Saturday, October 18, 2025
ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গে শেখ মুজিবকে নিয়ে by বদরুদ্দীন উমর
২০ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ‘একুশে পদক ২০২৩’ প্রদান অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর যে অবদান, সেই অবদানটুকু কিন্তু মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছিল। অনেক বিজ্ঞজন, আমি কারও নাম বলতে চাই না, চিনি তো সবাইকে। অনেকে বলেছেন, ওনার আবার কী অবদান ছিল? উনি তো জেলেই ছিলেন। বঙ্গবন্ধু জেলে ছিলেন বলে ওনার কোনো অবদান নেই? তাহলে উনি জেলে ছিলেন কেন? এই ভাষা আন্দোলন করতে গিয়েই তো তিনি বারবার কারাগারে গিয়েছেন। সেই গুরুত্ব কিন্তু কেউ দিতে চায়নি। আমাদের ভাষা মাতৃভাষার অধিকার আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁরই উদ্যোগে ভাষাসংগ্রাম কমিটি গঠিত হয় ১৯৪৮ সালে। ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই কিন্তু আমাদের স্বাধীনতা অর্জন।’ পাকিস্তান ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের রিপোর্টে ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিবের অবদানের কথা উল্লেখ আছে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘ইন্টেলিজেন্স রিপোর্টগুলো পাওয়ার পর আমি একটা ভাষণ দিয়েছিলাম। তখন একজন বিদগ্ধজন আমাকে খুব ক্রিটিসাইজ করে একটা লেখা লিখলেন যে আমি নাকি সব বানিয়ে বানিয়ে বলছি।’
ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিবের অবদান মুছে ফেলার ‘অপচেষ্টা’ যে আমি করেছি, এটা শেখ হাসিনা কখনো আমার নাম উল্লেখ করে এবং কখনোবা নাম উল্লেখ না করে (যেমন ওপরের উদ্ধৃতি) সুস্পষ্ট ইঙ্গিতে বলে থাকেন। এ প্রসঙ্গে প্রথমেই বলে রাখা দরকার যে আমি আমার লেখায় কোনো ক্ষেত্রেই কোনো দল বা ব্যক্তিকে বড় বা ছোট করার চেষ্টা কখনো করিনি। আমি সব সময় তথ্যের ভিত্তিতেই লিখেছি, তথ্যের বাইরে কোনো আন্দাজি কথাবার্তা বলার অভ্যাস আমার একেবারেই নেই। এ দেশের এবং দেশের বাইরে আমার পাঠকেরা এটা ভালো করেই জানেন। নিজের কাছে সৎ থাকাকে আমি গুরুত্ব দিই। কারণ, সেটাই হলো একজনের সৎ চিন্তা ও আচরণের অপরিহার্য শর্ত। এই আত্মমর্যাদাবোধের অভাবই বর্তমানে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী, লেখক–সাহিত্যিকদের মধ্যে ব্যাপকভাবে দেখা যায়।
শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘ভাষা আন্দোলন করতে গিয়েই তো তিনি বারবার কারাগারে গিয়েছেন।’ এ কথা ঠিক নয়। শেখ মুজিব একবারই, ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ভাষা আন্দোলনের সময় জেলে গিয়েছিলেন। শুধু তিনি নন। সে সময় মোহাম্মদ তোয়াহা, রণেশ দাশগুপ্তসহ অনেকেই জেলে গিয়েছিলেন। চার–পাঁচ দিন পরই তাঁদের সবাইকে জেল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৫২ সালে শেখ মুজিব ভাষা আন্দোলনের জন্য জেলে ছিলেন না।
শেখ মুজিব শুধু ভাষা আন্দোলন নয়, এ দেশে অনেক আন্দোলনের সঙ্গেই জড়িত ছিলেন। ১৯৪৯ সালে খাদ্য আন্দোলনের সময় তাঁর জেল হয়েছিল। জেল থেকে তিনি মুক্তি পেয়েছিলেন ১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি। এরপরও তিনি নানা আন্দোলনে জড়িত থাকার কারণে বারবার জেলে গিয়েছিলেন।
শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমাদের ভাষা মাতৃভাষার অধিকার আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁরই উদ্যোগে ভাষাসংগ্রাম কমিটি গঠিত হয় ১৯৪৮ সালে।’ এই বক্তব্য ঠিক নয়। পরবর্তী জীবনে শেখ মুজিবুর রহমান একজন বড় মাপের রাজনীতিবিদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন, কিন্তু ১৯৪৮ সালে ঢাকার রাজনীতিতে তাঁর এমন কোনো অবদান ছিল না, যাতে তিনি ভাষা আন্দোলন বা অন্য কোনো আন্দোলনের সূচনা করতে পারেন।
এটা সবাই জানেন এবং এই সত্য সুপ্রতিষ্ঠিত যে ১৯৪৮ সালে প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠনের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন আবদুল মতিন। এ জন্য তিনি ‘ভাষা মতিন’ নামে পরিচিত হয়েছিলেন। আবদুল মতিনের সঙ্গে সেই কমিটি গঠনের ব্যাপারে অন্যরাও যুক্ত ছিলেন। কিন্তু তাতে শেখ মুজিবের কোনো উদ্যোগ, এমনকি উল্লেখযোগ্য সম্পৃক্ততা ছিল না। অন্য অনেকের মতো তিনি ১১ মার্চ মিছিলে রাস্তায় ছিলেন এবং জেলে গিয়েছিলেন। ১৯৫২ সালে যখন সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়, তখন শেখ মুজিব জেলে ছিলেন।
শেখ হাসিনা বলেছেন, পাকিস্তান ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের রিপোর্টে ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানের উল্লেখ আছে। শেখ মুজিবকে শাস্তিযোগ্য লোক প্রমাণ করার জন্যও এভাবে লেখা হয়ে থাকতে পারে। এ ছাড়া গোয়েন্দা পুলিশরা অনেক মিথ্যা রিপোর্ট নিজেরাও তৈরি করে থাকে। মোনায়েম খানের আমলে একবার কুমিল্লার ধীরেন দত্ত, অজিত গুহ এবং আমাকে জড়িয়ে এক গোয়েন্দা রিপোর্ট দিয়েছিল। এটা নিয়ে মোনায়েম খান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শামসুল হক সাহেবের ওপর আমাকে বরখাস্ত করার জন্য চাপ দিয়েছিলেন। তাতে কাজ হয়নি। এরপরই ওই গোয়েন্দা রিপোর্ট মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ গোয়েন্দাকে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। সেই সময় মণি সিংহের বিরুদ্ধেও এক মিথ্যা গোয়েন্দা রিপোর্ট দেওয়া হয়েছিল এবং সেটাও ধরা পড়েছিল।
কিন্তু এ ক্ষেত্রে যে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রাখা যায়, তা হলো ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে ইতিহাসবিদদের সংগৃহীত তথ্যের পরিবর্তে গোয়েন্দা পুলিশের রিপোর্টই কি অধিকতর নির্ভরযোগ্য? ইতিহাসবিদদের পরিবর্তে পুলিশের গোয়েন্দারাই কি প্রকৃত অর্থে সত্যের ধারক–বাহক?
ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিবের ভূমিকা মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছে, এটা শেখ হাসিনার নিজস্ব বক্তব্য। বাস্তবত দেখা যাবে ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিবের নায়কোচিত ভূমিকার কথা বলে এ দেশে অনেক লেখালেখি হচ্ছে। অজস্রই বলা যেতে পারে। এ ধরনের একটি লেখার কথা এখানে উল্লেখ করা যায়। কারণ, এটি প্রকাশিত হয়েছে কয়েক দিন আগে, ২১ ফেব্রুয়ারি দৈনিক বাংলা পত্রিকায়। আওয়ামী ঘরানার এক সাহিত্যিক ‘বঙ্গবন্ধুর ভাষা আন্দোলন’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখেছেন। সেই প্রবন্ধে শেখ মুজিবুর রহমানকে ভাষা আন্দোলনের মহানায়ক হিসেবে উপস্থিত করে অনেক কথা বলা হয়েছে, কিন্তু জনগণের ভূমিকার কোনো উল্লেখমাত্র এই লেখায় নেই। বলা হয়েছে, ভাষা আন্দোলন ছিল শেখ মুজিবের আন্দোলন। ‘বাবু যত বলে পারিষদ দলে বলে তার শতগুণ।’ বাস্তবত শেখ মুজিবের ভূমিকা কোথায় কীভাবে ছিল, এর কোনো উল্লেখ না করে তিনি বলেছেন ভাষা আন্দোলন যে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে, তাতে তাঁর ‘নেপথ্য ভূমিকার অবদান’–এর কথা। এই রচনায় ইতিহাসকে যেভাবে বুড়ো আঙুল দেখানো হয়েছে, তা বিস্ময়কর। এভাবে ইতিহাসকে বুড়ো আঙুল দেখাতে তিনি বলছেন, ‘তিনি না হলে বাংলাদেশ নামক স্বাধীন ভূখণ্ড অর্জন কত শতাব্দী পিছিয়ে যেত, তা পরিমাপ করা যায় না।’ দেখা যাচ্ছে পূর্ব বাংলায় জনগণের ওপর পাকিস্তান সরকারের শোষণ–নির্যাতন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ জনগণের ওপর পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর সর্বাত্মক সশস্ত্র আক্রমণ, তার বিরুদ্ধে জনগণের বিশাল স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ আন্দোলন, তাঁদের আত্মত্যাগ—এসবের কোনোই গুরুত্ব নেই বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ক্ষেত্রে! শেখ মুজিব না থাকলে জনগণের সেই প্রতিরোধ ‘শতাব্দীর পর শতাব্দী’ বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে পারত না! এ ধরনের লেখালেখি ও ভুল ইতিহাসচর্চাই এখন বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠিত বুদ্ধিজীবী, লেখক, ইতিহাসবিদ, সাহিত্যিক করছেন। এর ফলে বিভিন্ন পদ অধিকার করে এবং নানা প্রকার সুযোগ–সুবিধা লাভ করে তাঁরা ভালোই আছেন।
পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি বইটি লেখার সময় ১৯৬৯ সালের প্রথম দিকে শেখ মুজিবুর রহমানের একটা সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। (সেই সাক্ষাৎকারের বিবরণ আছে আমার আত্মজীবনী আমার জীবন–এর তৃতীয় খণ্ডে)। একদিন তাঁকে ফোন করে বললাম, আমি ভাষা আন্দোলনসহ অন্যান্য বিষয় নিয়ে একটা বই লিখছি, তাঁর একটা সাক্ষাৎকার নিতে চাই। তিনি বললেন, ‘আগামীকাল সকাল সাতটায় চলে এসো।’ আমি যথাসময়ে গেলাম ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে তাঁর বাড়িতে। সেই একবারই আমি ওই বাড়িতে গেছি। গিয়ে দেখলাম সেই সাতসকালেই সেখানে লোকের ভিড়। আমি খবর দেওয়ায় তিনি বেরিয়ে এসে আমাকে তাঁর সঙ্গে ভেতর দিকের একটা কামরায় নিয়ে গেলেন। কাজের লোকদের বললেন, কেউ যেন ঘরের মধ্যে না আসে। এরপর তিনি নিজেই দরজা বন্ধ করে দিলেন।
আমি তাঁর সঙ্গে ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ধর্মঘট আন্দোলন, ১৯৪৯ সালের খাদ্য আন্দোলন, ১৯৪৮ ও ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনসহ পরবর্তীকালের রাজনীতি ও রাজনৈতিক আন্দোলন নিয়ে অনেকক্ষণ আলাপ করেছিলাম। তিনি তো আমাকে ছোটবেলা থেকেই চিনতেন। আগ্রহের সঙ্গে আমাকে অনেক সময় দিয়েছিলেন। কথাবার্তার মধ্যে আমাকে রসগোল্লাও খাইয়েছিলেন।
১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের বিষয় আলোচনার সময় তিনি বললেন, সেই আন্দোলনে তাঁর বড় ভূমিকা ছিল। আমি বললাম, সেটা কী করে হয়। আপনি তো তার আগে কলকাতায় ছাত্রলীগের রাজনীতি করেছিলেন। ঢাকার সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক তো থাকেনি। সে সময় ঢাকায় নবাগত ছিলেন। তিনি বললেন ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ও জেলে যাওয়ার কথা। আমি বললাম, সে সময় তো শত শত ছাত্র এবং সাধারণ রাজনৈতিক কর্মী রাস্তার আন্দোলনে ছিলেন। তাঁদের অনেকেরই জেল হয়েছিল। তাঁদের সবার একটা ভূমিকা থাকলেও অল্পসংখ্যকেরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
এ ছাড়া আমি তাঁকে বললাম, আপনি তো বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির সদস্যও ছিলেন না। ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের ঠিক পরপরই জিন্নাহ সাহেব ঢাকায় এসেছিলেন। তিনি রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির সঙ্গে এবং ছাত্রলীগের নেতৃস্থানীয়দের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। মোহাম্মদ তোয়াহা, অলি আহাদ, শামসুল হক, তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ অনেকে সেই দুই সাক্ষাতের সময় ছিলেন, কিন্তু আপনি তো তাঁদের মধ্যে ছিলেন না। তিনি বললেন, ‘আমি তাজউদ্দীন ও নজরুল ইসলামকে আমার প্রতিনিধি হিসেবে পাঠিয়েছিলাম।’ কায়েদে আজমের সঙ্গে নিজে দেখা করতে না গিয়ে প্রতিনিধি পাঠিয়েছিলেন, এ কথায় আমি খুব বিস্মিত হয়েছিলাম। তাঁকে বললাম, সেটা কী করে হয়? এখন আপনি তাঁদের আপনার প্রতিনিধি হিসেবে কোথাও পাঠাতে পারেন। কিন্তু তখন ঢাকার রাজনীতিতে তো তাজউদ্দীন ও নজরুল ইসলামের গুরুত্ব আপনার থেকে বেশি ছিল। সৈয়দ নজরুল ইসলাম তো ছিলেন সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি)। সেই হিসেবে তিনি রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির সদস্য ছিলেন। তাজউদ্দীন ছিলেন একটি গ্রুপের সদস্য এবং তখনকার ঢাকার রাজনীতিতে সুপ্রতিষ্ঠিত একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। তিনি এরপর আর কিছু বললেন না, চুপ করে থাকলেন। আমার এসব কথার পর তিনি যে আমার ওপর রাগ করেছিলেন বা বিরক্ত হয়েছিলেন, এমন মনে হলো না।
