গ্রামীণ ব্যাংক তাঁদেরই ঋণ দিয়ে থাকে। গ্রাহকদের ৯০ শতাংশ নারী বলে তাঁদের ক্ষমতায়নেও বিরাট ভূমিকা রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে দেশে এই মডেলে বহু আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঋণসেবা দিয়ে যাচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশ তো বটেই, ইউরোপ-আমেরিকার বহু দেশে গ্রামীণ ব্যাংক মডেল জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।
প্রধানমন্ত্রী গ্রামীণ ব্যাংকের তহবিল স্থানান্তরসহ সব বিষয়ে তদন্ত হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন। মুহাম্মদ ইউনূসও প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, ‘আমরাও মনে করি, অভিযোগগুলো নিয়ে তদন্ত হোক এবং তদন্তের মাধ্যমে বিতর্কের অবসান হোক।’ এখন সরকারের দায়িত্ব হবে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা। কাজটি অভিভাবক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও করতে পারে। যেই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে লাখ লাখ মানুষের জীবনজীবিকা ও দেশের ভাবমূর্তি জড়িত, সেই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে অহেতুক বিতর্ক কাম্য নয়। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যত দ্রুত সম্ভব এই বিতর্কের অবসান হওয়া উচিত।

Saturday, November 6, 2010

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুপরামর্শ -বেকার তরুণ-তরুণীরা উপকৃত হবেন

দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোকে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে আবেদন ফি না নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক অত্যন্ত সুবিবেচনার পরিচয় দিয়েছে। দেশে কর্মহীন তরুণ-তরুণীর সংখ্যার তুলনায় চাকরির সংখ্যা নগণ্য। একেকজন চাকরিপ্রার্থীকে অসংখ্য জায়গায় চাকরির জন্য আবেদন করতে হয়। কর্মহীন বলে তাঁরা অর্থকষ্টে থাকেন; তদুপরি চাকরির জন্য আবেদন ফির অর্থ সংগ্রহ করা তাঁদের গোদের উপর বিষফোড়ার মতো কষ্টকর হয়ে যায়। তফসিলি ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরামর্শ অনুযায়ী চাকরির আবেদন ফি নেওয়ার বিধান প্রত্যাহার করলে বেকার চাকরিপ্রার্থী তরুণ-তরুণীদের অনেক উপকার হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পরামর্শ শুধু চারটি তফসিলি ব্যাংকের ক্ষেত্রেই নয়, সরকারি-বেসরকারি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে তা বিবেচনা করা উচিত বলে আমাদের মনে হয়। বেকার তরুণ-তরুণীরা প্রতিটি চাকরিক্ষেত্রে আবেদনপত্রের সঙ্গে ফি জমা দিতে বাধ্য হন। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে এই ফি ৫০০ টাকা বা তারও বেশি। এই টাকা ফেরতযোগ্যও নয়। অনেক আবেদনকারীকে লিখিত পরীক্ষা বা ইন্টারভিউয়ের জন্য ডাকাও হয় না। ফলে তাঁদের অনেক ক্ষতি স্বীকার করেও বারবার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির চেষ্টা করতে হয়।
মাঝেমধ্যে প্রথম আলোর চিঠিপত্র বিভাগে বেকার চাকরিপ্রার্থী তরুণ-তরুণীদের চিঠিপত্র আসে। এমন অভিযোগও কেউ কেউ করেন যে কিছু বেসরকারি সংস্থা চাকরির বিজ্ঞপ্তি ছাপিয়ে অর্থ আয় করে। আবেদনপত্রের সঙ্গে ফি হিসেবে নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ ব্যাংক ড্রাফট, পে-অর্ডার ইত্যাদি আকারে জমা দিতে বলা হয়। বেকারের দেশে একেকটি পদের জন্য হাজার হাজার প্রার্থী আবেদন করেন; বিজ্ঞপ্তি প্রকাশকারী চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানটির কাছে হাজার হাজার ব্যাংক ড্রাফট বা পে-অর্ডার জমা হয়, যা অফেরতযোগ্য। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান চাকরিপ্রার্থীদের পরীক্ষা বা ইন্টারভিউয়ের আয়োজনই করে না। এ ধরনের প্রতারণা থেকে বেকার যুবসমাজকে বাঁচানোর উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
সরকারি ও আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি ফি ছাড়াই চাকরিপ্রার্থীদের আবেদনের সুযোগ দেয়, তাহলে সবচেয়ে ভালো হয়। যদি সেটা একেবারেই অসম্ভব হয়, তাহলে যেন টাকার অঙ্ক হয় ন্যূনতম। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও একই নিয়ম হওয়া উচিত। আর যেসব প্রতিষ্ঠান সব আবেদনকারীকে পরীক্ষা বা ইন্টারভিউয়ের জন্য ডাকে না, শুধু বাছাই করা প্রার্থীদের ডাকে, তাদের উচিত বাকি সব আবেদনকারীর ফির টাকা ফেরত দেওয়া।