Showing posts with label রবার্ট ফিস্ক. Show all posts
Showing posts with label রবার্ট ফিস্ক. Show all posts

Sunday, March 11, 2018

আমি যদি মোহাম্মদ বিন সালমান হতাম... by রবার্ট ফিস্ক

ঈশ্বরকে ধন্যবাদ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানকে উষ্ণ অভিবাদনই দিয়েছেন। কারণ, এটিই যথোপযুক্ত। মহামান্য ক্রাউন প্রিন্স একজন সাহসী আরব সংস্কারক। তিনি তার ধনাঢ্য দেশকে একুশ শতকে পদার্পণ করাতে ভীষণ আগ্রহী। নারী অধিকার, ব্যাপক অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, মধ্যপন্থী ইসলাম, পাশ্চাত্যের জন্য আরও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও ‘সন্ত্রাস-বিরোধী যুদ্ধে’ আরও ঘনিষ্ঠভাবে অংশগ্রহণের মতো একগাদা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
ঈশ্বরকে আবারও ধন্যবাদ।
মুন্ডু শিরশেদকারী আক্রমণাত্মক এক আরব ক্রাউন প্রিন্স, যার সাংঘাতিক যুদ্ধ কিনা হাজার হাজার প্রাণ কেড়ে নিয়েছে ইয়েমেনে; ইয়েমেনের জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে তেরেসা মের কাছ থেকে কয়েক মিলিয়ন ডলারের সমরাস্ত্র কিনে যেই প্রিন্স কিনা যুক্তরাজ্যকে তার দুর্নামের ভাগীদার করেছেন; যিনি কিনা তার ধনবান কাতারি ভাইদের ধ্বংস করতে চান; যেই প্রিন্স কিনা মধ্যপ্রাচ্যের শিয়াদের বিরুদ্ধে সৌদি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কতিপয় পশ্চিমা দেশকে সম্পৃক্ত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছেন, সেই ক্রাউন প্রিন্সকে অভ্যর্থনা জানিয়ে অযথা নিজের সময় নষ্ট না করে তেরেসা মে অগাধ প্রজ্ঞার স্বাক্ষর রেখেছেন।
সমস্যাটা ধরতে পেরেছেন? অর্থ, অস্ত্র ও ক্ষমতার প্রশ্ন যখন এসে হাজির হয়, তখন আমরা যেকোনো আরব স্বৈরাচারের সঙ্গে দহরম মহরম করবো। বিশেষ করে যখন ওয়াশিংটনে আমাদের সর্দারও ওই স্বৈরাচারের ব্যাপারে একই মনোভাব পোষণ করে, তখন তো কথাই নেই। আর যদি বা যখন ওই স্বৈরাচারের কোনো মূল্য থাকবে না, আমাদের সমরাস্ত্র কিনবে না, কিংবা যখন তার অর্থ ফুরিয়ে যাবে বা ক্ষমতাচ্যুত হবে, তখন আমরা স্রেফ আমাদের হাত ধুয়ে মুছে ফেলবো। এ কারণে যুবক মোহাম্মদের জন্য আমি সামান্য করুণা অনুভব করি।
আরেকটু যোগ করে বলি, মানবাধিকার প্রশ্নে তেরেসা মের ‘আসুন পুরাতন ভুলে নতুন করে শুরু করি’ ধাঁচের বক্তব্য যদি কারও কয়েক মিনিটের বেশি শুনতে ইচ্ছে হয়, তাদের প্রতিও আমার করুণা রইলো। সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আল-জুবেইর খুবই ঝানু একজন কূটনীতিক। বৃটিশ কর্তাদের সুস্পষ্ট অসৎ ও অসংলগ্ন কথাবার্তা শোনার সময় তিনিও নিশ্চয়ই অধৈর্য বোধ করছিলেন। ১২ মাসের বিরতিতে বেলফোর ঘোষণাপত্রের প্রতি অবজ্ঞা থেকে ভালোবাসা জন্ম নিয়েছে বরিস জনসনের। আরব বিশ্বে একে নিকৃষ্ট হেঁয়ালিপনা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এই সপ্তাহে অ্যামনেস্টি ও অন্যান্য মানবাধিকার সংগঠন ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে। একই কাজ করছে বিক্ষোভকারীরা। কেউ এই বিক্ষোভে বাধা দিলে তারা সৌদির কাজই করবে, আমরা নিশ্চিত। কিন্তু আমার আশঙ্কা হলো, ক্রাউন প্রিন্সের উচিৎ ওই দেশের সরকারকে নিয়ে বেশি চিন্তিত হওয়া যারা এখন তার নেতৃত্বের প্রতি মাথা নত করছে। কারণ, তিনি একটি পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে লেনদেন করছেন, তার বেলায় সেই শক্তি হলো বৃটেন। তাকে এখন একটাই উপদেশ দেওয়া উচিৎ। সেটা হলো: নিজের পেছনটার দিকে খেয়াল রাখুন।
প্রয়াত মুয়াম্মার গাদ্দাফি যখন বাদশাহ ইদরিসকে উৎখাত করলেন, বৃটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় খুশি হলো। তেলসমৃদ্ধ দেশের নেতৃত্বে নতুন চালক, নতুন একজোড়া হাত। আমরা এই দেশের সম্পদের কিছু অংশ ভোগ করতে চাই। তাই আমরা ভেবেছি গাদ্দাফিই হতে পারে আমাদের লোক। আমেরিকানরা এমনকি তাকে এক পাল্টা-অভ্যুত্থান সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়। আমরাও পরে তার ভিন্নমতালম্বীদের নির্যাতনের জন্য বন্দী করতে তাকে সহায়তা করি। এরপর হুট করে গাদ্দাফি উপনিবেশ-বিরোধী জাতীয়তাবাদীতে পরিণত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। এক পর্যায়ে সে আইআরএ’র সঙ্গে জড়িত হলো। পশ্চিম বার্লিনের একটি নাইটক্লাবে বোমা হামলায় তার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেল। আর তাতেই সে হঠাৎ করে সন্ত্রাসী হয়ে গেল! এরপর যখন ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ শুরু হলো, দখল হলো ইরাক, তখন পরম পূজনীয় ব্লেয়ার পারলে গাদ্দাফিকে চুমু খান, এই অবস্থা! গাদ্দাফি তখন আবার মহান রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হলো। ২০১১ সালের বিপ্লবের আগে আগে, গাদ্দাফি ফের সন্ত্রাসী হয়ে যান। এবার তাকে বোমা মেরে উৎখাত করে ন্যাটো। তাকে হত্যা করে তার নিজের লোকেরা।
ইরাকের প্রসঙ্গ যেহেতু উঠলো, সেহেতু বলতে হয়, সাদ্দামেরও একই পরিণতি হয়েছিল। প্রথমে আমরা তাকে পছন্দ করেছিলাম। আমেরিকানরা তাকে তার কম্যুনিস্ট প্রতিপক্ষদের ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছিল। নিশ্চিতভাবে বলা যায়, সেও ছিল মস্তক বিদীর্ণকারী। কিন্তু যতদিন সাদ্দাম পশ্চিমা পছন্দসই রাষ্ট্র দখল করেছিল, ততদিন সে ছিল মহান রাষ্ট্রনায়ক। এ কারণেই ১৯৮০ সালে আমরা তার ইরান দখল অভিযানে সহায়তা দিয়েছিলাম। কিন্তু ১৯৯০ সালে যখন সাদ্দাম ভুল রাষ্ট্র অর্থাৎ কুয়েত দখলে নেন, তখন আমরা তাকে কুখ্যাত সন্ত্রাসী আখ্যা দিলাম। গাদ্দাফির মতো সাদ্দামকেও হত্যা করে তার নিজ দেশের মানুষ, যদিও আমেরিকানদের ঠিক করে দেওয়া আদালতই তাকে ফাঁসি দেওয়ার রায় দেয়।
ইয়াসির আরাফাতের কথা আমরা এখন অত মনেও করি না। তাকেও একসময় ভাবা হতো বৈরুতের ফিলিস্তিনি সন্ত্রাসী। আইজাক রবিন ও বিল ক্লিনটনের সঙ্গে করমর্দন করার আগে আরাফাত ছিলেন বিশ্ব সন্ত্রাসের কেন্দ্রবিন্দু। করমর্দন করার পর তিনি হয়ে যান মহান রাষ্ট্রনেতা। কিন্তু আরাফাত যখন অসলো চুক্তি থেকে দূরে গিয়ে পশ্চিম তীরে ইসরাইলি একাধিপত্য মানতে অস্বীকার করলেন, তখন তিনি ফের হয়ে যান কুখ্যাত সন্ত্রাসী। রামাল্লায় তাকে চারদিক থেকে ঘিরে রাখা হতো। বোমা হামলাও হয়েছে সেখানে। জীবনের শেষ মুহূর্তে তাকে বিমানে করে প্যারিসের এক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানেই তিনি মারা যান। ইসরাইলিরা তাকে ‘আমাদের বিন লাদেন’ হিসেবে আখ্যা দিত। আরাফাতের উত্তরসূরি মাহমুদ আব্বাসকেও এই উপাধি দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু মাহমুদ আব্বাসের অত সৌভাগ্য ছিল না। তিনি ভয়াবহ সন্ত্রাসী বা মহান রাষ্ট্রনায়ক কোনটাই নন। তিনি ছিলেন আরও খারাপ কিছু। একজন ব্যর্থ নেতা।
নাসের উৎখাত করেছিলেন দুর্নীতিগ্রস্ত বাদশাহ ফারুককে। সুয়েজ খাল জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তিনি পশ্চিমের চোখে হয়ে যান সন্ত্রাসী। তৎকালীন বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি এডেন তাকে ‘নীল নদের মুসোলিনি’ আখ্যা দিয়েছিলেন। মনে করে দেখুন, সাদ্দামকেও ‘টাইগ্রিস নদের হিটলার’ আখ্যা দেওয়া হয়েছিল ১৯৯০ সালে। প্যারিসে নির্বাসিত থাকাকালে খোমেনিও ছিলেন সম্ভাব্য রাষ্ট্রনায়ক। কিন্তু যখন তিনি শাহকে হটিয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করলেন ইরানে, তিনি হয়ে গেলেন সুপার টেরোরিস্ট-ইন-চীফ। ফরাসি বামপন্থীরা ভেবেছিল হাফেজ আল আসাদ হয়তো হবে মহান রাষ্ট্রনায়ক। কিন্তু তার ছেলে বাশার আল আসাদ, যিনি হৃষ্টপুষ্ট হন ফ্রান্সে, তিনি যখন তার প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে গেলেন, তখন তিনি তো ‘সুপার টেরোরিস্ট’ হলেনই, নিজের পিতাকেও ‘সন্ত্রাসী’ বানিয়ে ছাড়লেন। ওমানে ও কাতারের বাদশাহর বিরুদ্ধে তাদের ছেলেরা যখন অভ্যুত্থান করলো তখন আনুগত্য পরিবর্তনে একটুও সময় নেয়নি বৃটেন।
এ কারণে আদেল আল জুবেইরের উচিৎ হবে মোহাম্মদ বিন সালমানকে ‘মেমেন্টো হোমো’ শব্দদ্বয় মনে করিয়ে দেওয়া। মেমেন্টো হোমো - এই কথা গ্ল্যাডিয়েটরদের মনে করিয়ে দেওয়া হতো। এর মানে হলো তিনিই ‘একমাত্র মানুষ’। নিজে বৈ কেউ গ্ল্যাডিয়েটরদের সঙ্গে নেই। ইয়েমেন যুদ্ধ যদি আরও রক্তাক্ত হয়ে উঠে, সৌদি সামরিক বাহিনীর যদি যুদ্ধ থেকে মোহমুক্তি ঘটে, তাহলে কী হতে পারে? ক্রাউন প্রিন্সের ভিশন ২০৩০ যদি স্রেফ সাউথ সি বাবলের সৌদি সংস্করণ বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে কী ঘটবে? কী ঘটবে, যদি অপমানিত বিলিয়নিয়াররা, যাদেরকে ক্রাউন প্রিন্স রিয়াদের রিটয হোটেলে বন্দী করেছিলেন, তারা প্রতিশোধ নিতে আসে? কী হবে যদি ভবিষ্যৎ বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী আল ইয়ামামাহ অস্ত্র চুক্তি নিয়ে স্পেশাল ব্রাঞ্চের তদন্ত পুনরায় শুরু করেন? আর কী হবে, যদি কেউ আমেরিকার সমরাস্ত্র কীভাবে ২০১৪ সালের পর আইসিসের হাতে পৌঁছেছিল সেই পথ আবিষ্কার করে ফেলে? কিংবা যদি ইরানের সঙ্গে সত্যি সত্যি যুদ্ধ শুরু হয়?
সত্য হলো, আপনি কিছুতেই বলতে পারবেন না যে, কে আপনার বন্ধু। এই বৃটিশরাই কী সৌদি রাজবংশকে আরব সাম্রাজ্যের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফিলিস্তিন, টান্স-জর্দান ও ইরাক তাদের দখলে রেখে দেয়নি? এই বৃটিশরাই কি বেলফোর ঘোষণাপত্র প্রকাশ করার পর ইহুদীদের ও আরবদের সঙ্গে প্রতারণা করার চেষ্টা করেনি? ইহুদীদেরকে বৃটিশরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তাদেরকে একটি দেশ পাইয়ে দেওয়ার। আর আরবদের ভূখ- রক্ষার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল বৃটিশরা।
এই বৃটিশরাই কি রোমানিয়ার একনায়ক চচেসকুকে সম্মানসূচক নাইটহুড দিয়ে আবার তার উৎখাতের পর তা প্রত্যাহার করেনি? আমরা মুগাবেকেও একই সম্মাননা দিয়েছিলাম, পরে আবার ফেরত নিয়েছিলাম। আমরা মুসোলিনিকেও সম্মাননা দিয়েছিলাম! হ্যাঁ, আমরা ১৯৪০ সালে তা ফেরত নিই।
তাই, ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ, সতর্ক হোন। বিশ্বাসঘাতক বৃটিশদের বিশ্বাস করবেন না। দেশে থাকুন, আর বিদেশে। অস্ত্র কিনেছেন, সেজন্য ধন্যবাদ। ধন্যবাদ আপনাকে ওয়াহাবি বিশ্বাসে ব্রেইনওয়াশড হওয়া ছেলেপেলেগুলোর পদচিহ্ন অনুসরণের কাজে আমাদেরকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তার জন্য। কিন্তু যা-ই করুন না কেন, আমাদের সম্মানসূচক নাইটহুড নিয়ে উচ্ছ্বসিত হবেন না।
(রবার্ট ফিস্ক বৃটিশ পত্রিকা দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টের মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি। ইন্ডিপেনডেন্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তার এই কলাম অনুবাদ করেছেন মাহমুদ ফেরদৌস।)