ভাষা আন্দোলন বিষয়ে আমার লেখার বিরুদ্ধে লেখালেখি ও বিষোদ্গার শুরু হয়েছিল অনেক আগে। এর সূচনা করেছিলেন অধ্যাপক মযহারুল ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের সহকর্মী, পরে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। দৈনিক ইত্তেফাক–এ ১৯৭৩ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি বিশেষ সংখ্যা ও পরবর্তী রবিবাসরীয় একাধিক সংখ্যায় একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালক মযহারুল ইসলাম ‘ভাষা আন্দোলন ও শেখ মুজিব’ শীর্ষক একটি দীর্ঘ রচনা প্রকাশ করেন। এ রচনাটিতে তাঁর বক্তব্য ছিল, আমি ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিবের ভূমিকাকে অস্বীকার করে কৌশলের সঙ্গে তাঁকে খাটো করার চেষ্টা করেছি। বস্তুতপক্ষে তাঁর রচনায় সঙ্গে তথ্য ও সত্যের কোনো সম্পর্ক ছিল না। সেটা ছিল তোষামোদের উদ্দেশ্যে আমার বিরুদ্ধে এক বড় মিথ্যাচার। সে সময় তিনি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক।
আমি মযহারুল ইসলামের সেই রচনার একটি দীর্ঘ জবাব দিয়ে ইত্তেফাক পত্রিকায় পাঠালাম। দুই কিস্তিতে সেটা ছাপা হয়েছিল। এখানে বলা দরকার যে ইত্তেফাক–এ ড. মযহারুল ইসলাম আমার বিরুদ্ধে যা লিখেছিলেন, সেসব কথা ছিল তাঁর দ্বারা লিখিত ও বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নামে একটি বৃহদাকার বইয়ে। বইটি ছিল মিথ্যায় পরিপূর্ণ। মযহারুল ইসলাম তাঁর লেখাটিতে এমন এক কাজ করেছিলেন, যা ছিল বিস্ময়কর। বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক, পরবর্তীকালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদাধিকারী একজন লোক যে কতখানি মূর্খ, অসৎ ও ধান্দাবাজ হতে পারেন, তাঁর দৃষ্টান্ত তিনি রেখেছিলেন। তিনি নাটকীয়ভাবে বর্ণনা করেছিলেন ভাষা আন্দোলনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের ভূমিকার কথা। লিয়াকত আলীর মৃত্যু হয়েছিল ১৯৫১ সালের ১৬ অক্টোবর। এ নিয়ে তখন চারদিকে মহা হইচই হয়েছিল।
মযহারুল ইসলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়ে চলে যাওয়ার পর বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হয়েছিলেন মুস্তাফা নূরউল ইসলাম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁরা বাংলা বিভাগে সহকর্মী থাকার সময় তাঁদের মধ্যে সম্পর্ক ভালো ছিল না।
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হওয়ার পর মুস্তাফা নূরউল ইসলাম একদিন শেখ মুজিবের সঙ্গে একাডেমির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। তখন রাত প্রায় ১২টা। অন্যান্য বিষয় আলোচনার পর তিনি শেখ মুজিবকে বলেন, তাঁকে নিয়ে কিছু লেখালেখি হচ্ছে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত। এসবের দ্বারা তাঁর ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী শুধু নন, জাতির পিতা। কাজেই তাঁর ভাবমূর্তি এভাবে নষ্ট হওয়া ঠিক নয়। মুস্তাফা সাহেব ঘুরিয়ে–ফিরিয়ে পরোক্ষভাবে এসব কথা বলতে থাকার সময় শেখ মুজিব তাঁকে বলেন, ‘কী বলছিস সোজা করেই বল না। এত ঘুরিয়ে–ফিরিয়ে কথা বলার কী দরকার?’ শেখ মুজিবের এ কথার পর মুস্তাফা সাহেব আমার বিরুদ্ধে মযহারুল ইসলামের লেখালেখির কথা, বিশেষ করে তাঁর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নামক বইটির কথা উল্লেখ করেন। এ কথা শুনে শেখ মুজিব তাঁকে বলেন, ‘তুই কি মনে করিস, আমি এসব বিষয়ে কিছু জানি না।’ এই বলে তিনি বইয়ের একটি শেলফ দেখিয়ে বলেন, ‘ওটার ওপর যে ফাইলটা আছে, সেটা নিয়ে আয়।’ ফাইল নিয়ে এলে তিনি বললেন, ‘দেখ, ওতে কী আছে।’ দেখা গেল, সেই ফাইলে আমার ও ড. মযহারুল ইসলামের ইত্তেফাক–এ প্রকাশিত বিতর্কমূলক রচনাগুলো একসঙ্গে সাজিয়ে রাখা আছে। খুব সম্ভবত প্রেস ইনফরমেশন ডিপার্টমেন্ট থেকে ফাইলটি তৈরি করে তাঁর কাছে দেওয়া হয়েছিল।
ফাইলে লেখাগুলো দেখে মুস্তাফা সাহেব বলেন, ‘আপনি তো এগুলো দেখেছেন। এ বিষয়ে আপনার মত কী?’ শেখ মুজিব বললেন, ‘উমর যা লিখেছে, তার তথ্যগুলি ঠিক, সে বিষয়ে আমার বলার কিছু নেই। তবে তার মূল্যায়নের সাথে আমি একমত নই।’ মুস্তাফা সাহেব বললেন, ‘ডক্টর মযহারুল ইসলামের বই যদি ভুল তথ্যে এভাবে ভরা থাকে, তাহলে সেটা তো আপনার ভাবমূর্তি নষ্ট করবে। আপনি তো দেশের প্রধানমন্ত্রী ও জাতির পিতা। কিন্তু আপনি যদি বলেন, তাহলে বইটির যে হাজার হাজার কপি গুদামে আছে, সেগুলো আমি স্কুল–কলেজে ও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিক্রি করে দিতে পারি। তবে সেটা তো ভালো হবে না। কিন্তু যদি এভাবে বিক্রি করা না হয়, তাহলে আবার বাংলা একাডেমির বিরাট ক্ষতি।’
মুস্তাফা সাহেব এ কথা বলার পর শেখ সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেন, ‘যা, বইগুলো ফেলে দেগা। কোনো অসুবিধা হবে না। ওপরে আল্লাহ, নিচে শেখ মুজিব।’ এর পরদিন সকালের দিকে বাংলা একাডেমিতে গিয়ে মুস্তাফা নূরউল ইসলাম ড. মযহারুল ইসলামের নধরকান্তি বইটির হাজার হাজার কপি গুদাম থেকে বের করে ফেলে দিয়েছিলেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণ আছে পাঁচ খণ্ডে প্রকাশিত আমার আত্মজীবনী আমার জীবন–এর (প্রকাশক বাঙ্গালা গবেষণা) চতুর্থ খণ্ডে। হাজার হোক, নিজের একটা বৃহদাকার জীবনীগ্রন্থ এভাবে ফেলে দেওয়ার মধ্যে যে শেখ মুজিবের সততার একটা পরিচয় ছিল, এতে সন্দেহ নেই।
ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিবের ভূমিকা মুছে ফেলা তো দূরের কথা, ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত শেখ মুজিবের রাজনৈতিক ভূমিকা সম্পর্কে আমি বাঙলাদেশের অভ্যুদয় নামক আমার দুই খণ্ডে প্রকাশিত (প্রকাশক বাতিঘর) বইয়ে অনেক লিখেছি। এক শ ভাগ তথ্যের ভিত্তিতে লিখিত বিবরণে তাঁর ভূমিকা যা–ই হোক না কেন, তা মুছে ফেলার কোনো চেষ্টা আমি করিনি।
ইতিহাসে যেকোনো ব্যক্তির ভূমিকা আলোচনার জন্য ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার। কারণ, কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তির ভূমিকা সম্পর্কে কে কী মনে করে, তার দ্বারা কোনো ব্যক্তির সঠিক ভূমিকা নির্ণয় করা একেবারেই অবৈজ্ঞানিক এবং প্রকৃত ইতিহাসচর্চার পথে মস্ত অন্তরায়। এ কথা সত্য যে একজন বড় মাপের ঐতিহাসিক ব্যক্তি তাঁর নিজের বিশেষ ক্ষেত্রে সমাজকে, সমাজের চিন্তাভাবনা, সাহিত্যকর্ম, বিজ্ঞানচর্চা, রাজনীতি ইত্যাদিকে অল্পবিস্তর প্রভাবিত করে থাকেন। কিন্তু তার থেকে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, তাঁদের প্রত্যেকেই নিজের সময়ের সমাজকাঠামোর অধীন। প্রত্যেক মানুষের—তিনি যতই সামান্য বা বিরাট হোন—চিন্তাভাবনা ও কার্যকলাপ তাঁর পরিপার্শ্ব এবং তাঁর সময়কার সমাজ সম্পর্ক ও বিদ্যমান পরিস্থিতি দ্বারা নির্ধারিত হয়ে থাকে।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আঠারো শতকের সমাজে সম্ভব ছিলেন না। ডারউইন ও মার্ক্সও সম্ভব ছিলেন না আঠারো শতকে। উনিশ শতকে সম্ভব ছিল না গান্ধী, জিন্নাহ, নেহরুর মতো রাজনৈতিক নেতার আবির্ভাব। আইনস্টাইনের মতো বিজ্ঞানী সম্ভব ছিলেন না উনিশ শতকে। সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটকের মতো চিত্রপরিচালক সম্ভব ছিলেন না বিশ শতকের প্রথম দিকেও। শুধু তা–ই নয়, এসব বিরাট পুরুষ ছাড়াও সাধারণ রাম–রহিমের জীবনও এভাবে তাঁদের বিদ্যমান সমাজ দ্বারাই গঠিত। যেকোনো মানুষের—তিনি ছোট, বড়, মাঝারি যে মাপেরই হোন না কেন—জীবন, চিন্তাভাবনা ও কর্ম তাঁর সময় ও সমাজ দ্বারা নির্ধারিত। কাজেই কে কার সম্পর্কে কী মনে করছে বা মনে করতে চায়, তার দ্বারা কোনো ব্যক্তির ঐতিহাসিক ভূমিকা নির্ধারণ প্রচেষ্টা বিবেচনার বিষয় হতে পারে না। ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকা নিয়ে মার্ক্স, প্লেখানভ ও লেনিনের তাত্ত্বিক রচনা আছে, যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অন্য কারও কারও মতো আমিও ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকা বিষয়ে লিখেছি।
ইতিহাসে দেখা যায়, যাঁরা নিজের বিশেষ ক্ষেত্রে বড় মাপের মানুষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, ভূমিকা পালন করেছেন, সেটা রাতারাতি হয়নি। ছোট থেকে বড় হওয়ার জন্য তাঁদের চেষ্টা করতে হয়েছে। বড় হয়ে তিনি যেসব কাজ করেছেন, ছোট থাকা অবস্থায় সেসব কাজ তাঁর দ্বারা সম্ভব ছিল না।
সমাজ পরিবর্তনশীল। এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই প্রতিটি সমাজ অগ্রসর হয়। এভাবে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রই বিকশিত হয়। এ জন্য সময়ের একপর্যায়ে যা হয় বা পাওয়া যায়, অন্য পর্যায়ে তা হয় না, তা পাওয়া যায় না। আবার একই সময়ে বা একই পর্যায়ের প্রয়োজনের তাগিদে দেখা যায় একই ধরনের মানুষ, তাঁদের একই ধরনের কাজ। ক্ষেত্রবিশেষে দেখা যায়, একাধিক ব্যক্তির একই রকম কাজ। একই বিন্দুতে তাঁদের অবস্থান। নিউটন এবং জার্মান দার্শনিক ও গণিতবিদ লাইবনিৎস একই সময়ে স্বাধীনভাবে আবিষ্কার করেছিলেন ডিফারেনশিয়াল অ্যান্ড ইন্টেগ্রাল ক্যালকুলাস; একই সময় আবির্ভাব হয়েছিল মার্ক্স ও এঙ্গেলস এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও অক্ষয় দত্ত; আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিজ্ঞানীরা খুব কাছাকাছি সময়ে স্বাধীনভাবে আবিষ্কার করেছিলেন আণবিক বোমা।
সমাজের বিবর্তন সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তিনিরপেক্ষ। বিবর্তনের প্রক্রিয়াই নির্ধারণ করে কখন সমাজে কী ঘটবে, কী ধরনের সব নতুন নতুন শক্তির উত্থান হবে, কী ধরনের ব্যক্তির আবির্ভাব হবে। এসবের সঙ্গে ব্যক্তির কোনো সম্পর্ক নেই। সবই ব্যক্তিনিরপেক্ষ। এভাবেই ইতিহাসে আবির্ভাব হয় একেক সময়ে, একেক পর্যায়ে বিশেষ ধরনের ব্যক্তির। এখানে ব্যক্তি নির্ধারক নয়, ইতিহাসই আবির্ভাব ঘটায় প্রয়োজনীয় ব্যক্তির। প্লেখানভ লিখেছিলেন, নেপোলিয়ন যদি না থাকতেন, তাহলে তৎকালে ফ্রান্সে নেপোলিয়নের মতো অন্য এক সামরিক নায়কের আবির্ভাব ঘটত। শেখ মুজিব না থাকলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা দু–চার বছর বা দু–দশ বছর নয়, শতাব্দীর পর শতাব্দী পিছিয়ে যেত—এ ধরনের বক্তব্যের মধ্যে অন্য যে জ্ঞানই থাকুক, সামান্যতম ইতিহাসজ্ঞান নেই।
![]() |
| বদরুদ্দীন উমর |
Wednesday, February 12, 2020
মাতৃভাষার রক্তক্ষরণ by ড. মো. নজরুল ইসলাম

যে ভাষার জন্য রক্ত দিল সালাম, বরকত ও আরও অসংখ্য বীর, একুশে ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ঘোষণার মাধ্যমে যে ভাষা আন্দোলনকে সারা বিশ্ব স্বীকৃতি দিয়েছে, সে ভাষা আজ আমাদের কাছে শুধু একটি প্রভাত ফেরি ও কিছু আনুষ্ঠানিকতায় সীমিত হয়ে আছে। যে বাংলা থাকার কথা আমাদের বিশ্বাসে, চেতনায় ও কর্মে, সে বাংলা এখন ইংরেজি, হিন্দি, আরবি প্রভৃতি ভাষার ধাক্কায় অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে। বাংলাকে নিয়ে গর্বের পরিবর্তে আমরা হীনম্মন্যতায় ভুগি।
