Saturday, February 15, 2014

ভারতের নির্বাচন- কংগ্রেস, বিজেপি না তৃতীয় জোট? by এম সাখাওয়াত হোসেন

প্রায় দুই সপ্তাহ ভারতের দক্ষিণের তিনটি রাজ্য অন্ধ্র প্রদেশ, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু এবং আমাদের পশ্চিম সীমান্তের রাজ্য পশ্চিম বাংলায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। নিছক বেড়ানো হলেও চেষ্টা করেছিলাম ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনের হালহকিকত বুঝতে।
কারণ, ভারতের রাজনীতি এখন সরগরম, বিশেষ করে আসন্ন ১৬তম লোকসভার নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে। যদিও ভারতের রাজনৈতিক উত্তাপ এবং আসন্ন নির্বাচনের হাওয়া বড় বড় শহর ছাড়া তেমন উপলব্ধি করা যায় না, তথাপি ছোট শহরগুলোর দেয়াল আর লাইটপোস্টগুলোতে সাঁটানো এবং ঝুলন্ত পোস্টারগুলো মনে করিয়ে দেয় যে নির্বাচন আসন্ন। দক্ষিণের রাজ্যগুলোর সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনীতি নিয়ে মাতামাতি একেবারেই নেই। এমনকি ভোটারদের মধ্যেও আগ্রহ কম। বিগত কয়েক দশকে ভারতের সাধারণ নির্বাচনে গড় ভোটের হার ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ। প্রধান কারণ, ভারতের সাধারণ ভোটারদের কাছে দুই বৃহৎ জোট আকর্ষণ হারিয়ে ফেলেছে।

অনেকেই মনে করেন, এ কারণেই দিল্লির মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে ‘আম আদমি পার্টির মতো স্বল্পপরিচিত দল রাজ্য সরকার গঠন করতে পেরেছে। ‘আম আদমি পার্টিও (এএপি) তাদের সাফল্যের বিস্তৃতি ঘটাতে তৎপর। অপরদিকে হঠাৎ গর্জে ওঠা এই পার্টির বিস্তার ঠেকাতে উভয় জোট নানা ধরনের কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে বলে এএপি অভিযোগ তুলছে। এপিপির অভিযোগে বলা হচ্ছে যে বিজেপি দিল্লি সরকারকে উৎখাত করতে প্রায় ২০ কোটি রুপি খরচ করছে। শুধু এএপিই নয়, তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতার নেতৃত্বে সম্ভাব্য তৃতীয় জোট গঠনের আগেই বিজেপি বিরোধিতায় নেমেছে। তৃতীয় জোট গঠনে দক্ষিণের আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় দল এআইএডিএমকে ঘিরে সম্ভাবনা গড়ে উঠছে কংগ্রেস এবং বিজেপি বিরোধী জোটের। এ জোটে হয়তোবা শামিল হতে পারে উত্তর প্রদেশের শাসক দল বহুজন সমাজ পার্টি। অপরদিকে পশ্চিম বাংলার তৃণমূল কংগ্রেসের দিকেও নজর রয়েছে সম্ভাব্য এই জোটের। তবে এই জোট নির্বাচন-পূর্ব, না পরবর্তী সময় গঠিত হবে, তা নিয়ে দক্ষিণের দলগুলোর মধ্যে প্রাথমিক আলোচনা চলছে বেশ কিছুদিন ধরে। যদিও বহুজন সমাজ পার্টি নেতা মুলায়ম সিং এবং তৃণমূল কংগ্রেস নেতা বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কোনো পক্ষেই প্রকাশ্যে কোনো বক্তব্য এখন পর্যন্ত দেননি। এই জোটের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হতে পারেন জয়ললিতা, সে ক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা মুলায়ম সিং যাদব কতখানি উৎসাহ দেখাবেন, তা দেখার বিষয়। এই জোট যদি নির্বাচন-পূর্ব সময় গড়ে ওঠে, তা দুই বৃহৎ জোটের বৃহৎ শরিক বিজেপি ও কংগ্রেসের জন্য কত বড় চ্যালেঞ্জ হবে, তা হয়তো মাস খানেকের মাথায় দৃশ্যমান হবে।

দুই
আসন্ন নির্বাচন আগামী মে মাসে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে বৃহৎ দলগুলো এপ্রিল মাসে নির্বাচন করার জন্য নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ করেছে। এ বিষয়ে ভারতের নির্বাচন কমিশন মতামত দেয়নি। অঙ্কের হিসাবে আগামী লোকসভা নির্বাচনের কাউন্টডাউন শুরু হয়েছে। ক্রমেই আগাম নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা বেশ কিছুদিন থেকে মাঠে গড়িয়েছে বিভিন্ন রাজ্য ও শহরগুলোতে দুই বড় দল তথা জোটের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থীদের বিশাল বিশাল জনসভার মাধ্যমে। এতে অগ্রগামী রয়েছেন বিজেপির নেতা গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী, যদিও রাহুল গান্ধী কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী কি না, তা নিয়ে খোদ কংগ্রেসের মধ্যেই সন্দেহ রয়েছে। অপরদিকে বিজেপির তথা জোটের প্রধানমন্ত্রী পদে নরেন্দ্র মোদির সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত। যতটুকু দৃশ্যমান তাতে মনে হয়, এযাবৎ বিজেপির পাল্লাই বেশ ভারী।
যদিও ১৯৯৪ সালে ভারতের গুজরাটের দাঙ্গায় নরেন্দ্র মোদি সরকারের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত। বিষয়টি নিয়ে কংগ্রেসের অভিযোগের ও প্রচারণার জবাবে পুনর্জীবিত হয় ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার পর ১৯৮৪ সালে শিখ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সঙ্গে কংগ্রেসের সম্পৃক্ততার অভিযোগ। ১৯৮৪ সালে সবচেয়ে বড় দাঙ্গা হয় দিল্লির রাজনগরে। আগামী নির্বাচনে ওই দাঙ্গার বিষয়টি বেশ বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভারতের গুরুত্বপূর্ণ মিডিয়াতে এই দাঙ্গা নিয়ে নতুন করে শুরু হয়েছে ব্যাপক বিতর্ক। এ বিতর্ক কংগ্রেসকে ক্রমেই কোণঠাসা করছে। এই বিতর্কে যোগ দিয়েছে দিল্লির এএপি সরকার। ইতিমধ্যে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী এবং কেবিনেট ১৯৮৪ সালের দাঙ্গার ওপরে স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম (এসআইটি) গঠনের সিদ্ধান্ত দিল্লির লে. গভর্নরের কাছে সুপারিশ আকারে পাঠিয়েছে। লে. গভর্নরের অনুমোদনের পর প্রায় এক বছর লাগবে তদন্ত সমাপ্তির। বিষয়টি এএপি এবং কংগ্রেসের মধ্যে দূরত্বের প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিজেপি শুধু পালে হাওয়া দেওয়ার পর্যায়ে রয়েছে। প্রসঙ্গত দাঙ্গা ঘটার ৩০ বছর পার হলেও বিচার হয়নি।
শুধু ১৯৮৪ সালের দাঙ্গাই নয়, কংগ্রেসকে নিয়ে নতুন করে বিতর্ক হচ্ছে ১৯৮৪ সালের ৩ থেকে ৮ জুন অমৃতসরের স্বর্ণমন্দির অভিযান ‘অপারেশন ব্লুস্টার’-এ অত্যধিক শক্তি ব্যবহারে ব্যাপক প্রাণহানি এবং ওই সামরিক অভিযানে ব্রিটেনের সম্পৃক্ততা নিয়েও স্মরণযোগ্য যে, ওই অভিযানের জের হিসেবেই ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় শিখ দেহরক্ষীদের হাতে নিহত হন। ব্রিটেন অবশ্য সক্রিয় সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করে শুধু পরামর্শের কথা বলে জানিয়েছে যে ভারত ব্রিটেনের পরামর্শ গ্রহণ না করে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেছিল। বিষয়টি নিয়ে আলাদাভাবে আলোচনার আশা রাখি। এসব বিতর্ক কংগ্রেসকে যথেষ্ট বেকায়দায় ফেলেছে। তার ওপরে রয়েছে বিগত ১০ বছরের দুর্নীতি আর অব্যবস্থার। বিজেপি এসব বিষয়কেই তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করছে বলে অনেকেই মনে করেন।

তিন
বিজেপি এবার বেশ চাঙা অবস্থাতেই রয়েছে বলে মনে হয়। এরই প্রেক্ষাপটে নরেন্দ্র মোদি ক্রমেই আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন। নরেন্দ্র মোদি এখন বিজেপির সম্মুখ সিপাহসালার, যে কারণে মোদি সারা ভারত চষে বেড়াচ্ছেন বিভিন্ন রাজ্যের সমর্থন আদায়ের প্রয়াসে। নজর রয়েছে উত্তর প্রদেশ এবং পশ্চিম বাংলার দিকে। বিজেপির টার্গেট ২৭২ আসন অথবা ততধিক যে অঙ্কটি এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় না, আগামী নির্বাচনে ভারতের কেন্দ্রে একক দল হিসেবে কোনো দল সরকার গঠনের মতো সমর্থন পাবে। সে কারণেই কংগ্রেস ও বিজেপিকে আঞ্চলিক দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে হবে। এ কারণেই বিজেপির টার্গেট অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে লোকসভার ৪৪ আসনের পশ্চিম বাংলার দিকে।
৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি নির্বাচনের আগাম প্রচারণা হিসেবে কলকাতায় এক বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন। বিভিন্ন মিডিয়া এবং তথ্য অনুযায়ী কলকাতার ব্রিগেড ময়দানে বিজেপির জনসভায় প্রায় ১ দশমিক ৫ লাখ (এক লাখ পঞ্চাশ হাজার) লোকের সমাগম ঘটে। ওই জনসভায় মোদি বামপন্থীদের ৩৪ বছরের শাসনের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, উন্নয়নধারাকে আরও জোরদার করতে হলে কেন্দ্রে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো বাংলা-দরদি লোকের প্রয়োজন। ওই সভায় মোদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমালোচনা করেননি, যদিও এর আগে একই স্থানে অন্য এক জনসভায় মমতা মোদিকে ইশারা করে বলেছিলেন যে তিনি দিল্লিতে ‘দাঙ্গার মুখ’ দেখতে চাইবেন না। তথাপি মমতা মোদির ভাষণের প্রতিবাদ করেননি। মোদি তাঁর ভাষণে কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে পশ্চিম বাংলাকে অবহেলা করার অভিযোগ বারবার উত্থাপন করেন। এমনও অভিযোগ করেন যে বাংলার সবচেয়ে প্রবীণ রাজনীতিবিদকেও কংগ্রেস উপেক্ষা করেছে। তিনি বলেন যে ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর কংগ্রেসের বয়োজ্যেষ্ঠ নেতা হিসেবে বর্তমান রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্যতা থাকলেও ‘দাদা’কে ওই পদ না দিয়ে বাংলার প্রতি একধরনের অন্যায় করেছে। মোদি কেন্দ্রে সরকার গঠন করতে পারলে মমতাকে সব ধরনের সহায়তা প্রদান করে বাংলার চেহারা পাল্টানোর অঙ্গীকার ওই সভায় একাধিকবার করেছেন। এত তুষ্টির পরও তৃণমূল অথবা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
অপরদিকে বিগত বাম সরকারের কঠোর সমালোচনা করাতে সিপিএম সহজে মোদিকে গ্রহণ করছে না। সিপিএমের মতে, মোদি-মমতার কোনো ধরনের সমঝোতা হলে তাতে মমতার ক্ষতিই হবে। কারণ পশ্চিম বাংলায় প্রায় ২৪ শতাংশ ভোট রয়েছে সংখ্যালঘু মুসলিমদের। মোদির ‘দাঙ্গা মুখ’ ওই ভোটারদের মমতাবিমুখ করতে পারে। সে ক্ষেত্রে সিপিএম মমতার বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার ধুয়া উঠতে পারে। অবশ্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে দিল্লির সমীকরণে এক বড় ফ্যাক্টর, তা সব জোট বা ভারতের বড় দলগুলোর ধর্তব্যের মধ্যে রয়েছে। বাংলায় মোদির গ্রহণযোগ্যতা এবং মমতা-মোদি নির্বাচন-পূর্ব বা পরবর্তী সমীকরণ কেন্দ্রে বিজেপি সরকার গঠনের জন্য এক বড় ফ্যাক্টর হয়ে থাকবে। আর যদি তৃতীয় জোট গঠিত হয় সেখানেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হয়ে উঠবেন অপরিহার্য। যেভাবেই হোক, পশ্চিম বাংলার তৃণমূল কংগ্রেস এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আগামী সরকার গঠনে বড় ফ্যাক্টর। তাই, মমতা রয়েছেন ফুরফুরে মেজাজে।

চার
ভারতের আসন্ন লোকসভার নির্বাচন যে কংগ্রেস ও বিজেপির কাছে কত গুরুত্বপূর্ণ, তার আলামত বিভিন্নভাবে প্রতীয়মান। তবে ওই নির্বাচনে কংগ্রেসের তথা শাসক জোটের অবস্থা যে তেমন ভালো নয়, তা বেশ দৃশ্যমান। এককভাবে না হলেও বিজেপি জোটবদ্ধভাবে ভারতের পরবর্তী শাসক জোট হতে যাচ্ছে, তেমনটাই প্রতীয়মান। নরেন্দ্র মোদিই যে ভারতের ভাবী প্রধানমন্ত্রী, তা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেন না অনেকেই। মোদি তাই তাঁর অতীত ছবি পরিবর্তনে সংখ্যালঘুদের ভোট অর্জনের সব চেষ্টা করেছেন। ব্রিগেড ময়দানের ভাষণে মোদি তথাকথিত অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের ভারত থেকে বিতাড়িত করবেন বলে যে মন্তব্য করেছেন, তা অবশ্যই আমাদের জন্য চিন্তার বিষয়।
মোদির এ দাবি বাস্তবায়ন করতে হলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থানে যে পরিবর্তন হবে, তাতে সন্দেহ নেই।
শুধু এ কারণেই নয়, বহুবিধ কারণে বাংলাদেশের কাছে ভারতের আগামী নির্বাচন যথেষ্ট তাৎপর্য বহন করে।

এম সাখাওয়াত হোসেন (অব.): অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক।
hhintlbd@yahoo.com

কালের পুরাণ- বিএনপিকে মাঠে নামাতে মন্ত্রীদের উসকানি! by সোহরাব হাসান

কূটনীতিকেরা বিএনপিকে দুই বছরের মধ্যে আন্দোলন না করার পরামর্শ দিয়েছেন বলে গতকাল একটি পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে। এ খবরের সত্যাসত্য সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত নই।

