Wednesday, August 19, 2026

নেতানিয়াহুকে রক্ষার চেষ্টা—আইসিসির প্রেসিডেন্ট ও কৌঁসুলির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রেসিডেন্ট এবং একজন জ্যেষ্ঠ কৌঁসুলির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গতকাল মঙ্গলবার এ ঘোষণা দেন।

নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ–ভিত্তিক এ আন্তর্জাতিক আদালতের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের ধারাবাহিক আক্রমণের অংশ হিসেবেই নেওয়া হলো এই সর্বশেষ পদক্ষেপ।

যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে ২০০২ সালে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্যোগে আইসিসি গঠিত হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র এ আদালতের সদস্য নয়।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক বিবৃতিতে জানান, আইসিসির প্রেসিডেন্ট ও জাপানি বিচারক তোমোকো আকানে এবং আদালতটির ‘সিনিয়র ট্রায়াল লয়ার’ (জ্যেষ্ঠ কৌঁসুলি) সেনেগালের নাগরিক আবদুলায়ে সেয়ের ওপর এ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। গত বছর আইসিসির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারির অনুমোদন দিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সই করা একটি নির্বাহী আদেশের আওতায় এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

মার্কো রুবিও বলেন, ‘যেসব দেশের সরকার আইসিসির এখতিয়ারে সম্মতি দেয়নি, সেসব দেশের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা, গ্রেপ্তার, আটক কিংবা তাঁদের বিচারের আওতায় আনার আইসিসির প্রচেষ্টায় এই ব্যক্তিরা (আইসিসির প্রেসিডেন্ট ও জ্যেষ্ঠ কৌঁসুলি) সরাসরি জড়িত।’

তবে যুক্তরাষ্ট্রের এ পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে আইসিসি। এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, এমন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা আইনের শাসনকে ক্ষুণ্ন করে।

বিবৃতিতে আইসিসি আরও বলেছে, ‘আইন প্রয়োগের কারণে যখন বিচারিক কাজে যুক্ত ব্যক্তিরা হুমকির সম্মুখীন হন, তখন মূলত আন্তর্জাতিক আইনশৃঙ্খলাই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।’

নিষেধাজ্ঞার শিকার আবদুলায়ে সেয়ে আইসিসির সেই কৌঁসুলি দলের একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য, যাঁরা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা চেয়েছিলেন। এ ছাড়া আইসিসির বিচারক হিসেবে নির্বাচনের জন্যও তিনি মনোনীত হয়েছেন।

নিষেধাজ্ঞা আরোপের এই মার্কিন তৎপরতা ইউরোপে তাদের মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে একধরনের দূরত্ব তৈরি করেছে।

আদালতের স্বাগতিক দেশ নেদারল্যান্ডসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী টম বেরেন্ডসেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এ নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে নেদারল্যান্ডস তার অসম্মতি জানাচ্ছে। একই সঙ্গে নেদারল্যান্ডসের ধারাবাহিক সমর্থনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য তিনি তোমোকো আকানেকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

টম বেরেন্ডসেন আরও লেখেন, ‘আন্তর্জাতিক আদালত ও ট্রাইব্যুনালগুলোর স্বাধীনভাবে নিজেদের ম্যান্ডেট বা দায়িত্ব পালন করার সুযোগ থাকা উচিত।’

আইসিসির শীর্ষ বিচারক তোমোকো আকানে গত ডিসেম্বরেই সতর্ক করে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞা ‘সব ধরনের পরিস্থিতি ও মামলায় আদালতের কার্যক্রমকে দ্রুত স্থবির করে দেবে এবং এর অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তুলবে।’

আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে অতীতের একটি তদন্ত এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এর জের ধরে গত বছর আদালতের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা, কৌঁসুলি ও বিচারকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ওয়াশিংটন।

এদিকে নতুন নিষেধাজ্ঞার ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সম্পদ জব্দ করা হবে। একই সঙ্গে মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে তাঁদের সব ধরনের লেনদেন বন্ধ হয়ে যাবে, যার সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে কার্যত প্রায় সব ব্যাংকেরই নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। নতুন নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ (অর্থ মন্ত্রণালয়) গতকাল একটি সাধারণ লাইসেন্স ইস্যু করেছে। এর আওতায় তোমোকো আকানে এবং আবদুলায়ে সেয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লেনদেনগুলো গুটিয়ে নিতে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে।

নেতানিয়াহুকে রক্ষা করার চেষ্টা

গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে চলতি বছরের জুনে ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করেন আইসিসির তিন বিচারক। এ পদক্ষেপকে বেআইনি বলে দাবি করেন তাঁরা।

এ ছাড়া মানবাধিকার সংগঠনগুলোও দুটি আলাদা মামলায় বলেছে, বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া নৃশংসতার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আইসিসির সঙ্গে যেসব সংস্থা কাজ করছে, যুক্তরাষ্ট্রের এ তৎপরতা তাদের সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী।

মার্কো রুবিও গত মাসে বলেছিলেন, আইসিসির কার্যক্রম ব্যাহত করতে মার্কিন প্রশাসন তাদের চেষ্টা আরও জোরদার করবে। এর অংশ হিসেবে অন্য দেশগুলোকে এ সংস্থা ত্যাগ করতে রাজি করানোর জন্য একটি কূটনৈতিক প্রচারণাও চালানো হবে। ইতিমধ্যে অন্তত পাঁচটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সেই আহ্বানে সাড়া দিয়েছে।

রুবিওর যুক্তি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতি বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তা, মাদক বহনের অভিযোগে নৌযানে অভিযান পরিচালনাকারী দল এবং অন্যান্য মার্কিন সামরিক সদস্যদের জন্য এ আদালত এক বড় হুমকি।

অবশ্য ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, এ প্রচারণার লক্ষ্য নিজেকে বিচার থেকে বাঁচানো নয়, বরং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও অন্যদের রক্ষা করা।

যুক্তরাষ্ট্র কখনোই এ আদালতের সদস্য ছিল না। কোনো সদস্যরাষ্ট্র যখন নিজের দেশে ঘটে যাওয়া কোনো নৃশংসতার বিচার করতে অসমর্থ বা অনিচ্ছুক হয়, শুধু তখনই আইসিসি সেখানে নিজের এখতিয়ার খাটায়।

তবে আইসিসির সংবিধিতে এ-ও বলা আছে যে কোনো সদস্যরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে যদি সদস্য নয় এমন কোনো দেশের নাগরিকও নৃশংস অপরাধ করেন, তবে তাঁর বিচার করার ক্ষমতা এ আদালতের রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প  
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি: রয়টার্স

হামাস নিরস্ত্র না হলে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে না ইসরাইল

দ্য গার্ডিয়ানঃ ব্যর্থ নেতানিয়াহু-কুশনার বৈঠক গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকরের স্থবির হয়ে থাকা চুক্তি নিয়ে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা ও বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনারের বৈঠকে কোনো অগ্রগতি হয়নি। বৈঠকে নেতানিয়াহু স্পষ্ট করেছেন, হামাস অস্ত্র সমর্পণ না করা পর্যন্ত গাজা থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার করা হবে না।

ইসরাইলি এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সোমবার ইসরাইলে তিন ঘণ্টার বৈঠকে কোনো সমঝোতা হয়নি। নেতানিয়াহু বলেছেন, ইসরাইলি সেনারা গাজা থেকে প্রত্যাহার করবে না। তারা সেখানে অভিযানও চালিয়ে যাবে।

এর এক দিন আগে রোববার মিসরে হামাসের রাজনৈতিক প্রধান খলিল আল-হাইয়ার সঙ্গে বৈঠক করেন কুশনার। ওই বৈঠকে হামাস দাবি করে, চুক্তি বাস্তবায়নের আগে গাজার ইসরাইলি দখলে থাকা প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে।

সোমবারের বৈঠকটি হয় গাজায় যুদ্ধবিরতি এগিয়ে নিতে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত ১৫ দফা রোডম্যাপ নেতানিয়াহু এক সপ্তাহ আগে জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করার পর।

কুশনারের সঙ্গে বৈঠকেও নেতানিয়াহু তার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, হামাস পুরোপুরি নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত গাজা থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার বা সেখানে পুনর্গঠন শুরু করা যাবে না। হামাসের অস্ত্র হস্তান্তর তদারকির জন্য একজন মার্কিন জেনারেল নিয়োগের অনুরোধও করেন তিনি।

নেতানিয়াহুর কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী ও ‘বোর্ড অব পিস’-এর মধ্যে গভীর ও গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে। গাজাকে নিরস্ত্রীকরণ ও সামরিকীকরণমুক্ত করার জন্য দুটি কর্মদল গঠনে সম্মতি হয়েছে। ইসরাইল ও বোর্ড অব পিস দ্রুত এই কাজ শেষ করতে চায়। গাজায় পুনর্গঠন শুরুর আগেই তা সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছে।

বোর্ড অব পিসের এক কর্মকর্তাও বৈঠকটিকে দীর্ঘ, বিস্তারিত ও ফলপ্রসূ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে সামনে এগোনোর একটি পথ নিয়ে একমত হয়েছেন তারা। এখন হামাস সত্যিই চুক্তি মেনে চলতে চায় কি না, তা দেখানোর দায়িত্ব তাদের।

হামাস-ইসরাইলের অবস্থান যেখানে

হামাস জানিয়েছে, তারা ১৫ দফা রোডম্যাপে সম্মত। এতে হামাসের নিরস্ত্রীকরণের বিষয়টিও রয়েছে। তবে সংগঠনটি মধ্যস্থতাকারী দেশ ও বোর্ড অব পিসকে ইসরাইলকে চুক্তিতে সম্মত করানোর আহ্বান জানিয়েছে।

মধ্যস্থতাকারী মিসর, কাতার ও তুরস্কের কর্মকর্তারাও আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন।

রোডম্যাপ অনুযায়ী, ইসরাইলকে ধাপে ধাপে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। কিন্তু ইসরাইল বলছে, হামাস পুরোপুরি নিরস্ত্র হওয়ার আগে কোনো সেনা প্রত্যাহার করা হবে না। এই দুই বিপরীত অবস্থানই দীর্ঘদিন ধরে অচলাবস্থার মূল কারণ।

বর্তমানে গাজার প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা ইসরাইলি সেনাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এর আগে নেতানিয়াহু আরো বেশি এলাকা দখলে নেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন।

রোববার কুশনার হামাসের রাজনৈতিক প্রধান খলিল আল-হাইয়ার সঙ্গে বৈঠক করেন। আঞ্চলিক এক কর্মকর্তা ও হামাসের এক কর্মকর্তা বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন।

হামাসের ওই কর্মকর্তা বলেন, সংগঠনটি চুক্তি বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ১৪ দিনের আলোচনাপর্ব শুরু করার জন্য তারা মধ্যস্থতাকারীদের অপেক্ষায় রয়েছে। এই সময়ে চুক্তি বাস্তবায়নের সময়সূচি নির্ধারণের কথা রয়েছে। তবে এর জন্য সব পক্ষের রোডম্যাপে সম্মতি প্রয়োজন।

হামাসের ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, হামাসের নেতা দাবি করেছেন, চুক্তি বাস্তবায়ন শুরুর আগে ইসরাইলকে গাজায় হামলা বন্ধ করতে হবে এবং তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ পর্যন্ত সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। গাজাকে বিভক্ত করা এই রেখার সুনির্দিষ্ট অবস্থান কখনো নির্ধারণ করা হয়নি। ইসরাইলি সেনারাও এর বাইরে চলে গেছে।

ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর মধ্যে বাড়ছে মতপার্থক্য

ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজা যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে নেতানিয়াহুর অনিচ্ছায় ট্রাম্প ক্রমেই হতাশ হচ্ছেন। চুক্তি অনুযায়ী নেতানিয়াহু তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করছেন না বলেও ট্রাম্প মনে করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইসরাইলি সংবাদপত্র ইয়েদিওথ আহরোনোথ জানিয়েছে, কুশনারের সঙ্গে ইসরাইল সফরের সময় ট্রাম্প প্রশাসনের চাওয়া বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের তালিকা থাকার কথা ছিল। এর মধ্যে ছিল গাজায় ইসরাইলি হামলা বন্ধ, সেনা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া এবং মানবিক সহায়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো।

তবে ইসরাইলের পক্ষ থেকে গাজায় হামলা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি মিলেছে বলে হারেৎসের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এটি সোমবার ট্রাম্পের দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ওই দিন ট্রাম্প বলেছিলেন, ইসরাইলের গাজায় হামলা চালানো উচিত নয়।

কুশনারের সঙ্গে নেতানিয়াহুর বৈঠকে সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার ও ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’-এর সদস্য নিকোলাই ম্লাদেনভও ছিলেন।

তবে বৈঠকের সময়টি নেতানিয়াহুর জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। চলতি বছরের শেষ দিকে ইসরাইলে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা। জনমত জরিপে নেতানিয়াহু চাপের মধ্যে রয়েছেন। গাজা যুদ্ধ এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরাইলি সীমান্তবর্তী এলাকায় হামাসের আকস্মিক হামলার আগে নেতানিয়াহুর ভূমিকা দেশটির রাজনীতিতে অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে আছে।

যুদ্ধবিরতি কার্যকরে কেন এত অচলাবস্থা

২০২৫ সালের অক্টোবরে মিসরে কুশনার ও আরেক মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে হামাস নেতাদের বৈঠক গাজায় যুদ্ধবিরতি চূড়ান্ত করতে সহায়তা করেছিল। কিন্তু এরপর চুক্তির বাস্তবায়ন হামাসের নিরস্ত্রীকরণের প্রশ্নে আটকে যায়।

এদিকে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি আঞ্চলিক দেশ ইসরাইলের রোডম্যাপ প্রত্যাখ্যানের নিন্দা জানিয়েছে। যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেছে, গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত করার দায় এখন ইসরাইলের।

বিবৃতিতে বোর্ড অব পিস ও যুক্তরাষ্ট্রকে চুক্তি বাস্তবায়নে কোনো পক্ষ যাতে বাধা দিতে না পারে, সে জন্য ‘অবিলম্বে ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ’ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। জর্ডান, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়াসহ যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতাকারীরাও এতে স্বাক্ষর করেছে।

এর আগে মে মাসে নেতানিয়াহু বলেছিলেন, গাজার ৭০ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়াই হবে পরবর্তী পদক্ষেপ। তিনি হামাসের ওপর ‘সব দিক থেকে চাপ আরো বাড়ানোর’ কথাও বলেছিলেন।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পর থেকে ইসরাইলি হামলায় গাজায় ১ হাজার ২০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৪ হাজার ১০০-এর বেশি আহত হয়েছেন।

হামাস নিরস্ত্র না হলে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে না ইসরাইল
ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

‘রহমতের ধর্মে তোমাকে স্বাগতম’—রবার্তো কার্লোসকে কাবার ইমামের অভিনন্দন

ব্রাজিলের কিংবদন্তি ফুটবলার রবার্তো কার্লোসের ইসলাম গ্রহণের খবর সামনে আসার পর তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন মসজিদুল হারামের ইমাম ও খতিব শায়খ ড. ইয়াসির আদ-দোসারি।

বুধবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে রবার্তো কার্লোসের অতীত এবং বর্তমান ছবি শেয়ার করে তাকে স্বাগত জানিয়ে তিনি লেখেন, ‘রহমতের ধর্মে তোমাকে স্বাগতম।’

সাবেক এই ব্রাজিলিয়ান তারকার জন্য দোয়া করে শায়খ ইয়াসির আদ-দোসারি পোস্টে আরও লেখেন, ‘হে আল্লাহ! তাকে আপনার দ্বীনের ওপর অটল রাখুন, তার অন্তরে হেদায়েত দান করুন, তার ইসলাম গ্রহণে বরকত দিন এবং তাকে দৃঢ় ও হেদায়েতপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত করুন।’