প্রথমেই আসি ইংরেজি প্রসঙ্গে। ইংরেজি এখন একমাত্র আন্তর্জাতিক ভাষা, এ কথা সবাই বললেও কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা কিন্তু ইংরেজিকে এরূপ স্বীকৃতি কখনো দেয়নি। জাতিসংঘ ইংরেজির পাশাপাশি আরও কিছু ভাষাকে আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছে। আর ইংরেজি সারা বিশ্বে বহুল প্রচলিত ভাষা নয়। লোকসংখ্যার হিসেবে ইংরেজি ভাষাভাষীদের স্থান দ্বিতীয় বা তৃতীয়। তবে এ কথা সত্য, ইংরেজির দাপট অন্য সব ভাষার চেয়ে অনেক বেশি। ইংরেজি ভাষার এই দাপট কি তার ভাষাগত বৈশিষ্ট্যের কারণে? ইংরেজির চেয়েও উন্নত ভাষা পৃথিবীতে রয়েছে। তাহলে ইংরেজির কেন এত দাপট? এর উত্তর, ভাষা নয় বরং ভাষাভাষীদের কারণেই ইংরেজির এই দাপট। ইংরেজি ভাষাভাষী প্রধান দুটি জাতি, ব্রিটিশ ও আমেরিকান, সারা পৃথিবীতে নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রেখেছিল এবং এখনো রেখে চলেছে। এক সময় ব্রিটিশরা রাজ্য দখল করত। এসব অঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সবাইকে ইংরেজি শিখতে বাধ্য করত। এভাবে ব্রিটিশ উপনিবেশ স্থাপনের মাধ্যমে ব্রিটিশরা ইংরেজিকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আর বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাল দিয়ে আমেরিকা সারা বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করছে। অতএব প্রভুর সঙ্গে যোগাযোগ, প্রভুর সন্তুষ্টি অর্জন ও সুবিধা আদায়ের জন্য সারা বিশ্ব এখন ইংরেজিকেই মেনে নিয়েছে। ভবিষ্যতে চীন যদি বিশ্বকে দখল করে নেয়, তবে চীনা ভাষা হবে আন্তর্জাতিক ভাষা। খোদ আমেরিকানরাও বাণিজ্যের প্রয়োজনে অন্য ভাষার চর্চা করে থাকে। সুতরাং, দুপক্ষের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম কোনো ভাষা হবে তা ভাষার গুণগত মানের ওপর নয় বরং দুপক্ষের মধ্যে কে শক্তিশালী তার ওপর।
এই লেখা ইংরেজিকে তাড়িয়ে বাংলাকে প্রতিষ্ঠিত করা নয়, বরং ইংরেজির পাশে বাংলাকে মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করা। অন্য ভাষার তুলনায় বাংলা ভাষার অনেক উৎকর্ষ রয়েছে। যেমন, বর্ণমালা। মানুষের মুখে যে কয়েক প্রকার ধ্বনি উচ্চারিত হয়, তা বর্ণ বা অক্ষর দিয়ে প্রকাশ করা হয় ভাষায়। ইংরেজি ভাষায় বর্ণমালার সংখ্যা ২৬। অথচ বাংলা রয়েছে ৪৬টি বা তারও বেশি বর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, ‘ত’ ও ‘ট’-এর পৃথক উচ্চারণ অনেক ভাষায় নেই। ‘র’, ‘স’, ‘ণ’ ইত্যাদি বর্ণের যে প্রকারভেদ রয়েছে বাংলায় তা খুবই উন্নত বৈশিষ্ট্য। যেমন, ইংরেজিতে বর্ণের প্রকারভেদ অপ্রতুল হওয়ায় উচ্চারণের প্রকারভেদ করা হয় একটি শব্দে একটি বর্ণের অবস্থানের ওপর নির্ভর করে।
ভাষা বিচারের আর একটি মাপকাঠি হলো এর সাহিত্য। বাংলা সাহিত্যের রয়েছে হাজার বছরের ঐতিহ্য। বাংলার মতো সাহিত্যের সব শাখায় এত উন্নত মানের রচনা খুব কম ভাষাতেই রয়েছে। নোবেলজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছাড়াও আমাদের রয়েছে অগণিত বিশ্বমানের কবি-সাহিত্যিক। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই শিক্ষা, গবেষণা ও জাতিগত উন্নয়নে নিজ ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। সেখানে আমরা গুরুত্ব দিই ইংরেজির ওপর। শিশুদের আমরা পাঠাই ইংরেজি মাধ্যমে পড়তে। বাংলার পরিবর্তে ইংরেজি ছড়া ও বর্ণমালা শেখানো হয় একেবারে শিশুকাল থেকে। ফলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা দুভাবে সংকটাপন্ন হচ্ছে।
প্রথমত, মাতৃভাষা অবহেলিত হওয়ায় কোনো শিক্ষা পরিপূর্ণ হচ্ছে না। কারণ মাতৃভাষা ভিন্ন অন্য ভাষায় জ্ঞান কখনোই আত্মস্থ হয় না। দ্বিতীয়ত, গণিত, বিজ্ঞান, ইতিহাস ইত্যাদি বিষয় বাদ দিয়ে শুধু একটি বিদেশি ভাষার ওপর গুরুত্বারোপ করায় শিক্ষার্থীদের চিন্তা ও চেতনার বিকাশ ঘটছে না। অতএব মাতৃভাষায় প্রকৃত জ্ঞানচর্চা শুরু করা উচিত। এরপর ধীরে ধীরে দ্বিতীয়, তৃতীয় ভাষা শেখা যায়। বিশ্বের অনেক দেশে জ্ঞানচর্চা এমনকি প্রযুক্তির শিক্ষায় নিজ ভাষা ব্যবহার করে থাকে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কোনো ভাষা নেই। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গবেষণা ও উন্নয়নে কিন্তু ইংরেজির তুলনায় অন্য ভাষাভাষীরা এগিয়ে। আমরা ইদানীং কম্পিউটারে বাংলা ব্যবহার শুরু করেছি, ই-মেইল, ফেসবুক, ইত্যাদি মাধ্যমে বাংলায় লিখি। সেখানেও একটি বিষয় লক্ষণীয়, ইংরেজিতে লেখার সময় আমরা বানান ও ব্যাকরণ নিয়ে সতর্ক থাকি। কিন্তু বাংলায় অহরহ ভুল বানানে ও শব্দচয়নে লিখে যাচ্ছি কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে। ইংরেজিতে ভুল করা লজ্জার বিষয়, আর বাংলায় ভুল করা যেন গর্বের।
এবার আসি অন্যান্য ভাষার আগ্রাসন প্রসঙ্গে, যেমন উর্দু। এই আগ্রাসন শুরু হয় এ দেশে ইংরেজদের দৌরাত্ম্য শেষ হওয়ার পর অর্থাৎ ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর। আমাদের দেশে প্রথম আঘাত হানল তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক অন্যায়ভাবে উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টার মাধ্যমে। প্রাণের বিনিময়ে এই ষড়যন্ত্রকে ঠেকানো গেলেও পশ্চিম পাকিস্তানের গভীর ষড়যন্ত্র থামানো যায়নি। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তারা প্রচারণায় মেতে উঠল, বাংলা হিন্দুদের ভাষা আর উর্দু মুসলমানদের ভাষা। এই ধারায় প্রথমে হিন্দু কবি অভিযোগে রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো। নজরুলকেও ইসলামিকরণ করা হয়, তাঁর সাম্যবাদী সাহিত্যকর্মকে বর্জন করা হয়, বাকি সাহিত্যের অনেক শব্দ পরিবর্তন করে উর্দু বা ফারসি শব্দ জুড়ে দেওয়া হয়। সর্বোপরি সাম্যের কবিকে ইসলামি কবি বলে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়। এভাবে আমরা অনেক উর্দু শব্দকে মেনে নিয়েছি। যেমন, আজ আমরা ‘জল’-এর পরিবর্তে ‘পানি’, ‘দাদা’-র পরিবর্তে ‘ভাইয়া’—এরকম বহু উর্দু শব্দ গ্রহণ করে এক ইসলামি বাংলা ভাষা তৈরি করে নিয়েছি। কিন্তু আমরা ভুলে যাই, উর্দু আর হিন্দি ভাষা প্রায় কাছাকাছি। হিন্দিতেও হিন্দুরা ‘পানি’, ‘ভাইয়া’ জাতীয় শব্দ ব্যবহার করে থাকে। তাহলে তারা কি মুসলমান হয়ে গেল?
এই লেখাকে কেউ ইসলামবিরোধী ভাববেন না। মূল বক্তব্য হচ্ছে, ধর্ম ও ভাষা দুটি ভিন্ন বিষয়। ভাষা হচ্ছে মানুষের চিন্তাধারা প্রকাশের একটি উপায়। অন্যদিকে ধর্ম হচ্ছে একটি আদর্শ, জীবনযাপনের একটি মূলনীতি, একটি বিশ্বাস। এই আদর্শ, নীতি ও বিশ্বাসকে যেকোনো ভাষাতেই প্রকাশ করা যেতে পারে। ‘জল’ বলি আর ‘পানি’ বলি, আমার বিশ্বাস ও আদর্শ কিন্তু সৃষ্টিকর্তা ঠিকই বুঝে নিচ্ছেন।
একইভাবে বলা যায়, আরবি ভাষা প্রসঙ্গে। আরবি ভাষায় পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে বলে আরবি ইসলামি ভাষা হয়ে যায়নি। আরবিতে কিন্তু অনেক অমুসলমানরাও কথা বলে। আরবি নাম রাখলেই আমি মুসলমান হব আর বাংলা নাম রাখলে হিন্দু হয়ে যাব—এ ধারণা সঠিক নয়। ধর্ম ভাষার ওপর যেমন নির্ভর করে না, তেমনি একটি ভাষাও ধর্ম দ্বারা পরিচিত হয় না। তাই ধর্মের নামে আমাদের বাংলা ভাষাকে বিকৃত করার প্রচেষ্টা খুবই অনুচিত।
বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানছে আকাশ সংস্কৃতি ও অধুনা ইন্টারনেট প্রযুক্তি। স্যাটেলাইট চ্যানেলের মাধ্যমে হিন্দি ভাষা আমাদের সংস্কৃতিকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। হিন্দি ভাষা, গান ও নাচ আমাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে যাচ্ছে। আমাদের সংগীত, নাটক, চলচ্চিত্র চোখ বুজে হিন্দিকে অনুকরণ করে যাচ্ছে। সামাজিক যেকোনো অনুষ্ঠানে হিন্দি গান ও নাচের দৌরাত্ম্য খুবই বেদনাদায়ক। এমনকি প্রবাসেও নতুন প্রজন্ম বাংলা না জানলেও হিন্দি গান ও নাচ ঠিকই শিখছে।
এভাবেই বিভিন্ন অজুহাতে বা উপায়ে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে নিগৃহীত ও বিকৃত করার অপচেষ্টা চলছে। ভবিষ্যতে হয়তো নতুন কোনো ধারার আবির্ভাব ঘটবে। আমাদের উন্নসিকতায় অন্য ভাষা ও সংস্কৃতি চেপে বসবে আমাদের ওপর। হারিয়ে যাবে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, হাসন রাজা, লালন। তখন বিশ্বে জাতি হিসেবে পরিচয় দেওয়ার মতো কিছু বাকি থাকবে না। তবে আবার এমন দিনও আসতে পারে, জাতীয়তার সংকটে ভুগতে ভুগতে আগামী প্রজন্মের কেউ হয়তো জেগে উঠবে, গগন উঁচিয়ে দাবি জানাবে, ‘মাতৃভাষা বাংলা চাই’।
অধ্যাপক, স্টেট ইউনিভার্সিটি অফ নিউইয়র্ক, ফার্মিংডেল
Friday, February 22, 2019
রায় লিখুন বাংলায়, যাতে মানুষ বোঝে: প্রধানমন্ত্রী

আমাদের ভাষাগতভাবে যোগাযোগটা খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ভাষা শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতেই সরকারের তরফ থেকে পৃথিবীর নয়টি ভাষা নিয়ে একটি অ্যাপ তৈরি করা হয়েছে। তার মাধ্যমে কিন্তু মানুষ অনেক ভাষা শিখতে পারে। ইংরেজি সারা বিশ্বে একটা মাধ্যম হয়ে গিয়েছে। কাজেই আমাদের দেশের দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে সেটা শিখতে পারে। সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাষা মাতৃভাষা, যে ভাষার জন্য আমরা জীবন দিয়েছি সেই ভাষাটাও সবাই যাতে শেখে সেই ব্যবস্থাটাও করা একান্তভাবে প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ অনুষ্ঠানে চকবাজারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের পরিবারের প্রতিও সমবেদনা জানান। অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, শিক্ষা উপমন্ত্রী মহীবুল হাসান চৌধুরী নওফেলসহ মন্ত্রিসভার সদস্য, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ইংরেজিতে লেখা সাইনবোর্ড, নামফলকের ছড়াছড়ি
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ইংরেজিতে লেখা সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, নামফলকের ছড়াছড়ি। তবে সরকারি দপ্তরের সাইনবোর্ড বা নামফলক বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বাংলায় রূপান্তর হয়েছে। এ ছাড়া যানবাহনের ডিজিটাল নম্বরপ্লেটগুলো বাংলায় সরবরাহ হওয়ার কারণে এ ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশ অনেকটাই বাস্তবায়ন হয়েছে। একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি আদালত বিদেশি দূতাবাস ও প্রতিষ্ঠান বাদে দেশের সব সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার, গাড়ির নম্বরপ্লেট, দপ্তরগুলোর নামফলক এবং গণমাধ্যমে ইংরেজি বিজ্ঞাপন ও মিশ্র ভাষার ব্যবহার বন্ধ করতে নির্দেশ দেন।
পরে ২০১৪ সালের ২৯ মে আন্তমন্ত্রণালয় সভায় স্থানীয় সরকার বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন সিটি করপোরেশন, পৌরসভার মাধ্যমে এটি কার্যকর করার সিদ্ধান্ত হয়। তারপরও বাংলা ব্যবহারে দৃশ্যত কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় ২০১৫ সালের ১৮ আগস্ট আদালত কড়া ভাষায় মন্তব্য করেন। যে রিটের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এই আদেশ দেন, সেই রিটের আবেদনকারী সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইউনুস আলী আকন্দ অভিযোগ করেন, সরকারের গাফিলতির কারণে আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। সরকার বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করতে আন্তরিক না। সরকার এ বিষয়ে সক্রিয় হলে এবং জনগণ সচেতন হলেই কেবল সর্বস্তরে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সচিব রবীন্দ্রশ্রী বড়ুয়া বলেন, সাইনবোর্ডে ভিনদেশি ভাষার ব্যবহার দীর্ঘদিনের বাজে অভ্যাস। সিটি করপোরেশনের অভিযান চলমান প্রক্রিয়া। এ ব্যাপারে জনগণকে সচেতন হতে হবে, বাংলা ভাষার প্রতি দরদ থাকতে হবে।
ইংরেজিতে সাইনবোর্ড টাঙানো বিভিন্ন ধরনের অন্তত ১৫টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেকেই জানেন না বাংলায় সাইনবোর্ড লেখা নিয়ে আদালতের আদেশের বিষয়ে। ব্র্যান্ডের নাম ও লোগো ইংরেজিতে হওয়ায় ইংরেজিতেই সাইনবোর্ড তৈরি করেছেন বলেও কেউ কেউ দাবি করলেন। অথচ ব্যবসা সনদ (ট্রেড লাইসেন্স) নেওয়ার সময় সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে সাইনবোর্ডে বাংলা ব্যবহারের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়। ‘সাইনবোর্ড/ব্যানার বাংলায় লিখতে হবে’—এই কথাটি ব্যবসা সনদে আলাদাভাবে লেখা থাকে।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, সাইনবোর্ডে ভাষার ব্যাপারে নির্দেশনা দেওয়া থাকার পরও অনেকে সেটা অনুসরণ করেন না। এ ক্ষেত্রে ক্ষমতা থাকলেও সিটি করপোরেশন কখনোই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয় না।