সময়চিত্র- বইমেলা, বাংলা ভাষা এবং কিছু প্রশ্ন by আসিফ নজরুল

বইমেলার সঙ্গে আমার প্রজন্মের মানুষের পরিচয় আশির দশক থেকে। ১৯৮৮ সাল থেকে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় আমি চাকরি করার সুবাদে এই পরিচয় আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে।
বিচিত্রার শাহরিয়ার কবির, মঈনুল আহসান সাবের, মাহমুদ শফিক, শামীম আজাদ তখনই ছিলেন খ্যাতিমান লেখক। বিচিত্রায় যাঁরা লিখতেন, তাঁদের আরও অনেকের বই বের হতো তখন। কাজেই বইমেলা আসার বহু আগে থেকে এর তোড়জোড় টের পাওয়া যেত সেখানে। প্রকাশক, প্রচ্ছদশিল্পী, প্রুফ রিডার আসতেন, গল্প করার জন্য আসতেন বড় লেখকেরা, প্রচারের জন্য নবীন লেখকেরা। বিচিত্রা তখন প্রভাবশালী সাপ্তাহিকী ছিল বলে বইমেলার দিনগুলোতে সাহিত্য পাতার সম্পাদক মঈনুল আহসান সাবেরের টেবিল ঘিরে থাকত নানা ধরনের সাহিত্যানুরাগী মানুষ।
বিচিত্রা সম্পাদক শাহাদত চৌধুরী বাংলাদেশে সাংবাদিকতার বহু নতুন ধারার জনক ছিলেন। বিচিত্রাই বাংলাদেশে খুব বিস্তৃতভাবে বইমেলা কাভার করা শুরু করেছিল, ফেব্রুয়ারিতে লেখকদের নিয়ে বিভিন্ন প্রচ্ছদ-কাহিনিও। শওকত ওসমান, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক, শওকত আলী, সৈয়দ শামসুল হক আর হুমায়ূন আহমেদকে বিচিত্রার কাভারে দেখতাম আমরা, সশরীরে দেখতাম বিচিত্রা অফিসে। সে সময়ের বহুল আলোচিত একটি প্রচ্ছদ-কাহিনি ছিল সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে হুমায়ূন আহমেদের আলাপচারিতা। সৈয়দ হক হুমায়ূন আহমেদকে প্রশ্ন করেন: আপনি ছয় ফর্মায় উপন্যাস লেখেন কী করে? হুমায়ূন আহমেদের পাল্টা প্রশ্ন ছিল: আপনি ছয় লাইনে কবিতা লেখেন কেমন করে? আমরা বইমেলায় গিয়ে দেখতাম সেখানে বড় একটি আলোচনা ছিল বিচিত্রার এসব প্রচ্ছদ-কাহিনি আর বইমেলার সংবাদকে ঘিরে।
আমার ঔপন্যাসিক হওয়ার সূচনাও বিচিত্রা থেকে। সে সময়ের একজন জনপ্রিয় লেখক ছাত্ররাজনীতি নিয়ে অদ্ভুত এক উপন্যাস লিখেছিলেন। সেখানে ছাত্রনেতারা মাথায় ফেট্টি বাঁধেন, হাতে থাকে তাঁদের হকিস্টিক আর হূদয়ে শুধু নারীর ভালোবাসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। অথচ আমাদের চেনা ছাত্ররাজনীতি ছিল তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন, এরশাদবিরোধী সময়ে ছাত্রনেতাদের জীবনযাপনও ছিল আরও অনেক অগ্রসর। খুব বিরক্ত হয়ে হয়ে আমি নিজেই লিখে ফেলি একটি উপন্যাস নিষিদ্ধ কয়েকজন। বিচিত্রার ঈদসংখ্যায় তা ছাপা হওয়ামাত্র সবিস্ময়ে দেখি কয়েকজন প্রকাশক এসে হাজির অফিসে, আমার বই বের করতে চান বইমেলায়। পিএইচডি করতে লন্ডনে যাওয়ার আগে এর পরের চার বছরে বইমেলাই হয়ে ওঠে আমার সবচেয়ে প্রিয় প্রাঙ্গণ। তখনকার সময় বহু মানুষ ঈদ-পূজা-জন্মদিন, আবাহনী-মোহামেডান ফুটবল খেলা বা নাটক-যাত্রার মৌসুমের জন্য অপেক্ষা করত। আমরা করতাম একুশের বইমেলার জন্য। বইমেলার নতুন বইয়ের গন্ধ, নবীন লেখকের লাজুক গাম্ভীর্য, বইমেলা চত্বরের দুমড়ানো ঘাস, হঠাৎ বাতাসে ছিটানো ধুলোকণা—সবকিছুর জন্য। বইমেলার বিকেল আর সন্ধ্যা কেন সর্বদাই অস্তগামী আর বইমেলার মাস কেন দ্রুতগামী, এই আফসোস কখনো শেষ হতো না আমাদের।
একুশের বইমেলা এখন বহুগুণ বড় হয়েছে। বাংলা একাডেমি চত্বর থেকে এখন তা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিশাল পরিসরে সম্প্রসারিত হয়েছে। দৈনিক পত্রিকা আর টিভিতে বইমেলা প্রধান সংবাদ হচ্ছে, প্রতিদিন নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হচ্ছে, বইয়ের বিজ্ঞাপনে রঙে ঢেকে যাচ্ছে অসুস্থ খবরের বিষাদ। উপন্যাস আর লেখা হয়নি, এই দুঃখে বইমেলা থেকে আমি দূরে আছি বহু বছর। তবু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ি নতুন বইয়ের খবর, দূর থেকে আরও নিবিড়ভাবে অবলোকন করার চেষ্টা করি বইমেলার মাহাত্ম্য আর বিশালত্ব। অনুভব করার চেষ্টা করি বাংলা ভাষা আর সংস্কৃতিকে ধারণ আর বেগবান করার ক্ষেত্রে এর অবদান। কিন্তু আমি একই সঙ্গে বিচলিত হই মধ্যবিত্ত আর নব্য ধনিক শ্রেণীর ওপর সারাটা বছর ধরে ভিনদেশি ভাষার ক্রমবর্ধমান আধিপত্যেও। ভাবি বইমেলার মর্মবাণীকে, বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসাকে আসলে কতটা অর্থবহ করতে পেরেছি আমরা এই স্বাধীন বাংলাদেশে?
ভাষা, সংস্কৃতি, জাতীয়তার রাজনীতি সম্পর্কে আমার জ্ঞান ও উপলব্ধি খুব সীমিত। তবু এটুকু বুঝতে অসুবিধা হয় না যে বইমেলা শুধু বাংলা ভাষায় বই প্রকাশের অনুষ্ঠান নয়, এটি বাংলাকে প্রাণের ভাষা হিসেবে উদ্যাপন, বাংলাদেশের মানুষের আত্মপরিচয় ধারণ ও প্রকাশ করার এক স্বতঃস্ফূর্ত আয়োজন। ফেব্রুয়ারির বইমেলা আমাদের অনিবার্যভাবে নিয়ে যায় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের গৌরবময় স্মৃতিচারণায়। বাংলাকে তখন শুধু রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়নি, ধর্মসর্বস্ব এক সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ থেকে মুক্ত করাও হয়েছিল এই অঞ্চলের মানুষের মনোজগৎকে। বাংলাদেশ যে কখনো পাকিস্তান নয়, বাংলাদেশ যে কখনো সাম্প্রদায়িক নয়, এই দেশের মানুষের ইতিহাসবোধ আর কৃষ্টির শুরু যে ১৯৪৭ সালের বহু যুগ আগে থেকে, তার জোরালো ও দৃপ্ত উচ্চারণ ছিল ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। ভাষার লড়াইয়ে বিজয়ী না হলে এত তাড়াতাড়ি আমরা পাকিস্তান নামক কূপমণ্ডূক রাষ্ট্র থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন দেশ পেতাম না, বইমেলাও হয়তো তখন হতো না এমন প্রাণের মেলা!
আমাদেরই তাই সবচেয়ে ভালো করে জানার কথা যে নিজ ভাষা মানে শুধু স্বাতন্ত্র্য নয়, এর মানে স্বাধীনতা, জাতিসত্তা, আত্মমর্যাদাবোধ এবং আত্মপরিচয়। নিজ ভাষাকে জীবনযাপনে, আচার-অনুষ্ঠানে আর সব সামাজিকতায় তাই আত্মস্থ করতে হয়। কিন্তু আমরা কি আসলে তা পারছি আর? বইমেলার এক মাস আমাদের নিজ ভাষার সবচেয়ে শৈল্পিক প্রকাশ আর সৃজনশীল আত্মপরিচয়ের কাছে নিয়ে যায়। কিন্তু ভাষাভিত্তিক এই সংস্কৃতিবোধ বারো মাসের আকাশ সংস্কৃতির দাপটে কি দূষিত হওয়ার হুমকিতে পড়েনি? আমাদের একদল শিশু কি বাংলা শেখার আগে কিংবা বাংলার চেয়ে ভালো করে বলতে শিখছে না হিন্দি কিংবা ইংরেজি? পাকিস্তানি বর্বর শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে রক্ত দিয়ে লড়াই করে বাংলাকে প্রতিষ্ঠা করার সময় আমরা কি এমন একটি সময়ের প্রত্যাশা করেছিলাম?
অন্য ভাষা শেখা বা বলায় আমার কেন কারোরই আপত্তি থাকার কথা না। আমি ইংল্যান্ড আর জার্মানিতে পড়াশোনা করার সময় দেখেছি সেখানকার অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী একাধিক বিদেশি ভাষা জানেন। ফ্রান্সের মানুষ অনর্গল বলতে পারছে চীনা ভাষা, কিংবা জাপানের মানুষ বলছে স্প্যানিশ, এটা খুবই সাধারণ এমনকি প্রত্যাশিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে গোলাকায়নের এই যুগে। কিন্তু আমার জানামতে, এই ভাষাশিক্ষা মূলত জ্ঞানচর্চা বা জীবিকার প্রয়োজনে। ঠিক সে ধরনের সচেতন সিদ্ধান্ত থেকে আমরা যেকোনো ভাষা শিখতে পারি। কিন্তু ভিনদেশি ভাষা শিক্ষা যদি হয় বাধ্য হয়ে, আকাশ সংস্কৃতির কাছে নিজের অজান্তে সমর্পিত হয়ে, তাহলে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কারণ আছে।
অন্য ভাষা জানার প্রয়োজন কী, এটি কেন চর্চা করা হচ্ছে, সেটিও আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। ইংরেজি পৃথিবীর সবচেয়ে কমন ভাষা বলে আমাদের ইংরেজি জানতে হবে, ভারতে পড়তে গেলে হিন্দি বা কোরিয়ায় পড়তে গেলে কোরিয়ানও। কিন্তু বিদেশি ভাষা যদি আমাদের সামাজিক জীবনযাপন এবং আচার-অনুষ্ঠানকে গ্রাস করে, বাংলার স্থান দখল করে ফেলে—আমার আপত্তি সেখানেই। বিয়ে, জন্মদিন, যেকোনো উদ্যাপনে কেন আমরা দেখব বিদেশি গান আর নাচের অনুকরণ সংস্কৃতি? ছাব্বিশে মার্চ বা ষোলোই ডিসেম্বর কেন পাড়ার ক্লাবেও আনন্দ করে বাজানো হয় হিন্দি এমনকি উর্দু গানও? যিনি ভারতীয় সিরিয়াল দেখবেন তিনি হিন্দিতে তা দেখুন, কিন্তু স্পোর্টস চ্যানেল বা এইচবিও হিটস-এ ছবি দেখতে গেলে কেন আমাকে শুনতে হবে হিন্দি!
অন্য ভাষা যখন প্রাত্যহিক জীবনযাপন আর সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে মোবাইল ফোনের রিংটোনে প্রবেশ করে, তখন নিজস্ব সামাজিক সংস্কৃতি, স্বাতন্ত্র্যবোধ আর আত্মমর্যাদাবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব ক্ষতিগ্রস্ত বা দুর্বল হয়ে গেলে ভিনদেশি ভাষা-সংস্কৃতির হাত ধরে আসে ভিনদেশি পণ্য এমনকি ভিনদেশি রাজনীতির আধিপত্য। বাংলা বইমেলায় এক মাসের অনুষ্ঠানের সময়ে হলেও আমরা কি কখনো ভেবে দেখছি তা? একবারও কি আমরা আলোচনা করছি নিয়ন্ত্রণহীন আকাশ সংস্কৃতি কীভাবে গ্রাস করছে আমাদের ভাষা, কৃষ্টি আর স্বাধীন সত্তাকে? কীভাবে তা বেসুরো হয়ে আছে বইমেলা, একুশে আর পয়লা বৈশাখের আবেদনের সঙ্গে?

আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ভারতের নির্বাচন- কংগ্রেস, বিজেপি না তৃতীয় জোট? by এম সাখাওয়াত হোসেন

প্রায় দুই সপ্তাহ ভারতের দক্ষিণের তিনটি রাজ্য অন্ধ্র প্রদেশ, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু এবং আমাদের পশ্চিম সীমান্তের রাজ্য পশ্চিম বাংলায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। নিছক বেড়ানো হলেও চেষ্টা করেছিলাম ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনের হালহকিকত বুঝতে।

সময়চিত্র- বইমেলা, বাংলা ভাষা এবং কিছু প্রশ্ন by আসিফ নজরুল

বইমেলার সঙ্গে আমার প্রজন্মের মানুষের পরিচয় আশির দশক থেকে। ১৯৮৮ সাল থেকে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় আমি চাকরি করার সুবাদে এই পরিচয় আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে।

কালের পুরাণ- মেধা ও তারুণ্যের প্রতি রাষ্ট্রের উপেক্ষা by সোহরাব হাসান

গত বছরের এপ্রিল-মে মাসে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। বিরোধী দলের আন্দোলন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাতের কারণে দীর্ঘ সময় নিয়ে এই পরীক্ষা নিতে হয়েছে। বেশির ভাগ পরীক্ষা হয়েছে শুক্র ও শনিবার।
অন্য দিন বিরোধী দলের হরতাল-অবরোধ থাকায় পরীক্ষা হতে পারেনি। গত বছর একই সমস্যা হয়েছিল এসএসসি, জেএসসি ও পিএসসি পরীক্ষার বেলায়ও।

এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয় গত বছর আগস্টের মাঝামাঝি। এখন ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি। এর মধ্যে
ছয় মাস চলে গেলেও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ভর্তির প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন পর্যন্ত ভর্তির প্রক্রিয়া শুরুই হয়নি। মার্চ নাগাদ ভর্তির প্রক্রিয়া শেষ হলেও ক্লাস শুরু হতে এপ্রিল-মে পর্যন্ত গড়াবে।
মাঝখানে পুরো একটি বছর হারিয়ে যাবে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জীবন থেকে।
সাধারণত একটি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর নতুন শ্রেণীতে ভর্তির প্রক্রিয়া তিন মাসের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। গত এক বছরে রাজনৈতিক সহিংসতার অজুহাত দেওয়া হলেও ভর্তি প্রক্রিয়ার এই বিলম্ব সব সময় ঘটে থাকে। কেন ঘটে, কারা ঘটান, তার ব্যাখ্যা নেই। ইতিমধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একাধিক সেমিস্টার শেষ করেছে। আমাদের প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনগুলোও এ নিয়ে আন্দোলন করে না। আর সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠনের নেতারা মনে করেন, পরীক্ষা যত বিলম্বে হবে, তত তাঁদের লাভ। নেতৃত্ব প্রলম্বিত হবে; সেই সঙ্গে চাঁদাবাজি আর দখলবাজিও।
কেবল ভর্তি পরীক্ষা নয়, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের সব পরীক্ষা, ক্লাস ও কোর্স শেষ হয় নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে। সব বিশ্ববিদ্যালয়েই কম-বেশি সেশনজট আছে। তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এ ক্ষেত্রে রেকর্ড সৃষ্টি করে চলেছে। গড়ে দুই থেকে তিন বছর সেশনজট চলছে এই প্রতিষ্ঠানটিতে। এর কুফল ভোগ করতে হচ্ছে গরিব ও সুবিধাবঞ্চিত ছাত্রছাত্রীদেরই এবং বলা বাহুল্য, তাঁদের সংখ্যাই বেশি।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে স্নাতক ও স্নাতক সম্মান, স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষার্থীসংখ্যা ২১ থেকে ২২ লাখ। যার মধ্যে ১৩ থেকে ১৪ লাখ পড়াশোনা করেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। অন্যরা অর্থাৎ তুলনামূলক সুবিধাভোগীরা ভর্তি হন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজে। কেউ কেউ উচ্চতর মাদ্রাসায়ও পড়েন। কিন্তু অর্ধেকের বেশি ছাত্রছাত্রী যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আওতায় পড়েন, সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির মা-বাপ আছে বলে মনে হয় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজট অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব হলেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় চলছে সেই পুরোনো নিয়মেই। সেখানে অধ্যয়নরত প্রত্যেক শিক্ষার্থী গড়ে দুই বছর সেশনজটে পড়লে জাতীয় ক্ষতির পরিমাণটি ভাবা যায়। ১৩-১৪ লাখ ছাত্রছাত্রীর জীবন থেকে দুটি বছর করে হারিয়ে যাচ্ছে। কমপক্ষে ২৬ লাখ ইউনিট বছর। গত বছর এইচএসসিতে পাস করেছেন পাঁচ লাখ ৭৯ হাজার। এঁদের সবাই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে না পড়লেও অধিকাংশ পড়বেন। কিন্তু তাঁদের জীবনের হারিয়ে যাওয়া দিন, মাস ও বছরগুলোর হিসাব কে দেবেন?