Tuesday, May 23, 2017

ট্রাম্পের বক্তব্য কপটতায় ভরা by রবার্ট ফিস্ক

ফে  ইক নিউজ (বানোয়াট সংবাদ) আবিষ্কার করার পর আমেরিকার খ্যাপাটে প্রেসিডেন্ট রোববার বিশ্বের মুসলিমদের সামনে নিজেই এক বানোয়াট বক্তব্য দিলেন। ডনাল্ড ট্রাম্প বললেন, সৌদি আরবে তিনি ‘লেকচার’ দিতে যান নি। কিন্তু পরক্ষণেই বিশ্বের ইসলাম ধর্মপ্রচারকদের বলে দিলেন কি বলতে হবে। ‘ইসলামিস্ট টেররিজম’ এর সমালোচনা করলেন, ভাবখানা এমন যে সহিংসতা কেবল মুসলিম সংশ্লিষ্ট একটা বিষয়। এরপর ওল্ড টেস্টামেন্টের একজন পয়গম্বরের মতো ঘোষণা দিলেন যে তিনি ‘শুভ-অশুভের লড়াইয়ের’ মাঝে আছেন। কোন সমবেদনা ছিল না, সহমর্মিতাও না। গেল বছর তার বৈষম্যমূলক, মুসলিমবিরোধী বক্তব্যের জন্য  একটি শব্দও ছিল না।
আরো তাজ্জব বিষয় হলো তিনি ‘সাম্প্রদায়িক সহিংসতা উসকে দেয়া’র জন্য ইরানকে দোষারোপ করেছেন, আইসিসকে নয়। ইরান যেদিন একজন উদারমনা সংস্কারপন্থিকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত করেছে তার একদিন পর ট্রাম্প ইরানি জনগণকে তাদের ‘হতাশা’র জন্য করুণা প্রকাশ করেছেন। সেইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে সর্ববৃহৎ শিয়াপ্রধান দেশটিকে আরো বিচ্ছিন্ন করে তোলার দাবি জানিয়েছেন। ‘এতো বেশি অস্থিতিশীলতার’ জন্য দায়ী হলো ইরান। নিন্দার শিকার হয়েছে শিয়া হিজবুল্লাহও। বাদ যায় নি শিয়া ইয়েমেনিরাও। ট্রাম্পের এমন বিচক্ষণতায় প্রীত হয়েছেন তার সুন্নি সৌদি আমন্ত্রণকর্তারা।
সিএনএন এটাকে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক ‘রিসেট’ (পুনরায় শুরু করা) করার বক্তব্য হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। ‘রিসেট’কে আপনি ‘রিপেয়ার’ (মেরামত) পড়তে পারেন। তবে, রোববার রিয়াদে ট্রাম্পের তীব্র নিন্দামূলক বক্তব্য ‘রিসেট’ও ছিল না ‘রিপেয়ার’ও ছিল না। এটা ছিল ওই ‘লেকচার’ যেটা তিনি দেবেন না বলে দাবি করেছিলেন।
ট্রাম্প বললেন, ‘প্রতিবারই যখন একজন সন্ত্রাসী একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে হত্যা করে ভুলভাবে সৃষ্টিকর্তার নাম টেনে আনে, তা প্রত্যেক ধর্মবিশ্বাসীর জন্যই অপমানজনক হওয়া উচিত।’ তিনি পুরোটাই এড়িয়ে গেলেন যে, ইরান নয় সৌদি আরবই ওয়াহাবি সালাফি জঙ্গিবাদের আদিউৎস যাদের ‘সন্ত্রাসীরা’ ‘নিরপরাধ মানুষ’ খুন করে। অবশ্য ট্রাম্পের এটা এড়িয়ে যাওয়া ছাড়া কিছু করার ছিল না।
তিনি তার পুরোনো বৈষম্যমূলক ‘র‌্যাডিক্যাল ইসলামিক এক্সট্রিমিস্ট’ (উগ্রপন্থি ইসলামি জঙ্গি) মন্ত্র আওড়ানো থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করেছেন। আর এর পরিবর্তে বলার চেষ্টা করেছেন ‘ইসলামিস্ট এক্সট্রিমিজম’ (ইসলামপন্থি জঙ্গিবাদ)। কিন্তু তিনি দৃশ্যত তার শব্দচয়নে তালগোল পাকিয়েছেন। আর ‘ইসলামিক’ শব্দটাও ব্যবহার করেছেন। ইংরেজিতে তিনি সূক্ষ্ম যে পার্থক্য গড়ার চেষ্টা করছিলেন তা মুসলিমদের কাছে ওই ‘সন্ত্রাসীরা মুসলিম’ ধারণার ভিন্ন এক রূপ বৈ অন্য কিছু ছিল না।
এসব এসেছে সৌদি আরবের সঙ্গে ট্রাম্প আরেকটি ভয়ানক অস্ত্র চুক্তি (১১ হাজার কোটি ডলার) করা, আর কাতারের মার্কিন অস্ত্র ক্রয়ের প্রস্তাবের পর- ট্রাম্প যেসব অস্ত্রকে কদর্যভাবে আখ্যা দিয়েছেন ‘সুন্দর সব সামরিক সরঞ্জাম’ হিসেবে। এটা বিচিত্র যে তিনি এমন একটা মন্তব্য এমন সময় করলেন, যার দু’দিন পরই তিনি কায়রোতে পোপের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। আর যেই পোপ দু’সপ্তাহ আগে আল আজহারের মুসলিম শেখের সঙ্গে অস্ত্র ব্যবসায়ীদের দুষ্টচক্রের বিরুদ্ধে কড়া সমালোচনা করেছেন।
ট্রাম্প সৌদিদের ও আরো ৫০ মুসলিম রাষ্ট্রের নেতাদের রোববার বলেন, ‘আমরা নীতিনিষ্ঠ এক বাস্তববাদ গ্রহণ করছি যা আমাদের অভিন্ন মূল্যবোধ আর স্বার্থের মধ্যে প্রোথিত।’
ট্রাম্প যখন বললেন যে, ‘আমাদের মিত্ররা কখনই আমাদের সমর্থন নিয়ে প্রশ্ন তুলবে না, আর আমাদের শত্রুরা আমাদের দৃঢ় সংকল্প নিয়ে সংশয় প্রকাশ করবে না,’ ট্রাম্প কি তার বন্ধু বলতে সৌদিদের বুঝিয়েছেন? নাকি ‘ইসলামিক বিশ্ব’কে বুঝিয়েছেন যেখানে নিশ্চিতভাবে ইরান, সিরিয়া ও ইয়েমেনও থাকবে, আরো  থাকবে লিবিয়ার যুদ্ধরত মিলিশিয়ারা? ‘শত্রু’ বলতে কি তিনি আইসিস বুঝিয়েছেন? নাকি রাশিয়া? বা সিরিয়া? অথবা ইরান? যে দেশটির নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নিশ্চিতভাবে আমেরিকার সঙ্গে শান্তি চায়। নাকি তিনি বিশ্বের সুন্নি মুসলিমদের সঙ্গে বন্ধুত্ব আর শিয়া মুসলিমদের প্রতি বৈরিতার ঘোষণা দিচ্ছিলেন?- মুসলিম বিশ্বের একাংশ সঙ্গত কারণেই যেটা মনে করবে।
এ কারণে এটাই আসলে ছিল রিয়াদ বক্তব্য-উৎসবের আসল কথা। এই উদ্ধৃতিটা ধরুন: ‘আমরা বাস্তব জগতের ফলের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেবো- অনমনীয় ভাবাদর্শের ওপর নয়। আমরা অভিজ্ঞতালব্ধ শিক্ষা দিয়ে পরিচালিত হবো, অটল চিন্তাধারার সীমাবদ্ধতা দিয়ে নয়। আর যেখানেই সম্ভব আমরা ক্রমাগত সংস্কারের চেষ্টা করবো- আকস্মিক হস্তক্ষেপ নয়।’ এখন ছোট্ট এই বিভিষিকার বিশ্লেষন করা যাক। ‘বাস্তব জগতের ফলের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত’- এর অর্থ হলো নৃশংস প্রয়োগবাদ। ‘ক্রমাগত সংস্কার’ ইঙ্গিত দেয় যে যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকারের জন্য কিছু করবে না, মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রতিহত করতে কোনো পদক্ষেপ নেবে না- যদি না সেগুলো ইরান, সিরিয়া, ইরাকি শিয়া, লেবাননের শিয়া হিজবুল্লাহ বা ইয়েমেনের শিয়া হুতিরা করে।
পুরো বিষয়টা ছিল ‘অংশীদারিত্ব’ নিয়ে- আমাদের এমনটাই বিশ্বাস করার কথা ছিল। বিষয়টা ছিল একটি ‘জোট’- নিয়ে। আপনি এটা নিশ্চিত হতে পারেন। আমেরিকা ইরাক ও আফগানিস্তানে যেমনটা রক্ত বইয়েছে তেমনটা আর করবে না। নিজেদের মাঝে লড়াইরত আরবদেরকেই রক্তাক্ত হতে হবে যারা সর্ববৃহৎ অস্ত্র সরবরাহকারীর কাছ থেকে অনুপ্রাণিত। সুতরাং ট্রাম্প তাদের লেকচার দিলেন ‘তাদের অংশের বোঝা’ বহন করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে। আরবরা ‘একতাবদ্ধ আর শক্তিশালী’ হবে ‘মঙ্গলের শক্তি’ হিসেবে। লড়াইটা যদি ‘সকল ধর্মের সজ্জন’ আর ‘বর্বর অপরাধীদের’ মধ্যে হয়- ‘শুভ আর অশুভের মধ্যে’ হয়- যেমনটা ট্রাম্প ধরে নিয়েছেন, তাহলে এটা গুরুত্বপূর্ণ যে এই লড়াইটা শুরু হচ্ছে সুন্নি সৌদি আরবের ‘পবিত্র ভূমিতে’। গুরুত্বপূর্ণ নয় কি? 
যে সময়ে ট্রাম্প তার বক্তব্যের ওই অংশে পৌঁছেছেন যেখানে তিনি মন্দলোকদের হুঁশিয়ারি দেন- ‘আপনি যদি সন্ত্রাসের পথ বেছে নেন, আপনার জীবন হবে শূন্য। আপনার জীবন হবে সংক্ষিপ্ত। আর আপনার আত্মা হবে অভিশপ্ত’- তাকে আইসিসের বক্তব্য-লেখকদের মতো শোনাচ্ছিল। দৃশ্যত, ট্রাম্পের মূল বক্তব্য আংশিকভাবে ওই একই লোকের প্রস্তুত করা যিনি যুক্তরাষ্ট্রে ৭টি দেশের মুসলিমদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে ট্রাম্পের হাস্যকর (এবং ব্যর্থ) আইনি প্রচেষ্টার অনেকখানি প্রস্তুত করেছিলেন। সবমিলিয়ে বেশ একটা ‘রিসেট’ বটে। ট্রাম্প শান্তির কথা বলছিলেন কিন্তু একইসঙ্গে আরবদের প্রস্তুত করছিলেন একটি সুন্নি-শিয়া যুদ্ধের জন্য। বলার অপেক্ষা রাখে না যুক্তরাষ্ট্রের পাগল প্রেসিডেন্ট যখন তার বক্তব্য শেষ করেন তখন মুসলিম বিশ্বের তোষামোদি নেতারা তালি বাজাচ্ছিলেন। কিন্তু তারা কি বুঝেছেন তার কথাগুলো আসলে কোন অশনি সংকেতের আলামত?
[বৃটেনের অনলাইন ইন্ডিপেন্ডেন্টে প্রকাশিত রবার্ট ফিস্কের লেখা ‘ডনাল্ড ট্রাম্প’স স্পিচ টু দ্য মুসলিম ওয়ার্ল্ড ওয়াজ ফিলড উইথ হিপোক্রেসি অ্যান্ড কনডেসেনশন’ শীর্ষক নিবন্ধের অনুবাদ। ইন্ডিপেন্ডেন্টের মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি রবার্ট ফিস্ক একাধিক পুরস্কারজয়ী বর্ষীয়ান একজন সাংবাদিক। চার দশকের বেশি সময় ধরে তিনি আরব বিশ্বে বসবাস করছেন। দীর্ঘ এ সময়ে তিনি লেবানন পরিস্থিতি, ৫টি ইসরাইলি আগ্রাসন, ইরান-ইরাক যুদ্ধ, আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসন, আলজেরিয়ান গৃহযুদ্ধ, সাদ্দাম হুসেইনের কুয়েত আক্রমণ, বসনিয়া ও কসোভো যুদ্ধ, ইরাকে মার্কিন হামলা ও দখলদারিতা এবং ২০১১’র আরব অভ্যুত্থান কভার করেছেন। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে তার লেখা গ্রন্থ ‘পিটি দ্য নেশন’ ও ‘দ্য গ্রেট ওয়ার ফর সিভিলাইজেশন’ বেস্ট সেলার।]

Sunday, April 24, 2016

একজন ‘প্রিন্স’-এর জন্য কাঁদি, ৫০০ শরণার্থীর জন্য নয় by রবার্ট ফিস্ক

সংবাদ লেখায় আমাদের নৈতিকতার কিছু কি হারিয়ে গেছে? গত সপ্তাহে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে গত ১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বোমা হামলায় নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ৬৪ আফগান নাগরিক। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৩৪০ জন। অভিজান নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী, যারা রাজধানীকে রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত, তাদের খুব কাছেই তালেবানরা এ হামলা চালিয়েছে। এতে কয়েকটি পরিবারের সবাই মারা গিয়েছেন। তাদের জন্য কোন ময়না তদন্ত হয় নি। স্থানীয় টেলিভিশনে দেখানো ফুটেজে দেখা গেছে মা, তার স্বামী ও তিন সন্তানের পুরো একটি পরিবার মিলি সেকেন্ডের মধ্যে টুকরো টুকরো হয়ে গেছেন। শহরের এম্বুলেন্স সার্ভিস থেকে বলা হয়েছে, তাদের সবগুলো এম্বুলেন্স (১৫টি) উদ্ধার অভিযানে লাগানো হয়েছে। এর মধ্যে একটি এম্বুলেন্সে এত বেশি আহত ব্যক্তিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল যে, এর পিছনের দরজার পাল্লা এক সময় খুলে যায়।
এখন আফগানিস্তান হলো সেই দেশ, যেখানে আমরা ও আমাদের ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশীদাররা শরণার্থীদের ফেরত পাঠিয়ে তুষ্ট হচ্ছি। আর বলছি কাবুল ও এর আশপাশের প্রদেশ এখন নিরাপদ। অবশ্যই এটা একটি ডাহা মিথ্যা কথা। যেমন ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের আগে ব্যাপক বিধ্বংসী মারণাস্ত্রের কথা বলা হয়েছিল অসৎ উদ্দেশে। ২০০১ সালে আফগানিস্তানে আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যে, তাদেরকে আমরা ফেলে যাব না। সোভিয়েত যুুদ্ধের পর তাদেরকে যেভাবে আমরা ভুলে গিয়েছিল সেভাবে ভুলবো না। অবশ্যই ওই সময়ের প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের দেয়া সেই প্রতিশ্রুতির কোন মূল্যই নেই।
গত সপ্তাহে আফগানিস্তানের টেলিভিশনে আরেকটি খবর দেয়া হয়েছে। তাতে তাদের ভবিষ্যত কেমন অন্ধকারাচ্ছন্ন হতে পারে তা তুলে ধরা হয়। দু’জন আমেরিকানকে হত্যার জন্য সবুর নামে এক যুবককে অভিযুক্ত করা হয়েছে। সে আদালতে বলেছে, এ জন্য তার কোন অনুশোচনা নেই। সঙ্গে সঙ্গে আফগানিস্তানের সামাজিক মিডিয়ায় এই যুবকের পক্ষে সমর্থন উপচে পড়ে। একজন বলেন, ওই যুবকই হলেন খাঁটি আফগান। আরেকজন বলেন, তিনি প্রকৃত আফগান।
কিন্তু এই সপ্তাহে মারা গিয়েছেন সঙ্গীতশিল্পী প্রিন্স।
তারপর রয়েছে সর্বশেষ ভূমধ্যসাগরীয় বিপর্যয়। একটি বড় বোটে ছিলেন মিশরীয়, ইথিওপিয়ান, সোমালিয়ার মানুষ ও সুদানিরা। একটি ছোট বোট থেকে তাতে আরও শরণার্থী তাতে তুলে দেয়ার পর ওই বোটটি ডুবে মারা গেছেন ৫০০ শরণার্থী ও অভিবাসী। যারা বেঁচে আছেন তাদেরকে গ্রিসে নামানো হয়েছে। তাদের অনেকে নিজের পরিবারকে ডুবে মরতে দেখেছেন। কিন্তু তাদের ডুবে যাওয়ার কোন ছবি নেই। অবশ্যই তাদের কোন ময়না তদন্তও নেই। ছোট্ট আয়লান কুর্দির মতো কেউ সমুদ্রতীরে ভেসে আসে নি কারো মৃতদেহ। তাই কোন ক্যামেরাও এর ছবি পায় নি। তারা সোজা সাগরের গভীরে ডুবে গেছেন। যোগ দিয়েছেন সেই সব হাজার হাজার মানুষের কংকালের সঙ্গে যারা আর কোনদিন ইউরোপে যেতে পারবেন না। বিখ্যাত টাইটানিক ডুবে যে পরিমাণ মানুষ মারা গিয়েছিলেন তার এক তৃতীয়াংশ হলো সর্বশেষ ডুবে মরা এই ৫০০ শরণার্থী। ওই ঘটনার সঙ্গে এটাকে মিলিয়ে দেখবেন না। এটাও বলবেন না যে, এখনও এক মিলিয়ন মানুষ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেয়াকেই বেছে নিয়েছেন, আমরা গ্রিস ও তুরস্কের মধ্যকার প্রণালী বন্ধ করে দিচ্ছি।
না, যারা মেধাবী এই মেধাবী সঙ্গীতশিল্পীর (প্রিন্স) মৃত্যুতে বিলাপ করছেন, সামাজিক মিডিয়ায় ঝড় তুলেছেন তাদেরকে আমি রুষ্ঠ করতে চাই না। ‘পারপেল রেইন’-এর এই সুপারস্টারের ভক্ত রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে। সেখানে আরবে যে ফেসবুক রয়েছে তাতে এই সুপারস্টারের মৃত্যুতে বেদনায় পূর্ণ। আমরা যদি আর একটু এগিয়ে যাই তাহলে বিস্মিত হতে হয়। যখন যখন টেলিভিশনের উপস্থিাপক-উপস্থাপিকারা মিনিয়াপোলিশের মেয়রের কাছে তাদের বেদনা প্রকাশ করছেন, আইফেল টাওয়ার রক্তবর্ণ ধারণ করেছে, তখন অবশ্যই এমন একটি সময় এসেছে যখন আমরা নিজেদের কাছে প্রশ্ন করতে পারি, আমাদের অগ্রাধিকারের সব উদ্দেশ্য কি হারিয়ে যায় নি। কাবুলে যে তিনটি শিশু মারা গিয়েছে তাদের কেউ একজনও কি একজন ‘প্রিন্স’ হয়ে উঠতে পারতো না? অথবা ভূমধ্যসাগরে যে ৫ শত মানুষ ডুবে মরেছেন তাদের মধ্য থেকে কোন শিশু কি তা হতে পারতো না? একটি ছেলে বা একজন মেয়ে শিশু কি হতে পারতো না এক একজন সুপারস্টার? কতজন টিভি উপস্থাপক বা উপস্থাপিকা এসব শিশুর মৃত্যুতেও দুঃখ প্রকাশ করেছেন? অবশ্যই রক্তবর্ণের চেয়ে রঙটা হতে পারতো কালো। আইফেল টাওয়ারের আলো নিভিয়ে দেয়া হতে পারতো।
কিন্তু তা হবে না। কারণ, এ সপ্তাহে ‘প্রিন্স’ মারা গিয়েছেন।
(রবার্ট ফিস্ক ইংলিশ ভাষার সাংবাদিক ও লেখক। লন্ডনের দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকায় মধ্য প্রাব্য বিষয়ক সাংবাদিকতরা করছেন ২০ বছরের বেশি। )
(অনলাইন দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টে প্রকাশিত লেখার অনুবাদ)