ধানমন্ডির সাতমসজিদ রোডের অধিকাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড বড় বড় ইংরেজি হরফে লেখা। শংকর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অবস্থিত একটি ভবনের বাইরের অংশে ১০টি প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড টাঙানো। এর অধিকাংশই রেস্তোরাঁ। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড ইংরেজিতে লেখা। তবে দুটি প্রতিষ্ঠান ইংরেজিতে লেখা সাইনবোর্ডের পাশে ছোট করে পৃথক ব্যানারে বাংলায় প্রতিষ্ঠানের নাম টাঙিয়েছে।
একই চিত্র দেখা যায়, বনানী ১১ নম্বর সড়কে। এই সড়কের প্রায় প্রতিটি ভবনেই আছে ব্র্যান্ডের পোশাক ও খাবারের দোকান। এই সড়কের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড ইংরেজিতে লেখা। একটি রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপক নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, ‘বাংলার প্রতি অবজ্ঞা থেকে এটি করা হয়েছে, বিষয়টি এমন না। নামটি ইংরেজিতে তাই সাইনবোর্ড ইংরেজি হরফেই লেখা হয়েছে। আমাদের সচেতনতার অভাব আছে এটি সত্যি।’
জানতে চাইলে শিক্ষাবিদ ও জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, এটি দুর্ভাগ্যের বিষয়। শুধু প্রতিষ্ঠানের নাম নয়, সামাজিক অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রও ইংরেজিতে করা হচ্ছে। এগুলো সরকারের বা আদালতের আদেশেই কেন বাংলায় লিখতে হবে? এটি নাগরিকদের দায়িত্ববোধ থেকেই করা উচিত।
Saturday, September 1, 2018
আমার ভাষা আমার দায়িত্ব by মুহম্মদ জাফর ইকবাল

অনুমান করা হয়, পৃথিবীতে এখন প্রায় সাত হাজার ভাষা রয়েছে। অনেকেই হয়তো চিন্তাও করতে পারবে না যে, এই সাত হাজার ভাষা থেকে প্রতি দুই সপ্তাহে একটি করে ভাষা ‘মৃত্যুবরণ’ করছে। ভাষা কোনও প্রাণী নয়, তাই তার জন্য মৃত্যুবরণ শব্দটা ব্যবহার করা যায় কিনা, সেটা নিয়ে তর্ক করা যেতে পারে, কিন্তু যখন একটি ভাষায় আর একজন মানুষও কথা বলে না, তখন ভাষাটির মৃত্যু হয়েছে বলা অযৌক্তিক কিছু নয়। অনুমান করা হয়, এই শতক শেষ হওয়ার আগেই পৃথিবীর অর্ধেক ভাষা মৃত্যুবরণ করবে। একটি ভাষা যখন মৃত্যুবরণ করে, তখন তার সঙ্গে বিশাল একটা ইতিহাসের মৃত্যু হয়, অনেক বড় একটা কালচারের মৃত্যু হয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে, একটি জাতি যখন আরেকটি জাতিকে পদানত করতে চায়, তখন প্রথমেই তারা তাদের ভাষাটির গলা টিপে ধরে।
একসময় পৃথিবীর ভয়ঙ্কর একটি দেশ ছিল সাউথ আফ্রিকা। সেই দেশের স্কুলের কৃষ্ণাঙ্গ বাচ্চাদের ওপর জোর করে আফ্রিকানা ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। ১৯৭৬ সালের ১৬ জুন প্রায় ২০ হাজার কৃষ্ণাঙ্গ স্কুলের বাচ্চা প্রতিবাদ করে রাস্তায় নেমে এসেছিল। শ্বেতাঙ্গ পুলিশ সেদিন গুলি করে একজন নয়, দুই জন নয় প্রায় সাতশত স্কুলের বাচ্চাকে মেরে ফেলেছিল। ভাষার জন্য পৃথিবীর ইতিহাসে এর চাইতে বেশি প্রাণ দেওয়ার উদাহরণ আছে বলে আমার জানা নেই।
আমাদের ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের কথা এখন শুধু আমরা নই, সারা পৃথিবী জানে। ২১ ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। শুধু তাই নয়, আমাদের এই দেশটির জন্মের ইতিহাসটি বাহান্নোর ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে একইসঙ্গে একই সূত্রে গাঁথা।
কিন্তু অনেকেই জানে না, বাংলা ভাষার জন্য আমাদের এই অঞ্চলে আরও একবার রক্ত ঝরেছিল। আসামের একটা বড় অংশ বাংলা ভাষায় কথা বলতো। তারপরও শুধু অহমিয়া ভাষাকে আসামের দাফতরিক ভাষা হিসেবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর সেখানকার বাঙালিরা তাদের ভাষার জন্য আন্দোলন শুরু করেছিল। সেই আন্দোলন থামানোর জন্য পুলিশ গুলি করে ১৯৬১ সালের ১৯ মে এগারোজনকে হত্যা করে। তার মধ্যে একজন ছিল ১৬ বছরের কিশোরী কমলা, মাত্র একদিন আগে সে তার ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা শেষ করেছিল। আসামের বরাক উপত্যকার সেই রক্ত শেষ পর্যন্ত বৃথা যায়নি, সেখানকার তিনটি জেলায় বাংলাও এখন দাফতরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। তবে, আমরা যত গৌরবের সঙ্গে আমাদের ভাষা শহীদদের স্মরণ করি, আসামের ভাষা শহীদের ততটুকু গৌরবের সঙ্গে স্মরণ করা হয় বলে মনে হয়নি। আমরা একবার শিলচরে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম, তখন সেখানকার বাঙালি শিক্ষকেরা দুঃখ করে বলেছিলেন, তাদের ভাষা আন্দোলনকারীদের স্মরণে তৈরি করা শহীদ মিনারটিও তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে করার অনুমতি পাননি। সেটি তৈরি হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকার বাইরে। আমি মনে করি, প্রতি বছর ১৯ মে দিনটিতে বরাক উপত্যকার সেই ভাষা শহীদদের বাংলাদেশে গভীর ভালোবাসার সঙ্গে স্মরণ করা উচিত।
ভাষা মৃত্যুবরণ করতে পারে, জানার পর আমার এক ধরনের কৌতূহল হয়েছিল, তাহলে কি ভাষা অসুস্থ হতে পারে? ভাষাবিজ্ঞানীরা এখনও অসুস্থ ভাষা হিসেবে ভাষাগুলোকে চিহ্নিত করতে শুরু করেননি কিন্তু তার উল্টোটা আছে, ‘প্রভাবশালী’ ভাষা। কাউকে নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না, কথা বলার সংখ্যায় তৃতীয় হয়েও পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী ভাষা হচ্ছে ইংরেজি। পৃথিবীতে যে ভাষায় যতবেশি মানুষ কথা বলে, তাদের প্রভাবও সে রকম। তবে দুটো চোখে পড়ার মতো ব্যতিক্রম রয়েছে, একটি হচ্ছে ফরাসি ভাষা। কথা বলার সংখ্যায় তারা অনেক পেছনে, প্রায় আঠারো নম্বর কিন্তু প্রভাবের দিক দিয়ে তারা একেবারে দুই নম্বর। আবার বাংলাভাষা কথা বলার সংখ্যায় পঞ্চম কিংবা ষষ্ঠ হয়েও প্রভাবের দিকে অনেক পেছনে, একেবারে আঠারো নম্বর। বলাই বাহুল্য, তথ্যটি দেখে আমি যথেষ্ট বিচলিত হয়েছি। আমাদের বাংলা ভাষা এত পিছিয়ে আছে কেন? যত দিন যাবে, সারা পৃথিবীর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় আমাদের ভাষাটি আরও পিছিয়ে যাবে? ভাষাটি কি আরও দুর্বল হয়ে যাবে?
এই মুহূর্তে বাংলাদেশসহ ভারতবর্ষে বিশ কোটিরও বেশি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে। এটি বাংলাদেশের জাতীয় ভাষা, ভারতবর্ষ ও সিওরালিওনের দাফতরিক ভাষা। বাংলাদেশ ও ভারত এই দুটি দেশের জাতীয় সঙ্গীত বাংলাভাষায়। শুধু তাই নয়, বাংলা ভাষায় কথা বলে এমন প্রায় এককোটি মানুষ পৃথিবীর নানা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, তারপরও বাংলাদেশ প্রতাপের দিক দিয়ে এত পিছিয়ে কেন?
তার কারণ বাঙালিরা কখনও অন্য দেশকে কলোনি করে জোর করে নিজ ভাষাকে অন্য ভাষার ওপর চাপিয়ে দেয়নি, কখনও অর্থনৈতিক ভাবে শক্তিশালী দেশ ছিল না যে, অন্য ভাষার মানুষ আগ্রহ নিয়ে এই ভাষা শিখবে। শুধু তাই নয় তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে যখন ভাষাকে কম্পিউটারে ব্যবহার করার সময় এসেছে, তখন আমরা দেখছি বাংলা ভাষাকে তথ্য-প্রযুক্তি দিয়ে সমৃদ্ধ করার ব্যাপারে অনেক পিছিয়ে আছি! আমরা নিজেরা নিশ্চয়ই লক্ষ করেছি, বাংলা ভাষাকে তথ্য-প্রযুক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত করার ব্যাপারে আমাদের সেরকম আগ্রহ নেই, অপেক্ষা করে আছি পৃথিবীর বড় বড় প্রতিষ্ঠান কোনও একসময়ে আমাদের সমাধান করে দেবে এবং তখন সেই সমাধান ব্যবহার করে আমরা কৃতার্থ হয়ে যাবো। কাজেই আমি ব্যক্তিগতভাবে খুবই আনন্দিত হয়েছিলাম, যখন বাংলাদেশ সরকার বাংলা ভাষার উন্নয়ন সংক্রান্ত গবেষণার জন্য প্রায় একশত ষাট কোটি টাকার বরাদ্দ করেছে। যখন এই প্রজেক্টটি শেষ হবে, তখন একধাক্কায় আমাদের হাতে বাংলা ভাষায় গবেষণা করার জন্য অনেক মাল-মশলা চলে আসার কথা।
কলকাতার কনফারেন্সে গিয়ে সেখানকার অনেক গবেষক অধ্যাপকের সঙ্গে কথা হয়েছে। তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলে আমি একটি বিস্ময়কর বিষয় জানতে পেরেছি। আমাদের দেশে প্রাইমারি-সেকান্ডারিতে যারা পড়াশোনা করে, তাদের মাত্র পাঁচ শতাংশ ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করে। (৩০ শতাংশ মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে, সেখানে আলিয়া মাদ্রাসার অংশটুকু বাংলা মাধ্যম)। অর্থাৎ বাংলাদেশের লেখাপড়ার মূল ধারাটি হচ্ছে মাতৃভাষায়, যেরকমটি হওয়া উচিত। কলকাতার ছবিটি একেবারে ভিন্ন। যেহেতু তাদের প্রতিযোগিতাটি করতে হয় পুরো ভারতবর্ষের সঙ্গে। তাই তারা আর নিজের মাতৃভাষায় পড়তে আগ্রহী নয়। সেখানে সবাই ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করে। শুধু যাদের কোনও গতি নেই, কোনও উপায় নেই, তারা বাংলা মাধ্যমে লেখাপড়া করে। যার অর্থ, এভাবে চলতে থাকলে মূলধারার বাঙালি বাংলাভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে এবং বাংলা ভাষার পুরো দায়িত্বটি এসে পড়বে আমাদের হাতে।
যেহেতু ধীরে ধীরে পুরো পৃথিবীটা ছোট হয়ে আসছে, আমাদের বাংলাদেশের মানুষকেও এখন আগে থেকে অনেক বেশি আন্তর্জাতিক হতে হয়। আমাদের লেখাপড়ার মাঝে তার ব্যবস্থা করে রাখা আছে, ছাত্রছাত্রীরা বাংলার সঙ্গে সঙ্গে প্রায় বারো বছর ইংরেজি পড়ে। এই বারো বছর ইংরেজি পড়া হলে খুবই স্বাভাবিকভাবে একজন ছাত্র বা ছাত্রীর ইংরেজিতে যথেষ্ট দক্ষ হওয়ার কথা। কিন্তু যে কারণেই হোক আমাদের সব ছাত্রছাত্রী ইংরেজিতে যথেষ্ট দক্ষ হচ্ছে না। বাবা-মায়েরা দুর্ভাবনায় পড়ছেন এবং অনেকেই মনে করছেন ইংরেজি মাধ্যমে লেখাপড়া করানোই হয়তো তার সমাধান! কিন্তু আমরা সবাই জানি মাতৃভাষায় লেখাপড়া করার কোনও বিকল্প নেই। তাই আমরা যদি মাতৃভাষার দায়িত্বটি নিতে চাই, স্কুল কলেজে ঠিক করে ইংরেজি পড়াতে হবে। যদি স্কুল কলেজে লেখাপড়া করে ছেলেমেয়েরা যথেষ্ট ইংরেজি শিখে যায়, তাহলে ইংরেজি মাধ্যমে লেখাপড়া করার জন্য ছুটে যাবে না।
কলকাতার ভাষা সংক্রান্ত কনফারেন্সে উড়িষ্যার একজন ভাষাবিদের সঙ্গে আমার কথা হচ্ছিল। তার কাছে আমি জানতে পারলাম, ভারতবর্ষে প্রত্যেকটি শিশুর তিনটি ভাষা শেখার কথা, একটি হিন্দি, একটি ইংরেজি, অন্যটি নিজেদের মাতৃভাষা। আমাকে তথ্যটি দিয়েই ভদ্রলোক হতাশভাবে মাথা নেড়ে জানালেন, তাদের দেশে পদ্ধতিটি মোটেও ঠিকভাবে কাজ করছে না। কেন কাজ করছে না, আমরা মোটামুটিভাবে তার কারণটি অনুমান করতে পারি—প্রবল প্রতাপশালী ইংরেজি ও হিন্দি ভাষার চাপে নিশ্চয়ই তাদের নিজেদের মাতৃভাষাটি কোনঠাসা হয়ে পড়ছে। একজন শিক্ষার্থীকে একসঙ্গে তিনটি ভাষা শিখে বড় হওয়া নিশ্চয়ই খুব সহজ নয়। ভারতের তুলনায় আমরা অনেক সুবিধাজনক জায়গায় আছি। মাতৃভাষার পাশাপাশি আমাদের বেশির ভাগ ছেলেমেয়েদের মাত্র একটি ভাষা শিখতে হয়। সেটি হচ্ছে ইংরেজি। সেই ইংরেজিটুকু যদি ভালো করে শেখানো হয়, আমার ধারণা আমাদের মাতৃভাষা অনেক বেশি নিরাপদ থাকবে!
এখানে আরও একটি বিষয় বলা যায়। আমরা এখন সবাই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কিংবা নিউরাল নেটওয়ার্ক—এই ধরনের কথাগুলো শুনেছি। পৃথিবীতে গবেষণার জগতে এই বিষয়গুলো একেবারে নতুন একটি মাত্রা যোগ করেছে। এই বিষয়গুলো এখন যে কাজগুলো করতে পারে, সোজা ভাষায় সেটি শুধু যে অবিশ্বাস্য, তা নয় এটি রহস্যময়ও। গবেষণার এই নতুন মাত্রায় অবশ্যই আমাদের এখনও আনন্দ পাওয়ার বেশি কিছু নেই। কারণ এর জন্য প্রয়োজন উপাত্ত, লক্ষ লক্ষ উপাত্ত, কোটি কোটি উপাত্ত! কার আছে সেই উপাত্ত? আমাদের নেই। সেই উপাত্ত আছে ফেসবুকের হাতে, গুগলের হাতে, আমাজনের হাতে। এই উপাত্ত এখন সোনার থেকেও দামি। সেই উপাত্ত ব্যবহার করে তথ্য-প্রযুক্তির এই মহাশক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এখন শুধু আমাদের জীবন নয়, সারা পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। আমাদের বলার কিছু নেই, কারণ তাদের সেবা গ্রহণ করে কৃতজ্ঞতায় আপ্লুত হয়ে আমরা তাদের হাতে আমাদের সব তথ্য, সব উপাত্ত উজার করে তুলে দিয়েছি!
