Saturday, February 15, 2020

আজারবাইজান: বিয়ের রাতে এক নারীর বিভীষিকাময় যৌন মিলনের অভিজ্ঞতা

"বিয়ের পর যখন তিনি আমার সামনে পোশাক খুলতে শুরু করেন, তখন আমি ভয়ে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম," বলছিলেন এলমিরা (ছদ্মনাম)।
"আমি বার বার নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম যে এখন আমার বিয়ে হয়ে গেছে। তাই আমার সাথে এগুলোই হবে।"
এলমিরার তখন বয়স ছিল ২৭ বছর। সবেমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে একজন দোভাষী হিসেবে কাজ শুরু করেছেন।
এলমিরার স্বামীকে বেছে নিয়েছিলেন তার বাবা-মা। এলমিরা সেই বিয়েতে সম্মতিও জানিয়েছিলেন। শুধুমাত্র তার "মা'কে খুশি করতে"।
"ওই লোকটি ছিল আমাদের প্রতিবেশী, আমরা একেবারে আলাদা মানুষ ছিলাম; সে শিক্ষিত ছিল না, আমাদের মধ্যে কোন কিছুতেই কোন মিল ছিল না," বলেন এলমিরা।
"আমার ভাই, আমাকে তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল, এবং তারা আমাকে বলেছিল যে সে একজন ভাল লোক। প্রতিবেশীকে বিয়ে করছি দেখে, মা খুব খুশি ছিলেন। কারণ আমি তার কাছাকাছি থাকতে পারবো, সে আমার খোঁজ খবর নিতে পারবে।
কিছু প্রাচীন ঐতিহ্যের কারণে নারীদের জন্য তার বিয়ের দিনটি হয়ে পড়ে বিভীষিকাময়।
বাড়িতে বিয়ের প্রসঙ্গ উঠতেই এলমিরা তার মা'কে অনেকভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে তিনি এখনই বিয়ে করতে চাননা।
এলমিরার মা এই বিষয়টি আত্মীয় স্বজনদের জানিয়ে দিলে তারা এলমিরাকে চাপ দিতে থাকেন। অনেকেই সন্দেহ করছিলেন যে এলমিরা হয়তো কুমারী নন।
কিন্তু সত্যিটা হল বিয়ের রাতেই এলমিরা প্রথমবার যৌনমিলন করেছিলেন।
প্রথম রাতেই তিনি জানতে পারেন যে তার স্বামী তার অনুভূতি এবং আত্ম-সম্মানবোধকে বিন্দুমাত্র পরোয়া করেননা।
"তিনি শুধু আমার উপর হামলে পড়েন, যখন আমার মাথা আলমারির সঙ্গে ধাক্কা লাগতে থাকে, তখনই শুনি দরজায় টোকা পড়ছে আর পাশের ঘর থেকে নারী কণ্ঠ ভেসে আসছে 'অ্যাই আস্তে, চুপচাপ থাকো।'"- "বিষয়টা কি জঘন্য!"- বলেন এলমিরা।
আসলে দরজা পিছনে ছিলেন এলমিরার মা, দুই ফুফু/খালা, তার শাশুড়ী, এবং আরেকজন দূরবর্তী আত্মীয় (যিনি দরজায় টোকা দিয়ে চেঁচিয়েছিলেন)।
স্থানীয় প্রথা অনুযায়ী বিয়ের রাতে বর কনের ঘরের বাইরে দুই পরিবারের সদস্যদের বাধ্যতামূলকভাবে উপস্থিত থাকতে হয়, যেন নববধূর কুমারীত্ব প্রমাণ করা যায়।
আমার সেই দূরবর্তী আত্মীয় 'ইঙ্গি' এর ভূমিকা পালন করছিলেন: ইঙ্গি বলতে বোঝায় এমন একজন বিবাহিতা নারীকে যিনি নবদম্পতির সঙ্গে বরের বাড়িতে যান।
বিয়ের রাতে নব দম্পতির শোবার ঘরে আড়ি পেতে থাকেন দুই পরিবারের কয়েকজন সদস্য। যা ককেশাসের নিয়মিত প্রথা।
তার কাজ হলো সারা রাত নবদম্পতির শোবার ঘরের পাশে বসে থাকা।
তার দায়িত্বগুলোর মধ্যে একটি হল পরামর্শ দেয়া।
ধারণা করা হয়, যৌনমিলনে অনভিজ্ঞ নববধূ হয়তো রাতের বেলা শোবার ঘরের বাইরে বেরিয়ে অভিজ্ঞ নারীদের থেকে পরামর্শ চাইতে পারেন।
ইঙ্গির আরেকটি দায়িত্ব হল বিয়ের প্রথম রাতের পর নবদম্পতির বিছানার চাদর সংগ্রহ করা।
"আমি একইসঙ্গে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলাম আবার বিব্রত বোধ করছিলাম। ভাবছিলাম, বিয়ে মানে কি এগুলোই?"
"বিয়ের রাত অনেকের জন্য রহস্যে ঘেরা থাকে"
বিয়ের প্রথম রাতের পরে যখন সকাল হয়, তখন বিছানার চাদর দেখাতে হয়। ককেশাসে এটাই বিয়ের একটি প্রচলিত প্রথা।
বিছানার সেই চাদরে রক্তের দাগ থাকলে, সব আত্মীয় স্বজনের সামনে প্রমাণিত হয় মেয়ের কুমারীত্ব। আর এর মাধ্যমেই বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার ইতি টানা হয়।
এই দাগ দেখার পরই পরিবারের সদস্যরা নব দম্পতিকে তাদের বিয়ের জন্য অভিনন্দন জানান।
কেননা, শুধুমাত্র এই কুমারীত্ব প্রমাণের মাধ্যমেই বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে বলে বিবেচনা করা হয়।
"এ কারণে বিয়ের রাত অনেকের জন্য রহস্যে ঘেরা থাকে।- যে সকালে বিছানার চাদর কি অবস্থায় থাকবে।" বলেন শখলা ইসমাইল, তিনি আজারবাইজানে নারীর অধিকার নিয়ে গবেষণা করছেন।
যদি চাদরে দাগ না থাকে, তবে নববধূকে একঘরে করা হয়। মেয়েটিকে ত্রুটিযুক্ত বলে তার মা-বাবার বাড়িতেও পাঠিয়ে দেয়া হয়।
তারপরে, ওই নারীকে তালাকপ্রাপ্ত বলে মনে করা হয়, এবং প্রায়শই এই নারীদের জন্য আরেকটি বিয়ে করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশ্বের ২০টি দেশে এখনও বিছানার চাদর দেখে নববধূর কুমারীত্ব পরীক্ষার চল রয়েছে।
