Friday, April 12, 2019

অ্যাসাঞ্জ স্বচ্ছতার হিরো না রাষ্ট্রীয় শত্রু! -এএফপির বিশ্লেষণ

সাড়া জাগানো উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অতি গোপনীয় তথ্য ফাঁস করে এক পক্ষের কাছে যেমন ‘বীরে’ পরিণত হয়েছিলেন, তেমনই অন্য পক্ষের কাছে হয়েছিলেন শত্রু। তাঁর প্রধান শত্রু যুক্তরাষ্ট্র। তিনি এখনো এই মেরুকরণ অবস্থায় রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র অ্যাসাঞ্জকে নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি হিসেবে মনে করে। তাই তাঁকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে বিশ্বের মোড়ল দেশটি। আর সেই বিচারের হাত থেকে নিজেকে রক্ষার চেষ্টায় অ্যাসাঞ্জ।
এক দশক আগে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের কোটি কোটি অতি সংবেদনশীল গোপন নথি ফাঁস করে বিশ্ব আলোচনার পাদপ্রদীপে আসেন অ্যাসাঞ্জ। সেটার সূত্র ধরেই ৪৭ বছর বয়সী ওই অস্ট্রেলিয়ানকে গতকাল বৃহস্পতিবার লন্ডনে ইকুয়েডরের দূতাবাস থেকে গ্রেপ্তার করেছে যুক্তরাজ্যের পুলিশ। যুক্তরাজ্যে বসবাসের অনুমতি প্রত্যাহারের পর ২০১২ সাল থেকেই অ্যাসাঞ্জ ওই দূতাবাসের একটি ছোট অ্যাপার্টমেন্টে ছিলেন। তবে যুক্তরাজ্যে তাঁর বসবাসের অনুমতি বাতিল করা হয় তথ্য ফাঁসের অভিযোগে নয়, সুইডেনে যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের অভিযোগে। যদিও পরে ওই অভিযোগ থেকে তিনি অব্যাহতি পেয়েছেন। অ্যাসাঞ্জ নিজেও তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিলেন।
অ্যাসাঞ্জ যেসব নথি ফাঁস করেছেন, তার বেশির ভাগে যুদ্ধের নামে বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যু, নির্যাতন, গোপনে সামরিক অভিযানের মতো বিষয়গুলো ওঠে আসে। শুধু ইরাক ও আফগান যুদ্ধের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পাঁচ লাখ নথি প্রকাশ করা হয়। সরকারগুলোর মধ্যে স্বচ্ছতা তৈরি এবং যুদ্ধবিরোধী প্রচারণার অংশ হিসেবে উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা তখন বিশ্বে বেশ প্রশংসিত হন। রাতারাতি হিরোতে পরিণত হন তিনি।
তবে নাখোশ হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও দেশটির মিত্ররা। গোয়েন্দা পদ্ধতি ও গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠানের প্রধান কাঠামোগুলোর অবস্থানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তথ্য প্রকাশের কারণে অ্যাসাঞ্জ জনজীবন হুমকির মুখে ফেলেছেন বলে দাবি করে তারা। উইকিলিকস কোনো সম্পাদনা ছাড়া তথ্যদাতার নাম সংযুক্ত করে অনলাইনে অতি গুরুত্বপূর্ণ নথি প্রকাশ করায় একসময় অ্যাসাঞ্জের সঙ্গে কাজ করা মানবাধিকার গোষ্ঠী ও সংবাদপত্রগুলো বেশ হুমকির মুখে পড়ে। তখন থেকেই অ্যাসাঞ্জের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক থাকার সন্দেহ ডালপালা মেলতে শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের তদন্ত করা রবার্ট ম্যুলার খুঁজে পান, রাশিয়ার সরকারি মদদপুষ্টরা ২০১৬ সালের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের নির্বাচনী প্রচারণা শিবির হ্যাক করেন এবং সেখান থেকে প্রাপ্ত তথ্য উইকিলিকসহ বিভিন্ন মাধ্যমের কাছে হস্তান্তর করেন।
১৯৭১ সালে অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডে জন্মগ্রহণকারী অ্যাসাঞ্জের ছোটকাল ছিল যাযাবরের মতো। মেলবোর্নে থিতু হওয়ার আগে তিনি ৩৭টি স্কুল পরিবর্তন করেন। কিশোর বয়স থেকে তিনি কম্পিউটার হ্যাকিংয়ে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। এরপর তিনি প্রযুক্তিবিশেষজ্ঞ ও তাঁর মতাদর্শের লোকদের নিয়ে ২০০৬ সালে গড়ে তোলেন উইকিলিকস। প্রতিষ্ঠানটির ফাঁস করা যুদ্ধসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ফাঁস করা হয়।
বিচারের মুখে
ইকুয়েডরের আগের প্রেসিডেন্ট রাফায়ের কোরেইয়া অ্যাসাঞ্জের প্রতি বেশ সহানুভূতিশীল ছিলেন। তবে ২০১৭ সালে লেনিন মরেনো ক্ষমতায় আসার পর অ্যাসাঞ্জের প্রতি দেশটির মোহমুক্তি ঘটে। দেশটি জানায়, বিদেশি বিষয়ে হস্তক্ষেপের বিষয়ে অ্যাসাঞ্জ অভিযুক্ত। গত বছর অ্যাসাঞ্জের বাসার ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করা হয়।

রাফাল যুদ্ধবিমান ওড়ানোর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন পাকিস্তানের পাইলটরা, ভারতের উদ্বেগ নাকচ করেছে ফ্রান্স

রাফাল যুদ্ধবিমান কেনা নিয়ে ভারতের রাজনৈতিক মহলে চলছে নানান আলোচনা-সমালোচনা। কেনাকাটায় দুর্নীতি নিয়ে বিস্তর অভিযোগ। আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে ব্যাপারটি। এখন সর্বশেষ তথ্য সঠিক হলে ভারতের জন্য ব্যাপারটি বেশ উদ্বেগের। কারণ নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যে জানা গেল, রাফাল যুদ্ধবিমান ওড়ানোর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সদস্যরা। ২০১৭ সালের নভেম্বরে ফ্রান্সের মাটিতে ওই প্রশিক্ষণ হয়েছিল। সদ্য প্রকাশিত এমন একটি প্রতিবেদনে উদ্বেগ বেড়েছে ভারতের। তবে পাকিস্তানের পাইলটদের বিমান ওড়ানোর প্রশিক্ষণের খবরকে ভুয়া বলেছে ফ্রান্স সরকার।
এআইএন অনলাইন ডটকম নামের একটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ফ্রান্সে রাফাল যুদ্ধবিমান ওড়ানোর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন পাকিস্তানের পাইলটরা। ২০১৭ সালের নভেম্বরে ফ্রান্সে ওই প্রশিক্ষণের খবরে ভারত উদ্বিগ্ন। ভারতের মতোই ফ্রান্সের কাছ থেকে রাফাল কিনতে চুক্তিবদ্ধ কাতার। রাফাল যুদ্ধবিমান প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের প্রকাশ করা প্রেস বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে ফ্রান্সের কাছ থেকে ২৪টি রাফাল যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তি করে কাতার। ২০১৭ সালে কাতার আরও ১২টি রাফাল যুদ্ধবিমান কিনতে নতুন চুক্তি করে। ওই বছরই সেই যুদ্ধবিমান চালানোর জন্য প্রশিক্ষণ নিতেই কাতার থেকে ফ্রান্সে গিয়েছিল পাইলটদের একটি দল। সেই দলেই ছিলেন পাকিস্তানি পাইলটরা।
তবে নয়াদিল্লিতে ফরাসি দূতাবাসের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের পাইলটদের রাফালে প্রশিক্ষণের খবরটি ভুয়া বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মোতায়েন আছেন পাকিস্তানের সেনারা। জর্ডানের মতো দেশের কাছ থেকে সরাসরি সামরিক সহযোগিতা পেয়ে থাকে পাকিস্তান। কিছুদিন আগেই ইসলামাবাদকে ১৩টি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান দিয়েছিল জর্ডান। বালাকোটে ভারতীয় বিমানবাহিনীর অভিযানের পর নিয়ন্ত্রণরেখা পেরিয়ে যে যুদ্ধবিমানগুলো ভারতের আকাশে হামলা চালাতে গিয়েছিল, তার মধ্যে জর্ডানের দেওয়া যুদ্ধবিমানও থাকতে পারে বলে ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম দ্য নিউজ ডটকম ডটপিকের খবরে বলা হয়, ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে ইসলামাবাদে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সদর দপ্তরে গিয়েছিলেন কাতার বিমানবাহিনীর প্রধান। সেই অনুষ্ঠানের পর পাকিস্তানের বিমানবাহিনীর প্রধান বলেছিলেন, সামরিক ক্ষেত্রে পাকিস্তানের বিমানসেনাদের সব রকমের সাহায্য করতে প্রস্তুত কাতার।
আকাশযুদ্ধে নিজেদের এগিয়ে রাখার পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই ভারত অত্যাধুনিক রাফাল যুদ্ধবিমান কেনার পথে হাঁটে। এই বছরের সেপ্টেম্বরে ভারতে আসতে পারে রাফাল যুদ্ধবিমান। তার আগেই পাকিস্তানের পাইলটরা এই বিমান ওড়ানোর প্রশিক্ষণ নিয়ে ফেললে তা যথেষ্ট উদ্বেগের ভারতের কাছে। কারণ, ভারত তাঁর নিজের পছন্দমাফিক রাফাল যুদ্ধবিমানে বেশ কিছু অদলবদল করার পরই তা কিনতে সম্মত হয়েছে। তাই কাতারের কেনা যুদ্ধবিমানের সঙ্গে ভারত যে রাফাল কিনছে, তার মধ্য পার্থক্য থাকলেও এই বিমানের রাডার-ব্যবস্থা দুই দেশের ক্ষেত্রেই এক। অত্যাধুনিক এই রাডার-ব্যবস্থা থাকলে বিমান ওড়ানোর সময়ই পাইলটেরা বুঝতে পারেন, আকাশ বা সমুদ্রের কোথায় বিপদ লুকিয়ে আছে বা কোন জায়গা থেকে প্রতিপক্ষ আঘাত হানার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এখন এই রাডার-ব্যবস্থা পাকিস্তানের হাতে থাকলে ভারতের রাফাল আকাশে উড়লেই পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সদস্যরা তার অবস্থান সহজেই জেনে ফেলতে পারবেন।
ভারতের বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত পাইলট অংশুমান মাইকার বলেন, ‘প্রশিক্ষণ নেওয়া থাকলে ওরা (পাকিস্তান) এর সবকিছুই জেনে যাবে। যুদ্ধবিমানের অস্ত্রব্যবস্থা কেমন, কতক্ষণ আকাশে উড়তে পারে, কীভাবে এই বিমান অভিযান চালায় সব জেনে যাবে।’
ফ্রান্সের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী ২০২২ সালের মধ্যে ভারতের ৩৬টি রাফাল বিমান পাওয়ার কথা। এর জন্য খরচ হবে ৫৯ হাজার কোটি রুপি। তথ্যসূত্র: এনডিটিভি

