Showing posts with label কালি ও কলম. Show all posts
Showing posts with label কালি ও কলম. Show all posts
Friday, October 16, 2026
গল্প- সিক্স-বি by মোহাম্মদ কামরুজ্জামান

বাড়িঅলা
যখন দেখলেন, গ্রাম থেকে আমার বাসায় যত বার আমার ভাইবোন-ভাস্তেভাস্তিরা
বেড়াতে আসে, তত বার খেজুরের পাটালি, তালের পিঠা, মটরশুঁটির শাক, বেতের আগা,
তালশাঁস, মেটে আলু তার ঘরে চলে যায়‒তিনি জুনের এক তারিখ থেকে ভাড়া ৩০০
টাকা বাড়িয়ে দিলেন, আর গ্যাস ওনার ভেতরে ছিল, আমার ভেতরে দিয়ে দিলেন,
বললেন, ‘কেডায় কইব, বাজেটের আলোচনা হুইনা ইলিশের ব্যাপারি থিকা পটলের
আড়ৎদার, টিভির শোরুম থিকা দাঁতনের ক্যানভাসার‒সবাই হঠাৎ ক্ষেইপা উঠব? বিপদ
আফনেরও, বিপদ আমারও। এখুন তো আর কইতে পারি না, ‘মনির ভাই, যান গিয়া, আফনের
কষ্ট অইব এইহানে। কষ্ট করলে দুই ভাই একলগেই করুম। কী কন্?’ আমি বলতে
চাচ্ছিলাম, ‘গ্যাসটা আপাতত আপনার ভেতরেই থাক।’ কথাটা মুখ দিয়ে বেরিয়েছিল কি
না নিশ্চিত করে বলতে পারব না‒বাড়িঅলার হঠাৎ আর্তনাদে আমার কান বন্ধ হয়ে
গিয়েছিল, অথবা তিন সেকেন্ড স্মৃতিলিখন হয়নি। উনি ডান হাত দিয়ে দুই চোখ ঢেকে
আর্তনাদ করে উঠলেন, ‘ওরে, মাইচ্চে রে, মাইচ্চে!..আইচ্চা থাউক, আফনের কষ্ট
অইলে আমার এক টেকাও লাগত না। আমি এক বেলা নাহয় খামু না; মিনিকেট খাইতাম,
পাইজাম খামু। তবু নিজের ভাইরে কষ্ট দিমু না।’ সে মাসে বাড়িঅলা দুই বার ভাড়া
চাইতে এলেন‒দুই বার ভাড়া চাওয়ার পর দুই বার ভুল স্বীকার করলেন, দুই বার
ভুল স্বীকার করে দুই বার মাফ চাইলেন। অথচ উনি জানেন, আমি মাসের প্রথম
বৃহষ্পতিবার সন্ধ্যায় আগের মাসের ভাড়া দেই। সাত বছর আগের কথা বলছিলাম।
দীপের বয়স তখন ছয় বছর। অক্ষর জোড়া দিয়ে শব্দ লিখতে শিখেছে কেবল, সেই বিদ্যা
দিয়েই ক্লাশের বইয়ের পাশাপাশি কমিক্স পড়ে ফেলত।
সাত বছর আগে এই ছোট্ট এপার্টমেন্টটায় ওঠার আগে, মতি, জয়গুন, রাফেজা, সালামত ভাই, মজিদ চাচাদের সাথে শেওড়াপাড়ায় একটা টিনশেড বাড়ির দুই রুম নিয়ে থাকতাম। সকালে মজিদ চাচা সামনের প্যাসেজে হেঁটে হেঁটে দাঁতন করত, খক খক করে কফ ফেলত, দুপুরে আওয়াজ দিত রাফেজা-সালামতরা, আর রাতে হিস্ হিস্ করত মতি-জয়গুনরা। ছেলেকে নিয়ে এপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ে থাকব বলে অফিস বন্ধের দিনগুলোতে বাসা খুঁজতে শুরু করলাম। প্রতি বন্ধের দিনে ঘর থেকে বেরুতে দেখে দীপ একদিন জানতে চাইল, ‘ফ্রাইডেতে তুমি কোথায় যাও, বাবা?’
‘বাসা খুঁজতে যাই।’
‘আমাকেও নিয়ে যাও।’
‘রোদের ভেতর ঘুরে ঘুরে তোর জ্বর হবে।’
‘হোক। জ্বর হলে ভালোই হবে। ঘরে শুয়ে থাকতে পারব।’
‘ঘরে শুয়ে শুয়ে কী করবি?’
‘হিটলু বিটলু পড়ব।’
‘আচ্ছা, তাহলে শুয়ে শুয়ে হিটলু বিটলু পড়্, আমি বাসা খুঁজে আসি।’
আরেকদিন ও আমাকে আটকে ফেলল‒দুই হাত দুই দিকে মেলে ধরে পথের উপর দাঁড়াল, বলল, ‘আজ আমাকে নিয়ে যাও, বাবা।’ আমি বললাম, ‘ঘরে শুয়ে শুয়ে হিটলু বিটলু পড়্। কাল থেকে তো আবার স্কুলে যেতে হবে।’ ও দুই পা নাচাতে নাচাতে বলল, ‘হিটলু বিটলু সব শেষ করে ফেলেছি।’
‘তাহলে এখন রিভাইজ দে।’
‘রিভাইজ দিয়ে রেখেছি।’
ও দৌড় দিয়ে ওঘরে চলে গেল, ডেস্ক থেকে একটা হিটলু বিটলু নিয়ে এল। পাতা খুলে একটা ডায়লগ বক্সের উপর আঙুল রেখে একটা ইংরেজি শব্দ দেখাল, ‘ফাইট‒ফাইট মানে লড়াই করা।’ তারপর বই বন্ধ করে দৌড়ে গিয়ে ডেস্কে রেখে এল। কমিকসের কোনো নতুন বই পেলে, এক বসায় পড়ে ফেলে, প্রথম বার পড়ার সময় মাথা তোলে না, কারোর সাথে কথাও বলে না। দ্বিতীয় বার পড়ার আগে মারুফার কাছ থেকে অজানা শব্দগুলোর মানে জেনে নেয়।
ওর হিটলু বিটলু সব পড়া শেষ। অগত্যা ওকে সাথে করে নিয়ে বেরুতে হলো সেদিন। কাজিপাড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে বেশ ভেতরে, যেখানে বাড়িগুলো বাড়ির গায়ে গা লেগে উঠেছে, ড্রইং রুমের জানালা খুলে প্রতিবেশীদের বেডরুমে পাওয়া যায়, বেডরুমের জানালা খুলে হাত বাড়িয়ে বেলকনির তারে কাপড় নাড়তে হয়‒দরজা দিয়ে ঢুকে বেলকনিতে দাঁড়ানো যায় না, পানের পিক মুখে নিয়ে ঘোরার পরামর্শ যেখানে দেওয়া হয় না‒সিঁড়িতে খালাস করে শান্তি লাভের সুযোগ দেওয়া হয়‒তেমন একটি এলাকার তেমন একটি বাসায় টু-লেট দেখে ঢুকেছিলাম।
শীতল কালো বর্ণের মাঝবয়েসি এক লোক চাবি হাতে নিয়ে ছয়তলা দালানের ছয় তলার দক্ষিণ-পশ্চিম পাশের খালি হওয়া ফ্ল্যাটটা খুলে দিয়েছিলেন। ঢোকার সময় চোখ পড়ল দরজার চৌকাঠে সাঁটা টিনের নম্বর প্লেটের উপর‒সিক্স-বি‒মাঝ বরাবর একটিমাত্র পেরেক ঠোকা। এপার্টমেন্টের নম্বর থাকে। ভদ্রলোক পেছনে নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে দেখছিলেন, আমি ঠিকমতো দেখেশুনে নিচ্ছি কি না, আর তিন তলায় এনে তার দীর্ঘকাল বন্ধ থাকা ড্রইং রুমের ঠান্ডা সোফায় বসে আমাকে দেখেশুনে নিচ্ছিলেন‒দেখেশুনে তিনি বুঝেছিলেন, বাসা পছন্দ হয়েছে, আর আমি বুঝেছিলাম, আমার পোষাবে। লেবুর সরবত দেখিয়ে দীপকে বললেন ‘খাও, মিস্টি লাগব।’ তারপর দীপের কাছে ওর স্কুলের গল্প শুনলেন।
এ চেহারার মানুষ আমি এর আগেও দেখেছি। এদের মুখণ্ডল একটি চ্যাপ্টা পান পাতার মতো। পান পাতার যে জায়গাটাতে পত্রশীর্ষ সরু হয়ে নেমে গেছে, সে জায়গায় এদের একগুচ্ছ দাড়ি মোচড় দিয়ে থুতনির নিচে নেমে গেছে, থুতনি ধরে ঝুলে পড়েনি, ঝুলে পড়ার ভয়ে মাঝে মাঝে হাত দিয়ে ডলে নিচে পরিপাটি করে রেখে দেয় এরা‒এ ধরণের লোকরা খুব বাকসংযত হয়‒কথার তাৎক্ষণিক অর্থ, স্বল্পমেয়াদি অর্থ আর দীর্ঘমেয়াদি অর্থ‒তিনটাই আলাদা করে জানে। মুখের চামড়া অভিজ্ঞতার আঁচে পুড়িয়ে পাকা করা‒মনের ভাব বোঝা যায় না। ভাবশূন্য একজন মানুষের সাথে আমার ভাব হওয়ার কথা না, কিন্তু হয়ে গেল, রীতিমতো ভালোবাসাই হয়ে গেল, উনি যখন বললেন, ‘আপনার ছেলেটারে খুবই ভালা লাগল, ম্যাথমেটিক্যাল ব্রেইন।’ আমি একটু চমকে উঠেছিলাম। উনি ‘ম্যাথ’ শব্দটা জানেন।
এপার্টমেন্টে থাকব বলে বাসাটা নিয়ে নিয়েছিলাম। সাত বছর ধরে দীপকে নিয়ে সেখানেই আছি। সাত বছরে বাসার দেয়ালের সিমেন্ট-চুনকাম খসে পাতলা হয়ে গেছে, বাথরুমে শাওয়ার বিকল হয়ে ঝুলে পড়ে আছে সেই কবে থেকে, বেসিনের কল ঘুরাতে গেলে সহজে হাতের ভেতরে আসে না‒দুই পাশে মাথা নাড়িয়ে না বলে দেয়‒ম্যালা টাকার কাজ জমে গেছে‒আর বাসাভাড়া নিয়মিত-অনিয়মিতভাবে বেড়ে দ্বিগুনে ঠেকেছে। এত টাকার কাজ একসাথে জমানোর জন্য আমিই দায়ী। ভালোবাসার কারণেই সময়ে-অসময়ে বিরক্ত করিনি। ফলে যেদিন একটু বিরক্ত করতে গেলাম, অনেক দিনের ভালোবাসার বিপরীতে জমানো অনেক বিরক্তি সালেক ভাই একসাথে ঝেড়ে ফেললেন, আমি ঝড়ের মতো উড়ে গেলাম, বিশ্বাস আর আত্মবিশ্বাসের সবগুলো ভিত নড়ে উঠল, কটাদিন দীপকে ডাকতে গেলেও গলা ছেড়ে আওয়াজ করতে পারতাম না। গেল মাসে আমি শুধু বলেছিলাম, ‘পানির একটা ব্যবস্থা করেন, সালেক ভাই, বালতিতে পানি ধরে আর কয়দিন? দীপের টাইফয়েড। ছাদে সিক্স-বি-এর চাবিটা মোচড় দিয়ে রাখা হয়েছে, আমি তা জানি, দীপও জানে‒সাত বছরে ওর এটা জেনে ফেলা স্বাভাবিক। কিন্তু হাশেম চাচা নিচে মোটর ছাড়লে ছাদে উঠে ঘুরিয়ে দেয়নি ও কখনও‒চাপ খেয়ে যতটুকু পানি আসে, তা-ই বালতিতে ধরে রাখে, হাশেম চাচা ছাদে উঠে মোচড় দিয়ে বাকিটা বন্ধ করে দেওয়ার আগ পর্যন্ত। সালেক ভাই একদিন সুবিচারের কথা বলছিলেন, ‘পানি কম আসে লাইনে। যা আসে সবাইরে সমান ভাগ কইরা নিতে হইব। কেউ বেশি খাইব, কেউ পাইবই না‒এইটা কোনো বিচার হইল?’ তার কথা আমি মেনেছিলাম। কিন্তু আরেক দিন যখন দীপের অসুখের কথা বারবার বললাম, তিনি বুঝলেন, তার কথা আমি বিশ্বাস করিনি, সহে নিয়েছিলাম মাত্র। আমার মনোভাব প্রকাশিত হলে সালেক ভাই যারপর নাই বিরক্ত হলেন, শুকনো চোখে তাকিয়ে শুধু বললেন, ‘দেখি।’
আমি ভালো ব্যবহার সম্পর্কে অনেক আগেই একবার বলেছিলাম, এটা অন্যের কাছ থেকে সুবিধা বের করে আনার কৌশল, একবার তা বেরিয়ে আসলে কৌশলের আর দরকার পড়ে না‒মাছ ধরা পড়লে বড়শি তুলে ফেলা হয়‒পানিতে ফেলে রেখে বসে থাকে না কেউ।
দীপের জ্বর বাড়ছে। মহল্লার ডাক্তারের কাছে সন্ধ্যায় কয়েক দিন বসে থেকেছি। ডাক্তার বলেছে প্রচুর পানি খেতে। ওকে মারুফার কাছে একা ফেলে রেখে অফিসের কাজে মনোযোগ দিতে পারছি না। মারুফা রান্নায়-কান্নায়-ভালো গোছের মেয়ে, একটা রুটিনমাফিক কাজ আর অন্যটা মর্জিমাফিক। কান্নার মর্জি হলে কাঁদে, না হলে অস্থির হয়ে ওঠে‒খানিক্ষণ চোখের সামনে বই ধরে চোখ ভিজিয়ে নেয়। এর বাইরেও অনেক কিছু আছে‒ও জানে না, ওর হাজবেন্ড জানত, তাই বেচারা বাইরে বাইরে ঘুরত; কিন্তু কতকাল আর বাইরে বাইরে ঘুরবে? একদিন ঘরে এসে ওকেই বাইরে বের করে দিল।
জিএম স্যার সেদিন ডাকলেন। খুব সংক্ষেপে ধমকালেন, ‘আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল, আপনার মতো একজন লোককে একাউন্টসের দায়িত্ব দেওয়া ঠিক হয়নি। ঘরে সমস্যা করে রাখলে, অফিসের হিসাব মিলাবেন কী করে? এমডি স্যারের কাছে যান, উনি বোধহয় আপনাকে কিছু বলবেন।’ এমডি স্যারের চেম্বারে গেলাম। ‘মনির সাহেব, আমি আপনার বড়ভাই হিসাবে বলছি‒কথাগুলো অন্যভাবে নেবেন না‒মানুষ সোশ্যল জীব, তাছাড়া ফিজিক্যাল নিড বলে একটা বিষয় আছে। আপনার কাজে অমনোযোগের বিষয়টা নতুন নয়‒অনেক দিন ধরেই বলব বলব করে বলিনি‒আপনি আবার কীভাবে নেন‒লাইফে অনেক কিছুই হয়‒তাই বলে সব থেমে থাকে না‒আবার একবার চেষ্টা করে দেখেন। আমরা আপনাকে হারাতে চাই না,’ এমডি স্যার তার বিশাল শরীর নিয়ে চেয়ারের ভেতরে গেড়ে বসে চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো বললেন। আমি বললাম, ‘স্যার, আমি কি এখন যাব?’ স্যার বললেন, ‘যান, কাজগুলো মোসাব্বিরকে বুঝিয়ে দেন। অর্ডারটা কিছুক্ষণের ভেতরে হাতে পাবেন। আমরা আর আপনাকে একাউন্টসের কাজ দেখতে দিচ্ছি না‒ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্ত। আপনি বরং লজিস্টিক্স এন্ড সেনিটেশনটা দেখেন। মকবুল সাহেবের কাছে যান, উনি সব বুঝিয়ে দেবেন।…বেচারা মকবুল সাহেবের বয়স হয়েছে। কুড়ি বছর একই ডেস্কে একই পোস্টে থাকতে থাকতে লেথার্জিক হয়ে গেছেন। ভাবছি ওনাকে এজিএম করে রিটায়ারমেন্টে পাঠাব‒ম্যানেজমেন্টের তেমনই মত।’ আমি ডেস্কে এসে কিউবিকলের সেল্ফ থেকে লুকা প্যাসিওলির প্ল্যাস্টার-অব-প্যারিসের আবক্ষ মূর্তিটা তুলে নিয়ে ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রাখলাম। মোসাব্বির আশেপাশের ডেস্কে ঘোরাঘুরি করছে, এর ওর সামনে গিয়ে বসছে, অসংলগ্নভাবে কথা বলছে‒ডাকলেই এদিকে চলে আসবে। একাউন্টসের কাজে ওর খুব কৌতূহল। সময় পেলেই পাশে এসে বসে, জিজ্ঞাসা করে, কী করছি। একদিন অবসরে ম্যানেজমেন্ট একাউন্টিং বোঝাচ্ছিলাম ওকে। সবশুনে দাঁত-দুপাটি বের করে বলল, ‘ওসব ফালতু হিসেব নিকেশ, ওভাবে প্রোফিট-লস ক্যালকুলেট করা যায় না।’ তারপর ডেস্কের উপর থেকে টিএ-ডিএর ভাউচারগুলো হাতে নিয়ে বিড়বিড় করে খানিক্ষণ পড়ল, তারপর ধন্যবাদ দিয়ে চলে গেল।
অনেক দিন স্কুলে যায় না দেখে, দীপের বন্ধুরা স্কুল থেকে ফেরার পথে ওকে দেখতে এসেছিল। আমি ছিলাম না। দীপ চাবি হাতে করে ছয়তলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে ওদের সাথে দেখা করে গেছে। দারোয়ান হাশেম চাচার দিবানিদ্রায় ব্যাঘাত হওয়ায়, পাশ ফিরতে ফিরতে হাক দিয়েছিল, ‘সাবধান! সাবধান! দেখতাছি কইলাম।’ দীপের খুব লেগেছিল কথাটা। এ মাসে ভাড়া দেবার সময়, দীপের অসুখের বিষয়টা আবার বললাম। সালেক ভাই সেদিনের মতো শুকনো চোখে একবার তাকালেন। বেরিয়ে আসার সময় শুনি সালেক ভাই বিড়বিড় করছেন, ‘বন্ধুগো নিয়া বাসার সামনে খাড়াইয়া গপ করে দেখি!…আবার কয় জ্বর!’
শুক্রবার সকালে গ্যারেজে চ্যাঁচামেচি দেখে সিঁড়ি বেয়ে নেমে দেখি পুরো বিলডিংয়ের পুরুষ মানুষরা সবাই নিচে, আর দোতলার সাবু ভাইয়ের বাসার পুরুষ মহিলা শিশুরা সবাই। হাশেম চাচাকে পিঠমোড়া করে বেঁধে রেখেছে। আমি বললাম, ‘কী হয়েছে?’ সাবু ভাই কড়া দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। তারপর দারোয়ানের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে ধমকের সুরে বললেন, ‘কী হইব আর!’ চারতলার ভাড়াটিয়া আশিক ভাইয়ের দিকে তাকালাম। উনি বললেন, ‘রাতে দোতলার সাবু ভাইয়ের মোটর সাইকেল বের করে নিয়ে গেছে।’ সাবু ভাই বাইং হাউজে আছেন। মাঝে মাঝে অনেক রাতে ফিরতে হয় বলে মোটর সাইকেল কিনে নিয়েছেন। আমি বললাম, ‘হাশেম চাচা ছিলেন না?’ জিপারঅলা গোলাপি পায়জামার পকেটে দুই হাত গুঁজে দিয়ে পাঁচতলার মতি ভাই রসিয়ে রসিয়ে জবাব দিলেন, ‘দারোয়ান আবার থাকে নাকি? একরাতে থাকে ভাসানট্যাক বস্তিতে, অন্য রাতে শান্তির ছাপড়ায়। আরেক রাতে…।’ আশিক ভাই আর বলতে দিলেন না, কথার মাঝখানে মন্তব্যের গোঁজ ঢুকিয়ে দিলেন, ‘কিন্তু ফজরের ওয়াক্তে তো পানির মোটর ছাড়তে শুনি।’ মতি ভাই বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘আহা বুঝেন না! ফজরের আগ দিয়া আইসা পড়ে।’
সালেক ভাই সব দেখে হতভম্ব হয়ে গেছেন। তার ট্যান পড়া চামড়ায়ও বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। হাশেম চাচার বুকের উপর নারিকেলের ছোবড়ার দড়ি শক্ত করে বসে ছিল, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। সালেক ভাই হাশেম চাচার সামনে গিয়ে বসলেন। দুই হাত দিয়ে দড়িটা টেনেটুনে একটু আলগা করে দিয়ে উঠে এলেন। বাড়িঅলা নতুন ভাড়াটিয়া সাবু ভাইয়ের কোনো সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন না, কোনো কথায় দ্বিমত করেন না, আবার ‘ঠিক আছে’-ও বলেন না।
বেচারি সাবু ভাবির সাথে আজ দুবার চোখাচুখি হলো‒উনি নির্লিপ্ত চোখে আমার দিকে তাকালেন। এই বিল্ডিংয়ে নতুন এলেও ওই ভাবিকে আমি চিনি। মতি ভাই একদিন দোতলার সিঁড়িতে আমাকে পেয়ে গলা চড়িয়ে বলছিলেন, ‘এইখানে আর থাকন যাইব না।’ আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘কেন?’
‘কেন‒বুঝেন না?’
‘সালেক মিঞা নতুন ভাড়াটিয়া তুলব।’
‘আমরা কি ভাড়া দিচ্ছি না?’
‘দিতাছেন, নতুন ভাড়া দিতাছেন না, পুরান ভাড়া দিতাছেন।’
‘পুরান-ভাড়া নতুন ভাড়া‒এসব কী বলছেন?’
‘ভাড়াটিয়া রাখলে পুরান ভাড়া, ভাড়াটিয়া নামাইলে নতুন ভাড়া।’
‘কই, উনি তো কিছু বললেন না।’
‘কয় নাই‒কইব। আর কইলেও আফনে বুঝেন নাই। যাগো বুঝনের হ্যারা ঠিকই বুঝছে।’
‘আপনার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না।’
‘দোতলার কাদের ভাই…’
‘কাদের ভাই! কাদের ভাই তো তিন মাস আগেই চলে গেছেন।’
‘বুঝছে দেইখা চইলা গেছে।’
আমি বুঝব না দেখে মতি ভাই আমার সাথে আর কথা বাড়ালেন না। মনে হলো বাকি কথাগুলো নিজের সাথে বললেন‒গলা আরেকটু চড়ালেন‒সামনে দাঁড়ানো মানুষের সাথে এত জোরে কথা বলে না কেউ। মতি ভাই চ্যাঁচাচ্ছিলেন, ‘দ্যাখতাছেন না, দোতলার বাইং-হাউজ ভাই পরিবেশ নষ্ট করতাছে! এডভান্স সিস্টেম আছিল না‒তিনি আইসা চালু কইরা দিলেন‒ছয় মাসের এডভান্স দিয়ালাইছেন। দেয়াল ঘইষা একটুন চুন লাগাইয়া দিছে, কলের নাট বল্টু দুই খান প্যাঁচাইয়া দিছে, ভাইজানের মন গইলা পানি হইয়া গ্যাছে‒দুইগুন ভাড়া চাইছে, দুইগুনেই সই।’ মতি ভাই সিঁড়ি বেয়ে ধুপধাপ উপরে উঠে গেলেন। সিঁড়ির উপর ধুপধাপ পায়ের আওয়াজ আর কর্কশ হাকাহাকি শুনে, দোতলার নতুন ভাড়াটিয়া সাবু ভাইয়ের মিসেস আস্তে করে ড্রইং রুমের দরজা খুলে দেখে নিলেন। আমি ওনার দিকে একবার তাকিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেলাম।
সালেক ভাই সবার দিকে একবার চোখ ঘুরিয়ে নিয়ে বললেন, ‘আফনেরা যান। আফনেগো এহেনে কী কাম? আফনেগো তো কিছু চুরি অয় নাই।’ ‘হইতে কতক্ষণ!’ মতি ভাই অন্য দিকে তাকিয়ে বললেন। সালেক ভাই সেদিকে কান দিলেন না, সাবু ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘মেয়েছেলেরা যান। পুলিশ আসতাছে।’ মতি ভাই স্পিরিংয়ের মতো পা ফেলে সিঁড়ি বেয়ে এক নিমিষে উধাও হয়ে গেলেন। সাবু ভাবি এক হাতে সিঁড়ির রেলিং আর অন্যহাতে ছেলের হাত ধরে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলেন। একে একে অন্যরাও সিঁড়ির পথ ধরলেন। সাবু ভাই দারোয়ানের দিকে শ্যেন দৃষ্টি হেনে দাঁড়িয়ে থাকলেন। আমি উপরে উঠলাম না, এগিয়ে গিয়ে সালেক ভাইয়ের পাশে দাঁড়ালাম। আমি সবচেয়ে পুরোনো ভাড়াটিয়া। সালেক ভাই আমার দিকে তাকালেন‒দুদিন আগের সেই শুকনো চাহনি। দুদিন চোখের পাতা ফেলেও যে চোখ ভেজেনি, দুরাত ঘুমিয়ে যে চাহনি মিলায়নি, সে চাহনি অনেক শক্তিশালী‒যে কাউকে ঠেলে সরিয়ে দিতে পারে। আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে, সিঁড়ির রেলিং ধরে ধীর পায়ে উঠে এলাম।
সাবু ভাইয়ের মোটর সাইকেল পাওয়া গেছে কি না, জানি না। দীপের টাইফয়েড বাড়ছে। সারা দিন অফিস করি, সন্ধ্যায় মহল্লার ডাক্তারের চেম্বারে লাইনে বসে থাকি; না হলে প্যাথলজিকার টেস্টের জন্য ঢাকা প্যাথের রুমে রুমে দৌড়োই, নয়তো দীপের মাথাটা কাঁধের পরে নিয়ে লবিতে বসে অপেক্ষা করি। বাড়িঅলার সাথে কদিন আর দেখা হয় না। মতি ভাইয়ের সাথে একদিন গ্যারেজে দেখা। উনি বললেন, ‘সালেক মিঞার সাথে কথা হয়েছে?’ আমি বললাম, ‘না!’ উনি বললেন, ‘পুলিশের লোকজন কিছু জিগাইছে?’ আমি বললাম, ‘না!’ উনি বললেন, ‘পোলা ক্যামুন আছে?’ আমি বললাম, ‘ভালো না।’ উনি আর কিছু বললেন না, গেট খুলে বাইরে চলে গেলেন। পকেট গেট দিয়ে মাথা নিচু করে বেরুবার আগে, আমার দিকে আরেক বার তাকালেন।
ডাক্তার ওষুধ দিচ্ছে। মারুফা জলপট্টি দিচ্ছে। দীপ জ¦রের ভেতরে প্রলাপ বকছে, ‘এফেকশন‒এফেকশন মানে ভালোবাসা… এফেকশন‒এফেকশন মানে ভালোবাসা…।’ আমি অফিস বন্ধ করে দিয়েছি। ডাক্তার বলেছে, টাইফয়েড এমনিতেই সেরে যায়, একটু সেবা শুশ্রুষা করলে। তবে শরীরে র্যাশ উঠলে একটু সাবধান থাকতে হবে। সকাল থেকে ওর র্যাশ উঠতে শুরু করেছে।
ওইদিনই সন্ধ্যায় সালেক ভাই এলেন। হাতে এক জোড়া সবুজ ডাব, কিন্তু মুখ নারকেলের ছোবড়ার মতো শুকনো। বসতে বসতে বললেন, ‘ছেলের অবস্থা কী?’
আমি বললাম, ‘ভালো না। জ¦র কমছে না।’
‘ডাক্তার কী বলে?’
‘ওষুধ দেয়।’
‘কিছু বলে না?’
‘বলে।’
‘কী বলে?’
‘প্রচুর পানি খেতে।’
সালেক ভাই উত্তর শুনে মুখ কালো করে ফেললেন, ‘সে কথা না।’
আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ওনার চোখের দিকে তাকালাম। উনি জবাব দিলেন, ‘সারতে আর কয়দিন লাগবে‒সেই কথা।’ মারুফা লেবুর শরবত নিয়ে ড্রইং রুমে ঢুকল, ‘স্লামালাইকুম ভাইয়া।’ সালেক ভাই মাথা নেড়ে সালাম গ্রহণ করলেন, তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমি মহল্লার সিক্যুরিটিগুলারে ধমকাইছি। ব্যাটা, কারে দেখতে কারে দেখছস্‒উল্টাপাল্টা কথা কবি না!’ আমি বুঝলাম, উনি সেদিনের মোটর সাইকেল চুরির কথা বলছেন। এ বিষয়ে আলাপ করার বিন্দুমাত্র আগ্রহ আমার নাই। তবুও কথা চালাবার জন্য বললাম, ‘ওরা কী বলছে?’
‘ওরা তো কয়, ওই রাতে দীপরে দ্যাখা গেছে, গেট খুইলা দ্ইু বন্ধুরে নিয়া বাড়ির ভিতরে হান্দাইছে।’
সাত বছর আগে এই ছোট্ট এপার্টমেন্টটায় ওঠার আগে, মতি, জয়গুন, রাফেজা, সালামত ভাই, মজিদ চাচাদের সাথে শেওড়াপাড়ায় একটা টিনশেড বাড়ির দুই রুম নিয়ে থাকতাম। সকালে মজিদ চাচা সামনের প্যাসেজে হেঁটে হেঁটে দাঁতন করত, খক খক করে কফ ফেলত, দুপুরে আওয়াজ দিত রাফেজা-সালামতরা, আর রাতে হিস্ হিস্ করত মতি-জয়গুনরা। ছেলেকে নিয়ে এপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ে থাকব বলে অফিস বন্ধের দিনগুলোতে বাসা খুঁজতে শুরু করলাম। প্রতি বন্ধের দিনে ঘর থেকে বেরুতে দেখে দীপ একদিন জানতে চাইল, ‘ফ্রাইডেতে তুমি কোথায় যাও, বাবা?’
‘বাসা খুঁজতে যাই।’
‘আমাকেও নিয়ে যাও।’
‘রোদের ভেতর ঘুরে ঘুরে তোর জ্বর হবে।’
‘হোক। জ্বর হলে ভালোই হবে। ঘরে শুয়ে থাকতে পারব।’
‘ঘরে শুয়ে শুয়ে কী করবি?’
‘হিটলু বিটলু পড়ব।’
‘আচ্ছা, তাহলে শুয়ে শুয়ে হিটলু বিটলু পড়্, আমি বাসা খুঁজে আসি।’
আরেকদিন ও আমাকে আটকে ফেলল‒দুই হাত দুই দিকে মেলে ধরে পথের উপর দাঁড়াল, বলল, ‘আজ আমাকে নিয়ে যাও, বাবা।’ আমি বললাম, ‘ঘরে শুয়ে শুয়ে হিটলু বিটলু পড়্। কাল থেকে তো আবার স্কুলে যেতে হবে।’ ও দুই পা নাচাতে নাচাতে বলল, ‘হিটলু বিটলু সব শেষ করে ফেলেছি।’
‘তাহলে এখন রিভাইজ দে।’
‘রিভাইজ দিয়ে রেখেছি।’
ও দৌড় দিয়ে ওঘরে চলে গেল, ডেস্ক থেকে একটা হিটলু বিটলু নিয়ে এল। পাতা খুলে একটা ডায়লগ বক্সের উপর আঙুল রেখে একটা ইংরেজি শব্দ দেখাল, ‘ফাইট‒ফাইট মানে লড়াই করা।’ তারপর বই বন্ধ করে দৌড়ে গিয়ে ডেস্কে রেখে এল। কমিকসের কোনো নতুন বই পেলে, এক বসায় পড়ে ফেলে, প্রথম বার পড়ার সময় মাথা তোলে না, কারোর সাথে কথাও বলে না। দ্বিতীয় বার পড়ার আগে মারুফার কাছ থেকে অজানা শব্দগুলোর মানে জেনে নেয়।
ওর হিটলু বিটলু সব পড়া শেষ। অগত্যা ওকে সাথে করে নিয়ে বেরুতে হলো সেদিন। কাজিপাড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে বেশ ভেতরে, যেখানে বাড়িগুলো বাড়ির গায়ে গা লেগে উঠেছে, ড্রইং রুমের জানালা খুলে প্রতিবেশীদের বেডরুমে পাওয়া যায়, বেডরুমের জানালা খুলে হাত বাড়িয়ে বেলকনির তারে কাপড় নাড়তে হয়‒দরজা দিয়ে ঢুকে বেলকনিতে দাঁড়ানো যায় না, পানের পিক মুখে নিয়ে ঘোরার পরামর্শ যেখানে দেওয়া হয় না‒সিঁড়িতে খালাস করে শান্তি লাভের সুযোগ দেওয়া হয়‒তেমন একটি এলাকার তেমন একটি বাসায় টু-লেট দেখে ঢুকেছিলাম।
শীতল কালো বর্ণের মাঝবয়েসি এক লোক চাবি হাতে নিয়ে ছয়তলা দালানের ছয় তলার দক্ষিণ-পশ্চিম পাশের খালি হওয়া ফ্ল্যাটটা খুলে দিয়েছিলেন। ঢোকার সময় চোখ পড়ল দরজার চৌকাঠে সাঁটা টিনের নম্বর প্লেটের উপর‒সিক্স-বি‒মাঝ বরাবর একটিমাত্র পেরেক ঠোকা। এপার্টমেন্টের নম্বর থাকে। ভদ্রলোক পেছনে নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে দেখছিলেন, আমি ঠিকমতো দেখেশুনে নিচ্ছি কি না, আর তিন তলায় এনে তার দীর্ঘকাল বন্ধ থাকা ড্রইং রুমের ঠান্ডা সোফায় বসে আমাকে দেখেশুনে নিচ্ছিলেন‒দেখেশুনে তিনি বুঝেছিলেন, বাসা পছন্দ হয়েছে, আর আমি বুঝেছিলাম, আমার পোষাবে। লেবুর সরবত দেখিয়ে দীপকে বললেন ‘খাও, মিস্টি লাগব।’ তারপর দীপের কাছে ওর স্কুলের গল্প শুনলেন।
এ চেহারার মানুষ আমি এর আগেও দেখেছি। এদের মুখণ্ডল একটি চ্যাপ্টা পান পাতার মতো। পান পাতার যে জায়গাটাতে পত্রশীর্ষ সরু হয়ে নেমে গেছে, সে জায়গায় এদের একগুচ্ছ দাড়ি মোচড় দিয়ে থুতনির নিচে নেমে গেছে, থুতনি ধরে ঝুলে পড়েনি, ঝুলে পড়ার ভয়ে মাঝে মাঝে হাত দিয়ে ডলে নিচে পরিপাটি করে রেখে দেয় এরা‒এ ধরণের লোকরা খুব বাকসংযত হয়‒কথার তাৎক্ষণিক অর্থ, স্বল্পমেয়াদি অর্থ আর দীর্ঘমেয়াদি অর্থ‒তিনটাই আলাদা করে জানে। মুখের চামড়া অভিজ্ঞতার আঁচে পুড়িয়ে পাকা করা‒মনের ভাব বোঝা যায় না। ভাবশূন্য একজন মানুষের সাথে আমার ভাব হওয়ার কথা না, কিন্তু হয়ে গেল, রীতিমতো ভালোবাসাই হয়ে গেল, উনি যখন বললেন, ‘আপনার ছেলেটারে খুবই ভালা লাগল, ম্যাথমেটিক্যাল ব্রেইন।’ আমি একটু চমকে উঠেছিলাম। উনি ‘ম্যাথ’ শব্দটা জানেন।
এপার্টমেন্টে থাকব বলে বাসাটা নিয়ে নিয়েছিলাম। সাত বছর ধরে দীপকে নিয়ে সেখানেই আছি। সাত বছরে বাসার দেয়ালের সিমেন্ট-চুনকাম খসে পাতলা হয়ে গেছে, বাথরুমে শাওয়ার বিকল হয়ে ঝুলে পড়ে আছে সেই কবে থেকে, বেসিনের কল ঘুরাতে গেলে সহজে হাতের ভেতরে আসে না‒দুই পাশে মাথা নাড়িয়ে না বলে দেয়‒ম্যালা টাকার কাজ জমে গেছে‒আর বাসাভাড়া নিয়মিত-অনিয়মিতভাবে বেড়ে দ্বিগুনে ঠেকেছে। এত টাকার কাজ একসাথে জমানোর জন্য আমিই দায়ী। ভালোবাসার কারণেই সময়ে-অসময়ে বিরক্ত করিনি। ফলে যেদিন একটু বিরক্ত করতে গেলাম, অনেক দিনের ভালোবাসার বিপরীতে জমানো অনেক বিরক্তি সালেক ভাই একসাথে ঝেড়ে ফেললেন, আমি ঝড়ের মতো উড়ে গেলাম, বিশ্বাস আর আত্মবিশ্বাসের সবগুলো ভিত নড়ে উঠল, কটাদিন দীপকে ডাকতে গেলেও গলা ছেড়ে আওয়াজ করতে পারতাম না। গেল মাসে আমি শুধু বলেছিলাম, ‘পানির একটা ব্যবস্থা করেন, সালেক ভাই, বালতিতে পানি ধরে আর কয়দিন? দীপের টাইফয়েড। ছাদে সিক্স-বি-এর চাবিটা মোচড় দিয়ে রাখা হয়েছে, আমি তা জানি, দীপও জানে‒সাত বছরে ওর এটা জেনে ফেলা স্বাভাবিক। কিন্তু হাশেম চাচা নিচে মোটর ছাড়লে ছাদে উঠে ঘুরিয়ে দেয়নি ও কখনও‒চাপ খেয়ে যতটুকু পানি আসে, তা-ই বালতিতে ধরে রাখে, হাশেম চাচা ছাদে উঠে মোচড় দিয়ে বাকিটা বন্ধ করে দেওয়ার আগ পর্যন্ত। সালেক ভাই একদিন সুবিচারের কথা বলছিলেন, ‘পানি কম আসে লাইনে। যা আসে সবাইরে সমান ভাগ কইরা নিতে হইব। কেউ বেশি খাইব, কেউ পাইবই না‒এইটা কোনো বিচার হইল?’ তার কথা আমি মেনেছিলাম। কিন্তু আরেক দিন যখন দীপের অসুখের কথা বারবার বললাম, তিনি বুঝলেন, তার কথা আমি বিশ্বাস করিনি, সহে নিয়েছিলাম মাত্র। আমার মনোভাব প্রকাশিত হলে সালেক ভাই যারপর নাই বিরক্ত হলেন, শুকনো চোখে তাকিয়ে শুধু বললেন, ‘দেখি।’
আমি ভালো ব্যবহার সম্পর্কে অনেক আগেই একবার বলেছিলাম, এটা অন্যের কাছ থেকে সুবিধা বের করে আনার কৌশল, একবার তা বেরিয়ে আসলে কৌশলের আর দরকার পড়ে না‒মাছ ধরা পড়লে বড়শি তুলে ফেলা হয়‒পানিতে ফেলে রেখে বসে থাকে না কেউ।
দীপের জ্বর বাড়ছে। মহল্লার ডাক্তারের কাছে সন্ধ্যায় কয়েক দিন বসে থেকেছি। ডাক্তার বলেছে প্রচুর পানি খেতে। ওকে মারুফার কাছে একা ফেলে রেখে অফিসের কাজে মনোযোগ দিতে পারছি না। মারুফা রান্নায়-কান্নায়-ভালো গোছের মেয়ে, একটা রুটিনমাফিক কাজ আর অন্যটা মর্জিমাফিক। কান্নার মর্জি হলে কাঁদে, না হলে অস্থির হয়ে ওঠে‒খানিক্ষণ চোখের সামনে বই ধরে চোখ ভিজিয়ে নেয়। এর বাইরেও অনেক কিছু আছে‒ও জানে না, ওর হাজবেন্ড জানত, তাই বেচারা বাইরে বাইরে ঘুরত; কিন্তু কতকাল আর বাইরে বাইরে ঘুরবে? একদিন ঘরে এসে ওকেই বাইরে বের করে দিল।
জিএম স্যার সেদিন ডাকলেন। খুব সংক্ষেপে ধমকালেন, ‘আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল, আপনার মতো একজন লোককে একাউন্টসের দায়িত্ব দেওয়া ঠিক হয়নি। ঘরে সমস্যা করে রাখলে, অফিসের হিসাব মিলাবেন কী করে? এমডি স্যারের কাছে যান, উনি বোধহয় আপনাকে কিছু বলবেন।’ এমডি স্যারের চেম্বারে গেলাম। ‘মনির সাহেব, আমি আপনার বড়ভাই হিসাবে বলছি‒কথাগুলো অন্যভাবে নেবেন না‒মানুষ সোশ্যল জীব, তাছাড়া ফিজিক্যাল নিড বলে একটা বিষয় আছে। আপনার কাজে অমনোযোগের বিষয়টা নতুন নয়‒অনেক দিন ধরেই বলব বলব করে বলিনি‒আপনি আবার কীভাবে নেন‒লাইফে অনেক কিছুই হয়‒তাই বলে সব থেমে থাকে না‒আবার একবার চেষ্টা করে দেখেন। আমরা আপনাকে হারাতে চাই না,’ এমডি স্যার তার বিশাল শরীর নিয়ে চেয়ারের ভেতরে গেড়ে বসে চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো বললেন। আমি বললাম, ‘স্যার, আমি কি এখন যাব?’ স্যার বললেন, ‘যান, কাজগুলো মোসাব্বিরকে বুঝিয়ে দেন। অর্ডারটা কিছুক্ষণের ভেতরে হাতে পাবেন। আমরা আর আপনাকে একাউন্টসের কাজ দেখতে দিচ্ছি না‒ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্ত। আপনি বরং লজিস্টিক্স এন্ড সেনিটেশনটা দেখেন। মকবুল সাহেবের কাছে যান, উনি সব বুঝিয়ে দেবেন।…বেচারা মকবুল সাহেবের বয়স হয়েছে। কুড়ি বছর একই ডেস্কে একই পোস্টে থাকতে থাকতে লেথার্জিক হয়ে গেছেন। ভাবছি ওনাকে এজিএম করে রিটায়ারমেন্টে পাঠাব‒ম্যানেজমেন্টের তেমনই মত।’ আমি ডেস্কে এসে কিউবিকলের সেল্ফ থেকে লুকা প্যাসিওলির প্ল্যাস্টার-অব-প্যারিসের আবক্ষ মূর্তিটা তুলে নিয়ে ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রাখলাম। মোসাব্বির আশেপাশের ডেস্কে ঘোরাঘুরি করছে, এর ওর সামনে গিয়ে বসছে, অসংলগ্নভাবে কথা বলছে‒ডাকলেই এদিকে চলে আসবে। একাউন্টসের কাজে ওর খুব কৌতূহল। সময় পেলেই পাশে এসে বসে, জিজ্ঞাসা করে, কী করছি। একদিন অবসরে ম্যানেজমেন্ট একাউন্টিং বোঝাচ্ছিলাম ওকে। সবশুনে দাঁত-দুপাটি বের করে বলল, ‘ওসব ফালতু হিসেব নিকেশ, ওভাবে প্রোফিট-লস ক্যালকুলেট করা যায় না।’ তারপর ডেস্কের উপর থেকে টিএ-ডিএর ভাউচারগুলো হাতে নিয়ে বিড়বিড় করে খানিক্ষণ পড়ল, তারপর ধন্যবাদ দিয়ে চলে গেল।
অনেক দিন স্কুলে যায় না দেখে, দীপের বন্ধুরা স্কুল থেকে ফেরার পথে ওকে দেখতে এসেছিল। আমি ছিলাম না। দীপ চাবি হাতে করে ছয়তলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে ওদের সাথে দেখা করে গেছে। দারোয়ান হাশেম চাচার দিবানিদ্রায় ব্যাঘাত হওয়ায়, পাশ ফিরতে ফিরতে হাক দিয়েছিল, ‘সাবধান! সাবধান! দেখতাছি কইলাম।’ দীপের খুব লেগেছিল কথাটা। এ মাসে ভাড়া দেবার সময়, দীপের অসুখের বিষয়টা আবার বললাম। সালেক ভাই সেদিনের মতো শুকনো চোখে একবার তাকালেন। বেরিয়ে আসার সময় শুনি সালেক ভাই বিড়বিড় করছেন, ‘বন্ধুগো নিয়া বাসার সামনে খাড়াইয়া গপ করে দেখি!…আবার কয় জ্বর!’
শুক্রবার সকালে গ্যারেজে চ্যাঁচামেচি দেখে সিঁড়ি বেয়ে নেমে দেখি পুরো বিলডিংয়ের পুরুষ মানুষরা সবাই নিচে, আর দোতলার সাবু ভাইয়ের বাসার পুরুষ মহিলা শিশুরা সবাই। হাশেম চাচাকে পিঠমোড়া করে বেঁধে রেখেছে। আমি বললাম, ‘কী হয়েছে?’ সাবু ভাই কড়া দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। তারপর দারোয়ানের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে ধমকের সুরে বললেন, ‘কী হইব আর!’ চারতলার ভাড়াটিয়া আশিক ভাইয়ের দিকে তাকালাম। উনি বললেন, ‘রাতে দোতলার সাবু ভাইয়ের মোটর সাইকেল বের করে নিয়ে গেছে।’ সাবু ভাই বাইং হাউজে আছেন। মাঝে মাঝে অনেক রাতে ফিরতে হয় বলে মোটর সাইকেল কিনে নিয়েছেন। আমি বললাম, ‘হাশেম চাচা ছিলেন না?’ জিপারঅলা গোলাপি পায়জামার পকেটে দুই হাত গুঁজে দিয়ে পাঁচতলার মতি ভাই রসিয়ে রসিয়ে জবাব দিলেন, ‘দারোয়ান আবার থাকে নাকি? একরাতে থাকে ভাসানট্যাক বস্তিতে, অন্য রাতে শান্তির ছাপড়ায়। আরেক রাতে…।’ আশিক ভাই আর বলতে দিলেন না, কথার মাঝখানে মন্তব্যের গোঁজ ঢুকিয়ে দিলেন, ‘কিন্তু ফজরের ওয়াক্তে তো পানির মোটর ছাড়তে শুনি।’ মতি ভাই বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘আহা বুঝেন না! ফজরের আগ দিয়া আইসা পড়ে।’
সালেক ভাই সব দেখে হতভম্ব হয়ে গেছেন। তার ট্যান পড়া চামড়ায়ও বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। হাশেম চাচার বুকের উপর নারিকেলের ছোবড়ার দড়ি শক্ত করে বসে ছিল, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। সালেক ভাই হাশেম চাচার সামনে গিয়ে বসলেন। দুই হাত দিয়ে দড়িটা টেনেটুনে একটু আলগা করে দিয়ে উঠে এলেন। বাড়িঅলা নতুন ভাড়াটিয়া সাবু ভাইয়ের কোনো সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন না, কোনো কথায় দ্বিমত করেন না, আবার ‘ঠিক আছে’-ও বলেন না।
বেচারি সাবু ভাবির সাথে আজ দুবার চোখাচুখি হলো‒উনি নির্লিপ্ত চোখে আমার দিকে তাকালেন। এই বিল্ডিংয়ে নতুন এলেও ওই ভাবিকে আমি চিনি। মতি ভাই একদিন দোতলার সিঁড়িতে আমাকে পেয়ে গলা চড়িয়ে বলছিলেন, ‘এইখানে আর থাকন যাইব না।’ আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘কেন?’
‘কেন‒বুঝেন না?’
‘সালেক মিঞা নতুন ভাড়াটিয়া তুলব।’
‘আমরা কি ভাড়া দিচ্ছি না?’
‘দিতাছেন, নতুন ভাড়া দিতাছেন না, পুরান ভাড়া দিতাছেন।’
‘পুরান-ভাড়া নতুন ভাড়া‒এসব কী বলছেন?’
‘ভাড়াটিয়া রাখলে পুরান ভাড়া, ভাড়াটিয়া নামাইলে নতুন ভাড়া।’
‘কই, উনি তো কিছু বললেন না।’
‘কয় নাই‒কইব। আর কইলেও আফনে বুঝেন নাই। যাগো বুঝনের হ্যারা ঠিকই বুঝছে।’
‘আপনার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না।’
‘দোতলার কাদের ভাই…’
‘কাদের ভাই! কাদের ভাই তো তিন মাস আগেই চলে গেছেন।’
‘বুঝছে দেইখা চইলা গেছে।’
আমি বুঝব না দেখে মতি ভাই আমার সাথে আর কথা বাড়ালেন না। মনে হলো বাকি কথাগুলো নিজের সাথে বললেন‒গলা আরেকটু চড়ালেন‒সামনে দাঁড়ানো মানুষের সাথে এত জোরে কথা বলে না কেউ। মতি ভাই চ্যাঁচাচ্ছিলেন, ‘দ্যাখতাছেন না, দোতলার বাইং-হাউজ ভাই পরিবেশ নষ্ট করতাছে! এডভান্স সিস্টেম আছিল না‒তিনি আইসা চালু কইরা দিলেন‒ছয় মাসের এডভান্স দিয়ালাইছেন। দেয়াল ঘইষা একটুন চুন লাগাইয়া দিছে, কলের নাট বল্টু দুই খান প্যাঁচাইয়া দিছে, ভাইজানের মন গইলা পানি হইয়া গ্যাছে‒দুইগুন ভাড়া চাইছে, দুইগুনেই সই।’ মতি ভাই সিঁড়ি বেয়ে ধুপধাপ উপরে উঠে গেলেন। সিঁড়ির উপর ধুপধাপ পায়ের আওয়াজ আর কর্কশ হাকাহাকি শুনে, দোতলার নতুন ভাড়াটিয়া সাবু ভাইয়ের মিসেস আস্তে করে ড্রইং রুমের দরজা খুলে দেখে নিলেন। আমি ওনার দিকে একবার তাকিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেলাম।
সালেক ভাই সবার দিকে একবার চোখ ঘুরিয়ে নিয়ে বললেন, ‘আফনেরা যান। আফনেগো এহেনে কী কাম? আফনেগো তো কিছু চুরি অয় নাই।’ ‘হইতে কতক্ষণ!’ মতি ভাই অন্য দিকে তাকিয়ে বললেন। সালেক ভাই সেদিকে কান দিলেন না, সাবু ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘মেয়েছেলেরা যান। পুলিশ আসতাছে।’ মতি ভাই স্পিরিংয়ের মতো পা ফেলে সিঁড়ি বেয়ে এক নিমিষে উধাও হয়ে গেলেন। সাবু ভাবি এক হাতে সিঁড়ির রেলিং আর অন্যহাতে ছেলের হাত ধরে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলেন। একে একে অন্যরাও সিঁড়ির পথ ধরলেন। সাবু ভাই দারোয়ানের দিকে শ্যেন দৃষ্টি হেনে দাঁড়িয়ে থাকলেন। আমি উপরে উঠলাম না, এগিয়ে গিয়ে সালেক ভাইয়ের পাশে দাঁড়ালাম। আমি সবচেয়ে পুরোনো ভাড়াটিয়া। সালেক ভাই আমার দিকে তাকালেন‒দুদিন আগের সেই শুকনো চাহনি। দুদিন চোখের পাতা ফেলেও যে চোখ ভেজেনি, দুরাত ঘুমিয়ে যে চাহনি মিলায়নি, সে চাহনি অনেক শক্তিশালী‒যে কাউকে ঠেলে সরিয়ে দিতে পারে। আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে, সিঁড়ির রেলিং ধরে ধীর পায়ে উঠে এলাম।
সাবু ভাইয়ের মোটর সাইকেল পাওয়া গেছে কি না, জানি না। দীপের টাইফয়েড বাড়ছে। সারা দিন অফিস করি, সন্ধ্যায় মহল্লার ডাক্তারের চেম্বারে লাইনে বসে থাকি; না হলে প্যাথলজিকার টেস্টের জন্য ঢাকা প্যাথের রুমে রুমে দৌড়োই, নয়তো দীপের মাথাটা কাঁধের পরে নিয়ে লবিতে বসে অপেক্ষা করি। বাড়িঅলার সাথে কদিন আর দেখা হয় না। মতি ভাইয়ের সাথে একদিন গ্যারেজে দেখা। উনি বললেন, ‘সালেক মিঞার সাথে কথা হয়েছে?’ আমি বললাম, ‘না!’ উনি বললেন, ‘পুলিশের লোকজন কিছু জিগাইছে?’ আমি বললাম, ‘না!’ উনি বললেন, ‘পোলা ক্যামুন আছে?’ আমি বললাম, ‘ভালো না।’ উনি আর কিছু বললেন না, গেট খুলে বাইরে চলে গেলেন। পকেট গেট দিয়ে মাথা নিচু করে বেরুবার আগে, আমার দিকে আরেক বার তাকালেন।
ডাক্তার ওষুধ দিচ্ছে। মারুফা জলপট্টি দিচ্ছে। দীপ জ¦রের ভেতরে প্রলাপ বকছে, ‘এফেকশন‒এফেকশন মানে ভালোবাসা… এফেকশন‒এফেকশন মানে ভালোবাসা…।’ আমি অফিস বন্ধ করে দিয়েছি। ডাক্তার বলেছে, টাইফয়েড এমনিতেই সেরে যায়, একটু সেবা শুশ্রুষা করলে। তবে শরীরে র্যাশ উঠলে একটু সাবধান থাকতে হবে। সকাল থেকে ওর র্যাশ উঠতে শুরু করেছে।
ওইদিনই সন্ধ্যায় সালেক ভাই এলেন। হাতে এক জোড়া সবুজ ডাব, কিন্তু মুখ নারকেলের ছোবড়ার মতো শুকনো। বসতে বসতে বললেন, ‘ছেলের অবস্থা কী?’