Wednesday, February 10, 2016

পরাশক্তিদের সংঘাত এড়াতে হবে by রবার্ট ফিস্ক

সিরিয়ার ‘ইসলামি খিলাফত’ যতটা দীর্ঘমেয়াদি মনে হতো, সেটা এখন আর অতটা দীর্ঘমেয়াদি মনে হচ্ছে না। সে কারণেই কি সুন্নি সৌদিরা হঠাৎ করেই সিরিয়াতে স্থলসেনা পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে? আবার তুর্কিরাই বা এতটা বিচলিত কেন?
পাঁচ বছর ধরে আইএসের সঙ্গে যুদ্ধ করে ৬০ হাজার সেনা হারিয়ে সিরীয় সেনাবাহিনী হঠাৎ করেই এ যুদ্ধের সবচেয়ে বড় জয় অর্জন করেছে, তারা আলেপ্পো শহরের আশপাশে জাবাত আল-নুসরাসহ অন্য বিদ্রোহীদের গুঁড়িয়ে দিয়ে নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণ করে ফেলেছে। ওদিকে শহরের বাইরে রুশ বিমান হামলা তো ছিলই।
তুরস্ক থেকে আলেপ্পো পর্যন্ত বিদ্রোহীদের সরবরাহ লাইন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, কিন্তু এটাই গল্পের শেষ নয়। বেশ কয়েক মাস ধরে সিরিয়ার সেনা কর্তৃপক্ষ আরও লাখ খানেক বেসামরিক মানুষসহ আলেপ্পো শহরের মধ্যে আটকা পড়েছিল, তারা একরকমভাবে নুসরা যোদ্ধাদের বোমা ও মর্টার গোলার মধ্যেই তাদের দয়ায় বেঁচে ছিল। এই বিদ্রোহীরা তাদের ঘিরে রেখেছিল, যতক্ষণ সেনাবাহিনী দক্ষিণমুখী মহাসড়কটি খুলে দেয়।
সে সময় আলেপ্পোতে যাওয়ার একমাত্র উপায় ছিল বিমানযাত্রা, কারণ বিমানবন্দরে যাওয়ার খুবই ছোট একটা উপদ্বীপ সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। এক রাতে আমি সিরিয়ার বিমানবাহিনীর একটি বিমানে চড়ে সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম, ওই বিমানে অনেক আহত যোদ্ধা ছিল।
কিন্তু পরিকল্পনা বদলে গেছে। এখন বিদ্রোহীরাই শহরে ঘেরাও হয়ে পড়েছে, যাদের সঙ্গে আছে লাখ খানেক বেসামরিক মানুষ, নিজ নিজ ঘরবাড়িতেই তারা আটকা পড়েছে। কিন্তু তাদের টিকিয়ে রাখতে পারে, এমন কোনো বিমানবন্দরও নেই, যেটা সেনাবাহিনীর ছিল।
এই আতঙ্কজনক যুদ্ধে আনুষঙ্গিক যেসব লড়াই হয়েছে তার ভিত্তিতে বলা যায়, এই শহরের কেন্দ্রে তেমন জোরালো হামলা হবে না। উল্লেখ্য, এটিই সিরিয়ার মহত্তম শহর। সিরিয়ার সেনাবাহিনী হয়তো সেখানে তীব্র হামলা না চালিয়ে বিদ্রোহীদের বহুদিন ধরে ঘেরাও করে রেখে তাদের আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করবে।
সিরিয়ায় নুবল ও জারা নামে দুটি শিয়া-অধ্যুষিত গ্রাম রয়েছে, এই গ্রাম দুটি এত দিন বিদ্রোহীদের দ্বারা ঘেরাও ছিল, টানা তিন বছর সেখানকার অধিবাসীরা খাদ্যাভাবে ভুগেছে। সে সময় সিরিয়ার সেনাবাহিনী বিমান থেকে যে খাদ্য ফেলত, সেটা দিয়েই ওই দুটি গ্রামের মানুষ খাবারের চাহিদা পূরণ করত। সেই দুটি গ্রাম এখন সিরিয়ার সেনাবাহিনীর দখলে, এটাকে সাম্প্রতিক ইতিহাসের উল্টো রথযাত্রা হিসেবে অভিহিত করা যায়।
সেখানকার শিয়ারা আলাওয়াইট গোত্রভুক্ত, দেশটির প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদও ওই গোত্রের মানুষ। ওই অঞ্চলের বেশ কয়েকটি গ্রামে শিয়ারা কোণঠাসা হয়ে গেছে, যদিও তাদের দুরবস্থার কথা এখন পর্যন্ত গণমাধ্যমে উঠে আসেনি।
আবার আলেপ্পোর বিদ্রোহী-অধ্যুষিত অঞ্চলের মানুষেরও এখন একই অবস্থা হবে, সেই একই বিচ্ছিন্নতার বোধ অনুভব করছে তারা। আর তার সঙ্গে ঘেরাওকারীদের বোমা তো আছেই। এই শহরের দুটি অংশের মানুষের মধ্যে সব সময়ই যোগাযোগ ছিল, সেই পথ কি এখন বন্ধ হয়ে যাবে? আর যে লাখো শরণার্থী উত্তরে তুরস্কের দিকে যাচ্ছে, তাদের কী হবে?
আলেপ্পো বেশ দেরি করেই এ যুদ্ধে যোগ দিল। এটা একধরনের ঐতিহাসিক অলৌকিক ব্যাপার, তারা ২০১২ সাল পর্যন্ত এই যুদ্ধ থেকে দূরে ছিল। ২০১২ সালে বিদ্রোহীরা দামেস্কের পথ ভেবে এই প্রাচীন শহরে ঢুকে পড়ে। কয়েক মাসের যুদ্ধে সেখানকার রাস্তায় রাস্তায় আগুন জ্বলেছে। তবে এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কোনো শহর সরকারের হাতে এল, কিন্তু এরপর কী হবে? রোমান শহর পালমিরার পুনর্দখল নেবে সরকার? দিরার আশপাশের ভূমি থেকে অবাঞ্ছিত মানুষের অপসারণ?
এদিকে আরও নাটকীয় ব্যাপার ঘটবে তখন, যখন কথা হচ্ছে, ওয়াশিংটন ও মস্কো যদি যুদ্ধ লাগায়, তাহলে আবারও বিশ্বযুদ্ধ সৃষ্টি হবে, যেটা আমাদের এড়াতে হবে।
হিজবুল্লাহ সহযোগীদের নিয়ে সিরিয়ার সেনাবাহিনী ও রুশ বিমানবাহিনী আইএসের ‘রাজধানী’ রাকা দখলের উদ্দেশ্যে রওনা দেবে?
গত কয়েক দিনে যেসব অসাধারণ ব্যাপার ঘটেছে আইএস নিশ্চয়ই তা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করেছে, যদিও পালমিরা এখনো তাদের দখলেই আছে। সিরিয়ার ‘ইসলামি খিলাফত’ যতটা দীর্ঘমেয়াদি মনে হতো, সেটা এখন আর অতটা দীর্ঘমেয়াদি মনে হচ্ছে না। সে কারণেই কি সুন্নি সৌদিরা হঠাৎ করেই সিরিয়াতে স্থলসেনা পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে? আবার তুর্কিরাই বা এতটা বিচলিত কেন? আমার মনে সন্দেহ, শিয়া ইরানে কেউ চোখের পানি ফেলছে কি না।
যা-ই হোক না কেন, অপমানজনক ইয়েমেন যুদ্ধ থেকে সৌদিরা ইতিমধ্যে পাততাড়ি গুটিয়ে নিচ্ছে। তুরস্ক সিরিয়ায় নিজের ন্যাটো সেনা পাঠালে সেটা এক দুঃস্বপ্নের মতো হবে, যদিও সেটা করলে তারা সম্ভবত রুশ হামলার মুখে পড়বে, কিন্তু ওয়াশিংটন ও মস্কো উভয়কেই তা এড়াতে হবে। গাভরিলো প্রিনসিপ নামের এক সার্ব ১৯১৪ সালে অস্ট্রিয়ার আর্চডিউক ফার্দিনান্দ ও তাঁর স্ত্রী সোফিকে হত্যা করেছিলেন, আর তার ফলে কী হয়েছিল আমরা সবাই জানি: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। কথা হচ্ছে, ওয়াশিংটন ও মস্কো যদি যুদ্ধ লাগায়, তাহলে আবারও বিশ্বযুদ্ধ সৃষ্টি হবে, যেটা আমাদের এড়াতে হবে।
দ্য ইনডিপেনডেন্ট থেকে নেওয়া,
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
রবার্ট ফিস্ক: দ্য ইনডিপেনডেন্টের মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি।

Saturday, February 6, 2016

নেতানিয়াহু কি খেপেছেন? by রবার্ট ফিস্ক

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কি খানিকটা পাগল হয়ে গেছেন? আমি এটাকে বিচ্যুতি বলতে নারাজ। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের কথার উত্তরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী যা বললেন, তাতে আমি বুঝলাম, তিনি কিছুটা অপ্রকৃতিস্থ। মুন গত অক্টোবর থেকে ইসরায়েলিদের ওপর হামলার ঘটনা বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বলেছিলেন, ‘তরুণ ফিলিস্তিনিরা বিচ্ছিন্নতা ও হতাশার গভীর অনুভূতি থেকে এসব করছে।’
বান কি মুন ঠিক কথাই বলেছেন, ‘গত ৫০ বছরের দখলদারি চলতে থাকা ও শান্তির প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার কারণে ফিলিস্তিনিদের হতাশা বেড়েছে।’ সম্প্রতি তিনি বলেছেন, ‘সব যুগেই দেখা গেছে, নিপীড়িত মানুষেরা প্রকৃতিগতভাবে দখলদারির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে।’
আমি জানি, জাতিসংঘের মহাসচিব হিসেবে বিশ্ব রাজনীতিতে মুনের ক্ষমতা ফিজির নেতাদের সমান (ফিজির নেতাদের অশ্রদ্ধা করার জন্য বলছি না)। কিন্তু ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের মহাসচিবকে ‘সন্ত্রাসবাদ’ উৎসাহিত করার জন্য কেন সমালোচনা করলেন?
আপনারা মনে করতে পারেন, তিনি ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের কথা বলছিলেন, কিন্তু ব্যাপারটা তা নয়। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও রাশিয়ার ইরানের দিকে ঝুঁকে পড়ার কারণে কিছুটা খাপছাড়া হয়ে গেছেন, সে কারণেই হয়তো নিধিরাম সর্দার মুনের দিকে তির ছুড়েছেন তিনি।
কিন্তু আমাদের এ কথাও মনে রাখতে হবে যে এই নেতানিয়াহুই নিউইয়র্কে জাতিসংঘের দপ্তরে কালো ফিউজ দিয়ে বোমার এক হাস্যকর কার্টুন করেছিলেন, তাঁর উদ্দেশ্য ছিল পৃথিবীকে এটা দেখানো যে তেহরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়া হলে কী হতে পারে। অক্লান্ত লেখক ইউরি আভিনেরিসহ বেশ কয়েকজন ইসরায়েলি লেখক নেতানিয়াহুর এই হাস্যকর কাণ্ডের সমালোচনা করেছেন। এর মধ্যে কার্টুনের মতো একটা ব্যাপার ছিল, আমি আপনাদের বলতে পারি।
এটা মার্কিন, ইউরোপীয় ও রুশদের থামাতে পারত না, বিশেষত এ কারণে যে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখলেও ইউরোপ তা করত না। কিন্তু নেতানিয়াহু কি এটা বুঝতে পারেন না যে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে তাঁর আচরণের কারণে ইউরোপীয়রা কতটা খেপত? ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী লঁরা ফ্যাবিয়াস কী বলেছেন, তিনি কি তা লক্ষ করেননি? লঁরা বলেছিলেন, শান্তিপ্রক্রিয়া ব্যর্থ হলে ফ্রান্স ‘ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব পালন করবে।’ আমি মনে করি না যে সেখানে শান্তিপ্রক্রিয়া বলে কিছু ছিল। কারণ এটা সব সময়ই ছিল দখলদারদের সঙ্গে দখলীকৃতদের লড়াই, যেখানে সবাইকে ভান ধরতে হতো যে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন সমপর্যায়ে রয়েছে। ব্যাপারটা কখনোই এমন ছিল না, এখনো নয়।
এবার একটু ইতিহাসের দোহাই পারা যাক। ইসরায়েল ১৯৬৭ সালে জর্ডানের পশ্চিম তীর দখল করে নেয়। তারা সেখানে বসতি স্থাপন করে, পশ্চিম যেটাকে ইসরায়েলি ‘বসতি’ হিসেবে আখ্যা দেয়, অনেকটা আমেরিকার গহিন পশ্চিমে পশ্চিমা ‘বসতির’ মতো, যেটা ইসরায়েলিদের বসতি স্থাপনকে অনেকটা ইউরোপীয় মেজাজ দিয়েছিল। এরপর তারা দেখল, অন্যের জমিতে বেআইনিভাবে বসতি স্থাপন করার জন্য পশ্চিম তার সমালোচনা করছে। ইসরায়েল সরকার ঠিক কাজটিই করেছে, যে বিষয়ে অনেক ইসরায়েলিই এত দিন বিতর্ক করে এসেছে, কারণ এর ফলে ইসরায়েল জাতিসংঘের নির্ধারিত সীমান্তের বাইরেও ভূমির ‘মালিক’ হয়েছে। এর ফলে ইসরায়েলই এখন একমাত্র দেশ, যে এখনো উপনিবেশবাদী যুদ্ধ করছে।
ফিলিস্তিনিরা বলেছে, এটা একদম চুরির শামিল, অটোমান ও ব্রিটিশ শাসনে তারা এ ভূমির বৈধ মালিক ছিল। ঠিক কথাই বলেছে তারা। ফিলিস্তিনিদের দখলে থাকা জমি এভাবেই ইসরায়েলিরা কেড়ে নিয়েছে আর সেখানকার পণ্য যেমন সবজিসহ অন্যান্য জিনিস অবৈধভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে বিক্রি করত তারা। আবার ইউরোপীয় ইউনিয়ন যখন এর প্রতিবাদ করেছে, তখন তারা দুর্বৃত্তের মতো তাকে সেমিটীয়বিরোধী হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। এভাবেই ঘৃণার সঞ্চার হয়েছে।
আমি সন্দেহ করি, মুন যে ইহুদিদের আরব ভূমি দখল করে নেওয়ার কথা বলেছিলেন, সেটাই আসলে নেতানিয়াহুর পছন্দ হয়নি। তিনি যা বলেছিলেন তা হলো, ‘ধারাবাহিকভাবে এই বসতি স্থাপন চলতে থাকলে তা ফিলিস্তিনি জনগণ ও বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি অবজ্ঞার শামিল’, আমি বরং ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছি। মুন যা বলেছেন আমরাও তা জানি। সেটা হলো অধিকৃত মানুষ দখলদারির বিরোধিতা করে, যেখান থেকে ওই ভূমি ‘ঘৃণা ও চরমপন্থার উর্বর ক্ষেত্রে পরিণত হয়’। ইরাকিরা কি এভাবে আমাদের প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে? আফগানরাই–বা কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে? আর ফিলিস্তিনি ইহুদিরাই-বা কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যখন সেখানে ব্রিটিশরা ছিল?
কিন্তু এখন ‘ফিলিস্তিনে’ (দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ইদানীং এই ইনভার্টেড কমা হরদম ব্যবহার করতে হচ্ছে) পরাধীন মানুষ আছে। আমরা জানি, দখলদারির মধ্যে কী হতে পারে। মানুষ হয় সাংঘাতিকভাবে প্রতিরোধ করে, না হয় তারা চলে যায়। ফিলিস্তিনিরা ভূমি ছেড়ে চলে গেলেই বোধ হয় নেতানিয়াহু খুশি হতেন। কারণ তাহলে তিনি আরও দ্রুত তাদের ভূমি দখল করতে পারতেন। কিন্তু তারা যদি পশ্চিম তীর থেকে ইউরোপের পথ ধরে, তাহলে কী হবে? আমরা ইতিমধ্যে দেখেছি, আরব ও মুসলমানরা কীভাবে অস্ট্রিয়া ও জার্মানির দিকে গিয়েছে। গাজার গোবরের স্তূপ থেকে মানুষ ছোট নৌকায় করে গ্রিস ও ইতালির দিকে যেতে শুরু করলে ব্যাপারটা কেমন হবে?
মধ্যপ্রাচ্যে অনেক বিপদ আছে, যে ব্যাপারে ইউরোপীয়দের আরও সচেতন হওয়া উচিত। বা তারা কি সেটা বুঝতে পেরেও বলতে চায় না? বা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী কি সত্য জানেন না? নাকি তিনি খেপেছেন?
দ্য ইনডিপেনডেন্ট থেকে নেওয়া, অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
রবার্ট ফিস্ক: দ্য ইনডিপেনডেন্টের মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি।