নিষেধাজ্ঞা আরোপে কড়া জবাব: কিম জং-উন

উত্তর কোরিয়া যে অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর, এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে কেউ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে তাকে ‘কড়া জবাব’ দেওয়া উচিত। আজ বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সিকে (কেসিএনএ) দেওয়া সাক্ষাৎকারে দেশটির প্রেসিডেন্ট কিম জং-উন এ কথা বলেন।
ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ে যুক্তরাষ্ট্র-উত্তর কোরিয়া দ্বিতীয় দফার বৈঠক গত ফেব্রুয়ারিতে ভেস্তে যায়। এরপর প্রথমবারের মতো উত্তর কোরিয়ার অবস্থান নিয়ে মুখ খুললেন উন। দেশটির ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকে ইঙ্গিত করেন তিনি। সম্প্রতি এক আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে অর্থনীতিকে প্রাধান্য দেওয়ার কৌশলগত দিকনির্দেশনা দেন কিম।
বৈঠকে উত্তর কোরিয়ার অবস্থান সম্পর্কে কিম বলেন, জাতীয় অর্থনীতির ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরশীলতা বাড়াতে প্রয়োজনে দ্বিগুণ পরিশ্রম করতে হবে। তবু ‘শত্রুপক্ষের’ কাছ থেকে ভিক্ষা নিয়ে মাথা নিচু করবে না উত্তর কোরিয়া।
হ্যানয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কত দূর এগোবে, তা নিয়ে বিস্তারিত জানতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক চুল্লি নিষ্ক্রিয় করতে রাজি হলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর থেকে অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নেবে—এমনটাই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তি ছাড়াই হঠাৎ করে শেষ হয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উনের মধ্যকার দ্বিতীয় দফা সম্মেলন। এরপর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র-উত্তর কোরিয়ার সম্পর্কের ক্রমশ অবনতি ঘটছে।
অবরোধ তুলে না নেওয়ার পরও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তাঁর দেশের আর্থিক অবস্থা দিন দিন উন্নতির দিকে যাচ্ছে বলে দাবি করেন কিম। গত সপ্তাহে পাঁচ দিনব্যাপী চারটি অর্থনৈতিক প্রকল্প ঘুরে দেখেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছে পুনর্গঠিত ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, পর্যটন রিসোর্ট এবং চীন সীমান্ত-সংলগ্ন ইকোনমিক হাব। জাতীয় গণমাধ্যমে কিমের এই সফরের ছবি এবং প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।
গত বছর অনুরূপ এক পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে কিম আনুষ্ঠানিকভাবে এক ‘নতুন কৌশলগত লাইনের’ ঘোষণা দেন। তাঁর এই কৌশলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি উত্তর কোরিয়ার জনগণের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়। এর আগের পারমাণবিক কর্মসূচি-নির্ভর অধিবেশনের চেয়ে এটি ছিল একেবারেই আলাদা।
বিশ্লেষকেরা বলেন, প্রকাশ্যে ‘শত্রুপক্ষের’ নাম উচ্চারণ না করলেও অবরোধ তুলে না নেওয়ায় ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে যাবেন কিম, তা বলাই বাহুল্য। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জে-ইন আজ বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে এক সম্মেলনে মিলিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে প্রকাশিত হলো কিমের এই মন্তব্য। উত্তর কোরিয়া এবং অন্যান্য জোট ইস্যু নিয়ে কথা বলবেন ট্রাম্প ও মুন।

খুলনায় জোড়া ইলিশ ৭০০০ টাকা

পহেলা বৈশাখ দরজায় কড়া নাড়ছে। একদিন পরেই বাঙালির প্রাণের উৎসব বর্ষবরণ। এ জন্য চলছে নানা প্রস্তুতি। আর এ জন্য প্রভাব পড়েছে ইলিশের বাজারে। বেসামাল হয়ে উঠেছে খুলনার ইলিশ বাজার। দেড় কেজি সাইজের হিমাগারে রাখা জোড়া ইলিশের দাম হাঁকানো হচ্ছে সাত হাজার টাকা। ইলিশের সরবরাহ কম থাকার কারণ দেখিয়ে আকাশ ছোঁয়া দাম চাচ্ছে।
নগরীর ময়লাপোঁতা মোড়স্থ কেসিসি সন্ধ্যা বাজারে গিয়ে দেখা যায়, হিমাগারে রাখা প্রায় দেড় কেজি সাইজের ইলিশ আড়াই হাজার টাকা, এক কেজি সাইজের ২ হাজার টাকা, ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম সাইজের ১২শ’ টাকা, ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রাম সাইজের ১ হাজার টাকা, ৪০০ গ্রাম সাইজের ৮০০ টাকা এবং সদ্য ধরা (টাটকা) ইলিশ ১ কেজি সাইজের ২ হাজার থেকে ২২শ’ টাকা, ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম সাইজের ১৫শ’ থেকে ১৬শ’ টাকা, ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রাম সাইজের ১ হাজার থেকে ১২শ’ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
অথচ এক সপ্তাহ আগে দেড় কেজি সাইজের ইলিশ ২ হাজার থেকে ২২শ’ টাকা, এক কেজি সাইজের ১৫শ’ থেকে ১৬শ’ টাকা, ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম সাইজের ৮শ’ থেকে ১ হাজার টাকা, ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রাম সাইজের ৭শ’ টাকা, ৪০০ গ্রাম সাইজের ৫শ’ থেকে ৬শ’ টাকা এবং সদ্য ধরা (টাটকা) ইলিশ ১ কেজি সাইজের ১৫শ’ থেকে ১৮শ’ টাকা, ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম সাইজের ১ হাজার থেকে ১২শ’ টাকা, ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রাম সাইজের ৮শ’ থেকে ৯শ’ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। 
একাধিক ব্যবসায়ীর সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, বরিশাল, ভোলা, পাথরঘাটা, চরখালী, বেকুটিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ইলিশ খুলনার চাহিদা মেটায়। একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, এখন ইলিশের মওসুম না হওয়ায় ইলিশ ধরা পড়ছে কম। এ কারণেই বাজারে ইলিশের সরবরাহ কম।
নগরীর ময়লাপোঁতা মোড়স্থ কেসিসি সন্ধ্যা বাজারের ব্যবসায়ী শাহজালাল ফিশের স্বত্বাধিকারী মো. আনোয়ার হাওলাদার বলেন, ‘সাধারণত আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র ও আশ্বিন মাসে নদীতে ইলিশ ধরা পড়ে। এখন ইলিশ ধরা মওসুম না হওয়ায় বাজারে সরবরাহ অনেক কম। তিনি বলেন, বাজারে কোল্ড স্টোরে রাখা ইলিশের পরিমাণ বেশি। শাহজালাল ফিশের আরেক স্বত্বাধিকারী মো. কবির হাওলাদার একই মন্তব্য করেন। নগরীর ময়লাপোঁতা মোড়স্থ কেসিসি সন্ধ্যা বাজারে আসা ক্রেতা মো. জামিল হোসেন বলেন, ‘পহেলা বৈশাখকে পুঁজি করে ইলিশের চড়া দাম হাঁকানো হচ্ছে। তিনি বলেন, টাটকা ইলিশের কথা বলে কোল্ড স্টোরে রাখা ইলিশ বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে।’ বাজারে আসা আরেক ক্রেতা এম এ জলিল বলেন, ‘ইলিশ চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে।’

ট্রাম্পের উচিত হবে না সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ করা -পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে ‘ম্যাজিক ম্যান’ বলে আখ্যায়িত করেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন। তবে বলেছেন, ট্রাম্পের উচিত হবে না সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ করা। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা শরণার্থী সঙ্কট সমাধানের জন্য তিনি মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়ানোর জন্য আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি। ওয়াশিংটনে প্রভাবশালী ‘পলিটিকো’ ম্যাগাজিনকে মঙ্গলবার দেয়া এক সাক্ষাতকারে এসব কথা বলেছেন মোমেন। ওই সাক্ষাতকারভিত্তিক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে পলিটিকো।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসীর সংখ্যা সীমিত করার যে বাসনা প্রশাসনের, তা ত্যাগ করা উচিত। এক্ষেত্রে তিনি যুক্তি দেখান অভিবাসী সম্প্রদায়ের কঠোর পরিশ্রমে গড়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র। সাংবাদিক নেহাল তুসি’র নেয়া ওই সাক্ষাতকারে মোমেন বলেন, তার (ট্রাম্পের) উচিত যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যবোধ ও নীতি অনুসরণ করা।
এ সময় তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ করা উচিত হবে না ট্রাম্পের। যুক্তরাষ্ট্র ‘গ্রেট’। কারণ, এটা হলো সব শ্রেণির নির্যাতিত মানুষের স্থান। নিজেদের নিয়ে সংকীর্ণ মানসিকতার পরিবর্তে ট্রাম্প প্রশাসনকে ব্যাপক উদার মানসিকতা দেখানো উচিত।
২০১৭ সালের আগস্ট থেকে বাংলাদেশে আসা কমপক্ষে ৭ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর বোঝা টেনে নিয়ে বেড়াচ্ছে বাংলাদেশ। এসব শরণার্থীকে ফেরত নিতে বার বার মিয়ানমারকে চাপ দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। মিয়ানমার ফেরত নেয়ার অঙ্গীকার করেছে। কিন্তু তা ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে উল্লেখ করার মতো কোনো ফল আসছে না। বহু রোহিঙ্গা ফেরত যেতেও চাইছেন না। তাদের ভয়, ফেরত গেলে দেশে আরো নিষ্পেষণের শিকার হবেন, যেখানে তাদের নাগরিকত্ব ও আইনগত মৌলিক অধিকারগুলো দশকের পর দশক কেড়ে নেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে অবস্থানরত এসব রোহিঙ্গাকে ত্রাণ হিসেবে বিপুল পরিমাণ সহায়তা দেয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের প্রশংসা করেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এক্ষেত্রে জাপানের মতো এশিয়ায় যেসব মিত্র রয়েছে ওয়াশিংটনের, তাদের প্রতি অবদান রাখার জন্য আহ্বান জানাতে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। যদিও তাতে মিয়ানমারের বড় মিত্র চীনের ক্ষোভ বাড়তে পারে। মোমেন আরো বলেছেন, মিয়ানমারের সেনানেতৃত্ব ও অন্যদের বিরুদ্ধে আরো অবরোধ আরোপ করা উচিত যুক্তরাষ্ট্রের, যাতে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নৃশংসতার বিচার করা হয়।
মোমেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আরো অনেক কিছু করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গেও কিছু বিষয়ে কাজ করতে পারে, যাতে তারা রোহিঙ্গাদের সহায়তায় জাতিসংঘের কর্মকান্ডে সমর্থন দেয়। এ সময় তিনি রোহিঙ্গা নির্যাতন সম্পর্কে জাতিসংঘের কর্মকর্তা ও অন্যান্যদের বক্তব্য ও রিপোর্টের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। জাতিসংঘ ও অন্যরা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নৃশংসতাকে ‘গণহত্যার উদ্দেশে’ হত্যাকা- হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। পলিটিকোকে দেয়া ওই সাক্ষাতকারে মোমেন বলেন, সব কিছুই ইঙ্গিত দেয় যে, মিয়ানমারের এ ঘটনা একটি ক্লাসিক গণহত্যার কাছাকাছি। তবে একটি প্রশ্নের উত্তর অন্যভাবে দিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যা হয়েছে তাকে ট্রাম্প প্রশাসনের কি গণহত্যা ঘোষণা করা উচিতÑ এ কথায় বিশ্বাস করেন কিনা? এমন প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানান মোমেন।
গণহত্যা এমন একটি শব্দ, যার আইনগত পরিণাম রয়েছে। ওই প্রশ্নের জবাবে মোমেন বলেছেন, এটা তাদের (ট্রাম্প টিম) সিদ্ধান্ত। এ সময় বার বারই তিনি প্রশ্ন এড়িয়ে যান।
ট্রাম্প প্রশাসন রোহিঙ্গা সঙ্কটকে একটি ‘জাতি নিধন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে, আন্তর্জাতিক আইনে যার অর্থ খুব বেশি বড় করে দেখা হয় না। তবে এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন ঘোষণা দিয়েছে যে, জঙ্গি গোষ্ঠী আইএসের হাতে সিরিয়া ও ইরাকে খ্রিস্টান, ইয়াজিদি ও অন্যান্য গ্রুপ গণহত্যার শিকারে পরিণত হয়েছে।
এরই মধ্যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেনের সঙ্গে সাক্ষাত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর। তবে সেখানে রোহিঙ্গা মুসলিমরা গণহত্যা অথবা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের শিকার হয়েছেন কিনা এ বিষয়ে অবস্থান নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন পম্পেও। তিনি উল্লেখ করেছেন, পরিস্থিতি জটিল। তিনি এখনও এ বিষয়টি দেখছেন।
তবে এটা অস্পষ্ট যে, পম্পেও কেন অবস্থান পরিষ্কার করতে এত লম্বা সময় নিচ্ছেন। তিনি ক্ষমতা নিয়েছেন প্রায় এক বছর। আর মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের দেশত্যাগের ঘটনা তার সেই ক্ষমতা নেয়ার কয়েক মাস আগের। এক্ষেত্রে একটি জোরালো ব্যাখ্যা হলো, তিনি হয়তো এটা নিয়ে উদ্বিগ্ন যে, মিয়ানমারকে গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত করা হলে তাতে দেশটিকে চীনের হাতে আরেকটু বেশি তুলে দেয়া হবে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ এবং বুধবার সিনেটে শুনানি হয়েছে। সেখানে আইন প্রণেতারা মাইক পম্পেওকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে একটি অবস্থান নেয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করেছেন। ডিসেম্বরে প্রতিনিধি পরিষদ রোহিঙ্গা সঙ্কটকে গণহত্যা আখ্যায়িত করে একটি প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে পাস করেছে।
মধ্য মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা মাইকেল কোজাক মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের হতবাক করে দিয়েছেন। মিয়ানমার বিষয়ক এক প্রশ্নের জবাবে মাইকেল কোজাক ঘোষণা দিয়েছেন যে, গণহত্যা হলো একটি ‘ম্যাসেজিং ম্যানেজমেন্ট টুল’ যার কোনো আইনগত প্রভাব নেই। তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেছেন, আপনারা এ বিষয়ে যে কথা বলছেন এর স্বাভাবিক কারণ হলো, আপনারা বিষয়টিতে মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করছেন। আমাদের কথা হলো, আমরা এ বিষয়ে প্রচুর মনোযোগ দিয়েছি। আমরা এখন যেটা চাইছি তা হলো ব্যবস্থা নিতে চাইছি এবং আরো চাপ বাড়াতে চাইছি।
গণহত্যার অভিযোগ বার বারই অস্বীকার করেছে মিয়ানমার। তারা বলেছে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে শুধু সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে তারা ওই অভিযান পরিচালনা করেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন সন্ত্রাসী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে সামান্যই এবং তারা মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে খুব সামান্যই হুমকি। বিশেষজ্ঞরা সতর্কতা দিয়েছেন। বলেছেন, শরণার্থী সঙ্কটের বিষয়ে কোনো রেজ্যুলুশন না নেয়ায় সর্বহারা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে নুতন করে উগ্রপন্থির উত্থান ঘটতে পারে।
একে আবদুল মোমেন বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে বাংলাদেশের সার্বিক সম্পর্ক ভাল। এ সময় তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের প্রশংসা করেন এ জন্য যে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে খুব বেশি হস্তক্ষেপ করে না। ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশংসা করেন তিনি। মোমেন বলেন, আপনি তাকে (ট্রাম্প) পছন্দ করুন বা নাই করুন, তিনি নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন। আপনি পছন্দ করুন বা নাই করুন, এখনও পর্যন্ত তার ব্যাপক সমর্থন রয়েছে মানুষের কাছে। তিনি একজন ম্যাজিক ম্যান।

