Monday, February 6, 2017

‘জাল ভোট’ তদন্তে কমিশন করবেন ট্রাম্প

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ২০১৬ সালের নির্বাচনে ব্যাপক জাল ভোট পড়ার অভিযোগ তদন্তে একটি কমিশন করছেন তিনি। কমিশনে নেতৃত্ব দেবেন তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স।
গতকাল রোববার ট্রাম্পের কাছ থেকে এই ঘোষণা আসে। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়। গত বছরের ৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ব্যাপক অবৈধ ভোট পড়ার​ অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তথ্য পাওয়া যায়নি। ট্রাম্প নিজেও তাঁর তোলা অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেননি। তা সত্ত্বেও জাল ভোটের অভিযোগ করছেন ট্রাম্প। সবশেষ ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প তাঁর অভিযোগের কথা ফের উল্লেখ করেছেন। ভোটে অনিয়ম কীভাবে হয়েছে, তার ধারণাপ্রসূত পন্থাও বলেছেন তিনি।ট্রাম্পের ভাষ্য, মৃত মানুষের নামে ভোট দেওয়া হয়েছে। এক ব্যক্তি দুই অঙ্গরাজ্যে ভোট দিয়েছেন।
অবৈধ ব্যক্তি, তথা যাঁরা নাগরিক নন, তাঁরা ভোট দিয়েছেন। জাল ভোটের অভিযোগ তদন্তে একটি কমিশন গঠনের বিষয়ে অঙ্গীকার করেছেন ট্রাম্প। তাঁর এই কমিশনের প্রধান হবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট পেন্স। ট্রাম্প বলেছেন, অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে। আগে ট্রাম্প অভিযোগ করেছিলেন, অবৈধ অভিবাসীদের ভোট না পড়লে পপুলার ভোটেও জয়ী হতেন তিনি। ট্রাম্পের দাবি, তাঁর নির্বাচনী প্রতিপক্ষ হিলারি ক্লিনটনের পক্ষে লাখ লাখ জাল ভোট পড়েছে। ইলেকটোরাল কলেজ ভোটে এগিয়ে থেকে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। তবে মোট ভোটের হিসাবে ট্রাম্পের চেয়ে অনেক বেশি ভোট পেয়েছেন হিলারি।

আদালতে আবার ধাক্কা খেলেন ট্রাম্প

সাত মুসলিম দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণে সাময়িক নিষেধাজ্ঞার যে নির্দেশ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল আপিল কোর্টের নির্দেশে আবারও তার বাস্তবায়ন স্থগিত হলো। গতকাল রোববার সান ফ্রান্সিসকোতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের আপিল আদালতের নবম সার্কিট আদেশটি বহাল রাখার পক্ষে ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি অগ্রাহ্য করে তা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন।
এক সপ্তাহ আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক নির্বাহী আদেশে সাতটি মুসলিম দেশ থেকে সাময়িকভাবে সব ধরনের যাত্রীর যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেন। এই সাতটি দেশ হলো ইরান, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন, সুদান, সোমালিয়া ও লিবিয়া। এই নিষিদ্ধকরণের ফলে হাজার হাজার যাত্রী তাঁদের নির্ধারিত ভ্রমণ বাতিল করতে বাধ্য হন। অনেকে মার্কিন বিমানবন্দরগুলোতে আটকা পড়েন।
এর প্রতিবাদে সারা দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরে হাজার হাজার মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। হোয়াইট হাউস থেকে প্রথমে বলা হয়েছিল, এই ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার ফলে মাত্র শ খানেক যাত্রীর ভিসা বাতিল হয়েছে। পরে তারা স্বীকার করে, এই সংখ্যা সম্ভবত ৬০ হাজারের মতো। মানবাধিকারকর্মীদের বক্তব্য, আটকে পড়া মানুষের প্রকৃত সংখ্যা ১ লাখের মতো হবে। গত শুক্রবার সিয়াটলের একজন ফেডারেল বিচারক ওয়াশিংটন ও মিনেসোটা—এ দুই অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলদের অনুরোধে ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন অবিলম্বে স্থগিত রাখার নির্দেশ দেন। হোয়াইট হাউস কোর্টের সেই নির্দেশ জাতীয় স্বার্থে বাতিলের আবেদন জানালে এর জবাবে সান ফ্রান্সিসকোর আপিল আদালত তা প্রত্যাখ্যান করেন। এই আদালতের সিদ্ধান্ত অনুসারে আপিল অনুরোধটি আদালতে পূর্ণ শুনানি না হওয়া পর্যন্ত ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ কার্যকর হবে না। আদালত ওয়াশিংটন ও মিনেসোটার অ্যাটর্নি জেনারেল এবং হোয়াইট হাউসকে আজ সোমবারের মধ্যে বক্তব্য পেশ করার নির্দেশ দিয়েছেন। অবশ্য এর আগে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ চেয়ে হোয়াইট হাউসের আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। তবে তেমন কোনো ইঙ্গিত এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। সিয়াটলের আদালতের সিদ্ধান্তের পরপরই মার্কিন বিচার বিভাগ জানায়, ভিসা বাতিলের কারণে যেসব যাত্রী আটকা পড়েছিলেন, তাঁদের যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকায় কোনো বাধা নেই। মূল আদেশে গ্রিন কার্ডধারীদেরও নিষিদ্ধ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। পরে সমালোচনার মুখে পড়ে সেই আদেশটিও তুলে নেওয়া হয়। অন্য আরেক ঘোষণায় হোমল্যান্ড সিকিউরিটির দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে,
৮৭২ জন উদ্বাস্তু, যাঁদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি আগেই দেওয়া হয়েছে এবং এই মুহূর্তে ‘ট্রানজিটে’ অবস্থান করছেন, তাঁদের এখনই ঢুকতে কোনো বাধা নেই। সিয়াটলের ফেডারেল বিচারক জেমস রবার্ট গত রোববার ট্রাম্পের আদেশটির বাস্তবায়ন স্থগিত রাখার নির্দেশ দেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই বিচারকের সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ করেছেন। এক টুইটার বার্তায় তিনি এই সিদ্ধান্তকে হাস্যকর বর্ণনা করে বলেন, এর ফলে হাজার হাজার ‘খারাপ ও ভয়ানক লোক’ যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকে পড়বে। জর্জ ডব্লিউ বুশের সময় নিয়োগ পাওয়া এই বিচারককে তিনি ‘তথাকথিত’ নামে অভিহিত করে বলেন, দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে ‘আমরা জিতবই’। ট্রাম্প যেভাবে ও যে ভাষায় একজন ফেডারেল বিচারকের সমালোচনা করেন, একাধিক ডেমোক্রেটিক নেতা তা বিচার বিভাগের কাজে হস্তক্ষেপ বলে নিন্দা করেন। সিনেটর প্যাট্রিক লেহি এক বিবৃতিতে বলেন, ট্রাম্প বিচার বিভাগকে ভয় দেখাচ্ছেন এবং আদালতের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছেন। এমনকি রিপাবলিকান নেতারাও একজন ফেডারেল বিচারককে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করায় ট্রাম্পের সমালোচনা করেছেন। সিনেটর রাউল ল্যাব্রাডর এক বিবৃতিতে ট্রাম্পকে বলেছেন, রায়ের সমালোচনা করুন, বিচারকের নয়।