আমি বললাম, ‘ভালো না। জ¦র কমছে না।’
‘ডাক্তার কী বলে?’
‘ওষুধ দেয়।’
‘কিছু বলে না?’
‘বলে।’
‘কী বলে?’
‘প্রচুর পানি খেতে।’
সালেক ভাই উত্তর শুনে মুখ কালো করে ফেললেন, ‘সে কথা না।’
আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ওনার চোখের দিকে তাকালাম। উনি জবাব দিলেন, ‘সারতে আর কয়দিন লাগবে‒সেই কথা।’ মারুফা লেবুর শরবত নিয়ে ড্রইং রুমে ঢুকল, ‘স্লামালাইকুম ভাইয়া।’ সালেক ভাই মাথা নেড়ে সালাম গ্রহণ করলেন, তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমি মহল্লার সিক্যুরিটিগুলারে ধমকাইছি। ব্যাটা, কারে দেখতে কারে দেখছস্‒উল্টাপাল্টা কথা কবি না!’ আমি বুঝলাম, উনি সেদিনের মোটর সাইকেল চুরির কথা বলছেন। এ বিষয়ে আলাপ করার বিন্দুমাত্র আগ্রহ আমার নাই। তবুও কথা চালাবার জন্য বললাম, ‘ওরা কী বলছে?’
‘ওরা তো কয়, ওই রাতে দীপরে দ্যাখা গেছে, গেট খুইলা দ্ইু বন্ধুরে নিয়া বাড়ির ভিতরে হান্দাইছে।’
Tuesday, September 15, 2026
গল্প- ডুমুরের ফুল এবং সাপের পাঁচ পা by নীহারুল ইসলাম

ডুমুরের
ফুল আর সাপের পাঁচ পা দেখা নিয়ে অনেক কথা শোনা যায়। তবে ওই দুই জিনিসই
কখনো চোখে দেখা যায় না। কেউ কখনো দেখেনি। আমি অন্তত এতদিন সেটাই জানতাম।
কিন্তু হঠাৎ করে আন্দু আমাকে বলল, ডুমুরের ফুল দেখবি?
আন্দু আমাদের বন্ধু। তার কথায় আমি চমকে উঠলাম। বললাম, তুই একটা পাগল নাকি! ডুমুরের ফুল হয় নাকি যে তুই আমায় দেখাবি?
আন্দু বলল, হয় রে হয়! দেখার চোখ থাকলে দেখাও যায়। আমি আজকাল রোজ দেখি।
ছোঁড়া বলে কী? ডুমুরের ফুল হয়, সেই ফুল আবার সে দেখতে পায়! ছোঁড়া কি তবে সত্যিই পাগল হয়ে গেল?
আন্দুর কথা আমার বিশ্বাস হয় না। তাকে আমি বলি, চল – কোথায় ডুমুরের ফুল আছে আমি দেখব।
আন্দু বলল, আজ নয়, কাল দেখাব তোকে। ঠিক দশটার সময় রেডি থাকিস।
– ঠিক আছে রেডি থাকব। কথার খেলাপ করবি না কিন্তু।
– কথা খেলাপের কী আছে? আমি রোজ দেখি। তুই আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। না হয় তুইও একদিন দেখলি। তাছাড়া একা দেখে সুখ হয় না, সঙ্গে কেউ থাকলে বেশি সুখ পাওয়া যায়।
আন্দুর এমন কথায় আমার গর্ব হয়। সে যে আমাকে এত পাত্তা দেয়, বন্ধু ভাবে – এর আগে কখনো বুঝতে পারিনি। তাই হয়তো আন্দুর ডুমুরের ফুল দেখার গল্পটা আমি বিশ্বাস করে বসি।
আন্দু আমাদের গ্রামের ছেলে। আমার বয়সী। বলতে গেলে আমরা একসঙ্গে জন্মেছি – একসঙ্গেই বেড়ে উঠছি। তাই ওকে আমি যতটা জানি, আর কেউ জানে না। এমনকি ওর মা সখী বেওয়া পর্যন্ত জানে না। সখী বেওয়া জানবে কী করে, সে তো স্বামী-মরা, চাকরি করে বেড়ায়, শহরে যায় চাকরি করতে। সেই ফজরের নামাজের আজান পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যায়। ফিরে আসে মাগরিবের নামাজের আজানের পর।
আন্দু যখন খুব ছোট ছিল সেও মায়ের সঙ্গে যেত। শহরের ইংলিশ মিডিয়াম ইশকুলে পড়ত। কিন্তু যেই সে বিড়ি-সিগারেট টানতে শিখল, মায়ের সঙ্গ ছেড়ে দিলো। আজকাল সে আর স্কুলে যায় না। আমরা যখন গ্রামের ইশ্কুলে পড়তে যাই, সে তখন ডোমকুল-মাঠে তার রাখালবন্ধুদের সঙ্গে খেলে বেড়ায়। পাখপাখালি শিকার করে। কিংবা বিল-ডোমকুলের নহরে ছিপ ফেলে মাছ ধরে। সেইসব মাছ আবার ওই মাঠেই রাখালবন্ধুদের সঙ্গে পুড়িয়ে খায়। আরো অনেক ব্যাপারস্যাপার আছে তার।
শুধু বিকেলবেলা সে আমাদের সঙ্গী হয়, দরগার মাঠে যখন আমরা একসঙ্গে ফুটবল খেলি কিংবা গুলিডাণ্ডা। আমাদের সঙ্গে আরো অনেকেই খেলে। কিন্তু আন্দুর সঙ্গে আমরা কেউ কোনো খেলাতেই কখনো পেরে উঠি না। সবকিছুতে সে একাই একশ। সত্যি কথা বলতে আমরা প্রত্যেকেই তাকে রীতিমতো সমীহ করে চলি। সমীহ না করে আমাদের কোনো উপায় থাকে না। আমরা জানি, এই বয়সে সে যা যা করে বেড়ায় তার জন্য যে সাহস লাগে তা আমাদের কারোর নেই।
যেমন দরগার মাঠের সেই জঙ্গলে গোদানা আছে। এটা আমরা সকলেই জানি। তাই সন্ধ্যার আগে সেখান থেকে বাড়ি ফিরে আসি। আন্দু কিন্তু ফিরে আসে না। একা একা বসে থাকে। বিড়ি টানে। স্বভাবতই এই বয়সে আমাদের চোখে আন্দু রীতিমতো হিরো সালমান খান। না হলে পরদিন আমি হঠাৎ করে তার সঙ্গী হয়ে ডুমুরের ফুল দেখতে যেতে রাজি হবো কেন?
-----দুই-----
আমার স্কুল ছিল। বাড়ি থেকে স্কুলে যাচ্ছি বলে বেরিয়ে আমি দরগাতলায় এসে বসে আছি। আন্দু আমাকে এখানেই আসতে বলেছে; কিন্তু কোথায় সে? এখনো তার পাত্তা নেই কেন? আমার যে ভয় করছে! ঘুরেফিরে মনে পড়ছে আমি যেখানে বসে আন্দুর অপেক্ষা করছি, জায়গাটার নাম দরগাতলা। এখানে জিনের একরাত্রে তৈরি একটা ইঁদারা আর একটা মসজিদ আছে। যদিও এখন দুটোই পরিত্যক্ত। একটা বিশাল বটগাছ ঝুরি নামিয়ে দুটোকেই ঢেকে রেখেছে। আর এসবের দখল নিয়ে রেখেছে একটা শয়তান গোদানা। ভেতরে প্রবেশের কোনো পথ নেই। কেউ প্রবেশ করতে চাইলেও পারে না, ওই গোদানার ভয়ে। গোদানাটা নাকি পাহারা দেয় জায়গাটা। কেউ প্রবেশ করলে তার আর রক্ষে থাকে না। মুরব্বিরা গল্প করে, বহুদিন আগে ডিহিপাড়ার বাশেদ সেখ নামে একজনকে ঘাড় মটকে মেরে ফেলেছিল ওই গোদানাতেই।
আন্দুর অপেক্ষা করতে করতে গোদানার ভয় আমাকে ঘিরে ধরছে। আমাদের স্কুলটা এখন থেকে খুব বেশি দূরে নয়, শেষ পর্যন্ত স্কুলেই চলে যাব কি না ভাবছি। হঠাৎ দেখি আন্দুকে। কী একটা গান গুনগুন করতে করতে চামাবেড়ার ডিহির ওপর দিয়ে হেঁটে আসছে।
বুঝতে পারি যেখানে আতঙ্ক, সেখানেই আন্দু। সাধারণত আমরা কেউ চামাবেড়ার ডিহি মাড়াই না। আমরা জানি, যত অপদেবতার আশ্রয় নাকি ওই ডিহিতেই। আমাদের গ্রাম, এমনকি আশপাশের গ্রামে যদি কারো ওপর অপদেবতা ভর করে, দুলহাবুড়ি কিংবা সায়েদ ওঝার তাড়া খেয়ে তারা আশ্রয় নেয় ওই ডিহিতেই। তাই নাকি সেখানে কোনো আবাদ হয় না, ফসল ফলে না। সারাবছর অনাবাদি পড়ে থাকে। বাড়ির গরু-ছাগল-কুকুর-হাঁস-মুরগি মরলে ফেলে আসা হয় সেখানে। অথচ আন্দু বলে, ওরকম ডিহি নাকি দুনিয়ায় আর একটিও নেই।
একদিন আন্দুকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, দুনিয়ায় কেন নেই ওরকম আর একটি ডিহি?
কোনো জবাব দেয়নি সে। বদলে একদিন সে আমাকে নিয়ে গেছিল ওই ডিহিতে। আমি দেখেছিলাম সেই ডিহি। অদ্ভুত জায়গা বটে। মাটি যা আছে তার চেয়ে বেশি আছে খোলামকুচি। সবুজের চিহ্ন নেই। গাছ বলতে যা আছে কাঁটাঝোপ আর দু-চারটে বাবলা গাছ। যেগুলোর ডালে সর্বক্ষণ কাক-শকুন বসে থাকে লোলুপদৃষ্টি মেলে। অথচ বৃষ্টি হলে নাকি ওই ডিহি ফুঁড়ে চাঁদির মোহর উঠে আসে। সেই গল্পও করছিল আন্দু। শুধু গল্পই করেনি, পকেট থেকে একটা চাঁদির মোহর বের করে আমাকে দেখিয়ে বলেছিল, জানিস – কালিপালের ডিহিতে পাওয়া এরকম মোহর আমার কাছে প্রচুর আছে।
শেষ পর্যন্ত আন্দু যখন আমার কাছে এলো, দেখলাম তার দুই হাতে আলতো করে ধরা একটা ফুটফুটে ফড়িং। আমি কিছু বলার আগেই সে বলতে শুরু করল, জানিস বন্ধু – এটা আমার একটা নতুন খেলা। এই খেলার নাম ফড়িংধরা খেলা। এর একটা একটা করে পাখনা ছিঁড়ে এর মৃত্যু দেখতে আজকাল আমার খুব ভালো লাগে। হয়তো জিজ্ঞেস করবি, এমন নিষ্ঠুর খেলার শখ আবার আমার হলো কী করে? তার উত্তরে বলি, খেলাটা নিষ্ঠুর বটে। তবে খুব মজার। আর এ-খেলার শখটা আমার এমনি এমনি হয়নি। তুই জানিস – একসময় আমার প্রিয় শখ ছিল পুকুরে ছিপ ফেলে মাছ ধরা। সেটাও একটা নিষ্ঠুর খেলা। যদিও মানুষ তা স্বীকার করবে না। মাছেভাতে বাঙালি একটা কথা আছে না! সেটা অন্য প্রসঙ্গ। যাই হোক, আমি ছিপ ফেলে ফাতনার দিকে চেয়ে থাকতাম আর অপেক্ষা করতাম, কখন মাছ বড়শির টোপে মুখ দেবে আর আমি আমার হাতে ধরা ছিপে মারব খাঁচ আর উঠে আসবে মাছ! কিন্তু তার আগেই কোথা থেকে ফড়িং উড়ে এসে বসল জলে ভাসা আমার ছিপের ফাতনার ওপর। ফাতনা নড়ে যেত। আমি ভাবতাম মাছ বড়শির টোপে মুখ দিয়েছে। ছিপে খাঁচ মারতাম। অথচ শূন্য বড়শি উঠে আসত আমার হাতে, আমার ভীষণ খারাপ লাগত। খুব রাগ হতো।
সেই রাগ থেকেই আমার ছিপে মাছ ধরার শখ কোথায় হারিয়ে গেছে। এখন আমি ফড়িংয়ের পেছনে পড়ে থাকি। যেখানেই ফড়িং দেখি, খুব ধৈর্য ধরে আগে সেটাকে ধরি। তারপর তার একটা একটা করে পাখনা ছিঁড়ি। সে ছটফট করতে থাকে, কিন্তু আমি তারিয়ে তারিয়ে তার মৃত্যু দেখি। আজ অবশ্য ধৈর্য ধরে শুধু ফড়িংটাকে ধরেছি মাত্র। তারপর ডুমুরের ফুল দেখাব বলে তোকে দাঁড় করিয়ে রেখেছি ব্যাপারটা মনে পড়তেই একে সঙ্গে করে নিয়ে সরাসরি তোর কাছে চলে এলাম। এই বিরান মাঠে একা একা দাঁড়িয়ে থাকতে যদি তুই ভয় পাস! কে জানে, ওই জঙ্গলের গোদানা যদি জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে তোর ঘাড় মটকে দেয়।
আন্দু বলল, আর একটু দাঁড়া। আগে এটাকে সাপের পাঁচ পা দেখিয়ে নিয়ে আসি। তারপর তোকে ডুমুরের ফুল দেখাব। বলেই আন্দু ফড়িংটাকে সঙ্গে নিয়ে ভয়ংকর জঙ্গলটার ভেতর ঢুকে গেল।
----তিন----
আন্দুকে আমার কেমন লাগে! তার কথা যেন আমি ঠিক ঠিক বুঝতে পারছি না। তার কথায় ডুমুরের ফুল দেখতে এসে আমি কোনো ভুল করিনি তো? আমার পিঠে স্কুলব্যাগ। অথচ আমি স্কুলের বদলে ডুমুরের ফুল দেখব বলে বিরান মাঠের মধ্যে একা দাঁড়িয়ে আছি। যার একদিকে দরগাতলার সেই ভয়ংকর জঙ্গল। আর একদিকে যতসব অপদেবতার আশ্রয় ওই চামাবেড়ার ডিহি।
নিজের অবস্থান টের পেতেই আমি ডুমুরের ফুল দেখার কথা ভুলে যাই। আর আমার মনে পড়ে সেই গোদানাটাকে, যে ওই জঙ্গলটা পাহারা দেয়। যার বিনা অনুমতিতে ওই জঙ্গলে কেউ প্রবেশ করতে পারে না, করলেই ঘাড় মটকে মেরে ফেলে। যেমন বহুদিন আগে বাশেদ সেখকে মেরে ফেলেছিল। তাহলে যে আন্দু ফড়িংকে সঙ্গে করে ওই জঙ্গলে গিয়েই প্রবেশ করল! যদি তার কিছু হয়ে যায়! যদি ছোঁড়া মরে যায়!
আন্দুর ভাবনা ভাবতে গিয়ে আমার ভীষণ ভয় করতে শুরু করল। দুপাশে দুই বিপদ নিয়ে আমি আর দরগার বিরান মাঠে একা দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না, প্রাণভয়ে দিগি¦দিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটতে শুরু করলাম।
----চার----
যখন আমার জ্ঞান ফিরে এলো, দেখলাম আমি আমার বিছানায় শুয়ে আছি। আমাকে ঘিরে আছে আমার আত্মীয়স্বজন। তাদের সবার চোখেমুখে আতঙ্ক! আমার কী হয়েছে বুঝতে পারি না। সময়টা ভোর হতে পারে, আবার সন্ধ্যাও। তা বলে ফজরের কিংবা মাগরিবের নামাজের আজান শুনতে পাই না, তার বদলে আমার কানে আমাদের প্রতিবেশী কাদুখালার কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে। খুব করুণ স্বরে কাদুখালা কাঁদছে। কাদুখালা কাঁদছে কেন? আমি জিজ্ঞেস করি, কাদুখালার কী হলো যে এভাবে কাঁদছে?
আমার মা বসেছিলেন আমার মাথার কাছে। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন। তিনি বললেন, অর বিটি ফড়িংকে জি দরগার জঙ্গলে গোদানায় মেরে ফেলেছে বেটা।
এতক্ষণে বুঝতে পারি, আন্দু আমাকে শুধু ডুমুরের ফুল দেখায়নি, সাপের পাঁচ পা-ও দেখিয়েছে। কিন্তু সে-কথা আমি কাউকে বলতে পারি না।
আন্দু আমাদের বন্ধু। তার কথায় আমি চমকে উঠলাম। বললাম, তুই একটা পাগল নাকি! ডুমুরের ফুল হয় নাকি যে তুই আমায় দেখাবি?
আন্দু বলল, হয় রে হয়! দেখার চোখ থাকলে দেখাও যায়। আমি আজকাল রোজ দেখি।
ছোঁড়া বলে কী? ডুমুরের ফুল হয়, সেই ফুল আবার সে দেখতে পায়! ছোঁড়া কি তবে সত্যিই পাগল হয়ে গেল?
আন্দুর কথা আমার বিশ্বাস হয় না। তাকে আমি বলি, চল – কোথায় ডুমুরের ফুল আছে আমি দেখব।
আন্দু বলল, আজ নয়, কাল দেখাব তোকে। ঠিক দশটার সময় রেডি থাকিস।
– ঠিক আছে রেডি থাকব। কথার খেলাপ করবি না কিন্তু।
– কথা খেলাপের কী আছে? আমি রোজ দেখি। তুই আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। না হয় তুইও একদিন দেখলি। তাছাড়া একা দেখে সুখ হয় না, সঙ্গে কেউ থাকলে বেশি সুখ পাওয়া যায়।
আন্দুর এমন কথায় আমার গর্ব হয়। সে যে আমাকে এত পাত্তা দেয়, বন্ধু ভাবে – এর আগে কখনো বুঝতে পারিনি। তাই হয়তো আন্দুর ডুমুরের ফুল দেখার গল্পটা আমি বিশ্বাস করে বসি।
আন্দু আমাদের গ্রামের ছেলে। আমার বয়সী। বলতে গেলে আমরা একসঙ্গে জন্মেছি – একসঙ্গেই বেড়ে উঠছি। তাই ওকে আমি যতটা জানি, আর কেউ জানে না। এমনকি ওর মা সখী বেওয়া পর্যন্ত জানে না। সখী বেওয়া জানবে কী করে, সে তো স্বামী-মরা, চাকরি করে বেড়ায়, শহরে যায় চাকরি করতে। সেই ফজরের নামাজের আজান পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যায়। ফিরে আসে মাগরিবের নামাজের আজানের পর।
আন্দু যখন খুব ছোট ছিল সেও মায়ের সঙ্গে যেত। শহরের ইংলিশ মিডিয়াম ইশকুলে পড়ত। কিন্তু যেই সে বিড়ি-সিগারেট টানতে শিখল, মায়ের সঙ্গ ছেড়ে দিলো। আজকাল সে আর স্কুলে যায় না। আমরা যখন গ্রামের ইশ্কুলে পড়তে যাই, সে তখন ডোমকুল-মাঠে তার রাখালবন্ধুদের সঙ্গে খেলে বেড়ায়। পাখপাখালি শিকার করে। কিংবা বিল-ডোমকুলের নহরে ছিপ ফেলে মাছ ধরে। সেইসব মাছ আবার ওই মাঠেই রাখালবন্ধুদের সঙ্গে পুড়িয়ে খায়। আরো অনেক ব্যাপারস্যাপার আছে তার।
শুধু বিকেলবেলা সে আমাদের সঙ্গী হয়, দরগার মাঠে যখন আমরা একসঙ্গে ফুটবল খেলি কিংবা গুলিডাণ্ডা। আমাদের সঙ্গে আরো অনেকেই খেলে। কিন্তু আন্দুর সঙ্গে আমরা কেউ কোনো খেলাতেই কখনো পেরে উঠি না। সবকিছুতে সে একাই একশ। সত্যি কথা বলতে আমরা প্রত্যেকেই তাকে রীতিমতো সমীহ করে চলি। সমীহ না করে আমাদের কোনো উপায় থাকে না। আমরা জানি, এই বয়সে সে যা যা করে বেড়ায় তার জন্য যে সাহস লাগে তা আমাদের কারোর নেই।
যেমন দরগার মাঠের সেই জঙ্গলে গোদানা আছে। এটা আমরা সকলেই জানি। তাই সন্ধ্যার আগে সেখান থেকে বাড়ি ফিরে আসি। আন্দু কিন্তু ফিরে আসে না। একা একা বসে থাকে। বিড়ি টানে। স্বভাবতই এই বয়সে আমাদের চোখে আন্দু রীতিমতো হিরো সালমান খান। না হলে পরদিন আমি হঠাৎ করে তার সঙ্গী হয়ে ডুমুরের ফুল দেখতে যেতে রাজি হবো কেন?
-----দুই-----
আমার স্কুল ছিল। বাড়ি থেকে স্কুলে যাচ্ছি বলে বেরিয়ে আমি দরগাতলায় এসে বসে আছি। আন্দু আমাকে এখানেই আসতে বলেছে; কিন্তু কোথায় সে? এখনো তার পাত্তা নেই কেন? আমার যে ভয় করছে! ঘুরেফিরে মনে পড়ছে আমি যেখানে বসে আন্দুর অপেক্ষা করছি, জায়গাটার নাম দরগাতলা। এখানে জিনের একরাত্রে তৈরি একটা ইঁদারা আর একটা মসজিদ আছে। যদিও এখন দুটোই পরিত্যক্ত। একটা বিশাল বটগাছ ঝুরি নামিয়ে দুটোকেই ঢেকে রেখেছে। আর এসবের দখল নিয়ে রেখেছে একটা শয়তান গোদানা। ভেতরে প্রবেশের কোনো পথ নেই। কেউ প্রবেশ করতে চাইলেও পারে না, ওই গোদানার ভয়ে। গোদানাটা নাকি পাহারা দেয় জায়গাটা। কেউ প্রবেশ করলে তার আর রক্ষে থাকে না। মুরব্বিরা গল্প করে, বহুদিন আগে ডিহিপাড়ার বাশেদ সেখ নামে একজনকে ঘাড় মটকে মেরে ফেলেছিল ওই গোদানাতেই।
আন্দুর অপেক্ষা করতে করতে গোদানার ভয় আমাকে ঘিরে ধরছে। আমাদের স্কুলটা এখন থেকে খুব বেশি দূরে নয়, শেষ পর্যন্ত স্কুলেই চলে যাব কি না ভাবছি। হঠাৎ দেখি আন্দুকে। কী একটা গান গুনগুন করতে করতে চামাবেড়ার ডিহির ওপর দিয়ে হেঁটে আসছে।
বুঝতে পারি যেখানে আতঙ্ক, সেখানেই আন্দু। সাধারণত আমরা কেউ চামাবেড়ার ডিহি মাড়াই না। আমরা জানি, যত অপদেবতার আশ্রয় নাকি ওই ডিহিতেই। আমাদের গ্রাম, এমনকি আশপাশের গ্রামে যদি কারো ওপর অপদেবতা ভর করে, দুলহাবুড়ি কিংবা সায়েদ ওঝার তাড়া খেয়ে তারা আশ্রয় নেয় ওই ডিহিতেই। তাই নাকি সেখানে কোনো আবাদ হয় না, ফসল ফলে না। সারাবছর অনাবাদি পড়ে থাকে। বাড়ির গরু-ছাগল-কুকুর-হাঁস-মুরগি মরলে ফেলে আসা হয় সেখানে। অথচ আন্দু বলে, ওরকম ডিহি নাকি দুনিয়ায় আর একটিও নেই।
একদিন আন্দুকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, দুনিয়ায় কেন নেই ওরকম আর একটি ডিহি?
কোনো জবাব দেয়নি সে। বদলে একদিন সে আমাকে নিয়ে গেছিল ওই ডিহিতে। আমি দেখেছিলাম সেই ডিহি। অদ্ভুত জায়গা বটে। মাটি যা আছে তার চেয়ে বেশি আছে খোলামকুচি। সবুজের চিহ্ন নেই। গাছ বলতে যা আছে কাঁটাঝোপ আর দু-চারটে বাবলা গাছ। যেগুলোর ডালে সর্বক্ষণ কাক-শকুন বসে থাকে লোলুপদৃষ্টি মেলে। অথচ বৃষ্টি হলে নাকি ওই ডিহি ফুঁড়ে চাঁদির মোহর উঠে আসে। সেই গল্পও করছিল আন্দু। শুধু গল্পই করেনি, পকেট থেকে একটা চাঁদির মোহর বের করে আমাকে দেখিয়ে বলেছিল, জানিস – কালিপালের ডিহিতে পাওয়া এরকম মোহর আমার কাছে প্রচুর আছে।
শেষ পর্যন্ত আন্দু যখন আমার কাছে এলো, দেখলাম তার দুই হাতে আলতো করে ধরা একটা ফুটফুটে ফড়িং। আমি কিছু বলার আগেই সে বলতে শুরু করল, জানিস বন্ধু – এটা আমার একটা নতুন খেলা। এই খেলার নাম ফড়িংধরা খেলা। এর একটা একটা করে পাখনা ছিঁড়ে এর মৃত্যু দেখতে আজকাল আমার খুব ভালো লাগে। হয়তো জিজ্ঞেস করবি, এমন নিষ্ঠুর খেলার শখ আবার আমার হলো কী করে? তার উত্তরে বলি, খেলাটা নিষ্ঠুর বটে। তবে খুব মজার। আর এ-খেলার শখটা আমার এমনি এমনি হয়নি। তুই জানিস – একসময় আমার প্রিয় শখ ছিল পুকুরে ছিপ ফেলে মাছ ধরা। সেটাও একটা নিষ্ঠুর খেলা। যদিও মানুষ তা স্বীকার করবে না। মাছেভাতে বাঙালি একটা কথা আছে না! সেটা অন্য প্রসঙ্গ। যাই হোক, আমি ছিপ ফেলে ফাতনার দিকে চেয়ে থাকতাম আর অপেক্ষা করতাম, কখন মাছ বড়শির টোপে মুখ দেবে আর আমি আমার হাতে ধরা ছিপে মারব খাঁচ আর উঠে আসবে মাছ! কিন্তু তার আগেই কোথা থেকে ফড়িং উড়ে এসে বসল জলে ভাসা আমার ছিপের ফাতনার ওপর। ফাতনা নড়ে যেত। আমি ভাবতাম মাছ বড়শির টোপে মুখ দিয়েছে। ছিপে খাঁচ মারতাম। অথচ শূন্য বড়শি উঠে আসত আমার হাতে, আমার ভীষণ খারাপ লাগত। খুব রাগ হতো।
সেই রাগ থেকেই আমার ছিপে মাছ ধরার শখ কোথায় হারিয়ে গেছে। এখন আমি ফড়িংয়ের পেছনে পড়ে থাকি। যেখানেই ফড়িং দেখি, খুব ধৈর্য ধরে আগে সেটাকে ধরি। তারপর তার একটা একটা করে পাখনা ছিঁড়ি। সে ছটফট করতে থাকে, কিন্তু আমি তারিয়ে তারিয়ে তার মৃত্যু দেখি। আজ অবশ্য ধৈর্য ধরে শুধু ফড়িংটাকে ধরেছি মাত্র। তারপর ডুমুরের ফুল দেখাব বলে তোকে দাঁড় করিয়ে রেখেছি ব্যাপারটা মনে পড়তেই একে সঙ্গে করে নিয়ে সরাসরি তোর কাছে চলে এলাম। এই বিরান মাঠে একা একা দাঁড়িয়ে থাকতে যদি তুই ভয় পাস! কে জানে, ওই জঙ্গলের গোদানা যদি জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে তোর ঘাড় মটকে দেয়।
আন্দু বলল, আর একটু দাঁড়া। আগে এটাকে সাপের পাঁচ পা দেখিয়ে নিয়ে আসি। তারপর তোকে ডুমুরের ফুল দেখাব। বলেই আন্দু ফড়িংটাকে সঙ্গে নিয়ে ভয়ংকর জঙ্গলটার ভেতর ঢুকে গেল।
----তিন----
আন্দুকে আমার কেমন লাগে! তার কথা যেন আমি ঠিক ঠিক বুঝতে পারছি না। তার কথায় ডুমুরের ফুল দেখতে এসে আমি কোনো ভুল করিনি তো? আমার পিঠে স্কুলব্যাগ। অথচ আমি স্কুলের বদলে ডুমুরের ফুল দেখব বলে বিরান মাঠের মধ্যে একা দাঁড়িয়ে আছি। যার একদিকে দরগাতলার সেই ভয়ংকর জঙ্গল। আর একদিকে যতসব অপদেবতার আশ্রয় ওই চামাবেড়ার ডিহি।
নিজের অবস্থান টের পেতেই আমি ডুমুরের ফুল দেখার কথা ভুলে যাই। আর আমার মনে পড়ে সেই গোদানাটাকে, যে ওই জঙ্গলটা পাহারা দেয়। যার বিনা অনুমতিতে ওই জঙ্গলে কেউ প্রবেশ করতে পারে না, করলেই ঘাড় মটকে মেরে ফেলে। যেমন বহুদিন আগে বাশেদ সেখকে মেরে ফেলেছিল। তাহলে যে আন্দু ফড়িংকে সঙ্গে করে ওই জঙ্গলে গিয়েই প্রবেশ করল! যদি তার কিছু হয়ে যায়! যদি ছোঁড়া মরে যায়!
আন্দুর ভাবনা ভাবতে গিয়ে আমার ভীষণ ভয় করতে শুরু করল। দুপাশে দুই বিপদ নিয়ে আমি আর দরগার বিরান মাঠে একা দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না, প্রাণভয়ে দিগি¦দিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটতে শুরু করলাম।
----চার----
যখন আমার জ্ঞান ফিরে এলো, দেখলাম আমি আমার বিছানায় শুয়ে আছি। আমাকে ঘিরে আছে আমার আত্মীয়স্বজন। তাদের সবার চোখেমুখে আতঙ্ক! আমার কী হয়েছে বুঝতে পারি না। সময়টা ভোর হতে পারে, আবার সন্ধ্যাও। তা বলে ফজরের কিংবা মাগরিবের নামাজের আজান শুনতে পাই না, তার বদলে আমার কানে আমাদের প্রতিবেশী কাদুখালার কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে। খুব করুণ স্বরে কাদুখালা কাঁদছে। কাদুখালা কাঁদছে কেন? আমি জিজ্ঞেস করি, কাদুখালার কী হলো যে এভাবে কাঁদছে?
আমার মা বসেছিলেন আমার মাথার কাছে। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন। তিনি বললেন, অর বিটি ফড়িংকে জি দরগার জঙ্গলে গোদানায় মেরে ফেলেছে বেটা।
এতক্ষণে বুঝতে পারি, আন্দু আমাকে শুধু ডুমুরের ফুল দেখায়নি, সাপের পাঁচ পা-ও দেখিয়েছে। কিন্তু সে-কথা আমি কাউকে বলতে পারি না।
Monday, June 15, 2026
গল্প- ফুলি

ফজলুর
শুধু মনে আছে বাসটা চলছিল একটা বাঁশঝাড়ের গা ঘেঁষে, ঝিরঝির বৃষ্টির মধ্য
দিয়ে। বাঁশঝাড়ে ভূত থাকে বলে দাদি ভয় দেখাতেন, ভয়টা সে পেতও, তবে সন্ধ্যার
আঁধার নামলে। কিন্তু সেদিন বাসটা চলছিল ভরদুপুরে, তাছাড়া সে বসেছিল মার হাত
ধরে। মা অনেক হাসতেন, তার হাসি ফজলুর সব ভয় দূর করে দিত। ভয় ছিল না বলে
ফজলু বাঁশঝাড়ের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল। একসময় নিশ্চয় ঘুমিয়ে পড়েছিল,
যেমন ঘুমিয়ে পড়েছিল বাসের ড্রাইভার, অথবা সেরকমই আমাদের ধারণা। একটা শব্দে
তার ঘুমটা ভেঙেও গেল। শব্দটা ছিল তার ছয় বছরের জীবনের ওপর একটা পাহাড় ভেঙে
পড়ার।
পাহাড় ভাঙার জন্য দাদি বজলুকে, অর্থাৎ ফজলুর বাবাকে দোষ দিতেন। কেন সে ভরা বর্ষায় বন্ধুর বিয়ে খেতে ছেলে-বউসহ একটা ভাঙা বাসে চড়ে নিয়ামতপুর রওনা হবে? সেই বন্ধুকে দাদি কখনো চোখে দেখেননি, এমনি দূরে দূরে থাকত লোকটা। অনেকদিন ধরে সৌদিতেও ছিল লোকটা। দশদিনের ছুটিতে এসে কেন বজলুকেই ডাকতে হবে বিয়েতে যেতে?
দাদি বলেন, ফজলুর বাবা-মার লাশ লোকটাই অবশ্য বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল; ফজলুকেও – অথবা যেটুকু ফজলু তখনো জাগা ছিল। দাদির ধারণা, ফজলু যে কোনোদিন মানুষ হয়নি, সেটি ওই বর্ষাদিনে তার জীবনের ওপর একটা পাহাড় ভেঙে পড়ার জন্য।
তোরে আমি অনেক চেষ্টা করছি ফজলু, মানুষ করতে। পারলাম না, দাদি ফজলুকে বললেন। আমাদের হিসাবে হাজার তিনশোবারের মতো।
ফজলু পুকুর থেকে বালতি ভরে পানি তুলে একটা কাটা ড্রামে রাখছে। ড্রামের পাশে দাদির প্রিয় গরুটা ঝিম মেরে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে গোসল দিতে হবে। গরুটা একটা গাভী, দাদি যার একটা নাম দিয়েছেন, ফুলি। তার কড়া বাদামি চামড়ায় সাদা কিছু দাগ, দেখলে মনে হয় কোনো বুনো ফুল। গাভীটা বিষণ্ণ, তার বাছুরটা মারা গেছে। ফজলু সকাল সকাল গাভীটার দুধ দুইয়েছে। সেই দুধ কিছু গরম করে সে খেয়েওছে। এখন তাকে গোসল দিলে তার বিষণ্ণতা কমবে। দাদি তাকে বলেছেন।
পাড়ার লোক ফজলুকে ভয় পায়। ছেলেটা একটা গুন্ডা, তার মধ্যে একটা বেপরোয়া ভাব, কাউকে সে পরোয়া করে না, এমন কথা প্রতিবেশী ইন্তাজ আলি সবাইকে বলেন, বিশেষ করে ফজলুদের বাড়ির তিনটি মরাগাছ তিনি লোক লাগিয়ে লাকড়ির জন্য কেটে নেওয়ার পর সে যেভাবে তার বাড়িতে গিয়ে তা-ব চালিয়েছিল, তারপর। পাড়ার লোক অবশ্য এখন খুশি, ফজলু নারায়ণগঞ্জ থাকে। মাঝেমধ্যে আসে, কিন্তু বাড়ি ছেড়ে খুব একটা বেরোয় না। আগে যখন গ্রামে ছিল, মানুষ তার সামনে পড়তে চাইত না। ফজলুর এক মামা, যিনি পুলিশে চাকরি করতেন, এবং চাকরি চলে গেলে বাড়িতেই থাকেন, তাকে গুন্ডা থেকে ‘মানুষ’ করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তাতে লাভ হয়নি। এই মামাই তাদের দেখাশোনা করেছেন, তাদের বাড়িটা যে দখল হয়ে যায়নি, সেটিও তার জন্য। ফজলু সেজন্য মামার সামনে বেয়াদবি করে না; কিন্তু তার কোনো কথা শোনার দায় তার আছে, তা বিশ্বাস করে না।
একটা মানুষের সামনেই শুধু ফজলু কখনো মেজাজ দেখায় না এবং তিনি হচ্ছেন তার দাদি। তার জীবনের ওপর পাহাড় ধসে পড়ার পর তাকে টেনেটুনে তুলেছেন দাদি। তাকে আগলে রেখেছেন। তাকে সঙ্গ দিয়েছেন। সেবা দিয়েছেন। তার দিকে তাকিয়ে দাদি বললেন, বাপের মতো অত চওড়া-লম্বা হইতে গেলি কেনরে ফজলু? চওড়া লম্বা ছিল বইলা তো জানালায় আটকায়া গেল, বাইর হইতে পারল না।
গরুটার গা ডলতে ডলতে ফজলুর মন কিছুটা খারাপ হলো। বাছুরটা মুখে ফেনা তুলে আচমকা মরে গেল। ফজলু নারায়ণগঞ্জ ছিল। খবর পেয়ে বাড়ি আসতেই দাদি বললেন, ফুলির বাচ্চাটা মইরা গেছেরে ফজলু, এই দুঃখে ফুলিও যদি এখন যায়?
ফুলি কি বাসে করে বাচ্চাটাকে নিয়ে নিয়ামতপুর যাচ্ছিল?
তবে ফজলু জানে, কারো মারা যাওয়ার দুঃখে যদি কেউ মারা যেত, তবে সে-ই তো অনেক আগে যেত। অনেক বছর মার মুখটা তার যখন-তখন মনে ভেসে উঠত, তার হাসিটা কানে বাজত। তখন সে ঠিক থাকতে পারত না। চোখ বন্ধ করে ঝিম মেরে থাকত – ফুলি এখন যেমন থাকে, চোখে পানি নিয়ে – না হয় বাইরে গিয়ে পুকুরের কোনার বাঁশঝাড়টাতে একটার পর একটা রাগী ঢিল মারত।
একসময় ঝিম মারা থেকে বেরিয়ে সে রাগের ঝাপটায় পড়ল। রাগটা কার ওপর, সে জানে না। হয়তো বাঁশঝাড়গুলির ওপর, অথবা বাঁশঝাড়ে দিনের বেলা লুকিয়ে থাকা ভূতগুলির ওপর। একসময় তার বিশ্বাস হলো নিয়ামতপুর যাওয়ার পথের বাঁশঝাড়ের ভূতগুলিই তার ওপর ভেঙেপড়া পাহাড়টা কেটেছিল, এজন্য এক সন্ধ্যায় সে সাইকেল চালিয়ে ওই বাঁশঝাড়ে গিয়ে তা-ব করেছে। ঢিল ছুড়েছে। বাঁশ কেটেছে। কচি বাঁশে আগুন লাগানোর চেষ্টা করেছে। তাতে আগুন না জ্বললেও ধোঁয়া হয়েছে বেশ। রাতঘুমে থাকা পাখিগুলি জেগে উঠে হইচই করেছে।
ঘণ্টাদুয়েক বাঁশঝাড়ে তুফান তুলে সে ফিরেছে। সাইকেলটা বন্ধু মনুকে ফেরত দিয়ে বাড়িতে এসে দা-টা রান্নাঘরের দেয়ালে গুঁজে পুকুরে নেমে গোসল করেছে। গোসল করতে করতে তার চোখে ভেসেছে একটা ডোবা। ফজলুর ওপর নেমে আসা পাহাড়টা ওই ঝিরঝির বৃষ্টিদিনের বাসটাকে এক ধাক্কায় বাঁশঝাড়ের উল্টোদিকের ডোবায় ফেলে দিয়েছিল। গত তিন-চার বছরে তাকে কয়েকবার নিয়ামতপুর যেতে হয়েছে। তার বাবার বন্ধু তাকে টাকা-পয়সা দিয়েছেন, জামা-জুতা দিয়েছেন, একবার দাদির জন্য শাড়ি দিয়েছেন। ফজলু নিয়েছে, কিন্তু দাদি ছুঁয়েও দেখেননি সেই শাড়ি। সেটি গেছে রইসুন বুয়ার ভাগে। রইসুন বুয়া আরেক মানুষ, যিনি ফজলুর রাগটা তেমন দেখেননি। নিয়ামতপুরে যাওয়া-আসার পথে ফজলু শুধু বাঁশঝাড়ের দিকেই তাকিয়ে থেকেছে। কোনো ডোবার দিকে তার চোখ যায়নি।
ফুলির গা ডলতে ডলতে ফজলু খেয়াল করল, গাইটা চোখ বুজেছে, এবং চোখের কোনা বেয়ে পানি পড়ছে। ফজলু বুঝল, গাইটা এখন তার মতোই স্মৃতির ঝাপটা থেকে নিজেকে বাঁচাতে চোখ বোজার রাস্তা নিয়েছে।
গরুর কি কোনো স্মৃতি থাকে? থাকলে কি তার মতো টুকরো টুকরো, এলোমেলো?
দাদি বসে ডাঁটাশাক বাছছেন। ডাঁটাশাক ফজলুর প্রিয় খাবার। আর ট্যাংরা মাছ। রইসুন বুয়ার হাঁটতে কষ্ট হয়, তারপরও ট্যাংরা মাছ এনে দিয়ে গেছেন, সাত সকালে। দাদি জিজ্ঞেস করলেন, তুই যেহানে থাহিস, জায়গাটার নাম কী?
বন্দর। অনেকবার কইছি দাদি।
হ। তা বন্দরে কোনো সুন্দর মাইয়া নাই? চোহে পড়ে না? এই প্রশ্নটা দাদি তাকে গত কয়েকমাসে অন্তত ত্রিশবার জিজ্ঞেস করেছেন। ফজলু হাসল, বলল, চোহে পড়লে তোমারে জানাইমু, দাদি।
হ। এই গেরামের, আশপাশের কুনু গেরামের, কুনু মাইয়া তো তোরে বিয়া করব না।
বিষয়টা ফজলুর জন্য স্বস্তির। সে কথা বাড়ায় না।
পকেটে রাখা মোবাইল ফোন বাজে। ফজলু ধরে, এবং ফুলিকে চোখ বুজে স্মৃতির ঝাপটা সামলাতে দিয়ে একটু দূরে হেঁটে যায়। ফোন করেছে তার বন্দরের বন্ধু, নাম খাদেম। সে বলল, ওরে ফজলু, ভালো খবর। ম্যানেজ করা গেছে। অহন সব মোটামুটি কিলিয়ার। তুই আইতে পারিস।
ঠিকাসে, ফজলু বলল।
শুন, শুন, কথা আছে, খাদেম বলল, মনুরে ছুটাইবার রাস্তা পাওয়া গেছে। অবশ্য তাতে খরচ দেড় লাখ। বস আধা দিবেন, বাকিটা আমাগো ম্যানেজ করতে হইব। তোর ভাগে পড়ছে দশ। টেহাটা কাইল লাগব। একটা নম্বর এসেমেস কইরা দিতাছি। ওই নম্বরে বিকাশ কইরা দিস। দুইবারে করিস, সকালে একবার, বিকালে আরেকবার।
খাদেমরে, আমার টাকা নাই। একশ টাকাও নাই। দশ হাজার কইত্থে দেই? কাতর কণ্ঠে বলল ফজলু।
না দিলে বস রাগবো। বস রাগলে মনুও ফৌত। তুইও। তোরে কিলিয়ার করতে বসের কত লাগছে জানিস তো। আইচ্ছা রাখি।
খাদেম ফোন রেখে দিলে ফজলু চিন্তায় পড়ল। গ্রামে তার একটাই বন্ধু, মনু। ফজলুকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়ার পর মনুই তাকে সঙ্গ দিয়েছে। সিনেমা দেখতে নারায়ণগঞ্জ নিয়ে গেছে। মনু মাঝে মাঝে বাড়ি থেকে পালায়। তার মা আছে, আবার সৎমাও আছে। সৎমা এক খতরনাক মহিলা, তার বাবাকে পোষ মানিয়ে একটা ফাউল মানুষ করে ফেলেছে। মনু এসব কথা যখন ফজলুকে বলেছে, তার গলায় অবশ্য রাগ ছিল না। কারণ তার মা আছেন। কিন্তু রাগের বদলা মনুর গলায় একটা দুঃখ বেজেছে। এখন সেটা নেই। দুই বছর ধরে বন্দরে থাকতে থাকতে, ফজলুর সঙ্গে মেসের একটা ঘর ভাগ করতে করতে, তার মনে রাগ এসেছে। একদিন বাড়ি এসে সৎমাকে বলেছে, আমার মারে আর একটা খারাপ কথা কইলে আফনারে আর আফনার পোলাডারে আমি ডোবায় ফালাইয়া চুবাইমু। চুবাইয়া চুবাইয়া দম আটকাইয়া মারমু, বুঝলেন?
ফাউল মানুষ বাবা ঘরের দাওয়ায় বসে মনুর রাগী গলা শুনেছেন। এই রাগ তিনি কোনোদিন দেখেননি। একে তাৎক্ষণিক সামাল দেওয়াটাও তার জ্ঞানের ভেতর নেই। তিনি চুপ করে থাকলেন।
মনু তার মাকে একটা মোবাইল ফোন দিয়েছিল। সে মাকে বলল, একদিনও যদি তোমারে একটা বদ কথা কয়, আমারে জানাইও মা। চললাম।
সেই থেকে মনুর মা স্বস্তিতে আছেন। ফাউল মানুষটাও মাঝেমধ্যে তার বিছানায় আসেন; কিন্তু মা স্বস্তিতে গেলেও মনুর রাগটা থাকল। এটি সে ফজলু থেকে সারা জীবনের মতো কর্জ নিয়েছে।
বন্দরের তারা মিয়ার ক্যাডার বাহিনীতে মনুই প্রথম নাম লিখিয়েছে, নারায়ণগঞ্জে সিনেমা দেখতে এসে খাদেমের সঙ্গে তার পরিচয়ের সুবাদে। তারা মিয়ার ক্যাডার হলেও তাদের বস আরেকজন, যিনি থাকেন নারায়ণগঞ্জে এবং বন্দরে আসেন মাঝে মধ্যে, শীতলক্ষ্যা পাড়ি দিয়ে। তার স্পিডবোট আছে। গাড়িও আছে। তাকে কেউ ডাকে ডন সাহেব, কেউ জিয়া সাহেব। তারা মিয়া তাকে সমীহ করেন। লোকটার নিশ্চয় অনেক টাকা, কারণ মনুদের চার-পাঁচজনকে তিনি ভালোই পয়সা দেন। তারা মিয়া লোকটা কিপ্টা। হাড্ডি কিপ্টা, কিন্তু বস হাতখোলা হওয়ায় তারা মিয়াকে মনুরা ছেড়ে যায়নি। বসের কেন তারা মিয়াকে দরকার, যেখানে তাকে পুলিশও দেখলে সালাম দেয়, হেসে হেসে কথা বলে, থানায় ডেকে চা খাওয়ায়, এ-প্রশ্নটি মনু একদিন করেছে খাদেমকে। উত্তরে খাদেম বলেছে, বড় দালানের খুঁটি লাগে না মনু? বন্দুক সগিরের পিস্তল লাগে না?
ফজলু জানে, বসের সাম্রাজ্য শীতলক্ষ্যা পার হয়ে নারায়ণগঞ্জকে পেছনে ফেলে ঢাকা পর্যন্ত ছড়ানো। তবে বন্দর তার কাছে পয়া। এখানে অনেক জমি এখন তার দখলে, যার বেশিরভাগ তারা মিয়ার ক্যাডারেরা ব্যবস্থা করে দিয়েছে। বসের সঙ্গে তারা মিয়ার পার্থক্যটা ফজলু বুঝেছে এভাবে : বসের যেখানে বন্দরে একটা গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি আছে, তারা মিয়ার আছে কিনা ঝুট ব্যবসা, যে-কাজে তার নির্ভরতা আবার ক্যাডারদের ওপর। খাদেম বলে, এখন অবশ্য তারা মিয়ার ইয়াবা ব্যবসা ঝুট ব্যবসা থেকেও বেশি পয়মন্ত।
বস এবং তারা মিয়া সম্বন্ধে মনুর উৎসাহটা বেশি। ফজলুর আবার কোনো মানুষকে নিয়ে উৎসাহটা কম। কারো সম্পর্কে কথা উঠলে সে শোনে, মনে মনে নোট করে নেয়, ব্যস। তাছাড়া, এখন ভাবাভাবির সময়টা কম। কারণ একটু সমস্যা যাচ্ছে তারা মিয়ার ক্যাডারদের। থানার ওসি পাল্টালে কিছুদিন তাদের দৌড়ের ওপর থাকতে হয়। এই তিনমাস যেমন। থানায় নতুন ওসি এসেছেন, একদিন বস থানায় গিয়ে ওসির সাক্ষাৎ না পেয়ে তারা মিয়ার গদিতে বসে গজর গজর করেছেন। তারা মিয়ার সিমেন্ট ব্যবসা, খুবই নিরীহ ধরনের, তাও একদিন ওসি এসে দেখে গেছেন। তাকে বলেছেন সাবধান হয়ে যেতে। তিনি তারা মিয়াকে চোখে চোখে রাখবেন। যেদিন একটা পা বিপথে ফেলবেন তারা মিয়া, তাকে আইনের দড়ি দিয়ে বাঁধবেন।
তারা মিয়া বিগলিত হেসেছেন। এই হাসিটা অভিনয়ের, কিন্তু অভিনয়টা এমনই নিপুণ, ওসিও বুঝলেন না। তিনি কথা না বাড়িয়ে চলে গেলেন। ওসি চলে গেলে তারা মিয়া যা বললেন তা ওসির কানে গেলে কী হতো কে জানে। তিনি চোখ সরু করে বললেন, আমার পথ তো একটাই ওসি সাহেব। দেখি এই পথ আপনি কতদিন আগলে রাখতে পারেন।
ঝুট ব্যবসায় মারামারি, এমনকি খুনাখুনিও হয়। কিন্তু তারা মিয়া এই ব্যবসা করেন শান্তিতে। কারণ তার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। নতুন ওসি আসার পর প্রতিদ্বন্দ্বী এলো, একদিন মারধরও হলো। তাতে মাথা ফেটে একজন হাসপাতালে গেল, পেটে গুলি লেগে আরেকজন গেল ঢাকা মেডিক্যালে। গুলিটা খাদেমের পিস্তলের। পিস্তলটা তাকে ভাড়ায় দিয়েছে বন্দুক সগির, যাকে প্রটেকশন দেন বন্দরের এক সরকারি দলের নেতা।
পুলিশ এসে হানা দিলো। খাদেম পালাল। মনু ধরা পড়ল। ফজলুকে নারায়ণগঞ্জ একটা কাজে পাঠিয়েছিলেন তারা মিয়া, সে বেঁচে গেল। বন্দর না ফিরে সে সোজা বাড়ি গেল।
খাদেম তাকে ফোনে জানাল, বাড়িতেই যেন থাকে, আর অকারণে বাইরে না যায়। ওসির প্রমোশন হয়েছে, বন্দর ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে পারেন। গেলে একটা কিছু হবে, না হলে রূপগঞ্জ না হয় আড়াইহাজারে বস তাদের একটা ব্যবস্থা করে দেবেন।
বছরখানেক আগে একটা জমি দখল করতে গিয়েছিল তারা মিয়ার ক্যাডারদল। তাদের সঙ্গে ছিল বন্দুক সগির। লোকটা ছোটখাটো, কিন্তু বিরাট তার তেজ। জমিটা ছিল সোনার, এর জন্য বস অনেকদিন চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু এরকম জমি সহজে দখলে আসে না। দখলের ব্যবস্থাটা সেজন্য বস পাকাপোক্ত করে রেখেছিলেন, শুধু একটা ফাঁক থেকে গিয়েছিল। আরেকটা পার্টি নেমেছিল মাঠে, যাদের হাতটা ছিল অনেক লম্বা। পুলিশ শুধু না, প্রশাসনেও সেই হাত পৌঁছেছিল।
জমিতে পৌঁছানোর আগেই খাদেম ব্যাপারটা টের পেয়েছিল। সে বন্দুক সগিরকে বলেছিল, ভাইজান, আইজকা থাক। আইজ প্যাঁচটা বড়।
সগির শোনেনি।
পুলিশ সগিরকে ধরেছিল, ফজলুকেও। আরো দু-একজনকে। খাদেম পালানোতে ওস্তাদ। সে পালিয়েছিল। বসকে বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়েছিল সবাইকে ছাড়িয়ে নিতে। জীবনে প্রথম জেলের ভাত খেয়েছে ফজলু। দাদি অবশ্য কিছুই টের পাননি। প্রতিদিন দাদিকে ফোন করে সে। সূর্য ওঠা-ডোবার মতোই নিয়মে। জেলে বসেও প্রতিদিন তার কথা হয়েছে দাদির সঙ্গে। ব্যবস্থাটা তারা মিয়া করে দিয়েছেন।
তারপরও অন্তত আধামণ চালের জেলের ভাত তাকে খেতে হয়েছে।
অবাক কা-, ফজলু বেরিয়ে দেখল, জমিটাতে বিরাট সাইনবোর্ড, যাতে বড় করে কোম্পানির নাম লেখা। কোম্পানির নাম ডন ভ্যালি। খাদেম বলে, এটা রিয়াল ইস্টেট।
হেলাফেলা, মোড়ামুড়ি বস পছন্দ করেন না, ফজলু জানে। জেল থেকে মনু তাকে ফোনে বলেছে, জেলে এবার বিপদ। গেল বছর কিছু লোককে মেরে তক্তা করেছিল তারা মিয়ার ক্যাডাররা। তাদের দুজন এখন একই জেলে। তারা মনুকে বলেছে বাড়িতে মিলাদ পড়াতে। তার জান এবার শেষ।
যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বের হতে হবে, মনু বলেছে, যা পারো তোমরা করো।
আর আজ সকালে খাদেমের ফোন। এখন সে কী করে? হাতে আছে একটা দিন। সে কি পিয়ারু মামার কাছে যাবে? পিয়ারু-পুলিশ মামার কাছে? নাকি বাবার বন্ধুর বাড়ি যাবে নিয়ামতপুর? দাদির হাতে টাকা নেই। তাকে যত টাকা সে দিয়েছে, তার কিছু তিনি খরচ করেছেন, বাকিটা জমিয়েছেন। কিন্তু কোথায় রেখেছেন, ফজলু জানে না। তারপরও দাদিকে জিজ্ঞেস করতে হবে।
ফজলু শ-পাঁচেক টাকা চাইলে নিশ্চয় দাদি দিতেন, কিন্তু একসঙ্গে দশ হাজার সে কী করে চায়।
দুপুরে তার জন্য দাদি ভাত বেড়ে দিলে সে অবশ্য কথাটা তুলেছে। জরুরি দরকার, সে দাদিকে বলেছে।
টাকা দিলে তুই কই যেন কুনখানে থাহিস সেইখানে চইলা যাবি?
হ। ফজলু আসেত্ম করে বলেছে।
দাদিকে দেখলে মনে হতে পারে ভুলাভালা মানুষ, কেউ ঠকালেও বোঝেন না, লোকের চালাকি ধরতে পারেন না; কিন্তু আমরা জানি দাদি সহজ মানুষ নন। তিনি বোঝেন। ফজলু কোনো কারণে একটা বিপদে আছে, তিনি সেটা টের পেয়েছেন। দাদির মন। মাস দুই নাতিটা আছে তার সঙ্গে, তার মনটা ভরে আছে। টাকা দিলে সে চলে যাবে। তিনি উদাসীনভাবে বললেন, হাতে টাকা নাইরে ফজলু। যা ছিল আছিয়ারে কিছু দিছি। কিছু জমা আছে সুফিয়া বইনের কাছে।
আছিয়া ফজলুর চাচাত বোন। পিয়ারু চাচার বড়ভাই আজমত মুন্সির মাদ্রাসা পাশ মেয়ে। বিধবা। জীবনটা কাটে কষ্টে। ফজলু তাকে দেখেছে কদাচিৎ।
দাদির ওপর ফজলুর কখনো রাগ হয় না, আজো হলো না, তবে তার রাগ গিয়ে পড়ল আছিয়ার ওপর। আছিয়া বুবুকে দাদি বলেছিলেন তার কাছে চলে আসতে। দুই ছেলেমেয়েসুদ্ধ। কিন্তু আছিয়া পড়ে থাকল শ্বশুরবাড়ি, আধাপেটা খেয়ে, শ্বশুর-শাশুড়ির অত্যাচার সয়ে। ফজলুর ইচ্ছা হয় একদিন বুবুর শ্বশুরবাড়ি গিয়ে ওই দুই বুড়া-বুড়িকে সাইজ করে তাকে বাড়িতে নিয়ে আসে।
দাদি বললেন, ফুলিটা গোসল কইরা আরাম পাইল ফজলু। কিন্তু তারপর ঘাস-বিচালি কিছুই খায় নাই। উপোস করতেছে। ফুলিটার বুকে দুধ, ছাওয়ালটা নাই। সকালে দুধ দুইলে ওর পরানটা কান্দে। শূন্য হয়। ফুলি বাঁচবে না।
খাওয়া শেষ করে উঠানে নামল ফজলু। বদনার পানি ঢেলে হাত ধুলো। ফুলিকে চোখে পড়ল। সজনেগাছের নিচে বসে আছে ঝিম মেরে। স্মৃতির ঝাপটা কি একটা গাইকেও এমন উদাসী করে দেয় যে কিছু খেতে তার ইচ্ছা হয় না?
ফজলু যেমন মিষ্টি খায় না। খেতে না পেরে মরে গেলেও, এবং আধাসের ম-া অথবা রসগোল্লা পৃথিবীর শেষ খাদ্য হলেও, না, সেদিন থেকে, যেদিন তাকে দাদি বলেছিলেন, তোর মা মিষ্টির পোকা ছিলরে ফজলু, মিষ্টি পাইলে আর কিছু না খাইলেও তার চলত।
ফুলির বোজা চোখের দিকে তাকাতে তাকাতে একটা চিন্তা তার মাথায় এলো। মনে মনে একটা হিসাব করল। দাদি ঘণ্টাখানেকের জন্য ঘুমাতে যাবেন, তিনটার দিকে। তার আগেই তার চিন্তাটা পাকা করতে হবে। আজ হাটবার। প্রতি মাসের শেষ মঙ্গলবার হাটটা খুব জমে। আজ শেষ মঙ্গলবার।
-----দুই-----
হাটের যেখানটায় গরুর বেচাকেনা হয়, সেখান পর্যন্ত ফুলিকে হাঁটিয়ে নিয়ে যেতে একবারও কোনো সমস্যা হলো না ফজলুর। দাদি ঘুমিয়ে গেলে ফুলিকে যখন সে জাগিয়ে তুলল, এবং ফুলি উঠে দাঁড়াল, সে যেন বুঝল তাকে নিয়ে ফজলুর কোনো মতলব আছে। ফজলু ভেবে দেখেছে, না খেয়ে ফুলি যখন মরেই যাবে, তাকে হাটে নিয়ে বিক্রি করে দিলেই তো হলো। এমনিতে ফুলি তরতাজা, একটা তিন-সাড়ে তিন বছরের গাই যেমন হয়। গরুর দাম এখন ভালো, কম করে হলেও পঞ্চাশ-ষাট হাজার তো পাওয়া যাবেই। দশ হাজার বিকাশ করে বাকিটা রেখে দিলেই হবে। ফুলিকে দাদি ভুলে গেলে তার হাতে টাকাটা একসময় সে তুলে দেবে।
ঘণ্টাখানেক অপেক্ষার পর খদ্দের পাওয়া গেল। খদ্দের ইমামগঞ্জের। ফজলু স্বস্তি পেল। সে তাকে চেনে না, ফজলুও তাকে চেনে না। খাদেমের দেওয়া নম্বরে সে আজ পাঁচ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেবে। বাকিটা কাল সকালে। তারপর সে বাসে উঠবে বন্দরের পথে।
যতক্ষণ ফুলিকে ধরে ফজলু দাঁড়িয়ে ছিল, ফুলি ঝিম মেরেই ছিল। কিন্তু খদ্দেরের হাতে তাকে তুলে দিলে ফুলির মধ্যে একটা চাঞ্চল্য দেখা দিলো। সে বুঝতে পারছিল না, তার চেনা পৃথিবীর বাইরের একজন মানুষ কেন তাকে ধরেছে। ফজলুই বা কেন এটি করতে দিচ্ছে। খদ্দেরটা একটা দড়ি লাগিয়েছে ফুলির গলায়, এবং দড়িটা যেন তাকে বাস্তবে জাগিয়ে দিলো। একটা অবিশ্বাসের দৃষ্টি মেলল সে ফজলুর দিকে। তারপর তার চাঞ্চল্য চলে গেল। একটা অবসাদ যেন নামল তার শরীরে। চোখ দুটি বন্ধ করে দিলো। ফজলু কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। কেন জানি তার ধারণা হলো ফুলির সঙ্গে তার আর চোখাচোখি হবে না। হলোও না। ফজলু দাঁড়িয়ে থাকলেও খদ্দেরের তাড়া ছিল, সে চলে গেল।
ফুলি চোখ খুলল না। অথবা খুলল এমন চিকন করে, মাটির দিকে, যেন ফজলুর ছায়াটাও তার চোখে না লাগে।
বাড়ি ফিরে ফজলু দেখল, দাদি দাওয়ায় বসে আছেন। তার প্রিয় বেতের মোড়ায়। তার সামনে যেতে যেতে সে তার বিলাপ শুনল।
বিলাপের সুরে দাদি বললেন, তুই কই ছিলিরে ফজলু? আমার ফুলিটা চইলা গেছে।
চইলা গেছে? কোথায়? অবাক হওয়ার ভান করল ফজলু।
জানি না। দাদি বললেন, তারপর চোখ বুজলেন।
ফজলুর কেন জানি খুব রাগ হলো। না দাদির ওপর না, নিজের ওপরও না। কিসের ওপর তাও সে জানে না। কিন্তু তার রাগ হলো, সবাই কেন তাকে দেখে চোখ বুজবে? দাদি কি সব বুঝেছেন? তিনি কি জানেন ফুলি যায়নি, তাকে ফজলুই নিয়ে গেছে?
অবাক, সে কোথায় ছিল এতক্ষণ, একবারও দাদি জিজ্ঞেস করলেন না। তাকে শুধু বললেন, ফুলিটা চইলা গেল। তুইও কি যাবি?
এ-কথা কেন জিজ্ঞেস করলেন তার ভুলাভালা দাদি?
আমি একটু খুইজ্জ্যা দেহি, দাদি? সে বলল।
দাদি বন্ধ চোখেই একটুখানি হাসলেন। বললেন, ফুলি চইলা গেছে। এখন তুইও চইলা যাবি। তয় যা।
-----তিন-----
সকালে ঘুম থেকে উঠে সে বলল, যদি না যাই দাদি, ক্যামনে কী হইব? খামু কী?
খাওনের অভাব হইবে নারে ফজলু, দাদি বললেন। তোর তাগড়া শরীর। বাপদাদার ভিটা আছে। একটুখানি জমি আছে, একটা পুকুর আছে।
ফুলি যেখানে বসে বসে ঝিমাচ্ছিল গতকাল, দাদি ঠিক ওই জায়গায় বসেছেন মোড়া পেতে।
তৈরি হয়ে তার রংওঠা ব্যাগটা কাঁধে ফেলে দাদির সামনে এসে দাঁড়াতেই তিনি বললেন, কেউ যাইতে চাইলে তারে আটকানো যায় নারে ফজলু। তোর বাপেরে পারি নাই। তোরেও পারমু না। যা।
ফজলু হাঁটা দিলো।
কিছুদূর গিয়ে সে তার কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে মাটিতে রাখল। তারপর একটা গাছের সঙ্গে মাথা ঠুকল। এবার রাগটা তার নিজের ওপর।
কপাল দিয়ে রক্ত বেরুলো। রক্ত মিশল চোখের পানির সঙ্গে।
-----চার-----
বন্দরে মেসঘরে পৌঁছল সে বেলা বারোটায়। বেশ ক্ষুধা লেগেছে, কিন্তু ফুলির মতো সে একটা সিদ্ধান্ত নিল, আজ কিছুই খাবে না।
খাদেম তাকে জিজ্ঞেস করল, কপাল ফাটল ক্যামনে?
ফজলু উত্তর দিলো না। খাদেমও দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করল না। জিজ্ঞেস করে নষ্ট করার মতো সময় তার নেই। গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজে বেরুতে হবে আজ রাতে। বস পইপই করে বলে দিয়েছেন, কাজটা ঠিকঠাক করতে হবে।
কী কাজ?
পরে বলব। এখন খা। খাইয়া ঘুমা। তিনটায় উঠিস। তিনটায় মিটিং, খাদেম বলল, তারপর চলে গেল।
ফজলু খেলও না, ঘুমালও না। শুধু বিছানায় চুপচাপ শুয়ে থাকল।
তিনটায় মনু এলো। জেলে থেকে সে শুকিয়ে গেছে। রংটাও কালো হয়ে গেছে। মনুর পেছন পেছন উত্তম এলো – উত্তম বসের খাস মানুষ। ওর সঙ্গে পিস্তল থাকে। ফজলু বুঝল আজকের কাজটা সহজ নয়। উত্তম যেখানে যায়, খবর তৈরি করে দিয়ে আসে।
থানার ওসি চলে গেছেন। এখনো নতুন ওসি আসেন নাই। বস এই সময়টা বেছে নিয়েছেন তার কাজের জন্য। খাদেম জানালো বসের সোনার মতো দামি জমিটা সাত কোটি টাকায় রফা করেছিলেন এক পেপার মিলের সঙ্গে। কিন্তু সেটা কাল হঠাৎ দখলে নিয়েছে গোদনাইলের হাজি এহসান। লোকটা ঘাঘু। বন্দুক সগিরকে সে কৌশলে নারায়ণগঞ্জ নিয়ে সেখানে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে। এখন উত্তম ভরসা।
উত্তমের কথা শুনে মনে হলো, লাশ পড়বে। মনু শিউরে উঠল। ফজলু অবশ্য উত্তমের কথা শুনেছে আবার শোনেওনি। তার মন পড়ে আছে দাদি আর ফুলির বোজা চোখে। সে ঠিক জেনেছে, দাদি সব বুঝেছেন। সব বুঝে দাদি রেগে বাড়ি মাথায় তুললে সে খুশি হতো, তাকে চেলা কাঠ দিয়ে পেটালে সে আরাম পেত, তিনি দাওয়ায় গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদলে তার স্বস্তি হতো। কিন্তু দাদি এসব কিছু না করে শুধু চোখ বুজেছেন।
কেন?
সন্ধ্যার মধ্যেই খবর এলো, সর্বনাশ! ওসি ফিরেছেন, কিন্তু ঠিক কী কারণে খাদেম বলতে পারল না। মধু নামের উত্তমের এক সঙ্গী বলল, ওসি কঠিন মানুষ, একটা মেরামতি চালাচ্ছিলেন বন্দরে, সেইটা শেষ করতে ফিরে এসেছেন। এক সপ্তা থাকবেন।
উত্তমের, খাদেমের ফোন বাজতেই থাকল। একজন কেউ জানালো বন্দুক সগিরকে নিয়ে পুলিশ বন্দরে এসেছে, আরেকজন বলল, ডন সাহেব নারায়ণগঞ্জ ফিরে গেছেন। খাদেম নিজেই একটা নাম্বারে ফোন করে শুনল, বসের এক ইস্পিশাল ক্যাডারকে পিটিয়ে হাড়গোড় ভেঙে হাসপাতালে পাঠিয়েছে এহসানের লোকজন। লোকটা বাঁচে কিনা সন্দেহ।
এহসানের লোকজনকে নিয়ে অবশ্য ভয় নেই তারা মিয়ার ক্যাডারদের। ঢাকা থেকে কঠিন কিছু লোক তিনি আনিয়েছেন, তারাই তাদের সামাল দেবে। তাদের ভয়টা ওসিকে নিয়ে। এ লোক তার মেরামতির কাজে কাউকে তোয়াক্কা করে না।
তারা মিয়া কাঁপা কাঁপা গলায় ফোন করলেন খাদেমকে, বললেন কিছু একটা করতে। পুলিশ তার গদি ঘিরে রেখেছে।
খাদেম বেরিয়ে গেল। মধুও গেল। উত্তমও একসময় উঠল। যাওয়ার আগে সে ফজলুকে বলল নিতাইবাবুর আড়তের পেছনের খালটা পার হয়ে ইনাম মার্কেটের গেটে কিসলুর চায়ের দোকানে চলে যেতে। সে মনুকে সঙ্গে নিয়ে যাবে।
ফোনটা খোলা রাখিস, সে বলল।
কিন্তু বাড়ির সামনের গলিটার মোড়েও হয়তো উত্তম পৌঁছাতে পারল না, পুলিশের বাঁশি বাজা শুরু হলো। একই সঙ্গে দ্রুতপায়ে দৌড়াদৌড়ি। দরজা খুলে ফজলু দেখল, গলিটায় সাত-আট পুলিশ। দুই পুলিশ তাদের মেসবাড়ির দিকেই আসছে। তাদের হাতে বন্দুক উঁচু করে ধরা। গলিতে আলো নেই, কিন্তু একটা ফাজিল চাঁদ উঠে আলোর অভাবটা অনেকটা ঘুচিয়ে দিয়েছে। ফজলু দাঁড়িয়ে পড়ল। তার ভেতর থেকে একটা তাড়া আসছে, পালা, পালা, ডাইনে দৌড় দে। না-হয় ঘরে ঢুইকা পিছনে যা, পিছনের পাঁচিল বাইয়া পালা। কিন্তু তার পা গলির ইট আর খোয়ায় আটকে গেছে। পা নড়ে না। সে দেখল দুই পুলিশ দৌড়ে আসছে বন্দুক তাক করে। পুলিশ নিশ্চয় জানে তারা মিয়ার ক্যাডাররা কোথায় থাকে। ওসি তো জানতেন। এই দেড়তলা আধাপাকা দালানে, চার কামরার মেসবাড়িতে।
চাঁদের আলোটা স্থির, দুধ-ঘোলা সাদা। গলির রাস্তার দুই দিকে দুটা নিমগাছ, কে কবে লাগিয়েছিল কে জানে, কিন্তু কেউ কাটে না, গাছ দুটা নাকি গলিটার হাওয়া পরিষ্কার করে। নিমগাছের পাতায় চাঁদের আলো তিরতির করে। উলটো দিকের গাছটার নিচে দু-একটি ভাঙা চেয়ার, তক্তা, কেরোসিন কাঠের বাক্স। মোক্তার অ্যান্ড সন্সের পরিত্যক্ত তৈজসপত্র। দোকানটা মেরামত হয়েছে কদিন আগে, আবর্জনাগুলি সরানো হয়নি। সেই আবর্জনার ওপার থেকে হঠাৎ একটা ছায়া রাস্তাটা পার হয়ে তার সামনে এসে দাঁড়ালো। একটা গরু। কড়া বাদামি পিঠ আর গা, চাঁদের আলোয় কিছুটা অস্পষ্ট, কিন্তু সেই অস্পষ্টতার মধ্যেও সাদা সাদা কিছু অবিন্যস্ত টুকরো আভা জেগেছে, যা দেখলে হঠাৎ বুনোফুল বলে মনে হতে পারে।
ফুলি! ফজলু নিজেকেই বলল। ফুলি এখানে কী করে এলো? এও কি সম্ভব? নাকি চাঁদের আলো তার চোখে বিভ্রম ছড়িয়েছে?
সে চাঁদটার দিকে তাকাল। চাঁদের ওপর কিছু সাদা মেঘ হালকা চাদর বিছিয়েছিল। সেই চাদর এখন সরে গেছে। চাঁদটা তাজা। যেমন তাজা গরুটাও। গরুটার দিকে চোখ নামাতে হলো ফজলুর। এটি এখন মাথাটা শক্ত করে সামনে মেলে বেশ তেজে এগিয়ে যাচ্ছে দুই পুলিশের দিকে, যেন তার মাথাটা ঢাল, অথবা একটা কামানের নল।
পুলিশ দুজন ভড়কে গেল। তারা গরুটার দিকে তাকাল। তারা বুঝতে চেষ্টা করল, কেন তাদের দিকেই এটি ধেয়ে আসছে। তারা বন্দুক চালাতে পারত, বন্দুক তো তাক করাই ছিল। কিন্তু তারা গ্রামের ছেলে, একটা গাভীকে বন্দুকের গুলিতে মারার কথা ভাবতে পারে না। তারা বরং গাভীটা থেকে দূরে সরে যেতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কিন্তু গাভীটা তেজি, তার চোখে পানি নেই, তার শরীরেও অবসাদ নেই। সে গিয়ে তাদের সামনে দাঁড়াল। গলিতে কয়েকজন পথচারী ছিল, মোক্তার অ্যান্ড সন্সের কর্মচারী ছিল। তারা অবাক হয়ে দেখল, গাভীটা এক পুলিশের সামনে গিয়ে মাথা তুলে তার বন্দুকে একটা হালকা টোকা দিলো। তারপর জিভ বের করে বন্দুক ধরা হাতটা চাটতে লাগল।
মোক্তার অ্যান্ড সন্সের এক কর্মচারী শব্দ করে হাসল। বলল, পুলিশভাই, গরুটা আপনারে পছন্দ করেছে।
পুলিশটার জন্য বিব্রতকর অবস্থা। অন্য পুলিশটাও এই অবাক দৃশ্যে দাঁড়িয়ে গেছে। তাদের চোখ এখন গাভীটার দিকে। সেটি এখন স্থির দাঁড়িয়ে লেজ নাড়ছে। অন্য পুলিশটার দিকে তাকিয়ে যেন জানতে চাইছে, তোমার হাতটাতে একটু আদর করে দিলে রাগ করবে?
চাঁদের আলোয় দুই পুলিশ, একটি গাভী, কিছু মানুষ যেন একটা শান্ত ছবির ফ্রেমে বন্দি হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্তের জন্য। তারপর চাঁদের সামনে ক্ষক্ষরের দেয়াল তুলে দিতে একটা মেঘ এগিয়ে এলো। হেলতে দুলতে।
এই দৃশ্য দেখার জন্য ফজলু অবশ্য আর দাঁড়িয়ে ছিল না। গাইটা তেজি ভাব নিতেই তার পায়ে চাঞ্চল্য এসেছে, সে ঘরে ঢুকে দুপুরে কাঁধে ঝুলিয়ে আনা ব্যাগটা তুলে নিয়েছে, যার ভেতরের একটা পকেটে এখনো কাল হাটে পাওয়া বাকি টাকাগুলি আছে। তারপর পেছনের পাঁচিল টপকে হাওয়া হয়ে গেছে।
বন্দর পার হতে হতে সে চাঁদটার দিকে আবার তাকিয়েছে। চাঁদটা ক্ষক্ষরের পাঁচিলের পেছনে বন্দি। আলোটা অস্পষ্ট। আকাশ জুড়ে সাদা মেঘের হুটোপুটি।
-----পাঁচ----
বাড়ি ফিরতে ফিরতে ভোর হয়ে গেল ফজলুর। সে জানে দাদি ততক্ষণে উঠে যাবেন, নামাজ পড়বেন, কিছুক্ষণ উঠানে হাঁটবেন। হয়তো নিচুস্বরে বিলাপ করবেন – তার ছেলে আর ছেলের বউয়ের জন্য, হয়তো ফুলি এবং ফজলুর জন্য। অথবা চুপ করে মোড়াটাতে বসে থাকবেন।
গত সন্ধ্যার ঘটনা ফজলুকে বিমূঢ় করে রেখেছে। যে-গাইটা তাকে বাঁচিয়ে দিলো দুই পুলিশের হাত থেকে, সে কোত্থেকে এলো। সে কি ফুলি? যদি ফুলি হয়, দুনিয়ায় এর থেকে অসম্ভব কথা আর কে কবে শুনেছে?
মেসবাড়ি থেকে পালিয়ে সে অনেকক্ষণ ঘোরাঘুরি করেছে, খবর নিয়েছে। তার মোবাইলে ফোন করেছে মনু, বলেছে খাদেম মারা পড়েছে, বস আটক হয়েছে। মনু বলেছে, তুই পালা। বন্দরে আর জীবনে না। মনু যাবে চাঁদপুর। তার এক মামার ইলিশের আড়ত আছে সেখানে।
বাড়ির কাছাকাছি এসে ফজলুর ইচ্ছা হয়েছে, একটা গাছে তার মাথাটা ঠুকবে। কিসের জন্য, সে বলতে পারবে না। ঠুকতে ইচ্ছা হয়েছে, কিন্তু ঠুকল না, কারণ কপালে রক্ত জমলে দাদি দেখলে ভয় পাবেন। এমনিতেই গতকালের রক্তের দাগটা কপালে আছে।
দাদি রক্ত ভয় পান। বাবা-মার লাশ যখন বাড়িতে আসে, তার পুলিশ মামা তাকে বলেছেন, তাদের গায়ে রক্ত ছিল। রক্ত দেখে দাদি জ্ঞান হারিয়েছিলেন।
বাড়িতে ঢুকতেই দাদিকে দেখা গেল। তিনি বেতের মোড়া পেতে বসে আছেন ফুলি যেখানে ঝিম মেরে থাকত সেখানে। ফজলুর বুকটা একটা মোচড় দিলো। হালকা পায়ে সে এগোল। কিন্তু সামনে তাকাতেই তার চোখটা কপালে উঠল। ফুলি! নাকি অন্য কোনো গাই? একটু এগিয়ে সে দেখল গাইয়ের চামড়াটা কড়া বাদামি, ভোরের হালকা আলোতেও যা বোঝা যাচ্ছে। এবং এখানে-সেখানে সাদা দাগ। যেন বুনোফুল। গাইটা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। তার সামনে একটা টুকরিতে ঘাস, বিচালি। কিন্তু সে খাচ্ছে না, শুধু তার চোয়াল নড়ছে।
ফজলুর পায়ের শব্দে দাদি তাকালেন। গত সন্ধ্যার চাঁদটার মতো একটা আলোময় হাসি দিয়ে বললেন, ফজলু, তুই আইলি? দ্যাখ। আমার ফুলিও ফিরা আইছে। যা, এখন পুকুরে গিয়া একটা ডুব দিয়া আয়। তোর পেটে ক্ষুধা, ফুলিটার মতো। তুই কাইল থাইক্ক্যা কিছু খাস নাই। তুই খাইলে ফুলিও খাইব।
পাহাড় ভাঙার জন্য দাদি বজলুকে, অর্থাৎ ফজলুর বাবাকে দোষ দিতেন। কেন সে ভরা বর্ষায় বন্ধুর বিয়ে খেতে ছেলে-বউসহ একটা ভাঙা বাসে চড়ে নিয়ামতপুর রওনা হবে? সেই বন্ধুকে দাদি কখনো চোখে দেখেননি, এমনি দূরে দূরে থাকত লোকটা। অনেকদিন ধরে সৌদিতেও ছিল লোকটা। দশদিনের ছুটিতে এসে কেন বজলুকেই ডাকতে হবে বিয়েতে যেতে?
দাদি বলেন, ফজলুর বাবা-মার লাশ লোকটাই অবশ্য বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল; ফজলুকেও – অথবা যেটুকু ফজলু তখনো জাগা ছিল। দাদির ধারণা, ফজলু যে কোনোদিন মানুষ হয়নি, সেটি ওই বর্ষাদিনে তার জীবনের ওপর একটা পাহাড় ভেঙে পড়ার জন্য।
তোরে আমি অনেক চেষ্টা করছি ফজলু, মানুষ করতে। পারলাম না, দাদি ফজলুকে বললেন। আমাদের হিসাবে হাজার তিনশোবারের মতো।
ফজলু পুকুর থেকে বালতি ভরে পানি তুলে একটা কাটা ড্রামে রাখছে। ড্রামের পাশে দাদির প্রিয় গরুটা ঝিম মেরে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে গোসল দিতে হবে। গরুটা একটা গাভী, দাদি যার একটা নাম দিয়েছেন, ফুলি। তার কড়া বাদামি চামড়ায় সাদা কিছু দাগ, দেখলে মনে হয় কোনো বুনো ফুল। গাভীটা বিষণ্ণ, তার বাছুরটা মারা গেছে। ফজলু সকাল সকাল গাভীটার দুধ দুইয়েছে। সেই দুধ কিছু গরম করে সে খেয়েওছে। এখন তাকে গোসল দিলে তার বিষণ্ণতা কমবে। দাদি তাকে বলেছেন।
পাড়ার লোক ফজলুকে ভয় পায়। ছেলেটা একটা গুন্ডা, তার মধ্যে একটা বেপরোয়া ভাব, কাউকে সে পরোয়া করে না, এমন কথা প্রতিবেশী ইন্তাজ আলি সবাইকে বলেন, বিশেষ করে ফজলুদের বাড়ির তিনটি মরাগাছ তিনি লোক লাগিয়ে লাকড়ির জন্য কেটে নেওয়ার পর সে যেভাবে তার বাড়িতে গিয়ে তা-ব চালিয়েছিল, তারপর। পাড়ার লোক অবশ্য এখন খুশি, ফজলু নারায়ণগঞ্জ থাকে। মাঝেমধ্যে আসে, কিন্তু বাড়ি ছেড়ে খুব একটা বেরোয় না। আগে যখন গ্রামে ছিল, মানুষ তার সামনে পড়তে চাইত না। ফজলুর এক মামা, যিনি পুলিশে চাকরি করতেন, এবং চাকরি চলে গেলে বাড়িতেই থাকেন, তাকে গুন্ডা থেকে ‘মানুষ’ করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তাতে লাভ হয়নি। এই মামাই তাদের দেখাশোনা করেছেন, তাদের বাড়িটা যে দখল হয়ে যায়নি, সেটিও তার জন্য। ফজলু সেজন্য মামার সামনে বেয়াদবি করে না; কিন্তু তার কোনো কথা শোনার দায় তার আছে, তা বিশ্বাস করে না।
একটা মানুষের সামনেই শুধু ফজলু কখনো মেজাজ দেখায় না এবং তিনি হচ্ছেন তার দাদি। তার জীবনের ওপর পাহাড় ধসে পড়ার পর তাকে টেনেটুনে তুলেছেন দাদি। তাকে আগলে রেখেছেন। তাকে সঙ্গ দিয়েছেন। সেবা দিয়েছেন। তার দিকে তাকিয়ে দাদি বললেন, বাপের মতো অত চওড়া-লম্বা হইতে গেলি কেনরে ফজলু? চওড়া লম্বা ছিল বইলা তো জানালায় আটকায়া গেল, বাইর হইতে পারল না।
গরুটার গা ডলতে ডলতে ফজলুর মন কিছুটা খারাপ হলো। বাছুরটা মুখে ফেনা তুলে আচমকা মরে গেল। ফজলু নারায়ণগঞ্জ ছিল। খবর পেয়ে বাড়ি আসতেই দাদি বললেন, ফুলির বাচ্চাটা মইরা গেছেরে ফজলু, এই দুঃখে ফুলিও যদি এখন যায়?
ফুলি কি বাসে করে বাচ্চাটাকে নিয়ে নিয়ামতপুর যাচ্ছিল?
তবে ফজলু জানে, কারো মারা যাওয়ার দুঃখে যদি কেউ মারা যেত, তবে সে-ই তো অনেক আগে যেত। অনেক বছর মার মুখটা তার যখন-তখন মনে ভেসে উঠত, তার হাসিটা কানে বাজত। তখন সে ঠিক থাকতে পারত না। চোখ বন্ধ করে ঝিম মেরে থাকত – ফুলি এখন যেমন থাকে, চোখে পানি নিয়ে – না হয় বাইরে গিয়ে পুকুরের কোনার বাঁশঝাড়টাতে একটার পর একটা রাগী ঢিল মারত।
একসময় ঝিম মারা থেকে বেরিয়ে সে রাগের ঝাপটায় পড়ল। রাগটা কার ওপর, সে জানে না। হয়তো বাঁশঝাড়গুলির ওপর, অথবা বাঁশঝাড়ে দিনের বেলা লুকিয়ে থাকা ভূতগুলির ওপর। একসময় তার বিশ্বাস হলো নিয়ামতপুর যাওয়ার পথের বাঁশঝাড়ের ভূতগুলিই তার ওপর ভেঙেপড়া পাহাড়টা কেটেছিল, এজন্য এক সন্ধ্যায় সে সাইকেল চালিয়ে ওই বাঁশঝাড়ে গিয়ে তা-ব করেছে। ঢিল ছুড়েছে। বাঁশ কেটেছে। কচি বাঁশে আগুন লাগানোর চেষ্টা করেছে। তাতে আগুন না জ্বললেও ধোঁয়া হয়েছে বেশ। রাতঘুমে থাকা পাখিগুলি জেগে উঠে হইচই করেছে।
ঘণ্টাদুয়েক বাঁশঝাড়ে তুফান তুলে সে ফিরেছে। সাইকেলটা বন্ধু মনুকে ফেরত দিয়ে বাড়িতে এসে দা-টা রান্নাঘরের দেয়ালে গুঁজে পুকুরে নেমে গোসল করেছে। গোসল করতে করতে তার চোখে ভেসেছে একটা ডোবা। ফজলুর ওপর নেমে আসা পাহাড়টা ওই ঝিরঝির বৃষ্টিদিনের বাসটাকে এক ধাক্কায় বাঁশঝাড়ের উল্টোদিকের ডোবায় ফেলে দিয়েছিল। গত তিন-চার বছরে তাকে কয়েকবার নিয়ামতপুর যেতে হয়েছে। তার বাবার বন্ধু তাকে টাকা-পয়সা দিয়েছেন, জামা-জুতা দিয়েছেন, একবার দাদির জন্য শাড়ি দিয়েছেন। ফজলু নিয়েছে, কিন্তু দাদি ছুঁয়েও দেখেননি সেই শাড়ি। সেটি গেছে রইসুন বুয়ার ভাগে। রইসুন বুয়া আরেক মানুষ, যিনি ফজলুর রাগটা তেমন দেখেননি। নিয়ামতপুরে যাওয়া-আসার পথে ফজলু শুধু বাঁশঝাড়ের দিকেই তাকিয়ে থেকেছে। কোনো ডোবার দিকে তার চোখ যায়নি।
ফুলির গা ডলতে ডলতে ফজলু খেয়াল করল, গাইটা চোখ বুজেছে, এবং চোখের কোনা বেয়ে পানি পড়ছে। ফজলু বুঝল, গাইটা এখন তার মতোই স্মৃতির ঝাপটা থেকে নিজেকে বাঁচাতে চোখ বোজার রাস্তা নিয়েছে।
গরুর কি কোনো স্মৃতি থাকে? থাকলে কি তার মতো টুকরো টুকরো, এলোমেলো?
দাদি বসে ডাঁটাশাক বাছছেন। ডাঁটাশাক ফজলুর প্রিয় খাবার। আর ট্যাংরা মাছ। রইসুন বুয়ার হাঁটতে কষ্ট হয়, তারপরও ট্যাংরা মাছ এনে দিয়ে গেছেন, সাত সকালে। দাদি জিজ্ঞেস করলেন, তুই যেহানে থাহিস, জায়গাটার নাম কী?
বন্দর। অনেকবার কইছি দাদি।
হ। তা বন্দরে কোনো সুন্দর মাইয়া নাই? চোহে পড়ে না? এই প্রশ্নটা দাদি তাকে গত কয়েকমাসে অন্তত ত্রিশবার জিজ্ঞেস করেছেন। ফজলু হাসল, বলল, চোহে পড়লে তোমারে জানাইমু, দাদি।
হ। এই গেরামের, আশপাশের কুনু গেরামের, কুনু মাইয়া তো তোরে বিয়া করব না।
বিষয়টা ফজলুর জন্য স্বস্তির। সে কথা বাড়ায় না।
পকেটে রাখা মোবাইল ফোন বাজে। ফজলু ধরে, এবং ফুলিকে চোখ বুজে স্মৃতির ঝাপটা সামলাতে দিয়ে একটু দূরে হেঁটে যায়। ফোন করেছে তার বন্দরের বন্ধু, নাম খাদেম। সে বলল, ওরে ফজলু, ভালো খবর। ম্যানেজ করা গেছে। অহন সব মোটামুটি কিলিয়ার। তুই আইতে পারিস।
ঠিকাসে, ফজলু বলল।
শুন, শুন, কথা আছে, খাদেম বলল, মনুরে ছুটাইবার রাস্তা পাওয়া গেছে। অবশ্য তাতে খরচ দেড় লাখ। বস আধা দিবেন, বাকিটা আমাগো ম্যানেজ করতে হইব। তোর ভাগে পড়ছে দশ। টেহাটা কাইল লাগব। একটা নম্বর এসেমেস কইরা দিতাছি। ওই নম্বরে বিকাশ কইরা দিস। দুইবারে করিস, সকালে একবার, বিকালে আরেকবার।
খাদেমরে, আমার টাকা নাই। একশ টাকাও নাই। দশ হাজার কইত্থে দেই? কাতর কণ্ঠে বলল ফজলু।
না দিলে বস রাগবো। বস রাগলে মনুও ফৌত। তুইও। তোরে কিলিয়ার করতে বসের কত লাগছে জানিস তো। আইচ্ছা রাখি।
খাদেম ফোন রেখে দিলে ফজলু চিন্তায় পড়ল। গ্রামে তার একটাই বন্ধু, মনু। ফজলুকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়ার পর মনুই তাকে সঙ্গ দিয়েছে। সিনেমা দেখতে নারায়ণগঞ্জ নিয়ে গেছে। মনু মাঝে মাঝে বাড়ি থেকে পালায়। তার মা আছে, আবার সৎমাও আছে। সৎমা এক খতরনাক মহিলা, তার বাবাকে পোষ মানিয়ে একটা ফাউল মানুষ করে ফেলেছে। মনু এসব কথা যখন ফজলুকে বলেছে, তার গলায় অবশ্য রাগ ছিল না। কারণ তার মা আছেন। কিন্তু রাগের বদলা মনুর গলায় একটা দুঃখ বেজেছে। এখন সেটা নেই। দুই বছর ধরে বন্দরে থাকতে থাকতে, ফজলুর সঙ্গে মেসের একটা ঘর ভাগ করতে করতে, তার মনে রাগ এসেছে। একদিন বাড়ি এসে সৎমাকে বলেছে, আমার মারে আর একটা খারাপ কথা কইলে আফনারে আর আফনার পোলাডারে আমি ডোবায় ফালাইয়া চুবাইমু। চুবাইয়া চুবাইয়া দম আটকাইয়া মারমু, বুঝলেন?
ফাউল মানুষ বাবা ঘরের দাওয়ায় বসে মনুর রাগী গলা শুনেছেন। এই রাগ তিনি কোনোদিন দেখেননি। একে তাৎক্ষণিক সামাল দেওয়াটাও তার জ্ঞানের ভেতর নেই। তিনি চুপ করে থাকলেন।
মনু তার মাকে একটা মোবাইল ফোন দিয়েছিল। সে মাকে বলল, একদিনও যদি তোমারে একটা বদ কথা কয়, আমারে জানাইও মা। চললাম।
সেই থেকে মনুর মা স্বস্তিতে আছেন। ফাউল মানুষটাও মাঝেমধ্যে তার বিছানায় আসেন; কিন্তু মা স্বস্তিতে গেলেও মনুর রাগটা থাকল। এটি সে ফজলু থেকে সারা জীবনের মতো কর্জ নিয়েছে।
বন্দরের তারা মিয়ার ক্যাডার বাহিনীতে মনুই প্রথম নাম লিখিয়েছে, নারায়ণগঞ্জে সিনেমা দেখতে এসে খাদেমের সঙ্গে তার পরিচয়ের সুবাদে। তারা মিয়ার ক্যাডার হলেও তাদের বস আরেকজন, যিনি থাকেন নারায়ণগঞ্জে এবং বন্দরে আসেন মাঝে মধ্যে, শীতলক্ষ্যা পাড়ি দিয়ে। তার স্পিডবোট আছে। গাড়িও আছে। তাকে কেউ ডাকে ডন সাহেব, কেউ জিয়া সাহেব। তারা মিয়া তাকে সমীহ করেন। লোকটার নিশ্চয় অনেক টাকা, কারণ মনুদের চার-পাঁচজনকে তিনি ভালোই পয়সা দেন। তারা মিয়া লোকটা কিপ্টা। হাড্ডি কিপ্টা, কিন্তু বস হাতখোলা হওয়ায় তারা মিয়াকে মনুরা ছেড়ে যায়নি। বসের কেন তারা মিয়াকে দরকার, যেখানে তাকে পুলিশও দেখলে সালাম দেয়, হেসে হেসে কথা বলে, থানায় ডেকে চা খাওয়ায়, এ-প্রশ্নটি মনু একদিন করেছে খাদেমকে। উত্তরে খাদেম বলেছে, বড় দালানের খুঁটি লাগে না মনু? বন্দুক সগিরের পিস্তল লাগে না?
ফজলু জানে, বসের সাম্রাজ্য শীতলক্ষ্যা পার হয়ে নারায়ণগঞ্জকে পেছনে ফেলে ঢাকা পর্যন্ত ছড়ানো। তবে বন্দর তার কাছে পয়া। এখানে অনেক জমি এখন তার দখলে, যার বেশিরভাগ তারা মিয়ার ক্যাডারেরা ব্যবস্থা করে দিয়েছে। বসের সঙ্গে তারা মিয়ার পার্থক্যটা ফজলু বুঝেছে এভাবে : বসের যেখানে বন্দরে একটা গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি আছে, তারা মিয়ার আছে কিনা ঝুট ব্যবসা, যে-কাজে তার নির্ভরতা আবার ক্যাডারদের ওপর। খাদেম বলে, এখন অবশ্য তারা মিয়ার ইয়াবা ব্যবসা ঝুট ব্যবসা থেকেও বেশি পয়মন্ত।
বস এবং তারা মিয়া সম্বন্ধে মনুর উৎসাহটা বেশি। ফজলুর আবার কোনো মানুষকে নিয়ে উৎসাহটা কম। কারো সম্পর্কে কথা উঠলে সে শোনে, মনে মনে নোট করে নেয়, ব্যস। তাছাড়া, এখন ভাবাভাবির সময়টা কম। কারণ একটু সমস্যা যাচ্ছে তারা মিয়ার ক্যাডারদের। থানার ওসি পাল্টালে কিছুদিন তাদের দৌড়ের ওপর থাকতে হয়। এই তিনমাস যেমন। থানায় নতুন ওসি এসেছেন, একদিন বস থানায় গিয়ে ওসির সাক্ষাৎ না পেয়ে তারা মিয়ার গদিতে বসে গজর গজর করেছেন। তারা মিয়ার সিমেন্ট ব্যবসা, খুবই নিরীহ ধরনের, তাও একদিন ওসি এসে দেখে গেছেন। তাকে বলেছেন সাবধান হয়ে যেতে। তিনি তারা মিয়াকে চোখে চোখে রাখবেন। যেদিন একটা পা বিপথে ফেলবেন তারা মিয়া, তাকে আইনের দড়ি দিয়ে বাঁধবেন।
তারা মিয়া বিগলিত হেসেছেন। এই হাসিটা অভিনয়ের, কিন্তু অভিনয়টা এমনই নিপুণ, ওসিও বুঝলেন না। তিনি কথা না বাড়িয়ে চলে গেলেন। ওসি চলে গেলে তারা মিয়া যা বললেন তা ওসির কানে গেলে কী হতো কে জানে। তিনি চোখ সরু করে বললেন, আমার পথ তো একটাই ওসি সাহেব। দেখি এই পথ আপনি কতদিন আগলে রাখতে পারেন।
ঝুট ব্যবসায় মারামারি, এমনকি খুনাখুনিও হয়। কিন্তু তারা মিয়া এই ব্যবসা করেন শান্তিতে। কারণ তার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। নতুন ওসি আসার পর প্রতিদ্বন্দ্বী এলো, একদিন মারধরও হলো। তাতে মাথা ফেটে একজন হাসপাতালে গেল, পেটে গুলি লেগে আরেকজন গেল ঢাকা মেডিক্যালে। গুলিটা খাদেমের পিস্তলের। পিস্তলটা তাকে ভাড়ায় দিয়েছে বন্দুক সগির, যাকে প্রটেকশন দেন বন্দরের এক সরকারি দলের নেতা।
পুলিশ এসে হানা দিলো। খাদেম পালাল। মনু ধরা পড়ল। ফজলুকে নারায়ণগঞ্জ একটা কাজে পাঠিয়েছিলেন তারা মিয়া, সে বেঁচে গেল। বন্দর না ফিরে সে সোজা বাড়ি গেল।
খাদেম তাকে ফোনে জানাল, বাড়িতেই যেন থাকে, আর অকারণে বাইরে না যায়। ওসির প্রমোশন হয়েছে, বন্দর ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে পারেন। গেলে একটা কিছু হবে, না হলে রূপগঞ্জ না হয় আড়াইহাজারে বস তাদের একটা ব্যবস্থা করে দেবেন।
বছরখানেক আগে একটা জমি দখল করতে গিয়েছিল তারা মিয়ার ক্যাডারদল। তাদের সঙ্গে ছিল বন্দুক সগির। লোকটা ছোটখাটো, কিন্তু বিরাট তার তেজ। জমিটা ছিল সোনার, এর জন্য বস অনেকদিন চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু এরকম জমি সহজে দখলে আসে না। দখলের ব্যবস্থাটা সেজন্য বস পাকাপোক্ত করে রেখেছিলেন, শুধু একটা ফাঁক থেকে গিয়েছিল। আরেকটা পার্টি নেমেছিল মাঠে, যাদের হাতটা ছিল অনেক লম্বা। পুলিশ শুধু না, প্রশাসনেও সেই হাত পৌঁছেছিল।
জমিতে পৌঁছানোর আগেই খাদেম ব্যাপারটা টের পেয়েছিল। সে বন্দুক সগিরকে বলেছিল, ভাইজান, আইজকা থাক। আইজ প্যাঁচটা বড়।
সগির শোনেনি।
পুলিশ সগিরকে ধরেছিল, ফজলুকেও। আরো দু-একজনকে। খাদেম পালানোতে ওস্তাদ। সে পালিয়েছিল। বসকে বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়েছিল সবাইকে ছাড়িয়ে নিতে। জীবনে প্রথম জেলের ভাত খেয়েছে ফজলু। দাদি অবশ্য কিছুই টের পাননি। প্রতিদিন দাদিকে ফোন করে সে। সূর্য ওঠা-ডোবার মতোই নিয়মে। জেলে বসেও প্রতিদিন তার কথা হয়েছে দাদির সঙ্গে। ব্যবস্থাটা তারা মিয়া করে দিয়েছেন।
তারপরও অন্তত আধামণ চালের জেলের ভাত তাকে খেতে হয়েছে।
অবাক কা-, ফজলু বেরিয়ে দেখল, জমিটাতে বিরাট সাইনবোর্ড, যাতে বড় করে কোম্পানির নাম লেখা। কোম্পানির নাম ডন ভ্যালি। খাদেম বলে, এটা রিয়াল ইস্টেট।
হেলাফেলা, মোড়ামুড়ি বস পছন্দ করেন না, ফজলু জানে। জেল থেকে মনু তাকে ফোনে বলেছে, জেলে এবার বিপদ। গেল বছর কিছু লোককে মেরে তক্তা করেছিল তারা মিয়ার ক্যাডাররা। তাদের দুজন এখন একই জেলে। তারা মনুকে বলেছে বাড়িতে মিলাদ পড়াতে। তার জান এবার শেষ।
যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বের হতে হবে, মনু বলেছে, যা পারো তোমরা করো।
আর আজ সকালে খাদেমের ফোন। এখন সে কী করে? হাতে আছে একটা দিন। সে কি পিয়ারু মামার কাছে যাবে? পিয়ারু-পুলিশ মামার কাছে? নাকি বাবার বন্ধুর বাড়ি যাবে নিয়ামতপুর? দাদির হাতে টাকা নেই। তাকে যত টাকা সে দিয়েছে, তার কিছু তিনি খরচ করেছেন, বাকিটা জমিয়েছেন। কিন্তু কোথায় রেখেছেন, ফজলু জানে না। তারপরও দাদিকে জিজ্ঞেস করতে হবে।
ফজলু শ-পাঁচেক টাকা চাইলে নিশ্চয় দাদি দিতেন, কিন্তু একসঙ্গে দশ হাজার সে কী করে চায়।
দুপুরে তার জন্য দাদি ভাত বেড়ে দিলে সে অবশ্য কথাটা তুলেছে। জরুরি দরকার, সে দাদিকে বলেছে।
টাকা দিলে তুই কই যেন কুনখানে থাহিস সেইখানে চইলা যাবি?
হ। ফজলু আসেত্ম করে বলেছে।
দাদিকে দেখলে মনে হতে পারে ভুলাভালা মানুষ, কেউ ঠকালেও বোঝেন না, লোকের চালাকি ধরতে পারেন না; কিন্তু আমরা জানি দাদি সহজ মানুষ নন। তিনি বোঝেন। ফজলু কোনো কারণে একটা বিপদে আছে, তিনি সেটা টের পেয়েছেন। দাদির মন। মাস দুই নাতিটা আছে তার সঙ্গে, তার মনটা ভরে আছে। টাকা দিলে সে চলে যাবে। তিনি উদাসীনভাবে বললেন, হাতে টাকা নাইরে ফজলু। যা ছিল আছিয়ারে কিছু দিছি। কিছু জমা আছে সুফিয়া বইনের কাছে।
আছিয়া ফজলুর চাচাত বোন। পিয়ারু চাচার বড়ভাই আজমত মুন্সির মাদ্রাসা পাশ মেয়ে। বিধবা। জীবনটা কাটে কষ্টে। ফজলু তাকে দেখেছে কদাচিৎ।
দাদির ওপর ফজলুর কখনো রাগ হয় না, আজো হলো না, তবে তার রাগ গিয়ে পড়ল আছিয়ার ওপর। আছিয়া বুবুকে দাদি বলেছিলেন তার কাছে চলে আসতে। দুই ছেলেমেয়েসুদ্ধ। কিন্তু আছিয়া পড়ে থাকল শ্বশুরবাড়ি, আধাপেটা খেয়ে, শ্বশুর-শাশুড়ির অত্যাচার সয়ে। ফজলুর ইচ্ছা হয় একদিন বুবুর শ্বশুরবাড়ি গিয়ে ওই দুই বুড়া-বুড়িকে সাইজ করে তাকে বাড়িতে নিয়ে আসে।
দাদি বললেন, ফুলিটা গোসল কইরা আরাম পাইল ফজলু। কিন্তু তারপর ঘাস-বিচালি কিছুই খায় নাই। উপোস করতেছে। ফুলিটার বুকে দুধ, ছাওয়ালটা নাই। সকালে দুধ দুইলে ওর পরানটা কান্দে। শূন্য হয়। ফুলি বাঁচবে না।
খাওয়া শেষ করে উঠানে নামল ফজলু। বদনার পানি ঢেলে হাত ধুলো। ফুলিকে চোখে পড়ল। সজনেগাছের নিচে বসে আছে ঝিম মেরে। স্মৃতির ঝাপটা কি একটা গাইকেও এমন উদাসী করে দেয় যে কিছু খেতে তার ইচ্ছা হয় না?
ফজলু যেমন মিষ্টি খায় না। খেতে না পেরে মরে গেলেও, এবং আধাসের ম-া অথবা রসগোল্লা পৃথিবীর শেষ খাদ্য হলেও, না, সেদিন থেকে, যেদিন তাকে দাদি বলেছিলেন, তোর মা মিষ্টির পোকা ছিলরে ফজলু, মিষ্টি পাইলে আর কিছু না খাইলেও তার চলত।
ফুলির বোজা চোখের দিকে তাকাতে তাকাতে একটা চিন্তা তার মাথায় এলো। মনে মনে একটা হিসাব করল। দাদি ঘণ্টাখানেকের জন্য ঘুমাতে যাবেন, তিনটার দিকে। তার আগেই তার চিন্তাটা পাকা করতে হবে। আজ হাটবার। প্রতি মাসের শেষ মঙ্গলবার হাটটা খুব জমে। আজ শেষ মঙ্গলবার।
-----দুই-----
হাটের যেখানটায় গরুর বেচাকেনা হয়, সেখান পর্যন্ত ফুলিকে হাঁটিয়ে নিয়ে যেতে একবারও কোনো সমস্যা হলো না ফজলুর। দাদি ঘুমিয়ে গেলে ফুলিকে যখন সে জাগিয়ে তুলল, এবং ফুলি উঠে দাঁড়াল, সে যেন বুঝল তাকে নিয়ে ফজলুর কোনো মতলব আছে। ফজলু ভেবে দেখেছে, না খেয়ে ফুলি যখন মরেই যাবে, তাকে হাটে নিয়ে বিক্রি করে দিলেই তো হলো। এমনিতে ফুলি তরতাজা, একটা তিন-সাড়ে তিন বছরের গাই যেমন হয়। গরুর দাম এখন ভালো, কম করে হলেও পঞ্চাশ-ষাট হাজার তো পাওয়া যাবেই। দশ হাজার বিকাশ করে বাকিটা রেখে দিলেই হবে। ফুলিকে দাদি ভুলে গেলে তার হাতে টাকাটা একসময় সে তুলে দেবে।
ঘণ্টাখানেক অপেক্ষার পর খদ্দের পাওয়া গেল। খদ্দের ইমামগঞ্জের। ফজলু স্বস্তি পেল। সে তাকে চেনে না, ফজলুও তাকে চেনে না। খাদেমের দেওয়া নম্বরে সে আজ পাঁচ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেবে। বাকিটা কাল সকালে। তারপর সে বাসে উঠবে বন্দরের পথে।
যতক্ষণ ফুলিকে ধরে ফজলু দাঁড়িয়ে ছিল, ফুলি ঝিম মেরেই ছিল। কিন্তু খদ্দেরের হাতে তাকে তুলে দিলে ফুলির মধ্যে একটা চাঞ্চল্য দেখা দিলো। সে বুঝতে পারছিল না, তার চেনা পৃথিবীর বাইরের একজন মানুষ কেন তাকে ধরেছে। ফজলুই বা কেন এটি করতে দিচ্ছে। খদ্দেরটা একটা দড়ি লাগিয়েছে ফুলির গলায়, এবং দড়িটা যেন তাকে বাস্তবে জাগিয়ে দিলো। একটা অবিশ্বাসের দৃষ্টি মেলল সে ফজলুর দিকে। তারপর তার চাঞ্চল্য চলে গেল। একটা অবসাদ যেন নামল তার শরীরে। চোখ দুটি বন্ধ করে দিলো। ফজলু কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। কেন জানি তার ধারণা হলো ফুলির সঙ্গে তার আর চোখাচোখি হবে না। হলোও না। ফজলু দাঁড়িয়ে থাকলেও খদ্দেরের তাড়া ছিল, সে চলে গেল।
ফুলি চোখ খুলল না। অথবা খুলল এমন চিকন করে, মাটির দিকে, যেন ফজলুর ছায়াটাও তার চোখে না লাগে।
বাড়ি ফিরে ফজলু দেখল, দাদি দাওয়ায় বসে আছেন। তার প্রিয় বেতের মোড়ায়। তার সামনে যেতে যেতে সে তার বিলাপ শুনল।
বিলাপের সুরে দাদি বললেন, তুই কই ছিলিরে ফজলু? আমার ফুলিটা চইলা গেছে।
চইলা গেছে? কোথায়? অবাক হওয়ার ভান করল ফজলু।
জানি না। দাদি বললেন, তারপর চোখ বুজলেন।
ফজলুর কেন জানি খুব রাগ হলো। না দাদির ওপর না, নিজের ওপরও না। কিসের ওপর তাও সে জানে না। কিন্তু তার রাগ হলো, সবাই কেন তাকে দেখে চোখ বুজবে? দাদি কি সব বুঝেছেন? তিনি কি জানেন ফুলি যায়নি, তাকে ফজলুই নিয়ে গেছে?
অবাক, সে কোথায় ছিল এতক্ষণ, একবারও দাদি জিজ্ঞেস করলেন না। তাকে শুধু বললেন, ফুলিটা চইলা গেল। তুইও কি যাবি?
এ-কথা কেন জিজ্ঞেস করলেন তার ভুলাভালা দাদি?
আমি একটু খুইজ্জ্যা দেহি, দাদি? সে বলল।
দাদি বন্ধ চোখেই একটুখানি হাসলেন। বললেন, ফুলি চইলা গেছে। এখন তুইও চইলা যাবি। তয় যা।
-----তিন-----
সকালে ঘুম থেকে উঠে সে বলল, যদি না যাই দাদি, ক্যামনে কী হইব? খামু কী?
খাওনের অভাব হইবে নারে ফজলু, দাদি বললেন। তোর তাগড়া শরীর। বাপদাদার ভিটা আছে। একটুখানি জমি আছে, একটা পুকুর আছে।
ফুলি যেখানে বসে বসে ঝিমাচ্ছিল গতকাল, দাদি ঠিক ওই জায়গায় বসেছেন মোড়া পেতে।
তৈরি হয়ে তার রংওঠা ব্যাগটা কাঁধে ফেলে দাদির সামনে এসে দাঁড়াতেই তিনি বললেন, কেউ যাইতে চাইলে তারে আটকানো যায় নারে ফজলু। তোর বাপেরে পারি নাই। তোরেও পারমু না। যা।
ফজলু হাঁটা দিলো।
কিছুদূর গিয়ে সে তার কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে মাটিতে রাখল। তারপর একটা গাছের সঙ্গে মাথা ঠুকল। এবার রাগটা তার নিজের ওপর।
কপাল দিয়ে রক্ত বেরুলো। রক্ত মিশল চোখের পানির সঙ্গে।
-----চার-----
বন্দরে মেসঘরে পৌঁছল সে বেলা বারোটায়। বেশ ক্ষুধা লেগেছে, কিন্তু ফুলির মতো সে একটা সিদ্ধান্ত নিল, আজ কিছুই খাবে না।
খাদেম তাকে জিজ্ঞেস করল, কপাল ফাটল ক্যামনে?
ফজলু উত্তর দিলো না। খাদেমও দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করল না। জিজ্ঞেস করে নষ্ট করার মতো সময় তার নেই। গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজে বেরুতে হবে আজ রাতে। বস পইপই করে বলে দিয়েছেন, কাজটা ঠিকঠাক করতে হবে।
কী কাজ?
পরে বলব। এখন খা। খাইয়া ঘুমা। তিনটায় উঠিস। তিনটায় মিটিং, খাদেম বলল, তারপর চলে গেল।
ফজলু খেলও না, ঘুমালও না। শুধু বিছানায় চুপচাপ শুয়ে থাকল।
তিনটায় মনু এলো। জেলে থেকে সে শুকিয়ে গেছে। রংটাও কালো হয়ে গেছে। মনুর পেছন পেছন উত্তম এলো – উত্তম বসের খাস মানুষ। ওর সঙ্গে পিস্তল থাকে। ফজলু বুঝল আজকের কাজটা সহজ নয়। উত্তম যেখানে যায়, খবর তৈরি করে দিয়ে আসে।
থানার ওসি চলে গেছেন। এখনো নতুন ওসি আসেন নাই। বস এই সময়টা বেছে নিয়েছেন তার কাজের জন্য। খাদেম জানালো বসের সোনার মতো দামি জমিটা সাত কোটি টাকায় রফা করেছিলেন এক পেপার মিলের সঙ্গে। কিন্তু সেটা কাল হঠাৎ দখলে নিয়েছে গোদনাইলের হাজি এহসান। লোকটা ঘাঘু। বন্দুক সগিরকে সে কৌশলে নারায়ণগঞ্জ নিয়ে সেখানে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে। এখন উত্তম ভরসা।
উত্তমের কথা শুনে মনে হলো, লাশ পড়বে। মনু শিউরে উঠল। ফজলু অবশ্য উত্তমের কথা শুনেছে আবার শোনেওনি। তার মন পড়ে আছে দাদি আর ফুলির বোজা চোখে। সে ঠিক জেনেছে, দাদি সব বুঝেছেন। সব বুঝে দাদি রেগে বাড়ি মাথায় তুললে সে খুশি হতো, তাকে চেলা কাঠ দিয়ে পেটালে সে আরাম পেত, তিনি দাওয়ায় গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদলে তার স্বস্তি হতো। কিন্তু দাদি এসব কিছু না করে শুধু চোখ বুজেছেন।
কেন?
সন্ধ্যার মধ্যেই খবর এলো, সর্বনাশ! ওসি ফিরেছেন, কিন্তু ঠিক কী কারণে খাদেম বলতে পারল না। মধু নামের উত্তমের এক সঙ্গী বলল, ওসি কঠিন মানুষ, একটা মেরামতি চালাচ্ছিলেন বন্দরে, সেইটা শেষ করতে ফিরে এসেছেন। এক সপ্তা থাকবেন।
উত্তমের, খাদেমের ফোন বাজতেই থাকল। একজন কেউ জানালো বন্দুক সগিরকে নিয়ে পুলিশ বন্দরে এসেছে, আরেকজন বলল, ডন সাহেব নারায়ণগঞ্জ ফিরে গেছেন। খাদেম নিজেই একটা নাম্বারে ফোন করে শুনল, বসের এক ইস্পিশাল ক্যাডারকে পিটিয়ে হাড়গোড় ভেঙে হাসপাতালে পাঠিয়েছে এহসানের লোকজন। লোকটা বাঁচে কিনা সন্দেহ।
এহসানের লোকজনকে নিয়ে অবশ্য ভয় নেই তারা মিয়ার ক্যাডারদের। ঢাকা থেকে কঠিন কিছু লোক তিনি আনিয়েছেন, তারাই তাদের সামাল দেবে। তাদের ভয়টা ওসিকে নিয়ে। এ লোক তার মেরামতির কাজে কাউকে তোয়াক্কা করে না।
তারা মিয়া কাঁপা কাঁপা গলায় ফোন করলেন খাদেমকে, বললেন কিছু একটা করতে। পুলিশ তার গদি ঘিরে রেখেছে।
খাদেম বেরিয়ে গেল। মধুও গেল। উত্তমও একসময় উঠল। যাওয়ার আগে সে ফজলুকে বলল নিতাইবাবুর আড়তের পেছনের খালটা পার হয়ে ইনাম মার্কেটের গেটে কিসলুর চায়ের দোকানে চলে যেতে। সে মনুকে সঙ্গে নিয়ে যাবে।
ফোনটা খোলা রাখিস, সে বলল।
কিন্তু বাড়ির সামনের গলিটার মোড়েও হয়তো উত্তম পৌঁছাতে পারল না, পুলিশের বাঁশি বাজা শুরু হলো। একই সঙ্গে দ্রুতপায়ে দৌড়াদৌড়ি। দরজা খুলে ফজলু দেখল, গলিটায় সাত-আট পুলিশ। দুই পুলিশ তাদের মেসবাড়ির দিকেই আসছে। তাদের হাতে বন্দুক উঁচু করে ধরা। গলিতে আলো নেই, কিন্তু একটা ফাজিল চাঁদ উঠে আলোর অভাবটা অনেকটা ঘুচিয়ে দিয়েছে। ফজলু দাঁড়িয়ে পড়ল। তার ভেতর থেকে একটা তাড়া আসছে, পালা, পালা, ডাইনে দৌড় দে। না-হয় ঘরে ঢুইকা পিছনে যা, পিছনের পাঁচিল বাইয়া পালা। কিন্তু তার পা গলির ইট আর খোয়ায় আটকে গেছে। পা নড়ে না। সে দেখল দুই পুলিশ দৌড়ে আসছে বন্দুক তাক করে। পুলিশ নিশ্চয় জানে তারা মিয়ার ক্যাডাররা কোথায় থাকে। ওসি তো জানতেন। এই দেড়তলা আধাপাকা দালানে, চার কামরার মেসবাড়িতে।
চাঁদের আলোটা স্থির, দুধ-ঘোলা সাদা। গলির রাস্তার দুই দিকে দুটা নিমগাছ, কে কবে লাগিয়েছিল কে জানে, কিন্তু কেউ কাটে না, গাছ দুটা নাকি গলিটার হাওয়া পরিষ্কার করে। নিমগাছের পাতায় চাঁদের আলো তিরতির করে। উলটো দিকের গাছটার নিচে দু-একটি ভাঙা চেয়ার, তক্তা, কেরোসিন কাঠের বাক্স। মোক্তার অ্যান্ড সন্সের পরিত্যক্ত তৈজসপত্র। দোকানটা মেরামত হয়েছে কদিন আগে, আবর্জনাগুলি সরানো হয়নি। সেই আবর্জনার ওপার থেকে হঠাৎ একটা ছায়া রাস্তাটা পার হয়ে তার সামনে এসে দাঁড়ালো। একটা গরু। কড়া বাদামি পিঠ আর গা, চাঁদের আলোয় কিছুটা অস্পষ্ট, কিন্তু সেই অস্পষ্টতার মধ্যেও সাদা সাদা কিছু অবিন্যস্ত টুকরো আভা জেগেছে, যা দেখলে হঠাৎ বুনোফুল বলে মনে হতে পারে।
ফুলি! ফজলু নিজেকেই বলল। ফুলি এখানে কী করে এলো? এও কি সম্ভব? নাকি চাঁদের আলো তার চোখে বিভ্রম ছড়িয়েছে?
সে চাঁদটার দিকে তাকাল। চাঁদের ওপর কিছু সাদা মেঘ হালকা চাদর বিছিয়েছিল। সেই চাদর এখন সরে গেছে। চাঁদটা তাজা। যেমন তাজা গরুটাও। গরুটার দিকে চোখ নামাতে হলো ফজলুর। এটি এখন মাথাটা শক্ত করে সামনে মেলে বেশ তেজে এগিয়ে যাচ্ছে দুই পুলিশের দিকে, যেন তার মাথাটা ঢাল, অথবা একটা কামানের নল।
পুলিশ দুজন ভড়কে গেল। তারা গরুটার দিকে তাকাল। তারা বুঝতে চেষ্টা করল, কেন তাদের দিকেই এটি ধেয়ে আসছে। তারা বন্দুক চালাতে পারত, বন্দুক তো তাক করাই ছিল। কিন্তু তারা গ্রামের ছেলে, একটা গাভীকে বন্দুকের গুলিতে মারার কথা ভাবতে পারে না। তারা বরং গাভীটা থেকে দূরে সরে যেতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কিন্তু গাভীটা তেজি, তার চোখে পানি নেই, তার শরীরেও অবসাদ নেই। সে গিয়ে তাদের সামনে দাঁড়াল। গলিতে কয়েকজন পথচারী ছিল, মোক্তার অ্যান্ড সন্সের কর্মচারী ছিল। তারা অবাক হয়ে দেখল, গাভীটা এক পুলিশের সামনে গিয়ে মাথা তুলে তার বন্দুকে একটা হালকা টোকা দিলো। তারপর জিভ বের করে বন্দুক ধরা হাতটা চাটতে লাগল।
মোক্তার অ্যান্ড সন্সের এক কর্মচারী শব্দ করে হাসল। বলল, পুলিশভাই, গরুটা আপনারে পছন্দ করেছে।
পুলিশটার জন্য বিব্রতকর অবস্থা। অন্য পুলিশটাও এই অবাক দৃশ্যে দাঁড়িয়ে গেছে। তাদের চোখ এখন গাভীটার দিকে। সেটি এখন স্থির দাঁড়িয়ে লেজ নাড়ছে। অন্য পুলিশটার দিকে তাকিয়ে যেন জানতে চাইছে, তোমার হাতটাতে একটু আদর করে দিলে রাগ করবে?
চাঁদের আলোয় দুই পুলিশ, একটি গাভী, কিছু মানুষ যেন একটা শান্ত ছবির ফ্রেমে বন্দি হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্তের জন্য। তারপর চাঁদের সামনে ক্ষক্ষরের দেয়াল তুলে দিতে একটা মেঘ এগিয়ে এলো। হেলতে দুলতে।
এই দৃশ্য দেখার জন্য ফজলু অবশ্য আর দাঁড়িয়ে ছিল না। গাইটা তেজি ভাব নিতেই তার পায়ে চাঞ্চল্য এসেছে, সে ঘরে ঢুকে দুপুরে কাঁধে ঝুলিয়ে আনা ব্যাগটা তুলে নিয়েছে, যার ভেতরের একটা পকেটে এখনো কাল হাটে পাওয়া বাকি টাকাগুলি আছে। তারপর পেছনের পাঁচিল টপকে হাওয়া হয়ে গেছে।
বন্দর পার হতে হতে সে চাঁদটার দিকে আবার তাকিয়েছে। চাঁদটা ক্ষক্ষরের পাঁচিলের পেছনে বন্দি। আলোটা অস্পষ্ট। আকাশ জুড়ে সাদা মেঘের হুটোপুটি।
-----পাঁচ----
বাড়ি ফিরতে ফিরতে ভোর হয়ে গেল ফজলুর। সে জানে দাদি ততক্ষণে উঠে যাবেন, নামাজ পড়বেন, কিছুক্ষণ উঠানে হাঁটবেন। হয়তো নিচুস্বরে বিলাপ করবেন – তার ছেলে আর ছেলের বউয়ের জন্য, হয়তো ফুলি এবং ফজলুর জন্য। অথবা চুপ করে মোড়াটাতে বসে থাকবেন।
গত সন্ধ্যার ঘটনা ফজলুকে বিমূঢ় করে রেখেছে। যে-গাইটা তাকে বাঁচিয়ে দিলো দুই পুলিশের হাত থেকে, সে কোত্থেকে এলো। সে কি ফুলি? যদি ফুলি হয়, দুনিয়ায় এর থেকে অসম্ভব কথা আর কে কবে শুনেছে?
মেসবাড়ি থেকে পালিয়ে সে অনেকক্ষণ ঘোরাঘুরি করেছে, খবর নিয়েছে। তার মোবাইলে ফোন করেছে মনু, বলেছে খাদেম মারা পড়েছে, বস আটক হয়েছে। মনু বলেছে, তুই পালা। বন্দরে আর জীবনে না। মনু যাবে চাঁদপুর। তার এক মামার ইলিশের আড়ত আছে সেখানে।
বাড়ির কাছাকাছি এসে ফজলুর ইচ্ছা হয়েছে, একটা গাছে তার মাথাটা ঠুকবে। কিসের জন্য, সে বলতে পারবে না। ঠুকতে ইচ্ছা হয়েছে, কিন্তু ঠুকল না, কারণ কপালে রক্ত জমলে দাদি দেখলে ভয় পাবেন। এমনিতেই গতকালের রক্তের দাগটা কপালে আছে।
দাদি রক্ত ভয় পান। বাবা-মার লাশ যখন বাড়িতে আসে, তার পুলিশ মামা তাকে বলেছেন, তাদের গায়ে রক্ত ছিল। রক্ত দেখে দাদি জ্ঞান হারিয়েছিলেন।
বাড়িতে ঢুকতেই দাদিকে দেখা গেল। তিনি বেতের মোড়া পেতে বসে আছেন ফুলি যেখানে ঝিম মেরে থাকত সেখানে। ফজলুর বুকটা একটা মোচড় দিলো। হালকা পায়ে সে এগোল। কিন্তু সামনে তাকাতেই তার চোখটা কপালে উঠল। ফুলি! নাকি অন্য কোনো গাই? একটু এগিয়ে সে দেখল গাইয়ের চামড়াটা কড়া বাদামি, ভোরের হালকা আলোতেও যা বোঝা যাচ্ছে। এবং এখানে-সেখানে সাদা দাগ। যেন বুনোফুল। গাইটা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। তার সামনে একটা টুকরিতে ঘাস, বিচালি। কিন্তু সে খাচ্ছে না, শুধু তার চোয়াল নড়ছে।
ফজলুর পায়ের শব্দে দাদি তাকালেন। গত সন্ধ্যার চাঁদটার মতো একটা আলোময় হাসি দিয়ে বললেন, ফজলু, তুই আইলি? দ্যাখ। আমার ফুলিও ফিরা আইছে। যা, এখন পুকুরে গিয়া একটা ডুব দিয়া আয়। তোর পেটে ক্ষুধা, ফুলিটার মতো। তুই কাইল থাইক্ক্যা কিছু খাস নাই। তুই খাইলে ফুলিও খাইব।
Friday, May 15, 2026
বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থ by ভি এস নাইপল

অনুবাদ : মোজাফ্ফর হোসেন।
প্রায়
তিনজন করে ভিক্ষুক প্রতিদিনই নিয়ম করে আমাদের মিগুয়েল স্ট্রিটের বাড়িটায়
আসত। দশটার দিকে ধুতি ও সাদা জ্যাকেট পরিহিত একজন ভারতীয় এলো, আমরা তাকে এক
মগ চাল দিয়ে বিদায় করলাম। বারোটার দিকে একজন বয়স্ক মহিলা এলো, এক টাকা
নিয়ে চলে গেল। দুটার দিকে একজন অন্ধ ভিখারি এক বালককে লাঠি বানিয়ে হাজির
হলো, তাকেও এক টাকা দিয়ে বিদায় করলাম। মাঝেমধ্যে কিছু ধূর্ত প্রকৃতির
ভিক্ষুক আসত। একদিন এক ভিখারি দরজায় বাড়ি দিয়ে বলল যে, তার খুব খিদে
পেয়েছে। আমরা তাকে খেতে দিলাম। তারপর সে একটা সিগারেট চাইল, এবং আমি তার
সিগারেটে আগুন না দেওয়া পর্যন্ত নড়ল না। তাকে আর কোনোদিন দেখা যায়নি। একদিন
বিকেল চারটার দিকে আজব প্রকৃতির একজন দরজায় এসে দাঁড়াল। আমি সবে স্কুল
থেকে ফিরেছি।
‘শোনো বাবা, আমি কি ভিতরে আসতে পারি?’ সে আমাকে বলল। লোকটি বেশ খাটো, পরনে সাদা শার্ট ও কালো ট্রাউজার। মাথায় টুপি।
‘আপনি কি চান?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।
‘তোমাদের মৌমাছিগুলো একবার দেখতে চাচ্ছিলাম।’ সে বলল।
আমাদের উঠোনে চারটি পামগাছ ছিল, সেখানে বেশ কয়েকটি মৌমাছির চাক ছিল। আমি ঘরের দিকে কয়েক পা এগিয়ে চেঁচিয়ে বললাম – ‘মা, দরজায় একজন লোক আছে, আমাদের মৌমাছিগুলো একবার দেখতে চায় বলছে!’
মা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে লোকটির দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে কর্কশ গলায় বললেন – ‘কি চাওয়া হয়?’
‘আপনাদের মৌমাছিগুলো দেখতে চাচ্ছিলাম।’ লোকটি বলল।
তার ইংরেজি খুব গোছানো। বোঝাই যাচ্ছিল এটা তার মাতৃভাষা নয়। মাকে বেশ চিন্তিত মনে হলো। মা আমাকে বললেন – ‘যতক্ষণ উনি থাকেন, তুই এখান থেকে এক পাও নড়বি না।’
‘ধন্যবাদ ম্যাডাম! আপনার অশেষ মেহেরবানি।’ সে খুব ধীরে ধীরে গুছিয়ে কথাটা বলল, যেন প্রতিটি শব্দ তার টাকা দিয়ে কেনা! আমরা পামগাছের নিচে হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে বসে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে মৌমাছিগুলো দেখলাম।
‘মৌমাছি দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। তোমার কেমন লাগে?’ লোকটি বলল।
‘আমার অত সময় নেই।’ বললাম আমি।
সে গম্ভীর হয়ে মাথা ঝাঁকালো। ‘আমি এ-কাজই করি। এটা-ওটা দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। শুধু পিঁপড়ে দেখতে দেখতেই আমি দিনের পর দিন কাটিয়ে দিতে পারি। তুমি কি কখনো পিঁপড়েদের লক্ষ করে দেখেছ? কিংবা মাকড়সা, কেন্নোই – এদের ভালো করে দেখছ?’
আমি মাথা নাড়ালাম। ‘আপনি আসলে কী করেন, বলুন তো?’
সে উঠে দাঁড়াল – ‘আমি কবি’।
‘খুব ভালো কবি?’ আমি কোনোরকম ভণিতা না করেই জানতে চাইলাম।
‘পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কবি।’ সে অকপটে বলল।
‘আপনার নামটা কি একবার বলবেন?’
‘বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থ।’
‘বি মানে কি বিল?’
‘ব্ল্যাক। ব্ল্যাক ওয়ার্ডসওয়ার্থ। সাদা ওয়ার্ডসওয়ার্থ ছিলেন আমার ভাই। আমাদের আত্মা একটাই। আমি খুব ক্ষুদে একটা ফুলকেও সকালের মতোই শুভ্র ও মহৎ মনে করি; আর সেটা দেখে আমার কান্না পায়।’
‘কেন? এতে কান্না পাওয়ার কি আছে?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।
‘বুঝলে না বালক! তুমি যখন বড় হবে তখন বুঝবে। তুমিও যে একজন কবি, তুমি কি জানো সেটা? এবং একজন কবি যখন-তখন যে-কোনো কারণে কাঁদতে পারে!’
আমি না হেসে পারলাম না!
‘তুমি তোমার মাকে পছন্দ করো?’ সে জানতে চাইল।
‘করি, তবে আমাকে যখন মারে না, তখন।’
সে তখন তার পেছনের পকেট থেকে একটা ছাপা কাগজ বের করে বলল – ‘এই কাগজে মাকে নিয়ে লেখা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিতাটি আছে। আমি এটা বিক্রি করব। কোনো দরদাম চলবে না, একদাম – চার টাকা।’
আমি ভেতরে গিয়ে মাকে বললাম – ‘মা, তুমি কি চার টাকা দিয়ে একটি কবিতা কিনবে?’
মা রেগে গিয়ে ভদ্রতার মাথা খেয়ে বলল – ‘ওই ফালতু লোকটাকে গিয়ে বল, ও যদি এখনই আমার সীমানা থেকে বেরিয়ে না যায়, আমি তার লেজ টেনে ছিঁড়ে ফেলব; কি, কানে যায় আমার কথা?’
‘মার কাছে এখন চার টাকা নেই।’ আমি বাইরে এসে বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থকে বললাম।
‘এখানেই তো কবির ঐতিহাসিক পরাজয়!’ বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থ বলল।
তারপর সে তার কাগজটি যথাস্থানে রেখে দিলো। মার কথায় কিছু মনে করেছে বলে মনে হলো না।
আমি বললাম – ‘এভাবে কবিতা বিক্রি করে বেড়ানো কি ভালো দেখায়? খুব বেশি কি বিক্রি হয়?’
‘এখন পর্যন্ত এক কপিও হয়নি।’
‘তাহলে আপনি এভাবে ঘুরেঘুরে কবিতা বেচে বেড়াচ্ছেন কেন?’
‘এর ফলে আমি অনেক কিছু দেখার সুযোগ পাই। আর আমি সবসময় কবিদের সাক্ষাৎ পেতে চাই।’
‘আপনি কি সত্যি সত্যিই আমাকে কবি মনে করেন?’
‘তুমি আমার চেয়ে কোনো অংশে কম নও।’ সে উত্তরে বলল।
বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থ চলে যাওয়ার পর আমি মনে মনে প্রার্থনা করলাম যেন তার সঙ্গে ফের আমার দেখা হয়।
এক সপ্তাহ পর, আমি যখন স্কুল থেকে ফিরছিলাম তখন মিগুয়েল স্ট্রিটের এক বাঁকে তার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।
‘আমি অনেকক্ষণ থেকে তোমার জন্য এখানে অপেক্ষা করছি।’
‘এ কয়দিনে একটা কবিতাও কি বিক্রি করতে পারলেন?’ আমি জানতে চাইলাম।
সে মাথা নাড়াল। বলল – ‘আমার উঠোনে এই অঞ্চলের শ্রেষ্ঠ আমগাছটি আছে। এখন গাছে আম পেকে টসটস করছে। আমি তোমাকে আম খাওয়ার দাওয়াত দিতে এসেছি।’
সে আলবার্তো স্ট্রিটের এক মোড়ে এক কামরাবিশিষ্ট একটি বাসায় বসবাস করত। বাড়ির সামনেটা সবুজে ভরা। সেখানে বিশাল এক আমগাছ আছে, আর আছে নারিকেল ও তালগাছ। জায়গাটি জঙ্গল হয়ে আছে, দেখে মনে হয় শহরের বাইরে কোথাও এসেছি। এখান থেকে রাস্তার ওপারের বিশাল বিশাল দালানকোঠা দেখা যায় না।
সে একটুও বাড়িয়ে বলেনি, আমগুলো সত্যিই চমৎকার। আমি প্রায় আটটা সাবাড় করে ফেললাম। আমের হলুদ রস আমার কনুই চুইয়ে জামায় লেগে গেল। আমি যখন বাড়ি ফিরলাম, মা বললেন – ‘এতক্ষণ কোথায় ছিলি, হতচ্ছাড়া? ভেবেছিস খুব বড় হয়ে গেছিস, যেখানে খুশি যেতে পারবি, তাই না? যা, আমার জন্য একটা কঞ্চি কেটে আন।’
মা আমার কাটা কঞ্চি দিয়ে আমাকেই পেটালেন – আচ্ছা পিটুনি পেটালেন! আমি কাঁদতে কাঁদতে রেগেমেগে বাড়ি থেকে বের হয়ে এলাম। প্রতিজ্ঞা করলাম – আর কিছুতেই বাড়ি ফিরব না। বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থের বাড়িতে গেলাম। আমার নাক রাগে লাল হয়ে গিয়েছিল।
বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থ বলল – ‘কান্না এবার থামাও। চলো কোথাও ঘুরে আসি।’
আমার কান্না থেমে গেল। তখনো বেশ জোরে জোরে নিশ্বাস নিচ্ছিলাম। আমরা হাঁটতে বের হলাম। এসটি অ্যাভিনিউয়ের ভেতর দিয়ে সাভান্নাহ হয়ে রেসকোর্সে চলে গেলাম।
বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থ বলল – ‘এসো, দুজনে ঘাসের ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে আকাশ দেখি। আমি চাই তুমি এখন চিন্তা করে দেখবে ওই তারাগুলো আমাদের থেকে কত দূরে অবস্থান করছে।’
তার কথামতো আমি চিন্তা করা শুরু করলাম। তার উদ্দেশ্যটা একটু পরই পরিষ্কার হলো। নিজেকে খুব হালকা মনে হচ্ছিল। একই সঙ্গে খুব মহান আর বিশাল মনে হচ্ছিল, ঠিক ওই আকাশটার মতো; জীবনে আর কখনো কোনোদিন এই অনুভূতি হয়নি। আমি আমার সমস্ত ক্রোধ, অশ্রু ও আঘাতকে ভুলে গেলাম। যখন আমি বললাম যে, আমার খুব ভালো লাগছে, সে তখন এক-এক করে তারাদের নাম বলতে লাগল। তখনই একটা টর্চের আলো এসে আমাদের মুখের ওপর পড়ল। দেখলাম – পুলিশের লোক, ঘাস থেকে উঠে দাঁড়ালাম।
‘তোমরা এখানে কী করছ?’ পুলিশটি জিজ্ঞেস করল।
বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থ উত্তরে বলল – ‘নিজেকে আমি চল্লিশ বছর ধরে এই একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে ফিরছি।’
আমরা খুব দ্রুত বন্ধু হয়ে গেলাম। সে আমাকে বলল – ‘তুমি কাউকে কখনো আমার সম্পর্কে বলবে না। আমার ওই গাছগুলো সম্পর্কেও নয়। সমস্ত বিষয়টা গোপন রাখবে। কাউকে বললেই আমি কিন্তু ধরে ফেলব, কারণ আমি কবি।’
আমি তাকে কথা দিয়েছিলাম, এবং আজ অবধি আমি আমার কথা রেখেছিলাম। তার ছোট্ট বাড়িটি আমার ভালো লাগত। এত সুন্দর, গোছানো ও পরিষ্কার! তবে বেশ নিঃসঙ্গ দেখাত। একদিন আমি জিজ্ঞেস করলাম – ‘আপনি উঠানের আবর্জনাগুলো কেটে ফেলেন না কেন? জায়গাটা আরো স্যাঁতসেঁতে হয়ে গেছে।’
‘শোনো, তোমাকে তাহলে ঘটনাটা বলেই ফেলি – একদা একটা মেয়ে আর একটা ছেলের সাক্ষাৎ ঘটল এবং তারা পরস্পরের প্রেমে পড়ে গেল। ফলে তারা বিয়ে করে ফেলল। ছেলেটি শব্দ বুনতে ভালোবাসত, আর মেয়েটি ভালোবাসত ঘাস, ফুল আর গাছপালা। তারা একটি কক্ষে বেশ সুখেই দিনযাপন করছিল। তারপর একদিন মেয়েকবিটি ছেলেকবিকে বলল – আমরা পরিবারে আর একজন কবিকে পেতে চলেছি। কিন্তু সেই কবির আর জন্ম হয়নি; কারণ মেয়েটি মারা গেল। এবং শিশুকবিটি মায়ের সঙ্গে, মায়ের ভেতরে সমাধিস্থ হলো। ছেলেটি খুব কষ্ট পেল। সে প্রতিজ্ঞা করল যে বাগানের একটি জিনিসও সে আর কোনোদিন স্পর্শ করবে না। কাজেই বাগানটি রয়ে গেল, বেড়ে উঠল, তারপর একসময় জঙ্গলে পরিণত হলো।’ বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থ গল্পটি এখানেই শেষ করল।
আমি মুগ্ধ হয়ে তার দিকে তাকালাম। তাকে আরো বয়স্ক দেখাচ্ছিল। আমি তার গল্পটি বুঝতে পারলাম। আমরা সেদিন দীর্ঘ পথ হেঁটেছিলাম। বোটানিক্যাল গার্ডেনে গেলাম, তারপর গেলাম রক গার্ডেনে। সন্ধের আগ দিয়ে চ্যান্সেলর হিলে উঠলাম, দেখলাম – সমস্ত জায়গাটাকে অন্ধকার কেমন করে গিলে ফেলল। তারপর আবার শহরের বাতিগুলো শহরটাকে অন্ধকারের হাত থেকে উদ্ধার করল।
সে প্রতিটি কাজ এমন মনোযোগ দিয়ে করত, মনে হতো যেন জীবনে প্রথম সেই কাজটি করছে। আর মনে হতো, যেন ঈশ্বরের উদ্দেশে সবকিছু করছে। সে আমাকে বলত – ‘এখন আইসক্রিম খেলে কেমন হয়?’ এবং আমি যখন বলতাম – ‘মন্দ হয় না’। সে খুব গম্ভীর হয়ে বলত – ‘এখন আমরা কোন দোকানের সেবা গ্রহণ করব?’ যেন এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। সে এটা নিয়ে কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলত – ‘আমার মনে হয়, ওই দোকানের সঙ্গে এ-ব্যাপারে আলোচনায় বসা যেতে পারে!’ তখন পৃথিবীকে আমার খুব উপভোগ্য বলে মনে হতো।
একদিন, যখন আমি তার উঠানে দাঁড়িয়ে ছিলাম, আমাকে বলল – ‘আমার খুব গোপন একটা বিষয় আজ তোমাকে বলব।’
‘খুউব গোপন কিছু?’ – আমি জানতে চাইলাম।
‘এ মুহূর্তে তা তো বটেই।’
আমি তার দিকে তাকালাম। সেও আমার দিকে তাকাল। আমি ভেতরে ভেতরে বেশ শিহরিত হলাম। সে বলল – ‘মনে রেখো, এটা শুধু তোমার আর আমার ভিতরে। একটি কবিতা লিখছি।’
ওহ, সেই কথা! বেশ হতাশ হলাম শুনে। আমি আরো গুরুত্বপূর্ণ কিছু শোনার অপেক্ষায় ছিলাম।
‘কিন্তু এটা ভিন্ন ধাঁচের একটি কবিতা।’ সে বলল। ‘এটা পৃথিবীর সব থেকে মহৎ একটি কবিতা।’
আমি শিস দিলাম।
সে আরো বলে – ‘এটা নিয়ে আমি পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ করছি। আজ থেকে বাইশ বছর পরে কবিতাটি শেষ করব। তাও সেটা সম্ভব হবে আমি যে গতিতে এখন লিখছি সেটা ধরে রাখতে পারলে।’
‘তুমি তাহলে প্রচুর লেখ?’ আমি বললাম।
‘এখন আর না। এখন আমি প্রতিমাসে একটা করে লাইন লিখি। তবে নিশ্চিত করি যেন ওটাই শ্রেষ্ঠ লাইন হয়।’
‘গত মাসের শ্রেষ্ঠ লাইনটা কী?’ আমি জানতে চাইলাম।
সে আকাশের দিকে তাকাল, তারপর বলল – ‘অতীত বড় বিধুর, বিষণœময়।’
‘বেশ ভালো লাইন।’ আমি বললাম।
‘আমি আমার একটি মাসের সমস্ত অভিজ্ঞতাকে জ্বালিয়ে কবিতার একটি লাইনে ঘনীভূত করতে চাই। তাই বাইশ বছর পরে আমি যে-কবিতাটি লিখব সেটা বিশ্বমানবতার সংগীত হয়ে উঠবে।’
আমি খুব বিস্মিত হলাম।
আমাদের হাঁটা চলতেই থাকল। একদিন ডকসাইটে সি-ওয়ালের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় আমি বললাম – ‘ওয়ার্ডসওয়ার্থ, যদি আমি এই পিনটি পানিতে ফেলে দিই, তোমার কি ধারণা এটি ভেসে থাকবে?’
‘পৃথিবীটা বড় আজব। ওটা ফেলে দাও, দেখি কী ঘটে!’ সে বলল।
পিনটি ডুবে গেল।
আমি বললাম – ‘এ-মাসের লাইনটি কতদূর?’
সে আর কোনো লাইন শোনায়নি। শুধু বলত – ‘এই তো চলে এসেছে … হয়ে যাবে …।’
আমরা তখন সি-ওয়ালের ওপরে বসে যাত্রীবাহী জাহাজগুলোকে বন্দরে ভিড়তে দেখতাম। পৃথিবীর সেই শ্রেষ্ঠ কবিতাটি আমার আর শোনা হয়নি।
আমার মনে হতো, সে একটু জলদিই বুড়ো হয়ে যাচ্ছে।
‘তুমি কীভাবে বেঁচে আছ?’ – একদিন জানতে চাইলাম।
‘মানে, তুমি বলতে চাইছ আমি কীভাবে আয়-রোজগার করি?’
আমাকে তোতলাতে দেখে সে মৃদু হেসে বলল – ‘আমি ক্যালিপসোর সময়ে ক্যালিপসো গেয়ে বেড়াই।’
‘তাতেই তোমার হয়ে যায়?’
‘খুব ভালোমতোই।’
‘কিন্তু তুমি যখন পৃথিবীর বিখ্যাত কবিতাটি লেখা শেষ করবে তখন তো তুমি বেশ ধনী হয়ে যাবে?’
সে কোনো উত্তর করল না।
একদিন তাকে আমি তার সেই ছোট্ট ঘরটিতে দেখতে গেলাম। সে শুয়ে ছিল। খুব বয়স্ক আর ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। তার এই অবস্থা দেখে আমার কাঁদতে ইচ্ছে করছিল।
‘কবিতাটি আসতে আসতে কোথায় যেন থমকে গেছে।’ সে বলল।
সে তখন জানালা দিয়ে বাইরের নারিকেল গাছটির দিকে তাকিয়ে ছিল। এমনভাবে কথা বলছিল যেন আমার উপস্থিতি টের পায়নি। ‘যখন আমার বয়স বিশের কাছাকাছি ছিল, নিজের ভিতরে একটা শক্তি অনুভব করতাম।’ তারপর আমার চোখের সামনেই তাকে আরো বুড়িয়ে ও ক্ষয়ে যেতে দেখলাম। ‘কিন্তু, সেটা ছিল অনেক অনেক দিন আগে।’
তার কথা শুনে, সবকিছু এতটাই তীব্রভাবে আমার চেতনায় এসে ধরা দিলো যে, মনে হলো মা আমার গালে কষে একটা থাপ্পড় মারল। মৃত্যু তার সংকুচিত হয়ে আসা মৃতপ্রায় মুখম-লে জীবন্ত হয়ে উঠল – এটা যেন সবার জন্যই উপস্থিত হয়েছিল।
সে আমার দিকে তাকাল, আমার চোখে পানি দেখে উঠে বসল।
‘এদিকে এসো।’ বলল সে। আমি তার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসলাম।
সে আমার চোখের দিকে তাকাল, বলল – ‘তুমিও তাহলে এটাকে দেখতে পাচ্ছ? আমি জানতাম, তোমার চোখদুটো কবির চোখ।’
তাকে একটুও চিন্তিত দেখাচ্ছিল না। তার বোকার মতো শান্ত চেহারা দেখে আমি চিৎকার করে কেঁদে উঠলাম।
সে তার শুকনো বুকে আমাকে টেনে নিল। ‘তুমি কি চাও আমি তোমাকে এখন একটা মজার গল্প বলি?’ তারপর আমার ভেতরে উৎসাহ জোগাতে হেসে উঠল। কিন্তু আমি কোনো উত্তর দিলাম না।
সে বলল – ‘যখন আমি গল্পটি বলা শেষ করব, আমি চাই তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যাবে এবং আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। তুমি এখন আমাকে প্রতিশ্রুতি দেবে।’
আমার কণ্ঠস্বর যেন রুদ্ধ হয়ে আসছিল!
সে বলল – ‘বেশ, তবে শোনো। আমি তোমাকে ওই ছেলে কবি ও মেয়ে কবিকে নিয়ে যে-গল্পটা বলেছিলাম, তোমার মনে পড়ে? ওটা সত্য ছিল না। গল্পটা আমি তোমাকে বানিয়ে বলেছিলাম। তোমাকে কবিতা এবং আমার বিখ্যাত কবিতাটি নিয়ে যে-সমস্ত কথা বলেছি তাও সত্য নয়। এটা তোমার জীবনে শোনা সব থেকে মজার বিষয় হলো না?’
কিন্তু তার কণ্ঠস্বর আস্তে আস্তে ক্ষয়ে যেতে লাগল।
আমি ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। একজন কবির মতো যা কিছু দেখলাম তাই দেখে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ছুটে এলাম।
এক বছর পরে এলবার্তো স্ট্রিট ধরে একা হেঁটে যাচ্ছিলাম। ওই কবির বাড়ির কোনো চিহ্ন খুঁজে পেলাম না। এটা ঠিক অদৃশ্য হয়েও যায়নি, মনে হচ্ছে কে বা কারা যেন গুঁড়িয়ে ফেলেছে। বেশ বড় দোতলা একটি ভবন জায়গাটি দখল করে নিয়েছে। সেই বিশাল আমগাছটিসহ, নারিকেল ও তালগাছটিও কেটে ফেলা হয়েছে। এখন সেখানে শুধু ইট, পাথর আর লোহা দেখা যাচ্ছে – যেন বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থ কোনোদিনই ছিল না এখানে।
‘শোনো বাবা, আমি কি ভিতরে আসতে পারি?’ সে আমাকে বলল। লোকটি বেশ খাটো, পরনে সাদা শার্ট ও কালো ট্রাউজার। মাথায় টুপি।
‘আপনি কি চান?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।
‘তোমাদের মৌমাছিগুলো একবার দেখতে চাচ্ছিলাম।’ সে বলল।
আমাদের উঠোনে চারটি পামগাছ ছিল, সেখানে বেশ কয়েকটি মৌমাছির চাক ছিল। আমি ঘরের দিকে কয়েক পা এগিয়ে চেঁচিয়ে বললাম – ‘মা, দরজায় একজন লোক আছে, আমাদের মৌমাছিগুলো একবার দেখতে চায় বলছে!’
মা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে লোকটির দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে কর্কশ গলায় বললেন – ‘কি চাওয়া হয়?’
‘আপনাদের মৌমাছিগুলো দেখতে চাচ্ছিলাম।’ লোকটি বলল।
তার ইংরেজি খুব গোছানো। বোঝাই যাচ্ছিল এটা তার মাতৃভাষা নয়। মাকে বেশ চিন্তিত মনে হলো। মা আমাকে বললেন – ‘যতক্ষণ উনি থাকেন, তুই এখান থেকে এক পাও নড়বি না।’
‘ধন্যবাদ ম্যাডাম! আপনার অশেষ মেহেরবানি।’ সে খুব ধীরে ধীরে গুছিয়ে কথাটা বলল, যেন প্রতিটি শব্দ তার টাকা দিয়ে কেনা! আমরা পামগাছের নিচে হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে বসে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে মৌমাছিগুলো দেখলাম।
‘মৌমাছি দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। তোমার কেমন লাগে?’ লোকটি বলল।
‘আমার অত সময় নেই।’ বললাম আমি।
সে গম্ভীর হয়ে মাথা ঝাঁকালো। ‘আমি এ-কাজই করি। এটা-ওটা দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। শুধু পিঁপড়ে দেখতে দেখতেই আমি দিনের পর দিন কাটিয়ে দিতে পারি। তুমি কি কখনো পিঁপড়েদের লক্ষ করে দেখেছ? কিংবা মাকড়সা, কেন্নোই – এদের ভালো করে দেখছ?’
আমি মাথা নাড়ালাম। ‘আপনি আসলে কী করেন, বলুন তো?’
সে উঠে দাঁড়াল – ‘আমি কবি’।
‘খুব ভালো কবি?’ আমি কোনোরকম ভণিতা না করেই জানতে চাইলাম।
‘পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কবি।’ সে অকপটে বলল।
‘আপনার নামটা কি একবার বলবেন?’
‘বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থ।’
‘বি মানে কি বিল?’
‘ব্ল্যাক। ব্ল্যাক ওয়ার্ডসওয়ার্থ। সাদা ওয়ার্ডসওয়ার্থ ছিলেন আমার ভাই। আমাদের আত্মা একটাই। আমি খুব ক্ষুদে একটা ফুলকেও সকালের মতোই শুভ্র ও মহৎ মনে করি; আর সেটা দেখে আমার কান্না পায়।’
‘কেন? এতে কান্না পাওয়ার কি আছে?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।
‘বুঝলে না বালক! তুমি যখন বড় হবে তখন বুঝবে। তুমিও যে একজন কবি, তুমি কি জানো সেটা? এবং একজন কবি যখন-তখন যে-কোনো কারণে কাঁদতে পারে!’
আমি না হেসে পারলাম না!
‘তুমি তোমার মাকে পছন্দ করো?’ সে জানতে চাইল।
‘করি, তবে আমাকে যখন মারে না, তখন।’
সে তখন তার পেছনের পকেট থেকে একটা ছাপা কাগজ বের করে বলল – ‘এই কাগজে মাকে নিয়ে লেখা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিতাটি আছে। আমি এটা বিক্রি করব। কোনো দরদাম চলবে না, একদাম – চার টাকা।’
আমি ভেতরে গিয়ে মাকে বললাম – ‘মা, তুমি কি চার টাকা দিয়ে একটি কবিতা কিনবে?’
মা রেগে গিয়ে ভদ্রতার মাথা খেয়ে বলল – ‘ওই ফালতু লোকটাকে গিয়ে বল, ও যদি এখনই আমার সীমানা থেকে বেরিয়ে না যায়, আমি তার লেজ টেনে ছিঁড়ে ফেলব; কি, কানে যায় আমার কথা?’
‘মার কাছে এখন চার টাকা নেই।’ আমি বাইরে এসে বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থকে বললাম।
‘এখানেই তো কবির ঐতিহাসিক পরাজয়!’ বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থ বলল।
তারপর সে তার কাগজটি যথাস্থানে রেখে দিলো। মার কথায় কিছু মনে করেছে বলে মনে হলো না।
আমি বললাম – ‘এভাবে কবিতা বিক্রি করে বেড়ানো কি ভালো দেখায়? খুব বেশি কি বিক্রি হয়?’
‘এখন পর্যন্ত এক কপিও হয়নি।’
‘তাহলে আপনি এভাবে ঘুরেঘুরে কবিতা বেচে বেড়াচ্ছেন কেন?’
‘এর ফলে আমি অনেক কিছু দেখার সুযোগ পাই। আর আমি সবসময় কবিদের সাক্ষাৎ পেতে চাই।’
‘আপনি কি সত্যি সত্যিই আমাকে কবি মনে করেন?’
‘তুমি আমার চেয়ে কোনো অংশে কম নও।’ সে উত্তরে বলল।
বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থ চলে যাওয়ার পর আমি মনে মনে প্রার্থনা করলাম যেন তার সঙ্গে ফের আমার দেখা হয়।
এক সপ্তাহ পর, আমি যখন স্কুল থেকে ফিরছিলাম তখন মিগুয়েল স্ট্রিটের এক বাঁকে তার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।
‘আমি অনেকক্ষণ থেকে তোমার জন্য এখানে অপেক্ষা করছি।’
‘এ কয়দিনে একটা কবিতাও কি বিক্রি করতে পারলেন?’ আমি জানতে চাইলাম।
সে মাথা নাড়াল। বলল – ‘আমার উঠোনে এই অঞ্চলের শ্রেষ্ঠ আমগাছটি আছে। এখন গাছে আম পেকে টসটস করছে। আমি তোমাকে আম খাওয়ার দাওয়াত দিতে এসেছি।’
সে আলবার্তো স্ট্রিটের এক মোড়ে এক কামরাবিশিষ্ট একটি বাসায় বসবাস করত। বাড়ির সামনেটা সবুজে ভরা। সেখানে বিশাল এক আমগাছ আছে, আর আছে নারিকেল ও তালগাছ। জায়গাটি জঙ্গল হয়ে আছে, দেখে মনে হয় শহরের বাইরে কোথাও এসেছি। এখান থেকে রাস্তার ওপারের বিশাল বিশাল দালানকোঠা দেখা যায় না।
সে একটুও বাড়িয়ে বলেনি, আমগুলো সত্যিই চমৎকার। আমি প্রায় আটটা সাবাড় করে ফেললাম। আমের হলুদ রস আমার কনুই চুইয়ে জামায় লেগে গেল। আমি যখন বাড়ি ফিরলাম, মা বললেন – ‘এতক্ষণ কোথায় ছিলি, হতচ্ছাড়া? ভেবেছিস খুব বড় হয়ে গেছিস, যেখানে খুশি যেতে পারবি, তাই না? যা, আমার জন্য একটা কঞ্চি কেটে আন।’
মা আমার কাটা কঞ্চি দিয়ে আমাকেই পেটালেন – আচ্ছা পিটুনি পেটালেন! আমি কাঁদতে কাঁদতে রেগেমেগে বাড়ি থেকে বের হয়ে এলাম। প্রতিজ্ঞা করলাম – আর কিছুতেই বাড়ি ফিরব না। বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থের বাড়িতে গেলাম। আমার নাক রাগে লাল হয়ে গিয়েছিল।
বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থ বলল – ‘কান্না এবার থামাও। চলো কোথাও ঘুরে আসি।’
আমার কান্না থেমে গেল। তখনো বেশ জোরে জোরে নিশ্বাস নিচ্ছিলাম। আমরা হাঁটতে বের হলাম। এসটি অ্যাভিনিউয়ের ভেতর দিয়ে সাভান্নাহ হয়ে রেসকোর্সে চলে গেলাম।
বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থ বলল – ‘এসো, দুজনে ঘাসের ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে আকাশ দেখি। আমি চাই তুমি এখন চিন্তা করে দেখবে ওই তারাগুলো আমাদের থেকে কত দূরে অবস্থান করছে।’
তার কথামতো আমি চিন্তা করা শুরু করলাম। তার উদ্দেশ্যটা একটু পরই পরিষ্কার হলো। নিজেকে খুব হালকা মনে হচ্ছিল। একই সঙ্গে খুব মহান আর বিশাল মনে হচ্ছিল, ঠিক ওই আকাশটার মতো; জীবনে আর কখনো কোনোদিন এই অনুভূতি হয়নি। আমি আমার সমস্ত ক্রোধ, অশ্রু ও আঘাতকে ভুলে গেলাম। যখন আমি বললাম যে, আমার খুব ভালো লাগছে, সে তখন এক-এক করে তারাদের নাম বলতে লাগল। তখনই একটা টর্চের আলো এসে আমাদের মুখের ওপর পড়ল। দেখলাম – পুলিশের লোক, ঘাস থেকে উঠে দাঁড়ালাম।
‘তোমরা এখানে কী করছ?’ পুলিশটি জিজ্ঞেস করল।
বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থ উত্তরে বলল – ‘নিজেকে আমি চল্লিশ বছর ধরে এই একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে ফিরছি।’
আমরা খুব দ্রুত বন্ধু হয়ে গেলাম। সে আমাকে বলল – ‘তুমি কাউকে কখনো আমার সম্পর্কে বলবে না। আমার ওই গাছগুলো সম্পর্কেও নয়। সমস্ত বিষয়টা গোপন রাখবে। কাউকে বললেই আমি কিন্তু ধরে ফেলব, কারণ আমি কবি।’
আমি তাকে কথা দিয়েছিলাম, এবং আজ অবধি আমি আমার কথা রেখেছিলাম। তার ছোট্ট বাড়িটি আমার ভালো লাগত। এত সুন্দর, গোছানো ও পরিষ্কার! তবে বেশ নিঃসঙ্গ দেখাত। একদিন আমি জিজ্ঞেস করলাম – ‘আপনি উঠানের আবর্জনাগুলো কেটে ফেলেন না কেন? জায়গাটা আরো স্যাঁতসেঁতে হয়ে গেছে।’
‘শোনো, তোমাকে তাহলে ঘটনাটা বলেই ফেলি – একদা একটা মেয়ে আর একটা ছেলের সাক্ষাৎ ঘটল এবং তারা পরস্পরের প্রেমে পড়ে গেল। ফলে তারা বিয়ে করে ফেলল। ছেলেটি শব্দ বুনতে ভালোবাসত, আর মেয়েটি ভালোবাসত ঘাস, ফুল আর গাছপালা। তারা একটি কক্ষে বেশ সুখেই দিনযাপন করছিল। তারপর একদিন মেয়েকবিটি ছেলেকবিকে বলল – আমরা পরিবারে আর একজন কবিকে পেতে চলেছি। কিন্তু সেই কবির আর জন্ম হয়নি; কারণ মেয়েটি মারা গেল। এবং শিশুকবিটি মায়ের সঙ্গে, মায়ের ভেতরে সমাধিস্থ হলো। ছেলেটি খুব কষ্ট পেল। সে প্রতিজ্ঞা করল যে বাগানের একটি জিনিসও সে আর কোনোদিন স্পর্শ করবে না। কাজেই বাগানটি রয়ে গেল, বেড়ে উঠল, তারপর একসময় জঙ্গলে পরিণত হলো।’ বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থ গল্পটি এখানেই শেষ করল।
আমি মুগ্ধ হয়ে তার দিকে তাকালাম। তাকে আরো বয়স্ক দেখাচ্ছিল। আমি তার গল্পটি বুঝতে পারলাম। আমরা সেদিন দীর্ঘ পথ হেঁটেছিলাম। বোটানিক্যাল গার্ডেনে গেলাম, তারপর গেলাম রক গার্ডেনে। সন্ধের আগ দিয়ে চ্যান্সেলর হিলে উঠলাম, দেখলাম – সমস্ত জায়গাটাকে অন্ধকার কেমন করে গিলে ফেলল। তারপর আবার শহরের বাতিগুলো শহরটাকে অন্ধকারের হাত থেকে উদ্ধার করল।
সে প্রতিটি কাজ এমন মনোযোগ দিয়ে করত, মনে হতো যেন জীবনে প্রথম সেই কাজটি করছে। আর মনে হতো, যেন ঈশ্বরের উদ্দেশে সবকিছু করছে। সে আমাকে বলত – ‘এখন আইসক্রিম খেলে কেমন হয়?’ এবং আমি যখন বলতাম – ‘মন্দ হয় না’। সে খুব গম্ভীর হয়ে বলত – ‘এখন আমরা কোন দোকানের সেবা গ্রহণ করব?’ যেন এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। সে এটা নিয়ে কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলত – ‘আমার মনে হয়, ওই দোকানের সঙ্গে এ-ব্যাপারে আলোচনায় বসা যেতে পারে!’ তখন পৃথিবীকে আমার খুব উপভোগ্য বলে মনে হতো।
একদিন, যখন আমি তার উঠানে দাঁড়িয়ে ছিলাম, আমাকে বলল – ‘আমার খুব গোপন একটা বিষয় আজ তোমাকে বলব।’
‘খুউব গোপন কিছু?’ – আমি জানতে চাইলাম।
‘এ মুহূর্তে তা তো বটেই।’
আমি তার দিকে তাকালাম। সেও আমার দিকে তাকাল। আমি ভেতরে ভেতরে বেশ শিহরিত হলাম। সে বলল – ‘মনে রেখো, এটা শুধু তোমার আর আমার ভিতরে। একটি কবিতা লিখছি।’
ওহ, সেই কথা! বেশ হতাশ হলাম শুনে। আমি আরো গুরুত্বপূর্ণ কিছু শোনার অপেক্ষায় ছিলাম।
‘কিন্তু এটা ভিন্ন ধাঁচের একটি কবিতা।’ সে বলল। ‘এটা পৃথিবীর সব থেকে মহৎ একটি কবিতা।’
আমি শিস দিলাম।
সে আরো বলে – ‘এটা নিয়ে আমি পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ করছি। আজ থেকে বাইশ বছর পরে কবিতাটি শেষ করব। তাও সেটা সম্ভব হবে আমি যে গতিতে এখন লিখছি সেটা ধরে রাখতে পারলে।’
‘তুমি তাহলে প্রচুর লেখ?’ আমি বললাম।
‘এখন আর না। এখন আমি প্রতিমাসে একটা করে লাইন লিখি। তবে নিশ্চিত করি যেন ওটাই শ্রেষ্ঠ লাইন হয়।’
‘গত মাসের শ্রেষ্ঠ লাইনটা কী?’ আমি জানতে চাইলাম।
সে আকাশের দিকে তাকাল, তারপর বলল – ‘অতীত বড় বিধুর, বিষণœময়।’
‘বেশ ভালো লাইন।’ আমি বললাম।
‘আমি আমার একটি মাসের সমস্ত অভিজ্ঞতাকে জ্বালিয়ে কবিতার একটি লাইনে ঘনীভূত করতে চাই। তাই বাইশ বছর পরে আমি যে-কবিতাটি লিখব সেটা বিশ্বমানবতার সংগীত হয়ে উঠবে।’
আমি খুব বিস্মিত হলাম।
আমাদের হাঁটা চলতেই থাকল। একদিন ডকসাইটে সি-ওয়ালের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় আমি বললাম – ‘ওয়ার্ডসওয়ার্থ, যদি আমি এই পিনটি পানিতে ফেলে দিই, তোমার কি ধারণা এটি ভেসে থাকবে?’
‘পৃথিবীটা বড় আজব। ওটা ফেলে দাও, দেখি কী ঘটে!’ সে বলল।
পিনটি ডুবে গেল।
আমি বললাম – ‘এ-মাসের লাইনটি কতদূর?’
সে আর কোনো লাইন শোনায়নি। শুধু বলত – ‘এই তো চলে এসেছে … হয়ে যাবে …।’
আমরা তখন সি-ওয়ালের ওপরে বসে যাত্রীবাহী জাহাজগুলোকে বন্দরে ভিড়তে দেখতাম। পৃথিবীর সেই শ্রেষ্ঠ কবিতাটি আমার আর শোনা হয়নি।
আমার মনে হতো, সে একটু জলদিই বুড়ো হয়ে যাচ্ছে।
‘তুমি কীভাবে বেঁচে আছ?’ – একদিন জানতে চাইলাম।
‘মানে, তুমি বলতে চাইছ আমি কীভাবে আয়-রোজগার করি?’
আমাকে তোতলাতে দেখে সে মৃদু হেসে বলল – ‘আমি ক্যালিপসোর সময়ে ক্যালিপসো গেয়ে বেড়াই।’
‘তাতেই তোমার হয়ে যায়?’
‘খুব ভালোমতোই।’
‘কিন্তু তুমি যখন পৃথিবীর বিখ্যাত কবিতাটি লেখা শেষ করবে তখন তো তুমি বেশ ধনী হয়ে যাবে?’
সে কোনো উত্তর করল না।
একদিন তাকে আমি তার সেই ছোট্ট ঘরটিতে দেখতে গেলাম। সে শুয়ে ছিল। খুব বয়স্ক আর ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। তার এই অবস্থা দেখে আমার কাঁদতে ইচ্ছে করছিল।
‘কবিতাটি আসতে আসতে কোথায় যেন থমকে গেছে।’ সে বলল।
সে তখন জানালা দিয়ে বাইরের নারিকেল গাছটির দিকে তাকিয়ে ছিল। এমনভাবে কথা বলছিল যেন আমার উপস্থিতি টের পায়নি। ‘যখন আমার বয়স বিশের কাছাকাছি ছিল, নিজের ভিতরে একটা শক্তি অনুভব করতাম।’ তারপর আমার চোখের সামনেই তাকে আরো বুড়িয়ে ও ক্ষয়ে যেতে দেখলাম। ‘কিন্তু, সেটা ছিল অনেক অনেক দিন আগে।’
তার কথা শুনে, সবকিছু এতটাই তীব্রভাবে আমার চেতনায় এসে ধরা দিলো যে, মনে হলো মা আমার গালে কষে একটা থাপ্পড় মারল। মৃত্যু তার সংকুচিত হয়ে আসা মৃতপ্রায় মুখম-লে জীবন্ত হয়ে উঠল – এটা যেন সবার জন্যই উপস্থিত হয়েছিল।
সে আমার দিকে তাকাল, আমার চোখে পানি দেখে উঠে বসল।
‘এদিকে এসো।’ বলল সে। আমি তার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসলাম।
সে আমার চোখের দিকে তাকাল, বলল – ‘তুমিও তাহলে এটাকে দেখতে পাচ্ছ? আমি জানতাম, তোমার চোখদুটো কবির চোখ।’
তাকে একটুও চিন্তিত দেখাচ্ছিল না। তার বোকার মতো শান্ত চেহারা দেখে আমি চিৎকার করে কেঁদে উঠলাম।
সে তার শুকনো বুকে আমাকে টেনে নিল। ‘তুমি কি চাও আমি তোমাকে এখন একটা মজার গল্প বলি?’ তারপর আমার ভেতরে উৎসাহ জোগাতে হেসে উঠল। কিন্তু আমি কোনো উত্তর দিলাম না।
সে বলল – ‘যখন আমি গল্পটি বলা শেষ করব, আমি চাই তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যাবে এবং আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। তুমি এখন আমাকে প্রতিশ্রুতি দেবে।’
আমার কণ্ঠস্বর যেন রুদ্ধ হয়ে আসছিল!
সে বলল – ‘বেশ, তবে শোনো। আমি তোমাকে ওই ছেলে কবি ও মেয়ে কবিকে নিয়ে যে-গল্পটা বলেছিলাম, তোমার মনে পড়ে? ওটা সত্য ছিল না। গল্পটা আমি তোমাকে বানিয়ে বলেছিলাম। তোমাকে কবিতা এবং আমার বিখ্যাত কবিতাটি নিয়ে যে-সমস্ত কথা বলেছি তাও সত্য নয়। এটা তোমার জীবনে শোনা সব থেকে মজার বিষয় হলো না?’
কিন্তু তার কণ্ঠস্বর আস্তে আস্তে ক্ষয়ে যেতে লাগল।
আমি ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। একজন কবির মতো যা কিছু দেখলাম তাই দেখে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ছুটে এলাম।
এক বছর পরে এলবার্তো স্ট্রিট ধরে একা হেঁটে যাচ্ছিলাম। ওই কবির বাড়ির কোনো চিহ্ন খুঁজে পেলাম না। এটা ঠিক অদৃশ্য হয়েও যায়নি, মনে হচ্ছে কে বা কারা যেন গুঁড়িয়ে ফেলেছে। বেশ বড় দোতলা একটি ভবন জায়গাটি দখল করে নিয়েছে। সেই বিশাল আমগাছটিসহ, নারিকেল ও তালগাছটিও কেটে ফেলা হয়েছে। এখন সেখানে শুধু ইট, পাথর আর লোহা দেখা যাচ্ছে – যেন বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থ কোনোদিনই ছিল না এখানে।
Monday, September 15, 2025
গল্প- ঠান্ডা রক্ত বা এনআরসির দিনে প্রেম by মিথিলেশ ভট্টাচার্য

ওই
যে লালমাটির ছোট্ট গলিপথ, পুরোটা না, শুধু মুখটুকু, কোনো কোনোদিন বেশ
রঙিন, ফুরফুরে আর প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে সিক্তার উপস্থিতিতে। সিক্তা ঝলমলে
সালোয়ার-কামিজে, নির্ভার মেজাজে, ছাতা মাথায় এসে দুদ- দাঁড়ায় গলিমুখে একটা
অটোরিকশা ধরার আশায়। তবে রোজই এখানে দাঁড়িয়ে তার ভাগ্যে রিকশা জোটে না।
খানিকটা পথ উজিয়ে মেইন রোডে গিয়ে রিকশা ধরতে হয়। মাঝেমধ্যে লালমাটি-গলিপথের
বিপরীত গলির যতীনের গাড়িতে কখনো লিফট পেয়ে যায় সে; দুজনের বাড়ি থেকে
বেরোনোর সময় যদি মিলে যায় তবে। যেমন আজ -।
যতীনের লাল রঙের সেকেন্ডহ্যান্ড ফিয়াট গলিমুখে পড়ে রোজকার মতো ক-মুহূর্ত স্থির ও সতর্ক, রাস্তার দুপাশের পথচারী ও ছোট-বড় গাড়ির সম্ভাব্য আনাগোনার ব্যস্ততায়, আর সে-সময় ওর দৃষ্টি পড়ে সিক্তার ওপর বা গলিমুখে সিক্তার খানিক ফুটে ওঠা তার চাতকদৃষ্টি চুম্বকের মতো টেনে নেয়। আর ওদিকেও, সিক্তার লম্বাটে ফেসিয়াল করা মসৃণ চেহারায়, রক্তরাঙা ঠোঁটে স্মিত হাসির ঝিলিক -।
গাড়িটা রাস্তার ওপাশে নিয়ে গিয়ে চালক সাজু সিক্তার সামনে দাঁড় করায়। ওকে নিতে হবে বিলক্ষণ জানে সে। যতীন দরজা খুলে যথারীতি সিক্তাকে আহ্বান করে : এসো! আজ আবার ওর সঙ্গে একটু জরুরি দরকারও আছে তার। তবে এক্ষুনি কথাটা বলে আবহাওয়াকে ভারী করতে চায় না সে।
এই যে সিক্তাকে গাড়িতে তুলে নেওয়া, তা কিন্তু রোজ রোজ ঘটে না। মাঝেমধ্যে সকালবেলা বাজারে যাওয়ার সময় সিক্তার সঙ্গে গলিমুখে বা রাস্তার পাশে দেখা হলে যতীন অবশ্যই তাকে তুলে নেয় গাড়িতে। যে-ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কাজ করে সিক্তা, তা বড়জোর দুই কিলোমিটার দূর এবং এটুকু পথ তাকে প্রায়ই দশ টাকা অটোভাড়া খরচ করে পাড়ি দিতে হয়। মাসের মধ্যে দু-চারদিন যতীন গাড়িতে লিফট দেয় তাকে।
ওদের দুজনের পরিচয় দেখতে দেখতে বেশ কবছর হয়ে গেল। মুখোমুখি গলির বাসিন্দা হলেও দুজনের মধ্যে পরিচয়, ঘনিষ্ঠতা কিছুই হয়তো হতো না। একই পাড়ায় পাশাপাশি বাস করেও অনেকেই তো বছরের পর বছর পরিচিত মুখ হয়েও অপরিচিত থেকে যায়। যতীন আর সিক্তার মধ্যেও ওরকম সম্পর্কই হতো যদি না এক নেমন্তন্নবাড়িতে সিক্তার তার প্রতি কৌতূহলী হয়ে ওঠা, পাশে দাঁড়ানো, ঘনিষ্ঠ আচরণভঙ্গি, স্মিত হাসির বাক্সময় দৃষ্টি ওসব চোখে না পড়ত। এখন যতীনের মনে হয়, হঠাৎ করে তার প্রতি ওরকম মনোযোগী হয়ে ওঠেনি সিক্তা। ব্যাপারটি নিশ্চয় বহুদিন থেকেই ওর মনের কোনো অতল কোণে জন্মেছিল, যার প্রকাশ ঘটে নেমন্তন্নবাড়ির খোলা পরিবেশে।
নেমন্তন্নবাড়িতে খাবার পর মুখ ধোয়ার জায়গা করা হয়েছিল মেইন রোডের পাশে। দু-তিনটি বালতিতে জল ও কয়েকটি মগ রাখা ছিল। যতীন যখন মগ নিয়ে হাতে জল ঢালতে যাবে, তখন একটু চমকে দেখতে পেয়েছিল পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ানো সিক্তাও তার সুডৌল হাতটি ধারার নিচে পেতে দিয়েছে। ওর শ্যামলা চেহারায় স্মিত হাসির ঝিলিক।
তারপর থেকে পথে কোথাও দেখা হলে বা হঠাৎ করে দুজন মুখোমুখি পড়ে গেলে সিক্তার হাসিমাখা ঝলমলে চেহারা ও কৌতূহলী দৃষ্টি যতীনকে সবিশেষ আলোড়িত ও উজ্জীবিত করে দিত। মাঝেমধ্যে এমনও হয়েছে, পথচলতি অন্যমনস্ক তার দিকে নির্নিমেষ দৃষ্টির সিক্তাকে হঠাৎ লক্ষ করে অবাক যতীন খুব উৎফুল্লও বোধ করেছে।
এবং তারপরের ঘটনাক্রম দিয়েই আজকের এই কাহিনির শরীর তৈরি হয়েছে।
গলিপথ ছেড়ে কিছুদূর এগিয়ে এসে তেল নেওয়ার জন্য সাজু গাড়ি ঢোকাল সত্যম পেট্রল পাম্পের প্রশস্ত চত্বরে। ছিমছাম, সাজানো-গোছানো পাম্পের এপাশ-ওপাশ একপলক চেয়ে দেখে সিক্তা যতীনকে বলে, এনআরসির ফরম ফিলাপ করেছেন?
না। করিনি এখনো। অবহেলা-মেশানো উদাস সুরে বলে যতীন।
আমাদেরটা হয়ে গেছে -। ভারমুক্ত কণ্ঠে বলে সিক্তা।
তাই, কে করেছে? এবার একটু আগ্রহের গলায় জানতে চায় যতীন।
কে আবার, বাবা নিজেই করেছে।
তোমার বাবা ওসব জানেন?
জানে তো। পাড়ার বেশকজনকে হেল্পও করেছে।
কিন্তু ফরমের অনেক কলম তো আমার কাছে বেশ কনফিউজিং লেগেছে, – দ্বিধান্বিত কণ্ঠে বলে যতীন।
তাহলে বাবার কাছে চলে আসুন!
বলছ – ? যতীন সিক্তার চোখে চোখ রাখে।
হ্যাঁ। বাবা বুঝিয়ে দেবে আপনাকে – উৎসাহের সুরে বলে সিক্তা।
ঠিক আছে যাব। তোমার মোবাইল নম্বরটা দাও তো, – প্যান্টের পকেটে হাত ভরে নিজের মোবাইল বের করে আনে যতীন। অনেকদিন থেকেই একান্তে কথা বলার অভিপ্রায়ে সিক্তার মোবাইল নম্বরটা জানার সুতীব্র কৌতূহল তার। কিন্তু সেরকম সুযোগ হচ্ছিল না। আজ হাতের কাছে সুযোগ এসেছে। ভেতরে বেশ উৎফুল্ল বোধ করে যতীন।
হাতের মুঠোয় ধরা নিজের মোবাইলের দিকে তাকিয়ে সিক্তা বলে, আমারটা কেন, ঘরের ল্যান্ড নম্বর দিচ্ছি, পাশে আমার নামটা লিখে রাখবেন – !
এ-কথা শুনে একটু দমে যায় যতীন। ওর নম্বরটি দিতে চাইছে না কেন। ঠিক আছে, বলো, – মিয়ানো কণ্ঠে বলে যতীন।
আচ্ছা, সিক্তা নিজের মোবাইল নম্বরটি দিতে চায় না কেন, ওর কি যতীনের সঙ্গে একান্তে কথা বলতে ইচ্ছা করে না? তবে তাকে দেখতে পেলে কেন হাসিমুখে সাড়া দেয়, নির্বিবাদে চড়ে বসে গাড়িতে? যত দুর্বলতা তো ও-ই দেখিয়েছিল প্রথমে। তবে কি যতীনের মতো মধ্যবয়স্ক, বিবাহিত পুরুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে লাভ নেই ভেবে সিক্তার ওরকম আচরণ? সুঠামদেহী, সুদর্শন যতীনের রূপই ওকে শুরু থেকে পতঙ্গের মতো আকর্ষণ করেছে, এখন হয়তো বাস্তব সত্যের মুখোমুখি হয়ে ক্রমে মোহভঙ্গ হচ্ছে ওর!
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে যতীনের ঘন শিহরণ ফড়িঙের ডানার মতো চঞ্চল মনে সহসা কিম্ভূত সব শব্দ ও ভাষায় আকীর্ণ এনআরসি ফরমের কথা মনে পড়ে। কারো সঙ্গে ভাগ করতে ইচ্ছা করে ভেতরে ঘনিয়ে ওঠা সব চিন্তা ও প্রশ্নের আঘাতকে। পাশে বসে থাকা সিক্তার দিকে একপলক তাকায় যতীন। ও কি ওসব চিন্তা ও প্রশ্নের সুবিচার করতে পারবে?
পিতৃ-মাতৃ কেন, মুরব্বি কেন? কী ধরনের বাংলা শব্দ ওগুলো? পিতৃ-মাতৃর মতো তৎসম শব্দ তো বাংলায় ব্যবহার হয় না। আর আঞ্চলিক সিলেটি শব্দ ‘মুরব্বি’ তো শিষ্ট ভাষায় কেউ লেখে না। ‘প্রাতিষ্ঠানিক মুুরব্বি’, ‘আইনি অভিভাবক’, ওরকম ক্লিশে শব্দবন্ধ কেন? কথাগুলো ভেবে মনে মনে বেদনাবোধ করেছে যতীন। এনআরসি নিয়ে সবাই এত উদ্বিগ্ন, উৎকণ্ঠিত যে, ওসব কথা নিয়ে ভাবনার, কথা বলার অবকাশ কারো নেই!
বলবে কি সে-কথাগুলো সিক্তাকে, ও কি বুঝতে পারবে তার অন্তর্গত ক্ষোভ ও বেদনার গূঢ় কারণ? সিক্তা তো একশভাগ বাঙালি। ও কি খবরের কাগজ পড়ে, নিজের ভাষা নিয়ে ভাবে? ওকে দেখলে কিন্তু ওরকম মনে হয় না। দেখেছে সে বর্তমান প্রজন্মকে, সবাই জীবিকা আর ক্যারিয়ার নিয়ে এত ব্যস্ত যে, অন্যদিকে তাকানোর মতো অবকাশ নেই যেন। আসন্ন অস্তিত্ব-সংকট যে কত গভীর ও ব্যাপক সে-সম্পর্কে সবাই কেমন অজ্ঞান, উদাসীন!
পাম্প ছেড়ে পথে বেরোতেই ওপারের একটি দোকানের শোকেস আড়াল বিজ্ঞাপনে চোখ পড়ে যতীনের : এখানে এনআরসির জন্য ফটো তোলা হয়। শুধু এই দোকানটিই নয়, শহরের যত্রতত্র এমন বিজ্ঞাপনে ছেয়ে গেছে। যতীনের নিজের পাড়ায় নিজামের দোকানের একটি বিজ্ঞাপন বেশ কৌতূহলোদ্দীপক : এখানে বিনামূল্যে এনআরসির ফরম ফিলাপ করা হয়। সৌজন্যে, হরেকেষ্ট দাস। অতিপরিচিত রাজনৈতিক পার্টির সক্রিয় সদস্য!
এনআরসির ফরম সংগ্রহের দিনের একটি ঘটনার কথা প্রায়ই মনে পড়ে যতীনের। সেদিন দুপুরবেলা সেও অন্যদের মতো পাড়ার ক্লাবঘরে গিয়েছিল ফরম আনতে। নানা বয়সের পরিচিত মহিলা ও পুরুষে ক্লাবঘর গমগম করছিল। ভিড়ের মধ্যে বয়োবৃদ্ধ, পাড়ার সম্মানিত বাসিন্দা উমাপদবাবুও লাঠিহাতে হাজির ছিলেন। সরকারি কর্মচারী যারা টেবিল-চেয়ার পেতে বসে কাজ করছিল, তিনি সেখানে ফরম হাতে নিয়ে সহসা কাঁপা-গলায় আবেগভরা সুরে অতিবিখ্যাত কবিতার দুটি লাইনের একটি শব্দ বদল করে আবৃত্তি করে উঠেছিলেন :
কী যাতনা বিষে বুঝিবে সে কিসে
কভু পার্টিশন-বিষে (আশী বিষে) দংশেনি যারে!
ভেতরের সুতীব্র মর্মবেদনার এমন মোক্ষম বহিঃপ্রকাশ যতীনকে আমর্ম কাঁপিয়ে দিয়েছিল সেদিন। সত্যি, সাপের বিষ যেমন লহমায় গোটা শরীরে ছড়িয়ে মানুষকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেয়; পার্টিশন বিষও তো তেমনি লাখো কোটি লোকের এমনই দশা করেছে। যে ভয়ংকর কূটাঘাত ছিন্নমূল মানুষকে শুধু শুধু তাড়িয়ে মারছে – !
লক্ষ করেছে যতীন, এনআরসি নিয়ে শহর-গ্রামে তুমুল উথালপাথাল, হইহই কা-, আতঙ্ক, এমনকি আত্মহননের মতো চরম দুঃখজনক ঘটনা! জীবন-জীবিকা নির্বাহের রক্ত জল করা-বিবিধ কাজকামের ভেতরে, অবকাশ যাপনের স্বল্প অবসরে উচ্চ-নিচ সবার একমাত্র চর্চা এনআরসি। এই ভূম-লে লাখো মানুষের বর্তমান অস্তিত্বের অমোঘ নিয়ন্তা হয়ে যেন দেখা দিয়েছে এনআরসি। বুড়োবুড়ি, যুবক-যুবতী, প্রৌঢ়-প্রৌঢ়া সবাই আগপাশতলা তটস্থ ওই একটিমাত্র বজ্রনির্ঘোষের দোর্দ-প্রতাপে!
ঘুম থেকে উঠেই ইস্ত্রি করা পাটভাঙা জামাকাপড় পরে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ছুটছে এনআরসির জন্য ফটো তোলার তাগিদে, ফরম ফিলাপের জন্য হন্যে হয়ে একে-তাকে অনুনয়-বিনয় করতে বা মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে কাজ সম্পন্ন করতে। এদের মধ্যে অনেকেই আবার বাংলায় ছাপা ফরম দেখে বিরক্ত। ইংরেজিতে হলেই যেন ভালো ছিল – এরকম মনোভাব। নিজের মাতৃভাষা যে-লোক ভালো জানে না, সে আবার ইংরেজিতে কেমন করে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে, ভেবে পায় না যতীন!
এনআরসির জন্য ফটো উঠিয়েছেন যতীনদা? সিক্তা কৌতূহলী সুরে যতীনকে শুধায়।
না। এখনো উঠাইনি। তুমি – তোমরা?
আমি এখনো ফটো তুলিনি। বাবা আর মা একসঙ্গে গিয়ে ফটো উঠিয়ে এসেছে গতকাল।
সিক্তা এখনো ফটো তোলেনি জেনে হঠাৎ করে যতীনের মনে একঝলক রোমান্টিক হাওয়া ওঠে। সে সিক্তার দিকে তাকিয়ে ঝটিতি প্রস্তাব দেয়, এখন ফটো ওঠাবে নাকি?
এখন? একটু বিস্ময়ের কণ্ঠে বলে সিক্তা।
হ্যাঁ, এখন! উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে যতীন। তাদের যৌবন-বয়সে তো ওরকম ছিল, প্রেমিকাকে সঙ্গে নিয়ে যুগলে ফটো তোলা। সিনেমাহলের অন্ধকারে পাশাপাশি সিটে বসে সিনেমা দেখা, হাতে হাত রাখা, কখনো-বা প্রেমিকার উন্নত বুকে কনুই দিয়ে চকিত সুখস্পর্শ, – কথাগুলো ভাবতে ভাবতে যতীন আড়চোখে সিক্তার সুডৌল স্তনের দিকে তাকায়। ক্লিভেজের আলো-আঁধারে মুখ গুঁজতে বড্ড সাধ হয় মুহূর্তে।
এখন তো অফিসে যাব, পরে ওঠাব। সিক্তা যতীনের প্রস্তাব এড়ানোর চেষ্টা করে।
এখন হলেই তো ভালো ছিল, দুজনে একসঙ্গে ফটো ওঠাতাম।
ফটো তো সিঙ্গল ওঠাতে হবে -। সিক্তা সামান্য হেসে বলে।
জানি। তবে তোমার সঙ্গে একটা ফটো ওঠানোর বড্ড ইচ্ছা। এরকম সুযোগ তো সবসময় হবে না।
কেউ যদি দেখে ফেলে?
দেখবে কেন, নিজের কাছে রেখে দিলেই হবে।
না না। মা সবসময় আমার ব্যাগ খুলে দেখে, আপনার সঙ্গে ফটো দেখতে পেলে হাজারটা প্রশ্ন করবে! একটু ভীতু সুরে বলে সিক্তা।
ঠিক আছে, ফটোটা না হয় আমার কাছেই থাকবে। যতীন নাছোড়বান্দা।
আপনার ঘরেও তো লোক আছে দেখার, তখন? সিক্তা যতীনের স্ত্রীর প্রতি ইঙ্গিত করে কথাটা বলে।
তা আছে। সেটা আমি ম্যানেজ করে নেব। যতীন প্রত্যয়ের সঙ্গে বলে।
ঠিক আছে, তবে আজ না, আরেকদিন -।
আরেকদিন কবে হবে। যতীন ঈষৎ হতাশ গলায় বলে।
খুউব শিগগির – সিক্তা হালকা হাসে।
সত্যি বলছ তো? সন্দিগ্ধ সুরে যতীন প্রশ্ন করে।
আরে বাবা বললাম তো, – আচ্ছা, আপনি লিগ্যাসি ডাটা জোগাড় করেছেন – ? সিক্তা দ্রুত প্রসঙ্গান্তরে যায়।
ওসব জোগাড় হয়ে গেছে। লিগ্যাসি ডাটা, পুরনো ভোটার লিস্ট, মাইগ্রেশন কার্ড – শেষের দুটি নথির কথা উচ্চারণ করেই বেশ ক-মুহূর্তের জন্য দূরমনস্ক হয়ে পড়ে যতীন।
ভোটার লিস্টে কত পুরনো পরিচিত সব নাম! নামগুলোয় চোখ বোলাতে বোলাতে যতীনের স্মৃতিতে বহুকালের পুরনো পাড়ার শান্ত-সুন্দর ছবি ভেসে উঠেছিল। সে-সময়ের কত কত নামিদামি নির্লোভ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, নাট্যকার, খেলোয়াড়, সমাজসেবকের নাম পড়তে পড়তে রোমাঞ্চিত হয়ে পড়েছিল যতীন। সেই সোনার দিনকাল আর সহজ-সরল লোকেরা যে কোথায় হারিয়ে গেল! সবচেয়ে বেশি স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছিল সে ‘উদ্বাস্তু তালিকাভুক্ত ফরম’ নামক সেই পোকায় কাটা কাগজখানা দেখে। কী যে মায়া হচ্ছিল তার! বাবার নাম, মায়ের নাম, দিদি ও দাদার নাম, ছোটভাইয়ের নাম – সব মৃত মানুষ মুহূর্তের তরে জেগে উঠেছিল যতীনের চোখের সামনে। পরম মমতায় নামগুলোর ওপর হাত বোলাচ্ছিল সে, যেন একদার ফেলে আসা দেশ-বাড়ির শরীর হাতড়াচ্ছিল। এক দেশের মাটিতেই এপার-ওপার – লাখো কোটি নিঃস্ব, রিক্ত মানুষ দিশেহারা হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছিল; আজো ওই ছোটা বিরামহীন – !
----দুই----
আর অল্পদূর এগোলেই সিক্তার ডায়াগনস্টিক সেন্টার। ওখানে সে নেমে যাবে। কিন্তু যতীন ওর সঙ্গ ছাড়তে চাইছিল না। কেন জানি আজ ওর পাশে থাকতে ইচ্ছা হচ্ছিল। যদিও সিক্তার মনোভাব বোঝার কোনো উপায় নেই। যতীনের দেখা পেলে, সঙ্গ পেলে সিক্তা বেশ উৎফুল্ল হয়, এটা সে বেশ বুঝতে পারে। তবে শুধু ওটুকুই, এর বেশি গণ্ডি পেরোতে চায় না সিক্তা। অথচ আগল ভেঙে বেরিয়ে আসার এটাই ছিল উপযুক্ত সময় – ভাবে যতীন। চারদিক এনআরসির ঝড়ে ল-ভ-। বিভ্রান্ত, দিশেহারা মানুষ। কোনোদিকে দৃষ্টি স্থির করে তাকানোর অবসর নেই কারো। সে আর সিক্তা এই উথালপাথাল সময়েই তো ভেসে যেতে পারে উন্মাদ প্রেমের জোয়ারে। যদিও এ-মুহূর্তে ভাবনাটা খুবই স্বার্থপরের মতো, তবু ভেতরে জেগে ওঠা বিপুল প্রেমের আবেগকে কীভাবে বাগ মানাবে যতীন – !
আমি আজ তোমার ওখানে যাব ভাবছি – সহসা বলে ওঠে যতীন।
কেন – ? সিক্তা সপ্রশ্ন-দৃষ্টিতে তাকায় যতীনের মুখের দিকে।
সঙ্গে সঙ্গে উত্তর না দিয়ে যতীন সিক্তার দিকে দুদ- স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তারপর মৃদু সুরে বলে, জানো, ইদানীং আমার একটা অদ্ভুত ফিলিং হচ্ছে – !
কী রকম?
কাউকে কথাটা বলিনি এখনো। একটু ইতস্তত ভঙ্গিতে বলে যতীন।
আমাকে বলতে পারেন, যদি আপত্তি না থাকে।
আপত্তি কেন হবে, আমার কাজটা যে তোমার ওখানেই, শুধু ভাবছি কথাটা তুমি বিশ্বাস করবে কি না – !
বলেই দেখুন, বিশ্বাস করা না করা তো পরের ব্যাপার -।
জানো, বেশ কিছুদিন থেকে লক্ষ করছি আমার শরীরের কোথাও কেটে গেলে যে-রক্ত বেরোয় তা বেশ ঠান্ডা – !
ঠান্ডা? প্রশ্নের ঢংয়ে ঈষৎ চমকের সঙ্গে শব্দটা উচ্চারণ করে সিক্তা।
ভাবছি শরীরের ভেতরে কোনো বড় রোগ বেঁধে গেল কি না! ভয় ও চিন্তা-মেশানো সুরে বলে যতীন।
এ-কথার পিঠে চট করে কোনো কথা না বলে সিক্তা যতীনের বিষণœ ও গম্ভীর চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকে।
কিছুদিন আগে নারকেল কাটতে বসে হঠাৎই দায়ের কোপ পড়ে যায় আমার বাঁহাতের পিঠে। সঙ্গে সঙ্গে প্রায় ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোতে থাকে। আমি ডানহাত দিয়ে জায়গাটা চেপে ধরি। আর তখনই টের পাই রক্তটা কেমন ঠান্ডা ঠান্ডা – ! শুধু ওই হাতই নয়, আমার ডান পায়ের বুড়ো আঙুলের ডগা হোঁচট লেগে ফেটে যায়, তখনো লক্ষ করেছি রক্তটা বেশ ঠান্ডা – !
সিক্তার মুখে কোনো কথা জোগায় না। সে নির্বাক ভঙ্গিতে চোখ বড় করে বিস্ময়ের সঙ্গে তাকিয়ে থাকে যতীনের দিকে।
এতদিন তো জানতাম ব্যাঙের রক্ত ঠান্ডা। মানুষের শরীরের রক্ত তো সবসময়ই গরম আর এখন তো পরিস্থিতির চাপে আরো বেশি গরম, আমার শরীরের রক্তও তো বেশি গরম হওয়া উচিত, কী বলো – । জানো, আমার কেমন ভয় হচ্ছে, অস্বস্তি হচ্ছে – !
থামে যতীন। গাড়ির জানালাপথে বাইরে তাকায়।
তারপর আবার সিক্তার দিকে ফিরে সামান্য উত্তেজিত গলায় বলে, মাঝেমধ্যে আমার কী মনে হয় জানো সিক্তা, ওই যে লোকগুলো সব এনআরসির জন্য উদ্ভ্রান্ত হয়ে এদিক-ওদিক ঘুরছে, ওদের রক্তও কি আমার মতো ঠান্ডা, সবাইকে ধরে ধরে পরীক্ষা করলে কেমন হয় – !
যতীনের লাল রঙের সেকেন্ডহ্যান্ড ফিয়াট গলিমুখে পড়ে রোজকার মতো ক-মুহূর্ত স্থির ও সতর্ক, রাস্তার দুপাশের পথচারী ও ছোট-বড় গাড়ির সম্ভাব্য আনাগোনার ব্যস্ততায়, আর সে-সময় ওর দৃষ্টি পড়ে সিক্তার ওপর বা গলিমুখে সিক্তার খানিক ফুটে ওঠা তার চাতকদৃষ্টি চুম্বকের মতো টেনে নেয়। আর ওদিকেও, সিক্তার লম্বাটে ফেসিয়াল করা মসৃণ চেহারায়, রক্তরাঙা ঠোঁটে স্মিত হাসির ঝিলিক -।
গাড়িটা রাস্তার ওপাশে নিয়ে গিয়ে চালক সাজু সিক্তার সামনে দাঁড় করায়। ওকে নিতে হবে বিলক্ষণ জানে সে। যতীন দরজা খুলে যথারীতি সিক্তাকে আহ্বান করে : এসো! আজ আবার ওর সঙ্গে একটু জরুরি দরকারও আছে তার। তবে এক্ষুনি কথাটা বলে আবহাওয়াকে ভারী করতে চায় না সে।
এই যে সিক্তাকে গাড়িতে তুলে নেওয়া, তা কিন্তু রোজ রোজ ঘটে না। মাঝেমধ্যে সকালবেলা বাজারে যাওয়ার সময় সিক্তার সঙ্গে গলিমুখে বা রাস্তার পাশে দেখা হলে যতীন অবশ্যই তাকে তুলে নেয় গাড়িতে। যে-ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কাজ করে সিক্তা, তা বড়জোর দুই কিলোমিটার দূর এবং এটুকু পথ তাকে প্রায়ই দশ টাকা অটোভাড়া খরচ করে পাড়ি দিতে হয়। মাসের মধ্যে দু-চারদিন যতীন গাড়িতে লিফট দেয় তাকে।
ওদের দুজনের পরিচয় দেখতে দেখতে বেশ কবছর হয়ে গেল। মুখোমুখি গলির বাসিন্দা হলেও দুজনের মধ্যে পরিচয়, ঘনিষ্ঠতা কিছুই হয়তো হতো না। একই পাড়ায় পাশাপাশি বাস করেও অনেকেই তো বছরের পর বছর পরিচিত মুখ হয়েও অপরিচিত থেকে যায়। যতীন আর সিক্তার মধ্যেও ওরকম সম্পর্কই হতো যদি না এক নেমন্তন্নবাড়িতে সিক্তার তার প্রতি কৌতূহলী হয়ে ওঠা, পাশে দাঁড়ানো, ঘনিষ্ঠ আচরণভঙ্গি, স্মিত হাসির বাক্সময় দৃষ্টি ওসব চোখে না পড়ত। এখন যতীনের মনে হয়, হঠাৎ করে তার প্রতি ওরকম মনোযোগী হয়ে ওঠেনি সিক্তা। ব্যাপারটি নিশ্চয় বহুদিন থেকেই ওর মনের কোনো অতল কোণে জন্মেছিল, যার প্রকাশ ঘটে নেমন্তন্নবাড়ির খোলা পরিবেশে।
নেমন্তন্নবাড়িতে খাবার পর মুখ ধোয়ার জায়গা করা হয়েছিল মেইন রোডের পাশে। দু-তিনটি বালতিতে জল ও কয়েকটি মগ রাখা ছিল। যতীন যখন মগ নিয়ে হাতে জল ঢালতে যাবে, তখন একটু চমকে দেখতে পেয়েছিল পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ানো সিক্তাও তার সুডৌল হাতটি ধারার নিচে পেতে দিয়েছে। ওর শ্যামলা চেহারায় স্মিত হাসির ঝিলিক।
তারপর থেকে পথে কোথাও দেখা হলে বা হঠাৎ করে দুজন মুখোমুখি পড়ে গেলে সিক্তার হাসিমাখা ঝলমলে চেহারা ও কৌতূহলী দৃষ্টি যতীনকে সবিশেষ আলোড়িত ও উজ্জীবিত করে দিত। মাঝেমধ্যে এমনও হয়েছে, পথচলতি অন্যমনস্ক তার দিকে নির্নিমেষ দৃষ্টির সিক্তাকে হঠাৎ লক্ষ করে অবাক যতীন খুব উৎফুল্লও বোধ করেছে।
এবং তারপরের ঘটনাক্রম দিয়েই আজকের এই কাহিনির শরীর তৈরি হয়েছে।
গলিপথ ছেড়ে কিছুদূর এগিয়ে এসে তেল নেওয়ার জন্য সাজু গাড়ি ঢোকাল সত্যম পেট্রল পাম্পের প্রশস্ত চত্বরে। ছিমছাম, সাজানো-গোছানো পাম্পের এপাশ-ওপাশ একপলক চেয়ে দেখে সিক্তা যতীনকে বলে, এনআরসির ফরম ফিলাপ করেছেন?
না। করিনি এখনো। অবহেলা-মেশানো উদাস সুরে বলে যতীন।
আমাদেরটা হয়ে গেছে -। ভারমুক্ত কণ্ঠে বলে সিক্তা।
তাই, কে করেছে? এবার একটু আগ্রহের গলায় জানতে চায় যতীন।
কে আবার, বাবা নিজেই করেছে।
তোমার বাবা ওসব জানেন?
জানে তো। পাড়ার বেশকজনকে হেল্পও করেছে।
কিন্তু ফরমের অনেক কলম তো আমার কাছে বেশ কনফিউজিং লেগেছে, – দ্বিধান্বিত কণ্ঠে বলে যতীন।
তাহলে বাবার কাছে চলে আসুন!
বলছ – ? যতীন সিক্তার চোখে চোখ রাখে।
হ্যাঁ। বাবা বুঝিয়ে দেবে আপনাকে – উৎসাহের সুরে বলে সিক্তা।
ঠিক আছে যাব। তোমার মোবাইল নম্বরটা দাও তো, – প্যান্টের পকেটে হাত ভরে নিজের মোবাইল বের করে আনে যতীন। অনেকদিন থেকেই একান্তে কথা বলার অভিপ্রায়ে সিক্তার মোবাইল নম্বরটা জানার সুতীব্র কৌতূহল তার। কিন্তু সেরকম সুযোগ হচ্ছিল না। আজ হাতের কাছে সুযোগ এসেছে। ভেতরে বেশ উৎফুল্ল বোধ করে যতীন।
হাতের মুঠোয় ধরা নিজের মোবাইলের দিকে তাকিয়ে সিক্তা বলে, আমারটা কেন, ঘরের ল্যান্ড নম্বর দিচ্ছি, পাশে আমার নামটা লিখে রাখবেন – !
এ-কথা শুনে একটু দমে যায় যতীন। ওর নম্বরটি দিতে চাইছে না কেন। ঠিক আছে, বলো, – মিয়ানো কণ্ঠে বলে যতীন।
আচ্ছা, সিক্তা নিজের মোবাইল নম্বরটি দিতে চায় না কেন, ওর কি যতীনের সঙ্গে একান্তে কথা বলতে ইচ্ছা করে না? তবে তাকে দেখতে পেলে কেন হাসিমুখে সাড়া দেয়, নির্বিবাদে চড়ে বসে গাড়িতে? যত দুর্বলতা তো ও-ই দেখিয়েছিল প্রথমে। তবে কি যতীনের মতো মধ্যবয়স্ক, বিবাহিত পুরুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে লাভ নেই ভেবে সিক্তার ওরকম আচরণ? সুঠামদেহী, সুদর্শন যতীনের রূপই ওকে শুরু থেকে পতঙ্গের মতো আকর্ষণ করেছে, এখন হয়তো বাস্তব সত্যের মুখোমুখি হয়ে ক্রমে মোহভঙ্গ হচ্ছে ওর!
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে যতীনের ঘন শিহরণ ফড়িঙের ডানার মতো চঞ্চল মনে সহসা কিম্ভূত সব শব্দ ও ভাষায় আকীর্ণ এনআরসি ফরমের কথা মনে পড়ে। কারো সঙ্গে ভাগ করতে ইচ্ছা করে ভেতরে ঘনিয়ে ওঠা সব চিন্তা ও প্রশ্নের আঘাতকে। পাশে বসে থাকা সিক্তার দিকে একপলক তাকায় যতীন। ও কি ওসব চিন্তা ও প্রশ্নের সুবিচার করতে পারবে?
পিতৃ-মাতৃ কেন, মুরব্বি কেন? কী ধরনের বাংলা শব্দ ওগুলো? পিতৃ-মাতৃর মতো তৎসম শব্দ তো বাংলায় ব্যবহার হয় না। আর আঞ্চলিক সিলেটি শব্দ ‘মুরব্বি’ তো শিষ্ট ভাষায় কেউ লেখে না। ‘প্রাতিষ্ঠানিক মুুরব্বি’, ‘আইনি অভিভাবক’, ওরকম ক্লিশে শব্দবন্ধ কেন? কথাগুলো ভেবে মনে মনে বেদনাবোধ করেছে যতীন। এনআরসি নিয়ে সবাই এত উদ্বিগ্ন, উৎকণ্ঠিত যে, ওসব কথা নিয়ে ভাবনার, কথা বলার অবকাশ কারো নেই!
বলবে কি সে-কথাগুলো সিক্তাকে, ও কি বুঝতে পারবে তার অন্তর্গত ক্ষোভ ও বেদনার গূঢ় কারণ? সিক্তা তো একশভাগ বাঙালি। ও কি খবরের কাগজ পড়ে, নিজের ভাষা নিয়ে ভাবে? ওকে দেখলে কিন্তু ওরকম মনে হয় না। দেখেছে সে বর্তমান প্রজন্মকে, সবাই জীবিকা আর ক্যারিয়ার নিয়ে এত ব্যস্ত যে, অন্যদিকে তাকানোর মতো অবকাশ নেই যেন। আসন্ন অস্তিত্ব-সংকট যে কত গভীর ও ব্যাপক সে-সম্পর্কে সবাই কেমন অজ্ঞান, উদাসীন!
পাম্প ছেড়ে পথে বেরোতেই ওপারের একটি দোকানের শোকেস আড়াল বিজ্ঞাপনে চোখ পড়ে যতীনের : এখানে এনআরসির জন্য ফটো তোলা হয়। শুধু এই দোকানটিই নয়, শহরের যত্রতত্র এমন বিজ্ঞাপনে ছেয়ে গেছে। যতীনের নিজের পাড়ায় নিজামের দোকানের একটি বিজ্ঞাপন বেশ কৌতূহলোদ্দীপক : এখানে বিনামূল্যে এনআরসির ফরম ফিলাপ করা হয়। সৌজন্যে, হরেকেষ্ট দাস। অতিপরিচিত রাজনৈতিক পার্টির সক্রিয় সদস্য!
এনআরসির ফরম সংগ্রহের দিনের একটি ঘটনার কথা প্রায়ই মনে পড়ে যতীনের। সেদিন দুপুরবেলা সেও অন্যদের মতো পাড়ার ক্লাবঘরে গিয়েছিল ফরম আনতে। নানা বয়সের পরিচিত মহিলা ও পুরুষে ক্লাবঘর গমগম করছিল। ভিড়ের মধ্যে বয়োবৃদ্ধ, পাড়ার সম্মানিত বাসিন্দা উমাপদবাবুও লাঠিহাতে হাজির ছিলেন। সরকারি কর্মচারী যারা টেবিল-চেয়ার পেতে বসে কাজ করছিল, তিনি সেখানে ফরম হাতে নিয়ে সহসা কাঁপা-গলায় আবেগভরা সুরে অতিবিখ্যাত কবিতার দুটি লাইনের একটি শব্দ বদল করে আবৃত্তি করে উঠেছিলেন :
কী যাতনা বিষে বুঝিবে সে কিসে
কভু পার্টিশন-বিষে (আশী বিষে) দংশেনি যারে!
ভেতরের সুতীব্র মর্মবেদনার এমন মোক্ষম বহিঃপ্রকাশ যতীনকে আমর্ম কাঁপিয়ে দিয়েছিল সেদিন। সত্যি, সাপের বিষ যেমন লহমায় গোটা শরীরে ছড়িয়ে মানুষকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেয়; পার্টিশন বিষও তো তেমনি লাখো কোটি লোকের এমনই দশা করেছে। যে ভয়ংকর কূটাঘাত ছিন্নমূল মানুষকে শুধু শুধু তাড়িয়ে মারছে – !
লক্ষ করেছে যতীন, এনআরসি নিয়ে শহর-গ্রামে তুমুল উথালপাথাল, হইহই কা-, আতঙ্ক, এমনকি আত্মহননের মতো চরম দুঃখজনক ঘটনা! জীবন-জীবিকা নির্বাহের রক্ত জল করা-বিবিধ কাজকামের ভেতরে, অবকাশ যাপনের স্বল্প অবসরে উচ্চ-নিচ সবার একমাত্র চর্চা এনআরসি। এই ভূম-লে লাখো মানুষের বর্তমান অস্তিত্বের অমোঘ নিয়ন্তা হয়ে যেন দেখা দিয়েছে এনআরসি। বুড়োবুড়ি, যুবক-যুবতী, প্রৌঢ়-প্রৌঢ়া সবাই আগপাশতলা তটস্থ ওই একটিমাত্র বজ্রনির্ঘোষের দোর্দ-প্রতাপে!
ঘুম থেকে উঠেই ইস্ত্রি করা পাটভাঙা জামাকাপড় পরে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ছুটছে এনআরসির জন্য ফটো তোলার তাগিদে, ফরম ফিলাপের জন্য হন্যে হয়ে একে-তাকে অনুনয়-বিনয় করতে বা মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে কাজ সম্পন্ন করতে। এদের মধ্যে অনেকেই আবার বাংলায় ছাপা ফরম দেখে বিরক্ত। ইংরেজিতে হলেই যেন ভালো ছিল – এরকম মনোভাব। নিজের মাতৃভাষা যে-লোক ভালো জানে না, সে আবার ইংরেজিতে কেমন করে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে, ভেবে পায় না যতীন!
এনআরসির জন্য ফটো উঠিয়েছেন যতীনদা? সিক্তা কৌতূহলী সুরে যতীনকে শুধায়।
না। এখনো উঠাইনি। তুমি – তোমরা?
আমি এখনো ফটো তুলিনি। বাবা আর মা একসঙ্গে গিয়ে ফটো উঠিয়ে এসেছে গতকাল।
সিক্তা এখনো ফটো তোলেনি জেনে হঠাৎ করে যতীনের মনে একঝলক রোমান্টিক হাওয়া ওঠে। সে সিক্তার দিকে তাকিয়ে ঝটিতি প্রস্তাব দেয়, এখন ফটো ওঠাবে নাকি?
এখন? একটু বিস্ময়ের কণ্ঠে বলে সিক্তা।
হ্যাঁ, এখন! উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে যতীন। তাদের যৌবন-বয়সে তো ওরকম ছিল, প্রেমিকাকে সঙ্গে নিয়ে যুগলে ফটো তোলা। সিনেমাহলের অন্ধকারে পাশাপাশি সিটে বসে সিনেমা দেখা, হাতে হাত রাখা, কখনো-বা প্রেমিকার উন্নত বুকে কনুই দিয়ে চকিত সুখস্পর্শ, – কথাগুলো ভাবতে ভাবতে যতীন আড়চোখে সিক্তার সুডৌল স্তনের দিকে তাকায়। ক্লিভেজের আলো-আঁধারে মুখ গুঁজতে বড্ড সাধ হয় মুহূর্তে।
এখন তো অফিসে যাব, পরে ওঠাব। সিক্তা যতীনের প্রস্তাব এড়ানোর চেষ্টা করে।
এখন হলেই তো ভালো ছিল, দুজনে একসঙ্গে ফটো ওঠাতাম।
ফটো তো সিঙ্গল ওঠাতে হবে -। সিক্তা সামান্য হেসে বলে।
জানি। তবে তোমার সঙ্গে একটা ফটো ওঠানোর বড্ড ইচ্ছা। এরকম সুযোগ তো সবসময় হবে না।
কেউ যদি দেখে ফেলে?
দেখবে কেন, নিজের কাছে রেখে দিলেই হবে।
না না। মা সবসময় আমার ব্যাগ খুলে দেখে, আপনার সঙ্গে ফটো দেখতে পেলে হাজারটা প্রশ্ন করবে! একটু ভীতু সুরে বলে সিক্তা।
ঠিক আছে, ফটোটা না হয় আমার কাছেই থাকবে। যতীন নাছোড়বান্দা।
আপনার ঘরেও তো লোক আছে দেখার, তখন? সিক্তা যতীনের স্ত্রীর প্রতি ইঙ্গিত করে কথাটা বলে।
তা আছে। সেটা আমি ম্যানেজ করে নেব। যতীন প্রত্যয়ের সঙ্গে বলে।
ঠিক আছে, তবে আজ না, আরেকদিন -।
আরেকদিন কবে হবে। যতীন ঈষৎ হতাশ গলায় বলে।
খুউব শিগগির – সিক্তা হালকা হাসে।
সত্যি বলছ তো? সন্দিগ্ধ সুরে যতীন প্রশ্ন করে।
আরে বাবা বললাম তো, – আচ্ছা, আপনি লিগ্যাসি ডাটা জোগাড় করেছেন – ? সিক্তা দ্রুত প্রসঙ্গান্তরে যায়।
ওসব জোগাড় হয়ে গেছে। লিগ্যাসি ডাটা, পুরনো ভোটার লিস্ট, মাইগ্রেশন কার্ড – শেষের দুটি নথির কথা উচ্চারণ করেই বেশ ক-মুহূর্তের জন্য দূরমনস্ক হয়ে পড়ে যতীন।
ভোটার লিস্টে কত পুরনো পরিচিত সব নাম! নামগুলোয় চোখ বোলাতে বোলাতে যতীনের স্মৃতিতে বহুকালের পুরনো পাড়ার শান্ত-সুন্দর ছবি ভেসে উঠেছিল। সে-সময়ের কত কত নামিদামি নির্লোভ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, নাট্যকার, খেলোয়াড়, সমাজসেবকের নাম পড়তে পড়তে রোমাঞ্চিত হয়ে পড়েছিল যতীন। সেই সোনার দিনকাল আর সহজ-সরল লোকেরা যে কোথায় হারিয়ে গেল! সবচেয়ে বেশি স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছিল সে ‘উদ্বাস্তু তালিকাভুক্ত ফরম’ নামক সেই পোকায় কাটা কাগজখানা দেখে। কী যে মায়া হচ্ছিল তার! বাবার নাম, মায়ের নাম, দিদি ও দাদার নাম, ছোটভাইয়ের নাম – সব মৃত মানুষ মুহূর্তের তরে জেগে উঠেছিল যতীনের চোখের সামনে। পরম মমতায় নামগুলোর ওপর হাত বোলাচ্ছিল সে, যেন একদার ফেলে আসা দেশ-বাড়ির শরীর হাতড়াচ্ছিল। এক দেশের মাটিতেই এপার-ওপার – লাখো কোটি নিঃস্ব, রিক্ত মানুষ দিশেহারা হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছিল; আজো ওই ছোটা বিরামহীন – !
----দুই----
আর অল্পদূর এগোলেই সিক্তার ডায়াগনস্টিক সেন্টার। ওখানে সে নেমে যাবে। কিন্তু যতীন ওর সঙ্গ ছাড়তে চাইছিল না। কেন জানি আজ ওর পাশে থাকতে ইচ্ছা হচ্ছিল। যদিও সিক্তার মনোভাব বোঝার কোনো উপায় নেই। যতীনের দেখা পেলে, সঙ্গ পেলে সিক্তা বেশ উৎফুল্ল হয়, এটা সে বেশ বুঝতে পারে। তবে শুধু ওটুকুই, এর বেশি গণ্ডি পেরোতে চায় না সিক্তা। অথচ আগল ভেঙে বেরিয়ে আসার এটাই ছিল উপযুক্ত সময় – ভাবে যতীন। চারদিক এনআরসির ঝড়ে ল-ভ-। বিভ্রান্ত, দিশেহারা মানুষ। কোনোদিকে দৃষ্টি স্থির করে তাকানোর অবসর নেই কারো। সে আর সিক্তা এই উথালপাথাল সময়েই তো ভেসে যেতে পারে উন্মাদ প্রেমের জোয়ারে। যদিও এ-মুহূর্তে ভাবনাটা খুবই স্বার্থপরের মতো, তবু ভেতরে জেগে ওঠা বিপুল প্রেমের আবেগকে কীভাবে বাগ মানাবে যতীন – !
আমি আজ তোমার ওখানে যাব ভাবছি – সহসা বলে ওঠে যতীন।
কেন – ? সিক্তা সপ্রশ্ন-দৃষ্টিতে তাকায় যতীনের মুখের দিকে।
সঙ্গে সঙ্গে উত্তর না দিয়ে যতীন সিক্তার দিকে দুদ- স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তারপর মৃদু সুরে বলে, জানো, ইদানীং আমার একটা অদ্ভুত ফিলিং হচ্ছে – !
কী রকম?
কাউকে কথাটা বলিনি এখনো। একটু ইতস্তত ভঙ্গিতে বলে যতীন।
আমাকে বলতে পারেন, যদি আপত্তি না থাকে।
আপত্তি কেন হবে, আমার কাজটা যে তোমার ওখানেই, শুধু ভাবছি কথাটা তুমি বিশ্বাস করবে কি না – !
বলেই দেখুন, বিশ্বাস করা না করা তো পরের ব্যাপার -।
জানো, বেশ কিছুদিন থেকে লক্ষ করছি আমার শরীরের কোথাও কেটে গেলে যে-রক্ত বেরোয় তা বেশ ঠান্ডা – !
ঠান্ডা? প্রশ্নের ঢংয়ে ঈষৎ চমকের সঙ্গে শব্দটা উচ্চারণ করে সিক্তা।
ভাবছি শরীরের ভেতরে কোনো বড় রোগ বেঁধে গেল কি না! ভয় ও চিন্তা-মেশানো সুরে বলে যতীন।
এ-কথার পিঠে চট করে কোনো কথা না বলে সিক্তা যতীনের বিষণœ ও গম্ভীর চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকে।
কিছুদিন আগে নারকেল কাটতে বসে হঠাৎই দায়ের কোপ পড়ে যায় আমার বাঁহাতের পিঠে। সঙ্গে সঙ্গে প্রায় ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোতে থাকে। আমি ডানহাত দিয়ে জায়গাটা চেপে ধরি। আর তখনই টের পাই রক্তটা কেমন ঠান্ডা ঠান্ডা – ! শুধু ওই হাতই নয়, আমার ডান পায়ের বুড়ো আঙুলের ডগা হোঁচট লেগে ফেটে যায়, তখনো লক্ষ করেছি রক্তটা বেশ ঠান্ডা – !
সিক্তার মুখে কোনো কথা জোগায় না। সে নির্বাক ভঙ্গিতে চোখ বড় করে বিস্ময়ের সঙ্গে তাকিয়ে থাকে যতীনের দিকে।
এতদিন তো জানতাম ব্যাঙের রক্ত ঠান্ডা। মানুষের শরীরের রক্ত তো সবসময়ই গরম আর এখন তো পরিস্থিতির চাপে আরো বেশি গরম, আমার শরীরের রক্তও তো বেশি গরম হওয়া উচিত, কী বলো – । জানো, আমার কেমন ভয় হচ্ছে, অস্বস্তি হচ্ছে – !
থামে যতীন। গাড়ির জানালাপথে বাইরে তাকায়।
তারপর আবার সিক্তার দিকে ফিরে সামান্য উত্তেজিত গলায় বলে, মাঝেমধ্যে আমার কী মনে হয় জানো সিক্তা, ওই যে লোকগুলো সব এনআরসির জন্য উদ্ভ্রান্ত হয়ে এদিক-ওদিক ঘুরছে, ওদের রক্তও কি আমার মতো ঠান্ডা, সবাইকে ধরে ধরে পরীক্ষা করলে কেমন হয় – !
Sunday, June 15, 2025
গল্প- তুমি মরো আমি বাঁচি by মঞ্জু সরকার

জীবনের
শেষ কথাটি বলার জন্য তিনবার দমফাটা হিক্কা তুলে, উড়ে যাওয়ার আগে প্রাণপাখি
চোখে চরম সতর্কবার্তা পাঠালে বৃদ্ধা ঘরে উপস্থিত একমাত্র জীবিত প্রাণী
ছোটবউয়ের দিকে কাতর-ব্যাকুল দৃষ্টিতে তাকায়, তাকিয়ে থাকে, কয়েক সেকেন্ড
মাত্র। চোখের আলো নিভে গেলে দৃষ্টি স্থির ও শরীর যখন নিস্পন্দ, রহিমা
জিজ্ঞেস করে, ‘ও আম্মাজান, কী হইল!’
এতো কাছে থেকে মানুষকে আগে মরতে দেখেনি রহিমা। শাশুড়ি সাড়া না দেওয়ায় গায়ে হাত দেয়, নাকের ওপর হাত রেখে নিশ্চিত হয়, বুড়ির প্রাণপাখি এইমাত্র তার চোখের সামনেই উড়ে গেল! আর এমন এক সময়ে শাশুড়ির অন্তরাত্মা দেহছাড়া হলো, বাড়িতে যখন সে ছাড়া উপস্থিত নেই কেউ। এখন তার কী করা উচিত? রহিমা মৃতার চোখদুটি বুজিয়ে দেয় আলতো স্পর্শে।
বড়বাড়ির মুরবিব মরবে, বয়স হয়েছে, রোগে-দুর্ভোগে বিছানায় পড়ে থাকার বদলে এখন মরলেই তার শান্তি। সবাই জানত এবং এরকম বলাবলি করত। কিন্তু আজ সকালেও তো লাঠি ঠুকঠাক করে উঠানে হেঁটে বেড়িয়েছে মানুষটা। বাথরুমেও গেছে একা। রহিমা যথারীতি তার ঘরে খাবার দিয়ে এসেছে। মিষ্টিকুমড়ার ঘ্যাঁটে স্বাদ বাড়াতে কয়েক টুকরা বাসি মাংস দিয়েছিল সে। বেছে বেছে বুড়ির জন্য এক টুকরা হাড় দিয়েছিল আজ । দাঁতে অসমর্থ মানুষটাকে শক্ত হাড্ডি দেওয়ার সময় ফোকলা মুখে-গলায় হাড় আটকে তার মরণ কামনাও মনে উঁকি দিয়েছিল হয়তো, কিন্তু রহিমার মনে শুধু হিংসের বিষ নয়, হাড্ডিটা পেঁচিয়ে এক পোঁচ মাংসও ছিল এবং দেখেশুনেই দিয়েছে রহিমা, বুড়ি যাতে খেতে পারে। জোহরের নামাজ পড়ে ভাতও খেয়েছে বুড়ি। খাওয়ার পর বিছানায় যেমন গড়ায়, আজো শুয়ে ছিল।
শাশুড়ির এঁটো থালাবাটি আনার জন্য ঘরে ঢুকে রহিমা হিক্কার আওয়াজ শুনে তার বিছানার দিকে এগিয়ে এসেছে, শেষ কথাটি শোনার জন্য তার মুখের ওপর ঝুঁকেও ছিল, কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই আজগুবি মরে গেল মানুষটা! চোখের সামনে জ্বলজ্যান্ত মরণ দেখে বুকের ভেতরে নিজের আত্মাটাও ধকধক করছে। এখন রহিমা কী করবে? নির্জন বাড়িতে শাশুড়ির আকস্মিক মৃত্যুর একমাত্র সাক্ষী হতে চায় না সে। লোকে বলবে, ছোটবউ খোঁজখবর নেয়নি, যত্নআত্তি করেনি ঠিকমতো। খাবারে বিষ মিশিয়ে হাড়-জ্বালানি শাশুড়িকে মারার চিন্তা যেহেতু তার মনেও এসেছিল, সন্দেহটা জাগতে পারে বুড়ির সন্তানদের মনেও। শকুনিবুড়ির জান নিতে আল্লাহর কাছে অসংখ্যবার ফরিয়াদ জানিয়েছিল রহিমা। তার নীরব প্রার্থনা আল্লাহ না শুনুক, দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা বুড়ির অন্য ছেলেমেয়েদের কানে না যাক, মনের খবর বুড়ির ছোট ছেলে তথা রহিমার গুণধর স্বামী ঠিকই জানে এবং সমর্থনও করেছে অনেক সময়, বউয়ের ভালোবাসা ও ভবিষ্যতের সুখ নিষ্কণ্টক রাখার গরজে। কিন্তু এখন মায়ের মৃত্যুসংবাদ পেলে স্বামী আজ খুশি হওয়ার বদলে নির্ঘাৎ অভিযোগ করবে, মায়ের শরীর খারাপ তো আমাকে ফোন দাওনি কেন?
রহিমা এক ছুটে নিজের ঘরে ঢুকে মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে স্বামীর নম্বর টেপে। সাধারণত স্বামীকে প্রতিটি ফোনকলে কানে পাওয়ার সময় শহরে তার অবস্থান নিয়ে মনে নানারকম সন্দেহ জাগে; কিন্তু আজ ফোন ধরতে বিলম্বের মুহূর্তগুলোতে মোটরসাইকেলে স্বামীর কোমরজড়ানো সন্দেহজনক নারীকে দেখে ভূত দেখার মতো ভয় পায় এবং ভয়কাঁপা কণ্ঠে খবরটা জানায় সে, ‘আম্মাজান কেমন যেন করছে! একজন ডাক্তার নিয়া জলদি আসো বাড়িতে।’
‘মা কেমন মানে কী করছে? আমি তো সকালেও ভালো দেখে আসলাম। শবরি কলা আর গ্যাসের ঔষধ নিতে কইছে, রাতে নিয়া যাবখন।’
মায়ের কলা খাওয়ার দিন শেষ হওয়ার খবরটা চেপে রাখায়, অব্যক্ত সত্যের ভারে স্বামীকে দেওয়া ধমকটাও এবার ভারি হয়ে ওঠে, ‘যা বললাম তাই করো আগে, আমি দেখি এদিকে।’
বজ্রপাতের মতো খবরটা গোপন রেখে নির্জন বাড়িতে একা স্বাভাবিক থাকতে পারে না রহিমা। মৃত্যুর অসহ্য চাপ এড়াতে জীবন্ত কিছু আঁকড়ে ধরতে বালকপুত্রকে চেঁচিয়ে ডাকে, ‘ও রুম্মান, বাবা রুম্মান! খেলতে কোথায় মরতে গেছিস হারামজাদা?’ রুম্মানকে খুঁজতে খুঁজতে রহিমা বাড়ি ছেড়ে রাস্তার দিকে যায়। ছেলের বদলে রাস্তায় বুড়ির সেবায় নিযুক্ত কাজের মেয়ে পড়শি জামেনাকে দেখতে পায়। জামেনা রোজ তিন-চার বেলা আসে এ-বাড়িতে। আজ সকালেও এসেছিল, বুড়ির গোসলের পানি রেডি করে দিয়েছে, কাপড় কেচে দিয়ে পানসুপারিও পিষে দিয়ে গেছে।
‘ও জামেনা, জলদি আয় তো বাড়িতে। আম্মাজানের কী হইল, দেখ তো আসি।’
‘খানিক আগেই না বুড়ির জন্য পানসুপারি পিষে দিয়া গেইনু চাচি!’
হামানদিস্তায় বুড়ির পানসুপারি বেটে দেওয়ার কাজটি করতে গিয়ে জামেনার নিজেরও পানটা খাওয়া চলে। কিন্তু আজ একটাও সুপারি অবশিষ্ট ছিল না বলে বুড়ির পেশা সুপারি একটু মুখে দিয়েছে। বুড়ো মানুষের পেশা সুপারি খেয়ে মোটেও তৃপ্তি হয় না। এখন সাবান কেনার পয়সার সঙ্গে একটা পান খাওয়ারও মতলব নিয়ে দোকানের দিকে যাচ্ছিল সে, বিরক্তি নিয়ে অনিচ্ছাতেও বড়বাড়িতে ঢোকে আবার।
বুড়ির ঘরে ঢোকার আগেই, তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ভিতে দাঁড়িয়ে ঠাট্টা-মশকরা করে জামেনা, ‘ও দাদি, গুয়াপান খায়া মন ভরে নাই? তোর লাঠির ঠুকঠকানি আর উড়ুনগাইনের ঢকঢকানি না শুনলে ছোটবউয়ের খালি মরার চিন্তা আইসে।’
অতঃপর ঘরে ঢুকে বিছানায় মৃতাকে পরীক্ষা করতে গিয়ে তার মুখ থেকে পানের গন্ধও পায় জামেনা, মুখের কোণে রক্ত-পিত্তের মতো লোল গড়িয়েছে, ওই দুর্গন্ধ রসটুকু ছাড়া বুড়ির শরীরে প্রাণের কোনো সাড়া না পেয়ে জামেনাই প্রথম বিস্ময়কাঁপা গলায় ঘোষণা করে, ‘ও আল্লা রে, বুড়ি না মরি গেইছে! মুখ থাকি এলাও মোর পেশা গুয়ার গন্ধ বারায়! হায় আল্লা, কোনবেলা কেমনে মরল চাচি? ও আল্লা রে!’
টেবিলের ওপর ভাতের পেস্নটবাটি দেখে জামেনা আবারো মৃতার জ্যান্ত দশা সম্পর্কে আগ্রহ দেখায়, ‘ভাত খায় নাই এলাও?’
ছোটবউয়ের রান্না খাওয়ার পরই ভালো মানুষটা আজ মরে গেল কেন? এমন প্রশ্ন ওঠার আশঙ্কা রহিমা দিশেহারা শোকের মাঝেও অনুভব করে জামেনার ওপর পালটা অভিযোগ চাপায়, ‘তোর জর্দা দেওয়া পানসুপারি মুখে নিয়া আম্মাজান আইজ মরি গেল ক্যানে?’
শোকের আবেগে নিজের ঘরে দৌড়ে গিয়ে মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে আবারো স্বামীর কানে খবরটা কোনোমতে ছুড়ে দেয় সে, ‘আম্মাজান আর নাই!’
স্বামীর কথার কোনো উত্তর না দিয়ে মোবাইলটা উঠানে ছুড়ে দেয় রহিমা, তারপর শাশুড়ির আত্মা যে আসমানে উড়ে গেছে সেদিকে তাকিয়ে গলা ছেড়ে কাঁদতে শুরু করে, ‘ও আল্লাহ রে! বড়বাড়ি ধুয়া করিয়া হামার আম্মাজান মরি গেল রে!’
এ-বাড়িতে বউ হয়ে আসার পর এটাই রহিমার প্রত্যাশিত প্রথম মৃত্যুশোক যাপন। এখন তার অনেক কাঁদা উচিত, গলা ছেড়ে কাঁদতে না পারলেও শোকের আবেগে দাঁতকপাটি লেগে মাটিতে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া উচিত। স্বজনপড়শি সবাই দেখার জন্য ছুটে আসতে শুরু করবে। রহিমার আগে তার মোবাইল ফোনটাই মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে, সেটা দেখে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার আগে মনে হয়, খবরটা অন্তত বড় ননদকে তারই জানানো উচিত। মায়ের খবর নিয়মিত নেওয়ার জন্য মোবাইল ফোনটা ননদই তাকে গিফট দিয়েছে। বুড়ি ফোন চালাতে পারত না, তার ওপর কানেও শোনে কম, এ-কারণে ফোনের সঙ্গে মায়ের পক্ষে মোবাইল-অপারেটরের চাকরিটাও দিয়েছিল ননদ। গরিব পড়শি জামেনাকেও টাকা দিয়ে মায়ের সেবায় নিযুক্ত করেছে সে-ই। জামেনা ননদকে ফোন করার আগে তারই ফোন করা উচিত। ফোনটা হাতে নিয়ে শরীর-উথলানো কান্নাসহ বড় ননদকে কোনোমতে জানায় শুধু, ‘ও আপা, আম্মাজান আর নাই।’ খবরটা দিয়েই সে ফোন হাতে নিয়েই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আবার।
ততক্ষণে জামেনাও গলা ছেড়ে কাঁদতে শুরু করেছে এবং প্রতিবেশীরাও সরব কৌতূহল নিয়ে ছুটে আসতে শুরু করেছে। প্রতিবেশীদের মধ্যে সবাই জানে এবং জামেনাও সেদিন ঠাট্টার ভঙ্গিতে বলেছে, ‘বুড়ি মরলে বড়বাড়ির আসল রানি হইবে ছোটচাচি। মাথার উপরে খ্যাচম্যাচ করার জন্য কেউ থাকপে না, ছোটবউয়ের হুকুমেই চলবে সব।’ শোকের মাঝেও এসব কথা মনে করে রহিমার শোকের আবেগ দ্বিগুণ বেগে উথলে ওঠে।
-----দুই-----
মানুষের মরণ যতই নীরবে-নিভৃতে ঘটুক, টাটকা মৃত্যুকে নিয়ে জীবিতদের প্রতিক্রিয়া জীবন্ত হয় তৎক্ষণাৎ। জনবহুল এ-গ্রামটাতে সব বাড়ির নবজাতকের ক্ষীণকণ্ঠের কান্না সবার কানে যায় না, গর্ভবতী মেয়েরা যথাসম্ভব লুকিয়ে রাখে পেটের খবর, কিন্তু কোনো বাড়িতে কেউ মরে গেলে স্বজনদের মড়াকান্নায় ভারি হয়ে ওঠে গাঁয়ের বাতাস। দিশেহারা গ্রামবাসীও নিজেদের অন্তিম গন্তব্য স্মরণে এলে বিহবল হয়, পরিচিত একজন সেই গন্তব্যে যাত্রা করেছে শুনলেই ছুটে আসে দেখতে।
মড়াকান্না ছাড়াও গ্রামসমাজকে নাড়া দিয়ে ইদানীং ভিড় তৈরির দায়িত্ব পালন করে গাঁয়ের মসজিদের মাইকটি। ঘড়ির টাইম মেনে রোজ পাঁচবার আজান শুনেও শোনে না বে-নামাজিরা, বড়জোর বেলা সম্পর্কে সচেতন হয়; কিন্তু সময়-অসময়ের তোয়াক্কা না করে মাইকটি কারো মৃত্যুসংবাদ ঘোষণা করলেই কান খাড়া করে সবাই। চেনা মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে দেশি ভাষায় মৃতের পরিচয় জেনে মাইকের ইন্নালিল্লাহি রাজিউন দোয়ার সঙ্গেও কণ্ঠ মেলায়।
আজান ছাড়াও মাইকে গ্রামবাসীর ইমেত্মকাল-সংবাদ ঘোষণার দায়িত্ব পালন করে যে মুয়াজ্জিন হামিদুল, সে আসরের আজান দিতে মসজিদে যাওয়ার মুখে বড়বাড়িতে ক্রন্দনরোল শুনতে পেয়ে থমকে দাঁড়ায়। বড়বাড়ির বড় অভিভাবক ও গাঁয়ের মুরবিব বৃদ্ধার মৃত্যু-আশঙ্কাটি মনে আসতেই জীবিত বেশে সামনে দাঁড়ায় সে। আজ সকালেও হামিদুল এ-বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় বুড়ি হাতের লাঠি উঁচিয়ে তাকে ডেকেছিল, ‘আল্লাহর ঘরে আজান দিস, একটা সত্য কথা বল তো আমাকে। এ-বাড়ির সয়-সম্পত্তি উড়িয়া যায় কোথায় রে?’
বুড়ি আসলে মরহুম স্বামীর রেখে যাওয়া জায়গা-জমির বেহাল দশা ও বখাটে ছেলে কাফির ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল, ‘শুনলাম, তোর বেটার কাছেও নাকি কাফি ভুঁই বন্ধক থুইয়া দুই লাখ টাকা নিছে, কথা কি সত্য?’
হামিদুল সত্যের মুখোমুখি হয়ে সমস্যায় পড়েছিল। কারণ টাকা নেওয়ার সময় কাফি সতর্ক করেছে খবরটা মাকে না জানাতে। অথচ গ্রামবাসী সবাই জানে, বড়ভাইদের অনুপস্থিতি এবং বুড়ি মায়ের পক্ষপাতের সুযোগ নিয়ে কাফি একাই পৈতৃক বিষয়সম্পত্তি যাচ্ছেতাই ভোগ করছে। চাষাবাদ করে বড়বাড়ির গোলাঘর ভরলে কারো কিছু বলার ছিল না, কাফি একের পর এক জমি বন্ধক রেখে নিজের ব্যবসায়ের পুঁজি জোগাড় করেছে। মোটরসাইকেল দাবড়ে রোজ শহরে যায়। শহরে সে কি ব্যবসা করে, নাকি নেশাফুর্তি করে টাকা ওড়ায়, সঠিক কেউ জানে না। তবে বিশ্বস্তসূত্রে জানা গেছে, টাউনে সম্প্রতি সে আরেকটা বিয়েও করেছে, তার মোটরসাইকেলের পেছনে সে-বউকে দেখেছে গাঁয়েরই দুজন শহরবাসী।
বাঁকা কোমর নিয়ে লাঠিভর মেয়েমানুষের পক্ষে বখাটে ছেলের কা-কীর্তি কন্ট্রোল করা সম্ভব নয়। তবে কালা কানেও সব খবর বাজে। শাসন করার জন্য ছেলেকে হাতের নাগালে না পেয়ে বউয়ের সঙ্গেও গজগজ করে সারাদিন। হামিদুল সত্যি বললে কাফি রেগে যাবে, আবার মিথ্যে বললে তার বন্ধকের টাকা মার যাওয়ার ভয়। উভয় সংকটে পড়ে জবাব দিয়েছিল সে, ‘আম্মা, এই বয়সে জায়গাজমির খোঁজ নিয়া আর কী করেন। চোখ বুজলে তো বেটারাই খাইবে সব।’
‘হ্যাঁ, বুড়ি চোখ মুদলে ভূঁইয়ার জায়গাজমিও কাগজের মতো বাতাসে উড়ি যাবে রে। বড়বাড়ির ফকিরি হাল নিজের চোখে দেখবি তোরা, কয়া রাখলাম কথাটা, দেখিস।’
সকালে বুড়িকে দেখার জীবন্ত স্মৃতি মাথায় নিয়ে হামিদুল আজ বড়বাড়ির ভেতরে ঢোকে, আঙিনায় কাফির বউ ও জামেনাসহ পড়শি মেয়েদের কান্নার প্রতিযোগিতা দেখে বৃদ্ধার ঘরেও যায়। বিছানায় শায়িত কাঁথা-মোড়ানো লাশ দেখে দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে ইন্নালিল্লাহি দোয়া পড়ে হামিদুল, তারপর ছুটে যায় মসজিদে। আজ দেড় মিনিট বিলম্বে আসরের আজানটা দেয়, এবং আজান শেষ হলে মাইকের সুইচ অফ করার আগেই সে দুটি ফুঁ দিয়ে একটি শোকসংবাদ ঘোষণা করতে থাকে : ‘ভূঁইয়া বাড়ির মুরবিব, মরহুম নাসির ভূঁইয়ার স্ত্রী ও কাফি ভূঁইয়ার মাতা এইমাত্র ইমেত্মকাল ফরমাইলেন।’ ইন্নালিল্লাহি পড়ার পর মনে হয়, গ্রামের অনেকেই তার কণ্ঠে খবরটা জানছে ঠিক, কিন্তু বুড়ির প্রবাসী ও শহরবাসী ছেলেমেয়েরা খবর পায়নি এখনো। ছেলেরা সবাই বাড়িতে না এলে মৃতার জানাজা ও কুলখানি ইত্যাদি অনুষ্ঠানের দিনক্ষণ জানানো সম্ভব নয়। শুধু শোকসংবাদটি আবারো জোরালো কণ্ঠে ঘোষণা করে সে নামাজের জন্য মসজিদে উপস্থিত ছয় মুসলিস্নর কাতারে শরিক হয়।
মুয়াজ্জিনের মৃত্যুঘোষণার রেশ এবং মৃতাকে ঘিরে বড়বাড়ির সাড়ম্বর স্মৃতি মাথায় নিয়ে গাঁয়ের নামাজি লোক কয়েকটি আজ আল্লাহর দরবারে হাজির হয়েছে। যেহেতু বড়বাড়ি মসজিদের নিটকবর্তী বাড়ি এবং মেয়েমানুষরা আল্লাহর আরশে পৌঁছানোর জন্য কান্নার আওয়াজ সপ্তমে তুলতে পারে বটে, নামাজে দাঁড়িয়েও বড়বাড়ির মড়াকান্নার আওয়াজ শুনতে পায় মুসলিস্নরা এবং হায়াত-মউতের মালিক আল্লাহর দরবারে প্রার্থনাও আজ আকুল ও একাগ্র করে তুলতে সচেষ্ট হয়।
মোনাজাতশেষে মসজিদ থেকে বেরিয়ে মুসলিস্নরা সবাই আজ বড়বাড়ির দিকে হাঁটে। গাঁয়ের ছোট-বড়, নারী-পুরুষ সবাই ছুটে আসছে বড়বাড়িতে। বাড়ির উঠানে শোকের মাতম মুখর করে তুলেছে মূলত গাঁয়ের মেয়েরাই। উৎসবের আনন্দে পালাপার্বণে গীত গাওয়ার সুযোগ পায় না তারা, কিন্তু আত্মীয়স্বজনকে দুনিয়া থেকে বিদায় দেওয়ার সময় কেউ কারো চেয়ে কম কাঁদে না, কান্নাও সুরেলা গীত হয়ে ওঠে অনেকের কণ্ঠে। বাড়িতে মৃতার ছেলেমেয়ে ও নাতি-নাতনির অনুপস্থিতিও পড়শিদের শোক ও কান্নার দায়িত্ব খানিকটা বাড়িয়ে তোলে বটে।
শোকের ঝড়ে সমবেত গাঁয়ের পুরুষরা মেয়েদের মতো কাঁদতে পারে না, ক্রন্দনরত মেয়েদের এড়িয়ে তারা আলাদা ভিড় তৈরি করে। পাথারের ক্ষেতের কাজ ফেলেও ছুটে এসেছে কয়েকজন কামলা। মৃত্যুকে ঘিরে গ্রামসমাজ ত্বরিত সংঘবদ্ধ হওয়ার মূলে মৃত্যুকে ঠেকানোর এবং শোক-সহানুভূতি প্রকাশের আদিম প্রবৃত্তি তো আছেই, সেইসঙ্গে বড়বাড়িতে চটজলদি গ্রামবাসীর ছুটে আসার মূলে তাদের কৌতূহলও কম দায়ী নয়। গ্রামবাসী জানে, নিজের এক ইঞ্চি আবাদি জমি নেই, এমন চাষিমজুরের সংখ্যা গ্রামদেশে নেহায়েত কম নয়। নিজেরা চাষবাস না করেও বড়বাড়ির ভূঁইয়াদের অন্তত পাঁচ হালের জমি এখনো। এমন নিয়ম আইনে টিকলেও আল্লাহর ন্যায়বিচারে টিকবে? স্বয়ং ভূঁইয়ার বিধবা স্ত্রীও বড়বাড়ির সম্পত্তি কাগজের মতো আসমানে উড়ে যাওয়ার কথা বলে গেছে। বুড়ি মরলেই বড়বাড়ি ভেঙে অন্তত বারো টুকরা হবে। নদীতে ভাঙবে না, বানে ডুববে না; কিন্তু এ-বাড়ির সমস্ত জমি গিলে খাবে ওয়ারিশরাই। ছোটছেলে কাফির কা-কীর্তিও যে গ্রামসমাজে নানা গল্প ও প্রশ্ন জমিয়ে রেখেছিল, মৃতাকে ঘিরে নানারকম মন্তব্যের মধ্যেও তা ধরা পড়ে।
‘আহা রে, স্বামী মরি যাওয়ার পরও এতকাল লাঠি ঠুকঠুক করিয়া সবাইকে শাসন করছে। বুড়িমা ছিল বলিয়াই এই বাড়ি আর বিষয়-সম্পত্তি রক্ষা হইছে। কিন্তু এখন কে রক্ষা করবে? রক্ষা করার দায়িত্ব যাদের, তারা বুড়িমায়ের সেবাযত্ন দূরে থাউক, খোঁজটাও নেয় নাই ঠিকমতো। আর একজন তো বাড়িতে থাকিয়াও মৃত্যুকালে মায়ের মুখ দেখতে পাইল না! মোটরসাইকেল হাঁকিয়ে বাড়িতে আসতে কতক্ষণ লাগে?’
কাফি ও তার বড়ভাইদের সঙ্গে যাদের ফোন-যোগাযোগ হওয়ার মতো ঘনিষ্ঠতা আছে, তারা আগাম সহানুভূতি জানাতে মোবাইল বের করে সংযুক্ত হওয়ার চেষ্টা করে। আর মুয়াজ্জিন হামিদুল সকালে বুড়ির সাক্ষাতের স্মৃতি স্মরণ করে তার শেষ কথাটি সবাইকে শোনায় – ‘আজ সকালেই লাঠি হাঁকে ডাকল মোকে, কানের মধ্যে এলাও বাজে তার গলা, হামদুরে আল্লাহর ঘরে আজান দিস, তোকেও কয়া গেনু শেষ কথাটা। মুই মরতে না মরতে বড়বাড়ির ফকিরি হাল নিজের চক্ষক্ষ দেখপেন সগাই।’
বৃদ্ধার শেষ কথার সমর্থনে উপস্থিত মানুষগুলো যুক্তি দেওয়ার আগে, মেয়েদের ভিড় থেকে ছুটে আসা এক বালক পুরুষ ভিড়ে উপস্থিত তার বাবাকে খবর জানায়, ‘রুম্মানের মা কাঁদতে কাঁদতে নিজেও মনে হয় মরি গেইছে।’
রুম্মানের মা তথা কাফির বউকে দেখতে পুরুষ ভিড়ের অনেকেই উঠানে কান্নাকুল মেয়েদের দিকে এগোয়।
আঙিনায় রহিমার কান্নায় ততক্ষণে শরিক হয়েছে অন্তত পনেরোজন মহিলা ও শিশু। কান্নার চেয়ে কিছু শিশুর কৌতূহলই প্রবল। তারা ঘরে ঢুকে মৃতাকে দেখে, মৃতাকে ঘিরে একটা মাছি উড়তে দেখেও ভয় পায়। আরেকটি বালক ক্রন্দসী ভিড়ের পেছনে দাঁড়িয়ে নাক কুঁচকে সহাস্য মন্তব্য করে, ‘কাঁদতে কাঁদতে কাঁয়বা পাদি ফেলাইছে রে।’
অন্যরা গলা ছেড়ে কাঁদছে বলে রহিমাকে চেঁচিয়ে কাঁদতে হয় না আর। নিজের কান্নাবিকৃত শরীর আঙিনায় লুটিয়ে পড়েছে, মাটিতে মুখ লুকিয়ে পরিস্থিতি নিয়ে কিছুটা ভাবারও সুযোগ পায়। মোটরসাইকেলের আওয়াজ পেলেই তাকে আবার কান্না শুরু করতে হবে, শোকের তীব্রতায় আবারো দাঁতকপাটি লেগে জ্ঞান হারাতে হবে। কান্না ছাড়া আগামী তিনদিন তার কাজ নেই। গাঁয়ের নিয়মে মৃতের বাড়িতে তিনদিন চুলা জ্বলবে না। আত্মীয়স্বজনই রান্না করা খাবার দিয়ে যাবে। বুড়ি কবরে ঢুকতে না ঢুকতে একে একে তার রক্তসম্পর্কের স্বজনরা বাড়িতে আসবে। বড় ননদ হয়তো ফোনে এতক্ষণে সবাইকে জানিয়েছে খবরটা। কিন্তু বুড়ি কবরে আড়াল হলেই কি বড়বাড়ির মাটির ওপরে খাড়া হয়ে স্বপ্নের স্বাধীন সংসার ফিরে পাবে রহিমা?
বিধ্বস্ত দেহে চোখ বুজে চুপচাপ এসব কথাই ভাবছিল রহিমা। হঠাৎ চেনা মোটরসাইকেলের আওয়াজ পেয়ে এবং সত্যি সত্যি অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার জন্য মনকে ভাবনাশূন্য করে দাঁতে দাঁত চেপে ধরে সে।
------তিন-----
বুড়ির দাফন হওয়ার পরও তার কাঁচা কবর ঘিরে বড়বাড়িতে শোকপালন যেন অনেকটা উৎসবে রূপ নেয়। একে একে বাড়িতে উপস্থিত হয়েছে পাঁচ ছেলে এবং চার মেয়ে। ছোট কাফি ছাড়া বড় চার ভাইয়ের দুজন ঢাকায়, একজন নীলফামারীতে এবং অস্ট্রেলিয়াতেও আছে একজন। মেয়েরাও নানা ঠিকানায় নিজ নিজ স্বামী-সংসার নিয়ে প্রতিষ্ঠিত। মায়ের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সপরিবার এসেছে সবাই। দাফন হয়ে যাওয়ার পরও এসেছে এক মেয়ে এবং অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী ছেলে একা এসেছে কুলখানির দিনে। বাড়িতে পৌঁছে যথারীতি মাকে না দেখে ‘মা মা’ বলে কেঁদেছে সবাই, অন্য ভাইবোনরাও শরিক হয়েছে সেই কান্নায়; কিন্তু কান্না ও শোকের পরিবেশ জমাট বাঁধতে দেয় না তাদের অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরাই। মৃত্যুশোকে শরিক হয়েও দাদুবাড়ি কি নানাবাড়িতে বেড়াতে আসার মজা লুটতে ছোটাছুটি, খেলাধুলা ও হাসিতামাশাও করে তারা। তিনদিন রান্নাঘর থেকে মুক্ত থাকার কথা ভাবলেও আতিথেয়তার দায় মেটাতে রহিমাকে শাশুড়ির দাফনের পরপরই চুলা জ্বেলে রান্নাঘরেই অনেকটা সময় কাটাতে হয়।
তিনদিন পর মায়ের কুলখানিতে একটি গরু ও চারটি খাসি জবাই করা হয়। পেশাদার মৌলবি-সংকটে বিশজন মাদ্রাসাছাত্র এসে কোরান খতম দেয়। মিলাদ, কবর জিয়ারত ও দোয়া-খায়েরে শরিক হয় গাঁয়ের বয়স্ক সব পুরুষ মানুষ। ভোজনপর্বে শরিক হয় আরো বেশি সংখ্যক। মড়ার বাড়ির মজলিসি খাওয়া-দাওয়ার ভিড় কোলাহল থেমে যাওয়ার পরও বাড়িটির দিকে গ্রামবাসীর মনোযোগ ও কৌতূহল কমে না। কারণ মরে গিয়ে বুড়ি তার ছেলেমেয়েদের বাড়িতে জড়ো করেছে, তার উদ্দেশ্যটা বেঁচে থাকতেই ছোটবউ-ছেলেকে ঝগড়া করে অনেকবার জানিয়ে রেখেছে, সবাই এলে এবার বিষয়-সম্পত্তির ভাগাভাগি হবে অবশ্যই।
মায়ের মৃত্যুর পর ওয়ারিশদের মধ্যে যে-ঝগড়াটা অনিবার্য ছিল, ভূসম্পত্তি ঘিরে স্বাভাবিক ঝগড়াঝাঁটি দেখার জন্য অপেক্ষায় ছিল যারা, তাদের অনেকটা হতাশ করে দিয়ে বাড়ির অন্দরমহলে ঝগড়াটা শুরু হয় আসলে ভাইবোনের পুনর্মিলনীর আদলে। বড়ভাইয়ের আহবানে মায়ের ঘরে জড়ো হয় সব ভাইবোন। বিছানায় ও চেয়ার টেনে বসে সবাই। পরকালযাত্রার শোক ও মাথায় টুপি রেখেই বিষণ্ণ কণ্ঠে বলে বড়ভাই, ‘মা নাই। কিন্তু আমরা রক্তসম্পর্কের ভাইবোনরা আছি, এই বাড়ি ও পৈতৃক সম্পত্তির ওপর অধিকার আমাদের প্রত্যেকেরই আছে। স্বয়ং আল্লাহ এ-বিষয়ে কোরানে আইন করে দিয়েছে। কিন্তু বাবার মৃত্যুর এক যুগের মধ্যেও আমরা ভাগাভাগির ওপর জোর দেইনি। কারণ মা বেঁচে ছিল এবং ছোট কাফি তেমন লেখাপড়া শিখে চাকরিবাকরি করেনি। তাকে বিয়েও করানো হয়েছে গ্রামের ঘরগেরস্থালি দেখার উপযুক্ত মেয়ে খুঁজে। আমরা চেয়েছি বড়বাড়ির সংসার ও কৃষিকাজ দেখাশোনা করে কাফি নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে নিক। কিন্তু সে দশ বছরে কী করেছে, কমবেশি তোমরা সবাই শুনেছো, গ্রামবাসীও সবাই জানে।’ কাফিই প্রথম উত্তেজিত কণ্ঠে শোকসভায় প্রতিবাদ করে, ‘কী করেছি আমি? তোমাদের ভাগের জমি গিলে খেয়েছি, নাকি নিজের নামে করে নিয়েছি?’
বড়বোন শাসনের গলায় বলে, ‘মা বেঁচে থাকতে তুই আর তোর বউয়ের কীর্তিকলাপের খবর আমাদের জানিয়েছে। এত বছর বাড়ি থেকে যে আয়-উন্নতি হয়েছে, তার ভাগ কি তুই আমাদের দিয়েছিস?’
কাফির সব যুক্তি তো জমাট ক্ষোভ হয়ে ছিল, বিস্ফোরণ ঘটলে তা আর থামতে চায় না, ‘আমি চাকরের মতো তোমাদের বাড়িসম্পত্তি পাহারা দিয়েছি। বড়বাড়ির চাষাড়ি কাজ করাতে আমাকে গ্রামের মেয়েকে বিয়ে করিয়েছো, আমার বউ দাসিবাঁদির মতো খেটেছে। মা আমার সংসারেই ছিল দশ বছর, কিন্তু তোমাদের সবার এতো সচ্ছল অবস্থা, আমার জন্য কি কেউ এক কানাকড়ি দিয়ে সাহায্য করেছো? বরং আমি যাতে মানুষ হতে না পারি, এজমালি জায়গাজমিতে সারাজীবন খেটে মরি, সেটাই চেয়েছো সবাই।’
এক ভাই জানতে চায়, ‘মানুষ হওয়া মানে কি মোটরসাইকেল দাবড়ে প্রতিদিন শহরে যাওয়া, ব্যবসায়ের নামে বদনেশা করে টাকা অপচয় করা? রোজ কী করিস তুই টাউনে গিয়ে?’
মেজোভাই জানতে চায়, ‘সংসারের কৃষিকাজ থেকে যে-আয় হয়েছে, তার ভাগ কেউ চায়নি, চাইবেও না। কিন্তু ভাগাভাগির আগে তুই বহু জমি বন্ধক রেখে কেউ বলে বিশ লাখ, কেউ বলে ত্রিশ লাখ, এতো টাকা নিয়ে টাউনে কী ব্যবসা ফেঁদেছিস? ব্যবসা করবি ভালো কথা, কিন্তু বন্ধক খুলবে কে?’
কাফি সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়, ‘সময়মতো আমি খুলে দেব। ভাগাভাগি করে দাও, আমার ভাগ বেচে দিয়ে বউ নিয়ে শহরে আলাদা বাসা করে স্থায়ীভাবে থাকব আমি। তোমাদের বারোয়ারি সম্পত্তি পাহারা দেওয়া আমার কাজ না। তোমরা যেভাবে ভাগাভাগি করো আমার আপত্তি নেই। আমি এখন চলি, চারদিন আমার ব্যবসা দেখিনি, জরুরি ফোন এসেছে, আমাকে এখনই যেতে হবে।’
বড়দের অনুমতির তোয়াক্কা না করে কাফিই প্রথম সভাস্থল ত্যাগ করে। উঠানে নেমেই মোটরসাইকেল স্টার্ট দেয় সে, একাধিক ভাইবোনের ধমক ও স্নেহমেশানো হাঁকডাকও তাকে আর ফেরাতে পারে না। কাফির মোটরসাইকেলের গর্জন মিলিয়ে যাওয়ার পরও বড়বাড়ির পারিবারিক সভার উত্তাপ-উত্তেজনা থেমে যায় না। বড়ভাইদের অনুপস্থিতিতে কাফি রক্ষক হয়ে শুধু ভক্ষক নয়, দুর্বৃত্ত-দস্যুর মতো আচরণ করেছে, তার প্রমাণ দিতে থাকে। মাকে কীরকম মানসিক কষ্ট দিয়েছে, সে-কথাও জোর গলায় বলে কেউ কেউ। কিন্তু কাফির বউ রহিমা কী ভূমিকা রেখেছে?
কাফিকে না পেয়ে তার স্ত্রী তথা রুম্মানের মা তথা রহিমাকেই ডাকে সবাই।
শাশুড়ির দাফন হওয়ার পরও বাড়িতে মেহমান হয়ে আসা স্বামীর ভাইবোনদের সেবায় এতটা ব্যস্ত যে, রহিমা দম ফেলারও সময় পায় না। ঘরে সভা বসলে রান্নাঘরে সবার জন্য চা করছিল সে। জামেনার কাছে সেই দায়িত্ব হস্তান্তর করে ভাসুর-ননদের ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য মাথায় ঘোমটা টেনে ঘরে আসে এবং দাঁড়িয়েই থাকে।
বড়ভাইয়েরা তার কাছে জানতে চায়, কত জমি বন্ধক রেখেছে কাফি? কীভাবে ল-ভ- করেছে সংসার? রহিমা কি জানত না? স্বামীকে শাসন করার চেষ্টা করেনি? শহরে কিসের দোকান দিয়েছে? কী ব্যবসা করে? অনেকে বলেছে টাউনে যায়, সেখানে নাকি আরেকটা বিয়ে করেছে সে?
ভাসুর-ননদের নানারকম প্রশ্নের মুখে রহিমা নতমুখে একই জবাব দেয়, ‘আমি কিছুই জানি না। আমাকে তো টাউনে নিয়ে গিয়ে কিছুই দেখায়নি।’
বড়ভাই এবার সিদ্ধান্ত জানায়, ‘আমি মাকেও কথা দিয়েছিলাম, রিটায়ার করার পর বাড়িতেই পাকাপোক্ত থাকব। আর মোটে বছরখানেক বাকি। রফিকও রিটায়ারমেন্টের পর বাড়িতেই বেশিরভাগ সময় থাকবে বলছে। এবারে তো সম্ভব হবে না, তোমরা একটা ডেট ঠিক করে আসো, যার যেটা পাওনা, শান্তিপূর্ণ এবং আইনসংগতভাবে বাটোয়ারা করে দেব আমি। এলাকার চেয়ারম্যান, গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং উকিল সবাইকে ডাকব। ভাগের পর তোমরা যদি কেউ নিজেদের ভাগ কাফিলকে দিয়ে যেতে চাও, আমার কোনো আপত্তি নেই।’
এক বোন প্রতিবাদ করে, ‘ওকে দেবো কেন? এ-বাড়িতে আমাদের অধিকার নেই, আমাদের ভবিষ্যৎ নেই?’
রহিমা ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য বলে, ‘আমি আপনাদের জন্য চা করছি, নিয়ে আসি।’
-----চার-----
মায়ের পারলৌকিক শান্তি এবং নিজেদের ইহকালীন স্বার্থ রক্ষায় ভাগবাটোয়ারার বিষয়টা পাকা করে ওয়ারিশগণ একে একে চলে যায়। বড়বাড়ি হঠাৎ বেশ ফাঁকা এবং অচেনা লাগে রহিমার কাছে। আগে দিনভর শাশুড়ির খ্যানখ্যানে গলা ও লাঠি-ঠুকঠুক মাতবরি অসহ্য লাগত, এখন তার বদলে নানারকম ভুতুড়ে ভয়। শাশুড়ি মরলে রহিমা বড়বাড়ির মালিক হবে বলেছিল যারা, তারা এখন সাজাপ্রাপ্ত আসামির মতো রহিমাকে দেখে মজা পায়। ওয়ারিশরাই ব্যবস্থা করে গেছে, মৃতা মায়ের ঘরবাড়ি পাহারা দিয়ে রাখবে জামেনাও। জামেনা তার মেয়েকে নিয়ে রাতে এখন বড়বাড়িতে থাকে। এছাড়া যে বাঁধা কামলা করমালি চাষাড়ি কাজকাম তত্ত্বাবধান করে, সেও যেন বড়বাড়ির মালিক হয়ে উঠেছে একজন। জোরগলায় হাসিমুখে রহিমাকে স্মরণ করিয়ে দেয়, ‘ও ছোটভাবি, বড়ভাই অর্ডার দিছে, ভাগাভাগির পর তার ভাগের জমি হামাকেই দেখাশুনা করা লাগবে। মেজোভাই তার ভাগ আধি দেবে মনে হয় হাকিমুদ্দিকে। আর তোমার জন তো টাউনে বাসা করার কথা ডিক্লেয়ার দিছে। আমি এখন কোন দিকে যাই, কন দেখি কী জ্বালা!’
এসব জ্বালার কথা বলার সময় করমালির মুখে হাসি ধরে না। শাশুড়ি মরতে না মরতেই শহরে রহিমার সতিনের সংসার কল্পনা করে কিংবা বড়বাড়িতে তার আসন্ন ফকিরনি দশা জানতেও সম্ভবত, লোকজন তাকে নানা কথা জিজ্ঞেস করে। রহিমা কোনো জবাব দেয় না। বিয়ের আগে থেকেই জানত সে, ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগাভাগি হলে বড়বাড়ি একদিন ছিন্নভিন্ন হবেই। এ শুধু হিংসুক গ্রামবাসীর কামনা নয়, শাশুড়িও রহিমাকে প্রায় রোজই বোঝানোর চেষ্টা করে গেছে।
রহিমাও তো গাঁয়ের গেরস্তঘরের মেয়ে, জমির মায়া যে কী সাংঘাতিক জিনিস, নিজের বাপ-চাচার ঝগড়া দেখে ছোটবেলাতেই বুঝে গেছে। সেই বাবা মেয়েকে বড়বাড়ির বউ করে পাঠানোর সময় বেকার ও নেশাখোর জামাইকেও মেনে নিয়েছিল তাদের বিস্তর জায়গাজমি দেখেই। ভাইয়েরা সবাই দেশ-বিদেশে চাকরি করে, বাড়ির আবাদি ফসলের ভাগ নেওয়া দূরে থাক, নিজেদের জমিটাও পর্যন্ত চেনে না। বাড়ির কৃষি থেকে ম্যালা আয় হয় বলেই ছোটছেলে চাকরিতে ঢোকেনি। এই সুযোগে রহিমা যদি নিজের সংসার গুছিয়ে নিতে পারে, ভবিষ্যতে কোনো অভাব থাকবে না তার। বিয়ের পর থেকে রহিমা সেই চেষ্টাই করে গেছে। শহরবাসী ভাসুর-ননদের মতো নিজেও শহরে ঝামেলামুক্ত সংসার গড়ে ছেলেকে মানুষ করার স্বপ্ন দেখেছে। স্বপ্নপূরণের পথে শাশুড়ি ছিল বড় বাধা, শাশুড়ি মরে যেতে না যেতেই অচেনা সতিন মস্ত বাধা হয়ে উঠবে কল্পনাও করেনি সে।
বাড়ি ফাঁকা হওয়ার পরও কাফি ব্যবসায়ের কাজের দোহাই দিয়ে টানা তিনদিন বাড়িতে ফেরেনি। ফোনে রহিমাকে জানিয়েছিল ব্যবসায়ের কাজে ঢাকায় যাবে। ভাগ নিয়ে বড়ভাইয়ের সঙ্গেও প্রাইভেট কথা বলবে। মা বেঁচে থাকতেও অনেকদিন রাতে বাড়িতে ফিরত না সে। মাত্র এক ঘণ্টায় মোটরসাইকেল হাঁকিয়ে বাড়ি ফেরা যায়, কিন্তু তারপরও কী এমন কাজের ব্যস্ততা যে রাতেও স্ত্রী-সন্তানের কাছে ফেরার গরজ থাকে না। সন্দেহ অবশ্য আগেও জেগেছিল, রাতে বাড়িতে ফিরলেও স্বামীর ভালোবাসার উত্তাপ খুঁজে পায়নি। তারপরও শহরে নিজের সংসার গুছিয়ে নেওয়ার স্বপ্নটা আঁকড়ে রেখেছিল রহিমা। কাফি ভাইদের কাছে শহরে বাসা নিয়ে থাকার ঘোষণা দিলে স্বপ্নপূরণের আশাও জেগেছিল।
তিনদিন পর রাতে বাড়িতে ফেরে কাফি। দমবন্ধ অবস্থায় অপেক্ষা করে রহিমা। স্বামীকে রাতের খাবার দিয়ে সরাসরি কথা তোলে, ‘আম্মাজানের মৃত্যুর পর এ-বাড়িতে দম বন্ধ হয়ে আসে আমার। রুম্মানকে টাউনের স্কুলে ভর্তি করাতে হবে। তুমি এ-মাসেই আমাদের নিয়ে টাউনের বাসায় উঠবে।’
যুদ্ধ করার জন্য কাফির প্রস্ত্ততি তো দীর্ঘদিনের, জবাব দেয় সে, ‘আমার রক্তসম্পর্কের শত্রুরা, গ্রামের হিংসুক শয়তানরা তোমাকে জানায় নাই, টাউনে আর একটা বিয়া করব আমি?’
‘আমি বিশ্বাস করি নাই।’
‘অবিশ্বাস করার কী আছে? আমার বাপ ও দাদারও ছিল দুই পরিবার। মুসলমানের ছেলে আমি, চারটা না হোক, প্রয়োজনে দুই বউ রাখা আমার আইনি অধিকার। বড়বাড়ির গেরস্থালি কাম সামলানোর জন্য তুমি এ-বাড়িতে এসেছ, তুমি সেই কাজই করবে।’
খাওয়ার পর সিগারেট ধরিয়ে কাফি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও সান্তবনা দেয়, ‘ভাগাভাগির পর রুম্মানকে নিয়ে এ-বাড়িতেই থাকবে তুমি। এ-বাড়ির গেরস্তি কামকাজ করলে ভাতের অভাব হবে না তোমার।’
বুড়ি শাশুড়ি মরে যাওয়ার পর রহিমা কেঁদে মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে গ্রামের মানুষ জড়ো করেছিল, কিন্তু নিজের জীবনের এমন সর্বনাশা ঘটনার মুখেও টুঁ-শব্দটি করতে পারে না আজ। মনে হয় স্বামী সর্বশক্তি দিয়ে তার মুখ চেপে ধরেছে দমবন্ধ করে মারার জন্য।
বউকে সারারাত নির্ঘুম, পাথরের মতো স্তব্ধ এবং একা রেখে, সকালে মোটরসাইকেল হাঁকিয়ে কাফি বাড়ি ছেড়ে চলে যায়।
বাপের মতো ছেলে রুম্মানও যথারীতি খেলার নেশায় বাড়ির বাইরে ছুটে বেড়ায় দিনমান। বাড়িতে একা হয়েও কোনো কাজেই মন বসে না রহিমার। বিয়ের পর থেকে কাজই তো করে গেছে রহিমা। নিজের হবে না জেনেও বাড়ির উঠান ঘরদুয়ার ঝাঁট দিয়েছে। শাশুড়ির সেবাযত্ন ছাড়াও তার চৌদ্দগোষ্ঠীকে রান্নাবাড়া করে খাইয়েছে। গোলায় ধান তোলা, ধান উঠানো, রোদে শুকানো এবং ভিটায় মাচান বেঁধে এন্তার লাউ-শিম-কুমড়া ফলানো – এসব করে চাষিবাপের নাম ফাটিয়েছে। পোষা গাইটি ও মুরগিগুলোর তত্ত্বতালাশ করেছে। এতো কাজের পরও এ-সংসারে স্বামীর প্রাপ্য গালমন্দ মুখ বুজে হজম করেছে নিজের সুখের সংসার হওয়ার স্বপ্ন দেখে। মা মরলেই আলাদা হয়ে শহরের বাসায় ভালো চলবে তাদের, স্বামীও আশ্বাস দিয়েছিল এরকম।
শাশুড়ির মৃত্যুতে বাড়িতে লোকদেখানো এত কান্নাকাটির পরও, শাশুড়ির কথা ভেবে রহিমার সত্যি কান্না পায় আজ। বেঁচে থাকলে ছেলের দ্বিতীয় বিয়ের কথা শুনলে বুড়ি আজ রহিমার পক্ষে থাকত অবশ্যই। ছেলেবউয়ের সঙ্গে যতই খ্যাচম্যাচ করুক, চোখের সামনে একমাত্র নাতি রুম্মান ছিল বলে তার ওপর টানটাও ছিল বেশি বুড়ির। রুম্মান দাদির হাতের লাঠি নিয়েও খেলত। মরার দুদিন আগেও খেলার জন্য দাদিকে কানা বুড়ি সাজিয়েছিল। অন্ধ সেজে বুড়ি লাঠি ধরলে, অন্য প্রান্ত ধরে রুম্মান উঠানে ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা চেয়েছিল, ‘কানা ফকিরকে ভিক্ষা দেন মা-সকল।’ এই দৃশ্য দেখে হাসি লুকাতে রান্নাঘরে ছুটে গিয়েছিল রহিমা। সেই হাসির কথা স্মরণ করেও আজ চোখের জল ফেলে। শহরে ব্যবসা করার নামে কাফি পিরিতের সংসার ফেঁদেছে জানলে লম্পট ছেলেকে বাড়িছাড়া করে, বুড়ি নিশ্চয় ছোটছেলের প্রাপ্য ভাগের জমি ছোটবউ ও নাতির নামে দেওয়ার সুপারিশ করত বড়ছেলেদের কাছে। করত নাকি?
রহিমা এখন শাশুড়ির ফোনটা থেকে ভাসুর-ননদকে কল দিয়ে জরুরি কথা বলতে চাইলে, শুনবে তারা। কিন্তু তাতে লাভ কী হবে? প্রতারক ভাইয়ের বদমায়েশি ও শহরে ব্যবসায়ের নামে দ্বিতীয় সংসার ফাঁদার খবরটা তারা রহিমার আগেই জেনেছে। কৃষক পরিবারের মেয়ে হয়েও স্বামীকে কৃষিকাজে ধরে রাখতে পারেনি রহিমা, উলটো নিজেও শহরে সংসার ফাঁদার স্বপ্ন দেখেছে। ব্যবসায়ের পুঁজি জোগাড়ে স্বামীকে এজমালি জমি বন্ধক রাখতে এবং গোলার ধান ও ভিটার গাছপালা বেচতেও উৎসাহ দিয়েছে। যার জন্য এত করেছে রহিমা, সে-ই হয়তো ভাইদের কাছে ছোটলোক বউয়ের হাজারটা গিবত গেয়ে দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতিও জোগাড় করেছে ভাইদের কাছে। রহিমা বিয়ের পর শহরে এক ননদের বাসায় বেড়াতে গেলে সে তার কাজের বুয়ার কাছে পরিচয় দিয়েছিল, আমাদের গ্রামের বাড়ির সব কাজ এই মেয়ে একাই সামলায়। তার মানে কী? রহিমাও তাদের কাছে তুচ্ছ কাজের লোক ছাড়া আর কিছু নয়। তারপরও বড় ননদের কাছে ফোন করে শাশুড়িবিহীন বাড়িতে একা হওয়ার কান্না নিয়ে স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের খবরটা জানায় রহিমা। ননদ সহানুভূতি দেখাবে কী, উলটো রহিমাকেই ধমক দিয়ে বলে, ‘কেমন মেয়ে রে তুই, স্বামী শহরে ফষ্টিনষ্টি করে বেড়ায়, আর তুই এতদিন মুখ বুজে ছিলি! থাক, তুই বড়বাড়ির কাজকর্ম নিয়েই থাক।’ ননদের কথার প্রতিবাদে এই মুহূর্তেই এ-বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে বাপের বাড়ি চলে যাওয়ার কথা ভাবে রহিমা। কিন্তু গরিব বাপ জমি বেচে বড়ঘরের জামাইকে মোটরসাইকেল যৌতুক দিয়েছিল। সংসার-ভাঙা মেয়েকে চিরদিনের জন্য আশ্রয় দেওয়ার সংগতি নেই তার। রহিমার ভাইয়েরাও বলে দিয়েছে, ভাগাভাগিতে পৈতৃক জমির কড়াক্রান্তিও পাবে না সে। না, বাপের বাড়িতে ফিরবে না রহিমা। তারচেয়ে বিষ খেয়েই বড়বাড়ির সঙ্গে সকল সম্পর্ক ঘুচাবে। রহিমার আপন খালাতো বোন প্রেমিককে বিয়ে করতে না পেরে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছে। বড়বাড়ির কৃষিতেও কীটনাশকের ব্যবহার দেখলে কথাটা মনে পড়ত রহিমার। নিজে লাউ-শিমের মাচায় স্প্রে করার জন্য করমালিকে দিয়ে বাজার থেকে কীটনাশক কিনে আনিয়ে ছিল, সেই বিষ দেখেও মনে পড়েছিল আত্মঘাতী বোনটির কথা। তাই বলে নিজে তার অনুগামী হওয়ার কথা বিয়ের আগে বা পরে কোনোদিন ভাবেনি রহিমা। নির্দোষ বোনের আত্মহত্যার জন্য দায়ী প্রেমিক ছেলেটির কোনো শাস্তি হয়নি, বউ-বাচ্চা নিয়ে সুখে সংসার করছে এখন। রহিমাও বিষ খেয়ে মরলে দ্বিতীয় বউ নিয়ে স্বামীর সুখের সংসার আরো নিষ্কণ্টক হবে। বিষ হাতে নিয়েও রহিমা মোটরসাইকেলের পেছনে বসা কল্পিত যুবতীকে স্বামীর আলিঙ্গনে সুখের হাসি হাসতে দেখে। সতিনের সুখ দেখে রহিমা যদি আজই মরে, তার অনাথ সন্তান কোথায় ঘুরে বেড়াবে? আপাতত বিষ রেখে রুম্মানকে খোঁজার জন্য রহিমা বাড়ির বাইরে বেরোয়।
নিজের মৃত্যুকামনা নিয়ে রহিমা অ্যাক্সিডেন্টে স্বামীর মৃত্যুর কথাও ভাবে। মোটরসাইকেল চালাতে গিয়ে একদিন মারাত্মক অ্যাক্সিডেন্টের হাত থেকে অল্পের জন্য বেঁচে গেছে সে। আবারো যদি সেরকম কোনো দুর্ঘটনায় মুহূর্তেই তাকে দুনিয়া থেকে তুলে নেয় দয়াময় আল্লাহ, স্বামীশোকে এক ফোঁটাও চোখের জল ফেলবে না রহিমা। স্বামী মরলেই বরং বড়বাড়িতে পৈতৃক সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে রুম্মান এবং স্ত্রী হিসেবে রহিমাও পাবে দুই আনা অংশ। স্বামীর ভাগ পেলে বড়বাড়িতেও নিজের আলাদা সংসার এবং পিতৃহারা ছেলের ভবিষ্যৎ গুছিয়ে দিতে পারবে সে একাই। বিধবা শাশুড়ি যেমন বড়বাড়িকে একান্ত নিজের ভেবে দেখেশুনে রেখেছে আজীবন, নিজে বিধবা হলে রহিমাও স্বামীর সম্পদ আরো ভালোভাবেই রক্ষা করতে পারবে। কিন্তু স্বামী বেঁচে থাকলে নিজের ভাগ বেচে দিয়ে শহরে সতিনের সংসারে ঢালবে অবশ্যই। তালাক দিয়ে রহিমাকে বড়বাড়ি থেকে বের করে দিতে এক মিনিটও সময় লাগবে না তার। তখন কোথায় যাবে রহিমা? অসহায় এক নারীকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য আল্লাহ যদি নেশাখোর দুশ্চরিত্র এক পুরুষকে দুনিয়া থেকে তুলে নেয়, সেটা কি অবিচার হবে? সুবিচার পাওয়ার জন্য রহিমা গোপনে চোখের জলের সঙ্গে আল্লাহর কাছে জরুরি আবেদন-নিবেদন জানাতেই থাকে।
মরা-বাঁচার সংকটে তার স্বামী অপ্রত্যাশিতভাবে ঘুমানোর সময়ে রাতে বাড়িতে ফেরে আজ। বাড়িতে এসেও অকারণে মোটরসাইকেলের হর্ন বাজায়। সাধারণত বাড়িতে ফিরলে এরকম রাতেই ফেরে সে, কিন্তু আসবে না মনে করে রহিমা তার জন্য ভাত রাখেনি। কী মনে করে কে জানে ছেলের জন্য আজ একটা খেলনা কার এনেছে কাফি। খেলনা কার পেয়ে রুম্মান মহাখুশি, ঘুমানো স্থগিত রেখে বিছানাতেও কার চালায়। আর রহিমাকে ধমকের গলায় হুকুম দেয় কাফি, ‘ভাত দে। খিদে লেগেছে।’
রহিমা বিছানা থেকে উঠে রান্নাঘরে যায়। আধঘণ্টার মধ্যে ফ্রিজের তরকারি ও ভাত গরম করে খাবার টেবিলে সাজিয়ে দেয়। স্বামীর সঙ্গে কথা বলা দূরে থাক, তার দিকে একবারও না তাকিয়ে বিছানায় ছেলের পাশে গিয়ে শোয় আবার। মানুষটা খাচ্ছে খাক, রহিমা ঘুমন্ত ছেলের পাশে মৃতা শাশুড়ির মতো অসাড় পড়ে থাকে।
আরো আধঘণ্টা পরে স্বামীর বিকৃত কণ্ঠের চিৎকার শুনে বিছানায় উঠে বসতে বাধ্য হয় রহিমা। যন্ত্রণাবিকৃত গলায় চেঁচিয়ে বলছে মানুষটা, ‘হারামজাদি খাবারের মধ্যে বিষ মিশায় দিছিস নাকি? আমার এতো বুক জ্বলে কেন? এতো পেট জ্বলে কেন?’
আকস্মিক দুর্ঘটনায় পড়ার মতো স্বামী ফোনটা হাতে নিয়ে যন্ত্রণায় মৃত মাকে ডেকে বিছানায় গড়াগড়ি দিতে থাকলে রহিমা ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে চেঁচিয়ে এবার আল্লাহকেই ডাকে, ‘হায় আল্লা! রুম্মানের আববার কী হইল? টাউন থাকি কী বিষ খায়া আসছে আজ? বিছানায় গড়াগড়ি দেয় ক্যানে? ও জামেনা, ও উমেদভাই, আমার কপালে ফের কী আগুন লাগল!’
মধ্যরাতে বড়বাড়িতে নারীকণ্ঠের চিৎকার শুনে একজন-দুজন করে প্রতিবেশী ছুটে আসতে থাকে। পাড়ার দোকানে টিভি দেখছিল যারা, তাদের কয়েকজনও টিভি দেখা বাদ দিয়ে ছুটে আসে বড়বাড়িতে। অসুস্থ কাফির আর তখন কথা বলারও শক্তি নেয়, দাঁতে দাঁত চেপে শারীরিক যন্ত্রণা হজম করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে উঠানে গলা ছেড়ে কাঁদতে শুরু করেছে রহিমা।
কান্না কোলাহলের মাঝেই ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ছুটে আসে একটি অ্যাম্বুলেন্স। অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে আসার জন্য কাফিই তার এক বন্ধুকে ফোন করেছিল। কাফিকে স্ট্রেচারে তুলে অ্যাম্বুলেন্সে ওঠানো হয়। এদিকে আঙিনায় গড়াগড়ি দিতে থাকা রহিমার কান্নার আওয়াজ তীব্রতর হয়ে ওঠে। রাতের আঁধার চিরে ছুটে যাওয়ার সময় অ্যাম্বুলেন্সখানা লাল আলো চটকে আর পোঁ-পোঁ সাইরেন বাজিয়ে কার মরণ কামনা করে, রহিমা বুঝতেও পারে না।
এতো কাছে থেকে মানুষকে আগে মরতে দেখেনি রহিমা। শাশুড়ি সাড়া না দেওয়ায় গায়ে হাত দেয়, নাকের ওপর হাত রেখে নিশ্চিত হয়, বুড়ির প্রাণপাখি এইমাত্র তার চোখের সামনেই উড়ে গেল! আর এমন এক সময়ে শাশুড়ির অন্তরাত্মা দেহছাড়া হলো, বাড়িতে যখন সে ছাড়া উপস্থিত নেই কেউ। এখন তার কী করা উচিত? রহিমা মৃতার চোখদুটি বুজিয়ে দেয় আলতো স্পর্শে।
বড়বাড়ির মুরবিব মরবে, বয়স হয়েছে, রোগে-দুর্ভোগে বিছানায় পড়ে থাকার বদলে এখন মরলেই তার শান্তি। সবাই জানত এবং এরকম বলাবলি করত। কিন্তু আজ সকালেও তো লাঠি ঠুকঠাক করে উঠানে হেঁটে বেড়িয়েছে মানুষটা। বাথরুমেও গেছে একা। রহিমা যথারীতি তার ঘরে খাবার দিয়ে এসেছে। মিষ্টিকুমড়ার ঘ্যাঁটে স্বাদ বাড়াতে কয়েক টুকরা বাসি মাংস দিয়েছিল সে। বেছে বেছে বুড়ির জন্য এক টুকরা হাড় দিয়েছিল আজ । দাঁতে অসমর্থ মানুষটাকে শক্ত হাড্ডি দেওয়ার সময় ফোকলা মুখে-গলায় হাড় আটকে তার মরণ কামনাও মনে উঁকি দিয়েছিল হয়তো, কিন্তু রহিমার মনে শুধু হিংসের বিষ নয়, হাড্ডিটা পেঁচিয়ে এক পোঁচ মাংসও ছিল এবং দেখেশুনেই দিয়েছে রহিমা, বুড়ি যাতে খেতে পারে। জোহরের নামাজ পড়ে ভাতও খেয়েছে বুড়ি। খাওয়ার পর বিছানায় যেমন গড়ায়, আজো শুয়ে ছিল।
শাশুড়ির এঁটো থালাবাটি আনার জন্য ঘরে ঢুকে রহিমা হিক্কার আওয়াজ শুনে তার বিছানার দিকে এগিয়ে এসেছে, শেষ কথাটি শোনার জন্য তার মুখের ওপর ঝুঁকেও ছিল, কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই আজগুবি মরে গেল মানুষটা! চোখের সামনে জ্বলজ্যান্ত মরণ দেখে বুকের ভেতরে নিজের আত্মাটাও ধকধক করছে। এখন রহিমা কী করবে? নির্জন বাড়িতে শাশুড়ির আকস্মিক মৃত্যুর একমাত্র সাক্ষী হতে চায় না সে। লোকে বলবে, ছোটবউ খোঁজখবর নেয়নি, যত্নআত্তি করেনি ঠিকমতো। খাবারে বিষ মিশিয়ে হাড়-জ্বালানি শাশুড়িকে মারার চিন্তা যেহেতু তার মনেও এসেছিল, সন্দেহটা জাগতে পারে বুড়ির সন্তানদের মনেও। শকুনিবুড়ির জান নিতে আল্লাহর কাছে অসংখ্যবার ফরিয়াদ জানিয়েছিল রহিমা। তার নীরব প্রার্থনা আল্লাহ না শুনুক, দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা বুড়ির অন্য ছেলেমেয়েদের কানে না যাক, মনের খবর বুড়ির ছোট ছেলে তথা রহিমার গুণধর স্বামী ঠিকই জানে এবং সমর্থনও করেছে অনেক সময়, বউয়ের ভালোবাসা ও ভবিষ্যতের সুখ নিষ্কণ্টক রাখার গরজে। কিন্তু এখন মায়ের মৃত্যুসংবাদ পেলে স্বামী আজ খুশি হওয়ার বদলে নির্ঘাৎ অভিযোগ করবে, মায়ের শরীর খারাপ তো আমাকে ফোন দাওনি কেন?
রহিমা এক ছুটে নিজের ঘরে ঢুকে মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে স্বামীর নম্বর টেপে। সাধারণত স্বামীকে প্রতিটি ফোনকলে কানে পাওয়ার সময় শহরে তার অবস্থান নিয়ে মনে নানারকম সন্দেহ জাগে; কিন্তু আজ ফোন ধরতে বিলম্বের মুহূর্তগুলোতে মোটরসাইকেলে স্বামীর কোমরজড়ানো সন্দেহজনক নারীকে দেখে ভূত দেখার মতো ভয় পায় এবং ভয়কাঁপা কণ্ঠে খবরটা জানায় সে, ‘আম্মাজান কেমন যেন করছে! একজন ডাক্তার নিয়া জলদি আসো বাড়িতে।’
‘মা কেমন মানে কী করছে? আমি তো সকালেও ভালো দেখে আসলাম। শবরি কলা আর গ্যাসের ঔষধ নিতে কইছে, রাতে নিয়া যাবখন।’
মায়ের কলা খাওয়ার দিন শেষ হওয়ার খবরটা চেপে রাখায়, অব্যক্ত সত্যের ভারে স্বামীকে দেওয়া ধমকটাও এবার ভারি হয়ে ওঠে, ‘যা বললাম তাই করো আগে, আমি দেখি এদিকে।’
বজ্রপাতের মতো খবরটা গোপন রেখে নির্জন বাড়িতে একা স্বাভাবিক থাকতে পারে না রহিমা। মৃত্যুর অসহ্য চাপ এড়াতে জীবন্ত কিছু আঁকড়ে ধরতে বালকপুত্রকে চেঁচিয়ে ডাকে, ‘ও রুম্মান, বাবা রুম্মান! খেলতে কোথায় মরতে গেছিস হারামজাদা?’ রুম্মানকে খুঁজতে খুঁজতে রহিমা বাড়ি ছেড়ে রাস্তার দিকে যায়। ছেলের বদলে রাস্তায় বুড়ির সেবায় নিযুক্ত কাজের মেয়ে পড়শি জামেনাকে দেখতে পায়। জামেনা রোজ তিন-চার বেলা আসে এ-বাড়িতে। আজ সকালেও এসেছিল, বুড়ির গোসলের পানি রেডি করে দিয়েছে, কাপড় কেচে দিয়ে পানসুপারিও পিষে দিয়ে গেছে।
‘ও জামেনা, জলদি আয় তো বাড়িতে। আম্মাজানের কী হইল, দেখ তো আসি।’
‘খানিক আগেই না বুড়ির জন্য পানসুপারি পিষে দিয়া গেইনু চাচি!’
হামানদিস্তায় বুড়ির পানসুপারি বেটে দেওয়ার কাজটি করতে গিয়ে জামেনার নিজেরও পানটা খাওয়া চলে। কিন্তু আজ একটাও সুপারি অবশিষ্ট ছিল না বলে বুড়ির পেশা সুপারি একটু মুখে দিয়েছে। বুড়ো মানুষের পেশা সুপারি খেয়ে মোটেও তৃপ্তি হয় না। এখন সাবান কেনার পয়সার সঙ্গে একটা পান খাওয়ারও মতলব নিয়ে দোকানের দিকে যাচ্ছিল সে, বিরক্তি নিয়ে অনিচ্ছাতেও বড়বাড়িতে ঢোকে আবার।
বুড়ির ঘরে ঢোকার আগেই, তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ভিতে দাঁড়িয়ে ঠাট্টা-মশকরা করে জামেনা, ‘ও দাদি, গুয়াপান খায়া মন ভরে নাই? তোর লাঠির ঠুকঠকানি আর উড়ুনগাইনের ঢকঢকানি না শুনলে ছোটবউয়ের খালি মরার চিন্তা আইসে।’
অতঃপর ঘরে ঢুকে বিছানায় মৃতাকে পরীক্ষা করতে গিয়ে তার মুখ থেকে পানের গন্ধও পায় জামেনা, মুখের কোণে রক্ত-পিত্তের মতো লোল গড়িয়েছে, ওই দুর্গন্ধ রসটুকু ছাড়া বুড়ির শরীরে প্রাণের কোনো সাড়া না পেয়ে জামেনাই প্রথম বিস্ময়কাঁপা গলায় ঘোষণা করে, ‘ও আল্লা রে, বুড়ি না মরি গেইছে! মুখ থাকি এলাও মোর পেশা গুয়ার গন্ধ বারায়! হায় আল্লা, কোনবেলা কেমনে মরল চাচি? ও আল্লা রে!’
টেবিলের ওপর ভাতের পেস্নটবাটি দেখে জামেনা আবারো মৃতার জ্যান্ত দশা সম্পর্কে আগ্রহ দেখায়, ‘ভাত খায় নাই এলাও?’
ছোটবউয়ের রান্না খাওয়ার পরই ভালো মানুষটা আজ মরে গেল কেন? এমন প্রশ্ন ওঠার আশঙ্কা রহিমা দিশেহারা শোকের মাঝেও অনুভব করে জামেনার ওপর পালটা অভিযোগ চাপায়, ‘তোর জর্দা দেওয়া পানসুপারি মুখে নিয়া আম্মাজান আইজ মরি গেল ক্যানে?’
শোকের আবেগে নিজের ঘরে দৌড়ে গিয়ে মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে আবারো স্বামীর কানে খবরটা কোনোমতে ছুড়ে দেয় সে, ‘আম্মাজান আর নাই!’
স্বামীর কথার কোনো উত্তর না দিয়ে মোবাইলটা উঠানে ছুড়ে দেয় রহিমা, তারপর শাশুড়ির আত্মা যে আসমানে উড়ে গেছে সেদিকে তাকিয়ে গলা ছেড়ে কাঁদতে শুরু করে, ‘ও আল্লাহ রে! বড়বাড়ি ধুয়া করিয়া হামার আম্মাজান মরি গেল রে!’
এ-বাড়িতে বউ হয়ে আসার পর এটাই রহিমার প্রত্যাশিত প্রথম মৃত্যুশোক যাপন। এখন তার অনেক কাঁদা উচিত, গলা ছেড়ে কাঁদতে না পারলেও শোকের আবেগে দাঁতকপাটি লেগে মাটিতে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া উচিত। স্বজনপড়শি সবাই দেখার জন্য ছুটে আসতে শুরু করবে। রহিমার আগে তার মোবাইল ফোনটাই মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে, সেটা দেখে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার আগে মনে হয়, খবরটা অন্তত বড় ননদকে তারই জানানো উচিত। মায়ের খবর নিয়মিত নেওয়ার জন্য মোবাইল ফোনটা ননদই তাকে গিফট দিয়েছে। বুড়ি ফোন চালাতে পারত না, তার ওপর কানেও শোনে কম, এ-কারণে ফোনের সঙ্গে মায়ের পক্ষে মোবাইল-অপারেটরের চাকরিটাও দিয়েছিল ননদ। গরিব পড়শি জামেনাকেও টাকা দিয়ে মায়ের সেবায় নিযুক্ত করেছে সে-ই। জামেনা ননদকে ফোন করার আগে তারই ফোন করা উচিত। ফোনটা হাতে নিয়ে শরীর-উথলানো কান্নাসহ বড় ননদকে কোনোমতে জানায় শুধু, ‘ও আপা, আম্মাজান আর নাই।’ খবরটা দিয়েই সে ফোন হাতে নিয়েই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আবার।
ততক্ষণে জামেনাও গলা ছেড়ে কাঁদতে শুরু করেছে এবং প্রতিবেশীরাও সরব কৌতূহল নিয়ে ছুটে আসতে শুরু করেছে। প্রতিবেশীদের মধ্যে সবাই জানে এবং জামেনাও সেদিন ঠাট্টার ভঙ্গিতে বলেছে, ‘বুড়ি মরলে বড়বাড়ির আসল রানি হইবে ছোটচাচি। মাথার উপরে খ্যাচম্যাচ করার জন্য কেউ থাকপে না, ছোটবউয়ের হুকুমেই চলবে সব।’ শোকের মাঝেও এসব কথা মনে করে রহিমার শোকের আবেগ দ্বিগুণ বেগে উথলে ওঠে।
-----দুই-----
মানুষের মরণ যতই নীরবে-নিভৃতে ঘটুক, টাটকা মৃত্যুকে নিয়ে জীবিতদের প্রতিক্রিয়া জীবন্ত হয় তৎক্ষণাৎ। জনবহুল এ-গ্রামটাতে সব বাড়ির নবজাতকের ক্ষীণকণ্ঠের কান্না সবার কানে যায় না, গর্ভবতী মেয়েরা যথাসম্ভব লুকিয়ে রাখে পেটের খবর, কিন্তু কোনো বাড়িতে কেউ মরে গেলে স্বজনদের মড়াকান্নায় ভারি হয়ে ওঠে গাঁয়ের বাতাস। দিশেহারা গ্রামবাসীও নিজেদের অন্তিম গন্তব্য স্মরণে এলে বিহবল হয়, পরিচিত একজন সেই গন্তব্যে যাত্রা করেছে শুনলেই ছুটে আসে দেখতে।
মড়াকান্না ছাড়াও গ্রামসমাজকে নাড়া দিয়ে ইদানীং ভিড় তৈরির দায়িত্ব পালন করে গাঁয়ের মসজিদের মাইকটি। ঘড়ির টাইম মেনে রোজ পাঁচবার আজান শুনেও শোনে না বে-নামাজিরা, বড়জোর বেলা সম্পর্কে সচেতন হয়; কিন্তু সময়-অসময়ের তোয়াক্কা না করে মাইকটি কারো মৃত্যুসংবাদ ঘোষণা করলেই কান খাড়া করে সবাই। চেনা মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে দেশি ভাষায় মৃতের পরিচয় জেনে মাইকের ইন্নালিল্লাহি রাজিউন দোয়ার সঙ্গেও কণ্ঠ মেলায়।
আজান ছাড়াও মাইকে গ্রামবাসীর ইমেত্মকাল-সংবাদ ঘোষণার দায়িত্ব পালন করে যে মুয়াজ্জিন হামিদুল, সে আসরের আজান দিতে মসজিদে যাওয়ার মুখে বড়বাড়িতে ক্রন্দনরোল শুনতে পেয়ে থমকে দাঁড়ায়। বড়বাড়ির বড় অভিভাবক ও গাঁয়ের মুরবিব বৃদ্ধার মৃত্যু-আশঙ্কাটি মনে আসতেই জীবিত বেশে সামনে দাঁড়ায় সে। আজ সকালেও হামিদুল এ-বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় বুড়ি হাতের লাঠি উঁচিয়ে তাকে ডেকেছিল, ‘আল্লাহর ঘরে আজান দিস, একটা সত্য কথা বল তো আমাকে। এ-বাড়ির সয়-সম্পত্তি উড়িয়া যায় কোথায় রে?’
বুড়ি আসলে মরহুম স্বামীর রেখে যাওয়া জায়গা-জমির বেহাল দশা ও বখাটে ছেলে কাফির ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল, ‘শুনলাম, তোর বেটার কাছেও নাকি কাফি ভুঁই বন্ধক থুইয়া দুই লাখ টাকা নিছে, কথা কি সত্য?’
হামিদুল সত্যের মুখোমুখি হয়ে সমস্যায় পড়েছিল। কারণ টাকা নেওয়ার সময় কাফি সতর্ক করেছে খবরটা মাকে না জানাতে। অথচ গ্রামবাসী সবাই জানে, বড়ভাইদের অনুপস্থিতি এবং বুড়ি মায়ের পক্ষপাতের সুযোগ নিয়ে কাফি একাই পৈতৃক বিষয়সম্পত্তি যাচ্ছেতাই ভোগ করছে। চাষাবাদ করে বড়বাড়ির গোলাঘর ভরলে কারো কিছু বলার ছিল না, কাফি একের পর এক জমি বন্ধক রেখে নিজের ব্যবসায়ের পুঁজি জোগাড় করেছে। মোটরসাইকেল দাবড়ে রোজ শহরে যায়। শহরে সে কি ব্যবসা করে, নাকি নেশাফুর্তি করে টাকা ওড়ায়, সঠিক কেউ জানে না। তবে বিশ্বস্তসূত্রে জানা গেছে, টাউনে সম্প্রতি সে আরেকটা বিয়েও করেছে, তার মোটরসাইকেলের পেছনে সে-বউকে দেখেছে গাঁয়েরই দুজন শহরবাসী।
বাঁকা কোমর নিয়ে লাঠিভর মেয়েমানুষের পক্ষে বখাটে ছেলের কা-কীর্তি কন্ট্রোল করা সম্ভব নয়। তবে কালা কানেও সব খবর বাজে। শাসন করার জন্য ছেলেকে হাতের নাগালে না পেয়ে বউয়ের সঙ্গেও গজগজ করে সারাদিন। হামিদুল সত্যি বললে কাফি রেগে যাবে, আবার মিথ্যে বললে তার বন্ধকের টাকা মার যাওয়ার ভয়। উভয় সংকটে পড়ে জবাব দিয়েছিল সে, ‘আম্মা, এই বয়সে জায়গাজমির খোঁজ নিয়া আর কী করেন। চোখ বুজলে তো বেটারাই খাইবে সব।’
‘হ্যাঁ, বুড়ি চোখ মুদলে ভূঁইয়ার জায়গাজমিও কাগজের মতো বাতাসে উড়ি যাবে রে। বড়বাড়ির ফকিরি হাল নিজের চোখে দেখবি তোরা, কয়া রাখলাম কথাটা, দেখিস।’
সকালে বুড়িকে দেখার জীবন্ত স্মৃতি মাথায় নিয়ে হামিদুল আজ বড়বাড়ির ভেতরে ঢোকে, আঙিনায় কাফির বউ ও জামেনাসহ পড়শি মেয়েদের কান্নার প্রতিযোগিতা দেখে বৃদ্ধার ঘরেও যায়। বিছানায় শায়িত কাঁথা-মোড়ানো লাশ দেখে দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে ইন্নালিল্লাহি দোয়া পড়ে হামিদুল, তারপর ছুটে যায় মসজিদে। আজ দেড় মিনিট বিলম্বে আসরের আজানটা দেয়, এবং আজান শেষ হলে মাইকের সুইচ অফ করার আগেই সে দুটি ফুঁ দিয়ে একটি শোকসংবাদ ঘোষণা করতে থাকে : ‘ভূঁইয়া বাড়ির মুরবিব, মরহুম নাসির ভূঁইয়ার স্ত্রী ও কাফি ভূঁইয়ার মাতা এইমাত্র ইমেত্মকাল ফরমাইলেন।’ ইন্নালিল্লাহি পড়ার পর মনে হয়, গ্রামের অনেকেই তার কণ্ঠে খবরটা জানছে ঠিক, কিন্তু বুড়ির প্রবাসী ও শহরবাসী ছেলেমেয়েরা খবর পায়নি এখনো। ছেলেরা সবাই বাড়িতে না এলে মৃতার জানাজা ও কুলখানি ইত্যাদি অনুষ্ঠানের দিনক্ষণ জানানো সম্ভব নয়। শুধু শোকসংবাদটি আবারো জোরালো কণ্ঠে ঘোষণা করে সে নামাজের জন্য মসজিদে উপস্থিত ছয় মুসলিস্নর কাতারে শরিক হয়।
মুয়াজ্জিনের মৃত্যুঘোষণার রেশ এবং মৃতাকে ঘিরে বড়বাড়ির সাড়ম্বর স্মৃতি মাথায় নিয়ে গাঁয়ের নামাজি লোক কয়েকটি আজ আল্লাহর দরবারে হাজির হয়েছে। যেহেতু বড়বাড়ি মসজিদের নিটকবর্তী বাড়ি এবং মেয়েমানুষরা আল্লাহর আরশে পৌঁছানোর জন্য কান্নার আওয়াজ সপ্তমে তুলতে পারে বটে, নামাজে দাঁড়িয়েও বড়বাড়ির মড়াকান্নার আওয়াজ শুনতে পায় মুসলিস্নরা এবং হায়াত-মউতের মালিক আল্লাহর দরবারে প্রার্থনাও আজ আকুল ও একাগ্র করে তুলতে সচেষ্ট হয়।
মোনাজাতশেষে মসজিদ থেকে বেরিয়ে মুসলিস্নরা সবাই আজ বড়বাড়ির দিকে হাঁটে। গাঁয়ের ছোট-বড়, নারী-পুরুষ সবাই ছুটে আসছে বড়বাড়িতে। বাড়ির উঠানে শোকের মাতম মুখর করে তুলেছে মূলত গাঁয়ের মেয়েরাই। উৎসবের আনন্দে পালাপার্বণে গীত গাওয়ার সুযোগ পায় না তারা, কিন্তু আত্মীয়স্বজনকে দুনিয়া থেকে বিদায় দেওয়ার সময় কেউ কারো চেয়ে কম কাঁদে না, কান্নাও সুরেলা গীত হয়ে ওঠে অনেকের কণ্ঠে। বাড়িতে মৃতার ছেলেমেয়ে ও নাতি-নাতনির অনুপস্থিতিও পড়শিদের শোক ও কান্নার দায়িত্ব খানিকটা বাড়িয়ে তোলে বটে।
শোকের ঝড়ে সমবেত গাঁয়ের পুরুষরা মেয়েদের মতো কাঁদতে পারে না, ক্রন্দনরত মেয়েদের এড়িয়ে তারা আলাদা ভিড় তৈরি করে। পাথারের ক্ষেতের কাজ ফেলেও ছুটে এসেছে কয়েকজন কামলা। মৃত্যুকে ঘিরে গ্রামসমাজ ত্বরিত সংঘবদ্ধ হওয়ার মূলে মৃত্যুকে ঠেকানোর এবং শোক-সহানুভূতি প্রকাশের আদিম প্রবৃত্তি তো আছেই, সেইসঙ্গে বড়বাড়িতে চটজলদি গ্রামবাসীর ছুটে আসার মূলে তাদের কৌতূহলও কম দায়ী নয়। গ্রামবাসী জানে, নিজের এক ইঞ্চি আবাদি জমি নেই, এমন চাষিমজুরের সংখ্যা গ্রামদেশে নেহায়েত কম নয়। নিজেরা চাষবাস না করেও বড়বাড়ির ভূঁইয়াদের অন্তত পাঁচ হালের জমি এখনো। এমন নিয়ম আইনে টিকলেও আল্লাহর ন্যায়বিচারে টিকবে? স্বয়ং ভূঁইয়ার বিধবা স্ত্রীও বড়বাড়ির সম্পত্তি কাগজের মতো আসমানে উড়ে যাওয়ার কথা বলে গেছে। বুড়ি মরলেই বড়বাড়ি ভেঙে অন্তত বারো টুকরা হবে। নদীতে ভাঙবে না, বানে ডুববে না; কিন্তু এ-বাড়ির সমস্ত জমি গিলে খাবে ওয়ারিশরাই। ছোটছেলে কাফির কা-কীর্তিও যে গ্রামসমাজে নানা গল্প ও প্রশ্ন জমিয়ে রেখেছিল, মৃতাকে ঘিরে নানারকম মন্তব্যের মধ্যেও তা ধরা পড়ে।
‘আহা রে, স্বামী মরি যাওয়ার পরও এতকাল লাঠি ঠুকঠুক করিয়া সবাইকে শাসন করছে। বুড়িমা ছিল বলিয়াই এই বাড়ি আর বিষয়-সম্পত্তি রক্ষা হইছে। কিন্তু এখন কে রক্ষা করবে? রক্ষা করার দায়িত্ব যাদের, তারা বুড়িমায়ের সেবাযত্ন দূরে থাউক, খোঁজটাও নেয় নাই ঠিকমতো। আর একজন তো বাড়িতে থাকিয়াও মৃত্যুকালে মায়ের মুখ দেখতে পাইল না! মোটরসাইকেল হাঁকিয়ে বাড়িতে আসতে কতক্ষণ লাগে?’
কাফি ও তার বড়ভাইদের সঙ্গে যাদের ফোন-যোগাযোগ হওয়ার মতো ঘনিষ্ঠতা আছে, তারা আগাম সহানুভূতি জানাতে মোবাইল বের করে সংযুক্ত হওয়ার চেষ্টা করে। আর মুয়াজ্জিন হামিদুল সকালে বুড়ির সাক্ষাতের স্মৃতি স্মরণ করে তার শেষ কথাটি সবাইকে শোনায় – ‘আজ সকালেই লাঠি হাঁকে ডাকল মোকে, কানের মধ্যে এলাও বাজে তার গলা, হামদুরে আল্লাহর ঘরে আজান দিস, তোকেও কয়া গেনু শেষ কথাটা। মুই মরতে না মরতে বড়বাড়ির ফকিরি হাল নিজের চক্ষক্ষ দেখপেন সগাই।’
বৃদ্ধার শেষ কথার সমর্থনে উপস্থিত মানুষগুলো যুক্তি দেওয়ার আগে, মেয়েদের ভিড় থেকে ছুটে আসা এক বালক পুরুষ ভিড়ে উপস্থিত তার বাবাকে খবর জানায়, ‘রুম্মানের মা কাঁদতে কাঁদতে নিজেও মনে হয় মরি গেইছে।’
রুম্মানের মা তথা কাফির বউকে দেখতে পুরুষ ভিড়ের অনেকেই উঠানে কান্নাকুল মেয়েদের দিকে এগোয়।
আঙিনায় রহিমার কান্নায় ততক্ষণে শরিক হয়েছে অন্তত পনেরোজন মহিলা ও শিশু। কান্নার চেয়ে কিছু শিশুর কৌতূহলই প্রবল। তারা ঘরে ঢুকে মৃতাকে দেখে, মৃতাকে ঘিরে একটা মাছি উড়তে দেখেও ভয় পায়। আরেকটি বালক ক্রন্দসী ভিড়ের পেছনে দাঁড়িয়ে নাক কুঁচকে সহাস্য মন্তব্য করে, ‘কাঁদতে কাঁদতে কাঁয়বা পাদি ফেলাইছে রে।’
অন্যরা গলা ছেড়ে কাঁদছে বলে রহিমাকে চেঁচিয়ে কাঁদতে হয় না আর। নিজের কান্নাবিকৃত শরীর আঙিনায় লুটিয়ে পড়েছে, মাটিতে মুখ লুকিয়ে পরিস্থিতি নিয়ে কিছুটা ভাবারও সুযোগ পায়। মোটরসাইকেলের আওয়াজ পেলেই তাকে আবার কান্না শুরু করতে হবে, শোকের তীব্রতায় আবারো দাঁতকপাটি লেগে জ্ঞান হারাতে হবে। কান্না ছাড়া আগামী তিনদিন তার কাজ নেই। গাঁয়ের নিয়মে মৃতের বাড়িতে তিনদিন চুলা জ্বলবে না। আত্মীয়স্বজনই রান্না করা খাবার দিয়ে যাবে। বুড়ি কবরে ঢুকতে না ঢুকতে একে একে তার রক্তসম্পর্কের স্বজনরা বাড়িতে আসবে। বড় ননদ হয়তো ফোনে এতক্ষণে সবাইকে জানিয়েছে খবরটা। কিন্তু বুড়ি কবরে আড়াল হলেই কি বড়বাড়ির মাটির ওপরে খাড়া হয়ে স্বপ্নের স্বাধীন সংসার ফিরে পাবে রহিমা?
বিধ্বস্ত দেহে চোখ বুজে চুপচাপ এসব কথাই ভাবছিল রহিমা। হঠাৎ চেনা মোটরসাইকেলের আওয়াজ পেয়ে এবং সত্যি সত্যি অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার জন্য মনকে ভাবনাশূন্য করে দাঁতে দাঁত চেপে ধরে সে।
------তিন-----
বুড়ির দাফন হওয়ার পরও তার কাঁচা কবর ঘিরে বড়বাড়িতে শোকপালন যেন অনেকটা উৎসবে রূপ নেয়। একে একে বাড়িতে উপস্থিত হয়েছে পাঁচ ছেলে এবং চার মেয়ে। ছোট কাফি ছাড়া বড় চার ভাইয়ের দুজন ঢাকায়, একজন নীলফামারীতে এবং অস্ট্রেলিয়াতেও আছে একজন। মেয়েরাও নানা ঠিকানায় নিজ নিজ স্বামী-সংসার নিয়ে প্রতিষ্ঠিত। মায়ের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সপরিবার এসেছে সবাই। দাফন হয়ে যাওয়ার পরও এসেছে এক মেয়ে এবং অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী ছেলে একা এসেছে কুলখানির দিনে। বাড়িতে পৌঁছে যথারীতি মাকে না দেখে ‘মা মা’ বলে কেঁদেছে সবাই, অন্য ভাইবোনরাও শরিক হয়েছে সেই কান্নায়; কিন্তু কান্না ও শোকের পরিবেশ জমাট বাঁধতে দেয় না তাদের অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরাই। মৃত্যুশোকে শরিক হয়েও দাদুবাড়ি কি নানাবাড়িতে বেড়াতে আসার মজা লুটতে ছোটাছুটি, খেলাধুলা ও হাসিতামাশাও করে তারা। তিনদিন রান্নাঘর থেকে মুক্ত থাকার কথা ভাবলেও আতিথেয়তার দায় মেটাতে রহিমাকে শাশুড়ির দাফনের পরপরই চুলা জ্বেলে রান্নাঘরেই অনেকটা সময় কাটাতে হয়।
তিনদিন পর মায়ের কুলখানিতে একটি গরু ও চারটি খাসি জবাই করা হয়। পেশাদার মৌলবি-সংকটে বিশজন মাদ্রাসাছাত্র এসে কোরান খতম দেয়। মিলাদ, কবর জিয়ারত ও দোয়া-খায়েরে শরিক হয় গাঁয়ের বয়স্ক সব পুরুষ মানুষ। ভোজনপর্বে শরিক হয় আরো বেশি সংখ্যক। মড়ার বাড়ির মজলিসি খাওয়া-দাওয়ার ভিড় কোলাহল থেমে যাওয়ার পরও বাড়িটির দিকে গ্রামবাসীর মনোযোগ ও কৌতূহল কমে না। কারণ মরে গিয়ে বুড়ি তার ছেলেমেয়েদের বাড়িতে জড়ো করেছে, তার উদ্দেশ্যটা বেঁচে থাকতেই ছোটবউ-ছেলেকে ঝগড়া করে অনেকবার জানিয়ে রেখেছে, সবাই এলে এবার বিষয়-সম্পত্তির ভাগাভাগি হবে অবশ্যই।
মায়ের মৃত্যুর পর ওয়ারিশদের মধ্যে যে-ঝগড়াটা অনিবার্য ছিল, ভূসম্পত্তি ঘিরে স্বাভাবিক ঝগড়াঝাঁটি দেখার জন্য অপেক্ষায় ছিল যারা, তাদের অনেকটা হতাশ করে দিয়ে বাড়ির অন্দরমহলে ঝগড়াটা শুরু হয় আসলে ভাইবোনের পুনর্মিলনীর আদলে। বড়ভাইয়ের আহবানে মায়ের ঘরে জড়ো হয় সব ভাইবোন। বিছানায় ও চেয়ার টেনে বসে সবাই। পরকালযাত্রার শোক ও মাথায় টুপি রেখেই বিষণ্ণ কণ্ঠে বলে বড়ভাই, ‘মা নাই। কিন্তু আমরা রক্তসম্পর্কের ভাইবোনরা আছি, এই বাড়ি ও পৈতৃক সম্পত্তির ওপর অধিকার আমাদের প্রত্যেকেরই আছে। স্বয়ং আল্লাহ এ-বিষয়ে কোরানে আইন করে দিয়েছে। কিন্তু বাবার মৃত্যুর এক যুগের মধ্যেও আমরা ভাগাভাগির ওপর জোর দেইনি। কারণ মা বেঁচে ছিল এবং ছোট কাফি তেমন লেখাপড়া শিখে চাকরিবাকরি করেনি। তাকে বিয়েও করানো হয়েছে গ্রামের ঘরগেরস্থালি দেখার উপযুক্ত মেয়ে খুঁজে। আমরা চেয়েছি বড়বাড়ির সংসার ও কৃষিকাজ দেখাশোনা করে কাফি নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে নিক। কিন্তু সে দশ বছরে কী করেছে, কমবেশি তোমরা সবাই শুনেছো, গ্রামবাসীও সবাই জানে।’ কাফিই প্রথম উত্তেজিত কণ্ঠে শোকসভায় প্রতিবাদ করে, ‘কী করেছি আমি? তোমাদের ভাগের জমি গিলে খেয়েছি, নাকি নিজের নামে করে নিয়েছি?’
বড়বোন শাসনের গলায় বলে, ‘মা বেঁচে থাকতে তুই আর তোর বউয়ের কীর্তিকলাপের খবর আমাদের জানিয়েছে। এত বছর বাড়ি থেকে যে আয়-উন্নতি হয়েছে, তার ভাগ কি তুই আমাদের দিয়েছিস?’
কাফির সব যুক্তি তো জমাট ক্ষোভ হয়ে ছিল, বিস্ফোরণ ঘটলে তা আর থামতে চায় না, ‘আমি চাকরের মতো তোমাদের বাড়িসম্পত্তি পাহারা দিয়েছি। বড়বাড়ির চাষাড়ি কাজ করাতে আমাকে গ্রামের মেয়েকে বিয়ে করিয়েছো, আমার বউ দাসিবাঁদির মতো খেটেছে। মা আমার সংসারেই ছিল দশ বছর, কিন্তু তোমাদের সবার এতো সচ্ছল অবস্থা, আমার জন্য কি কেউ এক কানাকড়ি দিয়ে সাহায্য করেছো? বরং আমি যাতে মানুষ হতে না পারি, এজমালি জায়গাজমিতে সারাজীবন খেটে মরি, সেটাই চেয়েছো সবাই।’
এক ভাই জানতে চায়, ‘মানুষ হওয়া মানে কি মোটরসাইকেল দাবড়ে প্রতিদিন শহরে যাওয়া, ব্যবসায়ের নামে বদনেশা করে টাকা অপচয় করা? রোজ কী করিস তুই টাউনে গিয়ে?’
মেজোভাই জানতে চায়, ‘সংসারের কৃষিকাজ থেকে যে-আয় হয়েছে, তার ভাগ কেউ চায়নি, চাইবেও না। কিন্তু ভাগাভাগির আগে তুই বহু জমি বন্ধক রেখে কেউ বলে বিশ লাখ, কেউ বলে ত্রিশ লাখ, এতো টাকা নিয়ে টাউনে কী ব্যবসা ফেঁদেছিস? ব্যবসা করবি ভালো কথা, কিন্তু বন্ধক খুলবে কে?’
কাফি সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়, ‘সময়মতো আমি খুলে দেব। ভাগাভাগি করে দাও, আমার ভাগ বেচে দিয়ে বউ নিয়ে শহরে আলাদা বাসা করে স্থায়ীভাবে থাকব আমি। তোমাদের বারোয়ারি সম্পত্তি পাহারা দেওয়া আমার কাজ না। তোমরা যেভাবে ভাগাভাগি করো আমার আপত্তি নেই। আমি এখন চলি, চারদিন আমার ব্যবসা দেখিনি, জরুরি ফোন এসেছে, আমাকে এখনই যেতে হবে।’
বড়দের অনুমতির তোয়াক্কা না করে কাফিই প্রথম সভাস্থল ত্যাগ করে। উঠানে নেমেই মোটরসাইকেল স্টার্ট দেয় সে, একাধিক ভাইবোনের ধমক ও স্নেহমেশানো হাঁকডাকও তাকে আর ফেরাতে পারে না। কাফির মোটরসাইকেলের গর্জন মিলিয়ে যাওয়ার পরও বড়বাড়ির পারিবারিক সভার উত্তাপ-উত্তেজনা থেমে যায় না। বড়ভাইদের অনুপস্থিতিতে কাফি রক্ষক হয়ে শুধু ভক্ষক নয়, দুর্বৃত্ত-দস্যুর মতো আচরণ করেছে, তার প্রমাণ দিতে থাকে। মাকে কীরকম মানসিক কষ্ট দিয়েছে, সে-কথাও জোর গলায় বলে কেউ কেউ। কিন্তু কাফির বউ রহিমা কী ভূমিকা রেখেছে?
কাফিকে না পেয়ে তার স্ত্রী তথা রুম্মানের মা তথা রহিমাকেই ডাকে সবাই।
শাশুড়ির দাফন হওয়ার পরও বাড়িতে মেহমান হয়ে আসা স্বামীর ভাইবোনদের সেবায় এতটা ব্যস্ত যে, রহিমা দম ফেলারও সময় পায় না। ঘরে সভা বসলে রান্নাঘরে সবার জন্য চা করছিল সে। জামেনার কাছে সেই দায়িত্ব হস্তান্তর করে ভাসুর-ননদের ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য মাথায় ঘোমটা টেনে ঘরে আসে এবং দাঁড়িয়েই থাকে।
বড়ভাইয়েরা তার কাছে জানতে চায়, কত জমি বন্ধক রেখেছে কাফি? কীভাবে ল-ভ- করেছে সংসার? রহিমা কি জানত না? স্বামীকে শাসন করার চেষ্টা করেনি? শহরে কিসের দোকান দিয়েছে? কী ব্যবসা করে? অনেকে বলেছে টাউনে যায়, সেখানে নাকি আরেকটা বিয়ে করেছে সে?
ভাসুর-ননদের নানারকম প্রশ্নের মুখে রহিমা নতমুখে একই জবাব দেয়, ‘আমি কিছুই জানি না। আমাকে তো টাউনে নিয়ে গিয়ে কিছুই দেখায়নি।’
বড়ভাই এবার সিদ্ধান্ত জানায়, ‘আমি মাকেও কথা দিয়েছিলাম, রিটায়ার করার পর বাড়িতেই পাকাপোক্ত থাকব। আর মোটে বছরখানেক বাকি। রফিকও রিটায়ারমেন্টের পর বাড়িতেই বেশিরভাগ সময় থাকবে বলছে। এবারে তো সম্ভব হবে না, তোমরা একটা ডেট ঠিক করে আসো, যার যেটা পাওনা, শান্তিপূর্ণ এবং আইনসংগতভাবে বাটোয়ারা করে দেব আমি। এলাকার চেয়ারম্যান, গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং উকিল সবাইকে ডাকব। ভাগের পর তোমরা যদি কেউ নিজেদের ভাগ কাফিলকে দিয়ে যেতে চাও, আমার কোনো আপত্তি নেই।’
এক বোন প্রতিবাদ করে, ‘ওকে দেবো কেন? এ-বাড়িতে আমাদের অধিকার নেই, আমাদের ভবিষ্যৎ নেই?’
রহিমা ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য বলে, ‘আমি আপনাদের জন্য চা করছি, নিয়ে আসি।’
-----চার-----
মায়ের পারলৌকিক শান্তি এবং নিজেদের ইহকালীন স্বার্থ রক্ষায় ভাগবাটোয়ারার বিষয়টা পাকা করে ওয়ারিশগণ একে একে চলে যায়। বড়বাড়ি হঠাৎ বেশ ফাঁকা এবং অচেনা লাগে রহিমার কাছে। আগে দিনভর শাশুড়ির খ্যানখ্যানে গলা ও লাঠি-ঠুকঠুক মাতবরি অসহ্য লাগত, এখন তার বদলে নানারকম ভুতুড়ে ভয়। শাশুড়ি মরলে রহিমা বড়বাড়ির মালিক হবে বলেছিল যারা, তারা এখন সাজাপ্রাপ্ত আসামির মতো রহিমাকে দেখে মজা পায়। ওয়ারিশরাই ব্যবস্থা করে গেছে, মৃতা মায়ের ঘরবাড়ি পাহারা দিয়ে রাখবে জামেনাও। জামেনা তার মেয়েকে নিয়ে রাতে এখন বড়বাড়িতে থাকে। এছাড়া যে বাঁধা কামলা করমালি চাষাড়ি কাজকাম তত্ত্বাবধান করে, সেও যেন বড়বাড়ির মালিক হয়ে উঠেছে একজন। জোরগলায় হাসিমুখে রহিমাকে স্মরণ করিয়ে দেয়, ‘ও ছোটভাবি, বড়ভাই অর্ডার দিছে, ভাগাভাগির পর তার ভাগের জমি হামাকেই দেখাশুনা করা লাগবে। মেজোভাই তার ভাগ আধি দেবে মনে হয় হাকিমুদ্দিকে। আর তোমার জন তো টাউনে বাসা করার কথা ডিক্লেয়ার দিছে। আমি এখন কোন দিকে যাই, কন দেখি কী জ্বালা!’
এসব জ্বালার কথা বলার সময় করমালির মুখে হাসি ধরে না। শাশুড়ি মরতে না মরতেই শহরে রহিমার সতিনের সংসার কল্পনা করে কিংবা বড়বাড়িতে তার আসন্ন ফকিরনি দশা জানতেও সম্ভবত, লোকজন তাকে নানা কথা জিজ্ঞেস করে। রহিমা কোনো জবাব দেয় না। বিয়ের আগে থেকেই জানত সে, ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগাভাগি হলে বড়বাড়ি একদিন ছিন্নভিন্ন হবেই। এ শুধু হিংসুক গ্রামবাসীর কামনা নয়, শাশুড়িও রহিমাকে প্রায় রোজই বোঝানোর চেষ্টা করে গেছে।
রহিমাও তো গাঁয়ের গেরস্তঘরের মেয়ে, জমির মায়া যে কী সাংঘাতিক জিনিস, নিজের বাপ-চাচার ঝগড়া দেখে ছোটবেলাতেই বুঝে গেছে। সেই বাবা মেয়েকে বড়বাড়ির বউ করে পাঠানোর সময় বেকার ও নেশাখোর জামাইকেও মেনে নিয়েছিল তাদের বিস্তর জায়গাজমি দেখেই। ভাইয়েরা সবাই দেশ-বিদেশে চাকরি করে, বাড়ির আবাদি ফসলের ভাগ নেওয়া দূরে থাক, নিজেদের জমিটাও পর্যন্ত চেনে না। বাড়ির কৃষি থেকে ম্যালা আয় হয় বলেই ছোটছেলে চাকরিতে ঢোকেনি। এই সুযোগে রহিমা যদি নিজের সংসার গুছিয়ে নিতে পারে, ভবিষ্যতে কোনো অভাব থাকবে না তার। বিয়ের পর থেকে রহিমা সেই চেষ্টাই করে গেছে। শহরবাসী ভাসুর-ননদের মতো নিজেও শহরে ঝামেলামুক্ত সংসার গড়ে ছেলেকে মানুষ করার স্বপ্ন দেখেছে। স্বপ্নপূরণের পথে শাশুড়ি ছিল বড় বাধা, শাশুড়ি মরে যেতে না যেতেই অচেনা সতিন মস্ত বাধা হয়ে উঠবে কল্পনাও করেনি সে।
বাড়ি ফাঁকা হওয়ার পরও কাফি ব্যবসায়ের কাজের দোহাই দিয়ে টানা তিনদিন বাড়িতে ফেরেনি। ফোনে রহিমাকে জানিয়েছিল ব্যবসায়ের কাজে ঢাকায় যাবে। ভাগ নিয়ে বড়ভাইয়ের সঙ্গেও প্রাইভেট কথা বলবে। মা বেঁচে থাকতেও অনেকদিন রাতে বাড়িতে ফিরত না সে। মাত্র এক ঘণ্টায় মোটরসাইকেল হাঁকিয়ে বাড়ি ফেরা যায়, কিন্তু তারপরও কী এমন কাজের ব্যস্ততা যে রাতেও স্ত্রী-সন্তানের কাছে ফেরার গরজ থাকে না। সন্দেহ অবশ্য আগেও জেগেছিল, রাতে বাড়িতে ফিরলেও স্বামীর ভালোবাসার উত্তাপ খুঁজে পায়নি। তারপরও শহরে নিজের সংসার গুছিয়ে নেওয়ার স্বপ্নটা আঁকড়ে রেখেছিল রহিমা। কাফি ভাইদের কাছে শহরে বাসা নিয়ে থাকার ঘোষণা দিলে স্বপ্নপূরণের আশাও জেগেছিল।
তিনদিন পর রাতে বাড়িতে ফেরে কাফি। দমবন্ধ অবস্থায় অপেক্ষা করে রহিমা। স্বামীকে রাতের খাবার দিয়ে সরাসরি কথা তোলে, ‘আম্মাজানের মৃত্যুর পর এ-বাড়িতে দম বন্ধ হয়ে আসে আমার। রুম্মানকে টাউনের স্কুলে ভর্তি করাতে হবে। তুমি এ-মাসেই আমাদের নিয়ে টাউনের বাসায় উঠবে।’
যুদ্ধ করার জন্য কাফির প্রস্ত্ততি তো দীর্ঘদিনের, জবাব দেয় সে, ‘আমার রক্তসম্পর্কের শত্রুরা, গ্রামের হিংসুক শয়তানরা তোমাকে জানায় নাই, টাউনে আর একটা বিয়া করব আমি?’
‘আমি বিশ্বাস করি নাই।’
‘অবিশ্বাস করার কী আছে? আমার বাপ ও দাদারও ছিল দুই পরিবার। মুসলমানের ছেলে আমি, চারটা না হোক, প্রয়োজনে দুই বউ রাখা আমার আইনি অধিকার। বড়বাড়ির গেরস্থালি কাম সামলানোর জন্য তুমি এ-বাড়িতে এসেছ, তুমি সেই কাজই করবে।’
খাওয়ার পর সিগারেট ধরিয়ে কাফি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও সান্তবনা দেয়, ‘ভাগাভাগির পর রুম্মানকে নিয়ে এ-বাড়িতেই থাকবে তুমি। এ-বাড়ির গেরস্তি কামকাজ করলে ভাতের অভাব হবে না তোমার।’
বুড়ি শাশুড়ি মরে যাওয়ার পর রহিমা কেঁদে মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে গ্রামের মানুষ জড়ো করেছিল, কিন্তু নিজের জীবনের এমন সর্বনাশা ঘটনার মুখেও টুঁ-শব্দটি করতে পারে না আজ। মনে হয় স্বামী সর্বশক্তি দিয়ে তার মুখ চেপে ধরেছে দমবন্ধ করে মারার জন্য।
বউকে সারারাত নির্ঘুম, পাথরের মতো স্তব্ধ এবং একা রেখে, সকালে মোটরসাইকেল হাঁকিয়ে কাফি বাড়ি ছেড়ে চলে যায়।
বাপের মতো ছেলে রুম্মানও যথারীতি খেলার নেশায় বাড়ির বাইরে ছুটে বেড়ায় দিনমান। বাড়িতে একা হয়েও কোনো কাজেই মন বসে না রহিমার। বিয়ের পর থেকে কাজই তো করে গেছে রহিমা। নিজের হবে না জেনেও বাড়ির উঠান ঘরদুয়ার ঝাঁট দিয়েছে। শাশুড়ির সেবাযত্ন ছাড়াও তার চৌদ্দগোষ্ঠীকে রান্নাবাড়া করে খাইয়েছে। গোলায় ধান তোলা, ধান উঠানো, রোদে শুকানো এবং ভিটায় মাচান বেঁধে এন্তার লাউ-শিম-কুমড়া ফলানো – এসব করে চাষিবাপের নাম ফাটিয়েছে। পোষা গাইটি ও মুরগিগুলোর তত্ত্বতালাশ করেছে। এতো কাজের পরও এ-সংসারে স্বামীর প্রাপ্য গালমন্দ মুখ বুজে হজম করেছে নিজের সুখের সংসার হওয়ার স্বপ্ন দেখে। মা মরলেই আলাদা হয়ে শহরের বাসায় ভালো চলবে তাদের, স্বামীও আশ্বাস দিয়েছিল এরকম।
শাশুড়ির মৃত্যুতে বাড়িতে লোকদেখানো এত কান্নাকাটির পরও, শাশুড়ির কথা ভেবে রহিমার সত্যি কান্না পায় আজ। বেঁচে থাকলে ছেলের দ্বিতীয় বিয়ের কথা শুনলে বুড়ি আজ রহিমার পক্ষে থাকত অবশ্যই। ছেলেবউয়ের সঙ্গে যতই খ্যাচম্যাচ করুক, চোখের সামনে একমাত্র নাতি রুম্মান ছিল বলে তার ওপর টানটাও ছিল বেশি বুড়ির। রুম্মান দাদির হাতের লাঠি নিয়েও খেলত। মরার দুদিন আগেও খেলার জন্য দাদিকে কানা বুড়ি সাজিয়েছিল। অন্ধ সেজে বুড়ি লাঠি ধরলে, অন্য প্রান্ত ধরে রুম্মান উঠানে ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা চেয়েছিল, ‘কানা ফকিরকে ভিক্ষা দেন মা-সকল।’ এই দৃশ্য দেখে হাসি লুকাতে রান্নাঘরে ছুটে গিয়েছিল রহিমা। সেই হাসির কথা স্মরণ করেও আজ চোখের জল ফেলে। শহরে ব্যবসা করার নামে কাফি পিরিতের সংসার ফেঁদেছে জানলে লম্পট ছেলেকে বাড়িছাড়া করে, বুড়ি নিশ্চয় ছোটছেলের প্রাপ্য ভাগের জমি ছোটবউ ও নাতির নামে দেওয়ার সুপারিশ করত বড়ছেলেদের কাছে। করত নাকি?
রহিমা এখন শাশুড়ির ফোনটা থেকে ভাসুর-ননদকে কল দিয়ে জরুরি কথা বলতে চাইলে, শুনবে তারা। কিন্তু তাতে লাভ কী হবে? প্রতারক ভাইয়ের বদমায়েশি ও শহরে ব্যবসায়ের নামে দ্বিতীয় সংসার ফাঁদার খবরটা তারা রহিমার আগেই জেনেছে। কৃষক পরিবারের মেয়ে হয়েও স্বামীকে কৃষিকাজে ধরে রাখতে পারেনি রহিমা, উলটো নিজেও শহরে সংসার ফাঁদার স্বপ্ন দেখেছে। ব্যবসায়ের পুঁজি জোগাড়ে স্বামীকে এজমালি জমি বন্ধক রাখতে এবং গোলার ধান ও ভিটার গাছপালা বেচতেও উৎসাহ দিয়েছে। যার জন্য এত করেছে রহিমা, সে-ই হয়তো ভাইদের কাছে ছোটলোক বউয়ের হাজারটা গিবত গেয়ে দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতিও জোগাড় করেছে ভাইদের কাছে। রহিমা বিয়ের পর শহরে এক ননদের বাসায় বেড়াতে গেলে সে তার কাজের বুয়ার কাছে পরিচয় দিয়েছিল, আমাদের গ্রামের বাড়ির সব কাজ এই মেয়ে একাই সামলায়। তার মানে কী? রহিমাও তাদের কাছে তুচ্ছ কাজের লোক ছাড়া আর কিছু নয়। তারপরও বড় ননদের কাছে ফোন করে শাশুড়িবিহীন বাড়িতে একা হওয়ার কান্না নিয়ে স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের খবরটা জানায় রহিমা। ননদ সহানুভূতি দেখাবে কী, উলটো রহিমাকেই ধমক দিয়ে বলে, ‘কেমন মেয়ে রে তুই, স্বামী শহরে ফষ্টিনষ্টি করে বেড়ায়, আর তুই এতদিন মুখ বুজে ছিলি! থাক, তুই বড়বাড়ির কাজকর্ম নিয়েই থাক।’ ননদের কথার প্রতিবাদে এই মুহূর্তেই এ-বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে বাপের বাড়ি চলে যাওয়ার কথা ভাবে রহিমা। কিন্তু গরিব বাপ জমি বেচে বড়ঘরের জামাইকে মোটরসাইকেল যৌতুক দিয়েছিল। সংসার-ভাঙা মেয়েকে চিরদিনের জন্য আশ্রয় দেওয়ার সংগতি নেই তার। রহিমার ভাইয়েরাও বলে দিয়েছে, ভাগাভাগিতে পৈতৃক জমির কড়াক্রান্তিও পাবে না সে। না, বাপের বাড়িতে ফিরবে না রহিমা। তারচেয়ে বিষ খেয়েই বড়বাড়ির সঙ্গে সকল সম্পর্ক ঘুচাবে। রহিমার আপন খালাতো বোন প্রেমিককে বিয়ে করতে না পেরে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছে। বড়বাড়ির কৃষিতেও কীটনাশকের ব্যবহার দেখলে কথাটা মনে পড়ত রহিমার। নিজে লাউ-শিমের মাচায় স্প্রে করার জন্য করমালিকে দিয়ে বাজার থেকে কীটনাশক কিনে আনিয়ে ছিল, সেই বিষ দেখেও মনে পড়েছিল আত্মঘাতী বোনটির কথা। তাই বলে নিজে তার অনুগামী হওয়ার কথা বিয়ের আগে বা পরে কোনোদিন ভাবেনি রহিমা। নির্দোষ বোনের আত্মহত্যার জন্য দায়ী প্রেমিক ছেলেটির কোনো শাস্তি হয়নি, বউ-বাচ্চা নিয়ে সুখে সংসার করছে এখন। রহিমাও বিষ খেয়ে মরলে দ্বিতীয় বউ নিয়ে স্বামীর সুখের সংসার আরো নিষ্কণ্টক হবে। বিষ হাতে নিয়েও রহিমা মোটরসাইকেলের পেছনে বসা কল্পিত যুবতীকে স্বামীর আলিঙ্গনে সুখের হাসি হাসতে দেখে। সতিনের সুখ দেখে রহিমা যদি আজই মরে, তার অনাথ সন্তান কোথায় ঘুরে বেড়াবে? আপাতত বিষ রেখে রুম্মানকে খোঁজার জন্য রহিমা বাড়ির বাইরে বেরোয়।
নিজের মৃত্যুকামনা নিয়ে রহিমা অ্যাক্সিডেন্টে স্বামীর মৃত্যুর কথাও ভাবে। মোটরসাইকেল চালাতে গিয়ে একদিন মারাত্মক অ্যাক্সিডেন্টের হাত থেকে অল্পের জন্য বেঁচে গেছে সে। আবারো যদি সেরকম কোনো দুর্ঘটনায় মুহূর্তেই তাকে দুনিয়া থেকে তুলে নেয় দয়াময় আল্লাহ, স্বামীশোকে এক ফোঁটাও চোখের জল ফেলবে না রহিমা। স্বামী মরলেই বরং বড়বাড়িতে পৈতৃক সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে রুম্মান এবং স্ত্রী হিসেবে রহিমাও পাবে দুই আনা অংশ। স্বামীর ভাগ পেলে বড়বাড়িতেও নিজের আলাদা সংসার এবং পিতৃহারা ছেলের ভবিষ্যৎ গুছিয়ে দিতে পারবে সে একাই। বিধবা শাশুড়ি যেমন বড়বাড়িকে একান্ত নিজের ভেবে দেখেশুনে রেখেছে আজীবন, নিজে বিধবা হলে রহিমাও স্বামীর সম্পদ আরো ভালোভাবেই রক্ষা করতে পারবে। কিন্তু স্বামী বেঁচে থাকলে নিজের ভাগ বেচে দিয়ে শহরে সতিনের সংসারে ঢালবে অবশ্যই। তালাক দিয়ে রহিমাকে বড়বাড়ি থেকে বের করে দিতে এক মিনিটও সময় লাগবে না তার। তখন কোথায় যাবে রহিমা? অসহায় এক নারীকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য আল্লাহ যদি নেশাখোর দুশ্চরিত্র এক পুরুষকে দুনিয়া থেকে তুলে নেয়, সেটা কি অবিচার হবে? সুবিচার পাওয়ার জন্য রহিমা গোপনে চোখের জলের সঙ্গে আল্লাহর কাছে জরুরি আবেদন-নিবেদন জানাতেই থাকে।
মরা-বাঁচার সংকটে তার স্বামী অপ্রত্যাশিতভাবে ঘুমানোর সময়ে রাতে বাড়িতে ফেরে আজ। বাড়িতে এসেও অকারণে মোটরসাইকেলের হর্ন বাজায়। সাধারণত বাড়িতে ফিরলে এরকম রাতেই ফেরে সে, কিন্তু আসবে না মনে করে রহিমা তার জন্য ভাত রাখেনি। কী মনে করে কে জানে ছেলের জন্য আজ একটা খেলনা কার এনেছে কাফি। খেলনা কার পেয়ে রুম্মান মহাখুশি, ঘুমানো স্থগিত রেখে বিছানাতেও কার চালায়। আর রহিমাকে ধমকের গলায় হুকুম দেয় কাফি, ‘ভাত দে। খিদে লেগেছে।’
রহিমা বিছানা থেকে উঠে রান্নাঘরে যায়। আধঘণ্টার মধ্যে ফ্রিজের তরকারি ও ভাত গরম করে খাবার টেবিলে সাজিয়ে দেয়। স্বামীর সঙ্গে কথা বলা দূরে থাক, তার দিকে একবারও না তাকিয়ে বিছানায় ছেলের পাশে গিয়ে শোয় আবার। মানুষটা খাচ্ছে খাক, রহিমা ঘুমন্ত ছেলের পাশে মৃতা শাশুড়ির মতো অসাড় পড়ে থাকে।
আরো আধঘণ্টা পরে স্বামীর বিকৃত কণ্ঠের চিৎকার শুনে বিছানায় উঠে বসতে বাধ্য হয় রহিমা। যন্ত্রণাবিকৃত গলায় চেঁচিয়ে বলছে মানুষটা, ‘হারামজাদি খাবারের মধ্যে বিষ মিশায় দিছিস নাকি? আমার এতো বুক জ্বলে কেন? এতো পেট জ্বলে কেন?’
আকস্মিক দুর্ঘটনায় পড়ার মতো স্বামী ফোনটা হাতে নিয়ে যন্ত্রণায় মৃত মাকে ডেকে বিছানায় গড়াগড়ি দিতে থাকলে রহিমা ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে চেঁচিয়ে এবার আল্লাহকেই ডাকে, ‘হায় আল্লা! রুম্মানের আববার কী হইল? টাউন থাকি কী বিষ খায়া আসছে আজ? বিছানায় গড়াগড়ি দেয় ক্যানে? ও জামেনা, ও উমেদভাই, আমার কপালে ফের কী আগুন লাগল!’
মধ্যরাতে বড়বাড়িতে নারীকণ্ঠের চিৎকার শুনে একজন-দুজন করে প্রতিবেশী ছুটে আসতে থাকে। পাড়ার দোকানে টিভি দেখছিল যারা, তাদের কয়েকজনও টিভি দেখা বাদ দিয়ে ছুটে আসে বড়বাড়িতে। অসুস্থ কাফির আর তখন কথা বলারও শক্তি নেয়, দাঁতে দাঁত চেপে শারীরিক যন্ত্রণা হজম করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে উঠানে গলা ছেড়ে কাঁদতে শুরু করেছে রহিমা।
কান্না কোলাহলের মাঝেই ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ছুটে আসে একটি অ্যাম্বুলেন্স। অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে আসার জন্য কাফিই তার এক বন্ধুকে ফোন করেছিল। কাফিকে স্ট্রেচারে তুলে অ্যাম্বুলেন্সে ওঠানো হয়। এদিকে আঙিনায় গড়াগড়ি দিতে থাকা রহিমার কান্নার আওয়াজ তীব্রতর হয়ে ওঠে। রাতের আঁধার চিরে ছুটে যাওয়ার সময় অ্যাম্বুলেন্সখানা লাল আলো চটকে আর পোঁ-পোঁ সাইরেন বাজিয়ে কার মরণ কামনা করে, রহিমা বুঝতেও পারে না।
Subscribe to:
Posts (Atom)
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (2388)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
Recent Comments
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
প্রথম আলো
আন্তর্জাতিক
মানবজমিন
আলোচনা
কালের কণ্ঠ
উপ-সম্পাদকীয়
যুগান্তর
প্রথম পাতা
মতামত
জাতীয়
সমকাল
নয়া দিগন্ত
রাজনীতি
জনকণ্ঠ
সুশীল কথন
ভারত
অর্থনীতি
বিনোদন
শেষের পাতা
ক্রিকেট খেলা
মধ্যপ্রাচ্য
যুক্তরাষ্ট্র
দেশে দেশে
নির্বাচন
স্পেশাল প্রতিবেদন
প্রথম আলো
খেলা
খোলা কলম
আমার দেশ
আইন আদালত ও বিচার
ইসরায়েল
ফুটবল খেলা
বাংলানিউজ
মুক্তধারা
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা
ফিলিস্তিন
Lead
রাজধানী
আন্দোলন
অপরাধ
এক্সক্লুসিভ
ইরান
আইন ও মানবাধিকার
নারী
শিক্ষা
বিএনপি
সারা বিশ্ব
ক্রিকেট
সাহিত্য
কালবেলা
পাকিস্তান
মুক্তমঞ্চ
আওয়ামী লীগ
বাংলা ট্রিবিউন
শিশু
দুর্নীতি
সারা দেশ
চট্টগ্রাম
বিশাল বাংলা
ব্রেকিং নিউজ
সাউথ এশিয়ান মনিটর
সিলেট
ক্রীড়া
পার্সটুডে
অর্থ
খালেদা জিয়া
অর্থ ও বাণিজ্য
শিল্প বাণিজ্য
চীন
বিবিসি বাংলা
কাশ্মীর
চতুরঙ্গ
খবরাখবর
প্রধানমন্ত্রী
বিশ্ব
হত্যা
নতুন বার্তা
ধর্ম
মুসলিম
যুক্তরাজ্য
স্মরণ
গল্প
রাশিয়া
শিক্ষাঙ্গন
শেখ হাসিনা
জাতিসংঘ
ফুটবল
বার্তা২৪ ডটনেট
রস+আলো
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
সাক্ষাৎকার
মুক্তিযুদ্ধ
ইউরোপ
সৌদি আরব
মিডিয়া
হরতাল-অবরোধ
খেলা ধুলা
ইতিহাস
ছাত্রলীগ
প্রতিবেদন
জামায়াতে ইসলামী
সোহরাব হাসান
অমানবিক
পশ্চিমবঙ্গ
আলোকিত চট্টগ্রাম
আইন
চাষাবাদ- কৃষি ও কৃষক
ফিচার
ভ্রমণ
মিজানুর রহমান খান
ওয়েছ খছরু
খোলা চোখে
বাংলাদেশ-ভারত
ইসলাম ও সমাজ
সিরিয়া
যৌন নির্যাতন
নারায়ণগঞ্জ
জাতীয় সংসদ
নারী ধর্ষণ
আনন্দ
বিজ্ঞান ও গবেষণা
আফ্রিকা
খেলাধুলা
ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ
মাদক
সন্ত্রাস
আনিসুল হক
সংখ্যালঘু
যৌন আবেদনময়ী
তুরস্ক
প্রবাস
ছুটির দিনে
মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান
সৈয়দ আবুল মকসুদ
নকশা
আফগানিস্তান
বিজ্ঞান প্রজন্ম ও কম্পিউটার
গোল্লাছুট
বইপত্র
অন্য আলো
ড. মুহাম্মদ ইউনূস
ছবি
প্রতারণা
ইউক্রেন
টাইমস্ আই বেঙ্গলী
প্রকৃতি
তরুণ প্রজন্ম
ব্যবসা বাণিজ্য
দুর্ঘটনা
অপহরণ
সাহিত্যালোচনা
গার্মেন্টস শিল্প শ্রমিক
স্বাস্থ্য
জাতীয় পার্টি
রাজশাহী
স্টেডিয়াম
দীন ইসলাম
মানবাধিকার
Exclusive
ফূটবল খেলা
রোহিঙ্গা
হিন্দু
মিজানুর রহমান
মশিউল আলম
আইন ও বিচার
আলী যাকের
ইয়েমেন
রুদ্র মিজান
খুলনা
মানবকণ্ঠ
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ
আব্দুল কাইয়ুম
নেপাল
মালয়েশিয়া
তারেক শামসুর রেহমান
আসিফ নজরুল
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
সাজেদুল হক
ফারুক ওয়াসিফ
কাফি কামাল
মৌলভীবাজার
হাসান ফেরদৌস
আনন্দ কণ্ঠ
তৃতীয় পাতা
যাপিত জীবন
জ্যোতির্বিজ্ঞান
সড়ক দুর্ঘটনা
আলী রীয়াজ
ক্রিখেট খেলা
ফুটবল খলা
বদরুদ্দীন উমর
মরিয়ম চম্পা
রংপুর
শিল্প ও সাহিত্য
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া
নতুনের জানালা
বৃষ্টি ও বন্যা
মোস্তফা কামাল
কক্সবাজার
এ এম এম শওকত আলী
ঢাকা
বন্ধুসভা
মিয়ানমার
সংবিধান ও রাষ্ট্র
বগুড়া
ফ্রান্স
ঈদ বিশেষ সংখ্যা
গবেষণা
মিসর
জীবনযাপন
বাংলাদেশ
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি
অবৈধ-অনিয়ম-কারচুপি
এ কে এম জাকারিয়া
নির্বাচনী কূটনীতি
বদিউল আলম মজুমদার
শোক
এম আবদুল হাফিজ
পরিবেশ
সংস্কৃতি
খবর
বাংলাদেশে
ব্রাহ্মণবাড়িয়া
শুভ্র দেব
অজয় দাশগুপ্ত
প্রজন্ম ডট কম
আবুল কাশেম
আমদানি ও রপ্তানি
কিশোরগঞ্জ
লেবানন
আবদুল মান্নান
কুমিল্লা
জাপান
রঙের মেলা
ঐতিহ্য
শিল্প
মুক্তমত
মাহমুদুর রহমান
রাজনৈতিক আলোচনা
শরিফুল হাসান
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল
পার্বত্য চট্টগ্রাম
ময়মনসিংহ
সংবাদ২৪.নেট
সীমান্ত সন্ত্রাস
ইরাক
আহমদ রফিক
ইফতেখার মাহমুদ
কাজের খবর
স্বপ্ন নিয়ে
টাঙ্গাইল
যশোর
HotTopic
চিকিৎসা
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়
অমর সাহা
আনোয়ার হোসেন
আলী ইমাম মজুমদার
গাজীপুর
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
আবুল মোমেন
থাইল্যান্ড
মুফতি এনায়েতুল্লাহ
শ্রীলঙ্কা
তথ্য প্রযুক্তি
কলকাতা
মেহেদী হাসান
পরিবেশ-জীববৈচিত্র্য
রসালোচনা
কামরুজ্জামান মিলু
বরগুনা
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
আনু মুহাম্মদ
কাজী সোহাগ
স্মৃতিচারণ
কুলদীপ নায়ার
ব্রাজিল
সারাবেলা
অস্ট্রেলিয়া
মারুফ কিবরিয়া
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
অন্য দিগন্ত
মহিউদ্দীন জুয়েল
মসজিদ
মানসুরা হোসাইন
মুনতাসীর মামুন
শিরোনাম
শেখ রোকন
আবু সাঈদ খান
জেল থেকে জেলে
ফেসবুক
মহিউদ্দিন আহমদ
সংবাদ
কবিতা
বিশ্বজিৎ চৌধুরী
আলী হাবিব
প্রকৃতি ও পরিবেশ
শিল্প ও বাণিজ্য
শেষ পাতা
আবু আহমেদ
এম সাখাওয়াত হোসেন
নুরুজ্জামান লাবু
নূর মোহাম্মদ
সুভাষ সাহা
আতাউস সামাদ
আলোচনা মতামত
অর্থনীতি ও বানিজ্য
এবিএম মূসা
বরিশাল
আতাউর রহমান
আসাম
কামাল আহমেদ
পিয়াস সরকার
রংবেরং
রাহীদ এজাজ
রোকনুজ্জামান পিয়াস
শ্রদ্ধাঞ্জলি
আশরাফুল ইসলাম
প্রকৃতি ও বিজ্ঞান
ফেনী
রণজিৎ বিশ্বাস
অরুণ কর্মকার
উত্তর কোরিয়া
মোস্তফা হোসেইন
একরামুল হক
জলবায়ু ও পরিবেশ
আশীষ-উর-রহমান
একরামুল হক শামীম
কালি ও কলম
তুহিন ওয়াদুদ
ইন্দোনেশিয়া
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ
অপরাজিতা
জাগোনিউজ২৪.কম
মইনুল ইসলাম
মানিকগঞ্জ
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
মোশতাক আহমেদ
আশরাফুল হক রাজীব
ফরহাদ মাহমুদ
প্রণব বল
রাজীব আহমেদ
শংকর কুমার দে
সেলিম জাহিদ
আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ
কামরুল হাসান
জনস্বাস্থ্য
পার্থ প্রতীম ভট্টাচার্য্য
শিল্পী
সাময়িকী ফ্যাশন
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
নিবন্ধ
বিদ্যুৎ
মোরসালিন মিজান
রবার্ট ফিস্ক
কুষ্টিয়া
অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য
ঈদ
কাজী সুমন
জাতীয় নাগরিক পার্টি
ঝিলিমিলি
মুস্তাফা জামান আব্বাসী
মনজুরুল হক
মহসীন হাবিব
মাহবুব মোর্শেদ
রফিকুল ইসলাম
শিলালিপি
শুভ রহমান
চৌধুরী মুমতাজ আহমদ
ছিটমহল
jugantor
নোবেল পুরস্কার
পাঠকের মতামত
পাবনা
মোশাররফ বাবলু
উচ্চশিক্ষা
তানভীর সোহেল
মামুন রশীদ
আনন্দ প্রতিদিন
উৎপল রায়
এনামুল হক
কাজল ঘোষ
চারু শিল্প
দিল্লি
নদী দূষণ
নাটোর
নিত্যপণ্য
ফাহিমা আক্তার সুমি
বাংলা নববর্ষ
কাতার
বিজ্ঞান
ভেনেজুয়েলা
শওকত হোসেন
নজরুল ইসলাম
নিউজিল্যান্ড
প্রযুক্তি
পার্থ সারথি দাস
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান
আদিবাসী
গোলাম মর্তুজা
ফরহাদ মজহার
শারমিন নাহার
principalsanaullah
কালের খেয়া
ফখরুল ইসলাম
বাংলাদেশ প্রতিদিন
মুখোমুখি প্রতিদিন
মোহীত উল আলম
রাহাত খান
অমিতোষ পাল
কানাডা
গল্পালোচনা
পানি আগ্রাসন
বিশ্বজিৎ পাল বাবু
মাহবুব তালুকদার
আব্দুল কুদ্দুস
বিদেশ
WikiOpinion
তোফায়েল আহমেদ
তৌহিদা শিরোপা
আলোকিত বাংলাদেশ
কাদের সিদ্দিকী
ড. আবু এন এম ওয়াহিদ
ফারুক মঈনউদ্দীন
মোছাব্বের হোসেন
উৎপল শুভ্র
দিনাজপুর
নোমান মোহাম্মদ
সুদীপ অধিকারী
অরূপ দত্ত
ঝড় ও দুর্যোগ
পাভেল পার্থ
ফরিদপুর
ফিরোজ মান্না
মাসুদ পারভেজ
রোজিনা ইসলাম
শরিফুজ্জামান
শিশির মোড়ল
হামিদ-উজ-জামান মামুন
আকমল হোসেন
আজিজুর রহমান
আরব আমিরাত বা দুবাই
আলম শাইন
তারেক মাহমুদ
দীপংকর চন্দ
পাভেল হায়দার চৌধুরী
ফখরে আলম
মাসুদ রানা
শহিদুল ইসলাম
হুমায়ূন আহমেদ
আবুল হাসনাত
আল আমিন
আসিফ আহমেদ
ইশতিয়াক পারভেজ
জিয়া চৌধুরী
লাতিন আমেরিকা
হারুন হাবীব
অমিত বসু
ওমর ফারুক
জার্মানি
ফজলুল বারী
ফারুক চৌধুরী
মাসুদ মিলাদ
শর্মিলা সিনড্রেলা
শাহাদুজ্জামান
হায়দার আকবর খান রনো
জাবেদ রহিম বিজন
জাহাঙ্গীর আলম
ট্রানজিট
নন্দন
যতীন সরকার
যুবলীগ
সুদান
আরিফুজ্জামান তুহিন
কাজী আনিছ
খাবার
গাজীউল হাসান খান
তারেক রহমান
বাংলার দিগন্ত
মোহাম্মদ কায়কোবাদ
শেখ হাফিজুর রহমান
শৈলী
সাতকানিয়া
কাজী হাফিজ
জোবাইদা নাসরীন
নিয়ামত হোসেন
মাহফুজুর রহমান মানিক
লুৎফর রহমান রনো
ইমরান আলী
এস এম আজাদ
জাহাঙ্গীর শাহ
মাহমুদুর রহমান মান্না
মুশফিকুর রহমান
সাতক্ষীরা
ইকতেদার আহমেদ
উৎসব
ঝিনাইদহ
মাসুদা ভাট্টি
মোকারম হোসেন
শেখ সাবিহা আলম
সিরাজগঞ্জ
সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ
হারুন আল রশীদ
WikiEducation
উজ্জ্বল মেহেদী
কনকচাঁপা
ড. মাহফুজ পারভেজ
পরিতোষ পাল
ব্যবসা
মিঠুন চৌধুরী
শাহদীন মালিক
হায়দার আলী
আহমেদ জামাল
ইমদাদুল হক মিলন
নওগাঁ
পোশাকশিল্প
বাতায়ন
আবু সালেহ আকন
ইসলাম
এমাজউদ্দীন আহমদ
টিপু সুলতান
ড. মাহবুব উল্লাহ্
ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী
শোকাবহ ১৫ ও ২১ আগস্ট
WikiInternational
এবনে গোলাম সামাদ
দক্ষিণ কোরিয়া
পারভেজ খান
ফজলুল আলম
ফরিদা আখতার
বিভাষ বাড়ৈ
মাহমুদুজ্জামান বাবু
মুনির হাসান
মোশতাক আহমদ
লিবিয়া
সুনামগঞ্জ
আপেল মাহমুদ
জহির উদ্দিন বাবর
নোয়াখালী
রিপন আনসারী
শরীফুল ইসলাম
সুব্রত আচার্য্য
উপন্যাস
কাল স্রোত
ক্রীড়া দিগন্ত
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ
গাজীউল হক
জাহীদ রেজা নূর
শাহনেওয়াজ বিপ্লব
সাইদুজ্জামান
সাময়িকী
অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী
অনন্যা আশরাফ
অনিকা ফারজানা
আদিত্য আরাফাত
ইফতেখার আহমেদ টিপু
কামাল লোহানী
ড. সা'দত হুসাইন
তামান্না ইসলাম অলি
ফারজানা লাবনী
ফারুক যোশী
মনজুর আহমেদ
রিয়েল-টাইম নিউজ
আসজাদুল কিবরিয়া
কাক ছোট গল্প
ছিনতাই
জলবায়ু
বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বাপন
মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
রশিদ মামুন
লক্ষ্মীপুর
সম্পাদকীয়
সাইফুদ্দীন চৌধুরী
সুমন বর্মণ
BBC
ইমরান রহমান
ইলিরা দেওয়ান
উইঘুর মুসলিম
এম শাহজাহান
নওশাদ জামিল
নুরুন্নবী চৌধুরী
প্রতীক ওমর
বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
বিকাশ দত্ত
মনিরুজ্জামান
মহিউদ্দিন আহমেদ
জোহরান মামদানি
দৈনিক ইত্তেফাক
পিটার কাস্টার্স
পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রিয় চট্রগ্রাম
বাজেট
বাণিজ্য
মহাকাশচারী
মোবাশ্বির আলম মজুমদার
সঞ্জয় সাহা পিয়াল
হবিগঞ্জ
Hot Topic
খুন
টাকা আনা পাই
মাহবুবুর রহমান
শুভজ্যোতি ঘোষ
হাছান কুতুবী
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
Fantastic
আবিষ্কার
ড. কামাল
দৈনিক ইনকিলাব
ফিলিপাইন
ভুটান
ইতালি
নিয়ন আলোয়
সাভার
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ
গ্রিনল্যান্ড
শফিক রহমান
শামীমুল হক
শেয়ারবাজার
আইন আদালত
নারী নির্যাতন
পটুয়াখালী
ফরিদ উদ্দিন আহমেদ
মণিপুর
মাগুরা
মেক্সিকো
অনিম আরাফাত
কিরণ শেখ
জাভেদ ইকবাল
দুদক
রাঙ্গামাটি
Art Mag
আরিফুল ইসলাম
ইহুদি
প্রতিবাদ
প্রবাসী বাঙালি
বান্দরবান
মালদ্বীপ
শফিকুল ইসলাম
শিক্ষানীতি
সংবিধান
কিশোর আলো
ডিডাব্লিউ
নরসিংদী
শরিফ রুবেল
কূটনীতি
গাইবান্ধা
জলবায়ু পরিবর্তন
ঝালকাঠি
নাইজেরিয়া
বায়ুদূষণ
যৌন অপরাধ
শাহনাজ পারভীন
স্বাধীনতা
WikiCity
WikiPolitics
বৌদ্ধ
মতিউর রহমান চৌধুরী
WikiInterview
আকবর হোসেন
ইসলামী ছাত্রশিবির
দৈনিক সংগ্রাম
Exclusive Articles
WikiEconomy
WikiLaw
ঘূর্ণিঝড়-হারিকেন
চুয়াডাঙ্গা
বাগেরহাট
ভূমিকম্প
রাজনৈতিক
সমিতির খবর
সানজানা চৌধুরী
সায়েদুল ইসলাম
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল
আমাদের সময় ডট কম
কুতুবদিয়া স্পেশাল
খাগড়াছড়ি
গণমাধ্যম
ধর্মঘট
স্পেন
আইন ও আদালত
কাদির কল্লোল
খ্রিষ্টধর্ম
তাইওয়ান
দুর্গোৎসব ও পূজা
দৈনিক আমার সংবাদ
নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা 2013.
নূরে আলম সিদ্দিকী
প্রতিক্রিয়া
বিডিআর বিদ্রোহ
ব্যাংক
মুন্সীগঞ্জ
শিশুসাহিত্য
গদ্যকার্টুন
পিরোজপুর
প্রতিদিনের সংবাদ
ভোরের কাগজ
রুমিন ফারহানা
Hit
আর্জেন্টিনা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
বন্যা
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
সরল গরল
Asia
জন্মদিন
ডেনমার্ক
পরামর্শ
প্রকৃত্
ভাষা
ভোলা
MERIT
Soikot
WikiWoman
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
উন্নয়ন
জর্ডান
জ্বালানি
পিলখানা হত্যাকাণ্ড
ফ্যাশন
রঞ্জন বসু
সাংসদ
হরতাল
WikiCrime
উইকিলিকস
ক্রিকেট ও রাজনীতি
গণতন্ত্র
গোপালগঞ্জ
চাঁদপুর
চিত্রকর্ম
ছাত্ররাজনীতি
জঙ্গিবাদ
তিউনিসিয়া
তেল-গ্যাস
দক্ষিণ ধুরুং
দূর পরবাস
নাকিবুল আহসান নিশাদ
নারী অধিকার
নোবেল শান্তি পুরস্কার
পঞ্চগড়
পরীক্ষা
প্রবাসী শ্রমিক
বিজয় দিবস
মেঘালয়
রাঙামাটি
শিশুমৃত্যু
সুশাসনের জন্য নাগরিক
সোমালিয়া
হামলা
আন্দালিব রাশদী
ঈদুল আজহা
এনটিভি
কক্সবাজার নিউজ ডটকম
কলম্বিয়া
কুতুবদিয়া নিউজ
কুয়েত
চট্টগ্রাম বন্দর
চিঠিপত্র
ছাত্র রাজনীতি
ঠাকুরগাঁও
ডিজিটাল বাংলাদেশ
তথ্য অধিকার
দুর্যোগ
দ্বিজেন শর্মা
নির্যাতন
নড়াইল
বেলজিয়াম
ভারতের প্রধানমন্ত্রী
মরক্কো
মৃত্যু
শারদীয় দুর্গোত্সব
শিশুহত্যা
সালমান রাফি শেখ
সুবীর ভৌমিক
সুশাসন
স্মৃতি
হংকং
Africa
My Art
অধিকার
আন্তর্জাতিক নারী দিবস
একুশে টেলিভিশন
ওমান
চাঁপাইনবাবগঞ্জ
চুক্তি
নির্বাচন ও রাজনীতি
নেত্রকোণা
পরিবহন
পর্যটন কেন্দ্র
প্রশাসন
ফ্রান্সিস বুলাতসিঙ্ঘালা
বন্য প্রাণী
বিশ্বকাপ ফুটবল
বড়ঘোপ
ভি এস নাইপল
ভৈরব
মাওবাদী
মামলা
যানজট
লেমশীখালী
সংসদ
সমাজ
সামাজ
সুজন সুপান্থ
সুন্দরবন
সৈয়দ দিদার বখত
Middle East
Principal Sanaullah
Special Day
অগ্নিসংযোগ
অমৃতবাজার পত্রিকা
অরবিন্দ কেজরিওয়াল
আইন ও অধিকার
আগুন ও মৃত্যু
আজকের কাগজ
আল মাহমুদ
আহসান কবির
এম.এ মান্নান
এল সালভাদোর
কমল জোহা খান
কিউবা
খাদ্যসমস্যা
জঙ্গি
জর্দান
জাদুঘর
তথ্য অধিকার আইন
দ্য ডেইলি স্টার বাংলা
নরওয়ে
পানামা
পূর্বপশ্চিম
প্রাণি ও উদ্ভিদ
বঙ্গবন্ধু হত্যা বিচার
বেলুচিস্তান
ভিয়েতনাম
ভোরের ঈদ ১৯
ভয়েস অফ আমেরিকা
যায়যায়দিন
লালমনিরহাট
শিক্ষা অধিকার
শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থা
শিশুশিক্ষা
শেরপুর
শ্রমিক
সন্ত্রাসবাদ
সিঙ্গাপুর
সুইডেন
NEWS
Palestine
fd
অরণ্যে রোদন
অরুণাচল
অর্থনৈতিক
অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক
অ্যান্টার্কটিকা
আহমেদ মুনির
ইকরাম সেহগাল
উত্তর ধুরুং
উমর মনজুর শাহ
একুশে ফেব্রুয়ারি
ঐতিহাসিক
কিশোরকণ্ঠ
কুড়িগ্রাম
কোরবান
ঘূর্ণিঝড়
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন
জাইমা রহমান
জামালপুর
জীবন
জেসমিন আখতার
জ্বালানি তেল
টেলিভিশন
তথ্যপ্র্রযুক্তি
তুষার আবদুল্লাহ
দেশপ্রেম
দৈনিক কক্সবাজার
নাগরিক সংবাদ
নারীঅধিকার
নিরাপত্তা
নির্বাচিত
নেদারল্যান্ডস
পানিসম্পদ
পাহাড়
পয়লা বৈশাখ
বঙ্গবন্ধু
বন্দর
বিশ্ব অর্থনীতি
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা
মহান বিজয় দিবস
মা
মাদারীপুর
মানবতা
মানববন্ধন
মিজোরাম
মিডিয়া ভাবনা
মে দিবস
রাজবাড়ী
শরীয়তপুর
শিক্ষা দিবস
শিক্ষা-প্রশাসন
শুভ বড়দিন
সজীব ওয়াজেদ জয়
সময়চিত্র
সরেজমিন প্রতিবেদন
সাতকানিয়া পৌরসভা
সুইজ়ারল্যান্ড
সুশান্ত মজুমদার
স্মরণ সভা
স্মর্রণ
হাসান আজিজুল হক
America
Burma
Child
China
Hot Video
Huw Cordey
Latin America
Marwan Barghouti
Tom Geoghegan
Tom Heap
Washington
kolkata24x7
অমানবিকতা
আহমদ ছফা
উখিয়া
উত্সব
উদ্যোগ
এসিড-সন্ত্রাস
ওয়াসি আহমেদ
কর্মসূচি
কেনিয়া
ঘড়ি
চট্টগ্রাম বন্দর
চাকরি
চারদিক
চীন ও জাপান
জনসংখ্যা
জাকির তালুকদার
জাহাজ
জাহিদ হোসাইন খান
জায়গা
জায়মা জারনাজ রহমান
জীবনী
জেলহত্যা দিবস
জ্বালানী সম্পদ
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন
ড. সাজিদ হক
ডিজিটাল
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন
তিব্বত
ত্রিপুরা
নগরজীবন
নিবন্ধন
নীলফামারী
পবিত্র আশুরা
পবিত্র ঈদুল ফিতর
পরিকল্পনা
পুলিশ
পেরু
পোল্যান্ড
প্যারিস
প্রান্তকথা
প্রিয়.কম
প্রেক্ষিত
বর্নাঢ্য র্যালী
বলিভিয়া
বাংলাভিশন
বাজারসুবিধা
বাস্তবসম্মত
বিচার
বিশ্ব খাদ্য দিবস
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস
বিশ্ব নদী দিবস
বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস
বিশ্ব শিক্ষক দিবস
বিশ্ববিদ্যালয়
ব্যবস্থাপনা
ব্যাংক ব্যবস্থা
ব্রিটিশ
ভাষাসৈনিক
মাহমুদ আহমাদ
মুস্তাফিজ মামুন
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান
যুদ্ধ ও শান্তি
যুদ্ধাপরাধ
যুদ্ধাপরাধের বিচার
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
লবন চাষ
লামিনে ইয়ামাল
শহীদের স্মৃতি
শান্তি
শিল্প ও পরিবেশ
শিশুশ্রম
সন্ত্রাস ও রাজনীতি
সহজিয়া কড়চা
সিগন্যাল
সেলিনা হোসেন
স্বাধীন
স্বাস্থ্যনীতি
স্মরণ মুক্তিযুদ্ধ
স্মৃতিঘর
হাসপাতাল
Afghanistan
Bangladesh
Brazil
CNN
California
Comments
Croatia
Delhi
Denise Winterman
Dome of the Rock
God Mag
Google
Hugh Schofield
India
Indonesia
Jane O'Brien
Japan
Jeremy Bowen
Jerusalem
Jon Kelly
Kareem Khadder
Kate Dailey
Kim Ghattas
Lead News
Libya
Mahfuz Anam
Michal Zippori
New York
Nigeria
Pakistan
Paris
Paul Colsey
Qamrul Islam
Rosie Goldsmith
Rupert Wingfield-Hayes
Sanjoy Majumder
Source
South Sudan
The Daily Star
The Telegraph
Thomas Fessy
Tours
Vietventures
Wall Street
World's Last Chance
Young
a excellent photo in Kutubdia Island
bdnews24
google search
image
অদিতি ফাল্গুনী
অযোগ্যদে
অসারপনা
আইনকানুন
আজারবাইজান
আদিবাসী দিবস
আনোয়ারা সৈয়দ হক
আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস
আফসার আমেদ
আবদুল লতিফ মাসুম
আবু আজাদ
আব্বাস আরাগচি
আলজেরিয়া
আশান উজ জামান
আহমদ ফাহমি
ইথিওপিয়া
ইভ টিজিং
ইমরান খান
ইমাম খাইর
ইলহান ওমর
ইসলাম ও জীবন
ঈদের খুশি ও আনন্দ
ঈদের বেতন
উজবেকিস্তান
উপনির্বাচ
উপনির্বাচন
উর্দুভাষী
এ পি জে আবদুল কালাম
একুশে ফেব্রুয়ারি:
ঐতিহাস
ওবামা
কক্সবাজার নিউজ
কমিল্লা
কম্বোডিয়া
কলকাতার চিঠি
কাকন রেজা
কাজাখস্তান
কাটরা
কানাই কুণ্ডূ
কালের পুরাণ
কুতুবদিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়
কৈয়ারবিল
ক্রসফায়ার
ক্ষত
ক্ষমাপ্রার্থনা
ক্ষুদ্রঋণ
কয়লানীতি
খায়ের মাহমুদ
খোন্দকার শওকত হোসেন
গাম্বিয়া
গোধূলি
গোড়ার
গৌড়
গ্রামীণ অর্থনীতি
গ্রিস
গ্রেপ্তার
ঘূর্ণিঝড় সম্পাদকীয়
ঘোড়া
চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন
চরমোনাই পীর
চলতি পথে
চাঁদ
চাদ
চিনি
চিরকুট
চিলি
চেয়ারম্যান
ছাত্র-রাজনীতি
ছাত্রদল
ছাড়পত্র
ছুটিদন
জজ হত্যা দিবস
জনদুর্ভোগ
জনস্বাস্থ্যের
জবাবদিহি
জম্মদিন
জলদস্যু
জাতিগত সহিংসতা
জারদারি
জি. মুনীর
জীবনযুদ্ধ
জীবিকা
জুমকন্যার
জ্বালানি রাজনীতি
জ্বালানি সম্পদ
জ্বালানিসম্পদ
জয়পুরহাট
ঝুঁকি
ঝুঁকি হ্রাস দিবস
টিপাইমুখ
টিপাইমুখ বাঁধ
টিপাইমুখে বাঁধ
টিভি চ্যানেল
টোঙ্গা
ঢাকা টাইমস
তানজির আহমেদ রাসেল
তুর্কমেনিস্তান
তেঁতুল
তেলকূপ দুর্ঘটনা
তেলিরকাটা
দক্ষিণ মগডেইল
দারিদ্র্য বিমোচন
দায়গুলো
দায়িত্ব
দুই দু’গুণে পাঁচ
দুর্গ
দূর পরবাসে
দেবনারায়ণ চক্রবর্তী
দৈনিক আজাদী
নগরদর্পণ
নদীকৃত্য দিবস
নববধূ
নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন
নারীর ক্ষমতায়ন
নাসরীন জাহান
নাসিমা আনিস
নাসির উদ্দিনের স্বাভাবিক মৃত্যু
নিকারাগুয়া
নিজাম কুতুবী
নিপীড়ন
নিরাপতা
নির্বাসনে
নিষেধাজ্ঞা’
নীহারুল ইসলাম
নূরে আলম জিকু
নেতা ইমরান খান
নেতৃত্বে
নোযাখালী
পণ্যবাজার
পদক
পবিত্র হজ
পররাষ্ট্রনীতি
পরিস্থিতি
পর্তুগাল
পাঠকের মন্তব্
পাপুয়া নিউগিনি
পাপড়ি রহমান
পাসপোর্ট
পাহাড়ধস
পিলখানা হত্যা
পোশাক
প্রশ্নবিদ্ধ
প্রস্তাবিত
প্রাণীজী
প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ
প্রয়াণ
ফাঁসি
ফিনল্যান্ড
ফেরি ও পন্টুন
বঙ্গবন্ধু হত্যা
বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন
বঞ্চনা
বনসম্পদ
বরিশাল ছাত্রলীগ
বর্ণবৈষম্যবিলোপ দিবস
বাঁকখালী
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
বাংলাদেশের পতাকা
বার্লিন দেয়াল
বাল্যবিয়ে
বাস্তবা
বাস্তবায়
বাহরাইন
বিচার বিভাগ
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড
বিজ্ঞানচিন্তা
বিজ্ঞাপন
বিজয়
বিদ্যুত
বিদ্যুৎ-সংকট
বিদ্যুৎকেন্দ্রে
বিপ্রদাশ বড়ুয়া
বিলবোর্ড দুর্ঘটনা
বিলেতের স্ন্যাপশট
বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস
বিশ্ব পরিবেশ দিবস
বিসিবি
বুলগেরিয়া
বুলবন ওসমান
বুড়িগঙ্গা
বৃক্ষরোপণ
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন
বৈষম্য
বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর
ব্যারিস্টার নাজির আহমদ
ব্রুনাই
বড়পুকুরিয়া
ভাজিরালংকর্ন
ভালোবাসা
ভাষণ
ভেজাল
ভোজ্যতেল
মংলা থেকে
মঈনুল হাসান
মঙ্গোলিয়া
মঞ্জু সরকার
মনযূরুল হক
মনি হায়দার
মন্ত্রিসভা
মাওবাদী সহিংসতা
মাতৃভাষা ও পরভাষা
মানচিত্র নিউজ
মানসিক স্বাস্থ্য দিব্স
মানসিকতা
মালি
মাল্টা
মাহবুব রেজা
মাহামুদা খাতুন
মিথিলেশ ভট্টাচার্য
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
মুরগি জমা
মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন
মূল্যস্ফীতি
মৃত্যু ও কিছু ভাবনা
মোহাম্মদ মোশাররফ হুসাইন
ম্যাডোনা
ম্যান্ডেলা দিবস
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল
যুদ্ধাপরাধ-বিচার
রকিব হাসান
রক্ত
রদ্ধাঞ্জলি
রবাণিজ্যে
রাগবি
রাজনৈতিক সংস্কৃতি
রাজপথ
রাষ্ট্রীয়
রাস্তার
রিয়াল মাদ্রিদ
রুবেল হোসেনের
রেলওয়ের
রোমাঞ্চিত
রোমানিয়া
র্বিজ্ঞান
শক্তিশালী
শঙ্কা
শরীরের
শশী থারুর
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস
শাকিরা
শাহ্নাজ মুন্নী
শায়খ আহমাদুল্লাহ
শিক্ষক খুন
শিক্ষক-রাজনীতি
শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস
শিক্ষাচিত্রে
শিক্ষাবিদের
শিবের গীত
শুঁটকি উৎপাদন
শেরাটনীয়
শোনা
শ্রদ্ধাঞ্জল
শ্রমবাজার
শ্রমশক্তি
ষড়যন্ত্র
সংকট
সংঘাত
সংশোধন
সঙ্গী
সততা
সন্দেশ
সমন্বয়সাধন
সমাজ ও নারী
সমুদ্রস্নান
সময়
সময় নিউজ টিভি
সময়ের প্রতিবিম্ব
সরকার
সাংবাদ
সাইক্লোন শেল্টার
সাইপ্রাস
সাজিদ গ্রেফতার
সাদাসিধে কথা
সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম
সামন্ততন্ত্র
সামরিক শাসন
সামাজি
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম
সাহসী
সিডনি
সিয়াম
সুপ্রভাত
সূর্যে
সেচসুবিধা
সোনার বাংলা
স্কাইপি
স্বকৃত নোমান
স্বচ্ছতা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
স্বাধীনত
স্বাধীনতাযুদ্ধ
স্বামী
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
স্বীকৃতি
স্মৃত-নিদর্শন
স্মৃতিসৌধ
স্মৃতিসৌধে
স্লোভাকিয়া
হত্যা ও হরতাল
হাইতি
হামিদ মীর
হুগজিল্ট