Wednesday, April 20, 2022

ভারতের রাজনীতি: কাশ্মীর শান্ত, তবে শান্তি ফেরেনি by শুভজিৎ বাগচী

আড়াই বছর পর আবার পর্যটক-বিস্ফোরণ দেখল ভারতশাসিত কাশ্মীর। রাজধানী শ্রীনগরে সাধারণত যে হোটেলে আমি উঠি, সেখানে আগামী কয়েক মাসে কোনো কক্ষ পাওয়া যাবে না বলে জানাল হোটেল কর্তৃপক্ষ। কলকাতা ও বাংলাদেশ থেকে অনেকেই বেড়াতে গিয়েছেন, এদের মধ্যে যাঁরা থাকার জায়গা ঠিক করে যাননি, তাঁদের হোটেলে কক্ষ পেতে বেশ অসুবিধা হয়েছে।

গত মার্চের মাঝামাঝি শ্রীনগর ও জম্মুতে গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেল। কাশ্মীরে পর্যটন সংস্থাগুলোর সমিতি টিএএকের সভাপতি ফারুখ কুথো বলেন, কাশ্মীরে হোটেলের ৯০-৯৫ শতাংশ কক্ষে পর্যটক রয়েছেন। তাঁর কথায়, বাম্পার ব্যবসা হচ্ছে। দৈনিক ৩০-৪০ হাজার মানুষ আসছেন। পর্যটকদের মধ্যে বেশির ভাগ আসছেন মহারাষ্ট্র, গুজরাট ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে।

২০১৯ সালের ৫ আগস্ট নরেন্দ্র মোদির সরকার ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল করে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা রদ করেছিল। এর মধ্য দিয়ে দুই টুকরা হয় জম্মু-কাশ্মীর। লাদাখকে বের করে তৈরি করা হয় নতুন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল, যার কোনো বিধানসভা থাকবে না। জম্মু-কাশ্মীরকেও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ঘোষণা করা হয়। তবে তার বিধানসভা থাকবে। এর কিছুদিন পর শুরু হয় নির্বাচনী কেন্দ্রের পুনর্বিন্যাসের (ডিলিমিটেশন) প্রক্রিয়া।

জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহারের সময়ও এ রকম ভিড় ছিল উপত্যকায়। পাইন গ্রোভ নামে একটি বড়সড় হোটেলের মালিক আবদুল লতিফ বলেন, হয়তো এর চেয়ে কিছু বেশিই ছিল। তারপরে দুই বছর ধরে চলল কখনো কারফিউ, কখনো করোনা। পর্যটন কার্যত শেষ হয়ে গিয়েছিল।

কিসের আশঙ্কায় মানুষ?

পর্যটকেরা ফিরে আসায় খুশি কাশ্মীরের হোটেল মালিকেরা। খুশি পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত সব ধরনের ব্যবসায়ী ও দোকানিরাও। কিন্তু আশঙ্কাও কম নয়।

শ্রীনগরের দক্ষিণে রিগাল চকে খান নিউজ এজেন্সি নামে পত্রিকা বিক্রির একটি বড় দোকান রয়েছে। শ্রীনগরে থাকলে, স্থানীয় পত্র-পত্রিকা উল্টে পাল্টে দেখতে এই দোকানে মাঝেমধ্যে যাই। দোকানের মালিক হিলাল বাটকে কাশ্মীরের একজন অভিজ্ঞ পর্যবেক্ষক বলা যায়। তাঁর সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে, কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহারের পরে। তখন শ্রীনগরে কারফিউ ছিল, অলিগলিতে ছিল আধা সামরিক বাহিনীর টহল। হিলাল সে সময় বলেছিলেন, এভাবে জবরদস্তি করে কাশ্মীরের ওপর কিছু চাপিয়ে দেওয়া যায় না। মাটির নিচের গরম পানির মতো মানুষ ফুঁসছে। যেকোনো মুহূর্তে ফেটে বেরিয়ে আসবে।

কাশ্মীরের অলিগলিতে এখনো আধা সামরিক বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। যদিও মানুষের ক্ষোভের তেমন বহিঃপ্রকাশ নেই। খোলা চোখে কাশ্মীরের অবস্থা এখন অনেকটাই স্বাভাবিক, পর্যটকেরা আসছেন, দোকান খুলছে, হোটেল-রেস্তোরাঁয় জায়গা পাওয়াও মুশকিল। তাহলে কি কাশ্মীরের মানুষের মধ্যে আর কোনো ক্ষোভ নেই? এমন প্রশ্নে হিলাল বললেন, ‘এই মুহূর্তে মানুষের বিশেষ কিছু করার নেই। তাদের মুখ বুজে থাকতে হবে। মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে, সেই ক্ষোভ চেপে তারা সরকারের নির্দেশ পালন করে চলেছে। এভাবে কত দিন চলে, সেটাই দেখার বিষয়।’

কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে?

হিলালের কথা কতটা সত্য, তা বুঝতে আরও কিছু মানুষের সঙ্গে কথা বললাম। তাঁদের একজন জি এন শাহীন। তিনি কাশ্মীর হাইকোর্টের বার অ্যাসোসিয়েশনের সাতবারের নির্বাচিত সচিব।

গোড়াতেই শাহীন বললেন, তিনি আর সচিব নেই। কারণ, দুই বছর ধরে করোনার কারণ দেখিয়ে বার অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচন করতে দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, নির্বাচনের দিন সকালে কয়েক শ নিরাপত্তারক্ষী এখানে মোতায়েন করা হয়। বলা হয়, এবার নির্বাচন হবে না। এর থেকে বোঝা যাচ্ছে ঠিক কতটা স্বাধীনভাবে কাশ্মীরে আইনজীবীরা কাজ করছেন।

একটি মামলার শুনানির দিন ছিল শাহীনের। তিনি যাওয়ার আগে একটি মামলায় পুলিশ করা একটি অভিযোগপত্র দিয়ে গেলেন। অভিযোগপত্রে আসা অভিযুক্তের নাম ব্যবহার না করার অনুরোধ করে শাহীন বললেন, ‘কী ধরনের ভুয়া অভিযোগের ভিত্তিতে মানুষকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, তা অভিযোগপত্র পড়লেই বুঝবেন। বিশেষ সন্ত্রাসবাদ দমন আইনেও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। এ আইনে জামিন পেতে বহু বছর লাগে।’

অভিযোগপত্রে কাশ্মীরের পুলওয়ামা অঞ্চলের ২৭ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার সদস্য বলে চিহ্নিত করে নানা অভিযোগ আনা হয়েছে। কিন্তু সবই ‘বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা’ বা ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া সূত্রের’ খবরের ওপর ভিত্তি করে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, পুলিশ ‘অনেক কষ্ট করে, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে অভিযুক্তের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদী দলের যোগাযোগ চিহ্নিত করতে পেরেছে’। কিন্তু অভিযুক্ত ব্যক্তি কোথায়, কীভাবে অপরাধ করেছেন, যে কারণে তাঁকে বিশেষ সন্ত্রাসবাদ দমন আইনে (পাবলিক সেফটি অ্যাক্ট) গ্রেপ্তার করা হলো, তা অভিযোগপত্রে বলা হয়নি।

শুনানি শেষে আধঘণ্টা পর শাহীন ফিরে এসে বলেন, এটাই কাশ্মীরের বৈশিষ্ট্য। তিনি বলেন, এখানে কার্যত যাঁকে যখন খুশি গ্রেপ্তার করা যায়। সাধারণ আইনের পাশাপাশি সরাসরি বিশেষ সন্ত্রাসবাদ দমন আইন—আনলফুল অ্যাকটিভিটিস (প্রিভেনশন) অ্যাক্ট এবং পাবলিক সেফটি অ্যাক্ট ব্যবহার করে গ্রেপ্তার করা হয়। এর ফলে অনির্দিষ্টকালের জন্য এরা জেলে থাকেন। যেকোনো সময় আপনি কাশ্মীরে ১০ থেকে ১২ হাজার লোক পাবেন, যাঁরা একাধিক জেলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছেন। মামলার বিচার শুরু হতে সময় লাগছে, জামিন পাচ্ছেন না, মামলার শুনানির তারিখ ধার্য হচ্ছে না—এমন নানা কারণে বছরের পর বছর কাশ্মীরের কিছু মানুষ জেলের ভেতর দিন কাটাচ্ছেন। একটা অংশ বেরোচ্ছে, তো আর একটা অংশ ঢুকছে। নানা বিষয় নিয়ে সরকারের কাজের প্রতিবাদ করা হলো এদের প্রধান ‘অপরাধ’।

শাহীন আরও জানান, অনেকে এমনও আছেন, যারা কিছুই করেননি, কিন্তু গ্রেপ্তার হয়েছেন। তিনি একটা উদাহরণও দিলেন। কাশ্মীরের বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী খুরম পারভেজ কিছু মামলা সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করছিলেন। সরকারের কাছে এমন কাজ ‘অপরাধ’। সে কারণে তাঁকে সন্ত্রাসবাদ দমন আইনে গ্রেপ্তার করে দিল্লি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সবাই যেন ‘অধিকৃত’ অঞ্চলের

কাশ্মীরে নাগরিক সমাজের অবস্থা করুণ বললেও কম বলা হয়। কোথাও কোনো কিছু নিয়ে মুখ খোলার পরিবেশ নেই। তিনি আইনজীবীই হোন কি ব্যবসায়ী, কি শিক্ষক—সবার প্রায় একই অবস্থা। সরকারবিরোধী কথা বলার অধিকার নেই, দৈনন্দিন সমস্যার কথা তুলে ধরার অধিকারও খুব একটা নেই। এর জন্য সাংবাদিকেরা সবচেয়ে বেশি হয়রানি, নির্যাতন ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। পরিস্থিতির এতটাই অবনতি হয়েছে যে এখন কাশ্মীর নিয়ে নিজেদের নাম প্রকাশ করে কথা বলতে নারাজ জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সম্পাদকেরা।

সম্প্রতি বিশেষ সন্ত্রাসবাদ দমন আইনে গ্রেপ্তার হয়েছেন ফাহাদ শাহ। বয়সে তরুণ এই সাংবাদিক আন্তর্জাতিক স্তরে পরিচিত। তাঁর পত্রিকা ‘কাশ্মীরয়ালা’ কার্যত বন্ধ। পত্রিকাটির একজন সাংবাদিক বলেন, এত খারাপ অবস্থার মধ্যে কাশ্মীর কখনো পড়েনি। ফিলিস্তিনিদের মতো এখানেও সবাই যেন অধিকৃত অঞ্চলের বাসিন্দা।

এরপরও কাশ্মীরে এখনো অন্তত ২০টি পত্র-পত্রিকা নিয়মিত বেরোচ্ছে। তবে দুই সপ্তাহ ধরে সংবাদপত্রে সরকারবিরোধী একটি লেখাও খুঁজে পেলাম না। প্রায় প্রতিদিনই সংবাদপত্রের শিরোনাম হচ্ছে, কাশ্মীরে বাইরে থেকে কত হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ আসছে বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলটির উন্নতির জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মনোজ সিনহা কী কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন, তা নিয়ে।

মোটা দাগে তিন ধরনের সাংবাদিক কাশ্মীরে এই মুহূর্তে রয়েছেন বলে স্থানীয় সাংবাদিকেরা জানান। এক. যাঁরা পুরোপুরি সরকারের হয়ে লেখেন। দুই. যাঁরা অল্পবয়স্ক এবং কিছুটা ঝুঁকি নিয়ে বিদেশের বা কাশ্মীরের বাইরের পত্রিকায় ফ্রিল্যান্সিং করেন। এদের অধিকাংশই কাশ্মীর ছেড়ে দিল্লিতে গিয়ে থাকতে শুরু করেছেন। তিন. যাঁরা এখনো কাশ্মীরে থেকে লেখার চেষ্টা করছেন। এই শ্রেণি খুবই ক্ষুদ্র এবং এদের হয় থানায়, না হলে আদালতে নিয়মিত হাজিরা দিতে হচ্ছে। এদের অনেকেরই ল্যাপটপ এবং ফোন পুলিশের হেফাজতে রয়েছে বলে কয়েকজন সাংবাদিক জানান। এদের বাইরে চাপের মুখে যাঁরা আর লিখতে চান না, তাঁদের অনেকেই পেশা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।

কাশ্মীরের বর্তমান অবস্থা নিয়ে কথা হয় বহুজাতিক একটি ওষুধ কোম্পানির বিপণন বিভাগের সাবেক প্রধান আবদুল হামিদের সঙ্গে। শ্রীনগর শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত লাল চকে ঘুরতে ঘুরতে বললেন, এটার একটা ভালো দিক আছে। এই পরাধীনতার মধ্যে থাকতে থাকতে, মানুষের রুখে দাঁড়ানোর খিদেটা আরও বাড়ছে। এই অঘোষিত সামরিক ব্যবস্থা সম্পর্কে তাদের ভয় ক্রমেই কমে যাচ্ছে। এ কারণে আড়াই বছর ধরে কাশ্মীরের তেমন বড় ধরনের কোনো সংঘাত না হওয়া সত্ত্বেও নিরাপত্তা বাহিনীর আয়তন কমাতে ভয় পাচ্ছে দিল্লির সরকার। লাল চকের বিভিন্ন অংশে মোতায়েন করা নিরাপত্তা বাহিনীর দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘মোটামুটি এক বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে রয়েছেন অন্তত ৫০ হাজার নিরাপত্তারক্ষী। কিন্তু আমরা ধরে নিচ্ছি, কাশ্মীর স্বাভাবিক। প্রশ্ন হলো, কাশ্মীর স্বাভাবিক হলে শুধু লাল চকে এই ফৌজ ভারত সরকারকে রাখতে হচ্ছে কেন?’

কেন ভারত নিজেকে কাশ্মীরে ‘সফল’ মনে করছে

বস্তুত কাশ্মীরের অবস্থা যে স্বাভাবিক নয়, তা স্বীকার করে নিচ্ছেন নিরাপত্তা বাহিনীর সর্বোচ্চ স্তরের কর্মকর্তারাও। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, কাশ্মীরে অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ড কমেছে, রাস্তায় বেরিয়ে প্রতিবাদের ঝোঁকও নেই। তার মানে এই নয় যে যাবতীয় সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। যেকোনো সময়ই জঙ্গিবাদ বাড়তে পারে। তবে বিষয়টি অনেকটাই নির্ভর করছে পাকিস্তানের ভূমিকার ওপর।

ভারতের কাশ্মীরের নিরাপত্তা দেখভালের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বক্তব্য, যেসব মাপকাঠির ওপর ভিত্তি করে কাশ্মীরে বেসামরিক স্তরে আন্দোলন বা সশস্ত্র জঙ্গিবাদ বাড়ে বা কমে, তার অনেক কিছুই ভারত সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যেমন আন্তর্জাতিক স্তরে পাকিস্তানের ওপর জঙ্গিবাদ দমনে চাপ বাড়ায় তারা কাশ্মীরে জঙ্গি পাঠাতে পারছে না। যদিও পাকিস্তান বরাবরই এমন অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, গত কয়েক বছরে কাশ্মীরে ৭০-৮০ জনের বেশি বিদেশি জঙ্গি ছিল না। এদের মধ্যে অন্তত ৬০ জন পাকিস্তানের নাগরিক এবং অন্তত ১০ জন পেশোয়ারের পাঠান সম্প্রদায়ের। এ ছাড়া ৩০-৪০ জন স্থানীয় জঙ্গি সক্রিয় ছিল এবং এখনো আছে।

অতীতে বিভিন্ন ধরনের সশস্ত্র এবং বেসামরিক বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের মধ্যে একটা যোগসূত্র হিসেবে কাজ করত ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক সংগঠন জামায়াতে ইসলামি, কাশ্মীর। ২০১৯ সালে কাশ্মীরে জামায়াতে ইসলামি নিষিদ্ধ হয়েছে।