দুই
প্রতিদিন পাঠকের কাছ থেকে বহু চিঠি পাই। তরুণদের চিঠির বেশির ভাগই চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ও বিসিএস পরীক্ষা-সংক্রান্ত। গতকাল প্রথম আলোয় খবর বের হয়েছে, প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফল প্রকাশের সাত মাস পার হলেও ৩৪তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। ফলে দুশ্চিন্তায় আছেন ৪৬ হাজার ২৫০ জন পরীক্ষার্থী। ভাবা যায়! এই কর্মকমিশন নিয়ে আমরা কী করব?
সরকারি চাকরিতে প্রবেশের আগের বয়সসীমা ছিল ২৮ বছর। এখন করা হয়েছে ৩০ বছর। কিন্তু অনেকেরই অভিযোগ, এই সময়ের মধ্যে তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হতে পারেন না। পারলেও চাকরি খোঁজার বয়স থাকে না। সে জন্য চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩২ বা ৩৫ করার দাবি তাঁদের। পৃথিবীর আর কোনো দেশে তরুণদের নিয়ে রাষ্ট্র ও সরকার এমন তামাশা করতে পারে না। সব সম্ভবের দেশে সবকিছু করে পার পাওয়া যায়।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ আছে। আছে পথ ও মতের বিস্তর ফারাক। কিন্তু একটি জায়গায় তাদের মধ্যে অদ্ভুত মিল দেখা যায়। সেটি হলো, তরুণ প্রজন্মকে ক্রমাগত উপেক্ষা করা। তাদের তারুণ্য, প্রাণশক্তি ও মেধাকে অগ্রাহ্য করা। আর এই কাজটি শুরু হয় প্রাথমিক স্তর থেকেই। স্বাধীনতার ৪৩ বছরেও অভিন্ন প্রাথমিক শিক্ষা চালু হয়নি। প্রাথমিক শিক্ষা অতিশয় বাণিজ্যিকীকরণ হয়ে পড়েছে। প্রথম শ্রেণীতে পড়ার আগেই ছেলেমেয়েকে দুই থেকে তিন বছর পড়তে হয়, প্লে গ্রুপ, কেজি ওয়ান, কেজি টু। তাই একটি শিশুকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চৌকাঠ পার হতেই আট থেকে নয় বছর লেগে যায়। চার বছর বয়সেও শিশুটি বিদ্যালয়ে ভর্তি হলে এসএসসি পাস করতে লাগে ১৮-১৯ বছর। এরপর কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও ছয়-সাত বছর। আর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের খপ্পরে পড়লে তো বাড়তি দুই বছর যোগ করতে হবে। এরশাদের আমলে আশির দশকে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি নৈরাজ্য চলছিল। তখন আমাদের এক অনুজ শিক্ষার্থী এইচএসসি পাস করার পর এখানে ভর্তির প্রক্রিয়া বিলম্ব দেখে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন ইংরেজি বিভাগে। সেখানে চার বছরে অনার্স ও এমএ করার পর দেশে এসে দেখেন, তাঁর সতীর্থরা অনার্সই শেষ করতে পারেননি। এই অপচয়ের জবাব কী?
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার এই মস্ত বড় দুর্বলতার দিক নিয়ে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা কিংবা শিক্ষাবিদেরা ভাবেন না। ভাবলে প্রতিবছর লাখ লাখ পরীক্ষার্থীকে এভাবে পরীক্ষা, ফল প্রকাশ কিংবা ভর্তি পরীক্ষার তারিখের জন্য হয়রানি ও দুর্ভোগে পড়তে হতো না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যে ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, তা তাঁরা একবারও চিন্তা করেন না।
আমাদের নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকেই বড় বড় কথা বলেন। তাঁদের হাতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বলে দাবি করেন,
কিন্তু নতুন প্রজন্মের প্রায় প্রত্যেকের জীবন থেকে যে তিন-চারটি বছর হারিয়ে যাচ্ছে, সে সম্পর্কে তাঁরা কেউ কিছু বলেন না।
এর পেছনে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী শিক্ষার এবং তরুণ প্রজন্মের প্রতি রাষ্ট্রের ও শিক্ষার অভিভাবকদের চরম উদাসীনতা।
১৯৯২ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল কলেজ পর্যায়ের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে। আগে যার দায়িত্ব ছিল কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর। এসব বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব শিক্ষাক্রম পরিচালনার পাশাপাশি কলেজগুলোর তদারকির কাজ করত; বিশ্ববিদ্যালয় সনদও প্রদান করত তারা। কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষায় শৃঙ্খলা আনার বদলে দুর্গতি এনেছে। এই বিশ্ববিদ্যালয় সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত ও কলঙ্কিত হয় বিগত বিএনপি সরকারের আমলে, যখন আফতাব উদ্দিন আহমাদ উপাচার্য ছিলেন। পরবর্তীকালে পদ্মা-যমুনায় অনেক পানি গড়িয়েছে। একাধিকবার সরকার ও উপাচার্য বদল হয়েছেন। কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয়টির দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা কমেছে এমন দাবি করা যাবে না। সেশনজট আগেও ছিল, এখনো আছে। দলীয়করণ আগেও ছিল, এখনো আছে। আর এসব রোগের উপসর্গ এখন আর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়েই সীমিত নেই, প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের মচ্ছব চলছে। যখন যাঁরা ক্ষমতায় থাকেন, তাঁরাই বিশ্বদ্যািলয়গুলোকে দলীয় কর্মীদের কর্মসংস্থান কেন্দ্রে পরিণত করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র ও শিক্ষক-কর্মচারী অনুপাত কত হওয়া উচিত? উন্নত বিশ্বে ছাত্র ও শিক্ষকের অনুপাত ১০:১। অর্থাৎ ১০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক। আমাদের দেশে সেটি সম্ভব না হলেও ইউজিসি এই অনুপাত বেঁধে দিয়েছে ১৪:১। কিন্তু যেখানে ছাত্র ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনুপাত বেশি হওয়ার কথা, সেখানে অনেক কম। উপাচার্য মহোদয়েরা দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম যে কাজটি করেন সেটি হলো, কিছু অপ্রয়োজনীয় কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে দল ভারী করা। বিশ্ববিদ্যালয় মানেই এখন মাথাভারী প্রশাসন। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ও কর্মচারী অনুপাত ৪: ১। অর্থাৎ চারজন ছাত্র বা ছাত্রীকে দেখাশোনার জন্য একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারী রয়েছেন।
বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ফি ও বেতন বাড়ানোর বিরুদ্ধে আন্দোলন হচ্ছে। এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্ধিত ফি ও বেতন থেকে আয় বাড়বে ৫০ লাখ টাকারও কম। অথচ বাড়তি শ্রমিক-কর্মচারী নিয়োগ করে তাঁদের পেছনে ব্যয় করা হচ্ছে কয়েক কোটি টাকা। জনগণের অর্থ নিয়ে এমন স্বেচ্ছাচারিতা চালানোর সাহস পান কীভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা?
একটি দেশের মানবসম্পদ তৈরি করার প্রধান মাধ্যম হলো বিশ্ববিদ্যালয় বা সমমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। অথচ আমাদের দেশে এর মানই নাজুক। পশ্চিমের উন্নত বিশ্ববিদ্যালয় দূরে থাক, প্রতিবেশী দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গেও আমরা প্রতিযোগিতায় পেরে উঠছি না।
বিশ্ব, এমনকি এশীয় সূচকেও বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান ক্রমেই নিচের দিকে নামছে। আর কত নিচে নামলে মহাত্মনদের চৈতন্যোদয় হবে?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

কালের পুরাণ- মেধা ও তারুণ্যের প্রতি রাষ্ট্রের উপেক্ষা by সোহরাব হাসান

গত বছরের এপ্রিল-মে মাসে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। বিরোধী দলের আন্দোলন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাতের কারণে দীর্ঘ সময় নিয়ে এই পরীক্ষা নিতে হয়েছে। বেশির ভাগ পরীক্ষা হয়েছে শুক্র ও শনিবার।

কালের পুরাণ- বিএনপিকে মাঠে নামাতে মন্ত্রীদের উসকানি! by সোহরাব হাসান

কূটনীতিকেরা বিএনপিকে দুই বছরের মধ্যে আন্দোলন না করার পরামর্শ দিয়েছেন বলে গতকাল একটি পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে। এ খবরের সত্যাসত্য সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত নই।
তবে বিএনপির নেতাদের হাবভাব দেখে মনে হয়, তাঁরা দুই বছর না হলেও আন্দোলনের জন্য সরকারকে কিছুটা সময় দিতে চান। এর আগে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনের আগে দল গোছানোর কথা বলেছিলেন। সেই সঙ্গে তিনি এ কথাও জানিয়ে দেন যে তাঁরা খুব বেশি দিন অপেক্ষা করবেন না। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৯-দলীয় জোটের ভেতরেও যে আন্দোলনে নামা না-নামা নিয়ে চাপান-উতোর চলছে, নানা সূত্রে তারও আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

