Sunday, January 24, 2016
ক্লিন ঢাকা গ্রিন ঢাকা গড়তে গণমাধ্যমের সহযোগিতা চাইলেন মেয়র আনিসুল হক
![]() |
| হোটেল সোনারগাঁওয়ে গতকাল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে সম্পাদকদের সাথে মতবিনিময় : নয়া দিগন্ত |
গতকাল রাজধানী হোটেল সোনারগাঁওয়ে পত্রিকা ও অনলাইন সম্পাদকদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন। সভায় অংশগ্রহণকারী সম্পাদকেরাও মেয়রের ভালো কাজে সব সময় পাশে থাকার আশ্বাস দেন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন আয়োজিত সভায় সমকাল সম্পাদক গোলাম সরওয়ার, নয়া দিগন্ত সম্পাদক আলমগীর মহিউদ্দিন, জনকণ্ঠ সম্পাদক আতিকউল্লাহ খান মাসুদ, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, আমাদের অর্থনীতি সম্পাদক নাঈমুল ইসলাম খান, বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজাম, কালের কণ্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন, ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন, ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসমীমা হোসেন, ডেইলি এশিয়ান এজ সম্পাদক নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ, ঢাকা ট্রিবিউন সম্পাদক জাফর সোবহান, ইউএনবির সিএনই মাহফুজুর রহমান, ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো: মেসবাহুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
সভায় মেয়র আনিসুল হক গত আট মাসে ডিএনসিসির নেয়া বিভিন্ন কার্যক্রম তুলে ধরেন। আগামী পরিকল্পনাগুলোও সবিস্তারে বর্ণনা করেন তিনি। আনিসুল হক বলেন, প্রতিদিন যতই ময়লা পরিষ্কার করি ঢাকা শহর কিন থাকে না। আজ পরিষ্কার করলে পরদিন আবার আগের অবস্থায় চলে যাচ্ছে। বিভিন্ন বিল্ডিংয়ের মাঝখানে টন টন ময়লা জমে গেছে। ড্রেনের মধ্যে ময়লা সিমেন্টের মতো জমে গেছে। রাস্তার পাশে ডাস্টবিন দিলে রাতের মধ্যে চুরি হয়ে যাচ্ছে। খাল-বিল দখল হয়ে গেছে। ৪৩টি খালের মধ্যে ২৩টিরই মাথা দখল করে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। মানুষ সচেতন না হলে এ অবস্থার পরিবর্তন হবে না। মেয়র একা কিছুই করতে পারবে না। মানুষের মগজের মধ্যে ঢুকাতে হবে, তাদের ম্যাসেজ দিতে হবে, ময়লা ফেলা যাবে না। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। রাজধানীকে পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। আর এ কাজটি গণমাধ্যমই একমাত্র করতে পারে।
মেয়র যানজট নিরসন, আধুনিক পাবলিক টয়লেট নির্মাণ, ইউলুপ নির্মাণ, ময়লা পরিষ্কার, সেকেন্ডরি ট্রান্সফার স্টেশন নির্মাণ, ফুটপাথ দখলমুক্ত করা, ফুটওভার ব্রিজে গাছ লাগানোসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি তুলে ধরে বলেন, ৩৬টি ওয়ার্ডের প্রতিটিতে দুইটি করে মোট ৭২টি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) নির্মাণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে ৬০টির ৮০ ভাগ কাজ শেষ হয়ে গেছে। আগামী মার্চ মাসে এগুলো তৈরি শেষ হলে রাজধানীর ময়লা সব এখানে ফেলা হবে। তখন অনেকটা শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। রাস্তায় বড় কোনো ময়লা থাকবে না। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছি তাদের দোকানের সামনে কোনো ময়লা রাখা যাবে না। তারা যদি না শোনে তাহলে দোকান বন্ধ করে দেয়া হবে। ২০ হাজার বিলবোর্ড অপসারণ করা হয়েছে জানিয়ে মেয়র বলেন, এ জন্য অনেক যুদ্ধ করতে হয়েছে। আপস করতে হয়েছে। আবার বিলবোর্ড ফিরবে জানিয়ে তিনি বলেন, এ বিলবোর্ড হবে আধুনিক ও পরিবেশসম্মত। দেয়ালে আর কোনো লেখালেখি করতে দেয়া হবে না জানিয়ে তিনি বলেন, যারা লেখেন তাদের নিষেধ করে ফোন দেয়া হচ্ছে। এরপর তাদের অফিসে হানা দেয়া হবে। আগামী এপ্রিলের মধ্যে ফুটপাথ দোকানমুক্ত করা হবে বলেও জানান মেয়র। যানজট আগামী বছর আরো বেড়ে যাবে এমন আশঙ্কার কথা জানিয়ে আনিসুল হক বলেন, তেজগাঁও, গাবতলী, মোহাম্মদপুরসহ ১০টি জায়গায় পার্কিং বন্ধ করা হয়েছে। এতে বেশ উপকার পাওয়া গেছে। যত্রতত্র বাস থামানো বন্ধ করা হচ্ছে। বর্তমানে ৯০টি সংস্থার মাধ্যমে দুই হাজার মালিক রাজধানীতে বাস চালাচ্ছেন জানিয়ে মেয়র বলেন, এদেরকে পাঁচটি কোম্পানির অধীন আনা হচ্ছে। পাঁচটি এলাকায় ভিন্ন রঙের এসব বাস চলবে। এ ছাড়া তিন হাজার নতুন বাস নামানো হবে। এর মধ্যে এক হাজার থাকবে এসি বাস। জোড়-বিজোড় সিরিয়ালে গাড়ি চালানো যায় কিনা তারও পরীক্ষা করা হবে। তবে বাস ব্যবসায় কঠিন সিন্ডিকেট ও হাজার কোটি টাকার লেনদেন রয়েছে জানিয়ে মেয়র বলেন, বাস মালিকদের কোম্পানির অধীন আনতে রাজি করাতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থির উন্নতি ঘটাতে পুরো ডিএনসিসি এলাকা সিটিটিভির আওতায় আসছে জানিয়ে আনিসুল হক বলেন, বর্তমানে গুলশান-বনানী এলাকায় ৯০টি সিসিটিভি রয়েছে। এতে ত্রিশ ভাগ অপরাধ কমে গেছে। পুরো সিটি এলাকায় পর্যায়ক্রমে আড়াই হাজার সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হবে। এগুলো পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে পুলিশ। কোথায় কোনো অপরাধ ঘটলে তখন দোষী ধরতে সহজ হবে। মানুষ যেখানে সেখানে ময়লা ফেললে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন এ ক্যামেরা দিয়ে দেখা যাবে। গ্রিন ঢাকা গড়তে বাড়িতে বাড়িতে ফুলগাছ, সার পৌঁছে দেয়া হবে জানিয়ে মেয়র বলেন, বাস সার্ভিস থাকবে। তাদের জানালেই বাড়িতে গাছ পৌঁছে দেবে। তাদের মাসিক একটা চার্জ দিতে হবে। সিএনজি স্টেশনগুলোতে পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করা হবে জানিয়ে বলেন, তারা সহযোগিতা না করলে খবর আছে। রাজউকের অধীনে থাকা বড় পার্কগুলো সিটি করপোরেশনের অধীনে দেয়ার অনুরোধ করেন মেয়র। এ ছাড়া জলাবদ্ধতা নিরসনে রাজধানীর খালগুলো পরিষ্কারের কার্যক্রম মেয়রের এখতিয়ারে দেয়ার আহ্বান জানান তিনি। আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক স্থাপনা অপসারণ অভিযান প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, আপাতত অভিযান বন্ধ রাখা হচ্ছে। তবে পার্কিং স্থান না রেখে বাণিজ্যিক ব্যবহার বন্ধ করা হবে।
সভায় সমকাল সম্পাদক গোলাম সরওয়ার মেয়রকে ভালো কাজে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে বলেন, রাজনীতিবিদেরাও আপনার মতো হলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। তবে তিনি আবাসিক এলাকা থেকে বাণিজ্যিক স্থাপনা অপসারণে আরো সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেন। বিলবোর্ডে সুন্দরী নারীদের ছবি না রাখারও আহ্বান জানান তিনি।
আলমগীর মহিউদ্দিন মেয়রের বিভিন্ন কর্মসূচির প্রশংসা করে বলেন, ঢাকাবাসী এবার অন্তত ভালো কিছু দেখবে। তিনি আরো বলেন, ঢাকার জন্য প্রথম একটি মাস্টার প্লান তৈরি করা হয়েছিল, এতে ছয়টি পার্কিং এরিয়া ছিল, সেগুলোর এখন একটাও নেই। সেগুলো থাকলে অনেক ভালো হতো। ডিএনসিসির ভালো কার্যক্রমে সব সময় পাশে থাকার আশ্বাস দেন আলমগীর মহিউদ্দিন।
আতিকউল্লাহ খান মাসুদ হকার উচ্ছেদে মেয়রকে একই জায়গায় বারবার অভিযান চালানোর পরামর্শ দেন।
মতিউর রহমান চৌধুরী তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ডের সামনের রাস্তা ফাঁকা করায় মেয়রের প্রশংসা করে বলেন, তবে আবারো দখল করে নেয়ার পাঁয়তারা চলছে।
নঈম নিজাম মূল সড়ক থেকে ডাস্টবিন সরানোর আহ্বান জানান। ফাইওভার নির্মাণে প্রতি বছর সময় বাড়ানোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, একটি কাজ কেয়ামত পর্যন্ত চলতে পারে না।
ইমদাদুল হক মিলন বলেন, অতীতে আমরা অনেক স্বপ্ন দেখেছি। তবে এবার বাস্তবায়ন দেখতে চাই।
তাসমীমা হোসেন বলেন, ফার্মগেটে একটি পার্ক দখল করে ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। ব্যক্তিগত সম্পদ হিসেবে এটি ব্যবহার করা হচ্ছে। এর সাথে কয়েকজন মন্ত্রীরও সমর্থন রয়েছে। এভাবে শহরের মধ্যে যেকোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান, ওয়াজ মাহফিল, তাবলিগ বন্ধ করা উচিত। মসজিদ থেকে মাইকে উচ্চ শব্দে আজান দিয়ে শব্দ দূষণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, যাদের আজান শোনা দরকার তারা প্রয়োজনে মসজিদের সাথে ইলেট্রনিক মাধ্যমে নিজেদের কানে লাগিয়ে শুনতে পারে।
About: Anonymous
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
ফরিদগঞ্জে ব্যাংকসহ ৭ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নিকাণ্ড
About: ATM COX
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
উন্নয়ন করছেন, দুর্নীতিও বন্ধ করুন by মইনুল ইসলাম
অন্যদিকে, দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির নিয়মানুযায়ী ভাষণের পরদিন এর প্রতিক্রিয়ায় তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপনের মাধ্যমে বিএনপির পক্ষ থেকে মঈন খান ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দাবি করলেন যে দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে নয়, লুটপাটের মহাসড়কে অবস্থান করছে। বিএনপির এই দাবিকেও উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ, দেশের এই ব্যাধিটিও অতি পুরোনো ও দুরারোগ্য। কঠোর হাতে এই ব্যাধির যথাযোগ্য চিকিৎসার মাধ্যমে নিরাময়ের সদিচ্ছা সরকার গত সাত বছরে দেখিয়েছে বলা যাবে না। আমার দৃষ্টিতে এই মুহূর্তে এটাই জাতির অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে ‘এক নম্বর প্রতিবন্ধক’। মানে, এ দেশের রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতির রাশ টেনে ধরা গেলে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ নয়, এত দিনে ৮ শতাংশ ছাড়িয়ে যেত। দেশের অর্থনীতি যে উড়াল দিয়েছে, তা নিচের আশা-জাগানিয়া সাফল্যগুলো প্রমাণ করছে:
১. ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৮২ শতাংশই দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল, কিন্তু ২০১০ সালের হাউস হোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে মোতাবেক দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থানকারী জনসংখ্যার অনুপাত ৩১ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০১৬ সালে দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থানকারীদের হার জনসংখ্যার ২৩ শতাংশে নেমে গেছে বলে প্রাক্কলন করা হচ্ছে।
২. মোটা ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ম্ভরতা অর্জন করেছে। ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের খাদ্যশস্যের চাহিদা মেটানোর জন্য ধান লাগত বার্ষিক দেড় কোটি টন, অথচ ধান উৎপাদন ছিল মাত্র ১ কোটি ১০ লাখ টন, ঘাটতি ছিল প্রায় ৪০ লাখ টন। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ধান উৎপাদন ৩ কোটি ৮৪ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে, যার ফলে দেশ মোটা ধান উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে এখন খাদ্য রপ্তানির সক্ষমতা অর্জন করেছে। গত ৪৫ বছরে দেশের মাছ উৎপাদন বেড়েছে ছয় গুণ। মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান এখন বিশ্বে চতুর্থ। শাকসবজি উৎপাদনও বেড়েছে প্রায় চার গুণ।
৩. ১৯৮১-৮২ অর্থবছরে এ দেশের জিডিপির অনুপাত হিসাবে বৈদেশিক ঋণ/অনুদান ১৩ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছিল। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এই অনুপাত জিডিপির ১ শতাংশেরও নিচে নেমে গেছে। আরও স্বস্তিকর হলো, বৈদেশিক ঋণ/সাহায্যের ৯৮ শতাংশই এখন প্রকল্প ঋণ, মাত্র ২ শতাংশ খাদ্যসাহায্য। বাংলাদেশ এখন আর পণ্য সাহায্য নেয় না। অথচ সত্তরের দশকে গড়ে প্রায় ২৯ দশমিক ৪ শতাংশ বৈদেশিক সাহায্য নেওয়া হতো খাদ্যসাহায্য হিসেবে, ৪০ দশমিক ৮ শতাংশ নেওয়া হতো পণ্য সাহায্য হিসেবে আর বাকি ২৯ দশমিক ৮ শতাংশ ছিল প্রকল্প ঋণ। আমাদের রাজনীতিবিদ এবং আমলারা প্রকল্প থেকে মার্জিন আত্মসাৎ করার লোভে এখনো প্রকল্প ঋণ গ্রহণের বদখাসলত ছাড়তে পারছেন না, নইলে এখন বৈদেশিক ঋণ না নিলেও বাংলাদেশের অর্থনীতির কোনোই ক্ষতি হবে না।
৪. বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যের চলতি হিসাবে দুই বছর বাদে গত ১০ বছর ধরে উদ্বৃত্ত সৃষ্টি হচ্ছে। বাণিজ্য ভারসাম্যের ঘাটতি পূরণে প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রেরিত রেমিট্যান্স যথেষ্ট প্রমাণিত হচ্ছে। ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে ২৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ, ভারতের পরই। পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১৬ বিলিয়ন ডলার। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বৈধ পথে প্রেরিত রেমিট্যান্স প্রবাহ ছিল প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার। আরও ৮-১০ বিলিয়ন ডলার হুন্ডি ও অন্যান্য অপ্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেলে অর্থনীতিতে প্রবেশ করছে (হয়তো ডলার আসছে না)। এই বিপুল রেমিট্যান্স প্রবাহ গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগের জোয়ার সৃষ্টি করেছে।
৫. বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ছিল ৩১ বিলিয়ন ডলার, মানে ৩১০০ কোটি ডলার। অথচ, ১৯৮১-৮২ অর্থবছরে তা ছিল মাত্র ৮২ কোটি ডলার। তৈরি পোশাক ছাড়াও চামড়া, চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, সিরামিক পণ্য, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য এবং মৎস্য রপ্তানির প্রবৃদ্ধি প্রতিবছর আশাব্যঞ্জক থাকছে। চীনের পর এখন পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রপ্তানিকারকে পরিণত হয়েছে।
৬. বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার প্রতিবছর ৬ শতাংশের বেশি হচ্ছে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তা ছিল ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দুর্নীতি-লুটপাট কমাতে পারলে অদূর ভবিষ্যতে প্রবৃদ্ধির হারকে ৮ শতাংশে উন্নীত করা যাবে।
৭. বাংলাদেশের গ্রামীণ ব্যাংক প্রবর্তিত ÿক্ষুদ্রঋণ পদ্ধতি প্রান্তিক অবস্থানের ভূমিহীন নারীদের কাছে ব্যাংকঋণ পৌঁছে দেওয়ার সফল ও লাগসই ব্যবস্থা হিসেবে বিশ্ব-স্বীকৃতি পেয়েছে নোবেল পুরস্কার জয় করার মাধ্যমে। ক্ষুদ্রঋণব্যবস্থার কিছু নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য সত্ত্বেও প্রান্তিক অবস্থানের উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠীর কাছে পুঁজি সরবরাহের এই পদ্ধতিগত উদ্ভাবনকে আরও গ্রহণযোগ্য ও টেকসই করাটাই এখন জাতির চ্যালেঞ্জ।
৮. ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচির প্রশংসনীয় অগ্রগতি বাংলাদেশের আনাচকানাচে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিপ্লবের সুফল পৌঁছে দিচ্ছে। দেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে ১৩ কোটি এখন মোবাইল টেলিফোনের আওতায় চলে এসেছে, যার খরচ দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশে সর্বনিম্ন। দেশের সাড়ে পাঁচ কোটি মানুষ এখন ইন্টারনেট ব্যবহার করে।
৯. বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় ৩০ শতাংশ আসছে শিল্প খাত থেকে, ১৮ শতাংশ আসছে কৃষি খাত থেকে আর ৫২ শতাংশ আসছে টারশিয়ারি (প্রধানত সেবা ও বাণিজ্য) খাত থেকে। জিডিপি কম্পোজিশনের এই উল্লেখযোগ্য রূপান্তর দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত ও টেকসই হওয়ার লক্ষণ।
