Sunday, January 28, 2018

ইছামতির কান্না by রাশিম মোল্লা

ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার কাশিয়াখালী বেড়িবাঁধের মূল পয়েন্টে স্লুইসগেট না থাকায় ইছামতি নদী এখন প্রায় বিলুপ্ত। এক সময় দিন-রাত শোনা যেত নদীর উত্তাল ঢেউ আর জাহাজের সাইরেন। কিন্তু আজ আর নেই ইছামতির সেই চিরচেনা যৌবন। হারিয়ে যেতে বসেছে তার আপন চেহারা। মিইয়ে গেছে আসল দৃশ্য। আর এর প্রধান কারণ ইছামতি ও পদ্মা নদীর সংযোগস্থল কাশিয়াখালী বাঁধের ইছামতি নদীর প্রধান সংযোগস্থলে স্লুইসগেট নির্মাণ না করা।
অথচ স্লুইসগেট নির্মাণ করা হয়েছে অন্যত্র। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ইছামতি বাঁচাও আন্দোলন ও স্থানীয় বাসিন্দারা মূল নদীতে স্লুইসগেট নির্মাণের দাবি জানালেও কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে থেকেছে সব সময়ই উদাসীন। এতে শুকিয়ে গেছে কাশিয়াখালী থেকে শিকারীপাড়া বারুয়াখালী বান্দুরা পর্যন্ত প্রায় ১৬ কিলোমিটার নদীপথ। সমস্যায় পড়েছে স্থানীয় ৫ হাজার জেলে পরিবারের প্রায় ২৫ হাজার সদস্য। সে সঙ্গে বেকার হয়ে পড়েছে নদীর সঙ্গে সম্পৃক্ত হাজারও পেশার মানুষ। আর এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে ঢাকা জেলার দোহার-নবাবগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান ও মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার ওপর। বিশেষ করে নবাবগঞ্জ ও দোহার উপজেলার বাসিন্দাদের পোহাতে হচ্ছে দুর্ভোগ। পানিসম্পদমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর আগমনের খবরে এলাকাবাসী আশার আলো দেখছে। তাদের দাবি মন্ত্রী বেড়িবাঁধের ইছামতি নদীর মূল পয়েন্টে স্লুইসগেট নির্মাণ ও বাঁধ মেরামত করবেন।
ইছামতি বাঁচাও আন্দোলনের সেক্রেটারী মোতাহার হোসেন বলেন, নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে। ইছামতি ও পদ্মার সংযোগস্থল কাশিয়াখালী বাঁধের মূল নদীতে স্লুইসগেট না থাকায়ই আজ ইছামতি নদীর এ দুরবস্থা। ইছামতির এ দুরবস্থা নিরসনের জন্য প্রয়োজন মূল নদীতে একটি স্লুইসগেট নির্মাণ। তা না হলে মৃতপ্রায় ইছামতি চলে যাবে প্রভাবশালী মহলের দখলে। ইতিমধ্যে অনেক স্থানে নদীর অংশ বিশেষ দখল হয়ে গেছে। নদীর এ দুরবস্থা নিরসনে নৌ-পরিবহনমন্ত্রী মো. শাজাহান খান মানবজমিনকে বলেন, নবাবগঞ্জ উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ইছামতি ও কালিগঙ্গা নদীর নাব্য সংকট নিরসনে শিগগিরই ড্রেজিং করা হবে। সেই সঙ্গে সংযোগস্থল কাশিয়াখালী বাঁধে স্থাপন করা হবে একটি স্লুইসগেট।
সরজমিন ইছামতি নদীর তীর ঘুরে দেখা যায়, ঢাকা জেলার অন্যতম বৃহত্তম কোঠাবাড়ীর বিলে আজ পানির অভাবে ধান চাষ করতে পারছেন না কৃষক। এক সময় এই বিলেই চাষ হতো লাখ লাখ হেক্টর ইরি-বোরো। বিলের পানির উৎপাদিত ধানই নবাবগঞ্জ ও দোহার উপজেলাবাসীর চালের চাহিদা মেটাতো। অপরদিকে বর্ষা মওসুমে জেলেরা এ বিলের পানিতে রাত-দিন মাছ শিকারে ব্যস্ত থাকতো। আর সেই মাছ বিক্রি করেই সংসার চলতো জেলে পরিবারগুলোর। এখানে পাওয়া যেত দেশি প্রজাতির হরেক রকম সুস্বাদু মাছ। কিন্তু এখন মাছ পাওয়া তো দূরের কথা দেখা দিয়েছে পানির চরম অভাব।
সূত্র জানায়, চিরচেনা সদরঘাট থেকে কলাকোপা বান্দুরা লঞ্চ অতিপরিচিত একটি নাম। উপজেলা হিসেবে নবাবগঞ্জকে বাংলাদেশের অনেক মানুষ না চিনলেও কলাকোপা বান্দুরাকে চিনতো সবাই। চেনার অন্যতম কারণ ছিল গ্রামবাংলার ঐতিহ্য মাসব্যাপী নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা। ভাদ্র মাসের ১ তারিখে খানেপুর-তুইতাল এলাকায় ইছামতি নদীতে শুরু হতো নৌকাবাইচ। এভাবে ভাদ্র মাসজুড়েই চলতো নৌকাবাইচ। নৌকাবাইচ ঐতিহ্য রক্ষা কমিটির আহবায়ক মো. মাসুদ মোল্লা বলেন, ভাদ্র মাস এলেই নৌকাবাইচের নেশায় ঘুম আসতো না। পুরো মাসের রাত-দিন ইছামতি নদীর সঙ্গে কাটতো। কিন্তু আজ সেই স্বপ্নের ইছামতি পানির স্বল্পতায় আমার সে নেশা পণ্ড হয়ে গেছে। আজ আর বর্ষা মওসুমে বাইচাদের (মাঝি) বাঁশির শব্দ শোনা যায় না। নদীতে এখন আর নৌকা চলে না, দুই পাড়ের মানুষ এখন হেঁটেই পার হয় নদী। জেগে উঠা নদীর বিভিন্ন স্থানে আবাদ হচ্ছে ধান, কেউবা আবার মাঝ নদী জাল আটকে চাষ করছে মাছ। কোথাও আবার জমে থাকা কচুরিপানায় ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে পানি।
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত প্রায় দেড় যুগ ধরে বর্ষা মওসুমে পদ্মার পানি প্রবেশ করতে না পারায় স্রোতের প্রবাহ নেই। বন্ধ হয়ে গেছে ইছামতির সঙ্গে পদ্মার সংযোগ। ফলে শুকিয়ে গেছে নদী। চৈত্র মাস আর শ্রাবণ মাসের যেন কোনো পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যায় না। বন্ধ হওয়া পয়েন্টগুলো হলো সাদাপুর খাল, আড়িয়ল বিলের গোবিন্দপুর খাল, কার্তিকপুর বেড়িবাঁধ ও কাশিয়াখালী বাঁধ এলাকা। এসব স্থানে পদ্মার সঙ্গে সংযোগ ক্যানেলগুলো ভরাট হওয়ায় ইছামতি আজ মরা নদীতে পরিণত হয়েছে।
আশির দশকজুড়েই এ অঞ্চলের মানুষের ঢাকা যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম ছিল লঞ্চ। ইছামতিজুড়েই যেন কচুরিপানার দখল। ইছামতির সঙ্গে পদ্মা নদীর সব সংযোগ খাল ভরাট ও বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণেই আজ এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তবে ইছামতিকে সচল করতে এলাকার কিছু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের দাবি-দাওয়া থাকলেও স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের মাথাব্যথা নেই। আর সাবেক গণপরিষদ সদস্য সুবিদ আলী টিপু জানান, ১৯৭২ সালে ইছামতিকে সচল করতে কোমরগঞ্জ থেকে মরিচা পর্যন্ত ড্রেজিং করে ১০ কিমি. খনন করা হয়। ১৯৭৭ সালে তৎকালীন সরকারের শাসন আমলে ঢাকা-১ দোহারের সংসদ সদস্য ও নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন নুরুল হক ইছামতি নদীর নাব্যতা ফিরে আনতে ড্রেজিং করেন।
বিগত ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দোহার-নবাবগঞ্জ এবং হরিরামপুর উপজেলাকে পদ্মা নদীর ভাঙন থেকে রক্ষা করার জন্য দোহারের অরঙ্গাবাদ থেকে মানিকগঞ্জের হাটিপাড়া বংখুরী পর্যন্ত সাড়ে ১১ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়। ইছামতির সঙ্গে পদ্মার সংযোগস্থলগুলোতে স্লুইসগেট নির্মাণ না করায় ইছামতি নদী খরস্রোত হারিয়ে নাব্যতার সংকট সৃষ্টি হয়। ফলে শুকনো মওসুমে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার সৈয়দপুর হতে মানিকগঞ্জের কাশিয়াখালী পর্যন্ত প্রায় ৩৫ কিমি. জলপথে নৌ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
এতে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের পণ্যসামগ্রী, কাঁচামাল, বাড়িঘর নির্মাণ সামগ্রী নৌপথে স্বল্প খরচে আনা-নেয়া করতে পারছে না। এসব সমস্যার সম্মুখীন হয়ে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। ইছামতি নদী পথে সৈয়দপুর, মরিচা, ভাঙাভিটা, হরিস্কুল, কলাকোপা পোদ্দারবাজার, ধাপারী, গোল্লা, বান্দুরা, খানেপুর, আলালপুর, দাউদপুর, বারুয়াখালী ও শিকারিপাড়াসহ বিভিন্ন স্থানে নদীর পানি শুকিয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। দাউদপুরের মৎস্যজীবী সুকুমার হালদার বলেন, ইছামতি মরে যাওয়ায় আজ অনেকে বাপ-দাদার পেশা ফেলে বিভিন্ন পেশায় চলে যাচ্ছে।
ধাপারী বাজারের ব্যবসায়ী আবুল কালাম বলেন, নদীপথে কম খরচে বেশি মালামাল আনা-নেয়া যায়। বর্তমানে সড়কপথে মালামাল পরিবহন করতে ট্রাফিক, মাস্তানদের চাঁদা প্রদানসহ নানা ভোগান্তি পোহাতে হয়। নদীতে ড্রেজিং করা হলে এলাকাবাসী স্বল্প খরচে নৌযানে মালামাল বহন করতে পারবে।
সেভ দ্য সোসাইটি এন্ড থান্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরামের সভাপতি এড. সাইদুর রহমান মানিক বলেন, নদী মরে যাওয়ায় এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের, কৃষিকাজ, মৎস্য আহরণে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। তাই দ্রুত নদীটি খননের দাবি জানান তিনি। একইভাবে সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যরা কাশিয়াখালী বেড়িবাঁধ রক্ষা মঞ্চের সদস্যরা গত কয়েক আগে এলাকায় স্লুইসগেট নির্মাণ ও বেড়িবাঁধ সংস্কারে ক্যাম্পেইন করেছে। তারা জরুরি ভিত্তিতে নদীটি খনন করে সারা বছর নৌ চলাচলের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান।

মেয়রের পরিচয় সেবক নগরপিতা নয়



মেয়র একজন জনপ্রতিনিধি। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে একজন ব্যক্তি একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য মেয়র পদে নির্বাচিত হন। পৌরসভা ও সিটি ক র্পোরেশন উভয়ের নির্বাচিত প্রধানকে মেয়র বলা হয়। অতীতে পৌরসভার প্রধান নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি চেয়ারম্যান নামে অভিহিত হতেন। বর্তমানে পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন উভয়ের প্রধান নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি মেয়র নামে অভিহিত হন। সিটি কর্পোরেশনের মেয়রদের কিছু গণমাধ্যম ও সাংবাদিক অযাচিতভাবে কোনো ধরনের সাংবিধানিক ও আইনি ভিত্তি ব্যতিরেকেই দীর্ঘদিন ধরে ‘নগরপিতা’ নামে অভিহিত করে আসছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ১২টি সিটি কর্পোরেশন থাকলেও ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়রদের ক্ষেত্রেই নগরপিতা শব্দটি অধিক ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। মেয়রের ন্যায় সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার কাউন্সিলরাও নির্ধারিত এলাকার বিপরীতে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন। কোনো কাউন্সিলরকে কখনোই তিনি যে এলাকা থেকে নির্বাচিত, সে এলাকার নামানুসারে ‘পিতা’ নামে অভিহিত করা হয় না। অনুরূপ পৌরসভার চেয়ারম্যানদেরও পৌরসভার নাম উল্লেখপূর্বক পিতা নামে অভিহিত করা হয় না। আমাদের দেশে দু’ধরনের জনপ্রতিনিধি রয়েছেন। এর একটি হল, একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকা থেকে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে আইনানুযায়ী নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং অপরটি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অধীন বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশন, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদে প্রত্যক্ষ নির্বাচনে নির্বাচিত যথাক্রমে মেয়র ও কাউন্সিলর, চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান, মেয়র ও কাউন্সিলর, চেয়ারম্যান ও ওয়ার্ড মেম্বার (সাধারণ সদস্য)। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জেলার অন্তর্ভুক্ত স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অধীন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ভোটে নির্বাচিত হন। উভয় ধরনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নির্ধারিত পদমর্যাদা রয়েছে। তাছাড়া তারা সরকারের কাছ থেকে প্রতি মাসে নির্ধারিত বেতন, ভাতা, সম্মানী ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাদি প্রাপ্ত হন। সিটি কর্পোরেশনের মেয়রদের নগরপিতা নামে অভিহিত করা হলে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অধীন নির্বাচিত সিটি কর্পোরেশন, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদে প্রত্যক্ষ নির্বাচনে নির্বাচিত যথাক্রমে মেয়র ও কাউন্সিলর, চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান, মেয়র ও কাউন্সিলর, চেয়ারম্যান ও ওয়ার্ড মেম্বাররা স্ব স্ব নির্বাচনী এলাকার পিতা হওয়ার সমঅধিকারী। সমগ্র মানবজাতির পিতা হচ্ছেন হজরত আদম (আ.)। আর মুসলিম জাতির পিতা হলেন হজরত ইব্রাহীম (আ.)। প্রতিটি ব্যক্তির জন্মদাতা পিতা একজন। কিছু কিছু রাষ্ট্র সৃষ্টিতে বিশেষ ব্যক্তির অবদান থাকায় তার প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশে স্ব স্ব দেশের নির্ধারিত আইনের অধীনে তাদের নিজ নিজ রাষ্ট্রের জাতির পিতার মর্যাদার আসনে সমাসীন করা হয়েছে। আবার এমন রাষ্ট্রও রয়েছে, যেখানে একাধিক ব্যক্তিকে জাতির পিতার পরিবর্তে জাতি বা রাষ্ট্রের স্থপতিরূপে সম্মানিত করা হয়েছে। জন্মদাতা পিতার অবস্থান সব সময় স্থায়ী। অনুরূপ মানবজাতির পিতা ও মুসলিম জাতির পিতার অবস্থানও স্থায়ী। সচরাচর জাতির পিতা বা জাতির স্থপতির অবস্থান স্থায়ী হয়ে থাকে।
রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বিপন্ন হলে বা রাষ্ট্র দ্বিখণ্ডিত হলে জাতির পিতার পরিবর্তন লক্ষণীয়। সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের ন্যায় অপরাপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা নির্ধারিত মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হয়ে থাকেন। যে কোনো নির্বাচনে সর্বাধিক ভোট পেয়ে যিনি বিজয়ী হন, তাকেই একটি পদের বিপরীতে জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। এরূপ জনপ্রতিনিধির পদে বহাল থাকার বিষয়টি আইন দ্বারা নির্ধারিত। একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির পদের মেয়াদের অবসান ঘটলে তিনি আর জনপ্রতিনিধি নন। পিতা শব্দটি ব্যক্তি সংশ্লেষে স্থায়ী হলেও সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের ক্ষেত্রে স্থায়ী নয়। একজন ব্যক্তি নির্বাচনে পরাভূত হলে তাকে সিটি কর্পোরেশনভুক্ত নগরের পিতা নামে অভিহিত করার অবকাশ থাকে না। সব ধরনের জনপ্রতিনিধিই জনগণের সেবক। নিজ নিজ এলাকার জনমানুষকে নিঃস্বার্থ সেবা দেয়ার মানসে একজন ব্যক্তি নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়ে সফলতা পেলে তিনি জনপ্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃত হন। আমাদের দেশে বর্তমানে জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোয় নারীদের জন্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে আসন সংরক্ষিত থাকলেও তাদের জন্য পুরুষের পাশাপাশি সরাসরি নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে কোনোরকম বিধিনিষেধ নেই।জাতীয় সংসদ এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত সরাসরি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়ে অনেক নারী বিজয়ী হচ্ছেন। সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনেও একাধিকবার জনৈক নারী প্রার্থীকে বিজয়ী হতে দেখা গেছে, যিনি বর্তমানেও মেয়র পদে আসীন আছেন। স্বভাবতই প্রশ্নের উদয় হয়, সিটি কর্পোরেশনের পুরুষ মেয়রকে নগরপিতা নামে অভিহিত করা হলে কোনো সিটি কর্পোরেশনে নির্বাচিত নারী মেয়র কি নামে অভিহিত হবেন? স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন, ২০০৯; স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯ এবং স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এ লাভজনক পদের যে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে তা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর অনুরূপ। কিন্তু স্থানীয় সরকার (উপজেলা পরিষদ) অধ্যাদেশ, ২০০৮-এর লাভজনক পদের ব্যাখ্যায় ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। এখানে বলা হয়েছে, ‘লাভজনক’ পদ অর্থ প্রজাতন্ত্র কিংবা সরকারি সংবিধিবদ্ধ কর্তৃপক্ষ কিংবা পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে বেতন, সম্মানী কিংবা আর্থিক বা অন্য কোনোভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত লাভজনক পদ বা অবস্থান। স্পষ্টত শেষোক্ত ব্যাখ্যায় বেতন ব্যতিরেকে সম্মানী বা আর্থিক অথবা অন্য কোনোভাবে সুবিধা প্রাপ্তিকে লাভজনক বলা হয়েছে। যদিও সাধারণ অর্থে প্রজাতন্ত্রের লাভজনক পদ বলতে এমন সব পদধারীকে বোঝায়, যারা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা ও সম্মানী গ্রহণ করে থাকেন। এ অর্থে গণকর্মচারীরা (Public Servant) প্রজাতন্ত্রের লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত মর্মে গণ্য। উল্লেখ্য, আমাদের সংসদ সদস্যরা ভ্রমণভাতা, আবাসন সুবিধা, করমুক্ত গাড়ি আমদানির সুযোগ প্রভৃতি ছাড়াও প্রতি মাসে অন্যান্য যেসব বেতন-ভাতা ও সম্মানী পেয়ে থাকেন, তার পরিমাণ লক্ষাধিক টাকা। আমাদের সংবিধানে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্ম’ অর্থ অসামরিক বা সামরিক ক্ষমতায় বাংলাদেশ সরকার সংক্রান্ত যে কোনো কর্ম, চাকরি বা পদ এবং আইনের দ্বারা প্রজাতন্ত্রের কর্ম বলে ঘোষিত হতে পারে, এরূপ অন্য কোনো কর্ম। অপরদিকে ‘সরকারি কর্মচারী’ অর্থ প্রজাতন্ত্রের কর্মে বেতনযুক্ত পদে অধিষ্ঠিত বা কর্মরত ব্যক্তি। সংবিধানে উল্লিখিত সরকারি কর্মচারীকে ইংরেজিতে বলা হয়েছে Public Officer. সংবিধানে উল্লিখিত Public Officer এবং দণ্ডবিধির ২১নং ধারায় উল্লিখিত Public Servant একটি অপরটির সমার্থক কিনা, সে বিষয়ে বিতর্ক রয়েছে। দণ্ডবিধিতে উল্লিখিত Public Servant ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। দণ্ডবিধিতে অপরাধ হিসেবে উল্লিখিত উৎকোচ গ্রহণ, অসাধুভাবে সম্পত্তি আত্মসাৎ এবং অপরাধমূলক বিশ্বাস ভঙ্গের জন্য একজন সরকারি কর্মচারীর ন্যায় স্থানীয় ও জাতীয়ভাবে নির্বাচিত ব্যক্তিদের অপরাধ দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭, ফৌজদারি সংশোধন আইন, ১৯৫৮ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-সহ দণ্ডবিধির অধীন শাস্তিযোগ্য হওয়ায় স্থানীয় ও জাতীয়ভাবে নির্বাচিত ব্যক্তিদের Public Servant অর্থাৎ গণকর্মচারী-বহির্ভূত বিবেচনার অবকাশ আছে কিনা, সে প্রশ্নটি এসে যায়। সংবিধান ও আইন মেনে চলা প্রতিটি নাগরিকের যেমন কর্তব্য, অনুরূপ সব সময়ে জনগণের সেবা করার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য। জনপ্রতিনিধিরা গণকর্মচারী গণ্যে জনগণকে সেবা প্রদান তাদের আবশ্যিক কর্তব্য। এ বিষয়টিকে আমাদের সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার একটি মূলনীতি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনার যে কোনো মূলনীতি মেনে চলার বিষয়ে দেশের প্রতিটি নাগরিকের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। জাতীয় সংসদ বা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অধীন পরিচালিত নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক হলে প্রকৃত অর্থেই সৎ, যোগ্য, ত্যাগী ও জনদরদি ব্যক্তি নির্বাচনে বিজয় লাভ করেন। নির্বাচন কলুষিত ও ত্রুটিপূর্ণ হলে এর ব্যত্যয় ঘটে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এবং সভ্য সমাজে কলুষিত ও ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন প্রত্যাশিত না হলেও অনেক তথাকথিত গণতান্ত্রিক ও সভ্য রাষ্ট্র এ কালিমায় আচ্ছন্ন। জন্মদাতা পিতা সচরাচর তার সব সন্তানকে সমদৃষ্টিতে দেখে থাকেন এবং সমভাবে আদর-স্নেহের মাধ্যমে লালন-পালন করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ব্যাপারে সর্বাত্মক প্রয়াস নেন। একজন পিতার এ প্রয়াসে কোনো ধরনের কৃত্রিমতা ও স্বার্থের লেশ থাকে না। কিন্তু সিটি কর্পোরেশনের একজন মেয়র বা অপর যে কোনো জনপ্রতিনিধি তাদের নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় যেসব ভোটার তার বিরোধী প্রার্থীর পক্ষাবলম্বন করেন, নির্বাচিত হওয়ার পর তাদের সমভাবে দেখেন না। এটি যে কোনো প্রকৃত পিতার চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্যের পরিপন্থী। একজন ভোটার কখনও ভোট দিয়ে পিতা বানায় না। ভোটার যাকে ভোট দেন, তিনি তার প্রতিনিধি বা সেবক। প্রতিনিধি বা সেবক পৃথিবীর কোথাও পিতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন, এমনটি আমাদের দেশ ব্যতীত অন্য কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। আমাদের দেশে যেসব গণমাধ্যম ও সংবাদকর্মী জনপ্রতিনিধি বা সেবক হিসেবে নির্বাচিত সিটি কর্পোরেশনের মেয়রকে নগরপিতা আখ্যা দিয়ে তাদের বিশেষভাবে সম্মানিত করার প্রয়াসে লিপ্ত, তারা নিছক ভ্রান্ত ধারণা বা আবেগের বশবর্তী হয়ে এ কাজটি করে সাধারণ মানুষকে ভুল বার্তা দিয়ে চলেছেন।
ইকতেদার আহমেদ : সাবেক জজ; সংবিধান ও রাজনীতি বিশ্লেষক
iktederahmed@yahoo.com

