Thursday, August 15, 2013

দৃষ্টিনন্দন ক্যাম্পাসে নষ্ট রাজনীতির থাবা by ফরিদ আহমদ রবি

ঈদের পরদিন একবেলা প্রকৃতির ভেতর হারিয়ে যাওয়ার লোভে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আমার বন্ধু প্রায়ই বলত, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস সবচেয়ে সুন্দর বর্ষাকালে। এত সবুজ আর কোথাও পাওয়া যাবে না। একই সঙ্গে টলমল করে লেকের পানি। তাই বর্ষার ক্যাম্পাস দেখার এ সুযোগটা নিয়ে নিলাম। বন্ধুটি নেই। ঈদের ছুটিতে বাইরে গেছে। অবশ্য আমার তাতে অসুবিধা হয়নি। আমার ছেলে অল্প কয়েক মাস জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিল। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। এ সুবাদে জাহাঙ্গীরনগরে ওর কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু রয়েছে। ঈদে অনেকে বাড়ি চলে গেছে। তবে একজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হল- আশিক। ধামরাইয়ের দিকে ওর বাড়ি। সে আরও কয়েকজন বন্ধু জোগাড় করে আমাদের জন্য ক্যাম্পাসে অপেক্ষা করবে। প্রায় জনবিরল ক্যাম্পাসে আমরা প্রকৃতির সঙ্গে মিশে গেলাম। এদেশে এমন দৃষ্টিনন্দন ক্যাম্পাস আর আছে কি-না আমার জানা নেই। ছেলের ভর্তির সুবাদে কয়েকবার এসেছি। তবে এমন নিসর্গ আগে চোখে পড়েনি। বর্ষার কারণে লেকের পানি টলটল করছে। এবার ক্যাম্পাসের সব লেক ও পুকুর সংস্কার করায় আরও যৌবনবতী হয়েছে। আমরা মুক্তমঞ্চের পাশ দিয়ে মীর মশাররফ হোসেন হলের দিকে যাচ্ছিলাম। আশিক একটি পানিভরা পুকুর দেখাল। আমি আবার আমার উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলাম। আশিক আমাকে থামাল। বলল, আংকেল খুশি হবেন না। আমাদের একদল স্যার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। বলেছেন, এভাবে পুকুর কেটে ভিসি সাহেব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূদৃশ্য নষ্ট করেছেন। কারণ এর আগে এটি ছিল একটি বাইদ জমি। আগাছা উন্মাত। অথবা কেউ ধান চাষ করত। আমি বললাম, তাতে কী, মানব সভ্যতা তো এভাবেই নিজেকে সাজায়। প্রকৃতি কিছুটা দেয়, তার ওপর মানুষের সৃষ্টিশীল হাতের কারুকাজে অনিন্দ্যসুন্দর হয়ে ওঠে। আশিক বলল, আমরাও আমাদের স্যারদের এ কথা শুনে তাৎপর্য খোঁজার চেষ্টা করেছি। আমাদের প্রশ্ন, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এতসব একাডেমিক বিল্ডিং, হল- এসব হল কেমন করে? এত বড় দাগে ভূদৃশ্য নষ্টের প্রতিবাদে অতীতে কি আন্দোলন হয়েছে? ভূদৃশ্য রক্ষার নামে উচিত ছিল গাছতলায় ক্লাস করা। আশিক বলল, আংকেল আপনি মন ভালো করার জন্য ক্যাম্পাসে এসেছেন। এখন মন খারাপ করার মতো কয়েকটি নমুনাও দেখাব। আমরা জাহানারা ইমাম হল পার হয়ে চলে এলাম ভিসির বাসভবনের কাছে। আশিক দেখাল ভিসি ভবনের সীমানা প্রাচীরের পর থেকে ভবনের সামনের লেককে ঘিরে কাঁটাতারের বেড়া দেয়া হয়েছে। প্রকৃতির সঙ্গে মিলে সবুজ রঙ করা এ বেড়াটি সদ্য তৈরি। আশিক জানাল, এই বেড়া ঘিরেও রাজনীতি হয়েছে। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, এই বেড়া দিয়ে ভিসি তার ভবনের সীমানা বাড়িয়েছেন। কথাটি আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। এই ভবনটি নিশ্চয়ই ব্যক্তি অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনের নয়। ভিসি ভবন সমৃদ্ধ হওয়ার মধ্যে অন্যায় কী! আমি স্মৃতিচারণ করলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা। আমার বন্ধু এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ক্যাম্পাস ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলেন। তার বর্ণনায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দ্রষ্টব্য বিষয় ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ভবন। গর্ব করে বলেছিলেন, আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এতটা জায়গা নিয়ে ভিসি ভবন নেই। আশিক একটু লাজুক হাসি দিয়ে বলল, আপনি বিশ্বাস করবেন কি-না জানি না। ভিসি তার ভবনের সামনের লেকে সস্ত্রীক নৌকায় মাঝে মাঝে বিহার করেন, তাও নাকি স্যারদের সমালোচনার বিষয়। এ কথাটি অবশ্য আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হল না। এমন উন্মুক্ত ক্যাম্পাসের মানুষ এতটা সংকীর্ণ নিশ্চয়ই হবেন না।
আশিক ও ওর বন্ধুরা নিয়ে গেল প্রশাসনিক ভবনের সামনে। সেখানে সাদা-কালো নানা ধরনের ব্যানার টানানো। পড়ে বিশ্বাস করতে কষ্ট হল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটি অংশ সহকর্মীর বিরুদ্ধে এমন সব শব্দ চয়নে ব্যানার লেখে। শ্রমিক সংগঠনগুলোর ব্যানারে প্রতিবাদী শব্দ চয়নে যে সাবধানতা থাকে, শিক্ষকদের ব্যানার তা অতিক্রম করেছে। এমন স্থূলতা দেখব আমি আশা করিনি। আমি আশিকদের বললাম, হাইকোর্ট তো আন্দোলনকারীদের প্রশাসনিক ভবন থেকে হটিয়ে দিয়েছেন, তাহলে এসব কুৎসিত ব্যানার এখানে এখনও টানানো কেন? আশিক হেসে বলল, ভিসি স্যার বোধহয় আন্দোলনকারী শিক্ষকদের মতো অতটা নিচে নামতে পারেননি। তাই ব্যানার টানানোর গণতান্ত্রিক অধিকারকে রক্ষা করছেন।
এবার আশিক সলজ্জ হাসি হেসে বলল, আংকেল লজ্জা যখন কেটে গেছে তখন আমাদের স্যারদের আরেকটি ছেলেমিসুলভ কীর্তি দেখাই। ও নিয়ে গেল সদ্য সংস্কার করা কয়েকটি পুকুর ও লেকের পাড়ে। সেখানে সিমেন্ট পাথরে একটি করে ফলক স্ট্যান্ড রয়েছে। কালো কাপড় বেঁধে ঢেকে দেয়া হয়েছে ফলক। একটির মধ্যে কাগজ সাঁটা রয়েছে। পড়ে বোঝা গেল ‘অবাঞ্ছিত’ ভিসি যথাযোগ্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা না করে জলাশয়ের নামকরণ করেছেন বলে এই শাস্তি। আশিক জানাল, শিক্ষার্থীরা এতে খুব বিব্রত হয়েছে। ভিসির প্রতি ব্যক্তিগত ক্ষোভের প্রকাশ ছাড়া একে আর কী বলা যায়! এবার ফোড়ন কাটল রুবেল অথবা নোভেল ছেলেটি। বলল, আন্দোলনকারী স্যারদের সবই কালো। ব্যানার কালো, নামফলক মুছে দেয়ার কাপড়ও কালো, প্রতিবাদের ভঙ্গি আর ভাষাও কালো। ওদের সামনে আমিও কেমন বিব্রত বোধ করতে লাগলাম।
আমি আশিককে প্রশ্ন করলাম, পত্রিকা পড়ে তো মনে হয়েছে এই আন্দোলনের তেমন যৌক্তিক ভিত্তি নেই। সব শ্রেণীর শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীর সমর্থনও নেই। তোমরা কীভাবে দেখছ তোমাদের স্যারদের আন্দোলন? আশিকের মুখে একটি কষ্টের রেখা দেখতে পেলাম। ও বলল, স্যাররা নিজেদের স্বার্থের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেজকে ভীষণ সংকটের মধ্যে ফেলে দিয়েছেন। এখন বাইরে কোথাও নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় দেয়ার জো নেই। নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। হাইকোর্টের রায়ের আগে আমার কয়েকজন বন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসেছিল। বলল, ‘আমরা তোদের স্যারদের পিকেটিং দেখতে এসেছি। তারা নাকি প্রশাসনিক ভবন তালা দিয়ে পালা করে পাহারা দেন?’ ওদের প্রশাসনিক ভবনের পথ দেখিয়ে আমি পালিয়ে বেঁচেছিলাম।
অনেক্ষণ পর মুখ খুলল আশিকের বন্ধু রুবেল অথবা নোভেল। ও ছাত্রদলের সঙ্গে জড়িত। এই ক্যাম্পাসে বরাবরই সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের দাপট। তাই এখন ওরা অনেকটা নিষ্ক্রিয়। এই প্রায় জনবিচ্ছিন্ন আন্দোলনে বিএনপির শিক্ষকরা জড়িত হয়েছেন দেখে ওর দুঃখ। বলল, বর্তমান উপাচার্য আওয়ামী লীগের মনোনীত। আর তার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছে পদত্যাগকারী আগের ভিসির লোকজন। তারাও আওয়ামী লীগের সমর্থক। আগের ভিসি শরিফ এনামুল কবির নাকি এই ভিসিকে তাড়িয়ে আবার ভিসি হতে চান। তাহলে কামড়াকামড়ি আওয়ামী লীগের সঙ্গে আওয়ামী লীগের। বিএনপি কেন নিজেকে পচাতে গেল। আশিক হেসে বলে, দোস্ত আগামী নির্বাচনে তোমরা নাকি পাওয়ারে আসবে। তাই এই সুযোগে দলীয় নেতাদের চোখে পড়ার জন্য তোমার স্যারেরা কসরৎ করছেন। একটি অদ্ভুত হাসি খেলে গেল ছেলেটির ঠোঁটে। বলল, ঈদের আগে নয়াপল্টনে আমাদের অফিসে গিয়েছিলাম। সেখানে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসঙ্গ এলো। নেতাগোছের একজন আন্দোলনে যুক্ত বিএনপি শিক্ষকদের সমালোচনা করলেন। বললেন, আনোয়ার সাহেব সরে গেলে সরকার আরেকজন আওয়ামী লীগের শিক্ষককে বসাবেন। বিএনপির জন্য তিনি আনোয়ার সাহেবের চেয়ে ভালো হবেন না। এছাড়া বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে নতুন ধারার পরিচ্ছন্ন রাজনীতি করবে। অযৌক্তিক আন্দোলনে আওয়ামী শিক্ষকদের সঙ্গে যুক্ত থেকে যারা দলের ইমেজ নষ্ট করছেন, তারা নিশ্চয়ই পার্টির সুনজরে থাকবেন না।
আমি আশিকদের কাছে জানতে চাইলাম, এই আন্দোলন নিয়ে তোমাদের মনোভাব কী? আশিক বলল, আমরা ছাত্রছাত্রীরা দারুণ বিরক্ত। স্যাররা নিজেদের লাভ-লোকসান আর পাওয়া-না পাওয়ার ঝগড়ায় আমাদের শিক্ষা জীবনের ভীষণ ক্ষতি করে দিলেন। অত্যন্ত অনৈতিকভাবে আমাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে চাইলেন। গত গ্রীষ্মের ছুটির আগে নিজেদের দাবি আদায়ের জন্য আমাদের ক্লাস পরীক্ষা বন্ধ করে দিলেন। প্রায় দেড় মাস আমরা স্যারদের ইচ্ছার হাতে বন্দি হয়ে রইলাম। এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি সময় ছিল। সামনে প্রায় সব বর্ষের পরীক্ষা। এটা ছিল ক্লাস ও টিউটোরিয়াল পরীক্ষা শেষ করার সময়। সব আটকে গেল। এই জের টানতে গিয়ে আমরা প্রায় ছয় মাসের সেশনজটে পড়ে যাব। এই ক্ষতির দায় কি আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকরা নেবেন?
এই দৃষ্টিনন্দন ক্যাম্পাস দেখতে এসে আমি ও আমার পরিবার ভীষণ কষ্ট অনুভব করতে লাগলাম। এই চমৎকার ক্যাম্পাস জ্ঞানচর্চার তপোবন হতে পারত। নষ্ট রাজনীতির থাবা সে সম্ভাবনাকে কীভাবে বিবর্ণ করে দিচ্ছে। আমরা আমাদের সন্তানদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাই সুশিক্ষিত হবে এই আশায়। শুধু ক্লাসরুম আর লাইব্রেরি নয়, এই বিশাল ক্যাম্পাস থেকেও নানা জ্ঞানের সঞ্চয় করবে। শিক্ষাগুরু শিক্ষকদের দেখে বড় হওয়ার স্বপ্ন তৈরি করবে নিজেদের মধ্যে। কিন্তু সেই পথ প্রদর্শন কি করতে পারছেন আমাদের শিক্ষকরা? শিক্ষকরা ছাত্রছাত্রীর আদর্শ। সেই আদর্শের এই বিপন্ন দশা নিশ্চয় জাতির কাম্য নয়। এটি সত্য যে, শিক্ষকদের বড় অংশই সৎ আদর্শ ধারণ করে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। কিন্তু নষ্ট রাজনীতির জগতে হাঁটা অবিবেচকদের কারণে সব শিক্ষককে ইমেজ সংকটে পড়তে হচ্ছে। তাই আমরা প্রত্যাশা করি, শুভ শক্তির সরব প্রতিবাদের মুখে অশুভ শক্তি বিদূরিত হোক।
ফরিদ আহমদ রবি : একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা

বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অপপরিকল্পনার শিকার by ড. আবদুল হাকিম সরকার

শোকাবহ আগস্ট মাস কতটা দুঃখের, মর্মবেদনার ও ঐতিহাসিক দিক থেকে কলঙ্কময় তা সচেতন মানুষমাত্র অনুভবে না এনে পারেন না। ১৫-এর কালরাত্রি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়- এ কথা সচেতন-অর্ধসচেতন সবাই স্বীকার করবেন। সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এক অপপরিকল্পনার আওতায় নৃশংস হত্যাকাণ্ডের এই মহাযজ্ঞ সংঘটিত হয়। নির্দিষ্ট এই দিনটি বেছে নেয়ার পেছনে পাক-ভারত-বাংলাদেশের কিছু ঐতিহাসিক ঘটনার যোগসূত্র থাকলে থাকতেও পারে। সমালোচকদের কেউ কেউ বলেন, আওয়ামী লীগ তথা ওই সময়ের বাকশাল কাঠামোতে অন্তর্দলীয় কোন্দল এ নৃশংস ঘটনার জন্য দায়ী। এ ধরনের উক্তি তর্কের খাতিরে সত্য হিসেবে ধরে নিলে বলতে হয়, অদৃশ্য কোনো সুতা দ্বারা পুতুল নাচিয়ে সক্রিয়তার মধ্য দিয়ে ওই অন্তর্দ্বন্দ্বের সৃষ্টি। এটি কি আকস্মিক ঘটনা! ক্রান্তিকালীন অবস্থায় সৃষ্ট নাজুকতায় সুযোগসন্ধানীদের সুপরিকল্পিত ও তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করার স্বার্থে এক ধরনের সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের অপচেষ্টা এর দ্বারা চালানো হচ্ছে। রাজনৈতিক ইতিহাসের জঘন্যতম ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড হচ্ছে সপরিবারে শিশুপুত্র রাসেলসহ জাতির পিতা, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিহত হওয়ার ঘটনা। কেউ বলে, কিছুসংখ্যক পথভ্রষ্ট উচ্চাভিলাষী সৈনিক এ ঘটনা ঘটিয়েছে। কথাটি যতটা সহজ মনে হয়, সম্ভবত বিষয়টি তা নয়। বিষয়টি উপরোল্লিখিত বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনা করা যেতে পারে। ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫-এর ঘটনা দ্বিতীয় পর্যায়ের হয়তো প্রথম। প্রথম পর্যায়ের প্রকাশ্য ও আধাগোপন স্বাধীনতা-বিরুদ্ধ ষড়যন্ত্র স্বাধীনতা আন্দোলনের শুরুতে সচল ছিল এবং তা স্বাধীনতা অর্জনের প্রাক্কালে তো বটেই। তবে এই প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক-অপরাজনৈতিক তৎপরতার মধ্যে মিল ও গরমিল দুই-ই আছে। তবে প্রক্রিয়ার বাইরে উদ্দেশ্যের দিক থেকে দুটোর মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই।
অপশক্তির পরিকল্পনা অনুসারে দ্বিতীয় পর্যায়ে ৩ নভেম্বর, ১৯৭৫-এ জেলহত্যার মাধ্যমে এক লোমহর্ষক ঘটনার মধ্য দিয়ে জাতীয় চার নেতাকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, তাতে লুকায়িত কী দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে সেটি কি কাউকে বুঝিয়ে বলার অবকাশ রাখে? কথায় চর্বন করতে হলে বলতে হয়, ‘কারাগার হচ্ছে সবচেয়ে নিরাপদ স্থান’, জীবনের নিরাপত্তা এর চেয়ে আর কোথাও থাকতে পারে না। অথচ এটিও অপশক্তি ‘তুচ্ছ’ জ্ঞান করেছে। এতে কি এটি প্রমাণিত হয় না, নেপথ্য অপশক্তির ক্ষমতা ও বিস্তার কতটা দূর পর্যন্ত সম্প্রসারিত!
এভাবে আওয়ামী লীগের হারানো ক্ষমতা ফিরে পেতে দুই দশকেরও বেশি সময় লেগেছিল। তাও হয়তো সম্ভব হতো না, যদি বিদেশে অবস্থান করার কারণে দুই বোন দৈবাৎ বেঁচে না যেতেন! তাদের একজন শোকে মুহ্যমান হওয়ার পরও জাতির জনকের রক্তের ঋণ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত না হতে দেয়ার সুতীব্র প্রতিজ্ঞায় ধৈর্য ধারণ করে হাল ধরেন আওয়ামী রাজনীতির। কিন্তু মাঝখানে বইয়ে যাওয়া একুশটি বছর রাজনীতি বিপথে পরিচালিত হয়েছে। যুব-তরুণ সমাজের হাতে অর্থসহ অস্ত্র তুলে দেয়া, সংবিধান কাটাছেঁড়া করে অবশিষ্টাংশকে মূল করে আরও কত কিছু সংযোজন করে তা এমনভাবে সাজানো হয়েছে যে, ইচ্ছা করলেও যেন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তার পরিবর্তন করতে না পারে। মূল সংবিধানে ফিরে গেলেও যেন আপসকামিতা অপরিহার্য হয়ে পড়ে।
বিংশ শতকের শেষ অর্থাৎ ’৯৬-তে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দায়িত্ব পুনরুদ্ধারে সক্ষম হয়। ততদিনে নানাপক্ষের সম্মিলনে দ্বিতীয় পক্ষ হিসেবে আর একটি শক্তির উত্থান ঘটে। যদিও এই উত্থানের বিষয়টি গত ২১ বছরে এভাবে না হয় সেভাবে, একক ও যৌগিকভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতার সাধ ভোগ করেছে; নিজেদের করেছে সমৃদ্ধ, পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক চেতনার যোগসাজশে কলেবরে হয়েছে বড়। এ শক্তির সঙ্গে স্বাধীনতা যুদ্ধের মূলনীতির কোনো সম্পর্ক ছিল না বা নেই।
বাস্তব অবস্থা হচ্ছে এই যে, আজ শত্র“ হয়েছে আপন, মিত্র হয়েছে হয়তো পর। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া বাস্তবে কঠিন হলেও কী করে আদর্শের ভিত্তি সুদৃঢ় করা যায়, তাতে সচেষ্ট থাকতে হবে। গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা ক্রমধারাবাহিকতার মধ্য দিয়েই হয়ে থাকে। নীতি ও আদর্শে বিপরীতমুখিতা থাকলে ক্ষমতা বদলের সঙ্গে সঙ্গে এর ধারাবাহিকতা শুধু ক্ষতিগ্রস্তই হয় না; লুডু খেলার মতো মই বেয়ে ওপরে ওঠা ও সাপের মুখে পড়লে লেজে নিপতিত হওয়াও বিচিত্র নয়।
ড. আবদুল হাকিম সরকার : উপাচার্য, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ

কেন তত্ত্বাবধায়ক ভীতি by আহমেদ সুমন

মহাজোট সরকারের শেষ সময় চলছে। শেষ সময় না বলে শেষ মুহূর্ত বলা উত্তম। কারণ এ সরকারের নির্ধারিত মেয়াদ আর নব্বই দিনও নেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রীতি ও ভীতি দুটিই রয়েছে। বিচারপতি হাবিবুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ ২১ বছর পর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিল। আবার বিচারপতি লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হয়। দলটি এখন তত্ত্বাবধায়ক ভীতিতে রয়েছে। স্বভাবগতভাবেই মানুষ আনন্দ-অনুভূতির কথা মনে রাখে কম। দুঃখের চিত্র চোখে-মুখে বেশি ফুটে ওঠে, সে আতংকিত হয়। বিগত প্রায় পৌনে পাঁচ বছরে আওয়ামী লীগ অনেক ভালো কাজ নিশ্চয়ই করেছে। ভালো কাজের বিচার-বিবেচনায় বিএনপির শাসনামলের তুলনায় আওয়ামী লীগ হয়তো এগিয়েও থাকবে। কিন্তু মন্দ কাজ বা দুর্নীতির অভিযোগ থেকে আওয়ামী লীগ মুক্ত নয়। অনেকেই বলেন, বিএনপির সময়ে দুর্নীতি হয় সরকারের মধ্যস্তরে কিংবা আরও নিচের স্তরে। পক্ষান্তরে আওয়ামী লীগের সময়ে দুর্নীতি হয় সরকারের উচ্চপর্যায়ে। এসব দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে প্রধানমন্ত্রী উল্টো দুর্নীতিবাজ মন্ত্রীদের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন।
৫ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীদের করুণ পরাজয়ের পর মন্ত্রীরা জনগণের উদ্দেশে বলেছেন, ভালো কাজের প্রতিদান এভাবে দেয়া উচিত নয়। কিন্তু এ কথা কে অস্বীকার করবে যে, ভালো কাজ করা সরকারের দায়িত্ব। মন্দ কাজ জনসাধারণ দেখতে চায় না। ভালো কাজের জন্য বাহবা পাওয়া না গেলেও মন্দ কাজের জন্য তিরস্কার অনিবার্য। শেয়ারবাজারে পুঁজি খাটিয়ে বিনিয়োগকারীর মাথায় হাত, হলমার্ক কেলেংকারিতে জনগণের অর্থ লুটপাট, দুর্নীতির অভিযোগে পদ্মা সেতু থেকে বিশ্বব্যাংকের পিছুটান, রেলের কালো বিড়াল, নিশ্চল কয়েক কোটি টাকার ডেমু ট্রেন এখন জনসাধারণের চোখের সামনে। মহাজোট সরকারের উন্নয়ন এসবের পেছনে পড়ে গেছে। ধারণা করি, এসব তথ্য সরকারের কাছে রয়েছে। আর রয়েছে বলেই তত্ত্বাবধায়কের ভীতি আওয়ামী লীগকে ধাওয়া করছে। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন থেকে আওয়ামী লীগের যে পরাজয় শুরু হয়েছে, তা আর পিছু ছাড়েনি। আবার এটাও ঠিক, মানুষমাত্রই মৃত্যুর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাঁচার আকুতি জানায়, বাঁচতে চেষ্টা করে। আমার অবস্থা ভালো নয়, আমি মরে যাই- এমন কথা কাউকে বলতে শুনিনি। সুতরাং প্রধানমন্ত্রীর পুত্র বিদেশ থেকে এদেশে এসে যখন বলেন, তার কাছে তথ্য আছে আওয়ামী লীগ আবারও ক্ষমতায় আসবে, তাতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই সরকার পরিচালিত জনমত জরিপের ফলাফলেরও। কারণ সরকারি লোকেরা সরকারের মন ভেঙে যেতে পারে, এমন তথ্য সরবরাহ করে না। সরকারের জয়গান করাই তাদের কাজ।
ইতিহাস পঠনে তিন ধরনের শিক্ষার কথা বলা হয়। এক. মানুষ অপরজন থেকে শুনে শিক্ষা গ্রহণ করে। দুই. অপরজনকে দেখে শিক্ষা গ্রহণ করে এবং তিন. নিজের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। ইতিহাস এই সাক্ষ্য দেয় যে, শেষোক্ত অর্থাৎ নিজের অভিজ্ঞতা থেকে মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করে। বস্তুত এই শিক্ষাটি খুব পেইনফুল। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণের ইচ্ছা বা অভিমতের বাইরে গিয়ে সরকার যদি কোনো কিছুতে অনড় থাকে এবং এতে যদি সরকারের পতন হয়, সেক্ষেত্রে পুনর্বার সরকারের দায়িত্বে আসা তার পক্ষে বেশ কঠিন। বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতির অস্থিরতার মধ্যে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তনের দাবিটি মুখ্য। এটি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণের দাবি। অথচ শেখ হাসিনা সরকার এটি জেনে-বুঝেও মানতে চাইছে না। এর কারণ যে ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়ার আশংকায় তত্ত্বাবধায়কের ভীতি আওয়ামী লীগকে পেয়ে বসেছে, তা লুকোছাপা নয়।
বাংলাদেশের জনসাধারণ নির্বাচন এলে সঠিক রায় দিতে এখন পর্যন্ত ভুল করেনি। ভুল করে সরকার। আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি সরকার গঠন করেই মধুচন্দ্রিমায় বেহুঁশ থাকে। হুঁশ আসে নির্ধারিত মেয়াদের মাসছয়েক আগে। তখন আর কিছু করার থাকে না বলে কিভাবে, কোন পদ্ধতিতে নির্বাচন করলে পুনরায় ক্ষমতায় আসা যায়, সেই ছলচাতুরিতে নির্দিষ্ট মেয়াদই শেষ হয়ে যায়। ফলে তার পক্ষে আর ফিরে আসা সম্ভব হয় না। আমরা লক্ষ্য করলাম আওয়ামী লীগও এর ব্যতিক্রম নয়। শেষ পরিণতিতে আওয়ামী লীগের কী হয়, তা ভবিষ্যতেই জানা যাবে।
আহমেদ সুমন : গবেষক ও বিশ্লেষক

ভালোবাসায় সব জয় করা যায় by নুরুল ইসলাম বিএসসি

দেহের ধ্বংসই আত্মার মুক্তি। দেহের অভ্যন্তরে যে কামনা, বাসনা, লোভ, লালসা থাকে, তা সত্য পথ দেখতে দেয় না। এই বস্তুগুলোকে ‘নফস’ বলতে পারি। নফস ধ্বংস করতে পারলেই দেহের কর্তৃত্বের অবসান হয় এবং আত্মার স্বাধীনতায় আসে পূর্ণতা। যারা সাধক তারাই নফসকে দমন করতে পারেন। আর সাধারণ মানুষের আত্মার মুক্তি আসে তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।
যখন নফস সম্পূর্ণ পরাজিত হয়, তখন আত্মার আজ্ঞাবহ হয়। সেদিন কোনো অন্তরায় নাই- তখন হবে বিনয়, তখন হবে ফানা। ফানা মানেই বিলীন হওয়া। আমরা যে চিনি ফানা পান করি, চিনি পানির মধ্যে এমনভাবে বিলীন হয় যা চোখে দেখা যায় না। যখন মানুষ স্রষ্টার প্রেমে বিলীন হয়, তখন তার চোখে সব মানুষ এক কাতারে দাঁড়ায়। না থাকে ধর্মের বন্ধন, না থাকে গোষ্ঠীর বেড়াজাল। এরই নাম অমরত্ব।
আল্লামা রুমী বলে গেছেন, স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসা ধর্মের নিয়ম-কানুনের আওতাবহির্ভূত। আল্লাহকে ভালোবাসতে হবে শুধু আল্লাহর কারণে। আল্লাহর ইবাদত হবে সার্বক্ষণিক। শুধু আল্লাহর উদ্দেশে। গাছ যেমন মাথা উঁচু করে সার্বক্ষণিক আল্লাহর ইবাদত করে। আল্লাহর ইবাদতে কোনো চাওয়া-পাওয়া থাকে না। এর নাম ভালোবাসার ধর্ম, প্রেমিকের ধর্ম এবং ভালোবাসার পাঠশালা। প্রকৃতি ভালোবাসার পাঠশালা। অথচ আমরা সার্বক্ষণিক ওই গাছ ধ্বংস করছি। প্রকৃতিকে কলুষিত করছি।
রুমী বলতেন, নৃত্য ও আনন্দ উল্লাস সব জীবন্ত প্রাণীর স্বভাব, এমনকি সুখী হলে পশুরাও লাফায়। দৌড়ে খেলা করে বেড়ায়। আমরা বানর ছানার দৌড়ঝাঁপ, আনন্দ উল্লাস দেখেছি। মানুষের মধ্যেও একই অনুভূতি আছে। আর এই আনন্দ উল্লাস যদি স্রষ্টার প্রেমে হয়, তার নামই ইবাদত। এখানে অন্য কোনো নিয়মনীতির প্রয়োজনীয়তাই বা কী? এ থেকে বোঝা যায়, সব ধর্মের স্রোতই মিশে গেছে রুমীর অভিজ্ঞানে। প্রথমে রুমী একজন দার্শনিক থাকলেও শমসের তাব্রীজের গুণে কবিতে রূপান্তরিত হন। কবি আর দার্শনিকের একসঙ্গে সমন্বয় জগতে বিরল।
শুন হে মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই। রুমীর জগৎ শুধু সূফিবাদের জগৎ নয়, নয় হিন্দু, নয় ইহুদির, নয় খ্রিস্টানদের। এ যেন মনুষ্যত্বের চরম বিকাশের পরিণতি। তাই যখন খ্রিস্টানদের গির্জায় যাই, বৌদ্ধদের মন্দিরে প্রবেশ করি, এমনকি ঢুকে পড়ি নিউইয়র্কের কোনো শিল্প-সংস্কৃতির আড্ডায়- মসজিদ, মন্দির সব জায়গায় রুমীর উপস্থিতি। এ যেন এক অভাবিত পুরুষ, তার মসনবী। রুমীর রচনা প্রমাণ করে সব ধর্মের লোকরা সুখে-শান্তিতে বসবাসের ক্ষমতা রাখে। রুমীর সব রচনা হৃদয়ের সব ঘৃণা, বিদ্বেষ, লোভ-লালসা ত্যাগ করে মানবতার দিকে টানে। তাই রুমী সব ধর্মের প্রচারক ও অনুরাগী। বর্তমান হিংসার যুগে রুমীর আদর্শ অনুসরণ বড় প্রয়োজন। রুমীর লেখাই পারে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে। ভালোবাসা দিয়ে শত্র“, মিত্র সবাইকে জয় করতে রুমীই শিখিয়েছেন।
নুরুল ইসলাম বিএসসি : সংসদ সদস্য ও কলাম লেখক

১৫ আগস্ট ট্রাজেডি : বঙ্গভবন ও ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের অজানা অধ্যায় by মুসা সাদিক

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট খুনি ফারুক-রশীদ-ডালিমরা ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে যে ট্যাংক নিয়ে ধানমণ্ডিতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর বাড়ির নিরাপত্তা বাহিনীকে এবং সাভারে রক্ষীবাহিনীকে আতংকিত ও ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলেছিল, সেগুলো যে ভুয়া ট্যাংক ছিল, তাতে যে কোনো গোলা ছিল না, সে তথ্য রক্ষীবাহিনী বা সেনাবাহিনীর কেউ জানত না। জানতেন মাত্র চারজন- সেনাবাহিনী প্রধান, উপ-প্রধান, সিজিএস ও ডিজিএফআই। যাদের একজন ছাড়া সবাই শেখ মুজিবের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেন। এমনকি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ফোর্সের দায়িত্বপ্রাপ্ত সিজিএসকে ৩২ নম্বরে অবস্থিত বিদ্রোহী বাহিনীকে আক্রমণ করার জন্য আর্মি চিফ জেনারেল শফিউল্লাহ যখন অর্ডার দেন, তখন কর্নেল শাফায়াত জামিলকে নিয়ে তার ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ফোর্সসহ সিজিএস ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ শেরেবাংলা নগর ঘুরে এসে বলেন, ওদের হাতে সুপিরিয়র আর্মস অ্যামিউনিশন্স আছে বিধায় তাদের আক্রমণ করে পরাজিত করা সম্ভব নয়। আর্মি কোড ‘ডু আর ডাই’-এর কথা কীভাবে তারা ভুলে গেলেন? নাকি তারা সংবিধানকে ভুলে গেছেন?
যে আত্মঘাতী ও উচ্চাভিলাষী পথ সেদিন তারা বেছে নেন, সেই পথেই পরবর্তী সময়ে একে একে তাদের সব অপমৃত্যু ঘটে। সেনাবাহিনীর গৌরবময় অফিসার পদে যোগদানকালে দেশের সংবিধান ও রাষ্ট্রপতিকে রক্ষায় তারা জীবন উৎসর্গ করতে সদা প্রস্তুত মর্মে পবিত্র কোরআন শরিফ ছুঁয়ে যে শপথ বাক্য উচ্চারণ করেছেন, তা ১৫ আগস্টে তারা কার ইঙ্গিতে বিস্মৃত হয়ে গেলেন? অপরদিকে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত রুখতে বঙ্গবন্ধুর এমএসপি কর্নেল জামিলকে ডিজিএফআই পদে নিয়োগ দান করা হলেও তদানীন্তন ডিজিএফআই কর্নেল আবদুর রউফ তাকে দায়িত্বভার বুঝিয়ে দিতে গড়িমসি করেন এবং সময়ক্ষেপণ করে খুনিদের ষড়যন্ত্র দ্রুত এগিয়ে আনার ব্যবস্থা করেন। এমনকি কর্নেল জামিল তার নতুন পদে যোগদান উপলক্ষে ঢাকার বিদেশী দূতাবাসগুলোয় কর্মরত ডিফেন্স এটাশেদের নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানিয়েও সে আমন্ত্রণপত্র প্রত্যাহার করে নেন। কারণ তখনও তিনি দায়িত্ব পাননি। তদানীন্তন ডিজিএফআই কর্নেল আবদুর রউফ নানা অজুহাতে তার দায়িত্ব হস্তান্তরে কয়েক সপ্তাহ বিলম্ব করেন। এক অজুহাত দেখিয়ে তিনি ছুটি নেন এবং বিদেশ গমন করেন। বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত গোপালগঞ্জের কর্নেল জামিলের কাছে যথাসময়ে, এমনকি বঙ্গবন্ধু হত্যার দু’-একদিন আগেও কর্নেল রউফ ডিজিএফআইয়ের দায়িত্ব কর্নেল জামিলের হাতে তুলে দিলে খুনিদের সব ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে যেত এবং খুনিরা ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলিবিদ্ধ হয়ে তাদের প্রাপ্য পেয়ে যেত। ডিজিএফআই কর্নেল আবদুর রউফ নানা টালবাহানা ও ছল-ছুতা করে দু’-তিন সপ্তাহের বেশি তার বদলি আদেশের বাস্তবায়ন বিলম্বিত করেন এবং বিদেশে অবস্থান করতে থাকেন। এ অস্বাভাবিক বিলম্বের প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের চক্রান্ত দ্রুততর করার এবং তা এগিয়ে আনার প্রস্তুতিতে কর্নেল রউফ প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখেন। অতঃপর যেদিন অর্থাৎ ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট বিকালে তিনি যখন ডিজিএফআইয়ের দায়িত্ব কর্নেল জামিলের হাতে হস্তান্তর করেন, তখন তিনি ১০০ ভাগ নিশ্চিত ছিলেন যে, কর্নেল জামিল ডিজিএফআইয়ের network of intelligence and counter-intelligence তার হাতের মুঠোয় নেয়ার সময় পাবেন না। পরিণতিতে ১৫ আগস্টের সূর্যের মুখ দেখার আগেই অর্থাৎ তার দায়িত্ব হস্তান্তরের ১০ ঘণ্টার মাথায় রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হবেন।
ডিজিএফআইয়ের ইন্টেলিজেন্সের ৬০ জন এবং কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্সের ৬০ জন ধুরন্ধর গোয়েন্দা ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে-বাইরে এবং ঢাকার স্পর্শকাতর স্থানে ও অবস্থানে ২৪ ঘণ্টা ধরে তিন ভাগে ডিউটি করে। ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে ১৫ আগস্ট রাতে ৮টি ট্যাংক বেরিয়ে গেল, আর তারা সব চোখে ঠুলি পরেছিল বলে ডিজিএফআই আবদুর রউফের কোনো অফিসার তা দেখতে পায়নি বললে কোনো ‘কানা বগির ছা’ও তা বিশ্বাস করবে না। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অন্যতম সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ পদের বদলি আদেশ, বিশেষ করে ডিজিএফআইয়ের মতো চরম স্পর্শকাতর পদের বদলি আদেশ নানা ছল-ছুতায় অমান্য করার ও অস্বাভাবিক সময়ক্ষেপণের বিষয়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী ও সেনাবাহিনী প্রধান, উপ-সেনাবাহিনী প্রধান এবং আর্মি এইচকিউ উদাসীন হয়েছিলেন ও উপেক্ষা করেছিলেন। এভাবে তাদের সবার বিশ্বাসঘাতকতায় ১৫ আগস্ট সকালে চিফ অব স্টাফের হেডকোয়ার্টারের কমান্ড ভেঙে পড়ে।
সিজিএস জেনারেল খালেদ মোশাররফ ও ৪৬ ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডার কর্নেল শাফায়াত জামিলকে (যার অধীনে তিনটি ব্যাটালিয়ন নিয়োজিত ছিল) দেয়া আর্মি চিফের অর্ডার 'attack & destroy the killers of the President' আদেশ তামিল না করে ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে আর্মি চিফ জেনারেল শফিউল্লাহ কমান্ড নিজের হাতে তুলে নিতে পারতেন। কিন্তু তার আদেশ তামিল করার মতো কাউকে চারপাশে পাননি। এ বিষয়ে তিনি আমাকে বলেছেন, ‘সেদিন আমার চারপাশের বিশ্বাসঘাতকদের বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েছিলাম আমি। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার সংবাদ নিশ্চিত হয়ে আমার চারপাশের সবাই খুনিদের পক্ষে চলে যায়। তাদের সবার বিশ্বাসঘাতকতায় আর্মি এইচকিউর ক্ষমতা সিস্ড হয়ে যায়।
১৫ আগস্টে বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে যে চক্রান্তের বীজ বপন করা হয়েছিল, সেই ষড়যন্ত্রের গুপ্তকথা জানতে আমি ’৯৪ সালে এক সরকারি কাজে চট্টগ্রামে যাই। বঙ্গবন্ধুর তদানীন্তন প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক নুরুল ইসলাম চৌধুরীর সঙ্গে ’৯৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর তার জামাল খান রোডের বাসায় সাক্ষাৎ করি। তিনি প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী থাকতে যখন ঢাকায় ৩ নম্বর মিন্টো রোডের বাসায় থাকতেন, তখন তার একান্ত সচিব আমার বন্ধু অধ্যাপক সুরঞ্জন সেনের সঙ্গে বহুবার তার বাসায় গিয়েছি। তার জামাল খান রোডের বাসায় ওই সাক্ষাৎকারের সময় তার পুত্র ডা. মঈনুল ইসলাম চৌধুরীসহ তাদের পরিবারের আরও লোকজন উপস্থিত ছিলেন এবং অধ্যাপক নুরুল ইসলাম চৌধুরী লিভার সিরোসিস রোগে আক্রান্ত ছিলেন। চট্টগ্রামে তার বাড়িতে অসুস্থ অবস্থায় শুয়ে শুয়ে দেয়া সাক্ষাৎকারে সেই ১৫ আগস্টের ট্রাজেডির অজানা রহস্যের পর্দা তিনি উন্মোচন করেছিলেন, যা বাঙালি জাতির কাছে শত-সহস্র বছর ধরে কারবালার চেয়েও ভয়াবহ নিষ্ঠুর ট্রাজেডি হিসেবে গণ্য হয়ে থাকবে। বিষাদ সিন্ধুর কবি মশাররফ হোসেন অথবা মেঘনাদবধ মহাকাব্যের রচয়িতা কবি মাইকেল মধুসূদন যদি বেঁচে থাকতেন, তাহলে তারা ১৫ আগস্ট নিয়ে ট্রাজিক মহাকাব্য রচনা করতেন এবং শত-সহস্র বর্ষ ধরে বিশ্বব্যাপী বাঙালি ভাই-বোনেরা ১৫ আগস্টে বুক চাপড়ে মহররমের মতো মাতম করতেন। বেডে শুয়ে দেয়া সাক্ষাৎকারের প্রথমে জনাব চৌধুরী খুব আবেগতাড়িত হয়ে গেলেন। তার দু’চোখের কোনা গড়িয়ে অবিরত ধারায় ফোঁটা ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল। প্রায় ৫-৭ মিনিট তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে থাকলেন। তারপর ধীরে ধীরে উন্মোচন করলেন ১৫ আগস্টের সেই খলনায়কদের আসল চেহারা। যে চেহারা দেশবাসী কখনও দেখতে পায়নি। তিনি প্রথমে বললেন, ‘আপন স্নেহে বঙ্গবন্ধু আমাকে সব মন্ত্রণালয়ের চেয়ে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েছিলেন, আমার নৈতিক সততার ওপর বিরাট আস্থা রেখে।’ তিনি বারবার বাকরুদ্ধ কণ্ঠে চোখের পানি মুছতে মুছতে বললেন, বঙ্গবন্ধুকে আমরা রক্ষা করতে পারিনি, এর দায়-দায়িত্ব শফিউল্লাহ, সেনাবাহিনী, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীর চেয়ে আমার সবচেয়ে বেশি ছিল। সব হারিয়ে, বঙ্গবন্ধুকে হারিয়ে আমরা যখন সর্বহারা হয়ে গেলাম, তখন বুঝলাম রাষ্ট্রনীতিতে কাউকে সহজে বিশ্বাস করতে নেই। বঙ্গবন্ধু আগস্টের প্রথম সপ্তাহে এই হুশিয়ারি ঠিকই দিয়েছিলেন। কিন্তু আমার অ্যাসেসমেন্টে মারাত্মক ভুল হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর অ্যাসেসমেন্ট সঠিক ছিল। বঙ্গবন্ধু খবর পাচ্ছিলেন এবং আমিও খবর পাচ্ছিলাম যে, সেনাবাহিনীর ভেতরে বিচ্ছিন্ন কিছু ষড়যন্ত্র চলছে। সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কয়েকজন এবং তাদের সঙ্গে সেনাবাহিনীর শীর্ষের দু’-একজন এ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। আমাদের কয়েকটি বন্ধু রাষ্ট্রের গোয়েন্দারাও সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রের বিষয়ে আমাদের বারবার সতর্ক করছিল। কিন্তু সন্তানতুল্যরা কেউ যে পিতার প্রাণ বধ করবে, এটা বঙ্গবন্ধুর বিশ্বাসই হতো না। জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর সামনে আমাকে উদ্দেশ করে বলেছেন, স্যার, বঙ্গবন্ধুর গায়ে আঁচড় লাগার আগে আমার বুক বুলেটে ঝাঁজরা করতে হবে। বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি সøেহে তাকে বুকে টেনে নিয়ে সন্তানের মতো আদর করতে। শেখ কামাল, জামালের মতো আদর করতে। আর আজ যখন পেছনের দিকে তাকাই, তখন ভাবি, কত বড় ভুল হয়ে গেছে!
’৭৫-এর মার্চে এসে বঙ্গবন্ধুর মুখ্য সচিব আমার মামা রুহুল কুদ্দুস প্রথমবারের মতো আকস্মিকভাবে জানতে পারলেন, সেনাবাহিনীর একটি চক্র দেশের রাষ্ট্রপতির টেলিফোনে গোপনে আড়ি পাতছে এবং তার সব কথাবার্তা ও গোপন আদেশ-নিষেধ গোপনে জেনে যাচ্ছে। দেশের রাষ্ট্রপতির কার্যক্রমের ওপর বিনা অনুমতিতে গোপন তৎপরতা চালানো দেশদ্রোহিতা ও সংবিধানের মারাত্মক লংঘন। এটা জানার পর তিনি বিস্মিত হয়ে গেলেন। তিনি প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক নুরুল ইসলামের সঙ্গে গোপনে সাক্ষাৎ করে জানতে চাইলেন আর্মির এ তৎপরতার বিষয়ে তিনি কিছু জানেন কি-না। অথবা তার কোনো অনুমোদন এতে আছে কি-না? তিনিও বিস্মিত হয়ে গেলেন। তখন রুহুল কুদ্দুস তাকে এ বিষয়ে কোথাও মুখ না খোলার জন্য বললেন এবং এ বিষয়ে তিনি যে তার সঙ্গে কথা বলেছেন, সে বিষয়েও দ্বিতীয় কারও সঙ্গে আলোচনা না করার জন্য বললেন। এ বিষয়ে তিনি আমাকে তার স্ত্রী হামিদা কুদ্দুস, তার পুত্র (শেখ হাসিনার সাবেক বিশেষ উপদেষ্টা) এহসানুল আমিন বাবুর সামনে বলেছেন, ‘অতঃপর আমি বঙ্গভবনে বঙ্গবন্ধুর অফিসে গিয়ে তার কক্ষে উপস্থিত তাহেরউদ্দীন ঠাকুর ও অন্যদের সরিয়ে দিয়ে সব ঘটনা বললাম। তিনি আমার দিকে কিছুক্ষণ নির্বাক তাকিয়ে রইলেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি সেনাবাহিনীকে আপনার টেলিফোন বাগিং (আড়িপাতার) করার জন্য বলেছেন? নাকি তারা আপনার অনুমতি নিয়ে এ কাজ করেছে? সরলপ্রাণ বঙ্গবন্ধু হেসে বললেন, ‘এমন কোনো অনুমতি আমি কাউকে দেইনি। তবে তোমাদের সবকিছুতে সন্দেহ। তারা আমার সন্তান। তারা এসব নিশ্চয়ই আমার ভালোর জন্য করেছে।’
বঙ্গবন্ধুর হিমালয়সম বিশ্বাস ছিল, কোনো বাঙালি কোনোদিন তাকে হত্যা করবে না। বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতিকে ভালোবেসে তিনি তার জীবন-যৌবন, ধন-মান, সাধ-আহ্লাদ সব কারাগারের অন্ধকারে বিসর্জন দিয়েছেন। তার প্রিয় জীবনের চেয়েও প্রিয়তম বাঙালি জাতির জন্য বারবার হাসিমুখে দৃপ্ত পায়ে ফাঁসির মঞ্চে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। বছরের পর বছর কারাগারের অসীম অন্ধকারে বিনিদ্র রজনী তার কেটে গেছে, প্রিয় সন্তানদের চেহারা এক পলক দেখার সৌভাগ্য হয়নি। মুক্তিদূত মুজিব ১৯৭১ সালে হাজার বছরের শৃংখলিত বাঙালি জাতির শৃংখল টুটে দিয়ে বাঙালি জাতিকে আজাদ করে দিয়েছেন এবং তাদের বসবাসের জন্য বিশ্বের বুকে ‘বাংলাদেশ’ নামে স্বাধীন ও সার্বভৌম একটি দেশ তাদের উপহার দিয়েছেন, যেখানে গত ৬০ বছর যুদ্ধরত ফিলিস্তিনিদের ও কাশ্মীরিদের একটি স্বাধীন দেশ হয়নি। 
১৪ আগস্ট রাত ১২টায় যখন ডিজিএফআইয়ের তদানীন্তন পরিচালক গোপালগঞ্জের অধিবাসী স্কোয়াড্রন লিডার আজিজ বঙ্গবন্ধুকে ঘুম থেকে তুলে তার অনুমতি প্রার্থনা করে বললেন, ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে খুব সন্দেহপূর্ণ কিছু ঘটনা ঘটছে বলে আমরা ক্যান্টনমেন্ট সিলগালা করে দিতে চাই। সেই অটল বিশ্বাসে বঙ্গবন্ধু তার মাথায় স্নেহমাখা হাতের পরশ বুলিয়ে বললেন, ‘তুই খেয়েছিস? না খেয়ে থাকলে কামালের মাকে ডেকে তুলি, কিছু খেয়ে নে। ... ওরে আমাকে কেউ মারবে না। তোর মতো একই রকম কথা রোজ রাতে শুনে আমি ঘুমাতে যাই। আবার সকালে ঘুম ভেঙে উঠে দেখি আমি বেঁচে আছি। তোর কাছে একই কথা শুনলাম। এখন ঘুমাতে যা। কাল সকালে আসিস। তোর সাথে বসে সজনে ফুলের ভাজি দিয়ে একসাথে নাশতা খাব।’
স্কোয়াড্রন লিডার আজিজের অসীম দুঃখ যে, তিনি খুনিদের প্রতিরোধে ব্যর্থ হন বলে তাকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ১৫ আগস্ট সকালে সজনে ফুলের নাশতা খাবার শেষ ইচ্ছা পূরণ হয়নি! (সংক্ষেপিত)
মুসা সাদিক : স্বাধীন বাংলা বেতারের ওয়ার করেসপন্ডেন্ট, বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব

দলীয়করণ by আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

বহুমুখী এক ব্যক্তিত্ব আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। অধ্যাপনা, সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা ও লেখালেখির বাইরে তিনি একজন সফল সংগঠক। তার স্বপ্ন ও চিন্তার ফসল বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। যা আজ দেশব্যাপী বইপড়া আন্দোলনের সূতিকাগার। লাখো ছাত্র-ছাত্রীর মেধা ও মননের বিকাশে নিরন্তন কাজ করছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। গড়ে তুলছে আগামীর নেতৃত্বকে। সফল সংগঠক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ২৫শে জুলাই পা রেখেছেন পঁচাত্তরে। সবছাপিয়ে লেখালেখির নানা ক্ষেত্রে তিনি রেখেছেন প্রতিভার স্বাক্ষর। সমস্যাসঙ্কুল দেশ নিয়ে সচেতনভাবে তিনিও চিন্তা করেন। গভীর অন্তদৃষ্টি দিয়ে তা লেখার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন। বাংলাদেশে গণতন্ত্র চর্চার গতি-প্রকৃতি নিয়ে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ-এর লেখা ‘গণতন্ত্র ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতা’ বইটি ২০০৯ সালে মাওলা ব্রাদার্স থেকে প্রকাশিত হয়। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ-এর পঁচাত্তরতম জন্মদিনের চলমান সময়ে মানবজমিন অনলাইন পাঠকদের উদ্দেশে বইটির খণ্ড খণ্ড অংশ প্রকাশিত হলো-
১...
১৯৯০ সালের শেষ দিকে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে, আমার বড় মেয়ে তখন একদিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরে খানিকটা দার্শনিকসুলভ ভঙ্গিতে বলল, ‘এরশাদ, দেখো আর বেশিদিন ক্ষমতায় থাকবে না।’
শুনে অবাক লাগল। এমন মহাশক্তিধর এরশাদ ক্ষমতা থেকে পড়ে যাবে? কী করে এ কথা বিশ্বাস করা যায়?
বললাম, কীভাবে বুঝলে? ও বলল, স্কুলের ছেলেমেয়েদের একদমই বাড়ি-ঘরে ধরে রাখা যাচ্ছে না। সুযোগ পেলেই পালিয়ে মিছিলে চলে যাচ্ছে। শুনে মনে হলো, তাই তো। খেয়ালই তো হয়নি। বড়রা, বয়স্করা, সজাগ সচেতন মানুষ। তারা মিছিল বা মিটিংয়ে যেতেই পারে। কিন্তু স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েদের যাওয়া খুবই আলাদা ব্যাপার। তারাও যখন জড়িয়ে পড়ছে তখন বুঝতে হবে ব্যাপারটা জাতীয় আবেগে পরিণত হয়েছে; দেশের সবচেয়ে সচেতন মানুষটি থেকে সবচেয়ে অবোধ মানুষটি কেউ-ই এই আন্দোলনের বাইরে নেই।
মনে পড়ল এর একুশ বছর আগে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে ঠিক একই দৃশ্য আমরা দেখেছিলাম। বড়দের পাহারা এড়িয়ে কিশোর-তরুণরা এভাবেই পালিয়ে যেত রাস্তায়। ফলে লৌহমানব আইয়ুবের পতন ঘটে গিয়েছিল।
১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানের কথা এখনও চোখের সামনে ভাসে। কী তোলপাড় সবার মধ্যে! ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ দাবিতে রাজপথে বাঁধভাঙা মানুষের কী স্বতঃস্ফূর্ত জোয়ার! মুক্তির জন্যে গণমানুষের ভেতর এ ধরনের উন্মাদনা একটা জাতির জীবনে রোজ ঘটে না।
এরশাদের পতনে আমরা ভেবেছিলাম চিরদিনের জন্যে স্বৈরতন্ত্র বিদায় নিল। মুক্ত হল গণতন্ত্র। এবার উদার আবহাওয়ায় প্রাণখুলে গণতন্ত্রের চর্চা হবে। কিন্তু গত পনেরো বছরের গণতন্ত্রের চেহারা দেখে সে ভুল আমাদের ভেঙেছে। আমরা ধীরে ধীরে টের পেয়েছি স্বৈরশাসনের হাত থেকে মুক্তি পাবার বদলে আমরা গভীরতর স্বৈরাচারের হাতে বন্দি হয়েছি। পার্থক্য এই: আগে আমরা বন্দি ছিলাম সামরিক স্বৈরতন্ত্রের হাতে, এখন গণতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্রের হাতে। যখন যে দল এদেশে ক্ষমতায় আসছে সে দল দেশ শাসন করে চলছে নিরঙ্কুশ স্বৈরাচারীর আদলে, সবরকম গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে। ফলে গণতন্ত্রের নামে একটা নিষ্ঠুর অকর্ষিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা আজ এ দেশে জেঁকে বসে গেছে।
২...
শাসকের ব্যক্তিত্বের অসাধারণত্ব উদ্ভাসের কারণে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় যদি স্বৈরতন্ত্রের রঙ লাগে তাতে অধিকাংশ সময় ক্ষতির চেয়ে লাভই বরং বেশি, কেননা রাষ্ট্রকে তখন শাসন করে শ্রেষ্ঠ মানুষেরা। কিন্তু এই স্বৈরশাসন যদি শাসকের যোগ্যতার থেকে উ™ভূত না হয়ে উ™ভূত হয় অন্য কোনো উৎস থেকে, কোনো অনভিপ্রেত বিধান বা ক্ষতিকর সাংবিধানিক অনুমোদনের কারণে তবে তা জল্লাদের মতো জাতির বুকে বসে তার রক্তপান করতে থাকে। জাতিকে তা তখন এমন এক দুরপনেয় সংকট ও সংঘাতের মধ্যে ঠেলে দেয় যা থেকে জনগণ ও রাজনীতিকে উদ্ধার করা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। প্রথমে এই সংকটের মূল কারণটি নিয়ে আলোচনা করতে চাই:
এরশাদের বিদায়ের পর আমরা যা পেয়েছি তা গণতন্ত্র তো নয়ই, বরং প্রায় এর উল্টো। জাতি ইতিমধ্যেই এর নাম দিয়েছে পুরুষানুক্রমিক রাজতন্ত্র। এ এমন এক রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেখানে গণতন্ত্র পুরোপুরি গণবিচ্ছিন্ন ও জাতীয় সমৃদ্ধির প্রধানতম প্রতিবন্ধক, জনগণের সুখ-সম্ভাবনা ভালোমন্দ রাজনীতিতে প্রায় সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত, এমনকি গণতন্ত্রের বিকাশ ও সমৃদ্ধিও বিভিন্ন দলের দল-প্রধানদের দ্বারা নির্দয়ভাবে শ্বাসরুদ্ধ। আজ জাতির ভাগ্য প্রধানত দুজন ব্যক্তির হাতে জিম্মি এবং এর ধারাবাহিকতায় দু’টি পরিবারের হাতে। আজ কি কেউ ভাবতে পারে শেখ মুজিব বা জিয়াউর রহমানের পরিবারের সদস্য না হয়ে কেউ এ দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন? এমনকি তিনি যদি দেশের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষটিও হন? কিছুদিন আগে তারেক রহমান শেখ হাসিনাকে ভর্ৎসনা করতে গিয়ে আওয়ামী লীগের সদস্যদের পরামর্শ দিয়েছেন তারা যেন শেখ হাসিনাকে সরিয়ে তার জায়গায় তার ছোট বোন শেখ রেহানাকে নেতৃত্বে বসায়। এখন প্রশ্ন আওয়ামী লীগাররা যদি শেখ হাসিনাকে সত্যি সত্যি অযোগ্য মনে করে তবে তার জায়গায় শেখ রেহানাকে বসাতে হবে কেন? তার চেয়ে যোগ্য মানুষ কি দলটিতে নেই! গণতন্ত্র তো জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের শাসন! আমাদের গণতন্ত্রে দলের যোগ্যতম মানুষদের দলের নেতৃত্বে আসার পথ কেন রুদ্ধ? কেন কেবল একচ্ছত্র পারিবারিক আধিপত্য? এই যদি হবে তবে পৃথিবী জুড়ে বিপুল রক্তযুগান্তরের পথ ধরে রাজতন্ত্রকে হটিয়ে গণতন্ত্র এসেছিলই-বা কী করতে। তারেক রহমানের কথা থেকে তার মনের অবচেতন মনোভাবটা স্পষ্ট: কথাটি ধৃষ্টতাপূর্ণ ও উদ্ধত। এর মূল কথা: বাংলাদেশের ভাগ্য আজ তাদের দু’টি পরিবারের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। শেখ হাসিনা না হলে শাসন করবেন শেখ রেহানা, খালেদা জিয়া না হলে তার ছেলে তারেক রহমান। এদের বাইরের চৌদ্দ কোটি মানুষ মোটামুটি জীবজন্তু। জনগণের প্রতি দল-প্রধানদের মনোভাব যে কতখানি তাচ্ছিল্যপূর্ণ তার আরেকটা উদাহরণ দিই। কিছুদিন আগে ২০০৬-এর অক্টোবরে, নির্বাচন কমিশন আর রাজনৈতিক সংস্কার নিয়ে দলদুটির মধ্যে মহাসচিব পর্যায়ে আলোচনা চলছিল। জাতির জন্যে অসম্ভব সংকটপূর্ণ সময় সেটা। কেননা দুটি দলের সঙ্গে সারাদেশ তখন মুখোমুখি হয়ে রয়েছে সংঘাতপূর্ণ অবস্থায়, মহাসচিব পর্যায়ের সমঝোতা ব্যর্থ হলে গৃহযুদ্ধ বেধে যাওয়ার সম্ভাবনা, অথচ আলোচনায় অগ্রগতি নেই। এদিকে খালেদা জিয়া সরকারের মেয়াদ আর মাত্র ১৪ দিন। এর মধ্যে ঈদ আর সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে সবকিছু বন্ধ থাকবে ৬ দিন, দুটি দলের ভেতর সমঝোতা হলেও সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডেকে কোনো কিছু সংস্কার করার সময় ফুরিয়ে যাবে। এসব টান টান উত্তেজনায় যখন দেশের মানুষ উৎকণ্ঠায় ছিঁড়ে যাচ্ছে, সেই সময় খালেদা জিয়া চলে গেলেন আরবে ওমরাহ করতে, যা জাতীয় স্বার্থের কথা ভেবে দিনকয় পিছিয়েও দেওয়া যেত। যখন তারা ফিরবেন তখন ঈদের ছুটির পর হাতে সময় থাকবে মাত্র তিন-চার দিন। হয়ত তা-ও নয়। কথাটা বললাম, এ কথাটা বোঝাতে যে নিজেদের ক্ষমতা আর স্থায়িত্বের ব্যাপারে তারা কী পরিমাণ নিশ্চিত ও উদ্বেগহীন। সামরিক একনায়কতন্ত্রীদের ক্ষমতা অবৈধ বলে এবং তাদের ক্ষমতার উৎস ক্যান্টনমেন্ট বলে তাদের তবু ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কা থাকে। কিন্তু দেশের জনগণকে জিম্মি করা এই দল-প্রধানদের নিজেদের অবস্থান নিয়ে ন্যূনতম দুর্ভাবনা নেই। কেননা তাদের এই স্বৈরতন্ত্র এরশাদ, আইয়ুব বা ইয়াহিয়ার সামরিক স্বৈরতন্ত্রের মতো অবৈধ নয়। এ বৈধ এবং সংবিধানসম্মত। গোটা জাতি আজ এমনি নিñিদ্র স্বেচ্ছাচারী এই সংবিধান-সমর্থিত স্বৈরতন্ত্রের হাতে বন্দি।
৩...
কেবল এঁরা নন, দেশের প্রতিটি দল-প্রধানের স্বৈরতান্ত্রিক অবস্থানই আজ এমনি নিরঙ্কুশ। একটা ছোট্ট উদাহরণ দিনই। ১৯৯০ সালে ক্ষমতা হারালেও এরশাদ আজও রাজনীতিতে সক্রিয়। এখনও তিনি তার প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টির ক্ষীয়মাণ দলটির প্রধান। সংসদে এই দলের সদস্যসংখ্যা আজও বেশ। কিছুদিন আগে বিএনপি সরকারের চাপের মুখে সম্পূর্ণ একক সিদ্ধান্তে তিনি ২০০৬ সালের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার দলের একটি বড় অংশ এই সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ছিল। সেদিন টিভির পর্দায় দেখলাম, ব্যাপারটি নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি আঙুল নেড়ে নেড়ে বলছেন, আমার দল কোন পক্ষে যাবে না যাবে এটা সম্পূর্ণভাবে আমার ব্যক্তিগত ইচ্ছার ব্যাপার। এখানে অন্য কারো কথা বলার অধিকার নেই। ভেবে দেখুন, কথাটি আমাদের গণতান্ত্রিক দেশটির একটি গণতান্ত্রিক দলের প্রধানের। দেখুন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে কী সর্বময় ক্ষমতা তার! এই স্বৈরতন্ত্রীর নয় বছরের সামরিক শাসনামলেও তো সিদ্ধান্ত নেবার এমন নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা বা দুঃসাহস তার ছিল না। অন্ততপক্ষে সেনাবাহিনীর ইচ্ছা-অনিচ্ছা বা সমর্থন-অসমর্থনের ধার তাকে ধারতে হত। কিন্তু আজ একটি গণতান্ত্রিক দলের প্রধান হওয়ায় সামরিক একনায়কতন্ত্রীদের চাইতেও তিনি ক্ষমতাবান। কারণ তিনি এখন তার দলের নিরঙ্কুশ প্রভু। স্বাধীন ইচ্ছায় নিজের দল বা তার অনুসারী বা সমর্থকদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি এখন যেমন খুশি ছিনিমিনি খেলতে পারেন। তাকে বাধা দেবার কেউ নেই। কেবল তিনি নন, বাংলাদেশের রাজনীতির মূল ধারা দুটির প্রধান শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া থেকে শুরু করে প্রতিটি ছোট বড় দলের প্রধানই আজ নিজ নিজ দলের এমনি নিরঙ্কুশ কর্তা। জনগণ আজ মূলত দেশের দু’টি বিরোধী রাজনৈতিক পতাকার নিচে সংঘবদ্ধ। ফলে দলগুলো থেকে গণতন্ত্র পুরো বিদায় নিয়েছে এবং দেশের গণতন্ত্রের রূপটি পুরোপুরি স্বৈরতান্ত্রিক রূপ নিয়েছে।
এখন প্রশ্ন দল-প্রধানদের এমন অফুরন্ত ক্ষমতার উৎস কি? না শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, এরশাদ বা অন্য কেউ ষড়যন্ত্র করে এই স্বৈরতন্ত্র তৈরি করেননি। এই দুর্ভাগ্যের মূল উৎস খোদ বাংলাদেশের সংবিধান। এর ৭০ অনুচ্ছেদ। মোটামুটি এই অনুচ্ছেদটিই আজ এভাবে গণতন্ত্রকে স্বৈরাচারী করে ফেলেছে ও দেশের জনগণকে শৃঙ্খলিত করে তাদের সবাইকে দেশের জনাকয় রাজনৈতিক দল প্রধানের ভৃত্যে পরিণত করেছে। ৭০ অনুচ্ছেদ আমার এই লেখাটির একমাত্র বিষয় নয়। আমি শুধু দেখাতে চেষ্টা করবো অনুচ্ছেদটির সুদূর প্রভাবে আমাদের গণতন্ত্র কীভাবে আপাদমস্তক স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে পড়েছে; এবং গণতন্ত্র - যা মূলত স্বৈরতন্ত্রবিরোধী একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা তা কোনো কারণে স্বৈরাচারী হয়ে পড়লে জাতির জন্যে কত দিক থেকে ধ্বংসাত্মক ও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে যে ক্ষতি সামরিক বা অন্যান্য স্বৈরতন্ত্রের চাইতেও অনেক গভীর ও সুদূরপ্রসারী।
৪...
কথার শুরুতেই আমি সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সম্বন্ধে পাঠককে প্রাথমিক ধারণা দিয়ে নিতে চাই। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে যে গণতন্ত্র চালু রয়েছে তা সংসদীয় গণতন্ত্রের হুবহু ছকটি এখানে নেই। ৭০ অনুচ্ছেদেও এমন কিছু নতুন বিষয় সংযোজিত হয়েছে যার ফলে এই দুটি দেশের গণতন্ত্রের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য ঘটে গেছে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র এতে যে কেবল সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল চরিত্রটি হারিয়ে ফেলেছে তাই নয়, গণতন্ত্র বিষয়টিকেই প্রায় পরিত্যাগ করেছে। কীভাবে তা ঘটেছে সে ব্যাপারটি শাদামাটাভাবে এখানে তুলে ধরছি।
বৃটিশ গণতন্ত্রে একজন নির্বাচিত সাংসদ সংসদে তার দলের উত্থাপিত কোনো প্রস্তাব ইচ্ছা করলে সমর্থন করতে পারেন অথবা প্রস্তাবটিকে কোনো কারণে জাতির জন্যে ক্ষতিকর বিবেচনা করলে, তার সমালোচনা করতে এমনকি তার বিরুদ্ধে ভোট পর্যন্ত দিতে পারেন। অর্থাৎ চাইলে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে তার দলের বিরুদ্ধে ভোট পর্যন্ত দিতে পারেন। অর্থাৎ চাইলে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে তার দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারেন। এতে সংসদে তাকে সদস্যপদ হারাতে হয় না। এই পুরো ব্যাপারটাকেই বলে ফ্লোর ক্রসিং। কিছুদিন আগে ইংল্যান্ডের সংসদে লেবার পার্টির নেতা প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাতের জন্যে ইরাকের বিরুদ্ধে আমেরিকার সঙ্গে যৌথভাবে যুদ্ধ করার প্রস্তাব আনলে তার দলের বহু সদস্য এর বিরুদ্ধে ভোট দেয়, ফলে শুধু নিজ দলের সদস্যদের সমর্থন নিয়ে তিনি সংসদে এই প্রস্তাব পাস করাতে পারেননি। পেরেছিলেন সংসদের বিরোধী দলের বিরাট সংখ্যক সদস্য এর পক্ষে ভোট দেওয়ায়। কাজেই ফ্লোর ক্রসিং কথাটার অর্থ দাঁড়াল: একজন সাংসদ কোনো একটি দলের পক্ষ থেকে নির্বাচিত হলেও সংসদের ভেতরে তিনি একজন সম্পূর্ণ স্বাধীন ব্যক্তি- এমন একজন জননেতা যার দায়বদ্ধতা বা জবাবদিহিতা কেবলমাত্র তার দলের কাছে নয়, তার নির্বাচনী এলাকার জনগণের কাছে (যাদের তিনি সরাসরি প্রতিনিধি), তার ব্যক্তিগত বিবেকের কাছে এবং বড় অর্থে গোটা জাতির কাছে। এই ব্যবস্থায় একটি আইন সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাংসদের ভোটে পাস হয়, কেবলমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সদস্যদের বাধ্যতামূলক ভোটে নয়। গণতান্ত্রিক আদর্শের মূল কথা এটিই।
প্রথাটি কেবল বৃটিশ সংবিধানে নয়, কমবেশি পরিবর্তিত অবস্থায় অনেক দেশের সংবিধানেই রয়েছে। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে হুবহু বৃটিশ আদলে এই ধারাটি পাকিস্তানের সংবিধানেও ছিল। কিন্তু বৃটিশ সাংসদদের তুলনায় আমাদের সাংসদদের রাষ্ট্রসম্পর্কিত ভাবনায় অপ্রতুলতা, আত্মমর্যাদাবোধ, বিবেক বা জাতীয় কল্যাণের অঙ্গীকার বা দায়বদ্ধতা নিম্নমানের ছিল বলে এবং প্রায় সবাই মোটামুটি সুবিধাবাদী চরিত্রের ছিলেন বলে এর ফল হয়েছিল আত্মঘাতী। নিজ সিদ্ধান্তে দল ত্যাগের ক্ষমতা থাকায় তারা মন্ত্রিত্বের মতো কোনো পদ বা এরও চেয়ে তুচ্ছ কোনো লোভ বা লাভের বিনিময়ে নির্বিকারে নিজ নিজ দল ছেড়ে অন্যদলে যোগ দিয়ে বসতেন এবং অনেক সময় বড় ধরনের প্রলোভনের মুখে দলবেঁধে ভিন্ন দলে চলে যেতেন। এভাবে একদল থেকে সাংসদদের ভাগিয়ে অন্যদলে নেয়ার ইংরেজি নাম ‘হর্স ট্রেডিং’। (ইংরেজি ভাষায় বাগধারাটির জনপ্রিয়তা থেকে বোঝা যায় ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টেও একসময় ব্যাপারটা হয়ত জমজমাটভাবেই চলত)। পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে ও পূর্বপাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদে পঞ্চাশের দশকে এই হর্স ট্রেডিং এমন ব্যাপকভাবে শুরু হয় যে সরকারগুলোর স্থিতিশীলতা পুরো বিপন্ন হয়ে পড়ে’ হর্স ট্রেডিংয়ের ফলে ঘন ঘন সরকার পতন শুরু হয়। ১৯৫৬ সালে আবু হোসেন সরকারে নেতৃত্বে গঠিত সরকার মাত্র একদিনের মাথায় ক্ষমতা থেকে পড়ে যায় এবং সাংসদদের স্বার্থলোলুপতা ও নৈরাজ্যের এক মর্মান্তিক পর্যায়ে প্রাদেশিক পরিষদের ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী (সেদিন স্পিকার হিশেবে কার্যরত) অধিবেশন চলাকালে মারমুখো সদস্যদের আক্রমণে পরিষদের মধ্যেই নিহত হন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার এই নৈরাজ্য সে সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান আইয়ুব খানের সামনে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের সুবর্ণ সুযোগ খুলে দেয় এবং রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতা এবং দেশের বিরাজমান বিশৃঙ্খলতার অজুহাতে ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি করে তিনি পাকিস্তানের সর্বময় কর্তা হয়ে বসেন। দীর্ঘ তেরো বছর শ্বাসরুদ্ধকর সামরিক বুটের নিচে পদদলিত থাকার পর ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং স্বাধীনতাযুদ্ধের ভেতর দিয়ে দেশ ঐ অশুভ দানবের কবল থেকে মুক্ত হয়।
গণতন্ত্র খুইয়ে রাজনৈতিক নেতারা গভীর দুঃখের সঙ্গে অনুভব করেন যে জাতির গণতন্ত্র হারানোর অন্যতম কারণ সংবিধানের ফ্লোর ক্রসিং ব্যবস্থা এবং বৃটিশ গণতন্ত্র তাদের শ্রদ্ধার জিনিশ হলেও দুদেশের জনগণের সংস্কৃতি ও মূল্যবোধগত সুবিপুল ব্যবধানের কারণে ঐ সংবিধানের সবকিছু অন্ধের মতো অসুনরণ করা সুবিবেচনার কাজ হয়নি। এই ভাবনার ফলশ্রুতিতে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান তৈরির সময় সরকারের স্থিতিশীরতার কথা মাথায় রেখে ফ্লোর ক্রসিং ব্যাপারটি নিষিদ্ধ হয়। সংবিধানের যে অনুচ্ছেদ ফ্লোর ব্যবস্থা নিষিদ্ধ করে সেই অনুচ্ছেদের নামই ৭০ অনুচ্ছেদ। ১৯৭২ সালের সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদ যুক্ত হলে রাজনৈতিক মহল মোটামুটি হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। সরকারের স্থিতিশীলতাকে যে শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত করা গেছে তা ভেবে স্বয়ং বঙ্গবন্ধুও সে সময় নাকি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিলেন।
৫...
এবার আসুন আমরা দেখি ফ্লোর ক্রসিং সম্বন্ধে এই অনুচ্ছেদে কী বলা হয়েছে:
“৭০। কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি-
ক. উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন
খ. সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোট প্রদান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাহার আসন শূন্য হইবে, তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোনো নির্বাচনে সংসদ সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না।
তাহলে দাঁড়াল কি? দাঁড়াল: সংসদের আইন প্রণয়নে সাংসদদের নিজস্ব কোনো মতামত নেই। দলের মতই তাদের মত। অর্থাৎ বৃটিশ সাংসদদের মতো তারা স্বাধীন জনপ্রতিনিধি নন। জাতীয় স্বার্থ বা ব্যক্তিগত বিবেক তার আচরণে অবাঞ্ছিত। শেষ বিচারে দলীয় সিদ্ধান্তের তিনি একজন অনুগত ধারক ও সেবক মাত্র। যতক্ষণ তার এই আনুগত্য প্রশ্নাতীত ততক্ষণই তিনি সাংসদ। এর একটু এদিক্ল-সেদিক হলেই তিনি দল ও সংসদ থেকে বহিষ্কৃত ও ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত। এক কথায় দলের সর্বময় কর্তৃত্বের নিচে তিনি অন্তঃসারহীন অস্তিত্বহীন একটি ছায়া-মানুষ কেবল। যে দলের সাংসদ বা মন্ত্রীরাই এতখানি অর্থহীন সে দলের কোটি কোটি সাধারণ নেতাকর্মীর অবস্থা কী তা সহজেই বোঝা যায়। অর্থাৎ আমাদের গণতন্ত্রে একটা জিনিশই কেবল ঝাণ্ডার মতো উন্নত- তার নাম দলীয় কর্তৃত্বের সার্বভৌমত্ব। বাকি গোটা দল, দলের তাবৎ সদস্য বা নেতাকর্মীÑ এমনকি সমর্থকÑ সবার কাজ সেখানে একটাই: ঐ সর্বশক্তিমান দলীয় কর্তৃত্বের পায়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত হয়ে ঐ শক্তির স্তম্ভকে মজবুত ও দীর্ঘস্থায়ী করে রাখা।
স্পষ্টই বোঝা যায় গণতন্ত্রের ভিতকে পাকাপোক্ত করার স্বপ্ন নিয়ে যে বিধান তৈরি করা হয়েছিল তা আমাদের গণতন্ত্রকে শুধু ধ্বংস করেনি, একে নিখাদ স্বৈরতন্ত্রে পরিণত করেছে। সামরিক স্বৈরতন্ত্রের চেয়েও এ স্বৈরতন্ত্র কঠোর ও নির্মম। শেখ মুজিবুর রহমানের অধিকাংশ উদ্যোগের পেছনে জনগণের বিপুল আস্থা ও অনুমোদন ছিল বলে তার আমলে ব্যাপারটা ঠিকমতো চোখে পড়েনি। কিন্তু জিয়াউর রহমান আর এরশাদের সামরিক শাসন পেরিয়ে গণতন্ত্রের যুগ আসার পর এ এখন পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে জেগে উঠেছে।
এখানে একটা কথা। সংবিধানে দল বলে যা বোঝানো হয়েছে শেষ বিচারে তার মানে কি? আমরা ধারণা, এর মানে একটাই: ‘দল-প্রধান’। যেহেতু তিনিই দলের সর্বময় নিয়ন্তা। ফলে দলের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্বের নামে এখন প্রতিটি দলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দল প্রধানের কর্তৃত্ব। এক কথায়, তার একনায়কত্ব। দেশের সব ক’টি দলই আজ তাদের দল-প্রধানের হাতে জিম্মি। তার ইচ্ছা-অনিচ্ছা, খেয়াল-খুশি, ভালো-মন্দ, বুদ্ধি-নির্বুদ্ধিতা, ক্ষুদ্রতা বা লোভের হাতে দল আজ পুরোপুরি একটা খেলনা। তার দল রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকলে তিনি হয়ে দাঁড়ান স্বৈরশাসক। যেহেতু দল নামটির আড়ালে দাঁড়িয়ে গোটা দলটিকেই তিনি পায়ের নিচে আগাপাশতলা পিষ্ট করে রেখেছেন। এই পদ্ধতি দলের ভেতর নেতাকর্মীদের স্বাধীন মত প্রকাশের অর্থাৎ গণতন্ত্র চর্চার সুযোগ প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। সার্বভৌম ক্ষমতায় বলীয়ান হয়ে দল-প্রধান তার দলের শাসনতন্ত্রকে এমনভাবে নিজের অনুকূলে রচনা ও ব্যবহার করছেন যাতে লিখিত বা অলিখিতভাবে দলের ভেতর তার একনায়কত্ব নিরঙ্কুশ হয়। এভাবে দলের মধ্যে গণতন্ত্রের মৃত্যু ঘটায় দেশের রাজনীতিতেও তা ধ্বংস হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দল-প্রধানেরা একনায়কতন্ত্রের দিকে ঝুঁকবেন এ তো খুবই স্বাভাবিক। যিনি সাংবিধানিকভাবেই সর্বক্ষমতার অধিকারী তিনি কেন দলের ভেতর গণতন্ত্র দিয়ে অযথা নিজের বিপত্তি বাড়াবেন কিংবা নিজের ক্ষমতা খর্ব করবেন। ফলে যোগ্য হোক অযোগ্য হোক, তার সন্তান-স্বজনেরাই যে পুরুষানুক্রমে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ শাসন করবে তা অলিখিতভাবে নির্ধারিত হয়ে গেছে। নির্বাচনে দু’দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা তাদের ছাপানো পোস্টারের ওপরের দিকে দল-প্রধানের দু’তিন পুরুষের ছবি ছাপার পর যেখানে নিজের ছবিটি ভয়ে দ্বিধায় এবং অবনতভাবে নিবেদন করে তা থেকেও বোঝা যায় কীভাবে পুরুষানুক্রমিক রাজনীতির ধারা আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের পুরো উপেক্ষা করে জাতীয় জীবনে জগদ্দল পাথরের মতো জেঁকে বসেছে।
৬...
গণতন্ত্র জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের শাসন। এই ব্যবস্থায় দেশের সবচেয়ে  যোগ্য ব্যক্তিরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ধাপ ডিঙিয়ে দলের শীর্ষে উঠে দেশ শাসন করে। কিন্তু বর্তমানে প্রক্রিয়াটি উল্টে যাওয়ায় একজন রাজনীতিবিদ যত যোগ্য বা প্রতিভাসম্পন্নই হোন না কেন, তার অস্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ দলের দল-প্রধানের অনুগ্রহ বা আশীর্বাদের ওপরেই পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। সংবিধানের ঐ একটিমাত্র অনুচ্ছেদের জন্যে আজ দেশের শ্রেষ্ঠ মানুষদের রাজনীতির শীর্ষে যাবার পথ প্রায় রুদ্ধ হয়ে পড়েছে! নেতারা এখন নিচ থেকে ওপরে যাচ্ছে না, ওপর থেকে নিচে আসছেন। মোদ্দা কথা, আমাদের রাষ্ট্রশাসকরা আজ আসছেন দেশের মাত্র দুটো পরিবার থেকে। এত ছোট্ট জায়গা থেকে আসা মানুষদের মধ্যে দেশের যোগ্যতম ব্যক্তিদের পাওয়ার নিশ্চয়তা কোথায়? উচ্চতর নেতৃত্বের অভাবে দেশ আজ দিকনির্দেশনাহীন ও ধ্বংসোন্মুখ। সাহিত্যিক আবুল ফজল তার লেখকের রোজনামচায় চল্লিশ বছর আগে দুঃখ করে লিখেছিলেন, বৃদ্ধ হয়ে মৃত্যুর দরোজায় এসে তিনি দাঁড়ালেন কিন্তু কোনো সভ্য নেতার দ্বারা শাসিত হওয়ার সৌভাগ্য পেলেন না। আজ পর্যন্ত আমাদের জন্যে হয়ত কথাটা অনেকখানিই সত্যি। সুকান্ত লিখেছিলেন, এদেশে জন্মে পদাঘাতই শুধু পেলাম। আমাদেরও একই অবস্থা। ব্যক্তিগত যোগ্যতায় যারা হয়ত নিজ নিজ দলের সাধারণ সদস্যের অতিরিক্ত কিছু হতেন না তারাই আজ দলের সর্বক্ষমতার অধিকারী। এটা গণতন্ত্রের স্বাস্থ্যময় বিকাশের অন্তরায়। ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে, একটা জাতি সেই মাপের নেতাই পায় যার সে যোগ্য। দুঃখের সঙ্গে এককেসময় মনে হয় জাতি হিসেবে আমরা কি এমনই অযোগ্য যে এমন নেতারাই আমাদের বিধিলিপি হয়ে গেল? একজন সামরিক শাসক যদি পেতেই হয়, তবে সামরিক বিভাগে এত উজ্জ্বল মানুষ থাকতে এরশাদের মতো একজন দুর্নীতিপরায়ণ মানুষই হবে আমাদের ভাগ্য? গণতন্ত্রের সময়ই-বা কী ঘটছে?
দলের সাধারণ মানুষের নেতৃত্বের হাতে উৎকৃষ্টরা শাসিত হতে থাকায় আজ এদেশের দলগুলো হয়ে পড়েছে হতোদ্যম, বিশৃঙ্খল। দল-প্রধান এবং তার অনুগৃহীত কিছু মানুষ ছাড়া দলে আজ আর সুখী মানুষ নেই। বাকি সবাই ক্ষমতাবর্জিত, ক্ষুব্ধ ও হতাশাক্রান্ত। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সাংসদ ও মন্ত্রীদের যে গুরুত্ব বা মর্যাদা থাকে তা তাদের নেই। সবাই কার্যত আজ পার্টি প্রধানের অলিখিত সেবক। আজ বাংলাদেশে কোনো দলে টিকে থাকার ও উন্নতি করার একমাত্র যোগ্যতা হচ্ছে পদলেহন, তোয়াজ আর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ। এর কোথাও একচুল এদিক ওদিক হলে সে নিক্ষিপ্ত হয় কালের ভাগাড়ে বা বিস্মৃতির আঁস্তাকুড়ে। আজ ছোট বড় যে কোনো জনসভার বক্তৃতায়, পোস্টারে বা বিজ্ঞাপনে দল-প্রধান ও তাদের আর্শীবাদপুষ্ট ছোট বড় প্রতিটি নেতার নামের সামনে পেছনে যেসব তোষণমূলক বিশেষণ ও নির্লজ্জ তোয়াজের প্রাচুর্য দেখা যাচ্ছে তা থেকেও ঐ পদলেহনের কথা ক্ষমতার পুরো এককেন্দ্রিকতার প্রমাণ মেলে।
ফলে এদেশে যে গণতন্ত্র আজ চলছে তা প্রশ্নহীনতার, আনুগত্যের ও দাসত্বের। দল-প্রধানের উদ্যত যষ্টির সামনে গোটা দল আজ সন্ত্রস্ত ও নতজানু। দলের প্রতিটি নেতাকর্মীর মধ্যে প্রতি মুহূর্তে অস্তিত্ব হারানোর ভয় যতখানি, ঠিক সে পরিমাণেই তাদের মরিয়া চেষ্টা দলের ভেতর নিজেদের অস্তিত্ব ও অবস্থান নিরাপদ করার। ফলে দলের ভেতর তৈরি হয়েছে অবিশ্রান্ত চাটুকারিতার এক আত্মতৃপ্ত পরিবেশ। যোগ্য মানুষের মধ্যে সবসময়ই ব্যক্তিত্ব, বিবেক বা আত্মমর্যাদাবোধ থাকে প্রবল। প্রশ্নহীন দাসত্ব ও নির্লজ্জ পদলেহন তাদের ব্যক্তিত্বের অনুকূল নয়। বর্তমানের অমর্যাদাকর পরিবেশে দেশের যোগ্য মানুষেরা তাই আর রাজনীতিতে নাম লেখাতে আগ্রহী নয়। ফলে রাজনীতিতে মেধাবী তরুণ বা উদ্যমশীল কর্মীর সংখ্যা যেমন আশঙ্কাজনকভাবে কমছে তেমনি বেড়ে যাচ্ছে দুর্নীতিপরায়ণ বিতর্কিত ও চাটুকারিতাসর্বস্ব নেতাদের ভিড়। অনেক দল-প্রধান আবার অস্তিত্ব হারানোর আতঙ্কে দলের যোগ্য মানুষদের ওপরে উঠতে দিতে নারাজ। দলের ভেতর যাদের প্রশ্নপ্রবণতা, বিবেক বা আত্মমর্যাদাবোধ দেখা যাচ্ছে তাদের দল থেকে বহিষ্কার করে স্তব্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। ফলে ক্রমাগতভাবে দলগুলো হয়ে উঠছে নেতৃত্বশূন্য এবং নিঃসঙ্গ। তরুণ নেতা প্রায় কোনো দলেই এখন নেই। দলের ‘তরুণতম’ নেতাদের বয়সও এখন ষাট বছরের ওপরে। অযোগ্য বা স্বার্থান্বেষী মানুষদের জন্যে এখন হযেছে পোয়াবারো। আত্মমর্যাদার সমস্যা না থাকায় তারা স্বার্থ হাতিয়ে নিতে তোয়াজ, আত্মবিক্রয়, চাটুকারিতা- কোনো কিছুতেই পিছ-পা নয়। তাই দলের ভেতর যোগ্য মানুষদের নিচে ফেলে এই সব বিবেকবর্জিত ও জন্তুসুলভ মানুষেরা আজ প্রাধান্য বিস্তার করেছে। আমি দেশের তরুণ সম্প্রদায়কে নিয়ে কাজ করি। আমি দেখেছি তাদের সামনে রাজনীতিবিদেরা হয়ে দাঁড়িয়েছে সবচেয়ে অশ্রদ্বেয় মানুষ। সেদিন এক জরিপ থেকে জানা গেল রাজনীতিবিদ হওয়ার কথা ভাবে এমন তরুণের সংখ্যা দেশে এখন শতকরা মাত্র আড়াইজন।
৭...
বিশ্বের বিত্তসম্পদ বৃদ্ধির ফলে আজ ব্যক্তিস্বাধীনতা ও গণতন্ত্র একনায়কতন্ত্রের চেয়ে বেশি জনপ্রিয়। তার মানে এ নয় যে শাসন ব্যবস্থা একনায়কতন্ত্রী বা স্বৈরতন্ত্রী হলেই তা সবসময় খারাপ হবে। মাও সেতুংয়ের একনায়কতন্ত্র, কামাল পাশার স্বৈরতন্ত্র, সিঙ্গাপুরের লি কুয়ানের বা মালয়েশিয়ার মহাথির মোহাম্মদের একনায়কতন্ত্রী কর্তৃত্ব যে ঐসব দেশের বিকাশ ও সমৃদ্ধিকে পিছিয়ে দিয়েছে এ কথা আশা করি কেউ বলবেন না। এসব স্বৈরাচারীই যে কেবল নিজ নিজ দেশের জন্যে ভাল কাজ করছেন তা নয়, ক্ষমতায় থাকতে হলে অধিকাংশ একনায়কতন্ত্রীকেই কমবেশি ভাল কাজ করতে হয়। জনস্বার্থে ভাল ভাল কাজ করে তাকে প্রতিনিয়ত জনসাধারণের সামনে প্রমাণ করতে হয় তিনি জনগণের বন্ধু এবং গণতন্ত্রীদের চেয়ে উচ্চতর। যখন তিনি ঠিকমতো তা হন না তখনও প্রচারণার মাধ্যমে হলেও তাকে এই ভাবমূর্তি উঁচু করে রাখতে হয়। দ্বিতীয়ত একনায়কতন্ত্রী হলেই একজন মানুষ যে দেশের জন্যে ক্ষতিকর হবেন এমন কথাও নেই। পৃথিবীর এযাবৎকালের বহু স্বৈরতন্ত্রীই ছিলেন দেশপ্রেমিক। নিজেদের বুদ্ধি-বিবেচনামতো জনগণের ভালোর জন্যেই তারা কাজ করেছেন। তাদের প্রধান অপরাধ অন্য জায়গায়: জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতাকে কৌশল ও শক্তির মাধ্যমে কুক্ষিগত করায়। এই দুর্বলতা তাদের সবসময় সন্ত্রস্ত রাখে। তাই জনগণের জন্যে নিয়মিতভাবে ভাল কিছু করতে তারা বাধ্য হয়ে যান। তাছাড়া স্বৈরাচারীদের একক ইচ্ছায় রাষ্ট্র পরিচালিত হয় বলে রাষ্ট্রের কল্যাণে বড় বড় সিদ্ধান্তগুলো তারা অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সঙ্গে বাস্তবায়িত করতে পারেন যা বহু প্রশাখাবহুল জটিল ভীরু ও দ্বিধান্বিত সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পক্ষে কঠিন। এ জন্যে দেখা যায় প্রতিভাবান ও দেশপ্রেমিক স্বৈরতন্ত্রীদের হাতে বিভিন্ন সময় নানা জাতির যে অবিশ্বাস্য সমৃদ্ধি ঘটেছে গড়পড়তা গণতান্ত্রিক শাসনে তা হয়নি। আমার ধারণা, ভাল হাতে পড়লে গণতান্ত্রিক শাসন জাতির জন্যে যতটা ফলপ্রসূ ও কার্যকর হয় একনায়কতন্ত্রী ব্যবস্থায় তার চেয়ে কম হয় না। বললে কেমন শোনাবে জানি না, তবু মনে হয় কেবল স্বৈরতন্ত্রী শাসন নয়, অনেক সময় গণতান্ত্রিক শাসনেরও সর্বোচ্চ ফসল ফলে এর পক্ষে কোনোভাবে একনায়কতন্ত্রী হয়ে ওঠা সম্ভব হলে।
আমার এই বক্তব্যের সমর্থনে বার্ট্রান্ড রাসেলের একটা চুক্তি তুলে ধরি। একটি প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন: “শ্রেষ্ঠ গণতন্ত্রী তিনিই যিনি ক্ষমতায় যান গণতান্ত্রিক উপায়ে, কিন্তু এক পর্যায়ে সেই গণতন্ত্রের বিলুপ্তি ঘটাতে সমর্থ হন।” (The best democrat is he who is elected democratically but in the end is able to abloish it.) এর অর্থ শ্রেষ্ঠ গণতন্ত্রী সেই ব্যক্তি যিনি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ভেতর থেকে বিকশিত হলেও প্রতিভা ও অসাধারণত্বের মহিমায় এমনই ভাস্কর হয়ে ওঠেন যে পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটাই তার দূরদৃষ্টি ও বিচক্ষণতার হাতে নিজেকে সঁপে দিয়ে নিরাপদ বোধ করে এবং নিজের দুর্লভ যোগ্যতার কারণে গোটা দলের উদ্বেলিত সমর্থন পেয়ে কিছুটা একচ্ছত্র ক্ষমতায় রাষ্ট্রশাসন করেন। এ ধরনের রাষ্ট্রনায়ক অনেকটা একনায়কতন্ত্রীদের আদরে দেশ চালালেও এদের হাতে দেশ নিরাপদ বা বিপন্ন হয় না। বরং এদের নেতৃত্বের যুগেই দেশের অবিশ্বাস্য উন্নতি হতে দেখা যায়। তাদের এই স্বৈরাচার আসলে উদারমনা মহৎপ্রাণ দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও অসাধারণ রাষ্ট্রনায়কদের জনপ্রিয় স্বৈরাচার। এই স্বৈরাচারের ভিত্তি এদের দুর্লভ ব্যক্তিত্ব ও প্রজ্ঞা তাদের অসামান্যতা, দূরদৃষ্টি এবং জীবন ও রাষ্ট্র ব্যাপারে গভীর ও সমুন্নত অন্তদৃষ্টি। এদের ব্যক্তিত্বের দুর্লভ উদ্ভাসের সামনে অন্যদের অভিভূত আত্মসমর্পণই তাদের এই স্বৈরতন্ত্রের ভিত্তি, কোনো দমন বা নির্যাতনমূলক প্রক্রিয়া নয়। পেরিক্লিস বা জওহরলাল নেহেরু এই ধারার স্বৈরাচারী। কিন্তু স্বৈরাচারীদের যদি এ ধরনের ব্যক্তিগত মহত্ত্ব না থাকে, তারা যদি খুবই সাধারণ মাপের মানুষ হওয়া সত্বেও সংবিধানের বিধান বা অন্য কোনো উপায়ে স্বৈরাচারের কর্তৃত্ব পেয়ে যান তখন স্বৈরাচার জাতির জন্যে হয়ে ওঠে দুর্দৈবের কাল। আমাদের দেশে সংবিধান সমর্থিত একনায়কতন্ত্র এমনি এক বিপর্যয়ের জন্ম দিয়েছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বদলে আমাদের শাসকরা পারিবারিক সূত্র থেকে উঠে আসছেন বলে রাজনীতির শীর্ষে আমরা শ্রেষ্ঠ মানুষদের পাচ্ছি না। আশঙ্কা বাড়ছে এ জন্যে যে সাংবিধানিক সমর্থনের কারণে দেশে এই শাসনের দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে।
দুই স্বৈরতন্ত্র
৮...
আমাদের দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কারণে আজ রাজনৈতিক শাসকদের ক্ষমতায় আসতে হচ্ছে ভোটের মাধ্যমে অর্থাৎ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়। কাজেই ক্ষমতায় থাকার দিনগুলোতে জনগণের কল্যাণে ভাল কাজ করলে তারা হয়ত তাদের ভোটে পরের নির্বাচনে জিতে আসতে পারতেন। কিন্তু দুঃশাসনের ফলশ্রুতিতে তারা সে সম্ভাবনা হারিয়ে ফেলেন। ফলে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্যে জনসমর্থনের বদলে তাদের কেবলি বেছে নিতে হচ্ছে চক্রান্ত আর ষড়যন্ত্রের পথ। রাষ্ট্রকাঠামোকে টুকরো টুকরো করে, দলীয়করণের মাধ্যমে আমলাতন্ত্র, সামরিক বাহিনী থেকে শুরু করে শিক্ষাঙ্গন, বিচার বিভাগ, সাংবাদিকতা, চিকিৎসা বিভাগ, প্রকৌশল বিভাগের মতো সব পেশাগত শ্রেণীসহ গোটা জাতিকে পুরোপুরি বিভক্ত ও দ্বিখণ্ডিত করে সারাদেশে এমন এক সংঘাতপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন যে কোন সঙ্কটে দেশকে অভিভাবকত্ব দেবার বা উদ্ধার করার মতো সর্বজন গ্রহণযোগ্য মানুষ বা গোষ্ঠী এখন আর নেই। প্রায় সুনিশ্চিতভাবে আমরা এগিয়ে চলেছি এক নিষ্ঠুর অন্ধকার গৃহযুদ্ধের দিকে পরাক্রান্ত রাজনৈতিক সমাজ আজ প্রলোভন আর নির্যাতনের মুখে দেশের সুশীল সমাজকে গ্রাস করে ফেলেছে। দেশের শুভবুদ্ধি বিবেক বা ন্যায়নীতি সংকীর্ণ হীন রাজনীতির আক্রমণের সামনে মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে আছে।
কোন দেশে যখন স্বৈরাচার চালু থাকে তখন সেখানে একজন ব্যক্তি বা একটি মাত্র দল বা সংস্থার স্বৈরাচারই প্রতিষ্ঠিত থাকে। যেমন আইয়ুব, ইয়াহিয়া বা এরশাদের স্বৈরাচার। রাজতন্ত্রও এমনি একটি স্বৈরাচারী প্রক্রিয়া। রাজা সেখান এককভাবে দেশ শাসন করেন। তাই রাজতন্ত্রেও রাজা থাকে একজন। এসব জায়গায় অন্য রাজা বা স্বৈরাচারীকে আসতে হলে প্রাক্তন শাসক বা রাজার উচ্ছেদ ঘটিয়েই আসতে হয়। একসঙ্গে দুই শাসক বা দুই রাজার জায়গা কোথাও নেই। কিন্তু গণতন্ত্র জনগণের ভোটে নির্বাচিত রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বলে কোন একক ব্যক্তি বা একক দলের নিরঙ্কুশ ও অব্যাহত শাসন সেখানে সম্ভব নয়। তাই গণতন্ত্র যদি কখনও স্বৈরাচারী হয়ে পড়ে সেখানে স্বৈরাচারের একটা ভিন্ন চেহারা দেখতে পাওয়া যায় যা সামরিক বা অন্যান্য স্বৈরাচার থেকে খুবই আলাদা। আমাদের গণতন্ত্রে সরকারগুলো জনগণের ভোটে নির্বাচিত হচ্ছে বলে এবং জনগণ একই দলকে নিজ স্বার্থে বারবার ক্ষমতায় আনার নির্বুদ্ধিতা দেখাচ্ছে না বলে দেশে স্বৈরাচার একটি থাকতে পারেনি, দেশের দু’টি প্রধান দলের ক্ষমতার হাতবদলের কারণে স্বৈরাচার হয়ে গেছে দু’টি। এই দু’টি স্বৈরাচারই আজ আমাদের গণতন্ত্র ও জাতির জন্যে হয়ে দাঁড়িয়েছে সবচেয়ে আত্মঘাতী ঘটনা। কেন তা এমন আত্মধ্বংসী হল তা নিয়ে এখানে দু’চারটি কথা বলে নিতে চাই।
৯...
আগেই বলেছি কোন দেশে স্বৈরাচার থাকলে তা সবসময় খারাপ হবে এমন কোন কথা নেই। কিন্তু স্বৈরাচার একটি না হয়ে দু’টি হলে তা একটি বড় ধরনের বিপদের জন্ম দিয়ে বসে। এর মূল কারণ স্বৈরাচার যে ধরনেরই হোক, তার মূল প্রবণতা রাষ্ট্রে তার সার্বভৌম কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। সাধারণভাবে স্বৈরাচার তা করেও থাকে। আমাদের দেশেও স্বৈরাচার দু’টি হওয়ায় আজ প্রত্যেকটি স্বৈরাচারই চেষ্টা করছে অন্যটিকে নিশ্চিহ্ন করে নিজের অবস্থান নিষ্কণ্টক করতে অর্থাৎ তার একচ্ছত্র স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠা করতে এর ফলে কী ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে প্রথমে সে আলোচনায় যাওয়া যেতে পারে।
আগেই বলেছি, একনায়কতন্ত্র নানা চেহারায় বহু দেশেই থাকে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেও থাকে। কিন্তু আমাদের গণতান্ত্রিক একনায়কতন্ত্র সেগুলো থেকে ব্যতিক্রমী কেবল নয়, খুবই ভিন্নস্বভাবী।
আলোচনার শুরুতে গণতন্ত্রের একটা মৌলিক বৈশিষ্ট্যের কথা স্মরণ করাতে চাই। রাজতন্ত্র, সামরিক একনায়কতন্ত্র বা অন্যসব স্বৈরতন্ত্রের সঙ্গে গণতন্ত্রের একটা মৌলিক পার্থক্য আছে। একনায়কতন্ত্র মনে করে একাই আমি সব পারি। দেশ শাসনের জন্যে আমার অন্য কাউকে দরকার নেই। তাই একনায়কতন্ত্র বিরুদ্ধ দলের অস্তিত্ব স্বীকার করে না। সমস্ত বিরোধীতাকে স্টিমরোলারে পিষে নিজের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে সে নিশ্চিন্ত হতে চায়। কিন্তু গণতন্ত্র তা নয়। রাষ্ট্রের সমস্যা ও জনকল্যাণের ব্যাপারে গণতন্ত্র একনায়কতন্ত্রের তুলনায় অনেক বেশি শ্রদ্ধাশীল সহাবস্থানমূলক ও সুসংস্কৃত। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ক্ষমতাসীন দল মনে করে রাষ্ট্রের জটিল বিশাল অন্তহীন সমস্যার পুরোপুরি সমাধান একা তার পক্ষে সম্ভব নয়। এ করতে দেশের সব মানুষকে তার নিজের সঙ্গে নিতে হবে। এসব ভাবনার কারণে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধী দল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে বিরোধী দলের প্রধান কেবলমাত্র একজন সাংসদ নন, রাষ্ট্রীয়ভাবে তিনি একজন অত্যন্ত মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি, তার দলের সাংসদরা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য হিসেবে এবং বিভিন্ন জাতীয় কমিটি ও কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থেকে ক্ষমতাসীন দলকে সমর্থন ও অসমর্থন দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় সহযোগিতা করে।
এ জন্যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা একটি বহুদলীয় ব্যবস্থা। এই বহুদলীয়তা গণতন্ত্রের প্রাণ নয় কেবল, এর সৌন্দর্য ও শ্রেষ্ঠত্ব। এর ফলে দেশের ভাগ্য নির্ধারণে প্রতিনিধি নির্বাচনের ভেতর দিয়ে জাতির প্রতিটি মানুষের অংশগ্রহণ এতে নিশ্চিত হয়। দেশের প্রতিটি দল, মত ও দৃষ্টিভঙ্গিকে এই পদ্ধতি স্বীকৃতি দেয় বলে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এক হয়ে কাজ করতে কারও কোথাও বাধে না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তাই একটি বন্ধুত্ব ও সহাবস্থানমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা। এখানে পার্লামেন্টে জাতীয় রাজনীতির শত্রুরা পাশাপাশি বসে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে গালগল্প বা রসরসিকতা করে দেশ শাসন করে। সাংসদরা এখানে স্বাধীন ও বিবেকপ্রসূত বক্তব্য এবং ভোট দেবার অধিকারী বলে দলীয় কোন্দল বা সহিংসতার অবকাশ এখানে কম। ফলে গণতন্ত্রের পুরো প্রক্রিয়াটা চলে আয়েসি মেজাজে, ঢিলেঢালা বা স্বচ্ছন্দ চালে। এতে দলীয় কোন্দলের চেয়ে বিবেকবোধ ও জনগণের কল্যাণ প্রাধান্য পায় বেশি।
কিন্তু সাংবিধানিক অনুমোদনের কারণে আমাদের দেশে দু’টি স্বৈরতন্ত্র জন্ম নেয়ায় ও দেশের জনগণ ঐ দু’টি প্রধান দলের ছত্রচ্ছায়ায় মোটামুটি সংঘবদ্ধ হওয়ায় এবং দলদু’টি, স্বৈরতন্ত্রের প্রকৃতিগত প্রবণতার পথ ধরে পরস্পরের উৎখাতে বদ্ধপরিকর হয়ে ওঠায় আমাদের গণতন্ত্র আজ হয়ে পড়েছে পুরোপুরি সংঘাতমূলক। এই সংঘাত বাড়তে বাড়তে এমন এক পর্যায়ে এসেছে যে দেশের গৃহযুদ্ধ প্রায় অনিবার্য হয়ে উঠেছে।
১০...
সামরিক স্বৈরাচার কোন ভাল জিনিশ নয়, কিন্তু গণতন্ত্র একনায়কতন্ত্রী হয়ে পড়লে যে অবস্থা হয় তা সামরিক স্বৈরতন্ত্রের চেয়েও খারাপ। সামরিক স্বৈরাচারের নিয়তি দুটো: হয় সে পূর্ণক্ষমতায় শাসন করবে। নয় বিলুপ্ত হবে। কিন্তু গণতন্ত্র স্বৈরাচারী হয়ে উঠলেও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কারণেই, একটানা বেশিদিন থাকেও না, আবার একেবারে বিদায়ও না। বরং বড় দল, একটা স্বস্তিদায়ক বিরতির পর, আগের দুঃশাসনের রক্তাক্ত হাত মুছে উন্নত ও জ্যোতির্ময় চেহারা নিয়ে নতুনভাবে ফিরে আসে। অর্থাৎ হাত বদল করে স্বৈরাচার জাতির জীবনে চিরস্থায়ী হয়ে ওঠে। দ্বিতীয়ত সামরিক স্বৈরতন্ত্র শাসন করে গোটা জাতিকে। তার কোনো বিরোধী দল থাকে না। থাকলেও তা থাকে পাতানো খেলার মতো বা অনুগত দল হিসেবে। কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে থাকে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল। ফলে গণতন্ত্র স্বৈরতান্ত্রিক হতে চাইলে ক্ষমতাসীন দলকে নির্মূল করতে হয় তারই মতো সংবিধানসম্মত, শক্তিশালী ও বিপুল জনসমর্থনপুষ্ট একটি দলকে। গণতন্ত্রে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে এমন বিশাল ও সংঘবদ্ধ একটি জনসমর্থনকে উচ্ছেদ করা সম্ভব নয় বলে এই নিশ্চিহ্নকরণ প্রক্রিয়া হয়ে ওঠে বিপজ্জনক ও এই সংঘাত দল ছেড়ে ক্রমে জাতীয় সংঘাতে রূপ নেয়।
পরপর তিনটি গণতান্ত্রিক সরকারের সময়ই আমরা দেখেছি, বিরোধী দল সংসদ বর্জন করেছে। অনেকেই ভেবেছেন তারা গোসা করে সংসদে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। এই কিন্তু একেবারেই তা নয়। আসল কারণ প্রতিটি সরকারি দলই প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্র হিসেবে বিরোধী দলকে সংসদ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। সংসদে কথা বলতে না দিয়ে, জনপ্রতিনিধিত্বের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে, হৃদয় ভেঙে দিয়ে, অসম্মান অপমানে ক্লিষ্ট করে তাদের বিতাড়িত করেছে। কেবল সংসদ থেকে নয়, রাস্তা থেকে, এমনকি তাদের বাড়িঘর থেকে তাড়িয়ে দিয়ে কার্যত পাঁচ বছরের জন্যে উদ্বাস্তু করে রেখেছে। এক কথায় ক্ষমতাসীন দল বিরোধী দলকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে নিজস্ব স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে। প্রতিবাদ জানানোর, কথা বলার কোন পথই তারা খোলা রাখেনি। দু’টি দলই করেছে কাজটা। বিরোধীদের ওপর অত্যাচার প্রতিটি দল-প্রধান থেকে শুরু করে দুটো দলের নিম্নতম পর্যায়ের প্রতিটি কর্মী বা সমর্থকদের পর্যন্ত আক্রান্ত ও রক্তাক্ত করেছে। ফলে দুই দলে জখমির সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েছে। এ সংখ্যা দু’টি দলের প্রতিটি মানুষকে যেমন প্রতিশোধপরায়ণ ও সহিংস করে তুলছে তেমনি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত প্রতিটি মানুষকে ক্রমাগতভাবে নিরাপত্তাহীনতার ভেতর ঠেলে দিয়েছে। রাজনীতিকের পরিচয় এখন প্রতিটি রাজনৈতিক কর্মীর জন্যে হয়ে উঠেছে ঝুঁকি ও আশঙ্কার বিষয়।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা একনায়কতন্ত্রী হওয়ার প্রধান বিপত্তি হল যারা নির্বাচনে পরাজিত হচ্ছে তারা পুরো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। এই ব্যাপারটাই আজকের রাজনৈতিক অঙ্গনের সবচেয়ে ভয়াবহ সঙ্কট। আজ তাই নির্বাচনে সবার একমাত্র কাম্য বিজয়। এ অকারণ নয়। কেননা বিজয় মানে রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর প্রশ্নহীন ও সর্বময় কর্তৃত্ব, জাতির ক্ষমতা আর সম্পদের ওপর নিরঙ্কুশ অধিকার। পাশাপাশি পরাজয় মানেই নিশ্চিহ্ন হওয়া। কাজেই যেভাবেই হোক, দেশের ধ্বংসের বিনিময়ে হলেও, শত লক্ষ লাশ পায়ে মাড়িয়ে হলেও, ক্ষমতায় যেতে হবে। এ ব্যাপারে ছাড়ের অবকাশ নেই। তাহলে বাঁচা যাবে না, অস্তিত্ব থাকবে না, উৎখাত হতে হবে। এত বড় ঝুঁকি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে কী করে সুস্থতা সম্ভব।
তাই রাজনীতি এখন এমন অসুস্থ। নির্বাচনে জয়ের জন্যে সবাই আজ হিংস্র আর মরিয়া। এ কারণেই আমাদের নির্বাচন আজ এত সংঘাতময়। জয় নিশ্চিত করার জন্যে রাষ্ট্রযন্ত্র ধ্বংস করা থেকে শুরু করে জঘন্যতম অন্যায় বা অপরাধ করতে কারো বিকার নেই। সবার শেষ কথা যেন একটাই: আমি জিততে না পারলে আসুক সামরিক শাসন। হোক জাতি শৃঙ্খলিত। তবু প্রতিপক্ষ যেন ক্ষমতায় না যায়। সামরিক শাসন এলেও আমি বাঁচব। কিন্তু প্রতিপক্ষ এলে থাকব না। এভাবে গণতন্ত্রের স্বৈরাচার গণতন্ত্রকে পুরো ধ্বংস করে দিয়েছে। দেশকে এ এমন সংঘাতময় পরিস্থিতিতে এনেছে যেখানে সামরিক বুটের নিচে পিষ্ঠ হওয়াকেও মুক্ত স্বাধীন বা গণতান্ত্রিক জীবনের চেয়ে নিরাপদ ও কাম্য মনে হচ্ছে। এ থেকেও বোঝা যায় নিজেদের সম্পূর্ণ অনিচ্ছাতে কী উদ্ধারহীন কাদার ভেতর আটকে গেছে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো- আর কী বিপাকে পড়েছে আমাদের গণতন্ত্র তথা রাজনীতি।
১১...
ক্ষমতাসীন হতে না পারলে বিরোধী দলের অবস্থা আজ যে কতখানি করুণ হয়ে ওঠে তার প্রমাণ পাওয়া যায় তাদের ডাকা হরতাল দেখে। ক্ষমতায় থাকার সময় দু’টি দলই অঙ্গীকার করে ভবিষ্যতে তারা কখনও হরতাল করবে না, কিন্তু দেখা যায় বিরোধী দলে গেলেই তারা লাগাতার হরতাল ডেকে দেশের জনজীবন তথা অর্থনীতির ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করে। কেন প্রতিজ্ঞা ভাঙে? কেন জাতির বা তার নিজের ভবিষ্যতের জন্যে ক্ষতিকর জেনেও এ করে? উত্তর একটাই। প্রতিবাদ জানানোর আর কোন গণতন্ত্রসম্মত বা বৈধ পথ তাদের তখন থাকে না। সমস্ত ক্ষমতা বা মর্যাদা থেকে বিতাড়িত ও নিশ্চিহ্ন হওয়া একটি দল নিজের ওপর অনুষ্ঠিত অত্যাচারের প্রতিবাদ করতে গিয়ে মুমূর্ষু গলায় হরতালের একটা ক্ষীণ করুণ ডাক আকাশে রণিত করা ছাড়া কী-ই-বা আর সে করতে পারে। সে পুরোপুরি জানে এ দিয়ে ক্ষমতাসীন দলের কোন বাস্তব ক্ষতিই সে করতে পারবে না। রাস্তায় নামার সাহস নেই বলে হরতাল শেষ অব্দি হয়ত নিছক আহ্বান-সর্বস্ব একটা করুণ কাৎরানি হয়েই হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে, অফিস-আদালত কল-কারখানা সবই যথারীতি চলবে, কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতির ভয়ে কিছু মানুষ যে দোকানপাঠ খুলবে না বা মহাসড়ক দিয়ে গাড়ি চলতে পারবে না এটুকু দেখেই হরতালকারীরা আপাতত আত্মসান্ত্বনা পাওয়ার চেষ্টা করবে।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিভিন্ন দলের মধ্যে যে সৌহার্দ্য ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বা শোভন আচরণ থাকার কথা তা এসব কারণেই আমাদের রাজনীতি থেকে আজ পুরোপুরি উধাও। সবাই জানেন আমাদের দু’দলের শীর্ষ দুই নেত্রীর মধ্যে বাক্যালাপ পর্যন্ত নেই। থাকলেও তেমন লাভ হত না। স্বৈরতান্ত্রিক অবস্থান ও সংঘাতের কারণে অচিরেই তা বন্ধ হয়ে যেত। ব্যাপারটা এখন শীর্ষ নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ কর্মীতে এসে ঠেকেছে। দু’দলের কর্মী বা নেতাদের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকাকে সন্দেহজনক দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে ও দলদ্রোহিতার অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। পরিবর্তে ঘৃণা, বিদ্বেষ, সহিংসতা ও প্রত্যাঘাত দু’দলের প্রতিটি সদস্যের প্রতিমুহূর্তের আচরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ যে কতখানি সহিংসরূপ নিয়েছে তা বোঝা যায় একটি পরিচিত টিভি চ্যানেলে জনপ্রিয় একটি টকশো দেখলে! এটা একটা ঝগড়ার অনুষ্ঠান। ঝগড়া দেখলে মানুষ এক ধরনের স্থূল ও বিকৃত মজা পায়, এতে অকর্ষিত জনতার কাছে অনুষ্ঠান জনপ্রিয় হয়, ফলে বিজ্ঞাপন ও আয় বাড়ে। মূলত এ কারণেই চ্যানেলটি অনুষ্ঠানটিকে দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে যাচ্ছে। বলাবাহুল্য অনুষ্ঠানটির জনপ্রিয়তা এখন তুঙ্গে। অনুষ্ঠানটায় দু’দলের একজন করে মন্ত্রী, সাংসদ বা নেতা মুখোমুখি বসে এমন অমার্জিত ভাষা এবং অকর্ষিত চেহারা নিয়ে পরস্পরকে আক্রমণ করতে থাকে যা প্রায় জাতীয় অসম্মানের প্রতীক। স্থূলতার রগরগে অশ্লীল লালার সঙ্গে দর্শকরা তা মজাদার চাটনির মতো উপভোগ করে। অনুষ্ঠানটিতে উপস্থাপকের দু’পাশে বসে থাকে দু’জন ক্ষিপ্ত জন্তুসুলভ মানুষ। তাদের ভয়ঙ্কর চোখমুখ আর মারমুখো চেহারা দেখলে বোঝা যায় অনুষ্ঠানের মধ্যেই হয়ত হাতাহাতি তারা শুরু করত, কেবল মাঝখানে একটা জল-অচল বৈদ্যুতিক বাধা থাকায় এ যাত্রা তেমন কিছু হল না। এ দৃশ্যের ব্যতিক্রম হয় খুবই কমই। তাদের কথা শুনে মনে হবে তাদের নিজ নিজ দল যা করছে তাই শ্রেষ্ঠ। অন্যদল যা করছে সবই দুর্নীতি, সন্ত্রাস আর জঘন্য অপরাধ। কে বিরোধী পক্ষকে কতখানি দলীয় ও ব্যক্তিগতভাবে জখম করতে পারছে তার ওপর নির্ভর করছে দলের ভেতর ঐ নেতা বা কর্মীর উন্নতি। এ ঘটছে জাতীয় রাজনীতির সবখানে, ঐ অনুষ্ঠানে আমরা তার প্রতীকী রূপটি দেখছি মাত্র। সন্ত্রাসীরা, খুনিরা, আক্রমণকারী ঘাতক ও কালো টাকার মালিকরা ক্রমাগত দলের মধ্যে প্রাধান্য বিস্তার করেছে।
বিরুদ্ধ দলের মধ্যে ভাল কিছু দেখা বা নিজের দলের মধ্যে বিন্দুপরিমাণ খারাপ খুঁজে পাওয়া দুটোই এখন পুরোপুরি নিষিদ্ধ। এ করলে নিজ দল থেকে পত্রপাঠ বিদায় নিতে হয়। তাই সত্যভাষণ বা বিবেকের কাছে দায়বদ্ধতা দুটো দল থেকেই বিদায় নিয়েছে। রাজনীতি পুরোপুরি বিভক্ত হয়ে গেছে শাদা আর কালোয়। সত্য যে একটা ধূসর এলাকা, শাদা কালো মেশানো এ দুয়ের মাঝামাঝি জিনিস তা যেন কেউ শোনেও নি কখনও। বিবেক ন্যায় বা শুভবুদ্ধির কথা শোনার মানুষ রাজনীতিতে এখন আর নেই। যারা এসব তুলতে চাচ্ছে তারা আক্রান্ত ও বিতাড়িত হচ্ছে।
১২...
দুটি স্বৈরতন্ত্রের প্রত্যেককে বিরুদ্ধ পক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টায় ও বিরুদ্ধ পক্ষের হাতে নিজের নিশ্চিহ্ন হওয়া ঠেকাতে এমন নিষ্ঠুরভাবে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে যে দল দু’টিকেই নিজ দলের স্বৈরাচারকে নিñিদ্র ও নির্মম করে তুলতে হচ্ছে। এর একটি কুফল হল দলের ভেতরকার গণতন্ত্রের বিলুপ্তি। প্রতিটি দলেই ঘটেছে এটা। দলগুলো এখন চলেছে দল প্রধানের পুরোপুরি নিজস্ব ইচ্ছায়। দলের গঠনতন্ত্রও তৈরি হয়েছে সম্পূর্ণ তার অনুকূলে, দলের কর্মী বা নেতাদের চাওয়া-পাওয়াকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে। গঠনতন্ত্রে গণতান্ত্রিক কিছু থাকলেও দলের প্রধান ও শীর্ষ ব্যক্তিদের আচরণে তা প্রত্যাখ্যাত। দলের বার্ষিক কাউন্সিল হবে কী হবে না, হলে ক’বছর পরে, সেখানে কে কতখানি বলবে বা কার কথা শোনা হবে না হবে তা নিরঙ্কুশভাবে দল-প্রধানের। সে সভায় (যদি সভা আদৌ হয়) যা কিছু কথাবার্তা তার সবই তার গুণগান, এবং সব বিষয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই দল প্রধানের একক ইচ্ছার হাতে সমর্পিত। জাতীয় সংসদের যাবতীয় মনোনয়ন চলছে দল-প্রধানের ইচ্ছায়, প্রার্থীদের টাকার বিনিময়ে কিনতে হচ্ছে মনোনয়ন, ফলে দেদারসে জমে উঠেছে রমরমা মনোনয়ন বাণিজ্য, সেখানে তৃণমূল নেতাকর্মীদের পছন্দ-অপছন্দ, মতামত বা গণতান্ত্রিক অধিকার পুরোপুরি উপেক্ষিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের খোদ সংবিধানই যদি দল প্রধানের এই সর্বময় কর্তৃত্ব নিশ্চিত করে থাকে তবে কেনই বা তারা এই ক্ষমতা স্বেচ্ছাখুশিতে ব্যবহার করবেন না। কেন দলের ভেতর গণতন্ত্র দিয়ে নিজের কর্তৃত্বের সমস্যা বাড়াবেন।
১৩...
এই পরিস্থিতির কারণে দলগুলোর আদর্শিক অবস্থান পুরো ভেঙে পড়েছে। নির্বাচন-জয়ের মরিয়া চেষ্টায় দলগুলো দলীয় চেতনা বা আদর্শের সম্পূর্ণ বিরুদ্ধবাদী শক্তির সঙ্গেও মোর্চা করতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে রাজনীতি পরিণিত হচ্ছে নিখাদ ক্ষমতা ও স্বার্থের দ্বন্দ্বে। জয়ের লিপ্সা আর পরাজয়ের আতঙ্ক দলের ভেতরকার ন্যায়নীতি, আদর্শ ও গণতান্ত্রিক চেতনাকে চুরমার করে দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ায় কালো টাকা আজ নির্বাচন মাঠের ঈশ্বরে পরিণত হয়েছে। জয় নিশ্চিত করার জন্যে তাই কেবল বিরোধী আদর্শের সঙ্গেই যে দলগুলো হাত মেলাচ্ছে তাই নয়, দলের ভেতরকার দুর্বৃত্ত আর কালো টাকার মালিকদেরও নির্বিকারে প্রাধান্য দিয়ে চলেছে। দলের পরীক্ষিত ও আত্মোৎসর্গিত সদস্যদের বদলে অবৈধ টাকার মালিক এবং জনগণ প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তিরাই সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পেয়ে যাচ্ছেন। ফলে দলের ভেতরকার সৎ ও আত্মোৎসর্গিত নেতাকর্মীরা তাদের ভেঙে যাওয়া হৃদয়ের সাথে নিঃশব্দে দল থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে জাতীয় সংসদের ভেতর শুভশক্তির বিলুপ্তি ঘটেছে এবং স্থূল ও দাঁতাল পশুশক্তি জাতির কর্তৃত্ব দখল করছে।
মনে রাখতে হবে আমাদের জাতির কোনদিন নিজস্ব রাষ্ট্র ছিল না। আমরা একটি রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতাহীন জাতি। নিজেদের ভাগ্য নির্মাণের অধিকার আমরা কখনও পাইনি। আমরা এমন এক যুগসন্ধিতে আজ দাঁড়িয়ে আছি যখন আমরা নিজেদের একটি রাষ্ট্র পেয়েছি কিন্তু তার যোগ্য কাঠামো গড়ে তুলতে পারিনি। আমার এই লেখা সেই শূন্য সময়ের গল্প। ধীরে ধীরে আমাদের রাষ্ট্রের কাঠামো গড়ে উঠলে, এর অঙ্গগুলো সুপরিণতি পেয়ে শক্তপোক্ত হলে এই নৈরাজ্য প্রকৃতির নিয়মেই কমতে থাকবে।
১৪...
আজ প্রতিটি দলের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন ও আত্মোৎসর্গিত নেতাকর্মীদের সঙ্গে সারা জাতি যদি সমবেত হয়ে সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে দলের ভেতর দল প্রধানের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্বের অবসান না ঘটায় তবে জাতীয় জীবনে গণতন্ত্রের বিকাশের পরিবর্তে তার পুরো বিলুপ্তি ঘটবে এবং দুই স্বৈরনায়কের নেতৃত্বে জাতি অচিরেই সংঘাতের ভেতর বিধ্বস্ত হবে। আমাদের দেশের দলগুলোর কর্মী ও নেতারা যদি একনায়ক বা রাজার অধীনস্থ রাজনীতিবিদ হতেন তবে এই আক্রোশ ও হতাশা তাদের জন্যে এমন অসহনীয় হতো না। কারণ অধীনতার দাসখত দিয়েই তারা তখন রাজনীতিতে আসতেন। কিন্তু স্বাধীন সত্তাসম্পন্ন গণতান্ত্রিক নেতার পক্ষে এই দাসত্ব দুর্বিষহ। কেবল রাজনীতিবেদরা নয়, গোটা জাতি আজ মূলত দুটি দলনায়কের হাতে জিম্মি। দেশের প্রধান দুর্দৈব হিসেবে সবাই আজ নাম ধরে তাদের চিহ্নিত করছে। তাদের অপশাসনের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে প্রতিমুহূর্তে বিদ্বেষ প্রকাশ করছে, কিন্তু কিছুই করতে পারছে না। বুঝতেও পারছে না ব্যাপারটা দুজন বা চারজন মানুষের ব্যক্তিগত ষড়যন্ত্রের ফলে ঘটছে না, ঘটছে সংবিধানের ধারাটির কারণে। এ থেকেও বোঝা যায় জাতির ভাগ্যের ক্ষেত্রে সংবিধান কত বড় জিনিশ, একটা ছোট্ট অনুচ্ছেদ কীভাবে জাতির অগ্রযাত্রাকে পুরো রুখে দিয়ে তাকে খাদের মধ্যে ফেলে দিতে পারে। এই অনুচ্ছেদের মাধ্যমে আমরা গণতন্ত্রের নামে কার্যত বংশগত রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছি। ইলিয়ড মহাকাব্যে হেলেনের অপহরণকারী রাজপুত্র প্যারিস গোটা ট্রোজান জাতিকে যে দুঃস্বপ্নের মধ্যে ফেলেছিল, এই অনুচ্ছেদও যেন আজ আমাদের জাতির জীবনকে প্রায় তাই করছে। সংবিধান একটা জাতির জীবনে হালের মতো। হাল একটু এদিক ওদিক বেঁকে গেলে যেমন বহু লোক একসঙ্গে দাঁড় টেনেও নৌকার গতি ফেরাতে পারে না, তেমনি সংবিধানের কোথাও বড় ধরনের ত্রুটি থাকলেও জাতির বিপর্যয় ঠেকানো দুরূহ হয়। কাজেই দরকার সংবিধানকে ঠিক পথে নিয়ে আসা। লাইনচ্যুত ট্রেনকে আবার লাইনের ওপর দাঁড় করানো।
১৫...
দুই স্বৈরাচারের ফলে দেশের সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটি হয়েছে তা হল গোটা জাতিকে এ পুরোপুরি দ্বিখণ্ডিত করে ফেলেছে। এদের এই অনিচ্ছাকৃত সংঘাত আমাদের দরিদ্র দেশটির সমৃদ্ধি ব্যাহত করে, গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে নিজেদের অন্ধকার কবর খোঁড়ার দিকে এগিয়ে নিচ্ছে। বছর পঁচিশ তিরিশ আগে রাশিয়া থেকে প্রকাশিত শিশুদের একটি সচিত্র গল্পের বই দেখেছিলাম। বইটি দুটি বেড়ালের ঝগড়া নিয়ে। বইটির শুরুতে আছে সকাল বেলার ছবি। দুটো শাদা লোমওয়ালা হৃষ্টপুষ্ট বেড়াল কিছু একটা নিয়ে মারামারি শুরু করেছে। পরের ছবিটি সন্ধ্যার। সারাদিন মারামরি করার পরের দৃশ্য। তাতে দেখা যাচ্ছে দু’জনের গোটা শরীর রক্তাক্ত, ছিন্নভিন্ন। আগাগোড়া শরীর পুরু ব্যাণ্ডেজে বাঁধা। কেবল চোখ আর লেজদুটো অক্ষত। আজ আমাদের জাতির দিকে তাকিয়ে ঠিক ঐ ধরনের একটা আশঙ্কা হচ্ছে। মনে হচ্ছে ছিন্নভিন্ন অবস্থায় অমনি অবশিষ্ট একজোড়া চোখ আর লেজ নিয়ে জাতির রাজনীতির মতো আমরাও কি তাহলে শেষ হব! মহাভারতের যুদ্ধের কথা মনে পড়ে। কী দীর্ঘ শ্বাসরুদ্ধকর উদ্ধারহীন একটা যুদ্ধ। দু’পক্ষে কত মহা মহা যোদ্ধা, কত অযুত অক্ষৌহিণী (ডিভিশন) সৈন্য যুদ্ধ করল। কিন্তু যুদ্ধ শেষে পাণ্ডবেরা বিজয়ীর বেশে যখন জনশূন্য নিঃশব্দ হস্তিনাপুরের রাজপথে প্রবেশ করল তখন তাদের সঙ্গে মাত্র কয়েক হাজার সৈন্য। সবই যদি ধ্বংসের আগুনে ছাই হয়ে গেল তবে পৃথিবীকে ভোগ করবে কে?
আমি নিশ্চিত রাজনীতির দুটি পক্ষের কেউই এই অনভিপ্রেত পরিস্থিতি চান না। কেবল তারা কেন, ন্যূনতম মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষও এটা চাইতে পারে না। কিন্তু রোমান গ্ল্যাডিয়েটাররা যেমন রাজার খেয়ালি ইশারায় শুধুমাত্র জীবন বাঁচানোর তাগিদে বন্ধু হয়ে বন্ধুকে হত্যা করতে বাধ্য হতো, সংবিধানের এমনি ক্ষতিকর একটি ধারার জন্যে আজ তেমনি রাজনৈতিক দলগুলো একে অন্যকে নিশ্চিহ্ন করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এই হিংস্রতা দল ছেড়ে এখন রাজনৈতিক নেতাকর্মী, সমর্থক এমনকি সাধারণ মানুষের মধ্যেও সংক্রমিত হয়েছে- যেসব রাজনৈতিক নেতাকর্মীর সম্পর্ক চার পাঁচ দশক ধরে ছিল উষ্ণ ও বন্ধুত্বপূর্ণ, যারা ছিলেন একটি বড় ও অভিন্ন রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য।
১৬...
সব দেশেই সাধারণ মানুষ চাকরি-বাকরি, অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্যের মতো ব্যাপার-স্যাপার নিয়েই জীবন কাটায়। দেশের ভালোমন্দ দেখভালের দায়িত্ব তারা তুলে দেয় রাজনীতিবিদদের হাতে। সরকার পরিচালনার জন্যে ভোট দিয়ে জনগণ রাজনীতিবিদদের নির্বাচিত করে ছুটি নেয়। এটাই আধুনিক রাষ্ট্রের ধারা। কিন্তু ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করতে ও অস্তিত্ব বিলুপ্তির ভয়ে দুটি পক্ষই আজ দেশের প্রতিটি মানুষকে রাজনীতির ভেতর জড়িয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছে। আজ দেশের প্রতিটি মানুষই তাই প্রায় রাজনীতিবিদ। জনগণ বলে এখন আর প্রায় কেউ নেই। ছাত্র, শিক্ষক, উকিল, সাংবাদিক, ডাক্তার, বিচারপতি সবাই রাজনৈতিক নেতা, রাজনৈতিক কর্মী। শিক্ষ এমনকি বিচারপতির চেহারার ভেতরও যেন জেগে উঠছে মাস্তান আর সন্ত্রাসীর ঘাতক মুখ। প্রতিটি মানুষ আজ যেন রাজনৈতিক মাস্তান। সুশীল সমাজও আজ পুরো রাজনৈতিক সমাজ। অবস্থা দেখে মনে হয় কিছুদিনের মধ্যে সদ্যোজাত শিশুরাও জিন্দাবাদ দিয়ে রাস্তায় বেরোবে।
গল্পটা খুব সম্ভব নাসিরুদ্দিন হোজ্জার। হোজ্জাকে একবার জিগ্যেস করা হয়েছিল, ‘সকালে ঘুম থেকে উঠে মানুষেরা কেন একেকজন একেকদিকে যায়। কেউ যায় ব্যবসা-বাণিজ্যে, কেউ চাকরিতে, কেউ অফিস-আদালতে, কেউ স্কুল-কলেজে।’ প্রশ্ন শুনে হোজ্জা হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘সবাই একদিকে গেলে পৃথিবীটা কাত হয় যাবে যে।’ আমাদের দেশেও হয়েছে তাই। সবাই রাজনীতিবিদ হওয়ায় দেশটা আজ রাজনীতির দিকে কাত হয়ে গেছে। আজ মানুষের মুখে, প্রিন্ট-ইলেকট্রনিক মিডিয়ায়, রাস্তায়, গঞ্জে, হাটে-বাজারে একমাত্র আলোচ্য বিষয় রাজনীতি। আজ সেই মানুষই ভাগ্যহীন, যে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নয়। দুই দলের নেতৃত্বে দেশে আজ যে অবাধ লুণ্ঠন চলছে সে-ই আজ কেবল তার ভাগ থেকে বঞ্চিত।
দুই বৈরী স্বৈরতন্ত্রের কারণে গোটা দেশ দ্বিখণ্ডিত হয়ে পড়ায়, সমাজ, পরিবার, জনজীবন থেকে শুরু করে প্রতিটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আজ ভেঙে গিয়ে পরিণত হয়েছে দুটি প্রতিষ্ঠানে। সাংসদরা পারলে জাতীয় সংসদকেও হয়তো এতদিনে দুভাগ করে ফেলত; পারেনি কেবল সাংবিধানিক বাধার কারণে। জাতীয় জীবনের প্রতিটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে ঘটছে এই ঘটনা। এগুলোর প্রত্যেকটি আজ দ্বিখণ্ডিত হয়ে দুটো আলাদা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। দেশ পরিণত হয়েছে দুটি দেশে। ফলে বিবেক ও জনস্বার্থের প্রতিনিধি সুশীল সমাজের কল্যাণধর্মী নেতৃত্ব এগুলো এসব প্রতিষ্ঠান থেকে বিদায় নিয়েছে এবং বিভক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর দুটো অংশই দুই মোর্চার অকর্ষিত রাজনৈতিক নেতাকর্মীর অবারিত চারণ ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। লুণ্ঠন আর স্বার্থলোলুপতা ছাড়া আজ আর কোনো আপাত লক্ষ্য এগুলোতে নেই। ছাত্র, শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সাংবাদিক, আইনজীবী-এদের কারো সংগঠনই আজ একটি নয়, দুটি। দুটি যুদ্ধোন্মাত্ত রাজনৈতিক দলের মদদে এখন পরস্পরের বিনাশে এরা বদ্ধপরিকর। যে রাজনৈতিক দল রাষ্ট্র-ক্ষমতায় আসছে সেই দলের সমর্থকরা বিরুদ্ধপক্ষকে তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে পুরোপুরি তাড়িয়ে গোটা প্রতিষ্ঠানটি দখল করে স্বৈরাচারী ধাঁচে সেটিকে লুণ্ঠন ও পরিচালনা করছে।
১৭...
এককথায় স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের স্বার্থে দেশের প্রতিটি সংগঠন আজ দলীয়করণের শিকার। এদের মধ্যে যে দলীয়করণটি জাতির জন্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে তা হল আমলাতন্ত্রের দলীয়করণ বা দ্বিখণ্ডকরণ। রাজনৈতিক আদেশ নির্দেশে কাজ করলেও সংসদীয় রাজনীতিতে আমলাতন্ত্রের নিজস্ব একটি সার্বভৌম ও কল্যাণধর্মী ভূমিকা আছে। দেশের জনগণের কাছে তাদের যেমন আছে নৈতিক দায়বদ্ধতা তেমনি রাজনৈতিক নেতৃত্বকে জনকল্যাণের অনুকূলে পরামর্শ ও সহায়তা দেওয়াও তাদের কর্তব্য। তাছাড়া সংসদীয় গণতন্ত্রে যে কোনো মুহূর্তে সরকার বদল ঘটতে পারে বলে আমলাতন্ত্রের নিরপেক্ষতা এই পদ্ধতিতে হতে হয় নিরঙ্কুশ। বহুদিন ধরে এদেশের আমলাতন্ত্রের চরিত্র কার্যত ছিল নিরপেক্ষই। পাকিস্তানি আমল তো বটেই এমনকি বাংলাদেশ আমলের এরশাদের যুগ পর্যন্ত এ ছিল অনেকটাই তাই। কিন্তু গত দুই সরকারের আমলে ক্রমাগতভাবে আমলাতন্ত্রকে ভেঙে দ্বিখণ্ডিত করা হয়েছে। এ করা হয়েছে মূলত দুটো কারণে। প্রথম কারণটি নিয়ে আগে কিছু কথা বলে নিই।
আগেই বলেছি আমলাতন্ত্রের মাধ্যমে সরকার রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনা করলেও এই ভূমিকার বাইরেও রাষ্ট্রের স্থিতিস্থাপকতার স্বার্থে আমলাতন্ত্রের একটা শুভত্বমুখী ভূমিকা থাকে। রাষ্ট্রের আইনকানুন ও নীতিমালা নিরপেক্ষভাবে সমুন্নত রাখা তার কর্তব্য। এই নিরপেক্ষতা ও ন্যায়নীতি সরকারের নির্বিচার দুরভিসন্ধি ও দুর্নীতিগ্রস্ত পদক্ষেপগুলোকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই স্বৈরতন্ত্রকে নিñিদ্র করতে চাইলে আমলাতন্ত্রকে দলীয়করণ করা অনিবার্য হয়ে যায়। দেশের প্রতিটি মানুষের মতো আমারও সঙ্গতভাবেই কোনো না কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ আছে। কিন্তু তা নিতান্তই তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। জনস্বার্থ, বিবেক বা পেশাগত আচরণে সেই মতাদর্শের কোনো ভূমিকা নেই। কিন্তু দলীয়করণ করতে গিয়ে ক্ষমতাসীন দল তার মতাদর্শের সমর্থক আমলাদের আজ দলীয় রাজনীতিবিদে পরিণত করেছে। প্রজাতন্ত্রের সেবককে পরিণত করা হয়েছে দলীয় ক্যাডারে। পেশাগত নৈতিকতা ও রাষ্ট্রীয় কল্যাণ বর্জনের পারিতোষিক হিসেবে চাকরি ক্ষেত্রে তাদের যে পুরস্কার দিতে হয়েছে তাতে আমলাতন্ত্রের কর্তৃত্ব-পারম্পর্য বিপন্ন হয়ে পড়েছে। নিজ দলের অযোগ্য আমলাদের পদোন্নতি দিয়ে উঠানো হযেছে বিপরীত মতাদর্শের যোগ্য আমলাদের ওপরে। অকারণে বঞ্চিত করা হয়েছে বহু যোগ্য মানুষকে। এর ফলাফল হয়েছে নির্মম। গোটা চাকরিজীবন জুড়ে যে অধস্তন কর্মকর্তা কোনো একজনকে স্যার বলে সম্বোধন করেছে আজ সেই অধনস্তকেই উল্টো তাকে স্যার বলে সম্বোধন করতে হচ্ছে। এই অবমাননা বহু কর্মকর্তার হৃদয়কে রক্তাপ্লুত করেছে। দু’দলের যে বিরাট সংখ্যক কর্মকর্তা এভাবে বিরুদ্ধ দলের সরাসরি আক্রমণের শিকার হচ্ছে তাদের মিলিত ঘৃণা আর প্রতিরোধ দু’দলকে আত্মধ্বংসী সংঘাতে জড়িয়ে ফেলেছে এককালের বন্ধু, প্রিয়, শ্রদ্ধেয় ও স্নেহাস্পদেরা স্বৈরাচারের স্বার্থোদ্ধারের গুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আজ পরস্পরের বিনাশে উদ্যত। অথচ গোটা চাকরিজীবন ধরে তারা বাস করেছে সৌহার্দ্য ও প্রীতিপূর্ণ পরিবেশে। ফলে যুগ যুগ ধরে আমলাতন্ত্রের ভেতর শ্রেয়বোধ ও নিরপেক্ষতার যে উচ্চ ঐতিহ্য গড়ে উঠেছিল তা লুপ্ত হয়েছে এবং নৈরাজ্যের ভেতর আমলাতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়েছে।
আগেই বলেছি আমলাতন্ত্রের দলীয়করণ বা দ্বিখণ্ডিতকরণের সবচেয়ে বড় কারণ পরবর্তী নির্বাচনে দলের বিজয় নিশ্চিত করা। অর্থাৎ স্বৈরতন্ত্রকে দুটি থেকে স্থায়ীভাবে একটিতে নামিয়ে আনা। এটা করতে গিয়ে আমলাতন্ত্রের কর্তৃত্ব-পারম্পর্যকে পুরো লন্ডভন্ড করে ফেলতেও দ্বিধা করা হয়নি ও নিজ দলের সমর্থকদের এমনভাবে ওপরে তোলা হয়েছে যাতে তারা গোপন ষড়যন্ত্রের পথে বিজয় নিশ্চিত করতে পারে। কেবল আমলাতন্ত্র নয়, গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রটাকেই এভাবে দ্বিখণ্ডিত করা হয়েছে।
গণতন্ত্রের প্রাণ নির্বাচন এবং নির্বাচনের প্রাণ নির্বাচন কমিশন। এই নির্বাচন কমিশনকে পূর্ণ স্বাধীনতা তো দেওয়া হয়ই না, বরং তাকে পুরো দলীয়করণ করে নির্বাচনে বিজয় নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন সুষ্ঠু না হওয়া গণতন্ত্র হত্যারই শামিল। এতে নির্বাচিত সরকার জনচক্ষে কার্যত অবৈধ হয়ে যায়। এ অবস্থায় ক্ষুব্ধ পরাজিতদের সহিংস প্রতিরোধের মুখে গৃহযুদ্ধ, সামরিক শক্তি কিংবা অন্য কোনো অকর্ষিত ক্ষমতাগোষ্ঠীর উত্থান ঘটে গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের মতো বিচার বিভাগকে দলীয়করণ করে বিচারের নিরপেক্ষতার ঐতিহ্যকে যেমন নষ্ট করা হয়েছে তেমনি পাবলিক সার্ভিস কমিশনকে দলীয়করণ করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর নিজ নিজ দলের কর্তৃত্বকে নিñিন্দ্র করা হয়েছে। দেশের পেশাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে শুরু করে তাবৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চাকুরেদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও সুযোগ সুবিধার ক্ষেত্রে চলেছে এই বৈষম্য।

নিজের পছন্দে একটি প্রেমও করিনি, অন্যের পছন্দের বলি হয়েছি by তসলিমা নাসরিন

অনেক দিন প্রেম না করলে এমন হয়, প্রেম করতে ভুলে যাই। প্রেম না করে বছরের পর বছর কী করে যে পার করি! ভাবলেই কষ্ট হতে থাকে সারা শরীরে। প্রেম কার সঙ্গে করব? হাবিজাবি লোকদের সঙ্গে প্রেম করার চেয়ে বেড়াল নিয়ে খেলা করা অনেক ভালো।

জামায়াত মৌলিক বিষয়ে কম্প্রোমাইজ করবে না: ডা. তাহের by জাকারিয়া পলাশ

জামায়াতে ইসলামীর অন্যতম নীতিনির্ধারক, সাবেক সংসদ সদস্য ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বলেছেন, আমরা নির্বাচন কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী মৌলিক বিশ্বাসের বাইরে গঠনতন্ত্রে কিছু সংশোধনের চিন্তা করছি।

সজীব ওয়াজেদ জয়, আপনাকেই কিছু কথা by শাখাওয়াৎ নয়ন

একবার এক রাজা তাঁর সভাসদদের বললেন, যাও তোমরা আমার পক্ষ থেকে দেশের মানুষকে ভালোবাসা পৌঁছে দাও। রাজার আদেশ বাস্তবায়নে তাঁর কর্মীবাহিনী হন্তদন্ত হয়ে পড়লো। তারা রাজার ভালোবাসা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে দেশের মানুষকে চুমু দেয়ার সিদ্ধান্ত নিল।

যুদ্ধাপরাধের কোন ২ রায় কার্যকর? by সাজেদুল হক

আইন প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট কামরুল ইসলাম হলফ করেই বলেছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের কমপক্ষে দু’টি মামলার রায় বর্তমান সরকারের মেয়াদে কার্যকর হবে। একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলকে এ কথা বলেছেন তিনি।

নিউইয়র্কের রাস্তায় প্রিয়াঙ্কা

বলিউড অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা চোপড়া এখন আর শুধু অভিনেত্রী নন। একাধারে তিনি একজন আর্ন্তজাতিক সংগীতশিল্পীও। বিশ্বের যে কোনো স্থানে পা রাখলে ভক্তরা তাকে ঘিরে ধরবে, এটাই স্বাভাবিক। ঠিক এমনই একটি ঘটনা ঘটলো বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের ম্যানহ্যাটানের রাস্তায়।

রক্তাক্ত বলকানে শান্তির সন্ধানে by মোশাররফ হোসেন ভূঞা

যুদ্ধবিধ্বস্ত বলকান রাজ্যে জাতিসংঘ শান্তি বাহিনীতে আমার অংশগ্রহণ ছিল সিভিলিয়ান পুলিশ মনিটর হিসেবে। সময় ১৯৯২-৯৩ সাল। তখন সার্ব ও ক্রোয়াটদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে সাবেক যুগোশ্লাভিয়া ভেঙে নতুন রাষ্ট্র হিসেবে ক্রোয়েশিয়া স্বাধীনতা অর্জন করেছে। তদুপরি ক্রোয়েশিয়ার সার্ব অধ্যুষিত কয়েকটি অঞ্চলে জাতিগত দ্বন্দ্বের সূত্র ধরে যুদ্ধাবস্থা বিরাজমান ছিল। সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। সার্ব ও ক্রোয়াটদের মধ্যকার জাতিগত দ্বন্দ্বের ইতিহাস বেশ পুরনো হলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে যুগোস্লাভিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট মার্শাল যোশেফ ব্রোশ টিটু জাতে ক্রোয়াট হওয়ার কারণে সার্বদের প্রতি ক্রোয়াটদের ক্ষোভের প্রকাশ কিছুটা অবধমিত ছিল। মার্শাল টিটুর মৃত্যুর পর অর্থ ও সম্পদের অসম বণ্টন, সামরিক বিভাগে সার্বদের একচ্ছত্র আধিপত্য ইত্যাদি পুরনো ক্ষতের যন্ত্রণা পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠলে ১৯৯১ সালের গোড়ার দিকে সার্ব ও ক্রোয়াটদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সূচনা হয়। এ সংঘর্ষের লক্ষ্য ছিল জাতীয় জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রে সার্বদের অনভিপ্রেত ও অশুভ নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়ে স্বাধীন ও সার্বভৌম ক্রোয়েশিয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।
এখানে একটি বিষয় উল্লেখ না করে পারছি না। আমার অভিজ্ঞতায় মনে হচ্ছে, সার্ব ও ক্রোয়াটদের দীর্ঘদিনের জাতিগত দ্বন্দ্ব অনেকটা বাঙালিদের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানিদের স্বার্থ সুরক্ষায় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার কর্তৃক চরম বৈষম্যমূলক আচরণের মতো। যতটা জানা যায়, সার্ব ও ক্রোয়াটদের জাতিগত দ্বন্দ্বের সূত্রপাতের প্রধান কারণ অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ক্রোয়াটদের তুলনায় সার্বদের প্রাধিকার প্রদান। ক্রোয়াটরা দাবি করে, আড্রিয়াটিক সাগর পাড়ে অবস্থিত প্রকৃতির অপরূপ লীলাময় সাগর সৈকত হতে পর্যটন খাতে প্রতিবছর যে আয় হয় তা জাতীয় আয়ের ৮০ শতাংশ। এ আয় থেকে ক্রোয়েশিয়া প্রাদেশিক সরকারের হাতে ২০ শতাংশ রেখে বাকি সমূদয় অর্থ চলে যেত কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে। আবার সেই অর্থের বিশাল অংশ ব্যয় হতো সামরিক খাতে। যেহেতু সামরিক বাহিনীতে সার্ব সদস্যরা ৮০ শতাংশ স্থান দখল করে আছে, তাই ওই ধরনের অর্থনৈতিক বণ্টন ব্যবস্থা ক্রোয়াটদের প্রচণ্ডভাবে যন্ত্রণা দিয়ে আসছিল যুগ যুগ ধরে। মাঝখানে মার্শাল টিটুর শাসনকাল পর্যন্ত সময়টুকুতে তাদের সান্ত্বনা ও প্রাপ্তি ছিল তাদের প্রেসিডেন্ট ক্রোয়াট বংশোদ্ভূত- এতটুকুই। মার্শাল টিটুর মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় শাসনযন্ত্রে সার্বদের পুনরায় নিরঙ্কুশ প্রাধান্য সূচিত হলে পুরনো ক্ষতের যন্ত্রণা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সূচনা করে।

সাবেক যুগোস্লাভিয়ায় ক্রোয়েশিয়া ব্যতিরেকে অন্যান্য প্রদেশ যেমন স্লোভেনিয়া, বসনিয়া ও হার্জেগোভেনিয়া, মন্টিনিগ্রো ও মেসেডোনিয়া ইত্যাদি জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে সার্বদের প্রতি নানাবিধ কারণে ক্ষোভ বিরাজমান থাকলেও সার্ব তথা সার্বিয়ানদের ধারাবাহিক খবরদারি প্রতিহত করার মতো শক্তি বা সার্বদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার মতো শক্তি ও সামর্থ্য কোনোটাই তাদের ছিল না। তদুপরি সার্ব ও ক্রোয়াটরা যখন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত, যুগোস্লাভিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশ স্লোভেনিয়া অনায়াসে স্বাধীনতা ঘোষণাক্রমে বলতে গেলে বিনা রক্তপাতে তা অর্জন করে নেয়। তখন সেনাবাহিনীর ক্রোয়াট সদস্য ও জনতা মিলে সার্বদের বিরুদ্ধে অর্থাৎ সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। একপর্যায়ে ক্রোয়াটরা যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র ক্রোয়েশিয়া প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হলে বসনিয়া ও হার্জেগোভেনিয়াও স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ফলে সার্ব বা সরকারি বাহিনী রক্তক্ষয়ী আক্রমণ করে দুর্বল বসনিয়া ও হার্জেগোভেনিয়ার জনসাধারণের ওপর নির্বিচারে হত্যা, জ্বালাও-পোড়াওসহ নারীদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে সে অঞ্চলকে এক ধ্বংসপুরীতে রূপান্তরিত করে। উল্লেখ্য, বসনিয়া ও হার্জেগোভেনিয়ার অধিকাংশ জনগণ মুসলিম হওয়ার কারণে সেনাবাহিনীতে তাদের অংশগ্রহণের অধিকার ছিল খুবই সীমিত। তা ছাড়া সে অঞ্চলের জনগণের একটা বিরাট অংশ ছিল যাযাবর জাতি। যে কারণে যুদ্ধের শুরুতে সে অঞ্চলের জনগণের মৃত্যু ও পলায়নকে মেনে নেয়া ছাড়া উপায় ছিল না। পরবর্তীতে তারা মাথা উঁচু করে আক্রমণ প্রতিহত করার শক্তি ও সাহস অর্জন করে এবং এক সময় তারাও স্বাধীনতা অর্জন করতে সক্ষম হয়।
কেনিনে আমার অবস্থানকালে গোটা বসনিয়া ও হার্জেগোভেনিয়ায় সার্বদের সঙ্গে মুসলমানদের প্রচণ্ড যুদ্ধ চলছিল। কেনিনে আমরা যে বাড়িতে থাকতাম, তাদের রেডিওযোগে বিবিসি ও ভয়েস অব আমেরিকার সংবাদে প্রতিনিয়তই ওখানকার ঘটে যাওয়া ঘটনার বিবরণ আমরা জানতে পারতাম। এদিকে ক্রোয়েশিয়া স্বাধীনতা অর্জন করলেও এর অভ্যন্তরে কেনিন, টুপোস্কো ও ব্যালিমানাস্তিসহ চারটি সার্ব অধ্যুষিক্ত অঞ্চল ক্রোয়াটদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়ে যায়। ক্রোয়েশিয়া থেকে সার্বরা অর্থাৎ সার্বিয়ান বাহিনী পশ্চাৎ গমনকালে বর্ণিত সার্ব অধ্যুষিত অঞ্চলে তারা বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও যুদ্ধসামগ্রী রেখে যায়। এসব অস্ত্রশস্ত্রে বলীয়ান হয়ে বর্ণিত চারটি অঞ্চলের সার্বরা ‘সার্বস্কা ক্রাইনা’ নামে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে, যা পরবর্তী বছরের অর্থাৎ ১৯৯৩ সালের জানুয়ারির মধ্যে ক্রোয়াট বাহিনী অনায়াসে দখল করে ক্রোয়েশিয়ার অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। যুদ্ধকালীন ওই সব স্থানে মানব ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত জাতিসংঘ বাহিনীকে অস্থায়ীভাবে অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়।
ওই সময় পর্যন্ত সার্ব অধ্যুষিত এলাকা কেনিনস্থ সেক্টর সাউথ এ চার মাস পুলিশ লিয়াজোঁ অফিসার হিসেবে কর্ম সম্পাদন করি। আমার দায়িত্ব ছিল রেডক্রস সোসাইটি এবং জাতিসংঘ উদ্বাস্তু কমিশনের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে দুই অঞ্চলের বন্দিবিনিময় কাজে সহযোগিতা করা। বন্দিবিনিময় কাজটি মূলত আমাদের মধ্যস্থতায় দুই দেশের সরকারি পর্যায়ে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সম্পন্ন করা হতো। তবে বন্দিদের তালিকা ও নির্ধারিত ফরমে বন্দির আত্মীয়স্বজনের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত আবেদনপত্র আমার তত্ত্বাবধানে প্রেরণ করা হতো। দ্বিপক্ষীয় আলোচনার সিদ্ধান্ত মোতাবেক বন্দিবিনিময়ের দিন আমাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বন্দির একজন আত্মীয় বর্ডার এলাকায় যেতে পারতেন। বিষয়টি খুবই আবেগাশ্র“ত থাকায় বন্দিদের আত্মীয়স্বজন তাকে গ্রহণের উদ্দেশ্যে হাতে করে শোভনীয় ফুলের তোড়া নিয়ে উপস্থিত হতো। অনেক সময় দেখা যেত ১০-১২ জন আত্মীয় বন্দিকে গ্রহণ করার জন্য আমাদের সঙ্গে সমসংখ্যক আত্মীয়স্বজন যেত। সে ক্ষেত্রে প্রায় সময়ই হঠাৎ করে উড়ে আসা রাজনৈতিক অনাকাক্সিক্ষত অশুভ সিদ্ধান্তের পালাবদলের কারণে বন্দি বিনিময় কম হতো। এমন কি কখনো কখনো দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হঠাৎ করে ভেস্তে যাওয়ার কারণে বন্দিবিনিময় স্থগিত করা হয়ে যেত। তখন আত্মীয়স্বজনের কান্না, বিলাপ, আহাজারী এবং বুকে ও কপালে হাত চাপড়ানো ইত্যাদি হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখে চোখের জল সম্বরণ করতে পারতাম না। আবার বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বন্দির আত্মীয়স্বজনরা অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে যেত। কোনো কোনো সময়ে সে রকম পরিস্থিতিতে যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার আশঙ্কার উদ্ভব হলে তাদেরকে অজ্ঞান অবস্থাতেই গাড়িতে করে নিয়ে এসে বাড়িতে পৌঁছে দিতাম। গাড়িতে তুলে চোখে-মুখে ঠাণ্ডা পানির ছিটা দিয়ে জ্ঞান ফিরিয়ে আনার কাজটি আমিই করতাম। আমার এ চিকিৎসা পদ্ধটির কারণে আমি সেখানে কিছুটা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলাম। খুব মনে পড়ে দ্রাগা নামের এক সপ্তাদশী ওই সংঘর্ষকালে বাবা-মা ও একমাত্র ভাইকে হারিয়ে সে একদম একা হয়ে যায়। তার প্রেমিক ক্রোয়েশিয়ার রাজধানী জাগরেভে তখন অধ্যয়নরত ছিল। ওই মেয়েটির প্রেমিককে ফিরিয়ে আনার জন্য আমি চারবার আবেদনপত্র প্রেরণ করি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে চারবারই গ্রিন সিগন্যাল পাওয়া গেলেও প্রতিবারই দ্রাগাকে অজ্ঞান অবস্থায় নিয়ে আসতে হয়েছিল।
দ্রাগাদের বাড়ি কেনিন শহরের উত্তর-পূর্ব সন্নিকটে ভারপলি গ্রামে। গ্রামটি ক্রোয়াট অধ্যুষিত। যতটুকু মনে পড়ে গোটা বিশেক সার্ব পরিবারের বসতি সেখানে ছিল। প্রথমদিকে ওদের মধ্যে নির্ভরশীল সহাবস্থান থাকলেও ’৯১ সালের শেষের দিকে ক্রোয়েশিয়ার বন্দর নগরী স্পি­ট থেকে গোরান অবোটাসহ ৬-৭ জন যুবক কোনো রকমে প্রাণে বেঁচে ভারপলি আসতে সক্ষম হয়। ওরা প্রত্যেকেই স্বজনহারা। দুঃখজনক ঘটনা ছিল গোরান অবোটার দুই বোনকে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় সে প্রায় উন্মাদ হয়ে যায়। তারা ফিরে এসে গ্রামের ও এলাকার লোকজনদের ওসব বলে ক্ষেপিয়ে তুললে ওই গ্রামের সার্ব ও ক্রোয়াটদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষ চলাকালে গ্রামের প্রায় সবাই আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে। ফলে অনেক প্রাণহানি সংঘটিত হয়। যেহেতু গ্রামটি বিশাল এবং ক্রোয়াট অধ্যুষিত, তাই ক্রোয়াটদের কাছে তারা পরাজিত হয়ে গ্রাম ত্যাগ করে। ফলে গ্রামের প্রত্যেকটি সার্ব পরিবারের বাড়িঘর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। সেই ধ্বংসযজ্ঞে দ্রাগার বাবা ও ছোট ভাইকে হত্যা করা হয় এবং তার মাকে অপহরণ করে কোথায় নিয়ে যায় তার সন্ধান তারা কোনো দিন পায়নি। তারা অনুমান করছে হয়তো তাকে ধর্ষণ করে লাশ গুম করে ফেলা হয়েছে।
দ্রাগাদের বাড়িটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। সে তখন বাড়িতে ছিল না বলে প্রাণে বেঁচে গেছে। সেখানে তার মাতৃপক্ষীয় কেউ না থাকায় ওই ঘটনার পর সে আর বাড়ি ফেরেনি। দ্রাগা প্রথমে গির্জায় আশ্রয় নিয়েছিল। সেখানে এক রাত কাটিয়ে চলে যায় তার বয়ফ্রেন্ড ইভানস্কোভিসের বাবা-মার কাছে। দ্রাগার কাছে শুনেছি, তার মা তুর্কি বংশোদ্ভূত অনন্য সাধারণ এক সুন্দরী রমণী। তার মা-বাবা বেলগ্রেডে একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে চাকরি করতেন। সেখান থেকে তার মাকে নিয়ে তার বাবা পালিয়ে কেনিন এসে বিয়ে করে। বিয়ের সময় তার মায়ের বয়স ছিল ১৮ বছর। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সুন্দরী। তার ছিল ঘন কালো লম্বা চুল। তার মাকে প্রথম কেউ দেখলে ২০ বছরের বেশি বয়স হয়েছে মনেই করতে পারবে না। দ্রাগা তার মায়ের চেহারা, টিয়া পাখির ঠোঁটের মতো বাঁকা নাক, দুধে আলতা রঙের শরীর ও ঘন কালো চুল পুরোটাই পেয়েছে। তার ভাই ঈগরের চেহারা ও শারীরিক গড়ন তার বাবার মতো। তাদের কথা দ্রাগা প্রায়ই বলত আর অজোর ধারায় চোখের জল ফেলত। আমি নিজে থেকে প্রথম একবার ছাড়া কেনিন অবস্থানকালীন পরবর্তী চার মাসে ওর বাবা-মার প্রসঙ্গে কোনো কথা বলিনি। ক্রোয়েশিয়ার ভেতরের সার্ব অধ্যুষিত অঞ্চলগুলো ক্রোয়েশিয়ার দখলে চলে যাওয়ার পর দ্রাগা ও ইভানস্কোভিসের মিলন দুরাশায় পরিণত হয়। কেনিন থেকে জাগরেভ আসার বিভিন্ন সময়ে দ্রাগা আমাকে জেলখানায় খোঁজখবর নিয়ে ইভানস্কোভিসের সন্ধান করতে বলত। কিন্তু কাজটা খুবই দুরূহ এবং সন্দেহজনক ছিল বলে আমি চেষ্টা করিনি। কিন্তু পরবর্তীতে জাগরেভে বদলি হয়ে আসার পর ইভানস্কোভিসের সন্ধান আমি পেয়েছিলাম। কিন্তু ছবিতে যে ইভানস্কোভিসকে আমি দেখেছিলাম তার সঙ্গে বন্দি ইভানস্কোভিসের তফাৎ ছিল আকাশ-পাতাল। দ্রাগার প্রসঙ্গ তুললে তার চোখ বেয়ে অজোর ধারায় পানি বেয়ে পড়তে দেখেছিলাম। সে কোনো কথা বলতে পারেনি। শুধু জানিয়েছিলাম তার বাবা-মার সঙ্গে দ্রাগা অবস্থান করছে। তারপর ইচ্ছা করে দ্রুত চলে আসি। এ ব্যাপারে দ্রাগাকে কোনো কিছু জানাতে বা যোগাযোগের কোনো চেষ্টা আমি করিনি।
এত বছর পর দ্রাগার পরিপূর্ণ অবয়ব আমার পরিষ্কার মনে নেই। লেখার প্রয়োজনে স্মৃতির পাথর খুঁড়ে খুঁড়ে টুকরো টুকরো কথা বের করার চেষ্টা করছি। সত্যি কথা বলতে কি, চেহারা, গায়ের বর্ণ ও শারীরিক দর্শনীয় শৈলী মিলিয়ে দ্রাগার মতো মেয়ে দ্বিতীয়টি আমার চোখে পড়েনি। দ্রাগা নামটি ওদের কোনো পৌরাণিক চরিত্রের রূপকার্থক কিনা জানা নেই। তবে তার নামের অর্থের চেয়েও সে বেশি অপরূপ ও মোহনীয়। সে যখন কাঁদত, মনে হতো তার কান্নার সময়, নিজে কেঁদে তাকে সমবেদনা জানাতে পারলে হয়তো যথার্থ হতো।