Showing posts with label জামায়াতে ইসলামী. Show all posts
Showing posts with label জামায়াতে ইসলামী. Show all posts

Thursday, September 10, 2026

সংসদে নামাজ নিয়ে জামায়াত এমপির বক্তব্য, ‘ধর্ম পালন ব্যক্তিগত স্বাধীনতা’ বললেন স্পিকার

জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রীয়ভাবে নামাজ কায়েম ও জাকাত ব্যবস্থা চালুর আহ্বান জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান। একই সঙ্গে সংসদ সদস্যদের নিজেদের আমল-চরিত্র গঠনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে সংসদে নামাজের বিরতির সময় যথাযথভাবে কাজে লাগানোর আহ্বান জানান তিনি।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে এসব কথা বলেন মুজিবুর রহমান।

তিনি বলেন, ‘সংবিধানে একটা ধারা ছিল, আল্লাহর প্রতি ইমান এবং আস্থা সকল কাজের মূল উৎস। ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে এটাকে বাতিল করা হয়েছিল। বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ, তার চেয়েও বেশি মানুষ আল্লাহর প্রতি ইমান এনেছে এবং মুসলমান বলে দাবি করি আমরা।’

সংসদে আসর ও মাগরিবের নামাজের জন্য দেওয়া বিরতির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘আপনি কিছুক্ষণ আগে আসরের এক আধা ঘণ্টা বিরতি দিয়েছেন। মাগরিবের সময়ও আরও আধা ঘণ্টা বিরতি দেবেন। টার্গেট হচ্ছে, আল্লাহর সেই বিধানকে যারা ঈমান এনেছে তারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করবে।’

নামাজ মানুষের চরিত্র গঠনে ভূমিকা রাখে উল্লেখ করে জামায়াতের এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘গোটা বাংলাদেশের মানুষ নামাজ যারা আদায় করে তাদের সম্মান করে। তাদের সৎ বলে জানে এবং তাদের ওপর আস্থা রাখে।’

কোরআনের আয়াতের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আল্লাহ তায়ালা নামাজ কায়েম ও জাকাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। যাকাত ব্যবস্থা চালু হলে মানুষের ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও বেকারত্ব দূর করা সম্ভব হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আল্লাহ বলেছেন, যারা ক্ষমতা পাবে, আল্লাহ তায়ালা যাদের হাতে ক্ষমতা দেবেন, তাদের এক নম্বর কাজ হচ্ছে নামাজ চালু করে মানুষের চরিত্র ভালো করা এবং যাকাত চালু করে মানুষের ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও বেকারত্ব দূর করা।’

তিনি সংসদে উপস্থিত সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা যাতে নিজেরা নামাজি হই, দেশে নামাজ কায়েম হয়, আমাদের সন্তানরা যাতে সাত বছর বয়সে নামাজের প্রশিক্ষণ পায় এবং ১০ বছর হলে তাকে প্রশাসনিকভাবেও নামাজি বানানোর জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন।’

সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে মুজিবুর রহমান আরও বলেন, ‘শুধু আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার নয়, সকল সংসদ সদস্যের এটা উপকারে লাগবে। ১০০ বছর পরে কেউ সংসদে থাকবে না। মাননীয় স্পিকার, আপনিও থাকবেন না, আমরাও থাকব না। কবরে গিয়ে কী অসুবিধা হবে, সেদিন টের পাওয়া যাবে।’

রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, স্পিকার যেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে এবং রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনা করে দেশে সালাত কায়েম ও জাকাত ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেন। এর মাধ্যমে নাগরিকদের চরিত্র গঠন এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার আবেদন জানান তিনি।

জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ধর্ম পালন সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও বিশ্বাসের বিষয়। প্রত্যেকের নিজ নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা রয়েছে।

স্পিকার বলেন, ‘এটা তো পুরোই একটা ধর্মীয় ব্যাপার। প্রত্যেকের স্বাধীনতা রয়েছে নিজ নিজ ধর্ম পালন করার জন্য। এবং ইসলাম মানবতার ধর্ম।’

তিনি বলেন, ধর্ম সঠিকভাবে পালন করলে বেহেশত এবং ধর্ম পালনে অবহেলা করলে জাহান্নামে যাওয়ার বিষয়টি ধর্মীয় বিধানের অংশ। সংসদ সদস্যরা এ বিষয়ে অবগত এবং ধর্মপ্রাণ মানুষ হিসেবে আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

তবে সংসদ থেকে কোনো নোটিশ জারি করে কাউকে ধর্ম পালনে বাধ্য করা যাবে না উল্লেখ করে স্পিকার বলেন, ‘এটা সংসদীয় স্পিকারের নোটিশ দিয়ে বলবৎ করা যাবে না।’

একই সঙ্গে মুজিবুর রহমানের বক্তব্যের অনুভূতির প্রতি সম্মান জানিয়ে স্পিকার বলেন, ‘তবুও আপনি আপনার সেন্টিমেন্টকে আমরা সম্মান করি। এবং আমরা নিশ্চয়ই আল্লাহর প্রদত্ত নির্দেশ মান্য করার জন্য সচেষ্ট থাকব।’