অন্যদিকে, উন্নয়নের পথে যাত্রা সত্ত্বেও সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনীতির সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকতা অর্জন ও পুঁজি লুণ্ঠনের ‘সিস্টেমের’ দৌরাত্ম্য গত সাত বছরে একবারেই কমেনি। এর ফলে সাধারণ মানুষ যেমন দৈনন্দিন জীবনে ঘুষ-দুর্নীতির তাণ্ডবে দিশেহারা, তেমনি সরকারের প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পে যে দুর্নীতির মচ্ছব চলছে, সেটা প্রকটভাবে ধরা পড়ছে। প্রতিটি প্রকল্পের ব্যয় প্রাক্কলিত ব্যয়ের কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে।
কয়েকটি উদাহরণ দেখুন: ঢাকার মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের নির্মাণব্যয় শেষ পর্যন্ত প্রতি বর্গমিটারে যা দাঁড়িয়েছে, সেটা অস্বাভাবিক। পাবলিক-প্রাইভেট-পার্টনারশিপের (পিপিপি) নির্মিত এই প্রকল্পে যেভাবে নিয়ন্ত্রণহীন ব্যয় বাড়ানো হয়েছে, সেটা কোনো যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। খবর নিয়ে দেখা যাচ্ছে, ক্ষমতাসীন জোটের সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যবসায়ী-ঠিকাদারদের বিভিন্ন মহলকে বখরা দিয়ে মূল নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি এই অবিশ্বাস্য খরচ ফাঁপানোর কাজটি সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছে। প্রকল্প চালু হওয়ার পর চুক্তির শর্তাবলি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান দুই বছর ধরে কয়েক গুণ বেশি হারে টোল আদায় করে যাওয়া সত্ত্বেও সরকার রহস্যজনকভাবে বিষয়টির আইনি সুরাহার প্রক্রিয়া ঝুলিয়ে রেখেছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে চার লেনে প্রশস্তকরণ প্রকল্পের খরচ প্রাক্কলিত ব্যয়ের প্রায় চার গুণ বেড়ে যাচ্ছে। শুধু বিলম্বের ওজর দেখিয়ে এত বেশি ব্যয়বৃদ্ধিকে জায়েজ করা যাবে না। কারণ, গত সাত বছরে নির্মাণসামগ্রীর আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ দাম এত বেশি বাড়েনি যে তা দিয়ে প্রকল্পের কয়েক গুণ ব্যয়বৃদ্ধিকে যৌক্তিক প্রমাণ করা যাবে। এই বড় প্রকল্পটির পাশাপাশি সড়ক-সম্পর্কীয় সব প্রকল্পের খরচ দফায় দফায় বাড়ানো এখন রুটিনে পরিণত হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথকে ডাবল ট্র্যাক করার প্রকল্পের ব্যয়ও কয়েক গুণ বাড়িয়ে ফেলা হয়েছে। রেলওয়ের তাবৎ প্রকল্প বিলম্বিত হওয়াই নিয়মে পরিণত হয়েছে।
মোদ্দা কথা হলো, প্রকল্প মানেই উন্নয়ন—এটা আমাদের রাজনীতিতে বদ্ধমূল ধারণায় পরিণত হয়েছে বহুদিন আগেই। আর প্রকল্প থেকে রাজনীতিবিদ, আমলা ও ব্যবসায়ী-ঠিকাদারেরা মার্জিন আহরণ করে অনর্জিত আয়-রোজগার করার বিষয়টিও এখন আমাদের ধাতস্থ হয়ে গেছে। বিএনপির তুলনায় এ ব্যাপারে বরং আওয়ামী লীগের পারঙ্গমতা কিছুটা কম বলে ধারণা রয়েছে। অতএব, দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে উত্তীর্ণ হলে যে পাল্লা দিয়ে রাজনৈতিক-আমলাতান্ত্রিক-ব্যবসায়িক পুঁজি লুণ্ঠন বাড়াই স্বাভাবিক, সেটা বিএনপির নেতারাও ভালোভাবে জানেন। আমার মতে, লুটপাটের মহাসড়কে অবস্থানের ব্যাপারে বিএনপির এহেন মন্তব্য যদি সুস্পষ্ট তথ্য-উপাত্তভিত্তিক হয়, তাহলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সেগুলোকে আমলে নিয়ে কার্যকর তদন্ত শুরু করলে এবং অভিযোগগুলোকে আইনি প্রক্রিয়ার অধীনে নিয়ে এলে জাতি উপকৃত হবে। বিরোধী দল বলেই চলেছে, দুদক শুধু অতীতের ক্ষমতাসীন মহলের দুর্নীতি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করায় বেশি পারদর্শিতা প্রদর্শন করছে। এ ব্যাপারে দুদককে সাবধানতার সঙ্গে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতেই হবে। আমিও মনে করি ‘স্বাধীন’ দুদকের আরেকটু বেশি সাহসী হওয়ার প্রয়োজন অনস্বীকার্য।
প্রধানমন্ত্রী বারবার বলে চলেছেন, তাঁকে কেনা যায় না। তাঁর এই সাহসী বক্তব্যকে বিশ্বাসযোগ্য করতে হলে তাঁকে দুর্নীতিবাজ ও পুঁজি লুটেরাদের বিরুদ্ধে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। তাঁর এবং তাঁর দলের জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধারের এটাই একমাত্র পথ। তাঁর সরকারের সাফল্যগুলোকে বরবাদ করার জন্য দুর্নীতিই হবে প্রতিপক্ষের হাতে সবচেয়ে মোক্ষম অস্ত্র। এই অস্ত্রকে ভোঁতা করার প্রয়োজনে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নিতে হবে এবং অবিলম্বে।
ড. মইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
About: Anonymous
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
রায় ঘোষণা করতে হয় প্রকাশ্য আদালতেই by ইকতেদার আহমেদ
আদিম অধিক্ষেত্রের দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালতগুলো মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ সমাপ্ত হওয়ার পর উভয়পক্ষকে শুনানি শেষে সিদ্ধান্ত দেয়া হয়। দেওয়ানি ও ফৌজদারি আপিল ও রিভিশনের ক্ষেত্রে সচরাচর সাক্ষ্যগ্রহণের আবশ্যকতা না থাকায় চূড়ান্ত শুনানি অন্তে সিদ্ধান্ত দেয়া হয়। আদালতের এ সিদ্ধান্তটিই মামলার রায়। মামলার রায় দেয়ার ক্ষেত্রে আদালত কী পদ্ধতি অনুসরণ করবেন তা সবিস্তারে আইন, বিধি এবং আদেশ ও নিয়মাবলিতে উল্লেখ রয়েছে।
দেওয়ানি কার্যবিধিতে দেওয়ানি আদালতগুলোতে বিচারকার্য পরিচালনা-সংক্রান্ত পদ্ধতিগত বিষয়গুলো আলোচনা করা হয়েছে। দেওয়ানি কার্যবিধিতে পৃথকভাবে আদালতের কোনো সংজ্ঞা না দেয়ায় দেওয়ানি কার্যবিধির যেসব স্থানে বিশেষণের ব্যবহার ছাড়া ‘আদালত’ শব্দটি ব্যবহার হয়েছে, সেসব স্থানে আদালত বলতে সংবিধানে উল্লিখিত সুপ্রিম কোর্টসহ সব আদালতকে বোঝানো হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগে কিছু বিশেষায়িত মামলা যেমন- কোম্পানি, অ্যাডমিরালটি, রিট ও আদালত অবমাননা ছাড়া দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলাগুলোর আপিল ও রিভিশনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। দেওয়ানি কার্যবিধির ধারা নম্বর ৩৩ রায় এবং ডিক্রি সংক্রান্ত। ধারা নম্বর ৩৩-এ বলা হয়েছে- মামলার শুনানি হওয়ার পর আদালত রায় ঘোষণা করবেন এবং এরূপ রায়ের ভিত্তিতে ডিক্রি প্রণীত হবে। দেওয়ানি কার্যবিধিকে আরো কার্যক্ষম করার লক্ষ্যে প্রতিটি ধারা সংশ্লেষে বিধি প্রণয়ন করা হয়েছে এবং এরূপ বিধিতে ধারাতে উল্লিখিত বিষয়গুলো অধিকতরভাবে কার্যকরণের লক্ষ্যে অতিরিক্ত ব্যবস্থাদির ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ নম্বর ২০ রায় ও ডিক্রি সংক্রান্ত। আলোচ্য নিবন্ধের বিষয়বস্তুর আলোকে ২০ নম্বর আদেশের ১, ২ ও ৩ নম্বর বিধি প্রাসঙ্গিক। ২০ নম্বর আদেশের ১ নম্বর বিধিতে রায় ঘোষণার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। ওই বিধিতে বলা হয়েছে- মামলার শুনানি সমাপ্ত হওয়ার পর তৎক্ষণাৎ বা অনূর্ধ্ব সাত দিনের কোনো পরবর্তী তারিখে পক্ষগণকে বা তাদের আইনজীবীগণকে যথাযথ নোটিশ দিয়ে আদালত প্রকাশ্য আদালতে রায় ঘোষণা করবেন।
একই আদেশের ২ নম্বর বিধি পূর্ববর্তী বিচারকের লিখিত রায় ঘোষণার ক্ষমতা-সংক্রান্ত। এ বিধিতে বলা হয়েছে- কোনো বিচারক তার পূর্ববর্তী বিচারকের লিখিত কিন্তু ঘোষিত হয়নি, এরূপ রায় ঘোষণা করতে পারেন।
২০ নম্বর আদেশের ৩ নম্বর বিধিতে রায়ে স্বাক্ষর দেয়ার বিষয়টি উল্লিখিত হয়েছে। এ বিধিতে বলা হয়েছে- রায় ঘোষণা করার সময় প্রকাশ্য আদালতে বিচারক তাতে স্বাক্ষর ও তারিখ দেবেন এবং একবার স্বাক্ষরিত হলে তারপর কেবল ১৫২ ধারা অনুসারে বা রিভিউ ছাড়া এর কোনো সংশোধন বা সংযোজন করা চলবে না। ৩ নম্বর বিধিতে উল্লিখিত ১৫২ ধারার ব্যাপ্তি কতটুকু সে বিষয়ে ধারণা পেতে হলে ১৫২ ধারার ওপর আলোকপাত প্রয়োজন। ১৫২ ধারায় রায়, ডিক্রি বা আদেশ সংশোধন বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ওই ধারায় বলা হয়েছে- করণিক বা গাণিতিক ভুল থাকলে অথবা কোনো আকস্মিক ফসকান (Accidental slip) বা বিচ্যুতির (Omission) কারণে সেখানে কোনো ভুল থাকলে যেকোনো সময় আদালত নিজ উদ্যোগে বা কোনো পক্ষের আবেদনক্রমে তা সংশোধন করতে পারেন।
দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ নম্বর ৪১ মূল ডিক্রি থেকে আপিল-সংক্রান্ত। আদেশ নম্বর ৪১-এর ৩০ ও ৩১ বিধিদ্বয় আলোচ্য নিবন্ধ সংশ্লেষে প্রাসঙ্গিক। ৩০ নম্বর বিধিতে রায় কখন এবং কোথায় ঘোষণা করা হয় সে বর্ণনা রয়েছে। ওই বিধি অনুযায়ী আপিল আদালত পক্ষগণ বা তাদের আইনজীবীদের বক্তব্য শ্রবণের পর এবং আপিলের বা যে আদালতের ডিক্রি থেকে আপিল করা হয়েছে, সে আদালতের কার্যক্রমের কোনো অংশ রেফারেন্সের জন্য প্রয়োজনীয় বিবেচিত হলে তা রেফার করে, তখনি অথবা অন্য কোনো ভবিষ্যৎ দিনে পক্ষগণ বা আইনজীবীদের নোটিশ দিয়ে প্রকাশ্য আদালতে রায় ঘোষণা করবেন। ৩১ নম্বর বিধিতে রায়ের সারমর্ম, তারিখ এবং স্বাক্ষর বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে- আপিল আদালতের রায় লিখিত আকারে হতে হবে এবং ক. সিদ্ধান্তের বিষয়গুলো; খ. বিষয়গুলোর ওপর সিদ্ধান্ত; গ. সিদ্ধান্তের কারণগুলো এবং ঘ. যে ক্ষেত্রে ডিক্রি বাতিল বা পরিবর্তন করা হয়, সে ক্ষেত্রে আপিলকারী যে প্রতিকারের অধিকারী, তা বিবৃত করতে হবে এবং রায় ঘোষণার সময় বিচারক বা মতৈক্যশীল বিচারকেরা তাতে স্বাক্ষর করবেন ও তারিখ দেবেন।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ রুল, ১৯৮৮ তে (সর্বশেষ ২২ এপ্রিল, ২০০৮ পর্যন্ত সংশোধিত) রায়, ডিক্রি ও আদেশ বিষয়ে বলা হয়েছে- আদালত মামলার শুনানি শেষ হওয়ার পর তখনি অথবা অন্য কোনো ভবিষ্যৎ দিনে পক্ষগণ অথবা তাদের অ্যাডভোকেট অন রেকর্ডকে যথাযথভাবে নোটিশ দিয়ে প্রকাশ্য আদালতে রায় ঘোষণা করবেন এবং সে অনুসারে ডিক্রি অথবা আদেশ প্রস্তুত করা হবে।
হাইকোর্ট বিভাগ রুলে অ্যাডভোকেট অন রেকর্ডের পরিবর্তে আইনজীবীরা উল্লেখপূর্বক উপরিউক্ত বিষয়টি একইভাবে বর্ণিত হয়েছে। আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগ রুলে রায় বিষয়ে উল্লিখিত বিধানাবলি দেওয়ানি ও ফৌজদারি উভয় ধরনের মামলার রায়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের রায় বিষয়ে উভয় আদালতের বিধিতে আরো বলা হয়েছে- আদেশ নম্বর ২৬-এ বিবৃত বিধানাবলি সাপেক্ষে, আদালতে প্রকাশ্যে ঘোষিত কোনো রায় অথবা আদালতের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে অথবা মতদ্বৈধতায় ঘোষিত রায় পরবর্তীতে করণিক অথবা গাণিতিক ভুল অথবা আকস্মিক ফসকান ও বিচ্যুতি হতে উদ্ভূত ভুল ব্যতীত পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করা যাবে না।
দেওয়ানি কার্যবিধির অনুরূপ ফৌজদারি কার্যবিধিতেও আদালতের কোনো ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা নম্বর ৩৬৬ রায় দেয়ার পদ্ধতি-সংক্রান্ত। ওই ধারার ১(ক) আলোচ্য নিবন্ধের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। ধারা নম্বর ৩৬৬ (১) (ক) তে বলা হয়েছে- আদিম অধিক্ষেত্রের যেকোনো ফৌজদারি আদালতের প্রতিটি বিচারের ক্ষেত্রে রায় ঘোষণা করতে হবে অথবা ওই রায়ের সারমর্মের ব্যাখ্যা দিতে হবে- প্রকাশ্য আদালতে বিচারকার্য সমাপ্ত হওয়ার অব্যবহিত পর অথবা পরবর্তী কোনো সময় পক্ষগণ অথবা তাদের আইনজীবীদের নোটিশের মাধ্যমে অবহিত করণপূর্বক।
ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা নম্বর ৩৬৭-তে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি সুস্পষ্টরূপে উল্লিখিত হয়েছে- রায় ঘোষণাকালে প্রকাশ্য আদালতে বিচারক তাতে স্বাক্ষর ও তারিখ দেবেন। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৬৯ নম্বর ধারাটি অনেকটা দেওয়ানি কার্যবিধির ১৫২ ধারার অনুরূপ। ওই ধারায় বলা হয়েছে- এ বিধির (Code) অন্যত্র অথবা অপর কোনো আইনে ভিন্নতর কিছু না থাকলে কোনো আদালত রায় স্বাক্ষর করার পর করণিক ভুল ব্যতীত ওই রায় কোনোরূপ সংশোধন বা রিভিউ করবেন না।
ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা নম্বর ৪২৪ নিম্ন আপিল আদালতের রায়-সংক্রান্ত। ওই ধারায় বলা হয়েছে- আদিম অধিক্ষেত্রের ফৌজদারি আদালতের মামলার রায় বিষয়ে অধ্যায় নম্বর ২৬-এ যেসব নিয়মাবলি বর্ণিত হয়েছে, তা হাইকোর্ট বিভাগ ছাড়া আপিল আদালতের রায়ের ক্ষেত্রে সাধ্যমতো প্রযোজ্য হবে।
তা ছাড়া দেওয়ানি আদেশ ও নিয়মাবলির ১৪০ নম্বর নিয়মে রায় ঘোষণা বিষয়ে বলা হয়েছে- প্রকাশ্য আদালতে রায় ঘোষণা করতে হবে এবং ঘোষণাকালীন প্রকাশ্য আদালতে স্বাক্ষর ও তারিখ দিতে হবে।
নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরি বদলিযোগ্য। নিম্ন আদালতের একজন বিচারক কোনো মামলার রায় না দিয়ে এক জেলায় কার্যভার হস্তান্তরপূর্বক অপর জেলায় যোগদান করলে পূর্ববর্তী জেলার তদ্কর্তৃক নিষ্পন্ন মামলার রায় দেয়া না হয়ে থাকলে তার দ্বারা পূর্ববর্তী স্বাক্ষরযুক্ত তারিখ দিয়ে ওই মামলার রায় দেয়ার কোনো অবকাশ নেই। যদিও পূর্ববর্তী বিচারক কর্তৃক লিখিত রায় পরবর্তী বিচারক কর্তৃক ঘোষিত হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই।
নিম্ন আদালতের একজন বিচারক এক জেলা থেকে অপর জেলায় স্বপদে অথবা পদোন্নতিপ্রাপ্ত হয়ে বদলি হলে অথবা ৫৯ বছর পূর্তিতে চাকরির মেয়াদ অবসানে অবসর নিলে তদ্কর্তৃক পূর্বের কর্মস্থলের নিষ্পন্ন বা অনিষ্পন্ন কোনো মামলার রায় বা আদেশ দেয়ার সুযোগ একেবারে অনুপস্থিত। যে মুহূর্তে কর্মকর্তাটি অন্যত্র বদলি হওয়ার কারণে কার্যভার অর্পণ করলেন অথবা অবসর নিলেন সে মুহূর্তে ওই কর্মস্থলের ওই পদের জন্য তিনি Functus Officio হয়ে গেলেন। এর অর্থ পূর্বের পদের বিচারিক কর্তৃক রায়ের করণিক অথবা গাণিতিক ভুল ছাড়া অন্য কোনো ধরনের সংশোধন বা পরিবর্তন আইন সমর্থন করে না।
উচ্চাদালতের বিচারকেরা সাংবিধানিকভাবে শপথের অধীন। একজন ব্যক্তি উচ্চ আদালতের বিচারক পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হলেও যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি তার জন্য নির্ধারিত সংবিধানে উল্লিখিত শপথ পাঠ না করছেন ততক্ষণ পর্যন্ত তার বিচারকার্যে অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ নেই। অনুরূপভাবে ৬৭ বছর পূর্ণ হওয়ার পর যেদিন তিনি চাকরি থেকে অবসরে চলে যাবেন সেদিন বা সেদিনের পূর্বের কোনো রায় তদকর্তৃক প্রকাশ্য আদালতে ঘোষিত না হয়ে থাকলে তার পক্ষে প্রকাশ্য আদালতে ওই রায়ের ঘোষণা বা ওই রায়ে স্বাক্ষর দেয়া আইনসম্মত কি না, তা পূর্বোল্লিখিত আলোচনার আলোকে বিবেচনায় নিলে প্রতীয়মান হয় এরূপ সুযোগ আইন ও বিধিবিধান দিয়ে সমর্থিত নয়। প্রশ্ন উঠতে পারে উচ্চ আদালতের একজন বিচারপতি বা বিচারক কোনো মামলার রায়ের সংক্ষিপ্ত আদেশ দেয়ার পর অবসরে চলে গেলে তার পক্ষে দীর্ঘ সময় যেমন এক বছরের অধিক সময় অতিবাহিত হওয়ার পর মামলার পূর্ণ রায় লিখে তাতে পেছনের তারিখযুক্ত স্বাক্ষর দেয়া আইনানুগ হবে কি না? এ প্রশ্নের সহজ উত্তর- উচ্চ আদালতের বিচারপতি বা বিচারক অবসরে যাওয়ার পরমুহূর্তেই স্বীয় শপথ থেকে অবমুক্ত হয়ে যান। শপথ থেকে অবমুক্ত হয়ে গেলে পূর্বের কোনো সংক্ষিপ্ত রায়ের পূর্ণাঙ্গরূপে তার সুচিন্তিত মতামতের ওপর তিনি পূর্বের তারিখযুক্ত স্বাক্ষর করলে তা কতটুকু আইনানুগ হবে তা বিবেচনার দাবি রাখে। অনেকে হয়তো বলবেন এর আগে এ ধরনের একাধিক নজির রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন- যদি বিষয়টি বেআইনি, কর্র্র্র্তৃত্ববিহীন ও অনিয়ম হিসেবে গণ্য হয় সে ক্ষেত্রে আগের বেআইনি, কর্র্র্র্তৃত্ববিহীন কার্যকলাপ ও অনিয়ম সমর্থন করে একই ধারাবাহিকতায় বেআইনি, কর্র্র্র্তৃত্ববিহীন কাজ ও অনিয়ম করা কতটুকু যুক্তিযুক্ত?