রবার্তো কার্লোসের ইসলাম গ্রহণের খবরটি প্রথম প্রকাশ্যে আসে মঙ্গলবার। তুরস্কের ক্ষমতাসীন একে পার্টির গাজিয়ানতেপের সংসদ সদস্য আলি শাহিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ দাবি করেন।

আলি শাহিন জানান, সম্প্রতি ব্রাজিল সফরের সময় দেশটির মুসলিম সম্প্রদায়ের কয়েকজন প্রতিনিধির সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। সেখানেই ব্রাজিলের ইসলামী ব্যক্তিত্ব শায়খ জিহাদ হাম্মাদের কাছ থেকে রবার্তো কার্লোসের ইসলাম গ্রহণের খবর জানতে পারেন তিনি। পরে সাবেক এই ফুটবলারকে অভিনন্দনও জানান শাহিন।

তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রবার্তো কার্লোসের সঙ্গে শায়খ জিহাদ হাম্মাদের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ ছিল। প্রায় চার সপ্তাহ আগে সাও পাওলোতে তাদের সাক্ষাৎ হয়। ওই সময় রবার্তো কার্লোস শাহাদাত পাঠ করে ইসলাম গ্রহণ করেন বলে দাবি করা হয়েছে।

‘রহমতের ধর্মে তোমাকে স্বাগতম’—রবার্তো কার্লোসকে কাবার ইমামের অভিনন্দন
মসজিদুল হারামের ইমাম ও খতিব শায়খ ড. ইয়াসির আদ-দোসারি (বামে) তার ফেসবুক পোস্টে শেয়ার করা রবার্তো কার্লোসের ছবি (ডানে)।

উগ্রপন্থি ইসরাইলিরা যেভাবে সন্ত্রাসী, ব্যাখ্যা মার্কিন রাষ্ট্রদূতের

ইসরাইলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি মঙ্গলবার পশ্চিম তীরের উগ্রপন্থি ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যায়িত করার আগের অবস্থানেই অটল থেকেছেন। একই সাথে, গাজার জন্য মার্কিন-সমর্থিত পরিকল্পনার পরবর্তী পর্যায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং হোয়াইট হাউসের মধ্যকার মতবিরোধের খবরও অস্বীকার করেছেন।

গত সপ্তাহে হাকাবি পশ্চিম তীরের কুসরা গ্রামের কয়েকটি বাড়ি অবরোধকারী বসতি স্থাপনকারীদেরকে ‘ইসরাইলি সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে উগ্রপন্থিরা বাড়িগুলো ঘিরে রেখেছে, যার স্পষ্ট উদ্দেশ্য হলো সেখানকার বাসিন্দাদের— যাদের মধ্যে একজন মার্কিন নাগরিকও রয়েছেন—পালিয়ে যেতে বাধ্য করা। যদিও সেনাবাহিনী দৃশ্যত তাদের ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে, বসতি স্থাপনকারীরা বারবার সেই স্থানে ফিরে এসেছে।

সম্প্রতি চ্যানেল ১২ নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হাকাবি বলেন, ‘অনেকে আমাকে তিরস্কার করে বলেছেন, ‘এটা তো সন্ত্রাসবাদ নয়’।’

এর বিপরীতে তিনি সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা তুলে ধরেন। তিনি জানান, সন্ত্রাসের সংজ্ঞা অনুযায়ী, যখন এমন কোনো কাজ করা হয় যা মানুষের আচরণে পরিবর্তন আনে এবং তাদের জীবনকে শঙ্কিত করে তোলে, যখন কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে মানুষের ওপর কিছু করা হয়, তা কোনো জাতির ওপর হোক কিংবা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা পরিবারের ওপর হোক—যার ফলে তারা তাদের জীবনযাপন করতে ভয় পায় — সেটাই সন্ত্রাস।

হাকাবি বলেন, অপরাধীরা ইসরাইলের ‘একটি সংখ্যালঘু গোষ্ঠী’ থেকে এসেছে এবং দাবি করেন যে তাদের অনেকেই পশ্চিম তীরের বাইরে বাস করে। তিনি বলেন, ‘তারা বসতি স্থাপনকারী নয়, বরং উচ্ছেদকারী।’

তিনি বলেন, ‘তারা সেখানে বিশৃঙ্খলা করতে এসেছে এবং তারা ইসরাইল ও ইহুদি জনগণের ক্ষতি করছে—আমার কোনো ধারণা নেই কেন তারা মনে করে যে, যাদের জন্য তারা লড়াই করার দাবি করে, তাদের ক্ষতি করা ছাড়া তারা আর কিছু অর্জন করছে।’

কুসরা অবরোধের কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন যে মার্কিন দূতাবাসের সম্পৃক্ততা নির্বিশেষে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যেই এই ঘটনা মোকাবেলায় ‘পদক্ষেপ’ নিচ্ছে। তবে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, ‘যদি কোনো মার্কিন নাগরিক জড়িত না থাকে, তাহলে আমাদের সরাসরি কোনো সম্পৃক্ততা থাকে না।’

তিনি বলেন, ‘কিন্তু যখনই কোনো মার্কিন নাগরিক জড়িত হন, তখন আমাদের সম্পৃক্ততা প্রায় স্বয়ংক্রিয় এবং তা তাৎপর্যপূর্ণ হবে, কারণ এটাই আমাদের কাজ।’

ফিলিস্তিনি-আমেরিকান লুই রিদি, যার পশ্চিম তীরের কুসরা গ্রামের বাড়িটি এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে উগ্রপন্থি বসতি স্থাপনকারীরা ঘিরে রেখেছে।

প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে প্রকাশ্যে নিন্দা জানানোর জন্য চাপ দেওয়া সত্ত্বেও এখনও পর্যন্ত তা না করায় তিনি হতাশ কিনা জানতে চাইলে হাকাবি চ্যানেল ১২-কে বলেন, ‘আমরা দায়িত্বশীল পদক্ষেপ চাই।’

হাকাবি বলেন, ‘আমরা চাই, যারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছে, তাদের সবাইকে যেন কঠোর পরিণতির সম্মুখীন হতে হয়।’

সূত্র: টাইমস অব ইসরাইল

উগ্রপন্থি ইসরাইলিরা যেভাবে সন্ত্রাসী, ব্যাখ্যা মার্কিন রাষ্ট্রদূতের

‘পাওনা চাইতে গিয়ে’ খুন পাকিস্তানি জনপ্রিয় টিকটকার

পাকিস্তানের জনপ্রিয় টিকটক তারকা শামসো বিবি অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতকারীর গুলিতে নিহত হয়েছেন। পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসের দিন (১৪ আগস্ট) এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। ২৮ বছর বয়সী এই কনটেন্ট ক্রিয়েটরের আকস্মিক প্রয়াণে বিনোদন জগতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। সামাজিকমাধ্যমে জনপ্রিয় ওই টিকটকার তরুণীর আসল নাম শামসো বিবি। তবে নেটদুনিয়ায় তিনি আয়েশা গিলামানা নামে বেশি পরিচিত ছিলেন। তার অনুরাগীর সংখ্যা ১৩ লাখেরও বেশি। রাওয়ালপিন্ডির তক্ষশীলা শহরে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর খবর জানিয়েছেন তার ভাই নিয়ামাতুল্লাহ।

ঘটনার দিন কাশিফ নামের এক যুবকের ফোন পেয়ে ভাই নিয়ামাতুল্লাহ ও বোন আসিমাকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন শামসো বিবি। এর কিছু পরই এক পেট্রোল পাম্পের কাছে বাইকে আসা দুই অজ্ঞাতপরিচয় যুবক তাদের লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। এ সময় ঘাড়ে গুলি লেগে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান এই বিনোদন তারকা। একই সময় তার বোনও গুরুতর আহত হন।

ভারতীয় গণমাধ্যম আনন্দবাজারে শামসোর ওপর আততায়ীদের হামলার একটি ভিডিও প্রকাশ্য হয়েছে। সেই ভিডিওটি ব্যাপক ভাইরাল হয়। যদিও সেই এর সত্যতা যাচাই করেনি আনন্দবাজার ডটকম।

শামসুর পরিবারের দাবি, কাউসার ও জাভেদ নামে দুই ব্যক্তির কাছে টাকা পাওনা কেন্দ্র করে আগে থেকেই খুনের হুমকি পাচ্ছিলেন এই তারকা।

রাওয়ালপিন্ডি পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে হত্যাকারীদের দ্রুত শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।

বিনোদন জগতের এই উজ্জ্বল তারকার নৃশংস হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের কড়া শাস্তির দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন তার পরিবার ও অনুরাগী মহল। 

পাকিস্তানি জনপ্রিয় টিকটক তারকা শামসো বিবি। ছবি: সংগৃহীত
পাকিস্তানি জনপ্রিয় টিকটক তারকা শামসো বিবি। ছবি: সংগৃহীত

নায়িকা থেকে ব্যাংকার, জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু তমা মির্জার

‘সুড়ঙ্গ’ ও ‘দাগি’ সিনেমায় অভিনয় করে দর্শকের নজর কাড়েন হালের জনপ্রিয় অভিনেত্রী তমা মির্জা। বর্তমানে চলচ্চিত্রে তাকে খুব বেশি ব্যস্ত দেখা যায় না তাকে। এবার প্রকাশ্যে এসেছে নতুন খবর। একটি বেসরকারি ব্যাংকে অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট (এভিপি-ব্র্যান্ড অ্যান্ড কমিউনিকেশনস) পদে প্রায় তিন মাস ধরে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। ব্যাংকিং পেশায় যুক্ত হলেও অভিনয় ছাড়ছেন না বলে জানিয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত এই অভিনেত্রী।

অভিনয়ের বাইরে নতুন ব্যাংকিং পেশাকে নিজের জন্য একটি নতুন অভিজ্ঞতা হিসেবেই দেখছেন তমা মির্জা।

এ প্রসঙ্গে গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘আমি খুব বেছে বেছে কাজ করি। বছরে একটা কিংবা দুটো সিনেমায় কাজ করি। জীবনের বাকি সময়টা অন্য কিছু এক্সপ্লোর করতে পারাটা দারুণ একটা সুযোগ। সেই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে আমার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চাই। তবে অভিনয়ই আমার প্রথম ভালো লাগা ও ভালোবাসার জায়গা। তাই অভিনয় থেকে দূরে সরে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই।’

উল্লেখ্য, আফরান নিশোর বিপরীতে ‘সুড়ঙ্গ’ ও ‘দাগি’ সিনেমায় অভিনয় করে দর্শকের নজর কাড়েন তমা। ২০১৫ সালে ‘নদীজন’ চলচ্চিত্রে চমৎকার অভিনয়ের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রী) লাভ করেন। এম বি মানিকের ‘বলো না তুমি আমার’ সিনেমার মাধ্যমে ২০১০ সালে চলচ্চিত্রে তমা মির্জার অভিষেক হয়। এরপর অনন্ত হীরা পরিচালিত ‘ও আমার দেশের মাটি’ সিনেমায় চিত্রনায়িকা হিসেবে অভিনয় করে আলোচনায় আসেন তিনি। 

তমা মির্জা। ছবি : সংগৃহীত
তমা মির্জা। ছবি : সংগৃহীত

ইসরায়েলের হাজার দিনের যুদ্ধ ও হামাসের কৌশল by মালিহা লোধি

গাজায় ইসরায়েলের যে গণবিধ্বংসী যুদ্ধ চলছে, তা ইতিমধ্যেই হাজার দিনের সীমা ছাড়িয়েছে। গত অক্টোবর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যে যুদ্ধবিরতি হয়েছিল, তা কার্যত ভেঙে পড়েছে। থামেনি হামলা, থামেনি মৃত্যু। ধ্বংস আর হত্যালীলা যেন এক অন্তহীন অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে।

এই দীর্ঘ সময়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি। তাঁদের মধ্যে ২১ হাজারের বেশি শিশু। হাজার হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ। পুরো গাজা আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত। এলাকার প্রায় ৮০ শতাংশ সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত। শুধু সাধারণ মানুষই নন, লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন সাংবাদিকেরাও। ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় প্রাণ গেছে দুই শতাধিক সাংবাদিকের। আন্তর্জাতিক মহলের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে গাজার আরও বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে ইসরায়েল। জাতিসংঘ ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, এ পরিস্থিতি ফিলিস্তিনিদের জন্য আরও প্রাণঘাতী ঝুঁকি তৈরি করছে।

মানবিক বিপর্যয় এখনো ভয়াবহ। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা লঙ্ঘন করে চলছে হামলা। অথচ বিশ্বের দৃষ্টি অন্যত্র সরে গেছে। এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত এবং তাদের সম্ভাব্য সমঝোতা। আঞ্চলিক শক্তিগুলোও গাজা প্রসঙ্গ থেকে অনেকটাই দূরে সরে গেছে। ফলে গাজা কার্যত আন্তর্জাতিক আলোচনার প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। শান্তি পরিকল্পনাও তাই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে আছে।

এ প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি বদলাতে চায় হামাস। আন্তর্জাতিক মহলের নজর ফেরাতে তারা নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে। গত সপ্তাহে তারা ঘোষণা করেছে, গাজায় তাদের দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ক্ষমতা তারা একটি টেকনোক্র্যাট কমিটির হাতে তুলে দেবে। প্রায় দুই দশক ধরে গাজায় কার্যত শাসনক্ষমতায় ছিল হামাস। এখন তারা সেই দায়িত্ব ছাড়তে চাইছে।

এই নতুন সংস্থার নাম ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা, সংক্ষেপে এনসিএজি। এটি মূলত ফিলিস্তিনি বিশেষজ্ঞদের একটি অন্তর্বর্তী কমিটি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে এটি গঠিত হয় ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই কমিটি গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব নেবে এবং বোর্ড অব পিস নামে একটি সংস্থার তত্ত্বাবধানে কাজ করবে।

ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে ছিল ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং গাজাকে সামরিকীকরণমুক্ত করা। প্রথম ধাপে ছিল ইসরায়েলি জিম্মিদের বিনিময়ে ফিলিস্তিনি বন্দীদের মুক্তি। কিন্তু বাস্তবে এর কোনোটাই কার্যকর হয়নি।

এনসিএজিকে কোনো সম্পদ বা সহায়তা দেওয়া হয়নি। তারা এখনো কায়রোয় আটকে আছে। ইসরায়েল তাদের গাজায় প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীও এখনো মোতায়েন হয়নি। বোর্ড অব পিস কার্যত নিষ্ক্রিয়। আইনি ও রাজনৈতিক জটিলতায় তারা জড়িয়ে আছে। এমনকি তাদের জন্য গঠিত তহবিলেও কোনো অর্থ নেই।

পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে, যখন বোর্ড অব পিস ঘোষণা করে, ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য রাষ্ট্রসংঘের সংস্থা ইউনরার গাজায় আর কোনো ভূমিকা থাকবে না। ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব এ সিদ্ধান্তকে শরণার্থী সমস্যাকে মুছে ফেলার চেষ্টা বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।

এর পাশাপাশি দক্ষিণ গাজায় একটি ‘নিয়ন্ত্রিত মানবিক অঞ্চল’ তৈরির পরিকল্পনাও করছে বোর্ডটি। সেখানে যাচাই করা কিছু ফিলিস্তিনিকে রাখা হবে। এ পরিকল্পনাকে অনেকেই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী বলে মনে করছেন। অনেকের মতে, এটি জোরপূর্বক জনসংখ্যা স্থানান্তরের শামিল।

হামাস বলেছে, তারা শাসনক্ষমতা ছাড়ছে, যাতে ইসরায়েল তাদের আক্রমণ চালিয়ে যাওয়ার অজুহাত হারায়। এ ঘোষণা দিয়ে তারা তাদের প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে দিয়েছে। এর লক্ষ্য, ইসরায়েলের ওপর চাপ তৈরি করা এবং শান্তিপ্রক্রিয়াকে আবার সচল করা।

তবে ইসরায়েল এ ঘোষণাকে গুরুত্ব দেয়নি। তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে ‘চালাকি’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর দাবি, নিরস্ত্রীকরণ এড়াতেই এ কৌশল নিয়েছে হামাস।

বোর্ড অব পিস জানিয়েছে, তারা কথার চেয়ে কাজকে গুরুত্ব দেবে। তাদের মতে, গাজায় সব অস্ত্র এনসিএজির নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে। কিন্তু হামাস নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে কিছু বলেনি। শুরু থেকেই তাদের অবস্থান পরিষ্কার—ইসরায়েল যদি গাজা থেকে পুরোপুরি সরে যায় এবং দখলদারি শেষ করে, তবেই তারা অস্ত্র ছাড়ার কথা ভাববে।

হামাস আরও বলছে, আগে একটি পূর্ণাঙ্গ ফিলিস্তিনি প্রশাসন গড়ে তুলতে হবে। কারণ, কোনো কার্যকর প্রশাসন না থাকলে তারা অস্ত্র কার হাতে তুলে দেবে?