‘দেয়ালেঘেরা আমেরিকা হবে জেলখানা’

‘আমার নাম ড্যানিয়েলা, আমার মাথায় এই যে সুন্দর কোঁকড়া চুলগুলো দেখতে পাচ্ছেন, এগুলো আমি পেতাম না, যদি না আমার ইরানিয়ান মা ভালোবেসে আমার আমেরিকান বাবার হাত না ধরতেন...আমার মা, সাবিয়েলার মতো এমন অসংখ্য মমতাময়ী মাকে বিমানবন্দরে আটকে রেখে, তাঁদের এ দেশে ঢুকতে না দিয়ে আমেরিকা কখনো গ্রেট হতে পারে না।’ এমন অসংখ্য মানুষের ছোট ছোট বেদনার গল্পে ভরে উঠেছিল গতকাল সান ফ্রান্সিসকোর সিভিক সেন্টার প্লাজার ‘নো ব্যান নো ওয়াল’ (কোনো নিষেধাজ্ঞা নয়, দেয়াল নয়) প্রতিবাদ সভা। শনিবার বেলা তিনটা থেকে শুরু হওয়া এই প্রতিবাদ সভায় হাজির হন ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে নানা পেশার মানুষ। শুধু সান ফ্রান্সিসকোই নয়, নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন ডিসিসহ কয়েকটি শহরে হয়েছে বিক্ষোভ মিছিল। মিছিল বেরিয়েছে আটলান্টিকের ওপারে লন্ডন, প্যারিসসহ ইউরোপের অনেক শহরে। ফেসবুকে এই প্রতিবাদ সভার খবর পেয়ে আমি কাল (শনিবার) রওনা দিলাম সেদিকে। সিভিক সেন্টার প্লাজা স্টেশনে নেমে মানুষের স্রোতের সঙ্গে একরকম ভাসতে ভাসতেই চলে এলাম প্লাজার সামনে। হাজার হাজার মানুষে ঘিরে থাকা ছোট্ট একটা মঞ্চে তখন একজন আবৃত্তি করছেন কেনিয়ান বংশোদ্ভূত সোমালিয়ান কবি ওয়ারসান শায়ারের কবিতা ‘হোম’ (ঘর)। কবিতার প্রথম চরণ: ‘কেউ ঘর ছাড়ে না,
যদি না ঘর হয় এক ভয়ংকর হাঙরের মুখ; মানুষ তখনই সীমান্তে দৌড়ায়, যখন পুরো শহর সেদিকে দৌড়ায়...’ কবিতা শুনতে শুনতে ভিজে আসে চোখ। ভেজা চোখেই মঞ্চে ওঠেন ডাক্তার ও আলোকচিত্রী র্যাচেল। মাইক ধরে বলেন, ‘আমরাই বোমা মেরে তাদের জীবনের এক করুণ বাস্তবতায় পৌঁছে দিয়ে এখন তাদেরকে শরণার্থী নাম দিয়ে নিষিদ্ধ করে দিচ্ছি। এটা আমার আমেরিকা না, এ আমার প্রেসিডেন্ট না।’ একের পর এক গান, কবিতা আর ছোট ছোট অভিজ্ঞার গল্পে প্রতিবাদ সভা চলে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত। সভার আয়োজক ছিলেন সাবেক ফেসবুক, গুগল ও স্পেসএক্স কর্মকর্তা বার্টন ও ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার তিন সাবেক ছাত্রী। অ্যাপলের প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস ছিলেন সিরিয়ান শরাণার্থী পরিবারের সন্তান। সেদিকে ইঙ্গিত করে একজন প্ল্যাকার্ডে লিখেছেন, ‘নো সিরিয়ান, নো স্টিভ জবস, নো আইফোন।’ লেবানন থেকে মিসর, আরব শরণার্থীদের হাত ধরে ‘হামাস’ এখন খুব জনপ্রিয় খাবার আমেরিকায়। তাই একজন লিখেছেন, ‘আমরা শরণার্থীরা তোমাদের হামাস দিয়েছি, এর বেশি আর কী চাও?’ প্রতিবাদ সভা শেষে একদল বড় একটা ড্রাম বাজিয়ে শুরু করল নাচ, ইয়েমেনি একজন বাজানো শুরু করলেন বাঁশি। আমি হাঁটা দিলাম মেট্রো স্টেশনের দিকে। পথে আলাপ হলো এক আমেরিকান নাগরিকের সঙ্গে। তাঁকে বললাম, ‘আমেরিকা যদি মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল তোলে, একজন আমেরিকান হিসেবে তোমার সমস্যাটা কী?’ শান্ত স্বরে সে বলল, ‘কোনো মুক্ত মানুষের চারদিকে কোনো দেয়াল থাকে দেখেছ? দেয়াল থাকে জেলখানায়। দেয়ালেঘেরা আমেরিকা হবে জেলখানা।’

ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ আটকে দিয়েছেন যিনি

সাতটি মুসলিমপ্রধান দেশের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা থামিয়ে দিয়েছেন যে বিচারক, তিনি জেমস এল রবার্ট। ২০০৪ সালে মার্কিন সিনেটে সর্বসম্মতভাবে অনুমোদন পাওয়া এই ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিয়েছিলেন তৎকালীন রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ। এখানে তুলে ধরা হলো আলোচিত এই বিচারক সম্পর্কে কিছু তথ্য।
১. ১৯৪৭ সালে ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের সিয়াটলে জন্ম। নিজস্ব আইন ব্যবসা ও আইনি সহায়তা প্রতিষ্ঠানে কাজ করা থেকে ফেডারেল বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান।
২. বিচারক রবার্ট কমিউনিটি পর্যায়ে সেবাদানের জন্য পরিচিত এক নাম। ফেডারেল বিচারক হিসেবে তাঁর নিয়োগের শুনানিতে ওয়াশিংটনের ডেমোক্র্যাট সিনেটর প্যাটি মারে কমিউনিটির সেবায় রবার্টের উদার মনোভাবের প্রশংসা করেছিলেন।
৩. গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কোর্টের ওয়েবসাইটে পোস্ট করা এক ভিডিও নিয়ে মন্তব্য করে আলোচনায় এসেছিলেন তিনি। রবার্ট বলেছিলেন, পুলিশের গুলিতে ‘প্রাণহানির শিকার ৪১ শতাংশ মানুষ এসেছে জনসংখ্যার মাত্র ২০ শতাংশ থেকে...কৃষ্ণাঙ্গদের জীবনেরও দাম আছে।’
৪. রবার্ট এভারগ্রিন লিগ্যাল সার্ভিস নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অনগ্রসরদের জন্য আইনি সহায়তা দেন। তিনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শরণার্থীদের জন্য কাজ করেছেন।
৫. আদালতকে মানুষকে সাহায্য করার একটা মাধ্যমে হিসেবে দেখেন জেমস এল রবার্ট।