কাজেই আগে হোক পরে হোক, আমাদের নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। সেই নড়বড়ে পা নিয়ে আমাদের লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই, দেখতে দেখতে সেই পা শক্তিশালী হবে। অন্যের ঘাড়ে চড়ে বহুদূর দেখা যায়, কিন্তু তখন প্রতিমুহূর্তে আশঙ্কায় থাকতে হয়, কখন তারা ঘাড় থেকে ছুড়ে কাদা মাটিতে ফেলে দেবে!
জেনেশুনে কেন আমরা সেই ঝুঁকি নেবো?
লেখক: অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।
Thursday, February 22, 2018
দুই ভাষাসৈনিক by এস. আলম তুহিন

তিনি বলেন, যেহেতু মুসলিম ছাত্রলীগ থেকে নির্বাচিত হয়েছিলাম তাই মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ আমাকে ভাষা আ্ন্দোলন থেকে সরে আসতে বলে। বাধ্য হয়ে মুসলিম ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগ করে সাধারণ ছাত্রদেরকে নিয়ে মিছিলে যোগ দিই। মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ এবং পুলিশের বাধার কারণে একসময় নিজ বাড়ি মাগুরায় চলে আসি। তখনো মাগুরায় তেমন কোন আন্দোলন শুরু হয়নি। আবু মিয়া সংগঠিত করছিলেন সবাইকে। আমি, চান্দু মিয়াও কাজ শুরু করি। ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকার ঘটনা জানতে পেরে আমরা মাগুরার সংগঠক নাসিরুল ইসলাম আবু মিয়ার সাথে দেখা করি। সেখান থেকেই ঠিক করা হয় যে, পরদিনই মিছিল ও সমাবেশ করা হবে। সেদিন সকালেই সবাই সেগুন বাগিচায় একত্রিত হই। সেখানে আবু মিয়ার সভাপতিেত্েব সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ শেষে আমরা মিছিল নিয়ে এগিয়ে চৌরঙ্গী মোড়ে আসতেই পুলিশ ব্যাপক লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। অন্যরা নিরাপদ স্থানে সরে গেলেও আমি, জলিল খান এবং চান্দু মিয়া পুলিশের হাতে ধরা পড়ি। আমাদেরকে পার্শ্ববর্তী জিআরও অফিসে বসিয়ে রাখা হয়। কয়েক ঘণ্টা পর ছেড়ে দেয়া হলে আমরা নোমানী ময়দানে পুনরায় একত্রিত হই।
৯০ বছর বয়সী খান জিয়াউল হকের প্রায় সমবয়সী বন্ধু আমিনুল ইসলাম চান্দুমিয়া সেদিনের স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমি তখন বাম সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম খান জিয়াউল হক মাগুরা এলে দু’বন্ধু মিলে আবু মিয়ার কাছে গেলাম। উনি আমাদের পেয়ে খুব খুশি হলেন। ২রা ফেব্রুয়ারি ঢাকায় গুলি চালানো হলে আমরা সিদ্ধান্ত নিই মিছিল সমাবেশ করবো। সবাইকে সংগঠিত করা শুরু করি। পরদিন একটি বিশাল মিছিল নোমানী ময়দান থেকে বের হয়। চৌরঙ্গী মোড়ে পৌঁছামাত্র পুলিশ আমাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। আমরা বাধা দিতে গেলে আমাকে, খান জিয়াউল হক ও জলিল খানকে পুলিশ আটকে রাখে। বিকালে ছেড়ে দেয়া হয়। এ সময় বাইরে মির্জা শওকত এবং আজিম দেওয়ান বিক্ষোভ করেন।
চান্দু মিয়া বলেন, ফেব্রুয়ারি এলেই সাংবাদিকরা আসেন কথা বলেন ভালোই লাগে। কিন্তু ভাষাসৈনিক হিসেবে আজ পর্যন্ত জেলা প্রশাসনের কোনো অনুষ্ঠানে ডাক পেলাম না।
খান জিয়াউল হক বলেন, নতুন প্রজন্ম ভাষাসৈনিকদের গুরুত্ব দিচ্ছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে যেমন সমাহিত করা হয় তেমনি ভাষাসৈনিকদেরও করা হোক। আর সঠিক ইতিহাস রক্ষার স্বার্থে ভাষাসৈনিকদের প্রকৃত তালিকা করা জরুরি।
Sunday, February 21, 2016
‘বাঙালি, আমাকে বাঁচাও’ by আবু এন এম ওয়াহিদ
![]() |
| ভাষা শহীদদের স্মরণে কলকাতায় স্মারক প্রতিষ্ঠা |
কুয়েমপু সম্পর্কে তার সে লেখার কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন, কুয়েমপু কন্নড় ভাষায় লিখলেও বাংলা ও বাংলা ভাষার সাথে ছিল তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, যোগাযোগ ও মনের টান। রবীন্দ্র যুগে জন্মে, রবীন্দ্রভক্ত হয়েও তিনি ছিলেন স্বকীয়তায় পরিপূর্ণ। কুয়েমপুর সাহিত্যকর্ম এতই নিখাদ ও নিখুঁত যে, নিজের সাথেই কেবল তার তুলনা চলে; অন্য কারো সাথে নয়। ঘরকুনো এ মানুষটা ১৯২৯ সালে কলকাতায় এসেছিলেন, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সাথে তার দেখা হয়েছিল কি না, তা কেউ জানে না। কুয়েমপু স্বীকার করেছেন যে, সাহিত্য চর্চায় তিনি রবীন্দ্রনাথকে অনুসরণ করতেন। তার ওপর রবিঠাকুরের প্রভাব এতই প্রবল ছিল যে, রবীন্দ্রনাথের শান্তি নিকেতনের অনুকরণে কুয়েমপু তার গ্রামের বাড়িতে একটা আশ্রমের মতো বানিয়েছিলেন।
কুয়েমপুর জন্ম ১৯০৪ সালে এবং মৃত্যু ১৯৯৪ সালে। দীর্ঘ ৯০ বছরের জীবদ্দশায় তিনি লিখেছেন প্রচুর। কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ, অনুবাদ, শিশু সাহিত্য, জীবনী প্রভৃতি ক্ষেত্রে তার ছিল বিস্তর ও স্বচ্ছন্দ বিচরণ। সাহিত্যের এসব ক্ষেত্রে তিনি সফলতার উজ্জ্বল নজির রেখে গেছেন। কুয়েমপুর অনেক লেখা ভারতীয় বিভিন্ন এবং বিদেশী ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। তার যে গ্রন্থটি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তা হলো, ‘রামায়ণ দর্শন’। এ বিশাল বইটাও ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। এখানে তিনি সীতার অগ্নিপরীক্ষার মতন রামকেও অগ্নিপরীক্ষায় ফেলেছেন। কুয়েমপু খুব প্রচারবিমুখ মানুষ ছিলেন। বিদেশ যাওয়া তো দূরের কথা, নিজের কর্মস্থল ছাড়া ভারতবর্ষের ভেতরেও অন্য কোনো রাজ্যে তিনি সহজে যেতে চাইতেন না। তাই সাধারণ পাঠকের মধ্যে তার পরিচিতি একটু কম বৈকি। কিন্তু জনপ্রিয় না হলেও অন্য এক দিক থেকে কুয়েমপু ছিলেন খুবই ভাগ্যবান। জীবনে তিনি উদার ও পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক এবং সরকারি স্বীকৃতি পেয়ে ধন্য হয়েছেন। জ্ঞানপীঠ ও ভারতরত্ন উপাধি পাওয়া সে দেশের যেকোনো কবি-সাহিত্যিকের জন্য চাট্টিখানি কথা নয়! অন্য আরো অনেক স্বীকৃতির সাথে কুয়েমপু এ দুটো গৌরবেরও অধিকারী।
কথা বলতে বলতে অনেক বলা হয়ে গেল। আমার আজকের নিবন্ধের বিষয়বস্তু কিন্তু কুয়েমপু নন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও নন। ভিন্নধর্মী, সম্পূর্ণরূপে অন্য এক বিষয় নিয়ে এ লেখায় আলোকপাত করার ইচ্ছা আছে। তবে কেন এখানে কুয়েমপুকে নিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এ রচনার ভূমিকা টানলাম, এক্ষুনি পাঠকদের কাছে তা খোলাসা করে বলছি। কুয়েমপুকে নিয়ে আলোচ্য প্রবন্ধের শেষে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ‘বিমানবন্দরে অলস চিন্তা’ শিরোনামে মাত্র ছোট্ট একটা প্যারা লিখেছেন। ওই প্যারার সাথে তার মূল রচনার কী সম্পর্ক এবং কী তাৎপর্য অনেক কসরত করেও আমি তার কোনো হদিস পাইনি। পাঠকদের সুবিধার জন্য সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ থেকে উদ্ধৃতিটা হুবহু তুলে ধরছি-
‘কর্নাটকের মানুষ তাদের ভাষাকে খুব ভালবাসে। রাজ্য পরিচালনার অনেক ক্ষেত্রে কন্নড় ভাষার প্রয়োগ হয়। বেঙ্গালুরুর অতি আধুনিক, অতি সুদৃশ্য বিমানবন্দরে বসে কফি খেতে খেতে দেখতে পাচ্ছি, সমস্ত লিখিত নির্দেশিকাতেই ইংরেজি হিন্দির সঙ্গে কন্নড় ভাষাও স্থান করে নিয়েছে। বাইরে অলসভাবে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ একটা ঝাঁকুনি লাগল। আমাদের কলকাতায় তো খুব শিগগিরই সম্পূর্ণ আধুনিক এবং বেশ বড় আকারের বিমানবন্দরের উদ্বোধন হবে। সেখানে কি একটাও বাংলা অক্ষর থাকবে? সন্দেহ হচ্ছে কেন? মনে কেন কুডাক ডাকছে! কাউকে তো দাবি জানাতে হবে। সবাই যেন কেমন ঝিমিয়ে পড়েছে। মাঝে মাঝে বাংলা ভাষার অপব্যবহার দেখি, কেউ কোনও প্রতিবাদ করে না। তাই আমি আবার এই প্রশ্ন তুলছি : কলকাতার নতুন বিমানবন্দরে কি একটাও বাংলা অক্ষর দেখা যাবে?’
পাঠকেরা এবার বুঝতে পারছেন, কত বড় আফসোস নিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো একজন বড় মাপের বাঙালি লেখক এমন প্রশ্ন তুলতে পারেন। পশ্চিমবঙ্গ একটা স্বাধীন দেশের স্বশাসিত স্বাধীন রাজ্য। বাংলা ভারতবর্ষের একটা অতি উন্নত ও সমৃদ্ধ ভাষা। বাংলা ছাড়া ভারতের অন্য কোনো ভাষার লেখক নোবেল পুরস্কার আনতে পারেননি, কিংবা অন্য কোনো উপায়েও এত বড় বিশ্বস্বীকৃতি কেউ পাননি। তারপরও ভারতের বাঙালিরা গোটা দেশে দূরে থাক, খোদ পশ্চিমবঙ্গে, এমনকি তার রাজধানী কলকাতাতেও দীর্ঘ ৬৪ বছরেও বাংলা ভাষাকে মর্যাদার সাথে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি। আমি কখনো কলকাতা যাইনি। যারা গিয়েছেন তাদের দেখায়, তাদের লেখায়, তাদের কথায় হরহামেশাই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কথার যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়।
দৈনিক আমার দেশের সিনিয়র সাংবাদিক সঞ্জীব চৌধুরী কলকাতা থেকে ফিরে এসে নিজ পত্রিকায় ডিসেম্বর ১৭, ২০১১ সালে ‘এপারে বাংলা ওপারে হিন্দি’ শিরোনামে একটা উপসম্পাদকীয় নিবন্ধ লিখেছেন। ওই নিবন্ধে সঞ্জীব চৌধুরীর মূল বক্তব্য একটাই। অর্থাৎ, দিনে দিনে কলকাতায় বাংলা ভাষা এবং বাঙালি কণ্ঠ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে আসছে। আর বাংলার জায়গাটা হিন্দি দ্রুত দখল করে নিচ্ছে। তার মতে, কলকাতায় এখন বাংলার চেয়ে ইংরেজির প্রচলন বরং বেশি। এখনো কলকাতায় যেটুকু বাংলা শোনা যায়, তার একটা উল্লেখযোগ্য অংশ বাংলাদেশের ভিজিটর, যারা লেখাপড়া, চিকিৎসা, ব্যবসাবাণিজ্য কিংবা আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের দেখতে যান তাদের জন্য। কলকাতায় বাংলা ভাষার হাল যে এমন হবে, তার আলামত অনেক আগে থেকেই পাওয়া যাচ্ছিল। সঞ্জীব চৌধুরী তার নিবন্ধের শুরুতে তা খুব সুন্দর করে উপস্থাপন করেছেন। ১৯৭৪ সালে তার এক বন্ধু দীপক কলকাতায় বেড়াতে গিয়ে বন্ধুদের নিয়ে এক পানশালার আড্ডায় কাটিয়েছিলেন কিছুক্ষণ। যতক্ষণ তিনি সেখানে বসেছিলেন, ঠাণ্ডা-গরম পানীয় পরিবেশনের সাথে গিটারের সুরে একের পর এক চলছিল হিন্দি সঙ্গীতের সুর। একপর্যায়ে বিরক্ত হয়ে দীপক একটা বাংলা গান শোনার আরজি পেশ করেছিলেন। তখন গিটার বাদক জবাবে বলেছিলেন, ‘দাদা আপনি কি জয় বাংলার লোক?’ দীপক মুচকি হেসে হ্যাঁসূচক মাথা নাড়ালে ওই বাদক গিটারে নতুন সুর তুলেছিলেন, ‘আমি জেনেশুনে বিষ করেছি পান...’। উনিশ শ’ চুয়াত্তরে কলকাতায় দীপকের অভিজ্ঞতা এবং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সে দিনকার আফসোস থেকে বোঝা যায়, হিন্দির দৌরাত্ম্যে কলকাতার ‘বাংলা’ শরীরে বিষের ক্রিয়া পুরো মাত্রায় শুরু হয়ে গেছে। সীমান্ত পেরিয়ে মাত্র ক’মাইল দূরে সে বিষের যন্ত্রণা স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার মন-মগজে অনুভূত হতে কি খুব বেশি দেরি? বাংলা ভাষার মুখে যদি কোনো ভাষা থাকত তাহলে আজ কেঁদে কেঁদে চিৎকার করে বলত, ‘বাঙালি, আমাকে বাঁচাও’!