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। ছবি: সংগৃহীত
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। ছবি: সংগৃহীত

Saturday, September 5, 2026

সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে :-নারায়ণগঞ্জে লংমার্চে শফিকুর রহমান

জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ঘোষিত ছয় দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চ নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল ট্রাকস্ট্যান্ডে পথসভা করেছে। শনিবার সকাল ৯ টায় লংমার্চ সেখানে পৌঁছায়।

পথসভায় সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা রাজপথে নেমেছি গণভোট বাস্তবায়ন করার জন্য। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়ন করার জন্য। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসনের জন্য। এই সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে, ভাঁওতাবাজি করছে। জনগণ তাদেরকে ক্ষমা করবে না।’

১১ দলীয় জোট জনগণের পাশে আছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস, এই চেষ্টা আল্লাহ কবুল করবেন। আমরা ফ্যাসিবাদ মুক্ত বাংলাদেশ গড়বো। আপনারা বিজয়ের শেষ হাসি হেসে ঘরে ফিরবেন।’

জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমাদের লংমার্চ সফল হবে। তেল ও গ্যাসের দাম না কমালে এই সরকারকে গদি ছাড়তে হবে।’

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ‘দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করার জন্য আমরা কঠিন মুহূর্তেও প্রস্তুত আছি। সরকার প্রধানকে বলবো—এই জাতির পালস বুঝার চেষ্টা করেন, শেখ হাসিনা ৩ বার মানুষের ভোট নিয়ে খেলেছেন, তাই তাকে এই দেশের মানুষ ছক্কা মেরে বিদায় করেছে। ফ্যামিলি কার্ড দিয়ে প্রতারণা করলে এই দেশের মানুষ লাল কার্ড দেখাবে।’

এ সময় আরও বক্তব্য রাখেন, এলডিপির চেয়ারম্যান অলি আহমেদ ও এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল আমিন এমপি।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা রক্ষা, জুলাই গণহত্যার বিচার, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, বিদ্যুৎ-গ্যাস-জ্বালানি সংকট নিরসনসহ ছয় দফা দাবি সামনে রেখে ঢাকা-চট্টগ্রামমুখি লংমার্চ করছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট।

সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে

Sunday, August 16, 2026

কুষ্টিয়ায় আমির হামজার গাড়িতে হামলা, ভাঙচুর

কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য আমির হামজার গাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। আজ শনিবার সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে শহরে থানাপাড়া জামে মসজিদের সামনে ছয়রাস্তার মোড়ে এ ঘটনা ঘটে।

এ হামলার জন্য গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীদের অভিযুক্ত করছেন কুষ্টিয়া জেলা জামায়াতের আমির খন্দকার এ কে এম আলী মহসীন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘গণ অধিকার পরিষদের লোকজন আক্রমণ করেছে। তাঁদের সঙ্গে বিএনপির ছাত্রদল যোগ দিয়েছে। এমপি সাহেব (আমির হামজা) বাইরে থেকে আসছিলেন, ওরা ইটপাটকেল মেরে গাড়ির পেছনের কাচ ভেঙেছে। আমাদের লোকজন প্রতিহত করতে গেলে মারামারি হয়েছে। আমরা এ ব্যাপারে কেস (মামলা) করব।’

হামলায় আমির হামজা আঘাত পেয়েছেন কি না, এমন প্রশ্নে জেলা জামায়াতের আমির বলেন, ‘আঘাতপ্রাপ্ত হননি। এমপি সাহেব ওনার বাসায় আছেন। আমাদের লোকজন প্রটেকশন দিচ্ছে।’

পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি গণ অধিকার পরিষদ সম্পর্কে আমির হামজা একটি বক্তব্য দিয়েছেন। সেই বক্তব্যের জেরে গণ অধিকার পরিষদের পক্ষ থেকে আজ বিকেলে কুষ্টিয়া শহরের ছয় রাস্তার মোড়ে থানাপাড়া জামে মসজিদের সামনে প্রতিবাদ সভা করা হয়। সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে আমির হামজা নিজ গাড়িতে করে মোড় হয়ে পাশেই তাঁর বাড়িতে যাচ্ছিলেন। এ সময় সমাবেশ থেকে স্লোগান দিতে থাকেন গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা। তখন আমির হামজার গাড়ির সামনে-পেছনে পুলিশের একাধিক গাড়ি ছিল।

একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ছয় রাস্তার মোড় অতিক্রম করার সময় গণ অধিকার পরিষদ ও জামায়াতের নেতা-কর্মীদের (এমপির গাড়িবহরের সঙ্গে থাকা) মধ্যে ধাক্কাধাক্কি হয়। পাল্টাপাল্টি স্লোগানও চলতে থাকে। একপর্যায়ে জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীরা আমির হামজাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে হেঁটে বাড়ির দিকে নিয়ে যান। গাড়িটিও তাঁদের পেছন পেছন যেতে থাকে। দুই দলের নেতা-কর্মীদের ধাক্কাধাক্কির এক পর্যায়ে দুই পক্ষই ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। ইটের আঘাতে আমির হামজার গাড়ির কাচ ভেঙে যায়। গাড়ির আরও কয়েক জায়গায় ইটের আঘাত লাগে।

