Monday, July 20, 2015

ধর্ষকদের বিরুদ্ধে লাঠ্যৌষধি by আব্দুল কাইয়ুম

খাস বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, ‘মাইরের ওপর ওষুধ নাই’! আর একটু ভদ্র বাংলায় বলে ‘লাঠ্যৌষধি’। প্রায় শতবর্ষ পুরোনো এক বাংলা অভিধানেও আমি এই লাঠ্যৌষধি শব্দটি পেয়েছি। তার মানে, ওষুধটি বহু বছরের পরীক্ষিত। এটা যদি ফল না দিত, তাহলে বনেদি অভিধানে এর উল্লেখ থাকত না। এখন যে হারে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে চলেছে এবং প্রায় ক্ষেত্রেই অপরাধীরা আইনের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে, বীরদর্পে সমাজে চলছে-ফিরছে, তাতে মনে হয় এই বাঙালি সমাজে প্রচলিত ওষুধটি ছাড়া বোধ হয় কাজ হবে না।
তবে প্রথমেই পরিষ্কার করে নিই, আক্ষরিক অর্থে এই ওষুধ প্রয়োগের কথা বলা হচ্ছে না। কোনো নাগরিকেরই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার নেই। প্রকৃতপক্ষে, লাঠিপেটা না করেও লাঠ্যৌষধি প্রয়োগ করা চলে এবং তাতে ফলও পাওয়া যায়। আমাদের দেশেই ইদানীং এ রকম কিছু মোক্ষম উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে। সে কথাতেই আসছি।
পুলিশ যখন নববর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নারী নির্যাতনকারী বখাটেদের ধরল না, অথবা পুলিশের ভাষায়, কারও সহায়তা না পাওয়ায় ধরতে পারল না, তখন সারা দেশের মানুষ প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠল। কারণ ছাত্র ইউনিয়নের নেতারা তো কিছু সাহস দেখিয়ে অন্তত একজন নির্যাতনকারীকে পুলিশের হাতে দিয়েছিলেন। কিন্তু সে ‘পালিয়ে’ গেল! তারপর প্রতিবাদ করতে গেলে ছাত্র-তরুণদের বিভিন্ন সময়ে পুলিশের লাঠিপেটা খেতে হয়েছে।
মানুষের প্রতিবাদ চলতে থাকায় একপর্যায়ে পুলিশ সিসি ক্যামেরায় ধারণ করা কিছু বখাটের ছবি ছাপিয়ে ওই অপরাধীদের ‘ধরিয়ে দিলে পুরস্কার’ ঘোষণা করেই দায়িত্ব শেষ করেছে। আজ পর্যন্ত কাউকে ধরা হয়নি, কেউ তাদের ধরিয়ে দিয়ে পুরস্কার লাভও করেনি। এটা পরিষ্কার যে লোক দেখানো পদক্ষেপে কোনো কাজ হবে না।
এ অবস্থায় দেশের নাগরিক সমাজের নেতা ও সমাজের বিবেক বলে সমাদৃত বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও বিবৃতি দিলেন, প্রতিবাদ জানালেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। খুবই অবাক ব্যাপার! এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে এ রকম ধারণা হতে পারে যে ওই বখাটেরা বোধ হয় ক্ষমতাসীনদের আশীর্বাদপুষ্ট কেউ হবে। সে জন্যই তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে! সরকারের জন্য এ রকম পরিস্থিতি বিব্রতকর।
পুলিশ তো এতটা অক্ষম নয়। তারা সমাজবিরোধী অপরাধীদের টপাটপ ধরে ফেলছে। আইএসের সমন্বয়কারী জঙ্গি সন্ত্রাসীদের অনায়াসে ধরে ফেলছে। জাল টাকার ব্যবসায়ী, ইন্টারনেটে হুমকিদাতাদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করতে তাদের জুড়ি
নেই। পুলিশের এই সাফল্য ছোট করে দেখা যায় না। বিলেত-আমেরিকাও বাংলাদেশে উগ্রবাদী জঙ্গি নেতাদের বিরুদ্ধে সফল অভিযানের প্রশংসা করছে। প্রকৃত দক্ষতা না থাকলে এ রকম প্রশংসাপত্র পাওয়ার কথা নয়। তাহলে কেন আজও সেই নববর্ষে নারী নির্যাতনকারী বখাটেদের কাউকে ধারা গেল না? কেন ধর্ষকদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না?
এ ধরনের পরিস্থিতি সমাজে বখাটেদের উৎসাহিত করে। ওরা সুযোগ পেয়ে নারী ধর্ষণ-নির্যাতনের মতো ঘটনাগুলো আরও জোরেশোরে চালিয়ে যাওয়ার সাহস পায়। পত্রপত্রিকা খুললে প্রায় প্রতিদিনই ধর্ষণের খবর দেখা যায়। প্রলোভন দেখিয়ে বন্ধুর বাসায় নিয়ে কোনো নারীকে গণধর্ষণ, সেই সব ছবি মুঠোফোনে ধারণ করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা বেড়েই চলেছে। এটা উদ্বেগজনক।
কোনো কোনো ঘটনায় অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের বিচার ঝুলে থাকে। দুর্বলভাবে মামলা সাজানো হয় বলে অপরাধীদের সাজা হয় না। একসময় আসামিরা জামিনে বেরিয়ে এসে নির্যাতিত পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি দেখায়। মামলা তুলে নিতে বাধ্য করে।
তাহলে কি এই সামাজিক অরাজকতা নির্বিবাদে চলতেই থাকবে? একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় যে রাজাকার-আলবদরেরা দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে গণহত্যা চালিয়েছিল, নারী ধর্ষণ-নির্যাতন চালিয়েছিল, আজ ৪৪ বছর পর তাদের বিচারের রায় হচ্ছে, রায় কার্যকর হচ্ছে। রক্তস্নাত সেই স্বাধীন বাংলাদেশে আজ কিছু সমাজবিরোধী বখাটে নারী নির্যাতন করে পার পেয়ে যাচ্ছে। এটা মেনে নেওয়া যায় না।
তাহলে উপায় কী? উপায় একটা আছে। সর্বত্র সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। ১৯৮৩-৮৪ সালে এরশাদের সামরিক শাসনের সময় মেয়েদের বিভিন্ন স্কুলের আশপাশে বখাটেদের অত্যাচার বেড়ে উঠেছিল। সে সময় এলাকার ছাত্র-তরুণ-যুবকেরা কমিটি গঠন করে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। এলাকায় এলাকায় সেই কমিটির উদ্যোগে সমাবেশ করে বখাটেদের হুঁশিয়ার করে দেওয়া হয়। তখন আমাদের হাতে লাঠি ছিল না, কিন্তু বুকে ছিল বখাটে দমনের দৃঢ় প্রত্যয়। সেটা টের পেয়ে সেদিন বখাটেরা কেটে পড়েছিল। মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার সাহস তারা হারিয়ে ফেলে। এ ধরনের সামাজিক প্রতিরোধ থানা-পুলিশকেও সহায়তা করে। বখাটেদের কাছে একটা বিপৎসংকেত যায়। তারা বুঝতে পারে, মেয়েদের নির্যাতন করে ছাড় পাওয়া যাবে না।
যারা নারী ধর্ষণ–নির্যাতন করে, তাদের কোনো দল নেই। তারা সমাজের নিকৃষ্ট অপরাধী। তাদের অনাচার বন্ধ করতে নাটোরের লাঠি–বাঁশির মতো লাঠ্যৌষধি দরকার উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের পর সারা দেশে কিছুদিন রাজনৈতিক-প্রশাসনিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল। রাতে কিছু এলাকায় চুরি-ডাকাতির অভিযোগ আসতে থাকে। কয়েকটি এলাকায় জনমনে ভয়ভীতি ছড়ানোর জন্য একটি মহল তৎপর হয়ে ওঠে। তখন অবশ্য নারী নির্যাতনের ঘটনা ছিল বিরল। কিন্তু অপরাধপ্রবণতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিল। সেই সময় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকা ও পাড়া-মহল্লায় সামাজিক প্রতিরোধ টিম গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। তখন আমরা কয়েকজন তরুণ ছাত্র ঢাকায় অন্যান্য এলাকার মতো আমাদের মহল্লায়ও একটি প্রতিরোধ ব্রিগেড গড়ে তুলি। পাড়ার মুরব্বিরাও এগিয়ে আসেন। একজন নিজের বাসার গ্যারেজে সমন্বয়কেন্দ্র গড়ে তোলার সুযোগ করে দেন। আমরা সারা রাত বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পর্যায়ক্রমে নিজেদের মহল্লা সুরক্ষার ব্যবস্থা করি। থানার পুলিশের সঙ্গে সমন্বিতভাবেই এই সামাজিক প্রতিরোধব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা সেদিন রেখেছিল।
কেউ হয়তো বলবেন, সেসব পুরোনো দিনের কথা। তখন ছিল বিপ্লবী পরিস্থিতি। আজ ওসব হবে-টবে না। কিন্তু না, জীবনে সাফল্য লাভের কোনো ঘটনাই কখনো তাৎপর্যহীন হয়ে যায় না। ইতিহাসে এর অনেক উদাহরণ আছে।
ধরা যাক ইদানীংকালে নাটোরের ‘লাঠি-বাঁশি কর্মসূচির’ কথা। নাটোরে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও মাদকের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য এলাকার ব্যবসায়ী ও জনসাধারণের সমন্বয়ে শুরু হয় ‘লাঠি-বাঁশি কর্মসূচি’। নেতৃত্বে ছিলেন মো. আব্দুস সালাম। গতকাল তাঁর সঙ্গে আমি মুঠোফোনে কথা বলি। তিনি বলেন, ১৯৯৯ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে এই কর্মসূচি উল্লেখযোগ্য সাফল্য লাভ করে। সময়টি লক্ষ করুন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শুরু আর পরবর্তী বিএনপি সরকারের সময় চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন। কৌশলটি খুব সহজ। সবার হাতের কাছে লাঠি ও বাঁশি মজুত থাকে। কেউ চাঁদাবাজি বা সন্ত্রাস করতে এলে আক্রান্ত ব্যক্তি বাঁশি বাজিয়ে সবাইকে সতর্ক করেন। সবাই রাস্তায় নেমে আসেন। অপরাধী পালানোর পথ পায় না। আব্দুস সালাম বলেন, সমিতির কর্মসূচি এখনো চলছে। এখনো কোথাও ডাকাতি হলে বাঁশি বেজে ওঠে। এলাকা এখন শান্ত।
প্রশাসনও নাটোরের লাঠি–বাঁশি কর্মসূচিকে উচ্চ মূল্যায়ন করে। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে নাটোরের বিদায়ী পুলিশ সুপার সমাজে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার জন্য লাঠি–বাঁশি কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। ২০০০ সালে রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার উত্তরাঞ্চলীয় ১৬টি জেলায় লাঠি–বাঁশি কর্মসূচি ছড়িয়ে দেওয়ার কথা বলেছিলেন বলে সালাম সাহেব জানান।
আজ যারা নারী ধর্ষণ-নির্যাতন করে, তাদের কোনো দল নেই। তারা সমাজের নিকৃষ্ট অপরাধী। তাদের অনাচার বন্ধ করতে নাটোরের লাঠি–বাঁশির মতো লাঠ্যৌষধি দরকার।
আব্দুল কাইয়ুম: সাংবাদিক।
quayum@gmail. com

