Monday, August 17, 2015

বিচার বিভাগ নিয়ে একটি মহল ষড়যন্ত্রে লিপ্ত: প্রধান বিচারপতি

সুরেন্দ্র কুমার সিনহা
একটি মহল বিচার বিভাগ নিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। তিনি বলেন, যারা কথায় কথায় ‘বিচার বিভাগ শেষ হয়ে গেছে, শেষ হয়ে গেছে’ বলে প্রচার চালাচ্ছে তাদের ব্যাপারে সাবধান থাকতে হবে।
আজ সোমবার নাটোরে আইনজীবীদের দেওয়া এক সংবর্ধনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধান বিচারপতি এসব কথা বলেন। এ ছাড়াও তিনি বিচার নিষ্পত্তির হার বেড়ে যাওয়া, জজ আদালত ডিজিটালাইজেশনসহ নানা দিক নিয়ে কথা বলেন।
আইনজীবীদের উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘কিছু মিডিয়া, কিছু বুদ্ধিজীবী, কথায় কথায় “বিচার বিভাগ চলে গেল, চলে গেল” বলে শোরগোল করেন। একটি মহল বিচার বিভাগ নিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। কথায় কথায় “বিচার বিভাগ শেষ হয়ে গেছে, শেষ হয়ে গেছে” বলে প্রচার চালাচ্ছে। তাদের ব্যাপারে সাবধান থাকতে হবে। তারা যেন বিচার ব্যবস্থার পুনর্গঠনকে ব্যাহত করতে না পারে এ জন্য আইনজীবীদের সজাগ থাকতে হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখতে আইনজীবীদের বিচারকদের পাশে দাঁড়াতে হবে।’
বিচার নিষ্পত্তির হার বেড়েছে
নাটোর আইনজীবী সমিতির সভাপতি রুহুল আমিন তালুকদারের সভাপতিত্বে সংবর্ধনা সভায় প্রধান বিচারপতি জানান, দেশে ৩০ লাখ মামলা ‘ডেডলক’ হয়েছে বলে একটি মহল অপপ্রচার চালাচ্ছে। তারা অসত্য তথ্য প্রচার করছে। গত ১৭ জানুয়ারি তিনি বিচার বিভাগের দায়িত্ব নেওয়ার পর বিচার বিভাগে প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বিচার নিষ্পত্তির হার বেড়ে চলেছে। আগে মামলা নিষ্পত্তির হার ছিল ২৬ থেকে ৪০ শতাংশ। আগামী ডিসেম্বর নাগাদ তা দাঁড়াবে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশে। বিচার বিভাগ পুনর্গঠনের সব প্রক্রিয়া ঠিকঠাকভাবে চললে আগামী এক বছরে ৫০ ভাগেরও বেশি হারে মামলা নিষ্পত্তি হবে। তিনি এই প্রক্রিয়া সফল করার জন্য আইনজীবীদের সহযোগিতা চান তিনি।
আইনজীবীদের উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেন, ‘আপনারা যথাসময়ে (সকাল সাড়ে ৯ টা) আদালতে আসবেন। শেষ সময় পর্যন্ত বিচার কাজে সহায়তা করবেন।’ তিনি জানান, দুপুরের খাবারের পর আদালতে না বসা আদালতের প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তিনি তা বাতিল করে বিচারকদের নিয়মিত বিকেল পর্যন্ত এজলাসে বসে কাজ করার প্রথা চালু করেছেন। তিনি আরও জানান, আগে শুধু ফৌজদারি আদালতে জামিন শুনানির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হতো। সাক্ষী নেওয়া হতো না। তাই দুপুরের পর জামিন শুনানির জন্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে কিছু প্রবীণ আইনজীবীর শারীরিক সমস্যা হচ্ছে বলে জেনেছেন। তিনি তাঁদের আরও ৬ মাস এভাবে কষ্ট করার অনুরোধ করেছেন। মামলা কমে এলে বিষয়টি আবার বিবেচনা করা হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
শিগগিরই জজ আদালতে ডিজিটালাইজেশন হবে
প্রধান বিচারপতি বলেন, খুব শিগগিরই জজ আদালতগুলোর ডিজিটালাইজেশন কার্যক্রম শুরু হবে। ইতিমধ্যে সব জজ আদালতকে অনলাইনের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। অবকাঠামো বাড়ানোর কাজ চলছে। সহকারী জজদের আর্থিক এখতিয়ার বাড়িয়ে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা করার বিষয়টি বিবেচনাধীন। সাক্ষীদের আদালতে যাতায়াতের খরচ সরবরাহ ও আদালতে তাঁদের বিশ্রামের ব্যবস্থা করার পাইলট কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ই-লাইব্রেরি তৈরির কাজও চলছে বলে তিনি জানান।
মামলা নিষ্পত্তি ও ন্যায়বিচার দেওয়ার ক্ষেত্রে তদন্ত কর্মকর্তা ও চিকিৎসকদের ভূমিকা নিয়েও কথা বলেন প্রধান বিচারপতি। তিনি বলেন, ‘তদন্ত কর্মকর্তা ও চিকিৎসক যথাযথভাবে প্রতিবেদন না দিলে বিচার প্রার্থীকে ন্যায়বিচার দেওয়া সম্ভব না।’ এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সভা করার কথাও জানান তিনি।
নাটোর জজ আদালতে ও আইনজীবীদের কিছু সুযোগসুবিধা বাড়ানোর আশ্বাস দিয়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘নাটোরে আসা আমার জন্য একটা স্বপ্ন ছিল। এখানকার গণভবন, রাজবাড়ি ও চলনবিলের মাছ আমাকে আকৃষ্ট করেছে।’ সেখানকার আইনজীবীদের পেশাগত উন্নয়ন দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, এখানকার আদালত পরিদর্শনের সময় আইনজীবীদের শুনানি শুনতে শুনতে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন।
সংবর্ধনা সভায় প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল, অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার ও প্রধান বিচারপতির একান্ত সচিব, নাটোরের জেলা প্রশাসক মশিউর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান বিচারপতি গতকাল রোববার বিকেলে নাটোরে আসেন। তিনি ওই দিন সন্ধ্যায় জজ আদালতের আয়োজনে বিচারিক সম্মেলনে যোগ দেন। এর আগে তিনি এখানকার দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখেন। সোমবার সকাল থেকে তিনি জজ আদালত, বিচারিক হাকিম ও নির্বাহী হাকিমদের আদালত পরিদর্শন করেন এবং পুলিশের একটি ত্রৈমাসিক সভায় যোগ দেন।

বিএনপিকে নিয়ে আওয়ামী লীগের এত উদ্বেগ কেন? by সোহরাব হাসান

ইদানীং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতা এবং সরকারের মন্ত্রীদের বক্তৃতা-বিবৃতি শুনে ও পাঠ করে মনে হচ্ছে দুর্বল বিএনপিকে সবল করার বাইরে তাঁদের কোনো কাজ নেই। প্রায় প্রতিদিনই পত্রিকায়, টেলিভিশনে আওয়ামী লীগের জাঁদরেল নেতারা বিএনপিকে টিকিয়ে রাখতে হলে কী কী করতে হবে, কীভাবে দলকে এগিয়ে নিতে হবে, সেসব নিয়ে উপদেশ বর্ষণ করে চলেছেন। আওয়ামী লীগের একজন তুখোড় সাংসদ ও একটি সংসদীয় কমিটির সভাপতি বিএনপির জন্য পাঁচ দফা করণীয় বাতলিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের স্বেচ্ছায় পদ থেকে সরে দাঁড়ানো, যুদ্ধাপরাধীর বিচারে সম্মতি ও জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গ ত্যাগ, স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হিসেবে নিজেকে ঘোষণা এবং সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদীদের পৃষ্ঠপোষকতা না করা। তাঁর শেষ তিনটি প্রস্তাবের সঙ্গে কারও দ্বিমত থাকার কথা নয়। কেননা, কোনো গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলই যেমন যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরোধিতা করতে পারে না, তেমনি সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ডকেও পৃষ্ঠপোষকতা দিতে পারে না। কিন্তু বিএনপির নেতৃত্ব কে দেবেন কিংবা কে কবে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করবেন, সেসব নিয়ে সরকারি দলের নেতার কিছু করণীয় আছে বলে মনে করি না।
বিএনপি নেতৃত্ব দুর্বল হলে কিংবা দলের নেত্রী খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তায় ধস নামলে তো আওয়ামী লীগেরই লাভ এবং নেতাদের খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু তাঁরা খুশি না হয়ে হঠাৎ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন কেন? এর একটি কারণ হতে পারে তাঁরা প্রতিদ্বন্দ্বীকে ভয় পান। আরেকটি কারণ হতে পারে নেত্রীকে খুশি করা। নেত্রীকে খুশি করার দুটি উপায় আছে—অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন ও তোষামোদ। প্রথম কাজটি কঠিন বলেই ডিজিটাল জমানার আওয়ামী লীগের অনেক নেতা সহজ পথটি বেছে নিয়েছেন। এতে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের কিংবা সরকারের কোনো লাভ না হলেও নেতাদের সুবিধা নিশ্চিত। কিন্তু এই নেতারা একবারও ভেবে দেখেন না যে তাঁরা যত বেশি বিএনপির নেত্রীকে নেতৃত্ব ছাড়ার কথা বলবেন, তাঁর প্রতি সাধারণ মানুষের সহানুভূতি তত বেশি বাড়বে। এটি অনুমানের কথা নয়, অঙ্কের কথা। চাঁদের যেমন নিজস্ব আলো নেই তেমনি বাংলাদেশে কোনো দল নিজ গুণে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে না। একসময় বিএনপির দুর্বলতা আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করেছে। এখন আওয়ামী লীগের দুর্বলতা খালেদা জিয়া কিংবা বিএনপির শক্তি জোগাচ্ছে। আওয়ামী লীগ জঙ্গিদের পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে না ঠিকই কিন্তু সন্ত্রাসীদের পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার ভূরি ভূরি প্রমাণ রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের নেতা ও সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর নজরুল ইসলামকে বিএনপির কোনো নেতা হত্যা করেননি। র্যাব সদস্যদের দিয়ে খুন করিয়েছেন নুর হোসেন নামে স্থানীয় আওয়ামী লীগের আরেক নেতা। তাঁকে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন একজন আওয়ামী লীগ সাংসদ। ফেনীর উপজেলা চেয়ারম্যান কিংবা টাঙ্গাইলের আওয়ামী লীগের নেতা ফারুক আহমদের খুনিও বিএনপি থেকে আসেনি। দুটো ঘটনায়ই অভিযোগের তির স্থানীয় সাংসদের প্রতি।
বাংলাদেশে গত ৪৪ বছরে বর্তমানে শেখ হাসিনার মতো অনুকূল পরিবেশ কেউ পাননি। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছিলেন দুই তরফেই, চরম ডান ও চরম বাম। শেখ হাসিনার প্রথম সরকারের সময়ও বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াত সরকারের বিরুদ্ধে এককাট্টা হয়েছিল। এমনকি নবম সংসদেও তাঁকে বিরোধী দলকে মোকাবিলা করতে হয়েছে, সংখ্যায় তারা যত কমই হোক না কেন। এবারে ‘বিরোধী দলও’ সরকারের অংশ। বাম ও ডানদের একাংশও সরকারের সঙ্গে আছে। বিএনপি বিভ্রান্ত ও বিশৃঙ্খল। তাহলে আওয়ামী লীগের ভয় কী? ভয়টি হলো দলের ভেতরে গড়ে ওঠা ফ্রাঙ্কেনস্টাইনরা। যেহেতু সংসদের ভেতরে-বাইরে কোনো বাধা নেই, তাই তারা আরও ভয়ংকর হয়ে উঠছেন। মন্ত্রী নেতাকে মানছেন না, নেতা মন্ত্রীকে মানছেন না। মন্ত্রী সাংসদকে উপেক্ষা করছেন আর সাংসদ উপজেলা চেয়ারম্যানকে পাত্তা দিচ্ছেন না। শেখ হাসিনা দলকে তৃণমূল পর্যায়ে যতই শক্তিশালী করার কথা বলুন না কেন, তৃণমূলের নেতারা দলকে সংগঠিত করার চেয়ে বখরা নিয়েই মারামারিতে ব্যস্ত আছেন। এই যে দেশে মানব পাচারের মহাবিপর্যয় ঘটে গেল; সেটি নিয়ে ক্ষমতাসীন দলে কোনো উচ্চবাচ্য নেই। এই যে ঢাকা শহর মুমূর্ষু হয়ে যাচ্ছে, সে সম্পর্কেও মন্ত্রী-সাংসদদের মুখে কোনো কথা নেই। তাঁরা সবাই উদ্বিগ্ন আছেন বিএনপির করণীয় নিয়ে।
আওয়ামী লীগের আরেক কেন্দ্রীয় নেতা, যিনি শেখ হাসিনার আগের কেবিনেটে পূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন; বলেছেন, বিএনপি এখন লাইফ সাপোর্টে আছে। তিনি খালেদা জিয়াকে দলের চেয়ারপারসনের পদ থেকে পদত্যাগ করে শেখ হাসিনার রাজনীতির পাঠশালায় ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। লক্ষ করুন, তিনি লাইফ সাপোর্টে থাকা বিএনপির নেত্রীকে শেখ হাসিনার পাঠশালায় ভর্তি হতে বলেছেন। কিন্তু অনেক আগে থেকে ভর্তি হওয়া ছাত্রদের পারফরম্যান্স যে মোটেই ভালো নয়, বর্তমান বাংলাদেশই তার প্রমাণ।
আরেকজন মন্ত্রী বলেছেন, বিএনপির দিন শেষ। মিডিয়া বিএনপিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। খালেদা জিয়া নেতা-কর্মীদের যতই উজ্জীবিত করার চেষ্টা করুন না কেন, বিএনপি আর শিরদাঁড়া শক্ত করে দাঁড়াতে পারবে না। মাননীয় মন্ত্রী যদি সরকারের পুলিশ, র্যাব, বিজিবি বাদ দিয়ে মাঠে খেলতে নামতেন, দেখতেন কত ধানে কত চাল। সিটি করপোরেশন নির্বাচনী প্রচারে খালেদা জিয়া নামতে না-নামতেই আওয়ামী লীগের কর্মীদের গায়ে জ্বর উঠে গিয়েছিল। এরপর যা ঘটেছে, সেই জ্বরের প্রতিক্রিয়া। মিডিয়া নয়, বিএনপিকে চাঙা করে রাখছে মন্ত্রী-সাংসদ নেতাদের গরম বক্তৃতা-বিবৃতি। অনেক সময় দেখা যায়, যে বিষয়েই সেমিনার বা আলোচনা হোক না কেন, আওয়ামী লীগের নেতারা খালেদা জিয়া বা বিএনপিকে সেখানে টেনে আনবেনই।
মন্ত্রী-সাংসদেরা সংসদের বাইরে ও ভেতরে অবিরাম বিএনপির ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কথা জানিয়ে আসছেন। কিন্তু নিজ দলের নেতা-কর্মীরা যে দেশজুড়ে নানা অপকর্ম করে বেড়াচ্ছেন, সেসব নিয়ে তাঁদের আদৌ কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। যখন রাষ্ট্রীয় ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হয়ে যায়, যখন মানব পাচার ও ইয়াবা ব্যবসায় সরকারি দলের সাংসদ জড়িয়ে পড়েন কিংবা একজন নারী সাংসদের ছেলে গুলি করে দুজন নিরীহ মানুষকে হত্যা করেন, তখন তাঁদের টুঁ শব্দটি করতে দেখা যায় না।
তাঁদের এসব সদুপদেশ শুনে চারদলীয় জোট এবং তার আগে ‘একদলীয়’ বিএনপি সরকারের সময়ে বিএনপি নেতাদের অযাচিত বক্তৃতা-বিবৃতির কথা মনে পড়ে। আওয়ামী লীগের নেতারা এখন ক্ষমতার মোহে আচ্ছন্ন হয়ে বলছেন, বিএনপি কোনো দিনই আর মেরুদণ্ড খাড়া করে দাঁড়াতে পারবে না। ক্ষমতায় থাকতেও বিএনপি নেতারা ৪১ বছরেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে পারবে না বলে ফরমান জারি করেছিলেন। এমনকি খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের আমলে এক ছাত্রসমাবেশে খালেদা জিয়া বলেছিলেন যে বিরোধী দলকে মোকাবিলায় তাঁর ছাত্রদলই যথেষ্ট। বিএনপি নেতারা তখন এমন কথাও বলে বেড়াতেন যে শেখ হাসিনা যত দিন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী থাকবেন, তত দিন আর তাঁদের কোনো ভাবনা নেই। ভাবনা আছে কি না, এখন টের পাচ্ছেন। আশা করি, বর্তমান শতকে না হলেও আগামী শতকের কোনো একসময় আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতাচ্যুত হবে, তখন এই দলের নেতারা অথবা তাঁদের উত্তরসূরিরাও টের পাবেন।
পত্রিকায় দেখলাম, নৌপরিবহনমন্ত্রী বলেছেন, যারা নদী দখল করে, তারা এ যুগের রাজাকার। রাজাকার শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ যা-ই থাকুক না, রাজাকার বলতে এ দেশের মানুষ একশ্রেণির ঘৃণ্য মানুষকেই বোঝে, যারা একাত্তরে হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটিয়েছে, এখনকার নদী দখলকারীরা যদি সেই রাজাকারের শিরোপা পেয়ে থাকে, মন্ত্রীর কাছে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা হয়, সেই রাজাকাররা কোন দলের? একাত্তরের রাজাকারদের চিহ্নিত ও বিচার করার কাজটি সরকার করছে। কিন্তু মন্ত্রী এ যুগের রাজাকার অর্থাৎ নদী দখলকারীদের তালিকা টাঙিয়ে দিলে মানুষ তাদের নাম-পরিচয় জানতে পারত।
সংসদের ভেতরে বিরোধী দল নেই। রাজপথে বিরোধী দল নেই। তিন মাসের ভুল আন্দোলনের খেসারত দিতে গিয়ে খালেদা জিয়া এখন ঘরে চুপচাপ বসে আছেন। এত বড় রাজনৈতিক বিপর্যয় নিয়ে দলের মধ্যে আলোচনা করতে তিনি সাহস পাচ্ছেন না। তারপরও বিএনপিকে নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাদের এত উদ্বেগ কেন? তাঁরা যদি বিএনপিকে নিয়ে সারাক্ষণ না ভেবে একটু সময় দেশের ও দলের কথা ভাবতেন, তাহলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হতো। আগুন–বোমার রাজনীতি দেশের মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছে। এর অর্থ এই নয় যে তারা দলীয় মাস্তানি-চাঁদাবাজির রাজনীতিকে বুকে আলিঙ্গন করে নেবে।
এই মুহূর্তে বিএনপি বা জামায়াতে ইসলামী সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ নয়। চ্যালেঞ্জ হলো নিজ দলের ভেতরে জন্ম নেওয়া ফ্রাঙ্কেনস্টাইনরা। ছিপি খুলে যাদের বের করে দেওয়া হয়েছে, তাদের আবার শিশিতে পোরা খুবই কঠিন কাজ। সেই কাজটি করতে ব্যর্থ হয়েই আওয়ামী লীগের নেতারা হাওয়ায় ছড়ি ঘোরাচ্ছেন।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
hsohrab55@gmail.com