কিন্তু এক মাস বয়সী সরকারের কতিপয় মন্ত্রী যে ভাষায় কথা বলছেন, তাতে মনে হচ্ছে, ক্ষমতাসীন দলটিই চাইছে না বিএনপি বেশি দিন আন্দোলনের বাইরে থাকুক। মাঠ গরম না হলে এই শেষ শীতের দিনে তাঁদের ভালো লাগে না।
গত বৃহস্পতিবার শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু একটি বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে জাতীয় নির্বাচনে অংশ না নিয়ে উপজেলা নির্বাচনে অংশ কেন নিচ্ছে, সে জন্য বিএনপির কাছে কৈফিয়ত তলব করেছেন। এ নিয়ে মন্ত্রীর আত্মশ্লাঘার কিছু নেই। বিএনপি জাতীয় নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার কারণেই তো আমির হোসেনের মতো আরও অনেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সাংসদ নির্বাচিত হয়ে শেখ হাসিনার তৃতীয় সরকারের মন্ত্রী হয়েছেন। শেখ হাসিনার প্রথম সরকারে যিনি প্রথমে মন্ত্রীই হতে পারেননি। কেননা, তিনি বিএনপির একজন নবীন নেতার কাছে হেরে গিয়েছিলেন। পরে টেকনোক্র্যাট কোটায় খাদ্যমন্ত্রী হন এবং উপনির্বাচনে ইলেন ভুট্টোকে হারিয়ে সাংসদ হন। ২০০১ সালের নির্বাচনে আবার ইলেন ভুট্টোই নির্বাচিত হন। হেরে যান আমির হোসেন আমু।
সে ক্ষেত্রে বিএনপি নির্বাচনে না আসায় তাঁর অন্তত সুবিধাই হয়েছে। বিএনপির কাছে কৈফিয়ত না চেয়ে তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারতেন।
আর নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বিএনপি ভুল করে থাকলে সে জন্য জনগণ তাদের কাছে কৈফিয়ত চাইবে। এখন যদি বিএনপি ভুল বুঝতে পেরে উপজেলা নির্বাচনে শরিক হয়েও থাকে, সে জন্য কৈফিয়ত দিতে হবে কেন?
আমির হোসেন আমুরা যেহেতু নিজেদের নির্বাচিত প্রতিনিধি মনে করেন, তাঁদেরই উচিত জনগণের কাছে কৈফিয়ত দেওয়া। এক মাসের বেশি সময় হলো, তিনি শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন। এই সময়ে তাঁর মন্ত্রণালয়ে কী কাজ হয়েছে, সেটি জানার অধিকার দেশবাসীর আছে। এত দিন সব দুর্গতির জন্য তাঁরা বিরোধী দলের সংঘাত-সংঘর্ষ, হরতাল-অবরোধের অজুহাত দিতেন। এখন তো সেসব নই। তাহলে কেন শিল্পকারখানায় উৎপাদন বাড়ছে না? কেন কারখানাগুলোতে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে না? কেন রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকারখানাগুলোর লোকসান বাড়ছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর আমির হোসেন আমু শিল্পবহির্ভূত বিষয় নিয়ে কথাবার্তাই বেশি বলছেন।
আরেক মন্ত্রী, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন একই দিন ফরিদপুরে ছাত্রলীগের কর্মী সম্মেলনে বিএনপির উদ্দেশে বলেছেন, তাদের আন্দোলন ঠেকাতে ছাত্রলীগই যথেষ্ট। তাঁর এ কথাটি পত্রিকায় পড়ে দুই দশক আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার একটি বক্তব্য মনে পড়ে। সে সময় বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে জোরদার আন্দোলন চলছিল। সেই প্রেক্ষাপটে তিনি বলেছিলেন, বিরোধী দলের আন্দোলন দমন করতে ছাত্রদলই যথেষ্ট। আমাদের দেশে ক্ষমতা বদলায়, দল বদলায়, ক্ষমতাবানদের চরিত্র বদল হয় না।
কঠিন সত্য হলো, খালেদা জিয়ার ছাত্রদল বিরোধী দলের আন্দোলন মোকাবিলা করতে পারেনি। তাঁকে শেষ পর্যন্ত বিরোধী দলের দাবি মেনে নিতে হয়েছিল। আর এখন তো বিরোধী দল আন্দোলনই করছে না। সংসদের ভেতরে যাঁরা বিরোধী দলের আসনে বসেছেন, তাঁরা নিষ্ক্রিয়, নির্জীব। একই সঙ্গে সরকারে ও বিরোধী দলেও আছেন। দলের নেতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নির্বাচন না করেও সাংসদ হয়েছেন, বিশেষ দূত হয়েছেন। রওশন এরশাদ নির্বাচন করে সংসদে বিরোধী দলের নেতা হয়েছেন। তাঁদের স্বামী-স্ত্রীর বিরোধ এখন সংসদেও গড়িয়েছে। রঙ্গভরা বঙ্গদেশে আরও কত কিছু দেখতে হবে।
আর সংসদের বাইরে থাকা বিএনপি ভোটে পরাজিত না হলেও রাজনৈতিক কৌশলে পরাজিত হয়ে এখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। দলের বিভিন্ন পর্যায়ে নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিরোধ ও দ্বন্দ্ব লক্ষ করা যাচ্ছে। কর্মীদের অভিযোগ, নেতাদের কারণে আন্দোলন সফল হয়নি। এই অবস্থায় বিএনপির নেতারা যখন শিগগিরই আন্দোলনের চিন্তা করছেন না, তখন মন্ত্রীদের উসকানিমূলক বক্তৃতা-বিবৃতির কী যুক্তি থাকতে পারে?
বাংলায় একটি প্রবাদ আছে। সুখে থাকতে ভূতে কিলায়। দেশে আন্দোলন নেই, হরতাল-অবরোধ নেই এটি সম্ভবত মন্ত্রীদের ভালো লাগছে না। এ কারণেই কি মন্ত্রীরা উসকানিমূলক বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে যাচ্ছেন? তবে গত মন্ত্রিসভার সদস্য যাঁরা ছিলেন, তাঁদের কাছ থেকে নব্য মন্ত্রীদের শিক্ষা নেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি। সেই মন্ত্রিসভায় যাঁরা বড় বড় কথা বলতেন, তাঁদের অনেকেই এখন মন্ত্রিসভার বাইরে। পাঁচ বছর তাঁরা বিএনপি তথা বিরোধী দলকে গালমন্দ করে নিজেদের সফল মন্ত্রী হিসেবে দেখাতে চেয়েছিলেন। দিনের শেষে মন্ত্রিত্ব হারিয়েছেন। কেননা, শেষ বিচারে সরকারের সাফল্য ও ব্যর্থতার দায় শেখ হাসিনাকেই নিতে হবে।
বর্তমানে বিএনপি নাজুক অবস্থায় আছে, মানি। এর অর্থ এই নয় যে আওয়ামী লীগ খুব ভালো অবস্থায় আছে। বিএনপি নির্বাচন করেনি, তাই সংসদে বা সরকারে তার কোনো ভূমিকা নেই। কিন্তু যেহেতু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে, ভালোমন্দের দায়ও তাদের নিতে হবে। কে কীভাবে নেন সেটাই দেখার বিষয়। ইতিমধ্যে মন্ত্রী পদমর্যাদার চিফ হুইফ সাহেব এক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন। দলের নেতা-কর্মীদের কাছে ক্রেস্ট না দিয়ে ক্যাশ নিয়ে আসার জন্য হুকুম দিয়েছেন। বিগত সরকারের ক্যাশ আদায়কারীরা এখন দুদকের সন্দেহ ও তদন্তের আওতায়।
আমরা জানি না, উসকানিমূলক বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে মন্ত্রীরা বিরোধী দলকে মাঠে নামাতে চাইছেন কেন? দেশে শান্তি আছে, এটি তাঁদের পছন্দ নয়? আবার কি মন্ত্রীরা ৫ জানুয়ারির আগের অবস্থায় দেশকে ফিরিয়ে নিতে চান?
শেখ হাসিনার তৃতীয় সরকারের মেয়াদ মাত্র এক মাস কয়েক দিন। এই কয়েক দিনে নিশ্চয়ই সরকার টের পেয়েছে, বিরোধী দলকে রাজনৈতিক কৌশলে হারানো যত সহজ, দেশ চালানো তত সহজ নয়। এই এক মাস সময়ের মধ্যেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেছে, এই এক মাস সময়ের মধ্যেই দাম না পেয়ে কৃষকেরা আলু রাস্তায় ফেলে দিচ্ছেন। এই সময়ের মধ্যেই জানা গেল, যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি-সুবিধা সহজে ফিরিয়ে দিচ্ছে না।
প্রায় প্রতিদিনই সরকারপ্রধানকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তিনি সাধ্যমতো সেগুলো সমাধানেরও চেষ্টা করছেন। কিন্তু তাঁর অধিকাংশ মন্ত্রীই সম্ভবত সেই বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারছেন না। আর সে কারণেই বিরোধী দলকে রাজপথে নিয়ে আসার জন্য উসকানি দিয়ে যাচ্ছেন। এটি থামানো প্রয়োজন।

সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

চাচার পাঁচালি- নব্য গণতন্ত্র by মাহবুব তালুকদার

চাচা বললেন, ছাত্রলীগের মিডিয়া কানেকশন বিশেষ ভালো নয়। সে কারণে বারবার 
তাদের খেসারত দিতে হচ্ছে।
আমি বললাম, এ কথার অর্থ কী?
অর্থ খুব সোজা। মিডিয়া ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছে।
মিডিয়া তো রিপোর্ট করা ছাড়া আর কিছুই করছে না।
সেটাই বলতে চাচ্ছি। সেদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের কয়েকজন সিনিয়র নেতার পিস্তল হাতে ছবি ছাপা হয়েছে। এ রকম একপেশে রিপোর্ট বা ছবি ছাপার নাম কী সাংবাদিকতা?
কিন্তু একপেশে রিপোর্ট হলো কীভাবে?
আরে ভাই! জামায়াতে ইসলামীর ক্যাডাররা যখন প্লাস্টিক বোমা ছোড়ে, তাদের কী কোনো ছবি আজ পর্যন্ত পত্রিকায় ছাপা হয়েছে? হয়নি। অথচ ছাত্রলীগের সোনার ছেলেরা যখন আত্মরক্ষার্থে পিস্তল হাতে নেয়, ফলাও করে সেটা ছাপা হয়, যা দুরভিসন্ধিমূলক।
চাচা কোনো বিষয়ে উত্তেজিত হয়ে গেলে আমাকে ভাই বলে সম্বোধন করেন। এটা নতুন কিছু নয়। আমি বললাম, ক’দিন আগে জাতীয় সংসদে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের ঢাকা মহানগরের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাজী সেলিম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা প্রসঙ্গে বলেন, ‘শিবির রগ কাটে, ছাত্রলীগ কবজি কাটে, মাথা কাটে।’ এ কথার জবাবে ছাত্রলীগ লিখিতভাবে প্রতিবাদলিপিতে জানিয়েছে, হাজী সেলিম একজন ‘অশিক্ষিত’ ও ‘মূর্খ’ লোক। কিন্তু এটা কী হাজি সেলিমের কথার জবাব হলো?
ঠিকই বলেছে ওরা। চাচা জানালেন, ছাত্রলীগের ছেলেরা যেহেতু ছাত্র, সেহেতু তাদের চোখে ‘অশিক্ষিত’ ও ‘মূর্খ’ হাজী সেলিমের অপরাধ হচ্ছে ‘শিক্ষিত’ ও ‘বিদ্বান’ ছাত্রদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে মুখ খোলা। সংসদ সদস্য হয়েছেন বলে সংসদে দাঁড়িয়ে সমাজের শিক্ষিত অংশের বিরুদ্ধে গায়ে পড়ে মন্তব্য করা হাজী সেলিমের উচিত হয়নি। ছাত্রশিবির আর ছাত্রলীগ কি এক বিষয় হলো যে তাদের তুলনা করা হবে? ‘অশিক্ষিত’ আর ‘মূর্খ’ না হলে হাজী সেলিম এটা করতে পারতেন না।
আমি বললাম, চাচা! ছাত্রলীগ সম্পর্কে আরো অভিযোগ আছে। ক’দিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হল থেকে ৯৭ জন শিক্ষার্থীকে ছাত্রলীগ নেতারা বের করে দিয়েছে। ওই ৯৭ ছাত্রের অপরাধ হলো তাদের কাছে স্থানীয় ছাত্রলীগ বা আওয়ামী লীগের নেতাদের প্রত্যয়নপত্র নেই। তাদেরকে জানানো হয়েছে, তারা শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল না এবং ছাত্রলীগ করত- এ রকম প্রত্যয়নপত্র যার যার এলাকার আওয়ামী লীগ নেতার কাছ থেকে আনতে হবে। এটা কেমন কথা?
কী আশ্চর্য! এতে অভিযোগের কী আছে? চাচা ক্ষুব্ধস্বরে বললেন, ছাত্রলীগ স্বাধীনতার অতন্দ্র প্রহরী। বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি যাতে আসন পেতে ঘাঁটি বানাতে না পারে, তা দেখা নিশ্চয়ই অন্যায় কিছু নয়। তাতে প্রয়োজনে ৯৭ জন কেন, ৯৭০ জনকে হলে থাকতে না দেয়ার অধিকার ছাত্রলীগের রয়েছে।
কিন্তু ছাত্রলীগ তো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত নয়। হলে স্থান পেতে ছাত্রদের যার যার এলাকার আওয়ামী লীগ নেতার প্রত্যয়নপত্রইবা আনতে হবে কেন?
তুমি ব্যাপারটা নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছ কেন? ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে সাহায্য করছে বলেই তাদের এটা করতে হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এককভাবে আবাসন সমস্যার সমাধান করতে পারছে না বলেই ছাত্রলীগ এ ব্যাপার হ্যান্ডেল করছে। ওরা যদি অন্যায় কিছু করত তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়ই তাতে বাধা দিতো। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কি কিছু বলেছে?
না। তারা তো ছাত্রলীগের পক্ষে।
তাহলেই বুঝতে পার, ছাত্রলীগ কোনো অন্যায় করছে না। তুমিও দেখছি হাজী সেলিম হয়ে গেলে।
চাচার কথায় আমি রীতিমতো বিচলিতবোধ করলাম। হাজী সেলিম ঢাকার একজন খ্যাতনামা রাজনীতিবিদ ও আওয়ামী লীগ নেতা। তিনি সংসদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হননি। আওয়ামী লীগের আরেক প্রখ্যাত নেতা ও আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দীনকে নির্বাচনে পরাজিত করে তিনি সংসদ সদস্য হয়েছেন। ভবিষ্যতে তিনি মন্ত্রীও হতে পারেন। যদি তাই হয়, তাহলে তিনি হবেন ছাত্রলীগের ভাষায় দেশের প্রথম ‘অশিক্ষিত’ ও ‘মূর্খ’ মন্ত্রী। তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে যা বলেছেন, আমি তা সমর্থন করিনি। তাহলে আমি তার সঙ্গে তুলনীয় হলাম কী করে?
আমি প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে বললাম, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ঘোষণা করেছেন, আগামী ২০১৯ সালের ২৮শে জানুয়ারির পূর্বে আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। মেয়াদ শেষে বর্তমান সংবিধান অনুযায়ীই নির্বাচন হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
এটা নির্বাচনের ব্যাপারে আওয়ামী লীগের আন্তরিকতা ও স্বচ্ছতার প্রমাণ। চাচা বললেন, বিএনপি যাতে এ সময়ের মধ্যে নিজেদের তৈরি করে নিতে পারে, এজন্যই সৈয়দ আশরাফ সময়টি অগ্রিম জানিয়ে দিয়েছেন।
চাচা! নির্বাচন কী বিগত নির্বাচনের মতোই হবে?
অবশ্যই। চাচা বললেন, দু-একটি দেশ ছাড়া পৃথিবীর প্রায় সব দেশ আমাদের নির্বাচন মেনে নিয়েছে। সবাই বর্তমান নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছেন। তাছাড়া, বাংলাদেশের বিগত নির্বাচন একটা মডেল হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। ভবিষ্যতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এ মডেলটিকে গ্রহণ করবে। সুতরাং, সংবিধানের বাধ্যবাধকতা রক্ষা করে একই পদ্ধতিতে আগামী নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হবে।
কিন্তু এটা তো বিরোধী দলবিহীন নির্বাচন!
কেন? জাতীয় সংসদে বিরোধী দল তো আছে। বেগম রওশন এরশাদ বিরোধীদলীয় নেতা।
উনি কি সত্যি বিরোধীদলীয় নেতা?
তোমার এসব অহেতুক প্রশ্ন আমার ভালো লাগে না। বেগম রওশন এরশাদ একজন অসাধারণ রাজনীতিবিদ। তিনি একদিকে তার স্বামী হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কাছ থেকে দলের ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছেন, অন্যদিকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ক্ষমতার অংশীদার হিসেবে ভারসাম্য রক্ষা করছেন। দক্ষিণ এশিয়ায় এমন উদাহরণ আর এক পিস পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ।
আমি চুপ করে চাচার কথা শুনলাম। জাতীয় পার্টির অভ্যন্তরীণ ব্যাপারটা আমি ঠিক বুঝি না। গত নির্বাচনে এরশাদের নির্দেশে ১৮৬ জন প্রার্থী তাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন। বাকিরা নির্দেশ অমান্য করে নির্বাচন করেন। বর্তমান সংসদে জাতীয় পার্টির ৩৪ জন সদস্য রয়েছেন। এরশাদ নিজেও সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। এরপর তাকে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত করা হয়। এজন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। অন্যদিকে তার স্ত্রী বেগম রওশন এরশাদ দলের যে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে স্বামীকে ক্ষমতাহীন করেছেন, তা ফিরে পেতে এরশাদ সমপ্রতি দলের নেতাকর্মীদের এক সম্মেলনে গান গেয়েছেন? ‘আয় খোকা আয়!’ তবে দলের ৩০ জন সংসদ সদস্য তার ডাকে সাড়া দেননি। আসলে দলের খোকারা বুঝতে পারছেন না কার কাছে যাবেন? ক্ষমতাবান রওশন এরশাদের কাছে, না ক্ষমতাহীন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কাছে?
আমি আবার প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে বললাম, চাচা! উপজেলা নির্বাচনে তো দেখছি রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন আছে, অথচ কাগজপত্রে সবই নির্দলীয়। নির্বাচনে একক প্রার্থী দেয়ার জন্য বিদ্রোহী প্রার্থীদের দল থেকে বহিষ্কারও করা হচ্ছে। ব্যাপারটা অদ্ভুত নয়?
তোমার কাছে তো সবই অদ্ভুত। তবে এ নির্বাচন আওয়ামী লীগের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
গুরুত্বপূর্ণ কেন?
বিএনপি তলে তলে এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে বলে। বর্তমান সরকারকে বিএনপি অবৈধ সরকার বলছে, আবার এ সরকারের অধীনে উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। এটা কেমন নৈতিকতাবিরোধী কথা?
নির্বাচনে দলীয় প্রতীক নেই বলেই বোধহয়। আমি বললাম।
আওয়ামী লীগের উচিত ছিল এবারও কৌশল করে বিএনপিকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখা। চেষ্টাও করা হয়েছিল। তবে তা ব্যর্থ হয়েছে। এখন একটা ভিন্ন কৌশল দেখা যাচ্ছে।
কি কৌশল?
এবার উপজেলা নির্বাচনে জেলা প্রশাসক ও অন্যান্য প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ওপর বিশেষভাবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের ওপর তেমন আস্থা রাখা যায়নি বলেই এ ব্যবস্থা। চাচা বললেন।
এভাবে নির্বাচন করে কি গণতন্ত্র রক্ষিত হতে পারে?
গণতন্ত্রের তুমি বোঝটা কী? চাচা বিরক্তিস্বরে আমাকে বললেন, তুমি কি মনে করো নির্বাচনে কেবল দেশের মানুষেরা ভোট দেয়, বিদেশীরা কিছু করে না?
তা করে। বিগত জাতীয় নির্বাচনে ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের সচিব সুজাতা সিং সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছেন। জাতীয় পার্টি যাতে নির্বাচনে যায়, তার জন্য এরশাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন তিনি।
কথাটা ফাঁস করা এরশাদের মোটেই উচিত হয়নি। চাচা গলার স্বর স্বাভাবিক করে বললেন, গণতন্ত্রের পুরোনো ধারণা এখন আর নেই। নির্বাচন ছাড়া কিংবা নামকা-ওয়াস্তে নির্বাচন করেও গণতন্ত্র রক্ষিত হতে পারে। এর নাম হচ্ছে নব্য গণতন্ত্র।
নব্য গণতন্ত্র!
আঁতকে উঠলে যে! এটা অবশ্য আইউব খানের মৌলিক গণতন্ত্র নয়। বর্তমান নব্য গণতন্ত্র সময়ের প্রয়োজনে ও সংবিধান রক্ষার্থে গণতন্ত্রের ভিন্নতর রূপ। এটা ওয়েস্ট মিনস্টার গণতন্ত্রের আদল থেকে আলাদা। এখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ নব্য গণতন্ত্রের বিকাশ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
সেটা কী রকম? আমি প্রশ্ন করলাম।
মিসরের দিকে তাকিয়ে দেখ। মিসরের সেনাপ্রধান ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফিল্ড মার্শাল আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি আগামী এপ্রিলে অনুষ্ঠেয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হচ্ছেন। ফিল্ড মার্শাল সিসি বিগত নির্বাচনে নির্বাচিত মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে শাসনক্ষমতা দখল করেন ও মুরসিকে জেলে দেন। মিসরের এবারের নির্বাচনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ফিল্ড মার্শাল সিসিকে প্রকাশ্যে অগ্রিম সমর্থন দিয়েছেন। আমি শতভাগ গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, মিসরের আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ফিল্ড মার্শাল সিসি জয়যুক্ত হবেন।
কিন্তু এতে কি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে? আমি প্রশ্ন করলাম।
তুমি গণতন্ত্রের পুরোনো ধ্যানধারণার বিষয়টা ভুলে যাও। চাচা বিগলিত হাসি মুখে বললেন, নব্য গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় যে কোনো একটা নির্বাচন হলেই হলো। কিভাবে কী নির্বাচন হলো, তা নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা হবে না।