Monday, December 28, 2015

শুধু সুন্নিদের নিয়ে জোট গঠন কেন? by রবার্ট ফিস্ক

সৌদি আরবের নেতৃত্বে সন্ত্রাসবিরোধী সামরিক জোট গঠিত
সৌদিরা জোট করতে ভালোবাসে। ১৯৯১ সালে কুয়েত থেকে সাদ্দাম হোসেনের বাহিনীকে হটাতে তাঁরা মার্কিন, ব্রিটিশ, ফরাসি ও বিভিন্ন তেল আমদানিকারকদের পাশে পেয়েছিল। এ বছরই মাস কয়েক আগে সৌদি সামরিক বাহিনী তাদের রাজতন্ত্রের শত্রু শিয়া হুতিদের ইয়েমেনে গিয়ে আক্রমণ করেছে, সেটা করতেও তারা জোট করেছিল। সামরিক বাহিনীর জায়গায় বিশ্বের তরুণতম প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও উচ্চাভিলাষী সৌদি উপপ্রধানমন্ত্রী মোহামেদ বিন সালমান আল সৌদ পড়ুন। এই জোটে শুধু সৌদি যুদ্ধবিমানই ছিল না, কাতার, আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন, মিসর, জর্ডান, মরক্কো ও সুদানও ছিল।
কিন্তু এখন নতুন হলিউডি নাটক মঞ্চস্থ করতে সৌদিরা বহুজাতিক সামরিক অভিযান শুরু করেছে, প্রতিপক্ষ হচ্ছে ইসলামি ‘সন্ত্রাসের অসুখ’। এই জোটে মুসলিম ও মুসলিম তকমা-প্রত্যাশী বেশ অনেকগুলো রাষ্ট্র রয়েছে, মহানবী (সা.)–এর সময়ের পর এতগুলো মুসলিম রাষ্ট্র আর কখনোই একত্র হতে পারেনি। ইয়েমেন অভিযানের মতো এবারও ৩১ বছর বয়সী যুবরাজ মোহামেদ দেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ওদিকে সৌদি বিমান হামলায় ইয়েমেনে ইতিমধ্যে মানবিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে অনেক বেসামরিক মানুষ মারা গেছে, বিশ্বাসযোগ্য সূত্রে আমরা সে খবর পেয়েছি।
একদম গুরুগম্ভীর ভাব নিয়ে মোহামেদ ঘোষণা করেছেন, তাঁদের এই সর্বশেষ জোটের যুদ্ধ করতে হলে ‘খুবই শক্তিশালী পদক্ষেপ’ নিতে হবে। এই জোটের মধ্যে কারা আছে জানেন? রূপকথার মতো দেশ ‘ফিলিস্তিন’ থেকে শুরু করে আফগানিস্তানের মতো দুর্নীতিগ্রস্ত, লেবাননের মতো নখর দন্তহীন, চাদের মতো দেউলিয়া ও রিপাবলিক অব করোমোসের মতো দেশকে সৌদি আরব নিয়েছে শুধু এটা নিশ্চিত করার জন্য যে এই জোটে যথেষ্টসংখ্যক দেশ আছে। খুব স্বল্পসংখ্যক মানুষই এটা খেয়াল করেছে যে বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়া এই ৩৪টি দেশের শক্তিশালী জোটে নেই।
এটা খুবই বিস্ময়কর ব্যাপার, কারণ ২০০২ সালে বালি হামলায় ২০২ জন বেসামরিক মানুষ মারা যাওয়ার পর ইন্দোনেশিয়ার ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের’ মধ্যে শত্রুর তালিকায় আল-কায়েদাও ঢুকে যায়। ইন্দোনেশিয়ায় ২০ কোটি সুন্নি মুসলমানের বসবাস, ফলে তারা নিজেদের সুন্নি মুসলমান ভাইদের সঙ্গে এই অভূতপূর্ব ‘জোটে’ যোগ দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী হবে, সেটাই তো স্বাভাবিক ছিল। অথবা এমনটা হতে পারে যে সৌদি আরবে ৩০ জন ইন্দোনেশীয় পরিচারিকাকে অন্যায্য বিচারে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে সৌদি আরবের জোটে যোগ দেওয়ার আগে তারা চায়, এই অবিচারের অবসান হোক।
তবে এই জোটে পাকিস্তানের যোগ দেওয়াটা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। কারণ এর আগে তাদের যখন ইয়েমেনের বিপর্যয়কর গৃহযুদ্ধে সৌদি আরবের পক্ষে লড়াই করার জন্য বলা হয়েছিল, তখন ইসলামাবাদের সংসদ সৌদি আরবের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছিল। কারণ, তখন সৌদি আরব পীড়াপীড়ি করেছিল, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সুন্নি মুসলমানরাই শুধু যুদ্ধে অংশ নিতে পারবে।
সার্বিকভাবে বেশ শক্তিশালী ‘জোট’ হয়েছে। এই দেশগুলোর অধিকাংশের ঘাড়েই বিপুল পরিমাণ আন্তর্জাতিক ঋণের বোঝা রয়েছে, তারা সব সময়ই অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে আছে। ফলে এই অসাধারণ সামরিক জোট গঠনের পেছনের প্রকৃত বিবেচনা কিন্তু কত দেশ এই জোটে অংশ নিচ্ছে সেখানে নিহিত নয়, বরং সৌদি আরবকে এই ভ্রাতৃত্বসুলভ সামরিক সহায়তা দেওয়ার জন্য দেশগুলো তাদের কাছ থেকে কত মিলিয়ন বা বিলিয়ন ডলার পাবে, তার মধ্যেই নিহিত রয়েছে।
এখন একটি প্রশ্ন অবধারিতভাবেই এসে যায়: এই তরুণ যুবরাজ ‘সন্ত্রাস রোগের’ কোন তরিকা ধ্বংস করতে চান? আইএস তরিকা? যদিও এই সংগঠনটি ওয়াহাবি সুন্নি বিশুদ্ধতাবাদী মতবাদের ভিত্তিতে একরকম আধ্যাত্মিকভাবেই গড়ে উঠেছে। নাকি নুসরা তরিকা, যেটা সেই কাতার থেকেই সৃষ্ট, যে কাতার এখন এই রহস্যময় ‘জোটের’ অন্তর্ভুক্ত? অথবা ইয়েমেনের শিয়া হুতি তরিকা, যাদের ইয়েমেনের সুন্নি প্রেসিডেন্ট ইরানপন্থী সন্ত্রাসী মনে করেন, যেই সুন্নি প্রেসিডেন্টকে আবার সৌদি আরব সমর্থন করে। আর সৌদি যুবরাজ ইরানের সঙ্গে আবার কোন ধরনের সম্পর্কের কথা চিন্তা করছেন, যেখানে ইরানিরা ইরাক ও সিরিয়ায় সেই একই আইএস ‘সন্ত্রাসের’ বিরুদ্ধে লড়ছে, যাকে আমাদের প্রিয় সৌদি যুবরাজ ‘অসুখের’ অংশ বলে মনে করেন? শিয়া ইরান বা ইরাক—কেউই এই নতুন আন্তর্জাতিক মুসলিম সেনাবাহিনীর অংশ নয়, এ কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
তাহলে আমরা জানি যে একটি ‘জোট’ হয়েছে। কিন্তু সে কার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে, আর সেখান থেকে কী ফল-ই বা পাওয়া যাবে? আর এটা কেন সুন্নি মুসলমানদের জোট, স্রেফ মুসলিম ‘জোট’ নয় কেন?
দ্য ইনডিপেনডেন্ট থেকে নেওয়া
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
রবার্ট ফিস্ক: দ্য ইনডিপেনডেন্টের মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি।

Saturday, December 26, 2015

সন্ত্রাসী ও অপরাধীর মধ্যে পার্থক্য কী? by রবার্ট ফিস্ক

পুলিশ ও সাংবাদিকদের মধ্যে অনেক মিল আছে। তাঁরা উভয়ই মানবীয় ভুলের শিকার হন। তাঁদের মধ্যকার সম্পর্ক যেন অনেকটা মূল গাছ ও পরজীবী উদ্ভিদের সম্পর্কের মতো। আর আমি মনে করি, এটা একরকম স্বাভাবিক যে অপরাধের ব্যাপারে তাঁদের উভয়ের অবস্থানও এক।
কয়েক বছর ধরে দেখছি, অপরাধ দুই ধরনের হয়, একটি সাধারণ অপরাধ, আরেকটি ‘সন্ত্রাসী অপরাধ’। ধরুন, কোনো বন্দুকধারী যদি হঠাৎ করে গুলি করে মানুষ মেরে ফেলে, তাহলে সেটা সাধারণ অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। আর ‘সন্ত্রাসী হামলা’ হচ্ছে সেই প্রকৃতির হামলা, যেখানে হামলাকারীদের রাজনৈতিকভাবে ক্ষুব্ধ ও কোনো ধর্মের দলছুট গোষ্ঠীর সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক থাকতে হয়। সন্ত্রাসী অপরাধীদের ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়, তাদের নিপীড়ক, অসুস্থ বা কোনো ‘মৃত প্রথার’ মধ্যযুগীয় সদস্য হতে হয়। এটা বলার প্রয়োজন নেই যে এই দ্বিতীয় প্রকৃতির মানুষেরা ‘ঘরেই বেড়ে ওঠা চরমপন্থী’, মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা শক্তি হস্তক্ষেপ করেছে বলে যারা যেকোনো ধর্মের মানুষকে কতল করতে প্রস্তুত।
বাস্তবে এই বিভাজনের কারণে মনে হয়, ‘সাধারণ’ অপরাধ একরকম স্বাভাবিক ব্যাপার, মানুষ পয়সা, লোভ, ব্যক্তিগত প্রতিশোধ ও মাদকের কারণে মানুষকে হত্যা করে। কিন্তু ‘সন্ত্রাসী’ অপরাধের মাজেজা হচ্ছে, মুসলমানরা সব সময় অপরাধী। অন্য কথায়, অপরাধীরা তো আমাদের ভাই-ব্রাদার, যেখানে সন্ত্রাসীরা হচ্ছে অশ্বেতাঙ্গ মুসলমান, যারা আমাদের মূল্যবোধ ঘৃণা করে, ওরা আমাদের মাথা কাটতে চায়, যারা দৃশ্যতই পাগলাটে।
ক্যালিফোর্নিয়াতে ১৪ জন নিরপরাধ মার্কিনকে হত্যা করার পর আমরা এই অর্থহীন ধারণার নড়বড়ে প্রকৃতিটা দেখলাম। প্রথমত, মার্কিন পুলিশ বলল যে তারা জানে না, এটা ‘সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সম্পর্কিত’ অপরাধ কি না। তারা এটার নাম দিল গণ-গুলিবর্ষণ। বিভিন্ন তরফ থেকে আমাদের বলা হলো, এই হত্যাকাণ্ডটি একটি বাদবিসংবাদের ফল হিসেবে ঘটেছে। বন্দুকধারী এই ১৪ জন খুন হওয়া মানুষের একজনের হাতে নিগৃহীত হয়ে এই কাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারেন। কিন্তু এরপর দেখা গেল, নামে তিনি মুসলমান, আর স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি বাড়িতে এক অস্ত্রভান্ডারও গড়ে তুলেছিলেন। আর দৃশ্যত তিনি আইএসের প্রতি ‘আনুগত্যও’ প্রদর্শন করেছেন। এই গণ-গুলিবর্ষণের ঘটনা তখন ‘সন্ত্রাসী কাণ্ডের’ আখ্যা পেল। এই নতুন সংজ্ঞাকে আরও বিভ্রান্ত করে দিতে পুলিশ বলল, তারা বিশ্বাস করে না যে এই দম্পতির সঙ্গে আইএসের কোনো যোগাযোগ আছে, যদিও গোষ্ঠীটি সেই দায় স্বীকার করেছে। এরপর দেখা গেল, এই দম্পতি হত্যাকাণ্ডের কয়েক বছর আগে ‘চরমপন্থায়’ দীক্ষিত হয়েছিল, মাফিয়াদের বেলায় যেটা ঘটে না।
কয়েক সপ্তাহ আগে লন্ডনের টিউব স্টেশনে যে ছুরিকাঘাতের ঘটনা সংঘটিত হলো, তখন যে কথা বলা হলো তা-ও একইভাবে বিভ্রান্তিকর। প্রথমত, পুলিশ লেটনস্টোনে একটি ‘ছুরিকাঘাতের ঘটনার’ তদন্ত করছিল, কিন্তু তারা যখন একটি ভিডিওতে শুনতে পেল যে একজন মানুষ জোরে জোরে বলছে, ‘এটা সিরিয়ার জন্য’ এবং একজন বেসামরিক নাগরিক বলছেন, ‘ভাই, তুমি মুসলমানও নও’, তখন পুলিশ বলে বসল, এটা ‘সন্ত্রাসী ঘটনা’। এরপর একজন মানুষের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে।
কিন্তু এসবই কিছুটা উদ্ভট ব্যাপার। সেই ১৯৮০-এর দশকে যখন ব্রিটিশ সেনা ও আইআরএ উত্তর আয়ারল্যান্ডে প্রাণপণ যুদ্ধ করছিল, তখন যুক্তরাজ্য সরকার আইআরএকে অপরাধী, মারাত্মক সন্ত্রাসী, বেপরোয়া সন্ত্রাসী ও এমনকি সন্ত্রাসী অপরাধী হিসেবে আখ্যা দিতে তৎপর ছিল। কিন্তু সর্বোপরি সাধারণ অপরাধীদের তো আইনের মুখোমুখি করে বহু বছরের জন্য জেলে পুরতে হবে, সে তাদের সহিংস প্রচারণার কারণ যা-ই হোক না কেন। তখন আইআরএ সিদ্ধান্ত নিল, তারা নিজেদের ‘রাজনৈতিক বন্দী’ হিসেবে আখ্যা দেবে, যেটা কিনা ‘সন্ত্রাসীর’ ভদ্রোচিত রূপ। কারণ, তারা চেয়েছিল নিজেদের ডাকাতি, খুন, ভীতি প্রদর্শন—প্রভৃতি অপরাধ সাধারণ অপরাধের বাইরে ‘রাজনৈতিক অপরাধ’ হিসেবে স্বীকৃতি পাক।
আইআরএ ‘রাজনৈতিক’ মর্যাদা লাভ করতে এতটা উৎসাহী ছিল যে তারা আমরণ অনশন শুরু করে। কিন্তু থ্যাচারের শীতল মনোভাবের কারণে তাদের ১০ জন সহযোদ্ধা মারা যায়। কিন্তু তখন ব্রিটিশ সরকার আইআরএর প্রায় সব দাবিই মেনে নেয়। ফলে আইআরএর বন্দীরা ‘রাজনৈতিক’ তকমা পেয়ে যায়, আর যখন ‘শান্তি’ ঘোষিত হলো, তারা তখন বন্দিদশা থেকে মুক্ত হলো। তবে খুনি ও অসৎ মানুষেরা রানির আতিথ্যেই থাকল।
তাহলে ‘সন্ত্রাসী’ বা সাধারণ অপরাধী হলে কি কোনো লাভ আছে? আমার মনে হয়, এটা নির্ভর করে আপনার জীবনের মূল্য কতটা। ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত আইএস যোদ্ধা রেয়াদ খান ও রুহুল আমিন যে ড্রোন হামলায় নিহত হলেন, তাঁদের যে সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল, তা মারাত্মক প্রমাণিত হয়েছে। তাঁদের মৃত্যু আসলে মৃত্যু নয়, হত্যাকাণ্ড, যেটা ডেভিড ক্যামেরনের মতে, ‘যুক্তরাজ্যের ব্যক্তির নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় ও যথাযথ’ ছিল। তাঁরা ব্রিটেনে হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছিলেন। অন্য কথায় বললে, ডেভ তো আর লেস্টারে স্কুলছাত্রদের খুনিকে মারার জন্য ড্রোন হামলার আদেশ দিতেন না, বা লন্ডনের পূর্বাঞ্চলের কাউকে মারার জন্য তিনি হামলার নির্দেশ দিতেন না, এমনকি তাঁরা যদি ব্রিটেনে হামলার পরিকল্পনা করেও থাকেন।
তারপরও এই অপরাধী/সন্ত্রাসী দ্বি-বিভাজন চলছেই। সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের বিরোধীরা সর্বশেষ দাবি করেছেন, বাশার আইএসের চেয়েও বড় সন্ত্রাসী। কারণ, তিনি এই ইসলামি গোষ্ঠীর চেয়ে বেশি মানুষ হত্যা করেছেন (চ্যানেল ফোর–এর ভাষ্য অনুসারে, আইএসের চেয়ে ছয় গুণ বেশি মানুষ)। এতে বোঝা যায়, আপনার হাতে কত মানুষ মরল, তার সংখ্যা দিয়েই নির্ধারণ করা হবে আপনি সন্ত্রাসী নাকি অপরাধী। অথবা এর মাজেজা এ রকম হতে পারে যেকোনো ‘সন্ত্রাসী’ গোষ্ঠীর খুনের আকাঙ্ক্ষা যদি ‘পরিমিত’ হয়, তাহলে তারা অত ভয়ংকর নয়, যাদের বন্দুকের নলে বেশি খাঁজ আছে, তাদের তুলনায়।
কিন্তু পাঠক, ক্ষণিকের জন্য দাঁড়ান। বাশারের বিরোধীদের কথার যৌক্তিক সারসংক্ষেপ দাঁড় করালে আমাদের এই সিদ্ধান্তে আসতে হবে যে বুশ ও ব্লেয়ার আইএস ও বাশারের চেয়ে বেশি বেসামরিক মানুষ হত্যা করেছেন। ২০০৩ সালে অবৈধভাবে ইরাক আগ্রাসন করে তাঁরা এ কাজ করেছেন। তাহলে বুশ ও ব্লেয়ারকে কি অতি-সন্ত্রাসী আখ্যা দেবেন, নাকি শুধু অপরাধী হিসেবে? যদিও তাঁরা যুদ্ধাপরাধী হিসেবেও আখ্যায়িত হতে পারেন, যাঁদের হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে তোলা যেতে পারে। তাঁরা কিন্তু ড্রোন হামলার আশঙ্কা থেকে একেবারেই মুক্ত, আর তাঁদের কখনোই ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দেওয়া হবে না।
দ্য ইনডিপেনডেন্ট থেকে নেওয়া
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
রবার্ট ফিস্ক: দ্য ইনডিপেনডেন্টের মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি।

Thursday, December 10, 2015

বাগাড়ম্বর করে শান্তি প্রতিষ্ঠা হয় না by রবার্ট ফিস্ক

আইসেনহাওয়ার ১৯৫৬ সালে অ্যান্থনি ইডেনকে কিছু অভব্য পরামর্শ দিয়েছিলেন, যখন তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, মিসরে ব্রিটেনের প্রতারণামূলক যুদ্ধ শেষ হওয়া উচিত। তিনি বলেছিলেন, ‘সেনারা, থামো এবার।’ এই ঘটনা ইতিহাসের পাতায় বেশ বিখ্যাত। কথাটি এখন রাজনীতিবিদ ও ইতিহাসবিদদের জন্য পুনরুচ্চারণ করা জরুরি। একই সঙ্গে সেই সব নির্বোধ ব্যক্তির উদ্দেশেও এটা পুনরুচ্চারণ করা জরুরি, যারা নিজেদের অনিঃশেষ যুদ্ধের ভবিষ্যৎ-বক্তা হিসেবে মনে করে।
প্রতিটি সকালেই যেন আরেকটি হলিউডি নিষ্ঠুরতার গল্প শোনার জন্য আমার ঘুম ভাঙে, যার গল্পকার হচ্ছে আমাদের গোপন পুলিশ বা জনসংযোগ প্রভাবিত রাজনৈতিক নেতারা। জার্মানির শীর্ষ গোয়েন্দা আমাদের ‘সন্ত্রাসী বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে’ সতর্ক করে দেন, আমি তাঁর বিশেষজ্ঞ মতামত মেনে নিই, কারণ বিশ্বযুদ্ধ শুরু করার ব্যাপারে জার্মানির দক্ষতা প্রমাণিত। ওদিকে একজন মেধাবী ও সুস্থ মস্তিষ্কের ইতিহাসবিদ ইউরোপের দুর্দশাকে রোমান সাম্রাজ্যের পতনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। অনেকেই মনে করে, প্যারিস হত্যাকাণ্ড ‘প্যারিসকে চিরদিনের জন্য বদলে’ দিয়েছে বা ‘ফ্রান্সকেই চিরতরে বদলে’ দিয়েছে। কিন্তু প্যারিস হামলাকে ১৯৪০ সালের জার্মান দখলদারির সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। একঘেয়ে প্রকৃতির ফরাসি দার্শনিক বার্নার্ড অঁরি-লেভি বলেই যাচ্ছেন, আইএস হচ্ছে ‘ফ্যাসিস্টইসলামিস্ট’।
অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, ১৯৮২ সালে বৈরুতের সাবরা-শাতিলা শরণার্থীশিবিরে যে খ্রিষ্টান খুনিরা ১ হাজার ৭০০ ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করেছিল, তখন কিন্তু অঁরি ইসরায়েলের এই লেবানিজ জঙ্গিগোষ্ঠীকে ‘ফ্যাসিস্টক্রিশ্চিয়ান’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন বলে আমার মনে পড়ে না। সেটা এক সন্ত্রাসী হামলাই ছিল, যার সঙ্গে আমি পরিচিত। দুজন সহকর্মী সাংবাদিককে নিয়ে আমি সেই শরণার্থীশিবিরে গিয়েছিলাম, ধর্ষণের শিকার ও কচুকাটা হওয়া মানুষের সারি সারি লাশ পড়ে আছে। মার্কিন অস্ত্রে সজ্জিত ও সেখানকার টাকায় পরিচালিত ইসরায়েলি সেনারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে দৃশ্য দেখলেও তারা কিছুই করেনি। কিন্তু তারপরও একজন ফিলিস্তিনি রাজনীতিক বলেননি যে এ কারণে ‘মধ্যপ্রাচ্য চিরদিনের জন্য বদলে গেছে।’ বৈরুতে ১ হাজার ৭০০ বেসামরিক মানুষ মারা যাওয়ার পরও যদি ‘বিশ্বযুদ্ধ’ ঘোষিত না হয়, তাহলে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ ১৩০ জন নিরীহ মানুষ মারা যাওয়ার পর কীভাবে বলেন যে ফ্রান্স ‘যুদ্ধে’ লিপ্ত হয়েছে?
এত কিছু সত্ত্বেও আমার বন্ধু নিয়েল ফার্গুসনের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই গাদাগাদি করে থাকা গরিব মানুষ প্রাচীন রোমের দিকে যাত্রা শুরু করেছে। ফার্গুসন স্বীকার করেন, তিনি পঞ্চম শতকের রোমান ইতিহাস সম্পর্কে তেমন কিছু জানেন না, ফলে এই বিষয়ে তিনি রোমান ইতিহাস থেকে উদ্ধৃতি দিতে পারবেন না। কিন্তু রোমানরা নতুন দেশ জয় করলে সেখানকার মানুষকে নাগরিকত্ব দিত, আর নিয়েল তৃতীয় শতকের ইতিহাস একটু পড়ে দেখবেন, যখন নতুন রোমান সম্রাট সিজার মার্কাস জুলিয়াস ফিলিপাস সিরিয়া থেকে এসেছিলেন। দামেস্ক থেকে ৩০ মাইল দূরে তাঁর জন্ম হয়েছিল, তাঁকে ‘আরবের ফিলিপ’ বলা হতো। কিন্তু আসুন, আমাদের প্রতিশোধ নেওয়ার আকাঙ্ক্ষায় আধুনিক ইতিহাসকে বাগড়া দিতে না দিই।
মালির ঘটনাটি লক্ষ করুন। সেখানকার ইসলামপন্থীরা দেশটির উত্তরাঞ্চল দখল করে রাজধানী বামাকোর দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় ফরাসি সেনাবাহিনী ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে মালিতে অভিযান চালায়। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদকে সেখানকার গণমাধ্যমে ব্যঙ্গ করে ‘ফিল্ড মার্শাল’ বলে অভিহিত করা হয়। তিনি মালিতে ‘সন্ত্রাসীদের’ ধ্বংস করার জন্য তাঁর সেনাদের পাঠান, যে সন্ত্রাসীরা সেখানে বেসামরিক মানুষকে ‘ইসলামি’ কায়দায় শাস্তি দিচ্ছিল, যেখানে ইসলাম ছিল তাঁদের বিদ্রোহের তরিকা। কিন্তু ফ্রান্স একবারও বলল না যে এই সহিংসতা সাহারা মরুভূমি অঞ্চলের যাযাবর গোষ্ঠী তুয়ারেগ ও মালি সরকারের মধ্যে চলমান গৃহযুদ্ধের অংশ। জানুয়ারির শেষ নাগাদ খবর পাওয়া গেল, ফ্রান্সের সেনাবাহিনীর মালি-মিত্ররা সেখানে জাতিগত প্রতিশোধের ঢেউয়ে বেসামরিক মানুষকে হত্যা করছে। তৎকালীন ফরাসি প্রতিরক্ষামন্ত্রী স্বীকার করেছিলেন, ‘শহরাঞ্চলের গেরিলা যুদ্ধ’ সামাল দেওয়া খুব কঠিন ব্যাপার।
আবার দেখা গেল, মালির যেসব মানুষ ফরাসিদের সহায়তা করেছিল, ইসলামপন্থীরা তাদের মারা শুরু করেছে। ফ্রান্স যেহেতু ইতিমধ্যে বিজয় অর্জন করেছে বলে দাবি করছিল, ফলে সেই ইসলামপন্থীদের মুখপাত্রের কথা কেউ তেমন একটা খেয়াল করতে পারেনি: ‘ফ্রান্স আমাদের শত্রু, যারা মালি, নাইজার, সেনেগাল ও টোগোর সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাজ করছে, যারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাজ করছে...এই সব দেশই আমাদের শত্রু, আমরা তাদের শত্রুর মতোই গণ্য করব।’
যারা মনে করে, ইউরোপীয় সেনারা আফ্রিকার দেশে দেশে ঠুসঠাস গুলি ছুড়বে, আর কেউ তার প্রতিশোধ নিতে চেষ্টা করবে না, তাদের মনে করিয়ে দিতে চাই, গত জানুয়ারি মাসে প্যারিসে একজন নারী পুলিশ ও সুপার মার্কেটে চারজন ইহুদিকে যে এক আইএস যোদ্ধা হত্যা করল, তার জন্ম কিন্তু প্যারিসের এক মালি মুসলমান পরিবারে। তাঁর নাম আমেদি কুলিবালি।
এখন মালির ওপর ২০১৩ সালের শুরুর দিকের এই প্রতিবেদন পড়া যাক: ‘ফরাসি যুদ্ধবিমানগুলো উত্তর মালির সন্দেহভাজন বিদ্রোহী শিবির, কমান্ড পোস্ট, “সন্ত্রাসীদের যানবাহন” ও মালপত্রের ঘাঁটিতে হামলা চালাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে কর্মকর্তারা বলছেন, তারা তিমবাকতু ও গাও অঞ্চলে নানা লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করছে, এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে ডজন খানেক হামলা চালিয়েছে তারা...।’ তিমবাকতু ও গাওয়ের জায়গায় রাকা ও ইদলিব বসান, আজ প্যারিস ও মস্কো আমাদের সেই একই খবর দিচ্ছে।
আর আমাদের প্রতিক্রিয়া কী? তার সবই অবশ্যই বাগাড়ম্বর, আমাদের অজ্ঞতা, মধ্যপ্রাচ্যের প্রতি কী অন্যায় করা হচ্ছে, সেটা বোঝার ক্ষেত্রে আমাদের অনাগ্রহ এবং রাজনৈতিক পরিকল্পনা ও উদ্দেশ্যযুক্ত দ্বন্দ্ব-বিবাদ আমলে নেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের আলস্য। আমরা যদি আজও ‘সেনারা, থামো এবার’ গোছের উপদেশ দিই, তাহলে একদম নতুন মনোভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে। এই অঞ্চলকে নিয়ে ১৯৪৫ সালের আদলে বিশ্ব সম্মেলন করা যেতে পারে, যখন বিশ্বনেতারা একত্রে বসে জাতিসংঘ গঠন করেছিলেন, যার লক্ষ্য ছিল পৃথিবীতে আর যেন বিশ্বযুদ্ধ না লাগে, সেটা নিশ্চিত করা। আর শরণার্থীদের জন্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যেমন নানসেন শরণার্থী পাসপোর্ট প্রণয়ন করা হয়েছিল, সে রকম কিছু একটা করা যেতে পারে, সেবার ৫০টি জাতি তা গ্রহণ করেছিল।
রবার্ট ফিস্ক
আমরা সে রকম কিছু না করে উদ্দেশ্যহীনভাবে কেয়ামত, সন্ত্রাসী বিশ্বযুদ্ধ ও প্রাচীন রোমের বিষয়ে কথা বলে যাচ্ছি। আমাদের জনসংযোগপ্রিয় প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে আমি পুনরুচ্চারণ করব: ‘বাছা, এবার থামো।’
দ্য ইনডিপেনডেন্ট থেকে নেওয়া, অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
রবার্ট ফিস্ক: দ্য ইনডিপেনডেন্টের মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি।

Monday, December 7, 2015

এটা সীমানাবিহীন পৃথিবীর ব্যাপার by রবার্ট ফিস্ক

বুলডোজার দিয়ে ইরাক–সিরিয়ার সীমান্তপ্রাচীর ভেঙে ফেলছে আইএস
২০১৪ সালে আইএস তার অন্যতম প্রথম ভিডিওবার্তা প্রকাশ করে, এই ভিডিওটি ইউরোপের মানুষের নজরে একরকম পড়েইনি। এই ভিডিওটির মান অতটা উন্নত ছিল না, এমনকি আবহসংগীত হিসেবে ‘নাশিদ’ও সেখানে ছিল না, যেটা আইএসের পরবর্তী মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ভিডিওগুলোতে পাওয়া যায়। ভিডিওতে দেখা যায়, একটি বুলডোজার ইরাক ও সিরিয়ার সীমান্ত চিহ্নিতকারী বালুর দেয়ালটি ভেঙে ফেলছে। পুরো দৃশ্যটি হাতে ধরা ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছিল, আর সেই বালুর মধ্যে একটি পোস্টার পড়ে ছিল, যেখানে লেখা ছিল ‘সাইকস-পাইকটের শেষ’।
লাখো আরবের মতো আমি এই ভিডিওটি প্রথম দেখি বৈরুতে, এই সাইকস-পাইকট চুক্তিটি আরবের মানুষের কাছে দুষ্টক্ষতের মতো। ব্রিটিশ ও ফরাসি কূটনীতিক মার্ক সাইকস ও ফাঁসোয়া জর্জ-পাইকত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় গোপনে এই সীমানা চিহ্নিত করেছিলেন, যেখানে ফ্রান্সকে সিরিয়া, মাউন্ট লেবানন ও উত্তর ইরাক দেওয়া হয়েছিল আর ব্রিটিশদের দেওয়া হয়েছিল ফিলিস্তিন, ট্রান্সজর্ডান ও ইরাকের বাকি অংশ। এ অঞ্চলের সব মুসলমান, খ্রিষ্টান ও ইহুদি সে কথা জানে। এই দুই কূটনীতিক ক্ষয়িষ্ণু অটোমান সাম্রাজ্যকে ছিঁড়েখুঁড়ে কৃত্রিম জাতি সৃষ্টি করেন, যেখানে সীমানা, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ও পাহাড়ের মাধ্যমে পরিবার, গোত্র ও মানুষকে বিভক্ত করা হয়েছিল। এটা ছিল ইেঙ্গা-ফরাসি উপনিবেশবাদের ফসল।
যেদিন এই ভিডিওটি দেখেছিলাম, সে রাতেই আমি লেবাননের দ্রুজ নেতা ওয়ালিদ জামব্লাতের সঙ্গে দেখা করি। তিনি আমার উদ্দেশে গর্জন করে বলেন, ‘সাইকস-পাইকটের শেষ’। আমি কিছুটা অধৈর্য হয়ে ফোঁস ফোঁস করলাম। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় দেখা গেল, জামব্লাতের কথাই সত্য হলো। তিনি সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পেরেছিলেন, লাখ লাখ আরব ১০০ বছর ধরে যেটা প্রত্যাশা করছিল, আইএস সেটা প্রতীকীভাবে দ্রুতই করে ফেলেছিল: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ী শক্তি ব্রিটিশ ও ফরাসিরা যে মিথ্যা সীমান্ত দিয়ে আরবদের বিভক্ত করেছিল, সেই সীমান্ত গুঁড়িয়ে দেওয়া।
আমরা চালাকি করে আরবদের ওপর রাজা গছিয়ে দিয়েছিলাম, ১৯২২ সালে ইরাকের হাশেমি রাজা ফয়সালের পক্ষে গণভোট করে তাঁকে ৯৬ শতাংশ ভোট পাইয়ে দিয়েছিলাম। আমরা আরবদের জেনারেল ও একনায়ক উপহার দিয়েছি। ব্রিটিশরা ১৯ শতকে ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া ও মিসর দখল করেছিল, পরবর্তীকালে যাদের ভাগ্যে মিথ্যাবাদী সরকার, পাশবিক পুলিশ বাহিনী, মিথ্যুক সংবাদপত্র ও ভুয়া নির্বাচন জুটেছিল। মোবারকও ফয়সালের মতো মহাকাব্যিক ৯৬ শতাংশ সমর্থন পেয়েছিলেন। আরবদের কাছে গণতন্ত্র মানে বাক্স্বাধীনতা বা নিজের নেতা নির্বাচন করার অধিকার ছিল না, তার মানে ছিল ‘গণতান্ত্রিক’ পশ্চিমা সরকারগুলোর আরব একনায়কদের সমর্থন দেওয়া, যারা তাদের নিপীড়ন করেছে।
ফলে ২০১১ সালে আরবে যে বিপ্লবের হাওয়া বইতে শুরু করে, সেখানে কিন্তু তারা গণতন্ত্রের দাবি তোলেনি, ‘আরব বসন্তের’ কথা ভুলে যান, সেটা ছিল হলিউডের সৃষ্টি। কায়রো, তিউনিস, দামেস্ক ও ইয়েমেনের রাস্তায় যেসব পোস্টার দেখা গেছে, সেখানে মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের কথাই ছিল, যে দুটি বস্তু আমরা নিশ্চিতভাবে আরবদের জন্য খুঁজিনি।
আমি নিজের প্রতিবেদনেও এই উপলব্ধির কারণ হিসেবে বলেছিলাম, আরবদের শিক্ষার হার ও মধ্যপ্রাচ্যে তাদের ভ্রমণ বেড়েছে। আর ইন্টারনেট ও সামাজিক গণমাধ্যমের ভূমিকা স্বীকার করে বলেছিলাম, এর গভীরে কোনো না–কোনো একটা ব্যাপার কাজ করছে। আরবেরা গভীর ঘুম থেকে জেগে উঠেছে, তারা আর নিজেদের নাসের, সাদাত, মোবারক, আসাদ, গাদ্দাফি ও সাদ্দামের মতো পিতৃতান্ত্রিক নেতার সন্তান হিসেবে বিবেচনা করে না, বরং মনে করে সরকার তাদের মতো সন্তানদের নিয়েই গঠিত হয়। আরবেরা তাদের বাসস্থানের মালিকানা চেয়েছে।
কিন্তু এখন মনে হয়, আমি কতটা ভুল ছিলাম। আমি এই বিপ্লবের বার্তা অনুধাবন করতে মারাত্মক ভুল করেছিলাম। আমি এখন বিশ্বাস করি, ২০১১ সালে আসলে এটাই উদ্ভাসিত হয়েছে যে আমরা পশ্চিমারা ১০০ বছর আগে এই মানুষের জন্য যে প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছিলাম, সেটা মূল্যহীন। যে কৃত্রিম জাতি ও ততোধিক কৃত্রিম সীমান্তের ওপর আমরা রাষ্ট্র আরোপ করেছিলাম, তা অর্থহীন ছিল। অর্থাৎ তাদের ওপর আমরা যা গছিয়ে দিয়েছিলাম, তারা সেটার পুরোটাই খারিজ করে দিয়েছে।
গাজার হামাস ও ব্রাদারহুড এক হয়ে গেছে, সিনাই-গাজা সীমান্ত ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। ওদিকে লিবিয়ার পতনের কারণে গাদ্দাফির আগের সীমান্ত খুলে গেছে, যেটা এখন অস্তিত্বহীন। গাদ্দাফির অস্ত্রগুলো এখন মিসর ও সিরিয়ার বিদ্রোহীদের কাছে বিক্রি হচ্ছে, রাসায়নিক শেলসহ। তিউনিসিয়া ‘গণতন্ত্রের’ প্রতি আসক্ত হওয়ায় সে এখন পশ্চিমের প্রিয় পাত্র, কিন্তু লিবিয়া ও আলজেরিয়ার সঙ্গে তার যে সীমান্ত আছে, সেটা ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্র সরবরাহের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ায় দেশটি বিপদে পড়েছে। আইএস সীমানাবিহীন ভূমি দখলে আনতে পেরেছে, যার মানে হচ্ছে, সে তার অন্তর্দেশীয় অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছে: ইরাক হয়ে সিরিয়ার আলেপ্পোর প্রান্ত, ওদিকে নাইজেরিয়া থেকে নাইজার ও চাদ।
আইএস এই নতুন ব্যাপারটা আমাদের আগেই বুঝতে পেরেছে। কিন্তু আধুনিক যুগে সীমান্ত নিরাপত্তাহীন—আইএসের এই উপলব্ধি আর আরবদের স্বসৃষ্ট জাতির অসারতা-বিষয়ক উপলব্ধি কিন্তু যুগপৎভাবে একই সময়ে হয়েছে। আমরা ইসরায়েলকে সমর্থন দিই, কিন্তু এটা স্বীকার করি না যে দেশটির পূর্ব সীমান্ত আরব বিশ্বের পাশ ঘেঁষে চলে গেছে, তবে আমাদের স্বার্থের সঙ্গে মিলে গেলে আমরা তা স্বীকার করি। সর্বোপরি আমরাই তো ‘বালুতে রেখা’ বা ‘লাল রেখা’ আঁকার সুযোগ পেয়েছি। আমরা ইউরোপীয়রাই সিদ্ধান্ত নিই, সভ্যতা কোথায় শুরু হয়, আর কোথায় গিয়ে শেষ হয়।
হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্ট সিদ্ধান্ত নেন, ‘খ্রিষ্টান সভ্যতা রক্ষা’ করতে তিনি কোথায় সেনাবাহিনী নামাবেন। হ্যাঁ, আমাদের পশ্চিমাদেরই তো সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার চারিত্রিক সাধুতা আছে, মধ্যপ্রাচ্যের জাতীয় সীমানা মানা হবে কি হবে না।
কিন্তু যখন আরবেরাই ঠিক করেছে যে তারা আর এই নাচ নাচবে না এবং ‘আমাদের’ ভূমিতেই নিজ ভবিষ্যৎ খুঁজে নেবে, ‘তাদের ভূমিতে’ নয়, তখন এই নীতি ভেঙে পড়ে। এটা সত্যিই কেমন অনন্যসাধারণ বিষয় যে আমরা খুব সহজেই ভুলে যাই, আধুনিক যুগের সীমান্ত ভঙ্গকারী ব্যক্তি কিন্তু একজন ইউরোপীয়, যিনি ইউরোপের ইহুদিদের নিঃশেষ করে দিতে চেয়েছিলেন। হিটলার নিজের আত্মজীবনী মেইন ক্যাম্প–এ মুসলমানদের সম্পর্কে বর্ণবাদী মন্তব্য করেছিলেন, সেই পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, তাঁর হত্যাযজ্ঞ আরবেও সম্প্রসারিত হয়েছে।
আমরা সব সময় ঘোষণা করছি, আমরা ‘যুদ্ধে লিপ্ত’ হয়েছি। বলা হচ্ছে, আমাদের নির্দয় হতে হবে। আমাদের তাদের ভূখণ্ড আক্রমণ করতে হবে, তা না হলে তারা আমাদের ভূখণ্ড আক্রমণ করবে। কিন্তু সেই দিন আর নেই যে আমরা অন্যের দেশ আক্রমণ করে নিজ দেশে নিরাপদ থাকতে পারব। নিউইয়র্ক, প্যারিস, মাদ্রিদ, লন্ডন ও ওয়াশিংটনে হামলার ঘটনা আমাদের সে কথাই জানান দেয়। আমরা যদি ন্যায়বিচারের জন্য কণ্ঠ ছাড়ি, অর্থাৎ হন্তারকদের বিচার-প্রক্রিয়া ও আদালতের মুখোমুখি করি, তাহলে হয়তো আমরা আমাদের রাজদণ্ডধারী মহাদেশে নিরাপদ থাকতে পারব। না, শুধু নিজের ও শত্রুর জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করলেই চলবে না, মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের জন্যও তা নিশ্চিত করতে হবে, যারা এক শতাব্দী ধরে আমাদের সৃষ্ট একনায়কতন্ত্র ও কাগুজে প্রতিষ্ঠানের খপ্পরে পড়ে যারপরনাই ভুগেছে, যার কারণে আইএসের উত্থান হয়েছে।
দ্য ইনডিপেনডেন্ট থেকে নেওয়া।
সংক্ষেপিত অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
রবার্ট ফিস্ক: দ্য ইনডিপেনডেন্ট-এর মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি।

Monday, November 16, 2015

মার্কিনদের যা জানতে হবে by রবার্ট ফিস্ক

ওবামার কয়েক ডজন সাহসী আত্মত্যাগী মানুষের সিরিয়ার কুর্দি অধিকৃত মাটিতে পা দেওয়ার আগে আইএস সম্পর্কে সিরিয়ার এক ইতিহাসবিদের লেখা থেকে তাঁদের কিছু জানা উচিত। যেখানে তাঁরা নামবেন, সেটি কাশিমলি থেকে তেমন একটা দূরে নয়। বইটি পড়লে তাঁরা জানতে পারবেন, আইএসের ‘খলিফা’ আবু বকর আল-বাগদাদি শুধু একজন উৎসাহী ফুটবল দর্শকই নন, তিনি যুবক বয়সে নিয়মিত মসজিদগামী তরুণদের নিয়ে ফুটবল দল গড়ে তুলেছিলেন। এমনকি রসিকতা করে তিনি নিজেকে ইরাকের ম্যারাডোনা হিসেবে আখ্যা দিতেন।
তাঁরা আবিষ্কার করবেন, তিনি মুঠোফোন, হোয়াটসঅ্যাপ ও স্কাইপে এসএমএস চালাচালি করে দলের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি কথা বলেন ইংরেজিতে। এমনকি তাঁর চাহিদা হচ্ছে, খবরের কাগজে ছাপা হওয়া সব গোয়েন্দা প্রতিবেদন যেন একটি এ৪ কাগজে ছাপিয়ে তাঁকে দেওয়া হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলও তাঁর আমলাদের কাছে একই দাবি করতেন। এমনকি বাগদাদি চান যে তাঁর খিলাফতের নাগরিকেরা যেন সপ্তাহে ছয় দিন কাজ করে। আইএসের রাজধানী রাকায় একটি ডাকব্যবস্থা আছে। আর আপনি যদি বাগদাদির (ইব্রাহিম আওয়াদ ইব্রাহিম আল-বদরি) কাছে চিঠি লিখতে চান, তাহলে আপনাকে ঠিকানার জায়গায় লিখতে হবে: আল-খলিফা ইব্রাহিম, রাকা। ‘নিশ্চিত থাকুন, এটা জায়গামতো পৌঁছাবে’—কালো পতাকার অধীনে যে লেখকেরা আছেন, তাঁদের জানানো হয়েছে।
তাঁর নাম সামি মুবায়েদ, তিনি একজন ইতিহাসবিদ ও বৈরুতের কার্নেগি সেন্টারের পণ্ডিত। তিনি দামেস্কে থাকেন, একজন সাহসী মানুষ হিসেবে তিনি এটা জানেন। তিনি আমাকে বলেছেন, ‘এই বই আমার জন্য খুবই বিপজ্জনক। এর জন্য আমাকে জীবন দিতে হতে পারে। আমি অতীতে যা লিখেছি, সেগুলো থেকে এটা একদম ভিন্ন। এটা এক ভিন্ন সিরিয়ার গল্প, যা লেখাও আমার জন্য খুব বেদনাদায়ক ছিল। আপনাকে এই কট্টরদের বিরুদ্ধে লড়তে হবে, কিন্তু এদের ওপর বোমা বর্ষণ করাটা জবাব হতে পারে না।’
মুবায়েদ তাঁর বইয়ে আরও বলেছেন, ‘১৯৫০-এর দশকের বাথ-পূর্ব সিরিয়া কখনোই ফিরে আসবে না, আবার ১৯৬৩-২০১১ পর্যায়ের বাথরাও ফিরে আসবে না...ইসলামপন্থী ও ক্ষমতালোভী সেনাদের প্রতি আমার কোনো সহমর্মিতা নেই। আজ সিরিয়ায় যা ঘটছে, তা দেশটির ইতিহাসে একদমই নতুন ব্যাপার। এটা এক নোংরা অধ্যায়, কিন্তু আমাদের অনেকের আকাঙ্ক্ষার চেয়ে এটা অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী হবে।’ তিনি কি একজন হতাশাবাদী? নিশ্চিতভাবেই বাথপন্থীদের নয়, মুবায়েদের সতর্ক থাকা উচিত।
আল-বাগদাদি যে রাকাকে রাজধানী হিসেবে বেছে নিয়েছেন, সেটা বিস্ময়কর ব্যাপার নয়। তিনি সিরিয়ার শহরগুলোর তিনটি ইতিহাস পাঠ করেছেন, তিনি আইএসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাঁদের মধ্যে দলটির পটু যোগাযোগকর্মীরাও রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একজন হচ্ছেন আলেপ্পো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির স্নাতক ২৫ বছর বয়সী আবু আল-নাদা আল-ফরাজ, তিনি আইএসকে স্রেফ ‘আরেকটি ভালো বেতন দেওয়া চাকরিদাতা মনে করেন।’ এই ব্যক্তি আইএসের বিতৃষ্ণাকর ম্যাগাজিন দাবিক-এর জন্য অনুবাদ করেন। এই ম্যাগাজিনের সব কর্মীই ইউরোপীয় মুসলমান, এঁরা গুগলে আসক্ত। তাঁরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা পড়ে থাকেন। এ তালিকায় রয়েছে দ্য ইনডিপেনডেন্ট, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, ফরেন পলিসি ও সিরিয়ার সরকারের সংবাদ এজেন্সি সানা।
রাকার করব্যবস্থা খুবই কার্যকর, সেখানকার স্কুলগুলো আবার খুলেছে। তবে সেখানে ধর্মের ওপর অনেক বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। বৈপরীত্যমূলক ব্যাপার হচ্ছে, এসব স্কুলের পরীক্ষার খাতা সিরিয়ার সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হচ্ছে। আইএস সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, কিন্তু দেখা যাচ্ছে, তারা অতটা শক্তিশালী নয়।
মুবায়েদের নতুন বইটির পর্যালোচনা হয়নি বললেই চলে, ব্যাপারটা খুবই খারাপ হয়েছে। বইটিতে মুবায়েদ আইএসের নৃশংস, অমানবিক শাস্তি ও হত্যার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিয়েছেন, যেগুলো যুদ্ধাপরাধের পর্যায়েই পড়ে। কিন্তু তিনি সেটার ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতও খুঁজতে চান। সুন্নিরা বিশ্বাস করে, খলিফাকে মক্কার কুরায়েশ গোত্রের মানুষ হতে হবে। সে কারণে আল-বাগদাদি নিজের নামের সঙ্গে অতিরিক্ত দুটি নাম লাগাতে চান, ‘আল-কুরায়শি’ ও ‘আল-হাসানি’ (নবীর বংশধর)। আইএস সব সময় তাঁকে এই তিনটি নামে ডেকে থাকে।
১৪ শতকে ইসলামি চিন্তাবিদ ইবনে তাইমিয়া নৈতিক অধঃপতনের বিরুদ্ধে বিশুদ্ধ ইসলাম পুনঃপ্রবর্তনের জন্য জিহাদের মাধ্যমে ইসলামি রাষ্ট্র কায়েমের ডাক দিয়েছিলেন। তারপর ১৮ শতকে মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহাব ও মোহাম্মদ ইবনে সৌদ আরব ভূমিতে নিজেদের বিশুদ্ধ শাসন বিস্তৃত করার অভিপ্রায়ে ময়দানে নেমেছিলেন।
হ্যাঁ, আল-বাগদাদি যে রাকাকে রাজধানী হিসেবে বেছে নিয়েছেন, সেটা বিস্ময়কর ব্যাপার নয়। তিনি সিরিয়ার শহরগুলোর তিনটি ইতিহাস পাঠ করেছেন। কারণ, আব্বাসীয় রাজত্বের একদম মধ্যগগনে এই একই শহর থেকে একটি মুসলিম সাম্রাজ্য পরিচালিত হয়েছে, যেটা উত্তর আফ্রিকা থেকে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
ফলে সিরিয়ায় আসার আগে মার্কিন সেনাদের এসব জানতে হবে।
ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন দ্য ইনডিপেনডেন্ট থেকে নেওয়া
রবার্ট ফিস্ক: দ্য ইনডিপেনডেন্টের মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি।

Wednesday, November 4, 2015

সিরিয়ার সেনাবাহিনীর কথা ভুললে চলবে না by রবার্ট ফিস্ক

সিরিয়ার কমান্ডাররা এখন রাশিয়ার
প্রতিটি বিমান হামলা সমন্বয় করছে
মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার দুঃসাহসী অভিযান নিয়ে পৃথিবী এখনো রাগে গরগর করছে। রাশিয়া সিরিয়ায় হস্তক্ষেপ করে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ব্যাপারে নাক গলানো থেকে বঞ্চিত করেছে, কোন একনায়ক বেঁচে থাকবে আর কোন জন মারা যাবে। কিন্তু এই ডামাডোলের মধ্যে আমরা একটি প্রতিষ্ঠানের কথা ভুলে যাচ্ছি। সেটি হলো এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যা সেই রাষ্ট্রের মধ্যে ক্রিয়াশীল আছে, রাষ্ট্রটিকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে, যে রাষ্ট্রকে আবার মস্কো রক্ষা করতে চায়। সেই প্রতিষ্ঠানটি হলো সিরিয়ার সেনাবাহিনী। রাশিয়া নিজের ক্ষেপণাস্ত্রের প্রচারণা দিচ্ছে, আর সিরিয়ার সেনাবাহিনী মাস কয়েক আগেও লোক ও অস্ত্রবলে কমজোর থাকলেও হঠাৎ করেই গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছে। আমরা মনে করতে পারি, এ বছরের শুরুর দিকে এই সেনাবাহিনী প্রায় অকেজো হয়ে গিয়েছিল, বাশার আল-আসাদের সরকার নিজের শেষ দেখে ফেলেছিল।
ক্ষমতার পালাবদল ঘটানোর জন্য আমরা ঘুণে ধরা সেনাবাহিনীকে নামিয়েছিলাম। সিরিয়ার সেনাবাহিনী জিসর আল-সুগুর ও পালমিরায় হারছিল। ফলে আমরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলাম, বাশারের রাষ্ট্র এমন জায়গায় চলে গিয়েছিল, যেখানে আর সামান্য কিছু হলেই তার পতন হতে পারে।
এরপর ভ্লাদিমির পুতিন তাঁর বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র বহর নিয়ে হাজির হলেন, আর পুরো পরিস্থিতি বদলে গেল। আমরা যখন গোঁৎ গোঁৎ করছিলাম যে রাশিয়া মধ্যপন্থী বিদ্রোহীদের ওপর বোমাবর্ষণ করছে, তখন আলেপ্পো ও ওরোন্তসের উপত্যকার আশপাশে সিরিয়ার সেনাবাহিনী নুসরা ফ্রন্টের বিরুদ্ধে যে অভিযান চালাচ্ছে, সেদিকে আমরা নজর দিইনি। অথচ মার্কিন জেনারেলরা বলেছিলেন, মধ্যপন্থীদের অস্তিত্ব নেই।
সিরিয়ার কমান্ডাররা এখন রাশিয়ার প্রতিটি বিমান হামলা সমন্বয় করছে। তারা প্রতি রাতে ২০০ থেকে ৪০০টি হামলা সমন্বয় করছে। এখন সে সংখ্যাটা প্রায়ই ৮০০-তে চলে যাচ্ছে। না, রুশরা যে মানচিত্রের প্রতিটি রেফারেন্স অনুসারেই হামলা করছে, ব্যাপারটা তা নয়। সিরিয়া দেখেছে, রুশরা ঘনবসতিপূর্ণ স্থানে হামলা করতে চায় না, তারা আফগানিস্তানে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের কাছে সিরিয়ার জ্বলন্ত হাসপাতাল ও মৃত বরযাত্রীদের রেখে যেতে চায়। তবে নীতির পরিবর্তন যেকোনো সময় হতে পারে। বিমানবাহিনীর বোমাবর্ষণে বেসামরিক মানুষ নিহত হবে না, তা হতে পারে না। আর সেটা করতে হলে অন্য দেশের সীমানাও অতিক্রম করতে হয়।
যৌক্তিক পরম্পরায় রুশরা তুর্কিদের বলেছে, এই যুদ্ধ সমন্বয়ের তথ্যটা মার্কিনদের হাতে যাওয়া উচিত। আরও উল্লেখযোগ্য খবর হচ্ছে, সিরিয়ার ভূমধ্যসাগর উপকূলে রুশদের ঘাঁটির সঙ্গে তেল আবিবের ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে হটলাইন যোগাযোগ চালু হয়েছে। আরও অবিশ্বাস্য খবর হচ্ছে, ইসরায়েলের বিমানবাহিনী একসময় গোলান উপত্যকায় সিরিয়া ও ইরানের বেসামরিক মানুষের ওপর বোমা হামলা চালালেও হঠাৎ করেই তারা আকাশ থেকে উধাও হয়ে গেছে। অন্য কথায় বললে, রাশিয়া এক বড় অভিযানে নেমেছে, সিরিয়ায় তারা এক মাসের জন্য ঘুরতে আসেনি। এটা অনেক দিন ধরে চলবে বলেই মনে হয়।
সিরিয়া আসলে পালমিরা পুনর্দখলের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন ছিল, আইএস গত মে মাসে সেটি দখল করেছিল। কিন্তু রুশরা আলেপ্পো অঞ্চলের ব্যাপারেই বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে, এর আংশিক কারণ হচ্ছে তারা মনে করে, লাতাকিয়া উপকূলের আশপাশে তাদের ঘাঁটি দুর্বল। নুসরা ফ্রন্ট লাতাকিয়া ও তারতুসের দিকে কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে, আর মস্কো চায় না যে তার বিমানবাহিনী ভূমিতেই অন্য কারও লক্ষ্যবস্তু হোক। কিন্তু সিরিয়ার সেনাবাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে তার গুরুত্বপূর্ণ চারটি ইউনিট মোতায়েন করেছে, তারা এখন তুরস্ক সীমান্তের দিকে এগোচ্ছে: প্রথম ও চতুর্থ ডিভিশন, রিপাবলিকান গার্ড ও স্পেশাল ফোর্সেস।
আইএসের রাজধানী রাকায় রাশিয়ার বিমান হামলায় আইএস আক্রান্ত হতেও পারে আবার নাও হতে পারে, যদিও সিরিয়া এ কথা বলে বুক ফোলায় যে ওই শহর থেকে তারা অনেক গোয়েন্দা তথ্য পাচ্ছে। ব্যাপারটা সত্য হলে তা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক হবে, কারণ আইএস ‘সরকারের চরদের’ নির্যাতন করে মেরে ফেলার ব্যাপারে ওস্তাদ। ফলে যে-ই দামেস্কে তথ্য পাঠাক না কেন, তাকে অনেক সাহসী হতে হবে। তারপরও ভ্রমণকারীদের কথা সত্য হতে পারে। রাকা থেকে দামেস্ক পর্যন্ত একটি নিয়মিত বেসামরিক যাত্রীবাহী বাস চলাচল করে, এ এক অদ্ভুত ব্যাপার, কারণ বেসামরিক বাস সাধারণত যুদ্ধরেখা অতিক্রম করে থাকে। আর যাত্রীরা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা না বললেও বাড়ি পৌঁছে তারা নিজেদের অভিজ্ঞতার ঝাঁপি খুলে দেয়।
হ্যাঁ, এসবই পুতিনের অভিযানের শুরু মাত্র। ইদানীং তিনি মধ্যপ্রাচ্যে বেশ যাতায়াতও শুরু করেছেন। এই অঞ্চলের আরেক স্তম্ভ মিসরের ফিল্ড মার্শাল প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তিনি বন্ধুত্ব পাতিয়েছেন, যিনি নির্বাচনে ৯৬ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছেন, যিনি এখন মিসর শাসন করেন। কিন্তু মিসরীয় সেনাবাহিনী সিনাইয়ে ছোট একটি যুদ্ধে লিপ্ত হলেও বড় যুদ্ধের কৌশলগত অভিজ্ঞতা তার নেই। আবার সৌদি আরব, আমিরাত ও জর্ডানের বর্তমান সামরিক বাহিনী ইয়েমেন, লিবিয়া, সিরিয়া ও সুযোগমতো অন্যান্য লক্ষ্যবস্তুতে আকাশ থেকে ছেলেখেলা প্রকৃতির হামলা চালালেও একটি প্রকৃত যুদ্ধ কীভাবে লড়তে হয়, সে অভিজ্ঞতা কি তাদের আছে? লিবিয়ার সেনাবাহিনী ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। ওদিকে ইরাকের সেনাবাহিনী ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে কৃতিত্বপূর্ণ লড়াই করতে পারেনি।
কিন্তু একটি তথ্য এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।
সিরিয়ার সেনাবাহিনী যদি এই যুদ্ধে জেতে, নিজেদের ধরে রাখতে পারে, সেনাসংখ্যা বজায় রাখতে পারে, তাহলে তারাই হবে এ অঞ্চলের সবচেয়ে সমর-প্রশিক্ষিত, নির্মম ও সমর-অভিজ্ঞ সেনাবাহিনী। এ মুহূর্তে তাদের লোক ও অস্ত্রবল দুটোই কম। সিরিয়ায় প্রতিবেশীরা যদি এ কথা ভুলে যায়, তাহলে তাদের কপালে দুঃখ আছে।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন; দ্য ইনডিপেনডেন্ট থেকে নেওয়া
রবার্ট ফিস্ক: দ্য ইনডিপেনডেন্টের মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি।

Sunday, October 11, 2015

সিরিয়ার মধ্যপন্থীরা গেল কোথায়? by রবার্ট ফিস্ক

রুশ বিমান হামলায় বিধ্বস্ত সিরিয়ার কয়েকটি ভবন
সিরিয়ার আকাশসীমা পশ্চিমের কাছে অলীক বস্তু, রাশিয়ার বিমানবাহিনী সেখানে সরাসরি ঢুকে গেছে। আমাদের বলা হয়েছে, রাশিয়া সিরিয়ার ‘মধ্যপন্থীদের’ ওপর বোমা হামলা চালাচ্ছে। যে ‘মধ্যপন্থীদের’ অস্তিত্বের কথা যুক্তরাষ্ট্র দুই মাস আগেও স্বীকার করেছিল, তারা আর নেই।
এটা অনেকটা আইসিস যোদ্ধাদের মতো, যারা ‘খিলাফতের’ জন্য লড়াই করতে ইউরোপ ত্যাগ করেছে। পাঠক, তাদের কথা মনে আছে? বড় জোর দুই মাস আগের কথা, আমাদের রাজনৈতিক ও প্রথম সারির লেখকেরা ‘দেশের ভেতরে বেড়ে ওঠা’ ইসলামপন্থীদের ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছিলেন, যারা আইসিসের মতো দানবের হয়ে লড়াই করতে ব্রিটেন, আমেরিকাসহ অন্যান্য ইউরোপীয় দেশ ত্যাগ করছিল। তারপর আমরা দেখলাম, লাখ লাখ শরণার্থী বলকান এলাকা হয়ে ইউরোপের দিকে যাত্রা শুরু করেছে, মাঝপথে তারা ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকিও নিয়েছে। আর সেই একই রাজনৈতিক নেতারা বলেছেন, আমাদের শঙ্কিত হওয়া উচিত, কারণ এই শরণার্থীদের মধ্যে আইসিসের খুনিরা আছে।
ইউরোপীয় মুসলমানেরা আইসিসে যোগ দেওয়ার জন্য যেভাবে তুরস্কে আসছে, তা সত্যিই বিস্ময়কর। কয়েক সপ্তাহ পরেই সাগর পাড়ি দেওয়ার সময় তাদের নৌকা ফুটো হয়ে যাওয়ায় তারা ডুবে মরেছে অথবা ধীর পায়ে দেশে ফিরে গেছে। কেউ কেউ আবার হাঙ্গেরি থেকে ট্রেন ধরে জার্মানিতে গেছে। কিন্তু এই বাজে কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে ইউরোপে ফিরে যাওয়ার পর তারা আমাদের ওপর হামলা চালানোর মতো সন্ত্রাসী প্রশিক্ষণ নেওয়ার সময় পেল কোথায়?
আবার এমনও হতে পারে যে ব্যাপারটা স্রেফ গল্প। এর বিপরীতে গত সপ্তাহে সিরিয়ায় রাশিয়ার নির্মম বিমান হামলা যে ভীতি সৃষ্টি করেছে, তা রীতিমতো অসুস্থতার শামিল।
আসুন, বাস্তব পরিস্থিতিটা পরীক্ষা করেই শুরু করি। হামলাকারী রুশ সেনাবাহিনী খুনি। তারা চেচনিয়ায় ইসলামপন্থীদের উত্থান রোধ করতে সেখানকার নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে, আর এবার তারা বাশার আল-আসাদের সরকারকে রক্ষা করতে এবং এই নব্য ইসলামপন্থীদের প্রতিহত করতে সিরিয়ার নিরীহ মানুষকেও হত্যা করবে। সিরিয়ার সেনাবাহিনীর অনেকেই যুদ্ধাপরাধী, তারা রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে হিংস্র সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে, সেটা করতে গিয়ে তারা ব্যারেল বোমাও ব্যবহার করেছে। সিরিয়ার জন্য তারা আবার জীবনও দিয়েছে।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর অতি প্রিয় ‘মার্কিন কর্মকর্তারা’ দাবি করেছেন, সিরিয়ার সেনাবাহিনী আইসিসের বিরুদ্ধে লড়ছে না। সেটা যদি সত্য হয়, তাহলে সিরিয়ার ৫৬ হাজার সেনাকে কারা হত্যা করেছে? এই পরিসংখ্যানের দাপ্তরিক গোপনীয়তা থাকলেও তা সত্য, সিরিয়ার যুদ্ধে এখন পর্যন্ত কারা মারা গিয়েছে? সেই উদ্ভট ফ্রি সিরিয়ান আর্মি (এফএসএ)?
সিরিয়ার ‘মধ্যপন্থীদের’ নিয়ে যে প্রায়ই বীরগাথা রচিত হচ্ছে, তার মধ্য দিয়েই এই বাজে ব্যাপারটি চরমে পৌঁছেছে। এরা মূলত ছিল এফএসএর দলত্যাগী সদস্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের সম্ভাব্য পশ্চিমমুখী শক্তি মনে করেছিল, যাদের সিরিয়ার সরকারি সেনাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু এই এফএসএ খণ্ড খণ্ড হয়ে যায়, এরা ছিল দুর্নীতিবাজ। আর সেই ‘মধ্যপন্থীরা’ আবারও দলত্যাগ করে ইসলামিস্ট নুসরা ফ্রন্ট ও আইসিসে যোগ দেয়। তারা মার্কিনদের কাছ থেকে পাওয়া অস্ত্রগুলো সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে বিক্রি করে দেয় অথবা নীরবে গ্রামে গিয়ে বসবাস শুরু করে—বিচক্ষণতার সঙ্গেই। সেখানে তারা বিচ্ছিন্নভাবে কিছু চেক পয়েন্ট বসিয়েছে।
রুশ বিমান হামলায় বিধ্বস্ত সিরিয়ার কয়েকটি ভবন
ওয়াশিংটন স্বীকার করে, তারা লাপাত্তা হয়ে গেছে, তাদের দুর্ভাগ্যে শোকও প্রকাশ করে। ওয়াশিংটন সিদ্ধান্তে আসে, তাদের নতুন ‘মধ্যপন্থী’ দরকার। সে লক্ষ্যে তারা সিআইএকে দিয়ে ৭০ জন যোদ্ধাকে এই গ্রীষ্মে সশস্ত্র ও প্রশিক্ষিত করে তুরস্ক সীমান্ত দিয়ে সিরিয়ায় ঢুকিয়ে দেয়। তাদের মধ্যে ১০ জন ছাড়া বাকি সবাই নুসরা ফ্রন্টের হাতে ধরা পড়ে, আর তাদের মধ্যে অন্তত দুজনকে হত্যা করা হয়েছে। সপ্তাহ দুয়েক আগে আমি নিজে শুনেছি, ইরাকে যে জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তারা ছিলেন, তাঁদের মধ্যে ঊর্ধ্বতন একজন ঘোষণা দিয়েছেন, ‘মধ্যপন্থীরা অনেক আগেই ভেঙে পড়েছে।’ কেউ কি এখন তাদের দেখতে পায়? না, দেখতে পায় না।
কিন্তু রাশিয়া সিরিয়ায় হামলা চালানো শুরু করার পর ওবামা প্রশাসন, নিউইয়র্ক টাইমস, সিএনএন ও বৃদ্ধ বেচারা বিবিসি সেই ভূতকে পুনর্জাগ্রত করল! রুশরা সাহসী ‘মধ্যপন্থীদের’ ওপর হামলা শুরু করেছে, যারা বাশারের সেনাদের বিরুদ্ধে লড়ছে। অথচ তারাই
কয়েক সপ্তাহ আগে বলেছিল, এই মধ্যপন্থীদের অস্তিত্ব নেই।
এখন কিছু মামুলি তথ্য দিই। রাশিয়ার বিমানবাহিনীর হামলার লক্ষ্যবস্তুর তালিকা তৈরি করে দিচ্ছে সিরিয়ার সেনাবাহিনী, কিন্তু সিরিয়ায় ভ্লাদিমির পুতিনের নিজস্ব শত্রু রয়েছে।
রাশিয়া যে প্রথম বিমান হামলাটি চালায়, সেটা মার্কিনদের কথিত ‘মধ্যপন্থীদের’ ওপর নয়। সেই হামলাটি তারা চালিয়েছিল সিরিয়ার দূর উত্তর-পশ্চিমে, যে গ্রামটি বহুদিন ধরে চেচেন যোদ্ধাদের দখলে ছিল। এরা কিন্তু সেই চেচেন, যাদের পুতিন খোদ চেচনিয়াতেই খতম করে দিতে চেয়েছিলেন। এই চেচেন সেনারা গত বছর সিরিয়ার কৌশলগত সামরিক স্থাপনা পজিশন ৪৫১-তে হামলা চালিয়েছিল, ফলে বাশারের সেনাবাহিনী যে সেটাকে লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় রেখেছিল, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই।
রাশিয়ার অন্যান্য হামলার লক্ষ্যবস্তু আইসিস ছিল না, ছিল একই এলাকায় অবস্থানরত জয়েশ আল-শামস বাহিনী। কিন্তু প্রথম ২৪ ঘণ্টায় রাশিয়া পালমিরার ওপরে পর্বতের মধ্য দিয়ে আইসিসের সরবরাহ লাইনের ওপরও বোমা বর্ষণ করেছে।
রাশিয়ার বিমানবাহিনী সুনির্দিষ্টভাবে সালামিয়া শহরের আশপাশের মরু সড়কে হামলা চালিয়েছে। মে মাসে আইসিসের আত্মঘাতী বাহিনীর গাড়িবহর এ পথেই পালমিরায় গিয়ে সিরিয়ার বাহিনীকে পরাজিত করেছিল। তারা হাসাকের আশপাশে ও আইসিস-নিয়ন্ত্রিত রাকা বিমানঘাঁটিতেও হামলা চালিয়েছে। সিরীয় বাহিনী গত বছর রাকায় আইসিসের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে (আত্মসমর্পণের পর তাদের শিরশ্ছেদ করা হয়েছে)।
সিরিয়ায় রাশিয়ার যে স্থলসেনা রয়েছে, তারা শুধু ঘাঁটি পাহারা দিচ্ছে। তাদের উপস্থিতি প্রতীকী, কিন্তু তারা আইসিসের সঙ্গে লড়াই করবে, এমন চিন্তা মিথ্যা। রাশিয়া চায়, তাদের জায়গায় সিরিয়ার সেনাবাহিনী মাঠে লড়াই করে মরুক। না, সিরিয়ার যুদ্ধে ভালো বা খারাপ মানুষের বালাই নেই। বেসামরিক মানুষ হত্যার ব্যাপারে সিরিয়ার সেনা ও ন্যাটোর চেয়ে রাশিয়ার সংবেদনশীলতা বেশি নয়। সিরিয়ার যুদ্ধ নিয়ে ছবি বানানো হলে তার নাম হওয়া উচিত ওয়ার ক্রিমিনালস গ্যালোর!
কিন্তু দোহাই আপনাদের, আকাশকুসুম কল্পনা করা বন্ধ করুন। দিন কয়েক আগে হোয়াইট হাউসের একজন মুখপাত্র বলেছেন, রাশিয়ার বোমাবর্ষণের কারণে ‘মধ্যপন্থীরা চরমপন্থীদের খপ্পরে পড়ছে’।
এ গল্প কে লিখছে? হয়তো একজন ‘মধ্যপন্থীই’ বটে...
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন; দ্য ইনডিপেনডেন্ট থেকে নেওয়া
রবার্ট ফিস্ক: দ্য ইনডিপেনডেন্ট-এর মধ্যপ্রাচ্য সংবাদদাতা।

Saturday, August 22, 2015

ভিয়েনা চুক্তি: খেপেছে ইসরায়েল ও সৌদি আরব by রবার্ট ফিস্ক

ভিয়েনা চুক্তি নিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও উপসাগরীয় সুলতানরা যতই ক্ষিপ্ত হোন না কেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান গোষ্ঠীগত যুদ্ধে আমেরিকানরা যে শিয়া মুসলমানদের পক্ষ নিল—এই সত্য নিয়ে আরবদের সন্দেহ থাকবে।
অবশ্য মহান ও ভালো মানুষেরা বিষয়টিকে এভাবে উপস্থাপন করেননি। খবরের শিরোনামগুলো ছিল খুবই সাদামাটা। শিরোনামের ধরন ছিল এ রকম: ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করতে সম্মত হলো, সেন্ট্রিফিউজগুলো কয়েক দশকের জন্য শিকেয় তুলে রেখে তারা ইউরেনিয়ামের মজুত কমাবে। আর এসবের বিনিময়ে তুলে নেওয়া হবে নানা ধরনের অবরোধ, যেগুলো ৩৬ বছর আগে রুহুল্লা খোমেনির প্রতিষ্ঠিত ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের ওপর আরোপ করেছে ওয়াশিংটন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘ।
আন্তর্জাতিক পরমাণু জ্বালানি সংস্থার (আইএইএ) অনেক গবেষকই এখন থেকে ইরানের পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্রগুলোর ভেতরে হুটহাট ঢুকে পড়তে পারবে, সে জন্য ইরানি কর্তৃপক্ষকে আগেই জানাতে হবে কি হবে না, এটা পরিষ্কার করে বলা হয়নি। কিন্তু আমাদের সময়ে শান্তি ছিল। ওবামার উত্তরাধিকার বা ৮০ পাতার চুক্তিটির (ফারসিতে ১০০ পাতা) প্রযুক্তিগত বিষয়গুলো যাই হোক না কেন, ইরান এখন মরহুম শাহের আলখাল্লা গায়ে দিয়ে পারস্য উপসাগরে মাতব্বরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে যাচ্ছে। এখন মধ্যপ্রাচ্যের ভূমিকম্প বিশারদদের নড়েচড়ে বসা উচিত।
রুজভেল্ট ও বুশের উত্তরসূরি ওবামা হোয়াইট হাউসে বজ্রকণ্ঠে বলেছেন, ‘আরও আশাবাদী পৃথিবী...অন্যদিকে মোড় নেওয়ার সুযোগ।’ আর কংগ্রেসের সদস্যরা যদি এটা বানচালের ষড়যন্ত্র করেন, তাহলে ওবামা তাঁর ভেটো প্রয়োগ করে তা রহিত করবেন, খুব ছিমছামভাবে তিনি এ কথা বলেছেন। আর ইরানের পড়ুয়া প্রেসিডেন্ট রুহানি তাঁর অভিভাষণে বলেছেন, ‘গঠনমূলক চুক্তিতে কাজ হয়।’
এর মাধ্যমে সুন্নি মুসলমান জাতিগুলোর ব্যাপক প্রভাবের অবসান ঘটবে, যারা নিজেদের সন্তানদের ৯/১১-এর মানবতাবিরোধী অপরাধে উৎসর্গ করেছিল। যার কারণে পৃথিবীতে ওসামা বিন লাদেনের উত্থান হয়েছিল, যে তালেবান, ইরাক ও সিরিয়ার সুন্নি ইসলামপন্থীদের সমর্থন করেছিল। আর যে আমির ও রাজপুত্ররা আইসিসকে সমর্থন দিয়েছিলেন, শেষমেশ তাদেরও বিদায়। ওয়াশিংটন উপসাগরীয় জরাগ্রস্ত রাজপুত্রদের ব্যাপারে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, বিরক্ত হয়ে পড়েছে। তাদের নীতিবাগীশ বক্তৃতা, একঘেয়ে সম্পদ (যদি না সেটা মার্কিন অস্ত্র কেনায় ব্যয় হয়), আর ইয়েমেনে তাদের অপ্রীতিকর যুদ্ধ প্রভৃতি কারণে যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় শিয়া ইরান তো ভালো ছেলে।
নিশ্চিতভাবেই বাহ্যিক চেহারা কখনো প্রতারণামূলক হতে পারে। এদিকে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড, ইসরায়েলি মন্ত্রিসভা ও মার্কিন কংগ্রেসের অযৌক্তিক মানুষেরা এটা নস্যাৎ করার চেষ্টা করবে। কিন্তু আরেকটি কথা বলতে হয়। জন কেরি—সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে মেধাবী পররাষ্ট্রমন্ত্রী—ইরানের সঙ্গে এই চুক্তির জন্য ভিয়েনায় ১৮ দিন ছিলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আর কোনো মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক কাজে এক জায়গায় এত বেশি সময় কাটাননি। আমি ধারণা করি, বেচারা এডওয়ার্ড স্টেটিনিয়াসকে জাতিসংঘের সনদ প্রস্তুত করতে সানফ্রান্সিসকো কনফারেন্সে প্রায় দুই মাস থাকতে হয়েছিল। ইয়ালতা ও পটসডামের চুক্তি যথাক্রমে ৮ ও ১৭ দিন স্থায়ী হয়েছিল। ফলে নেতানিয়াহুর মাথায় যে খুন চড়ে যাবে, তাতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই।
কিন্তু অন্যান্য কথাও চালু আছে। সিরিয়া ও বাশারের ভবিষ্যৎ নিয়ে যারা আলোচনা করতে পারে, তাদের মধ্যে ইরানই এখন সবচেয়ে অগ্রগণ্য। আর সেই যে তা করবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। দেশটির গার্ড বাহিনী ও লেবাননের হিজবুল্লাহ সহযোগীরা ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে একদম সামনের কাতারে রয়েছে। সে সম্ভবত ওবামা প্রশাসনকে বাশারকে সমর্থনের ব্যাপারে রাজি করানোর ব্যাপারে নীরবে চেষ্টা করবে, যদি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের মতো সুন্নি ওয়াহাবি আইসিসকে/ ধ্বংস করতে চায়। আরবের সূত্রগুলো বলেছে, কেরি ও জারিফ ভিয়েনাতে এ বিষয়ে অনেকক্ষণ ধরে কথা বলেছেন, এই সূত্রগুলোর তো সেটা জানার কথা। সম্ভবত সে কারণেই আলোচনা এত দীর্ঘ হয়েছে। আমরা কি দামেস্কে শ্যাম্পেন গ্লাসের টুং টাং শব্দ শুনছি?
ভয়াল, রক্তপিপাসু মানুষ ও মহাপ্রলয়তুল্য সুন্নি মুসলিম সংগঠন আইসিস ইরানের এই চুক্তিতে নেতানিয়াহুর মতো বিতৃষ্ণ হবে। এরা ইরানকে সব সময়ই খারেজি ও স্বধর্ম ত্যাগকারী রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য করে। আর ইরানের রক্তপিপাসু আগ্রাসনের নিন্দাও তারা সব সময়ই করেছে। আর নেতানিয়াহু আমাদের কী বলেছেন? তিনি বলেছেন, ইরান এখন তার ‘রক্তপিপাসু আগ্রাসন’ চালাতে পারবে। বা! খুবই সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য হলেও একই চুক্তিতে বেনিয়ামিন ও আইসিসকে পাওয়া তো অসামান্য ব্যাপার। আর যেহেতু সৌদি আরবও ইরান সম্বন্ধে একই দৃষ্টিভঙ্গি লালন করে, সেহেতু আমরা পরবর্তীকালে নানা ঘটনা ঘটতে দেখব, অন্য কিছু না হলেও। আর একজন সৌদি রাজবংশীয় মানুষ তো ইরানকে নির্দয়ভাবে ‘সাপের মাথা’ আখ্যা দিয়েছেন।
কিন্তু ইরানের নতুন মর্যাদার ব্যাপারে অন্যথা হওয়ার জো নেই। সিগনোরা ফেদেরিকা মগেরিনি ভিয়েনায় বেশ সূক্ষ্মভাবে বলেছেন, ইরানের সামনে এখন ঐতিহাসিক সুযোগ এসেছে, তারা এখন মধ্যপ্রাচ্যে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালনে আগ্রহ...দেখাতে পারে। ইরান এ অঞ্চলেই দ্বন্দ্ব-বিবাদ মীমাংসা করার লক্ষ্যে তার প্রভাব কাজে লাগাতে পারে। সিরিয়া, তিনি শুধু এই একটা শব্দ ব্যবহার করতে পারতেন। আর ভিয়েনা চুক্তি যদি ‘ঐতিহাসিক মাত্রার বাজে ভুল হয়’ (আবারও বেনিয়ামিন), তাহলে এই শব্দগুলো দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে, ইসরায়েল কেন ইরানের সুন্নি জঙ্গিদের চিকিৎসার জন্য সিরিয়ার গোলান পাড়ি দিয়ে কিছুদিন পরপর ইসরায়েলে ঢুকতে দিচ্ছে।
এটা নিশ্চিত থাকুন, ওবামার পক্ষ থেকে উপসাগরীয় রাজাদের কক্ষে অনেক কোমল কণ্ঠের ফোন আসবে। তিনি হয়তো বলবেন, কোনো চিন্তা নেই, সবকিছু ভালোর জন্যই, আমাদের বিশ্বাস করুন প্রভৃতি, ঠিক যেমন ক্লিনটন উত্তর কোরিয়াকে বিশ্বাস করেছিলেন, যখন দেশটি তার কিছুদিন আগেই একই রকম আওয়াজ তুলেছিল। কিন্তু বেনিয়ামিনসহ সবাই মনে রাখবে, ধ্বংস দেখেও উদ্ধারকারীদের না ডেকে হেঁটে চলে যাওয়ার অভ্যাস ওবামার আছে।
জন কেরি কি কয়েক মাস আগে ফিলিস্তিন-ইসরায়েলের প্রাচীন দ্বন্দ্ব মীমাংসা করার চেষ্টা করেননি? আর যে মুহূর্তে সন্ত বারাক বুঝতে পারলেন, এই নৈরাশ্যজনক উদ্দেশ্য সাধন তাঁর অমর ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করবে না, তিনি তখন স্রেফ হেঁটে চলে গেলেন। এমনকি তিনি উদ্ধারকারীদেরও ডাকেননি, মেসার্স ব্লেয়ার অ্যান্ড কোং।
আর যে শব্দটি ভিয়েনায় গত আড়াই সপ্তাহে উচ্চারণই করা হয়নি, সেটা হলো ‘ফিলিস্তিন’।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
দ্য ইনডিপেনডেন্ট থেকে নেওয়া।
রবার্ট ফিস্ক: দ্য ইনডিপেনডেন্টের মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি

Sunday, July 5, 2015

আল-নুসরার সঙ্গে হাত মেলাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র by রবার্ট ফিস্ক

আল নুসরা ফ্রন্টের যোদ্ধা
না, ‘মধ্যপন্থী’ জাবহাত-আল-নুসরার বিদ্রোহীদের কথা উল্লেখ করার জন্য আজ কোনো দুঃখ নেই। এরাও গলাকাটা ও খুনি বাহিনী, এখন তারা আইএস-বিরোধী অবস্থান নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রণয় প্রার্থনা করছে।
আপনাদের মনে থাকতে পারে, এই দলের নেতা কাতারের আল–জাজিরা টিভিকে বলেছিলেন, আল–কায়েদার সঙ্গে সম্পর্কিত তাঁর যোদ্ধারা আইএস ও বাশার আল আসাদ উভয়েরই বিরোধিতা করবে। এমনকি তারা সিরিয়ার খ্রিষ্টান ও আলাওয়িদদের মতো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে রক্ষা করবে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাভাবিক প্রবণতা সম্পর্কে যারা জানে তারা বলবে, এর কোনো মানে নেই। তারা আরও বলবে, ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ববাদী’দের ঘাড়েই দোষটা বর্তায়। কারণ, তারা এমন কথা বলছে যে যুক্তরাষ্ট্র এসব মানুষের কাছে নতুন নতুন অস্ত্র পাঠাচ্ছে। না, যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত সন্ত্রাসী তালিকায় যারা আছে, তাদের সঙ্গে সে কখনো কোনো সম্পর্কে যাবে না। আর কাতার তো কখনো এই খুনিদের মধ্যপন্থী তকমা দেবে না, তাই না?
এবার ষড়যন্ত্র তত্ত্ববাদীদের দিকে আরেকবার নজর দেওয়া যাক। ফরাসি পত্রিকা লে মঁদ ডিপ্লোমাতিক এই মাসে ‘আপনি কি ষড়যন্ত্রের কথা বললেন?’ শিরোনামে অনেকগুলো নিবন্ধ ছেপেছে। খুব বেদনার সঙ্গে তারা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে, কতগুলো ফলস ফ্ল্যাগ অভিযানের (একাধিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছদ্ম অভিযান) খবর সত্য বলে প্রতীয়মান হয়েছে। মাকদেনের ঘটনার কথাই বলা যেতে পারে। যেমন ১৯৩১ সালে সাম্রাজ্যবাদী জাপানের ওপর চীনের আক্রমণ উল্টো চীনের ওপর জাপানের আক্রমণ বলে প্রতীয়মান হয়, যেখান থেকে জাপান চীনের মাঞ্চুরিয়া দখল করে নেয়। তারপর সেখানে জাপানের আগ্রাসন-বিষয়ক রেপ অব নানকিং-এর মতো বইও লেখা হয়েছে।
তারপর আমরা দেখলাম, রাইখস্ট্যাগে আগুন লাগল। এই কাজটা সম্ভবত নাৎসিরা করেছিল, কমিউনিস্টরা নয়। তারপর দেখা গেল সিআইএ ও এমআই ৫-এর ষড়যন্ত্র সফল হলো, যার মাধ্যমে তারা ইরানে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেগকে উৎখাত করে। অনুমান করা হয়, সেই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে কমিউনিস্টরাই বোমা পুঁতে রেখেছিল। ১৯৫৪ সালে ইসরায়েল কায়রোর মার্কিন ও ব্রিটিশ ভবনে হামলা চালায়, আর তার দোষ চাপানো হয় মিসরীয় জাতীয়তাবাদীদের ওপর। তারপর দেখলাম ১৯৬৪ সালের টনকিন কাণ্ড, তখন যুক্তরাষ্ট্র গায়েবি অভিযোগ করে, উত্তর ভিয়েতনাম মার্কিন যুদ্ধ জাহাজে হামলা চালিয়েছে। সেখান থেকে এক বাস্তব যুদ্ধের শুরু হয়, ভিয়েতনাম যুদ্ধ। কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার হচ্ছে, লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের এমন ষড়যন্ত্রের আরও নিদর্শন দেখা যায়, গুয়েতেমালা, ব্রাজিল, চিলি, আর্জেন্টিনা, নিকারাগুয়া, কিউবা ও আরও অনেক দেশে।
যারা বিশ্বাস করে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ও তাঁর সহযোগীরা ৯/১১-এর হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন, উপরোক্ত ফরাসি জার্নালে তাঁদের পক্ষপাতহীনভাবে সমালোচনা করা হয়েছে। ব্যাপারটা যেন এমন, যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট মধ্যপ্রাচ্যে কোনো কিছু করতে গিয়ে সব গুলিয়ে ফেলেছেন, তিনি ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ধ্বংস করতে পারেন। আর পশ্চিমা ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে আরব বিশ্বের আচ্ছন্নতা, যার আড়ালে তারা নিজেদের দায়-দায়িত্ব লুকাতে চান।
ঠিক সেভাবেই একজন ইসরায়েলি নারী কর্মকর্তা আরব নেতাদের শয্যাসঙ্গী হয়ে তাঁদের ইসরায়েলপন্থী রাজনীতি সমর্থন করতে প্রলুব্ধ করেছেন—এই মিথ্যা খবর ছাপানোর পর মিসরের পত্রিকা আল মাসরি আল ইয়ৌম পরবর্তীকালে ক্ষমাও চেয়েছিল। কিন্তু ইন্টারনেটের সৌজন্যে এই মিথ্যার পুনরুৎপাদন চলছেই।
আরবদের বলা হয়েছে, পশ্চিমা বিশ্ব ষড়যন্ত্র করে ২০১১ সালে মধ্যপ্রাচ্যের বিপ্লবের জোয়ার তৈরি করেছিল, যাতে সেখানে অস্থিতিশীলতা ও গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। বাশারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ আর মোবারকের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের পরিকল্পনাও করেছে মার্কিনরা। প্রথমটির লক্ষ্য ছিল ইসরায়েলের শক্তিশালী প্রতিবেশীর সাহচর্য থেকে দূরে রাখা, আর দ্বিতীয়টির লক্ষ্য ছিল মুসলিম ব্রাদারহুডকে ক্ষমতায় আনা এবং ‘মিসরের মহত্ত্ব খর্ব করা’। মিসরের রাজনৈতিক কর্মীরা সেনাবাহিনীর নৃশংসতার বিরোধিতা করলে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়, তারা পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে টাকা খেয়ে তাদের স্বার্থের বাড়বাড়ন্ত করছে। এমনকি ব্রিগেডিয়ার-জেনারেল-প্রেসিডেন্ট আল সিসিও তা বিশ্বাস করেন। আলজেরিয়ার মানুষ এখনো দাবি করে, সেখানকার সব রাজনৈতিক আন্দোলনের পেছনে রয়েছে ফরাসি দিউক্সিয়েম ব্যুরো (১৯৪০ সালের পর থেকে যাদের অস্তিত্ব আর নেই)।
তাই আমিও এতে যোগ দিচ্ছি। আমার মনে হয়, ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকার সাধারণ কোনো পাঠক এই বোকামির কথা শুনে ইংরেজি ভাষার বাগ্রীতির এক মহান দৃষ্টান্তের দ্বারস্থ হবেন: হোয়াট আ লোড অব ওল্ড কবলার্স! (বাজে কথা) কিন্তু অপেক্ষা করুন।
কিছুদিন আগে সিরিয়ায় থাকার সময় আমি কয়েকবার শুনেছি, ইরানিরা আসাদের জামানাকে রক্ষা করতে গিয়ে প্রাণ দিলেও অর্থনৈতিক সহায়তার ব্যাপারে তারা খুবই কৃপণ। দামেস্কের এক সূত্র আমাকে জানিয়েছে, তারা সিরিয়ার সেনাবাহিনীর জন্য কোনো খরচ করলে তার নিশ্চয়তা হিসেবে রিয়েল এস্টেট দাবি করে। জানি না এটা সত্য কি না। তবে জাতিসংঘের বিশেষ দূত স্তাফান দে মিস্তুরা হিসাব দিয়েছেন, ইরান সিরিয়ার বর্তমান জামানাকে রক্ষায় প্রতিবছর চার বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে। এর মধ্যে ইরানের সেনা কর্মকর্তা, হিজবুল্লাহ ও সিরিয়ার হয়ে লড়াই করা ইরাকি শিয়াদের খরচ ধরা হয়নি। তবে ‘ইউএস ইনস্টিটিউট অব পিসের’ এক ভদ্রলোক এই হিসাব খারিজ করে বলেছেন, এই খরচের পরিমাণ বছরে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার।
আর এর সব টাকাই নাকি আসে এমন এক দেশ থেকে, যার অর্থনীতি নিষেধাজ্ঞার কারণে ভেঙে পড়েছে? এটা বুঝতে পণ্ডিত হওয়ার দরকার নেই যে ইরান যদি এখনো পারমাণবিক অস্ত্র বানাতে চায় বা সমমনাদের দেওয়ার মতো এত টাকা তার থাকে, তাহলে সে আল-নুসরা, আইএস ও মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো গুপ্ত ইসলামপন্থীদের চেয়ে ইসরায়েল ও সুন্নি রাষ্ট্রগুলোর জন্য বড় হুমকি। আর এভাবেই কাতারের জনগণ এখন আল-নুসরা থেকে আল কায়েদার খুনিদের দূর করার প্রচারণায় আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিচ্ছে। হ্যাঁ, ষড়যন্ত্রতত্ত্বই বটে।
আবারও ভাবুন। কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খালেদ আল আতিয়াহ গত মাসে বলেছেন, ‘আমরা পরিষ্কারভাবেই যেকোনো সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু আইএস ছাড়া সবাই আসাদকে উৎখাতের চেষ্টা করছে।’ মধ্যপন্থীরা নুসরা ফ্রন্টকে বলতে পারে না, ‘আমরা তোমাদের সঙ্গে কাজ করব না। তোমাদের পরিস্থিতি বুঝতে হবে, বাস্তববাদী হতে হবে।’
অন্য কথায়, আল-নুসরার একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে আসাদ সরকারকে উৎখাত করা। ফলে তারা মধ্যপন্থীদের কাতারেই পড়ে, তাদের মতো সামরিক সহায়তাও পেতে পারে। যদি মধ্যপন্থীরা আল-নুসরাকে বলতে না পারে, ‘আমরা তোমাদের সঙ্গে কাজ করব না’, তাহলে মার্কিনরা করবে কীভাবে?
ফরাসি সরকারের কাছে পেশকৃত গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আইসিসের বিরুদ্ধে বিমান হামলার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। তারা আল-নুসরার অধিকৃত বিপজ্জনক স্থান ত্যাগ করেছে। গত মাসে যখন হাজার হাজার আইএস সেনা মূলত দিনের আলোয় পালমিরা আক্রমণ করে, তখন একটিও মার্কিন বিমান সিরিয়ার আকাশে দেখা যায়নি। আর এসবই ঘটেছে যখন মার্কিন সেনারা আইএসের বিরুদ্ধে পরিচালিত আক্রমণ শেষে ফিরছিল। তাদের বিমানে তখনো বোমা ছিল, কারণ তারা লক্ষ্যবস্তু খুঁজে পায়নি।
সিরিয়ায় ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধকে’ কেন্দ্র করে যে সতর্কসংকেত আকাশে-বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে, তা বোঝার জন্য আপনাকে প্রতিবেদক হতে হবে না। কারণ, কিছু কিছু সন্ত্রাসী শিগগিরই আমাদের সন্ত্রাসী হতে যাচ্ছে, যত দিন তারা একই সঙ্গে আরও ভয়ংকর সন্ত্রাসী ও আসাদের সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়ে। তাদের দরকার হচ্ছে আরও টাকা ও অস্ত্র। আমি বাজি ধরতে পারি, যুক্তরাষ্ট্রের বদৌলতে তারা সেটা পেয়ে যাবে। শুধু ষড়যন্ত্র শব্দটা উল্লেখ করলাম না।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন; যুক্তরাজ্যের দ্য ইনডিপেনডেন্ট থেকে নেওয়া
রবার্ট ফিস্ক: দ্য ইনডিপেনডেন্টের মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি।