Thursday, September 12, 2024

বিতর্কে কমলা জিতেছেন, নাকি ট্রাম্পই তাঁকে জিতিয়ে দিয়েছেন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে প্রধান দুই প্রার্থী কমলা হ্যারিস ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মুখোমুখি বিতর্কে কে জিতেছেন, তা নিয়ে কয়েকটি অনানুষ্ঠানিক জনমত জরিপের ফল প্রকাশ হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরাও এ নিয়ে নিজেদের মত দিচ্ছেন। জনমত জরিপ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বেশির ভাগেরই রায় হলো, বিতর্কে কমলাই জিতেছেন।

বিতর্কে দর্শকদের ওপর সিএনএন পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, কমলা হ্যারিস জয়ী হয়েছেন। ৬৩ শতাংশ মানুষ তাঁকে জয়ী বলে মনে করছেন। আর ট্রাম্পকে জয়ী মনে করছেন ৩৭ শতাংশ মানুষ।

নিবন্ধিত ভোটারদের ওপর ইউগভ পরিচালিত অপর এক জরিপেও দেখা গেছে, বেশির ভাগ মানুষ কমলা হ্যারিসকে জয়ী বলে মত দিয়েছেন। এমনকি রক্ষণশীলদের টিভি নেটওয়ার্ক ফক্স নিউজের বিশেষজ্ঞরাও বলেছেন যে ট্রাম্পকে পরাজিত করেছেন কমলা।

বিতর্কের পর সিদ্ধান্তহীনতায় থাকা ভোটারদের নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো জরিপের ফল এখনো প্রকাশ হয়নি। জরিপের ফল প্রকাশ হতে কয়েক দিন লেগে যেতে পারে। আর প্রার্থীরা কে কেমন করলেন, তার ওপর ভিত্তি করে ভোটারদের অনেকে তাদের সিদ্ধান্ত পাল্টে ফেলবেন কিনা, তা নিশ্চিত নয়।

তবে কমলা হ্যারিস কি আসলেই জিতেছেন, নাকি ট্রাম্পের দুর্বলতাই তাকে বিজয়ী করে তুলেছে?

এ ব্যাপারে কয়েকজন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলেছে আল জাজিরা। তাঁরা বিতর্ক, রাজনৈতিক বক্তব্য, মনস্তত্ত্ব এবং যোগাযোগসংক্রান্ত বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। তাঁদের কেউ কেউ বলেছেন ট্রাম্পের দুর্বল জায়গাগুলোতে খোঁচা দিয়ে সাফল্য পেয়েছেন কমলা হ্যারিস। আবার কেউ কেউ বলছেন, ট্রাম্পকে বিচলিত করে দেওয়ার কৌশল প্রয়োগ করেছিলেন কমলা। আর তা করতে গিয়ে তিনি ভোটারদের নিজের নীতিমালা কী হবে, সে সম্পর্কে খুব বেশি কিছু বলতে পারেননি।

যুক্তরাষ্ট্রের হফসট্রা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক টোমেকা এম রবিনসন বলেন, তিনি (কমলা) বিতর্কে জিতেছেন এবং এমনি এমনিই যে জিতে গেছেন এমনটা নয়।

ট্রাম্প সম্পর্কে রবিনসনের মত হলো, রিপাবলিকান এ নেতা বিভিন্ন বিষয়ে নিজের অবস্থানে অটল থাকতে পারেননি। তিনি মনে করেন, অবৈধ অভিবাসী এবং প্রজননবিষয়ক (গর্ভপাতের অধিকার) একই ধরনের আক্রমণাত্মক বক্তব্য না দিয়ে ট্রাম্পের উচিত ছিল প্রেসিডেন্ট হলে তাঁর নীতিমালা কী হবে, তা নিয়ে বলা।

বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণমাধ্যমবিষয়ক অধ্যাপক ট্যামি আর ভিজিলও বলেছেন, ট্রাম্পের দুর্বলতাগুলোকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়েছেন কমলা। তবে তিনি তাঁর নীতিমালাসংক্রান্ত পরিকল্পনাগুলো সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি।

ভিজিল আল জাজিরাকে বলেন, ‘হ্যারিস বিতর্কে জিতেছেন। কারণ, তিনি ভালো করেই জানতেন যে ঠিক কোন জায়গায় খোঁচা দিলে ট্রাম্প তাঁর চিরাচরিত রূপে নিজেকে প্রকাশ করতে শুরু করবেন। তিনি যা বলেন, তা খুব কম সময়েই সত্য হয়। তিনি চান কথাগুলোকে দর্শকেরা আবেগ দিয়ে বিবেচনা করুক, যুক্তি দিয়ে নয়। মঙ্গলবার রাতেও তিনি একই কাজ করেছেন।’

অত্যন্ত ক্ষুব্ধ এবং অসংলগ্ন ছিলেন ট্রাম্প

বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ আবার আগের বিতর্কে ট্রাম্পের আচরণের সঙ্গে গত মঙ্গলবার রাতের বিতর্কে তাঁর আচরণের তুলনা করছেন। আগের বিতর্কে ট্রাম্পের মুখোমুখি হয়েছিলেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তবে ট্রাম্পের কাছে বিতর্কে ধরাশায়ী হওয়ার পর বাইডেন তাঁর প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

নর্থইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক নিক বিউচ্যাম্প আল জাজিরাকে বলেন, প্রথম বিতর্কে বাইডেন নিজেই নিজের ধ্বংস ডেকে এনেছিলেন।  ট্রাম্প ধৈর্য সহকারে অপেক্ষা করে, শান্ত থেকে এবং বেশির ভাগ সময় নিজের বার্তা দেওয়ার মধ্য দিয়ে কাজটি আরও সহজ করে তুলেছিলেন। অপর দিকে কমলা-ট্রাম্প বিতর্কে কমলা একনাগাড়ে ট্রাম্পকে খোঁচা দিচ্ছিলেন, বিদ্রূপ করছিলেন এবং ছোটখাটো অপমান করে যাচ্ছিলেন। আর এতে ট্রাম্প কোণঠাসা হয়ে পড়েন। তিনি ক্রমাগত রেগে যেতে থাকেন এবং অসংলগ্ন আলোচনা করতে থাকেন।

কমলা সম্পর্কে বিউচ্যাম্প বলেন, তিনি (কমলা) নিজের সম্পর্কে, নিজের মূল্যবোধ সম্পর্কে খুব একটা স্পষ্ট ধারণা দিতে পারেননি। বরং তিনি ট্রাম্পকে বেসামাল করে দেওয়ার চেষ্টাতেই ব্যস্ত ছিলেন।
মিথ্যা নিয়ে ট্রাম্পের কিছু আসে যায় না

সত্যতা যাচাই–সংক্রান্ত সংস্থাগুলো ট্রাম্পকে ভুল প্রমাণের মতো অনেক তথ্য পেলেও বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করেন, বিতর্কে কে জিতেছেন, তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। কারণ, সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে ভুল এবং অযৌক্তিক সব দাবি করেন, তা নতুন কিছু নয়, তা অনেক আগেই প্রমাণিত। বরং তাঁর এসব কথাবার্তার কারণে অন্য অন্য রাজনীতিকদের ক্যারিয়ার নষ্ট হয়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দুই প্রার্থীর কাছ থেকে দুই ধরনের আচরণ যখন আশা করা হয়, তখন বিতর্কের ফলাফল নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে যায়।

উইলিয়ামস কলেজের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক স্টিভেন ফেইন বলেন, যখন একজন প্রার্থীর কাছ থেকে সত্য কথা শোনার প্রত্যাশাই করা হয় না, আবার অন্য প্রার্থীর কাছ থেকে নীতিমালা বিষয়ে স্পষ্টবাদী হওয়ার মতো প্রচলিত মানদণ্ড পূরণের আশা করা হয়, তখন একটি বিতর্ককে বস্তুনিষ্ঠভাবে মূল্যায়ন করা সহজ নয়।

মঙ্গলবার রাতে কমলার বিরুদ্ধে ট্রাম্প যেসব মিথ্যা কথা বলেছেন, সেগুলো উল্লেখ করে ফেইন বলেন, ‘সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা মানুষেরা বলেন, তারা দুই প্রার্থীর মধ্যে ভিন্নতা দেখেন না। কারণ, হ্যারিস তাঁর নীতিমালা নিয়ে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলেননি। এটা আপেলকে কমলার সঙ্গে তুলনা না করে ওয়াশিং মেশিনের সঙ্গে তুলনা করার মতো হয়ে যায়।’

আল জাজিরার বিশ্লেষণ 

কমলা হ্যারিস ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে মঙ্গলবার সরাসরি বিতর্ক হয়

সর্বাত্মক চেষ্টা থাকবে ভারতের সঙ্গে সবচেয়ে সুসম্পর্ক বজায় রাখা -ডয়চে ভেলেকে সাক্ষাৎকারে ড. ইউনূস

জার্মান সম্প্রচারমাধ্যম ডয়চে ভেলেকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম মাসে নেওয়া নানা উদ্যোগ এবং আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনাসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ডয়চে ভেলের আরাফাতুল ইসলাম

প্রশ্ন: আপনি প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণের পর এক মাস পূর্ণ হলো। গত কয়েক সপ্তাহে কোন কোন বিষয়কে আপনি অগ্রাধিকার দিয়েছেন?

ড. মুহাম্মদ ইউনূস: আমার তো অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা না। অগ্রাধিকারগুলো সামনে এসে গেছে। আমি বাছাই করার সুযোগও পাইনি। শান্তিশৃঙ্খলা হলো সবার প্রথমে। যেহেতু বিপ্লবের মধ্য দিয়ে আমরা আসছি, সরকার গঠন করেছি, কাজেই প্রথম দায়িত্ব হলো শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। এটার ওপরেই জোর দেওয়া হচ্ছে। এ রকম বিপ্লব বাংলাদেশের ইতিহাসে আগে হয় নাই। ছাত্রদের সঙ্গে সাধারণ জনগণ এগিয়ে এসেছে। এমন কোনো লোক ছিল না যে এটাতে শরিক মনে করে নাই। জনমত নির্বিশেষ এই আন্দোলনে শরিক হয়েছে। আমরা একটা বিরাট দায়িত্ব নিয়ে আসছি। এদিকে হলো বিপ্লব আর এদিকে স্বপ্ন। শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে আমরা নতুন বাংলাদেশ গড়ব। মানুষের সীমাহীন আকাঙ্ক্ষা। আমাদের দায়িত্ব অনেক। অর্থনীতি বিশৃঙ্খল, ভঙ্গুর হয়ে গিয়েছিল। যে কারণে মানুষ এত বিক্ষুব্ধ। সবকিছু লুটপাট। এটা লুটের একটা সরকার ছিল। কাজেই সেই লুটের সরকার থেকে সত্যিকার সরকার, জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা—এটাও মানুষের একটা আকাঙ্ক্ষা। এবং এটা দ্রুত দেখতে চায়। সেগুলো আমাদের করার চেষ্টা। এক মাসের মধ্যে আমাদের যতটুকু সম্ভব করেছি।

প্রশ্ন: রাষ্ট্র সংস্কারের পাশাপাশি সংবিধান পুনর্লিখনের দাবিও উঠেছে। বলা হচ্ছে, সংবিধান পুনর্লিখন ছাড়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?

ড. মুহাম্মদ ইউনূস: এটা মস্ত বড় সুযোগ। এই সুযোগ জাতির জীবনে আর আসবে কিনা জানি না। না আসাটাই স্বাভাবিক হোক। গোড়াতে হাত দিতে হবে, সংবিধানে হাত দিতে হবে। তো সেখানে প্রশ্ন হচ্ছে—সংবিধান নতুন করে লিখতে হবে, নাকি এই সংবিধানই কিছু সংশোধন করা হবে? এ বিষয়ে মতভেদ আছে। এ জন্য কমিশন হবে, বিচার বিবেচনা করবে, একমত হবে। এর ওপর ভিত্তি করে নির্বাচন হবে। এটা না হওয়া পর্যন্ত তো আমরা নির্বাচনের রূপরেখা ঠিক করতে পারছি না। কী ধরনের নির্বাচন হবে, কী কী নির্বাচন হবে—সবকিছুই সংবিধানের ভেতরে থাকবে। পুরো আন্দোলনের ব্র্যান্ড নেম হচ্ছে সংস্কার। সংস্কার হচ্ছে আকাঙ্ক্ষা। আমরা সেই আকাঙ্ক্ষার অংশীদার। আমরা দায়িত্ব নিয়েছি যেন আমরা সেই আকাঙ্ক্ষা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পূরণ করতে পারি।

প্রশ্ন: বাংলাদেশের অর্থনীতি কয়েক বছর ধরেই নানা রকম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ডলার–সংকট, ঋণের নামে ব্যাংক লুটপাট আর বিদেশে অর্থ পাচার এই সংকটকে তীব্র করেছে বলে বিশেষজ্ঞদের মতামত। সাম্প্রতিক সময়ে শ্রমিক অসন্তোষসহ নানা আন্দোলনেও রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ব্যবসা ও অর্থনীতিকে পুনরায় সন্তোষজনক অবস্থানে ফিরিয়ে নেওয়ার পথে কী কী বাধা দেখছেন?

ড. মুহাম্মদ ইউনূস: লুটপাটের একটি অর্থনীতি। তার একমাত্র লক্ষ্য ছিল নিজের টাকাপয়সা করার আগ্রহ। ৬০ হাজার কোটি টাকা শুধু ছাপানো হয়েছে তাদের সুবিধার জন্য; কিন্তু মানুষের যে মূল্যস্ফীতি হবে, এটার দিকে তাদের কোনো মনোযোগ ছিল না। ব্যাংকিং সিস্টেম পুরোটাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলতে কোনো জিনিস ছিল না। এগুলো সমস্ত কিছু নতুন করে গড়ে তুলতে হচ্ছে। সব কিছু নতুন করে করতে হচ্ছে। দেশকে বাঁচাতে হলে, সামনে নিয়ে যেতে হলে করতে হবে। আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য ভিত্তিটা করতে হবে। কিছুটা শৃঙ্খলা এসেছে। সবটা পেরে গেছি তা না। বৈদেশিক মুদ্রার অভাব আছে। বড় বড় প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। বিশাল বিশাল অঙ্কের ঋণ নেওয়া হয়েছে, সেগুলো শোধ করার পালা এসেছে আমাদের ওপরে। ওনারা নিয়ে গেছেন, ভোগদখল করেছেন। এখন টাকাটা জনগণকে শোধ করতে হবে। সেই পরিশোধের টাকা কোথা থেকে আসবে, কীভাবে আসবে—এটা আমাদের বড় চিন্তা। আমরা পৃথিবীর সামনে এমন একটা রাষ্ট্র হতে চাই না, যে তার অঙ্গীকার রক্ষা করতে পারে না। আমরা অঙ্গীকার রক্ষা করতে চাই। অর্থনীতিকে মজবুত ভিত্তির ওপরে দাঁড় করাতে চাই, যেন ভবিষ্যতে এই পরিস্থিতি না হয়।
প্রশ্ন: ছাত্রদের নেতৃত্বে গণ–অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে সুশাসনের বিষয়টি নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। বিশেষ করে নাগরিক অধিকার, মানুষের নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার, পুলিশের সেবা পাওয়ার অধিকার এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত করা যায়নি বলে নানা মহল থেকে দাবি করা হয়েছে। এ বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

ড. মুহাম্মদ ইউনূস: চেষ্টা করছি আমরা; কিন্তু পুরোপুরি হয়নি। অনেক লোক পালিয়ে গেছেন, যাঁরা জনপ্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ছিলেন। অথবা যাঁরা আছেন, তাঁদের সহকর্মীরা তাঁদের ওপর ভয়ানক বিক্ষুব্ধ। বিক্ষোভের মুখে তাঁরা পদত্যাগ করে চলে গেছেন। কাজেই এক বিরাট শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। জনপ্রশাসনে এই শূন্যতা পূরণ আবার মুশকিল। এরে দিলেন ওরে কেন দিলেন না ইত্যাদি ইত্যাদি প্রশ্ন উঠছে। তো এর মধ্য থেকেই আমরা মানুষকে বোঝাচ্ছি; দেখো, আমাদের বিবেচনায় যেটা সঠিক, সেটাই আমরা করছি। আমাদের ওপর আস্থা রাখেন। বহু পরিবর্তন হয়েছে। প্রধান বিচারপতি নিয়োগ হয়েছে। সব ভিসিই (উপাচার্য) চলে গেছেন। ভিসি নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, সঙ্গে প্রোভিসি দিতে হচ্ছে। এই নিয়োগে সবাই খুশি। আবার নতুন করে বিচারব্যবস্থা চালু হবে। অনেকগুলো পরিবর্তন আমাদের একসঙ্গে করতে হচ্ছে। অবস্থা উন্নতির দিকে যাচ্ছে।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী জুলাই-আগস্টে আন্দোলন চলাকালে এক হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এসব হত্যাকাণ্ডের বিচারে আপনার সরকারের তরফ থেকে এখন অবধি নেওয়া পদক্ষেপে আপনি কি সন্তুষ্ট?

ড. মুহাম্মদ ইউনূস: না, এখনো সন্তুষ্ট হওয়ার সময় আসে নাই তো। আমাদের প্রথম দৃষ্টি হচ্ছে তালিকা করা, যেটার কথা আপনি বললেন। আমরা প্রত্যেকের তথ্য নিয়ে ডেটাবেজ তৈরি করছি। আমাদের ভয় হলো, আমরা যদি এটা না করি কিছুদিনের মধ্যে ভুয়া শহীদ ইত্যাদি শুরু হয়ে যাবে। কাজেই এটা থেকে আমরা বাঁচতে চাই। আমরা ওয়াদা করেছি, প্রত্যেকটা শহীদ পরিবারের দায়িত্ব আমরা গ্রহণ করব। সরকারের পক্ষ থেকে আমরা গ্রহণ করব। কাজেই এটার সংখ্যা নির্দিষ্ট হয়ে যেতে হবে। যেন এক বছর পরে কেউ এসে না বলতে পারে যে আমার পরিবার শহীদের পরিবার। আমরা খুঁজে খুঁজে বের করছি। আমরা একটা ফাউন্ডেশন করেছি। একটা স্থায়ী ফাউন্ডেশন তাদের পরিবারকে দেখাশোনা করার জন্য। যারা বেঁচে আছে, তাদের মিলিয়ে আমরা কর্মসূচি নিচ্ছি।

প্রশ্ন: বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা গত কয়েক দশকে বিভিন্ন সরকারের সময় বেশ কয়েকবার শোনা গেছে। সর্বশেষ শেখ হাসিনা সরকারের পতনের সময়ও এ ধরনের হামলা ঘটেছে বলে জানিয়েছে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ ও হিন্দু মহাজোট নামের দুটো সংগঠন। সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধের দাবিতে রাজপথে নানা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিও দেখা গেছে গত কয়েক সপ্তাহে। এ ক্ষেত্রে স্থায়ী সমাধান কী হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

ড. মুহাম্মদ ইউনূস: এটা বাংলাদেশের একক সমস্যা না। সব দেশেই সংখ্যালঘু নিয়ে সমস্যা হয়। যুক্তরাষ্ট্রেও সংখ্যালঘু নিয়ে সমস্যা আছে। সরকারের দায়িত্ব এটা না হওয়া। সংবিধানের অধিকার সবার প্রাপ্য। আমরা তো হিন্দুর প্রাপ্য, মুসলমানের প্রাপ্য, কি বৌদ্ধর প্রাপ্য—এ রকম করে ভাগ করে দেই নাই। সরকারের দায়িত্ব হলো এই অধিকারগুলো প্রতিষ্ঠা করা। এই অধিকারগুলো প্রতিষ্ঠা হলেই আর ধর্মীয় বিভাজনের প্রশ্ন উঠবে না। যত দিন প্রতিষ্ঠিত না হচ্ছে, তত দিন আমাদের দায়িত্ব নিতে হবে। তবে আমি বলব, যে পরিমাণ প্রচার হচ্ছে সে পরিমাণ আমাদের দৃষ্টিতে আসছে না। আমরা বারে বারে খোঁজখবর নিচ্ছি; কিন্তু মনে হচ্ছে না যে অত বড় কিছু আসলে হচ্ছে। অনেকে এটা রাজনৈতিক কারণে ব্যবহার করছে। যেটুকু হচ্ছে সেটা যেন না হয়, শূন্যের কোঠায় পৌঁছায়, সেদিকে আমরা যাব।
প্রশ্ন: ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী এবং দুটো দেশ নানাভাবে একে অপরের ওপর নির্ভরশীল; কিন্তু ‘ভারতের শক্তিশালী মিত্র’ হিসেবে পরিচিত শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কে একধরনের টানাপোড়েন দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আপনি কোন বিষয়গুলোকে বিবেচনায় নিচ্ছেন?

ড. মুহাম্মদ ইউনূস: ভারত আমাদের প্রতিবেশী এবং আমাদের একমাত্র প্রতিবেশী বলা যায়। কারণ, চারদিক থেকেই ভারত আমাদের আছে। কাজেই তার সঙ্গে আমাদের সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক হওয়া উচিত এবং হবে। এ ছাড়া আমাদের গত্যন্তর নাই, তাদেরও গত্যন্তর নাই। দুই দেশের মধ্যে বৈরী সম্পর্ক রেখে কেউ লাভবান হবে না। আমাদের সর্বাত্মক চেষ্টা হবে সবচেয়ে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। বন্ধুত্বের শীর্ষ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া—এটাই আমাদের উদ্যোগ। পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক আইন আছে। দুই দেশের মধ্যকার চলমান বিরোধ নিরসনে দুই দেশ আন্তর্জাতিক আইন মেনে নিলেই সেটির সমাধান হবে। সার্ক একটা পরিবারের মতো ছিল। আমরা সেই কাঠামোতে ফিরে যেতে পারি কি না দেখব। শুধু ভারতের সঙ্গে না, দক্ষিণ এশিয়ায় যত দেশ আছে সবাই যেন পরস্পরের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখে। শান্তিপূর্ণ জোন হিসেবে আমরা একে গড়তে চাই। বাধাবিপত্তি এড়িয়ে সার্ক ও বিমসটেককে সক্রিয় করার করার চেষ্টা করব।
প্রশ্ন: বিগত সরকারের নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনেক ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগপন্থীদের প্রাধান্য দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল। আপনার নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অনেক পদে পরিবর্তন আনা হয়েছে। পাশাপাশি এই অভিযোগও উঠতে শুরু করেছে যে কিছু পদে নতুন যাদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, সেখানে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ে পরিচিতরা প্রাধান্য পাচ্ছেন। এ ব্যাপারে আপনার মূল্যায়ন কী?

ড. মুহাম্মদ ইউনূস: এটা উল্টোভাবে দেখতে পারেন। যেহেতু উনি সিভিল সার্ভিসে আছেন, উনি একটা পোস্টিং পাবেন। দল ছাড়া কেউ কিছু এখানে করতে পারত না। আমাদের চেষ্টা করতে হবে দল যেন না আসে। এ দলেও নাই, ওই দলেও নাই এমন কাউকে বাংলাদেশে খুঁজে পাওয়া যাবে না। এমনভাবে চলতে হবে যেন দলটা যেন ভারী না হয়ে যায়। আমাদের যেহেতু নিজেদের দল নাই, আমরা নির্দলীয়ভাবে দেখতে পারি।
প্রশ্ন: বাংলাদেশে আগামী নির্বাচন কবে নাগাদ অনুষ্ঠিত হতে পারে? সেই নির্বাচনের মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আপনি কতটা আশাবাদী?

ড. মুহাম্মদ ইউনূস
: আমি পুরোপুরি আশাবাদী। এটা না হলে তো এই সরকারের অর্থই হবে না। নির্বাচন করতে হবে। বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো নির্বাচন হিসেবে যেন গৃহীত হয়। তাহলে মনে করব যে আমাদের এই সময়টা সার্থক হয়েছে। সেটার জন্য পরিবেশ সৃষ্টি লাগে, আইন লাগে। সংবিধান হলে নির্বাচনী আইন, নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে। তাদের মতামত পাব। এই সরকারের বড় জিনিস হলো সংস্কার। এই সংস্কার সম্পন্ন করতে হবে। এই সুযোগ আর জীবনে ফিরে আসবে না। আমাদের সব কিছু কলাপ্স করে গেল—এমন যেন না হয়। হঠাৎ করেই সবকিছু জিরোতে গিয়ে পৌঁছাবে না। পুরাতন বাংলাদেশ ইতি। এটা নতুন বাংলাদেশ, আমরা নতুন বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে জেগে উঠব।

ডয়চে ভেলেকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে কূটনীতি, অর্থনীতি, নির্বাচন আয়োজনসহ নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস
ডয়চে ভেলেকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে কূটনীতি, অর্থনীতি, নির্বাচন আয়োজনসহ নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস

ফ্যাসিবাদের মেকানিক্স: শেখ হাসিনার সরকারের উত্থান ও পতন by ড. সিরাজুল আই. ভূঁইয়া

ফ্যাসিবাদ এমন একটি শব্দ যা নিপীড়ন এবং ভীতির সঞ্চার করে। প্রায়শই কর্তৃত্ববাদী ক্ষমতা, ভিন্নমতের ওপর নির্মম দমন, চরম জাতীয়তাবাদ এবং একক নেতার হাতে কুক্ষিগত ক্ষমতাকে বোঝাতে এই শব্দ ব্যবহার  করা হয়। বাংলাদেশের জনগণ যারা শেখ হাসিনার অধীনে বছরের পর বছর কর্তৃত্ববাদ সহ্য করেছে, তারা এই বৈশিষ্ট্যগুলোর সঙ্গে পরিচিত। হাসিনার শাসনের পতন ইতিহাস জুড়ে অনেক ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনকে প্রতিফলিত করে। যাদের উত্থান হয় ভয় ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে। কিন্তু অবশেষে জনগণের প্রতিরোধ ও দুঃশাসনের ভারে অনিবার্যভাবে সেই শাসন ভেঙে পড়ে। হাসিনা যে দমনমূলক নীতি প্রয়োগ করেছিলেন এবং যে শক্তি তার পতনের কারণ ছিল তা বিশ্লেষণ করে আমরা ফ্যাসিবাদের প্রকৃতি এবং এর ব্যর্থতাকে আরও ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারি।

ফ্যাসিবাদ ও এর মূল বৈশিষ্ট্য

ফ্যাসিবাদ বেশকিছু মৌলিক নীতির উপর নির্ভর করে-
 
১. সর্বগ্রাসী নেতৃত্ব: ফ্যাসিবাদী শাসন ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করে একক নেতার চারপাশে, যিনি সমস্ত বিষয়ে চূড়ান্ত কর্তৃত্বের অধিকারী হিসেবে অবস্থান করেন। রাজনৈতিক ভিন্নমতের কোনো অবকাশ সেখানে থাকে না এবং সেই নেতাকে নির্দোষ হিসাবে চিত্রিত করা হয়।

২.  বিরোধীদের দমন: ফ্যাসিবাদের একটি মূল নীতি হল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করা। ভীতি প্রদর্শন, কারাবাস বা এমনকি সহিংসতার মাধ্যমেই হোক না কেন, ফ্যাসিবাদী শাসনগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণের সম্ভাব্য হুমকিকে দমন করে।

৩. তথ্য ও প্রচারের ওপর নিয়ন্ত্রণ: ফ্যাসিস্ট নেতারা প্রচারের ওপর খুব বেশি নির্ভর করে। এর মাধ্যমে তারা তাদের শাসনকে মহিমান্বিত করে এবং যে কোনো বিরোধিতাকে নির্মূল করে। মিডিয়া আউটলেটগুলো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় এবং বাকস্বাধীনতাকে মারাত্মকভাবে খর্ব করা হয়।

৪. জাতীয়তাবাদ ও জেনোফোবিয়া: ফ্যাসিবাদ প্রায়শই চরম জাতীয়তাবাদকে উৎসাহিত করে, যেখানে রাষ্ট্রকে ‘উচ্চতর’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয় এবং যে কোনও বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ ভিন্নমতকে ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। প্রায়শই সংখ্যালঘু বা প্রান্তিক গোষ্ঠী জেনোফোবিয়া এবং বর্ণবাদের শিকার হয়।

৫. অর্থনৈতিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ: ফ্যাসিবাদী সরকারগুলো প্রায়ই অর্থনীতির উপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ জোরদার করে। শাসক শ্রেণি নিজেদের সমৃদ্ধ করার জন্য শ্রমিক শ্রেণিকে উপেক্ষা করে বা নিপীড়ন করে। সামরিক শক্তির নিয়ন্ত্রণ হাতে নিয়ে সরকার আন্তর্জাতিক স্তরে নিজের আক্রমণাত্মক অবস্থান তুলে ধরে বা দেশের অভ্যন্তরে পুলিশিং চালায় ।

এখন শেখ হাসিনা সরকারের ক্ষেত্রে এই বৈশিষ্ট্যগুলো প্রয়োগ করলে দেখা যাবে সেখানে কোনো অমিল নেই। বিশেষ করে ক্ষমতার  একত্রীকরণ, ভিন্নমত দমন এবং মিডিয়া ও বিরোধীদের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে।

শেখ হাসিনার সরকার: ফ্যাসিবাদী

শেখ হাসিনা তার ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অনেকগুলো বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করেছিলেন। ক্ষমতার ওপর তার দখল সুসংহত করা থেকে শুরু করে বিরোধী দলগুলো কোনঠাসা করা-তার নেতৃত্ব গণতন্ত্রের ছদ্মবেশে কর্তৃত্ববাদে পরিণত হয়েছিল। এখানে কিছু মূল কারণ রয়েছে যা প্রকাশ করে যে কীভাবে তার সরকার ফ্যাসিবাদী শাসনের অনুরূপ কাজ করেছিল:

১. ক্ষমতা একত্রীকরণ ও এক-দলীয় রাষ্ট্র

হাসিনার সরকার ক্রমবর্ধমানভাবে রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে কেন্দ্রীভূত করেছে, যা ফ্যাসিবাদের সর্বগ্রাসী দিককে প্রতিফলিত করে । তার শাসনামলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোতে কারচুপির অভিযোগ উঠেছিলো এবং বিরোধী দলগুলো, বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রায়ই প্রান্তিক হয়ে পড়েছিল বা নির্বাচনে সরাসরি অংশগ্রহণে অসম্মত ছিল। ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের কুখ্যাত নির্বাচনে ভোট কারচুপি এবং কম ভোটার উপস্থিতির ব্যাপক অভিযোগ সামনে এসেছে। বিশেষ করে বিরোধী সমর্থকদের কাছ থেকে, যা তার সরকারের প্রতি জনগণের অনাস্থাকে প্রতিফলিত করে।

২. বিরোধী ও ভিন্নমত দমন

হাসিনার শাসনব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন। তার সরকার ভিন্নমতের বিরুদ্ধে দমন, বিরোধী দলের প্রধান নেতাদের গ্রেপ্তার এবং সাংবাদিকদের মুখ বন্ধ করার জন্য বিশেষ পরিচিত ছিল। ২০১৮ সালে পাস হওয়া বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, সরকারকে রাষ্ট্র বা এর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ‘মানহানিকর’ বক্তব্য পেশ করার জন্য কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করার অনুমতি দেয়, যা কার্যকরভাবে বাকস্বাধীনতা রোধ করার সমতুল্য। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো বারবার বিরোধী দলের কর্মীদের গণবন্দি এবং বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিতর্কের জায়গা সঙ্কুচিত করার বিষয়ে সরকারকে সতর্ক করেছে ।

৩. মিডিয়া ও তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ

শেখ হাসিনার সরকার বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তথ্য প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত প্রচেষ্টা চালিয়েছে, যা ফ্যাসিবাদের আরেকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। সরকার ব্যাপকভাবে মিডিয়ার ওপর নজরদারি ও সেন্সর করেছে। সমালোচনামূলক কণ্ঠস্বরকে দমিয়ে রাখা হয়েছে। স্বাধীন সাংবাদিকরা হয়রানি, গ্রেফতার বা আরও খারাপ আচরণের সম্মুখীন হয়েছেন। গণমাধ্যমের জন্য ক্রমবর্ধমান সীমাবদ্ধ পরিবেশ প্রতিফলিত করে হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী সংবাদপত্রের ফ্রিডম র‌্যাঙ্কিংয়ে নিচের দিকে নেমে গেছে।

৪. জাতীয়তাবাদ ও ‘মুক্তিযুদ্ধের’ উত্তরাধিকার

জাতীয়তাবাদ ছিল শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বৈধতার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। তিনি প্রায়শই তার পিতা বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা তথা  ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করতেন। তার নেতৃত্বে এই ঐতিহাসিক আখ্যানটি শুধুমাত্র রাজনৈতিক ক্ষমতাকে সুসংহত করার জন্যই নয় বরং জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা জাগিয়ে তোলার জন্য এবং তার সরকারকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রকৃত রক্ষক হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল।

শেখ হাসিনার সরকার কেন ব্যর্থ হয়


এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় নিজের দখল বজায় রাখা সত্ত্বেও শেখ হাসিনার  সরকার শেষ পর্যন্ত নিজস্ব কর্তৃত্ববাদী শাসনের ভারে ভেঙে পড়ে। বেশ কয়েকটি কারণ এই সরকারের পতনে অবদান রেখেছে:

১ . দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক বৈষম্য

হাসিনার শাসনামলে সরকারি প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি বাসা বাঁধে। যদিও এই সময়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেখেছিল, তবুও বেশিরভাগ সম্পদ কিছু রাজনৈতিক অভিজাত এবং ক্ষমতাসীন দলের অনুগতদের হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল। সাধারণ জনগণ দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং মুদ্রাস্ফীতির শিকার হতে থাকে, যা তাদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ সৃষ্টি করে।

২. দানা বাঁধে বিদ্রোহ

২০২৩ সালে রাস্তায় নেমে আসা ছাত্র ও তৃণমূল স্তরের আন্দোলন হাসিনা সরকারের পতনের ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। এই বিক্ষোভগুলো স্বচ্ছতা, গণতান্ত্রিক সংস্কার এবং দুর্নীতির অবসানের আকাঙ্ক্ষার দ্বারা পরিচালিত হয়ে  ছাত্র, শ্রমিক এবং এমনকি মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটি বিস্তৃত অংশের  প্রতিনিধিত্ব করেছিল। যখন সরকার সহিংসতার সাথে এর প্রতিক্রিয়া জানায়, তখন এই বিদ্রোহ আরো জোরদার হতে শুরু করে।

৩. অভ্যন্তরীণ ফাটল এবং আন্তর্জাতিক চাপ

হাসিনার কর্তৃত্ববাদ যত গভীর হতে থাকে, আওয়ামী লীগের মধ্যে তত ফাটল বাড়তে থাকে। তার একক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দলীয় অনুগতদের অসন্তোষ সরকারকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়। আন্তর্জাতিকভাবে হাসিনার সরকার ক্রমবর্ধমানভাবে বিচ্ছিন্নতার সম্মুখীন হয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘন, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং নির্বাচনী জালিয়াতি পশ্চিমা গণতন্ত্রের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং বিশ্ব সম্প্রদায় তার শাসনব্যবস্থা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিতে শুরু করে ।

ফ্যাসিস্ট শাসনের অস্থিরতা

শেখ হাসিনার সরকার শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছিল কারণ, সমস্ত ফ্যাসিবাদী বৈশিষ্ট্যগুলোর মতো এই সরকারও দমন, দুর্নীতি এবং সমাজের ওপর টেকসই নিয়ন্ত্রণের ভিত্তি করে নির্মিত হয়েছিল। তার শাসন এবং ফ্যাসিবাদী শাসনের মধ্যে মিলগুলো স্পষ্ট: ক্ষমতার একত্রীকরণ, বিরোধীদের দমন, মিডিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ ও জাতীয়তাবাদ-এসবই তার শাসনের কর্তৃত্ববাদী প্রকৃতির দিকে ইঙ্গিত করে। কর্তৃত্ববাদ সহজাতভাবেই ভঙ্গুর। কারণ এটি ভয়, জবরদস্তি ও নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভর করে। একবার তাতে ফাটল দেখা দিলে, যেমনটি হাসিনার শাসনামলে হয়েছিল, তখন স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের জনগণ অন্যান্য ফ্যাসিবাদী শাসনামলের মতো অবশেষে পরিবর্তনের দাবি করেছিল, যার ফলে হাসিনার সরকারের পতন অনিবার্য হয়ে পড়ে।

হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসন থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দলগুলোর যা করা উচিত:

১ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও প্রতিষ্ঠানকে সমুন্নত রাখা

রাজনৈতিক দলগুলোকে অবশ্যই বিচার বিভাগ, সংসদ ও সংবাদপত্রর অধিকারসহ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একটি সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য চেক এবং ব্যালেন্স নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে নিশ্চিত করতে হবে যাতে, কোনো একক নেতা  অনিয়ন্ত্রিতভাবে আধিপত্য বিস্তার করতে না পারে ।

২. অন্তর্ভুক্তি ও নাগরিক অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করা

অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন অত্যাবশ্যক। ভবিষ্যৎ দলগুলোকে সক্রিয়ভাবে সুশীল সমাজের সাথে যুক্ত করা উচিত। ভিন্নমতের কণ্ঠস্বর শুনতে হবে এবং সমস্ত জনগোষ্ঠীর থেকে অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করতে হবে। এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে  জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে ভিন্ন মতামতকে সম্মান করা হয় এবং সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা জোরদার করা হয়।

৩. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রতিশ্রুতি

সরকারকে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করতে হবে। ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দলগুলোকে উন্মুক্ত শাসনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া উচিত। নিশ্চিত করা উচিত যে সরকারি কর্মকর্তাদের তাদের কর্মের জন্য জবাবদিহি করা হবে। হাসিনার শাসনামলে দুর্নীতি ও কুসংস্কার ছিল প্রধান সমস্যা। দলগুলোর উচিত দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং হাসিনার শাসন থেকে শিক্ষা নিয়ে আর্থিক স্বচ্ছতা বজায় রাখা।

৪. সকলের জন্য আইন ও ন্যায়বিচার

একটি সুষ্ঠু ও স্বাধীন বিচার বিভাগ একটি কার্যকরী গণতন্ত্রের মেরুদণ্ড। রাজনৈতিক দলগুলোকে অবশ্যই আইনের শাসনকে সম্মান করতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে যে আইনি ব্যবস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করবে এবং রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নির্বিশেষে সকল নাগরিকের জন্য ন্যায়বিচার সুনিশ্চিত করবে। এটি বিচার ব্যবস্থায় নাগরিকদের বিশ্বাস পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে।

৫ সামাজিক কল্যাণে ফোকাস  

ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দলগুলোকে অবশ্যই অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য দূর করে নতুন নীতি প্রণয়ন করতে হবে। বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা মাথায় রেখে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিনিয়োগ। যা জাতির উন্নয়নকে শক্তিশালী করবে এবং জনগণের অসন্তোষকে রোধ করবে।

৬ সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে হবে

সরকারকে জবাবদিহি করতে মিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দলগুলোকে অবশ্যই সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে যে সাংবাদিকরা সেন্সরশিপ, নিপীড়ন বা হয়রানির ভয় ছাড়াই যাতে কাজ করতে পারেন । হাসিনার অধীনে সংবাদপত্রের দমন, জনগণের অবিশ্বাস ও আন্তর্জাতিক সমালোচনার উদ্রেক করেছিল ।

রাজনৈতিক দলগুলোর যা করা উচিত নয়:

১. ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করা এড়িয়ে চলতে হবে

হাসিনার শাসনামলের অন্যতম প্রধান ত্রুটি ছিল একক কর্তৃত্বে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, যা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে দমিয়ে দেয় এবং ব্যাপক দুর্নীতির দিকে পরিচালিত করে। রাজনৈতিক দলগুলিকে একজন নেতা বা সত্তার হাতে খুব বেশি ক্ষমতা ন্যস্ত করা এড়িয়ে চলতে হবে , কারণ এটি কর্তৃত্ববাদের জন্ম দেয় এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াগুলিকে দুর্বল করে।

২. রাজনৈতিক বিরোধী দলকে দমন করলে চলবে না

হাসিনার শাসনের একটি বৈশিষ্ট্য ছিল আইনি কারসাজি, সহিংসতা এবং মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করা। ভবিষ্যত দলগুলোর উচিত সুস্থ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং বিরোধী শক্তির সাথে সংলাপকে উৎসাহিত করা, কারণ এটি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে এবং নাগরিক অস্থিরতা প্রতিরোধ করে।

৩. কর্তৃত্ববাদী কৌশল প্রত্যাখ্যান করতে হবে

অধিকার কর্মী, সাংবাদিক ও বিরোধী সদস্যদের বিরুদ্ধে ভয় দেখানো, নজরদারি এবং রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট সহিংসতার প্রয়োগ এড়িয়ে চলতে হবে। এ ধরনের কৌশল গণতান্ত্রিক স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করে এবং ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে। রাজনৈতিক দলগুলোকে অবশ্যই নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও মত প্রকাশের অধিকারকে সম্মান করতে হবে।

৪. ব্যক্তিগত লাভের জন্য রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহার এড়িয়ে চলতে হবে :

হাসিনার শাসনামলে দেখা যায় ব্যক্তিগত ও দলীয় লাভের জন্য রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার জনগণের আস্থা নষ্ট করেছে। ভবিষ্যৎ দলগুলিকে নিশ্চিত করতে হবে যে সরকারি সংস্থানগুলো জনসাধারণের সুবিধার জন্য যাতে ব্যবহার করা হয়, রাজনৈতিক আনুগত্য রক্ষা বা শাসকগোষ্ঠীকে সমৃদ্ধ করার জন্য নয়।

৫. নির্বাচনী স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে

নির্বাচনী কারসাজি ভোটের বৈধতা এবং আন্তর্জাতিক স্তরে দেশের অবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দলগুলোকে নিশ্চিত করতে হবে যে আগামী নির্বাচন যাতে অবাধ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ হয়। জনগণের গণতান্ত্রিক পছন্দকে সম্মান করতে হবে।

৬. ব্যক্তিত্বের প্রচার করা এড়িয়ে চলতে হবে

হাসিনার শাসনব্যবস্থা এমন ব্যক্তিত্বের মোড়কে আবৃত ছিল যেখানে ভিন্নমতকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসাবে দেখা হত। রাজনৈতিক দলগুলোকে অবশ্যই এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে যেখানে নেতারাও সমালোচনা ও জবাবদিহির সম্মুখীন হবেন এবং তাদের ভুলগুলিকেও সামনে আনতে হবে।

শেখ হাসিনা সরকারের কাছ থেকে নেয়া শিক্ষাগুলো কর্তৃত্ববাদের সংকট এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের গুরুত্বের কথা তুলে ধরে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দলগুলোকে অবশ্যই গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান রক্ষা, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রচার এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে। কর্তৃত্ববাদ পরিহার করে সুশাসনের নীতি গ্রহণ করলে রাজনৈতিক দলগুলো দেশের জন্য একটি সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারবে।

লেখক: যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ার সাভানাহ স্টেট ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগের অধ্যাপক এবং সাবেক বিভাগীয় প্রধান।

mzamin

ভারতের হুমকি: পররাষ্ট্রনীতির নতুন বিন্যাস by ডা. রফিকুর রহমান

দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির ধস নেমেছে। দিল্লির ভ্রান্ত ও আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি তার জন্য সম্পূর্ণভাবে দায়ী। হিন্দুত্ববাদী নেতৃত্ব এবং সাউথ ব্লকের আধিপত্যবাদী কূটনীতির কারণে ভারত এখন দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে।

সর্বশেষ, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মধ্যদিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের আধিপত্যবাদী ভূ-রাজনীতির পরিসমাপ্তি ঘটে। ব্যাপক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার পদত্যাগ এবং পলায়নে শুধু যে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটেছে তা নয় একই সঙ্গে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদেরও পতন ঘটে। যৌক্তিক কারণে বিশ্বাসযোগ্য যে, ভারত বাংলাদেশকে আজ্ঞাবহ করদ রাজ্যে পরিণত করার জন্য শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগকে বেছে নিয়েছিল। ভারত বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ফ্যাসিবাদী হাসিনা সরকারকে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে প্রায় ষোল বছর টিকিয়ে রাখে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসহ সরকারি এবং বেসরকারি প্রায় সকল প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে ফেলা হয়। বিচার বিভাগ এবং পুলিশ বাহিনীকে দলীয়করণ করে গুম খুন এবং হত্যাযজ্ঞের সংস্কৃতি তৈরি করা হয়। পৃথিবীর বহু দেশ মানবাধিকার লঙ্ঘনের এই বর্বরতার প্রতিবাদ করলেও মোদি সরকার টু শব্দটি পর্যন্ত করেনি। বরং ঢাকা দিল্লির সম্পর্ককে সর্বকালের সর্বোচ্চ উচ্চতর পর্যায়ে রয়েছে বলে নিজেরাই ঢাক-ঢোল পিটিয়ে নতুন নতুন বয়ান প্রচার করেছে। মোদি সরকার কোনোভাবেই শেখ হাসিনার পতনের বাস্তবতাকে মেনে নিতে পারছে না। মনে হয় তাদের মাথায় বাজ পড়েছে। দিল্লি এখনো সত্য বিবর্জিত পুরনো পথেই হাঁটছে।

ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং গত বৃহস্পতিবার সশস্ত্র বাহিনীর জয়েন্ট কমান্ডারদের সম্মেলনে রাশিয়া-ইউক্রেনে এবং ইসরাইল-হামাসের সংঘাতের সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ তুলে ধরেন এবং সামরিক বাহিনীকে অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটনা মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকতে নির্দেশনা দেন। শত শত কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রাশিয়া-ইউক্রেন এবং ইসরাইল-হামাসের সংঘাতের সঙ্গে বাংলাদেশকে এক করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। প্রচ্ছন্ন হুমকিটি যে বাংলাদেশকে উদ্দেশ্য করে দেয়া এটা বোঝার জন্য সামরিক বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই।

একটু পিছনে যদি দেখি, শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পরদিন বাংলাদেশে উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর পার্লামেন্টের সর্বদলীয় বৈঠকে বলেছিলেন ‘বাংলাদেশে উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পর্যবেক্ষণের নীতি অনুসরণ করবে ভারত। পাশাপাশি দেশটি সেনাবাহিনীকে সতর্ক অবস্থানে রাখবে।’ সেখানেও ছিল প্রচ্ছন্ন হুমকি।

বারবার এ ধরনের হুমকি হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে এবং সেই লক্ষ্যেই নতুন ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণে উদ্যোগী হতে হবে। বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির সমীকরণগুলো বিবেচনায় না নিয়ে ভারত নিজের মতো করে শান্তি এবং স্থিতিশীলতার বয়ান তুলে নির্বোধের মতো যুদ্ধের হুমকির প্রদান ভারতের জন্য আত্মঘাতী ছাড়া আর কিছুই হবে না।

কতিপয় ভারতীয় বিশ্লেষকের মতে, বিগত ১৬ বছর ভারত শেখ হাসিনার সরকারের কাছ থেকে যেসব সুযোগ-সুবিধা পেয়ে আসছিল বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছ থেকেও ভারত তেমনটি আশা করে। তাদের বুঝতে হবে ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তিত হয়েছে। ‘দিল্লি আছে আমরা আছি’,‘ভারতকে যা দিয়েছি সারা জীবন মনে রাখবে’ এবং ‘ভারতকে বলে এসেছি শেখ হাসিনাকে যেভাবেই হোক ক্ষমতায় রাখতে হবে’, এইসব বাক্য চয়ন প্রমাণ করে যে শেখ হাসিনা এবং তার সরকার গত পনেরো বছর শুধু দিল্লির দাসত্ব করে গেছে এবং বিনিময়ে দিল্লি হাসিনার ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখার জন্য গুম, খুন এবং হত্যার মতো জঘন্য অপরাধগুলোকে সমর্থন করেছে। বাংলাদেশের জনগণের বিপরীতে অবস্থান নিয়ে হাসিনা সরকারকে বৈধতা দেয়ার জন্য অভ্যন্তরীণ আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভারত পুরো মাত্রায় সক্রিয় ছিল। ভারতের এই দায় এড়াবার কোনো সুযোগ নেই। গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির চর্চা হাসিনা আমলের মতো নতজানু হওয়ারও কোনো সুযোগ নেই।

শত শত শহীদের রক্তের বিনিময়ে গড়ে ওঠা যে ম্যান্ডেট নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় এসেছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতিতে অবশ্যই তার প্রতিফলন থাকবে। বাংলাদেশ ভারত বিদ্বেষী নয় এবং বাহিরের কোনো নির্দেশনায় বাংলাদেশ চলবে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব অখণ্ডতা এবং স্বার্থকে রক্ষা করে এমনটাই হবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি। নতুন বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই ভারতকে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির উদ্যোগী হতে হবে। ঢাকা-দিল্লির সুসম্পর্কের ভিত্তি নয়াদিল্লিকেই নতুন করে নির্ধারণ করতে হবে। প্রচ্ছন্ন সামরিক হুমকি এক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন আনতে পারবে না বরং দু’দেশের সম্পর্ককে আরও দূরে ঠেলে দেবে যেটা ভারতের জন্য সুখকর হবে না।

বাংলাদেশের অবস্থান থেকে ভারতকে কখনো আক্রমণ করার প্রশ্নই ওঠে না। ভারত বড় দেশ, বড় দেশ হওয়ার কারণে ভারতের যেমন অনেক সুবিধা রয়েছে তেমনি অসুবিধারও কমতি নেই। ভারত বহু ভাষা এবং জাতিতে বিভক্ত একটি দেশ। যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা ভারতকে ঐক্যবদ্ধ করে রেখেছে। সামরিক দিক থেকে ভারতের অবস্থান অনেক বড়। তবে সামরিক সক্ষমতা এবং ভারতের অর্থনৈতিক শক্তি এত বিশাল নয় যে বাংলাদেশের মতো জাতিভিত্তিক একটি রাষ্ট্রকে সরাসরি যুদ্ধে পরাজিত করে দখলে নিতে পারবে। বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় এটা অসম্ভব। যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশাল সামরিক সক্ষমতার দেশকেও বিভিন্ন রাষ্ট্রে সামরিক অভিযান চালিয়ে সবশেষে পরাজিত হয়ে রাজনৈতিক সমঝোতায় ফিরতে হয়েছে। বাংলাদেশের বড় শক্তি হচ্ছে বাংলাদেশ একটি রেজিমেন্টেড জাতি রাষ্ট্র। সাউথ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান এমন এক জায়গায় যে বাংলাদেশ আঞ্চলিক দুই শক্তি ভারত এবং চীনের মধ্যে ব্যালেন্স অফ পাওয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে। চীনের সঙ্গে সরাসরি সীমান্ত না থাকলেও চীন এবং বাংলাদেশের প্রাকৃতিক অবস্থান কৌশলগত কারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের নিশ্চয়ই বিষয়টি অজানা নয়।

SAARC কে পুনরুজ্জীবিত করে কার্যকরী করার মাধ্যমে সাউথ এশিয়ার দেশগুলোর শান্তি এবং নিরাপত্তা জোরদার করা সকলের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বহুপাক্ষিকতাই কেবল শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। একপক্ষীয় শান্তি এবং নিরাপত্তার ধুঁয়া তুলে কোনো একটি দেশের আগ্রাসী তৎপরতা এবং প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরে সরকার ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে হস্তক্ষেপ সাউথ এশিয়ার অন্য কোনো দেশ মেনে নেবে না। আঞ্চলিক শান্তি এবং নিরাপত্তার জন্য চীনেরও যুক্ত হওয়া দরকার।

ভারত যদি সার্কের মাধ্যমে এই অঞ্চলে শান্তি এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণে ইচ্ছুক না হয় তাহলে বিকল্প ব্যবস্থা সাউথ এশিয়ার দেশগুলোকেই করতে হবে। বাংলাদেশ নেবে উদ্যোগী ভূমিকা। কোনোভাবেই এই অঞ্চলের শান্তিকে বিঘ্নিত করা যাবে না এবং এই অঞ্চলের কোনো দেশ আরেকটি দেশকে যুদ্ধের হুমকি দিতে পারবে না।

একটি প্রস্তাবনা হতে পারে সাউথ এশিয়ার রিমের সীমান্তে অবস্থিত দেশগুলোকে একসঙ্গে করে নিজেদের স্বার্থ এবং নিরাপত্তা সুরক্ষিত করার জন্য নতুন একটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা সম্পর্কিত বেল্ট বা এসোসিয়েশন তৈরি করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেয়া।

সাউথ এশিয়ার কেন্দ্রে মোটামুটিভাবে বিরাট অংশ নিয়ে ভারতের অবস্থান। দক্ষিণের সীমান্ত পানি বেষ্টিত, যেমন রয়েছে আরব সাগর, ভারত মহাসাগর এবং বঙ্গোপসাগর। রিমের অপর অংশে ভারতের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের স্থল সীমান্ত রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কিলোমিটার। এই দীর্ঘ সীমান্তে সর্বমোট ৭টি দেশের সঙ্গে ভারতের স্থল সীমান্ত রয়েছে। দেশগুলো হচ্ছে পাকিস্তান, চীন, ভুটান, নেপাল এবং বাংলাদেশ। আফগানিস্তানের সঙ্গে সরাসরি সীমান্ত নেই এবং মিয়ানমার সাউথ এশিয়ার রিম এর বাইরে অবস্থিত। সর্বদক্ষিণে দু’টি দ্বীপ রাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা এবং মালদ্বীপের সঙ্গে ভারতের রয়েছে জল সীমান্ত। নিচের ম্যাপ থেকে একটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

সাউথ এশিয়ার এই রিমে অবস্থানরত দেশগুলো নিয়েই গঠিত হবে নতুন একটি অর্থনৈতিক রাজনৈতিক এবং নিরাপত্তা বলয়। যার নামকরণ হতে পারে Association of Countries of South Asian Rim for Co-operation বা অনুরূপ কোনো সংঘ।

বাংলাদেশ ভারতের চারপাশে অবরুদ্ধ নয় প্রকৃতপক্ষে ভারত অবরুদ্ধ তার প্রতিবেশী দেশগুলো দ্বারা যাদের সঙ্গে ভারতের সুসম্পর্ক নেই, রয়েছে ক্রমাগত দ্বন্দ্ব এবং অবিশ্বাস। প্রতিবেশী দু’টি দেশের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে ভারতের সম্পর্ক খারাপ এবং তারা যুদ্ধেও জড়িয়েছে যেমন পাকিস্তান এবং চীন। অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ভারত নতুনভাবে আগ্রাসী নীতি চাপিয়ে দিয়ে বিবাদে জড়িয়েছে। যেমন আফগানিস্তান, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা এবং বাংলাদেশ। এই দেশগুলোর মধ্যে ভারত দ্বারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশ বাংলাদেশ। ভারতের হিন্দুত্ববাদী আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি চাপিয়ে সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করা পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠা করে রাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা ধ্বংস করা মেগা প্রকল্প প্রণয়নে বাধা প্রদান করা, অভিন্ন নদীগুলোতে বাঁধ দিয়ে ভাটির দেশকে কখনো বন্যা কখনো খরায় পরিণত করা এবং ক্রমাগত সীমান্ত হত্যর মাধ্যমে সম্পর্কের অবনতি ঘটিয়েছে। ভারতের পুতুল শেখ হাসিনা সরকার গণআন্দোলনকে নস্যাৎ করতে শত শত ছাত্র-জনতাকে হত্যা করেছে এবং হাজার হাজার ছাত্র-জনতা আহত হয়ে পঙ্গুত্বের শিকার হয়েছেন। এর দায়-দায়িত্ব ভারত সরকারের ওপর অবশ্যই বর্তায় কেননা ভারতই অগণতান্ত্রিত ভোটারবিহীন পৈশাচিক হাসিনা সরকারকে বছরের পর বছর ধরে টিকিয়ে রেখেছিল।

কৌশলগত স্বার্থ সর্বদা পরিবর্তনশীল এবং এই পরিবর্তন অভ্যন্তরীণ, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির সামান্য পরিবর্তনের উপরও নির্ভর করে। উইন উইন নীতির উপর ভিত্তি করে কৌশলগত স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়।

দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে সঠিক বৈদেশিক নীতি এবং তার প্রয়োগের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের এই চ্যালেঞ্জে মোকাবিলার অনেকগুণ সক্ষমতা রয়েছে। কৌশল হবে দেশের স্বার্থে যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বকে সুরক্ষিত করবে।

ভারত এই অঞ্চলের নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং শান্তি নিশ্চিতে আগ্রাসী তৎপরতার পরিবর্তে যদি উইন উইন নীতির ভিত্তিতে এগিয়ে না আসে তাহলে বৃহৎ পরিসরে কূটনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে তার মোকাবিলা করতে হবে। বাংলাদেশের এই সক্ষমতা রয়েছে।

লেখক: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক বিশ্লেষক।
mdr.rafiqur@gmail.com

mzamin

প্রিন্স উইলিয়ামের স্ত্রী কেইট ক্যান্সারের চিকিৎসা সম্পন্ন করেছেন

ব্রিটেনের রাজকুমার উইলিয়ামের স্ত্রী কেইট, প্রিন্সেস অফ ওয়েলস তার ক্যান্সার রোগ চিকিৎসায় কেমোথেরাপি সম্পন্ন করেছেন। তিনি আগামী মাসগুলোতে সীমিত আকারে জনসমক্ষে কার্যক্রম শুরু করবেন, যেটা রাজা তৃতীয় চার্লস এবং প্রিন্সেসের ক্যান্সার শনাক্ত হবার বড় ধাক্কার পর ব্রিটেনের রাজপরিবারের জন্য একটি সুখবর।

সোমবার প্রিন্স উইলিয়ামের ৪২ বছর বয়সী স্ত্রী একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি তার স্বামী এবং সন্তানদের পাশে ছিলেন। তার পরিবারের জন্য গত নয় মাস কত বেদনাদায়ক ছিল, কেইট সেটার বর্ণনা দেন এবং চিকিৎসা সম্পন্ন করায় স্বস্তি প্রকাশ করেন।

তিনি ভিডিওতে বলেন ‘আপনারা জানেন, জীবন মুহূর্তের মধ্যে বদলে যেতে পারে এবং অপরিচিত রাস্তা আর দুর্যোগপূর্ণ সমুদ্র পার হবার পথ আমাদের খুঁজে নিতে হয়েছে।’

তিনি ভিডিওতে আরো বলেন, যে ভিডিও নরফোকে পরিবারের গ্রীষ্মকালীন বাসার কাছে একটি বনে ফিল্ম করা হয়।

প্রিন্সেস অফ ওয়েলস বলেন, ‘ক্যানসার নিয়ে জীবনযাত্রা সবার জন্য খুব জটিল, ভয়ঙ্কর এবং অনিশ্চিত, বিশেষ করে আপনার প্রিয়জনদের জন্য। আপনি নিজে কত দুর্বল এবং ভঙ্গুর, আপনি এমনভাবে সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হন যেটা আগে কখনো ভাবেননি এবং তার সাথে সব কিছুর জন্য আসে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি।’

চলতি বছরের বেশিরভাগ সময় জুড়ে রাজপরিবার স্বাস্থ্য বিষয়ে একের পর এক ধাক্কা পেয়েছে। প্রথমে জানুয়ারি মাসে ঘোষণা আসে যে, রাজা প্রস্টেট বৃদ্ধির কারণে চিকিৎসা শুরু করবেন এবং কেইটের পেটে অস্ত্রপচার হবে।

ফেব্রুয়ারিতে, বাকিংহ্যাম প্রাসাদ জানায় যে চার্লস ক্যান্সারের জন্য চিকিৎসা নিচ্ছেন। ছয় সপ্তাহ পর, কেইট ঘোষণা দেন যে তিনিও ক্যান্সারের জন্য চিকিৎসা নিচ্ছেন। তার অস্ত্রপচারের পর থেকে সামাজিক মাধ্যমে কেইটকে নিয়ে যে কানা-ঘুষা চলছিল, ক্যান্সারের তথ্য প্রকাশ করার পর তা শান্ত হয়।

এই ঘোষণার ফলে রাজপরিবারের অসুস্থ সদস্যদের জন্য ব্যাপক শুভেচ্ছা বাণী প্রকাশ হলেও, রাজপরিবার প্রচণ্ড চাপের মধ্যেও পড়ে যায়। রাজপরিবার হাউস অফ উইন্ডসরের দৈনিক কাজের তালিকায় যেসব নানাবিধ ইভেন্ট ছিল, সেগুলো মেটানোর জন্য রানী কামিলা এবং রাজার বোন প্রিন্সেস অ্যান বাড়তি দায়িত্ব পালন করেন।

উইলিয়াম তার স্ত্রী এবং তিনটি স্বল্প বয়সী সন্তানের দেখাশোনা করার জন্য রাজকীয় কার্যক্রম থেকে কিছু সময় ছুটি নেন।

রাজা চার্লসের অস্ট্রেলিয়া সফর
চার্লস এপ্রিলের শেষের দিকে আবার জনসমক্ষে তার দায়িত্ব পালন শুরু করেন, যখন তিনি লন্ডনে একটি ক্যান্সার চিকিৎসা কেন্দ্র সফর করেন। এই শরৎকালে তিনি অস্ট্রেলিয়া এবং সামোয়া সফর করবেন, যেটা হবে ক্যান্সার শনাক্ত হবার পর তার প্রথম দীর্ঘ যাত্রা।

গতকাল সোমবার কেইট বলেন যে, তিনি যদিও কেমথেরাপি চিকিৎসা সম্পন্ন করেছেন, পুরোপুরি সুস্থ হতে আরো অনেক সময় লাগবে এবং তিনি ‘প্রতিটা দিন এক এক করে’ মোকাবেলা করছেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা যে সমর্থন পেয়েছি, তার জন্য উইলিয়াম এবং আমি কৃতজ্ঞ এবং যারা আমাদের এ সময়ে সাহায্য করছে তাদের কাছ থেকে অনেক শক্তি অর্জন করেছি।’

জুন মাসে প্রিন্সেস স্বীকার করেন যে, তিনি যখন চিকিৎসাধীন ছিলেন তখন কোন কোন দিন তার খারাপ ছিল, আবার কোন কোন দিন ভালো ছিল।

তার চিকিৎসার সময় জনসমক্ষে বেশিরভাগ দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ালেও, কেইট চলতি বছর দু’টি অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন। প্রথমত, জুনে রাজার জন্মদিনে ‘ট্রুপিং দ্য কালার’ নামে পরিচিত একটি সামরিক কুচকাওয়াজে এবং খুব সম্প্রতি জুলাই মাসে উইম্বল্ডনের পুরুষদের টেনিস ফাইনালে।

কেইট সোমবার বলেন, ‘যারা ক্যান্সার নিয়ে জীবনযাপন করছেন, তাদের জন্য বলি-আমি আপনাদের সাথে আছি, আপনার পাশে, হাতে হাত রেখে। অন্ধকার থেকে আলো আস পারে, তাই সেই আলোকে উজ্জ্বল হতে দিন।’

সূত্র : ভয়েস অব আমেরিকা

কেইট, প্রিন্সেস অফ ওয়েলসকে দেখা যাচ্ছে তাঁর স্বামী প্রিন্স উইলিয়াম এবং তিন সন্তানের সাথে। ফটোঃ ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ - ছবি : ভয়েস অব আমেরিকা

অশান্ত মণিপুর, কারফিউ উপেক্ষা সংঘর্ষ, সমালোচনায় কংগ্রেস

কারফিউ উপেক্ষা করে অশান্ত মণিপুরে বিক্ষোভ করেছে ছাত্রছাত্রীরা। এ সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে তাদের। তাতে আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৫০ শিক্ষার্থী। মঙ্গলবার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রাজ্য সরকার ইম্ফল উপত্যকার ৫টি জেলায় ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়। দুই জেলায় কারফিউ আরোপ করে। কিন্তু টানা দ্বিতীয় দিনের মতো ইম্ফলের রাজপথে নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের সঙ্গে ছাত্রদের সংঘর্ষ চলতেই থাকে। এ খবর দিয়ে অনলাইন দ্য হিন্দু বলছে, রাজভবন ও মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনে শিক্ষার্থীদের প্রবেশ ঠেকাতে পুলিশ শক্তি প্রয়োগ করে। এ সময় ওইসব শিক্ষার্থী আহত হন। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর আহতদের ভর্তি করা হয়েছে ইম্ফলে রিজিয়নাল ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেসে। এর মধ্যে একজন ছাত্রী আছেন। একজন মেডিকেল অফিসার বলেছেন, তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালের আইসিইউ’তে ভর্তি করা হয়েছে। ইম্ফলের খাওয়ারামবান্দ এলাকায় পুরোপুরি নারীদের একটি মার্কেটে একদল শিক্ষার্থী অবস্থান করেন। সেখান থেকেই উত্তেজনার সূত্রপাত। ওই এলাকায় ইম্ফল ওয়েস্ট প্রশাসন ভোর ৫টা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করে। রাজ্যটির রাজধানী ইম্ফল ওয়েস্ট এবং ইম্ফল ইস্ট জেলার মধ্যে বিস্তৃত। নারীদের ওই মার্কেটে অবস্থান নিয়েছিলেন যে বিপুল সংখ্যক ছাত্র, তাদের সঙ্গে কারফিউ ভঙ্গ করে যোগ দেন আরও শিক্ষার্থীরা। তারা সম্মিলিতভাবে রাজভবনের দিকে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু ভিআইপি এলাকার কাছাকাছি পৌঁছাতে তাদেরকে বাধা দেয় নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা। এতে উভয় পক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা। মণিপুর ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা ইম্ফলের অন্য অংশে আলাদা বিক্ষোভ করেন। তারা রাজ্যের নিরাপত্তা উপদেষ্টা কুলদীপ সিং এবং পুলিশের মহাপরিচালক রাজিব সিং-এর পদত্যাগ দাবি করে। কারণ, শিক্ষার্থীদের অভিযোগ তারা জনগণের জীবন ও সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। নৈতিকতার ভিত্তিতে সব এমএলএ’র পদত্যাগও দাবি করে এই বিক্ষোভকারীরা। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে যোগ দিতে বিভিন্ন গ্রুপে নারী ও পুরুষরা দলে দলে ভাগ হয়ে যান। তারা বিক্ষোভে যোগ দেন। অনেক স্থানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী নংথোমবাম বীরেন সিং-এর ছবি প্রদর্শন করছে এমন কিছু পোস্টার ছিঁড়ে ফেলেন। এ অবস্থায় স্থানীয় সময় সকাল ১১টা থেকে ইম্পল ওয়েস্ট জেলা কর্তৃপক্ষ কারফিউ জারি করে। থৌবাল জেলায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহতির ১৬২ ধারার অধীনে নিষেধাজ্ঞামূলক অর্ডার উপেক্ষা করা হয় যখন তখন ইম্ফল ইস্ট জেলা প্রশাসন একই রকম কারফিউ জারি করে। রাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মোবাইল ইস্টারনেট বন্ধ করার, লাইন ধার দেয়া, ব্রডব্যান্ড এবং ভিপিএন সার্ভিস বন্ধ করে দেয় ইম্ফল উপত্যকার ৫টি জেলায়। মঙ্গলবার স্থানীয় সময় বিকাল ৩টা থেকে তা কার্যকর হয়। এর উদ্দেশ্য, জাতীয়তা ও সমাজবিরোধীদের কর্মপরিকল্পনা বন্ধ করা, শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখা। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করা। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে শিক্ষা বিভাগ।

ওদিকে মঙ্গলবার স্থানীয় সময় বিকাল ৬টার দিকে শিক্ষার্থী এবং নারীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন মণিপুর গভর্নর লক্ষ্মণ প্রসাদ আচার্য। তিনি শান্তির আহ্বান জানিয়েছেন। রাজভবন থেকে ইস্যু করা এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, হঠাৎ করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন গভর্নর। এতে আরও বলা হয়, মণিপুরের প্রত্যেকের উচিত চলমান সহিংসতা কাটিয়ে ওঠার উপায় বের করা এবং এতে অবদান রাখা। কারণ, সহিংসতা কোনো সমস্যার সমাধান দিতে পারে না। আরও বলা হয়েছে, অব্যাহতভাবে সরকারি পর্যায়ের নেতা, ছাত্র এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে আলোচনা করছেন গভর্নর।

কংগ্রেস সরকার ১৫ বছরে যা করতে পারেনি তা ১৫ মাসে করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তার এই প্রতিশ্রুতির পর মণিপুরের উত্তেজনা নিয়ে  মোদির সমালোচনা করেছেন বিরোধী দল কংগ্রেসের সিনিয়র নেতা জয়রাম রমেশ। তিনি বলেন, প্রকৃতপক্ষে মণিপুরের সব শ্রেণির মানুষের সুনির্দিষ্ট ১৫ মাসের ম্যান্ডেটে তিনি (মোদি) রাজ্যের সহিংসতাকে বৃদ্ধি পাওয়া অনুমোদন দিয়েছেন। যে আগুন এখনো জ্বলছে, তা প্রশমিত হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। জয়রাম রমেশ আরও বলেন, সুপ্রিম কোর্ট ঘোষণা করেছে রাজ্যটিতে সাংবিধানিক মেশিনারি ভেঙে পড়েছে। কিন্তু মোদির এখনো নড়নচড়ন নেই। তিনি বিশ্ব জুড়ে ভ্রমণ করছেন। কিন্তু ২০২৩ সালের ৩রা মে এই রাজ্যে বিয়োগান্তক ঘটনা শুরু হওয়ার পর তিনি এখানে সফরে আসার সময় পাননি অথবা সফরে অনীহা দেখিয়েছেন।
উল্লেখ্য, গত ১৬ মাসে মণিপুরে কুকি- জো এবং মেইতি জনগণের মধ্যে জাতিগত দাঙ্গায় কমপক্ষে ২৩০ জন নিহত হয়েছেন। চার মাস পরিস্থিতি একটা শান্ত থাকার পর ১লা সেপ্টেম্বর সহিংসতা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এর পর দু’জন নারী সহ নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ১১ জন। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ২০ জন। কর্মকর্তারা বলছেন, উগ্রপন্থিরা এখন ড্রোন ব্যবহার করে বোমা হামলা করছে এবং দীর্ঘ পাল্লার রকেট হামলা করছে। এর ফলে পরিস্থিতির গুরুতর অবনতি হয়েছে। ইম্ফল উপত্যকায় কয়েকদিনে ড্রোন হামলায় ‘ফরেন এলিমেন্টস’ জড়িত থাকার কথা নিশ্চিত করেছেন আইজিপি আইকে মুইভাহ।

mzamin

ইলিশ চেয়ে চিঠি: একটি দল ছাড়া সবাই উগ্রবাদী ভারতের এমন মনোভাবের পরিবর্তন চান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা

বাংলাদেশের উগ্রবাদের উপস্থিতি নিয়ে ভারতীয় উদ্বেগ নাকচ করে দিলেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। কোনো দলের না না নিয়ে তিনি বললেন, ‘শুধুমাত্র একটি দল ছাড়া বাকি সবাই উগ্রবাদী’-তাদের (ভারতের) এমন মনোভাবের পরিবর্তনটা জরুরি। উপদেষ্টা ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ‘আওয়ামী লীগ প্রীতি’র প্রতি ইঙ্গিত করেন। বুধবার সন্ধ্যায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে উপস্থিত সাংবাদিকের সঙ্গে আলাপে তিনি এ নিয়ে কথা বলেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি’র খবরে জানানো হয়েছে, ওয়াশিংটনের জাতীয় প্রেস ক্লাবে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ নিয়ে কথা বলেছেন যুক্তরাষ্ট্র সফররত কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। সেখানে বাংলাদেশে উগ্রবাদের উপস্থিতি নিয়ে ভারত উদ্বিগ্ন বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এক সাংবাদিক। জবাবে উপদেষ্টা বলেন, আমার মনে হয় তাদের এই ন্যারেটিভ পরিবর্তন করা প্রয়োজন। বাংলাদেশে একটি দল ছাড়া বাকি সবাই উগ্রবাদী। এ ধরনের একটা ন্যারেটিভ প্রচার করা হচ্ছে দেশটির মিডিয়াতে। আমি মনে করি, এটা থেকে ভারতের বের হয়ে আসা প্রয়োজন। তৌহিদ হোসেন বলেন, দ্বিতীয় কথা হলো- আমাদের কাছে যে তথ্য আছে এখানে উগ্রবাদীরা বিরাট কিছু করে ফেলছেÑ এ রকম না। সরকারে যারা আছেন তাদের কারও এ ধরনের কোনো এজেন্ডা নেই, এরকম কোনো ব্র্যাকগ্রাউন্ড নেই। আমার মনে হয়, তাদের এ বক্তব্য থেকে বের হয়ে আসা প্রয়োজন। এটা দু’দেশের সম্পর্কের জন্য ভালো হয়।

পূজায় ইলিশ চায় ভারত, উপদেষ্টা যা বললেন-
এদিকে আসন্ন দুর্গাপূজা উপলক্ষে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে ইলিশ রপ্তানির জন্য চিঠি পাঠিয়েছে ভারতের ফিস ইমপোর্টার এসোসিয়েশন। ইলিশ চেয়ে পাঠানো চিঠিটি উপদেষ্টার হাতে পৌঁছেছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তৌহিদ হোসেন বলেন, আমি ১৫ মিনিট আগে কাগজটা দেখেছি এবং আমি বলেছি যে, এটা সরকারের যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় আছে তারা সিদ্ধান্ত নেবে। আমরা তো আর মাছ রপ্তানির সিদ্ধান্ত নেই না। ইলিশ চেয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টার কাছে আবেদন বিষয়ে ফিস ইমপোর্টার এসোসিয়েশনের সম্পাদক আনোয়ার মাকসুদ গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা প্রত্যেক বছর পুজোর আগে একটা চিঠি দিই। যেন বাংলাদেশ থেকে পুজোর আগে ইলিশ পাঠান। এই বছর আগস্টে তো ঝামেলা হলো বাংলাদেশে। সেই কারণে আমরা আগস্ট মাসে চিঠি দিইনি। এখন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। সবকিছু স্বাভাবিকের দিকে এগোচ্ছে বলে আমরা একটা আবেদন করেছি। তিনি বলেন, আমরা বিভিন্ন দপ্তরে ই-মেইল পাঠিয়েছি। কমার্স সচিব, এডভাইজার তৌহিদ সাহেব সবাইকে চিঠি পাঠিয়েছি যাতে প্রত্যেক বছরের মতো এ বছরও পুজো উপলক্ষে ওনারা আমাদের ইলিশ দেন। আনোয়ার মাকসুদ বলেন, বাংলাদেশের ইলিশ না আসায় বাজারে ইতিমধ্যেই চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে দামও কিছুটা বেশি আছে। যে মাছ হাজার বারোশ’ রুপিতে বিক্রি হয়, সেই মাছ দেড় থেকে দুই হাজার রুপিতে বিক্রি হচ্ছে। তাছাড়া এপারের বাঙালিদের কাছে বাংলাদেশের পদ্মার ইলিশের বরাবর একটা চাহিদা আছে। দাম বেশি হলেও ক্রেতারা কেনে। আমরা আশা করি এই ঝামেলার মধ্যেও পুজোর সময় ওনারা আমাদের ইলিশ দেবেন। বাঙালির পাতে ইলিশ থাকবে না সেটা ভাবাই যায় না।
mzamin

সংবিধান, বিচার বিভাগ, নির্বাচন ব্যবস্থা, দুদক, পুলিশ, প্রশাসন সংস্কারে ৬ কমিশন: কাজ বড় কঠিন, ব্যর্থ হওয়ার অবকাশ নেই

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের দাবির প্রেক্ষিতে সংবিধান, বিচার বিভাগ, নির্বাচন ব্যবস্থা, পুলিশ, প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কারে ছয়টি কমিশন গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এক মাস পূর্তি উপলক্ষে বুধবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে তিনি এই ঘোষণা দেন। আধাঘণ্টার বেশি সময় স্থায়ী প্রধান উপদেষ্টার ভাষণ বাংলাদেশ টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হয়। ভাষণে ড. ইউনূস চলমান সংস্কার প্রক্রিয়া, শিল্প-কারখানার বর্তমান পরিস্থিতি, নিত্যপণ্যের দাম কমানো, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, আর্থিক খাত, প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন।

তিনি বলেন, শিল্প-কারখানা বন্ধ হলে অর্থনীতিতে বিরাট আঘাত পড়বে, সমস্যার সমাধান বের করবো, কারখানা খোলা রেখে অর্থনীতির চাকা সচল রাখুন। ন্যায্যতা এবং সমতার ভিত্তিতে ভারতসহ প্রতিবেশী রাষ্ট্র সমূহের সঙ্গে সুসম্পর্ক চাই উল্লেখ করে তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে আমাদের দেশ যেন বিশ্বের কাছে পরিচিত হয়, কোনো নেতা বা দল নয়, দেশের পরিকল্পনা যেন মানুষকেন্দ্রিক হয়। দেশের মানুষকে আর ফাঁকি দেয়া চলবে না। কর্মসংস্থান তৈরি করবে এমন প্রকল্পগুলোকে সরকার অগ্রাধিকার দেবে। লুটপাট ও পাচার হয়ে যাওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু দ্রব্যের দাম কমাতে শুল্কহার হ্রাসে এনবিআর’কে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ভাষণে আইন নিজের হাতে তুলে না নেয়ারও আহ্বান জানান প্রধান উপদেষ্টা।

বক্তব্যের শুরুতে প্রধান উপদেষ্টা জুলাই-আগস্ট মাসে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ছাত্র-শ্রমিক-জনতার অভ্যুত্থানে নিহত শহীদদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।  
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, গণ-অভ্যুথানে শহীদদের পরিবারকে পুনর্বাসন করা হবে। আহত শিক্ষার্থী, শ্রমিক, জনতার চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয় সরকার বহন করবে। এই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মৃতি ধরে রাখতে সরকার ‘জুলাই গণহত্যা স্মৃতি ফাউন্ডেশন’- প্রতিষ্ঠা করেছে। সকল শহীদ পরিবার এবং আহতদের সর্বোত্তম চিকিৎসাসহ তাদের পরিবারের সম্পূর্ণ দায়িত্ব এই ফাউন্ডেশন গ্রহণ করছে।

ফেনীসহ কয়েকটি জেলায় স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা নিয়ে তিনি বলেন, গত মাসে কুমিল্লা-নোয়াখালী সিলেট অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা এসব এলাকার মানুষকে হতভম্ব করে দিয়েছে। এখানে বেশির ভাগ এলাকায় কোনোদিন বন্যা হয়নি। তারা বন্যা মোকাবিলা করায় অভ্যস্ত নন। দেশপ্রেমিক সশস্ত্রবাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে বন্যা আক্রান্ত সবাইকে রক্ষার জন্য এগিয়ে আসে। ফলে মানুষের দুর্ভোগ কম হয়েছে। এর পরপরই এনজিও এবং সাধারণ মানুষ দেশের সকল অঞ্চল থেকে দলে দলে এগিয়ে এসেছে। আমি বিশেষ করে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে আবারো ধন্যবাদ জানাচ্ছি। দেশের সকল দুর্যোগকালে তারা সবসময় আন্তরিকভাবে এগিয়ে এসেছে। বিশেষ করে বন্যা ও শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে তাদের সৈনিক এবং অফিসাররা দিনের পরদিন যেভাবে দায়িত্ব পালন করেছে তার কোনো তুলনা হয় না। জনজীবনে স্বস্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তাদের ভূমিকা অনন্য। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সকল সদস্যকে আমি ধন্যবাদ জানাই তাদের সততা, ত্যাগ ও অসীম দেশপ্রেমের জন্য। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে বন্যা, খরা, ঝড়, বৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড় সহ সকল প্রাকৃতিক দুর্যোগে আপনারা সকলের শেষ ভরসার স্থান। দেশের প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে আপনারা দেশের মানুষের পাশে থেকেছেন। দেশের স্বাধীনতার পক্ষে, সার্বভৌমত্বের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। দেশ গঠনেও আপনারা সবার আগে এগিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, বন্যা এখন চলে গেছে। কিন্তু পুনর্বাসনের কঠিন কাজ আমাদের সামনে রয়ে গেছে। সকলের সহযেগিতায় আমরা পুনর্বাসনের কাজটি সফলভাবে সমাধান করতে চাই।  

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য সরকার কাজ করে যাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, যেসব ভাই-বোনেরা তাদের গত ১৬ বছরের বেদনা জানিয়ে তার প্রতিকার পাওয়ার কর্মসূচি দিচ্ছেন আমি কথা দিচ্ছি আপনাদের ন্যায্য আবেদনের কথা ভুলে যাবো না। আমরা সকল অন্যায়ের প্রতিকারের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা আমাদের দায়িত্বকালে যথাসম্ভব সব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করবো। আমি আবারও অনুরোধ করছি আপনার যাতায়াতে ব্যাঘাত সৃষ্টি থেকে বিরত থাকুন। জাতি আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে।

তিনি বলেন, তৈরি পোশাক, ঔষধশিল্প এসব এলাকায় শ্রমিক ভাইবোনেরা তাদের অভিযোগ জানানোর জন্য ক্রমাগতভাবে এই শিল্পের কার্যক্রম পরিচালনা বন্ধ রাখতে বাধ্য করছেন। এটা আমাদের অর্থনীতিতে যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে সেটা মোটেই কাম্য নয়। এমনিতেই ছাত্র-শ্রমিক-জনতার বিপ্লবের পর যে অর্থনীতি আমরা পেয়েছি সেটা নিয়ম-নীতিবিহীন দ্রুত ক্ষীয়মাণ একটা অর্থনীতি। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তলানীতে গিয়ে ঠেকেছে। আমরা এই অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চারের চেষ্টা করছি। আমাদের উদ্যোগে সাড়াও পাচ্ছি। ঠিক এই সময়ে আমাদের শিল্প কারখানাগুলো বন্ধ ও অকার্যকর হয়ে গেলে দেশের অর্থনীতিতে বিরাট আঘাত পড়বে। শ্রমিক ভাইবোনদের অনেক দুঃখ আছে। কিন্তু সেই দুঃখ প্রকাশ করতে গিয়ে আপনাদের মূল জীবিকাই বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলে সেটা ঠিক হবে না। শ্রমিক-মালিক উভয়পক্ষের সঙ্গে আলাপ করে এসব সমস্যার সমাধান আমরা অবশ্যই বের করবো। আপনারা কারখানা খোলা রাখুন। অর্থনীতির চাকা সচল রাখুন। দেশের অর্থনীতিকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে দিন। আমরা আপনাদের সমস্যার স্থায়ী সমাধান বের করার জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করবো। মালিকপক্ষের কাছে আমাদের আবেদন, আপনারা শ্রমিকদের সঙ্গে বোঝাপড়া করুন। কারখানা সচল রাখুন। অর্থনীতির দুর্বল স্বাস্থ্যকে সবল করে তুলুন।  

তিনি বলেন, আমাদের দায়িত্ব অনেক। ন্যায়ভিত্তিক একটি সমাজ গড়ে তোলার জন্য একসঙ্গে অনেকগুলো কাজে আমাদের হাত দিতে হবে। দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিচার বিভাগের বড় সংস্কারের কাজে হাত দিয়েছে। যোগ্যতম ব্যক্তিকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেয়াতে মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সন্ত্রাস দমন আইন ও ডিজিটাল/সাইবার নিরাপত্তা আইনে দায়েরকৃত মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলাগুলো প্রত্যাহার করা হচ্ছে। সাইবার নিরাপত্তা আইনসহ বাংলাদেশে বিদ্যমান সকল কালো আইনের তালিকা করা হয়েছে। অতি সত্বর এ সকল কালো আইন বাতিল ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সংশোধন করা হবে। সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডসহ বহুল আলোচিত ৫টি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ও দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তির জন্য সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সমপ্রতি আমরা বলপূর্বক গুম থেকে সকল ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক কনভেনশন সনদে স্বাক্ষর করেছি। ফলে স্বৈরাচার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ‘গুম সংস্কৃতি’র সমাপ্তি ঘটানোর জন্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলাম। এছাড়া আমরা ফ্যাসিবাদী শাসনের ১৫ বছরে গুমের প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করার জন্য পৃথক একটি কমিশন গঠন করছি। আয়নাঘরগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এবং সেই সঙ্গে বের হয়ে আসছে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের গুমের শিকার ভাইবোনদের কষ্ট ও যন্ত্রণা গাথা।

তিনি বলেন, তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যত যেন উজ্জ্বল হয় সেটা নিশ্চিত করতে শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে আমাদের পূর্ণ নজর রয়েছে। ইতিমধ্যে প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বর্তমানের ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাক্রম পরিবর্তন করা হয়েছে। বই সংশোধন এবং পরিমার্জনের কাজ শেষ পর্যায়ে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের উচ্চ প্রশাসনিক পদগুলো পূরণ করে শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক করার কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা বোর্ডে দখলদারিত্বের রাজনীতি বন্ধ করার ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছে।

সংবাদমাধ্যম ও মত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়েছে মন্তব্য করে সরকার প্রধান বলেন, আপনারা মন খুলে আমাদের সমালোচনা করেন। মিডিয়া যাতে কোনো রকম বাধা বিপত্তি ছাড়া নির্বিঘ্নে তাদের কাজ করতে পারে সেজন্য একটি মিডিয়া কমিশন গঠন করা সরকারের সক্রিয় বিবেচনাধীন। আরও যেসব কমিশন সরকারসহ অন্য সবাইকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে পারে, আমরা তাদের পুনর্গঠন ও সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছি যাতে তারা আরও শক্তিশালী হয়, জনকল্যাণে কাজ করে।

তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত এবং হাইকমিশনারবৃন্দ আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বৃদ্ধির আশ্বাস দিয়েছেন। আমার অনুরোধে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৫৭ জন বাংলাদেশি যারা ফ্যাসিবাদ বিরোধী বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করায় বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন তাদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছেন সে দেশের সরকার। ইতিমধ্যে তাদের কয়েকজন দেশে ফিরে এসেছেন। এই ক্ষমা প্রদর্শন ছিল অতি বিরল একটি ঘটনা।
ড. ইউনূস বলেন, আমরা ভারত এবং অন্যান্য প্রতিবেশী রাষ্ট্র সমূহের সঙ্গে সুসম্পর্ক চাই। তবে সেই সম্পর্ক হতে হবে ন্যায্যতা এবং সমতার ভিত্তিতে। ভারতের সঙ্গে আমরা ইতিমধ্যে বন্যা মোকাবিলায় উচ্চ পর্যায়ের  দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার আলোচনা শুরু করেছি। দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আমি সার্ক রাষ্ট্র গোষ্ঠী পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিয়েছি। তিনি বলেন, আমাদের দেশ যেন গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে বিশ্বের কাছে সম্মানের সঙ্গে পরিচিত হয়। দেশের পরিকল্পনা যেন দেশের মানুষ কেন্দ্রিক হয়, কোনো নেতা বা দল কেন্দ্রিক নয়।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমরা স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের অহেতুক কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্প বাস্তবায়িত হতে দেখেছি যেগুলো কখনোই দেশের মানুষের জন্য ছিল না, বরং এর সঙ্গে জড়িত ছিল কুৎসিত আমিত্ব এবং বিশাল আকারের চুরি। চলমান এবং প্রস্তাবিত সকল উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর যাচাই-বাছাই করার কাজ শুরু করেছি। প্রকল্প বাস্তবায়নের পর্যায় বিবেচনা করে বাকি কাজে ব্যয়ের সাশ্রয় এমনকি প্রয়োজনবোধে তা বাতিল করার কথা বিবেচনা করা হবে। দেশের মানুষকে আর ফাঁকি দেয়া চলবে না। কর্মসংস্থান তৈরি করবে এমন প্রকল্পগুলোকে আমরা অগ্রাধিকার দেবো।  

তিনি বলেন, লুটপাট ও পাচার হয়ে যাওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছি। আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে একটা ব্যাংকিং কমিশনও গঠন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে এই একমাসে বিরাট পরিবর্তন এসেছে। ফ্যাসিবাদী সরকার লুটপাট করার জন্য নতুন করে ষাট হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে বাজারে ছাড়ার কারণে মুদ্রাস্ফীতির শিকার হয়েছে দেশের মানুষ। এই অতুলনীয় মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয় যৌক্তিক পরিমাণে হ্রাস করার জন্য কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। কৃষিপণ্য উৎপাদনের জন্য সার আমদানির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহ নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারকে বাজারভিত্তিক করা হয়েছে। কালো টাকা সাদা করার অনৈতিক অনুমতি বাতিল করা হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি করতে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বাজেট সাপোর্ট চাওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে অতিরিক্ত ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, বিশ্ব ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, জাইকা থেকে অতিরিক্ত ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রদানের অনুরোধ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, পাইপলাইনে থাকা ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক সহায়তা ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মেগাপ্রকল্পের নামে লুটপাট বন্ধের পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উপর চাপ কমানোর লক্ষ্যে রাশিয়া এবং চীন থেকে প্রাপ্ত ঋণের সুদের হার কমানো এবং ঋণের মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। সকল উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও নিবিড় করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সকল অর্থনৈতিক সূচক এবং পরিসংখ্যানের প্রকৃত মান বা সংখ্যা প্রকাশের জন্য নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, প্রকৃত রপ্তানি আয় নিরূপণ এবং প্রকাশের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অটোমাইজেশনের লক্ষ্যে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। পুঁজি বাজারকে স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন পুনর্গঠন করা হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখার নিমিত্তে ব্যবসায়ী, শিল্প মালিক ও ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গে সভা করা হয়েছে এবং তাদের মতামতের ভিত্তিতে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু দ্রব্যাদি, যেমন পিয়াজ, আলু এসবের দাম আরও কমানোর জন্য বিদ্যমান শুল্কহার হ্রাসের বিষয়ে এনবিআরকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

ড. ইউনূস বলেন, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় হতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি আইনের অধীন চলমান সকল প্রকার নেগোসিয়েশন, প্রকল্প বাছাই এবং ক্রয় প্রক্রিয়াকরণ কার্যক্রম আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। গত দেড় দশকে এই আইন ব্যবহার করে লক্ষ কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। এ খাতে অধিকতর সক্ষমতা, গতিশীলতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিশেষজ্ঞগণের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্য জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী সহনশীল রাখতে অকটেন ও পেট্রোলের দাম ৬ টাকা এবং ডিজেল ও কেরোসিনের দাম ১.২৫ টাকা কমানো হয়েছে। ৩৭ দিন বন্ধ থাকার পর গত ২৫শে আগস্ট হতে মিরপুর-১০ ও কাজীপাড়া স্টেশন ছাড়া বাকি সব স্টেশনে মেট্রোরেল পুনরায় চালু করা হয়েছে।

ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সম্পর্কে বলেন,  মুক্তিযুদ্ধের সময় যাদের বয়স সাড়ে বারো বছরের কম ছিল, তাদের মুক্তিযোদ্ধা তালিকা হতে বাতিলের জন্য সুপ্রিম কোর্টে লিভ টু আপিলের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের আওতাধীন বেদখলকৃত স্থাবর সম্পত্তি উদ্ধারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।  

একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের রূপরেখা তৈরি করতে সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আর যেন আমাদের কোনো স্বৈরাচারের হাতে পড়তে না হয়, আমরা যাতে বলতে পারি আমরা একটি গণতান্ত্রিক দেশে বসবাস করি। তিনি বলেন, কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিবেন না। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি করলে তাকে অবশ্যই শাস্তির আওতায় নিয়ে আসবো। আমরা একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্ট হয় এমন কোনো কাজ কেউ করবেন না।

সরকার প্রধান বলেন, ধ্বংস হয়ে পড়া একটা জনপ্রশাসনকে নিয়ে যাত্রা শুরু করেছি। জনপ্রশাসনকে নতুন করে দাঁড় করানোই ছিল আমাদের কঠিনতম সময়। সকল সমস্যা সমাধান করে একটি নতুন জনপ্রশাসন কাঠামো দাঁড় করাতে পেরেছি এটাই আমাদের প্রথম মাসের সবচাইতে বড় অর্জন। আমার বিশ্বাস এই জনপ্রশাসন জনগণের ইচ্ছা পূরণে সর্বোচ্চ অবদান রাখতে পারবে। তিনি বলেন, গত একমাসে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ১৯৮টি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ড. ইউনূস বলেন, ছাত্র, শ্রমিক, জনতার বিপ্লবের মূল লক্ষ্য ছিল গণভবন। এটা ছিল স্বৈরাচারের কেন্দ্রবিন্দু। এই সরকার বিপ্লবের প্রতি সম্মান দেখিয়ে গণভবনকে বিপ্লবের জাদুঘর হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। ছাত্র-জনতার ক্ষোভকে স্থায়ীভাবে তুলে ধরার জন্য গণভবনের আর কোনো সংস্কার করা হবে না। ছাত্র-জনতার ক্ষোভের মুখে তা যে অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিল সে অবস্থায় তাকে রাখা হবে।

তিনি বলেন, আমরা নতুন বাংলাদেশকে পরিবেশবান্ধব এবং জীব বৈচিত্র্যময় দেশ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছি। এটি তরুণদের আকাঙ্ক্ষা। আমাদের সবারই আকাঙ্ক্ষা। সেই লক্ষ্যে আমি প্রথমেই একটি ক্ষুদ্র পদক্ষেপ নিয়েছি। আমার বাসভবন ও সমগ্র সচিবালয়ে প্লাস্টিকের পানির বোতল ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছি। ইতিমধ্যে সুপার শপগুলোতে পলিথিনের শপিং ব্যাগ ব্যবহার বন্ধ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। গত কয়েক দশকে যে পরিমাণ নদী দূষণ হয়েছে, আমরা তা বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছি।

সরকারপ্রধান বলেন, আমরা সংস্কার চাই। আমাদের একান্ত অনুরোধ, আমাদের ওপর যে সংস্কারের গুরু দায়িত্ব দিয়েছেন, সেই  দায়িত্ব দিয়ে আপনারা দর্শকের গ্যালারিতে চলে যাবেন না। আপনারা আমাদের সঙ্গে থাকুন। আমরা একসঙ্গে সংস্কার করবো। এটা আমাদের সবার দায়িত্ব। আপনারা নিজ নিজ জগতে সংস্কার আনুন। একটা জাতির সংস্কার শুধুমাত্র সরকারের সংস্কার হলে হয় না। এই সংস্কারের মাধ্যমে আমরা জাতি হিসেবে নতুনভাবে যাত্রা শুরু করতে চাই। আমাদের এই যাত্রা আমাদের পৃথিবীর একটি সম্মানিত জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করুক এটাই আমাদের সবার কাম্য।

তিনি বলেন, বিগত মাসে আমি বেশকিছু রাজনৈতিক দলের সঙ্গে পৃথকভাবে বসেছি। তাদের সঙ্গে মতামত বিনিময় করেছি। তারা আমাদের উৎসাহিত করেছেন। ছাত্র, শ্রমিক, জনতার বিপ্লবের লক্ষ্যের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। সংস্কারের কাজে পূর্ণ সহযোগিতা দেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। আমি দেশের বিশিষ্ট সম্পাদকবৃন্দের সঙ্গে মতবিনিময় করেছি। তারাও সংস্কারের কাজে পূর্ণ সহযোগিতা দেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। বিভিন্ন বিষয়ে মূল্যবান পরামর্শ দিয়েছেন। সবার পরামর্শ নিয়ে এখন আমাদের অগ্রসর হওয়ার পালা।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে ফ্যাসিজম বা স্বৈরতান্ত্রিক শাসন পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা রোধ এবং জনমালিকানা ভিত্তিক, কল্যাণমুখী ও জনস্বার্থে নিবেদিত একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রবর্তনের লক্ষ্যে কিছু জাতীয়ভিত্তিক সংস্কার সম্পন্ন করা জরুরি। উক্ত সংস্কার ভাবনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যবস্থা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। আমরা যেহেতু জনগণের ভোটাধিকার ও জনগণের মালিকানায় বিশ্বাস করি, সেহেতু নির্বাচন ব্যবস্থার উন্নয়নে আমাদের সংস্কার ভাবনায় গুরুত্ব পেয়েছে। আমরা মনে করি নির্বাচনের নামে সংখ্যাগরিষ্ঠতার একাধিপত্য ও দুঃশাসন মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়া বা এর মাধ্যমে এক ব্যক্তি বা পরিবার বা কোনো গোষ্ঠীর কাছে সকল ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়। এসব আশঙ্কা রোধ করার জন্য নির্বাচনের সঙ্গে সম্পর্কিত নির্বাচন কমিশনসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের কথা আমরা ভাবছি। নির্বাচন ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুলিশ প্রশাসন, জনপ্রশাসন, বিচার প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন এই চারটি প্রতিষ্ঠানের সংস্কার করা সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের জন্য অপরিহার্য। এসব প্রতিষ্ঠানের সংস্কার জনমালিকানা ভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায়ও অবদান রাখবে বলে বিশ্বাস করি। সমাজের সকল স্তরের মানুষের প্রতিনিধিত্ব ও স্বার্থ নিশ্চিত করার জন্য এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বার্তাকে প্রতিফলিত করার জন্য সাংবিধানিক সংস্কারের প্রয়োজন আমরা অনুভব করছি। ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, এসব বিষয়ে সংস্কার করার প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে আমরা প্রাথমিকভাবে ছয়টি কমিশন গঠন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এসব কমিশনের কাজ পরিচালনার জন্য বিষয়ভিত্তিক অভিজ্ঞতা বিবেচনা করে ছয়জন বিশিষ্ট নাগরিককে এই কমিশনগুলো পরিচালনা করার দায়িত্ব দিয়েছি। এরপর আরও বিভিন্ন বিষয়ে কমিশন গঠন প্রক্রিয়া আমরা অব্যাহত রাখবো।

তিনি বলেন, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন ড. বদিউল আলম মজুমদার, পুলিশ প্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে কাজ করবেন সফর রাজ হোসেন, বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মমিনুর রহমান, দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন ড. ইফতেখারুজ্জামান, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী, সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে ড. শাহদীন মালিক দায়িত্ব পালন করবেন। এসব কমিশনের অন্য সদস্যদের নাম কমিশন প্রধানদের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করা হবে। কমিশনগুলোর আলোচনা ও পরামর্শ সভায় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, ছাত্র, শ্রমিক, জনতা আন্দোলনের প্রতিনিধি, নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে সরকার পরবর্তী পর্যায়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শ সভার আয়োজন করবে। চূড়ান্ত পর্যায়ে ছাত্র সমাজ, নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক দলের  প্রতিনিধি, সরকারের প্রতিনিধি নিয়ে ব্যাপকভিত্তিক তিন থেকে সাত দিনব্যাপী একটি পরামর্শ সভার ভিত্তিতে সংস্কার ভাবনার রূপরেখা চূড়ান্ত করা হবে। এতে এই রূপরেখা কীভাবে বাস্তবায়ন হবে তার একটি ধারণাও দেয়া হবে।
তিনি বলেন, আমাদের সামনে অনেক কাজ। সবাই মিলে একই লক্ষ্যে আমরা অগ্রসর হতে চাই। আমাদের মধ্যে, বিশেষ করে আমাদের নতুন প্রজন্মের মধ্যে যে সুপ্ত প্রতিভা লুকিয়ে আছে সেটা যেন বিনা বাধায়, রাষ্ট্রের এবং সমাজের সহযোগিতায় প্রকাশ করতে পারি সেই সুযোগের কাঠামো তৈরি করতে চাই।

সরকারপ্রধান বলেন, আমাদের কাজ বড় কঠিন, কিন্তু জাতি হিসেবে এবার ব্যর্থ হওয়ার কোনো অবকাশ আমাদের নেই। আমাদের সফল হতেই হবে। এই সাফল্য আপনাদের কারণেই আসবে। আপনার সহযোগিতার কারণে আসবে। আমাদের কাজ হবে আপনার, আমার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপায়িত করা। এখন আমরা দ্বিতীয় মাস শুরু করছি। আমাদের দ্বিতীয় মাসে যেন আপনাদের মনে দৃঢ় আস্থা সৃষ্টি করতে পারি সে চেষ্টা করে যাবো।

তিনি বলেন, ধৈর্য ধরুন এই কথাটি আমি মোটেই আপনাদের বলবো না। আমরা সবাই অধৈর্য হয়ে পড়েছি এতসব কাজ কখন যে শেষ হবে এটা চিন্তা করে। আমরা অধৈর্য হবো। কেন হবো না? কিন্তু সঠিকভাবে কাজ করবো। কাজে কোনো অধৈর্যের চিহ্ন রাখবো না।

mzamin

প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্কে কমালার চমক

এক অগ্নিঝরা প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্ক। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ৫ই নভেম্বর প্রেসিডেন্ট পদের দুই প্রার্থী- কমালা হ্যারিস ও ডনাল্ড ট্রাম্প। প্রথমজন ডেমোক্রেট। দ্বিতীয়জন রিপাবলিকান। মঙ্গলবার স্থানীয় সময় রাতে ফিলাডেলফিয়ায় তাদের মধ্যে বিতর্ক ছিল রীতিমতো উত্তেজনায় ভরা। আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে প্রতিটি পর্বই ছিল প্রাণবন্ত। বিতর্ককে অভিহিত করা হচ্ছে ফায়ারিং ডিবেট হিসেবে। বিতর্কে উঠে আসে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, গর্ভপাত, অভিবাসন, ইসরাইল-ফিলিস্তিন, ক্যাপিটল হিলে দাঙ্গার মতো বিষয়। বিতর্কে উভয় নেতা একে অন্যকে মিথ্যাবাদী বলে আখ্যায়িত করেন। হলঘর দর্শকশূন্য ছিল এ সময়। ফলে কোনো হর্ষধ্বনি বা দুয়োধনি- কিছুই শোনা যায়নি। তবে টেলিভিশনের পর্দায় লাখ লাখ মার্কিনি এই বিতর্ক উপভোগ করেছেন। বরাবরের মতো এই বিতর্কে কে বিজয়ী হয়েছেন তা নিয়েও ব্যাপক আগ্রহ সবার। এমন অবস্থায় ডনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থক মিডিয়া ফক্স নিউজ বলছে, বিতর্কে বিজয়ী হয়েছেন কমালা হ্যারিস। ফক্স নিউজের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ব্রিট হিউম বলেছেন, মঙ্গলবার রাতের বিতর্কে কমালা জিতেছেন। তার ভাষায়- বিতর্ক শুনে মনে হয়েছে কমালা খুব ভালোভাবেই প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিলেন। তিনি সেভাবেই প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। কি বলছেন, সে বিষয়ে ছিলেন সচেতন। এ বিতর্কে কমালা ছিলেন একেবারে ভিন্ন এক ব্যক্তি। একই রকম কথা বলেছে ওয়াশিংটন পোস্ট। বিতর্কের পর পরই জরিপ চালায় সিএনএন। তাতেও কমালা জয়ী হয়েছেন বলা হয়েছে।

বিশ্ব জুড়ে সচেতন মানুষের চোখ ছিল কমালা হ্যারিস ও ডনাল্ড ট্রাম্পের দিকে। অনলাইন ডয়চে ভেলে জানাচ্ছে- বিতর্কে কমালা হ্যারিস মার্কিনিদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনাদের জন্য ট্রাম্পের কোনো পরিকল্পনা নেই। ট্রাম্প শুধু ধনীদের জন্য কর ছাড় দেয়া নিয়ে চিন্তিত। তিনি সুবিধাবাদী অর্থনীতির পক্ষে। এতে ট্রাম্প জবাব দিয়েছেন। বলেছেন- কমালা হলেন খালি কলসি, যার ঢক্কানিনাদ বেশি। তার কোনো পরিকল্পনা নেই। তিনি বাইডেনের পরিকল্পনাই পরিবেশন করছেন। বিপরীতে কমালা অভিযোগ করেন, ট্রাম্প চীন ও অন্য দেশ থেকে আসা জিনিসের ওপর মাশুল বাড়াতে চান। এটা আসলে আমেরিকানদের ওপর কর বসানো। ফলে জিনিসের দাম বেড়ে যাবে। প্রতি মাসে সাধারণ মানুষের উপর কতোটা বোঝা চাপবে সেটাও জানিয়েছেন তিনি। ট্রাম্প বলেন, মাশুলের অর্থ দিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের কর কমাবেন। তার দাবি, মাশুলের ফলে জিনিসের দাম বাড়বে না। বরং এই মাশুল না থাকলে বেশি দামে জিনিস কিনতে হবে। এসময় হ্যারিস দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের জন্য তিনি নিজস্ব একটা আর্থিক নীতি নিয়ে চলছেন। ট্রাম্পের পাল্টা অভিযোগ, কমালা পুলিশের জন্য অর্থ কমাতে চান, সকলের কাছ থেকে বন্দুক কেড়ে নিতে চান। কমালা বলেন, তার কাছে ও তার রানিংমেট টম ওয়ালজের কাছে অনুমোদিত বন্দুক আছে। নিজের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য তিনি বন্দুক রেখেছেন।

ইসরাইল-ফিলিস্তিন ইস্যুতেও ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেছেন মার্কিন দুই নেতা। ট্রাম্প ও কমালা দু’জনের কাছ থেকেই জানতে চাওয়া হয়, তারা কী করে ইসরাইল-হামাস যুদ্ধ থামাবেন? জবাবে কমালা তার আগের অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। বলেন, ইসরাইলের আত্মরক্ষার অধিকার আছে। গতবছর ৭ই অক্টোবর হামাস ইসরাইলে ঢুকে এক হাজার দুইশ’ মানুষকে হত্যা করে। তিনি আরও বলেন, এখন যুদ্ধ অবিলম্বে বন্ধ হওয়া দরকার। গাজায় সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতি প্রয়োজন। সেই সঙ্গে যাদের জিম্মি করে রাখা হয়েছে, তাদের মুক্তি দিতে হবে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, আমাদের দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পথেই যেতে হবে। এর ফলে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। ট্রাম্পের দাবি, তিনি প্রেসিডেন্ট থাকলে এই লড়াই হতোই না। তার অভিযোগ, হ্যারিস ইসরাইলকে ঘৃণা করেন। তিনি প্রেসিডেন্ট হলে দুই বছরের মধ্যে ইসরাইল বলে কোনো দেশ থাকবে না। ট্রাম্পের অভিযোগ, হ্যারিস আরবদেরও ঘৃণা করেন। প্রেসিডেন্ট হলে দ্রুত এর সমাধান করার কথা জানান ট্রাম্প। হ্যারিস বারবার শপথ করে বলেন, তিনি এই সব অভিযোগ অস্বীকার করছেন। তিনি ইসরাইলের নিরাপত্তার অধিকার সমর্থন করেন। তার পাল্টা দাবি, বিশ্বনেতারা ট্রাম্পের কথায় হাসছেন।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ প্রসঙ্গে ট্রাম্প দাবি করেন, আমি এই যুদ্ধ বন্ধ করতে চাই। আমি মানুষের জীবন বাঁচাতে চাই। বাইডেন প্রশাসন ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন হতে দিয়েছে। এসময় সঞ্চালক ট্রাম্পকে প্রশ্ন করেন, আপনি কি চান- ইউক্রেন যুদ্ধে জিতুক? ট্রাম্প এই প্রশ্ন কৌশলে এড়িয়ে যান। কমালা হ্যারিস অভিযোগ করেন, ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হলে তিনি পুতিনকে ইউক্রেন দখল করে নিতে দেবেন। হ্যারিস বলেন, ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হলে পুতিন এতক্ষণে কিয়েভে বসে থাকতেন। তার নজর থাকতো বাকি ইউরোপের দিকে। হ্যারিস বলেন, ইউরোপীয় নেতারাও চান না, ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হোন।
ক্যাপিটল হিলের হামলা নিয়ে ট্রাম্প বলেন, ক্যাপিটলের ঘটনার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আমাকে ওরা একটা ভাষণ দিতে বলেছিল, এটুকুই। তার সমর্থকরা ক্যাপিটলে প্রবেশের আগে ট্রাম্প ভাষণ দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন, ফাইট লাইক হেল। তিনি সে সময় তার সমর্থকদের শান্তিপূর্ণভাবে ক্যাপিটলে যেতে বলেছিলেন। ট্রাম্প এই কথা বলতে অস্বীকার করেন যে, তিনি অনুতপ্ত। হ্যারিস বলেন, পাতা উল্টে দেখুন। ওইদিন কী বিশৃঙ্খলা হয়েছিল সেটা দেখুন।

গর্ভপাত নিয়ে ট্রাম্পের কাছে তার মতামত জানতে চাওয়া হয়। ট্রাম্প বলেন, ডেমোক্রেটরা চায় গর্ভধারণের নয় মাস পরেও গর্ভপাত করার অধিকার দিতে। তিনি চান, গর্ভপাতের বিষয়টি রাজ্যগুলো ঠিক করুক। তারা আইন করুক। ধর্ষণ বা কিছু ক্ষেত্রে তিনি গর্ভপাতের অধিকারের পক্ষে। ট্রাম্পের অভিযোগ, কিছু রাজ্যে শিশু জন্মানোর পরেও তাদের প্রাণনাশের ব্যবস্থা আছে। বিতর্ক যারা পরিচালনা করছিলেন, তারা বলেন, কোনো রাজ্যেই এই ধরনের কোনো ব্যবস্থা নেই। হ্যারিস বলেন, ট্রাম্পের আমলে যে তিনজন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগ করা হয়, তারাই দুই বছর আগে গর্ভপাত নিয়ে কেন্দ্রীয় স্তরে সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার বাতিল করেছেন। তিনি আবেগতাড়িত হয়ে বলেন, ট্রাম্পের গর্ভপাত নিয়ে নিষেধাজ্ঞায় ধর্ষিতাদের ক্ষেত্রেও কোনো ছাড় দেয়া হয়নি।

কমালা হ্যারিস বিতর্ক শেষ করেন এইভাবে, আমরা আর পেছনে ফিরে যেতে চাই না। আমরা সামনের দিকে তাকাতে চাই। আমরা নতুন পথে হাঁটতে চাই। ট্রাম্প বলেন, হ্যারিস ছিলেন বাইডেন প্রশাসনের অঙ্গ। তিনি মানুষকে চাকরি দিতে পারেননি, যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত সমস্যার সমাধান করতে পারেননি। তার উচিত, এখনই সরে দাঁড়ানো।

এ বিতর্কের পর কমালার নির্বাচনী প্রচার শিবিরের মুখপাত্র জেন ও’ম্যালি ডিলন বলেন, বিতর্কে ডনাল্ড ট্রাম্প পুরোপুরি অসংলগ্ন ছিলেন। তিনি ছিলেন রাগান্বিত ও বিশৃঙ্খল। অন্যদিকে ট্রাম্পের নির্বাচনী শিবির থেকে দাবি করা হয়, তাদের প্রার্থী নিপুণ দক্ষতার সঙ্গে বিতর্ক করেছেন। ও’ম্যালি ডিলন বলেন, বিতর্ক জুড়ে বিভিন্ন বিষয়ে ট্রাম্পকে লক্ষ্যচ্যুত করতে সক্ষম হয়েছেন কমালা। ব্রিট হিউম আরও বলেন, ‘মঙ্গলবার ট্রাম্পের জন্য খারাপ একটি রাত।’ আরেকজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক হ্যারল্ড ফোর্ড জুনিয়র সরাসরি বলেন, ‘আজ রাতে, কমলা জিতেছেন।’

কে ভালো করেছেন?- ওয়াশিংটন পোস্টের পক্ষ থেকে কয়েকজন ভোটারের কাছে এ প্রশ্নের উত্তর জানতে চাওয়া হয়। তারা সবাই সুইং স্টেট বা দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যের ভোটার। কোনো নির্বাচনের আগে পরিচালিত বিভিন্ন জরিপে যদি দেখা যায়, কোনো অঙ্গরাজ্যে দুই দলের কেউই সুস্পষ্টভাবে এগিয়ে নেই, তখন সেই অঙ্গরাজ্যকে সুইং স্টেট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ভোটারদের মতামতের ভিত্তিতে ওয়াশিংটন পোস্ট বলেছে, মঙ্গলবার রাতের বিতর্কে এগিয়ে রয়েছেন কমালা।

মার্কিন ভোটার শ্যারির বয়স চল্লিশের কোঠায়। ওয়াশিংটন পোস্টকে তিনি বলেন, ট্রাম্পের বিপরীতে বিতর্কের জন্য প্রস্তুত হয়েই এসেছিলেন কমালা। তিনি ভালোভাবে প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। তিনি যে একজন যোগ্য প্রার্থী, সেটা প্রমাণের সুযোগ কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছেন। তবে ট্রাম্পের পক্ষ নিয়ে কোনি নামের আরেকজন ভোটার বলেন, আমার মনে হয় না কমালা কোনো প্রশ্নের প্রকৃত উত্তর দিতে পেরেছেন। 

mzamin
মঙ্গলবার রাতে বিতর্কের পর বুধবার সকালে নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটানে বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রে সন্ত্রাসী হামলায় নিহতদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভে একই সঙ্গে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন প্রেসিডেন্ট পদের দুই প্রার্থী সাবেক প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট কমালা হ্যারিস। মঙ্গলবার ফিলাডেলফিয়ায় বিতর্কের আগে তাদের মধ্যে সাক্ষাৎ হয়নি। কিন্তু বিতর্কে প্রথম হাত মেলানোর পর ম্যানহাটানে একই সময়ে গিয়ে দ্বিতীয়বার আবার তারা হাস্যোজ্বল হাত মেলালেন। কুশল বিনিময় করলেন। এ সময় তাদের মাঝে উপস্থিত ছিলেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। ট্রাম্পের পাশে এ সময় উপস্থিত ছিলেন নির্বাচনে তার রানিংমেট ওহাইওর সিনেটর জেডি ভ্যান্স।

সিরাজগঞ্জের সেই অস্ত্রধারীরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে by সুজন সরকার

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমন করতে প্রশাসনকে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই নির্দেশে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ তাদের অন্যান্য অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা মাঠ দখলে রাজপথে নামে। গত ৪ঠা আগস্ট দুপুর থেকে সিরাজগঞ্জে পুলিশের পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের দমনে রাজপথে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়ে মাঠে নামে ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ ক্ষমতাসীনদের বিভিন্ন সংগঠনের ক্যাডাররা। এই ঘটনায় সিরাজগঞ্জ জেলা শহর, রায়গঞ্জ, হাটিকুমরুল, শাহজাদপুর ও এনায়েতপুরে ছাত্র-জনতার সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও পুলিশের সংঘর্ষে এনায়েতপুর থানার ১৫ জন পুলিশ সদস্য ও ২ জন কলেজ ছাত্রসহ ১ ব্যবসায়ী, সদরে ১ জন শিক্ষার্থী, ২ জন যুবদল কর্মী ও রায়গঞ্জে ১ জন ইউপি চেয়ারম্যান ও ৪ জন আওয়ামী লীগ নেতাসহ ২৭ জন নিহত হয়েছে।

সূত্র মতে, আন্দোলন ঠেকাতে সিরাজগঞ্জের এসএস রোড, মুজিব সড়ক, ইবি রোডসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় আগ্নেয়াস্ত্র হাতে জড়ো হন ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের শত শত ক্যাডার। সেদিন অত্যাধুনিক সব ধরনের অস্ত্রের মহড়া দেখা গেছে। নিরীহ ছাত্র-জনতার ওপর গুলিসহ মারপিটও করে ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডাররা। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে জেলার বিভিন্ন স্থানে দেখা গেছে অস্ত্রের ঝনঝনানি। সেই সঙ্গে ক্যাডাররা বন্দুক, রিভলবার, পিস্তলসহ অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ও রাম দা, হকিস্টিক, রডসহ বিভিন্ন ধরনের ধারালো দেশীয় অস্ত্র হাতে হামলা চালায় ছাত্র-জনতার ওপর।

একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন,  আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে বারবার বিদেশি সটগান দিয়ে গুলি করছিল আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকর্মী। ছবিতে দেখা যায়, স্থানীয় সংসদ সদস্য জান্নাত আরা হেনরীর ভাতিজা ও যুবলীগ নেতা এনামুল হক, পাশেই আরেক যুবলীগ নেতা এমএ মুছা ও করিম মুন্সি গুলি ছুড়ছেন সটগান দিয়ে। ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের হাতেও ছিল ছুড়ি, রামদা, রড, ফালা ও লাঠিসহ দেশীয় অস্ত্র। এই সকল অস্ত্রের গুলিতে নিহত হয় যুবদলের তিনজন। প্রকাশ্য দিবালোকে এ সকল অবৈধ অস্ত্রের প্রদশনীর ৩৮ দিন পার হলেও এই অস্ত্র উদ্ধারে প্রশাসনের নেই কোনো তৎপরতা। ইতিমধ্যে নিহতের ঘটনায় জেলায় ৫টি মামলায় আসামি করা হয়েছে প্রায় ১০ হাজার  লোককে। সেদিন আওয়ামী লীগ নেতাদের ব্যবহৃত সেই অস্ত্র্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। সেই সঙ্গে এনায়েতপুর ও হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানা থেকে ২৮টি অস্ত্র খোয়া যায়। এরমধ্যে ১৭টি উদ্ধার করা গেলেও ১১টি এখন উদ্ধার হয়নি। খোয়া যাওয়া অস্ত্রগুলো উদ্ধার না হওয়ায় চরম আতঙ্কে রয়েছে সাধারণ মানুষসহ পুলিশ সদস্যরা। এত অস্ত্র বাহিরে রেখে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও রয়েছে চরম আতঙ্কে।

এদিকে, গত ৪ঠা সেপ্টেম্বর থেকে অস্ত্র উদ্ধারে যৌথ বাহিনীর অভিযান শুরু হওয়ায় জনমনে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে। সিরাজগঞ্জবাসীর প্রত্যাশা, যৌথ বাহিনী সশস্ত্র সন্ত্রাসী ক্যাডার, তাদের সহযোগী ও গডফাদারদেরও আইনের আওতায় নিয়ে আসবে। সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপি সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বাচ্চু বলেন, আওয়ামী লীগের ক্যাডারদের গুলিতে যুবদলের ৩ কর্মী নিহত হয়েছে। অনেকেই আহত হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। তাই অবৈধ অস্ত্রগুলো যদি উদ্ধার না হয় তাহলে আমরা নিরাপদ নয়। এ ছাড়াও কয়েকটি থানা থেকে পুলিশের অস্ত্র লুট হয়েছে সেই অস্ত্রগুলো এখনো উদ্ধার হয়নি। তাই নিরাপত্তার স্বার্থে প্রশাসনকে বলবো যারা শিক্ষার্থীদের গুলি করেছে, যুবদলের নেতাকর্মীদের হত্যা করেছে তাদো দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা।

সিরাজগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মো. শামছুল আলম জানান, দুইটি থানা থেকে মোট ২৮টি অস্ত্র আন্দোলনের সময় খোয়া যায়। ইতিমধ্যে ১৭টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি ১১টি উদ্ধারের জন্য অভিযান চলছে। আশা করি দ্রুত এ সকল অস্ত্র উদ্ধার করতে স্বক্ষম হবো। আন্দোলনের সময় যারা অবৈধ অস্ত্র নিয়ে মহড়া গিয়েছে ও গুলি করেছে এসব অস্ত্রধারী অপরাধীদের ধরতে অভিযান চলছে।

mzamin

শ্রমিক অসন্তোষ: সাভার-আশুলিয়ায় ১১১ কারখানা বন্ধ ঘোষণা, গাজীপুরে বিক্ষোভের পর অগ্নিসংযোগ

চলমান শ্রমিক অসন্তোষের জেরে গতকাল সাভার ও আশুলিয়ায় ১১১টি তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া গাজীপুরে বিক্ষোভের জের ধরে ১৫টি কারখানা বন্ধ ও ছুটি ঘোষণা করা হয়। কাশিমপুর এলাকার বেক্সিমকো গ্রুপের কারখানার বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা বিগবস কারখানার গোডাউনে অগ্নিসংযোগ করে। এসময় তুরাগ গার্মেন্টস কারখানায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে।

এদিকে আশুলিয়ায় বিভিন্ন দাবিতে চলমান শ্রমিক অসন্তোষের জেরে ৫১টি তৈরি পোশাক কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল এই ঘোষণা দেয় সংশ্লিষ্ট কারখানা কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া আরও ৬০টি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। কোথাও কোনো ধরনের সড়ক অবরোধ বা বিক্ষোভের খবর পাওয়া যায়নি। তবে শিল্পাঞ্চলের অন্যান্য কারখানাসহ ঢাকা ইপিজেডের কারখানাগুলো চালু রয়েছে। সরজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আশুলিয়ার কাঠগড়া থেকে জিরাবো এলাকায় অধিকাংশ তৈরি পোশাক কারখানার মূল ফটকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণার নোটিশ টাঙিয়ে দেয়া হয়েছে। এরমধ্যে আশুলিয়ার নরসিংহপুর, ইউনিক, জামগড়া, বেরন এলাকার হা-মীম গ্রুপ, শারমিন গ্রুপ, এনভয় কমপ্লেক্স, হলিউড গার্মেন্টস প্রাইভেট লিমিটেড, স্টারলিং এ্যাপারেলস লিমিটেড, ভার্চ্যুয়াল বটয়ম, মণ্ডল নিটওয়্যারস লিমিটেড, সিগমা ফ্যাশনস লিমিটেড, ক্রশওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিস লিমিডেট, জিন্স প্রডিউসার লিমিটেড, অরুনিমা গ্রুপের অরুনিমা স্পোর্টসওয়্যার লিমিটেড, ডিএমসি এ্যাপারেলস লিমিটেড, এস এম নিটওয়্যারস লিমিটেড, আজমত গ্রুপের আজমত এ্যাপারেলস লিমিটেড, জেড-থ্রি কম্পোজিট নিটওয়্যার লিমিটেড ও জি-থ্রি ওয়াশিং প্যান্ট লিমিটেড, এনভয় কমপ্লেক্স, আগামী এ্যাপারেলস লিমিটেড, মানতা এ্যাপারেলস লিমিটেডসহ বেশকিছু কারখানার মূল ফটকে একই নোটিশ টানানো রয়েছে। নোটিশে বলা হয়েছে ‘গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়াসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় পোশাক শ্রমিকদের বিভিন্ন দাবিতে কেন্দ্র করে গার্মেন্টস কারখানায় ভাঙচুরসহ হট্টগোল চলছে। বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা উত্তেজিত হয়ে আমাদের কারখানায় ভাঙচুর চালানোর চেষ্টা করে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বুধবার থেকে শ্রম আইন-২০০৬ এর ১৩ (১) ধারা অনুসারে অনির্দিষ্টকালের জন্য ৫১টি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হলো। শ্রম আইন-২০০৬ এর ১৩ (১) ধারাতে বলা হয়েছে, কোনো প্রতিষ্ঠানের কোনো শাখা বা বিভাগে বেআইনি ধর্মঘটের কারণে মালিক উক্ত শাখা বা প্রতিষ্ঠান আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে পারবেন, এমন বন্ধের ক্ষেত্রে ধর্মঘটে অংশগ্রহণকারী শ্রমিকরা কোনো মজুরি পাবেন না। কয়েকটি কারখানায় শ্রমিকরা নির্দিষ্ট সময়ে উপস্থিত হলেও কারখানা বন্ধ থাকায় তারা চলে যান। বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে সড়কে টহল দিচ্ছে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা। বিভিন্ন কারখানার সামনে মোতায়েন রয়েছে অতিরিক্ত সেনা, পুলিশ ও এপিবিএন সদস্যরা। শিল্প পুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার সারোয়ার আলম জানান, সকাল থেকে আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের কোথাও কোনো সড়ক অবরোধ, কারখানায় হামলা বা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেনি। সকালে সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের প্রায় সব কারখানায় কাজে যোগ দেয় শ্রমিকরা। বেশির ভাগ কারখানাতেই উৎপাদন স্বাভাবিক রয়েছে। তবে আগে থেকেই কিছু কারখানায় অভ্যন্তরীণ বেশকিছু দাবি-দাওয়া নিয়ে শ্রমিক অসন্তোষ চলছিল।

সেসব কারখানার শ্রমিকরা কাজে ফেরেনি: সাভার- আশুলিয়া ও জিরানি এলাকায় ৫১টি কারখানায় শ্রম আইনের ১৩ (১) ধারা অনুযায়ী বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র একজন পরিচালক বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, বন্ধ থাকা ১১৪টি কারখানার মধ্যে ১১১টি সাভার-আশুলিয়া ও জিরানি এলাকায়। অন্যদিকে শিল্পাঞ্চলে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে কারখানাগুলোর সামনে মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য। পাশাপাশি যৌথ বাহিনীর টহলও অব্যাহত রয়েছে।

ওদিকে গাজীপুরের অধিকাংশ তৈরি পোশাক কারখানাসহ অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠান চালু থাকলেও ৩টি কারখানায় শ্রমিক বিক্ষোভ হয়েছে। শ্রমিক বিক্ষোভ চলাকালে একটি কারখানার গোডাউনে আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা। আগুন নিভাতে গেলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ভাঙচুর করে ফিরিয়ে দেয়া হয়। বিক্ষোভের জের ধরে অন্তত ১৫টি কারখানা বন্ধ ও ছুটি ঘোষণা করা হয়।

গতকাল সকাল থেকে বকেয়া বেতন-ভাতার দাবিতে গাজীপুরের চক্রবর্তী এলাকায় বেক্সিমকো গ্রুপের কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভ করে চন্দ্রা-নবীনগর সড়ক অবরোধ করে। এর আগে মঙ্গলবারও বকেয়া বেতনের দাবিতে বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের শ্রমিকরা বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করে। কারখানাটির মালিক কারাগারে আটক আওয়ামী লীগ নেতা সালমান এফ রহমান। শ্রমিকরা জানান, গত কয়েক দিন ধরে তারা গত মাসের বেতন-ভাতা প্রদানের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। তাদের দাবির প্রেক্ষিতে মঙ্গলবার বেতন দেয়ার কথা জানায় কারখানা কর্তৃপক্ষ। কিন্তু সেদিন কিছু শ্রমিককে বেতন দেয়া হলেও বেশির ভাগ শ্রমিক বেতন পায়নি। সে কারণে তারা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছেন।

এদিকে, পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দিনভর চেষ্টা করে। আন্দোলনের প্রেক্ষিতে পাশের বিগবস পোশাক কারখানার গোডাউনে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা। আগুন নেভাতে গেলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করা হয়। গাজীপুরের কাশিমপুর ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন মাস্টার তাশারফ হোসেন জানান, বুধবার দুপুর ১টার দিকে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের কাশিমপুরের বিগবস পোশাক কারখানার গোডাউনে আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা। সকাল থেকেই পাশের কারখানা বেক্সিমকো গ্রুপে বকেয়া বেতনের দাবিতে আন্দোলন চলছিল। তবে কারা আগুন ধরিয়েছে, এটা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট পাঠানো হলে উত্তেজিত শ্রমিকরা গাড়ি ভেঙে দেয়। এতে আগুন নেভানোর জন্য ঘটনাস্থলে পৌঁছতে না পেরে ফিরে আসে ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট দুটি। এ বিষয়ে সেনাবাহিনীর সহায়তা চাওয়া হয়েছে। তবে কারখানা শ্রমিকরা নিজস্ব অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

এ বিষয়ে গাজীপুর শিল্প পুলিশের বেক্সিমকো জোনের সহকারী পুলিশ সুপার মো. গোলাম মোর্শেদ জানান, বেক্সিমকো কারখানার আন্দোলন চলাকালে ওই এলাকার তুরাগ গার্মেন্টস কারখানায় ভাঙচুর করা হয়। বিগবস পোশাক কারখানায় হামলা চালিয়ে গোডাউনে আগুন দেয়া হয়। এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে জিরানী এলাকার সব কারখানা ছুটি ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া আগে থেকেই চন্দ্রা এলাকার নায়াগ্রা টেক্সটাইল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রয়েছে। এদিকে, গাজীপুর সদর উপজেলার বাংলাবাজার এলাকার পারটেক্স বেভারেজ লিমিটেড, হোতাপাড়া এলাকার ফুওয়াং সিরামিক লিমিটেড, সিটি করপোরেশনের ভার্গো এম এইচ লিমিটেড পোশাক কারখানা ও শ্রীপুরের একটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরাও বিভিন্ন দাবিতে সড়কে নেমে বিক্ষোভ করেছেন। গত মঙ্গলবারের শ্রমিক আন্দোলনের জেরে ইতিমধ্যে জেলার অন্তত পাঁচটি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করেছেন কর্তৃপক্ষ। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- গাজীপুর সদর উপজেলার শিরিরচালা এলাকার এস এম নিটওয়্যার লিমিটেড, গিলারচালা এলাকার ফমকম ফ্যাশন, ফমকম প্রিন্টিং ও এমব্রয়ডারি কারখানা।
এ বিষয়ে গাজীপুর শিল্প পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার এসএম আজিজুল হক জানান, সদর উপজেলার বাঘের বাজার, শিরিরচালা এলাকার ৪-৫ কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি হলে সেসব কারখানা খুলে দেয়া হবে। শ্রমিক অসন্তোষ, বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, কারখানা ভাঙচুরের ঘটনায় গত সপ্তাহে গাজীপুরের বেশ কিছু কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। গত বৃহস্পতিবার থেকে বিজিএমইএ’র সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ও সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার আশ্বাস পেয়ে প্রায় সব কারখানা চালু করেন শিল্প মালিকগণ।

mzamin

পদত্যাগ করলেন কেন সুজন by ইশতিয়াক পারভেজ

কয়েকদিন ধরেই গুঞ্জন ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) থেকে পদত্যাগ করছেন খালেদ মাহমুদ সুজন। গতকাল সকালে তা সত্যি হলো। তিনি বিসিবিতে তার পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। তবে এখন থেকে ফের আলোচনা শুরু। কেন হঠাৎ করেই সরে গেলেন তিনি? কী কারণ হতে পারে এর পেছনে! এর পেছনে দুটি বিষয় শোনা যাচ্ছে। একটি হলো সরকার ও বিসিবি সভাপতি পরিবর্তনের পর এই বোর্ডে আর কাজ করা সম্ভব হচ্ছিল না নানা বিতর্কের কারণে। আরেকটি কারণ বেশ জোড়ালো ভাবে শোনা যাচ্ছে আর বিসিবি পরিচালক হিসেবে নয় তিনি মাঠে থাকতে চান কোচ হিসেবে। কেউ কেউ বলছেন তিনি হয়তো জতীয় দলের প্রধান কোচ হয়ে ফিরবেন। তবে এমন কথার কোনো সত্যতা মেলেনি। এমনকি তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি মুঠোফোনে। তার পদত্যাগের বিষয়টি  দৈনিক মানবজমিনকে নিশ্চিত করেন বিসিবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিজামুদ্দিন চৌধুরী সুজন।

তিনি বলেন, ‘হ্যা, আমরা আজ (বুধবার) সকালেই তার পদত্যাগ পত্র পেয়েছি। কারণ হিসেবে সেখানে ব্যক্তিগত লিখা আছে।’ তার মানে সুজন বিসিবিকেও জানিয়েছেন ব্যক্তিগত কারণে তিনি পদত্যাগ করেছেন! ২০১৩ তে নাজমুল হাসান পাপনের সঙ্গী হয়ে বিসিবিতে পরিচালক হয়ে এসেছিলেন খালেদ মাহমুদ। তার সঙ্গে ছিলেন জাতীয় দলের সাবেক দুই ক্রিকেটার আকরাম খান ও নাঈমুর রহমান দুর্জয়। সেবারই জাতীয় দলের সাবেক তিন অধিনায়ককে বিসিবি’র পরিচালক হতে দেখা যায়। ধারণা করা হচ্ছিল তাদের হাত ধরেই বদলে যাবে বাংলাদেশের ক্রিকেট। তবে যত দিন গড়িয়েছে ততোই তাদের নিয়ে বেড়েছে বিতর্ক। আগষ্টে গনআন্দোলনে সরকারের পতনের পর বিসিবিতেও বড় বদলের দাবি উঠে। এরই মধ্যে পাপন সহ বিবিবির অনেক পরিচালক চলে যান আত্মগোপনে।  ই-মেইলের মাধ্যমে পদত্যাগ করেন পাপন। শেষ হয় তার ১২ বছরের অধ্যায়। তবে এমন সময়েও দেশে ছিলেন খালেদ মাহমুদ ও আকরাম খান। অন্যদিকে বিসিবিতে আর না এসেই নিজের পদত্যাগপত্র পাঠান দুর্জয়। আর গতকাল সেই তালিকাতে যুক্ত হলো সুজনের নাম। তবে এখনো এই বোর্ডে বহালতবিয়তে আছেন আকরাম। সুজনের বিদায়ের পর এখন বিসিবিতে ১১ জন পরিচালককে পাওয়া যাবে সশরীরে। বাকিদের ভাগ্য নির্ধারণ হবে পদত্যাগ কিংবা তিন কার্যনির্বাহী সভাতে অংশ না নেয়ার মধ্য দিয়ে। সুজনের পদত্যাগের দুটি কারণের একটি হলো তাকে নিয়ে আর বিসিবি কাজ করতে চাইছে না। তাকে নিয়ে আপত্তি আছে ক্রীড়া উপদেষ্টারও। তার বিপক্ষে সরাসরি কোনো দুর্নীতির অভিযোগ না থাকলেও নাজমুল হাসান পানের বোর্ডে নানা রকম  মেকানিজমের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়াও জানা গেছে তাকে গেম ডেভালপমেন্টের পদ থেকে সরিয়ে সেখানে নয়া পরিচালক নাজমুল আবেদিন ফাহিমকে দায়িত্ব দেয়ার কথাও আলোচনা হয়েছে। বিসিবির গেম ডেভেলপমেন্ট বিভাগের দায়িত্বে সুজন ছিলেন লম্বা সময়। তার মেয়াদকালে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল ২০২০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জেতে।

বোর্ড পরিচালক থাকাকালীন আরও কিছু দায়িত্বে দেখা গেছে সুজনকে। তিনি বাংলাদেশ জাতীয় দলের অন্তর্বর্তীকালীন কোচ ও ম্যানেজারের ভূমিকায় কাজ করেছেন। এ নিয়ে সমালোচনা কম হয়নি। হয়তো সে কারণেই তিনি স্বসম্মানে বিসিবি থেকে বিদায় নিলেন। তবে গুঞ্জন রয়েছে তিনি হতে পারেন বিসিবির প্রধান কোচ। কিন্তু সেটির সম্ভাবনাও কম। যদি সব দিক বিবেচনা করা হয় তাহলে নয়া সভাপতি সুজনকে প্রধান কোচ করে নিজে বিতর্কিত হতে চাইবেন না। বিসিবির একটি সূত্রের দাবি সুজন বিসিবি ছাড়লেও ক্রিকেট ছাড়তে পারবেন না। সূত্রটি জানায়, ‘খালেদ মাহমুদ সুজন একজন ক্রিকেট পাগল মানুষ। তিনি আর যাই হোক ক্রিকেট ছেড়ে দূরে থাকতে পারবেন না। তিনি বিসিবি পরিচালক না থাকলেও হয়তো কোনো না কোনো জায়গাতে ক্রিকেট নিয়েই থাকবেন সেটি বিসিবিতে হলেও অবাক হবো না। তবে প্রধান কোচ, এটির খুব বেশি সম্ভাবনা দেখি না। সেটি হলে বিতর্কের মুখে পড়বেন নয়া সভাপতি ফারুক।’

সার্জারিতে বিশ্বাসী নন কারিনা

বর্তমানে দুই সন্তানের মা হলেও বলিউডের অন্যতম সুন্দরী অভিনেত্রীদের তালিকায় রয়েছেন কারিনা কাপুর। শোবিজে অনেক অভিনেত্রী রয়েছেন যারা কৃত্রিম উপায়ে নিজেদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করিয়েছেন। তালিকাটি বড় হলেও তা স্বীকার করেন না বেশির ভাগই। কখনো নাকের সার্জারি আবার কখনো ঠোঁটের সার্জারি, চাহিদা অনুযায়ী রূপ পেতে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছেন অনেক তারকা। বয়স ধরে রাখতে বোটক্স, ফিলারের সাহায্য নিয়ে থাকেন বলি অভিনেত্রীরা। করণ জোহর পরিচালিত ‘ফ্যাবিউলাস লাইফ অফ বলিউড ওয়াইভস’-এ এই বোটক্সের ব্যবহার দেখিয়েছেন করণ। এবার বোটক্স নিয়ে করা প্রসঙ্গে মুখ খুললেন কারিনা। তিনি জানান, ‘সার্জারি’তে বিশ্বাসী নন তিনি। কারণ তার স্বামী চুয়াল্লিশেও তাকে এভাবেই দেখতে ভালোবাসেন। তিনি গর্বিত তার বয়স নিয়ে। কারিনা বলেন, আমার স্বামীর কাছে এই বয়সেও আমি আকর্ষণীয়। তাই এ সব সার্জারি কিংবা বোটক্সের প্রয়োজন নেই। বয়স লুকানোর বিষয় নয় বরং সেটাকে উদ্‌যাপন করার বিষয়। আমি এমন ছবি করি যেখানে আমার বয়স স্পষ্ট বোঝা যায়, সে জন্য গর্বিত। আমি চাই আমার দর্শক সেভাবেই দেখুন, যেমনটা আমি ব্যক্তিগত জীবনে। বোটক্স না করালেও শরীরচর্চা করি। ভালো খাওয়া-দাওয়া করি।
mzamin

৮ ডিসি প্রত্যাহার: সচিবালয়ের ঘটনায় তদন্ত কমিটি

দুই দফায় নিয়োগ পাওয়া ৫৯ জেলা প্রশাসকের (ডিসি) মধ্যে ৮ জেলার ডিসিদের নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। গতকাল সচিবালয়ের নিজ দপ্তরে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোখলেস-উর রহমান এই তথ্য জানিয়েছেন। বিকালে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া আগের দু’দিনের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এ বিষয়ে সিনিয়র সচিব জানান, বাছাই কমিটির বৈঠকে পর্যালোচনা করে আট জেলা প্রশাসককে প্রত্যাহার করা হয়েছে। পাশাপাশি চারজন জেলা প্রশাসকের জেলা অদল-বদল করা হয়েছে। বুধবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় জানায়, মঙ্গলবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এম এ আকমল হোসেন আজাদের নেতৃত্বে এক সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

আট জেলা প্রশাসককে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে গতকাল প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এরা হলেন- তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের উপ-সচিব সুফিয়া আক্তার রুমীকে  লক্ষ্মীপুর থেকে, বঙ্গবন্ধু হাইটেক সিটি-২ এর সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. সাইদুজ্জামান জয়পুরহাট থেকে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব ফারহানা ইসলামকে কুষ্টিয়া, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মাহবুবুর রহমানকে রাজশাহী থেকে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মোহাম্মদ মনির হোসেন হাওলাদারকে সিরাজগঞ্জ থেকে, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উপ-সচিব আবদুল আজিজকে শরীয়তপুর থেকে, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মোহাম্মদ মোবাশশেরুল ইসলামকে দিনাজপুর থেকে এবং আরপিএটিসি’র উপ-পরিচালক মনোয়ারা বেগমকে রাজবাড়ী জেলার ডিসি পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছে।

অন্যদিকে টাঙ্গাইলের ডিসিকে পঞ্চগড়ে, নীলফামারীর ডিসিকে টাঙ্গাইলে, নাটোরের ডিসিকে লক্ষ্মীপুরে এবং পঞ্চগড়ের ডিসিকে নীলফামারীতে বদলি করা হয়েছে। নতুন ডিসি হওয়া কয়েকজনের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সুবিধা নেয়ার অনেক অভিযোগ উঠে। এ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ তুলে হট্টগোল করেন উপ-সচিব পর্যায়ের একদল বিক্ষুব্ধ কর্মকর্তা। জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগে সরকারের আমলে পদোন্নতি বঞ্চিত ছিলেন এসব কর্মকর্তারা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সমপ্রতি তাদের উপ-সচিব পদে পদোন্নতি দিয়েছে। ডিসি হওয়ার জন্য তাদের প্রত্যাশা ছিল। সোমবার দেশের ২৫ জেলায় নতুন ডিসি নিয়োগ দেয়া হয়। মঙ্গলবার আরও ৩৪ জেলায় নতুন ডিসি নিয়োগ হয়। তালিকায় নাম না দেখে হতাশ হয়ে হট্টগোল করেন তারা।

নতুন ডিসিদের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে ব্রিফিং হঠাৎ স্থগিত: প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে নতুন নিয়োগ পাওয়া জেলা প্রশাসকদের (ডিসি)  ব্রিফিংটি  অনিবার্য কারণবশত স্থগিত করা হয়। সদ্য  নিয়োগ পাওয়া ৫৯ জন জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) একটি ব্রিফিং অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল গতকাল সকাল ১১টায়। সেটি  স্থগিত করা হয়। এজন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত ডিসিদের পদায়নকৃত কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে বারণ করা হয়।

ডিসি নিয়োগ নিয়ে হট্টগোলে তদন্ত কমিটি গঠিত: ডিসি নিয়োগ ইস্যুতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে হট্টগোলের ঘটনায় এক সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বুধবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এই তথ্য জানানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় জানায়, মঙ্গলবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এমএ আকমল হোসেন আজাদের নেতৃত্বে এক সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবে।

সচিবালয়ে জেলা প্রশাসক (ডিসি) হতে ইচ্ছুকদের বিশৃঙ্খলা শোভন হয়নি বলে মনে করেন ডিসি নিয়োগ নিয়ে ‘বঞ্চিত’ কর্মকর্তাদের হট্টগোল তদন্তে গঠিত কমিটির একমাত্র সদস্য, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এমএ আকমল হোসেন আজাদ। গতকাল সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। এমএ আকমল হোসেন আজাদ বলেন, সব ডেপুটি সেক্রেটারি ডিসি হয় কিনা! কম করে হলেও ১ হাজার ডেপুটি সেক্রেটারি থেকে মাত্র ৬৪ জন ডিসি হন। বর্তমান সরকার পাঁচজন বাদে ৫৯ জনকে পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। রেকর্ড আছে একজন ডিসিকে দ্বিতীয় দিনেই প্রত্যাহার করা হয়েছে। যাওয়ার আগে যদি প্রি কন্সেন্ট বলেন, এদের সবাই স্বৈরাচার সরকারের উপকারভোগী ছিল। কয়েকজন সচিবের নেতৃত্বে হাই পাওয়ার কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা যাচাই বাছাই করে দেখেছে, টপ স্কোরার, বেস্টদের মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। এখন বিতর্ক হয়েছে এরা খারাপ, এরা ভালো। এরই মধ্যে জনপ্রশাসন সচিব কয়েকজনকে বাতিল করেছেন। সচিবালয়ে ডিসি  থেকে ইচ্ছুকদের বিশৃঙ্খলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি বিভিন্ন নিউজ দেখে সাধারণভাবে মনে করি এটা শোভন হয়নি। কারা করেছে, যারা ডেপুটি সেক্রেটারি, সিনিয়র অফিসার, ডিসি হতে ইচ্ছুক, তালিকায় তাদের নাম ছিল, কিন্তু তারা হয়নি। তালিকায় নাম থাকলেই যদি তারা মনে করেন যে, তারা ডিসি হয়েছেন, এটা ঠিক নয়। আমাদের বাছাই করে ৬০ জনের তালিকা দিতে বলেছে। যারা ডিসি হন নাই, তারাতো পদাবনত হননি, ইজ্জতহানি হয় নাই। তারা কেন হয় নাই, আমরা কিন্তু সেটা প্রকাশ করিনি। যদি প্রকাশ করার কোনো আইনগত সুযোগ থাকে, যদিও সেই সুযোগ নাই, তাহলে তারা সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হবেন। অফিসিয়াল সিক্রেসি অ্যাক্ট অনুযায়ী আমরা এটা প্রকাশ করতে পারি না। তিনি সেই পদের জন্য যোগ্য হতে পারেন নাই, অযোগ্য শব্দটা আমরা ব্যবহার করি না। তিনি আরও বলেন, একটা জেলার ডিসি মানে একটি মিনি বাংলাদেশের তিনি নেতা। বর্তমান সময়ে ১২০টা কমিটির সভাপতি তিনি। ডিসির মাধ্যমেই সব কিছু চ্যানেলাইজ হয়ে যায়। সুতরাং ডিসির অভিজ্ঞতা, বয়স, স্বাস্থ্য অনেক কিছু বিবেচনা করতে হয়। আমি কিন্তু তাদের বিভাগীয় মামলা করার অথরিটি না। সাক্ষ্য-প্রমাণে আমি কী পেলাম সেটা বলতে পারি। কারা দোষ করেছে, কারা করেনি।

অন্যদিকে, সমালোচনার মুখে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব পি কে এম এনামুল করিমের সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। নিয়োগের একদিন পরেই মঙ্গলবার  জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে তাকে ডিসি নিয়োগের আদেশটি বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। আগের দিনে সোমবার ২৫ জেলায় নতুন ডিসি নিয়োগ দেয় সরকার। সেখানে এনামুল করিমকে সিলেটের ডিসি নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। এনামুল করিমের নিয়োগ আদেশ বাতিল করে মঙ্গলবার সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের উপ-সচিব মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদকে সিলেটের ডিসি নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সোমবার সিলেটে ডিসি নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারির পর ফেনীর সাবেক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) এনামুল করিমের নিয়োগ নিয়ে সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এনামুল করিমের বিরুদ্ধে ২০১৯ সালে ফেনীর কলেজছাত্রী নুসরাত হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের বাঁচাতে প্রচেষ্টা চালান বলে অভিযোগ রয়েছে।

শতকোটি টাকার মালিক সিলেটের চিনি বুঙারী আবুল by ওয়েছ খছরু

সিলেটে হাজার কোটি টাকার চিনির চোরাকারবারে নাম একটাই। বুঙারী আবুল। পুরো নাম আবুল হোসেন। আওয়ামী লীগের শাসনামলের শেষ দু’বছরে চিনি ‘বুঙার’ লাইনের মালিক হয়ে দু’হাতে টাকা কামিয়েছেন। আর এই টাকা দিয়ে নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলেছেন। কতো টাকার মালিক বুঙারী আবুল- এ প্রশ্নের উত্তরে অনেকেই অনুমান করতে পারছেন না। দুই বছরে প্রতিদিন ৫০-৬০ লাখ টাকা কামিয়েছে বলে জানিয়েছেন এলাকার মানুষ। এ কারণে কেউ বলছেন, শতকোটি টাকার মালিক। তবে অঢেল সম্পদের মালিক যে হয়েছে, তার প্রমাণ মিলে সিলেটের চিনি চোরাকারবারের নিরাপদ জোন হরিপুরের উতলার পাড়ে গড়ে তোলা অট্টালিকা দেখে। ৩-৪ কোটি টাকা খরচ করে ওই অট্টালিকা নির্মাণ করা হচ্ছে। টাকায় অন্ধ আবুল নিজেই নিজেকে ‘চৌধুরী’ উপাধিতেও ভূষিত করতে শুরু করেছেন। ছিপছিপে গড়নের যুবক আবুল হোসেন। বয়স ৩০ কিংবা ৩২ বছর। সিলেটের হরিপুরে ক্ষমতা ও দাপটের এক জ্বলন্ত উদাহরণ তিনি। বাড়ি হরিপুর বাজারের ব্রিজের কাছে ছিল।  ফেরি করে জ্বালানি তেল বিক্রি করার ব্যবসা তাদের দীর্ঘদিনের। এ সময় জাফলং কোয়ারিতে বোমা মেশিনে ফেরি করে ডিজেল বিক্রি করতো। পারিবারিক দেনার দায়ে এক সময় হরিপুরের বাড়ি বিক্রি করে চলে যান পার্শ্ববর্তী ৭ নম্বর গ্যাস ফিল্ডের উতলার পাড়ে। প্রায় ৫ বছর আগে ঢুকে পড়ে চোরাই লাইনে। সিলেট জেলা পুলিশের ডিবির সোর্স হিসেবে সীমান্ত দিয়ে চোরাই পথে নিয়ে আসা পণ্যের লাইনের টাকা তুলতো। আর ওই টাকা সে ডিবি ও থানা পুলিশকে দিয়ে নিজের অংশ রেখে দিতো। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সিলেট জেলা পুলিশের ডিবি উত্তরের তৎকালীন ওসি রেফায়েত চৌধুরীর সঙ্গে সখ্যতা গড়ে উঠে তার। ডিবি’র ওসির নিজস্ব মানুষ হিসেবে সে  চোরাই সাম্রাজ্যে দাপট দেখাতে শুরু করে। দুই থেকে আড়াই বছর আগে গরু ও মহিষ চোরাচালান থেকে চিনির চোরাচালানে ডাইভার্ট হন সীমান্তের চোরাকারবারিরা। এই সুযোগে প্রথমে ডিবির ও পরবর্তীতে পুলিশ, বিজিবি’র একক লাইনম্যান হয়ে যায় আবুল হোসেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। সিলেটের চিনির কারবারিরা জানিয়েছেন, আবুল তার চৌধুরী এন্টারপ্রাইজের নামে লাইনের রিসিট দিয়ে হরিপুর থেকে গাড়ি ছাড়তো। আর এই এন্টারপ্রাইজের চালান রশিদ গোটা দেশের পুলিশের কাছে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে এলাকার মানুষের প্রতিবাদের মুখে চৌধুরী নাম পরিবর্তন বিজয় নাম পরিবর্তন করে। বর্তমানে বিজয় এন্টারপ্রাইজের নামে রশিদ দিচ্ছে। প্রতিটি গাড়ি থেকে সে লাইনে ৬০ হাজার টাকা নিতো। কোনো কোনো দিন ২৫০ থেকে ৩০০টি গাড়ি ছেড়েছে। গড়ে প্রতিদিন একশ’র ওপরে চিনিভর্তি গাড়ি হরিপুর ছেড়েছে। এতে দেখা গেছে; ডিবি, পুলিশ ও বিজিবি’র নাম করে প্রতিদিন কোটি টাকার মতো টাকা তুলতো। আর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নামমাত্র টাকা দিয়ে পুরো টাকাই লুটে নিতো। এভাবে টাকার মালিক হয়েছে আবুল। ৫ই আগস্টের অভ্যুত্থানের পূর্ব পর্যন্ত আবুল একচেটিয়া লাইনের ব্যবসা করেছে। এ কারণে চিনি ব্যবসায়ীদের ধারণা; আবুল শতকোটি টাকার সম্পদ বানিয়েছে। আর এই টাকা কামিয়ে সে হরিপুরের পার্শ্ববর্তী গ্যাসকূপ এলাকার উতলার পাড়ে ৩-৪ কোটি টাকা খরচ করে অট্টালিকা তৈরি করছে। বাড়ির কাছে শাহ মাদার ফিলিং স্টেশন নামে একটি বন্ধ পেট্রোল পাম্প ছিল। কোটি টাকার ওপরে বিনিয়োগ করে ওই পাম্পের ৬০ ভাগ শেয়ার কিনেছে। ফের চালু করে পাম্পের নিচতলায় নিজের চিনি ব্যবসার অফিস খুলেছে। পাম্পের মালিক আবুল কালাম শেয়ার বিক্রির কথা মানবজমিনের কাছে স্বীকার করেছে। এ ছাড়া, বটেশ্বর এলাকার একটি হাউজিং নামে-নামে কোটি টাকা দিয়ে কয়েকটি প্লট, শাহ সুন্দর এলাকার আরেকটি হাউজিংয়ে প্লট ও হরিপুর এলাকায় জমি কিনেছেন আবুল। স্থানীয়রা এসব তথ্য দিয়ে বলেছেন, ঢাকার একটি নামকরা আবাসিক এলাকায় কয়েক কোটি টাকা দিয়ে একটি ফ্লাট কিনেছেন। ঢাকার সম্পদের কথা তিনি তার পরিচিত কয়েকজনের কাছে স্বীকারও করেছেন। পুলিশের এক কর্মকর্তা ওই সম্পদ দেখভাল করেন। বছর খানেক ২২ লাখ দিয়ে নিজের জন্য একটি করোলা ফিল্টার কার কিনেছিল আবুল। ওই কার কিছুদিন ব্যবহারের পর নতুন করে ৪৬ লাখ টাকা খরচ করে করোলা ক্রস নামে আরেকটি গাড়ি কিনেছেন। হরিপুরের স্থানীয়রা জানিয়েছেন, গত এপ্রিল মাসে ডিবির সাবেক ওসি রেফায়েত চৌধুরীকে সঙ্গে নিয়ে চট্টগ্রামের একটি শোরুম থেকে এককালীন টাকা দিয়ে ওই গাড়ি কিনেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, চিনি চোরাকারবারে লাইনম্যান হওয়ার কারণে বিভিন্ন সময় তার বিরুদ্ধে জৈন্তাপুরসহ নগরের কয়েকটি থানায় মামলা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকলেও তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। দু’মাস আগে আবুলকে ধরতে র‌্যাবের একটি টিম হরিপুরের পাম্প এলাকায় অভিযান চালালেও তাকে পায়নি। ২০২২ সালে এক মামলার হাজিরা দিতে গিয়ে সে গ্রেপ্তার হয়ে ৩ দিন কারাবরণ করেছে। চিনি চোরাচালানের ঘটনায় নাম প্রকাশের পর সিলেটের দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে তাকে নোটিশ প্রদান করেছিল। পরে পরিচিত পুলিশ কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে ওই নোটিশ তামাদি করতে চেষ্টা চালিয়েছেন বলে তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ব্যবসায়ী জানিয়েছেন। আবুল চিনির ব্যবসা করে কেবল সম্পদই গড়েননি, হরিপুরের ঐতিহ্য ভেঙে নানা বেলাল্লাপনায়ও মেতে ওঠেন। কয়েক মাস আগে একটি রিসোর্টে ঢাকা থেকে আনা নারীদের নিয়ে আমোদ-ফুর্তি করেছেন তিনি। আর তার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড় হয়েছে। এসব ব্যাপারে কথা হয় আবুল হোসেনের সঙ্গে। জানান- তিনি চিনি’র লাইনে সম্পৃক্ত নয়। পাম্পের শেয়ার কিনে জ্বালানি তেলের ব্যবসা করেন তিনি। ৪ কোটি টাকা দিয়ে বাড়ি নির্মাণ, কয়েক হাউজিংয়ে সম্পদ ক্রয়, গাড়িক্রয়সহ নানা প্রশ্নের উত্তরে আবুল জানিয়েছেন- তিনি কেবল বাড়ি নির্মাণ করছেন। আর অন্য সম্পদ সম্পর্কে তার জানা নেই। একটি কুচক্রী মহল তার বিরুদ্ধে এসব কুৎসা রটিয়ে যাচ্ছে। ঢাকায়ও তার কোনো প্লট কিংবা ফ্লাট নেই বলে দাবি করেন। আর তার নামে কোনো গাড়িও কিনেনি বলে জানান। কম মূল্যের একটি গাড়ি কিনেছিলেন, সেটি পরবর্তীতে বিক্রি করে দেন।