প্রবৃদ্ধিই যথেষ্ট নয় by হাসান ফেরদৌস

আজকাল সবাই প্রবৃদ্ধি প্রবৃদ্ধি বলে মাথা গরম করছে। প্রবৃদ্ধির হিসাবে বাংলাদেশ গড়ে ৫ থেকে ৬ শতাংশ অর্জন করে চলেছে, অতএব দেশের উন্নতি শনৈঃ শনৈঃ। দেশের মন্ত্রী ও আমলারা তো রয়েছেনই। ভারত থেকে প্রধানমন্ত্রী মোদি এসেছিলেন, তিনিও আমাদের পিঠে হালকা চাপড় দিয়ে গেলেন—বেশ করছ তোমরা।
সমস্যা হলো, এক প্রবৃদ্ধি দিয়ে দেশের উন্নতির হিসাব অনেকটা শুভংকরের ফাঁকি। দেশের মোট সম্পদ বাড়লে একদল লোকের পকেট ভারী হয় বটে, কিন্তু সেই সম্পদ যদি অধিক ন্যায়সংগতভাবে বণ্টন না করা যায়, তাহলে দেশের মোট জনসংখ্যার এক বৃহৎ অংশ তার সুবিধা থেকে বঞ্চিত থেকে যায়। বাংলাদেশে ঠিক সেই ব্যাপারটাই ঘটে চলেছে।
মুদ্রাস্ফীতির হিসাব বাদ দিয়েও যদি বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হিসাব ধরি, মানতেই হবে আমাদের অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য। ২০০৮ সালের পর বিশ্বজুড়ে যে মহা মন্দাবস্থা ছড়িয়ে পড়ে, বাংলাদেশ তা ভালোভাবেই এড়াতে পেরেছে। মাসের পর মাসজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, তা-ও বাংলাদেশ উতরে গেছে। অর্থনীতির অধিকাংশ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ইতিবাচক। এমনকি মানব উন্নয়নের নিরিখেও বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ দেশের তুলনায় ভালো করেছে। অথচ তারপরও দেশের এক বৃহৎ মানবগোষ্ঠী দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়ে গেছে।
চলতি হিসাবে বাংলাদেশের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ দরিদ্র। অন্য কথায়, সেখানে প্রতি তিনজনের একজন মানুষের দৈনিক আয় মাথাপিছু দুই ডলারেরও কম। মাথাপিছু আয় যে হারে বেড়েছে, মূল্যস্ফীতি, বিশেষ করে খাদ্যসামগ্রীর মূল্যের বিচারে, বেড়েছে তার চেয়ে বেশি। ফলে অতিদরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়ার বদলে কমেছে। খাওয়া-পড়ার খরচটাই সাধারণ মানুষের প্রধান খরচ। সেটাই যখন বেড়ে যায়, তখন অন্য খাতে যেমন স্বাস্থ্য, শিক্ষা, মনোরঞ্জন—খরচ করার মতো কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। এই অসাম্য যত দীর্ঘ সময় ধরে চলে, দেশের সবচেয়ে দরিদ্র মানুষ ততই ক্রমে পিছিয়ে পড়তে থাকে।
এই হিসাবটা যদি পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করি, তাহলে ছবিটা আরও পরিষ্কার হবে। সাম্প্রতিক যে পরিসংখ্যান মিলেছে, তা অনুসারে ২০০৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত আমাদের দেশে পরিবারপ্রতি মাসিক আয় বেড়েছে ১১ দশমিক ৮৭ শতাংশ। এই সময়ে পরিবারপ্রতি ব্যয় বেড়েছে ১৬ দশমিক ৫২ শতাংশ। গ্রাম ও শহরের মধ্যে অথবা অঞ্চলভেদে আয়-ব্যয়ের এই তারতম্য আরও বেশি। আয়-ব্যয়ের এই ফারাকের মূল কারণ আয় বৃদ্ধির তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয়ভার, বিশেষ করে খাদ্যসামগ্রীর দাম, বেড়েছে কয়েক গুণ বেশি। ফলে পরিসংখ্যানের হিসাবে মোট দারিদ্র্য কমলেও ধনী-দরিদ্রের মধ্যে অসাম্য বেড়েই চলেছে।
দেশের মোট আয় বাড়ছে, কিন্তু অর্থনৈতিক অসাম্য কমছে না—এ কথার এক অর্থ হচ্ছে, দেশের উপার্জিত সম্পদ সুষমভাবে বণ্টিত হচ্ছে না। যারা ধনী, তারা আরও ধনী হচ্ছে, অন্যদিকে গরিব হচ্ছে আরও গরিব। সবাই মানেন, মোট সম্পদের হিসাবে বাংলাদেশের সবচেয়ে ধনিক গোষ্ঠী আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখনো অধিক ধনী। শুধু তা-ই নয়, তারা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক দ্রুত হারেও ধনী হচ্ছে। শুধু একটা হিসাব দিই। ২০১০ সালের হিসাবে দেখেছি, দেশের সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ মানুষ নিয়ন্ত্রণ করে দেশের মোট সম্পদের ২৪ দশমিক ৬১ শতাংশ বা প্রায় এক-চতুর্থাংশ। অন্যদিকে, সবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশ মানুষের হাতে রয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৭৮ শতাংশ সম্পদ। মোট আয়ের হিসাবে এমন আকাশ-পাতাল বৈষম্য পৃথিবীর খুব বেশি দেশে নেই।
এ তো গেল মোট আয়ের হিসাবে। কয়েক বছর আগে জাতিসংঘ একই দেশের জনগোষ্ঠীর মধ্যে দারিদ্র্যের হিসাবে প্রকৃত বৈষম্য বোঝাতে গরিব ও কার্যকরভাবে গরিব—ইংরেজিতে ইনকাম পুওর ও ক্যাপাবিলিটি পুওর—এই অভিনব ধারণাটি চালু করে। আপনি আয়ের হিসাবে হয়তো একদম গরিব নন, কিন্তু আপনি যদি গ্রামে থাকেন অথবা অনুন্নত কোনো অঞ্চলে বাস করেন, তাহলে পকেটে পয়সা থাকলেও আপনার সঙ্গে অতি নিঃস্বর বড় ধরনের ফারাক নেই। চিকিৎসক বা হাসপাতাল না থাকলে পকেটে পয়সা থেকেও আপনি স্বাস্থ্যসেবা পাবেন না, প্রসূতির বা শিশুর যথোপযুক্ত পরিচর্যায় সক্ষম হবেন না।
অমর্ত্য সেন বা জন রলসের মতো অর্থনীতিবিদেরা দরিদ্র ও কার্যকর দরিদ্র—এই ধারণাটিকে আরও সম্প্রসারিত করে যে ‘সুবিচারতত্ত্ব’ (থিওরি অব জাস্টিস) উপহার দিয়েছেন, তাতে দারিদ্র্য বিচারের ক্ষেত্রে আয়, সম্পদ ও সুযোগের পাশাপাশি নাগরিক অধিকার, এমনকি আত্মসম্মানের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করেছেন। কোনো দাঁড়িপাল্লা নেই, যা দিয়ে এই সূচকগুলো নির্ণয় করা যাবে, কিন্তু আমরা খালি চোখেই তো বুঝতে পারি আমাদের মতো দেশে ধনী-দরিদ্রের এই ফারাকটা কত বিশাল। আয়ের তারতম্য থেকেই ঘটে অর্থনৈতিক অসাম্য। এই অসাম্যের কারণে রাজনৈতিক বা সামাজিক কোনো ক্ষেত্রেই নিম্নবর্গের মানুষের মতামতের কোনো দাম নেই, তাদের কোনো কার্যকর অংশগ্রহণও নেই।
অমর্ত্য সেন আমাদের আরও একটা জিনিসের দিকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন যে কার কী আয় বা কার নিয়ন্ত্রণে কত সম্পদ আছে, শুধু সেই হিসাব দিয়ে ধনী-দরিদ্রের প্রকৃত ফারাক বোঝা অসম্ভব। অন্যান্য মোদ্দা অর্জনের (বা সাবসট্যান্টিভ অ্যাচিভমেন্ট) কথাও মাথায় রাখা দরকার। একজন প্রতিবন্ধী মানুষের কথা ভাবুন। সমাজ চাইলে একজন প্রতিবন্ধীকে স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য যথোপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে দিতে পারে। কিন্তু সেই অবস্থা না হওয়া পর্যন্ত তার বিস্তর ধনসম্পদ থাকলেও একজন সুঠাম ব্যক্তির তুলনায় সে বহুলাংশে দরিদ্র রয়ে যাবে। একই কথা বৃদ্ধ বা নারীর বেলায়। অনেক দেশেই খুব মৌলিক মানবাধিকার থেকে তাঁরা বঞ্চিত, যদিও অর্থ বা উপার্জনের হিসাবে তাঁরা হয়তো মোটেই দরিদ্র নন।
ধনী-দরিদ্রের এই যে বৈষম্য, তা যে স্বতঃসিদ্ধ, এমন নয়। পরিকল্পিত ও নীতিগত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে কোনো দেশ শুধু যে জনপ্রতি আয়ের বৈষম্য কমাতে পারে তা-ই নয়, তাদের কার্যকর দারিদ্র্যের ফারাকও কমিয়ে আনতে পারে। কিন্তু সে জন্য দরকার বলিষ্ঠ রাজনৈতিক নেতৃত্ব। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী কোনো সরকারের পক্ষেই সম্ভব দেশের মোট সম্পদের অধিক ন্যায়সংগত বণ্টন এবং নাগরিক অধিকার ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধার অধিক ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সেই ফারাক কমিয়ে আনা।
একসময় ভাবা হতো যে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সম্পদ উৎপাদনের প্রতিটি ক্ষেত্রের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ অর্জনের মাধ্যমে ভারসাম্যপূর্ণ ও অধিক ন্যায়সংগত সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব। ক্লাসিক্যাল সমাজতন্ত্র ব্যর্থ—এ কথা অনেকে বলেন, এখন সেই তর্কে আমরা যাব না। কিন্তু প্রথাগত পুঁজিবাদী ব্যবস্থায়ও অধিক ন্যায়সংগত সমাজব্যবস্থা গঠন সম্ভব। পশ্চিম ইউরোপের কোনো কোনো দেশ, যেমন নরওয়ে বা ফিনল্যান্ড ভারসাম্য ও ন্যায়বিচার অর্জনে অনেকটা এগিয়ে গেছে। কিন্তু আমি উদাহরণ হিসেবে আমাদের মতো উন্নয়নশীল একটা দেশের কথা বলতে চাই। দেশটির নাম ব্রাজিল।
শুধু প্রবৃদ্ধির হিসাবে ব্রাজিলের সেরা সময় ছিল সত্তরের দশক, যখন সেখানে চলছিল কঠোর সামরিক শাসন। বছরপ্রতি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১০ শতাংশ বা তার চেয়েও বেশি। অথচ মোট সম্পদ বৃদ্ধি পেলেও দেশের অধিকাংশ মানুষ যে শুধু আয়ের দিক দিয়েই গরিব ছিল তা নয়, মৌলিক অধিকারের দিক দিয়েও ছিল হতবঞ্চিত। অবস্থাটা বদলাতে শুরু করল ২০০২ সাল থেকে, শ্রমিকনেতা লুলা দা সিলভা প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর। সরকার চাইলে সম্পদ নির্মাণে যেমন নেতৃত্ব দিতে পারে, তেমনি সেই সম্পদের ন্যায়সংগত পুনর্বণ্টনেও হস্তক্ষেপ করতে পারে—এই ছিল তাঁর বিশ্বাস। সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপের ফলে তাঁর সময় শ্রমিকদের ঘণ্টাপ্রতি বেতন বাড়ল, বেকারত্ব কমল, মানুষের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সুযোগও সম্প্রসারিত হলো। এমনকি বিনিয়োগগের ক্ষেত্রেও সুযোগ-সুবিধার অধিক সমতা অর্জিত হলো। লুলার উত্তরসূরি প্রেসিডেন্ট দিলমা রুসেফের সময়েও এই নীতি অব্যাহত থাকার ফলে গত ১৫ বছরে ব্রাজিল তার দরিদ্র মানুষের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনতে পেরেছে।
শুধু মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির হিসাবটা ধরলেই স্পষ্ট হবে পরিকল্পিত হস্তক্ষেপের ফলে বৈষম্য কীভাবে কমে আসে। ২০০০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে ব্রাজিলে নামিক বা নমিনাল অর্থে সর্বনিম্ন আয় বেড়েছে ২১১ শতাংশ। এমনকি মুদ্রাস্ফীতি বিবেচনায় নিয়েও এই বৃদ্ধির পরিমাণ ৬৬ শতাংশ। এই সময়ে গরিবি থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে এমন মানুষের সংখ্যা প্রায় তিন কোটি। মধ্যবিত্তের তালিকায় যুক্ত হয়েছে আরও চার কোটি মানুষ।
তাহলে মোদ্দাকথা হলো, শুধু প্রবৃদ্ধি বাড়াই যথেষ্ট নয়। ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির ফলে অতিরিক্ত যে সম্পদ অর্জিত হলো, তা থেকে দেশের আরও কত মানুষ লাভবান হলো, সেটাই আসল কথা। অধিকতর মোট সম্পদ সৃষ্টিতে বাংলাদেশ সক্ষম, গত ২০ বছরে সেই প্রমাণ আমরা রেখেছি। এখন যা দরকার তা হলো, সেই সম্পদ থেকে যাতে দেশের সব মানুষ, বিশেষ করে যারা অধিকারবঞ্চিত, তারা যাতে লাভবান হয়, সেদিকে নজর দেওয়া। এই কাজটা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। ব্রাজিল পারলে আমরাই বা পারব না কেন?
হাসান ফেরদৌস: যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি।