আর এসব কারণে মেয়েটিকে তার নিজ বাড়িতে মা বাবার নানা গঞ্জনা শুনে জীবন কাটিয়ে দিতে হয়।
আজারবাইজানের মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন যে বিয়ের এই প্রথা দেশের গ্রামাঞ্চলে এখনও বিস্তৃত।
অনেক সময়, মেয়েটি এখনও কুমারী কিনা তা দেখতে 'বিশেষজ্ঞ' দিয়ে পরীক্ষা করানো হয়।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অন্তত ২০টি দেশে এসব প্রথা এখনও চলছে বলে জানায় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা।
এ ধরণের প্রথাকে নারীদের জন্য অপমানজনক এবং আঘাতমূলক দাবি করে জাতিসংঘ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রথাগুলো বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।
তাছাড়া, চিকিৎসা বিজ্ঞানেও নারীর 'কুমারীত্ব' প্রমাণের বিষয়টিকে বানোয়াট হিসেবে ধরা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় চিন্তাভাবনায় বিদ্যমান।
"ভয় পরিণত হয় লজ্জায়"
ভয়, ব্যথা, এবং লজ্জা- বিবাহের রাতকে, এই তিনটি অনুভূতি দিয়ে ব্যাখ্যা করেন এলমিরা।
"সারা রাত আমি ভয় আর যন্ত্রণায় ঘুমাতে পারিনি। আমার স্বামী এগুলো নিয়ে বিন্দুমাত্র পরোয়া করেননি। এরপর সকালে যখন ইঙ্গি, বিছানার চাদর নিতে আমার ঘরে আসেন- তখন রাতের ভয় কয়েকগুণ বেশি লজ্জায় পরিণত হয়।
এই ঐতিহ্য প্রতি বছর নারীদের জন্য আরও মানসিক আঘাতমূলক হয়ে উঠছে বলে জানান মনোবিজ্ঞানী এলাডা গরিনা।
অনেক সময় লাল আপেলের ইঙ্গিত দিয়ে নববধূর কুমারীত্বকে প্রমাণ করতে হতো।
আজারবাইজানের কিছু গ্রামের পরিস্থিতি আরও গুরুতর। নেগার এমনই এক গ্রামে থাকতেন।
তার বিয়ের রাতে তার শোবার ঘরের পাশে কয়েকজন 'পরামর্শদাতা' নয়, বরং হাজির ছিল 'পুরো গ্রাম'।
"আমি জীবনে এর চাইতে বেশি বিব্রতকর অবস্থার মুখে পড়িনি। দরজার পিছনে এতো মানুষকে দেখে বিয়ের রাতে আমাদের দুজনের কারোই যৌনমিলনের কোনও ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু সকালে বিছানার চাদর দেখানোর চাপে আমরা বাধ্য ছিলাম।"
সেই সময় নেগারের বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর। এখন তার বয়স ৩০, তালাকপ্রাপ্ত এবং রাজধানী বাকুতে বসবাস করছেন। তিনি তার আত্মীয়দের এখন 'বিকৃত মনের' বলে উল্লেখ করে।
পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীদের এমন হেনস্থার পরিবর্তন অনেক ধীরে আসছে বলে তিনি আক্ষেপ করেন।
"লাল আপেল"
পার্শ্ববর্তী আর্মেনিয়া, জর্জিয়া এমন রাশিয়ার উত্তরাঞ্চলেও বিছানার চাদর দেখার এই প্রথা প্রচলিত রয়েছে।
তবে আর্মেনিয়াতে দরজার বাইরে কোন সাক্ষী থাকেনা। সেখানে, ঐতিহ্যটিকে 'লাল আপেল' বলা হয়, যার মাধ্যমে কুমারীত্ব বোঝানো হয় আপেলের সূক্ষ্ম ইঙ্গিত দিয়ে।
রাজধানী ইরেভান শহরের বাইরে এই ঐতিহ্য এখনও চলছে। যাদের বেশিরভাগ কোন পরিবর্তন চাননা- এমনটাই বলছেন মানবাধিকার কর্মী নিনা কারাপেটিয়ানস।
আধুনিক যুগেও এখনও অনেক গ্রামাঞ্চলে এবং ছোট শহরে এমন নানা প্রথা প্রচলিত রয়েছে।
তিনি বলেন, কখনও কখনও বাবা মায়েরা তাদের কন্যাকে 'পবিত্র ও শুদ্ধ' প্রমাণ করার জন্য তাদের সব আত্মীয়স্বজন এবং প্রতিবেশীদের আমন্ত্রণ জানান। পুরো গ্রাম এই অপমানের অনুষ্ঠানে অংশ নেয়।
গ্রামে মেয়ের বয়স ১৮ হলেই তাদের বিয়ে দেয়া হয়। সে বয়সে বেশিরভাগের কোন দক্ষতা থাকেনা। যদি এই মেয়েটি আপেল পরীক্ষায় পাস না হয়, তার বাবা-মা তাকে ত্যাজ্য করতে পারে।
"আমরা সেই রাতের ব্যাপারে কিছু বলিনা"
এলাডা গরিনার মতে, কিছু নারী এই ঐতিহ্যকে সহজভাবে সামলাতে পারলেও, বেশিরভাগ নারীকে বছরের পর বছর মানসিক ট্রমার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়।
"এমনও ঘটনা আছে যে, চাদরে কোন রক্তের দাগ না থাকায় মাঝ রাতে স্বামীর পুরো পরিবার মেয়েটি কুমারী কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিল,"
একজন নারীর গোপনীয়তার ওপর এ ধরণের আক্রমণ তার ওপর সহিংসতার সামিল। কারণ এটি তাকে দীর্ঘমেয়াদে আক্রান্ত করে।
বিয়ের ছয় মাস পর এলমিরার স্বামী মারা যান। এই পুরো সময় তিনি তার বিয়ের প্রথম রাতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা কাউকে বলতে পারেননি।
এলমিরা বলেন, "আমি আবার বিয়ে করার জন্য এমনকি কারও সঙ্গে দেখা করার জন্যও প্রস্তুত ছিলাম, কিন্তু আমার আগের অভিজ্ঞতা আমাকে থামিয়ে দেয় ... যদি আমার সেই অভিজ্ঞতা না থাকতো, তাহলে আমার আচরণ আজকে সম্পূর্ণ আলাদা হতো।"