বর্তমানে গাজার প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাঁর সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন গাজার ৭০ শতাংশ দখলে নিতে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ জানিয়েছেন, গাজার ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’গুলোয় অনির্দিষ্টকালের জন্য সেনা থাকবে। সেনা প্রত্যাহারের কোনো সময়সীমা নেই।

হামাসের পদক্ষেপ অনেকের কাছে প্রতীকী মনে হতে পারে। কিন্তু তা সহজেই যাচাই করা সম্ভব। যদি ১৩ সদস্যের এই টেকনোক্র্যাট কমিটিকে (যার নেতৃত্বে রয়েছেন আলি শাথ) গাজায় ঢুকতে দেওয়া হয়, তাহলে তারা প্রশাসনের দায়িত্ব নিতে পারবে। কিন্তু সে পথও আটকে রেখেছে ইসরায়েল।

কায়রোয় বিভিন্ন বৈঠক হয়েছে। সেখানে হামাস, অন্যান্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী, বোর্ড অব পিসের প্রতিনিধিরা, কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতাকারীরা অংশ নিয়েছেন। তবু অচলাবস্থা কাটেনি। শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়ন নিয়ে হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে মতভেদ রয়ে গেছে।

এখন কী হবে, তা নির্ভর করছে কয়েকটি বিষয়ের ওপর। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা। ট্রাম্প প্রশাসন গাজা পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে কতটা আগ্রহী, সেটাই মূল প্রশ্ন। আপাতত তাদের সমস্ত মনোযোগ ইরান সংকটের দিকে।

গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা হয়েছে। ওয়াশিংটন ইরানি তেল বিক্রির অনুমতিও বাতিল করেছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি শেষ। তবে আলোচনার দরজা খোলা আছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

তবু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারক এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে। ট্রাম্পের অস্থিরতা, খামেনির অন্ত্যেষ্টির পর ইরানের কঠোর অবস্থান এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব—সব মিলিয়ে উত্তেজনা বাড়ছে। ফলে গাজার দিকে যুক্তরাষ্ট্রের নজর ফেরার সম্ভাবনা কমছে।

আরেকটি প্রশ্নও বড় হয়ে উঠছে—ইসরায়েলের ওপর যুক্তরাষ্ট্র কতটা চাপ প্রয়োগ করবে। এখন পর্যন্ত তারা কার্যত চোখ বন্ধ করে রয়েছে। গাজায় হামলা, ত্রাণে বাধা, নতুন এলাকা দখল—এসব নিয়ে ওয়াশিংটনের বক্তব্য নীরব।

বরং তাদের বক্তব্যে বারবার উঠে আসছে হামাসের নিরস্ত্রীকরণের দাবি। কিন্তু ইসরায়েলের দৈনন্দিন হামলা বা পশ্চিম তীরে কার্যত দখলদারি, অভিযান, বেদুইন ও পশুপালক সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন—এসব বিষয়ে তারা কিছু বলছে না।

এর মধ্যে নেতানিয়াহু আসন্ন নির্বাচনের মুখে। তাঁর জনসমর্থন কমছে। ফলে শান্তি পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার ঝুঁকি নিতে তিনি আরও অনিচ্ছুক হয়ে উঠেছেন।

সব মিলিয়ে গাজার শান্তি পরিকল্পনার সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হচ্ছে। আবারও ফিলিস্তিনিদের সামনে শান্তির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তারা পেয়েছে মৃত্যু, ধ্বংস আর অন্তহীন যন্ত্রণা।

* মালিহা লোধি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও রাষ্ট্রসংঘে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত।
- ডন থেকে নেওয়া। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ।

গাজাকে যেভাবে সাজানো বা পুনর্গঠনের কথা বলা হচ্ছে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
গাজাকে যেভাবে সাজানো বা পুনর্গঠনের কথা বলা হচ্ছে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। কোলাজ: প্রথম আলো

কলকাতায় হোটেলে আগুন : স্ত্রী, সন্তান, শ্বশুরসহ কুষ্টিয়ার সাংবাদিকের মৃত্যু

ভারতের কলকাতায় আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে চারজনের বাড়ি কুষ্টিয়ায়। তাঁদের মধ্যে আছেন এক সাংবাদিক, তাঁর স্ত্রী, সন্তান ও শ্বশুর।

মৃত দেবাশীষ দত্ত আজকের পত্রিকা ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল নাইনের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি ছিলেন। এ ছাড়া তিনি কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত আজকের আলো পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন। ওই ঘটনায় তাঁর স্ত্রী আফসানা শারমীন (২৭), ছেলে শর্ণশীষ দত্ত (৩) ও শ্বশুর আকরাম হোসেন (৬০) মারা গেছেন। চিকিৎসার জন্য ১৫ দিন আগে তাঁরা ভারতের কর্নাটকের বেঙ্গালুরুতে গিয়েছিলেন। আজ বুধবার তাঁদের দেশে ফেরার কথা ছিল।

গতকাল মঙ্গলবার রাতে কলকাতায় নিউমার্কেটের কাছে মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শিশুসহ ৯ ব্যক্তির মৃত্যু হয়। এর মধ্যে কুষ্টিয়ার ওই চারজন ছিলেন।

সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত (৩৯) কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়ার দিলীপ দত্তের ছেলে। আজ সকালে দিলীপ দত্ত ছেলে, পুত্রবধূ ও তাঁদের সন্তানের মৃত্যুর খবর পান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি ছেলের (দেবাশীষ) লাশের ছবি দেখেছেন।

দিলীপ দত্ত আজ দুপুরে প্রথম আলোকে জানান, দেবাশীষের এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ে ফাহিমাকে (৮) রেখে ৩ আগস্ট তিনি স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে ভারতে যান। দুই দিন পর তাঁর শ্বশুরও কলকাতায় যান। প্রথমে তাঁরা কলকাতায় দুই দিন ছিলেন। এরপর স্ত্রী ও ছেলের চিকিৎসার জন্য বেঙ্গালুরুতে যান। গত সোমবার রাত এগারোটায় উড়োজাহাজে করে কলকাতায় আসেন তাঁরা। সেখানে হোটেলে উঠেছিলেন। আজ সকালে দিলীপ দত্ত জানতে পারেন যে অগ্নিকাণ্ডে তাঁরা সবাই মারা গেছেন।

দেবাশীষের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আজ সকাল থেকে তাঁর বাড়িতে বন্ধু, সাংবাদিক ও প্রতিবেশীরা ভিড় করেন। ছেলেকে হারিয়ে মা স্বপ্না দত্ত পাগলপ্রায়। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলতে থাকেন, ‘আমার দেবা (দেবাশীষ) একটু পরই বাড়িতে আসবে। এত দেরি করছে কেন? রাতে বলেছিল, ব্যাগ গোছাচ্ছে। সকালেই রওনা দেবে বাড়ির উদ্দেশে।’

কলকাতায় অগ্নিকাণ্ডে মৃত দেবাশীষ দত্ত, তাঁর স্ত্রী আফসানা শারমীন ও ছেলে শর্ণশীষ দত্ত। ভারতে গিয়ে ৪ আগস্ট ফেসবুকে ছবিটি পোস্ট করেন দেবাশীষ দত্ত
কলকাতায় অগ্নিকাণ্ডে মৃত দেবাশীষ দত্ত, তাঁর স্ত্রী আফসানা শারমীন ও ছেলে শর্ণশীষ দত্ত। ভারতে গিয়ে ৪ আগস্ট ফেসবুকে ছবিটি পোস্ট করেন দেবাশীষ দত্ত। ছবি : দেবাশীষ দত্তের ফেসবুক থেকে

হামাস কি তাহলে শেষ হয়ে গেল? by তামির আজরামি

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে খুব সহজেই বলে দেওয়া যায় যে হামাসের অবসান ঘটেছে। গাজা ধ্বংস হয়ে গেছে, সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, তাদের সামরিক শক্তি এখন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, সরকার পরিচালনার ক্ষমতা কমে গেছে এবং গাজার সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও ক্লান্তি এখন চরমে। এসব বিষয় কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না।

তবে এই বাস্তবতাগুলো থেকে যদি সরাসরি এই সিদ্ধান্তে আসা হয়—‘হামাসের ইতি ঘটেছে’, তা হবে বড় ভুল। একটি আংশিক সামরিক পরাজয় মানেই একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের বিলুপ্তি নয়। শাসনক্ষমতা কমে যাওয়া মানেই প্রভাব একদম মুছে যাওয়া নয়। আর জনগণের একটি অংশের সমর্থন হারানো মানেই হামাস ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক ইতিহাস থেকে মুছে গেছে তা বলা চলে না।

এ কারণেই ‘হামাসের সমাপ্তি ঘটেছে’—এই ধারণার সঙ্গে আমি একমত নই। বরং এটি বলা বেশি যথার্থ যে, হামাস এই যুদ্ধ থেকে একটি ভিন্ন রূপ নিয়ে বের হয়েছে: সামরিকভাবে দুর্বল, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে আরও বেশি ওজনদার; এখন শাসন করার ক্ষমতার চেয়ে টিকে থাকার সক্ষমতার ওপরই তারা বেশি নির্ভরশীল। তবুও, তারা বিলুপ্ত হয়ে যায়নি বা তাদের বিকল্প অন্য কেউ তৈরি হয়নি। ফিলিস্তিনে এখনও এমন কোনো শক্তি উঠে আসেনি যা হামাসের রেখে যাওয়া শূন্যতা পূরণ করতে পারে।

মূল প্রশ্নটি এটা নয় যে: ৭ অক্টোবরের আগে হামাস যতটা শক্তিশালী ছিল, এখনো কি ততটাই আছে? এর উত্তর পরিষ্কার: না। আসল প্রশ্ন হলো: গাজার ভবিষ্যৎ কিংবা ফিলিস্তিন ইস্যুতে প্রভাব ফেলার ক্ষমতা কি হামাস হারিয়ে ফেলেছে? এখানে উত্তরটি একদম ভিন্ন। বন্দী বিনিময় প্রক্রিয়া, যেকোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তি, গাজার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কিংবা যুদ্ধের পর ‘পরবর্তী’ পরিকল্পনা—সবক্ষেত্রেই হামাস এখনও একটি বড় ফ্যাক্টর। এমনকি যারা হামাসকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চায়, তারাও তাদের ভূমিকা, অস্ত্র কিংবা প্রভাবকে ঘিরে আলোচনা করতে বাধ্য হচ্ছে। এটিই প্রমাণ করে যে হামাসের অবসান ঘটেনি।

একটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক ক্ষমতার পতন আর একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের বিলুপ্তির মধ্যে অনেক বড় পার্থক্য রয়েছে। হামাস হয়তো আগের মতো গাজা শাসন করতে পারবে না, কিন্তু সংঘাতের রাজনীতিতে তাদের কাছে এখনও বড় একটি শক্তি রয়ে গেছে: অন্য কাউকেও সহজে গাজা শাসন করতে না দেওয়ার ক্ষমতা।

রাজনীতিতে প্রভাব ধরে রাখার জন্য সব সময় সরকারে থাকার প্রয়োজন হয় না; কখনো কখনো কোনো একটি পক্ষকে বাদ দিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া অসম্ভব বা অনেক কঠিন।

যারা হামাসের অবসান দেখছেন, তারা এই সত্যটি এড়িয়ে যাচ্ছেন যে খোদ ইসরায়েলও কিন্তু হামাস শেষ হয়ে গেছে—এমন আচরণ করছে না। হামাস সত্যিই শেষ হয়ে গেলে যুদ্ধ, অবরোধ, চাপ ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাওয়ার ইসরায়েলি অজুহাতও শেষ হয়ে যেত। কিন্তু ইসরায়েল এখনও হামাসের অস্ত্র সমর্পণ, তাদের ফিরে আসা ঠেকানো এবং নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণের কথা বলছে। এর মানে, মুখের কথা যাই হোক না কেন, ইসরায়েল মনে মনে ভালো করেই জানে যে হামাস এখনও এই সমীকরণের অংশ।

মূলত, ‘হামাস একটি বড় হুমকি’—ইসরায়েলের এই অবস্থানটি দুটি উদ্দেশ্য পূরণ করে। এক. এটি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া এবং গাজার বড় অংশ দখল করে রাখার অজুহাত দেয়। দুই. এটি যুদ্ধের পরের বড় রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যেতে সাহায্য করে—যেমন: যুদ্ধের পর গাজা কে চালাবে? ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎ কী? স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কোনো পথ তৈরি হবে, নাকি কেবল স্থায়ী সামরিক নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে? ‘হামাস আতঙ্ক’ বাঁচিয়ে রেখে তেল আবিব মূলত এই কঠিন প্রশ্নগুলো থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।

গাজার ভেতরের পরিস্থিতি অবশ্যই জটিল। মানুষের চরম ক্ষোভ রয়েছে, অনেকেই এই বিপর্যয়ের জন্য হামাসকে আংশিক দায়ী ভাবছেন এবং যে কোনো স্লোগানের চেয়ে মানুষের কাছে এখন পানি, বিদ্যুৎ, খাবার, ওষুধ ও নিরাপত্তা পাওয়াটা বেশি জরুরি। তবে এই ক্ষোভের অর্থ এই নয় যে গাজাবাসী ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ বা বিকল্প মেনে নিচ্ছে। এর মানে এই নয় যে তারা আত্মসমর্পণ করতে চায় বা ফিলিস্তিনিরা তাদের স্বাধীনতার অধিকার ছেড়ে দিয়েছে।

যুদ্ধ না চাওয়া কোনো গাজাবাসী রাতারাতি আত্মসমর্পণের সমর্থক হয়ে যান না। আবার হামাসের সমালোচনা করা মানেই কেউ ইসরায়েলের সমর্থক হয়ে গেছে—এমনটা ভাবাও ভুল। নিজের দেশের নেতৃত্বের ভুল সিদ্ধান্তের বিচার করা আর যে জাতীয় সংগ্রামের ভেতর থেকে সেই নেতৃত্বের জন্ম, সেটিকে পুরোপুরি নস্যাৎ করে দেওয়া—এই দুটির মধ্যে স্পষ্ট তফাৎ রয়েছে।