লেখক : অধ্যাপক, টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র
এডিটর, জার্নাল অব ডেভেলপিং এরিয়াজ
Email : wahid2569@gmail.com
বিনম্র শ্রদ্ধায় ভাষা শহীদদের স্মরণ
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা পরে মন্ত্রিবর্গ ও দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়ে দলের পক্ষ থেকে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ সময় মন্ত্রিসভার সদস্যরা, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাগণ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, তিন বাহিনীর প্রধানগণ, কূটনীতিক বর্গ এবং উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক ও কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পরে জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী কেন্দ্রিয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের নেতৃবৃন্দ শহীদ বেদিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। ১৪ দলের পর বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। রাত দেড়টার দিকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া শহীদদের স্মৃতি প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। দলের সিনিয়র নেতাদের নিয়ে এ সময় তিনি শহীদ বেদীতে কিছুক্ষণ নিরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। এর আগে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও গুরুত্বপূর্ণ নাগরিকদের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে শহীদ মিনার সবার জন্য খুলে দেয়া হয়। এরপরই ঢল নামে সাধারণ মানুষের। নানা শ্রেণি পেশার মানুষ ফুল হাতে সারি বেঁধে এগিয়ে যান শহীদ বেদির দিকে। শ্রদ্ধা নিবেদনকে ঘিরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকা গতকাল থেকেই ছিল নিñিদ্র নিরাপত্তা বলয়ে ঘেরা। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সঙ্গে সারা দেশের শহীদ মিনারগুলোতেও একুশের প্রথম প্রহর থেকে চলে শ্রদ্ধা নিবেদনের পালা। সবার কণ্ঠে ছিল অমর সেই গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি..।’
দিবসটি উপলক্ষে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। আজ সরকারি ছুটির দিন। দিবসটি উপলক্ষে রেডিও, টেলিভিশন বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করছে। জাতীয় দৈনিকগুলো প্রকাশ করেছে বিশেষ ক্রোড়পত্র।
মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষায় ১৯৫২-এ জীবন দিয়েছিল সালাম, বরকত, জব্বার, রফিক, শফিউল্লাহসহ নাম না জানা অনেকে। তাদের রক্তের বিনিময়েই আজকে মুখে মুখে বাংলা ভাষা। বাংলায় রচিত হচ্ছে হাজারো গান, কবিতা, নাটক, উপন্যাস আর অজস্র কথামালা। আজকের দিনটি শুধু সেই বীর ভাষাসৈনিকের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর, যারা ভাষার জন্য অকাতরে নিজের প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছিলেন। আজকের দিনটি কেবল বাংলাদেশে নয়। বিশ্বের সব প্রান্তে পালিত হবে বীরের রক্তস্রোত আর মায়ের অশ্রুভেজা অমর একুশে। বাঙালির রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলনের স্বীকৃতি দিয়ে জাতিসংঘের সহযোগী সংস্থা ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে। এরপর থেকেই যথাযোগ্য মর্যাদায় সারা বিশ্বে একযোগে পালিত হয়ে আসছে দিনটি।
৬৪ বছর আগের এই দিনে বাংলার সংগ্রামী ছেলেরা যে ত্যাগ ও গৌরবগাথা রচনা করেছিলেন, তারই পথ ধরে আমরা মুখোমুখি হই স্বাধীনতা সংগ্রামে। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। লাভ করি লাল সবুজের পতাকা। ১৯৫২ সালের এই দিনে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ঘোষিত ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মায়ের ভাষা প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলনরত বাঙালি রাজপথ রক্তে রঞ্জিত করে। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রতিবাদ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে সামনে রেখে হরতালের প্রস্তুতি চলতে থাকে। সরকার ২০শে ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ছয়টায় একটানা এক মাসের জন্য ঢাকা জেলার সর্বত্র হরতাল, সভা, মিছিলের ওপর ১৪৪ ধারা জারি করে। এসব নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ছাত্ররা দলে দলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জমায়েত হয়। ঐতিহাসিক আমতলায় ছাত্রদের সভা থেকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পরিকল্পনা করা হয়, চারজন চারজন করে মিছিল নিয়ে বের হওয়ার। ছাত্ররা মিছিল শুরু করলে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে ট্রাকে তুলতে থাকে। বিকাল ৩টায় গণপরিষদের অধিবেশনের আগেই শুরু হয়ে যায় ছাত্র-পুলিশ সংঘর্ষ। বিকাল ৪টায় পুলিশ ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে ছাত্রদের ওপর গুলি চালায়। বুলেট কেড়ে নেয় জব্বার ও রফিকের প্রাণ। গুলিবিদ্ধ আবুল বরকত রাত পৌনে আটটায় হাসপাতালে মারা যান। তাদের মৃত্যু সংবাদে বাংলা ভাষার প্রাণের দাবি সারা দেশে স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে। শাসকগোষ্ঠী বাংলা ভাষার দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়। এরপর থেকেই একুশে ফেব্রুয়ারি অমর ভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। শহীদদের স্মরণে সারা দেশে তৈরি হয় অসংখ্য শহীদ মিনার।
ভাষা শহীদদের প্রতি খালেদার শ্রদ্ধা, দোয়েল চত্ত্বরে বাঁধা: কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। একুশে ফেব্রুয়ারি রাত দেড়টার দিকে এই শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তিনি। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবসহ সিনিয়র নেতৃবৃন্দ। ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে রাত ১২টা ২০ মিনিটে খালেদা জিয়ার গাড়িবহর তার গুলশানের বাসা থেকে বেরিয়ে শহীদ মিনারের রওনা হয়। রাত ১ টা ৫ মিনিটে তার গাড়ি বহরটি দোয়েল চত্ত্বরে এসে পৌঁছায়।
এসময় সেখানে দায়িত্বরত পুলিশের সদস্যরা তার গাড়িটিকে বাঁধা দেন। তারা ওই গাড়ি বহরটিকে পলাশী হয়ে ঢুকতে বলেন। এসময় চেয়ারপারসনের সঙ্গে থাকা নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে পুলিশ তর্কে জড়িয়ে পড়েন। পুলিশ বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানালে পরে তার গাড়িবহরের সামনে থেকে ব্যারিকেড তুলে নেয়। এসময় গাড়ির সামনে অবস্থান নেয়াকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের দুই গ্রুপের নেতাকর্মীরা হাতাহাতিতে লিপ্ত হয়। সিনিয়র নেতাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়। পরে খালেদা জিয়া সিনিয়র নেতাদের নিয়ে শহীদ মিনারে দেড়টার দিকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এসময় শহীদ মিনারে শৃংখলা ভেঙে পড়ে।
খালেদা জিয়ার সঙ্গে এসময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মওদুদ আহমদ, মাহবুবুর রহমান, তরিকুল ইসলাম, আ.স.ম হান্নান শাহ, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান প্রমুখ।
গত বছর ফেব্রুয়ারিতে নিজের ডাকা লাগাতার অবরোধের মধ্যে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে শহীদ মিনারে যাননি বিএনপি চেয়ারপারসন।
নিশ্চদ্র নিরাপত্তা: শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য গতকাল বিকাল থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকা ছিল নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা। শহীদ মিনারমুখী সব রাস্তায় ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের সতর্ক পাহারা। তাদের সঙ্গে পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দায়িত্ব পালন করে বিশ্ববিদ্যালয় বিএনসিসি ও রোভার স্কাউটের কয়েক হাজার সদস্য। সন্ধ্যার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টিকার ছাড়া কোনো গাড়ি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ঢুকতে দেয়া হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, অমর একুশে উদযাপনের জন্য শহীদ মিনার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকায় যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২১শে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে পুরো রাজধানীতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার থাকবে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের অনুষ্ঠানে নিরাপত্তা দিতে পুরো এলাকায় ছিল চার স্তরের নিরাপত্তা। সব মিলিয়ে ৯০০০ পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করেন পুরো এলাকায়। এছাড়া র্যাব সদস্যরাও পুরো এলাকায় দায়িত্ব পালন করেন। দিবসটি উপলক্ষে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কর্মসূচি পালন করা হবে। কর্মসূচির অংশ হিসেবে আগামীকাল বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বিকাল তিনটায় অনুষ্ঠিত হবে আলোচনা সভা। এতে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সভাপতিত্ব করবেন।
Thursday, February 11, 2016
একুশের এই শক্তি আমরা বারবার দেখেছি by হাসান ফেরদৌস
আমরা যাঁরা সেখানে সমবেত হয়েছিলাম, তাঁদের বুঝতে কষ্ট হলো না, এই বিদেশি মানুষগুলো কীভাবে এই ভাস্কর্যের ভেতরে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের বার্তাটি নির্ণয়ে সক্ষম হলো। যে দেশের বা যে জনগোষ্ঠীরই হোক না, সব প্রতিবাদই অন্তর্গতভাবে অভিন্ন। সে চলতি নিয়মকে প্রত্যাখ্যান করে, সে ভিন্নমত প্রকাশ করে, সে সংহতি খোঁজে। সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাষাভাষী ও ভিন্ন জনপদের মানুষ হলেও টোগোর এসব প্রতিবাদী মানুষের পক্ষে একুশের প্রতীকবহ এই ভাস্কর্যের ভেতর সংহতির আশ্বাস খুঁজে নিতে কষ্ট হয়নি।
একুশের আসল শক্তি তার এই প্রতীকময়তা। একুশ বাঙালিকে আন্দোলিত করে, তার ভেতরে সে প্রতিবাদ ও বিজয়ের সন্ধান পায়, এই দিন তাকে স্মরণ করিয়ে দেয় প্রতিটি বিজয়ের পেছনে আছে কঠোর আত্মত্যাগ।
দেশের বাইরে আমি প্রথম একুশ উদ্যাপন করি ১৯৭৪ সালে, তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্যতম প্রজাতন্ত্র ইউক্রেনের খারকফ শহরে। সেখানে তখন আমরা ছাত্র, সদ্য স্বাধীন একটি দেশের প্রতিনিধি হিসেবে আমাদের পরিচয় লড়াকু হিসেবে। সিদ্ধান্ত হলো আমরা একুশ উদ্যাপন করব এবং ঢাকায় যেভাবে একুশের প্রথম প্রহরে ফুল দেওয়া হয়, আমরাও সেভাবে ফুল দিয়ে একুশকে বরণ করে নেব। সেখানে একুশের মিনার নেই, আছে লেনিন স্মৃতিস্তম্ভ। ঠিক হলো, ঠিক মধ্যরাতে আমরা ফুল নিয়ে হাজির হব শহরের কেন্দ্রে সেই লেনিন স্মৃতিস্তম্ভে।
কথাটা বলা যত সহজ, করা ততটা নয়। ফেব্রুয়ারি মাসে খারকফে প্রচণ্ড শীত, চারদিকে কঠিন জমাটবাঁধা বরফ। অন্য সমস্যা, মধ্যরাতের পর যানবাহন পাওয়া প্রায় অসম্ভব। ৪০ বছর আগের খারকফ ঘুমকাতুরে এক মফস্বলীয় শহর ভিন্ন অন্য কিছু ছিল না। কেউ কেউ একুশের দিনের বেলায় ফুল দেওয়ার কথা ভাবলেন, কিন্তু বুদ্ধিমন্তদের সেসব উপদেশ কাজে লাগল না। ফেব্রুয়ারিতে তাজা ফুল মেলা কঠিন, মিললেও তার দাম বিস্তর।
আমরা সদ্যাগত ছাত্র, পকেটে রেস্ত নেই। ঠিক হলো কাগজের ফুল নিয়ে যাব। আমাদের সঙ্গে যুক্ত হলো বছর দুয়েক ওপরের ক্লাসে পড়ুয়া এক রুশ বন্ধু। সেই শহরে আমরা তখনো নতুন, আমাদের চেয়ে পথঘাট তার বেশি ভালো চেনা, পুলিশ ঝামেলা করলে তার পক্ষে বুঝিয়ে বলাও সহজ হবে। তার পিছু পিছু মাঝরাতের বেশ আগেই আমরা ট্রামে চড়ে রওনা হলাম।
এ কথাগুলো লেখার সময়, এত বছর পরেও, আমি শিহরিত হচ্ছি। আমরা জনা বারো ছাত্রছাত্রী, সঙ্গে সেই রুশ বন্ধু, শীত রাতের ট্রামে আমরা ভিন্ন অন্য কোনো যাত্রী নেই। প্রথমে ভেবেছিলাম বেশ মজার একটা ব্যাপার, কেমন উৎসব উৎসব আমেজ। অথচ ট্রামে ওঠার পর আমাদের কারও মুখে কথা নেই, সবাই যেন নিঃশব্দে কোনো স্মৃতি হাতড়ে বেড়াচ্ছি। একুশ যেন এক পবিত্র অর্জন, এই বিদেশ-বিভুঁইয়ে তাকে আগলে রাখার দায়িত্ব কেবল আমাদের। একটি পুরো দেশের মানুষ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। বলছে, এই পবিত্র অর্জন যেন খোয়া না যায়।
খারকফ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে লেনিন স্তম্ভ। অধিকাংশ সরকারি আনুষ্ঠানিকতার জন্য এই চত্বরকেই বেছে নেওয়া হয়, এখানেই অক্টোবর বিপ্লবের কুচকাওয়াজ হয়, বিদেশিরা এলে একবারের জন্য হলেও এখানে আসবেন, নবদম্পতিরা বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা শেষে সবার আগে এখানে আসেন ফুলের অর্ঘ্য নিয়ে। একুশের অর্ঘ্য নিয়ে আমরাও সেখানে।
ট্রাম থেকে নামলাম, তখনো মধ্যরাত হয়নি। দূর থেকে দেখা যায় ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনকে, এক হাত বুকের কাছে, অন্য হাত ঊর্ধ্বাকাশে, যেন তর্জনী উঁচিয়ে আমাদের উদ্দেশে নির্দেশ দিচ্ছেন। সেই নির্দেশের অর্থ বুঝি না, কিন্তু এ কথা বুঝতে আমাদের কষ্ট হয় না যে তাঁর সলক্ষ্য সস্নেহ দৃষ্টি আমাদের ওপরও রয়েছে। কিছু সময় আমরা সেই চত্বর ঘুরে দেখি, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আমরা ছাত্র, কিন্তু কাছ থেকে এই স্মরণিক স্তম্ভ কখনো খুঁটিয়ে দেখা হয়নি। গ্রানাইট শিলায় তৈরি, আলো-আঁধারে তা দেখে দৃষ্টি আনত হয়, মনের দৃষ্টিতে দেখি অন্য এক স্মৃতিস্তম্ভ, ঢাকার শহীদ মিনার।
মধ্যরাতের আগেই আমরা এক লাইন করে দাঁড়িয়ে পড়ি, সবার পেছনে সেই রুশ বন্ধু। চারদিকে জমাট বরফ, যদিও স্মৃতিস্তম্ভের আশপাশে প্রতিদিন সযত্নে সব বরফ ছেঁচে ফেলা হয়েছে। কনকনে শীত, হাড়ে কাঁপুনি ধরিয়ে দেয়। এক বন্ধু বললেন, জুতা পায়ে ফুল দিলে শহীদদের স্মৃতির অবমাননা করা হবে। আমরা তার যুক্তি মেনে নিই, জুতা সরিয়ে শুধু পশমি মোজা পায়ে দাঁড়াই। আমি জানি না এমন সাহস কোত্থেকে পেয়েছিলাম, হয়তো তারুণ্যের ঔদ্ধত্য। এক বন্ধু গান ধরলেন ‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো’। বাকি সবাই তার সঙ্গে গলা মেলালাম। চারদিকে নিস্তব্ধ আকাশ চিরে সেই গান ভেসে যায়। আকাশ তো একটাই, আমরা হয়তো আশা করেছিলাম ইথারে সেই গান ভেসে যাবে তার উৎসমূলে। আমি হলফ করে বলছি, সেই রাতে আমরা কেউ শীতের দাপট অনুভব করিনি, বরং বুকের ভেতর এক ভিন্ন উষ্ণতার অভিজ্ঞতা পেয়েছি।
একুশের এই শক্তি আমরা বারবার দেখেছি। এই নিউইয়র্কে প্রতিবছর ‘মুক্তধারা’র আমন্ত্রণে সেই মধ্যরাতে গেছি ফুল নিয়ে| এখানে আমরা আর ছাত্র নই, মাঝ বয়সী কর্মজীবী, গৃহস্থ। পরের দিন কাজ, সেসব অগ্রাহ্য করে কেউ তাজা গোলাপ, কেউ টিউলিপ নিয়ে কার্ডবোর্ড দিয়ে বানানো এক প্রতীকী শহীদ মিনারের সামনে ফুল দিয়ে নিজের ভালোবাসা জানিয়ে এসেছি। মনে পড়ছে এক ভীষণ তুষারঝরা হাড় কাঁপানো মধ্যরাতের কথা। ট্যাক্সিচালক এক যুবক স্ত্রী ও শিশুকন্যাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। দূর থেকে শহীদ মিনারের কার্ডবোর্ডটি দেখিয়ে সেই শিশুকন্যাকে বুকে জড়িয়ে কী আগ্রহে কোথায়, কেন এসেছেন, তার ব্যাখ্যা করছেন। শিশুকন্যাটি কী বুঝেছিল জানি না, কিন্তু আমি নিশ্চিত, বাবা যে গর্ব ও বিশ্বাসে তাকে একুশের গল্প বলছিলেন, তার ছিটেফোঁটা আনন্দ তাকেও ভরিয়ে তুলেছিল।
এই গর্ববোধ কোত্থেকে আসে? আমি খুব নিশ্চিত নই, অনুমান করি একুশের ভেতর আমরা শুধু বায়ান্নর একটি ঘটনাকে দেখি না, অথবা মাতৃভাষার অধিকার নিয়ে আমাদের বিজয়ের কাহিনি স্মরণ করি না, একুশের প্রতীকময়তার ভেতর দিয়ে বাঙালির অব্যাহত সংগ্রামের রচিত গাথা আমরা দেখি। শহীদ মিনারের সূর্যগোলকে আমরা এক নতুন প্রভাতের আমন্ত্রণ পাই। সেই প্রভাত আসে না, তবু আমরা এই মিনারের কাছে এসে আমাদের স্বপ্নের বিবরণ জানিয়ে যাই। অন্য কেউ না হোক, এই মিনার জানে, আগামীকাল আসবে, যে আগামীকালের আলো আমাদের সব ক্লেদ, সব বর্জ্য ধুয়ে–মুছে নেবে।
তাহলে কী করে ভুলব ভায়ের রক্ত রাঙানো সেই স্বপ্ন প্রভাতের কথা?
