Sunday, August 18, 2013

রাজনীতিতে বিলবোর্ডের ব্যবহার by ড. সৈয়দ রাশিদুল হাসান

বিলবোর্ডও যে রাজনীতি চর্চার একটা মাধ্যম হতে পারে, এটা কখনোই আমার চিন্তার মধ্যে আসেনি। বিলবোর্ড গণযোগাযোগের একটি স্বীকৃত মাধ্যম। এ মাধ্যম ব্যবহার করে যে কেউ তার পণ্য, সেবা, চিন্তা কিংবা ধারণার প্রচার ও প্রসার করতেই পারেন। আওয়ামী লীগ তাদের ভাষায় গত সাড়ে চার বছরে তাদের অর্জনকে মানুষের মনে আরেকবার গেঁথে দেয়ার জন্য বিজ্ঞাপনের সব মাধ্যম ছেড়ে বিলবোর্ডকেই বেছে নিল। কেন নিল তা বলতে পারব না। তবে তাদের পক্ষ থেকে নিশ্চয়ই যুক্তি আছে। আমি মার্কেটিংয়ের লোক হয়ে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রচার ও প্রসারে বিলবোর্ডের ব্যবহারের বিপক্ষে কোনো যুক্তি দাঁড় করাতে পারব না। তাহলে এটা নিয়ে এত কথা হচ্ছে কেন? বিরোধী দলসহ অনেক দল ও গোষ্ঠী এহেন প্রচারের বিপক্ষে রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। আবার কেউ কেউ বলছেন, আওয়ামী লীগ সঠিক পথেই হাঁটছে। পক্ষে-বিপক্ষে কোনোটাতেই যাব না। তবে এ কথা অনস্বীকার্য, আওয়ামী লীগ প্রচারমাধ্যম হিসেবে বিলবোর্ডের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিল অনেকখানি।
জানি না, আওয়ামী লীগকে বিলবোর্ড ব্যবহারের এ বুদ্ধি দিল কে বা কারা। বর্তমানে আওয়ামী লীগ যে পর্যায়ে আছে, তাতে তার প্রচার ও প্রসারের জন্য বিলবোর্ডের ব্যবহার কি সঠিক সিদ্ধান্ত? মার্কেটিংয়ের যে কোনো বিশেষজ্ঞকে নিরপেক্ষভাবে মতামত দিতে বললে অবশ্যই একটাই উত্তর পাওয়া যাবে এবং তা হল ‘না’। গণযোগাযোগের একটা ব্যাকরণ আছে। বর্তমানে আওয়ামী লীগের বিলবোর্ড ব্যবহার কোনোমতেই এ ব্যাকরণের মধ্যে পড়ে না। মানুষের মনে আওয়ামী লীগ সম্বন্ধে প্রচণ্ড নেগেটিভ মনোভাব আছে। এটা প্রমাণ হয়েছে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত পাঁচ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে। নজিরবিহীন লুটপাট, পদ্মা সেতু দুর্নীতি, শেয়ারবাজার কারসাজি, ব্যাংক জালিয়াতি, হত্যা-গুম আর নিরীহ আলেম ও শিক্ষানবিস আলেমদের হত্যা-হয়রানির ঘটনাগুলোর জন্য আওয়ামী লীগের যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠে ২০০৮-০৯ সালের অবস্থায় ফিরে যাওয়া দু-তিনশ’ কিংবা দু-তিন লাখ বিলবোর্ড দিয়ে সম্ভব নয়।
যাই হোক, আমার কথাগুলো আওয়ামী ঘরানার মানুষ মেনে নিতে চাইবেন না। সেক্ষেত্রে আমার প্রশ্ন হচ্ছে, আওয়ামী লীগ কি এতটাই দুর্বল হয়ে গেছে যে, বিএনপি মহাসচিব সেগুলো সরানোর কথা বলার পরপরই স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বিলবোর্ডের লেখাগুলো সরিয়ে ফেলা হল? মানুষ এত বোকা নয় যে, আমার ভাবনাটা তারা গ্রহণ করে ফেলবেন। ভেতরের সংবাদ কী জানি না, তবে এতটুকু বলা যেতে পারে, আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীর স্বভাব অনুযায়ীই তারা বিলবোর্ডগুলোকে সরকারি খাসজমি কিংবা সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর মনে করে রাতারাতি দখল করে ফেলেছিল। যদি তাই হয় তবে বলা যেতে পারে, পাহাড়সম দুর্নীতিকে ঢাকতে গিয়ে আরেক দুর্নীতির জন্ম দিয়ে ফেলল আওয়ামী লীগ। আর মাঝখানে লাভের গুড় কে খেল? বিলবোর্ডের কথা আর ছবিগুলো লেখার জন্য সরকারি কোষাগার থেকে যাকে বা যাদের লাখো কোটি টাকা দিতে হল, নিশ্চয়ই সেই সৌভাগ্যবান ব্যক্তি কিংবা ব্যক্তিদের পকেটে গেল লাভের গুড়। আওয়ামী লীগ যে ইমেজ সংকটে ভুগছে, এখন তার জন্য ইমেজ ফিরিয়ে আনার কৌশল হিসেবে জবরদখল করা বিলবোর্ডের ব্যবহার বুমেরাং হয়েই ফিরে এসেছে। আওয়ামী লীগ একটি রাজনৈতিক দল। রাজনীতি হয়তো তারা ভালো বুঝতে পারে, কিন্তু মার্কেটিং তো ভিন্ন জিনিস। এটা তাদের জানতে হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিলিয়ন ডলার খরচ করে প্রেসিডেন্ট প্রার্থীরা প্রচার বিশেষজ্ঞ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভাড়া করে। তারাই ঠিক করে দেয় প্রার্থী কোথায় কখন যাবে, কী কাপড়-চোপড় পরবে, কী কথা বলবে তাদের বক্তৃতায়, কোথায় কী বলে সম্বোধন করবে, এহেন আরও অনেক কিছু। আমাদের রাজনীতিকরা মনে করেন, তারা সবকিছুরই ওস্তাদ। তাই তারা মাঝে মধ্যে এমনই ভুল করে ফেলেন, যার জন্য খেসারত দিতে হয় পুরো দলকেই।
এবার অন্য পক্ষের কথায় আসি। আওয়ামী লীগ বিলবোর্ড ব্যবহার করেছে তো কী হয়েছে- আওয়ামী দুঃশাসন, নিপীড়ন, অত্যাচার আর হেফাজতের ওপর আইন-শৃংখলা বাহিনীর হামলার চিত্র ধরে তাদের পঞ্চাশটি বিলবোর্ডের বিপরীতে বিরোধী দল যদি একটি বিলবোর্ড টাঙিয়ে দিত, তাহলে তাদের লাভের পরিমাণ হতো আকাশসম। বিরোধী দলকেও শিখতে হবে রাজনৈতিক প্রচার কৌশল। মারের বদলে মার, কথার বিপরীতে কথা দিয়ে সব সময় কাজ হয় না। তাতে লাভ হয় না খুব বেশি। প্রচার কৌশল ঠিক করতে হবে অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায়। বুদ্ধি দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার উপায় খুঁজতে হবে। তাদের শিক্ষার জন্য একটা গল্প দিয়ে শেষ করব। লন্ডনের কোনো এক বাজারে এক মাংস বিক্রেতা তার মাংসের মান সম্বন্ধে উচ্চ ধারণা দেয়ার কৌশল হিসেবে দোকানে একটা ব্যানার ঝুলিয়ে রাখল। ব্যানারে লেখা ছিল ‘কুইন’স শেফ বায়’জ (কেনা) মিট ফ্রম হেয়ার’। রানীর বাবুর্চি এখান থেকে রানীর জন্য মাংস কেনে। ক্রেতারা হুমড়ি খেয়ে পড়ল সেই দোকানে। এ অবস্থায় অপরাপর মাংস বিক্রেতারা বিপদেই পড়ল। কী করবে তারা? না, কোনো মারামারি নয়, কিংবা সেই ব্যানারটি রাতের আঁধারে ছিঁড়ে ফেলাও নয়। ঠাণ্ডা মাথায় আরেক বিক্রেতা তার দোকানে একটা ব্যানার টাঙিয়ে দিল। সেই ব্যানারে লেখা ছিল ‘গড সেভ দ্য কুইন’। আল্লাহ রানীকে বাঁচিয়ে রাখুন। কী অপূর্ব কৌশল। সুতরাং বিরোধী দলকে আরও কৌশলী হতে হবে। বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা সব সময় কাজে লাগে না, লাগলেও লাভের গুড় খাওয়া যায় না।
ড. সৈয়দ রাশিদুল হাসান : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক

দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন স্বচ্ছ হবে না by ইকতেদার আহমেদ

চারটি সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা বিরোধী ১৮ দলীয় জোটের প্রার্থীদের কাছে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হলে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা সংসদে তার প্রদত্ত বক্তব্যে নির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়ার জন্য বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এ আহ্বানে বিরোধী দলের নেতারা ইতিবাচক সাড়া না দিয়ে পাল্টা দাবি উত্থাপন করে অবিলম্বে তত্ত্বাবধায়কের বিল এনে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করতে বলেন। সংবিধানের বর্তমান বিধান অনুযায়ী মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে এবং মেয়াদ অবসান ছাড়া অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করতে হবে। সাধারণ নির্বাচন পরবর্তী একটি সংসদের মেয়াদ ৫ বছর। সংসদের প্রথম বৈঠকের তারিখ থেকে এ ৫ বছর সময়কাল গণনা করা হয়। নবম সংসদের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২৫ জানুয়ারি ২০০৯ এবং সে হিসাবে ৫ বছর মেয়াদান্তে ২৪ জানুয়ারি ২০১৪ সংসদ ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে হবে অর্থাৎ ২৪ অক্টোবর ২০১৩ থেকে ২৪ জানুয়ারি ২০১৪-এর মধ্যবর্তী ৯০ দিন সময়ের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করতে হবে। সংবিধানের বর্তমান বিধান অনুযায়ী সংসদ ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হলে সংসদ বহাল রেখে নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে। বিশ্বের অপর কোনো গণতান্ত্রিক দেশে সংসদ বহাল থাকাবস্থায় সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় না এবং এ অবস্থায় নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হলে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা যে প্রশ্নবিদ্ধ হবে এমন ধারণা পোষণ অমূলক নয়।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দাবি, তাদের অধীনে স্থানীয় সরকারের প্রায় ২ হাজার ৫শ’ ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা এবং ৯টি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন স্বচ্ছ হয়েছে। তাই আগামী সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন তাদের দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হলে নির্বাচনের স্বচ্ছতা কোনোভাবেই ক্ষুণ হবে না। আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হওয়া পরবর্তী ৯টি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন পর্যালোচনায় দেখা যায় চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দ্বারা গঠিত নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। অপর ৬টি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন যথাÑ রংপুর, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট ও গাজীপুরের নির্বাচন বর্তমান সরকার দ্বারা গঠিত নির্বাচন কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সেনা মোতায়েনের জন্য বলা হলেও সরকার তাতে সাড়া দেয়নি। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ৫টি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি ও তাদের সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের কাছে সেনা মোতায়েনের দাবি করা হলে তা সরাসরি অগ্রাহ্য করা হয়।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় ভিত্তিতে না হওয়ার কথা থাকলেও অতীতে যেমন বিষয়টি উপেক্ষিত হয়েছে, বর্তমানেও উপেক্ষিত হয়ে আসছে। তাছাড়া দেখা গেছে, দলীয় ভিত্তিতে হওয়ার কারণে জাতীয় ইস্যু সরাসরি নির্বাচনকে প্রভাবিত করছে, যার ফলে স্থানীয় উন্নয়ন বিজয়ের ক্ষেত্রে আশানুরূপ অবদান রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। তবে একথাও ঠিক, স্থানীয় সরকারের অধীন বাস্তবায়নাধীন বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের মান নিয়ে জনগণের অসন্তোষ রয়েছে। স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী উন্নয়ন কাজের প্রকারভেদে বরাদ্দের ২০-৫০ ভাগ মেয়র, চেয়ারম্যান, কমিশনার ও দলীয় নেতাকর্মীদের পকেটস্থ হয়। অনুসন্ধানে জানা যায়, একজন মেয়র বা চেয়ারম্যানের প্রথম দফা নির্বাচিত হওয়া পরবর্তী দ্বিতীয় দফা নির্বাচনকালীন সম্পদের বহুগুণ বৃদ্ধি ঘটে। ক্ষমতা ও পদ দুর্নীতির মাধ্যমে সহজে অর্থ উপার্জনের যে পথ তৈরি করে, তা বর্তমানে ব্যবসার মাধ্যমে সম্ভব না হওয়ায় ব্যবসায়ীরা অধিক হারে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ছেন। আওয়ামী লীগ প্রধান যদিও সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের বিজয়কে দলীয় সরকারের অধীনে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের যৌক্তিকতা হিসেবে দাঁড় করাচ্ছেন, কিন্তু প্রধান বিরোধী দল বিএনপি আওয়ামী লীগ প্রধানের দাবির সঙ্গে একমত নন। তাদের ভাষ্য মতে, স্থানীয় নির্বাচন ও জাতীয় নির্বাচন এক নয়। এর আগে দলীয় সরকারের অধীনে সিটি নির্বাচনে বিরোধীদলীয় প্রার্থীর বিজয়ের একাধিক নজির থাকলেও দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনে বিরোধী দলের বিজয়ের একটি নজিরও নেই। তারা আরও বলেন, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ৫টি সিটি নির্বাচন সম্পূর্ণ অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলে, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন পক্ষপাতদুষ্টু না হলে এবং সেনা মোতায়েন করা গেলে ভোটের ব্যবধান আরও বেশি হতো। নির্বাচন কমিশন বিষয়ে বিএনপির নেতাদের সুনির্দিষ্ট বক্তব্য হল, চারটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের দিন বেলা সাড়ে ১২টা পর্যন্ত কোনো নির্বাচন কমিশনারকে তাদের কক্ষে পাওয়া যায়নি। সেদিন প্রধান নির্বাচন কমিশনার বেলা দেড়টায় তার কার্যালয়ে এসেছেন এমন তথ্যই পাওয়া যায়। নির্বাচন কমিশনের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, যে কোনো নির্বাচনে ভোট গ্রহণ পর্ব শুরু হওয়ার পর সকালের দিকে অধিক অনিয়ম হয় এবং সে সংক্রান্তে যে কোনো অভিযোগ উপেক্ষা করার জন্যই ইচ্ছাপূর্বক তাদের কমিশনে বিলম্বে আগমন। আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের বিপর্যয়কে সেভাবে গুরুত্ব দিয়ে না দেখলেও তার সরকারের প্রভাবশালী অর্থমন্ত্রী মুহিতের অভিমত, এ বিপর্যয় সরকারের জন্য একটি অশনি সঙ্কেত। এ প্রসঙ্গে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, সিটি নির্বাচনে যে দল পরাজিত হবে তাদের জন্য আগামী নির্বাচন সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।