হামাসের জনভিত্তি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে—এমন দাবি করার ক্ষেত্রেও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। গণহত্যার মতো যুদ্ধের মুখোমুখি হওয়া একটি সমাজ এত সহজে স্থায়ী রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করতে পারে না। ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে, তাঁবুতে বসে মানুষ যে ক্ষোভ প্রকাশ করছে তা অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত ও স্বাভাবিক। কিন্তু সেই তাৎক্ষণিক ক্ষোভকে দশক ধরে টিকে থাকা একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি ধরে নেওয়াটা তড়িঘড়ি বিশ্লেষণ হবে।

হামাস কেবল গাজার একটি সরকার নয়। এটি একটি সামাজিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামরিক নেটওয়ার্ক। এটি ফিলিস্তিনি ঐতিহ্যের এমন একটি অংশ, যা তাদের আগেও ছিল এবং পরেও থাকবে। তাই কেবল শীর্ষ নেতাদের হত্যা করে এই আন্দোলন শেষ করা সম্ভব নয়। দখলদারির বিরুদ্ধে জন্ম নেওয়া সংগঠনগুলো তাদের নেতাদের মৃত্যু বা পরিকাঠামো ধ্বংসের কারণে একেবারে মরে যায় না। তারা আকারে ছোট হতে পারে, বদলাতে পারে, নতুন নামে ও নতুন কৌশলে আবার ফিরে আসতে পারে।

এখানেই আমাদের বুঝতে হবে আগের হামাস এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য হামাসের মধ্যে পার্থক্য কী। হয়তো গাজার শাসক হিসেবে হামাসের পুরোনো অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। অবরুদ্ধ ও ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি ভূখণ্ডে একই সঙ্গে সরকার পরিচালনা ও প্রতিরোধ আন্দোলন চালানোর মোহ হয়তো ভেঙে গেছে। হয়তো সংগঠনটি এখন অপেক্ষাকৃত কম দৃশ্যমান কোনো রূপ গ্রহণে বাধ্য হবে। কিন্তু এটি হামাসের ধ্বংস নয়, বরং এটি হামাসের একটি নির্দিষ্ট সংস্করণের সমাপ্তি মাত্র।

অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের সঙ্গে মূল পার্থক্যটা এখানেই। অনেকে হামাসের ওপর আসা আঘাতগুলোকে তাদের বিলুপ্তির প্রমাণ হিসেবে দেখেন; আমি সেগুলোকে দেখি নতুন এক যুগে প্রবেশের আলামত হিসেবে। অবসান মানে ইতিহাস থেকে মুছে যাওয়া, আর রূপান্তর মানে পরাজয় ও নতুন বাস্তবতার চাপে নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলা।

সবচেয়ে বড় কথা হলো, যে কারণগুলো হামাসের জন্ম দিয়েছিল, সেগুলো কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি। দখলদারি শেষ হয়নি, অবরোধ ওঠেনি, বসতি স্থাপন থামেনি, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র তৈরি হয়নি, আর গাজাও কোনো মুক্ত বা নিরাপদ স্থান হয়ে ওঠেনি। যতক্ষণ এই কারণগুলো থাকবে, ততক্ষণ হামাস বা তার চেয়েও নতুন কোনো রূপ বা নতুন ধারার প্রতিরোধ জন্ম নেওয়ার মতো পরিবেশ থেকেই যাবে।

তাই ‘হামাসের কি অবসান ঘটেছে?’—প্রশ্নটি এভাবে করাটাই হয়তো ভুল। সঠিক প্রশ্নটি হওয়া উচিত: এই যুদ্ধের পর হামাস কী রূপ ধারণ করবে? তারা কি একটি শাসক দল হিসেবে থাকবে, নাকি শুধুই রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে? তারা কি তাদের সামরিক শাখা পুনর্গঠন করবে, নাকি বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে কিছুটা পেছনে সরবে?

হামাসের অবসান ঘোষণা করা বস্তুনিরপেক্ষ বিশ্লেষণের চেয়ে রাজনৈতিক ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ বেশি। ইসরায়েল যখন বিজয়ের গল্প বলতে চায়, তখন বলে হামাস শেষ; আবার যখন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অজুহাত দরকার হয়, তখন বলে হামাস এখনও বড় হুমকি। অন্যদিকে, হামাসবিরোধী অনেক গোষ্ঠীও তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক হিসাব থেকে এর অবসান দেখতে চায়। কিন্তু বাস্তবতা সকলের ইচ্ছার চেয়েও অনেক বেশি জটিল।

হামাস শেষ হয়ে যায়নি, তবে তারা আর আগের মতো নেই। এটাই হয়তো সবার জন্য সবচেয়ে কঠিন সত্য—হামাসের নিজের জন্য, ইসরায়েলের জন্য, ফিলিস্তিনিদের জন্য এবং এমন সবার জন্য যারা জটিল একটি সংকটের সহজ উত্তর খুঁজছেন।

একটি যুদ্ধে একটি দল হেরে যেতে পারে, তাদের মূল পরিকাঠামো ধ্বংস হতে পারে, তাদের সমর্থকেরা ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারে। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত প্রতিটি রাজনৈতিক সমীকরণে তাদের উপস্থিতি বজায় থাকে এবং তাদের জন্ম দেওয়া মূল কারণগুলো বিদ্যমান থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের চূড়ান্ত অবসান ঘোষণা করা সম্ভব নয়।

তাই আসল প্রশ্ন হামাস শেষ হয়েছে কি না তা নয়। আসল প্রশ্ন হলো: এই ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে কোন রূপের হামাস বের হয়ে আসবে?

* তামির আজরামি, বেলজিয়ামে বসবাসকারী লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত।

হামাসের সশস্ত্র মহড়া
হামাসের সশস্ত্র মহড়া। ফাইল ছবি: এএফপি

নার্সের ভুলে ‘ব্রুস লি’, রাস্তায় মার খাওয়া ছেলেটিই কুংফুর রাজা

১৯৪০ সালের ২৭ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোর চায়নাটাউনের এক হাসপাতালে জন্ম নেয় এক হালকা-পাতলা শিশু। জন্মের সঙ্গেই জড়িয়ে যায় এক কাকতাল—মা গ্রেস ছেলের নাম রাখতে চেয়েছিলেন ‘ইউমেন ক্যাম’; কিন্তু হাসপাতালের নার্স নামটি ঠিকমতো উচ্চারণ করতে না পারায় বার্থ সার্টিফিকেটে লিখে ফেলেন অন্য এক নাম ‘ব্রুস লি’। মা–বাবা আপত্তি করেননি, নাম বদলানোর কথাও আর ওঠেনি। তখন কি ভেবেছিলেন, এই নামই একদিন হয়ে উঠবে বিশ্ব চলচ্চিত্র ও মার্শাল আর্টের ইতিহাসের প্রতীক—পূর্ব ও পশ্চিমের সাংস্কৃতিক দূরত্ব ভাঙার এক নীরবকিন্তু প্রবল শরীরী ভাষা!

যদিও জন্ম যুক্তরাষ্ট্রে, তবে ব্রুস লির পারিবারিক শিকড় ছিল হংকংয়ে। জন্মের এক বছরের মধ্যেই ক্যান্টনিজ অপেরার জনপ্রিয় শিল্পী বাবা লি হুই চোয়েন পরিবার নিয়ে ফিরে যান হংকংয়ে। সেখানেই মঞ্চ, আলো ও ক্যামেরা আর অভিনয়ের আবহে বেড়ে ওঠে এই শিশু, যাঁর জীবন মাত্র ৩২ বছরেই থেমে গেলেও প্রভাব রেখে গেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। আজও ব্রুসলিকে নিয়ে চর্চা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ছবি ও পোস্টার শেয়ার হয়।

শিশুশিল্পী থেকে আত্মগঠনের কঠিন পথ
ফিল্ম স্টুডিওই ছিল ব্রুস লির প্রথম খেলার মাঠ। বাবার হাত ধরে ছোটবেলা থেকেই ক্যামেরা, আলো, সেট—সবই তাঁর কাছে হয়ে ওঠে স্বাভাবিক পরিবেশ । মাত্র ছয় বছর বয়সে ‘দ্য বিগিনিং অব আ বয়’ ছবিতে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর চলচ্চিত্রযাত্রা । সমালোচকদের মতে, সাত বছর বয়সেই ক্যামেরার সামনে তাঁর উপস্থিতি ছিল বিস্ময়করভাবে স্বচ্ছন্দ—চোখের দৃষ্টি স্থির, শরীরী ভঙ্গি নিয়ন্ত্রিত, যেন বয়সের আগেই তিনি বুঝে ফেলেছিলেন ফ্রেমের ভাষা।

কিন্তু পর্দার এই শান্ত শিশুটির বাস্তব জীবন ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। কৈশোরে পা রাখার আগেই হংকংয়ের রাস্তায় ব্রুস লি পরিচিত হয়ে ওঠেন ঝগড়া আর মারামারির জন্য। সমবয়সীদের নিয়ে ছোটখাটো একটি ‘গ্যাং’ তৈরি করেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া আর জমে থাকা আগ্রাসী মানসিকতা তাঁকে বারবার সংঘর্ষে জড়িয়ে ফেলে।
সমস্যা ছিল একটাই—শরীর। ছিলেন হালকা-পাতলা। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের কাছে বহুবার মার খেতে হয়েছে তাঁকে। এই অপমান, ক্ষত আর ব্যর্থতার অভিজ্ঞতাই ধীরে ধীরে তাঁকে ঠেলে দেয় মার্শাল আর্টের দিকে। কুংফু তাঁর জীবনে আসে সমাধান হিসেবে নয়; বরং আত্মরক্ষার জরুরি প্রয়োজন হিসেবে। এরপর যুক্ত হয় উইং-চুন-চীনা আত্মরক্ষার এক সূক্ষ্ম, নিয়ন্ত্রণনির্ভর শৈলী, যেখানে শক্তির চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় সময়জ্ঞান, দূরত্ব আর প্রতিক্রিয়ার বুদ্ধিমত্তা। দিনের পর দিন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলা কঠোর অনুশীলনই ব্রুস লিকে ধীরে ধীরে বদলে দেয়।

রিং, ছন্দ আর ‘খুদে ড্রাগন’
সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার স্কুলে পড়ার সময় একটি ঘটনাই প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে জানিয়ে দেয়—ব্রুস লি সাধারণ ছাত্র নন । দুর্বিনীত আচরণে বিরক্ত হয়ে এক শিক্ষক, ব্রাদার এডওয়ার্ড, তাঁকে শাস্তি দিতে স্কুলের বক্সিং রুমে নিয়ে যান। উদ্দেশ্য ছিল কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা। শিক্ষক তাঁকে রিংয়ে নামতে বলেন।
বাস্তবতা হলো, সে সময় ব্রুসের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্সিং প্রশিক্ষণ ছিল না; কিন্তু রিংয়ের ভেতরে দাঁড়িয়েই তিনি নির্ভর করেন নিজের শেখা উইং-চুন কৌশল, দ্রুত পা চালনা আর আত্মবিশ্বাসের ওপর । কয়েক মিনিটের মধ্যেই অভিজ্ঞ শিক্ষককে পরাস্ত করেন তিনি। শাস্তির বদলে সেখানে জন্ম নেয় বিস্ময়। ব্রাদার এডওয়ার্ড রাগ না করে মুগ্ধ হন এবং ব্রুসকে স্কুল বক্সিং দলে নেন। সেই বছরই আন্তবিদ্যালয় টুর্নামেন্টে তিন বছর ধরে অপরাজিত চ্যাম্পিয়নকে হারান ব্রুস লি।

এ সময়েই তাঁর মার্শাল আর্টে যুক্ত হয় আরেক গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা—নৃত্য । খুব কম মানুষই জানেন, ব্রুস লি ছিলেন দক্ষ চা-চা নৃত্যশিল্পী এবং কিশোর বয়সেই হংকংয়ে চা-চা প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন। নাচ থেকে পাওয়া ভারসাম্য, পায়ের সূক্ষ্ম কাজ, শরীরের ঘূর্ণন পরে এসে মিশে যায় তাঁর মার্শাল আর্টে। ফলে তাঁর লড়াই হয়ে ওঠে শক্তির প্রদর্শন নয়; বরং গতি ও ছন্দে গড়া এক জীবন্ত কোরিওগ্রাফি। ১৮ বছর হওয়ার আগেই তিনি অভিনয় করেন ২০টির বেশি হংকং চলচ্চিত্রে। দর্শকের কাছে তাঁর নাম হয়ে ওঠে ‘লি সিউ লুং’ বা খুদে ড্রাগন।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় নির্বাসন
একটি মারামারির ঘটনায় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর পরিবারের উদ্বেগ চরমে পৌঁছায়। মা বুঝে যান, এই পরিবেশে ছেলেকে রাখা আর নিরাপদ নয়। সেই সিদ্ধান্ত থেকেই ব্রুস লিকে পাঠানো হয় যুক্তরাষ্ট্রে। ষাটের দশকের শুরুতে সিয়াটলে শুরু হয় নতুন অধ্যায়—যা ছিল নির্বাসনের মতো।

পড়াশোনা, বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ, বাসা ভাড়া, দৈনন্দিন ব্যয়—সব মিলিয়ে অর্থকষ্ট ছিল নিত্যসঙ্গী । খণ্ডকালীন কাজ করতে হয়েছে তাঁকে। এই সংগ্রামের মধ্যেই ব্রুস নতুন করে নিজেকে গড়তে শুরু করেন। সিয়াটলেই তিনি কুংফু শেখানো শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে মার্শাল আর্ট স্কুল গড়ে তোলেন। এখানেই তাঁর জীবনে আসে লিন্ডা এমেরি। ছাত্রী থেকে ভালোবাসা, ভালোবাসা থেকে বিয়ে, ১৯৬৪ সালে তাঁদের বিয়ে হয় । ১৯৬৫ সালে জন্ম নেয় তাঁদের ছেলে ব্র্যান্ডন লি।

এ সময়েই জন্ম নেয় ব্রুস লির চিন্তার সবচেয়ে বড় অবদান—জিৎ কুনে দো । কুংফু, বক্সিং, ফেন্সিং আর বাস্তব স্ট্রিট ফাইটের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে তিনি বোঝেন, কোনো একক স্টাইলে আটকে থাকা অর্থহীন। জিৎ কুনে দো কোনো নির্দিষ্ট ধারা নয়, এটি ‘ফর্মহীনতার দর্শন’। পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেকে বদলাতে পারাই প্রকৃত শক্তি—এই উপলব্ধিই তাঁকে একজন দার্শনিক শিল্পীতে রূপ দেয় ।

হলিউডে প্রশিক্ষক
হলিউডে ব্রুস লি তখন পরিচিত নাম; কিন্তু অভিনয়ের জন্য নয়। তিনি ছিলেন তারকাদের প্রশিক্ষক। স্টিভ ম্যাককুইন, জেমস কোবার্ন, করিম আবদুল জব্বার নিয়মিত তাঁর কাছে প্রশিক্ষণ নিতেন। সে সময় এক ঘণ্টার প্রশিক্ষণের পারিশ্রমিক ছিল ২৫০ ডলার—অস্বাভাবিক বড় অঙ্ক ।

কিন্তু অভিনয়ের জগতে তিনি ছিলেন অবহেলিত। কারণ একটাই—তিনি এশিয়ান। ১৯৬৬ সালে এবিসির সিরিজ ‘দ্য গ্রিন হর্নেট’-এ ‘কেটো’ চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের নজর কাড়লেও মূল নায়কের স্বীকৃতি পাননি তিনি। এরপর ‘কুং ফু’ সিরিজে এশীয় চরিত্র দেওয়া হয় শ্বেতাঙ্গ অভিনেতা ডেভিড ক্যারাডাইনকে । তখনই ব্রুস বুঝে যান, নিজের পথ নিজেরই তৈরি করতে হবে ।

