Showing posts with label হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ. Show all posts
Showing posts with label হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ. Show all posts

Thursday, March 18, 2021

এরশাদ কেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেন by আহমদ ছফা

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে আমি একবার অত্যন্ত কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। দেড় বছর আগের কথা। বুড়িগঙ্গার অপর পাড়ে কামরাঙ্গীর চরে হাফেজ্জি হুজুরের মাদরাসার বার্ষিক সভায় আমাকে কিছু বলার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। আমাদের দেশের মুখচেনা বুদ্ধিজীবীদের একটা বিরাট অংশ মোল্লা-মাওলানাদের মানুষ করতে চান না। আমি এই মনোভাবটির বিরুদ্ধে অনেকদিন থেকেই প্রতিবাদ করে আসছি। একজন মানুষ টুপি পরে, দাড়ি রাখে, লম্বা জামা পরে এ সকল কারণে মানুষটি অমানুষ হয়ে যায়- এ রকম একটি ধারণা সৃষ্টির করার জন্যে এক ধরনের তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়। নাটক সিনেমায় একজন ক্রিমিনাল দেখাতে হলে একজন টুপিপরা, দাড়িওয়ালা মানুষকে স্টেজে হাজির করতে হয়। এই মনোভাব বর্ণবৈষম্যবাদের মতেই জঘন্য এবং নিন্দনীয়।

যা হোক, আসল কথায় ফিরে আসি।
আমি যখন হুজুরদের সভায় গিয়ে বসলাম, তার অল্পক্ষণ পরেই দেখা গেল সভার উপস্থিত লোকজনদের মধ্যে একটা চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। তার একটু পরেই এলেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি লে. জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। একেবারে নিকট থেকে এই প্রথম তাঁকে দেখার সুযোগ হলো। ছিমছাম চেহারার দীঘলদেহী মানুষ। পাঞ্জাবি পায়জামা এবং টুপিতে এরশাদ সাহেবকে সত্যি সত্যি একজন মুসল্লির মতন দেখাচ্ছিল। এরশাদ সাহেব এত সুন্দর চেহারার মানুষ আগে কোনো ধারণা ছিল না।

দীর্ঘ এক ঘণ্টা ধরে তার বক্তৃতা শুনলাম। আমার ধারণা হলো, এই ভদ্রলোক ইচ্ছা করলে অত্যন্ত নরম জবানে গুছিয়ে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারেন। এরশাদ সাহেব অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে একটানা প্রায় ১০ বছর বাংলাদেশ শাসন করেছেন। একজন স্বৈরাচারী একনায়কের পক্ষে একটানা ১০ বছর ক্ষমতায় থাকা কম কৃতিত্বের কথা নয়। এরশাদ সাহেবের ক্ষেত্রে এটি সম্ভব হয়েছিল। কারণ, তিনি সামরিক শাসনের কড়াকড়ির সঙ্গে নরম জবানের একটা সুন্দর সমন্বয় সাধন করতে পেরেছিলেন। আমার ধারণা, এরশাদ সাহেবের মানুষকে বোকা বানানোর ক্ষমতা ছিল অসাধারণ।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন থেকে রাজনৈতিক আন্দোলন দানা বেঁধে উঠছিল। একটা পর্যায়ে বিএনপি, আওয়ামী লীগ এবং এগার দলসহ সব রাজনৈতিক দল এরশাদ সাহেবকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্যে রাজপথে নেমে এসেছিল। সে বিষয়ে কোনোকিছু পুনরাবৃত্তি করার কোনো প্রয়োজন নেই। সকলে জানেন বিক্ষুব্ধ জনগণের দুর্বার গণ-আন্দোলনের মুখে এরশাদকে ক্ষমতা ছেড়ে কারাগারে যেতে হয়েছিল।

আমি এরশাদ সাহেবের ওপর শুরু থেকেই একটা বিরোধী মনোভাব পোষণ করে আসছিলাম। কারণটা রাজনৈতিক নয়। তিনি ক্ষমতা দখল করার পর কবিতা লিখতে আরম্ভ করলেন। সবগুলো দৈনিকের প্রথম পাতায় তাঁর লেখা পদ্য ঘটা করে ছাপা হতে থাকল। এটুকুর মধ্যে যদি এরশাদ সাহেব সীমাবদ্ধ থাকতেন আমার ক্ষোভটা হয়তো অত তীব্র আকার ধারণ করত না। তিনি তাঁর অধীনস্থ আমলাদের মধ্যে কবিতা লেখার বাতিকটা এত অধিক পরিমাণে সঞ্চারিত করতে পেরেছিলেন যে সেক্রেটারিদের মধ্যে কেউ কেউ অফিসে আসামাত্রই অন্য সেক্রেটারিদের বিগত চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে কত লাইন কবিতা লেখা হয়েছে সেটা পাঠ করে শোনাতেন।

এরশাদ সাহেব রাজনীতিতে যেমন একটা দল গঠন করলেন, কবিদের নিয়েও আর একটা কবিতার দল বানালেন। সে এক মহা রমরমা কা-। বঙ্গবভনে কবিতা পাঠের আসর বসে। সেখানে এরশাদ সাহেব স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন এবং মোসাহেব কবিরা দাড়ি নেড়ে মাথা দুলিয়ে কর্তাকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, আপনার কবিতা বাংলা কাব্যে নতুন যুগের সূচনা করতে যাচ্ছে। কথাগুলো পত্র-পত্রিকায় এত জোরের সঙ্গে প্রচারিত হয় যে আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হতো, ক্ষমতা দখল করার পর থেকে এরশাদ সাহেবের সঙ্গে অন্যান্য স্বৈরাচারী একনায়কের ফারাক কোথায় সে ব্যাপারেও সামান্য ধারণা জন্মাল। এরশাদ সাহেব রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার পর শুধু কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন না, দিকে দিকে একজন মস্ত প্রেমিক হিসেবেও তার সুনাম রটে গেল। এরশাদ সাহেব যখন ক্ষমতার মধ্যগগনে সে সময়ে আমরা কতিপয় বন্ধু মিলে ‘উত্তরণ’ নামাঙ্কিত একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা চালাতাম। বাংলা একাডেমির এক তৎকালীন কর্মকর্তা আমাকে একটা গান দেখালেন। গানটির লেখক ছিলেন সুরেন্দ্রলাল ত্রিপুরা। এই ভদ্রলোক রাঙ্গামাটিতে উপজাতীয় একাডেমির একজন কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি একটি গান লিখেছিলেন, সে গানটির প্রথম পক্তি ছিলÑ ‘নতুন বাংলাদেশ গড়ব মোরা/ নতুন করে আজ শপথ নিলাম।’ এই গানটি উপজাতীয় একাডেমি থেকে প্রকাশিত বার্ষিক সংকলনটিতে ছাপা হয়েছিল। এই বার্ষিক সংকলনটি দেখে আমি ভীষণ ক্ষিপ্ত এবং মর্মাহত হয়েছিলাম। কারণ, প্রায় প্রতিদিন এ গানটি রেডিও টেলিভিশনে গাওয়া হতো এবং রচয়িতা হিসেবে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নাম দেখান হতো। একটি দেশের প্রেসিডেন্ট একজন সাধারণ নাগরিকের লেখা একটি গানকে নিজের গান বলে চালিয়ে দিয়ে গীতিকার খ্যাতি পেতে চান, এটা আমার কাছে অত্যন্ত গর্হিত অপরাধ বলে মনে হয়েছিল।

আমি এটাও অনুভব করছিলাম, এই গানচুরির সংবাদটি দেশের মানুষদের জানানো প্রয়োজন। অনেক দৈনিক সাপ্তাহিকের সম্পাদকদের পেছনে আমি ছোটাছুটি করেছি। দেখলাম তাদের অনেকেই এই গানচুরির বিষয়টি জানেন। কিন্তু খবরটি ছাপাতে কেউ রাজি নন। রাঙ্গামাটির এক চাকমা বন্ধু জানালেন, আমি যদি এ গানটি নিয়ে বাড়াবাড়ি করি তাহলে সুরেন্দ্রলাল ত্রিপুরাকে বিপদের মধ্যে ফেলে দেওয়া হবে। একাডেমি থেকে তার চাকরিটা যাবে এবং মাথা বাঁচানো দায় হয়ে পড়বে। অগত্যা আমাদের কাগজে সংবাদটি ছাপলাম। ‘এরশাদ সুরেন্দ্রলাল ত্রিপুরার গান চুরি করেছে।’ সংবাদটি এভাবে ছাপলে আমাদের পত্রিকার সেটি শেষ প্রকাশিত সংখ্যা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তাই উল্টো করে খবরটা ছাপতে হলো। আমরা ছাপলাম, সুরেন্দ্রলাল ত্রিপুরা দেশের রাষ্ট্রপতি গীতিকার হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের গান চুরি করে উপজাতীয় একাডেমির বার্ষিক সংকলনে ছেপেছে। সুতরাং, সুরেন্দ্রলাল ত্রিপুরার শাস্তি হওয়া উচিত। এই ঘটনাটির পর থেকে এরশাদ সাহেবের প্রতি আমার মনে একটা ঘৃণা এবং অনুকম্পা গভীরভাবে রেখাপাত করেছে।

এরশাদ সাহেব গণ-আন্দোলনের দাপটে বাধ্য হয়ে ক্ষমতা ছাড়লেন। বেগম খালেদা জিয়া সরকার তাঁকে কারাগারে পাঠাল। তাঁকে কি ধরনের করুণ জীবনযাপন করতে হচ্ছে, সে সংবাদ মাঝেমধ্যে কাগজে ছাপা হতো। পাঠ করে আমার মনে একধরনের কষ্ট জন্ম নিত। আহা, মানুষটা অল্প কিছুদিন আগেও প্রচ- দাপটের সঙ্গে ১২ কোটি মানুষকে শাসন করেছে। আজ তাঁর কি দুর্দশা।

এরশাদ অনেক ধরনের নালিশ করতেন। তাঁকে ঘিঞ্জি সেলে রাখা হয়েছে। সংবাদপত্র দেওয়া হয় না। যে সব খাবার দেওয়া হয় সেগুলো মুখে দেওয়ার অযোগ্য ইত্যাদি ইত্যাদি। এরশাদের কারাবাসের সময়ে কারারুদ্ধ রাষ্ট্রপতির প্রতি বেগম জিনাত মোশাররফের উথলানো দরদের কথাও সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। বেগম জিনাত এরশাদকে প্যান্ট, শার্ট, পাজামা, পাঞ্জাবি, গেঞ্জি এবং অন্তর্বাস জেলখানায় নিয়মিত পাঠাতেন এবং তার মন কম্পাসের কাঁটার মতো কারারুদ্ধ এরশাদের প্রতি হেলে থাকত। এরশাদের জন্যে কষ্ট পেতাম ঠিকই, কিন্তু তাঁর সৌভাগ্যে একধরনের ঈর্ষাও বোধ করতাম।

এরশাদ এখন ক্ষমতায় নেই। তিনি কারাগারে দুঃখ দুর্দশার মধ্যে দিন অতিবাহিত করছেন। এই চরম দুঃসময়েও সুসময়ের বান্ধবী জিনাত মোশাররফ অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে এরশাদের সুখ-সুবিধার দিকে মনোনিবেশ করছেন। বেগম জিনাত এরশাদের প্রতি অনুরাগ প্রকাশ করতে গিয়ে তার নিজের সংসারটি ভাঙতে বাধ্য হয়েছিলেন। আমি মনে মনে এই মহিলার খুব তারিফ করতাম। এরশাদ যখন জেল থেকে মুক্তি পেলেন তখন পত্র-পত্রিকার সাংবাদিকদের কাছে পাঁচকাহন করে জিনাতের প্রতি তাঁর অনুরাগের কথা প্রকাশ করলেন। কিন্তু একটা সময়ে যখন তিনি অনুভব করলেন, তিনি জিনাতকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন না, তখন তাকে পচা কলার খোসার মতো নির্মম অবজ্ঞায় ছুড়ে দিলেন। এরশাদের এই কাজটিকে আমার গানচুরির কাজটির চাইতেও অধিক জঘন্য মনে হয়েছিল।

এরশাদ লোভী, প্রতারক এবং ভ- নয় শুধু একজন কাপুরুষও বটে। পশ্চিমা দেশগুলোতে নারী-পুরুষের সম্পর্ক অধিকতর খোলামেলা। সেখানে কোনো রাজনীতিবিদ যদি কোনো নারীর সঙ্গে এই ধরনের কাপুরুষোচিত আচরণ করত তা হলে সেখানেই তার রাজনৈতিক জীবনের ইতি ঘটত। আমি মনে মনে এরশাদকে এইভাবে মূল্যায়ন করেছিলাম। এরশাদে কবিতা নকল, গান নকল, পুত্র নকল, প্রেম নকল এমন কি আস্ত এরশাদ মানুষটাই একটা নকল মানুষ। আমাদের এই জাতি অত্যন্ত ভাগ্যবান কারণ একজন আগাগোড়া নকল মানুষ এই জাতিকে দশটি বছর শাসন করেছে।
আমার মূল্যায়নের পদ্ধতিটা কিছুটা ভাবাবেগজনিত। যে সমস্ত মানুষ খুব ঠা-া মাথায় চিন্তাভাবনা করতে অভ্যস্ত, এরশাদ সম্পর্কে যে রকম অনেক মানুষের মতামত আমি জানতে চেষ্টা করেছি। তাদের মধ্যে যে সমস্ত মানুষ সরাসরি এরশাদের দ্বারা বিশেষভাবে উপকৃত হয়নি সে সমস্ত ব্যক্তি ছাড়া অন্য সকলেই আমাকে বলেছে, এরশাদ অত্যন্ত খারাপ মানুষ। আর এরশাদ যে খারাপ মানুষ সে ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ একমত।

এখন এরশাদের সম্পর্কে আমার মনে যে একটা বিস্ময়বোধ জন্ম নিয়েছে, সে বিষয়ে কিছু কথা বলব। এরশাদকে যখন মামলার পর মামলায় অভিযুক্ত করে খালেদা জিয়া সরকার জেলখানায় ঢোকাল, অনেকের মতো আমিও ধরে নিয়েছিলাম এরশাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ। যে কৃষ্ণগহ্বরের মধ্যে এরশাদ ঢুকেছেন সেখান থেকে কোনোদিন বেরিয়ে আসতে পারবে না। দু’বছর না যেতেই আমার ধারণা মিথ্যা প্রমাণিত হল। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পর হাসিনা এবং খালেদা দুই নেত্রীকে করজোড়ে এরশাদের সামনে হাজির হতে হলো। খালেদা জিয়া বললেন, আপনি আমার দলকে সমর্থন করুন, আপনার সমর্থনে আমার দল যদি সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়, আপনাকে রাষ্ট্রপতি বানাব। এরশাদ খালেদার আবেদনের কর্ণপাত করলেন না, কারণ এই মহিলার ওপর তিনি ভয়ানক ক্ষুব্ধ ছিলেন। মহিলা তাঁকে জেলখানায় পাঠিয়েছেন। সুতরাং, তাঁর সঙ্গে কোনো রকমের বোঝাপড়া কিছুতেই হতে পারে না।

হাসিনা বললেন, আপনি আমার দলকে সমর্থন করে আমাদের সরকার গঠন করার সুযোগ করে দিন। আমরা আপনার সবগুলো মামলায় জামিনের ব্যবস্থা করব এবং আপনাকে মুক্ত মানব হিসেবে কারাগারের বাইরে নিয়ে আসব। বাস্তবিকই হাসিনা এরশাদের সমর্থন নিয়ে ঐকমথ্যের সরকার গঠন করলেন এবং এরশাদ সাহেব বাইরে চলে এলেন। এরশাদ সাহেবের সমস্ত রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপের সঙ্গে টান টান দড়ির ওপর দিয়ে চীনা এ্যাক্রোব্যাট মেয়েরা যেভাবে সাইকেল চালায় তার সঙ্গে তুলনা করা যায়। পরিস্থিতি যতই খারাপ এবং অনিশ্চিত হোক না কেন, তিনি ঠিকই নিরাপদে তাঁর কাজটি করে যাবেন।

বেশ কিছুদিন বাইরে থারার পর এরশাদ আবার নতুন একটা মোচড় দিলেন। সর্বত্র বলে বেড়াতে লাগলেন আওয়ামী লীগ সরকার দেশকে রসাতলের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এখন থেকে তিনি এই সরকারের বিরোধিতা করবেন। কারণ এই সরকারের ইতিবাচক কোনকিছু অবদান রাখার ক্ষমতা নেই। তারপরে বেগম খালেদা জিয়া জামাতের সঙ্গে মিলে চারদলীয় জোট গঠন করলেন। চারদলীয় ঐক্যজোটের কর্মপদ্ধতি এবং রূপরেখা যখন আকার পেতে শুরু করেছে সে সময়ে একটি পুরনো মামলায় এরশাদকে পাঁচ বছরের কারাদ- এবং পাঁচ কোটি টাকা জরিমানা করা হলো। জরিমানার টাকা যদি শোধ করতে না পারে, তাহলে আরও দু’বছর জেল খাটতে হবে।

এরশাদ সুপ্রিম কোর্টে আপিল করতে যাচ্ছেন। এ সময়ের মধ্যে আদালত থেকে জানানো হয়েছে তাকে দু’বছর কম সময় জেলের মধ্যে থাকতে হবে। কেননা আগে যতটা সময় তিনি জেলে ছিলেন, তাতে পাঁচ বছরের মেয়াদ থেকে সে সময়টা কাটা যাবে। এরশাদের আপিলে কি রায় দেওয়া হবে সে ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু বলার উপায় নেই। হয়তো এরশাদের দ-াদেশ বহাল থাকবে। হয়তো তাঁকে মুক্তি দেওয়া হবে। কিন্তু আমি আমার একটা আশঙ্কার কথা উচ্চারণ করতে চাই। এরশাদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে পারমাণবিক বর্জ্যপদার্থের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। পারমাণবিক বর্জ্যপদার্থের তেজষ্ক্রিয়তা অনন্তকাল ধরে টিকে থাকে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এরশাদ একটা নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করছেন। হাসিনা-খালেদার সাধ্য নেই এরশাদকে কোথাও ছুড়ে ফেলে দেয়ার।

কারণ হাসিনা-খালেদা যে ধরনের রাজনীতি করছেন এরশাদের অবস্থান সে ধরনের রাজনীতির মধ্যেই। আমাদের দেশে অনেক লোক ব্যক্তি হিসেবে এরশাদের নিন্দা করে থাকেন। হাসিনা-খালেদা ব্যক্তি হিসেবে ভালো কি মন্দ সেটা পুরোপুরি আমরা জানিনা। কিন্তু তাঁদের রাজনীতি এরশাদের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং তাদের রাজনৈতিক নিয়তির নিয়ন্ত্রক ভূমিকা এরশাদই পালন করেন। এই দেশের ভাগ্য, দেশের জনগণ অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে সামরিক শাসনের কব্জা থেকে দৃশ্যত একটা গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। কিন্তু সেই সামরিক শাসনের একনায়ক মানুষটিকে কিছুতেই সরানো যাচ্ছে না।

>>>সূত্র : আজকের কাগজ, ১১ই সেপ্টেম্বর, ২০০০ / ‘হারানো লেখা’ বই থেকে নেয়া

Wednesday, September 23, 2020

এইচ এম এরশাদের অনন্য আখ্যান by আফসান চৌধুরী

সাবেক প্রেসিডেন্ট এইচ. এম. এরশাদ দীর্ঘদিন ধরে রোগে ভুগছিলেন এবং তার মৃত্যুর বিষয়টি কোন আকস্মিক বিষয় ছিল না। তার মৃত্যুতে শোকের উচ্ছ্বাসও তেমন ছিল না, কারণ সেই অর্থে কোন জনপ্রিয় নেতা তিনি ছিলেন না। সময় বদলেছে, মিডিয়া তার কীর্তিগাথা প্রচার না করলেও তার শেষকৃত্যের খবর প্রচার করেছে। শেষ বিচারে তিনি যদি নাও জিতে থাকেন, তার শত্রুতাও সে ক্ষেত্রে জেতেনি এবং যে সড়কগুলো তাকে পদচ্যুত করার জন্য জ্বলে উঠেছিল একদিন, সেটা অন্য যে কোন সময়ের চেয়ে মৃতপ্রায় পড়ে আছে এখন।

বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণী তাকে স্বৈরাচার, দুর্নীতিগ্রস্ত, নারীঘেঁষা বিভিন্ন বিশেষণে ডেকেছেন, যেগুলোর এখন আর তেমন মূল্য নেই কারণ বহু ক্ষমতাধর ব্যক্তিরাই এখন একই রকম, সবাই সেটা জানেন। ইতিহাসে এরশাদের একটা জায়গা রয়েছে। সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন তিনি, যে সময়টাতে বিশেষ করে রাজনীতিতে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একটা স্বল্পমেয়াদি উত্থান ও পতনও দেখা গেছে।

এরশাদ বিচারপতি সাত্তারের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের কাছ থেকে ক্ষমতা দখল করেছিলেন যখন প্রেসিডেন্ট জিয়ার হত্যাকাণ্ডের পর একটা টালমাটাল অবস্থা চলছিল। এরশাদ ক্যু দমন করেছিলেন যদিও বিএনপি পরে জিয়া হত্যার জন্য এরশাদকে দায়ি করেছিল।

কিন্তু বিএনপি এরপরে খুব বেশি স্থায়ী হয়নি এবং শিগগিরই এরশাদ প্রথম রক্তপাতহীন ক্যু-এর মাধ্যমে বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসেন। তাকে ক্ষমতা থেকে চলে যেতে হয় নাটকীয় একটা পরিস্থিতির মধ্যে যখন মূলত শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নেতৃত্বে মহাসড়কে আন্দোলন সৃষ্টি হয়েছিল। যে দশকটাকে তিনি শাসন করেছেন, তখন অভিজাত শ্রেণীর ক্ষমতা ভাগাভাগির একটা ফর্মূলাও তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন, যেটা আজ পর্যন্ত টিকে আছে।
এই বিনিময়ের একটা অংশ ছিলেন তিনি।

এরশাদের ক্ষমতা গ্রহণের প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশের রাজনীতির শুরুতে বেসামরিক রাজনীতিবিদদের নেতৃত্বাধীন শাসন ব্যবস্থা ছিল, ১৯৭৫ সালে একদলীয় শাসন প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে যেটার পরিবর্তন শুরু হয়। এই পদক্ষেপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বেসামরিক ও সামরিক আমলাদের রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করা।

পরবর্তী ধাপের সূচনা হয় ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরে, শেখ মুজিবের হত্যা এবং সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণের পরে। এটা শুধু তার নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড ছিল না, বরং রাজনৈতিক সিস্টেমের বাইরের খোলসের আড়ালে যে সহিংসতার বীজ লুকিয়ে ছিল, সেটারই প্রকাশ হয়েছিল এই সময়।

জিয়ার আমলে বেশ কিছু সামরিক ক্যু প্রচেষ্টা এবং কতিপয় রাজনৈতিক গ্রুপকে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। এই সময়টাতেই রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক সিস্টেমকে ব্যবহার করে সম্পদ তৈরির যুগ শুরু হয়। এই সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হলো প্রাইভেট ব্যাংকের উত্থান। ১৯৭১ সালের এক দশকের মধ্যে, বহু মানুষের একটা প্রাইভেট ব্যাংক চালুর মতো অর্থ জমে গিয়েছিল, যাদের অধিকাংশেরই অবস্থা ছিল করুণ।

ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ছিল বিশাল এবং উদারভাবে সেটা দেয়া হয়েছে এবং সেটা আসলে শোধ দেয়ার কথা ভাবাও হয়নি। যারা আওয়ামী লীগের সময় এই যাত্রায় অংশ নিতে পারেনি, তারা দ্রুত পরের ট্রেনে সওয়ার হয়ে গেছেন। উচ্চবিত্ত শ্রেণী ততদিনে প্রধান জায়গাগুলোতে নিজেদের ক্ষমতা সংহত করতে শুরু করেছে। কিন্তু ক্ষমতার আধিপত্য সেভাবে বেসামরিক ব্যক্তিদের হাতে ছিল না, তা বেসামরিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের যতই বিকাশ ঘটুক। জিয়ার আমলে সামরিক বাহিনীর মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব জোরালো ছিল এবং ক্ষমতার লড়াইও যথারীতি বজায় ছিল।

একটি বাদে এই সব বাধাগুলোই পার করেছিলেন জিয়া, কিন্তু তার সেনা সহকর্মীদের একটি গ্রুপের হাতে পতন হয় তার। হঠাৎই সবদিক ভেঙে পড়তে শুরু করে। দুর্বল প্রেসিডেন্ট সাত্তারের অধীনস্ত বিএনপি সরকারকে নিয়ন্ত্রণহীন মনে হতে থাকে। যতই দিন যাচ্ছিল, চারপাশের বলশালী ব্যক্তিদের মধ্যে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল এরশাদের অবস্থান তত জোরালো হয়ে উঠছিল।

রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলায় নিপতিত বিএনপি – যারা তাদের ক্যারিশম্যাটিক নেতা জিয়ার অভাব বোধ করছিল তীব্রভাবে – তাদেরকে ক্ষমতাচ্যুত করেন জেনারেল এরশাদ, যিনি জিয়া হত্যার ঘটনাটি সামলে একটা নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে এনেছিলেন। ক্যু-এর নেতা জিয়ার নেতৃত্বে একটা বেসামরিক শাসনামলের অবসানের পর ব্যারাক থেকে আরেকজন নেতা উঠে এসে দেশের দায়িত্ব নিলেন। পরে তিনিও অনেকটা বেসামরিক রাজনীতিবিদ হয়ে উঠেছিলেন।

সরকার ও প্রতিরোধ

বহু প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসেন এরশাদ। এর মধ্যে কিছু তিনি পূর্ণ করেছিলেন, বহু কিছু পূর্ণ করতে পারেননি, কিন্তু রাষ্ট্রীয় সিস্টেমের অধীনে ধনিক শ্রেণীর উত্থান অব্যাহত থাকে। তবে, এরশাদের মিত্রদের সম্পদ বৃদ্ধির সাথে সাথে এরশাদ তার বেসামরিক রাজনৈতিক দল জাতীয় পার্টি (জেপি) গঠন করেন। তবে বেসামরিক রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পক্ষ থেকে তখন রাজনৈতিক প্রতিরোধ বাড়তে থাকে, যারা তখন ক্ষমতা থেকে বহু দূরে ছিলেন। এর অর্থ হলো মধ্যবিত্ত শ্রেণীরও উত্থান হচ্ছিল।

এরশাদ বল প্রয়োগে বিএনপিকে সরিয়ে দিয়েছিলেন এবং তার ক্ষমতা গ্রহণকে হালাল করতে তিনি তাদেরকে ছুড়ে ফেলেছিলেন। বিএনপি তাদের শক্তি ফিরিয়ে আনে এবং একটা আন্দোলন গড়ে তোলে যেটা ছিল অনমনীয় এবং ক্রমেই সেটার শক্তি বাড়তে থাকে। অনেকেই বলেছিলেন যে, প্রেসিডেন্ট জিয়ার বিধবা স্ত্রী হিসেবে সেনাবাহিনীতে খালেদা জিয়ার সমর্থক ছিল কিন্তু যে দিন তিনি এরশাদের বিরোধিতা শুরু করলেন, সেদিন থেকে তার জনসমর্থনও বাড়তে শুরু করলো।

আওয়ামী লীগ সতর্কভাবে বিরোধিতা করেছিল এবং মেপে মেপে পদক্ষেপ নিয়েছিলো তারা কারণ তারা চায়নি যে বিএনপি আবার ক্ষমতায় ফিরে আসুক। এরশাদ আর বিএনপি উভয়কেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিবেচনা করেছিল তারা।

রাজনৈতিকভাবে জিয়ার অনুকরণ করেছিলেন এরশাদ – জেপি থেকে বিএনপি – কিন্তু সময় বদলে গিয়েছিল। ১৯৮৬ সালের নির্বাচন বিএনপি বয়কট করলেও আওয়ামী লীগ তাতে অংশ নিয়েছিল এবং সেখানেই বাংলাদেশের রাজনীতির বাস্তবতাটা উঠে এসেছিল। এর অর্থ হলো কারো না কারো সাথে জোট গড়তে হবে। এর আরেকটা অর্থ হলো বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ যদি একজোট না হতো, জাতীয় পার্টি এবং এরশাদ তাহলে দীর্ঘসময় টিকে যেতেন।

মধ্যবিত্তের উত্থান?

এই সময়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আকাঙ্ক্ষার উত্থান, যারা বিপুল অর্থের উপর নির্ভর করে এসেছিল, যেটা ততদিনে যথেষ্ট বেড়ে গেছে। এর একটা সূচক হলো প্রাইভেট মিডিয়ার উত্থান, যার অর্থ হলো বিকাশমান মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে ভাড়া করার মতো অর্থ জমে গেছে ততদিনে। এই গ্রুপ আকারে বিশাল নয় এবং তারা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রণও করে না কিন্তু তারা সরব এবং তাদের উপস্থিতি জানান দিয়েছে। তারা রাস্তায় নামার সাহস অর্জন করেছিল এবং সেটাই ছিল মূল বিষয়। শিক্ষিত ও সাহসী, অনেকেই এসেছিলেন ঢাকার বাইরে থেকে, তারা এমন একটা স্টাইল তুলে ধরলেন, যেটা নতুন আগ্রাসী শ্রেণীর জানান দিচ্ছিল।

এটা সত্যি যে বহু মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সংস্কৃতিবাদী একটা নির্ভরশীলতার চরিত্র গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে তারা নিজেদের প্রকল্পের জন্য নব্য ধনিক শ্রেণীর উপর নির্ভর করতেন, কিন্তু এরশাদ এই দুই পক্ষের সাথেই খেলেছেন। তিনি কবিদের পৃষ্ঠপোষকতা দিতে শুরু করেন, বিশেষ করে প্রথাগত অভিজাত প্রভাবের বাইরে, কিন্তু তিনি বাংলাদেশী ধারাটা ভালোই বুঝতেন বলে মনে হয়। তিনি সব পক্ষকেই প্রশ্রয় দিতেন।

একদিকে যখন তিনি কবিদের পিঠ চাপড়াচ্ছেন, অন্যদিকে তখন তাকে ঘন ঘন ওয়াজ মাহফিলে দেখা যাচ্ছিল এবং তিনি মাওলানাদের ঘনিষ্ঠ হয়ে ইসলামকে এমনকি রাষ্ট্রীয় ধর্মও ঘোষণা দিয়ে দিলেন। উভয় পক্ষেই তার বন্ধু ও শত্রু জন্মালো কিন্তু তিনি সজিবভাবে টিকে থাকলেন। আর এরপর আসলো আটরশির পীরের প্রসঙ্গ।

আটরশির পীর + ঢাকার সুন্দরী রমনীরা

আটরশির পীর তার ‘অলৌকিক শক্তি’ দিয়ে বাংলাদেশের বহু মানুষকে মোহাবিষ্ট করে রেখেছিলেন, যখনই এটা জানা গেলো যে এরশাদ তার একজন ‘মুরিদ’। হাজার হাজার মানুষ তখন আটরশির কাছে যেতে শুরু করলো। এরশাদের পদক্ষেপ ছিল অসাধারণ, সচেতনে হোক বা অচেতনে, তিনি জানতেন যে, বাংলাদেশের মানুষ পীরদের ভালোবাসেন এবং সে কারণে তাকেও সবাই ‘শ্রদ্ধা’ করবে, এমনকি মুরিদ হিসেবে তাকে হয়তো ভক্তিও করবে।

অবশ্যই, কিছু লোক আটরশির কাছে এ কারণে যেতেন যে, ওখানে এরশাদ (পড়ুন ক্ষমতা) যান এবং এ কারণে সেটা প্রভাব বিস্তারের একটা বিশাল নেটওয়ার্ক হয়ে ওঠে। কিন্তু পীরের অনুসারীরা সবাই সুবিধাবাদী ছিল না। অনেকেই ছিলেন শুদ্ধবাদী এবং এদের মধ্যে অনেক সাংবাদিকও ছিলেন, তা যে ভাবনা থেকেই সেখানে তারা যান না কেন। এরশাদ যখন সরে গেলেন, তখন পীরের প্রভাবও কমে গেলো যদিও তার তখনও বহু অনুসারী ছিল।

এরশাদের আশেপাশে বহু নারীও ছিল, তা নিজে তিনি যতবার বিয়েই করুন না কেন। যেটা মূল বিষয়, সেটা হলো তার আশেপাশে বহু নারী ছিল যারা তাকে ভালোবাসতো, এদের প্রায় সবাই সুন্দরী ও বিবাহিতা। ক্ষমতা নিঃসন্দেহে একটা শক্তিশালী আসক্তির বিষয় এবং এর বাইরে তিনি কবিতাও লিখতেন। যদিও কবিতাগুলো অত ভালো ছিল না তবে গুজব শোনা গেছে যে, অনেক ভালো কবি তার হয়ে কবিতা লিখে দিতেন।

তাই সেনাবাহিনীর সাথে সাথে ধনী এবং নারীরাও তার পেছনে ছিল এবং কবিদের একটা অংশও তার সাথে ছিল। এরশাদের আর উদ্বিগ্ন হওয়ার কি ছিল? একটা ভুল তিনি করেছিলেন। সেটা হলো দুই নারীর নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক শ্রেণীকে তাদের গণআন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষমতাকে তিনি যথেষ্ট গুরুত্ব দেননি।

দুই নারীর সম্মিলন

এরশাদ বহু শিক্ষার্থীদের প্রলুব্ধ করেছিলেন – যেটা মধ্যবিত্তের শক্তির আঁতুরঘর, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। এই মানুষেরা খালেদা এবং হাসিনার মধ্যে শক্তি দেখতে পেয়েছিলেন – এই দুই রাজনীতিবিদের সেই ক্ষমতা ছিল যার শক্তিতে তারা সড়কে আশাবাদী তরুণদের দিয়ে ভর্তি করে দিতে পারতেন। তাদের সেই ক্যারিশমা ছিল যার বলে তারা আন্দোলনের রাজপথে সবাইকে নিয়ে আসতে পারতেন। প্রাথমিক অনীহার পর, হাসিনা খালেদার সাথে জোট গড়তে সম্মত হন, যার নিজেরও একই রকম অনীহা ছিল। কিন্তু রাজনীতিতে যখন দুজন এক হলেন, তাদের সাথে প্রায় ৮০% মানুষের জনসমর্থন ছিল, তখন এরশাদের তাসের ঘর টলতে শুরু করলো।

অবশ্যই, এরশাদ তার সবচেয়ে বড় শক্তি সেনাবাহিনীর উপর নির্ভর করতে চেষ্টা করলো কিন্তু সেনাবাহিনী তাকে সমর্থন দিতে অস্বীকার করলো। তারা তখন একটা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভূমিকা রাখছিল এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে আগ্রহী ছিল না। এরশাদ একসময় তাদের প্রতিনিধিত্ব করতেন ঠিক কিন্তু তখন তিনি আরেকজন রাজনীতিবিদ মাত্র। জনগণের বা প্রাতিষ্ঠানিক কোন সমর্থন না থাকায়, সবাই যখন তার পতনের জন্য একত্রিত হলো, এরশাদের তখন পতন হলো। ১৯৯০ সালের শেষটা তার জন্য সবচেয়ে নিষ্প্রভ সময় এর এরপর তাকে জেলে যেতে হলো।

পালাবদলের ধারা?

তার শাসনামলের সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা কি?
ক্ষমতার ভিত্তিতে বেসামরিক ও সামরিক শক্তির মধ্যে সঙ্ঘাতের তীব্রতাও কমে গেছে। বরং সেনাবাহিনী যখন এরশাদের পক্ষে ভূমিকা রাখতে অস্বীকার করলো, তখন উভয় শক্তির মধ্যে একটা জোট গঠন প্রায় অবশ্যম্ভাবী হয়ে গেলো। এরশাদ বা জিয়া যখন ক্ষমতায় আসেন, ১৯৯০ সালের পরিস্থিতি ছিল তার চেয়ে আলাদা। এই শিক্ষাটা ২০০৬ সালে সাময়িকভাবে ভুলে যাওয়া হয়েছিল কিন্তু যখন লক্ষণগুলো বোঝা গেলো যে এক পক্ষে থাকলেই সেটা ভালো কাজ করবে, তখন সামরিক বাহিনী নির্বাচন দিয়ে ২০০৮ সালে সরে গেলো।

বিএনপি ও আওয়ামী লীগ – এই দুই দলের হাতে ছিল ক্ষমতার চাবিকাঠি এবং তারা একত্র হলো তারা অন্য যে কোন বেসামরিক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করতে পারতো। পরিস্থিতি এখন বদলে গেছে। বিএনপি ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে গেছে এবং আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন শ্রেণীর সব পক্ষের মতামত নিয়ে ক্ষমতা চালানোর একটা নীতি মেনে চলছে। বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে যে অভ্যন্তরীণ সঙ্ঘাত ছিল, সেটা অধিকাংশই চলে গেছে।

রাজনীতিবিদরা বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষাপটে একত্র হতে পারতেন কিন্তু তারা রাজনৈতিক কাঠামোটাকে বদলাতে চাননি, যেটা করতে হলে পরিবর্তিত রাজনীতির সাথে মিল রেখে প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের প্রয়োজন হতো। এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হলো নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, যেটা ২০০৬ সাল পর্যন্ত টিকে ছিল, কিন্তু বিএনপি যখন এটাকে ব্যবহারের চেষ্টা করলো, তখন আন্দোলন ও সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে তাদের পতন হলো। পরে আওয়ামী লীগ এটাকে বাতিল করে অন্যদের চাপ দেয়ার শক্তিকে কঠিন করে দিলো কারণ জোটগুলো কোন সঙ্ঘাত চায়নি।

সামরিক বাহিনীও এটা শিখেছে যে, একতরফা সেনা শাসনের সময় চলে গেছে। তারা জিয়া-এরশাদ মডেলের বাইরেই থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং বেসামরিক সরকারের সহায়তা নিয়ে বিকশিত হওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে। সামরিক বাহিনীর ভেতর থেকে এসে বিএনপি ও জাতীয় পার্টির মতো দল গঠনের সময়ও চলে গেছে। মইন-ফখরু সরকার যে দল গঠনের চেষ্টা করেছিল, সেটা কখনই কাজ করেনি।

আর মধ্যবিত্তের কি হলো?

১৯৯০ সালে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সবচেয়ে উজ্জ্বল সময় ছিল যখন তারা এরশাদকে ক্ষমতাচ্যুত করে এবং ২০০৬-০৮ সালে এরাই সামরিক শাসনের বিরোধিতা করে, কিন্তু আর কখনই তারা আলোচনায় আসতে পারেনি। এখন তারা আগের যে কোন সময়ের চেয়ে শক্তিহীন এবং ক্ষমতাসীন শ্রেণী এখন খুব ভালো করে বুঝে গেছে, কিভাবে তাদের ক্ষমতা ও আকাঙ্ক্ষাকে টিকিয়ে রাখতে হয়।

রাজনৈতিক দলগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং আওয়ামী লীগ নিজেকে ক্ষমতাসীন আরও আস্থাশীল প্রতিনিধি হিসেবে গড়ে তুলেছে, যতটা বিএনপি পারেনি। ক্ষমতাসীন শাসকশ্রেণী এখন একটা জোটের সমন্বয় যাদের শীর্ষে রয়েছে সশস্ত্র বাহিনী, এর পরেই রয়েছে ব্যবসায়ী শ্রেণী, এরপরে বেসামরিক আমলা এবং সবশেষে রাজনীতিবিদরা। এই সমীকরণে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কোন স্থান নেই।

এরশাদ কি শেষ হাসি হেসেছেন

এক হিসেবে দেখলে এই মধ্যবিত্ত শ্রেণীই এক দশক ধরে জেগে উঠেছিল এবং এরশাদ পতনে নেতৃত্ব দিয়ে আবার নিজেরাই হারিয়ে গেছে। কবি, চিত্রশিল্পী এবং অধিকার কর্মীরা তখন গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। এখন তাদের আর গুরুত্ব নেই এবং কেবল দলীয় ক্যাডারদের গুরুত্ব রয়েছে। এরশাদের সময় যেমনটা ছিল, সমাজ এখন তার চেয়েও বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত এবং বিশৃঙ্খল, কিন্তু তাতে আর কিছু যায় আসে না। মানুষ এখন যেভাবে বাস করে, ভালোবাসে এবং অর্থ উপার্জন করে, সেটাতে মানুষ আর হতবাক হয় না।

এরশাদ বহু বছর জেলে কাটিয়েছেন, কখনই পূর্ণ ক্ষমতা ফিরে পাননি কিন্তু আওয়ালী লীগের সাথে জোট করে ক্ষমতার কাছাকাছি থেকেছেন এবং আওয়ামী লীগের প্রকল্পে সহযোগির ভূমিকা পালন করেছেন। কেউ কেউ এখনও তাকে ‘স্বৈরাচার এরশাদ’ বলে থাকেন কিন্তু এটা এখন অর্থহীন হয়ে গেছে। প্রায় এক দশক ক্ষমতাসীন দলের মিত্র ছিলেন তিনি এবং তারা তাকে ব্যবহার করেছে।

শেষ পর্যন্ত এরশাদ তার প্রতিশোধটা নিতে পেরেছেন বা শেষ হাসি হেসেছেন। তিনি আসলে কখনই হারিয়ে যাননি এবং তার মৃত্যুর সময় প্রধানমন্ত্রী শোকবার্তা দিয়েছেন যিনি তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলন করেছিলেন। আর এদিকে মধ্যবিত্তি শ্রেণী বিশেষ করে এর শহুরে অংশটি আগের যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি চাপে আছে। তাই সব মিলিয়ে একটা রূপকথার পরিণতি বা অপরিণতি ঘটলো, তা যেটাই বলুন না কেন।

Tuesday, July 14, 2020

জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের জন্য শোকগাঁথা by ডেরেক ব্রাউন

স্বৈরাচাররা যেমনটা হয়ে থাকেন, হোসেন মুহম্মদ এরশাদ ততটা নৃশংস ছিলেন না। তার শাসনামলে বাংলাদেশ ত্রাস, কারাদণ্ড ও মৃত্যুদণ্ডের জনপদ ছিল না। তবে দেশটা ছিল এমন যেখানে সর্বত্র যেন সন্দেহ ও নৈরাশ্যের ছাপ। দুর্নীতি পৌঁছে গিয়েছিল দেশের প্রতিটি কোণায়। ভঙ্গুর রাজনৈতিক কাঠামো আরও ন্যুজ্ব হয়ে গিয়েছিল।

এরশাদ মারা গেছেন ৮৯ বছর বয়সে। আশির দশকের পুরোটা ও নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে বাংলাদেশ শাসন করে গেছেন তিনি। নেতা হওয়ার ক্ষেত্রে তার একমাত্র যোগ্যতা ছিল এই যে, তিনি ১৯৭৮ সাল থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন। ওই সময় বাংলাদেশ শাসন করছিলেন আরেক সামরিক শাসক, ক্যারিশম্যাটিক জিয়াউর রহমান।

১৯৭৫ সালে জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর জিয়া ক্ষমতায় এসেছিলেন। ১৯৮১ সালে ঘাতকদের বুলেট বুকে নেয়ার সময় চলে এল জিয়ার। বিফল ওই অভ্যুত্থান করেছিলেন মধ্যম পর্যায়ের সেনা কর্মকর্তারা, যাদের কয়েকজন অভ্যুত্থানের সময়ই মারা যান।

শেখ মুজিবের মৃত্যুর পর যেমনটা হয়েছিল, জিয়ার মৃত্যুর পরও অন্তর্বর্তীকালীন জরুরী প্রশাসন দেশ শাসন করার চেষ্টা করছিল। ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী জন্মের পর থেকে উত্থান-পতন ও সহিংসতা ছাড়া খুব কম কিছুই চাক্ষুষ করেছে বাংলাদেশ।

লেফটেন্যান্ট জেনারেল এইচ এম এরশাদ ছিলেন পেশাদার সেনা কর্মকর্তা। ওই সময় রাজনীতির প্রতি তেমন আগ্রহ তিনি দেখাননি। সাবেক বস জিয়ার মৃত্যুর পর ঝঞ্ঝাটময় সময়েও এরশাদ শক্ত ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দ্বিধান্বিত ছিলেন। তবে ১৯৮২ সালের শুরুর দিকে তিনি রক্তপাতহীন অভ্যুত্থান ঘটান। দেশে সেনা শাসন আরোপ করেন। নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি ক্ষমতা দখল করার সময় দাবি করেছিলেন (কোনো সন্দেহ নেই যে, বিশ্বাসও করেছিলেন) যে, তিনি সংবিধান রক্ষা করতে ও দেশকে গণতন্ত্রের জন্য নিরাপদ করতেই সামনে এসেছেন।

এরশাদ পরবর্তীতে সেনাপ্রধান পদ ছাড়েন। সামরিক শাসনের অবসান ঘটান। তিনি সংসদ নির্বাচনও আয়োজন করেন। জাতীয় পার্টি (জেপি) নামে দল গঠন করে ওই নির্বাচনে লড়েন। বেসামরিক রাজনীতিতে তখন আধিপত্য ছিল (এখনও আছে) আওয়ামী লীগ ও বিএনপির। যেই দুই দলের প্রধান ব্যক্তি ছিলেন যথাক্রমে মুজিব ও জিয়া।

উপমহাদেশীয় রাজনীতির বংশানুক্রমিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় দল দু’টির নেতৃত্বে আসেন মুজিবের মেয়ে শেখ হাসিনা ও জিয়ার বিধবা স্ত্রী খালেদা জিয়া। এই দুই নারী একে অপরকে দেখতে পারতেন না, কিন্তু তারা এরশাদকে আরও বেশি ঘৃণা করতেন। তারা এরশাদের অধীনে নির্বাচন বর্জন করেন।

১৯৮৮ সালের নির্বাচনে, জাতীয় পার্টি ৩০০ আসনের ২৫১টিতে ‘জয়’ পায়। এর আংশিক কারণ হলো প্রধান দুই দলের বয়কট, আরেক কারণ ছিল স্থূল কারচুপি।

ওই সময় আমি ছিলাম ওই অঞ্চলে গার্ডিয়ানের প্রতিনিধি। তখন আমি জোচ্চুরির পর জোচ্চুরি প্রত্যক্ষ করেছি। ভোটাভুটি স্বাভাবিক ও নিয়মিত দেখাতে শ্রমিকদের ভাড়া করা হয়েছিল। ওই দিনটি যেন মানুষের ঔদাসীন্য ও ক্ষোভের মিশেল ছিল। ঢাকার একটি ভোটকেন্দ্রে দুপুরের আগেই রিটার্নিং কর্মকর্তা ঘোষণা দিলেন, ১০০ শতাংশ ভোট হয়ে গেছে, আর ভোটগ্রহণ করা হবে না। তাকে এই প্রশ্ন করতে যাওয়াটা নিষ্ঠুর হয়ে যেত যে, তার সকল ব্যালট বক্স রাজপথে। ক্ষুদ্ধ লোকজন সেগুলো পুড়িয়ে দিয়েছে। ওই রাতেই কিছু জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক ও বিদেশী সংবাদদাতা নিজেদের মধ্যে আলাপ করছিলেন, টার্নআউট কতো হতে পারে, তা নিয়ে। সর্বোচ্চ অনুমান ছিল, ২ শতাংশ।

এই প্রশ্নবিদ্ধ ম্যান্ডেট নিয়ে এরশাদ ক্ষমতায় ফিরলেন, দেশের আধুনিকায়ন ও পুনর্গঠনের কাজে। তার প্রিয় ছিল সিদ্ধান্ত কথিত উপজেলা পদ্ধতির মাধ্যমে তৃণমূলের কাছে ক্ষমতা দেয়া। এগুলো ছিল প্রত্যন্ত এলাকার প্রশাসনিক ইউনিট, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব অর্পিত ছিল এই প্রশাসনে। এতে দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত ছিল। উপজেলা নেটওয়ার্ক স্থাপিত হয় পূর্বের ৪৬০টি থানা বা পুলিশ স্টেশনের ভিত্তিতে। নিজেদের দুর্দশাগ্রস্থ জীবন নিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে সামান্য হলেও সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা দেয়ার চেষ্টা হয়েছিল ওই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব উপজেলায় আধিপত্য ছিল স্থানীয় ক্ষমতাশালী ব্যক্তি ও সরকারী কর্মকর্তাদের।

এরশাদ বসবাস করতেন প্রকাণ্ড প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে। তার ছিল নিজস্ব গলফ কোর্স। সবসময় দুর্নীতি নির্মূল নিয়ে প্রগাঢ় ভাষায় কথা বলতেন। দারিদ্রপীড়িত মানুষের কষ্ট নিয়েও তিনি সত্যিকার অর্থে পীড়িত ছিলেন। ১৯৮৭ সালে আমি তার সঙ্গে একটি বন্যা উপদ্রুত এলাকায় সফর করি। বহু গ্রামে যাই আমরা। প্রত্যেকটা গ্রামে প্রেসিডেন্ট বন্যার বিধ্বস্ততার শিকার এলাকায় যেতেন। তাকে মিনতির সুরে ছুঁতে যাওয়া নারীদের ভদ্রস্থভাবে এড়িয়ে যেতেন। তার পেছনে থাকতো একজন সহযোগী, যার হাতে ছিল নোটভর্তি ব্রিফকেস। এরশাদ নারীদের দিকে ইঙ্গিত দিতেন, আর তাদের হাতে টাকা বিলাতেন ওই সহযোগী।

সেখান থেকে বিরতি নিয়ে আমরা বগুড়া সামরিক ক্যান্টনমেন্টে অফিসার্স মেসে দারুণ কিন্তু একেবারেই বেমানান দুপুরের খাবার খেলাম। আমরা যখন খাচ্ছিলাম, এরশাদের চোখ অশ্রুসজল। তিনি বর্ণনা করছিলেন, যেই ক্ষুদা ও দারিদ্র্য আমরা গ্রামে গ্রামে চাক্ষুষ করলাম। তিনি বিদেশী ত্রাণ চাননি। সতর্কভাবে নিজের পর্যবেক্ষণের কথা বললেন, ‘মানুষ ভিক্ষুককে কিছু দিতে চায় না।’

সমালোচকরা বলেন, ১৯৮৮ সালে, সস্তা জনপ্রিয়তা পেতে, এরশাদ সংবিধান সংশোধন করে ইসলামকে ধর্মনিরপেক্ষ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের রাষ্ট্রধর্ম বানালেন। তিনি পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার জেলার দিনহাটায় জন্মগ্রহণ করেন। তখন সেটি ছিল বৃটিশ শাসিত ভারত। তার পিতার নাম মকবুল হোসেন, মায়ের নাম মাজিদা খাতুন। তার পরিবার বর্তমান বাংলাদেশে অভিবাসী হয়ে আসে ১৯৪৮ সালে। তখন এটি ছিল পাকিস্তানের অংশ।

এরশাদ রংপুরের কারমাইকেল কলেজে ও পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন। ১৯৫০ সালে তিনি স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৯ সালে পাকিস্তানের কোয়েটায় কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজের পর তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার হিসেবে পদায়ন পান। তবে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যখন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার যুদ্ধে লড়ছিল, তখন তাকে অন্তরীন করা হয়। ১৯৭৩ সালে তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়।

বিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘকালের শাসক ছিলেন এরশাদ। কিন্তু দেশের অবস্থা এত উত্তাল ছিল যে, তিনি আজীবন ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। ইতিহাসে প্রথম ও একমাত্র নজির গড়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ঐক্যবদ্ধ হয়ে হরতাল ও রাজপথে আন্দোলন করে। সহিংসভাবে হরতাল প্রয়োগও করে। ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে, প্রেসিডেন্ট বুঝতে পারলেন তার সময় শেষ। তিনি পদত্যাগ করলেন। তার পরে যেই সরকারগুলো আসলো সেগুলোর নেতৃত্বে ছিলেন খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা।

১৯৯১ সালে এরশাদকে আটক করা হয়। দুর্নীতির অভিযোগে কারান্তরীণ করা হয়। কিন্তু ভেঙ্গে যাওয়ার পরিবর্তে জাতীয় পার্টি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে টিকে যায়। টানা দুই নির্বাচনে এরশাদ ৫টি আসন থেকে নির্বাচন করেন ও প্রত্যেকটি থেকে জয়লাভ করেন, অথচ তখন তিনি কারাগারে। কিন্তু তারপরও তার গৌরবময় দিনগুলো ততদিনে শেষ।

১৯৯৭ সালে তিনি জামিনে মুক্ত হন। এরপর ২০০০ সালে তাকে আবারও ৪ মাসের জন্য জেল দেয়া হয়। ওই সময় তিনি ৫ বছরের জন্য নির্বাচনে অযোগ্য হন। মৃত্যুর সময়, তার বিরুদ্ধে একটি সামরিক অভ্যুত্থান সমর্থনের অভিযোগে মামলা চলছিল, যেই অভ্যুত্থানে তারই সহকর্মী মেজর জেনারেল আবুল মনজুর নিহত হন।

এরশাদ ১৯৫৬ সালে রওশন এরশাদকে বিয়ে করেন। তিনি ২০০০ সালে বিদিশা সিদ্দিকিকে বিয়ে করেন। ২০১৫ সালে তাদের মধ্যে ডিভোর্স হয়। মৃত্যুর সময় ৩ ছেলে ও ১ মেয়ে রেখে গেছেন তিনি।
  • *সৈনিক থেকে রাজনীতিবিদ হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের জন্ম ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৩০, মৃত্যু ১৪ জুলাই ২০১৯।
  • *ড্রেক ব্রাউন ২০১১ সালে মারা গেছেন।
২০০০ সালে ঢাকার আদালত পাড়ায় সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ, ছবি: পাভেল রহমান/এরশাদ
(সংকলিত)

Saturday, February 1, 2020

এরশাদকে যেমন দেখেছি by আবু রূশদ

২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনের তখন আর মাত্র ১৬ দিন বাকি। একটি জাতীয় দৈনিকে সিনিয়র রিপোর্টার হিসেবে নিয়োজিত থাকাকালে নির্বাচন কমিশন কভার করার দায়িত্ব পালন করছি। আমার নিজের বিশেষায়িত প্রতিরক্ষা বিট তো আছেই। সংসদ নির্বাচনের সময় নির্বাচন কমিশন সংক্রান্ত রিপোর্ট করা যে কী ঝক্কি-ঝামেলার ব্যাপার, তা ভুক্তভোগী ছাড়া অনুধাবন করা সম্ভব নয়। ওই নির্বাচনে আবার সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে মোতায়েন করায় প্রতিরক্ষা বিষয়েও তীক্ষ নজর রাখতে হতো। সকালে বের হয়ে চলে আসতাম নির্বাচন কমিশনে। এই তথ্য, সেই তথ্য জোগাড় করার পাশাপাশি হঠাৎ হঠাৎ প্রেস ব্রিফিং তো ছিলই। আর বিশেষ রিপোর্ট করার জন্য বিশেষ তথ্য বের করতে জোঁকের মতো লেগে থাকতে হতো।

দুপুরে কোনো দিন খেতাম, কোনো দিন থেকে যেতাম অভুক্ত। বিকেলের দিকে একঝাঁক সাংবাদিকের মধ্যে বসে হাতে লিখে রিপোর্ট নির্বাচন কমিশন অফিস থেকেই ফ্যাক্সে পাঠিয়ে দিতাম পত্রিকায়। এরপর সন্ধ্যার দিকে মতিঝিলের শেষ প্রান্তে দৈনিক অফিসে যেতে হতো বাকি কাজগুলো শেষ করার জন্য। প্রতিরক্ষা বিষয়ে কোনো ব্রিফিং থাকলে বা সোর্সের কাছে যেতে হলে ওই সময়ের মধ্যেই ছুটতে হতো। এটি সঙ্গত কারণেই অনেক স্পর্শকাতর বিষয়। তাই বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হতো। কোনো কোনো দিন রাতে আবার বাসায় ফেরার পথে নির্বাচন কমিশনে ঢুঁ মারতাম সর্বশেষ অবস্থা জানার জন্য। প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবু সাইদ প্রায়ই রাতে মিটিংয়ে বসতেন। সব মিলিয়ে তখন চোখে সর্ষেফুল দেখছি। শরীর ক্লান্তির চরম সীমায় চলে গেছে।

ঠিক তখনই রাতে সম্পাদক তার রুমে ডেকে বললেন- কাল সকাল থেকে আমাকে জাতীয় পার্টির বিটও দেখতে হবে। জাতীয় পার্টি তখন আবার তিন ভাগে বিভক্ত। সহকর্মী এম আব্দুল্লাহ এত দিন জাতীয় পার্টির বিট দেখতেন। নির্বাচনের মাত্র ১৬ দিন আগে কেন তাকে সরিয়ে আমাকে দেয়া হলো, আর এই অল্প সময়ের মধ্যে কিভাবে সোর্স তৈরি করব- জানতে চাইলাম সম্পাদকের কাছে? তিনি সাফ জানিয়ে দিলেন, আমি রংপুরের লোক ও সেনাবাহিনীর অফিসার ছিলাম, তাই জেনারেল এরশাদের কাছে বিশেষ ‘ফেবার’ পাবো, এই বিবেচনায় আমাকে জাতীয় পার্টির বিট দেয়া হয়েছে। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। কারণ অবসর নেয়ার পর যখন বিভিন্ন দৈনিকে কলাম লেখা শুরু করেছি, তখন থেকেই জাতীয় পার্টি ও এরশাদের বিরোধিতা করেছি।

আদর্শগত দিক থেকে আমি কখনোই জাতীয় পার্টির সাথে খাপ খাওয়াতে পারিনি। তাই খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম। রংপুর শহরে আমার পৈতৃক বাড়ি থেকে জে. এরশাদের পৈতৃক বাড়ি ‘স্কাইভিউ’ এক কিলোমিটারের মতো দূরে। এ ছাড়া আমার আপন ছোট বোন বিয়ে করেছে এরশাদ পরিবারে। তবে আমি কখনো এরশাদ পরিবারের সাথে কোনো সখ্য বা যোগাযোগ রাখতাম না। কোনো দিন জে. এরশাদের কাছে যাইনি। তার ইমিডিয়েট ছোট ভাই এবং সে সময়ের এমপি মরহুম মোজাম্মেল হক লালু আমাদের রংপুুরের বাসায় যেতেন আব্বার সাথে দেখা করতে। তিনিও জানতেন- আমি জাতীয় পার্টি ও তার বড় ভাইকে নিয়ে ‘কী সব’ লিখেছি। তাই পুরো বিষয়টি আমার জন্য বেশ বিব্রতকর হয়ে দাঁড়াল। এসব চিন্তা করে মারাত্মক টেনশনে পড়ে গেলাম। সারা রাত কাটল দুশ্চিন্তা ও রাগে।

পরদিন বেলা ১১টায় জাতীয় পার্টির বনানীস্থ চেয়ারম্যান কার্যালয়ে জেনারেল এরশাদের প্রেস ব্রিফিং ছিল। পার্টি অফিসে একটু আগেই চলে গেলাম প্রেস সচিব সুশীল শুভ রায়ের সাথে পরিচিত হওয়ার জন্য। তিনি তার অফিসে সাদরে আমাকে অভ্যর্থনা জানালেন এবং পার্টির সিনিয়র নেতাদের ব্যাপারে ব্রিফ করলেন। ব্রিফিং শুরু হওয়ার সময় জে. এরশাদ আসার পর সুনীল দা আমাকে তার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। এরশাদ বেশ অবাকই হলেন নির্বাচনের মাত্র ১৬ দিন আগে তার দল কভার করার জন্য রিপোর্টার পরিবর্তন করার কথা শোনে। আমাকে বললেন প্রেস ব্রিফিং শেষে তার সাথে অফিসে দেখা করে যেতে। আমি আরো সঙ্কুচিত হয়ে গেলাম; ভয় পেলাম। হাজার হলেও ১৯৮৫ সালের ডিসেম্বরে তার হাত দিয়েই মিলিটারি একাডেমি থেকে কমিশন পেয়েছি। সেনাবাহিনীর সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্কে যে বিশেষ স্পর্শকাতরতা রয়েছে তা থেকে কোনো সেনা অফিসারের পক্ষেই কোনো দিন বের হওয়া সম্ভব নয়।

অন্য দিকে দৈনিক পত্রিকার রিপোর্টার হিসেবে একটি রাজনৈতিক দল কভার করতে গেলে প্রয়োজন হয় অনেক ইনফরমাল সম্পর্কের। দুরু দুরু বুকে প্রেস ব্রিফিং কোনো মতে শেষ করলাম। এরপর নির্দেশমতো জেনারেল এরশাদের রুমের দরজায় গিয়ে নক করলাম। ভেতরে যাওয়ার পর এরশাদের সামনে গিয়ে যখন দাঁড়ালাম, তখন অনেকটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা। ভাবছিলাম, না জানি কী ধরনের কঠোর অভ্যর্থনার মুখে পড়তে হয়! কিন্তু না। তিনি অত্যন্ত অমায়িকভাবে আমার ও আমার পরিবার সম্পর্কে জানতে চাইলেন। তারপর খুব স্বাভাবিকভাবেই বললেন, তুমি তো আমার ও আমার দল সম্পর্কে পত্রিকায় বহু কিছু লিখেছ। এর অনেক কিছুই আমার দফতরে ফাইলবন্দী করা আছে। তোমার মতো এমন জাতীয় পার্টি-বিরোধী একজনকে কেন এ সময়ে আমার দল কভার করতে দেয়া হলো? তুমি তো নির্বাচনের এই জটিল সময়ে আমার পার্টির ‘বারোটা বাজিয়ে দেবে’।

আমি কী উত্তর দেবো ভাবছি। কিন্তু এরশাদ সরাসরি আমার সম্পাদককে মোবাইল ফোনে কল করে বসলেন। তার আশঙ্কার কথা বললেন। ও পাশ থেকে সম্পাদক সাহেব কী বলেছিলেন, তা জানি না। তবে ফোন শেষে এরশাদ মাথা নেড়ে নরম সুরে বললেন, ‘ঠিক আছে যাও। দেখি, তুমি কেমন রিপোর্ট করো।’ আমি তখন ওই রুম থেকে বের হয়ে আসতে পারলে বাঁচি। তবে বের হওয়ার আগে তার অনুমতি নিয়ে বললাম- স্যার, আপনার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক অনেক সিদ্ধান্ত আমি পছন্দ করি না। ওগুলোর বিরোধিতা করি। ঠিক একইভাবে আপনার দল জাতীয় পার্টির রাজনীতিও আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তবে আপনি আমাদের সেনাপ্রধান ছিলেন, দেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। আপনার সেই মর্যাদা আমার কাছে সারা জীবন থাকবে। রিপোর্ট করার ক্ষেত্রে কোনো দিন দলবাজি করিনি, করবও না। যা হয়েছে বা ঘটেছে, তাই বলব। মিথ্যে বা উদ্দেশ্যমূলক কোনো রিপোর্ট আমার হাত দিয়ে হবে না।’

জে. এরশাদ চুপচাপ আমার কথা শুনলেন। রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে তিনি তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন নম্বর দিয়ে হেসে বললেন, ‘কোনো কিছু ক্ল্যারিফাই করতে হলে আমাকে সরাসরি ফোন করবে। কেউ কিছু না বললেও আমি তোমাকে তথ্য দেবো।’ অনেকটা অবাক হয়েই রুম থেকে বের হলাম। কোথায় বকাঝকা খাওয়ার কথা, সেখানে আমার সাথে এত নম্র আচরণ করলেন? কিছুই বললেন না। আজো ভাবি, অন্য কাউকে যদি তার এবং তার দল সম্পর্কে এমন কথাবার্তা বলতাম, তাহলে আমার কী অবস্থা হতো?

খুব দ্রুত জাতীয় পার্টির মধ্যে সোর্স গড়ে তুলতে পেরেছিলাম। এরশাদের পিএস ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর খালেদ। সেনাবাহিনীর কোর্স বিবেচনায় তিনি আমার চেয়ে অনেক সিনিয়র। এরশাদ তাকে খুব স্নেহ করতেন। যেখানেই যেতেন, সাথে নিয়ে যেতেন তাঁকে। দলের অনেক সিনিয়র নেতা যে তথ্য বা ভেতরের খবর জানতেন না মেজর খালেদ তা প্রথমেই জেনে যেতেন। খালেদও আমাকে কাছে টেনে নিলেন। অল্প সময়ের মধ্যে তিনি যাবতীয় সহায়তা করেছেন। এতে এক দিকে যেমন কোনো রিপোর্ট মিস করিনি, তেমনি সেনাবাহিনীর চিরাচরিত কমরেডশিপ কাজে লাগিয়ে অনেক বেশি তথ্য পেয়েছি, যা অন্য রিপোর্টাররা হয়তো পেতেন না কিংবা পেতে বেশ কষ্ট হতো। এ দিকে জে. এরশাদ কয়েক দিনের মধ্যে আমাকে বেশ পছন্দ করা শুরু করলেন। তিনি দেখলেন, রিপোর্টে আমি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা বজায় রাখছি। কয়েকবার তার অফিসেও গিয়েছি এর মধ্যে। প্রতিবারই বসতে বলে সস্নেহে চা-কফি খাইয়েছেন। মেজর খালেদ কাচ্চি বিরিয়ানি দিয়ে আপ্যায়ন করেছেন। এরশাদ ওই যে আমাকে স্নেহ করতে শুরু করলেন, তা এখনো বজায় আছে।

নির্বাচনের পর জেনারেল এরশাদ তার বাসায় দাওয়াত দিয়েছেন। টেবিলে একসাথে খেয়েছি। তার স্ত্রী বিদিশা আন্তরিকতার সাথে খাবার পরিবেশন করেছেন। এরশাদ প্রায়ই ফোন করতেন, খোঁজখবর নিতেন। রোজার মাসে, তিনি দৈনিক পত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেলে জাতীয় পার্টির বিট কভার করতেন যেসব সাংবাদিক, তাদের সবাইকে তার বারিধারার প্রেসিডেন্ট পার্কের বাসায় ইফতার ও ডিনারের দাওয়াত দিতেন। নিজে আমাদের সাথে বসে ইফতার করে ছাদে গিয়ে নামাজ শেষে সবার সাথে বসে চা খেতেন আর গল্প করতেন। তাকে হাজারো বিব্রতকর প্রশ্ন করলেও তিনি কখনো রাগতেন না। সবার সব প্রশ্নের উত্তর দিতেন ভদ্র ভাষায়। আমি তাকে কখনো রাগতে দেখিনি। অনেক রাজনীতিবিদের সাথে মিশে দেখেছি যে, তাদের যদি কোনো অপ্রীতিকর প্রশ্ন করা হতো, তাহলে হয়তো আর এ দেশেই থাকতে পারতাম না।

রাজনীতি ও ব্যক্তিগত হাজারো সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, জেনারেল এরশাদের এই গুণ অন্তত আর কারো মাঝে দেখিনি। যেদিনই বনানীর জাতীয় পার্টির অফিসে যেতাম, সেদিনই কাজী জাফর আহমদ, রুহুল আমীন হাওলাদার, অব: ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহমুদুল হাসান, গোলাম মসিহ (বর্তমানে সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত)-এর মতো যাকেই পেতাম তার সাথে স্বভাবসুলভ তর্ক জুড়ে দিতাম, না হয় কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে বেশ কড়া জোক করতাম। এমনকি বিদিশার সাথে যখন এরশাদের সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু করে তখন সরাসরি বিব্রতকর প্রশ্ন করলেও কেউ রাগ করতেন না। তারা সাংবাদিকদের সাথে সখ্য ও ভদ্রতা বজায় রাখতেন। মনে হয়, আমরা অনেকেই বরং এরশাদের সাথে অশোভন আচরণ করেছি, তবুও তিনি সেসব নিয়ে উচ্চবাচ্য করেননি। বিদিশার সাথে তার সম্পর্ক খারাপ হতে থাকলে কয়েকটি পত্রিকায় নিতান্ত ব্যক্তিগতভাবে এরশাদকে নিয়ে ইচ্ছেমতো লেখা হতে থাকে। এগুলোর বেশির ভাগই ছিল আপত্তিকর। কিন্তু তিনি কাউকে কিছু বলেননি, তিরস্কার করা তো দূরের কথা।

এ দিকে জাতীয় পার্টির রিপোর্টের বাইরেও যদি আমার কোনো বিশেষ রিপোর্ট তার ভালো লাগত, তিনি ফোন করে অভিনন্দন জানাতেন ও উৎসাহ দিতেন। একদিন সকাল ৮টার দিকে তার ফোন পেয়ে ঘুম ভাঙল। সেদিন পত্রিকায় আমার একটি বিশেষ প্রতিবেদন ‘লিড’ অর্থাৎ শীর্ষ রিপোর্ট হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল। তত দিনে বিশেষ সংবাদদাতা হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছি। এখনো মনে আছে, রিপোর্টটির শিরোনাম ছিল ‘বন্ধুহীন হয়ে পড়ছে বাংলাদেশ’। এটা ২০০৪ সালের কথা। জে. এরশাদ ফোনে জানালেন, সকালে প্রথমেই তিনি ওই রিপোর্টটি পড়েছেন এবং আমি যা লিখেছি ঠিক তাই ঘটছে। সে সময় বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার না পারছিল যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সুসম্পর্ক রাখতে, না ছিল মুসলিম দেশগুলোর সাথে আগের সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে। দীর্ঘ দিনের ঘনিষ্ঠ কৌশলগত মিত্র চীনকে ভীষণ ক্ষেপিয়ে দিয়েছিল ঢাকায় তাইওয়ানের ভিসা ইস্যুর অনুমোদন দিয়ে। এ ছাড়া ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ছিল না বাস্তবসম্মত কোনো কূটনীতি।

যা হোক, জেনারেল এরশাদকে কাছ থেকে দেখে বেশ অবাকই হলাম। তিনি আর কোনো দিন আমার ব্যক্তিগত আদর্শিক বিষয়ে কোনো কথা বলেননি, বরং ব্যক্তিগতভাবে বেশ স্নেহ করতে শুরু করেছেন। ঈদ এলে তিনি জাতীয় পার্টির বিট কভার করা সব সাংবাদিককে উপহার পাঠাতেন। ফোন করে জিজ্ঞেস করতেন, ঈদের গিফট পেয়েছি কি না। তার তেমন একটি উপহারÑ আড়ংয়ের পাঞ্জাবি এখনো আমার কাছে আছে। পার্টির কাজে রংপুর বা কোথাও গেলে তিনি প্রায়ই সাথে নিয়ে যেতেন। ২০০৫ সালে বিদিশাকে তালাক দেয়ার কয়েক দিন পর সকালে হঠাৎ ফোন দিয়ে বললেন- ‘এখনি বনানীর কার্যালয়ে চলে এসো, দুই দিনের জন্য রংপুর যেতে হবে।’

নাশতা না করেই দৌড় দিলাম। পথে যেতে তার গাড়ি থামল টাঙ্গাইলে। সার্কিট হাউজে দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে কথা বললেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি রাষ্ট্রীয় প্রটোকল পেয়ে থাকেন। সাথে থাকে পুলিশ। টাঙ্গাইলের এসপি তার সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এলেন। তিনি এসপির গ্রামের বাড়ি, সন্তানাদির খোঁজখবর নিলেন। এসপিকে আসার জন্য এবং প্রটেকশন দেয়ার জন্য ধন্যবাদ জানালেন। দুপুরে বগুড়া পর্যটন মোটেলে খাওয়ার সময় আমাকে ও আরো কয়েকজনকে তার টেবিলে নিয়ে বসালেন। তীক্ষè নজর রাখলেন আমরা ঠিকমতো খাচ্ছি কি না। বিকেলের দিকে তার গাড়ি যে মাত্র বগুড়া সীমান্ত অতিক্রম করে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ সীমান্তে প্রবেশ করল, তখন সড়কের দুই পাশে হাজার হাজার মানুষ।

আশপাশের গ্রাম থেকে ফসলের ক্ষেত ডিঙিয়ে ছুটে আসছে আরো অনেকে। সবার গলায় স্লোগান- এরশাদ, এরশাদ। গাড়ির গতি ধীর হয়ে গেল। রংপুর-ঢাকা সড়কে যান চলাচল হয়ে পড়ল স্থবির। পলাশবাড়ি উপজেলায় তার একটি পথসভায় বক্তৃতা দেয়ার কথা। পলাশবাড়িতে আমার গ্রামের বাড়ি। ওখানে পৌঁছে দেখি হাজার হাজার মানুষ। আমি ও প্রেস সচিব সুনীল শুভরায় গাড়ি থেকে নেমে গাড়ির পেছনে দাঁড়িয়ে এরশাদের বক্তৃতা শুনছি। সারা দেশে তখন বিদিশা ইস্যু বেশ রমরমা। ওই অবস্থায় ওটাই ছিল তার প্রথম জনসভা। রংপুুরের স্থানীয় ভাষায় তিনি বক্তব্য রাখছেন। একপর্যায়ে তিনি উপস্থিত জনতার উদ্দেশে বললেন- আইনের মধ্যে থেকে ও ধর্মীয় বিধিবিধান মেনে বিদিশাকে বিয়ে করেছিলাম। কিন্তু তার বিভিন্ন বিষয় আমি মেনে নিতে পারিনি, তার সাথে একই ছাদের নিচে থাকা আমার পোষায়নি। তাই ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী তালাক দিয়েছি। আমি কি অন্যায় করেছি? ‘হাজার হাজার মানুষ দুই হাত উঁচু করে সমস্বরে গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে বলল- না!’

সুনীল দার দিকে তাকালাম চোখে কৌতুক নিয়ে। সুনীল দা বললেন, আপনাদের রংপুরে স্যারের এটাই কারিশমা। সন্ধ্যায় রংপুর পৌঁছানোর পর আমাদের রাখা হলো পর্যটন মোটেলে। আব্বা মারা যাওয়ার পর আমাদের রংপুরের বাসা ভাড়া দেয়া হয়েছিল, তাই অন্যদের সাথে আমাকেও মোটেলে থাকতে হলো। রাতে পার্টি মহাসচিব এসে হাজির। বললেন, এরশাদ তাকে পাঠিয়েছেন আমাদের সাথে ডিনার করতে, দেখভাল করতে। সকালে রংপুর ক্যাডেট কলেজের পাশে যে নতুন বাড়ি করেছেন, সেখানে আমাদের নাশতা খেতে বলেছিলেন এরশাদ। তার সাথে নাশতা খেলাম আমরা। রংপুরের পদাগঞ্জের আম খাওয়ালেন যতœ করে। দুপুরের খাওয়াও তার বাসায়। এরপর বদরগঞ্জ যাওয়ার কথা জনসভায় যোগ দিতে। পরদিন ঢাকায় আমার পারিবারিক গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ ছিল। স্ত্রী বারবার ফোন করছিলেন। তাই দুপুরে খাওয়ার পর স্যারকে জানালাম, আমাকে রাতের মধ্যেই চলে যেতে হবে।

কারণ শুনে তিনি সায় দিলেন। জানতে চাইলেন আমি যাবো কিভাবে? সাড়ে ৩টায় একটা এসি বাস ছাড়ে, সেটাতে যাওয়ার কথা বলায় তিনি বললেন- না, আমি গাড়ি দিয়ে দিচ্ছি, ওটাতে যাও। কোনো প্রয়োজন নেই তার বহরের দু’টি প্রাডো গাড়ির একটি আমাকে দিয়ে দেয়ার- এটা বলার পরও তিনি ড্রাইভার ডেকে আরেকজনকে সাথে নিয়ে আমাকে ঢাকায় নামিয়ে দিয়ে আসার হুকুম দিলেন। তবে জিপটি যমুনা সেতুর টাঙ্গাইল অংশ পর্যন্ত যাবে। ওই দিকে ঢাকা থেকে আরেকটি গাড়ি এসে থাকবে আমাকে বাকি পথটুকু নিয়ে যাওয়ার জন্য। এ ব্যবস্থা করা হলো, যাতে জিপটি রাতে রংপুর ফিরে আসতে পারে। তার এই বদান্যতা ওই পর্যায়ের আর কোনো মানুষের মাঝে দেখিনি। এদিকে, ২০০৫ সালের অক্টোবরে ওই দৈনিক থেকে পদত্যাগ করে দৈনিক যায়যায়দিন-এ যোগদান করি। এরপর ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেন ঘটনার পর চলে যাই দৈনিক আমার দেশ-এ। গিয়েই জেনারেল এরশাদের সমালোচনা করে একটি মন্তব্য প্রতিবেদন লিখি, যা প্রথম পাতায় বেশ বড় করেই ছাপা হলো।

তিনি ফোন করলেন। মৃদুস্বরে বললেন, তুমি আবারো আমার বিরুদ্ধে লেখা শুরু করেছ? আমি যথারীতি উত্তর দিলাম, স্যার, আগেই তো বলেছিলাম আমি আপনার রাজনৈতিক বিষয়গুলো পছন্দ করি না। এখন তো জাতীয় পার্টির বিট করছি না, তাই লিখেছি। আপনার কোনো প্রতিবাদলিপি দেয়ার থাকলে পাঠিয়ে দিন; আমরা ছাপাব গুরুত্ব দিয়ে। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, তিনি আমাদের ওখানে প্রতিবাদলিপি না পাঠিয়ে, আমি ২০০৫-এর আগে যে পত্রিকায় কাজ করতাম, সেখানে নিজ নামে একটি কলাম লেখেন আমার মন্তব্য প্রতিবেদনে উল্লিখিত বিষয়গুলোর জবাব দিতে। কিন্তু সেই লেখায় একটিবারের জন্যও আমার নাম উল্লেখ করেননি। শুধু জবাব দিয়ে গেছেন।

গত ক’বছর যখন কোনো অনুষ্ঠানে এরশাদের সাথে দেখা হতো, তিনি কাছে ডেকে কাঁধে হাত দিয়ে ঠিক বাবার মতো কুশলাদি জিজ্ঞেস করতেন। আমার স্ত্রীকে ‘মা’ কেমন আছো, ছেলে কত বড় হয়েছে, জানতে চাইতেন। তার ভাগ্নে কর্নেল এলাহী ২০০৯ সালে বিডিআর বিদ্রোহে শহীদ হওয়ার পর তিনি মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েন। আমাকে ফোন করে এলাহীর বাবার একটি স্মৃতিচারণমূলক লেখা আমার সম্পাদিত ডিফেন্স জার্নালে ছাপাতে অনুরোধ করেন। তার কাছে ১১ বছর ধরে ডিফেন্স জার্নাল পাঠাই। তিনি তা পড়েন এবং পত্রিকা পাঠানোর জন্য ফোন করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। আমার আব্বা যখন ২০০৩ সালে ইন্তেকাল করেন তখন তিনি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে শোক বার্তা দিয়েছেন। তার ছোট ভাই মোজাম্মেল হক লালু ও তার স্ত্রী আমাদের রংপুরের বাসায় ছুটে গেছেন।

হাজারো সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এরশাদ একজন হৃদয়বান রাজনীতিবিদ, যা বর্তমান বাংলাদেশে বেশ বিরল। চার বছর জাতীয় পার্টি কভার করার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, শুধু এরশাদের ব্যক্তিগত ইমেজে দলটি এখনো (এলাকাভিত্তিক হলেও) টিকে আছে। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এরশাদের রাজনীতি এ দেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে ভাঙন ধরিয়েছে, রাজনৈতিক অঙ্গনকে করেছে কলুষিত। তিনি ১৯৮২ সালে সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে নির্বাচিত বিএনপি সরকারকে হটিয়ে সামরিক শাসন জারি করেছিলেন। বিএনপিকে তছনছ করে দেন। অথচ ওই বিএনপির আদর্শকেই সামনে রেখে দাঁড় করান সমান্তরাল জাতীয়তাবাদী একটি দলÑ জাতীয় পার্টি। পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক বিষয়ে জেনারেল জিয়াউর রহমান যে দিকনির্দেশনা দিয়ে গিয়েছিলেন, এরশাদ সেগুলোই অনুসরণ করেছেন। ক্ষমতারোহণ অবৈধ হলেও তার শাসনামলে সশস্ত্র বাহিনীতে পেশাদারিত্বকে গুরুত্ব দেয়া হতো। এতে সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরে আসে। সে আমলে চীন, পাকিস্তান, তুরস্ক, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েতের মতো দেশগুলোর সাথে নিবিড় সামরিক সম্পর্ক গড়ে তোলা হয়। তার দৃঢ় অবস্থানের কারণেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জাতিসঙ্ঘ শান্তিরক্ষী মিশনে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। সে সময় সেনাবাহিনীতে রাজনৈতিক বিবেচনায় পদোন্নতি দেয়া হতো না এবং প্রশাসনে যোগ্যতা বলে নিয়োগ দেয়া হতো। গার্মেন্ট শিল্পকে প্রণোদনা দিয়ে এগিয়ে নেয়া হয়েছিল।

তবে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির আবর্তে জাতীয় পার্টি গড়ে উঠলেও দেশের বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক আকাক্সক্ষা অনুধাবনে এরশাদ ব্যর্থ হয়েছেন। তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, তিনি চাপের কাছে সহজেই নত হয়ে যান। ক্ষমতা হারানোর পর এ যাবৎ তার রাজনৈতিক দোদুল্যমানতা নিয়ে যেসব ঘটনা ঘটেছে তাতে সুস্পষ্ট যে, তিনি কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে স্থির থাকতে পারেন না। সংস্থা বা সরকারের চাপ এলেই কাত হয়ে পড়েন, মেরুদণ্ড সোজা থাকে না। একজন সাবেক সেনাপ্রধান হিসেবে যেমন দৃঢ়তা তার কাছে প্রত্যাশা করা যায়, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সেসবের অনেক কিছুই হয়তো তার নেই। ব্যক্তিগত বিষয়েও তিনি বেশ অস্থিতিশীল। বিদিশার সাথে তার হঠাৎ বিয়ে, তারপর চকিত ছাড়াছাড়ি, মোবাইল চুরির মামলা দায়েরের ঘটনা, ইত্যাদি যতটা না ছিল তার নিজস্ব ইচ্ছের ফল; তার চেয়ে বেশি ছিল অন্তরালের চাপের পরিণতি। আমার মনে হয়েছে, সে সময়কার সরকার ও সংস্থাগুলো তাকে বাধ্য করেছিল বিদিশাকে ওভাবে তালাক দিতে আর হাস্যকর কেসে মামলা দায়ের করতে। ওই ক্ষেত্রে তার উচিত ছিল নিজ সম্মান রক্ষার্থে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো।

ভুলত্রুটি নিয়েই মানুষ। এরশাদও এর ব্যতিক্রম নন। ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক বিষয়ে তার হাজারো সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার অবস্থান কিভাবে নির্ণীত হবে তা ভবিষ্যৎ বলে দেবে। তবে তার ঘনিষ্ঠজনেরা তাকে একজন ‘আপাদমস্তক ভদ্রলোক, সজ্জন ও অমায়িক ব্যক্তি’ হিসেবে জানেন। চরম বিরুদ্ধ মত ও সমালোচনা সহ্যের ক্ষমতা তার অন্যসব দুর্বলতাকে চাপা দিতে সক্ষম। আজ তিনি জীবনসায়াহ্নে উপনীত। হয়তো স্বচ্ছভাবে চিন্তার ক্ষমতাও আর তার নেই। প্রার্থনা করি, আল্লাহ তার মঙ্গল করুন।

>>>লেখক : বাংলাদেশ ডিফেন্স, জার্নালের সম্পাদক

হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ: তাঁর সফলতা এবং বিতর্কের নানা দিক by আকবর হোসেন

বাংলাদেশের রাজনীতিতে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ বরারই একটি আলোচিত এবং বিতর্কিত নাম। নয় বছর এরশাদ ক্ষমতায় থাকাকালীন যেসব কাজ করেছেন সেগুলো প্রভাব নানাভাবে পড়েছে পরবর্তী সময়ে।
ক্ষমতায় থাকার সময় এরশাদের কোন কাজগুলো আলোচনা এবং বিতর্কের জন্ম দিয়েছে সেগুলো তুলে ধরা হলো।

উপজেলা পদ্ধতি চালু

জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় থাকার সময় উপজেলা পদ্ধতি চালু করেন। তাঁর যুক্তি ছিল, সরকারী সুবিধাদি জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার জন্যই এ ব্যবস্থা নেয়া। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে উপজেলা পরিচালনার পদ্ধতি চালু করা হয়।
যারা ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলেন, তাদের অনেকের কাছেই এই পদ্ধতি প্রশংসা পেয়েছিল।

হাইকোর্টের বেঞ্চ বিকেন্দ্রীকরণ

হাইকোর্টের ছয়টি বেঞ্চ ঢাকার বাইরে স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। উচ্চ আদালতের বিচারের জন্য যাতে ঢাকায় আসতে না হয় সেজন্যই এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল।
কিন্তু আইনজীবীদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে শেষ পর্যন্ত সেটি বাস্তবায়ন করতে পারেনি এরশাদ সরকার।

ঔষধ নীতি প্রণয়ন

১৯৮২ সালে এরশাদ সরকার দেশ একটি ঔষধ নীতি প্রণয়ন করে। এর ফলে ঔষধের দাম যেমন কমে আসে, তেমনি স্থানীয় কোম্পানিগুলো ঔষধ উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন করে।
সে নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে সরকারের বাইরে থেকে যিনি সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেন তিনি হলেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তিনি বলেন, ঔষধ নীতিতে উল্লেখ করা হয়েছিল যে ভিটামিন ট্যাবলেট/ক্যাপসুল এবং এন্টাসিড বিদেশী কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের ভেতরে উৎপাদন করতে পারবে না। এসব ঔষধ উৎপাদন করবে শুধু দেশীয় কোম্পানি।
ক্ষমতায় থাকার সময় বিদেশী গণমাধ্যমের নজরে ছিলেন জেনারেল এরশাদ।
এর ফলে দেশীয় কোম্পানিগুলো আর্থিকভাবে লাভবান হয় এবং বিদেশী কোম্পানিগুলোর সাথে পাল্লা দিয়ে তারা অন্য ঔষধ উৎপাদনের জন্য বিনিয়োগ করতে পারে। তাছাড়া সে নীতির আওতায় সরকার সব ধরণের ঔষধের দাম নিয়ন্ত্রণ করতো। ফলে ঔষধের দাম কমে আসে বলে উল্লেখ করেন ডা. চৌধুরী।

রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম

জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় থাকার সময় রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি নিয়ে যেসব কাজ করেছিলেন সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা। এর মাধ্যমে রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব আরো বেড়ে যায়।
বিভিন্ন ইসলামপন্থী দল এবং সংগঠনকেও মদদ দিতে থাকেন জেনারেল এরশাদ। রাজনৈতিক সংকট সামাল দিতে সংবিধানে তিনি রাষ্ট্রধর্মের ধারণা নিয়ে আসেন।
বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ যেহেতু মুসলিম সেজন্য তাদের খুশি করতে তিনি এ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। কারণ নানা দুর্নীতির অভিযোগ এবং বিতর্ক নিয়ে এরশাদ তখন জর্জরিত। যদিও এরশাদের প্রবর্তিত সে রাষ্ট্রধর্মের স্বীকৃতি পরবর্তীকালে কোন সরকার বাতিল করেনি।

সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার

ক্ষমতায় টিকে থাকতে এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য জেনারেল এরশাদ সামরিক গোয়েন্দাদের ব্যবহার করেন। এ অভিযোগ ছিল বেশ জোরালো। এছাড়া সামরিক বাহিনীর সহায়তা নিয়ে তিনি ১৯৮৬ এবং ১৯৮৮ সালে দুটি বিতর্কিত নির্বাচন করেন।
অভিযোগ রয়েছে, সেনাবাহিনীর সদস্যদের তুষ্ট রাখার জন্য সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে সেনা কর্মকর্তাদের নিয়োগ ব্যাপকতা লাভ করে জেনারেল এরশাদের শাসনামলে ।
এরশাদ বিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে উঠে তখন সেনাবাহিনী মি: এরশাদের উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে এবং বিষয়টি তাকে জানিয়ে দেয়। এরপর তিনি পদত্যাগ করেন।
তখন ঢাকা সেনানিবাসে ব্রিগেডিয়ার পদে কর্মরত ছিলেন আমিন আহমেদ চৌধুরী, যিনি পরবর্তীতে মেজর জেনারেল হয়েছিলেন। মি: চৌধুরী ২০১৩ সালে মারা যান। ২০১০ সালে বিবিসি বাংলার সাথে এক সাক্ষাতকারে জেনারেল চৌধুরী বলেন, " উনি (সেনাপ্রধান) প্রেসিডেন্টকে বলেছিলেন আপনার উচিত হবে বিষয়টির দ্রুত রাজনৈতিক সমাধান করা। অথবা বিকল্প কোন ব্যবস্থা নেয়া।"

দুর্নীতির বিস্তার

ক্ষমতায় থাকাকালীন এবং ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর জেনারেল এরশাদের দুর্নীতি নিয়ে নানা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। ১৯৮৬ সালে ব্রিটেনের দ্য অবজারভার পত্রিকা এরশাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
মরিয়ম মমতাজ নামে এক নারী নিজেকে এরশাদের দ্বিতীয় স্ত্রী দাবি করে দ্য অবজারভার পত্রিকাকে বলেন, জেনারেল এরশাদ আমেরিকা এবং সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে ১৫০ মিলিয়ন ডলার পাচার করেছেন।
এছাড়া বিভিন্ন সময় এসোসিয়েটেড প্রেস এবং ওয়াশিংটন পোস্ট সহ নানা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এরশাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের শিরোনাম হয়েছিল। ক্ষমতাচ্যুত হবার পর দুর্নীতির মামলায় কারাগারেও থাকতে হয়েছে তাকে।

নির্বাচনে কখনো হারেননি এরশাদ

জেনারেল এরশাদের শাসনামল নিয়ে যতই বিতর্ক থাকুক না কেন, ক্ষমতাচ্যুত হবার পরেও তিনি কখনো নির্বাচনের পরাজিত হননি।
এমনকি কারাগারে থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে পাঁচটি আসনে জয়লাভ করেন মি: এরশাদ। যদিও এরশাদের নির্বাচনী এলাকাগুলো ছিল তাঁর গ্রামের বাড়ি রংপুর এবং আশপাশের জেলায়।
১৯৮৩ সালে হোয়াইট হাউজে জেনালের এরশাদ

Tuesday, January 14, 2020

এরশাদকে ছেড়ে গেছেন ঘনিষ্ঠরা

১৯৮২ সালে ক্ষমতায় বসার চার বছর পর জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি জাতীয় ফ্রন্টের ধানমন্ডির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে ‘জাতীয় পার্টি’ (জাপা) গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়। পাঁচটি শরিক দল এক হয়ে এর আত্মপ্রকাশ ঘটে। এর চার বছর পর ’৯০ সালে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন এরশাদ। এর মধ্য দিয়ে অবসান ঘটে ‘এরশাদ যুগে’র।
তবে ’৯১ সালে দেশে আবারও সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা চালু হওয়ার পর রাজনীতিতে গুরুত্ব বাড়তে থাকে তার। বৃহৎ দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভোটের রাজনৈতিক সমীকরণে জড়িয়ে যান তিনি। অবশ্য এই জোট-রাজনীতিতে সাবেক এই রাষ্ট্রপতি হারিয়েছেন দলের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতাকে, নিজের একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহকর্মীদের। যাদের মন্ত্রী বানিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই ‘সুযোগ-সুবিধা’র প্রশ্নে পক্ষ ত্যাগ করেছেন।
জাতীয় পার্টির নেতাদের দল পরিবর্তনের প্রসঙ্গে এরশাদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, কেএম ওবায়দুর রহমান, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনসহ অনেকেই এরশাদ সাহেবকে ত্যাগ করে অন্য দলে ভিড়েছেন।’
প্রবীণ এই রাজনীতিক বলেন, ‘তবে যারা দল ত্যাগ করেছেন, তাদের বেশিরভাগই বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। অনেকে জিয়াউর রহমানের হাত ধরে বিএনপিতে ছিলেন, পরে ক্ষমতা পরিবর্তনের কারণে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন।’
দল পরিবর্তন ঘটে সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য মন্তব্য করে মাওলানা ইসহাক বলেন, ‘আমাকে এরশাদ সাহেব অনেকবার বলেছেন, কিন্তু আমি যাইনি।’ তার দাবি, সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য তিনি রাজনীতি করেন না।
তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, ১৯৮৮ সালে এরশাদ সরকারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। তিনি শিল্প মন্ত্রণালয়ও দেখভাল করেছেন। এখন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য তিনি। ২০০১ সালে জোট সরকারে আইনমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব প্রফেসর এমএ মতিন বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। এরশাদ সরকারের উপপ্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমেদ পরে নতুন জাতীয় পার্টি গঠন করেন। তবে তিনি অন্য কোনও দলে যোগ দেননি।
’৮৮ সালে এরশাদ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন। বর্তমানে তিনি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান।
জেপি’র আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ছিলেন এরশাদ সরকারের যোগাযোগমন্ত্রী। বর্তমানে তিনি মহাজোটে আছেন। গত আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় মেয়াদে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ছিলেন।
১৯৮৬ সালে নবগঠিত জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। মহাসচিব নিযুক্ত হন অধ্যাপক এমএ মতিন। ৬০১ সদস্যের জাতীয় কমিটি গঠিত হয়। ৫৭ সদস্যের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সচিব হন সাংবাদিক আনোয়ার জাহিদ। পরে তিনি ১৯৯৯ সালে ৪ দলীয় জোট গঠনে ভূমিকা রাখেন এবং বিএনপিতে সক্রিয় হন।
এরশাদ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। আওয়ামী লীগ ’৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে তাকে স্পিকার নির্বাচিত করে।
জাপার দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠাকালে ফ্রন্টের শরিক দল জনদল, ইউপিপি, গণতান্ত্রিক পার্টি, বিএনপি (শাহ) এবং মুসলিম লীগ (সা) নিজেদের অস্তিত্ব বিলুপ্ত ঘোষণা করে জাতীয় পার্টিতে একীভূত হয়। পরে ১৯৮৫ সালের ১৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি এরশাদের নীতি ও আদর্শ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার নিয়ে জাতীয় ফ্রন্ট গঠিত হয়। রাজনৈতিক দলের বাইরেও অনেক বরেণ্য ব্যক্তিত্ব ও নেতা এই ফ্রন্টে যোগ দিয়েছিলেন। পার্টি গঠনের ঘোষণার দিনে তারাও জাতীয় পার্টিতে যোগ করেন।
জাতীয় পার্টি গঠনের দিন ২১ সদস্যের প্রেসিডিয়াম, ৫৭ সদস্যের জাতীয় নির্বাহী কমিটিসহ ৬০১ সদস্যের জাতীয় নির্বাহী কমিটির ঘোষণা দেওয়া হয়। ২১ সদস্যের প্রেসিডিয়ামের মধ্যে ১৮ জনের নাম ঘোষণা করা হয়। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিজানুর রহমান চৌধুরী (আসেন আওয়ামী লীগ থেকে), মওদুদ আহমদ (আসেন বিএনপি থেকে, পরে আবার জাপা ছেড়ে বিএনপি), কাজী জাফর আহমেদ (পৃথক দল), সিরাজুল হোসেন খান, রিয়াজউদ্দিন আহমেদ ভোলা মিয়া, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী (বিএনপিতে যোগ দেন), আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী।
এরশাদ সরকারের ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ছিলেন মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাছ। বর্তমানে তিনি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের (একাংশ) চেয়ারম্যান। দল পরিবর্তনের বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘অন্যরা কেন দল ত্যাগ করেছে সেই বিষয়ে তো আমি সঠিক বলতে পারবো না। ১৯৮৬ থেকে ’৯০ সাল পর্যন্ত আমি এরশাদের সঙ্গে ছিলাম। আমি স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে জয়ী হওয়ার পরে জাতীয় পার্টিতে যোগদান করি। কিন্তু আমার মূল দল ছিল জমিয়তে ইসলাম। পরে আমি আবার সেই দলে ফিরে আসি। এরশাদ সাহেব আমাকে যথেষ্ট ভালো জানতেন।’
জাতীয় পার্টিতে যোগদান করার দিনে এরশাদ তাকে ২ লাখ টাকা দিতে চেয়েছিলেন বলে দাবি করেন মুফতি ওয়াক্কাছ। তিনি বলেন, ‘কিন্তু আমি বলেছি টাকা নেবো না। আমরা এলাকার উন্নয়ন দরকার। ফলে যোগদানের দিন আমি ২ লাখ টাকা নিইনি।’ ব্যক্তিগতভাবে এরশাদের অনেক কিছু থাকলেও বাংলাদেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে তার অনেক অবদান আছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

Friday, December 6, 2019

এরশাদের পতন: পর্দার আড়ালে যা ঘটেছিল by কাদির কল্লোল

নয় বছর ক্ষমতায় ছিলেন এরশাদ
লাস্ট আপডেট- ৬ ডিসেম্বর ২০১৮: ১৯৯০ সালের এই দিনে, ৬ই ডিসেম্বর ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন সাবেক সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। দিনটিকে আওয়ামী লীগ 'গণতন্ত্র মুক্তি দিবস', বিএনপি 'গণতন্ত্র দিবস' এবং এরশাদের জাতীয় পার্টি 'সংবিধান সংরক্ষণ দিবস' হিসেবে পালন করে থাকে। কোনো কোনো রাজনৈতিক দল এই দিনকে 'স্বৈরাচার পতন দিবস' হিসেবেও পালন করে থাকে।
গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে হলেও প্রায় তিনদশক ধরে রাজনীতিতে কিভাবে টিকে রয়েছেন জেনারেল এরশাদ? বিবিসি নিউজ বাংলার বিশেষ প্রতিবেদন:
১৯৯০ সালের ডিসেম্বর মাসের এক তারিখে ঢাকা সেনানিবাসে এক জরুরী বৈঠকে বসেন ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা।
সে বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল প্রেসিডেন্ট এইচএম এরশাদ যেভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন, সে প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনীর ভূমিকা কী হওয়া উচিত সে বিষয়ে আলোচনা করা।
জেনারেল এরশাদ বিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। এর কয়েকদিন আগেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় চিকিৎসক নেতা ডা: শামসুল আলম মিলনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
সেনানিবাসের ভেতরে ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত নিলেন যে দেশের চলমান সংকট একটি রাজনৈতিক বিষয় এবং এ সঙ্কট সমাধানের জন্য রাষ্ট্রপতিকে রাজনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে।
ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা আরো সিদ্ধান্ত নিলেন যে চলমান রাজনৈতিক সংকটে সেনাবাহিনীর করনীয় কিছু নেই।
এমন অবস্থায় প্রেসিডেন্ট এরশাদ সেনা সদরকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন যে দেশে সামরিক আইন জারী করা হবে।
এরপর ডিসেম্বরের তিন তারিখে তখনকার সেনা প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল নূর উদ্দিন প্রেসিডেন্ট এরশাদের সাথে দেখা করতে যান।
সেনা কর্মকর্তারা চেয়েছিলেন যে সেনাবাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল নূর উদ্দিন যেন প্রেসিডেন্ট এরশাদকে পদত্যাগের জন্য সরাসরি বলেন।
কিন্তু সেনাপ্রধান প্রেসিডেন্ট এরশাদকে সরাসরি পদত্যাগের কথা না বললেও তিনি জানিয়ে দেন যে দেশের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর অফিসাররা কোন দায়িত্ব নিতে রাজী হচ্ছে না।
তখন ঢাকা সেনানিবাসে ব্রিগেডিয়ার পদে কর্মরত ছিলেন আমিন আহমেদ চৌধুরী, যিনি পরবর্তীতে মেজর জেনারেল হয়েছিলেন। মি: চৌধুরী ২০১৩ সালে পরলোকগমন করেন।
২০১০ সালে বিবিসি বাংলার সাথে এক সাক্ষাতকারে জেনারেল চৌধুরী বলেন, " উনি (সেনাপ্রধান) প্রেসিডেন্টকে বলেছিলেন আপনার উচিত হবে বিষয়টির দ্রুত রাজনৈতিক সমাধান করা। অথবা বিকল্প কোন ব্যবস্থা নেয়া।"
জেনারেল এরশাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী সামরিক শাসন জারীর বিষয়ে সেনাবাহিনী একমত নয় বলে প্রেসিডেন্টকে পরিষ্কার জানিয়েছিলেন তখনকার সেনাপ্রধান।
প্রেসিডেন্টের সাথে সেনাপ্রধানের বৈঠক নিয়ে তখন দেশজুড়ে নানা গুঞ্জন। সেসব বৈঠক নিয়ে নানা অনুমান তৈরি হয়েছিল সে সময়।
একদিকে ক্যান্টনম্যান্টের ভেতরে নানা তৎপরতা অন্যদিকে রাস্তায় এরশাদ বিরোধী বিক্ষোভ। সব মিলিয়ে এক উত্তেজনাকর পরিস্থিতির তৈরি হয়েছিল।
ডিসেম্বর মাসের চার তারিখে সেনাবাহিনীর চীফ অব জেনারেল স্টাফ মেজর জেনারেল আব্দুস সালাম প্রেসিডেন্ট এরশাদকে সরাসরি বলেন যে তার পদত্যাগ করা উচিত।
"পদত্যাগের কথাটা জেনারেল সালামই প্রথম সরাসরি বলেন। অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে। আর্মি অধৈর্য হয়ে যাচ্ছে," বলছিলেন আমিন আহমেদ চৌধুরী।
জরুরী অবস্থা এবং কারফিউর মতো কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমেওে যখন গণআন্দোলন দমানো যাচ্ছিল না তখন সেনাবাহিনীর দিক থেকে নেতিবাচক মনোভাব দেখলেন মি: প্রেসিডেন্ট এরশাদ।
এমন অবস্থায় ডিসেম্বরের চার তারিখ রাতেই পদত্যাগের ঘোষণা দেন জেনারেল এরশাদ।
তখন এরশাদ সরকারের ভাইস-প্রেসিডেন্ট ছিলেন মওদুদ আহমেদ. যিনি বর্তমানে বিএনপির একজন সিনিয়র নেতা। মি: আহমেদ জানালেন সেনাবাহিনীর মনোভাব বোঝার পরেই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করেননি মি: এরশাদ।
সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য নানা ধরনের কৌশল অবলম্বন করেছিলেন।
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলন মোকাবেলার জন্য তিনি সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণাও দিয়েছিলেন। কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক জোটগুলো এরশাদের সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।
ডিসেম্বর মাসের চার তারিখে তখনকার ভাইস-প্রেসিডেন্ট মওদুদ আহমেদকে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবার জন্য বাংলাদেশে টেলিভিশনে পাঠিয়েছিলেন মি: এরশাদ।
উদ্দেশ্য ছিল, প্রেসিডেন্টের পরিকল্পিত নির্বাচন সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা তুলে ধরা।
বিরোধী দলগুলো এ নির্বাচনের প্রস্তাব আগেই বর্জন করার পরেও মি: এরশাদ চেয়েছিলেন ভাইস-প্রেসিডেন্টের মাধ্যমে নির্বাচন সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা তুলে ধরার মাধ্যমে জনগণকে আশ্বস্ত করা।
মি: এরশাদের নির্দেশ মতো ভাইস-প্রেসিডেন্ট মওদুদ আহমদ সন্ধ্যার সময় বাংলাদেশ টেলিভিশনে গিয়েছিলেন ভাষণ রেকর্ড করার জন্য। সে ভাষণ তিনি রেকর্ডও করেছিলেন।
সে ভাষণ রেকর্ড করার পর মওদুদ আহমদ যখন বাসায় ফিরে আসেন তখন তিনি জানতে পারেন প্রেসিডেন্ট পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এরপর কয়েক ঘন্টা পর মধ্যরাতে মওদুদ আহমেদকে আবারো বাংলাদেশ টেলিভিশনে যেতে হয়েছিল প্রেসিডেন্ট এরশাদের পদত্যাগের ঘোষণা দেবার জন্য।
১৯৯০ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর রাতের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মওদুদ আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, " প্রথম ভাষণ রেকর্ড করে আমি যখন বাসায় ফিরে আসলাম, তখন আমার স্ত্রী বললেন, প্রেসিডেন্ট সাহেব ফোন করেছিলেন। তখন আমি ওনাকে ফোন করলাম। উনি তখন বললেন, আমি এখনই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তখন আমি ওনার বাসায় গেলাম। তখন রাতে নিউজের পরে ওনার পদত্যাগের ঘোষণা দেয়া হলো।"
এরশাদ সরকারের ভাইস-প্রেসিডেন্ট ছিলেন মওদুদ আহমেদ
এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে বিভিন্ন সময় ছন্দপতন হয়েছিল। ১৯৮৭ সালে একটি মিছিলে পুলিশের গুলিতে নূর হোসেন নিহত হবার ঘটনা আন্দোলনে গতি এনেছিল।
আওয়ামীলীগ এবং বিএনপি'র নেতৃত্বে রাজনৈতিক জোট একই সাথে আন্দোলন কর্মসূচী নিয়ে এগিয়েছে। জামায়াতে ইসলামীও মাঠে ছিল।
১৯৯০ সালের অক্টোবর মাস থেকে ছাত্র সংগঠনগুলো 'সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের' ব্যানারে আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল।
সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বিএনপি সমর্থিত ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের নেতা খায়রুল কবির খোকন।
তিনি বলছিলেন, ২৭শে নভেম্বর চিকিৎসক নেতা ডা. শামসুল আলম মিলনকে হত্যার পর আন্দোলনের মোড় ঘুরে গিয়েছিল।
"ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে দখল করার জন্য বহিরাগত মাস্তানরা পরিকল্পিতভাবে ডা: মিলনকে হত্যা করা হয়েছিল। এটা ছিল আন্দোলনের টার্নিং পয়েন্ট, " বলছিলেন মি: খোকন।
ডা: মিলন যখন রিক্সায় করে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা দিয়ে যাচ্ছিলেন তখন তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
ডা: মিলনের সাথে একই রিক্সায় ছিলেন বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশনের তখনকার মহাসচিব ডা: মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন।
অভিযোগ রয়েছে জেনারেল এরশাদ সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দখল চেষ্টার অংশ হিসেবে ডা: মিলনকে হত্যা করা হয়েছে।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে ডা: মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন বলেন, " আমার রিক্সাটা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় উপস্থিত হয়েছে তখন মিলন আরেকটি রিক্সায় করে আমাকে ক্রস করে সামনে চলে যাচ্ছিল। তখন আমি মিলনকে বললাম তুমি ঐ রিক্সা ছেড়ে আমার রিক্সায় আসো। এরপর মিলন আমার রিক্সায় এসে ডানদিকে বসলো। রিকশাওয়ালা ঠিকমতো একটা প্যাডেলও দিতে পারে নাই। মনে হলো সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের দিকে থেকে গুলি আসলো। গুলিটা মিলনের বুকের পাশে লেগেছে। তখন মিলন বললো, জালাল ভাই কী হইছে দেখেন। একথা বলার সাথে সাথে সে আমার কোলে ঢলে পড়লো। "
ডা: মিলনকে হত্যার পর জেনারেল এরশাদ বিরোধী আন্দোলন আরো তুঙ্গে উঠে। তখন জনগণের ক্ষোভের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে শুরু করেছিল সেনাবাহিনী।
একইসাথে জেনারেল এরশাদের উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের প্রক্রিয়াও শুরু করেছিল সেনাবাহিনী।
ডা: মিলন হত্যাকাণ্ডের পর আন্দোলন সামাল দিতে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে চেয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট এরশাদ।
সেনা মোতায়েনের জন্য জেনারেল এরশাদ যথেষ্ট চাপ প্রয়োগ করেছিল।
প্রয়াত মেজর জেনারেল আমিন আহমেদ চৌধুরীর বর্ণনা মতে, সেনাবাহিনী সৈনিকদের পাঠিয়ে রাস্তায় মোতায়েন করার পরিবর্তে রমনা পার্কে সীমাবদ্ধ করে রাখে। কমান্ডিং অফিসাররা সরকারের 'অপকর্মের' দায়িত্ব নিতে রাজী ছিলেন না।
জেনারেল এরশাদ ক্ষমতা ছাড়লে কী হবে সে বিষয়টি নিয়ে আন্দোলনকারী দলগুলো নিজেদের মধ্যে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি ফর্মুলা ঠিক করে রেখেছিল।
সে ফর্মুলা মতে সাধারণ নির্বাচন পরিচালনার জন্য তিনমাস মেয়াদী একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের কথা ছিল।
কিন্তু সে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান কে হবেন সেটি তখন নির্ধারিত ছিলনা ।
ড: কামাল হোসেন তখন আওয়ামীলীগের সিনিয়র নেতার পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতিও ছিলেন।
তিনি জানালেন, জেনারেল এরশাদের পদত্যাগের ঘোষণা দেবার পর আন্দোলনকারী দলগুলো তখনকার প্রধান বিচারপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন আহমদের বিষয়ে একমত হয়েছিল।
অস্থায়ী সরকার প্রধানের নাম আসার পর ৬ই ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির দপ্তরে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া হয়েছিল।
ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পর্কে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, " পাঁচ তারিখে বিরোধী দল থেকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব আসলো যে প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন সাহেব উপ-রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণ করে তারপর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির কাজ করবেন তিনি এবং তার অধীনেই একটি নির্দলীয় সরকার হবে। ছয় তারিখ বিকেল তিনটায় আমি রিজাইন করলাম। আমি রিজাইন করার পরে সাহাবুদ্দিন সাহেবকে ভাইস-প্রেসিডেন্ট এপয়েন্ট করলেন প্রেসিডেন্ট সাহেব। তারপর প্রেসিডেন্ট এরশাদ নিজে রিজাইন করলেন এবং তারপর সাহাবুদ্দিন সাহেব ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করে গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা শুরু করলেন।"
ডিসেম্বর মাসের চার তারিখে জেনারেল এরশাদ যখন পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছিলেন, তখন রাস্তায় মানুষের যে ঢল নেমেছিল সেটি ৬ই ডিসেম্বর বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদের কাছে জেনারেল এরশাদের ক্ষমতা হস্তান্তর পর্যন্ত বজায় ছিল।
ড: কামাল হোসেন তখন আওয়ামীলীগের সিনিয়র নেতার পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতিও ছিলেন।

Saturday, November 2, 2019

হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ: ভাসানী ও শেরে বাংলার দলের মতো জাতীয় পার্টিও বিলুপ্ত হতে পারে - বিশ্লেষক রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ

হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ
বাংলাদেশের সাবেক সামরিক শাসক ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের পর যেকোন বিশৃঙ্খলায় তাঁর দলে ভাঙন দেখা দিতে পারে - এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
তারা বলছেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে 'কর্তৃত্ববাদী নেতৃত্ব' থাকে। আর দলগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ 'গণতন্ত্রের অভাব' রয়েছে।
এই পটভূমিতে জেনারেল এরশাদের অনুপস্থিতি জাতীয় পার্টির ভবিষ্যতকে কোন দিকে নিয়ে যাবে, এমন প্রশ্ন করা হয়েছিলো রাজনৈতিক বিশ্লেষক রিয়াজ উদ্দিন আহমেদকে।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেনে, "জাতীয় পার্টি কোন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় গঠিত হয়নি। এটি ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।"
"জাতীয় পার্টি সুবিধাবাদীর রাজনীতি করেছে। যার কারণে এক সময় ক্ষমতা ভোগ করেছে, এক সময় ছিটকে পড়েছে ক্ষমতার বলয় থেকে। আবার সমন্বয় করে ক্ষমতার বলয়ের মধ্যে ঢুকেছিলো। কিন্তু এতো সবকিছুই এরশাদকে কেন্দ্র করে ছিল।"
মিস্টার আহমেদ বলেন, "এখানে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব রয়েছে। দলে রওশন এরশাদের নেতৃত্বে একটি ধারা রয়েছে । আরেকটি ধারা জিএম কাদেরকে কেন্দ্র করে।"
"অথবা দুটি ধারার একটি আওয়ামী লীগের সাথে মিশে যাবে, আরেকটি এ্যান্টি-আওয়ামীলীগ ফোরামে বা বিএনপি ফোরামের দিকে ঝুঁকে যেতে পারে।"
পারসোনালিটি কাল্ট বা ব্যক্তি জনপ্রিয়তা এদেশের রাজনীতির একটা বড় অংশ, যা জেনারেল এরশাদের মধ্যেও ছিল। কিন্তু এধরণের আরো অনেক দল যেমন, মওলানা ভাসানী কিংবা এ কে ফজলুল হকের মতো ক্ষমতাশালী ও জনপ্রিয় ব্যক্তিদের মৃত্যুর পর তাদের দলগুলো বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
এরশাদের জাতীয় পার্টির ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটতে পারে কি-না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, "খুব সম্ভাবনা রয়েছে এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষণ একথাই বলে।"
তিনি বলেন, "এই দলের কোন জনভিত্তি নেই, আদর্শিক ভিত্তি নেই, কোন ভবিষ্যৎ কমিটমেন্ট নেই। একারণে মওলানা ভাসানী ও শেরে বাংলার দলের মতো জাতীয় পার্টিও বিলুপ্ত হতে পারে বলে আমার ধারণা।"
আওয়ামীলীগ, বিএনপি কিংবা বামদলগুলো সুস্পষ্ট রাজনৈতিক মতবাদের ভিত্তিতে কাজ করে। এমন সুসংগঠিত দলগুলোর রাজনীতিতে দলগত আদর্শিক ভিত্তি না থাকা সত্ত্বেও জাতীয় পার্টি কিভাবে এতো দিন টিকে ছিলো এমন প্রশ্নও করা হয় মিস্টার আহমেদকে।
তিনি বলেন, "টিকে ছিলো ক্ষমতার রসায়নে একটা জায়গা ছিলো বলে। কারণ যেকোন স্বৈরাচারের পতনের পরে একজন স্বৈরাচারী শাসক রাজনীতিতে টিকে থাকে না। কিন্তু এরশাদ টিকে ছিলেন শুধু তার রংপুর রাজনীতিকে ভিত্তি করে।"
উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, "গণঅভ্যুত্থানে পতনের পর, জেলখানায় থেকে তিনি নির্বাচনে অংশ নিয়ে রংপুরের ৫টি আসনে জয় লাভ করেছিলেন এরশাদ।"
"এরপর থেকে রংপুরকে ভিত্তি করে একটি আঞ্চলিক দল হিসেবে পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসিতে ১৫-২০ আসন পেলে একটা বার্গেনিং পজিশন থাকে। এরশাদ সেটাকে কাজে লাগিয়েছেন।"
১৯৮২ সালে ক্ষমতা দখল করে প্রায় নয় বছর দেশ শাসনের পর ১৯৯০ সালে গণআন্দোলনের মুখে মি. এরশাদ পদত্যাগ করেন। কিন্তু তারপরও জাতীয় পার্টি বিস্ময়করভাবে ক্ষমতার রাজনীতিতে ফিরে আসেন।
ক্ষমতা হারানোর পর থেকে এরশাদের রাজনৈতিক পুনর্বাসনে আওয়ামীলীগ বা বিএনপির ভূমিকাই বেশি ছিল বলে উল্লেখ করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মিস্টার আহমেদ। তিনি বলেন, এসব দলের কারণেই রাজনীতিতে টিকে গেছেন জেনারেল এরশাদ।
"এরশাদ সারভাইভ করতে [টিকে থাকতে] পারতো না যদি এরা এরশাদকে নিয়ে প্লে [খেলা] করতে না চাইতো। আওয়ামীলীগও করেছে বিএনপিও করেছে," তিনি বলেন।
"পার্লামেন্টোরি ডেমোক্রেসির মধ্যে অঞ্চল ভিত্তিক একটা প্রভাব ছিল। একটা রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ ছিল। এটাকে তারা ব্যবহার করতে চেয়েছে।"
"এটাকে ব্যবহার করতে গিয়ে এরশাদকে এমন অবস্থানে নিয়ে গেছে যে, এরশাদ খুব দুর্বল অবস্থানে থেকেও সবলভাবে ক্ষমতার রাজনীতিতে দর কষাকষি করতে পেরেছে। এর কারণেই তিনি ১৯৯৬ থেকে ক্ষমতার বলয়ের বাইরে আর পরে যাননি," তিনি বলেন।

Wednesday, October 30, 2019

হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ: জেনারেল থেকে রাজনীতিক হিসেবে উত্থান ও আস্থার সংকট by কাদির কল্লোল

হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ
আপডেট- ১৪ জুলাই ২০১৯: বাংলাদেশে গণআন্দোলনের মুখে জেনারেল এরশাদের নয় বছরের শাসনের পতন হলেও তিনি রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হয়েছেন।
তিনি সামরিক শাসন জারি করে ক্ষমতা দখলের পর জাতীয় পার্টি নামে দল গঠন করেন।
তবে তিনি ক্ষমতায় থাকাকালে অন্য সব দলের বিরোধীতার বিষয়টি ছিল তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
দেশকে কয়েকটি প্রদেশে ভাগ করাসহ কিছু সংস্কারের পদক্ষেপ নিলেও তিনি বাস্তবায়ন করতে পারেননি।
জেনারেল এরশাদের শাসনের সময় ১৯৮৮ সালে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী আনা হয়।
শেষপর্যন্ত তাঁর সরকারের পতনের পর তিনি জেলে গিয়েও সবদলের অংশগ্রহণে সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন এবং সেই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ৩৫টি আসন পেয়ে ভোটের রাজনীতিতে একটা প্রভাব ফেলেছিল।
জেনারেল এরশাদের ঘনিষ্ট ছিলেন এমন একজন রাজনীতিক , যিনি পরে অন্য দলে গেছেন, তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, আন্দোলনের মুখে জেনারেল এরশাদকে যখন ক্ষমতা ছাড়তে হয়, তখন তাঁকে বিদেশে চলে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাবে রাজি হননি। তিনি জেলে যাওয়ার বিষয়টি মেনে নিয়েছেলেন। এটি দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ছিল বলে ঐ রাজনীতিক মনে করেন।
তিনি উল্লেখ করেছেন, "জেনারেল এরশাদ বিদেশে না গিয়ে দেশে ছিলেন বলেই পরে রাজনীতিতে টিকে গেছেন।"
বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, প্রায় তিন দশক ধরে দেশের ভোটের রাজনীতিতে জাতীয় পার্টির একটা প্রভাব থাকলেও বিভিন্ন সময় জেনারেল এরশাদের বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে দলটি আস্থার সংকটেও পড়েছে।

এরশাদ উকিল হতে চেয়েছিলেন

জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ জন্মগ্রহণ করেন রংপুরে তাঁর নানার বাড়িতে ১৯৩০ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি।
তবে তাঁর শৈশব এবং স্কুলজীবন কেটেছে বাবা মা'র সাথে ভারতের কুচবিহারের দিনহাটায়।সেখান থেকেই তিনি এসএসসি পাস করেছেন।
স্কুল শেষ করে তিনি রংপুরে কারমাইল কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পড়েছেন।
তাঁর ভাই এবং জাতীয় পার্টির নেতা জি এম কাদের জানিয়েছেন, হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রী নেয়ার পর উকিল হওয়ার চিন্তা থেকে ল'কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু আইন পড়া শেষ হওয়ার আগেই ১৯৫২ সালে তিনি সেনাবাহিনীতে চাকরি পেয়ে তাতে যোগ দেন।

হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের পরিবারিক আরেকটি নাম ছিল

তাঁর বাবা-মা এবং ভাই বোন বা কাছের আত্নীয়রা তাঁকে পেয়ারা নামে ডাকতেন।
এটি তাঁর ডাক নাম।
জি এম কাদের জানিয়েছেন, তাদের চার ভাই পাঁচ বোনের মধ্যে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ছিলেন মেজো। সবার বড় বোনের নাম ছিল পেয়ারী এবং সেই নামের সাথে মিলিয়ে মি: এরশাদের পরিবারে নাম ছিল পেয়ারা।
তাদের এক ভাই এবং দুই বোন আগেই মারা গেছেন।
মি: কাদের বলেছেন, তাদের বাবা মকবুল হোসেন পেশায় আইনজীবী ছিলেন এবং তিনি বাড়ি করেছিলেন কুচবিহারের দিনহাটায়। আর তাদের মা মজিরা খাতুন গৃহিনী ছিলেন।সেকারণে কুচবিহারের দিনহাটাতেই তাঁর বেড়ে ওঠা।
জেনারেল এরশাদের প্রথম স্ত্রী রওশন এরশাদ জাতীয় পার্টির নেত্রী এবং গত সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা ছিলেন।
নানা গুঞ্জনের প্রেক্ষাপটে ২০০০ সালে জেনারেল এরশাদ একজন ফ্যাশন ডিজাইনার বিদিশা ইসলামকে বিয়ে করেছিলেন। বিয়ের পর এই নারী বিদিশা এরশাদ নামে পরিচিত হন। তবে সেই ঘর বেশি দিন টেকেনি।

জেনারেল এরশাদের ছাত্রজীবন কেমন ছিল?

জি এম কাদের জানিয়েছেন, তাঁর ভাই মি: এরশাদের খেলাধূলায় আগ্রহ বেশি ছিল। তিনি ছাত্রজীবনে ফুটবলার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন।
তখন ফুটবল জনপ্রিয় খেলা ছিল।
স্কুল এবং কলেজ জীবনে মি: এরশাদ রংপুর অঞ্চলে বিভিন্ন ক্লাবে ভাড়ায়ও ফুটবল খেলতে যেতেন। এছাড়া তিনি তখন থেকেই কবিতা লিখতেন এবং কারমাইকেল কলেজের সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্বও পালন করেছিলেন বলে জি এম কাদের জানান।
জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় থাকাকালে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত পত্রিকা দৈনিক বাংলায় তাঁর অনেক কবিতা ছাপা হয়েছিল। তা নিয়ে অবশ্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নানারকম আলোচনা ছিল।
তিনি আত্মজীবনী লিখেছেন। সেই বইয়ের নাম, ''আমার কর্ম আমার জীবন''। এছাড়া তিনি কয়েকটি কবিতার বইও বের করেছেন।

এরশাদের ক্ষমতা দখল

১৯৮১ সালের ৩০শে মে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। সে সময় জেনারেল এরশাদ সেনাপ্রধান ছিলেন।
জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর সে সময়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আব্দুস সাত্তার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন এবং তাঁর নেতৃত্বে বিএনপিরই সরকার গঠিত হয়েছিল।
কিন্তু সেই সরকার বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে পারেনি।
সে সময় প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ে উর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা ছিলেন, বেশ আগে অবসর নেয়া সেই কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, বিচারপতি আব্দুস সাত্তার সরকারের দু'মাস পরই জেনারেল এরশাদ কয়েকজন জেনারেলকে নিয়ে রাষ্ট্রপতির সাথে দেখা করে মন্ত্রীদের ব্যাপারে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরেছিলেন এবং এভাবে দেশ চলতে পারে না বলে বার্তাও দিয়েছিলেন।
সাবেক ঐ সেনা কর্মকর্তা আরও জানিয়েছেন, বিচারপতি সাত্তারকে বার্তা দেয়ার পর জেনারেল এরশাদ ক্ষমতা দখলের ক্ষেত্র তৈরি করেছিলেন।
শেষপর্যন্ত ১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ জেনারেল এরশাদ বিচারপতি সাত্তারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করেন।

জেনারেল থেকে তাঁর রাজনীতিক হওয়ার গল্প

ক্ষমতা দখলের পর দেশে রাজনীতি নিষিদ্ধ করে তিনি বাংলাদেশে দ্বিতীয় বারের মতো সামরিক শাসন জারি করে নিজেকে প্রধান সামরিক শাসক হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।
তিনি নতুন এক শ্লোগান চালু করেছিলেন, সেটি ছিল ''নতুন বাংলাদেশ, গড়ব মোরা...।''
তিনি তাঁর সেই শ্লোগান দিয়ে গানও লিখেছিলেন।
তবে তাঁর সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম প্র্রতিবাদ করেছিলেন ছাত্ররা।
১৯৮২ সালেই ১১ই সেপ্টেম্বর শিক্ষা দিবসকে কেন্দ্র করে মজিদ খানের প্রস্তাবিত শিক্ষানীতি বাতিলের দাবি নিয়ে ছাত্র সংগঠনগুলো সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা শুরু করেছিল। সে বছরই নভেম্বরে তৈরি হয়েছিল সব ছাত্র সংগঠনের ঐক্যবদ্ধ ফোরাম ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ।
পরের বছর ১৯৮৩ সালের ১৪ এবং ১৫ ই ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্ররা সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে নামলে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে কমপক্ষে পাঁচজন নিহত হয়েছিল।
জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনে সেই প্রথম রক্ত ঝরেছিল ঢাকার রাজপথে।
এরপরও তাঁর বিরুদ্ধে ছাত্ররা ঐক্যবদ্ধ থেকে আন্দোলন গড়ার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন।
জেনারেল এরশাদ আন্দোলন দমনের চেষ্টার পাশাপাশি নিজে রাজনীতিক হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে তৎপর হলেন।
তিনি ১৯৮৬ সালের শুরুতে বিভিন্ন দল থেকে মিজানুর রহমান চৌধুরী, শাহ আজিজ এবং মওদুদ আহমেদসহ অনেক রাজনীতিককে নিয়ে জাতীয় পার্টি নামের দল গঠন করেন।
সেই দল থেকে মনোনয়ন নিয়ে তিনি নির্বাচন দিয়ে রাষ্ট্রপতি হন।
এরই মাঝে রাজনৈতিক দলগুলো তাঁর বিরুদ্ধে যৌথভাবে আন্দোলন শুরু করেছিল।
জেনারেল এরশাদ তখন সেই ১৯৮৬ সালে সংসদ নির্বাচন করেছিলেন। সেই সংসদ মাত্র এক বছর টিকেছিল।
১৯৮৮ সালে তিনি মূল ধারার দলগুলোর বয়কটের মুখে একতরফা নির্বাচন করলেও তিনি বেশিদিন টিকে থাকতে পারেননি।
দুই বছর পরই আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং বামপন্থী দলগুলোর অর্থ্যাৎ তিনি জোটের গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ই ডিসেম্বর জেনারেল এরশাদের শাসনের পতন হয়।
তাঁর শাসনের সময় আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে অনেকে নিহত হয়েছে। তাদের মধ্যে নূর হোসেন এবং ডা: মিলনের নাম এখনও মুখে মুখে উচ্চারিত হয়।
জেনারেল এরশাদের পতনের দিনটি স্বৈরশাসকের পতন দিবস হিসেবে এখনও বিভিন্ন দল ও সংগঠন পালন করে থাকে।
তিনি মোট নয় বছর ক্ষমতায় ছিলেন।

রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম

জিয়াউর রহমান যেমন ১৯ দফা কর্মসূচি নিয়েছিলেন, তার আদলে জেনারেল এরশাদ ১৮ দফা উন্নয়নের কর্মসূচি নিয়ে রাজনীতিতে নেমেছিলেন।
তিনি ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলেছিলেন এবং দেশকে কয়েকটি প্রদেশে ভাগ করার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। কিন্তু তা বাস্তবায়ন করতে পারেননি।
হাইকোর্ট বা উচ্চ আদালতকে রাজধানী ঢাকার বাইরে অন্য বিভাগীয় শহরগুলোতেও স্থানান্তরের উদ্যোগ নিয়েছিলেন, বিরোধীতার মুখে সেই উদ্যোগও ব্যর্থ হয়।
তাঁর সময়ই প্রথম উপজেলা এবং জেলা পরিষদ গঠিত হয়েছিল। তাঁর ক্ষমতার শেষদিকে উপজেলা নির্বাচনও হয়েছিল।
তাঁর এই পদক্ষেপগুলোকে বিশ্লেষকদের অনেকে ইতিবাচক হিসেবে বর্ণনা করেন।
তাঁর সময়ে ১৯৮৮ সালে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী আনা হয়েছিল।
তখন আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি-প্রধান দুই দলই এর বিরোধীতা করেছিল।
কিন্তু পরে কোন দলই আর এর পরিবর্তন করেনি।
এরশাদ সরকারের একজন প্রভাবশালী নেতা, যিনি এখন অন্য রাজনৈতিক দলে আছেন, তিনি বলেন যে রাজনৈতিক সংকট সামাল দেবার জন্য একটি কৌশল হিসেবে মি: এরশাদ ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভূক্ত করেন।

রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব

জেনারেল এরশাদের শাসনের পতনের পর তাঁকে জেলে নেয়া হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা এবং দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে ডজনখানেক মামলা হয়েছিল।
১৯৯১ সালে গণতন্ত্র আবার ফিরে আসার পর তিনি জেলে থেকেই সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। সেই পরিস্থিতিতে তাঁর দল জাতীয় পার্টি ৩৫টি আসন পেয়েছিল। তিনি রংপুরের পাঁচটি আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরপরের সংসদ নির্বাচনগুলোতে তিনি নিজে কখনও পরাজিত হননি।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পর তিনি জেলে থেকেই আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনের জন্য সমর্থন দিয়েছিলেন।
তখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ছয় বছর জেল খাটার পর জেনারেল এরশাদ জামিনে মুক্তি পেয়েছিলেন।
তাঁর বিরুদ্ধে মামলাগুলোর কয়েকটিতে তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। কোনটিতে খালাসও পেয়েছেন।
এসব মামলার কারণে তিনি স্বাধীন অবস্থান নিয়ে রাজনীতি করতে পারেন নি।
জাতীয় পার্টি কয়েকটি ভাগে বিভক্তও হয়েছে।
এরপরও ভোটের রাজনীতিতে তাঁর দল জাতীয় পার্টির একটা অবস্থান তৈরি হয়। রংপুর অঞ্চলের ১৭টি আসনে জাতীয় পার্টির ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে।
নির্বাচন এলেই আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি - প্রধান দুই দলই তাঁকে সাথে নেয়ার চেষ্টা করে। তবে গত কয়েকটি নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে আওয়ামী লীগের সাথেই থাকতে হয়েছে।
জাতীয় পার্টি গত কয়েকটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সাথে জোট থেকে অংশ নিয়েছে। যদিও দলটি তাদের দলীয় প্রতীক লাঙল নিয়ে লড়েছে।

আস্থার সংকট

জাতীয় পার্টি রাজনীতিতে টিকে গেলেও জেনারেল এরশাদ এবং তাঁর দল নিয়ে মানুষের মাঝে আস্থার কিছুটা অভাব আছে।
বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের সময় জেনারেল এরশাদ তাঁর বক্তব্য বা অবস্থান বার বার বদল করেছিলেন। ফলে তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়েছিল।
গত দশম সংসদে তাঁর দলের তিনজন নেতা সরকারের মন্ত্রিসভায় ছিলেন এবং তিনি নিজে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত ছিলেন।
একইসাথে তাঁর স্ত্রী রওশন এরশাদ ছিলেন সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা।
সর্বশেষ ২০১৮সালের ৩০শে ডিসেম্বরের নির্বাচনে জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক হিসেবে অংশ নিয়ে ২২টি আসন পায়।
এরপর ৮৯ বছর বয়সে জেনারেল এরশাদ এই সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হন এবং জাতীয় পার্টি বিরোধীদলের আসনে বসে।
জেনারেল এরশাদ তাঁর অনুপস্থিতিতে ছোট ভাই জি এম কাদেরকে জাতীয় পার্টির দায়িত্ব দিয়ে গেছেন।
তিনি উত্তরসূরি নির্ধারণ করতে গিয়েও কয়েকবার সিদ্ধান্ত বদল করেছেন।
২০১৯ সালের শুরুতে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার সময় জি এম কাদেরকে দলের সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান করে দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন।
মাসখানেক পর চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরেই জি এম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরিয়ে জেনারেল এরশাদ তাঁর স্ত্রী রওশন এরশাদকে তাঁর পরবর্তী অবস্থানে নিয়ে আসেন।
অল্প কিছুদিন পরই মে মাসের প্রথম সপ্তাহে মধ্যরাতে জেনারেল এরশাদ হুইল চেয়ারে করে অসুস্থাবস্থায় সাংবাদিকদের ক্যামেরার সামনে হাজির হন।
তখন তিনি আবার জিএম কাদেরকে তাঁর উত্তসূরি হিসেবে ঘোষণা করেন।
এনিয়ে দলটিতে জেনারেল এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদ এবং ভাই জে এম কাদেরের সমর্থকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়ে গেছে।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট থেকে জেনারেল এরশাদের জাতীয় পার্টি এবং আরেক সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর দল ২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বরের নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল।

Thursday, October 10, 2019

এরশাদ: কবিখ্যাতি পাওয়ার জন্য ব্যাকুল এক সেনাশাসক, নিষিদ্ধ কবিতা এবং একটি সংবাদ সম্মেলন by মোয়াজ্জেম হোসেন

"আপনার কবিতা পত্রিকার প্রথম পাতায় ছাপানোর জন্য কী কোন নির্দেশ আছে?"
নয় বছরের শাসনামলে সেনাশাসক জেনারেল এরশাদকে কোন সংবাদ সম্মেলনে এরকম বিব্রতকর প্রশ্নের মুখোমুখি সম্ভবত আর হতে হয়নি।
১৯৮৩ সালের অক্টোবর মাস। জেনারেল এরশাদ তখন বাংলাদেশের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। মাত্র তিনি যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে দেশে ফিরেছেন।
সংসদ ভবনে তখন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দফতর (সিএমএলএ)। সেখানে রীতি অনুযায়ী এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। জেনারেল এরশাদ কথা বলবেন তার যুক্তরাষ্ট্র সফর নিয়ে।
জাহাঙ্গীর হোসেন তখন সরকারি বার্তা সংস্থা বাসস এর কূটনৈতিক সংবাদদাতা। এখন তিনি ঢাকায় অবসর জীবনযাপন করছেন। বিবিসি বাংলার সঙ্গে টেলিফোনে তিনি বর্ণনা করছিলেন ৩৬ বছর আগের সেই সংবাদ সম্মেলনটির কথা।
"সংবাদ সম্মেলনটি হচ্ছিল পার্লামেন্ট ভবনের দোতলায় এক নম্বর কমিটি রুমে। জেনারেল এরশাদকে প্রচুর রাজনৈতিক প্রশ্ন করা হচ্ছিল, কারণ তিনি রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপে ডেকেছিলেন। কিন্তু কোন দল তার ডাকে সাড়া দিচ্ছিল না। কেউ তার সঙ্গে কথা বলতে আসছিল না। বিরক্ত হয়ে জেনারেল এরশাদ বলেছিলেন, আমি কি রেড লাইট এলাকায় থাকি যে আমার সঙ্গে কেউ কথা বলবে না?"
সংবাদ সম্মেলনের এই পর্যায়ে জাহাঙ্গীর হোসেন উঠে দাঁড়িয়ে জেনারেল এরশাদকে বললেন, "মে আই আস্ক ইউ এ নন-পলিটিক্যাল কোয়েশ্চেন"- অর্থাৎ আমি কি আপনাকে একটি অরাজনৈতিক প্রশ্ন করতে পারি?
ঢাকায় বিদেশি সাংবাদিক পরিবেষ্টিত জেনারেল এরশাদ
জেনারেল এরশাদ বেশ খুশি হয়ে গেলেন। কিন্তু জাহাঙ্গীর হোসেন যে প্রশ্নটি তাকে ছুঁড়ে দিলেন, সেটির জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন না। একজন প্রবল ক্ষমতাধর সামরিক শাসক আর এক সাংবাদিকের মধ্যে এই প্রশ্নোত্তর পর্ব বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় প্রবাদতুল্য হয়ে আছে।
ইংরেজীতে তিনি যে প্রশ্নটি ছুঁড়ে দিয়েছিলেন তার বাংলা তর্জমা এরকম:
"আপনি ক্ষমতায় আসার আগে কেউ জানতো না আপনি একজন কবি। এখন সব পত্রিকার প্রথম পাতায় আপনার কবিতা ছাপা হয়। পত্রিকার প্রথম পাতা তো খবরের জন্য, কবিতার জন্য নয়। বাংলাদেশের প্রধানতম কবি শামসুর রাহমানেরও তো এই ভাগ্য হয়নি। আমার প্রশ্ন হচ্ছে আপনার কবিতা প্রথম পাতায় ছাপানোর জন্য কী কোন নির্দেশ জারি করা হয়েছে?"
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত সবাই হতচকিত। জেনারেল এরশাদের পাশে বসা তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ আর এস দোহা বললেন, 'শামসুর রাহমান ইজ নট দ্য সিএমএলএ (শামসুর রাহমান প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নন)।
জেনারেল এরশাদ অবশ্য তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে থামিয়ে দিলেন। তিনি প্রশ্নকারী সাংবাদিককে বললেন, আমি দেশের জন্য এত করি, এটুকু কি আপনি দেবেন না আমাকে?
"তখন আমি বললাম, ওয়েল জেনারেল, আস্কিং কোয়েশ্চেন ইজ মাই প্রিরোগেটিভ, আনসারিং ইজ ইয়োর্স। ইউ হ্যাভ নট আনসার্ড মাই কোয়েশ্চেন। মাই কোয়েশ্চেন ইজ....(প্রশ্ন করার অধিকার আমার, উত্তর দেয়ার অধিকার আপনার। কিন্তু আপনি আমার প্রশ্নের উত্তর দেননি। আমার প্রশ্নটি হচ্ছে..)
জাহাঙ্গীর হোসেন এরপর তার প্রশ্নটি আবার করলেন।
এবার জেনারেল এরশাদ বললেন, "আপনি যদি চান, আর ছাপা হবে না।"
এরপর পত্রিকার প্রথম পাতায় জেনারেল এরশাদের কবিতা ছাপা অনেকটাই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তার কবিতা প্রথম পাতা থেকে চলে গিয়েছিল ভেতরের পাতায়। তবে এর পরিণাম ভোগ করতে হয়েছিল জাহাঙ্গীর হোসেনকে।
"এ ঘটনার পর আমাকে বদলি করে দেয়া হয় চট্টগ্রামে। আমি যেতে চাইনি। আমার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু আমাকে ব্যুরো এডিটর করে পাঠিয়ে দেয়া হলো। আমি দুবছর ছিলাম। দুবছর পর আমি পদত্যাগ করে সেখান থেকে চলে আসি।"

সামরিক শাসক যখন কবি

এটি ছিল এমন এক সময়, যখন কবিতাকে ঘিরেই চলছিল বাংলাদেশে রাজনীতির লড়াই।
একদিকে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করা সেনাশাসক জেনারেল এরশাদ, যিনি কবিখ্যাতি পাওয়ার জন্য আকুল। অন্যদিকে বিদ্রোহী একদল তরুণ কবি, যারা কবিতাকে পরিণত করেছেন তাদের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের প্রধান অস্ত্রে।
প্রতিটি পত্রিকার প্রথম পাতায় তখন হঠাৎ হঠাৎ ছাপা হচ্ছে জেনারেল এরশাদের কবিতা। ক্ষমতায় আসার কিছুদিনের মধ্যে বেরিয়ে গেছে তার প্রথম কবিতাগ্রন্থ, 'কনক প্রদীপ জ্বালো।' বঙ্গভবনে নিয়মিত বসছে কবিতার আসর। ঢাকার সেসময়কার প্রথম সারির নামকরা কিছু কবি তাকে ঘিরে থাকেন এসব অনুষ্ঠানে।
কবি এবং অবসরপ্রাপ্ত সরকারি আমলা মোফাজ্জল করিম তখন যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা। ক্ষমতা গ্রহণের আগে পর্যন্ত এরশাদের কবিতানুরাগের কথা তিনি শোনেননি, স্বীকার করলেন তিনি।
মোফাজ্জল করিম ছিলেন এরশাদকে ঘিরে থাকা কবিগোষ্ঠীর সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠ। এর কিছুটা সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে, কিছুটা তার কবিতা চর্চার সুবাদে। একারণে এরশাদের বঙ্গভবনের কবিসভায় তিনিও আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন।
"কবিতার প্রতি তার অনুরাগের কথা আমরা প্রথম জানতে পারি ক্ষমতা নেয়ার মাসখানেক পরে এক অনুষ্ঠানে", স্মৃতি হাতড়ে জানালেন তিনি।
"সেই অনুষ্ঠানে তিনি এসেছিলেন সরকারি কর্মকর্তাদের সামনে বক্তৃতা দিতে। শিল্পকলা একাডেমীর মিলনায়তনে এটা হয়েছিল। উনি বক্তৃতা করলেন। আমরা সবাই সামনে বসে শুনছি। তারপর বক্তৃতার শেষে তিনি হঠাৎ করে বললেন, কাল রাতে আমি একটি কবিতা লিখেছি।"
"এরপর কবিতাটি তিনি পড়ে শোনালেন। সেই প্রথম আমরা তার কবিতা শুনলাম।"
সরকারি ট্রাস্ট থেকে তখন প্রকাশিত হতো দৈনিক বাংলা এবং সাপ্তাহিক বিচিত্রা। দৈনিক বাংলার সম্পাদক তখন শামসুর রাহমান। দুটি কাগজেই নিয়মিত ছাপা হতে লাগলো জেনারেল এরশাদের কবিতা।
বঙ্গভবনে তখন যে কবিতার আসর বসতো তাতে একদিন যোগ দিলেন মোফাজ্জল করিম।
"আমাকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিল আমার এক কবিবন্ধু এবং সহকর্মী মনজুরে মাওলা। আমি অনেক অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা করে সেখানে গিয়েছিলাম। প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণ বা অনুরোধ, এখানে না গেলে আবার কি না কি হয়, তাই গেলাম, কবিতাও পাঠ করেছিলাম। তো সেখানে আমি লক্ষ্য করেছিলাম, অনেক খ্যাতনামা কবি সেখানে ছিলেন।"
সেই কবিকুলের মধ্যে প্রধান দুই ব্যক্তি ছিলেন কবি ফজল শাহাবুদ্দীন এবং কবি ইমরান নুর, (এটি তার ছদ্মনাম, তার আসল নাম মনজুরুল করিম, সরকারের ডাকসাইটে আমলা ছিলেন)।
মোফাজ্জল করিম মনে করতে পারেন এরা দুজন বিভিন্নভাবে এরশাদ সাহেবের নৈকট্য লাভ করেছিলেন।
তখন কবিদের দুটি সংগঠন ছিল। একটির নাম কবিকন্ঠ। এর নেতৃত্বে ছিলেন ফজল শাহাবুদ্দীন। তার সঙ্গে ছিলেন আল মাহমুদ, সৈয়দ আলী আহসানের মতো কবিরা। এরশাদ ছিলেন এই সংগঠনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। কবিকন্ঠ বেশ সক্রিয় ছিল। তারা জেনারেল এরশাদকে বলে ধানমন্ডিতে একটি পরিত্যক্ত বাড়ি এই সংগঠনের নামে বরাদ্দ নেন। সেখানে প্রতি মাসে কবিতার আসর বসতো। সেখানে এরশাদ থাকতেন প্রধান অতিথি। তিনি নিজে কবিতাও পড়তেন।
শামসুর রাহমান এবং আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ মিলে কবিদের আরেকটি সংগঠন গড়ে তোলেন। সেটার নাম ছিল পদাবলী। তাদের ঘিরে জড়ো হন আরেকদল কবি।
বাংলাদেশের কবিদের জন্য এটি ছিল এক অভূতপূর্ব সময়। দেশের রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষ ব্যক্তি কবিতার অনুরাগী, কবিযশপ্রার্থী। কাজেই কবিদের মধ্যে শুরু হলো একধরণের প্রতিযোগিতা, কিভাবে কবিতার মাধ্যমে তার নৈকট্য এবং আশীর্বাদ পাওয়া যায়।
দেশে সংবাদপত্রগুলোর ওপর তখন জারি রয়েছে কঠোর সেন্সরশীপ। কিন্তু তার মধ্যে নানা কথা, নানা গুজব ভেসে বেড়ায়।
একটি গুজব ছিল, জেনারেল এরশাদের নামে ছাপা হওয়া এসব কবিতা আসলে লিখে দেন নামকরা কজন কবি।
মোফাজ্জল করিম স্বীকার করলেন, এরকম কথা তাদের কানেও এসেছিল তখন। তখন বাংলাদেশের বেশ নামকরা কজন কবির নামই তারা শুনেছিলেন, যারা একাজ করতেন।
"আমরা শুনতাম, কিন্তু এর বেশি আমরা জানতাম না আর কিছু। তবে আমি এটা বিচার করতে যাইনি। এসব কবিতা এরশাদ সাহেবের নামে ছাপা হচ্ছে, আমি সেভাবেই দেখেছি। কে লিখে দিচ্ছে, কেন লিখে দিচ্ছে, সেটা নিয়ে আমি মাথা ঘামাইনি।"

নিষিদ্ধ কবিতা

পত্রিকার প্রথম পাতায় সামরিক শাসকের কবিতা নিয়ে যখন এত আলোচনা, তখন বাংলাদেশে গোপনে হটকেকের মতো বিক্রি হচ্ছে এক নিষিদ্ধ কবিতা।
"খোলা কবিতা" নামে সেই কবিতা কেউ প্রকাশ করতে সাহসই করছিল না। কবির নাম মোহাম্মদ রফিক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী সাহিত্যের শিক্ষক।
নিষিদ্ধ কবিতাটির কয়েকটি পংক্তি এরকম:
"সব শালা কবি হবে, পিপীলিকা গোঁ ধরেছে উড়বেই, দাঁতাল শুয়োর এসে রাজাসনে বসবেই।"
পুরো কবিতাটি ছিল অনেক দীর্ঘ, প্রায় ১৬ পৃষ্ঠা। এটি গোপনে ছাপানো হয় এক ছাপাখানায়। নিউজপ্রিন্টে এক ফর্মায় ছাপানো সেই কবিতা গোপনে বিলি করেন মোহাম্মদ রফিকের ছাত্র-ছাত্রীরা। হাতে হাতে সেই কবিতা ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে।
কিভাবে রচিত হয়েছিল সেই কবিতা, সেই কাহিনী শোনালেন মোহাম্মদ রফিক, যিনি এখন ঢাকায় অবসর জীবনযাপন করছেন।
"কবিতাটি আমি লিখেছিলাম জুন মাসের এক রাতে, এক বসাতেই। আমার মনে একটা প্রচন্ড ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, মনে হচ্ছিল একজন ভুঁইফোড় জেনারেল এসে আমাদের কবিতার অপমান করছে।"
তার মানে তার এই কবিতার লক্ষ্য তাহলে ছিলেন জেনারেল এরশাদই?
"এটা শুধু এরশাদকে নিয়ে লেখা কবিতা নয়। এরশাদের মার্শাল ল জারি আমার কাছে একটা ঘটনা। কিন্তু একজন লোক, যে কোনদিন লেখালেখির মধ্যে ছিল না, ভূঁইফোড় - সে আজ সামরিক শাসন জারির বদৌলতে কবিখ্যাতি অর্জন করবে, এটা তো মেনে নেয়া যায় না।"
মোহাম্মদ রফিক ছিলেন ষাটের দশকে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী। এজন্যে জেলও খেটেছেন। জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের মধ্যে তিনি পাকিস্তানি আমলের সামরিক শাসনের ছায়া দেখতে পেয়েছিলেন। তার কবিতায় তিনি এর প্রতিবাদ জানালেন।
নিষিদ্ধ খোলা কবিতা তখন নানা ভাবে কপি হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে সারাদেশে। টনক নড়লো নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর। একদিন মোহাম্মদ রফিকের ডাক পড়লো সাভারে সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের দফতরে।
"সেখানে তিনজন সেনা কর্মকর্তার মুখোমুখি আমি। তাদের প্রথম প্রশ্ন, এটা কি আপনার লেখা। আমি বললাম হ্যাঁ, আমার লেখা। আমি তাদের বললাম, আমি আপনাদের সব প্রশ্নের উত্তর দেব, কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর দেব না। সেটা হচ্ছে, এটি কে ছেপে দিয়েছে। কারণ আমি তাকে বিপদে ফেলতে চাই না।"
এর কিছুদিন পর মোহাম্মদ রফিকের নামে হুলিয়া জারি হয়। তাকে কিছুদিন আত্মগোপন করে থাকতে হয়।

কবিদের বিদ্রোহ

এরশাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তখন চলছে নানা জোয়ার-ভাটা। আন্দোলন কখনো তীব্র রূপ নিচ্ছে, আবার কখনো ঝিমিয়ে পড়ছে।
১৯৮৭ সাল। গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বড় দলগুলোর মধ্যে যখন চলছে নানা টানাপোড়েন, তখন তরুণ কবিরা এক বিরাট কাণ্ড করে ফেললেন। ঢাকায় তারা এক বিরাট কবিতা উৎসবের আয়োজন করলেন, যার নাম দেয়া হলো 'জাতীয় কবিতা উৎসব।'
এই বিদ্রোহী কবিদের নেতৃত্বে আছেন শামসুর রাহমান। তিনি জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি। আর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মূল সংগঠকের দায়িত্বে সেই রাগী বিদ্রোহী কবি মোহাম্মদ রফিক।
কিভাবে এই কবিতা উৎসবের আয়োজন করা হয়েছিল, সেটি বলতে গিয়ে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়লেন তিনি।
"তখন অনেক তরুণ কবির সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা ছিল। বিশেষ করে রুদ্র, কামাল, এরা অনেকে আমার কাছাকাছি ছিল। আমরা তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে বা আশে-পাশে আড্ডা দেই। আমাদের মধ্যে তখন আলাপ চলছিল, এরকম কিছু করা যায় কীনা। সেখান থেকেই এর শুরু। তরুণ কবিরাই এর উদ্যোগ নেন। আর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমার নাম প্রস্তাব করেন রফিক আজাদ।"
১৯৮৭ সালের ফেব্রুয়ারী ১ এবং ২ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় টিএসসির মোড়ে প্রথম জাতীয় কবিতা উৎসব শুরু হলো। সারা বাংলাদেশের কবিরা জড়ো হলেন সেখানে।
এই উৎসব কার্যত পরিণত হলো এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের এক বিরাট মঞ্চে। প্রথম উৎসবের শ্লোগানটাই ছিল, "শৃঙ্খল মুক্তির জন্য কবিতা।" উৎসবে যত কবিতা পড়া হতো, তাতে রাজনৈতিক কবিতার সংখ্যাই বেশি।
একদিকে সরকার বিরোধী কবিরা যখন রাজপথ গরম করছেন, তখন বঙ্গভবন-কেন্দ্রিক কবিরাও এশিয় কবিতা উৎসব নামে আরেকটি উৎসব করছেন সরকারী আনুকুল্যে। এরশাদ তাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। তাতে বিভিন্ন দেশের নামকরা কবিদেরও আমন্ত্রণ জানানো হলো। ১৯৮৯ সালে তাদের একটি উৎসবে যোগ দিতে এসেছিলেন ইংল্যান্ডের সেসময়ের সবচেয়ে খ্যাতিমান কবি টেড হিউজ।
কিন্তু বিদ্রোহী কবিরা যেভাবে সরকার বিরোধী আন্দোলনে উত্তাপ ছড়িয়ে যাচ্ছিলেন, তা জেনারেল এরশাদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ালো।
১৯৮৮ সালে দ্বিতীয় বারের মতো ঢাকায় জাতীয় কবিতা উৎসবে ঘটলো এক অভাবিত ঘটনা। সেবারের উৎসবের শ্লোগান 'স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কবিতা।" উৎসব মঞ্চে অতিথি হিসেবে ছিলেন বাংলাদেশের একজন নামকরা শিল্পী, কামরুল হাসান। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি সেখানেই ঢলে পড়েছিলেন। তবে মৃত্যুর আগের মুহূর্তে তিনি এঁকেছিলেন একটি স্কেচ, যার নীচে তিনি লিখেছিলেন, 'দেশ আজ বিশ্ববেহায়ার খপ্পরে।'
উৎসবের কর্মীরা রাতারাতি সেই স্কেচ দিয়ে পোস্টার ছাপিয়ে ফেলেন, কিন্তু বিলি করার আগেই পুলিশ হানা দিয়ে জব্দ করে অনেক পোস্টার। একজন শিল্পীর আঁকা একটি স্কেচ যেন একজন সেনাশাসকের ক্ষমতার জন্য এক বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

একটি গণঅভ্যুত্থান

১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে এক ব্যাপক ছাত্র-গণ অভ্যুত্থানের মুখে পতন ঘটে এরশাদের। পদত্যাগে বাধ্য হন তিনি।
কিন্তু তারপর যেভাবে একদিন ধুমকেতুর মতো বাংলাদেশের কাব্যজগতে তার আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল, সেভাবেই হঠাৎ করে তার কবিতা যেন হারিয়ে যায়। ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দুর্নীতির কারণে তাকে কারাবাসে যেতে হয়। তবে সেখানে অখন্ড অবসর সত্ত্বেও তিনি কবিতার চর্চা করেছেন এমন খবর পাওয়া যায়নি। আর পত্রিকার প্রথম পাতা শুধু নয়, ভেতরের পাতাতেও তার কোন কবিতা আর ছাপা হতে দেখা যায়নি।
কিন্তু যেসব কবিতা হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের নামে প্রকাশিত হয়েছিল, তাতে তার কাব্য প্রতিভা সম্পর্কে কী ধারণা পাওয়া যায়?
মোফাজ্জল করিম বলছেন, এরশাদের মধ্যে একটা কবি মন ছিল বলেই তাঁর মনে হয়েছে।
"আমার একটা জিনিস মনে হয়, তার একটা কাব্যপ্রীতি ছিল। কবিতা তিনি ভালোবাসতেন, কবিদের সাহচর্য পছন্দ করতেন। এ কারণেই তিনি কবিতা পাঠের আসর করতেন, কবিদের সঙ্গে মেলামেশা করতেন। কবিদের জন্য তার একটা সফট কর্ণার ছিল। কেউ কেউ তার কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধেও নিয়েছেন এটাকে কাজে লাগিয়ে, শোনা যায়।"
মোহাম্মদ রফিক অবশ্য জেনারেল এরশাদকে এখনো কবি স্বীকৃতি দিতে রাজী নন।
"সে তো কবি নয়। বাঙ্গালির সবচেয়ে বড় গর্বের জায়গা হচ্ছে কবিতা। কারণ কবিতা চিরকাল বাঙ্গালিকে উদ্বুদ্ধ করেছে। কিন্তু এই কবিতাকে আসলে এরশাদ ধ্বংস করতে চেয়েছে।"
"আমার দেশের একটা চরিত্র আছে। যখন সে জাগে, তখন সে গান শোনে আর কবিতা পড়ে। আর যখন তার অবক্ষয় শুরু হয়, তখন সে কবিতা থেকেও দূরে সরে যায়।"
মোহাম্মদ রফিক মনে করেন, প্রবল পরাক্রমশালী সেনাশাসক জেনারেল এরশাদকে যে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছিল, তার পেছনে কবিতা এক বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছিল।
মোহাম্মদ রফিকের সেই আলোচিত ও কবিতা  মোহাম্মদ রফিক