দেশের শতভাগ মানুষের বাস দূষিত বায়ুতে by ইফতেখার মাহমুদ

**বৈশ্বিক বায়ুদূষণের ঝুঁকিবিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশ।
**প্রতিবেদনে বায়ুদূষণে গড় আয়ু কমা ও স্বাস্থ্যঝুঁকিকে প্রাধান্য।
**বাংলাদেশের বায়ুর মান মানমাত্রার চেয়ে অনেক নিচে।
**২০১৭ সালে দেশে মারা গেছে ১ লাখ ২৩ হাজার মানুষ।

বিশ্বের যে পাঁচটি দেশের শতভাগ মানুষ দূষিত বায়ুর মধ্যে বসবাস করে, তার একটি বাংলাদেশ। আর বায়ুদূষণজনিত কারণে মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ পঞ্চম। এ কারণে ২০১৭ সালে দেশে মারা গেছে ১ লাখ ২৩ হাজার মানুষ। গতকাল বুধবার প্রকাশিত বৈশ্বিক বায়ুদূষণের ঝুঁকিবিষয়ক ‘দ্য স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার-২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব কলাম্বিয়া, টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়, ইনস্টিটিউট অব হেলথ ম্যাট্রিকস অ্যান্ড ইভালুয়েশন ও হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট যৌথভাবে ওই প্রতিবেদন তৈরি করেছে। বায়ুদূষণের কারণে মানুষের গড় আয়ু কমা এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিকে প্রাধান্য দিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বর্তমান সময়ে জন্ম নেওয়া শিশুদের গড় আয়ু ২০ মাস কমবে। বাংলাদেশের বায়ুর মান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানমাত্রার চেয়ে অনেক নিচে। সংস্থাটির বেঁধে দেওয়া সীমার মধ্যে বায়ুর মান ধরে রাখতে পারলে যে দেশগুলো লাভবান হবে, তার মধ্যে সবার ওপরে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ু তখন বাড়বে ১ দশমিক ৩ বছর। আর ভারত, পাকিস্তান ও নাইজেরিয়ায় গড় আয়ু এক বছর করে বাড়বে।
বায়ুদূষণ পরিস্থিতি নিয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহার প্রথম আলোকে বলেন, বায়ুদূষণ রোধে সরকার অনেক ধরনের তৎপরতা চালাচ্ছে। রাস্তায় ধুলা কমাতে পানি দিচ্ছে। বায়ু দূষিত হলে জনগণকেও দায়িত্ব পালন করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, মুখে মাস্ক পরলে ব্যক্তিগতভাবেও দূষণ থেকে মানুষ রক্ষা পাবে।
মূলত বায়ুতে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর ক্ষুদ্র বস্তুকণা পিএম-২.৫ ও পিএম-১০-এর পরিমাণ মেপে বায়ুর মান নির্ধারণ করা হয়েছে। বাতাসে পিএম-২.৫-এর পরিমাণের দিক থেকে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে থাকা দেশগুলো দক্ষিণ এশিয়ার। এই দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে নেপাল, ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে বায়ুদূষণের কারণে হৃদ্‌রোগ, শ্বাসকষ্টজনিত জটিল সমস্যা, ফুসফুসে সংক্রমণ ও ক্যানসারের মতো রোগবালাই ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষত শিশু ও গর্ভবতী নারীরা বায়ুদূষণের সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছে। ইটভাটা, অবকাঠামো নির্মাণ ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে বের হওয়া ধোঁয়া ও ধুলার কারণে ওই দূষণ ঘটছে।
এর আগে গত মার্চে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এয়ারভিজ্যুয়ালের ‘বিশ্ব বাতাসের মান প্রতিবেদন ২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বিশ্বে সবচেয়ে বায়ুদূষণের কবলে থাকা শহরগুলোর মধ্যে ঢাকা শহরের অবস্থান ১৭ তম। আর রাজধানী শহরগুলোর তালিকায় ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয়। এই শহরের বাতাসে ক্ষুদ্র বস্তুকণার (পার্টিকুলেট ম্যাটার বা পিএম ২.৫) পরিমাণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বেঁধে দেওয়া মাত্রার চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা বায়ুর সঙ্গে কী ধরনের দূষিত পদার্থ নিচ্ছি, তা যদি দেখা যেত, তাহলে অনেকে হয়তো নিশ্বাস নেওয়া বন্ধ করে দিত। বিশ্বের বেশির ভাগ বড় শহরে বায়ুদূষণের মানমাত্রা অতিক্রম করলে নানা ধরনের সাবধানতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়। যেমন বাচ্চাদের স্কুলে না যাওয়া, মাস্ক পরা, দূষিত এলাকায় না যাওয়া। দেশে বায়ুদূষণ রোধে একটি আইন প্রণয়ন করে দ্রুত তা বাস্তবায়নের পরামর্শ দেন তিনি।