কবিতার কোন মৃত্যু নেই : আল মাহমুদ by শাহীন রেজা

আল মাহমুদ
আল মাহমুদ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি। তিনি ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের মৌড়াইলের মোল্লাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ মৃত্যু বরণ করেন। তার প্রকৃত নাম মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ। তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, ছোটগল্প লেখক, শিশুসাহিত্যিক এবং সাংবাদিক। আধুনিক বাংলা কবিতার শহরমুখী প্রবণতার মধ্যেই ভাটি বাংলার জনজীবন, গ্রামীণ আবহ, নদীনির্ভর জনপদ, চরাঞ্চলের জীবনপ্রবাহ এবং নর-নারীর চিরন্তন প্রেম-বিরহকে পরম আন্তরিকতার সঙ্গে তুলে এনেছেন তার কবিতায়। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়াংশে সক্রিয় থেকে তিনি আধুনিক বাংলা কবিতাকে নতুন আঙ্গিকে, চেতনায় ও বাকভঙ্গিতে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করেছেন।

তিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সম্মুখ সমরে অংশ নিয়েছেন। সম্পাদনা করেছেন দৈনিক গণকণ্ঠ। ১৯৬৮ সালে দুটি কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। ‘লোক লোকান্তর’, ‘কালের কলস’, ‘সোনালী কাবিন’ তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। বাংলা কবিতাকে সমৃদ্ধ করেছেন নতুন আঙ্গিকে, চেতনায় ও বাক্, ভঙ্গির সমন্বয়ে। কবি হিসেবে খ্যাতিমান হলেও বাংলা গল্পের এক আশ্চর্য সাহসী রূপকার আল মাহমুদ। এ মহান মানুষটির জন্মদিন উপলক্ষে সাহিত্য ও জীবন-যাপনের নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেন- শাহীন রেজা। @মানবকণ্ঠ।

আপনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ঢাকাই হচ্ছে বাংলা কবিতার রাজধানী। এখনো কি সেই বিশ্বাসে আপনি অবিচল আছেন?
অবশ্যই। বাংলা কবিতা নিয়ে আমি এ বাংলা ও বাংলা বিভাজনে যেতে চাই না। আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি সারাবিশ্বে যেখানে যত বাংলা কবিতা রচিত হচ্ছে তার ক্ষেত্রভূমি এই ঢাকা। ঢাকাতে কবিতা নিয়ে যা হয়েছে এবং হচ্ছে তা বিশ্বের কোথাও হয়নি। তাই একে বাংলা কবিতার রাজধানী হিসেবে স্বীকার করে নিতে কারো কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়।

সবকিছুরই সমাপ্তি আছে- কবিতারও কি?
না কবিতার কোনো মৃত্যু নেই, সমাপ্তি নেই। কবিতা কালের ধ্বনি। এর ধারা এককাল থেকে অন্যকালে ছড়ায়। চর্যাপদ থেকে আজকের কবিতা কোনোটাই হারানোর নয়। অতীতে যেমন হারায়নি আগামীতেও হারাবে না।

এবার মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে আসি-
দেখো একটি জাতির জন্য এর চেয়ে গৌরবের আর কোনো ব্যাপার নেই। এই যুদ্ধের মধ্য দিয়েই আমরা একটা মানচিত্র পেয়েছি, একটা পতাকা পেয়েছি। আমাদের যে জাতিসত্তা তা বিনির্মাণেও এর ভূমিকা অপরিসীম। তবে এর জন্য আমাদের অনেক ত্যাগ করতে হয়েছে। অনেক রক্ত ঝরাতে হয়েছে।

একাত্তরে আপনার ভূমিকা প্রসঙ্গে যদি জানতে চাই-
আমার একাত্তরের ভূমিকা সবাই জানে। এটা আর নতুন করে বলতে চাই না। যদি তাঁবেদারি করতাম তাহলে এদেশে স্ত্রী-পরিজন নিয়ে পায়ের ওপর পা তুলে বেশ ভালোভাবেই কাটাতে পারতাম। অনেকে সেটি করেছেন এবং মুক্তিযুদ্ধের পর ভোল পাল্টে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক সেজে ক্ষমতার স্বাদ নিয়েছেন। আমি তাঁবেদারি করিনি বলেই আমাকে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে কলকাতা যেতে হয়েছে। এরপরের ইতিহাস তো সবাই জানে।

কিন্তু এখনো তো একশ্রেণির লোক আপনাকে মৌলবাদী বলে আখ্যা দেয়?
আমি আল্লাহতে বিশ্বাস করি। নিয়মিত নামাজ পড়ি এবং রোজা রাখি। আমার এ বিশ্বাসকে যদি কেউ মৌলবাদী বলতে চায়, তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই। আমি কারো কথায় আমার বিশ্বাস থেকে বেরুতে পারি না।