ইউরোপীয় শিক্ষাপদ্ধতি by জাবির আল ফাতাহ

স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ
বিদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে প্রতিনিয়ত অনেক প্রশ্নই আমাদের মনে জাগে। আমার দেশীয় বন্ধুরা এখানকার পড়াশোনার ধরন ও পাঠ্যক্রম বিষয়ে জানতে অনেক আগ্রহী। তাই এবার আমি বিশেষ করে সুইডেনের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখার ধরন নিয়ে আলোচনা করব।
অনেকে ভাবতে পারেন বিদেশ মানেই মেধা গড়ার কারখানা ও উন্নত দেশের স্কুল-কলেজে যারা অধ্যয়ন করে সবাই মেধাবী। এমন ধারণা করে থাকলে সেটা পুরোপুরি ভুল। সত্যটি হলো একটি উন্নত দেশের বেশির ভাগ মানুষই পরিশ্রমী ও স্বনির্ভর। কথায় আছে যে জাতি যত পরিশ্রমী সে জাতি তত উন্নত | সুইডেনে একটি বিদ্যালয় অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ে সকল শিক্ষার্থীরা সমান সুবিধা ভোগ করে ও মেধা বিকাশের সমান সুযোগ পায়। বাংলাদেশের মতো এখান ব্যাকবেঞ্চার স্টুডেন্ট বলতে কিছু নেই।
আমাদের দেশে কতিপয় শিক্ষার্থী খুব গুরুত্ব সহকারে প্রাইভেট পড়ে পরীক্ষায় একটি ভালো ফলাফল করার আত্মবিশ্বাস নিয়ে বেড়ে ওঠে। অন্যদিকে কেউ কেউ আর্থিক দুরবস্থার নানা কারণে কোচিংয়ে যেতে পারে না বলে মানসিক হীনমন্যতা তাদের দুর্বল করে রাখে। পরিণামে আত্মবিশ্বাস হারায়। আর এখানে ঠিক তার উল্টো | কোচিং বলতে কিছু আছে সেটা অনেকে জানেও না। সকল শিক্ষার্থী সমান উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে সামনে এগোয়। শিক্ষকেরাও শিক্ষার্থীদের জন্য অনেক সময় ও মেধা উৎসর্গ করেন | যতক্ষণ পর্যন্ত স্কুল চলবে একজন শিক্ষক তার শিক্ষার্থীদের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিতে চান।
পরীক্ষায় খারাপ, গণিতে কম নম্বর পাওয়া ও পড়াশোনায় মনোযোগ কম—এ ধরনের শিক্ষার্থী এখানেও অনেক আছে। স্কুল পর্যায়ে এ ধরনের ছেলেমেয়েদের জন্য বিশেষ দেখভাল করার ব্যবস্থা আছে। তাদের কখনোই নিরুৎসাহিত করা হয় না। দুর্বল শিক্ষার্থী বলে শ্রেণিকক্ষে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় না। আমাদের দেশে কেউ পরীক্ষায় কম নম্বর পেলে ভাবি ছেলে অথবা মেয়েটির মাথায় তো কিছু নেই! ভাবখানা এমন যে আমরা কেউ তার মাথার মধ্যে ঢুকে মেধা মাপক যন্ত্র সেট করে রেখেছি এবং সব সময় সেখান থেকে আপডেট পাচ্ছি। আসলে শুধুমাত্র কাগজে কলমে ও হাতে গোনা কয়েকটি পরীক্ষার ফলাফলের মাধ্যমে কারও বুদ্ধি যাচাই সম্ভব নয়। আর কারও মাথায় ঢুকে ব্রেন যাচাই করাও সম্ভব না।
উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের রিডিং রুম
এতক্ষণ বললাম পড়ালেখার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে। এবার এখানকার বিশ্ববিদ্যালয় ও সেগুলোতে উচ্চশিক্ষার প্রকৃতি নিয়ে কিছু বলতে চাই।
সুইডেনে বর্তমানে ৫৩টি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। সবগুলোই সরকারি অনুদানে পরিচালিত। এআরডব্লিউইউ-র (ARWU—Academic Ranking of World Universities) পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০০৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত সুইডেনের ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তালিকায় আছে। এর মধ্যে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের (স্টকহোম ইউনিভার্সিটি, উপসালা ইউনিভার্সিটি ও লুন্ড ইউনিভার্সিটি) অবস্থান বরাবরই বিশ্বের সেরা এক শর মধ্যে আছে। সব প্রতিষ্ঠান মোটামুটি একই কারিকুলাম অনুসরণ করে শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। ব্যাচেলর লেভেল তিন বছর ও মাস্টার্সের জন্য এক অথবা দুই বছর নির্ধারিত থাকে। এক শিক্ষাবর্ষে দুই সেমিস্টার সম্পন্ন করানো হয়।
প্রতি সেমিস্টারকে ৩০ ক্রেডিট সমমান ধরা হয়। শিক্ষা পদ্ধতি পরিচালনার জন্য অনলাইন প্ল্যাটফর্ম মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বহুল ব্যবহৃত একটি হলো ইটসলার্নিং (ওয়েবসাইট: itslearning. eu/)। ক্লাস ও কোর্স সম্পর্কিত যেকোনো আপডেট ইটসলার্নিং-এ পাওয়া যায়। যেকোনো অ্যাসাইনমেন্ট অথবা পেপার জমা দেওয়া ও শিক্ষক-সহপাঠীদের সঙ্গে যোগাযোগসহ যাবতীয় কাজ ইটসলার্নিংয়ের মাধ্যমে পরিচালনা করা হয়। কোনো পেপার হাতে লিখে জমা দেওয়া অথবা গ্রহণ করার প্রচলন নেই।
যেহেতু কোচিংয়ের কোনো রীতি নেই তাই ক্লাসে উপস্থিত থাকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ক্লাস চলাকালে কোনো শিক্ষকই হুটহাট করে নির্দিষ্ট করে একজন শিক্ষার্থীকে কোনো প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে বিপাকে ফেলতে চান না। ক্লাস শেষেও যে কেউ ইচ্ছা করলে শিক্ষকের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কোনো বিষয় বুঝে নিতে পারে। মোটামুটি সব শিক্ষকরাই বন্ধুসুলভ ও অত্যন্ত আন্তরিক। যদিও আন্তরিকতার মাত্রাটি শিক্ষকভেদে তারতম্য হতে পারে।
লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস
পরীক্ষার পদ্ধতি একটু অন্যরকম। বেশির ভাগ লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নই সৃজনশীল পদ্ধতিতে করা হয়। কিছু বিষয়ের পরীক্ষার সময় বই সঙ্গে রাখার অনুমতি থাকে। অনেকে ভাবতে পারেন বই দেখে পরীক্ষা দেওয়ার মানে কি? কিন্তু আসলে প্রশ্নপত্র এমনভাবে করা হয় যে, বই থেকে কোনো কিছু হুবহু খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনেক সাহায্য করতে পারে। যেমন গণিত পরীক্ষায় যে সূত্রগুলো সহজে মনে আসে না সেগুলো বই থেকে দেখে নেওয়া যায়। আবার বই থেকে কিছু তথ্য ও উপাত্তের প্রয়োজন হতে পারে যেগুলো মনে রাখা প্রায় অসম্ভব। পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত সময়কাল বেশ দীর্ঘই থাকে বলতে গেলে। সাধারণত একটি কোর্স ফাইনাল পরীক্ষা চার অথবা পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী হয়। একজন নিয়মিত ছাত্রের জন্য এই সময় যথেষ্ট। যেকোনো পরীক্ষায় কৃতকার্য হওয়ার জন্য কমপক্ষে ৫০% নম্বর পাওয়া আবশ্যক।
সবশেষে আমি বলব এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুধুমাত্র একেকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয় বরং পৃথিবীর বহু দেশ থেকে আগত নানা সংস্কৃতি ও চিন্তাধারার মিলনমেলা। বিভিন্ন দেশের বহু ভাষাভাষী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এক সাথে অধ্যয়নের মাধ্যমে পরস্পরকে জানা যায়। আরও জানা যায় বহির্বিশ্বের নানা অজানা তথ্য। এভাবে বহুজাতিক মানুষদের সঙ্গে মিলেমিশে গড়ে উঠে এক চমৎকার সৌহার্দ্যপূর্ণ সামাজিক বন্ধন। যেটার মাধ্যমে জ্ঞান ও জানার পরিধিকে বহু গুনে বিকশিত করার এক দারুণ সুযোগ মেলে।
(লেখক শিক্ষার্থী, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং)