দুই পক্ষের মুখোমুখি অবস্থানের সময় ছয় রাস্তার মোড় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ ছোটাছুটি করতে থাকে। উভয় পক্ষের মধ্যে প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া চলে। ঘটনার সময় পুলিশ ও র‌্যাবের সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন।
কুষ্টিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কবির হোসেন মাতুব্বর প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা সাথেই ছিলাম। এরই মধ্যে হঠাৎ করে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এমপি সাহেব বাড়িতে আছেন। পরিস্থিতি আপাতত নিয়ন্ত্রণে আছে।’

সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে আমির হামজার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তাঁর গাড়িটি গ্যারেজে রাখা। তিনি বাড়িতেই অবস্থান করছিলেন। নেতা-কর্মীদেরও ভিড় ছিল। ওই সময় ৫০-৬০ জন নেতা-কর্মীকে লাঠিসোঁটা বের হতে দেখা যায়।

আমির হামজার মিডিয়া সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত তানভীর হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা একটা অনুষ্ঠান শেষ করে বাসায় ফিরছিলাম। এমপি সাহেবের গাড়ির সামনে ও পেছনে পুলিশ ও র‌্যাবের গাড়ি ছিল। এমপি সাহেব চলে যাওয়ার সময় গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা আক্রমণ করে। ইট দিয়ে গাড়িতে আঘাত করে। সদর থানার ওসির উপস্থিতি থাকা সত্বেও হত্যার উদ্দেশে এ আক্রমণ হয়। ইটের আঘাতে আমার পায়ে রক্ত ঝড়েছে।’

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গণ অধিকার পরিষদের কুষ্টিয়া জেলার সাধারণ সম্পাদক আবদুল খালেকের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ধরেননি। তবে বিষয়টি নিয়ে গণ অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হাসান আল মামুন তাঁর ফেসবুক আইডিতে লিখেছেন, কুষ্টিয়ার এমপি আমির হামজা তাঁর এক বক্তব্যে গণ অধিকার পরিষদকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছেন, সেই বক্তব্যের প্রতিবাদে কুষ্টিয়ায় গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা মানববন্ধন করেন। মানববন্ধন শেষে বিক্ষোভ মিছিল করলে সেখানে জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীরা গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা চালায়। এতে গণ অধিকার পরিষদের ৪০-৫০ জন নেতা-কর্মী গুরুতর আহত হন।

হাসান আল মামুন ফেসবুকে আরও লিখেছেন, ‘প্রিয় জামাত, আপনারা ভুলে গেছেন গণ অধিকার পরিষদের অবদান? সমস্যা নেই, সময় বলে দিবে আপনারা কোন পথে যাবেন! শেখ হাসিনার পথ আপনাদের ডাকছে।’

গণ অধিকার কার্যালয়ে হামলা

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, সন্ধ্যা সাতটার দিকে আমির হামজার সর্মথকেরা লাঠিসোঁটা নিয়ে শহরের হাইস্কুল মার্কেটে গণ অধিকার পরিষদের জেলা কার্যালয়ে অতর্কিত হামলা চালায়। পরে তাঁরা মিছিল নিয়ে শহরের ছয় রাস্তা মোড়ের পাশে হরিপুর সংযোগ সেতুর নিচে যায়। সেতুর নিচে গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আবদুল খালেকের ব্যক্তিগত কার্যালয়ে ভাঙচুর চালায়। এতে শহরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় সাংবাদিকেরা পেশাগত দায়িত্ব পালনে গেলে তাঁদের ওপর চড়াও হয় ভাঙচুরকারীরা।

এ বিষয়ে গণ অধিকার পরিষদের কুষ্টিয়া জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক তৌকির আহমেদ বলেন, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ শেষে ফিরে যাওয়ার সময় আমির হামজার সমর্থকেরা তাঁদের ওপর অতর্কিত হামলা চালান। এতে কয়েকজন নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন।

কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, রক্তাক্ত অবস্থায় তিনজন এসেছিলেন। তাঁরা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে চলে গেছেন। তাঁদের সামান্য কাটাছেঁড়া দেখা গেছে। ইটের আঘাত হতে পারে।
গণ অধিকারের বিষয়টা আমাদের ওপর চাপাচ্ছে

আমির হামজার ওপর হামলার বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সদস্যসচিব জাকির হোসেন সরকারের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তিনি বলেন, ‘ছাত্রদলের ছেলেরা গিয়ে দুই পক্ষকেই সেখান থেকে সরিয়ে দিয়েছে। আমরা কখনোই চাইনি মারামারি হোক।’ তিনি আরও বলেন, ‘সম্প্রতি আমির হামজা গণ অধিকার ও আমাদের নিয়ে কিছু আপত্তিকর কথা বলেছেন। এ জন্য গণ অধিকার ছয় রাস্তার মোড়ে সমাবেশ করছিল। জামায়াত যে অভিযোগ করছে তা একেবারেই ভিত্তিহীন। গণ অধিকারের বিষয়টা আমাদের ওপর চাপাচ্ছে।’