সোহেল রানার পিতার চিকিৎসা চলবে কীভাবে? by আশরাফুল ইসলাম

কতই বা বয়স হয়েছিল সোহেল রানার। মাত্র ২৪ বছরের ছোট্ট জীবনটাই পরের জন্য বিলিয়ে দিয়ে গেছেন। তিনি হারিয়ে  যাননি হাওরের বিশালতায়। বরং হাওরের জলে লিখে গেছেন গৌরব আর ত্যাগের ইতিবৃত্ত। অন্যের জীবন বাঁচাতে গিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন অসীম সাহসিকতায় আত্মত্যাগের অসামান্য নজির। বনানীর এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডে আটকে পড়াদের জীবন বাঁচাতে গিয়ে উৎসর্গ করেছেন নিজের জীবন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তাকে সমাহিত করা হয়েছে বাড়ির আঙিনার প্রিয় শিমুল ছায়ায়। চোখের জলে সোহেল রানাকে শেষ বিদায় জানালেও কান্না থামেনি পরিবারের।
পাগলের মতো ছেলের কবরের দিকে ছুটে যান মা হালিমা খাতুন। সোহেল রানার কবরের দিকে তাকিয়ে চোখের জলে ভাসেন বাবা, ভাই-বোন, স্বজনেরা।
ছোটবেলা থেকেই ভীষণ মিশুক আর পরোপকারী ছিলেন সোহেল রানা। চরম দারিদ্রতাও কেড়ে নিতে পারেনি তার মুখের হাসি। হাওরের বিশালত্বের মতোই উদার ছিল তার হৃদয়জমিন। অন্যের দুঃখে হতেন সমব্যথী। নিজের সামান্যটুকুও বিলিয়ে দিতেন নিরন্নের মধ্যে। ছেলেকে কবরে শোয়ানোর পরও মা হালিমা খাতুনকে বিলাপ করে বলেন, ‘ফহিন্নীর ঘরে ক্যারে আল্লাহ এমন সোনা দিছিল’।
কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা উপজেলার চৌগাংগা ইউনিয়নের কেরুয়ালা গ্রামের প্রান্তিক কৃষক নূরুল ইসলামের পাঁচ ছেলে-মেয়ের মধ্যে সোহেল রানা ছিলেন দ্বিতীয়। সবার বড় বোন সেলিনা আক্তার। তারপর সোহেল রানা, রুবেল মিয়া (২৩), উজ্জ্বল মিয়া (২১) ও দেলোয়ার হোসেন (১৫)। বাবা নূরুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে প্যারালাইসিসের রোগী। তিনি পার্শ্ববর্তী বর্শিকূড়া হাওরে পত্তনি জমিতে জিরাত চাষ করেন। বাবাকে সহায়তা করতে সোহেল রানা ছুটে যেতেন হাওরের জিরাত ঘরে। সেখানে প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে ফলাতেন সোনালী ধান। ভাইয়েরা মিলে নদীতে মাছ ধরে বিক্রি করেছেন বাজারে। কৈশোরেই বসেছেন অটোরিকশার চালকের আসনে। ২০১০ সালে এসএসসি পাশের পর অর্থাভাবে নিজের পড়ালেখা বন্ধ করে দিলেও বন্ধ হতে দেননি ভাই-বোনদের লেখাপড়া।
ফলে সোহেল রানার এইচএসসি পাশের আগেই ছোট ভাই রুবেল ২০১৩ সালে এইচএসসি পাস করেন। অটোরিকশা-টমটম চালিয়ে আর প্রাইভেট টিউশনি করে সোহেলের এইচএসসি পাশের বছরে আরেক ছোট ভাই উজ্জ্বল এসএসসি পাস করেন। ২০১৬ সালে এইচএসসি পাস করা উজ্জ্বল করিমগঞ্জ সরকারি কলেজে বিবিএ তৃতীয় বর্ষে এখন পড়ছেন। ২০১৫ সালে ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্সে ফায়ারম্যান হিসেবে যোগ দেয়ার পর থেকেই সোহেলই ছিলেন পরিবারের আশার আলো। সোহেলের চাকরির সামান্য বেতনেই চলতো অসুস্থ বাবার চিকিৎসা। টেনে-টুনে চলতো ছোট তিন ভাইয়ের লেখাপড়ার খরচ।
চৌগাংগা শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত সোহেল রানার সহপাঠী ছিলেন পার্শ্ববর্তী মাওরা গ্রামের সোহেল। নামের সাথে মিল থাকায় দু’জনের মধ্যেই ছিল গভীর ঘনিষ্ঠতা। গাজীপুরের একটি সোয়েটার কোম্পানিতে কর্মরত সোহেল জানান, সোহেল রানা স্কুলজীবন থেকেই মানুষের সাথে সম্পর্ককে খুব মূল্য দিতেন। কখনো কারো সাথে খারাপ ব্যবহার করতেন না। কারো মনে আঘাত দিয়েও কিছু বলতেন না। স্কুলে টিফিনের সময়ে বন্ধুদের সাথে নিজের টাকায় টিফিন কিনে ভাগাভাগি করে খেতেন। সহপাঠী কারো বিপদে পড়ার খবরে সাথে সাথে ছুটে যেতেন।
কেরুয়ালা গ্রামের মধ্যে ফায়ার সার্ভিসে সোহেল রানাই ছিলেন প্রথম চাকুরে। ২০১৫ সালে সোহেল রানার ফায়ার সার্ভিসে যোগ দেয়ার পর সেবাধর্মী এই প্রতিষ্ঠানের প্রতি ঝোঁক তৈরি হয় অনেক তরুণের। ছুটিতে সোহেল রানা বাড়িতে এলে তাদের অনেকেই ছুটে যেতেন সোহেল রানার কাছে। গ্রামের মধ্যে আদর্শ হয়ে ওঠা সোহেল রানাকে দেখে অনুপ্রাণিত হতেন তারা। তাদেরই একজন মো. শরিফ মিয়া। ২০১৮ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর তিনি ফায়ারম্যান হিসেবে যোগ দেন ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সে।
বর্তমানে তিনি তাড়াইল ফায়ার স্টেশনে কর্মরত রয়েছেন। মো. শরিফ মিয়া বলেন, ভাইকে (সোহেল রানা) দেখেই ফায়ার সার্ভিসের চাকরিতে আমি অনুপ্রাণিত হই। ফায়ার সার্ভিসের চাকরির জন্য দরখাস্ত থেকে শুরু করে নিয়োগ এবং যোগদান পর্যন্ত সব কাজেই ভাই আমাকে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করেছেন। তার অকৃত্রিম সহযোগিতার জন্যই আমি ফায়ার সার্ভিসের চাকরিতে যোগ দিতে পেরেছি। কিন্তু আমাদের জীবনটাকে সাজিয়ে দিয়ে ভাই এমনভাবে চলে যাবেন, স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি। কেরুয়ালা গ্রামের বাড়িতে টিনের জরাজীর্ণ একটি চৌচালা ঘর সোহেল রানাদের। সেই ঘরটিকে দু’ভাগ করে এক অংশে চাচা রতন মিয়া ও তার পরিবার এবং অন্য অংশে সোহেল রানার বাবা নূরুল ইসলাম পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। রতন মিয়ার পাঁচ ছেলে সন্তানের মধ্যে সবার বড় মোশারফ হোসেন দশম শ্রেণির ছাত্র। মোশারফ বলেন, ভাই (সোহেল রানা) আমাদের কখনো চাচাতো ভাই মনে করতেন না। আপন ভাইয়ের মতোই তিনি আমাদের আদর-স্নেহ দিতেন। আপন ভাইদের জন্য নতুন জামাকাপড় কিনলে আমাদের জন্যও কিনতেন। সাত জন্মেও মানুষ এমন চাচাতো ভাই পায় কিনা জানি না!
সোহেল রানা স্থানীয় কেরুয়ালা জামে মসজিদে কোরআন শিক্ষা, চৌগাংগা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে চৌগাংগা শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১০ সালে এসএসসি পাস করেন। এরপর অর্থাভাবে বন্ধ হয়ে যায় তার লেখাপড়া। এই সময়ে অটোরিকশা ও টমটম চালিয়ে পরিবারকে সহায়তা করেছেন। এভাবে দুই বছর পাঠবিরতির পর করিমগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে ২০১৪ সালে এইচএসসি পাস করেন। এইচএসসি পাশের পর ২০১৫ সালের মাঝামাঝিতে ফায়ারম্যান হিসেবে যোগ দেন ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সে। ট্রেনিং শেষে মুন্সীগঞ্জ নদীঘাট ফায়ার সার্ভিস স্টেশনে প্রথম যোগদান করেন সোহেল রানা। সেখানে মাস চারেক দায়িত্ব পালন করার পর থেকে তিনি কুর্মিটোলা ফায়ার স্টেশনে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। সর্বশেষ গত ১৫ই মার্চ ছুটিতে বাড়ি এসেছিলেন সোহেল রানা। ছুটি শেষে ২৩শে মার্চ তিনি কর্মস্থলে যোগ দেন। কর্মস্থলে যোগ দেয়ার মাত্র ৫দিন পরেই ২৮শে মার্চ ঘটে বনানীর এফ আর টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা।
সোহেল রানার ছোট ভাই রুবেল মিয়া জানান, পরিবার থেকে বারবার তাগিদ দিয়েও তাকে বিয়ে করানো যায়নি।
রুবেল বলেন, ভাই-ই ছিলেন আমাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাঁর মৃত্যু আমাদের স্তব্ধ করে দিয়েছে।
সোহেল রানার বাবা নূরুল ইসলাম বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে জানান, গত ২৩শে মার্চ ছুটি শেষে চাকরিতে যাওয়ার সময়ে সোহেল বলেছিলো, ১৫ দিনের ছুটি নিয়ে এসে তোমাকে ধান কাটায় সাহায্য করবো। ধান তোলা শেষে বাবাকে চিকিৎসা করাবেন বলেও জানিয়েছেন। কিন্ত বনানীর আগুন সোহেলের সব স্বপ্ন-আশা কেড়ে নিয়েছে।
নূরুল ইসলাম বলেন, সোহেলই ছিল আমার আশার আলো। সেই আলো অহন নিইভ্যা গিয়ে আমরার জীবনটা অহন আন্ধাইর অইয়া গেছে।

সিঙ্গেল ডিজিট সুদে ঋণ দেয় মাত্র তিন ব্যাংক by গোলাম মওলা

বেসরকারি ব্যাংকের মালিকরা ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে (এক অঙ্কে) নামিয়ে আনার ঘোষণা দিয়ে বেশকিছু সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন। কিন্তু এই ব্যাংকগুলো এখনও ঋণের বিপরীতে উচ্চ সুদারোপ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, সরকারি-বেসরকারি মিলে মাত্র তিনটি ব্যাংক ঋণের বিপরীতে সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে এনেছে। এর মধ্যে রয়েছে একটি বেসরকারি ব্যাংক, একটি বিশেষায়িত খাতের ব্যাংক ও একটি বিদেশি খাতের ব্যাংক। যদিও ব্যাংক মালিকদের ঘোষণা অনুযায়ী, গত বছরের ১ জুলাই থেকে ঋণের সুদহার হবে ৯ শতাংশ। কিন্তু সেই ঘোষণা বাস্তবায়ন করেছে মাত্র তিনটি ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৫৭টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে ৫৪টিই এখন দুই অঙ্কে সুদ নিচ্ছে। এর মধ্যে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে দেওয়া ঋণের বিপরীতে ১৫ শতাংশেরও বেশি হারে সুদারোপ করছে কোনও কোনও ব্যাংক।
২০১৯ সালের মার্চ মাসের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বেসরকারি খাতের এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক তাদের বিতরণ করা ঋণে ৯ শতাংশ হারে সুদারোপ করেছে। সরকারি খাতের বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক  ও বিদেশি খাতের সিটি ব্যাংক এনএ ৯ শতাংশ হারে সুদ নিচ্ছে। বাকি সব ব্যাংক গ্রাহকদের ডাবল ডিজিট (দুই অঙ্কে) সুদে ঋণ দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, খাতভিত্তিক যেমন– রফতানি খাতে ৭ শতাংশ ও কৃষিতে ৯ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করছে ব্যাংকগুলো। কয়েকটি ব্যাংক সিঙ্গেল ডিজিট সুদে দীর্ঘমেয়াদি বৃহৎ ঋণও বিতরণ করছে। তবে অন্য খাতে যেমন– এসএমই ঋণ, ভোক্তা ঋণ, গৃহ ঋণ, ট্রেডিংসহ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ করছে ১৬ থেকে ১৮ শতাংশ হারে।
এ প্রসঙ্গে বেসরকারি মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এসএমই গ্রাহক গোলাম কিবরিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত ফেব্রুয়ারিতে সাড়ে ১৪ শতাংশ হারে সুদারোপ করেছে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক। ১ মার্চ থেকে ব্যাংকটি দেড় শতাংশ সুদহার বাড়িয়ে ১৬ শতাংশ হারে সুদারোপের বিষয়ে চিঠি দিয়েছে। এ বিষয়ে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়, ব্যাংকের বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এ বছরের ১ মার্চ থেকে ১৬ শতাংশ হারে সুদারোপ করা হয়েছে।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি মাসে ৩১টি ব্যাংক তাদের ঋণের গড় সুদহার বাড়িয়েছে। আগের মাসে (জানুয়ারি) ঋণের সুদহার বাড়িয়েছিল ২৮টি ব্যাংক। আর ডিসেম্বরে এ সংখ্যা ছিল ২৭টি। অর্থাৎ প্রতি মাসে ঋণের সুদহার বাড়ানো ব্যাংকের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত ফেব্রুয়ারিতে যেসব ব্যাংক ঋণের সুদহার বাড়িয়েছে তার মধ্যে বেসরকারি ব্যাংকই রয়েছে ২১টি। এছাড়া, বিদেশি ছয়টি, রাষ্ট্রায়ত্ত দু’টি ও বিশেষায়িত একটি ব্যাংকও রয়েছে এই তালিকায়। আর যেসব ব্যাংক ক্রেডিট কার্ড সেবা দিচ্ছে, তারা এই সেবার বিপরীতে দুই অঙ্কের সুদারোপ করছে।
ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, ক্রেডিট কার্ডে সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে কোনোভাবেই নামবে না।
ব্যাংকের এমডিরা বলছেন, ডাবল ডিজিট সুদে আমানত সংগ্রহ করে সিঙ্গেল ডিজিটে ঋণ বিতরণ করা মানেই ব্যাংককে লোকসানের দিকে নিয়ে যাওয়া। খেলাপি ঋণ বাড়ার কারণে ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামানো সম্ভব হচ্ছে না বলেও তারা জানান।
নাম প্রকাশ না করে নতুন প্রজন্মের একটি ব্যাংকের এমডি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের ১০ শতাংশ হারে আমানত নিতে হচ্ছে। এমনকি ১০ শতাংশের কমে সরকারি আমানতও পাচ্ছি না।  তাহলে কীভাবে সিঙ্গেল ডিজিটে ঋণ দেবো।’ তিনি উল্লেখ করেন, ‘কম সুদে সরকারি আমানত যদি পাওয়া যায়, তাহলেই কেবল কম সুদে ঋণ দেওয়া সম্ভব।’
অন্যদিকে, ব্যবসায়ী ও শিল্পোদোক্তারা বলছেন, ঋণের সুদহার বাড়ায় তাদের সমস্যা হচ্ছে। এতে শিল্প-কারখানা চালু রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। উচ্চ সুদের কারণে নতুন শিল্প বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ব্যাংকের মালিকরা বেশ কয়েকটি সুবিধা নিয়েছেন। এর মধ্যে ব্যাংক পরিচালকদের মেয়াদ ও সংখ্যা দুটোই বাড়িয়েছেন। ব্যাংকের করপোরেট কর আগের চেয়ে আড়াই শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিএবি’র চাহিদা অনুযায়ী সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখা, ঋণ আমানতের হার (এডিআর) সমন্বয়সীমার সময় বাড়ানো এবং রেপো রেট ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে ৬ শতাংশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকে রাখা ব্যাংকগুলোর নগদ জমা সংরক্ষণ (ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও বা সিআরআর) এক শতাংশ কমিয়ে সাড়ে পাঁচ শতাংশ করা এবং এডিআর সমন্বয়ের সময়সীমা কয়েকবার বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