আজ কি আর কাজে মন টেকে? by মানসুরা হোসাইন

ঈদের ছুটি শেষ হয়েছে । কিন্তু আজও রাজধানী ঢাকা ছিল অনেকটা ফাঁকা। প্রধান সড়কগুলোতেও গাড়ির চলাচল ছিল কম। ছবিটি আজ দুপুরে মতিঝিল শাপলা চত্বর থেকে তোলা। ছবি: আবদুস সালাম
ঈদের ছুটি শেষ হয়েছে । কিন্তু আজও রাজধানী ঢাকা ছিল অনেকটা ফাঁকা। প্রধান সড়কগুলোতেও গাড়ির চলাচল ছিল কম। ছবিটি আজ দুপুরে মতিঝিল শাপলা চত্বর থেকে তোলা। ছবি: আবদুস সালাম
আজ সোমবার সকাল থেকেই রাজধানীতে কখনো ইলশে গুঁড়ি, আবার কখনো মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। কয়েক দিন ধরে চলা বৃষ্টির ফলে রাস্তাঘাটে ধুলোবালি নেই। ঈদের পর আজ ছিল প্রথম কর্মদিবস। একদিকে বৃষ্টি, অন্যদিকে ঈদের পর ঢাকা প্রায় ফাঁকাই বলা যায়। তাই যাদের ছুটি শেষ, তাঁরা অনেকটা বাধ্য হয়ে অফিসমুখী হয়েছেন। তবে আজ কি আর অফিসে মন টেকে? পুরো রাজধানীতে চলছে ছুটির আমেজ।
সরকারি, বেসরকারি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী জানালেন, আজ অফিসে হাজিরা দিয়ে ঈদের কোলাকুলি, জামা, শাড়ি, পাঞ্জাবি নিয়ে আলোচনা আর কার বাসায় কয় পদের রান্না হয়েছিল; তা বলতে বলতেই বাড়ি চলে গেছেন।
সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে চলছে লেনদেন। ছবি: মনিরুল আলম
সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে চলছে লেনদেন। ছবি: মনিরুল আলম
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোতে কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ‘সকাল থেকে পুরো অফিসেই লোকজন কম ছিল। যেসব বিভাগের বসেরা ছুটিতে, তাঁদের আজ আর পায় কে? হাজিরা দিয়ে কিছুক্ষণ অফিসে কাটিয়ে দুপুরের মধ্যে অনেকেই বাড়ি ফিরে গেছেন।’
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংকের চিত্র ছিল কিছুটা ভিন্ন। যাঁরা ছুটি বাড়িয়ে নিয়েছেন, শুধু তাঁদের চেয়ারগুলো ফাঁকা। এবার ঈদের ছুটি সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্র ও শনিবার হওয়ায় সরকারি কর্মজীবীদের মন খারাপ। আবার, বৃহস্পতিবার যাঁরা ছুটি নিয়েছেন তাঁদের আজ অফিসে হাজিরা দেওয়া ছিল বাধ্যতামূলক।
চলছে ঈদের কুশলবিনিময়। ছবিটি আজ সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে তোলা। ছবি: মনিরুল আলম
চলছে ঈদের কুশলবিনিময়। ছবিটি আজ সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে তোলা। ছবি: মনিরুল আলম
ঈদের ছুটির পর রাজধানী আস্তে আস্তে চিরচেনা রূপে ফিরতে শুরু করেছে। রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা বেড়েছে। বিভিন্ন সিগন্যালে আজ একটু বেশিক্ষণ করেই থামতে হচ্ছে ঢাকাবাসীকে। তবে সিগন্যালগুলো বলতে গেলে ছিল অনেকাংশে ভিক্ষুকশূন্য। দু-একজন বৃষ্টিতে ভিজে ভিক্ষা করছেন। যেসব রাস্তায় অন্য সময় রিকশা চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকে, সেসব রাস্তায় ঈদের ছুটিতে রিকশা চলেছে।
দুপুরে মোহাম্মদপুর, মতিঝিলের শাপলা চত্বর, ব্যাংক পাড়া, গুলিস্তান, নয়াপল্টন, প্রেসক্লাব, কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে এসব জায়গার চেহারা এখনো খানিকটা অচেনাই ঠেকেছে । ফুটপাতের খোলা দোকানগুলো পলিথিনে মোড়ানো। বেশির ভাগ বিপণিবিতানে বড় বড় তালা ঝুলছে। দুই-একটি বিপণিবিতান খোলা আছে। তবে ক্রেতার অভাবে দোকানিরা বসে অলস সময় কাটাচ্ছেন। রাস্তার পাশে বসা ফলের দোকানে ফল আছে, কিন্তু ক্রেতা নেই। দোকানি ছাতা মাথায় দিয়ে ক্রেতার অপেক্ষায়।
ঈদের ছবি দেখতে সিনেমা হলে যান অনেকে। ছবিটি মিরপুরের সনি সিনেমা হল থেকে তোলা। ছবি: আশরাফুল আলম
ঈদের ছবি দেখতে সিনেমা হলে যান অনেকে। ছবিটি মিরপুরের সনি সিনেমা হল থেকে তোলা। ছবি: আশরাফুল আলম
দুপুর সাড়ে তিনটার দিকে মতিঝিলে অফিস থেকে বের হওয়া কয়েকজনকে দেখা গেল পলিথিনে করে ফল, শসা বা অন্যান্য সবজি কিনে বাড়ি ফিরতে। এই ক্রেতারাই আজ বিক্রেতাদের ভরসা।
মোহাম্মদপুরের কৃষি মার্কেটের কাঁচা বাজারের দোকানিরা মাছ, মাংস, শাক-সবজি নিয়ে বসেছেন। তবে বাজারে ক্রেতা হাতেগোনা।
চন্দ্রিমা উদ্যান, শিশু পার্ক, সিনেমা হলসহ বিনোদন কেন্দ্রগুলোর সামনে মানুষের জটলা আছে। অনেকেই পরিবার পরিজন নিয়ে এসব জায়গায় এসেছেন। চন্দ্রিমা উদ্যানে ছাতা মাথায় এবং বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা প্রেমিক যুগলের সংখ্যাই বেশি দেখা গেল আজ।
এখনো বন্ধ রয়েছে অনেক দোকান। ছবিটি মিরপুর ১ এলাকা থেকে তোলা। আশরাফুল আলম
এখনো বন্ধ রয়েছে অনেক দোকান। ছবিটি মিরপুর ১ এলাকা থেকে তোলা। আশরাফুল আলম
জীবিকার তাগিদে ঢাকায় না ফিরে গতি নেই। গুলিস্তানে ঈদ শেষে ঢাকা ফেরা এক মা ও মেয়েকে বড় একটি ব্যাগ হাতে করে বৃষ্টিতে ভিজতে দেখা গেল। সিএনজি, রিকশাওয়ালা সুযোগ বুঝে আজ দাম হাঁকাচ্ছেন দ্বিগুণ, তিনগুণ। তাঁদের যুক্তি, ঈদের সময় বেশি না দিলে আর কবে দেবেন।
ঈদে যাঁরা ঢাকায় ছিলেন বা বাড়িতে গেলেও ঢাকায় ফিরে এসেছেন তাঁদের অনেকেই আজ ঢাকায় থাকা বিভিন্ন আত্মীয় বা বন্ধুদের বাড়িতে ঢুঁ দিচ্ছেন।
দু-একটি দোকান আজ খুলেছে। ছবি: মনিরুল আলম
দু-একটি দোকান আজ খুলেছে। ছবি: আশরাফুল আলম
মিরপুরের গৃহিণী নাজমা আখতার জানালেন, ঈদের পরে নিজের বোন, দেবরের পরিবারসহ অনেকেই বেড়াতে এসেছেন। তবে বৃষ্টির কারণে যাঁরা এসেছেন তাঁদের ফিরতে বিভিন্ন ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।
ঢাকার যানজট, গাড়ির হর্ন, মানুষের অবিরাম ছুটে চলার যান্ত্রিক শহরটিতে থাকতে থাকতে অনেকেই বিরক্ত। ঈদের ছুটিতে আপনজনের সঙ্গে ঈদ করতে গ্রামে গিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন অনেকে। তবে জীবন চালানোর জন্য আয়েশি আড়মোড়া ভেঙে অপছন্দের ঢাকায় ফিরতেই হবে। তাই আজ বাড়ি ফেরা মানুষের ভিড় জমছে বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন ও লঞ্চঘাটে। অন্যদিকে যেসব বাসিন্দা ঈদে ঢাকাতেই ছিলেন তারাও এই কয়দিন ফাঁকা ঢাকায় স্বস্তি পেয়েছেন। কিন্তু স্বস্তির দিন শেষ হতে চলেছে। কর্মক্ষেত্রে একদিন, দুই দিন কিছুটা ফাঁকি দেওয়া গেলেও কাজে ব্যস্ত হতেই হবে। দুই একদিনের মধ্যেই ঢাকা ফিরবে তার আপন চেহারায়।

ছাত্রদল সভাপতি কারাগারে

পটুয়াখালীতে গ্রেপ্তার হওয়া
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাজীব
আহসান। ছবি: সংগৃহীত
পটুয়াখালীতে গ্রেপ্তার হওয়া ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাজীব আহসানসহ ছয়জনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে করা মামলায় মুখ্য বিচারিক হাকিম এসএম তারেক শামস এ আদেশ দেন। জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও আইনজীবী মো.মজিবুর রহমান বলেন, আদালতের নির্দিষ্ট সময় শেষ হওয়ায় জামিন আবেদন করা যায়নি। তবে আগামীকাল মঙ্গলবার তাঁদের জামিন আবেদন করা হবে। আজ সোমবার বেলা পৌনে তিনটার দিকে রাজীবসহ ছয়জনকে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আদালতে আনা হয়। এ সময় আদালত প্রাঙ্গণে দলীয় নেতা-কর্মীরা জড়ো হন। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাজীব আহসানসহ ছয়জনকে গতকাল রোববার রাত সাড়ে ১১টার দিকে পটুয়াখালীর লেবুখালী ফেরিঘাট এলাকা থেকে আটক করে পুলিশ। পুলিশের দাবি, তাঁদের প্রাইভেট কারে থাকা লাগেজ থেকে ৪৫টি ইয়াবা বড়ি ও একটি বোতল উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশের সন্দেহ, বোতলের পদার্থ মদ হতে পারে। রাজীবের সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া অন্য ব্যক্তিরা হলেন সালাহউদ্দিন, রফিকুল ইসলাম, সৈয়দ জসীম উদ্দিন, সাইফুল ইসলাম ও গাড়িচালক অসীম হালদার। পুলিশের ভাষ্য,তাঁরা রাজীবের সহযোগী। ঘটনার বিষয়ে রাত দুইটার দিকে পটুয়াখালী পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ফয়েজ আহমেদ। এ সময় তিনি বলেন, ‘ছাত্রদল সভাপতি ঢাকায় নিয়মিত মামলার আসামি। এখানে (পটুয়াখালী) মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে সহযোগীসহ তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হবে।’ পরে রাজীবসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করে পটুয়াখালীর দুমকি থানার পুলিশ।

ঈদে ঘরে ফেরেনি সোয়া লাখ পুলিশ

চট্টগ্রামের দামপাড়া পুলিশ লাইন মসজিদে ঈদের নামাজ শেষে
ফিরছেন ক্রিকেটার মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। তাঁর নিরাপত্তায়
ছিলেন পুলিশের এক সদস্য। ছবি: সৌরভ দাশ
ঘরমুখো মানুষের নিরাপদ যাত্রা ও ঈদ আনন্দ নিশ্চিত করতে ঘরে ফেরা হয়নি প্রায় সোয়া লাখ পুলিশ সদস্যের। ঈদ উপলক্ষে ঈদগাহ, রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি, ব্যাংক-বিমা আর বিনোদন কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দায়িত্ব পালন করেছেন তাঁরা। এই বাড়তি চাপের কারণে নিজেদের ঘরে ফিরতে পারেননি পুলিশের ৮০ শতাংশ সদস্য। বাবা-মা, ভাই-বোন, স্ত্রী সন্তান থেকেছে অনেক দূরে। দায়িত্ব পালন শেষে ব্যারাক বা অস্থায়ী আবাসেই ঈদ কেটেছে এসব পুলিশ সদস্যের। পুলিশের তথ্যমতে, সারা দেশে তাদের মোট সদস্য রয়েছে এক লাখ ছাপান্ন হাজার।
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) মো. নজরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মানুষের নিরাপদ চলাচল এবং ঈদ উদ্‌যাপনে যথাযথ ভূমিকা রাখতে বাংলাদেশ পুলিশকে ধন্যবাদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ঈদের দিন সন্ধ্যায় পুলিশ মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) পাঠানো এক বার্তায় ওই ধন্যবাদ জানান তিনি।
দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে জননিরাপত্তা ও জনগণের ঈদ আনন্দ নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখায় পুলিশের সব সদস্যকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক। ঈদের ছুটি শেষে আবারও মানুষের কর্মস্থলে ফেরার পথ নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন রাখতে বাড়তি দায়িত্ব পালনে সব পুলিশ সদস্যের প্রতি তিনি আহ্বান জানান। আইজিপি বলেন, ‘মানুষের বাড়তি আনন্দ বা কষ্ট মানেই আমাদের বাড়তি দায়িত্ব। মানুষের কষ্ট লাঘব করে আনন্দ বা খুশির নিশ্চয়তা দেওয়াই আমাদের আনন্দ।’
ঈদের আগের রাত পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটেছেন নাড়ির টানে। প্রিয়জনের সঙ্গে মিলিত হওয়ার আনন্দে সবাই থেকেছেন বিভোর। কিছু গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের মতো পুলিশও ছিল দায়িত্বে। দিনরাত রাস্তায়, রেল, নৌপথে, বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে মানুষের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করেছে তারা। ঈদুল ফিতরের সরকারি ছুটিতে অফিস আদালত যখন বন্ধ, তখন পুরোপুরিই খোলা থেকেছে থানা-ফাঁড়ি, তদন্ত কেন্দ্র, সচল থেকেছে পুলিশের সব অফিস।
পুলিশের উচ্চ পর্যায়ের সূত্রগুলোর তথ্যমতে, নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়াতে আগেই গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করেছে পুলিশ। যেমন—কোনো ঈদগাহ বা মসজিদে নামাজ বা অন্য কোনো ইস্যু নিয়ে কারও মধ্যে কোনো সমস্যা রয়েছে কি না? আগের বছরগুলোতে কোনো গ্রাম বা মহল্লায় কোনো সমস্যা হয়েছিল ছিল কি না? ‍
সে অনুযায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা সাজিয়েছে পুলিশ। ঈদগাহ, রাস্তাঘাটে থেকেছে পুলিশ। আবার ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, খুলনার মতো বড় শহরগুলোতে মানুষের ফাঁকা ঘরবাড়ির নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হয়েছে তাদের। হঠাৎ নিরাপত্তা সমস্যা যাতে না হয়, সে জন্য স্ট্যান্ডবাই থাকতে হয়েছে একটি দলকে।

তুরস্কে বিস্ফোরণ, ২৮ জন নিহত

তুরস্ক ও সিরিয়ার সীমান্তবর্তী শহর সুরিজে বিস্ফোরণে অন্তত ২৮ জন নিহত ও অনেকে আহত হয়েছেন। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে এ খবর জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি। তুরস্ক কর্তৃপক্ষের দাবি, এটি জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) কাজ। বিবিসি অনলাইনের খবরে জানানো হয়, আমারা কালচার সেন্টারের কেন্দ্রের বাগানে এ বিস্ফোরণটি হয়।
বিস্ফোরণে পর অনেকের লাশ পড়ে থাকতে দেখা যায়। তাঁদের শরীরের বিভিন্ন অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বিস্ফোরণে। ছবি: রয়টার্স
দ্য ফেডারেশন অব সোশ্যালিস্ট ইয়ুথ অ্যাসোসিয়েশনস (এসজিডি​এফ) জানায়, সিরিয়ার কোবানি শহরের পুনর্গঠন কাজে অংশ নেওয়ার জন্য ওই ​সময় সেখানে অন্তত ৩০০ সদস্য ​ছিলেন। সংগঠনটি বিস্ফোরণের আগের ও পরের ছবি টুইটারে প্রকাশ করেছে। এটি ঠিক কোন ধরনের বিস্ফোরণ আনুষ্ঠানিকভাবে জানা যায়নি। তবে, এটি আত্মঘাতী হামলা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিস্ফোরণে পর ঘটনাস্থলে পড়ে থাকতে দেখা যায় কাগজপত্র ও এসজিডি​এফের পতাকা। ছবি: রয়টার্স
সিরিয়ার কোবানি শহরের কাছেই তুরস্কের এই সীমান্তবর্তী শহর সুরিজ। গত সেপ্টেম্বর থেকে কোবানিতে জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সদস্য ও কুর্দি যোদ্ধাদের মধ্যে যুদ্ধ চলছে। আইএস শহরটি দখল করে নিলে সেখানকার অনেক বাসিন্দা পালিয়ে তুরস্কে আশ্রয় নেন।

সাইবার জগতেও চাই বাকস্বাধীনতা by কামাল আহমেদ

বাংলাদেশে আমরা যাঁরা মোবাইল ফোন ব্যবহার করি, তাঁদের কাউকেই মনে করিয়ে দেওয়ার দরকার নেই যে দৈনিক কত অপ্রয়োজনীয় বার্তা আমাদের বিরক্তির কারণ হয়। শুধু যে লিখিত বার্তা (টেক্সট) তা নয়, ধারণকৃত বাণীও (ভয়েস মেইল) কম নয়। এঁদের কেউ বেচতে চান মোবাইলের রিংটোন, কেউ কম দামে বাড়ি, জমি, কাপড়, রেস্তোরাঁর খাবার ইত্যাদি। এসব পণ্য ও সেবা বিক্রেতার কাছ থেকে বার্তা পাওয়ার কারণ হচ্ছে আমরা সেবা কেনার সময় তাঁদের আমাদের টেলিফোন নম্বর দিয়েছি। ফলে সময়ে-সময়ে তাঁরা তাঁদের পণ্য বা সেবার কথা জানান দিতে আমাদের বার্তা পাঠান। কিন্তু দৈনিক যেসব অগুনতি বার্তা আসে, সেগুলোর অধিকাংশের সঙ্গেই হয়তো আমাদের কোনো দিন কোনো যোগাযোগ হয়নি (আমার ক্ষেত্রে পরিমাণটা ৯০ শতাংশের বেশি)। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, ওই সব কোম্পানি বা ব্যক্তি আমাদের নম্বর কোত্থেকে পেলেন? আমার টেলিফোন নম্বরটি আমার অজান্তে এবং সম্মতি ছাড়াই অন্যের কাছে হস্তান্তর হওয়া কি আমার ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারের লঙ্ঘন নয়?
এই বিড়ম্বনার অন্য আরও সূত্র আছে। যেমন ক্রেডিট কার্ড কোম্পানি বা তাদের পক্ষের এজেন্ট বিভিন্ন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান। ব্যক্তিভেদে কার্ডের ঋণসীমার ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ধরনের পণ্য ও সেবা বিক্রেতারা দিন-রাত আমাদের মোবাইল ফোনে বার্তা পাঠাচ্ছেন। প্লাটিনাম কার্ডের গ্রাহক হলে ইউরোপ-আমেরিকায় ভ্রমণের প্যাকেজসহ নানা ধরনের বিলাসিতার বিষয়ে তথ্য। আর ঋণসীমা বেশি না হলে দেশের ভেতরের নানা পণ্য ও সেবার বিজ্ঞাপন। সোজাকথায় এর অর্থ হচ্ছে আমি গরিব না ধনী, নাকি মধ্যবিত্ত সেই তথ্য আমার অগোচরে বড় বড় কোম্পানিগুলোর হাতে পৌঁছে গেছে। কিন্তু কীভাবে এটা ঘটছে এবং কত দূর পর্যন্ত এটা বিস্তৃত হতে দেওয়া উচিত অথবা অনুচিত, সে প্রশ্নে আমাদের কারও মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না।
দেশের আইন বলছে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সাংবিধানিক অধিকার এবং তা বেআইনিভাবে লঙ্ঘন বা লঙ্ঘনের চেষ্টা ফৌজদারি অপরাধ। আমাদের এসব ব্যক্তিগত তথ্যে আইনগত নাক গলানোর কিছু অধিকার অবশ্য রয়েছে রাষ্ট্রের। অর্থাৎ যুক্তিসংগত কারণে এবং আইনগত অনুমোদনের ভিত্তিতে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনী ও আইন প্রয়োগকারীরা এসব তথ্য চাইতে ও পেতে পারেন। কিন্তু আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ যাতে আবার রাজনৈতিক কারণে তার ক্ষমতা অপব্যবহার না করে, সে জন্য ন্যূনতম সুরক্ষাও থাকার কথা। সে ধরনের সুরক্ষা যে নেই সেটা বলাই বাহুল্য। বরং নিরাপত্তা বাহিনীর এই ক্ষমতার অপব্যবহার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বিরোধী রাজনীতিক, সাংবাদিক, ক্রিকেট তারকা, অভিনেত্রী ও ব্যবসায়ীদের টেলিফোন সংলাপের রেকর্ড প্রকাশ এখন নৈমিত্তিক চর্চায় পরিণত হয়েছে। সরকারের সমালোচনার জন্য যাঁরা পরিচিত, তাঁরা এখন আর টেলিফোনে কোনো আলোচনা ও মন্তব্য করতে চান না। আর বিরোধী রাজনীতিকদের নাকি দলীয়ভাবেই পরামর্শ দেওয়া হয়েছে টেলিফোনে স্পর্শকাতর কোনো বিষয়ে তাঁরা যেন কথা না বলেন। টেলিযোগাযোগ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এ বিষয়ে আজ পর্যন্ত টুঁ শব্দও করেনি। রাষ্ট্রের নিরাপত্তায় নিয়োজিত বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে তাদের সহযোগিতার সম্পর্ক থাকবে, সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু তা কি আইনের বাইরে যেতে পারে? অবশ্য বলা ভালো, কোনো কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সংস্থা যে টেলিফোনে আড়ি পাতা কিংবা ইন্টারনেটে নজরদারির ক্ষেত্রে সীমা লঙ্ঘন করে নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করছে, তার কারণটা রাজনৈতিক। ক্ষেত্রবিশেষে প্রতিপক্ষকে হেয় করার রাজনীতি থেকে শিগগির আমাদের মুক্তি নেই। কেননা, বিটিআরসির মতো প্রতিষ্ঠানের যে সংসদের কাছে জবাবদিহি করার কথা, সেই ‘অনির্বাচিত’ সংসদ হলো বিরোধী দলহীন, যেখানে আর যা-ই হোক কারও জবাবদিহি আশা করা যায় না।
মোবাইল ফোনের প্রসঙ্গ দিয়ে লেখাটি শুরু করার কারণ রয়েছে। বিটিআরসির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল সাড়ে চার কোটির সামান্য বেশি। আর এঁদের মধ্যে ৪ কোটি ৪২ লাখই মোবাইল ইন্টারনেট সংযোগের গ্রাহক। হতে পারে, এঁদের অনেকে ডেস্কটপ বা পিসিই ব্যবহার করছেন, কিন্তু সংযোগটা মোবাইল নেটওয়ার্কের। তবে সংযোগ যা-ই হোক, ইন্টারনেট ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আগের আইন যথেষ্ট নয়, এমন সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে সরকার নতুন সাইবার আইন তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। ‘অনির্বাচিত’ সংসদের যুগে সরকারের ইচ্ছাই তো শেষ কথা। কথিত জনমত সংগ্রহের উদ্যোগও যে সরকারের সমালোচনা এড়ানোর কৌশলমাত্র, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। এর আগেও বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা প্রণয়নে সরকারকে এ ধরনের জনমত সংগ্রহের সুযোগ দিতে দেখা গেলেও সেগুলোতে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনমানুষের মতামত উপেক্ষিতই থেকে গেছে। মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ঠিক করার দৃষ্টান্ত নিশ্চয়ই এখানে অপ্রাসঙ্গিক হবে না।
আমাদের ই-মেইল, আমাদের সামাজিক যোগাযোগের নেটওয়ার্কগুলোতে বিচরণ সবকিছুর ওপর রাষ্ট্র যুক্তিসংগত কারণে আইনগত অনুমোদন নিয়ে নজরদারি করলে সেটা মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি অথবা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নাশকতার নামে স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতার অপপ্রয়োগ কিছুতেই মানা যায় না। রাজনীতিকদের নিয়ে ব্যঙ্গ-কার্টুন করার চল একটি বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা এবং তা সারা বিশ্বেই মত প্রকাশের স্বাধীনতা হিসেবে স্বীকৃত। অথচ আমাদের দেশে ক্ষমতাসীনদের নিয়ে অনলাইনে ব্যঙ্গচিত্র বা প্যারোডি প্রকাশ করলে গন্তব্য হয় কারাগার। এখন আবার নতুন সাইবার আইনে প্রস্তাব করা হচ্ছে, বিদেশি বন্ধুরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘ক্ষতিকর’ কিছু সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা যাবে না। ধরা যাক, আমি সুন্দরবনকে রক্ষার স্বার্থে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিরুদ্ধে। আমি বিশ্বাস করি, ওই প্রকল্প আমাদের হৃৎপিণ্ডের অক্সিজেন শুষে নিয়ে এ দেশের প্রকৃতিকে অসুস্থ করে ফেলবে। কিন্তু ওই প্রকল্পে যেহেতু বন্ধুরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান জড়িত, সেহেতু আমার রামপাল প্রকল্প-সম্পর্কিত মতামতকে আমাদের রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ সাইবার অপরাধ হিসেবে অভিহিত করলে তার প্রতিকার পাব কোথায়? এখন তো আবার নতুন আইনে প্রস্তাব করা হয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী চাইলে দরজা-জানালা ভেঙে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করতে পারবে।
এই আইনকে কঠোরতর করার উদ্যোগ নিয়ে যখন সরকার এগোচ্ছে, সে সময়ে জেনেভায় চলছে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের বার্ষিক অধিবেশন। ওই অধিবেশনে জাতিসংঘ সুস্পষ্ট করে বলেছে, কিছু রাষ্ট্র ইন্টারনেটকে শত্রু মনে করে। কিন্তু ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবে প্রবেশাধিকার বন্ধের চেষ্টা হচ্ছে মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন। অনলাইনে ব্যক্তির গোপনীয়তা সুরক্ষা এবং মানবাধিকার বিষয়ে জাতিসংঘের স্পেশাল র্যাপোর্টিয়ার ডেভিড কে ১৮ জুন জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে বলেন যে অপরাধীরা সুবিধা নিতে পারে, এই ঝুঁকি সত্ত্বেও অনলাইন ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা প্রয়োজন।
ব্লগার ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যরা যখন বাস্তব জগতের তুলনায় ডিজিটাল জগতে অনেক বেশি হয়রানির মুখোমুখি হন, তখন ব্যক্তির গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। এই যুক্তি তুলে ধরে ডেভিড কে সরকারগুলোর প্রতি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের তথ্য এনক্রিপ্ট করার ধারণা গ্রহণ করার জন্য আহ্বান জানান। এই এনক্রিপশন ব্যবস্থায় ইন্টারনেট ব্যবহারকারী পরিচয় গোপন রাখার সুবিধা পান। বিভিন্ন নাগরিক অধিকার আন্দোলনকারী, সাংবাদিক, শিক্ষক ও গবেষকদের অনেকেই ইন্টারনেট ব্যবহারে এই কৌশল অনুসরণ করেন। তবে সরকারগুলো এই এনক্রিপশনের বিরোধিতা করে বলছে যে এ ধরনের ব্যবস্থা অপরাধী ও সন্ত্রাসবাদী চক্রগুলোকে নিরাপত্তা বাহিনীকে পাশ কাটিয়ে চলার সুবিধা করে দেবে। ডেভিড কে বলেন যে তিনি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারি বা তা তদন্ত করার বিরুদ্ধে নন, তবে তা হতে হবে আদালতের অনুমোদনক্রমে।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থায় কাজ করা সাবেক গোয়েন্দা এডওয়ার্ড স্নোডেনের ফাঁস করা তথ্যসূত্রে আমরা এখন জানি যে পাশ্চাত্যের সরকারগুলো—বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য কম্পিউটার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কম্পিউটারের মধ্যেই এমন ব্যবস্থা ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম যন্ত্র স্থাপনে বাধ্য করার জন্য চাপ দিয়ে আসছে, যাতে সেই কম্পিউটার ব্যবহারকারীর অনলাইনের সব গতিবিধি বা কার্যক্রমে গোপনে নজরদারি করা যায়। ডেভিড কে ওই সরকারগুলোর উদ্যোগের বিরোধিতা করে বলছেন যে কম্পিউটার প্রস্তুতকারকদের যদি ব্যবহারকারীর তথ্য গোপনে সংগ্রহের ব্যবস্থা রাখতে বাধ্য করা হয়, তাহলে বেপরোয়া বা নির্যাতনকারী সরকারগুলো ওই সব তথ্যের অপব্যবহার করবে। আমাদের সরকার এ দেশে যেসব কম্পিউটার ব্যবহৃত হয়, সেগুলোর নির্মাতাদের এমন কোনো বাধ্যবাধকতার মধ্যে এনেছে কি না, আমরা জানি না। তবে এ দেশেও অনলাইনভিত্তিক স্কাইপ কথোপকথনের রেকর্ড ফাঁস করে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার একাধিক ঘটনা ঘটেছে।
সরকারের কাছে অবশ্য বেশ জোরালো একটি যুক্তি আছে। আর তা হলো, সন্ত্রাসবাদের হুমকি মোকাবিলায় এ ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগ ও ব্যবস্থা অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই। সে জন্য বিশ্বের নানা দেশ থেকে উন্নত প্রযুক্তির নানা সরঞ্জাম ক্রয়ে আমাদের নিরাপত্তা বাহিনীগুলো যে বেশ সচেষ্ট, সে কথা আমরা জানি। অবশ্য সেটাও জানা গেছে, প্রাইভেসি ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি নাগরিক অধিকার সংগঠনের তৎপরতায় সুইচ সরকার র্যাবের এ ধরনের একটি ক্রয় উদ্যোগ আটকে দেওয়ার খবরে। ওই নাগরিক সংগঠনটি বাংলাদেশে নিরাপত্তা বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের নজির তুলে ধরে ওই প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিরোধিতা করে।
সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় নিরাপত্তা বাহিনীর কৌশল ও চাহিদা সম্পর্কে জাতিসংঘ র্যাপোর্টিয়ার ডেভিড কে বলছেন, সন্ত্রাসীদের ইন্টারনেট ব্যবহারের আশঙ্কা যেভাবে দেখানো হয়, তা বাস্তবের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ওসামা বিন লাদেনের লুকিয়ে থাকার বাড়িটিতে অভিযানের পর যেসব জিনিস পাওয়া গেছে, তাতে দেখা গেল সেখানে পেনড্রাইভের মতো জিনিস ছিল, যেগুলো বাহক মারফত আনা-নেওয়া হতো। তিনি বলছেন সন্ত্রাসবাদীরা অতটা কাঁচা নয় যে তারা মনে করবে অনলাইন ব্যবহার করে তথ্য আদান-প্রদান করলে সেগুলো গোপন রাখা সম্ভব হবে। ডেভিড কে তাই মানবাধিকার হিসেবে অনলাইনে ব্যক্তির গোপনীয়তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় বৈশ্বিক সমঝোতার আহ্বান জানিয়েছেন। এই বিতর্ক পাশ কাটিয়ে আমাদের দেশে নতুন নতুন নিবর্তনমূলক আইন তৈরি কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। কারণ, আমরাও চাই সাইবার জগতে বাকস্বাধীনতা এবং গোপনীয়তা রক্ষার অধিকার। ব্লগিংয়ের জন্য যেমন জঙ্গি ঘাতকের হামলার শিকার হতে চাই না, তেমনি রাষ্ট্রের স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াও মেনে নিতে পারি না।
কামাল আহমেদ: সাংবাদিক।

‘বিশ্বের এখন বাংলাদেশকে নিয়ে ভাবা উচিত’

এ বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশে বিএনপি জোটের অবরোধ-হরতালে পেট্রলবোমায় আগুনে পুড়ে শতাধিক ব্যক্তি নিহত হন। বছরের মাঝামাঝি এসে সাগরে বিদেশ পাড়ি দিতে গিয়ে অসংখ্য বাংলাদেশি আটক হলো এবং দেশেও ফেরে অনেকে। এ ছাড়াও বিচার ‘বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ ও রাজনৈতিক দলের নেতারা ‘গুম’ও হয়েছেন। এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে হাফিংটন পোস্টের এক নিবন্ধে মন্তব্য করা হয়েছে, ‘এখন সবার বাংলাদেশ নিয়ে ভাবা উচিত’। ডোমেনিখ মোসবার্গেন এটি লিখেছেন এ মাসের শুরুতে। তাঁর মন্তব্য পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো। 
হরতাল-অবরোধে এভাবেই যানবাহন ভাঙচুর চালানো হয় বাংলাদেশে। ছবি: প্রথম আলো
শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ফোনালাপের কথা বলা হয়েছে। শেখ হাসিনা ২০১৩ সালের ২৬ অক্টোবর খালেদা জিয়াকে ফোন করেছিলেন। ৩৭ মিনিটে তাঁদের ফোনালাপের বড় অংশজুড়েই ছিল পাল্টাপাল্টি আক্রমণ, ছিল উত্তেজনা। ফোনালাপের একটি অংশ ছিল এমন-
হাসিনা: আমরা ঝগড়া করতে চাই না।
খালেদা: আপনি তো ঝগড়াই করছেন।
হাসিনা: আপনি একাই একতরফা বলে যাচ্ছেন। আমাকে তো কথা বলারই সুযোগ দিচ্ছেন না।
খালেদা: আমি একতরফা বলব কেন। আপনি বলছেন আমি শুধু জবাব দিচ্ছি।
হাসিনা: আমি তো আপনার সঙ্গে কথা বলারই সুযোগ পাচ্ছি না।
দুই নেত্রীর ফোনালাপকে লেখক তাহমিমা আনাম নিউইয়র্ক টাইমসের এক নিবন্ধে ‘প্যারোডির মতো’ বা ‘ব্যাঙ্গরসাত্মকের মতো’ বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এক দৃষ্টিতে দেখলে এটাই বাংলাদেশের রাজনীতির আসল চিত্র যেখানে ‘হাসিনা-খালেদা’ একই বৃত্তে ঘোরপাক খাচ্ছে এবং একে অপরকে সরিয়ে ক্ষমতার মসনদে বসেন। ১৯৯১ সালের পর থেকে একবার শেখ হাসিনা এবং একবার খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। দায়িত্ব পালনে দুজনেরই বেশ কিছু সফলতা থাকলেও ‘ভোট কারচুপি’ করে ক্ষমতায় যাওয়া, দুর্নীতি এবং অদক্ষভাবে শাসন চালানোর অভিযোগও আছে তাঁদের বিরুদ্ধে। বিরোধী দলে থাকার সময় দুজনই দাবি আদায়ে হরতাল-অবরোধসহ সহিংসতার পথ বেছে নেন।
এ ব্যাপারে এ বছরের প্রথমের দিকে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে বেসরকারি সংস্থা সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার মন্তব্য করেন, শেখ হাসিনা (৬৭) ও খালেদা জিয়ার (৬৯) ‘স্বৈরাচারী আচরণের কারণেই বাংলাদেশ দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে। আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছে এবং সুশীল সমাজও বিভক্ত’।
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে হাসিনা ও খালেদার মধ্যেকার দ্বন্দ্বের অন্যতম কারণ জাতীয়তা উল্লেখ করে ডোমেনিখ মোসবার্গেন বলেন, শেখ হাসিনার সমর্থকেরা ধর্ম নিরপেক্ষ এবং খালেদার সমর্থকেরা ইসলামপন্থী।
এ বছরের জানুয়ারিতে বিএনপি জোটের ডাকা টানা অবরোধে বগুড়ার এক ব্যবসায়ীর আলুর ট্রাকে পেট্রলবোমা ছুড়ে মারে দুর্বৃত্তরা। এতে ওই ব্যবসায়ীর কয়েক লাখ টাকার ক্ষতি হয়। ছবি: প্রথম আলো
খালেদা জিয়ার বর্জনের পর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের জয়ী হয়। এ নির্বাচনের বর্ষপূর্তিতে বিএনপি জোটের আন্দোলন অবরোধে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে জ্বালাও পোড়াও এবং ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি চলে। দেশটির ইতিহাসে এমন ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি অতীতে আর দেখা যায়নি। খালেদা জিয়া ওই নির্বাচনকে ‘কলঙ্কজনক প্রহসন’ বলে অভিহিত করেছেন। এ বছরের প্রথম দিকে খালেদা জিয়া অবরোধের ডাক দিয়ে বলেন, নতুন নির্বাচনের ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। তবে তিনি সফল হননি। তিন মাসের ওই আন্দোলনে বোমা হামলা ও গাড়িতে আগুন দেওয়ার ফলে শতাধিক লোক পুড়ে নিহত হন। আহত হন শত শত। এ সময় বিরোধী দলের ১০ হাজারেরও বেশি নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। রাজনৈতিক অস্থিরতায় বাংলাদেশের অর্থনীতির ২২০ কোটি ডলার ক্ষতি হয়েছে এবং এই ক্ষতির পরিমাণ প্রবৃদ্ধির ১ শতাংশ বলে, মত বিশ্বব্যাংকের।
কানাডা ভিত্তিক একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা জন লাওটার ফেব্রুয়ারিতে হরতাল-অবরোধের সময় ঢাকায় ছিলেন। তিনি বলেন, ‘সরকারের পদত্যাগের পক্ষেই মত ছিল জনগণের এবং হরতাল-অবরোধের কারণে দৈনন্দিন জীবনে বিড়ম্বনায় পড়ে সাধারণ মানুষ।’ ঢাকায় বাস পোড়া দেখার কথা অভিজ্ঞতা কথা জানিয়ে লাওটার বলেন, ‘একদিন বিকেলের দিকে আমাদের অফিসের কাছেই জটলা কাটিয়ে গাড়ি নিয়ে পার হয়ে যাচ্ছিলাম, এমন সময় আগুনের শিখা দেখতে পেলাম। লক্ষ্য করলাম অনেকে খুব আগ্রহ নিয়ে তা দেখছে। আমরা দেখলাম একটি বাস জ্বলছে। সেখানকার লোকের কথোপকথন শুনে মনে হলো তাঁদের কাছে এটা নতুন কিছু নয়।’
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতায় অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এ ব্যাপারে দুই রাজনৈতিক দলের (আওয়ামী লীগ ও বিএনপি) বিরোধের কথা উল্লেখ করে যুক্তরাজ্যের হল বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক প্রকল্পের পরিচালক অধ্যাপক ভূমিত্র চাকমা বলেন, ‘এ জন্য দেশটি চরম মূল্য দিচ্ছে।’ রাজনৈতিক অস্থিরতায় অর্থনীতিতে প্রভাব পড়ছে ও রাজনৈতিক পরিবেশে ভেঙে পড়ছে। ইসলামি চরমপন্থীরা আবার দেশটিতে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। এ বছরের শুরুতে ‘ইসলামি মৌলবাদে’র বিরুদ্ধে লেখার কারণে তিন ব্লগারকে খুন হয়েছেন।
এ অবস্থার মধ্যেই সাগর পথে বিদেশে পাড়ি দিতে গিয়ে ধরা পড়ছে বাংলাদেশের মানুষ। মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশও ঘটছে। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত বড় হচ্ছে। শতকরা ৭০ জন লোক গ্রামে থাকেন এবং এক-তৃতীয়াংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করেন। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। বলা হচ্ছে, এ কারণে ২০৫০ সালে দেশটির প্রায় ১৭ শতাংশ এলাকা ডুবে যাবে এবং এক কোটি ৮০ লাখ লোক বসতি হারাবে। এর সঙ্গে পোশাক খাতের উন্নতির কারিগর পোশাক শ্রমিকেরা বিশেষ করে নারী কর্মী নিপীড়নের ঘটনাও ঘটছে। দুর্নীতিও বাড়ছে নিম্ন মধ্য আয়ের দেশটিতে।
বাংলাদেশ থেকে কাজের খোঁজে বিদেশে যাওয়ার হারটাও বেশি। ভাগ্যান্বেষণে প্রতি বছর ৫ লাখ লোক বৈধ পথে বিদেশে যায়। বিদেশে পাড়ি দেওয়া বাংলাদেশিরা অদক্ষ এবং আধা দক্ষ হিসেবে কাজ করতে যায়। বিদেশে যাওয়া শ্রমিকেরা অধিকাংশই অস্থায়ী ভিত্তিতে মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে যায়। বিশ্বব্যাংকের মতে, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে বাংলাদেশ বিশ্বের অষ্টম দেশ। এ ব্যাপারে ভূমিত্র চাকমা বলেন, ‘নানা কারণে বৈধ পথে বিদেশ পাড়ি দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। রাজনৈতিক সহিংসতা, সুশাসনের অভাব, পরিবেশের ভারসাম্য কমে আসা এবং অর্থনৈতিক সুযোগ কমায় মানুষের জীবনযাপনের সক্ষমতা কমছে।’ 
সাগর পথে বিদেশ পাড়ি দিতে গিয়েই এরা আটক হন। ছবি: প্রথম আলো
বাংলাদেশের জনশক্তি, কর্মসংস্থান এবং প্রশিক্ষণ বুর‍্যো (বিএমইটি) বলছে, বর্তমানে ৮০ লাখ প্রবাসী বিদেশি কর্মরত আছে। তবে সরকারের দেখানো এ সংখ্যা আসল সংখ্যার চেয়ে অনেক কম। প্রবাসে কত লোক অবৈধভাবে আছে এর সঠিক কোনো তথ্য নেই। ধারণা করা হয় ১ থেকে দেড় কোটি লোক শুধু ভারতেই অবৈধভাবে আছেন।
যথোপযুক্ত, সম্মানজনক ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা না পেয়ে অনেকে প্রবাসে যাচ্ছেন উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক বিভাগের অধ্যাপক আমেনা মহসিন হাফিংটন পোস্টকে বলেন, ‘অনুন্নয়ন, দারিদ্র্য ও উন্নত জীবনের হাতছানির কারণে অবৈধভাবে হলেও অনেকে বাইরে যাচ্ছে।’
এই প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বাংলাদেশকে এড়িয়ে চলে। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের লোকেরা অবৈধভাবে সাগর পথে বিদেশ পাড়ি দেওয়ার আগ পর্যন্ত বিশ্ব মিডিয়ায় বাংলাদেশ নিয়ে খুব একটা তোড়জোড় ছিল না। ছোট ছোট নৌকায় খাবার ও পানি ছাড়া সাগরে ভাসতে থাকা দুই দেশের লোকদের কোনো কোনো দেশ আশ্রয় না দেওয়ায় সমালোচনার মুখে পড়ে ওই দেশগুলো। এই ঘটনাকে ‘পিং পং’ (ছোট টেবিলে দু পাশ থেকে বল পেটানো) গেমের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
অনাহারে দীর্ঘদিন ধরে সাগরে অমানবিক কষ্টে কাটানো নারী-পুরুষদের খবর বিশ্ব মিডিয়ার প্রচারের পরই আলোচনায় আসে বাংলাদেশ। সাগরে ভাসতে ভাসতে নৌকা ডুবির ঘটনায় বেঁচে যাওয়া ১৯ বছর বয়সী বাংলাদেশি সাইদুল ইসলামের ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে দ্যা গার্ডিয়ান পত্রিকায়। সেখানে সাইদুল বলেন, ‘একটি নৌকায় ৭০০ জন ছিলাম, দাঁড়ানোর জায়গা ছিল না। খাবার চাওয়া হলে নৌকার ক্যাপটেন আঘাত করেছে।’ ওই নৌকার বেচেঁ যাওয়া অপর যাত্রী আমিন বলেন, খাবার চাওয়ায় একজনকে গুলি করা হয়েছে।
জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার হিসেবে বঙ্গোপসাগর দিয়ে বছরের প্রথম তিন মাসে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে প্রায় ২৫ হাজার লোক পাচার হয়। গত বছরের এ সময়ের চেয়ে এ সংখ্যা দ্বিগুণ। মানব পাচার নিয়ে কাজ করা মানবাধিকার কর্মী চেরিস লেওয়া-ই প্রথম বাংলাদেশের মানব পাচারের খবর বিশ্বের দৃষ্টিতে আনেন। তিনি বলেন, এ সময় পাচার হওয়া অধিকাংশই বাংলাদেশের। অভিবাসী নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর তথ্য মতে, ২০১৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৫ সালের মে পর্যন্ত অন্তত এক হাজার লোক মারা গেছে। একসঙ্গে এত লোকের সাগরে পাড়ি দেওয়া ঠেকাতে বাংলাদেশ সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। মানব পাচারকারীরা এ কাজ সহজেই করতে পারছে, কারণ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কিছু লোক এ দুষ্কর্মে সহযোগিতা করছেন এবং সরকারি কিছু কর্মকর্তার দুর্নীতিও এ কাজে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
ভূমিত্র চাকমা বলেন, ‘অবৈধভাবে বিদেশ পাড়ি দেওয়া ঠেকাতে বাংলাদেশ সরকারকে প্রনোদনামুলক নানা কর্মসূচি হাতে নিতে হবে।’ দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি বিরাজ করলেই কেবল তা সম্ভব বলে ইঙ্গিত তাঁর।
দুই নারী (হাসিনা-খালেদা) এবং তাঁদের দলের মধ্যে সমস্যা সেই একই, অর্থাৎ সাধারণ ‘শত্রুতা’ বিদ্যমান-এ মন্তব্য বাংলাদেশ নিয়ে কাজ করা লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের অধ্যাপক ডেভিড লুইজের। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দল দুটো গণতান্ত্রিক না হলে এ অবস্থার কোনো পরিবর্তন হবে না। কিন্তু আশার কথা হচ্ছে অতীতে এই দুই দল গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধারে একসঙ্গে কাজ করেছে। ২০০৮ সালেও এই দুই নেত্রী একত্রে গণতন্ত্রের জন্য সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে চাপে রেখেছিল। এখন মনে হচ্ছে দুই নেত্রীর আবার গণতন্ত্রের জন্য এক জায়গায় আসা দরকার।

ঢাকায় পাঁচ বছরে মোটরযান বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ by মোছাব্বের হোসেন

ঢাকায় গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে দিন দিন।
সৃষ্টি হচ্ছে ভয়াবহ যানজট। ছবিটি হোটেল
রূপসী বাংলা মোড় থেকে তোলা l প্রথম আলো
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুসারে গত পাঁচ বছরে রাজধানীতে মোটরযান বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। ২০০৯ পর্যন্ত রাজধানীতে মোটরযানের সংখ্যা ছিল পাঁচ লাখের বেশি আর চলতি বছরের জুন পর্যন্ত এই সংখ্যা হয়েছে প্রায় নয় লাখ। বিআরটিএ সূত্র জানায়, নিবন্ধিত যানবাহনের বাইরে আরও কয়েক লাখ যানবাহন ঢাকায় চলাচল করছে। এর বেশির ভাগই মোটরসাইকেল ও স্থানীয়ভাবে নির্মিত হিউম্যানহলার বা লেগুনা।
বিআরটিএ ২০ ধরনের যানবাহনের হিসাব সংরক্ষণ করে। এর মধ্যে কার, স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিক্যাল-এসইউভি (জিপ নামে পরিচিত) ও মাইক্রোবাসকে ব্যক্তিগত ব্যবহারের গাড়ি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর বাস-ট্রাকসহ অন্য সব যানবাহন বাণিজ্যিক যানের আওতাভুক্ত।
বিআরটিএ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীতে শুধু তিন লাখ গাড়ি চলাচলের ব্যবস্থা রয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ গাড়ি পার্কিং ও চলাচলের পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় ঢাকার যানজট দিনে দিনে বাড়ছে।
বিআরটিএ সূত্র থেকে জানা গেছে, ২০০৯ সাল পর্যন্ত নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ছিল, ৫ লাখ ১৬ হাজার ৯১২টি। ২০১০ সালে ৭৬ হাজার ১৬৫টি গাড়ি নিবন্ধিত হয়েছে। ২০১১ সালে নিবন্ধিত হয় ৭২ হাজার ৯৪৭, ২০১২ সালে ৫৯ হাজার ৫৭৩, ২০১৩ সালে ৫৪ হাজার ৪৯২, ২০১৪ সালে ৭৩ হাজার ৫১ এবং সর্বশেষ চলতি বছরের জুন পর্যন্ত নিবন্ধিত হয়েছে ৪৩ হাজার ৫৩টি গাড়ি। সর্বমোট নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৯৬ হাজার ১৯৩টি।
বিআরটিএ সূত্র জানায়, রাজধানীতে মোটরসাইকেলের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৩২৪টি। এরপর বেশি নিবন্ধিত হয়েছে ব্যক্তিগত গাড়ি, যার সংখ্যা ২ লাখ ১৩ হাজার ৪৮৯টি।
শহরের যানজট প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পরিবহন বিশেষজ্ঞ শামসুল হক বলেন, রাজধানীতে বিআরটিএ যেভাবে গাড়ির নিবন্ধন দিয়েই যাচ্ছে তা অবৈজ্ঞানিক। ঢাকায় যত গাড়ি চলছে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এর মাধ্যমে চাহিদা ও জোগানের মধ্যে কোনো সমন্বয় থাকছে না তাই যানজট বাড়ছেই। লোকজন ব্যক্তিগত গাড়ির দিকে তখনই ছুটছেন, যখন তাঁরা গণপরিবহনের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলছেন। গণপরিবহন উন্নত হলে ব্যক্তিগত গাড়ির এত চাহিদা থাকত না। এতে যানজট কিছুটা হলেও কমে যেত। এই পরিবহন বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, এমন পরিস্থিতি থেকে একদিনে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। এর জন্য কর্মপরিকল্পনা ঠিক করতে হবে। বছরে কী পরিমাণ জোগান আছে সে অনুসারে গাড়ির নিবন্ধন করাতে হবে। যানবাহনের ঢালাও নিবন্ধন করতে দেওয়া যাবে না। গণপরিবহনের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। সড়কে চলতে লোকজন যখন বিকল্প গণপরিবহন বা অন্যান্য যানবাহন পাবেন, তখন গাড়ি কিনতে নিরুৎসাহিত হবেন।
এ সম্পর্কে বিআরটিএর প্রকৌশল বিভাগের উপপরিচালক সিতাংশু শেখর বিশ্বাস বলেন, একটি শহরে যেখানে যানবাহনের চলাচল ও ব্যবস্থাপনার জন্য ২০ থেকে ২৫ শতাংশ সড়ক দরকার সেখানে ঢাকায় আছে মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশ। ফলে যানজট হবে এটাই স্বাভাবিক। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা না থাকায় লোকজন সড়কের ওপরই গাড়ি রাখছেন, যা যানজট বেড়ে যাওয়ার বড় একটি কারণ।

‘চোখ তুইল্যা ফালানের কথা শুইন্যা কি আর দুনিয়ায় আছি!’ by মানসুরা হোসাইন

উপড়ে ফেলা চোখে ব্যান্ডেজ নিয়ে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে একটু পর পর ব্যথায় কোঁকাচ্ছিলেন সুখী। আর ব্যান্ডেজের নিচে দিয়ে গড়িয়ে পড়া কষ জাতীয় কিছু মুছতে চাচ্ছিলেন। আরেক চোখের দুই পাতা একসঙ্গে লাগানো। তবে পুরোটাতেই কালচে দাগ আর ফোলা।
বিছানার পাশে বসা সুখীর মা লায়লা বেগম বললেন, ‘আমার মাইয়্যার হাত পা বানছে। একজন বুকের ওপর বসছে। চোখে লাইট ধরছে একজন। তারপর টেস্টার দিয়া আমার মাইয়্যার এক চোখ উপড়াইয়্যা তুইল্যা ফালাইছে। আরেক চোখ আছে কি না জানি না।’
তার পাশেই সুখীর বাবা নূর মোহাম্মদ বিলাপ করে বললেন, ‘আমার ম্যায়ার (মেয়ে) চিকিৎসার জন্য পাঁচ হাজার টাকা ভাংমু তাও সামর্থ্য নাই। আমার চারটা ম্যায়া। এক পোলা। তাদের আমি উল্টা হাত দিয়াও কোনো দিন থাপড় দেই নাই। জানে খাইট্যা আমি মানুষ করছি। আমি এর সুষ্টু (সুষ্ঠু) বিচার চাই।’
আজ রোববার বিকেলে রাজধানীর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পঞ্চম তলায় ফিমেল ওয়ার্ড (১) এ এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন সুখীর বাবা ও মা।
এক যুগ আগে বিয়ে হয়েছে সুখী আক্তারের (২৪)। যৌতুকের জন্য ঈদের আগের দিন শুক্রবার সাভারের জিঞ্জিরা এলাকায় এক ভাড়া বাসায় স্বামী, দেবর, ভাসুর ও ননদ মিলে সুখীর হাত-পা বেঁধে ইলেকট্রিক টেস্টার দিয়ে এ ঘটনা ঘটিয়েছে বলে জানালেন সুখীর বাবা মা। ঘটনার পর সুখীর চিৎকারে বাড়িওয়ালার সহায়তায় এলাকাবাসী তাঁকে উদ্ধার করে এই হাসপাতালে ভর্তি করান। আর সুখীর স্বামী রবিউলকে তুলে দেন সাভার থানা-পুলিশের হাতে।
সুখীর বাবা ঈদের দিন মেয়ের স্বামীসহ তিনজনকে আসামি করে মামলা করেছেন। এখন রবিউল জেলে। সেদিন আসলে কী ঘটনা ঘটেছিল এখন পর্যন্ত তা জানার সুযোগ পাচ্ছেন না সুখীর বাবা-মা। সুখীর কাছে কোনো কিছু জানতে চাইলেই তাঁর যে চোখের দুই পাতা একসঙ্গে লেগে আছে সেখানে শুধু কান্নার পানি জমে। তাই তাঁকে কেউ এ ঘটনা জানার জন্য জোর করছেন না।
সাভার থানা-পুলিশের এক সদস্য ফোন করে সুখীর মাকে ঘটনার কথা জানান। তারপর থেকে পুরো পরিবারের দিশেহারা অবস্থা। তাঁদের ঈদ কেটেছে হাসপাতালে। সুখীর সাত বছর বয়সী মেয়েকেও সুখীর শ্বশুরবাড়ির লোকজন আটকে রেখেছে। সুখীর শ্বশুরবাড়ি ঢাকার সিঙ্গাইর থানায়। আর সুখীর বাবার বাড়ি নবাবগঞ্জ থানায়।
জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক জালাল আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘সুখীর ডান চোখ একেবারে তুলে ফেলা হয়েছে। সুখীকে যাঁরা হাসপাতালে ভর্তি করাতে এসেছিলেন তাঁরা তুলে ফেলা চোখটি সঙ্গে করে এনেছিলেন। তাঁরা ভেবেছিলেন চিকিৎসকেরা যদি তা আবার লাগাতে পারেন। আসলে তা করা সম্ভব না। আর সুখীর বাম চোখেও প্রচণ্ড আঘাত করা হয়েছে। তবে আই বল আছে। চোখের নার্ভের ফাংশন খুব দুর্বল। লাইট ধরলে সে তা দেখতে পাচ্ছে না বলছে। তবে আমাদের বিভিন্ন বিভাগের চিকিৎসকেরা বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করে বলছেন, এ চোখ দিয়ে কিছুটা দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। দেখতে পাবেই তা বলা যাচ্ছে না। কাল সোমবার হাসপাতালের মেশিন দিয়ে সুখীর ব্রেন ও চোখে সিটিস্ক্যান করা হবে।’
হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক জালাল আহমেদের আজ ছিল ঈদের ছুটি। তবে এই ঘটনা শুনে হাসপাতালের অন্যান্য বিভাগের সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের নিয়ে দুপুরে তিনি সুখীকে দেখতে আসেন।
অধ্যাপক জালাল আহমেদ বলেন, ‘চিকিৎসক জীবনে ডাকাত, এলাকাবাসীর সঙ্গে শত্রুতাসহ বিভিন্ন কারণে চোখ উপড়ে ফেলা রোগী পেয়েছি। তবে স্বামী ও অন্যরা মিলে ইলেকট্রিক টেস্টার দিয়ে এভাবে চোখ উপড়ে ফেলেছে তা দেখিনি। সুখীকে দেখার পর থেকে মনে হচ্ছে, মানুষ এত অমানুষ হয় কীভাবে? সুখীর চোখের জন্য তিনটি ইনজেকশন লাগবে। একেকটির দাম এক হাজার টাকার বেশি। হাসপাতালে এ ইনজেকশনের সাপ্লাই নাই। পরিবারটির অসহায় অবস্থা দেখে আমি আমার নিজের পকেট থেকে আজ একটি ইনজেকশন কেনার দাম দিয়েছি। আর দুইটির দাম জোগাড় করতে না পারলে হাসপাতালের সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে তা জোগাড় করার চেষ্টা করব। চোখের সামনে এত কম বয়সী মেয়ের কষ্ট, যন্ত্রণা সহ্য করা যাচ্ছে না। মেয়েটা কথা খুব কম বলছে। ঘটনা কী কারণে ঘটেছে তা স্পষ্ট করে জানা যায়নি। তবে যে কারণেই ঘটুক, স্বামী ও অন্যরা মিলে এভাবে আঘাত করতে পারে তা না দেখলে বোঝা যেত না।’
চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের আনসার কমান্ডার আবুল কাশেম সুখীকে হাসপাতালে আনার পর প্রথম দেখার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘দুই চোখ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল। কাগজে করে উপড়াইয়্যা ফেলা চোখ আমরা অনেকেই দেখছি। অনেকে মোবাইলে ছবিও তুলছে। শুধু পশুর বেলাতেই সম্ভব অন্যকে এইভাবে হামলা করা।’
সুখীর মা জানালেন, মাত্র মাস খানেক আগে মেয়ের স্বামী বিদেশ থেকে ফিরেছে। এর আগেও একবার বিদেশ গিয়েছিল। সুখীর বাবা-মা একবার তিন লাখ টাকা দেন বিদেশ যাওয়ার সময়। এবার বিদেশ থেকে একেবারে চলে এসেছে বলে জানায় মেয়ের স্বামী। আসার পর আবার স্ত্রীর কাছে দেড় লাখ টাকা দাবি করে। মেয়ে বেশির ভাগ সময় বাবার বাড়িতেই থাকত। এর আগেও মেয়েকে মারধর, ঘরে বন্দী করে রাখা, খাবার না দেওয়াসহ বিভিন্ন কারণে বিচার-সালিস হয়েছে। সুখীর বাবা-মা অনেক বার সিদ্ধান্তও নিয়েছেন মেয়েকে আর শ্বশুরবাড়ি পাঠাবেন না। এবার মেয়ের স্বামী বিদেশ থেকে আসার পর সাত দিনের মাথায় মারধরের ঘটনায় মেয়েকে নিয়ে আসেন বাবা-মা। তবে মেয়ে নিজের মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে বাবা-মা কাউকে কিছু না বলে স্বামীর কাছে চলে যায়। সাভারের কোথায় বাসা ভাড়া নিয়েছিল বা কেনো নিয়েছিল তার কিছুই জানেন না তাঁরা।
সুখীর মা জানালেন, ঘটনার দিনদুপুর ১২টার দিকে সুখীর স্বামীর মুঠোফোনে ফোন দেন মেয়ে ও মেয়ের জামাইকে ঈদের দাওয়াত দেওয়ার জন্য। মেয়ের স্বামী ভালো ভাবে কথাও বলে। তবে বেশ কয়েক দিন ধরে মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে চাইলেও নানা অজুহাতে কথা বলতে দিত না। সেদিনও বলে সুখী ঘুমাচ্ছে। নাতির সঙ্গে কথা বলতে চাইলেও বলে ও দোকানে গেছে। তারপর সেই দিনই এ ঘটনা ঘটায়।
সুখীর বাবা গৃহস্থালির কাজ করেন। জমিজমা নেই তেমন একটা। সুখীর মা বলেন, ‘কয়দিন ধইরাই খালি বুকের মধ্যে কেমন জানি করতাছিল। আপনজন মরলে যেমন লাগে তেমন লাগে। হুদাহুদি কান্না আহে। আজেবাজে স্বপ্ন দেহি। তারপর পুলিশের ফোনে চোখ তুইল্যা ফালানের কথা শুইন্যা কি আর দুনিয়ায় আছি! কাটা মুরগি যেমুন ছটফট করে আমি খালি ছটফট করছি।’
সাভার থানার সাব ইন্সপেক্টর সুখীর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শাহেদ আলী টেলিফোনে প্রথম আলোকে বলেন, যৌতুক মামলার আসামি সুখীর স্বামী এখন জেলখানায়। অন্য দুই আসামি এখনো ধরা পড়েনি।
সুখী অনেক বেশি অসুস্থ এবং মানসিক ভাবে ট্রমার মধ্যে থাকায় প্রথম আলোর পক্ষ থেকে সুখীকে কথা বলার জন্য জোর করা হয়নি। প্রতিবেদক চলে আসার সময় সুখীর বাবা আবার বললেন, ‘আমার এতটুকুন বয়স হইছে, কোনোদিন এই ধরনের ঘটনা দেহি নাই। আমি সরকারের কাছে আর কিছু চাই না, খালি সুষ্টু বিচার চাই।’

বইপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী ও রওশনের পরামর্শ by আনিসুল হক

এমন কাজ কোরো না কেউ বলে, ‘ছোট’, এমন চেয়ারে বোসো না কেউ বলে, ‘ওঠো’। আমি এই উপদেশটা মেনে চলার চেষ্টা করি। এমন চেয়ারে বোসো না কেউ বলে ‘ওঠো’—খুব একটা বাস্তব উপদেশ। বড় কোনো অনুষ্ঠানে, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান হলে তো কথাই নেই, আমি বসি মাঝামাঝি আসনেরও একটু পেছনে। ওখানে নিজের মুখ লুকিয়ে রাখা যায়, দরকার হলে অনুষ্ঠানস্থল থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসা যায়। সবচেয়ে বড় কথা, কেউ এসে বলে না, আপনি কি কাইন্ডলি একটু উঠবেন, আমাদের সিনিয়র অতিথিরা এসেছেন তো, তাঁদের জায়গা দিতে পারছি না।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমন্ত্রণপত্র এল, ৮ জুলাই ২০১৫ গণভবনে ইফতার অনুষ্ঠান। একটা না, দুটো আমন্ত্রণপত্র পেলাম। আরেকটা বিষয় আমি শিখেছি কবি শামসুর রাহমানের কাছ থেকে, তিনি বলেছিলেন, দেশের প্রধান বা সরকারের প্রধান আমন্ত্রণ জানালে সেটাকে সম্মান করতে হয়। আর তো আছেনই আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আছে তাঁর ‘পুরস্কার’ কবিতাটি। যেখানে একজন কবি তাঁর স্ত্রীর অনুরোধে চলেছেন রাজদরবারে, রাজার সঙ্গে দেখা করতে।
স্ত্রী বলেছেন,
‘আমাদের রাজা গুণীর পালক,
মানুষ হইয়া গেল কত লোক,
ঘরে তুমি জমা করিলে শোলোক
লাগিবে কিসের কাজে!’
আর কবির কী হলো?
‘কবির মাথায় ভাঙি পড়ে বাজ,
ভাবিল—বিপদ দেখিতেছি আজ,
কখনো জানি নে রাজা মহারাজ,
কপালে কী জানি আছে!’
প্রধানমন্ত্রী কিংবা রাষ্ট্রপতির অনুষ্ঠানে যাওয়া বেশ কঠিন। অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছাতে হয় এক ঘণ্টা আগে, সঙ্গে মোবাইল ফোন নেওয়া যায় না। বছর দু-এক আগে একবার গণভবন থেকে বেরিয়ে বিপদে পড়েছিলাম, গাড়ি বাইরে দূরে কোথাও, সঙ্গে মোবাইল ফোন নেই, এর মধ্যে শুরু হলো বৃষ্টি, উল্টো দিকের দোকানে আশ্রয় নিলাম, কিন্তু কারও কাছ থেকে ফোন ধার নিয়ে যে ড্রাইভারকে কল করব, তারও উপায় নেই। কারণ, ড্রাইভারের নম্বর মুখস্থ রাখিনি।
এবার নিজের গাড়ি নিইনি, আমাদের সহকর্মী আব্দুল কাইয়ুম ভাইয়ের গাড়িতে যেচে উঠে পড়লাম। মোবাইল ফোন তাঁর গাড়িতেই রেখে বেশ খানিকটা দূরে গাড়ি ছেড়ে দিয়ে হেঁটে চললাম রাজার বাড়ির দাওয়াতে। হাঁটার কারণ দুটো, স্বাস্থ্য ভালো থাকবে, দুই. গাড়িওয়ালাদের চেয়ে আধঘণ্টা আগে পৌঁছাতে পারব। আগের দিনেই খবরের কাগজে পড়েছি, বিরোধীদলীয় নেত্রী রওশন এরশাদ গণভবনের সামনে যানজটের কারণে প্রধানমন্ত্রীর ইফতার পার্টিতে ঢুকতে পারেননি। পরে জাতীয় সংসদে এই বিষয়ে তাঁর বক্তব্যও শুনেছি। তিনি বললেন, আমার গাড়ির সামনে আরও ৫০টা গাড়ি ছিল, ততক্ষণে আজান দেওয়া শুরু হয়ে গেছে, তারাবির নামাজের সময়ও ঢুকতে পারতাম কি না সন্দেহ। রওশন এরশাদ প্রধানমন্ত্রীকে আহ্বান জানিয়েছেন বোরকা পরে বেরিয়ে সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট প্রত্যক্ষÿ করতে।
রওশন এরশাদ কথাটা ভালো বলেছেন। আমাদের ভিআইপিদের উচিত, সাধারণের দুঃখ স্বচক্ষে দেখা, অনুধাবন করা, তাহলে তাঁরা হয়তো বাস্তব কিছু পদক্ষেপ নিতে পারবেন। এর জবাবে জাতীয় সংসদেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যা বলেছেন, সে-কথা রসিকতা হলেও সত্য! কৌতুকপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এরশাদ সাহেব আলাদা গাড়িতে আসতে পেরেছেন, তাঁরা দুজনে এক গাড়িতে এলে যানজট কিছুটা কম হতো। এই প্রসঙ্গে আমি সপ্তাহ দু-এক আগে আমার এই কলামে লিখেওছি, ‘পৃথিবীর একটা বসবাস অযোগ্য শহর থেকে বলছি’ শীর্ষক কলামে। আমাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে। মানুষ মধ্যবিত্ত হচ্ছে। আর আমাদের গণপরিবহন নেই। কাজেই টাকা হলেই আমরা গাড়ি কিনে ফেলব। আমাদের শহরে রাস্তার পরিমাণ প্রয়োজনের তিন ভাগের এক ভাগ। কিন্তু রাস্তার পরিমাণ বাড়ানো হলেও যানজট কমবে না, কারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, গাড়ির পরিমাণ রাস্তার ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি হবেই। কাজেই রাস্তার পরিমাণ যতই বাড়াই না কেন, যানজট থেকে আমাদের মুক্তি নেই। নিউইয়র্কে যানজট আছে, সানফ্রান্সিসকোতে যানজট আছে—এই সমস্যার সমাধান হলো, রেলওয়ে এবং নৌপরিবহন। আমাদের আকাশ-রেল লাগবে, পাতাল-রেল লাগবে, ভূমি-রেল লাগবে, ঐতিহ্যবাহী নৌপরিবহনব্যবস্থার ওপর জোর দিতে হবে, হাঁটার জন্য ফুটপাত লাগবে এবং সেসব করার জন্য লাগবে মাস্টারপ্ল্যান। আশা করি, সরকার এই বিষয়ে প্রণীত আগের মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে বসবে এবং এটাকে যুগোপযোগী করে নতুন মহা কর্মযজ্ঞে নামবে। প্রতিটা সমস্যারই কারিগরি সমাধান আছে, কিন্তু তার জন্য দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। আমরা নিম্ন মধ্য-আয়ের দেশ হয়েই গেছি, টাকা এই দেশে সমস্যা নয়। পরিকল্পনার অভাব, দক্ষতার অভাব এবং সততার অভাব আমাদের সমস্যা। স্বপ্নবান উদ্যোগী নেতৃত্ব এই অভাবকে পরাজিত করতে পারবে।
তো বেগম রওশন এরশাদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আব্দুল কাইয়ুম ভাই আর আমি বৈকালিক হণ্টনের মাধ্যমে গণভবনে প্রবেশ করলাম। বিশাল আয়োজন। কয়েক হাজার মানুষের বসার ব্যবস্থা। সাংবাদিকদের জন্য মাঝামাঝি একটা সারি। আমরা সাংবাদিক সারির মধ্যভাগে একটা নিরাপদ টেবিলে বসে পড়লাম। যাতে মুখটা লুকিয়ে রাখা যায়, কেউ এসে যেন বলতে না পারে, ‘ওঠো’।
আমার নিজের আরেকটা সমস্যা আছে। অতি অল্প বয়সে চুল পেকে গেছে। বয়সের তুলনায় ঢের বুড়ো দেখায়। আর যেহেতু গণমাধ্যমে কাজ করি, নাটক-সিনেমাও অল্প-বিস্তর লিখেছি, টেলিভিশনে দু-চারটা অনুষ্ঠানে চেহারা দেখানোর সুযোগও হয়েছে, লোকজন আমাকে একটু বেশিই সমাদর করেন, যা আমার ঠিক প্রাপ্য নয়। কেউ না কেউ এসে বলবেনই, আপনি সামনে চলেন। আমি সাধারণত এই ফাঁদে পা দিই না, দুটো কারণে। এক. আমার আশপাশেই অনেক গুণী প্রবীণ মানুষ আছেন, যাঁরা প্রচারবিমুখ, কিন্তু সমাজে যাঁদের অবদান অসামান্য, আমি তাঁদের রেখে সামনে যেতে পারি না। আর দ্বিতীয়টা হলো, যিনি ডেকে নিচ্ছেন, তিনি আমাকে ভালোবাসেন বলে নিচ্ছেন, এরপরে যখন ভিআইপিরা এসে যাবেন, তখন আরেকজন ভালোবেসেই বলবেন, আপনি কি কাইন্ডলি একটু আসনটা ছাড়বেন!
আমরা—লেখক সাংবাদিক শাহনাজ মুন্নী, কবি সরকার আমিন, সাইমন জাকারিয়া, ওবায়েদ আকাশ, দুজন প্রকাশক ও আব্দুল কাইয়ুম—মধ্যখানের নিরাপদ টেবিলে বসে রইলাম। কিন্তু দিনটা ছিল রবীন্দ্রনাথের ‘পুরস্কার’ কবিতাটারই যেন একটা ক্ষুদ্র সংস্করণ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উঠে বিভিন্ন সারিতে যাবেন, হাঁটবেন, কথা বলবেন, কুশল জিজ্ঞাসা করবেন—এই গুণ যে তাঁর আছে, সেটা আমরা জানি। তাঁর সঙ্গে টুরে যান যে-সাংবাদিকেরা, তাঁরা বলেন। তাঁর বাসভবনে যাঁরা গেছেন, তাঁদের প্রায় সবাই তাঁর আন্তরিকতায় ও বাঙালি আতিথেয়তার গুণে মুগ্ধ হয়ে ফেরেন। এই গুণ নিশ্চয়ই তিনি পেয়েছেন তাঁর মহান পিতার কাছ থেকে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত অনেক স্মৃতিকথায় আমরা এটা পড়েছি। বাইরে কোনো সভায় ও সম্মেলনে গেলে বঙ্গবন্ধু, তখনো তিনি সরকারপ্রধান হয়েছেন কি হননি, নিজে খাওয়ার আগে প্রথমে খোঁজ নিতেন সঙ্গের সাংবাদিকেরা ও অন্য অতিথিরা খেয়েছেন কি না।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন টেবিলের মধ্যবর্তী সারি দিয়ে হাঁটবেন, এটা জানা কথা। এবং এই সময় আমাদের মতো দর্শনপ্রার্থীরা তাঁর কাছাকাছি হওয়ার জন্য, তাঁর সঙ্গে একটা ছবি তোলার জন্য একটু ভদ্রস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হব, তাতে কনুই দুটোরও ভূমিকা থাকবে, তাও জানি।
তিনি আমাদের সারির দিকে আসছেন। আমরা সবাই দাঁড়িয়ে পড়লাম। ফটোগ্রাফাররা আগে আগে উল্টো মুখে হাঁটছেন। নিরাপত্তা কর্তারা ভদ্রতা বজায় রেখেই আমাদের পেছনে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। নিজের মুখ লুকিয়ে রাখা গেল না। একে তো ফটোগ্রাফাররা অনেকেই বন্ধু মানুষ, তার মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মাহবুবুল হক শাকিল আমাকে পেছনের সারি থেকে টেনে সামনে নিয়ে এলেন। প্রধানমন্ত্রীকে বললেন, ‘এই যে আনিসুল হক, যারা ভোর এনেছিল বইয়ের লেখক।’
প্রধানমন্ত্রীর হাসিমুখ প্রসন্নতর হয়ে উঠল। তিনি বললেন, ও আপনি লিখেছেন, এত সুন্দর হয়েছে বইটা! আমি বললাম, ‘থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ’। সঙ্গে সঙ্গে প্রস্তাবটা পেড়ে ফেললাম, ‘শাকিল ভাইকে বলেছি, আপনার সঙ্গে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট যেন করে দেন, আমার বইয়ের পরের খণ্ড লেখার জন্য বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে আপনার কাছ থেকে কিছু কথা শুনতে চাই।’ তিনি বললেন, ঠিক আছে, কথা বলা যাবে একদিন। আমি সঙ্গে সঙ্গে শাকিল ভাইকে বললাম, ‘শাকিল ভাই, ব্যবস্থা করে দেবেন।’
এটা আমাদের কাছে আরেক বিস্ময়—প্রধানমন্ত্রী সাহিত্য পাঠ করেন। নিয়মিত বই পড়েন। সার্ক সাহিত্য সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ঢাকায় জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনের অনুষ্ঠানে তিনি হরিশংকর জলদাসের লেখা দহনকাল বইটা নিয়ে কথা প্রসঙ্গে লিখিত বক্তৃতার বাইরে বেশ খানিকটা আলোচনা করলেন—নিম্নবর্গের মানুষের জীবন সম্পর্কে সাহিত্য কীভাবে আমাদের ধারণা দেয়, তা বললেন। শেখ হাসিনার স্মৃতিশক্তিও অসাধারণ, তাও তিনি নিশ্চয়ই পেয়েছেন জেনেটিক্যালি, তাঁর পিতার কাছ থেকে। বই আমরা অনেকেই হয়তো পড়ি, কিন্তু মনে রাখতে পারি না। আমাদের প্রধানমন্ত্রী পারেন। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে দিল্লি-আগ্রা ভ্রমণের কুড়ি বছর পরের স্মৃতিচারণায় তাজমহলের যে অপরূপ বর্ণনা আছে, যে ডিটেইল আছে, কোনো কাগজ না দেখে ইন্টারনেটের সাহায্য ছাড়া তা লেখার কথা আমি কল্পনাও করতে পারি না।
প্রধানমন্ত্রীর দিনরাত্রি অবসরবিহীন। একটা মুহূর্তও কি তাঁর আছে, যখন তিনি থাকতে পারবেন ভারহীন আর ভাবনাহীন? এর মধ্যে তিনি কী করে তাঁর নাতি-নাতনিদের সময় দেন, কীভাবে রান্নাঘরে গিয়ে প্রিয়জনের জন্য রাঁধেন, আবার একেবারে সমসাময়িক লেখকের লেখা বই পড়েন? সেই বই মনে রাখেন, বক্তৃতায় তা নিয়ে কথা পাড়েন, হাজার হাজার মানুষের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে একজন লেখকের সঙ্গে দেখা হলে তাঁর বই নিয়ে আলোচনা করেন?
সংসদে বেগম রওশন এরশাদের পরামর্শ খুবই দরকারি, প্রধানমন্ত্রী বা ভিআইপিদের উচিত সাধারণের বেশে সাধারণের জীবন দেখতে যাওয়া। কিন্তু আরেকটা উপায় আছে, সাধারণ মানুষের জীবন আর মনের সুখ-দুঃখ, স্বপ্ন-আশার কথা জানার। তা হলো, পড়া। সাহিত্য পাঠ এবং সংবাদপত্র পাঠ। সংবাদপত্র পড়া খুব জরুরি, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসন (১৭৪৩-১৮২৬) তো বহু আগে বলে দিয়েছেন, সংবাদপত্রহীন সরকার আর সরকারবিহীন সংবাদপত্রের মধ্যে যেকোনো একটা বেছে নিতে হলে তিনি সরকারবিহীন সংবাদপত্রই বেছে নেবেন। তাঁর সঙ্গে যদি সাহিত্য পাঠ করা যায়, তাহলে তো সোনায় সোহাগা। কারণ, সংবাদপত্রে পাওয়া যায় মানুষের বাহ্যিক কথা আর কাজের খবর, কিন্তু সাহিত্য দেয় মানুষের মনের গহিনের খবর, সাংবাদিকের যেখানে প্রবেশ নিষেধ।
‘পুরস্কার’ কবিতাতেই রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন—রাজাকে কবি বলছেন, কবির কাজ শ্রী!
‘সংসার-মাঝে কয়েকটি সুর
রেখে দিয়ে যাব করিয়া মধুর,
দু-একটি কাঁটা করি দিব দূর—
তার পরে ছুটি নিব।
সুখহাসি আরো হবে উজ্জ্বল,
সুন্দর হবে নয়নের জল,
স্নেহসুধামাখা বাসগৃহতল
আরো আপনার হবে।’
আমাদের অনেক কাঁটা দূর করতে হবে, আমরা যে স্নেহসুধামাখা বাসগৃহটি পেয়েছি, যার নাম বাংলাদেশ, তাকে যে আরও বাসযোগ্য, আরও সুন্দর করে তুলতে হবে—আমাদের ছুটি নেওয়ার আগেই। সেই কাজ সবার—কবির, লেখকের, সাংবাদিকের—সব মানুষের এবং নেতৃবর্গের।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

এই ছিল প্লুটোর বুকে!

চাঁদ ক্যারনের আলোয় প্লুটোর বুকে চাঁদের আলো।
রাইট ভ্রাতৃদ্বয় আকাশে বিমান ওড়ানোর ১১২ বছরের মাথায় পৃথিবী থেকে এক নভোযান সৌরজগৎ পাড়ি দিল। ১০ বছর ধরে চলতে চলতে ৩০০ কোটি মাইল পাড়ি দিয়ে বরফাচ্ছন্ন এক গ্রহের ছবি তুলল নভোযানটি। এক সপ্তাহ আগেও প্লুটো পৃথিবীর মানুষের কাছে সৌরজগতের দূরতম গ্রহ হিসেবে একটা ঝাপসা বিন্দুর মতোই ছিল। কিন্তু এখন তার ভূ-প্রকৃতির নানা ধাঁধা সামনে হাজির হচ্ছে। নাসার নভোযান নিউ হরাইজনসের পাঠানো ছবিতে প্লুটোর ভূপৃষ্ঠে দেখা গেছে বরফঢাকা পর্বতমালা।
গতকাল বুধবার নিউ হরাইজনসের পাঠানো ছবি থেকে প্লুটোর ভূ-প্রকৃতি সম্পর্কে প্রথমবারের মতো ধারণা পেলেন গবেষকেরা। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার নভোযানটি মঙ্গলবার প্লুটোর প্রায় সাত হাজার ৭৫০ মাইল দূর থেকে প্লুটোর এই ছবিগুলো তুলেছে। নাসা এর মধ্য থেকে বাছাই করা কিছু ছবি উন্মুক্ত করেছে।
২০০৬ সালে পূর্ণাঙ্গ গ্রহের মর্যাদা হারায় প্লুটো। সূর্যের দূরতম গ্রহ হিসেবে একে ডাকা শুরু হয় বামন গ্রহ বলে। নাসার গবেষকেরা বলছেন, প্লুটোর পর্বতগুলো ১১ হাজার ফুট পর্যন্ত উঁচু হতে পারে যা অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রের রকি পর্বতমালার কাছাকাছি।
অবশ্য প্লুটো-পৃষ্ঠের ছবি গবেষকেদের বিস্ময় জাগিয়েছে এর বিশেষ ভূগঠনের কারণে। প্লুটোর অবস্থান কুইপার বেল্ট অঞ্চলে হলেও ছবিতে আগ্নেয়গিরির ফলে সৃষ্ট কোনো গর্ত বা জ্বালামুখ দেখতে পাননি তাঁরা। কুইপার বেল্ট হচ্ছে নেপচুন গ্রহের বাইরের একটি বিশেষ অঞ্চল যেখান থেকে মহাকাশীয় বস্তুর ধ্বংসাবশেষ নিয়মিত প্লুটো ও এর পাঁচটি চাঁদের ওপর আঘাত করতে থাকে।
প্লুটোর চাঁদ ক্যারন
নাসার গবেষকেরা দাবি করছেন, তাঁদের মনে হয়েছে প্লুটো এখনো ভূতাত্ত্বিকভাবে গঠিত হচ্ছে বা সক্রিয়; এবং সেখানে এমন কিছু অংশ রয়েছে যা জ্যোতির্বিজ্ঞানের শর্ত অনুযায়ী এখনো নবীন অবস্থায় রয়েছে। অর্থাৎ এগুলোর বয়স ১০ কোটি বছরের বেশি হবে না, যা আমাদের এই সৌরজগৎ সৃষ্টির ৪৫০ কোটি বছরের ভগ্নাংশ মাত্র। নিউ হরাইজনস প্রকল্পের বিজ্ঞানী জন স্পেনসার বলেন, ‘প্লুটো এখনো সক্রিয়।’
বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো এমন ভূতাত্ত্বিক সক্রিয়তার নমুনা দেখতে পান ট্রাইটন নামের নেপচুনের এক চাঁদে। আশির দশকে ভয়েজার-টু মহাকাশ মিশনের তোলা ছবি দেখে সেখানেও কোনো আগ্নেয়গিরির ফলে সৃষ্ট গুহার সন্ধান পাননি তাঁরা।
গবেষক অ্যালাস স্টার্ন দাবি করেছেন, ‘আমরা একটি বিষয়ে একমত হয়েছি যে, ছোট গ্রহগুলো দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় থাকতে পারে। আমি মনে করি এটা এখন অনেক ভূতাত্ত্বিকদের ড্রয়িং বোর্ডে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে এবং এর কারণ খুঁজতে ও ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে উত্সাহী করবে।
গবেষক স্টার্ন বলেন, যে পাথুরে স্তর দিয়ে প্লুটোয় পর্বত তৈরি হয়েছে সেগুলো অবশ্যই পানি বা পানি-বরফ দিয়ে তৈরি। এ ছাড়া প্লুটোর পৃষ্ঠে আর যে ধরনের বরফের প্রাচুর্য থাকতে পারে সেগুলো নাইট্রোজেন, মিথেন ও কার্বন মনোক্সাইড দিয়ে তৈরি। শুধু ওই একটি উপাদান দিয়ে পর্বত তৈরি হওয়া সম্ভব নয়। কারণ এটি অনেক কোমল।
প্লুটোর পৃষ্ঠের ছবি পাঠানোর আগে নিউ হরাইজনস প্লুটোর সম্পূর্ণ এই ছবিটি পাঠিয়েছিল।
প্লুটোর বুকের ছবি তুলে পাঠানো মহাকাশযান নিউ হরাইজনস তৈরি করতে ব্যয় হয়েছে ৭০ কোটি মার্কিন ডলার। মহাকাশযানটি পারমাণবিক শক্তিতে চলে। দেখতে অনেকটা পিয়ানো আকৃতির। প্লুটো এত দিন মানুষের কাছে একটি ঝাপসা বিন্দুর মতো থাকলেও নিউ হরাইজনসের ছবির কারণে আগের চেয়ে অন্তত দশগুণ অতিরিক্ত তথ্য জানা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
অবশ্য এখনই সবকিছু জানা হয়ে যাচ্ছে না। এক দশকে তিন শ কোটি মাইল পাড়ি দিয়ে যে ছবি নিউ হরাইজনস তুলেছে তা এখন পৃথিবীতে আসতে শুরু করেছে। আগামী ১৬ মাস ধরে এই তথ্য সংগ্রহ করতে পারবেন গবেষকেরা।
প্লুটোর ভূ-প্রকৃতির ছবি। নিউ হরাইজনস সাত হাজার ৭৫০ মাইল দূর থেকে প্লুটোর ভূপৃষ্ঠের এই ছবি তুলেছে। এতে প্লুটোতে রকি পর্বতমালার সমান উঁচু বরফের পর্বত দেখা যাচ্ছে। গতকাল বুধবার ছবিটি প্রকাশ করেছে নাসা।
বুধবার প্লুটোর বৃহত্তম চাঁদ ক্যারনের ছবিও প্রকাশ করেছে নাসা। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের সমান আয়তনের এই উপগ্রহটিতে চার থেকে ছয় মাইল গভীর গিরিখাত রয়েছে। গবেষকেরা জানিয়েছেন, ক্যারন গিরিখাত, খান খন্দ, রহস্যময় অন্ধকারাচ্ছন্ন অঞ্চলের ছোট্ট এক দুনিয়া। শুধু এই একটি ছবিতে মজার বৈজ্ঞানিক বিষয় রয়েছে।
(এএফপি, বিবিসি, নিউইয়র্ক টাইমস)

প্রবাস জীবনের প্রথম সকাল by জাবির আল ফাতাহ

কোপেনহেগেন বিমানবন্দর
অনেক বছর হলো দেশের বাইরে আছি | প্রবাস জীবনের প্রথম দিনটি সবার জীবনেই একটি স্মরণীয় ঘটনা হয়ে থাকে | ইচ্ছে করে ভুলতে চাইলেও ভোলা যায় না | আমার ক্ষেত্রেও তাই ঘটবে এটাই স্বাভাবিক | তবে আমার গল্পের শুরুটা একটু আগে থেকে করতে চাই |
আমার যেদিন সুইডেনে আসার ফ্লাইট তার বেশ কয়েক দিন আগে থেকেই ছিল প্রচণ্ড জ্বর | কিছুতেই জ্বর কমছিল না | এ রকম আগে খুব কমই হয়েছে | শরীরের তাপমাত্রা প্রায় ১০৫ ডিগ্রি ছিল | ভেবেছিলাম ফ্লাইট হয়তো মিস করব | যাত্রার নির্ধারিত দিনেও জ্বর ছিল। জ্বর নিয়েই রওনা হলাম |
আসল ম্যাজিকটা তখনই ঘটল যখন প্লেনে উঠলাম | প্লেনের ভেতরের পরিবেশটা যেন হঠাৎ​ করে আমাকে পুরোপুরি চেঞ্জ করে দিল | আস্তে আস্তে আমি ভালো অনুভব করতে লাগলাম | আমার জ্বরও কমে গেল | এ কথা অনেকে শুনলে বিশ্বাস করবেন না, কিন্তু আমার জীবনে এই ব্যতিক্রম ঘটনাটিই ঘটল | বাবার কথাটাও খুব মনে পড়ছিল তখন | তিনি বলেছিলেন, বিদেশে গেলেই তুই সুস্থ হয়ে যাবি | আর আমি আমি প্লেনে উঠেই সুস্থ হয়ে গেলাম |
জীবনের প্রথম বিমান ভ্রমণ কখনো ভুলবার নয় | শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে যখন কাতার এয়ারলাইনসের বিমান রানওয়ে দিয়ে অনেক দ্রুত ওপরে উঠতে লাগলে তখন আমি জানালা দিয়ে তাকিয়ে ছিলাম | উঁচু উঁচু দালানকোঠা ও গাছের সারিগুলো ক্রমাগত দূরে সরে যাচ্ছিল | ফসলের মাঠ গুলোও ছোট হয়ে আসছিল | প্লেনটি যতই দূরে যেতে থাকল মা ও মাতৃভূমি থেকে আমার দূরত্ব তত বাড়তে থাকল |
বিমান ভ্রমণের সময় উত্তেজনার পাশাপাশি অনেক শঙ্কাও কাজ করছিল | শঙ্কাটা ছিল ইমিগ্রেশন নিয়ে | যে বিমানবন্দরে ট্রানজিট হবে সেখানে কর্তব্যরত লোকজন কি প্রশ্ন করবে আর আমি কি উত্তর দেব এসব নিয়ে দুশ্চিন্তা | আমার বিশ্বাস প্রথমবার বিদেশ ভ্রমণের সময় সবার এ রকম ভয় কাজ করে | সত্যি বলতে ভয়ের কিছু নেই | এমন ঘটনা খুব কমই ঘটে যে বিমানবন্দর থেকে কেউ উল্টো ফিরে আসে |
যা হোক দীর্ঘ ভ্রমণ শেষ করে আমি আমার ফাইনাল ডেস্টিনেশন কোপেনহেগেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি এসে পড়লাম | প্লেনটি আস্তে আস্তে ল্যান্ড করার জন্য নিচে নামতে থাকল | কোপেনহেগেন বিমানবন্দর সাগরের পাড়ে | যখন বিমানটি নিচে নামছিল তখন ভয় পেয়েছিলাম এই ভেবে যে, এটি বুঝি শেষ পর্যন্ত সাগরে গিয়ে পড়বে | এভাবে যতই রানওয়ের কাছে আসতে থাকলাম ততই পাশ দিয়ে থাকা ছোট্ট ছোট্ট সবুজ মাঠের ছবিগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। আর আমার ভয়ও কাটতে লাগল |
বিমান অবতরণের মুহূর্তটি ছিল সকাল আটটা | সেই সকালের মুহূর্তটি আমার জীবন থেকে কখনো মুছবে না | এখনো যদি কখনো সকাল আটটায় ঘুম থেকে উঠি তাহলে সেদিনের সকালটার কথা মনে পড়ে | বিমানবন্দরে আমাকে নিতে আসেন ভাইয়া ও তার পরিবার | প্রায় এক ঘণ্টা পর আমি তাদের বাসায় পৌঁছি।
সেদিন সকালে সূর্য উঠতে একটু দেরি হয়েছিল | তাই আমি ভুলে সকালকে রাত ভেবে নিয়েছিলাম | যদিও আগে থেকে জানতাম যে, আমি সকালে ল্যান্ড করব, তারপরও কেন জানি সময়সূচিটা এলোমেলো মনে হচ্ছিল | বোকার মতো ভাবিকে প্রশ্ন করলাম, এখন কি রাত না সকাল? এভাবে সময়-ভ্রান্তি নিয়ে কয়েক দিন পার করলাম | যেহেতু উত্তর গোলার্ধে সাধারণত শীতকালে রাতের দৈর্ঘ্য ও গ্রীষ্মকালে দিনের দৈর্ঘ্য খুব বেশি থাকে, তাই প্রথম প্রথম মানিয়ে নিতে একটু কষ্ট হয়েছিল।
এভাবে দিন পার হতে থাকল আর আমি নতুন দেশের নতুন পরিবেশের সঙ্গে মিশে যেতে লাগলাম | মাস গড়িয়ে বছর যায় | এক বছর নয়, দুই বছর নয়, অনেক বছর | এখন মনে হয় বছরগুলোও যেন রানওয়ের বিমানের মতো অনেক দ্রুত চলে যাচ্ছে | সবার কাছে আমি একজন প্রবাসী | এখন আমি পৃথিবীর যে দেশই ভ্রমণ করি না কেন, কোপেনহেগেন বিমানবন্দরের সেই মিষ্টি সকালটির মতো আর কোনো সকাল আমার জীবনে আসবে না |
(লেখক কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষার্থী)

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশের জয়জয়কার

বাংলাদেশের সাফল্যের জয়গান ভারতীয় সংবাদমাধ্যম
কদিন আগেও ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশের ক্রিকেট গুরুত্ব পেয়েছে কমই। বেশির ভাগ সময়ই বাংলাদশের ক্রিকেটের খবর থাকত না। থাকলেও ছোট্ট জায়গা বরাদ্দ, সাংবাদিকতার পরিভাষায় যাকে বলে ‘সিঙ্গেল কলাম’। মাশরাফিরা সেই দৃশ্যপট বদলাতে বাধ্য করেছেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে এখন বেশ ফলাও করে প্রচার করছে বাংলাদেশ দলের সাফল্যের খবর। প্রকাশ করা হচ্ছে বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে নানা বিশ্লেষণী।
‘বাংলাদেশের সাফল্য আকস্মিক নয়, আরও আসছে’ শিরোনামে একটি সুদীর্ঘ বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দেশটির শীর্ষ সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া। বাংলাদেশের সাফল্যের পেছনে পাঁচটি কারণ বের করেছে তারা। প্রথম কারণ, অধিনায়ক পরিবর্তন। টানা ১৩ ম্যাচ জয়হীন থাকার পর গত বছর অক্টোবরে মাশরাফি বিন মুর্তজার কাঁধে তুলে দেওয়া হয় ওয়ানডে অধিনায়কের দায়িত্ব। এরপরই আমূল বদলে যায় বাংলাদেশ। গত আট মাসে মাশরাফির অধিনায়কত্বে খেলা ২০ ম্যাচের ১৫টিই জিতেছে বাংলাদেশ। চোয়ালবদ্ধ লড়াই, সতীর্থদের প্রতি আস্থা ও সাফল্যের জন্য তীব্র ক্ষুধা—মাশরাফির এসব গুণে মাঠে বাংলাদেশ পাচ্ছে একের পর এক সাফল্য। বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে পা দেওয়া, ঘরের মাঠে পাকিস্তানকে বাংলাওয়াশ, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজ জয়‍—মাশরাফির নেতৃত্বে বাংলাদেশ ছুটছে এক্সপ্রেস গতিতে। টাইমস অব ইন্ডিয়া মাশরাফির মধ্যে খুঁজে পাচ্ছেন লঙ্কান অধিনায়ক অর্জুনা রানাতুঙ্গাকে। সাধারণ এক দল থেকে শ্রীলঙ্কাকে যিনি পরিণত করেছিলেন বিশ্ব চ্যাম্পিয়নে।
দ্বিতীয়ত কোচিং স্টাফ। প্রধান কোচ চণ্ডিকা হাথুরুসিংহের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এ সাফল্যে। মাহমুদউল্লাহকে ব্যাটিং অর্ডারে ওপরে আনা, সহজাত খেলতে খেলোয়াড়দের স্বাধীনতা দেওয়া—নানা সিদ্ধান্তে হাথুরুর ভূমিকা প্রশংসনীয়। বোলিং কোচ হিথ স্ট্রিকের অধীনে ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছে বাংলাদেশের পেস আক্রমণ।
তৃতীয়ত, স্পিন নির্ভরতা কমা। একটা সময় বোলিং আক্রমণে বাংলাদেশকে নির্ভর করতে হতো কেবল স্পিনের ওপর। চিত্রটা এখন বদলেছে। গত এক বছরে বাংলাদেশের আট পেসার নিয়েছেন ৯৬ উইকেট, গড় ২৮.৫৭। একই সময়ে বাংলাদেশের স্পিনাররা নিয়েছেন ৭৯ উইকেট, গড় ৩১.৭৯। মাশরাফির সঙ্গে পেস আক্রমণে রয়েছেন তাসকিন, রুবেলের মতো দারুণ কিছু পেসার। চারদিকে হইচই ফেলে দিয়ে নতুন আবির্ভাব হয়েছে আরেক পেসার মুস্তাফিজুর রহমানের।
চতুর্থত, তরুণ তুর্কিদের জ্বলে ওঠা। গত একটা বছর বেশ কয়েকজন প্রতিভাবান তরুণ খেলোয়াড় এসেছেন জাতীয় দলে। প্রত্যেকেই যথাযথ পালন করে যাচ্ছেন নিজ দায়িত্ব। গত বছর ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডে অভিষেকেই বাংলাদেশের পক্ষে রেকর্ড ৫ উইকেট নিয়ে নিজের আগমনী বার্তা ভালোভাবেই জানান দিয়েছিলেন তাসকিন। ডিসেম্বরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে অভিষেকেই হ্যাটট্রিক করে রেকর্ড বইয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন তাইজুল ইসলাম। এ বছর ভারতের বিপক্ষে একের পর এক বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছেন মুস্তাফিজ। ব্যাট হাতে সৌম্য-সাব্বিররা দেখাচ্ছেন উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথ। অধিনায়ক মাশরাফি ও কোচ হাথুরু—দুজনই তরুণদের জন্য জায়গাটা প্রশস্ত করে দিয়েছেন। দিয়েছেন নির্ভার হয়ে খেলার লাইসেন্সও।
পঞ্চম কারণ, তরুণদের সঙ্গে অভিজ্ঞ সেনানীদের যুগলবন্দী। দলের সিনিয়র খেলোয়াড় মাশরাফি, মুশফিকুর রহিম, সাকিব আল হাসান ও মাহমুদউল্লাহর সঙ্গে অসাধারণ সমন্বয় হয়েছে তরুণ খেলোয়াড়দের। অভিজ্ঞরাও পারফর্ম করছেন একই তালে। প্রতি মুহূর্ত নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিচ্ছেন তরুণ সদস্যদের সঙ্গে।
বাংলাদেশের সাফল্যের পেছনে মাশরাফিকে অধিনায়ক বানানো ও কোচিং স্টাফে পরিবর্তন আনাকে মূল কারণ হিসেবে মনে করছে ভারতের আরেকটি জনপ্রিয় পত্রিকা হিন্দুস্থান টাইমস। ‘‘‘বাংলাওয়াশ’, বাংলাদেশকে যথাযোগ্য কৃতিত্ব দেওয়ার সময় হয়েছে’’ শীর্ষক খবরে বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণের উন্নতির প্রশংসা করেছে পত্রিকাটি।
এ দিকে বাংলাদেশকে নিয়ে আজ বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে কলকাতার জনপ্রিয় দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা। ‘রেখেছ বাঙালি করে আবার ক্রিকেটারও করেছ’ শিরোনামে বিশেষ প্রতিবেদন লিখেছেন ভারতের অন্যতম সিনিয়র ​ক্রীড়া সাংবাদিক গৌতম ভট্টাচার্য। যে লেখায় তিনি বাংলাদেশের ক্রিকেটের বদলে যাওয়া আর তাঁর দেখার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন।
শুধু তা-ই নয়, গতকাল ভারতের শীর্ষ বাংলা​ দৈনিক আনন্দবাজারের অনলাইন সংস্করণ একই দিনে বাংলাদেশকে নিয়ে চারটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে: ‘আফ্রিকান সিংহও বিধ্বস্ত, বিশ্ব ক্রিকেটে ব্যাঘ্রগর্জন’, ‘সিরিজ জিতে রাতভর রাজপথে বিজয়োল্লাস’, ‘প্রতিভার কোহিনূরের ছটায় বিশ্বে এখন বাঘের ডাক’, ‘সাকিবের হাত ধরে নতুন সূর্যোদয় বাংলাদেশের’।