জীবনের শুরুতে আপনি বাম চিন্তায় আচ্ছন্ন ছিলেন আর এখন সম্পূর্ণ ঈশ্বরবাদী- এটাকে কি ডাবল স্ট্যান্ডার্ড বলা যায় না?
না যায় না। আমি এখনো একই বিশ্বাসে অবিচল। বাম চিন্তার প্রতি আমার অনুরাগের কারণ তাদের মানব মুক্তির স্লোগান। আমি মনে করেছিলাম সাম্য ও মানব মুক্তির জন্য তাদের পথ ও স্লোগানই সর্বোত্তম। কিন্তু পরবর্তীতে দেখলাম, ইসলামই একমাত্র পথ যাতে এ চিন্তার সর্বোচ্চ প্রতিফলন ঘটেছে। তাই আল্লাহর পথেই সাম্য ও মানব মুক্তির স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ খুঁজে নিলাম।
কবি হতে হলে প্রথমেই কী কী জিনিস অর্জন করতে হয়।
প্রথমেই একটি তৃতীয় নয়ন। তারপরে ভাব ও ভাষাকে আয়ত্ত করা। ছন্দ সম্পর্কে জ্ঞান আর সবশেষে পাঠক মনে সহজেই প্রবিষ্ট হওয়ার কৌশল অর্জন।

এ মুহূর্তে যদি দেশের প্রধান কবি হিসেবে আপনাকে শনাক্ত করতে চাই তাহলে তার উত্তরে আপনি কী বলবেন?
আমি প্রধান কবি হওয়ার জন্য কোনোদিন কবিতা লিখিনি। আমি চিরকাল শুধু একজন কবি হতে চেয়েছি। আজ সর্বত্র বিশেষ করে এই উপমহাদেশসহ সমগ্র বিশ্বে বাংলা ভাষাভাষীদের মুখে আমার নাম উচ্চারিত হচ্ছে। এতে আমি অবাক হই না। এটা তো হতেই পারে। আমি তাদের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই আর উপভোগের কথা বলছেন- ভালোই তো লাগে। জীবন সায়াহ্নে তাদের এই উচ্চারণ আমাকে উজ্জীবিত করে, আপ্লুত করে।

কবিতার জন্য জীবন, নাকি জীবনের জন্য কবিতা?
মাহমুদ: ধরে নাও এটি একটি সংসার। কবিতা যদি রমণী হয় তাহলে জীবন পুরুষ। দুজনেই দুজনার। এদের আলাদা করার উপায় নেই। এরা একে অপরের পরিপূরক।

আপনার দশকের একজন প্রভাবশালী কবি ফজল শাহাবুদ্দীন এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘সোনালী কাবিন’-এর জন্য কবি মাহমুদ নোবেল পাওয়ার যোগ্য। আপনি কী বলেন-
এটা যদি কেউ বলে তাহলে আমার কি আর বলার কিছু আছে? তবে পৃথিবীতে অনেক বড় কবি আছেন যারা নোবেল পাননি অথচ তাদের কবিতা আমাদের নিত্য-পাঠ্য। আমি মনে করি, কবিতা কবিতাই। কবিতা কখনোই কোনো নোবেল পুরস্কারের মুখাপেক্ষী নয়।

জীবনানন্দ দাশকে আধুনিক বাংলা কবিতার প্রবর্তক বলা হয়। তাহলে কি রবীন্দ্রনাথ-নজরুল আধুনিক নন?
সন্দেহ নাই যে জীবনানন্দ দাশ আধুুনিক কবি। কিন্তু বাংলা কাব্যে আধুনিকতার প্রবর্তক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

এক সময়ের প্রবল কবি ফররুখ আহমদ কিংবা জসীমউদ্দীন এখন অনেকটাই আড়ালে- বিষয়টিকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
আমি বিষয়টিকে মূল্যায়ন করি এভাবে- কালচক্রে যারা কবিতায় নতুনত্ব নিয়ে আসেন নিঃসন্দেহে জসীমউদ্দীন তাদের একজন। জসীমউদ্দীনের কবিতার একটি লাইন আমি বলছি- ‘কাল সে আসিবে মুখখানি যার নতুন চরের মতো’- এই পঙ্ক্তিটি বাংলা কাব্যে বিপ্লব সৃষ্টি করেছিল। এর আগে কেউ মাটির সঙ্গে, চরের সঙ্গে প্রিয়তম নারীর মুখের তুলনা দেয়নি। যত তুলনা এর আগে দেয়া হয়েছে সব চাঁদের সঙ্গে। জসীমউদ্দীন প্রথম এই ধারা ভঙ্গ করেন। কোনো সৃজনশীল কবি কখনোই আড়ালে যান না। হয়তো নতুনত্বের জোয়ারে তারা একটু পাশে সরে থাকেন। ফররুখ কিংবা জসীমউদ্দীনের ক্ষেত্রে এটিই ঘটেছে।

আমাদের দেশে কবিরা গোষ্ঠী বিভাজনে বিভক্ত- এটা কি আমাদের কবিতার জন্য ক্ষতিকর নয়?
এটা কখনো কখনো ক্ষতিকর হয় তবে এই গোষ্ঠী বিভাজন সব সময়ই ছিল। সব কালেই ছিল। নানা গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়েছিল কবির কোলাহল এবং কবির উচ্চারণই হলো ভাষার গতিবেগ নির্ধারণ। মানুষের ভাষা আছে আর কারো কোনো ভাষা নেই।

বোদ্ধারা বলেন, একজন কবির জীবনে প্রেমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। আপনি কি এর সঙ্গে একমত?
সব সময় হয়তো একমত হই না। তবে প্রেম কার না জীবনে আছে বলো? প্রেম আছে, একটি নারী আছে আত্মার ভেতরে।

সাহিত্যের সঙ্গে অর্থনীতির কোনো যোগসূত্র আছে কি?
আছে। কবিরাও মানুষ- তাদেরও খেতে হয়, বাসাভাড়া দিতে হয়।