হামলায় আমির হামজার গাড়ির কাঁচ ভেঙে যায়। শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে তোলা ছবি
হামলায় আমির হামজার গাড়ির কাঁচ ভেঙে যায়। শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে তোলা ছবি। প্রথম আলো

Wednesday, July 8, 2026

গণভোটের রায়কে অগ্রাহ্য করার সুযোগ দেব না: বিরোধীদলীয় নেতা

গণভোটের রায় বাস্তবায়নের প্রত্যাশার কথা জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আমরা গণভোটের রায়কে অগ্রাহ্য করতে দেব না। জনগণের এই রায় বৃথা যাবে না ইনশাআল্লাহ। সংসদে সবাই মিলে চিৎকার দেব, রাজপথের আন্দোলনও আরও বেগবান হবে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, এ দেশকে আমরা ভালোবাসি, কোনো অশুভ শক্তিকে মাঝখান থেকে খেলতে দেব না। নাক-কান সজাগ রেখেই আমাদের সব কাজ চলবে এবং সময়মতো জনগণের আকাঙ্ক্ষাও পূরণ হবে ইনশাআল্লাহ। আমরা নতুন বা পুরানো কোনো ফ্যাসিবাদ মেনে নেব না।

বুধবার দুপুরে রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সের মাল্টিপারপাস হলে ১১ দলীয় ঐক্য আয়োজিত জাতীয় সেমিনারে এসব কথা বলেন। ‘অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন এবং সব গণহত্যার বিচারের দাবিতে’ এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম। প্রবন্ধ পাঠ করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম।

এ সময় জুলাই যোদ্ধাদের নিয়ে বাড়াবাড়ি করা হচ্ছে-অভিযোগ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আপনারা সংযত হোন, নইলে জনগণের উত্তাল ঢেউ আর জোয়ারে সব খড়কুটা ভেসে যাবে। তিনি বলেন, আইন আমরা হাতে তুলে নেয়ার পক্ষে নই, তবে কেউ শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করে জুলাইকে অপমান করার দু:সাহস আর দেখাবেন না। দু:সাহস দেখালে এই যুব সমাজ ও জনতা এখনো ঘুমিয়ে যায়নি। যারা সশস্ত্র বাহিনীর সামনে খোলা হাতে দেশপ্রেম নিয়ে দাঁড়াতে পারে, আজও তারা দাঁড়িয়ে আছে। আমরা ঘুমাইনি, আমরা ঘুমাবো না।

গণভোট নিয়ে প্রতারণার বিষয়ে জাতীয় সংসদে আত্মস্বীকৃত সাক্ষী পাওয়া গেছে জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, হায়া শরম থাকলে এটা হওয়ার কথা ছিল না। তবে, ভালো হয়েছে, জাতি চিনে ফেলছে, এখন আর অন্য কোনো ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ সংসদে যা বলা হয় কার্যপ্রণালিতে তা লেখা হয়ে যায়, ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। যেহেতু এই বক্তব্য এক্সপাঞ্জ হয় নাই, কাজেই এই আত্মস্বীকৃতিও রেকর্ড হয়ে থাকল।

তিনি বলেন, তারা (সরকারি দল) এই সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন- জুলাই সনদ একটা অন্তহীন প্রতারণার দলিল, আর এই সংসদেই দাঁড়িয়ে তারা আবার প্রমাণ করলেন তারাই জাতির সঙ্গে অন্তহীন প্রতারণা করেছে। তাদের কাছে তাদের আপন সঙ্গীদেরও রক্তের কোনো মূল্য নেই। যদি সে মূল্য থাকতো তাহলে আগে দেশবাসীর পাশে দাঁড়াতো। নির্বাচন কার জন্যে, সরকার কার জন্যে? জনগণের জন্যে। সেই জনগণ প্রমাটাইজ, আহত, দারুণ কষ্টে আছে। তাদের কষ্টে পাশে না দাঁড়িয়ে আমাদেরকে অপবাদ দেওয়া হয়েছে যে, আমরা নির্বাচন চাই না। নির্বাচন না চাইলে পরে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলাম কিভাবে?

