Showing posts with label শিক্ষা-প্রশাসন. Show all posts
Showing posts with label শিক্ষা-প্রশাসন. Show all posts

Wednesday, November 16, 2011

বৈষম্যের শিকার শিক্ষা ক্যাডার by পুলক চাকমা

স্বাধীনতার চার দশক পরেও হলেও জাতি একটি বাস্তবমুখী, অসাম্প্রদায়িক চেতনাসমৃদ্ধ শিক্ষানীতি পেয়েছে। এই শিক্ষানীতিতে শিক্ষার দিকনির্দেশনার পাশাপাশি শিক্ষকদের মর্যাদা ও অধিকারকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। শিক্ষকতা একটি মহান পেশা, যা সব পেশার মূল উৎসও বটে। কিন্তু দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, সমাজের মূলভিত্তি রচনাকারী শিক্ষক সমাজ উপেক্ষিত রয়ে গেছেন। যে শিক্ষক সমাজের ওপর জাতি গঠন ও মানবসম্পদ উন্নয়নের মহান দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে, সেই শিক্ষক সমাজ অবমূূল্যায়িত হলে তাঁদের পক্ষে এ দায়িত্ব যথাযথভাবে সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
১৯৮৩ সাল থেকে সরকারি কলেজের শিক্ষকদের ক্যাডারভুক্ত করার পর থেকে ১৬ কোটি জনসংখ্যার এ দেশে মাত্র ১৫ হাজারের মতো সরকারি কলেজ শিক্ষক কর্মরত আছেন। বিসিএসে অন্তর্ভুক্ত ২৯টি ক্যাডারের মধ্যে শিক্ষা ক্যাডারটিই সর্ববৃহৎ। কিন্তু তুলনামূলক বিচার করলে দেখা যায়, শিক্ষা ক্যাডারের সঙ্গে অন্য ক্যাডারের মধ্যে বৈষম্য প্রকট। যেমন—জাতীয় পদমর্যাদা বা মানক্রম নির্ধারণী-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনেও (ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স, ১৯৮৬) শিক্ষকদের যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি বলে অনেকে মনে করেন। এই ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সের ২০ নম্বর ক্রমিকে শিক্ষা ক্যাডারের সর্বোচ্চ পদ অর্থাৎ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালকের অবস্থান রাখা হয়েছে মাত্র। কিন্তু কলেজগুলোর অধ্যক্ষ বা অধ্যাপকদের ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সের মানক্রমে স্থান হয়নি। ২২ নম্বর ক্রমিকে চিকিৎসা ও প্রকৌশল মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের, অন্যদিকে ২৩ নম্বর ক্রমিকে চিকিৎসা ও প্রকৌশল মহাবিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের জাতীয় মানক্রম নির্ধারণ করা আছে। অথচ এমন অনেক বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ রয়েছে, যেগুলোর গুরুত্ব চিকিৎসা-প্রকৌশল-পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে কলেজের অধ্যক্ষ বা অধ্যাপকদের মানক্রম নির্ধারিত না থাকার কারণে অনেক সময় জাতীয় অনুষ্ঠানে শিক্ষকদের বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। এ জাতীয় পদমর্যাদা বিন্যাসকরণে যে আন্তক্যাডার বৈষম্য রয়েছে, সেটি সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয় ২৫ নম্বর ক্রমিকে অর্থাৎ সর্বশেষ মানক্রমে। এ অংশে সিভিল সার্জন, উপসচিব, পুলিশ সুপারদের অবস্থান নির্ধারণ করা আছে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, এ সর্বশেষ ধাপেও সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ বা অধ্যাপকদের মানক্রম দেওয়া হয়নি। এখানে দুটি উদাহরণ তুলে ধরলে চিত্রটি আরও স্পষ্ট হবে। প্রশাসন ও পুলিশ ক্যাডারভুক্ত কর্মকর্তারা চাকরির তৃতীয় ধাপে এসে উপসচিব ও পুলিশ সুপারের মতো পদমর্যাদায় উন্নীত হন। অন্যদিকে, শিক্ষা ক্যাডারভুক্ত কর্মকর্তাদের চাকরির সর্বোচ্চ ও সর্বশেষ ধাপটি অধ্যাপক বা অধ্যক্ষ হলেও জাতীয় মানক্রমে তাঁদের অবস্থান নির্ধারণ করা হয়নি। এ ছাড়া সহকারী অধ্যাপকেরা (৫ম গ্রেড) যখন পদোন্নতি পেয়ে সহযোগী অধ্যাপক পদে উন্নীত হন, তখন তাঁরা কেবল পদমর্যাদাটুকু লাভ করেন। কিন্তু আর্থিক বিবেচনায় প্রাপ্য চতুর্থ গ্রেড পান না, যেটি অন্য ক্যাডারভুক্ত কর্মকর্তারা পেয়ে থাকেন। এ ছাড়া শিক্ষা ক্যাডারকে অবকাশ বিভাগ হিসেবে গণ্য করার কারণে এই ক্যাডারের কর্মকর্তাদের অর্ধগড় বেতনে ছুটি ভোগ করতে হয়। অথচ অন্য ক্যাডার ও নন-ক্যাডারভুক্ত কর্মকর্তারা পূর্ণগড় বেতনে ছুটি ভোগ করেন। বরং বার্ষিক ছুটি হিসাবে দেখা যায়, শিক্ষা ক্যাডারভুক্ত কর্মকর্তারা গ্রীষ্মকালীন ছুটিসহ অন্যান্য ছুটির দিনগুলোতে এইচএসসি, ডিগ্রি পরীক্ষাসহ বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় দায়িত্ব পালনে বাধ্য থাকেন। ফলে তাঁদের নির্ধারিত পূর্ণকালীন ছুটি ভোগ করার কোনো সুযোগ থাকে না। যে পেশায় বৈষম্য সর্বদা তাড়া করে বেড়ায়, সে পেশার প্রতি স্বাভাবিকভাবে মেধাবীরা বিমুখ থাকবে। অথচ শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মান বাড়াতে হলে শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীদের সম্মিলন ঘটানো জরুরি।
বর্তমানে শিক্ষা ক্যাডারে নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়াটি বিসিএস, আত্তীকরণ, প্রদর্শক থেকে প্রভাষক পদে পদোন্নতীকরণ এবং ১০ শতাংশ কোটায় (রাষ্ট্রপতির নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে) নিয়োগ সম্পন্ন হয়ে থাকে। ফলে শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণে বিরাট সমস্যা দেখা দেয়। তাই এ সমস্যা নিরসনের জন্য শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদ আপগ্রেড করাসহ পদোন্নতির বৈষম্য হ্রাস করতে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও সুপার নিউমারারি পদ সৃষ্টি করে ব্যাচভিত্তিক পদোন্নতি নিশ্চিত করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গতিশীলতা ফিরিয়ে আনা জরুরি।
বর্তমান শিক্ষানীতিতে শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়নে আলাদা পে-স্কেলেরও সুপারিশ করা হয়েছে। বহির্বিশ্বের দিকে তাকালেও দেখি, সেখানে শিক্ষকদের জন্য উচ্চতর বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা আছে। আমরা মনে করি, শিক্ষক সমাজের জীবনমান ও মর্যাদা বজায় রাখতে হলে ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে শিক্ষকদের পদমর্যাদা যেমন নির্ধারণ করা জরুরি, তেমনই শিক্ষক সমাজের জন্য প্রস্তাবিত আলাদা পে-স্কেল দ্রুত কার্যকর করে শিক্ষকতা পেশার প্রতি মেধাবীদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। ‘২০২১-এর ভিশন-মিশন’ সফল করতে হলে শিক্ষা প্রশাসনকে গতিশীল করার কোনো বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে যে বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দেওয়া দরকার, সেটি হলো শিক্ষা ক্যাডারভুক্ত কর্মকর্তাদের মধ্য থেকেই শিক্ষা প্রশাসনে নিয়োগ নিশ্চিত করা।
টিআইবির ২০১০ সালের প্রতিবেদনেই উল্লেখ করা হয়েছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতির পরিমাণ ২৯ শতাংশ থেকে কমে ১৫ শতাংশে নেমে এসেছে। আমরা মনে করি, শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়ন ও শিক্ষা-সংশ্লিষ্টদের যথাযথ মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থা থেকে দুর্নীতির শেকড় উপড়ে ফেলা সম্ভব। কাজেই শিক্ষক সমাজ মনে করে, বর্তমানে গৃহীত শিক্ষানীতিটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এনে জ্ঞান-বিজ্ঞাননির্ভর একটি ডিজিটাল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে এর কোনো বিকল্প নেই।
পুলক চাকমা: শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা
pulakchakma21@gmail.com

Sunday, October 2, 2011

মিয়ানমারে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল

মিয়ানমারের ইরাবতী নদীতে ৩৬০ কোটি ডলার ব্যয়ে প্রস্তাবিত বৃহৎ জলবিদ্যুৎ ও বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প স্থগিত করা হয়েছে। জনতার তীব্র আপত্তির মুখে গতকাল শুক্রবার প্রেসিডেন্ট থিন শিন পার্লামেন্টে এই ঘোষণা দেন।
প্রেসিডেন্ট থিন শিনের বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প বাতিলের ঘোষণায় মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চির সমর্থকদের জয় হলো বলে মনে করা হচ্ছে।
মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের কাচিন রাজ্যে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ইরাবতী নদীতে প্রস্তাবিত মাইটসন বাঁধ তৈরির কাজ পেয়েছিল চীনের বৃহৎ বিদ্যুৎ কোম্পানি চায়না পাওয়ার ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন।
চীন ও মিয়ানমারের মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী, জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে উৎপাদিত বিদ্যুৎ চীনের ইউনান প্রদেশে সরবরাহ করার কথা। চীনের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রয়েছে এমন ব্যক্তিরা চুক্তির পক্ষে থাকলেও চীনের সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
সু চি বলেছিলেন, বাঁধের কারণে ইরাবতী নদীর পানির প্রবাহ হুমকির মুখে পড়বে। এতে ৬৩টি গ্রামের ১২ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়বে। এছাড়াও সমাজের বিভিন্ন অংশ বাঁধ নির্মাণের বিরোধিতা করে। পরিবেশবাদীদের মতে, জলবিদ্যুতের জন্য বাঁধ নির্মাণ করা হলে সিঙ্গাপুরের সমান জায়গা প্লাবিত হবে এবং অন্তত ১০ হাজার লোক গৃহহীন হবে।

Friday, January 7, 2011

বেসরকারি কলেজের নিরীক্ষা by বদরে মুনীর

সরকারি এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় মিনিস্ট্রি অডিট বলে একটা কাজ হয়। এই প্রক্রিয়ায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সাধারণত একজন পরিদর্শক ও একজন নিরীক্ষক নির্ধারিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো, জনবল-কাঠামো, বছরভিত্তিক আয়-ব্যয়ের হিসাব, নিয়োগ-প্রক্রিয়া ইত্যাদি পরিদর্শন ও নিরীক্ষণ শেষে মন্ত্রণালয়ে রিপোর্ট প্রদান করেন। এ রকম অডিটের কবলে পড়ে হয়তো ১০-১৫, এমনকি ২০ বছর ধরে শিক্ষকতা করা এবং বেতন-ভাতার সরকারি অংশ ভোগ করে যাওয়া একজন শিক্ষক জানতে পারেন, তাঁর নিয়োগ অবৈধ। অর্থাৎ এই ১০-১৫-২০ বছরে হাজার হাজার ছাত্রের সামনে শিক্ষক হিসেবে দাঁড়িয়ে তাদের পড়ালেখায় সাহায্য করা এবং বিনিময়ে মজুরি পাওয়ার পুরো ব্যাপারটাই একজন শিক্ষকের জীবনে অবৈধ! কারণ কী? কারণ, ওই নিয়োগ-প্রক্রিয়ায় একটি বিষয়ের জন্য ন্যূনতম নিয়োগপ্রার্থী থাকার নিয়ম তিনজন, ছিলেন দুজন; শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের প্রতিনিধি হিসেবে সাক্ষাৎকার বোর্ডে সরকারি কলেজের একজন অধ্যক্ষের উপস্থিত থাকার বিধি, কিন্তু ছিলেন একজন সহকারী অধ্যাপক; বিষয় বিশেষজ্ঞ হিসেবে একজন সহকারী অধ্যাপক থাকার বিধান, ছিলেন একজন প্রভাষক।বাংলাদেশের বাস্তবতায় যেকোনো পেশায় নিয়োগপ্রার্থী একজন ব্যক্তির পক্ষে কি উপরিউক্ত শর্তগুলো জানা সম্ভব, না সেগুলো জানা তাঁর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য? একজন নিয়োগপ্রার্থী কি নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের কাছে জানতে চাইবেন, নিয়োগ-প্রক্রিয়ায় কতজন প্রতিযোগী অংশ নিচ্ছেন, নাকি সাক্ষাৎকার বোর্ডে জানতে চাইবেন, মাউশির প্রতিনিধি সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ কি না অথবা বিষয় বিশেষজ্ঞ সহকারী অধ্যাপক কি না? তাহলে নিয়োগ-প্রক্রিয়ার এই অবৈধতার দায় কার? দায় যারই হোক, তা বহন করতে হয় সেই শিক্ষককে, আকৈশোর যার ধারণা ছিল শিক্ষকতা একটা নির্ঝঞ্ঝাট এবং মোটামুটি সম্মানজনক জীবিকা।এভাবে সকাল নয়টা থেকে রাত নয়টা—তিন দিন অডিট চলার পর নির্ধারিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষক-কর্মচারীর নিয়োগ অবৈধ হয়ে গেলে পরিদর্শক বা নিরীক্ষক সাহেব রসিকতা করে বলেন, মিনিস্ট্রি অডিট হলো কারেন্টের জাল, অনিয়মের কেঁচকি মাছটাও ছাড়া পাবে না। দিন তিনেক পর প্রতিষ্ঠানপ্রধান শিক্ষক-কর্মচারীদের জানান, ঢাকা থেকে ফোন করা হচ্ছে যোগাযোগ করতে। অডিটের কারেন্টের জাল ছিঁড়ে সব অবৈধতাকে বৈধতা দিতে পারে যে বোয়াল মাছ, তার দাম প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষক-কর্মচারীর দুই মাসের বেতন। সত্য-মিথ্যা বলা মুশকিল। কেননা, মফস্বলের এসব বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের বেশির ভাগই (অবশ্যই সবাই নন) তস্কর শ্রেণীর। ইন্সপেক্টর-অডিটর সত্যিই উৎকোচ চাইছেন, না প্রতিষ্ঠানের প্রধানেরা তাঁদের নাম ভাঙিয়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন অথবা যে পরিমাণ ঘুষ দাবি করা হচ্ছে, তার পরিমাণ বাড়িয়ে বলা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করার কোনো উপায় এই শিক্ষক-কর্মচারীদের থাকে না। লেনদেন বিষয়ে কথা হয় প্রতিষ্ঠানের প্রধানের সঙ্গে।
এ ব্যাপারে দৃষ্টান্ত টানতে গত অক্টোবরের একটি প্রসঙ্গ তোলা যায়। বেসরকারি কলেজের শিক্ষকদের চাকরির মেয়াদ আট বছর পূর্ণ হওয়ায় বেতন স্কেলের যে উন্নতি ঘটে, তা কয়েক বছর বন্ধ ছিল। সেই টাইম স্কেল পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় শিক্ষা ভবনে উৎকোচ গ্রহণের প্রস্তুতি বিষয়ে খবর প্রকাশিত হয় পত্রপত্রিকায়।
মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর ত্বরিত হস্তক্ষেপে অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে এবারের টাইম স্কেল পরিবর্তনে শিক্ষা ভবনে টাকা লাগেনি। কেননা এ বিষয়ে গঠিত কমিটির আহ্বায়ক দীপক কুমার নাগ, মহাপরিচালক (প্রশাসন), মাউশি জানাচ্ছেন, ‘কোনো টাকা লাগবে না। কে টাকা নিচ্ছে, আমাকে বলেন। আমরা দিনরাত দরজা বন্ধ করে কাজ করছি। ১৮ (অক্টোবর) তারিখের মধ্যে টাইম স্কেল পৌঁছে যাবে।’ এরপর তো বলা যায় না, শিক্ষা ভবন ঘুষ নিয়েছে। অথচ বেসরকারি কলেজের অনেক অধ্যক্ষই টাকা না নিয়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঢাকায় পাঠাননি, অথবা কাগজপত্র ঢাকায় নিয়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের ফোন করেছেন, ‘ঘুষ লাগছে, এসএ পরিবহনে টাকা পাঠান।’
এ পর্যন্ত যা লেখা হলো তার প্রতি বর্ণ প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় পাওয়া নির্জলা সত্য হলেও এর কোনো দালিলিক প্রমাণ হাজির করা সম্ভব না। কেননা গত শতকের নব্বইয়ের দশকে এবং তার পরে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের মফস্বলের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর, বিশেষ করে বেসরকারি কলেজগুলো প্রতিষ্ঠায় ও পরিচালনায় ব্যাপক-বিস্তৃত অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, আত্মীয়প্রীতি এবং অদক্ষতা ও অযোগ্যতা বিরাজমান। এমন দৃষ্টান্তও হাজির করা যাবে যে মফস্বলের আনাচ-কানাচে যেকোনো চার বর্গকিলোমিটার, অথবা তারও কম এলাকা নিয়ে পাঁচ-ছয়জন যেনতেন এমএ পাস, তাদের মধ্য থেকে শারীরিকভাবে সবচেয়ে বলশালী একজনকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বানিয়ে একটা কলেজ খুলে বসা হয়েছে। এরপর বিষয়ভিত্তিক এমএ, এমএসসি, এমকম পাস স্থানীয়দের কাছ থেকে ‘যার কাছে যেমন পাই’ ভিত্তিতে লাখ লাখ টাকা নিয়ে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ আর নানা রকম প্রলোভন দেখিয়ে ছাত্র ভর্তি শুরু করা হয়। এভাবে চলতে চলতে পাঁচ-সাত বছর চলার পর একেকটা কলেজ মোটামুটি দুই-তিন-চার শ ছাত্রছাত্রী এবং ৪০-৫০-৬০ জন শিক্ষক-কর্মচারী নিয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। সুতরাং জন্মলগ্ন থেকেই অনিয়ম-দুর্নীতি এসব কলেজগুলোর দোসর। মিনিস্ট্রি অডিটের কালে এসব অনিয়ম-দুর্নীতি, অসৎ অধ্যক্ষ ও অসৎ ইন্সপেক্টর অডিটরদের কাছে এক মহা মওকা হয়ে ওঠে। আর এটা তো সবারই জানা যে এ রকম লেনদেনের কোনো প্রমাণ থাকে না।এমন পরিবেশ-পরিস্থিতিতে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছে মিনিস্ট্রি অডিট আরেকটা বিষফোঁড়া।শিক্ষামন্ত্রীর অনেক সাহসী, দৃঢ়সংকল্প ও পদক্ষেপের ফলে আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থারই মনে হচ্ছে একটা বদল হচ্ছে। আধুনিক ও সম্ভাবনাময় জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন সেই পদক্ষেপগুলোর একটি। এ বিষয়ে কি কিছু ভাবা যায় না, এই মিনিস্ট্রি অডিট নিয়ে?দেশের জন্য সুখবর যে আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব একজন কবি। ক্ষমতার অন্যায্য দাপটের সামনে টিকতে না পেরে ঘুষ দিলে কেবল তো আর্থিক ক্ষতিই হচ্ছে না, মানুষ হিসেবে ব্যক্তির মর্যাদাও মাটিতে লুটাচ্ছে। এদিকটায় একটু তাকানো মনে হয় দরকার।
বদরে মুনীর: কবি ও শিক্ষক।