রবীন্দ্রনাথের শেষ দিনগুলো by জাহীদ রেজা নূর

মৃত্যুর আগে শেষবারের মতো শান্তিনিকেতন ছাড়ছেন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জুলাই ১৯৪১ l ছবি: বিনোদ কোঠারি
৭৪ বছর আগে এই দিনটিতেই কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মারা যান। ক্যালেন্ডারের হিসাবে দিনটি ছিল ২২ শ্রাবণ, ৭ আগস্ট, এখন অবশ্য আমাদের দেশে দিনটি পালন করা হয় ৬ আগস্টে।
১৯৪১ সালে জীবনের শেষ দিনগুলোয় অসুখে ভুগছিলেন কবি। সারা জীবন চিকিৎসকের কাঁচি থেকে নিজেকে বাঁচিয়েছেন, এবার বুঝি আর তা সম্ভব নয়। হোমিওপ্যাথি, অ্যালোপ্যাথি চলছেই। কিন্তু কিছুতে কিছু হচ্ছে না। শান্তিনিকেতনে ছিলেন তখন। এরই মধ্যে অবনীন্দ্রনাথ বেশ কিছু গল্প লিখেছেন। সেগুলো পড়ে দারুণ আনন্দ পেলেন কবি। বললেন, আরও লিখতে। অবন ঠাকুর রানী চন্দকে গল্প বলে যান, রানী চন্দ সে গল্প শুনে লিখে ফেলেন। তারই কিছু আবার দেওয়া হলো রবীন্দ্রনাথকে। তিনি পড়লেন, হাসলেন এবং কাঁদলেন। রানী চন্দ এই প্রথম এমন করে রবিঠাকুরের চোখ থেকে জল পড়তে দেখলেন।
রানী চন্দ ছিলেন রবীন্দ্রনাথের প্রিয়ভাজন, শান্তিনিকেতনের শিক্ষার্থী ও চিত্রশিল্পী এবং রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত সচিব অনিল চন্দের স্ত্রী।
চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারের কথাই বললেন। রবীন্দ্রনাথের তাতে মত নেই। তিনি বললেন, ‘মানুষকে তো মরতেই হবে একদিন। একভাবে না একভাবে এই শরীরের শেষ হতে হবে তো, তা এমনি করেই হোক না শেষ। মিথ্যে এটাকে কাটাকুটি ছেঁড়াছেঁড়ি করার কি প্রয়োজন?’
কিন্তু যে যন্ত্রণায় কষ্ট পাচ্ছেন তিনি, তার উপশমের জন্য দেহে অস্ত্রোপচার করতেই হবে—এই হলো চিকিৎসকদের মত। আর সেটা করতে হলে শান্তিনিকেতনকে বিদায় জানিয়ে চলে আসতে হবে কলকাতায়। তাই শেষবারের মতো শান্তিনিকেতন ছাড়লেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ২৫ জুলাই বেলা তিনটা ১৫ মিনিটে রবীন্দ্রনাথ এলেন জোড়াসাঁকোর বাড়িতে।
খবরটা গোপন রাখায় স্টেশনে কিংবা বাড়িতে ভিড় ছিল না। পুরোনো বাড়ির দোতলায় ‘পাথরের ঘর’-এ তিনি উঠলেন। স্ট্রেচারে করে দোতলায় নিতে হলো তাঁকে। ২৬ জুলাই রবিঠাকুর ছিলেন প্রফুল্ল। ৮০ বছরের খুড়ো রবীন্দ্রনাথ আর ৭০ বছর বয়সী ভাইপো অবনীন্দ্রনাথ অতীত দিনের নানা কথা স্মরণ করলেন। হাসলেন প্রাণখুলে। ২৭ জুলাই সকালে রবীন্দ্রনাথ মুখে মুখে বললেন একটি কবিতা, টুকে নিলেন রানী চন্দ। কবিতাটির প্রথম কয়েকটি পঙ্ক্তি হলো: ‘প্রথম দিনের সূর্য প্রশ্ন করেছিল সত্ত্বার নতুন আবির্ভাবে, কে তুমি, মেলে নি উত্তর।’ ৩০ জুলাই ঠিক হয়েছিল তাঁর দেহে অস্ত্রোপচার হবে। কিন্তু সেটা তাঁকে জানতে দেওয়া হয়নি। তিনি ছেলে রথীন্দ্রনাথকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কবে অপারেশন হবে’। রথীন্দ্রনাথ বললেন, ‘কাল-পরশু’। আবার রানী চন্দকে ডাকলেন কবি, লিখতে বললেন: ‘তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি/ বিচিত্র ছলনাজালে/ হে ছলনাময়ী।’ ডা. ললিত এলেন একটু পরে। বললেন, ‘আজকের দিনটা ভালো আছে। আজই সেরে ফেলি, কী বলেন?’ হকচকিয়ে গেলেন কবি। বললেন, ‘আজই!’ তারপর বললেন, ‘তা ভালো। এ রকম হঠাৎ হয়ে যাওয়াই ভালো।’
বেলা ১১টায় স্ট্রেচারে করে অপারেশন-টেবিলে আনা হলো কবিকে। লোকাল অ্যানেসথেসিয়া দিয়ে অপারেশন করা হচ্ছে। ১১টা ২০ মিনিটের দিকে শেষ হলো অস্ত্রোপচার। ভারী আবহাওয়া উড়িয়ে দেওয়ার জন্য কবি রসিকতা করলেন, ‘খুব মজা, না?’
শরীরে যথেষ্ট যন্ত্রণা হয়েছিল অপারেশনের সময়। কিন্তু তা বুঝতে দেননি কবি। সেদিন ঘুমালেন। পরদিন ৩১ জুলাই যন্ত্রণা বাড়ল। গায়ের তাপ বাড়ছে। নিঃসাড় হয়ে আছেন। ১ আগস্ট কথা বলছেন না কবি। অল্প অল্প পানি আর ফলের রস খাওয়ানো হচ্ছে তাঁকে। চিকিৎসকেরা শঙ্কিত। ২ আগস্ট কিছু খেতে চাইলেন না, কিন্তু বললেন, ‘আহ! আমাকে জ্বালাসনে তোরা।’ তাতেই সবাই খুশি। ৩ আগস্টও শরীরের কোনো উন্নতি নেই। ৪ আগস্ট সকালে চার আউন্সের মতো কফি খেলেন। জ্বর বাড়ল। ৫ আগস্ট ডা. নীলরতন বিধান রায়কে নিয়ে এলেন। রাতে স্যালাইন দেওয়া হলো কবিকে। অক্সিজেন আনিয়ে রাখা হলো। ৬ আগস্ট বাড়িতে উৎসুক মানুষের ভিড়। হিক্কা উঠছিল কবির। পুত্রবধূ প্রতিমা দেবী ডাকছিলেন, ‘বাবা মশায়!’ একটু সাড়া দিলেন কবি। রাত ১২টার দিকে আরও অবনতি হলো কবির শরীরের। ৭ আগস্ট ছিল ২২ শ্রাবণ। কবিকে সকাল নয়টার দিকে অক্সিজেন দেওয়া হলো। নিশ্বাস ধীরে ধীরে ক্ষীণ হতে থাকল কবির। দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে তা একেবারে থেমে গেল।
জনারণ্যে পরিণত হয়েছে তখন ঠাকুরবাড়ি। কবিকে বেনারসি-জোড় পড়ানো হলো। কোঁচানো ধুতি, গরদের পাঞ্জাবি, চাদর, কপালে চন্দন, গলায় মালা দিয়ে সাজানো হলো। রানী চন্দ কবির বুকের ওপরে রাখা হাতে ধরিয়ে দিলেন পদ্মকোরক। কবি চললেন চিরবিদায়ের পথে।
আমরা বিশ্বকবির প্রয়াণ দিবসে তাঁর শেষদিনগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দিলাম পাঠককে। আমরা সেই কবির কথা বললাম, যিনি প্রকৃতি, প্রেম ও জগৎকে দেখার জন্য আমাদের চোখ খুলে দিয়েছেন। বাংলা ভাষায় রচিত সাহিত্যের প্রতিটি বিভাগেই দেখি তাঁর শক্তিমান উপস্থিতি। প্রয়াণ দিবসে বিশ্বকবি, আপনার জন্য রইল আমাদের শ্রদ্ধা।
(রানী চন্দ রচিত গুরুদেব অবলম্বনে।)

গোবর থেকে গাড়ির জ্বালানি! by আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ

মিটার দেখাচ্ছেন আবদুস সালাম। যেখানে সংকুচিত
বায়োগ্যাস উৎপাদনের পরিমাণ বোঝা যায় -প্রথম আলো
গরুর গোবর থেকে জৈব সার, কেঁচো সার, কীটনাশক ও বায়োগ্যাস উৎপাদন করছেন অনেক দিন ধরেই। এবার বায়োগ্যাস সংকুচিত করে মোটরগাড়ির জ্বালানি হিসেবে পরীক্ষামূলক ব্যবহার শুরু করেছেন আবদুস সালাম।
শুধু নিজের গাড়ির জন্যই নয়, এই জ্বালানির বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার ভাংড়া গ্রামের বাসিন্দা ডিপ্লোমা প্রকৌশলী আবদুস সালাম (৫১)। তিনি সড়ক ও জনপথ বিভাগের রাজশাহী সার্কেলের নকশাকার হিসেবে কর্মরত। ভাংড়া গ্রামে ১ একর ৬৯ শতাংশ জমির ওপর ‘স্বস্তি ডেইরি’ খামার গড়ে তুলেছেন তিনি। অফিস থেকে ফিরে বাকি সময়টা এই খামারেই ব্যয় করেন।
শুরুর কথা: ২০০৮ সালে ১২টি গরু নিয়ে খামার শুরু করেন। বর্তমানে গরুর সংখ্যা ৬৫টি। আবদুস সালাম জানালেন, এই খামার থেকে একে একে জৈব সার, কেঁচো সার, কীটনাশক ও বায়োগ্যাস উৎপাদন শুরু করেন। এরপর সংকুচিত বায়োগ্যাসের (সিবিজি) ধারণাটি মাথায় আসে তাঁর। মূলত খামারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ইন্টারনেটে ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে ২০১৩ সালে সংকুচিত বায়োগ্যাসের বিষয়টি জানতে পারেন। ইন্টারনেটেই এ বিষয়ে কিছু পড়াশোনা করেছেন। অন্য দেশে যাঁরা এটা নিয়ে কাজ করছেন, তাঁদের সঙ্গে নানাভাবে যোগাযোগ করেন। তাঁদের পরামর্শেই যন্ত্রপাতি কিনে সংকুচিত বায়োগ্যাসের উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছেন।
সিবিজির উৎপাদন প্রক্রিয়া: সংকুচিত বায়োগ্যাস উৎপাদনের জন্য যন্ত্রপাতি কেনা, সাজানো, বসানো—সবকিছু নিজেই করেছেন বলে জানালেন সালাম। উৎপাদন প্রক্রিয়ার ধাপগুলো আর প্রয়োজনীয় উপাদানের বর্ণনা দিলেন তিনি। খামারের গরুর প্রতিদিনের গোবরের সঙ্গে বাইরে থেকে কিনে নেওয়া আরও দুই টন গোবর যোগ করে প্রায় সমপরিমাণ পানি মিশিয়ে সেই মিশ্রণ ডাইজেস্টরে (মাটির নিচে স্থাপিত কনটেইনার) দেওয়া হয়। এই ডাইজেস্টরে গ্যাস তৈরি হয়। পাইপের মাধ্যমে তা খামারের পরিশোধন (রিফাইনার) যন্ত্রে যায়। সেখান থেকে ‘কম্প্রেসর’ যন্ত্রের মাধ্যমে সংকুচিত করে গ্যাস সিলিন্ডারে নেওয়া হয়।
আবদুস সালামের হিসাবমতে, বর্তমানে তিনি ১০০ থেকে ১২৫ ঘনমিটার সংকুচিত বায়োগ্যাস উৎপাদন করতে পারেন। জানালেন, প্রাথমিক পর্যায়ে এই গ্যাস প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয়টি হিউম্যান হলারে দেওয়া সম্ভব। তবে এ জন্য থ্রি-ফেজ বিদ্যুৎ লাইন প্রয়োজন। এ ছাড়া বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের জন্য বিস্ফোরক অধিদপ্তরের অনুমতির প্রয়োজন। থ্রি-ফেজ লাইনের জন্য ইতিমধ্যে আবেদন করেছেন। আবেদন করেছেন বিস্ফোরক অধিদপ্তরেও।
আবদুস সালামের আবেদন প্রসঙ্গে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের রাজশাহী কার্যালয়ের পরিদর্শক আসাদুল ইসলাম বলেন, দেশে ব্যক্তিগত পর্যায়ে এভাবে সংকুচিত বায়োগ্যাস উৎপাদনের প্রতিষ্ঠান নেই। অনুমতি দেওয়া না-দেওয়ার কোনো নীতিমালাও নেই। তাই স্থানীয়ভাবে কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে তাঁকে সদর দপ্তরে আবেদন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তিনি আবেদনও করেছেন। সিদ্ধান্ত দেওয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
এই সংকুচিত বায়োগ্যাস পরীক্ষামূলকভাবে সালাম নিজের গাড়িতে ব্যবহার করেছেন। সরকার এক ঘনমিটার গ্যাস ৩০ টাকা করে বিক্রি করছে। তিনি আশা করছেন, বেসরকারিভাবে এই গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার ৪৫ টাকা করে রাখা যাবে।
ভাংড়া গ্রামের হিউম্যান হলারচালক দবির উদ্দিন (৫০) বলেন, পরীক্ষামূলকভাবে তিনি স্বস্তি ডেইরি থেকে একদিন গ্যাস নিয়ে পাবনায় গেছেন। কোনো সমস্যা হয়নি। সিএনজির মতোই মনে হয়েছে। তিনি বলেন, এরা যদি গ্যাস দিতে পারে তাহলে পাঁচ-দশ টাকা করে বেশি নিলেও মানুষের উপকার হবে। গ্যাস আনার জন্য পাবনা বা বগুড়ায় যেতে হবে না।
সরেজমিনে একদিন: সম্প্রতি ওই খামারে গিয়ে দেখা যায়, খামারের ভেতরে একটি ঘরে গরুর জন্য যন্ত্রের সাহায্যে খড় কাটা হচ্ছে। একজন শ্রমিক দুধ মোড়কজাত করছেন। একটি ঘরের ভেতরে বস্তায় জৈব সার সাজিয়ে রাখা হয়েছে। এক পাশে কেঁচো সার পলিথিনের এক থেকে দুই কেজির প্যাকেটে সাজিয়ে রাখা হয়েছে।
সিবিজির উৎপাদন প্রক্রিয়ায় দেখা গেল, গরুর ঘর থেকে একটি নালা দিয়ে গোবর মিশ্রিত পানি খানিকটা দূরে একটি গর্তে গিয়ে জমা হয়েছে। সেখান থেকে তুলে তা ডাইজেস্টরে দেওয়ার জন্য একটি কুয়ায় ঢালা হচ্ছে। একটি বিরাট চৌচালা খড়ের ঘরের ভেতরে মাটির নিচে স্থাপন করা হয়েছে ডাইজেস্টর। সেখানে গ্যাস উৎপন্ন হচ্ছে। ডাইজেস্টরের ওপরে গ্যাসের চাপ মাপার জন্য একটি মিটার লাগানো রয়েছে। একটি নির্দিষ্ট সময় পরে ডাইজেস্টর থেকে ‘স্লারি’ পার্শ্বে একটি কুয়ায় গিয়ে জমা হচ্ছে। সেখানেই শ্রমিকেরা কীটনাশক আলাদা করছেন। আর ডাইজেস্টর থেকে গ্যাস পাইপের মাধ্যমে পরিশোধন (রিফাইনার) যন্ত্রে চলে আসছে। সেখান থেকে গ্যাস সংকোচন যন্ত্রের মাধ্যমে সংকুচিত করে সিলিন্ডারে ভরা হচ্ছে। সংকুচিত গ্যাস মজুতের জন্য কক্ষের বাইরে একটি বড় সিলিন্ডার বসানো হয়েছে।
সিবিজির পাশাপাশি জৈব সার ও কীটনাশক: ডাইজেস্টরে দেওয়ার ২৪ ঘণ্টা পর গোবর-পানির যে মিশ্রণ পাওয়া যায়—সেটাই ‘স্লারি’। স্লারি থেকে পানি আলাদা করা হয়। এই পানিটাই উৎকৃষ্ট মানের কীটনাশক, জানালেন সালাম। এই কীটনাশক প্রতিদিন পাঁচ শ লিটার করে উৎপাদিত হচ্ছে। তা এক টাকা লিটার দরে কিনে নিচ্ছেন স্থানীয় চাষিরা।
পুঠিয়ার বেলপুকুরে সবজি চাষ করেন রাশিদুল ইসলাম। তিনি বললেন, স্লারি নিয়ে বেগুন ও মরিচের জমিতে কীটনাশক হিসেবে ব্যবহার করে ভালো ফল পেয়েছেন তিনি।
স্লারি থেকে পানি আলাদা করার পরে যে উচ্ছিষ্ট থাকছে, তা পচনক্রিয়া শেষে উৎকৃষ্ট মানের জৈব সারে পরিণত হচ্ছে। প্রতিদিন খামারে এক টন জৈব সার তৈরি হচ্ছে। সাড়ে সাত টাকা কেজি হিসাবে খামার থেকে চাষিরা কিনে নিয়ে ব্যবহার করছেন শাকসবজির খেত, পেয়ারা বাগান, আম বাগান, ধান ও পাট খেতে।
পুঠিয়ার বিড়ালদহ গ্রামের রনি আহাম্মেদ ১০ বিঘা জমিতে পেয়ারার বাগান করেছেন। তিনি বলেন, সম্প্রতি পেয়ারায় পচন ও পোকার প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে স্বস্তি ডেইরি থেকে কীটনাশক কিনে পেয়ারা গাছে স্প্রে করেছেন। একবার ব্যবহার করার পরে ১৫ দিনেও কোনো পোকার আক্রমণ দেখা যায়নি। অথচ বাজারের রাসায়নিক কীটনাশক সাত দিন পরপর ব্যবহার করেও সুফল পাওয়া যায় না।
সালামের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, স্লারি ও জৈব সার উৎপাদন ছাড়াও মিশ্রণের কিছু উচ্ছিষ্ট কেঁচোর খাবার হিসেবে দেওয়া হচ্ছে। গড়ে ২০ দিন পরে তা কেঁচো সারে পরিণত হচ্ছে। এই সার প্রতি কেজি ১৫ টাকা দরে কৃষকেরা কিনে নিচ্ছেন। প্রতি মাসে খামারে দুই টন কেঁচো সার উৎপাদন হচ্ছে। এ ছাড়া এই খামার থেকে প্রতিদিন ২০০ থেকে ২৫০ লিটার পর্যন্ত দুধ পাওয়া যাচ্ছে। স্বস্তি ডেইরির প্যাকেটজাত তরল দুধ রাজশাহী শহরে বাজারজাত হচ্ছে।
বায়োগ্যাস নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ইডকল) ভাইস প্রেসিডেন্ট (করপোরেট অ্যাফেয়ার্স) নাজমুল হক বলেন, ব্যক্তিগত পর্যায়ে সংকুচিত বায়োগ্যাস উৎপাদনের ব্যাপারে আইনে স্পষ্ট কিছু বলা নেই। তিনি বলেন, যেহেতু গ্যাস উচ্চ চাপে সিলিন্ডারে ভরাতে হয়, তাই যথাযথ যন্ত্রপাতি না হলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। এর আগে বান্দরবানে এক ব্যক্তি এ ধরনের প্রকল্প করেছিলেন। নাজমুল হকের মতে, ব্যাপকভাবে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এর উৎপাদন আপাতত সম্ভব নয়। কারণ এ জন্য বড় আকারের বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট ও মূল্যবান যন্ত্রপাতি দরকার।
রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আলীম উদ্দীন বলেন, তিনি ওই খামার পরিদর্শন করেছেন। যে সার-কীটনাশক উৎপাদিত হচ্ছে, তা মানসম্পন্ন ও পরিবেশবান্ধব।
সালাম জানালেন, খামারে তাঁর ১০ থেকে ১২ জন শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। পারিশ্রমিক গড়ে ২৫০ টাকা করে। এর বাইরেও সব খরচ তিনি হিসাব করে দেখেছেন প্রকল্পটি বেশ লাভজনক। বললেন, সরকারি কোনো পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তিনি প্রকল্পটি বড় করতে পারেন। প্রতিটি উপজেলায় এ রকম খামার করা হলে দেশের ভূগর্ভস্থ গ্যাসের ওপর চাপ অনেকটা কমবে। উৎসাহী কোনো ব্যক্তি চাইলে স্বল্প পারিশ্রমিকে কারিগরি সহায়তা দিতেও প্রস্তুত তিনি।

সাবেক আইএসআই প্রধান গুলের মৃত্যু

হামিদ গুল
পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের সাবেক প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হামিদ গুল (৭৯) গত শনিবার রাতে মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণে মারা গেছেন। ১৯৮৭ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত আইএসআইপ্রধান ছিলেন তিনি। ভারত ও আফগানিস্তানে জঙ্গিবাদের উত্থানে তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। খবর রয়টার্সের। ক্ষমতাসীন দল পাকিস্তান মুসলিম লিগের (পিএমএল-এন) বিবৃতিতে বলা হয়েছে, (প্রধানমন্ত্রী) নওয়াজ শরিফ হামিদ গুলের মৃত্যুতে হৃদয়গ্রাহী সমবেদনা জানিয়েছেন। তিনি তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেছেন। ভারত ও আফগানিস্তান গুলকে তাদের ভূখণ্ডে জঙ্গিবাদের উত্থানে সহায়তাকারী সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ পাকিস্তানি কর্মকর্তা হিসেবে দেখে থাকে।
আইএসআইয়ের প্রধান থাকাকালে আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আফগান যোদ্ধাদের শক্তিশালী করতে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদির সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করেন গুল। সোভিয়েত বাহিনী হটানোর পর অনেক যোদ্ধাই তালেবানে যোগ দেয়। গুলের মেয়াদের শেষের দিকে পাকিস্তানি কর্মকর্তারা আফগান যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ও অস্ত্রগুলো লস্কর-ই-তাইয়েবার (এলইটি) মতো জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোতে ভেড়াতে কাজ শুরু করেন। ভারতশাসিত কাশ্মীরে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন হিসেবে ১৯৯০ সালে গড়ে তোলা হয় এলইটি।  আইএসআইপ্রধানের পদ ছাড়ার পর বহুবার টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন গুল। এসব সাক্ষাৎকারে তিনি তালেবান ও কাশ্মীরি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন।

ক্ষমতার মঞ্চে ফেরার প্রত্যাশায় রাজাপক্ষে

মাহিন্দা রাজাপক্ষের​ বিশাল পোস্টারের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন
এক শ্রীলঙ্কান। গল শহর থেকে শুক্রবার তোলা ছবি। রয়টার্স
ক্ষমতায় ফিরতে মরিয়া শ্রীলঙ্কার সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপক্ষে। কাল সোমবার দেশটির পার্লামেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে এবার প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসতে চান দেশটির একসময়ের প্রবল ক্ষমতাশালী এই নেতা। এবার কোনো একক দলের পক্ষে নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সম্ভব নয় বলে আভাস মিলছে। আর খোদ প্রেসিডেন্টসহ নানা পক্ষের বিরোধিতায় রাজাপক্ষেরও ক্ষমতার মঞ্চে প্রত্যাবর্তন সহজ হবে না বলেই বিশ্লেষকদের ধারণা। খবর এএফপির। দ্বীপরাষ্ট্রটির নির্বাচনী প্রচারে বড় বড় সমাবেশ করেছেন রাজাপক্ষে। ৬৯ বছর বয়সী এ নেতা এক বিশাল সমাবেশে তাঁর ফিরে আসার চেষ্টার পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেন, ‘এখন যারা ক্ষমতায় আছে, তারা যদি ভালোভাবে সবকিছু চালাত, তবে আমি অবসরই নিতাম। তবে তাদের একের পর এক ভুল দেখে আমি রাজনীতিতে ফিরতে একরকম বাধ্য হয়েছি।’ রাজাপক্ষে প্রায় এক দশক ধরে ক্ষমতায় ছিলেন। গত ৮ জানুয়ারির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সবাইকে বিস্মিত করে তিনি হেরে যান নিজ দল ইউনাইটেড পিপলস ফ্রিডম অ্যালায়েন্সের (ইউপিএফএ) সাধারণ সম্পাদক মাইথ্রিপালা সিরিসেনার কাছে। সিরিসেনা এর আগ পর্যন্ত একজন মন্ত্রী ও রাজাপক্ষের ঘনিষ্ঠ সহযোগীই ছিলেন। দীর্ঘ ৩৭ বছরের তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদী লড়াই অবসানে সাফল্যের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলি জনগোষ্ঠীর মধ্যে এখনো রাজাপক্ষের জনপ্রিয়তা রয়েছে।
তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, রাজাপক্ষের চরিত্রের মধ্যে বিভক্তির যে বৈশিষ্ট্য আছে, সেটির বিবেচনায় তাঁর পক্ষে কোনো জোট সরকার করা সম্ভব হবে না। বর্তমান পরিস্থিতি এমন যে, যিনিই নির্বাচনে জিতে প্রধানমন্ত্রী হতে চান, তাঁকে অন্য দলের সহায়তা নিতেই হবে। এবার কোনো দলের পক্ষে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন সম্ভব নয় বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। লন্ডনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা চাথাম হাউসের চেয়ারম্যান চারুলতা হোগ বলেন, ‘রাজনীতিতে রাজাপক্ষের প্রত্যাবর্তন শ্রীলঙ্কার জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে। তামিল ও মুসলিমদের কাছে তিনি অভিশাপস্বরূপ আর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের উজ্জ্বল উদাহরণ।’ সিংহলিদের ব্যাপক সমর্থন, নির্বাচনী সমাবেশে ব্যাপক জনসমাগমের পরও রাজাপক্ষের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে আরও বাধা আছে। প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা এখন ইউপিএফএ জোটের প্রধান। রাজাপক্ষের প্রার্থিতার বিষয়ে তিনি মোটেও রাজি ছিলেন না। নতুন সরকার গঠনের জন্য সিরিসেনা বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিঙ্গের ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টিকে (ইউএনপি) বেছে নেবেন বলে মনে করা হয়। সম্প্রতি সিরিসেনা এক সমাবেশে বলেই ফেলেন, ‘৮ জানুয়ারির নির্বাচনের নীরব বিপ্লবকে রক্ষা করুন।’ তাঁর কথায় বিশ্লেষকেরা রনিলকে সমর্থন দেওয়ার ইঙ্গিত খুঁজে পান। বিরোধীরা বলছেন, ভবিষ্যতে মামলায় জড়ানোর ভয় থেকেই রাজাপক্ষে আবার রাজনীতিতে নেমেছেন। ক্ষমতা যাওয়ার পর তাঁর স্ত্রী এবং দুই ভাই দুর্নীতির মামলায় ফেঁসেছেন। এক ছেলের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করা হয়েছে। চাথাম হাউসের চারুলতা হোগ বলেন, নিজেকে বাঁচানোর জন্যই রাজাপক্ষে নির্বাচনে নেমেছেন। জনসংখ্যা: ২ কোটি ৩ লাখ ২০ হাজার। সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতিগত সিংহলি (৭৪.৯%) সংখ্যালঘু তামিল (১৫.২৬%) ভোটার: দেড় কোটি। ১৮ বছরের বেশি বয়সীরা ভোটার রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান: প্রেসিডেন্ট প্রত্যক্ষ নির্বাচনে পাঁচ বছর করে দুই মেয়াদে নির্বাচিত হতে পারেন। আলাদাভাবে ২২৫ সদস্যের আইনসভা নির্বাচন হয়।

দুর্নীতি ভারতকে কুরে কুরে খাচ্ছে: মোদি

লালকেল্লা থেকে ভাষণ দিচ্ছেন মোদি
৬৯তম স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বললেন, দুর্নীতি দেশকে ঘুণপোকার মতো কুরে কুরে খাচ্ছে। দীর্ঘ ভাষণে তিনি দুর্নীতি ও দারিদ্র্য নির্মূল করারও ঘোষণা দেন। খবর টাইমস অব ইন্ডিয়া ও এএফপির। প্রথা মেনে গতকাল শনিবার রাজধানী দিল্লির লালকেল্লা থেকে স্বাধীনতা দিবসের ভাষণ দেন নরেন্দ্র মোদি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দ্বিতীয়বার এ ভাষণ দিলেন তিনি। হিন্দুত্ববাদীদের পছন্দের নেতা বলে পরিচিত মোদি সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ততা নিয়ে দেশবাসীকে সাবধান করে দেন। ভারতীয় প্রচারমাধ্যমে বলা হয়, ৮৫ মিনিট স্থায়ী ভাষণটি সম্ভবত ছিল ভারতের যেকোনো প্রধানমন্ত্রীর সবচেয়ে বেশি সময় ধরে দেওয়া স্বাধীনতা দিবসের ভাষণ। মোদির ভাষণে বারবার ফিরে আসে দুর্নীতির প্রসঙ্গটি। তিনি স্বীকার করেন, দুর্নীতি বাসা বেঁধেছে একেবারে ওপরের স্তরে। মোদি বলেন, ‘আমি আবার নিশ্চিত করে বলতে চাই, দুর্নীতির গ্রাস থেকে আমাদের মুক্তি পেতে হবে। একেবারে মাথা থেকে শুরু করতে হবে।’ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ এবং রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের দলীয় দুই মুখ্যমন্ত্রীর দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগের প্রেক্ষাপটে দুর্নীতির বিরুদ্ধে মোদির এই বক্তব্য এল।
সাবেক কংগ্রেসি সরকারের আমলে দুর্নীতির একের পর এক ঘটনার পর প্রশাসনকে দুর্নীতিমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েই ক্ষমতায় এসেছিলেন মোদি। তাই দলীয় নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তাঁকে বেশ বিব্রতকর অবস্থাতেই ফেলেছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁর সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ তুলে ধরে মোদি জানান, কালোটাকার মালিকদের কাছে থেকে এযাবৎ সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা আদায় করা হয়েছে। অনেকে আছেন যাঁরা এসব পছন্দ করছেন না। প্রধানমন্ত্রী মোদি গতকালের ভাষণে ‘স্টার্ট আপ ইন্ডিয়া, স্ট্যান্ড আপ ইন্ডিয়া’ নামে নতুন এক কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তাঁর এই কর্মসূচির মধ্যে আছে নতুন তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি, কৃষকদের কল্যাণ এবং দুর্নীতি ও সাম্প্রদায়িকতা দমন। মোদি তাঁর ভাষণে এক হাজার দিনের মধ্যে ভারতের প্রতিটি গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার জন্য রাজ্য সরকারগুলোর প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, দরিদ্র ১৭ কোটি মানুষের জন্য ব্যাংক হিসাব খুলে দেওয়ার প্রকল্প নিয়েছে তাঁর সরকার। উন্নয়ন পিরামিডের ভিত্তিমূলেই দরিদ্র মানুষ—এ মন্তব্য করে মোদি বলেন, ‘সেই ভিত্তিকে আমাদের শক্তিশালী করতে হবে।’ মোদির ভাষণের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে কংগ্রেস আমলের সম্প্রচারমন্ত্রী মনীশ তিওয়ারি বলেন, সম্প্রতি সরকারের যাঁদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পার্লামেন্টে উঠেছে, তাঁদের বাদ দেওয়ার নৈতিক সাহস দেখাননি প্রধানমন্ত্রী। দিল্লিভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি অলটারনেটিভসের মোহন গুরুস্বামী বলেন, ‘ওপরের কারা দুর্নীতি করে কত আয় করছে, গরিবদের তা নিয়ে ভাবনা নেই। পুলিশ বা সরকারি কর্মকর্তারা তাঁদের কাছ থেকে যখন ঘুষ নেন, বিষয়টি তখনই তাঁদের ভাবায়। সেটি বন্ধ না করা গেলে কোনো পরিবর্তন হবে না।’

৩০ হাজারে রফার নাটক নির্যাতনকারীর

দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশু নির্যাতনের আরো একটি ঘটনা। রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার বিনবিনার চরে চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র রাকিবুল ইসলামকে চুরির অপবাদ দিয়ে অমানবিক নির্যাতন করেছে স্থানীয় প্রভাবশালী কাজী তালেব মাস্টার ও তার ছেলেরা। রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রাকিবুল এখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। রাকিবুলকে নির্যা্তনের বিচার-সালিশে বেরিয়ে আসছে গা শিউড়ে ওঠা সব তথ্য। রশি দিয়ে বেঁধে লোহার রট দিয়ে মারধর, ইজকেশন দিযে অজ্ঞান করাসহ গরম পানি দিয়ে গায়ে ডলুনি, সূর্যের দিকে চোখ দিয়ে রাখার মতো নির্যাতন করা হয়েছে তাকে। অভিযোগ উঠেছে, পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় অভিযোগ দেয়া হলেও পুলিশ ও মাতবররা ৩০ হাজার টাকায় মীমাংসার নাটক বানানোয় আটক কাজী তালেবকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। শিশুটির উন্নত চিকিৎসা ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। নির্যাতিত রাকিবুলের মা আদুরী বেগম বলেন, “গত ২৮ জুলাই বিয়ে খেতে যাই আমি। কিন্তু ছেলে রাকিবুল সেদিন স্কুল যায়নি। স্কুল কামাই করার কারণে বাবার ধমক খেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে দিনমান ঘোরাফেরা শেষে আবুলিয়া বাজারে যায় রাকিবুল। সেখানে রাতে আশ্রয় নেয় কাজী তালেব মাস্টারের গালামালের দোকান বসুনিয়া ভ্যারাইটিজ স্টোরে। ভোরবেলা দারোয়ান টের পেয়ে খবর দেয় মালিককে। শুরু হয় চুরির অপবাদে অমানুষিক নির্যাতন।  রাকিবুল চুরির জন্য দোকানে ঢুকেছে অপবাদ দিয়ে তালেব কাজি, আসাদ, মিঠু, দুখু, সামাদ নামের ৫ যুবক তাকে রড দিয়ে পা, পেট, পিঠ, কোমরে নির্যাতন চালায়। একপর্যায়ে ইনজেনকশন দিয়ে তাকে অজ্ঞান করে পেটানো হয়। এতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে রাকিবুল।” আদুরী বেগম  জানান, সকালে এ নিয়ে বসে সালিশ। তালেব কাজি দাবি করেন ৩৮ হাজার ৫০০ টাকা দোকান থেকে চুরি হয়েছে। সেখানে রাকিবুলের বাবা আশরাফ আলী হলে তাকে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। দিনমজুর আশরাফ ছেলেকে তালেব কাজির হাতে  তুলে দিয়ে দয়া ভিক্ষা চান। তালেব কাজি আবার রাকিবুলকে বাড়িতে নিয়ে নির্যাতন চালান। বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত রশি দিয়ে বেঁধে নির্যাতন চালানো হয় স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য।  হাতে রশি বেঁধে মাটিতে শুইয়ে গায়ে গরম পানি দিয়ে ডলুনি দেয়া হয়। সূর্যের দিকে মুখ করিয়ে রাখা হয় দীর্ঘক্ষণ। এতে শিশুটি অজ্ঞান হয়ে পড়লে তালেব কাজীর স্ত্রী তাতে বাধা দেয়। তাকে নিয়ে যাওয়া হয় কালিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।” আদুরি বেগম বলেন, সেখানকার চিকিৎসকরা রাকিবুলকে ভর্তি না নিলে তাকে ফিরিয়ে আনা হয় আবুলিয়া বাজারে। ইতিমধ্যে বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেলে এলাকার মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। স্থানীয় ইউপি মেম্বার বাকের আলীর নেতৃত্বে আবার সালিশ বসে। প্রত্যক্ষদর্শী আমিনুর রহমান বলেন, “ছেলেটিকে যখন চোর সন্দেহে মারা হয় তখন আমি হাসের খামারে ছিলাম। দৌড়ে গিয়ে দেখি আসাদ, মিঠু, দুখু তাকে লাঠি দিয়ে খুব মারছে। আমি তাদের বারণ করি। তিন-তিনবার আমি তাদের কাছে থেকে বাচ্চাটিকে ছিনিয়ে নিই। কিন্তু তারা বারণ মানেনি। একপর্যায়ে আসাদ শিশু রাকিবুলকে মাটিয়ে শুইয়ে তার বুকের ওপর পা রাখলে আমি আসাদকে সতর্ক করে দিই।” বিষয়টি কেন পুলিশকে জানালেন না, জানতে চাইলে আমিনুর জানান, বাচ্চাটিকে এতটাই মারা হয়েছিল যে, আমি দিকজ্ঞান হারিয়ে ফেলে তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করছিলাম। রাকিবুলের চাচাতো ভাই দুলু মিয়া জানান, “সকালে মোবাইল ফোনে জানতে পেরে আমি বিছানা থেকে উঠে গিয়ে দেখি রাকিবুলকে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে। এখন রাবিকুলের অবস্থা খারাপ। আমরা তার উন্নত চিকিসা এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।” তিনি জানান, সব জানাজানি হওয়ার পর নির্যাকতনকারীরা ৩০ হাজার টাকা দেয়ার কথা বলে প্রতারণা করেছে। টাকাটি এখনো পায়নি রাকিবুলেল বাবা। দিনমজুর বাবা খুব কষ্ট করে তার চিকিৎসা চালাচ্ছে।”   ইউপি সদস্য বাকের আলী বলেন, “শিশুটিকে আনা হলে দেখা যায় তার ওপর অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে। সালিশে স্থানীয়রা সকালের বিচারের তীব্র প্রতিবাদ করেন। তারা আগের বিচার বাতিল করে শিশুটির চিকিৎসার জন্য ৩০ হাজার টাকা তালেব কাজির জরিমানা করা হয়।”  ইউপি সদস্য জানান, টাকাটা সাথে সাথে নেয়া হয়। কিন্তু শিশুটিকে তখনো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। নির্যাতিত শিশুর চাচা আতাউর রহমান জানান, “রাকিবুলকে উদ্ধার করতে না পেরে আমি সন্ধায় নদী পার হয়ে গিয়ে কম্পিউটার কম্পোজ করে থানায় মামলার জন্য একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করি। সঙ্গে সঙ্গে এসআই ফজলু কনস্টেবলসহ গিয়ে রাকিবুলকে উদ্ধার করে গঙ্গাচড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করায়। এরই মধ্যে রাকিবুলের অবস্থার অবনতি হলে তাকে আমরা রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসাপাতালের অর্থোপ্যাডিক বিভাগে ভর্তি করি। আমরা সালিশের কোনো টাকা পাইনি।” আতাউর রহমান আরো বলেন, “আমি রাকিবুলকে রংপুরে হাসপাতালে ভর্তি করে নদী পার না হয়ে কোলকোন্দে আত্মীয়ের বাড়িতে থাকি। কোলকোন্দ থেকে আমাকে তালেব কাজির ছেলে নাইম, ফারুক, আমিনসহ ৪/৫ জন জোর করে থানায় নিয়ে যায়। পরে এসআই ফজলু আমাকে ওসির কাছে নিয়ে গেলে সেখানে দেখি তালেব কাজি ও মেম্বার বাকেরও আছেন। এ সময় ওসি সাহেব বলেন, তুমি কী করবে। মামলা করবে কি না। তখন আমি বলি, “স্যার আমি তো রাকিবুলের চাচা। ওর বাবা মেডিক্যালে আছে। ওদের সাথে কথা বলতে হবে। তখন ওসি বলে,  ঠিক আছে বিষয়টি যেহেতু মীমাংসা হয়েছে তাই দুটি কাগজে সই করো। আর চিকিৎসা করার জন্য যা টাকা লাগবে তা তালেব কাজি দেবে।” এরপর তারা আমার কোনো কথা কানে না নিয়ে আমাকে জোর করে সই নিয়ে বলে মীমাংসা হয়ে গেছে।” এ ব্যাপারে ইউপি সদস্য বাকের আলী বলেন, “কাজী তালেবকে যখন থানায় আটক করা হয় তখন আমাকে ফোন দেয়া হয়। সেখানে গিয়ে আতাউর ও কাজী দুটি কাগজে সই করে। সেখানে আরও ৫ হাজার টাকা দেয়া হয়।” এ প্রসঙ্গে রাকিবুলের চাচা আতাউর রহমান বলেন, “আমাদের কোনো টাকা দেয়া হয়নি। তারা দালালকে টাকা দিয়েছে।” বিষয়টি থানায় ওসির সামনে অভিযুক্ত কাজী তালেবও স্বীকার করেন। গঙ্গাচড়া থানার অফিসার ইনচার্জ আব্দুল কাদের জানান, “আমাদের কাছে এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ দেয়া হয়নি। আমরা সেলফোনে বিষয়টি জেনে এসআই ফজুলকে পাঠিয়ে ছেলেটিকে প্রথমে গঙ্গাচড়া ও পরে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করাই। তাদের কাছ থেকে অভিযোগ চাই, কিন্তু কেউ অভিযোগ না করায় এসআই ফজলু নিজেই বাদী হয়ে একটি সুয়োমুটো মামলা করেছে। খোঁজ খবর রাখছি। তদন্ত চলছে। যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।”   তবে পুলিশের ভাষ্যকে সঠিক নয় বলে দাবি করছে পরিবারের লোকজন। রাকিবুলের চাচা আতাউর রহমান জানান, “আমি নিজেই কম্পিউটার কম্পোজ করে থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। এখন পুলিশ বলছে আমরা নাকি অভিযোগ দেইনি।” এ ব্যাপারে হাসান নামের এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, “আমিও আতাউর রহমানের সাথে ছিলাম অভিযোগ দায়েরের সময়। পরে কয়েক দিন মামলা রেকর্ড করার জন্য যোগাযোগ করি। কিন্তু পুলিশ আমাদের কোনো কথা শোনেনি।” এদিকে বিনবিনারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র রাকিবুলের ওপর নির্যাছতনের ঘটনায় ও তার করুণ অবস্থা দেখে ফুঁসে উঠেছে এলাকাবাসী। তারা শনিবার বিকালে ওই এলাকায় মানববন্ধন করে শিশু নির্যাতনকারীদের বিচার দাবি করে। রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপ্যাডিক্স বিভাগে চিকিৎসাধীন শিশু রাকিবুলের উন্নত ও সুচিকিৎসা নিশ্চিতের পাশাপাশি প্রভাবশালী তালেব কাজি ও তার লোকজনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন এলাকাবাসী। রাকিবুলের বাবা আশরাফ আলী বলেন, “নির্যাসতনের কারণে আমার ছেলে খুব অসুস্থ। তার উন্নত চিকিৎসা দরকরা। আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে এর বিচার দাবি করছি। আমি আবার আমার ছেলেকে সুস্থ দেখতে চাই। নির্যাতনকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।” আরডিআরএসের  মানবাধিকারকর্মী বিলকিস বেগম বলেন, “রাকিবুলের ওপর নির্যাতনের বিষয়ে পুলিশের কাছে বিচার না পেয়ে তার পরিবার আমাদের জানায়। আমরা তদন্ত করে দেখেছি বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা চলছে। আমরা পুলিশকে বলেছি রাকিবুলকে সেফ হোমে রাখার জন্য “ তিনি বলেন, “আমরা সব ধরনের সহযোগিতা দেব রাকিবুলের পরিবারকে।” রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপ্যাডিক্স বিভাগের প্রধান ডা. শফিকুল ইসলাম শফিক বলেন, “আমরা সর্বোচ্চ চিকিৎসা দিচ্ছি শিশুটিকে। শিশুটির পায়ে, কোমরে যেভাবে নির্যাতন করা হয়েছে, তা অমানবিক। আমরা চেষ্টা করছি তাকে সারিয়ে তোলার জন্য। তবে সময় লাগবে।”

একই পরিবারের ৮ সদস্যকে খুন, নেপথ্যে যে কাহিনী...

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের হিউস্টন শহরে ঘটে গেলো নৃশংস এক হত্যাকান্ডের ঘটনা। একই পরিবারের ৮ জনকে হত্যা করলো ঘাতক। তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং আদালতে শুনানি শুরু হয়েছে। ৬ শিশু ও তাদের পিতামাতাসহ ৮ জনকে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়। হত্যাকান্ডের কারণ অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ৬ সন্তানের মায়ের সঙ্গে সাবেক প্রেমিকের বিতর্কের জের ধরে নির্মম এ হত্যাকা- চালিয়েছে ৪৮ বছর বয়সী ডেভিড কনলি নামের ওই ব্যক্তিকে। এর আগেও ওই ব্যক্তি সহিংস অপরাধ কর্মকা- ঘটিয়েছে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এপি। কনলির বিরুদ্ধে হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। নিহত অধিকাংশের হাতে হ্যান্ডকাফ বা হাতকড়া পরানো ছিল। হ্যারিস কাউন্টি শেরিফের কার্যালয়ের প্রধান তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ সার্জেন্ট ক্রেইগ ক্লপটন জানান, এর মধ্যে কয়েকজনকে বেশ কয়েকবার গুলি করা হয়েছে। নিহতরা হলেন, ডেওয়েইন জ্যাকসন (৫০), তার স্ত্রী ভ্যালেরি জ্যাকসন (৪০), এবং তাদের সন্তান ডেওয়েইন (১০), অনেস্টি (১১), ক্যালেব (৯), ট্রিনিটি (৭)। এদিকে ওই নারীর সঙ্গে পূর্বে হত্যাকারীর সম্পর্ক ছিল। ঘাতক কনলি ও ভ্যালেরির সন্তান ১৩ বছরের ন্যাথানিয়েলকেও হত্যা করে কনোলি। হত্যাকারীর উদ্দেশ্য নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা রয়েছে পুলিশ। বিশেষ করে এতোগুলো শিশুকে হত্যার কোন কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না কর্মকর্তারা। গতকাল আদালতে হত্যা মামলায় প্রথম শুনানিতে উপস্থিত ছিল না হত্যাকারী। গ্রেপ্তারের একটি বিবৃতি আদালতে পড়ে শোনানো হয়। শনিবার কখন এ হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটে, তা জানাতে অস্বীকৃতি জানান তদন্ত কর্মকর্তারা। তাদের মধ্যে কেউ বেঁচে আছেন কিনা, তাও নিশ্চিত করেননি। তবে বিভিন্ন সূত্রে বলা হচ্ছে, হামলায় ওই পরিবারের সবাই নিহত হয়েছে। ১৯৮৮ সালেও কনলির বিরুদ্ধে অপরাধের রেকর্ড ছিল। গত মাসে ভ্যালেরিকে আঘাত করার অভিযোগে অভিযুক্ত হয় কনলি। আদালতে পেশ করা নথি অনুযায়ী, যে বাড়িতে এ হত্যাকা- সংঘটিত হয়েছে, সেখানেই তারা ডেটিং করছিলেন। ২০১৩ সালে ছুরি দিয়ে ভ্যালেরিকে ভয় দেখানোর অভিযোগ আনা হয়েছিল ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে। ৯ মাস সে সময় জেলে ছিল সে। ২০০০ সালেও সে সময়কার গার্লফ্রেন্ড, তার শিশু সন্তানকে ছুরিকাঘাতে হত্যার হুমকি দেয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিল কনলি। আত্মহত্যাও করতে চেয়েছিল সে।

বৃটেনে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত টিনএজারদের ভাড়ায় ‘শখ’ পূরণ