জামায়াত আমির বলেন, আমরা নির্বাচন চেয়েছি, তবে আমরা নির্বাচনের নামে ষড়যন্ত্র চাই নাই। ষড়যন্ত্র করা হয়েছে, আমরা নিন্দা জানাই। দল-নিরপেক্ষ পরিচয়ের অন্তর্বর্তী সরকারও এই ষড়যন্ত্রে শরিক ছিল। নিজেরাই তারা স্বীকার করেছে, ষড়যন্ত্র করে ১১ দলকে হারানো হয়েছে।

তারপরও এই রায় মেনে নেয়ার কারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাড়ে ১৭ বছর পরে এই নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্রের ফসল হিসেবে যদি আমরা সেদিন রিভোর্ট করতাম, এই নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করতাম, তাহলে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে এর শেষ কোথায় গিয়ে দাঁড়াতো কেউ জানে না। ১১ দল দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু একইসঙ্গে ১১ দল এটাও বলেছে, নির্বাচনের এই ষড়যন্ত্রের ফল মেনে নিলেও আমরা গণভোটের রায়কে অগ্রাহ্য করতে দেব না।

সংসদে সংবিধান সংশোধন কমিশন গঠনে এ পর্যন্ত ১০-১১ বার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব এসেছে জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সংশোধনের জন্য কমিটি লাগে না। আর সংশোধনী কমিশনের জন্য গণভোট হয়নি। গণভোট হয়েছে দেশের পচা রাজনীতির আমূল পরিবর্তন সাধনের জন্য। ফ্যাসিবাদের মূল কেটে দেওয়ার জন্য। আমরা সেই সংস্কার চাই।

তিনি বলেন, বিএনপি ওয়াদা থেকে সরে গিয়েছে। আমরা বেঈমানি করতে পারব না। আমরা জাতিকে কথা দিয়েছিলাম, সেই জায়গায় আমরা আছি এবং আমরা আত্মবিশ্বাসী। আমরা গভীর আস্থাশীল। জনগণের এই রায় বৃথা যাবে না ইনশাআল্লাহ। সংসদে সকলে মিলে চিৎকার দেব। রাজপথের আন্দোলন চলছে, এটা আরো বেগবান হবে।

তিনি বলেন, লোহা গরম হয়ে লাল হতে সময় লাগে। কিন্তু লাল যখন হবে, তখন জনগণ মুগুর নিয়ে ঠিকমতোই পিটাবে ইনশাআল্লাহ।

জামায়াত আমির বলেন, আমরা দীর্ঘদিন একসঙ্গে মজলুম ছিলাম, একসঙ্গে জেল খেটেছি, একসঙ্গে রাজনীতি করেছি, জেল-জুলুম সহ্য করেছি। সরকার গঠনও করেছি। কিন্তু এখন কোন কোন বন্ধুর বক্তব্য ভাষায় মনে হয়, তারা জীবনেও আমাদেরকে দেখেননি। ভুলে গেছেন এততাড়াতাড়ি? স্মরণ হতে সময় লাগবে না। একটা ঝাঁকুনিই যথেষ্ট।

মান-অভিমান ভুলে গিয়ে জনগণের এই রায়কে সম্মান করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তাহলে জনগণের কাছে সম্মানিত হবেন। সম্মান না করলে যেখানে স্পিকারের অনুমতি লাগে না, ওখানে বক্তব্য হবে।

জেল-জুলুমের ভয় না দেখানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সংসদে একজন পরিণতির কথা বলেছেন, আমরা বলেছি, ৫৫ বছর পরিণতি দেখে দেখেই বাংলাদেশ এই জায়গায় এসেছে। সর্বোচ্চ পরিণতি ফাঁসির তক্তা অথবা একটা গুলি। আমরা দেশ-জাতির ও আল্লাহর জন্য প্রস্তুত আছি। আমাদের লড়াই চলবে, ইনশাআল্লাহ জনগণের বিজয় হবে।

তিনি বলেন, আমাদের আলোচনা চলবে, সরকারের ন্যায্য কাজে সহযোগিতা করবো। কিন্তু জনগণের অধিকারের বিষয়ে একচুলও ছাড় দেওয়া হবে না। জনগণের রায়ের অপমান আমরা সহ্য করবো না। জনগণকে নিয়ে বাংলাদেশ নিয়েই বিজয় হবো ইনশাআল্লাহ। আমাদের কোনো মামু বাড়ি নেই, এই বাংলাদেশ নিয়েই এগিয়ে যেতে চাই।

সেমিনারে আরো বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপি, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটাকরি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ, জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি, নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইজহার প্রমুখ।

গণভোটের রায়কে অগ্রাহ্য করার সুযোগ দেব না: বিরোধীদলীয় নেতা
কাকরাইলে ১১ দলীয় ঐক্যের সেমিনারে বিরোধীদলীয় নেতা। ছবি: সংগৃহীত

Saturday, June 20, 2026

সমাবেশে লোক ভাড়া করে বেশি মাথা দেখানো কী ফল দেয় by সালেহ উদ্দিন আহমদ

রাজধানীতে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ সভা হয়ে গেল। এখনো হচ্ছে। বড় বড় রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে জুলাই আন্দোলনের ছাত্রদের নেতৃত্বাধীন ‘সদ্যোজাত’ দল—সবাই, এই আন্দোলন মাসে সভা করেছে।

সরকারও পিছিয়ে নেই, তারাও জুলাই সনদ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সভা করেছে সংসদ ভবনের সামনে। এই মাসটাতে প্রতিটি সভাই জাতির জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ—বিভিন্ন অঙ্গীকার ও তথ্যে ভরপুর।