চাচার পাঁচালি- নব্য গণতন্ত্র by মাহবুব তালুকদার

চাচা বললেন, ছাত্রলীগের মিডিয়া কানেকশন বিশেষ ভালো নয়। সে কারণে বারবার 
তাদের খেসারত দিতে হচ্ছে।
আমি বললাম, এ কথার অর্থ কী?

মসনদ ছাড়লেন আম আদমির নেতা

অরবিন্দ কেজরিওয়াল
তিনি কথা দিয়েছিলেন, জন লোকপাল বিল পাস করাতে না পারলে পদত্যাগ করবেন। কথা রাখলেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। বিল পাস করানো তো দূরের কথা, বিল পেশ করতে ব্যর্থ হয়ে মাত্র ৪৮ দিন ক্ষমতায় থেকে দিল্লির মসনদ ছেড়ে দিলেন আম আদমি পার্টির (এএপি) মুখ্যমন্ত্রী। জন লোকপাল বিল উত্থাপন নিয়ে গতকাল দিনভর উত্তাল ছিল দিল্লি বিধানসভা। পরে সন্ধ্যায় এএপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর ইস্তফার ঘোষণা দেন কেজরিওয়াল।
এর ফলে দিল্লি বিধানসভায় বিকল্প সরকার গঠনের সম্ভাবনা এখন প্রায় রইলই না। লোকসভার নির্বাচনের সঙ্গেই এখন দিল্লির বিধানসভার ভোট হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। তত দিন দিল্লিতে রাষ্ট্রপতির শাসন জারি থাকবে। কেজরিওয়ালের পদত্যাগের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর কংগ্রেস থেকে বলা হচ্ছে, এএপি সরকারের ওপর থেকে তারা সমর্থন প্রত্যাহার করেনি, বরং কেজরিওয়াল সরকার চালাতে ব্যর্থ হয়ে জন লোকপাল বিলকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সরে দাঁড়ালেন। একই অভিমত বিজেপির। দুই দলই বলছে, তারা জন লোকপালের বিরুদ্ধে নয়। কিন্তু আইন ও প্রথার বাইরে গিয়ে তাঁরা বিল পাস করানোর শরিক হতে পারবে না। জন লোকপাল বিলকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সংকট যে সৃষ্টি হতে চলেছে, তার স্পষ্ট আভাস মুখ্যমন্ত্রী নিজেই দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, এই বিল পাস না হলে তিনি সরকার ভেঙে দেবেন। শুক্রবার দিনভর নাটকীয়তার পর বিরোধীদের আপত্তি উপেক্ষা করে মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল জন লোকপাল বিলটি বিধানসভায় পেশ করার দাবি জানালেও শেষ পর্যন্ত ভোটাভুটিতে দেখা যায়, অধিকাংশই বিল পেশের বিরুদ্ধে। স্পিকারও বিল পেশ হয়নি বলে রুলিং দেন। এই বিলকে অসাংবিধানিক আখ্যা দিয়ে শুক্রবার সকালেই স্পিকার এম এস ধীরকে চিঠি লেখেন দিল্লির উপরাজ্যপাল নাজিব জং।
চিঠিতে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় অনুমতি যেহেতু নেওয়া হয়নি, সেহেতু বিলটি অসাংবিধানিক। সভার শুরুতেই সেই চিঠি পাঠের জন্য বিজেপি ও কংগ্রেস একযোগে দাবি জানাতে থাকে। সভা মুলতবি করে দিয়ে স্পিকার সর্বদলীয় বৈঠক ডাকেন। আধঘণ্টা পর সভা শুরু হলে স্পিকার চিঠিটি পাঠ করেন। এএপি সেই চিঠি নিয়ে আলোচনার দাবি জানাতে থাকেন। সেই গোলমালের মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী বিলটি পেশ করেছেন বলে দাবি জানান। সভাও দ্বিতীয়বারের জন্য মুলতবি করে দেওয়া হয়। আধঘণ্টা পর আবার সভা শুরু হলে বিল পেশ ও বিলসংক্রান্ত আইনি জটিলতা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। বিল উত্থাপিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে স্পিকার সদস্যদের মত জানতে চান। ২৭ জন বিলের পক্ষে থাকলেও ৪২ জন বিরোধী আপত্তি জানানোয় বিলটি উত্থাপনই হয়নি বলে স্পিকার রুলিং দেন। এর পরেই সাসপেন্স শুরু। তীব্র গোলমালের মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী তাঁর ভাষণে স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেন, ইস্তফাই একমাত্র পথ। কংগ্রেস ও বিজেপিকে তিনি শিল্পপতি মুকেশ আম্বানির কৃপাধন্য বলে অভিযুক্ত করেন। বলেন, আম্বানিদের কাছ থেকে এই দুই দলই টাকা পায়। সেই আম্বানির বিরুদ্ধে তাঁর সরকার মামলা করেছে বলে দুই দল জোট বেঁধে বিলের বিরোধিতা করছে। এটাই যে সরকারের শেষ দিন, তাও বুঝিয়ে দেন। তারপর দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি দলীয় অফিসের বারান্দা থেকে পদত্যাগের কথা ঘোষণা করেন। ভাষণে দিল্লির উপরাজ্যপালকেও তিনি আম্বানির কাছের লোক বলে অভিহিত করেন।

বাড়ি ছেড়েছে দুই লাখ মানুষ

ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপের মাউন্ট কেলুদ আগ্নেয়গিরির
অগ্ন্যুত্পাতের ছাই-ভস্মে ঢেকে গেছে কয়েক কিলোমিটার
এলাকার বাড়িঘর ও রাস্তাঘাট। এর মধ্যেই গতকাল নিরাপদ
আশ্রয়ের উদ্দেশে বের হন সেখানকার বাসিন্দারা। ছবি: রয়টার্স
ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপে গত বৃহস্পতিবার অগ্ন্যুৎপাতের কারণে অন্তত দুই লাখ বাসিন্দা ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। অগ্ন্যুৎপাতের ছাই, পাথর ও বালিতে ঘর চাপা পড়ে দুই ব্যক্তি প্রাণ হারিয়েছে। দুর্ঘটনার আশঙ্কায় সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সাতটি বিমানবন্দর। জাভা দ্বীপের পূর্বাঞ্চলে মাউন্ট কেলুদ আগ্নেয়গিরি থেকে বৃহস্পতিবার রাতে ওই অগ্ন্যুৎপাত শুরু হয়। এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে অগ্ন্যুৎপাতের সতর্কতা জারি করে কর্তৃপক্ষ। ইন্দোনেশিয়ার আগ্নেয়গিরিগুলোর মধ্যে মাউন্ট কেলুদকে অন্যতম বিপজ্জনক বলে বিবেচনা করা হয়।
ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় দুর্যোগ সংস্থার মুখপাত্র সুতোপো পুরো নুগ্রহো জানান, মাউন্ট কেলুদের চারপাশের ১০ কিলোমিটার এলাকার বাসিন্দাদের বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে বলা হয়েছে। ওই এলাকাগুলোর ৩৬টি গ্রামের অন্তত দুই লাখ বাসিন্দা বাড়িঘর ছেড়ে চলে গেছে। মুখপাত্র বলেন, ‘অগ্ন্যুৎপাতের ছাই-ভস্ম আগ্নেয়গিরির অবস্থান থেকে চারপাশের প্রায় ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে। জ্বালামুখে অবিরামভাবে আগুনের শিখা দেখা যাচ্ছে।’ প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, গতকাল শুক্রবার ছাই-ভস্মের উদিগরণ কিছুটা কমে যাওয়ায় বাড়িঘর ছেড়ে যাওয়া অনেকেই পোশাক ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নেওয়ার জন্য বাড়িতে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই উদিগরণ বেড়ে যাওয়ায় তারা ফিরে যেতে বাধ্য হয়। বিবিসি ও আল-জাজিরা। এএফপি।

‘গণমাধ্যমে অনুরোধ এখন উপদ্রব’ by জাকারিয়া পলাশ

দৈনিক আমাদের অর্থনীতি সম্পাদক নাঈমুল ইসলাম খান বলেছেন, স্বাধীন সাংবাদিকতায় বৈরিতা-হুমকির সঙ্গে ইদানীং নতুন উপদ্রব হচ্ছে ‘অনুরোধ’। এর সঙ্গে রয়েছে ভীতি ও মিত্রতাজনিত সেলফ সেন্সরশিপ।
এ নিয়েই চলছে দেশের গণমাধ্যম। মানবজমিনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সাংবাদিকতার রূপ বদলায়, ক্রমান্বয়ে বিবর্তন হয়। ক্ষেত্র বিস্তৃত হয়। এটা হলো দার্শনিক সত্য। আমরা ২০ বছর আগে সাংবাদিকতায় যে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতাম এখনকার চ্যালেঞ্জ তার চেয়ে ভিন্নতর। অনেক ক্ষেত্রে আরও কঠিন, আরও দুরূহ। একই সঙ্গে প্রযুক্তির উন্নয়নের কারণে কিছু কিছু কাজ সহজ, স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ হয়েছে। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের মতো ঘটনা আমাদের জাতীয় জীবনে আগে কখনও ঘটেনি। এমন একটা ঘটনার সঙ্গে সাংবাদিকদেরও মানিয়ে নিতে সময় লাগছে। এর আগেও নতুন অবস্থায় মানিয়ে নিতে গিয়ে এমন অবস্থা দেখা গেছে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনা কতটা স্পর্শকাতরতা মাথায় রেখে কাভার করতে হবে তা খাপ খাইয়ে নিতে একটু সময় লেগেছে। সিলেটে মাগুরছড়ায় গ্যাস ফিল্ডে আগুন লাগার পর তা নেভাতে যে যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয় তার নাম লিখতেও আমরা ভুল করেছি। আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতাতেও এমনটা হয়ে থাকে। বাবরি মসজিদ যখন ভাঙা হলো তখন পাশ্চাত্যের অনেক নামী পত্রিকাও তার বিবরণ দিতে অক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। একটা মসজিদের কোনটা মিনার কোনটা মিম্বর- এ পার্থক্য তাদের কাছে সহজ ব্যাপার ছিল না। সাংবাদিকতায় নতুন পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জ, বৈরিতার চ্যালেঞ্জ, হুমকি-ধমকি সব কিছুই নতুন রকম। এ সময়েও আমাদের নতুন অভিজ্ঞতা। এখন টেলিভিশনের ব্যাপক বিস্তৃতি হয়েছে। নতুন নতুন সংবাদপত্র এসেছে। এগুলোর মালিকানার আবার স্বরূপ আছে। ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর মালিকানায় বড় প্রকাশনার পত্রিকা আসছে। পয়সাওয়ালারা পত্রিকা করবে, টিভি করবে এটা আমি খারাপ অর্থে বলি না। কিন্তু এই যে ব্যবসায়িক নিয়ন্ত্রণ এটা অসুবিধার। আর অন্যদিকে রয়েছে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ। অনেকেই গণমাধ্যম করছেন যার একটা রাজনৈতিক পরিচয় আছে বা তারা কোন দলের সদস্য। তার সঙ্গে চিরন্তন হুমকি তো কমবেশি অব্যাহত আছে ঢাকার ভেতরে ও বাইরে। সঙ্গে আবার সাম্প্রতিককালে নতুন শব্দ হলো ‘অনুরোধ’। অনুরোধের ঢেঁকি গেলা এখন নতুন উপদ্রব। অনেক ক্ষেত্রে হুমকি আসে না। অনুরোধ আসে, প্লিজ! এ কথাটা লিখবেন না। এই যে অনুরোধ এটা ব্যক্তির কাছ থেকে আসে। প্রতিষ্ঠান থেকে আসে। এটাও সাংবাদিকতার জন্য একটা চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের চরিত্র এবং আমাদের রাজনীতির সংঘাতময় পরিবেশের কারণে হুমকি ও অনুরোধের চ্যালেঞ্জ বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে আমরা সেলফ সেন্সরশিপেও যাচ্ছি। এটি আবার দুই প্রকার আছে। একটা হচ্ছে ভীতিজনিত সেলফ সেন্সরশিপ। আরেকটা রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা বা মিত্রতার জন্য সেলফ সেন্সরশিপ। বাংলাদেশের সাংবাদিকতা যদি আরেকটু ফেয়ার হয়, ভাল হয়- জাতিসংঘের দূত অসকার ফারনান্দেজ-তারানকোর এ বক্তব্য উল্লেখ করে নাঈমুল ইসলাম খান বলেন, তার মানে তিনি কি উপলব্ধি করেছিলেন, আমরা সম্ভবত সম্পূর্ণ ফ্রি ও ফেয়ার থাকতে পারছি না। এর সব কিছুই আমাদের সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ। এ অবস্থায় তিনি নিজের নীতি প্রসঙ্গে বলেন, আমি সাংবাদিকতার স্বাধীনতার জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত না। আজকে আমি যেটুকু পারলাম না সেটা আগামী দিনের আমার বুদ্ধি-বিবেচনা, সাহস ও কৌশলের সমন্বয়ে আগামীতে করবো। এখন টিকে থেকে অস্তিত্ব রক্ষা করতে চাই। যদি প্রতিকূলতার জন্য আমি একটা রিপোর্ট না করতে পারি আপাতত সময়-সুযোগের জন্য আমি অপেক্ষা করবো। এতে হতাশাবোধ করলেও আমার মধ্যে কোন আত্মাহুতির প্রবণতা কাজ করে না। আমি শহীদ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বাস করি না। চ্যালেঞ্জের মধ্যেও গণমাধ্যম কাজ করছে দাবি করে তিনি বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে বহুত্ববাদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে হবে। নিজের স্বার্থে, মালিকের স্বার্থে, ভয়ে বা চাপে এক পত্রিকা যা করতে পারছে না অন্য পত্রিকা তা করছে। সুতরাং, সামগ্রিক অর্থে কেউ না কেউ দায়িত্ব পালন করছে। সেটা দিয়েই আমি আমাদের অর্জনগুলো হিসাব করি। প্রতিটি পত্রিকা সব বিষয়ে দায়িত্ব পালন করবে- এমনটা বাস্তবসম্মত নয়, সেটা আশা করাও অন্যায় মনে করি। বর্তমান অবস্থা দীর্ঘদিন চললে কি হবে? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, যে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার এসেছে তাতে রাজনৈতিকভাবে প্রধান বিরোধী দল সংসদের বাইরে রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এ অবস্থা বিরাজ করলে তা আমাদের গণতন্ত্র, অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থের অনুকূল নয়। এর একটা পরিবর্তন হতে হবে। পরিবর্তন কত দ্রুত হবে তার চেয়ে জরুরি বিষয় হচ্ছে সব পক্ষ সমাধানের জন্য কতটুকু এগিয়ে আসছে। সব পক্ষ এগিয়ে এলে তাতে একটু বেশিও যদি সময় লাগে সে সময়টা তো কাটবে সমঝোতার প্রয়াসে। সে সময়টুকু তো খারাপ কাটবে না। তাতে একটা দীর্ঘস্থায়ী সমাধান হতে পারে। সব বিষয়ে সমঝোতা হতে পারে।