নির্বাচনী বছরে কালো টাকার ছড়াছড়ির আশঙ্কা অর্থমন্ত্রীর

নির্বাচনের বছরে কালো টাকা ছড়াছড়ি হতে পারে আশঙ্কা জানিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। রোববার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘নির্বাচন সামনে রেখে কালো টাকার ছড়াছড়ি হতে পারে। এ জন্য সতর্কতার সঙ্গে ব্যাংকগুলোকে অর্থ বিতরণ করতে হবে।’ তিনি বলন, ‘ব্যাংকিং খাত নিয়ে সমালোচনা আছে। সেটি থাকবে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে বাজেট থেকে মূলধন সরবরাহ করাতেও সমালোচনা আছে। সমালোচনা থাকুক। তবুও বাজেট থেকে সরকারি ব্যাংকগুলোতে মূলধন জোগান দেয়া হবে।’ অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান, রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

ভোলায় নর্থ-১ ক্ষেত্র থেকে পরীক্ষামূলক গ্যাস উত্তোলন শুরু

ভোলা নতুন গ্যাসক্ষেত্র ভোলা নর্থ-১ এ পরীক্ষামূলক গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়েছে।শনিবার দুপুর ১টায় ভেদুরিয়া ইউনিয়নের মাঝিরহাটের গ্যাসক্ষেত্রে বাপেক্সর ব্যবস্থাপনা পরিচালক শওশাদ ইসলাম বার্নারে আগুন প্রজ্বলন করে গ্যাসের অস্তিত্বের প্রমাণ ও মজুত পরীক্ষা ( ডিএসটি) করেন। এ সময় ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাংবাদিকদের জানান, এটি দেশের ২৭তম গ্যাসক্ষেত্র। এর নর্থ-১ কূপের ৩ হাজার ২০০ মিটার গভীরতায় গ্যাসের অস্তিত্ব মিলেছে। গ্যাসের মজুত ও চাপ পরীক্ষাকে বলা হয় ডিএসটি । এমন ডিসটি-১ ও ডিএসটি-২ পরীক্ষা শেষেই গ্যাসের প্রকৃত মজুতের পরিমাণ নিশ্চিত হবে। তবে প্রাথমিক ধারণা করা হচ্ছে মজুত ৬০০ বিলিয়ন ঘনফুট ছাড়িয়ে যাবে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন, ভোলা নর্থ-১ কূপের প্রকল্প পরিচালক মো. ফজলুর রহমান, বাপেক্সের ডিজিএমসহ কর্মকর্তারা। সূত্র জানায়, ভোলা নর্থ-১ কূপখননের কাজ শুরু হয় ৯ ডিসেম্বর। জ্বালানি সচিব নাজিম উদ্দিন চৌধুরী খননকাজের উদ্বোধন করেন। গত সপ্তাহে মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুন গ্যাসক্ষেত্রে গ্যাসের সন্ধান মিলেছে বলে জানান। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর শনিবার ওই কূপ থেকে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার চাপে গ্যাস বের হয়ে আসার বিষয়টি নিশ্চিত করেন বাপেক্স কর্মকর্তরা। দুই বছর আগে পেট্রোবাংলার অধীন সিসিমিক জরিপে মাঝির এলাকায় গ্যাস জোনের অস্তিত্ব মেলে। ওই জরিপের ভিত্তিতেই রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাপেক্স এ তত্ত্বাবধানে রাশিয়ান কোম্পানি গাজপ্রম খননকাজ করছে। কূপের ম্যানেজার ও ড্রিলিং মনিটরিং টিমের প্রধান হেলাল উদ্দিন জানান, ড্রিলিং কাজ শেষে মজুত পরিমাপের জন্য ডিএসটি-১ কাজ শুরু করা হয়েছে।
এটি সম্পূর্ণ আলাদা জোন। এটি দেশের জন্যও সুখবর। সূত্রটি জানায়, ভোলায় এ নিয়ে ৩টি গ্যাসক্ষেত্রে ৬টি কূপখনন করা হয়েছে। ইস্ট-১ ও নর্থ-১ কূপখনন করে রাশিয়ান গাজপ্রম কোম্পানি। ওই কোম্পানি দেড় মাস আগে ৬০ কিলোমিটার দূরের বোরহানউদ্দিন উপজেলার শাহবাজপুর ইস্ট-১ কূপখনন করেছিল। ওই কূপে ৭০০ বিলিয়ন গ্যাসের মজুত পাওয়া যায়। ভোলায় ৬টি কূপের গ্যাসের মজুত প্রায় পৌনে ২ ট্রিলিয়ন ছাড়িয়ে যাওয়ার ধারণা করছেন বাপেক্স কর্মকর্তারা। ফলে এ অঞ্চলে মজুত গ্যাস দিয়ে কলকারখানা স্থাপনে আর কোনো বাধা থাকছে না বলেও জানান, বিশেষজ্ঞরা। বাপেক্স সূত্র জানায়, ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার কাচিয়া এলাকায় ৪টি ও টবগি এলাকায় ১টিসহ ৫টি কূপ ইতিমধ্যে খনন শেষে গ্যাসের মজুত নিশ্চিত হয়েছে। ৪টি থেকে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের ব্যবহার শুরু হয়েছে। তবে এই ৫টি কূপের গ্যাসের স্তর কাছাকাছি রয়েছে। ভোলা-নর্থ কূপ সর্বশেষ খননকৃত শাহবাজপুর ইস্ট-১ কূপ থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে রয়েছে। এ কূপে গ্যাসের আলাদা জোন রয়েছে। প্রথম ১৯৯৫ সালে বোরহানউদ্দিন কাচিয়া ইউনিয়নের প্রথম কূপখননের পর বের হয়ে আসা গ্যাস প্রজ্বলন করা হয়। পরবর্তী সময়ে ওই এলাকায় আরও ৪টি কূপখনন করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভোলায় আরও কয়েকটি গ্যাসের জোন রয়েছে। ওই স্থানেও কূপখনন করা হলে গ্যাসের মজুত আরও বাড়বে।

রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্রে সামরিকভাবে শক্তিশালী হচ্ছে কাতার

রাশিয়া থেকে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এস-৪০০ অন্যান্য অস্ত্র কেনার জন্য আলোচনা করছে কাতার। মস্কোয় নিযুক্ত দোহার রাষ্ট্রদূত ফাহাদ বিন মোহাম্মদ আলে-আতিয়া বৃহস্পতিবার এ কথা জানিয়েছেন। রুশ সংবাদ সংস্থা তাসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, এ সংক্রান্ত আলোচনার অনেক অগ্রগতি হয়েছে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি কাতারের স্থলবাহিনীর জন্য রুশ সামরিক সরঞ্জাম কেনার লক্ষ্যেও কাতার আলোচনা করছে বলে জানান তিনি। গত বছর দোহা-মস্কোর মধ্যে সম্পাদিত সামরিক এবং কারিগরি সহযোগিতাবিষয়ক চুক্তির কথাও তুলে ধরেন তিনি। তিনি বলেন, এ মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে আরো সামরিক সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
কাতারে আরো সেনা মোতায়েন করেছে তুরস্ক
কাতারে আরো একদল সেনা পাঠিয়েছে তুরস্কের সরকার। কয়েকটি আরব দেশের সঙ্গে দোহার যখন চরম উত্তেজনা চলছে তখন নতুন করে এ পদক্ষেপ নিল তুরস্ক। তবে নতুন করে কত সেনা পাঠানো হয়েছে তা জানা যায় নি। কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে তুরস্কের দৈনিক সাবাহ পত্রিকা জানিয়েছে, মঙ্গলবার দোহার দক্ষিণাঞ্চলে উদাইদ বিমানঘাঁটিতে এসব সেনা পৌঁছায়। এর আগে দেশটিতে যেসব তুর্কি সেনা মোতায়েন করা রয়েছে গতকালের সেনারা তাদের সঙ্গে যোগ দেবে। তারিক বিন জিয়াদ ঘাঁটিতে আগের সেনা মোতায়েন রয়েছে। কাতার ও তুরস্কের মধ্যে ২০১৪ সালে সই হওয়া একটি চুক্তির আওতায় দু দেশ কাতারে একটি সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করেছে এবং গত জুন মাসে ওই ঘাঁটিতে প্রথমবারের মতো সেনা পাঠায় তুরস্ক। গত ৫ জুন সৌদি আরব, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মিশর কাতারের ওপর অবরোধ আরোপ করে। এরপরই কাতারের পক্ষে অবস্থান নেয় তুরস্ক এবং কয়েকদিনের মধ্যে দেশটিতে সেনা পাঠায়। এছাড়া, কাতারের সহায়তায় ইরান খাদ্য সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসে।
পেন্টাগন থেকে সামরিক সহায়তা পাচ্ছে কাতার
আমেরিকার বোয়িং কোম্পানি শেষ পর্যন্ত কাতারের কাছে ৩৬টি এফ-১৫ জঙ্গিবিমান বিক্রির অনুমতি দিয়েছে। ৭২টি জঙ্গিবিমান কেনার জন্য গত জুন মাসে আমেরিকার সঙ্গে একটি চুক্তি করেছিল কাতার কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেশটিকে তার অর্ধেক বিমান দেয়া হচ্ছে। মা র্কিন সেনা সদরদপ্তর পেন্টাগন বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।গত জুন মাস থেকেই সৌদি আরবের সঙ্গে কাতারের প্রচণ্ড কূটনৈতিক তিক্ততা সৃষ্টি হয় এবং কাতারের ওপর সর্বাত্মক অবরোধ আরাপ করে সৌদি আরব, বাহরাইন, সংযুক্ত আব আমিরাত ও মিশর। সৌদি আরব এবং কাতার- দু দেশের সঙ্গেই মিত্রতার সম্পর্ক রয়েছে আমেরিকার। পুরো চুক্তির জন্য কাতারকে এক হাজার ২০০ কোটি ডলার খরচ করার কথা ছিল এবং ২০২২ সালের শেষ দিক থেকে এসব বিমান কাতারকে সরবরাহ করা হবে বলে চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে। চলতি মাসের প্রথম দিকে কাতার জানিয়েছে, ব্রিটেনের কাছ থেকে ২৪টি টাইফুন জঙ্গিবিমান কিনবে দোহা যার জন্য ব্যয় হবে আটশ কোটি ডলার।
তুরস্কের বৃহত্তম সামরিক প্রশিক্ষণ স্থাপনা কাতারে
দেশের বাইরে কাতারে সবচেয়ে বড় সামরিক প্রশিক্ষণ স্থাপনা তৈরি করেছে তুরস্ক। রবিবার কাতারে এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটির উদ্বোধন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে মূলত নিজেদের আরো বেশি শক্তি বৃদ্ধি করল তুরস্ক।দেশ দু’টির কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে এই অঞ্চলের দেশগুলোর নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার বিষয়টি। কাতারের প্রতিরক্ষাবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী খালিদ বিন মোহাম্মদ আল আতিয়াহ এবং তুরস্কের জাতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রী নুরেত্তিন কানিক্লি প্রশিক্ষণ স্থাপনাটির উদ্বোধন করেন। এতে কাতারের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, তুরস্ক ও অন্যান্য দেশের কূটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটিতে হেলিকপ্টার ফ্লাইট সিমুলেশনের সুবিধাও থাকবে। কাতারের সরকার ও জনগণ তুরস্কের এই সহযোগিতার প্রশংসা করছে এবং এটি ভবিষ্যতে দেশটির সামরিক বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণে অনেক ভূমিকা রাখবে। অনুষ্ঠানে সামরিকভাবে শক্তিশালী করতে কাতারের প্রতি তুরস্কের এই সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে জানানো হয়। এ সামরিক প্রশিক্ষণ স্থাপনাটি নির্মিত হবে তুরস্ক সরকার, বিমান প্রতিরক্ষা এবং সেনা সফটওয়্যার কোম্পানি হ্যাভেলসান এর যৌথ উদ্যোগে। অত্যাধুনিক প্রশিক্ষণ সরঞ্জামের পাশাপাশি উৎকর্ষ প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো হবে। সময়োপযুগী ও মানসম্মত প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা থাকবে। তুরস্কের জাতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রী নুরেত্তিন কানিক্লি বলেন, তুরস্ক-কাতারের মধ্যে রয়েছে ভ্রাতৃপ্রতিম সম্পর্ক, কৌশগত ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বেশ জোরদার। আমরা দিন দিন প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করছি। সামরিক শক্তি বৃদ্ধির উদ্দেশ্যেই নতুন প্রশিক্ষণের সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছি। যেসব দেশ তাদের প্রতিরক্ষা সেক্টরকে অবহেলা করছে, দীর্ঘমেয়াদে তাদের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়ছে। তুরস্ক প্রতিরক্ষা সামর্থ্যে যথেষ্ট অগ্রসর। বিশেষ করে ড্রোন প্রযুক্তিতে তুরস্ক বেশ এগিয়ে রয়েছে। ভবিষ্যতে ড্রোনের মাধ্যমেই সামরিক বিমান-হেলিকপ্টার পরিচালিত হবে।
ইতোমধ্যেই কাতার বিমান বাহিনীর ৫৫ জন পাইলট এবং ৪০ জন ইঞ্জিনিয়ার গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে। তুরস্কই কাতারের সেনা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখে চলেছে। কাতার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামরিক শক্তি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছে। ২০১৫ সালে সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে দুই দেশ। সম্পাদিত সামরিক সহযোগিতা চুক্তির মধ্যে ছিল অপারেশনের অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ বিনিময়, সামরিক শিল্পের উন্নয়ন, প্রয়োজনের সময়ে উভয় দেশে যৌথ সেনাবাহিনী ফের মোতায়েন ও যৌথ সামরিক মহড়া। এই চুক্তি এই অঞ্চলে তুরস্কের জন্য কৌশলগত ক্ষেত্র প্রদান করেছিল। এই চুক্তি কাতারে তুরস্কের সশস্ত্রবাহিনী মেতায়েনকে অনুমোদন করেছিল একইভাবে কাতার ও তুরস্কের ভূমিতে তার সশস্ত্রবাহিনী মোতায়েন করতে পারবে বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। ২০১৪ সালে চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে তুরস্ক কাতারে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে। সেখানে বর্তমানে তুর্কি সেনা মোতায়েন রয়েছে। কাতার শুরুতে পদাতিক সেনা, পরে নৌবাহিনীর সদস্য এবং এফ-১৬ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে। এই সামরিক ঘাঁটি উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদানকারী। উল্লেখ্য সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে বিশ্বে অন্যতম শক্তিধর দেশ তুরস্ক। জনশক্তি, যুদ্ধাস্ত্র, প্রযুক্তি-প্রশিক্ষণ ও সামরিক ব্যয়সহ বিভিন্ন দিক থেকে তুর্কি সামরিক বাহিনী বিশ্বের সেরা বাহিনীগুলোর একটি। ১৯৫২ সাল থেকেই দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্য।

সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে দাঁড়ান : সু চিকে রিচার্ডসন

মিয়ানমার পরিস্থিতিতে সে দেশের সেনাবাহিনীকে দায়ী করেছেন রাখাইন পরিস্থিতি নিয়ে গঠিত পরামর্শক কমিটি থেকে সদ্য পদত্যাগ করা মার্কিন কূটনীতিক বিল রিচার্ডসন। সু চিকে তিনি আহ্বান জানিয়েছেন সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে। পাশাপাশি মিয়ানমারে এখনই পশ্চিমা অবরোধ না করার অনুরোধ জানিয়েছেন এবং অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে সু চিকে বের করে আনতে তাকে আরেকটিবার সুযোগ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এই পশ্চিমা কূটনীতিক। ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্বপরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ছয় লাখেরও বেশি মানুষ। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এ ঘটনায় খুঁজে পেয়েছে মানবতাবিরোধী অপরাধের আলামত। জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার কমিশন এই ঘটনাকে জাতিগত নিধনযজ্ঞের ‘পাঠ্যপুস্তকীয় উদাহরণ’ আখ্যা দিয়েছে। রাখাইনের সহিংসতাকে জাতিগত নিধন আখ্যা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী।
দেশটির গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেত্রী ও রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চিও রোহিঙ্গাদের পক্ষে কোনো ইতিবাচক ভূমিকা নিতে সক্ষম হননি। এ নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিতর্কিত হয়েছেন তিনি। হারিয়েছেন বহু সম্মাননা। তবু সেই সু চিকেই ভরসা করতে চান রিচার্ডসন। বলেন, ‘আমি মনে করি, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে অভিযুক্ত খুবই জরুরি এবং সু চিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি সফলভাবে কাজটি করতে সক্ষম। আমি মনে করি, সু চির এই কাজ শুরু করা উচিত।’ আশয় নেয়া রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দেয়ার পাশাপাশি তাদের ফিরিয়ে নেয়ার জন্যও মিয়ানমারকে চাপ দিচ্ছিল বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক বিশ্ব। গত ২৩ নভেম্বর বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য একটি অ্যারেঞ্জমেন্ট চুক্তিতে সই করেন। এরপর ১৯ ডিসেম্বর যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হয় এবং ১৬ জানুয়ারি ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট চুক্তি সই হয়। সর্বশেষ অ্যারেঞ্জমেন্ট অনুযায়ী দুই দেশের সীমান্তে অস্থায়ী ক্যাম্পে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ২৩ জানুয়ারি প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা ছিল। তবে এখনো অনেক কাজ বাকি বলে সেটিও পিছিয়ে যায়। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে শুরু হতে যাওয়া সেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়েও কথা বলেন রিচার্ডসন। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ফেরাতে তড়িঘড়ি করা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

