Tuesday, March 31, 2026
পৃথিবীর শেষ প্রান্তভাগের গ্রামটির মানুষ কীভাবে বাঁচে
পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত বিশ্বব্যবস্থায় সত্যিকারের দুর্গম জায়গায় ভ্রমণের অভিজ্ঞতা পাওয়াটা খুবই বিরল। একই সঙ্গে পৃথিবীর সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন অঞ্চলগুলোর মানুষেরা কীভাবে জীবন যাপন করে, তা জানতে পারাটা আরও বিরল অভিজ্ঞতা।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক আলোকচিত্রী কেভিন হল সেই বিরল অভিজ্ঞতাই লাভ করেছেন। বিবিসিতে লেখা এক নিবন্ধে তিনি সে অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন।
ইতোকোর্তোরমিত হলো ছোট একটি গ্রাম। সেখানে ৩৭০ জন মানুষের বসবাস। গ্রামের ঘরগুলো বর্ণিলভাবে রং করা।
গ্রামটিতে নেই কোনো সড়ক। সেখানে পৌঁছানোর উপায় হলো হেলিকপ্টার, নৌকা (গ্রীষ্মকালে) ও স্নোমোবাইল নামের যানে চড়া। এ ছাড়া প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে নের্লেরিট ইনাট বিমানবন্দরগামী ফ্লাইটে চড়েও যাওয়া যায়। এ ফ্লাইট সপ্তাহে দুবার হয়। এর মধ্যে একটি আসে আইসল্যান্ড থেকে, আর অন্যটি পশ্চিম গ্রিনল্যান্ড থেকে।
ইতোকোর্তোরমিতের খুব কাছাকাছি কোনো গ্রাম বা শহর নেই। এর সবচেয়ে নিকটবর্তী শহরের অবস্থান প্রায় ৮০০ কিলোমিটার দূরে। গ্রামের আশপাশের এলাকা বরফময়। সেখানকার হিমশৈলে বাস করে মেরুভালুক (পোলার বিয়ার), মাস্ক অক্স আর লাখ লাখ সামুদ্রিক পাখি।
বছরের নয় মাস গ্রামটি সাগরের পানিজমা বরফে ঢাকা থাকে। ইতোকোর্তোরমিতের আদিবাসী গোষ্ঠী ইনুইটরা তখন কুকুরে টানা স্লেজ বাহন ব্যবহার করে বরফের ওপর ভ্রমণ করে এবং শিকারের খোঁজ করে।
২০২৫ সালে গ্রামটির শতবর্ষ উদ্যাপিত হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এখানে জনসংখ্যা কমতে দেখা গেছে। কিছু হিসাব অনুসারে, ২০০৬ সালের পর জনসংখ্যা প্রায় ৩৫ শতাংশ কমে গেছে।
কারণ হচ্ছে, পূর্বসূরিদের শিকারনির্ভর জীবনধারা থেকে বের হয়ে নতুন ধরনের পেশার খোঁজে কিংবা পড়াশোনা করতে তরুণেরা শহরে চলে যাচ্ছেন। তা ছাড়া, উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে আশপাশের সাগরের বরফ জমতে বেশি সময় নিচ্ছে এবং দ্রুত গলে যাচ্ছে।
এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র বারবারই ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছে। সব মিলে ইতোকোর্তোরমিত এখন দুটো বড় সমস্যার মুখোমুখি। একটি হলো জলবায়ু পরিবর্তন এবং অন্যটি হলো ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা।
আলোকচিত্রী কেভিন হল লিখেছেন, ইতোকোর্তোরমিতে প্রচণ্ড শীতের মধ্যে ভ্রমণ করাটা শুধু রোমাঞ্চকর অভিযানই ছিল না, এটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং অভিজ্ঞতাগুলোর একটি।
কেভিন প্রথমে আইসল্যান্ড থেকে ফ্লাইটে করে নের্লেরিট ইনাট বিমানবন্দরে পৌঁছান। এর পর তিনি জমে থাকা বরফের ওপর পাঁচ দিন কাটিয়েছেন। সেখানকার তাপমাত্রা মাইনাস ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যেত।
কেভিন হল লিখেছেন, ‘আমি কুকুরে টানা স্লেজ বাহনে ভ্রমণ করেছি, তাঁবু ও শিকারিদের ছোট কুটিরে ঘুমিয়েছি। সেখানে ছিল না বিছানা, চলমান পানিপ্রবাহ, উষ্ণতা বা অন্য কোনো সুবিধা। আমি ঘণ্টায় ৮০ মিটার গতির বাতাস আর তুষারঝড়ের মধ্যে ৪৫ কিলোমিটার এলাকা স্নোমোবাইলে পার হয়েছি।’
কেভিনের মতে, এটি নিতান্তই একটি ফটোগ্রাফি অভিযান ছিল না, বরং এটি পৃথিবীর সবচেয়ে দূরবর্তী অঞ্চলে মানুষের জীবনযাপনের বিরল চিত্রটা একঝলক দেখার সুযোগ দিয়েছে। এ ছাড়া ইতোকোর্তোরমিতের বাসিন্দারা কীভাবে দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে সংগ্রাম করছেন, তা–ও জানার সুযোগ হয়েছে।
চরম ঠান্ডার সঙ্গে বসবাস
কেভিন হলের জন্য এই ভ্রমণের ব্যবস্থা করেছিলেন খ্যাতিমান আলোকচিত্রী জোশুয়া হোলকো। তিনি ওগে ড্যানিয়েলসেন ও মানাসে টুকো নামের দুজন স্থানীয় ইনুইট গাইডের ব্যবস্থা করেন। কুকুরে টানা স্লেজে করে কেভিনসহ তিনজন আলোকচিত্রীকে নের্লেরিট ইনাট বিমানবন্দর থেকে ইতোকোর্তোরমিতে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁদের লক্ষ্য ছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে নির্জন ও বিস্ময়কর মেরুপ্রকৃতির ছবি তোলা।
ভ্রমণের শুরুর দিকের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে কেভিন হল লিখেছেন, ‘প্রথম রাতেই আমরা বিমানবন্দরের কাছাকাছি ছোট ছোট তাঁবুতে ক্যাম্প করি। তখন তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তাপমাত্রা ক্রমাগত নামছিল।
ড্যানিয়েলসেন ও টুকো বরফের ওপর জমে থাকা কড মাছ কাঠমিস্ত্রির মতো করে করাত দিয়ে কেটে নেন এবং গলানো বরফের পানি গরম করে সেখানে তা (মাছ) সেদ্ধ করেন। তাঁরা বললেন, রাতের খাবার প্রস্তুত। মাছ সুস্বাদু ছিল, যদিও অনেক কাঁটা ছিল। কিন্তু আমাদের আসল চিন্তা ছিল, সামনে কী অপেক্ষা করছে।’
কেভিন লিখেছেন, তিনি এর আগে কখনো এমন শীত অনুভব করেননি। রাতে যখন তাঁরা গুটিসুটি মেরে শুয়ে ছিলেন, তখন প্রবল বাতাসে তাঁবু কাঁপছিল। স্লেজ টানার কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ করছিল।
কেভিন বলেন, তাঁর ধারণা, উত্তর মেরু অঞ্চলের শিয়াল বা ভালুক তখন সেদিক দিয়ে চলাচল করছিল। তাপমাত্রা আরও কমতে থাকলে তাঁর পায়ে টান ধরে যায়।
কেভিন হলের মতে, এটা ছিল সত্যিকার অর্থেই ঠান্ডায় দীক্ষা নেওয়ার মতো এক অভিজ্ঞতা।
জাতীয় প্রতীক
পরদিন সকালে নাশতার পরপরই ড্যানিয়েলসেন ও টুকো তাঁদের সঙ্গে থাকা মালামাল গুছিয়ে নিতে শুরু করেন। তাঁরা ব্যাগ, কুলার বক্স, ক্যামেরার কেস, কুকুরের খাবারসহ আরও বিভিন্ন জিনিসপত্র স্লেজে তুলে শক্ত করে বেঁধে ফেলেন।
এরপর একেকটি স্লেজে দুজন করে বসলেন। সামনে ছিলেন একজন গাইড, যিনি স্লেজটানা কুকুরগুলোকে পরিচালনা করতেন। পরবর্তী ছয় দিন ধরে প্রতিটি স্লেজে নিযুক্ত ১২টি গ্রিনল্যান্ড স্লেজ কুকুর ৪৫০ কিলোগ্রামের বেশি বোঝা টেনে নিয়েছে। প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত দৌড়েছে তারা।
এই আদুরে প্রাণীগুলোকে গ্রিনল্যান্ডের ইনুইট ভাষায় ‘কিম্মিত’ নামে ডাকা হয়। ইনুইটদের আদিগোষ্ঠীর মানুষেরা বড় ও হাস্কি জাতের এই কুকুরকে প্রায় এক হাজার বছর আগে সাইবেরিয়া থেকে গ্রিনল্যান্ডে নিয়ে এসেছিল বলে ধারণা করা হয়। বর্তমানে এগুলো গ্রিনল্যান্ডে একধরনের জাতীয় প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
এক সকালে স্লেজে করে ইতোকোর্তোরমিত গ্রাম থেকে ১০ কিলোমিটার পশ্চিমের দিকে যাওয়ার সময় কেভিন হলরা দূরের একটি পাহাড়ের চূড়ায় চারটি মাস্ক অক্সকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন।
মাস্ক অক্স দেখতে কেমন, সেটার বর্ণনা দিয়ে কেভিন হল লিখেছেন, প্রায় ৪০০ কেজি ওজনের এই প্রাগৈতিহাসিক চেহারার প্রাণীগুলোর গাল থেকে বেরিয়ে থাকা ছোট শিং আর শক্ত বাতাসে উড়তে থাকা লম্বা কালো-বাদামি লোমের আবরণ—সব মিলিয়ে তারা যেমন ভয়ংকর, তেমনি দারুণ ফটোজেনিক।
কেভিন হল ও তাঁর সঙ্গীরা স্লেজ থেকে নেমে অত্যন্ত সতর্কভাবে এগোতে শুরু করেন। কারণ, হোলকো তাঁদের আগেই সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে বরফযুগের এই জীবাশ্মসদৃশ প্রাণীগুলো খুব সহজেই চমকে ওঠে এবং আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে। খুব দ্রুত নড়াচড়া করলে তারা পালিয়ে যাবে, আবার খুব কাছে গেলে সোজা তেড়ে আসতে পারে।
কেভিন লিখেছেন, ‘বিশালাকার প্রাণীগুলোর ছবি তুলতে প্রায় এক ঘণ্টা কাটানোর পর তারা ধীরে ধীরে পাহাড়ি পথের আরও উঁচু দিকে উঠে যেতে শুরু করল। হয়তো তারা জানত, ইতোকোর্তোরমিত এলাকায় তাদের স্থানীয়ভাবে সুস্বাদু খাদ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।’
শিকারি
তৃতীয় দিনে কেভিন হলকে ড্যানিয়েলসেন জানালেন যে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে তাঁর একটি কুঁড়েঘর আছে। সেখানে দুটি রাত কাটানোর আমন্ত্রণ জানান তিনি। কুঁড়েঘরটির অবস্থান এমন এক জায়গায় যে আমন্ত্রণ পাওয়ামাত্রই কেভিন হল রাজি হয়ে যান। কারণ, তাঁর মনে হলো, ওখানে গেলে জমে থাকা বরফের ওপর মেরুভালুকের দেখা পাওয়া যেতে পারে।
ড্যানিয়েলসেনের কুঁড়েঘরটি ছিল উজ্জ্বল নীল রঙে রাঙানো। ভেতরে আছে ছোট একটি সোফা, একটি চেয়ার, একটি সিঙ্ক, একটি চুলা আর একটি টয়লেট।
ড্যানিয়েলসেন যদিও আয়ের বাড়তি উৎস হিসেবে গাইডের কাজ করেন, তবে শিকার করাই তাঁর আসল ভালোবাসা, পেশা ও বংশানুক্রমিক ঐতিহ্য। সেখানকার আইনে শিকারিদের শিকার করা প্রাণীর মাংস বা চামড়া বিক্রি করার অনুমতি নেই। মাস্ক অক্সের ক্ষেত্রে তো সেগুলো দেশের বাইরে নেওয়াও নিষেধ।
আইন অনুযায়ী, শিকার করা মাংস কেবল পরিবারের খাবার ও পোশাকের প্রয়োজনে ব্যবহার করা যায়, ঠিক যেমনটা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে হয়ে আসছে।
ড্যানিয়েলসেনের কুঁড়েঘর থেকে কেভিন হলরা প্রায় ২০ কিলোমিটার পূর্ব দিকে যাত্রা শুরু করেন। পাঁচ দিন ভ্রমণের পর তাঁরা ক্যাপ হোপে পৌঁছান। এটি ইতোকোর্তোরমিত থেকে ১৪ কিলোমিটার পশ্চিমে ছোট একটি বসতি। সেখানে প্রায় ২০টি পুরোনো কুঁড়েঘর রয়েছে। রাতে তাঁরা সেখানেই ঘুমিয়েছেন।
পরদিন সকালে দেখা মিলল মেরুভালুকের। ড্যানিয়েলসেন দুরবিন দিয়ে তাকিয়ে হঠাৎ চিৎকার করলেন, ‘পোলার বিয়ার! পোলার বিয়ার!’ কেলভিনরা তখন ছবি তোলার প্রস্তুতি নেন। ভালুকটি প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে বরফের ওপর দাঁড়িয়ে ২০ মিনিট কাটায়, তারপর ধীরে ধীরে চলে যায়।
আলোকচিত্রী জোশুয়া হোলকোর কাছ থেকে গল্প শুনে আরেক ধরনের মেরুভালুকের ছবি তুলতে চেয়েছিলেন কেভিন হল। সাদা লোমের ওই মেরুভালুককে ‘আর্কটিক অঞ্চলের ভূত’ নামে ডাকা হয়। কারণ, তাদের সাদা লোম এত নিখুঁতভাবে আশপাশের পরিবেশের সঙ্গে মিশে যায় যে এদের খালি চোখে দেখা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে কেভিন হল ওই ভালুকদের দেখা পাননি।
পৃথিবীর প্রান্তভাগের জীবনধারা
কেভিন হলের তথ্য অনুসারে, পায়ে হেঁটে ইতোকোর্তোরমিত গ্রামের পুরোটা ঘুরে বেড়াতে আধা ঘণ্টার মতো সময় লাগে। এখানে আছে একটি গির্জা, ছোট একটি ট্রাভেল এজেন্সি, পুলিশ স্টেশন, একটি বার, একটি অতিথিশালা, একটি হেলিপোর্ট এবং পিলেরুইসোক নামের একটি ছোট সুপারমার্কেট। এই সুপারমার্কেটে প্রতি মৌসুমে মাত্র দুটি জাহাজে করে পণ্য আসে।
দোকানের প্রায় ফাঁকা তাক ঘুরে দেখে আমার চোখে পড়ে, সবকিছুর দাম অস্বাভাবিক বেশি। তখন ভাবি, যেখানে কাজের সুযোগ খুব কম, সেখানে স্থানীয় মানুষ এসব জিনিস কিনে কীভাবে চলে?
সবশেষে কেভিন হল লিখেছেন, বাইরে বেরিয়ে অনেক বাড়ির পাশে ঝুলতে থাকা মেরুভালুকের চামড়া আমাকে এই সম্প্রদায়ের শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। আমি এই অভিযানে এসেছিলাম বন্য প্রাণীর অনন্য ছবি তুলতে। এ যাত্রায় তথাকথিত ‘আর্কটিক অঞ্চলের ভূত’দের দেখা না পেলেও তাতে আফসোস নেই। কারণ, এর চেয়ে বেশি কিছু আমি পেয়েছি। পৃথিবীর সবচেয়ে দূরবর্তী একটা স্থানে মানুষ কীভাবে জীবন চালিয়ে যায়, তা আমি উপলব্ধি করতে পেরেছি।’
![]() |
| ইতোকোর্তোরমিত গ্রাম। ছবি: এএফপি ফাইল ছবি |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
নৈতিক মানদণ্ডে বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রের অবস্থান কোথায় by নুরুল হুদা সাকিব ও মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান
লর্ড নোলান এই নীতিগুলোকে জনজীবনে সততা, দায়িত্ববোধ ও স্বচ্ছতার ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেন, যাতে জনসেবার কাজে যাঁরা সম্পৃক্ত, তাঁরা নিজেদের আচরণে এসব মূল্যবোধ ধারণ করতে পারেন। এই সাত নীতি যথাক্রমে সততা, নৈতিকতা, নিরপেক্ষতা, জবাবদিহি, নিঃস্বার্থতা, স্বচ্ছতা ও নেতৃত্ব। এগুলো এখন বিশ্বের বহু দেশের প্রশাসনিক নীতিশিক্ষার ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।
বাংলাদেশেও বিভিন্ন সময় নোলান কমিটির এই নীতিগুলো নিয়ে আলোচনা শোনা গেছে। যুক্তরাজ্যের মতো যদিও এখানে আনুষ্ঠানিকভাবে এই নীতিগুলো গ্রহণ করা হয়নি। এরপরও জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল, তথ্য অধিকার আইন, দুর্নীতি দমন ও সুশাসনের বিভিন্ন নীতিমালায় এগুলোর প্রভাব স্পষ্ট।
এসব নীতি আমাদের প্রশাসন/আমলাতন্ত্রে নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ভিত্তি গঠনে সহায়ক হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু বাস্তব প্রেক্ষাপটে চিত্রটি ভিন্ন। আমলাতন্ত্রে রাজনৈতিক প্রভাব, দলীয় আনুগত্যভিত্তিক নিয়োগ ও নৈতিক শিথিলতা প্রশাসনিক কাঠামোকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। নোলান কমিটির সাতটি নীতির আলোকে বাংলাদেশের প্রশাসন পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয়, কীভাবে জনসেবামুখী প্রশাসন ধীরে ধীরে ক্ষমতাকেন্দ্রিক ও স্বার্থান্বেষী ব্যবস্থায় রূপ নিয়েছে।
ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার ও প্রশাসনিক সংস্কৃতি
বাংলাদেশের মূল প্রশাসনিক কাঠামো বা আমলাতন্ত্র হলো রাষ্ট্র পরিচালনার মূল চালিকা শক্তি। কিন্তু এই কাঠামো কতটা জনস্বার্থে নিবেদিত? নোলান কমিটির দেওয়া সরকারি দায়িত্বে নৈতিকতার সাতটি নীতি গ্রহণ করে বিশ্বজুড়ে অপরাপর দেশসমূহ সংস্কার ও পরিবর্তনের পথে হাঁটতে পারলেও বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই নীতিগুলোর প্রতিফলন কতটা ঘটেছে?
বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রের শিকড় ঔপনিবেশিক আমলে প্রোথিত। ব্রিটিশ প্রশাসনের উদ্দেশ্য ছিল জনগণের সেবা নয়; বরং শাসন ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ক্ষমতা সংরক্ষণ। পাকিস্তান আমলেও সেই কেন্দ্রীকৃত ও কর্তৃত্বমূলক প্রশাসনিক ধারা অব্যাহত থাকে।
স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় কাঠামো বদলালেও প্রশাসনের মৌলিক চরিত্রে তেমন পরিবর্তন আসেনি। শাসক পরিবর্তিত হলেও শাসনের ধরন রয়ে গেছে প্রায় একই। ফলে জনসেবার চেতনা স্থান করে নিয়েছে ক্ষমতার আনুগত্য ও প্রভাবের রাজনীতি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দলীয় প্রভাব, আনুগত্যের বিনিময়ে পদোন্নতির সংস্কৃতি এবং ‘ফাইলনির্ভর’ প্রশাসনিক জটিলতা।
সততা ও নৈতিকতার কাঠামোগত অবমূল্যায়ন
নোলানের প্রথম দুটি নীতি—সততা ও নৈতিকতা; জনসেবায় ন্যায্যতা, দায়বদ্ধতা ও নৈতিক সাহসের প্রতীক। কিন্তু বাংলাদেশের প্রশাসনিক বাস্তবতা এ নীতিগুলোর প্রায় বিপরীত চিত্র উপস্থাপন করে।
যেমন পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তা সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ সত্ত্বেও তিনি কর্মজীবনে একাধিক রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ও পদোন্নতি পেয়েছেন। সরকারি দায়িত্বে থেকে ব্যবসায়িক প্রভাব বিস্তার ও অবৈধ সম্পদ গঠনের অভিযোগে অভিযুক্ত হলেও প্রশাসন তাঁর বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। ২০২০-২১ সালে সততাসহ নানা গুণের কারণে তিনি রাষ্ট্রীয় শুদ্ধাচার পুরস্কার পান।
অপর দিকে দুদকের কর্মকর্তা শরীফ উদ্দিনের ঘটনা সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরে। বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অনুসন্ধান করায় তাঁকে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। সম্প্রতি আদালত অবশ্য চাকরিচ্যুতি বেআইনি ঘোষণা করে তাঁকে পুনর্বহালের নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু এটি আমাদের প্রশাসনে সৎ কর্মকর্তাদের পরিণতির বিষয়ে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে রইল।
এই দুই বিপরীত ঘটনা দেখায়, বাংলাদেশে সততা ও নৈতিকতা শুধু উপেক্ষিত নয়; বরং কাঠামোগতভাবে দুর্বল করে রাখা হয়েছে। দুর্নীতিবাজেরা পুরস্কৃত হন আর নৈতিক সাহস দেখানো কর্মকর্তারা শাস্তি পান। ফলে প্রশাসনে এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে সততার চেয়ে আনুগত্য ও আপসকেই নিরাপদ পথ হিসেবে দেখা হয়।
নিরপেক্ষতার সংকট অথবা দলীয় আনুগত্যে পেশাদারত্বের অবক্ষয়
নোলানের তৃতীয় নীতি হলো নিরপেক্ষতা। অর্থাৎ দল–মতনির্বিশেষে যোগ্যতা ও ন্যায়ের ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া, যা বাংলাদেশের প্রশাসনিক বাস্তবতায় আজ বিলুপ্তপ্রায়। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রশাসন ক্রমে একদলীয় আনুগত্যভিত্তিক কাঠামোয় পরিণত হয়, যেখানে কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও সুবিধা নির্ধারিত হতো তাঁদের রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে।
বিশেষ করে ২০২৪ সালের পাতানো নির্বাচনে অনেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা প্রকাশ্যে ক্ষমতাসীন দলের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করেছেন, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় দলীয় প্রার্থীদের সহায়তা দিয়েছেন—এমন অভিযোগ একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে আসে। অন্যদিকে ভিন্ন রাজনৈতিক মতাবলম্বী বা নিরপেক্ষ কর্মকর্তারা বঞ্চনা, বদলি, এমনকি প্রশাসনিক নিপীড়নের মুখে পড়েছেন।
ফলে প্রশাসন ধীরে ধীরে একটি দলীয় আনুগত্যনির্ভর কাঠামোতে পরিণত হয়েছে, যেখানে পেশাগত দক্ষতা নয়; বরং রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতাই সাফল্যের পূর্বশর্তে পরিণত হয়েছে, যা নোলানের নিরপেক্ষতার নীতির পরিপন্থী।
জবাবদিহির ভাঙা কাঠামো ও সামষ্টিক বিপর্যয়
নোলানের চতুর্থ নীতি জবাবদিহি আজ বাংলাদেশের প্রশাসনিক বাস্তবতায় প্রায় অকার্যকর। অধিকাংশ তদারকি প্রতিষ্ঠানই স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতিগ্রস্ত সিন্ডিকেটে আবদ্ধ। ফলে অভ্যন্তরীণ জবাবদিহির ব্যবস্থা দিয়ে অসৎ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বাহ্যিক তদারকি সংস্থা যেমন দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।
অপেক্ষাকৃত দুর্বল কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিলেও প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তি বা মহলের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার বহু উদাহরণ রয়েছে। অন্যদিকে ন্যায়পালসহ স্বাধীন জবাবদিহি প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুপস্থিতি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতে আমাদের সামষ্টিক ব্যর্থতাকে আরও প্রকট করেছে। ফলে প্রশাসনে দায়বোধের পরিবর্তে বাধাহীন দুর্নীতির সংস্কৃতি শক্তিশালী হয়েছে।
জনস্বার্থ নয়, ব্যক্তিস্বার্থই মুখ্য
নোলানের নীতিসমূহের অন্যতম নীতি হলো নিঃস্বার্থতা, অর্থাৎ সরকারি দায়িত্ব পালনে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থ যেন প্রভাব ফেলতে না পারে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রশাসনে এই নীতি প্রায় অনুপস্থিত।
২০২৫ সালের শুরুতে অন্তর্বর্তী সরকার ৫৫০ কর্মকর্তাকে অতিরিক্ত বা ‘সুপারনিউমারারি’ পদে পদোন্নতি দেয়, যা অনুমোদিত শূন্য পদের চেয়ে বহুগুণ বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, এসব পদোন্নতির পেছনে যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য বা ব্যক্তিগত সম্পর্ক বড় ভূমিকা রেখেছে।
এতে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নষ্ট হচ্ছে এবং প্রশাসনিক দক্ষতা ও ন্যায্যতা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ দেখা দিচ্ছে। ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজের প্রেরণা হয়ে দাঁড়ায় নিজের অবস্থান রক্ষা, জনস্বার্থ নয়।
রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার জালে স্বচ্ছতা ও নেতৃত্বের সংকট
বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রে স্বচ্ছতা ও নেতৃত্ব—নোলান নীতির এই দুটি মৌলিক মূল্যবোধ এখন মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে। স্বচ্ছতার অর্থ হলো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যেন খোলামেলা প্রক্রিয়ায়, জবাবদিহির মাধ্যমে গৃহীত হয় এবং জনস্বার্থে পরিচালিত হয়।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রভাব ও অভ্যন্তরীণ পৃষ্ঠপোষকতা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে অস্বচ্ছ করে তুলছে। ২০২৪ সালে কক্সবাজারের ভূমি অধিগ্রহণ দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত এক কর্মকর্তাকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরিচালক হিসেবে নিয়োগের উদ্যোগ তার স্পষ্ট উদাহরণ। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এ ঘটনাকে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও নৈতিক নেতৃত্বের পরিপন্থী হিসেবে আখ্যা দেয়।
যখন অভিযোগে জড়িত ব্যক্তিরাও গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হন, তখন নেতৃত্বের নৈতিক মানদণ্ড ভেঙে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে নেতৃত্ব মানে দায়িত্ব ও সততার প্রতীক হওয়ার পরিবর্তে ক্ষমতাবানদের আনুগত্য প্রদর্শনের উপায়ে পরিণত হয়। ফলে প্রশাসনে স্বচ্ছতা দুর্বল হয় এবং প্রকৃত নেতৃত্বের বদলে গোষ্ঠীনির্ভর আনুগত্যের সংস্কৃতি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে ২০০৯ সালের তথ্য অধিকার আইন নাগরিকদের প্রশাসনিক তথ্য জানার সাংবিধানিক অধিকার দিলেও বেশির ভাগ দপ্তর এখনো গোপনীয়তাকে একটি ‘প্রতিরক্ষামূলক দেয়াল’ হিসেবে ব্যবহার করছে। ফলে দেখা যায়, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও খরচের স্বচ্ছতা যেখানে গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত হওয়া উচিত, সেখানে ‘গোপনীয়তা’ নীতিকে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক স্বার্থরক্ষার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
কীভাবে পরিবর্তন সম্ভব
বাংলাদেশের প্রশাসনে নৈতিকতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হলে শুধু আইন বা নির্দেশনা নয়, প্রয়োজন বাস্তব ও কাঠামোগত পরিবর্তন।
প্রথমত, নৈতিকতা ও জনসেবা মনোভাবকে প্রশাসনিক প্রশিক্ষণের মূল ভিত্তি করতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (বিপিএটিসি) ও পাবলিক সার্ভিস একাডেমির প্রশিক্ষণগুলোতে আইন, নীতি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ওপর জোর দেওয়া হলেও নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের চর্চা প্রায় অনুপস্থিত।
যুক্তরাজ্যে সিভিল সার্ভিসের প্রশিক্ষণে ‘এথিক্যাল লিডারশিপ’ বা নৈতিক নেতৃত্ব মডিউল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যেখানে কর্মকর্তারা বাস্তব জীবনের নৈতিক দ্বন্দ্ব নিয়ে আলোচনা করেন। যেমন রাজনৈতিক চাপ এলে কীভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত বজায় রেখে তা থেকে উত্তরণ করা যায়। অনুরূপভাবে দক্ষিণ কোরিয়ার অ্যান্টি করাপশন অ্যান্ড সিভিল রাইটস কমিশন (এসিআরসি) কর্মকর্তাদের জন্য নৈতিকতার ওপর নিয়মিত কর্মশালা আয়োজন করে সেখানে ব্যক্তিগত সততা, জনস্বার্থ রক্ষা ও নৈতিক নেতৃত্বকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শেখানো হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এ ধরনের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি প্রবর্তন করা গেলে কর্মকর্তাদের মানসিকতা ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করবে।
দ্বিতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে হবে। পদোন্নতি, বদলি ও মূল্যায়নে রাজনৈতিক প্রভাব দূর করে সততা, কর্মদক্ষতা ও নাগরিক সেবার মানদণ্ডে কর্মকর্তাদের বিচার করতে হবে। উদাহরণ হিসেবে সিঙ্গাপুরের সিভিল সার্ভিসকে নেওয়া যেতে পারে। সেখানে কর্মকর্তাদের বেতন উচ্চ হলেও প্রতিটি সিদ্ধান্ত স্বচ্ছ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হয়।
‘হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা আইন’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের নিরাপদভাবে অনিয়ম প্রকাশে উৎসাহিত করা যেতে পারে। যেমনটি হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে। একই সঙ্গে ই-গভর্ন্যান্স ও ওপেন ডেটা প্ল্যাটফর্ম চালুর মাধ্যমে নাগরিকদের তথ্য প্রাপ্তি ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা দরকার। ভারতের ‘আরটিআই অনলাইন’ বা এস্তোনিয়ার ই–গভর্নমেন্ট মডেল এর সফল উদাহরণ।
পরিশেষে শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা যদি নিজেদের আচরণে স্বচ্ছতা ও নৈতিক নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, তবে সেটি নিচের স্তরের কর্মচারীদের জন্যও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠবে। নৈতিক সংস্কৃতির এ রূপান্তর সময়সাপেক্ষ, কিন্তু এটি ছাড়া প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতার পুনর্গঠন সম্ভব নয়।
নৈতিকতার পথে ফেরা
বাংলাদেশের প্রশাসন ‘দক্ষ’, কিন্তু এই দক্ষতার প্রায় সবটুকু জনসেবার চেয়ে নির্দেশ পালনে বেশি ব্যবহৃত হয়। নোলানের সাতটি নীতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জনসেবা মানে কেবল নির্দেশ মানা নয়; বরং বিবেকবান হওয়া। যদি ব্রিটিশ প্রশাসন নোলানের নীতিসমূহের বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে নিজেদের পুনর্গঠিত করতে পারে, তবে বাংলাদেশও পারবে। এ জন্য দরকার নৈতিক প্রশাসনিক কাঠামো। যেখানে ক্ষমতার চেয়ে সততা, আনুগত্যের চেয়ে দায়িত্ব এবং ভয়ের চেয়ে ন্যায়ের মূল্য বেশি হবে।
আমলাতন্ত্রকে জনসেবায় ফিরিয়ে আনতে হলে আমাদের কাগুজে নীতির চেয়ে বাস্তব আচরণ ও সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। নৈতিকতা আইন দিয়ে চাপিয়ে দেওয়া যায় না। এটি গড়ে তুলতে হয় নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত, নাগরিকের দাবি ও প্রশাসনের আন্তরিকতার মাধ্যমে।
* নুরুল হুদা সাকিব, অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
* মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান, স্বাধীন গবেষক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
- মতামত লেখকদের নিজস্ব

About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
দাঁত দিয়ে জাহাজ টেনে তুললেন মাহরুস
বর্তমানে এই রেকর্ডটি ২০১৮ সালে একজন ব্যক্তি দাঁত দিয়ে ৬১৪ টন (৫,৫৭,০০০ কেজি) ওজনের জাহাজ টেনেছিলেন। এর আগেও মাহরুস একাধিক বিশ্ব রেকর্ডের মালিক। ২০২৫ সালের মার্চে তিনি দাঁত দিয়ে ২৭৯ টন (২,৫৩,১০৫ কেজি) ওজনের ট্রেন প্রায় ১০ মিটার (৩৩ ফুট) টেনে নিয়ে যান এবং গিনেস কর্তৃপক্ষ তাকে সবচেয়ে ভারী রেল টানার রেকর্ডধারী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তাকে আরও দুইটি প্রশংসাপত্র দেয়া হয়- সবচেয়ে ভারী লোকোমোটিভ টান এবং দ্রুততম ১০০ মিটার সড়কযান টান-এর জন্য। এর তিন বছর আগে, তিনি দাঁত দিয়ে ১৫,৭৩০ কেজি ওজনের ট্রাক টেনে বিশ্ব রেকর্ড গড়েন। শনিবারের চ্যালেঞ্জের আগে মাহরুস প্রতিদিন ছয় ঘণ্টা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তার খাদ্যতালিকায় ছিল প্রচুর প্রোটিন ও আয়রনসমৃদ্ধ খাবার। প্রতিদিন অন্তত এক ডজন ডিম, দুইটা সম্পূর্ণ মুরগি এবং ৫ কেজি মাছ। ৬ ফুট ৩ ইঞ্চি (১.৯ মিটার) লম্বা ও ১৫৫ কেজি (৩৪১ পাউন্ড) ওজনের এই শক্তিশালী মানুষ বলেন, ছোটবেলাতেই তিনি নিজের অস্বাভাবিক শক্তির প্রমাণ পেয়েছিলেন। নয় বছর বয়সে তিনি টাকার বিনিময়ে ভারী জিনিস টানতেন। একবার খেলতে গিয়ে বন্ধুর হাত ভেঙে ফেলেছিলেন শুধুমাত্র টান দেয়ার সময়! ছোটবেলা থেকেই তিনি খেলাধুলা ভালোবাসতেন- কুংফু, কিকবক্সিং শিখেছেন। এমনকি কায়রোতে নিজের রেসলিং টিম গঠন করেন।