আবার পুতিনের পক্ষে ট্রাম্প

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের পক্ষে আবার সাফাই গাইলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রাশিয়া হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে এবং পুতিন একজন খুনি, তারপরও তাঁকে শ্রদ্ধা করেন কি না—ফক্স নিউজ চ্যানেলের এমন এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প পুতিনকেই সমর্থন করলেন। বললেন, ‘আপনি কী মনে করেন? আমাদের দেশ খুব নির্দোষ?’ নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকেই ভ্লাদিমির পুতিনের প্রশংসা করে আসছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। পরেও পুতিন সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়তে আগ্রহ দেখিয়েছেন তিনি। মার্কিন প্রেসিডেন্টের ফ্লোরিডার বাসভবনে তাঁর সাক্ষাৎকার নেন ফক্স নিউজের উপস্থাপক বিল ও’রাইলি। সাক্ষাৎকারটির অংশবিশেষ শনিবার প্রচার করা হয়। এতে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করা হয়, তিনি পুতিনকে শ্রদ্ধা করেন কি না। জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি তাঁকে শ্রদ্ধা করি। আমি অনেককেই শ্রদ্ধা করি। এর মানে এই নয় তাঁর সঙ্গে আমার বনবেই।’ তখন পুতিনকে ‘হত্যাকারী’ অভিহিত করে ওই প্রশ্নটি করেন উপস্থাপক বিল ও’রাইলি। জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘সেখানে প্রচুর খুনি রয়েছে। আমাদের অনেক খুনি আছে।
আপনি কী মনে করেন? আমাদের দেশ খুব নির্দোষ?’ ট্রাম্প বলেছেন, তিনি পুতিনের সঙ্গে মানিয়ে চলতেই চাইবেন। আর ‘ইসলামি জঙ্গিবাদের’ বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রাশিয়ার সাহায্য চান বলেও এ সময় জানিয়েছেন তিনি। ধনকুবের ব্যবসায়ী থেকে প্রেসিডেন্ট হওয়া ট্রাম্প আরও বলেন, ‘আমি বলেছি, রাশিয়ার সঙ্গে মানিয়ে চলা তুলনামূলকভাবে ভালো হবে, না চলার চেয়ে। আর রাশিয়া যদি আইসিস (ইসলামিক স্টেট) এবং বিশ্বব্যাপী জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের সাহায্য করে—তাহলে ভালো হবে। তাঁর সঙ্গে আমার বনবে কি না? এ মুহূর্তে বলতে পারছি না।’ এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লাখ লাখ জাল ভোট পড়ার যে দাবি ট্রাম্প করেছেন, তথ্যপ্রমাণ ছাড়া সে রকম দাবি করা কতটা নির্ভরযোগ্য—ফক্স নিউজের এ প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘অনেকে এমনটা জানিয়েছেন এবং বলেছেন আমার কথা ঠিক। ...যখন আপনি দেখেন অবৈধ লোকেরা, যারা নাগরিক নন তাঁরা ভোটার তালিকায়, মৃতরা তালিকায়...এটা সত্যি বাজে পরিস্থিতি।’

মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন শশীকলা

এবার মুখ্যমন্ত্রী হতে চলেছেন ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতার দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ বান্ধবী শশীকলা নটরাজন। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পানিরসেলভাম গতকাল রোববার পদত্যাগ করেছেন। গতকালই অনুষ্ঠিত বৈঠকে দলীয় বিধায়কেরা শশীকলাকে মুখ্যমন্ত্রী পদের জন্য নির্বাচিত করেছেন। জয়ললিতার মৃত্যুর পর থেকেই এআইএডিএমকের একটি অংশ বলে আসছিল, দল ও রাজ্য সরকারের নেতৃত্বে একজনেরই থাকা উচিত। এতে করে মূল ক্ষমতার কেন্দ্র একাধিক হবে না। গতকালের ঘটনার পর দলের ওই অংশের দাবি পূরণ হলো। দলীয় বিধায়কদের বৈঠকের পর শশীকলা প্রয়াত জয়ললিতার মতোই একটি সবুজ রঙের শাড়ি পরে সমর্থকদের সামনে হাজির হন।
জয়ললিতার প্রিয় রং ছিল সবুজ। তাঁর মৃত্যুর পর শশীকলা প্রয়াত নেত্রীর ‘পদাঙ্ক অনুসরণ করার’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। দুর্নীতির অভিযোগে যে দুবার জয়ললিতা গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, ৬৫ বছর বয়সী পানিরসেলভাম তখন রাজ্য সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। গত বছরের ডিসেম্বরে জয়ললিতার মৃত্যুর পর তিনিই হন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। অন্যদিকে সমর্থকদের কাছে ‘চিনাম্মা’ (মায়ের ছোট বোন) নামে পরিচিত শশীকলা নেতা-কর্মীদের অনুরোধে দলীয় প্রধানের পদ গ্রহণ করেন।

নতুন কমিশন নিয়োগের জন্য বিবেচ্য

আমরা সব সময় সংবিধানমতে চলার কথা বলি। কিন্তু অনেক সময় মুখে বলি এক, বাস্তবে করি আরেক। অনেক সময় চিন্তার দীনতা প্রকট হয়ে ওঠে। আর কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন নির্বাচন কমিশন পাব। আমাদের উচিত শুধু একজন সিইসি নয়, ভাবী সিইসি পেতে পারি এমন চার কমিশনারকে বেছে নেওয়া, যাতে এই কমিশনের মেয়াদ শেষে তাঁদের একজন সিইসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি ও দায়িত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
বয়স অনধিক ৭০ বিবেচনার যে খবর পাই, তা যথাযথ নয়, কর্মক্ষমতা ও মানসিক সামর্থ্য ৭০ এর বেশে পরেও অনেকের টিকে থাকে। এটা মনে রেখেই সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদের ২ দফার দিকে নজর রাখা উচিত। প্রজ্ঞাপনটি জারি করতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদের ১ উপদফার উদ্দেশ্য পূরণের কথা নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু একই অনুচ্ছেদের ২ দফার খ উপদফার দিকে নজর দিতে হবে। এতে বলা হয়েছে, ‘অন্য কোন নির্বাচন কমিশনার অনুরূপ পদে কর্মাবসানের পর প্রধান নির্বাচন কমিশনাররূপে নিয়োগলাভের যোগ্য হবেন।’ সুতরাং পাঁচ বছর পরে নবনিযুক্ত চার কমিশনারের যখন কর্মাবসান ঘটবে, তখন তাঁদের যাতে আমরা অন্তত সিইসি করার কথা ভাবতে পারি। বর্তমানে যেটা চলছে তা একটা গলাকাটা ব্যবস্থা বটে! পাঁচজনের চারজনকেই আমরা মাত্র পাঁচ বছর কাজ করিয়ে তাঁদের বিশেষজ্ঞ জ্ঞান আমরা আর কাজে লাগাব না? বিদায়ী কমিশন অবশ্য একেবারেই ব্যতিক্রম।
সরকারের আজ্ঞাবহ হওয়ার কারণে তাঁরা যতটা বিতর্কিত হয়েছেন, তাতে কমিশনারদের কারোরই আর সেই সুযোগ পাওয়ার অধিকার আছে বলে মানা যায় না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের আগে একজন দায়িত্বশীল নেতা ভারত ঘুরে এসে বললেন, তিনি নিশ্চিত জেনে এসেছেন যে, সেখানে লোকসভা রেখেও লোকসভা নির্বাচন হয়। তাঁর যুক্তি: লোকসভা রেখে লোকসভা হওয়া গণতান্ত্রিক হলে এখানে হবে না কেন। বেশ কথা। তাহলে ভারতের মডেলেই পরের সিইসি করার মতো পরিবেশ তৈরি করা হোক। সাধারণত জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ পান, ভারতে এখন সেভাবে সিইসি নিয়োগের রেওয়াজ গড়ে উঠেছে। আমরা শুধু নই, বিশ্বের বহু দেশ জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রধান বিচারপতি নিয়োগকেই মানে, কারণ এর সঙ্গে বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতার প্রশ্ন জড়িত। একই যুক্তিতে সিইসি নিয়োগের সঙ্গে নির্বাচনব্যবস্থার স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার প্রশ্ন জড়িত। সুপ্রিম কোর্টের যেভাবে স্বাধীন সচিবালয় আছে, সংসদের যেভাবে একটি স্বাধীন সচিবালয় আছে, সেভাবে ইসির একটি স্বাধীন সচিবালয় থাকবে। ভারতের আইন কমিশন বলেছে,
এই স্বাধীন সচিবালয় থাকার বিধান সংবিধানে লিখে নিতে হবে। আমরাও একই দাবি তুলছি। তবে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে সিইসি নিয়োগ দিতে আমাদের রাজনীতিকেরা কেন পলায়নপরতার পরিচয় দিয়ে চলছেন, সেটা ভেবে দেখতে অনুরোধ করি। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করব, কিন্তু রেওয়াজটা থাকবে তত্ত্বাবধায়ক আমলের খেলোয়াড় ভাড়ায় আনার মতোই, সেটা তো গণতান্ত্রিক হতে পারে না। আগামী পাঁচ বছর পরে আরও একবার হায়ারের প্লেয়ার আনতে বঙ্গভবনে ছোটাছুটি না চাইলে, এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। আমরা এবারের নতুন মুখগুলোকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত থাকব, কিন্তু উৎকণ্ঠায় থাকব। এখন যাঁরা কমিশনের সদস্য হবেন, তাঁদের মধ্য থেকে পাঁচ বছর পরে কাউকে সিইসি করার কথা যদি এখনকার অনুসন্ধান কমিটি বিবেচনায় না নেয় তবে ধরে নিতে হবে, আমরা ভুল পথে হাঁটছি। পথ শুধরে নিতে হবে।ভারতে গত ১৪ বছরে নয়জন সিইসি এসেছেন। এর আগের ১৪ বছরে মাত্র তিনজন সিইসি ছিলেন। গড়ে তাঁরা পাঁচ বছর মেয়াদে দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু ভারত নীরবে একটা রেওয়াজ গড়ে তুলেছে যে, সিইসি হিসেবে জ্যেষ্ঠতমই নিয়োগ পাবেন। তাই ৩২৪ অনুচ্ছেদে ভারত আইন করেনি বলে যাঁরা বাংলাদেশে ১১৮ এ আইন না করার মধ্যে দোষ দেখেন না,
তাঁরা বাস্তবে ওই সত্য চাপা দেন। ১৯৯০ সালে গোস্বামী কমিটি সিইসি নিয়োগে রাষ্ট্রপতিকে ভারতের প্রধান বিচারপতি ও লোকসভায় বিরোধী দলের নেতার সঙ্গে পরামর্শ করার বিধান আনতে সুপারিশ করেছিল। ১৯৯০ সালের ৩০ মে রাজ্যসভায় ১৭তম সংশোধন বিলে প্রস্তাব করা হয়েছিল যে, সিইসি নিয়োগে রাষ্ট্রপতি, রাজ্যসভার চেয়ারম্যান, লোকসভার স্পিকার, লোকসভার বিরোধী দলের নেতার (অথবা বৃহত্তম দলের নেতা) সঙ্গে আলোচনা করবেন। কিন্তু সরকার ১৯৯৪ সালে বিলটি প্রত্যাহার করে নেয়। এরপর থেকে কোনো পরামর্শ গ্রহণের প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়াই প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশে রাষ্ট্রপতিই সিইসি নিয়োগ দিয়ে চলছেন। কিন্তু তাতে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠেনি বলেই জানি। ভারতের আইন কমিশন ২০১৫ সালের এক রিপোর্টে কয়েকটি দেশের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেয়। আমাদের এবারের কমিশনে কোন পেশা ও শ্রেণির মধ্য থেকে বাছাই করা হবে, তাও আমরা আঁচটুকু পর্যন্ত করতে পারলাম না। এমনকি ১৬ জন আমন্ত্রিতদের মধ্যে সংখ্যালঘুরা বাদ পড়ল। দক্ষিণ আফ্রিকায় নেলসন ম্যান্ডেলা