একজন কবির প্রকৃত অর্জন কী- পুরস্কার, পদক নাকি মানুষের ভালোবাসা?
অবশ্যই মানুষের ভালোবাসা। তবে পুরস্কার বা পদক কবিকে উৎসাহিত করে।

একজন কবির চূড়ান্ত লক্ষ্য কী হওয়া উচিত?
ছন্দের দোলা বুকে রেখে পঙ্ক্তি রচনা করা

তরুণ কবিদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন-
কবিতা সব সময় তারুণ্যের মুখাপেক্ষী। তরুণরাই কাব্য, সাহিত্যে নতুন কিছু নিয়ে আসে। আমি সব সময় এটা মনে করি। তরুণদের বলি- সৎ হও, মানুষ হও। প্রকৃত কবি হয়ে বেড়ে ওঠো।

আপনার দীর্ঘ জীবনের স্বপ্ন, প্রাপ্তি ও অপূর্ণতা কী?
যখন কিছু মুখের কথা সকৃতজ্ঞ চিত্তে উল্লেখ করতে যাই তখন পারি না। নাম মনে থাকে না। ধাম হারিয়ে গেছে। সে জন্যই সম্ভবত আমার বাম দিকটা সবসময় শূন্যতার হাহাকারে ভরা।

আমি কবি। স্বপ্নের মধ্যে হাঁটাই আমার কাজ। যদি দুর্ঘটনা না ঘটে তাহলে এভাবে একদিন অন্তিমে পৌঁছে যাব। এ কথা তো সবারই জানা যে, আমি সাধ্যমতো লিখেছি। কী লিখেছি সেটা আমিও জানতে চাই না। আজও এই মুহূর্ত পর্যন্ত আমি লিখে কোথাও পৌঁছবার চেষ্টা করছি। কিন্তু আমি তো জানি না, এটা কোন জায়গা। এখন কোথায় আছি। বলার মতো কথা হলো পথে আছি কিংবা হয়তো বা কোনো প্রান্তরে আছি। কোনো পরিসমাপ্তি দেখতে পাচ্ছি না। তা বলে আমি তো পরিশ্রম কম করিনি। পৌঁছতে চাই। কিন্তু কোথায় পৌঁছব? আমার আগে যারা আমার মতো পথে-প্রান্তরে পরিশ্রম ঝরিয়ে চলে গেছেন তাদের ঘাম শুকানোর কোনো বিশ্রাম ছিল না। আমি বিশ্রাম চাই, বিরাম চাই, পরিণাম চাই।

আমার পরিশ্রম তো কবির পরিশ্রম। এটা বৃথা যেতে পারে না। আমি স্বপ্ন নির্মাণ করি এবং সত্যের কাছে এনে মানুষকে দাঁড় করিয়ে দিই। এই তো হাত পেতেছি আমার প্রাপ্য আমাকে কড়ায় গণ্ডায় বুঝিয়ে দাও। আমি বেশি চাই না, কমও আমাকে দেয়া উচিত নয়। জগতে কবিকে বঞ্চিত রাখার মহৎ-ক্ষুদ্র-বৃহৎ ইতিহাস পাওয়া যায়। সে সব পর্যালোচনা করলে আজও পাঠকের মন ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে। কবির প্রতিশ্রুত স্বর্ণমুদ্রা নানা টালবাহানার পর যখন সত্যিই কবির বাসস্থানে এসে পৌঁছে তখন দেখা যায় অন্য গেট দিয়ে কবির লাশ বেরিয়ে যাচ্ছে। এটাই তো জগতের কবিদের বঞ্চনার নিয়ম। কিন্তু কোনো কবিই এই নিয়মের আয়ত্তে আসতে সম্মত হননি। তিনি সোনার টাকার পরিবর্তে রুপোর টাকা গ্রহণ করতে সম্মত হননি। সব সুলতানই শেষ পর্যন্ত কবিকে ঠেকাতে গিয়ে জুলুমের ভাগী হয়েছেন। শেষ পর্যন্ত সোনার টাকাই তাকে দিতে হয়েছে। কিন্তু আক্ষেপের বিষয়, কবি জীবিত থাকতে তা দেখে যেতে পারেননি। সোনার টাকা আসে মৃত্যুর পর।

লেখালেখির পথে আমার পরেও মানুষ আসবে। তারা আমার আগেও এসেছিলেন। এই জটিল লেনদেনের খেলায় কেবল কবিরাই চিরকাল বঞ্চিত থাকবে কেন? কেন তারা ছেড়ে দেবে তাদের সত্যিকার পাওনাটা। কম কেন নেবে? কারণ দম ফুরানোর আগে আমি তো বিশ্রাম নেইনি। বিরাম ছিল না আমার। কত বিভিন্ন রসে আমি রসসিক্ত করেছি বাংলাদেশের মাটিকে। তা না হলে কি তুমি ভাব বাংলাদেশ এত সবুজ হতো। এই শ্যামলিমা আমার রক্ত, মাংসের মধ্য থেকে উত্থিত হয়েছে। এর কোনো পরাজয় নেই। তবে জয়ের স্বীকৃতি স্বাভাবিকভাবে কবির করায়ত্ত হতে চায় না। কবি শুধু কবিই আর কিছু নন। কবি না থাকলে কী কী থাকবে না তা কি তুমি জান? যদি না জান তাহলে লিখে নাও, কবি না থাকলে স্বপ্ন থাকবে না, সবুজ থাকবে না, সংগীত থাকবে না আর থাকবে না ভালোবাসা। যার কথা তোমরা দিবস রজনী বলতে সবচেয়ে বেশি আনন্দ পাও।

গল্প- পাহাড়ের স্তব্ধতা by বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর

আমার চারপাশে পাহাড়ের স্তব্ধতা। এই স্তব্ধতা কেউ ভেঙে দিক আমি চাই না। সকালবেলা, রোদ যখন গাছের পাতা রঙিন করে। আমি এক কাপ কালো কফি নিয়ে গরুর ঘণ্টার পিছু পিছু পাহাড়ের ঢালে চলে আসি। আমাকে ঘিরে ধরে পাহাড়ের স্তব্ধতা, কিন্তু পাহাড়ের মধ্যে নানা শব্দ আছে, সে সকল শব্দ কখনো পাখির ডাক। সে সকল শব্দ কখনো পাখির ডাক, কখনো পাহাড়ের বাজনা, কখনো পাহাড়ে বাতাসের বাজনা, কখনো গরুর পায়ের আওয়াজ, কখনো প্রজাপতির নড়াচড়া হয়ে যায়। আমি শব্দকে এভাবে ভিন্ন ভিন্ন করতে থাকি। আমি শান্ত হয়ে যাই।

তখন তুমি আমার সামনে এসে দাঁড়াও। তুমি এসেছ তোমার দেশ থেকে পালিয়ে, আমিও এসেছি আমার দেশ থেকে পালিয়ে।

আমি বললাম, সেই একই কাজ। গ্যারেট সাফ করলাম, কয়লা তুললাম।

কিচেন সাফ। কিচেন সাফ করলাম।

লেখোনি কিচেন সাফ করলাম।

লেখোনি কিছু।

না।

কেন লেখো না। লিখলে তো অতীতটাকে খুঁজে পাও।

আমি কোনো জবাব দিই না। ঠান্ডা লাগে, আর একটি পুলওভার গায়ে চাপাই। কিচেনে গিয়ে চা বানাই, ট্রেতে সাজিয়ে নিয়ে আসি রুটি ডাল, দুধের বোতল, চিনি। চা খেতে খেতে আমরা নিঃশব্দ হয়ে যাই। আমরা ফিরে যাই নিজের নিজের অভিজ্ঞতায়।

যেদিন তোমার মুড ভালো থাকে, সেদিন কিংবা সেসব দিনগুলিতে তুমি বলতে তোমার ওয়ার্স শহরের কথা, তোমার প্রিয় শহর।

তুমি বলতে টমাসের কথা। তোমাদের প্রিয় কাফে ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে। টমাস সবসময় দেরি করে আসত। কাফের কাছে যেই ট্রাম আসত, কাচের দরজা ধাক্কা দিয়ে ঢুকত, যে-কোণে তোমরা সবাই, এক কোণে, সেখানে এসে মাফ চাইত দেরির জন্য। মারী কাউন্টারের পেছনের মেয়েটিকে চেঁচিয়ে ডাকত, এক পেস্নট মাশরুম ফ্রাই করো।

মানুষ কেন পাথর? হয়? তুমি কি তা খুঁজে পেয়েছ? কিংবা আমি?

মনে আছে আমরা যখন একত্রে থাকা শুরু করি। তুমি বলতে নিষিদ্ধ ইশতেহার যেভাবে আমি পড়ি সেভাবে নাকি আমি তোমার দিকে তাকাই, সেই একাগ্রতা নিয়ে তোমার দিকে তাকাই, সেই একাগ্রতা নিয়ে আসলে আমাদের দুজনের অভিজ্ঞতার মধ্যে নিষিদ্ধ ইশতেহার গেঁথে আছে।

তুমি কাজ সেরে সারাদিন পর ফিরে আসতে। তুমি কাজ নিয়েছিলে পাড়ার লাইব্রেরিতে। তুমি ফিরে এলেই বলতাম, চা?

হ্যাঁ, বলেই ক্লোকটা ছুড়ে দিয়ে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়তে।

কেটলি বসিয়ে দিয়ে আমি ফিরে আসতাম তোমার কাছে। তোমার চুলে হাত বুলোতাম। দেয়ালের ময়লা ওয়ালপেপার বাতির আলোয় কদর্য হয়ে উঠত। আমার নাকে আসত কেন জানি পচা ফুলের গন্ধ।

ততক্ষণে তুমি উঠে বসেছ। একটু হেসে জিজ্ঞাসা করতে, কী করলে সারাদিন?

আমি বলতাম, সেই একই কাজ।

কথা বলত জোরে, হাসত জোরে, যদিও কখনো বলোনি, আমি বুঝতাম টমাস তোমাকে প্রেম করত সমগ্র সত্তা দিয়ে।

টমাসের কথা যখন বলতে চোখে পৃথিবীর যত শরমের সব শরম ভর করত।

মাশরুমে কামড় দিয়ে টমাস একদিন বলেছিল, দ্যাখো সবই আমার মনে আছে : আজ সকালে মা চিঠি পেয়েছেন সেন্ট্রাল কমিটি থেকে বাবাকে রিঅ্যাভিলেট করা হয়েছে। চিঠি পড়ে মা শুধু বললেন, তোর বাবাকে এখন পুলিশ ধরে নিয়ে যায়, সব তছনছ করে যায় : এমনকি তোর বাবার ফটোগ্রাফ পর্যন্ত। তখন থেকে আমার আছে কান্না আর চুপ করে থাকা। এখন এই চিঠি নিয়ে আমি কী করব। তোর কাছে রাখ।

টমাস পকেট থেকে বের করে চিঠি দিয়ে দিয়েছিল তোমার দিকে। তুমি চিঠিটি নিয়ে ভাবছিলে, তাই না?

টমাসের বাবা গমুলকার সহকর্মী ছিলেন। রুটির রায়টে গমুলকাকে সরানো হলো। সেই সঙ্গে টমাসের বাবাকে প্রতিবিপস্নবী কর্মে দায়ী করে তাকে দেওয়া হলো সশ্রম কারাদ-। জেলেই তিনি মারা যান। জানুয়ারির কোনো এক সকালে মৃতদেহ তাদের বাড়িতে পৌঁছতে পেরেছিল, কবরস্থানে বরফ আর বরফ। কিছু নেই, কিছু ছিল না। না পাখি, না পাতা, না কোনো শব্দ। জানুয়ারির ছ তারিখ, দ্যাখো তারিখটা পর্যন্ত আমার মনে আছে।