হাসান ফেরদৌস: যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি।
Wednesday, February 10, 2016
জাগৃতি-শুদ্ধস্বরে ফুটে আছে নীরব প্রতিবাদ by মোছাব্বের হোসেন
দোকানের ভেতরে মাঝে দীপনের ছবির নিচে লেখা—‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ যারা অন্ধ, সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা।’ স্টলের ওপর কালো ব্যানারে জাগৃতি প্রকাশনীর ডান দিকে দীপনের ছবি আর নিচে লেখা ‘সকলের মাঝে শুভবুদ্ধির উদয় হোক...’।
![]() |
| জাগৃতির স্টলটিতে যেন ফুটে উঠেছে প্রতিবাদের ভাষা। ছবি: জাহিদুল করিম। |
জাগৃতির স্টলে দীপনকে আলাদাভাবে স্মরণ করার জন্য প্রতিটি নতুন প্রিন্ট করা বইয়ের শেষে কালো ব্যাজের প্রিন্টে ছাপানো হয়েছে দীপনের ছবি। স্টলে একটি ঝুড়িতে কিছু কাঠের চাবির রিং রাখা। সেখানেও দীপনের ছবি। কালো প্রিন্ট করা একটি প্রচারপত্রে দীপনের ছবিসহ সংক্ষিপ্ত জীবনী লেখা হয়েছে। আগ্রহীরা অনেকে তা সংগ্রহ করছেন। স্টলে পাঠকের সমাগমও বেশ ভালো।
![]() |
| স্টলে দীপনের টেবিলে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ আর কাদা মাটি, রক্তমাখা কলমদানি, রক্ত লাগা পাণ্ডুলিপি। ছবি: জাহিদুল করিম |
রাজিয়া আর কথা বলতে পারলেন না। চাপা কান্নায় মুখ ঢাকলেন তিনি। কিছুটা ধাতস্থ হয়ে জানালেন, এই বইমেলায় পুরোনো বইগুলোই পাঠক বেশি খুঁজছেন ও কিনছেন। এই দোকানে গত বছর বই কিনেছিলেন ইন্দিরা রোডের বাসিন্দা আরাফাত। এবারও এখানে বই কিনতে এসেছেন তিনি। দীপন হত্যার প্রতিবাদ জানালেন তিনিও। বললেন, মানুষকে এভাবে হত্যা করতে হবে কেন? এটি কোনোভাবেই সমর্থন করা যায় না।
দীপনকে হত্যা করার দিনই আরেক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান শুদ্ধস্বরের লালমাটিয়ার কার্যালয়ে ঢুকে স্বত্বাধিকারী আহমেদুর রশীদ টুটুলসহ তিনজনকে কুপিয়ে আহত করা হয়। বইমেলায় সেই প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান শুদ্ধস্বরের স্টলেও দেখা গেল প্রতিবাদের ভাষা। কর্মচারীদের কেউ কিছু বলতে না চাইলেও দোকানের সবকিছুতে যেন প্রতিবাদের ভাষা ফুটে আছে। কালো আর লাল রঙে দোকান সাজানো হয়েছে। খুঁটিগুলো কালো রং করা হয়েছে।
এই স্টলের বই বিক্রেতা মো. আশরাফুল জানান, টুটুল এখনো বইমেলায় আসেননি। এখান থেকে নতুন বইও বের হয়নি। পাঠকেরা এখান থেকেও পুরোনো বইগুলোই ঘুরেফিরে কিনছিলেন। এখানেই মিরপুর থেকে আসা এক পাঠক আসিফ বলেন, এত বড় ঘটনা ঘটে গেল, একজন প্রকাশককে হত্যা করা হলো! আরেক প্রকাশকসহ তিনজনকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হলো। এর বিচার এখনো হলো না। কেউ ধরা পড়ল না। কে জানে আবার এ ধরনের ঘটনা ঘটে কি না...!
![]() |
| শুদ্ধস্বরের দোকানেও মানুষ আসছেন। কিনছেন পুরোনো বই। ছবি: জাহিদুল করিম |
নব্বই শতাংশ বই মানসম্মত নয়- বাংলা একাডেমি
প্রতিবছর একুশে মেলায় গড়ে তিন হাজারের মতো বই প্রকাশিত হয়।
কিন্তু এসব বইয়ের মধ্যে নব্বই শতাংশেই মানসম্মত নয় বলে মনে করে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ। তারা বলছেন, এর একটি বড় কারণ হচ্ছে অধিকাংশ বইয়ের ক্ষেত্রে কোন সম্পাদনা হয়না।
বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পে সম্পাদনার বিষয়টি দিন দিন গুরুত্ব হারাচ্ছে বলে অনেকেই মনে করছেন।
মেলায় প্রতিদিন যেসব বই প্রকাশিত হয় সেগুলোর মধ্যে উপন্যাস, গল্প এবং কবিতার সংখ্যা বেশি। অনেক বইয়ের বিজ্ঞাপন এবং মোড়ক দেখতে বেশ আকর্ষণীয়।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড: বিশ্বজিত ঘোষ বিবিসিকে বলেন, চকচকে মোড়কের আড়ালে অনেক বই ভুলে ভরা। তিনি মনে করেন কোন ধরনের সম্পাদনা ছাড়া বই প্রকাশ হওয়ায় এ ধরনের পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ এই সত্যটাই প্রতিষ্ঠিত হলো না যে বই প্রকাশের জন্য সম্পাদনার প্রয়োজন আছে।
তিনি বলেন অনেক বইয়ের বানান, বাক্য গঠন এবং বিষয় বিন্যাস একেবারেই মানসম্মত নয়। সাধারণত এই কাজটি একজন সম্পাদক করেন।
অধ্যাপক ঘোষ বলেন, আমার সীমাবদ্ধতা আমার চোখে ধরা পড়বে না। সেটি আরেকজনের চোখে ধরা পড়বে। সেজন্য প্রত্যেকের বই সম্পাদিত হওয়া উচিত। কারণ কোন মানুষই নির্ভুল নয়। বই সম্পাদনাকে পেশা হিসেবে নেয়া ব্যক্তির সংখ্যা খুব একটা বেশি নয়। গত এক দশক ধরে এ কাজ করেন রাখাল রাহা। বই সম্পাদনার জন্য তার একটি প্রতিষ্ঠানও আছে।
মি: রাহা বলছেন সম্পাদিত বইয়ের মান ভালো হতে বাধ্য।
মি: রাহা বলেন, পাণ্ডুলিপি হাতে পাওয়ার পরে আমরা দেখার চেষ্টা করি সেটার উন্নতির জায়গা কোথায় আছে। এরপর যে পরামর্শ দেয়া হয় তার ভিত্তিতে লেখক কাজ করেন।
বাংলা একাডেমি বলছে মেলায় প্রতিবছর ৩০০টির মতো প্রকাশনা সংস্থা অংশ নেয়। কিন্তু হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সম্পাদনা পরিষদ আছে।
এ বিষয়ে প্রকাশকদের এতো অনাগ্রহ কেন?
প্রকাশনা সংস্থা জ্যোৎস্না পাবলিশার্সের কর্ণধার স্বপন দত্ত মনে করেন বিষয়টি মূলত আর্থিক সামর্থ্যের উপর নির্ভর করে।
মি: দত্ত বলেন, বেশিরভাগ প্রকাশক কম পুঁজিতে ব্যবসায় নেমেছে। বই সম্পাদকদের বেতন দেবার মতো আর্থিক পুঁজি অনেক প্রকাশকের নেই। বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ মনে করে মেলায় অনেক নিম্নমানের বই যে আসছে সে বিষয়টি তারা অবগত।
একডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বলেন অধিকাংশ প্রকাশনা সংস্থা বই সম্পাদনার গুরুত্ব বুঝতে পারছেনা বলে তিনি মনে করেন।
মি: খান বলেন, অমর্ত্য আমাকে বলেছিলেন তার বই সম্পাদকরা সম্পাদনা করেন। এতো বিখ্যাত লেখকের বই যদি সম্পাদনা হয়, তাহলে এখানকার লেখকের বই কেন সম্পাদনা করা হবেনা।
মহাপরিচালক বলেন অনেক প্রবাসী বাংলাদেশী প্রকাশকদের টাকা দিয়ে বই ছাপায়। এতে করে বইয়ের গুনগত মান আরো নিচে নেমে যাচ্ছে বলে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক উল্লেখ করেন।
অধ্যাপক বিশ্বজিত ঘোষ মনে করেন বাংলা একাডেমির এমন নিয়ম করা উচিত যাতে সম্পাদনা পরিষদ ছাড়া কোন প্রকাশনা সংস্থা মেলায় আসতে না পারে।
সুত্রঃ বিবিসি
Saturday, February 6, 2016
আপন রূপ ফিরে পাচ্ছে মেলা BY মাসুম আলী
![]() | |
| অমর একুশে বইমেলার স্টলে পছন্দের বই খুঁজছে শিশুরা। গতকাল ছুটির দিনের সকালটা ছিল বিশেষ করে তাদের জন্য l ছবি: প্রথম আলো |
তবে হ্যাপাও ছিল। মানুষের পায়ে পায়ে ধুলা উড়ে বাতাস করে তুলেছিল ভারী। মেলা প্রাঙ্গণে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি ছিটানো হয়নি—এমন অভিযোগ দর্শনার্থীদের। তবে ধুলা মাড়িয়ে সবাই ছুটে গেছেন পছন্দের বইটি কিনতে
মেলার এই ভিড় হাসি ফুটিয়েছে প্রকাশকদের মুখেও। অনিন্দ্য প্রকাশের প্রধান নির্বাহী আফজাল হোসাইন বললেন, বইমেলা এখন জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। শুক্রবার বিপুল পাঠকের সমাগম ঘটেছে।
কথাপ্রকাশের সম্পাদক ও প্রকাশক জসিম উদদীন বলেন, আজকেই মূলত মেলা শুরু হলো। কারণ, এ কয়েক দিন কমবেশি মানুষ হলেও বিক্রি তেমন একটা হয়নি। আজ ভিড়ের সঙ্গে বিক্রিও হয়েছে ভালো।
সময় প্রকাশনের স্বত্বাধিকারী ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘এবার বৃহৎ পরিসরে মেলা হওয়ায় এবং নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার আশ্বাস পেয়ে পাঠকেরা আসছেন। আমি আশাবাদী এবারের মেলা নিয়ে।’ ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশের উদ্যোক্তা জহিরুল আবেদিন হতাশা প্রকাশ করেন ধুলাবালি নিয়ে। বলেন, এই ধুলাতে স্টলে বসে থেকে বিক্রি করা কঠিন।
প্রথমা প্রকাশনের সামনে প্রচণ্ড ভিড় দেখা গেছে। এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান সমন্বয়কারী জাফর আহমদ বলেন, নতুন বইয়ের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির পুরোনো বইগুলোও পাঠকেরা খুঁজছেন।
গতকাল নিরাপত্তার বিষয়টি আবারও নিশ্চিত করেন ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। সন্ধ্যার কিছুটা আগে বইমেলা পরিদর্শনে আসেন তিনি। নিরাপত্তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই জানিয়ে আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, মেলা প্রাঙ্গণের নানা দিকে ওয়াচ টাওয়ার রয়েছে। দুরবিন দিয়ে সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হচ্ছে। এ ছাড়া সিসি ক্যামেরায় সব ভিডিও ফুটেজে প্রত্যেক দর্শনার্থীর আগমন-নির্গমন পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
বিকেল পাঁচটার দিকে বইমেলা পরিদর্শনে আসেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। গত বছর সেতুমন্ত্রীর একটি উপন্যাস বেরিয়েছিল বইমেলায়। এবার বেরিয়েছে তাঁর সাংবাদিকতা জীবন নিয়ে বই যখন সাংবাদিক ছিলাম। চারুলিপি প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছে বইটি।
বাংলা একাডেমির শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে গুলতেকিন খানের আজো, কেউ হাঁটে অবিরাম বইটির প্রকাশনা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এতে কবি গুলতেকিন খান ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক, কার্টুনিস্ট আহসান হাবীব প্রমুখ। অনুষ্ঠানে মুহম্মদ জাফর ইকবালের একটি লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন তাম্রলিপির প্রকাশক এ কে এম তরিকুল ইসলাম।
অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে গিয়ে গুলতেকিন বলেন, ‘আমি কবিতাগুলো নিজের মতো করে লিখেছি। এ কবিতাগুলোর কোনো একটি কিংবা কোনোটির দুই লাইন যদি আপনাদের কারও ভালো লাগে, সেটাই আমার সার্থকতা।’
সকালে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা: এর আগে সকাল সাড়ে আটটায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বসেছিল শিশু-কিশোর মেলা। তাদের জন্য সেখানে আয়োজন করা হয় চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার। রংপেনসিল শহীদ মিনার, ফুল-ফল-প্রকৃতির ছবি মনের মাধুরী মিশিয়ে আঁকে তারা। আর তাদের জন্য বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সিসিমপুরের হালুম-ইকরি-টুকটুকি।