যাঁরা সভাগুলোয় যোগ দিয়েছেন বা যাঁরা অন্যভাবে সভাগুলোর প্রতি নজর রেখেছেন, তাঁদের জন্য এতসব গুরুগম্ভীর তথ্য সম্ভবত মনে রাখা খুব সহজ নয়। তবে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা, সবার জন্য সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং জুলাই সনদ নিয়ে নেতারা যা যা বলেছেন, সেগুলো মোটাদাগে সবাই স্মরণ করবেন।

তবে একটা জিনিস সবাই মনে রাখবেন। সেটা হলো ‘হেড কাউন্ট’। কোন দলের সভায় কত লোক হলো, কাদের সভায় রাস্তা কতটুকু উপচে উঠেছিল এবং যানবাহন কতক্ষণ বন্ধ ছিল—এই জিনিসগুলো আলোচনায় এসেছে।

আমাদের রাজনীতিবিদদের দরকার হেড কাউন্ট বা মাথার হিসাব। কারা সভায় কত মাথা আনতে পারলেন, তা দিয়ে জনপ্রিয়তা মাপা হয়ে থাকে। সমাবেশে যত বেশি হেড কাউন্ট, টিভি সংবাদ ও পত্রিকায় জনসভার ছবিও তত ভালো দেখাবে।

তবে জনসভার হেড কাউন্ট দল বিচারে বা জনপ্রিয়তার দৌড়ে যে খুব প্রভাব ফেলে, তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। বিগত সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের প্রতিটি জনসভায় উপচে পড়া ‘মাথা’ থাকত। কিন্তু জনতার স্বতঃস্ফূর্ত হেড কাউন্টের কাছে তারা শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেনি।

জনসভায় হেড কাউন্ট জিনিসটা আমাদের রাজনীতিতে অনেক দিন ধরে চলে আসছে। একাত্তরের আগে দেখেছি, রাজনৈতিক দলগুলো বাস পাঠিয়ে ডেমরা, তেজগাঁও থেকে শ্রমিকদের নিয়ে আসত। প্রয়োজন হলে কাঁটাবন বস্তি থেকেও লোক আসত। তাতেই ভরে যেত পল্টন ময়দান। ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শেখ মুজিবের সভা ভরাতে বাস-ট্রেনের প্রয়োজন হয়নি, মানুষ নিজেদের উদ্যোগে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসেছিল।

মাওলানা ভাসানী যখন পল্টনে সভা করতেন, তখন অন্য দলের লোকজনও ওখানে যেত। কারণ, তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা সব সময়ে তুঙ্গে ছিল। তাঁর সভায় ডান দিকে টুপি মাথায় তাঁর ভক্ত ও মুরিদেরা থাকতেন, বাম দিকে লাল ঝান্ডা হাতে বা লাল পট্টি কপালে বেঁধে তাঁর রাজনৈতিক অনুসারীরা বসতেন। দক্ষিণপন্থী-বামপন্থী কোনো হাঙ্গামা হতো না। সবাই মন দিয়ে তাঁর সাম্যের বাণী শুনতেন। মাওলানা ভাসানী হেড কাউন্ট নিয়ে কখনো খুব মাথা ঘামাতেন না, যা ভাবতেন তাই বলতেন, আর যা বলতেন তা-ই করতেন।

এখন সময় পাল্টে গেছে। সবকিছু এখন ফাইভ স্টারভিত্তিক। দলের কাজকর্ম সব এখন ফাইভ স্টার ভবনে। রাজনৈতিক দলের ইফতার হবে ফাইভ স্টার হোটেলে। নেতাদের গাড়িবহর হবে ১০০টি গাড়িতে। দলের জনসভায় লোক আনানো হবে রেলগাড়িতে।

জনসভার জন্যও কোনো সীমারেখা নেই। মাঠ-ময়দান, রাস্তাঘাট, হাসপাতাল চত্বর সবই বৈধ। রাজনৈতিক দলগুলোর অঢেল টাকা। তার কিছুটা সভা-সমিতিতে হেড কাউন্ট বাড়াতে খরচ হবে, সেটাই স্বাভাবিক।

১৯ জুলাই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মহাসমাবেশ উপলক্ষে বাইরে থেকে সমর্থকদের ঢাকায় আনার জন্য চার জোড়া বিশেষ ট্রেন ভাড়া করা হয়েছিল। ইসলামী আন্দোলনও গাড়ি ও লঞ্চ ভাড়া করে বাইরে থেকে লোক এনে ইদানীং ঢাকায় সভা করেছে। আমির আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘সারা দেশ থেকে কয়েক হাজার গাড়ি রিজার্ভ করা হয়েছে।’

আগে ছাত্ররা সভা করত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায়। বটতলায় সমাবেশ করাটাই ছিল তাদের গর্ব। একুশে যেত শহীদ মিনারে। এখন ছাত্রদের দলগুলো রাজনৈতিক দলগুলোকে পাল্লা দিচ্ছে। বাস-ট্রেন ভাড়া করে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ‘ছাত্র’ আনছে তাদের ‘ছাত্রসভায়’ যোগ দিতে।