আমাদের পার্শ্ববর্তী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারতসহ পৃথিবীর উন্নত দেশে নির্বাচন-পরবর্তী আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল ঘোষণার আগে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী দলের যে কোনো একটির শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে যখন নির্বাচনের জয়-পরাজয়ের ফলাফল স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তখন বিজিত প্রার্থী প্রথম যে দায়িত্বটি পালন করে থাকেন তা হল বিজয়ী প্রার্থীকে অভিনন্দন জানিয়ে তার সাফল্য কামনা। ওই সব দেশের সাধারণ মানুষ এ কাজটিকে উন্নত মানসিকতাসম্পন্ন অর্থাৎ ইতিবাচক কাজ হিসেবে দেখে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, উন্নত গণতান্ত্রিক দেশের মতো আমরা আমাদের মনমানসিকতা সেভাবে উন্নত করতে পারিনি। আমরা পরাজয়কে পরাজয় হিসেবে না দেখে কারচুপি হিসেবে দেখি। এ সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে এ সংস্কৃতি থেকে আমরা কিছুটা বের হয়ে আসতে পারলেও জাতীয় নির্বাচনে পারব কি-না সে বিষয়ে সংশয় রয়েছে। এ প্রসঙ্গে জনৈক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেছেন, আমাদের বড় দুটি দলের শীর্ষ নেতৃত্বের একজনের সঙ্গে অপরজনের যেখানে মুখ দেখাদেখি নেই এবং যেখানে একজনকে দেখলে অপরজন কথা না বলে এড়িয়ে চলেন, সেখানে অভিনন্দন জানাবেন কিভাবে?
সিলেট সিটি নির্বাচনের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার আগে বিজিত মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান ফলাফল গ্রহণ করে যেভাবে বিজয়ী মেয়র আরিফুল হককে অভিনন্দন জানিয়ে উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন, তা আমাদের সব রাজনৈতিক নেতা অনুসরণ করতে পারলে রাজনৈতিক ময়দানে মারামারি, কাটাকাটি ও হানাহানির অবসান ঘটবে বলেই মনে হয়। এ উদাহরণ দ্বারা অভিভূত হয়ে সিলেট স্থানীয় বিএনপির অনেক নেতার মন্তব্য, এর দ্বারা বিজিত প্রার্থী কামরান আগামী নির্বাচনে বিজয়ের বীজ বপন করেছেন।
সম্প্রতি একই দিনে অনুষ্ঠিত চার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের অপর বৈশিষ্ট্য হল, রাজশাহীর বিজয়ী মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, খুলনার বিজয়ী মেয়র মনিরুজ্জামান মনি এবং সিলেটের বিজয়ী মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী নির্বাচনের পরদিন ফুলের মালা ও মিষ্টি নিয়ে পরাজিত বিদায়ী মেয়রের বাড়িতে উপস্থিত হয়ে সামনের দিনে পথচলায় তাদের সাহায্য ও সহযোগিতা কামনা করেছেন। তাদের এ উদারতা ও মহানুভবতা সব মহল কর্তৃক প্রশংসিত হয়েছে, যা প্রকারান্তরে তাদের সবার কাছে অধিক গ্রহণযোগ্য করতে সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে বরিশালের বিজয়ী মেয়র আহসান হাবিব কামালের সংকীর্ণতাকে অনেকে মেনে নিতে পারছেন না। সিটি কর্পোরেশনের একজন বিজিত প্রার্থী এবং তিনজন বিজয়ী প্রার্থী ফলাফল মেনে নিয়ে, অভিনন্দন জানিয়ে এবং পরাজিত প্রার্থীর বাড়িতে উপস্থিত হয়ে তাকে মিষ্টি খাইয়ে ও ফুলের তোড়া দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়ে রাজনীতিতে যে দুর্লভ নজির সৃষ্টি করেছেন, আমাদের জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে এটি অনুসরণ করা হলে দেশের স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি কোনোভাবে ব্যাহত হওয়ার অবস্থা সৃষ্টি হবে না। আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে ব্যর্থতা, দুর্নীতি ও অনিয়ম সংক্রান্ত যেসব অভিযোগ রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ, শেয়ারবাজার কারসাজি, পদ্মা সেতু দুর্নীতি, রেলের কালো বিড়াল দুর্নীতি, টেলিযোগাযোগ সংশ্লিষ্ট দুর্নীতি, প্রশ্নপত্র ফাঁস দুর্নীতি, সরকারের উচ্চপদে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দুর্নীতি প্রভৃতি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, একটি বিশেষায়িত মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে শুধু দলীয় বিবেচনায় দু’শর কাছাকাছি জ্যেষ্ঠ, যোগ্য. দক্ষ, মেধাবী ও সৎ কর্মকর্তাকে বঞ্চিত করে সার্বিক বিবেচনায় নিকৃষ্ট একজনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। অনুরূপ অপর এক কর্মকর্তা দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে অতিক্রম করে রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গের সাংবিধানিক পদ লাভে সক্ষম হয়েছেন।
এ ধরনের পাহাড়সম অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগের ত্যাগী ও বঞ্চিত নেতাকর্মী এবং সমর্থকদের অভিমত, ভোটের ময়দানে এসব অভিযোগ মোকাবেলার কোনো যুক্তিগ্রাহ্য বক্তব্য আছে কি? আর এ কথা নিশ্চিত বলা যায়, মোকাবেলা করার মতো যুক্তিগ্রাহ্য বক্তব্য না থাকলে বিপর্যয় অনিবার্য। সম্ভবত সে বিপর্যয় আঁচ করতে পেরেই আওয়ামী লীগ দলীয় সরকারের অধীনে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে অনড়। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, তারা যদি রাজনীতির মাঠে তাদের দলের সরব উপস্থিতি প্রত্যক্ষ করতে চান, সেক্ষেত্রে জনআকাক্সক্ষার প্রতি সম্মান দেখিয়ে সঠিক পথ বেছে নেয়াই উত্তম। আর সেই সঠিক পথটি কী, তা আজ আর কারও অজানা নয়।
ইকতেদার আহমেদ : সাবেক জজ ও কলামিস্ট