‘গণমাধ্যমে অনুরোধ এখন উপদ্রব’ by জাকারিয়া পলাশ

দৈনিক আমাদের অর্থনীতি সম্পাদক নাঈমুল ইসলাম খান বলেছেন, স্বাধীন সাংবাদিকতায় বৈরিতা-হুমকির সঙ্গে ইদানীং নতুন উপদ্রব হচ্ছে ‘অনুরোধ’। এর সঙ্গে রয়েছে ভীতি ও মিত্রতাজনিত সেলফ সেন্সরশিপ।

‘বেবি ডল’ নিয়ে আলোচনায় সানি

মার্চের প্রথম দিকেই মুক্তি পেতে যাচ্ছে বর্তমান সময়ের বলিউডের আলোচিত তারকা সানি লিওন অভিনীত ‘রাগিনি এমএমএস ২’ ছবিটি। হরর-থ্রিলারনির্ভর এ ছবিটি প্রযোজনা করছেন একতা কাপুর।
নির্মাণের ঘাষণা দেয়ার পর থেকেই ছবিটি নিয়ে দর্শকদের কৌতূহলও তৈরি হয়েছে প্রবলভাবে। তবে মুক্তির আগে সম্প্রতি ভালবাসা দিবসে প্রকাশ করা হয়েছে এই ছবিতে সানি লিওনের একটি হট আইটেম গান। ‘বেবি ডল’ শীর্ষক এই আইটেম গানটি এরই মধ্যে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে ইউটিউব ও টিভি চ্যানেলে মুক্তি দেয়া এই আইটেম গানটিতে ব্যাপক খোলামেলারূপে দর্শকদের সামনে হাজির হয়েছেন সানি। শুধু তাই নয়, এখানে তাকে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ আবেদময়ীরূপে উপস্থাপন করা হয়েছে। গানে বেশ কিছু অন্তর্বাস ও একেবারেই ছোট ছোট টপস পরে ক্যামেরাবন্দি হয়েছেন তিনি। এখানে তিনি পারফর্মও করেছেন অসাধারণ। এরই মধ্যে অত্যন্ত অল্প সময় ইউটিউবে গানটি উপভোগ করেছেন রেকর্ড সংখ্যক দর্শক। প্রচারের একদিনের মাথায়ই বেশ কয়েকটি বলিউডভিত্তিক গানের চ্যানেলে টপচার্টের শীর্ষে অবস্থান করছে সানি লিওনের ‘বেবি ডল’। ছবির প্রচারণায় গানটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে ইতিমধ্যে। সব মিলিয়ে বলা যায় অভাবনীয় আলোড়ন তুলেছে সানি লিওনের এই আইটেম গানটি। এদিকে ছবিতে সময়ের আলোচিত সংগীত তারকা হানি সিংয়ের সঙ্গেও একটি গানে পারফর্ম করেছেন সানি। আগামী কিছুদিনের মধ্যেই সেটি অনএয়ার হবে। ‘বেবি ডল’ গানটির সাড়া নিয়ে দারুণ খুশি সানি লিওন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘লায়লা’র পর এটি আমার দ্বিতীয় আইটেম গান। ভাবতে পারিনি অল্প সময়ের মধ্যে এতোটা রেসপন্স পাবো। আমি কৃতজ্ঞ আমার ভক্ত-দর্শকদের কাছে। ফেসবুক, টুইটার, ই-মেইল, ফোন, এসএমএসে  সবাই আমাকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। আশা করছি গানটির মতো করে ছবিটিও দর্শক পছন্দ করবেন। কারণ, গতানুগতিক ধারার বাইরের কাহিনীর একটি ছবি এটি। আমি নিজে অনেক আশাবাদী ‘রাগিনি এমএমএস-২’ ছবিটি নিয়ে।

‘বেবি ডল’ নিয়ে আলোচনায় সানি

মার্চের প্রথম দিকেই মুক্তি পেতে যাচ্ছে বর্তমান সময়ের বলিউডের আলোচিত তারকা সানি লিওন অভিনীত ‘রাগিনি এমএমএস ২’ ছবিটি। হরর-থ্রিলারনির্ভর এ ছবিটি প্রযোজনা করছেন একতা কাপুর।

মস্কোর দিকে ঝুঁকছেন ফিল্ড মার্শাল সিসি!

আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, তিনিও চান, মিসরের সেনাপ্রধান ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফিল্ড মার্শাল আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হোন। গতকাল বৃহস্পতিবার মস্কোতে সিসির সঙ্গে বৈঠকে এ কথা বলেন পুতিন। ২০০ কোটি ডলারের অস্ত্রচুক্তি নিয়ে ওই বৈঠক হয়। রাশিয়ার সঙ্গে নতুন করে এত বড় অঙ্কের অস্ত্রচুক্তির ফলে ধারণা করা হচ্ছে, দীর্ঘদিনের মিত্র ওয়াশিংটন থেকে মিসরের সহায়তা আগের তুলনায় কমে আসছে। তাই তিনি রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছেন। ঊর্ধ্বতন রুশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে যোগ দিতে সিসি ও মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নাবিল ফাহমি গত বুধবার মস্কো পৌঁছান। গতকাল তাঁরা পুতিন ছাড়াও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। মিসরে গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে গত জুলাইয়ে ফিল্ড মার্শাল সিসির নেতৃত্বে সেনাবাহিনী ক্ষমতাচ্যুত করে। আগামী মধ্য এপ্রিলে অনুষ্ঠেয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সিসি যে প্রার্থী হচ্ছেন,
তা এখন অনেকটা নিশ্চিত। মস্কোর কূটনীতিক সূত্র গতকাল জানায়, আলোচনায় মিসরে রুশ সমরাস্ত্র সরবরাহের বিষয়ের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য বিষয় নিয়েও কথা হয়। এ বিষয়ে বিস্তারিত আর কিছু জানানো হয়নি। মিসরের সেনাপ্রধান সিসি বলেন, ‘আমাদের এ সফরের মধ্য দিয়ে সামরিক ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে মস্কো ও কায়রোর সহায়তার এক নতুন দ্বার উন্মোচিত হলো।’ মুরসিকে উৎখাতের জেরে মিসরে বার্ষিক সামরিক সহায়তার পরিমাণ কমিয়ে দেয় ওয়াশিংটন। এই প্রেক্ষাপটে মিসরের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা করছে মস্কো। এএফপি ও বিবিসি।

বিয়ন্সের প্রেমে মজেছেন ওবামা!

একসঙ্গে প্রেসিডেন্ট ওবামা (ডানে) ও বিয়ন্স নোয়েলস
জনপ্রিয় মার্কিন পপতারকা বিয়ন্স নোয়েলস আর প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কি প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছেন? ওবামা-মিশেল দম্পতির সম্পর্কে তবে কি ভাঙনের সুর? এ রকমই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়ে গুঞ্জনে মেতে উঠেছে ফরাসি গণমাধ্যম। গুঞ্জন এতটাই জোরাল যে ফ্রান্সের গণমাধ্যম ওবামা ও ফার্স্টলেডি মিশেলের বৈবাহিক জীবনের খুঁটিনাটি সমস্যাগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরে দাবি করেছে, বিয়ন্সের জালে জড়িয়ে ওবামা শেষ পর্যন্ত স্ত্রী মিশেলকে সম্ভবত ছাড়তেই চলেছেন। বিয়ন্স-ওবামার কথিত প্রেম নিয়ে প্রথম রসালো মন্তব্য ছড়ায় বেতার চ্যানেল ইউরোপ ওয়ান গত সোমবার সকালে।
খবরে বলা হয়, ফরাসি আলোকচিত্রী পাসকেল রোস্টাইন ওবামা-বিয়ন্সের সম্পর্কের কথা ফাঁস করেছেন। সম্প্রতি ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ ও অভিনেত্রী জুলি গায়েতের গোপন অভিসারের ছবি তুলে পাপারাজ্জি পাসকেল আলোচনায় আসেন। জুলির সঙ্গে মেলামেশার জের ধরে ওলাঁদ-ত্রিয়াবেলার দম্পতির সম্প্রতি বিবাহবিচ্ছেদ ঘটেছে। পাসকেল ইউরোপ ওয়ান বেতারকে সোমবার এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আপনারা জানেন, এ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রে বিশাল কিছু ঘটতে চলেছে। আমরা একে বিকৃত রুচির এমনটা বলতে পারি না—এটি, প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও বিয়ন্সের সম্পর্কের খবর। আমি বলতে পারি, এ নিয়ে গোটা বিশ্ব কথা বলবে।’ পাসকেল বলেন,ওয়াশিংটন পোস্ট এমন একটি প্রতিবেদন ছাপতে পারে বলে তাঁর কাছে তথ্য রয়েছে। তবে পত্রিকাটি এ রকম খবর তাদের কাছে থাকার কথা নাকচ করে দিয়েছে। বিয়ন্সের একজন মুখপাত্রও ওবামার সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্কের খবর হাস্যকর বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। টাইম, হাফিংটন পোস্ট।

৬৫ বন্দীকে মুক্তি দিল আফগান সরকার

যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি উপেক্ষা করে বাগরাম কারাগার থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার ৬৫ তালেবান সদস্যকে মুক্তি দিয়েছে আফগানিস্তান সরকার। হামিদ কারজাই সরকারের এই সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়ে ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছে বারাক ওবামা প্রশাসন। কারাবন্দীদের মুক্তি দেওয়ার পক্ষে আফগান সরকারের যুক্তি হলো, ওই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ নেই। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বলছে, ওই বন্দীরা আফগান বেসামরিক নাগরিক ও ন্যাটো বাহিনীর ওপর হামলার জন্য দায়ী। মার্কিন বাহিনী গত বছর বাগরাম কারাগারের নিয়ন্ত্রণ আফগান সরকারের হাতে ছেড়ে দেয়। আফগান সরকারের কর্মকর্তা আবদুল শুকুর দাদরাস জানান, বাগরাম কারাগার থেকে ৬৫ জন বন্দীকে বৃহস্পতিবার সকালে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সামরিক পুলিশের প্রধান লে. জেনারেল গোলাম ফারুকও বন্দীদের মুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেন। আফগানিস্তানে মার্কিন দূতাবাস থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘বাগরাম কারাগার থেকে ৬৫ বন্দীকে মুক্তি দেওয়ার খবরে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিরা সাংঘাতিক অপরাধের সঙ্গে জড়িত। আফগান আইনে তাঁদের বিচারের মুখোমুখি করা উচিত। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘আমরা আফগান সরকারকে অনুরোধ করব, প্রতিটি ব্যক্তির অপরাধ পর্যালোচনা করে দেখা...আফগান সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার দায়ভার আফগান সরকারকেই বহন করতে হবে।’ বাগরাম থেকে গতকালই মুক্তি পাওয়া ১৬ বছর বয়সী কিশোর মুহিবুল্লাহ জানায়, সে এক বছরের বেশি সময় ধরে বন্দী ছিল।
হেলমান্দ প্রদেশে বাসিন্দা মুহিবুল্লাহ পরিবারের সঙ্গে কৃষিকাজ করত। সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ ছাড়াই তাকে আটক করা হয়। মুক্তি পাওয়ার পর ক্ষুব্ধ কণ্ঠে মুহিবুল্লাহ বলে, ‘আমাদের সম্পর্কে কেউ কিছু জিজ্ঞেস পর্যন্ত করেনি। আমি এক বছর মা-বাবাকে ছেড়ে দূরে থাকলাম। কেন? আমার অপরাধ কী?’ এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়, বাগরাম থেকে মুক্তি পেলে ওই ব্যক্তিরা আবার ন্যাটো ও আফগান বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করতে পারে। তবে আফগান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই ওই কারাগারকে ‘তালেবান উৎপাদনের কারখানা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ওই কারাগারে কয়েকজন বন্দীকে এত নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়েছে যে তারা এখন নিজের দেশকে ঘৃণা করতে শুরু করেছে। মার্কিন আপত্তি উপেক্ষা করে ৬৫ জনকে মুক্তি দেওয়ার বিষয়টি আফগান-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের চলমান তিক্ততাকে আরও তীব্র করে তুলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ আফগানিস্তান থেকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনী প্রত্যাহারের কথা রয়েছে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর পর মার্কিন বাহিনী আফগানিস্তানে অভিযান চালায়। এর পর থেকেই তালেবানসহ কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করছে যুক্তরাষ্ট্র। এএফপি ও বিবিসি।

