Sunday, January 18, 2026

ইরানে যে কারণে আরেকটি বিপ্লব হচ্ছে না by সাঈদ গোলকার

ইসলামি বিপ্লবের পর ইরান এখন ইতিহাসের বিপজ্জনক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশজুড়ে বিক্ষোভ এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং স্থায়ী অবস্থায় রূপ নিচ্ছে। নতুন করে অস্থিরতার ঢেউ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সহিংসতাও বেড়েছে। প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যাচ্ছে না।

এ পরিস্থিতিতে আবারও একটি পরিচিত প্রশ্ন সামনে এসেছে। ইরান কি ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের মতো আরেকটি মোড়ের দিকে এগোচ্ছে।

এই তুলনার প্রতি আকর্ষণ থাকা স্বাভাবিক। ব্যাপক জনসমাবেশ ও ঘন ঘন বিক্ষোভের দৃশ্য শাহ শাসনের শেষ দিকের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু এই তুলনা শেষ পর্যন্ত বিভ্রান্তিকর।

১৯৭৯ সালের বিপ্লবের সাফল্য কেবল গণ–আন্দোলনের ফল ছিল না; বরং আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে সমন্বিত বিরোধী শক্তির আবির্ভাব এবং আন্দোলন দমনে ক্ষমতাসীন অভিজাতদের ব্যর্থ হওয়াই বিপ্লবের পথ প্রশস্ত করেছিল।

ইরানের রাজা মোহাম্মদ রেজা শাহ তখন ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন। ওষুধের ওপর নির্ভরশীল ওই রাজার সিদ্ধান্তহীনতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। সংকটের সময়ে তাঁর নেতৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে তিনি দুবার দেশ ছেড়ে যান। প্রথমবার ১৯৫৩ সালে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের চ্যালেঞ্জের সময় এবং দ্বিতীয়বার ১৯৭৯ সালের জানুয়ারিতে, যখন সারা দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

এ ছাড়া শাহর দমনযন্ত্রও ছিল খণ্ডিত ও সামাজিকভাবে বৈচিত্র্যময়। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সাভাক, পুলিশ ও জেন্ডারমেরির ওপর ছিল সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব। তখন সেনাবাহিনী মূলত সীমান্ত ও ভূখণ্ড রক্ষায় নিয়োজিত ছিল, রাজনৈতিক দমন-পীড়নে নয়। এই বাহিনীগুলোয় আদর্শগত যাচাই ছিল দুর্বল এবং সদস্যরা নানা সামাজিক ও রাজনৈতিক পটভূমি থেকে এসেছিলেন।

শাহ দেশ ছাড়ার পর পুলিশের কিছু অংশ বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দমনমূলক আচরণ বন্ধ করে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে জনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিক্ষোভকারীদের সহযোগিতাও শুরু করে। একই সময়ে জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তারা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েন, নিজেদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেন এবং শেষ পর্যন্ত রাজতন্ত্র রক্ষার দায়িত্ব থেকে সরে আসেন।

তবে আজকের পরিস্থিতি ভিন্ন। শাহর মতো আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নেতৃত্ব সংকটের মুহূর্তে দ্বিধা বা সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে না। ১৯৮৯ সালে সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পর থেকে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে গভীরভাবে রূপান্তরিত করেছেন। আমার ভাষায়, ইরান এখন এমন একটি ধর্মতান্ত্রিক নিরাপত্তা রাষ্ট্র, যা সমাজের সম্মতির চেয়ে দমননীতির ওপর বেশি নির্ভরশীল। সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে তিনি অত্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক, সংহত, আদর্শিকভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং শক্তভাবে বলপ্রয়োগকারী কাঠামোর নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

ইসলামি প্রজাতন্ত্রের দমনক্ষমতা কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কেন্দ্রীভূত নয়; বরং এটি একাধিক পরস্পর জড়িত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছড়িয়ে আছে, যেখানে একাধিক কমান্ড কাঠামো একসঙ্গে কাজ করে। এই শক্তিগুলো মূলত ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী, বাসিজ, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং এসবের সঙ্গে যুক্ত সামাজিক নেটওয়ার্কে কেন্দ্রীভূত।

এই দমনমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোয় শাসনব্যবস্থার সবচেয়ে কট্টর সমর্থকেরাই প্রভাবশালী। তাদের আনুগত্য কেবল সুবিধাভিত্তিক নয়; এটি আদর্শিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রজন্মগত। আদর্শিক যাচাই ও পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে এই আনুগত্য শুধু নিশ্চিত করা হয় না, বরং সচেতনভাবে লালন করা হয়। তাদের সামাজিক উত্থান, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং পরিচয়ের বোধ শাসনব্যবস্থার টিকে থাকা এবং খামেনির নেতৃত্বের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাদের কাছে শাসনব্যবস্থার পতন কোনো রাজনৈতিক রূপান্তর নয়, বরং অস্তিত্বের জন্য সরাসরি হুমকি।

সংকটের মুহূর্তে এই অনুগত শক্তিগুলো আগেভাগেই সক্রিয় হয়, যাতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে না পড়ে। তারা অস্থিরতাকে বিদেশি মদদপুষ্ট ষড়যন্ত্র হিসেবে উপস্থাপন করে এবং সহিংসতার পথে যেতে দ্বিধা করে না।

এ কারণে ১৯৭৯ সালের তুলনায় বড় ও বিস্তৃত বিক্ষোভও শাসনব্যবস্থার ভিত্তিকে মৌলিকভাবে নাড়িয়ে দিতে পারছে না; বরং এর ফল হবে আরও কঠোর দমনমূলক। এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা স্পষ্ট হয়—বিক্ষোভ নিজে থেকেই বিপ্লব ঘটায় না; বিপ্লব ঘটে তখনই, যখন ব্যাপক গণ–অসন্তোষের সঙ্গে ক্ষমতাসীন অভিজাতদের অচলাবস্থা বা ভাঙন একত্র হয়। ১৯৭৯ সালে তা ঘটেছিল, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তা ঘটেনি। এই ভারসাম্য বদলাতে শুধু বিক্ষোভ নয়, বরং শাসনব্যবস্থার নেতৃত্বকাঠামোর ওপর সরাসরি কোনো বড় ধাক্কা দরকার।

শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়লেও ইরান এমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতার মুখে পড়বে না, যেমনটি বিদেশি হস্তক্ষেপের ফলে কিছু রাষ্ট্রে দেখা গেছে। দেশটির আধুনিক আমলাতন্ত্র বিশ শতকের শুরু থেকেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এসেছে। রাষ্ট্রের সক্ষমতা, সামাজিক সংগঠন এবং জাতীয় পরিচয়ের কারণে প্রশাসনিক ব্যবস্থায় তেমন চিড় ধরাতে পারবে না।

অনেকে সতর্ক করছেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন হলে অনিবার্যভাবে দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হবে। এই ঝুঁকি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে ইরাক বা আফগানিস্তানের মতো পরিস্থিতির সঙ্গে ইরানের একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

ইরানের ক্ষেত্রে এমন কোনো বাইরের রাষ্ট্র নেই, যারা সশস্ত্র উগ্র আন্দোলনকে অর্থায়ন, সংগঠিত ও দীর্ঘ মেয়াদে টিকিয়ে রাখার মতো ইচ্ছা ও সক্ষমতা রাখে। একই সঙ্গে ইরানি সমাজ ধর্মীয় চরমপন্থা ও রাজনৈতিক উগ্রতার বিরুদ্ধে গভীর প্রতিরোধ দেখিয়েছে। তাই শাসনব্যবস্থা পতনের পর যে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে, তা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভবও হতে পারে।

ইরান ১৯৭৯ সালের পুনরাবৃত্তির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। বিপদ হলো, এই পুরোনো তুলনার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ইরানের বর্তমান বাস্তবতা বুঝতে তেমন সহায়ক নয়। ইরানে ক্ষমতার প্রকৃত চরিত্র ভুলভাবে বুঝলে দমন, উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার মূল্য ইরানিদেরই দিতে হবে।

* সাঈদ গোলকার, যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক
- আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে পতন ঘটে ইরানের শেষ রাজা মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভীর। এ বিপ্লবের প্রধান ব্যক্তিত্ব আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির ছবি নিয়ে লাখো মানুষের জমায়েত। ১৯৭৯ সালের জানুয়ারি, তেহরান
ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে পতন ঘটে ইরানের শেষ রাজা মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভীর। এ বিপ্লবের প্রধান ব্যক্তিত্ব আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির ছবি নিয়ে লাখো মানুষের জমায়েত। ১৯৭৯ সালের জানুয়ারি, তেহরান। ফাইল ছবি: এএফপি

গাজায় যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ শুরুর ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের

ফিলিস্তিনের গাজায় শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ শুরুর ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গত বুধবার এ ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। এরপর দ্বিতীয় ধাপ নিয়ে বৃহস্পতিবার মিসরের রাজধানী কায়রোয় আলোচনায় বসে হামাসসহ অন্যান্য ফিলিস্তিনি সংগঠন। যদিও পরিকল্পনার প্রথম ধাপের অনেক শর্তই এখনো পূরণ হয়নি।