মূল মঞ্চের আয়োজন: বিকেল চারটায় গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘বাংলা একাডেমির হীরকজয়ন্তী: অভিধান ও ব্যাকরণ কর্মসূচি, অতীত থেকে বর্তমান’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক স্বরোচিষ সরকার। আলোচনা করেন অধ্যাপক হাকিম আরিফ ও অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক আহমদ কবির। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বেগম রাহিজা খানম ঝুনুর পরিচালনায় নৃত্য পরিবেশন করেন ‘বাংলাদেশ একাডেমি অব ফাইন আর্টস’-এর শিল্পীবৃন্দ। সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী আবদুল লতিফ শাহ্, শফি মণ্ডল, রণজিৎ দাস বাউল, মমতা দাসী বাউল, ভজন কুমার ব্যাধ ও কোহিনুর আকতার গোলাপী।
নতুন বই: বাংলা একাডেমির তথ্যকেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী গতকাল মেলায় নতুন ২৫৬টি বই এসেছে। নতুন বইয়ের তালিকায় প্রথমা প্রকাশন এনেছে গোলাম মুরশিদের আধুনিকতার অভিঘাতে বঙ্গরমণী, গেইল তুরিনের লেখা অসিত রায় অনূদিত আতঙ্কের দেয়াল: বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত, কাইয়ুম চৌধুরীর জীবনে আমার যত আনন্দ ইত্যাদি।
এ ছাড়া মেলায় কথা প্রকাশন এনেছে সেলিনা হোসেনের নিঃসঙ্গতার মুখর সময়, মুনতাসীর মামুনের ষড়যন্ত্রের রাজনীতি: দুই রাষ্ট্রপতি হত্যা, কবি প্রকাশন এনেছে নির্মলেন্দু গুণের না প্রেমিক না বিপ্লবী, রাতুল গ্রন্থপ্রকাশ এনেছে শামসুজ্জামান খানের নিষ্ঠুর রাজা ও দশ ভাই ইত্যাদি।
আজও মেলার দ্বার খুলবে ১১টায়: আজ শনিবার মেলা শুরু হবে বেলা ১১টায়। চলবে রাত ৮টা পর্যন্ত। বেলা ১১টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত অভিভাবকসহ শিশুদের স্বাচ্ছন্দ্যে বই কেনার সুবিধার্থে শিশুপ্রহর ঘোষণা করা হয়েছে
Thursday, February 4, 2016
ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি by মো. নিজাম উদ্দিন
Saturday, October 10, 2015
নিউইয়র্কের সরকারি স্কুলে বাংলা এখন চতুর্থ প্রধান ভাষা by হাসান ফেরদৌস
বাংলা ভাষাভাষী ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও নিউইয়র্কের স্কুলব্যবস্থায় বাংলা ভাষায় শিক্ষাদানের সুযোগ সমানুপাতে বাড়েনি। এই মুহূর্তে নিউইয়র্কের মাত্র তিনটি স্কুলে ইংরেজির পাশাপাশি বাংলার সমান্তরাল ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। দ্বিভাষিক কর্মসূচি নামে পরিচিত এই ব্যবস্থায় ছাত্রছাত্রী একই সঙ্গে ইংরেজি ও তার মাতৃভাষায় পাঠ গ্রহণের সুযোগ পায়। যে তিনটি স্কুলে বাংলার দ্বিভাষিক ব্যবহার চালু রয়েছে, সেগুলো ব্রুকলিন, ব্রঙ্কস ও কুইন্সের বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলে অবস্থিত।
বাংলার তুলনায় চীনা, স্প্যানিশ ও কোরিয়ান ভাষায় দ্বিভাষিক শিক্ষার সুযোগ বহুলাংশে বেশি। এই বৈষম্যের কারণ কী, জানতে চাওয়া হলে নিউইয়র্কে স্কুলব্যবস্থার চ্যান্সেলর কারমেন ফারিনার একজন মুখপাত্র প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, ছাত্রছাত্রীর মাতৃভাষা যা-ই হোক না কেন, প্রত্যেকে যাতে সর্বোচ্চ মানের শিক্ষা লাভে সক্ষম হয়, সে ব্যাপারে নিউইয়র্কের শিক্ষা বিভাগ অত্যন্ত সচেতন। মুখপাত্রটি জানান, নিউইয়র্ক স্কুলব্যবস্থায় দ্বিভাষিক ও অন্তর্বর্তীকালীন দ্বিভাষিক ভাষা হিসেবে বাংলার ব্যবহার সম্প্রসারণের কাজ চলছে। বাংলা ভাষায় কথা বলেন—এমন শিক্ষকের নিয়োগ বৃদ্ধির চেষ্টাও চলছে।
নিউইয়র্কের স্কুলব্যবস্থার সঙ্গে দীর্ঘদিন দোভাষীর কাজ করছেন মিনহাজ আহমেদ। তিনি জানান, নিউইয়র্কে পর্যাপ্তসংখ্যক সার্টিফায়েড বাংলা দ্বিভাষী শিক্ষক না থাকায় স্কুলগুলোতে বাংলা দ্বিভাষী বা দ্বৈতভাষী ক্লাস চালু করা যাচ্ছে না। বাংলা দ্বিভাষী বা দ্বৈতভাষী ক্লাস থাকলে শিক্ষার্থীরা ইংরেজির পাশাপাশি মাতৃভাষারও অনুশীলন করতে পারত। তিনি জানান, দ্বিভাষিক কর্মসূচি চালু থাকার ফলে হিস্পানিক ও চীনা ছাত্রছাত্রীরা শুধু ইংরেজি শিখছে তা-ই নয়, তাদের মাতৃভাষাকেও প্রবাসে ধরে রাখতে পারছে।
ব্রুকলিনের একটি মাধ্যমিক স্কুলে দীর্ঘদিন ইংরেজি ভাষার শিক্ষকতা করছেন শামস আল মোমিন। তিনি মনে করেন, কোনো কোনো বাংলাদেশি মা-বাবা দ্বিভাষিক কর্মসূচির ব্যাপারে অনাগ্রহী। ‘দ্বিভাষিক শিক্ষাকে কেউ কেউ নিম্ন মেধাবী ছাত্রদের কর্মসূচি’ বিবেচনা করে তাতে ছেলেমেয়েকে পাঠাতে ইতস্তত করেন। অথচ ইংরেজি না-জানা কোনো বাঙালি ছাত্র ইংরেজি ভাষার এই দেশে কী যে অসহায়ভাবে ক্লাসে বসে সময় পার করে, নিজে চোখে না দেখলে বোঝা অসম্ভব। মোমিন মনে করেন, দ্বিভাষিক শিক্ষাপদ্ধতিতে যেহেতু দুই ভাষাতেই সমানভাবে শিক্ষা দেওয়া হয়, ফলে ছাত্ররা অতিরিক্ত মানসিক চাপ ছাড়াই ইংরেজিসহ সব বিষয়ে পারদর্শী হয়ে ওঠে।
নিউইয়র্ক শিক্ষা দপ্তরের অন্যতম এক মুখপাত্র প্রথম আলোকে জানান, দ্বিভাষিক কর্মসূচির গুরুত্ব নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। কিন্তু এই মুহূর্তে একটা বড় সমস্যা হলো প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের অভাব। তিনি জানান, নিউইয়র্ক শিক্ষা বিভাগ বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় সনদপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগের বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। এ উদ্দেশ্যে শিক্ষা বিভাগ প্রথাগত পথের বাইরে নিউইয়র্ক টিচিং ফেলোস কর্মসূচির মাধ্যমেও শিক্ষক সংগ্রহের চেষ্টা করছে।
ভাষার সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ থেকে আগত ছাত্রদের সাফল্যের হার খুব উৎসাহব্যঞ্জক। কুইন্সের একটি মাধ্যমিক স্কুলের চিত্রকলা বিভাগের শিক্ষক মনিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে জানান, বিগত শিক্ষা বছরে তাঁর স্কুলের প্রথম চারজন সেরা ছাত্রছাত্রীর প্রত্যেকেই ছিল বাংলাদেশের। এ দেশে আসার আগে এদের অধিকাংশের ইংরেজি জ্ঞান ছিল সীমিত।
‘আমাদের ছেলেমেয়েদের এই সাফল্যে সবাই অবাক হয়ে গেছে।’ এই ফলাফলে কোনো ভুল আছে কি না, তা দেখার জন্য একাধিকবার কাগজপত্র ও পরীক্ষার ফল বিচার করা হয় বলে মনিরুল জানান।
Friday, October 9, 2015
তাঁর স্বপ্ন ও ভাষা বেঁচে থাক by মাতিয়া বানু
ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন চলে গেছেন এক বছর হয়ে গেল। আজ বাদে কাল তিন দিন হলে শোক কমে যায় ঠিকই, কিন্তু বছর চলে গেলেও আমার মনে হচ্ছে তিন দিন। এই না সেদিন শহীদ মিনারে কত লোক জড়ো হয়ে ভাষা-মতিনকে শ্রদ্ধা জানাল! কবে হলো যেন, পরশু, নাকি তার আগের দিন, নাকি গত সপ্তাহে! ভুলোমনা মেয়েরা হয়তো বাবার প্রস্থানের দিনের হিসাব রাখতে পারে না। যে চলে যায়, তার কাছের লোকদের মন এত সহজে প্রস্থান মেনে নিতে পারে না! সময় লাগে। আর আমার মন না মানলেও এটাই সত্য, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যায় সবকিছু। নতুনকে জায়গা করে দিতে পুরোনোর সরে যাওয়াটাই প্রকৃতির রীতি।
না, ভয়ের কিছু নেই, কে কতটা মনে রেখেছে বা ভুলে গিয়েছে, তার হিসাব করতে বসিনি আমি। কারও দিকে আঙুল তুলে বলবও না, তুমি যে আমার বাবার অনেক কাছের লোক ছিলে, আজ কেন তোমার ছায়াটাও দেখা যায় না!
কারও কাছে কৈফিয়ত চেয়ে বলব না, ‘ভাষা-মতিনের স্মৃতি নিয়ে পড়ে থাকা তাঁর স্ত্রী-পরিবারের সঙ্গে সামান্য সৌজন্য সম্পর্কটুকু আজ কারও নেই, কিসের ভয়ে! তাদের বিপন্নতার দায় ঘাড়ে এসে পড়ার কিংবা দান-অনুদানের ভয়!’ আবারও বলছি, ভয়ের কিছু নেই। ভাষাসৈনিক আবদুল মতিনের পরিবারে কখনোই কোনো প্রাচুর্য ছিল না, তাই অভাবের প্রশ্ন আসে না। কিন্তু অভাব তো হয়েছে। কোলাহলমুখর, চিন্তাসচেতন একজন প্রাণবন্ত মানুষের অভাব সেখানে ঘটেছে। তাঁকে ঘিরে যে জনসমাগম ঘটত, সেটা এখন আর হয় না, সেই অভাব সৃষ্টি হয়েছে।
ভাষাসৈনিক আবদুল মতিনের নীতি-আদর্শে সচল কর্মজীবনে ছায়াসঙ্গী হয়ে ছিলেন যিনি, তিনি আজও ছায়া হয়ে আছেন, কায়া নেই। স্ত্রী গুলবদন নেছা নীরবে ভাষা-মতিনের সব সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ব্যস্ত সময় কাটিয়ে হঠাৎ যেন বেকার হয়ে পড়েছেন। একেই বলে নারী জীবন। কোনো প্রাপ্তি বা স্বীকৃতি তো নেই-ই, তাঁর কর্মোদ্যমী সচল জীবনটাকে কর্মমুখর করে তোলার জন্যও কেউ সহায়তার হাত বাড়ায়নি। অথচ আজীবন সংগ্রামী ভাষাসৈনিকের জীবনের অনেক না-বলা কথা, অপ্রকাশিত ইতিহাস আর অনেক স্বপ্নের সাক্ষী তিনি।
স্বাধীন রাষ্ট্রের কামনা, রাষ্ট্রভাষার দাবি থেকে শুরু করেগণমুক্তির রাজনীতি, অন্যায়ের প্রতিবাদ, মোট কথা দেশের যেকোনো সংকটের সময়ে বুক পেতে তিনি দাঁড়িয়েছেন, বাঙালি জনগোষ্ঠীর খুব কাছের এবং জনপ্রিয় ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন। ভাষাশহীদ, ভাষাসৈনিক এবং মুক্তিকামী জনগোষ্ঠীকে নিয়ে দেশ গঠনে তঁার অবদান কোনো অংশে কম ছিল না।
বিশাল স্মৃতিসৌধ, নামী পদক, স্মরণ সমাবেশ, নামকরণ—এমন কোনো কিছুর চাহিদা ভাষাসৈনিক আবদুল মতিনের ছিল না। তাঁর মেয়ে হিসেবে এই দেশ ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর কাছে আমারও বিশেষ কোনো দাবি নেই। তবে একটা আকাঙ্ক্ষা আছে, প্রত্যাশা আছে। ভাষাসৈনিকদের দাবি, আর ভাষাশহীদদের রক্তের বিনিময়ে প্রাপ্ত এই বাংলা ভাষাকে যেন পূর্ণ মর্যাদায় সংরক্ষণ করা হয়। ভুল বা বিভ্রান্তি নয়, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ভাষার অর্জন আর তার ধারাবাহিকতায় স্বাধীনতাপ্রাপ্তির সঠিক ইতিহাস যেন লিপিবদ্ধ হয়।
ভাষা আমাদের পরিচয়। বর্ণ, ধর্মের ভেদাভেদ থাকলেও ভাষার কোনো বিভেদ নেই। বাংলায় কথা বলা প্রতিটি মানুষের একটাই জাত, বাঙালি। প্রত্যেক স্বতন্ত্র মানুষের নিজেকে প্রকাশ করার একটাই অবলম্বন, ভাষা। অর্থাৎ ভাষা প্রাণের সমতুল্য। ভাষা আমার অধিকার, অথচ সেই ভাষাকে রক্তের বিনিময়ে অর্জন করতে হয়েছিল আমাদের। স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাস প্রতিটি রাষ্ট্রের থাকে, ভাষা অর্জনের ইতিহাস বিরল। যত দিন এই ভাষা টিকে থাকবে, তত দিন আমাদের জাতিগত পরিচয় টিকে থাকবে। গাছের যেমন করে তার শিকড় চিনতে হয়, তেমনিভাবে প্রজন্মের জাতিসত্তার ইতিহাস জানার আকাঙ্ক্ষা থাকা স্বাভাবিক। আর অগ্রজদের দায়িত্ব হলো সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ করা। পিঁপড়ার দলনেতা যদি তার দলকে ভুল পথে এগিয়ে দেয়, তাহলে ঘটতে পারে যেকোনো কিছু।
আমি সাধারণ মানুষ। রাজনীতি, দলনেতা—এসব বুঝি না। ভূতের রাজার কাছে আমি এমন এক ভাষার বর চাইব, যে ভাষায় আমি প্রাণ খুলে গাইতে পারি—
‘সুরেরই ভাষা, প্রাণেরই ভাষা, গানেরই ভাষা, আনন্দেরই ভাষা
ভাষা এমন কথা বলে, বোঝে রে সকলে, উঁচা-নিচা, ছোট-বড় সমান
মোরা সেই ভাষাতেই করি গান।’
মাতিয়া বানু শুকু: প্রয়াত ভাষাসৈনিক আবদুল মতিনের মেয়ে, নাট্যনির্মাতা।
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (1997)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...