যে নির্বাচন কমিশন গঠন করেছিলেন, তাতে আমরা দেখি, পাঁচ সদস্যের কমিশনে একজন কর্মরত বিচারককে রাখা হয়েছে। সংসদের সুপারিশে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেন। সংসদের একটি আন্তদলীয় কমিটি অন্তত আটজন প্রার্থী বাছাই করে। চার সদস্যের অনুসন্ধান কমিটি তাদের সহায়তা দেয়। অনুসন্ধান কমিটিতে মানবাধিকার এবং জেন্ডার ইকুয়ালিটি বিষয়ক দুই কমিশনের দুজন প্রতিনিধি, পাবলিক প্রসিকিউটর এবং সাংবিধানিক আদালতের সভাপতি আছেন। ঘানার প্রেসিডেন্ট কাউন্সিল অব স্টেটের পরামর্শে সাত সদস্যের ইসি গঠন করে থাকেন। কানাডায় সংসদের প্রস্তাবক্রমে টানা ১০ বছর মেয়াদে (পুনঃ নবায়ন অযোগ্য) সিইসি নিয়োগ পান। পাকিস্তান তার জন্ম থেকে হাইকোর্টে কর্মরত বিচারপতিদের সিইসি ও ইসি করেছে। এরপর তারা দেখে এটা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্যÿ ক্ষতিকর। তাই তারা গত বছর জুনে সংবিধানে ২২তম সংশোধনী আনে। এখন কর্মরত বিচারক ছাড়াও অবসরপ্রাপ্ত বিচারক, সিভিল সার্ভেন্ট এবং টেকনোক্র্যাটরা হতে পারবেন। ফেডারেল বা প্রাদেশিক সরকারে অন্তত ২০ বছর চাকরি আর টেকনোক্র্যাটদের অন্তত ১৬ বছরের শিক্ষাজীবন, সেই সঙ্গে জাতীয় বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য অর্জনের রেকর্ড থাকার সাধারণ শর্ত সংবিধানে লিখে নিয়েছে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেতার মধ্যে যখন কারও নামের বিষয়ে সমঝোতা হবে না,
তখন তাঁরা পৃথক তালিকা একটি সংসদীয় কমিটির কাছে পাঠাবেন। তারাই তখন একটি নাম নিশ্চিত করবে। ভারতের কথায় ফিরি। তাদের আইন কমিশন ২০১৫ সালে নির্বাচন সংস্কার-বিষয়ক এক দীর্ঘ প্রতিবেদন (আমাদের এমন নজির নেই) তৈরি করেছে। তারা রাষ্ট্রপতির কাছে তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনের জন্য নাম প্রেরণে তিন সদস্যের একটি কলিজিয়াম বা বাছাই কমিটি গঠনের সুপারিশ করেছে। এতে প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা এবং ভারতের প্রধান বিচারপতি থাকবেন। ভারতের আইন কমিশন মনে করে, ক্ষমতাসীন সরকারের একজন প্রতিনিধি হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকে বাছাই কমিটিতে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের জন্যও সেটা বাস্তবতা মনে করি। তবে তারা কিন্তু সিইসি নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীকে খুশিমতো চলতে দেয়নি। বলেছে, সিইসির পদ শূন্য হলে দুই নির্বাচন কমিশনারের মধ্যে যিনি জ্যেষ্ঠতম তিনিই সিইসি হবেন। ৬৫ বছরে পৌঁছা বা পাঁচ বছরের মেয়াদ পুরো হওয়া, যেটা আগে হবে, সেই মেয়াদে কেউ সিইসি থাকবেন। তবে ভারতের আইন কমিশন বলেছে, যদি তিন সদস্যের বাছাই কমিটি কোনো জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনারকে তাদের বিবেচনায় সিইসি হতে অযোগ্য মনে করে, তাহলে তার লিখিত কারণ ব্যাখ্যা করে বিকল্প নাম প্রস্তাব করবে। ভারতের বর্তমান সিইসি নাসিম জায়দি ২০১৫ সালের ৩১ মে পিটিআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ‘বিচারক নিয়োগের মতোই সিইসি নিয়োগে একটি কলিজিয়াম’ পদ্ধতি চান। তাঁর এই মন্তব্য জেনে আমরা প্রীত হই।
কারণ, ভারতে বিচারক বাছাইয়ে কলিজিয়াম আছে। নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে নেই। জায়দি তাই এখানে কলিজিয়াম চাইছেন। এই একই যুক্তিতে আমরা বলি, ২০১৭ সালে ইসি গঠনে যে কলিজিয়াম (অনুসন্ধান কমিটি) আমরা পেলাম, এটাই আইনে পরিণত হোক, আর একইভাবে তা বিচারপতিসহ অন্যান্য সাংবিধানিক প্রার্থী বাছাইয়েও কাজে লাগুক। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ২০১৫ সালের ১৩ জুলাই ভারতের প্রধান বিচারপতি এইচ এল দাত্তুর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ সরকারকে একটি নোটিশ দিয়েছেন। তাঁদের যুক্তি: কেন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে নির্বাহী বিভাগের ‘এক্সক্লুসিভ’ ভূমিকার অবসান ঘটিয়ে একটি স্বচ্ছ ব্যবস্থা চালু করা হবে না? এবং এ জন্য প্রধান বিচারপতি, প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার সমন্বয়ে কেন একটি উচ্চপর্যায়ের বাছাই কমিটি গঠন উপযুক্ত মনে করা হবে না। শক্তিশালী ইসি গঠন লগ্নে আমরা মনে রাখব, এ রকম একটি নোটিশ আমাদের দেশে নির্মোহভাবে দেখতে আমরা পারি নাকি পারি না। দলীয় সরকারের অধীনে ভারতের যে স্বাধীন নির্বাচন ব্যবস্থা, তার প্রধান ঢাল হলো দেশটির সুপ্রিম কোর্ট।
(দি হিন্দু, ১৩ জুলাই, ২০১৫) এবার অনুসন্ধান কমিটি যেভাবে কাজ করল, সেটা অন্যান্য সাংবিধানিক পদধারীদের বাছাইয়ে একটা মডেল হোক। তারা যা করল, তা এখনই একটি আইনে এবং পরে তা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্য স্থির হোক। রাষ্ট্রপতি ‘স্বীয় বিবেচনায়’ নিয়োগ দেবেন, কিন্তু অপসারণ? সরকার বলতে পারে, সেটাও রাষ্ট্রপতি স্বীয় বিবেচনায় করবেন। বিশিষ্ট আইনবিদ এম এ মতিন (আপিল বিভাগের সাবেক বিচারক) আমাকে বলেন, হাইকোর্টে ১৬তম সংশোধনী বাতিলের কারণে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল কার্যকর রয়েছে। তারাই সিইসিসহ নির্বাচন কমিশনারদের আচরণ প্রয়োজনে তদন্ত করবে। জ্যেষ্ঠতা মানা হলে ২০১৯ সালের নির্বাচনকালে বর্তমান অনুসন্ধান কমিটির সভাপতিই প্রধান বিচারপতি হতে পারেন। সেই হিসাবে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের সভাপতি তাঁরই হওয়ার কথা। অবশ্য হাইকোর্টের ওই রায় আপিলে পাল্টে গেলে ভিন্ন কথা।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