তুমি টমাসের হাত চাপ দিয়ে বলেছিলে, ছিঃ মন খারাপ করে না।

টমাস ক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছিল, চিৎকার শুরু করেছিল, মন খারাপ করব না। ভদ্রলোক, বন্ধু, সহকর্মী, কমরেডরা বলুন আমি মন খারাপ করব না। আমার বাবাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছে, তবু আমি মন খারাপ করব না। বলুন তবু আমি মন খারাপ করব না। বলুন কমরেডরা, বন্ধুরা, সহকর্মীরা আমার মন খারাপ করা উচিত কি না।

টমাসের চিৎকার শুনে তাদের অনেকেই হতবাক, রেগুলারদের অনেকেই বিল চুকিয়ে ততক্ষণে রাস্তায়। শুধু তুমি চুপ, আর কাউন্টারে মারী নির্ধারিত গস্নাস ধুচ্ছে।

ততক্ষণে টমাসের রাগ পড়ে গেল। আসেত্ম আসেত্ম বলেছে, মাপ করো লক্ষ্মীটি, মাপ করো লক্ষ্মীটি, মাপ করো। বাবার কথা মনে পড়ায় বাবার পুরনো কাগজপত্র ঘেঁটেছি। বাবার বিশ্বাসের মধ্যে কোনো খাদ ছিল না। আমাদের দেশে শোষণহীন সমাজ তৈরি হবে সে সত্য, তেমন সত্য ওয়ার্স শহর কিংবা ক্রেকাও শহরের দুর্গ।

বাবার ডায়েরিতে একটা নোট পড়েছি, যদি মুক্ত ব্যক্তিদের সম্ভব তাহলে মুক্ত ব্যক্তি-রাষ্ট্র এই সম্বন্ধ রচনা করতে পারে।

টমাস কথা বলছে, থেমে যাচ্ছে, ফের বলছে। তুমি তাকিয়ে টমাসের দিকে, কিংবা নয়। তুমি হয়তো ভাবছিলে ভিস্ত্তলা নদীতে স্রোত কেমন ফুলে উঠছে, হয়তোবা ভাবছিলে, নদীর পাড়ে লিনডেন গাছের তলায় আগের জন্মে টমাসের পাশে বসে জন্মদিনের উৎসবের কথা। পুরনো দিন পুরনো দিনের মতন ধূসর, কতদূরের তাই নয়? যেখান থেকে স্বপ্নের শিস শোনা যায়।

টমাস তখনো বলছে, স্বনিযুক্ত এলিটরা ক্ষমতা ও সুবিধা কতদিন অগণতান্ত্রিক উপায়ে ধরে রাখবে। নিশ্চয়ই শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলন ফের দেখা দেবে, মুক্ত ব্যক্তিরা ফের সমাজ তৈরি করবে। নচ্ছার সংবিধান খানখান হয়ে যাবে, গাডানস্কের লেনিন শিপইয়ার্ডের শ্রমিকরা প্রচলিত বিধিনিষেধ ভেঙে ফেলবে, আমরা ফের মানবসমাজের কেন্দ্রে, শেষ মানুষটি অবধি তিক্ত, সে অবধি আমরা আসব।

জানালা নিয়ে ভেসে ওঠে আমার শহর, যেখানে গণতন্ত্র ফের পর্যায়ক্রমে গণতন্ত্র ফের সামরিকতন্ত্র লেফট রাইট। আমি উঠে কিচেনে গিয়ে কেটলি বসাই, রুটি কাটি। আমি উবু হয়ে বসি : চোখ আমার ওপর নিবদ্ধ আর আমার চোখ তোমার ওপর নিবদ্ধ।

কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব: দুই দেশের যুদ্ধই কি একমাত্র সমাধান? by সুহেল হালিম

