Friday, June 26, 2026

ইরান যুদ্ধ: নয়াদিল্লির হার নাকি পাকিস্তান সত্যিই লাভবান হলো? by শশী থারুর

পশ্চিম এশিয়ায় সম্প্রতি সমাপ্ত ১০৭ দিনের সংঘাত, যার পরিণতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি নাজুক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। আগামী ৬০ দিনের মধ্যে সেটিকে একটি শান্তি চুক্তিতে রূপ দেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে যা আধুনিক ভূরাজনীতির পরিবর্তনশীল বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

তেল সরবরাহ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করায় এবং যুদ্ধকালীন উচ্চতা থেকে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম স্থিতিশীলতার দিকে নেমে আসায় বিশ্ব অর্থনীতি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। তবে এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু বিধ্বংসী যুদ্ধের কৌশলগত হিসাব-নিকাশ বিশ্লেষণ করলে ভুল মূল্যায়ন, অসম প্রতিরোধক্ষমতা এবং কূটনৈতিক পুনর্বিন্যাসের একটি জটিল চিত্র সামনে আসে।

নয়াদিল্লির দৃষ্টিকোণ থেকে এই সংঘাতের কাঠামোগত ফলাফল বিশ্লেষণ করলে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের মনোযোগ পড়ে সরাসরি জড়িত পক্ষগুলোর ওপর- ওয়াশিংটনের ব্যর্থ বোমাবর্ষণ অভিযান এবং সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থতা, হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের অসম প্রতিরোধমূলক চাপ প্রয়োগের সক্ষমতা এবং ইসরাইলের আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীগুলোর ওপর কৌশলগত আঘাত হানার সাফল্য, যা ইরানের পূর্ণ আত্মসমর্পণ আদায়ে ব্যর্থতার কারণে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে।

কিন্তু এই তাৎক্ষণিক কৌশলগত বাস্তবতার আড়ালে আরও সূক্ষ্ম, কিন্তু সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি কূটনৈতিক মঞ্চ বিদ্যমান ছিল। সেখানে দক্ষিণ এশিয়ার শক্তিগুলো সংকট মোকাবিলায় নিজেদের অবস্থান নির্ধারণের চেষ্টা করেছে। যার ফলে দীর্ঘদিনের প্রচলিত ভূমিকাগুলোর নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে।

পশ্চিম এশিয়া নিয়ে ভারতের নীতি
দশকের পর দশক ধরে পশ্চিম এশিয়ায় নয়াদিল্লির পররাষ্ট্রনীতি একটি সূক্ষ্ম ও সুচিন্তিত জোটনিরপেক্ষ অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল, যা সাম্প্রতিক সময়ে ‘বহুমুখী সমন্বয়’ (মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট) নামে পুনর্ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই কৌশল ভারতের জন্য ইরানের সঙ্গে গভীর সভ্যতাগত, অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সম্পর্ক বজায় রাখা সম্ভব করেছে। একই সঙ্গে ইসরাইলের সঙ্গে উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা এবং উপসাগরীয় রাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখাও সম্ভব হয়েছে। এই কৌশলগত ভারসাম্য কেবল একটি নৈতিক অবস্থান ছিল না; বরং ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং অর্থনৈতিক প্রয়োজনের কারণে এটি ছিল একটি বাস্তববাদী অপরিহার্যতা।

তবে সাম্প্রতিক সংঘাত এই নীতির একটি দুর্বলতা উন্মোচন করেছে বলে মনে হয়। কারণ নয়াদিল্লি যেন তার ঐতিহাসিক ভারসাম্য নষ্ট করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল অক্ষের দিকে অতিমাত্রায় ঝুঁকে পড়েছিল। এর একটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, ইরানের ওপর বোমাবর্ষণ শুরু হওয়ার কয়েক দিন আগে তেল আবিবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ইসরাইলি সমকক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা প্রদর্শনের বিষয়টি। সংকটের সবচেয়ে উত্তপ্ত পর্যায়ে ঐতিহ্যগত নিরপেক্ষ অবস্থান পরিত্যাগ করে ভারত এমন একটি ঝুঁকি নিয়েছে, যাতে তাকে স্বাধীন বৈশ্বিক শক্তির পরিবর্তে একটি পক্ষবিশেষের সমর্থক হিসেবে দেখা হতে পারে।

এই আপাত কূটনৈতিক ভুলের তাৎক্ষণিক কৌশলগত মূল্যও দিতে হয়েছে। ভূরাজনীতিতে সম্ভাব্য কোনো মধ্যস্থতাকারী পিছু হটলে, সেই শূন্যস্থান দ্রুতই কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি পূরণ করে। সংঘাতের এক পক্ষের সঙ্গে নিজেদের কূটনৈতিক ও বক্তব্যগত অবস্থান ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার মাধ্যমে নয়াদিল্লি সম্ভবত তেহরানের কাছে গ্রহণযোগ্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করেছে। ফলে যুক্তি দেয়া হচ্ছে যে, ভারত পশ্চিম এশিয়ার কূটনীতির মর্যাদাপূর্ণ ও প্রভাবশালী উচ্চ আসন- বিশেষত জেনেভায় অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনা- ইসলামাবাদের কাছে ছেড়ে দিয়েছে।

যে দেশ দীর্ঘদিন ধরে তার কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এবং বিভক্ত বৈশ্বিক ব্যবস্থার সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলার সক্ষমতা নিয়ে গর্ব করেছে, তাদের কাছে ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানকে- যাকে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অনুসারী এবং চীনের ওপর নির্ভরশীল রাষ্ট্র হিসেবে অবজ্ঞা করা হয়েছে, আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠার মুখ্য ভূমিকায় দেখতে হওয়া অনেকের কাছে একটি বড় কূটনৈতিক ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এটি দেখিয়ে দেয়, বিশেষত এমন এক অঞ্চলে যেখানে ভৌগোলিক বাস্তবতা অপরিবর্তনীয় এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক বজায় রাখা অপরিহার্য, সেখানে স্বল্পমেয়াদি জোটগত অবস্থান গ্রহণ দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক ধারাবাহিকতার তুলনায় কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে- সরকারগুলোর আদর্শিক বা ধর্মীয় চরিত্র যেমনই হোক না কেন।

মধ্যস্থতাকারী নাকি বার্তাবাহক?
তবে ইসলামাবাদের আকস্মিক উত্থানকে একটি স্বাধীন আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উপস্থাপনের বর্ণনাকে গভীর সংশয়ের সঙ্গে পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। যদিও পাকিস্তান যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা এবং শত্রুতা বন্ধের ঘোষণা দেয়ার ক্ষেত্রে নিজের ভূমিকাকে জোরালোভাবে তুলে ধরেছে, সংকটজুড়ে তাদের কূটনৈতিক আচরণ আরও জটিল একটি বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রতি পাকিস্তানি নেতৃত্বের অত্যধিক দৃশ্যমান প্রশংসা- যা অনেকের কাছে প্রায় তোষামোদপূর্ণ বলে মনে হয়েছে এবং ওয়াশিংটনে প্রস্তুত করা একটি বিবৃতি পাকিস্তানের পক্ষ থেকে প্রকাশ করার বিব্রতকর ঘটনা (যেখানে ভুলবশত প্রকাশিত শিরোনাম ছিল ‘পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর জন্য খসড়া’) তাদের তথাকথিত ‘নিরপেক্ষতা’র সত্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করে।

প্রকৃত মধ্যস্থতার জন্য প্রয়োজন একটি নির্দিষ্ট মাত্রার দূরত্ব বজায় রাখা এবং বিরোধের উভয় পক্ষ থেকে সমান ব্যবধান রক্ষা করা। কিন্তু ওয়াশিংটনের প্রতি ইসলামাবাদের প্রদর্শিত আনুগত্যপূর্ণ আচরণ দৃঢ়ভাবে ইঙ্গিত করে যে, তারা মোটেই নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ সালিশকারীর ভূমিকায় ছিল না। বরং তাদের আচরণ একটি সুবিধাবাদী প্রতিনিধির প্রচলিত সংজ্ঞার সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়- এমন একটি পক্ষ, যার পূর্বনির্ধারিত আনুগত্য রয়েছে এবং যে তার পরাশক্তিধর পৃষ্ঠপোষকের অনুকম্পা লাভের মাধ্যমে নিজ দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দুর্বলতাগুলো লাঘব করতে আগ্রহী। ফলে আরও নিবিড় বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইসলামাবাদ প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন ও কার্যকর মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছে, এমন দাবি খুব বেশি গ্রহণযোগ্য নয়।

একজন প্রকৃত মধ্যস্থতাকারীর এমন স্বাধীন প্রভাবক্ষমতা থাকে, যার মাধ্যমে তিনি বিরোধের উভয় পক্ষের আচরণ পরিবর্তন করতে পারেন এবং আলোচনার কাঠামো নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারেন। কিন্তু এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান একটি স্বতন্ত্র শান্তি প্রতিষ্ঠাকারীর চেয়ে বরং একটি সুবিধাজনক কূটনৈতিক বিকল্প হিসেবে কাজ করেছে। অর্থাৎ এমন একটি যোগাযোগের মাধ্যম, যার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ চ্যানেলবিহীন দুই প্রতিপক্ষ নিজেদের অবস্থান থেকে সম্মান রক্ষা করে উত্তেজনা প্রশমনের বার্তা আদান-প্রদান করতে পেরেছে। ওয়াশিংটন এমন একটি সংঘাতে আটকে পড়েছিল, যা ছিল অভ্যন্তরীণ আইনসভা বা কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই শুরু করা, জনসমর্থনহীন, অর্থনৈতিকভাবে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী এবং আইনগতভাবে বিতর্কিত। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জরুরি প্রয়োজন ছিল এমন একটি গোপন যোগাযোগের পথ, যার মাধ্যমে তারা সংকট প্রশমনে নিজেদের নমনীয় অবস্থানের ইঙ্গিত দিতে পারে।
অন্যদিকে, তেহরান হরমুজ প্রণালির সামুদ্রিক সংকীর্ণ পথকে কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যাহত করার সক্ষমতা প্রদর্শন করলেও, লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড এবং অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার কারণে অভ্যন্তরীণভাবে তীব্র চাপের মুখে ছিল। তারও এমন একটি অবতরণস্থল প্রয়োজন ছিল, যেখানে সম্মান অক্ষুণ্ন রেখে উত্তেজনা হ্রাসের পথ খুঁজে পাওয়া যায়।

কেন পাকিস্তানকে বেছে নেওয়া হয়েছিল
এই প্রেক্ষাপটে ইসলামাবাদকে বেছে নেয়া হয়েছিল তার কৌশলগত গুরুত্ব বা নৈতিক কর্তৃত্বের কারণে নয়, বরং নির্ভরযোগ্য বার্তা আদান-প্রদানের একটি মাধ্যম হিসেবে তার উপযোগিতার কারণে। পাকিস্তান এমন একটি হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি দেশের সঙ্গে সরাসরি উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ স্থাপনের রাজনৈতিক মূল্য না দিয়েই নিজেদের প্রস্তাব পাঠাতে এবং জবাব গ্রহণ করতে পেরেছে- যে দেশটিকে তারা কয়েক মাস ধরে প্রকাশ্যে নিন্দা ও দানবায়নের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিল। এই ব্যবস্থার ফলে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের জন্য একটি সম্মানজনক প্রস্থান কৌশল পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের দক্ষিণ এশীয় অংশীদারও নিজেকে বৈশ্বিক রাষ্ট্রনায়কোচিত ভূমিকায় উপস্থাপনের সুযোগ পেয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের প্রতি যে অতিরিক্ত প্রশংসাবাক্য বর্ষণ করা হয়েছে, তা মূলত একটি লেনদেনভিত্তিক মূল্যপরিশোধ হিসেবে দেখা যেতে পারে। এটি এমন এক বিকল্প প্রতিনিধির আচরণ, যে তার পৃষ্ঠপোষকের কাছে নিজের গুরুত্ব প্রমাণে আগ্রহী এবং আশা করে যে ভবিষ্যতে তার কূটনৈতিক সেবার বিনিময়ে প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক সুবিধা লাভ করবে।

বদলে যাওয়া কূটনৈতিক বাস্তবতা
সবশেষে বলা যায়, পশ্চিম এশিয়ার এই সংকটের বিস্তৃত বিশ্লেষণ দেখায় যে যদিও অস্ত্রের গর্জন আপাতত থেমে গেছে এবং পারমাণবিক আলোচনা এগিয়ে নেয়ার জন্য একটি নাজুক ৬০ দিনের কাঠামো গড়ে উঠেছে, তবুও কূটনৈতিক মানচিত্র ইতিমধ্যে পুনর্গঠিত হয়েছে। নয়াদিল্লির ঐতিহ্যগত নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সরে আসা একটি কঠোর বাস্তবতা সামনে এনেছে- মহাশক্তির রাজনীতিতে কোনো রাষ্ট্রকে পক্ষপাতদুষ্ট হিসেবে দেখা মাত্রই বৈশ্বিক সেতুবন্ধনকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক প্রভাব দ্রুত ক্ষয়ে যায়।

ভারত এমন একটি দীর্ঘদিনের সুনাম ও কৌশলগত সম্পদ বিসর্জন দিয়েছে, যার বিনিময়ে খুব সামান্য বাস্তব কৌশলগত লাভ অর্জিত হয়েছে। অন্যদিকে, কূটনৈতিক অঙ্গনে পাকিস্তানের এই মুহূর্তের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসাকে মধ্যস্থতার সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও, বাস্তবে এটি ছিল প্রতিনিধিনির্ভর কূটনীতির একটি অনুশীলন। এটি দেখিয়েছে যে, কোনো রাষ্ট্র প্রকৃত কৌশলগত স্বাধীনতা ছাড়াই আন্তর্জাতিক আলোচনার উচ্চপর্যায়ের টেবিলে স্থান করে নিতে পারে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রটি প্রকৃতপক্ষে একটি পশ্চাদপসরণরত পরাশক্তির জন্য অত্যাধুনিক একটি ‘সামনের মুখ’ বা প্রতিনিধির ভূমিকাই পালন করে। ওয়াশিংটন হয়তো এর বিনিময়ে পাকিস্তানকে অতিরিক্ত সামরিক বা আর্থিক সহায়তা দিতে পারে। তবে তা পাকিস্তানের সামগ্রিক ভাগ্য পরিবর্তনকারী কোনো ঘটনা হওয়ার সম্ভাবনা কম।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যখন এখন জেনেভায় চূড়ান্ত চুক্তির খুঁটিনাটি নির্ধারণের কঠিন পর্যায়ে প্রবেশ করছে, তখন এই সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো- অকালেই নিরপেক্ষতা পরিত্যাগ করা এবং আগ্রহভরে অন্যের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার ভূমিকা গ্রহণ করা- দুটোরই দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের ওপর গভীর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রয়েছে। ভারতের জন্য সুস্পষ্ট শিক্ষা হলো প্রকৃত বহুমুখী সমন্বয় বা মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট নীতিতে ফিরে যাওয়া। আর পাকিস্তানের জন্য শিক্ষা হবে বৈশ্বিক মর্যাদা বৃদ্ধির বিষয়ে নিজেদের অতিরঞ্জিত ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা।

চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন হলে পাকিস্তান, কাতার, ওমান এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠাকারীরা অবশ্যই কিছু প্রশংসা পেতে পারে। কিন্তু সন্ত্রাসবাদে পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগে অভিযুক্ত ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের জন্য একটি নোবেল শান্তি পুরস্কারের কল্পনা করা বাস্তবতা থেকে অনেক দূরের বিষয়। বিশ্ব স্পষ্টভাবেই বুঝতে পারে, একজন স্বতন্ত্র ও স্বাধীন কূটনৈতিক অভিনেতা এবং কেবল বার্তা বহনকারী একজন দূতের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

(শশী থারুর, ২০০৯ সাল থেকে কেরালার তিরুবনন্তপুরম আসনের সংসদ সদস্য। তিনি একজন খ্যাতিমান লেখক এবং সাবেক কূটনীতিক। অনলাইন এনডিটিভি থেকে তার লেখার অনুবাদ)

ইরান যুদ্ধ: নয়াদিল্লির হার নাকি পাকিস্তান সত্যিই লাভবান হলো?

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিকে চিরতরে বদলে দিয়েছে ফিলিস্তিন -দ্য ন্যাশনের বিশ্লেষণ

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস প্রায় কোনো বিরোধিতা ছাড়াই প্রতি বছর ইসরাইলি সামরিক বাহিনীকে শত শত কোটি ডলার অর্থায়ন করে আসছে। এই দেশে জাতীয় পদে আসীন হতে চাইলে, যেকোনো মূল্যে ইসরাইলকে সমর্থন করাটা প্রায় অপরিহার্য—দীর্ঘদিন ধরেই এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য ছিল। অথচ সেই সমর্থনের কারণে যারা ফিলিস্তিনি ও লেবানিজ আমেরিকান, তাদের আত্মীয়স্বজনসহ লাখ লাখ মানুষ ক্রমাগত হত্যা, বাস্তুচ্যুতি ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।

কিন্তু ইসরাইলের জন্য অবাধ অর্থায়ন ও দায়মুক্তির দিন শেষ। তা আর কখনো ফিরে আসবে না। এই অকাট্য বাস্তবতা নিয়ে যার সন্দেহ আছে, তার নিউইয়র্ক সিটির নির্বাচনের দিকে তাকানো প্রয়োজন। নির্বাচনে ফিলিস্তিনপন্থি প্রার্থীরা পাঁচটি বরোতে বিপুল বিজয় লাভ করেছেন। এই ঐতিহাসিক ফলাফলের পেছনে অনেক কারণ ছিল। কিন্তু একটি বিষয় তারা নিঃসন্দেহে নিশ্চিত করেছেন যে, ফিলিস্তিনি অধিকারের প্রতি সমর্থন অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পরিবর্তন আনছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে আর কিছুই আগের মতো থাকবে না।

স্থানীয় সময় মঙ্গলবার রাত ৯টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার প্রায় সাথে সাথেই এটা স্পষ্ট হয়ে যায়, নিউইয়র্ক সিটির ওপর দিয়ে ফিলিস্তিনপন্থি একটি ঢেউ আছড়ে পড়ছে। এই অপ্রতিরোধ্য স্রোতের ব্যাপকতা প্রথম অনুভব করেন বিদায়ী প্রতিনিধি ড্যান গোল্ডম্যান, যিনি তার বামপন্থি প্রতিদ্বন্দ্বী নিউইয়র্ক সিটির সাবেক কম্পট্রোলার ব্র্যাড ল্যান্ডারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার চেষ্টা করছিলেন। গোল্ডম্যান তার পুরো রাজনৈতিক জীবনে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলের নিপীড়নের একজন সোচ্চার সমর্থক ছিলেন এবং এই প্রচারণার শেষ পর্যন্ত তিনি এই অবস্থান বজায় রেখেছিলেন। তিনি ইসরাইল যে ফিলিস্তিনি ভূমি দখল করেছে তা মেনে নিতে রাজি নন। তিনি গাজায় সংঘটিত গণহত্যাকে অস্বীকার করেন এবং এমনকি স্বীকার করেন যে গত বছরের সিটি নির্বাচনে তিনি নিউইয়র্ক সিটির মেয়র পদের ডেমোক্র্যাটিক মনোনীত প্রার্থী জোহরান মামদানিকে ভোট দেননি। আর ভোট না দেওয়ার কারণ ছিল, মামদানি ফিলিস্তিনি অধিকারের পক্ষে সোচ্চার।

যখন গোল্ডম্যানের ভোটাররা ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধি থেকে মুক্তির দাবি জানাচ্ছিলেন, তখন ওয়াশিংটনে তাদের প্রতিনিধি নির্লজ্জভাবে ইসরাইলের সামরিক বাহিনীকে অর্থায়নের জন্য শত শত কোটি ডলার পাঠাচ্ছিলেন। এমনকি ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তার থেকে রক্ষা করার জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপকারী রিপাবলিকান-নেতৃত্বাধীন আইনের পক্ষে ভোটও দিয়েছিলেন।

বিগত বছরগুলোতে, এই ভোটগুলো হয়তো তার পুনঃনির্বাচনকে সুনিশ্চিত করত। এ বছর সেগুলোই তার বিরুদ্ধে কাল হয়ে দাঁড়ায়-যা কোনো বড় অঙ্কের অনুদান দিয়েও মোকাবিলা করা সম্ভব ছিল না।

ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার মাত্র চার মিনিটের মধ্যেই ফলাফল ঘোষণা করা হয়। গোল্ডম্যান ল্যান্ডারের কাছে ৩০ পয়েন্টে হেরে যান। তিনি কংগ্রেসের ইতিহাসে প্রথম সদস্য হিসেবে ইসরাইলের প্রতি তার দৃঢ় সমর্থনের কারণে সুস্পষ্টভাবে পরাজিত হন।

এক ঘণ্টা পর, একই ঘটনা আবার ঘটল। কয়েক মাস আগে, খুব কম লোকই বিশ্বাস করত যে, ফিলিস্তিনি অধিকারের প্রতি সোচ্চার কণ্ঠ দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ার তার প্রতিদ্বন্দ্বী আদ্রিয়ানো এস্পাইলাটের মতো পাঁচবারের ক্ষমতাসীন একজনকে পরাজিত করতে পারবেন। আমেরিকান ইসরাইল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি ও তার মিত্ররা এই প্রতিযোগিতায় লাখ লাখ ডলার ঢেলেছিল, আভিলা শেভালিয়ারের ওপর অবিরাম আক্রমণ চালিয়েছিল এবং এস্পাইলাটকে জেতানোর চেষ্টা করেছিল। তবে তা কাজে আসেনি। সবচেয়ে বিস্ময়কর অঘটনে আভিলা শেভালিয়ার এস্পাইলাটকে পরাজিত করেন। তার বিজয় সমাবেশের জনতা ‘ফিলিস্তিনকে মুক্ত করো!’ ধ্বনিতে গগনভেদী স্লোগান দিয়ে উল্লাসে মেতে ওঠে।

এখন এটা স্পষ্ট যে, ইসরাইলের গণহত্যার বিরুদ্ধে আভিলা শেভালিয়ারের স্বচ্ছ নৈতিক অবস্থান তার প্রচারণার জন্য একটি হাতিয়ার ছিল—ঠিক যেমনটা ছিল ল্যান্ডার ও ক্লেয়ার ভালদেজের জন্য।

এক রাতের মধ্যেই কংগ্রেসের দুজন সদস্য হেরে গেলেন, যাদের দুজনেরই সবচেয়ে বড় দাতা হলো এআইপিএসি। এর একটি বড় কারণ হলো, তারা সেই সমর্থন পেয়েছিলেন শর্ত সাপেক্ষে: ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলের গণহত্যা অস্বীকার করা এবং আমেরিকানরা যখন জীবনধারণের জন্য সংগ্রাম করছে, তখন ইসরাইলকে দেওয়া শত শত কোটি ডলারের পক্ষে ভোট দেওয়া। এই ঘটনা আমাদের দেশের রাজধানীতে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, যেখানে উভয় দলের কংগ্রেসের অধিকাংশ সদস্য এখনো সেই একই অনুদান গ্রহণ করেন এবং সেই একই ভোট দেন। একইভাবে, এই ঘটনাটিও আলোড়ন সৃষ্টি করছে যে, ফিলিস্তিনপন্থি মেয়র মামদানি ডেমোক্র্যাটিক নেতৃত্বের প্রচণ্ড চাপ সত্ত্বেও দ্ব্যর্থহীনভাবে ল্যান্ডার, আভিলা শেভালিয়ার ও ভালদেজকে সমর্থন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং ভোটারদের কাছ থেকে বিপুলভাবে পুরস্কৃত হয়েছিলেন।

এরপরও নিশ্চয়ই এমন কিছু মানুষ থাকবেন যারা বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে নিজেদের বোঝাবেন যে শহরগুলো এবং ঐতিহ্যগতভাবে ডেমোক্র্যাট-সমর্থিত রাজ্যগুলো দেশের প্রতিনিধিত্ব করে না। কিন্তু জনমত জরিপ ভিন্ন কথা বলছে। টেক্সাসের সিনেট নির্বাচনের মার্চ মাসের ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে ভোটারদের ওপর চালানো জরিপে দেখা গেছে, ৭৬ শতাংশ ভোটার বিশ্বাস করেন যে ইসরাইল গণহত্যা চালাচ্ছে। অ্যারিজোনার মতো গুরুত্বপূর্ণ সুইং স্টেটের ৭৬ শতাংশ ডেমোক্র্যাটও একই মত পোষণ করেন। এই পরিসংখ্যানটি, এই মাসে প্রকাশিত আমাদের জরিপে নিউইয়র্ক স্টেটজুড়ে ৭০ শতাংশ ডেমোক্র্যাটের মতামতের চেয়েও বেশি, যারা বলেছিলেন যে ইসরাইল গণহত্যা চালাচ্ছে।

তবে এটি কেবল জনমতের বিষয় নয় বরং ভোটারদের সংগঠিত করারও বিষয়। ফিলিস্তিনি অধিকারের পক্ষে জোরালো অবস্থান গ্রহণ করা আজকের রাজনীতিতে অন্য যেকোনো বিষয়ের চেয়ে বেশি শক্তি জোগায়। এই পরিবর্তনটি ঘটার জন্য একটি ‘লাইভস্ট্রিম’ করা গণহত্যার প্রয়োজন হয়েছিল। ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলের নিপীড়ন ও নৃশংসতার মাত্রা একে লাখ লাখ ভোটারের জন্য একটি রেড-লাইন ইস্যুতে পরিণত করেছে, যারা এই ধরনের ভয়াবহতায় জড়িত কাউকেই সমর্থন করবে না।

যদিও ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতৃত্ব তা অস্বীকার করে যেতে পারেন, কিন্তু এটা স্পষ্ট যে, বাস্তবতাকে উপেক্ষা করার এই মনোভাবের কারণেই কমলা হ্যারিস ২০২৪ সালের নির্বাচনে জেতার জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ ভোট হারিয়েছেন। একই মনোভাব বজায় রাখলে ২০২৮ সালেও সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি রয়েছে। আগামীতে ভোটারদের দাবি স্পষ্ট: জাতীয়ভাবে, ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে ভোট দিতে ইচ্ছুক ভোটারদের মধ্যে ৭১ শতাংশ চান যে তাদের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ইসরাইলের কাছে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করার বিষয়টিকে সমর্থন করবে। সেইসঙ্গে তারা ইসরাইলি সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টিকেও সমর্থন করেন।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে, ইরানের সঙ্গে আলোচনা নিয়ে ইসরাইলি সরকারের সাথে প্রকাশ্য বিরোধ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। যা থেকে মনে হচ্ছে যে রক্ষণশীল ভোটাররাও ইসরাইলকে সমর্থন করা থেকে সরে এসেছেন। মে মাসে নিউইয়র্ক টাইমসের এক জরিপে দেখা গেছে, ৪৫ বছরের কম বয়সী ৬৩ শতাংশ রিপাবলিকান ইসরাইলকে সামরিক সহায়তা বন্ধ করার পক্ষে। এখনই কিছু বলাটা বেশি তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে, কিন্তু ডেমোক্র্যাটরা এখন পর্যন্ত যে সুযোগটি হাতছাড়া করেছেন, রিপাবলিকানরা তা গ্রহণ করে ‘ইসরাইলের প্রতি কঠোর’ দলের তকমা দাবি করবেন—এই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

ভোটাররা যেদিকে ঝুঁকে আছেন, সেদিকে সরে আসা ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নেতৃত্বের জন্য কঠিন হওয়া ঠিক হবে না। ডেমোক্র্যাটিক ভোটারদের কাছে ইসরাইলের সামরিক বাহিনীকে অর্থায়ন চালিয়ে যাওয়া সমকামী বিবাহ নিষিদ্ধ করার চেয়ে বেশি জনপ্রিয় নয়। যদি নিজেদের অবস্থান দ্রুত সংশোধন করা না হয়, তবে ডেমোক্র্যাটরা দেখতে পাবে যে সরকার গঠনের জন্য তারা নিজেরাই নিজেদের সবচেয়ে বড় বাধা।

সঠিক ও নৈতিক অবস্থান রাজনৈতিক কৌশলগত অবস্থানের সাথে মিলে যাবে-রাজনীতিতে এটা সবসময় নাও হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ফিলিস্তিনি অধিকার কর্মীরা, যারা কয়েক দশক ধরে এই কাজ করে আসছেন, তারা জানেন যে অবিশ্বাস্য সাহসিকতার ফলেই তারা আজ এই অবস্থানে এসে পৌঁছেছেন। ডেমোক্র্যাটদের কাছে এখন সুযোগ রয়েছে তাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ানোর এবং সেই মূল্যবোধগুলোকে সমুন্নত রাখার, যেগুলোকে দলটি সবচেয়ে গভীরভাবে গুরুত্ব দেয় বলে দাবি করে। যা সঠিক এবং যা চিরকাল সঠিক ছিল, তা করে দেখানোর এখনই সময়। তা না করার আর কোনো অজুহাত বাকি নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিকে চিরতরে বদলে দিয়েছে ফিলিস্তিন

ধর্মীয় উগ্রতা নয়, ১৪০০ বছরের আইনি ভিত্তিতে চলে ইরান

পশ্চিমা বিশ্বে ইরানকে কেবল একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র হিসেবে চিত্রায়িত করা হলেও দেশটির শাসনব্যবস্থার আসল রূপ সম্পূর্ণ ভিন্ন। আয়াতুল্লাহ খোমেনি কোনো ধর্মান্ধ নেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন ইসলামি আইনশাস্ত্রের এক মহান পন্ডিত।

এক নিবন্ধে এমনটাই দাবি করেছেন বিশিষ্ট গবেষক ও আইনজীবী লিম টিন।

তার মতে, পশ্চিমা প্রচারণার কারণে ইরানের প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক জটিল কাঠামো এবং এর পেছনের আইনি ভিত্তি বিশ্ববাসীর কাছে আড়ালে রয়ে গেছে।

নিবন্ধে লিম টিন উল্লেখ করেন, ইরানের একটি নিজস্ব সংবিধান, নির্বাচিত সংসদ, জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ও সুপ্রিম কোর্ট রয়েছে। এছাড়া সেখানে একটি সাংবিধানিক পর্যালোচনা কাউন্সিল রয়েছে। এই পুরো ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা আইনজ্ঞ।

শব্দ চয়ন ও পশ্চিমা প্রচারণা

লিম টিন বলেন, পশ্চিমা এস্টাবলিশমেন্ট ইরানকে হেয় করতে অত্যন্ত সচেতনভাবে ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র’ শব্দটি বেছে নিয়েছে। এই শব্দটির মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে এমন একটি ধারণা তৈরি করা হয়েছে যে, ইরান কোনো আইন ছাড়াই কেবল ধর্মীয় উগ্রতা দিয়ে পরিচালিত হয়। অথচ ইরানের শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠেছে ১৪ শ বছরের পুরোনো এবং অত্যন্ত সমৃদ্ধ ইসলামি আইনশাস্ত্রের (ফিকহ) ওপর ভিত্তি করে। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম ইরানকে এমনভাবে উপস্থাপন করে যাতে দেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপানো বা হামলা চালানো সহজ হয় এবং মানুষের মনে কোনো অপরাধবোধ না জাগে।

খোমেনির পড়াশোনা

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের মূল ভিত্তি হলো ‘ভেলায়েত-ই-ফকিহ’ বা ইসলামি আইনজ্ঞের অভিভাবকত্ব। আয়াতুল্লাহ খোমেনি কেবল একজন ধর্মীয় প্রচারক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন ‘ফকিহ’ বা আইনশাস্ত্রের মাস্টার। ১৯২২ সালে তিনি পবিত্র শহর কোমে যান। সেখানে তিনি আয়াতুল্লাহ আবদুল করিম হায়েরি ইয়াজদির অধীনে পড়াশোনা শুরু করেন। ৩০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি ‘ইজতিহাদ’ বা স্বাধীন আইনি যুক্তির সনদ লাভ করেন এবং একজন ‘মুজতাহিদ’ হন। এর ফলে তিনি কোরআন ও হাদিস থেকে সরাসরি নতুন আইনি সিদ্ধান্ত নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন।

আইনশাস্ত্রের পাশাপাশি তিনি দর্শন, নীতিশাস্ত্র এবং ইসলামি আধ্যাত্মবাদ শিক্ষা দিতেন। ১৯৬১ ও ১৯৭০ সালে যথাক্রমে গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ বোরুজেরদি এবং গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ হাকিমের মৃত্যুর পর খোমেনি লাখ লাখ মানুষের কাছে অনুসরণের উৎস হিসেবে স্বীকৃতি পান। এই পদটি কোনো রাজনৈতিক বা মনোনীত পদ নয়, বরং পণ্ডিতদের মধ্যে সর্বোচ্চ পাণ্ডিত্যের ভিত্তিতে এই স্বীকৃতি মেলে। নির্বাসনে থাকা অবস্থাতেও তার আইনি নির্দেশনাবলী অনুসারীদের কাছে বাধ্যতামূলক ছিল।

১৯৬৩ সালে শাহের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ায় খোমেনি গ্রেফতার হন। ওই সময় রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে তার মৃত্যুদণ্ড হতে পারত। কিন্তু ১৯০৬ সালের ইরানি সংবিধানের একটি ধারা অনুযায়ী জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় নেতাদের মৃত্যুদণ্ড থেকে দায়মুক্তি দেওয়া হতো। আয়াতুল্লাহ মোহাম্মদ কাজেম শরিয়তমাদারিসহ জ্যেষ্ঠ আলেমদের প্রতিবাদের মুখে শাহের সরকার তার মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করে এবং তাকে নির্বাসনে পাঠাতে বাধ্য হয়।

যা প্রমাণ করে ১৯৭৯ সালের আগেই ইরানে সাংবিধানিক চিন্তাভাবনা বিদ্যমান ছিল। খোমেনি আইনশাস্ত্র, আইনি দর্শন এবং আধ্যাত্মবাদের ওপর ৪০টিরও বেশি বই লিখেছেন। তার লেখা ‘কিতাব আল-বায়’ বা ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত আইন এবং দুই খণ্ডের ‘তাহরির আল-ওয়াসিলা’ অত্যন্ত বিখ্যাত ও জটিল আইনি গ্রন্থ।

জনগণের রায় ও সাংবিধানিক কাঠামো

১৯৭৯ সালের মার্চ ও এপ্রিলে ইরানে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য একটি জাতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। এতে রেকর্ডসংখ্যক ভোটার অংশ নেন এবং ৯৮ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন।

লিম টিন এটিকে ২০১৬ সালের ব্রিটেনের ব্রেক্সিট গণভোটের সাথে তুলনা করে বলেন, ব্রেক্সিটকে বিশ্ব গণতান্ত্রিক স্বীকৃতি দিলেও ইরানের গণভোটকে স্বৈরতন্ত্র হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। অথচ ইরান ১৯৫৩ সালে সিআইএ-র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বসানো শাহের স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত হয়ে এই ব্যবস্থা বেছে নিয়েছিল।

ইরানের সংবিধানে একটি চমৎকার ভারসাম্য রয়েছে। এর সর্বোচ্চ নেতা জনগণের দ্বারা নির্বাচিত, বিশেষজ্ঞ পরিষদ দ্বারা মনোনীত হন। ২৯০ সদস্যের একটি নির্বাচিত সংসদ (মজলিস) আইন পাস করে এবং প্রশাসনকে জবাবদিহিতার আওতায় আনে। গার্ডিয়ান কাউন্সিল আইনগুলোর সাংবিধানিক বৈধতা পরীক্ষা করে, যা যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট বা ফ্রান্সের কনস্টিটিউশনাল কাউন্সিলের মতো কাজ করে।

আইনজীবীর দৃষ্টিভঙ্গি ও আন্তর্জাতিক আইন

ব্রিটিশ কমন ‘ল’ ঐতিহ্যে প্রশিক্ষিত একজন আইনজীবী হিসেবে লিম টিন বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের মূল ভিত্তি হলো ‘কমিটি অব লজ’ বা অন্য দেশের আইনি ব্যবস্থার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। তিনি ইতালির ফৌজদারি আদালতের উদাহরণ দিয়ে বলেন, সেখানে আসামিদের শপথ নিয়ে সাক্ষ্য দিতে হয় না, যা কমন ‘ল’-এর চেয়ে আলাদা হলেও নিকৃষ্ট নয়। একইভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সূচনাকালে দাসদের মানুষের তিন-পঞ্চমাংশ ধরা হতো, নারীদের ভোটাধিকার ছিল না এবং পূর্ণ নাগরিক অধিকার পেতে প্রায় দুই শতাব্দী লেগেছে। সেই তুলনায় ইরানের শাসনব্যবস্থার বয়স মাত্র ৪৬ বছর।

লিম টিন স্বীকার করেন, ইরানে রাজনৈতিক স্বাধীনতার অভাব, নারী ও সংখ্যালঘুদের অধিকারের সীমাবদ্ধতা এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের প্রার্থী বাছাইয়ের কড়াকড়ির মতো প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা ও গণতান্ত্রিক ঘাটতি রয়েছে। তবে সমালোচনা করতে হবে প্রকৃত সত্যকে সামনে রেখে, প্রচারণার ওপর ভিত্তি করে নয়। ইরান ৯ কোটি ৩০ লাখ মানুষের একটি সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্র, যা একটি সুপ্রতিষ্ঠিত আইনি ঐতিহ্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। পশ্চিমা প্রচারণা এই সত্য অস্বীকার করতে চায়, কারণ ধর্মান্ধদের একটি দেশকে ধ্বংস করা সহজ, কিন্তু একটি বৃহৎ সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্রকে সহজে মুছে ফেলা যায় না।

গবেষণার জন্য তিনি হামিদ আলগারের অনূদিত খোমেনির রাজনৈতিক লেখা এবং সাইদ আমির আরজোমান্দের 'দ্য টারবান ফর দ্য ক্রাউন' বইটি পড়ার পরামর্শ দেন। লিম টিনের এই নিবন্ধের সাথে নাজাফে নির্বাসনে থাকার সময় খোমেনির পড়াশোনার একটি ছবিও যুক্ত রয়েছে।

ধর্মীয় উগ্রতা নয়, ১৪০০ বছরের আইনি ভিত্তিতে চলে ইরান
ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা রুহুল্লাহ খোমেনি। ছবি: সংগৃহীত

ভারতে হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী মসজিদসহ যেসব স্থাপনা ধ্বংস করেছে মোদি সরকার

পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ার সুপুরডিহি গ্রামের ঠেলাগাড়িতে বাসনপত্র বিক্রেতা দরিদ্র মুসলিম আকবর ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানধারী জঙ্গি হিন্দুদের হাতে প্রাণ দিয়ে অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকার হাত থেকে মুক্তি পেয়েছেন। পুরুলিয়ায় আরেক হতভাগ্য মুসলিম মাইমুর উগ্রবাদী হিন্দুদের হামলায় গুরুতর আহত হয়ে এখন বেঁচে থাকার শেষ চেষ্টা করছেন।

ভীতসন্ত্রস্ত মাইমুর পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা করে বলেন, হামলার মুহূর্তে আমি শুধু বাঁচতে চেয়েছিলাম। ওরা ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি দিয়ে আমাকে ধাওয়া করছিল। আমি কোথায় লুকাব, তা বুঝতে পারছিলাম না। থানায় গেলে যে পুলিশ আমাকে সাহায্য করবে না, সেটা নিশ্চিত ছিলাম। তারপরও থানায় গিয়ে উঠলাম। পুলিশ তখন আমাকে নিরাপত্তা দেওয়ার পরিবর্তে গরু পাচার মামলার আসামি বানিয়ে দিল। বুঝতে পারলাম, আমাদের মুসলিম পরিচয় নিয়ে ভারতে বসবাস করা সবচেয়ে বড় অপরাধ!

মাইমুরই এখন ভারতের ২৫ কোটি মুসলিমের জীবনের প্রতিচ্ছবি। অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে জীবন পার হচ্ছে দেশটির মুসলিমদের। হতাশা আর আতঙ্ক এখন তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। কখন যেন হিন্দু জঙ্গিদের হাতে প্রাণ যায়! মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয় অথবা বেঁচে থাকার অবশিষ্ট অবলম্বন জয় শ্রীরাম স্লোগানধারীদের বুলডোজারের নিজে চাপা পড়ে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ভারতের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তথা মুসলিমদের ওপর নানামুখী নির্যাতন দিন দিন বেড়েই চলছে। তথাকথিত গোরক্ষা গোষ্ঠীসহ উগ্রবাদী হিন্দু সংগঠনের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে হত্যাসহ বহুমাত্রিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন মুসলিমরা। প্রতিনিয়ত প্রকাশ্য দিবালোকে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে তাদের। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে অন্তত ২৭ জন মুসলিমকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এমনকি অনেক রাজ্যে তাদের ঘরবাড়ি ও দোকানপাট বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে টার্গেটে পরিণত হয়েছে মুসলিমদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মসজিদ, মাদরাসা, দরগা থেকে শুরু করে কবরস্থান পর্যন্ত। গত দেড় মাসে মসজিদসহ অন্তত ২৩টি ধর্মীয় স্থাপনা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজাব পরা, পাবলিক প্লেসে নামাজ বা মসজিদের মাইক ব্যবহারের মতো ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিষয়ে কড়াকড়ি তৈরি হয়েছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন এবং জাতীয় নাগরিকপঞ্জি নিয়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বড় ধরনের ভীতি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের রাজনীতিতে মুসলিম প্রতিনিধিদের সংখ্যা আগের চেয়ে কমে গেছে। পাঠ্যপুস্তক থেকে মুসলিম শাসকদের ইতিহাস বাদ দেওয়া এবং ঐতিহাসিকভাবে পরিচিত বিভিন্ন শহরের নাম পরিবর্তনের ঘটনা ঘটছে।

বিজেপি সমর্থিত বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) এবং বজরং দলের (বিডি) মতো হিন্দু আধিপত্যবাদী জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো দেশজুড়ে, বিশেষ করে বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোয় অবাধে তাদের কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে। সংগঠনগুলোর সদস্যরা বিভিন্ন অজুহাতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে মুসলমানদের হয়রানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, আক্রমণ এবং হত্যা অব্যাহত রেখেছে।

পাহালগাম হামলা এবং তার ফলস্বরূপ পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক সংঘাতের পর দেশজুড়ে হাজার হাজার মুসলমানকে যথেচ্ছভাবে গ্রেপ্তার করে কর্তৃপক্ষ। ভারতজুড়ে হাজার হাজার বাংলাভাষী মুসলমানকে আটক করা হয় এবং গুজরাট ও আসামে তাদের বসতিগুলো নির্বিচারে ভেঙে দেওয়া হয়। এছাড়া একটি নতুন ‘পুশব্যাক’ নীতির অধীন যথাযথ বিচার প্রক্রিয়া ছাড়াই অন্তত এক হাজার ৮৮০ জনকে বাংলাদেশে পুশব্যাক করা হয়, যাদের মধ্যে প্রায় ২০০ জন ভারতীয় নাগরিক ছিলেন।

বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোয় ৪৫ দিনে ২৩টির বেশি মুসলিম স্থাপনা ধ্বংস

ভারতে গত ৪৫ দিনে (দেড় মাসে) অন্তত ২৩টি মুসলিম ধর্মীয় স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে মসজিদ, মাদরাসা, ঈদগাহ ও দরগাহ রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, এই উচ্ছেদ অভিযানের অধিকাংশই বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে সংঘটিত হয়েছে। এই ধ্বংসযজ্ঞগুলো মূলত দিল্লি, উত্তর প্রদেশ, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র, গুজরাট এবং হরিয়ানা রাজ্যে চালানো হয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অধিকারকর্মী সংগঠন ‘জাস্টিস ফর অল’ ভারতে মসজিদ ভাঙার ঘটনা দ্রুতগতিতে বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা সম্ভল, বারাণসী এবং জয়পুরে সাম্প্রতিক ঘটনার কথা উল্লেখ করেছে। ১০০০ বছরের পুরনো মসজিদ থেকে শুরু করে ২০০ বছরের পুরনো দরগাহ পর্যন্ত গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ভারতের কয়েকটি বিজেপি-শাসিত রাজ্যে মুসলিমদের ধর্মীয় স্থানগুলোকে লক্ষ্য করে চালানো এই ধ্বংসযজ্ঞের ঢেউ গুরুতর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, এই ধ্বংসযজ্ঞগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে মনে হচ্ছে না। মে মাস থেকে ছয়টি রাজ্য জুড়ে মসজিদ, দরগাহ, ঈদগাহ, মাদরাসাসহ অন্তত ২৩টি মুসলিম ধর্মীয় স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়েছে। বারাণসীর ১০০০ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক মসজিদ গঞ্জ শহীদা ভেঙে দেওয়া হয়েছে।

দিল্লির মঙ্গোলপুরীতে অবস্থিত প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো ‘দরগাহ পঞ্চ পীরান’ ভেঙে ফেলা হয়। এছাড়া রাজস্থানের জয়পুরের নূরানি মসজিদ, মুম্বাইয়ের বান্দ্রা ও গোরেগাঁওয়ের বেশ কয়েকটি মসজিদ ও দরগাহ এবং বারাণসীর গঞ্জ শাহিদা মসজিদও এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ওয়াকফ বোর্ড এবং স্থানীয় তত্ত্বাবধায়কদের অভিযোগ, আইনি বাধা এবং স্থাপনাগুলোর ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও কোনো পূর্ব নোটিস ছাড়া তাড়াহুড়া করে এই ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে।

নির্বাচন-পরবর্তী মুসলিম নির্যাতন

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার শিকার মুসলিম সম্প্রদায়ের সর্বশেষ পরিস্থিতি সরেজমিন পরিদর্শন শেষে আমার দেশ-এর কলকাতা প্রতিনিধি জানান, পশ্চিমবঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে বিজেপি সরকার আসার পর থেকেই রাজ্যজুড়ে মুসলমানদের ওপর অত্যাচার শুরু হয়েছে ভারতের অন্যান্য বিজেপি-শাসনাধীন রাজ্যের মতো।

শুভেন্দু দায়িত্ব গ্রহণ করেই পশ্চিমবঙ্গে হিমন্ত ও যোগীর বুলডোজার ও উচ্ছেদ মডেলের পথ বেছে নিয়েছেন। মুসলিম বসতিস্থলে চলেছে বুলডোজার, তপশিয়া, তিলজলার বহুতলে বুলডোজার অ্যাকশন। কারণ, এগুলো নাকি অবৈধ আনপ্ল্যানড নির্মাণ। তপশিয়ায় বুলডোজার চালিয়ে ভেঙে দেওয়া ফ্ল্যাটের বাসিন্দা মুহাম্মদ ইরফান এখন সহায় সম্বলহীন।

রাতারাতি ফ্ল্যাট হারিয়ে বাস করছেন তিলজলার ছোট্ট ঘুপচি ঘরে। তিনি জানালেন, পুরো কলকাতা শহরজুড়ে অবৈধ নির্মাণ। প্ল্যান নেই সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই। কিন্তু মুসলমান, সেজন্য আমাদের বাড়িতে বুলডোজার চালিয়ে দিল। আমাদের মাল-সামান সরিয়ে নেওয়ার সময়টুকু দেয়নি প্রশাসন। বিজেপি সরকারের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল নিজে দাঁড়িয়ে থেকে এই কাজ করিয়েছেন। আমরা এখন কী করব জানি না! এ রকম ইরফানের সংখ্যা প্রায় ৩০ জনের বেশি যারা তপশিয়ায় বুলডোজার অ্যাকশনে বাড়িছাড়া হয়েছেন। তারা কেউ আত্মীয়ের বাসায় আশ্রয় নিয়েছেন। কেউ বা পাড়ি দিয়েছেন নতুন বাসার খোঁজে। তাদের মনে প্রশ্ন, বড়বাজার তো সবচেয়ে ঘিঞ্জি আনপ্ল্যানড এলাকা। সেখানে বুলডোজার চলছে না কেন? ওখানে বিজেপি জিতেছে, ওখানে হিন্দু মাড়োয়ারি, গুজরাতিরা থাকে বলে বুলডোজার যাবে না?

অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অফ সিভিল রাইটসের (এপিসিআর) একটি বিস্তৃত রিপোর্ট বলছে, মে মাসের ৪ থেকে ৭ তারিখের মধ্যে রাজ্যের অন্তত আটটি জেলায় ব্যাপক সহিংসতা, ভাঙচুর করা হয়েছে। কোচবিহার, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, কলকাতা মেট্রো, মুর্শিদাবাদ এবং হাওড়ার মতো জেলাগুলোতে সব মিলিয়ে ৩৪টি এ ধরনের দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ নথিবদ্ধ করা হয়েছে। এই অসহিষ্ণুতার মর্মান্তিক পরিণতি হিসেবে অন্তত দুজনের প্রাণহানি ঘটেছে, যার মধ্যে কোচবিহারের গোসানিমারিতে একটি মসজিদ রক্ষা করতে গিয়ে এক মুসলিম ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।

এই ধারাবাহিক আক্রমণের ফলে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকে অন্তত ৫৪টি সম্পত্তি যার মধ্যে বসতবাড়ি, দোকানপাট এবং দলীয় কার্যালয় রয়েছে আক্রমণ বা ধ্বংসের শিকার হয়েছে এবং শারীরিকভাবে বা অন্য কোনো উপায়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অন্তত ৫০ জন ব্যক্তি। উত্তর ২৪ পরগনার বারাসাতে মুসলিম মালিকানাধীন হোটেল বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া, আমতায় বেছে বেছে ১৫টি বাড়িতে ভাঙচুর চালানো এবং কলকাতার হকার ও সাধারণ ব্যবসায়ীদের ওপর হামলার ঘটনাগুলো এই আগ্রাসনের স্পষ্ট প্রমাণ দেয়। শুধু তাই নয়, অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার একটি সুপরিকল্পিত রূপরেখাও দেখা গেছে, যেখানে হাওড়া, কলকাতা ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় জোরপূর্বক গবাদি পশুর বাজার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং মাংসের দোকানগুলোতে অবাধে হামলা চালানো হয়েছে।

ভারতে হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী মসজিদসহ যেসব স্থাপনা ধ্বংস করেছে মোদি সরকার

গাড়ি যখন দেখতে কলার মতো

সাধারণত পুলিশ থামায় বেপরোয়া গতির গাড়ি কিংবা ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারীদের। কিন্তু এবার পুলিশকে থামাতে হলো একটি বিশাল কলাকে। অবশ্য এটি আসল কলা নয়, কলার আদলে তৈরি একটি গাড়ি। যুক্তরাষ্ট্রের মন্টানায় ঘটেছে এ ঘটনা।

মন্টানা হাইওয়ে প্যাট্রোল (এমএইচপি) গত মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি প্রকাশ করে। ছবিতে দেখা যায়, বিলিংস শহরের কাছে আন্তরাজ্য মহাসড়ক ইন্টারস্টেট ৯০–এর পাশে দাঁড়িয়ে আছে কলার আকৃতির একটি গাড়ি।

বিলিংসের কাছের একটি মন্টানা হাইওয়ে প্যাট্রোল (এমএইচপি) মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবিটি প্রকাশ করে। ছবির সঙ্গে মজার একটি বার্তাও দেয় পুলিশ। তারা লিখেছে, ‘আমরা অতিরিক্ত গতির গাড়ি, অসতর্ক চালক আর অনেক অদ্ভুত যানবাহন থামিয়েছি। কিন্তু এবারের ঘটনা সত্যিই আলাদা। দেখতে যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন, ফলের ক্ষেত্রেও ট্রাফিক আইন প্রযোজ্য।’

এ গাড়ির নির্মাতা ও চালক স্টিভ ব্রেইথওয়েট বলেন, পুলিশের তাঁকে থামানোর ঘটনা নতুন নয়। তিনি বলেন, ‘প্রথম আট-নয় বছর সম্ভবত আমিই ছিলাম যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি থামানো চালক।’

তবে এবার কারণটা ছিল ভিন্ন। গাড়ির পেছনে রাখা কয়েকটি বাক্স তাঁর নম্বরপ্লেট আংশিকভাবে ঢেকে রেখেছিল। গাড়ির নম্বরপ্লেটে লেখা ছিল ‘স্প্লিট’।

পুলিশ বিষয়টি জানিয়ে চালককে সতর্ক করে ছেড়ে দেয়। কোনো জরিমানা করা হয়নি। স্টিভ ব্রেইথওয়েট বলেন, অভিযোগটি যৌক্তিক ছিল।

ব্রেইথওয়েট জানান, এ গাড়ির শুরুটা ছিল ১৯৯৩ সালের একটি ফোর্ড এফ-১৫০ পিকআপ ট্রাক দিয়ে। দীর্ঘ সময় ধরে পরিবর্তন ও সংস্কার শেষে ২০১১ সালে সেটিকে তিনি কলার আদলের গাড়িতে রূপ দেন।

ইংল্যান্ডে জন্ম নেওয়া ব্রেইথওয়েট প্রায় ৪০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে বসবাস করছেন। শুরুতে নিজের বিজ্ঞাপন ব্যবসার প্রচারণার জন্য এ অদ্ভুত গাড়ি ব্যবহার করতেন তিনি।

তবে সম্প্রতি জীবনে বড় পরিবর্তন এনেছেন ব্রেইথওয়েট। নিজের বেশির ভাগ সম্পদ বিক্রি করে বাকি জিনিসপত্র গুদামে রেখে দিয়েছেন। এখন তিনি দেশজুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

কলার আদলে তৈরি গাড়ি
কলার আদলে তৈরি গাড়ি। ছবি: মন্টানা হাইওয়ে প্যাট্রোলের ইনস্টাগ্রাম থেকে

‘মনে হচ্ছিল কোনো ভৌতিক সিনেমার দৃশ্য’

‘নিচে নেমে মনে হচ্ছিল যেন কোনো ভৌতিক সিনেমার দৃশ্য দেখছি। চারদিকে শুধু ধ্বংসস্তূপ। সেগুলো টপকে কোনোমতে বেরিয়ে আসতে হয়েছে’—ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর রাজধানী কারাকাসে ধসে পড়া একটি ভবনের পাশের বাসিন্দা মারিয়া আলেহান্দ্রা এভাবেই সেই মুহূর্তের কথা বর্ণনা করছিলেন।

গত বুধবার ভেনেজুয়েলায় এক মিনিটের কম সময়ের ব্যবধানে দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে নিহত মানুষের সংখ্যা বেড়ে ২৩৫–এ দাঁড়িয়েছে। এখন পর্যন্ত দেড় হাজারের বেশি মানুষ আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। কারাকাস ও আশপাশের এলাকায় কয়েক ডজন ভবন ধসে পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, প্রথমে রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ২ মাত্রার একটি ভূমিকম্প কারাকাসের প্রায় ১৬০ কিলোমিটার পশ্চিমে আঘাত হানে। এর ১ মিনিটের কম সময়ে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার আরও শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়।

ইউএসজিএসের পূর্বাভাস বলছে, হতাহত ব্যক্তির সংখ্যা শেষ পর্যন্ত হাজার হাজার হতে পারে। মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ভূমিকম্পের পর ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধারে ছুটছেন উদ্ধারকর্মীরা। অনেকে নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজে বের করতে মরিয়া হয়ে সাহায্য চাইছেন। কয়েকজন জীবিত ব্যক্তিকে স্ট্রেচারে করে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে।

মারিয়া আলেহান্দ্রা বলেন, ‘ধ্বংসস্তূপ টপকে আমাদের বের হতে হয়েছে। আমাদের ভবনের তত্ত্বাবধায়ক তাঁর শিশুকে নিয়ে এবং অন্য প্রতিবেশীরা আতঙ্কে নিচে নেমে এসেছিলেন। কিন্তু ধসে পড়া ওই ভবন থেকে আমি শুধু একটি পরিবারকেই বের হতে দেখেছি।’

ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেন, ‘অনেক ভবন ধসে পড়েছে। যত বেশি সম্ভব মানুষকে জীবিত উদ্ধার করার জন্য অত্যন্ত জোরাল অভিযান চলছে। এটি সত্যিকারের একটি ট্র্যাজেডি।’

ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতাদের উদ্যোগে চালু করা একটি ওয়েবসাইটে স্থানীয় সময় গতকাল বৃহস্পতিবার রাত দুইটার কিছু পর পর্যন্ত ৬ হাজার ৬০০–এর বেশি মানুষ নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

জাতীয় ছুটির দিনে বিকেলে ভূমিকম্প দুটি আঘাত হানায় অনেক মানুষ তখন বাড়িঘরে ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানস্থলে ছিলেন।

পূর্ব কারাকাসের বাসিন্দা ৫৬ বছর বয়সী কোরো মার্তিনেজ বলেন, ‘খুব জোরে একটা বিকট শব্দ হয়। ঘরের জিনিসপত্র সব পড়ে যেতে থাকে। জীবনে এমন কিছু কখনো দেখিনি।’

পশ্চিম কারাকাসের বাসিন্দা ৪১ বছর বয়সী অ্যাস্ট্রিড রামিরেজ বলেন, ‘কম্পন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে মানুষের চিৎকার শুনতে পাই। সবাই সিঁড়ি বেয়ে নিচে দৌড়াতে শুরু করে।’

দক্ষিণ কারাকাসের ৮০ বছর বয়সী মারিয়া রোমেরো বলেন, পুলিশ তাঁকে বাড়ি থেকে বের হতে সহায়তা করেছে। তাঁর ভাষায়, ‘এই ভূমিকম্প ছিল ভয়াবহ; এমনকি ১৯৬৭ সালের ভূমিকম্পের চেয়েও।’

ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত মাইকেতিয়া বিমানবন্দর থেকে ভিডিও বার্তায় সাবেক আইনপ্রণেতা উইলমের আজুয়াহে বলেন, ‘পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। শক্তিশালী ভূমিকম্পে সবকিছু লন্ডভন্ড হয়ে গেছে।’

কারাকাসের মেডিক্যাল শিক্ষার্থী হুয়ান অর্তিজ বলেন, ‘আমি হতবাক ও কিংকর্তব্যবিমূঢ়। আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু মারা গেছে। আরেকজন ধ্বংসস্তূপে আটকা পড়েছেন। উপকূলীয় এলাকায় আমার পরিচিত আরও প্রায় ২০ জন নিখোঁজ।’

ভূমিকম্পের পর এ পর্যন্ত একের পর এক অন্তত ৩০টি পরাঘাত অনুভূত হয়েছে।

দেলসি রদ্রিগেজ বলেন, উদ্ধারকাজে সহায়তা করতে বিভিন্ন দেশ থেকে উদ্ধারকারীরা ভেনেজুয়েলায় আসছেন। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ কয়েকজন বিদেশি নেতাকে সহায়তার প্রস্তাব দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘ভেনেজুয়েলায় যে দুটি বড় ভূমিকম্প হয়েছে, তা ভয়াবহ প্রাণহানির কারণ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা দিতে প্রস্তুত, ইচ্ছুক ও সক্ষম।’

কারাকাসের হাসপাতালগুলোয় আহত মানুষের চাপ সামলাতে চিকিৎসক ও কর্মীদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র নিরূপণে কর্তৃপক্ষ সপ্তাহের বাকি সময়ের জন্য সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র, এল সালভাদর, ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্র, ব্রাজিল, স্পেনসহ বিভিন্ন দেশ ভেনেজুয়েলাকে সহায়তা ও সংহতির বার্তা দিয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, তারা ভেনেজুয়েলা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে এবং জরুরি সহায়তা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ভেনেজুয়েলার লা গুয়ারায় ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত একটি ভবনে আগুন ধরে যায়
ভেনেজুয়েলার লা গুয়ারায় ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত একটি ভবনে আগুন ধরে যায়। ছবি: রয়টার্স

১ হাজার ৩০০ কোটি আয়, বক্স অফিসের রানি এবার রাশমিকা

প্রকাশ: ১৮ নভেম্বর ২০২৫ঃ গত বছরটা ‘পুষ্পা ২’ সিনেমা দিয়ে দারুণভাবে শেষ করেছিলেন রাশমিকা মান্দানা। চলতি বছরটাও যেন সেখান থেকেই শুরু করেছেন। চলতি বছর তাঁর অভিনীত পাঁচটি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে; যেগুলোর মধ্যে আছে বড় দুটি হিট ছবি। সব মিলিয়ে ২০২৫ সালে রাশমিকাই ভারতীয় সিনেমায় বক্স অফিসের রানি।

৫ সিনেমা, কোনটির কত আয়
চলতি বছরের শুরুতে ১৪ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পায় লক্ষ্মণ উতেকরের সিনেমা ‘ছাবা’; এতে জুটি হয়ে হাজির হন রাশমিকা মান্দানা ও ভিকি কৌশল। ঐতিহাসিক অ্যাকশন সিনেমাটি মুক্তির পর থেকেই বক্স অফিসে ঝড় তোলে, এ পর্যন্ত আয় করেছে ৮০০ কোটি রুপি! ‘কানতারা: চ্যাপটার ১’–এর আগে এটিই ছিল ২০২৫ সালে সর্বোচ্চ আয় করা ভারতীয় সিনেমা।

এরপর ৩০ মার্চ মুক্তি পায় ‘সিকান্দার’। এ আর মুরুগোদাস পরিচালিত সিনেমাটিতে প্রথমবারের মতো জুটি হন সালমান খান ও রাশমিকা। এ ছবিটি বক্স অফিসে সেভাবে সাড়া ফেলতে পারেনি, আয় করে ১৭৬ কোটি রুপি।

হিন্দি সিনেমার পর দক্ষিণের মেয়ে রাশমিকা আবার ফেরেন দক্ষিণিতে, তাঁকে দেখা যায় তামিল–তেলেগু সিনেমা ‘কুবেরা’য়। শেখর কাম্মুলা পরিচালিত সিনেমা প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় ২০ জুন। এ ছবিটিও মোটামুটি ব্যবসা করে, আয় করেছে ১১৫ কোটি রুপি।
এরপর গত ২১ অক্টোবর দেওয়ালি উপলক্ষে মুক্তি পায় ‘থামা’।

এ ছবির মাধ্যমে ম্যাডক ফিল্মসের হরর–কমেডি ইউনিভার্সে দেখা যায় অভিনেত্রীকে। ছবিতে তাঁর জুটি ছিলেন আয়ুষ্মান খুরানা। এটি প্রেক্ষাগৃহে এখনো চলছে, আয় করেছে ১৬৮ কোটি রুপি।
সবশেষ ৭ নভেম্বর মুক্তি পেয়েছে রাশমিকা অভিনীত সিনেমা ‘দ্য গার্লফ্রেন্ড’। রাহুল রবিন্দ্রন পরিচালিত তামিল সিনেমাটিতে রাশমিকা ছাড়াও আছেন দীক্ষিত শেঠি। রোমান্টিক–ড্রামা–নির্ভর সিনেমাটি এক সপ্তাহে বক্স অফিস থেকে আয় করেছে প্রায় ৫০ কোটি রুপি।
সব মিলিয়ে চলতি বছর রাশমিকা অভিনীত পাঁচটি সিনেমা বক্স অফিস থেকে আয় করেছে ১ হাজার ৩০০ কোটি রুপির বেশি। আয়ের দিক থেকে চলতি বছর তাঁর ধারেকাছে নেই অন্য কোনো নায়িকা। অবশ্য অন্য কোনো বড় তারকার এতগুলো সিনেমা মুক্তিও পায়নি।

রাশমিকা কেন এত জনপ্রিয়
কর্ণাটকের মেয়ে রাশমিকা, ২০১৬ সালে বড় পর্দায় অভিষেকও হয় কন্নড় সিনেমা দিয়ে, এরপর করেন তেলেগু সিনেমা। সব কটিই কমবেশি ব্যবসা করেছে। তবে আলাদাভাবে রাশমিকাকে মনে রাখার কারণ ছিল না।
রাশমিকার ক্যারিয়ার নতুন গতি পায় ২০১৮ সালে তেলেগু সিনেমা ‘গীতা গোবিন্দম’ দিয়ে। অল্প বাজেটে নির্মিত এই রোমান্টিক কমেডি সিনেমাটি সুপারহিট হয়। সঙ্গে শুরু হয় বিজয় দেবরাকোন্ডার সঙ্গে জুটিও। ছবিটি তরুণ দর্শকেরা ব্যাপক পছন্দ করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবির নানা দৃশ্য, সংলাপ নিয়ে তৈরি হয় মিম। অন্তর্জালে তাঁকে নিয়ে চর্চা বাড়তে থাকে।

এই সিনেমায় পাওয়া জনপ্রিয়তা আরও ছড়িয়ে পড়ে ‘ডিয়ার কমরেড’ দিয়ে। ২০১৯ সালে মুক্তি পাওয়া ভারত কর্মার সিনেমাটি নানা কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। এটি পুরোপুরি বাণিজ্যিক ধারার সিনেমা নয়, আবার শৈল্পিক ঘরানারও নয়। দুই ঘরানার মিশ্রণে দর্শক-সমালোচকের কাছে প্রশংসিত এক সিনেমা উপহার দিয়েছিলেন নির্মাতা। ছবিতে রাশমিকাকে দেখা যায় ক্রিকেটারের চরিত্রে। এক নারী ক্রিকেটার, যে যৌন হয়রানির শিকার হয়, প্রেমিককে হারায়, এমন জটিল মনস্তত্ত্বের চরিত্র পর্দায় দারুণভাবে তুলে ধরে নিজের অভিনয়দক্ষতার জানান দেন রাশমিকা। তরুণদের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা আরও বেড়ে যায়।

এরপর ‘সারিলেরু নিকিভারু’, ‘বিসমা’, ‘সুলতান’ ইত্যাদি সিনেমা দিয়ে সিনেমার দুনিয়ায় নিজের জায়গা আরও পোক্ত করে ফেলেন রাশমিকা।
তবে এই অভিনেত্রীর জীবন আমূল বদলে যায় ‘পুষ্পা: দ্য রাইজ’ দিয়ে। ২০২১ সালে মুক্তি পাওয়া সুকুমারের ছবিটি দিয়ে উপমহাদেশজুড়ে পরিচিতি পান। পরের গল্পটা সবার জানা। গত বছরের ডিসেম্বরে মুক্তি পাওয়া ‘পুষ্পা ২’ সিনেমায় আবার তাঁকে পাওয়া যায় ‘শ্রীভাল্লি’ রূপে। ‘পুষ্পা ২’-তে তাঁর অভিনয়ের জায়গা ছিল আরও বেশি, সেটার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছেন তিনি।

সব মিলিয়ে এখন প্রযোজক ও পরিচালকদের কাছে রাশমিকার ব্যাপক চাহিদা। রাশমিকার আরেকটি সুবিধা, সব ধরনের চরিত্রে, সব ধরনের সিনেমায় তাঁকে মানিয়ে যায়। ‘গীতা গোবিন্দম’-এ তিনি পাশের বাড়ির মেয়ে টাইপ চরিত্র করেছেন, ‘ডিয়ার কমরেড’-এ হয়েছেন নারী ক্রিকেটার। আবার হিন্দি সিনেমার অভিষেকে ‘গুডবাই’-এ গ্ল্যামারহীন চরিত্র করেছেন। চলতি বছর ‘ছাবা’য় তাঁকে দেখা গেছে ঐতিহাসিক চরিত্রে। আবার ‘অ্যানিমেল’-এ নিজের ‘সুইট গার্ল’ ইমেজ ভেঙে সাহসী দৃশ্যে অভিনয়ও করেছেন।

সামনে কী
চলতি বছর রাশমিকাকে আর কোনো সিনেমায় দেখা যাবে না। তবে আগামী বছর তাঁর অভিনীত ‘ককটেল ২’ আর ‘মাইসা’ মুক্তি পাবে।

পিংকভিলা, হিন্দুস্তান টাইমস অবলম্বনে

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-17%2F1mlhyaae%2Fb7193590-d610-4a11-aaf9-ae803c6176bf.jpg?rect=0%2C0%2C1600%2C1067&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
চলতি বছর রাশমিকা অভিনীত পাঁচটি সিনেমা বক্স অফিস থেকে আয় করেছে ১ হাজার ৩০০ কোটি রুপির বেশি। কোলাজ

এ জন্য সভ্য হওয়া বা শত বছর লাগবে না, চীন থেকে ফিরে তাসরিফ

সম্প্রতি চীনে গিয়েছিলেন গায়ক তাসরিফ খান। সেখানে নিজের মতো করে ঘুরে দেখেছেন দেশটি। এর ফাঁকে ভিডিও করে সেগুলো ভক্তদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। উন্নত চীনের সেসব ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসিত হয়েছে। তাসরিফ এতে যেমন তুলে ধরেছেন চীনের উন্নয়নের পেছনের গল্প, তেমনি তুলনা করেছেন বাংলাদেশের সঙ্গে। চীন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এক সময় তাসরিফ খান বলেন, ‘এ জন্য সভ্য হওয়া বা শত বছর লাগবে না।’ প্রশ্ন হতে পারে কেন, কী প্রসঙ্গে এ কথা বলেন এই গায়ক।

১০ নভেম্বর ২০২৫ চীনে যান তাসরিফ। এটাই ছিল তাঁর প্রথম চীনযাত্রা। মূলত একটি মুঠোফোন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণে গিয়েছিলেন এই গায়ক। প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন শেষে নিজের মতো ঘুরেছেন তিনি; সঙ্গে ছিলেন তাঁর ব্যান্ডের সদস্য ও ছোট ভাই তানজীব খান। তাসরিফ জানান, চীন সম্পর্কে শুনে বা ভিডিও দেখে অনেক অভিজ্ঞতাই হয়েছিল। তবে এবার সরাসরি ভিন্ন অভিজ্ঞতা হয়েছে।

তাসরিফ বলেন, ‘চীন দিন দিন সব দিক থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ হচ্ছে। তাদের রাস্তা ঝাড়ু দেওয়ার জন্যও রোবট রয়েছে। এ সবই তাদের তৈরি। তাদের জীবনযাপনের মান এখন বেশ ভালো। অনেকের সঙ্গেই কথা হয়েছে। তারা নিজেদের গতিতেই এগিয়ে যেতে চায়। ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার সবাই তাদের দেশের। এভাবে সবকিছুই স্বয়ংসম্পূর্ণ না হলে কোনো দেশ এগিয়ে যেতে পারবে না। আমদানি–রপ্তানিতে পিছিয়ে যেতে হবে।’

তাসরিফ মনে করেন, চীন এখন উন্নত দেশ, এটা মানতেই হবে। তাদের অর্থনীতির পরিসর বিশাল। দিন দিন তারা অর্থনীতি, রাজনীতি—সব দিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে। সেটা বাংলাদেশের তুলনায় বহু এগিয়ে। এ দেশের চীনের মতো জায়গায় যেতে দীর্ঘ সময় লাগবে। তবে এই গায়ক দেশ নিয়ে আশাবাদী।

তাসরিফ প্রথম আলোকে বলেন, ‘চীনের এগিয়ে যাওয়ার পেছনে রয়েছে তাদের চেষ্টা ও পরিশ্রমের ফল। সামনে আরও এগিয়ে যাবে। এতে আমার কোনো সমস্যা নেই। তবে জাতি হিসেবে আমাদের আরেকটু সভ্য হওয়া উচিত। আমাদের দেশে ড্রাইভারবিহীন গাড়ি চলতে হয়তো আরও বহু বছর লাগবে, বহু বছর পরে হয়তো রোবট রাস্তা ঝাড়ু দেবে। কিন্তু খুব সহজেই আমরা দেশের কিছু পরিবর্তন আনতে পারি। এ জন্য কিন্তু অর্থ লাগবে না।’

কিছু সময় চুপ থেকে তাসরিফ বলতে শুরু করেন, ‘ঢাকার রাস্তায় বের হলে গাড়ির গতি ভয় পাইয়ে দেয়। একটু ফাঁকা রাস্তা হলে অনেকেই অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালান। এটা সচেতন নাগরিক হিসেবে না করলেও হয়। তাহলে বহু দুর্ঘটনা এড়ানো যায়। কিন্তু দিনের পর দিন আমরা ওভারটেকিং করেই যাচ্ছি। এর সঙ্গে হর্ন বাজানোর কথা না বললেই নয়। অযথা হর্ন বাজানো বন্ধ করার জন্য কি টাকা দরকার? দরকার সচেতনতা ও কড়া আইন। আমাদের দেশ ছাড়া পৃথিবীর তেমন কোথাও পাবেন না স্কুল ও হাসপাতালের সামনে গাড়ি হর্ন দিচ্ছে।’

দেশের রাস্তাঘাটে প্রচুর জ্যাম থাকে। এতে দুর্বিষহ মানুষের জীবন। এসব নিয়ে তাসরিফ বলেন, ‘বিশেষ করে আমাদের ঢাকার কথা বলা যায়, পুরো রাস্তাই বাস স্টপেজ। আমাদের রাস্তায় যেকোনো জায়গা থেকে সহজেই যাত্রী ওঠানো–নামানো যায়। নিয়মের তোয়াক্কা না করে আমরা সহজেই রাস্তা পার হই। এগুলো জ্যাম তৈরি করে। দুর্ঘটনা বাড়ায়। চাইলে সহজেই আমরা এটা থেকে বের হতে পারি। এ জন্য সভ্য হওয়া বা এক শ বছর লাগবে না। এ জন্য আমাদের সচেতন হওয়া জরুরি। আমাদের আইন মেনে চলা উচিত। এ জন্য যথাযথ আইনের ব্যবহার থাকতে হবে।’

সম্প্রতি চীন থেকে ফিরেছেন তাসরিফ। সুখবর দিলেন। তাসরিফ আসছেন নতুন গান নিয়ে। এ গানটি চীন সফরে গিয়ে তৈরি করেছেন। সেই গান নিয়েই তাসরিফের এখন ব্যস্ততা। তাসরিফ জানান, এই গানের শিরোনাম, ‘চীনদেশে ভিন দেশে।’ এটি তাঁর নিজের লেখা ও গাওয়া। গানটি শিগগির ফেসবুক ও তাসরিফের কুঁড়েঘর ব্যান্ড ইউটিউবে প্রচার হবে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-18%2Ffhnlorzy%2FIMG_8164.jpg?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
তাসরিফ খান। ছবি: শিল্পীর সৌজন্যে