প্রেমিকার টোপে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার জুয়েল

মোবাইল ফোনে প্রেমিকার শারীরিকভাবে মিলিত হওয়ার ডাক পেয়ে ঘর থেকে বের হয়ে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন নাসিরনগরের জুয়েল মিয়া (২৬)। এই হত্যারহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডে জড়িত জুয়েলের প্রেমিকা আসমা খাতুন (২৪) আর তার স্বামী হারুন মিয়া (৩০)কেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গতকাল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার কার্যালয়ে  এক সংবাদ সম্মেলনে এর বিস্তারিত জানিয়েছেন জেলার পুলিশ কর্মকর্তারা। হত্যাকাণ্ডে জড়িত আরো ৫ জনকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছে পুলিশ।
স্থানীয় চাপরতলা বউবাজারে চা খেতে যাচ্ছে বলে ১৪ই মার্চ রাত ৯ টার দিকে ঘর থেকে বের হয়ে যান জুয়েল। এর ৫ দিন পর ১৯শে মার্চ গ্রামের একটি কচুরীপানা ভর্তি ডোবা থেকে তার লাশ উদ্ধার হয়। গলা এবং পা শক্ত করে বাধা এবং অর্ধ পচা অবস্থায় পাওয়া যায় জুয়েলের লাশ।
জুয়েল নাসিরনগর উপজেলার চাপরতলা গ্রামের আনব আলীর ছেলে। তার চাচা আবদুল হক প্রকাশ ছুট্টু মিয়া এ হত্যা ঘটনায় ওইদিনই থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশ তদন্তে নেমে একই গ্রামের আলতাব আলীর ছেলে হারুন মিয়া (৩০) ও তার স্ত্রী আসমা খাতুন (২৪) এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত বলে শনাক্ত করে। এরপরই তাদেরকে গ্রেপ্তারে বিভিন্ন জায়গায় অভিযান শুরু করে। হারুন মিয়াকে ৮ই এপ্রিল ভোররাতে চট্টগ্রাম আনোয়ারা থানা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হারুন হত্যাকাণ্ডে স্ত্রীসহ তার নিজের এবং অপরাপর আরো ৫ জন জড়িত বলে জানায়। পুলিশ হারুনের দেয়া তথ্যমতে হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার নোয়াগাঁও এলাকায় তার এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে জুয়েল মিয়ার ব্যবহৃত মোবাইলটি উদ্ধার করে। তার তথ্যের ভিত্তিতে ৯ই এপ্রিল চাপরতলায় অভিযান চালিয়ে এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে স্ত্রী আসমা খাতুনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আসমাও পুলিশের কাছে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে।
জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আলমগীর হোসেন সংবাদ সম্মেলনে জানান- হারুন মিয়া ও তার পরিবারের সঙ্গে জুয়েল মিয়ার বেশ সুসম্পর্ক ছিল। হারুন চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বিভিন্ন কসমেটিক্‌স ফেরি করে বিক্রি করেন। আর বাড়িতে স্ত্রী আসমা একাই থাকতেন। একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে আসমার সঙ্গে ডেকোরেটর্স কর্মী জুয়েল মিয়ার পরিচয় হয়। সেই পরিচয়ের সূত্র ধরে তাঁদের দুইজনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। জুয়েল পরিচয়ের প্রথমে আসমাকে ভাবী বলে সম্বোধন করলেও পরবর্তীতে ধর্মবোন বানিয়ে সম্পর্ক গভীর করে। জুয়েল মিয়া ও আসমা খাতুনের এই সম্পর্ক শারীরিক সম্পকের্র দিকে গড়ায়।
বেশ কয়েকবার তারা শারীরিকভাবে মিলিত হয়। বিষয়টি হারুন টের পায়। এরপরই আসমা খাতুনের পিত্রালয়সহ বেশ কয়েকজনের নিকট বিচার দাবি করে সে। কিন্তু জুয়েল ও আসমা খাতুনের এই সম্পর্ক চলমান থাকলে হারুন অপরাপর আসামিদেরকে নিয়ে তাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করে। শারীরিকভাবে মিলিত হবে বলে হারুনের কথামতো আসমা ফোন দিয়ে গত ১৪ই মার্চ রাত ১০ টার দিকে জুয়েলকে তার বাড়িতে ডেকে নিয়ে আসে। হারুন পূর্বপরিকল্পনা মতো আসমা খাতুন ও অপরাপর আসামিদের সহযোগিতায় প্রথমে মাথায় আঘাত করে মাটিতে ফেলে দেয় জুয়েলকে। এরপর গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। এরপর মাথা, মুখমণ্ডল ও শরীরের বিভিন্নস্থানে ধারালো চাকু ও সুঁচালো লোহা দিয়ে ঘাই মেরে হত্যা নিশ্চিত করে। পরে পা বেঁধে চাপরতলা গ্রামের খন্দকার বাড়ি সংলগ্ন পশ্চিমের কচুরিপানা ভর্তি ডোবায় মরদেহ ফেলে দেয়।
এর আগে ১৪ই মার্চ জুয়েল তার স্ত্রী তাহমিনা বেগমের সঙ্গে রাতের খাবার শেষ করে চাপরতলা বউবাজারে চা খেতে যাচ্ছে বলে লুঙ্গি ও হাফ শার্ট পরে ঘর থেকে বের হয়ে যায় এবং দ্রুত বাসায় ফিরে আসবে বলে স্ত্রীকে আশ্বাস দেয়। ঘণ্টা খানিক পার হওয়ার পরও জুয়েল ফিরে না আসায় স্ত্রী তাহমিনা বেগম তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর থেকে জুয়েলের নম্বরে ফোন করে মোবাইলটি বন্ধ পান। তাহমিনা ও জুয়েলের মা রোহেনা বেগম বিষয়টি তার চাচাকে জানান। ওইরাত থেকে শুরু করে ১৭ই মার্চ পর্যন্ত চাপরতলা এবং আশেপাশের বিভিন্ন স্থানে ও আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে ঁেখাজ-খবর নিয়ে কোথাও জুয়েলের সন্ধান পাননি তারা। ১৯শে মার্চ সকাল সাড়ে ৮টায় চাপরতলা খন্দকার বাড়ি সংলগ্ন ডোবায় একটি লাশ ভেসে উঠেছে এই খবর পেয়ে জুয়েলের মা, স্ত্রী ও ভাইয়েরা সেখানে গিয়ে লাশের শরীরে থাকা লুঙ্গি এবং পরিহিত শার্ট দেখে লাশ জুয়েলের বলে শনাক্ত করেন।

নদী দূষণ প্র্রতিরোধে সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করে নদী দূষণ প্র্রতিরোধে এগিয়ে  আসতে সবার প্র্রতি আহবান জানিয়েছেন। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পানি দূষণের অন্যতম কারণ উল্লেখ করে প্র্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বব্যাপীই এটি একটি সমস্যা। এই সমস্যা নদীতেই কেবল নয়, সাগরেও দেখা দিচ্ছে। সমুদ্রগামী জাহাজের মাধ্যমে বর্জ্য ফেলা। আমি সকলকে বলবো যে, নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে। কারণ এটি একটি সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। কাজেই প্র্রতিটি শিল্প প্র্রতিষ্ঠান যারা গড়ে তুলবেন তারা যেন নদী দূষণ না করেন। সেজন্য তাদের আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নির্মাণ করতে হবে।
পানি শোধনাগার করতে হবে। সেই সঙ্গে রাস্তা-ঘাটে চলাচল করার সময়ও এদিক সেদিকে বর্জ্য না ফেলার প্র্রতি লক্ষ্য রাখতে সকলের প্র্রতি আহবান জানান তিনি। প্র্রধানমন্ত্রী গতকাল রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বিশ্ব পানি দিবস উপলক্ষে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্র্রধান অতিথির বক্তব্যে একথা বলেন। প্র্রধানমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সেটা আমরা জানি। আর সেজন্যই নিজস্ব অর্থ দিয়ে ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করে এই জলবায়ুর ক্ষতিকর প্র্রভাব মুক্ত করতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। এজন্য সব থেকে বেশি প্রয়োজন প্র্রচুর বৃক্ষরোপণ করা। তিনি বলেন, এজন্য আমি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে বলবো কেবল নদী ড্রেজিং করলেই হবে না, সেখানে বৃক্ষরোপণটাও করে দিতে হবে। প্র্রতিটি উপকূল অঞ্চলে সবুজ বেষ্টনির সৃষ্টি করতে হবে। প্র্রধানমন্ত্রী এ সময় নদী ড্রেজিংয়ের মাটি আবার নদীতেই না ফেলে পাড়ে জুট জিও টেক্সটাইলের সাহায্যে পকেট সিস্টেম করে দেয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেন,তাহলে সেখান থেকে অনেক ভূমিও উদ্ধার করা সম্ভব হবে যেখানে পরবর্তীতে কৃষি এবং শিল্পায়ন দুটি কাজই করা যাবে। নদী দূষণমুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্র্রধানমন্ত্রী বলেন, নদী সংরক্ষণের সঙ্গে যারা জড়িত তারা যার যার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবেন যেন ভবিষ্যত প্র্রজন্মের জন্য আমরা নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারি। শেখ হাসিনা এ সময় শহরাঞ্চলে  দৈনন্দিন কাজে পানির অপচয় রোধ করা প্র্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য বলেও উল্লেখ করেন। পানিসম্পদ প্র্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী একেএম এনামুল হক শামীম এবং একই মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান রমেশ চন্দ্র সেন বক্তৃতা করেন। মন্ত্রণালয়ের সচিব কবির বিন আনোয়ার অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন। এতে বাংলাদেশের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং বাংলাদেশ ডেল্টা প্লান-২১০০ এর উপর নির্মিত দুটি ভিডিও চিত্র প্র্রদর্শিত হয়। অনুষ্ঠানে পানি সম্পদ প্র্রতিমন্ত্রী এবং উপমন্ত্রী মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্র্রধানমন্ত্রীকে শত বর্ষের ব-দ্বীপ পরিকল্পনার একটি স্মারক উপহার দেন। মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাবৃন্দ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উর্দ্ধতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত এবং মিশন প্র্রতিনিধি ও প্র্রধান, উন্নয়ন সহযোগি সংস্থার প্র্রতিনিধি এবং আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে আমাদের দেশের পানি ব্যবস্থাপনা উজানের দেশের উপর নির্ভরশীল উল্লেখ করে প্র্রধানমন্ত্রী বলেন, বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করেই জাতির পিতা আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনার জন্য ১৯৭২ সালে ‘যৌথ নদী কমিশন-জেআরসি’ গঠন করেন। তিনি বলেন, তারই ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৬ সালে ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর ও বাস্তবায়ন করে। তিনি বলেন,আমরা ভারতের সঙ্গে অন্যান্য নদীর পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। ২০১১ সালে ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত হয়েছে ‘ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট অন কো-অপারেশন ফর ডেভেলপমেন্ট।’ বিভিন্ন কারণে এক সময়ের খর স্রোতা নদীগুলো মরে গেছে উল্লেখ করে প্র্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীর গতিপথ ও নাব্যতা পুনঃরুদ্ধারের উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকায় বাঁধ শক্তিশালীকরণ এবং প্লাবনভূমির সঙ্গে নদীর সংযোগ স্থাপন করা হচ্ছে। পরিবেশ ও প্র্রতিবেশ সুরক্ষায় নদীর তীর বরাবর বাফারজোন তৈরির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সরকার প্র্রধান বলেন, নদ-নদীর সুরক্ষা ও নৌপরিবহনকে নির্বিঘ্ন করার লক্ষ্যে স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সরকার ৭টি ড্রেজার সংগ্রহ করেছিলেন। এর দীর্ঘ সময় পর আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯-’১৩ মেয়াদকালে আরও ১৪টি ড্রেজার সংগ্রহ করে। বর্তমানে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ২২টি, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এবং সেনাবাহিনীর আওতায় ৪০টি ড্রেজার রয়েছে। আরও ৮০টি ড্রেজার সংগ্রহ প্র্রক্রিয়াধীন রয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, চলতি মেয়াদে ১০ হাজার কিলোমিটার নৌপথ পুনঃখনন করে নৌ চলাচলের উপযোগী করা হবে। প্র্রধানমন্ত্রী এ সময় বালু মহল করা নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্র্রশাসনকে সতর্ক করে বলেন,এজন্য আমি ডিসিদের নির্দেশ দিয়েছি এক জায়গায় বেশিদিন বালু মহাল করা যাবে না। বালু মহালগুলো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে করতে হবে যাতে করে আমাদের ঐ অঞ্চলটা নদী ভাঙ্গনের হাত থেকে মুক্তি পেতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী বন্যার দুর্ভোগের কথা স্মরণ করে বলেন, এর একটি ভাল দিকও রয়েছে যে, এটি প্রচুর পলি মাটি বহন করে আনে। কাজেই দেখা যায়-যে বছর বন্যা হয় তার পরের বছর ফসলও ভালো হয়। তিনি বলেন,প্রকৃতি যেমন নেয়, তেমনি ফিরিয়েও দেয়। এখন আমরা কতটুকু এই প্রকৃতির কাছ থেকে গ্রহণ করে কাজে লাগাতে পারি সেটাই হল বড় কথা। প্রধানমন্ত্রী ‘ব্লু ইকোনমির’ প্রসঙ্গে বলেন, ‘২০১৪ সালে প্রতিবেশি দেশের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি করে আমরা সর্বমোট ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র অঞ্চল লাভ করেছি। এই বিস্তীর্ণ সমুদ্র অঞ্চল ‘ব্লু ইকোনমির’ বিকাশে অপার সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। আমরা সমুদ্র সম্পদের সর্বোচ্চ ও টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করতে চাই। বিশ্বের বহু দেশে পানির অভাব থাকলেও নদী মাতৃক বাংলাদেশে পানির কোন অভাব না থাকায় এই প্রাকৃতিক সম্পদটিকে ভবিষ্যতে রপ্তানীযোগ্য পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায় কি না সে বিষয়েও তিনি এখন থেকে দৃষ্টি দেয়ার আহবান জানান। দেশের ৮০ ভাগ জনগণ সুপেয় পানির আওতায় এসেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন,বাংলাদেশে পানির কোন অভাব নেই। বৃষ্টির পানি আমাদের অনেক বেশি সেটা আমরা সংরক্ষণ করে আমাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের যেমন কাজে লাগাতে পারি তেমনি যে সব দেশে সুপেয় পানির অভাব রয়েছে ইনশাআল্লাহ সেসব দেশে আমরা ভবিষ্যতে পানি সরবরাহ করতে পারবো। এমনকি এই পানি বোতলজাত করে বিশ্বের অনেক জায়গায় বিক্রিও করতে পারি। আমাদের সেই সুযোগটাও রয়েছে। দেশবাসী ২০২০ সালে জাতির পিতার জন্ম শতাবার্ষিকী এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন করবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন,এই সময়টাকে মুজিব বর্ষ হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। তখন বাংলাদেশে আর কোন হতদরিদ্র থাকবে না। তিনি ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ করে গড়ে তুলতে তার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে ভবিষ্যত প্রজন্মের সুন্দর জীবন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের শতবর্ষ মেয়াদি ব-দ্বীপ পরিকল্পনা গ্রহণের কথাও উল্লেখ করেন।

বীরের মৃত্যু নেই by আশরাফুল ইসলাম

জন্ম তার কিশোরগঞ্জের প্রত্যন্ত হাওরের এক প্রান্তিক কৃষক পরিবারে। দারিদ্র্যের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে বেড়ে উঠতে হয়েছে। পরিবারের আটপৌরে জীবনে সচ্ছলতার আশা ছিল আকাশ ছোঁয়ার মতোই। বালক বয়সেই হাওরের জিরাত ঘরে থেকে প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে পত্তনি জমিতে ফলিয়েছেন ধান।
আধপেটা খেয়ে চলেছে দিনের পর দিন। অটোরিকশা-টমটম চালিয়ে পাঠবিরতি দিয়ে করেছেন লেখাপড়া। দেশসেবার আশা নিয়ে যোগ দিয়েছিলেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ফায়ারম্যান হিসেবে। কে জানতো এমন দুর্গম হাওর বালকই একদিন দেখাবেন অসীম সাহসিকতায় আত্মত্যাগের অসামান্য নজির।
উদ্ভাসিত হবেন বীরের মহিমায়। অন্যের জীবন বাঁচাতে গিয়ে অকাতরে বিলিয়ে দেবেন নিজের জীবন। বনানীর এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডে আটকা পড়াদের জীবন বাঁচাতে গিয়ে গুরুতর আহত সোহেল রানাকে আর বাঁচানো যায়নি। চিকিৎসকদের প্রাণান্ত চেষ্টা আর দেশবাসীর অফুরান প্রার্থনাকে ব্যর্থ করে দিয়ে তিনি চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তার মৃত্যুতে কাঁদছে পুরো দেশ। এই অগ্নিযোদ্ধার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এফ আর টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা ছুটে যান আগুন নেভানো ও আটকেপড়া ব্যক্তিদের উদ্ধার করতে। ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মীদলে ছিলেন কুর্মিটোলা ফায়ার স্টেশনের ফায়ারম্যান সোহেল রানাও। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ফায়ার সার্ভিসের উঁচু ল্যাডারে উঠে আগুন নেভানোর পাশাপাশি ভবনে আটকে পড়াদের উদ্ধারে সক্রিয় ছিলেন সোহেল রানা। অসীম সাহসিকতায় অগ্নিকুণ্ড থেকে বের করে এনে জীবন বাঁচিয়েছেন অনেকের। কিন্তু বিধি বাম! হঠাৎ ল্যাডারটি বন্ধ হয়ে গেলে বিপাকে পড়েন সোহেল। কেননা ল্যাডারের বাস্কেটে তখন ভবন থেকে উদ্ধার করা পাঁচ-ছয় জন রয়েছেন। ফলে বাস্কেটে জায়গা হচ্ছিলো। উদ্ধার করা ব্যক্তিদের ঝুঁকির কথা ভেবে সোহেল রানা ল্যাডারের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার চেষ্টা করেন। তখনই ঘটে চরম দুর্ঘটনাটি। ল্যাডারে পা আটকে গিয়ে ভেঙে কয়েক টুকরো হয়ে যায় সোহেলের ডান পায়ের হাড়। টান পড়ে কোমরে বাঁধা সেফটি হুকেও। মই থেকে পিছলে পড়ে বিপজ্জনকভাবে ঝুলছিলেন তিনি।
পেটে চাপ লেগে নাড়িভুঁড়িও থেঁতলে যায়। কিছুক্ষণ পরেই অজ্ঞান হয়ে যান সোহেল রানা। নিয়ে যাওয়া হয় সিএমএইচ-এ। সিএমএইচ-এর আইসিইউতে ভেন্টিলেশনে রেখে দেয়া হয় চিকিৎসা। সহকর্মীরা দিয়েছেন ব্যাগের পর ব্যাগ রক্ত। কিন্তু কিছুতেই আশার আলো দেখছিলেন না চিকিৎসকরা। এ রকম পরিস্থিতিতে গত ৪ঠা এপ্রিল সোহেল রানার চিকিৎসার খোঁজ নিতে গিয়ে যত দ্রুত সম্ভব উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পরদিনই ৫ই এপ্রিল সন্ধ্যা পৌনে ৭টায় একটি এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সোহেল রানাকে সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে পাঠানো হয়। কিন্তু সেখানকার চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে সোমবার বাংলাদেশ সময় রাত ২টা ১৭ মিনিটে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান ফায়ার ফাইটার সোহেল রানা।
সোমবার গভীর রাতে সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে সোহেল রানার যখন হৃদস্পন্দন থেমে যায়, তখনো ছেলের সুস্থতা নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় নিদ্রাহীন রাত পার করছিলেন মা হালিমা বেগম। সকাল ৭টার দিকে যখন একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন তিনি, তখনই আসে মায়ের অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে দেয়া খবরটা। সিঙ্গাপুর প্রবাসী মামাতো ভাই শফিকুল ইসলাম ফায়ারম্যান সোহেল রানার ছোটভাই রুবেল মিয়াকে মুঠোফোনে জানান সোহেল রানার মারা যাওয়ার চরম দুঃসংবাদটি। এরপর থেকেই পরিবারটিতে চলছে মাতম আর আহাজারি।
নিহত ফায়ারম্যান সোহেল রানা (২৪) কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা উপজেলার চৌগাংগা ইউনিয়নের কেরুয়ালা গ্রামের প্রান্তিক কৃষক নূরুল ইসলামের ছেলে। তার মায়ের নাম হালিমা খাতুন। চার ভাই ও এক বোনের মধ্যে দ্বিতীয় এবং ভাইদের মধ্যে সবার বড় সোহেল রানা। বড় বোন সেলিনা আক্তার বিবাহিত, ছোট তিন ভাইয়ের মধ্যে রুবেল মিয়া (২৩) উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক প্রথমবর্ষের ছাত্র, উজ্জ্বল মিয়া (২১) করিমগঞ্জ সরকারি কলেজে বিবিএ তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী এবং সবার ছোট দেলোয়ার হোসেন (১৫) চৌগাংগা শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণির ছাত্র।
সোমবার দুপুরে ফায়ারম্যান সোহেল রানার কেরুয়ালা গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, টিনের চৌচালা ঘরটির জরাজীর্ণ দশা। বাড়িভর্তি শোকাহত লোকজন। মা হালিমা খাতুন বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন। পাগলপারা সোহেলের মাকে সান্ত্বনা দেয়া ভাষা নেই আত্মীয়স্বজন ও পাড়া প্রতিবেশীর। ঘরের এক কোণে পড়ে থেকে বড় বোন সেলিনা ভাই হারানোর শোকে বিলাপ করছেন। কাঁদছেন আত্মীয়স্বজন আর পাড়াপড়শীরাও।
স্বজনেরা জানান, সোহেল রানার বাবা নূরুল ইসলাম প্যারালাইসিসের রোগী। তিনি পার্শ্ববর্তী বর্শিকূড়া হাওরে পত্তনি জমিতে জিরাত চাষ করেন। ছোট তিন ভাইয়ের মধ্যে ছোটভাই দেলোয়ার হোসেন পড়ালেখার পাশাপাশি অন্যের অটোরিকশা ভাড়ায় চালায়। ফায়ার সার্ভিসে সোহেলের চাকরি হওয়ায় আশার আলো দেখেছিল পরিবারটি। ফায়ারম্যান সোহেল রানার চাকরির সামান্য বেতনই ছিল পরিবারের মূল উপার্জন। সোহেল রানা নিজে উদ্যোগী হয়ে কয়েক বছর ধরে ছোটভাই বিবিএ শিক্ষার্থী উজ্জ্বল মিয়াকে ফায়ার সার্ভিসে চাকরির জন্য চেষ্টা করে আসছিলেন। কিন্তু তিন বারের চেষ্টায়ও লিখিত পরীক্ষার বাঁধা পেরোতে পারেনি উজ্জ্বল মিয়া। এরপরও মা হালিমা খাতুনের আশা ছিল, ছেলের চাকরি আয়ে জরাজীর্ণ ঘরটি ভেঙে নতুন ঘর উঠাবেন, ছেলেকে বিয়ে করাবেন। কিন্তু সকল আশা ভরসা ভেঙে চুরে শেষ হয়ে গেছে তার।
সোহেল রানা স্থানীয় কেরুয়ালা জামে মসজিদে কোরআন শিক্ষা, চৌগাংগা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে চৌগাংগা শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১০ সালে এসএসসি পাস করেন। এরপর অর্থাভাবে বন্ধ হয়ে যায় সোহেল রানার লেখাপড়া। এই সময়ে অটোরিকশা ও টমটম চালিয়ে পরিবারকে সহায়তা করেছেন। এভাবে দুইবছর পাঠবিরতির পর করিমগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে ২০১৪ সালে এইচএসসি পাস করেন। এইচএসসি পাসের পর ২০১৫ সালের মাঝামাঝিতে ফায়ারম্যান হিসেবে যোগ দেন ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্সে। ট্রেনিং শেষে মুন্সীগঞ্জে প্রথম যোগদান করেন সোহেল রানা। সেখানে মাস চারেক দায়িত্ব পালন করার পর থেকে তিনি কুর্মিটোলা ফায়ার স্টেশনে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
সোহেল রানার ছোটভাই রুবেল মিয়া জানান, সর্বশেষ গত ১৫ই মার্চ ছুটিতে বাড়ি এসেছিলেন সোহেল রানা। ছুটি শেষে ২৩শে মার্চ তিনি কর্মস্থলে যোগ দেন। কর্মস্থলে যোগ দেয়ার মাত্র ৫দিন পরেই ২৮শে মার্চ ঘটে বনানীর এফ আর টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের মর্মন্তুদ ঘটনা।
রুবেল বলেন, ভাই-ই ছিলেন আমাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাঁর মৃত্যু আমাদের স্তব্ধ করে দিয়েছে। সামনে আমাদের জীবন অন্ধকার। এখন একমাত্র সরকারই পারে আমাদের এই অকুলপাথার থেকে বাঁচাতে।
সিঙ্গাপুর প্রবাসী মামাতো ভাই শফিকুল ইসলামের বরাত দিয়ে ফায়ারম্যান সোহেল রানার ছোটভাই রুবেল মিয়া জানান, সোমবার বাংলাদেশ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় সিঙ্গাপুর থেকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সোহেল রানার মরদেহ দেশে পাঠানো হবে। রাত সাড়ে ১০টায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সটির অবতরণ করার কথা রয়েছে। মঙ্গলবার সোহেল রানার মরদেহ কেরুয়ালা গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসা হবে। স্থানীয় ঈদগাহ মাঠে জানাজা শেষে গ্রামের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।
বিকাল ৪টার দিকে রুবেলের সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল, তখন অন্যের কাঁধে ভর দিয়ে হাওর থেকে বাড়িতে ফিরেন সোহেল রানার বাবা নূরুল ইসলাম। তখনও তিনি জানতেন না, তার আদরের ধন সবাইকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেছে দূরে বহুদূরে। বাড়িভর্তি মানুষজন আর স্ত্রী-কন্যা-স্বজনদের কান্না আর আহাজারি দেখে তিনি নির্বাক হয়ে যান। বুঝতে পারেন, সোহেল রানার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর শেষ আশার প্রদীপটিও যে নিভে গেছে। তাঁর চোখের কোণ বেয়ে নীরবে ঝরে পড়ে অশ্রুবিন্দু।
সোহেল রানার বাল্যবন্ধু শহীদুল ইসলাম জানান, সোহেল খুব বন্ধুবৎসল ছিল। তার মাঝে কোনো হিংসা-বিদ্বেষ ছিল না। মানুষের সঙ্গেশার তার অসাধারণ একটি গুণ ছিলো। যে কারণে সে সহজেই সবার সঙ্গে মিশতে পারতো।