ভালোবাসি তাই, ভালো কাজ চাই

৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে বিদেশি কূটনীতিকদের, আন্তর্জাতিক নানা সংস্থার ব্যাপক তৎপরতা দেখা দিয়েছিল। একদিকে আমেরিকা থেকে উড়ে আসেন নিশা দেশাই, আরেক দিকে ভারত থেকে আসেন সুজাতা সিং। এই জাতিসংঘের সেক্রেটারির ফোন তো ওই ইউরোপীয় ইউনিয়নের বার্তা। তাঁরা একবার আওয়ামী লীগের নেতার সঙ্গে দেখা করেন, একবার বিএনপির নেতার সঙ্গে। তাঁরা কী বলতেন? এখন শোনা যাচ্ছে, তাঁরা বিএনপির নেতাদের বলতেন, আপনারা নির্বাচনে অংশ নিন।
নিশা দেশাইয়ের সংবাদ সম্মেলনে তো বলেই দেওয়া হয়েছিল, নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা পাবে কি পাবে না তা নির্ভর করছে বাংলাদেশের মানুষ নির্বাচনটাকে গ্রহণ করবে কি করবে না তার ওপর। এখনো অন্তত আমেরিকানরা এই নির্বাচনকে মেনে নিয়েছে, সে রকম ভাবার কোনো কারণ ঘটেনি। কিন্তু যদি ডিআইয়ের জরিপ ঠিক হয়ে থাকে, তাহলে নির্বাচনের পর জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি অর্জন করেছে আওয়ামী লীগ। নির্বাচনের পর প্রশ্ন করা হয়েছিল, সব দল অংশ নিলে আপনি কাকে ভোট দিতেন। ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ বলেছেন, তাঁরা আওয়ামী লীগকেই ভোট দিতেন। আর ৩৭ দশমিক ৬ শতাংশ বলেছেন, তাঁরা ভোট দিতেন বিএনপিকে। অথচ নির্বাচনের আগের জরিপে দেখা গিয়েছিল, প্রায় ৫০ ভাগ মানুষ বিএনপিকে ভোট দিতে চান। এর ব্যাখ্যা নিশ্চয়ই একেকজন একেক রকমভাবে দেবেন। আমাদের মনে হচ্ছে, বিএনপির নির্বাচন বর্জন করাটাকেই দেশের মানুষ ঠিকভাবে গ্রহণ করেনি। তার ওপর জামায়াতের সঙ্গে পরিচালিত আন্দোলনের নামে যেভাবে পেট্রলবোমা ছুড়ে মারা হয়েছে, মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে আর স্কুল-কলেজে আগুন দেওয়া হয়েছে, সেটাকেই বা কে সমর্থন করবে? মার্চ ফর ডেমোক্রেসিতে কোথাও কোনো মার্চ হয়নি। এমন দুর্বল দলের ভোট না কমার কি কোনো কারণ আছে?
আবার নির্বাচনের নামে যা হয়েছে, তা খুবই দৃষ্টিকটু। এক এরশাদ সাহেবকে নিয়ে যে নাটক হয়ে গেছে, তা মলিয়েঁরের মতো কমেডি নাটক-রচয়িতার পক্ষেও কল্পনা করা অসম্ভব ছিল। ১৫৩টা আসনে ভোটই হয়নি। তার পরও দেশের মানুষের মধ্যে এখন কিন্তু একটা স্বস্তির ভাব। কারণ অনির্দিষ্টকালের জন্য ঘোষণা করা অবরোধটা এখন আর নেই। এখন বিএনপি কী করবে? আমেরিকানরা চায়, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আরেকটা সর্বগ্রহণযোগ্য নির্বাচন হোক। গতকাল ঢাকা ট্রিবিউন পত্রিকায় প্রকাশিত একটা জনমত জরিপেও দেখা যাচ্ছে, দেশের বেশির ভাগ মানুষ তাড়াতাড়ি আরেকটা নির্বাচন চায়। এখন আসুন একটা কল্পনা করি, সরকার আরেকটা নির্বাচন দিচ্ছে। সেই নির্বাচন কি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে দেবে? কোনো কারণ দেখি না। প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে শেখ হাসিনা সরে যাবেন? মনে হয় না। তাহলে সেই নির্বাচনে বিএনপি কেন যাবে? যদি যায়, তাহলে প্রশ্ন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে কেন তারা তাহলে গেল না? এত প্রাণহানি, এত অঙ্গহানি, এত সম্পদ ধ্বংসের দায় কে নেবে? কাজেই খুব তাড়াতাড়ি দেশে একটা নির্বাচন হচ্ছে, এই সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। এই সরকার বেশ কিছুদিনের জন্য রয়ে যাচ্ছে, এই হলো আমার ভবিষ্যদ্বাণী। নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধবেরা বলেছিলেন, সরকার একতরফা নির্বাচন করে ক্ষমতায় এসে ভালো ভালো কাজ করবে। জনগণের মন জয় করে বিপুলভাবে জনপ্রিয়তা ফিরিয়ে আনবে। তারপর আবার একটা নির্বাচন দেবে। শুনে আমি প্রশ্ন করেছিলাম, সরকার যদি জানেই যে ভালো ভালো কাজ করলে জনপ্রিয়তা অর্জন করা যায়, গত পাঁচ বছরে তা বেশি বেশি করে করল না কেন? এই দেশের নিয়ম হলো, যে ক্ষমতায় থাকে, সে জনপ্রিয়তা হারায়।
কিন্তু এই প্রথম এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটল, ডিআইয়ের জরিপে যার প্রতিফলন ঘটেছে। ক্ষমতা ধরে রাখতে পারার সাফল্যে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা বেড়ে গেছে। এখন আওয়ামী লীগের সরকার ভালো ভালো কাজ করুক। আপনারা প্রশ্ন করতে পারেন, আওয়ামী লীগের সরকার ভালো ভালো কাজ করে জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে ক্ষমতায় বহুদিন থাকুক, আপনি তা-ই চান? আমি বলব, আমি চাই সরকারের ভালো ভালো কাজ। যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, তার কাজকর্মে যদি দেশের ভালো হয়, মানুষের ভালো হয়, আমি এক শ বার সেটাই চাইব। গতকাল প্রকাশিত একটা খবরে আশার সঞ্চার হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন গত মহাজোট সরকারের দুজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীকে তলব করেছে। একটা সূত্রে খবর পেয়েছি, বেশ কজন সাবেক মন্ত্রী সম্পর্কে তদন্তে নামার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী দুদককে অনুমোদন দিয়েছেন। এটা একটা সংকেত। এর আগেও শোনা গিয়েছিল, হলফনামায় মন্ত্রী-সাংসদদের সম্পদের রকেটগতির উল্লম্ফন দেখে প্রধানমন্ত্রী নাকি বলেছেন, এঁদের দায়দায়িত্ব দল নেবে না, দুদক এসবের তদন্ত করবে। সরকারের কাছে মানুষের চাওয়া দুটো: দুর্নীতি না করা, আর দক্ষতা। পদ্মা সেতু চাই, বিদ্যুৎ চাই, যোগাযোগ, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি চাই, আইনের শাসন চাই, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা চাই, মানবাধিকারের প্রতিষ্ঠা চাই, খেয়ে-পরে বাঁচতে চাই, লেখাপড়ার পরিবেশ চাই। আর চাই গণতান্ত্রিক আচরণ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর গুলি করা কোনো যুক্তিতেই মেনে নেওয়া যায় না। একটা ছবিতে দেখা গেছে, একজন ছাত্রর পিঠে ছর্রা গুলির অসংখ্য দাগ। আর দেখা গেছে, ছাত্রলীগের ছেলেরা পিস্তল/রিভলভার উঁচিয়ে গুলি ছুড়ছে। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের দাবি যত অযৌক্তিকই হোক না কেন, কোনো অবস্থাতেই পুলিশ তাদের ওপর গুলি ছুড়তে পারে না। এটা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না।
আগে তো ক্যাম্পাসে পুলিশের ঢোকাই নিষেধ ছিল, বিশেষ অনুমতি ছাড়া পুলিশ কখনো শিক্ষাঙ্গনে ঢুকত না। এখন পুলিশ ছাত্রদের ওপর রাবার বুলেট হলেও ছুড়ছে! এটা একেবারেই কাম্য নয়। আর ছাত্রলীগের নেতাদের গুলি করার ছবি? কারোরই গুলি করার অধিকার নেই, সে ছাত্রলীগ হোক, ছাত্রদল হোক আর অছাত্র হোক বা নির্দলীয় ছাত্র হোক। ছাত্রদের আন্দোলন রুখতে ছাত্রলীগ শক্তির মহড়া দেখাবে, এটা তো কৌশল হিসেবেও খুবই অকার্যকর, খুবই বিপজ্জনক। বিশ্বজিৎ হত্যার ঘটনার পরও কি এদের শিক্ষা হয় না? nতবে হ্যাঁ, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন বাড়ানো যাবে না, রাতের শিফট চালু করা যাবে না—এই অবস্থানও ঢালাওভাবে ঠিক নয়। অধিকাংশ শিক্ষার্থীই মোবাইল ফোনে মাসে তিন-চার শ টাকা খরচ করেনই। সেখানে এক শ টাকা বেতন দেওয়া যাবে না, এটা হয়তো সাধারণভাবে ঠিক নয়। হ্যাঁ, গরিব ছাত্রদের জন্য ফুল ফ্রি, হাফ ফ্রি এমনকি বৃত্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে। সম্পন্ন পরিবারের সন্তানেরা বেশি করে বেতন দেবেন, অসচ্ছল পরিবারের সন্তানেরা উল্টো বৃত্তি পাবেন। উন্নত দেশেও এটাই প্রচলিত। আবার ওয়াকিফহাল মহল বলছে, শুধু বেতন বৃদ্ধি কিংবা সান্ধ্য কোর্স চালুর প্রতিবাদেই এই আন্দোলন ছিল না, এর পেছনে ছিল ফল হতে দেরি হওয়া বা পরীক্ষার ফি বেশি বেশি নিয়ে ভাগ করে নেওয়ার মতো নানা অভিযোগ। যেটাই হোক, ক্ষোভের প্রকৃত কারণ বের করে তা নিরসন করতে হবে। গুলি কোনো সমস্যারই সমাধান নয়। আর সব সময় আন্দোলনই বা করতে হবে কেন? বইমেলায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঢোকার মুখে দেখি আলো নেই, তোরণ দেখা যায় না। সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরকে আমি বহুদিন থেকে চিনি। আমি তাঁকে ফোন করে জানালাম, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশমুখে আলো চাই।
দুই ঘণ্টার মধ্যে দেখি আলো ঝকমক করছে। আমরা বাংলা একাডেমির অমর একুশে বইমেলায় শুধু বাংলাদেশের বই-ই দেখতে চাই। আবার আমরা অন্য দেশের বই পড়ব না বা কলকাতা থেকে প্রকাশিত শঙ্খ ঘোষ, কিংবা অমিয়ভূষণ মজুমদারের বই সহজে পাব না, তাও তো ঠিক নয়। সে জন্য একটা আন্তর্জাতিক বইমেলা করা হোক আলাদা করে, আগে যেটা জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র করত ঢাকা বইমেলা নামে। কোনো অসুবিধা নেই। প্রতিযোগিতাকে আমরা ভয় পাই না। রাস্তায় সুনীল-শীর্ষেন্দুর নকল বই খুব কম দামে পাওয়া যায়, তা সত্ত্বেও বইমেলায় ঢুকে বেশি বেশি দাম দিয়ে পাঠক দেশি লেখকদের বই কিনছেন তো! কারণ পঞ্চাশের দশকের ঢাকার বর্ণনা সৈয়দ শামসুল হকের তিন পয়সার জোছনাতেই কেবল পাওয়া যাবে, যেমন বীরাঙ্গনার কথা পাওয়া যাবে সেলিনা হোসেনের গেরিলা ও বীরাঙ্গনায়। হুমায়ূন আহমেদ আর মুহম্মদ জাফর ইকবালের একাত্তরের ডায়েরি আমার বাবা ও একাত্তর তো কলকাতার বইয়ে পাওয়া যাবে না। এসব প্রসঙ্গেও আন্দোলন করতে হবে বলে মনে করি না, শুধু ঠিক জায়গায় প্রত্যাশার কথাটা জানানোই যথেষ্ট। তাই জানিয়ে রাখি। বাংলা একাডেমির অমর একুশে বইমেলায় বিদেশি বই চাই না। আর এবারের বইমেলা রাত নয়টা পর্যন্ত খোলা রাখা হোক। অফিস সেরে যানজট ঠেলে বইমেলায় পৌঁছাতেই তো আটটা বেজে যায়। আজ ভালোবাসা দিবস। এই দিনে ভালোবাসার কথা না বলে কী বলছি এসব! আসলে ভালোবাসার কথাই বলছি। আমাদের সবচেয়ে প্রিয় ভালোবাসার সংলাপ তো ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’। সে কারণেই আমরা সরকারগুলোর কাছে ভালো ভালো কাজ চাই। ভালো ভালো কাজ করে জনগণের হূদয় হরণের প্রতিযোগিতার চেয়ে ভালো প্রতিযোগিতা আর কী হতে পারে?
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

