Sunday, February 10, 2019

উইঘুর মুসলিমদের প্রতি সম্মান দেখাতে চীনের প্রতি তুরস্কের আহ্বান

চীনে উইঘুর মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নির্যাতনের কাহিনী নতুন নয়। এবার ওই সম্প্রদায়ের মানুষদের অধিকারেরর প্রতি সম্মান দেখাতে চীনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তুরস্ক। চীনের সংখ্যালঘু এ সম্প্রদায়ের সঙ্গে যে আচরণ করা হচ্ছে তাকে মানবতার জন্য বড় লজ্জা বলে আখ্যায়িত করেছে তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এপি।
এ বিষয়ে শনিবার একটি বিবৃতি দিয়েছেন তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হামি আকসয়। তিনি বলেছেন, বন্দি শিবিরে কমপক্ষে ১০ লাখ উইঘুর সম্প্রদায়ের মানুষকে খেয়ালখুশি মতো আটকে রেখেছে চীন। এটা আর কোনো গোপন কথা নয়।  তিনি আরো বলেছেন, চীনের পশ্চিমাঞ্চলে এ সম্প্রদায়ের ওপর যে পর্যায়ক্রমিক ‘অ্যাসিমিলেশন’ ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন তার উত্তাপ তুরস্কের মুসলিম জনগোষ্ঠীও পাচ্ছেন। হামি আকসয় আরো বলেন, সর্বক্ষেত্রে চীনের অবস্থান শেয়ার করে তুরস্ক।
তাই তারা কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানায়, ওই বন্দিশিবিরগুলো বন্ধ করে দিতে এবং মানবাধিকারের প্রতি সম্মান দেখাতে।
একবার তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়্যিপ এরদোগান চীনের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ এনেছিলেন। তার পর থেকেই তিনি চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন।
উল্লেখ্য, ২০০৯ সালের রক্তাক্ত দাঙ্গার পর উইঘুর সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে চীনের নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী দমনপীড়ন তীব্র থেকে তীব্র করেছে। ফলে অনেক উইঘুর পালিয়ে আশ্রয় নিচ্ছেন তুরস্কে।

গরুর দুধ ও দইয়ে কীটনাশক, অণুজীব ও সিসা!

গরুর তরল দুধে (প্রক্রিয়াজাতকরণ ছাড়া) সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি কীটনাশক ও নানা ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকের উপাদান পাওয়া গেছে। পাওয়া গেছে বিভিন্ন অণুজীবও। একই সঙ্গে প্যাকেটজাত গরুর দুধ, দুগ্ধজাত পণ্য এমনকি দইয়েও অ্যান্টিবায়োটিক ও সিসা পাওয়া গেছে মাত্রাতিরিক্ত। আজ (১০ ফেব্রুয়ারি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এসব তথ্য জানিয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরি (এনএফএসএল)। সংস্থাটি জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) আর্থিক সহায়তায় গরুর দুধ, প্যাকেটজাত দুধ, দই ও গো খাদ্য নিয়ে এই জরিপের কাজ করেছে। এনএফএসএল সূত্র জানায়, দেশের বিভিন্ন উপজেলা/থানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। গরুর দুধ সরাসরি খামার থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। একই সাথে উক্ত খামার থেকেই গবাদী পশুর খাবার সংগ্রহ করা হয়েছে। দই ঢাকা শহরের বিভিন্ন ব্র্যান্ড দোকান ও আশপাশের উপজেলার দোকান থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।
বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত তরল দুধ এবং আমদানি করা প্যাকেটজাত দুধও সংগ্রহ করা হয়েছে। এগুলো নির্দিষ্ট নিয়মে মেনে ল্যাবরেটরিতে পৌঁছানোর পর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে ।
গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফলে জানানো হয়, ৬৯-১০০ শতাংশ গোখাদ্যে বিভিন্ন রকমের রাসায়নিক- কীটনাশক (৯টি নমুনায়), সীসা (২২টি নমুনায়), ক্রোমিয়াম(১৬টি নমুনায়), টেট্রাসাইক্লিন(২২টি নমুনায়), এনরোফ্লোক্সাসিন (২৬টি নমুনায়), সিপ্রোসিন(৩০টি নমুনায়) এবং আফলাটক্সিন (১৯টি নমুনায়) গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি মাত্রা পাওয়া যায়।
গরুর দুধের ৯৬টি নমুনার মধ্যে ৯ শতাংশ দুধে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কীটনাশক, ১৩ শতাংশে টেট্রাসাইক্লিন, ১৫ শতাংশে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি মাত্রায় সিসা পাওয়া যায়। ৯৬ শতাংশ দুধে মেলে বিভিন্ন অণুজীব।
প্যাকেটজাত দুধের ৩১টি নমুনায় ৩০ শতাংশে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি হারে আছে টেট্রাসাইক্লিন। একটি নমুনায় সিসা মিলেছে। একই সঙ্গে ৬৬ থেকে ৮০ শতাংশ দুধের নমুনায় বিভিন্ন অণুজীব পাওয়া গেছে।
এছাড়া দইয়ের ৩৩টি নমুনা পরীক্ষা করে একটিতে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি সিসা পাওয়া গেছে। আর ৫১ শতাংশ নমুনায় মিলেছে বিভিন্ন অণুজীব।
গবেষকেরা বলছেন, যে সকল উপাদান পাওয়া গেছে তা মানুষের রোগ প্রতিরোধ শক্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাছাড়া সিসা ও ক্রোমিয়াম ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে।
আজ রাজধানীর জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এর মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. আবুল কালাম আজাদের সামনে ঢাকা মেডিকেল কলেজের বিভাগীয় প্রধান এবং এএফএসএ’র প্রধান অধ্যাপক ড. শাহনীলা ফেরদৌসী এই গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন।

বাংলাদেশি সাংবাদিকের দৃষ্টিতে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের চার দশক

মুজতাহিদ ফারুকী
ইরানে ইসলামি বিপ্লবের ৪০তম বার্ষিকী ১১ ফেব্রুয়ারি। আন্তর্জাতিক বিশ্বের সীমাহীন বৈরিতা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের দশকের পর দশক ধরে চলমান অবরোধের মধ্যেও অভূতপূর্ব প্রাণশক্তিতে ভরপুর ইরানি জাতি বিশ্বের অনেক দেশের চেয়ে দ্রুত ও দৃপ্ত গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে।
বৈশ্বিক মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনে তাদের অবস্থান এখন ১৮৯ দেশের মধ্যে ৬০ তম যা তুরস্ক, চীন ও ভারতেরও ওপরে। ইরানের ভৌগোলিক সীমার মধ্যেই শুধু নয়, তেহরানের প্রভাবের পরিধি বাড়ছে ইরাক-সিরিয়া-ইয়েমেন-লেবানন পর্যন্ত। দীর্ঘ চার দশক ধরে কঠিন অবরোধের মধ্যে থেকেও ইরান যে শুধু টিকে আছে তাই নয়, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে পূর্ণ শক্তিমত্তারও পরিচয় দিচ্ছে যা রীতিমত বিস্ময়কর।
বিপ্লবের আগে ইরানের জনমানসে প্রধান বৈরি দেশ ছিল যুক্তরাজ্য। মূলত যুক্তরাজ্যকে ইরানের তেলসম্পদ লুটে নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার প্রতিবাদেই শাহের বিরুদ্ধে ইরানি জনগণ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। সেই ক্ষোভ থেকে জন্ম নেয় এক অপ্রতিরোধ্য জাতীয়তাবাদী ও ইসলামি মূল্যবোধসঞ্জাত ধর্মীয় চেতনা। সেটাই পরে কোম শহরের ইসলামি নেতৃত্বের নিরলস চেষ্টায় সমগ্র জাতির মধ্যে এক বিশাল জাগরণ সৃষ্টি করে এবং সর্বব্যাপী বিপ্লব সংঘটনকে অবশ্যম্ভাবী করে তোলে।
ইমাম খোমেনী (রহ.)-এর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের সমাবেশ
বিপ্লব সফল হবার পর ১৯৭৯ থেকে ক্রমেই ইরানের প্রধান বৈরী দেশ হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্র। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সম্পূর্ণ একতরফাভাবে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে ইতিহাসের কঠোরতম অর্থনৈতিক অবরোধ কার্যকর করেছে। তেল বিক্রি, সমুদ্র-বাণিজ্য, ব্যাংকব্যবস্থা- সবই নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন। ইরানকে নতজানু করার জন্য গত ৪০ বছর ধরেই ওয়াশিংটন একর পর এক অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ইরান সে সময় যুক্তরাষ্ট্রকে ‘সবচেয়ে বড় শয়তান’ হিসাবে চিহ্ণিত করে। এখন ওই অভিধাটি ব্যবহার না করলেও দুই দেশের বৈরিতার মাত্রায় তেমন কোনও হেরফের হয়নি। তবে ইউরোপের প্রধান কয়েকটি দেশ জার্মানি, ব্রিটেন, রাশিয়া ও ফ্রান্স এখন ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধে শরিক না হয়ে দেশটির সঙ্গে কিছু কিছু অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক সম্পর্ক রক্ষা করছে। এভাবে ইরান কূটনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে কার্যত পেছনে ফেলে দিয়েছে।
ইরান তার ইসলামি বিপ্লব বিদেশে রপ্তানির কোনও চেষ্টা করেনি। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। এই প্রচেষ্টারই প্রতিফলন ইরাকে, সিরিয়ায়, লেবাননে এবং ইয়েমেনে ইরানি প্রভাবাধীন শক্তির একটি বলয় তৈরি হওয়া।
বর্তমান অন্যায্য বিশ্ব ব্যবস্থায় অব্যাহত নিপীড়নের হাত থেকে সারা বিশ্বের মুসলমানদের রক্ষার জন্য ইরান বিপ্লবের মহান নেতা ইমাম আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনী কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেন। তিনিই পবিত্র মাহে রমজানের শেষ শুক্রবার বা জুমাতুল বিদার দিনটিকে 'বিশ্ব কুদস দিবস' ঘোষণা করেন। ১৯৭৯ সাল থেকে বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোতে দিবসটি প্রতি বছর পালিত হয়ে আসছে। মুসলমানদের প্রথম কিবলা বায়তুল মুকাদ্দাস বা আল-কুদস আল শরিফকে (জেরুজালেম) ইহুদিদের দখল থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে তিনি এই ঘোষণা দেন। সেইসঙ্গে ফিলিস্তিনি জনগণের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে তাদের জন্য আল-কুদসকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর অংশীদার ফিলিস্তিনিদের ওপর ইহুদি শাসকগোষ্ঠীর অব্যাহত জুলুম-নিপীড়নের চির অবসান ঘটানোও ছিল তার লক্ষ্য।
ইমাম খোমেনীর আদর্শকে ধারণ করে ইরানি শিশুরা
ইমাম খোমেনী শুধু যে ফিলিস্তিনিদের কথা মাথায় রেখে এই দিবস পালনের আহবান জানান এমন নয়। বরং বিশ্বের যেখানেই মুসলমানরা এবং সাধারণ মানুষ ক্ষমতাধর সাম্রাজ্যবাদী ও জালিম শাসকদের হাতে নিপীড়িত, নির্যাতিত ও অন্যায়-অবিচারের শিকার হচ্ছে সেখানেই প্রতিরোধের আহবান জানান ইমাম খোমেনী। আল-কুদস দিবসের গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, “কুদস দিবস একটি বিশ্ব দিবস। দিবসটি কেবল কুদসের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। এই দিবস বলদর্পী শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে শোষিত-বঞ্চিত-নিপীড়িত জনতার দিবস। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশের জুলুম অত্যাচারে যেসব দেশ পিষ্ট হয়েছে তাদের রুখে দাঁড়ানোর দিবস। এই দিবস বলদর্পীদের বিরুদ্ধে নিগৃহীতদের সুসজ্জিত হবার দিবস।”
তাই আল-কুদস দিবস হলো শোষণ, বঞ্চনা, অন্যায়-অবিচার, নির্যাতন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবার এক প্রতীকী দিবস, বিশ্ব মানবতার পক্ষে, সত্য, ন্যায় ও মানবাধিকারের পক্ষে এক অনন্যসাধারণ মানবিক আহ্বান।
তবে তিনি ফিলিস্তিনিদের স্বার্থরক্ষা ও অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং আল-কুদস দিবস পালনের মধ্য দিয়ে বিশ্বের মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধভাবে জেগে ওঠার একটি মঞ্চ তৈরি করে দেন যা অন্য কোনও আরব বা ইসলামি বিশ্বের নেতা কখনও করেননি। এখানেই খোমেনীর কৃতীত্ব, তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব।
এসব কারণেই ফিলিস্তিন মুক্তি সংগ্রামের অব্যাহত গতিধারায় একটি নতুন আশার আলো হিসাবে বিবেচনা করা হয় ইরানের ইসলামি বিপ্লবকে। বর্তমান ফিলিস্তিনে আপোষকামিতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ফিলিস্তিনিদের সবচেয়ে জনপ্রিয় সংগঠন হামাসের নেতৃত্বের জেগে উঠেছে ফিলিস্তিনের অযুত মানুষ। আর দক্ষিণ লেবাননে বিপুল শক্তি অর্জন করেছে অকুতোভয় এক লড়াকু সংগঠন হিজবুল্লাহ। তাদের হাতে পর্যুদস্ত হয়ে ২০০৬ সালে ইসরাইলী সেনাবাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল।
বার্লিনে কুদস দিবসের সমাবেশ
অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল ২০০৮ থেকে এ পর্যন্ত হামাস শাসিত গাজা দখলের জন্য তিন তিনবার সর্বাত্মক যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়। কিন্তু হামাস কঠিন প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ফলে প্রতিবারই গাজার ব্যাপক মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হলেও ইসরাইল গাজা দখল ও হামাসের পতন ঘটাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। অন্যদিকে হিযবুল্লাহ্ অপরাজেয় হিসেবে পরিগণিত ইসরাইলের ওপর তিন তিনবার শোচনীয় পরাজয়ের গ্লানি চাপিয়ে দেয়। হামাস ও হিযবুল্লাহর এসব সাফল্যের পেছনে ইরানের সক্রিয় সহযোগিতা ও মদদ রয়েছে। ইরান যদি পাশ্চাত্য ও তাদের তাবেদার আরব দেশগুলোর সব বৈরিতার মোকাবিলা করে নিজস্ব শক্তিমত্তা নিয়ে বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকার যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারে তাহলে নির্যাতিত ইসলামি বিশ্বের জন্য সেটি হবে আল্লাহর প্রত্যক্ষ আশীর্বাদের মতো।
ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো ইরান বিপ্লবের অগ্নিগর্ভ দিনগুলিতে দু'বার তেহরান সফর করেন। ইরান বিপ্লব ও সেই সময়কার ইরান নিয়ে তিনি বেশ কিছু  নিবন্ধ লেখেন। তিনি পাশ্চাত্যের বেশিরভাগ পণ্ডিতের মতো ইরান বিপ্লবকে ‘মৌলবাদ’ বা ‘ইসলামি’ অভিধায় চিহ্নিত না করে বরং এটিকে বহমান ইতিহাসের এক সমসাময়িক অভিব্যক্তি হিসাবে হিসেবে দেখেছেন। বিপ্লবের নেতা ইমাম খোমেনীর ‘আধ্যাত্মিকতার রাজনীতি’র ভবিষ্যৎ নিয়ে ফুকো আশাবাদী ছিলেন। নতুন রাজনীতি ও সংস্কৃতির এই নতুন জোয়ার মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন পটপরিবর্তনের সূচনা করবে বলে তিনি বিশ্বাস করতেন। ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন ও লেবাননের বর্তমান পরিস্থিতি সম্ভবত তাঁর অনুমানের অভ্রান্ততার সাক্ষ্য দেয়। ফুকো বিশ্বব্যাপী পশ্চিমা আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে ইরান বিপ্লবকে প্রথম বড় ধরনের অভ্যুত্থান হিসেবে অভিহিত করেন।
ইরান বিপ্লব কেবল ইরানের সবচেয়ে বড় বিপ্লব এমন নয়, বরং এটি গোটা বিশ্বের ইতিহাসে সর্বকালের সবচেয়ে বড় বিপ্লব। কারণ এর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে ছিল ইরানি জাতির মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ মানুষ। ভাবলে বিস্মিত হতে হয় যে, বিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত ও গৌরবময় বিপ্লবের উদাহরণ হিসাবে চিহ্ণিত করা হয় যে ফরাসী বিপ্লবকে তাতে তৎকালীন ফরাসী জনগোষ্ঠীর মাত্র দুই শতাংশের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল।
ইরান বিপ্লব নিয়ে দেশে দেশে প্রচারমাধ্যমে নেতিবাচক প্রচারণা এই ৪০ বছরেও কিছুমাত্র কমেনি। এখনও পাশ্চাত্যের এবং আমাদের মতো দেশগুলোর পাশ্চাত্যপন্থি লেখক বুদ্ধিজীবীরা ইরান বিপ্লবকে নিছক মোল্লাতন্ত্রের উত্থান এবং একটি কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র হিসাবে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। মার্কিন অবরোধের কারণে ইরান কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং কীভাবে দেশটির শাসকগোষ্ঠীর সম্ভাব্য পতন ঘটতে পারে তা নিয়েও গবেষণার শেষ নেই। ইরানে নারী অধিকার, সংখ্যালঘু সুন্নী মুসলমানদের অধিকার এবং মানবাধিকার কতভাবে খর্ব করা হয়েছে কিংবা কোমভিত্তিক ইসলামি নেতৃত্বের সঙ্গে রাজধানীকেন্দ্রিক শিক্ষিত তরুণ সমাজের মানসিক দ্বন্দ্ব কীভাবে দেশটিতে সম্ভাব্য বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে তা নিয়েও কৌতুহলোদ্দীপক বিচার-বিশ্লেষণ হামেশা চলছে। কিন্তু তারা কোনও তল খুঁজে পাচ্ছে না।
পাশ্চাত্যের লেখক বুদ্ধিজীবীদের এই ব্যর্থতার পেছনের কারণ হলো তাদের সংস্কৃতি ও শিক্ষার মধ্যে বিশ্বাসের ঘাটতি। ইমাম খোমেনী তাঁর অনুসারীদের কাছে ইসলামি জাগরণের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পরিষ্কার একটি ধারণা দিতে সক্ষম হয়েছিলেন যা তাদের মনে বিশ্বাসের সুদৃঢ় শেকড় গেড়েছিল। সেই বিশ্বাসের অবসান হয়েছে এমন মনে করার কোনও কারণ নেই।
বিপ্লবের মূল মর্মবাণী ছিল, স্বাধীনতা, মুক্তি, ইসলামি প্রজাতন্ত্র। আয়াতুল্লাহ ইমাম খোমেনী দেখিয়ে গেছেন সেই সত্যের পথে যে বাধা বিপত্তি আছে তার সাথে লড়াই করে কিভাবে অটল অবিচল থাকতে হয়। ইতিহাস, বর্তমান ও ভবিষ্যতের বিবেচনায় ইসলামি জ্ঞান থেকে ইরানের ইসলামি বিপ্লব রসদ সংগ্রহের অন্যতম কৌশল শিখিয়েছে। তাই তাকে প্রকৃতি ও চারপাশ সম্পর্কে গভীর অনুধ্যান করতে এবং এর নিরিখে ইসলামের মর্মবাণী কী তা নিরূপণ করতে হয়।
ইসলাম একজন বিপ্লবীর জীবনের যেসব বাস্তব ও ব্যক্তিগত দিক রয়েছে তাকে উদ্ভাসিত করে তোলে। একজন অনুসারী তার ধর্মীয় নেতা বা ইসলামি শাসকের কাছ থেকে জীবন সংগ্রামের যেসব রসদ পায় তা তাকে এতটাই সমৃদ্ধ করে তোলে যে, কোনো আগ্রাসী শক্তিকেই সে ভয় পায় না। তার উপলব্ধি অটুট থাকে। কারণ, সে তার লক্ষ্যমাত্রা ও অর্জনের পথগুলো সম্পর্কে পরিষ্কার জ্ঞান অর্জন করে। এভাবেই এক ধরনের দৃঢ় আস্থা নিয়ে ইসলামি বিপ্লবের অনুসারীরা একের পর এক বাধা অতিক্রম করতে পেরেছে। যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া ইরাকের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, পরাশক্তিগুলোর অবরোধ কিংবা বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরানের মানুষ যে কঠিন মনোবল নিয়ে বছরের পর বছর লক্ষ্য অর্জনে ধাবিত হতে পেরেছে তার রহস্য নিহিত রয়েছে ওই বিশ্বাস ও আত্মিক সম্পর্কের মধ্যে।
ইরানে সম্পদের সামাজিক বণ্টনের একটি সুপ্রাচীন ব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে সম্পদের যোগান দেওয়ার এই ব্যবস্থা এখনও অব্যাহত আছে এবং তা আরও জোরালো হয়েছে। বিপ্লবের নেতারা ক্ষমতাকে নিজেদের সম্পদ অর্জনের বা ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার হাতিয়ার হিসাবে গ্রহণ করেননি। বরং নজীরবিহীন সততা ও নিষ্ঠার দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছেন রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রে। সমাজের স্বাভাবিক বিকাশ ও অগ্রগতির নিয়ামকগুলো তারা ধর্মের নামে রুদ্ধ করেননি যেমনটা করেছিল আফগানিস্তানের তালেবানি শাসকরা। বাইরের প্রচারণা সত্ত্বেও ইরানি সমাজে নারীর ভূমিকা অতীতের চেয়ে সংকুচিত তো নয়ই বরং আরও বিস্তৃত হয়েছে। দেশটির সাহিত্য, সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র, ক্রীড়া, ব্যবসা-বাণিজ্য এমনকি রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণের দিকে তাকালেই সেটি স্পষ্ট হয়।
সাফির রকেটের মাধ্যমে চতুর্থ কৃত্রিম উপগ্রহ মহাকাশে পাঠায় ইরান
ইরান বিপ্লবের পর ১৯৯০ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ইরানিদের গড় আয় বেড়েছিল ৬৮ শতাংশ। গড় আয়ু ৫৪ থেকে বেড়ে হয়েছে ৭৫ বছর। কঠোরতর অবরোধে পড়ে এসব অগ্রগতি হয়তো কিছুটা বাধাগ্রস্ত হবে। কিন্তু থমকে থেমে যাবে না। মনে রাখতে হবে মধ্যপ্রাচ্যের ইরানই হচ্ছে জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে সবচেয়ে অগ্রসর মুসলিম দেশ। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনেক পশ্চিমা দেশকেও ইরান এখন চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। কিছু পরিসংখ্যান তুলে ধরলে বিষয়টা বোঝা সহজ হবে।
ইরানি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া ২০১৬-১৭ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ওই বছর দেশটির রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে সাড়ে ১২ শতাংশ। তেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞার পরও প্রধানত পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য ও অন্যান্য সমগ্রী রপ্তানি থেকে এই প্রবৃদ্ধি অর্জন করে দেশটি।
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ইরান সম্প্রতি বিশ্বের শীর্ষস্থানটি দখল করে। ২০১৭ সালের হিসাবে এই ক্ষেত্রে শীর্ষে ছিল ইরান, দ্বিতীয় অবস্থানে রাশিয়া এবং তৃতীয় স্থানে ছিল চীন। শীর্ষ ২৫টি দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতায় ইরানের প্রবৃদ্ধি হয় ১৪ শতাংশ। দেশটির প্রযুক্তিভিত্তিক পণ্যের রপ্তানিও বেড়েছে বিপুল পরিমাণে। ২০১৫ সালে ইরান ৫০ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের বিজ্ঞানভিত্তিক পণ্যসামগ্রী রপ্তানি করে। বিখ্যাত তেহরান টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বে ন্যানো প্রযুক্তিতে দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি, জাপান ও ফ্রান্সের মতো দেশকে টপকে ৪র্থ শীর্ষস্থান দখল করেছে ইরান। এই খাতে ৮ হাজার ৭৯১টি আর্টিকেল প্রকাশ করে দেশটি এই অবস্থান অর্জন করে। এই তালিকায় চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত ছিল যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে।
বৈজ্ঞানিক উৎপাদনেও সম্প্রতি বিস্ময়কর অগ্রগতি অর্জন করেছে দেশটি। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে ইরানের অবস্থান এখন ১৬তম।
এতক্ষণ যেসব বিষয়ে বলা হলো তাতে মনে হতে পারে যে, অর্থনীতি সামাল দিতে হিমশিম খাওয়া ইরানের মোল্লাতান্ত্রিক(!) শাসকরা সম্ভবত সব ধরণের মননশীলতার চর্চা বন্ধ করে দিয়ে কেবল বৈষয়িক উন্নয়নের দিকেই মনোযোগী হয়েছে। কিন্তু বিশ্বের চলমান ঘটনাবলীর সামান্য খবরাখবরও যারা রাখেন তাদের অজানা নয় যে, সৃজনশীল সংস্কৃতির চর্চা সেখানে বন্ধ তো হয়ইনি বরং তা বিশ্বমানে উন্নীত হয়েছে। মাত্র আট কোটি মানুষের এই দেশটিতে এখনও বছরে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হয় প্রায় ২০০টি। প্রতিবছর জাতীয় চলচ্চিত্র উৎসব পালিত হয় এবং বিশ্বের সর্বত্র এ ধরণের উৎসবে অংশ নিয়ে পুরস্কার ছিনিয়ে আনেন ইরানি চলচ্চিত্র জগতের গুণী ব্যক্তিরা।
'দ্য সেলসম্যান' চলচ্চিত্রের পোস্টার
ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে বিগত বছরগুলোতে ইরানের চলচ্চিত্র শিল্প বিশ্বের দর্শক ও বোদ্ধাদের কাছে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশ্বের বেশিরভাগ চলচ্চিত্র নির্মাতা যখন বাণিজ্যিক উপাদানকে হাতিয়ার করে অতি সহজে দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন তখন ইরানের চলচ্চিত্র নির্মাতারা বেছে নিয়েছেন পেশাগত দক্ষতা ও শিল্পের নান্দনিক প্রকাশের দিকটি। তারা কাজে লাগাচ্ছেন সামাজিক, চারিত্রিক ও মানবিক মূল্যবোধগুলো যা দর্শকের কাছে ভিন্নতর মাত্রা যোগ করেছে। এ কারণেই বিশ্বব্যাপী আজ ইরানি চলচ্চিত্রের এমন জয়জয়কার। সেইসঙ্গে শক্তিশালী চিত্রনাট্য, অনন্য অভিনয় শৈলী, কলাকুশলির মনকাড়া আবেদন এবং বিশ্বমানের কারিগরি কৌশলের কারণে বিশ্বের সর্বত্র আজ ইরানি সিনেমা ব্যাপকভাবে দর্শক সমাদৃত।
আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত ও সম্মানজনক পুরস্কার অস্কার থেকে শুরু করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার ঘরে তুলে নিচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের এ দেশটি। দুই দু'বার সেরা পরিচালক হিসাবে অস্কার জিতেছেন ‘অ্যা সেপারেশন’ ও ‘দ্য সেলসম্যান’ ছবির পরিচালক আসগর ফারহাদি। এছাড়াও ইরানে অনেক মেধাবি চলচ্চিত্রকারের জন্ম হয়েছে যাদের হাত ধরে দেশটি ভবিষ্যতেও অস্কার জিতবে বলে বোদ্ধাদের ধারণা।
এভাবে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক প্রতিটি ক্ষেত্রে ইরান যে অগ্রগতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে তা মূলত ইসলামি বিপ্লবেরই সুফল। সম্পূর্ণ প্রতিকূল বিশ্ব-পরিস্থিতির মোকাবেলা করে এই অর্জন সত্যিই অভূতপূর্ব, অনন্য। বাংলাদেশের বর্তমান উন্নয়নের কাণ্ডারিদের জন্য এ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে।
লেখক: মুজতাহিদ ফারুকী, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, বাংলাদেশ।

মুসলিম নারীরা কেন হিজাব পরেন? by কেইতলিন কিলিয়ান

মাত্র ১১ বছর বয়সে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন নাজমা খান। কিন্তু মাথায় স্কার্ফ পরার কারণে নিউ ইয়র্কে তাকে অনেক বছর তিরস্কারের মুখে পড়তে হয়েছে। তাই ২০১৩ সালে তিনি বিশ্ব হিজাব দিবস পালন শুরু করেন। এ দিনটিতে মুসলিম ও অমুসলিম নারীরা মাথায় স্কার্ফ পরার রীতি চর্চা করেন। ১লা ফেব্রুয়ারি এ দিবসটি পালন করা হয় ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতি সংহতি ও সমর্থন প্রকাশের জন্য। নাজমা বলেছেন, একজন মুসলিম অভিবাসী হিসেবে আমি নারীদের তাদের পোশাক বেছে নেয়ার ক্ষেত্রে ধর্মীয় অধিকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছি। হিজাব তো শুধু ধর্মীয় কারণে নারীরা পরেন না। এর আরো কিছু কারণ আছে, যা সময়ের সঙ্গে, সামাজিকতার সঙ্গে পরিবর্তন হয়।
হিজাব পরা কি ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা?
এ বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো ঘোষণা পাওয়া যায় না। তবে পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থগুলোতে মহানবী হযরত মোহাম্মদ (স.) তার স্ত্রীদের বোরকা পরার রেফারেন্স ব্যবহার করেছেন। তবে বিজ্ঞজনরা স্পষ্ট করে বলেন নি এই বর্ণনা কি শুধু মহানবীর (স.) স্ত্রীদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নাকি সব মুসলিম নারীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অনেকের মতে, পুরুষদের যৌন লালসা থেকে নারীদের নিরাপদ রাখার একটি উপায় হলো এমন পোশাক পরা। ইতিহাসে, বিশ্বের বিভিন্ন অংশে, বিভিন্ন ধর্মে নারীদের মাথা ও শরীর ঢেকে রাখার এমন প্রচলন পাওয়া যায়।
তবে মাথায় স্কার্ফ পরার সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক আছে। বহু নারী, যারা এভাবে মাথা ঢেকে রাখেন তারা এ নিয়ে কথা বলেছেন। তারা মনে করেন, এর মধ্য দিয়ে নিজেকে সৃষ্টিকর্তার কাছে সঁপে দেয়া হয়।
ওদিকে ফরাসি ও বৃটিশ ঔপনিবেশিকরা মুসলিম নারীদের বোরকা পরিহার করে ইউরোপিয়ান নারীদের অনুকরণ করতে উৎসাহিত করেছে। পক্ষান্তরে উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রার্চের দেশগুলোতে জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছে বোরকা।
বর্তমানে অনেক নারী তাদের জাতিগত পরিচয়কে গর্বের সঙ্গে প্রকাশ করতে হিজাব পরিধান করেন। এমনটা বেশি ঘটে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীদের ক্ষেত্রে, যেখানে ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে ইসলামভীতি।
২০১৮ সালের বিশ্ব হিজাব দিবসে ফেসবুকে কলাম্বিয়া কলেজের শিক্ষার্থী তোকা বদরান লিখেছেন, আমি এই স্কার্ফ পরি। এর কারণ, যখন শিশু ছিলাম তখন সামাজিকভাবে বিব্রতকর অবস্থার শিকার হয়েছিলাম। লজ্জিত হয়েছিলাম। ধর্মীয় ও আমার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বিষয়ে আমাকে সচেতন করা হয়েছিল। আমাকে বলা হয়েছিল, মুসলিমরা সন্ত্রাসী হয়। মুসলিমরা সহিংসতা ও নিষ্পেষণকে অনুমোদন দেয়। তাই আমি যতক্ষণ আমার ঐতিহ্যের প্রতীক ধরে রাখবে ততক্ষণ আমাকে স্বাগত জানানো হবে নাÑ এমনটা আমি বুঝতে পেরেছিলাম। যুক্তরাষ্ট্রে আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মার্কিন মুসলিম নারীরা মাঝেমধ্যে হিজাব পরেন। এটা দিয়ে তারা বোঝাতে চান তাদের ধর্মীয় আনুগত্য। আফ্রিকান বংশোদ্ভূত সব মার্কিনিই যে খ্রিস্টান এমন একটি ধারণা প্রচলিত আছে। তারা এ পোশাক পরে সেই ধারণাকে দূরীভূত করতে চান। প্রকৃতপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে শতকরা ১৩ ভাগই হলেন মুসলিম।
আবার অনেকে ক্ষেত্রে বহু নারী তাদের সৌন্দর্য্যকে ঢেকে রাখার বিরোধিতা করে মাথায় স্কার্ফ পরেন। কারণ, তাদের সেই সৌন্দর্য্যকে প্রদর্শন করার দাবি রয়েছে। এমন নারীদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, পুরুষদের দাবির প্রেক্ষিতে এসব পোশাক সরিয়ে ফেলা সমান অধিকার নয়।
গবেষকদের মতে, যেসব নারী হিজাব পরে তারা মনে করেন নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের উচিত তাদের চেহারার ওপর গুরুত্ব না দিয়ে যোগ্যতা দেখা। তাই হিজাব হলো তাদের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টির একটি মাধ্যম। কিন্তু পশ্চিমা দেশে, যেসব নারী স্কার্ফ বা হিজাব পরেন তাদের কাজ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
শেষ পর্যন্ত, কিছু নারীর কাছে মাথায় স্কার্ফ পরা হলো স্বস্তিকর। কর্মক্ষেত্রে, রাস্তায় এবং প্রকাশ্য স্থানে বিব্রতকর মন্তব্যের শিকার হওয়া কমিয়ে দেয় এমন পোশাক।
(অনলাইন ইনকুইরার ডট নেটে প্রকাশিত লেখার অনুবাদ)

‘নূরজাহান’ : সময়কে ছাড়িয়ে যায় যে গল্প by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

সিলেটের মৌলভীবাজারের ছাতকছড়ায় একটি মেয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেছিল। সেই ‘অপরাধে’ তাকে শাস্তি দিয়ে ফতোয়া দিলেন গ্রামের মসজিদের ইমাম। মেয়েটিকে বুক পর্যন্ত মাটিতে পুঁতে পাথর ছোড়া হলো। পাথর তার মুখমণ্ডল ক্ষতবিক্ষত করে দিল, কিন্তু তার থেকে বেশি ক্ষতবিক্ষত করল তার আত্মসম্মানবোধকে, মানুষ হিসেবে তার পরিচিতিকে এবং সমাজ, মানুষ ও ধর্মের ওপর তার বিশ্বাসকে। এক বিশাল অবিশ্বাস এবং অপমানের ভার সহ্য করতে না পেরে মেয়েটি আত্মহত্যা করল।
আমাদের সকলের মতো ইমদাদুল হক মিলনের মনেও ঘটনাটি গভীর দাগ কাটল। মেয়েটির জন্য তাঁর গভীর মমতা হলো; যে ইমামের ফতোয়া মেয়েটিকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিল, তার প্রতি তাঁর ঘৃণা জাগল। কিন্তু মেয়েটিকে তাঁর সহানুভূতি, তাঁর ভালোবাসা যে জানাবেন, তার কোনো উপায় নেই। মসজিদের ওই ইমামকে তিনি হয়তো তাঁর ঘৃণার কথা জানাতে পারতেন, কিন্তু তাতে তার কোনো বিকার হতো, তার বিবেক আর অপরাধবোধ জাগত—তেমন সম্ভাবনা ছিল না। মিলন সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি একটি উপন্যাসে মেয়েটিকে আঁকবেন, পাঠকের মনে চিরকালের জন্য একটা জায়গা তাকে করে দেবেন। আর নিষ্ঠুর ইমামকে তিনি পাঠকের আদালতে হাজির করবেন দিনের পর দিন, তারা তাকে শাস্তি দেবে। আরো গুরুত্বপূর্ণ যা, আমাদের চারদিকে প্রচুর বিপন্নতা নিয়ে বেঁচে থাকা বাস্তব জীবনের এ রকম মেয়েগুলোকে পাঠকরা সুরক্ষা দেবে, বাস্তবের বিবেকহীন হন্তারকগুলোকে তারা প্রতিরোধ করবে। একটি উপন্যাসের অনেক শক্তি, অনেক দূর সে যেতে পারে। পাঠককে জাগাতে পারে। তাকে শুদ্ধ করতে পারে।
মিলন তাঁর লেখার শক্তিতে বিশ্বাসী, সে জন্য তাঁর লেখা পাঠককে স্পর্শ করে। যেমন তাঁর ‘পরাধীনতা’ আমাকে স্পর্শ করেছিল, এবং আমি স্পর্শিত হওয়ার কথাটা লিখে বর্ণনা করেছিলাম। তাঁর ‘নূরজাহান’ও আমাকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। অনেক দিন পর এ বইটি নিয়ে লিখছি, যদিও মিলনের অনেক উপন্যাস আমি পড়েছি, নানা মাত্রায় সেগুলোর অভিঘাত আমি উপলব্ধি করেছি; কিন্তু ‘নূরজাহান’ এগুলোর চেয়ে কিছুটা ভিন্ন, যার প্রধান কারণ এর এপিক বিস্তার। তবে উপন্যাসটির প্রায় ১১০০ পৃষ্ঠার কলেবর এই বিস্তার তৈরি করেনি, করেছে মিলনের কল্পনার বিশালতা—এক সামান্য গ্রামের অসামান্য এক জীবনচিত্রকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সচল রাখার তাঁর ক্ষমতা; এক বিশাল ক্যানভাসে অসংখ্য চরিত্রকে তাদের নিতান্ত ব্যক্তিগত আর সামষ্টিক জীবন নিয়ে হাজির করা, ছোট ছোট ঘটনা দিয়ে ক্ষুদ্র থেকে বৃহত্তের দিকে গল্পরেখাকে চালিয়ে নিয়ে যাওয়া আর মানুষের সঙ্গে প্রকৃতি আর ঋতুবদলের ভেতরের রসায়নগুলোকে সম্পৃক্ত করার তাঁর দক্ষতা। মিলন সংবেদী লেখক, তিনি একটা কোমল হাত রাখেন তাঁর অকিঞ্চিৎকর সব চরিত্রের পিঠে, তাদের আনন্দে হাসেন, তাদের দুঃখে কাঁদেন। কিন্তু তাঁর বর্ণনায় এর প্রকাশ্য ছায়াপাত ঘটাতে দেন না। তিনি অনেক ঘটনায় নিজেকেও বিনিয়োগ করেন, তাঁর পক্ষপাতিত্ব আমরা টের পাই, তাঁর ক্রোধ অথবা পুলক আমরা বুঝতে পারি, কিন্তু সেগুলো গল্পের একটা গভীরেই শুধু সক্রিয় হয়। গল্প বলায় তিনি একটা বস্তুনিষ্ঠতা মেনে চলেন। ফলে পাঠক একটি ঘটনার অনিবার্যতাকে যেমন বাস্তবের কার্যকারণ সূত্রে ফেলে মাপতে পারেন, তেমনি এর পেছনে লেখকের পক্ষগ্রহণের বিষয়টিও অনুধাবন করেন। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে, উদাহরণটি ‘নূরজাহান’ উপন্যাসের শেষ দিক থেকে নেওয়া (শুরুর থেকে উদাহরণ দিলে হয়তো যথাযথ হতো, কিন্তু শেষ দিকের উদাহরণটি এমনই প্রাসঙ্গিক আমার ওপরের বক্তব্যের সঙ্গে যে তা দেওয়ার লোভ সামলানো গেল না)।
নূরজাহানকে ফতোয়া দিয়ে দুজন শাগরেদ লাগিয়ে তাকে একটা গর্তে পুরে মসজিদ বানানোর খোয়া—সুরকি ছুড়ে মাওলানা মান্নান তার প্রতিহিংসা মেটাল। নূরজাহানের মুখ ও মাথা রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত হলো, সে একসময় টলতে টলতে উঠে বাড়ি গিয়ে অ্যানড্রিন খেল, এবং তার মারা যাওয়ার পর মেদিনীমণ্ডলের দৃশ্যপট বদলে গেল। পুলিশ এলো এবং মাওলানা মান্নানকে ধরে নিয়ে গেল কোমরে দড়ি দিয়ে, যে রকম দড়ি দিয়ে নিষ্পাপ মাকুন্দা কাশেমকে সে চোর সাজিয়ে গ্রাম থেকে বিদেয় করে তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল। কিন্তু পুলিশের এক কর্তা, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, এবার রাজাকার মাওলানাকে বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু পিছু পিছু তাড়া করে আসা বাদলা নাদের হামেদ আলালদ্দি বারেকের মতো কিশোর তরুণরা পাষণ্ড মাওলানাকে যখন ঢিল ছুড়ে মারছে, সে কিছুই বলল না। মাওলানার মুখে-মাথায় ঢিল পড়তে দিল। মিলন এরপর লেখেন, “আর কথা নাই। হালটের পাশ থেকে তুমুল ক্রোধে বৃষ্টির মতন চাকা পড়তে লাগলো মান্নান মাওলানার মুখে। হাত তুইলা, মুখ নিচা কইরা, চিৎকার চেঁচামেচি কইরা নানানভাবে পোলাপানের চাকার হাত থেকে নিজেরে রক্ষা করতে চাইলো, পারলো না।” এই বর্ণনা কি কোনো চরিত্র দিচ্ছে? না, দিচ্ছেন লেখক। কিন্তু তিনিই তো এর অনেক আগে মান্নান মাওলানা আর তার ছেলে আতাহারের অমানুষিক নির্যাতনের শিকার মাকুন্দা কাশেমের ভয়ার্ত আর্তনাদ এবং সেই আর্তনাদে তার শেষ হতে যাওয়া আয়ু কিছুক্ষণ ঠেকিয়ে রাখার নিষ্ফল চেষ্টার পর লিখেছিলেন, “মাকুন্দা কাশেমের বুকফাটা আর্তনাদে তখন স্তব্ধ হয়েছিল জেগে ওঠা মানুষ, ভেঙে খানখান হয়ে যাচ্ছিল শীতরাত্রির নিস্তব্ধতা।” এই ভাষিক পরিবর্তন কেন? কিশোর-তরুণদের হাতে মান্নান মাওলানার শাস্তি পাবার দৃশ্যে কেন তিনি চলে গেলেন তাঁর শৈশব-কৈশোরের মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুরের ভাষায়, ক্ষণিক ছুটি নিলেন সর্বজ্ঞ বর্ণনাকারীর অবস্থান থেকে, হয়ে গেলেন বাদলা নাদের হামেদদের একজন?
উদাহরণটি আমি দিয়েছি লেখকের পক্ষগ্রহণের প্রসঙ্গে। রাজনীতিতে যেমন শেষ বিচারে নিরপেক্ষতা বলে কেউ নেই—যিনি একটি নির্বাচনে ভোট দিতে যান না, তিনিও একটি পক্ষ নেন, হয়তো নির্বাচনের অসারতার বিপক্ষেই—লেখালেখিতেও নিরপেক্ষতা একটি আপেক্ষিক ব্যাপার মাত্র। যাঁরা সমাজ নিয়ে লেখেন, সমাজের অসংগতি-অবিচার আর স্খলন-পতন নিয়ে লেখেন, তাঁরা ক্ষমতার আর বিত্তের বিপরীতে থাকা মানুষগুলোরই পক্ষ নেন। এই পক্ষগ্রহণ বেশির ভাগই প্রচ্ছন্ন; প্রায়ই তার আয়োজন থাকে না, উত্তেজনাও থাকে না। মিলনও অনেক উপন্যাসে এই পক্ষপাত প্রচ্ছন্নই রাখেন, কিন্তু ‘পরাধীনতা’ ও ‘নূরজাহান’-এ এটি অনেকটাই স্পষ্ট। ‘পরাধীনতা’য় দুই পক্ষ ছিল, অথবা দুটি পক্ষের অনেক রূপ ছিলÑদেশ-বিদেশ, মুক্তি-অন্তরিনতা, বস্তুর নিগড়-কল্পনার উড়াল, যন্ত্র-মানুষ। ‘নূরজাহান’-এ মিলন নিজে আছেন, এবং তাঁর যে সত্তার আড়ালে বর্ণনাকারী তার গল্প বুনে যায়, নিঃশব্দে জাল বুনে যাওয়া কোনো মাকড়সার মতো, সে নিজেই তো রক্তাক্ত। রূঢ় বাস্তব, বাস্তবের কল্পনা আর কল্পনার বাস্তব এমন অনিবার্যভাবে মিলে যায় এই উপন্যাসে যে, কোনো ঘটনাকেই আর কল্পিত মনে হয় না।
‘নূরজাহান’-এর গল্প জীবন পায় মিলনের চেনা অন্তরঙ্গ ভ‚গোলে, তাঁর নিজের উঠানে। এই উঠানে তাঁর অধিকার ষোলো আনা। এর চরিত্ররা তাঁর চেনা, এর গাছপালা বিছিয়ে থাকে তার করতলে। এই উঠানে যখন কোনো অপচ্ছায়া পড়ে, একটি দুরন্ত কিশোরীকে বেঁধে ফেলে তার অপরিষ্কার শেকলে, তখন তিনিও জেগে ওঠেন। ‘নূরজাহান’ এ জন্য এত টানে আমাদের। আধুনিক সাহিত্যের তাত্ত্বিকরা বলবেন, ওই পক্ষগ্রহণ গল্পের জন্য ক্ষতিকর; উত্তরাধুনিক তত্তের প্রবক্তারা বলবেন, এতে কোনো দোষ নেই—বস্তুত গল্পকে তা মানবিক করে। মিলন উত্তরাধুনিক লেখক নন, কিন্তু তিনি গল্প বলার ঐতিহ্যকে ধারণ করেন। সেই ঐতিহ্যে পক্ষগ্রহণ একটা স্বাভাবিক ঘটনা। তবে বিষয়টা আরো গভীর—এবং তা হচ্ছে, পক্ষগ্রহণে গল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয় কি না!
মিলন দেখান, ক্ষতি নয়, তাতে লাভ হয়। একটা বিশাল ক্যানভাসের কাজ একটা জায়গা খুঁজে পায়। নূরজাহানের পুনজন্ম হয়, পাঠকের চেতনায়। পৃথিবীর সব মান্নান মাওলানা একজোট হয়েও তাকে আর মারতে পারে না।
‘নূরজাহান’-এর শেষ অংশটি আমার বিস্ময় জাগিয়েছে। মিলন যেভাবে ঋতু ধরে ধরে অগ্রসর হয়ে মেদিনীমণ্ডল গ্রামটির একটি চালচিত্র মেলে ধরেছেন, তাতে মান্নান মাওলানার চরিত্রটি অপ্রতিরোধ্য মনে হয়েছে। মাকুন্দা কাশেমকে পিটিয়ে মৃতপ্রায় করে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার পর তার অবস্থান আরো পোক্ত হয়েছে। এই উপন্যাসের খল চরিত্রগুলো প্রায় সবাই একটা অপ্রতিরোধ্য অবস্থানে চলে যায়। আতাহার, সড়কের কন্ট্রাক্টর আলী আমজাদ এবং আতাহারের সাঙ্গোপাঙ্গকে কেউ স্পর্শ করতে পারবে তেমন মনে হয় না। বাংলাদেশের বাস্তবতায় তাদের পরাজিত হওয়া তো দূরের কথা, তাদের কেউ বিপদে ফেলতে পারে, সে রকম ভাবারও কথা নয়। কিন্তু সবাই তারা হেরে যায়। মান্নান মাওলানার মুখে যেদিন নূরজাহান থুতু ছিটিয়ে দিল, সেদিন থেকেই তার সেই পরাজয়। ধূর্ত ও নিষ্ঠুর এই মাওলানা এরপর প্রতিশোধ নিতে নামল। তার পরিকল্পনা ধরে সে এগোল। দেলোয়ারার ভালোমানুষি এবং এনামুলের বদান্যতায় সে একটি মসজিদের ইমাম হলো। এর আগে সে নূরজাহানকে স্ত্রী হিসেবে অধিকারের চেষ্টা করে বিফল হলেও প্রতিশোধটা সে ঠিকই নিল। তার বিরুদ্ধে একটা ফতোয়া দিয়ে নিজেই বসল বিচারে। এইখানে এসে মিলনের জন্য দুটি পথ খোলা ছিল—তিনি বাস্তবকে মেনে নিয়ে মান্নান মাওলানাকে তার বিজয়মুহূর্তে ছেড়ে দিতে পারতেন, এবং নূরজাহানকে এক হতভাগ্য ও ট্র্যাজিক চরিত্র হিসেবে তার করুণ পরিণতির কাছে সমর্পণ করতে পারতেন, যা পাঠককে একসময় একটা দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে বলতে বাধ্য করত, “এ আর এমন কী, বাংলাদেশের নূরজাহানদের কপালে এই তো লেখা থাকে, আর বাংলাদেশের মান্নান মাওলানাদের এমনই তরক্কি হয়”; অথবা মান্নান মাওলানার পরাজয়টা দেখাতে পারতেন। তিনি দ্বিতীয় পথটা শুধু বেছে নেননি, এই পরাজয়কে একটা প্রতীকী মাত্রায় বাংলাদেশের জেগে ওঠা হিসেবেও দেখিয়েছেন। মাকুন্দা কাশেমের মৃত্যুর সময় জেগে ওঠা মানুষ স্তব্ধ হয়ে ছিল, মান্নান মাওলানার শাস্তি নিশ্চিত করার সময় জেগে থাকা মানুষ স্তব্ধতা ভেঙে সক্রিয় হয়েছে। সক্রিয় হয়েছে কিছু কিশোর—নতুন প্রজন্ম যারা, এক মুক্তিযোদ্ধার সন্তানও, তবে সবচেয়ে বড় কথা, সক্রিয় হয়েছে মানুষের বিবেক, এমনকি প্রকৃতিও। সত্য যে, এই শাস্তি দেওয়াটা একটা রূপকথার আদল দিয়েছে গল্পটাকে, কিন্তু এটি জেগে ওঠা মানুষের রূপকথা, মিলন যার রূপকার। ‘নূরজাহান’-এর শেষে এসে সরাসরি পক্ষ নিয়েছেন মিলন, কিন্তু এই পক্ষ নেওয়ায় গল্পের আড়ালে জেগে থাকা ইতিহাসটা স্বস্তি পেয়েছে, সত্য জেগে উঠেছে।
ছাতকছড়ায় যে নূরজাহান ছিল, সেও মরেছিল ফতোয়ার আঘাতে। মেদিনীমণ্ডলের নূরজাহানও। মিলন একবার পক্ষ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর পরিশ্রম করেছেন তাঁর অবস্থানটি সত্য, ন্যায় ও ধর্মের আলোকে উপস্থাপন করতে। এ জন্য ফতোয়াকে তিনি ইসলামের দৃষ্টি দিয়ে পড়েছেন। অসংখ্য বই পড়েছেন। রীতিমতো গবেষণা করেছেন—যেন তিনি উপন্যাস নয়, একটি অভিসন্দর্ভ লিখেছেন। কত অভিনিবেশ নিয়ে তিনি ইসলামের নীতি ও বাণীগুলো খুঁটিয়ে পড়েছেন, মহানবী (সা.)-এর জীবনী ও হাদিস পড়েছেন, ধর্মের ব্যাখ্যা এবং ইসলামে নারীর অধিকার বিষয়ে অনুসন্ধান করেছেন। ধর্মের প্রতি তিনি শ্রদ্ধাশীল, কারণ তিনি সেই লোকজ ঐতিহ্যে বেড়ে উঠেছেন, যা ধর্মের সত্যিকার সারটুকু গ্রহণ করে, এবং করে সমৃদ্ধ হয়। তাঁর এই উপন্যাসে মান্নান মাওলানার এক বিপরীত চরিত্র আছেন, মাওলানা মহিউদ্দিন, যিনি ইসলামের মূল্যবোধগুলো ধারণ করে এক শীতল ছায়া মেলে ধরেন প্রতিটি মানুষের মাথায়। মান্নান মাওলানা গ্রামের ছনু বুড়ি মারা গেলে তার জানাজা পড়াতে অস্বীকার করল, যেহেতু ছনু বুড়ি টুকটাক চুরি করে, যদিও পেটের দায়ে। মাওলানা মহিউদ্দিন তার জানাজা পড়ালেন, তার ছেলেকে সান্ত্বনা দিলেন। তাঁকে দেখলেই মন জুড়িয়ে যায়।
মাওলানা মহিউদ্দিনের চরিত্র কি তাহলে একটা ভারসাম্য রক্ষার প্রয়াস, এ কথা প্রমাণ করতে যে মান্নান মাওলানারা ব্যতিক্রম, মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেবরাই নিয়ম। না, এর কোনোটিই না। মিলন কোনো শ্রেণি নয়, মানুষ ধরে ধরে এগোন। তাঁর প্রতিটি মানুষই আলাদা। মাওলানা মহিউদ্দিন তেমনই এক মানুষ। প্রথমত তিনি মানুষ, ভালো মানুষ, যেমন দবির গাছি ভালো মানুষ, মরণি ভালো মানুষ, ফুলমতি ভালো মানুষ। তারপর তাঁর কিছু দায়িত্ব আছে, তিনি মসজিদের ইমাম। সেই দায়িত্ব তিনি সুচারুভাবে পালন করেন। দবিরও তার দায়িত্ব পালন করে, মরণিও। মানুষের অবস্থানেই এরা মর্মস্পর্শী।
একই কারণে মান্নান মাওলানার পরাজয়টা বাস্তবকে পাশ কাটিয়ে রূপকথার অঞ্চলে চলে গেলেও এক হিসাবে এই পরাজয়ের কারণটা তার মানুষ হিসেবে অকৃতকার্য হওয়ার জন্য। আতাহারও শক্তিশালী ছিল, কপট ও ভণ্ড ছিল; সে মদ খায়, বড় ভাইয়ের স্ত্রীকে শয্যাসঙ্গী করে সন্তানও উৎপাদন করে, এবং স্বার্থপরতার প্রয়োজনে বাবার কুকর্মকে সমর্থন করে। কিন্তু যেদিন তার মা তার মিথ্যাবাদিতার প্রমাণ পেয়ে (এবং একই সঙ্গে স্বামীর মিথ্যাবাদিতার নতুন কিস্তির সন্ধান পেয়ে) অবিশ্বাস ও ঘৃণা নিয়ে হৃদপিণ্ডের দুর্বলতায় মারা গেলেন, সেদিন আতাহারের মনুষ্যত্বের কিছুই আর অবশিষ্ট রইল না। মাওলানাবাড়ির বঞ্চনায় পোড়া অতৃপ্ত পারুকে অনেক দিন আতাহার তার অধিকারে রেখে যথেচ্ছ ব্যবহার করেছে তার সঙ্গে। কিন্তু বাবার বাড়ি ফেরত যাওয়া পারু তাকে পথ দেখিয়ে দিল। তার শত অনুনয়েও পারুর মন গলল না, বরং আতাহার ও তার বাবাকে ‘গুয়ের পোকা’ অভিধা দিয়ে তাকে তাড়িয়ে দিল। আতাহার কাঁদল, কপাল চাপড়াল, কিন্তু পারুর অবস্থানের উনিশ-বিশ হলো না। গুয়ের পোকাই বটে, মনুষ্যত্বের ছিটেফোঁটা না থাকলে এ রকমই তো হওয়ার কথা।
ঠিকই পরাজিত হলো আলী আমজাদও। উপন্যাসের শুরুতে সেও ছিল অপ্রতিরোধ্য। নূরজাহান তাকে চিনেছিল, কিন্তু কিশোরী নূরজাহান তখনো তার জগৎটাকে দেখছে মাওয়া সড়কের মতো এক বিস্ময় হিসেবে—যেন দূরের জগতের সঙ্গে এক বিস্ময়কর যোগাযোগ অপেক্ষা করছে তার জন্যও। আমজাদেরও কুদৃষ্টি পড়েছিল নূরজাহানের ওপর, কিন্তু ভাগ্য মেয়েটিকে বাঁচিয়ে দিয়েছে, তবে আমজাদের নিষ্ঠুরতার বলি হতে হয়েছে বদর ও হেকমতকে এবং এক দুর্ঘটনায় তারই সড়ক নির্মাণের শ্রমিকদের ফেলা মাটিতে চাপা পড়ে মারা যাওয়া মজনুর বাবা আদিলদ্দিকে। আদিল নামাজ পড়তে ঢালের দিকে বসেছিল। একসময় আমজাদের বাড়তে থাকা পাপ তাকে কাবু করেছে। সেও পরাজিত হয়েছে, নিজের লোভ ও ক্ষমতার নির্মমতার কাছে।
ইংরেজিতে যাকে ‘ক্যামিও’ বলে, সে রকম একঝলক দেখা দিয়ে হাওয়া হয়ে গেছে আরেক অমানুষ, রিকশাচালক রুস্তম। গ্রামের পাগলি মেয়ে তছিকে সে ফুসলিয়ে রিকশায় চড়িয়ে নিয়ে গেছে এক বাজারে মুরলিভাজা কিনে দেওয়ার জন্য। সেখানে সে ধর্ষণের চেষ্টা করেছে অরক্ষিত ওই মেয়েটিকে। কিন্তু তছি সাধারণ মানুষ নয়, তার অতিমানুষি কিছু শক্তি আছে, অমানুষ হতে থাকা একটি পাষণ্ডের জন্য যা ভয়ংকর। রুস্তম পরাজিত হয় তার লালসার কাছে, তছি হয় তার শাস্তির নিমিত্ত। তবে তছির জীবনও তারপর পাল্টে যায়। পাগল হোক যা-ই হোক, জীবনবিজ্ঞানের সূত্রগুলোর একটি-দুটি অন্তত সে বুঝতে পারে, বাস্তবের আইন আর অপরাধ-শাস্তির দু-এক ধারা সম্পর্কেও তার ধারণা আছে। তবে আমার শুরু থেকেই মনে হচ্ছিল, তছি পুলিশের হাতে পড়বে না। কারণ তছি পুলিশের চালাক পৃথিবী আর আইনের ছোট-লম্বা হাতের মাপের বাইরের এক অস্তিত্বের নাম।
অবাক, নানা বয়সের নারীরাই এই উপন্যাসের মনুষ্যত্বকে জাগায়, প্রখর করে, তার বিপন্নতাকে নিজেদের জীবনের বিনিময়েও রক্ষা করে। নূরজাহান যখন থুতু ফেলল মান্নান মাওলানার মুখে, সে তার নিজের মৃত্যু নিশ্চিত করে মনুষ্যত্বের জেগে ওঠাকে ত্বরান্বিত করল। সেই মনুষ্যত্ব আমরা দেখলাম বাদলা নাদের এবং অন্যান্য কিশোরের মধ্যে। তছি স্বাভাবিক মানুষ নয়, তবু সে ওই অসমাপ্ত মানুষিতা দিয়েও মনুষ্যত্বকে ওপরে নিয়ে গেল। আর পারুর নিজের জীবনে ছিল এত অসম্পূর্ণতা, অনেক স্খলনও। তার প্রতি সহানুভূতি দেখানোটাও একটু কঠিন। কিন্তু সেও এক অমানুষকে অরক্ষিত করে দিয়ে মনুষ্যত্বকেই জাগাল।
মনুষ্যত্ব ছিল মরণির, ফিরোজার, নূরজাহানের মা হামিদার, কিছুটা দেলোয়ারার, এমনকি মান্নান মাওলানার স্ত্রীরÑনিজের নিজের মতো মাপে। সন্দেহ নেই মিলনের নারী চরিত্রদের গভীরতা প্রচুর, তাদের মধ্যে বৈচিত্র্যও অনেক। কে ভেবেছে নূরজাহানকে দুদণ্ড শান্তি দিয়ে পালিয়ে যাওয়া রব্বানের প্রথম স্ত্রীও অনুশোচনা করবে নূরজাহানের জন্য, তার মনটা খারাপ হবে? বাস্তবের এই চরিত্রগুলোর হাত-পা এমনি বাঁধা, তারা প্রথা ও প্রচলের দাস হয়েই জীবন যাপন করে, পুত্রবধূ-শাশুড়ি সম্পর্কটা সমস্যাসংকুল, একান্নবর্তী বাড়িতে সংসারের জীবনটা তো আরো। আর এইসব সমস্যা ও অসুখ তৈরি করে পিতৃতান্ত্রিকতা। কিন্তু মিলনের কৃতিত্বটা এই—তাঁর নারীরা এসব সীমাবদ্ধতার ভেতর থেকেই একটা-দুটা মহিমার অবস্থানে চলে যায়, যাকে অন্যভাবে বললে মনুষ্যত্বের জেগে ওঠাও বলা যায়। ছনু বুড়ির পুত্রবধূ যে বানেছা—যার কাজ ছিল শাশুড়ির জীবনটা ভাজা ভাজা করা—একসময় সেও শাশুড়ির দুঃখে কাতর হয়, মেয়েকে বলে, শাশুড়ির সঙ্গে ভালো ব্যবহার না করে সে অপরাধ করেছে।
‘নূরজাহান’-কে ঘনিষ্ঠভাবে পড়লে এ বিষয়টি পরিষ্কার হয় যে, প্রথমত মিলন এটিকে একটি এপিকধর্মী ব্যাপ্তি দিতে চেষ্টা করেছেন। তিন খণ্ডে—এবং খণ্ডগুলোর মধ্যে সময়ের অনেক দূরত্ব—লিখলেও উপন্যাসটির ভেতর একটি ব্যাপক ঐক্য আছে, বিশালতা আছে। আমার মনে হয়েছে, এপিকধর্মী যেকোনো কাজের মতোই এ উপন্যাসটিকে তিনি একটি সুচারু চিন্তা, নীতিবোধ অথবা শ্রেয়বোধের একটি কাঠামোর ভেতর স্থাপন করতে চেষ্টা করেছেন। এ জন্য পাপ-নিষ্পাপতা, নীতি-নীতিহীনতা, পাশবিকতা-মনুষ্যত্ব, সংকীর্ণতা-উদারতার একটা ডায়ালেকটিক বা দ্বন্দ্বমানতা সক্রিয় থাকে পুরো উপন্যাসে। কিন্তু এই দ্বন্দ্বমানতা উপন্যাসটির কোনো সরল পাঠ উপহার দেয় না, যেহেতু এপিকধর্মী লেখার মতো এ উপন্যাসেও চরিত্রগুলো তাদের জীবনকে ছাপিয়ে ওঠে। পশ্চিমা এপিকধর্মী লেখায় সাধারণত ‘সাধারণ’—অর্থাৎ আটপৌরে, প্রান্তিক—মানুষজনের ভূমিকাটা থাকে সীমিত, কিন্তু মিলন এদেরকেই উপজীব্য করেন। এক এনামুল ছাড়া কেউই প্রচুর টাকা-পয়সার মালিক নয়। তবে এনামুলের টাকা থাকলেও আভিজাত্য নেই, সে কুলীন শ্রেণিতেও পড়ে না। মেদিনীমণ্ডলের সামান্য সামাজিক ভূগোলে স্থাপিত মানুষগুলো যখন জীবনকে ছাড়িয়ে বড় হতে থাকে, তখন বুঝতে হয় এর পেছনে আছে কল্পনার ব্যাপ্তি। প্রকাশের শক্তি আর গল্প-কাঠামোকে টান টান রেখে পাঠককে ধরে রাখার লেখকের দক্ষতা।
তবে এর বাইরে যা আছে, যা উপন্যাসটিকে গতিশীল, পরিব্যাপ্ত করে, বাবুই পাখির বাসার মতো এক আশ্চর্য কাঠামো নিয়ে আমাদের মনে জেগে থাকে, তা হচ্ছে এর পেছনে মিলনের বিনিয়োগ। মিলনকে অমনোযোগী লেখক কেউ বলবে না, যদিও তাঁর দু-একটি উপন্যাস পড়ে মনে হয়েছে নিজেকে যথেষ্ট সময় দেননি, যেটুকু যত্নবান তিনি ভাষার প্রতি, চরিত্র সৃষ্টির প্রতি, ততটা যত্নবান হননি। কিন্তু ‘নূরজাহান’-এ নিজেকে শতভাগ দিয়েছেন তিনি। আইরিশ কবি ডাব্লিউ বি ইয়েটস লিখেছিলেন, প্রতিটি লেখায় তিনি নিজেকেই পুনর্নির্মাণ করেন। ‘নূরজাহান’-এর ক্যানভাসজুড়ে আছে মিলনের সংবেদী সত্তা, কিন্তু এতে তিনি একটি গল্প শুধু নির্মাণ করেননি, করেছেন নিজের জানা পৃথিবীটাকেও, নতুন করে, এবং পুনর্নির্মাণ করেছেন নিজেকেও। উপন্যাসের শেষে ‘লেখকের বক্তব্য’ অংশে তিনি প্রকারান্তরে এটি স্বীকারও করে নিয়েছেন। নূরজাহান মেয়েটি তাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে, তৃতীয় খণ্ডে এসে তার হাত থেকে তাঁর মুক্তি পাওয়ার কথা, কিন্তু এর পরিবর্তে তিনি দেখতে পান, মেয়েটি তাঁর অস্তিত্বের অংশ হয়ে গেছে। এ এক অপূর্ব রাসায়নিক সংবদল। লেখক যখন চরিত্রকে এতটা অন্তস্থিত করেন, চরিত্র তাঁকেও বদলে দেয়। নূরজাহানকে মিলন দেখেন বাইরে থেকেও, তাঁর সচল ক্যামেরায় ধরা পড়ে তার অস্থির ছুটে চলা, তার নিষ্পাপ আনন্দ আর উচ্ছ্বাস। ভেতরের আর বাইরের নূরজাহানের যোগফল এক অসাধারণ চরিত্র সৃষ্টি করে, যার বড় একটা শখ হচ্ছে ছুটে বেড়ানো। সেই নূরজাহানই শেষ পর্যন্ত স্তব্ধ পড়ে থাকে, মানুষের আর অ্যানড্রিনের বিষে নীল, মিলন এ উপন্যাসে নিজেকে বিনিয়োগ করেছেন বলে এর বোধগুলো শুদ্ধ। বোধের প্রকাশগুলো শুদ্ধ। ভাষাটিও শুদ্ধ, মাটির কাছে। ‘নূরজাহান’-এর আগে একই উপন্যাসে কোনো বর্ণনাকারী তাঁর আখ্যানের জন্য একই সঙ্গে প্রমিত ও আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করেছেন, তেমন নজির আমার স্মৃতিতে নেই।
মিলন বিনিয়োগ করেছেন মেদিনীমণ্ডলের ভ‚গোলে, সমাজে, এর নিত্যদিনের জীবনে। ফলে যত ভূদৃশ্য তিনি বর্ণনা করেন, শীত-বসন্ত-বর্ষার পালাবদলের চিত্র আঁকেন, তার প্রধান পরিচয় হয় বিশ্বস্ততা। সামাজিক সম্পর্ক, আচার এবং প্রতিদিনের কাজকর্ম ও পেশার বর্ণনাতেও থাকে বস্তুনিষ্ঠতা। তবে সবচেয়ে যা টানে পাঠককে, তা অত্যন্ত সামান্য, সীমাবদ্ধ ও সাদামাটা জীবন নিয়েও চরিত্রগুলোর জীবন্ত হয়ে ওঠা। এক গ্রাম চরিত্র আছে উপন্যাসটিতে, এবং তারা সবাই খুব সাধারণ। দবির গাছি অথবা আজিজ গাওয়ালি, কুট্টি অথবা আলফু, রাবি অথবা মোতালেব—এদের কী দাবি আছে সাহিত্যের কাছে, জীবনের কাছে? ছায়ার মানুষ তারা—এ রকম এক শজন আমাদের ঘিরে রাখলেও কি তাদের চোখে পড়ে আমাদের? কিন্তু মিলন শুধু তাদের দেখেনইনি, তাদের স্থান দিয়েছেন সাহিত্যের শুদ্ধ কল্পনায়।
-------২-------
‘নূরজাহান’ যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে আমার কাছে, জয়নুলের বড়মাপের স্ক্রলচিত্রের মতো, তা শুধু এর ব্যাপ্তি নয়, এর গভীরতার জন্যও। ধরা যাক কুট্টি ও আলফুর কথা। দরিদ্র কাজের মেয়ে কুট্টি, কাজের লোক আলফু। তাদের চোখে পড়ারই কথা নয় কারো। কিন্তু তাদের প্রেম হয়, প্রেমটাও একটু জটিল, যেহেতু আলফুর স্ত্রী-সন্তান আছে। মিলন এই প্রেমের বর্ণনা দেন এক প্রসন্ন রোমান্টিকতায়, যেন তারা কত কুলীন মানুষ, যেন তাদের জীবনে কত সংস্কৃতি আর শিক্ষা আছে, শুদ্ধ ভাষা চর্চা আছে! অথচ কত সীমাবদ্ধ তারা, এই গ্রামের বাইরের জগৎটা কুট্টির হয়তো দেখা হয়নি। যখন এ রকম দুই মানুষের প্রেমকে বর্ণনায়-বিশ্লেষণে নিয়ে আসেন মিলন, তাতে একটা গভীরতা আসে, যে গভীরতা অনুভবের, অন্তর্দৃষ্টির। দ্বিতীয় একটি কারণ হচ্ছে ‘নূরজাহান’-এর কাহিনী, কাঠামো এবং দর্শনগত ঐক্য। শুনতে অবাক লাগার মতো হলেও বলা দরকার, উপন্যাসটির একটি দর্শন আছে, নান্দনিকতার উদ্ভাস আছে, এবং তা জীবনকে ঘিরেই। নূরজাহানের অপমৃত্যু হয়, কিন্তু মৃত্যুতে সে শেষ হয়ে যায় না, বলা যায় পাঠকের চেতনায় তার পুনর্জন্ম হয়। মেয়েটিকে ঘিরে উপন্যাস, তার জীবনের এক সকালবেলা থেকে এর শুরু, এক অকালসন্ধ্যায় তার শেষ। নূরজাহানের জীবনটা যে রকম চলতে চলতে বদলে যায়, তাকেই মিলন সাক্ষী মানেন, আমাদের বলেন, জীবনের স্থায়িত্ব নেই, সুন্দরের আছে, সত্যের আছে। আর যে জীবন সুন্দরের, সত্যের, তার স্থায়িত্ব মহাজীবনের।
নূরজাহানের জীবনের সৌন্দর্য ও সত্যগুলোকে উদ্ঘাটন করেছেন, বর্ণনা করেছেন, সাজিয়েছেন মিলন। এ জন্য নূরজাহান এ রকম এক মোহ-ধরানো চরিত্র পাঠকের জন্য। তার খুব কাছে আসতে পেরেছিল মজনু নামের ছেলেটি, যাকে মেয়েটি ভালোবেসেও ছিল। কিন্তু মজনুর শক্তি নেই কোনো কিছু করার, কোনো কিছু বদলে দেওয়ার। সে গ্রামে থাকে না, যদিও শহরে থাকার সময় গ্রামটা থাকে তার ভেতরে। মজনুর সঙ্গে যে নূরজাহানের সম্পর্ক হবে না, বিয়েও হবে না, সেটি মনোযোগী পাঠক বুঝতে পারেন। এই গ্রামে মজনু থাকবে না, তার পেশা ও ভবিষ্যৎ শহরে, নূরজাহানও গ্রাম ছেড়ে বাইরে যেতে পারবে না। টমাস হার্ডির কয়েকটি উপন্যাসের পটভ‚মি ইংল্যান্ডের ওয়েসেক্স অঞ্চল, যা চরিত্রদের ধরে রাখে নিয়তির মতো। ‘দ্য রিটার্ন অব দ্য নেটিভ’ উপন্যাসের ইউস্টাসিয়া ভাই নামের মেয়েটি পালাতে চায় এই জায়গা থেকে, যেখানে আশা বা ভবিষ্যৎ নেই। প্রেমিকের হাত ধরে পালায়ও সে। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারে না, ওয়েসেক্স অঞ্চলেই সে অঘোরে মারা পড়ে। মেদিনীমণ্ডলও নূরজাহানের নিয়তি, যে নিয়তির সুতা ধরে টান দেয় মান্নান মাওলানার মতো লোকেরা। হার্ডির মতো ট্র্যাজিক বোধ মিলন জাগান ‘নূরজাহান’-এ। দেখান সময়, স্থান আর ইতিহাস কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করে মানুষকে। নূরজাহান সংগ্রাম করে তার সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে, কিন্তু পরাজিত হয়। মাওয়া সড়কটি তাকে টানে, কিন্তু সেও হয়তো জানে, এই সড়কটি তার জন্য নয়। এই সড়ক গিলে নেয় ছেলের জন্য কাতর আদিলদ্দিকে। আদিলদ্দিরও পথ শেষ হয় মেদিনীমণ্ডলে। এবং, মান্নান মাওলানারও।
‘নূরজাহান’-এর এক বড় শক্তি এর আকর্ষণীয় দৈনন্দিনতা। মিলন একে বর্ণনা করেন অনেক দৃশ্য-শব্দ-গন্ধ-স্পর্শে; প্রতিদিনের গৃহস্থালি চর্চা থেকে নিয়ে টুকটাক আসবাবপত্র, খাদ্যসামগ্রী অথবা পেশার বিবরণে কোথাও আরোপিত কিছু নেই, কষ্টকল্পিত কিছু নেই। যেন কেউ নির্মোহ এক চলমান ক্যামেরায় ধরে রাখছে প্রতিদিনের জীবন। মিলন বর্ণনাও করেন খণ্ডে খণ্ডে। চার পৃষ্ঠা বানেছার গল্প তো তিন পৃষ্ঠা নিখিলের কথা। কিন্তু টুকরো টুকরো এসব গল্প এক অবাক মোজাইক শিল্পের মতো পাশাপাশি জোড়া লেগে তুলে ধরে একটি গ্রামের অসামান্য কিছু ছবি। একটি বা একজনের ঘটনা থেকে অন্য বা আরেকজনের ঘটনায় মিলন যান অনায়াস স্বাচ্ছন্দ্যে। একটা সুবিধা অবশ্য তিনি আদায় করে নেন তাঁর গতিশীলতার গুণে : কোথাও ছন্দপতন হয় না, কার্যকারণ সূত্রে ছেদ পড়ে না, যেন একটাই গল্প তিনি বলছেন, এক টানে।
মিলন না জানালে আমাদের কাছে এই রহস্যটা অজানা রয়ে যেত যে তিনটি খণ্ড তিনি সমাপ্ত করেছেন নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে। শেষ খণ্ডটি তিনি নিজেকে নিয়ে জোর করে লিখিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু ‘নূরজাহান’-এর কাহিনীরেখাটি এতটাই টান টান যে এই যুদ্ধের কোনো ছায়া সেখানে পড়ে না।
--------৩-------
মিলনকে দু-একবার বলেছি ‘নূরজাহান’ নিয়ে লিখব। কিন্তু লিখতে গিয়ে এতটা উত্তেজনা আর আনন্দ অনুভব করব, ভাবতে পারিনি। এটি সময়কে অতিক্রম করে যাওয়া একটি উপন্যাস, অথচ কী সাধারণ এর গল্প—প্রতিদিনের, অতিচেনা। এই চেনা গল্পটিই মিলন লিখেছেন এতটা দরদ, শক্তি আর অধিকার নিয়ে যে শেষ পর্যন্ত ঔপন্যাসিক অলডাস হাক্সলির কথাটাই উপন্যাসটি প্রমাণ করে ছাড়ে : জীবনে যা সাধারণ, তাকেই অসাধারণ করে তোলা সাহিত্যের কাজ। সব সাহিত্যিক তা পারেন না, কয়েকজন পারেন।
মিলন সেই কয়েকজনের একজন।
লেখক : শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক

উগেৎসু : যন্ত্রণাদগ্ধ মানুষের মহাকাব্য by জাহিদ সোহাগ

শুরুতে, ষোলো শতকের জাপানের একটি গ্রামের দৃশ্যাবলীর সঙ্গে প্রবেশ করি, জীর্ণ কুটিরের ছাদ দেখে, জেনজুরো-তোবেই দুই ভাই ও তাদের পরিবারের কাছে। যারা একই সঙ্গে কৃষক ও কুমাড়। রওনা হয়েছে ঠেলাগাড়িতে তাদের বানানো তৈজসপত্র শহরে বিক্রির উদ্দেশ্যে। বাতাসে যুদ্ধের বার্তা, বোমার শব্দ। স্ত্রীর নিষেধ থোড়াই করে দুই ভাই চলেতে থাকে। তোবেই যুদ্ধে যেতে চায়। যুদ্ধ অবসম্ভাবি পরিবর্তন আনবে। পটারি বিক্রি শেষে সে সৈন্যদলে যোগ দিতে গেলে তাকে আস্তাকুরের ভিখিরি বলে প্রত্যাখান করা হয়। কারণ তার নিজের বর্ম নেই, অস্ত্র নেই। নাছোড় তোবেই তবু আশা ছাড়ে না। অপর ভাই জেনজুরো স্ত্রীর জন্য পোশাক কিনে বাড়ি ফেরে।
‘উগেতসু’র শুরুতেই জানতে পেরেছি ১৬ শতকের সিভিল ওয়ারের কাল এটা। যুদ্ধ মানুষকে যা দেয়—ধর্ষণ, খুন, অনিশ্চয়তা, ভীতি, বীরত্ব-ভীরুতা এবং অন্তঃসারশূন্যতার সবগুলো দিক।
১৯৫৩ সালে নির্মিত কেনজি মিজোগুচি’র এই ছবিটি বাস্তব জগতের সঙ্গে রূপকথা ও ফ্যান্টাসির মিশ্রণ ঘটিয়ে নিরেট বাস্তবতাকে, যা আসলেই বাস্তব, তাকে, কল্পদৃশ্যের মধ্যে নিপতিত করেছে। যে কারণে দর্শক কোথাও না কোথায় নিজেকে কল্পনায় স্থাপিত করে নিতে পারে।
উগেতসুর প্রায় সব চরিত্রই, অন্তত যাদের ব্যাপ্তি আছে, তাদের পাপেটের মতো চলাফেরা করতে দেখি। তারা কোমর সোজা না করে ছোটাছুটি করে। নেপথ্য সংগীত বা বাদ্য তাদের হাড়ে-রক্তে বাজে, বা নিংড়ে নেয় সবটুকুই।
গ্রামে সৈন্য ঢুকে পড়ে। চলে লুঠতরাজ। নারী অপহরণ। নির্যাতন। গ্রামের মানুষ পালাচ্ছে যে যার মতোন। জেনজুরো-টোবেই পরিবার তাদের সঙ্গে জঙ্গলে লুকায়। যুদ্ধের গতিবিধি বুঝতে চেষ্টা করে।
কিন্তু তাদের আছে বেঁচে থাকার স্বপ্ন। তারা তৈজসপত্র নৌকায় বোঝাই করে রওনা হয়, লেক পাড়ি দিয়ে পৌঁছুবে শহরে, মাঝপথে কুয়াশার মধ্য দিয়ে আরেকটি নিরুদ্দেশ নৌকা ভেসে এলে দেখে আহত এক মাঝি, পানি চায়, পান শেষে মৃত্যু হলে ওই কুয়াশার ওপারে কী আছে তা বুঝতে বাকি থাকে না। আবার ফিরে আসে গ্রামে। গ্রাম শহর দুটোই অনিরাপদ।
টোবেই’র স্বপ্ন সে সামুরাই (প্রাক-শিল্প যুগের জাপানী যোদ্ধা) হতে চায়। তৈজসপত্র বিক্রির পয়সা দিয়ে বর্ম কেনে, যুদ্ধাস্ত্র কেনে। তবে তাকে সঙ্ঘবদ্ধ কোনো দলের সঙ্গে দেখা যায় না। ফাঁকতালে সে এক সৈন্যকে হত্যা করে তার কাছ থেকে প্রতিপক্ষ এক শীর্ষ ব্যক্তির কাটামুণ্ডু ছিনিয়ে নিয়ে বিজয়ী নেতৃত্বের কাছে অর্পন করে। মুহূর্তেই সে সেনানায়কে পরিণত হয়। ঘোড়া ও আরো সরাঞ্জম পেয়ে, সৈন্য সমেতে বের হয় শহরের পথে। যেভাবে জুলিয়াস সিজার শহরে প্রবেশ করলে মানুষের আনন্দধ্বনি চারপাশ গোলজার করে।
নারীদের আহ্বানে পথে এক বেশ্যালয়ে ঢুকে পড়ে তোবেই তার সৈন্যসমেতে। সে এখন মর্যাদাবান ব্যক্তি। কিন্তু পানাহারের মধ্যে স্ত্রীকে আবিষ্কার করে পয়সা না দিয়ে পালানো খদ্দের পাকরাও করা অবস্থায়। স্ত্রীর কুয়োয় ঝাঁপ দিতে উদ্যত হলে তারা পরস্পরের ভালোবাসার উত্তাপ স্পর্শ করলে বুঝতে পারে, যুদ্ধই এসবের কার্যকারণ। তারা সানন্দে গ্রামের পথে পা বাড়ায়। নদীতে ছুড়ে ফেলে সাধের বর্ম ও অস্ত্র। আবার নতুন করে বাঁচার আশা।
অপরদিকে, জেনজুরো, তোবেই যখন যায় বর্ম কিনতে তখন সে পতিত হয় এক কল্পরাজ্যে। তৈজস বিক্রির সময় এক সম্ভ্রান্ত নারী তার পরিচারিকা সহ শহরের বাজারে এসে তার প্রণয়মুগ্ধ হয়। যদিও জেনজুরো শুরুতে তা বুঝতে পারে না। তৈজস হাতে সে তাদের অনুসরণ করে গৃহে এসে বোঝে এক ফ্যান্টাসির জগতে সে হতে যাচ্ছে রতিরাজা। নিজে বেমালুম ভুলেও যায়, গোপনও রাখে স্ত্রী-সন্তানের কথা, যে স্ত্রীকে বুদ্ধ-মন্দিরে ফেলে সৈন্যরা ধর্ষণ করে শেষে কয়টি পয়সা ফেলে যায়।
অডিসিয়াস ট্রয়ের যুদ্ধ শেষে ইথাকায় ফেরার পথে সদলবলে এক কামুক দেবী ও তার লাস্যময়ীদের দ্বারা ছলনার শিকার হয়ে রতিরসে ভুলে যায়। যখন সম্বিত ফেরে তখন অনেকগুলো বছর পেরিয়ে যায়। ওদিকে ইথাকায় তার স্ত্রীকে অধিকার করতে সম্ভ্রান্তরা প্রতিযোগীতার লিপ্ত। 
জেনজুরো যুদ্ধের এই অনিশ্চয়তার সময় অডিসিয়াসের মতো পরিবারের কথা ভুলে সুরা ও সঙ্গে বিভোর। কিন্তু একদিন সে ধরা পরে, স্বীকার করে স্ত্রী-সন্তানের কথা। আবার লেডি ওয়াকাসার স্বামী যে কিনা, মারা গেছে বলে সংবাদ পেয়েছে, সেও শেষে ফিরে আসে।
জেনজুরো বাড়ি ফিরে দেখে স্ত্রী উনুনের কাছে, সন্তান ঘুমাচ্ছে। স্বাভাবিক আলাপ ও পানাহার শেষে সন্তানের পাশে ঘুমিয়ে পড়ে সে। যেনো যুদ্ধ তার স্ত্রী-সন্তানের গায়ে ফুলের টোকাটিও দেয়নি। কিন্তু তার ভ্রম কাটে যখন সকালে জানতে পারে তার স্ত্রী নিহত হয়েছে অনেক আগেই। গতরাতে স্ত্রী যেখানে বসে ছিল সেখানে সে হাত বাড়িয়ে বুঝতে চেষ্টাও করে আসলেই তার স্ত্রী আছে কিনা। তখন তার কবরের কাছে গিয়ে কাঁদা ছাড়া পথ থাকে না।
তোবেই যুদ্ধে অংশ নিয়ে স্ত্রীর কথা ভুলে গেছে। জেনজুরো সেই যুদ্ধের মধ্যেই স্ত্রী-সন্তানের কথা ভুলে এক অভিজাত নারীর অঙ্কশয্যায় বিভোর। কারো উদ্বেগ যেনো নেই। তাদের অন্তঃসারশূন্য মনোভূমি দেখতে পাই, বিশেষত জেনজুরোর।
পৃথিবীর যব যুদ্ধই নারীর উপর দিয়ে একই পরিণতি বয়ে আনে।
মিজোগুচি উগেতসুতে এমন সব মানুষের সাক্ষাৎ ঘটিয়েছে, তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ পায়ের উপর যন্ত্রণাদগ্ধ। শান্তি নেই। উপশম নেই কিছুতেই। সৈন্যদেরও দেখি শেষে খাবার ছিনিয়ে খেতে। অনাহারে শরীর সামলাতে না পেরে বারবার আছড়ে পড়তে। বিশেষত নারীর উপর যা যা প্রবাহিত হতে পারে, বিভীষিকাময়, সবিই দেখি।
এমনই, শেষ দৃশ্যে পুত্র জেনিসি ধোয়া ওঠা এক বাটি স্যুপ তার মা মিয়াগির কবরে রাখে। যেন সে বেঁচে আছে, বেঁচে থাকাদের মতো করে—ঋত্বিক ঘটকের তিতাস একটি নদীর নাম-এ অনন্ত যেমন নদীর পাড়ে ভাত ছিটায় কাকরূপে মা এসে খাবে বলে। সেই সান্ত্বনাটুকু কোথায়, মিয়াগির!

মিতু কারাগারে

রিমান্ড শেষে গতকাল ডা. তানজিলা হক চৌধুরী মিতুকে আদালতে নিয়ে যান মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। দাখিল করেন প্রতিবেদন। আদালত প্রতিবেদন   গ্রহণ এবং জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে মিতুকে কারাগারে প্রেরণ করেন।
মিতুর ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধন করেছেন চট্টগ্রামের বেসরকারি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (এএসটিসির) শিক্ষার্থীরা।
দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং ভবনের সামনের রাস্তায় বিভিন্ন স্লোগান সংবলিত ব্যানার নিয়ে মানববন্ধন করেন তারা।
এর আগে গত সোমবার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আল ইমরান খানের আদালত মিতুর তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। সাতকর্ম দিবসের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের আদেশ দেন।
এরপর চট্টগ্রাম মহানগরীর চান্দগাঁও থানায় বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত তিনদফা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় মিতুকে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চান্দগাঁও থানার এসআই আবদুল কাদের বলেন, শেষ দিনে এসে মিতু পরকীয়ার কথা স্বীকার করেন।
জানান, বিয়ের আগে কুমিল্লা মেডিকেলের ব্যাচমেট, এর আগে চুয়েটের এক শিক্ষার্থী এবং বিয়ের পরে ডা. মাহবুব আলম ও আমেরিকায় থাকা অবস্থায় ভারতীয় নাগরিক উত্তম প্যাটেলের সঙ্গে তার শারীরিক সম্পর্ক ছিল। যা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেন স্বামী ডা. মোস্তফা মোরশেদ আকাশ। যা জবানবন্দি হিসেবে রেকর্ড করা হয় বলে জানান এসআই আবদুল কাদের। 
এসআই আবদুল কাদের বলেন, গত ৩১শে জানুয়ারি ভোরে আত্মহত্যার আগে ডা. আকাশ তার নিজের ফেসবুক ওয়ালে স্ত্রী মিতুর পরকীয়া ও পরপুরুষের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক থাকার কথা ফাঁস করেন। এরপর ৩১শে জানুয়ারি দিনগত রাতে নগরীর নন্দনকানন এলাকায় তানজিলা হক চৌধুরী মিতুকে তার খালাতো ভাইয়ের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে সিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট।
এরপর ১লা ফেব্রুয়ারি বিকালে তানজিলা হক চৌধুরী মিতু (২৯), তার মা শামীম শেলী (৪৯), বাবা আনিসুল হক চৌধুরী (৫৫), বোন সানজিলা হক চৌধুরী আলিশা (২১), তানজিলা হক চৌধুরী মিতুর দুই ছেলে বন্ধু উত্তম প্যাটেল ও ডা. মাহবুবুল আলম (২৮)সহ ৩-৪ জন অজ্ঞাতকে আসামি করে চান্দগাঁও থানায় মামলা দায়ের করেন আকাশের মা জোবাইদা খানম। এরপর ২রা ফেব্রুয়ারি চান্দগাঁও থানা পুলিশ তানজিলা হক চৌধুরী মিতুকে সাতদিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করেন। আদালত ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ৭ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করার আদেশ দেন। কিন্তু তিনদিনের রিমান্ড শেষে গতকাল ৫ম দিনে রিমান্ডে দেয়া মিতুর জবানবন্দির রেকর্ডসহ আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন বলে জানান মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আবদুল কাদের।
তিনি বলেন, আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের সময় মিতুর জামিন চেয়ে আবেদন করেন আইনজীবীরা। কিন্তু আদালত জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে মিতুকে কারাগারে প্রেরণ করেন।   
মিতুর ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধন: চিকিৎসক মোস্তফা মোরশেদ আকাশের আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেয়ায় মিতুর ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধন করেছে বেসরকারি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (এএসটিসির) শিক্ষার্থীরা। গতকাল দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং ভবনের সামনের রাস্তায় বিভিন্ন স্লোগান সংবলিত ব্যানার নিয়ে মানববন্ধন করেন তারা।
শিক্ষার্থীরা ‘আকাশ ভাইয়ের হত্যাকারী মিতুর ফাঁসি চাই, আকাশ ভাইয়ের ভালোবাসা পরাজিত হয়নি প্রতারিত হয়েছে, ভালো থেকো আমার ভালোবাসা তোমার প্রেমিকদের নিয়ে ‘ঔঁংঃরপব ঋড়ৎ অশধংয্থ ইত্যাদি লেখা সংবলিত ব্যানার হাতে বিচার চেয়ে স্লোগান দিতে থাকেন।
মানববন্ধনে অংশ নেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী তানজিনা বলেন, একটি মানুষ যে তার সর্বস্ব উজাড় করে দিয়ে স্ত্রীকে ভালোবাসতে পারে ডা. আকাশ তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কিন্তু মিতু প্রতিনিয়ত মানুষটিকে ঠকিয়েছে। একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে তিলে তিলে ডা. আকাশকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। সর্বশেষ তাকে আত্মহত্যা করতে অনেকটা বাধ্য করেছে।
আশফাক উদ্দিন নামে একজন বলেন, আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীরা একজন তরুণ মেধাবী চিকিৎসকের আত্মহত্যার প্ররোচনাকারী মিতুর ফাঁসির দাবিতে রাস্তায় নেমেছি। এই ঘটনায় জড়িত মিতু গ্রেপ্তার হলেও অন্য আসামিরা এখনো গ্রেপ্তার হয়নি। আমরা চাই অভিযুক্ত প্রতিটি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক।

থাই প্রিন্সেসকে নিয়ে কেন এত বিতর্ক

প্রিন্সেস উবোলরাতানা রাজাকানিয়া সিরিভাধানা বারনাভাদিকে (৬৭) ঘিরে থাইল্যান্ডে ঝড়ো বিতর্ক। তিনি দেশটিতে আগামী ২৪ শে মার্চ অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিয়েছেন। এমন ঘোষণা যেকোনো নাগরিকই দিতে পারেন। তাতে বিতর্কের কি আছে? তবে বিতর্ক আছে প্রিন্সেস উবোলরাতানা রাজাকানিয়াকে কেন্দ্র করে। কারণ, তিনি বর্তমান রাজার বড় বোন। তার ওপর তিনি দেশে ক্ষমতাচ্যুত ও নির্বাসনে থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার ভক্ত। থাকসিন সিনাওয়াত্রা বা তার বোন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রাকে নিয়ে থাইল্যান্ডের রাজনীতিতে আছে তীব্র আলোচনা, সমালোচনা। থাইল্যান্ডে রাজাকে দেখা হয় সর্বোচ্চ সম্মানের আসনে।
তার বোন হয়ে এবং একজন নির্বাসিত প্রধানমন্ত্রীর অনুরক্ত হিসেবে প্রিন্সেস উবোলরাতানা রাজাকানিয়ার প্রধানমন্ত্রী পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণায় তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। এখন সর্বশেষ এ বিষয়ে রাজার হস্তপক্ষেপ চাওয়া হয়েছে। তিনি যেন প্রিন্সেস উবোলরাতানা রাজাকানিয়ার প্রার্থিতা আটকে দেন এমন আবেদন করা হয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন স্টার।
থাই রাকসা চার্ট পার্টি থেকে ওই নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন প্রিন্সেস উবোলরাতানা রাজাকানিয়া। এখন ওই দলটিই বলছে, তারা রাজার সিদ্ধান্ত মেনে চলবে। একদিন আগে তারা প্রিন্সেস উবোলরাতানা রাজাকানিয়াকে তাদের দল থেকে প্রধানমন্ত্রী পদে প্রার্থী হিসেবে সামনে নিয়ে এসেছিলেন। আর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টির পর তারাই নাটকীয়ভাবে সিদ্ধান্ত পাল্টে ফেলেছে। তারা বলছে, তাদের দল রাজা ও রাজপরিবারের সব সদস্যের প্রতি অনুগত। তাদের যেকোন রাজকীয় কমান্ড তারা মেনে চলবে।
প্রিন্সেস উবোলরাতানা রাজাকানিয়া এর আগে সবাইকে বিস্মিত করে দিয়ে ঘোষণা দেন যে, তিনি প্রধানমন্ত্রী পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। শনিবার দেয়া এমন ঘোষণায় তিনি তার সব সমর্থককে ধন্যবাদ জানান। বলেন, থাইল্যান্ডকে তিনি সামনে এগিয়ে নিতে চান। কিন্তু এ ঘোষণার পর পরই দ্রুততার সঙ্গে তার ভাই, থাইল্যান্ডের রাজা তার এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। স্টার অনলাইন লিখেছে, শনিবার প্রথম ঘোষণা দেন প্রিন্সেস উবোলরাতানা রাজাকানিয়া। তিনি বলেন, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার প্রতি অনুগত রাজনৈতিক দল থাই রাকসা পার্টি থেকে প্রধানমন্ত্রী পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন তিনি। এতে পুরো দেশ বিস্মিত হয়ে যায়। কারণ, তার এই রাজনীতিতে প্রবেশের সিদ্ধান্ত সেদেশের রাজতন্ত্রের রীতির ভঙ্গ। এমন ঘটনায় তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিরোধিতা করেন ছোটভাই ও দেশের রাজা মাহা ভাজিরালংকর্ণ (৬৬)। এর ফলে ধরে নেয়া হয় যে, প্রিন্সেস উবোলরাতানা রাজাকানিয়া যদি মনোনয়নপত্র জমা দেন তাহলে নির্বাচন কমিশন থেকে তা অযোগ্য ঘোষণা করা হতে পারে।
এ অবস্থায় শনিবার পরিকল্পিত দলীয় প্রচারণা বাতিল করে প্রিন্সেস উবোলরাতানা রাজাকানিয়াকে মনোনয়ন দেয়া থাই রাকসা চার্ট দল। তবে রাজার মন্তব্যের বিষয়ে কোনো কথা বলেন নি ওই দলের কোনো নেতা। শুক্রবার দিনশেষে রাজা ভাজিরালংকর্ন একটি বিবৃতি দেন। তাতে তিনি তার বড়বোন প্রিন্সেস উবোলরাতানা রাজাকানিয়ার প্রার্থিতাকে অসঙ্গত বলে বর্ণনা করেন। এতে আরো বলা হয়, রাজপরিবারের সদস্যদের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়া সংবিধানের স্পিরিটের বিরোধী।
যদিও একজন প্রার্থীর প্রার্থিতার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনই শেষ কথা বলে, তবুও রাজার মতো শক্তিধর প্রভাবশালী ব্যক্তির মন্তব্যকে এ কমিশনের কোনো সদস্য অবজ্ঞা করবেন এমনটা ঘটবে না বলেই মনে হয়।
শনিবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইন্সটাগ্রামে একটি পোস্ট দিয়েছেন প্রিন্সেস উবোলরাতানা রাজাকানিয়া। তাতে তিনি তার ভাইকে সরাসরি উল্লেখ করেন নি। উল্লেখ করেন নি রাজনৈতিক প্রত্যাশার বিষয়ে। তবে তিনি তার সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তাদেরকে বিগত দিনে একের প্রতি অন্যের ভালবাসা ও মমতার উল্লেখ করেন। তাদের সমর্থনের জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
শুক্রবার ছিল সেখানে দলগুলোর প্রার্থিতা ঘোষণার সর্বশেষ দিন। যদি মার্চের জাতীয় নির্বাচনে তার প্রার্থিতা টেকে তাহলে প্রিন্সেস উবোলরাতানা রাজাকানিয়ার প্রধান প্রতিপক্ষ হবেন প্রধানমন্ত্রী ও সাবেক সেনাপ্রধান প্রায়ুথ চান-ওচা। তিনি শুক্রবার তার প্রার্থিতা ঘোষণা করেছেন। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বার্তা সংস্থা রয়টার্স যোগাযোগ করে শুক্রবার রাতে। কিন্তু কমিশন এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানায়। একজন কর্মকর্তা বলেছেন, নির্বাচন কমিশনের সদস্যরা সোমবার একটি বৈঠকে বসবেন।
১৯৩২ সাল থেকে থাইল্যান্ড একটি রাজতন্ত্র শাসিত সংবিধানের অধীনে চলছে। এখানে রাজ পরিবারের রয়েছে বিরাট রকমের প্রভাব।

খালেদা জিয়া: রাজনৈতিক যত সফলতা এবং ভুল -বিবিসি বাংলা

১৯৮১ সালের মে মাসে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা এবং রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে যখন হত্যা করা হয়, খালেদা জিয়া তখন নিতান্তই একজন গৃহবধূ। রাজনীতি নিয়ে চিন্তাধারা তো দূরের কথা, রাজনৈতিক কোন অনুষ্ঠানেও তাকে খুব একটা দেখা যেতো না।
প্রেসিডেন্ট জিয়ার মৃত্যুর পর বিচারপতি আব্দুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

এক পর্যায়ে মি. সাত্তারকে অপসারণ করে ক্ষমতা দখল করেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ।
একদিকে দলীয় কোন্দল, অন্যদিকে বিএনপির অনেক নেতার এরশাদের মন্ত্রিসভায় যোগদান - এই দুই পরিস্থিতিতে বিএনপি তখন অনেকটা ছত্রভঙ্গ, বিপর্যস্ত এবং দিশেহারা।
দল টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনে তৎকালীন বিএনপির সিনিয়র কিছু নেতার পরামর্শ এবং অনুরোধে ১৯৮২ সালের জানুয়ারি মাসে রাজনীতিতে আসেন খালেদা জিয়া।
বিএনপি নিয়ে গবেষণাধর্মী বই লিখেছেন মহিউদ্দিন আহমদ - তাঁর মতে, সেই সময় থেকেই খালেদা জিয়া হয়ে উঠেন বিএনপির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান ক্ষমতার বলয়ের ভেতরে থেকে দল তৈরি করেছেন। কিন্তু পরবর্তীতে খালেদা জিয়া সে দলকে রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে নেন।
মি. আহমদ বলেন, "সেভাবে এটি রাজনৈতিক দল ছিল না, যেভাবে রাজনৈতিক দল তৈরি হয় আমাদের দেশে। বিএনপির রাজনৈতিক দল হিসেবে গড়ে উঠা এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে। আজকে আমরা যে বিএনপি দেখি, যদিও সেটার আইকন জিয়াউর রহমান কিন্তু দলটাকে এ পর্যায়ে এনেছেন খালেদা জিয়া।"
সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনের সময় রাস্তায় বেশ সক্রিয় ছিলেন খালেদা জিয়া।
ওই আন্দোলন দেশব্যাপী তাঁর ব্যাপক পরিচিতিও গড়ে তুলেছিল।
জেনারেল এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তাতে বিএনপি জয়লাভ করে। রাজনীতিতে আসার ১০ বছরের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী হলেন খালেদা জিয়া।

এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনের সময় তাঁকে কয়েকবার আটক করা হলেও আন্দোলন থেকে সরে যাননি বিএনপি চেয়ারপারসন।
ওই সময় খালেদা জিয়াকে বেশ কাছ থেকে দেখেছেন বিএনপির বর্তমান ভাইস-চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান।
"তিনি সবসময় যেটা বলতেন সেটা করতেন ... কখনো ওনাকে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়তে দেখিনি," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন সেলিমা রহমান।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক 'সফলতা এবং ভুলগুলো'
১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি বিএনপির অধীনে একটি বিতর্কিত নির্বাচনে জয়ী হয়ে খুব অল্প সময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ঘটনা বাদ দিলে খালেদা জিয়া পূর্ণ মেয়াদে সরকার পরিচালনা করেছেন দুই বার।
প্রথমবার যখন প্রধানমন্ত্রী হন, তখন দেশ পরিচালনায় তিনি ছিলেন একেবারেই অনভিজ্ঞ।
এমনকি সংসদেও তিনি ছিলেন নতুন। কিন্তু জীবনের প্রথম নির্বাচনেই খালেদা জিয়া পাঁচটি আসন থেকে লড়ে পাঁচটিতেই জয়লাভ করেন।
তাঁর রাজনৈতিক জীবনে যতগুলো নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, তার কোনটিতেই পরাজিত হননি তিনি।
খালেদা জিয়ার শাসন আমল, ১৯৯১-৯৬ এবং ২০০১-২০০৬ -- এই দুইভাগে ভাগ করেন অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক।
আমেরিকার পাবলিক ইউনিভার্সিটি সিস্টেমের শিক্ষক ড. সাঈদ ইফতেখার আহমেদ বলেন, খালেদা জিয়ার প্রথম শাসনামলে দুর্নীতি তেমন একটা বিস্তার লাভ করেনি। এছাড়া, ওই সময় তিনি নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মি. আহমেদ বলেন, "বাংলাদেশ হচ্ছে অত্যন্ত রক্ষণশীল একটি রাষ্ট্র। সেই রক্ষণশীল রাষ্ট্রে তিনি প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। নারীদেরকে ঘিরে যে কিছু প্রচলিত সংস্কার ছিল, সে সংস্কারের ব্যারিয়ারগুলো উনি ভেঙ্গে ফেলেছেন। বাংলাদেশের নারীর অগ্রযাত্রায় ওনার একটা বড় ভূমিকা রয়েছে বলে আমার সবসময় মনে হয়।"
কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতাসীন হবার পর প্রগতিশীল ধারা থেকে দলটি সরে আসে বলে তিনি মনে করেন।
"ওনাকে যেন ক্রমশই আপস করতে দেখা গেছে ধর্ম-ভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে। মৌলবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে অতিমাত্রায় যোগাযোগ এবং আপোষের ফলে আন্তর্জাতিক যে মহল - প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্য - এ দুই জায়গা থেকে তিনি নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন," বলছিলেন মি. আহমেদ।
২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে বিএনপি দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নির্বাচনে জয়লাভ করেছিল এবং নির্বাচনের পর জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামীকে সঙ্গে নিয়েই সরকার গঠন করে।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির শাসনামলে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে , যেগুলো খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে অনেকের ধারণা।
বিএনপি ক্ষমতায় থাকলেও দলের ভেতরে নানা টানাপড়েন স্পষ্ট হয়ে উঠে।
সম্প্রতি খালেদা জিয়ার জীবন কাহিনী নিয়ে বই প্রকাশ করেছেন সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ। তিনি মনে করেন, গণতন্ত্রের প্রতি খালেদা জিয়ার অবিচল আস্থা ছিল এবং রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে তাঁর ক্যারিশমা রয়েছে।
কিন্তু খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের ভুলগুলো কী? - এমন প্রশ্নে মাহফুজ উল্লাহ বলেন, ১৯৯৬ সালে যখন আওয়ামী লীগ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি তুলেছিল তখন খালেদা জিয়ার উচিত ছিল সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে আগাম নির্বাচন দেয়া।

এতে করে বিএনপি আরো বেশি জনপ্রিয়তা নিয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসতো বলে তিনি মনে করেন।
মাহফুজ উল্লাহর দৃষ্টিতে ২০০১-২০০৬ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়ার সরকারের কিছু দুর্বলতা ছিল।
তিনি বলেন, "এই সময়টিতে কিছু কিছু দুষ্টু লোক শাসন পদ্ধতিতে ঢুকে কিছু কিছু কাজকর্ম করেছে যেটার দায় গিয়ে তাঁর ওপর পড়েছে। বিষয়টা তাই হয়। সে সময় যদি তিনি সরকারকে সুশাসনের পথে আরো আনতে পারতেন দৃঢ়তার সঙ্গে, তাহলে পরবর্তী পর্যায়ে যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, সেগুলো ঐভাবে ঘটতো না।"
অন্য অনেক রাজনীতিবিদের মতো খালেদা জিয়ার সফলতা বা অবদান যেমন রয়েছে, তেমনি তিনি বিতর্ক বা ভুলের ঊর্ধ্বে নন বলে মনে করেন অনেক পর্যবেক্ষক।
তবে এমন কিছু ভুল তিনি করেছিলেন যেগুলোর মাশুল তাঁর দল বিএনপি এখনও দিচ্ছে অনেকের ধারণা।
তবে খালেদা জিয়ার সবচেয়ে বড় ভুলগুলো, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যেও মতভেদ আছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তারেক রহমানকে অতি দ্রুততার সাথে দলের শীর্ষ পর্যায়ে নিয়ে আসা এবং ২১শে অগাস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার বিষয়টি বিএনপির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় দলের সিনিয়র অনেক নেতার সাথে খালেদা জিয়ার দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। তারই একটি ফলাফল হিসেবে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে।
ক্ষমতার মেয়াদের একেবারে শেষের দিকে দল ছেড়ে গিয়েছিলেন অলি আহমদ, যিনি এক সময় খালেদা জিয়াকে রাজনীতিতে আনার জন্য ভূমিকা রেখেছিলেন।
এছাড়া ২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর খালেদা জিয়া গ্রেফতার হবার আগে মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভুঁইয়াকে দল থেকে বহিষ্কার করেন।
খালেদা জিয়া যখন রাজনৈতিকভাবে নানান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছিলেন, ওই একই সময়ে তাঁর পারিবারিক ট্র্যাজেডিও ঘটে ২০১৫ সালে ছোট ছেলে আরাফাত রহমানের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।
২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি নির্বাচন বর্জনের পর বিএনপি রাজনৈতিকভাবে অনেকটা চাপে পড়ে যায়। খালেদা জিয়ার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এসে হাজির হয় তাঁর বিরুদ্ধে করা দুর্নীতির মামলা।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে গত এক বছর ধরে তিনি কারাগারে।
তাঁর কারাবাস এতোটা দীর্ঘ হবে সেটি অনেকেই ভাবেননি। দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ৭৩ বছর বয়সী খালেদা জিয়ার শরীরও ভালো যাচ্ছে না।
খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখেই সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছে বিএনপি।
বিএনপি নেত্রীর রাজনৈতিক ভবিষ্যত নিয়ে অনেকে নানা রকম সমীকরণ করছেন। তবে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী হবে, সেটি নিয়ে এখনই কোন উপসংহারে পৌঁছতে চান না সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ।
"১৯৭৫ সালের পর আওয়ামী লীগ আজকের বিএনপির তুলনায় কম বিপর্যস্ত ছিল না। বিএনপির দু'জন নেতা (খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান) আজকে প্রকাশ্যে অনুপস্থিত। এছাড়া গত আট-দশ বছরে বিএনপির মধ্যে কি কোন ভাঙ্গন হয়েছে? বিএনপি থেকে কি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ অন্য দলে চলে গেছেন? কাজেই আমি বেগম জিয়ার রাজনৈতিক ভবিষ্যত নিয়ে খুব শঙ্কিত নই," বলছিলেন মাহফুজ উল্লাহ।
তবে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী হবে - সেটি এখন বেশ অনিশ্চয়তায় রয়েছে বলে মনে করেন সাঈদ ইফতেখার আহমেদ।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত এই শিক্ষক এই মুহুর্তে খালেদা জিয়ার 'খুব ভালো কোন' রাজনৈতিক ভবিষ্যত দেখতে পাচ্ছেন না। কারন তাঁকে মুক্ত করার জন্য বিএনপির তরফ থেকে কোন কার্যকর রাজনৈতিক চাপ বা আন্দোলন দেখেননি মি. আহমেদ।
সাঈদ ইফতেখার আহমেদ মনে করেন, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাবে তার অনেকটাই নির্ভর করছে বিএনপি রাজনৈতিক দল হিসেবে সংগঠিত হয়ে সরকারের উপর কতটা চাপ তৈরি করতে পারবে তার উপর।

খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে যদি বিএনপি কোন আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারে না, সেক্ষেত্রে খালেদা জিয়ার কোন রাজনৈতিক ভবিষ্যত নেই বলে উল্লেখ করেন মি. আহমেদ।

২০ বছরের শিশু! by আমিনুল ইসলাম লিটন

২০ বছর বয়সী চম্পা খাতুন কেবল হাসতে আর কাঁদতে পারেন। এখনো মায়ের কোলেই চড়েন। হাটতে পারেন না। বয়স বাড়লেও বাড়েনি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ। নেই শরীরের কোন পরিবর্তন। যে বয়সে পড়ালেখা বা বিয়ের রঙ্গিন স্বপ্ন থাকার কথা সেই বয়সেও চম্পা মানুষের কোল চেপে বসে থাকে। বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধি হিসেবে সমাজসেবা থেকে তার নাম নিবন্ধিত হলেও এখনো ভাগ্যে জোটেনি প্রতিবন্ধি ভাতার কার্ড।
চম্পা খাতুন ঝিনাইদহ সদর উপজেলার সাধুহাটী ইউনিয়নের বংকিরা গ্রামের হাসেম মোল্লার মেয়ে।
চম্পা খাতুনের মা মিনুয়ারা বেগম জানান, ১৯৯৯ সালের ২৮শে এপ্রিল চম্পা খাতুনের জন্ম। জন্মের পর থেকে সে বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধি। আচরণ করে শিশুর মতো। কোন কথা বলতে পারে না। কেবল হাসতে আর কাঁদতে পারে। সারাক্ষণ মানুষের কোলে কোলেই তার দিন কাটে।
বড় বোন ময়না খাতুন জানান, ২০ বছর বয়স হলেও চম্পা এখনো শিশুর মতোই রয়ে গেছে। তার পিতা হাসেম মোল্লার মেয়েকে চিকিৎসা করানোর মতো সঙ্গতি নেই। এ জন্য তারা চম্পার জন্য একটি প্রতিবন্ধি ভাতার কার্ড করার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, ঝিনাইদহ সদর উপজেলা সমাজসেবা থেকে ২০১৬ সালে প্রতিবন্ধি হিসেবে চম্পার নাম নিবন্ধিত হলেও সেখানে মোছা. চম্পার খাতুনের স্থলে ভুলক্রমে মো. চাকমা খাতুন লেখা হয়েছে। নাম সংশোধনের চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও ময়না খাতুন জানান।
প্রতিবন্ধি ভাতা না হওয়া প্রসঙ্গে এলাকার ইউপি মেম্বর এনামুল হক ডালু বলেন, বছরে দুইটি কার্ড পায়। কার রেখে কার দেব? তবে পর্যায়ক্রমে চম্পা খাতুনকেও দেয়া হবে বলে তিনি জানান।
২০ বছর বয়সী চম্পা খাতুন এখনো ‘শিশু’ থাকার বিষয়ে ঝিনাইদহের প্রাইভেট প্র্যাকটিশনার বিশিষ্ট শিশু চিকিৎসক ডা. দুলাল কুমার চক্রবর্তী জানান, অনেক সময় মস্তিস্কের অসম্পূর্ণ গঠনে এমনটি হতে পারে। তারপরও জন্মের পর থেকে শিশুটির ইতিহাস পর্যালোচনা ও পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখতে হবে।

ক্যামেরার সামনে পুরো নগ্ন ৪ নারী

তারা পেশাদার পরিচ্ছন্নকর্মী। কেউ পার্কে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ করেন। কেউ গৃহস্থালির। কিন্তু তারা অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিলেন। কয়েকদিন আগে সুপার মডেল কেন্দাল জেনার (২৩) ‘ভৌগ ইতালিয়া’র জন্য যে নগ্ন পোজ দিয়েছিলেন, যেভাবে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন সব পোশাক খুলে, ঠিক সেইভাবে তারা ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেন। এ সময় তাদের শরীরে পোশাক বলতে ছিল শুধু হাতে মেরিগোল্ড আর পায়ে ছিল সাদা হাই-হিল। হাঁটুর নিচ অবধি স্বচ্ছ টাইটস।  এমন সাহসিকতা দেখিয়েছেন চারজন নারী। তারা বলছেন, তাদেরও শক্তি আছে সেটা দেখাতে এমনটা করেছেন।
তাদের একজন জেনি ফ্রাঁসিস। তিনি বলেন, আমি জানি আমি কোনো সুপারমডেল নই। তবে আমি এভাবে ক্যামেরার সামনে পোজ দিতে পেরে গর্বিত।
নর্থ ডেভোনের সাউনটনের বাসিন্দা বোনি স্টেইনার (৩৪)। তিনি ক্যারাভান পার্কের একজন পরিচ্ছন্নকর্মী। তার রয়েছে পেইসলে নামের চার বছর বয়সী একটি মেয়ে। তিন বছর বয়সী ছেলে রেকো। বনি স্টেইনার বলেন, পর্যটকরা চলে যাওয়ার পর আমি পার্ক পরিষ্কার করি। আমি একজন সিঙ্গেল নারী। আমি এই পার্কে পরিচ্ছন্নকাজ করে আসছি তিন বছর ধরে। কাজটি আমি পছন্দ করি। কাজের অংশ হিসেবে আমাকে ইউনিফর্ম পরতে হয়। হলুদ গ্লোভস পরতে হয়। সঙ্গে থাকে একটি বাকেট। মানুষ তা দেখে হাসাহাসি করে। কেউ আমাকে দেখে কিছু বলে না। কিন্তু কেন্দাল জেনার যেখানেই যায় সেখানেই ক্যামেরা। তার ওপর ওত পেতে থাকে। আমি তো তার মতো নই। তাই আমার দিকে কেউ দ্বিতীয়বার তাকায় না। এখনও না। তাই আমি তার ওই ছবিটা দেখার পর নতুন করে নিজের ছবি তৈরি করতে চেয়েছি। পরতে চেয়েছি ওই গ্লোভস, যা আমরা প্রতিদিন পরি। এমন গ্লোভসকে বলা হয় মেরিগোল্ড। এই মেরিগোল্ড পরে আমরা পর্যটকদের ফেলে যাওয়া সব নোংরা পরিষ্কার করি। কর্দমাক্ত জিনিসপত্র পরিষ্কার করি। থালাবাসন পরিষ্কার করি। নোংরা শাওয়ার বা টয়লেট পরিষ্কার করি। আমার কাছে এই হলুদ গ্লোভস ভৌগ ম্যাগাজিনের উপকরণ নয়। এটা আমার জীবন বাঁচিয়ে রাখার উপকরণ। তাই এটাকে আমার শক্তির উৎস হিসেবে মনে করি। আমি জানি আমি কোনো সুপারমডেল নই। তবে কেন্দাল জেনারের মতো আবেদনময়ী ও গর্বিত নিজেকে মনে করি।   
একই রকম পোজ দিয়েছেন আরেক কুকুরের ঘর পরিচ্ছন্নকর্মী ও কুকুরের প্রজননকাজে সহায়তাকারী মিশেল বেল (২২)। তিনি মোটা অনেক। তবু তিনি মনে করেন, তার সাইজ যাই হোক না কেন, যদি কেন্দাল জেনারের মতো তিনিও নগ্ন হয়ে পোজ দেন তাহলে তাতে যৌন আবেদন ফুটে উঠবে। তিনি বলেন, যখন আমি কেন্দালের ওই নগ্ন ছবি দেখেছি তখনই আমি ভেবেছি, এটা অন্য যেকোনো উচ্চ মাত্রার ফ্যাশনের ছবি। কিন্তু যখন আরো মনোযোগ দিলাম ছবিতে, বুঝতে পারলাম কেন্দাল জেনার মেরিগোল্ড পরিধান করেছেন। তা দেখে আমি শিহরিত হলাম। ছবিটি বন্ধুবান্ধবকে দেখালাম এবং বললাম, আমি তো এই প্রবণতার সঙ্গেই। এরপর মনে হলো, আমি এই ছবিটি নিজের মতো করে ধারণ করবো।  আমি কুকুরের ঘর পরিষ্কার করি। তাদের প্রজনেন সহায়তা করি। তাদেরকে গোসল করিয়ে দিই। পরিষ্কার করি। এ কাজটি করতে আমি ভালবাসি। প্রতিদিন আমার শরীরে লেগে যায় ডিটারজেন্ট, ময়লা আবর্জনা, কুকুরের পশম, কখনো কুকুরের মূত্র। কিন্তু আমাকে তা থেকে রক্ষা করে ওই হলুদ গ্লোভস। ওই মেরিগোল্প আমার ময়লা আবর্জনার সঙ্গে সাধারণভাবে যুক্ত। কিন্তু যখন সেটা আমি কেন্দাল জেনারের ওই ছবির পোজে দেখতে পেলাম তখন মনে হলো এটা নারীর শক্তির প্রতীক হতে পারে। আরো বেশি হতে পারে নিজেকে যৌন আবেদনময়ী হিসেবে প্রকাশের প্রতীক।
উত্তর পশ্চিম লন্ডনের হ্যাম্পস্টেডের ৩৩ বছর বয়সী গৃহকর্মী এমিলি কুপারসও কম যান না। তিনিও কেন্দাল জেনারের অনুকরণে ক্যামেরার সামনে পোজ দিয়েছেন একেবারে নগ্ন হয়ে। তিনি মনে করেন, কেন্দাল জেনার শিখিয়ে দিয়েছেন এই হলুদ গ্লোভস হতে পারে নারীর যৌন আবেদনের নতুন উপকরণ, যা বেডরুমকে গরম রাখবে। তিনি বলেন, দেড় বছর ধরে আমি বর্তমান গৃহকর্তার বাড়িতে পরিচ্ছন্নতার কাজ করি। অন্যদের বাড়িও পরিষ্কার করি। আমার কাছে কখনো কাজটিকে গ্লামারহীন মনে হয় নি। তবে কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়তাম। বিরক্তি লাগতো। একদিন রাত তিনটায় আমি উঠে পড়েছিলাম। দেখলাম কেন্দাল জেনারের ওই ছবিটি। দেখে প্রথমে হেসেছি। তারপর ভেবেছি, একই রকম এই রাবারের গ্লোভস তো আমাকে কখনো এভাবে যৌন আবেদনময়ী হিসেবে প্রকাশিত হতে ভাবায় নি। কিন্তু কেন্দাল জেনারের ওই ছবি অবিশ্বাস্যরকমভাবে যৌন আবেদনময়ী। এতে প্রকাশ পেয়েছে যে একজন নারী কিভাবে তার নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রদর্শন করেন। তার পার্টনার তাকে বেডরুমে কিভাবে অনুসরণ করবেন তার এক নতুন আকর্ষণ এর মধ্যে। তাই আমি এভাবেই ছবি ধারণ করতে উৎসাহিত হয়েছি।
ওয়াটফোর্ঢের ভ্যানেসা হিলডার (৪৭)। তিনি বর্তমানে একটি গৃহের পরিচ্ছন্নকর্মী। আগে তিনি নার্সিং-হাউজ পরিষ্কার করতেন। তিনি বলেন, ক্যামেরার সামনে নগ্ন হওয়া তো ভীতির বিষয়। কিন্তু গ্লোভস আমাকে এক্ষেত্রে সাহস দিয়েছে। যখন কেন্দাল জেনারের ছবি দেখেছি তখনই বুঝতে পেরেছি এই রাবারের হলুদ গ্লোভসে একজন নারী কতটা আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারেন। আমি কেন্দালের মতো আগে কখনো এই মেরিগোল্ড পরি নি। আমরা শুধু এটা পরি ময়লা পরিষ্কার করার সময়।  কিন্তু তা এখন ফ্যাশনে উঠে এসেছে। আসলে যেকোনো কিছুকে আপনি ফ্যাশনের উপকরণ বানিয়ে ফেলতে পারেন।