জনসমর্থন দেখাতে রাজধানীতে ৩ জুলাই ছাত্রদল ও এনসিপির পৃথক সমাবেশ হয়েছে। পত্রপত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছে, জনসভায় হেড কাউন্ট বাড়াতে ছাত্রদল চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত ২০ বগির বিশেষ ট্রেন ভাড়া করেছে।

প্রথম আলোর খবরে প্রকাশ, ঐতিহাসিক জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ অনুষ্ঠানে সারা দেশ থেকে ছাত্র-জনতা আনতে আট জোড়া ট্রেন ভাড়া করেছে সরকার। এসব ট্রেনে করে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ছাত্র-জনতাকে ৫ আগস্ট ঢাকায় নিয়ে আসার কর্মসূচি নেওয়া হয়। আট জোড়া ট্রেনের জন্য প্রায় ৩০ লাখ ৪৬ হাজার টাকা ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও দেশের সব টিভি চ্যানেলে এই অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছে, তবু বাইরের থেকে লোক আনতে হয়েছে। কারণ, সরকারের প্রয়োজন হেড কাউন্ট।

রাজনীতির আরেকটা হেড কাউন্টের বর্ণনা আশা করি এখানে অপ্রাসঙ্গিক হবে না। কিছু রাজনৈতিক দলের সভায় এই হেড কাউন্ট সবার চোখে পড়বে—স্টেজের ব্যানারে একটা ফ্যামিলি ট্রি-এর ছবি। বিএনপির ব্যানারে হেড কাউন্ট থাকে তিন—জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান। আওয়ামী লীগের ব্যানারে হেড কাউন্ট দুই—শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনা; তৃতীয়জন তারা এখনো ঠিক করে উঠতে পারেনি।

এক শ বছর পরে, এই দল দুটির ব্যানারে ফ্যামিলি ট্রি আরও বড় হবে, হেড কাউন্টও স্বভাবত আরও অনেক বাড়বে!

যুক্তরাষ্ট্রে খোদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও তাঁর রিপাবলিকান পার্টির প্রতিষ্ঠাতা কে, তা বলতে পারবেন কি না, সন্দেহ আছে। কারণ, ওদের ব্যানারে কোনো ফ্যামিলি ট্রি নেই।

একক হেড কাউন্টের বিষয়টাও এখন বলা যেতে পারে। শেখ হাসিনার সময় টিভি স্ক্রিনের ওপরের বাঁ দিকের কোনায় শেখ মুজিবের একটা মাথার ছবি প্রায়ই দেখা যেত বছরের প্রায় দশটা মাস। স্বাধীনতা দিবস, ৭ মার্চ, মৃত্যুদিবস, জন্মদিবস, বিজয় দিবস, পাকিস্তান থেকে প্রত্যাগমন দিবস ইত্যাদি সব দিবসে মাসব্যাপী অনুষ্ঠান থাকত। এই একক হেড কাউন্টটা শেখ মুজিবের মর্যাদা বাড়াতে কোনো সাহায্য করেনি।

এখন ইন্টারনেট-যুগে আমাদের শহরে গ্রামে প্রায় প্রতিটি জায়গায় ইন্টারনেট সংযোগ আছে। আমাদের জাতীয় দলের একজন বড় নেতা লন্ডনে বসে প্রায় প্রতিদিন বাংলাদেশে তাঁর সমর্থক ও দলীয় নেতাদের সঙ্গে ভার্চ্যুয়ালি কথা বলছেন। ঢাকার জনসভায়ও তিনি ভার্চ্যুয়ালি যোগ দিয়েছেন।

সুতরাং সশরীর হাজির হয়ে দলের হেড কাউন্ট বাড়াতে হবে, এই যুগে এ ধারণাটা অচল। হেড কাউন্ট বাড়াতে সভাস্থল থেকে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে ভার্চ্যুয়াল যোগাযোগ স্থাপন করা যেতে পারে। যার যত সংযোগ এবং প্রতি সংযোগের স্ক্রিনে যত লোক দেখছেন, তার তত হেড কাউন্ট।

রাজনৈতিক দলগুলো ভাড়া করা গাড়িতে বাইরের থেকে লোকজন নিয়ে এসে আরও বড় প্রশ্নের সম্মুখীন হতে পারেন। যদি কোনো অর্বাচীন প্রশ্ন করে বসেন—বাইরের থাকে আনা লোকগুলোও কি ভাড়াটে? আড়াই কোটি লোকের শহরে হেড কাউন্ট দেখাতে, তাদের শহরের বাইরের থেকে লোক আনতে হবে কেন?