যৌন হয়রানি : রিপাবলিকান পদ থেকে ক্যাসিনো মোগলের পদত্যাগ

স্টিভ উইন কেবল ক্যাসিনো জগতের একজন হোমড়া-চোমড়া ব্যক্তিই নন, তিনি রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটির অর্থনীতি-বিষয়ক চেয়ারম্যান ছিলেন। তবে যৌন হয়রানির অভিযোগের মুখে তিনি সে পদ থেকে এবার সরে দাঁড়িয়েছেন। শুক্রবার ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ৭৬ বছর-বয়সী কোটিপতি মেসেজ থেরাপিস্টদের যৌন হয়রানি করতেন এবং একজনকে তার সাথে যৌন সম্পর্কে স্থাপনে বাধ্য করেন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের রিপোর্ট অনুসারে, সেখানে বলা হয় তারা ডজন-খানেক লোকের সাক্ষাতকার নিয়েছে যারা উইনের সাথে কাজ করেছেন। তাদের বক্তব্যে উইনের বিরুদ্ধে বিভিন্নভাবে হয়রানি করার অভিযোগ এসেছে। প্রায়ই তিনি তার ব্যক্তিগত অফিসে মেসেজ থেরাপিস্টদের হয়রানি করতে বলে অভিযোগ রয়েছে।
মেনিকিউর করার কাজ করতেন এমন একজন নারী উইনের বিরুদ্ধে জোর করে যৌন সম্পর্কে স্থাপনে বাধ্য করার অভিযোগ তুলেছেন, তাকে সাড়ে সাত মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রদান করেছেন এই ক্যাসিনো মোগল। আদালতে দাখিল করা দলিলে এমনই উঠে আসে বলে রিপোর্টে বলা হয়। উইন অবশ্য কোনো ধরনের অসদাচরণের অভিযোগ অস্বীকার করে এগুলোকে 'হাস্যকর' বলে মন্তব্য করেছেন। উইন রিপাবলিকান দলের একজন অর্থ-দাতা এবং তহবিল সংগ্রাহক। এই বিষয়টিতে রিপাবলিকানদের নীরবতার কারণে তারা ডেমোক্রেটিক ন্যাশনাল কমিটির তোপের মুখে পড়েছে। রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটির প্রধান রন্না ম্যাকড্যানিয়েল জানিয়েছেন উইনের পদত্যাগপত্র তিনি গ্রহণ করেছেন। এদিকে উইন তার ভাষায় এসব 'অপবাদ' তৈরির জন্য তার সাবেক স্ত্রীকে দোষারোপ করেছেন যার সাথে তার আইনি লড়াই চলছে।

ব্রাজিলে নাইটক্লাবে বন্দুক হামলা, হতাহত ২০

ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ফর্টালেজা নগরীতে বন্দুক হামলায় কমপক্ষে ১৪ জন নিহত ও অপর ছয় জন আহত হয়েছেন। শনিবার স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছে। খবর বার্তা সংস্থা সিনহুয়া’র। ভোরে জনাকীর্ণ ‘ফোরো ডো গাগো’ নাইটক্লাবে একদল অস্ত্রধারী লোক নির্বিচারে গুলি চালায়। সেখানে তখন একটি অনুষ্ঠান চলছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা স্থানীয় গ্লোবো টিভিকে জানায়, বন্দুকধারীরা তিনটি গাড়িতে করে এসে ক্লাবের সামনে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। তারা আধাঘণ্টা ধরে তাণ্ডব চালিয়ে পালিয়ে যায়।
এই ঘটনায় বেশ কয়েকজন হতাহত হয়েছেন। স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, এই ঘটনায় ১৪ জন নিহত ও অপর ছয়জন আহত হয়েছেন। হতাহতদের মধ্যে কয়েকজন শিশু রয়েছে। হাসপাতাল সূত্র জানায়, আহতদের মধ্যে দু'জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করা কয়েকটি ছবিতে দেখা গেছে, মাটিতে কমপক্ষে ১২টি লাশ পড়ে আছে। এদের অধিকাংশই নারী। স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, তারা এর আগে এমন নির্মম ঘটনা দেখেনি। ‘পরিকল্পিতভাবে’ এই হামলা চালানো হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা হেলিকপ্টারে করে অপরাধীদের খোঁজে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছে। ওই অঞ্চলে দুটি মাদক চক্রের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব ও বিরোধ চলছে এই ঘটনার সাথে তার কোনো সম্পৃক্ততা রয়েছে কিনা- পুলিশ তা খতিয়ে দেখছে।

তেহরানে প্রবল তুষারপাত : বিমানবন্দর ও স্কুল বন্ধ ঘোষণা

ইরানের রাজধানী তেহরানে গতরাতে প্রবল তুষারপাত হয়েছে। তীব্রতা কিছুটা কমলেও তুষারপাত থেমে নেই। গতরাত থেকে টানা তুষারপাতের কারণে শুভ্রতায় ঢেকে গেছে নগরীর অধিকাংশ এলাকা। প্রবল তুষারপাতের কারণে নগরীর দু’টি বিমানবন্দরেই বিমান ওঠানামা বন্ধ রয়েছে। সব স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
নগরের শিশু-কিশোরেরা মেতে উঠেছে তুষার উৎসবে। পার্কে ও বাড়ির সামনে চলছে তুষার নিয়ে নানান খেলা। কেউ কেউ তুষার দিয়ে তৈরি করছে পুতুল। কেউ আবার নানা ধরনের ঘর ও টাওয়ার। চলতি শীত মৌসুমে এর আগে তেহরানের বিভিন্ন এলাকায় তুষারপাত হলেও তা ছিল খুবই সামান্য। রাজধানী তেহরান ছাড়াও আরও ১৬টি প্রদেশে প্রবল তুষারপাত হচ্ছে। কোনো কোনো শহরে সরকারি অফিসও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি বলেছে, যারা গাড়ি নিয়ে বাইরে বেরুতে চান তাদেরকে অবশ্যই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। বরফে ঢাকা রাস্তায় চলাচলের সরঞ্জাম সঙ্গে রাখতে অনুরোধ করা হয়েছে।

মুক্তির আগে সৌদি প্রিন্স আল ওয়ালিদ বিন তালালের সাক্ষাৎকার

সৌদি আরব থেকে পাওয়া খবরে জানা গেছে, সেদেশের এক দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের সময় আটক হওয়া ধনকুবের প্রিন্স আল ওয়ালিদ বিন তালাল মুক্তি পেয়েছেন। নভেম্বর মাসে ওই অভিযান শুরু হয়েছিল। প্রিন্স তালালের পারিবারিক সূত্রগুলো রয়টার্স বার্তা সংস্থাকে বলেছেন, রিয়াদের একটি বিলাসবহুল হোটেল থেকে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। প্রিন্স তালাল ওই হোটেলে মুক্তি পাওয়ার আগে ৩০ মিনিট ধরে রয়টার্সকে এক সাক্ষাৎকার দেন যা শনিবার প্রকাশিত হয়েছে এবং তাতে তিনি বলেছেন, তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনা হয়নি, এবং তিনি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে সমর্থন করেন। এই হোটেলে তিনি আটক ছিলেন গত নভেম্বর মাস থেকে। আটক হওয়ার পর সৌদি আরবের অত্যন্ত প্রভাবশালী ও ধনকুবের এই ব্যবসায়ী এই প্রথম একটি সাক্ষাৎকার দিলেন। তার কিছু অংশ এখানে তুলে ধরা হলো।
প্রশ্ন : প্রধান প্রশ্ন হচ্ছে আপনি এখানে কেন?
উত্তর : এখানে আরো বেশ কয়েকজন আছেন। আমরা সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করছি কারণ আমিও সরকারের একটি অংশ। আমি সৌদি শাসক পরিবারেরও অংশ। আমাদের আলোচনা চলছে। আমার বিশ্বাস আর অল্প ক'দিনের মধ্যেই আমরা সবকিছু শেষ করে আনতে পারবো।
প্রশ্ন : আপনার বিরুদ্ধে কি কি অভিযোগ আনা হয়েছে?
উত্তর : কোনো অভিযোগ নেই। সরকার ও আমার মধ্যে কিছু বিষয়ে শুধু আলোচনা হচ্ছে। অনেক বিষয় আছে যা আমি এখনই প্রকাশ করতে পারবো না। প্রথমে আপনাকে আশ্বস্ত করছি যে এই গল্পের প্রায় শেষ পর্যায় ে আমরা পৌঁছে গেছি। তবে আমি ভালো আছি কারণ আমি তো আমার নিজের দেশেই আছি। নিজের শহরেই আছি। আমার মনে হ চ্ছে যে আমি আমার বাড়িতেই আছি। এখানে কোনো সমস্যা নেই। সবকিছু ঠিক আছে।যেসব কারণে আপনি আমার সাথে কথা বলছেন এর সবগুলোই গুজব যা বিশেষ করে বিবিসিতে এসেছে। এতে আমি খুব হতাশ হয়েছি। খোলামেলা-ভাবে বলতে গেলে এর সবই মিথ্যা। এই হোটেলে আমি সবসময়ই ছিলাম এবং এখানে সবকিছুই ঠিক আছে। আমি ব্যায়াম করছি, সাঁতার কাটছি, হাঁটাচলা করছি। আমার আমার ডায়েট খাবারও পাচ্ছি।এখানে প্রতিদিন আমার পরিবারকে ডেকে পাঠাই। এটা আমার অফিসের মতো। আমার ব্যক্তিগত অফিস, রাজ পরিবারের অফিস, আমার কিছু দেশসেবার কাজ- সবকিছুর সাথেই আমার যোগাযোগ আছে। সবকিছুই ঠিকঠাক মতো চলছে।
প্রশ্ন : বিশেষ কোন গুজবে আপনি হতাশ হয়েছেন?
উত্তর : এটা আমি বিবিসি এবং অন্য জায়গাতেও দেখেছি। সেখানে বলা হয়েছে যে আল ওয়ালিদকে অন্য জায়গায় আসল কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এবং তাকে নির্যাতন করা হয়েছে। এসব খবর খুবই দুর্ভাগ্যজনক।আমি বের হওয়ার সাথে সাথেই একটি সাক্ষাৎকার দে য়ার পরিকল্পনা করছিলাম। এবং কয়েক দিনের মধ্যেই এটা হবে। কিন্তু এই সাক্ষাৎকারটি আমি এখনই দিচ্ছি কারণ নানা রকমের গুজ ছড়িয়ে পড়ছে। এসব একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। এসব এক গাদা মিথ্যা কথা।
প্রশ্ন : কিন্তু কি অভিযোগের কারণে আপনাকে এখানে আটকে রাখা হয়েছে?
উত্তর : দেখুন, আমি খুব শীর্ষস্থানীয় একজন ব্যক্তি, জাতীয়ভাবে, আঞ্চলিকভাবে এবং আন্তর্জাতিকভাবে। আমি অনেক প্রকল্পের সাথে জড়িত আছি। আমার গোপন করার কিছু নেই। আমি এখানে খুব ভালো আছি। আরাম করছি। আমি এখানে শেভ করি, যেমন বাড়িতেও করি। নাপিত এখানে এসে চুল কাটে। সত্যি করে বলি, আমার মনে হয় যে আমি আমি বাড়িতেই আছি। এখানে বিশেষ কিছু নেই। খুব সাধারণ কিছু বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। আমি সরকারকে বলেছি, তারা যতো দিন চায় আমি এখানে থাকবো। কারণ আমি চাই সত্যটা বেরিয়ে আসুক।
প্রশ্ন : কোন কোন ডিল ঠিক ছিলো না বলে তারা বলছে?
উত্তর : এখানে ঠিক বেঠিকের কিছু নেই। সবকিছুই ঠিক আছে।
প্রশ্ন : কিন্তু দুর্নীতি-বিরোধী অভিযান তো চলছে।
উত্তর : দুর্নীতি-বিরোধী- এটা একটা বড় কথা। এখানে অনেকেই আছেন যাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগই আনা হয়নি। কারণ আমি জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে এতো সব প্রকল্পের সাথে জড়িত আছি, এতো সব স্বার্থ, আমি তাদের বলেছি, আপনারা আপনাদের সময় নিন। সবকিছু  খতিয়ে দেখুন। তারপরেই সব ঠিক হয়ে যাবে।আসলে আমি আরো কিছু দিন আগেই এখান থেকে চলে যেতে পারতাম। আমাকে এরকম প্রস্তাবও দেয়া হয়েছে। কিন্তু আমি না করে দিয়েছি। বলেছি সবকিছু সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আমি এখান থেকে যাবো না। কারণ সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাওয়া খুবই জরুরি। আর সেটাই হতে যাচ্ছে।
প্রশ্ন : আপনার সাথে কোন ধরনের বোঝাপড়া নিয়ে আলোচনা হচ্ছে? সরকার আপনার কাছে কতো অর্থ চাইছে? তারা কি সম্পদ চায় নাকি কোম্পানিতে ভাগ চাইছে?
উত্তর : এরকম কথা আসলে আমি ব্লুমবার্গে পড়েছি। তারা বলছে যে সরকার আমার কাছ থেকে ছয় শ' কোটি ডলার এবং কিংডম হোল্ডিং এর বড় একটা অংশ নিতে চাইছে। কিন্তু এসব মিথ্যা। আসলে আমি এসব নিয়ে কোনো কথা বলতে চাইনি। কিন্তু আমাকে নির্যাতন করার কথা যখন বলা হয়েছে তখনই আমি এই সাক্ষাৎকারটি দিতে রাজি হই।
প্রশ্ন : আপনি চলে যাওয়ার সময় কি আর্থিক বোঝাপড়া হতে পারে?
উত্তর : সেরকম কিছুর দরকার নেই। আমি ফাঁস করতে পারবো না। কারণ এখানে দুটি পক্ষ আছে। এখনও পর্যন্ত ভালোই আলোচনা হয়েছে। যখন আমার মতো একজন হাই-প্রোফাইল ব্যক্তিকে ঘিরে কিছু সন্দেহ তৈরি হয় তখন সেগুলো পরিষ্কার করে ফেলা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সারা বিশ্বেই আমার বিনিয়োগ আছে। পুরোপুরি সত্যতা নিশ্চিত করেই আমি এখান থেকে যাবো। ধীরে ধীরে আমার তার দিকেই অগ্রসর হচ্ছি।
প্রশ্ন : এটা কিভাবে সমাধান হতে পারে বলে আপনি আশা করছেন? আপনি কি কোনো ধরনের ডোনেশন দেবেন?
উত্তর : সরকারের সাথে আমরা এখন আলোচনা করছি। তাদের সাথে চূড়ান্ত আলোচনায় আপনাকে আসতে দিতে পারি না। তবে আমরা সেরকম একটা চূড়ান্ত জায়গায় পৌঁছে গেছি।
প্রশ্ন : এখানে কি রাজনীতির কোনো ভূমিকা আছে? আপনার পিতা প্রিন্স তালালের কোনো বিষয় কি আছে যে তিনি চান না যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ক্ষমতায় আসুক? নাকি এটা শুধুই দুর্নীতির বিষয়?
উত্তর : এখানে রাজনীতির কিছু নেই। অর্থনীতি বা দুর্নীতির সাথেও কিছু নেই। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমি এখানে আছি। আছি সত্যটাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। এই সত্য ১০০ ভাগ প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত আমি এখানে থাকতে চাই। আমি বলতে পারি আমরা এর ৯৫ শতাংশ অর্জন করেছি।
প্রশ্ন : রিটজ হোটেল ছেড়ে যাওয়ার পর কি হতে পারে বলে আমি আশা করেন? আপনি কি সৌদি আরবেই থাকবেন?
উত্তর : আমি সৌদি আরব ছেড়ে যাবো না। এটা নিশ্চিত। এটা আমার দেশ। আমার পরিবার, আমার সন্তান, আমার নাতি নাতনিরাও এখানে। এখানে আমার সহায় সম্পত্তি আছে। বাদশাহ, যুবরাজ কিম্বা সৌদি আরবের প্রতি আমার যে আনুগত্য সেটা নিয়ে কোনো আপস করা যাবে না।
প্রশ্ন : আপনি কি মনে করেন যে কোন একটা পর্যায়ে আপনার কোনো সম্পদ রাষ্ট্রের হাতে তুলে দিতে হবে?
উত্তর : না, না, এরকম কিছু নয়। এরকম কিছুই হবে না। এরকম কিছু হয়নি।
প্রশ্ন : আপনি কি আপনার কোম্পানির লোকজনের সাথে কথা বলতে পারে?
উত্তর : হ্যাঁ, কিংডম হোল্ডিংয়ের প্রতিনিধিরা যখনই কথা বলতে চেয়েছেন তারা আমার সাথে কথা বলতে এখানে এসেছেন। যখনই দরকার হয়েছে আমি তাদের সাথে কথা বলেছি। কখনো প্রতিদিন আবার কখনও দুই একদিন পর পর। এবং আমার পরিবারের সাথেও। এই তো ছেলের সাথে, মেয়ের সাথে আজ কথা বললাম। আমার নাতনিদের সাথেও আমি আজ কথা বলেছি।
প্রশ্ন : আপনি কি মনে করেন যে সৌদি আরবে আপনার বাড়ির মালিকানা আপনারই থাকবে?
উত্তর : হ্যাঁ। দোষ প্রমাণিত হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রত্যেক মানুষই নির্দোষ। আমি জানতাম আপনি এরকম একটা প্রশ্ন করতে পারেন। আমি একজন সৌদি নাগরিক এবং রাজ পরিবারের সদস্য। আমি জানি, লোকজন জিজ্ঞেস করছেন আলওয়ালিদ এখানে কেন। এটা জানতে চাইছে কারণ এটার কোন অর্থ হয় না। আমি দান করি, দেশপ্রেমের মতো কাজ আছে আমার। এখানে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে এবং এটা এখন পরিষ্কার হয়ে গেছে।
প্রশ্ন : ভবিষ্যতের আয় থেকে কিছু দেওয়ার ব্যাপারে কি অঙ্গীকার করেছেন? এসব নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে? আরামকোতে বিনিয়োগের মতো কিছু?
উত্তর : না না, ওরকম কিছুই না।
প্রশ্ন : তার মানে আপনি কোন ধরনের ডোনেশন দিচ্ছেন না?
উত্তর : না, কিছুই না।
প্রশ্ন : মুক্তি পাওয়ার পর আপনি কি করবেন?
উত্তর: সেই আগের মতোই। অন্য কিছু নয়। আমি বাইরে যাবো। আমি আমার অফিসে যাবো। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে আমি মরুভূমিতে যাবো। এবং নিরামিষাশী হিসেবে আমি আমার জীবন চালিয়ে যাবো।
প্রশ্ন : এই হোটেলে আপনি প্রতিদিন কি করেন?
উত্তর : এই যে আমার টেনিস খেলার জুতা। আমি হাঁটি, সাঁতার কাটি, ব্যায়াম করি, আমি খবর দেখি।
প্রশ্ন : আপনি যখন সরকারের সাথে কথা বলেন তখন তারা আপনাকে কি বলে?
উত্তর : সেটা তো আমি প্রকাশ করতে পারবো না। তবে আমরা গত ৩০ বছর ধরে সৌদি আরবে কাজ করছি। এখন দেশটিতে নতুন নেতৃত্ব পেয়েছি। তারা এখন খুঁটিনাটি সবকিছু করার চেষ্টা করছে। আমি বলেছি, ঠিক আছে, আমার কোনো সমস্যা নেই। আপনারা অগ্রসর হোন। আমি সম্পূর্ণ সহযোগিতা করবো।
প্রশ্ন : এই বিষয়টি কি বিচার পর্যন্ত গাড়ে পারে এবং আপনি কি জেলেও যেতে পারেন?
উত্তর : বিচারের কোন সম্ভাবনা নেই। জেলের প্রশ্নও আসে না।
প্রশ্ন : যে প্রক্রিয়াটা চলেছে আপনি কি মনে করেন এটা সৌদি আরবের জন্যে ভালো?
উত্তর : আমার মনে হয় তারা পক্ষপাতহীন ও সৎভাবেই কাজ করেছেন। সৌদি আরবে যে দুর্নীতি আছে সেটা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এটা দুর্ভাগ্যজনক যে দুর্নীতিবিরোধী এক ব্যক্তিও এই পাকের মধ্যে পড়ে গেছে। বহু লোক এখানে এসেছেন। প্রায় তিন শ'র মতো। আমার মনে হয় এদের বেশিরভাগই এখন মুক্ত। এবং সত্যি কথা বলতে বেশিরভাগই নির্দোষ। বাকিদের জন্যে সমঝোতা হয়েছে। তবে সেটা শুধু তাদের ও সরকারের মধ্যে। গত দশকে প্রচুর অর্থের অপচয় হয়েছে। সরকারের কোন কোন ব্যক্তি দুর্নীতির সাথেও জড়িত ছিলেন। আমার মনে হয় এসব আগাছা উপড়ে ফেলা ভালো। এর মধ্য দিয়ে সৌদি আরব আরো পূত পবিত্র হয়ে উঠবে। আমি শুধু বলবো যে আমি বাদশাহ ও যুবরাজ যে নতুন সৌদি আরব তৈরির জন্যে কাজ করছেন আমি তাতে পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছি।

ইরান ও রাশিয়ার সহযোগিতায় যুদ্ধ চলবে : প্রেসিডেন্ট আসাদ

সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ বলেছেন, ইরান ও রাশিয়ার সহযোগিতায় তার দেশ সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। একইসঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সংকট সমাধানেরও চেষ্টা চালানো হবে বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি। সিরিয়া সফররত ইরানের আরব ও আফ্রিকা বিষয়ক উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন জাবেরি আনসারির সঙ্গে দামেস্কে এক বৈঠকে এ মন্তব্য করেন প্রেসিডেন্ট আসাদ।
বৈঠকে ইরান ও সিরিয়ার মধ্যে সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধসহ নানা ইস্যুতে কৌশলগত সহযোগিতা শক্তিশালী করার উপায় নিয়ে আলোচনা করেন আসাদ ও জাবেরি আনসারি। রাশিয়ার সোচি শহরে সিরিয়ার সরকার ও বিরোধী পক্ষগুলোর মধ্যে আগামীকাল সোমবার থেকে যে সম্মেলন শুরু হতে যাচ্ছে সে সম্পর্কেও তারা মতবিনিময় করেন। রাশিয়া গত বৃহস্পতিবার ঘোষণা করে, আসন্ন এ সম্মেলনে প্রায় ১,৬০০ প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করবেন। বৈঠকে সিরিয়ার উপ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল মিকদাদ এবং প্রেসিডেন্টের সিনিয়র উপদেষ্টা বুসিনা শাবান উপস্থিত ছিলেন। সিরিয়ার সেনাবাহিনী দেশটিতে তৎপর উগ্র সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ করছে তাতে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করছে রাশিয়া। সিরিয়া সরকারের অনুরোধে সাড়া দিয়ে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর অবস্থানে বিমান হামলা চালিয়ে আসছে রাশিয়া। এদিকে, ইরান এ যুদ্ধে সিরিয়াকে সামরিক পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করছে।

মোবাইল ফোনে কিভাবে আনা হয় সোনার চালান?

শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ঢাকায় বিমানবন্দরে একজন যাত্রীর দুটি মোবাইল ফোনের ভেতর অভিনব কায়দায় লুকানো ১০টি স্বর্ণের বার আটক করেছেন । শুল্ক গোয়েন্দাদের তথ্য অনুসারে আটক স্বর্ণ বারের মোট ওজন ১১৬০ গ্রাম। শনিবার চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে অবতরণ করার পর ওই ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার কাছে থাকা মোবাইল ফোন-সেটের ভেতর স্বর্ণের বার পাওয়া যায়। তাকে আটক করা হয়। যাত্রীদের অন্তর্বাস, জুতোসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে বহন করে বিভিন্ন সময় বাংলাদেশে ঢুকছে সোনার চালান।
সর্বশেষ মোবাইলে করে সোনা বহনের খবর এলো। মোবাইল ফোনে কিভাবে বহন করা হয় সোনার বার? শুল্ক গোয়েন্দাদের দেয়া ছবি অনুসারে দেখা যায়, মোবাইল ফোন-সেটের যে জায়গাটিতে ব্যাটারির স্থান সেখানে সোনার বারগুলো লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুসারে ওই ব্যক্তির নাম যা রয়েছে, বোর্ডিং পাশ অনুসারে তার সাথে মিল নেই। কর্মকর্তারা জানান, এনআইডিতে তার নাম উল্লেখ রয়েছে, মোহাম্মাদ আবু তাহের, বাড়ি চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়ায়। কিন্তু বোর্ডিং পাশ অনুযায়ী যাত্রীর নাম মোহাম্মাদ আব্দুর রহিম। তিনি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসেন। তবে বিমানের ফ্লাইটটি মাস্কাট থেকে চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকায় পৌঁছায়। ধারণা করা হচ্ছে, মাস্কাট থেকে আগত কোনো যাত্রীর থেকে এই স্বর্ণ তার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

বিশ্বের প্রবীণতম গরিলাটির মৃত্যু

পৃথিবীর সবচেয়ে প্রবীণতম গরিলার মৃত্যু হয়েছে। তার বয়স হয়েছিল ৬০ বছর। বৃহস্পতিবার ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগোর চিড়িয়াখানায় বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যু হয় ভিলা নামের ওই গরিলার। বর্তমান বিশ্বে সব চেয়ে বেশি বছর ধরে বেঁচেছিল এই ভিলা।
১৯৫৭ সালে আফ্রিকার কঙ্গোয় জন্ম হয় এই স্ত্রী গরিলাটির। এর দু’বছর পর ১৯৫৭ সালে নিয়ে আসা হয় চিড়িয়াখানায়। এর পর ১৯৭৫ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার এই সাফারি পার্কে নিয়ে আসা হয়। সেই থেকেই ভিলা রয়ে গিয়েছিল এখানে। বিজ্ঞানীদের মতে গরিলার গড় আয়ু সাধারণত ৩৫ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত হয়ে থাকে। এর পর তারা রোগাক্রান্ত হয়ে বা নিজেদের মধ্যে মারামারি করে অথবা অসুস্থ হয়ে মৃত্যু হয়।

প্রণব মুখার্জির মিশন! by সৈয়দ আবদাল আহমদ

বাংলাদেশ ঘুরে গেলেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি। তার পাঁচ দিনের এই সফর ছিল খুবই আলোচিত। সরকারি মহল এ সফরকে এতটাই গুরুত্ব দেয় যে, মনেই হয়নি প্রণব মুখার্জি একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি। সফরকালে তার সম্মানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে মধ্যাহ্নভোজ ও রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বঙ্গভবনে নৈশভোজের আয়োজন করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে দিয়ে বিশেষ সমাবর্তন আয়োজন করে প্রণব মুখার্জিকে সম্মানসূচক ‘ডি লিট’ ডিগ্রি প্রদান করা হয়। অতীতে বহুবার বাংলাদেশে এলেও এবারই প্রথম তিনি বন্দরনগরী চট্টগ্রাম সফর করেন। ‘ডি লিট’ ডিগ্রি গ্রহণ ছাড়াও তিনি সেখানকার প্রাচীন ও ঐতিহাসিক স্থানও পরিদর্শন করেন। বাংলা একাডেমিতে আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে তিনি প্রধান অতিথি হয়ে বক্তৃতা করেন। এই সম্মেলন উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওইদিনই প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশে আসেন। দিল্লি ফেরার আগে তিনি ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে যান এবং শেখ মুজিবের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পরিদর্শন বইতে লেখেন- ‘সর্বকালের সাহসী নেতাকে স্যালুট জানাই।’ ২০১৩ সালে প্রণব মুখার্জি ভারতের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি হিসেবে বাংলাদেশেই প্রথম সফর করেছিলেন। তখন তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ‘ডি লিট’ ডিগ্রি দিয়েছিল। অবসরের পরও তার প্রথম সফর বাংলাদেশে। তবে এবারের এই সফর নানা জল্পনা ও কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে। সফরের প্রথম দিন ভারতীয় হাইকমিশনে তোলা একটি ছবি রীতিমতো বিতর্কের সৃষ্টি করে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ছবি হইচই ফেলে দেয়। ছবিতে দেখা যায়, প্রণব মুখার্জি সামনে চেয়ারে বসে আছেন আর বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন সিনিয়র রাজনীতিবিদ পেছনে দাঁড়ানো। এর মধ্যে রয়েছেনÑ সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ, জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। ভারতীয় হাইকমিশনের দেয়া নৈশভোজ শেষে ছবিটি তোলা হয়।
এই ছবি হাইকমিশনের ফেসবুক ও টুইটার পেজে আপলোড করা হলে সৃষ্টি হয় বিতর্ক। ছবিটির অর্থ অনেকের কাছে এমন দাঁড়ায়- এ যেন মোড়লিপনারই চরম নিদর্শনমূলক একটি ছবি। ছবিটি নিয়ে নানা ধরনের মন্তব্য ও সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে পরে অবশ্য ভারতীয় হাইকমিশন ওই পেজ থেকে তা সরিয়ে ফেলে। এ নিয়ে হাইকমিশন একটি ব্যাখ্যাও দেয়। প্রণব মুখার্জির সাথে সাক্ষাৎ করতে ভারতীয় হাইকমিশনে ওইদিন নাকি ১৭-১৮টি গ্রুপ গিয়েছিল। তাদের আগ্রহেই তিনি ছবি তোলেন। সে যাই হোক, প্রণব মুখার্জিকে নিয়ে কৌতূহলের বিষয় ছবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; কৌতূহলের আরো কারণ আছে। উপমহাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, যারা হিংসাত্মক আক্রমণের শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন, প্রণব মুখার্জি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দেয়া ভাষণে তাদের নাম উল্লেখ করলেও রহস্যজনক কারণে জিয়াউর রহমানের নাম উচ্চারণ করেননি। এ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। তবে কৌতূহলের প্রধান বিষয় ছিলÑ ‘ভোট নিয়ে হাসিনা-প্রণব আলোচনা’। কলকাতায় আনন্দবাজার পত্রিকা এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ঢাকার মানবজমিন পত্রিকা আনন্দবাজারকে উদ্ধৃত করে লিখেছে ১৫ জানুয়ারি গণভবনে মধ্যাহ্নভোজের পর মনে করা হচ্ছে, বাংলাদেশে নির্বাচনের আগে হাসিনা সরকারের সাথে ভারতের ‘ট্র্যাক-টু’ কূটনীতির সূত্রপাত হয়েছে। হাসিনার সাথে বৈঠকে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ভোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন প্রণব মুখার্জি। এ আলোচনা বেশ কিছু সময় চলে এবং নির্বাচন ও চলমান রাজনীতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পরামর্শ দিয়েছেন প্রণব বাবু। আনন্দবাজারের সাংবাদিক অগ্নি রায় প্রণব মুখার্জির সফর নিয়ে বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন লিখেছেন। একটি প্রতিবেদনে তিনি লিখেন, ভারতের রাষ্ট্রপতি হিসেবে অবসর নেয়ার পর প্রথম সফরে ঢাকায় পৌঁছে প্রণব মুখার্জি জানিয়েছিলেন- ‘রথ দেখা ও কলা বেচা’ এই হলো তার সফরের উদ্দেশ্য। রথ দেখা অর্থাৎ বাংলা সাহিত্য সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে অংশ নেয়াকে বুঝিয়েছেন। কিন্তু ‘কলা বেচার’ ব্যাখ্যা তিনি স্পষ্ট করেননি। অনেকের ধারণা, ভোট নিয়ে শেখ হাসিনার সাথে আলোচনার মধ্যেই ‘কলা বেচা’র বিষয়টি জড়িত থাকতে পারে। প্রণব মুখার্জির এই সফরের কথা প্রথম ঘোষিত হওয়ার পর, মাসখানেক আগে নয়া দিগন্তের এই পাতায় নির্বাচন নিয়ে মানুষের শঙ্কার কথা লিখেছিলাম। পাঠকদের হয়তো মনে আছে, সেই লেখায় ছিল- ‘প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশে বেড়াতে আসতেই পারেন। তাতে দোষের কিছু নেই। তবে প্রণব মুখার্জিকে নিয়ে আমাদের ভয়ও আছে।’ সেই ভয় হচ্ছে নির্বাচন হাইজ্যাকের শঙ্কা। প্রণব মুখার্জি নিজেই তার ‘কোয়ালিশন ইয়ার্স ১৯৯৬-২০১২’ বইতে লিখেছেন, আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনার ব্যাপারে তার ভূমিকা ছিল। তিনি কোনো রাখঢাক না করেই বলেন, বিএনপির প্রথম আমলে (১৯৯১-৯৬) তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে শক্ত আন্দোলন করতে তিনি শেখ হাসিনাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন। আমরা জানি, শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলনে ‘শক্ত’ অবস্থানে ছিলেন এবং সংসদ থেকে তার নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল এ জন্য পদত্যাগও করেছিল। পদত্যাগপত্র সংসদে গ্রহণ করা না হলেও তিনি আর সংসদে যাননি। এরপর ১৫ ফেব্রুয়ারির একতরফা নির্বাচন করিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আদায় করে, নির্বাচনের মাত্র এক-দেড় মাসের মাথায় ওই সরকারকে ক্ষমতায় বসানো হয়। এরপর ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয় এবং শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনেও আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনার ব্যাপারে নিজের ভূমিকার কথা লিখেছেন প্রণব মুখার্জি।
ওয়ান-ইলেভেনের সময় আওয়ামী লীগের বড় নেতারা যখন জেলবন্দী শেখ হাসিনাকে পরিত্যাগ করে সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন, এ অবস্থায় ওই অভ্যন্তরীণ সঙ্কট প্রণব মুখার্জিই নিরসন করে দেন। তিনি তাদের ডেকে ভর্ৎসনা করেন এবং শেখ হাসিনাকে ছেড়ে না যাওয়ার পরামর্শ দেন। জেনারেল মইন ইউ আহমেদের হাই-প্রোফাইল ভারত সফরের কথা কে না জানে? তাকে ভারতের পক্ষ থেকে রাজকীয় ছয়টি ঘোড়া উপঢৌকন দেয়া হয়েছিল। শুধু তাই নয়, প্রণব মুখার্জি নিজেই লিখেছেন, জেনারেল মইনকে তার পদে শেখ হাসিনা বহাল রাখবেন বলে তিনি তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন। বিনিময়ে দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছে আন্দোলনের ফসল মইন-ফখরুদ্দীনের সরকার শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগকে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী করে ক্ষমতায় নিয়ে আসে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের সময় প্রণব মুখার্জি ছিলেন ভারতের রাষ্ট্রপতি। তখন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং ঢাকায় ২৬ ঘণ্টার ঝটিকা সফরে এসে আওয়ামী লীগের পক্ষে যে ভূমিকা রাখেন, সেটা কারো নজর এড়ায়নি। একটি স্বাধীন দেশের জাতীয় নির্বাচনে প্রতিবেশী দেশের এমন নগ্ন হস্তক্ষেপে সেদিন সবাই ক্ষুব্ধ হলেও করার কিছুই ছিল না। শুধু অসহায় চোখে ‘নির্বাচন হাইজ্যাক’ হওয়ার দৃশ্য দেখতে হয়েছে। এই সেই সুজাতা সিং ষড়যন্ত্রের বীজ যার অস্থিমজ্জায়, তারই বাবা ষড়যন্ত্র করে লেন্দুপ দর্জিকে দিয়ে সিকিমকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করিয়েছিলেন। আজ তাই প্রণব মুখার্জি কিংবা সুজাতা সিংরয়র প্রসঙ্গ উঠলে আমাদের ভয় হয়। ২৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অনশনরত শিক্ষকদের প্রতি সংহতি জানাতে এসে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেছেন, ‘সময় এখন ভালো নয়। সঠিকভাবে নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ জিততে পারবে না।’ এটা শুধু তার কথাই নয়, দেশের সবাই তা মনে করে। এমনকি শেখ হাসিনাও সেটা জানেন। ভয় সেখানেই। আমরা জানি না, হাসিনা-প্রণব ভোটের আলোচনায় সঠিকভাবে নির্বাচন যাতে না হয়, সে ব্যাপারে কোনো কথা হয়েছে কি না। আনন্দবাজার লিখেছে, প্রণব মুখার্জি রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নির্বাচন নিয়ে পরামর্শ দিয়েছেন। সেই পরামর্শ যদি হয় আবার নির্বাচন ‘ম্যানেজ’ করা, বেঠিক নির্বাচনের কিংবা ৫ জানুয়ারির পুনরাবৃত্তির, তা হবে জাতির জন্য বড়ই দুর্ভাগ্যের।
নিজেকেই প্রশ্ন করুন
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ‘ডি লিট’ ডিগ্রি গ্রহণ করে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি তার ভাষণে প্রশ্ন তোলেন- উপমহাদেশে কেন গণতন্ত্র মজবুত হতে পারছে না? তিনি এও বলেন, ভারত ও বাংলাদেশ ছাড়া উপমহাদেশের অন্য দেশগুলোতে সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বেশি দিন স্থায়ী হতে পারেনি। গণতন্ত্রের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নেয়া যায়। শত বাধার মুখেও এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ (সমকাল, ১৭ জানুয়ারি)। তার এ কথাগুলো বিশ্লেষণ করলে আমরা কী দেখতে পাই? উপমহাদেশের গণতন্ত্র মজবুত হতে পারছে না কী কারণে? এর জন্য কারা দায়ী? প্রণব মুখার্জি যদি এ বিষয়ে নিজেকে প্রশ্ন করেন, তাহলেই উত্তর পেয়ে যাবেন। আর সেটা হচ্ছে, ভারতের কারণেই উপমহাদেশে গণতন্ত্র মজবুত হতে পারছে না। ভারত নিজে যে গণতন্ত্র ভোগ করেছে, প্রতিবেশী দেশগুলোকে সেভাবে ভোগ করতে দিচ্ছে না। সুজাতা সিংয়ের উক্তি আমরা ভুলে যাইনি। বাংলাদেশে এসে তিনি বলেছিলেন, ‘গণতন্ত্র একেক দেশে একেক রকম হয়।’ অর্থাৎ তিনি বাংলাদেশে ভারতের মতো গণতন্ত্র চান না। ভারতের স্বার্থ বিশেষ করে কংগ্রেসের স্বার্থ হাসিল হয়- এমন গণতন্ত্র চেয়েছেন। সেই ‘গণতন্ত্র’ এখন চলছে। ভারতের সাথে এখন প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে শুধু বাংলাদেশ সরকারেরই সম্পর্ক মধুর। এই সম্পর্কের বিনিময়ে বাংলাদেশকে অন্য অনেক বিষয়ের সাথে গণতন্ত্রকেও বিসর্জন দিতে হয়েছে।বস্তুত, ভারত চায় না তার প্রতিবেশী দেশগুলোতে জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী কোনো দল ক্ষমতায় থাকুক। তাতে তাদের আবদার পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ জন্য জনবিচ্ছিন্ন তাঁবেদার সরকার পছন্দ ভারতের। বাংলাদেশ এখন এর বড় প্রমাণ। শুধু বাংলাদেশ নয়, প্রতিবেশী কোনো দেশেই ভারত গণমুখী দলকে ক্ষমতায় দেখতে চায় না। যেমন- তার কার্যত ‘করদরাজ্য’ ভুটানের বর্তমান গণতন্ত্রমনা রাজাকে পছন্দ নয় দিল্লির। এ জন্য ২০১৩ সালে ভুটানের জনগণকে শায়েস্তা করতে জ্বালানির ভর্তুকি তুলে দিয়ে দেশটিকে বিপাকে ফেলেছিল ভারত সরকার। ভুটানের বর্তমান সরকার চাইছে ভারতের পেটের ভেতর থেকে বের হয়ে চীনমুখী হতে। কিন্তু সেটা দিল্লি হতে দিচ্ছে না। ভুটানকে কব্জায় রাখার জন্য ভারতের চেষ্টার কোনো কমতি নেই। সম্প্রতি চীনের সাথে ভুটানের মালিকানাধীন ডোকলাম নিয়ে সৃষ্ট বিরোধে দিল্লির এই মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছে নগ্নভাবে। ভুটান সরকার ডোকলাম নিয়ে চীনের সাথে বিরোধে জড়াতে না চাইলেও ভারত গায়ে পড়ে চীনের সাথে বিবাদে জড়িয়েছে। অবশ্য শেষ পর্যন্ত ‘নাকে খত দিয়ে’ ভারতকে ডোকলাম ছাড়তে হয়েছে। এক সময় সাংবিধানিকভাবে হিন্দুরাষ্ট্র, নেপালেও গণমুখী সরকারকে ক্ষমতায় দেখতে চায়নি ভারত। অভিযোগ আছে, জনগণের কাছে অতিপ্রিয় নেপালের রাজা বীরেন্দ্রসহ রাজপরিবারের ১০ জন সদস্যকে ২০০১ সালে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার মদদে হত্যা করা হয়। রাজা বীরেন্দ্র ছিলেন ভারতের আগ্রাসন নীতির বিরোধী এবং গণমুখী। তাই তাকে সরিয়ে পুতুল সরকার সেখানে ক্ষমতায় বসানো হয়।
এরপর নেপালে গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণীত হলে ক্ষেপে যায় ভারত। উগ্রপন্থীদের দিয়ে নেপালকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করা হয়। নেপালে গত বছরের শেষের দিকে নির্বাচনে ক্ষমতায় এসেছে ভারতবিরোধী জোট। দক্ষিণ এশিয়ায় কোনো দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ভারতপন্থী দল যে ক্ষমতায় আসতে পারে না, নেপালের নির্বাচনে সেটা আবারো প্রমাণিত হয়েছে। শ্রীলঙ্কা নিয়েও ভারত কম খেলা দেখায়নি। তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে মদদ দেয়া ছাড়াও দেশটিতে ভারত সরাসরি সেনাবাহিনী পর্যন্ত পাঠিয়েছিল। ভারতের হস্তক্ষেপের কারণে শ্রীলঙ্কার মানুষও দিল্লির ওপর অসন্তুষ্ট। সরাসরি ভারতের দালালি করে এ দেশটিতে কোনো দলের ক্ষমতায় যাওয়া অসম্ভব। শ্রীলঙ্কার বর্তমান সরকার কিছুটা ভারতঘেঁষা হলেও তারা ভারসাম্যমূলক নীতি অনুসরণ করছেন। ভারত ও চীনের সাথে দরকষাকষির অবস্থান বজায় রেখেছে মাইথ্রিপালা সিরিসেনার সরকার। দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপের রাজনীতিতেও ভারতের হস্তক্ষেপ কোনো অংশে কম নয়। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে প্রতিবেশী ভারত আমাদের বিপুল সহযোগিতা করেছে। ভারতের প্রতি এ জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, ভারতের কথায় সব সময় আমাদের চলতে হবে। ভারত চায়, তার স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে বাংলাদেশ চলুক। সেজন্য বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই ভারত খবরদারি করে আসছে। একাত্তরে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে দিয়ে সাত দফা ভারত-বাংলাদেশ চুক্তি স্বাক্ষর করিয়ে নেয়া হয়েছিল। এ চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষা পরিচালিত হবে দিল্লি থেকে। চুক্তিতে আরো বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের কোনো সেনাবাহিনীর প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বিডিআর ভেঙে দিয়ে ভারতের সীমান্তরক্ষী বিএসএফের তত্ত্বাবধানে একটি বর্ডার গার্ড (বিজিবি) বাহিনী গঠন করা হবে। পাকিস্তান থেকে মুক্ত হয়ে মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান দিল্লিতে স্বল্পকালীন যাত্রাবিরতিকালে তাকে সাত দফা চুক্তির কথা জানানো হলে তিনি তা মানেননি। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় বাহিনী ফিরিয়ে নেয়া দিল্লির কাম্য ছিল না। কিন্তু মুজিবের পীড়াপীড়িতে ভারত তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। আজো সেই চুক্তির কথা ভারত ভুলে যায়নি। বিডিআর ভেঙে দিয়ে এখন বিজিবি গঠিত হয়েছে। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষানীতি কাদের ইঙ্গিতে পরিচালিত হচ্ছে, সবার তা জানা। বর্তমান সরকারের প্রতি ভারতের অন্ধসমর্থন রয়েছে। ফলে সরকার ভারতকে যেকোনো মূল্য দিতে রাজি আছে। ভারত সে মূল্য আদায়ও করে নিচ্ছে। বাংলাদেশের সড়ক, নৌ, রেলপথ ও সমুদ্রবন্দরগুলো প্রায় বিনামূল্যে সরকারের কাছ থেকে আদায় করে নিয়েছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি সাধারণ নির্বাচনের ব্যাপারে দিল্লি যে অশোভনভাবে হস্তক্ষেপ করেছে, এর নজির সত্যিই বিরল। ৫ জানুয়ারির তামাশার নির্বাচনের পর অবৈধ সরকারের পক্ষে স্বীকৃতি আদায়ের জন্য ভারতীয় কূটনীতিকেরা বিশ্বব্যাপী দাপাদাপি করেছেন। তখন থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে ভারতের হস্তক্ষেপ বেড়ে যায়। প্রণব মুখার্জি আজ তাই বড়গলায় বলছেন, বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র ভারতের মতোই নাকি এগিয়ে যাচ্ছে। তিনি জানেন, কথাটা একেবারেই হাস্যকর। বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র ভারতের মতো এগিয়ে গেলে তাতে ভারতের লাভ হতো না। বাংলাদেশ এগিয়ে যেত। মানুষ গণতন্ত্রের সুফল পেত, কিন্তু ভারত বাংলাদেশে তার দেশের মতো গণতন্ত্র হোক তা চায়নি। তারা চেয়েছেন বাংলাদেশে এমন একটা গণতন্ত্র কায়েম হোক, যাতে তার স্বার্থ রক্ষা হয়। সেই লক্ষ্যে তার পছন্দের একটা সরকারকে ক্ষমতায় আনতে হবে। সেটাই হয়েছে। ফলে সত্যিকার গণতন্ত্র আজ নির্বাসিত।
বাংলাদেশে বিরোধী দল বলতে কিছু নেই। বিরোধী দলকে সরকার সভা-সমাবেশ করতে দিচ্ছে না। অসংখ্য মামলা দিয়ে হাজার হাজার বিরোধী নেতাকর্মীকে কয়েদ করে রেখেছে; বাড়িঘর ছাড়া করে রেখেছে। বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও খুন করছে। ভিন্নমতাবলম্বীদের মিডিয়া বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এক কথায়, বাংলাদেশে এখন চলছে ত্রাসের রাজত্ব; কর্তৃত্ববাদী শাসন চলছে। এর মধ্যে সংসদীয় গণতন্ত্রের লেশমাত্র নেই, যাকে প্রণব মুখার্জি স্বীকৃতি দিতে চেয়েছেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ভোটারবিহীন নির্বাচন হয়েছে। সেই তামাশার নির্বাচনে অর্ধেকের বেশি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বি¦তায় প্রার্থীদের নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। ভুয়া নির্বাচনে যে সংসদ গঠিত হয়, সেই সংসদে বিরোধী দল সরকারের মন্ত্রিসভায়ও আছে। আসলে প্রণব মুখার্জিও কথা এমনিতেই বলেননি। আসন্ন নির্বাচনটিও ম্যানেজ করে তাদের পছন্দের সরকারকে যাতে টিকিয়ে রাখা যায়, সেটাই তার লক্ষ্য। তবে ভারতের বর্তমান নেতৃত্ব মনে হয় না প্রণবের পথে হাঁটবেন। কারণ, বাংলাদেশে অতীতের কংগ্রেস সরকারের অতিমাত্রায় হস্তক্ষেপের কারণে ভারত যে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে; সে খবর মোদি সরকারের কাছে রয়েছে। আর সেই ক্ষতি হচ্ছে- অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন বাংলাদেশের মানুষ প্রচণ্ড ভারতবিদ্বেষী। এটা ক্রমাগত চলতে থাকলে বিশ্বের অন্যতম গণতন্ত্রের দেশ ভারতের জন্য ভালো দেখায় না। এ নিয়ে ভারতের বর্তমান নেতৃত্ব আশা করি সজাগ রয়েছেন। তাই বাংলাদেশে মিশন না চালিয়ে কী করে খাদে পড়া কংগ্রেসকে টেনে তোলা যায়, সে দিকেই প্রণব মুখার্জির মনোনিবেশ করা উচিত।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় প্রেস ক্লাব

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ‘ঠাণ্ডাযুদ্ধ’ ঘোষণা

২০১৮ সালের ১৯ জানুয়ারি দিনটি ওয়াশিংটনের একটি নতুন ঠাণ্ডা বা স্নায়ুযুদ্ধের ঘোষণা দেয়ার তারিখ হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। জন হপকিন্স ভার্সিটিতে ভাষণ দিতে গিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিস এ ঘোষণা দিলেন। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির নতুন করে অবনমনই প্রকট হয়ে উঠেছে। মি. ম্যাটিসের এই বক্তৃতা নিশ্চিত করেছে, ট্রাম্প প্রশাসন আগের চেয়ে বেশি ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়ে রাশিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক পুনর্গঠিত করবে বলে যে ধারণা বা প্রত্যাশা থাকতে পারে, তা প্রবাদের ডোডো পাখির মতোই মৃত (মরিশাসের এই বিরাট পাখি উড়তে পারত না এবং বর্তমানে বিলুপ্ত)। বরং এই অবস্থায়, যেসব দেশ ‘সাম্রাজ্যের নির্দেশ’ পালনে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে, তাদের পরস্পরের আরো ঘনিষ্ঠ হওয়ার বিকল্প নেই। এই সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে তাদের অর্থনৈতিক, সামরিক ও ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্রে অভিন্ন ক্ষোভ রয়েছে। রিচার্ড সাকওয়া তার 'Frontline Ukraine' বইতে এই গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট তুলে ধরেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের নব্য রক্ষণশীলদের (নিউকন) শেকড় যে ট্রটস্কিপন্থীদের মাঝে প্রোথিত, তা অনেকেরই জানা আছে। তাদের বিশ্বাস : ‘বিশ্ববিপ্লব’ বাতিল হয়ে যায়নি, এর কেবল রূপান্তর ঘটেছে। তারা মনে করেন এখন লড়াই সমাজতন্ত্র নয়, পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের জন্য। এটা হবে বিশ্বকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নিরাপদ বানানোর উদ্দেশ্যে। ‘নিউকন’ হিসেবে যিনি লজ্জিত নন, সেই টমাস ফ্রিডম্যান একই কথা আরো স্পষ্টভাবে বলেছেন। এ ব্যাপারে তার কুখ্যাত জোরালো বক্তব্য হলো- “বাজার অর্থনীতির লুকানো হাত সক্রিয় রাখতে লুকানো মুষ্টি থাকতে হয়। ‘ম্যাকডোনাল্ডস’ সমৃদ্ধ হতে পারে না ‘ম্যাকডোনেল ডগলাস’ ছাড়া। এই ডগলাস হলেন এফ-১৫ যুদ্ধবিমানের নির্মাতা। সিলিকন ভ্যালির যাবতীয় প্রযুক্তির জন্য দুনিয়াকে নিরাপদ রাখছে যে ‘লুকায়িত মুষ্টি’, তার নাম মার্কিন সেনা, বিমান ও নৌবাহিনী এবং মেরিন কোর।” রুশ মিডিয়া পাশ্চাত্যের প্রতি চ্যালেঞ্জ জানানো এবং পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক আধিপত্যের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সাহস দেখিয়েছে। এই মিডিয়া সামগ্রিক আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়ে আসছে। তার আসল কারণ এটাই। আরটি এবং স্পুটনিক সাফল্যের সাথে একটি সাম্রাজ্যের ভণ্ডামি, দ্বিমুখী নীতি ও অসততা উন্মোচন করে দিয়েছে। এই সাম্রাজ্যটি গণতন্ত্রের পোশাক পরে স্বীয় আধিপত্যের দণ্ডবিকশিত করা পশুটিকে বিশেষ পরিচ্ছদে শোভিত করার কাজে নিয়োজিত রয়েছে। আফ্রিকার একটি প্রবাদ হলো, ‘সিংহের যত দিন না নিজস্ব ইতিহাসবিদ থাকে, তত দিন শিকারের কাহিনীগুলো সর্বদাই শিকারির জন্য গৌরবজনক হিসেবে গণ্য হবে।’ বিকল্প মিডিয়া থাকায় আমরা এমন এক বিশ্বে বাস করছি যেখানে সিংহদের নিজস্ব ‘ইতিহাসবিদ’ আছে। যেসব দেশ ও সরকার মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ক্রোধের পাত্র, তারা একধরনের সিংহ বটে।
তাদের ইতিহাসবিশারদরা সাফল্যের সাথে এবং ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে তুলে ধরছেন যে, ‘পশ্চিমা আদর্শের প্রবক্তারা দেশে দেশে সরকার পরিবর্তনের পক্ষে গণতন্ত্রের অজুহাত দেখালেও গণতন্ত্রকে প্রকৃত অর্থে প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে তাদের আগ্রহ কম। অথচ জাতিসঙ্ঘ সনদ মোতাবেক, এক রাষ্ট্রের সাথে অন্য রাষ্ট্রের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গণতন্ত্রই আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তি।’ যা হোক, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ম্যাটিস তার ভাষণে রাশিয়া ও চীনকে ‘সংশোধনবাদী শক্তি’ বলার মতো হঠকারিতা দেখিয়েছেন। এর কারণ, যুক্তরাষ্ট্র নামের দেশটির নির্দেশ পালনে অস্বীকৃতি। এই রাষ্ট্রের শাসক শ্রেণী দীর্ঘ দিন ধরে দাবি করছে, দুনিয়াজুড়ে শাসনের অধিকার তারা রাখেন। রাশিয়া অল্প সময়ের জন্য পাশ্চাত্যের আদর্শিক চশমা পরিধান করেছিল। তবে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ওয়াশিংটনের অধীনতামূলক অবস্থান নিতে রাশিয়া রাজি হয়নি। তখনই তার আসল অপরাধের সূচনা। তাকে নতজানু করার মতলবে মুক্তবাজার অর্থনীতির ‘শক ট্রিটমেন্ট’ দেয়ার প্রয়াস সফলভাবে সে প্রতিহত করেছে। ইরাকের জনগণকে জিজ্ঞেস করুন শান্তি বজায় রাখায় মার্কিন সেনাদের ভূমিকা সম্পর্কে। লিবিয়ার মানুষের খবর কী? ওয়াশিংটন সিরিয়ায় দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত ও নৈরাজ্য দীর্ঘায়িত করার প্রয়াসে সফল হয়েছে। সে ব্যাপারে সিরীয় জনগণকে প্রশ্ন করে দেখুন। আর আফগানিস্তান তো আছেই। সে দেশে গত এক দশকেরও বেশি সময়ে মার্কিন ও ন্যাটোর বোমায় হাজার হাজার বেসামরিক নাগরিক নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। শান্তি রক্ষার কথা বলতে চান? টেনিস কিংবদন্তি জন ম্যাকেনরোর অননুকরণীয় কথাটির পুনরাবৃত্তি করছি- ম্যাটিস সাহেব, আপনারা শান্তি রক্ষার প্রশ্নে ‘সিরিয়াস হতে পারবেন না।’ যে পর্যন্ত না তারা সিরিয়াস হবেন, তত দিন রোমান সাম্রাজ্যের অনুসরণে জেমস ম্যাটিস বলবেন- Pax Americana, মানে, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে ‘শান্তি’ চাপিয়ে দেবে। আসলে এটা আধিপত্য ও দাসত্ব। এহেন কথিত শান্তির মূল কথাটা রোমের ইতিহাসবিদ ট্যাসিটাস সবচেয়ে জোরালোভাবে তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেছেন, “ডাকাতরা দুনিয়ার ভূ-উপরিস্থ সব লুটে নেয়ার পালা শেষ করে এরপর গভীরে অনুসন্ধান করে আরো লুণ্ঠনের লক্ষ্যে। ওদের শত্রু যদি ধনী হয়, ওরা শত্রুর ধনসম্পদের জন্য লোভী হয়ে ওঠে। আর শত্রু গরিব হলে লোভটা গিয়ে পড়ে শত্রুর ভূখণ্ডের ওপর। দুনিয়ার প্রাচ্য বা পাশ্চাত্য, কোনোটাই তাদের খুশি করতে পারেনি। ধনী-গরিব কাউকে ওরা রেহাই দেয় না। ডাকাতি, হত্যা, লুণ্ঠনকে তারা ‘সাম্রাজ্য’ নাম দিয়ে মিথ্যাচার চালায়। তেমনি তারা কোনো ভূখণ্ডকে মরুভূমি বানিয়ে তাকে বলে ‘শান্তি’।” জেমস ম্যাটিস এবং তার সমগোত্রীয়দের বেশি মনোযোগ দেয়া উচিত ইতিহাসের দিকে। কারণ, ইতিহাসের বড় শিক্ষা হলো- সাম্রাজ্যের ভিত্তি বালুর তৈরি এবং যারা মানুষের ওপর আধিপত্য করতে চায়, তারা নিজেদের পতন ত্বরান্বিত করে।
ভাষান্তর : মীযানুল করীম