এই তো আমাদের বিমানবন্দর!

যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষক আলী রীয়াজ বাংলাদেশে এসেছিলেন। আমাদের প্রথম আলোয় তিনি নিয়মিত কলামও লেখেন। যাঁরা খোঁজখবর রাখেন তাঁরা জানবেন, গত বুধবার তিনি ঢাকায় সুশাসনবিষয়ক এক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ পড়েছেন। সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ আয়োজিত সেমিনারের শিরোনাম ছিল ‘গভর্ন্যান্স: অা ক্রিটিক্যাল এক্সামিনেশন। এই লেখার বিষয় সেই প্রবন্ধ বা সেমিনার নয়। সেমিনার শেষে আলী রীয়াজ শিকাগোর ইলিনয়ে তাঁর কাজের জায়গায় ফিরে গেছেন। বাংলাদেশ থেকে সেখানে পৌঁছাতে প্রায় ২৪ ঘণ্টা সময় লেগেছে। এই দীর্ঘ যাত্রার শেষে ইলিনয়ের বাসায় ফিরে তিনি যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলেন, তার সূত্র ধরেই এই লেখা। আমাদের আনন্দ-বেদনা প্রকাশ বা রাগ-ক্ষোভ ঝেড়ে ফেলার একটা জায়গা এখন ফেসবুকের ওয়াল। আলী রীয়াজ তাঁর ফেসবুকের ওয়ালে যা লিখেছেন তা অনেকটা এ রকম: দীর্ঘ যাত্রার পর তাঁর বাসায় ফেরার আনন্দ মাটি হয়ে গেছে সুটকেস খোলার পর। শিকাগো বিমানবন্দরে লাগেজের তলার অবস্থা দেখে তিনি যা অনুমান করেছিলেন, বাসায় গিয়ে দেখলেন সেটাই সত্য। তাঁর সুটকেসটি খোলা হয়েছিল এবং পরে তাড়াহুড়ো করে ঠেলেঠুলে কাপড়চোপড় আবার ঢোকানো হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে লাগেজের দশা খুবই খারাপ। একটা মূল্যবান জিনিস খোয়া গেছে সুটকেস থেকে। অর্থমূল্যের বিবেচনায় না হলেও দরকারি বিবেচনায় তাঁর কাছে তা যথেষ্ট মূল্যবান।
তবে এই মূল্যবান জিনিস খোয়ানোটা তাঁর কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। সুটকেস খোলা ও লাগেজের দশা বর্ণনা করে আলী রীয়াজ লিখেছেন, ‘আমার উদ্বেগটা চুরি করে নেওয়ায় যতটা, তার চেয়ে বেশি নিরাপত্তা নিয়ে। আপনার ব্যাগ থেকে চুরি সম্ভব হলে, সেখানে অনাকাঙ্ক্ষিত এমনকি নিষিদ্ধ জিনিস ঢুকিয়ে দেওয়াও সম্ভব৷ সেটা আবিষ্কৃত হবে ভিন্ন দেশে, বাকিটা কল্পনা করতে পারেন৷ যাত্রীর কী হবে, সেটা বাংলাদেশের কর্তাব্যক্তিরা না ভাবতে পারেন, কিন্তু বিমানবন্দর হিসেবে ঢাকার নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে আগেও প্রশ্ন উঠেছিল, দ্বিতীয়বার উঠলে তার পরিণতি দেশের জন্য ইতিবাচক হবে না৷ ঘটনা ঘটার পর এই নিয়ে আলোচনার ঝড় না তুলে এখনই পদক্ষেপ নিন৷ আমার কত ক্ষতি হলো, সেটা খুব সামান্য বিষয়, বাংলাদেশের কত ক্ষতির আশঙ্কা সেই ভেবেই এই কথাগুলো৷’ আলী রীয়াজের এই ফেসবুক স্ট্যাটাস পড়ে মনে প্রশ্ন জাগে, বাংলাদেশের ক্ষতি নিয়ে আমরা কি আদৌ চিন্তিত! এসবে কি আমাদের কিছু আসে-যায়? আমাদের বিমানবন্দর তো এভাবেই চলছে। এই বিমানবন্দর দিয়ে যাঁরা আসা-যাওয়া করেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা কী বলে? লাগেজ চুরি, লাগেজ কাটা, লাগেজের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, বিমানবন্দরের কর্মীদের লাগেজের প্রতি অসভ্য আচরণ, ইমিগ্রেশন পার হতে বেশি সময় লাগা, নিরাপত্তার নামে যাত্রী ও দর্শনার্থীদের হয়রানি—এসবের স্বাদ না নিয়ে কে কবে এই বিমানবন্দর পার হতে পেরেছেন! কখনো কখনো তা মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। লাগেজের জন্য একবার তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার অভিজ্ঞতা আমার নিজেরই হয়েছে। আর বন্ধুবান্ধব ও পরিচিতজনদের কাছ থেকে তো নিয়মিতই নানা বাজে অভিজ্ঞতা ও এ নিয়ে রাগ-ক্ষোভের কথা শুনি। আলী রীয়াজের ফেসবুক স্ট্যাটাসের নিচে দেখলাম, অনেকেই তাঁদের বিভিন্ন সময়ের নানা অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। অবস্থার আসলে কোনো বদল হয় না। বিশ্বের সবচেয়ে ভালো ও খারাপ বিমানবন্দরের একটি তালিকা নিয়মিত বের হয়। সেবার মান, সুযোগ-সুবিধা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ভিত্তিতে তালিকাটি তৈরি করে ‘দ্য গাইড টু স্লিপিং ইন এয়ারপোর্টস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। ২০১৪ সালে এশিয়ার সবচেয়ে বাজে ১০টি বিমানবন্দরের মধ্যে ৯ নম্বরে জায়গা হয়েছিল ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের। ২০১৪ সালের ১৯ অক্টোবর সে খবর প্রথম আলো পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। ২০১৬ সালের একটি তালিকাও বের হয়েছে গত বছরের অক্টোবরে।
ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখলাম, এশিয়ার সবচেয়ে বাজে বিমানবন্দরের তালিকায় বাংলাদেশের শাহজালাল বিমানবন্দর দুই বছর পর সেই ৯ নম্বরেই আছে। বোঝা যায় বিমান, বিমানবন্দর ও বেসামরিক বিমান চলাচলের দায়িত্ব নিয়ে যাঁরা বসে আছেন, তাঁদের টনক বলে তেমন কিছু নেই। আর থাকলেও তা নড়ে না। জরিপ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান দ্য গাইড টু স্লিপিং ইন এয়ারপোর্টসের প্রশ্নের জবাবে শাহজালাল বিমানবন্দর সম্পর্কে একজন বলেছেন, ‘উড়োজাহাজ থেকে টার্মিনালে আসার জন্য আমাদের একটি বাসের দরকার ছিল। এ জন্য আমাদের ২০ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। বলা হয়েছে অনিবার্য কারণে বাস আসতে দেরি হচ্ছে।’ আমাদের বিমানবন্দর সম্পর্কে সেখানে আরও বলা হয়েছে, এখান থেকে কোথাও যেতে বা আসতে অতিরিক্ত সময় লাগবে। ইমিগ্রেশনের জন্য দীর্ঘ সময় লাগে এবং ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়ার কাজের গতি খুবই ধীর। লাগেজের জন্য একইভাবে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়। টার্মিনালের সবখানেই দীর্ঘ লাইন ও সবখানেই বিশৃঙ্খলা। এই হচ্ছে আমাদের বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনা। আর নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবেই উদ্বেগ আছে। নিরাপত্তার ‘আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে’ ঘাটতি থাকায় গত বছর যুক্তরাজ্য এই বিমানবন্দর থেকে সরাসরি পণ্য পরিবহন বন্ধ করে দিয়েছিল। পরিস্থিতির উন্নতি করতে না পারলে যুক্তরাজ্যে বিমান বাংলাদেশের যাত্রীবাহী ফ্লাইটও নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়তে পারে বলেও তখন সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল। ব্রিটেনের তখনকার প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে চিঠি লিখে আমাদের বিমানবন্দর নিয়ে তাঁর উদ্বেগের কথা জানিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের বেসরকারি অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটি প্রতিষ্ঠান রেডলাইনের সঙ্গে দুই বছরের পরামর্শসেবা নেওয়ার চুক্তি করে সেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেছে। তবে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে নানা পদক্ষেপের পরও তাতে যে ফাঁকফোকর আছে, তা টের পাওয়া গেল ছুরি হাতে এক যুবকের হামলা ও এক আনসার সদস্যের মৃত্যুর ঘটনায়।
গত বছরের ৭ নভেম্বর এ ঘটনা ঘটে। এর আগে গুলশান হামলার পর নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে গিয়ে বিমানবন্দরে যাত্রী ছাড়া সবার প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। যেখানে যাত্রী ছাড়া কেউ ঢুকতে পারে না, সেখানে নানা বাহিনীর নজরদারির মধ্যে এক যুবক কীভাবে ছুরি হাতে বিমানবন্দরের প্রবেশমুখের ড্রাইভওয়ে পর্যন্ত চলে এলেন, তা সত্যিই বিস্ময়ের। বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনা যে কতটা দুর্বল, সেটাও ওই হামলার সময়ে টের পাওয়া গেছে। ছুরির আঘাতে গুরুতর আহত হতভাগা আনসার সদস্যকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে কোনো অ্যাম্বুলেন্স তো দূরে থাক, গাড়িও পাওয়া যায়নি। যাত্রীদের সহায়তায় একটি অটোরিকশায় করে তাঁকে হাসপাতালে নিতে হয়েছে। বোঝা যায় কোনো ঘটনা-দুর্ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো জরুরি সুযোগ-সুবিধা এখানে নেই। জরুরি চিকিৎসা-সুবিধা আছে—এমন একটি আধুনিক অ্যাম্বুলেন্সে করে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নেওয়া গেলে হয়তো সেই আনসার সদস্যকে বাঁচানো যেত। বিমানবন্দর একটি বড় ও বিস্তৃত স্থাপনা। অসংখ্য লোক সেখানে কর্মরত। শত শত যাত্রী সেখান দিয়ে আসা-যাওয়া করেন। এখানে সার্বক্ষণিক জরুরি চিকিৎসাব্যবস্থা থাকবে না! এমন একটি বিমানবন্দর নিয়েই তো আমরা চলছি! ফেসবুকে মাঝেমধ্যে কিছু ভিডিও চোখে পড়ে। পাঠকদের অনেকেই নিশ্চয়ই সেগুলো দেখেছেন। আমাদের বিমানবন্দর ব্যবহারকারী ক্ষুব্ধ যাত্রীদের কেউ কেউ মোবাইল ফোনে রেকর্ড করে এসব ভিডিও ফেসবুকে দিয়েছেন। বিমান থেকে আসা লাগেজগুলোকে কীভাবে বেল্টের ওপর ফেলছেন সেখানকার কর্মীরা! অনেকটা ইচ্ছে করেই যেন লাগেজগুলোকে তাঁরা আছাড় দিচ্ছেন। এমন একটি ভিডিও দেখে আমার মনে হয়েছে অসুস্থ মানসিকতার কেউ অথবা কোনো কারণে ক্ষুব্ধ একজন কর্মী তাঁর সব রাগ–ক্ষোভ ঝাড়ছেন লাগেজগুলোর ওপর। লাগেজ ঠিক থাকবে কীভাবে?
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কোনো কর্তাব্যক্তির নজরে কি এসব ভিডিও কখনো পড়েনি? কোনো ব্যবস্থা হয়েছে কি? পরিস্থিতি পাল্টাবে কীভাবে? নিরাপত্তা এখন এমন ইস্যু যেখানে কোনো আপস নেই। বিশ্বের সব বিমানবন্দরেই নিরাপত্তার নানা বাড়াবাড়ি রয়েছে। কিন্তু কেউ কি এমন বিমানবন্দর দেখেছেন, যেখানে যাত্রীর সঙ্গে কাউকে বিমানবন্দরে টার্মিনালের কাছাকাছিও যেতে দেওয়া হয় না? আপনি কাউকে বিমানবন্দরে নামিয়ে দিতে গেছেন, আপনি যেহেতু যাত্রী নন, আপনাকে ড্রাইভওয়ের নিচেই নামিয়ে দেওয়া হবে। গাড়ি যাত্রীকে নামিয়ে দিয়ে ঘুরে আসবে আর আপনাকে নিচ দিয়ে হেঁটে ওই পারে গিয়ে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করতে হবে। ৭০ বছর বয়সী একজন ‘সিনিয়র সিটিজেন’ তাঁর এক আত্মীয়কে বিমানবন্দরে নামাতে গিয়ে এ ধরনের পরিস্থিতিতে কী দুর্ভোগে পড়েছিলেন, তার বর্ণনা শোনালেন সেদিন। এসব নিয়ে কারও কি কোনো চিন্তা আছে? নিরাপত্তার কারণে কারও লাগেজ বা সুটকেস খুলতে পারে নিরাপত্তা বাহিনী। কিন্তু যাঁর লাগেজ বা সুটকেস খোলা হয়েছিল, তাঁকে অন্তত তা জানাতে হবে। লাগেজের সঙ্গে একটি চিঠি বা নোট থাকবে। আর চোরেরা খুলে থাকলে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে তার দায় নিতে হবে। আমাদের বিমানবন্দর এমনই এক বিমানবন্দর যে এখানে কারও কোনো দায় নেই। আসলে দায় তখনই থাকে, যখন দায়িত্বে অবহেলা বা ব্যর্থতার জন্য কাউকে শাস্তির মুখোমুখি অথবা চাকরি হারাতে হয়। আমাদের দেশে কারও সেই ভয় নেই। মন্ত্রীরও নেই, লাগেজ নামানো কর্মীরও নেই। ফলে কারও কোনো দায়ও নেই। আমাদের বিমানবন্দর যেভাবে চলছে, সেভাবেই চলবে!
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com