তার বন্ধুরা একবার দেখেছিলেন, তিনি জিমের এক ফাঁকা প্রাঙ্গণে বিশাল ট্রাকের টায়ার পরপর দশবার উল্টে দেন, এমনকি এক আঙুলে একটি গাড়ি ঠেলে দেন। তখনই বন্ধুরা তাকে বিশ্ব রেকর্ডের চেষ্টায় উৎসাহ দেন। মাহরুস বলেন, তিনি কোনো সাপ্লিমেন্ট খাবার খান না। কিন্তু প্রতিদিন দুইবার ব্যায়াম করেন এবং যথেষ্ট ঘুমান। তার পরবর্তী লক্ষ্য আরও অবিশ্বাস্য। তিনি মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসির কাছে অনুমতি চাইবেন একটি সাবমেরিন টানার জন্য। ভবিষ্যতে তিনি শুধু চোখের পাতার পেশি দিয়ে বিমান টানার পরিকল্পনাও করছেন! মাহরুস বিশ্বাস করেন, তিনি যেসব বস্তু টানেন, সেগুলোর সঙ্গে আগে কথা বলা জরুরি। এতেই নাকি বস্তুটির সঙ্গে তার হৃদস্পন্দনের একধরনের সংযোগ তৈরি হয়। তার ভাষায়, আমি যে জিনিসটি টানব, তাকে আমার শরীরের অংশ মনে করি। তখন সেটি আমার হৃদস্পন্দনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোয়- এটাই আমার সাফল্যের রহস্য।

About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
ঈদে শিশুদের জন্য কী পোশাক এল by ফারদীন–ই–হাসান ফুয়াদ
গরমে আরামদায়ক কাপড়
ঈদপোশাকে প্রধানত সুতি, লিনেন ও ভিসকস—এই তিন ধরনের কাপড় প্রাধান্য পেয়েছে। তবে সুতি কাপড়ই সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া ডাবল জর্জেট, সাটিন সিল্ক, সিল্কও ব্যবহার করা হয়েছে।
মেয়েশিশুদের জন্য আছে সালোয়ার-কামিজ, ফ্রক, টিউনিক, ঘাগরা-চোলি, ওয়ান–পিস, টু–পিস ও থ্রি–পিস স্যুট। আরও আছে সারারা, খাটো কামিজ, ফারসি এবং লেহেঙ্গা ধাঁচের স্কার্ট। আগে ফ্রক ও টিউনিকের চাহিদা বেশি থাকলেও এবার সালোয়ার-কামিজ আর ঘাগরা-চোলির দিকেই ঝোঁক বেশি।
ছেলেশিশুদের জন্য আছে পাঞ্জাবি, পায়জামা, কাবলি, টি-শার্ট, পোলো শার্ট ও ফতুয়া। এ ছাড়া আছে হাফহাতা, ফুলহাতা এবং থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট।
পোশাকে উজ্জ্বল রং
গরমকে মাথায় রেখে পোশাকের রং বাছাই করা হয়েছে। মেয়েশিশুদের পোশাকে প্রাধান্য পেয়েছে উজ্জ্বল রং। ফিরোজা, লাল, কমলা, গোলাপি ও বেগুনির বিভিন্ন শেড ব্যবহার করা হয়েছে।
ছেলেশিশুদের ঈদপোশাকগুলো মোজাইক থিমে করা হয়েছে। নীল, ধূসর, বাদামি এবং রাস্টিক অরেঞ্জ রংগুলো প্রাধান্য পেয়েছে। শার্ট ও পাঞ্জাবির জন্য ব্যবহার করা হয়েছে সুতি এবং ভিসকস কাপড়। পাঞ্জাবির মোটিফে আছে স্ট্রাইপ, সঙ্গে আছে রঙিন কোটি।
নকশা
শিশুদের আগ্রহোদ্দীপক বিষয়গুলো স্ক্রিন প্রিন্টের মাধ্যমে ছেলেশিশুদের শার্টে তুলে আনা হয়েছে। শার্ট ও টি-শার্টে বিভিন্ন ধরনের কার্টুন এবং অ্যানিমেশন চরিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের প্যাচওয়ার্কও করা হয়েছে। আজরাক ও বোহো থিমকে কেন্দ্র করে পোশাকে নকশা এসেছে।
পাঞ্জাবিতে আজরাক থিমের প্রিন্টে নকশা করা হয়েছে। এতে জারদৌসি, কারচুপির কাজও আছে। বোহো থিমে শার্ট, টি-শার্ট, পোলো শার্ট এবং মেয়েদের টপ নকশা করা হয়েছে। স্পিডবোট, তরমুজ, কলা—এসব মোটিফ কমিকধাঁচে শিশুদের পোশাকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
কাট ও প্যাটার্ন
মেয়েশিশুদের পোশাকের প্যাটার্নে লেয়ারিং, ফ্লেয়ার গুরুত্ব পেয়েছে। স্তরভিত্তিক নকশাও আছে। যেমন অরগাঞ্জা কিংবা টিস্যু কাপড়ের সঙ্গে জর্জেট, ভিসকস বা সাটিন কাপড়ের স্তর। হাতায় এসেছে বৈচিত্র্য—পাফ হাতা, লেয়ারড হাতা, সার্কুলার হাতা, বেলুন আকৃতি দেখা যাচ্ছে। মেয়েশিশুদের পোশাকে এমব্রয়ডারি, কাচের কাজ, জারদৌসি এবং কারচুপির কাজ করা হয়েছে।
| শিশুদের পোশাকে স্টাইলের পাশাপাশি স্বস্তির দিকটাও খেয়াল রাখা হয়েছে। মডেল: জারিস বিন জায়েদ, আমায়রা রহমান। পোশাক: ক্লাব হাউস। ছবি: কবির হোসেন |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
শহরের কাছেই পাহাড়–ঝরনা ও সাগর–হ্রদ, ঘুরে আসুন এক দিনে by কৃষ্ণ চন্দ্র দাস
সীতাকুণ্ডে বেড়ানোর উপযুক্ত সময় বর্ষা থেকে শীত মৌসুম। বর্ষায় পানিতে টইটম্বুর থাকে ঝরনা। তবে এ সময় ভ্রমণ কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাই শীত মৌসুমকেই নিরাপদ ভ্রমণ ও ট্রেকিংয়ের উপযুক্ত সময় হিসেবে বেছে নেন পর্যটকেরা। শীতল আবহাওয়ার কারণে এ সময় পাহাড়, জঙ্গল ও বনবাদাড়ে ঘুরে বেড়াতে ক্লান্তি লাগে না। সহজেই পাহাড়ে বেয়ে ওপরে ওঠা যায়।
সীতাকুণ্ডের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ক। মহাসড়কের পূর্ব পাশে সারি সারি পাহাড়। আর সেখানেই রয়েছে ঝরনা ও হ্রদ। পাহাড়গুলোয় হনুমান–বানরসহ বন্য প্রাণীর ছোটাছুটি, ঝিঁঝি পোকার ডাক ও পাখির কলতান উপভোগ করা যায়। আর পশ্চিম দিকে সমুদ্রসৈকত। সেখানে বসে উপভোগ করা যায় লাল কাঁকড়ার ছোটাছুটি, সাগরের গর্জন ও মাছ ধরার নৌকাসহ মনোরম নানা দৃশ্য।
সীতাকুণ্ড উপজেলাটি চট্টগ্রাম নগরের পাশেই। ফলে চট্টগ্রাম নগর থেকে মাত্র এক দিনেই সীতাকুণ্ডের পাহাড়–ঝরনা ও সাগর–হ্রদের দৃশ্য উপভোগের সুযোগ রয়েছে। তবে সময় থাকলে দুই থেকে তিন দিনের ভ্রমণের পরিকল্পনাও নিতে পারেন। একটু আগেভাগে কোথায়, কীভাবে যাবেন—এসব ঠিক করে রাখলে ভ্রমণ যেমন আনন্দদায়ক হবে, তেমনি খরচও কম হবে।
সীতাকুণ্ডে ভ্রমণের ক্ষেত্রে পাহাড় ট্রেকিং ও ঝরনা–হ্রদ সকালে ঘুরে দেখাই ভালো। তাহলে বিকেলে সমুদ্রসৈকতে ঘুরে বেড়ানো যায়। সাগরপাড়ে বসে দেখা যায় সূর্যাস্তের দৃশ্য।
সীতাকুণ্ডে মোট আটটি ঝরনা রয়েছে। ঝরনাগুলো হলো সহস্রধারা–১, রূপসী ঝরনা, সুপ্তধারা, সহস্রধারা–২, মধুখাইয়া, বাড়বকুণ্ডের অগ্নিকুণ্ড, বাঁশবাড়িয়া বিলাসী ঝরনা ও কুমারীকুণ্ড। এর মধ্যে সহজেই সহস্রধারা–২ ঝরনাটিতে যেতে পারেন পর্যটকেরা। কিন্তু অন্য সাতটি ঝরনায় যেতে হলে পর্যটকদের পাহাড় ডিঙিয়ে যেতে হয়। পাহাড় ডিঙিয়ে ঝরনার কাছে যাওয়ার রোমাঞ্চকর যাত্রা পর্যটকেরা বেশ উপভোগ করেন। সীতাকুণ্ডে ঘুরে বেড়ানোর মতো তিনটি সমুদ্রসৈকত রয়েছে। এর মধ্যে আকিলপুর ও বাঁশবাড়িয়া সমুদ্রসৈকত বালুময়। এর বাইরে গুলিয়াখালী সৈকতটি ম্যানগ্রোভ বনযুক্ত।
কম পরিশ্রমে ঝরনা, হ্রদ ও সমুদ্রসৈকত দেখতে এক দিনের ভ্রমণের পরিকল্পনায় রাখতে পারেন সহস্রধারা ঝরনা–২ ও লবণাক্ষ হ্রদ ও গুলিয়াখালী সমুদ্রসৈকত। তবে কিছুটা পরিশ্রম করলে এর সঙ্গে বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্কের সুপ্তধারা ঝরনা ও সহস্রধারা ঝরনা–১ ঘুরে আসা যায়। সীতাকুণ্ডে পর্যটকদের জন্য কিছুটা কষ্টকর যাত্রা হয় চন্দ্রনাথ পাহাড় ও মন্দির, রূপসী ঝরনা ও বিলাসী ঝরনায় যাওয়ার ক্ষেত্রে। তবে সুবিধা হলো সীতাকুণ্ডের সব পর্যটন স্পটই মাত্র ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে।
সীতাকুণ্ডে যাওয়া ও থাকা
ঢাকা কিংবা চট্টগ্রাম থেকে যেকোনো বাসযোগে সীতাকুণ্ড পৌর সদরের বাসস্ট্যান্ডে নামতে হবে। চট্টগ্রাম নগর থেকে যেতে খুব একটা সময় লাগে না। তাই দূরের পর্যটকেরা চট্টগ্রাম নগরে রাতযাপন করে সীতাকুণ্ডে ঘুরে বেড়াতে পারেন। তবে সীতাকুণ্ডেও বিভিন্ন মানের ১৯টি হোটেল রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে ১০টি হোমস্টে। ৩০০ থেকে ১ হাজার টাকার মধ্যেই কক্ষ ভাড়া পাওয়া যায়।
ভ্রমণ পরিকল্পনা–১
ঝামেলা এড়িয়ে কম পরিশ্রমে এক দিনের পরিকল্পনায় রাখতে পারেন সহস্রধারা ঝরনা–২, লবণাক্ষ হ্রদ ও গুলিয়াখালী সৈকতে ঘুরে বেড়ানো। লবণাক্ষ হ্রদ ও সহস্রধারা ঝরনা–২ যেতে সীতাকুণ্ড পৌর সদর থেকে মিনিবাস কিংবা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ছোট দারোগাহাট নামতে হবে। এরপর হেঁটে কিংবা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় সূর্য মন্দির যেতে হবে। তারপর টিকিট কেটে লবণাক্ষ হ্রদে বেড়াতে পারেন। নৌকায় ভ্রমণ করতে করতে একসময় পৌঁছে যাবেন সহস্রধারা ঝরনা–২–এ। সেখানে ঝরনার পানিতে নিজেকে ভিজিয়ে নিতে পারেন। তবে হ্রদের পানিতে না নামায় উত্তম। কারণ, হ্রদটি অত্যন্ত গভীর এবং পানিও ঠান্ডা। এই ঝরনা দেখার যাত্রা সকাল ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে করাই ভালো। এরও আগে যেতে পারেন। যেতে সময় লাগতে পারে আধা ঘণ্টা থেকে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা। তবে যেভাবেই যান না কেন, ফিরতে হবে বেলা দেড়টার মধ্যে।
সীতাকুণ্ডে যদি হোটেল ভাড়া নেন, তবে এর আশপাশে দুপুরের খাবার সেরে হালকা বিশ্রাম নিলে ক্লান্তি কম হয়। বিশ্রাম শেষে পৌর সদরের নামার বাজার সড়কের মাথায় গিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় গুলিয়াখালী সৈকতের উদ্দেশে রওনা দিতে হবে। বেলা সাড়ে তিনটার মধ্যে গুলিয়াখালী বেড়িবাঁধে পৌঁছাতে পারলে সুবিধা হয়। এরপর হেঁটে কিংবা নৌকায় মূল সৈকতে যাওয়া যায়। সূর্যাস্ত পর্যন্ত সেখানে কাটিয়ে ভ্রমণ শেষ করতে পারেন।
ভ্রমণ পরিকল্পনা–২
পাহাড় ট্রেকিং, দুটি ঝরনা ও সমুদ্রসৈকত দেখতে এ পরিকল্পনাটি করতে পারেন। এটিতে রয়েছে বোটানিক্যাল গার্ডেন, সুপ্তধারা ঝরনা ও বাঁশবাড়িয়া সৈকতে ঘুরে বেড়ানো। এটিও শুরু করার উত্তম সময় সকাল ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে।
সীতাকুণ্ড পৌর সদরের মন্দির সড়কের মাথা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় যেতে হবে বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্কের ফটক। এরপর টিকিট কেটে ভেতরে প্রবেশ করলেই পাহাড় ট্রেকিং শুরু। কিছুদূর গেলে দেখা মিলবে সুপ্তধারা ঝরনার। এরপর সেখান থেকে পাহাড় বেয়ে আরও এক হাজার ফুট ওপরে উঠলে দেখা মিলবে সহস্রধারা ঝরনা–১। সেখান থেকে বেলা আড়াইটার মধ্যে ফিরতে হবে। এরপর হালকা বিশ্রাম শেষে রওনা দিতে হবে বাঁশবাড়িয়া সৈকতের উদ্দেশে। ইকোপার্কের গেট থেকে কিংবা সীতাকুণ্ড বাসস্ট্যান্ড থেকে ৮ ও ১৭ নম্বর মিনিবাসে বাঁশবাড়িয়া বাজারে নামতে হবে। এরপর মহাসড়ক পার হয়ে সৈকত সড়কের মাথা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় যাওয়া যায় সমুদ্রসৈকতে। বিকল্প হিসেবে পৌর সদরের কলেজ রোডের মাথা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে বাঁশবাড়িয়া সৈকতে যাওয়া যায়। সে ক্ষেত্রে সিএনজিচালিত অটোরিকশার ভাড়া দরদাম করে নিতে হবে।
ভ্রমণ পরিকল্পনা–৩
ভূমি থেকে ১ হাজার ২০০ ফুট ওপরে পাহাড়ের চূড়ায় থাকা চন্দ্রনাথ মন্দির ও সমুদ্রসৈকত ভ্রমণে এ পরিকল্পনাটি নিতে পারেন। এ ক্ষেত্রে ভ্রমণ সকাল সাতটা থেকে আটটার মধ্যে শুরু করতে পারলে ভালো হয়। পাহাড় বেয়ে ওঠানামায় চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা সময় লেগে যেতে পারে।
শুরুতেই পৌর সদরের মন্দির সড়কের মাথা থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশা কিংবা সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিয়ে ৩ নম্বর সেতু পর্যন্ত যেতে হবে। পথে অসংখ্য মঠ ও মন্দির দেখা যাবে। এরপর হেঁটে পাহাড়ে ওঠার পালা। পাহাড়টির একেবারে চূড়ায় রয়েছে চন্দ্রনাথ মন্দির। দ্বিতীয় বৃহত্তম চূড়ায় বিরূপাক্ষ মন্দির। চূড়ায় ওঠার সময় পথে পথে বানরের দেখা মিলতে পারে। শোনা যাবে পাখিদের কিচিরমিচির। বিরূপাক্ষ মন্দিরের কাছাকাছি গেলে মেঘের ছোঁয়াও পাওয়া যেতে পারে। চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার পর ক্লান্ত–পরিশ্রান্ত শরীরে চারদিকে সবুজ পাহাড় দেখতে দেখতে চোখ জুড়িয়ে যাবে। এরপর ফিরে এসে আকিলপুর সৈকতে বেড়াতে পারেন। সে ক্ষেত্রে পৌর সদর থেকে ৮ ও ১৭ নম্বর মিনিবাসে ছোট কুমিরা বাজারে নামতে হবে। সেখান থেকে অটোরিকশায় সমুদ্রসৈকতে যাওয়া যায়।
ভ্রমণ পরিকল্পনা–৪
সূর্যাস্ত দেখা ও নৌকায় ভ্রমণের জন্য যেতে পারেন ভাটিয়ারী লেক ও সানসেট পয়েন্ট। এ দুটি পর্যটনকেন্দ্র সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত। চট্টগ্রাম নগর থেকে মাত্র ছয় কিলোমিটার দূরে ভাটিয়ারী বাজার। সীতাকুণ্ড থেকে এর দূরত্ব ২৫ কিলোমিটার। সেখান থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় শুরুতেই আপনি যেতে পারেন ভাটিয়ারী হ্রদে। এই যাত্রা দুপুরে শুরু করলেও পারবেন। সেখানে কিছুক্ষণ নৌকায় ভ্রমণ করে সেনাবাহিনী পরিচালিত সানসেট রেস্তোরাঁয় সময় কাটানো যায়। রেস্তোরাঁটি পাহাড়ের টিলায়। সেখান থেকেও সুন্দর সূর্যাস্ত উপভোগ করা যায়। একই দিনে আপনি চাইলে সকালে কিংবা বিকেলে কুমিরা জেটি ঘুরে আসতে পারেন। ৭০০ মিটারের জেটিতে দাঁড়িয়ে সাগরের দৃশ্য দেখে মনোরম বিকেল কাটানো যায়। এ ছাড়া সেখান থেকে দেখা যায় জাহাজভাঙার কাজ। উপকূলের কিছু কারখানায় পুরোনো জাহাজ কাটা হয়।
ভ্রমণ পরিকল্পনা–৫
সীতাকুণ্ড ভ্রমণে অগ্নিকুণ্ড মন্দির, অগ্নিকুণ্ড ঝরনা ও সৈকত ভ্রমণও রাখতে পারেন পরিকল্পনায়। এর জন্য ভ্রমণ শুরু করতে হবে সকালে। সীতাকুণ্ড সদর কিংবা চট্টগ্রাম নগর থেকে বাসযোগে বাড়বকুণ্ড বাজারে পৌঁছাতে হবে। সেখান থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা কিংবা ব্যাটারিচালিত রিকশায় যাওয়া যাবে অগ্নিকুণ্ড মন্দিরের একেবারে কাছে। এরপর ছোট্ট একটি পাহাড় বেয়ে ওপরে উঠলে অগ্নিকুণ্ড মন্দির। সেখানে দেখা যাবে পানির ওপরে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। মন্দিরের কাছেই অগ্নিকুণ্ড ঝরনা। তবে শীতকালে এই ঝরনায় পানি থাকে না। অগ্নিকুণ্ড মন্দির থেকে ফিরে এসে বিকেলে যেকোনো একটি সমুদ্রসৈকতে ভ্রমণের মতো পর্যাপ্ত সময় থাকে।
পাশেই মিরসরাই
সীতাকুণ্ডের মতো ঝরনা–হ্রদ রয়েছে পাশের উপজেলা মিরসরাইয়েও। সেখানে মুহুরী প্রজেক্ট, মহামায়া হ্রদ, খৈয়াছাড়া ঝরনা, রূপসী ঝরনা, ডোমখালী সমুদ্রসৈকত, মেলখুম ট্রেইলসহ বেশ কিছু পর্যটন স্পট রয়েছে। সীতাকুণ্ডের সঙ্গে চাইলে পাশের উপজেলা মিরসরাইয়ের এসব পর্যটনকেন্দ্রও ভ্রমণের পরিকল্পনায় রাখা যায়।
![]() |
| চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সহস্রধারা ঝরনা। সম্প্রতি তোলা। ছবি: প্রথম আলো |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
চেরনোবিলে রহস্যজনক নীল কুকুর
চেরনোবিল নিষিদ্ধ অঞ্চলে এখন প্রায় ৭০০টি কুকুর বসবাস করছে। এরা মূলত সেই পোষা প্রাণীদের বংশধর, যাদের মালিকরা ১৯৮৬ সালে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর এলাকা খালি করার সময় ফেলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। তবে সংস্থাটি বলেছে, কুকুরগুলোর এই নীল রঙের কারণ তেজস্ক্রিয় বিকিরণ নয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের মতে, সবচেয়ে সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো- কুকুরগুলো কোনো রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শে এসেছে, যেমন কোনো লিক হওয়া পোর্টেবল টয়লেটের নীল তরল। এদিকে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কুকুরগুলো সম্পূর্ণ সুস্থ ও সক্রিয় আছে, যদিও তাদের শরীরের রঙ অস্বাভাবিক। কর্মীরা নীল কুকুরগুলোকে ধরার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন, যাতে পরীক্ষার মাধ্যমে এ রহস্যের সঠিক কারণ নির্ণয় করা যায়।

About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Monday, March 30, 2026
নিজের শুক্রাণু ব্যবহার করে ‘শিশু প্রজনন খামার’ গড়ার পরিকল্পনা করেছিলেন এপস্টিন
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনের অনুযায়ী, বছরের পর বছর ধরে এপস্টিন বিভিন্ন বিজ্ঞানী ও পরিচিত ব্যক্তিদের কাছে নিজের একটি ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। এপস্টিন চাইতেন, নিউ মেক্সিকোতে অবস্থিত তাঁর বিশাল খামারে তাঁর শুক্রাণু ব্যবহার করে নারীরা গর্ভধারণ করুক এবং অনেক সন্তান হোক।
যাঁরা ব্যক্তিগতভাবে এ পরিকল্পনার কথা শুনেছিলেন, তাঁরা এটিকে ‘বেবি র্যাঞ্চ’ বা ‘শিশু প্রজনন খামার’ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে তাঁর এ পরিকল্পনা বাস্তবে কখনো কার্যকর হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। হয়ে থাকলেও তা আইনত অপরাধ বলে বিবেচিত হবে কি না, তা–ও স্পষ্ট নয়।
বছরের পর বছর ধরে তদন্তকারী ও সাংবাদিকেরা দেখিয়েছেন, এপস্টিন তাঁর আর্থিক সাফল্য নিয়ে বাড়িয়ে বলতেন। তিনি তাঁর গ্রাহকদের পরিচয় ভুলভাবে উপস্থাপন করতেন। ব্যবসা ও বিজ্ঞানে নিজের ভূমিকার কথাও বাড়িয়ে বলতেন এপস্টিন। তবু অর্থ ও একনিষ্ঠ প্রচেষ্টায় তিনি রাজনীতি, অর্থনীতি ও শিক্ষাঙ্গনের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এপস্টিন একই কৌশল ব্যবহার করে অভিজাত বিজ্ঞানী মহলেও ঢুকে পড়েছিলেন। বিশিষ্ট কয়েকজন বিজ্ঞানীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এমন কয়েকজন বিজ্ঞানী হলেন নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী মারে গেল-মান, তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী ও লেখক স্টিফেন হকিং, বিবর্তনবিজ্ঞানী স্টিফেন জে. গুল্ড এবং স্নায়ুতত্ত্ববিদ জর্জ এম চার্চ।
এপস্টিন বিজ্ঞানবিষয়ক বিভিন্ন সম্মেলন এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার খরচ বহন করতেন। তিনি অনানুষ্ঠানিকভাবে কিছু বৈজ্ঞানিক সভারও আয়োজন করতেন। সেখানে ব্যয়বহুল খাবার খেতে খেতে বিজ্ঞানীরা তাঁদের মতামত ভাগাভাগি করতেন। পরে অনেক বিজ্ঞানী বলেছিলেন, বিভিন্ন কাজে তহবিল পাওয়ার আশায় তাঁরা এপস্টিনের অপরাধমূলক ইতিহাসের দিকে নজর দেননি।
এপস্টিন হার্ভার্ড বিশ্বিব্যালয়ের ইভোল্যুশনারি ডাইনামিকস প্রোগ্রাম-এ ৬৫ লাখ ডলারের অনুদান দিয়েছিলেন। এপস্টিনের অনুদানে যেসব কনফারেন্স হতো, সেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিন আইল্যান্ডসে আয়োজন করা হতো। সেখানে উড়োজাহাজে করে অতিথিদের নিয়ে আসা হতো এবং তাঁর ব্যক্তিগত দ্বীপে তাঁদের জন্য বিনোদনের ব্যবস্থা করা হতো। একবার স্টিফেন হকিংসহ কয়েকজন বিজ্ঞানী এপস্টিনের চার্টার্ড সাবমেরিনে উঠেছিলেন।
হার্ভার্ডের মনোবিজ্ঞানী স্টিভেন পিঙ্কার বলেছেন, এপস্টিন একবার তাঁকে একটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ওই বৈঠকে তাঁর সহকর্মী গণিতজ্ঞ ও জীববিজ্ঞানী মার্টিন নোয়াক এবং পদার্থবিজ্ঞানী লরেন্স ক্রাউসকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ওই আলোচনা এপস্টিনের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল।
‘বেবি র্যাঞ্চ’ বা ‘শিশু প্রজনন খামার’
হার্ভার্ডের এক আলোচনা সভায় এপস্টিন দরিদ্র দেশগুলোতে খাদ্যসংকট কমানো ও স্বাস্থ্যসেবা বাড়ানোর উদ্যোগের সমালোচনা করেছিলেন। তাঁর দাবি ছিল, এ ধরনের উদ্যোগ জনসংখ্যা বাড়িয়ে দেবে।
হার্ভার্ডের মনোবিজ্ঞানী স্টিভেন পিঙ্কার ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন। তিনি এপস্টিনের এই বক্তব্যের বিরোধিতা করেন। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে পাওয়া ফলাফলের ভিত্তিতে পিঙ্কার যুক্তি দেখিয়েছিলেন, শিশু মৃত্যুহার বেশি হলে বরং পরিবারগুলো বেশি সন্তান নেয়।
পিঙ্কারের ওই কথায় এপস্টিন নাকি বিরক্ত হয়েছিলেন। পরে পিঙ্কার এক সহকর্মীর কাছ থেকে জানতে পারেন, তাঁকে আর এপস্টিনের আয়োজিত সভায় আমন্ত্রণ জানানো হবে না।
২০০০–এর দশকের শুরুর দিকে এপস্টিন বিজ্ঞানী ও ব্যবসায়ীদের বলতেন, তিনি নিউ মেক্সিকোতে থাকা তাঁর সম্পদকে কাজে লাগাতে চান। সেখানকার সান্তা ফে শহরের কাছে তাঁর মালিকানাধীন ৩৩ হাজার বর্গফুটের একটি জোরো র্যাঞ্চ ছিল। তিনি সেটিকে এমন একটি কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, যেখানে তাঁর শুক্রাণু ব্যবহার করে নারীদের গর্ভধারণ করানো হবে।
দুজন পুরস্কারপ্রাপ্ত বিজ্ঞানী এবং ধনকুবেরদের উপদেষ্টা হিসেবে পরিচিত এক ব্যক্তির বরাতে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে বিভিন্ন নৈশভোজ ও সম্মেলনে এপস্টিন তাঁদের কাছে এই পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন।
এই ধারণা শুধু ব্যক্তিগত আলাপেই সীমাবদ্ধ ছিল না। একজন উপদেষ্টা বলেছেন, তিনি শুধু এপস্টিনের কাছ থেকেই নয়, ম্যানহাটানের এক অনুষ্ঠানে এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর কাছ থেকেও এই পরিকল্পনার কথা শুনেছিলেন। যাঁরা এ বিষয়ে শুনেছিলেন, সবাই এটিকে অস্বস্তিকর ও অবাস্তব বলে উল্লেখ করেছেন।
নিজেকে নাসার বিজ্ঞানী হিসেবে পরিচয় দেওয়া এক নারী বলেন, এপস্টিন চাইতেন, র্যাঞ্চে যেকোনো সময় অন্তত ২০ জন নারী অন্তঃসত্ত্বা থাকুক। এপস্টিন ‘রিপোজিটরি ফর জার্মিনাল চয়েস’ নামের একটি স্পার্ম ব্যাংক (শুক্রাণু সংরক্ষণ কেন্দ্র) থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। এ স্পার্ম ব্যাংক এখন আর চালু নেই।
রিপোজিটরি ফর জার্মিনাল চয়েস নামে প্রতিষ্ঠানটি গঠনের উদ্দেশ্য ছিল, নোবেলজয়ীদের কাছ থেকে শুক্রাণু সংগ্রহ করা। কারণ, তারা বিশ্বাস করত, নোবেলজয়ীদের জিন মানবজাতিকে আরও শক্তিশালী করবে। তবে ১৯৯৯ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগপর্যন্ত মাত্র একজন নোবেলজয়ী প্রতিষ্ঠানটিতে শুক্রাণু দান করেছিলেন।
এপস্টেইন নিজের দেহ সংরক্ষণ করে রাখার ইচ্ছা নিয়েও খোলাখুলি কথা বলতেন। তাঁর এক সহযোগী বলেন, এপস্টিন ‘ক্রায়োনিকস’ নিয়ে আলোচনা করতেন। এটি এমন একটি অপ্রমাণিত পদ্ধতি, যেখানে মৃত্যুর পর ভবিষ্যতে পুনরুজ্জীবনের আশায় দেহ হিমায়িত করে রাখা হয়। ওই ব্যক্তির মতে, এপস্টিন চেয়েছিলেন, তাঁর মাথা ও যৌনাঙ্গ সংরক্ষণ করা হোক।
সন্তান ও গোপনীয়তার অভিযোগ
এপস্টিন কখনো সন্তানের বাবা হয়েছিলেন কি না, এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ এপস্টিন–সংক্রান্ত অনেক নথি প্রকাশ করেছে। সেখানে এমন কিছু বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে, যা থেকে ধারণা করা হচ্ছে, তিনি সম্ভবত সন্তানের বাবা হয়েছিলেন।
এর মধ্যে একটি ডায়েরির অংশ রয়েছে। সেখানে এক নারী লিখেছেন, তিনি ২০০২ সালের দিকে একটি কন্যাশিশুর জন্ম দেন। তখন তাঁর বয়স ছিল ১৬ বা ১৭ বছর। ওই নারীর দাবি, জন্মের কয়েক মিনিটের মধ্যেই শিশুটিকে তাঁর কাছ থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। এপস্টিনের সাবেক সঙ্গী গিলেন ম্যাক্সওয়েল পুরো প্রক্রিয়াটি তত্ত্বাবধান করেছিলেন।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা আলাদা করে যাচাই করা হয়নি। কথিত শিশুটির কী হয়েছিল, তা–ও অজানা।
ওই নারীর আইনজীবীরা ডায়েরিটি ফেডারেল কৌঁসুলিদের কাছে দিয়েছিলেন। পরে তিনি ছদ্মনামে বিনিয়োগকারী লিওন ব্ল্যাকের বিরুদ্ধে মামলা করেন। সেখানে এপস্টিনের বাড়িতে ব্ল্যাক তাঁকে ধর্ষণ করেছেন বলে অভিযোগ করেন ওই নারী। ব্ল্যাক এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং মামলাটি এখনো বিচারাধীন।
এপস্টিনের কোনো সন্তান ছিল কিনা, তার কোনো প্রকাশ্য প্রমাণ নেই। তাঁর উইলেও সন্তানের কথা উল্লেখ নেই। কারিনা শুলিয়াক নামের এক নারী তাঁর সর্বশেষ বান্ধবী বলে পরিচিত। ওই নারীর জন্য তিনি তাঁর ব্যক্তিগত দ্বীপ, ম্যানহাটানের বাড়ি এবং ৫ কোটি ডলার রেখে যেতে চেয়েছিলেন।
এপস্টিনের নিউইয়র্কের বাড়ি থেকে পাওয়া একটি ভিডিওতে একটি টেবিলের ওপর ডিএনএ পিতৃত্ব পরীক্ষার নথি দেখা গেছে। ওই ভিডিও কবে ধারণ করা হয়েছে, তা উল্লেখ করা হয়নি।
২০১১ সালে যুক্তরাজ্যের লেখিকা সারা ফার্গুসন এক ই–মেইলে এপস্টিনকে একটি ছেলেসন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য অভিনন্দন জানান। সারাহ ওই ই–মেইলে উল্লেখ করেছিলেন, তিনি ডিউক অব ইয়র্কের কাছ থেকে এ তথ্য পেয়েছিলেন। পরে ফার্গুসন ইঙ্গিত দেন, তাঁকে এই বার্তা পাঠাতে উৎসাহিত করা হয়েছিল। এরপর আর কিছু শোনেননি।
![]() |
| জেফরি এপস্টিন ও তাঁর সাবেক বান্ধবী গিলেন ম্যাক্সওয়েল। ছবি: এএফপি ফাইল ছবি |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
দক্ষিণ এশিয়ায় কেন ‘খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের’ গুঞ্জন by আলতাফ পারভেজ
প্রায় ২ লাখ বর্গকিলোমিটারের বিশাল বলয়!
দক্ষিণ এশিয়ায় খ্রিষ্টান ধর্মের প্রচার ও প্রসার শুরু কেরালা, তামিলনাড়ুর দিকে। কেউ কেউ এ ক্ষেত্রে তক্ষশীলার কথাও বলে। পুরোনো তক্ষশীলা এখন পড়েছে পাকিস্তানের পাঞ্জাবে। এর মধ্যে কেরালায় এখন প্রায় ২০ শতাংশ জনসংখ্যা খ্রিষ্টান। তামিলনাড়ুতে সেটা ৬ শতাংশের মতো। পাকিস্তানে ১ শতাংশের কম।
খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের গুঞ্জনটা অবশ্য এসব পরিসংখ্যান থেকে তৈরি হয়নি। এ গুঞ্জনের ভরকেন্দ্র দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় জনপদগুলো। মিয়ানমারের সন্নিহিত অঞ্চলও তাতে যুক্ত হয়েছে। উত্তর–পূর্ব জনপদগুলোর মধ্যে মেঘালয় (৭১ শতাংশ), মিজোরাম (৮৭ শতাংশ) এবং নাগাল্যান্ডে (৮৮ শতাংশ) খ্রিষ্টানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ।
এই তিন জনপদ যে লাগোয়া, তা নয়, তবে কাছাকাছি। মিয়ানমারের চিন এস্টেট এদের কাছের জনপদ। চিন এলাকায় ৯৬ শতাংশ মানুষ একই ধর্মাবলম্বী।
দক্ষিণ এশিয়ায় চারটি জায়গা হলো খ্রিষ্টানপ্রধান। চারটি জায়গাতেই খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী রাজনীতিবিদদের রাজ্য চালানোর অভিজ্ঞতা আছে। তবে জনপদগুলো আয়তনে ও লোকসংখ্যায় ছোট।
এই চারটি এলাকার পাশাপাশি মণিপুর ও অরুণাচলকেও যদি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক খ্রিষ্টান জনসংখ্যার (৪১ ও ৩০ শতাংশ) কারণে কাছে টানা হয়, তাহলে বেশ বড় একটা বলয় তৈরি হয়। আয়তনে যা দুই লাখ বর্গকিলোমিটারও ছাড়িয়ে যায়।
ভিন্ন ভিন্ন নামে কাছাকাছি থাকা বেশ বড় একটি এলাকার জনবিন্যাসের এ রকম প্রবণতা নিশ্চিতভাবে চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান তিন ধর্ম হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ ‘মুরব্বিদের’ এটা ভালোভাবে নজরে পড়েছে। মিজোরাম ও চিনসংলগ্ন বাংলাদেশের বান্দরবানের সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলোয় (রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি) খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতির কারণে বিষয়টা ঢাকায়ও মনোযোগের বিষয় হয়েছে। বান্দরবানে খ্রিষ্টান জনসংখ্যা ১০ শতাংশের মতো।
গুঞ্জনের বহু কারণ
দক্ষিণ এশিয়ায় খ্রিষ্টান রাজ্যের গুঞ্জন কেবল এই বিশ্বাসীদের সংখ্যাগত বৃদ্ধির কারণে নয়; উল্লিখিত এলাকাগুলোর অনেক বৈশিষ্ট্যও এ বিষয়ে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, চিন, মণিপুর, বান্দরবানের একাংশ এবং অরুণাচলের মধ্যে অনেক এলাকায় নানা ধরনের দাবিতে নিরস্ত্র-সশস্ত্র ব্যাপক আন্দোলন-সংগ্রাম চলছে।
কোথাও কোথাও সশস্ত্রতার ধরন অনেক ব্যাপক ও গভীর, কোথাও তা মৃদু, কিন্তু অগ্রাহ্য করার মতো নয়। এসব সশস্ত্রতার আবার প্রধান একটা ধরন দেখা যাচ্ছে, এ অঞ্চলের ‘রাষ্ট্র’গুলোর পরিচালকদের প্রতি আস্থার গভীর এক সংকট। এ রকম অনাস্থার পটভূমি তৈরি করেছে উপরিউক্ত প্রতিটি এলাকার উন্নয়ন-প্রান্তিকতা। ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পর থেকে এ রকম প্রতিটি জনপদের মানুষ নিজেদের ক্রমে সংকুচিত ও সীমিত গণ্ডিতে আবিষ্কার করছে। ফলে তাদের মধ্যে একধরনের আত্মরক্ষার বোধ বাড়ছে।
এসব জনপদের মানুষ জানে তারা কোনো দেশের কেন্দ্রীয় সরকারের নীতিসিদ্ধান্তকে খুব একটা প্রভাবিত করতে পারবে না। যেমন ৫৪৩ আসনের ভারতীয় লোকসভায় অরুণাচল-মণিপুর-মেঘালয়-মিজোরাম-নাগাল্যান্ড মিলে আসন ৯টি। অথচ সেখানে শুধু উত্তর প্রদেশের জন্য আসন ৮০টি। মিয়ানমারের পার্লামেন্টের (দুই কক্ষ মিলে) ৬৬৪ আসনে চিন এস্টেটের জন্য আসন আছে ২১টি। বাংলাদেশে ৩০০ আসনের পার্লামেন্টে বান্দরবানের জন্য আসন ১টি। যেহেতু আসন বণ্টিত হয় জনসংখ্যার হিস্যায়, তাই এই বাস্তবতাটা শিগগিরই বদলাবেও না। ফলে এসব জনপদের মানুষ জানে, নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় তাদের উপস্থিতি সীমিত থাকতে বাধ্য।
অতীতে বিশেষ করে ঔপনিবেশিক শাসনামলের আগে ও তার মধ্যে এসব জায়গার জাতিসত্তাগুলো সমতলের মানুষদের থেকে দূরে পাহাড়ি এলাকায় যে রকম ট্রাইবাল স্বশাসন ভোগ করেছে, তার ঘাটতিও তাদের মধ্যে একধরনের হতাশার বোধ তৈরি করে।
এখন নিজেদের চারপাশে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধদের সংখ্যাবৃদ্ধির মুখে তারা স্বধর্ম রক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে শুরু করেছেন। দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে বিভিন্ন সময় চার্চগুলোয় আক্রমণ এবং এই ধর্মবিশ্বাসীদের ওপর হামলার ঘটনাও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় জনপদের মানুষদের আত্মরক্ষার বোধে একটা ধর্মীয় ধরন যুক্ত করেছে। একেই ভারত, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মূলধারার অনেক মানুষ খ্রিষ্টবলয় তৈরির চেষ্টা আকারে ভাবেন। এ রকম ভাবনার কারণ এটাও যে ওপরের এলাকাগুলোয় খ্রিষ্টান রাজনীতিবিদদের সঙ্গে চার্চের সম্পর্কও বেশ নিবিড়।
আবার কিছু কিছু এলাকায় খ্রিষ্টান জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি এবং তার অতি প্রচারও কথিত গুঞ্জনের একটা উপাদান হয়েছে। তবে এরপরও ভারতে খ্রিষ্টান জনসংখ্যা ৩ শতাংশেরও কম। কিন্তু বিষয়টি আরএসএস পরিবারের কাছে এত স্পর্শকাতর যে খ্রিষ্টানমুখী ধর্মান্তরকরণ ঠেকাতে অন্তত ৯টি রাজ্যে ধর্মান্তরকরণবিরোধী আইন করা হয়েছে। সেখানে আরএসএস-বিজেপি পরিবারের অন্যতম সাংস্কৃতিক প্রতিপক্ষ হলো গির্জামণ্ডলী।
তবে ধর্মান্তরকরণ ও খ্রিষ্টান জনসংখ্যা বাড়ার প্রচার দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে অনেক সময় একপেশে চেহারাও নেয়। যেমন বাংলাদেশে অনেকে বান্দরবানের খ্রিষ্টান জনসংখ্যার বৃদ্ধি নিয়ে বলেন। কিন্তু শুমারির তথ্যে দেখা যায়, সেখানে ৯-১০ শতাংশ খ্রিষ্টানের বিপরীতে মুসলমান জনসংখ্যা প্রায় ৫৩ শতাংশ এবং সর্বশেষ দুটি শুমারির মধ্যে শেষোক্তরা প্রায় ৮ শতাংশ বেড়েছে। অথচ একই সময়ে খ্রিষ্টান জনসংখ্যা ১ শতাংশও বাড়েনি সেখানে।
কিন্তু খ্রিষ্টানরা কি নতুন দেশ চাইছে?
প্রশ্ন হলো, এত কিছুর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার খ্রিষ্টান সমাজ বা উল্লিখিত জনপদগুলো কি কখনো ধর্মভিত্তিক নতুন কোনো রাষ্ট্রের দাবি তুলেছে? এর জন্য কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন আছে? এ রকম দাবির সপক্ষে খ্রিষ্টান সমাজের বা গির্জামণ্ডলীর কোনো ইশতেহার আছে? সচরাচর এসব প্রশ্নের বিশ্বাসযোগ্য উত্তর পাওয়া যায় না।
তারপরও ক্রমাগত এ রকম দাবি ও গুঞ্জন উঠছে। সেটা ঘটছে মুখ্যত অখ্রিষ্টানদের তরফ থেকে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশে বিশেষ বিশেষ মতাদর্শের বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে মাঝেমধ্যেই বিষয়টি সক্রিয় হয়ে ওঠে। ভারতে ‘স্বরাজমার্গ’ নামে হিন্দুত্ববাদী একটা বিখ্যাত মিডিয়া এই ইস্যুতে বেশ এগিয়ে।
কৌতূহলোদ্দীপক হলো, ভারতের হিন্দুত্ববাদীদের মতো আশপাশের অন্যান্য দেশের বৌদ্ধ ও ইসলামপন্থী অনেক মহলও এ প্রচারণায় উৎসাহী। বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গির সংস্থাগুলোর এ রকম একই ধরনের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায় সামাজিক আর কোনো বিষয়ে তেমন দেখা যায় না। ভারতসহ সর্বত্র ভোট এলে দেখা যায়, খ্রিষ্টানরা প্রধানত মধ্যপন্থী কংগ্রেস বা মধ্য-বাম আঞ্চলিক দলগুলোকে ভোট দিচ্ছে। এটাও তাদের প্রতি ডানপন্থী প্রচারণা বাড়িয়ে দিয়ে থাকতে পারে।
খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের গুঞ্জনকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে কথিত ওই রাষ্ট্রের জন্য ইউরোপ-আমেরিকার আগ্রহের কথাও বলা হয় প্রচারে। কিন্তু তার সপক্ষে কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না এখনো। কিন্তু এ রকম প্রচার খ্রিষ্টানদের জন্য নানাভাবে বিব্রত অবস্থা তৈরি করছে।
বাংলাদেশ খ্রিষ্টান অ্যাসোসিয়েশনের নেতা অ্যালবার্ট ডি কস্টা কয়েক মাস আগে এ বিষয়ে এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের প্রচার তাদের সঙ্গে অন্যান্য সম্প্রদায়ের দূরত্ব সৃষ্টির ঝুঁকি তৈরি করছে।
তারপরও যে এ রকম একটা প্রচারের পালে সম্প্রতি আরও বাতাস লেগেছে, তার কারণ মণিপুর ও চিন প্রদেশের ঘটনাবলি। মাসের পর মাস ধরে চলমান মণিপুর দাঙ্গায় হিন্দু মৈইতৈইদের হাতে খ্রিষ্টান কুকিরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পার্শ্ববর্তী মিজোরামে তাদের প্রতি সহানুভূতির নীরব এক ঢেউ তৈরি হয়েছে। সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধরত মিয়ানমারের চিন প্রদেশের স্থানীয়দের প্রতিও মিজোরামের অনুরূপ সহানুভূতি রয়েছে।
এই তিন জায়গার মানুষই ‘জো’ জাতির শাখা-উপশাখা। বান্দরবানের বম খ্রিষ্টানরাও একই জাতিসত্তার দূরবর্তী অংশীদার। উত্তর-পূর্বাঞ্চলজুড়ে জো সমাজের এ রকম ঘটনাবলিতে এতদঞ্চলে খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের গুঞ্জন তীব্রতা পেলেও কার্যত এ ধারণা বাস্তবসম্মত না হওয়ার কারণ একই জনপদগুলোয় নাগাদের উপস্থিতি।
নাগারাও খ্রিষ্টান, কিন্তু জোদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক খুব বেশি প্রীতিকর নয়। ফলে নাগাল্যান্ড, মণিপুরসহ আশপাশে কেবল খ্রিষ্টান ধর্মীয় বিশ্বাস সামনে রেখে নাগা ও কুকিরা (জো) একটা রাষ্ট্র গড়তে চাইবে বা পারবেন সেটা খুব কম রাজনৈতিক ভাষ্যকারের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়।
এমনকি কেবল জো–অধ্যুষিত অঞ্চলগুলো নিয়ে কোনো রাষ্ট্রের ধারণাও মিজো নেতা জোরামথাংঙা কিছুদিন আগে (২১ জুন) প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নাকচ করেছেন। তাঁর মতে, দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ‘জো’দের বিভক্তি অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও এটা এখন এক বাস্তবতা। কারণ, তিনটি পৃথক রাষ্ট্রের সীমান্তে আছে তারা।
মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ইন্ধন দিচ্ছে
মিয়ানমারের চলতি গৃহযুদ্ধ এবং তার সম্ভাব্য পরিণতিও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের গুঞ্জনে একধরনের উসকানি হিসেবে কাজ করছে বলা যায়। এই গৃহযুদ্ধে সবচেয়ে সক্রিয় তিনটি প্রান্তিক অঞ্চল হলো দক্ষিণ-পূর্বের কারেন, উত্তরের কাচিন এবং পশ্চিমের চিন অঞ্চল। এই তিন এলাকায় গেরিলা যুদ্ধ সবচেয়ে বেশি সুসংগঠিত এবং এই তিন অঞ্চলে খ্রিষ্টান ধর্মবিশ্বাসের মানুষও অনেক।
এ রকম মনে করা হয় যে দেশটির কেন্দ্রীয় অঞ্চলে গণতন্ত্রপন্থীদের সশস্ত্র সংগ্রাম যদি বিজয়ী হয় তাহলে প্রান্তিক এলাকা যে বাড়তি স্বায়ত্তশাসন ভোগ করবে, সেটা অনেকটা স্বাধীন রাষ্ট্রের চেহারা নিতে পারে। আবার গণতন্ত্রপন্থীদের সংগ্রাম অনিশ্চিতভাবে দীর্ঘায়িত হলেও গেরিলা-দৃঢ়তা এ তিন অঞ্চলকে অনুরূপ চেহারা দিতে পারে।
মিয়ানমারের এ রকম সম্ভাবনায় ভারত উদ্বিগ্ন। সে কারণে তারা ওই দেশের সঙ্গে তার সীমান্ত অনেকটাই বন্ধ করে দিতে চায় বলে খবর বেরিয়েছে। সীমান্ত এলাকার ট্রাইবালরা অবশ্য এর ঘোর বিরোধী। কারণ, এতে তারা জাতিগতভাবে চিরস্থায়ীভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ার শঙ্কায় পড়েছে।
উল্লেখ্য, ১৯৫০-এর এক চুক্তির বলে সীমান্তবর্তী ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী পাসপোর্ট-ভিসাবিহীন একধরনের সাধারণ ভ্রমণ পাস নিয়ে অপর দেশের ১৬ কিলোমিটার ভেতর পর্যন্ত আসা-যাওয়া করতে পারে। শুরুতে চুক্তি অনুযায়ী ৪০ কিলোমিটার ভেতর পর্যন্ত এই সুবিধা ছিল। পরে কমিয়ে ১৬ কিলোমিটার করা হয় সেটা।
মিজোরাম, মণিপুর, নাগাল্যান্ড ও অরুণাচলের ১ হাজার ৬৪৩ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে এ সুবিধা রয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বলছে, তারা এ সুবিধা আর রাখতে চায় না। কারণ, এটা তাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
অন্যদিকে এ ঘোষণার পর জো সংগঠনগুলো বলছে, এটা করার আগে ভারত-মিয়ানমার-বাংলাদেশে বিভক্ত হয়ে থাকা তাদের জাতির মানুষদের একত্র করে দেওয়া হোক। তা না হলে তারা এ রকম পদক্ষেপের বিরোধিতা করবে। জো-রিইউনিফিকেশন অর্গানাইজেশন (জো-রো) নামের একটা সংগঠন দেশ-বিদেশে এ বিষয়ে কথা বলছে। দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের গুঞ্জন বাড়ার এটাও এক কারণ।
তবে এ রকম যাবতীয় গুঞ্জন অতিক্রম করে সরেজমিনে আরও গভীরে মনোযোগ দিলে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রায় সব পাহাড়ি উপত্যকায় ধর্মের বদলে একধরনের অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্বের আকুতিই বেশি শোনা যায়। কিন্তু মূলধারার রাজনীতি তার স্বার্থেই যেন কেবল খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের গুঞ্জনে বেশি আগ্রহী, সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক সুশাসন বা স্বশাসনে নয়।
● আলতাফ পারভেজ, দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ে গবেষক

About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া নিয়ে বিব্রত হচ্ছেন? by ডা. সাইফ হোসেন খান
মিথ ১: আমার ব্লাডার ছোট, তাই বারবার প্রস্রাব হয়
অনেকে মনে করেন, ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া মানেই ব্লাডার ছোট। বাস্তবে বিষয়টি একেবারেই তা নয়। বেশির ভাগ মানুষের ব্লাডারের ধারণক্ষমতাই যথেষ্ট। সমস্যা হয় তখন, যখন ব্লাডার ঠিকভাবে সংকুচিত বা প্রসারিত হতে পারে না কিংবা মস্তিষ্ক থেকে সংকেত পেতে দেরি হয়। অর্থাৎ ছোট ব্লাডার নয়; বরং এর কার্যকারিতার সমস্যার কারণে ঘন ঘন প্রস্রাব হতে পারে।
মিথ ২: কেবল বয়স্ক বা নারীরাই ব্লাডারের সমস্যায় ভোগেন
এটিও সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। যদিও গর্ভধারণ, সন্তান জন্মদান ও হরমোন পরিবর্তনের কারণে নারীদের মধ্যে ব্লাডার ইনকন্টিনেন্স বা নিয়ন্ত্রহীন মূত্রথলির প্রবণতা কিছুটা বেশি, তবে পুরুষদেরও এ সমস্যা হতে পারে। বয়স বা লিঙ্গপরিচয় যা–ই হোক, জীবনযাত্রা, অতিরিক্ত ওজন, ধূমপান, এমনকি কিছু ওষুধও এর ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
মিথ ৩: পানি কম খেলে সমস্যা কমবে
অনেকেই ভাবেন, পানি কম খেলে প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাবে, ফলে ব্লাডারও ‘আরাম পাবে’। আসলে তা নয়। পানি কম খেলে প্রস্রাব ঘন হয়ে যায়, যা ব্লাডারকে আরও বেশি উত্তেজিত করে, বাড়িয়ে দেয় প্রস্রাবের চাপ। তাই প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি। অল্প অল্প করে, সারা দিনে সমানভাবে ভাগ করে পানি খেতে হবে।
মিথ ৪: কেগেল ব্যায়ামই একমাত্র সমাধান
কেগেল (প্রস্রাব নিয়ন্ত্রণের ব্যায়াম) ব্লাডারের চারপাশের মাংসপেশি মজবুত করতে দারুণ কার্যকর, তবে এটি একমাত্র সমাধান নয়। কিছু ক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন, ক্যাফেইন ও অ্যালকোহল গ্রহণ কমানো, ওজন নিয়ন্ত্রণ বা ওষুধ প্রয়োজন হতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী থেরাপি বা ফিজিওথেরাপিও উপকার দিতে পারে।
মিথ ৫: আগে থেকেই প্রস্রাব করে নেওয়া ভালো অভ্যাস
অনেকে ঘর থেকে বের হওয়ার আগে বা দীর্ঘ পথ ধরার আগে প্রস্রাব করে নেন। কিন্তু সময়ের আগেই বারবার ব্লাডার খালি করলে শরীরের স্বাভাবিক সংকেতের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। এতে ব্লাডার ছোট হয়ে যেতে পারে এবং পরে আরও ঘন ঘন প্রস্রাবের প্রবণতা দেখা দিতে পারে।
সচেতনতার শুরু নিজ থেকেই
‘ওভারঅ্যাকটিভ ব্লাডার’ বা অতি সক্রিয় মূত্রথলি এমন একটি অবস্থা, যেখানে মানুষ ঘন ঘন প্রস্রাবের চাপ বোধ করে, অনেক সময় ধরে রাখতে না পারার আশঙ্কা থাকে। শারীরিকভাবে এটি বিপজ্জনক না হলেও মানসিক ও সামাজিক জীবনে প্রভাব ফেলে। তবে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব। সঠিক জীবনযাপন, পর্যাপ্ত পানি পান, নিয়মিত ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শে চিকিৎসা গ্রহণ—এসবই ব্লাডারকে সুস্থ রাখার মূল চাবিকাঠি।
মূত্রথলির সমস্যা কোনো লজ্জার বিষয় নয়; বরং এটি শরীরের একটি সংকেত। ভুল ধারণার বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে এসে সচেতন হোন, সমস্যা থাকলে কথা বলুন, প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন। কারণ, নিজের শরীর সম্পর্কে জানাই হলো সুস্থ জীবনের প্রথম পদক্ষেপ।
* ডা. সাইফ হোসেন খান, মেডিসিন কনসালট্যান্ট পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ধানমন্ডি
![]() |
| ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া মানেই ব্লাডার ছোট, বাস্তবে বিষয়টি একেবারেই তা নয়। ছবি: পেক্সেলস |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
কুমিরের হঠাৎ এই খ্যাপা আচরণ কেন? by গওহার নঈম ওয়ারা
পরবর্তী জলবায়ু সম্মেলন কপ৩০ এ বছরের নভেম্বরে ব্রাজিলের বেলেমে অনুষ্ঠিত হবে। এই সম্মেলনের প্রধান আলোচ্যসূচি হবে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার জন্য জাতিসংঘের নেতৃত্বে বিভিন্ন দেশের মধ্যে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বিশেষত অভিযোজন ও জলবায়ু অর্থায়ন।
পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়েই মানুষ বেঁচে আছে শুরু থেকে। অনেক প্রতিকূলতা আর বিপর্যয়ের মধ্যেও টিকে যায় শুধু মানুষ, কেউ কেউ বলেন, ‘তেলাপোকাও’! মানুষ কেবল টিকে থাকেনি, সে তার বিকাশের পথও আজ অবধি চালু রেখেছে। বিকাশ রুদ্ধ হলেই বিনাশ ত্বরান্বিত হয়।
দুনিয়াজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের মাতম গবেষকদের স্পর্শ করার অনেক আগে থেকেই মানুষের এই পথপরিক্রমা জারি ছিল। বিকল্প জীবিকা আর বসতি খুঁজে নেওয়ার কাজ মানুষের মজ্জাগত। অভিযোজনের জ্ঞান তাকে গুহা থেকে গৃহে নিয়ে এসেছে। এনেছে জঙ্গল থেকে নগরে। কিন্তু গোল বেধেছে হঠাৎ গজিয়ে ওঠা অভিযোজন বিশেষজ্ঞদের তাড়াহুড়ো আর ব্র্যান্ডিং তৎপরতা নিয়ে। সে কথা বলতেই এই লেখার অবতারণা।
২.
সুন্দরবন বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট গণমাধ্যমকর্মী মোহসীন উল হাকিম গত ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ এক স্ট্যাটাসে লিখেছিলেন, ‘কাঁকড়া ধরে ফিরছিলেন সুব্রতরা। পথে বড় খাল করমজল। এখানে কুমির আছে। মাঝে মাঝেই আক্রমণ করে। গত বছর মারা গেল মোশাররফ। তাই সবাই বেশ সতর্ক। পাঁচজনের কাঁকড়াশিকারির দল। সবাই পার হয়ে গেলেন। সুব্রত ছোটখাটো মানুষ। ওঠার সময় পানিতে একটু খাবি খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। এক মুহূর্ত। দুই পা একসঙ্গে কামড়ে ধরল বিশাল এক কুমির। সাথে সাথে সুব্রতর হাত ধরে ফেলল সহযাত্রীরা। শুরু হলো টানাটানি। চারজন মিলে প্রায় তিন মিনিট চেষ্টা করল। কিন্তু পানির নিচে থাকা কুমিরের শক্তির কাছে পরাস্ত হলো। সুব্রতকে নিয়ে গেল সুন্দরবনের কুমির।’
শুধু সুব্রত নন, ২০২৪ সালের ১৫ মে সুন্দরবন–সংলগ্ন ফকিরকোনা এলাকায় খাইরুল ইসলাম মোড়ল প্রাণ হারান কুমিরের আক্রমণে। একই বছর যুবক রাজু হাওলাদার নদীতে গোসল করতে গিয়ে কুমিরের কামড়ে আহত হন।
২০২৫ সালের ১১ মে শনিবার আবদুল কুদ্দুস কুমিরের আক্রমণে আহত হয়ে ভাগ্যক্রমে বেঁচে ফেরেন। কুদ্দুস ও হালিম দলবল নিয়ে ৩৫ থেকে ৩৬ বছর ধরে মাছ, কাঁকড়া শিকারে সুন্দরবনে যাতায়াত করেন, কিন্তু কুমিরের এ রকম মারমুখী আচরণ তাঁদের নজরে পড়েনি।
এর আগে ২০১৫ সালে মধু কাটতে তালপট্টি এলাকায় গিয়ে বাঘের কবলে পড়লেও কুমিরের তাড়া খাননি কখনো। কুমিরের এ রকম আক্রমণাত্মক আচরণ সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সুন্দরবনের পশ্চিমবঙ্গ অংশেও বেশ বেড়েছে। কুমিরের হামলায় সেখানকার মানুষ তটস্থ।
২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার দুপুরে সুনীল মণ্ডল সুন্দরবনের গোসাবা ব্লকের ট্রিবলিঘেরি লাগোয়া দত্ত নদে কাঁকড়া ধরতে যান। এলাকাটি পড়েছে পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন কোস্টাল থানার লাহিড়িপুর পঞ্চায়েতের মধ্যে। কাঁকড়া ধরার সময় আচমকা পেছন থেকে কুমির সুনীলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাঁকে টানতে টানতে নদীর মাঝখানে নিয়ে যায়।
৫০ বছরের সুনীল মণ্ডলকে আর জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। কুমিরের আক্রমণে নিহত ও আহতের তালিকা ক্রমে বাড়ছে। বাড়ছে বাঘ–বিধবার মতো কুমির–বিধবার সংখ্যা। কাঁকড়া ধরতে গিয়ে বা গ্রামের লাগোয়া নদীতে ঘরগৃহস্থালির কাজ করতে গিয়ে নারীরাও কুমিরের শিকার হচ্ছেন।
ওডিশা উপকূলের এক নারীকে কুমিরে টেনে নিয়ে যাওয়ার ভিডিও ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে ভাইরাল হয়েছিল। ওডিশার জাজপুরের পালাতপুর গ্রামের সেই ঘটনা নদীর কাছেই উপস্থিত এক ব্যক্তি ভিডিও করেছিলেন বলে ঘটনাটি সবার সামনে এসেছিল, না হলে আর পাঁচটা নিখোঁজ ঘটনার সঙ্গে সেটাও সবাই গুলিয়ে ফেলতেন।
এদিকে দাকোপসহ সুন্দরবনের কাছাকাছি সব কটি লোকালয়ে কুমিরের আনাগোনার খবর আগের যেকোনো সময়ের থেকে এখন বেশি। বিশেষ করে নাগর নদী সংলগ্ন এলাকায় মানুষ কুমিরের উপস্থিতিতে আতঙ্কে রয়েছেন, যা তাঁদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অনেকটা থামিয়ে দিয়েছে। দৈনন্দিন কাজে নদীর ব্যবহার নিয়ে ভয় বাড়ছে ক্রমে।
বাঁধের বাইরে আগেও সুতারখালীর (দাকোপ) মানুষ বসবাস করেছেন জোয়ার-ভাটার মধ্যেই। তাঁরা জীবিকার পথ খুঁজে নিয়েছেন।
৩.
কুমিরের হঠাৎ এই খ্যাপা আচরণ কেন?
করমজল বন্য প্রাণী প্রজনন ও পর্যটনকেন্দ্রের কর্মকর্তার কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সংবাদকর্মীদের জানান, খাবারের খোঁজে কিংবা আবাসসংকটে কুমিরগুলো পার্শ্ববর্তী নদীগুলোয় চলে আসছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনে কুমিরের খাদ্য, যেমন কাঁকড়া, মাছ ইত্যাদি কমে গেলে এরা মানুষের ওপর আক্রমণ করে। তা ছাড়া কাঁকড়ার খোঁজে মানুষ যখন কুমিরের এলাকায় প্রবেশ করেন, তখন কুমির তাঁদের নিজেদের আক্রান্ত মনে করে এবং আক্রমণ করে।
কুমিরের খাদ্যনিরাপত্তায় কেন ব্যাঘাত ঘটছে?
এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের জনপ্রিয় অভিযোজন প্রচেষ্টার মধ্যে। বাংলাদেশ–পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন উপকূল থেকে ওডিশার বালেশ্বর ও ভদ্রক জেলায় একসময় ধুমসে চিংড়ির চাষ হতো।
নানা কারণে উপকূলে চিংড়ি চাষ মুখ থুবড়ে পড়েছে অনেক দিন। চিংড়ি আমাদের পরিবেশ, প্রতিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্যনির্ভর জীবন-জীবিকাকে ক্ষতবিক্ষত করছে নানাভাবে। উপকূলে চিংড়ি চাষ বা সাদা সোনার লাগামহীন আবাদ লবণাক্ততা বাড়িয়ে মানুষকে দেশান্তরি করেছে।
অভিযোজন ব্যবসায়ীরা এখন ‘সাদা সোনার বদলে কালো সোনার’ ধান্দা ধরিয়ে দিচ্ছেন মানুষের হাতে। বলার চেষ্টা করছেন, কালা সোনা মানে কাঁকড়ার চাষ পরিবেশ-প্রতিবেশ এবং জীবন ও জীবিকাবান্ধব। কথাটা কি ঠিক?
পরিবেশের তৈরি স্বাভাবিক খাদ্যশৃঙ্খলা নষ্ট করে রাতারাতি কিছু টাকা কামানো গেলেও আখেরে সেটা না জলবায়ু পরিবর্তনের ভুক্তভোগীদের অভিযোজনে সাহায্য করবে, না জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ভূমিকা রাখবে। কেউ কেউ বলছেন, কাঁকড়ার হ্যাচারি করে সুন্দরবনের কাঁকড়া সুরক্ষা সম্ভব।
চিংড়ি চাষের স্বর্ণযুগেও একই কথা বলা হয়েছিল। চিংড়ির হ্যাচারি হয়নি আর সাগরের চিংড়ি পোনা ধরাও বন্ধ হয়নি এক দিনের জন্যও। তার ওপর হ্যাচারিতে কাঁকড়ার বেঁচে থাকার রেকর্ড ৩ শতাংশের আশপাশেই থাকছে। তাই সুন্দরবনের আর উপকূলের কাঁকড়া ধরার কোনো বিকল্প নেই। নির্বিচার কাঁকড়া ধরার কারণে কুমিরের খাবারে টান পড়ছে, তাই তারাও খেপে উঠছে, মানুষকে তাড়া করছে, শিকার করছে কাঁকড়ার বদলে আস্ত মানুষ, গবাদি প্রাণী।
৪.
আমরা জানি, সাতক্ষীরা, খুলনা, কক্সবাজারে কাঁকড়া চাষ এবং আহরণ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কার্যক্রম। আন্তর্জাতিক বাজারে ডিমওয়ালা কাঁকড়ার চাহিদা অনেক বেশি। ফলে চাষি ও জেলেরা বেশি মুনাফার আশায় যত পারছেন ডিমওয়ালা কাঁকড়া রপ্তানির জন্য প্যাকেটে ভরে ফেলছেন।
গবেষকেরা বলছেন, ডিমওয়ালা কাঁকড়া রপ্তানির উন্মাদনা কাঁকড়ার প্রজনন চক্রে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। ডিমওয়ালা কাঁকড়া প্রকৃতির পরবর্তী প্রজন্ম তৈরির মূল উৎস। এগুলো যদি রপ্তানির বাক্সে চলে যায়, তাহলে ডিম থেকে নতুন কাঁকড়া জন্মানোর সুযোগ কমে যায়। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে কাঁকড়ার প্রাকৃতিক সংখ্যা কমে গিয়ে কুমিরের খাদ্যশৃঙ্খলে বিরূপ প্রভাব ফেলবে ও ফেলছে।
অভিযোজনের নামে চিংড়ির বদলে কাঁকড়া চাষের ব্যবসা শুরুর আগে জালে ডিমওয়ালা কাঁকড়া উঠলে বনজীবীরা সেগুলো ছেড়ে দিতেন। সেটাই ছিল প্রকৃতির সঙ্গে বসবাসের একটি জনপ্রিয় আচরণ। এখন মাদি কাঁকড়া ৮০০ টাকা থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা কেজি বিক্রি হয় সাতক্ষীরার কাঁকড়া মোকামে। মাদি কাঁকড়ার পেট ডিমে ভরে উঠলে সেটা বিক্রির উপযুক্ত হয়। তার মানে, কাঁকড়ার বংশবৃদ্ধির পথ রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে ক্রমেই।
এখন কাঁকড়ার সংখ্যা কমে যাওয়ায় কুমিরের জন্য সহজলভ্য খাদ্যসংকট দেখা দিচ্ছে। বিশেষত ছোট ও মাঝারি বয়সী কুমির কাঁকড়ার ওপর বেশি নির্ভরশীল। বলাবাহুল্য, খাদ্যের প্রাপ্যতা কমে গেলে কুমিরদের পর্যাপ্ত পুষ্টি পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে যাবে। পুষ্টির সংকটে প্রজননক্ষমতা হ্রাস পায়, বেঁচে থাকার হার কমে যায়। নিরুপায় কুমির তাই মানুষের বসতিতে চলে আসছে। সমস্যা বাড়ছে।
৫.
মনে রাখতে হবে, কাঁকড়া শুধু কুমিরের খাদ্য নয়, ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রের মাটির গঠন ও পুষ্টি পুনঃচক্রের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তাই অভিযোজনের নামে কালো সোনার কথা বলে নির্বিচার কাঁকড়া নিধন ও ডিমভরা কাঁকড়া রপ্তানিতে একদিকে কুমির যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অন্যদিকে পুরো ইকোসিস্টেমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া প্রান্তিক মানুষের বাঁচার নিজস্ব উদ্যোগকে অভিযোজনের নামে হেলাফেলা করা যাবে কি?
১৯৮৮ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের পর ঘরবাড়িহারা নিঃস্ব মানুষেরা দাকোপের কালাবগি গ্রামে নদীর চরে লম্বা খুঁটির ওপর ঝুলন্ত পাড়া গড়ে তোলেন। জোয়ারে ডুবে যাওয়া এসব চর আবার ভাটিতে ভেসে ওঠে। এটা ছিল তাঁদের অভিযোজন কৌশল। কাঁকড়াগাছের খুঁটি, শিরীষ কাঠের পাটাতন ও গোলপাতার বেড়া দিয়ে তৈরি করে নেন নিজেদের আবাস। ঘরেই চলে রান্না-খাওয়া, ঘুমানো। প্রতিটি ঘরের সঙ্গে রয়েছে ঝুলন্ত শৌচাগার।
এক–দুইটা করে বাড়তে বাড়তে ২০২২ সালে ঝুলন্ত পাড়ার ঘরের সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়ে যায়। সিডর ও আইলার আঘাতে বসতভিটা আর রাস্তা ভেঙে যাওয়ায় পাড়াটির পরিধি বাড়তে থাকে। আগে কুমির কালেভদ্রে ভদ্রা বেয়ে সুতারখালী নদীতে আসত। এখন কুমিরের এই আনাগোনা প্রতিদিনের ঘটনা। দূরে বা ভাটায় ভেসে ওঠা চরে ক্ষণিকের রোদ পোহানো নয়, রীতিমতো ঘরের নিচে রাতদিন জোয়ারে, ভাটায় ঘুরঘুর করছে কুমির।
উপকূলের ভাঙনের মুখে আরেক দল মানুষ ছোট ছোট নৌকায় বসবাস করছেন। বিরূপ প্রকৃতিকে মোকাবিলা করে জীবন–জীবিকা রক্ষার এটাও একটা প্রচেষ্টা, এটাও অভিযোজন। ‘মান্তা’ নামে পরিচিত এসব হাজার হাজার প্রান্তিক মানুষ পটুয়াখালী, বরগুনা, লক্ষ্মীপুর, ভোলা অঞ্চলে সারা বছর নৌকাতেই থাকেন।
এটাই এখন তাঁদের বাঁচার পথ। এককালের মৎস্যজীবী এসব মানুষ স্থলভাগের জমি-ঘর হারিয়ে নৌকাতেই আশ্রয় নিয়েছেন। সরকারি জনগণনা বা মৎস্য জরিপে তাঁদের আলাদা করে ধরা হয় না।
ইলিশ রক্ষার নামে ইলিশ শিকার বন্ধের সময় তাঁদের নৌকাতেও শিকল পরানো হয়, মানে ভাসতে দেওয়া হয় না। সরকারি খাতায় তাঁদের নাম না থাকায় তাঁরা কোনো আপৎকালীন খাদ্যসহায়তারও হকদার নন।
মজার ব্যাপার, তাঁরা তাঁদের ছোট ছোট নৌকা নিয়ে মোহনার এমন দূরে যেতে পারেন না, যেখানে ইলিশ থাকে। তাঁরা মাছ ধরেন ছোট ছোট খাঁড়িতে, নদীসংলগ্ন খাল–বিল আর শাখা নদীতে। ইলিশ রক্ষার প্রচেষ্টা থেকে তাঁদের রেহাই না দিলে এই মানুষগুলোর বাঁচার পথ থাকবে না।
ভবদহ অঞ্চলে জল বদ্ধতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য যাঁরা একসময় পুকুর আর ঘেরের প্রেসক্রিপশন দিয়েছিলেন, তাঁরা নিশ্চয় বুঝতে পারছেন, কী ক্ষতি তাঁরা করেছেন। জলাবদ্ধতা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। বাড়ছে লম্বায়, বহরে।
ফসলের জমিতে ফল চাষে আয় বাড়লেও খাদ্য আর সামাজিক নিরাপত্তা লাটে উঠছে। গোলপাতা বাঁচানোর ভ্রান্ত পদক্ষেপের গলি দিয়ে এসবেসটারের কোলে চড়ে সুন্দরবনের জনপদে যে মরণবিষ ছড়িয়ে পড়ছে, তার কী হবে। এসব নিয়ে অভিযোজন–যজমানরা নিশ্চয়ই আলোচনা করবেন!
* গওহার নঈম ওয়ারা, লেখক গবেষক
- wahragawher@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব
| সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নদীতেও কুমিরের দেখা মিলছে। ফাইল ছবি : প্রথম আলো |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
৫০ বছরে কখনো হাসপাতালে যাননি শতবর্ষী নারী
ওই নারীর
নাম জিন বাওলিং। তিনি চীনের ঝেজিয়াং প্রদেশের তাইঝৌয়ের একটি গ্রামে বসবাস
করেন। তাঁর ছেলে, ছেলের বউ এবং নাতি–নাতনিরা নিয়মিত তাঁকে দেখতে যান।
হাসিখুশি স্বভাবের জিন গ্রামে বেশ জনপ্রিয়। গ্রামের বাসিন্দারা সবাই শতবর্ষী এই নারীকে ভালোবাসেন, আদর করে ‘ওল্ড বেবি’ ডাকেন।
তাইঝৌ
ইভিনিং নিউজের খবর অনুযায়ী, শত বছর বয়স হলেও জিন এখনো খুবই বুদ্ধিদীপ্ত
এবং শারীরিকভাবে সুস্থ। গত ৫০ বছরে তাঁকে কখনো হাসপাতালে যেতে হয়নি।
জিন
প্রতিদিন সকাল ৯টায় ঘুম থেকে ওঠেন, হাতমুখ ধুয়ে বাগানে কিছুক্ষণ রোদ
পোহান। সন্ধ্যা ৭টার ভেতর তিনি রাতের খাবার শেষ করে ঘুমাতে চলে যান। এর
মাঝে দিনের বেলাতেও তিনি খানিকটা ঘুমিয়ে নেন।
তাঁর ছেলে হু হুয়ামেই বলেন, তিনি দিনে ১৫ ঘণ্টাও ঘুমিয়ে থাকতে পারেন।
জিন
তাঁর খাবারের বিষয়েও খুব সচেতন। তাঁর সকালের নাশতায় থাকে ডাম্পলিং ও বান।
দুপুর ও রাতের খাবারে সাধারণত নুডলস বা ভাত থাকে, মাংস তাঁর খুবই প্রিয়,
তিনি প্রতিদিন মাংস খান। তাঁকে প্রতি বেলার খাবার একটি বড় বাটিতে পরিবেশন
করা হয়।
প্রধান খাবারের পাশাপাশি জিন নাশতায় কেক, রুটি এবং বাদামি চিনি ও লাল খেজুর দিয়ে বানানো চা খান।
এ ছাড়া জিন দিনে তিনটি কমলা এবং দুটো ডিম খান। তবে তিনি সবজি খেতে খুব একটা পছন্দ করেন না। নিয়মিত তিনি রাইস ওয়াইন পান করেন।
হাঁটাচলা
করতে জিনের অন্যের সহায়তা প্রয়োজন হয়। তবে তাঁর দৃষ্টিশক্তি এখনো তীক্ষ্ণ।
তিনি এখনো মোজা বুনতে পারেন, জুতা মেরামত করতে পারেন।
জিনের ছেলে মায়ের সুস্বাস্থ্যের পেছনে তাঁর সব সময় হাসিখুশি থাকার ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন।
হু বলেন, ‘তিনি কখনো কারও সঙ্গে ঝগড়া করেন না। যদি দেখেন কোনো সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে, তিনি সব ভুলে যান।’
হু
সংবাদমাধ্যমকে আরও বলেন, তাঁর মা একজন সহজ–সরল গ্রামীণ গৃহিণী, যিনি
পরিবারের সবাইকে নিয়ে মিলেমিশে থাকাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন। তাঁর
সবচেয়ে বড় চাওয়া, পরিবারের শান্তি ও সুখ। তিনি চান তাঁর পরিবার সব সময়
সুখে–শান্তিতে বসবাস করুক।
| জিন বাওলিং। ছবি: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
চিকিৎসায় লাখো রোগীর ভরসা মা ও শিশু হাসপাতাল by ফাহিম আল সামাদ
চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে একজন রোগী মাত্র ১০০ টাকা খরচ করে চিকিৎসক দেখাতে পারেন। সেখানে চিকিৎসকেরা সরাসরি তাঁদের সেবা দেন। প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে পাঠানো হয়, তবে এর জন্য বাড়তি টাকা লাগে না।
সন্তানের হঠাৎ জ্বরে আঁতকে ওঠেন মো. ইয়াসিন আরাফাত। তড়িঘড়ি করে বাসার কাছে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে ছুটে আসেন তিনি। চিকিৎসকদের জানান, ছেলে দুই দিন ধরে জ্বরে ভুগছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে চিকিৎসক তাঁকে আশ্বস্ত করেন, তাঁর সন্তান ঠিক আছে। সাধারণ ফ্লুতে আক্রান্ত হয়েছে। বাসায় পরিচর্যা হলেও সুস্থ হয়ে যাবে।
সম্প্রতি নগরের আগ্রাবাদ এলাকায় চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের বহির্বিভাগের সামনে কথা হয় ইয়াসিনের সঙ্গে। বাবার কাঁধে মাথা দিয়ে আছে তিন বছরের শিশু রায়হান। ইয়াসিন জানান, পরিবার নিয়ে আগ্রাবাদ রঙ্গিপাড়া এলাকায় থাকেন তিনি। পেশায় ব্যবসায়ী। সন্তানের হঠাৎ জ্বরে ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়ার আতঙ্কে ভুগছিলেন। এখন নিশ্চিন্ত হয়েছেন।
ইয়াসিনের সঙ্গে কথা বলার সময় হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বহির্বিভাগে আরও ৩০ থেকে ৪০ জন অপেক্ষা করছিলেন। জ্বর, সর্দি-কাশি, ব্যথা—এসব সমস্যায় তাঁদের সবার শিশু আক্রান্ত। নগরের আগ্রাবাদ, চৌমুহনী, হালিশহর ও আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের জন্য কাছের হাসপাতাল এটি, যেখানে দ্রুত ও সহজে সেবা পান বলে জানিয়েছেন রোগীরা।
হাসপাতালের তথ্যানুযায়ী, হাসপাতালের বহির্বিভাগ ও অন্তর্বিভাগে মিলে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজার রোগী হাসপাতাল থেকে সেবা নিচ্ছেন। এর মধ্যে বহির্বিভাগ থেকে সেবা নিচ্ছেন ১ হাজার ২০০ জনের বেশি। গত বছর মোট ৪ লাখ ৭১ হাজার রোগী হাসপাতালটির বহির্বিভাগ থেকে সেবা নিয়েছেন। সব মিলিয়ে রোগী ছিল ৭ লাখ ৩৯ হাজারের বেশি।
চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে একজন রোগী মাত্র ১০০ টাকা খরচ করে চিকিৎসক দেখাতে পারেন। সেখানে চিকিৎসকেরা সরাসরি তাঁদের সেবা দেন। প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে পাঠানো হয়, তবে এর জন্য বাড়তি টাকা লাগে না। তবে সরাসরি অধ্যাপককে দেখাতে চাইলে ৫০০ টাকা, সহযোগী অধ্যাপককে ৪০০ টাকা ও সহকারী অধ্যাপককে দেখাতে চাইলে ৩৫০ টাকা ফি দিতে হয় একজন রোগীকে।
হাসপাতালের প্রশাসন বিভাগের পরিচালক ডা. মো. নুরুল হক বলেন, কোনো রোগী যদি অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক কিংবা সহকারী অধ্যাপককে ফি দিয়ে দেখান, তাহলে এক সপ্তাহের মধ্যে আবার তিনি দেখাতে পারবেন। এর জন্য বাড়তি কোনো টাকা লাগবে না।
মূলত প্রায় ১০ হাজার আজীবন সদস্য, ৪০০ দাতা সদস্য ও সরকারি-বেসরকারি অনুদানে চলে বৃহৎ এই হাসপাতাল। প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনার জন্য আজীবন সদস্যদের মধ্য থেকে নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়। ভবিষ্যতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নতুন আরেকটি রেডিওথেরাপি মেশিন কেনার পরিকল্পনা করছে। এ ছাড়া এমআরআই ও মেমোগ্রাফি মেশিনও কেনার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
নগরের আগ্রাবাদ এলাকায় ১৯৭৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর চারতলা ভবনে যাত্রা শুরু হয়। সে শুরুর তিন বছরে রোগীর সংখ্যা ছিল সব মিলিয়ে ৩৫ হাজারের মতো। সে সময় প্রায়ই আগ্রাবাদ এলাকায় জোয়ারের পানির কারণে হাসপাতালের নিচতলায় গোড়ালিসমান পানি উঠত। এরপর চার দশক পেরিয়েছে। প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৪ সালে ১৩ তলার নতুন হাসপাতাল ভবন নির্মাণ শুরু করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
২০২৩ সালে চট্টগ্রাম মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতাল নামে উদ্বোধন করা হয় সেই ভবন। বর্তমানে হাসপাতালের সব বিভাগ এ ভবনেই। পাশাপাশি ১৫০ শয্যার ক্যানসার ইনস্টিটিউটের ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে ২০২১ সালে। ১৩০ কোটি টাকা ব্যয়ের এই ইনস্টিটিউট ২০২৩ সালের ৫ নভেম্বর উদ্বোধন করা হয়। এখন পর্যন্ত ৮০০-এর মতো রোগী এখান থেকে রেডিওথেরাপি সেবা নিয়েছেন। প্রতিদিন এ সেবা নিচ্ছেন ৬০-৬৫ জন।
৪০০ চিকিৎসকসহ প্রায় ২ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন এখানে। হাসপাতালটিতে সাধারণ সব রোগের চিকিৎসাসহ ৩৪ শয্যার সিসিইউ, ৩০ শয্যার অত্যাধুনিক আইসিইউ, কার্ডিয়াক ইউনিট, নিওনেটলজি, শিশু আইসিইউ, নিউরোসার্জারি, মা-শিশুর জন্য বিশেষ ইউনিট, কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার ও শিশুবিকাশ কেন্দ্র রয়েছে। ক্যাথল্যাবে সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চিকিৎসার পাশাপাশি স্বাস্থ্য শিক্ষাতেও নানা উদ্যোগ তারা নিয়েছে। ২০০৫-০৬ সালে ৫০ আসনের চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়। বর্তমানে প্রতি ব্যাচে ১১৫ জন শিক্ষার্থী এমবিবিএস সম্পন্ন করছেন। ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত নার্সিং ইনস্টিটিউটে ডিপ্লোমা কোর্সে ৫০ জন এবং ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত নার্সিং কলেজের বিএসসি অনার্স (নার্সিং) কোর্সে ৫০ জন ভর্তি করা হয় বছরে।
হাসপাতালের নির্বাহী কমিটির সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি, যাতে রোগীদের সব ধরনের সুবিধা দিতে পারি। মা ও শিশু হাসপাতালের অধীন জেনারেল হাসপাতাল, ক্যানসার ইনস্টিটিউট, নার্সিং ইনস্টিটিউটসহ বেশ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমাদের পরিকল্পনা আছে আরও কিছু যন্ত্রপাতি কেনার। এ জন্য সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন।’
![]() |
| চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন একজন চিকিৎসক। সম্প্রতি তোলা। ছবি: সৌরভ দাশ |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Sunday, March 29, 2026
জাতিসংঘের পাল্টা ট্রাম্পের ‘শান্তি পর্ষদ’ কি নতুন বিশ্বব্যবস্থার ইঙ্গিত by মো. আবু হুরাইরাহ্
সুইজারল্যান্ডের বরফঢাকা দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) জাঁকজমকপূর্ণ মঞ্চে গত ২২ জানুয়ারি এক নজিরবিহীন ঘটনার সাক্ষী হলো বিশ্ব। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর বহুল আলোচিত ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পর্ষদ-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। উজ্জ্বল আলোকচ্ছটার নিচে কয়েক ডজন দেশের নেতার উপস্থিতিতে এ ঘোষণা এলেও, এর গভীরে লুকিয়ে আছে এক বড় ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
বিশ্লেষকেরা মার্কিন প্রেসিডেন্টের এ উদ্যোগকে শুধু একটি শান্তি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন না; বরং একে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী জাতিসংঘ কেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে হটিয়ে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক প্রভাবাধীন নতুন ‘ঔপনিবেশিক কাঠামো’ হিসেবে বর্ণনা করছেন।
এ পর্ষদের উৎপত্তির পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ ও সুচতুর কূটনৈতিক পরিকল্পনা; যাকে অনেকে ‘বেইট-অ্যান্ড-সুইচ’ বা টোপ দেখিয়ে প্রতারণা হিসেবে দেখছেন। গত ১৮ নভেম্বর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ‘রেজোল্যুশন ২৮০৩’ পাস হয়েছিল ১৩-০ ভোটে।
তখন বিশ্বনেতারা এবং ইউরোপ ও আরব দেশগুলো এ ভেবে ওই প্রস্তাবে সমর্থন দিয়েছিল যে এটি গাজায় ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতিকে একটি আন্তর্জাতিক বৈধতা দেবে, সেখানকার পরিস্থিতি স্থায়ীভাবে শান্ত করবে, উপত্যকাটিতে প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি হবে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় গাজার পুনর্গঠন ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এমনকি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতি অন্তত নামমাত্র বা কাগুজে সমর্থন বজায় রাখার শর্তে এতে রাজি হয়েছিল অনেক দেশ।