পিংপংয়ের পর আণবিক কূটনীতি by আলমগীর মহিউদ্দিন

অবিশ্বাস্য হলেও বাস্তবতা হলো, বিশ্বের প্রধান ঘটনাবলির সূত্রপাত হয় ছোট্ট ঘটনা থেকে। অনুসন্ধানকারীরা এমন ছয়টি ঘটনার সন্ধান পেয়েছেন, যা আজকের আধুনিক বিশ্বকে নির্ মাণ করেছে। যেমন ০১. একটি স্যান্ডউইচ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর জন্য দায়ী। ০২. একটি আর্ট স্কুলের ভর্তি সমস্যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর পেছনে। ০৩. একটি সিগারেটের বাক্স মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধ থামিয়ে দিয়ে বর্তমানের যুক্তরাষ্ট্রকে রক্ষা করে। ০৪. ছোট্ট একটি ভূখণ্ডের আদান-প্রদান সৃষ্টি করে এক সাম্রাজ্য। ০৫. একটি ‘হার্ট অ্যাটাক’ বাঁচিয়ে দেয় পশ্চিমা জগৎকে।
০৬. এক উল্কাবৃষ্টি সাহায্য করে খ্রিষ্টান ধর্ম প্রচার করতে। গ্যাব্রিলো প্রিনসিপ ছিল সার্বিয়ার স্বাধীনতাকামী গোপন দল ‘ব্লাক হ্যান্ড’-এর সদস্য। তাদের লক্ষ্য ছিল অস্ট্রিয়ার আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্ডিনান্ডকে হত্যা করে সার্বিয়াকে স্বাধীন করা। অস্ট্রিয়া তখন সার্বিয়া দখল করে রেখেছিল। তাই ব্লাক হ্যান্ড ফার্ডিনান্ডের গাড়িবহরের ওপর বোমা হামলা চালায়। সে হামলা লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে দলের সদস্যরা এক রেস্টুরেন্টে সমবেত হয় বিষয়টি আলোচনার জন্য। বোমাটা ছুড়েছিল প্রিনসিপ এবং সে ছিল সরব। হঠাৎ লক্ষ করল, তাদের রেস্টুরেন্টের পাশের রাস্তা দিয়ে ফার্ডিনান্ডের গাড়িবহরটি যাচ্ছে এবং ফার্ডিনান্ড খোলা জানালার পাশে বসা। প্রিনসিপ সময়ক্ষেপণ না করে তার রিভলবারটা দিয়ে গুলিবর্ষণ করে এবং ফার্ডিনান্ড মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু এর ফল হয় ভয়াবহ। নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলো এবং মৃত্যুবরণ করল কোটি কোটি মানুষ। ধ্বংস হলো বিশাল। ভিয়েনার আর্ট স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য এলো এক যুবক। দু’বার চেষ্টা করেও ভর্তি হতে পারল না। তার চিত্রশিল্পী হওয়ার স্বপ্ন মুছে গেল। সে থাকত ভিয়েনার এক বস্তিতে। সেখানে চেক, ক্রোশিয়ান, ইতালিয়ান ও কয়েকজন ইহুদি থাকত। তারা সবাই বেকার ও নিম্নশ্রেণীর। এর মাঝে ইহুদিরা ওই যুবককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করল। তখন সে আর্মিতে যোগদান করে। তাকে মিলিটারি পুলিশে পোস্টিং দেয়া হলো। যোগ্যতার বলে সে দ্রুত ওপরে উঠতে থাকে এবং একপর্যায়ে তাকে ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট ওয়ার্কার্স পার্টিতে (নাজি পার্টি) যোগদান করে তাদের সব তথ্য গোপনে সরবরাহের দায়িত্ব দেয়া হলো। এ যুবক আর কেউ নন, বিশ্বখ্যাত অ্যাডলফ হিটলার। নাজি পার্টি ‘ভার্সাই চুক্তি’কে দাসত্ব মনে করত এবং তা বানচালের জন্য কার্যক্রম শুরু করে। এর পরের ইতিহাস সবার জানা : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং বিশ্বরাজনৈতিক চিত্রের আমূল পরিবর্তন। যদি প্রিনসিপ স্যান্ডউইচ না খেতে যেত এবং হিটলার যদি আর্ট স্কুলে ভর্তি হতো, তাহলে ইতিহাস নিশ্চয়ই অন্য রকম হতো। এমন ছোট ঘটনা ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে বারবার। যেমন- রাস্তায় পড়ে থাকা একটি সিগারেটের বাক্স মার্কিন গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটায় এবং দেশটির দু’টি ভাগে বিভক্ত হওয়া ঠেকিয়ে দেয়। যখন উত্তর ও দক্ষিণ দুই ভাগে যুক্তরাষ্ট্র ভাগ হওয়া প্রায় নিশ্চিত, তখনই ছোট্ট ঘটনাটি ঘটল। কর্পোরাল বার্টন ডাবলু মিশেল লক্ষ করেন, রাস্তায় এক সিগারেটের বাক্স এবং তিনটি সিগারেট এর বাইরে। তিনি বাক্সটা উঠিয়ে দেখেন তার মাঝে অনেক কাগজ। কাগজগুলো আর কিছুই নয়। সুপ্রিম কমান্ডার রবার্ট লি’র ১৯১ হুকুমনামা। এ হুকুমনামায় কেমনভাবে যুদ্ধ করতে হবে তিনি তার বিশদ নির্দেশনা দেন এবং তার সব জেনারেলের কাছে পাঠান। এর মধ্যে একজন ছিলেন স্টোনওয়াল জ্যাকসন। তিনি ছিলেন অলস প্রকৃতির জেনারেল। তিনি হুকুমনামাগুলো অনুসরণ করে নতুন হুকুমনামা না লিখে লির পাঠানো কাগজগুলোই কমান্ডারদের কাছে পাঠালেন। তার মতোই অলস ছিল এক কমান্ডার- ড্যানিয়েল হার্ভে হিল। তিনি তার ক্যাম্পসাইটে হুকুমনামাগুলো ফেলে রেখেছিলেন, যা রাস্তায় গিয়ে পৌঁছে। মিশেল সেখানেই এটা পান। তখন এটা কমান্ডারদের পৌঁছে দেয়া হলে, তারা সেভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটে এবং দেশটিও অখণ্ড থেকে যায়। জন্মগতভাবে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ফরাসি ছিলেন না। কারণ তার জন্ম হয়েছিল কর্সিকা দ্বীপে, যা ছিল ইতালির অংশ বা তুর্কির অংশ। জেনোয়ার ডিউক এটা ফরাসিদের কাছে বিক্রি করে দেন। তখন নেপোলিয়ন ফরাসি নাগরিকত্ব পেলেন এবং সেই সূত্রে তিনি ফরাসি সামরিক বাহিনীতে যোগদান করেন। এর পরের ঘটনাগুলো ঘটল দ্রুত। নেপোলিয়ন ফ্রান্সের সর্বময় ক্ষমতা দখল করলেন।পশ্চিমা বিশ্ব আজ যে অবস্থানে তা হয়তো অসম্ভব হতো, যদি ‘তার’ হার্ট অ্যাটাক না হতো। চেঙ্গিস খান মুসলিম সাম্রাজ্য ধ্বংস করে দ্রুত ইউরোপের দিকে এগোচ্ছিলেন এবং তখন এটা সবাই ধরে নিয়েছিল ইউরোপ চেঙ্গিস খানের কব্জায় পড়ে যাবে। ইউরোপিয়ানরা চেঙ্গিসকে সাদর আহ্বান  জানাচ্ছিল এ জন্য যে, তারা মুসলিম অধীনতা ছিন্ন করতে চাইছিল। চেঙ্গিস মুসলমানদের তখন পরাজিত করেছিলেন। তিনি হার্ট অ্যাটাকে মারা গেলেন এবং তার ছেলে ওজেদি খানকে মঙ্গোলিয়া ফিরে যেতে হলো। ইউরোপ বেঁচে গেল মুসলিম সাম্রাজ্যের মতো ধ্বংস ও দখলের হাত থেকে। তবে এ যুদ্ধে বিশ্বে যোগাযোগের পথ খুলে যাওয়ায় ইউরোপ ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে এসে যায়।আকাশজুড়ে তখন উল্কাপাত হচ্ছিল। খানিকটা অস্বাভাবিক। একজন সহযোগী কনস্টানটাইনকে বলল, দেখুন, উল্কার আলোর মাঝে লেখা দেখা যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে- ‘এই ক্রস দিয়ে জয় করো।’
কনস্টানটাইন তখন রোমের সিংহাসনের জন্য আরেক দাবিদার মাক্সেনটাইনের সাথে যুদ্ধ করছিলেন। এ লেখা কনস্টানটাইনের জন্য বলে কথাটি ছড়িয়ে দেয়া হলো এবং বলা হলো ‘গড তোমার সাথে’। সে অনুসারে কনস্টানটাইন যুদ্ধ শুরু করলেন। তিনি যুদ্ধে জিতে নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করলেন এবং খ্রিষ্ট ধর্মে দীক্ষিত হলেন এবং হুকুম জারি করেন রোমান সাম্রাজ্যে শুধু খ্রিষ্টানরাই বাস করবে। তার এই হুকুমের পথ ধরে পরবর্তী ধর্মান্তকরণের কর্মকাণ্ডে এখন বিশ্বের প্রথম ধর্ম বিশ্বাস হলো খ্রিষ্টান ধর্ম। এই ধারা ধরে রাখার সব চেষ্টা ও ব্যবস্থা চলছে অবিরাম। ছোট্ট ঘটনা থেকে এই ছয়টি বিশাল ঘটনা ঘটেছে বলে অনুসন্ধানকারীরা এই কর্মকাণ্ডগুলো তুলে ধরেন। তাদের বক্তব্য, অনেক সময় দেখা যায়- বিশাল আয়োজন ও পরিকল্পনার ফল অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আশানুরূপ হয় না। তখন সবার মাঝে একটা হতাশা এবং এমন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অনীহা দেখা দেয়। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় এক অনুসন্ধান পরিচালনা করেছে। তারা জানতে চায় ছোট্ট খবর বা ঘটনা সমাজের ওপর কোনো প্রভাব ফেলে কি না। কাজটি ছিল কঠিন। কেননা কোনো খবরের কাগজ যেমন ছোট্ট ঘটনার প্রতিবেদন দেয়, তেমনি বড় ঘটনার প্রতিবেদনও সেই সাথে থাকে। তারা তাই ছোট ছোট খবরের কাগজ ও সংবাদ সংস্থা বেছে নেয় এবং যখন সাধারণত বড় খবর থাকে না বলে বলা হয়, সে সময়টা বেছে নেয়। এমন দশটি মিডিয়াতে ৩৫ বার এই পরীক্ষা চালানো হয়। মিডিয়া কনসোর্টিয়াম এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর জো এলেন গ্রিন কাইজার বলেন, ‘অনুসন্ধানকারীরা দেখতে পান এমনকি ছোট্ট সংবাদমাধ্যম এবং নিরপেক্ষ বলে পরিচিত খবরের কাগজগুলোর সংবাদ জাতীয় ঘটনাবলির ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে।’ তিনি বলেন, নিরপেক্ষ সংবাদমাধ্যমগুলোর একটি সুবিধা হলো, তাদের কোনো অদৃশ্য বা দৃশ্যমান কর্তৃপক্ষের কথা শুনতে হয় না। ফলে আজকের সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব এমনভাবে বাড়ছে। কাইজার লিখছেন, এ জন্য বিশ্বব্যাপী ক্ষমতাবানেরা সোশ্যাল মিডিয়ার নিয়ন্ত্রণ চাইছে। তারা এটা পরিপূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে ক্ষমতা হবে নিরঙ্কুশ। এ জন্যই তারা চায় পুলিশ স্টেট এবং পুলিশের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা। তারা জনকল্যাণ বা জনগণের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবে না। কারণ, পুলিশের জন্মই হয়েছিল এলিটদের রক্ষার জন্য, যে কার্যক্রমে কখনো ছেদ পড়েনি। ছোট্ট ঘটনার মধ্যে পিংপংয়ের খেলা নিয়ে যে কূটনীতি তা বর্তমান বিশ্বের জন্ম দেয় বললে অত্যুক্তি হবে না। ছেচল্লিশ বছর আগে ১৯৭২ সালের এপ্রিলে ভিয়েতনামে যুদ্ধ চলছিল। তখন চীনের এক টেবিলটেনিস দল ডেট্রয়টে মার্কিনিদের সাথে পিংপং খেলতে আসে। এটা ছিল ‘পিংপং কূটনীতি’র প্রথম পদক্ষেপ। এটা শুরু হয় প্রায় এক বছর আগে। জাপানে অনুষ্ঠিত বিশ্ব টেবিলটেনিস টুর্নামেন্টে যখন মার্কিন দল খেলতে যায়, তখন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন চীন তাদের দেশে যাওয়ার জন্য মার্কিন দলকে আমন্ত্রণ জানায়। চীন তাদের দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত করতে চাইছিল। মার্কিন দলের চীনে যাওয়ার পর চীন-মার্কিন সংযোগ বাড়তে থাকে এবং তদানীন্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড এম নিক্সন এটাকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে গোপনে তার সেক্রেটারি অব স্টেট হেনরি কিসিঞ্জারকে বেইজিং পাঠান। এরপর তিনি ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বেইজিং যান। পিংপং কূটনীতির এক ব্যাপক সাফল্য বলে একে অভিহিত করা হয়। এর ফলে কয়েক যুগের ঠাণ্ডা যুদ্ধ (কোল্ড ওয়ার) বলে পরিচিত এক অসহনীয় অবস্থার অবসান ঘটে। এবার বিশ্ব আবার এক ভীতিকর অবস্থার সম্মুখীন হয়েছে দু’টি কারণে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং উত্তর কোরিয়ার আণবিক বোমার পরীক্ষা। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বারবার ঘোষণা যে, তারা উত্তর কোরিয়াকে নিশ্চিহ্ন করে দেবেন এবং তার জবাবে উত্তর কোরিয়ার বক্তব্য, তাদের আণবিক বোমা বহনকারী মিসাইল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সহজেই পৌঁছতে পারে- সারা বিশ্বকে এখন নিদারুণ শঙ্কার মাঝে রেখেছে। অবশ্য ১৯৮৬ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়া এই আণবিক শক্তির ব্যবহার নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছিল। কিন্তু এর মাঝে উত্তর কোরিয়া তার আণবিক বিস্ফোরণ ঘটালে বিষয়টি জটিল হয় ও শঙ্কার পর্যায়ে চলে যায়। তবে একটি নতুন পরিস্থিতি হলো, চীন ও উত্তর কোরিয়ার শীতল সম্পর্ক। এই ত্রিমুখী অবস্থার কী পরিণতি হবে বলা মুশকিল। কারণ, উত্তর কোরিয়াকে কেউ আস্থায় নিতে পারছে না; যেমন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকেও কেউ বিশ্বাস করতে পারছে না। তবে উত্তর কোরিয়ার আলোচনার প্রস্তাব এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের ওপর চাপ সেই ভীতিকর তৃতীয় মহাযুদ্ধের সম্ভাবনার দাবিকে অযৌক্তিক প্রমাণ করতে পারে। কেবল সময়ই বলতে পারবে এর জবাব। তবে সবাই আশা করে, পিংপং কূটনীতির যেমন জয় হয়ে বিশ্বরাজনীতিতে এক মোড় নিয়েছিল, এবার এই আণবিক কূটনীতির সাফল্যে বিশ্ব বেঁচে যাবে। কারণ, সবার মাঝেই একটি উপলব্ধি কাজ করে যে, যুদ্ধে আণবিক অস্ত্রের ব্যবহার বিশ্বকে ধ্বংস করবে, নতুনভাবে সৃষ্টি করবে না। অতীতের ধ্বংসতাণ্ডব এর কাছে অত্যন্ত নগণ্য বিষয়।

হুমকির মুখে গণতন্ত্র

আমাদের সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল-উদ্যোক্তা ও নেটস্পেস প্রতিষ্ঠাতা মার্ক অ্যান্ড্রিসন ২০১১ সালে ‘হোয়াই সফটওয়্যার ইজ ইটিং দ্য ওয়ার্ল্ড’ শীর্ষক এক প্রবন্ধ লেখেন, যা বহুলপঠিত হয়। কিন্তু আমরা তাঁকে গুরুত্বের সঙ্গে নিইনি। আমরা সেটাকে কেবল রূপক ভেবেছিলাম। অথচ এখন আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো পৃথিবীকে ইন্টারনেট প্ল্যাটফর্মের একচেটিয়াত্ব থেকে মুক্ত করা। প্রযুক্তি বিষয়ে আমি একজন আশাবাদী ছিলাম। ৩৫ বছরের ক্যারিয়ারে আমি নিজের সেরা ও উজ্জ্বল সময়টা সিলিকন ভ্যালিতে দিয়েছি। আমার সৌভাগ্য, ব্যক্তিগত কম্পিউটার, মোবাইল, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অংশ হতে পেরেছি আমি। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে আমার উল্লেখযোগ্য কাজ হলো গুগল ও আমাজনে বিনিয়োগ করা। এ ছাড়া ২০০৬ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত আমি ফেসবুক প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গের পরামর্শদাতা ছিলাম।
প্রযুক্তির প্রতিটি নতুন ঢেউয়ের সঙ্গে উৎপাদনশীলতা যেমন বেড়েছে, তেমনি জ্ঞানের ভান্ডারে আমাদের প্রবেশের সুযোগও বেড়েছে। প্রতিটি নতুন প্ল্যাটফর্ম আগের প্ল্যাটফর্মের চেয়ে সহজে ব্যবহারযোগ্য ও সুবিধাজনক। বছরের পর বছর ধরে এটি পৃথিবীকে আরও উন্নত করেছে। আমরা ধরে নিয়েছিলাম, এটা তা-ই করবে। এরপর এল ২০১৬ সাল, যে বার আমরা ইন্টারনেটের দুটি অন্ধকার অধ্যায় দেখতে পেলাম। একটি দিক ব্যবহারকারী সম্পর্কিত। এলটিই অবকাঠামোযুক্ত স্মার্টফোন ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কনটেন্ট ডেলিভারি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে, যেটা পুরো জাগ্রত মুহূর্তে ব্যবহারের উপযোগী ছিল। এর মধ্য দিয়ে প্রযুক্তি শিল্প ও ২০০ কোটি ব্যবহারকারীর জীবন বদলে গেছে। পৃথিবীর অধিকাংশ জায়গায় তেমন একটা তত্ত্বাবধান না থাকায় ফেসবুক, আলিবাবা, গুগল, আমাজন, টেনসেন্ট প্রচারণা ও জুয়ার কৌশল ব্যবহার করে গ্রাহকদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক আকর্ষণ তৈরি করেছে। আরেকটি অন্ধকারাচ্ছন্ন দিক হলো ভূরাজনৈতিক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিম ইউরোপ ও এশিয়ায় ইন্টারনেট প্ল্যাটফর্ম, বিশেষ করে ফেসবুকের মাধ্যমে রাজনীতি, পররাষ্ট্রনীতি ও বাণিজ্যে ক্ষমতাবানেরা ক্ষমতাহীনদের নিপীড়ন করার সুযোগ দিয়েছে। অন্যদিকে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন নির্বাচনে দেখা গেছে, স্বয়ংক্রিয় সামাজিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে গণতন্ত্রকে খাটো করা সম্ভব। এর আগে ব্রেক্সিট গণভোট ও মার্কিন নির্বাচনের সময়ও আমরা দেখেছি, ইতিবাচক খবরের তুলনায় নেতিবাচক খবর ফেসবুকে বেশি প্রচারণা পায়। কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলো নিপীড়নমূলক নীতির সপক্ষে জনসমর্থন তৈরিতে ফেসবুক ব্যবহার করতে পারে; মিয়ানমার, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইনে এখন যা ঘটছে, কিছু ক্ষেত্রে ফেসবুক অন্য সব বড় গ্রাহকের মতো প্রকৃত অর্থে এসব সরকারকে সমর্থন দেয়। আমি আত্মবিশ্বাসী যে ব্যবসায়িক মডেল গ্রহণের সময় ফেসবুক, গুগল ও অন্যান্য ইন্টারনেট প্ল্যাটফর্ম মানুষের ক্ষতি করতে চায়নি। এরা তখন তরুণ উদ্যোক্তা, সফলতার জন্য বুভুক্ষু। তারা একগুচ্ছ অ্যাপ্লিকেশনের ভিত্তিতে অনলাইনের জগৎ পুনর্গঠন করেছে। যার কারণে এটি আগের চেয়ে আরও বেশি ব্যক্তিগত প্ল্যাটফর্ম ও ব্যবহারের দিক থেকে সুবিধাজনক হয়ে উঠেছে। ব্যবহারকারীরা এতে অভ্যস্ত হওয়ার পর অনেক দিন পর্যন্ত তাঁরা এটা থেকে অর্থ উপার্জনের কথা ভাবেননি। উদ্যোক্তারা সামাজিক মাধ্যমকে যে আরও বেশি ব্যক্তিগত করে গড়ে তুলেছেন, তার ভিত্তিতেই এঁরা বিজ্ঞাপনী ব্যবসার মডেল তৈরি করেছেন। ফলে বিজ্ঞাপনদাতারা অভূতপূর্ব নির্ভুলতার সঙ্গে তাদের বার্তা উদ্দিষ্ট শ্রেণির কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছে। এরপর এল স্মার্টফোন, যার মাধ্যমে সব গণমাধ্যমের রূপ বদলে গেল। এর বদৌলতে ফেসবুক, গুগল ও গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের হাতে তথ্য সরবরাহের নিয়ন্ত্রণ চলে গেল। যে ছাঁকনি মানুষকে ‘চাহিদামতো’ সেবা দিতে পারে, সে মানুষকে বিভক্ত করতে পারে। এতে মুক্ত গণমাধ্যমের মতো মৌলিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ক্ষয়ে যেতে পারে। যে স্বতশ্চলনের (অটোমেশন) কারণে ইন্টারনেট প্ল্যাটফর্ম এত লাভজনক হয়েছে, সে কারণেই ইন্টারনেটের হানিকর মানুষের কারসাজিতে ব্যবহৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
গণতন্ত্র বৈরী কর্তৃত্ববাদী সরকারই যে শুধু এই উদ্দেশ্যে এটি ব্যবহার করছে, তা নয়। অ্যান্ড্রিসন আমাদের সতর্ক করে দিয়েছিলেন, বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও উপস্থিতি নিয়ে এই কোম্পানিগুলো বিশ্ব অর্থনীতি খেয়ে নিচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় তারা ফেসবুকের করপোরেট দর্শন গ্রহণ করেছে: ‘দ্রুত চলো ও সব ভেঙে ফেলো’। তাতে মানুষ, প্রতিষ্ঠান ও গণতন্ত্রের ওপর কী প্রভাব পড়ল, সেটা বিচার্য বিষয় নয়। উন্নত বিশ্বের এক বড় সংখ্যালঘু শ্রেণি এসব প্রতিষ্ঠানসৃষ্ট এই ছাঁকন বুদ্বুদের মধ্যে বসবাস করে, যেখানে বিদ্যমান বিশ্বাসগুলো আরও কট্টর ও অনমনীয় হয়ে পড়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক-তৃতীয়াংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নতুন চিন্তা গ্রহণে অক্ষম হয়ে পড়ছেন, এমনকি তথ্য-প্রমাণ থাকলেও। এই মানুষদের সহজেই প্রভাবিত করা যায়। গুগলের সাবেক ডিজাইন নীতিবিদ ত্রিস্তান হ্যারিস এই ধারণার উদ্গাতা, যাকে বলা হয় ‘ব্রেইন হ্যাকিং’। ব্যাপারটা হলো, পশ্চিমা গণতন্ত্র এই হুমকি মোকাবিলায় প্রস্তুত নয়। ইন্টারনেট প্ল্যাটফর্মের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোনো কার্যকর আইনি কাঠামো নেই, তাদের সেই রাজনৈতিক সদিচ্ছাও নেই। ইউরোপীয় ইউনিয়নে যেমন আইনি কাঠামো আছে, তেমনি তার প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সদিচ্ছাও আছে। কিন্তু কোনোটিই এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যথেষ্ট নয়। তারা যে সম্প্রতি প্রতিযোগিতাবিরোধী আচরণের জন্য গুগলকে ২৭০ কোটি ডলার জরিমানা করেছে, তা যথেষ্ট চিন্তাপ্রসূত হলেও আকারে ছোট হয়ে গেছে। গুগল আপিল করেছে। আর তার বিনিয়োগকারীরা এসব তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছে। শুরু হিসেবে হয়তো এটা ভালো, কিন্তু তা পরিষ্কারভাবে অনুপযুক্ত। আমরা এক ক্রান্তিলগ্নে উপনীত হয়েছি। ইন্টারনেট প্ল্যাটফর্মজাত ঝুঁকির ব্যাপারটা ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকেই আসছে। কিন্তু এটা ব্যবহার এত সহজ এবং তার প্রতি মানুষের যে মনস্তাত্ত্বিক আকর্ষণ তৈরি হয়েছে, তাতে ব্যবহারকারীর দিক থেকে পরিবর্তন আসতে গেলে আরও অনেক সময় লাগবে, অন্তত কয়েকটা প্রজন্ম; ধূমপানবিরোধী প্রচারণার সফলতা পেতে যেমনটা লেগেছে। প্রতিযোগিতা ও উদ্ভাবনের ওপর এই ইন্টারনেট প্ল্যাটফর্মের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইউরোপ বেশি সচেতন। কিন্তু কেউই এখন পর্যন্ত কার্যকর আইনি কাঠামো নির্মাণ করতে পারেনি। এটা ব্যবহার করে যে গণতন্ত্র খাটো করা যায়, সে ব্যাপারে সচেতনতা ক্রমেই বাড়ছে। তবে পশ্চিমা শক্তিগুলো এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত প্রতিরক্ষা কৌশল প্রণয়ন করতে পারেনি। সদ্য সমাপ্ত দাভোসের বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের ইন্টারনেট প্ল্যাটফর্ম মনোপলির হুমকি সম্পর্কে অবগত থাকা উচিত। জীবনে ভারসাম্য ও রাজনীতিতে আশার পুনর্জীবন ঘটাতে হলে যারা আমাদের জীবনে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে, তাদের কার্যক্রম বিঘ্নিত করতে হবে।
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট।
রজার ম্যাকনামি: এলিভেশন পার্টনারের সহপ্রতিষ্ঠাতা।

কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মীদের পাঁচ দিনের অবস্থান শুরু

চাকরি রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের দাবিতে কর্মবিরতির পর এবার পাঁচ দিনের লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেছেন কমিউনিটি ক্লিনিকের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডাররা (সিএইচসিপি বা স্বাস্থ্যকর্মী)। গতকাল শনিবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে তাঁরা এ কর্মসূচি শুরু করেন। আন্দোলনকারী বাংলাদেশ কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় দাবি বাস্তবায়ন কমিটির সদস্যসচিব মো. নঈম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের এই অবস্থান কর্মসূচি ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে। এর মধ্যে দাবি পূরণ না হলে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে তাঁরা আমরণ অনশন শুরু করবেন। গতকাল দুপুরের পর প্রেসক্লাবের সামনে গিয়ে দেখা যায়,
কয়েক হাজার স্বাস্থ্যকর্মী এই অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। সেখানে আগে থেকেই দুই ধরনের শিক্ষকদের অনশন চলছে। এর মধ্যেই হাজারো স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতিতে রাস্তার বেশির ভাগ জায়গা ভরে যাওয়ায় যানচলাচলের গতি কমে গিয়ে যানজটের সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া ক্লিনিক ছেড়ে আন্দোলনে থাকায় কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যসেবায় বিঘ্ন ঘটছে বলে তাঁরা জানিয়েছেন। উল্লেখ্য, সারা দেশে এ রকম স্বাস্থ্যকর্মী আছেন ১৩ হাজার ৫৪৪ জন। অবস্থানে অংশ নেওয়া নরসিংদীর মনোহরদীর গোতাশিয়া ইউনিয়নের খোটমোড়া কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি মো. ফারুক মিয়া বলেন, তাঁরা এখন বেতন পান প্রকল্প থেকে (উন্নয়ন খাত)। তাঁদের মূল বেতন ১০ হাজার ২০০ টাকা। সর্বসাকল্যে পান ১৬ হাজার ৭০০ টাকা। রাজস্ব খাতে না হওয়ায় তাঁরা অনেক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ করা হয়। ২০০১ সালে সরকার পরিবর্তনের পর কমিউনিটি ক্লিনিক বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৮ সালের পর আবার কমিউনিটি ক্লিনিক চালু হয়। এগুলো পরিচালনায় নিয়োগপ্রাপ্তরা রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের দাবি করছেন।

সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা

যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর এলাকায় শ্রমিকদের আধিপত্য বিস্তারের ছবি ও ভিডিও চিত্র সংগ্রহের সময় দুই সংবাদকর্মীকে পিটিয়ে আহত করার ঘটনায় বেনাপোল বন্দর থানায় একটি মামলা হয়েছে। গত শুক্রবার রাতে আহত এক সাংবাদিক মামলাটি করেন। মামলায় শার্শা যুবলীগের সভাপতি মো. অহেদুজ্জামান ও বেনাপোল আওয়ামী লীগের সদস্য আমিরুল ইসলামকে আসামি করা হয়েছে। গত বুধবার যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর এলাকায় শ্রমিকদের আধিপত্য বিস্তারের ছবি ও ভিডিও চিত্র সংগ্রহ করার সময় যশোরের দুই সংবাদকর্মীকে পিটিয়ে আহত করা হয়। আহত সাংবাদিকেরা হলেন ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের যশোর জেলা প্রতিনিধি ও যশোর থেকে প্রকাশিত প্রতিদিনের কথা সংবাদপত্রের নিজস্ব প্রতিবেদক জিয়াউল হক ও ক্যামেরাপারসন শরীফ খান। আহত জিয়াউল হক নিজেই বাদী হয়ে গতকাল মামলাটি করেন।
বেনাপোল বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অপূর্ব হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘হামলার ঘটনায় একটি মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে। মামলার এজাহারে শার্শা উপজেলা যুবলীগের সভাপতি মো. অহেদুজ্জামান ও বেনাপোল আওয়ামী লীগের সদস্য আমিরুল ইসলামের নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাত আরও ১০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। তবে এখনো কেউ গ্রেপ্তার হয়নি।’ এদিকে ওই হামলায় ঘটনার তৃতীয় দিনের মতো আজ শনিবার দুপুরে যশোরে মানববন্ধন করা হয়েছে। মুখে কালো কাপড় বেঁধে ‘যশোরবাসী সমন্বয় পরিষদ’ নামের একটি সংগঠনের উদ্যোগে যশোর প্রেসক্লাবের সামনে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। মানববন্ধন থেকে বক্তারা দোষীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

শৈত্যপ্রবাহ ছড়িয়ে পড়তে পারে

এক সপ্তাহ ধরে শীতের প্রকোপ অনেকটাই কম। মাসের শুরু থেকে মাঝামাঝি পর্যন্ত শীতের যে দাপট চলেছে, তার বিস্তার অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়েছিল। গতকাল শনিবার থেকে নতুন করে শীত বাড়তে শুরু করেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস বলছে, আজ রোববার থেকে সারা দেশের তাপমাত্রা কম-বেশি ২ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমতে পারে।
দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল এবং নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোতে মাঝারি থেকে ভারী কুয়াশা থাকতে পারে। উপমহাদেশীয় উচ্চ চাপবলয়ের বর্ধিতাংশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় বিস্তৃত রয়েছে। এর ফলে আজ সারা দেশে শীতের তীব্রতা কিছুটা বাড়তে পারে। পূর্বাভাস বলছে, সিলেট অঞ্চল দিয়ে বয়ে যাওয়া শৈত্যপ্রবাহটি আজ দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ওপর বিস্তৃত হতে পারে। পর্যায়ক্রমে তা দেশের অন্যান্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। এটি ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত চলতে পারে বলে সংস্থাটির পূর্বাভাসে বলা হয়েছে। তবে এটি আগের শৈত্যপ্রবাহের মতো তীব্র হবে না, মৃদু থেকে মাঝারি আকারের বয়ে যাবে। এ ব্যাপারে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. শাহিনুর ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, শৈত্যপ্রবাহটি ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত চলতে পারে। গতকাল দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল শ্রীমঙ্গলে ৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রাজধানীর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৪ দশমিক ৬ ডিগ্রি।

উখিয়ায় বন্ড গার্ল মিশেল ইয়ো

নিরুপায় হয়ে রাখাইন থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা কয়েক লাখ রোহিঙ্গার মাঝে আশার আলো জ্বালাতে সব দেশের এখন একসঙ্গে কাজ করার সময় হয়েছে। জীবন বাঁচাতে মরিয়া মিয়ানমারের সংখ্যালঘু এই জনগোষ্ঠীর জন্য মানবিক সহায়তাও জরুরি। গতকাল শনিবার এক সংক্ষিপ্ত সফরে কক্সবাজারে এসে হলিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী মিশেল ইয়ো রোহিঙ্গাদের সহায়তা করতে সব দেশের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার ওপর জোর দেন। মালয়েশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল রাজা মোহাম্মদ আফান্দি রাজা মোহাম্মদ নূরের সঙ্গে এদিন কক্সবাজারের উখিয়ায় বালুখালী রোহিঙ্গা শিবির ও মালয়েশিয়া পরিচালিত ফিল্ড হাসপাতাল ঘুরে দেখেন জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) শুভেচ্ছাদূত মিশেল ইয়ো। মালয়েশিয়ার নাগরিক মিশেল ইয়ো ১৯৯৭ সালে জেমস বন্ড সিমেনা টুমরো নেভার ডাইজ-এ পিয়ার্স ব্রসনানের সঙ্গে জুটি বেঁধে বিখ্যাত হয়েছিলেন। ২০০৮ সালে দ্য মামি এবং ২০১৬ সালে ক্রাউচিং টাইগার, হিডেন ড্রাগন সিমেনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অভিনয় করেন তিনি। এ ছাড়া ২০১১ সালে অং সান সু চির জীবনের ওপর নির্মিত দ্য লেডি ছবিতে তিনি সু চির ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। ১৯৯৭ সালে পিপল ম্যাগাজিনের নির্বাচিত বিশ্বের সুন্দর ৫০ মানুষের একজন হয়েছিলেন তিনি। মালয়েশিয়ার প্রতিনিধিদলটি দুপুরে কক্সবাজারে পৌঁছে শুরুতে বালুখালীর শিবিরে যায়। এরপর তাঁরা আসেন ফিল্ড হাসপাতালে। এখানে চিকিৎসাসুবিধা ঘুরে দেখার শুরুতে মালয়েশিয়ার চিকিৎসকসহ বিভিন্ন স্তরের কর্মীর সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন তাঁরা। কক্সবাজারে এসে কী অনুভূতি হলো জানতে চাইলে মিশেল ইয়ো বলেন, রোহিঙ্গাদের সেবা দিতে চার মাস আগে শুরু হওয়া এই হাসপাতালে তাঁর দেশের লোকজন অসাধারণ কাজ করছেন।
দেশে ফিরে তিনি তাঁর দেশের প্রধানমন্ত্রীকে এসব কাজের কথা জানাবেন। রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি কেমন দেখলেন জানতে চাইলে সাবেক বন্ড গার্ল বলেন, এরা মরিয়া হয়ে এখানে এসেছে। তাদের বাড়ি নেই, ফিরে গিয়ে থাকার কোনো জায়গা নেই। এমন পরিস্থিতিতে কেউ কি থাকতে চায়? কখনো না। উপায়ান্তর না থাকায় তারা আদি ভিটে ছেড়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। সাবেক বন্ড গার্ল জানান, উখিয়ায় মালয়েশিয়ার ফিল্ড হাসপাতাল সফর এবং রোহিঙ্গাদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণে অংশ নিতে তিনি নিজেই আগ্রহ দেখিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নাজিব তুন আবদুল রাজাকের কাছে। মিশেল ইয়ো বলেন, ‘এখন রোহিঙ্গাদের জন্য কাজ করার সময়। সব দেশের প্রতি আমার আহ্বান, জরুরি ভিত্তিতে রোহিঙ্গা শিশু, নারী ও বয়স্কদের মধ্যে আশা ছড়িয়ে দিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিন। বেঁচে থাকার জন্য তাদের সেটাই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।’ মালয়েশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল রাজা মোহাম্মদ আফান্দি রাজা মোহাম্মদ নূর বলেন, হাসপাতালের মাধ্যমে তাঁরা মানবিক সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। সশস্ত্র বাহিনী তাদের দেশের চিকিৎসক ও প্যারামেডিকসদের যে প্রশিক্ষণ দিয়েছে, তাঁরা সেটা এখানে কাজে লাগাচ্ছেন। প্রায় চার হাজার লোককে এ পর্যন্ত চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে। সেবার পরিধি বাড়ছে। তাঁদের সঙ্গে এখন সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও যুক্ত হয়েছে। মালয়েশিয়ার ফিল্ড হাসপাতালের প্রধান ফাতাহুল লেহেম মোহাম্মদ জানান, ১২ জন চিকিৎসকসহ সব মিলিয়ে মালয়েশিয়ার ৫০ জন নাগরিক হাসপাতালটিতে কাজ করছেন।

ভাঙা রাস্তা, যত্রতত্র আবর্জনা, ভোগান্তিতে ৫০ হাজার মানুষ

নাতি সুমনকে সঙ্গে নিয়ে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় বাড়ি ফিরছিলেন রহিমা বেগম। উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টর খালপাড় থেকে তিনি অটোরিকশায় ওঠেন। গন্তব্য ওয়ার্ডটির নয়ানগর এলাকা। কিন্তু ভাঙা রাস্তার ঝাঁকুনিতে নাতিকে কোলে নিয়ে স্থির বসে থাকতে কষ্ট হচ্ছিল তাঁর। মাঝে মাঝে চালককে ধীরে চালানোর অনুরোধ জানাচ্ছিলেন তিনি। রহিমা বেগম পরে প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঝাঁকুনিতে এদিক-ওদিক ছিটকে যাচ্ছিলাম। এই এলাকার কোনো রাস্তা ভালো নাই। অটোরিকশায় তবুও কিছুটা চলাচল করা সম্ভব। রিকশা হলে ঝাঁকুনি আরও বেশি।’ সরেজমিনে দেখা যায়, এলাকাবাসীর চলাচলের প্রধান রাস্তা নলভোগ, নয়ানগর, রানাভোলা, ধরঙ্গারটেক ও ফুলবাড়ির কার্পেটিং উঠে গিয়ে ভেঙে গেছে সর্বত্র। পিচঢালাই নষ্ট হয়ে ছোট-বড় অসংখ্য গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। সড়কের পাশে পানি নিষ্কাশনের নালা না থাকায় শীতেও পানি জমে থাকছে রাস্তায়। আর শুকনো অংশে ধুলাবালি উড়ছে চারদিকে। তাই গন্তব্যে যেতে প্রতিদিন ভোগান্তি পোহাতে হয় ওয়ার্ডটির প্রায় ৫৫ হাজার বাসিন্দাকে। ধরঙ্গারটেকের বাসিন্দা আলী আহম্মদ বলেন, ‘অনেক কষ্টে আছি।
রাস্তার অবস্থা খুব খারাপ। কোথাও গেলে শরীর ব্যথা হয়ে যায়।’ তিনি বলেন, এখানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি আছে, মনেই হয় না। বিগত বছরগুলোতে কোনো উন্নয়নকাজ হয়নি। ওয়ার্ডটিতে বর্জ্য ব্যবস্থার সুবন্দোবস্ত নেই। আবর্জনা অপসারণের নির্ধারিত স্থান নেই। সব এলাকার বাসাবাড়ি থেকেও আবর্জনা সংগ্রহ করা হয় না। কিছু এলাকা থেকে সংগ্রহ করা হলেও সেগুলো সেক্টরের ভেতরের এসটিএসে ফেলতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সিটি করপোরেশন। এর ফলে সংগ্রহকারী ব্যক্তিরাও এখন নিয়মিত ময়লা সংগ্রহ করেন না। বাধ্য হয়ে রাস্তার ধারে, বাড়ির পেছনে, বাজারের পাশে, উন্মুক্ত জায়গায়, যে যেখানে পারছেন আবর্জনা ফেলে দিচ্ছেন। ফুলবাড়ি এলাকার গৃহিণী সুলতানা বলেন, ‘প্রতিদিনের আবর্জনা কোথায় ফেলব, এই নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকি। বাধ্য হয়েই বাইরে খোলা জায়গায় আবর্জনা ফেলে দিই। এতে পরিবেশ দূষিত হয়। কিন্তু কী করার আছে বলুন? এলাকায় কোনো আবর্জনা সংগ্রহকারী নেই।’ এই ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলকায় একাধিক শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে। কারখানার অপরিশোধিত রাসায়নিক মিশ্রিত তরল বর্জ্য সরাসরি মিশছে ডোবা, নালা ও জলাশয়ের পানিতে। দূষিত হচ্ছে পানি। শুষ্ক মৌসুমে বিষাক্ত দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। ধরঙ্গারটেকের বাসিন্দা আবু নাঈম বলেন, পানির দুর্গন্ধে থাকা যায় না। দম বন্ধ হয়ে আসে। আগে এলাকার জলাশয়ে দেশি মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু এখন এসবের কিছুই নেই। স্কুল-কলেজ ছাড়া কিশোর-যুবকদের খেলাধুলার উন্মুক্ত জায়গা নেই। বিকেলবেলা খেলার জন্য তাই বেছে নিতে হয় নির্মাণাধীন কোনো ভবনের বালুর ঢিবি। ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হলে সেই সুযোগটিও বন্ধ হয়ে যায় তাদের। খুঁজতে হয় নতুন জায়গা। নয়ানগর শুক্রভাঙ্গা মসজিদ এলাকার যুবক জোবায়ের হাসান বলেন, ‘আমাদের খেলার মাঠ নেই। মাঠের অভাবে অনেক ছেলেমেয়েকে ঘরে বসেই সময় পার করতে হয়। আবার অনেক কিশোর-যুবক আড্ডাবাজি ও নেশার দিকে ঝুঁকছে।’ গত জুলাইয়ে হরিরামপুর ইউনিয়নের ফুলবাড়ি, রানাভোলা, ধরঙ্গারটেক, নয়ানগর, দিয়াবাড়ি, নলভোগ এলকাগুলো নিয়ে ডিএনসিসির নতুন ৫৩ নম্বর ওয়ার্ড গঠন করা হয়। প্রায় ৫৫ হাজার মানুষের বসবাস এখানে। পুরোনো তালিকা অনুসারে ভোটার আছে প্রায় ২৮ হাজার। ওয়ার্ডের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমডোর আবদুর রাজ্জাক প্রথম আলোকে বলেন, নতুন যুক্ত বর্ধিত অঞ্চলে সেবা দিতে কমিটি করা হয়েছে। কমিটি কাজ করছে। খুব শিগগির পরিকল্পনা অনুযায়ী সেবা চালু করা হবে। নতুন করে সেবা পেতে একটু ধৈর্য ধরতে হবে বলেও তিনি জানান। অন্যদিকে সাবেক হরিরামপুর ইউপির চেয়ারম্যান আবুল হাশেম বলেন, রাস্তার কাজ যেটুকু হয়েছে, তার সবই ইউনিয়নের নিজস্ব অর্থায়নে করা। বাজেটের স্বল্পতার কারণে বাকি উন্নয়নকাজ করা সম্ভব হয়নি।