ভবিষ্যতে আল–কায়েদা ইন ইন্ডিয়ান সাব–কনটিনেন্ট (একিউ-আইএস) কাশ্মীরসহ গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় জামায়াতের জায়গা নিতে পারে কি না, এই প্রশ্নের উত্তরে ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

জঙ্গি হামলায় এখনো সাধারণ মানুষ ও নিরাপত্তাকর্মী নিহত হচ্ছে। যে কারণে অনেক আড়ম্বর করে ‘কাশ্মীর ফাইলস’ সিনেমা বানানো হলেও, কাশ্মীরি পণ্ডিতেরা এখনো সেখানে ফেরেননি। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির পরিবর্তনের কারণে কাশ্মীরের অবস্থা রাতারাতি পাল্টে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন কাশ্মীর নীতি-নির্ধারকেরা। অর্থাৎ কাশ্মীর সমস্যা মিটে গেলেও মেটেনি।

এই অবস্থায় ‘ডিলিমিটেশনের’ কাজ শুরু হয়েছে। অর্থাৎ কোন বিধানসভা অঞ্চল হিন্দুপ্রধান জম্মুর সঙ্গে থাকবে এবং কোন কেন্দ্র মুসলিমপ্রধান কাশ্মীরের সঙ্গে জুড়বে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর বিতর্ক। এই বিতর্কের শেষে জম্মু–কাশ্মীরে বিধানসভা নির্বাচন হওয়ার কথা এই বছরের শেষে। কিন্তু ‘ডিলিমিটেশন’ নিয়ে বিতর্ক যদি আরও বাড়ে (কারণ, ভবিষ্যতে মুখ্যমন্ত্রী একজন হিন্দু হবেন না মুসলিম এই প্রশ্ন জড়িত), তবে শান্ত জন্মু–কাশ্মীর অশান্ত হয়ে উঠতে যে বেশিক্ষণ লাগবে না, তা স্বীকার করছে সব পক্ষই। ফলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা শিথিল করার প্রশ্নও আপাতত উঠছে না।

কাশ্মীরের ডাল লেকের পাড়ে টহল দিচ্ছেন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা
কাশ্মীরের ডাল লেকের পাড়ে টহল দিচ্ছেন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। ছবি: এএফপি