চাঁদরাতে চাঁদের সঙ্গে দিয়েছিলাম আড়ি by মোকাম্মেল হোসেন

এবাদত সাহেব ঈদ মোবারক বলে হাত বাড়িয়ে দিলেন। তারপর বুক। ঈদের ছুটি শেষে অফিসে এসেছি। রেওয়াজ অনুযায়ী সহকর্মীদের সঙ্গে ঈদ-পরবর্তী শুভেচ্ছা বিনিময় চলছে। হাতের সঙ্গে হাত আর বুকের সঙ্গে বুক মেলানো শেষ করে এবাদত সাহেব বললেন,
: ঈদ কেমন কাটাইলেন?
ঈদ আনন্দেই কেটেছে। তবে এ আনন্দের দাম অনেক চড়ামূল্যে শোধ করতে হয়েছে। মূল্য শোধের কথা মনে হতেই আমার একটা ঘটনার কথা মনে পড়ল। ঘটনাটা আমাদের গ্রামের মৌরণের মা চাচিকে নিয়ে। চাচি মারা গেছেন অনেক বছর আগে। তবে তার সৃষ্ট ঘটনা বিবর্তিত হয়ে বর্তমানে গল্পের রূপ ধারণ করেছে। প্রচলিত গল্পটা হচ্ছে এরকম-
দুপুরবেলা মৌরণের মা চাচি রান্নাঘরে বসে খাবারের আয়োজন করছিলেন। এমন সময় এক ফকির এসে হাঁক ছাড়ল,
: মা- ফকিররে ভিক্ষা দেইন মা।
কিছুক্ষণ অতিবাহিত হওয়ার পর কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে ফকির পুনরায় বলল,
: খয়রাত দেইন গো মা। দান-খয়রাতের অনেক বরকত। এক পয়সা দান করলে ৭০ পয়সা পাওয়া যায়।
ফকিরের কথায় চাচি চমৎকৃত হলেন। তিনি মনে মনে হিসাব করে দেখলেন- এক পয়সায় যদি ৭০ পয়সা পাওয়া যায় তাহলে এক টাকায় ৭০ টাকা আর ১০০ টাকায় ৭০০ টাকা পাওয়া যাওয়ার কথা! চাচি আর দেরি করলেন না। বালিশের নিচে রাখা ১০০ টাকার নোটখানা এনে ফকিরের হাতে তুলে দিলেন।
বিকেলে হাটে যাওয়ার আগে নসিমদ্দি চাচা টাকার তালাস করতেই চাচি বললেন,
: টেকা তো আমি এক ফকিররে দিয়া দিছি।
-ফকিররে দিয়া দিছস মানে?
ফকিরকে টাকা দেয়ার রহস্য খোলাসা করতেই চাচার মাথা গরম হয়ে গেল। আগের দিনের ১০০ টাকা এখনকার দিনের ১০০ টাকার মতো এত ফালতু ছিল না। চাচা দিগি¦দিক জ্ঞানশূন্য হয়ে চাচির গায়ে হাত তুললেন। তারপর কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে বাজারে চলে গেলেন।
মার খেয়ে চাচি নাওয়া-খাওয়া করলেন না। রাতে ঘরে শুতে গেলেন না। রান্নঘরের পেছনে গিয়ে বসে রইলেন। অনেক রাতে চাচির মান ভাঙানোর জন্য কুপিবাতি হাতে চাচা সেখানে গিয়ে তার হাত ধরে টান দিতেই চাচি একটা ছোট্ট কলাগাছ আঁকড়ে ধরলেন। টানাটানির এক পর্যায়ে চারা কলাগাছটা উপড়ে যেতেই কুপিবাতির আলোয় গর্ত হয়ে যাওয়া জায়গায় একটা বস্তু চকচক করে উঠল। চাচা বস্তুটি হাতে নিয়ে দেখলেন, সেটা একটা আধুলি। আধুলির পাশেই একটা বাঁশের চোঙ্গা পড়েছিল। চাচা কৌতূহলী হয়ে বাঁশের চোঙ্গা হাতে নিয়ে ঝাঁকি দিতেই ভেতরের ধাতব মুদ্রা ঝনঝন করে উঠল। পরে ঘরে এসে বাঁশের চোঙ্গা ভেঙে বাইরে পড়ে থাকা সেই আধুলিসহ ৭০০ টাকা পাওয়া গেল।
এর কয়েক দিন পরে সেই ফকির আবার এসে হাঁক ছাড়ল,
: মা- ফকিররে ভিক্ষা দেইন মা।
কিছুক্ষণ অতিবাহিত হওয়ার পর কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে ফকির পুনরায় বলল,
: খয়রাত দেইন গো মা। দান-খয়রাতের অনেক বরকত। এক পয়সা দান করলে ৭০ পয়সা পাওয়া যায়।
এ কথা শোনার পর চাচি আপনমনে বললেন,
: ফকির বাবা- এক পয়সা দান করলে ৭০ পয়সা পাওয়া যায় সত্য, তবে শরীরের ওপর চোট পড়ে...
পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে গিয়ে আমার কেবল শরীরের ওপরই চোট পড়েনি, জানের ওপরও চোট পড়ার উপক্রম হয়েছিল। পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকে পরিবারের অন্য সদস্যরা ২০ রোজার পরই ঢাকা থেকে ময়মনসিংহে হিজরত করেছিল। রুটি-রুজির কারণে ঢাকায় থাকতে বাধ্য হলেও ট্রেনের একখানা অগ্রিম টিকিট জোগাড় করতে সক্ষম হওয়ায় আমি বেশ নিশ্চিন্তেই ছিলাম। কিন্তু নির্ধারিত দিনে রেলস্টেশনে হাজির হওয়ার পর আমার মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। আমি ঘুমের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে রেলস্টেশনে চলে এসেছি, না সত্যি সত্যি এসেছি তা বোঝার জন্য হাতে চিমটি কাটলাম। চিমটির প্রতিক্রিয়া অনুভব করে বুঝতে পারলাম, বাস্তব জগতেই আছি। কিন্তু হিসাব তো মিলছে না!
হিসাব মেলানোর জন্য ট্রেনের অ্যাটেনডেন্টের দ্বারস্থ হলাম। সে দেখিয়ে দিল ট্রেনের গার্ডকে। গার্ড যেতে বলল স্টেশন মাস্টারের কাছে। স্টেশন মাস্টার সব শুনে বলল,
: ভাই একটু বসেন। স্যার বিদায় হওয়ার পর আপনের সমস্যাটা দেখতেছি...
স্যার মানে মন্ত্রী। মন্ত্রী বাহাদুর খলিফা হারুন-উর-রশিদ স্টাইলে দলবল নিয়ে প্লাটফর্মে ঘুরে ঘুরে জনগণের সুখ-দুঃখ দেখছেন। তাকে ঘিরে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর ক্যামেরা-লাইট-অ্যাকশনের মহড়া চলছে। আমার খুব ইচ্ছে হল, মন্ত্রীর সামনে দাঁড়িয়ে বলি,
: অই মিয়া, আপনে যে টিভি ক্যামেরার সামনে দাঁড়াইয়া বুলি আওড়াইতেছেন- হেন করেছি, তেন করেছি। এই পর্যন্ত কী করতে সক্ষম হইছেন- এই দেখেন তার নমুনা।
কল্পনায় বন্দুক ছাড়াই বাঘ শিকার সম্ভব। কিন্তু বাস্তব সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। আমি মনে মনে কয়েকবার এ দৃশ্যটির মহড়া দিলেও বাস্তবে তা রূপায়নের সাহস পেলাম না। এই দেশে আইন-শৃংখলা বাহিনীর একজন সাধারণ সদস্যকেও সমীহ না করলে তারা সেটাকে বেয়াদবি মনে করে হাতে-পায়ে গুলি করে মানুষকে সারাজীবনের জন্য পঙ্গু করে দেয়। অস্ত্র মামলাসহ নানা ধরনের মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়। মন্ত্রী যদি আমার ন্যায্য কথাকে ধৃষ্টতা ভেবে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠেন, তাহলে জীবন কয়লা হতে সময় লাগবে না। আমি স্টেশন মাস্টারের দিকে সকাতর দৃষ্টিতে তাকালাম। ভদ্রলোক মনে হয় আমার কথা ভুলে গেছেন। তার মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করতেই করতেই ট্রেন ছাড়ার সময় হয়ে গেল। দেখলাম- সমস্যা সমাধানের আশায় এই লোকের দিকে তাকিয়ে থাকলে আজ আর বাড়ি যাওয়া হবে না। আমি মনের ব্যথা মনে রেখে ট্রেনের সামনে এসে দাঁড়ালাম। আর ঠিক তখনই ট্রেন ছাড়ার বাঁশি বেজে ওঠল।
