Saturday, March 12, 2016

অবাক করা বিতর্কে রিপাবলিকানরা

মুখোমুখি রুবিও ও ট্রাম্প। এএফপি
ফ্লোরিডার মিয়ামিতে বৃহস্পতিবার রাতে অনুষ্ঠিত রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীদের দ্বাদশ বিতর্কের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল এর সুশীল চরিত্র। এর আগে ৩ মার্চ অনুষ্ঠিত একাদশ বিতর্কে তাঁরা চরম গালমন্দে লিপ্ত হন। মার্কো রুবিও ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘প্রতারক’ বলে অভিযুক্ত করেন, ট্রাম্প গর্ব প্রকাশ করেন নিজের বিশেষ অঙ্গ নিয়ে। টেড ক্রুজ বলেন সত্যের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক বড়ই ক্ষীণ আর জবাবে ট্রাম্প ক্রুজকে বলেছিলেন জন্মের মিথ্যুক। সিএনএন আয়োজিত বিতর্কের পরিবেশ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
রিপাবলিকান দলের চার প্রেসিডেন্ট মনোনয়ন প্রার্থীর কেউ কারও সম্বন্ধে একটি মন্দ কথা বলেননি। পুরো ব্যাপারটা এতটা বিস্ময়কর মনে হচ্ছিল যে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলতে বাধ্য হলেন, ‘আমি বিশ্বাস করতে পারছি না যে আমরা সবাই এত ভদ্র হয়ে গেছি।’ বিতর্কে অংশ নেওয়া সবার চোখ ছিল আগামী মঙ্গলবার, ১৫ মার্চ, তাঁদের পরবর্তী প্রাইমারি ভোটের ওপর। ওই প্রাইমারি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এর আগের প্রাইমারি ও ককাসগুলোতে যে যেমন ভোট পেয়েছেন, সেই অনুপাতে ডেলিগেট ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। কিন্তু মঙ্গলবারের প্রাইমারিতে ফ্লোরিডা, ইলিনয়, ওহাইও এবং নর্থ ক্যারোলাইনার মতো জনবহুল অঙ্গরাজ্যে এবং নর্দান ম্যারিয়ানা আইল্যান্ডে যে ভোট গ্রহণ হবে, তাতে মোট ভোটে বিজয়ী প্রার্থী একাই সব ডেলিগেট লাভ করবেন। সহপ্রার্থীদের কাছ থেকে না হলেও বিতর্কের সঞ্চালকদের কাছ থেকে কঠিন প্রশ্নের সম্মুখীন হন ট্রাম্প। ইতিপূর্বে ট্রাম্প এক সাক্ষাৎকারে ‘ইসলাম আমাদের ঘৃণা করে’ বলে যে মন্তব্য করেছিলেন, সে কথা উল্লেখ করে জিজ্ঞেস করা হয়, তিনি কি কিছু কিছু মুসলমান, না সব মুসলমানের কথা বলেছেন?
জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘অনেকে হয়তো জানে না, কিন্তু আমি বলছি তারা (অর্থাৎ মুসলমানেরা) আমাদের ঘৃণা করে।’ মার্কো রুবিও এই মন্তব্যের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, এই জাতীয় বক্তব্য বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করবে। ফ্লোরিডার বিপুলসংখ্যক কিউবান অভিবাসীর কথা মনে রেখে মার্কো রুবিও ও টেড ক্রুজ কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে ওবামা প্রশাসনের সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে হাভানায় মার্কিন দূতাবাস বন্ধ করে দেওয়ার অঙ্গীকার করেন তাঁরা। একমাত্র ট্রাম্প কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন সমর্থন করেন। ওবামার সঙ্গে একমত পোষণ করে তিনিও বলেন, দীর্ঘ ৫০ বছর সম্পর্ক ছেদের নীতি অনুসরণ করে কোনো লাভ হয়নি। তবে যে চুক্তির ভিত্তিতে সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, তাকে খুব দুর্বল বলে অভিহিত করেন ট্রাম্প। রিপাবলিকান প্রার্থীদের মধ্যে ভোটের লড়াইয়ে ট্রাম্প ও ক্রুজ এগিয়ে থাকায় তাঁরা উভয়েই নিজেকে সম্ভাব্য ডেমোক্রেটিক প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনকে পরাজিত করতে সক্ষম বলে দাবি করেন।

বিজয় মালিয়াকে সমন

বিজয় মালিয়া
ভারতে অর্থনৈতিক অপরাধের তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) মদ ব্যবসায়ী বিজয় মালিয়াকে হাজিরা দেওয়ার জন্য সমন জারি করল। দেশ ছেড়ে যুক্তরাজ্যে চলে যাওয়া মালিয়াকে গতকাল শুক্রবার নোটিশ পাঠিয়ে বলা হয়েছে, অর্থ তছরুপের অভিযোগের জবাব দিতে ১৮ মার্চ হাজিরা দিতে হবে। তাঁকে ধার দেওয়া ১৭টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্তাদেরও নথি নিয়ে হাজির হতে বলা হয়েছে। বিজয় মালিয়ার কোম্পানির দুই ঘনিষ্ঠ সহযোগীকে গতকাল ইডি জেরা করেছে। মালিয়া তাঁর কিংফিশার এয়ারলাইনসের জন্য বিপুল অর্থ ধার করার পর তা শোধ দিতে পারেননি। অভিযোগ,
বিলাসী জীবনে অভ্যস্ত এ ব্যবসায়ী ঋণের টাকা অন্যত্র সরিয়েছেন ও নয়ছয় করেছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই ঋণ শোধ করছেন না। এ নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি। এদিকে মালিয়া গতকাল বলেছেন, তিনি দেশত্যাগী হননি। সাতসকালে টুইট করে বলেছেন, ‘আমি একজন আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী। আমাকে অনবরত বিদেশে যেতে হয়। আমি মোটেই পালাইনি।’ মিডিয়াকেও একহাত নিয়েছেন বিজয় মালিয়া। বলেছেন, ‘মিডিয়ার বসরা ভুলবেন না, গত কয় বছর ধরে তাঁদের আমি কী সুবিধা দিয়েছি, কীভাবে সাহায্য করেছি। সবকিছুর হিসাব কিন্তু আমার আছে।’

প্রেয়সীর তিলটির জন্য ঢাকা চিটাগাং রাজশাহী খুলনা by মিনার রশীদ

ইরানের কবি হাফিজ তার প্রেয়সীর গালের এক তিলের জন্য সমরখন্দ ও বোখারা বিলিয়ে দিতে চেয়েছিলেন।
কবির সেই কবিতার বাণী সেখানকার শাসকের কানে পৌঁছলে তিনি রীতিমতো আঁৎকে উঠলেন। কবিকে তলব করে জিজ্ঞেস করেন, ও হতভাগা কবি! সমরখন্দ ও বোখারা আমার। আর কোথাকার কোন হতভাগিনীর জন্য তুমি কিনা আমার সাম্রাজ্য বিলিয়ে দিতে চাচ্ছ?
সমরখন্দ ও বোখারা বিলিয়ে দেয়ার কথা শুনে অন্ততপক্ষে সেখানকার শাসক নড়েচড়ে বসেছিলেন। কিন্তু প্রেমাস্পদের গালের তিল বা শরীরের অন্য কিছুর জন্য ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা বিলিয়ে দেয়ার কথা বলা হলেও কারো কোনো নড়ন চড়ন নজরে পড়বে বলে মনে হয় না।
পশ্চিমবঙ্গের খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের মহান ভাষা দিবস অনুষ্ঠানে তার আবেগপূর্ণ বক্তব্যে দুই বাংলার মধ্যে কেন পাসপোর্ট থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
এই কথাটি ইন্ডিয়ার কোনো খাদ্যমন্ত্রীর না হয়ে আরেকটু পশ্চিমের কোনো অ-খাদ্যমন্ত্রীর হলে এত দিনে কত ধানে কত চাল তা টের পাওয়া যেত। কোনো কোনো চ্যানেলের লোকজন পারলে ষোলো কোটি মানুষের কাছ থেকে প্রতিক্রিয়া নিয়ে এসে তাদের টিভিতে প্রচার করতেন।
অথচ মল্লিক বাবুর এই আবেগপূর্ণ বক্তব্য দু’টি রাষ্ট্রের মধ্যে একটির জন্য মারাত্মক ইঙ্গিত বহন করে। মল্লিকের এই মনোবাঞ্ছা সম্ভাব্য দু’টি উপায়ের মধ্যে একটির মাধ্যমে পূর্ণ হতে পারে। হয় পশ্চিম বাংলাকে ভারত থেকে পৃথক হয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সাথে যোগ দিতে হবে। নতুবা বাংলাদেশকে সিকিমের মতো তার সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিয়ে প্রতিবেশীর একটি অঙ্গরাজ্য হয়ে যেতে হবে।
যে রাষ্ট্রের মাটিতে দাঁড়িয়ে ওই মস্ত্রী এই আবেগটি দেখিয়েছিলেন সেই রাষ্ট্র এটাকে ক্ষতিকর গণ্য করেনি। রাষ্ট্রদ্রোহিতার জন্য তিনি এখনো অভিযুক্ত হননি। কাজেই বিয়োগ অঙ্কটি টানলে কলিজার মধ্যে কোথাও যেন, কেমন যেন একটি টান পড়ে। জাতে যা-ই হোন, মল্লিক বাবু তালে একদম ঠিক।
অনেক দেশের নাগরিকদের পরস্পরের দেশে যাতায়াতের জন্য কোনো ভিসার দরকার পড়ে না। কিন্তু তেমন সৌহার্দ্যরে নিদর্শনস্বরূপ জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক এই ভিসা তুলে দেয়ার কথা বলেননি। তিনি পাসপোর্ট তুলে দেয়ার কথা বলেছেন! তিনি বুঝে শুনেই কথাটি বলেছেন বলে ধরে নিতে হয়।
এই সিকোয়েন্সটি বোঝাতে হলে বেশ কিছু দিন আগের এক খাজা বাবার কথা স্মরণ করতে হয়। সেই বাবা আবার অনেক আধুনিক, মুক্তমনা ও মডার্ন ছিলেন। অনেকটা উন্মুক্ত যৌনতার প্রচারক আমেরিকান গুরু রজনীশের মতো। নারী-পুরুষ, বিশেষ করে উঠতি বয়সের যুবক-যুবতীরা বেশি করে তার মুরিদ হয়েছিল। তার আসরে মদ-গাঁজাসহ সব উত্তেজক ড্রাগের ব্যবহার হতো। আসরের শুরুতে ছেলেমেয়েদের মাঝে একটা কাপড়ের পর্দা টানানো থাকত। রাত একটু গভীর হলে আসরের মেজাজ বুঝে একসময় ‘খাজা বাবা’ গেয়ে উঠতেন, মনের মধ্যে পর্দা থাকলে বাইরের পর্দার দরকার নেই। সাথে সাথেই তুমুল চিৎকারের মধ্য দিয়ে ছেলেমেয়েদের মধ্যকার পর্দা সরিয়ে দেয়া হতো। কিছুক্ষণ ধ্যান করে সেই বাবা আবার বলতেন, মনের মধ্যে আলো থাকলে বাইরের আলোর দরকার নেই। তারপর আলোও নিভিয়ে দেয়া হতো। আলো নিভিয়ে ও পর্দা সরিয়ে বিশেষ পরিবেশ সৃষ্টি করে সবাই একত্র হয়ে কী ধরনের প্রার্থনা করত তা সহজেই অনুমেয়।
মল্লিক বাবুরা এই চেতনার অনেকটা কাছাকাছি আমাদের পৌঁছে দিয়েছেন বলে অনেকে আশঙ্কা করছে। মনে হচ্ছে, জাতি আজ বেহুঁশ হয়ে পড়েছে। এসব কথা শুনে আগে যা-ও দু-একজন উসখুস করতেন, এখন তা-ও বন্ধ। ভূ-রাজনৈতিক সচেতনতার বাতিটি অনেক আগেই নিভিয়ে ফেলা হয়েছে। এখন ‘মনের মধ্যে পাসপোর্ট থাকলে বাইরের পাসপোর্টের দরকার নেই’ বলে ধুয়া তোলা সম্ভব বলে কেউ কেউ মনে করেন।
শুধু এই মল্লিক মন্ত্রীই নন, গত বছর ১৯ ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশে এসে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা দিদির সফরসঙ্গী চলচ্চিত্র নায়ক ও ভারতের লোকসভার সদস্য দেব দুই বাংলাকে এক করে দেয়ার জন্য দুই দেশের সরকারের কাছে অনুরোধ করেছেন।
এই দেব ও জ্যোতিপ্রিয়দের আগের পুরুষ ১৯০৫ সালে প্রশাসনিক সুবিধার্থে বাংলাকে ভাগ করা হলে বাংলা মায়ের জন্য একই ধরনের মাতম তুলেছিলেন। তাদের সে দিন সে কী কান্না! সেই কান্নায় পুরোপুরি ভিজে গিয়ে ব্রিটিশরাজ ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রহিত করেন। তখন খুব খুশি হয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ সম্রাট পঞ্চম জর্জকে অভিনন্দন জানিয়ে একটি গান লিখেছিলেন। সে গানটিই পরবর্তী সময়ে আমাদের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে বাছাই করা হয়েছে। ওই কবি তখন এসব ব্যাপারে গোষ্ঠীগত ও নিজ সম্প্রদায়ের স্বার্থভিত্তিক ভাবনার ঊর্ধ্বে উঠতে পারেননি। বঙ্গভঙ্গ রহিত করার পরে মুসলিম সমাজকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করা হয়। তিনি বিরোধিতায় নেমেছিলেন। তখনো তার ভয় ছিল সেই একটাই। পূর্ব বাংলার চাষাভুষার ছেলেরা শিক্ষিত হয়ে গেলে অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে পড়বে। অথচ এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতারাই হয়ে পড়েছেন অনেকটা ভিলেনের মতো। একশ্রেণীর বুদ্ধিবৃত্তিক বরকন্দাজ সৃষ্টি করে তাদের দিয়ে এসব করা হচ্ছে।
প্রশাসনিক সুবিধার্থে ব্রিটিশরাজ বাংলাকে ভাগ করে পূর্ব ও পশ্চিম নামে দু’টি প্রদেশ করেছিল। আসাম ও পূর্ব বাংলাকে নিয়ে একটি স্বতন্ত্র প্রদেশ গঠন করা হয়েছিল, যার রাজধানী হয়েছিল ঢাকা। তাতে পূর্ব বাংলার জনগণ যারপরনাই খুশি হয়েছিল। কারণ নতুন এই প্রশাসনিক ব্যবস্থা তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়।
পূর্ব বাংলায় ছিল মূলত নিন্ম জাতের হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের বাস। এই দু’টি সম্প্রদায়কে লুণ্ঠন করে কলকাতা মহানগরীকে সমৃদ্ধ করে যাচ্ছিল উঁচু জাতের হিন্দু ও জমিদার সম্প্রদায়। বঙ্গভঙ্গ তাদের কায়েমি স্বার্থে আঘাত হানে। কাজেই তাদের পক্ষে এই বিভক্তি মেনে নেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে বাংলা মায়ের আবেগ নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে এবং নিজেদের সম্মিলিত রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে বঙ্গভঙ্গ রহিত করতে তারা সমর্থ হয়।
কিন্তু ১৯৪৭ সালে এই ‘বাংলাপ্রেমিক’দের আসল চেহারাটি স্পষ্ট হয়ে পড়ে। ১৯০৫ সালে যারা বাংলা মাকে ভাগ করার জন্য রোদন শুরু করেছিলেন, ১৯৪৭ সালে সেই একই গোষ্ঠী ‘বাংলা মা’কে দ্বিখণ্ডিত করতে উদগ্রীব হয়ে পড়েন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশেম, শরৎ বসু (সুভাষ বসুর ভাই) প্রমুখ স্বাধীন যুক্ত বাংলা প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করলেও তাদের পক্ষে এই বিশুদ্ধ বাংলাপ্রেমিকদের কাউকে পাওয়া যায়নি। তারা বরং বাংলাকে ভাগ করে কোনো মতে দিল্লির কোলে আশ্রয় নেয়াকেই শ্রেয় মনে করেছিলেন। একই আবেশে অন্য গ্রুপ পিন্ডির পূর্বসূরি করাচির সাথে জড়িয়ে পড়ে। তখন আর বাংলা মায়ের কথা কারো খেয়াল থাকেনি।
এটা সত্য, তখন ধর্মীয় উন্মাদনা বা আবেশ হিন্দু মুসলিম উভয় বাঙালি সম্প্রদায়ের মধ্যেই কাজ করেছিল। কিছু দিনের মধ্যেই সেই উন্মাদনা অপসারিত হলে আমরা পিন্ডির খপ্পর থেকে বেরিয়ে আসি। কিন্তু একই ধরনের চিন্তাভাবনার কথা দাদারা কল্পনাতেও আনতে পারে না। তারা আবেগে মাঝে মাঝে (আমাদের চেয়েও) বেশি ‘মাতাল’ হলেও দিল্লির ‘তাল’টি কখনোই ছাড়েন না। কোনো দিন হয়তো ছাড়বেনও না।
এ দিকে আমরা ছুটেছি ভিন্ন পথে। ১৯৪৭ সালের আগে সবাই এক থাকলেও এখন অনেক ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছি। স্বার্থের ভাগ, আবেগের ভাগ, অনুভবের ভাগ আমাদের নিঃশেষ করে দিয়েছে। ক্ষমতার লোভ আমাদের বেহুঁশ করে ফেলেছে।
আমাদের ভূ-রাজনৈতিক জ্ঞান ও বোধ শূন্যের কোঠায়। আজব এক ভয় যেন সবাইকে গ্রাস করে ফেলেছে। আমার এই বিলাপ স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য আমারই অন্য ভাই ওঁৎ পেতে আছে, আমাকে কায়দা মতো ধরার জন্য। আমরা এতটুকু হীনম্মন্য হয়ে পড়েছি যে, দালালদের কাছ থেকে দেশপ্রেমের সার্টিফিকেট নেয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে বসে থাকি। এগুলো নিয়ে দু-একজন নূরে আলম সিদ্দিকী আহাজারি করলেও মনে হয় আমরা বড্ড দেরি করে ফেলেছি। জীবনের প্রতি মায়া আমাদের অনেক বেশি। অথচ এই জীবনের ফয়সালা মাটিতে হয় না; তা হয় আসমানে।

বাদানুবাদে হিলারি ও স্যান্ডার্স

বিতর্ক অনুষ্ঠানে বার্নি স্যান্ডার্স ও হিলারি ক্লিনটন l এএফপি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থীদের অষ্টম বিতর্কে হিলারি ক্লিনটন ও বার্নি স্যান্ডার্স তাঁদের মিল-অমিল নির্দেশ করার সময় তীব্র ভাষায় পরস্পরের সমালোচনা করলেন। গত বুধবার মায়ামিতে অনুষ্ঠিত হয় এ বিতর্ক। হিস্পানিক টেলিভিশন ইউনিভিশন ও ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই বিতর্কের কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল, অভিবাসন প্রশ্নে তাঁদের অবস্থান। হিলারি ও স্যান্ডার্স উভয়েই ব্যাপক অভিবাসন সংস্কার প্রশ্নে সমর্থন জানালেও একে অপরের আগের অবস্থান নিয়ে বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়েন। গত কয়েক বছরে ওবামা প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুলসংখ্যক অবৈধ অভিবাসীকে বহিষ্কার করেছে। এদের মধ্যে অভিভাবকহীন—এমন অনেক শিশুও রয়েছে। হিলারি ক্লিনটন এর আগে ওবামা প্রশাসনের বহিষ্কার নীতি সমর্থন করলেও এদিনের বিতর্কে অঙ্গীকার করেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে তিনি শিশুদের বহিষ্কার করবেন না। অপরাধী ও সন্ত্রাসী—এমন ব্যক্তি ছাড়া অন্য কোনো অবৈধ অভিবাসীকে তিনি বহিষ্কার করবেন না, হিলারি সে প্রতিশ্রুতিও দেন। সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সও একই প্রতিশ্রুতি দেন, কিন্তু পাশাপাশি এ কথাও মনে করিয়ে দেন যে হিলারি একসময় অভিভাবকহীন শিশুদের আগমন রোধের ব্যাপারে উচ্চকণ্ঠ ছিলেন। ‘অতিথি শ্রমিক’ কর্মসূচি মার্কিন শ্রমিকদের স্বার্থবিরোধী—এই যুক্তিতে স্যান্ডার্স নিজেও একসময় বহিরাগত শ্রমিকদের আগমনে বাধা দিয়েছিলেন। তাঁকে সে কথা মনে করিয়ে দেওয়া হলে স্যান্ডার্স জানান, এই অতিথি শ্রমিক কর্মসূচির অধীনে বহিরাগত শ্রমিকদের দাসসুলভ মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়।
এ কারণেই তিনি ২০০৭ সালে সেই কর্মসূচির বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, অবৈধ বহিরাগতদের ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট ওবামার নির্বাহী আদেশ তিনি সমর্থন করেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে একইভাবে বহিরাগতদের কল্যাণে ব্যাপকতর ব্যবস্থা নেবেন। হিলারি অভিযোগ করেন, সবার জন্য স্বাস্থ্যবিমা থেকে বিনা মূল্যে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন স্যান্ডার্স, কিন্তু সে জন্য অর্থসংস্থান কীভাবে হবে, তার ব্যাখ্যা দেননি। জবাবে স্যান্ডার্স বলেন, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মধ্যে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই স্বাস্থ্যসেবা একটি অধিকার হিসেবে স্বীকৃত নয়। বিতর্কের একপর্যায়ে সরকারি কাজে ব্যক্তিগত ই-মেইল ব্যবহার করা নিয়ে হিলারি ক্লিনটন যে সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছেন, সে প্রশ্ন ওঠে। মার্কিন বিচার বিভাগ এখন ব্যাপারটি নিয়ে তদন্ত শুরু করেছেন। বিতর্কে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, এই তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হলে তিনি প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়াবেন কি না? হিলারি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, এমন কোনো ঘটনা ঘটবে না এবং এই প্রশ্নের তিনি জবাবও দেবেন না। বিতর্কের একটা অংশজুড়ে ছিল অভিবাসী ও মুসলমানদের ব্যাপারে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত অবস্থানের বিষয়টি। ট্রাম্পকে তাঁরা ‘বর্ণবাদী’ বলে মনে করেন কি না—এই প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে হিলারি ও স্যান্ডার্স উভয়েই ট্রাম্পের বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করেন।

সরকারে সু চির প্রভাব কতটা থাকছে?

অং সান সু চি
সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার জন্য সু চি প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হতে পারলেন না। তবে মনোনীত প্রার্থী থিন কিউ প্রেসিডেন্ট হিসেবে সু চির প্রতিনিধিত্বই করবেন। এখন সু চির ভূমিকা কী হবে, এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পর্দার আড়াল থেকে সু চিই দেশ পরিচালনা করবেন বলে ধারণা করা হয়। এখন কী হবে: সু চিকে যে সংবিধান প্রেসিডেন্ট হতে দিল না, সেই সংবিধানের বিধিবিধান ধরেই এখন নতুন প্রার্থী থিন কিউয়ের মূল্যায়ন হবে। পার্লামেন্টের দুই কক্ষে এরপর ভোটাভুটি হবে। দুটি কক্ষেই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি)। বিদায়ী সেনা-সমর্থিত প্রেসিডেন্ট থেইন সেইনের কাছে থেকে এ মাসের ৩১ তারিখ দায়িত্ব বুঝে নেবেন নতুন প্রেসিডেন্ট। এ সময়ে সু চি তাঁর মন্ত্রিসভা গঠনের কাজ সারবেন। এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই নতুন মন্ত্রিসভা কাজ শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে। সু চির ভূমিকা কেমন হবে: এখন মিয়ানমারে যে পরিস্থিতি হলো তাতে কেউ কেউ সু চির সঙ্গে ভারতের কংগ্রেস সভাপতি সোনিয়া গান্ধীর তুলনা করছেন। কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকার সময় দল তাঁর পুরো নিয়ন্ত্রণে ছিল। যদিও তিনি কোনো সরকারি পদে ছিলেন না। এর আরেক উদাহরণ সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান ইউ।
দায়িত্ব থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর নেওয়ার পর উপদেষ্টার ভূমিকা পালন করেন তিনি। মিয়ানমারেও এমনটিই ঘটবে। শুধু নামেই প্রেসিডেন্ট হবেন না সু চি। কিন্তু কার্যত তিনিই হবেন প্রেসিডেন্ট। অনেকেই ভাবছেন, সু চি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হতে পারেন। এর ফলে তিনি দেশটির সেনানিয়ন্ত্রিত নিরাপত্তা কাউন্সিলে থাকতে পারবেন। তবে সু চির জন্য নানা সমস্যাও আছে। সেনাবাহিনী হয়তো তাঁর মনোনীত প্রেসিডেন্টকে সংবিধানবিরোধী কাজের দায়ে অভিযুক্ত করতে পারে। আবার এ কথাও ঠিক, ‘পুতুল নেতা’ কখনো শতভাগ বিশ্বাসযোগ্য হন না। সোনিয়া গান্ধী এটি বুঝেছেন। সেনাবাহিনী কী অতীতের ভূমিকা থেকে সরে আসবে: এ ক্ষেত্রে বলা যায়, সে আশা সুদূরপরাহত। গত বছরের নভেম্বরের নির্বাচনে এনএলডির ভূমিধস বিজয় এবং এরপর শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের ফলে গণতান্ত্রিক শক্তির উন্মেষ আশা করা যেতেই পারে। কিন্তু দেশের সংবিধান আজও সেনাবাহিনীকে বিপুল ক্ষমতা দিয়ে রেখেছে। পার্লামেন্টের ২৫ শতাংশ আসন অনির্বাচিত সেনাসদস্যের দখলে। সেনাবাহিনী একটি ভাইস প্রেসিডেন্টের পদ পাবে। এ ছাড়া স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা এবং সীমান্তবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মতো তিন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় থাকছে তাদের হাতেই। দেশটির জাতীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা কাউন্সিলের অভিভাবক সেনাবাহিনীই। সবচেয়ে বড় কথা, এই কাউন্সিল জরুরি পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রক্ষমতা নিতে পারে।

‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত’ হওয়ার গণতন্ত্র! by সোহরাব হাসান

৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় দলীয় সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাউন্সিলের আগে বিএনপির চেয়ারপারসন ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়া প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘নাটকটা ভালোই করেছে। নির্বাচিত দুজনই আসামি।’ বিএনপির চেয়ারপারসন ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি যে নিছক লোক দেখানো ছিল, সেটাই ইঙ্গিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
বিএনপির চেয়ারপারসন ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনের জন্য বিএনপির পক্ষ থেকে সাবেক স্পিকার জমির উদ্দিন সরকারের নেতৃত্বে একটি নির্বাচন কমিশন করে প্রার্থিতা আহ্বান করা হয়েছিল। কিন্তু চেয়ারপারসন পদে খালেদা জিয়া এবং সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান পদে বর্তমানে লন্ডনে বসবাসকারী তারেক রহমান ছাড়া কেউ মনোনয়নপত্র জমা দেননি। ফলে ১৯ মার্চ নির্ধারিত কাউন্সিলের আগেই তাঁরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দলের দুই শীর্ষ পদে নির্বাচিত হয়ে গেছেন। প্রধানমন্ত্রী এটাকেই নাটক বলেছেন।
দলীয় নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে এ ধরনের নাটক কেবল বিএনপিতে মঞ্চস্থ হলে দেশের মানুষ এটুকু আশ্বস্ত হতে পারত যে একটি দলে গণতন্ত্রচর্চা না হলে কি, অন্যান্য দলে তো সুষ্ঠু গণতন্ত্রচর্চা হচ্ছে এবং তারা দেশ ও রাজনীতিকে সঠিক ধারায় নিয়ে যাবে। কিন্তু দলে গণতন্ত্রচর্চার সমস্যা কেবল বিএনপির নয়; ক্ষমতাসীন কিংবা বিরোধী নির্বিশেষে প্রায় সব দলেই প্রকট। এসব দলের নেতারা শীর্ষ নেতা বা নেত্রীর কথাকেই বেদবাক্য মনে করেন, তাঁদের কাছে যুক্তি-তর্ক পেশ করাকেও বেয়াদবি ভাবেন। দলের বাইরে সবাই গণতন্ত্রী কিন্তু কমিটিতে বসলে ভিজে বিড়াল। রাজনৈতিক দলগুলোতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেতৃত্ব নির্বাচনও এসেছে এই অনুগত মানসিকতা থেকে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতারা নিজেদের কলহ মেটাতে না পেরেই দুই নেত্রীকে ডেকে এনে তাঁদের হাতে দলের নেতৃত্ব অর্পণ করেছিলেন। তাঁরা কেউ সোৎসাহে রাজনীতিতে আসেননি।
প্রশ্ন হলো, নেতৃত্ব নির্বাচনে বিএনপি যে নাটক করেছে, আওয়ামী লীগ সেই নাটক করবে না, সেই আশা কি আমরা করতে পারি? পারি না। সেখানেও প্রায় ৩৫ বছর ধরে সভানেত্রী পদে দ্বিতীয় কেউ প্রার্থিতা ঘোষণা করেননি। প্রকৃত নির্বাচন বলতে যা বোঝায়, সেটি আওয়ামী লীগেও হবে না। যদিও দুই দলের গঠনতন্ত্রে ঢের ফারাক আছে।
যেকোনো নির্বাচনে দুই বা তার অধিক প্রার্থী থাকেন। কিন্তু জয়ী হবেন একজন। এরপর বিজিতকে নিয়ে বিজয়ীর কিংবা বিজয়ীর অধীনে বিজিতের কাজ করার মানসিকতা থাকতে হয়, যা আমাদের দলগুলোর মধ্যে প্রায় দুর্লভ। রাজনৈতিক দলগুলোর ভাঙনের পেছনে আদর্শের চেয়েও ব্যক্তিত্বের সংঘাতই বেশি সক্রিয় বরাবর। আগে এই বৈরিতা বা বিভক্তি বামপন্থীদের একচ্ছত্র ছিল। এখন সর্বত্র তার সংক্রমণ ঘটছে। বলা হয়, বড় দলগুলোতে গণতন্ত্র নেই। কিন্তু ছোট দলগুলোর অবস্থা কী? সেখানেও এক দল এক নেতা। দুই নেতা হলেই বিভক্তি।
বিএনপি কাউন্সিলের আগে যে এক ব্যক্তি এক পদ নেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে, সেটি বাস্তবায়ন হলে দলের চাঁই বিপদে পড়বেন। তাঁরা কেবল একাধিক পদ আঁকড়ে থাকেননি, অন্যদের আসার সুযোগও বন্ধ করে দিয়েছেন। এ কারণেই রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব হয়ে পড়েছে বন্ধকি সম্পত্তি। বছরের পর বছর চলে গেলেও মেয়াদ শেষ হয় না।
রাজনীতিতে একেক সময় একেকটি মৌসুম চলে। কখনো হরতালের মৌসুম, কখনো অবরোধ বা জ্বালাও-পোড়াও মৌসুম। এখন চলছে কাউন্সিলের মৌসুম। চলতি বছরে অনেক দলের কাউন্সিল হবে। কাউন্সিল মানে নতুন নেতৃত্ব। দলের নতুন কর্মসূচি, নতুন পরিকল্পনা। গতকাল শুক্রবার ক্ষমতাসীন জোটের অন্যতম শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল—জাসদের কাউন্সিল শুরু হয়েছে। ১৯ মার্চ হবে বিএনপির কাউন্সিল। এই কাউন্সিলের স্থান নিয়ে প্রথমে অনিশ্চয়তা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সরকার অনুমতি দিয়েছে।
তবে কাউন্সিল নিয়ে বেশি রহস্য সৃষ্টি করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলটি প্রথমে ঘোষণা দিয়েছিল ডিসেম্বরে কাউন্সিল হবে। কিন্তু দলের একাংশ পৌর নির্বাচনের দোহাই দিয়ে সেই কাউন্সিল পিছিয়ে দেয়। পরে নতুন তারিখ নির্ধারিত হয় ২৮ মার্চ। এখন শোনা যাচ্ছে কাউন্সিল আরেক দফা পেছাবে। কিন্তু কাউন্সিল যখনই হোক না কেন, দলই তার পূর্বশর্ত অনুযায়ী জেলা-উপজেলাগুলোর সম্মেলন শেষ করেনি। বিএনপি রাজনৈতিক প্রতিকূলতার অজুহাত দেখাতে পারে। তারা বলতে পারে, সরকারের জেল-জুলুম ও হামলা-মামলার কারণে সব জেলায় কমিটি করা সম্ভব হয়নি।
কিন্তু আওয়ামী লীগ কী বলবে? কাউন্সিলের আগে জেলা-উপজেলার কাউন্সিল করে নেতৃত্ব নির্বাচন করার কথা, তাও শেষ হয়নি। দুই দলের কেন্দ্রীয় নেতারা বিভিন্ন স্থানে গিয়ে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করে এসেছেন। সেটিও যেখানে সম্ভব হয়নি সেখান থেকে আগের কমিটিই প্রতিনিধিত্ব করবে। কয়েক দিন আগে কুমিল্লায় গিয়েছিলাম সেখানকার রাজনৈতিক হালচাল জানতে। বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে আলাপ করে মনে হয়েছে, ইউপি নির্বাচন বা দলীয় কাউন্সিল! কোনো ব্যাপারেই তাঁদের তেমন উৎসাহী নেই। তাঁরা মনে করেন, বর্তমান মেরুদণ্ডহীন নির্বাচন কমিশন কোনো ভালো নির্বাচন করতে পারবে না। আর দলীয় কাউন্সিলে কাউন্সিলরদের ভোটে নেতৃত্ব নির্বাচনেরও কোনো সম্ভাবনা নেই। ঢাকা দেশের রাজধানী। এই নগরে প্রায় দেড় কোটি লোকের বাস। কিন্তু আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মতো বড় দলেও এখানে পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই। বিএনপি মির্জা আব্বাসের নেতৃত্ব যে আহ্বায়ক কমিটি করেছিল, তা নিষ্ক্রিয়। মোহাম্মদ হানিফ মারা যাওয়ার পর থেকে নগর আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ খালি। এখন উত্তরে ও দক্ষিণে দুটি কমিটি করার কথা বলা হলেও সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক কারা হবেন ঠিক হয়নি। এই হলো প্রধান দুই দলের রাজনৈতিক সংস্কৃতি।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কাউন্সিল যখনই হোক না নেতৃত্ব নির্বাচনের সনাতনি ধারা বদলাবে না। কাউন্সিলে আগত কাউন্সিলররা শীর্ষ পদে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন না। যিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবেন, তাঁর পক্ষেই তাঁকে তাঁদের জয়ধ্বনি দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর ভাষায় বিএনপি নেতৃত্ব নির্বাচনে একটি ‘নাটক’ করেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের মঞ্চায়ন তার চেয়ে উন্নত মানের হবে, সেটি জোর দিয়ে বলা যায় না।
রাজনৈতিক দলগুলোতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কিংবা হাত তোলা পদ্ধতিতে নেতৃত্ব নির্বাচিত হওয়ার রেওয়াজ চলে আসছে সম্ভবত এ দেশে দলীয় রাজনীতি শুরুর পর থেকেই। কিন্তু সেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচনের বিষয়টি জাতীয় সংসদ থেকে ইউপি নির্বাচন পর্যন্ত সংক্রমিত হবে, সে কথা কেউ ভাবতে পারেননি। কেননা, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দলীয় নেতৃত্ব নির্বাচিত হলে দলের নেতা-কর্মীরা ভোট দেওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। আর রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন স্তরে যেসব নির্বাচন হয়, সেখানে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন হলে ১০ কোটি ভোটার ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হন। এই আলোকেই ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ১৫৪ জন সাংসদের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটাররা ভোট দিতে পারেননি। সেবার ক্ষমতাসীনদের পেক্ষ বলা হয়েছিল, বিরোধী জোট নির্বাচন বর্জন করেছে বলে এমনটি হয়েছে। তাদের কী করার আছে? কিন্তু চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অর্ধশতাধিক প্রার্থীর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়াকে তাঁরা কী বলবেন? যে দেশে গ্রামের ক্লাব কিংবা স্কুল কমিটির নির্বাচন নিয়ে তুলকালাম ঘটে, সেই দেশে প্রার্থী না পাওয়া অস্বাভাবিক বললেও কম বলা হবে। এ কথা স্বীকার করতে হবে যে বাংলাদেশে আরও অনেক খারাপ রীতির মতো নির্বাচনব্যবস্থার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রথা চালু করার কৃতিত্ব সামরিক শাসকদেরই। কথিত গণভোটে একজনই প্রার্থী থাকেন। ফলে সেখানে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়। দীর্ঘ আন্দোলন–সংগ্রাম এবং বহু মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা সেই সামরিক শাসকদের তাড়ালেও তাঁদের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভূত রয়ে গেছে।
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রথম দফার ৭৩৮টি ইউপির মধ্যে অর্ধশতাধিকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া কেবল বাংলাদেশের নির্বাচন ইতিহাসের, বিশ্ব ইতিহাসেও নজিরবিহীন। ফলে অদূর ভবিষ্যতে এই নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত কাজী রকিবউদ্দীনের কমিশন গিনেজ বুক অব রেকর্ডসে নাম লেখাতে পারবে আশা করি।
আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতা বলার চেষ্টা করছেন, বিএনপি এতই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে যে প্রার্থী দেওয়ার লোক পাচ্ছে না। সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ তাঁদের প্রার্থী ধার দিতে পারত। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগই যোগ্য প্রার্থী না পেয়ে বিএনপি ও জামায়াত থেকে প্রার্থী ধার করেছে। এ নিয়ে বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে হাঙ্গামাও হয়েছে। দ্বিতীয়ত, প্রার্থী দেওয়ার মতো লোক যদি বিএনপিতে না-ই থাকবে, তাহলে তাদের মনোনয়নপত্র ছিঁড়ে ফেলা কিংবা প্রার্থীকে আটকে রাখার ঘটনা কেন ঘটল? সামরিক শাসনামলেও নির্বাচনের প্রতি মানুষের প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল। তাঁরা এই ভোটকেই তাঁদের অধিকার প্রয়োগের একমাত্র হাতিয়ার মনে করেন। সেই হাতিয়ারটি কেড়ে নিলে নির্বাচন হওয়া না-হওয়ার মধ্যে কোনো ফারাক থাকে না। সিইসি বন্দুকের শেষ গুলিটি পর্যন্ত ব্যবহার করার কথা বললেও নির্বাচনের প্রথম শর্ত অর্থাৎ সবার প্রার্থিতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এই নির্বাচন কমিশন একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন দিতে পারবে, সে কথা কেউ বিশ্বাস করে না। কিন্তু তারা প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সুযোগটুকুও দেবে না, এটি কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায় না।
নির্বাচন কমিশন এবং ক্ষমতাসীনেরা মিলে যদি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার এই মহড়াটি এভাবে চালাতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে দেশে নির্বাচনী ব্যবস্থা বলে কিছু থাকবে না। তখন দারিদ্র্যকে জাদুঘরে পাঠানোর আগেই নির্বাচনব্যবস্থা জাদুঘরে ঠাঁই নেবে। সেটি দেশ, রাজনীতি ও রাজনীতিকদের জন্য সুখকর হবে বলে মনে হয় না।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

তদন্ত কমিটিতে সুপ্রিম কোর্ট ‘নোবডি’! by মিজানুর রহমান খান

আশঙ্কাই সত্যি হলো। বিচারক অপসারণের প্রস্তাবিত তদন্ত কমিটিতে কোনো কর্মরত বিচারককে রাখা হয়নি। এটা গ্রহণযোগ্য নয়। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ কখনো অতীতে এটা ভাবেনি। সেদিক থেকে এটা নজিরবিহীন। আইন কমিশন এই সুপারিশ চূড়ান্ত করার আগে তার সভায় আলোচনা করেছে যে কর্মরত বিচারক হয়ে আরেকজন কর্মরত বিচারকের বিষয়ে তদন্ত করায় স্বার্থের সংঘাত হতে পারে। তাই তারা কর্মরত বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত আগের কাউন্সিল প্রথা থেকে নাটকীয়ভাবে কর্মরত বিচারকমুক্ত একটি তদন্ত কমিটির সুপারিশ করেছে। একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি বা আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ও একজন ‘সম্ভ্রান্ত’ নাগরিক এর সদস্য হবেন। বিচারকের অপসারণে সংসদে দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থনের বিধান করা হয়েছিল, যাতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার রক্ষাকবচটা সুদৃঢ় হয়। আমরা মনে রাখব, বর্তমান সংসদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন কেবল সংসদনেত্রীর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। আর সংবিধানের ৭০ ধারার কারণে কোনো সাংসদের পক্ষেই স্বাধীন মত প্রকাশের সুযোগ নেই।
অধুনা লুপ্ত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ১৯৭৭ সাল থেকে একপ্রকার ঘুমিয়ে (একজনকে অপসারণ করেছে) ছিল, তার মূল দায় প্রধানমন্ত্রী বা সরকারপ্রধানদের। কারণ, সরকারি সিদ্ধান্ত ব্যতিরেকে কাউন্সিলকে তদন্ত শুরু করার অধিকার দেওয়া হয়নি। এ কারণে পাকিস্তান সম্প্রতি সংবিধান সংশোধন করে সেই অধিকার কাউন্সিলকে দিয়েছে। কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করার সিদ্ধান্ত কে নেবেন, সেটা অনেক বড় স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত। আমাদের জটিল সাংবিধানিক ভারসাম্য সুপ্রিম কোর্টকে বাদ দিয়ে বজায় রাখা সম্ভব নয়। সুপ্রিম কোর্ট বা প্রধান বিচারপতিকে ‘মি. নোবডি’ করাটা ঠিক হবে না (সাবেক প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ তাঁর মতামত না নিয়ে বিচারপতি নিয়োগ করায় আইনজীবীদের এক সভায় প্রধান বিচারপতির পদকে ‘মি. নোবডি’র পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়েছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন)। বিচারপতি নিয়োগে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলে অপসারণে তাঁকে নো বডি করার যুক্তি কী? ইংল্যান্ডে সবার আগে প্রধান বিচারপতি নিজেই এক সদস্যের তদন্ত কমিটি দিয়ে আনীত অভিযোগের সারবত্তা যাচাই করে নেন। অথচ শুনলাম ‘সহকর্মীদের বিষয়ে তদন্তে কর্মরতদের সীমাবদ্ধতা’র আশঙ্কা বিবেচনায় নিয়েছে আইন কমিশন। অথচ এটা এমন দেশ, যেখানে পুলিশের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ অন্য বিভাগ দিয়ে তদন্ত করানো হয় না।
আমাদের প্রস্তাবিত আইন বলেছে, স্পিকারের কাছে অভিযোগ দায়ের এবং তা যাচাইয়ের জন্য গঠিত ১০ সদস্যের একটি সংসদীয় কমিটি অভিযোগ ‘তদন্তযোগ্য’ বলে রিপোর্ট দিলেই তবে স্পিকার তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করবেন এবং সেই কমিটি অভিযোগ গঠন থেকে সাক্ষ্য–প্রমাণ ইত্যাদি করবে গোপনীয়তা বজায় রেখে। এতটা বাস্তবসম্মত কি না? তথ্য অধিকার আইন কি এখানে অকার্যকর থাকবে? ১৯৭০ সালে ১৯৯ জন সাংসদ এক বিচারকের বিরুদ্ধে অপসারণ প্রস্তাব আনলেও ভারতীয় স্পিকার তা নাকচ করেছিলেন। এ রকম একটি দৃশ্য আমরা যদি কল্পনা করতে না পারি, তাহলে গোপনে প্রাথমিক বাছাইয়ের জন্য অনধিক ১০ সাংসদকে নিয়ে গঠিত কমিটি কতটা সুরক্ষা দিতে পারবে?
ভারতের অগ্রগতিটা আমাদের অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বা ঔচিত্যবোধ প্রশ্নে আমাদের সংসদ নিশ্চয় লোকসভাকে অতিক্রম করেনি।
সেই ভারতীয় রাজনীতিকেরা মনমোহন সিংয়ের প্রধানমন্ত্রিত্বে ২০১২ সালে যে বিল পাস করেছিল, তাতে অভিযোগ তদন্তযোগ্য কি না, তা প্রাথমিকভাবে যাচাইয়ের ভার কার্যত স্পিকারের কাছ থেকে তুলে নিয়েছে। তিন সদস্যের ‘কমপ্লেইন্টস স্ক্রুটিনি প্যানেলে’ সুপ্রিম কোর্টের একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি এবং বর্তমান প্রধান বিচারপতির মনোনয়নে সুপ্রিম কোর্টের দুজন কর্মরত বিচারক রাখা হয়েছে। তাঁরা অভিযোগের সারবত্তা পেলে ওভারসাইট কমিটি তদন্ত শুরু করবে। এই নতুন নিয়ম এখনো কার্যকর হয়নি।
আমাদের প্রস্তাবিত আইনে বলা নেই যে অভিযুক্ত বিচারক তাঁর তদন্ত ও বিচারের প্রক্রিয়ার কোনো বৈধতার প্রশ্ন চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে কখন দ্বারস্থ হতে পারবেন। ২০১০ সালে ভারতের কর্ণাটক হাইকোর্টের বিচারপতি দিনাকরণকে অপসারণে রাজ্যসভায় গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি বহু ঝড়-তুফানের মধ্য দিয়ে অন্তত দুবার পুনর্গঠিত হয়েছিল। সুতরাং গোপনীয়তা লিখে দিলেই তদন্ত উদ্যোগ গোপন রাখা সম্ভব হবে না। পত্রিকায় খবর বেরোবে। দিনাকরণের তদন্ত কমিটিতে সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারকের নামভুক্তির খবর ছাপার পরে সংশ্লিষ্ট বিচারক লক্ষ করেন যে হিন্দুস্তান টাইমস-এ তাঁর বিষয়ে আপত্তির খবর বেরিয়েছে। সেটা দেখে তিনি কমিটি গঠনের আগেই সরে দাঁড়ান। তিনি চিঠি লেখেন যে ‘যদিও আমার কোনো স্বার্থের সংঘাত নেই, তদুপরি বিচার শুধু হলে হবে না, প্রতীয়মান হতে হবে। তাই নিজকে তফাতে রাখলাম।’ এ রকম আত্মমর্যাদাসম্পন্ন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক যাঁরা ডাক পাবেন, তাঁরা একই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে এ রকম চিঠি কি লিখবেন? আবার আপত্তি তুললেই সরে দাঁড়াতে হলে হয়তো কাউকে পাওয়া যাবে না। ওই দিনাকরণের তদন্ত কমিটিতে অভিযুক্ত বিচারক নিজেই এক জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর ব্যাপারে আপত্তি তুললে আইনজীবী সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছা ব্যক্ত করে চিঠি দেন। কিন্তু ভারতের তৎকালীন উপরাষ্ট্রপতি, যিনি রাজ্যসভার চেয়ারম্যান, তিনি তা অদরকারি মনে করেছিলেন। অভিযুক্ত বিচারক দিনাকরণ সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে কঠিন পরিশ্রমসাধ্য লেখা দীর্ঘ রায় বেরোল। আর তাতে বলা হলো, ওই আইনজীবীর পক্ষপাত প্রমাণিত। তাই তাঁকে রাখা যাবে না। এ রকম বৈধতার প্রশ্নে আমরা কি দ্রুত রায় পাব? নাকি অভিযুক্ত বিচারক তদন্তটা ঝুলিয়ে ফেলবেন।
সরকারি মহল ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছে যে তারা অভিযুক্ত বিচারককে ‘আত্মপক্ষ সমর্থনের’ বড় রকমের সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। ১৯৭৫ সালে প্রথম সংসদীয় অপসারণ প্রথা রহিত করা হয়। চতুর্থ সংশোধনীতে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি নোটিশ দিয়ে বিচারক অপসারণ করবেন। সেই তুলনায় এবারেরটা বিরাট রক্ষাকবচ। সরকারি মহলের দাবি, তারা ভারতের ১৯৬৮ সালের আইনের মতো কমিটি করছে। তথ্য হিসেবে তা ঠিক নয়। কারণ, ভারত তার ইতিহাসের কোনো পর্বেই কর্মরত বিচারকমুক্ত কোনো তদন্ত কমিটি করার ঝোঁক দেখায়নি। এখন আমরা যখন সাবেক বিচারপতিদের নেব, তখন তাঁদের নিয়োগ কী করে হয়েছিল তা মনে রাখব।
প্রধান বিচারপতি অপসারণে শ্রীলঙ্কা সরকারের গোঁয়ার্তুমি আমরা দেখলাম। তাদের তদন্ত কমিটির সবাই রাজনীতিক। এ প্রসঙ্গে আমরা ১৯৮৮ সালের মালয়েশীয় সংকটের দিকেও নজর দিতে পারি। মালয়েশীয় সংবিধানের ১২৫ অনুচ্ছেদে পাঁচজনের তদন্ত ট্রাইব্যুনালের বিধান আছে। এতে কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত বিচারক, এমনকি মালয়েশিয়ার বাইরের বিচারক আনারও বিধান রাখা হয়েছে। ওই সময়ে প্রধান বিচারপতিকে অপসারণে গঠিত তদন্ত ট্রাইব্যুনালের একটি অন্তর্বর্তী সিদ্ধান্ত পাঁচ সদস্যের একটি বেঞ্চ স্থগিত করেছিল। সেটা সরকারের মনঃপূত হয়নি, তাই তারা ওই বেঞ্চের প্রত্যেককে অপসারণে উদ্যোগী হলো, পরে তাঁদের দুজন অপসারিতও হন। সুতরাং সরকার যদি ক্ষমতার অপব্যবহারই চায়, তাহলে তা প্রতিহত করা কঠিন। তাই কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা আসলে অভিযুক্ত বিচারককে নয়, সরকারকেই বেশি সুরক্ষা দিতে পারে।
প্রতিবেশী ভারতসহ বিশ্বের অধিকাংশ গণতান্ত্রিক দেশে বিচার বিভাগকে যুক্ত রেখেই তদন্ত কমিটি হয়। ভারত ১৯৬৮ থেকে তাদের তিন সদস্যের কমিটিতে সুপ্রিম কোর্ট থেকে একজন (প্রধান বিচারপতি বা সুপ্রিম কোর্টের অন্য কেউ), রাজ্য হাইকোর্টের একজন প্রধান বিচারপতি এবং বাইরের একজন বিশিষ্ট আইনবিদকে রেখেছে। ২০১২ সালের উল্লেখিত বিলে পাঁচ সদস্যের ওভারসাইট কমিটির প্রস্তাব করেছে। আগে যে তিন সদস্যের বাছাই কমিটির কথা বলেছি, তারা যদি কোনো অভিযোগ তদন্তযোগ্য মনে করে তাহলেই এই ওভারসাইট কমিটি মূল তদন্ত শুরু করবে। ওভারসাইট কমিটির চেয়ারম্যানও একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি। এতে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির মনোনয়নে সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের একজন প্রধান বিচারপতি থাকবেন। আর থাকবেন অ্যাটর্নি জেনারেল ও রাষ্ট্রপতির মনোনয়নে একজন বিশিষ্ট আইনবিদ। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে সুপ্রিম কোর্ট বা নির্বাহী বিভাগ কেউ যাতে তদন্ত কমিটিতে প্রাধান্য বিস্তার করতে না পারে, সেদিকে বিশেষভাবে নজর রাখা হয়েছে। আর আমাদের আইন কমিশন নিরঙ্কুশভাবে শুধু স্পিকারের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করেছে। ওই বিল অবশ্য বলেছে, তদন্ত কমিটি ইন-ক্যামেরা বা গোপনে সভা করবে।
সুতরাং বিচারক অপসারণে কর্মরত বিচারপতিদের নিয়ে গঠিত বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের গঠনের দিকে নজর দিতেই হবে। সেখানে প্রধান বিচারপতি ও আপিল বিভাগের পরবর্তী দুজন জ্যেষ্ঠ বিচারক ছিলেন। এখন সেখান থেকে শতকরা ১০০ ভাগ সরে আসা সমীচীন হবে না। ওই তিনজনের সঙ্গে বাইরে থেকে দুজন আইনবিদকে অন্তর্ভুক্ত করার মতো বিকল্প ভাবা যেতে পারে। এটা সুখকর যে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক আশ্বস্ত করেছেন যে এই আইন করার আগে অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করবেন। আইন কমিশনের খসড়া প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয় আইন কমিশনের কাছে একটি খসড়া পাঠিয়েছিল, সেটাকেই তারা সংশোধন করে ১৩ পৃষ্ঠার একটি রিপোর্ট দিয়েছে, যা গত ডিসেম্বরে সরকারের হাতে ফিরে গেছে। এই রিপোর্ট পড়ে বোঝা যায় না, এই আইনের খসড়া তৈরিতে সরকারের মনে কী ছিল। কারণ, আইন মন্ত্রণালয় যে আদৌ আইন কমিশনকে খসড়া দিয়েছিল তার কোনো উল্লেখ নেই। সেই খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে পেতে চাই। সুপ্রিম কোর্টের মতামতও আমরা তাদের ওয়েবসাইটে পাওয়ার আশা করি। সংসদীয় অপসারণ প্রথা প্রসঙ্গে আইন কমিশনের রিপোর্টে ইংল্যান্ডের সুখপাঠ্য প্রাচীন ইতিহাসের বিবরণ আছে কিন্তু কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোতে এই প্রথাটাই যে জনপ্রিয় তা কিন্তু নয়।
আর সব অসদাচরণ বা অদক্ষতাই অপসারণযোগ্য নয়, অথচ তার লঘু প্রতিকার দরকার। এ জন্য একটি পিয়ার রিভিউ কমিটি থাকতেই হবে, আইন কমিশনের প্রতিবেদনে এর কোনো উল্লেখ না থাকা দুর্ভাগ্যজনক। সেই কাজ করাতে বিলুপ্ত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে জীবিত করতে হবে। অপসারণ তদন্তে যখন অ্যাডহক তদন্ত কমিটি হবে, তখন এই কাউন্সিলের তিনজনের সঙ্গে বাইরের দুজন যুক্ত হবেন। আর অসদাচরণের সংজ্ঞায় গুরুতর অদক্ষতাকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com