Thursday, May 8, 2014

লাশ ডোবাতে ব্যবহার করা হয় রেশনের বস্তা? সেদিন যা ঘটেছিল by কামরুল হাসান

বন্দর গুদারাঘাট থেকে হঠাৎ উধাও নৌকা দুটি। প্রায় চার বছর ধরে এগুলো এ ঘাটেই বাঁধা ছিল। গতকাল বুধবার সকালে সেখানে এগুলো আর দেখা যায়নি। নারায়ণগঞ্জের মানুষের কাছে এ নৌকাগুলো ছিল আতঙ্কের। মাঝেমধ্যে রাতের বেলা চোখবাঁধা লোককে তোলা হতো এসব নৌকায়। বন্দর এলাকার মানুষের ধারণা, নারায়ণগঞ্জের ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুল ইসলামসহ সাতজনকে অপহরণ করে হত্যার পর ইটবাঁধা লাশগুলো নদীতে ডোবাতে এ নৌকা দুটিই ব্যবহার করা হয়েছিল। সে কারণেই এগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নৌকা দুটি সরকারি বাহিনীর লোকজন ব্যবহার করতেন।
এদিকে লাশের সুরতহালের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, লাশের সঙ্গে যে বস্তায় ইট বাঁধা ছিল, সেই বস্তাগুলো সরকারি রেশনের জন্য ব্যবহার করা। বস্তায় সরকারি রেশনের সিলও রয়েছে। আর ওই বস্তায় যে ইটগুলো ভরা ছিল, সেই একই ধরনের ইট পাওয়া গেছে একটি বাহিনীর কার্যালয়ের পাশের নির্মাণাধীন ভবনে। নারায়ণগঞ্জের ১ নম্বর বন্দর গুদারাঘাটে পাশাপাশি বাঁধা আছে বিভিন্ন সংস্থার নৌকা। পুলিশেরও তিনটি নৌকা আছে। একই সারিতে ছিল র‌্যাবের দুটি বড় নৌকা। নৌকা চলাচলের জন্য সেখানে ছোট একটি নিয়ন্ত্রণকক্ষও আছে। গতকাল সকালে সেটিও বন্ধ দেখা যায়। বন্দরের ইজারাদার ইকবাল জানান, নিয়ন্ত্রণকক্ষটি ২৪ ঘণ্টা খোলা ছিল। এখন নৌকাও নেই, কক্ষও বন্ধ।
র‌্যাবের নৌকার খোঁজ করতে শহরের ভেতরের কার্যালয়ে এলে সেখান থেকে জানানো হয়, ওই কার্যালয়ে কোনো কর্মকর্তা নেই। তিন কর্মকর্তা চাকরি হারানোর পর সব কর্মকর্তা এখন ঢাকায়। নারায়ণগঞ্জ শহরে এখন বলতে গেলে র‌্যাবের কোনো কার্যক্রম নেই। র‌্যাবের কার্যক্রম আপাতত না থাকলেও এ বাহিনীর বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভের অন্ত নেই। নিহত নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম গতকাল প্রথম আলোর কাছে অভিযোগ করেন, র‌্যাব তাঁর স্বামীকে অপহরণ করেছে। কিন্তু তাঁকে মেরে ফেলতে নূর হোসেনের সহায়তা নিয়েছে। লাশের ধরন দেখে তিনি এ ধারণা করেন বলে জানান। এ কথা বলার সময় স্থানীয় সাংবাদিকেরাও উপস্থিত ছিলেন। নজরুলের জীবনযাপন সম্পর্কে সেলিনা ইসলাম বলেন, সন্ত্রাসী নূর হোসেন দেড় মাস আগে নজরুলকে হত্যার হুমকি দিয়েছিলেন। এ হুমকির পর থেকে নজরুল খুব ভয়ে ভয়ে চলতেন। নজরুল তাঁকে বলতেন, র‌্যাব-পুলিশ নূর হোসেনের কেনা। প্রাণের ভয়ে তিনি মিজমিজির বাসা ছেড়ে ঢাকায় বসবাস শুরু করেন। দেড় মাস ধরে ঢাকাতেই ছিলেন। মামলার হাজিরার জন্য ২৭ এপ্রিল তিনি নারায়ণগঞ্জে আদালতে এসেছিলেন। আসার আগের দিন শামীম ওসমানকে তিনি বলেছিলেন, 'ভাই, একটু দেইখেন।'
সেলিনা জানালেন, নজরুল ১৭-১৮ জনের দল নিয়ে চলতেন। রাস্তার মোড়ে মোড়ে তাঁর লোক থাকতেন। প্রতি পাঁচ মিনিট পরপর তাঁরা যোগাযোগ রাখতেন। ওই দিন আদালতে তাঁর সঙ্গে এসব লোক ছিল। সেলিনার অভিযোগ, র‌্যাব সদস্যরা আগে থেকেই নজরুলকে নজরে রাখছিলেন। আদালতের ভেতরে র‌্যাবের একজন সদস্য সাদাপোশাকে অস্ত্র নিয়ে ঘোরাফেরা করার সময় নজরুলের লোকজন তাঁকে সন্দেহবশত আটক করেন। ফতুল্লা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, র‌্যাবের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর লোকটিকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে পুলিশের কোর্ট পরিদর্শক তাঁকে জানিয়েছিলেন।
নজরুলের স্ত্রী আরও বলেন, নারায়ণগঞ্জ আদালত থেকে বের হয়ে স্টেডিয়াম পার হয়ে একটু দূরে গিয়ে নজরুল তাঁকে ফোন করে ঢাকায় যাওয়ার কথা জানান। এর পাঁচ মিনিট পর মনির নামের এক যুবক জানান, নজরুলসহ পাঁচজনের ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। পরে তিনি পাহারায় থাকা নজরুলের কয়েকজন সহযোগীকে সেখানে পাঠান। তাঁরা ফিরে এসে জানান, র‌্যাবের তিনটি গাড়ি এসে নজরুলের গাড়িটি গতিরোধ করে। তাঁরা প্রথমে গাড়ির সবাইকে মারধর করেন। এরপর জোর করে গাড়িতে তুলে নিয়ে যান। এ সময় নজরুলের কাছে দুটি অস্ত্রও ছিল। ঘটনাস্থলে থাকা বালুশ্রমিকেরা এ দৃশ্য দেখেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বালুশ্রমিক প্রথম আলোকে বলেন, নজরুলকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর তিনি দেখেন, সামনে একটি গাড়ি সাইরেন বাজিয়ে যাচ্ছে। নারায়ণগঞ্জ আদালতের একজন আইনজীবী প্রথম আলোকে বলেন, নজরুলকে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে ফেলেন আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার। তিনি কোনো কথা না বলে অপহরণকারীদের গাড়ির পিছু নেন। একপর্যায়ে তাঁর গাড়ি অপহরণকারীদের তিনটি গাড়ির একটির সামনে এসে পড়ে। তখন পেছন থেকে একটি গাড়ি চন্দনের গাড়িতে সজোরে ধাক্কা দিয়ে থামিয়ে দেয়। চন্দন গাড়ি থেমে নামলে চালকসহ তাঁকে ওই গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়। সবগুলো গাড়িই চলে যায় নারায়ণগঞ্জ শহরের দিকে। সেলিনা জানান, এ ঘটনা শুনে তিনি প্রথমে শামীম ওসমানের কাছে যান। শামীম ওসমান সব শুনে বলেন, নূর হোসেন এ কাজ করতেই পারে না। এভাবে তিনি অনেক সময় কাটান। তবে এ সময় শামীম ওসমান র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসানের সঙ্গে কথা বলেন। সেলিনা মনে করেন, শামীম ওসমান ভালো করে নূর হোসেনকে বললে নজরুলের মৃত্যু হতো না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কর্নেল জিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ওই দিন শামীম ওসমান তাঁকে বলেন, নজরুলকে র‌্যাব-১১-এর সদস্যরা ধরে নিয়ে গেছেন। এ কথা শুনে তিনি শামীম ওসমানের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, তিনি এটা কী করে জানলেন যে র‌্যাবই তাঁদের নিয়ে গেছে? জবাবে শামীম ওসমান বলেন, আদালতের লোকজন তাঁকে জানিয়েছেন, র‌্যাব-১১-এর লোকজন নজরুলসহ সবাইকে ধরে নিয়ে গেছেন। পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র জানায়, সবাইকে একটি 'টর্চার সেলে' নেওয়ার পর ইনজেকশন দিয়ে অজ্ঞান করা হয়। এরপর মুখে গামছা ঢুকিয়ে দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। লাশের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনেও শ্বাসরোধের প্রমাণ মিলেছে। ওই সূত্রটি জানায়, সাতজনকে ওই দিনই মেরে ফেলা হয়। এরপর রাতের বেলা বড় নৌকায় করে লাশগুলো নেওয়া হয় শীতলক্ষ্যা নদীর নির্জন স্থানে। সেখানে নেওয়ার পর বুক-পেট চিরে প্রতিটি লাশের সঙ্গে ১৬টি করে ইট বেঁধে পানিতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। আর এ দলে ছিলেন ২০ জনের মতো। এঁদের মধ্যে সরকারি বাহিনীর সদস্যও ছিলেন বলে শোনা যাচ্ছে।

লাশ ডোবাতে ব্যবহার করা হয় রেশনের বস্তা? সেদিন যা ঘটেছিল by কামরুল হাসান

বন্দর গুদারাঘাট থেকে হঠাৎ উধাও নৌকা দুটি। প্রায় চার বছর ধরে এগুলো এ ঘাটেই বাঁধা ছিল। গতকাল বুধবার সকালে সেখানে এগুলো আর দেখা যায়নি। নারায়ণগঞ্জের মানুষের কাছে এ নৌকাগুলো ছিল আতঙ্কের। মাঝেমধ্যে রাতের বেলা চোখবাঁধা লোককে তোলা হতো এসব নৌকায়।

হুমকির মুখে মার্কিন আধিপত্য by নোম চমস্কি

ইউক্রেনের চলমান সংকট খুব গুরুতর, বিশ্বশান্তির জন্য তা হুমকিস্বরূপ। সংকটের মাত্রা এতই গুরুতর যে অনেকে এটাকে ১৯৬২ সালের কিউবার ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের সঙ্গে তুলনা করছেন। দ্য বোস্টন গ্লোব-এ কলাম লেখক থ্যানাসিস ক্যামবানিস মূল বিষয়টি সংক্ষেপে তুলে ধরেছেন এভাবে: ঠান্ডাযুদ্ধের পরের সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা নিজেদের মতো একটি বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল, পুতিন যে ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত করে নিলেন, এর ফলে সেই ব্যবস্থা ভেঙে পড়ল। এই ব্যবস্থায় পরাশক্তিগুলো আন্তর্জাতিক সমর্থন পেলেই সামরিক হস্তক্ষেপ করত। অথবা সেটা সম্ভব না হলে তারা বিরোধী পক্ষের স্বার্থের ব্যাঘাত না ঘটিয়ে সেটা করত। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের ইরাক আগ্রাসন এই কথিত বিশ্বব্যবস্থায় কোনো ছেদ ঘটায়নি। সে সময় তারা রাশিয়া বা চীনের স্বার্থে ব্যাঘাত ঘটায়নি।

মোদি বনাম ভারত-লড়াই by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় @প্রথম আলো

আট দফায় লোকসভার ৫০২ আসনের ভোট শেষ হয়ে অপেক্ষা এখন শেষ পর্যায়ের। বাকি মাত্র ৪১ আসনের ভোট, ১২ মে যা অনুষ্ঠিত হবে। ১৬ মে জানা যাবে ভোটের ফলে কারা হাসছে। তার আগে নির্দ্বিধায় এ কথা বলা যায়, ষোড়শ লোকসভা ভোট হয়ে দাঁড়িয়েছে নরেন্দ্র মোদি বনাম অবশিষ্ট ভারতের লড়াই। একদিকে একজন ব্যক্তিবিশেষ, অন্যদিকে দেরিতে হলেও তাঁকে রোখার এক সম্মিলিত প্রচেষ্টা। এটাই ভারতের এবারের সাধারণ নির্বাচনের বিশেষত্ব। চার মাস আগে বিজেপি নানা টালবাহানার পর আদর্শিক মিত্র রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের (আরএসএস) সিদ্ধান্তের কাছে মাথা নুইয়ে নরেন্দ্র মোদিকে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু তখনো লড়াইটা এভাবে ভাগাভাগি হয়নি। তবে যত দিন গড়িয়েছে, সংঘ ও দলকে ছাপিয়ে মোদির মাথা ততই উঁচু হয়েছে এবং ক্রমে তিনি লড়াইকে ব্যক্তি বনাম সমষ্টিতে রূপান্তরিত করতে পেরেছেন। আজ সংবাদমাধ্যমের বিজ্ঞাপন কিংবা 'আউটডোর পাবলিসিটি', যেখানেই চোখ যায়, সর্বত্র একটাই স্লোগান, 'এবার, মোদি সরকার'। ১৯৯৮-৯৯ সালের ভোটেও এ রকম স্লোগান উঠেছিল, 'আব কি বারি, অটল বিহারি'। কিন্তু সেই ভোট এবারের মোদির মতো শুধুই বাজপেয়িকেন্দ্রিক ছিল না। অথচ এবারে প্রচারে মোদি ও দলীয় প্রতীক পদ্ম ফুল ছাড়া আর কারও উপস্থিতি সেভাবে চোখে পড়ে না। ব্যতিক্রম শুধু উত্তর প্রদেশের রাজধানী লক্ষেৗ। সেখানে মোদির সঙ্গে সহাবস্থানে রয়েছেন 'জীবন্মৃত' অটল বিহারি বাজপেয়ি, যাঁকে উপেক্ষা করার মতো ধৃষ্টতা মোদি এখনো অর্জন করেননি।
গতকাল বুধবার সাত রাজ্যের যে আসনগুলোতে ভোট হলো এবং ১২ মে যে রাজ্যগুলোতে ভোট আছে, সেগুলোর মধ্যে উত্তর প্রদেশে ৩৩, বিহারে ১৩, হিমাচল প্রদেশে চার ও উত্তরাখন্ডে পাঁচটি আসন রয়েছে। ক্ষমতায় আসতে হলে এই ৫৫টি আসনের অধিকাংশ বিজেপিকে কবজা করতে হবে। উত্তর প্রদেশের পূর্বাঞ্চলের ৩৩ আসনের মধ্যে ২০০৯ সালে বিজেপি পেয়েছিল মাত্র চারটি। কংগ্রেস ও বহুজন সমাজ পার্টি পেয়েছিল ১০টি করে। মোদির বারানসি থেকে দাঁড়ানোর উদ্দেশ্যই এই পূর্বাঞ্চলে আসন বাড়ানো এবং তার প্রভাব বিহারে ছড়িয়ে দেওয়া। সে লক্ষ্যে তিনি প্রচারের শেষবেলায় দুটি কৌশল নিয়েছেন। নিজের জাতিগত অনগ্রসর সত্তা ও চা বিক্রির অতীত পেশাকে বড় করে তুলে ধরে 'নিম্নবর্গীয় মানসিকতায়' নাড়া দিতে চেয়েছেন। পাশাপাশি অযোধ্যায় রামমন্দির প্রতিষ্ঠার প্রসঙ্গ নতুন করে তুলে ধরেছেন। কেন? কারণ, এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দলিতরা মায়াবতী ও অনগ্রসর মানুষ মুলায়মকে ছাড়া অন্যদের ভরসা করেন না। তাঁদের সঙ্গেই এত বছর ধরে লেপ্টে থাকতে বাধ্য হয়েছে অতি অনগ্রসর 'সাব কাস্ট'-এর মানুষজন, যাঁরা দলিত 'জাটভ' ও অনগ্রসর 'যাদব'দের দাপাদাপিতে সংকুচিত বোধ করেন। মোদি যেহেতু জাতিগতভাবে এই গোষ্ঠীভুক্ত, তাই সেই সত্তায় সুড়সুড়ি দেওয়ার রাজনীতিকে আঁকড়ে ধরেছেন। এঁদের ভোট পেতেই বিজেপি জোট বেঁধেছে 'আপনা দল'-এর সঙ্গে, উত্তর প্রদেশে যাদের ১০-১২ শতাংশ ভোট আছে। ভোটের অনেক আগে থেকেই নরেন্দ্র মোদির নিজের হাতে সাজিয়ে নেন প্রচারের ছকটা। সেই ছকে প্রত্যক্ষ প্রাধান্য পায় তাঁর 'গুজরাট মডেল', 'দৃঢ়কঠিন উন্নয়নমুখী' মানসিকতা এবং 'চটজলদি সিদ্ধান্ত নেওয়ার' ক্ষমতা। অতিমাত্রায় গণতন্ত্রী না হয়ে দেশের স্বার্থে 'উপকারী একনায়ক' হয়ে ওঠাকেই ওই প্রচারে হাতিয়ার করা হয়। সেই সঙ্গে প্রাধান্য দেওয়া হয় মোদির একদা অতিদরিদ্র সামাজিক চরিত্রকে, যা এক বিপুল জনসমষ্টিকে 'আমরাও এমন হতে পারি' স্বপ্ন দেখাতে শুরু করে। প্রচ্ছন্নভাবে এই প্রচারের পাশাপাশি পরোক্ষে উসকানি দেওয়া হতে থাকে আর্যাবর্তের গো বলয়ের হিন্দুত্বসর্বস্ব মানসিকতায়। অর্থাৎ একদিকে 'ইয়ং ইন্ডিয়ানদের' বড় হওয়ার কল্পনায় সাত রঙের পোঁচ আর অন্যদিকে কট্টর হিন্দুদের রামমন্দির গড়ার স্বপ্নে বাতাস দেওয়া। বিজেপি খুব চতুরভাবেই এই দুই জনসমষ্টিকে জুড়ে দিল। সমাজবাদী পার্টির সঙ্গে মানসিকভাবে যুক্ত বাবরি মসজিদ অ্যাকশন কমিটির নেতা ও মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের সদস্য জাফরইয়াব গিলানি লক্ষেৗতে নিজের বাড়িতে প্রথম আলোকে বলেন, 'মোদি বিজেপির প্রচারকে বহুমুখী করতে পেরেছেন। এ কারণে এবার উত্তর প্রদেশে ৩৫-৪০টি আসন তিনি আশা করতেই পারেন।' প্রদেশ কংগ্রেসের বড় নেতা সত্যদেও ত্রিপাঠি কিংবা বীরেন্দ্র মদনও প্রতিপক্ষের এতগুলো আসন পাওয়ার সম্ভাবনা অস্বীকার করেননি। তাঁদের ব্যাখ্যা: বিজেপির উচ্চবর্ণের ভোটব্যাংকের পাশে অনগ্রসর জাতিদের সমর্থন মিললে ও মুসলমান ভোটে বিভাজন হলে মোদির রণকৌশল সফল হতেই পারে।
লড়াই শুরুর আগে বিজেপির নজরে ছিল উত্তর প্রদেশ ও বিহারের মোট ১২০টি আসনের মধ্যে অন্তত ৬০টি। এনডিটিভির সর্বশেষ জরিপে শুধু উত্তর প্রদেশ থেকেই দলটিকে ৫৩টি আসন দেওয়া হয়েছে! এটা সম্ভব কি না, জানতে চাইলে উত্তর প্রদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষক রমেশ দীক্ষিত বলেন, 'একেবারে অসম্ভব বলব না। তার একটা বড় কারণ, নরেন্দ্র মোদির ভালো-মন্দ সম্বন্ধে সবাই বিশেষ একটা অবগত নন। আবার লাগাতার প্রচার তাঁর সম্বন্ধে একটা আকর্ষণীয় ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছে। তাঁকে গুজরাটের কসাই বলা হচ্ছে, কিন্তু হিন্দুপ্রধান ভারতে, বিশেষত দাঙ্গাপ্রবণ গো বলয়ে সেটা তাঁর পক্ষে যেতে পারে। মোদি একজন 'নো ননসেন্স' নেতা, এটা যত প্রচার পাচ্ছে, কট্টর হিন্দুদের মধ্যে ততই তাঁর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হচ্ছে। লোকসভার ভোটে অধিকাংশ মানুষ কেন্দ্রে একজন শক্তপোক্ত নেতাকে পেতে বেশি আগ্রহী।'
জাতীয় স্তরে বিজেপিকে রোখার মতো শক্তি এখন পর্যন্ত কংগ্রেসেরই রয়েছে। কিন্তু সেই কংগ্রেসকে অন্য 'ধর্মনিরপেক্ষ' দলগুলো গত দুই বছরে যেভাবে কোণঠাসা করেছে, কখনো কখনো বিজেপির সঙ্গে তাল ও হাত মিলিয়ে, তাতে দলটি দিন দিন দুর্বল হয়েছে। এই যে আট দফায় ভোট হয়ে গেল, তাতে বিরোধীদের টনক নড়েছে অনেক দেরিতে। কংগ্রেস ও মোদি দুজনকেই রুখে বিশ্বস্ত ও স্থায়ী বিকল্প সরকার গড়া যে সহজ নয়, সেই উপলব্ধি যখন হয়েছে, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। এখন এই শেষবেলায় বারানসিতে মুসলমান ভোট একজোট রাখার চেষ্টায় একটা উদ্যোগ হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু শুধুই তা কি মোদির রথ ঠেকাতে পারবে?
এবারের ভোট মোদিকেন্দ্রিক হয়ে ওঠার অনেক কারণের একটি যদি হয় প্রচারে 'টিম মোদির' উদ্ভাবনী ক্ষমতা, অন্যদিকে তা হলে থাকবে তাঁকে রুখতে কংগ্রেসের সার্বিক ব্যর্থতা। মনমোহন সিংকে নিয়ে দলের টালবাহানা, মোদির মোকাবিলায় রাহুলকে এগিয়ে দেওয়া না-দেওয়া নিয়ে দীর্ঘ দোলাচল এবং স্বাভাবিক মিত্রদের (তৃণমূল কংগ্রেস, ডিএমকে, টিআরএস) সঙ্গে সম্পর্কহানি এই লড়াইটা ক্রমে একপেশে করে তোলে। এখন কংগ্রেসের পক্ষে আশার আলো একটাই—প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। মত্ত ষাঁড়ের শিং ধরে মোকাবিলার মতো যেভাবে তিনি নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে টক্কর দিচ্ছেন, তাতে দেশের আপামর কংগ্রেসি এখন থেকেই তাঁর মধ্যে ইন্দিরা গান্ধীর ছায়া দেখতে পাচ্ছেন। প্রিয়াঙ্কাকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ গান্ধী পরিবার দেবে কি না, মোদিময় ভোট শেষ হওয়ার আগেই এই প্রশ্ন বড় হয়ে উঠছে। সেই প্রশ্নের মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত ষোড়শ লোকসভার ভোটে মূল লড়াই কংগ্রেস বনাম বিজেপির নয়, আঞ্চলিক দল বনাম কংগ্রেস বা বিজেপির মধ্যে নয়, ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম সাম্প্রদায়িকতারও নয়; লড়াইটা নরেন্দ্র মোদি বনাম অবশিষ্ট ভারতের।

মোদি বনাম ভারত-লড়াই by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

আট দফায় লোকসভার ৫০২ আসনের ভোট শেষ হয়ে অপেক্ষা এখন শেষ পর্যায়ের। বাকি মাত্র ৪১ আসনের ভোট, ১২ মে যা অনুষ্ঠিত হবে। ১৬ মে জানা যাবে ভোটের ফলে কারা হাসছে। তার আগে নির্দ্বিধায় এ কথা বলা যায়, ষোড়শ লোকসভা ভোট হয়ে দাঁড়িয়েছে নরেন্দ্র মোদি বনাম অবশিষ্ট ভারতের লড়াই।

মানবাধিকারের প্রশ্নটি উপেক্ষণীয় নয়

বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিশেষ করে র‌্যাব কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘনের বেশ কিছু অভিযোগ সময়ে সময়ে এসে থাকে। এমনকি কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে অপরাধজগতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার। এ ধরনের অভিযোগে নাগরিক সমাজ ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ। তারা চায় এমনটা না ঘটুক। তারা আরও চায়, আইন প্রয়োগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই হোক দক্ষ, কর্মতৎপর আর জনপ্রত্যাশার প্রতি সংবেদনশীল। জনগণ এ আশাও সংগত কারণে করে যে তারা হবে মানবাধিকার ও আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বিপরীত চিত্রটাই দেখা যাচ্ছে অধিক পরিমাণে। আর তা ক্রমবর্ধমান হারে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি নাগরিক ভাবনা ও নাগরিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দঁাড়িয়েছে। এ ধরিত্রীতে আমরা একটি ছোট দেশ বটে। দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা আর রোগ-ব্যাধির বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রাম করে যাচ্ছে এ দেশের মানুষ। স্বাধীনতার পর এই দীর্ঘ সময়ে সাফল্যও এসেছে উল্লেখ করার মতো। তবে নানাবিধ কারণে আমাদের অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীলতা রয়েছে। আর এক দেশ অন্য দেশের সঙ্গে এ ধরনের নির্ভরশীলতা থেকেই থাকে। তবে তুলনামূলকভাবে দরিদ্রদের প্রয়োজন তা বেশি। তাই এ ধরনের দেশের অভ্যন্তরীণ কিছু বিষয়েও আজ অন্যরা কথা বলে। এমনকি কথা বলে অরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানও। তারা নানাবিধ পরামর্শ দেয়। তবে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর ইদানীং জোর দেওয়া হচ্ছে। ফলে এ ধরনের পরামর্শ নির্বিচারে গ্রহণ করার প্রয়োজন না থাকলেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হয়।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন। তারা সম্প্রতি পরামর্শ দিয়েছে, র‌্যাব ভেঙে দিয়ে নতুন একটি বেসামরিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে। সে সংগঠনটি মানবাধিকারকে মূল ভিত্তি ধরে সংঘবদ্ধ অপরাধ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেবে। প্রস্তাবিত এ সংগঠনটিতে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের না নিতেও পরামর্শ দিয়েছে তারা। চলমান পরিপ্রেক্ষিতে এ সংস্থার পরামর্শ ভেবে দেখার বিষয়। তবে প্রতিষ্ঠানটির সূচনা আর প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও একই সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। র‌্যাব প্রতিষ্ঠার পটভূমিকায় দেখা যায়, ২০০২ সালের দিকে একদল জঘন্য অপরাধী অন্তত তখনকার মতো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে উঠেছিল। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে অনেকটা অসহায় মনে হচ্ছিল তাদের মোকাবিলায়। সে ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ নামের অভিযানটির সাফল্য থেকে শিক্ষা ও প্রেরণা নিয়ে ২০০৪ সালে সরকার পুলিশের একটি অঙ্গরূপে র‌্যাব গঠন করে। তবে এর কাঠামোয় যুক্ত হয় পুলিশের পাশাপাশি সামরিক বাহিনী, বিজিবি ও আনসার। সার্বিক নিয়ন্ত্রণ থাকে আইজিপির হাতেই। তবে অপারেশনাল দায়িত্বের নেতৃত্ব অনেকাংশে সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের ওপর ন্যস্ত। সেই র‌্যাব বিভিন্ন কার্যক্রমের জন্য নন্দিত ও নিন্দিত হচ্ছে সময়ে সময়ে। এর কাঠামোগত দিক কিছুটা জটিল। তবে সুনিয়ন্ত্রিত একটি কমান্ড স্ট্রাকচারে চলছে বাহিনীটি। এর অসাধারণ সাফল্য জেএমবির মতো একটি জঙ্গি সংগঠনের কাঠামো ভেঙে দিয়ে মূল নেতাদের গ্রেপ্তার ও আইনের আওতায় আনা।
উল্লেখ করতে হয়, র‌্যাবের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ এন্তার। কিন্তু প্রশংসার সঙ্গে উল্লেখ করতে হয়, জেএমবির জঙ্গি নেতৃত্বকে র‌্যাব আইনের আওতায় এনেই বিচারের মুখোমুখি দঁাড় করিয়েছিল। বাংলা ভাই নামের জিঙ্গনেতাকে গ্রেপ্তারে রীতিমতো বন্দুকযুদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু জীবন্ত গ্রেপ্তার করা হয় তঁাকে। যে তিন জঙ্গিকে সম্প্রতি গাজীপুর-ময়মনসিংহ সড়কে প্রিজন ভ্যানে হামলা ও পুলিশের এক সদস্যকে হত্যা করে তাদের সঙ্গীরা তখনকার মতো মুক্ত করে, তারা এই র‌্যাবের দ্বারাই গ্রেপ্তার। বিচারবহির্ভূত কোনো ব্যবস্থা না নিয়েই যদি জেএমবির মতো সংগঠনকে অন্তত দীর্ঘ সময়ের জন্য নিষ্ক্রিয় করা যায়, তবে অন্য ক্ষেত্রে তা হবে না কেন? খুব বিরল ব্যতিক্রম ছাড়া অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিচারবহির্ভূত কার্যক্রমের সঙ্গে এই অঞ্চলের মানুষ পরিচিত ছিল না। কিন্তু ২০০২ সালের দিকেই এটা একধরনের সামনে চলে আসে এবং প্রসারও ঘটে। পরিস্থিতির রাশ টেনে ধরার কোনো দৃঢ় ইচ্ছা সরকারগুলোর দেখা যায়নি। শুরুতে শুধু র‌্যাবের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল। এখন পুলিশের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ আসছে সমান তালে। তাহলে র‌্যাব ভেঙে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে, এমনটি বলা যায় না। আবশ্যক রয়েছে আইনের সুষ্ঠু ও যথাযথ প্রয়োগ। এ ধরনের সব অভিযোগ আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। এখানে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিষয়ে কিছু আলোচনার আবশ্যকতা রয়েছে।
সংস্থাটি নিউইয়র্কভিত্তিক এবং মানবাধিকার নিয়ে গবেষণা ও মতামত দেয়। সংগঠনটির লক্ষ্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলো উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রকে বিশ্বসমাজে চিহ্নিত করা। পাশাপাশি পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানোর লক্ষ্যে সম্ভব হলে সেসব রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রয়োজনীয় আলোচনা। ১৯৭৮ সালে ভিন্ন নামে প্রতিষ্ঠানটির সূচনা মূলত তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোর মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, গবেষণা ও প্রতিবেদন প্রকাশের উদ্দেশ্যে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়া এবং পূর্ব ইউরোপের রাজনৈতিক রূপান্তরের পর নতুন নামে ১৯৮৮ সাল থেকে বিশ্বজনীন মানবাধিকার-সংক্রান্ত বেসরকারি সংগঠনের ভূমিকায় কাজ করছে তারা। এ সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে এরা মূলত মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিকে অনুসরণ করেই কার্যক্রম পরিচালনা করে। গুয়ানতানামো বেতে অন্তরীণ আফগান যুদ্ধবন্দীদের প্রতি অমানবিক আচরণ তাদের কাছে আকাঙ্ক্ষিত অগ্রাধিকার পায়নি। তেমনি আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রতিবেদনেও সংস্থাটি পক্ষপাতদুষ্ট বলে অনেকে অভিযোগ করেন। এগুলো যা-ই হোক, এখন সংস্থাটি মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে। আমাদের রাষ্ট্রীয় লক্ষ্য আর আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারও তা-ই। তদুপরি সংবিধানের নির্দেশনায়ও একই বিধান রয়েছে। আজ র‌্যাব ভেঙে দেওয়ার দাবি যখন করা হচ্ছে, তখন নিকট অতীতে তাদের সাফল্যগুলো আলোচনায় সামনে আসছে না। র‌্যাবের কাঠামোয় বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয় রয়েছে। এ সম্পর্কে পরস্পরবিরোধী দাবিও আছে। বারবার বিচার-বিশ্লেষণ করে প্রতিষ্ঠানটির সাংগঠনিক কাঠামো পর্যালোচনা করা যেতে পারে। বিশেষ করে র‌্যাব তার দায়িত্ব পালন করে সম্পূর্ণ নিজস্ব সাংগঠনিক কাঠামোয়। এখানে পুলিশের সঙ্গে তাদের উল্লেখ করার মতো কোনো সমন্বয় লক্ষণীয় হয় না। জেলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে রয়েছেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সাধারণ তত্ত্বাবধানে পুলিশ সুপার।
সেই পুলিশ সুপার র‌্যাবের কার্যক্রম সম্পর্কে একরূপ অন্ধকারেই থাকেন। অর্থাৎ সংস্থাটি সমান্তরালভাবে কাজ করে চলছে। মাঠপর্যায়ে কোনো সমন্বয়ের আইনি সুযোগ রাখা হয়নি। এ সম্পর্কে একটি আনুষ্ঠানিক কাঠামো থাকার আবশ্যকতা উপেক্ষা করা যায় না। তারপর আসছে এর কার্যক্রমে বিভিন্ন বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে। আইন অনুযায়ী র‌্যাব পুলিশের একটি ইউনিট। সামরিক বাহিনীকে বাদ দিয়েই যদি কাজগুলো হতো, তবে এটা গঠনের আবশ্যকতা থাকত না। পুলিশে সব পর্যায়েই বহু ভালো ভালো দক্ষ ও চৌকস কর্মকর্তা রয়েছেন। তঁারা অনেক ক্ষেত্রেই র্যাবে যেতে বা থাকতে চান না বলে বলা হয়ে থাকে। হয়তো বা কিছু প্রতিবন্ধকতা এ নেতিবাচক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। সে পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে ক্রমান্বয়ে পুলিশের অধিকসংখ্যক সদস্যের সমন্বয়ে এ সংস্থাটি কাজ চালাতে পারে। সামরিক বাহিনীকে এ কার্যকর ও চৌকস বাহিনী থেকে নির্ভরযোগ্য বিকল্প ব্যতীত বাদ দেওয়া হলে প্রচণ্ড একটি শূন্যতা সৃষ্টি হবে। জঙ্গি দমন, গুরুতর অপরাধ নিয়ন্ত্রণসহ সব ক্ষেত্রেই পড়বে এর নেতিবাচক প্রভাব। এক দশকে প্রতিষ্ঠানটির যে অর্জন, তা বৃথা হয়ে যাবে। ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার সঙ্গে আইন প্রয়োগ করলেও ফল লাভ হয়। অসহিষ্ণুতা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে উসকে দেয়। এ ধরনের অসহিষ্ণুতার অভিযোগে আমরা দেশে-বিদেশে নিন্দিত হচ্ছি। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন, বিভিন্ন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ প্রায়ই সমালোচনা করছে এসব ঘটনার। তাদের বক্তব্যকে অব্যাহতভাবে উপেক্ষা করা আমাদের জন্য কল্যাণকর নয়। এ সত্যটি মেনে নিতে হবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সব বাহিনীকে। তবে যে যা-ই বলুক, মাথাব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলার আত্মঘাতী পথে আমরা পা বাড়াতে পারি না। উপযুক্ত ওষুধের মাধ্যমে সে ব্যথার উপশম ঘটাতে হবে। র্যাব প্রশ্নেও আমাদের থাকতে হবে এ ধরনের ভূমিকাই |
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

ওদের কি দেশে ফেরা হবে না?

গত ডিসেম্বর মাসেই তঁার বাংলাদেশে যাওয়ার কথা ছিল। আমাদের এক বন্ধুর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একজন অধ্যাপক বাংলাদেশ থেকে কিছু ছাত্রছাত্রীকে তঁার গবেষণাগারে চাকরি দেবেন এবং বাংলাদেশের সঙ্গে স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে যৌথ গবেষণার উদ্যোগ নেবেন—এই আশায়। কিন্তু গোলাগুলি আর মৃত্যুর মিছিল দেখে তঁার আর যাওয়া হলো না। একটা বড় সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেল। তার আগের মাসেই এক অস্ট্রেলিয়ান শিল্পোদ্যোক্তা তঁার বিশাল শোরুমে বাংলাদেশের পণ্যকে স্থান দেওয়ার জন্য যাচাই করতে যেতে চেয়েছিলেন আমাদের আরেক পরিচিত বাঙালির সঙ্গে। পত্রপত্রিকা আর সংবাদমাধ্যমে দেশের উদ্বেগজনক পরিস্থিতি দেখে ভদ্রলোক আর গেলেন না। ভেস্তে গেল কোটি টাকার ব্যবসার সম্ভাবনা। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই ইংল্যান্ডের একজন উদ্যোক্তার দেশে যাওয়ার কথা ছিল নতুন বিনিয়োগের সম্ভাব্যতা দেখতে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অপহরণের ভয়ংকর আর মর্মান্তিক ঘটনাপ্রবাহ দেখে তিনি বাতিল করেছেন দেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত। এভাবেই কি একের পর এক সুযোগ হারানোর মিছিল তৈরি হবে বাংলাদেশে? অবাক হয়ে আমাদের তাকিয়ে থাকতে হবে একই বৃত্তে ঘুরতে থাকার দৃশ্যপট?
আমরা সবাই দেশের বাইরে থাকি। কেউ অস্ট্রেলিয়া, কেউ যুক্তরাষ্ট্র, কেউ যুক্তরাজ্য আবার কেউ জাপানে। কিন্তু প্রতিনিয়ত আমাদের চিন্তায় জুড়ে আছে বাংলাদেশ। অদ্ভুতভাবে আমরা লক্ষ করলাম, অনেক অনেক দিন ধরে বাইরে থাকা এমনকি উন্নত দেশগুলোতে নাগরিকত্ব পাওয়া বাংলাদেশিরা এখনো ভুলতে পারেননি নিজেদের শিকড়কে, এখনো তঁাদের আলোচনায় সবার আগে বাংলাদেশ, বিতর্কের ঝড় ওঠে অস্ট্রেলিয়া কিংবা যুক্তরাষ্ট্র নয় বরং বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে। সিডনির রাস্তায় ট্যাক্সি চালানো বাংলাদেশের বুয়েটের ছেলেটি কিংবা নিউইয়র্কে সুপারশপে কাজ করা চট্টগ্রাম মেডিকেলের চিকিৎসক মেয়েটি নিজের পেশা বিসর্জন দিয়ে এই সহস্র মাইল দূরে বসে আছে বাংলাদেশে চাকরিতে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় প্রমোশন না পাওয়ার কষ্টে, ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হওয়ার কারণে বিশেষ কোনো সময়ে উপেক্ষার শিকার হয়ে, ক্ষমতাধর মামা না থাকায় নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী পছন্দের চাকরি না পাওয়ার কারণে। আর কত দিন এভাবে যোগ্যতার অবমূল্যায়ন চলতে থাকবে আর আমরা হারাতে থাকব সবচেয়ে মেধাবী সন্তানগুলোকে?
টরন্টোর ২০ তলা উঁচু অ্যাপার্টমেন্টে বসে বাংলাদেশের ছেলেটি আধুনিক কক্ষের উষ্ণতা অনুভব করছে ঠিকই, কিন্তু আজন্ম গ্রামে বেড়ে ওঠা ছেলেটি এখনো ভুলতে পারে না পূর্ণিমা রাতে ঘরের উঠোনে পাটি বিছিয়ে শুয়ে থাকায় মধুর স্মৃতি। প্রতিদিন সকালে অফিসে এসেই সবার আগে প্রবাসীদের কম্পিউটারের স্ক্রিনে বিবিসি কিংবা সিএনএন ভাসে না, দেখা যায় প্রথম আলো কিংবা বাংলাদেশের কোনো অনলাইন পত্রিকা। যত বড় গবেষণাগারেই পাশ্চাত্যের সমস্যা নিয়ে কাজ করি না কেন, সবার চিন্তায় বাংলাদেশ। আমাদের এক বন্ধু তাজ গবেষণা করছে অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত সোয়ান নদীতে ভাঙনের সম্ভাব্যতা প্রতিরোধ নিয়ে; কিন্তু তার উদাহরণে বর্ণনায় সব সময়ই চলে আসে সন্দ্বীপের নদীভাঙনের দুঃখ। দিন শেষে নীড়ে ফেরার প্রতীক্ষা সবার কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই মানুষগুলোর বেশির ভাগেরই দেশে ফেরার উপায় নেই। ন্যানো টেকনোলজি কিংবা জৈবপ্রযুক্তি নিয়ে পড়াশোনা করা ছেলেটা দেশে ফিরতে পারবে না। কারণ, দেশে অনেক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কর্মক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে না।
আমরা বিদেশে পিএইচডি করছি, গবেষণা করছি। আমরা সবাই দেশে ফিরে যেতে চাই। কিন্তু এখানে আমাদের সুপারভাইজাররা যখন বলেন, আসলেই কি এই উন্নত কাজগুলো তোমার দেশে করতে পারার সুযোগ ও অর্থায়ন পাবে? আমরা বিভ্রান্ত হয়ে যাই। চাইলে হয়তো আমরা অনেকেই এসব দেশে নাগরিকত্ব পেয়ে যাব। কিন্তু আমরা বাঙালি পরিচয়ে থাকতে চাই, অন্য কোনো দেশের নাগরিক নয়। তার পরও দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন দেখি শিক্ষক এই পরিচয়ের চেয়ে আমি কোন দল সমর্থন করি, এটাই অনেক ক্ষেত্রে বড় পরিচয়, তখন হতাশ হতে হয়৷ শিকড় ছড়িয়ে থাকা এই কষ্ট ও অনিশ্চয়তাগুলো মাঝেমধ্যে মনে প্রশ্নের উদয় ঘটায়—আমাদেরও কি তবে দেশে ফেরা হবে না? লেখার শেষে পার্থের কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শামসুল আরেফিন আনামের একটা কথা উল্লেখ না করলেই নয়। কিছুদিনের মধ্যেই সে পাবে অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব কিন্তু তবু বাংলাদেশকে নিয়ে তার অনেক ভাবনা ও উৎকণ্ঠা। তাকে প্রশ্ন করেছিলাম, কিছুদিনের মধ্যেই যেখানে অস্ট্রেলিয়ার মতো একটা উন্নত দেশের নিরাপদ নাগরিক হতে যাচ্ছ, বাংলাদেশকে নিয়ে এত চিন্তা কেন তোমার? উত্তরে সে বলেছিল, ‘পৃথিবীর যেই প্রান্তেই যাই না কেন, যেখানেই থাকি না কেন, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, ভালো আছে—এটা দূর থেকে দেখেও শান্তি পাব, ভীষণ ভালো লাগবে।’ মাননীয় সরকার, প্রশাসন ও ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা, দোহাই লাগে আপনাদের। আমাদের দেশে ফিরতে দিন, ফেরার পরিস্থিতি তৈরি করুন৷
লেখকবৃন্দ বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণারত এবং চট্টগ্রাম, ঢাকা, রাজশাহী, বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইউএসটিসির তরুণ শিক্ষক৷