এক প্রতিবাদী যোদ্ধার বিদায় by জিয়া চৌধুরী

শেষবারের মতো ফিরলেন তার প্রিয় সোনাগাজীতে। যে পিচঢালা রাস্তা, গ্রামের শ্যামল পথে পায়ে হেঁটে মাদরাসা থেকে ফিরতেন বাড়িতে, সে পথেই ফিরলেন নিজ ভূমে। নিথর দেহে, লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়িতে করে। সাইরেন বাজিয়ে। লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন যেন বাজছিল প্রতিবাদের কণ্ঠ হয়ে। জীবন দিয়ে প্রতিবাদ করে নুসরাত জানান দিলেন মানুষ মরলেও প্রতিবাদের ভাষা মরে না।
অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার অন্যায় অবিচারের   প্রতিকার চেয়ে থানা-পুলিশে গিয়েছিলেন নুসরাত। মাদরাসা কর্তৃপক্ষকেও জানিয়েছিলেন।
তখন কেউ সাড়া দেয়নি। গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু সন্ত্রাসের আগুনে লাশ হওয়া নুসরাতের শেষ বিদায়ে সাড়া দিয়েছে সোনাগাজীর হাজার হাজার মানুষ। তারা যেন নুসরাতের প্রতিবাদেরই সঙ্গী। হাজারো মানুষ ভালবাসা আর অশ্রুজলে শেষ বিদায় জানিয়েছে প্রতিবাদী নুসরাতকে। নুসরাতের এই শেষ যাত্রায় সঙ্গী পুরো দেশ। পুরো দেশের মানুষ। সবার মুখে মুখে বর্বর এই হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ। বিচারের দাবি। প্রতিবাদী মানুষজন বলছেন, জীবন দিয়ে নুসরাত প্রতিবাদের যে দ্বীপ শিখা জ্বেলে গেলেন তা হাল সময়ে নির্যাতন নিপীড়নের প্রতিবাদের দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
গতকাল বিকালে সোনাগাজী সাবের মোহাম্মদ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাদির কবরের পাশে দাফন করা হয়েছে নুসরাত জাহান রাফিকে। নিজের মাদরাসা অধ্যক্ষের হাতে শ্লীলতাহানির শিকার হয়ে মামলা করার কারণে পরীক্ষা কেন্দ্রে অগ্নি সন্ত্রাসের শিকার হন নুসরাত জাহান। আগুনে পুড়িয়ে হত্যা চেষ্টার পর ৫ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে বুধবার রাতে না ফেরার দেশে চলে যান নুসরাত। গতকাল সকালে ময়নাতদন্ত শেষে দুপুরে লাশ নিয়ে সোনাগাজীর উদ্দেশ্যে রওনা দেন নুসরাতের স্বজনরা। এদিকে সকাল থেকে নুসরাতের গ্রামের বাড়িতে ভিড় করতে থাকেন স্বজন ও এলাকাবাসী। বিকালে লাশবাহী গাড়ি গ্রামে পৌঁছার পর এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। কান্নার রোল পড়ে বাড়িজুড়ে। অস্বচ্ছল পরিবারে বেড়ে ওঠা নুসরাত চেয়েছিলেন উচ্চ শিক্ষা শেষে পরিবারের হাল ধরতে। আলীম পরীক্ষা শেষে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং করতে যাওয়ার কথা ছিল। স্বপ্ন ছিল একদিন বাবা-মায়ের কষ্ট ঘোঁচাবেন, পরিবারের পাশে দাঁড়াবেন। কিন্তু এই স্বপ্নচারি তরুণীর কষ্টের জীবন কষ্টেই শেষ হলো। বিকাল পাঁচটা নাগাদ তার মরদেহ বহনকারী গাড়িটি চর চান্দিয়ায় গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়।
প্রিয় কন্যার লাশ নিয়ে ঘরে ফিরলেন বাবা একেএম মূসা মানিক। অশ্রুসজল নয়নে কন্যাহারা পিতার সাথে কথা বলবার ভাষা ছিল না কারো মুখে। নুসরাতের বাবাকে শুধু দু’হাতে জড়িয়ে ধরে বুকে টেনে নেন স্বজন, প্রতিবেশিরা। তাতেও শোক যদি কিছুটা কমে। নুসরাতের দুই ভাই রায়হান ও নোমান বোনের শোকে সংজ্ঞা হারাচ্ছিল বারবার। বোনহারা ভাইদের শোকে যেন পাথর চাপা পড়েছে পুরো বাড়িতে। যে পুলিশ, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধিরা বেঁচে থাকতে নুসরাতকে নিরাপত্তা দিতে পারেননি তারা ছিলেন সজাগ। চর চান্দিয়া ছোট হুজুরের বাড়িতে নুসরাতদের উঠোন উপচে পড়া মানুষের ঢল।
তবে, স্বজন ও প্রতিবেশি ছাড়া কাউকে নুসরাতের লাশ দেখতে দেয়া হয়নি। নুসরাতকে  শেষবারের মতো একনজর দেখতে আসা মানুষদের চাপ সামলাতে বেগ পেতে হয়েছে পুলিশ-প্রশাসনের। প্রাণহীন নুসরাতকে নিয়ে তাদের এমন তৎপরতায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেকে। এলাকাবাসী ও নুসরাতকে দেখতে আসা জনগণ প্রশ্ন তোলেন, প্রতিবাদ জানানোর পরও পুলিশ প্রশাসন কেন ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টো পরিকল্পিত আগুন লাগানোর ঘটনাকে আত্মহত্যা বলে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ করেন বিক্ষুব্ধ অনেকে। সে সময় উদ্যোগ নিলে হয়তো আজ আর নুসরাতের পৃথিবী ছেড়ে যেতে হতো না। তবে, এরপরও নুসরাত হত্যার ন্যায়বিচার চান এলাকাবাসী। বাদ আছর সোনাগাজী সাবের মোহাম্মদ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জানাজায় অংশ নেন হাজার হাজার মানুষ। তার আগে বক্তব্য রাখেন জেলা পুলিশ সুপার, সোনাগাজী ইউএনওসহ বেশ কয়েকজন জনপ্রতিনিধি।
নুসরাতের বাবা তার সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে মেয়ের পাশে থাকার জন্য সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। চিকিৎসায় সব ধরনের সহায়তা করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানান। নুসরাত হত্যার বিচারের জন্য শেষ অবধি লড়ে যাওয়ার কথা বলেন তার ভাই নোমান। সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের মাঝখানে নুসরাতের হত্যার বিচার নিয়ে কথা উঠলে হাত তুলে সোচ্চার আওয়াজ তোলেন উপস্থিত জনতা। বিকাল ৫টা ৫৫ মিনিটে মেয়ের জানাজা পড়ান বাবা একেএম মূসা মানিক। সন্ধ্যা ছয়টা ২০ মিনিট নাগাদ চর চান্দিয়া ভূঞা বাড়ি পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় সোনাপুর ইসলামিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদরাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে। গত শনিবার সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসায় আলিম পরীক্ষা দিতে গেলে কৌশলে ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। গত ২৭শে মার্চ অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মামলা করায় তার ওপর এ হামলা হয়েছে বলে পরিবারের অভিযোগ। গুরুতর অগ্নিদদ্ধ নুসরাতকে প্রথমে সোনাগাজী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরে ফেনী জেলা সদর হাসপাতালে নেয়া হয়।
অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে আনা হয়। তাকে বাঁচাতে ৫ দিন প্রাণান্ত চেষ্টা চালান চিকিৎসকরা। তার চিকিৎসার সার্বক্ষণিক খোঁজ রাখছিলেন প্রধানমন্ত্রী। সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে বুধবার রাত সাড়ে নয়টায় মারা যান নুসরাত।
মর্গে স্বজনদের কান্না
জরুরি বিভাগের মর্গ থেকে কেন্দ্রীয় মর্গে নুসরাতের লাশ আনা হয় সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে। লাল কাপড়ে ঢেকে নিয়ে যাওয়া হয় নুসরাতের মরদেহটি। এরপর সাড়ে ৯টার দিকে মর্গে আসেন মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান। এর পরপরই আসেন নুসরাতের এলাকা সোনাগাজীর চেয়ারম্যান জহির উদ্দিন মাহমুদ লিপটন। তিনি বলেন, নুসরাতের পরিবার সুরক্ষিত। তার পরিবারের ওপর নেই কোন চাপ। তিনি বলেন, সোনাগাজীতে যারা ঘাতক শিক্ষকের পক্ষে মিছিল করেছে বা মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছে তাদের সকলকে আইনের আওতায় আনা হবে।
সকাল ১০টা ৪২ মিনিটে নুসরাতের সুরতহাল প্রতিবেদন পেশ করেন শাহবাগ থানার এসআই শামসুর রহমান। ১১টার দিকে মর্গ চত্ত্বরে আসেন নুসরাতের বাবা একে এম মুসা মানিক। এসময় তার কান্নায় ভারি হয়ে উঠে পরিবেশ। তিনি বলেন, আমার মেয়ে হত্যার বিচার চাই। দেশের আইন অনুযায়ী হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ বিচার চাই। বিচার না হলে আমার মেয়ের আত্মা শান্তি পাবে না। এছাড়াও তিনি তার মেয়ের খোঁজ রাখার জন্য সকলের প্রতি ধন্যবাদ জানান। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহযোগিতার কথা বারবার উল্লেখ করেন। কথা বলার মাঝে তিনি ফের কাঁদতে শুরু করেন।
লাশকাটা ঘরের পাশের ঘরে বসে বোনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান। এদিকে বোনের শোকে বারবার মোর্চা যান ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হান। নোমান বলেন, আমাদের ঘরের দেয়ালগুলো নুসরাতের দেয়াল লিখনে ভরা। যখনই ইচ্ছে হতো বাসার হার্ডবোর্ডে কলম কিংবা পেন্সিল দিয়ে আপন মনে লিখতেন ‘মা আমার চোখের মনি’। নুসরাত মাকে প্রচন্ড ভালোবাসতো। কোনো কারণ ছাড়াই মাকে জাড়িয়ে ধরতেন। ছোট বাচ্চাদের মতো মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে থাকতেন। মেহেদী পরতে খুব ভালোবাসতো নুসরাত। ও অনেক সুন্দর করে হাতে মেহেদীর আল্পনা আঁকতো। আমাদের একমাত্র বোন হওয়াতে কোনো কিছু বলার আগেই আমরা তা নিয়ে আসতাম। ওর কোনো চাহিদা আমরা অপূর্ণ রাখিনি। নুসরাত দুধ’চা খেতে প্রচন্ড ভালোবাসতো।
মর্গে সমবেদনা জানাতে এসেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সাবেক প্রটোকল অফিসার, কেন্দ্রীয় নেতা আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম। তিনি বলেন, আমাদের সমাজে ধর্মীয় লেবাসের কারণে অনেকে নানা ধরণের অন্যায় করে থাকেন। আর এই অন্যায়গুলো করে তারা বারবার পার পেয়ে যান। যার ফলে ধীরে ধীরে বড় অন্যায়ের দিকে ধাবিত হয় তারা।
বেলা ১২ টার কিছু সময় আগে ৩ জন চিকিৎসকের নেতৃত্বে শুরু হয় ময়না তদন্তের কাজ। শেষ হয় ১২টা ১৪ মিনিটে। নুসরাতের ময়না তদন্তের জন্য গঠিত বোর্ডের প্রধান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চেয়ারম্যান ডা. সোহেল মাহমুদের সঙ্গে ছিলেন বোর্ডের দুই সদস্য প্রভাষক ডা. প্রদীপ বিশ্বাস ও প্রভাষক ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস। সাড়ে ১২টার দিকে নুসরাতের কফিন নিয়ে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স ফেনীর সোনাগাজীর উদ্দেশে রওনা দেয়।
নুসরাত হত্যাকান্ডে জড়িতরা বিন্দুমাত্র ছাড় পাবে না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যাকান্ডে জড়িত কেউ-ই বিন্দুমাত্র ছাড় পাবে না। গতকাল সচিবালয়ে এক বৈঠক শেষে এ কথা জানান তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পিবিআই তদন্ত করছে, দ্রুত চার্জশিট দেয়া হবে। ঘটনায় যথাযথ ব্যবস্থা না নেয়ায় এবং অপরাধে সহযোগিতার অভিযোগে প্রত্যাহার হওয়া সোনাগাজীর ওসিসহ যারাই জড়িত ও দোষী তাদের প্রত্যেককেই আইনের আওতায় আনা হবে। নুসরাত হত্যাকান্ডের ঘটনায় দোষী কেউ-ই বিন্দুমাত্র ছাড় পাবে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ ঘটনায় যারা অভিযুক্ত সিরাজ উদ্দৌলার মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন করছেন, হয়তো তারা না জেনে করছেন। তদন্তসাপেক্ষে বিস্তর জানা যাবে। এদিকে নুসরাত হত্যাকান্ডের ঘটনায় দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
নুসরাতের মামলা প্রয়োজনে ট্রাইবু্রনালে স্থানান্তর: আইনমন্ত্রী
আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেছেন, ফেনীর সোনাগাজীতে মাদরাসা অধ্যক্ষের নিপীড়নের পর আগুনে পুড়িয়ে হত্যা মামলাটি প্রয়োজনে দ্রুত বিচার ট্রাইবু্রনালে স্থানান্তর করা হবে। গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক একথা বলেন। তিনি বলেন, যদি প্রয়োজন হয়, তাহলে মামলাটি দ্রুত বিচারে যাবে। এ ব্যাপারে কোনো প্রশ্নের প্রয়োজন হবে না জানিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, আপনারা জানেন এ ব্যাপারে মামলা হয়েছে। মামলার তদন্ত শেষে একটি অভিযোগপত্র দিতে হবে। আমি আপনাদের বলছি এ রকম মামলা যখনই হবে এটাকে ফাস্ট ট্রাক করবে। আমি প্রসিকিউশনকে নির্দেশ দেব, যাতে এটাকে ফাস্ট ট্রাক করা হয়। কোনো প্রশ্নেরও প্রয়োজন হবে না। এর আগে ১০৮ ঘণ্টা আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে গত বুধবার রাত সাড়ে ৯টায় মারা যান ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি।
নুসরাতের অগ্নিসংযোগকারীদের শাস্তি দাবি করেছে আওয়াজ
ফেনীর সোনাগাজীতে মাদরাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির শরীরে অগ্নিসংযোগকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছে মানবাধিকার সংগঠন আওয়াজ। গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে আওয়াজের সভাপতি সেলিমা রহমান ও সাধারণ সম্পাদক ড. শাহিদা রফিক এ দাবি জানান। বিবৃতিতে তারা বলেন, মাদরাসা ছাত্রী নুসরাতকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। নুসরাতের এই মৃত্যু কোনও সভ্য সমাজে মেনে নেয়া যায় না। আর কোন নুসরাতকে যেন এমন পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে না হয় সেজন্য আমরা হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি। বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, নুসরাত পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও প্রতিবাদী কন্ঠস্বর হিসাবে বিজয়ীনির বেশে দৃপ্ত মহিমায় বিরাজ করছে আমাদের মাঝে, সারা বাংলাদেশে, সারা বিশ্বে।
নুসরাত নারীর অপমানকে প্রত্যাখান করে আমাদের চেতনাবোধকে উন্মোচিত করেছে, মানবতার জাগরন ঘটিয়েছে। তার এ প্রতিবাদীকন্ঠ এবং বলিষ্ঠ  প্রতিবাদ এক উদাহরন হয়ে থাকবে। তারা নুসরাতের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ ও তার রুহের মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। বিবৃতিতে স্বাক্ষরদাতাদের মধ্যে রয়েছেন- বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সংগঠনের সভাপতি সেলিমা রহমান, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ড. শাহিদা রফিক, আওয়াজের সহ-সভাপতি প্রফেসর ড. তাজমেরী এস ইসলাম, সেলিনা রউফ, ফাতেমা সালাম, লায়লা বেগম, ফরিদা ইয়াসমিন, অধ্যক্ষ রফিকা আফরোজ, ওয়াহিদা আক্তার মুক্তা ও নাফিয়া লায়লা প্রমুখ।