বৃটেনের দরিদ্রতম বরোগুলোতে (প্রশাসনিক এলাকা) টিন-এজ কিশোর কিশোরীরা দামী গাড়ি হাঁকাচ্ছেন তাদের স্কুলের সমাপনী দিনটি উদযাপনের জন্য। চোখ-ধাঁধাঁনোভাবে নিজেদের উপস্থাপন করতে চান তারা। গাড়ি ভাড়া নেয়া অধিকাংশ শিক্ষার্থীই বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত। টাওয়ার হ্যামলেটস, ইস্ট লন্ডনের মতো অঞ্চলের ১৬ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীরা ল্যাম্বরগিনি, ফেরারি ও বেন্টলির মতো বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় নামকরা ব্র্যান্ডের সুপারকার হাঁকাচ্ছেন। গাড়িগুলো কেনার সাধ্য তাদের বা তাদের পরিবারের নেই। তাই কয়েকদিনের জন্য ভাড়া নিয়ে বিশেষ একটি শখ পূরণ করেন।
বৃটেনের টাওয়ার হ্যামলেটসে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত বৃহত্তম সম্প্রদায়ের বসবাস। ওই এলাকাগুলোতে একটি বাড়ি কেনার চেয়ে তাদের ভাড়া করা চোখ-ধাঁধাঁনো অধিকাংশ গাড়ির দাম আরও বেশি। তারপরও ন্যাশনাল রেকর্ড অব অ্যাচিভমেন্টের (এনআরএ) অনুষ্ঠানের জন্য তারা আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে চেষ্টার ত্রুটি রাখেন না। স্কুলে এনআরএ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সান্ধ্য পোশাকে সেজে তারা তাদের ভাড়া করা সুপার কারের সঙ্গে বিভিন্ন পোজে ছবি তোলেন ও ভিডিও করেন এবং অনলাইনে পোস্ট করেন। অনুষ্ঠানে পুরস্কার ও সনদ তুলে দেয়া হয় কৃতী ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে। অনুষ্ঠান শেষে সবাই একসঙ্গে ঘুরতে বেরোন। দামী গাড়ি ছেড়ে একসঙ্গে স্যালুন জাতীয় কোন গাড়ি বা আরও বড় কোন যানবাহনে একসঙ্গে আনন্দযাত্রা করে কিংবা সড়কে তারা গাড়ি চালানোর প্রতিযোগিতায় নামেন।
গর্বের সঙ্গে ওই শিক্ষার্থীরা জানাতে দ্বিধা করছেন না যে, পূর্ব লন্ডনের কাঁকরম-িত সড়কে ল্যাম্বরগিনি, ফেরারি ও এমনকি বেন্টলির মতো গাড়ি তারা ভাড়া করেছেন শুধু অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যই। কিছুটা সময় স্পটলাইটে থাকার বাসনা পূরণ করতেই তাদের এ ভাবনা। বৃটেনের বাজারে এর একেকটি গাড়ির মূল্য ৩ লাখ পাউন্ড পর্যন্ত হতে পারে। অথচ, ওই বরোর কয়েকটি অংশে এক বেডরুমের একটি ফ্ল্যাটের দাম পড়বে ৭০ হাজার পাউন্ড। ন্যাশনাল রেকর্ড অব অ্যাচিভমেন্ট (এনআরএ)-এর অনুষ্ঠানে অংশ নিতে শিক্ষার্থীরা দল বেঁধে নিজেদের চোখ ধাঁধাঁনো করেই অন্যদের সামনে উপস্থাপন করতে চান।
সোয়ানলি স্কুলের ছাত্র ফয়জুর রহমান বলছিলেন, এটা মূলত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। গান বাজানো, এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় গাড়ি হাঁকিয়ে বেড়ানো, সেখান থেকে আরেক এলাকায়। এ বছর স্কুলের সমাপনী ওই অনুষ্ঠানটিতে অংশ নিয়েছিলেন ফয়জুর। এক বন্ধুর সঙ্গে ৪০০ পাউন্ড ভাগাভাগি করে ৪ দিনের জন্য একটি অডি এস৪ ভাড়া নিয়েছিলেন। তিনি বলছিলেন, আপনার গাড়ি দেখানো, সবাই আপনাকে দেখছে। এটা সবার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে বা স্পটলাইটে থাকার মতো ব্যাপার।
ইব্রাহিম হুসেইন নামে একজন তার ভাইয়ের গাড়ি ভাড়া দেয়ার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। খ-কালীন কর্মচারী সেখানে চাকরি করছেন। তারা এ ধরনের অনুষ্ঠানের জন্য গাড়ি ভাড়া দিয়ে থাকেন। ইব্রাহিম বলছিলেন, প্রতিবার যখন এনআরএ আসে, কিশোর-কিশোরীদের জন্য সুখময় উত্তেজনা বোধ করেন। তিনি বলছিলেন, কিছু মানুষ অবশ্যই পয়সা খরচ করতে চান না। আপনি সেটা বুঝতে পারেন। তাদের পিতামাতা হয়তো কোন কাজ করেন না। তবে কিছু কিশোর-কিশোরী বেশ উত্তেজনা বোধ করে। অল্প বয়স থেকেই পয়সা জমাতে শুরু করে তারা এবং গাড়িগুলো ভাড়া নিতে চায়। ইয়ুথ অ্যান্ড কমিউনিটি অর্গানাইজেশন ‘ওসমানি ট্রাস্ট’-এর এক সিনিয়র তরুণ-কর্মী আবদুল হাসনাত। ১৪ বা ১৫ বছর আগে প্রমের মতো উদযাপন শুরু হয়। শিক্ষার্থীরা সে সময় লিমোজিন ভাড়া করতো। এরপর থেকে আরও দামী গাড়ির প্রতি উৎসাহ তৈরি হয়েছে। তিনি জানাচ্ছিলেন, প্রথমদিকে বেশ অল্পসংখ্যক শিক্ষার্থীই এ চল শুরু করে। কিন্তু, এখন সম্ভবত শিক্ষার্থীদের ডায়েরিতে ঈদ ও অন্যান্য বিশেষ দিনসহ এ দিনটি সবচেয়ে বিশেষ উপলক্ষ। ১৬ বছর গাড়ি চালানোর জন্য উপযুক্ত বয়স নয়। তাই গাড়ি ভাড়া করার প্রতিষ্ঠান কিংবা বন্ধু-বান্ধব বা আত্মীয়-স্বজনের সাহায্য নিয়ে থাকে কিশোর-কিশোরীরা।
কোন কোন টিনএজারের জন্য এতো অর্থ একসঙ্গে যোগাড় করাটা দুরূহ হয়ে পড়ে। বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ছাড়াও বৃটিশ বা অন্য দেশের শিক্ষার্থীরাও এমন গাড়ি ভাড়া করছেন। সোয়ানলি স্কুলের ছাত্র স্টিফ্যান বোলোম্পা বলছিলেন, প্রথমবার যখন তিনি তার মাকে এতো দাম দিয়ে একটি গাড়ি ভাড়া নেয়ার কথা বলেছিলেন, পরিবারের বাজেটের সঙ্গে তার এ ব্যয়টা একেবারেই সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। শেষ পর্যন্ত একটি চোখ ধাঁধাঁনো একটি গাড়ি তিনি ঠিকই যোগাড় করতে পেরেছিলেন। এ জন্য তার এক বন্ধুর মায়ের ধন্যবাদ প্রাপ্য। বন্ধুটির মায়ের সঙ্গে একটি প্রতিষ্ঠানের জানাশোনার কারণে তিনি একটি রেঞ্জ রোভার স্পোর্টস কার বিনামূল্যে যোগাড় করে দিতে পেরেছিলেন। গাড়িটি পাওয়া তার জন্য বিশাল কোন প্রাপ্তির মতোই ছিল।

পান্থপথ–ফার্মগেট সড়ক: রাস্তা–ফুটপাত দখল করে রিকশার অবৈধ গ্যারেজ by মোছাব্বের হোসেন

গ্রিন রোডের ফুটপাতটি দখল করে তৈরি হয়েছে
রিকশার গ্যারেজ। রিকশা মেরামতের জায়গা
হিসেবেও এটি ব্যবহৃত হচ্ছেl -মনিরুল আলম
রাজধানীর পান্থপথ থেকে ফার্মগেট আনন্দ সিনেমা হলে যাওয়ার পথে হাতের ডান দিকের সড়ক ও ফুটপাত দখল করে গড়ে উঠেছে রিকশার অবৈধ গ্যারেজ। এতে এই রাস্তায় তীব্র যানজট হচ্ছে। দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে পথচারীদের।
স্থানীয় ব্যক্তিদের অভিযোগ, জনগণের ভোগান্তিকে তোয়াক্কা না করে সরকারি দলের নাম ভাঙিয়ে রাস্তা-ফুটপাত দখল করে রিকশা গ্যারেজ তৈরি করে চাঁদা তোলা হয়।
সরেজমিনে গত বুধবার সকালে দেখা গেছে, পান্থপথ থেকে ফার্মগেটে যাওয়ার ডান দিকের এই সড়ক-ফুটপাত পুরোটাই দখল। প্রায় ৩০০ রিকশা নিয়মিত এখানে রাখা হচ্ছে। ফুটপাতে রিকশা রাখার পর আর অবশিষ্ট জায়গা না থাকায় সড়কের ওপরেও রিকশা সারি করে রাখা হয়েছে। রাস্তার ওপর কিছুদূর পরপর রিকশার মিস্ত্রি সরঞ্জাম নিয়ে বসে মেরামতের কাজ করছেন। এর ফাঁকে ফাঁকে ফুটপাতের ওপরেই বসেছে চায়ের দোকান। ফলে ওই ফুটপাত দিয়ে পথচারীদের চলার জায়গা নেই, এমনকি রাস্তারও অনেকটা অংশ দখলে। এর ফলে সড়ক সংকীর্ণ হয়ে গেছে, সারা দিন যানজট লেগেই আছে।
কিন্তু সন্ধ্যার পরের চিত্র আরও কিছুটা ভিন্ন। সরেজমিনে দেখা গেছে, সন্ধ্যার পর রিকশাচালকেরা রিকশা জমা দিতে আসেন, রাত যত বাড়তে থাকে, রিকশার সংখ্যাও বাড়তে থাকে। তখন আরও বেশি অংশজুড়ে এই দখল ছড়িয়ে পড়ে। সন্ধ্যার পর মাদকসেবীরা দাঁড় করিয়ে রাখা সেই সব খালি রিকশায় বসে গাঁজা সেবন ও মাদক গ্রহণ করে। এই রাস্তায় রাত গভীর হলে ছিনতাইয়ের অভিযোগও রয়েছে।
এই পথে নিয়মিত যাতায়াত করেন মো. আলম। তিনি বলেন, ‘ফুটপাত তো দখল হয়েছেই, রাস্তাও দখল। বাধ্য হয়ে বাঁ দিকের ফুটপাত দিয়ে চলি। এভাবে দখল করে রিকশার গ্যারেজ হয় কীভাবে? নিশ্চয় কারও ব্যাকআপ আছে ওদের।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, এখানে রিকশার গ্যারেজে বিল্লাল হোসেন ওরফে কালাম, লিটন, এরশাদ, সুলতানসহ আরও কয়েকজনের প্রায় ৩০০ রিকশা আছে। এই প্রতিবেদকের সঙ্গে এঁদের চারজনের কথা হয়। এখানে রিকশার অবৈধ গ্যারেজ স্থাপনের কথা তাঁরা প্রত্যেকেই স্বীকার করেছেন। তাঁদের ভাষ্য, তাঁদের কোনো গ্যারেজ না থাকায় তাঁরা এখানে গ্যারেজ বানিয়েছেন। রাস্তার ওপরই মেরামত করার কাজ সারেন তাঁরা। তবে তাঁরা জানিয়েছেন, প্রতিটি রিকশা রাখার জন্য দৈনিক ১২ টাকা দিতে হয়। এই হিসাবে ৩০০ রিকশার জন্য দৈনিক এখান থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকা ওঠে। মাসে এই টাকা এক লাখ ছাড়িয়ে যায়। আবদুল্লাহ নামের একজন এই চাঁদা নেন। যিনি নিজেকে এই এলাকার ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কাছের লোক আর ক্ষমতাসীন দলীয় কর্মী হিসেবে পরিচয় দেন। চাঁদা তোলার বিষয়ে কথা বলতে চাইলে আবদুল্লাহ এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
গ্যারেজের সঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যালয়। সেখানের কর্মকর্তারাও এই গ্যারেজের কারণে বিরক্ত। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনজন কর্মকর্তা জানান, এখান দিয়ে আসতে উল্টো পথের রাস্তা ও ফুটপাত ব্যবহার করতে হয়। গাড়ি নিয়ে প্রবেশে সমস্যা হয়। এর নিয়ন্ত্রণে দলীয় লোক থাকায় প্রতিবাদ করা যায় না।
কয়েকজন রিকশাচালক নিয়মিত এখান থেকে রিকশা নেন। তাঁরা বলেন, প্রতিটি রিকশা সকাল ছয়টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত নিলে জমা দিতে হয় ১০০ টাকা। ফার্মগেটের আশপাশের এলাকায় তাঁরা এই রিকশা চালান। তাঁরাও স্বীকার করেন, এখানে রিকশা থাকার কারণে তাঁদেরও বাড়তি যানজটে পড়তে হয়।
এই এলাকা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৫ নম্বর জোন ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত। এ বিষয়ে কথা বলার জন্য যোগাযোগ করা হলে ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ফরিদুর রহমান খান ফোন ধরেননি।
দখলের বিষয়ে জানতে চাইলে এই জোনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, তিনি এই জোনে কয়েক দিন আগে যোগ দিয়েছেন। তবে ফুটপাত দখলের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

অ্যাসাঞ্জের বিষয়ে সুইডেন ও ইকুয়েডরের সমঝোতা?

জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ
আলোচিত ওয়েবসাইট উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের বিষয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে ইকুয়েডরকে একটি প্রস্তাব দিয়েছে সুইডেন। এর আওতায় সুইডেনের কৌঁসুলিরা লন্ডনে ইকুয়েডরের দূতাবাসে আশ্রয় নেওয়া অ্যাসাঞ্জকে সেখানেই জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন। মনে করা হচ্ছে, এতে তাঁকে নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে দীর্ঘ টানাপোড়েনের অবসান ঘটতে পারে। খবর গার্ডিয়ানের।
যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন সরকারের লাখ লাখ স্পর্শকাতর গোপন নথি ফাঁস করে বিশ্বব্যাপী হইচই ফেলা অস্ট্রেলীয় নাগরিক অ্যাসাঞ্জ ২০১২ সালের জুনে লন্ডনে ইকুয়েডরের দূতাবাসে আশ্রয় নেন। সুইডেনে প্রত্যর্পণ এড়াতে এ কাজ করেন তিনি। একসময়ের দক্ষ হ্যাকার অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে ২০১০ সালে স্টকহোমে দুই নারী যৌন হয়রানির মামলা করেছেন। এ মামলায় তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চায় সুইডেন। তবে অ্যাসাঞ্জের দাবি, ওই যৌন হয়রানির অভিযোগগুলো সাজানো। তাঁর আশঙ্কা, সুইডেন তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিতে পারে।
সুইডেনের বিচার মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইকুয়েডরের সঙ্গে এ নিয়ে সরাসরি আলোচনা শুরু করতে সুইডেনের সরকার রাজি হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হবে, অপরাধসংক্রান্ত বিষয়গুলোতে আইনি সহযোগিতার জন্য ‘একটি সাধারণ সমঝোতা’র সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা। মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও অ্যাসাঞ্জের মামলার দায়িত্বে থাকা সিসিলিয়া রিড্ডেসেলিয়াস বলেন, ‘আসন্ন বৈঠকগুলোতেই দেখা যাবে, সামনে এগিয়ে যাওয়া যায় কি না।’
এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে সুইডেন অ্যাসাঞ্জ প্রশ্নে কিছুটা ছাড় দিল বলেই মনে করা হচ্ছে। অগ্রগতি আটকে দেওয়ার বিষয়ে দেশ দুটি একে অপরকে কড়া ভাষায় সমালোচনা করার পর এই পদক্ষেপ এল।
জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে নিয়ে দীর্ঘ অচলাবস্থার কারণে যুক্তরাজ্যও ক্রমবর্ধমানভাবে বিরক্ত হচ্ছে। অ্যাসাঞ্জের ওপর কড়া নজরদারি অব্যাহত রাখতে লন্ডনে ইকুয়েডরের দূতাবাসের চারপাশে পুলিশি পাহারা বসিয়ে ব্রিটিশ সরকার এরই মধ্যে এক কোটি পাউন্ড খরচ করেছে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুগো সয়্যার বলেন, ‘(অ্যাসাঞ্জের) জিজ্ঞাসাবাদ এখনো না হওয়ায় আমরা হতাশ। বিষয়টি এখনো খুব অসন্তোষজনক
ও ব্যয়বহুল।’

হার্টের ওষুধই ডেকে আনছে মৃত্যু!