কিন্তু দুই মাস যেতে না যেতেই দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র। ঘোষিত এ পর্ষদের যে সনদ (চার্টার) সদস্য দেশগুলোর কাছে পাঠানো হয়েছে; সেখানে ‘গাজা’ শব্দটির কোনো উল্লেখ পর্যন্ত নেই। এর পরিবর্তে পর্ষদকে ‘বিশ্বজুড়ে’ শান্তি ও সুশাসন প্রচারের ‘একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জাতিসংঘকে ব্যর্থ ও অকেজো সংস্থা হিসেবে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে কটাক্ষ করে শান্তি পর্ষদ নিজেকে আরও তৎপর ও কার্যকর হিসেবে জাহির করছে। ট্রাম্পের দাবি, এটি পূর্ণাঙ্গভাবে গঠিত হয়ে গেলে তাঁরা যা খুশি তা-ই করতে পারবেন এবং তা হবে জাতিসংঘের সমান্তরালে।
এ প্রসঙ্গে গত ২০ জানুয়ারি হোয়াইট হাউসে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তাঁর প্রস্তাবিত শান্তি পর্ষদ জাতিসংঘের স্থলাভিষিক্ত হবে বলে তিনি মনে করেন কি না। জবাবে তিনি বলেন, ‘হতে পারে। জাতিসংঘ খুব একটা কাজের নয়।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, এ সংস্থার (জাতিসংঘ) সম্ভাবনা আছে, কিন্তু কোনো যুদ্ধ মীমাংসার জন্য তাদের কাছে যাওয়ার কথা তিনি কখনো ভাবেননি।
চেয়ারম্যান যখন সর্বেসর্বা
জাতিসংঘের ১৯৪৫ সালের সনদের মূল ভিত্তি ছিল, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার সাম্য। কিন্তু ট্রাম্পের এ শান্তি পর্ষদের সনদ সম্পূর্ণ ব্যক্তিকেন্দ্রিক। এ সনদে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম অন্তত ৩৫ বার উল্লেখ করা হয়েছে; যা কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার সনদের ক্ষেত্রে অত্যন্ত নজিরবিহীন।
আবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পই এ পর্ষদের একমাত্র চেয়ারম্যান ও ‘সর্বময় ক্ষমতা’র অধিকারী। সনদে তাঁকে একাধারে বিচারক, জুরি, দণ্ডদানকারী, অর্থ নিয়ন্ত্রক, এমনকি অর্থায়ন ও পর্ষদের প্রচারমূলক কাজের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণও তাঁর হাতে রাখা হয়েছে।
সনদ অনুযায়ী, চেয়ারম্যানের পদ শুধু তখনই শূন্য হতে পারে; যদি তিনি নিজে পদত্যাগ করেন অথবা পর্ষদের সদস্যরা তাঁকে সর্বসম্মতিক্রমে অযোগ্য ঘোষণা করে। এটি কার্যত অসম্ভব একটি প্রক্রিয়া। ট্রাম্প একাই যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন এবং তাঁর হাতে থাকবে নিরঙ্কুশ ভেটো ক্ষমতা।
যেকোনো সফল বহুপক্ষীয় সংস্থা যেখানে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে চলে; সেখানে এ পর্ষদ চলবে একক নেতার ব্র্যান্ড ও ব্যক্তিগত কর্তৃত্বের ওপর ভিত্তি করে।
বিলিয়ন ডলারের সদস্যপদ: ‘পে-টু-প্লে’ ক্লাব
এই নতুন পর্ষদের সদস্যপদ পাওয়ার শর্ত অত্যন্ত বিতর্কিত এবং আর্থিক বৈষম্যে ভরা। এতে যোগ দিতে হলে সদস্য দেশগুলোকে নগদ ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলার ‘হার্ড কারেন্সি’তে দিতে হবে। এটি অন্তত তিন বছর বা এর বেশি সময়ের সদস্যপদ নিশ্চিত করবে।
বিশ্লেষকেরা এ শর্তকে একটি ‘পে-টু-প্লে’ ক্লাব হিসেবে দেখছেন; যেখানে শুধু ধনী রাষ্ট্রগুলোই প্রাধান্য পাবে এবং দরিদ্র বা স্বল্পোন্নত দেশগুলো প্রান্তিক হয়ে পড়বে। ট্রাম্পের এ মডেলে ‘করদ রাষ্ট্রগুলো’ নগদ অর্থের বিনিময়ে তাঁর আনুগত্য স্বীকার এবং তাঁর ব্যক্তিগত অনুকম্পা লাভের চেষ্টা করবে।
ইতিমধ্যে, ইতালির মতো দেশের জন্য এ অর্থ পরিশোধ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, এর ফলে তাদের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ বাজেট বা জাতিসংঘের জন্য বরাদ্দকৃত বাজেট কাটছাঁট করতে হচ্ছে। অন্যদিকে, যারা এতে যোগ দিতে অস্বীকার করছে, যেমন ফ্রান্স; তাদের ওপর শাস্তিমূলক ট্যারিফ বা শুল্ক আরোপের হুমকি দেওয়া হয়েছে।
থাকছে নিজস্ব বাহিনী আইএসএফ
ট্রাম্পের এ পরিকল্পনায় শুধু কূটনৈতিক বা আর্থিক শর্তই নেই; বরং একটি নিজস্ব সামরিক কাঠামোও রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত ‘আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী (ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স/আইএসএফ) সরাসরি একজন মার্কিন মেজর জেনারেলের অধীনে পরিচালিত হবে।
এ বাহিনী জাতিসংঘের চিরাচরিত শান্তিরক্ষী বাহিনীর আদলে তৈরি হলেও এর মূল দর্শনে বিশাল পার্থক্য রয়েছে। যেখানে জাতিসংঘের বাহিনী ‘নিরপেক্ষতা’ এবং সব পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতে কাজ করে; সেখানে ট্রাম্পের এ বাহিনী কোনো আন্তর্জাতিক আইনি ভিত্তি ছাড়াই মিত্র দেশগুলোর সমন্বয়ে একতরফা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করবে।
মিত্রদের অনীহা ও বৈশ্বিক বিভাজন
ট্রাম্পের এ উদ্যোগ বিদ্যমান বহুপাক্ষিকতাবাদ ও আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিকে বড় ধরনের হুমকির মুখে ফেলেছে। ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও কানাডার মতো ঘনিষ্ঠ মার্কিন পশ্চিমা মিত্ররা এ বোর্ড থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখছে।
ফরাসি কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, এ পর্ষদ জাতিসংঘের কার্যক্রমে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটাবে। কানাডার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বে ট্রাম্প দুই দেশের সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ সেতু বন্ধের হুমকি পর্যন্ত দিয়েছেন। এটি পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যে দ্বিধা ও আতঙ্ক বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবে নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প এ পর্ষদের ‘অসীম সম্ভাবনা’র প্রশংসা করে লিখেছেন, ‘শান্তি পর্ষদ ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সংস্থা হিসেবে প্রমাণিত হবে।’
কিন্তু সমালোচকেরা এ পর্ষদকে ট্রাম্পের ‘সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ডা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছেন, এটি কার্যত জাতিসংঘকে চ্যালেঞ্জ জানাতেই তৈরি করা হয়েছে।
হোয়াইট হাউস মোট ৫০টি দেশকে শান্তি পর্ষদে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানালেও এ পর্যন্ত ৩৫টি দেশ আগ্রহ দেখিয়েছে। এর মধ্যে ২৬টি দেশ প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে নাম লিখিয়েছে। অন্যদিকে ১৪টি দেশ আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছে।
যোগ দেওয়া দেশের তালিকার কয়েকটি—আলবেনিয়া, আর্জেন্টিনা, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বাহরাইন, বেলারুশ, বুলগেরিয়া, মিসর, হাঙ্গেরি, ইন্দোনেশিয়া, ইসরায়েল, জর্ডান, কাজাখস্তান, কসোভো, মঙ্গোলিয়া, মরক্কো, পাকিস্তান, প্যারাগুয়ে, কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, উজবেকিস্তান ও ভিয়েতনাম। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এতে গণতান্ত্রিক দেশের সংখ্যা খুব কম।
এদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আন্তর্জাতিক আইনের নির্ধারক নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রই শুধু এ পর্ষদে আছে। রাশিয়া জানিয়েছে, তারা প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছে।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন মস্কোর জব্দকৃত মার্কিন সম্পদ থেকে ১ বিলিয়ন ডলার ‘ফিলিস্তিনিদের সহায়তায়’ দিতে প্রস্তুত।
চীন এখনো তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেনি। ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য এই মুহূর্তে পর্ষদে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
ব্যবসায়িক বলয় ও ব্যক্তিগত স্বার্থের প্রভাব
পর্ষদের গঠন কাঠামো ও নেতৃত্বের তালিকা স্পষ্ট করছে যে এটি রাজনীতির চেয়ে ব্যবসায়িক স্বার্থ ও ‘ব্যক্তিগত ক্লাব’ সংস্কৃতিকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে।
সদস্য হিসেবে যাদের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে, তারা মূলত ট্রাম্পের ব্যক্তিগত মিত্র বা অর্থলগ্নি জগতের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। এ তালিকায় আছেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার, ধনাঢ্য আবাসন ব্যবসায়ী স্টিভ উইটকফ এবং মার্ক রোয়ান ও অজয় বাঙ্গার মতো ব্যক্তিরা।
জ্যারেড কুশনার জানিয়েছেন, এ পর্ষদের মাধ্যমে গাজার পুনর্গঠনে অর্থায়ন ও ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে কাজ করা হবে। তাঁর মতে, হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ না করলে এ পুরো পরিকল্পনা থমকে যাবে।
আবার গাজার পুনর্গঠনে জাতিসংঘের সংস্থাগুলো হটিয়ে সেখানে ‘মুনাফাভিত্তিক ব্যবসায়িক উদ্যোগ’ চালুর ইঙ্গিত রয়েছে পর্ষদের সনদে।
যখন পর্ষদের বিলিয়ন ডলারের হিসাব আর প্রশাসনিক ছক নিয়ে তোলপাড় চলছে, তখন গাজার সাধারণ মানুষের জন্য কোনো বাস্তব পরিবর্তন আসেনি। ফিলিস্তিনিদের অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে শুধু সর্বনিম্ন স্তরের ‘ন্যাশনাল কমিটি’তে।
অতিসম্প্রতি গাজার মূল প্রবেশপথ রাফাহ সীমান্ত খুলে দেওয়া হয়েছে। তবু গাজার মানুষ এখনো ইসরায়েলি বোমাবর্ষণ এবং খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনের শিকার হচ্ছেন। তাঁদের জন্য এ পরিস্থিতি দুঃসহ নরক যন্ত্রণার মতো। আর তাঁদেরই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে ট্রাম্পের এই তথাকথিত শান্তি পর্ষদ।
বহুপাক্ষিকতার সংকট ও ভবিষ্যৎ
সমালোচকদের মতে, এ পর্ষদ আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে কোনো নির্দিষ্ট আইনি মর্যাদা বা জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা ছাড়াই গঠিত হয়েছে। এটি মূলত একটি ‘যুক্তরাষ্ট্র-কেন্দ্রিক ক্লাব’ তৈরির ঝুঁকি তৈরি করছে; যা ভিন্নমত পোষণকারী দেশগুলোকে কোণঠাসা করবে।
সাধারণত কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা তৈরিতে বছরের পর বছর সময় লাগে, যেমন জাতিসংঘ গঠনে লেগেছিল চার বছর। কিন্তু ট্রাম্প মাত্র দুই মাসেই তাঁর ওই ‘চটপটে’ সংস্থাটি দাঁড় করিয়েছেন এবং দেশগুলোকে সিদ্ধান্ত নিতে খুব অল্প সময় দিয়েছেন।
পরিশেষে বলতে হয়, যদি এই পর্ষদ তার কাঠামো ও লক্ষ্যতে আমূল পরিবর্তন না আনে; অর্থাৎ ম্যান্ডেট স্পষ্ট করা এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ না করে; তবে এটি কোনো ঐতিহাসিক উদ্যোগ হিসেবে নয়; বরং দাভোসের একটি ‘ফটো সেশন’ হিসেবেই ইতিহাসে থেকে যাবে।
এ ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই ট্রাম্পের এ উদ্যোগ একটি সত্যিকারের কিছু গড়ার দুর্লভ সুযোগকে স্রেফ অপচয় করবে। মনে রাখতে হবে, টেকসই শান্তি আসে ক্ষমতার অংশীদারত্ব, কার্যকর নিয়মনীতি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামোর মাধ্যমে; এক নেতার ইমেজ কিংবা ইচ্ছার ওপর ভিত্তি করে তৈরি কোনো অতি-রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মাধ্যমে নয়।
[তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, রয়টার্স, আল–জাজিরা, দ্য হিল ও রিনিউঅ্যাবল ম্যাটার]
![]() |
| সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ৫৬তম বার্ষিক সম্মেলনের ফাঁকে বৈশ্বিক সংঘাত নিরসনে ‘শান্তি পর্ষদ’ গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ সময় পর্ষদের সনদ তুলে ধরেন তিনি। ২২ জানুয়ারি ২০২৬, দাভোস, সুইজারল্যান্ড. ছবি: রয়টার্স |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
নামের আগে ‘ডক্টর’ লাগাতে মরিয়া কেন তাঁরা by ইমদাদুল হক তালুকদার
এমন চর্চা দেখা যায় অনেকের ক্ষেত্রে নামের আগে ডক্টরেট লাগানো নিয়ে। একটু অর্থবিত্তের মালিক আর একটা অনার্স-মাস্টার্স থাকলেই জনগণের কাছে নিজেকে জাহির করার জন্য নানা উপায়ে এই ‘ডক্টর’ শব্দটির জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন কিছু ব্যক্তি। এ তালিকায় রয়েছেন রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ নানা পদধারী লোকজন। তাদের মধ্যেও অনেক যোগ্য ব্যক্তি আছেন নিশ্চয়ই, তাঁদের বাদ দিয়ে বাকিদের ক্ষেত্রে এ আলোচনা।
বিখ্যাত মনোবিদ আব্রাহাম মাসলোর তত্ত্বমতে, মানুষের যখন মৌলিক চাহিদা পূরণ হয়ে যায়, তখন সে খোঁজে নিরাপত্তা, এরপর সঙ্গ ও ভালোবাসা এবং এরপর খ্যাতি। পিএইচডি জিনিসটার সঙ্গে খ্যাতির কোনো সম্পর্ক নেই; অন্তত একাডেমিক দিক থেকে। এর সঙ্গে আসলে মাসলোর থিওরির আরও উচ্চপর্যায়ের সম্পর্ক। যেটিকে বলা হয় ‘সেলফ অ্যাকচুয়ালাইজেশন’। এ শব্দের অনুবাদ প্রায় অসম্ভব। তবে কাছাকাছি বললে এর অর্থ কিছুটা দাঁড়ায়, আত্মোপলব্ধির মাধ্যমে নিজেকে এমন স্তরে পৌঁছানো, যার মাধ্যমে ব্যক্তি এমন এক ফিলোসফিক্যাল বা দার্শনিক স্তরে পৌঁছান, যে জায়গায় তিনি চিন্তাগত দিক থেকে নিজের অন্তর্নিহিত শক্তিকে অর্থবহভাবে প্রকাশ ও চর্চা করেন; খ্যাতি যেখানে গৌণ। মুখ্য হলো আত্মসাধনা, আত্মোপলব্ধি।
পিএইচডির পুরো অর্থ হলো ‘ডক্টর অব ফিলোসফি’। কোনো ব্যক্তি যে বিষয়েই পিএইচডি অর্জন করুক না কেন, ডিগ্রির নাম ডক্টর অব ফিলোসফি! ডক্টর অব ফিজিকস বা ডক্টর অব ইকোনমিকস নয়। এর কারণ পিএইচডি কেবল ডিগ্রি নয়; এটি জ্ঞানের এমন স্তর, যেটি সম্পন্ন করার মাধ্যমে তিনি তাঁর বিশেষজ্ঞ এলাকায় নতুন জ্ঞান উৎপাদন করার সক্ষমতা অর্জন করেন। উন্নত দেশে কেবল যাঁরা একাডেমিয়াতে উচ্চতর গবেষণার মাধ্যমে জ্ঞানের জগতে অবদান রাখতে চান, তারাই কেবল পিএইচডির মতো জটিল, সময়সাপেক্ষ ও কষ্টসাধ্য পথে হেঁটে থাকেন। বাকিরা যাঁর যাঁর ফিল্ডে অনার্স বা বড়জোর মাস্টার্স করে চাকরির জগতে প্রবেশ করে নিজেকে অল্প বয়সে প্রতিষ্ঠিত করে নেন।
ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউয়ের ২০২৩ সালে উন্নত দেশের জনগণের ২৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী ব্যক্তিদের মধ্যে পিএইচডি ডিগ্রিধারীর শতকরা সংখ্যার তথ্য প্রকাশ করেছে। হিসাবে দেখা যায়, সুইজারল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ ও স্লোভেনিয়া সর্বোচ্চ পিএইচডিধারী জনসংখ্যায় এগিয়ে, যা ৩ শতাংশ। এ সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে ২ শতাংশ এবং ফ্রান্স, স্পেন, বেলজিয়ামসহ অন্যান্য দেশে এ হার ১ শতাংশ। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় এ সংখ্যা যথাক্রমে সর্বমোট ১৬ হাজার ও ১৩ হাজার। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের মতো জনবহুল বিশাল দেশে এ সংখ্যা মাত্র ২৪ হাজারের মতো। বাংলাদেশে এ সংখ্যা ৫১ হাজার ৭০৪ (বিবিএস, ২০২২)।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে আসছে ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রির ভয়াবহ চিত্র। সরকারি হিসাবে যে সংখ্যক পিএইচডি ডিগ্রি রয়েছে, তার উল্লেখযোগ্য অংশই যেখানে মৌলিকত্বের প্রশ্নে প্রশ্নবিদ্ধ, সেখানে এই পুচ্ছশোভিত ভুয়া পিএইচডির ভার জাতিকে সইতে হচ্ছে করুণভাবে। এই ভুয়া পিএইচডি-পুচ্ছধারীদের ক্রমাগত বাহাদুরি প্রদর্শন, গণমানুষকে ধোঁকা দেওয়া, নানা ধরনের সামাজিক সুবিধা নেওয়া থেকে শুরু করে নানাভাবে ঠকিয়ে চলেছেন জাতিকে।
এই পুচ্ছধারীদের অনেকে প্রায়ই এই ডিগ্রি ব্যবহার করে কোনো আর্থিক বা পদের সুবিধা নিচ্ছেন না বলে জায়েজ করে থাকেন। আপাতদৃষ্টে দেশের প্রচলিত আইনেও এর প্রতিকার নেই বলেই ব্যাপক মতামত প্রচলিত রয়েছে। এর বিপক্ষে দুটি কথা বলা জরুরি।
যদি আমরা আইনের দার্শনিকতার (জুরিসপ্রুডেন্স) দিক থেকে এটিকে বিশ্লেষণ করি, তাহলে আইনের দর্শনের দুটি দিক থেকে এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। প্রথমত, প্রতিশোধমূলক বা ন্যায়বিচারমূলক যুক্তির (রিট্রিবিউটিভিজম) দিক থেকে এটি নৈতিকতা ভঙ্গ করা, যা একাডেমিক মূল্যবোধ ও সমাজের প্রতি করা একটি নৈতিক অপরাধ, কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে যাঁরা পিএইচডি অর্জন করেন, তাঁদের অর্জিত মর্যাদার অপব্যবহার ও অবমাননা এবং প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার পবিত্রতা নষ্ট করা, যা আইনের দার্শিনকতার দৃষ্টিতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
অন্যদিকে ফলবাদী বা উপযোগবাদী যুক্তির (ইউটিলিটারিয়ানিজম ) আলোকে এ ধরনের অপরাধের বিচার নিশ্চিত হলে তা ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধপ্রবণতা ঠেকানো (ডিটারেন্স), অন্য অপরাধীদের ভীতি তৈরি করা (জেনারেল ডিটারেন্স) এবং সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিকে এ ধরনের কাজ করা থেকে বিরত রাখা (স্পেসেফিক ডিটারেন্স), জনসাধারণের বিশ্বাস রক্ষা, মিথ্যা বিশেষজ্ঞদের থেকে সুরক্ষিত রাখা, যাতে যোগ্য ব্যক্তিদের ওপর মানুষের বিশ্বাস বজায় থাকে ইত্যাদি একাডেমিক নৈতিকতাকে সুরক্ষিত করবে। এ ছাড়া রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রতারণা বন্ধ করা বিচারব্যবস্থার একধরনের সহজাত কর্তব্যও বটে।
ভুয়া পিএইচডি রোধকল্পে বারবার হাইকোর্ট বিভাগ নানা ধরনের নির্দেশনা দিয়েছেন এবং সে অনুযায়ী ইউজিসিসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এগিয়ে যাচ্ছে এ বিষয়ে আইন ও বিধি প্রণয়নে। যুগান্তকারী এই কর্মযজ্ঞে যেন আইনের উল্লিখিত দার্শনিক দিক বিবেচনায় ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রি ব্যবহার করে যেকোনো ব্যক্তি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যে ধরনের সুবিধাই নিক না কেন, তার যথাযথ শাস্তি যাতে নিশ্চিত করা হয়, এটিই পরম প্রত্যাশা। অন্যথায় ভুয়া পিএইচডি ব্যবহার করে প্রত্যক্ষ সুবিধাভোগীদের ফেরানো গেলেও পুচ্ছধারীরা পতপত করে জাতির সামনে উড়িয়ে চলবেন পিএইচডির চকচকে নকল পুচ্ছ; বিভ্রান্ত করবেন জাতিকে, হেয় করবেন শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক দর্শন।
* ইমদাদুল হক তালুকদার, মানসিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ
- মতামত লেখকের নিজস্ব

About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
প্রতিদিন কয়টি ফল খাওয়া ভালো? by ফাহমিদা মাহমুদ
শরীরের পর্যাপ্ত ভিটামিন ও খনিজ লবণের চাহিদা পূরণে প্রতিদিন ৪০০ গ্রাম শাকসবজি ও ফলমূল খেতে বলা হয়। এ ক্ষেত্রে প্রতিদিন দুটি করে মৌসুমি ফল (প্রতিটি ৫০ গ্রাম করে) খেতে হবে, যার একটিতে থাকবে সাইট্রাসের গুণাগুণ, অন্যটিতে ভিটামিন এ। টকজাতীয় ফলে ভিটামিন সি, ফলিক অ্যাসিড ছাড়াও অনেক গুরুত্বপূর্ণ খনিজ লবণ পাওয়া যায়, যেমন ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ফসফরাস, আয়রন, ফলেট, ম্যাগনেশিয়াম।
এ ছাড়া ফলে আছে প্রচুর অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট। ভিটামিন সি, ফলেট, অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট রোগ প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। সর্দি-কাশির সংক্রমণ ও ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি কোলাজেন উৎপাদন করে। ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ানোর পাশাপাশি রক্ষা করে চুলের কোষ। ফলের খনিজ লবণ, যেমন ক্যালসিয়াম, ফসফরাস হাড় ও চুলের গোড়া মজবুত করে। পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমায়, কিডনির পাথর প্রতিরোধে সহায়তা করে, পানিশূন্যতাও রোধ করে। হিমোগ্লোবিন গঠনসহ শক্তি ও কর্মক্ষমতা বাড়ায় আয়রন, মস্তিষ্কের কার্যকারিতা উন্নত করে, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা উন্নত করে। এ–জাতীয় ফলগুলো ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণেও ভালো ভূমিকা রাখে।
বর্তমানে বাজারে যে ফলগুলোয় এসব উৎস দেখা যায়, সেগুলো হলো:
আমড়া
১০০ গ্রাম আমড়ায় প্রায় ২৭০ মাইক্রোগ্রাম ক্যারেটিনয়েড, ৯২ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, ১ গ্রাম ফাইবার ও ৫৫ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম থাকে।
আমলকী
১০০ গ্রামে প্রায় ৪৩৪ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, ৭৩৪ মিলিগ্রাম জিংকসহ প্রায় ১৭৪ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম পাওয়া যায়। এ ছাড়া খুব সামান্য পরিমাণে আয়রন ও প্রায় ২৫ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম ও দশমিক ৮৫ গ্রাম ফাইবার পাওয়া যায়। প্রতিদিন অন্তত একটা করে আমলকী গ্রহণে ভিটামিন সির দৈনিক চাহিদা পূরণ সম্ভব।
জাম্বুরা
১০০ গ্রামে প্রায় ১২০ মাইক্রোগ্রাম ক্যারোটিনয়েড, ১০৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি ও ৩৭ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম থাকে।
জলপাই
১০০ গ্রামে প্রায় ১৯০ মাইক্রোগ্রাম ক্যারোটিনয়েড, ৩৯ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি ও ২২ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম ও ১.৬ গ্রাম ফাইবার থাকে।
পেয়ারা
১০০ গ্রামে প্রায় ১০০ মাইক্রোগ্রাম ক্যারোটিনয়েড, ২১০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, ১৬০ মিলিগ্রাম জিংকসহ প্রায় ৯১ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম ও সামান্য পরিমাণে ক্যালসিয়াম থাকে। এ ছাড়া পেয়ারায় প্রচুর পরিমাণে পেকটিন থাকে। পেকটিন হজমে সাহায্য করে, রক্তে শর্করার মাত্রা ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে। প্রায় ৫.২ গ্রাম ফাইবার থাকে যা অন্ত্রে ভিসকোস জেল তৈরি করে। এটি অন্ত্রের ভালো ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
লেবু
এটি থেকে প্রায় সারা বছর ভিটামিন সি, এ পাওয়া যায়। ১০০ গ্রামে প্রায় ৪৭ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি থাকে। আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে ভিটামিন সি–সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। কারণ, ভিটামিন সি আয়রন শোষণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
পাকা কতবেল
১০০ গ্রামে প্রায় ৬১ মাইক্রোগ্রাম ক্যারোটিনয়েড, প্রায় ৫৯ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম ও প্রায় ১৩ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি থাকে।
পাকা পেঁপে
পেঁপে প্রায় সারা বছরই পাওয়া যায়। পাকা পেঁপেতে প্রচুর ভিটামিন এ ও জিংক পাওয়া যায়। ১০০ গ্রাম পেঁপেতে আছে প্রায় ২৩৩০ মাইক্রোগ্রাম ক্যারোটিনয়েড, ২৯৩৩ মিলিগ্রাম জিংক, প্রায় ১৩৩ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম ও সামান্য পরিমাণে ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়।
আনারস
১০০ গ্রামে প্রায় ৯.৩ গ্রাম শর্করা, ৯০ মাইক্রোগ্রাম ক্যারোটিনয়েড, ২৬ গ্রাম ভিটামিন সি ও খুব সামান্য পরিমাণে ক্যালসিয়াম থাকে। এ ছাড়া আনারসে ব্রোমেলিন নামে একপ্রকার আমিষ পরিপাককারী এনজাইম থাকে। বিশেষ অবস্থায় (যেমন কিডনি রোগ, ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা) পুষ্টিবিদ ও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী এ ফল গ্রহণ করতে হবে।
সিনিয়র নিউট্রিশন অফিসার, সেন্টার ফর গ্লোবাল হেলথ রিসার্চ, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি
![]() |
| কিডনি রোগ বা ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা থাকলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী ফল খেতে হবে। ছবি: গ্রাফিক্স |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
বাজারে নকল ও মানহীন কনডম, জনস্বাস্থ্য হুমকিতে by পার্থ শঙ্কর সাহা
দোকানি যে কনডমটি বেচলেন, এর গায়ের নাম ‘ম্যান লাভ’। কিন্তু প্যাকেটের ভেতরে যে কনডম পাওয়া গেল, তার মোড়কে নাম লেখা ‘এক্সপ্রেশন’। দোকানিকে বিষয়টি দেখানোর পর তিনি বললেন, ‘এসব দেহি না ভাই। কুন নামে আছে হেইটা কে দেহে। জিনিস তো আছেই।’
দোকানি জানান, স্থানীয় কিছু ব্যবসায়ী কিছুদিন পরপর নানা ব্র্যান্ডের কনডম দিয়ে যায়। বাজারে প্রচলিত ভালো কোম্পানির চেয়ে এগুলোর দাম অনেক কম। তাই এগুলোর বিক্রিও ভালো। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে এসবের চাহিদা প্রবল।দেশের বাজার এখন এ রকম মানহীন ও নকল কনডমে ভরে গেছে।
জন্মনিয়ন্ত্রণ ও যৌনরোগ থেকে নিরাপদ থাকতেই মূলত কনডমের ব্যবহার হয়। স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনুমোদনহীন এসব কনডমে ‘মাইক্রোলিকেজ’ বা অতিক্ষুদ্র ছিদ্র থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। আর তা যদি থাকে তবে কনডম ব্যবহারের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়। এ ধরনের কনডম ব্যবহারের ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ যেমন হতে পারে, তেমনি যৌনবাহিত রোগ হওয়ারও আশঙ্কা আছে।
যৌনসংক্রামিত রোগ, যেমন সিফিলিস, গনোরিয়া, ক্ল্যামাইডিয়া, জেনিটাল হার্পিস, জেনিটাল ওয়ার্টস (এইচপিভি), হেপাটাইটিস বি ও সি ইত্যাদি রোগের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর পেছনে অনিরাপদ যৌন সম্পর্কের কারণ আছে। আর সে ক্ষেত্রে এ ধরনের কনডমের ব্যবহারও ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
কনডমের মান
কনডম একধরনের মেডিক্যাল ডিভাইস হিসেবে চিহ্নিত। তাই অন্য যেকোনো ওষুধের অনুমোদনের মতোই এরও অনুমোদন দেয় সরকারের ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর (ডিজিডিএ)। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মো. আকতার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, অনুমোদিত কনডমের সংখ্যা কমে-বাড়ে। তবে এখন ২৬ কোম্পানির ৫৭টি ব্র্যান্ডের কনডম এখন চালু আছে। এর বাইরের অন্য কোনো কনডমের অনুমোদন নেই।
আকতার হোসেন জানান, অনুমোদিত কনডমগুলোর মধ্যে সোশ্যাল মার্কেটিং কোম্পানির (এসএমসি) যে আট ধরনের ব্র্যান্ড আছে, সেগুলোই বেশি চলে।
অনুমোদনহীন ব্র্যান্ডে বাজার সয়লাব হয়ে গেছে। সরকারি তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বর্তমানে দেশের বাজারে পাওয়া যায় প্রায় ১৯০টি ব্র্যান্ডের কনডম। সরকারের তথ্য মেনে নিলে, অন্তত ১৪০টিই অনুমোদনহীন। অর্থাৎ এসব কনডমের কোনোটির পরীক্ষাও হয়নি, ডিজিডিএর অনুমোদন পায়নি।
আকতার হোসেন বলেন , কোনো কনডম দেশের বাজারে অনুমোদনের আগে সেগুলো তাঁদের অধিদপ্তরের পরীক্ষার জন্য জমা দিতে হয়। যে দেশ থেকে আনা হচ্ছে, সেসব দেশের ‘ফ্রি সেল সার্টিফিকেট’ দিতে হয়। অধিদপ্তরের ল্যাবে এসব পরীক্ষা করা হয়। তারপর অনুমোদন দেওয়া হয়।
অনুমোদনহীন কনডমের বিস্তার পর্যটন ও প্রত্যন্ত এলাকায়
উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব নকল ও মানহীন কনডমের বিস্তার বেশি প্রত্যন্ত অঞ্চল ও সীমান্ত এলাকায়। কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, সাতক্ষীরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কক্সবাজারের সীমান্তঘেঁষা এলাকা এসব পণ্য সহজলভ্য।
পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় সৈকতের কাছাকাছি এক মার্কেটের দোকানি বলছিলেন, নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত ভরা পর্যটনের মৌসুমে তাঁর দোকানসহ বিভিন্ন দোকানে কনডমের বিক্রি বেশি হয়। ওই দোকানির কথা, পরিচিত ব্র্যান্ডের বাইরে নানা ব্র্যান্ডের বিক্রি হয় তাঁর দোকানে। কম দামি ব্র্যান্ডের চাহিদাও আছে। অনেকেই মানের চেয়ে দামের দিকে বেশি দৃষ্টি দেয়। কম দামের কনডমগুলোতে লাভ বেশি থাকায় তাঁরা এসব বিক্রি করতে উৎসাহিত বোধ করেন। আবার সেগুলোর চাহিদাও আছে বলে জানান এই দোকানি।
কক্সবাজার শহরের এক ওষুধ ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলছিলেন, অল্প দামের কনডম শুধু দেশের মধ্যেই নয়, সীমান্ত পার হয়ে মিয়ানমারেও যায়। ওই সব দেশে বাংলাদেশের কনডমের চাহিদা আছে। ব্যবসায়ীর কথা, পর্যটনে এলে মানুষ মানের বাছবিচার কম করে।
যে দুই ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা হয়, তাঁরা কেউ নিশ্চিত নন—অনুমোদনহীন কনডমের কোনো ঝুঁকি থাকতে পারে। দেশের বাজারে যেহেতু বিক্রি হচ্ছে, তাই সেগুলোর মান ভালো বলেই মনে করেন তাঁরা।
তবে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরও গত বছর রাজধানীর মিটফোর্ড এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ অনুমোদনহীন কনডম উদ্ধার করে বলে জানান পরিচালক আকতার হোসেন। তিনি বলেন, ‘বাজারে এগুলো আছে। কিন্তু সব সময় আমরা পর্যবেক্ষণ করতে পারি না। এসব নিয়ে গণমাধ্যমও সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারে।’
অনুমোদনহীন, নিম্নমানের কনডম কীভাবে বাজারে ছড়ায়
একাধিক ব্যবসায়ী জানান, অনেক ব্যবসায়ী চীনসহ কিছু দেশ থেকে পুরোনো বা মেয়াদোত্তীর্ণ ল্যাটেক্স বা রাবার দিয়ে তৈরি এসব মানহীন কনডম স্বল্প দামে কিনে নিয়ে এসে দেশেই মোড়কজাত করে দেশের বাজারে ছেড়ে দিচ্ছেন।
সেগুলোতে মাইক্রোলিকেজ থাকতে পারে, এখানে প্রয়োজনীয় লুব্রিকেন্ট কম থাকতে পারে, আবার রাবারের মানও নিম্ন হয় সাধারণত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাইক্রোলিকেজ হলো কনডমের খুব সূক্ষ্ম ছিদ্র বা দুর্বল অংশ, যেখান দিয়ে ভাইরাস ও শুক্রাণু সহজেই প্রবেশ করতে পারে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চর্ম ও যৌন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. সমরেশ চন্দ্র হাজরা প্রথম আলোকে বলেন, মানহীন ও ত্রুটিপূর্ণ কনডমে মাইক্রোলিকেজ থাকতেই পারে। তিনি আরও বলেন, এর ফলে এইচআইভি ও অন্যান্য যৌন সংক্রমিত রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ে। অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের সম্ভাবনা তৈরি হয়। ব্যবহারকারীর মধ্যে কনডমের প্রতি আস্থা কমে যায়, যা দীর্ঘ মেয়াদে আরও বড় জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি করতে পারে।
বাড়ছে যৌন সংক্রমিত রোগের সংখ্যা
দেশে এইচআইভির সংক্রমণ বেড়েছে গত ২০২৫ সালে। সে বছর ১ হাজার ৮১৯ জন নতুন করে এইচআইভিতে আক্রান্ত হন। আগের বছর ২০২৪ সালে এইচআইভি শনাক্ত ব্যক্তির সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৪৩৮। শুধু এইচআইভি নয়, এসটিডির (যৌনসংক্রমিত রোগ) প্রাদুর্ভাব বেড়ে গেছে।
এশিয়ান জার্নাল অব মেডিক্যাল প্রিন্সিপ্যালস অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে ২০২৩ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেশে যৌনবাহিত রোগ বৃদ্ধির চিত্র উঠে আসে। ‘প্রিভিলেন্স, ট্রেন্ডস অ্যান্ড সোশিওডেমোগ্রাফিত ডিটারমিন্যান্টস অব সেক্সুয়ালি ট্রান্সমিটেডে ডিজিসেস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক ওই গবেষণা হয় খুলনা বিভাগের দুই হাজারের বেশি মানুষের ওপর। গবেষণাপত্রে বলা হয়, ‘গনোরিয়া ও ক্ল্যামাইডিয়ার সংক্রমণের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা এসব সংক্রমণ মোকাবিলায় লক্ষ্যভিত্তিক ও কার্যকর কৌশল গ্রহণের প্রয়োজনীয়তাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।’
হাসপাতালে রোগী ভর্তি এবং প্রাইভেট প্র্যাকটিসের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ঢাকা মেডিক্যালের সহযোগী অধ্যাপক সমরেশ চন্দ্র হাজরা বলেন, যৌন সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা বিশেষ করে সিফিলিসে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। এর দুটো দিক হতে পারে, হয়তো আগের চেয়ে মানুষ এখন বেশি করে আসছে। আবার সামাজিক নানা পরিবর্তন এবং ঝুঁকিপূর্ণ জীবনযাপন ও সুরক্ষাসামগ্রীর সমস্যার কারণেও হতে পারে।
![]() |
| প্রতীকী ছবি |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
-
▼
2026
(1426)
-
▼
March
(202)
-
►
Mar 30
(6)
- নিজের শুক্রাণু ব্যবহার করে ‘শিশু প্রজনন খামার’ গড়া...
- দক্ষিণ এশিয়ায় কেন ‘খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের’ গুঞ্জন by ...
- ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া নিয়ে বিব্রত হচ্ছেন? by ডা. সাই...
- কুমিরের হঠাৎ এই খ্যাপা আচরণ কেন? by গওহার নঈম ওয়ারা
- ৫০ বছরে কখনো হাসপাতালে যাননি শতবর্ষী নারী
- চিকিৎসায় লাখো রোগীর ভরসা মা ও শিশু হাসপাতাল by ফাহ...
-
►
Mar 30
(6)
-
▼
March
(202)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...