গণহত্যার শিকার রোহিঙ্গা সংখ্যালঘু সম্প্রদায় by ফ্রান্সিস বুলাতসিঙ্ঘালা

রোহিঙ্গা মুসলিমদেরকে (তারা মিয়ানমারের মোট জনসংখ্যার চার শতাংশ) বিশ্বের সবচেয়ে বন্ধুহীন হিসেবে অভিহিত করা হয়, বিশ্বজুড়ে তাদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা বর্তমান সময়ে তথাকথিত ‘মানবাধিকার’ কতটা তামাশার বস্তুতে পরিণত হয়েছে, তাই দেখাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সরকারের ভয়াবহ সহিংসতা আমাদের সামনে আরো দেখাচ্ছে যে যারা একসময় নির্যাতিত হয়েছিল, তারা অবশেষে মানবাধিকারের প্রবক্তা হবে, এমনটা নিশ্চিত নয়। এ ব্যাপারে উদাহরণ হলেন স্টেট কাউন্সিলর (প্রধানমন্ত্রীর সমতুল্য) আং সান সু চি। একসময় তিনি মিয়ানমারের সামরিক জান্তার হাতে নির্যাতিত হয়েছিলেন। সামরিক স্বৈরাচারের হাতে নির্যাতিত সু চি ১৯৯১ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন।
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত নির্যাতন নিয়ে অনেক কিছু লেখা হয়েছে। এসব লোক যে বর্বরতার শিকার হয়েছে, তারা যে অসহায় অবস্থায় থাকতে বাধ্য হয়েছে, তা বিশ্বের সচেতনতায় এখনো প্রবেশ করেনি। এ দিক থেকে শ্রীলঙ্কার প্রবীণ সাংবাদিক লতিফ ফারুক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। অর্ধ শতাব্দির পেশাজীবনে তিনি মানবতার সেবায় নিয়োজিত হয়েছেন। আর তা করেছেন সাংবাদিক এবং ১৯৭০-এর দশক থেকে মধ্যপ্রাচ্যে সম্পাদক ও গ্রন্থকার হিসেবে। তার বইগুলো তার জন্মস্থান শ্রীলঙ্কায় (তিনি বর্তমানে এখানেই বাস করেন) মুসলমানদের জন্য অবশ্য পাঠ্য। তার সর্বশেষ গ্রন্থ হলো ‘দি জেনোসাইড অব রোহিঙ্গা মাইনোরিটিস’। এতে রোহিঙ্গা জনসাধারণ নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর পাশাপাশি বিশ্লেষণও স্থান পেয়েছে।
ফারুক প্রায় ৩০ বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যের সংবাদ সংস্থাগুলোর সাথে জড়িত ছিলেন। ১৯৭৬ সালে তিনি নতুন করে ইংরেজি ভাষার গালফ নিউজে কাজ শুরু করেন, পরে সাত বছর খালিজ টাইমসে কাজ করেন। ১৯৮৭ সালে আবার গালফ নিউজে যোগ দেন। ২০০৩ সালে দেশে ফিরে তিনি ৫টি বই লিখেছেন: ওয়ার অন টেরোরিজম – দি আনটোল্ড ট্রুথস, নোবডিস পিপলস; দি ফরগোটেন প্লাইট অব শ্রীলঙ্কান মুসলিমস, আমেরিকাস নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার; এক্সপোর্টিং ওয়ার্স। আর তার সর্বশেষ গ্রন্থ হলো দি জেনোসাইড অব রোহিঙ্গা মাইনোরিটিস। তার গ্রন্থটি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ডা. মাহাথির মোহাম্মদ, নোবেল পুরস্কারজয়ী হ্যারল্ড পিন্টার, নোবেলজয়ী তাওক্কুল কারমান, আমেরিকান সাংবাদিক পল ক্রাইগ রবার্টসের প্রশংসা পেয়েছে।
ফারুক বিশেষ করে বিশ্বজুড়ে মুসলিমসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর দিকে নজর দেন তার গ্রন্থগুলোতে। অবহেলার শিকার কিংবা অযৌক্তিক যেসব অভিযোগ তাদের ওপর আনা হয়, সেগুলো অপনোদন করেন। পরাশক্তিগুলোর সম্পর্ক মুসলিমদের ওপর কী প্রভাব ফেলছে, তার ওপরও আলোকপাত করেন তিনি। রোহিঙ্গাদের নিয়ে তার বই লেখার কারণ হলো তিনি রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারে যে নৃশংসতা চালানো হয়েছে, সেব্যাপারে বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছেন। এর মধ্যেই তার একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ হলো, তিনি নিজের খরচে বই প্রকাশ করে বিনামূল্যে বিতরণ করে চলেছেন।
দি জেনোসাইড অব রোহিঙ্গা মাইনোরিটিস গ্রন্থে তিনি ১৯৪৮ সাল থেকে মিয়ানমারে মুসলিমরা যে খারাপ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সে দিকে আলোকপাত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ১৯৭৫ সাল থেকে রোহিঙ্গাদের ওপর ১৩বার সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে। তারা অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ আর ভূমি দখলের শিকার হয়েছে। তিনি আরো জানিয়েছেন, মিয়ানমারে মুসলিমরা বাস করছে সেই প্রথম খ্রিস্টাব্দ থেকে।
রোহিঙ্গাদের ইতিহাস ও পরিক্রমা নিয়ে প্রায় দেড় শ প্রতিবেদন সমৃদ্ধ গ্রন্থটি মিয়ানমার ও বাংলাদেশে বসবাসরত রাষ্ট্রহীন এই জনগোষ্ঠীটির দুর্দশার মূল কারণ অনুসন্ধান করেছে। এতে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের ওপর বর্তমানে যে জাতিগত শুদ্ধি অভিযান চালানো হচ্ছে, তার পেছনে রয়েছে ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন। এতে রোহিঙ্গাদের অবৈধ অভিবাসী হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এরা এসেছে ব্রিটিশ উপনিবেশ আমলে, তারা মূলত বাঙালি। বইটিতে রোহিঙ্গাদের আবাসিক বিদেশী হিসেবে চিহ্নিত করে তাদেরকে দুই সন্তানের বেশি গ্রহণ করতে না দেয়া, সরকারি অনুমোদন ছাড়া অন্য কোথাও যেতে না দেয়ার মতো ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে।
মিয়ানমারের বৌদ্ধ ও রোহিঙ্গা মুসলিমদের মধ্যকার অতি সাম্প্রতিক প্রক্সি যুদ্ধে ২০১৬ ও ২০১৭ সালে ১০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গার নিহত হওয়ার কথা তুলে ধরা হয়েছে। আরো আছে ২০১৭ সালে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের গণ-অভিবাসন। তাছাড়া ২০১৫ সালে মিয়ানমারের মুসলিমমুক্ত নির্বাচনের কথাও বলা হয়েছে।
রোহিঙ্গাদের ওপর দীর্ঘ দিন ধরে নির্যাতন চললেও বিশ্ব কেন এ দিকে নজর কেন দিচ্ছে না, সে ব্যাপারেও আলোকপাত করা হয়েছে বইতে। রোহিঙ্গা প্রশ্নে জাতিসঙ্ঘের প্রতিক্রিয়া, রোহিঙ্গাদের ক্ষুধা নিয়ে জাতিসঙ্ঘ প্রতিবেদনও তুলে ধরা হয়েছে এতে।
দি জেনোসাইড অব রোহিঙ্গা মাইনোরিটিস বইটির পাঠক এতে থাকা তথ্যে আতঙ্কিত হবেন। বিশেষ করে গার্ডিয়ানের যে প্রতিবেদনটি এখানে পুনঃমুদ্রিত করা হয়েছে, তাতে শিউরে উঠার মতো তথ্য রয়েছে। মিয়ানমার সরকারের অনুরোধে জাতিসঙ্ঘ বিশ্বখাদ্য কর্মসূচির প্রতিবেদন প্রত্যাহার করার ঘটনাও প্রকাশ করা হয়েছে। পুরো বইতেই এমন এক বিশ্বের ছবি ফুটে ওঠেছে যেখানে মানবাধিকার কার্যত প্রহসনে পরিণত হয়েছে। এতে দেখানো হয়েছে, একমাত্র যে অধিকার আছে তা হলো জুলুমতন্ত্র। কায়েমি স্বার্থবাদী আর শক্তিশালীদের রক্ষা করার ব্যবস্থাই আছে বিশ্বজুড়ে।
বইটির একটি প্রতিবেদন প্রথম প্রকাশ পেয়েছিল ইন্টার প্রেস সার্ভিস নিউজ এজেন্সিতে। লিখেছিলেন তালিফ দিন। তিনি দেখিয়েছেন যে রাশিয়া, ইসরাইল ও চীনের সামরিক সম্ভার পেয়েই মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী বেপরোয়া হয়ে পড়েছে।
বইয়ের প্রতিবেদনগুলোতে একটি বিষয় পরিষ্কার। তা হলো, মিয়ানমারের ধর্ম বৌদ্ধ মতবাদে অহিংসার কথা বলা হলেও সন্ন্যাসী বিরাথু বৌদ্ধের সহানুভূতি, সহমর্মিতার কথা প্রচার করছেন না। তিনি মিয়ানমারের মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণা প্রচার করছেন।
এই গ্রন্থটি বৌদ্ধধর্মকে সত্যিকারের অর্থে জানে, এমন কোনো বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পড়েন, তবে মিয়ানমারের সন্ন্যাসী অশ্বিন বিরাথুর প্রচার করা গণহত্যা পড়ে খুবই কষ্ট পাবেন। এই সন্ন্যাসী তার ক্যারিয়ারের প্রায় ৫০ বছর ধরে প্রচার করে আসছেন যে রোহিঙ্গা মুসলিমেরা ‘কুকুর’ ও ‘সাপ।‘ তিনি রোহিঙ্গা মুসলিমদেরকে মাগুর মাছ হিসেবেও অভিহিত করেছেন। তার মতে, এসব মাছ যেমন দ্রুত বৃদ্ধি পায়, অন্যান্য প্রজাতিকে সমূলে শেষ করে দেয়, পরিবেশকে ধ্বংস করে দেয়, রোহিঙ্গারাও তেমন করে। ফারুক নিজে শ্রীলঙ্কার লোক হওয়ায় দেশটিতে বৌদ্ধ চরমপন্থীদের উত্থানের পরিণতি সম্পর্কে অবগত। বিরাথু নিজে ২০১৪ সালের মাঝামাঝি সময় শ্রীলঙ্কা সফর করেছেন। ওই সময়ের দিকে মুসলিমবিরোধী দাঙ্গার সৃষ্টি করেছিলেন শ্রীলঙ্কার বৌদ্ধ সন্ন্যাসী গনানসারা থেরো। তিনি কুখ্যাত বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী সংগঠন বদু বালা সেনার (বিবিএস) সাধারণ সম্পাদক।
বইয়ের একটি প্রতিবেদনে নিকো হিনেসের অভিযানের কথাও বলা হয়েছে। এতে বর্ষীয়াণ এই মুভি পরিচালকের ক্যামেরায় জঙ্গলে বিরাথুর অপকর্মের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। তিনি দুজন সহকারী, ডিজিটাল ক্যামেরা নিয়ে জঙ্গলে ঢুকেছিলেন বিরাথুর ভয়াবহ কর্মকাণ্ড সচিত্রভাবে তুলে ধরার জন্য। তার ক্যামেরায় এত দিন লোকচক্ষুর অগোচরে থাকা অনেক কথাই প্রকাশিত হয়েছে।
বইটিতে আবেগগত এমন অনেক ভাষ্য দেয়া আছে যার ফলে কয়েকটি অধ্যায় পাঠ করাই অসম্ভব হয়ে পড়ে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর যৌন সহিংসতার ভাষ্য স্নায়ুকে বিকল করে দেয়। এই যৌন সহিংসতার রেশ ধরেই ২০১৭ সালে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। পালিয়ে আসা লোকজন সাথে করে ভয়াবহ নির্যাতনের নানা কাহিনীও সাথে করে নিয়ে আসে। এসব কাহিনীর ভয়াবহতা যেকোনো লোককে নাড়া দিয়ে যায়।
এই বইটি পাঠ করার সময়ই সশস্ত্র গ্রুপ আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) সৃষ্টির নেপথ্য কাহিনী উঠে আসে। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে সক্রিয় এই গ্রুপটি। মিয়ানমার সরকার অভিযোগ করছে, বিদেশী ইসলামপন্থীরা আরসাকে তহবিল দিচ্ছে। কিন্তু মিয়ানমার সরকার বুঝতে চাচ্ছে না যে নির্যাতনের কারণেই এই গ্রুপের সৃষ্টি।
বইটিতে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিবেদনও সংযোজন করা হয়েছে। এতে উত্তর রাখাইনকে রোহিঙ্গা মুসলিমশূন্য করার মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
লতিফ ফারুকের বইটি গবেষকদের জন্য একটি আদর্শ উদাহরণ হতে পারে। বিভিন্ন ক্যাম্পে অসহায়ভাবে অবস্থান করা লাখ লাখ রোহিঙ্গা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সন্নিবেশিত হয়েছে এই গ্রন্থে। বইতে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গণহত্যার শেষ ধাপটি শেষ হলেও তাদের দুর্ভোগ কিন্তু শেষ হয়নি এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী অবিচারের মুখে পড়ার জন্য বিশ্বও অপরাধী।

১৮৭২ সালে ‘বেগম’ বন্দি হয় লন্ডনে

আজ থেকে প্রায় দেড়শ’ বছর আগে বাংলাদেশ থেকে গন্ডার বিলুপ্ত হয়ে গেছে। পৃথিবীতে বুনো পরিবেশে পাঁচ প্রজাতির গন্ডারের বাস। যার দু’টি ছিল আফ্রিকায় ও তিনটি ছিল এশিয়ায়। এশিয়ার তিনটি গন্ডার প্রজাতির সবই ছিল বাংলাদেশে। কালের বিবর্তনে বসতি হারিয়ে, শিকারির শিকার হয়ে সব গন্ডার বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
অতীত নথিপত্র, জেলাভিত্তিক গেজেটিয়ার, ব্রিটিশ শাসনামলের বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের উত্তরে তিস্তা অঞ্চল থেকে দক্ষিণ-পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে সুন্দরবন পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল তিন প্রজাতির গন্ডারের বসতি। সর্বশেষ জীবিত গন্ডারটিকে অর্থের লোভে তৎকালীন বৃটিশ সরকার পাঁচ হাজার পাউন্ডে লন্ডন চিড়িয়াখানায় বিক্রি করে দেয় ১৮৭২ সালে।
গন্ডার একপ্রকার স্তন্যপায়ী তৃণভোজী প্রাণী। এটি রাইনোসেরোটিডি পরিবারের অন্তর্গত। বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত তিন প্রজাতির গন্ডারের বসতির বিস্তৃতি ছিল যথাক্রমে: একশিঙ্গি বড় গন্ডার নেপাল সিকিম থেকে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত। সুন্দরবন, যশোর থেকে বরিশাল, সিলেট, ময়মনসিংহসহ বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত। সুন্দরবন ও যশোর থেকে শিকার করা এমন ১১টি একশিঙ্গি ছোট গন্ডার কলকাতা, বার্লিন ও লন্ডন জাদুঘরে তখন নিয়ে যাওয়া হয়। দুইশিঙ্গি গন্ডারের আবাস কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার পর্যন্ত ছিল।

সুন্দরবনে আদি সভ্যতার প্রত্নস্থলের আবিষ্কারক ইসমে আজম ঋজু গন্ডারের বিলুপ্তি এবং তার সর্বশেষ বসবাসের অবস্থান নিয়ে জাগো নিউজকে জানান, ১৮৭৬ সালে কুমিল্লায় একটি দুইশিঙ্গি গন্ডার গুলি করে মারা হয়। ১৮৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে চট্টগ্রাম থেকে একটি গন্ডার ধরা হয়। যেটি ছিল দুইশিঙ্গি গন্ডার। এটি বাংলাদেশের শেষ জীবিত গন্ডার ‘বেগম’। ১৮৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে চট্টগ্রামের দক্ষিণের কোন একস্থানে এটি মানুষের হাতে বন্দি হয়। চোরাবালিতে আটকে দুর্বল হয়ে পড়েছিল গন্ডারটি। স্থানীয় লোকজন গন্ডারটিকে চোরাবালি থেকে তুলে আটকে রেখে প্রশাসনকে জানায়। ব্রিটিশ সরকারের ক্যাপ্টেন হুড ও মি. উইকস আটটি হাতি নিয়ে ১৬ ঘণ্টা কঠোর চেষ্টার পর এটিকে বন্দি করে। অর্থের লোভ সামলাতে পারেনি ব্রিটিশ কর্মকর্তা। ১৮৭২ সালে বাংলাদেশের জীবিত শেষ গন্ডারটিকে ৫ হাজার পাউন্ডে কিনে লন্ডন চিড়িয়াখানা বিক্রি করেন। নিজ বসতভিটা ছেড়ে বেগম বন্দি হলো লন্ডনের খাঁচায়। এই গন্ডারের সঙ্গে সঙ্গে বিলুপ্ত হয়েছে আমাদের গন্ডার প্রজাতি।
গবেষক ইসমে আজম ঋজু আফসোস করে বলেন, ‘এত বড় বাংলায় আমরা ‘বেগমের’ জন্য একটু জায়গা করে দিতে পারিনি। আমাদের লোভ, প্রভুদের খেতাব পাওয়ার আশা হয়তো সেদিন ভিজেছিল ‘বেগমের’ চোখের পানিতে। আজও সে লোভ-নিষ্ঠুরতা ভিজে ধুয়ে যেতে পারেনি হাজারও বন্যপ্রাণীর চোখের পানিতে।’
লন্ডন চিড়িয়াখানায় তার নাম দেওয়া হল ‘বেগম’। লন্ডনে মি. কিউলমান নামের এক আঁকিয়ে আঁকলেন মানুষের নজরে আসা বাংলাদেশের জীবিত শেষ গন্ডারের ছবিটি।

‘বেগম’কে বাংলাদেশের শেষ গন্ডার উল্লেখ করলেও গবেষক ইসমে আজম ঋজু সুন্দরবনে গবেষণা করে পেয়েছেন আরও কিছু তথ্য। সেই তথ্য অনুসারে, ১৮৬৮ সালের দিকে বাংলাদেশের শেষ গন্ডারের কথা বলা হলেও সুন্দরবনের ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৮০০ সালের শেষ দিকে বা ১৯০০ সালের প্রথম দিকে সুন্দরবনের নলিয়ান থেকে একটি গন্ডার শিকার করের কালাচাঁদ নামের এক শিকারি। খুলনার রায়সাহেব নলিনীকান্ত রায়চৌধুরী শেষ ১৮৮৫ সালে সুন্দরবনে গন্ডারের পায়ের চিহ্ন দেখেছিলেন। তারপর সুন্দরবনে বা বাংলাদেশের কোথাও গন্ডারের উপস্থিতির উল্লেখ পাওয়া যায়নি।
বাঘ সংরক্ষণ কার্যক্রমের সুবাদে সমগ্র সুন্দরবন ঘুরে দেখার সুযোগ পেয়েছি কয়েকবার। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৫-১৬ সালে বাঘবিষয়ক একটি গবেষণা কার্যক্রমের অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়। মাঠপর্যায়ের সেই গবেষণাকালে আমার দলের নাম দিয়েছিলাম টিম রাইন (গন্ডারের দল)। এই নামের উদ্দেশ্য ছিল সুন্দরবন থেকে গন্ডারের মতো প্রাণীর বিলুপ্তির কথা মনে রেখে বাঘ সংরক্ষণে এগিয়ে চলা। সেইসঙ্গে এত বড় একটি বনে বাঘের স্থান হলেও গন্ডারের বিলুপ্তির কারণ যাচাই করা। বনভূমি ও ইতিহাস অনুসন্ধানে বুঝেছিলাম, সম্ভবত সুন্দরবনে তৃণাঞ্চলের ঘাটতি ও অবাধ শিকারই গন্ডার বিলুপ্তির কারণ।
ইতিহাস ও সদ্য আবিষ্কৃত প্রত্নস্থল ঘেঁটে তার সত্যতাও পেয়েছিলাম। একসময় সুন্দরবনে চামড়া, শিং ও মাংসের জন্য ব্যাপক আকারে গন্ডার শিকার করা হতো। প্রাচীনকালে সুন্দরবন অঞ্চলের আদিবাসীরা গন্ডারের মাংস খেত। সুন্দরবনের প্রাচীন প্রত্নস্থলে তারই নমুনাস্বরূপ একটি গন্ডারের দাঁতের জীবাশ্ম-প্রমাণ পাওয়া যায়। পাশাপাশি অবশ্য অন্যান্য প্রাণীর হাড়ের জীবাশ্ম পাওয়া গেছে। অন্য আরেক প্রত্নস্থলে পাওয়া যায় পায়ের হাড়, যা দেখে অনুমান করা যায় হাড়ের ভেতরের মজ্জা বের করার জন্য ভাঙা হয়েছিল হাড়টি।
সুন্দরবনের ইতিহাস থেকে জানা যায়, সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সেকেন্দার ডাক্তার তাঁর জীবদ্দশায় একটি পুকুর খননের সময় মাটির গভীরে দুটি গন্ডারের কঙ্কাল পান। এছাড়া সুন্দরবনসংলগ্ন হরিণগড় গ্রামে এফাজতুল্লা সরদার পুকুর খননের সময় একটি গন্ডারের কঙ্কাল, ধূমঘাট দিঘি খননের সময় ছয়টি গন্ডারের কঙ্কাল ও ঈশ্বরীপুর মাখন লাল অধিকারীর বাড়িতে ‘সুন্দরবনের ইতিহাস’ গ্রন্থের লেখক এ এফ এম আবদুল জলিল ছয়টি গন্ডারের কঙ্কাল দেখেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘প্রায় একশত বৎসর পূর্বে বৃদ্ধ লোকেরা শ্রীফলাকাঠি ও খেগড়াঘাটের জঙ্গলে স্বচক্ষে গন্ডার দেখিয়াছেন।’
সুন্দরবন অঞ্চলে বসবাসরত ঢালী পদবির লোকজন সুন্দরবনে গন্ডার শিকার করে তার চামড়া দিয়ে যুদ্ধের জন্য ঢাল প্রস্তুত করত। ঢাল থেকে পেশাগত কারণে ঢালী পদবির উৎপত্তি। এই ঢালীরা মহারাজ প্রতাপাদিত্যর হয়ে যুদ্ধ করত। পরবর্তী যুগে এসে ইংরেজ শিকারিদের ব্যাপক শিকারের ফলে অবশিষ্ট গন্ডার সুন্দরবন থেকে বিলীন হয়ে যায়।