রক্ষকই ভক্ষক, নাকি সর্ষের মধ্যেই ভূত? বিকল হৃদযন্ত্রের চিকিত্সায় ব্যবহৃত শতাব্দী প্রাচীন প্রাণদায়ী ওষুধই ঘটাতে পারে অকালমৃত্যু। এমন চমকে ওঠার মতো তথ্য জানা গিয়েছে জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়ের সমীক্ষায়। হার্টের সমস্যায় ডাইজক্সিন-এর ব্যবহার নতুন নয়। বস্তুত এই জীবনদায়ী ওষুধের উপর গত ১০০ বছরের উপর নির্ভর করেছেন চিকিত্সকরা। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় এই ডাইজক্সিনকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে সংশয়। মনে করা হচ্ছে, atrial fibrillation অথবা congestive heart failure-এর মতো হৃদযন্ত্রের সমস্যায় এই ওষুধের অনিয়ন্ত্রিত প্রয়োগ ডেকে আনতে পারে হঠাত্ মৃত্যু। ১৯৯৩ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে বিভিন্ন স্বাস্থ্য পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যের পর্যালোচনার উপর ভিত্তি করে ফ্র্যাঙ্কফুর্টের জে ডব্লিউ গ্যেটে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এই দুই হৃদযন্ত্র জনিত অসুখের জেরে মৃত্যুতে ডাইজক্সিনের ভূমিকা খতিয়ে দেখেছেন। দেখা গিয়েছে, এর মধ্যে অন্তত ৩,২৬,৪২৬ জন রোগী ডাইজক্সিন প্রয়োগের পর মারা গিয়েছেন। সমীক্ষায় ধরা পড়েছে, ডাইজক্সিন প্রয়োগের ফলে atrial fibrillation এবং congestive heart failure-এর মতো সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের ২১ শতাংশ মৃত্যুর আশঙ্কা বেড়ে যাচ্ছে। এই দুই ধরনের হৃদরোগীদের ক্ষেত্রে সাধারণত ডাইজক্সিন প্রয়োগ করা হয়। তবে এই ওষুধ ব্যবহারের ক্ষেত্রে তার মাত্রা সম্পর্কে চিকিত্সকদের অত্যন্ত সাবধান হতে হয়। নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় ডাইজক্সিন যেমন ফলদায়ী, তেমনই নিয়ন্ত্রণ রেখা ছাড়িয়ে গেলে তার ফল হয় মারাত্মক। এই কারণে ডাইজক্সিন ব্যবহারকারী রোগীদের নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করে তাতে ডাইজক্সিনের মাত্রার উপর নজর রাখাই বিধেয়। গ্যেটে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক তথা হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক স্তেফান হনলুজার জানিয়েছেন, 'বিভিন্ন সাক্ষ্য বিশ্লেষণের পর একটি সত্যে উপনীত হওয়া গিয়েছে: ডাইজক্সিন ব্যবহার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।' সম্প্রতি ইউরোপীয় হার্ট জার্নালে এই গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে।– ওয়েবসাইট।

কাজ করছে বিকল্প হিমাগার by আবুল কালাম মুহাম্মদ আজাদ

রাজশাহী নগরের নামো ভদ্রার চকপাড়া এলাকায়
সেই বিকল্প হিমাগারে পেঁয়াজ বাছাইয়ের কাজে
শ্রমিকদের ব্যস্ততা l ছবি: প্রথম আলো
কাজ করছে রাজশাহীর সেই বিকল্প ‘হিমাগার’। ওই হিমাগারে রাখা হয়েছিল ৫০০ মণ পেঁয়াজ। প্রায় চার মাস পরে গত সোমবার সেই পেঁয়াজ বের করা শুরু হয়েছে। পেঁয়াজের ওজন কমেনি। পচনের হারও সামান্য। কৃষকেরা খুশি। এর আগে দুই হাজার মণ আলু রেখেও ভালো ফল মিলেছে।
বিদ্যুৎ ছাড়াই জলীয় বাষ্পের খুব সাধারণ একটি ধর্মকে কাজে লাগিয়ে তৈরি এই হিমাগার নিয়ে গত ৯ নভেম্বর প্রথম আলোর প্রথম পাতায় ‘এবার বিকল্প হিমাগার’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তখন এক বছর ব্যবহার না করা পর্যন্ত এর উপযোগিতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে না বলে মত দিয়েছিলেন বিশেষজ্ঞরা।
গত ৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান এই হিমাগারের উদ্বোধন করেন। এর উদ্ভাবক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এম মনজুর হোসেন। ৩০০ টন ধারণক্ষমতার এই হিমাগার নির্মাণে ব্যয় হয় প্রায় ১৪ লাখ টাকা। প্রচলিত পদ্ধতিতে ৩০০ টন ধারণক্ষমতার একটি হিমাগার তৈরিতে ব্যয় হয় আড়াই কোটি টাকা। বিকল্প এই হিমাগারটি রাজশাহী নগরের নামোভদ্রা এলাকায় নির্মাণ করা হয়।
গত সোমবার দুপুরে ওই হিমাগারে গিয়ে দেখা যায়, এর তৃতীয় তলা থেকে পেঁয়াজ বের করা হচ্ছে। ওপরে উঠে দেখা যায়, শ্রমিকেরা পেঁয়াজের ওপরের খোসা পরিষ্কার করে বস্তায় ভরছেন। তাঁদের হিসাবে ২০ বস্তা পেঁয়াজের মধ্যে এক বস্তারও কম পেঁয়াজ নষ্ট পাওয়া যাচ্ছে। তা-ও পুরোপুরি নষ্ট হয়নি। এগুলোও বিক্রয়যোগ্য।
এই হিমাগারে ১৫ মণ পেঁয়াজ রেখেছেন রাজশাহীর পবা উপজেলার মুসরাইল গ্রামের কৃষক আবদুল মমিন। তিনি বলেন, বাড়িতে পেঁয়াজ সংরক্ষণের বিশেষ কোনো জায়গা থাকে না। এবার হিমাগারে রেখেছেন। পেঁয়াজ দেখে এসেছেন, ভালো আছে। তিনি বলেন, তিনি আরও পরে তাঁর পেঁয়াজ বের করবেন। বেছে বেছে বড় পেঁয়াজগুলো বীজ তৈরির জন্য লাগাবেন। তখন আরও বেশি দাম পাবেন। তিনি বলেন, আগে পেঁয়াজ রাখার কোনো হিমাগার ছিল না, এখন ১০০ টাকা বস্তা (৮৫ কেজি) হিসাবে ভাড়া দেওয়ার কথা রয়েছে। তাতেও অনেক লাভ।
এম মনজুর হোসেন বলেন, হিমাগারটি আশানুরূপ কাজ করছে। গত ২৮ মার্চ থেকে পেঁয়াজ রাখা শুরু হয়। তখন পেঁয়াজের দাম সব খরচ মিলিয়ে ছিল এক হাজার টাকা মণ। এখন বাজারে পেঁয়াজের মণ দুই হাজার টাকারও বেশি। কৃষকের ঘরে রাখলে এই পেঁয়াজ প্রায় অর্ধেক ওজন হারাত। পচে নষ্ট হতো। তিনি বলেন, ১০ মণ রসুন রাখা হয়েছে। নষ্ট হয়নি। কিছু আদা রাখা হয়েছে। তা-ও ভালো আছে।
এম মনজুর হোসেন জানান, এবার তাঁদের একটা নতুন অভিজ্ঞতা হয়েছে, সেটা হচ্ছে আলু ও পেঁয়াজ একসঙ্গে রাখা যাবে না। আলু চার মাস পর্যন্ত রাখা হয়েছিল। ভালো ছিল। এপ্রিল মাসে যখন পেঁয়াজ ঢোকানো হলো, তার কিছুদিনের মধ্যেই আলুর গাছ বের হতে শুরু করল। কারণ, আলুর চেয়ে পেঁয়াজ বেশি তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হয়। আলুর তাপমাত্রায় পেঁয়াজ রাখা হলে আবার পেঁয়াজেরও গাছ বের হবে। এ জন্য তাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, পেঁয়াজ, রসুন ও আদা একসঙ্গে রাখা হবে। আলু আলাদা রাখতে হবে। একই কারণে আম ও টমেটো পেঁয়াজের সঙ্গে রাখা যাবে না। তার জন্য আলাদা ব্যবস্থা করতে হবে। ইতিমধ্যে তাঁরা পেঁয়াজ, রসুনের জন্য আলাদা একটি হিমাগার তৈরির প্রস্তাব পেয়েছেন। একটি বেসরকারি ব্যাংক অর্থায়ন করতে রাজি হয়েছে।

খাল ও কালভার্ট ভরাট করে আ.লীগ কার্যালয়, দোকান by সুমন মোল্লা

কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার রসুলপুর গ্রামে
চলছে কালভার্ট ও খাল ভরাট। ছবি -প্রথম আলো
কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার সাকেদপুর ইউনিয়নের রসুলপুর গ্রামের এক পাশে কালী নদী ও অপর পাশে মেঘনা। গ্রামের বুক চিড়ে বয়ে চলা একটি খালের দুই পাড় মিলেছে দুই নদীতে। একটি কালভার্টের মাধ্যমে পানিপ্রবাহ ঠিক রেখে করা হয়েছে সড়ক। এখন ওই খাল ও কালভার্ট ভরাট করে নির্মাণ করা হচ্ছে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কার্যালয় ও দোকানপাট।
এলাকাবাসী বলেন, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ফজলুল হক, কর্মী মো. নুরুজ্জামান ও ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান তোফাজ্জাল হোসেনের নেতৃত্বে এক বছর আগ থেকে ধীরে ধীরে খালটি ভরাট করে ফেলা হয়। এরই মধ্যে ভরাট করা জায়গায় ১৩টি আধপাকা দোকানঘর তৈরি করে পজেশন বিক্রি করা হয়ে গেছে।
জানতে চাইলে ভৈরবের সহকারী কমিশনার (ভূমি) চিত্রা শিকারি প্রথম আলোকে বলেন, কোনোভাবেই খাল ভরাটের সুযোগ নেই। প্রশাসনকে না জানিয়ে এটা করা হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব দোকানপাট উচ্ছেদ করে খালের স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনা হবে।
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এক যুগ আগেও এই খাল দিয়ে বড় নৌকা চলত। খালের কল্যাণেই সেটি ঘেঁষে চকবাজার প্রতিষ্ঠা হয়। প্রায় এক বছর আগে খালটি ভরাটের পরিকল্পনা করেন ওই তিন নেতা। পরে তাঁরা গ্রামবাসীকে নিয়ে সভা করেন। সভা থেকে গ্রামবাসীকে বোঝানো হয়, এখন সড়কপথ উন্নত হয়েছে। নৌকার প্রয়োজন নেই। তা ছাড়া গ্রামঘেঁষা গভীর খালটি বাড়িঘর ভাঙনের কারণ হতে পারে। লাগোয়া ঈদগাহটির সম্প্রসারণের জন্য খাল ভরাট জরুরি। গ্রামবাসী তাঁদের কথায় সায় দেন।
কথা হয় ভরাটে নেতৃত্ব দেওয়া মো. নুরুজ্জামানের সঙ্গে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘না বুনজাইয়া করুম কী। এমনিতেই বুইনজা গেছিল।’
গত বুধবার সেরজমিেন দেখা যায়, আওয়ামী লীগ নেতা ফজলুল হক, কর্মী আ. মালেক, ছেতু মোল্লা, আ. হামিদ, নুরু মিয়া, মো. হানিফ, হেলিম মিয়া, শিরু মিয়া, সাজিদ মিয়া, নুরুল হক, ছিদ্দিক মিয়া; বিএনপির কর্মী নুরুল হক মৌলভি ও ইউসুফ আলী দোকানের পজেশন কিনেছেন। প্রথম পজেশনটি-ই রাখা হয়েছে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের জন্য। নির্মাণকাজ চলছে।
জানা গেছে, রসুলপুর চকবাজার পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে পজেশন বিক্রি করা হয়। ফজলুল হক পরিচালনা কমিটির সভাপতি। প্রাপ্ত আয়ের একটি অংশ দিয়ে খাল ভরাটের ব্যয় নির্বাহ করা হয়। আর বড় অংশ যায় নেতাদের পকেটে।
ভরাটস্থলের মুদি দোকানি জামাল ভূঁইয়া জানান, তিনি ভাড়া নিয়েছেন শিরু মিয়ার কাছ থেকে। তিনি স্বীকার করেন, ভরাট হওয়ার কারণে কয়েকজনের লাভ হলেও পুরো গ্রামের লোকজনেরই ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে কৃষি ও পরিবেশের।
দলীয় কার্যালয় নির্মাণের কথা স্বীকার করেন ফজলুল হক। ‘খালটি কোনো কাজে আসছিল না। লোকজন মলমূত্র ফেলত।’ —ভরাটের পক্ষে এই ছিল ওই নেতার যুক্তি। পজেশন বিক্রির টাকা নেননি বলে তিনি দাবি করেন। নিয়ম অনুযায়ী খাল ভরাট করতে পারেন কি না, এমন প্রশ্নে ফজলুল হক বিব্রতবোধ করেন।
খাল ভরাটে নেতৃত্বে থাকার কথা সরাসরি অস্বীকার করেছেন চেয়ারম্যান তোফাজ্জল হোসেন। জনপ্রতিনিধি হিসেবে ভরাট বন্ধে কোনো উদ্যোগ নিয়েছিলেন কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমি ক্ষমতাসীন দলের কেউ না। আমার কথা কে শুনে? নীরব থাকতে বাধ্য হয়েছি।’ চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁকে একটি দোকান বরাদ্দ দিলেও তিনি তা গ্রহণ করেননি বলে দাবি করেন।