১৪ ফেব্রুয়ারি: এক রক্তঝরা দিন

আজ থেকে ৩১ বছর আগের সেই রাতের কথা প্রধানমন্ত্রীর ভুলে যাওয়ার কথা নয়। বেইলি রোডে আওয়ামী লীগের তৎকালীন প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. কামাল হোসেনের বাসায় বিএনপি ছাড়া অন্য সব রাজনৈতিক দলের নেতারা বৈঠকে বসেছেন। ঢাকায় সেদিন ছাত্র আন্দোলন দমনে পুলিশের গুলিবর্ষণ এবং ছাত্রহত্যা-পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও করণীয় নিয়ে আলোচনাই ছিল ওই বৈঠকের উদ্দেশ্য। কিন্তু সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদের বাহিনী বাড়িটি ঘিরে ফেলে রাজনীতিকদের সবাইকে ধরে নিয়ে যায়। ড. কামালসহ পুরুষ নেতাদের সবাইকে চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয় অজ্ঞাত স্থানে, যেটা সেনানিবাসের ভেতরে একটি জায়গায় বলেই আটক রাজনীতিকদের ধারণা। তবে শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় আরও দুজন নারীনেত্রীকে নেওয়া হয় কাছেই মিন্টো রোডে স্পিকারের জন্য নির্ধারিত বাসভবন, দোতলা লাল দালানটিতে। তাঁদের অবশ্য চোখ বাঁধা ছিল না বলেই জেনেছি। সেই রাতে ভবনটিতে থাকা সেনাদলের দায়িত্বে ছিলেন যে মেজর, তাঁর কাছ থেকেই শুনেছি যে নেত্রীত্রয়ের রাত কেটেছিল নিচতলাতেই সোফায়। মশার কামড় আর শীতের কাঁপুনি—দুটির কোনোটি থেকে তাঁরা রেহাই পাননি। আমাদেরও সেই রাতটি কেটেছিল মশার কামড় আর শীতের কাঁপুনিতে। সূর্য সেন হলের পেছনে একজন হাউস টিউটরের খালি বাসায় আমরা তিনজন—মরহুম অলি আহাদের নেতৃত্বাধীন ডেমোক্রেটিক লীগের ছাত্রসংগঠনের সভাপতি কায়েস (বছর কয়েক আগে তাঁর মৃত্যু হয়েছে), জাতীয় ছাত্র আন্দোলনের শরিফুল ইসলাম আলমাজি ও আমি। দরজা বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে আমরা আলো নিভিয়ে সেখানে পালিয়ে ছিলাম।
ওই শিক্ষকের পরিবারের কেউ একজন বিদেশ যাবেন বলে তাঁরা সবাই বিমানবন্দরে গিয়ে আটকা পড়েছিলেন। রাতভর সূর্য সেন, মুহসীন ও জসীমউদ্দীন হলগুলোতে বুটের আওয়াজ, ছাত্রদের মারধরের শব্দ, কান্না আর চিৎকার শুনেছি এবং ক্ষণে ক্ষণে আঁতকে উঠেছি। পরে শুনেছি, কয়েক শ ছাত্রকে (এমনকি হাজারও ছাড়িয়ে যেতে পারে) সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের খালি মাঠে রাতভর বসিয়ে রাখা হয়েছে। অনেক দিন আগে থেকেই ওই উদ্যানে তাঁবু খাটিয়ে সেনাবাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন রাখা হয়েছিল। শাহবাগের পুলিশের নিয়ন্ত্রণকক্ষের বাইরের আঙিনায় রাতভর অনেক ছাত্রের ওপর চলেছে নির্যাতন। স্বাধীন বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার একমাত্র সফল আন্দোলনটির সূচনা হয়েছিল যে আশির দশকে, সেই আন্দোলনের প্রথম রক্তপাতের দিনটির আজ ৩১ বছর পূর্ণ হচ্ছে। শহীদ জাফর, জয়নাল, দীপালি সাহা, মোজাম্মেল, আয়ুবসহ অজ্ঞাত কয়েকজনের রক্তে রঞ্জিত ছাত্র আন্দোলনের এক গৌরবময় দিন ১৪ ফেব্রুয়ারি। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার এক অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে সেদিন যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তাতে বিএনপি ছাড়া আর প্রায় সব দলের সহযোগী ছাত্রসংগঠনগুলো জোটবদ্ধ হয়েছিল। তারই ধারাবাহিকতায় কয়েক বছর পর তাতে বিএনপির ছাত্রসংগঠনও যুক্ত হয় এবং নব্বইয়ের ছাত্রজনতার গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন সামরিক স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ১৪ ফেব্রুয়ারির স্মৃতি আমাদের প্রজন্মের স্মৃতিতে এখনো উজ্জ্বল। বেলা সাড়ে ১১টা বা ১২টার দিকে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর মিছিল শিক্ষা ভবনের কাছে পৌঁছানোর পর পুলিশের কাঁটাতারের প্রতিবন্ধক ভেঙে ফেলার চেষ্টার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ গুলি ছোড়ে। মিছিলের সামনের দিকে ছিলেন তখনকার ছাত্রনেতাদের প্রায় সবাই।
আমি ছিলাম মিছিলের মাঝামাঝি, শিশু একাডেমীর সামনে। পুলিশ গুলি ছুড়তে শুরু করলে মিছিলের সবাই প্রাণ বাঁচাতে যে যেদিকে পেরেছেন, দৌড়ে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজেছেন। আমি গিয়েছিলাম শহীদ মিনারের দিকে এবং সেখান থেকে আবার কলা ভবনে। এর মধ্যেই দুর্দান্ত সাহসী কয়েকজন ছাত্র পুলিশের ছোবল পড়ার আগেই শহীদ জাফর ও জয়নালের মরদেহ নিয়ে আসে কলা ভবনে। অন্যদের মরদেহ পুলিশ নিয়ে গুম করে ফেলে শোনা যায়। জলকামানের পানির তোড়ে ধোয়া হয়ে যায় রক্তস্নাত রাজপথ। রাজনৈতিক নেতারা কেউ কেউ কলা ভবনে আসতে শুরু করেন সমবেদনা ও সংহতি জানাতে। শেখ হাসিনারও সেখানে আসার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই বিশ্ববিদ্যালয়ের চারপাশে অবস্থান নিয়ে পুলিশ সাঁড়াশি অভিযান চালায়। পুলিশের প্রথম লক্ষ্য, মরদেহগুলো উদ্ধার, যাতে লাশ নিয়ে কোনো মিছিল বেরোতে না পারে। এরই মধ্যে অন্তত একজনের লাশ নিয়ে একদল ছাত্র উপাচার্যের দপ্তর যে ভবনে, সেই রেজিস্টার বিল্ডিংয়ে ঢুকে পড়ে। শীতের বিকেলে দ্রুত সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। সঙ্গে সঙ্গে চারপাশে সেনাসদস্যরা অবস্থান নিতে শুরু করেন। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে বেরোনোর সব পথ বন্ধ হয়ে যায়। সন্ধ্যার পর শহরেও কারফিউ জারি করা হয়। পরদিন ঢাকা শহরের কয়েকটি কলেজে ছাত্ররা বিক্ষোভ করতে গেলে সেগুলোও নির্দয়ভাবে দমন করে পুলিশ। মহাখালীতে যেখানে এখন গাওছুল আজম মসজিদ, সেই জায়গাটি তখন ছিল ফাঁকা। তিতুমীর কলেজের একদল ছাত্রকে পুলিশ কোমরে দড়ি দিয়ে বেঁধে সেখানে প্রকাশ্যেই লাঠিপেটা করছিল। গুলিস্তান থেকে গুলশানের মধ্যে যাতায়াতকারী ৬ নম্বর বাসে বসে সেই দৃশ্য দেখে মনটা খুবই খারাপ হয়ে গিয়েছিল। তবে বছর না ঘুরতেই আবার সবাই সংগঠিত হতে শুরু করে।
১৯৮৪-এর ২৮ ফেব্রুয়ারিতে মিছিলের ওপর পুলিশের ট্রাক উঠিয়ে দিয়ে হত্যা করা হয় দুজন ছাত্র সেলিম ও দেলোয়ারকে। সেলিম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে আমার সহপাঠী ছিলেন। সে বছরই তাঁর এমএ পরীক্ষা শেষ হওয়ার কথা ছিল। ওই মিছিলেও শুরুতে আমি ছিলাম, কিন্তু ঢাকা মেডিকেল পর্যন্ত যাওয়ার পর অন্য একটি কাজে আমি মিরপুর চলে যাই। মিরপুর পৌঁছানোর পরই শুনতে পাই ওই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের কথা। আর পরের বছর ১৫ ফেব্রুয়ারিতে রাতের বেলায় বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর থেকে বেরোনোর আগেই পুলিশের গুলিতে নিহত হন জাতীয় ছাত্রলীগের নেতা রাউফুন বসুনিয়া। এরপর ছাত্র আন্দোলন সংগঠিত হতে থাকার পাশাপাশি মৃত্যুর সারিও দীর্ঘতর হতে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় শক্তির মহড়া দেওয়ার জন্য জেনারেল এরশাদ লেলিয়ে দেন জাতীয় ছাত্রসমাজ নামে সংগঠিত হওয়া কতিপয় দুর্বৃত্তকে। তাদেরই একজন আজম খানের গুলিতে নিহত হন রেডক্রসের চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগের নেতা ময়েজউদ্দিন, যাঁর মেয়ে বর্তমান মন্ত্রিসভার একজন সদস্য। পরবর্তী সময়ে কোনো এক নির্বাচনি জনসভায় আজম খানকে নিজের ছেলের সমতুল্য বলে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন জেনারেল এরশাদ। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এরশাদবিরোধী ছাত্র গণ-আন্দোলনে ঢাকায় পরবর্তী বছরগুলোতে আরও অনেকেই প্রাণ হারিয়েছেন, যাঁদের মধ্যে শহীদ ডাক্তার মিলন, নূর হোসেন, জেহাদের নাম বারবার উচ্চারিত হয় তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে। কিন্তু রাজনীতির সঙ্গে কোনো যোগসূত্র ছিল না, এমন জীবনও ওই আন্দোলনে উৎসর্গিত হয়েছে। নব্বইয়ের ডিসেম্বরে কলাবাগানের একটি বাড়ির বারান্দায় মায়ের কোলে থাকা শিশুও গুলিতে নিহত হয়েছে। এত সব মৃত্যুর দায়-দায়িত্ব অস্বীকার করার ঔদ্ধত্য দেখিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখনো টিকে আছেন সেই স্বৈরশাসক। তার সবচেয়ে বড় কারণ বোধ হয় ১৯৮৩-এর ছাত্র আন্দোলনের প্রথম সারির নেতাদের কারও কারও রাজনৈতিক আপস অথবা অক্ষমতা।
১৯৮২-এর মার্চে জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসন জারির আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু), প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউকসু, রাজশাহীর রাকসু, চট্টগ্রামের চাকসু, জগন্নাথ কলেজ, ঢাকা কলেজ, তিতুমীরের মতো কলেজগুলোর ছাত্রসংসদগুলোতে নির্বাচনের মাধ্যমে যেসব ছাত্রনেতা নির্বাচিত হয়েছিলেন, ওই আন্দোলনে তাঁদের ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নতুন দৃষ্টান্ত যোগ করেছে। তখন যেসব ছাত্রসংগঠনের সমন্বয়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়েছিল, সেসব সংগঠনের নেতারা ভবিষ্যতে এমপি বা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বা বড় বড় ব্যবসা বাড়ানোর আশায় ছাত্রসংগঠন করেছেন তা নয়। তেমনটি হলে আপসের বিনিময়ে তখনই তাঁরা কেউ কেউ তাঁদের সতীর্থ ডাকসুর তৎকালীন সাধারণ সম্পাদকের মতো এরশাদের মন্ত্রী বা উপদেষ্টা বনে যেতে পারতেন। এঁদের অনেকেই রাজনীতির নামে অপরাজনীতিতে যুক্ত হওয়া থেকে নিজেদের বিরত রেখেছেন। হাতে গোনা কেউ কেউ এখনো তৃণমুলের রাজনীতি করছেন। তবে অর্ধেকেরও বেশি, বিশেষ করে যাঁরা মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোতে সক্রিয় হয়েছেন, তাঁরা যেমন তাঁদের নিজেদের দলগুলোতে গণতন্ত্রায়ণে ব্যর্থ হয়েছেন, তেমনি ধীরে ধীরে সব আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়ে সেই সামরিক শাসকের সঙ্গে জোটের রাজনীতি করছেন। আন্দোলনের সহযোদ্ধা, মিছিলের সহগামীর রক্তে রঞ্জিত হাতের সঙ্গে হাত মেলানোর আংশিক ক্ষতিপূরণ অবশ্য তাঁরা পেয়ে গেছেন হয় মন্ত্রিত্বে, নয়তো ব্যবসা-বাণিজ্য আর অর্থসম্পদে। এসব কতিপয় আপসকামী অথবা সুযোগসন্ধানীর দৃষ্টান্ত সম্ভবত উত্তরকালের ছাত্ররাজনীতিকে কলুষিত করেছে। কেননা, এখনকার প্রজন্মের যাঁরা ছাত্ররাজনীতি করছেন, তাঁদের আকর্ষণ হচ্ছে ক্ষমতা আর বিত্ত। সেখানে কোনো আদর্শের লেশ অবশিষ্ট আছে কি না, বলা মুশকিল।

বন্যা ঝড়ে অন্ধকারে ব্রিটেন

প্রচণ্ড ঝড়ে নতুন করে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বন্যা উপদ্রুত ব্রিটেন। প্রবল বাতাসের তোড়ে দেশটির প্রায় দেড় লাখ বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ইতিমধ্যে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছেন একজন এবং দুটি ফুটবল ম্যাচ বাতিল করা হয়েছে। ইংল্যান্ডের বিভিন্ন অঞ্চল ও ওয়েলসের ওপর দিয়ে ঘণ্টায় ১শ’ মাইল বেগে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যাচ্ছে এবং টেমস নদীর পানি গত ৬০ বছরের মধ্যে এবারই প্রথম সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পাবে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। এতে পশ্চিম লন্ডনের বিভিন্ন শহর ও গ্রাম হুমকির মুখে পড়েছে।
দক্ষিণ-পশ্চিম ইংল্যান্ডের উইন্ডশায়ারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে একজনের প্রাণহানি ঘটেছে। কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রচণ্ড ঝড়ে বিশেষত ওয়েলসে বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে ১ লাখ ৪৭ হাজার বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন কর্মস্থলমুখী মানুষেরা। উত্তর ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারে ওভারহেড লাইন ভেঙে পড়ায় যাত্রীবাহী একটি ট্রেন আটকা পড়েছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা। জনৈক যাত্রী ক্যারল ম্যাকিন বিবিসি রেডিওকে বলেন, ‘আমরা কোথাও যেতে পারছি না। এটা পুরোপুরি একটা দুর্ঘটনা। এখানে সর্বত্র ছেঁড়া তার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। আমাদের কিছু করার নেই।’আবহাওয়া অফিস ওয়েলসের পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিম ইংল্যান্ডে ‘ব্যতিক্রমী ঝড়ো হাওয়ার’ সতর্কবাণী করেছে। কর্তৃপক্ষ জানায়, টেমস নদীর তীরবর্তী ১ হাজার ১শ’র বেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ২৯ জানুয়ারি থেকেই পানিতে ডুবে রয়েছে। বন্যা উপদ্রুত গ্রামগুলোতে বালির বস্তা ফেলতে এবং আটকে পড়া বাসিন্দাদের উদ্ধার করতে পর্যাপ্তসংখ্যক সৈন্য কাজ করছেন। এখানকার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে অস্থায়ী জরুরি কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

ভালোবাসা দিবস

যুগ পাল্টেছে! কলতলা থেকে কুড়ানো মুঠোভর্তি ফুল কিংবা গাঁটের কড়ি বাঁচিয়ে কেনা দু/তিন তোড়া ‘সাদামাটা’ গোলাপে প্রেয়সির খোঁপা ভরলেও মন ভরে না- মন ভোলানো কি এতই সস্তা! ভালোবাসা প্রদর্শনের এ আধুনিক তত্ত্ব সম্পর্কে বোধহয় চীনারাই বেশি সচেতন।
তাইতো যুবসমাজের মনোস্কামনা পূরণে ‘ভালোবাসা দিবস’ উপলক্ষে বিত্তমদে ভরা অভিজাত উপহার সামগ্রীর চাকচিক্যে ভরে উঠেছে রাজধানী বেইজিং’র শপিংমল। এদের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হল স্বর্নগোলাপ এবং স্যামনদানি (স্যামন মাছ দিয়ে তৈরি)। বিক্রেতাদের তথ্যমতে, দামের বাহারে খ্যাত এই দুটি ব্যতিক্রমী উপহারেরই এবার কাটতি বেশি