ইতিহাসের সাক্ষী: পুঁজিবাদের পথে রাশিয়ার মানুষের দুঃসহ অভিজ্ঞতা

সমাজতন্ত্র থেকে পুঁজিবাদের পথে রাশিয়া
লাস্ট আপডেট- ১১ এপ্রিল ২০১৯: কমিউনিজমের পতনের পর রাতারাতি যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে পড়লো, তার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এক চরম অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছিল রাশিয়া। পুঁজিবাদের পথে যাত্রা শুরুর জন্য যেসব সংস্কার করা হচ্ছিল তার ফলে জিনিসপত্রের দাম চলে গিয়েছিল মানুষের নাগালের বাইরে, তৈরি হয়েছিল তীব্র খাদ্য সংকট। সেই ঘটনা নিয়ে ইতিহাসের সাক্ষীর এই পর্বটি তৈরি করেছেন বিবিসির ডিনা নিউম্যান। প্রতিবেদনটি পরিবেশন করেছেন মোয়াজ্জেম হোসেন:
১৯৯১ সালের ২৫শে ডিসেম্বর। সোভিয়েত ইউনিয়নের অস্তিত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হলো। সর্বশেষ সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভ পদত্যাগ করলেন আনুষ্ঠানিকভাবে।
মিখাইল গর্বাচেভের জায়গায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হলেন বরিস ইয়েলৎসিন। তিনি যে নতুন সরকার গঠন করলেন সেখানে অনেক তরুণ এবং উচ্চাকাঙ্খী গবেষককে নিয়ে আসলেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির সংস্কার করে বাজার অর্থনীতির পথ খুলে দেওয়া।
এদের একজন আন্দ্রে নিচায়েভ। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে তাঁকে করা হয়েছিল রাশিয়ার অর্থমন্ত্রী। এর আগে পর্যন্ত তিনি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির প্রভাষক।
"আমাদের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের এটা ছিল এক দারুণ সুযোগ। যে কোন বিচারেই আমাদের মিশনটা ছিল বেশ অভূতপূর্ব। এর আগে এত বিশাল একটা কমিউনিষ্ট রাষ্ট্রকে একটি কার্যকর বাজার অর্থনীতিতে রূপান্তর ঘটানোর চেষ্টা এর আগে হয়নি।"
রাজনীতিতে কোন অভিজ্ঞতাই ছিল না আন্দ্রে নিচায়েভের। । রাশিয়ার যে অর্থনীতিকে ঠিক করার দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হয়েছে, সেটার তখন করুণ অবস্থা!
"সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়ার পর রাশিয়ার কোন সরকারী প্রশাসনযন্ত্র বলতে কিছু ছিল না। কিছুই না। না ছিল কোন সেনাবাহিনী, কোন সীমান্ত, কোন কাস্টমস। না ছিল কোন কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা মূদ্রা।"
সোভিয়েত কমিউনিজমের যুগে মস্কোতে থাকা আমলাদেরই দায়িত্ব ছিল সারা দেশে কাঁচামাল থেকে শুরু করে সব কিছু সরবরাহ করা। তখন সব কিছুই পুরোপুরি রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির অধীনে।
কিন্তু ১৯৯২ সালের শুরুতে কমিউনিস্ট আমলের এই সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়লো। দেশ-বিদেশের সব পর্যবেক্ষকরাই তখন হুঁশিয়ারি দিচ্ছিলেন যে, রাশিয়া হয়তো সেবারের শীত মৌসুমেই ভেঙ্গে পড়বে। এটাকে ভীতি বা আতংক ছড়ানোর চেষ্টা বলা যাবে না। এই বিপদ ছিল একেবারেই বাস্তব।
মস্কোর হাজার হাজার আমলা তখন সামনে অনিশ্চয়তা ছাড়া আর কিছু দেখছেন না। তারা তখন কার জন্য কাজ করছেন, সেটাই তাদের কাছে পরিষ্কার নয়। রাশিয়া - নাকি সোভিয়েত ইউনিয়ন যেটি এখন বিলুপ্ত?
আন্দ্রে নিচায়েভ বলছিলেন, "সব বিদেশি ঋণ তখন আটকে দেওয়া হয়েছে। আমাদের হাতে তখন কোন বৈদেশিক মূদ্রার নগদ তহবিল নেই।"
"বড় বড় নগরীতে তখন খাদ্য সংকট, ক্ষুধার সংকট দেখা দিয়েছে। সেই সব নগরীতে, যেখানে বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানি করতে হতো।"
তিনি বলছেন, "বিশ্বের একসময়ের পরাশক্তি এই দেশটির বৈদেশিক মূদ্রার রিজার্ভ কোন কোন দিন নেমে আসছিল মাত্র আড়াই কোটি ডলারে! তখন আমাদের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ যেখানে এগারো হাজার আটশো কোটি ডলার!"
রাশিয়া তখন প্রবেশ করছে এক অনিশ্চিত সময়ে, একদিকে পেছনে রাখা পুরনো ব্যবস্থা, সামনে বিশৃঙ্খলা এবং নৈরাজ্যের আশংকা। যে আশংকার কথা গর্বাচেভ বার বার বলেছেন।
তখন কী করছিলেন অর্থমন্ত্রী আন্দ্রে নিচায়েভ?
"সবাই জানতো যে এ অবস্থায় কিছু জরুরী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। দেশ তখন ভেঙ্গে পড়ছে। ক্ষুধার সংকট বাস্তবেই দেখা দিয়েছে।"
"তখন আমাদের সামনে বিকল্প কী? দেশ অচল হয়ে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা? নাকি জিনিসপত্রের দাম নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাটা তুলে নেওয়া?"
আন্দ্রে নিচায়েভ বৈপ্লবিক সংস্কারে বিশ্বাসী ছিলেন। এজন্যে তিনি অজনপ্রিয় পদক্ষেপ নিতেও প্রস্তুত ছিলেন। এর পরিণতি যাই হোক না কেন।
"আমরা যখন সরকারে যোগ দেই, তখন আমাদের ধারণা ছিল, হয়তো বড় জোর এক বা দুই মাসের জন্য থাকবো, এরপর আমাদের বরখাস্ত করা হবে।"
"আমরা সবচেয়ে কঠোর ব্যবস্থা বা সবচেয়ে অজনপ্রিয় পদক্ষেপ নিতেও প্রস্তুত ছিলাম। আমাদের পর অন্যরা এসে হয়তো একটা যথাযথ বাজার অর্থনীতি গড়ে তুলবে।"
প্রথম সংস্কারবাদী সরকার যেন তাই বেশ কিছুটা তাড়াহুড়োর মধ্যে ছিল। খাদ্য এবং অন্যান্য জিনিসের ওপর থেকে কমিউনিস্ট যুগের ভর্তুকি রাতারাতি তুলে নেওয়া হলো।
১৯৯২ সালের পহেলা জানুয়ারি রাশিয়ার মানুষ দোকানে গিয়ে দেখলেন, এক রাতেই সব জিনিসের দাম আকাশচুম্বী। সেসময় মস্কোতে নিযুক্ত বিবিসির সংবাদদাতা নিজের চোখে দেখেছেন রুশ অর্থনীতিতে এই 'শক থেরাপি কিভাবে কাজ করেছে।
ডাক্তার এবং নার্সরা তাদের বেতন দশগুণ বাড়ানোর দাবিতে মিছিলে নামে রাস্তায়
তার দেওয়া বর্ণনা অনুযায়ী, দশকের পর দশক ধরে চলা কৃত্রিম ভর্তুকি তুলে দেওয়ার পর দোকানে গিয়ে রাশিয়ার লোকজনের চোখ যেন ছানাবড়া। অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তারা দেখছিলেন, কিভাবে একেবারে নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রীর দাম পর্যন্ত তাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