দুই বছরের বেশি সময় ধরে গাজায় ইসরায়েলের নৃশংসতার পর গত ১০ অক্টোবর থেকে উপত্যকাটিতে যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ শুরু হয়। যুদ্ধবিরতির পরও এই ধাপে হামলা চালিয়ে শত শত ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে ইসরায়েল। মিসরের সঙ্গে গাজার সীমান্ত ক্রসিংও খুলে দেয়নি তারা। অন্যদিকে গাজায় থাকা ইসরায়েলি এক জিম্মির মরদেহ এখনো ফেরত দেয়নি হামাস।

শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপকে এগিয়ে নিতে যুক্তরাষ্ট্রসহ মধ্যস্থতাকারীদের আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে। এমন একটি চ্যালেঞ্জ হলো উপত্যকাটির শাসকগোষ্ঠী হামাসকে অস্ত্রমুক্ত করা। কারণ, অস্ত্র ছাড়তে নারাজ তারা। এ ছাড়া শান্তি পরিকল্পনা অনুযায়ী গাজায় যে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনের কথা রয়েছে, তা নিয়ে সমস্যা দেখা দিতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে উইটকফ জানান, দ্বিতীয় ধাপে গাজা পরিচালনার জন্য ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটদের নিয়ে একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসন গঠন করা হবে। তারা হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ ও গাজা পুনর্গঠনের কাজ শুরু করবে। শান্তি পরিকল্পনার মধ্যস্থতাকারী দেশ মিসর, কাতার ও তুরস্কের একটি যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী, এই প্রশাসনে ১৫ জন সদস্য থাকবেন। তাঁদের নেতৃত্ব দেবেন আলী শায়াথ। তিনি পশ্চিম-সমর্থিত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সাবেক উপমন্ত্রী ছিলেন।

বোর্ড অব পিস

যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, গাজার অন্তর্বর্তী প্রশাসন থাকবে ‘বোর্ড অব পিস’ নামের একটি আন্তর্জাতিক কমিটির অধীন। এই বোর্ডে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ছাড়া অন্য সদস্যদের মধ্যে জাতিসংঘের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক দূত নিকোলাই নিয়াদেনভের থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে মোট কতজন সদস্য থাকবেন, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানাননি স্টিভ উইটকফ।

ইউরোপীয় একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহে সুইজারল্যান্ডের দাভোস শহরে এ–সংক্রান্ত বৈঠকের পর বোর্ড অব পিস নিয়ে আরও ঘোষণা আসতে পারে। আর যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, বোর্ড অব পিসের সদস্য কারা হবেন, তা নিজেই ঠিক করেছেন ট্রাম্প। গত বুধবার সম্ভাব্য সদস্যদের এ নিয়ে আমন্ত্রণপত্রও পাঠানো হয়েছে।

এই বোর্ডের অধীন গাজার অন্তর্বর্তী প্রশাসন প্রথমে গাজাবাসীর জন্য জরুরি ত্রাণের ব্যবস্থা করবে বলে জানান প্রশাসনের সম্ভাব্য প্রধান আলী শায়াথ। ওয়েস্ট ব্যাংক রেডিও স্টেশন নামের একটি সম্প্রচারমাধ্যমে তিনি বলেন, গাজা পুনর্গঠনে তিন বছরের বেশি সময় লাগবে না। যদিও জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, উপত্যকাটিতে ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামোগুলো নতুন করে গড়ে তুলতে অন্তত ২০৪০ সাল পর্যন্ত সময় লাগবে।

হামাসকে অস্ত্রমুক্ত করার চ্যালেঞ্জ

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে ঢুকে হামলা চালায় হামাস। এতে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন। ইসরায়েল থেকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয় প্রায় আড়াই শ জনকে। সেদিন থেকেই উপত্যাটিতে নির্বিচার হামলা শুরু করে ইসরায়েল। এতে এখন পর্যন্ত ৭১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গাজায় ইসরায়েল জাতিগত নিধন চালিয়েছে বলে অভিযোগ জাতিসংঘের।

এরই মধ্যে হামাস ও ইসরায়েলের সমঝোতায় শুরু হয় যুদ্ধবিরতি প্রথম ধাপ। এরপর দ্বিতিয় ধাপ নিয়ে গতকাল কায়রোয় হামাস ও বিভিন্ন ফিলিস্তিনি সংগঠনের যে বৈঠক হয়েছে, সেখানে হামাসকে নিরস্ত্র করার বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় হয়েছে বলে জানিয়েছে সূত্র। এর আগে হামাস জানিয়েছিল, কেবল স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হলেই, অস্ত্র ত্যাগে রাজি হবে তারা।

এ বিষয়ে উইটকফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হলো গাজায় হামাসের বিকল্প একটি শক্তি গড়ে তোলা, যারা শান্তি চায়। এ বিকল্প শক্তি হিসেবে অন্তর্বর্তী প্রশাসনের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, এই প্রশাসন এখন হামাসের সঙ্গে পরবর্তী ধাপের বিভিন্ন শর্ত নিয়ে আলোচনা করবে। এর একটি হলো নিরস্ত্রীকরণ। হামাস সদস্যদের ক্ষমার বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হবে।

তাবুর বাইরে বসে আছে বাস্তুচ্যূত দুই ফিলিস্তিনি শিশু। গতকাল গাজা নগরীতে
তাবুর বাইরে বসে আছে বাস্তুচ্যূত দুই ফিলিস্তিনি শিশু। গতকাল গাজা নগরীতে। ছবি: রয়টার্স

যে কারণে ভারতে মাওবাদী বিদ্রোহ নিভন্তপ্রায় by শশী থারুর

এই শতকের শুরুতে, যখন ভারত বিশ্ব অর্থনীতির এক উজ্জ্বল তারকা হিসেবে মাথাচাড়া দিচ্ছিল, তখন দেশটির অভ্যন্তরীণ অঞ্চলগুলোয় এক কালো ছায়া নেমে আসে। সেটি হলো মাওবাদী বিদ্রোহ।

দেড় দশক ধরে ধীরে ধীরে ‘রেড করিডর’ নামে পরিচিত এলাকা বিস্তৃত হচ্ছিল। কারণ, দারিদ্র্যগ্রস্ত সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে বিপ্লবী কমিউনিস্ট মতাদর্শ গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছিল। এর ফলাফল ছিল—সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ভাষায়, ‘ভারতের ইতিহাসের একমাত্র বৃহত্তম অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ।’

তবে ভারত এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম হয়েছে। রেড করিডরের বিস্তার নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। ২০১৩ সালে যেখানে এটি ১২৬টি জেলাকে ছুঁয়েছিল, সেখানে গত বছরে তা মাত্র ১১টিতে নেমে এসেছে। নিশ্চিতভাবে এটি ভারত রাষ্ট্রের জন্য বিজয়ের প্রতীক। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ঘোষণা করেছেন, ‘নকশালবাদী’ বিদ্রোহ (১৯৬০-এর দশকে পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়ি গ্রামে এই বিদ্রোহের সূচনা হয় বলে এই নামকরণ) আগামী কয়েক মাসের মধ্যে সম্পূর্ণ নির্মূল করা হবে।

নকশাল দমনে ভারত এই অগ্রগতি অর্জন করেছে তেমন কোনো ভয়ানক হিংসা ছাড়াই। শ্রীলঙ্কার সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপক্ষে ২০০৯ সালে তামিল টাইগারদের দমনে কঠোর সহিংস পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। এর মধ্য দিয়ে সেখানে ৪০ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধের অবসান হয়েছিল। ১৯৯০-এর দশকে পেরুতে আলবার্তো ফুজিমোরির সরকার নৃশংস কৌশল অবলম্বন করে মাওবাদী সেনডেরো লুমিনোসো বিদ্রোহ দমন করেছিল। ভারতের কোনো সরকার সে পথে হাঁটেনি। এর বদলে তারা এমন একটি সুপরিকল্পিত কৌশল তৈরি করেছিল, যা বিদ্রোহের কারণ ও পরিণতি—উভয় দিকই বিবেচনা করেছে।

এই বিদ্রোহের শুরুতে আছে ভূমিহীনতা, দারিদ্র্য ও প্রান্তিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে বনাঞ্চলে বসবাসকারী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারি সেবা ও সুযোগের অভাব। এটি কৃষক বিদ্রোহের জন্ম দেয় এবং বিদ্রোহীরা মাওবাদী সামরিক কৌশল ‘পিপলস ওয়ার’ অনুসরণ করতে থাকে। তারা গ্রামাঞ্চলে তাদের নিজস্ব ‘শাসন ও প্রতিরক্ষা’ প্রতিষ্ঠা করতে ‘শ্রেণিশত্রু’ খতম করতে থাকে।

২০০৪ সালে বিদ্রোহী বিভিন্ন গোষ্ঠী মিলিত হয়ে কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মাওবাদী), সংক্ষেপে সিপিআই (মাওবাদী) নামের দল গঠন করে। এই দল ভারতের গণতন্ত্র উৎখাত করে মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদী মতাদর্শভিত্তিক ‘নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

প্রশাসনিক ও নিরাপত্তাশূন্যতার সুযোগ নিয়ে সিপিআই (মাওবাদী) এই জেলাগুলোয় আংশিক স্বশাসন প্রতিষ্ঠা করে এবং ঔপনিবেশিক ও দমনমূলক প্রাতিষ্ঠানিক শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজেকে অধিকারহীনদের রক্ষক হিসেবে স্থাপন করে। বিশেষ করে হতাশাগ্রস্ত যুবকদের দলে ভেড়াতে তারা সফল হয়।

কিন্তু এই ‘রক্ষাকর্তা’র কার্যক্রম প্রায়ই হিংসা ও ডাকাতি এবং চাঁদাবাজির টাকায় চলত। ফলে ২০০৯ সালের জুনে ভারতের সরকার সিপিআই (মাওবাদী) ও তার সহযোগী সংস্থাগুলোকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করে এবং বেআইনি কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইনের অধীন তাদের নিষিদ্ধ করে। এর প্রতিক্রিয়ায় মাওবাদীরা আরও সহিংস হয়ে ওঠে। ২০১০ সালে তারা একটি কুখ্যাত অভিযানে ছত্তিশগড়ে কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সের ৭৪ জন সদস্য ও ২ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যা করে। এর তিন বছর পর যখন মাওবাদীরা তাদের সহিংস তৎপরতার শিখরে ছিল, তখন ছত্তিশগড়ে আরেকটি হামলা চালিয়ে তারা কংগ্রেস পার্টির অনেক শীর্ষ নেতাকে হত্যা করে।

ভারতে তখন কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ ক্ষমতায় ছিল। তখনকার সরকার বুঝতে পেরেছিল, সরকারের এমন একটি নতুন কৌশল দরকার, যা নিরাপত্তা–হুমকি ও বিদ্রোহকে উসকে দেওয়া অর্থনৈতিক ক্ষোভ—উভয়কেই সমাধান করবে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর নরেন্দ্র মোদির সরকার সরাসরি ও বহুমাত্রিক একটি কৌশল কার্যকর করে। এই কৌশল নিরাপত্তা ও উন্নয়ন—উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করে।

নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সরকার পুলিশ বাহিনীকে আধুনিক অস্ত্র, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা এবং জঙ্গলে যুদ্ধে ও বিদ্রোহ দমন প্রশিক্ষণ দিয়ে শক্তিশালী করেছে। এ ছাড়া সরকার বহু নতুন ফরওয়ার্ড অপারেটিং বেজ স্থাপন করেছে, যা মাওবাদীদের ‘নিরাপদ’ এলাকা সংকুচিত করেছে এবং তাদের চলাচল ব্যাহত করেছে।

সরকারের লক্ষ্য ছিল মাওবাদীদের চাঁদাবাজি ও অন্যান্য অবৈধ অর্থায়ন নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া এবং কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক নেতৃত্বকে গ্রেপ্তার বা অকার্যকর করে দেওয়া।

ভারতের সরকার মাওবাদী বিদ্রোহ মোকাবিলায় ‘লৌহমুষ্টি’ ও ‘মসৃণ হাত’—দুই দিকই ব্যবহার করেছে। শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকলেও শুধু তার ব্যবহারই যথেষ্ট হতো না। তাই সরকারের পক্ষ থেকে ‘হৃদয় ও মন জয়ের অভিযান’ চালানো হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল দারিদ্র্য দূরীকরণ ও উন্নয়নমূলক উদ্যোগ। প্রভাবিত জেলাগুলোয় রাস্তা, সেতু, সেল টাওয়ার তৈরি করা হয়েছে। এগুলো গ্রামগুলোকে শহরের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং মাওবাদীদের বিচ্ছিন্ন করার সুযোগ কমিয়েছে।

সরকার সরাসরি জনগণের কাছে পৌঁছানোর জন্য ভর্তুকিপ্রাপ্ত খাদ্য, আবাসন ও স্বাস্থ্যসেবা মতো কর্মসূচিও চালু করেছে। এতে হতাশা ও অভাবের মধ্যে থাকা মানুষ, বিশেষ করে আদিবাসী যুবকেরা অস্ত্রের বিকল্প পেয়েছে।

এ কারণে বড় ধরনের বিদ্রোহ এখন অনেকটা কমে গেছে। সিপিআই (মাওবাদী) নেতৃত্ব এখন দুর্বল। অর্থায়নের সমস্যায় পড়ে তারা আগের মতো দলে সদস্য ভেড়াতে পারছে না। তাদের কেন্দ্রের নেতারা পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করছেন। যেমন ২০২৫ সালের অক্টোবরে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মালোজুলা বেণুগোপাল রাও ৬০ জন সঙ্গী নিয়ে আত্মসমর্পণ করেন। তিনি স্বীকার করেন, আন্দোলন রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে ছোট করে দেখেছিল। ফলে তাঁদের সশস্ত্র সংগ্রাম ব্যর্থ হয়েছে। তাঁর মতে, মাওবাদীদের সশস্ত্র শাখা বন্ধ করে দিয়ে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ ও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা উচিত।

তবে সমস্যার সবটাই এখনো কেটে যায়নি। এ কারণের মাওবাদীদের আবার সক্রিয় হওয়া ঠেকাতে টেকসই উন্নয়ন এবং স্থায়ী ও নির্ভরযোগ্য সেবা গরিব মানুষের দুয়ারে পৌঁছে দিতে হবে। ১১টি জেলায় এখনো মাওবাদীদের প্রভাব আছে এবং এই জেলাগুলো ঘন বনাঞ্চল–অধ্যুষিত হওয়ায় সেই সেবা পৌঁছে দেওয়া কঠিন।

আসলে চূড়ান্ত সমাধান তখনই সম্ভব, যখন সরকার স্থানীয়ভাবে সুপেয় পানি, বন ও জমির অধিকার রক্ষা করবে আর উন্নয়ন এমনভাবে করবে, যা ঐতিহ্য ও সম্প্রদায়ের অধিকারকে অটুট রাখে। এ ছাড়া শোষক প্রতিষ্ঠান (সরকারি বা বেসরকারি) আদিবাসী–অধ্যুষিত এলাকায় মানুষের জীবন ‘নিয়ন্ত্রণ’ করার চেষ্টা করবে না—এটিও নিশ্চিত করতে হবে।

* শশী থারুর, ভারতের কংগ্রেস পার্টির একজন লোকসভা সদস্য
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

ভারতের বড় অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সমস্যা হয়ে উঠেছিল মাওবাদী বিদ্রোহ
ভারতের বড় অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সমস্যা হয়ে উঠেছিল মাওবাদী বিদ্রোহ। ফাইল ছবি: রয়টার্স

মাদুরোকে তুলে নেওয়ার কয়েক মাস আগে থেকেই মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর যোগাযোগ ছিল

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে রাজধানী কারাকাস থেকে তুলে আনার জন্য মার্কিন সামরিক অভিযান চালানোর কয়েক মাস আগে থেকেই দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো কাবেলোর সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা আলোচনা চালিয়ে আসছিলেন। এমনকি মাদুরোকে তুলে নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়ার পরও এই যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মার্কিন কর্মকর্তারা ৬২ বছর বয়সী কাবেলোকে সতর্ক করেছিলেন, তিনি যেন তাঁর নিয়ন্ত্রণে থাকা নিরাপত্তা বাহিনী বা সশস্ত্র সমর্থকদের দিয়ে বিরোধীদের ওপর কোনো হামলা না করেন। ৩ জানুয়ারির অভিযানের পরও ভেনেজুয়েলার গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ এবং সশস্ত্র বাহিনী মূলত কাবেলোর নিয়ন্ত্রণেই আছে।

মার্কিন প্রশাসন নিকোলা মাদুরোকে তুলে নিতে মাদক পাচারের যে অভিযোগ ব্যবহার করেছিল, সেই একই অভিযোগে কাবেলো নিজেও অভিযুক্ত। তবে অভিযানের সময় তাঁকে ধরা বা তুলে নেওয়া হয়নি।

মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করেন, কাবেলো যদি তাঁর বাহিনী নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন, তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে স্থিতিশীলতা চাইছেন, তা নষ্ট হতে পারে। এ ছাড়া বর্তমানে ক্ষমতায় থাকা অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের ক্ষমতাও হুমকির মুখে পড়তে পারে।

কাবেলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা এবং তাঁর বিরুদ্ধে থাকা আইনি মামলা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সরাসরি ও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলছেন।

ভেনেজুয়েলার ক্ষমতার ভরকেন্দ্র কাবেলো

কাবেলো দীর্ঘদিন ধরে ভেনেজুয়েলার দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং মাদুরোর অন্যতম বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে পরিচিত। বর্তমান প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ ও কাবেলো দীর্ঘদিন সরকারের কেন্দ্রে থাকলেও তাঁরা একে অপরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু নন।

কাবেলো সামরিক বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা। ফলে দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা এবং ‘কালেকতিভো’–এর (মোটরসাইকেল আরোহী সশস্ত্র বেসামরিক বাহিনী) ওপর তাঁর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। অতীতে বিক্ষোভকারীদের ওপর এসব বাহিনীর হামলা চালানোর ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র আপাতত তেলের খনিসমৃদ্ধ ভেনেজুয়েলায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কাবেলোর ওপর কিছুটা নির্ভর করছে। তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের মনে ভয় আছে, কাবেলো যেকোনো সময় ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিতে পারেন।

মাদক পাচারের অভিযোগ

২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র কাবেলোকে ধরিয়ে দিলে এক কোটি ডলারের পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। বর্তমানে সেই পুরস্কার বাড়িয়ে ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, কাবেলো একটি আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারী চক্রের (কার্টেল অব দ্য সানস) প্রধান নেতা। তবে কাবেলো সব সময়ই এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পর অনেক মার্কিন রাজনীতিবিদ প্রশ্ন তুলেছেন, মাদুরোকে তুলে নেওয়া হলেও কেন কাবেলোকে ধরা হলো না? রিপাবলিকান প্রতিনিধি মারিয়া এলভিরা সালাজার এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘দিওসদাদো কাবেলো সম্ভবত মাদুরো বা দেলসি রদ্রিগেজের চেয়েও বেশি ভয়ংকর।’

বর্তমান পরিস্থিতি

মাদুরোকে সরিয়ে দেওয়ার প্রথম কয়েক দিন কাবেলো মার্কিন হস্তক্ষেপের কড়া সমালোচনা করেছিলেন। তবে গত কয়েক দিনে ভেনেজুয়েলায় তল্লাশি বা ধরপাকড়ের খবর আগের চেয়ে কমেছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও বর্তমান ভেনেজুয়েলা সরকার জানিয়েছে, রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দেওয়া হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে কাবেলো এ বিষয়টি দেখাশোনা করছেন। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, মুক্তির এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতির এবং এখনো শত শত মানুষ অন্যায়ভাবে বন্দী রয়েছেন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-17%2Fiip0xj7l%2FVenezuela-cabello.jpg?rect=108%2C0%2C960%2C640&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো কাবেলো। ছবি: রয়টার্স

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২: নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে রুমিন ফারহানা, ‘দিস ইজ দ্য লাস্ট টাইম, আই ওয়ার্নিং ইউ’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ-বিজয়নগর একাংশ) আসনে উঠান বৈঠকে বাধা দেওয়ার জেরে আচরণবিধি প্রতিপালনে নিয়োজিত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানার বাগ্‌বিতণ্ডার ঘটনা ঘটেছে। শনিবার বিকেলে সরাইল উপজেলার নোয়াগাঁও ইউনিয়নের ইসলামাবাদ (গুগদ) গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। পরে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। জুয়েল মিয়া নামের রুমিন ফারহানার এক অনুসারী জরিমানার টাকা পরিশোধ করেন।

উপজেলা প্রশাসন ও প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন বলেন, আজ বিকেলে ইসলামাবাদ গ্রামে উঠান বৈঠক করছিলেন রুমিন ফারহানা। তিনি বক্তব্য রাখার একপর্যায়ে কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে নিয়ে সেখানে হাজির হন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহরিয়ার হাসান খান । এ সময় রুমিন ফারহানা বৈঠকস্থলের পাশে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন। এ–সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।

ছড়িয়ে পড়া ভিডিও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উদ্দেশে রুমিন ফারহানাকে বলতে শোনা যায়, ‘আপনি পারলে থামাই দেন। আজকে আপনাকে ভদ্রতার সঙ্গে বলছি। নেক্সট টাইম কিন্তু ভদ্রতা দেখাব না।’ এ সময় পাশে থাকা এক ব্যক্তিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি উঁচিয়ে বলতে শোনা যায়, ‘আপনাদের তারা বুইড়া আঙুল দেখায়, আপনারা কিছুই করতে পারেন না।’ এ সময় রুমিন ফারহানা বৃদ্ধাঙ্গুলি উঁচিয়ে বলেন, ‘আপনাদের তারা এই রকম দেখায়।’

এ সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে বলতে শোনা যায়, ‘কে এমন করে?’ প্রত্যুত্তরে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘খোঁজ নেন, প্রশাসনে বইসা আছেন। আমি যদি না বলি, এখান থেকে বাইর হইতে পারবেন না। এক্সকিউজ মি স্যার, দিস ইজ দ্য লাস্ট টাইম, আই ওয়ার্নিং ইউ।’ তখন ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, ‘আচরণবিধি ভঙ্গ হলে আমাদের তো আসতে হবেই।’ উত্তরে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘সব জায়গাতেই হচ্ছে। আপনারা কিছুই করতে পারেন না।’ এ সময় রুমিন ফারহানার অনুসারীরা ‘ঠিক, ঠিক’ বলে চিৎকার করতে থাকেন।

আশুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান ও উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক আলমগীর খাঁর বিরুদ্ধে ১৩ জানুয়ারি জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে আচরণবিধি ভঙ্গের লিখিত অভিযোগ দেন রুমিন ফারহানা। এর পরদিন হাবিবুর রহমান এক সমাবেশে ওই অভিযোগকে ‘বৃদ্ধাঙ্গুলি’ দেখান।

রুমিন ফারহানা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার প্রতিপক্ষের জোটের প্রার্থী ও তার লোকজন প্রতিদিন স্টেজ করে সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করে আইন ভঙ্গ করছে। আমাকে আশুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক টিস্যু পেপার বলছে, নর্তকী বলছে। আমি অভিযোগ দিয়েছি। এর উত্তরে তারা বৃদ্ধাঙ্গুল দেখাচ্ছে, আমি বিষয়টি ম্যাজিস্ট্রেটকে স্যার সম্বোধন করে বলেছি। তারা (প্রশাসন) আমার প্রতিটি উঠান বৈঠকে আইনের অপপ্রয়োগ করছে। আমি একটি হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করি, কোনো স্টেজ করি না। এতে প্রতিদিন বাধা দিচ্ছে, জরিমানা করছে। আজ ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে। এর আগেও ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে। কিন্তু তাদের কোনো বাধা দিচ্ছে না।’

সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা আবু বকর সরকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আচরণবিধি ভঙ্গ করায় তাঁকে (রুমিন ফারহানা) অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আইন সবার জন্য সমান। আমরা আশা করি, সবাই আইন মেনে চলবেন। ওনার যদি অভিযোগ থাকে, তবে উনি অভিযোগ দিতে পারেন।’

সংরক্ষিত আসনের সাবেক সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহসম্পাদক ছিলেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী হতে দীর্ঘদিন ধরে মাঠে ছিলেন। কিন্তু আসনটিতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবকে জোটের প্রার্থী করা হয়েছে। দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে রুমিন ফারহানা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় গত ৩০ ডিসেম্বর তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে রুমিন ফারহানার বাগবিতণ্ডার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে রুমিন ফারহানার বাগবিতণ্ডার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ছবি: ভিডিও থেকে সংগৃহীত

মাথায় টুপি কি কেবল ভোটের আগেই! by সারফুদ্দিন আহমেদ

ঢাকা-৮ আসনের বয়সে তরুণ এক এমপি প্রার্থী ওই আসনের ভোটারদের মুখোমুখি হয়েছেন। একটি নবীন দলের মনোনয়ন পাওয়া ওই প্রার্থী, তাঁর সঙ্গে থাকা লোকজন এবং সাধারণ ভোটাররা জটলার মতো করে রাস্তায় দাঁড়িয়েছেন।

প্রার্থীর সঙ্গে একজন ভোটারের আলাপ হচ্ছে। উৎসুক লোকেরা তাঁদের কথা শুনছেন। কেউ কেউ মুঠোফোনে আলাপটি ভিডিও করছেন। প্রার্থী এবং ভোটার দুজনেরই গায়ে পাঞ্জাবি। মাথায় টুপি।

একই আসনে একটি বড় দলের টিকিট নিয়ে অন্য একজন প্রভাবশালী নেতা নির্বাচন করছেন। সেই নেতার লোকজনের কারণে এলাকার লোক কতটা অতিষ্ঠ, তাই নিয়ে দুজনের কথা হচ্ছে।

ভোটার বলছিলেন, বড় দলটির প্রভাবশালী ওই নেতার অনুসারীরা সমানে দুর্নীতি-চাঁদাবাজি করে যাচ্ছেন।

নবীন দলের তরুণ প্রার্থী বললেন, ‘তাঁর (প্রতিপক্ষ প্রার্থীর) লোকজন এসব করছেন, তাহলে উনি এত ভদ্র সাজেন কেন?’

তখন ভোটার তাঁকে যথেষ্ট শ্লেষ মেশানো গলায় খোঁচা মেরে বললেন, ‘ভদ্র মানে, আমার আপনার মতো ভদ্র। আমি আপনি ভদ্র না! এই যে আপনি নির্বাচনের কারণে টুপি পরছেন, এত দিন কিন্তু আপনার মাথায় টুপি ছিল না! এখন আপনার মাথায় টুপি।’

ভোটার মুখের ওপর এমন কথা বলবেন, তা তরুণ প্রার্থীটি আশা করেননি। তিনি থতমত খেলেন, তারপর বেশ জোরের সঙ্গে বললেন, ‘দ্যাখেন, আমি মাদ্রাসায় লেখাপড়া করছি...।’

ভোটার বললেন, ‘আপনি মাদ্রাসায় পড়ছেন, আমি কিন্তু মাদ্রাসায় পড়ি নাই। আমি জেনারেল লাইনে পড়ছি।’

ভোটারের দীর্ঘ শ্মশ্রুমণ্ডিত মুখের অনুযোগমিশ্রিত অভিব্যক্তি যেন অব্যক্ত ভাষায় প্রার্থীকে বলল, ‘আমি জেনারেল লাইনে পড়েও ভোটের জন্য মাথায় টুপি দিইনি, আমি আগে থেকেই টুপি পরি।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভোটার ও প্রার্থীর এই কথোপকথনের ভিডিওটি ভাইরাল হলেও ভোটের আগে প্রার্থীর পোশাক–পরিচ্ছদে আঁতকা পরিবর্তন আসাটা নতুন কিছু না। ভোটের সময় পুরুষ প্রার্থীর মাথায় টুপি ও নারী প্রার্থীর মাথায় হিজাব পরার ঐতিহ্য অতি সাধারণ। টুপি-পাঞ্জাবি পরে তোলা ছবিসহ পোস্টার সাঁটানো পুরোনো রেওয়াজ।

ভোটের পর যথারীতি নেতাদের বেশির ভাগেরই আগের ‘চেহারা-সুরতে’ ফিরে যাওয়ার ঘটনাও নতুন কিছু না। কারণ, এই দেশে নির্বাচন মানে শুধু ভোট না, এটি আসলে একধরনের বাস্তব জীবন-নাটকের ‘সামাজিক রিহার্সাল’। এখানে ভোট এলে রাজনীতিবিদ আর শুধু নাগরিক প্রতিনিধির ভূমিকায় থাকেন না, তিনি হয়ে ওঠেন অভিনেতা।

যে মানুষটিকে বছরের পর বছর ধর্মচর্চা নিয়ে উদাসীন ও নির্বিকার থাকতে দেখা যায়, ভোটের মঞ্চে উঠে সেই তাঁকেই হঠাৎ পোশাকে-আশাকে ‘ধার্মিক’ হয়ে উঠতে দেখা যায়; ঠিক যেমন নাটকের পর্দা উঠলে যাত্রাদলের অভিনেতারা কস্টিউম পরে ‘রাজা’ বা ‘সন্ন্যাসী’ হয়ে যান।

ভোটের আগে রাজনীতিকদের এই পোশাক পরিবর্তনে ধর্ম আর বিশ্বাসের প্রকাশ থাকে না, তা হয়ে ওঠে কৌশলের উপাদান। ধর্ম এখানে নৈতিক অনুশীলন থাকে না, তা হয়ে ওঠে ভোটের ভাষা। এই ভাষা দিয়ে ভোটারকে বলা হয়, ‘আমি তোমাদেরই লোক।’

২.

সাধারণ মানুষ বাস্তবতাকে সরাসরি যতটা না বোঝেন, তার চেয়ে বেশি বোঝেন প্রতীক, মিথ ও চিহ্নের মধ্য দিয়ে।

ধর্মীয় পোশাক (টুপি, হিজাব, গেরুয়া বসন, ক্রস, তিলক) কিংবা প্রতীক (চাঁদ-তারা, ক্রস, ত্রিশূল) ব্যক্তি বা দলের সম্পর্কে তিনটি বার্তা একসঙ্গে দেয়—১. নৈতিক শুদ্ধতা (‘আমি ধার্মিক, আমাকে বিশ্বাস করো’) ২. পরিচয়ের নিশ্চয়তা (‘আমি তোমাদেরই লোক’) ৩. অতীতের সংযোগ (‘আমি তোমাদেরই ইতিহাস ও বিশ্বাস বহন করি’)।

এই ধর্মীয় চিহ্ন বা সংকেত ব্যবহারের মনস্তত্ত্ব খুব সরল। প্রার্থী জানেন, ভোটার যুক্তির চেয়ে পরিচয়ে বেশি সাড়া দেন। তাই তিনি নিজেকে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ করতে চান আচরণ দিয়ে নয়, চিহ্ন দিয়ে। তিনি টুপি, দাড়ি, নামাজ, ধর্মীয় শব্দ—এসব অনুষঙ্গকে সংকেত হিসেবে ব্যবহার করেন।

এই ধর্মীয় পোশাক ও চিহ্ন যুক্তির চেয়ে আবেগের ওপর বেশি তাড়াতাড়ি কাজ করে। ভোটার যখন জটিল অর্থনীতি বোঝেন না, দীর্ঘ নীতিনথি পড়েন না কিংবা রাষ্ট্রীয় কাঠামো নিয়ে ভাবার সময় পান না, তখন তিনি সহজ প্রশ্নে আশ্রয় নেন: ‘এই লোকটা কি আমার মতো?’ বা ‘লোকটা কি আমার ধর্ম-সংস্কৃতির লোক?’

ভোটার যাতে শর্টকাটে বুঝতে পারেন, ‘আমি তোমাদেরই লোক’, সে জন্যই এই চিহ্ন-প্রতীকের আশ্রয় নেওয়া হয়। রাজনৈতিক মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় কগনিটিভ শর্টকাট।

এই পরিচয়গুলো টেকসই নয়, কিন্তু কার্যকর। এগুলো টেকসই বিশ্বাস তৈরি করে না, বিভ্রম তৈরি করে।

অনেক সময় ভোটার বুঝে যান, প্রার্থীর এই টুপি পরার মধ্যে কোনো ধর্মীয় বা নৈতিক দায় নেই, আছে কেবল ভোট হাতিয়ে নেওয়ার মতলব। তখন তিনি বিরক্ত হয়ে বলে ফেলেন, ‘এই যে আপনি নির্বাচনের কারণে টুপি পরছেন, এত দিন কিন্তু আপনার মাথায় টুপি ছিল না!’

প্রার্থী তখন অস্বস্তিতে পড়েন। কারণ, এতে তাঁর সাজানো পরিচয় প্রশ্নের মুখে পড়ে যায়। তখন তিনি খেপে গিয়ে বলেন, ‘আমি মাদ্রাসায় পড়েছি।’

তাঁর এই বক্তব্য আসলে আত্মপরিচয়ের ঘোষণা নয়, এটি আত্মরক্ষার চেষ্টা। যেন বলা হচ্ছে, ‘আমি এই পোশাক পরার অধিকার রাখি।’ কিন্তু ভোটার ততক্ষণে বুঝে গেছেন, অধিকার আর আন্তরিক অভ্যাস এক জিনিস নয়।

প্রার্থী যখন ‘আমি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছি’ বলে পরিচয়ের অস্ত্র বের করেন, তখন ভোটারের জবাব হয় আরও নির্মম। ভোটার তখন জবাব দেন, ‘আমি মাদ্রাসায় পড়িনি, তবু আগে থেকেই টুপি পরি।’ এটি তাঁর নিঃশব্দ কিন্তু তীব্র প্রতিক্রিয়া। তিনি জানিয়ে দেন, তিনি মাদ্রাসায় পড়েননি, তবু আগে থেকেই টুপি পরেন। অর্থাৎ তাঁর টুপি পরার ইচ্ছা নির্বাচনের হাওয়া দেখে জাগ্রত হয় না।

ভোটারের এই প্রতিক্রিয়াকে শুধু প্রত্যাখ্যান বলা যায় না। একই সঙ্গে তা প্রতারণামূলক ভোট কৌশলের বিরুদ্ধে এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী দার্শনিক রায়।

আমরা নির্বাচনের আগে টুপি ও হিজাব পরার এবং ভোটের পর তা খুলে ফেলার অসংখ্য ঘটনা দেখেছি। অনেক নেতাকে তাঁর মার্কায় ভোট দিলে জান্নাত পাওয়া যাবে বলে নিশ্চয়তা পর্যন্ত দিতে দেখা গেছে।

এই অবস্থায় ভোট আর নাগরিকের সচেতন সিদ্ধান্ত থাকে না; তা হয়ে ওঠে পরকালীন প্যাকেজ ডিল। ব্যালট পেপার রূপ নেয় আমলনামায়, সিলমোহর হয়ে ওঠে সওয়াবের সনদ।

পোশাক যে চরিত্রের প্রমাণ নয়, প্রতীক যে নীতির বিকল্প নয়, এই সহজ যুক্তিকেও ধর্মীয় পোশাক ও প্রতীক আবেগের আঘাতে দুর্বল করে দেয়। রাজনীতিকেরা এই দুর্বলতাকে কৌশলে ব্যবহার করেন। তাঁরা জানেন, এ ধরনের পোশাক ও প্রতীক দিয়ে ‘আমরা বনাম তারা’ বিভাজন তৈরি করা সহজ হয়; নিজেকে নৈতিক দিক থেকে উচ্চ শ্রেণির দাবি করা যায় এবং বিরোধীদের ‘অধার্মিক’ বা ‘শত্রু’ বানানো যায়; সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এসব দিয়ে দিন শেষে জবাবদিহি এড়ানো যায়।

প্রতীক প্রয়োজনীয়, কিন্তু প্রতীক যখন রাজনীতিকে গ্রাস করে যুক্তির জায়গা দখল করে নেয়, তখনই বিপদ। যে সমাজ ভোট দেয় পোশাক দেখে, সে সমাজ একসময় নীতি যাচাইয়ের ক্ষমতা অধিকার হারিয়ে ফেলে। যখন ধর্মীয় পোশাক ও প্রতীক রাষ্ট্রক্ষমতার সিঁড়ি হয়ে ওঠে, তখন সচেতন নাগরিক অচেতন ভক্তে পরিণত হয়। ভক্তের ভোট থাকে, প্রশ্ন থাকে না।

সবচেয়ে ভয়ের কথা হলো, ভোটে এই পোশাক ও প্রতীকের অপব্যবহার ধর্মকে ক্ষতিগ্রস্ত করে নীরবে, আর রাজনীতিকে দুর্বল করে ধীরে। পাঞ্জাবি-টুপি-হিজাব যখন ভোট আকর্ষণের টোপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন ধর্মের নৈতিক শক্তির আবেদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর রাজনীতি যখন অভিনয় হয়ে দাঁড়ায়, তখন তার জবাবদিহি হারিয়ে যায়। দিন শেষে দুটোই টিকে থাকে, কিন্তু দুটোই হয়ে ওঠে ফাঁপা।

ভোটার তখন বুঝে যান, এই টুপি বিশ্বাসের নয়, এই নামাজ আত্মা পরিশুদ্ধির নয়, এই জান্নাতের প্রতিশ্রুতির পেছনে আছে ক্ষমতার উদগ্র বাসনা। নির্বাচন তখন আর যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়া থাকে না, এটি হয়ে ওঠে সমষ্টিগত আত্মপ্রতারণার উৎসব।

* সারফুদ্দিন আহমেদ, প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক
- ই-মেইল: sarfuddin2003@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব

মাথায় টুপি কি কেবল ভোটের আগেই!

দূষণ আগরতলায়, ভুগছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া by মোস্তফা ইউসুফ ও শাহাদৎ হোসেন

* যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকে গত মার্চে দূষণ বন্ধের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। অবশ্য পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।
* দূষণের কারণে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলায় জনজীবনে নানা ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া সীমান্তের ওপারে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য। রাজ্যটির রাজধানী আগরতলায় শিল্প ও গৃহস্থালি বর্জ্যে সেখানকার নদী ও খাল দূষণের শিকার হচ্ছে। সেই দূষিত পানি আসছে বাংলাদেশে। ভুগছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ।

১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ আখাউড়া সীমান্তে গিয়ে দেখা যায়, ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের পাশ দিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে এসেছে কালন্দি খাল। সেই খাল দিয়ে আসছে কুচকুচে কালো পানি। আশপাশে তীব্র দুর্গন্ধ। চিকিৎসক ও স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, দীর্ঘদিনের এ দূষণে ত্বক ও পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হচ্ছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার ১৫ গ্রামের মানুষ।

সব মিলিয়ে পাঁচটি খাল ও দুটি নদী দূষণের শিকার হচ্ছে। সেগুলো হলো কালন্দি, মরা গাঙ, কাটা খাল, কালিকাপুর ও গঙ্গাসাগর খাল এবং হাওড়া ও জাজী নদী।

দূষণ নতুন নয়, তিন দশক ধরে চলছে। এ বছরের মার্চে অনুষ্ঠিত যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকে ভারতের পক্ষ থেকে দূষণ বন্ধের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল বাংলাদেশকে। তবে পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।

২০২০ সালে পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি কমিটি প্রথমবারের মতো এসব খাল ও নদীর পানি পরীক্ষা করে দূষণের প্রমাণ পায়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ভরা বর্ষাতেও সীমান্তবর্তী বাংলাদেশ অংশের খালগুলোতে দূষণ ছিল মাত্রাতিরিক্ত। দূষণের প্রভাব তিতাস নদ পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল।

কমিটির প্রতিবেদনে দূষণ বন্ধে ভারতীয় অংশে বর্জ্য পরিশোধনাগার (সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ও অ্যাফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) বসানোর ব্যবস্থা নিতে ভারতের সঙ্গে আলোচনা করার সুপারিশ করা হয়। সর্বশেষ পরিবেশ অধিদপ্তর গত এপ্রিলেও পানি পরীক্ষা করে। সেখানেও দূষণ পাওয়া যায়।

২০২০ সালের কমিটির প্রধান ছিলেন পরিবেশ অধিদপ্তরের তৎকালীন পরিচালক ফাহমিদা খানম। তিনি এখন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০২০ সালের অক্টোবরে আমরা প্রথম সীমান্তবর্তী খাল ও নদীর পানির নমুনা পরীক্ষা করে মানমাত্রা–বহির্ভূত দূষণ পাই। তখন আমরা পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে এটি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করার ব্যবস্থা করেছিলাম।’

ফাহমিদা বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে তখন যৌথ নদী কমিশনকে এসব দূষণ বন্ধে ব্যবস্থা নিতে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য বলি। তারা নিয়মিত বিষয়টি কমিশনের বৈঠকে উত্থাপন করে আসছে। সর্বশেষ ফলাফল কী, সেটা যৌথ নদী কমিশন ভালো বলতে পারবে।’

জানতে চাইলে যৌথ নদী কমিশনের পরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবু সাঈদ প্রথম আলোকে বলেন, কয়েক বছর ধরে যৌথ নদী কমিশনের সভায় দূষণ বন্ধে ব্যবস্থা নিতে ভারতকে বলা হচ্ছে। প্রতিবারই ভারত দূষণ বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেয়। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকেও দূষণ বন্ধে পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।

মোহাম্মদ আবু সাঈদ আরও বলেন, সর্বশেষ এ বছরের মার্চে অনুষ্ঠিত যৌথ নদী কমিশনের সভায় ভারত জানিয়েছে, দূষণ বন্ধে আগরতলা শহরে সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বসানোর কাজ শুরু হয়েছে। এটি নির্মাণাধীন। কাজ শেষে বাংলাদেশ থেকে একটা দলের সেটি পরিদর্শনে যাওয়ার কথা রয়েছে।

দূষণের চিত্র

পানিতে জলজ প্রাণী ও অণুজীবের শ্বাস নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উপাদান হলো দ্রবীভূত অক্সিজেন। প্রতি লিটারে দ্রবীভূত অক্সিজেন (ডিও) দরকার অন্তত ৫ মিলিগ্রাম।

পরিবেশ অধিদপ্তরের এ বছরের এপ্রিলের পরীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, ৭টি জায়গা থেকে নেওয়া নমুনার ৬টিতেই দ্রবীভূত অক্সিজেন গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে অনেক কম পাওয়া গেছে। ৫টিতে পাওয়া গেছে শূন্য দশমিক ৬১ থেকে ১ দশমিক ২০ মিলিগ্রামের মধ্যে। একটি জায়গায় এ হার ছিল ৪ দশমিক ১৫ মিলিগ্রাম। গ্রহণযোগ্য মানমাত্রায় পাওয়া গেছে একটি জায়গায়।

পানিতে জৈব দূষণ কতটা, তা মাপার সূচক হচ্ছে বিওডি (বায়োকেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড)। এটির গ্রহণযোগ্য মানমাত্রা হলো প্রতি লিটারে সর্বোচ্চ ৬ মিলিগ্রাম। সাতটি নমুনার সব কটিতেই গ্রহণযোগ্য মাত্রার বেশি পাওয়া গেছে। পরিমাণ ৮ থেকে ২৭ মিলিগ্রাম।

দূষণের মাত্রা পরীক্ষার আরেকটি সূচক হলো সিওডি (কেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড)। পানিতে সিওডি থাকতে হয় প্রতি লিটারে সর্বোচ্চ ৫০ মিলিগ্রাম। সাতটি নমুনার মধ্যে একটিতে সিওডি গ্রহণযোগ্য মাত্রায় পাওয়া গেছে। ছয়টিতে পাওয়া গেছে বেশি, ৫২ থেকে ১১৬ মিলিগ্রাম।

আখাউড়া প্রকৃতি ও পরিবেশ ক্লাবের আহ্বায়ক রুবেল আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ভারত থেকে দূষিত পানি আসছে। বিগত তিন দশকে দূষণ বেড়েছে।

স্বাস্থ্যের ক্ষতি, সম্পদের ক্ষতি

দূষণের কারণে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলায় জনজীবনে নানা ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে। উপজেলার স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিমেল খান প্রথম আলোকে বলেন, আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে দূষিত ও রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রিত পানি আসছে। এতে ডায়রিয়া, টাইফয়েড ও চর্মরোগ হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। তা ছাড়া ওই পানিতে থাকা রাসায়নিকের কারণে ক্যানসারের মতো রোগ হতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমরা বিষাক্ত মাছ ও সবজি খাচ্ছি। স্বাস্থ্যের সব ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।’

স্থানীয় কৃষকেরা জানান, সীমান্তবর্তী ১৫টি গ্রামে প্রায় ১ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে দূষিত পানি দিয়ে ধানের চাষ হয়। উপজেলার দক্ষিণ ইউনিয়নে ধানি জমি বেশি। মোগড়া ইউনিয়ন ও আখাউড়া পৌরসভারও কিছু জমি আছে।

উপজেলার দক্ষিণ ইউনিয়নের সাহেবনগর গ্রামের কৃষক মুসা ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, এলাকার লোকজন জ্বর, পাতলা পায়খানা, চুলকানিসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। কারও কারও পায়ে ঘা দেখা দিচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আখাউড়া উপজেলা কার্যালয় থেকে জানা যায়, উপজেলায় ৪ হাজার ৭১০ হেক্টর জমিতে আমন, ৫ হাজার ৭০৫ হেক্টর জমিতে বোরো ও ২১০ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের চাষ হয়। উপজেলায় চাষযোগ্য ৬ হাজার ৬৬৬ হেক্টর জমি রয়েছে। কৃষক পরিবারের সংখ্যা ১৬ হাজার।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা কত একর জমি এ দূষণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সে তথ্য দিতে পারেননি।

মাছ চাষের জন্য আখাউড়া উপজেলা সুপরিচিত। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় বছরে ৫ হাজার টনের বেশি মাছ উৎপাদিত হয়। সেখানে ১ হাজার ৪৩০ জন মৎস্যজীবী ও ৩ হাজার ৫৫৭ জন মাছচাষি রয়েছেন।

উপজেলা মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, ভারত থেকে আসা কালো বিষাক্ত পানি মাছের জন্য খুব ক্ষতিকারক। এই পানিতে অক্সিজেন থাকে না, পরিমাণ প্রায় শূন্য। এই পানিতে বিষাক্ত গ্যাস ও অ্যামোনিয়া থাকে বলে মাছ বাঁচে না। উপজেলার খালগুলোতে কোনো মাছ নেই।

‘কোনো সুরাহা হয়নি’

ভারত থেকে আসা দূষিত বায়ু বাংলাদেশের বায়ুদূষণের একটি বড় কারণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। যদিও এই বায়ুদূষণ ঠেকানো কঠিন। তবে আগরতলায় দূষণ বন্ধ করতে পারলে বাংলাদেশে পানিদূষণ কমানো যায়।

নদী ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক পানি আইন বিশেষজ্ঞ ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত প্রথম আলোকে বলেন, যৌথ নদী কমিশন শুধু গঙ্গার পানি ও তিস্তার পানি নিয়ে আলোচনা করে না, দুই দেশের অভিন্ন সব নদী নিয়ে আলোচনা করে। যৌথ নদী কমিশনে বিভিন্ন পর্যায়ের সভায় দুই দেশের প্রকৌশলীরা এ বিষয়টি (দূষণের) তুলতে পারেন।

আইনুন নিশাত বলেন, আগরতলা হয়ে যে বর্জ্যটা আসে, সেখানে প্রচুর ময়লা পানি ও পলিথিন থাকে। এগুলো নিয়ে বাংলাদেশ ভারতকে বহু অভিযোগ (কমপ্লেন) করেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সুরাহা হয়নি।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-28%2Ftvsirltt%2F28122025-cm-16.jpg?rect=59%2C0%2C1778%2C1185&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ভারতের ত্রিপুরা থেকে আসছে কলকারখানার বর্জ্য ও রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রিত বিষাক্ত পানি। গত বৃহস্পতিবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া আখাউড়া আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন পুলিশ চেকপোস্ট-সংলগ্ন উত্তর পাশের খালে। ছবি: শাহাদৎ হোসেন

ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২ আসন: কিছু কেন্দ্রে ভোট আগের রাতে করে ফেলার পরিকল্পনা হচ্ছে: রুমিন ফারহানা

ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২ (সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বিএনপির বহিষ্কৃত আন্তর্জাতিক–বিষয়ক সহসম্পাদক রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আমার কানে এসেছে, সরাইলের কিছু কিছু কেন্দ্রে ভোট কারচুপির পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। ভোট আগের রাতে করে ফেলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। কেন্দ্র বন্ধ করে সিলানোর পরিকল্পনা হচ্ছে। আপনারা আমার আত্মীয়, আপনারা আমার ভাই। ভোটকেন্দ্র আপনারা পাহারা দেবেন।’

গত বৃহস্পতিবার বিকেলে সরাইল উপজেলা সদরের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের আলীনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে কর্মী–সমর্থকদের উদ্যোগে আয়োজিত এক উঠান বৈঠকে রুমিন ফারহানা এ কথা বলেন।

রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আল্লাহ যদি আপনাদের ভোটে আমাকে সরাইল–আশুগঞ্জের এমপি নির্বাচিত করেন, সরাইল–আশুগঞ্জে আমি পৌরসভা করার উদ্যোগ গ্রহণ করব। শুধু তা–ই নয়, আমি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সবার জন্য ভালো স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করব। এলাকার রাস্তাঘাট, স্কুল–কলেজ, মসজিদ–মাদ্রাসার উন্নয়ন করব ইনশা আল্লাহ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গ্যাস ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় না দিয়ে অন্যখানে যেতে দেব না। যদি করতে না পারি, পাঁচ বছর পর আপনারা আমাকে আর ভোট দিয়েন না।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২ আসনের এই স্বতন্ত্র প্রার্থী বলেন, ‘অনেকে বলেন, স্বতন্ত্র এমপি হলে আপনি কীভাবে উন্নয়ন করবেন? আমি বলি, স্বতন্ত্র হই আর যা–ই হই। ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা কিন্তু আমাদের আছে। সুতরাং সরকারের কাছে যদি আমার এলাকার মানুষের ন্যায্য দাবি নিয়া যাই, আর সরকার যদি সেইটা না শোনে, তবে ঢাকা–সিলেট হাইওয়ে সড়কের আশুগঞ্জ থেকে বুধন্তি পর্যন্ত (৩৪ কিলোমিটার) বন্ধ করে দেব।’

ভোটারদের উদ্দেশে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আমার অসুস্থ মাকে ঢাকায় আল্লাহর হাওলা করে রেখে আসছি। আপনারা যদি আমারে ফিরাইয়া দেন, তবে আমার আর যাওয়ার জায়গা নাই। আমি আপনাদের দিকে তাকাইয়ে দলের ডাক শুনি নাই। আমি আপনাদের দিকে তাকাইয়ে ঢাকা শহরের আরাম–আয়েশের জীবন ফালাইয়ে এইখানে আসছি। আপনারা যদি আমাকে আপনাদের কাছে টেনে না নেন, আমার চারপাশে আর কিচ্ছু থাকবে না। আগামী ১২ তারিখ পর্যন্ত আপনারা আমার ভোটের আমানতকারী হবেন। আমার ভোটের জিম্মা আমি আপনাদের হাতে দিলাম।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২ আসনে বিএনপি জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। রুমিন ফারহানা এই আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। গত ৩০ ডিসেম্বর তাঁকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়।

উঠান বৈঠকে কথা বলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা। আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে সরাইল উপজেলা সদরের আলীনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে
উঠান বৈঠকে কথা বলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে সরাইল উপজেলা সদরের আলীনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে। ছবি: প্রথম আলো

বিক্ষোভে ‘হাজার হাজার মৃত্যুর’ পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল: খামেনির অভিযোগ

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বলেছেন, দেশজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে ‘কয়েক হাজার’ মানুষের মৃত্যু ও ক্ষয়ক্ষতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত অপশক্তি দায়ী।

শনিবার খামেনি বলেন, ‘ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা এই বিক্ষোভের সময় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছেন এবং কয়েক হাজার মানুষকে হত্যা করেছেন।’

ব্যাপক বিক্ষোভে দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ইরান অশান্ত ছিল। তিন হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন বলে বেসরকারি সূত্র দাবি করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সরাসরি এই সহিংসতার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ করেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে একজন ‘অপরাধী’ হিসেবে বর্ণনা করেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম তাঁর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছে, ‘এবারের ইরানবিরোধী ষড়যন্ত্র ছিল আলাদা। কারণ, এতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজে ব্যক্তিগতভাবে যুক্ত ছিলেন।’

ইরানের কর্তৃপক্ষ ক্রমাগত এই অস্থিরতার জন্য তাদের চিরশত্রু মূলত ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করছে। তাদের দাবি, বিদেশি শক্তিগুলো দেশটিতে অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে এবং মাঠপর্যায়ে বিশৃঙ্খলায় ইন্ধন জুগিয়েছে।

খামেনি সতর্ক করে বলেছেন, ইরান দেশের বাইরে যুদ্ধ টেনে নেবে না। তবে এই মৃত্যু ও ক্ষয়ক্ষতির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, ‘আমরা দেশকে যুদ্ধে জড়াব না, কিন্তু দেশি বা আন্তর্জাতিক অপরাধীদের শাস্তি না দিয়ে ছাড়ব না।’

নতুন যা জানা গেল

তেহরান থেকে আল–জাজিরার প্রতিনিধি রসুল সরদার আতাস জানিয়েছেন, খামেনির এই বক্তব্যে একটি বিষয় উল্লেখযোগ্যভাবে নতুন ছিল। তা হলো নিহতের সংখ্যা।

আগে সরকারি কর্মকর্তারা কয়েক শ মানুষের মৃত্যুর কথা বললেও এবারই প্রথম সর্বোচ্চ নেতা ‘হাজার হাজার’ মানুষ নিহতের কথা স্বীকার করলেন।

বিক্ষোভকারীদের সহিংসতায় এই বিপুল প্রাণহানি হয়েছে বলে খামেনি দাবি করেছেন।

তবে মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ বলছে, বিক্ষোভে তিন হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।

ধ্বংসযজ্ঞ ও গ্রেপ্তার

খামেনির অভিযোগ, বিক্ষোভকারীরা ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। এর মধ্যে ২৫০টির বেশি মসজিদ এবং চিকিৎসাকেন্দ্রে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া বিক্ষোভের ঘটনায় প্রায় তিন হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গত ২৮ ডিসেম্বর দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক কষ্টের কারণে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, যা শুরুতে শান্তিপূর্ণ ছিল। সরকার প্রথমে সাধারণ মানুষের দাবি ও কষ্টের কথা স্বীকার করে নিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এই আন্দোলনকে ‘হাইজ্যাক’ বা দখল করে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছে ইরান সরকার। তাদের দাবি, বিক্ষোভকারীরা বিদেশি শক্তির নির্দেশে সহিংস হয়ে ওঠে। খামেনির মতে, ট্রাম্প ছিলেন এই পুরো ষড়যন্ত্রের মূল কেন্দ্রে।

আজ শনিবার আধা সরকারি ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, দেশজুড়ে আট দিন প্রায় সম্পূর্ণ ইন্টারনেট বন্ধ রাখার পর ধাপে ধাপে ইন্টারনেট–সেবা চালু করা হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে মোবাইল এসএমএস সেবা আবার চালু করা হয়েছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি শিক্ষার্থীদের এক বৈঠকে বক্তৃতা করছিলেন। ৩ নভেম্বর ২০২৫, তেহরান
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি শিক্ষার্থীদের এক বৈঠকে বক্তৃতা করছিলেন। ৩ নভেম্বর ২০২৫, তেহরান। ছবি: এএফপি

এলপিজি–সংকট: সরকারি পর্যায়েও আমদানির পথ খোলা জরুরি

তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সাম্প্রতিক সংকট, ভোক্তাদের দুর্ভোগ ও বাড়তি ব্যয় আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল কৌশলগত পণ্যে একক উৎসে নির্ভরতা মোটেই টেকসই নীতি নয়। ১২ কেজি ওজনের এলপিজি সিলিন্ডারের সরকারঘোষিত দাম ১ হাজার ৩০৬ টাকা হলেও বাস্তবে বিক্রি হয়েছে দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকায়। বেশি টাকা দিয়েও অনেকে এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে পারেননি। এতে স্বাভাবিকভাবেই ভোক্তাদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। ডিসেম্বরে চাহিদার বিপরীতে প্রায় ৪০ শতাংশ কম আমদানি হওয়ায় এই সংকটের মূল উৎস। এ বাস্তবতায় এলপিজি আমদানি ও সরবরাহ নিয়ে সরকারের নীতিমালায় পরিবর্তন আনা জরুরি বলেই আমরা মনে করি।

দেশে বর্তমানে এলপিজির চাহিদা বছরে প্রায় ১৭ লাখ টন। এর মধ্যে বিপিসি উৎপাদন করে মাত্র ১৯ হাজার টন। ফলে এ খাত পুরোটাই বেসরকারি খাতের আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ২৩টি কোম্পানির আমদানির সক্ষমতা থাকলেও ৫ থেকে ৬টি কোম্পানি মূলত আমদানি করে। ফলে বাজারে সব সময়ই চাহিদা ও জোগানের যেমন একটা ঘাটতি থেকে যায়, আবার বিভিন্ন পর্যায়ে সিন্ডিকেট তৈরির মাধ্যমে কারসাজি করে মূল্যবৃদ্ধির ঘটনাও ঘটে। প্রতি মাসে বিইআরসি এলপিজির দাম নির্ধারণ করে দিলেও বাস্তবে ভোক্তাদের নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দাম দিয়েই পণ্যটি কিনতে হয়।

প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জিটুজি ভিত্তিতে এলপিজি আমদানির অনুমতি চেয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে বিপিসি বলেছে, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হলে তাৎক্ষণিকভাবে বাজার স্থিতিশীল করার হাতিয়ার সরকারের নেই। আমরাও মনে করি, এলপিজিকে পুরোপুরি বাণিজ্যিক খাতে পরিণত করার খেসারত দিতে হচ্ছে নাগরিকদের। এলপিজির বাজারে ভারসাম্য আনতে গেলে সরকারি পর্যায়েও আমদানির অনুমোদন দেওয়া প্রয়োজন।

দেশে এলপিজির প্রায় ৮০ শতাংশ ব্যবহৃত হয় রান্নার কাজে, বাকি ২০ শতাংশ শিল্পকারখানায়। একসময় শহরের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো রান্নার কাজে এলপিজি ব্যবহার করলেও বর্তমানে গ্রামীণ পরিবারগুলোও এলপিজির ওপর অনেক মাত্রায় নির্ভরশীল। এ ছাড়া রেস্টুরেন্ট থেকে শুরু করে ফুটপাতের খাবারের দোকানগুলোয়ও এলপিজি ব্যবহৃত হয়। ফলে এলপিজির মাত্রাতিরিক্ত দাম পরিবারগুলোর ওপর যেমন বাড়তি চাপ তৈরি করছে, একই সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়াচ্ছে। এমনিতেই টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দেশের বিশাল একটি জনগোষ্ঠীকে নানা কায়দা করে জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ করতে হচ্ছে, এর ওপর এলপিজির দাম তাদের জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে উঠেছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান সরকারি পর্যায়ে এলপিজি আমদানির ব্যাপারে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন। বর্তমান সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে যাতে এলপিজি নিয়ে বড় সংকটে পড়তে না হয় এবং ভোক্তারা যাতে সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি না হন, তার জন্য এলপিজি আমদানির নীতিমালা পরিবর্তন জরুরি।

আমরা মনে করি, সরকারি পর্যায়ে শুধু এলপিজি আমদানি করাটাই যথেষ্ট নয়, সরবরাহের জন্য অবকাঠামো তৈরি করাটাও জরুরি। কেননা, আমদানি করে সরবরাহের দায়িত্ব বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিলে তাতে সিন্ডিকেটের কারসাজি কতটা বন্ধ হবে, তা নিয়ে বড় সংশয় থেকে যায়। এলপিজি আমদানি করে বিপিসি যাতে সরাসরি ভোক্তার কাছে বিক্রি করতে পারে, সেই অবকাঠোমা তৈরির উদ্যোগ নেওয়াটাও জরুরি।

এলপিজি
এলপিজি। প্রতীকী ছবি

রাষ্ট্রপতির হাতে কিছু ক্ষমতা দেওয়া দরকার: আলী রীয়াজ

প্রকাশ ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ঃ প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন গঠন ও নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ দেওয়ার কথা রাষ্ট্রপতির। অথচ এটি করা হয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে। এ কারণে রাজনৈতিক দলগুলো রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে। দেশে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় রাষ্ট্রপতির হাতে কিছু ক্ষমতা দেওয়া দরকার। এ জন্য সংবিধান সংশোধন জরুরি।

আজ বৃহস্পতিবার গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণের লক্ষ্যে চট্টগ্রামে বিভাগীয় মতবিনিময় সভা ও ইমাম সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন আলী রীয়াজ। চট্টগ্রাম জেলা স্টেডিয়ামে পৃথক এই দুই সম্মেলনের আয়োজন করে বিভাগীয় প্রশাসন, জেলা প্রশাসন ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন।

গণভোট–সংক্রান্ত জনসচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রমের মুখ্য সমন্বয়ক আলী রীয়াজ বলেন, ‘গণভোটের প্রচারণায় আইনগত বা সাংবিধানিক কোনো বাধা নেই। আমরা বিচারপতি ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেছি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে আদেশের অধীনে এই বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া হচ্ছে, সেখানে কোথাও বলা হয়নি যে আপনি “হ্যাঁ” ভোটের পক্ষে বলতে পারবেন না।’

আলী রীয়াজ বলেন, এবার গণভোটে বলা হচ্ছে, এই যে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার দলিল (জুলাই সনদ), এটি আপনি গ্রহণ করছেন কি না। ‘হ্যাঁ’ ভোট মানে, আপনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা বদলে নতুন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে প্রস্তুত। ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে দেশের ভবিষ্যতের জন্য নির্ধারিত সংস্কার বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক হবে।

সংবিধান সংস্কার বিষয়ে আলী রীয়াজ বলেন, ‘বাংলাদেশে গত ১৬ বছরে একজন ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা অভাবনীয়ভাবে পুঞ্জীভূত হয়েছে। নিজের ইচ্ছেমতো তিনি দেশ চালিয়েছেন। কিন্তু তাঁকে সাহায্য করেছে, তাঁকে বৈধতা দিয়েছে সংবিধান। প্রয়োজন অনুযায়ী তিনি ইচ্ছেমতো সংবিধানও বদল করেছেন। সে জন্যই আমরা বলছি সংবিধানে পরিবর্তন, সংশোধন ও সংস্কার প্রয়োজন।’

জুলাই জাতীয় সনদ প্রসঙ্গে আলী রীয়াজ বলেন, সংবিধানের বিশেষ বিশেষ জায়গাগুলো পরিবর্তন, সংশোধন ও সংস্কারের জন্য এই দলিল তৈরি হয়েছে। দুর্নীতি, বিচার, সরকারি কমিশন, নির্বাচনী ব্যবস্থা, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন—এই সব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো আলোচনার মাধ্যমে একমত হয়েছে। উচ্চকক্ষ, সংবিধান সংশোধন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচন কমিশন—সবই এই সনদের মধ্যে উল্লেখ আছে।

অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘আগামী প্রজন্মের জন্য একটা ভবিষ্যৎ তৈরি করার দায় স্মরণ করানোর জন্য আমরা এখানে এসেছি। এটাই হলো “হ্যাঁ” এবং “না” ভোটের বিষয়। এটি নির্ধারণ করবে যে আপনি একটা ভবিষ্যতের বাংলাদেশ চান কি না। যে বাংলাদেশে ইনসাফ হবে, যার ভিত্তি মুক্তিযুদ্ধের প্রতিশ্রুতিতে এবং ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের মধ্যে রয়েছে।’

বিকেলে সম্মেলনে চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীনের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (ঐকমত্য) মনির হায়দার, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপুলিশ পরিদর্শক আহসান হাবিব পলাশ ও নগর পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ।

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (ঐকমত্য) মনির হায়দার বলেন, মুক্তিযুদ্ধের প্রধান তিনটি লক্ষ্য ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ইনসাফ। গত ৫৪ বছরে এ লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। এ কারণে ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থান অপরিহার্য। পতিত ফ্যাসিস্টরা তাদের পাচার করা টাকাগুলো ব্যবহার করছে গণভোট নিয়ে অপপ্রচার ছড়াতে।

গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য পুলিশ প্রশাসন প্রস্তুত আছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপুলিশ পরিদর্শক আহসান হাবিব পলাশ ও নগর পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের কর্মকর্তারা।

চট্টগ্রামে মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দেন অধ্যাপক আলী রীয়াজ। গতকাল বিকেল ৫টায় চট্টগ্রাম জেলা স্টেডিয়াম মাঠে
চট্টগ্রামে মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দেন অধ্যাপক আলী রীয়াজ। গতকাল বিকেল ৫টায় চট্টগ্রাম জেলা স্টেডিয়াম মাঠে। ছবি- সৌরভ দাশ