নতুন নিষেধাজ্ঞা অন্যায্য

ট্রাম্পের ক্ষমতায় আরোহণের পর অনেক ইরানি বিশ্লেষক ভয় পেয়েছিলেন, নতুন প্রেসিডেন্ট হয়তো ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি বাতিল করবেন, যে চুক্তির মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি সংকুচিত করে। কিন্তু তাঁরা এটা তেমন একটা বুঝতে পারেননি যে ইরানসহ সাতটি মুসলিম দেশের অভিবাসী, ছাত্র, ক্রীড়াবিদ ও অন্য দর্শনার্থীদের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরোক্ষ ক্ষতি হিসেবে ইরানকে নতুন করে নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হবে। কথা হচ্ছে, গত ৩০ বছর সরকারি পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্কে অনেক উত্থান-পতন সত্ত্বেও হাজার হাজার সাধারণ ইরানি যুক্তরাষ্ট্রে যাতায়াত করেছেন। তাঁরা যেমন আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা, খেলাধুলায় অংশগ্রহণ ও শিল্পবিষয়ক অনুষ্ঠানেও যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন। এখন পর্যন্ত কোনো ইরানির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার অভিযোগ ওঠেনি। তা সত্ত্বেও ট্রাম্প প্রশাসনের নির্দেশনার কারণে কোনো ইরানি অন্তত আগামী ১২০ দিন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন করতে পারবেন না।
একই সঙ্গে ইরানসহ সিরিয়া, ইরাক, লিবিয়া, ইয়েমেন, সুদান ও সোমালিয়ার দর্শনার্থীরা আগামী তিন মাস এখানে আসতে পারবেন না। গত শুক্রবারের এই নির্বাহী আদেশ জারি করার আগে ট্রাম্প মার্কিন সরকারের অন্য অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা করেননি, ফলে বিদেশি সরকারের সঙ্গে আলোচনার তো প্রশ্নই আসে না। এতে মানুষের যেমন হৃদয়ভঙ্গ হয়েছে, তেমনি বহু মানুষকে বিমান থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। আবার যাঁরা যুক্তরাষ্ট্রে এসে পড়েছিলেন, তাঁরা বিমানবন্দরে আটকা পড়েছেন। আমেরিকান সিভিল লিবার্টিস ইউনিয়ন কেনেডি বিমানবন্দরে আটকা পড়া দুই ইরাকি নাগরিকের পক্ষ থেকে যে আইনি উদ্যোগ নিয়েছে, তাতে এই মানুষেরা আরও সাত দিন যুক্তরাষ্ট্রে থাকার অনুমতি পেয়েছেন। কিন্তু তাঁদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। এই নীতিটা নিজের পায়ে কুড়াল মারার মতো, যার কারণে পৃথিবীতে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে। এতে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী তৎপরতা ব্যাহত হবে, তেমনি ইরাকের মতো দেশে মার্কিন কর্মকর্তারা আরও বিপদের মুখে পড়বেন। দুর্ভাগ্যবশত এটি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য ব্লুপ্রিন্ট হিসেবে কাজ করবে: সমস্যা বানাও অথবা তাকে অতিরঞ্জিত করো আর প্রকৃত সমস্যা এড়িয়ে যাও, এরপর ‘সমাধান’ বের করো, যার কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। মার্কিন গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ইতিমধ্যে আক্রান্ত দেশের শরণার্থী, এমনকি সাধারণ দর্শনার্থীদেরও ব্যাপকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা শুরু করেছে। সম্ভবত এ কারণেই তাদের কারও বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা ইউরোপের মতো নয়, অর্থাৎ ট্রাম্প যে ইউরোপের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনা টানেন, তা ঠিক নয়। কারণ, ইউরোপে ১০ লক্ষাধিক সিরীয় শরণার্থী প্রাক্ যাচাই-বাছাই ছাড়াই ঢুকে পড়েছে,
যারা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে বাঁচতে সমুদ্র ও বন্ধুর সড়কপথ ধরে সেখানে আসছে। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে দেখা যাচ্ছে, সেখানে জন্ম নেওয়া ও বেড়ে ওঠা মানুষেরাই সন্ত্রাসী কার্যক্রমে বেশি জড়িত। জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি প্রোগ্রাম অন এক্সট্রিমিজম অনুসারে, ২০১৪ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রে আইএসের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে যে ১১৩ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে বেশির ভাগই মার্কিন নাগরিক বা সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা। দুর্ভাগ্যবশত এই ভিসা–নিষেধাজ্ঞার কারণে মার্কিন মুসলমানেরা সরকারের সন্ত্রাসীবিরোধী কার্যক্রমে সহায়তা করতে অনিচ্ছুক হতে পারেন। বিষয়টি হচ্ছে ইরাক, লিবিয়া ও ইয়েমেনের মতো দেশে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি সামরিক বল প্রয়োগ করেছে, সেখানকার মানুষের ওপর ভ্রমণ–নিষেধাজ্ঞা আরোপ করাটা ক্ষীণদৃষ্টির পরিচায়ক, যেটা তার কঠিন হৃদয়ের সাক্ষ্য দেয়। সিরীয়দের ওপর অনির্দিষ্টকালের জন্য অভিবাসন–নিষেধাজ্ঞাও একই ব্যাপার, যেখানে গৃহযুদ্ধের কারণে ১ কোটি ১০ লাখ মানুষ গৃহচ্যুত এবং প্রায় ৫০ লাখ মানুষ শরণার্থী হয়েছে। সারা পৃথিবীতে এখন প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ শরণার্থী রয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে যে অর্থবছর শেষ হলো, সেবার যুক্তরাষ্ট্র ৮৫ হাজার শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে, যাদের মধ্যে ১৩ হাজার সিরীয় নাগরিক। ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের আগে ওবামা প্রশাসন আরও ৪ হাজার ৭৭০ জন সিরীয়সহ ২৫ হাজার শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে, যাদের ২০১৭ অর্থবছরে মোট ১ লাখ ১০ হাজার শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল।
ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যে এই সংখ্যা কমিয়ে ৫০ হাজার নির্ধারণ করেছে। তারা হয়তো আর কোনো সিরীয় শরণার্থীকে আশ্রয় দেবে না, যদিও তারা ৬০ হাজার সিরীয় নাগরিককে ইতিমধ্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে। শনিবার জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল ট্রাম্পকে ফোন করে এটা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন যে শরণার্থীদের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা জেনেভা কনভেনশনের লঙ্ঘন। অন্যদিকে ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের এই সিদ্ধান্তও একটি গুরুতর ব্যাপার। যে মার্কিন নাগরিকেরা ইরান সফল করেছেন, তাঁরা জানেন, অধিকাংশ ইরানি মানুষের গভীর যুক্তরাষ্ট্রপ্রীতি রয়েছে। তাঁরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে স্বাধীনতা ও সুযোগের আলোক-সংকেত। ২০০১ সালে টুইন টাওয়ারে হামলার পর মুসলিম দুনিয়ার মধ্যে শুধু ইরানি নাগরিকেরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মিছিল করেছেন। রাজধানী তেহরানে তাঁরা মোমবাতি মিছিল করেছেন। পারমাণবিক চুক্তির পর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কোন্নয়নের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। যদিও ইরান কিছু ইরানি মার্কিন নাগরিককে ভুয়া অভিযোগে অন্তরীণ করেছিল, তা সত্ত্বেও আরও বেশি মার্কিন নাগরিক ইরান ভ্রমণ শুরু করেছিলেন। সেই প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে ইরানি ছাত্রদের আগমন এবং ক্রীড়াবিদদের (অ্যাথলেট) যাতায়াত বেড়ে যায়। ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের পর ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলে, ইরানকে পাল্টা নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ দ্রুতই টুইট বার্তায় বলেন,
যে মার্কিনদের হাতে এখন ভিসা রয়েছে, তাঁরা ইরান ভ্রমণ করতে পারবেন। কথা হচ্ছে, ট্রাম্পের পিতামহ জার্মানি থেকে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন, তাঁর মা এসেছিলেন স্কটল্যান্ড থেকে, তাঁর স্ত্রী স্লোভেনিয়া থেকে। ট্রাম্পের নির্বাচনে বিজয়ের আংশিক কারণ হচ্ছে, তিনি লাতিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের কালো চামড়ার মানুষের সম্পর্কে ভীতি সৃষ্টি করেছিলেন। এমনকি তিনি মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল তোলারও অঙ্গীকার করেছেন, যদিও কয়েক বছরে অবৈধ অভিবাসন অনেকটা কমে গেছে। দর্শনার্থীদের প্রবেশাধিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছে। এ অবস্থায় সেই প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করা নতুন প্রেসিডেন্টের জন্য কতটা বিজ্ঞোচিত হবে, তা বলা মুশকিল। এই জটিল পৃথিবীতে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও জনগণের আন্তসম্পর্ক পণ্য হিসেবে বেশ মূল্যবান। আশা করা যায়, নতুন প্রশাসন এই নতুন নিষেধাজ্ঞা জারির সিদ্ধান্ত বাতিল করবে অথবা এই দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপারটি নবায়ন করবে না।
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন, ভয়েস অব আমেরিকা থেকে নেওয়া।
বারবারা স্লাভিন: ফিউচার অব ইরান ইনিশিয়েটিভের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক।