Thursday, May 14, 2015

চোখ বেঁধে গাড়িতে শিলং নেয়া হয় সালাহউদ্দীনকে

বিএনপি নেতা সালাহউদ্দীন আহমেদ তার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া দুজন আত্মীয়কে জানিয়েছেন, তাঁকে চোখ বাঁধা অবস্থায় কয়েকবার গাড়ি বদল করে শিলং নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। শিলং এর পলোগ্রাউন্ডে তাঁকে চোখ বাঁধা অবস্থাতেই গাড়ি থেকে নামিয়ে দেয়া হয়। চোখের বাঁধন খোলার পরও তিনি বুঝতে পারছিলেন না তিনি কোথায় আছেন। স্থানীয়দের জিজ্ঞাসা করে তিনি জানতে পারেন যে, তিনি শিলং এ আছেন। বৃহস্পতিবার বিকেলে সালাহউদ্দীন আহমেদের এই দুজন আত্মীয় প্রথমবারের মতো তার সঙ্গে শিলং এর সিভিল হাসপাতালে দেখা করতে সক্ষম হন। সাক্ষাৎ শেষে বেরিয়ে এসে তারা বিবিসি বাংলার অমিতাভ ভট্টশালীকে এই তথ্য জানান। এদের একজন আইয়ুব আলী জানান, তিনি কলকাতার বাসিন্দা এবং সালাউদ্দীন আহমেদের দূর সম্পর্কের ভাই।
এই দুজন আরও জানিয়েছেন, সালাহউদ্দীন আহমেদ নিজেই এর পর শিলং এর পুলিশের কাছে গিয়ে নিজের পরিচয় দেন। এর আগে গত দুদিন ধরে শিলং এর পুলিশের তরফ থেকে দাবি করা হচ্ছিল, স্থানীয় লোকজন সালাহউদ্দীন আহমেদকে উদভ্রান্তের মতো ঘুরতে দেখে থানায় খবর দেয়। এরপর পুলিশ তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে মানসিক হাসপাতালে নিয়ে যায়।
বাংলাদেশে দুমাসের বেশি সময় ধরে নিখোঁজ সালাউদ্দীন আহমেদকে শিলং এ খুঁজে পাওয়ার পর এই প্রথম তার নিজস্ব বয়ানে কোন তথ্য জানা গেল। শিলং পুলিশ গত কদিন ধরে তাকে কঠোর পাহারার মধ্যে রেখেছে। এমনকি যেসব ডাক্তার, নার্স সালাউদ্দীন আহমেদকে দেখেছেন, তারাও মিস্টার আহমেদের স্বাস্থ্য ছাড়া অন্য কোন বিষয়ে কোন তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন।
তবে শিলং এর একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ডি জে গোস্বামী জানিয়েছেন, সালাহউদ্দীন আহমেদের কাছে কিছু ওষুধ পাওয়া গিয়েছিল, যেগুলো বাংলাদেশের কোন ওষুধ কোম্পানির তৈরি বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ এসব ওষুধের স্ট্রীপে বাংলা লেখা ছিল। ভারতে তৈরি ওষুধের স্ট্রীপে বাংলা লেখা থাকে না।
ডাক্তার ডি জে গোস্বামী জানান, সালাহউদ্দীন আহমেদ হৃদরোগে এবং প্রোস্টেটের জটিলতায় ভুগছেন। তার সঙ্গে পাওয়া ওষুধগুলো মূলত এসব রোগের।
মেঘালয় পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের দুজন কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার বিকেলে সালাহউদ্দীন আহমেদকে প্রায় দু ঘন্টা ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদে তারা কি জানতে পেরেছেন তা প্রকাশ করেন নি।
সালাহউদ্দীন আহমদের সঙ্গে দেখা করতে তার পরিবারের সদস্যরা বৃহস্পতিবার শিলং এ পৌঁছান। এদের একজন হুমায়ুন রশিদ জানিয়েছেন, তিনি সালাহউদ্দীন আহমেদের কাজিন। সালাউদ্দীন আহমেদের সঙ্গে তাদেরকে দেখা করার অনুমতি দিয়েছিলেন শিলং এর পুলিশের এসপি। কিন্তু পরে সেই অনুমতি প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। দেখা করতে না পেরে তারা ফিরে যান।
আবদুল লতিফ জনি এবং স্বপন নামে বিএনপির দুজন নেতাও শিলং এ পৌঁছেছেন।
সূত্র- বিবিসি বাংলা
সালাহউদ্দিনের সঙ্গে দেখা করতে শিলংয়ে বিএনপি নেতা জনি
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে দেখা করতে দলটির সহ-দপ্তর সম্পাদক আবদুল লতিফ জনি ভারতের শিলংয়ে গেছেন। গতকাল তিনি ঢাকা থেকে শিলং গিয়ে পৌঁছান। তবে সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে তিনি দেখা করতে পেরেছেন কি- না সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ভারতীয় ভিসা পেলে সালাহউদ্দিন আহমেদের স্ত্রী হাসিনা আহমেদও শিলং যাবেন। দুই মাস ধরে নিখোঁজ সালাহউদ্দিন আহমেদকে সোমবার ভারতের শিলংয়ে পাওয়া যায়। সেখান থেকে স্থানীয় পুলিশ তাকে আকট করে হাসপাতালে ভর্তি করে।

৩ দেশকে রোহিঙ্গাদের বোট ফেরানো বন্ধের আহ্বান- মিয়ানমার এ সঙ্কট সৃষ্টি করেছে: এইচআরডব্লিউ

বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গা অভিবাসী বা আশ্রয়প্রার্থীদের বহনকারী বোটগুলোকে ফেরানো বন্ধ করা উচিত থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার। অভিবাসীদের তীরে নিয়ে গিয়ে জরুরি ভিত্তিতে তাদের যেসব ত্রাণ প্রয়োজন, অবিলম্বে সেগুলো সরবরাহ করা উচিত। আজ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) এক প্রতিবেদনে দেশ তিনটির প্রতি এ আহ্বান জানানো হয়েছে। এদিকে বার্মা (মিয়ানমার) সরকার রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর অব্যাহত নিপীড়ন চালানোর মাধ্যমে এ সঙ্কট সৃষ্টি করেছে বলে মন্তব্য করেছেন এইচআরডব্লিউ’র এশিয়া বিষয়ক ডেপুটি-পরিচালক ফিল রবার্টসন।
আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থার (আইওএম) দেয়া তথ্যানুযায়ী, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার সমুদ্র উপকূলসমূহে বোটে ভাসছেন ৮ হাজার বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গা অভিবাসী। তাদের কাছে পর্যাপ্ত খাবার, পানি বা স্যালাইন কিছুই নেই। এ খবরে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে এইচআরডব্লিউ। ফিল রবার্টসন বলেছেন, বার্মা (মিয়ানমার) সরকার রোহিঙ্গাদের ওপর অব্যাহত নিপীড়ন চালানোর মাধ্যমে এ সঙ্কট সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া কর্তৃপক্ষ বোটে আসা অভিবাসীদের এ প্রবাহকে ফিরিয়ে দেয়ার নির্মম নীতি গ্রহণের মাধ্যমে সে সমস্যাকে আরও ঘনীভূত করেছে, যা হাজার হাজার জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। অন্য দেশের সরকারসমূহের উচিত এই তিন সরকারকে একসঙ্গে কাজ করে মরিয়া এ মানুষগুলোকে উদ্ধারের আহ্বান জানানো এবং তাদের মানবিক ত্রাণ সরবরাহ করা। যাদের আন্তর্জাতিকভাবে সুরক্ষা প্রয়োজন, তাদের দাবিসমূহ প্রক্রিয়ার আওতায় আনতে সহযোগিতা করা এবং তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
ফিল রবার্টসন আরও বলেছেন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া নৌবাহিনীর উচিত ত্রিমুখী মানব পিং-পং খেলা বন্ধ করা। বরং, তাদের উচিত এসব দুর্ভাগ্যপীড়িত বোটগুলো থেকে সবাইকে উদ্ধারে একসঙ্গে কাজ করা। তিনি বলেন, এ সরকারসমূহকে বিশ্ব মূল্যায়ন করবে তারা কিভাবে ভীষণভাবে অরক্ষিত এ পুরুষ, নারী ও শিশুদের সঙ্গে আচরণ করে, তার নিরীখে। যদি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো বার্মা থেকে রোহিঙ্গাদের গণপলায়নের ঘটনায় অকৃত্রিমভাবেই উদ্বিগ্ন হয়ে থাকে, তাদের উচিত অবিলম্বে বার্মাকে তার সবচেয়ে অরক্ষিত জনসংখ্যার বিরুদ্ধে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের আবসান ঘটানোর দাবি জানানো। রবার্টসন বলেন, বৈষম্যমূলক নীতিসমূহের অবসান এবং পূর্ণ নিরাপত্তা প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত করা, যাতে রোহিঙ্গারা নিরাপদে এবং মর্যাদার সঙ্গে আরাকান রাজ্যে তাদের বাড়ি ফিরতে পারে, সেটা হবে শুরু করার জন্য ভালো একটি পদক্ষেপ।

চট্টগ্রামে বাসায় ঢুকে প্রবাসীর স্ত্রীকে হত্যা

চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ থানার মির্জারপুল এলাকায়
শারমিন আক্তার (২৫) নামের এক গৃহবধূকে কুপিয়ে
হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। মাকে আর কোনো দিনই
দেখা হবে না, তবু এই মুহূর্তে চোখের সামনে মাকে
দেখতে না পেয়ে কান্নায় অস্থির হয়ে ওঠে ১০ মাস
বয়সী আহমেদুল রহমান। ছবিটি আজ বিকেল
চারটার দিকে তোলা। ছবি: জুয়েল শীল, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ থানার মির্জার পুল এলাকায় শারমিন আক্তার (২৫) নামের এক গৃহবধূকে বাসায় ঢুকে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। আজ বৃহস্পতিবার দুপুর দুইটার দিকে ওই এলাকার ইকুইটি ভিলেজ নামের একটি বহুতল ভবনের চতুর্থ তলায় এ ঘটনা ঘটে।
নিহত শারমিনের স্বামী আবদুল হাকিম আবুধাবি প্রবাসী। শারমিন তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী।
পাঁচলাইশ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) গিয়াসউদ্দিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশ জানায়, ইকুইটি ভিলেজের চতুর্থ তলায় নিহতের স্বামী আবদুল হাকিমের প্রথম স্ত্রী রোজি আক্তার থাকেন। সপ্তাহখানেক আগে শারমিন ওই বাসায় বেড়াতে যান।
এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ রোজি আক্তারকে থানায় নিয়ে গেছে। রোজি আক্তারের দাবি, এক দল ডাকাত ডাকাতি করতে এসে শারমিনকে হত্যা করে।
তবে নিহত শারমিনের মামা মোহাম্মদ আজিমের অভিযোগ, রোজি পরিকল্পিতভাবে বাসায় ডেকে নিয়ে তাঁর ভাগনিকে হত্যা করেছে। শারমিনের একটি ছেলে আছে বলে তিনি জানান।
পুলিশ শারমিনের লাশ উদ্ধার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠিয়েছে।

সরকারের ভেতর থেকেই অপরাধীদের মদত দেয়া হচ্ছে

গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার বলেছেন, বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের পর আনসারুল্লাহ আল ইসলাম, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম ও আল-কায়েদার দায় স্বীকারের বিষয়ে কতটুকু অস্তিত্ব রয়েছে তা নিয়ে আমি সন্দিহান। তবে ভারতীয় উপমহাদেশে আস শাহাব নামে আল কায়েদার একটি ব্রাঞ্চ আছে। তারা এখানে দীর্ঘদিন কাজ করে যাচ্ছে। আনসারুল্লাহ আল ইসলাম, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম দাবি করে তারা আস শাহাবের আঞ্চলিক শাখা হিসেবে বাংলাদেশে কাজ করছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে কেউ সরকারের বিরুদ্ধে কথা বললে, ফেসবুকে কোন মন্তব্য করলে সরকারি গোয়েন্দা বাহিনী প্রযুক্তি ব্যবহার করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাদের গ্রেপ্তার করছে। সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য কে মোবাইলে কি কথা বলছে, কোন মেসেজ পাঠাচ্ছে সেগুলো ফাঁস করে তাদের ধরা হচ্ছে। আবার এগুলো মিডিয়ায়ও দিয়ে দেয়া হচ্ছে। অথচ ব্লগারদের হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে এসব কেন করা হচ্ছে না। তার মানে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার কেউ কেউ বা সরকারের ভেতর থেকে অপরাধীরা মদত পাচ্ছে। যার কারণে তারা খোলাখুলিভাবে হত্যার দায় স্বীকার করছে।
গতকাল মানবজমিনের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
হত্যাকাণ্ডে জড়িত অপরাধীদের সরকারের ভেতর থেকে ‘পৃষ্ঠপোষকতা’ করা হচ্ছে অভিযোগ করে ডা. ইমরান বলেন, স্থপতি রাজীব হায়দারের আত্মস্বীকৃত হত্যাকারীর বিচার কিছুদিন পর স্থগিত করা হয়। পরে তাকে রাতের অন্ধকারে সবকিছু দিয়ে বিদেশ পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। তার মানে অপরাধীদের ভেতর থেকে পৃষ্ঠপোষকতা করা হচ্ছে। খুনির জামিন হওয়া বিচার বিভাগের ভুল। কিন্তু সেই খুনি সরকারের কোন পর্যায়কে ম্যানেজ করে বিদেশ চলে গেল? বিদেশ যাওয়ার পর তার জামিন স্থগিত করা হলো। ভেতর থেকে পৃষ্ঠপোষকতা না করলে এটা সম্ভব হতো না।
অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বললো তারা ক্লুলেস। এদিকে ওয়াশিকুর বাবুর হত্যাকারীদের দুইজনকে মানুষ ধরে দিয়েছে। তারা আরও দুইজনের নাম বলেছে। সেই দুই অপরাধীকে এখনও ধরতে পারে নি। সর্বক্ষেত্রে এরকম হচ্ছে। সরকারের ভেতর থেকে পৃষ্ঠপোষকতা না করলে অপরাধীরা একের পর এক এসব ঘটনা ঘটাতে পারতো না। সম্ভব ছিল না। তিনি বলেন, রাজীব হত্যাকাণ্ডের দুই বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে গেল। শুনলাম, মামলা সিআইডিতে হস্তান্তর করা হয়েছে। এখন দেখা যাক কি হয়। অপরাধীদের আটক করতে ও হত্যাকাণ্ডের জট খুলতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আন্তরিক নয় দাবি করে ডা. ইমরান এইচ সরকার বলেন, এক্ষেত্রে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যর্থ এটা বলতে চাই না। আমার প্রশ্ন তাদের আদৌ আন্তরিকতা আছে কিনা? একের পর এক ঘটনা ঘটছে, অপরাধীদের কাউকেই আটক করতে না পারা প্রমাণ করে তাদের আন্তরিকতার অভাব ছিল। আন্তরিকতা যে নেই তার আরেকটি প্রমাণ ঘটনার শুরুতেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী খুঁজতে শুরু করে যাকে হত্যা করা হয়েছে তার কোন পারিবারিক বিরোধ বা নারী গঠিত কোন বিরোধ আছে কিনা। বর্ষবরণের দিন নারী নিপীড়ন হলো। নিপীড়কদের আড়াল করতে, ধামাচাপা দিতে চেষ্টা করা হলো। পরে মানুষ যখন প্রতিবাদী হলো তখন পুলিশ তাদের ওপর হামলা করে নারী নিপীড়ন করলো। এখানেও একই ঘটনা ঘটছে। হত্যাকাণ্ডের বিচার যারা চাচ্ছে তাদের ওপর পিপার সেপ্র, টিয়ারশেল মারা হচ্ছে। আন্তরিকতা নেই তার আরও প্রমাণ রয়টার্সকে দেয়া প্রধানমন্ত্রীর ছেলের সাক্ষাৎকার। ব্লগার ও মুক্তমনা হত্যাকাণ্ডে সরাসরি কারা দায়ী তা উল্লেখ করা সমীচীন নয় মন্তব্য করে গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র বলেন, ব্লগার হত্যাকাণ্ড ২০১৩ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে। একে একে হত্যা করা হয় স্থপতি রাজীব হায়দার, অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর রহমান বাবু, অনন্ত বিজয় দাসকে। একটি জায়গায় এদের মিল আছে। এরা প্রত্যেকেই কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতো। তবে এদের হত্যার পেছনে ধর্মীয় কারণই প্রধান বলে মনে করি না। কারণ এই চারজনের মধ্যে দুইজন ছিলেন সনাতন ধর্মের। তারা দুইজন পুরোপুরি বিজ্ঞান বিষয়ে লেখালেখি করতেন। বাকি দুইজন ধর্ম নিয়ে বিভিন্ন কথা লিখেছেন। অভিজিৎ ও অনন্ত বিজ্ঞানকে কিভাবে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, বিজ্ঞানের কঠিন থেকে শুরু করে খুঁটিনাটি বিষয়গুলো কিভাবে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেয়া যায় সে বিষয়ে লিখতেন। তাদের মূল লক্ষ্যই ছিল এটি। বর্ষবরণে নারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে অনন্ত কথা বলেছে। অর্থাৎ সমাজের বিভিন্ন অন্যায়ের বিরুদ্ধে এরা সোচ্চার ছিল। তবে এসব হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে এই প্রতিবাদের ভাষাটাকে বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে সমাজকে যারা অন্ধকারে রাখতে চায় বা নিজেদের কব্জায় রাখতে চায় তারা লাভবান হচ্ছে। যারা র‌্যাডিকেল (কট্টর) ইসলাম, যারা ধর্মকে নিয়ে রাজনীতি করে তারা লাভবান হচ্ছে। একদিকে যেমন মৌলবাদীরা এসব হত্যাকাণ্ডকে নানাভাবে উৎসাহিত করছে, হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ত হচ্ছে। অন্যদিকে যারা প্রগতিশীলতার কথা বলে, মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে তারা এসব বিষয়ে নীরব থেকে এ বিষয়গুলোকেই এক ধরনের সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। সুতরাং এ জন্য সরাসরি কারা দায়ী তা বলে দেয়া সমীচীন নয়। একজন ব্লগার হিসেবে এসব হত্যাকাণ্ডে আতঙ্কিত নন উল্লেখ করে ডা. ইমরান বলেন, ৮৪ জনের কথিত লিস্ট আছে বলে শুনেছি। কারা করেছে জানি না। লিস্টের প্রথমেই আমার নাম রয়েছে। সে হিসেবে বলতে পারি আমি মোটেই আতঙ্কিত নই। যেহেতু সৃষ্টিকর্তাকে বিশ্বাস করি, তার বাইরে কেউ জীবন নিতে পারে না, হত্যা করতে পারে না এবং রক্ষাও করতে পারে না। হত্যা করলেও কি হবে। ভূমিকম্পেওতো অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে। মানুষের জন্য কথা বলতে গিয়ে যদি আমাকে হত্যার শিকার হতে হয় তার জন্য আমার গর্বিত হওয়া ছাড়া অন্য কোন বিষয় আছে বলে আমি মনে করি না।
তিনি বলেন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে আতঙ্ক তৈরি করার জন্য এসব হত্যাকাণ্ড করা হচ্ছে। যারা সাধারণ ব্লগার বা যারা ফেসবুকে  লেখেন তারা এখন কোন কিছু লেখার পূর্বে চিন্তা করছেন এ লেখার জন্য তাকে আবার হত্যা করা হবে কিনা। বিচার হলে সাধারণ মানুষ আস্থা পেতো। মানুষজন এখন বাইরে বের হলে সে আবার বাসায় যেতে পারবে কিনা তা তারা জানে না। তিনি বলেন, আতঙ্কিত হওয়াই সমাধান নয়। জেগে উঠতে হবে। মানুষকেই অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।

রাতভর গাড়ি চালিয়ে সালাহ উদ্দিনকে ফেলে যায় : মানস চৌধুরী

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমেদকে ‘রাতভর গাড়ি চালিয়ে’ ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলংয়ে ফেলে রেখে যাওয়া হয় বলে মনে করেন শিলং টাইমসের সম্পাদক মানস চৌধুরী।
নিখোঁজের ৬৩ দিন পর খোঁজ পাওয়া সালাহ উদ্দিন আহমেদের শিলং পুলিশের হাতে আটক হওয়ার খবর প্রথম ছেপেছিল শিলং টাইমস। আজ বুধবার এনটিভির সাথে টেলিফোনে মেঘালয়ের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ও দুইবারের বিধায়ক মানস চৌধুরী এ কথা বলেন। এ সময় শিলং টাইমস পত্রিকার সম্পাদক ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘পুলিশ জানিয়েছে, ওনাকে (সালাহ উদ্দিন আহমেদ) পাওয়া গেছে অজানা-অপরিচিত জায়গার মধ্যে। উনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং জিজ্ঞাসাবাদ করায় উনি কোনো উত্তর দিতে পারছেন না। তারপর লোকদের সন্দেহ হওয়ায় লোকেরা পুলিশকে ডেকে নিয়ে আসে। পুলিশ এসে ওনাকে নিয়ে যায় থানায়।’
মানস চৌধুরী আরো বলেন, ‘এরপর পুলিশ জিজ্ঞেস করে, কী হয়েছে? উনি বললেন, আমি জানি না। আমাকে গাড়িতে করে এখানে চোখ বাঁধা অবস্থায় এনে ফেলে গেছে। পুলিশ বলল, আপনি কোথা থেকে আসছেন? উনি বললেন, আমাকে তো দুই মাস ধরে আটক করে রেখেছিল, বন্দী করে রেখেছিল। আমাকে কে বা কারা বন্দী করেছিল, আমি জানি না। আমি বন্দী অবস্থায় ছিলাম, আমাকে গাড়িতে করে চোখ বেঁধে এখানে নিয়ে এসে ফেলে গেছে। এটুকুই উনি বক্তব্য রেখেছেন।’
এরপরই শিলং টাইমস-এর সম্পাদক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা যোগ করেন, ‘যেটা বুঝতে পারলাম যে, রাতভর গাড়ি চালিয়ে ওনাকে ফেলে গেছে ওইখানে।’
বেআইনিভাবে ভারতে প্রবেশের ঘটনায় সালাহ উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও এদিন স্থানীয় কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এনটিভিকে জানান শিলং টাইমস পত্রিকার সম্পাদক মানস চৌধুরী।
এরই মধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে জানিয়ে মানস বলেন, ‘আমার মনে হয়, এটা অনেক দিন লাগবে। চট করে উনি ছাড়া পাবেন না। ফ্যামিলি মেম্বার যেতে পারে, গিয়ে দেখা করতে পারে, সেটা অলরাইট। কিন্তু ছাড়িয়ে আনতে পারবে না এখন।’
গত ১০ মার্চ থেকে ‘নিখোঁজ’ ছিলেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমেদ। তাঁকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে তাঁর পরিবার ও দলটির পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে।
তবে সালাহ উদ্দিন আহমেদকে আটক করা হয়নি বলে বারবার দাবি করেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।
সালাহ উদ্দিন আহমেদের সন্ধান চেয়ে গত ১১ মার্চ রাতে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গুলশান ও উত্তরা পশ্চিম থানায় যান তাঁর স্ত্রী ও সাবেক সংসদ সদস্য হাসিনা আহমেদ। তবে কোনো থানাই তাঁর জিডি গ্রহণ করেনি। পরে সালাহ উদ্দিন আহমেদকে খুঁজে বের করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে স্মারকলিপি দেন তাঁর স্ত্রী হাসিনা আহমেদ।
গত ১২ মার্চ হাসিনা আহমেদের করা এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমেদকে কেন খুঁজে বের করা হবে না এবং রোববার তাঁকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। গত ২০ এপ্রিল হাইকোর্ট আগামী ছয় মাস সালাহ উদ্দিন আহমেদের খোঁজ অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেন।
এর মধ্যেই গত সোমবার শিলংয়ে আটক হন সালাহ উদ্দিন আহমেদ। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পরপরই ভারতে অবৈধভাবে প্রবেশের দায়ে ফরেনার্স অ্যাক্টে মামলা করে পুলিশ।
ভারতের পাসপোর্ট আইন ১৯৫০-এর ৩ ও ৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী, দেশটিতে অবৈধভাবে কোনোরকম কাগজপত্র ছাড়া প্রবেশ বা প্রবেশের চেষ্টা করলে তিন মাস বা তার বেশি কারাদণ্ড অথবা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড পেতে পারেন।
এ ছাড়া ১৯৪৬ সালের ফরেনার্স অ্যাক্টের ১৪ ধারা অনুযায়ী, অন্য কোনো দেশের নাগরিক যদি অনুমোদিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় ভারতে অবস্থান করেন, তাহলে তাঁর পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে।
সূত্র: এনটিভি অনলাইন

ভারতে সালাহ উদ্দিনের বিচার কাম্য নয় by মিজানুর রহমান খান

ভারতের শিলং সিভিল হাসপাতালে বিএনপির
যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমদ
সালাহ উদ্দিন আহমদকে নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাদানুবাদের চেয়ে সবচেয়ে জরুরি, তাঁকে অবিলম্বে তাঁর পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা। প্রশ্ন উঠেছে, নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলার আলোচিত আসামি নূর হোসেনের প্রত্যর্পণ যেভাবে ঝুলে গেছে, সালাহ উদ্দিনের পরিণতিও সে রকম হয় কি না।
কিন্তু আমার ধারণা, ভারত ও বাংলাদেশ সরকারের সদিচ্ছা থাকলে সালাহ উদ্দিনকে বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করা ছাড়াই দ্রুত বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব। গতকাল একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর কাছে জানতে চাইলে তিনি যুক্তি দেখান, সীমান্ত এলাকায় হলে বিএসএফ তাঁকে পুশব্যাক করতে পারত। কিন্তু এখন যেহেতু ফরেনার্স অ্যাক্টে মামলা হয়েছে, তাই ভারত সরকার চাইলেও আর তাঁকে তুলে দিতে পারবে না। এখন তাঁর বিচার হবে। দোষী সাব্যস্ত হলে তিনি তাঁর সাজা খাটার পরেই কেবল ফিরতে পারেন। আমার মনে হয়, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার চাইলে তাঁর ফেরা ত্বরান্বিত হতে পারে।
ভিন্ন কোনো গোয়েন্দা তথ্য না থাকলে সালাহ উদ্দিন আহমদের বক্তব্য ভারত সরকার বিশ্বস্ততার সঙ্গে বিবেচনায় নিতে পারে। একটি সরল প্রশ্ন, কোনো ব্যক্তি যদি ‘অনিচ্ছাকৃতভাবে’ কোনো রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে যায়, তাহলে তাকে পাসপোর্ট আইন লঙ্ঘনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হতেই হবে, এটা কোনো সভ্য দেশের ব্যবস্থা হতে পারে কি না। ভারতীয় আইনের চোখে তিনি কোনো সন্দেহভাজন ফেরার বা জঙ্গি নন। ক্ষমতাসীন দলের অভিযোগমতে, তিনি ভিন্নমতাবলম্বী। একজন রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীর প্রতি ভারত কী আচরণ করে, সেটা দেখার বিষয়।
ক্ষমসতাসীন দলের বক্তব্য চূড়ান্ত কথা হলে ভারত সালাহ উদ্দিনের সঙ্গে হয়তো অরবিন্দ রাজখোয়ার মতো আচরণ করতে পারে। অরবিন্দরা ছিলেন বিচ্ছিন্নতাবাদী জঙ্গি ও ফেরার। অন্যদিকে সালাহ উদ্দিন হাইকোর্টের আদেশমতে কোনো ফেরার বা পলাতক ব্যক্তি নন। বরং তাঁকে খুঁজে বের করে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ারই আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিলেন আমাদের বিচার বিভাগ। অন্যদিকে ক্ষমতাসীনদের মতে, আওয়ামী লীগের বৈধ সরকার অপসারণে তিনি পেট্রলবোমা মারার কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
বিএনপি সালাহ উদ্দিনের অন্তর্ধান প্রশ্নে রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর কী করছে বা করবে, তার থেকে তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর অবস্থানকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া স্বাভাবিক প্রত্যাশা। সালাহউদ্দিন অবিলম্বে দেশে ফিরতে বা রাজনৈতিক আশ্রয় চাইতে পারেন। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে বিবেচনায় নিতে হবে যে স্বেচ্ছায় বাড়ি ফিরে যেতে চাওয়া তাঁর মৌলিক মানবাধিকার। ব্রিটিশ সরকারের একটি সেন্ট্রাল ভলান্টারি ডিপার্চারস টিম আছে। এর ওয়েবসাইট বলছে, ‘ব্রিটেনে আপনার থাকা যদি আইনানুগ না হয়, তাহলে আপনাকে অবশ্যই স্বেচ্ছায় বাড়ি ফিরে যেতে হবে।’ আর এতে সহায়তা দেওয়া ওই টিমের ২৪ ঘণ্টার কাজ। তবে স্বেচ্ছায় যেতে চাইলেও আবেদনকারীর জন্য আট ধরনের অযোগ্যতা রয়েছে, যার কোনোটিতেই সালাহ উদ্দিন পড়েন না।
ভারত সরকারের উচিত হবে তদন্ত করে দেখা, সালাহ উদ্দিন স্বেচ্ছায় না জবরদস্তিমূলক শিলং গেছেন। কেবল পাসপোর্ট নেই বলে তাঁর বিচার করার যুক্তি ত্রুটিমুক্ত হতে পারে না। ভারত তার বন্ধু সরকারকে বিব্রত করবে কি না, সেটা বড় প্রশ্ন। কারণ, তদন্তে যদি প্রকাশ পায় যে তিনি জবরদস্তি পাচার বা অপহরণের কবলে পড়েছেন, তাহলে সরকার বিব্রত হবে। টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছে, ‘প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী শিলংয়ের মারুতি জিপসি এলাকায় অজ্ঞাতনামা অপহরণকারীরা তাঁকে ফেলে দিয়েছে।’ ভারতের উচিত হবে নিরপেক্ষ তদন্তের ফলাফল যাই হোক, তা প্রকাশ করা। এটা দীর্ঘ মেয়াদে তার জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে যাবে। ভারতকে বিবেচনা করতে হবে, এ রকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি দুই দেশের জনগণ শেষ বিচারে কী চোখে দেখবে।
আমরা খুশি হব অনতিবিলম্বে সালাহ উদ্দিনকে ফিরে পেলে। বাংলাদেশের আইনের আপন গতির সঙ্গে ভারতের আইনের আপন গতির একটি মৌলিক পার্থক্য দেখতে চাই। ফরেনার্স অ্যাক্টে তাঁর বিচার না করে তাঁকে সসম্মানে ফেরত দিলে ভারতের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে।
গতকাল আসাম ট্রিবিউন লিখেছে, ‘মেঘালয়ের সঙ্গে দেশটির ৪৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের নিরাপত্তায় যে ফাটল রয়েছে, নিরাপত্তা প্রহরীদের ফাঁকি দিয়ে ভারতে তাঁর প্রবেশের ঘটনায় তা প্রমাণিত হলো।’ খালেদা জিয়ার তরফে হঠাৎ নির্দিষ্টভাবে র্যাবের কাছে সালাহ উদ্দিনকে ফেরত চাওয়া এবং তাঁর মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে শিলংয়ে তাঁর উপস্থিতি এবং সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের মহাপরিচালকের দ্বারা সালাহ উদ্দিনের বিচারের ঘোষণার সংকল্প ব্যক্ত করার মধ্যে কী ধরনের যোগসূত্র থাকতে পারে, তা নিঃসন্দেহে কৌতূহলোদ্দীপক। এই রহস্য আদৌ উদ্ঘাটিত হবে কি না, জানি না। তবে সব ছাপিয়ে সালাহ উদ্দিনের অসহায় স্ত্রীর যে দৃশ্যমান ছোটাছুটি, এর যে মানবিক দিক, তা সব থেকে দামি। আর ভারতের সংবিধানও একজন বিদেশি নাগরিকের মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করেছে। তিনি সেখানে অপহরণকারীর কবলে বা স্বেচ্ছায় যেভাবেই যান, তিনি স্বীকার করেছেন, তাঁর অনিচ্ছাকৃত অনুপ্রবেশ ঘটেছে এবং বাড়ি ফিরতে আগ্রহী।
এখানে রাজনৈতিক ইচ্ছাটাই বড়, আইন বাধা দেবে না। চণ্ডীগড়ভিত্তিক আইনজীবী অনিল মালহোত্রা ২০১৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর দ্য হিন্দু পত্রিকায় একটি নিবন্ধ লেখেন। তাঁর বক্তব্য সুপ্রিম কোর্ট–সমর্থিত। এতে তিনি উল্লেখ করেন, ‘১৯২০ সালের পাসপোর্ট (এন্ট্রি ইনটু ইন্ডিয়া) এন্ট্রি অ্যাক্ট এবং ১৯৪৬ সালের ফরেনার্স অ্যাক্ট যুগপৎ কার্যকর থাকার কারণে যেকোনো বিদেশি নাগরিককে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়াই ভারত থেকে বহিষ্কার ও সরাসরি প্রত্যর্পণে সরকারের হাতে নিরঙ্কুশ এবং অসীম ক্ষমতা রয়েছে।’ তাঁর আরও মন্তব্য: ‘কোনো বিদেশিকে ফেরত পাঠাতে কেন্দ্রীয় সরকারকে অন্য আর কোনো ফোরামে যাওয়ার দরকার নেই। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জাতীয়তা নির্ধারণ বা এই প্রক্রিয়ায় তাঁকে কোনো সংবিধিবদ্ধ অধিকার দেওয়ারও কোনো দায় তার নেই। এই মুহূর্তে এসব প্রশ্নের সুরাহা দিতে কোনো ট্রাইব্যুনালের অস্তিত্ব নেই। সাত খুনের আসামি নূর হোসেন থেকে সালাহ উদ্দিনের ঘটনা আলাদা। তাই এটা বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়ার সুযোগ আছে। ১৯২০ ও ১৯৪৬ সালের ওই দুটি আইন একই ঔপনিবেশিক আছর নিয়ে বাংলাদেশেও টিকে আছে।
এই প্রশ্ন বিবেচনার যোগ্য এ কারণে যে সামনের দিনগুলোতে ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহারের একটি প্রবণতা বৃদ্ধি পেতে পারে। তাই সেটা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে চলতে দেওয়া সমীচীন কি না—এই প্রশ্ন আন্তর্জাতিকভাবেও প্রাসঙ্গিক মনে করি। কারণ, কোনো একটি রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের শর্তেই কি তার কোনো নাগরিককে ফেরত পাঠাতে সংশ্লিষ্ট বিদেশি রাষ্ট্র আগ্রহী থাকবে?
একটি উদাহরণ দিই। ১৯৫৯ সালে নৌকায় করে বারনার্ডো নামে এক ব্যক্তি শ্রীলঙ্কা থেকে জেনোয়ায় যাচ্ছিলেন। পথে নৌকা ভিড়ল কোচিনে। পাসপোর্ট না নিয়ে প্রবেশের জন্য ভারতের শুল্ক কর্মকর্তারা তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেন। তাঁর আইনজীবী আব্রাহাম কেরালা হাইকোর্টে মামলা ঠুকলেন। বারনার্ডো বললেন, ‘আমি তো ইচ্ছায় ঢুকিনি। তাই এ আইনে আমার বিচার হতে পারে না। কারণ, এ আইন শুধু যারা স্বেচ্ছায় ভারতে ঢুকেছে, তাদের জন্য প্রযোজ্য।’ অ্যাডভোকেট জেনারেল বললেন, এই ব্যাখ্যা ঠিক নয়। ভারতের আকাশসীমায় যদি বিমান ভেঙে পড়ে, তাহলে তো জীবিত বিদেশিদের জন্য এ আইন খাটানো যাবে না। কেরালা হাইকোর্টের এক সদস্যবিশিষ্ট বিচারপতি সি এ ভায়ডিয়ালিঙ্গম এই যুক্তিই মেনে নিলেন। কিন্তু ওই রায় পুরো ঠিক ছিল বলে মানা যায় না। আবার ওই আইনের যে ব্যাখ্যা আজও অপরিবর্তিত, সেখানে তো এটাই পরিষ্কার যে আদালতসহ কোনো কর্তৃপক্ষের দিকে তাকাতে হবে না। মোদিজির মন্ত্রিসভার ইচ্ছাই চূড়ান্ত। বারনার্ডোর ঘটনা থেকেও সালাহ উদ্দিনের বিষয়টি আলাদা। বিমান ভেঙে না পড়লেও অন্তত ৩০ শতাংশ বাংলাদেশি-সমর্থিত দল বিএনপির স্বীকৃত মুখপাত্র সালাহ উদ্দিন হয়তো দেশটিতে অনিচ্ছায়ই পতিত হয়েছেন। তাহলে ভারত তাঁকে কেন সসম্মানে ফেরত দেবে না?
টাইমস অব ইন্ডিয়ায় উল্লিখিত তদন্ত নির্ভরযোগ্য ধরে নিই। তাই বলি, টেকনিক্যাল দিকে বেশি জোর দিয়ে একজন মামুলি অপরাধী হিসেবে সালাহ উদ্দিনের বিচার করা হলে তা ভারতীয় গণতন্ত্রের জন্য গৌরবজনক হবে না। দালাই লামাকে আশ্রয় দিয়েছে ভারত। লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসে বহাল তবিয়তে আছেন মার্কিন জাতীয় শত্রু জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ। অপরাধী বিবেচনায় সালাহ উদ্দিনের মাপের একজন মানুষের বিচার বাংলাদেশি রাজনীতিকদের জন্য ভালো উদাহরণ হবে না। আওয়ামী লীগের উচিত ভারতকে সহায়তা দেওয়া। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উচিত হবে সালাহ উদ্দিনের স্ত্রীর মানবিক আবেদনে সাড়া দেওয়া। তাঁকে ফিরিয়ে আনতে সহায়তা দেওয়া। আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ঠিকই বলেছিলেন, ‘তাঁর অন্তর্ধান সব রাজনীতিকের জন্য একটি অশনিসংকেত।’
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

বেতন কাঠামো চূড়ান্ত by মিজান চৌধুরী ও উবায়দুল্লাহ বাদল

সর্বোচ্চ বেতন ৭৫ হাজার টাকা ও সর্বনিম্ন ৮ হাজার ২৫০ টাকা নির্ধারণ করে ২০টি গ্রেডে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অষ্টম পে-স্কেল চূড়ান্ত করা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ ও মুখ্য সচিবের বেতন ধরা হয়েছে ৯০ হাজার টাকা (নির্ধারিত) এবং সিনিয়র সচিবের বেতন ৮৪ হাজার টাকা (নির্ধারিত)। তবে নতুন বেতন কাঠামোতে বাদ দেয়া হয়েছে সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল। এই বেতন ১ জুলাই থেকে দুই ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।
বুধবার অষ্টম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করতে গঠিত সচিব কমিটি তাদের প্রতিবেদন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে জমা দিয়েছে। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে বর্তমান বরাদ্দের চেয়ে অতিরিক্ত ১৩ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে বলে পর্যালোচনা কমিটি সূত্র জানিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বুধবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘সচিব কমিটির প্রতিবেদনটি আমি পর্যালোচনা করে দেখব এবং সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করব। বাজেট নিয়ে ব্যস্ততার কারণে ৪ জুনের আগে এটা নিয়ে কিছু করা সম্ভব হবে না। পে-স্কেল ঘোষণা করতে জুলাই-আগস্ট মাস লেগে যেতে পারে। তবে যখনই এটা ঘোষণা করা হোক না কেন পহেলা জুলাই থেকে এটা কার্যকর হবে।’
এতে নিত্যপণ্যের বাজারে কতটা প্রভাব পড়বে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটার কোনো ইমপ্যাক্ট হয় না।’
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘প্রত্যেকেরই বেতন বাড়ানো উচিত। প্রতি বছর অটোমেটিক্যালি হওয়া উচিত। প্রতিবেদনে এটি সুপারিশ করা হয়েছে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত বেতন কমিশন গত ২১ ডিসেম্বও যে প্রতিবেদন দিয়েছিল তাতে ১৬টি গ্রেডে বেতন কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে পাঁচ সদস্যের সচিব কমিটির সুপারিশে আগের মতো ২০টি গ্রেড রাখার পক্ষে মত দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এখানে ২০টি ধাপই রয়েছে। আমার যেটা মনে হয়, এটাকে আর টাচ করা উচিত হবে না।’
পর্যালোচনা কমিটির সুপারিশ : পে-স্কেল পর্যালোচনা কমিটির সুপারিশে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিবের বেতন ৯০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ ছিল এক লাখ টাকা। আর সিনিয়র সচিবের বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ৮৪ হাজার টাকা। এক্ষেত্রে কমিশনের সুপারিশ ছিল ৮৮ হাজার টাকা।
পর্যালোচনা কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, গ্রেড-এক সচিবের বেতন ৭৫ হাজার টাকা, গ্রেড-দুই ৬৪ হাজার ৬০০ টাকা, গ্রেড-তিন ৫৬ হাজার ৫০০ টাকা, গ্রেড-চার ৫০ হাজার টাকা, গ্রেড-পাঁচ ৪৩ হাজার টাকা, গ্রেড-ছয় ৩৫ হাজার ৫০০ টাকা, গ্রেড-সাত ২৯ হাজার টাকা, গ্রেড-আট ২৩ হাজার টাকা, গ্রেড-নয় ২২ হাজার টাকা, গ্রেড-দশ ১৬ হাজার টাকা, গ্রেড-এগার ১২ হাজার ৫০০ টাকা, গ্রেড-বারো ১১ হাজার ৩০০ টাকা, গ্রেড-তের ১১ হাজার টাকা, গ্রেড-চৌদ্দ ১০ হাজার ২০০ টাকা, গ্রেড-পনেরো ৯ হাজার ৭০০ টাকা, গ্রেড-ষোল ৯ হাজার ৩০০ টাকা, গ্রেড-সতেরো ৯ হাজার টাকা, গ্রেড-আঠারো ৮ হাজার ৮০০ টাকা, গ্রেড-উনিশ ৮ হাজার ৫০০ এবং গ্রেড-বিশ (সর্বনিু) ৮ হাজার ২৫০ টাকা। কমিশন সর্বনিু বেতন ৮ হাজার ২০০ টাকা করার প্রস্তাব করেছিল। এক্ষেত্রে পে-স্কেল পর্যালোচনা কমিটি আরও ৫০ টাকা বাড়িয়েছে।
কমিশনের সুপারিশ : অষ্টম জাতীয় কমিশন ২০ গ্রেডের বিপরীতে ১৬টি গ্রেডের সুপারিশ করেছিল। এক্ষেত্রে মন্ত্রিপরিষদ ও মুখ্য সচিবের বেতন এক লাখ টাকা, সিনিয়র সচিবের বেতন ৮৮ হাজার টাকা নির্ধারণ করার সুপারিশ করেছিল। এছাড়া গ্রেড-এক ৮০ হাজার টাকা, গ্রেড-দুই- ৭০ হাজার টাকা, গ্রেড-তিন ৬০ হাজার টাকা, গ্রেড-চার ৫২ হাজার টাকা, গ্রেড-পাঁচ ৪৫ হাজার টাকা, গ্রেড-ছয় ৩৭ হাজার টাকা, গ্রেড-সাত ৩২ হাজার টাকা, গ্রেড-আট ও নয় মিলে গ্রেড-আট ২৫ হাজার টাকা, গ্রেড-নয় ১৭ হাজার টাকা, গ্রেড-দশ ১৩ হাজার টাকা, গ্রেড-১১ ও ১২ মিলে গ্রেড-এগারোতে ১১ হাজার ৫০০ টাকা, গ্রেড-বারো ১০ হাজার ৫০০ টাকা, গ্রেড-তেরোতে ১০ হাজার টাকা, গ্রেড-চৌদ্দ ৯ হাজার ৫০০ টাকা, গ্রেড-১৫ ও ১৬ মিলে গ্রেড পনেরো ৯ হাজার টাকা এবং ১৬-২০ মিলে গ্রেড ষোল হচ্ছে ৮ হাজার ২০০ টাকা।
নতুন বেতন স্কেল প্রসঙ্গে পে-স্কেল পর্যালোচনা সংক্রান্ত সচিব কমিটির প্রধান ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা বুধবার নিজ দফতরে যুগান্তরকে বলেন, কমিশনের সুপারিশ আমরা পর্যালোচনা করে তা অর্থমন্ত্রীর কাছে জমা দিয়েছি। অর্থ মন্ত্রণালয় তা দেখে যত দ্রুত সম্ভব মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের জন্য পাঠাবে। সুপারিশে ২০টি ধাপ রাখা হয়েছে স্বীকার করলেও এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব আরও বলেন, “কমিটির সুপারিশ কমিশনের সুপারিশ থেকে কম হবে এটাই স্বাভাবিক। অতীতেও তাই হয়েছে। কমিশনের রিপোর্ট দাখিলের পর বাজারের ওপর কোনো প্রভাব পড়েনি, তাই এ পর্যায়েও হওয়ার কোনো যুক্তি নাই।”
অষ্টম জাতীয় বেতন কমিশনের অধিকাংশ সুপারিশ বহাল রেখেছে পে-স্কেল পর্যালোচনা সংক্রান্ত সচিব কমিটি। তবে টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাদ দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে বলা হয় টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড নিয়ে বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে। ইতোমধ্যে আদালতে এ সংক্রান্ত মামলা হয়েছে একাধিক। ফলে কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী এ দুটি সুবিধা বাদ দিয়েছে পর্যালোচনা কমিটি। প্রসঙ্গত, ১৯৮১ সালে ক্যাডার সার্ভিসে টাইম স্কেল চালু হলেও ১৯৮৩ সাল থেকে তা কার্যকর হয় নন ক্যাডার পদেও। সত্তর দশকে চালু হয়েছে সিলেকশন গ্রেড।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পর্যালোচনা কমিটির একজন সদস্য যুগান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী বেতন কাঠামোতে ১৬ ধাপের বিষয়ে একমত ছিলেন। কিন্তু ১৬ ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা খুবই জটিল হবে- এটি প্রধানমন্ত্রীকে জানানো হলে তিনি বিষয়টি পর্যালোচনা কমিটিকেই চূড়ান্ত করার নির্দেশনা দেন। পর্যালোচনা কমিটি যে সুপারিশ দিয়েছে তা পরিবর্তন করার মতো কিছু নেই উল্লেখ করে কমিটি এ সদস্য আরও বলেন, আগামী মন্ত্রিসভার বৈঠকে নতুন বেতন কমিশন নাও উঠতে পারে। তবে জুনের আগেই বিষয়টির ফয়সালা করার নির্দেশনা রয়েছে।
উল্লেখ্য, ২১ ডিসেম্বর প্রায় সাড়ে ১২ লাখ সরকারি চাকরিজীবীদের শতভাগ বেতন বাড়ানোর সুপারিশ করে অষ্টম বেতন কমিশনের চেয়ারম্যান বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন অর্থমন্ত্রীর কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছিলেন। অর্থমন্ত্রী কমিশনের রিপোর্ট পেয়ে ১ জানুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেন। ওই কমিটি টানা চার মাস ১২ দিন পর্যালোচনা করে এ সুপারিশ পেশ করেছে।

সালাহউদ্দিনের দেশে ফেরা বিলম্বিত হতে পারে- রহস্য বাড়ছেই

বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। দুই মাস কোথায় ছিলেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদ। কিভাবেইবা তিনি শিলংয়ে গিয়ে হাজির হলেন। একটি বিষয় পরিষ্কার। ১০ই মার্চ রাতে উত্তরার একটি বাড়িতেই ছিলেন সালাহউদ্দিন আহমেদ। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের মানসিক হাসপাতালে মঙ্গলবার অল্প সময়ের জন্য সাংবাদিকরা বিএনপির এই মুখপাত্রের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পান। এ সময় সালাহউদ্দিন আহমেদ পরিষ্কার করেই বলেন, তাকে উত্তরার বাড়ি থেকে অপহরণ করা হয়েছিল। সোমবার চোখ বাঁধা অবস্থায় তাকে নামিয়ে দেয়া হয় শিলংয়ে। তবে কারা তাকে অপহরণ করেছে এ ব্যাপারে তিনি কিছু বলতে পারেননি। এ সময় পুলিশ তাকে আর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে দেয়নি। পরে তাকে শিলংয়ের সিভিল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়, উত্তরা থেকে শিলং প্রায় ৩৮৯ কিলোমিটারের যাত্রাপথ কিভাবে অতিক্রম করলেন সালাহউদ্দিন আহমেদ। কারাইবা তাকে চোখ বেঁধে নিয়ে গেল। একটি আন্তর্জাতিক সীমান্ত এভাবে অতিক্রম করতে তিনি সক্ষম হলেন কিভাবে। সময় যত গড়াচ্ছে, রহস্য তত বাড়ছে।
গতকাল পরিস্থিতির আর তেমন কোন পরিবর্তন হয়নি। এদিন হাসপাতালে ছিল কড়াকড়ি। সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে কাউকেই কথা বলার সুযোগ দেয়নি পুলিশ। আর পুলিশও তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করতে পারেনি। শিলংয়ের পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট বিবেক সিয়াম জানিয়েছেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রিলিজ করে দেয়ার পর সালাহউদ্দিন আহমেদকে আদালতে হাজির করা হবে। আদালত যদি আদেশ দেন তবে তাকে পুশব্যাক করা হবে। তিনি বলেন, সালাহউদ্দিনের বিষয়টি এরই মধ্যে দিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশনকে জানানো হয়েছে। যদিও স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানিয়েছেন, আমরা এখনও অফিসিয়ালি কাগজপত্র হাতে পাইনি। তিনি বলেন, সালাহউদ্দিন এত দিন ভারতে আত্মগোপনে ছিলেন। তাদের একটি আইন আছে, আমাদেরও একটি আইন আছে। তাকে ফেরানোর ব্যাপারে মুখ্য ভূমিকা থাকবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র মনিরুল ইসলাম বলেছেন, সালাহউদ্দিনকে ফেরাতে প্রয়োজনে ইন্টারপোলের সহযোগিতা নেয়া হবে। ওদিকে ভিসা না পাওয়ায় গতকালও সালাহউদ্দিন আহমেদের স্ত্রী হাসিনা আহমেদ ভারত যেতে পারেননি।
অমিতাভ ভট্টশালীর বর্ণনা: গত সন্ধ্যায় সম্প্রচারিত খবরে বিবিসি বাংলা সরাসরি কথা বলে তাদের সংবাদদাতা অমিতাভ ভট্টশালীর সঙ্গে। এ সময় অমিতাভ ভট্টশালী জানান, শিলংয়ের যে হাসপাতালে সালাহউদ্দিন আহমেদ চিকিৎসাধীন আছেন, তার কাছে কোন সাংবাদিককে ভিড়তে দেয়া হচ্ছে না। তিনি হাসপাতালে যে সেলে ভর্তি আছেন, সেখানে আরও বিচারাধীন ৮ জন বন্দি রয়েছেন। পুলিশ কড়া নির্দেশ দিয়েছে, তার সঙ্গে কথা বলা যাবে না। সেখানকার নার্স ও ডাক্তাররাও একই কথা বলেছেন। আগের একটিমাত্র স্থানীয় পত্রিকা সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে কথা বলতে পেরেছে। সেটা জানাজানি হওয়ার পর সেখানে আরও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। সালাহউদ্দিন আহমেদ কিভাবে সেখানে গেছেন তার কাছ থেকে কিছুই জানা যায়নি। পুলিশ তাকে জেরা করতে পারেনি। কারণ তিনি চিকিৎসাধীন। অমিতাভ ভট্টশালী আরও জানান, তিনি কয়েকজন পুলিশের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাদের মধ্যে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ তাকে জানিয়েছে, সোমবার সকালে ঘণ্টাখানেক সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে তারা কথা বলেছে। সোমবার ভোর সাড়ে ৫টায় কয়েকজন ব্যক্তি মুখ ঢাকা অবস্থায় তাকে শিলংয়ের পলোগ্রাউন্ড মাঠে ফেলে যায়। সালাহউদ্দিন আহমেদের মুখও ঢাকা ছিল। পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সবার দৃষ্টি এড়িয়ে প্রায় ৮০ কিলোমিটার আন্তর্জাতিক সীমানা পেরিয়ে তিনি কিভাবে এলেন সেটা এক রকম অবিশ্বাস্য। কয়েকজন প্রাতঃভ্রমণকারী তাদের খবর দেন- এক ব্যক্তি উদভ্রান্তের মতো ঘোরাফেরা করছেন। তিনি কয়েকজনকে ওই জায়গাটার নামও জিজ্ঞেস করেন। তখনই তাকে পুলিশ চৌকিতে নিয়ে আসে এবং মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করে। সে সময় যারা কথা বলেছেন, তারা আমাকে জানিয়েছেন, মোটামুটিভাবে সালাহউদ্দিন আহমেদের পরিচ্ছন্ন পোশাক-আশাক ছিল। হাতে একটা প্লাস্টিক ব্যাগে আরও একসেট জামা ছিল। কিন্তু কোন টাকা-পয়সা ছিল না। তিনি নিজেই পরিচয় দেন বাংলাদেশের সাবেক একজন মন্ত্রী বলেন এবং তাকে অপহরণ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। এ ছাড়া মুখঢাকা অবস্থায় ফেলে রাখার কথাটাও জানান। তবে গত দুই মাস তিনি কোথায় ছিলেন, কিভাবে ছিলেন কিংবা শিলংয়ে কিভাবে পৌঁছালেন- সে বিষয়ে কিছু জানাতে পারেননি তিনি। তবে কথাবার্তার অসংলগ্নতার কারণে তাকে পুলিশ আটক করে মানসিক হাসপাতালে নিয়ে যায়। তবে সেখানকার চিকিসৎকরা জানিয়েছেন, তিনি সুস্থ আছেন। এখন তিনি সিভিল হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের ডি জে গোস্বামীর অধীনে চিকিৎসাধীন। সালাহউদ্দিন আহমেদ চিকিৎসকদের জানিয়েছেন, তার হৃদরোগের পুরনো কিছু সমস্যা আছে। গতকাল তার কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। ডি জে গোস্বামী জানিয়েছেন, তার ইসিজির রিপোর্ট স্বাভাবিক। অন্যান্য পরীক্ষার রিপোর্ট কাল (বৃহস্পতিবার) পাওয়া যাবে। তবে তার অবস্থা স্থিতিশীল। কথাবার্তার অসংলগ্নতার কোন লক্ষণ নেই। পুলিশ এখন কি করবে জানতে চাইলে অমিতাভ বলেন, অবৈধ অনুপ্রবেশের কারণে পুলিশ সালাহউদ্দিন আহমেদকে গ্রেপ্তার করেছে। চিকিৎসাধীন থাকার কারণে তাকে আদালতে হাজির করা যায়নি। ওই মামলায় আইনে যা যা আছে তা করা হবে। অন্যান্য অনুপ্রবেশকারীর ক্ষেত্রে যা যা করা হয় তার ক্ষেত্রেও তা-ই করা হবে। তার বিরুদ্ধে দ্রুত চার্জশিট দেয়া হবে। এর আগে জেরা করা হবে- সেই প্রস্তুতি চলছে।
চোখ বেঁধে রাখা হতো সালাহউদ্দিনকে: শিলং টাইমস পত্রিকার সম্পাদক মানস চৌধুরী লিখেছেন, পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, কি করে এখানে এলাম কিছুই জানি না। কিছু লোক চোখ বাঁধা অবস্থায় গাড়িতে করে আমাকে এখানে ফেলে গেল। তারা কারা তা-ও জানি না। সালাহউদ্দিন পুলিশকে বলেন, আমাকে ঢাকার উত্তরার বাসা থেকে অপহরণ করা হয়। তারা আমাকে বন্দি করে রেখেছিল। যারা আমাকে বন্দি করেছিল, তারা সব সময় চোখ বেঁধে রেখেছে। আমি কিছুই দেখতে পাইনি। তারা একটি গাড়িতে করে আমাকে নিয়ে আসে। এরপর ফেলে যায়। আমি কোথায় তার কিছুই বুঝতে পারছি না। আমার কাছে সব অচেনা মনে হচ্ছে।
সরকারের সহযোগিতা চান হাসিনা আহমেদ: বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন তার স্ত্রী সাবেক এমপি হাসিনা আহমেদ। একই সঙ্গে দ্রুত স্বামীর কাছে যেতে চান বলে জানিয়েছেন তিনি। গতকাল দুপুরে গুলশানের বাসায় সাংবাদিকদের কাছে তিনি এ কথা বলেন। হাসিনা আহমেদ বলেন, আমার স্বামীকে দেশে ফিরিয়ে আনার যথাযথ প্রক্রিয়া আমার জানা নেই। আমি আগে তার কাছে যেতে চাই। তারপর দেখবো দেশে ফিরিয়ে আনতে কি করণীয় আছে। তখন বিএনপি ও সিনিয়রদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবো। অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে সালাহউদ্দিনকে মেঘালয় পুলিশ আটকের বিষয় ও আইনি আনতে জটিলতার বিষয় জানতে চাইলে হাসিনা আহমেদ বলেন, আমরা ভারতে পৌঁছানোর পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবো। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকারের সহযোগিতা সব সময় কামনা করছি। সরকারের সহযোগিতা ছাড়া কিছুই সম্ভব নয়। ভারতের ভিসা পেলেই যত দ্রুত সম্ভব শিলংয়ের উদ্দেশে রওনা হতে চান বলে জানান তিনি। সাবেক এই এমপি বলেন, ভিসা পেতে ভারতীয় হাইকমিশনে আবেদনপত্র জমা দিয়েছি। ভিসার আবেদনপত্রে সড়ক ও আকাশপথে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছি। যে পথ সুবিধাজনক হবে, সে পথেই তারা যাবেন। তবে হাসপাতাল পরিবর্তন হওয়ায় স্বামীর সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে পারেননি বলে জানান তিনি। হাসিনা আহমেদ বলেন, আমার স্বামীকে অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেছে। এজন্য দেশবাসীসহ সবার প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তাদের ভিসার জন্য ভারতীয় হাইকমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান। হাসিনা আহমেদ, তার ভগ্নিপতি মাহবুবুল করিমসহ চারজনের নামে ভিসার আবেদন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
আইনি সহায়তা দেবেন জয়নাল আবেদিন: নিখোঁজের ৬৩ দিন পর ভারতের মেঘালয়ে সন্ধান পাওয়া যায় সালাহউদ্দিন আহমেদকে। অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে সেখানকার পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। এরপর তার বিরুদ্ধে একটি মামলা করা হয়। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সালাহউদ্দিনকে দেশে ফিরিয়ে আনতে মামলায় আইনি সহায়তা দেয়ার জন্য তার উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিনকে দায়িত্ব দিয়েছেন। সেই অনুযায়ী সালাহউদ্দিনের স্ত্রী হাসিনা আহমেদও তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। হাসিনা আহমেদ মেঘালয়ে পৌঁছার পর তার মামলার বিষয়ে বিস্তারিত জানাবেন। বাংলাদেশ থেকে সব ধরনের আইনি সহায়তা দেবেন জয়নাল আবেদিন।
হঠাৎ অসুস্থ হাসিনা আহমেদ: এদিকে গতকাল গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলার পর পরই হঠাৎ অসুস্থবোধ করছেন হাসিনা আহমেদ। এরপর দ্রুত তাকে ইউনাইটেড হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে বিকালে বাসায় ফেরেন। এ সময় হাসিনা আহমেদ বলেন, হঠাৎ শ্বাসকষ্টটা একটু বেড়ে গিয়েছিল। তাই হাসপাতালে গিয়েছিলাম। ডাক্তার ওষুধপত্র ও কয়েকটা টেস্ট দিয়েছেন। ওষুধগুলো খাচ্ছি এবং এখন একটু সুস্থ বোধ করছি।
‘সালাহউদ্দিন আহমেদকে আইনি প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনা হবে’
স্টাফ রিপোর্টার: ভারতের মেঘালয়ে উদ্ধার হওয়া বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার পর গ্রেপ্তার করা হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, সালাহউদ্দিন আহমেদকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। তার বিরুদ্ধে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় একাধিক মামলা রয়েছে। এছাড়া এই দুই মাস তিনি কোথায় ছিলেন আর কিভাবেই বা মেঘালয়ে গিয়েছিলেন এসব জানতেও পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে তাকে। তবে অপর একটি সূত্র বলছে, সালাহউদ্দিনকে ফিরিয়ে আনতে সরকারিভাবে কোন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। বরং অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে আদালতের রায়ে সেখানকার জেলে গেলেই সরকারের জন্য ভালো। দণ্ড শেষে তাকে পুশব্যাক করা হলে তখন তাকে গ্রেপ্তার করা হবে। ইতিমধ্যে অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে মেঘালয়ে সালাহউদ্দিনকে গ্রেপ্তারের পর সংশ্লিষ্ট আইনে মামলাও দায়ের করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, ‘বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনা হবে। সেক্ষেত্রে উভয় দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মুখ্য ভূমিকা পালন করবে।’ তিনি বলেন, ‘সালাহউদ্দিনকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ তুলে নিয়ে যায়নি। র‌্যাব বা পুলিশের কাছে সালাহউদ্দিন আছে বিএনপির এমন অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।’ স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সালাহউদ্দিন সাহেব নিজেই আত্মগোপন করে ছিলেন এবং সবসময় স্থান পরিবর্তন করেছেন।’ পুলিশ সূত্র জানায়, সালাহউদ্দিনের বিষয়টি নিয়ে গতকাল পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠক করেছেন। সেখানে সালাহউদ্দিনকে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তাকে ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলের সহায়তা নেয়া হতে পারে বলেও একটি সূত্র জানিয়েছে। তবে সালাহউদ্দিনকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সালাহউদ্দিন আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার পর তিনি কিভাবে সীমান্ত পাড়ি দিয়েছেন সেই রহস্য উদ্ঘাটন করা হবে। সূত্র জানায়, সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে যোগাযোগ করে বিশেষভাবে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তবে সেটা করা হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। আবার তা করলেও প্রথমে নিখোঁজ রহস্য উদ্ঘাটন করতে তাকে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হবে।
এদিকে মেঘালয়ের পূর্ব খাসি হিলের পুলিশ সুপার বিবেক সিয়েম সাংবাদিকদের বলেছেন, আদালত যদি নির্দেশনা দেয় তাহলে দ্রুত তাকে বাংলাদেশে পুশব্যাক করা হবে। পুরোটাই নির্ভর করবে আদালতের নির্দেশনার ওপর। পুলিশের ওই কর্মকর্তা আরও বলেছেন, তারা বিষয়টি ভারতের বাংলাদেশ হাইকমিশন ও কলকাতায় বাংলাদেশ মিশনেও জানিয়েছেন।

খুনের ৪৫ মিনিট আগেই অবস্থান নেয় ঘাতকরা by ওয়েছ খছরু

ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশ খুনের ৪৫ মিনিট আগেই এলাকায় অবস্থান নেয় ঘাতকরা। সকাল ৮টার দিকে একটি সাদা মাইক্রোবাস থেকে নামে ৪ ঘাতক। এরপর দুজন দুজন করে দাঁড়িয়ে থাকে গলির দুপাশে। স্থানীয়রা তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বলে মনে করেছিলেন। বাসের জন্য নেমেছে। তাদের নামিয়ে দিয়েই মাইক্রোটি গলির ভেতর ঢুকে যায়। আর খুনের ঘটনায় অংশ নেয়া চার ঘাতকই নুরানী দিঘিরপাড় পূর্বপাড় থেকে হেঁটে হেঁটে গিয়ে মাইক্রোতে উঠে বিকল্প সড়ক দিয়ে চলে যায়। এভাবেই খুনের বর্ণনা দেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
অনন্ত বিজয় দাশ
গতকাল নুরানী দিঘি এলাকায় মানববন্ধনে দাঁড়িয়েছিলেন প্রত্যক্ষদর্শী অনেকেই। তারা ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, খুনিরা চাইলে অনন্তকে সুবিদবাজার মূল রাস্তার গলির মুখেই খুন করতে পারতো। কিন্তু ওই স্থান জনাকীর্ণ হওয়ায় তারা তা করেনি। নিজ বাসা থেকে বের হয়ে যখন হেঁটে হেঁটে সুবিদবাজার পয়েন্টে যাচ্ছিলো তখন সামনে থেকে তাকে ধাওয়া করে খুনিরা। ওখান থেকে ধাওয়ার পর নুরানী দিঘিরপাড়ের নির্জন স্থানে এলে এলোপাতাড়ি কোপায়। এরপর ঘটনাস্থল থেকে তারা চলে যায়। কোপানোর সময় তারা মুখে ‘নারায়ে তাকবীর আল্লাহু আকবর’ বলে। স্থানীয়রা জানান, ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৩০০ ফুট দূরে অবস্থান করছিলো মাইক্রোবাসটি। ওই মাইক্রোবাসটি বিভিন্ন স্থানে পার্কিং করার পর একটি বাসার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। এ সময় মাইক্রোবাসে আরও ২-৩ জন বসা ছিলেন। তারা ‘ব্যাকআপ’ টিম হিসেবে মাইক্রোবাসেই বসা ছিল বলে ধারণা করেন তারা। খুনিরা মাইক্রোতে ওঠার পর হাজীপাড়ার দিকে দ্রুত চলে যায়।
তারা বলেন, ঘটনাস্থল থেকে অনন্ত দাশের বাসার দূরত্ব বেশি না। হামলার সময় অনেকেই অনন্তকে চিনেছেন। এরপরও খুনিরা ফের ঘটনাস্থলে আসতে পারে- এই ভয়ে তারা মাটিতে লুটিয়ে পড়া অনন্তকে উদ্ধার করতে ছুটে যাননি। পওে বোনরা খবর পেয়ে এসে রক্তমাখা দেহ ধরে সবাইকে এগিয়ে আসার অনুরোধ করেন। নিহত অনন্তের ভাই রত্নেশ্বর দাশ সহ পরিবারের লোকজন জানিয়েছেন, খুনিরা চলে যাওয়ার পর প্রায় ২৫ মিনিট অনন্তের রক্তমাখা দেহ রাস্তায় পড়েছিল। এসময় প্রত্যক্ষদর্শী অনেকেই থাকলেও তারা এগিয়ে আসেননি। ঘটনার পরপর অনন্তকে হাসপাতালে নেয়া হলে হয়তো বাঁচানো যেতো বলে মনে করেন তারা। তারা আরও বলেন, খুনিরা পরিকল্পিতভাবেই এ ঘটনা ঘটিয়েছে। খুনের সময় তাদের মুখে মুখোশ পরা ছিল। তবে, চলে যাওয়ার সময় তারা মুখোশ খুলেছে। এলাকার লোকজন তাদের দেখেছেন। তবে কেউ চিনতে পারেননি। তারা বলেন, ব্লগে লেখালেখি ও প্রগতিমনার কারণেই খুন করা হয়েছে অনন্তকে। ওদিকে, পুলিশও জানিয়েছে, খুনের ঘটনার অনেক আগেই খুনিরা এলাকায় অবস্থান করছিল। এর কারণ খুনিরা জানতো প্রতিদিনের মতো অনন্ত ওই রাস্তা দিয়ে বের হবে। তারা পরিকল্পিতভাবেই অনন্তকে খুন করেছে। আর খুনের ঘটনার পর তারা এলাকা ছেড়ে চলে যায়। পুলিশ জানায়, খুনিরা বাইরের না এলাকার সেটি এখনও নিশ্চিত নয়। খুনিরা বাইরের হলেও এলাকার কেউ জড়িত আছে কিনা সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অনন্তর খুনিদের গ্রেপ্তারে গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করার পাশাপাশি প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা যাচাই করা হচ্ছে। খুনের ঘটনার আগে ঘাতকরা বেশ কয়েকবার এলাকায় রেকি করতে পারে বলে ধারণা করেন তারা। এ কারণে খুনের ঘটনার পর শহরের একাধিক গলিময় এলাকা বনকলাপাড়া দিয়ে পালিয়েছে তারা।
সিলেটের এয়ারপোর্ট থানার ওসি গৌসুল হোসেন বলেন, অনন্তের খুনিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে, গতকাল বিকাল পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি বলে জানান তিনি। ওদিকে, ঘটনাস্থল ও অনন্তর বাসা থেকে উদ্ধারকৃত আলামত সহ আনুষঙ্গিক সকল বিষয় নিয়ে তদন্ত করছে পুলিশ।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ওসি নুরুল আলম বলেন, খুনিদের শনাক্ত করতে প্রযুক্তি সহায়তা নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি সম্ভাব্য স্থানগুলোতে গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করা হয়েছে। তিনি বলেন, অনন্তের খুনিরা ধরা পড়বে। এবং তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে। গতকাল এলাকাবাসী অভিযোগ করেছেন, ব্লগার অনন্তের ওপর হামলার ঘটনার পরপরই এয়ারপোর্ট থানা পুলিশকে ঘটনাস্থল থেকে অবগত করেছেন অনেকেই। কিন্তু পুলিশও এলাকায় পৌঁছায় বিলম্বে। আর ঘটনার পর থেকে সুবিদবাজার, বনকলাপাড়া এলাকায় পুলিশি নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। এতে করে পুলিশের ওপর এলাকাবাসীর ক্ষোভ রয়েছে। ব্লগার ও বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অনন্ত বিজয় দাশ খুনের ঘটনার পর গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক বাড়ানো হয়েছে। এর কারণ, বিভাগীয় শহর সিলেটে এর আগে কোন ব্লগারের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেনি। আনসার উল্লাহ বাংলা টিম-৮ এর সদস্যরা এ ঘটনা ঘটিয়েছে কিনা সেটি নিয়েই গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে।  গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ঢাকায় গ্রেপ্তারকৃত জঙ্গিদের কাছ থেকে ৮৪ জনের যে তালিকা পাওয়া গিয়েছিলো সেটিতে নিহত ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশের নাম ছিল প্রথম ১০ জনের মধ্যে। গণজাগরণ কর্মী হিসেবে কোন তালিকায় তার নাম ছিল না। সিলেটের গোয়েন্দারা অনেক আগেই আশংকা করেছিলেন, গণজাগরণ কর্মীদের ওপর হামলার বিষয়টি। এ কারণে গণজাগরণ কর্মীদের নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে তাদের সুপারিশও ছিল উপর মহলে। কিন্তু রাজনৈতিক কঠিন সময়ে সিলেটে কারও ওপর কোন হামলার ঘটনা ঘটেনি। দু’একটি বিচ্ছিন্ন মোবাইল ম্যাসেজের মাধ্যমে গণজাগরণ কর্মী, সিলেট আওয়ামী লীগের শীর্ষ অনেক রাজনৈতিক নেতাকে হুমকি দেয়া হয়েছিল। ওই সময় সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী সহ অনেক নেতার বাসায় ককটেল ও হাতবোমা হামলার ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি শান্ত। কোন রাজনৈতিক অস্থিরতা নেই। এ অবস্থায় হামলা হতে পারে সেটি ছিল ধারণার বাইরে।
হরতাল পালন: গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংগঠক, যুক্তি সম্পাদক, ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশ হত্যার প্রতিবাদে সিলেট মহানগর এলাকায় অর্ধদিবস হরতাল পালিত হয়েছে। বুধবার সকালে নগরীর কোর্ট পয়েন্টে গণজাগরণ মঞ্চ, প্রগতিশীল ছাত্রজোটসহ অন্য প্রগতিশীল সংগঠনের সদস্যরা উপস্থিত হন। পরে সকাল পৌনে ৮টায় সেখান থেকে একটি মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ কওে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে অবস্থান নেয়। এরপর সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে অবিলম্বে খুনিদেও গ্রেপ্তারের দাবি জানান হরতাল সমর্থকরা। হরতালে বড় ধরনের  কোন অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। সকাল ১০টার দিকে পিকেটাররা  কোর্ট পয়েন্টে দুইটি অটোরিকশা ভাঙচুর করে। হরতালে নগরীতে যান চলাচল কিছুটা কম ছিল। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দোকানপাট খুলতে শুরু করে। বাড়ে নাগরিক ব্যস্ততাও। শহীদ মিনারে আয়োজিত সমাবেশে গণজাগরণ সংগঠক রজত কান্তি গুপ্ত, দেবাশীষ দেবু সহ সিনিয়র নেতারা বক্তব্য রাখেন।
মামলা, আসামি চার মুখোশধারী: যুক্তি সম্পাদক, মুক্তমনা ব্লগার ও বিজ্ঞান  লেখক অনন্ত বিজয় দাশ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের বড় ভাই রত্নেশ্বর দাশ মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা চারজনকে আসামি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন এয়ারপোর্ট থানার ওসি তদন্ত নুরুল আলম। তিনি বলেন, মঙ্গলবার রাতে নিহতের বড় ভাই বিমানবন্দর থানায় একটি মামলা করেছেন। মামলার পর রাতে বিমানবন্দর থানাধীন এলাকায় অভিযান পরিচালনার কথা জানিয়েছেন। তবে কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি বলে জানান তিনি। ওসি  গৌসুল হোসেন বলেন, অজ্ঞাতনামা চারজনকে এজাহারে আসামি করা হয়েছে। রাতেই মামলাটি রেকর্ড করা হয়েছে। ওসি তদন্ত নুরুল আলমকে এ মামলার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার রহমত উল্লাহ জানান, অনন্তের হত্যাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য মঙ্গলবার রাতভর অভিযান চালানো হলেও কাউকে পাওয়া যায়নি। চারজন মুখোশধারী এই হত্যাকাণ্ডে অংশ  নেয় বলে আমরা জানতে পেরেছি। পুলিশ তাদের ধরার চেষ্টা করছে।
জয়ের স্টেটমেন্ট মৌলবাদীদের জন্য গ্রিন সিগন্যাল-জাফর ইকবাল: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী, যুুক্তি পত্রিকার সম্পাদক ও ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশের হত্যার প্রতিবাদে এবং দোষীদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছে ‘শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস ক্লাব’। হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে বুুধবার দুপুর সাড়ে ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ভবনের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়। মানববন্ধনে অধ্যাপক জাফর ইকবালসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেন।  মানববন্ধন শেষে একই স্থানে অনুষ্ঠিত হয় প্রতিবাদ সমাবেশ।  অনন্ত দাশ হত্যা সরকারের ব্যর্থতা উল্লেখ করে সমাবেশে অধ্যাপক জাফর ইকবাল বলেন, তোমরা স্বীকার করে নাও সরকারের কাছ থেকে বিশেষ কিছু পাবে না। তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডকে স্পর্শকাতর বিষয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় যে স্টেটমেন্ট দিয়েছেন তা মৌলবাদীদের জন্য একটা গ্রিন সিগন্যাল। জয়ের মন্তব্যে মনে হচ্ছে ‘তোমরা এভাবে হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাও সরকার কিছুই করবো না’। একজন একজন করে মারা হবে সরকার কিছুই করবে না। সরকার যেটা করেছে এবং জয় যেটা বলেছে সেটা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়, আমি এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই। বাংলাদেশে প্রত্যেকটি মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, হত্যাকারীদের প্রশাসন ধরতে পারছে না  সেটা আমি বিশ্বাস করি না। এটা সরকারের ব্যর্থতা। তিনি আরও বলেন, তোমরা যারা সত্যি কথা বলো তোমাদের যেকোন সময় মেওে ফেলা হবে, আমাদের মেরে ফেলা হবে, সরকার কিছুই করবে না। নিজেদের নিরাপত্তা নিজেদেরই নিতে হবে। প্রেস ক্লাবের দপ্তর সম্পাদক জাবেদ ইকবালের পরিচালনায় সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ইয়াসমীন হক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক শরীফ মো. শরাফ উদ্দিন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট শাবি শাখার কমিটি সদস্য ইসরাত রাহি রিশতা এবং সম্মিলিত সামাজিক-সাংস্কৃতিক-স্বেচ্ছাসেবী ও ক্রীড়া জোটের আহ্বায়ক গিয়াস বাবু।
এলাকায় মানববন্ধন: নিহত ব্লগার অনন্ত দাশ খুনের ঘটনায় বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। দুপুরে নগরীর ৭ নং ওয়ার্ডবাসীর উদ্যোগে খুনের ঘটনাস্থল নুরানী দিঘি এলাকায় স্থানীয়রা মানববন্ধন করেন। এ সময় তারা খুনিদের গ্রেপ্তার দাবি করে বলেন, প্রকাশ্য দিবালোকে পাড়ার ভেতর ঢুকে খুনের ঘটনা বিরল। খুনিরা পূর্ব থেকেই পরিকল্পনা করে এই খুন করে। আর এই খুনের ঘটনায় এলাকায় সন্ত্রস্ত অবস্থা দেখা দিয়েছে। স্থানীয়রা বলেন, খুনিদের খুঁজে বের করে শাস্তি নিশ্চিত না করলে মানুষের মনে শান্তি হবে না। আন্দোলনও চলবে। এ সময় সিলেট সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর আফতাব হোসেন খান সহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ বক্তব্য রাখেন।
সংহতি সমাবেশ শুক্রবার: সিলেটে প্রকাশ্য দিবালোকে ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশ খুনের ঘটনায় আগামী শুক্রবার সিলেটে সংহতি সমাবেশের ডাক দিয়েছে গণজাগরণ মঞ্চ। গতকাল আধা বেলা হরতাল কর্মসূচি পালন শেষে এই সংহতি সমাবেশের ডাক দেয়া হয়। শুক্রবার বিকাল ৪টায় সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এ সংহতি সমাবেশে সিলেটের প্রগতিশীল সহ সমমনারা উপস্থিত থাকবেন। সিলেট গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র দেবাশীষ দেবু জানিয়েছেন, অনন্তর খুনিদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবিতে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। পরে আরও কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে জানান তিনি।

ইসলাম প্রশ্নে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি জামায়াত থেকে পিছিয়ে নেই -ভারতীয় রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর মূল্যায়ন

ভারতীয় রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মাইদুল ইসলাম মনে করেন, ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পরে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয় জীবনে ইসলাম অনুসরণের প্রশ্নে এতটাই আপসকামিতা দেখান, আওয়ামী লীগ ও  বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপির মধ্যে সেটা আদর্শগত পার্থক্য ঘুচিয়ে দেয়। আওয়ামী লীগ তখন থেকে ধর্ম প্রশ্নে ‘রূপান্তরণকৃত’ এবং বিএনপির  সঙ্গে এই বিষয়ে একটি ‘পুরোপুরি অভিন্ন চরিত্র’ ধারণ করে।
সম্প্রতি ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রকাশিত ‘লিমিটস অব ইসলামিজম জামায়াত-ই-ইসলামী ইন কনটেম্পরারি ইন্ডিয়া অ্যান্ড বাংলাদেশ’ বইয়ে ওই মন্তব্য ছাপা হয়েছে। বইটির লেখক কলকাতা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ওই বইটি মূলত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরাল থিসিস, লেখক মর্যাদা সম্পন্ন ক্লারেনডন বৃত্তি পান। ২০০৭ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে তিনি থিসিসটি লিখেছেন যেটি এখন বই আকারে বেরুলো।
 অধ্যাপক ইসলাম বলেন, বাংলাদেশী রাজনীতিতে যদি ইসলাম ধর্মের উপস্থিতিকে জামায়াত কতটা ধারণ করে আছে তার সঙ্গে দেশের প্রধান দুই দলের তুলনা করা হয়, তাহলে ভোটাররা দেখবেন যে, জামায়াতের তুলনায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি- দুই দলের কেউ তার চেয়ে পিছিয়ে নেই। বরং বাস্তব অবস্থা এখন এই দাঁড়িয়েছে যে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ে মিলে নিজেদেরকে জনগণের সামনে এভাবে উপস্থাপন করেছে যাতে কিনা ‘ইসলামের একক ঝাণ্ডাধারী’ হিসেবে জামায়াতের মর্যাদা যথেষ্ট খর্ব হয়েছে।’
অধ্যাপক মাইদুল ইসলাম এরপর লিখেছেন যে, ‘একজন পর্যবেক্ষক মন্তব্য করেছেন যে, ‘জামায়াত বাংলাদেশে কখনই বড় রকম জনসমর্থন পায়নি। তার কারণ সাধারণ মানুষ ধর্মপ্রাণ মধ্যপন্থি, তাই মৌলবাদিতা তাদের পছন্দ নয়। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতে ধর্ম হলো ব্যক্তিগত বিষয়, তাই ধর্মকে যারা ‘দলীয় উদ্দেশ্যে’ ব্যবহার করে মানুষ তাদের পছন্দ করে না।
জেনারেল এরশাদ কেন অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করেছিলেন তার কারণ চিহ্নিত করে অধ্যাপক মাইদুল ইসলাম বলেন, এরশাদবিরোধী আন্দোলন চলাকালে বিএনপি নেতারা এটা দাবি করতেন যে, বিএনপিই বাংলাদেশে ইসলামকে ফিরিয়ে এনেছে। সে কারণে এরশাদ ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম প্রতিষ্ঠা করলেন। তবে  তখনই একটি বিষয় হয়ে গেল যে, যদিও ১৯৭২ সালের সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মূলনীতি হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল কিন্তু বাস্তবে আওয়ামী লীগেরই তার প্রতি অঙ্গীকার ছিল দুর্বল। সে কারণে অষ্টম সংশোধনী যখন পাস করা হলো, তখন আওয়ামী লীগ বা বিএনপি কাউকেই এর বিরুদ্ধে বড় আকারে কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে দেখা গেল না। সেটা ছিল একটা অনন্য রাজনৈতিক পরিস্থিতি। কারণ এটা বোঝা যায়নি যে, বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হয়েও তারা ইসলামকে আদৌ রাষ্ট্র ধর্ম হিসেবে দেখতে চেয়েছিল কিনা। বরং এটাই সত্যি যে, ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে বাংলাদেশের রাজপথে জনতার ঢল কেউ কখনও দেখেনি। আবার রাষ্ট্র্রধর্ম কেন করা হলো, তার বিরোধিতা করতেও তারা রাস্তায় নামেনি। তবে একজন ভাস্যকার বলেছেন, এরশাদ যখন এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিলেন তখন বড় দুটি দলের কোনটিই  যে এর বিরুদ্ধে দাঁড়ালো না, তার কারণ হলো- ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি তাদের উভয়ের অঙ্গীকার দুর্বল।’ অধ্যাপক ইসলাম বলেন, আশির দশকের ওই সময়টায় জামায়াত আবার ধর্মনিরপেক্ষ গোষ্ঠীর সঙ্গে রাজথের আন্দোলনে শরিক ছিল।         
তাঁর আরও মূল্যায়ন: ‘১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জামায়াত-ই-ইসলামী যদিও নির্বাচনে বড় রকমের ধাক্কা খেয়েছে কিন্তু তা সত্ত্বেও কোন একটি ইসলামী দল হিসেবে না হলেও ইসলাম ধর্মের আধিপত্য (হেজিমনিক উপস্থিতি) বাংলাদেশ রাজনীতিতে বড় আকারে জেঁকে বসেছে। তবে এই অগ্রগতিকে  একটি মুসলিম দেশে উদারনৈতিক বা মধ্যপন্থি ইসলামের একটি আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হিসেবে বর্ণনা করা যায়, কারণ দেশটির উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠীই ‘খোদাভীরু’। আর সে কারণে এমনকি ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী শেখ হাসিনাকেও ইসলাম ধর্মের প্রতি আনুগত্য থাকার প্রমাণ দিতে হয়। শেখ হাসিনা কতিপয় প্রতীকী পদক্ষেপ গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে এই প্রমাণ রাখেন।’

সালাহ উদ্দিনের খোঁজ মিললেও রহস্যের জট খুলছে না

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমদ ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলং শহরের সিভিল হাসপাতালে পুলিশি পাহারায় আছেন। সুস্থ হলে আগামী সপ্তাহে তাঁকে আদালতে সোপর্দ করা হবে বলে সেখানকার পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। হাসপাতালে তাঁর সঙ্গে কাউকে দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না।
নিখোঁজ হওয়ার দুই মাস পর গত সোমবার ভারতের মেঘালয়ের শিলংয়ে সালাহ উদ্দিন আহমদের হদিস মেলে। দুপুরে তাঁর স্ত্রী হাসিনা আহমদ জানান, শিলংয়ের হাসপাতাল থেকে তিনি স্বামীর ফোন পেয়েছেন। অন্যদিকে শিলং পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, শিলং শহরের গলফ লিংক এলাকায় উদ্ভ্রান্তের মতো ঘোরাফেরা করার সময় তাঁকে আটক করা হয়। সে দেশে অনুপ্রবেশের মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আটক করার সময় সালাহ উদ্দিন উদ্ভ্রান্তের মতো ঘোরাফেরা করছিলেন বলে স্থানীয় পুলিশ দাবি করলেও ছবিতে তাঁর পরনের পোশাক পরিষ্কারই দেখা যায়। পায়ের জুতাও ছিল চকচকে। সেভ করা মুখে পরিপাটিভাবে চশমা আঁটা। প্রশ্ন উঠেছে, অপহরণের পর দুই মাস আটক থাকা অবস্থায় কোনো মানুষের পক্ষে এমন পরিপাটি থাকা সম্ভব কি না। তা ছাড়া সীমান্ত পার হয়ে ওই জায়গায় তিনি কীভাবে পৌঁছালেন, এত দিন কোথায়, কী অবস্থায় ছিলেন, সেই রহস্য রয়েই গেছে। গতকাল বিভিন্ন মহলে এ বিষয়টি আলোচিত ছিল।
তবে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, সালাহ উদ্দিনকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তুলে নিয়ে যায়নি। বিএনপির অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলো। তিনি নিজেই আত্মগোপনে ছিলেন। গতকাল বুধবার বেলা ১১টার দিকে তেজগাঁও আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের কাছে তিনি এ মন্তব্য করেন।
এদিকে হাসিনা আহমদ গতকাল সাংবাদিকদের জানান, সালাহ উদ্দিনের সঙ্গে তাঁর আর কোনো কথা হয়নি। যত দ্রুত সম্ভব স্বামীর কাছে তিনি যেতে চান। এ জন্য তিনি ভিসা পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
সালাহ উদ্দিনের ব্যাপারে জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলে শিলং টাইমস-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মানস চৌধুরী গতকাল সন্ধ্যায় টেলিফোনে প্রথম আলোকে বলেন, সিভিল হাসপাতালের একটি কক্ষে সালাহ উদ্দিনকে রাখা হয়েছে। সেখানে কাউকে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। গতকাল গণমাধ্যমের কোনো সংবাদকর্মী তাঁর কাছে যেতে পারেননি। তিনি জানান, চিকিৎসকেরা তাঁকে বলেছেন, সালাহ উদ্দিনের হৃদ্রোগ ও লিভারের সমস্যা আছে। হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে।
উদ্ভ্রান্তের মতো ঘোরাফেরা করলেও পরনের পোশাক পরিষ্কারই দেখা যায়। পায়ের জুতাও ছিল চকচকে। সেভ করা মুখ, পরিপাটি চশমা। দুই মাস আটক থাকা অবস্থায় এমন পরিপাটি থাকা সম্ভব? ‘‘সালাহ উদ্দিনকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তুলে নিয়ে যায়নি। বিএনপির অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলো। তিনি নিজেই আত্মগোপনে ছিলেন’’ আসাদুজ্জামান খান কামাল স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আটক রাখার ব্যাপারে সালাহ উদ্দিন চিকিৎসক ও পুলিশকে কিছু বলেছেন কি না জানতে চাইলে মানস চৌধুরী বলেন, পুলিশ তাঁকে জানিয়েছেন, সালাহ উদ্দিন এখনো ঠিকমতো কিছু বলতে পারছেন না। কোনো কথা জানতে চাইলে চুপ থাকছেন। পুলিশ তাঁর সুস্থতার জন্য অপেক্ষা করছে। স্থানীয় পুলিশের ধারণা, মঙ্গলবার ভোরে তাঁকে একটি মারুতি জিপসি গাড়িতে করে শিলং শহরে পৌঁছে দেওয়া হয়। সকাল সাড়ে ১০টায় পুলিশ তাঁকে আটক করার আগ পর্যন্ত তিনি একটি স্থানেই বসে ছিলেন। তবে তিনি আগে থেকেই ভারতে ছিলেন, নাকি সীমান্তের ওপার থেকে পাঠানো হয়েছে, তা পুলিশ বলতে পারেনি। এমনকি তাঁর পরনের পোশাক ও পায়ের জুতা পরিষ্কার ছিল। চোখ বাঁধা থাকার কথা বলা হলেও ছবিতে তাঁর চোখে চশমা দেখা যাচ্ছে।
এদিকে স্বামীর খোঁজ পাওয়ার পর গতকালই ভিসার জন্য আবেদন করেন সালাহ উদ্দিনের স্ত্রী। ভারতীয় হাইকমিশন থেকে এ ব্যাপারে কিছু জানানো হয়েছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওনারা বলেছেন, আমরা চেষ্টা করছি। হবে ইনশা আল্লাহ।’
ভিসা হলে আজকেই যাবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে হাসিনা বলেন, ‘আশা করছি। যদি ভিসা হয়ে যায়, টিকিট পাব কি না, তারপর কীভাবে যাব, কোন দিক দিয়ে গেলে সুবিধা হবে, সেগুলো ডিসাইড করে তারপরে যাব।’
শিলংয়ের পুলিশ বলছে, ওনার সঙ্গে পাসপোর্ট নেই। তাই তাঁকে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াটা দীর্ঘ হতে পারে। এ নিয়ে প্রশাসন কিংবা সরকারের কারও সঙ্গে আলোচনা হয়েছে কি না, জানতে চাইলে হাসিনা বলেন, ‘আমরা আগে ওখানে পৌঁছাব। পরিস্থিতি বোঝার পর তারপর সিদ্ধান্ত নেব।’
স্বামীকে ফিরিয়ে আনতে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন কি না, জানতে চাইলে সালাহ উদ্দিনের স্ত্রী বলেন, ‘সরকারের সহযোগিতা তো সব সময়ই কামনা করে আসছি। সরকারের সহযোগিতা ছাড়া তো কোনো কিছুই করা সম্ভব নয়। অবশ্যই সরকারের সহযোগিতা চাই।’
গত ১০ মার্চ রাতে উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরের ১৩-বি নম্বর সড়কের একটি বাড়ির দোতলার ফ্ল্যাটে ঢুকে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা সালাহ উদ্দিন আহমদকে ধরে নিয়ে যায়। হাসিনা আহমদ তখন অভিযোগ করেন, স্বামীর খোঁজ চেয়ে পরদিন রাতে তিনি গুলশান থানা ও উত্তরা থানায় জিডি করতে চাইলেও পুলিশ তা নেয়নি। সরকারের নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সালাহ উদ্দিনকে নিয়ে গেছে বলে তিনি অভিযোগ করেছিলেন। বিএনপির পক্ষ থেকেও একই অভিযোগ করা হয়।

উদ্বেগের অবসান- সালাহ উদ্দিনকে দ্রুত ফিরিয়ে আনুন

অবিশ্বাস্য ঘটনা! সবাই ভাবছিলেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমদকে আর ফিরে পাওয়া যাবে না। কিন্তু নিখোঁজ হওয়ার দুই মাস পর হঠাৎ জানা গেল, তিনি মেঘালয়ের রাজধানী শিলংয়ের একটি হাসপাতালে আছেন। সন্দেহ-অবিশ্বাসের প্রেক্ষাপটে সালাহ উদ্দিন আহমদের বেঁচে থাকার সংবাদ নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক। কিন্তু তিনি কীভাবে অপহৃত হয়ে প্রতিবেশী দেশে গেলেন বা তাঁকে নিয়ে যাওয়া হলো, সেই প্রশ্নের উত্তরও পাওয়া জরুরি।
সালাহ উদ্দিন জানিয়েছেন, তাঁকে উত্তরার বাসা থেকে অপহরণের পর বন্দী করে রাখা হয়। সব সময় তাঁর চোখ বেঁধে রাখা হতো। পরে একটি গাড়িতে করে তাঁকে শিলংয়ে নিয়ে ফেলে আসা হয়। তাঁর কাছে ভ্রমণের কাগজপত্র না থাকায় আটক করা হয়েছে। কিন্তু তিনি যে বাংলাদেশের একজন সাবেক প্রতিমন্ত্রী, এ তথ্য জানার পর হাসপাতাল ও পুলিশ কর্তৃপক্ষ তাঁর সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করে প্রত্যাশিত মর্যাদা দিয়েছে।
কে বা কোন মহল তাঁকে অপহরণ করেছিল, কেন করেছিল, কোনো মুক্তিপণ দাবি না করে এবং শারীরিক নির্যাতন না করে আবার কেনই বা তাঁকে ফেলে দিয়ে এল প্রতিবেশী দেশে—এই সব অসংখ্য উত্তরবিহীন প্রশ্ন এখন সবার মনকে আলোড়িত করছে। এসব প্রশ্নের বিশ্বাসযোগ্য উত্তর বের করার দায়িত্ব সরকারের।
সালাহ উদ্দিনকে অপহরণের জন্য বিএনপির পক্ষ থেকে সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হচ্ছিল। আর সরকারের পক্ষ থেকে একে বিএনপিরই কারসাজি বলে পাল্টা অভিযোগ করা হচ্ছিল। সালাহ উদ্দিনকে খুঁজে পাওয়া গেল কি না, সে বিষয়ে নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন দিতে পুলিশকে হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন।
সরকার, প্রশাসন বা পুলিশ কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারে না। প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাদের কর্তব্য। এখন তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। তিনি সাবেক প্রতিমন্ত্রী। একটি বিশেষ পরিস্থিতির শিকার তিনি। অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগ তাঁর ক্ষেত্রে খাটে না। তিনি বেঁচে আছেন, এটাই বড় কথা। তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনা হোক।

‘আজকের মধ্যে নূর হোসেনকে মেরে ফেলতে হবে’ by বিল্লাল হোসেন রবিন

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত ৭ খুনের ঘটনায় দায়ের হওয়া দুটি মামলায় এরই মধ্যে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল হয়েছে। চার্জশিটে র‌্যাব-১১ এর সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ২৫ জন র‌্যাব সদস্য এবং নূর হোসেন ও তার ৯ সহযোগীকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে র‌্যাব-১১ এর সাবেক মেজর (অব.) মোহাম্মদ আরিফ হোসেন নিজের দোষ স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে সাতজনকে অপহরণ থেকে শুরু করে লাশ গুম করা পর্যন্ত পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। ২০ পৃষ্ঠার ওই জবানন্দিতে উঠে এসেছে ৭ হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক বিবরণ। গত বছরের ৪ঠা জুন আদালতে দেয়া মেজর (অব.) আরিফ হোসেনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিটি রেকর্ড করেন নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কেএম মহিউদ্দিন। আলোচিত এই ৭ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রথম দায় স্বীকার করেন মেজর আরিফ। গত বছরের ১৭ই মে ভোরে ঢাকা সেনানিবাসের বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর কয়েক দফা রিমাণ্ডে জিজ্ঞাসবাদের একপর্যায়ে সে জবানবন্দি দিতে রাজি হয়। জবানবন্দিতে আরিফ হোসেন আদালতকে জানান, সাতজনকে অপহরণ করার পর তাকে বলা হয়েছিল, কোন সাক্ষী রাখা যাবে না। ৭ জনকেই গুম করে ফেল। আরও বলা হয় ‘আজকের মধ্যে নূর হোসেনকে মেরে ফেল’।
জবানবন্দি রেকর্ড করার পূর্বে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কেএম মহিউদ্দিন মেজর (অব.) আরিফ হোসেনকে জিজ্ঞাসা করেন, আমি পুলিশ নই, ম্যাজিস্ট্রেট জানেন কি? আরিফ হোসেন হ্যাঁ সূচক উত্তর দেন। আপনি দোষ স্বীকার করতে বাধ্য নন, জানেন কি? আরিফ হোসেন হ্যাঁ সূচক উত্তর দেন। আপনার দোষ স্বীকারোক্তি আপনার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য হিসাবে ব্যবহৃত হতে পারে জানেন কি? আরিফ হোসেন হ্যাঁ সূচক উত্তর দেন। আপনি দোষ স্বীকার করেন বা না করেন আপনাকে পুলিশের কাছে ফেরত পাঠানো হবে না। জানেন কি? আরিফ হোসেন হ্যাঁ সূচক উত্তর দেন। আপনি কোন ভীতি বা লোভের বশে জবানবন্দি প্রদান করছেন না তো? আরিফ হোসেন না সূচক উত্তর দেন। যা বলছেন স্বেচ্ছায়, সত্য বলবেন তো? আরিফ হোসেন হ্যাঁ সূচক উত্তর দেন।
আরিফ হোসেনের আদালতে দেয়া ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এখানে তুলে ধরা হলো:
২০১৪ সালের মার্চ মাসে আদমজীনগরে অবস্থিত র‌্যাব-১১ এর হেডকোয়ার্টারে আমাদের অফিসার্সদের কনফারেন্স ছিল। ওই কনফারেন্সে সিও লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ কাউন্সিলর নজরুলকে আমাকে টার্গেট হিসেবে দেন। টার্গেট নজরুলকে ধরার জন্য সিও স্যার লে. কমান্ডার রানাকে আমাকে সাহায্য করার নির্দেশ দেন। এরপর আমি ও রানা স্যার মিলে একাধিকবার নজরুলকে ধরার চেষ্টা করি। কিন্তু বার বার ব্যর্থ হই। ওই সময় নজরুলকে ধরার জন্য আমরা সঠিকভাবে তথ্য পাচ্ছিলাম না। তখন আমরা নজরুলের প্রতিপক্ষ অপর কাউন্সিলর নূর হোসেনকে সোর্স হিসেবে ব্যবহার করি। ২০১৪ সালের ২৭শে এপ্রিল সকাল ১০টার দিকে নূর হোসেন আমাকে ফোন করে বলে যে, নজরুল আজকে নারায়ণগঞ্জ কোর্টে হাজিরা দিতে এসেছে। তখন তাৎক্ষণিকভাবেই আমি ওই সংবাদটি আমার সিও স্যার লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদকে জানাই। সিও স্যার তখনই আমাকে ও রানা স্যারকে নজরুলকে ধরার জন্য অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেন। আমি আনুমানিক সাড়ে ১০টার সময় অভিযানের বিষয়ে রানা স্যারের সঙ্গে কথা বলি এবং তখনই আমি আমার নীল রঙের মাইক্রোবাস নিয়ে আমার টিমসহ কোর্টের উদ্দেশে বের হই। আমি আমার টিমের সদস্য হাবিলদার এমদাদ, এসআই পুর্নেন্দু বালা, নায়েক দেলোয়ার (ড্রাইভার), নায়েক বেলাল, নায়েক হীরা, নায়েক নাজিম, সিপাহী তৈয়ব, সৈনিক আলীম, সৈনিক আলামিন, সৈনিক মহিউদ্দিন, কনস্টেবল শিহাব একত্রে নীল রঙের মাইক্রোবাস নিয়ে বের হই। আনুমানিক বেলা ১১টার সময় আমরা কোর্টের বাইরের গেটে এসে উপস্থিত হই। ওই সময় আমি আমার টিমের সদস্য হাবিলদার এমদাদ, নায়েক বেলাল, সিপাহী তৈয়বকে কোর্টের মধ্যে পাঠাই নজরুলের গতিবিধি নজরদারী করার জন্য। আমরা কোর্টের বাইরে রাস্তার পশ্চিম পাশে অপেক্ষা করছিলাম। বেলা সোয়া ১১টার দিকে একটি সিলভার কালারের মাইক্রোবাসে করে রানা স্যারের টিমের ৭/৮ জন সদস্য আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়। ওই সময় রানা স্যার মাইক্রোবাসে ছিলেন না। আনুমানিক বেলা সাড়ে ১১ টার দিকে রানা স্যার নিজের গাড়িতে করে এসে গাড়ি ছেড়ে দেন এবং আমার মাইক্রোতে আমার পাশের সিটে বসেন। ওই সময় আমি রানা স্যারকে জানাই যে, নজরুলের সঙ্গে তার ১৫/১৬ জন সহযোগী আছে। রানা স্যার সিনিয়র হওয়ার কারণে তখন তিনি অপারেশন কমান্ডার হয়ে যান এবং তিনি যেভাবে প্ল্যান করেন সেভাবেই কাজ হয়। ওই সময় রানা স্যার প্ল্যান করেন যে, রুটিন পেট্রল টিমের সদস্যদের দিয়ে ফতুল্লা স্টেডিয়াম এলাকায় সিটি করপোরেশনের গেটের কাছে ফাঁকা এলাকায় নজরুলের গাড়িটি থামাবেন। আনুমানিক ১টার দিকে নজরুল একটি সাদা প্রাইভেটকারে করে কোর্ট থেকে বের হয়ে সাইনবোর্ডের দিকে যায়। তখন আমি ও রানা স্যার আমাদের মাইক্রোবাস ২টি নিয়ে নজরুলের গাড়ির পিছু পিছু যাই। রানা স্যার ওই সময় নজরুলের গাড়ির বর্ণনা দিয়ে পেট্রল টিমকে ওই গাড়িটি থামাতে বলে। আনুমানিক দেড়টার দিকে পেট্রল টিম চেকপোস্ট বসিয়ে সিটি করপোরেশনের গেটের কাছে নজরুলের গাড়িটিতে থামায়। তখন আমরা পেছন থেকে গিয়ে নজরুলের গাড়ি থেকে নজরুলসহ ৫ জনকে বের করে আমার মাইক্রোবাসে তুলি। ওই সময় আমাদের পেছনে একটি অ্যাশ কালারের প্রাইভেটকার এসে থামে এবং ওই গাড়ি থেকে একজন ভদ্রলোক নেমে চিৎকার করতে থাকে। ওই সময় রানা স্যার ওই ভদ্রলোক ও তার ড্রাইভারকে তার মাইক্রোবাসে তুলে নেন। আমি ওই ৫ জনকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে কাঁচপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দেই এবং রানা স্যারকে বলি আমার গাড়িটিকে ফলো করার জন্য। আনুমানিক ১টা ৫০ মিনিটের দিকে তারাবো নামক এলাকায় পৌঁছাই। ২/৩ মিনিটের মধ্যেই রানা স্যারের গাড়িটি তারাবো পৌঁছায়। তারাবো পৌঁছে আমি আমার সিও লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ স্যারকে রিপোর্ট করি যে নজরুলসহ ৭ জনকে আটক করা হয়েছে। তখন সিও স্যার বলেন যে, কোন প্রত্যক্ষদর্শী রাখা যাবে না। ৭ জনকেই গুম করে ফেলো। সিও স্যারের আদেশ পেয়ে আমি আমার ক্যাম্পের বেলালকে বলি ৭ সেট ইটের বস্তা তৈরী করার জন্য। তারাবো আসার পথে রানা স্যার চিটাগাং রোডে মাইক্রোবাস থেকে নেমে যান এবং সিও স্যারের অফিসে চলে যান। আমি নায়েক বেলালকে ইটের বস্তা তৈরি করতে বলে মাইক্রোবাস ২টি নিয়ে নরসিংদীর দিকে চলে যাই। আনুমানিক আড়াইটার দিকে আমি নরসিংদী র‌্যাব ক্যাম্পের কাছাকাছি পৌঁছাই। ওই সময় আমি নরসিংদী ক্যাম্প কমান্ডার সুরুজকে ফোন করি এবং তার সঙ্গে ক্যাম্পের বাইরে দেখা করি। ওই সময় আমি মেজর সুরুজের নিকট থেকে ২ হাজার টাকা নিই এবং ক্যাম্পের বাইরে আমরা সবাই লাঞ্চ করি। আনুমানিক ৪ টার দিকে শিবপুর উপজেলার দিকে চলে যাই এবং একটি নির্জন জায়গায় অপেক্ষা করতে থাকি। আনুমানিক রাত ৮টার দিকে সিও স্যারকে জানাই যে, আমরা নারায়ণগঞ্জে আসতে চাচ্ছি। তখন সিও স্যার বলেন যে, রাস্তায় পুলিশের কড়া নজরদারী চলছে, আমি ৩ টনি ট্রাক পাঠাচ্ছি। তোমরা ওই ট্রাকে করে আসামিদের নিয়ে এসো। তখন আমি সিও স্যারকে বলি যে, ট্রাক আসতে অনেক দেরি হবে, আমরা মাইক্রোবাস নিয়ে নারায়ণগঞ্জে চলে আসছি। রাত আনুমানিক ৯টার দিকে আমরা নরসিংদীর বেলানগর পৌঁছাই। বেলানগর পৌঁছিয়ে আমি সৈনিক মহিউদ্দিনকে বলি ৭টি সাকসা (চেতনানাশক ইনজেকশন) এবং একটি সিরিঞ্জ কিনে আনতে। আনুমানিক রাত সাড়ে ১০টার দিকে মাইক্রোবাস ২টি নিয়ে আমরা কাঁচপুরে পৌঁছাই। কাঁচপুর পৌঁছিয়ে আমরা একটি পরিত্যক্ত পেট্রোল পাম্পে অপেক্ষা করতে থাকি। ওই সময় আমি সিওকে ফোন করে বলি যে, স্যার রাস্তায় পুলিশের কড়া নজরদারী চলছে। এ অবস্থায় নারায়ণগঞ্জ শহরে ঢোকা আমার জন্য ডিফিকাল্ট। রানা স্যার যেন ট্রলারটি কাঁচপুর ব্রিজের নিচে পাঠিয়ে দেন। তার কিছু সময় পরে রানা স্যার সিও স্যারের অফিসের ল্যান্ডফোন থেকে আমাকে জানান যে, কাঁচপুর ব্রিজের নিচেই ট্রলার থাকবে। তারপর আমি নূর হোসেনকে ফোন করে বলি যে, কাঁচপুর ব্রিজের নিচে যেন মানুষের কোন জটলা না থাকে। আনুমানিক রাত ১১টার দিকে আমি মাইক্রোবাস ২টিসহ কাঁচপুর ব্রিজের নিচে বিআইডব্লিউটিএ-এর ঘাটে পৌঁছাই। আনুমানিক রাত সাড়ে ১১টার দিকে বেলালকে ফোন করে বলি ইটের প্যাকেটগুলো কাঁচপুর ব্রিজের নিচে নিয়ে আসতে। সকাল বেলা হাবিলদার এমদাদ, নায়েক বেলাল কোর্টে নজরদারী শেষে আদমজীনগর ক্যাম্পে ফিরে গিয়েছিল। ওইদিন কোর্টে নজরদারী করার সময় নজরুলের লোকজন সিপাহী তৈয়বকে সন্দেহ করেছিল এবং আটক করেছিল। পরে তৈয়ব পরিচয় দিয়ে বের হয়ে গিয়েছিল। রাত আনুমানিক ১২টার দিকে একটি সাদা মিতসুবিশি মাইক্রোবাসে করে হাবিলদার এমদাদ, নায়েক বেলাল, সৈনিক আরিফ, সৈনিক তাজুল ইটের প্যাকেটগুলো নিয়ে বিআইডব্লিউটিএ-এর ঘাটে আসে। রাত সাড়ে ১২টার দিকে রানা স্যারের ট্রলারটি কাঁচপুর ব্রিজের নিচে আসে। ট্রলারটি আসার পর আমি এমদাদকে ইটের প্যাকেটগুলো ট্রলারে লোড করতে বলি। তারপর আমি সিও স্যারকে চূড়ান্ত রিপোর্ট দিয়ে বলি যে, ৭ জনকে গুম করার বিষয়ে আমি প্রস্তুত। ওইসময় সিও আমাকে বলেন, ওকে গো এহেড। সিও স্যারের আদেশ পেয়ে আমি নায়েক হীরা, সিপাহী তৈয়বকে বলি যে, মাইক্রোবাসে থাকা ৭ জনকে সাকসা ইনজেকশন পুশ করতে। রানা স্যারের মাইক্রোবাসের লোকজনকে বলি এলাকায় পাহারা দিতে। ইনজেকশন পুশ করার পর নায়েক বেলাল, নায়েক হীরা, সিপাহী তৈয়ব, এসআই পুর্নেন্দু বালা, সৈনিক আলামিন, সৈনিক তাজুল, কনস্টেবল শিহাব ও সৈনিক আলীম এই ৮ জনে আটককৃত ৭ জনের মুখে পলিথিন পেঁচিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে এবং আমাকে অবহিত করে। তারপর আমি সবাইকে ডেড বডিগুলো ট্রলারে লোড করার জন্য বলি। তারপর আমি আমার টিমসহ ট্রলারে উঠি এবং রানা স্যারের টিম ও গাড়িগুলাকে ফেরত পাঠিয়ে দেই। আমরা আনুমানিক ১টার দিকে ট্রলার নিয়ে মেঘনা নদীর মোহনার দিকে রওনা দেই। আনুমানিক রাত আড়াইটার দিকে ট্রলারটি নিয়ে মেঘনা নদীর মোহনায় পৌঁছাই। মেঘনা নদীর মোহনায় পৌঁছিয়ে আমার টিমের সদস্যরা প্রতিটি ডেডবডির সঙ্গে এক সেট ইটের বস্তা বেঁধে নদীতে ফেলে দেয়। নদীতে লাশ ফেলে ফেরত আসার সময় র‌্যাব-এর অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি অপস) কর্নেল জিয়াউল আহসান স্যার আমাকে মোবাইলে ফোন করেন। ওই সময় আমি স্যারের ফোন না ধরে আমার সিও স্যারকে ফোন করে বলি যে, স্যার এডিজি অপস স্যার কেন আমাকে ফোন করছেন? তখন সিও স্যার আমাকে বলেন যে, আমি এডিজি অপস এর সঙ্গে কথা বলে তোমাকে জানাচ্ছি। কিছুক্ষণ পর সিও স্যার আমাকে ফোন করে জানান যে, এডিসি অপস প্রথমে আমাকে ও সিও স্যারকে তার অফিসে যেতে বলেছিলেন। পরে তিনি শুধু আমাকে ও আমার টিমের সদস্যদেরকে তার অফিসে যেতে বলেছেন। রাত অনুমান সাড়ে ৩টার দিকে আমি ট্রলারে করে নারায়ণগঞ্জ ঘাটে এসে পৌঁছাই। ঘাটে পৌঁছে দেখি সিও স্যার ঘাটে দাঁড়িয়ে আছে। আমি ঘাটে সিও স্যারের সঙ্গে কথা বলে ওই সময় র‌্যাব হেডকোয়ার্টারের উদ্দেশে রওনা দেই। আনুমানিক রাত ৪টার দিকে আমি এডিজি অপস এর অফিসে পৌঁছাই। অফিসে পৌঁছার পর এডিজি অপস কর্নেল জিয়াউল আহসান স্যার আমাকে বলেন, আরিফ কি হয়েছে? নজরুল কোথায়? স্যারের প্রশ্ন শুনে আমি একটু অবাক হই। তারপর আমি বলি নজরুল কোথায় আমাকে জিজ্ঞাসা করছেন কেন? তখন স্যার আমাকে আবার ওই একই প্রশ্ন করেন। তখন আমি স্যারকে বলি যে, আমি যা করি সিও এর আদেশে করি। সো এ বিষয়ে যা জিজ্ঞাসা করার আপনি সিও স্যারকে জিজ্ঞাসা করেন। তারপর এডিসি স্যার সিওকে ফোন দেন এবং ফোনেই সিও স্যারের সঙ্গে আমাকে কথা বলান। তখন আমি সিও স্যারকে বলি যে, স্যার নজরুল কোথায় এই কথা এডিজি স্যার আমাকে কেন জিজ্ঞাসা করছেন। তখন সিও স্যার বলেন যে, এডিজি কেন এমন করছে তা আমি বুঝতেছি না। ঠিক আছে তুমি ঘটনা বর্ণনা করে আস। তারপর আমি সমস্ত ঘটনা এডিজি স্যারকে বলার পর তিনি আমাকে চলে যেতে বলেন। তারপর ভোর সাড়ে ৫টার দিকে আমি নারায়ণগঞ্জ এসে সিওকে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করে বাসায় চলে যাই। ২৮শে এপ্রিল সকাল সাড়ে ১১টার দিকে সিও’র সঙ্গে দেখা করে আমি আমার অফিসে যাই। সাড়ে ৩টার দিকে অফিস থেকে বাসায় আসি। ২৯শে এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে অফিসে যাই। ওইদিন ১২টার দিকে সিও স্যার আমাকে ফোন করে বলেন যে, এডিজি অপস স্যার আমাকে ও সিও স্যারকে তার অফিসে যেতে বলেছেন। তারপর আমি ও সিও স্যার র‌্যাব হেডকোয়ার্টারের উদ্দেশ্যে রওনা দেই এবং আনুমানিক দেড়টার দিকে র‌্যাব হেডকোয়ার্টারে পৌঁছাই। হেডকোয়ার্টারে পৌঁছার পর এডিজি স্যার প্রথমে সিও স্যারের সঙ্গে কিছু কথা বলেন। তারপর আমাকেও ডেকে পাঠান। তারপর আমাদের মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ কথা হয়। এডিজি স্যার আমাকে জিজ্ঞাসা করেন যে আমি নূর হোসেনের সঙ্গে কি কি কথা বলেছি। নূর হোসেন কতদিন ধরে নজরুলের বিষয়ে ইনফরমেশন দিয়েছে। ব্যাংক বিষয়ে নূর হোসেনের সঙ্গে কি কথা হয়েছে। লাশগুলো কি করেছি? তখন আমি বলি যে নূর হোসেন প্রায় দেড় মাস ধরে নজরুলের বিষয়ে তথ্য দিয়ে আসছিল। আর ব্যাংকের বিষয়ে নূর হোসেনের একজন বিশ্বস্ত লোকের একাউন্ট নম্বর দিতে বলেছিলাম। আর লাশগুলো মেঘনাতে ফেলে দিয়েছি। আমার কথা শেষ হওয়ার পর এডিজি অপস স্যার বলেন যে, আজকের মধ্যে নূর হোসেনকে মেরে ফেলতে হবে। তখন আমি বলি যে, নজরুলের কারণে নারায়ণগঞ্জ গরম হয়ে আছে। এ অবস্থায় নূর হোসেনকে মারলে পরিস্থিতি কন্ট্রোল করা ডিফিকাল্ট হবে। তারপর এডিজি অপস সিওকে বলেন যে, সিও এটা তোমাকে করতে হবে। তারপর আমি ও সিও স্যার নারায়ণগঞ্জে চলে আসি। তারপর সিও স্যার আমাকে ও রানা স্যারকে চিটাগাং রোডে রেকি করতে পাঠান। আনুমানিক বিকাল ৫টার দিকে সিও আমাকে ফোন করে অফিসে আসতে বলেন। অফিসে যাওয়ার পর আমরা জানতে পারি যে আমাদেরকে র‌্যাব হেডকোয়ার্টারে ক্লোজ করা হয়েছে। রাত ৮টায় হেডকোয়ার্টারে পৌঁছাই এবং মুভ অর্ডার নিয়ে রাতেই মাতৃবাহিনীতে যোগদান করি। পরের দিন স্ব-পরিবারে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা সেনানিবাস চলে যাই।

ম্যাডাম রেবির নেতৃত্বে ৫০ মানব পাচারকারী by সরওয়ার আলম শাহীন

বাংলা সিনেমা ম্যাডাম ফুলি। সিনেমা জগতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টিকারী একটি সিনেমার নাম। শহীদুল ইসলাম খোকন পরিচালিত এ সিনেমা ওই সময় ভিন্নমাত্রা যোগ করেছিল চলচিত্রপ্রেমীদের মাঝে। তবে এবার কিন্তু ম্যাডাম ফুলি নয়। এবার ম্যাডাম রেবি। তার পুরো নাম রেজিয়া আক্তার রেবি। সে উখিয়া-টেকনাফে সিনেমার জন্য আলোচিত নয়। সে আলোচিত মানব পাচারের জন্য। যাকে সবাই কক্সবাজার জেলার শীর্ষ মানব পাচারকারী হিসেবে এক নামে চেনে। রেবির গ্রামের বাড়ি উখিয়া উপজেলার সোনারপাড়া গ্রামে। সে নুরুল কবিরের স্ত্রী। আর সে-ই হচ্ছে আজকের রেবি ম্যাডাম। মানব পাচারকারী হিসেবে পুলিশের খাতায় রয়েছে তার নাম। কিন্তু প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের রয়েছে তার আশীর্বাদ। আর এ সুবাদেই গ্রেপ্তার হলেও বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে সে।
সূত্র জানায়, চলতি বছরের ২১শে জানুয়ারি রেবি ম্যাডামকে মানব পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। এর আগে ২০১৪ সালের ২৩শে নভেম্বর একই কারণে কক্সবাজার আদালতপাড়া থেকে গোয়েন্দা পুলিশের হাতে আটক হয়  সে। ওই সময় পুলিশ তার ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে উদ্ধার করে ৮৪ ও ২৭ লাখ টাকার ২টি চেক। এ সময় তার বিরুদ্ধে ২টি মামলা করা হয়। কিন্তু বারবার আইনের ফাঁকফোঁকর গলে বেরিয়ে এসে আবার জড়িয়ে পড়ে মানব পাচারে। সে এলাকায় বেশ প্রভাবশালী। শুধুমাত্র তার নেতৃত্বে রয়েছে ৫০ সদস্যের একটি মানব পাচাকারী দল। একসময় জীবনবীমা কোম্পানিতে চাকরি করতো রেজিয়া আক্তার রেবি। কৃষক স্বামী নুরুল কবিরের টানাপড়েনের সংসারে কষ্টে দিনাতিপাত করতো। বর্তমানে মানব পাচার করে কোটি কোটি টাকার ব্যাংক ব্যালেন্সসহ বাড়ি-গাড়ির মালিক হয়েছে। সঙ্গে রয়েছে প্রশিক্ষিত ৫০ মানব পাচারকারী সিন্ডিকেট। তার বিরুদ্ধে উখিয়া থানায় রয়েছে মানব পাচারের ৩টি মামলা। এছাড়াও কক্সবাজার সদর থানায় রয়েছে ২টি মামলা। তার স্বামী নুরুল কবিরের বিরুদ্ধেও রয়েছে মানব পাচারের ৬টি মামলা।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, তার পরিবারের সবাই মানব পাচার কাজে জড়িত। রেবি দম্ভোক্তি করে বলে বেড়ায়, থানার ওসি আমার গায়ের কেশও নড়াতে পারবে না। ওসি আমার ভ্যানিটি ব্যাগে থাকে। কক্সবাজারের রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে আমার ভাল সম্পর্ক। পুলিশের স্তরে স্তরে নিজের লোক থাকায় শীর্ষস্থানীয় মানব পাচারকারী হয়েও বারবার ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে সে। যারা তার মানব পাচারে বিরোধিতা করেন তাদের ওপর তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন। লেলিয়ে দেয় তার ক্যাডারবাহিনী। এমনি একটি ঘটনা- গত বছরের ১৭ই ডিসেম্বর তার বিরুদ্ধে মানব পাচারের তথ্য প্রকাশের অভিযোগ ওঠে। এ কারণে রেবি ম্যাডামের নেতৃত্বে ২০-৩০ জনের এক ক্যাডারবাহিনী সোনারপাড়া বাজারে উপজেলা মানব পাচার প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবদুল হামিদের মালিকানাধীন ওষুধের দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। হামলায় আহত হন স্বয়ং আবদুল হামিদ। এ ঘটনায় উখিয়া থানায় আবদুল হামিদ রেবি ম্যাডামসহ ১১ মানব পাচারকারীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করলেও রেবি ম্যাডামের প্রভাবের কারণে তা থমকে আছে। ম্যাডামের নেতৃত্বে মানব পাচারকারী সিন্ডিকেটের অন্য সদস্যদের মধ্যে সোনারপাড়ার কালা মন্টুর ছেলে নুরুল কবির, সোনাইছড়ির মৃত ইউছুপ আলীর ছেলে রোস্তম আলী, সোনারপাড়ার অজিউল্যাহর ছেলে কাউছার জনি, ওমর সওদাগরের ছেলে আলমগীর হোছন রানা, পশ্চিম সোনাইছড়ির আবু ছৈয়দের ছেলে মাহাদু, নুর মোহাম্মদের ছেলে আহম্মদ শরিফ, মৃত হোছন আলীর ছেলে শাহ আলম, মৃত রশিদ আহম্মদের ছেলে আবদুল্ল্যাহ, আবদুল জলিলের ছেলে লাল মাঝি, মৃত মোজাফ্‌ফর আহম্মদের ছেলে রাসেল, ফজল আহম্মদের ছেলে শামসু আক্তার, উত্তর সোনাইছড়ি গ্রামের হাবিব উল্ল্যাহর ছেলে জয়নাল উদ্দিন জুনু, আমির হামজার ছেলে ছৈয়দ আলম, সুলতান আহম্মদের ছেলে মুজিবুল হক, সোনার পাড়ার জমির আহম্মদ প্রকাশ কালা জমির, সোনাইছড়ি গ্রামের শফি আলম, জমির আহম্মদ, শামসুল আলম সোহাগ, লম্বরীর ছৈয়দ আলম তাবাইয়া, লাল বেলাল, রূপপতি গ্রামের মৃত নুরুল ইসলামের ছেলে জমির মিয়া, চোয়াংখালীর মোজাম্মেল হক, ইউপি মেম্বার জাহেদ, বেলাল মেম্বার, ফয়েজ আহমদ, আবুল কালাম, রফিকুল হুদা, সোলতান মেম্বার, মোসলেম উদ্দিন অন্যতম।
জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আনোয়ার হোছাইন চৌধুরী জানান, রেবি ম্যাডাম আমাদের এলাকার জন্য অভিশাপ। তাকে গ্রেপ্তার করা হলে এলাকা শান্ত হয়ে যাবে। তার কারণে সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ। এ ব্যাপারে উখিয়া সহকারী পুলিশ সুপার জসিম উদ্দিন মজুমদার বলেন, শুধু ম্যাডাম রেবি নয়, যাদের বিরুদ্ধে মানবপাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে সবাইকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। যতবড় প্রভাবশালীই হোক না কেন কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।

‘৪৫ দিন সাগরে ভেসে ছিলাম’ টেকনাফে ১১৬ মালয়েশিয়াগামী by আমান উল্লাহ আমান

বঙ্গোপসাগরে দীর্ঘ দেড় মাস ধরে ভাসমান থাকার পর অবশেষে ১১৬ জন মালয়েশিয়াগামী টেকনাফ উপকূলে ফিরে এসেছেন। থাইল্যান্ডে ধরপাকড় বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে দালাল ও ট্রলার মাঝি-মাল্লারা অপর ট্রলার নিয়ে পালিয়ে গিয়েছে। দালাল ও মাঝি-মাল্লারা থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারের নাগরিক। পরে ১১৬ জন যাত্রীরা নিজেই ট্রলারটি নিয়ে সেন্টমার্টিন উপকূলের দিকে আসার সময় সেন্টমার্টিন কোস্টগার্ড তাদের আটক করে। ফিরে আসা সকলে বাংলাদেশী নাগরিক। তন্মধ্যে কক্সবাজার, সিরাজগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নারায়ণগঞ্জ, বগুড়া, সুনামগঞ্জ, পাবনা, যশোর ও ময়মনসিংহ জেলার বাসিন্দা। ফিরে আসা যাত্রীদের ‘আইওএম’ নামক একটি এনজিও সংস্থার চিকিৎসক টিম চিকিৎসা প্রদান করেছে। মালয়েশিয়াগামী যাত্রীদের মঙ্গলবার বিকাল ৪টায় সেন্টমার্টিন থেকে পূর্ব-দক্ষিণের সাড়ে ৭ কিলোমিটার অদূরে গভীর বঙ্গোপসাগর থেকে আটক করা হলেও গতকাল সকাল ৭টায় টেকনাফ উপকূলে নিয়ে আসা হয়।
ফিরে আসা সিরাজগঞ্জ জেলার রতনকান্দি উপজেলার একডালা এলাকার মো. রিপন জানান, মো. জাকির নামে এক বন্ধু টেকনাফ ভ্রমণের কথা বলে নিয়ে আসে। টেকনাফে পৌঁছলে ওই বন্ধু তাকে ১৫ হাজার টাকার বিনিময়ে দালালদের কাছে বিক্রি করে দেয়। দালালরা তাকের জোর পূর্বক একটি সিএনজিতে তুলে নিয়ে রাতেই সাগরে অপেক্ষমাণ ট্রলারে নিয়ে যায়। সে আরও জানায়, যেখানে ট্রলারটি অবস্থান করছিল সেখানে ১৪টি ট্রলার রয়েছে। মাঝি-মাল্লারা সকলে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের নাগরিক। ট্রলারে মোট ১৬৪ জন যাত্রী ছিল। তন্মধ্যে ৩০ জনকে একটি ছোট বোটে করে আলাদাভাবে উঠিয়ে দেয়। থাইল্যান্ডে ধরপাকড় বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে মিয়ানমারের ১৮ মহিলা যাত্রী, দালাল ও নাবিকরা অপর একটি ট্রলারে উঠে আমাদের ট্রলারটি ভাসিয়ে দিয়ে চলে যায়। পরে আমি নিজে এবং অন্যান্যদের সহযোগিতায় ট্রলারটি সেন্টমার্টিনের দিকে আসলে কোস্টগার্ড আটক করে। নরসিংদী জেলার মুরাদনগরের হোসেন মিয়ার ছেলে জাহাঙ্গীর (৩২) জানান, সেসহ আরও ২১ জন ৪৫ দিন যাবত ট্রলারে রয়েছে। চট্টগ্রামের ইউসুফ নামক এক দালালের হাত ধরে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে টেকনাফের সাবরাং থেকে ট্রলারে উঠেছিল। সে জানায়, সকালের খাদ্য হিসেবে চিড়া ও গুড়  এবং রাতের বেলা ওষুধ মিশানো ভাত খেতে দিতো। যা খেলে বমি আসতো। তাছাড়া লবণ পানি পান করতে হতো।
কক্সবাজার জেলার উখিয়ার উপজেলার নতুন বাজারের আবদুল হাফিজের ছেলে নুরুল হাকিম (৫৩) জানায়, পানি চাওয়া হলে এবং বেশি নড়াচড়া করলে শারীরিক নির্যাতন করতো ট্রলারে থাকা দালালরা। টেকনাফের খতিজা ও শওকত নামক দালালের হাত ধরে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে ট্রলারে উঠেছিল।
মাদারীপুর জেলার মো. গাউজ ব্যাপারির ছেলে মো. মাসুম জানায়, ৪৫ দিন সাগরে ভাসতে থাকি। টেকনাফের নবী হোছেন ও বাবুল নামক দুইজন দালাল সার্বক্ষণিক ট্রলারে অবস্থান করে বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন চালাতো। বিশেষ করে টেকনাফে ৩ মানবপাচারকারী বন্দুক যুদ্ধে নিহতের খবরে নির্যাতন বেশি করা হয়েছে। এদিকে আরও কয়েকজন যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কেউ স্ব-ইচ্ছায় মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে আসলেও অনেককে জোর পূর্বক ট্রলারে উঠিয়ে দিয়েছে।
কক্সবাজার সৈকতের ৪ ফটোগ্রাফার: ফিরে আসা যাত্রীদের মধ্যে কক্সবাজার সৈকতের ৪ ফটোগ্রাফার রয়েছে। তারা টেকনাফ ভ্রমণে আসলে টেকনাফের সাবরাং জীপ স্টেশন থেকে সন্ধ্যা বেলায় ৪-৫ জন লোক একটি সিএনজিতে করে ট্রলারে উঠিয়ে দেয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে দুটি ক্যামরা ও ৪টি মোবাইল ছিনিয়ে নেয়। এরা হচ্ছে কক্সবাজারের কলাতলী এলাকার আবুল কালামের ছেলে মো. রফিক (১৯), আবদুল মজিদের ছেলে আবুল কাশেম (২০), নুর মোহাম্মদের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম (২২) ও মোহাম্মদ হোছেনের ছেলে মো. হাসেম (২১)। তারা সকলে জনি নামক একটি স্টুডিও’র তত্ত্বাবধানে ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করতো।
“আইওএম” সংস্থার ডা. সৌমেন জানান, যাত্রীদের মধ্যে আশঙ্কাজনক কেউ নেই। তবে খাদ্যজনিত অভাবে দুর্বল রয়েছে।
সেন্টমার্টিন কোস্টগার্ডের স্টেশন কমান্ডার লে. ডিকশন চৌধুরী জানান, আটককৃত মালয়েশিয়াগামীদের থানায় হস্তান্তর করে প্রকৃত দালালদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা হবে।

বাঁচার আকুতি সাগরে ভাসা অভিবাসীদের- মৃত্যুর পর লাশ ছুড়ে ফেলা হয় সাগরে

কিশোর মোহাম্মদ শরীফ (১৬) মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমান। স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হয়ে দেশে ফিরে নিপীড়িত-অসুস্থ রোহিঙ্গাদের সেবা করবে। এ স্বপ্নে ভর করে নৌকায় মালয়েশিয়ার উদ্দেশে সাগরে পাড়ি জমিয়েছিল। উত্তাল সাগরের ভয়ংকর যাত্রায় ক্ষুধা-তৃষ্ণা ও পাচারকারীদের মারধর-নির্যাতনে শুধু প্রাণটাই বাঁচাতে পেরেছে; স্বপ্নটা আর পারেনি। দেখেছে, সঙ্গীদের লাশ উচ্ছিষ্টের মতো সাগরে ছুড়ে ফেলে দেওয়াটাও।
গত রবি ও সোমবার মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার সমুদ্র উপকূল থেকে উদ্ধার হওয়া প্রায় ২০০০ বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা মুসলমানদের একজন এই শরীফ। মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পথে মাঝসাগরে ভাসমান অবস্থায় তাঁদের রেখে চলে যায় পাচারকারীরা। পরে ভেসে ভেসে ইন্দোনেশিয়ার উপকূলে গেলে সম্প্রতি তাঁদের উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধার হওয়া শরীফের মতোই আরও প্রায় আট হাজার অভিবাসী অথই সাগরে এখনো ভেসে চলেছেন। তাঁদের নৌকার জ্বালানি ফুরিয়ে আসছে। নেই খাবার ও পানি। মালয়েশিয়া যাওয়ার ট্রানজিট ও অভিবাসীদের প্রাথমিক গন্তব্যস্থল থাইল্যান্ডে বর্তমানে মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চলতে থাকায় ভাসমান এ মানুষগুলোকে তীরে নিয়ে যাচ্ছে না পাচারকারীরা। তাই সাগরের মাঝেই তাঁদের ফেলে পালিয়ে যাচ্ছে তারা।
আর কিছুদিন এভাবে ভাসতে থাকলে এসব অভিবাসীকে হয়তো মারাই পড়তে হবে বলে গতকাল মঙ্গলবার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম। এ অবস্থায় তাঁদের অনেকে বাঁচার আকুতি জানাচ্ছেন বলে জানা গেছে। খবর বিবিসি, এপি, এএফপি, রয়টার্স ও সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের।
ইন্দোনেশিয়ার আচেহর আশ্রয়শিবিরে নিজের ওই সুখস্বপ্ন ও রোমহর্ষক সাগরযাত্রার অভিজ্ঞতার কথা জানাচ্ছিল মোহাম্মদ শরীফ। শরীফ জানায়, মালয়েশিয়ায় চাচার কাছে গিয়ে ডাক্তারি পড়াশোনা শেষে নতুন জীবনের আশায় দেশ ছেড়েছিল সে। নিজের দেশের বঞ্চনার কথা ভুলে ছোট নৌকায় কয়েকজনের সঙ্গে চড়ে বসে। এ জন্য ধারদেনা করে জোগাড় করা এক হাজার ডলার দালালদের হাতে তুলে দেন মা-বাবা।
যাত্রার শুরুটা ছিল স্বপ্নের মতোই। কিন্তু দূর সাগরে নিয়ে যখন একটা জাহাজে তাদের তোলা হলো, তখনই তা পরিণত হয় বিভীষিকার যাত্রায়। সশস্ত্র পাচারকারীদের তত্ত্বাবধানে জাহাজে তাঁদের মতোই আরও শত শত অভিবাসীকে ওঠানো হচ্ছিল, জানাল শরীফ। বলে, ‘আমরা ঘুমাতে পারতাম না। কেননা, যখনই কিছুটা শোয়ার বা পা মেলে আরাম করার চেষ্টা করতাম, তখনই দালালেরা আমাদের পেটাত ও লাথি মারত।’
দালালেরা গুলি করার হুমকিও দিত বলে জানায় শরীফ। বলে, উদ্ধার হওয়ার আগে এক মাস ধরে সাগরে ভেসে বেড়িয়েছে তারা। এ সময়ে খুব সামান্যই খাবার ও পানি দেওয়া হয় তাদের। দিনে রোদে পুড়তে ও রাতে কনকনে ঠান্ডায় খালি গায়ে থাকতে বাধ্য করা হয়। এ কষ্ট সবার সহ্য হয়নি। কেউ কেউ পথেই মারা গেছে। সে বলে, ‘আমাদের নৌকার ছয়জন না খেয়ে ও অসুস্থ হয়ে মারা গেলে ক্যাপ্টেন তাদের লাশ সাগরে ছুড়ে ফেলার নির্দেশ দেয়।’
ভয়াবহ অভিজ্ঞতার এখানেই শেষ নয়। শরীফ বলে, তাদের জাহাজ মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া সীমান্তের কাছাকাছি পৌঁছার পর থাইল্যান্ডের ক্যাপ্টেন জাহাজ ছেড়ে পালিয়ে যায়। এর আগে বলে যায়, একটি স্পিডবোট এসে তাদের বাকি পথ নিয়ে যাবে। কিন্তু কেউ জাহাজ চালাতে না জানায় ভয়ে যাত্রীরা সবাই হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। তারপর তাদের আর করার কিছুই ছিল না। এরপর সাঁতরে তীরে পৌঁছে সে।
মালয়েশিয়ার লংকাবির পুলিশ সদর দপ্তরের সামনে গত সোমবার পুলিশের গাড়িতে গাদাগাদি দাঁড়িয়ে আছেন অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীরা (বাঁয়ে নিচে) ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশের পূর্ব আচেহ জেলায় সেখানকার পুলিশপ্রধান হেন্দ্রি বুদিম্যান (ডানে) উদ্ধার হওয়া দুই বাংলাদেশি সাইফুল ইসলাম ও হাবিবুর রহমানের সঙ্গে কথা বলছেন (বাঁয়ে ওপরে) অনাহারে গুরুতর অসুস্থ দুই অবৈধ অভিবাসীকে আচেহ প্রদেশের একটি অস্থায়ী কেন্দ্রে জরুরি চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে (ওপরে ডানে) l ছবি: এএফপি
বাঁচার আকুতি অভিবাসীদের: রোহিঙ্গা অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন আরাকান প্রোজেক্টের কর্মকর্তা ক্রিস লিউয়া বলেন, সাগরে একটি জাহাজে ভাসমান ৩৫০ জন রোহিঙ্গা মুঠোফোনে তাঁদের বাঁচানোর জন্য আহ্বান জানিয়েছেন।
এ জাহাজে ৫০ জন নারী ও ৮৪টি শিশু রয়েছে উল্লেখ করে ক্রিস লিউয়া গতকাল বলেন, তিন দিন ধরে তাঁদের কোনো খাবার ও পানি নেই। যাত্রীরা সাহায্য করতে এগিয়ে আসতে বলছেন ও কান্নাকাটি করছেন। যাত্রীরা জানেন না তাঁরা সাগরের ঠিক কোথায় আছেন এবং তেল ফুরিয়ে যাওয়া জাহাজটি কোথায় ভেসে যাচ্ছে। ক্যাপ্টেন ও তার সহকারীরা গত পরশু পালিয়ে গেছে।
এ অভিবাসীরা বলছেন, তাঁদের ধারণা, জাহাজটি মালয়েশিয়ার লংকাবি দ্বীপের কাছাকাছি অবস্থান করছে। তাঁরা অনেক দূরে স্থলভাগ দেখতে পাচ্ছেন। তীরের কাছাকাছি দিয়ে জাহাজও চলাচল করছে। কিন্তু তাঁদের ইশারায় এগিয়ে আসছে না।
নৌকা ফিরিয়ে দিল ইন্দোনেশিয়া: গত সোমবার সকালে কয়েক শ অভিবাসী বহনকারী একটি নৌকাকে মালয়েশিয়ার দিকে পাঠিয়ে দিয়েছে ইন্দোনেশিয়া। নৌকাটি ইন্দোনেশিয়ার জলসীমায় প্রবেশের পর দেশটির কর্মকর্তারা এর আরোহীদের খাদ্য ও পানি দিয়ে সেটি পাঠিয়ে দেন।
এ ব্যাপারে ইন্দোনেশিয়ার নৌ মুখপাত্র মানাহান সিমোরাংকির বলেন, ‘আমরা তাঁদের আমাদের দেশে আসতে বাধা দিইনি। যেহেতু তাঁদের গন্তব্য ছিল মালয়েশিয়া, তাই আমরা তাঁদের ওই দেশের দিকেই যাওয়ার অনুরোধ করেছি।’
তবে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) ইন্দোনেশিয়ার এ সিদ্ধান্তকে বেদনাদায়ক উল্লেখ করেছে।
আঞ্চলিক উদ্যোগের আহ্বান আইওএমের: আইওএমের মুখপাত্র জো লোরি ভাসমান হাজারো অভিবাসীর অবস্থা ও তাঁদের উদ্ধারের ব্যাপারে গতকাল বলেন, ‘তাঁদের উদ্ধারে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর প্রচেষ্টার প্রয়োজন। সংস্থার সামর্থ্য না থাকলেও অভিবাসীদের অনুসন্ধান ও উদ্ধারে দেশগুলোর জাহাজ এবং স্যাটেলাইট আছে। অভিবাসীরা খুবই খারাপ অবস্থায় রয়েছেন। জরুরিভিত্তিতে ব্যবস্থা না নিলে সবাই মারা পড়তে পারেন।’