এক কেজি হ্যাম বা শুকরের মাংসের দাম তখন দাঁড়িয়েছে এক হাজার রুবলে, যা কিনা সেসময় রাশিয়ায় একজন গড়পড়তা মানুষের দু'মাসের বেতনের সমান। সসেজের দাম একশো রুবল, বা প্রায় এক সপ্তাহের বেতনের সমান।
লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধি যে রাশিয়ার মানুষকে রাতারাতি দারিদ্রসীমার কাছে নামিয়ে আনলো। অনেকেই তাদের ঘরের জিনিসপত্র বিক্রি করতে রাস্তায় নামলেন।
কেউ কেউ তখন মজুতদারির ব্যবসায় জুটে গেল। তারা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস মজুত করে এক বা দু'সপ্তাহ পরে অনেক উচ্চ মূল্যে বিক্রি করছিল। বৃদ্ধা মহিলারা বাড়িতে বসে টুপি বা হাতমোজা বুনে সেসব বিক্রি করছিলেন রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে।
কিন্তু এই নিদারুণ দৃশ্য দেখেও তার মধ্যে নাকি আশার আলো দেখতে পাচ্ছিলেন সেসময়ের অর্থমন্ত্রী আন্দ্রে নিচায়েভ।
"আপনাকে বুঝতে হবে, যে দেশটা কার্যত ভেঙ্গে পড়েছে, যে দেশ দেউলিয়া হয়ে গেছে, আপনি যদি সেই দেশের সরকার চালানোর দায়িত্বে থাকেন, যদি বৃদ্ধ লোকজনকে আপনি অবসর ভাতা পর্যন্ত দিতে না পারেন, তখন তারা যে এভাবে জীবনধারণের একটা উপায় খুঁজে বের করেছে, নিজেদের দক্ষতাকে কাজে লাগাচ্ছে, সেটা কী ভালো নয়?"
"তারা যে হাতমোজা বুনে রাতের খাবার কেনার মতো কিছু আয় করছিল, সেটা কী ভালো নয়?"
তবে রাস্তায় যারা এরকম ব্যবসায় নেমেছিলেন, তাদের সবাই আমদানি করা বিদেশি পণ্য অনেক চড়া মূল্যে বিক্রি করছিলেন। এ অবস্থায় দারিদ্রক্লিষ্ট হাজার হাজার রুশ নাগরিক রাস্তায় নামলেন বিক্ষোভ করতে।
কিন্তু এই বিক্ষোভ সত্ত্বেও সরকার তাদের সংস্কার অব্যাহত রাখলো। এর ফলে সাধারণ মানুষের দু:খ দুর্দশা আরও বাড়লো। মাত্র এক বছরের মধ্যেই রাশিয়ার শিল্পোৎপাদন বিশ শতাংশ কমে গেল।
রাশিয়ার শিল্প এবং সামরিক যুদ্ধাস্ত্রের ব্যবসায় ধস নামলো। তবে সেসময়ের অর্থমন্ত্রী আন্দ্রে নিচায়েভ বলছেন, এটি এড়ানোর কোন উপায় তাদের সামনে ছিল না।
"সামরিক যুদ্ধাস্ত্র উৎপাদন বন্ধ করা ছাড়া আমাদের উপায় ছিল না। আমি আপনাকে একটা উদাহারণ দেব।"
"একবার আমি সাইবেরিয়ার ওমস্কে গেলাম একটি ট্যাংক তৈরির কারখানা দেখতে। আমি কারখানার পরিচালককে বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম, এই কারখানাটি এখন বেসামরিক কাজের উপযোগী কিছু তৈরির কারখানায় রূপান্তর করা দরকার। কিন্তু তিনি আমাকে অনুনয় বিনয় করছিলেন, দয়া করে দেখুন, আমরা কী চমৎকার ট্যাংক তৈরি করি।"
রাশিয়ার বড় বড় শহরে তখন তীব্র খাদ্য সংকট। দোকানগুলিতে ক্রেতাদের দীর্ঘ লাইন
আন্দ্রে নিচায়েভ বলছিলেন, "এই কারখানার কর্মীরা আসলেই চমৎকার ট্যাংক তৈরি করেন। নাম দ্য ব্ল্যাক ঈগল, বা কালো ঈগল। এটি একটি দারুণ অস্ত্র, একই সঙ্গে এটি লাফাতে পারে, এবং গোলা ছুঁড়তে পারে।"
ট্যাংক দেখে তিনি বিমোহিত হয়ে গেলেন। কিন্তু কারখানা ঘুরে কাছের জঙ্গলে গিয়ে দেখলেন, সেখানে মাইলের পর মাইল শত শত সাধারণ ট্যাংক তুষারের নীচে ঢাকা পড়ে আছে।
"আমাদের দেশ তখন প্রচন্ড খাদ্য সংকটের মুখে। আর এই লোকগুলো তখনো পর্যন্ত ট্যাংক বানানো ছাড়া আর কিছু করতে পারছে না।"
"আমাদের তৈরি ট্যাংক হয়তো সেসময়ের বিশ্ব সেরা। কিন্তু আমাদের বাজেটের অবস্থা তখন বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায়। আমি তখন নির্দেশ দিলাম ঐ কারখানায় একেবারে অত্যাধুনিক তিন ধরণের ট্যাংক ছাড়া আর সবধরণের ট্যাংক তৈরি বন্ধ করে দিতে হবে।"
এই সংস্কারের জের ধরে বহু দশকের মধ্যে রাশিয়ায় এক বিরাট সম্পদ বৈষম্য তৈরি হতে লাগলো। এক নব্য ধনিক শ্রেণী তৈরি হলো।
আর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবন মানের অবনতি ঘটতে থাকলো। অনেক মানুষের কোন রকমে খেয়ে-পড়ে বেঁচে থাকাই দুস্কর হয়ে পড়লো। এরপর ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে রাশিয়ার কংগ্রেস অব ডেপুটিজ বা জনপ্রতিনিধিদের কংগ্রেসে সংস্কারবাদী সরকারের পদত্যাগের দাবি উঠলো।
সংস্কারের গতি ধীর করে আনার জন্য সরকারের ওপর চাপ বাড়তে থাকলো। প্রেসিডেন্ট ইয়েলৎসিন প্রথমে তার সংস্কারবাদী প্রধানমন্ত্রীকে বরখাস্ত করলেন। এরপর বরখাস্ত করলেন অর্থমন্ত্রী আন্দ্রে নিচায়েভকে।
রাশিয়ার প্রথম সংস্কারবাদী সরকার টিকেছিল এক বছরেরও কম সময়। তারা যা আশা করেছিল, তার চেয়ে অনেক দীর্ঘ সময়। আন্দ্রে নিচায়েভ অবশ্য গর্বিত তাদের কাজ নিয়ে।
"লোকে বলাবলি করে, নব্বই এর দশকটা তাদের জন্য কত কঠিন ছিল, যেসব ভুল তখন করা হয়েছে, ক্ষমতার যে অপব্যবহার হয়েছে।"
"কিন্তু মনে রাখতে হবে, সেই প্রথম রাশিয়ার মানুষ ব্যবসা শুরু করেছে। একটা বাজার সৃষ্টি করার জন্য, তাদের ক্রেতাদের কাছে খাবার বা কাপড় বিক্রির জন্য।"
"তারা কিন্তু নিজেদের উদ্যোগে এটা করেছেন। কোন কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা ছাড়া। অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমি যা করেছি তার জন্য আমি গর্বিত। আমি এদেশ থেকে জিনিসপত্রের ঘাটতি দূর করেছি।"
রাশিয়ার এই চরম অর্থনৈতিক সংকট অব্যাহত ছিল পুরো নব্বই এর দশকের প্রথম ভাগ জুড়ে। মূদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব, নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের তীব্র সংকট আর রাজনৈতিক অস্থিরতা -- সব মিলিয়ে সমাজতন্ত্র থেকে পুঁজিবাদের পথে রাশিয়ার প্রথম কয়েক বছর ছিল দেশটির মানুষের জন্য এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা।
টেলিভিশনে পদত্যাগের ঘোষণা দিচ্ছেন মিখাইল গর্বাচেভ

শুধু খাবারে সীমাবদ্ধ নয় ভারতের ঐতিহ্য

ভাবিকা গোভিলঃ
পাহাড়গঞ্জের টাইপোগ্রাফি থেকে কাশ্মীরের পাশমিনা তৈরি – ভারতের এই জিনিসগুলো ঘুরে ঘুরে দেখতে গেলে অভিজ্ঞতাটা আপনাকে অতীতে টেনে নিয়ে যাবে।
যদিও বলা হয়ে থাকে যে জীবনে খাবারের চেয়েও অনেক বেশি কিছু রয়েছে, তবে এটা নিয়ে কোন দ্বিমত নেই যে খাবারের সংস্কৃতির বাইরেও বহু ঐতিহ্য রয়েছে। ভারতে ঐতিহ্য বলতে বোঝায় স্মৃতিস্মম্ভ, স্থাপত্যগুলো ঘুরে দেখা অথবা বিভিন্ন এলাকার খাবারের বৈচিত্র। এখানে ভিন্ন রকমের কিছু ঐতিহ্য তুলে এনেছি আমরা যেগুলোর মধ্যে রয়েছে দোকানের সাইন, স্ট্রিট আর্টসহ অন্য রকম কিছু বিষয়।
বুকওয়ার্মিং সফর, দিল্লী ও মুম্বাই
সাউথ বোম্বের ক্যাফে মোন্ডেগার
‘বিয়ন্ড বোম্বে’র প্রতিষ্ঠা করেছে স্মৃতি কে টায়াগি। এই কোম্পানিটি ভারতের ঐতিহ্যগুলো ঘুরিয়ে দেখায়। তাদের পছন্দের সফরগুলোর মধ্যে একটি হলো বুকওয়ার্মিং ট্যুর। কিছু রেস্টুরেন্টে যাওয়া হয় যেখানে কল্পনা আর বাস্তব এক হয়ে মিশে গেছে। মুম্বাইয়ে যারা আছেন, তারা শান্তারামে যেতে পারেন। মুম্বাইয়ে এ ধরণের যাওয়ার আরেকটি জায়গা হলো সুকেতু মেহতার বই আর ম্যাক্সিমাম সিটি।
টাইপোগ্রাফি, দিল্লী
পাহাড়গঞ্জের বিল্ডিংগুলোতে এ ধরণের চমৎকার সাইন নজরে পড়বে
দিল্লী-ভিত্তিক টাইপফেস ডিজাইনার পূজা সাক্সেনা পশ্চিম দিল্লীর শহরতলীর মূল মার্কেট এলাকার সাইনবোর্ডগুলো ঘুরে দেখেছেন। এগুলোর মধ্যে ফন্ট, ডিজাইন আর ইতিহাসকে একসাথে খুঁজে পেয়েছেন তিনি।
শুধু একটি ভাষা নয়, এই সব সাইনবোর্ডে পাওয়া যাবে ডজনখানিক ভাষা। এগুলোর মধ্যে রয়েছে কোরিয়ান, বাংলা, হিব্রু, তামিলসহ দিল্লীর বিভিন্ন এলাকার ভাষা।
স্ট্রিট আর্ট
রাস্তার পাশে দেয়ালে ইন্টারেকটিভ আর্ট
স্টার্ট (St+art) ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশান শহরের দেয়ালগুলোতে প্রমাণ সাইজের ম্যুরাল ও চিত্রকর্ম এঁকেছে। এগুলোর মাধ্যমে সড়কগুলোকে আরও ইন্টারেকটিভ করে তুলতে চায় তারা। তাদের এই প্রচেষ্টার কারণে শহরের বিভিন্ন জায়গা জীবন্ত যাদুঘর হয়ে উঠেছে।
নিজেদের তৈরি শিল্পকর্মগুলো ঘুরে দেখানোর আয়োজনও রয়েছে তাদের। দিল্লীর লোধি আর্ট ডিস্ট্রিক্টে সাধারণত এই ঘুরে দেখানোর আয়োজন রয়েছে।
মধ্যরাতের কলকাতা
রাতের হাওড়া ব্রিজ
ঘড়িতে রাত ১২টা বাজার পর কলকাতার জটিল সড়কগুলো ঘুরে দেখতে বের হোন। এই সফরের আয়োজন করে ‘লেট আস গো’। দিনের ট্রাফিকের জঞ্জালে যাদের ঐতিহাসিক জায়গাগুলো ঘুরে দেখার সুযোগ নেই, তাদের জন্যই এ আয়োজন।
ইডেন গার্ডেন পার হয়ে যাবেন আপনি। বিধান সভা দেখবেন। সেন্ট অ্যান্ড্রুজ চার্চ আর লাল বাজার দেখবেন। আর দেখবেন হাওড়া ব্রিজ – রাতের আলোতে কেমন ঐশ্বর্যময় হয়ে আছে।
সাহাপেডিয়া’র সাথে ঘোরাঘুরি
জয়পুরের নীল দেয়ালের শহরে পসরার আয়োজন
সাহাপেডিয়া ওয়াকস অ্যান্ড টকস বিভিন্ন শহরে ঘুরিয়ে দেখায়। কলকাতার পুরনো চায়নাটাউন, জয়পুরের নীল শহর, হায়দ্রাবাদের সেন্টেনারি মিউজিয়াম বা বিকানারের কূপ আর তালাব – সব খানেই আপনাকে ঘুরিয়ে দেখাবে এরা।
আর্টস, মুম্বাই
মুম্বাইয়ের গ্যালারিতে চিত্রকর্ম প্রদর্শনী
হেরিটেজ ওয়াক বলতে আমরা সাধারণ স্থাপত্য আর ভবনগুলোকেই বুঝি। কিন্তু এর ভেতরের জিনিসগুলোর কি হবে? ‘আর্টস ওয়াক মুম্বাই’ দর্শনার্থীদের বিভিন্ন গ্যালারি ও যাদুঘরের ভেতরে ঘুরিয়ে দেখায়।
কাশ্মীরের শৈলী
শ্রীনগরের জায়নাকাদালের স্থানীয় বাজারে পসরা বিছিয়ে বসেছে দোকানিরা
কাশ্মীর বলতেই আমরা বুঝি তুষারে ঢাকা পর্বতচূড়া, সবুজ প্রান্তর আর বিশাল ডাল লেক। কিন্তু দেখার আরও অনেক কিছু রয়েছে সেখানে। শ্রীনগরে এ ধরণের সুযোগ সৃষ্টি করেছে ‘ব্রেকঅ্যাওয়ে’।
তাদের সাথে সফরে আপনি স্থানীয় ওয়ার্কশপগুলো ঘুরে দেখতে পারবেন। দেখবেন চমৎকার সব পাশমিনা তৈরি করা হচ্ছে। কানি বয়ন দেখতে পারবেন যারা দুই মিটার দীর্ঘ জামাভার শাল হাতে তৈরি করে। এর সাথে স্থানীয়দের ঘরে তৈরি খাবার খাবারও সুযোগ হবে আপনার। এরা আপনাকে শ্রীনগরের সবচেয়ে পুরনো ব্রিজটিও দেখাতে নিয়ে যাবে। সফর শেষ হবে স্থানীয় বাজারে এসে।