প্রণিধানযোগ্য যে, যেখানে সংবিধান, আইন ও বিধি বদলি বা অবসরজনিত কারণে একজন পদধারীর পদে বহাল থাকাকালীন অবস্থায় কৃত কোনো কার্যে পদ থেকে অবমুক্ত হওয়ার পর পরিবর্তন ও পরিবর্ধনসহ স্বাক্ষর দেয়া অনুমোদন করে না, সেখানে কেন অহেতুক ও অযথা ভুল ব্যাখ্যার অবলম্বনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপপ্রয়াস।
দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার রায় বিষয়ে দেওয়ানি ও ফৌজদারি কার্যবিধি, দেওয়ানি আদেশ ও নিয়মাবলি এবং সুপ্রিম কোর্ট আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগ রুলে যেসব বিধানাবলি বর্ণিত হয়েছে তাতে সুস্পষ্টভাবে ধারণা পাওয়া যায়, আদিম অধিক্ষেত্রের আদালত ও আপিল আদালতের রায় প্রকাশ্য আদালতে শুনানি সমাপ্ত হওয়ার পর তাৎক্ষণিক অথবা পরবর্তী কোনো দিন পক্ষগণ বা আইনজীবীদের নোটিশ দিয়ে ঘোষণা করতে হবে এবং তা প্রকাশ্য আদালতে তারিখ ও স্বাক্ষরযুক্ত হবে। এতদসংক্রান্ত বিধিতে পূর্ববর্তী বিচারক রায় ঘোষণা না করে থাকলে পরবর্তী বিচারককে সে রায় ঘোষণার অধিকার দেয়া হয়েছে। কিন্তু আইন বা বিধির কোথাও পূর্ববর্তী বিচারক কর্তৃক নিষ্পন্নকৃত বা ঘোষিত রায়ে পূর্ববর্তী বিচারকের পূর্বের তারিখযুক্ত স্বাক্ষর দেয়ার বিষয়ে কোনো কিছু উল্লেখ নেই। আইনে উল্লিখিত বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে ভেবে দেখা প্রয়োজন নিম্ন বা উচ্চ আদালতের বিচারকের বদলি বা অবসর-পরবর্তী আগের কর্মস্থলের বিচারিক রায়ে পূর্বের তারিখযুক্ত স্বাক্ষর কতটুকু আইনসম্মত আর প্রকাশ্য আদালত ছাড়া এরূপ রায় ঘোষণা আইন ও বিধিবিধানের সমর্থনের অনুপস্থিতিতে বৈধ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার সুযোগ কতটুকু?
লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
iktederahmed@yahoo.com
About: Mids
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
গ্যাস সঙ্কটে শিল্পে অচলাবস্থা by জিয়াউল হক মিজান
পেট্রোবাংলার তথ্যানুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রতিদিন উৎপন্ন হচ্ছে দুই হাজার ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। এর বিপরীতে চাহিদা রয়েছে দুই হাজার ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। এ হিসাবে প্রতিদিন ঘাটতি থেকে যাচ্ছে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। মূলত এ বিশাল ঘাটতির কারণেই কারখানাগুলোয় নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। দিনের একটা বড় অংশ গ্যাস থাকছে না। আর যখন থাকছে, তখনো উপযুক্ত চাপ না থাকায়, তা কাজে লাগছে না। দিনের মধ্যে পাঁচ থেকে আট ঘণ্টা গ্যাস না পেয়ে বাধ্য হয়ে অধিক ব্যয়ে ফার্নেস অয়েলের ব্যবহার বাড়াচ্ছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। ফলস্বরূপ বেড়ে যাচ্ছে উৎপাদন ব্যয়, কমছে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার ক্ষমতা।
জানা যায়, তীব্র গ্যাস সঙ্কট সামাল দিতে সরকার ২০০৯ সালের ১ অক্টোবর থেকে সারা দেশে নতুন শিল্প ও বাণিজ্যিক সংযোগ এবং লোড বৃদ্ধি কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। এরপর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিল্পে সংযোগ দিতে ২০১১ সালের ২ জানুয়ারি একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী। নির্বাচন সামনে রেখে ২০১৩ সালে প্রায় ২০০ শিল্পে গ্যাস সংযোগ দেয় এ কমিটি। যদিও তার আগের তিন বছরে দেয়া হয় মাত্র ৪৫টি সংযোগ। এরপর আবার প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকে নতুন গ্যাস সংযোগ। পরে ২০১৫ সালে এসে শর্তসাপেে আরো সাড়ে ৩০০ শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে গ্যাস সংযোগ ও লোড বৃদ্ধির অনুমোদন দেয়া হয়। কিন্তু চাহিদার তুলনায় তা ছিল খুবই অপ্রতুল।
বিভিন্ন পর্যায়ের শিল্পোদ্যোক্তার সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর গত বছরের আগস্টে শিল্প খাতে আবার গ্যাস সংযোগ দেয়া শুরু করে সরকার। এতে নতুন উদ্যম পান উদ্যোক্তারা। বাড়তে থাকে গ্যাস সংযোগ চেয়ে আবেদন। কিন্তু আবেদন করেও গ্যাস সংযোগ পাননি দুই হাজারের বেশি উদ্যোক্তা। ফলে শিল্প স্থাপন করেও উৎপাদন শুরু করতে পারছেন না অনেকে। উল্টো প্রতিদিন গুনতে হচ্ছে অন্যান্য খরচ। এতে নষ্ট হচ্ছে তাদের মূলধনি যন্ত্রপাতি। বাড়ছে ব্যাংকঋণের সুদ। আবার গ্যাসের নিশ্চয়তা না পাওয়ায় আগ্রহ থাকলেও নতুন শিল্প স্থাপনের সাহস করছেন না অনেকে।
বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে, গ্যাসের অভাবে উৎপাদনে যেতে পারছে না ২৩৩টি পোশাক কারখানা। এসব প্রতিষ্ঠানে গ্যাসের প্রয়োজন প্রায় ১৪ কোটি ২৭ লাখ ঘনফুট। আর বস্ত্র খাতের সংগঠন বিটিএমএ’র তথ্যানুযায়ী, গ্যাসের অভাবে উৎপাদনে যেতে পারছে না এ খাতের ২৭টি প্রতিষ্ঠান। শিল্পায়ন ও গ্যাস বিতরণের ক্ষেত্রে সিলেট অঞ্চলকে বরাবরই গুরুত্ব দেয়ার ঘোষণা দেয়া হলেও গ্যাস সঙ্কটে ব্যাহত হচ্ছে শিল্পায়ন প্রক্রিয়াও। জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেড (জেজিটিডিএসএল) গত বছর নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে দেয়ায় বিপত্তিতে পড়েছে নানা শিল্পপ্রতিষ্ঠান। বাণিজ্যিক খাতে গ্যাস সংযোগের জন্য ১৪১টি প্রতিষ্ঠানের আবেদন ঝুলে আছে এখানে। সংযোগ না মেলায় উৎপাদনে যেতে পারছে না তারা।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা যায়, দেশে উৎপাদিত গ্যাসের ৪২ শতাংশ ব্যবহার হয় বিদ্যুৎকেন্দ্রে। এর বাইরে ১৬ শতাংশ ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার হয়। এ ছাড়া শিল্পে ১৭, আবাসিকে ১১, সার কারখানায় সাত ও সিএনজি উৎপাদনে ব্যবহার হয় ছয় শতাংশ। সূত্রমতে, আবেদন করেও গ্যাস সংযোগ পাননি দুই হাজার ২২৩ জন শিল্পোদ্যোক্তা। এসব প্রতিষ্ঠানে গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ৮৮৫ মিলিয়ন ঘনফুট। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি অনিষ্পন্ন আবেদন পড়ে আছে তিতাস গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডে। এ বিতরণ সংস্থার কাছে আবেদন করেও গ্যাস সংযোগ পাননি এক হাজার ৮১০ জন উদ্যোক্তা। আর এসব প্রতিষ্ঠানে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা ৬৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট।
গ্যাস সঙ্কট বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে রফতানিকারকদের ৪২টি সংগঠনের সমন্বয়ে গড়া প্রতিষ্ঠান এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি ও বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী নয়া দিগন্তকে বলেন, গ্যাস সঙ্কট আমাদের দীর্ঘ দিনের। সহস্রাধিক শিল্পোদ্যোক্তা আবেদন করে বসে আছেন নতুন লাইনের জন্য। আর যাদের লাইন আছে, তারাও প্রয়োজনীয় চাপের অভাবে উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পারছেন না। এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেয়া না হলে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে এবং রফতানি বাণিজ্যে দেশ প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারাবে বলে আশঙ্কা করেন তিনি। তিনি বলেন, সরকারের সাথে আমাদের দফায় দফায় আলোচনা হয়েছে। আমাদের আশ্বস্তও করা হয়েছে। কিন্তু সংযোগ পেয়ে উৎপাদন শুরু করতে পারলেই উদ্যোক্তারা স্বস্তি বোধ করবেন। এর আগ পর্যন্ত ও দুশ্চিন্তা থেকেই যাচ্ছে। কারণ ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের সুদ চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ছে।
তবে বরাবরের মতোই গ্রাহকদের আশ্বস্ত করতে ভুল করেননি পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান ইশতিয়াক আহমেদ। তিনি বলেন, শিল্পে গ্যাস দেয়ার সদিচ্ছা সরকারের রয়েছে। কোথাও কোথাও দেয়া হচ্ছে। তবে গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে গ্যাসের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে চায় সরকার। তাই সচেতন অবস্থান থেকে উচ্চপর্যায়ের কমিটি যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে সংযোগ দেয়া হচ্ছে। চূড়ান্ত না হলেও গ্যাস দেয়ার েেত্র কো-জেনারেশন, বিকল্প জ্বালানির মতো শর্তজুড়ে দেয়া হচ্ছে। তবে তিনি জানান, নতুন সংযোগ দিতে যেসব শর্ত ছিল তার মধ্যে রয়েছেÑ নতুন সংযোগ ও লোড বৃদ্ধির আবেদনকারী কোনো গ্রাহক বর্তমানে অবৈধভাবে গ্যাস ব্যবহারকারী হলে অথবা গ্যাস বিল বকেয়া থাকলে তার অনুকূলে গ্যাস সংযোগ দেয়া হবে না।
About: Anonymous
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
কেমন হলো পৌর নির্বাচন? by বদিউল আলম মজুমদার
নির্বাচন কমিশন ও সরকারি দলের পক্ষ থেকে নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে বলে দাবি করা হলেও বিএনপি নির্বাচনী ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছে। নাগরিক সমাজের মধ্যেও এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে একধরনের সন্দেহ লক্ষ করা যায়। সত্যিকারভাবেই কেমন হয়েছে এ নির্বাচন?
নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিরূপণ করতে হলে কতগুলো মানদণ্ড ব্যবহার করা প্রয়োজন। আমাদের আইনে কিংবা আদালতের রায়ে কোনো মানদণ্ড দেওয়া নেই। তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আইন ও চুক্তিতে—যেমন, ‘সর্বজনীন মানবাধিকার সনদ’ ও ‘ইন্টারন্যাশনাল কভেনেন্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস’–এ ‘জেনুইন’ নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে এবং এর কিছু মানদণ্ডও দেওয়া আছে। যেমন: (১) ভোটার তালিকা প্রস্তুতের প্রক্রিয়ায় যাঁরা ভোটার হওয়ার যোগ্য ছিলেন, তাঁরা ভোটার হতে পেরেছেন; (২) যাঁরা প্রার্থী হতে চেয়েছেন, তাঁরা প্রার্থী হতে পেরেছেন; (৩) ভোটারদের সামনে বিকল্প প্রার্থী ছিল; (৪) যাঁরা ভোট দিতে চেয়েছেন, তাঁরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পেরেছেন; এবং (৫) ভোট গ্রহণের প্রক্রিয়া ছিল স্বচ্ছ, কারসাজিমুক্ত ও বিশ্বাসযোগ্য।
ভোটার তালিকায় ত্রুটি
দুর্ভাগ্যবশত সাম্প্রতিক পৌর নির্বাচনে ব্যবহৃত ভোটার তালিকা ছিল অসম্পূর্ণ ও ত্রুটিযুক্ত। প্রথমত, ভোটার তালিকা আইন, ২০০৯-এর ১১ (১) ধারা অমান্য করে নির্বাচন কমিশন ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসের পরিবর্তে জুলাই মাসে হালনাগাদ কার্যক্রম শুরু করার কারণে ৪৩ লাখের বেশি নতুন ভোটার যথাসময়ে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেননি এবং তাঁদের অনেকেই সাম্প্রতিক পৌরসভা নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি।
দ্বিতীয়ত, ২০০৮ সালের ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা ছিল সর্বাধিক নির্ভুল এবং সেই তালিকায় পুরুষের তুলনায় নারী ভোটারের সংখ্যা বেশি ছিল ১৪ লাখের অধিক। এর কারণ হলো, আমাদের প্রায় এক কোটি নাগরিক বিদেশে কর্মরত, তাঁদের অধিকাংশই পুরুষ এবং অনেকেই ভোটার নন। কিন্তু ২০১৪ সালের হালনাগাদ প্রক্রিয়ায় যে ৪৭ লাখের মতো নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছিল, তাতে নারী-পুরুষের অনুপাত ছিল ৪৪: ৫৬, যা ঘটেছে তথ্য সংগ্রহকারীদের বাড়ি বাড়ি না যাওয়ার কারণে (যুগান্তর, ২৬ জানুয়ারি ২০১৫)। তাই ২০১৪ সালের হালনাগাদ করা তালিকায়, যে তালিকা দিয়ে সাম্প্রতিক পৌর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, অনেক নারী ভোটার বাদ পড়েছেন এবং তাঁদের অনেকেই এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি।
প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা
সাম্প্রতিক পৌর নির্বাচনে গ্রেপ্তার, মামলা-হামলা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে বিরোধী দলের ও ক্ষমতাসীন দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রার্থী হওয়া থেকে বিরত রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। বিএনপি অভিযোগ তুলেছে যে পৌর নির্বাচনের প্রাক্কালে এক সপ্তাহেই তাদের প্রায় তিন হাজার নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে (প্রথম আলো, ১০ নভেম্বর ২০১৫)। ফলে বিএনপির অনেক সম্ভাব্য প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি।
প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা প্রদানের একটি নগ্ন দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে ফেনীতে। ফেনীর তিনটি পৌরসভার ৪৮টি কাউন্সিলর পদের মধ্যে ৪৪টি এবং তিনটি মেয়র পদের মধ্যে দুটিতেই সরকারি দলের মনোনীত ও সমর্থিত প্রার্থীরা ‘এমপি সাব’-এর ফেনী ‘স্টাইলে’ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে যে জমা দেওয়ার আগের রাতে তাঁদের কাছে থেকে মনোনয়নপত্র ছিনিয়ে নেওয়া হয় (প্রথম আলো, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৫)।
ভোটারদের সামনে বিকল্প প্রার্থী
সাম্প্রতিক পৌরসভা নির্বাচনে সব ক্ষেত্রে বিকল্প প্রার্থী ছিল না। যেমন, সাতজন মেয়র পদপ্রার্থী, যাঁদের সবাই সরকারি দলের, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। একইভাবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন ১৩৪ জন কাউন্সিলর, যা ছিল একটি অনন্য নজির।
এ ছাড়া দলভিত্তিক নির্বাচন, প্রতিপক্ষের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ফলে সাম্প্রতিক পৌরসভা নির্বাচনে প্রার্থীর সংখ্যা কমে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত পৌর নির্বাচনে মেয়র পদে পৌরসভা প্রতি গড়ে ৫ দশমিক ১১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, কিন্তু এবারের নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থীর সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৯২।
স্বাধীনভাবে ভোট প্রদানের সুযোগ
সাম্প্রতিক পৌর নির্বাচনে ভোটাররা সব ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি বলে ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। কেন্দ্র দখল, অবৈধ প্রভাব বিস্তার, জাল ভোট প্রদান, সহিংসতাসহ নানা অনিয়মের দৃশ্য গণমাধ্যমে দেখা গেছে। এসব অনিয়মের কারণে ৩৯টি কেন্দ্রের নির্বাচনী ফলাফল স্থগিত করা হয়। তবে অনেকের আশঙ্কা, সমুদ্রে ভাসমান বরফখণ্ডের যেমন সামান্য অংশই দেখা যায়, তেমনিভাবে সাম্প্রতিক পৌরসভা নির্বাচনে দৃশ্যমান অনিয়ম ছিল অদৃশ্য কারসাজির তুলনায় অতি নগণ্য।