অধিকার আদায়ের ব্যর্থ চেষ্টা না করে প্রথমেই যদি ট্রেনে ওঠার প্রয়াস চালাতাম, তবে ভেতরে দাঁড়ানোর মতো একটা জায়গা পাওয়া যেত। এখন তারও উপায় নেই। কোনো রকমে দরজার হ্যান্ডেল ধরে ঝুলে পড়ে ভেতরে মাথা ঢুকিয়ে বুঝতে পারলাম- কোথায় মাথা ঢুকিয়েছি! কয়েক মিনিট অতিবাহিত হতে না হতেই মানুষের চাপের ঠেলায় আমার জিহ্বা ঝুলে পড়ল। আল্লাহপাকের অসীম অনুগ্রহ- তিনি আমাদের শরীরে নাট-বল্টুর সিস্টেম রাখেননি। শরীরে নাট-বল্টুর সিস্টেম থাকলে এই চাপে এতক্ষণে তার অধিকাংশই খুলে পড়ে যেত। চাপ ও তাপ সহ্যের সীমা অতিক্রম করায় বিমানবন্দর স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে পড়লাম। একবার ভাবলাম, সড়কপথে যাওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু ভরসা পেলাম না। সকালবেলা টেলিভিশনের খবরে দেখেছি- ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ১০ কিলোমিটারব্যাপী যানজট লেগে আছে। চারলেনে উন্নীত করার নামে এই মহাসড়কের অবস্থা এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যাকে বলে ফর্দিফাই অবস্থা। আমরা বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের মানুষ বর্তমানে এই ফর্দিফাই অবস্থার মধ্যে পড়ে গেছি।
সড়কপথ অবরুদ্ধ। রেলপথে কাপড়-চোপড় তো দূরস্থান- গায়ের চামড়া পর্যন্ত অক্ষত রাখা কঠিন। কী করব ভেবে পাচ্ছি না। হঠাৎ দেখি, স্টেশনের ফুটওভার ব্রিজ থেকে লোকজন ট্রেনের ছাদের উপর টুপটাপ করে লাফিয়ে পড়ছে। শেষ উপায় হিসেবে আমিও একই পথ অনুসরণ করে ট্রেনের ছাদে লাফিয়ে পড়তেই একজন আমার হাত ধরে পাশে বসালেন। আমি তার নাম দিলাম ছাদসখা। দেখলাম, শুধু ছাদসখা নয়, আশপাশে প্রচুর ছাদসখিও রয়েছে। ছাদের পরিবেশ অনেকটা ভালো। গায়ে বেশ হাওয়া-বাতাস লাগছে। তবে জীবনে এর আগে কখনো ট্রেনের ছাদে চড়িনি। তাই ভয় পাচ্ছিলাম- যদি গড়িয়ে পড়ে যাই! আমার কাঁপাকাঁপি দেখে ছাদসখা বললেন,
: আপনের ছাদে ওঠা ঠিক হয় নাই!
ছাদসখার কথায় আমি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লাম। পকেট থেকে ট্রেনের টিকিট বের করে বললাম,
: দুঃখের কথা কী বলব ভাই! এই দেখেন আমার টিকিট। টিকিটে সিটনম্বর লেখা থাকলেও বাস্তবে তা নাই।
-কী রকম!
: রেল কর্তৃপক্ষ আমাকে এই ট্রেনের ‘ক’ বগির ৫৫ নম্বর সিট বরাদ্দ দিয়েছে। অথচ এই ট্রেনে সংযুক্ত ‘ক’ বগিতে ৩০ নম্বরের পরে আর কোনো সিটই নাই। কমলাপুর স্টেশনে এইটা লইয়া কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেন-দরবার করার চেষ্টা করছি। কিন্তু লাভ হয় নাই। শেষে বাধ্য হইয়া ছাদে উঠছি।
: কমলাপুর স্টেশনে তো পত্র-পত্রিকা ও টেলিভিশনের সংবাদকর্মীরা ছিল। আপনে বিষয়টা তাদের নজরে আনতেন!
ছাদসখার কথায় আমি বিমর্ষ ভঙ্গিতে হাসলাম। বললাম,
: রেল ডিপার্টমেন্টের অবস্থা হইল কোনো ঝরনাধারার পাদদেশে পইড়া থাকা পাথরের মতো। ঝরনার পানিতে সেই পাথর সারাক্ষণ ভিজতেছে কিন্তু তার সর্দি লাগতেছে না। রেল বিভাগ লইয়া লেখালেখি-উপদেশ-অনুরোধ তো কম হইল না! কিন্তু যার শরীরের সব রক্ত দূষিত হইয়া পড়ছে, তারে ভিটামিন ট্যাবলেট খাওয়াইলে লাভ কী!
-তা ঠিক। তবে উন্নত দেশে এই ধরনের ঘটনা ঘটলে হৈচৈ পইড়া যাইত। এমন কী বিষয়টা মামলা-মোকদ্দমা পর্যন্ত গড়াইত।
: মামলা করার কথা আমারও একবার মনে হইছিল। কিন্তু ভাইব্যা দেখলাম- নেকড়ের স্বেচ্ছাচারিতা সম্পর্কে নালিশ করার জন্য কুমিরের শরণাপন্ন হওয়ার পর কোনো মেষশাবকের যে দশা হয়, আমারও সেই একই দশা হবে। খামাকা ঝামেলা বাড়ানোর আর কোনো ফায়দা নাই...
ট্রেনের ঝাঁকুনিতে ঈদের বাজার-সদাই রাখা ব্যাগটা একপাশে কাত হয়ে পড়ে যাচ্ছিল। সেটা আগলে রাখতে গিয়ে আরেক ধরনের কষ্ট মনের মধ্যে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। কয়েক দিন আগে টেলিভিশনে দেখলাম- টেলিভিশনের এক সংবাদকর্মী শপিং করতে যাওয়া ছোট্ট একটা মেয়েকে জিজ্ঞেস করছে,
: আপুমণি, এবারের ঈদে তোমার বাজেট কত?
ছোট্ট মেয়েটি কোনোরকম ইতস্তত না করে উচ্চারণ করল,
: ৫০ হাজার টাকা।
ঈদ উপলক্ষে আমার ব্যাগে যে বাজার-সদাই আছে, তা ওই ছোট্ট মেয়েটির বাজেটের ধারেকাছেও নেই। আমি তো তবু একটা অবস্থানে আছি। আমার নিচে যারা আছে- খুশির এই ঈদে তাদের প্রকৃত অবস্থা কী? আমার গ্রামের এক লোক কয়েক দিন আগে ফোন করে আমাকে বলল,
: ভাই, এইবার টাকা-পয়সার কোনো ব্যবস্থা করতে পারি নাই। আপনে আমারে ঈদ করার জন্য কিছু টাকা দেন।
-কত?
: এক হাজার।
-এক হাজারে চলব?
: চলব।
আমার জানা মতে ওই লোকের পরিবারের সদস্য সংখ্যা পাঁচ। তার মানে একা এই মেয়েটি আড়াইশ’ লোকের ঈদের আনন্দ হাতের তালুতে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ভাবা যায়! এই বাস্তবতা আমাকে আরও একটি রূঢ় সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দিল। শুনেছি, এবারের ঈদে লেনদেনের পরিমাণ অন্তত ৪০ হাজার কোটি টাকা। প্রশ্ন হল, এই ৪০ হাজার কোটি টাকায় আমার বা গ্রামের সেই লোকটির মতো দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অংশগ্রহণ কত শতাংশ?
ট্রেনের ছাদে বসেই ইফতার করলাম। ইফতার শেষে ঈদের চাঁদ দেখার জন্য মাথা উঁচু করেছি- এমন সময় মাথার উপর দিয়ে শাঁ করে একটা কিছু চলে গেল। তাকিয়ে দেখি আমার মাথার টুপিটা হাওয়ায় ভাসছে। এ সময় কেউ একজন চিৎকার করে উঠল,
: সবাই মাথা নিচু করেন। পোলাপানে পাথর ছুঁড়তেছে।
কিছুক্ষণ পর ছাদসখা আমাকে বললেন,
: আপনের ভাগ্য ভালো। ঢিলটা আধা ইঞ্চি নিচে দিয়া গেলে বাড়িতে আইজ আপনের লাশ যাইত!
রেললাইনের পাশে উল্লাসরত শিশু-কিশোরদের চেহারা মনের পর্দায় ভেসে উঠতেই আমার বুকটা হু হু করে উঠল। এই আমাদের বাংলাদেশ। এই আমাদের ভবিষ্যৎ। সরকার দেশে শিক্ষার হার শতভাগে উন্নীত করার সাফল্য নিয়ে গৌরব করে। গৌরব করা শিক্ষার এই হাল?
ভয়ে-আতংকে সেই যে মাথা নিচু করেছিলাম, আর উঁচু করিনি। হঠাৎ শুনি ছাদসখা কোমলস্বরে বলছেন,
: ভাই, আকাশে ঈদের চাঁদ দেখা যাইতেছে। দেখেন, কী সুন্দর চাঁদ!
শাওয়ালের চাঁদ খুশির বার্তা নিয়ে বাংলার আকাশে উদয় হয়েছে। চাঁদ কি জানে- তার আগমন এদেশের কত সহস্র মানুষের জীবনে দুর্ভোগ ও বেদনার দীর্ঘশ্বাস ডেকে এনেছে? আমি মাথা তুললাম না। শুধু মনে মনে চাঁদের উদ্দেশে বললাম,
: তুমি না এলে আমাকে এমন বিপন্ন সময় অতিক্রম করতে হতো না। তাই তোমার সঙ্গে আড়ি-আড়ি-আড়ি।
মোকাম্মেল হোসেন : সাংবাদিক