প্রয়োজনে তোমার সীমানার ভেতরে আক্রমণ চালাতে আমরা দ্বিধা করবো না, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ রেখো না। কাশ্মীর ইস্যুতে ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যে সাম্প্রতিক অস্থিরতা চলাকালীন দুই দেশ একে অপরকে বেশ পরিস্কারভাবেই এমন একটি বার্তা দিতে সক্ষম হয়েছে।
আবার হুঁশিয়ারির পাশাপাশি সৌজন্য আর ভালোবাসার বহি:প্রকাশেও দুই দেশ সমান উদারতার পরিচয় দিয়েছে।
আক্রমণ করার ক্ষেত্রে দুই দেশই বেছে নিয়েছে বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুকে, যেন কোনো পক্ষের সেনারাই আঘাত না পায়।
আর তারপর ক্রমাগত সাফাই গেয়ে গেছেন যে নিজেদের সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব সেনা সদস্যদের ওপরই বর্তায়।
যেহেতু আমাদের ওপর সরাসরি আঘাত করা হয়নি, তাহলে কি এই সংঘাতে আমাদের যোগ দেয়া উচিত? দু'পক্ষই ভেবেছিল যে তাদের সেনা কর্মকর্তারা এমন একটা দোটানার মধ্যে থাকবে।
কিন্তু টেলিভিশনের সামনে বসে থাকা বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ডুবে থাকা মানুষ এতো জটিলতা বোঝে না।
তারা শুরু থেকেই এই কাঁদা ছোড়াছুড়ির একটাই অর্থ খুঁজে পেয়েছে; আর তা হলো যুদ্ধ।
তাদের মতে, সমস্যার শুরু যাই হোক আর এর সমাধানের পথ যেদিকেই থাকুক, যুদ্ধের মাধ্যমে এর রফা করার মধ্যে দোষের কিছু নেই।
গত ১৪ই ফেব্রুয়ারি ভারত শাসিত কাশ্মীরে জঙ্গী হামলা হয়েছিল।
সাধারণ মানুষ হয়তো মনে করেছিল যে অস্ত্রগুলোর একটা নির্দিষ্ট স্থায়িত্বকাল রয়েছে যা বেশিদিন অব্যবহার্য অবস্থায় ফেলে রাখলে নষ্ট হয়ে যাবে। কাজেই মূল্যবান অস্ত্রের অপচয় না করে শত্রুর ওপর তার কিছুটা পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করলে লাভ ছাড়া ক্ষতি তো নেই!
কিন্তু ভারতীয় পাইলট আভিনন্দন ভার্তামানকে পাকিস্তান ফেরত পাঠানোর পর সবারই দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাবে বলে ধারণা করা যাচ্ছে। বিশেষ করে সামনেই ভারতের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকায় রাজনীতিবিদরা হয়তো এই সমস্যার সমাধানের পথ খোঁজার চেষ্টা করবেন।
আমরা ৭০ বছর যাবত এই এক ইস্যুতে যুদ্ধ করে আসছি, আর এখন আরেকবার যুদ্ধ শুরু হলে তা কতদিনে শেষ হবে, সে বিষয়েও আমরা নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারি না।
কেবলমাত্র ঈশ্বরই জানেন এর শেষ কোথায়।
পরিস্থিতি এই পর্যায় পর্যন্ত কীভাবে আসলো তা একটু খতিয়ে দেখার চেষ্টা করি আমরা।
পুলওয়ামায় ভারতীয় নিরাপত্তা রক্ষীদের ওপর হামলায় ৪০ জন নিহত হওয়ার পর ভারত সরকারের ওপর বেশ চাপ তৈরি হয় ঐ ঘটনার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য।
নরেন্দ্র মোদি এখনও যেই প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়ার পর আরো বেশি যে প্রশ্নের সম্মুখীন হবেন - তা হলো, জনসমর্থন অর্জন করে আসন্ন নির্বাচনে জেতার উদ্দেশ্যেই তিনি এই অভিযানে সম্মতি দিয়েছেন কি না।
তবে ভারতের সরকার বলছে আক্রমণ করা ছাড়া পাকিস্তানকে প্রতিক্রিয়া প্রদর্শনের আর সব রাস্তা অনেকটাই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
এরকম একটা ধারণা আছে যে এই অভিযানের সম্মতি না দেয়া হলে নরেন্দ্র মোদির বুকের পাটা কতটুকু তা নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়ে যেত।
পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের হোরিয়ান গ্রামের কাছাকাছি বিধ্বস্ত হয় ভারতীয় জেট বিমানটি
তবে কয়েকজন সামরিক বিশেষজ্ঞ এমনও প্রশ্ন তুলেছেন - এই অভিযানের ধারাবাহিকতায় দু'দেশের মধ্যে আরো বড় কোনো সংঘাতের সূত্রপাত হওয়ার সম্ভাবনার বিষয়টি নিয়ে সরকার কতটুকু চিন্তা করেছিল।
এমুহুর্তে অবশ্য ধীরে ধীরে উত্তেজনা প্রশমিত হচ্ছে।
কাজেই আক্রমণের চূড়ান্ত অনুমতি দেয়ার আগে ঐ সিদ্ধান্তের ফলে একটি পরমানু যুদ্ধ শুরু হতে পারতো কি না সে বিষয়ে নেতারা কতটা ওয়াকিবহাল ছিলেন?
এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো আমরা কিছুদিনের মধ্যেই পেতে শুরু করবো।
আরো একটি প্রশ্ন উঠছে। সেটি হলো, এখন পর্যন্ত বিজয়ী আসলে কারা? নাকি এখনও 'ম্যাচ ড্র' হয়েছে বলা চলে?
ভারত সরকার যেদিন বালাকোটে আক্রমণের বিস্তারিত জানায়, সেদিন সবাই মনে করেছিল যে এবারের নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির জয় একরকম নিশ্চিতই হয়ে গেলো।
ভারতের কাছে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিশ্বাসযোগ্যতাও এখন অনেকটাই প্রশ্নের মুখে।
ভারত এখন ইমরান খানের একটি বিষয়ই আমলে নেবে - তা হলো ভারতে হামলা করা জঙ্গীদের দমনে তিনি কী ভূমিকা নেন।
শান্তির পক্ষে: পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুদ্ধের বিরুদ্ধে নাগরিক প্রতিবাদ
কিন্তু কাশ্মীরে আরেকটি রক্তক্ষয়ী হামলা হলে পরিস্থিতি কী হতে পারে, সে বিষয়ে কেউই কথা বলছে না।
একজন অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল বলছিলেন, যুদ্ধে উত্থান-পতন থাকবেই। যুদ্ধের সময় কোনো পক্ষেরই উচিত না অতি দ্রুত হতাশ হওয়া অথবা বিজয় উদযাপন করা উচিত নয়।
ভারতের একজন পাইলটকে আটক করার বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ার পর উত্তেজনা প্রশমিত হতে শুরু করে।
দু'দেশের মধ্যে এবারের সংঘাতের বিস্তারিত বিশ্লেষণ প্রকাশিত হলে হয়তো সাধারণ মানুষ বুঝতে পারবে যে একজন পাইলটের জন্য শতশত বা হাজার-হাজার মানুষের জীবন বেঁচে গেছে।
পাইলট যদি বেঁচে না থাকতেন তাহলে ভারতের পক্ষ থেকে প্রতিশোধের দাবী থাকতো প্রবল, তখন নরেন্দ্র মোদির হাতে অন্য কোনো রাস্তাও হয়তো খোলা থাকতো না।
তাই আটককৃত পাইলটকে ছেড়ে দেয়ার কারণ ইমরান খানের ভাষায় 'শুভাকাঙ্খিতার ইঙ্গিত' নাকি পাকিস্তানের ওপর আন্তর্জাতিক মহলের চাপ - সে বিষয় এখনই নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ না থাকলেও, এর ফলে যে দু'দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা দ্রুত প্রশমিত হয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
তবে কাশ্মীরের সাম্প্রতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে দু'দেশের মধ্যে উত্তেজনা আপাতত স্তিমিত হলেও দু'দেশের রাজনীতিবিদ, সাধারণ মানুষ আর গণমাধ্যম এ বিষয়ে উত্তপ্ত আলোচনা যে এখানেই ছেড়ে দেবে না, তা বলাই বাহুল্য।