এমনকি ১২ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত সাতটি পৌরসভার নির্বাচনও জালিয়াতিমুক্ত ছিল না। উদাহরণস্বরূপ, প্রথম আলোর প্রতিবেদন (১৩ জানুয়ারি) অনুযায়ী: ‘ভোটকেন্দ্র দখল আর বহিরাগতদের অবাধে জাল ভোট দেওয়ার মধ্য দিয়ে...নরসিংদীর মাধবদী পৌরসভা নির্বাচনে পুনঃভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে...১২টি ভোটকেন্দ্রের প্রতিটিতে একজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পর্যাপ্ত সদস্য মোতায়েন ছাড়াও নির্বাচন কমিশনের আটজন কর্মকর্তা উপস্থিত থাকলেও কেন্দ্র দখল ও জাল ভোটের এ ঘটনা ঘটে...দুপুর ১২টার পর মোট ১২টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১০টিই নৌকার সমর্থকেরা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন।’
সাধারণত নির্বাচনী সহিংসতা ঘটে নির্বাচনের দিনে, জয়-পরাজয়ের উত্তেজনায়। কিন্তু এবারের নির্বাচনের আগেই অনেক সহিংস ঘটনা ঘটেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে ‘সুজন’ ৭ ডিসেম্বর থেকে ২৬ ডিসেম্বরের মধ্যকার ২০ দিনে ৫০টি সহিংস ঘটনা চিহ্নিত করে। আর সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২৬ ডিসেম্বর এক দিনেই ঘটে ১১টি সহিংস ঘটনা, যা অনেক ভোটারের মনে শঙ্কার উদ্রেক করেছে এবং ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার ব্যাপারে তাঁদের নিরুৎসাহিত করেছে।
ভোট গ্রহণ-প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা
২৬ নভেম্বর ২০১৫ প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিজস্ব জনবল থাকা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশন ১৭৫টি পৌরসভায় সরকারি কর্মকর্তাদের রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। আর অভিযোগ উঠেছে যে, ‘আইন মানেন না রিটার্নিং কর্মকর্তারা...আইনে রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে একাধিক প্রার্থী মনোনয়নের বিধান নেই। কিন্তু তা মানেননি খুলনার পাইকগাছা, মাগুরা ও বরগুনার বেতাগী পৌরসভার দায়িত্বপ্রাপ্ত রিটার্নিং কর্মকর্তারা...একটি পৌরসভার মেয়র প্রার্থী উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে থেকে নির্বাচন করলেও প্রার্থিতা বাতিল করেননি রিটার্নিং কর্মকর্তা’ (ইত্তেফাক, ৮ ডিসেম্বর ২০১৫)।
এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত ২৫৫টি পৌরসভা নির্বাচনে, যে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি, ভোট প্রদানের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ (সমকাল, ১০ মার্চ ২০১১)। কিন্তু ৩০ ডিসেম্বর ২০১৫ ঘোষিত ২০৭টি পৌরসভার ফলাফল অনুযায়ী সার্বিকভাবে ভোট পড়েছে ৭৩ দশমিক ৯২ শতাংশের মধ্যে। ৫টি পৌরসভায় ভোট প্রদানের হার ছিল ৯০ শতাংশের এবং ৭৪টি পৌরসভায় ৮০ শতাংশের বেশি, যা অভিজ্ঞ বিশ্লেষকদের মতে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাই এবারকার নির্বাচনে ভোট গণনার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ ছাড়া এ নির্বাচনে মনোনয়ন-বাণিজ্য ও ভোট কেনাবেচার অভিযোগ উঠেছে।
সাম্প্রতিক পৌরসভা নির্বাচনে আচরণবিধি ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। ২৩ জন এমপি-মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠা সত্ত্বেও তাঁদের কারও বিরুদ্ধেই কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি নির্বাচন কমিশন। এ ছাড়া পৌর নির্বাচনে সহিংসতা ও অনিয়মের শতাধিক অভিযোগের তদন্ত না করারও অভিযোগ ওঠে কমিশনের বিরুদ্ধে (যুগান্তর, ৫ জানুয়ারি ২০১৬), যদিও এ ব্যাপারে কমিশনের এমনকি নির্বাচন বাতিলের ক্ষমতাও রয়েছে। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের এসব নির্লিপ্ততা তাদের নিরপেক্ষতা এবং একই সঙ্গে নির্বাচন-প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তাই সার্বিক বিবেচনায় গত ৩০ ডিসেম্বর ২০১৫ ও ১২ জানুয়ারি ২০১৬ তারিখে অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনকে জেনুইন বা সঠিক নির্বাচন বলা যায় না।
এ ছাড়া সাম্প্রতিক পৌরসভা নির্বাচনকে আরও দুটি মানদণ্ডের আলোকেও বিচার করা যায়। ২০০৮ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে নবম সংসদসহ আরও অনেকগুলো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০০৯ সালের উপজেলা নির্বাচনে কিছু বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত সমস্যা ছাড়া এসব নির্বাচনই ছিল মোটামুটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আরেকটি মানদণ্ড প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১১ সালের পৌরসভা নির্বাচনের মাধ্যমে। দুর্ভাগ্যবশত এবারের পৌরসভা নির্বাচন সুষ্ঠুতা ও নিরপেক্ষতার বিচারে আগের এসব নির্বাচনের ধারে-কাছেও পৌঁছাতে পারেনি। বরং ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন এবং এর পরবর্তী উপজেলা ও ঢাকা-চট্টগ্রামের তিনটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচনী মানে নিম্নমুখিতার যে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হয়েছে, সাম্প্রতিক নির্বাচনে সেই ধারাই অব্যাহত রয়েছে; তা থেকে উত্তরণ ঘটেনি এবং আমাদের নির্বাচনী-প্রক্রিয়া সুস্থধারায় ফিরে আসেনি।
ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)।
About: Anonymous
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
প্রশ্নবিদ্ধ অক্সফোর্ড : বর্তমান ও অতীত by শফিক রেহমান
৮ অক্টোবর ২০০৯-এ প্রকাশিত এই লিস্টে দেখা যাচ্ছে বিশ্বের টপ ইউনিভার্সিটির র্যাংকিংস টেবিলে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির অবস্থান নিচে পড়ে গেছে। এই লিস্টে আরো দেখা গেছে, এশিয়ার কিছু ইউনিভার্সিটির অবস্থান এগিয়েছে এবং ভবিষ্যতে তারা আমেরিকার আইভি লিগ (Ivy League) এবং ইংল্যান্ডের অক্সবৃজ (অক্সফোর্ড ও কেমবৃজ) ইউনিভার্সিটিকে চ্যালেঞ্জ করবে। লেখাপড়া এবং সামাজিকভাবে শীর্ষ অবস্থানের কারণে আমেরিকার আটটি ইউনিভার্সিটিকে সম্মিলিতভাবে আইভি লিগ বলা হয়। এরা হলো : হার্ভার্ড, ইয়েল, পৃন্সটন, কলাম্বিয়া, ব্রাউন, কর্নেল, পেনসেলভিনিয়া ও ডার্টমাউথ কলেজ।
কিউএস/টাইমস হায়ার এডুকেশন র্যাংকিংস (QS/Times Higher Education Rankings)-এ গত বছর অক্সফোর্ড ছিল চতুর্থ। এ বছর তার অবস্থান নিচে নেমে ইমপিরিয়াল কলেজ লন্ডনের সাথে হয়েছে যুগ্ম পঞ্চম। প্রতিদ্বন্দ্বী কেমবৃজ হয়েছে বিশ্বে দ্বিতীয়। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন, (সংক্ষেপে UCL বা ইউসিএল) অক্সফোর্ডকে ছাড়িয়ে হয়েছে চতুর্থ- ইয়েল, কেমবৃজ ও হার্ভার্ডের পরেই।
যারা এখনো আমেরিকার বদলে উচ্চশিক্ষার জন্য বিলাত গমন-এ আগ্রহী, তারা আশ্বস্ত হবেন জেনে যে, বিশ্বের টপ ১০টি ইউনিভার্সিটির মধ্যে বৃটেনের রয়েছে চারটি এবং টপ ১০০টির মধ্যে বৃটেনের ১৮টি। তবে নর্থ আমেরিকান ইউনিভার্সিটিগুলোর অবস্থানে অবনতি ঘটেছে। ২০০৮-এ টপ ১০০-এর মধ্যে ৪২টি ছিল নর্থ আমেরিকান। ২০০৯-এ টপ ১০০-র মধ্যে সংখ্যাটি কমে হয়েছে ৩৬। গত বছরের তুলনায় টপ ১০০-র মধ্যে এশিয়ান ইউনিভার্সিটির সংখ্যা ১৪ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৬। এশিয়ান ইউনিভার্সিটিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ওপরে আছে টোকিও ইউনিভার্সিটি, ওয়ার্ল্ড র্যাংকিং ২২ এবং তারপরে আছে হংকং ইউনিভার্সিটি, র্যাংকিং ২৪।
জাপান, সাউথ কোরিয়া ও হংকংয়ের ইউনিভার্সিটিগুলোর ক্রমশক্তিমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য বৃটেনের ইউনিভার্সিটিগুলো আরো বেশি সরকারি সাহায্য চেয়েছে।
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির বিদায়ী ভাইস-চান্সেলর জন হুড বলেছেন, আগামী দশ বছরে এক বিলিয়ন পাউন্ডেরও বেশি দরকার হবে অক্সফোর্ডের নচেৎ অক্সফোর্ডের কিছু অংশ আর ওয়ার্ল্ড ক্লাস থাকবে না। তিনি আরো বলেন, এ নিয়ে পরপর চার বছর অক্সফোর্ডের বাজেট ঘাটতি হবে।
এই র্যাংকিংসের ভিত্তি ৯,০০০ একাডেমিক্স (শিক্ষাবিদ) ওপরে গৃহীত একটি আন্তর্জাতিক জরিপ। এই সার্ভেতে অংশগ্রহণকারী একাডেমিক্সরা বিবেচনা করেছেন, প্রতিষ্ঠানের রিসার্চগুলো কতটা প্রভাবশালী, শিক্ষাদান পদ্ধতির গুণগত মান এবং বিদেশ থেকে স্টাফ ও ছাত্র সংগ্রহে পারদর্শিতা।
শিক্ষাদান পদ্ধতির মান বিবেচনায় দেখা হয় শিক্ষক-ছাত্রের আনুপাতিক সংখ্যা কত।
র্যাংকিংস টেবিল প্রকাশের সময়ে টাইমস হায়ার এডুকেশন ম্যাগাজিনের ডেপুটি এডিটর ফিল ব্যাটি বলেন, সুনাম বিষয়ে অক্সফোর্ডের স্কোর ভালো ছিল। কিন্তু টিচারদের মানের কিছু নিম্নমুখী পরিবর্তন ঘটেছে। এশিয়ার কয়েকটি দেশে উচ্চশিক্ষায় অনেক খরচ করা হচ্ছে এবং তাই তাদের ইউনিভার্সিটিগুলো ওপরে উঠে যাচ্ছে।
আগেই বলেছি এই র্যাংকিংয়ে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিপ্রেমীরা হতাশ হয়েছেন। অতীতে ধারণা করা হতো অক্সফোর্ডই বিশ্বের নাম্বার ওয়ান ইউনিভার্সিটি। এই আত্মপ্রসাদে ভুগতেন অক্সফোর্ডের ছাত্র-শিক্ষক-স্টাফরা। এখন ৯,০০০ একাডেমিক্সের জরিপ কষ্টিপাথরে তাদের বর্তমান সত্যটা মেনে নিতে হচ্ছে- অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির অবস্থান নিম্নমুখী।
আর এরই পাশাপাশি ঢাকা ইউনিভার্সিটির ছাত্র-শিক্ষক-স্টাফরাও হয়তো হতাশ হয়েছেন। কারণ তারা ঢাকা ইউনিভার্সিটিকে ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ ভাবতে ভালোবাসেন। সুতরাং অক্সফোর্ডের নিম্নমুখিতায় তারা দুঃখিত হতে পারেন এটা ভেবে যে বিশ্ববাসীর চোখে ঢাকা ইউনিভার্সিটির অবস্থানও হয়তো বা নেমে গেছে।
কিন্তু আসলে কি তাই?
উত্তরটা আমরা জানি না। শুধু এটুকু আমরা জানি, বিশ্বের টপ ১০০টি ইউনিভার্সিটির মধ্যে ঢাকা ইউনিভার্সিটির নাম নেই। গত বছরেও ছিল না।
কিন্তু তার আগে?
সেই উত্তরও আমরা জানি না।
ঢাকা ইউনিভার্সিটি কি আদৌ বিশ্বের টপ ১০০ অথবা টপ ১,০০০ ইউনিভার্সিটির মধ্যে কোনো বছরে স্থান পেয়েছিল?
সেই উত্তরও আমরা জানি না।
ঢাকা ইউনিভার্সিটি কি আদৌ কোনো কালে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ছিল?
এই উত্তরে হয়তো অনেকেই বলবেন, হ্যা, ছিল।
কিন্তু কেন ছিল? কেন ঢাকা ইউনিভার্সিটি এক সময়ে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড রূপে (এই ভূখণ্ডে, বিদেশে নয়) পরিচিত হয়েছিল?
এর উত্তর হয়তো হবে, অক্সফোর্ডের মতোই ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে রেসিডেনশিয়াল হল ছিল এবং আছে।
কিন্তু অক্সফোর্ডের মতো লেখাপড়ার উচু মান আদৌ ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে কোনো কালে ছিল কি? আজ টোকিও এবং হংকং ইউনিভার্সিটি যখন চ্যালেঞ্জ করছে অক্সফোর্ড ও কেমবৃজকে, তখন ঢাকা ইউনিভার্সিটির অবস্থানটা কি?
এই প্রশ্নের সঠিক উত্তরটা আমাদের, বিশেষত যারা ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সচেতন সদস্য, তাদের জানতে হবে। কারণ এই সঠিক উত্তরের ওপর ভিত্তি করে অ্যালামনাই সদস্যদের সক্রিয় হতে হবে, বিশ্বে ঢাকা ইউনিভার্সিটির মান একটি গ্রহণযোগ্য লেভেলে নিতে। টপ ১০০-র মধ্যে না হোক, টপ ১,০০০-এর মধ্যে নিতে।
কিন্তু অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা সচেষ্ট হবেন কি? প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে তারা কি এখনো আত্মপ্রসাদে ভুগবেন?
হয়তো তাই। আমরা বাংলাদেশিরা আমাদের দেশ, জাতি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা, প্রভৃতি বিষয়ে আত্মপ্রসাদে ভুগেই চলেছি। আমরা দেখতে চাই না বিশ্বের বিভিন্ন পারফরমেন্স র্যাংকিংসে আমাদের র্যাংক কত নিচে। পনের কোটি মানুষের এই দেশে এখন অনেক সরকারি ও বেসরকারি ইউনিভার্সিটি আছে। ওয়ার্ল্ড র্যাংকিংসে এসব ইউনিভার্সিটি না থাকুক কিন্তু এসব ইউনিভার্সিটিতে বিশ্ব আদৃত কিছু শিক্ষক, প্রশংসিত কিছু ছাত্র ও মানবসমাজের জন্য উপকারী কিছু রিসার্চ সৃষ্টিতে অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন সদস্যরা যদি দৃঢ় সঙ্কল্পবদ্ধ হন তা হলে এক যুগ পরে হয়তো কিছু আমরা পাবো।
হয়তো সে দিন ঢাকা ইউনিভার্সিটির ছাত্র-শিক্ষকরা অক্সফোর্ডে গিয়ে আত্মপরিচয় দিতে গিয়ে সগর্বে বলতে পারবেন, আমি প্রাচ্যের অক্সফোর্ড থেকে এসেছি।
এ লক্ষ্যে অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন সদস্যরা ঢাকা ইউনিভার্সিটি র্যাংকিংস এইম (Dhaka University Rankings Aim) নামে একটি বিশেষ সেল গঠনের পর ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ ও সরকারের আর্থিক সহযোগিতায় কাজ শুরু করতে পারেন।
ইউনিভার্সিটির র্যাংকিংস ২০০৯
১ হার্ভার্ড, ইউএস
২ কেমবৃজ, ইউকে
৩ ইয়েল, ইউএস
৪ ইউসিএল, লন্ডন, ইউকে
৫ ইমপিরিয়াল কলেজ, লন্ডন, ইউকে
৬ অক্সফোর্ড, ইউকে
৭ শিকাগো, ইউএস
৮ পৃন্সটন, ইউএস
৯ এমআইটি, ম্যাসাচুসেটস, ইউএস
১০ ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেক, ইউএস
১১ কলাম্বিয়া, ইউএস
১২ পেনসেলভিনিয়া, ইউএস
১৩ জনস হপকিন্স, ইউএস
১৪ ডিউক, ইউএস
১৬ স্ট্যানফোর্ড, ইউএস
১৭ ন্যাশনাল, অস্ট্রেলিয়া
১৮ ম্যাকগিল, কানাডা
১৯ এসএফআইটি, জুরিখ, সুইজারল্যান্ড
২০ এডিনবরা, ইউকে
ঢাকা ইউনিভার্সিটির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে স্বাভাবিক কারণে অতীতের ঘটনাগুলো মনে পড়ছে। মনে পড়ছে বহু সতীর্থের কথা, যাদের অনেকে আজ প্রয়াত, অবসরপ্রাপ্ত ও অসুস্থ। কেউ কেউ এখনো সক্রিয়। কিন্তু আর্থিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণে অনেকের বলয় হয়ে গেছে ভিন্ন। প্রবাসে থাকার কারণেও অনেকের সাথে সম্পর্ক হয়েছে ছিন্ন। মনে পড়ছে বিটলসের লেখা ও মেরি হপকিন্সের গাওয়া একটি বিখ্যাত গান
Those were the days my friend :
Those were the days, my friend!
We thought they'd never end.
We'd sing and dance forever and a day.
We'd live the life we'd choose
We'd fight and never lose.
Then, the years went rushing by us,
We lost our starry notions on the way
If, by chance, I'd see you in the tavern,
We'd smile at one another and we'd say,
Those were the days, my friend!
Oh yes, those were the days.
পুরনো সেই চমৎকার দিনগুলো, বন্ধু আমার!
আমরা ভেবেছিলাম সেই দিনগুলো কখনোই ফুরাবে না।
আমরা গান গেয়ে যাবো। চিরদিন নাচবো।
যে জীবনটা আমরা বেছে নেব, সেভাবেই কাটাবো।
আমরা ঝগড়া করবো কিন্তু কখনো হারবো না।
কিন্তু তারপর, বছরগুলো দ্রুত আমাদের পেরিয়ে গেল,
আমাদের আকাশ কুসুম স্বপ্ন হারিয়ে গেল।
যদি, বাই চান্স,
কোনো রেস্টুরেন্টে আমাদের দেখা হয়ে যায়
আমরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসবো
আর আমরা বলবো,
পুরনো সেই চমৎকার দিনগুলো, বন্ধু আমার!
হ্যা, পুরনো সেই চমৎকার দিনগুলো।
হ্যা, সেই দিনগুলোর কিছু ঘটনা, কিছু প্রধান চরিত্রের স্মৃতি এখন ভীষণ নাড়া দিচ্ছে।
আপনি কি তাদের কথা শুনতে পাচ্ছেন?
তারা কে ছিল?
তাদের সেই সময়, ১৯৫২ থেকে ১৯৫৬, কেমন ছিল?
শুনুন তাহলে।
আকর্ষণীয় বক্তা : সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ। ইকনমিক্সের ছাত্র। পরে ব্যারিস্টার। ছয় ফিট লম্বা, টকটকে ফর্শা সুপুরুষ, চোস্ত পায়জামা ও পাঞ্জাবি পরনে চমৎকার বাংলা-ইংরেজিতে আবেগময় ভাষায় বক্তৃতা দিতেন। সেই সময়ে তিনি দক্ষিণপন্থীরূপে পরিচিত হলেও তার বক্তৃতা শোনার জন্য আমতলায় সমবেত হতো সকলপন্থী ছাত্রছাত্রী। পরে লন্ডনে তিনি বামপন্থী, বাংলাদেশে অ্যাডিশনাল অ্যাটর্নি জেনারেল ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হয়েছিলেন। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে বড় ভূমিকা রাখেন। প্রয়াত।
ভোজনপ্রিয় : ফারুক আহমদ চৌধুরী (এখন ফারুক চৌধুরী)। ইংরেজির ছাত্র। খাদ্যের প্রতি তার দুর্বলতার কারণে তিনি অনেকের প্রিয় ছিলেন। তাকে সেই সময়ের টপ রেস্টুরেন্ট রেক্স-এ অন্য ছাত্ররা নিমন্ত্রণ করে খাওয়াত এবং দেখত কিভাবে তিনি তার প্লেট সাফ করেন। ভালো টেনিস প্লেয়ার ছিলেন। পরবর্তীকালে হন রাষ্ট্রদূত, পররাষ্ট্র সচিব ও সফল লেখক-কলামিস্ট।
লাইব্রেরিপ্রিয় : মোজাফফর আহমদ। ইকনমিক্সের ছাত্র। আজিমপুরে থাকতেন এবং সেখান থেকে সাইকেল চালিয়ে ইউনিভার্সিটিতে আসা-যাওয়া করতেন। তার সাইকেলের সামনে-পেছনে গাদাগাদা বই থাকত। ইউনিভার্সিটিতে এসেই তিনি লাইব্রেরিতে ঢুকে যেতেন এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে থাকতেন। তবে তার অনার্স ও এমএ-র রেজাল্ট তাকে হতাশ করেছিল। সুশীল সমাজের অন্যতম প্রবক্তা ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। প্রয়াত।
বাকপ্রিয় : আবুল মাল আবদুল মুহিত। ইংরেজির ছাত্র। হাসিমুখে সারাক্ষণ কথা বলতেন। পড়াশোনা ও টেনিসে ভালো ছিলেন। এসএম হলের ছাত্র পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেনাতন্ত্রের ঘোর বিদ্বেষী মুহিত পরে সেনাপতি এরশাদের আমলে অর্থ উপদেষ্টা হন এবং বর্তমানে হাসিনা আমলে অর্থমন্ত্রী।
ক্যারিসম্যাটিক : এজেডএম ওবায়দুল্লাহ খান (ডাকনাম শিন্টু)। ইংরেজির ছাত্র। নামের আগে প্রায়ই বৃলিয়ান্ট বিশেষণটি যুক্ত হতো। ডিবেটে অনেক পুরস্কার পেতেন। প্রগতিশীল কবি রূপে খ্যাতিমান হন এবং পরে স্বৈরাচারী ও কবি খ্যাতি পেতে আগ্রহী এরশাদের আমলে মন্ত্রী হন। প্রয়াত।
ফ্যাসিনেটিং : আবিদ হুসেন। ইংরেজির ছাত্র। কমরেড নামে পরিচিত। তুখোড় বক্তা ও ছাত্ররাজনীতিতে বিতর্কিত। ভালো অভিনেতা। নিজেকে যৌন অভিজ্ঞ ও প্রফেসর অফ সেক্সোলজি দাবি করতেন। সেক্স বিষয়ে সহপাঠীদের লেসন দিতে উৎসাহী ছিলেন। পরে ব্যারিস্টার এবং বিবিসি-র ব্রডকাস্টার হয়েছিলেন। আর হ্যা, বহু নারীগমন করেছিলেন। প্রয়াত।
পাইওনিয়ার অভিনেত্রী : জহরত আরা (খুকি ডাকনামে পরিচিত)। পলিটিকাল সায়েন্সের ছাত্রী। ভালো অভিনেত্রী। বাংলাদেশের প্রথম মুভি মুখ ও মুখোশ-এর নায়িকা। বর্তমানে নরিচ, ইংল্যান্ড প্রবাসী।
হস্তরেখা বিশারদ : জহির রায়হান। বাংলার ছাত্র। তখন লেখক এবং হস্তরেখা বিশারদ রূপে খ্যাতিমান হয়েছিলেন। বিশেষত ছাত্রীদের হাত দেখতে তিনি ভালোবাসতেন। পরে সমাজসচেতন মুভি ডিরেক্টর রূপে নাম করেছিলেন। তার মুভি জীবন থেকে নেয়া স্বাধীনতা আন্দোলনে বিশাল প্রভাব ফেলেছিল। তিনি তার নিজের হাতের রেখায় জানতে পারেননি যে তার অকালমৃত্যু হবে স্বাধীনতার মাত্র দেড় মাস পরেই।
সুগায়িকা : খালেদা ফ্যান্সি খানম ছিলেন দীর্ঘাঙ্গী ও ফর্শা - প্লাস তিনি ছিলেন সুগায়িকা। অনেকেই তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। ড. কুদরাত-এ-খুদার পুত্র মনজুর-এ-খুদার সাথে বিয়ে হয়। বহু বছর টরন্টোতে ছিলেন। এখন ঢাকাবাসী। তবে মাইনাস হয়ে গেছেন সঙ্গীতভুবন থেকে।
ত্রিরত্ন : কাসেম, আশরাফ (ডাকনাম চানু) ও সিদ্দিক ছিলেন ত্রিরত্ন নামে পরিচিত। প্রথম দু’জন সায়েন্স ও তৃতীয়জন ইকনমিক্সের ছাত্র ছিলেন। কাসেম (এক চোখ অন্ধ হয়ে গিয়েছিল ব্যাডমিন্টন কর্কের আঘাতে) ছিলেন ফুটবল ব্লু। আশরাফ ও সিদ্দিক ছিলেন হকি ব্লু। আশরাফ সব প্রগতিশীল আন্দোলন ও নির্বাচনের পোস্টার আকতেন। সিদ্দিক রাষ্ট্রদূত হয়েছিলেন। তিনজনই প্রয়াত।
ধনী কবি : কবিদের সাধারণত অভাবী হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলার ছাত্র হাসান হাফিজুর রহমান ছিলেন খুব উদ্যমী সম্পাদক ও বিদ্রোহী কিন্তু ধনী কবি। সুবিখ্যাত একুশের সঙ্কলন তিনি সম্পাদনা করেছিলেন। পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক ইতিহাসের এবং দৈনিক বাংলা’র সম্পাদনা তিনি করেন। জামালপুরের বিত্তশালী পরিবারে জন্ম হয়েছিল এবং মধুকে পাচশ টাকার সবুজ নোটে বিল পরিশোধ করতেন। সেই যুগে পাচশ টাকা ছিল বর্তমানের পাচ হাজারের চেয়ে বেশি। তার অ্যাকাউন্টে অনেকেই খেত। প্রয়াত।
লাজুক কবি : শামসুর রাহমান ছিলেন ইংরেজির ছাত্র। ফর্শা, সুদর্শন ও অতি লাজুক কবি। সম্ভবত তিনিই প্রথম যিনি রহমান নামের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এসে রাহমান নামে পরিচিত হয়েছিলেন। প্রয়াত।
ব্রাদার : লতিফুর রহমান ছিলেন ইংরেজির ছাত্র। তার ডাক নাম ছিল শান্তি। কিন্তু তার বন্ধুরা তাকে ব্রাদার নামে ডাকত। পরবর্তীকালে তিনি হয়েছিলেন সফল উকিল এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা (২০০১)। তিনি তার আত্মজীবনীতে জানিয়েছেন অনার্সে খারাপ রেজাল্টের ব্যর্থতাকে মেনে না নিয়ে তিনি আইন পড়েন, সিভিল সার্ভিস-বিমুখী হন, আইন পেশায় ভালো করেন। হাইকোর্টের বিচারপতি এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হন। অনার্সে রেজাল্ট ভালো হলে তার জীবনের গতিপথ অন্য হতো এবং তিনি হয়তো প্রধান উপদেষ্টা হতেন না।
দম্পতি দিলারা ও হাশেম : ইউনিভার্সিটিতে প্রায় সব ছাত্রছাত্রী যখন কুমার-কুমারী, তখন দিলারা ও হাশেম দম্পতি ছিল তাদের ঈর্ষার পাত্রীপাত্র। দিলারা ছিলেন দীর্ঘাঙ্গী ও সুন্দরী। হাশেম ছিলেন সুপুরুষ। পরবর্তীকালে দিলারা হন ঔপন্যাসিক ও ভয়েস অফ আমেরিকার ব্রডকাস্টার। হাশেম হন সফল বিজনেসম্যান। দিলারা ও হাশেম দু’জনাই ছিলেন ওয়াশিংটন প্রবাসী। খুব অল্প বয়সে জুটি বাধলেও দু’জনার দুটি পথ যায় বেকে। দুইজনা বিচ্ছিন্ন কিন্তু সফল জীবনযাপন করেন। দিলারার সারনেইম হাশেম এখনো আছে। হাশেম প্রয়াত।
এক. শান্তিনিকেতন থেকে আসা রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়িকা ফরিদা বারি মালিকের (ডাকনাম বীথি) সাথে আমানুল্লাহ খান (ইউ নেভার ক্যান টেল-এর নায়ক, ডাক নাম শহীদ)-এর প্রেম। শহীদ ছিলেন দেখাশোনা, চলাফেরায় সাহেবি গোছের। বীথি ছিলেন রাবীন্দ্রিক বাঙালি গোছের। তাদের এই অপ্রত্যাশিত প্রেমে opposite attracts (অপজিট এট্রাক্টস) ফ্যাক্টরটির সাথে পরিচিত হয়েছিলাম। তাদের বিয়ে হয়েছিল। শহীদ ও বীথি উভয়ই প্রয়াত।
দুই. অভিনেত্রী কামেলা শরাফি ও সাংবাদিক দাউদ খান মজলিশের প্রেম। কামেলা ছিলেন প্রখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়ক কলিম শরাফির স্ত্রী। কামেলা দাউদের বিয়ে হয়েছিল। ছাত্র অবস্থাতেই She for the second and he for the first time (শি ফর দি সেকেন্ড, অ্যান্ড হি ফর দি ফার্স্ট টাইম) ঘটনার সাথে আমরা প্রথম পরিচিত হই। দু’জনাই প্রয়াত।
তিন. ইকনমিক্সের ছাত্র সৈয়দ ইশতিয়াক আহমদের সাথে ইতিহাসের ছাত্রী সুফিয়া আহমেদের প্রেম। ইশতিয়াক ছিলেন দক্ষিণপন্থী ছাত্রনেতা এবং অনুষ্ঠিতব্য এসএম হলের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সভাপতি পদপ্রার্থী। তার বিজয় ছিল অপ্রতিরোধ্য। কিন্তু নমিনেশন পেপার সাবমিশনের দিন দেখা গেল তিনি নিজের নমিনেশন পেপার দাখিল করেননি। বোমা পড়ার মতো জানা গেল ইশতিয়াক-সুফিয়ার গভীর প্রেমের কথা। বুঝলাম, Love conquers all. সবার ওপরে প্রেমই বিজয়ী হয়। এর পর তিনি সস্ত্রীক (সুফিয়া) বিলেতে চলে যান আইন পড়তে। ইশতিয়াক প্রয়াত। সুফিয়া আহমদ ন্যাশনাল প্রফেসর।
চার. ওবায়দুল্লাহ খান ও পুতুলের প্রেম। এমএ পাস করে নতুন টিচার ওবায়দুল্লাহ প্রেমে পড়েছিলেন ছাত্রী পুতুলের। পুতুল তাতে সাড়া না দেয়ায় ওবায়দুল্লাহ ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। মেডিক্যাল হসপিটালে অচেতন ওবায়দুল্লাহকে ট্রান্সফার করা হয়। এর পর পুতুল সাড়া দেন। ওবায়দুল্লাহ সিএসপি হন। তাদের বিয়ে হয়। বুঝলাম, আত্মহত্যা প্রচেষ্টার (আত্মহত্যার নয়) সাথে প্রেমে সাফল্যের একটা সম্ভাবনা থাকে। তবে এ ধরনের প্রচেষ্টা খুব রিস্কি - শিন্টু তখন পরলোকে যেতে পারতেন। শিন্টু আবার প্রেমে পড়েন, দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এখন তিনি পরলোকে।
পাচ. ইকনমিক্সের শফিক রেহমানের সাথে ইকনমিক্সের তালেয়া খান। বিয়ে না হওয়া সত্ত্বেও তৎকালীন দি পাকিস্তান অবজার্ভার-এ তাদের বিয়ের খবর ছাপা হয়েছিল। সম্ভবত এই মিথ্যা খবর প্রকাশের পেছনে ছিলেন তালেয়ার পাণিপ্রার্থী অন্য কোনো ছাত্র। প্রেমের পথ যে কুসুমাস্তীর্ণ নয় সেটা শফিক ও তালেয়া তখনই টের পেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তাদের বিয়ে হয় এবং লন্ডনে চলে যান। তালেয়া হন লন্ডনে স্কুল ডেপুটি হেড মিস্ট্রেস ও পরে ঢাকায় ডেমক্রেসিওয়াচের নির্বাহী পরিচালক। শফিক রেহমান হন চার্টার্ড অ্যাকাউনটেন্ট, লেখক এবং বাংলাদেশে ১৪ ফেব্রুয়ারিতে ভালোবাসা দিন-এর প্রবর্তক।
সিগারেট বিক্রেতা : মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান (ডাকনাম শেলি) আত্মনির্ভরশীলরূপে পরিচিত ছিলেন। ইউনিভার্সিটির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি গলায় একটি ট্রে ঝুলিয়ে, সেই ট্রেতে রাখা সিগারেট, ম্যাচ, পান ইত্যাদি বিক্রি করতেন। পরবর্তীকালে সফল গবেষক, লেখক, বিচারপতি এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা (১৯৯৬)। প্রয়াত।
অলরাউন্ডার : দু’জন বিখ্যাত অলরাউন্ডারের প্রথম জন ছিলেন এ. ডাবলিউ শামসুল আলম (ফিজিক্সে ফার্স্ট ক্লাস, টেনিস ও বৃজ-এ চ্যাম্পিয়ন)। পরবর্তীকালে রাষ্ট্রদূত। প্রয়াত।
দ্বিতীয় জন ছিলেন মোহাম্মদ আসাফউদ্দৌল্লাহ (লেখাপড়ায় উত্তম, গান-বাজনায় ভালো, খেলাধুলায় ও সাতারে পারদর্শী)। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সরকারের সচিব এবং ফখরুদ্দীন-মইন ইউ আহমেদ সরকার ও হাসিনা সরকারের কড়া কিন্তু জনপ্রিয় সমালোচক।
একনিষ্ঠ সংস্কৃতিসেবী : সনজীদা খাতুন। বাংলার ছাত্রী। রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুগায়িকা ছিলেন এবং সব প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। এখনো ছায়ানটের প্রধান প্রেরণা।
ফটোগ্রাফার : রফিকুল ইসলাম। বাংলার ছাত্র। সেই সময়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটির যে গুটিকয়েক ছাত্র ক্যামেরার মালিক ছিলেন তাদের অন্যতম ছিলেন তিনি। ভাষা আন্দোলনের বহু দুর্লভ ছবি তার তোলা। ফটোগ্রাফি থেকে দূরে সরে গিয়ে হয়েছেন কবি নজরুল ইসলাম বিশেষজ্ঞ। বর্তমানে একটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির ভাইস-চান্সেলর।
টপ নাটক : জর্জ বার্নার্ড শ’-এর ইউ নেভার ক্যান টেল-এর বাংলা অনুবাদ করেছিলেন আইন বিভাগের প্রফেসর নুরুল মোমেন। কার্জন হলে অভিনীত এই নাটকটি ছিল সে সময়ের একটি মানদণ্ড। নায়কের ভূমিকায় সুঅভিনয় করেছিলেন ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্স বিভাগের ছাত্র আমানুল্লাহ খান, ডাকনাম শহীদ। নায়িকার ভূমিকায় ছিলেন মনিমুন্নেসা। উভয়েই প্রয়াত।
ঘটনাবহুল বছর : ১৯৫৪। এর আগে ১৯৫২-তে ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও হস্টেলে। ১৯৫৪-তে এই আন্দোলনের নেতৃত্ব চলে আসে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে। এ ছাড়া এই বছরেই দেশ জুড়ে বন্যাদুর্গতদের সেবায় ঢাকা ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রীরা বড় ভূমিকা নেয়।
নকলের বছর : ১৯৫৫। অনার্স পরীক্ষার সময়ে কার্জন হল থেকে কিছু ছাত্র (ছাত্রী নয়) বহিষ্কৃত হয়েছিল নকলের অপরাধে। তবে অনেকে লঘু দোষে (কালির দোয়াতে নোট লিখে রাখা) দণ্ডিত হয়েছিল।
দু’টি গুডউইল মিশন : ১৯৫৪ এবং ১৯৫৫। ১৯৫৪-তে আমার উদ্যোগে এবং আরো চার সহপাঠীর [শামসুল আলম (হনো), আজিমুর রহমান (হারুন), আখতার, সারোয়ার-উল হক]-এর উদ্যমে ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে প্রথম প্রাইভেট গুডউইল মিশন যায় সিলোন (এখন শ্রী লঙ্কা)-এ। পরের বছর আমরা দ্বিতীয় প্রাইভেট গুডউইল মিশনে যাই বার্মাতে। এবার তিনজন ছাত্র ও তিনজন ছাত্রী (জহরত আরা, রাজিয়া খান ও ইশরত আরা) আমাদের মিশনে ছিলেন। ছাত্রীদের ‘রক্ষাকবচ’ ছিলেন ড. নুরুল মোমেন। মিশনে বা তারপরে আমরা কেউই পারস্পরিক প্রেমে পড়িনি। শামসুল আলম, আজিমুর রহমান ও সারোয়ার-উল হক প্রয়াত।
সহজবোধ্য টিচার : ইকনমিক্সের ড. আবু মাহমুদ। তার পড়ানোটা ছিল খুব সহজবোধ্য। অন্যান্য ক্লাসে আমার উপস্থিতি খুব কম হলেও প্রগতিপন্থী ড. মাহমুদের ৯৫ শতাংশ ক্লাসে আমি অ্যাটেন্ড করেছিলাম। আর সেই কারণেই আমি ডিসকলেজিয়েট হইনি। ড. মাহমুদ ছিলেন ঠিক ওই সময়ে ডিপার্টমেন্ট হেড। তার ক্লাসে আমার উপস্থিতির প্রতি তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলাম। তিনি আমাকে অনার্স পরীক্ষা দেয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। প্রগতিপন্থী ড. আবু মাহমুদ পাকিস্তানপন্থী ছাত্রদের রোষানলে পড়ে নির্যাতিত হন কিন্তু কখনই আদর্শ বিচ্যুত হননি। প্রয়াত।
স্টুডেন্ট ফ্রেন্ডলি টিচার : আইন বিভাগের ড. নুরুল মোমেনের চারপাশে ঘিরে থাকত গুণমুগ্ধ ছাত্রছাত্রীরা, আইন শিখতে নয়। তার রসালো কথা শুনতে। তার অনূদিত নাটকে অংশ নিতে। প্রয়াত।
ছাত্রোপকারী টিচার : ফিলসফির ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব অকাতরে সাহায্য করতেন ছাত্রছাত্রীদের। তিনি চিরকুমার ছিলেন। ছাত্রছাত্রীরাই ছিল তার জীবনসঙ্গী। একাত্তরে শহীদ।
বাংলিশ টিচার : ইকনমিক্সের ড. মজহারুল হক ছিলেন সদ্য ইংল্যান্ড ফেরত। তিনি ইকনমিক্সের চাইতে শুদ্ধ ইংরেজি বলার ওপর লেকচার দিতে পছন্দ করতেন। তিনি শিখিয়েছিলেন Joan Robinson-এর উচ্চারণ জোন রবিনসন (জোয়ান নয়), ক্যাম্বেল (Campbell, ক্যাম্পবেল নয়), হিউজ (Hughes, হিউজেস নয়), ইয়েন (Ian, আয়ান নয়), গ্রেহাম (Graham, গ্রাহাম নয়)।
নকল ফ্রেঞ্চ টিচার : মশিয়ে পেরোশো। সুদর্শন ও সুবক্তা, ফ্রান্স থেকে আসা মশিয়ে পেরোশো, পলিটিকাল সায়েন্স ডিপার্টমেন্টে যোগ দেন। তার চমৎকার শিক্ষকতায় প্রচণ্ডভাবে আকৃষ্ট হয়েছিল অনেকে। পরে সবাই হতাশ হয়েছিল জেনে যে, নকল সার্টিফিকেট জমা দেয়ার অভিযোগে তিনি পদচ্যুত হয়েছেন। তিনি আর ক্লাস নেননি। পরে তিনি ঢাকা-নারায়ণগঞ্জে ডেমরা রোড নির্মাণকাজে অংশ নেন। সেখানে তিনি কোদাল হাতে হাসিমুখে পিচ ঢালতেন এবং তার গুণমুগ্ধ ছাত্রদের সাথে বিনা সঙ্কোচে কথা বলতেন।