বিবাহে ইচ্ছুকদের জেন্ডার শিক্ষা by উম্মে মুসলিমা

ভোজ্যতেলের একটা বিজ্ঞাপনে পাত্রী জানতে চান, পাত্র কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পাস করেছেন। পাত্র বেশ ভাব নিয়ে ‘মামৈনসিংহ ক্যাডেট’ বললে পাত্রী বলেন ‘ময়মনসিংহ তো মেয়েদের ক্যাডেট’। ধরা পড়ে যায় পাত্রের প্রতারণা। তো হাড়েমজ্জায় পিতৃতন্ত্র নিয়ে উদিত হওয়া পাত্র বা প্রেমিকের জেন্ডার শিক্ষার পরীক্ষা নিয়ে তবেই প্রেম বা বিয়েতে নারীর এগিয়ে আসা উচিত। প্রেমের দেবতা কিউপিড অন্ধ। অত ভেবেচিন্তে প্রেম হয় না। কিন্তু এখন সেই ‘এক প্রেম এক বিয়ে’-এর দিন অস্তগামী। প্রেম ভাঙছে, বিয়েও ভাঙছে। এমনকি তরুণ-তরুণীরা ভাঙাগড়াকে এখন অনেক সহজভাবে নিচ্ছে। তালাক ও পুনর্বিবাহের সংখ্যাও আগের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। একটা বেসরকারি টিভি চ্যানেলের উদ্যোগে জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, আমাদের দেশে শতকরা ৮৫ ভাগ বিয়ে এখনো পরিবারের পছন্দমতো হয়। বাকি ১৫ ভাগ পাত্র-পাত্রীর নিজের পছন্দে। একটা ছোট্ট ফুটো রেখে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন হলেও নারী শিক্ষার প্রতি সরকারের প্রশংসনীয় উদ্যোগ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বাল্যবিবাহ রোধে ভেতরে-ভেতরে ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। নারী শিক্ষিত বা আলোকপ্রাপ্ত হয়ে উঠলে কোনো ফুটোফাটায় কাজ হবে না। তারপরও পারিবারিক জীবনে নারীর অশান্তি কেন লেগেই আছে? নারী এখন রোজগেরেও হচ্ছেন দিন দিন। কিন্তু ক্ষমতায়নে প্রত্যাশিত সুফল আসছে না। কেন? কারণ, শিক্ষা-সংস্কৃতি-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীর পদচারণ বৃদ্ধি পেলেও তাঁর পাশে থাকা পুরুষ বা পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন মানুষেরা তাঁদের আগের জায়গাতেই রয়ে গেছেন। কেবল রোজগেরে হলেই ক্ষমতায়ন হবে, তার কোনো মানে নেই। যেখানে উপার্জনক্ষম নারীরাও নিজের পছন্দে বিয়ে করতে দ্বিধা করেন, সেখানে ক্ষমতায়ন দূর অস্ত। পোশাকশিল্প কারখানায় নারীরা যেদিন মাইনে তোলেন, সেদিন তাঁদের স্বামী-ভাই-বাবা-শ্বশুরেরা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন টাকাগুলো হাতানোর জন্য। এ চিত্র বড় বড় চাকুরে নারীদের বেলায়ও প্রযোজ্য। ক্ষমতাধরদের চাপিয়ে দেওয়া শ্রমবিভাজন সময়ের উন্নয়নে সমতার যুক্তিপূর্ণ দাবিদার। কিন্তু পিতৃতন্ত্রের সুবর্ণ সুবিধা হারাতে এখনো সুবিধাভোগী গোষ্ঠী নারাজ। কেউ কেউ পুরুষতান্ত্রিক অধিকারকে ঈশ্বরপ্রদত্ত বলতেও দ্বিধা করেন না। শুধু গুটিকয়েক সমতানুরাগী পুরুষ এর ব্যতিক্রম। পাশ্চাত্যে এত তালাক কেন?
একটি ওয়েব ম্যাগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমেরিকায় ৪০-৫০ শতাংশ প্রথম বিয়ে এবং ৬০ শতাংশ দ্বিতীয় বিয়ে তালাকে পর্যবসিত হয়। ওই সব দেশে পুরুষের তুলনায় নারীর উদ্যোগে বেশি তালাক হয়। এর প্রধান কারণ জেন্ডার বৈষম্য। এখনো স্ত্রীদের স্বামীর নামের পদবি ব্যবহার করতে হয়। গৃহস্থালি কাজ এবং সন্তান পালনের বেশির ভাগ নারীকেই করা লাগে। বউ পেটানোতে কোনো দেশের পুরুষই কম যান না। দীর্ঘদিনের প্রেমের বিয়েও ভেঙে যায়, যখন স্ত্রী দেখেন স্বামী পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা প্রয়োগকে তাঁদের জন্মগত অধিকার ভাবেন। আমাদের দেশের মা-বাবারা ‘মানিয়ে নিতে শেখা’কে মেয়েদের সবচেয়ে বড় যোগ্যতা বলে প্রশিক্ষিত করে ছেড়ে দেন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার, মিডিয়াকর্মী, আইনজীবী ও স্বনির্ভর নারীরা স্বামীর বাড়ি থেকে কেউ লাশ হয়ে বেরিয়ে আসেন, কেউ প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জীবন কাটান, কেউ সামাজিকতার ভয়ে বেঁচে থেকেও নিঃশেষ হয়ে যান। আর যাঁরা নির্ভরশীল, তাঁদের তো ভাগ্যের ওপর নির্ভর করা ছাড়া বাঁচার কোনো পথ নেই। যেসব নারী ভালোবেসে বিয়ে করতে যাচ্ছেন, তাঁরা যাচাই করে নিন সঙ্গী পুরুষটি কতখানি জেন্ডার সচেতন। অথবা যাঁরা সদ্য প্রেমে পড়েছেন, তাঁরাও প্রেমিকের আচরণ লক্ষ করতে থাকুন। পুরুষতান্ত্রিক আচরণ বুঝতে না পারার কোনো কারণ নেই। বেশি বেশি কর্তৃত্ব ফলানোর ভাব দেখলেই শুধরে দেওয়ার পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে যেসব প্রেমিকা নিজ হাতে বিরিয়ানি রান্না করে টিফিন বক্সে ভরে প্রেমিককে খাইয়ে প্রশংসা পাওয়ার জন্য তীর্থের কাকের মতো বসে থাকেন, তাঁদের জন্য উপদেশ বৃথা। কারণ, তাঁরাই জেন্ডার বৈষম্য জিইয়ে রাখতে সচেষ্ট। সেই প্রেমিক স্বামী হয়ে উঠলে তিনি কোনো দিন তাঁর এ বদ্ধমূল ধারণা থেকে বেরোতে পারবেন না যে রান্না করা কেবল নারীরই কাজ। যেমন ধরুন, প্রেমিক বলে বসলেন, ‘এত জোরে বেটাছেলের মতো হাসো কেন? মেয়েদের মতো হাসতে পারো না?’ অথবা নারী নিজেই তাঁর প্রেমিককে বললেন, ‘মেয়েদের মতো ফ্যাস ফ্যাস করে কেঁদো না তো।’ জেন্ডার ধারণায় উদ্বুদ্ধ হতে হবে নারী-পুরুষ উভয়কেই। যেসব অভিভাবক তাঁদের পছন্দমতো ছেলেমেয়ের বিয়ে দিতে চান, তাঁদেরকেও পুরোনো ধ্যানধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। শিক্ষিত ও উপযুক্ত ছেলেমেয়ের নিজেদের পছন্দকে সম্মান দেখাতে হবে। এখন তো বিবাহযোগ্য ছেলেমেয়ের অনেক মা-বাবাকেই বলতে শোনা যায়, ‘বাছা, নিজে একটা পছন্দ করে রাখলেই তো আর এত ছুটতে হয় না আমাদের।’ যৌতুক দেওয়া ও নেওয়ার কোনো আলোচনা দুই পক্ষের মধ্যে হবে না। সে ক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রীর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, যৌতুক নারীকে হেয় করার প্রধান উপাদান। ভোজ্যতেলের বিজ্ঞাপনের মতো অন্য আরেকটি বিজ্ঞাপনে পাত্রীকে যদি পাত্রপক্ষ ‘কী কী রাঁধতে পারো মা?’ জিজ্ঞাসা করে, তাহলে মেয়েটিও পাত্রকে ‘আপনি থালাবাসন পরিষ্কার করতে পারেন?’ জিজ্ঞাসা করবেন। যদি পাত্র বিস্ময়ে বলে ওঠেন, ‘থালাবাসন পরিষ্কার করা তো মেয়েদের কাজ’, তখন পাত্রী সে বিয়েতে মত না দিলে সেটাই হবে পুরুষকে জেন্ডার সচেতন করার সফল বিজ্ঞাপন।
উম্মে মুসলিমা, কথাসাহিত্যিক।

শান্তিরক্ষী ছাত্রলীগ! by কামাল আহমেদ



গৌরবের সত্তর বছর ঘটা করে উদ্‌যাপনের মাত্র তিন সপ্তাহ পার না হতেই ছাত্রলীগের ‘শান্তিরক্ষীর ভূমিকা’ নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্ক এখন তুঙ্গে। সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের ঘেরাওয়ে অবরুদ্ধ থাকা উপাচার্যকে রক্ষা করতে গেছে এবং অবরোধকারীদের মারধর করে তাড়িয়ে দিয়েছে। ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে চলছে তোলপাড় এবং মূলধারার গণমাধ্যমেও ঘটনাটি বেশ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে। এসব সংবাদের শিরোনাম এবং ভাষ্য ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরতে পেরেছে কি না, সেটা অবশ্য প্রশ্নসাপেক্ষ। কেউ কেউ লিখেছে, অবরুদ্ধ উপাচার্যকে মুক্ত করল ছাত্রলীগ। কেউ বলেছে, উদ্ধার করেছে। আবার কারও কারও ভাষায়, উপাচার্যের ত্রাতার ভূমিকায় ছাত্রলীগ। যাদের নিয়ে এত কথা, তাদের ভাষ্যটি কী? ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুর রহমান বলেছেন, অছাত্রদের হামলা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে ‘উদ্ধার’ করতে ও উপাচার্যের সম্মান রক্ষায় ছাত্রলীগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে সেখানে গিয়েছিল। তিনি আরও বলেছেন, ছাত্রলীগ সেখানে মারামারি করতে যায়নি। ছাত্রদল, জামায়াত-শিবির এবং কিছু বাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে অবরুদ্ধ ও তাঁর ওপর হামলা করেছে শুনে সেখানে গিয়েছিল। এ ছাড়া অবরোধকারী ছাত্রছাত্রীদের বাম-সন্ত্রাসী অভিহিত করে তাদের বহিষ্কার ও বিচার দাবি করে ছাত্রলীগ যে বিবৃতি দিয়েছে, তাতে ঘটনার বিবরণে তারা উপাচার্যকে ‘উদ্ধার’-এর কথা বলেছে। ছাত্রলীগের অভিভাবক সংগঠন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ছাত্রলীগ উপাচার্যকে রক্ষা করতে এগিয়ে না গেলে তাঁর প্রাণনাশের আশঙ্কা ছিল।
‘বাংলাদেশের ইতিহাস, ছাত্রলীগের ইতিহাস’—এ রকম একটি ভাষ্য বহুদিন ধরেই চালু আছে। বিশেষ করে, যাঁরা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে ছাত্রলীগ করেছেন এবং পরবর্তীকালে জাতীয় পর্যায়ে রাজনীতি, প্রশাসন, বুদ্ধিবৃত্তিক বিভিন্ন পেশা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে সাফল্য লাভ করেছেন, তাঁরা গর্বের সঙ্গেই এ কথাগুলো বলে থাকেন। বাষট্টি, ছেষট্টি কিংবা উনসত্তরের ছাত্র-গণ-আন্দোলনে যাঁরা অংশ নিয়েছেন, তাঁদের কাছে ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচি নতুন কিছু নয়। অবশ্য ইতিহাস তো অতীতের কথা। সময় যে বদলে গেছে, সে কথাও তো আমাদের মানতে হবে। এখন উন্নয়নের রাজনীতির যুগ। তাই ছাত্রছাত্রীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের প্রধান ফটকের তালা ভাঙবে কিংবা কলাপসিবল গেট ভাঙবে, সেটা এখনকার ছাত্রলীগ এবং কিংবা তাদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকেরা মেনে নেবেন—এমন ধারণা ‘উন্নয়নের গণতন্ত্রে’ অচল। উন্নয়নের রাজনীতিতে বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তচিন্তা এবং বিতর্কের জন্য উন্মুক্ত থাকবে—এমনটি যাঁরা ভাবছেন, তাঁরা ভুলে যাচ্ছেন যে ছাত্রলীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনটি বহুদিন ধরেই ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ। বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলোর সাংগঠনিক শক্তি যেহেতু ক্ষমতাসীনদের জন্য তেমন কোনো মাথাব্যথার বিষয় নয়, সেহেতু তারা কিছুটা সীমিত অধিকার ভোগ করে থাকে। কিন্তু তারাও যখন মাথাব্যথার কারণ হয়েছে, তখন তাদের কী পরিণতির মুখোমুখি হতে হয়েছে, সে কথা নিশ্চয়ই কাউকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। ছাত্র সংসদ—ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে তাদের আন্দোলন দমনে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং ছাত্রলীগ উভয়ের মারমুখী আচরণের ঘটনা বেশি দিনের পুরোনো নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে শৃঙ্খলা তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রক্টরকে তখন তাঁর দায়িত্ব পালনে শারীরিক শক্তি প্রয়োগেও সক্রিয় দেখা গেছে। এগুলো সবই হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে শান্তি বজায় রাখার স্বার্থে। শান্তি ও স্থিতিশীলতা নষ্ট হলে উন্নয়নের রাজনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেই উপলব্ধি থেকেই সম্ভবত সংসদের বিরোধী দল মন্ত্রিসভারও অংশীদার! উপাচার্য তাই তাঁর ‘প্রিয় শান্তিরক্ষীদের’ দ্বারা ছাত্রী নিগ্রহে বিব্রত না হয়ে বরং আরও উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করেন যে কোনো ধরনের অশুভ তৎপরতা বরদাশত করা হবে না। ‘শান্তিরক্ষীদের’ পক্ষে সাফাই দিয়ে তিনি বরং বলেন যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারীদের সামাজিক শক্তি দিয়ে তিনি অশুভ শক্তি প্রতিহত করবেন (শুক্রবার ২৬ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযানের বক্তৃতা)। উপাচার্য অবশ্য সামাজিক শক্তির কথা বলতেই পারেন, কেননা ছাত্রলীগ ছাড়াও তাঁর রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। শিক্ষক সমিতি যে বিবৃতিটি দিয়েছে, তাতে তাদের পক্ষপাতদুষ্ট দলীয় অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে।
২. অনেকেই প্রশ্ন করেছেন, উপাচার্যকে রক্ষার দায়িত্ব ছাত্রলীগকে নিতে হবে কেন? দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজটি তো পুলিশের করার কথা? তাঁরা আসলে উন্নয়নের রাজনীতি দেখেও দেখেন না! সাতটি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করার পর পরীক্ষার ফল প্রকাশের দাবিতে আন্দোলন মোকাবিলায় পুলিশ আসারপর তা নিয়ে কর্তৃপক্ষকে কি কম সমালোচনা শুনতে হয়েছে? সিদ্দিকুর নামের তিতুমীর কলেজের সেই ছাত্রটির চোখ হারানোর ঘটনায়ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকেই গালমন্দ শুনতে হয়েছে। সুতরাং পুলিশের বদলে শৃঙ্খলা ফেরানোর কাজটি ছাত্রলীগ নিজেদের কাঁধে তুলে নেবে, তাতে অবাক হওয়ার কী আছে? আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, ‘ছাত্রলীগ ভিসির আমন্ত্রণে এসেছে’ (প্রথম আলো, ২৫ জানুয়ারি, ২০১৮)। প্রশ্ন উঠেছে, উপাচার্য কেন ছাত্রলীগকে লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করলেন? এক যুগের বেশি আগে ২০০৫ সালে তৎকালীন উপাচার্য এস এম এ ফায়েজকে উদ্ধারের জন্য ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরাও একই কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন। সে সময়ে অবশ্য উপাচার্যকে ঘেরাওয়ের পেছনে ছাত্রলীগের সমর্থন ছিল, এখন যেমন ছাত্রদলের ভূমিকার কথা উঠেছে। যাঁরা এভাবে ছাত্রলীগ আর ছাত্রদলের তুলনা করেন, তাঁরা সম্ভবত ভুলে যাচ্ছেন, উন্নয়নের রাজনীতির সঙ্গে বিএনপির শাসনামলের তুলনা চলে না। উন্নয়নের রাজনীতিতে উপাচার্যের ওপর হামলার অধিকার ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য কারও থাকার কথা নয়। যে কারণে ২০১৬ সালের ১ জুলাই সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের গাড়ির ওপর হামলা এবং তাঁর বাসভবনে তালা দিয়ে তাঁকে ছাত্রলীগের কর্মীরা অবরুদ্ধ করে রাখলেও তখন উপাচার্যের জীবনরক্ষার প্রশ্ন ওঠেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর স্মরণিকায় জিয়াউর রহমানকে দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করে ভুল তথ্য ছাপা হওয়ায় ক্ষুব্ধ ছাত্রলীগের কর্মীরা তখন উপাচার্যের বিরুদ্ধে কোমর বেঁধে নেমে পড়েছিলেন। উপাচার্যের ঘরবাড়ি তছনছ করার অধিকার ছাত্রলীগ যে শুধু ঢাকাতেই চর্চা করেছে, এমন নয়। গত বছরের ৮ নভেম্বরের সংবাদপত্রগুলো খুললে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭ নভেম্বর রাতে তারা কী ধরনের তাণ্ডব চালিয়েছিল, তার একটা চিত্র পাওয়া যাবে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাই বা বাদ যায় কী করে? সেখানেও তো বিক্ষোভ-ভাঙচুরের একচেটিয়া অধিকার ছাত্রলীগের। এ ছাড়া ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে প্রাণহানিগুলোর দিকে আওয়ামী লীগের নেতাদের তাকানোর ফুরসত কই? চট্টগ্রামে ছাত্রলীগ নেতার হত্যাকারীর বিচারের দাবিতে এই সরকারের আমলেই একজন মা আমরণ অনশনে বসতে বাধ্য হয়েছিলেন। সিলেটে অভ্যন্তরীণ খুনোখুনির হিসাবটিও তারা আর কত দিন উপেক্ষা করে চলবে?
৩. আপাতদৃশ্যে মনে হয় অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে উদ্ধার কিংবা মুক্ত করার এ ভাষ্যটিই সংবাদমাধ্যম গ্রহণ করেছে। ব্যতিক্রমী দু-একটি কাগজ ছাড়া কেউ উদ্ধার বা মুক্ত কথাগুলো উদ্ধৃতিচিহ্নের মধ্যে রাখেনি। উদ্ধার বা মুক্ত করার প্রশ্ন তখনই আসে, যখন কোনো বেআইনি উপায়ে কাউকে আটকে রাখা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে কি কেউ বেআইনিভাবে আটকে রেখেছিল? বিক্ষোভ, ঘেরাও এবং অবরোধের মতো কর্মসূচি বাংলাদেশের রাজনীতিতে তো কোনো নতুন সংযোজন নয়। উপাচার্যের কার্যালয় ঘেরাওয়ের কর্মসূচি ছিল পূর্বঘোষিত। সুতরাং সেটা বেআইনি হলে কর্তৃপক্ষ তা আগেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে পারত। সে রকম কোনো নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়নি। ছাত্রলীগের নিগ্রহের বিচার দাবিতে ঘেরাওয়ের কর্মসূচির দিনে উপাচার্যের কার্যালয়ের ফটকগুলোতে তালা লাগানো আর ছাত্রলীগের মিছিলের দিনে সেগুলো খুলে রাখার মধ্য দিয়ে আসলে উপাচার্যের নৈতিক অবস্থানের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। স্বাভাবিকভাবে প্রত্যাশিত ছিল, উপাচার্য বিক্ষোভকারীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলবেন এবং আলোচনার মাধ্যমেই সমস্যার একটি গ্রহণযোগ্য এবং শান্তিপূর্ণ সমাধান করবেন। দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটিতে সেভাবেই আন্দোলন-সংগ্রামের নিষ্পত্তি হওয়ার কথা। কিন্তু তার উল্টোটা কেন ঘটল? ছাত্রলীগ দাবি করেছে, তাদের ১০ জন কর্মী আহত হয়েছেন। ছাত্রলীগ তাদের অন্যায় দাপট দেখানোকে বৈধতা দিতে ‘নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ’ ব্যানার ব্যবহারের পর শনিবার ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নামটিকেও কাজে লাগানোর এক অদ্ভুত নজির তৈরি করেছে। ক্ষমতাসীন মহাজোটের শরিকদের (জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, ন্যাপ ইত্যাদি) ছাত্রসংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে তাঁরা ছাত্রলীগের ভাষ্যেরই পুনরুচ্চারণ করেছেন। তবে, লক্ষণীয়ভাবে তাঁরা উপাচার্যকে ঘেরাওকারীদের আর ‘বাম সন্ত্রাসী ‘বলেননি। কিছু ‍কিছু সংবাদপত্রে ছাত্রলীগের ১০ কর্মী আহত হওয়ার দাবি এমনভাবে ছাপা হয়েছে, যাতে সেটি সত্য বলেই মনে হয়। কিন্তু ভিডিও ফুটেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসাকেন্দ্রের ছবিগুলোতে তার উল্টো চিত্রই পাওয়া যাচ্ছে। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে, সত্যাসত্য যাচাইয়ের কাজটি গণমাধ্যম যথার্থভাবে করতে পেরেছে কি না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ক্ষমতার কাছে মূলধারার পত্রিকাগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষাটি কিন্তু এখন আর কোনোভাবেই ছোট করে দেখার সময় নয়।
কামাল আহমেদ: সাংবাদিক।