হংকংয়ে ফিরে ইতিহাস লেখা
হংকংয়ে প্রত্যাবর্তন হলিউডে বারবার ঠেকে গিয়ে ১৯৭০ সালের শেষ দিকে ব্রুস লি যখন হংকংয়ে ফেরেন, তখন তিনি আর কেবল একজন প্রতিভাবান মার্শাল আর্টিস্ট নন, তিনি ভেতরে–ভেতরে এক গভীর ক্ষোভ আর দৃঢ়সংকল্প বয়ে আনছিলেন। এ সময়েই তার দেখা হয় প্রযোজক রেমন্ড চোয়ের সঙ্গে, যিনি সদ্য প্রতিষ্ঠিত গোল্ডেন হার্ভেস্ট স্টুডিওকে দিয়ে হংকং চলচ্চিত্রে নতুন এক ধারা গড়তে চাইছিলেন। ব্রুস লি ও রেমন্ড চোয়ের এই হাত মেলানোই পরবর্তী কয়েক বছরে কুংফু চলচ্চিত্রের ইতিহাস বদলে দেয়। ১৯৭১ সালে মুক্তি পায় প্রথম ছবি ‘দ্য বিগ বস’ (চীনা নাম: তাং শান দা শিওং)। থাইল্যান্ডের পটভূমিতে নির্মিত ছবিটি প্রথমে খুব বড় প্রত্যাশা নিয়ে মুক্তি পায়নি; কিন্তু হলঘরে বসে দর্শকেরা যা দেখলেন, তা তাঁদের পূর্বপরিচিত কুংফু নায়কের চেনা ছক ভেঙে দিল। ব্রুস লির শরীরী ভাষা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন—অস্বাভাবিক গতি, আকস্মিক বিস্ফোরণ আর চোখেমুখে জমে থাকা আগুন। প্রথম ফ্লাইং কিকের পর থেকেই দর্শকের উচ্ছ্বাস থামেনি। বক্স অফিসে ‘দ্য বিগ বস’ হংকংয়ের আগের সব আয়ের রেকর্ড ভেঙে দেয় এবং এক রাতেই ব্রুস লিকে সুপারস্টার বানিয়ে ফেলে।

এর ঠিক পরের বছর ১৯৭২ সালে আসে ‘দ্য চায়নিজ কানেকশন’—আন্তর্জাতিকভাবে বেশি পরিচিত ‘ফিস্ট অব ফিউরি’ নামে। জাপানি দখলযুগে সাংহাইয়ের পটভূমিতে নির্মিত এই ছবিতে ব্রুস লির চরিত্র চেন ঝেন হয়ে ওঠে অপমানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রতীক। ছবিটি কেবল বক্স অফিসে সফল নয়, সাংস্কৃতিক বিস্ফোরণও ঘটায়। মুক্তির পর হংকং ও তাইওয়ানে আগের আয়ের রেকর্ড ভেঙে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করে ছবিটি। চেন ঝেনের চরিত্র এশীয় দর্শকদের মধ্যে এক অবদমিত গর্ববোধকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে, যা ব্রুস লিকে জনপ্রিয়তার নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। একই বছর ব্রুস লি নিজের নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ় করেন ‘ওয়ে অব দ্য ড্রাগন’-এ। এই ছবির বিশেষত্ব ছিল—এখানে তিনি শুধু অভিনয় করেননি, নিজেই ছিলেন গল্পকার, চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক। পশ্চিমা দর্শকের সঙ্গে সরাসরি সংলাপে যাওয়ার লক্ষ্যে ছবিটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ রোমে শুট করা হয়। রোমান কলোসিয়ামে মার্কিন কারাতে চ্যাম্পিয়ন চাক নরিসের সঙ্গে ব্রুস লির চূড়ান্ত লড়াই আজও অ্যাকশন চলচ্চিত্র ইতিহাসে এক ক্ল্যাসিক দৃশ্য হিসেবে বিবেচিত। এই লড়াইয়ে কোনো অতিরিক্ত কাট, কোনো বাহুল্য কৌশল নেই—শুধু শরীর, সময় আর মানসিক দৃঢ়তার দ্বন্দ্ব। চাক নরিস নিজেই পরে বলেছেন, ব্রুসের লড়াইয়ের স্টাইল কারও পক্ষে নকল করা সম্ভব নয়, ওটা একান্তই তাঁর নিজের।

এই ধারাবাহিক সাফল্যের মধ্য দিয়ে ব্রুস লি আর কেবল হংকং বা এশিয়ার নায়ক থাকেননি। ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের নানা দেশে তাঁর ছবিগুলো ডাবিং ও পুনর্মুক্তির মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক দর্শক টানে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন এশীয় অভিনেতা হয়ে উঠলেন সত্যিকারের বৈশ্বিক অ্যাকশন তারকা—যাঁর উপস্থিতি বক্স অফিসের গ্যারান্টি। এ সময়েই ব্রুস লির পারিশ্রমিক আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। সমকালীন এশীয় সিনেমায় যা ছিল কল্পনাতীত, ব্রুস লি সেখানে চলচ্চিত্রপ্রতি নজিরবিহীন অঙ্কের পারিশ্রমিক দাবি ও আদায় করতে সক্ষম হন।

অনেক গবেষকের মতে, তিনিই প্রথম এশীয় অভিনেতা, যাঁর চলচ্চিত্রমূল্য আন্তর্জাতিক বাজারে মিলিয়ন ডলার পর্যায়ে পৌঁছানোর সম্ভাবনা তৈরি করে—যা পরবর্তীকালে ‘এন্টার দ্য ড্রাগন’-এর মাধ্যমে বাস্তবেই নিশ্চিত হওয়ার পথে ছিল। হংকংয়ে ফিরে এসে মাত্র দু-তিন বছরের মধ্যেই ব্রুস লি প্রমাণ করে দেন নায়ক হতে হলে কারও অনুমোদনের অপেক্ষা করতে হয় না। নিজস্ব ভাষা, নিজস্ব শরীর আর নিজস্ব দর্শন দিয়েও ইতিহাস লেখা যায়। এই অধ্যায়ই তাঁকে একজন সফল অভিনেতার সীমা ছাড়িয়ে নিয়ে যায় বিশ্ব সংস্কৃতির এক স্থায়ী প্রতীকে।

অকালে চলে যাওয়া
মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে হংকং ও আন্তর্জাতিক সিনেমায় অভাবনীয় সাফল্য পেলেও ব্রুস লির জীবন তখন চরম চাপে ভারাক্রান্ত। একদিকে একের পর এক ছবির শুটিং, অন্যদিকে চিত্রনাট্য লেখা, ফাইট কোরিওগ্রাফির পরিকল্পনা, প্রতিদিনের দীর্ঘ শরীরচর্চা ও নতুন কৌশলের পরীক্ষা—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন ছিল প্রায় নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রমের এক চক্রে বাঁধা। অনিদ্রা তাঁর নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছিল। নিজের শরীর আর মনের সীমা তিনি বারবার ঠেলে দিচ্ছিলেন আরও সামনে। ঠিক এ সময়েই তাঁর সামনে ছিল সবচেয়ে বড় লক্ষ্য—হলিউডের মূলধারার বাজারে পূর্ণ শক্তিতে প্রবেশ। সেই স্বপ্নের নাম ছিল ‘এন্টার দ্য ড্রাগন’—ওয়ার্নার ব্রাদার্সের সঙ্গে যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত প্রথম বড় কুংফু চলচ্চিত্র, যা ব্রুস লিকে একযোগে এশিয়া ও পশ্চিমের বাজারে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করার কথা ছিল।

এই চাপের মধ্যেই ১৯৭৩ সালের মে মাসে একবার ডাবিংয়ের সময় ব্রুস লি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসকেরা তাঁর মস্তিষ্কে সেরিব্রাল এডিমা—মস্তিষ্কে পানি জমে ফুলে ওঠার গুরুতর লক্ষণ শনাক্ত করেন। দ্রুত চিকিৎসায় সেই বার তিনি ফিরে আসেন; কিন্তু সেই ঘটনা ছিল ভবিষ্যতের এক ভয়াবহ সতর্কসংকেত। এর মাত্র দুই মাস পর, ২০ জুলাই ১৯৭৩ সালে হংকংয়ের কাউলুন টং এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্টে ব্রুস লির মাথাব্যথা শুরু হয়। বিশ্রামের আগে একটি ব্যথানাশক ওষুধ গ্রহণ করেন ও শুয়ে পড়েন; কিন্তু আর ওঠেননি। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৩২ বছর।
এই অতর্কিত মৃত্যু বিশ্বজুড়ে নেমে আনে শোকের ঢেউ। হংকংয়ে তাঁর মরদেহ একনজর দেখার জন্য রাস্তায় নেমে আসেন হাজার হাজার মানুষ। শোকাহত জনতাকে সামলাতে পুলিশকে ব্যারিকেড দিতে হয়।

ব্রুস লির মৃত্যুর পরপরই মুক্তি পায় ‘এন্টার দ্য ড্রাগন’। ছবিটি সেই স্বপ্নই বাস্তবে পরিণত করে, যা তিনি দেখে যেতে পারেননি। বিশ্বজুড়ে শুরু হয়ে যায় অভূতপূর্ব কুংফু উন্মাদনা। পশ্চিমা দর্শকের কাছে মার্শাল আর্ট প্রথমবারের মতো মূলধারার বিনোদনে পরিণত হয়, আর ব্রুস লি হয়ে ওঠেন এমন এক কিংবদন্তি, যিনি মৃত্যুর পরও তারকাখ্যাতির শিখরে উঠতে থাকেন। পরবর্তী সময়ে টাইম ম্যাগাজিন তাঁকে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। তবে ব্রুস লির প্রকৃত উত্তরাধিকার কেবল সিনেমা বা বক্স অফিস সাফল্যে সীমাবদ্ধ নয়।
ব্রুস লির সবচেয়ে বড় অবদান ছিল দৃষ্টিভঙ্গিতে। তিনি মার্শাল আর্টকে দেখিয়েছেন আত্ম-অন্বেষণের ভাষা হিসেবে, যেখানে শরীর কেবল শক্তির মাধ্যম নয়; বরং চিন্তা, প্রতিবাদ আর মুক্তির প্রকাশ। একজন এশীয় হিসেবে পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আধিপত্যের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে নিজের শরীরকেই তিনি বানিয়েছিলেন প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের শক্তিশালী মাধ্যম।

https://media.prothomalo.com/prothomalo%2Fimport%2Fmedia%2F2017%2F09%2F25%2F51d71c7a13fb58aad77ce070f66ddd78-59c8e9bc86860.jpg?rect=0%2C0%2C553%2C369&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ব্রুস লি। আইএমডিবি

সিরিয়ায় হামলাকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের সঙ্গে তুরস্কের উত্তেজনার শঙ্কা

সিরিয়ায় ইসরায়েলি হামলাকে কেন্দ্র করে তুরস্কের সঙ্গে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন সিরিয়াবিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত থমাস বারাক। মঙ্গলবার রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সিরিয়ার কোনো সামরিক ঘাঁটিতে এ ধরনের হামলা হলে সেখানে তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি আরও বাড়তে পারে।

এর আগে মঙ্গলবার আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলি বাহিনী হামলা চালায়। রানওয়ে সংস্কারের কাজ দেখতে তুরস্কের একটি সামরিক প্রতিনিধিদল ঘাঁটিটি পরিদর্শনের পরই হামলা চালানো হয়। ইসরায়েলের দাবি, সিরিয়ার বিমানঘাঁটিতে তুরস্কের সেনা মোতায়েনের সুযোগ ভালোভাবে নিচ্ছে না তারা। এর প্রতিক্রিয়ায় হামলা হয়েছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে ইসরায়েল।

এ বিষয়ে মার্কিন বিশেষ দূত থমাস বারাক বলেন, হামলার আগে তুরস্ককে সতর্ক করা হয়নি। ফলে প্রতিক্রিয়া হিসেবে তুরস্ক ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই সময়ে সিরিয়ার দারা অঞ্চলের একটি গ্রামের কাছে গোলাবর্ষণের খবরও পাওয়া গেছে।

মার্কিন এই দূত বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ইসরায়েল, সিরিয়া ও তুরস্কের মধ্যে একটি সমন্বয় বা ‘ডিকনফ্লিকশন’ ব্যবস্থা জরুরি। ভবিষ্যতে ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে। তার মতে, এই মুহূর্তে উত্তেজনা কমানো এবং আরও সংযত পদক্ষেপের সুযোগ তৈরি করাই অগ্রাধিকার।

এর আগে আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলি হামলার খবরে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বারাক এটিকে ‘অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা বৃদ্ধি’ বলে মন্তব্য করেন।

এরপর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় এক বিবৃতিতে হামলার বিষয়টি কার্যত নিশ্চিত করে। বিবৃতিতে বলা হয়, নিরাপত্তা বিষয়ে ইসরায়েল ও সিরিয়ার মধ্যে একটি বিদ্যমান অবস্থান বজায় রাখার সমঝোতা ছিল। কিন্তু সিরিয়া আলেপ্পোর কাছে একটি বিমানঘাঁটিতে তুরস্কের সেনা মোতায়েনের সুযোগ দিয়ে সেই অবস্থান প্রায় লঙ্ঘন করেছে।

ইসরায়েলের দাবি, এ ধরনের তুর্কি মোতায়েন তাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে এবং সিরিয়াকে এ বিষয়ে একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছিল। তবে সিরিয়া সতর্কতা উপেক্ষা করায় ইসরায়েল নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি মেনে নেবে না বলে জানিয়েছে।

রাতে সিরিয়ার ইদলিব প্রদেশের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত আবু আল-দুহুর সামরিক বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চারটি বিমান দিয়ে ঘাঁটির রানওয়ে ও সংরক্ষণাগার লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। সিরিয়া এ হামলার জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করেছে।

সিরিয়ার একটি সামরিক সূত্র ও স্থানীয় এক বাসিন্দা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, হামলায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-আরাবি আল-জাদিদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রানওয়ে সংস্কারের কাজ দেখতে তুরস্কের একটি সামরিক প্রতিনিধিদল ঘাঁটিটি পরিদর্শনের পরই হামলা চালানো হয়।

আবু আল-দুহুর ঘাঁটি সারাকিবের প্রায় ১৭ মাইল পূর্বে অবস্থিত। ইদলিব, হামা ও আলেপ্পো এই তিন অঞ্চলের মধ্যবর্তী কৌশলগত অবস্থানে থাকা ঘাঁটিটি উত্তর সিরিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাগুলোর একটি।

তুরস্ককে ঘিরে ইসরায়েলের উদ্বেগ

তুরস্কের সহায়তায় বিমানঘাঁটিটির বড় ধরনের সংস্কার এবং সেখানে সম্ভাব্য তুর্কি সামরিক উপস্থিতি ইসরায়েলের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে ওই এলাকায় ইসরায়েলের আকাশ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকেই হামলাটি চালানো হয়ে থাকতে পারে।

তবে ইসরায়েল তুরস্ক বা সিরিয়ার সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়াতে চায় না। একই সঙ্গে ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে নিজেদের আকাশসীমায় সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখাকে ইসরায়েল গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে।

এ অবস্থায় সিরিয়ায় ইসরায়েলি সামরিক তৎপরতা এবং তুরস্কের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নতুন করে আঞ্চলিক উত্তেজনার ঝুঁকি তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন তিন দেশের মধ্যে সমন্বয় ব্যবস্থা গড়ে তুলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে। 

শারা, নেতানিয়াহু ও এরদোয়ান। ছবি: সংগৃহীত
শারা, নেতানিয়াহু ও এরদোয়ান। ছবি: সংগৃহীত

পাঠ্যবই থেকে ‘মুসলমানরা কখনো জেরুজালেম ছাড়বে না’ বাদ দিল সৌদি আরব

মিডল ইস্ট আইঃ সৌদি আরবের স্কুলের পাঠ্যবই থেকে ‘মুসলমানরা কখনো জেরুজালেম ছাড়বে না’—এমন একটি বাক্য বাদ দেওয়া হয়েছে। দেশটির শিক্ষাব্যবস্থায় সাম্প্রতিক সময়ে ইসরাইল, ইহুদি ও জেরুজালেম নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্যে পরিবর্তন আনার ধারাবাহিকতায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

ইসরাইলভিত্তিক পাঠ্যক্রম পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ইমপ্যাক্ট-সী -এর এক পর্যালোচনায় এসব পরিবর্তনের তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের সৌদি পাঠ্যবই পর্যালোচনা করেছে।

একাদশ শ্রেণির আরবি ভাষার বইয়ের ২০২৩-২৪ সংস্করণে ‘মুসলমানরা কখনো জেরুজালেম ছাড়বে না’ বাক্যটি ছিল। পরবর্তী সংস্করণে, অর্থাৎ ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে, বাক্যটি পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়েছে।

শুধু জেরুজালেমের প্রসঙ্গই নয়, সৌদি পাঠ্যবইয়ে ইসরায়েল ও ইহুদিদের নিয়ে ব্যবহৃত কিছু ভাষাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। কোথাও ‘জায়নবাদী শত্রু’ শব্দের পরিবর্তে ‘ইসরাইলি দখলদারত্ব’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কয়েকটি মানচিত্র থেকেও ফিলিস্তিনের নাম সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বা কিছু এলাকা নামহীন রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া বিভিন্ন ধর্মীয় ও সংখ্যালঘু গোষ্ঠী সম্পর্কে আগের কিছু কঠোর ভাষাও বাদ বা পরিবর্তন করা হয়েছে। ইমপ্যাক্ট-সী-এর দাবি, এসব পরিবর্তনের ফলে সৌদি পাঠ্যক্রমে সহাবস্থান, সহনশীলতা ও মধ্যপন্থার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, কিছু বিতর্কিত বিষয় এখনো পাঠ্যবইয়ে রয়ে গেছে।

সৌদি আরবের এই পরিবর্তনকে ঘিরে ইসরাইলের সঙ্গে দেশটির সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে সৌদি-ইসরাইল সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সম্ভাব্য উদ্যোগের সঙ্গে এসব পরিবর্তনের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা নিয়ে পর্যবেক্ষকদের মধ্যে আলোচনা চলছে।

তবে সৌদি আরব প্রকাশ্যে এখনো বলে আসছে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করার নিশ্চয়তা ছাড়া ইসরাইলের সঙ্গে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করবে না। ফলে পাঠ্যবইয়ের এই পরিবর্তনকে সরাসরি সৌদি-ইসরাইল সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার ঘোষণা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

সৌদি আরবের পাঠ্যবইয়ে জেরুজালেম ও ইসরাইল নিয়ে দীর্ঘদিনের কিছু কঠোর বক্তব্য পরিবর্তন করা হয়েছে। বিশেষ করে ‘মুসলমানরা কখনো জেরুজালেম ছাড়বে না’ বাক্যটি বাদ দেওয়ায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে এর রাজনৈতিক প্রভাব কতটা হবে এবং ফিলিস্তিন ইস্যুতে সৌদি নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আসবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

পাঠ্যবই থেকে ‘মুসলমানরা কখনো জেরুজালেম ছাড়বে না’ বাদ দিল সৌদি আরব

স্পেনের সেউতায় আটকা পড়েছেন ৮ হাজার অভিবাসী, আছে বাংলাদেশিও

স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ভূখণ্ড সেউতায় ৫ হাজার থেকে ৮ হাজার অভিবাসী আটকা পড়েছেন। তাদের মধ্যে বাংলাদেশিসহ মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা, সাব-সাহারান আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন। ইরাকি বার্তাসংস্থা শাফাক নিউজ এ তথ্য জানিয়েছে।

মরক্কো থেকে ব্যাপক অভিবাসন প্রবাহের দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় পরও তাদের আশ্রয় ও আইনি অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি।

সেউতা ও মেলিয়া উত্তর আফ্রিকায় স্পেনের দুটি স্বায়ত্তশাসিত শহর। মরক্কোর মাধ্যমে আফ্রিকা থেকে ইউরোপে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে এগুলো ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

২৯ ও ৩০ জুলাইয়ের ব্যাপক প্রবেশের সময় ৭২ হাজারের বেশি মানুষ সাময়িকভাবে সেউতায় ঢুকে পড়েছিলেন। পরে তাদের বেশির ভাগই স্বেচ্ছায় মরক্কোতে ফিরে যান। স্পেন ও মরক্কোর তথ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় অন্তত ৯৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।

রোববার ফ্রান্স২৪ জানিয়েছে, এখন যারা সেউতায় রয়ে গেছেন, তাদের মধ্যে ইরাকি, সিরীয়, ইয়েমেনি, ফিলিস্তিনি, মিসরীয়, আলজেরীয়, তিউনিসীয়, মরক্কান, সুদানি, নাইজেরীয়, সেনেগালিজ, বাংলাদেশি ও ভারতীয় নাগরিকও রয়েছেন।

অনেক অভিবাসী সেউতার এল ত্রাম্পোলিন সৈকতে অস্থায়ী আশ্রয় তৈরি করেছেন। খড়, কাপড় ও হাতের কাছে পাওয়া বিভিন্ন জিনিস দিয়ে বানানো এসব আশ্রয়ে রাত কাটাচ্ছেন তারা।

খাবার ও পানির সংকটের পাশাপাশি মানবেতর পরিবেশে দিন কাটছে তাদের। কেউ সমুদ্রের পানিতে কাপড় ধুচ্ছেন, কেউ কার্ডবোর্ডের ওপর ঘুমাচ্ছেন।

আটকে পড়াদের একজন ইরাকের মসুলের তরুণ আবদুলরহমান। কয়েক বছর মরক্কোয় থাকার পর তিনি সেউতায় পৌঁছান। এখন তার আশা, স্পেনে নিজের অবস্থান বৈধ করে সুইডেনে যেতে পারবেন, যেখানে তার এক আত্মীয় থাকেন।

সিরিয়ার এক নাগরিক মোহাম্মদও সেউতায় আটকে আছেন। তিনি জানান, মরক্কো থেকে একটি সিরীয় পরিবারের সঙ্গে সীমান্ত পেরিয়ে সেউতায় প্রবেশ করেন। পরে কয়েকজন সিরীয়কে মরক্কোতে ফেরত পাঠানো হলেও তিনি থেকে যান। তার সন্তান এখনো মরক্কোতে রয়েছে।

ইয়েমেনের আবদুলমাজিদ মূল প্রবেশের এক দিন আগে প্রায় আট কিলোমিটার সাঁতরে সেউতায় পৌঁছান। এরপর থেকে খোলা আকাশের নিচে ঘুমাচ্ছেন তিনি। ইয়েমেনের যুদ্ধ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে স্পেন তার আশ্রয়ের আবেদন গ্রহণ করবে বলে আশা করছেন তিনি।

মিসরীয় দুই অভিবাসী তারেক ও রমাদান জানান, তারা লিবিয়া, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া ও মরক্কো হয়ে সেউতায় পৌঁছেছেন। লিবিয়ায় যাত্রাপথে সহিংসতা ও গোলাগুলির মুখেও পড়তে হয়েছে বলে জানান তারা।

সুদানের এক নাগরিক মুজাম্মিল জানান, ৩০ জুলাই সমুদ্রপথে সেউতায় পৌঁছানোর পর প্রথম তিন দিন তার কাছে খাবার ও পানি ছিল না। নাইজেরিয়ার কামারাও এখন ত্রাণ ও মানুষের দেওয়া খাবারের ওপর নির্ভর করছেন।

তবে আটকে থাকা সবার আইনি পরিণতি এক হবে না। স্পেন প্রত্যেকের আশ্রয়ের আবেদন আলাদাভাবে যাচাই করবে।

দেশটির নিয়ম অনুযায়ী, কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে আশ্রয়ের আবেদন করলে সেটির সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত তাকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া স্থগিত থাকে। তবে আবেদন করলেই আশ্রয় পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।

এদিকে বিপুলসংখ্যক অভিবাসীর কারণে সেউতার আগে থেকেই চাপের মধ্যে থাকা আশ্রয় ও অভ্যর্থনা ব্যবস্থা আরও সংকটে পড়েছে। আশ্রয়ের আবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দিতে পুলিশের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়াতেও অনেকে সমস্যায় পড়ছেন।

স্পেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মনিকা গার্সিয়া জানিয়েছেন, গত ১৫ দিনে প্রায় ৫ হাজার ৮০০ অভিবাসী চিকিৎসা নিয়েছেন। জরুরি চিকিৎসাসেবা নেওয়ার চাপ প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। এখনো ২৮ জন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।

রোববার সেউতায় শত শত অভিবাসী বিক্ষোভ করেছেন। তারা আশ্রয়ের আবেদন করার সুযোগ এবং মরক্কোয় ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেউতায় আরও ৫০০-এর বেশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করেছে স্পেন। এতে সেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর মোট সদস্য সংখ্যা ১ হাজার ৬০০ ছাড়িয়েছে। অন্যদিকে, নতুন করে বড় আকারের সীমান্ত পারাপার ঠেকাতে মরক্কোও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে।

সূত্র: শাফাক নিউজ

অনেক অভিবাসী সেউতার সৈকতে অস্থায়ী আশ্রয় তৈরি করেছেন। ছবি: সংগৃহীত
অনেক অভিবাসী সেউতার সৈকতে অস্থায়ী আশ্রয় তৈরি করেছেন। ছবি: সংগৃহীত

ইউরোপের প্রতি ১০ জনের ৯ জনই বিদেশে থাকতে চায়, কেন?

ইউরোপের প্রতি ১০ জনের প্রায় ৯ জনই ভবিষ্যতে বিদেশে গিয়ে বসবাসের কথা ভাবছেন। নতুন এক জরিপে দেখা গেছে, জীবনযাত্রার বাড়তি খরচই বিদেশে পাড়ি জমানোর অন্যতম প্রধান কারণ। আর নতুন দেশে বসতি গড়ার পছন্দের তালিকায় সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে স্পেন। সম্প্রতি ইউরোনিউজ এ সংক্রান্ত খবর প্রকাশ করেছে।

ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও যুক্তরাজ্যের ২ হাজার মানুষের ওপর এই জরিপ চালানো হয়। প্রতিটি দেশ থেকে ৫০০ জন করে এতে অংশ নেন।

জরিপে দেখা গেছে, প্রতিটি দেশের মাত্র ১০ শতাংশ মানুষ বলেছেন, তারা কোনোভাবেই বিদেশে গিয়ে বসবাস করতে চান না।

বিদেশে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কথা বলেছেন ব্রিটেনের ৫৩ শতাংশ, ফ্রান্সের ৪৮ শতাংশ, জার্মানির ৪৩ শতাংশ এবং ইতালির ৩২ শতাংশ মানুষ।

সব দেশের উত্তরদাতাদের পছন্দ এক না হলেও স্পেন সামগ্রিকভাবে সবচেয়ে জনপ্রিয় গন্তব্য হিসেবে উঠে এসেছে।

যুক্তরাজ্যের ২৪ শতাংশ এবং ইতালির ২০ শতাংশ মানুষ স্পেনকে ভবিষ্যতের পছন্দের দেশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ফ্রান্সের ক্ষেত্রেও স্পেন দ্বিতীয় পছন্দের দেশ।

ফরাসিদের কাছে অবশ্য সবচেয়ে পছন্দের গন্তব্য কানাডা। ১৭ শতাংশ ফরাসি উত্তরদাতা কানাডায় বসবাসের আগ্রহ জানিয়েছেন। এরপর ১৪ শতাংশের পছন্দ ইতালি।

জার্মানদের পছন্দ তুলনামূলকভাবে কাছের দেশ। ১৭ শতাংশ জার্মান অস্ট্রিয়াকে পছন্দের গন্তব্য বলেছেন। স্পেন ও সুইজারল্যান্ডকে বেছে নিয়েছেন ১২ শতাংশ করে।

অন্যদিকে ব্রিটিশদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে দূরের দেশও। ১৯ শতাংশ অস্ট্রেলিয়া, ১৫ শতাংশ কানাডা এবং ১০ শতাংশ নিউজিল্যান্ডে বসবাসের আগ্রহ জানিয়েছেন।

বিদেশে বসবাসের ক্ষেত্রে নতুন একটি প্রবণতার কথাও উঠে এসেছে জরিপে। এক দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের বদলে কয়েকটি দেশে ভাগ করে সময় কাটানোর প্রবণতা বাড়ছে।

ভ্রমণ বিশেষজ্ঞ হলি রুবেনস্টাইনের মতে, নতুন ধরনের প্রবাসী জীবন হবে আরও নমনীয়। কেউ হয়তো ছয় মাস এক দেশে থেকে দূরবর্তীভাবে কাজ করবেন, এরপর অন্য দেশে গিয়ে নতুন জীবনযাপন পরীক্ষা করে দেখবেন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে কাজ, বন্ধুত্ব ও ব্যক্তিগত পরিচয় আর একটি নির্দিষ্ট দেশের সঙ্গে আবদ্ধ থাকবে না।

সূত্র: ইউরোনিউজ

ফ্রান্সের প্যারিস। ছবি: ইউরোনিউজ থেকে নেওয়া
ফ্রান্সের প্যারিস। ছবি: ইউরোনিউজ থেকে নেওয়া

ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসতে ট্রাম্পকে এরদোয়ানের আহ্বান

ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা কমাতে দেশটির সঙ্গে আলোচনার পথে এগোতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। একই সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে শান্তি প্রচেষ্টায় আঙ্কারার সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। খবর রয়টার্সের।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় এরদোয়ান এ আহ্বান জানান বলে জানিয়েছে তুরস্কের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়।

এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনা নিরসনে কূটনীতিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন এরদোয়ান। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দুই দেশের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত থাকবে এবং তুরস্ক শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় সহযোগিতা করে যাবে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে সাময়িক সমঝোতা হলেও স্থায়ীভাবে সংঘাত বন্ধের আলোচনা সাম্প্রতিক সময়ে থমকে গেছে। সোমবার এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, আলোচনা থেকে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না আসায় ইরান সামরিকভাবে পুরোপুরি আক্রমণাত্মক অবস্থানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

একই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টাতেও অগ্রগতি থেমে গেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের শুরু থেকেই তুরস্ক যুদ্ধের বিরোধিতা করে আসছে। একই সঙ্গে ইরানের হামলায় উপসাগরীয় দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ারও নিন্দা জানিয়েছে আঙ্কারা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং পাকিস্তান ও কাতারের মতো মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে তুরস্ক নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক বাহিনী রয়েছে তুরস্কের এবং দেশটির সঙ্গে ইরানের সরাসরি সীমান্ত রয়েছে। ফলে চলমান সংঘাতের প্রভাব নিয়ে আঙ্কারার বিশেষ কৌশলগত উদ্বেগ রয়েছে।

এরদোয়ানের ফোনালাপের এক দিন আগে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা এবং যুদ্ধবিরতি অব্যাহত রাখার বিষয়েও আলোচনা করেন।

ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ছাড়াও গাজা যুদ্ধ এবং সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি সই হওয়া প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়েও আলোচনা করেন এরদোয়ান।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট ওই চুক্তিকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার জন্য শক্ত অবস্থানের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেন। গত ৭ আগস্ট সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হয়।

গাজা পরিস্থিতি নিয়েও ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেন এরদোয়ান। তিনি বলেন, ট্রাম্পের ঘোষিত গাজা শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের হামলা বেড়েছে।

তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরেই গাজায় যুদ্ধ বন্ধ এবং ফিলিস্তিনিদের জন্য স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে। 

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : রয়টার্স
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : রয়টার্স

‘হরমুজ নিয়ে ইরান-ওমান সমঝোতা হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা সহজ হবে’

হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে একটি সমঝোতা হলে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা আবার শুরু করা সহজ হবে বলে জানিয়েছে কাতার। দেশটি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে। খবর দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের।

কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি সাংবাদিকদের বলেন, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমান ও ইরানের মধ্যে একটি চুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে দোহা। ওই চুক্তি হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা ফের একটি কাঠামোয় ফিরিয়ে আনা সহজ হবে।

তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি নিয়ে একটি সমঝোতা হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা পুনরায় শুরু করা অনেক সহজ হবে।

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দেয় ইরান। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।

ইরান ও ওমান দুই দেশেরই হরমুজ প্রণালিতে উপকূল রয়েছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রণালিটির ভবিষ্যৎ নৌ চলাচল নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। তেহরান জানিয়েছে, প্রস্তাবিত নৌ চলাচলের রুটের ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক নিয়ে দুই দেশ এরই মধ্যে একমত হয়েছে।

তবে হরমুজ প্রণালি পরিচালনা ও জাহাজ চলাচলের নিয়ম নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। জুনে দুপক্ষের মধ্যে সই হওয়া একটি সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ কার্যত ভেঙে যাওয়ার পরও প্রণালিটি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

ইরানের শীর্ষ আলোচক ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এর আগে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের দাবি পূরণ না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খোলা হবে না। এসব দাবির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়টিও রয়েছে।

ইরান বর্তমানে হরমুজ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে আগে অনুমতি নেওয়া এবং ট্রানজিট ফি দেওয়ার শর্ত দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কয়েকটি আঞ্চলিক দেশ এ ব্যবস্থার বিরোধিতা করছে। অনুমতি না নিয়ে প্রণালি দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করা কয়েকটি জাহাজে ইরান হামলাও চালিয়েছে।

এর মধ্যেই ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা গুরুতরভাবে চলমান রয়েছে এবং একটি যৌথ বিবৃতির খসড়া নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে মতবিনিময় হচ্ছে।

তবে হরমুজ প্রণালি নিয়ে অচলাবস্থা আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে ইরানের সঙ্গে হরমুজ নিয়ে সমঝোতার পথে ওমান বাধা দিলে দেশটিতে বোমা হামলার হুমকি দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি ইরানকে আত্মসমর্পণের আহ্বানও জানিয়েছেন।

এ অবস্থায় হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার বিষয়ে ইরান ও ওমানের সম্ভাব্য সমঝোতাকেই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনার পরবর্তী ধাপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে দেখছে কাতার।

সূত্র: দ্য টাইমস অব ইসরায়েল 

কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি। ছবি : রয়টার্স
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি। ছবি : রয়টার্স

বিশ্ব তেল সরবরাহে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধাক্কা

২০২৬ সালের মার্চে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ব তেল সরবরাহে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধাক্কা তৈরি হয়েছে। ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্টের প্রকাশিত এক তালিকা অনুযায়ী, এই সংকটে বিশ্ববাজারে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ কমে যায়। মঙ্গলবার ইরাকি বার্তা সংস্থা শাফাক নিউজ এ খবর প্রকাশ করেছে।

গত পাঁচ দশকের বড় যুদ্ধ ও তেল সংকটের কারণে তৈরি সরবরাহ ঘাটতির তুলনায় হরমুজ সংকটের মাত্রা অনেক বেশি। ১৯৭৮-৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের সময় প্রতিদিন প্রায় ৫৬ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ কমেছিল, যা তালিকায় দ্বিতীয় বৃহত্তম সংকট।

তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে আরব তেল অবরোধ এবং চতুর্থ অবস্থানে ১৯৯০ সালে কুয়েতে ইরাকের হামলা। দুটি ঘটনাতেই বিশ্ব তেল সরবরাহ প্রতিদিন প্রায় ৪৩ লাখ ব্যারেল কমে যায়।

১৯৮০-৮১ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় সরবরাহ কমেছিল প্রায় ৪১ লাখ ব্যারেল। এরপর ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের কারণে প্রতিদিন প্রায় ২৩ লাখ ব্যারেল এবং ২০১১ সালের লিবিয়া গৃহযুদ্ধের সময় প্রায় ১৫ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ কমে যায়।

বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন হয়। তাই এই নৌপথে দীর্ঘস্থায়ী বাধা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।

শাফাক নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পর ইরানের বিধিনিষেধের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ রয়েছে। ১৮ জুন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারক কার্যকর হওয়ার পর নৌপথটি সাময়িকভাবে খুললেও নতুন করে সামরিক উত্তেজনা বাড়ার পর আবার বন্ধ হয়ে যায়।

তেহরান অবশ্য দাবি করছে, হরমুজ প্রণালি এখনো ইরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

সূত্র: শাফাক নিউজ

ছবি: মেরিন ইনসাইট
ছবি: মেরিন ইনসাইট

যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর হওয়ার দৌড়ে আবদুল এল সাইদ

‘আমার কাজিনদের মতো আমারও মিশরে ট্যাক্সি ক্যাব ড্রাইভার হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু ইতিহাসের দুর্ঘটনায় আমার বাবা ডেট্রয়েটে অভিবাসী হয়ে আসেন আর আমি আমেরিকান হিসেবে পরিচিতি পাই।’

আগস্টের শুরুতে মিশিগান অঙ্গরাজ্য থেকে ডেমোক্র্যাটদের মনোনয়ন নিশ্চিত করার পর বিজয় ভাষণে সমর্থকদের সামনে এভাবেই নিজের পরিবারের অতীতের গল্প তুলে ধরেন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে হঠাৎই আলোচনার জন্ম দেওয়া আবদুল এল সাইদ।

তাকে নিয়ে আলোচনা যে শুধু তার মিশরীয় অভিবাসী বাবা-মায়ের সন্তান বা মুসলিম রাজনীতিবিদ হওয়ার কারণে, তা নয়।

সাবেক এই জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তার রাজনৈতিক অঙ্গীকার, ইসরাইলবিরোধী অবস্থান এবং বিভিন্ন দেশের সেনাবাহিনীতে আমেরিকান অর্থায়ন বন্ধের দাবি তাকে মিশিগানের ডেমোক্র্যাট মনোনয়ন প্রত্যাশী করার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

‘মানি আউট অব পলিটিক্স, মানি ইন ইওর পকেট, হেলথকেয়ার ফর অল’- অর্থাৎ রাজনীতি থেকে অর্থকে সরিয়ে তা মানুষের কাছে ফিরিয়ে দেয়া এবং সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা- এই ছিল তার নির্বাচনী প্রচারণার মূল বক্তব্য।

একইসাথে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে সমালোচনা করে তিনি এমন ভোটারদের আকৃষ্ট করেছেন, যারা ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দুই বছরের কার্যক্রমে ক্ষুব্ধ ।

পাশাপাশি ইসরাইলসহ যে কোনো দেশের সেনাবাহিনীতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নের বিরোধিতাও তাকে তার সমর্থকদের মধ্যে জনপ্রিয় করেছে। ইসরাইলের সেনাবাহিনীকে অর্থ সহায়তা দেওয়াকে ‘আমাদের ট্যাক্স ডলারের নিকৃষ্টতম ব্যবহার’ বলে সমালোচনা করেছেন তিনি।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, মিশিগান রাজ্যের ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে তিনি নিজের দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সমর্থনই পাননি। যে কারণে তাকে বলা হচ্ছে ‘আউটসাইডার’, বা বহিরাগত।

এল সাইদকে নির্বাচনে সমর্থন দিয়েছেন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বার্নি স্যান্ডার্স, আলেক্সান্দ্রা ওসারিও-কর্টেজের মতো নেতারা।

নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মিডটার্ম নির্বাচনে মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সিনেটর পদের জন্য রিপাবলিকান পার্টির মাইক রজার্সের, যিনি ট্রাম্পের কাছের মানুষ হিসেবে পরিচিত, সাথে লড়াই করবেন আবদুল এল সাইদ।

আর ওই নির্বাচনে জিতলে তিনি হবেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের প্রথম মুসলিম সিনেটর।

যেভাবে রাজনীতিতে উঠে আসা

একচল্লিশ বছর বয়সী এল সাইদকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বহিরাগত বলা হলেও মূলধারার রাজনীতিতে তার প্রথম সক্রিয় অংশগ্রহণ দেখা যায় ২০১৮ সালে, মিশিগান রাজ্যের গভর্নর নির্বাচনের সময়।

সেসময় তিনি গভর্নর নির্বাচনে হেরে গেলেও মোট ভোটের ৩০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছিলেন। ওই নির্বাচনেও তার মূল এজেন্ডা ছিল স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং রাজনীতি থেকে পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়ন বাদ দেওয়া।

তবে ধারণা করা হয় এল সাইদের রাজনীতিতে আসার প্রাথমিক অনুপ্রেরণাটা তৈরি হয়েছিল ২০০৭ সালে, যখন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সাথে তার সাক্ষাৎ হয়।

সে বছর এপ্রিলে মিশিগান ইউনিভার্সিটির সমাবর্তন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি বিল ক্লিনটনের উপস্থিতিতে শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থী হিসেবে বক্তব্য রেখেছিলেন আবদুল এল সাইদ। তার ওই বক্তব্যের পর বিল ক্লিনটন নিজের ভাষণের সময় অতিথিদের সামনেই তার বক্তব্যের প্রশংসা করেন।

পরে ক্লিনটন তার সঙ্গে আলাদাভাবে দেখা করেও তার প্রশংসা করেছিলেন।

সেই ঘটনার দশ বছর পর, ২০১৭ সালে, আবদুল এল সাইদ ঘোষণা দেন যে তিনি মিশিগানের গভর্নর নির্বাচনে লড়বেন। ওই নির্বাচনে অংশ নিতে তিনি মিশিগানের ডেট্রয়েট শহরের পাবলিক হেলথ বিভাগের পরিচালকের চাকরি ছাড়েন।

৩০ বছর বয়সে, ২০১৫ সালে, এল সাইদ যখন ডেট্রয়েটের পাবলিক হেলথ বিভাগের পরিচালক হন তখন তিনি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বড় শহরে এমন পদে থাকা সর্বকনিষ্ঠ ব্যক্তি। দায়িত্বে থাকার সময় তিনি শিশু মৃত্যুহার কমানো, শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে চশমা প্রদান ও শতাধিক স্কুলে সীসার মাত্রা পরীক্ষা করার মতো জনপ্রিয় পদক্ষেপ নিয়েছেন।

সেসময় যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম কমিউনিটিরও ব্যাপক সমর্থন পেয়েছিলেন এল সাইদ।

এ বছরের এপ্রিলে মিশিগানের প্রাথমিক নির্বাচনের জন্য প্রার্থিতা ঘোষণার পর তিনি আবার আলোচনায় আসেন।

এবারের নির্বাচনের প্রচারণায় নিজেকে এল সাইদ তুলে ধরেছেন কর্পোরেশনগুলোর মুখোমুখি হতে চাওয়া একজন শ্রমজীবী নেতা হিসেবে, যিনি ইসরাইলপন্থী অর্থায়নকারী আর দলীয় রাজনীতিতে বিশ্বাসী নেতাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার।

আর তার এমন অবস্থানের কারণে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সমালোচনা করেছেন ‘ইহুদি বিদ্বেষী’ হিসেবে।

‘এই ব্যক্তি (এল সাইদ) ইহুদিদের ভালোবাসে না, সে ইসরাইলকে ভালোবাসে না, সে তাদের ঘৃণা করে’, আবদুল এল সাইদ মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাট মনোনয়ন জেতার পর এই মন্তব্য করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর হওয়ার দৌড়ে আবদুল এল সাইদ
আবদুল এল সাইদ

পারমাণবিক কর্মসূচি আরো বৃদ্ধি করবে ইরান

ইরানের পরমাণু শিল্প ধ্বংসের জন্য শত্রুদের নানা প্রচেষ্টা সত্ত্বেও দেশটি পারমাণবিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক উন্নয়নের পথ থেকে সরে আসবে না বলে জানিয়েছেন ইসলামিক রেভল্যুশন গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) উপ-প্রধান মেজর জেনারেল মোস্তফা ইজাদি। ইসলামী বিপ্লবের শহীদ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির স্মরণে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন।

মেজর জেনারেল ইজাদি বলেন, ইরানকে দুর্বল, উৎখাত ও খণ্ডিত করার লক্ষ্য নিয়ে শত্রুরা বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে সংঘাতে নেমেছিল। দেশটির তেলসম্পদ ও হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, ইরানি-ইসলামি সভ্যতা ধ্বংস, সশস্ত্র বাহিনী ও প্রতিরোধ ফ্রন্টকে দুর্বল করা এবং পরমাণু শিল্প নিশ্চিহ্ন করার মতো লক্ষ্যও তাদের ছিল। তবে এসব প্রচেষ্টার কোনোটিই সফল হয়নি।

তিনি বলেন, আমরা শক্তির সঙ্গে দেশের পরমাণু, বৈজ্ঞানিক ও উন্নয়নমূলক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখব।

ইরানের এই সামরিক কর্মকর্তা দাবি করেন, আল্লাহর ওপর নির্ভরতা এবং বিচক্ষণ নেতৃত্বের কারণে ইসলামি প্রজাতন্ত্র কঠিন পরিস্থিতিগুলো অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে। শত্রুরা ইরানের পরমাণু শিল্পে প্রবেশ বা তা ধ্বংস করার লক্ষ্যেও সফল হতে পারেনি বলে উল্লেখ করেন তিনি।

বিশ্ব রাজনীতির সাম্প্রতিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গ টেনে ইজাদি বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় ধরনের পরিবর্তনগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা ও প্রভাব কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ইরানের সামরিক সক্ষমতা নিয়েও বক্তব্য দেন আইআরজিসির উপ-প্রধান। তিনি বলেন, বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি, শিল্প ও অর্থনৈতিক বাণিজ্যপথগুলোর অন্যতম হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতায় বড় অগ্রগতি এবং আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেশটির অসাধারণ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করেছে। এর ফলে প্রতিপক্ষরা সতর্ক ও অনেকটা নিষ্ক্রিয় অবস্থানে যেতে বাধ্য হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

আঞ্চলিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ইজাদি বলেন, প্রতিরোধ ফ্রন্টও ইসলামি বিপ্লবের আদর্শের সমর্থনে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিশেষ করে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির মতো কৌশলগত প্রবেশপথগুলোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এ ফ্রন্ট আঞ্চলিক প্রভাব আরও শক্তিশালী করেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সূত্র: তাসনিম নিউজ এজেন্সি

পারমাণবিক কর্মসূচি আরো বৃদ্ধি করবে ইরান
ইসলামিক রেভল্যুশন গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) উপ-প্রধান মেজর জেনারেল মোস্তফা ইজাদি।

ভারতে মুসলিম যুবকের পরিবারের জন্য ৪ দফা দাবি ককরোচদের

উত্তর কলকাতার ‘ভারত সভা হল’-এ নির্ধারিত ‘মিট আপ’ শেষ মুহূর্তে বাতিল করতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। বিজেপির চাপে অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন দলটির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা।