অগ্রগামী ছাত্র সংগঠন : ছাত্র ইউনিয়ন। আমাদের সময়ে প্রতিটি হলে ছাত্র ইউনিয়ন অগ্রগামী ছিল। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল ইসলামপন্থী দল। ছাত্রলীগ তখন খুব দুর্বল ছিল। ছাত্রশিবির ও ছাত্রদল ছিল না।
ছাত্রদের যা ছিল : ব্যক্তিগত সাইকেল, হলের কমনরুমে রেডিও এবং দৈনিক পত্রিকা, পেন্সিল, ফাউন্টেইন পেন, দোয়াতের কালি (পার্কার কুইঙ্ক) ও ভালো কাগজের খাতা, ক্যাপস্টান, সিজার্স ও কিং স্টর্ক সিগারেট। অ্যালার্ম টেবিল ক্লক। অব্যাহত ইলেকটৃসিটি সাপ্লাই।
ছাত্রীদের ছিল : লো অথবা মিডিয়াম হিল শু অথবা স্যান্ডাল ও শাড়ি-ব্লাউজ, শীতকালে কালারফুল জ্যাকেট-ওভারকোট। ছাত্রদের ছিল কাবলি চপ্পল অথবা স্যান্ডাল ও জুতা, হাফ অথবা ফুল শার্ট, কটন ও কর্ডের ট্রাউজার্স ও পায়জামা, শীতকালে হাতে বোনা সোয়েটার ও মাফলার।
সবার প্রধান রাজনৈতিক আদর্শ ছিল বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা।
ছাত্রদের যা ছিল না : চাপাতি-পিস্তল প্রভৃতি অস্ত্র, মোটরসাইকেল, টিভি, বল পয়েন্ট, সিডি বা এমপি থৃ প্লেয়ার, বন্ড মুভি দেখার অভিজ্ঞতা, মোবাইল ফোন, ক্যাশ টাকার বান্ডল, বেনসন অ্যান্ড হেজেস সিগারেট, ইয়াবা, ফেনসিডিল, বাংলা ও বিদেশি মদ, কোয়ার্টজ রিস্টওয়াচ, ক্যামেরা। ছাত্রীদের ছিল না বোরখা, নেকাব, থৃপিস, টপস, জিন্স ও স্নিকার্স। ছাত্রদের ছিল না টিশার্ট, জিন্স ও স্নিকার্স এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সরাসরি সম্পৃক্ততা ও পৃষ্ঠপোষকতা।
আর ছিল না কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিপূজা।
ছাত্রদের লক্ষ্য ছিল : একাডেমিক ইয়ারগুলোর (চার বছর) মধ্যেই ভালো ডিগ্রি অর্জন করে, সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা দিয়ে সিএসপি হয়ে কাঙ্ক্ষিত ছাত্রী অথবা প্রেমিকাকে বিয়ে করা, অ্যান্ড লিভ হ্যাপিলি এভার আফটার। যদি কাঙ্ক্ষিত নারীকে বিয়ে করা সম্ভব না হয় তাহলে চাদ সওদাগর জাতীয় কোনো প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর অথবা কোনো জাদরেল আমলার কন্যাকে বিয়ে করে ক্যারিয়ার মজবুত করা।
ছাত্রদের লক্ষ্য ছিল না : কোনো ছাত্রীকে ধর্ষণ অথবা গণধর্ষণ করা কিংবা ধর্ষণের ছবি ধারণ করে মোবাইলে প্রচার করা, টেন্ডারবাজি করা, চল্লিশোর্ধ্ব বয়সেও ছাত্রনেতা হওয়া, রাজনৈতিক নেতা হওয়া, সাধারণ নির্বাচনে নমিনেশন পাওয়া, এমপি ও মন্ত্রী হওয়া।
এমআইটি, ম্যাসাচুসেটস, ইউএস
হার্ভার্ড, ইউএস
(যুগ্ম) স্ট্যানফোর্ড, ইউএস
(যুগ্ম) কেমবৃজ, ইউকে
ক্যালিফোর্নিয়া ইন্সটিটিউট অফ টেক, ইউএস
অক্সফোর্ড, ইউকে
ইউসিএল, লন্ডন, ইউকে
ইমপিরিয়াল কলেজ, লন্ডন, ইউকে
এসএফআইটি, জুরিখ, সুইজারল্যান্ড
শিকাগো, ইউএস
পৃন্সটন, ইউএস
ন্যাশনাল, সিংগাপুর
নানইয়াং টেক, সিংগাপুর
এসএফইউটি, লসান, সুইজারল্যান্ড
ইয়েল, ইউএস
জনস হপকিন্স, ইউএস
কর্নেল, ইউএস
পেনসেলভিনিয়া, ইউএস
কিংস কলেজ, ইউকে
ন্যাশনাল, অস্ট্রেলিয়া
এই সর্বশেষ ইউনিভার্সিটি র্যাংকিংসে দেখা যাচ্ছে গত ছয় বছরে শীর্ষ ২০টির মধ্যে ১০টি ইউএসএ-তে, ৫টি ইউকে-তে, ২টি সুইজারল্যান্ডে, ২টি সিংগাপুরে এবং ১টি অস্ট্রেলিয়াতে। পশ্চিমের অক্সফোর্ড আগের ষষ্ঠ স্থানটি ধরে রেখেছে। শীর্ষ ৫০টির মধ্যে এগিয়ে এসেছে এশিয়ার কয়েকটি দেশ, সিংগাপুর, হং কং, জাপান, সাউথ কোরিয়া ও চায়না। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া দখল করেছে ৫টি স্থান। সরি, শীর্ষ ১০০-র মধ্যে ঢাকা ইউনিভার্সিটি নেই। বর্তমান সরকার কর্তৃক বহুল প্রচারিত ‘মধ্যম আয়ের দেশ’ বাংলাদেশের একটি ইউনিভার্সিটিও ১০,০০০-এর মধ্যেও আছে কিনা সে বিষয়ে রিসার্চ করার জন্য শিক্ষামন্ত্রী নহিদ একটি টিম নিয়োগ করতে পারেন।
২১ জানুয়ারি ২০১৬
About: Mids
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
ঝাঁকুনি তত্ত্বের ব্যাংক ব্যবসায় by ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী
এবারো আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের ভাষায় ‘জন্ডিসে আক্রান্ত’ অর্থমন্ত্রী আগা-পাছ-তলা বিবেচনা না করেই যখন ঘোষণা দিলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় আরো কিছু ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়া হবে, তখন আবারো চমকে উঠতে হলো। এমনিতেই সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাংকগুলো সরকারের লোকেরা ফোকলা করে দিয়েছে। এসব ব্যাংক থেকে হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়ে গেছে। শুধু সোনালী ব্যাংক থেকে এক হলমার্কই প্রায় চার হাজার কোটি টাকা যখন লোপাট করে দিলো, তখন হলমার্কের লুটেরাদের প্রতি পরম স্নেহে ‘জন্ডিসগ্রস্ত’ অর্থমন্ত্রী বলে বসলেন, চার হাজার কোটি টাকা কোনো টাকাই নয়। এরপর একে একে প্যান্ডোরার বাক্স খুলে যেতে থাকল। দেখা গেল, সরকার নিয়ন্ত্রিত সব ব্যাংকের অবস্থা একই। সোনালী ব্যাংকের কেলেঙ্কারির পর অন্য সব ব্যাংককে ছাপিয়ে আলোচনায় উঠে এলো বেসিক ব্যাংক। দেখা গেল, এই ব্যাংক থেকেও লুট হয়ে গেছে হাজার হাজার কোটি টাকা। আর তার পেছনে ছিলেন ব্যাংকের চেয়ারম্যান প্রভূত ক্ষমতার অধিকারী বিরাট কানেকশনের লোক শেখ আবদুল হাই বাচ্চু। তার দুর্নীতি নিয়ে পত্রিকার পাতা ভরে ডজন ডজন সপ্রমাণ রিপোর্ট ছাপা হলো, কিন্তু তিনি থাকলেন বহাল তবিয়তে। এখনো নির্বিঘ্ন আছেন। সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাংকগুলোর এই লুটের টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার নিজে। এ জন্য প্রতি বছর বাজেটে বরাদ্দ রাখতে হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। এ বছরও বরাদ্দ আছে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। যদিও এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা চেয়েছে লোকসানি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। অন্যান্য ব্যাংকও লাইনে আছে।
এ ধরনের একটি পরিস্থিতিতে ‘রাজনৈতিক বিবেচনা’য় সরকার দলের লোকদের নতুন করে অর্ধডজনেরও বেশি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অনুমতি দিয়েছে। তার একটি ফার্মার্স ব্যাংক। এর মালিক আমাদের আমলাতন্ত্র ও রাজনীতিতে এক আলোচিত ব্যক্তিত্ব ড. মহীউদ্দিন খান আলমগীর। মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় তিনি পাকিস্তান সরকারের চাকরি করেছেন। তারপর বাংলাদেশ সরকারে তার আত্তীকরণ হয়। ১৯৯৬ সালে জনতার মঞ্চ তৈরি করে সরকারি আমলাদের দলীয় কর্মসূচিতে নামিয়ে এনে তিনি আওয়ামী আলোতে প্রবেশ করেন। বাংলাদেশে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার জনক তিনি। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তমের বিরুদ্ধে মামলা করে তাকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করান। কাদের সিদ্দিকী বলেছেন, মহীউদ্দীন খান আলমগীরের মতো আমলাদের মদদে রাজাকার বাহিনী তৈরি হয়েছিল। আজ যদি রাজাকারের বিচার হয়, তবে তাদের যারা রাজাকার বানিয়েছিল, সেই মহীউদ্দীন খান আলমগীরের মতো আমলাদেরও বিচার হওয়া উচিত। এবার আওয়ামী লীগের প্রথম দফায় তিনি ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী।
আওয়ামী লীগের মদদ ও সহযোগিতায় ২০০৭ সালের এক-এগারোর যে সামরিক সরকার ক্ষমতায় এসেছিল, তারা মখা আলমগীরের ওপর নানা ধরনের নির্যাতন চালায়। তা নিয়ে তিনি একটি বেশ মোটাসোটা বই লিখেছেন। কিন্তু পরে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মরহুম আবদুল জলিল জানিয়েছিলেন, ২০০৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তা ছিল আওয়ামী লীগ ও জেনারেল মইনের মধ্যকার একটি ‘আঁতাতের নির্বাচন’। কিন্তু তা সত্ত্বেও মখা আলমগীর ওই অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী ও তাকে নির্যাতনকারী জেনারেল মইন গংয়ের বিচার দাবি করতে থাকেন। তবে একসময় তিনি পরিস্থিতি উপলব্ধি করে চুপ মেরে যান। আর তার নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক শিক্ষাপ্রতিমন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের বিরুদ্ধে ইতর মামলা দায়ের করতে থাকেন। তার মধ্যে আছে তার স্ত্রীর ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনতাইয়ের মামলাও। একজন সাক্ষর মানুষ এত নিচে নামতে পারেন, তা মখা আলমগীরের এসব কর্মকাণ্ড না দেখলে বোঝা যেত না।
এই মখা আলমগীর কিছু দিনের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন ২০১২ সাল থেকে। এ দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই তিনি পুলিশের সব অমানবিক নির্যাতনের পক্ষে নির্লজ্জ ওকালতি শুরু করেন। এমন কথাও বলেন যে, আক্রান্ত হলে পুলিশ কি বসে বসে আঙুল চুষবে? কী ভাষা! এ রকম অভিযোগই তার বিরুদ্ধে এনেছিল ১/১১-এর সরকার। তবে কি তারা মখার ওপর নির্যাতন করে ঠিক কাজই করেছিল? তাদেরও তো তাহলে আঙুল চোষার কথা নয়। মখা কাহিনীর এখানেই শেষ নয়। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারে নির্মাণত্রুটির কারণে ধসে পড়েছিল আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী নেতার মালিকানাধীন আটতলা গার্মেন্ট ভবন ‘রানা প্লাজা’। সে দিন হরতাল ডেকেছিল বিএনপির নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোট। রানা প্লাজায় ফাটল দেখা গিয়েছিল আগেই। ফলে ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল। এখানে একটি ব্যাংক শাখা ভাড়ায় ছিল। পরিত্যক্ত ঘোষণার পর সে শাখা সরিয়ে নেয়া হয়। সেখানে আটতলাজুড়েই ছিল গার্মেন্ট। ভবনে ফাটল ধরায় গার্মেন্টশ্রমিকেরাও কাজ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু ২৩ এপ্রিল সব গার্মেন্টশ্রমিককে ফোন করে জানিয়ে দেয়া হয়, কাল কাজ হবে। অনেকে কাজে আসতে রাজি হচ্ছিলেন না। তখন তাদের হুমকি দেয়া হয়, কাজে না এলে চাকরি যাবে। আসল লক্ষ্য ছিল, এই গার্মেন্টশ্রমিকদের নিয়ে হরতালবিরোধী মিছিল বের করা। আর বিরোধী দলের ডাকা হরতাল যে হচ্ছে না, তা দেখানো। বাইরে হরতালের পক্ষে ও বিরুদ্ধে মিছিল হচ্ছিল। এর মধ্যে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল আটতলা রানা প্লাজা। তাতে ১২ শ’রও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। কিন্তু এই ধ্বংসযজ্ঞের কারণ হিসেবে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর চোখ কপালে তোলার মতো একটি কারণ উল্লেখ করলেন। তিনি বললেন, হরতালের সময় বিএনপির লোকেরা বিল্ডিংয়ের পিলার ধরে ঝাঁকুনি দেয়ায় ভবনটি ভেঙে পড়েছে। এ নিয়ে বাংলাদেশ তো বটেই, সারা বিশ্বে তাক লেগে যায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তরুণেরা এ কথার প্রতিবাদে বিভিন্ন বিল্ডিংয়ের পিলার ধরে ধাক্কাধাক্কি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। কই, ভবন তো পড়ে না, নড়ে না। তার পর থেকে জনাব মখা আলমগীর ‘ঝাঁকুনি তাত্ত্বিক’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
‘রাজনৈতিক বিবেচনা’য় এই ঝাঁকুনি তাত্ত্বিককে ফার্মার্স ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অনুমতি দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবদুল মুহিত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেখানে ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে আনা হচ্ছে, যেখানে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সবল ব্যাংকের সাথে একীভূত করা হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশে সঞ্চয়কারীদের টাকা লুটের জন্য নতুন নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। ভারতে সম্প্রতি ৩৪টি ব্যাংককে একীভূত করা হয়েছে। তার মধ্যে ২৫টি ব্যাংককে সরকারি ব্যাংকের সাথে যুক্ত করা হয়েছে। মালয়েশিয়া তাদের ১৬টি ব্যাংককে এখন ছয়টিতে নামিয়ে এনেছে, কিন্তু বাংলাদেশে ব্যাংকের সংখ্যা বাড়াতে বাড়াতে এখন ৫৬টিতে দাঁড়িয়েছে।
এগুলোর মধ্যে মখা আলমগীরের ফার্মার্স ব্যাংক বয়সে একেবারে শিশু। কিন্তু এর মধ্যেই এই ব্যাংকে আইন লঙ্ঘনের হিড়িক পড়ে গেছে। সম্প্রতি ঋণসংক্রান্ত তথ্য গোপন করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক এই ফার্মার্স ব্যাংককে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করে। কিন্তু এই জরিমানার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করে জরিমানার আদেশ চার মাস স্থগিত করিয়ে নেয়া হয়েছে। এই প্রথম কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংক তার নিয়ন্ত্রক বাংলাদেশ ব্যাংকের জরিমানার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করল। আবার এই ব্যাংকের অবস্থা দিন দিন খারাপ হতে থাকায় গত সপ্তাহে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফার্মার্স ব্যাংকে একজন পরিদর্শক নিয়োগ করেছে। এই ব্যাংক চারটি সিকিউরিটিজ কোম্পানিকে তথ্য গোপন করে ৩৮ কোটি ২৬ লাখ টাকা ঋণ দিয়েছে, যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এর আগেও বাংলাদেশ ব্যাংক নানা অনিয়মে জড়িত থাকার কারণে ফার্মার্স ব্যাংকের নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান মাহাবুবুল হক চিশতীকে অপসারণের আদেশ দিয়েছিল। সে আদেশও আদালতের মাধ্যমে স্থগিত করা হয়েছে।
ফার্মার্স ব্যাংকের এই অনিয়মের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রশ্ন তোলায় খুব গোস্বা হয়েছেন মহীউদ্দীন খান আলমগীর। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংককে পাল্টা আঘাত হানার ব্যবস্থা নিয়েছেন। জনাব আলমগীর পাবলিক অ্যাকাউন্টস বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান। এই স্থায়ী কমিটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজকর্মের ওপর একটি বিশেষ রিপোর্ট তৈরি করে তা কমিটির কাছে পাঠাতে কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলকে নির্দেশ দিয়েছে। ব্যক্তিগত স্বার্থে ক্ষমতার অপব্যবহারের এটি একটি নিকৃষ্ট নজির। এটি জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ১৮৮(২) ধারারও চূড়ান্ত লঙ্ঘন। কারণ তাতে বলা আছে, তেমন কেউ এই কমিটির সদস্য হবেন না, যার সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্বার্থ রয়েছে। সংসদবিষয়ক বিশেষজ্ঞ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর নিজামউদ্দিন আহমদ বলেছেন, আলমগীরের উদ্যোগ অনৈতিক ও আপত্তিকর। সংসদীয় স্থায়ী কমিটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্পর্কে রিপোর্ট চাইতে পারে, কিন্তু যেহেতু বিষয়টি আলমগীরের ব্যাংক নিয়ে; সে কারণেই এটি অনৈতিক। এ সম্পর্কে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা হাফিজউদ্দিন খান বলেছেন, এটা ‘প্রতিশোধমূলক’। সাবেক কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি) হাফিজউদ্দিন বলেন, এই প্রতিষ্ঠান সাংবিধানিকভাবে স্বাধীন সংস্থা। কেউ তাকে নির্দেশ দিতে পারে না, অনুরোধ করতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তথ্য গোপন করে ফার্মার্স ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা থেকে সেপ্টেম্বর-নভেম্বর ২০১৫ তিন মাসে ৪০০ কোটি টাকা ভুয়া ঋণ দেয়া হয়েছে। গত অক্টোবর মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য মখা আলমগীরকে চিঠি দেয়। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক গত ১৩ জানুয়ারি ওই ব্যাংকে একজন পরিদর্শক নিয়োগ করে। এ দিকে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় তিনি কোনো ব্যাংকের চেয়ারম্যান হতে বা থাকতে পারেন না। এটি অসাংবিধানিক ও অবৈধ। শুরুতে বাংলাদেশ ব্যাংক এই ব্যাংকের অনুমোদন দিতে চায়নি, কিন্তু সরকারের উচ্চপর্যায়ের চাপে ২০১২ সালের ৮ এপ্রিল এই ব্যাংকসহ ৯টি ব্যাংকের অনুমতি দিতে বাধ্য হয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০১২ সালের অক্টোবরে যখন আলমগীর এই ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে আবেদন করেন, তখন তিনি মন্ত্রী ছিলেন। ফলে তা আপনাআপনিই বাতিল হয়ে যাওয়ার কথা। এর আগে আওয়ামী লীগের আবদুল জলিল ও বিএনপির মির্জা আব্বাস মন্ত্রী হওয়ায় মার্কেন্টাইল ব্যাংক ও ঢাকা ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পদ ত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু আলমগীর মন্ত্রী থাকা অবস্থায়ও ওই ব্যাংকের চেয়ারম্যান থেকে যান।
এখন তাহলে কী দাঁড়াবে? ক্ষমতার অপব্যবহারকারী মহীউদ্দীন খান আলমগীরেরই জয় হবে, নাকি বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনি পদক্ষেপ জয়ী হবে? এ ক্ষেত্রে সরকারের পদক্ষেপ কী হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক
rezwansiddiqui@yahoo.com
About: Mids
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ‘খণ্ডযুদ্ধের’ রাজনীতিকরণ by ড. আবদুল লতিফ মাসুম
ঘটনার শুরু এ রকম- কোনো এক সন্ধ্যায় শহরের জেলা পরিষদ মার্কেট এলাকায় এক ইজিবাইক চালকের সাথে শহরের এক মাদরাসা ছাত্রের বাগি¦তণ্ডা হয়। বিষয়টি মীমাংসার জন্য এগিয়ে আসেন একজন ব্যবসায়ী। মাদরাসা ছাত্রটির ওই ব্যবসায়ীর মধ্যস্থতা মনঃপূত হয়নি। ছাত্রটি পরে তার সতীর্থদের নিয়ে ওই ব্যবসায়ীর ওপর হামলা চালায়। হামলা প্রতিহত করতে এগিয়ে আসেন ব্যবসায়ীরা। এর সাথে যোগ দেয় ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী গোষ্ঠী। জেলা পরিষদ মার্কেটের ব্যবসায়ী ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ককটেল নিয়ে কান্দিপাড়া মাদরাসায় আক্রমণ চালায়। খবর পেয়ে পুলিশ আসে। এবার পুলিশের সাথে এসে ব্যবসায়ী এবং ক্ষমতাসীনদের সহযোগীরা জামেয়া ইউনিসিয়া মাদরাসা ভাঙচুর করে। মাদরাসা ছাত্রদের সহায়তায় এগিয়ে আসে মহল্লাবাসী। এ সময়ে ৫০-৬০টি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। আক্রমণকারীরা মাদরাসার বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ৫০৬ রাউন্ড রাবার বুলেট এবং ৭৬ রাউন্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষে পুলিশের ২৫ জন সদস্যসহ ৭০ জন আহত হয়। এভাবেই শেষ হয় খণ্ডযুদ্ধের প্রথম অংশ।
ক্ষমতাসীনেরা প্রথম অংশের খণ্ডযুদ্ধে জয়লাভ করতে না পেরে মধ্যরাতে দ্বিতীয় অংশের সূচনা করে। মধ্যরাতে পুলিশ ও ক্ষমতাসীন সন্ত্রাসীরা মাদরাসার হিফজ বিভাগের মূলফটক ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। আটটি কক্ষের দরজা ভেঙে মাদরাসা ছাত্রদের বেধড়ক মারধর করে তারা। বুট দিয়ে কোনো কোনো ছাত্রের মাথা মাটিতে চেপে ধরে পুলিশ। এরা মাদরাসার অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র কুরআনে হাফেজ মাসুদুর রহমানকে তিনতলা থেকে লাথি মেরে নিচে ফেলে দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় মাসুদুর রহমানকে রাত ২টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার তৃতীয় অংশ শুরু হয় তার পরদিন। মাদরাসা ছাত্রের নিহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে মাদরাসার বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা এবং পার্শ্ববর্তী এলাকার লোকজন ভোর থেকেই শহরে প্রায় সব সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে জানচলাচল বন্ধ করে দেয়। শুরু হয় অঘোষিত হরতাল। শহরের সব দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেল স্টেশন ভাঙচুর করে লাইনের স্লিপার খুলে ফেলায় ঢাকার সাথে সিলেট ও চট্টগ্রামের ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিক্ষুব্ধ জনতা স্টেশনের সুইচবোর্ড, কম্পিউটার, ১০টি সিসি ক্যামেরা, ভিআইপি কক্ষ, সিগনাল বাতি, টিকিট কাউন্টার ইত্যাদি ক্ষেত্রে ভাঙচুর চালায়। পরে পার্সেল কক্ষের মালামাল এবং সব আসবাপত্রে আগুন লাগিয়ে দেয়। এরা শহরের ওস্তাদ আলাউদ্দিন সঙ্গীতাঙ্গনে দু’টি অফিসকক্ষসহ সব মালামাল ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, জেলা আওয়ামী লীগ অফিস, সংসদ সদস্যের কার্যালয়, প্রশিকা অফিস, শিল্পকলা একাডেমি এবং ক্ষমতাসীনদের বাড়িঘরও আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
চতুর্থ দৃশ্যে এ রকম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিজিবি তলব করা হয়। মাদরাসা ছাত্রদের ব্যাপক উপস্থিতিতে তারা পিছু হটে। এ সময় বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিশকে ধাওয়া করে। পুলিশ পিছু হটে গিয়ে থানার গেটে অবস্থান নেয়। দুপুর পর্যন্ত পুলিশ থানা গেট এলাকায় অবরুদ্ধ থাকে। দুপুরের দিকে শাসক দলের সহযোগীরা মাদরাসা ছাত্রদের ধাওয়া করে। আবার শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এ পর্যায়ে পুলিশ ২০-২৫ রাউন্ড টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এতে আরো বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে সমবেত মাদরাসা ছাত্র ও সাধারণ মানুষ। এ পরিস্থিতিতে প্রশাসন শক্তির বদলে সম্মতির কৌশল অবলম্বন করে। ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে বিজিবি, র্যাব, পুলিশের একটি টহল দল মাদরাসা ছাত্রদের বুঝিয়ে শুনিয়ে বিরত রাখে।
কথিত খণ্ডযুদ্ধের পঞ্চম অংশে দেখা যায়, নিহত ছাত্রের লাশ দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অনীহা প্রকাশ করে। আবার বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে মাদরাসা ছাত্ররা। তারা হাসপাতাল ভাঙচুর করে। বিকেল ৪টায় ছাত্র-জনতা থানায় ঢোকে র্যাবের একটি প্রাইভেটকার ভাঙচুর করে। এরা র্যাবের এক সদস্যকেও মারধর করে। পরে বিক্ষুব্ধ লোকজন পুলিশের একটি রিকুইজিশন পিকআপে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ সময় পুলিশ বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে শতাধিত রাউন্ড টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। ষষ্ঠ পর্যায়ে আবার সমঝোতার প্রয়াস লক্ষ করা যায়। জেলা প্রশাসন ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সমঝোতা বৈঠকের পর অভিযুক্ত দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়। আলেমগণ আহূত হরতাল প্রত্যাহার করেন।
ঘটনাবলির আনুপূর্বিক বর্ণনা দিলাম এ কারণে যে, যাতে বিষয়টির ঘনঘটা, ব্যাপকতা এবং সহ্ংিসতার মাত্রা অনুধাবন করা যায়। অ্যারিস্টটল বলেছেন, ‘আপনার চেহারা আপনি ছোট আয়না দিয়েও দেখতে পারেন, বড় আয়না দিয়েও দেখতে পারেন’। এ ক্ষেত্রে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনাটিকে প্রতীকী অর্থে গ্রহণ করা যায়। গোটা দেশের লোকজনের মনস্তাত্ত্বিক গড়নের এটি একটি খণ্ডচিত্র- এই খণ্ডযুদ্ধের মাধ্যমে তা প্রতিভাত হয়েছে। একই সাথে ঘটনার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া যা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে তাও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
আগেই বলা হয়েছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি তাদের নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গিতে বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছে। ক. ইসলামপন্থীরা ঘটনার ঘনঘটায় তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। বর্ষীয়ান আলেম হেফাজতে ইসলাম প্রধান আল্লামা শফী এক বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ‘আলেম-ওলামাদের রক্তে এ জমিন রঞ্জিত হলে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ এবং নজিরবিহীন।’
খ. এর বিপরীতে চরম বামপন্থীরা ঘটনাটিকে জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডব বলে বর্ণনা করেছে। এদের কেউ কেউ ঘটনার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করেছেন। এমনকি ব্রাহ্মবাড়িয়াকে পাকিস্তানের ছিটমহল বলে অভিহিত করেছেন। এর সাথে আইএস বা আল কায়েদার সংযোগ খুঁজেছেন কোনো কোনো বুদ্ধিজীবী।
গ. অভ্যাসমতো ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ‘যত দোষ সব নন্দঘোষ’ নীতি অনুযায়ী তাদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির ঘাড়ে চাপিয়েছে। ঘটনার পর পুলিশ যে মামলা করেছে, তাতে আসামি করা হয়েছে স্থানীয় বিএনপির ৪৪ জন নেতাকর্মীকে। দেখা গেছে, ওই নেতাকর্মীরা আড়াই মাস কারাভোগের পর ঘটনার দিনই জামিনে মুক্তি পেয়েছিলেন।
ঘটনাবলির বস্তুনিষ্ঠ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করলে নিন্মোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো ফুটে ওঠে:
একটি অতি সামান্য ঘটনা ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থে আঘাত করলে তুলকালাম কাণ্ড ঘটে যেতে পারে।
মাদরাসা ছাত্ররা একটি বিশেষ গোষ্ঠী বা একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষ-প্রতিপক্ষ- ঘটনাক্রম এ রকমই প্রমাণ করে।
মাদরাসায় শিক্ষিত ছাত্ররা সংক্ষুব্ধ হলে বড় ধরনের ভাঙচুর করতে পারে।
বরাবরের মতো আবারো প্রমাণিত হলো যে, পুলিশ নিরপেক্ষ নয়। তারা সাধারণ মানুষের জানমাল রক্ষার চেয়ে ক্ষমতাসীনদের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করতে বেশি আগ্রহী।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনাক্রম আবারো প্রমাণ করেছে যে, জনতার শক্তি অপ্রতিরুদ্ধ। জনগণই আসল ক্ষমতার উৎস।
পাশ্চাত্য তথা আমেরিকা সাবধানতার সাথে ইসলাম ও জঙ্গিবাদের পার্থক্য নির্ণয় করতে চাইলেও প্রচারণা এবং অপপ্রচারণা ইসলাম এবং জঙ্গিবাদকে এক কাতারে শামিল করেছে। ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ এর মিত্র খুঁজতে গিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর সর্বত্র ‘পলিটিক্যাল ইসলাম’কে বিপজ্জনক বিবেচনা করেছে। ফলে বাংলাদেশের মতো ইসলামি রাজনীতির সম্ভাবনার দেশে ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিকে ক্ষমতায় এনেছে। ক্ষমতাসীনেরা ইসলামকে পাশ্চাত্যের মতো নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। বিগত তথাকথিত সামরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল থেকে জঙ্গি জিকির শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশে এরা তিন ধরনের- প্রথমত, মতাদর্শ আক্রান্ত বুদ্ধিজীবী শ্রেণী। তারা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনায় আইএস বা আল কায়েদার ভূত দেখতে পান। দ্বিতীয়ত, মতাদর্শবিহীন স্রেফ স্বার্থবাদী জ্ঞানপাপী গোষ্ঠী। এরা পাকিস্তান এবং ইসলামকে এক করে ফেলেন। এদের কথায় মনে হয় পাকিস্তানই ইসলামের সোল এজেন্ট। এরা তাই ঘটনার উৎসমূল সন্ধান না করে ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে পাকিস্তানের ছিটমহল মনে করেন। তৃতীয়ত, ক্ষমতাসীন সরকারের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের কূটবুদ্ধি। এরা কোনো রাজনৈতিক ঘটনা থেকে ফায়দা হাসিলের সুবর্ণ সুযোগ হেলায় হারাতে চান না। তাই ঘটনাটি মাদরাসা ছাত্র, ব্যবসায়ী এবং আওয়ামী সহযোগীদের- এই তিন পক্ষের হলেও মামলাটি হয়েছে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে।
তাহলে আমরা দেখলাম ঘটনার মূল কারণ এড়িয়ে একই ঘটনাকে যার যার মতো করে ব্যাখ্যা করছেন রাজনীতিকেরা। এ ঘটনাবলির দ্বারা এটাও প্রমাণিত হলো যে, মাদরাসার ছাত্ররা যথেষ্ট আলোকিত, সংযমী বা সংস্কৃতিবান নয়। তা না হলে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সংঙ্গীত প্রাঙ্গণ আক্রান্ত হতো না। একই সাথে বলা যায় যে, ‘জাতি গঠন’ এর বদলে শাসক শ্রেণী প্রথম থেকেই কৃত্রিম বিভাজনের মাধ্যমে যে বিষবৃক্ষ রোপণ করেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনা তারই একটি বিষফল। জাগতিক এবং ধর্মীয় শিক্ষা যে অভিন্ন আলোকিত সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠার কথা- তারই অনুপস্থিতির ফলে এসব ঘটনা।
একজন মার্কিন গবেষক দেখিয়েছেন, বাংলাদেশে ‘মেজরিটি মুসলিম বাট মাইনরিটি ইসলাম’। সে রকম অসম অবস্থার বাস্তব প্রমাণ দিলো ব্রাহ্মণবাড়িয়া। এই নিরেট বাস্তবতা অস্বীকার করে লাভ নেই যে, এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ইসলাম অনুসারী। আলেম-ওলামা, মাদরাসা-মসজিদ এবং মাদরাসার ছাত্ররা সেই ইসলামের প্রতিনিধি। তারা একটি অনিবার্য সামাজিক শক্তি। সামাজিক শক্তি হিসেবে রাজনৈতিক কাঠামোতে তাদের গ্রহণ, ধারণ, লালন এবং অনুধাবন যদি অগ্রাহ্য হয় তাহলে একটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সার্বিকভাবেই অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।
লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
Mal55ju@yahoo.com
About: Mids
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও ইরানের ভবিষ্যৎ by মীযানুল করীম
যা হোক, টাটকা খবর হলো, তেলের দাম এ বছর আরো কমবে। এর বিশেষ কারণ, ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ায় দেশটির বিপুল পরিমাণ তেল আসবে আন্তর্জাতিক বাজারে। এভাবে সরবরাহ বেড়ে তেলের দাম দেবে কমিয়ে। কথা হলো, এতে বাংলাদেশেও কি তেলের দাম কমবে? উল্টো চলার দেশে তা হবে বলে মনে হয় না। অতএব, ইরান তেল রফতানি করল কি না, তেলের দাম কমল কি না, এসব বিষয়ে বাংলাদেশের আপাতত কিছু আসে যায় না। সাধে কি আর বলে, ‘বেল পাকলে তাতে কাকের কী?’
এই গৌরচন্দ্রিকার পর আসল কথায় আসা যাক। ব্যাপার হচ্ছে, ইরানের ওপর এক যুগ ধরে আন্তর্জাতিক অবরোধ বা নিষেধাজ্ঞার যে খড়গ ঝুলছিল, তা এতদিনে তুলে নেয়া হয়েছে। ইরান পরমাণু বোমা বানাবে না, আরো স্পষ্ট করে বললে- ‘বানাতে পারবে না’ মর্মে নিশ্চিত হয়ে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পাশ্চাত্য এবং মার্কিন প্রভাবাধীন জাতিসঙ্ঘ এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। ‘নিউক্লিয়ার ক্লাব’-এর হোতা যুক্তরাষ্ট্র এবং এর অন্য মোড়লদের মনোভাব হলো, পারমাণবিক বোমা বানানোর অধিকার কেবল আমাদের ক’জনের। ইরানের মতো কোনো রাষ্ট্রকে তা বানাতে দেয়া হবে না। কারণ, আমাদের আপনজনদের (ইসরাইলসহ) বোমা বিশ্বশান্তির স্বার্থে; এর বাইরে যত দেশ আছে (বিশেষ করে মুসলিম অধ্যুষিত), ওদের বোমা বিশ্বকে ধ্বংস করবে।’ অবশ্য না বললেও চলে, ৭০ বছর আগে জাপানে পরমাণু বোমা ফেলে কয়েক লাখ মানুষ হত্যা করেছিল কারা।
গত জুলাই মাসে ভিয়েনাতে পাঁচ বৃহৎশক্তি আর জার্মানির সাথে ইরানের ফলপ্রসূ আলোচনার ফলে পরমাণু চুক্তি করা সম্ভব হয়েছিল। এর পর ছয় মাস ইরানকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে বিশ্ব সংস্থা নিশ্চিত হয় যে, দেশটি অঙ্গীকারমাফিক ওই চুক্তির শর্ত বাস্তবায়ন করেছে। তাই পূর্বনির্ধারিত ঘোষণা অনুযায়ী, ইরান দীর্ঘকালের আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ থেকে অব্যাহতি পেয়েছে।
এবার ভিয়েনায় আইএইএ সদর দফতরে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান ফেদেরিকা মোগেরিনি এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জারিফ যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। অতএব, ইরানের ১০ হাজার কোটি ডলার মূল্যের সম্পদ আটকাবস্থা থেকে ছাড় করাতে আর বাধা রইল না। নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার সাথে সাথেই ইরান তেল রফতানির প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে।
ইরান তার অবমুক্ত সম্পদের সাহায্যে জাতীয় অর্থনীতি চাঙ্গা করতে সক্ষম হবে। অপর দিকে, তেলের বাজারে ইরানের জোরালো উপস্থিতি আন্তর্জাতিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। ইরান জানিয়েছে, তারা দৈনিক পাঁচ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত উৎপাদন বাড়িয়ে রফতানি করার সক্ষমতা রাখে। জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ইদানীং ৩০ ডলারের কাছাকাছি নেমে আসায় তেল রফতানিকারী দেশগুলোর মাঝে উদ্বেগ সঞ্চারিত হয়েছে। ইরান তার বিপুল তেলভাণ্ডার নিয়ে বিশ্ববাজারে প্রবেশ করলে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল এমনকি, ২০ ডলারেরও কম হয়ে যেতে পারে। ইরানি প্রেসিডেন্ট রুহানি বলেছেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইরানের নয়াযুগের সূচনা হলো।’
এখন থেকে ইরান ও পাশ্চাত্য, পরস্পর থেকে যতটা সম্ভব, লাভবান হওয়ার প্রয়াস পাওয়াই স্বাভাবিক। তেমনি নজরদারিটাও কিন্তু একতরফা হবে না। শুধু যে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার মোড়ল-মাতব্বররা ইরানের প্রতিশ্রুতি প্রতিপালনের কড়ায়গণ্ডায় হিসাব নিতে চায়, তা নয়। ইরানও পশ্চিমা জগতের হোতাদের মতিগতির দিকে সতর্কতার সাথে লক্ষ রাখবে। কারণ যে পরমাণু চুক্তির বলে এক দশকের নিষেধাজ্ঞা থেকে ইরান মুক্ত হয়েছে, তেহরান মনে করে এটা একতরফা পালনের বিষয় নয়; বরং এর সাথে উভয় পক্ষের অঙ্গীকার পূরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
এ জন্যই ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানিকে ‘সর্বোচ্চ নেতা’ আয়াতুল্লাহ খামেনি লিখিতভাবে বলেছেন, পরমাণু বিষয়ে সমঝোতার অপরপক্ষ তার নিজের ওয়াদা রাখছে কিনা, তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে গভীরভাবে। খামেনি এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘মার্কিন নেতৃত্ব যেসব বক্তব্য দিয়েছে, তা খুব স্বস্তিকর নয়। প্রতিটি পদক্ষেপেই আমাদের থাকতে হবে সতর্ক।’
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার এমন সাবধানী মনোভাব যে অকারণ নয়, তার প্রমাণ হলো- ইরানের বিরুদ্ধে এ যাবৎ আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার পরদিনই নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র একটি নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। ইরান ব্যালাস্টিক মিসাইলের পরীক্ষা চালিয়েছে- এই কারণ দেখিয়ে ওয়াশিংটন নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ইরানের কিছু কোম্পানি এবং কয়েক ব্যক্তির ওপর। সাথে সাথে ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানালেন, ‘পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র বা মিসাইল তৈরি করার কর্মসূচি কিংবা এ জাতীয় কোনো পরিকল্পনা আমাদের নেই। তাই নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা বৈধ নয়।’
ইরানের সম্পর্ক পাশ্চাত্যের সাথে ক্রমশ ঘনিষ্ঠ হবে হয়তো। ভারত-চীন-রাশিয়ার সাথে হলো- সম্পর্কে আপাতত কিছুটা ওঠানামা দেখা যেতে পারে। তবে অর্থনৈতিক স্বার্থে এই তিন দেশের সাথে ইরানের সম্পর্ক মোটামুটি ভালোই থাকবে বলে আশা করা যায়। প্রশ্ন হচ্ছে, এখন বাংলাদেশের সাথে ইরানের সম্পর্ক কি বাড়বে? বাংলাদেশ কোনো বৃহৎশক্তি বা আঞ্চলিক শক্তি নয়। ইরানের প্রতিবেশীও নই আমরা। কিংবা ইরাক-ইয়েমেন-সিরিয়া-আজারবাইজান-বাহরাইনের মতো শিয়া-অধ্যুষিত বা প্রভাবিত রাষ্ট্রও নয় বাংলাদেশ। তবে বাংলাদেশ ও ইরান মুসলিম উম্মাহর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তদুপরি, বাংলাদেশ জনসংখ্যার বিচারে তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র যা বিশেষ করে অর্থনৈতিক সম্ভাবনাময়। এই বিবেচনায় বাংলাদেশ-ইরান সম্পর্ক ‘দহরম-মহরম’ পর্যায়ে না পৌঁছলেও কখনো ঢিলে বা দায়সারা গোছের হওয়ার কথা নয়। এবার জানা গেছে, বাংলাদেশ ইরানে সারকারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নিতে পারে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয়ের বিশেষজ্ঞ মেজর জেনারেল (অব:) আবদুর রশিদ আশা করেছেন, বাংলাদেশের সাথে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য ক্ষেত্রে ইরানের সহায়তা ও সম্ভাবনা বাড়বে।
এই পরমাণু চুক্তির সাফল্য নির্ভর করছে ইরান দেশটির সাত কোটি ৯০ লাখ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি ও সমৃদ্ধির ওপর। ইরানে বেকারত্ব, মন্দা, মূল্যস্ফীতি অত্যন্ত প্রকট। কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন সহজ কথা নয়। এ ছাড়া পর্যাপ্ত বিদেশী বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে সময়মতো। এদিকে, আগামী মাসে ইরানের পার্লামেন্ট নির্বাচনকেন্দ্রিক অনিশ্চয়তায়ও একটা সমস্যা হতে পারে।
কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার হলো, ইরানে সরকারবিরোধীরা পরমাণু চুক্তির সমালোচনা করে বলছেন, ‘এটা ইরানের অর্জনের সিমেন্টনির্মিত সমাধি।’ এ কথা বলার কারণ, কিছু দিন আগে ভিয়েনায় স্বাক্ষরিত ওই চুক্তি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ইরানের আরক নামের জায়গার হেভি ওয়াটার রিঅ্যাক্টর বা চুল্লি সরিয়ে নেয়া হয়েছে। ফলে সেখানে যে গর্ত সৃষ্টি হয়েছে, তা ভরাট করা হয়েছে সিমেন্ট দিয়ে। লক্ষ করার মতো আরেকটি বিষয় হলো, ইরানের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ইস্যু যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ক্ষমতাসীনদের জন্য কিছুটা সমস্যা হলেও ইরানের ক্ষমতাসীনেরা এটা তাদের বিরাট বিজয় হিসেবে রাজনৈতিক সুফল পাওয়ার আশা করছেন। আগামী মাসে ইরানে নির্বাচন, তাই প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি চেয়েছিলেন, এর আগেই যেন নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়।
ইরানের ওপর অবরোধ বা নিষেধাজ্ঞা আর নেই বলে ইসরাইল সাঙ্ঘাতিকরকম বিক্ষুব্ধ। তাদের দৃষ্টিতে, এটা হচ্ছে- ইরানের প্রতি পাশ্চাত্যের আপসকামিতা। এদিকে ইরানবিরোধী আরব দেশগুলোও অসন্তুষ্ট। অপর দিকে, ইরান সরকার সমালোচিত হচ্ছে নিজের দেশের বিরোধী দল কর্তৃক। এ দিক দিয়ে ইরানি প্রেসিডেন্ট রুহানি আর আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ওবামা একই সমস্যার সম্মুখীন। যুক্তরাষ্ট্রে কট্টরপন্থী রিপাবলিকানেরা ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার বিরোধিতা করেছেন। এই ইস্যুকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বিরুদ্ধে ব্যবহারের চেষ্টা চলছে।
এদিকে, পাশ্চাত্যের একটি প্রভাবশালী মহল ইরানের নিষেধাজ্ঞামুক্তির ঘটনায় খুশি না হয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে। নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকা লিখেছে, ইরান পরমাণু চুক্তির বিনিময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আটক হয়ে থাকা তার ১০ হাজার কোটি ডলার ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ায় তারা বিশ্ববাণিজ্যে ফের প্রবেশাধিকার পাবে। তেহরানের সমালোচকদের আশঙ্কা, এ অর্থ ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যকে ফের অস্থিতিশীল করে তোলা হতে পারে। ইরানের শাসকদের উচিত, এ অর্থ তাদের দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ব্যবহার করা।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যা-লয়ের অধ্যাপক মুহাম্মদ রুহুল আমীন ‘বিশ্ব আসলে কতটা নিরাপদ’ শীর্ষক নিবন্ধে বলেছেন, ইরানের ওপর পারমাণবিক ইস্যুতে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার সাথে সাথে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ইস্যুতে নতুন করে দেশটির ওপর যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলো, তা বিশ্বনিরাপত্তার প্রশ্নটিকেও অনিরাপদ করবে বলে মনে হয়।
১৯৭৯ সালে ইমাম খোমেনির নেতৃত্বে ইরানে ‘ইসলামি বিপ্লব’ সংঘটিত হয় মার্কিনপন্থী শাহেন শাহ রেজা পাহলভিকে উৎখাতের মাধ্যমে। এর পরই বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে এবং অচিরেই সব সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। তখন ইরানিরা যুক্তরাষ্ট্রকে ‘বড় শয়তান’ এবং ইসরাইলকে ‘ছোট শয়তান’ হিসেবে অভিহিত করত। সে সময় থেকে আমেরিকার সাথে ইরানের কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই তিন যুগ ধরে। গত ৩৬ বছরের বিভিন্ন পর্যায়ে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পাশ্চাত্যের প্রভাবশালী অধিকাংশ দেশ ছাড়াও ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, এমনকি জাতিসঙ্ঘেরও সম্পর্কে টানাপড়েন ঘটেছে ইরানের। এসব কিছুর চূড়ান্ত পরিণতি ছিল পরমাণু ইস্যুকেন্দ্রিক নিষেধাজ্ঞা।
আসলে ইরানের পরমাণু শক্তি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির অনেক আগে থেকেই দেশটি অর্থনৈতিক অবরোধের শিকার। ১৯৯৫ সালে এটা পুরোমাত্রায় কার্যকর হয়। পরের বছর বিদেশী ব্যবসায় এবং তেল-গ্যাসে ইরানি বিনিয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়। ২০০২ সালে এ মর্মে পাশ্চাত্যের দাবি শোনা যায় যে, ইরানের গোপন পরমাণু চুল্লি শনাক্ত করা হয়েছে। ২০০৬ সালে ইরানের পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির কারণ দেখিয়ে আর্থিক সম্পদ এবং সংশ্লিষ্ট অনেকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়। পরের বছর অস্ত্র বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল। ২০০৮ সালে ইরানের সামরিক-বেসামরিক ব্যবহারের সম্পদ এবং মার্কিন ব্যাংকগুলোর মধ্যস্থতার বিষয় নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসে। ২০১০-এ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় ট্যাংক, মিসাইল, যুদ্ধবিমানসহ ভারী অস্ত্র, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং ব্যাংকিংয়ের ওপর। ২০১১ সালে আরো সম্পদ এবং বিশেষ ক’জন ব্যক্তির নাম নিষেধাজ্ঞার তালিকায় ওঠে। ২০১২ সালে তেল সম্পদের ওপর অবরোধ আরোপ করা হয় ইরানি অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করার লক্ষ্যে। কারণ, জ্বালানি তেলের দিক থেকে বিশ্বের বৃহত্তম রিজার্ভগুলোর এবং সর্ববৃহৎ রফতানিকারকদের অন্যতম এই ইরান। একই বছর ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পদ জব্দ এবং আন্তঃব্যাংক লেনদেন বন্ধ করা হয়।
২০১৩ সালে অটোমোবাইল খাত এবং ইরানি মুদ্রার ক্ষেত্রেও পাশ্চাত্যের নিষেধাজ্ঞা সম্প্রসারিত হয়। ২০১৪ সালে অবশ্য হাওয়া কিছুটা উল্টো বইতে শুরু করে। সে বছর অর্থ, সোনা আর পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত হয়ে যায়। এরপর, ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই অবরোধ বা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ‘ভিয়েনা চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হলো। এ জন্য শর্ত দেয়া হয়, ইরান পরমাণু অস্ত্র বানাবে না। এটা মনিটর করার দায়িত্ব বর্তায় জাতিসঙ্ঘের অঙ্গ সংস্থা আইএইএর ওপর। এর সদর দফতর অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনা নগরীতে বিধায় সেখানে চুক্তি সই করা হয়েছে বৈঠকশেষে। উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তিসংস্থাকে সংক্ষেপে আইএইএ বলা হয়। যা হোক, তাদের অনুকূল প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়া হলো। এই নিষেধাজ্ঞা ছিল একই সাথে যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ এবং জাতিসঙ্ঘের।
ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে মনে করার কারণ নেই যে, সব ফাঁড়া কেটে গেছে এবং তেহরানের সামনে আর কোনো বাধা নেই। পাশ্চাত্য শক্তির কাছে বরাবরই আপন থাকবে ইসরাইল; তার প্রচণ্ড বিরোধী ইরান নয়। ইরান কিংবা অন্য কোনো দেশের আঞ্চলিক শক্তি হওয়ার আকাক্সক্ষা, প্রয়াস বা সামর্থ্য থাকতে পারে, এমনকি আশপাশে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টাও চালাতে পারে। এসব কিছু আন্তর্জাতিক আইনকানুন ও রীতিনীতির লঙ্ঘন হলে অবশ্যই আপত্তিকর ও অবাঞ্ছিত। কিন্তু কথা হলো, পশ্চিমি দুনিয়ার কাছে ইসরাইলের আগ্রাসন ও সম্প্রসারণের নীতি মোটেও অন্যায় নয়, বরং ইহুদিবাদী অপরাষ্ট্রের জন্য এটা নাকি ‘অপরিহার্য’। অথচ সেই একই পাশ্চাত্য শক্তি ইরান তো দূরের কথা, সৌদি আরব বা অন্য কোনো ‘পাশ্চাত্যবান্ধব’ মুসলিম রাষ্ট্রেরও পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের তীব্র বিরোধী। এ অবস্থায় ইরানের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নসহ পাশ্চাত্যের প্রখর নজরদারি বজায় থাকাটা অবশ্যম্ভাবী। ইরানের সাথে বাহ্যিকভাবে স্বাভাবিক সম্পর্ক রেখে ইউরোপ-আমেরিকার মোড়লেরা নিজেদের ফায়দা যতটা সম্ভব তুলে নেয়ার চেষ্টা করবে। তবে ইরান তাদের সন্দেহমুক্ত সহজে হতে পারবে বলে মনে হয় না।
‘এক মাঘে শীত যায় না।’ আরো ফাঁড়া রয়ে গেছে ইরানের। হয়তো, এগুলো পাহাড়সমান বাধা নয়, তবে বেশ কিছুটা চ্যালেঞ্জ তো বটেই। ইন্ডিপেন্ডেন্ট ও গার্ডিয়ান পত্রিকা জানিয়েছে, ইরানকে আরো কিছু বড় সমস্যার মোকাবেলা করতে হবে। এমনকি, যুক্তরাষ্ট্রে আগামী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন ডেমোক্র্যাটিক পার্টি হেরে গিয়ে যদি ক্ষমতায় আসে রিপাবলিকান পার্টি, তা হলে ইহুদি লবি ও কট্টরপন্থীদের চাপে ইরানের পরমাণু চুক্তি হুমকির মুখে পড়তে পারে।
উল্লেখ করা প্রয়োজন, পরমাণু চুক্তির আওতায় এমন সব নিষেধাজ্ঞা উঠে যাচ্ছে, যেগুলো পরমাণু ইস্যু সংশ্লিষ্ট। কিন্তু মানবাধিকারসহ অন্যান্য ইস্যুর সাথে সম্পর্কিত নিষেধাজ্ঞা বা অবরোধ উঠছে না। তদুপরি মার্কিন কংগ্রেসের নতুন আইন অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাওয়ার জন্য তৃতীয় দেশের সুপারিশ নেয়া ইরানিদের জন্য বাধ্যতামূলক।
ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে নানামুখী আলোচনা ও পর্যালোচনা হচ্ছে। এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক সম্ভাব্য কী কী প্রভাব আন্তর্জাতিক রাজনীতি, অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও কূটনীতির অঙ্গনে পড়তে পারে, তা নিয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেয়া হচ্ছে অভিমত। এটা স্পষ্ট যে, এখন ইরানের সুযোগ ও সম্ভাবনার পাশাপাশি দায়দায়িত্বও বেড়েছে। ইরান গত কয়েক বছরে নিজের গণ্ডি ছাড়িয়ে আঞ্চলিক পর্যায়ে, অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যে (এমনকি এর বাইরেও), বিভিন্ন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ও জ্বলন্ত ইস্যুতে সম্পৃক্ত হয়ে গেছে। এর কারণ যাই থাকুক, বাস্তবে পরিস্থিতি শুধু জটিল নয়, অনেক ক্ষেত্রে অগ্নিগর্ভ। এতদিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার সাথে দেশটি রাজনৈতিক চাপেও ছিল। এখন স্বস্তিদায়ক নতুন পরিস্থিতিতে তেহরানকে নিজের পররাষ্ট্রনীতি, আরব বিশ্বের সাথে সম্পর্ক, মুসলিম উম্মাহর প্রেক্ষাপটে তার অবস্থান প্রভৃতি বিষয় যথাযথভাবে বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে নিছক আবেগ নয়, বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। যে বিপ্লবের মাধ্যমে বর্তমান ইরানের নবজন্ম এবং যার উত্তরাধিকারের দাবিদার এখনকার ইরানও, সে বিপ্লবের মূল আদর্শের ধারাবাহিকতা ৩৬ বছর পরে কতটা ক্ষুণ্ন হয়েছে, আর কতটা অক্ষুণ্ন রয়েছে, সেটাও হিসাব করা দরকার। ইরানের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশের কাছে মুসলিম দেশগুলোসহ তৃতীয় বিশ্বের যে প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণের খতিয়ানও নেয়া উচিত। নিষেধাজ্ঞামুক্ত ইরান তার বর্ধিত শক্তিমত্তার কারণে বর্ধিত দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবে বলে আমরা আশা করি।
About: Mids
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1402)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
-
▼
2016
(3416)
-
▼
January
(576)
-
▼
Jan 24
(18)
- ক্লিন ঢাকা গ্রিন ঢাকা গড়তে গণমাধ্যমের সহযোগিতা চাই...
- ফরিদগঞ্জে ব্যাংকসহ ৭ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নিকাণ্ড
- উন্নয়ন করছেন, দুর্নীতিও বন্ধ করুন by মইনুল ইসলাম
- রায় ঘোষণা করতে হয় প্রকাশ্য আদালতেই by ইকতেদার আহমেদ
- গ্যাস সঙ্কটে শিল্পে অচলাবস্থা by জিয়াউল হক মিজান
- কেমন হলো পৌর নির্বাচন? by বদিউল আলম মজুমদার
- প্রশ্নবিদ্ধ অক্সফোর্ড : বর্তমান ও অতীত by শফিক রেহমান
- ঝাঁকুনি তত্ত্বের ব্যাংক ব্যবসায় by ড. রেজোয়ান সিদ্...
- ব্রাহ্মণবাড়িয়া ‘খণ্ডযুদ্ধের’ রাজনীতিকরণ by ড. আবদু...
- নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও ইরানের ভবিষ্যৎ by মীযানুল ...
- সুখ নামের স্বর্ণমৃগের পিছে
- উনিশশো একাত্তরের যুদ্ধে জ্যাকবের ভূমিকা by এবনে গো...
- ঢাকায় এসেছিলেন শরণার্থী হয়ে, হলেন নায়ক রাজ্জাক
- ওরা কি গান গাইতে দেবে না? by মান্নান হীরা
- কাঁদলেন, কাঁদালেন রাজ্জাক
- ভাঙা রেকর্ড ... আর কতো!
- নেতাজি সম্পর্কে গোপন নথি প্রকাশ
- ১০-১২টি পরমাণু বোমা বানাতে পারত ইরান!
-
▼
Jan 24
(18)
-
▼
January
(576)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...




