Saturday, February 8, 2014

সন্ত্রাস- ছাত্রলীগের ‘আত্মরক্ষা’ ও নিষ্ক্রিয় আইন by মশিউল আলম

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক সহিংসতায় ‘যতজনের হাতে অস্ত্র দেখা গেছে, তারা সবাই ছাত্রলীগের নয়’—প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে এই কথা বলেছেন।
এর মানে দৃশ্যমান অস্ত্রধারীদের কয়েকজন ছাত্রলীগের। তাহলে ছাত্রলীগের এই অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে কী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে? প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘ছাত্রলীগের যারা, আমরা তাদের বহিষ্কার করেছি। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’ বহিষ্কার মানে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার। এটা রাষ্ট্রের কোনো আইনি পদক্ষেপ নয়, সাংগঠনিক ব্যবস্থামাত্র। তাঁরা যে ফৌজদারি অপরাধ করেছেন, সে বিবেচনায় এটি নিতান্তই এক লঘু পদক্ষেপ, যা লোক দেখানো বলে কেউ ধরে নিলে তাকে দোষ দেওয়া যাবে না। তা ছাড়া আমরা জেনেছি, বহিষ্কৃত হয়েছেন সেদিনের অস্ত্রধারীদের মধ্য থেকে মাত্র দুজন। কিন্তু সংবাদমাধ্যমে অন্তত ছয়জন অস্ত্রধারীর ছবি ছাপা হয়েছে, যাঁরা ছাত্রলীগের নেতা। বাকি চারজনকে কেন বহিষ্কার করা হয়নি? তাঁদের বিরুদ্ধে আদৌ কোনো পদক্ষেপ কি নেওয়া হয়েছে?

ছাত্রলীগের অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে ‘আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে’—প্রধানমন্ত্রীর এই উক্তি তথ্য না আশ্বাস, তা আমরা জানি না। কিন্তু কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার খবর এখনো পাওয়া যায়নি। বরং যাঁদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাঁরা কেউই ছাত্রলীগের নন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে চারটি মামলা দায়ের করা হয়েছে, সেগুলোর কোনোটিতেই ছাত্রলীগের অস্ত্রধারী কোনো নেতাকে আসামি করা হয়নি। আসামি করা হয়েছে ছাত্র ফেডারেশন, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন প্রভৃতি ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীদের, যাঁরা প্রগতিশীল ছাত্রজোটের ব্যানারে বর্ধিত ফি ও সন্ধ্যাকালীন মাস্টার্স কোর্স বন্ধ করার দাবিতে আন্দোলন করছেন।
আর ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের আসামি করা হয়েছে—এটা কোনো খবর নয়। কারণ, এটা যে করা হবে, তা আগে থেকেই সবার জানা। মামলা দায়েরের আগেই সরকারের একাধিক নেতা সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, গোলাগুলি করেছেন আন্দোলনকারীদের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা শিবিরের কর্মীরা। কিন্তু রহস্যজনক ব্যাপার হলো শিবিরের কোনো অস্ত্রধারীর ছবি কেউ তুলতে পারেনি। এমনকি আন্দোলনকারী সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে কেউ কোনো অস্ত্রধারী শিবিরের কর্মীকে দেখেছেন, এ রকম খবরও পাওয়া যায়নি। শিবিরের কর্মীরা সম্ভবত নিজেদের অদৃশ্য রেখে অস্ত্রচালনার কায়দা রপ্ত করেছেন কিংবা তাঁরা এমন মন্ত্র জানেন, যা পড়ে ফুঁ দিয়ে তাঁরা ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি ফোটাবেন কিন্তু কেউ তাঁদের দেখতে পাবে না। শুধু অ্যাকশনের সময় অদৃশ্য থাকা কেন? অ্যাকশন শেষ করার পরও তাঁরা বেমালুম গায়েব হয়ে যাওয়ার কায়দা জানেন। নইলে পুলিশ তাঁদের একজনকেও গ্রেপ্তার করতে পারল না কেন? শিবির কি ছাত্রলীগ যে আইনের হাত তাঁদের স্পর্শ করার হিম্মত রাখে না?
না, ছাত্রলীগের কেউ অপরাধ করলে আইন তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না—এমন সাধারণীকরণ সঠিক নয়। দৃষ্টান্ত উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং। বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডের বিচারে ছাত্রলীগের ২২ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা তিনি বলেছেন। আদালতের রায়ে ১৪ জনের ফাঁসির রায়ের সংবাদ ইতিমধ্যে সুবিদিত এবং প্রশংসিত। কিন্তু স্মরণ না করে পারা যায় না যে বিশ্বজিতের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের বাঁচানোর চেষ্টা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ সংবাদ সম্মেলন করে বলেছিলেন, হত্যাকারীদের কেউই ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী নন। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীরও বলেছিলেন একই ধরনের কথা। কিন্তু হত্যাদৃশ্যের ভিডিও ফুটেজ সম্প্রচারমাধ্যমে বারবার প্রচার, পুরো সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা এবং দেশব্যাপী ধিক্কার উঠেছিল। জনমতের প্রবল চাপের ফলে ঘটনার দুদিন পর কোতোয়ালি থানার পুলিশ ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় আট ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছিল এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেছিলেন যে তাঁরা বিশ্বজিৎ হত্যা মামলার আসামি। কিন্তু ওই দিনই ঢাকা মহানগরের পুলিশ কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের বলেন, বিশ্বজিৎ হত্যার ঘটনায় পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করেনি, যাঁদের গ্রেপ্তারের কথা বলা হচ্ছে তাঁরা কেউ বিশ্বজিৎ হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। এ রকম কেলেঙ্কারির মধ্য দিয়ে পরস্ফুিট হয়েছিল একটিই বিষয়: সরকার বিশ্বজিৎ হত্যাকারী ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের আইনের আওতায় নিতে চায় না, পার পাইয়ে দিতে চায়। ওই নৃশংস হত্যাকাণ্ড নিয়ে সংবাদমাধ্যম দিনের পর দিন লেগে না থাকলে যে বিচার শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেছে, তা পাওয়া যেত কি না সন্দেহ।
কিন্তু সে জন্য বিশ্বজিৎ হত্যার বিচার করার জন্য সরকারের যে ধন্যবাদ ও প্রশংসা প্রাপ্য তা অস্বীকার করা যায় না। ধন্যবাদ আমরা দিয়েছি, প্রশংসা করতেও কার্পণ্য করিনি। এবং আমরা চাই আইন প্রয়োগের এই দৃষ্টান্ত বিরল ব্যতিক্রম হিসেবে না থেকে যেন সরকারের সাধারণ প্রবণতা হয়ে ওঠে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের ১৬ জনকে হত্যা করা হয়েছে, ছাত্রলীগের ছেলেরা সেখানে যেতে পারে না, তাদের রগ কেটে দেওয়া হয়—প্রধানমন্ত্রীর এসব অভিযোগের প্রতিকার করার দায়িত্ব সরকারের, আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের, ছাত্রলীগের নয়।
প্রধানমন্ত্রী সংসদে প্রশ্ন তুলেছেন, ‘আমাদের ছেলেদের কি জীবন বাঁচাবার অধিকার নেই?’ সরকারপ্রধানের কণ্ঠে এমন কথা উচ্চারিত হলে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা আগ্নেয়াস্ত্র বহন ও ব্যবহারে আরও উৎসাহিত হবেন। এমন কথা তিনি এর আগেও বলেছেন। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী এবার এ কথাও বলেছেন, ‘তবু সন্ত্রাসী সন্ত্রাসীই, সন্ত্রাসীদের বরদাশত করা হবে না।’ কিন্তু তার পরেই আবার ‘আত্মরক্ষার অধিকার সবার আছে’—এ কথাও বলেছেন। ফলে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের কাছে এই বার্তা পৌঁছে যেতে পারে যে ‘আত্মরক্ষার্থে’ আগ্নেয়াস্ত্র বহন ও ব্যবহার করার পক্ষে খোদ প্রধানমন্ত্রীর সায় আছে।
কিন্তু ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা আগ্নেয়াস্ত্র বহন ও ব্যবহার করলে ছাত্রশিবিরের সঙ্গে তাঁদের পার্থক্য থাকে না। ইসলামী ছাত্রশিবির সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালায় বলে সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করার দাবি ক্রমেই প্রবলতর হয়েছে। তারা তাদের রগকাটা কুখ্যাতি অতিক্রম করে পেশাদার দুর্বৃত্তদের মতো চোরাগোপ্তা হামলাকারী গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। বিশেষত গত এক বছরে জামায়াত-শিবিরের ব্যাপক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড তাদের জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। তাদের ব্যাপারে আপত্তি শুধু দেশের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই, আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশগুলোও তাদের প্রতি প্রচণ্ড নাখোশ। জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে তাদের প্রধান অভিযোগ ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিয়ে নয়, বরং তাদের সন্ত্রাসী তৎপরতা নিয়ে।
সন্ত্রাসের কারণে ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করার দাবি তুললে একই কারণে ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করার দাবিও যুক্তি পেয়ে যায়। কিন্তু কার যুক্তি কে মানবে, কে মানে এই দেশে? সন্ত্রাসী আচরণের কারণে ছাত্রলীগকে ছাত্রশিবিরের সঙ্গে তুলনা করলে তার প্রতিবাদে এই যুক্তি উত্থাপন করা হতে পারে যে ছাত্রলীগ আক্রমণ করে না, আত্মরক্ষার তাগিদে প্রতিক্রিয়া করে মাত্র। আত্মরক্ষার অধিকার তো ছাত্রলীগেরও আছে। কিন্তু ছাত্রলীগের অভিভাবক দল আওয়ামী লীগ সরকার পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে বলে আত্মরক্ষা কিংবা যে প্রয়োজনেই হোক, ছাত্রলীগ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারসহ সহিংসতায় লিপ্ত হলে সরকারের এমন বেকায়দা হয় যে মন্ত্রীরা দিশাহারা হয়ে অসত্য-অর্ধসত্য কথা বলেন। সংবাদমাধ্যম সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠে। এভাবে ছাত্রলীগ গত পাঁচ বছরে অজস্রবার সরকারকে ভীষণ বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। কিন্তু সরকার এটা সহ্য করে কেন?
‘সন্ত্রাসী সন্ত্রাসীই, সন্ত্রাসীদের বরদাশত করা হবে না’—প্রধানমন্ত্রীর এই উক্তি আন্তরিক হলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে সেদিন যে ছয় অস্ত্রধারী ছাত্রলীগের নেতাকে দেখা গেছে, যাঁদের সশস্ত্র ছবি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, তাঁদের প্রত্যেককে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করা হোক। তাঁদের আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে রেখে এক গন্ডা মামলা দায়ের করে শত শত শিক্ষার্থীর গায়ে ফৌজদারি আসামির ছাপ্পড় মেরে দেওয়া কোনো কাজের কথা নয়। আর ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরাই যদি সব সন্ত্রাসের হোতা হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁদের একজনকেও পুলিশ এখন পর্যন্ত অস্ত্র-বিস্ফোরকসহ পাকড়াও করতে পারল না কেন, এই প্রশ্নেরও জবাব পাওয়া দরকার।
শান্তিপূর্ণভাবে যাঁরা আন্দোলন করছেন তাঁদের মামলার আসামি করা ঠিক হয়নি, বাম ধারার ছাত্রসংগঠন করা আইনের দৃষ্টিতে কোনো অপরাধ নয়, আসামির তালিকা থেকে তাঁদের নাম বাদ দেওয়া উচিত। শত শত শিক্ষার্থীকে আসামি করে তাঁদের মাথার ওপর একাধিক ফৌজদারি মামলা ঝুলিয়ে রাখলে বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিরতা কাটবে না, পড়াশোনার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরবে না। কিন্তু এখনকার প্রধান বিবেচনা হওয়া উচিত, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দিয়ে স্বাভাবিক শিক্ষাজীবনে ফিরতে হবে।

মশিউল আলম: সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক।

খোলা চোখে- বিচারপতি, এবার হবে তোমার বিচার by হাসান ফেরদৌস

আইনের হাত অনেক দীর্ঘ। সেই দীর্ঘ হাত এখন ক্রমেই খালেদা জিয়াকে আঁকড়ে ধরছে। খালেদার আমলে অনেক অঘটনই ঘটেছে, তবে যে দুটি ঘটনা আর সব ঘটনাকে ছাপিয়ে যায় তা হলো ২০০৪ সালের এপ্রিলে ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা এবং সে বছরের ২১ আগস্টের রক্তাক্ত গ্রেনেড হামলা।

বিল ক্লিনটনের আরেক প্রেম!

২০০৫ সালে রাশিয়ায় এক চ্যারিটির অনুষ্ঠানে
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন
ও হলিউড অভিনেত্রী লিজ হার্লি
নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সঙ্গে হোয়াইট হাউসের শিক্ষানবিশ মনিকা লিউনস্কির সম্পর্ক বিশ্বব্যাপী আলোচনার ঢেউ তুলেছিল। একই সময় হলিউড অভিনেত্রী এলিজাবেথ হার্লির সঙ্গেও সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন ক্লিনটন, যা অজানাই থেকে গিয়েছিল। এমনটাই অভিযোগ করেছেন হলিউডের অভিনেতা টম সিজেমোর। অবশ্য, এ ধরনের দাবি নাকচ করে দিয়েছেন হার্লি। বিষয়টি নিয়ে তিনি মামলা করারও হুমকি দিয়েছেন। ওই সময় হার্লির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল বলে দাবি করা অভিনেতা সিজেমোরের একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে রাডার অনলাইন।
ভিডিওতে দেখা গেছে, সিজেমোর গর্ব করে তাঁর বন্ধুদের বলছেন, তিনিই ১৯৯৮ সালে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের সঙ্গে অভিনেত্রী হার্লির পরিচিত করিয়ে দেন। ঘটনার দিন হোয়াইট হাউসে সেভিং প্রাইভেট রায়ান চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী ছিল। এতে সিজেমোরও অভিনয় করেন। প্রদর্শনীর একপর্যায়ে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন সিজেমোরকে ডেকে নেন। ক্লিনটন তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন: ‘লিজ হার্লির সঙ্গে কি তোমার চার বছর ধরে সম্পর্ক চলছে? এখনো কি তাঁর সঙ্গে তোমার সাক্ষাৎ হয়?’ সিজেমোর প্রেসিডেন্টকে নিশ্চিত করেন, এখন তাঁদের কোনো সম্পর্ক নেই। তখন ক্লিনটন তাঁর কাছে হার্লির ফোন নম্বর চান। ভিডিওতে সিজেমোর বলেন, পরে ক্লিনটন হার্লিকে ফোন করে বলেন, ‘এলিজাবেথ, আমি তোমার প্রেসিডেন্ট! আমি তোমাকে আনতে একটি বিমান পাঠিয়ে দিচ্ছি।’ পরে ক্লিনটন লস অ্যাঞ্জেলস থেকে হার্লিকে ওয়াশিংটনে আনতে একটি ব্যক্তিগত বিমান পাঠান। হার্লি চার দিন ওয়াশিংটনে অবস্থান করেন। ক্লিনটনের সঙ্গে হার্লির এক বছর সম্পর্ক ছিল। অভিযোগের ব্যাপারে টুইটারে জবাব দিয়েছেন অভিনেত্রী হার্লি। তিনি লিখেছেন, ‘আমার ও বিল ক্লিনটন নিয়ে এটি হাস্যকর ও অর্থহীন গল্প, যা একেবারেই অসত্য।’ অভিনেত্রী হার্লির সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করলেও কোনো কথা বলছেন না সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট। দ্য টেলিগ্রাফ।

প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হচ্ছেন সিসি!

প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হচ্ছেন সিসি
মিসরের আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেনাপ্রধান ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফিল্ড মার্শাল আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি। কুয়েতের আল-সিয়াসাহ পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ কথা জানিয়েছেন তিনি। তবে সেনাবাহিনী দাবি করেছে, কুয়েতের ওই পত্রিকা সেনাপ্রধান সিসির বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা করেছে। আগামী এপ্রিলের মাঝামাঝি মিসরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গত বছরের ৩ জুলাই প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সিসিই মূল ভূমিকা পালন করেন বলে মনে করা হয়। পত্রিকাটির প্রশ্নের জবাবে সিসি বলেন, ‘হ্যাঁ, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ এএফপি।

চারদিকে বিপদ, দুশ্চিন্তায় কংগ্রেস

ভারতীয় লোকসভার নির্বাচনের আগে কংগ্রেসকে বিপদ চারদিক থেকেই ঘিরে ধরছে। দলের অভ্যন্তরে আর বিরোধীদের কাছ থেকে যেমন বিপদ, তেমনই বিপদ সেই দলের কাছ থেকে—কংগ্রেসের সমর্থন নিয়ে যারা দিল্লি সরকারে টিকে রয়েছে। পৃথক তেলেঙ্গানা রাজ্য গঠনের প্রস্তাব নিয়ে কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ এতই মারাত্মক আকার ধারণ করেছে, লোকসভার অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনও ভন্ডুল হলো। তেলেঙ্গানার বিরুদ্ধে এবং অখণ্ড অন্ধ্র প্রদেশের দাবিতে কংগ্রেসের সদস্যরা শুধু অধিবেশন মুলতবি রাখতেই বাধ্য করেনি, নিজের দলের সরকারের বিরুদ্ধে লোকসভায় অনাস্থা প্রস্তাবও পেশ করেছেন। অন্ধ্র প্রদেশের কংগ্রেস দলীয় পার্লামেন্ট সদস্যদের পাশাপাশি অনাস্থা এনেছে তেলুগু দেশমও। তেলেঙ্গানা বিল চূড়ান্ত করতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠক বাতিল করা হয়েছে। আজ শুক্রবার বিশেষ অধিবেশনে প্রস্তাবিত বিলে পরিবর্তনের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হবে। তাতে রায়লসীমা ও অন্ধ্রের ক্ষোভ প্রশমিত হবে কি না, বলা কঠিন। অবিভক্ত অন্ধ্র প্রদেশ রাজ্যে লোকসভার আসনসংখ্যা ৪২। এর মধ্যে প্রস্তাবিত তেলেঙ্গানার ১০ জেলায় পড়ছে ১৭টি আসন। এত বছর ধরে টালবাহানার পর কংগ্রেস দলীয় সদস্যদের বাধার মুখে পৃথক তেলেঙ্গানার দাবি বাস্তবায়িত করতে না পারে, তা হলে ভোটে তার প্রতিফলন দেখা যেতে পারে। রাজ্যের কংগ্রেসদলীয় মুখ্যমন্ত্রী কিরণ কুমার রাও দিল্লিতে তাঁর দলের সরকারের বিরুদ্ধে ধরনা দিচ্ছেন, রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপ দাবি করছেন। এমনকি দাবি আদায় করতে না পারলে রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এই বিরোধিতার মুখে পৃথক তেলেঙ্গানার সমর্থকেরাও আশাহত হচ্ছেন।
ভোটের আগে সংসদের চলতি অধিবেশনে তেলেঙ্গানা বিল পাস করা না গেলে অবিভক্ত অন্ধ্র প্রদেশে কংগ্রেসকে আম-ছালা দুই-ই হারাতে হতে পারে। বিজেপি ছোট রাজ্যের পক্ষে। তেলেঙ্গানায়ও তাদের সায় আছে। কিন্তু তারাও এখন বলছে, পৃথক রাজ্যের বিপক্ষের মানুষের দাবিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। নির্বাচনী রাজনীতিতে কংগ্রেসের যত ক্ষতি, বিজেপির ততই লাভ। তেলেঙ্গানা নিয়ে জেরবার কংগ্রেসের দুশ্চিন্তার বোঝা আরও বাড়িয়েছে তাদের সমর্থন নিয়ে সরকার গড়া দিল্লির আম আদমি পার্টির (এএপি) সরকার। গতকাল বৃহস্পতিবার দিল্লি সরকারের দুটি সিদ্ধান্তের ফল সুদূরপ্রসারী হতে পারে। প্রথম সিদ্ধান্ত হলো, ১৯৮৪ সালের দিল্লি দাঙ্গার তদন্তের ‘টার্মস অব রেফারেন্স’ বা বিচার্য বিষয় ঠিক করা। দিল্লি পুলিশের দায় কতটা ছিল, তাও খতিয়ে দেখা হবে। এক বছরের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন পেশ করতে হবে। গতকাল অকালি দল দিল্লিতে বিক্ষোভ করে। ১৯৮৪ সালে পাঞ্জাবের অমৃতসরে শিখ সম্প্রদায়ের পবিত্রতম তীর্থস্থান স্বর্ণমন্দিরে সেনা অভিযানে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের সহায়তা চাওয়া নিয়েও বিতর্ক উঠেছে। এএপি সরকারের দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত ২০১০ সালের কমনওয়েলথ গেমসের সময়কার দুর্নীতির তদন্তসংক্রান্ত। সব মিলিয়ে বড় দুশ্চিন্তায় কংগ্রেস।

ক্লিনটনের আরেক প্রেম প্রেয়সী হলিউডের হার্লি

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের নাম শুনলেই অবধারিতভাবে অন্য যে নামটি মানসপটে ভেসে ওঠে তিনি হলেন মনিকা লিউনস্কি। লাস্যময়ী ললনা এই মনিকা-ক্লিনটন সম্পর্কের চোরাস্রোতে ডুবতে বসেছিল হিলারি-ক্লিনটনের দাম্পত্য ভিটে। সে অনেক দিনের কথা- দগদগে সে ক্ষত এতদিনে বোধ হয় কাটিয়ে উঠেছেন হিলারি। কিন্তু এবার কি হবে? সম্প্রতি পরকীয়া সম্পর্কের আরেক চোরাবালিতে ফেঁসে গেছেন ক্লিনটন।
রমণীমোহন খ্যাত সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন (৬৭) অভিনেত্রী এলিজাবেথ হার্লির (৪৮) সঙ্গে এক বছর পরকীয়ায় মত্ত ছিলেন। ঘটনাটি ১৯৯৮ সালের। সম্প্রতি অডিও রেকর্ডে এ ঘটনা ফাঁস করে দিয়েছেন হার্লির সাবেক বয়ফ্রেন্ড হলিউড অভিনেতা টম সিজমোর। পাশ্চাত্যের জনপ্রিয় দৈনিক টেলিগ্রাফ, ডেইলি মেইল ও ওয়াশিংটন টাইমস বুধবার এ খবর প্রকাশ করে মার্কিন মুল্লুকে হৈচৈ ফেলে দিয়েছে। ১৯৯৮ সালে হোয়াইট হাউসে ‘সেভিং প্রাইভেট রায়ান’ এর প্রদর্শনীতে সিজমোরের সঙ্গে ক্লিনটনের দেখা হলে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন হার্লির ফোন নাম্বার চান। নাম্বার দিতে ইতস্তত করায় ক্লিনটন রাগান্বিত হয়ে সিজমোরকে মাদার... বলে গালি দেন এবং বলেন, আমি যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সেনাপতি। সিজমোর দাবি করেন, এরপর ক্লিনটন হার্লিকে ফোন করেন এবং তাকে আনতে একটি বিশেষ বিমান পাঠিয়ে দেন। সিজমোর দাবি করেন, তখন ক্লিনটন ও তার স্ত্রী হিলারির মধ্যে দাম্পত্য কলহ চলছিল এবং (সম্ভবত মণিকা লিউনস্কি কেলেংকারির কারণে) তারা আলাদা বিছানায় ঘুমাতেন। তিনি আরও দাবি করেন, ক্লিনটন ও হার্লি এরপর রাতে একত্রে ঘুমাতেন এবং এক বছর ধরে এই সম্পর্ক চলছিল। সিজমোরের বয়ান অনুযায়ী, কালবিলম্ব না করেই ক্লিনটন এরপর এলিজাবেথ হার্লিকে ফোন করেন।
‘এলিজাবেথ, তোমাদের কমান্ডার-ইন-চিফ (প্রেসিডেন্ট) বলছি।’ এলিজাবেথ বিষয়টিকে কৌতুক মনে করলেও ক্লিনটন ছিলেন নাছোড়বান্দা। ক্লিনটন বলেন, ‘শোন এলিজাবেথ। আমি প্রেসিডেন্ট বলছি। তোমাকে নিয়ে আসার জন্য আমি একটি বিমান পাঠাচ্ছি।’ তখন হার্লি ছিলেন ১৬০০ পেনসিলভানিয়া এভিনিউয়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সিজমোর দেখতে পান সেই সংবর্ধনা অনুষ্ঠান চলাকালেই হার্লি হাজির। এরপর একজন গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে একটি দরজা দিয়ে হারিয়ে যান হার্লি। একটি কক্ষে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সময় কাটান হার্লি। সেখান থেকে বের হয়ে ক্লিনটন সিজমোরের কাছে আসেন এবং বলেন, ‘আমি তোমার কাছে ঋণী।’ এরপরের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে অডিও টেপে সিজমোর বলেন, ‘আপনার কি মনে হয়? সে (হার্লি) সেখানে আরও চারদিন ছিল। তিনি বলেন, এখানেই ঘটনার শেষ নয়। এরপর এক বছর তাদের মধ্যে এই বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক বজায় ছিল। এদিকে বুধবার এক টুইটার বার্তায় ক্লিনটনের সঙ্গে পরকীয়ার কথা অস্বীকার করেছেন অভিনেত্রী এলিজাবেথ হার্লি।

বইমেলার আকাশে অনেক তারা

বইমেলা
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আকাশে একটা বাঁকা চাঁদ। আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে। আজ ষষ্ঠী। কমলার কোয়ার মতো আকার নিয়েছে চাঁদটা। বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসের খিলানগুলোর পাশে বটগাছের পাতার ফাঁক দিয়ে এই চাঁদ প্রতি ফেব্রুয়ারিতেই উঁকি দেয়। বড় হয়, ছোট হয়। একাডেমি চত্বরে বড় আমগাছটার মুকুল ঝরে পড়ে থাকে মাটিতে, গন্ধে ম-ম করে। এ ফেব্রুয়ারিতে একাডেমির মূল চত্বরে মাত্র একবার গিয়েছি, একটা বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করতে। অন্য সন্ধ্যাগুলো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতরেই ঢুঁ মারি।
উদ্যানের ভেতরেই তো আমার প্রিয় প্রকাশনা সংস্থাগুলো—প্রথমা, সময়, অনন্যা, কাকলি, অন্যপ্রকাশ, ইউপিএল, সাহিত্যপ্রকাশ, অনুপম, মাওলা ব্রাদার্স, জ্ঞানকোষ, পার্ল, তাম্রলিপি, জাগৃতি, শ্রাবণ, সন্দেশ, পাঠকসমাবেশ ইত্যাদি। কত প্রকাশক, কজনের নাম বলব! আমার চোখের সামনেই মেলা বড় হলো। সেই যে আশির দশকের শুরুতে বুয়েটে পড়ব বলে ঢাকায় এসেছিলাম। বন্ধুদের নিয়ে যেতাম বাংলা একাডেমির বইমেলায়। পুকুরের পাড়ে একটা স্টলে লেখা: এখানে নির্মলেন্দু গুণকে পাওয়া যায়। তখনই আরেক রসিক কবির ফোঁড়ন, নির্মলেন্দু গুণের ডজন কত? মনে হচ্ছে সেদিনের ঘটনা। আমার প্রথম কবিতার বই খোলা চিঠি সুন্দরের কাছে বেরিয়েছে, ১৯৮৯ সাল, একটা মাদুরে বইগুলো বিছিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম একাডেমি চত্বরে। তখন আমার ওজন ছিল ৫০ কেজি, এখন ওজন ৮০। তখন বয়স ছিল ২৪, এখন ৪৯। প্রথম বই যে বয়সে বেরিয়েছিল, ২৪-এ, তার চেয়ে বেশি বছর তারপর আমি পার করে দিলাম, ২৫ বছর পরে এখন আমার বয়স ৪৯। কিন্তু নিজেকে এখনো সেই হালকা-পাতলা জিনসের নীল রঙের শার্ট পরা এলোমেলো চুলে বড় দাঁতের কিশোরটিই মনে হয়।
মনে হচ্ছে, ওই তো দাঁড়িয়ে আছেন আহসান হাবীব, উন্মাদ সম্পাদক, তাঁর কাছে নিয়ে গেলেন বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের মাহফুজ ভাই, বললেন, ‘এর বই রাখো তোমার স্টলে।’ হাবীব ভাই এককথায় রাজি হয়ে গেলেন। আমার বই বইমেলার একটা স্টলে শোভা পাচ্ছে। বইমেলার ভেতরেই তখন বসত চায়ের দোকান। অনেকগুলো। হুমায়ূন আহমেদ, শামসুর রাহমান, মহাদেব সাহা—সবাই সেই চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিতেন। মহাদেবদার পাশের চেয়ারে বসেছিলাম। শামসুর রাহমান আর হুমায়ূন আহমেদও একই টেবিলে বসে পড়ায় টেবিলের মর্যাদা হঠাৎ গেল বেড়ে। আমি কী করব, বুঝে উঠতে পারছি না। এমন সময় কবি ফেরদৌস নাহার পাশ দিয়ে যেতে যেতে বলে উঠলেন, ‘মিটুন তো দেখি একেবারে বড়দের দলে যোগ দিয়ে বসেছ।’ লজ্জায়, সংকোচে কী করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এসব স্টলে অনেক রাত পর্যন্ত আড্ডা দিতেন রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। বইমেলা থেকে বের হয়েই একবার রাতের ট্রেনে তাঁর সঙ্গে ময়মনসিংহে গিয়েছিলাম কবিতা পড়তে। ভোরের কাগজ বের হলো ফেব্রুয়ারি মাসে। স্টল নেওয়া হলো বইমেলায়। তখন ভোরের কাগজ-এর শেষ পাতায় লিখতে শুরু করলাম বইমেলা প্রতিদিন। এখন সেটাই রেওয়াজ হয়ে গেছে, সব পত্রিকাতেই রোজ বইমেলার খবর ছাপা হয়। ভোরের কাগজ-এ আমিই লিখেছি কয়েক বছর। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আসতেন।
আমি তো ছোট্ট একটা মানুষ, গিয়ে স্যারের আঙুল ধরে ফেললাম। বললাম, ‘স্যার, কেমন লাগছে মেলা? কী কী বই বেরোল।’ হাসলেন। আমাকে সঙ্গে নিয়ে পুরো মেলা হাঁটলেন। কিন্তু প্রশ্নের উত্তর দিলেনই না। সাক্ষাৎকার নেওয়া হলো না। হাসান আজিজুল হক স্যার এলে তো আমি পোষা বিড়ালের মতো চঞ্চল হয়ে উঠতাম। তখন আমারও দু-একটা বই বেরিয়ে গেছে, কিশোর পাঠকেরা স্যারের সামনেই হয়তো আমার কাছে অটোগ্রাফ চাইছে, আমি লজ্জায় মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছি, রশীদ হায়দার তাই দেখে বললেন, ‘হাসানকে পেয়ে আনিস যে একেবারে পাগল হয়ে গেলে!’ আরও লজ্জা! আমি কি রশীদ ভাইকেও কম পছন্দ করি নাকি। আশির দশকে মেলায় হাঁটতেন হেলাল হাফিজ। আমি তাঁর সঙ্গে হাঁটতাম। একদিন অনেকক্ষণ হাঁটার পরে রসিকতা করে বললাম, ‘নাহ্, আর বড় কবিদের সঙ্গে হাঁটব না।’ হেলাল ভাই হেসে বললেন, ‘এভাবে বলতে হয় না আনিস।’ সেই হেলাল ভাই এবার বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন। অভিনন্দন, হেলাল ভাই। দাদাভাইয়ের কথাও খুব মনে পড়ে। রংপুরে থাকতে কচি-কাঁচার মেলা করতাম বলে ঢাকায় এসে তিনিই হয়ে উঠেছিলেন আশ্রয়। প্রথম দিকে কচি-কাঁচার আসরে ছড়া-কবিতা ছাপা হতো, পরের দিকে তাঁর সম্পাদিত ইত্তেফাক-এর বিশেষ সংখ্যাগুলোয় ছাপিয়ে দিতে লাগলেন কবিতা। একদিন তিনি হাঁটছেন বর্ধমান হাউসের ঝুলবারান্দার সামনে দিয়ে,
সঙ্গে লুৎফর রহমান রিটন আর আমীরুল ইসলাম, আমি ছুটে গেলাম, ‘দাদাভাই, জানেন, আমার বই অমুক আর অমুক লেখকের মতোই বিক্রি হয়।’ দাদাভাইয়ের মুখের কথা একটু আটকে যেত, বললেন, ‘সেটা তো ভালো খবর হলো না!’ খুব হতোদ্যম হয়েছিলাম। হুমায়ুন আজাদের উপস্থিতি ছিল সবচেয়ে নিয়মিত। বসতেন আগামীর স্টলে। বেলা তিনটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত স্বাক্ষর দিতেন বইয়ে। কথা বলতেন পাঠকদের সঙ্গে। প্রথমবার যখন তাঁর নারী বইমেলায় এল, নদী থেকে বেরিয়েছিল, প্রথম দিন মলাট ছাড়াই, তাই বিক্রি হয়ে যেতে লাগল। আমি বললাম, ‘স্যার, নারী তো কভার ছাড়াই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।’ তিনি বললেন, ‘নারী তো কভার ছাড়াই ভালো।’ এটা লিখে দিয়েছিলাম বলে তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘বেশি স্মার্ট হোয়ো না।’ কিন্তু এত ভালোবাসতেন আমাকে যে পরের দিনই সব ভুলে গিয়ে ডেকে নিলেন কাছে। মুহম্মদ জাফর ইকবালের সঙ্গেও আমার প্রথম পরিচয় বইমেলাতেই। আহসান হাবীব ভাই-ই পরিচয় করিয়ে দিলেন। জাফর স্যার যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছেন, নতুন লেখকদের সঙ্গে পরিচিত হতে চান, আহসান হাবীব ভাই আমাকে তাঁর স্টলের সামনে দাঁড় করিয়ে রেখে জাফর ইকবাল স্যারকে ডেকে আনলেন, ‘এই যে আনিসুল হক, নতুনদের মধ্যে যারা...’ সেই যে মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যারের সঙ্গে খাতির হলো, সেটা আজ অবধি অটুট আছে। হুমায়ূন আহমেদ জনপ্রিয় হয়ে গেলে আর বইমেলায় স্বাভাবিকভাবে আসতে পারতেন না। আসতেন রাত সাড়ে আটটার দিকে। এসে যে স্টলে বসতেন, সেই স্টলে এমন ভিড় হতো যে স্টল ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হতো।
অমনি ভিড় ঠেলে স্যারের কাছে গিয়ে বাচ্চাদের একটা বই কিনে বললাম, স্যার, আমার মেয়ে পদ্যর জন্য অটোগ্রাফ দেন। স্যার লিখলেন, ‘পদ্য, তুমি কেমন আছ?’ একটা লাইন হঠাৎ লিখে ফেলেই তিনি আমাকে বুঝিয়ে দিলেন, কেন একজন মানুষ সবার থেকে আলাদা। মাহমুদুল হককে আমি কখনো বইমেলায় দেখিনি। কিন্তু তাঁর বই কবে আসবে, সাহিত্যপ্রকাশে গিয়ে খুব খোঁজ নিতাম, আরেকজনকে খোঁজ নিতে দেখতাম, আমাদের লেখক বন্ধু ইমতিয়ার শামীমকে। তাঁকে দেখলাম বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণেই, খাটিয়ার মধ্যে শোয়ানো। সমুদ্র গুপ্ত খুব মজার মানুষ ছিলেন। বড় বড় চুল, সাদা, বড় বড় গোঁফ, বইমেলায় হেঁটে বেড়াচ্ছেন! একাকী রৌদ্রর দিকে নামে তাঁর কবিতার বই বেরোল, তাতে কবিতা ছিল, ধুলো নিয়ে, সেটা উদ্ধৃত করে বললাম, মেলায় ভীষণ ধুলো...তিনি পরের দিন বললেন, ‘প্রচারটা কায়দা করে ভালোই দিয়েছিস রে!’ প্রণব ভট্ট ছিলেন এক মজার চরিত্র। কার বই বেশি বিক্রি হচ্ছে, এটা খোঁজ নিয়ে বেড়াতেন বিভিন্ন স্টলে। হুমায়ূন স্যার তাঁকে বই উৎসর্গ করে লিখেছিলেন, ‘তাঁর পুরোটা শরীরজুড়ে কলিজা।’ সত্যি, তিনি আমার বইয়ের বিজ্ঞাপন বিভিন্ন পত্রিকায় তাঁর খরচে প্রকাশ করে দিতেন। শহীদুল জহিরকে আমি কোনো দিনও বইমেলায় দেখিনি, কিন্তু যেবার সেরাতে পূর্ণিমা ছিল বেরোল, সেবার হইচই পড়ে গিয়েছিল। খন্দকার আশরাফ হোসেন কিন্তু ছিলেন বইমেলার নিয়মিত চরিত্র, বই বেরোত, লিটল ম্যাগাজিন বেরোত, টিচার ইন ল কথাটা তিনিই আমাকে শিখিয়েছিলেন আর ফাঁদ বইটা হাতে নিয়েই বলেছিলেন কাফকায়েস্ক। এবার বইমেলায় আমরা তো খুব অনুভব করব মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানেরও অভাব।
সেই কবে বাংলা একাডেমি স্টল থেকে কিনেছিলাম তাঁর গঙ্গাঋদ্ধি থেকে বাংলাদেশ। তাঁর বইটা, আমরা কি যাব না তাদের কাছে যারা শুধু বাংলায় কথা বলে, খুব নাড়া দিচ্ছে। আমরা সবকিছুতে ইংরেজিতে ফিরে যাচ্ছি। বিয়ের আমন্ত্রণপত্র থেকে শুরু করে দোকানের নামফলক। কিন্তু খুব বিস্মিত হয়েছি, প্রশাসনের প্রশিক্ষণেও ইংরেজিরই চল দেখে। এখনো বইমেলায় মাঝেমধ্যেই আসেন সৈয়দ শামসুল হক ও আনোয়ারা সৈয়দ হক। পাশে গিয়ে দাঁড়াই। ছবি তুলি। কী যে ভালো লাগে। আনিসুজ্জামান স্যারকে আসতে হয়, চেয়ারম্যান হিসেবে, আবার অনুরোধের ঢেঁকি গিলতে, বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করতে। কাইয়ুম চৌধুরী, রফিকুন নবী, হাশেম খান এলেই বুঝতে হবে, সেরা স্টলের পুরস্কারের বিচার চলছে। মুনতাসীর মামুন স্যারের সঙ্গ খুব মজার, আগে সময় প্রকাশনীতে কিছুক্ষণ সময় কাটানোর পরে একটা ঢাউস বই বিক্রি হলেই ফরিদ আহমেদকে বলতেন, ‘ফরিদ, এবার মনে হয় এক কাপ চা খাওয়ার দাম উঠেছে।’ আমরা দুজনই ফরিদ আহমেদের কিপ্টেমি নিয়ে খুবই রসিকতা করি, ফরিদ ভাই সহ্য করেন। আসাদুজ্জামান নূর অনেক আগে থেকেই বইমেলায় নিয়মিত আসেন এবং বই কেনেন। আবুল মাল আবদুল মুহিতও আসতেন কেডস পরে, বৈকালিক হাঁটার কাজটাও সারতেন, বইও কিনতেন। মন্ত্রী হওয়ার পরে তো তাঁদের পেছনে ভিড় লেগে থাকবে।
যেমন নিরিবিলি হাঁটতে দেখা যাবে রামেন্দু মজুমদারকে। এক আধবার আসবেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। কিছুক্ষণ বসবেন। তারপর চলে যাবেন। মুহম্মদ জাফর ইকবাল এলে তো পেছনে তাঁকে মৌচাকের মতো ঘিরে ধরবে কিশোর-তরুণেরা। ইমদাদুল হক মিলন সম্পাদক হয়ে যাওয়ার পর কম সময় পান, তবু বলি, মিলন ভাই, বইমেলায় সময় দিন, আসুন। যেমন সেলিনা হোসেন, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, মঈনুল আহসান সাবের, নাসরীন জাহান, তবক দেওয়া পান মুখে আসাদ চৌধুরীকে না দেখলে মনে হবে বইমেলা অসম্পূর্ণই রয়ে গেল। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই বইমেলা হোক। সব স্টল সামনেরবার শুধু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই থাকুক। এমনকি উদ্যানের উন্মুক্ত মঞ্চ ও গ্যালারিটাও নিয়ে নেওয়া হোক মেলার ভেতরে, সেখানে অনুষ্ঠান হোক। বড় লেখক ও আলোচকেরা একাডেমি প্রাঙ্গণে সেমিনার করে ওই পাশে যদি পদধূলি না দেন, তাহলে কেমন করে হবে? বইমেলায় যাই। সন্ধ্যার আকাশে চাঁদ ওঠে। একদিন যে লেখকেরা-কবিরা এই মেলায় নিয়মিত আসতেন, আজ আর আসেন না, তাঁদের কথা মনে পড়ে। কিন্তু আকাশভরা অনন্ত নক্ষত্রবীথি দেখলে মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ দাশ থেকে শুরু করে শামসুর রাহমান—প্রত্যেকেই তো আছেন মেলায়। বই থাকা মানেই তো লেখকদের উপস্থিতি।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

ভারতের দৃষ্টিতে সরকারের এক মাস

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশে যে তুলকালাম হয়ে গেল, দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সম্ভবত তা নজিরবিহীন। প্রায় একতরফা নির্বাচন ঠেকাতে বিরোধীদের যাবতীয় কৌশল ব্যর্থ হওয়ার পর দেশের বিরোধী রাজনীতি এ মুহূর্তে একটু থমকে গেছে। গত কয়েক মাসের তুমুল আন্দোলন ও আন্দোলনের নামে জোটবদ্ধ সহিংসতা শেষে এ মুহূর্তের বাংলাদেশ আপাতত হাঁপাতে হাঁপাতে জিরিয়ে নিচ্ছে। নির্বাচনের পর একটা মাস দেখতে দেখতে কেটে গেল। এই এক মাসে নির্বাচন নিয়ে দেশ ও বিদেশে কম হইচই হলো না। ভোট সাঙ্গ হওয়ার পরপরই ভারতের প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশ সরকারকে আশ্বস্ত করল। ভারত এ নির্বাচনকে ‘সাংবিধানিক ও বৈধ’ বলার পাশাপাশি স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেয়, হিংসা কখনো নির্ণায়ক হতে পারে না। সব রাজনৈতিক দল বা অধিকাংশের যোগদানের মধ্য দিয়ে দ্রুত আরেকটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের যে দাবি পশ্চিমা দুনিয়া থেকে উঠেছে, ভারত তেমন কোনো অভিপ্রায় প্রকাশ করেনি। শুধু বলেছে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে তার মতো করে চলতে দেওয়া দরকার এবং বাংলাদেশের জনগণই সে দেশের নির্ণায়ক ভূমিকায় থাকবেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আশ্বস্ত করে ভারতের মতোই তাঁর সরকারের পাশে সমর্থন উজাড় করে একে একে দাঁড়িয়ে পড়ল রাশিয়া ও চীন। দক্ষিণ এশিয়ায় যে তিন বৃহৎ শক্তির প্রভাব ও স্বার্থ অন্য সবার চেয়ে বেশি,
সেই তিন শক্তির সমর্থন সদ্য নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে স্বস্তিই শুধু এনে দেয়নি, তাঁর বিরুদ্ধ-শক্তিদেরও বেশ কিছুটা হতোদ্যম করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘ আরেকটা নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে ঠিকই, কিন্তু শেষ বিচারে তারাও কিন্তু লাগামছাড়া সহিংসতাকে সমর্থন করতে পারেনি। তাদের দাবি বিরোধীদের ভেঙে যাওয়া মনোবল বাড়াতেও বেশ ব্যর্থ। নির্বাচন ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়া যদি বিরোধীদের প্রথম হার হয়ে থাকে, দ্বিতীয় হোঁচট তাহলে কূটনৈতিক লড়াইয়ে। সব মিলিয়ে দুই রাউন্ড লড়াই শেষে শাসকগোষ্ঠী বিরোধীদের চেয়ে দুই কদম এগিয়ে গেছে। সাধারণ নির্বাচনের রেশ থাকতে থাকতেই বেজে উঠেছে দেশের উপজেলা নির্বাচনের প্রথম পর্বের দামামা। এই নির্বাচনের দিকে অতীব আগ্রহে তাকিয়ে রয়েছে ভারত। কারণ, ভারত মনে করছে, বাংলাদেশের আগামী দিনের রাজনীতির গতি কোন খাতে বইবে, কয়েক দফার এই নির্বাচন তা ঠিক করে দিতে পারে। ভারতের যাঁরা বাংলাদেশের রাজনীতিকে গভীরভাবে নিরীক্ষণ করেন, যাঁরা নীতি নির্ধারণে সহায়ক হন, তাঁদের ধারণাও এমন যে, ভোট বর্জন করে বিএনপি নিজেদেরই বিপদের মধ্যে ফেলে দিয়েছে এবং ভবিষ্যতের সমস্যাও সৃষ্টি করেছে। বিএনপি অতিমাত্রায় পশ্চিমা দুনিয়ার ওপর ভরসা করেছিল। ভেবেছিল, তারা বাংলাদেশ সরকারকে বাধ্য করাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে ভোটে যেতে।
এ অন্ধ নির্ভরতা তাদের পক্ষে যে সহায়ক হয়নি, নির্বাচন কেটে যাওয়ার পর এখন তা বোধগম্য হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নবনির্বাচিত সরকারের কূটনৈতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্তি ঠেকানো যায়নি। আরও একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবি তোলা সত্ত্বেও পশ্চিমা দুনিয়া এ কথা জানিয়ে দেয় যে তারা এই সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে। দ্রুত নির্বাচনের দাবিও ক্রমে আবছা হয়ে আসছে। ফলে দল রাখতে শেষ পর্যন্ত উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত একরকম বাধ্য হয়েই বিএনপিকে নিতে হয়েছে। এই সিদ্ধান্তই কিন্তু বুঝিয়ে দিচ্ছে, বিরোধীদের ভোট বর্জনের আগের সিদ্ধান্তটি কত বড় ভুল ছিল। কারণ, এক মাস আগের পরিস্থিতির সঙ্গে আজকের অবস্থার মৌলিক কোনো পরিবর্তন কিন্তু ঘটেনি। এক মাস আগে নবম সংসদের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শেখ হাসিনা, দশম সংসদের প্রধানমন্ত্রীও তিনি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি হাসিনা মানেননি, সংশোধিত সংবিধান অনুযায়ী তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বেই ভোট হয়েছিল, এবারও উপজেলা নির্বাচন হবে তাঁরই শাসনামলে। বিএনপি যে যুক্তিতে সাধারণ নির্বাচন বর্জন করেছিল, অবস্থা অপরিবর্তিত থাকায় সেই একই যুক্তিতে উপজেলার ভোটও তাদের বর্জন করা উচিত। কিন্তু তা না করায় প্রশ্ন উঠতেই পারে, বিএনপির কোন অবস্থানটা ঠিক আর কোনটা ভুল। আগেরটা ঠিক হলে এবারেরটা ভুল, নয়তো আগেরটা ভুল হলে এবারেরটা ঠিক। দ্বিতীয় প্রশ্নটিও এরই পিঠাপিঠি এসে পড়ছে। উপজেলা নির্বাচন শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও অবাধ হলে সরকার বা নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতিত্বের আশঙ্কা বা অভিযোগ আর ধোপে টিকবে না। সে ক্ষেত্রে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে দ্রুত আরও একটি নির্বাচনের দাবির যৌক্তিকতাও ফিকে হয়ে যাবে। ওই দাবিতে আন্দোলন অযৌক্তিক হয়ে পড়বে।
উপজেলার ভোট শান্তিপূর্ণ হলে একরকম, না হলে অন্য রকম। বাংলাদেশের রাজনীতির পরবর্তী প্রবাহ অনেকটাই নির্ভর করছে ভোট কেমন হয় তার ওপর। ভারতের নজরও সেদিকে। ভোট-পরবর্তী এই এক মাসে ভারতের নজরে বেশ কয়েকটি বিষয় এসেছে। যেমন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের মধ্য দিয়ে পূর্বতন সরকারের ওপর সাধারণ মানুষের ক্ষোভে প্রলেপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। দুর্নীতিগ্রস্তদের বেশির ভাগকে বাদ দিয়ে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির মানুষদের তিনি দায়িত্বে এনেছেন। সবচেয়ে বড় কথা, বিরোধীদের হতোদ্যম করে কথায় কথায় হরতালের ডাক দেওয়ার মারাত্মক প্রবণতা বন্ধ করেছেন। এতে সাধারণ মানুষ হাঁফ ছেড়ে বাঁচছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিকে নজর দেওয়ায় রাজনৈতিক-অসামাজিক অপকর্মের হার কমছে। ভারত খুব আগ্রহের সঙ্গে নজর রাখছে বিএনপি-জামায়াত সম্পর্কের গতি-প্রকৃতির ওপর। জামায়াতের সহিংসতা বন্ধে সরকারের কঠোর মনোভাব কত দিন বজায় থাকে এবং বিএনপিও কত দিন তাদের আগের মতো গুরুত্ব দেয়, তার ওপরও দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি অনেকখানি নির্ভর করবে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার-প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া ও তাদের শাস্তিদান নতুন সরকারের অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকার থেকে সরকারকে সরাতে চাপ সৃষ্টির শেষ নেই। পাকিস্তান ইতিমধ্যেই নানাভাবে চাপ দিতে শুরু করেছে।
ভারতও তার মতো করে সচেষ্ট। জামায়াতকে কোনো রকম রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসর হাসিনা সরকার দিক, এটা ভারতের কাম্য নয়। জামায়াত দমনে হাসিনা সরকারের পাশে থাকার বিষয়ে ভারতের বিন্দুমাত্র দোলাচল নেই। জামায়াত দমন কর্মসূচি ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার-প্রক্রিয়া চালু রাখা সত্ত্বেও ইসলামি দেশগুলোর সংগঠন অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কান্ট্রিজ (ওআইসি) শেখ হাসিনার সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছে। ভারত মনে করছে, নতুন সরকারের এটাও একটা বড় কূটনৈতিক সাফল্য। গণতন্ত্রে মানুষের আস্থা অর্জনই প্রথম ও শেষ কথা। সেই আস্থা অর্জনের প্রথম ধাপ হলো বিশ্বাসযোগ্য ও ভরসাযোগ্য একটা সরকার গঠন। হাসিনা একেবারে প্রাথমিক এ কাজে সফল বলে ভারত মনে করছে। তাঁর দ্বিতীয় কাজ হওয়া উচিত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি। ভোটে জেতার পর হাসিনা দেশের সংখ্যালঘুদের স্বার্থরক্ষায় যেভাবে তৎপর হয়েছেন ও এ প্রবণতা বন্ধে যে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বার্তা দিয়েছেন, ভারত তাতে খুশি। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশিই চলে আসে সুপ্রশাসনের প্রশ্ন। এই সুপ্রশাসন নিশ্চিত করতে গিয়ে তাঁকে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলকেও শাসন করতে হবে। ভারত মনে করে, যে যে বিষয়ে হাসিনাকে প্রশ্নবিদ্ধ হতে হয়েছে, সেগুলোর অন্যতম হলো এত দিন নিজের দলের বিভিন্ন সংগঠনে লাগাম না টানা। দীর্ঘ মেয়াদে মানুষের মন জেতার জন্য এই দিকে তাঁর নজর দেওয়া আবশ্যিক। মন্ত্রিসভায় যা করেছেন,
সংগঠনেও তা করা প্রয়োজন। প্রশাসনিক এসব অবশ্য কর্তব্যের মধ্য দিয়েই প্রধানমন্ত্রীকে উজ্জ্বল করে তুলতে হবে দেশের অর্থনীতির চালচিত্রটা। দেশের স্বাধীন ‘থিঙ্ক ট্যাঙ্ক’ সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের হিসাব অনুযায়ী লাগাতার রাজনৈতিক অসন্তোষের দরুন গত বছরে আনুমানিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। বিদেশ থেকে টাকা পাঠানোর পরিমাণও নানা কারণে কমে গেছে। বিদেশে কর্মসংস্থানের সংখ্যাও কমেছে। লাগাতার আন্দোলনের ডাক, আন্দোলনের নামে সহিংসতা, মানুষ খুন, হরতাল, সম্পত্তি নষ্ট দেশের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হারে কোপ মেরেছে। প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কমে ৫ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়াবে বলে অনুমান। হাসিনাকে এই দক্ষিণমুখী প্রবাহকে রুখে উত্তরমুখী করে তুলতে হবে। কাজটা কঠিন কিন্তু অসম্ভব নয় বলেই ভারত মনে করে। নির্বাচনের পর গত এক মাসে দেশ আবার স্বাভাবিক হওয়ার দিকে অনেকখানি এগিয়েছে। এই গতি অব্যাহত রাখাই হাসিনার প্রথম ও প্রধান কাজ হওয়া উচিত বলে ভারত মনে করছে। তাহলে বেশির ভাগ দলের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে দেশের সংসদের পরবর্তী নির্বাচনের পশ্চিমা ও প্রধান বিরোধী দলের সম্মিলিত দাবি কত দ্রুত পূরণ হতে পারে? সরকারের প্রথম মাসপূর্তির প্রাক্কালে ভারত মনে করে, একমাত্র বাংলাদেশের মানুষই তা ঠিক করবেন।
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়: প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি।

দৈনন্দিন জীবনে মাতৃভাষাচর্চা

আল্লাহ তাআলা মানুষকে কথা বলা, পড়া ও শেখার জন্য বোধগম্য ও জ্ঞানপূর্ণ আলোকিত ভাষা দিয়েছেন। মহান সৃষ্টিকর্তা মাতৃভাষাকেই শিশুর আত্মার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে গেঁথে দেন। শৈশবে মাতৃক্রোড়ে প্রথম মানবসন্তানের মুখে ফুটে ওঠে ‘মা’ শব্দটি, তা-ই মাতৃভাষা, প্রাণের ভাষা। হূদয়ের ব্যক্ত-অব্যক্ত সব লৈখিক বা মৌখিক ভাষার বহিঃপ্রকাশ দৈনন্দিন জীবনে মায়ের ভাষায় ঘটে থাকে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘পরম করুণাময় (আল্লাহ)। তিনিই কোরআন শিক্ষা দিয়েছেন। তিনিই মানুষ সৃষ্টি করেছেন। তিনিই তাকে ভাব প্রকাশ করতে বা কথা বলতে (ভাষা) শিখিয়েছেন।’ (সূরা আর-রাহমান, আয়াত: ১-৪) জ্ঞান-বিজ্ঞান, ভাষা-সাহিত্য, শিল্প-সংস্কৃতি, মেধা-মনন, সুপ্ত প্রতিভা, সৃজনশীলতা ও চিন্তাচেতনায় মানবজাতি যে গৌরবময় অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে, তার মুখে রয়েছে স্রষ্টাপ্রদত্ত বাক্শক্তি বা মাতৃভাষা।
পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের মানুষের যেকোনো ভাষায় কথা বলা তার স্বভাবজাত, জন্মগত, সর্বজনীন ও আল্লাহপ্রদত্ত মানবাধিকার। পরিবেশ, পরিস্থিতি ও অবস্থাভেদে প্রয়োজনীয় কথা বলার ধরন, প্রকার ও বিন্যাস বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। মানুষ সবাক প্রাণী। তার বাগ্যন্ত্র ও মাতৃভাষার ব্যবহার যত সুন্দর ও যথার্থ হবে; ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে শান্তিশৃঙ্খলা এবং নিয়মানুবর্তিতা ততই পরিলক্ষিত হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় কথা বলা বা ভাষা ব্যবহারের সময় সবার সজাগ-সচেতন থাকা উচিত। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা দিয়েছেন, ‘কথায় কে উত্তম ওই ব্যক্তি অপেক্ষা, যে আল্লাহর প্রতি মানুষকে আহ্বান করে, সৎ কর্ম করে এবং বলে, “আমি তো আত্মসমর্পণকারীদের অন্তর্ভুক্ত।”’ (সূরা হা-মীম আস-সাজদা, আয়াত: ৩৩) মানুষের সঙ্গে পারস্পরিক আলোচনায় যেসব কথা বলা হবে, তা উত্তম ভাষা ও জ্ঞানসমৃদ্ধ হওয়া বাঞ্ছনীয়। কথা যেন জনকল্যাণকামী ও চমকপ্রদ হয়, মাতৃভাষার মাধুর্য দ্বারা নিজের ও অন্যের উপকার হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বক্তৃতা ও বাচনভঙ্গি ছিল অতুলনীয়। তিনি বিশুদ্ধ মাতৃভাষার অধিকারী ছিলেন। তাই বিনম্র কণ্ঠে শুদ্ধ কথা সবারই প্রিয়। ইসলামে নরম স্বরে সহজ-সরল ও বিশুদ্ধ ভাষায় কথা বলার দিকনির্দেশনা রয়েছে।
পবিত্র কোরআনে বুদ্ধিমত্তা, উত্তম বাক্য ও ভাষা দ্বারা ইসলাম প্রচারের আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, ‘তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে প্রজ্ঞা ও সদুপদেশ দ্বারা আহ্বান করো এবং তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে আলোচনা করো।’ (সূরা আন-নাহল, আয়াত: ১২৫) জনসমাবেশে বা মজলিসে উপবিষ্ট হয়ে এমন ভাষায় কথা বলা যাবে না, যাতে অন্যের তিরস্কার প্রচ্ছন্ন আছে এবং যা অন্যের মর্যাদার জন্য হানিকর। বরং মানুষের কথাবার্তা ও ভাষার প্রয়োগ এমন হূদয়গ্রাহী ও মনোমুগ্ধকর হওয়া উচিত, যা সঠিক, মার্জিত, রুচিসম্মত ও ভারসাম্যপূর্ণ। পরিবার, সমাজ ও জাতির অধিকাংশ সদস্য যদি সাবলীল ভাষা প্রয়োগের দিকে বিশেষ খেয়াল রাখে, তাহলে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-কলহ, ঝগড়া-বিবাদ, সংঘাত-সংঘর্ষ, হিংসা-বিদ্বেষ, পরচর্চা-পরনিন্দা ও প্রতিশোধপ্রবণতা বহুলাংশে লোপ পাবে এবং মানুষের মধ্যে অযথা শত্রুতা সৃষ্টি হবে না। পবিত্র কোরআনে এমন শুভদ শিক্ষা দিয়ে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো। তাহলে তিনি তোমাদের কর্মকে ত্রুটিমুক্ত করবেন এবং তোমাদের পাপ ক্ষমা করবেন।’ (সূরা আল-আহজাব, আয়াত: ৭০-৭১) দৈনন্দিন জীবন পরিচালনায় নরম, বুদ্ধিদীপ্ত ও প্রাণস্পর্শী কথা বলা উচিত। মাতৃভাষায় বাক্যালাপের মাধ্যমে স্বজাতির সঙ্গে নর-নারীর ভাবের আদান-প্রদান হয়। সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার প্রতিটি মুহূর্ত ভাগাভাগি করা যায়। তাই মানুষ যখন কথা বলবে, তখন সুস্পষ্ট উচ্চারণে আস্তে আস্তে বলবে। অযথা চিৎকার করে মাত্রাতিরিক্ত কথা বলা নির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক। পবিত্র কোরআনে সাবধান করা হয়েছে, ‘তুমি সংযতভাবে পদক্ষেপ করবে এবং তোমার কণ্ঠস্বর নিচু করবে! কেননা, স্বরের মধ্যে গর্দভের স্বরই সর্বাপেক্ষা অপ্রীতিকর।’ (সূরা লুকমান, আয়াত: ১৯)
মানুষ যে মাতৃভাষা বা কথা মুখ থেকে বের করে, এর ওপর আল্লাহর ফেরেশতারা সাক্ষী থাকেন। মানুষ যখন একটি মিথ্যা কথা মুখে উচ্চারণ করে, তখন তার কাঁধের ফেরেশতাদ্বয় তার কাছ থেকে দূরে সরে যায়। তাই মানুষকে সতর্ক করে বলে দেওয়া হয়েছে, ‘মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তা লিপিবদ্ধ করার জন্য তৎপর প্রহরী তার সন্নিকটেই রয়েছেন।’ (সূরা কাফ, আয়াত: ১৮) এ জন্য প্রত্যেক মানুষের উচিত মুখ থেকে বেফাঁস কোনো কথা বের করার আগে এর পূর্বাপর সব দিক চিন্তাভাবনা করা। গুরুজনেরা যথার্থই ধর্মের উপদেশবাণী প্রচার করে বলেন, ‘সদা সত্য কথা বলিবে, কখনো মিথ্যা বলিও না।’ মানুষকে মাতৃভাষা দান করা হয়েছে সঠিক মনোভাব প্রকাশের জন্য। এর জন্য প্রথমে কথাবার্তার উদ্দেশ্য ও অর্থ নির্ণয় করা এবং যথার্থতা প্রতিপন্ন করা প্রয়োজন। এরপর উত্তম ও উপযোগী পন্থায় মনের ভাব প্রকাশ করা উচিত। এটাই হচ্ছে নিরর্থক ও মিথ্যা বাক্যালাপ থেকে বেঁচে থাকার সহজ উপায়। দৈনন্দিন জীবনে মিথ্যাচারিতা, অপবাদ, দোষারোপ, কলঙ্ক রটানো, অসাক্ষাতে নিন্দা ও প্রতারণামূলক অন্যায় কার্যকলাপ কমবেশি প্রায়ই ঘটছে। বাক্যালাপে সদাচার ও মিথ্যাচার উভয়ই মানুষের ভেতর তথা মনোভাব ও অভিব্যক্তির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কযুক্ত। মানুষের কথাবার্তা, কাজকর্ম, ভাষার ব্যবহার ও আচার-আচরণে এগুলো প্রকাশ পায়। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে বাক্যালাপে প্রকাশ্যে বা গোপনে কথায় কাজে ভারসাম্যপূর্ণ মাতৃভাষা ব্যবহার ও প্রয়োগে সামঞ্জস্য থাকা দরকার।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, গবেষক ও কলামলেখক।
dr.munimkhan@yahoo.com