মিসরে ১৪ আগস্টের গণহত্যা সামরিক বাহিনী ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের যৌথ অপকর্ম by বদরুদ্দীন উমর

সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার যে নীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে বিভিন্ন সময়ে সুযোগ-সুবিধামতো কার্যকর করে এসেছে তারই সর্বশেষ দৃষ্টান্ত এখন আমরা দেখছি মিসরে সম্প্রতি সংঘটিত সামরিক অভ্যুত্থান ও তার পরবর্তী পর্যায়ের পরিস্থিতির মধ্যে। প্রেসিডেন্ট নাসেরের মৃত্যুর পর মিসর থেকে বাস্তবত বহিষ্কৃত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে সাদাত ও পরে মোবারকের মাধ্যমে সেখানে নিজেদের আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। তারা উভয়েই সামরিক বাহিনীর মাধ্যমেই দেশ শাসন করেছিলেন। নাসের নিজেও ছিলেন সামরিক বাহিনীর লোক। কিন্তু তার সঙ্গে তাদের পার্থক্য ছিল এই যে, নাসের যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে মিসরের সামরিক বাহিনীর ওপর কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে দেননি, সেখানে সাদাত ও মোবারক সামরিক বাহিনীতে মার্কিন অনুপ্রবেশকে স্বাগত জানিয়ে তাদের ওপরই নির্ভরশীল হয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট সাদাতের আমলে এই নীতির সূত্রপাত ও বিকাশ ঘটেছিল এবং সে কারণে মোবারক প্রথম থেকেই নির্ভরশীল হয়েছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর। অভ্যন্তরীণভাবে সামরিক বাহিনী এবং তার বাইরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর একান্তভাবে নির্ভরশীল থেকেই মোবারক তার ৩০ বছরের শাসন পরিচালনা করেছিলেন। যেহেতু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক ও অন্যান্য প্রক্রিয়ায় সামরিক বাহিনীর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল সে কারণে বলা চলে, একটি সামরিক একনায়কতন্ত্রের অধীনে মিসর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি মক্কেল দেশ হিসেবেই পরিচালিত হতো।
মোবারকের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ২০১১ সালের জানুয়ারিতে মিসরে যে গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল, সেটা যাতে সরাসরি সামরিক বাহিনী ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে না যায়, এজন্য মার্কিন সরকার তাদের গোলাম প্রেসিডেন্ট মোবারককে রক্ষায় মিসরে সামরিক বাহিনী ব্যবহারের বিরুদ্ধে ছিল। এজেন্ট হিসেবে অকার্যকর হয়ে যাওয়ায় মোবারককে রক্ষার কোনো প্রয়োজনও আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের থাকেনি। এ কারণে সে সময় সামরিক বাহিনী জনগণের বিরুদ্ধে না গিয়ে বস্তুত নিরপেক্ষ ছিল। এর ফলে মোবারক-পরবর্তী পর্যায়ে সামরিক বাহিনীর পক্ষে দেশ পরিচালনার কাজ হাতে নেয়া সম্ভব হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে মুসলিম ব্রাদারহুডসহ জনগণের কোনো অংশই দাঁড়ায়নি। ২০১১ সালের এই গণঅভ্যুত্থানের সময় মুসলিম ব্রাদারহুডই ছিল একমাত্র সংগঠিত দল। প্রেসিডেন্ট নাসের মুসলিম ব্রাদারহুড ও কমিউনিস্ট পার্টি উভয়কেই বেআইনি ঘোষণা করে তাদের ওপর দমন-পীড়ন করেছিলেন। উল্লেখ্য, নাসের যখন মিসরে কমিউনিস্ট পার্টি ধ্বংস করছিলেন, ঠিক তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা ক্রুশ্চেভের সঙ্গে তার সম্পর্ক খুব ভালো ও উষ্ণ ছিল। প্রকৃতপক্ষে মিসরের মস্কোপন্থী পার্টিটিকে ধ্বংস করে নাসেরের সঙ্গে সখ্যের সম্পর্ক তৈরি করতে ক্রুশ্চেভের কোনো অসুবিধা হয়নি। সোভিয়েত ইউনিয়নের এই নীতির ফলে নাসেরের সময়ে মিসরীয় কমিউনিস্ট পার্টি নিজেকে রক্ষা করতে ও পরবর্তী সময়ে আবার সংগঠিত করতে সক্ষম হয়নি। কিন্তু মুসলিম ব্রাদারহুড নাসেরের সময় প্রায় বিলুপ্ত অবস্থায় যাওয়া সত্ত্বেও তারা নিজেদের একটা সাংগঠনিক কাঠামো বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল এবং পরে প্রেসিডেন্ট সাদাত ও মোবারকের সময় অনেকখানি শক্তি সঞ্চয় করেছিল। একটি সামরিক কুচকাওয়াজ পরিদর্শনকালে মুসলিম ব্রাদারহুডই সাদাতকে হত্যা করেছিল। যাই হোক, ২০১১ সালে সংগঠিত দল হিসেবে মুসলিম ব্রাদারহুড একটা সুবিধাজনক অবস্থায় ছিল। এ কারণে পরে মিসরের ইতিহাসে প্রথম প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্টারি নির্বাচনের সময় মুসলিম ব্রাদারহুডের অঘোষিত প্রার্থী হিসেবে তাদের দলের অন্যতম নেতা মুহম্মদ মুরসির পক্ষে নির্বাচনে জয়লাভ সম্ভব হয়েছিল।
মুসলিম ব্রাদারহুড একটি প্রতিক্রিয়াশীল এবং ইসলামী মৌলবাদী রাজনৈতিক দল। মোবারক ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতার ক্ষেত্রে কমিউনিস্টসহ অন্য কোনো দলের কার্যকর প্রভাবের অনুপস্থিতিতে তারাই বিরোধী শক্তি হিসেবে সংগঠিত হয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও অসংগঠিত হলেও মিসরে ধর্মবিযুক্ত (secular) শক্তিগুলোর প্রভাব জনগণের মধ্যে যথেষ্ট ছিল। কাজেই নির্বাচনে মুসলিম ব্রাদারহুডের জয় সত্ত্বেও মুরসির বিরুদ্ধে ভোটের সংখ্যা বিশাল ছিল। এদিক দিয়ে উভয়ের অবস্থান ছিল কাছাকাছি। ক্ষমতায় বসার পর মুরসি মিসরের মূল সমস্যাগুলো সমাধানের উদ্দেশ্যে বিরোধীদের সঙ্গে কোনো আলাপ-আলোচনা ও সমঝোতার নীতি অনুসরণ না করায় এদিক দিয়ে তার কোনো সাফল্য বা অগ্রগতি ছিল না। উপরন্তু তিনি সমগ্র প্রশাসন এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে নিজের দল মুসলিম ব্রাদারহুডের লোকদের ক্ষমতায় বসিয়ে নিরঙ্কুশভাবে একদলীয় শাসন কায়েমের দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন। স্বাভাবিকভাবে তারা মুরসির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সারাদেশে মুসলিম ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সংগঠিত করতে নিযুক্ত হন। এই বিক্ষোভ খুব ব্যাপক ও শক্তিশালী হওয়ার মুহূর্তে মিসরে সামরিক বাহিনী এক অঘোষিত অভ্যুত্থান ঘটিয়ে মুরসির সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে নিজেদের তত্ত্বাবধানে একটি তথাকথিত বেসামরিক সরকার গঠন করেছে। এ সরকারের প্রত্যেকটি লোক মার্কিনপন্থী ও তাদের সহযোগী। সহসভাপতি এল বারাদি ও প্রধানমন্ত্রী হাজেম এল বেবলাউয়ী এই লোকদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
যেহেতু মুসলিম ব্রাদারহুড একটি সংগঠিত দল এবং জনগণের মধ্যে তার সমর্থনও ব্যাপক, সে কারণে তারা নিজেদের সরকার উৎখাতের বিরুদ্ধে মিসরজুড়ে আন্দোলন শুরু করে তাদের সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জানাচ্ছে এবং সরকারের সঙ্গে অর্থাৎ মূলত সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হচ্ছে, যে সংঘর্ষে সামরিক বাহিনীর সমর্থনে মুসলিম বাদ্রারহুডবিরোধী নানা দল, গ্র“প ও লোকজন সমবেত হয়েছে। সামরিক বাহিনীকে এভাবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করার পেছনে যে মার্কিন চক্রান্ত আছে এবং তা ভালোভাবেই কার্যকর করা হয়েছে, এটা যুক্তরাষ্ট্রের এখনকার অবস্থান থেকে ভালোভাবেই বোঝা যাচ্ছে। নিজেরা এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে গণহত্যার জন্য কুম্ভীরাশ্র“ বর্ষণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী নীতি ও কৌশলের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটা বিশ্বের বহু দেশে বারবার দেখা গেছে। মিসরের সামরিক বাহিনীর অভ্যুত্থানের পেছনে যে তাদের চক্রান্ত আছে, এর প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে সেখানকার সামরিক বাহিনীকে বাৎসরিক ১৩০ কোটি ডলারের সামরিক সাহায্য বন্ধ না করার পক্ষে তাদের ঘোষণা এবং এ মুহূর্তেও মিসরের সামরিক বাহিনীকে এফ ১৬ যুদ্ধবিমান সরবরাহের ব্যবস্থা থেকে। এটা এমন এক ব্যাপার, যার বিরুদ্ধে ফ্রান্সসহ কতগুলো ইউরোপীয় দেশ প্রতিবাদ জানিয়েছে, খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের প্রধান প্রধান সংবাদপত্রও এই মার্কিন অবস্থানের বিরোধিতা করে মিসরের সামরিক বাহিনীকে সাহায্য বন্ধের দাবি জানিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই যে মিসরের এই সামরিক অভ্যুত্থানের কলকাঠি নেড়েছে, এর অন্য একটি প্রমাণ হল- মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তাঁবেদার রাষ্ট্রগুলো কর্তৃক এর পক্ষ সমর্থন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মিত্র রাষ্ট্র ও সাম্রাজ্যবাদী প্রচার মাধ্যমেও যখন এই অভ্যুত্থানের সমালোচনা ও বিরোধিতা করা হচ্ছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বলা হচ্ছে সামরিক বাহিনীকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য না করার, সেখানে এই আরব দেশগুলো কর্তৃক একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ আরব রাষ্ট্রে মার্কিন সমর্থিত সামরিক অভ্যুত্থানকে সমর্থন করা থেকে বোঝার অসুবিধা নেই যে, উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এখনও কত শক্তিশালীভাবে তার থাবা বিস্তার করে আছে।
মুসলিম ব্রাদারহুডের সমর্থকদের তাদের প্রতিরোধ বন্ধ করার জন্য সামরিক বাহিনীর নির্দেশ সত্ত্বেও তারা প্রতিরোধ অব্যাহত রেখে কায়রো ও অন্যান্য শহরে অবস্থান বজায় রাখায় ১৪ আগস্ট সামরিক বাহিনী সারাদেশে তাদের ওপর এক ব্যাপক ও ভয়ংকর সশস্ত্র হামলা করে অসংখ্য লোক হত্যা করেছে। সামরিক বাহিনীর নিজের স্বীকৃতি অনুযায়ী নিহত ও আহতের সংখ্যা যথাক্রমে ৬৩৮ ও ৩৯৯৪। কিন্তু মুসলিম ব্রাদারহুডের দাবি, তিন হাজারের বেশি লোক নিহত হয়েছে এবং আহত হয়েছে প্রায় অর্ধলক্ষ। এভাবে যে হত্যাকাণ্ড করা হয়েছে তাকে গণহত্যা ছাড়া অন্য কোনোভাবে আখ্যায়িত করা যায় না। মুসলিম ব্রাদারহুড একটি প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মীয় মৌলবাদী দল হলেও তাদের বিরুদ্ধে এই আক্রমণ ও গণহত্যা গণতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন কারও সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। মিসরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতিয়ার সেখানকার সামরিক বাহিনী এবং তাদের দ্বারা ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত বর্তমান সরকার যেভাবে মুসলিম ব্রাদারহুডের বিরোধিতা মোকাবেলা করার জন্য দাঁড়িয়েছে, তাতে পরিস্থিতি এখন ঘোরতর আকার ধারণ করেছে। এর পরিণতি গৃহযুদ্ধ ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না। ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া ইত্যাদি দেশে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ যেভাবে হস্তক্ষেপ করে দেশগুলোকে নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দিয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করেছে এবং এখনও করছে, সেভাবেই তারা এখন মিসরে সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে এমন এক চরম নৈরাজ্য পরিস্থিতি তৈরির চক্রান্ত এগিয়ে নিচ্ছে, যেখানে সামরিক বাহিনী ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কোনো গণতান্ত্রিক সংগ্রাম পরিচালনা পরিণত হবে এক চরম দুরূহ ব্যাপারে। ‘আরব বসন্ত’ নামে তাদেরই দ্বারা আখ্যায়িত গণজাগরণ স্তব্ধ ও নির্মূল করার ক্ষেত্রে এটাই হল মিসরে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বর্তমান কৌশল।
বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

ঐশীর প্রেমের বলি বাবা-মা by নূরুজ্জামান

মেয়ে ঐশী’র প্রেমের বলি হয়েছেন পুলিশ দম্পতি মাহফুজুর রহমান ও স্বপ্না রহমান। নিজের পিতা-মাতাকে চেতনানাশক দ্রব্য খাইয়ে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে সে। ঐশীর জবানিতেই বেরিয়ে এসেছে এ তথ্য।

ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল ঐশীর

পুলিশ দম্পতি হত্যাকাণ্ডে ঐশীসহ তিনজনেক গ্রেফতার দেখিয়ে ৫ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। রোববার তাদেরকে আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড চাওয়া হলে আদালত ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে।

ভর্তির সুযোগ পাবে না ২০,০০০ শিক্ষার্থী by সোলায়মান তুষার

শনিবার এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়। এবার গতবারের চেয়ে ফল একটু খারাপ হলেও সুখবর নেই বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেলে ভর্তিচ্ছুক শিক্ষার্থীদের জন্য।

অধ্যাপক ইউনূস ও মেজর মান্নানের মেয়ের আংটি বদল by বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম

ঢাকা থেকে ঈদে বাড়ি যেতে চেয়েছিলাম ৫ই আগস্ট। শবেকদরের রাত কাটাতে চেয়েছিলাম টাঙ্গাইলে। শবে কদর একজন মুসলমানের কাছে হাজার মাসের ইবাদতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।

‘নিজেরা চুলোচুলি করলেও আমার বেলায় সবাই হাতে হাত মেলায়’

বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন তার দেশে ফেরা প্রসঙ্গে বলেছেন, সব রাজনৈতিক দলই এক্ষেত্রে বাধা। দলগুলো নিজেরা চুলোচুলি করলেও আমার ঢোকার দরজা তালা দিয়ে রাখে। সবাই হাতে হাত মেলায়।

ফুলন দেবী যেভাবে দস্যুরানী by কাজী সুমন

বনের রানী ফুলন দেবী। ঘন জঙ্গল আর রাতের অন্ধকার তার জীবনের বড় একটা অংশ কেড়ে নিয়েছিল। বঞ্চনা আর কষ্ট সইতে না পেরে তিনি অন্ধকারের কাছে আত্মসমর্পণ করেন।

‘নির্বাচন হবে না’

আগামী সংসদ নির্বাচন নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। তিনি বলেছেন, আমি সবসময় বলে আসছি নির্বাচন হবে না।

শহীদী মৃত্যু কামনা করেন সাঈদী

শহীদী মৃত্যু কামনা করেছেন কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক জামায়াতের নায়েবে আমীর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। তিনি বলেন, আমি সর্বদাই বলে আসছি শাহাদাতের মৃত্যু এক মহা সৌভাগ্যের ব্যাপার।

গোলাম আযমের বিচার ত্রুটিপূর্ণ পক্ষপাতদুষ্ট

জামায়াতে ইসলামীর সাবেক প্রধান গোলাম আযমের বিচার প্রক্রিয়া মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ। প্রসিকিউশনের প্রতি বিচার বিভাগ অত্যন্ত পক্ষপাতিত্ব করেছে। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণের ক্ষেত্রে ভয়ঙ্করভাবে অধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে।

‘এক চুলও নড়বো না’ - প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

বিরোধী দলের আগামী অধিবেশনে সংবিধান সংশোধনের দাবি নাকচ করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জনগণের ভোট নিয়ে সংবিধান সংশোধন করেছি। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে। একচুলও নড়া হবে না।

ঐশীর বয়ফ্রেন্ড আর ইয়াবা জীবন

ঐশির নিষ্ঠুরতা নিয়ে তোলপাড় সর্বত্র। পশ্চিমের দুনিয়ায় এ হয়তো অভিনব কোন ঘটনা নয়। কিন্তু বাংলাদেশে কোন সন্তানের পরিকল্পনায় মাতা-পিতার হত্যা এমনই নির্মম যে তা হতচকিত করেছে সবাইকে।