মঙ্গলবার কলকাতা প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আশুতোষ অভিযোগ করেন, ‘ভারত সভা হল’-এর পাশাপাশি কলকাতার আরো প্রায় ৬টি অডিটোরিয়াম তাদের অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য বুকিং দিতে রাজি হয়নি। তার দাবি, রাজনৈতিক চাপের কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, ওরা ভয় পেয়েছে।

তবে বাধা দিয়ে তাদের থামানো যাবে না বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আশুতোষ। তিনি জানান, খুব শিগগিরই আরো বড় পরিসরে ‘মিট আপ’ আয়োজন করা হবে। যত আটকানোর চেষ্টা হবে, আমরা তত শক্তিশালী হব।

এদিন সংবাদ সম্মেলনে বাঁকুড়ার ইন্দাসের যুবক শেখ আব্দুল হাফিজের পরিবারের পাশে থাকার কথাও জানান সিজেপির মুখপাত্র। দলটির দাবি, সিজেপির ‘স্কুল ঠিক করো’ আন্দোলনের অংশ হিসেবে স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করায় আব্দুলের বাবা শেখ মহম্মদ মাফিকে হত্যা করা হয়েছে।

আব্দুলের পরিবারের জন্য চার দফা দাবি তুলে ধরেছে ককরোচ জনতা পার্টি। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, হত্যাকাণ্ডে জড়িত অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার, পরিবারের পাশে থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা এবং আব্দুলের নামে অর্থ সংগ্রহ করে পরিবারকে সহায়তা করা।

এ জন্য শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষের কাছেও আর্থিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন আশুতোষ।

তবে সরাসরি নির্বাচনি রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই বলেও স্পষ্ট করেছেন তিনি। ছাত্র সংসদ নির্বাচনেও সিজেপি অংশ নেবে না বলে জানান আশুতোষ। তিনি বলেন, আমরা প্রেসার গ্রুপ হিসেবে কাজ করব। রাজনীতি করার জন্য আরো অনেকে আছে।

সূত্র: এই সময়

ভারতে মুসলিম যুবকের পরিবারের জন্য ৪ দফা দাবি ককরোচদের

অপরাধ প্রমাণ হয়নি, তবু ৬ বছর জেলে ভারতের মুসলিম ছাত্র নেতা উমর খালিদ

ভারতের স্বাধীনতা দিবস ঘিরে যখন স্বাধীনতার অর্জন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তখন দিল্লির তিহার কারাগারে প্রায় ৬ বছর ধরে বন্দি সাবেক জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (জেএনইউ) শিক্ষার্থী নেতা উমর খালিদের মামলা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে গ্রেপ্তারের পর থেকে তিনি এখনো কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হননি; এমনকি মূল মামলার বিচারপ্রক্রিয়াও এখনো শুরু পর্যায়ে রয়েছে।

উমর খালিদ দিল্লির ২০২০ সালের দাঙ্গাকে ঘিরে করা ‘বৃহত্তর ষড়যন্ত্র’ মামলায় বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন বা ইউএপিএসহ বিভিন্ন ধারায় অভিযুক্ত। তার বিরুদ্ধে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, দাঙ্গা ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে শত্রুতা উসকে দেওয়ার মতো অভিযোগও আনা হয়েছে।

দিল্লি পুলিশের অভিযোগ, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) বিরোধী আন্দোলনের সময় খালিদসহ কয়েকজন পরিকল্পিতভাবে সহিংসতা উসকে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করেছিলেন। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির দাঙ্গায় ৫৩ জন নিহত হন, যাদের বেশিরভাগই ছিলেন মুসলিম। পুলিশের দাবি, তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভারত সফরের সময় সহিংসতা ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনার অংশ ছিলেন খালিদ।

তবে শুরু থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন উমর খালিদ। তার দাবি, দাঙ্গার সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না এবং অন্য অভিযুক্তদের সঙ্গে কোনো ষড়যন্ত্রেও তিনি যুক্ত ছিলেন না। তার সমর্থকদের ভাষ্য, মামলার কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ ও ভিডিও নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

জামিনের পথেও দীর্ঘসূত্রতা

খালিদের মামলায় সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি করেছে দীর্ঘ সময় ধরে বিচারপূর্ব আটক থাকা। ইউএপিএর ৪৩ডি(৫) ধারায় জামিন পাওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর শর্ত রয়েছে। আদালতকে প্রাথমিকভাবে সন্তুষ্ট হতে হয় যে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তি নেই—যা সাধারণ ফৌজদারি মামলায় জামিনের প্রচলিত নীতির তুলনায় অনেক কঠিন।

২০২২ সালের অক্টোবরে দিল্লি হাইকোর্ট খালিদের জামিন আবেদন খারিজ করেন। এরপর তিনি সুপ্রিম কোর্টে যান। সেখানে শুনানি দীর্ঘ সময় ধরে এগোয়নি। বিভিন্ন কারণে এক বছরেরও বেশি সময় পর ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি সেই আবেদন প্রত্যাহার করে নিম্ন আদালতে নতুন করে জামিনের আবেদন করেন। সেখানেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাননি।

২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট একই মামলার পাঁচ অভিযুক্ত—গুলফিশা ফাতিমা, মীরান হায়দার, শিফা উর রহমান, মোহাম্মদ সেলিম খান ও শাদাব আহমদকে জামিন দেন। তবে উমর খালিদ ও আরেক কর্মী শরজিল ইমাম জামিন পাননি। আদালত তাদের অবস্থান অন্য অভিযুক্তদের তুলনায় ভিন্ন বলে উল্লেখ করেন।

এরপর দীর্ঘ বিচারপূর্ব আটক নিয়ে নিম্ন আদালতগুলো কীভাবে আইনি নজির প্রয়োগ করছে, তা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আরেকটি বেঞ্চ প্রশ্ন তোলে। সেই সুযোগে খালিদ ও শরজিল ইমাম নতুন করে জামিনের চেষ্টা করেন। কিন্তু ২০২৬ সালের জুলাইয়ে তাদের জানানো হয়, জানুয়ারির সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের কারণে ট্রায়াল কোর্ট ওই সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারবে না।

বর্তমানে খালিদ আবারো দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন। এটি তার অষ্টম দফা জামিন আবেদন বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। পুলিশের জবাব চাওয়া হয়েছে এবং আগস্টের শেষ দিকে এ বিষয়ে শুনানির কথা রয়েছে।

‘বিচারের আগে শাস্তি’ নিয়ে প্রশ্ন

খালিদের মামলাকে কেন্দ্র করে নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলো মূলত একটি প্রশ্ন তুলছে—একজন অভিযুক্তকে বছরের পর বছর বিচার ছাড়াই কারাগারে রাখা কতটা ন্যায়সংগত?

মামলায় বিপুল পরিমাণ নথি ও প্রমাণ রয়েছে বলে আদালতে উল্লেখ করা হলেও সেগুলোর বড় অংশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পরীক্ষা হয়নি। এমনকি গ্রেপ্তারের কয়েক বছর পরও মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন না হওয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সমালোচকদের মতে, দ্রুত বিচারের সাংবিধানিক নীতির সঙ্গে এত দীর্ঘ বিচারপূর্ব আটক সাংঘর্ষিক। তাদের যুক্তি, কোনো ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত দোষী সাব্যস্ত হন কি না, তা আদালতের বিচারের বিষয়; কিন্তু বিচার শুরুর আগেই বছরের পর বছর কারাবন্দি থাকা কার্যত শাস্তির মতো হয়ে যেতে পারে।

ইউএপিএর কঠোর জামিন বিধান নিয়েও জাতিসংঘের বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও দেশীয় নাগরিক অধিকার সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। তাদের অভিযোগ, সন্ত্রাসবিরোধী এই আইনটি রাজনৈতিক মতবিরোধ, সাংবাদিকতা ও প্রতিবাদের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও প্রয়োগ করা হয়েছে এবং দীর্ঘ বিচারপূর্ব আটক অনেক ক্ষেত্রে কার্যত শাস্তিতে পরিণত হয়েছে।

তবে খালিদের মামলায় আদালতের ভূমিকা নিয়ে সরাসরি আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের অভিযোগও নেই। আদালত বিদ্যমান আইন ও তার কঠোর জামিন কাঠামোর মধ্যেই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায়ে বলা হয়েছে, অস্বাভাবিক দীর্ঘ কারাবাস ও বিচারপ্রক্রিয়ায় বিলম্ব বিশেষ পরিস্থিতিতে জামিনের কারণ হতে পারে।

স্বাধীনতার প্রশ্নে উমর খালিদের মামলা

উমর খালিদের মামলা নাগরিকত্ব আইনবিরোধী আন্দোলন, ২০২০ সালের দিল্লি দাঙ্গা এবং ভারতে রাজনৈতিক ভিন্নমতকে নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে দেখার প্রবণতা—এই তিনটি বিষয়কে একই জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে।

তার সমর্থকদের মতে, সরকারের নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে তাকে দীর্ঘদিন কারাগারে থাকতে হচ্ছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, তিনি গুরুতর ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন—যার বিচার আদালতেই নির্ধারিত হওয়ার কথা।

শেষ পর্যন্ত খালিদ দোষী না নির্দোষ, সেটি নির্ধারণ করার দায়িত্ব আদালতের। কিন্তু প্রায় ছয় বছর ধরে বিচার না হওয়াই এখন তার মামলার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের মূল্যায়ন শুধু রাষ্ট্রের অর্জন দিয়ে নয়, রাষ্ট্র তার বিরোধীদের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করে—তার মাধ্যমেও হয়।

উমর খালিদের মামলা তাই শুধু একজন ব্যক্তির জামিনের প্রশ্ন নয়; এটি ভারতের বিচারব্যবস্থায় দ্রুত বিচার, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার কতটা কার্যকরভাবে সুরক্ষিত হচ্ছে—সেই বৃহত্তর প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।

সূত্র: দ্য অবজার্ভার পোস্ট

অপরাধ প্রমাণ হয়নি, তবু ৬ বছর জেলে ভারতের মুসলিম ছাত্র নেতা উমর খালিদ

ঠোঁট ফাটা দূর করার উপায় by আলিয়া রিফাত

শীত নিয়ে আসে ত্বকের কিছু সমস্যা। এসব সমস্যার মধ্যে অন্যতম ঠোঁট ফাটা। তাপমাত্রা কমতে থাকার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসের আর্দ্রতা কমতে থাকে। তাই শীতে আমাদের ঠোঁট ফেটে যায়। ঠোঁটে মরা চামড়া সৃষ্টি হয়, ঠোঁট দেখায় নিষ্প্রাণ।

ঠোঁটে কোনো তেলগ্রন্থি নেই। ঠান্ডা বাতাসে, এমনকি ঘরের তাপমাত্রায়ও ঠোঁট পানিশূন্য হয়ে যায়। জিব দিয়ে ঠোঁট ভেজালে, পর্যাপ্ত পানি না খেলে এসব সমস্যা আরও বাড়ে। ভয়ের কিছু নেই।

সঠিকভাবে সঠিক উপকরণ ব্যবহার করে ঠোঁটের যত্ন নিতে হবে। মেনে চলতে হবে কিছু অভ্যাস। তাহলে শীতজুড়েই আপনার ঠোঁট থাকবে কোমল ও উজ্জ্বল।

মরা চামড়া এক্সফলিয়েট করুন

কোমল ঠোঁটের জন্য আপনাকে অবশ্যই নিয়মিত এক্সফলিয়েশন করতে হবে। এক্সফলিয়েটর হিসেবে ব্যবহার করতে হবে একটি ভালো মানের লিপ স্ক্রাব। ঘরোয়াভাবেই লিপ স্ক্রাব তৈরি করা যায়। মধু ও চিনি মিশিয়ে লিপ স্ক্রাব তৈরি করতে পারেন।

এ ক্ষেত্রে চিনি ও মধুর অনুপাত হতে হবে ১: ১। চাইলে অলিভ অয়েলও মেশাতে পারেন। সে ক্ষেত্রে চিনির পরিমাণ দ্বিগুণ করতে হবে। এই লিপ স্ক্রাব সপ্তাহে অন্তত এক দিন ব্যবহার করা প্রয়োজন।

প্রতিবার এক মিনিট ধরে লিপ স্ক্রাব দিয়ে ঘষে ঘষে ঠোঁটের মরা চামড়া তুলে ফেলতে হবে। এ ছাড়া এক্সট্রা সফট টুথ ব্রাশ দিয়ে ঠোঁটের মরা চামড়া তুলে ফেলতে পারেন। প্রতিবার এক্সফলিয়েশনের পর ঠোঁটে লিপ বাম ব্যবহার করতে ভুলবেন না।

এতে ঠোঁট মোলায়েম হবে। নিয়মিত এক্সফলিয়েট করা ঠোঁটে ময়েশ্চারাইজার লাগালে ঠোঁট খুব ভালোভাবে সেটি শুষে নেবে। খুব ঘন ঘন এক্সফলিয়েট করবেন না। সপ্তাহে দুই দিন এক্সফলিয়েট করাই যথেষ্ট। অতিরিক্ত এক্সফলিয়েশনের ফলে ঠোঁটে অস্বস্তি দেখা দিতে পারে।

নিয়মিত ঠোঁট ময়েশ্চারাইজ করুন

ঠোঁটে নিয়মিত ময়েশ্চারাইজিং লিপ বাম ব্যবহার করতে হবে। শিয়া বাটার, নারকেল তেল কিংবা কোকো বাটার-সমৃদ্ধ লিপ বাম ব্যবহার করা সবচেয়ে ভালো। এসব উপাদান প্রাকৃতিকভাবে ঠোঁট কোমল করে।

ভিটামিন ই এবং বিজওয়াক্স ঠোঁটের আর্দ্রতা ধরে রাখে। ফেটে যাওয়া ঠোঁট সারিয়ে তুলতেও উপাদান দুটি কার্যকর। দিনের মধ্যে বেশ কয়েকবার ঠোঁটে লিপ বাম দিতে হবে। বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর আগে। এটি ঠোঁটে পুষ্টি জোগাতে খুবই প্রয়োজন।

পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার খান


শীতকালেও আপনার পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি খেতে হবে। পাশাপাশি গ্রিন-টি খেতে পারেন। এতে আপনার শরীরের ও ঠোঁটের পানিশূন্যতা দূর হবে। শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিলে ঠোঁটে তার চিহ্ন ফুঁটে ওঠে।

চরম আবহাওয়া থেকে ঠোঁটকে রক্ষা করুন

বাইরে বের হওয়ার আগে এসপিএফ-যুক্ত লিপ বাম ব্যবহার করুন। এতে আপনার ঠোঁট ঠান্ডা বাতাস ও সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে রক্ষা পায়। বাইরের অতিরিক্ত ঠান্ডায় খসখসে হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে ঠোঁট স্কার্ফ দিয়ে ঢেকে রাখতে পারেন।

বদভ্যাস এড়িয়ে চলুন

জিব দিয়ে ঠোঁট ভেজানো, দাঁত দিয়ে কামড়ানো, খুঁটতে থাকা, ঠোঁটের চামড়া তোলা—এসব বদভ্যাস বাদ দিতে হবে। এসব করলে ঠোঁট আরও শুকিয়ে যায়, ফাটা সহজে সেরে ওঠে না।

এসব নিয়ম মেনে চললে শীতকালেও আপনার ঠোঁট থাকবে কোমল ও মসৃণ।

সূত্র: উইকিহাউ

সঠিকভাবে যত্ন নিলে শীতেও ঠোঁট থাকবে কোমল, উজ্জ্বল
সঠিকভাবে যত্ন নিলে শীতেও ঠোঁট থাকবে কোমল, উজ্জ্বল। ছবি: পেক্সেলস