আজকাল আমাদের রাজনীতি ও রাজনৈতিক নেতারা প্রায় সবাই পুরোমাত্রায় ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে গেছেন। নেতাদের আগের দিনের মতো ঢাকার বাইরে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে সভা-সমিতি করতে দেখা যায় না। সেটাও একটা কারণ হতে পারে ঢাকার সভার হেড কাউন্ট বাড়ানোর। নেতারা যাবেন কেন জনগণের কাছে, জনগণকেই আসতে হবে তাঁদের কাছে! জনগণ হলো রাজনৈতিক দলের হেড কাউন্ট।

* সালেহ উদ্দিন আহমদ, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- ই-মেইল: salehpublic711@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব

রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে একটি রাজনৈতিক দলের সমাবেশ
রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে একটি রাজনৈতিক দলের সমাবেশ। প্রতীকী ছবি

Tuesday, February 24, 2026

জামায়াতের ‘ঢাকা দখল’ ও বড় উত্থান এবং কিছু ইঙ্গিতের ভোট by মনোজ দে

শীত বিদায়ের মিষ্টি রোদ আর মৃদুমন্দ বাতাসের দিন ছিল ১২ ফেব্রুয়ারি। ঠিক দুই দিন পরই বসন্ত। প্রকৃতিতে সন্ধিক্ষণের এ দিনটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেরও একটি সন্ধিক্ষণ হয়ে থাকবে। ভোট যে মানুষের কাছে বড় উৎসব, ভোট যে মানুষের কাছে নাগরিক হিসেবে নিজের ক্ষমতা প্রয়োগের পথ, সেটাই এ দেশের মানুষ ভুলে যেতে বসেছিল। সত্যিকার উৎসব করেই মানুষ এবার ভোট দিয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, এবার ভোট প্রদানের হার ছিল ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ। আওয়ামী লীগ–বিহীন নির্বাচনে এই ভোটের হার নিঃসন্দেহে আশাপ্রদ। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিয়েছিল প্রায় ৮৭ শতাংশ ভোটার। আর ২০০১ সালের নির্বাচনে ভোট দিয়েছিল প্রায় ৭৬ শতাংশ ভোটার।

গণ–অভ্যুত্থানে প্রশ্নহীন ম্যান্ডেটের মধ্য দিয়ে এলেও গত ১৮ মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলটা বাংলাদেশের ইতিহাসে দুর্বল শাসন হিসেবেই বিবেচিত হবে। মব সহিংসতার কাছে সরকারের অসহায় আত্মসমর্পণ এবং কোনো কোনো গোষ্ঠীর অতি ক্ষমতাবান হয়ে ওঠায় মানুষের কাছে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল, সরকার ঠিকমতো একটা নির্বাচন করতে পারবে তো? কিন্তু শেষবেলায় সরকার একটা ভালো নির্বাচন দিতে পেরেছে।

১৭ বছর ভোট দিতে না পারা নাগরিকদের ভোট দেওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা, প্রচারণার ক্ষেত্রে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ রাজনৈতিক দলগুলো এবং স্বতন্ত্র ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের সংযত আচরণ; নির্বাচন কমিশনের নেওয়া কড়া নিরাপত্তা ও নজরদারির ফলেই একটা সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ নির্বাচন সম্ভব হয়েছে। মানুষ যে ভয়হীন পরিবেশে ভোট দিতে কেন্দ্রের দিকে গেছেন, সেই পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা ও তৎপরতাকে আলাদাভাবে উল্লেখ করতেই হবে। এবারের নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য নিয়োগ করা হয়েছিল।

চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানে সেনাবাহিনীর জনতার পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা জয়-পরাজয় নির্ধারণে চূড়ান্ত ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সরকারের একটি দৃশ্যমান দূরত্ব দেখা গেছে। সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের অনেকে এই দূরত্ব তৈরিকে এজেন্ডা হিসেবেই বেছে নেয়। গণ–অভ্যুত্থান–পরবর্তী একটি সরকার যেখানে পুলিশি ব্যবস্থা নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ভীষণভাবে ভেঙে পড়েছিল, সেখানে অন্তর্বর্তী সরকার, অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া শক্তিগুলো এবং সশস্ত্র বাহিনী—এই তিন পক্ষের ঐক্যটা ছিল ভীষণ রকম জরুরি।

কিন্তু সেটা না হওয়ায় একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করা শাসনের বদলে মবতন্ত্রের মতো ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে নাগরিকদের। রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতাই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এই সত্যকেই সামনে এনেছে, রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের সক্ষমতা আছে।

দুই.

৩০০ আসনের মধ্যে একটি আসনে প্রার্থী মারা যাওয়ায় নির্বাচন হয়নি। বাকি দুটি আসনে আইনগত জটিলতায় ফলাফল আটকে আছে। ২৯৭টি আসনের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। আসন সমঝোতা করে নির্বাচনে যাওয়া দলটির মিত্ররা আরও তিনটি আসনে বিজয়ী হয়েছে। বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর এটি দলটির সবচেয়ে বড় বিজয়। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে দলটি ২০৭টি আসনে জিতেছিল। নব্বইয়ের গণ–অভ্যুত্থানের পর দেশে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরুর পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে দলটি ১৪০টি আসন পেয়েছিল। ২০০১ সালের নির্বাচনে এককভাবে ১৯৩টি এবং জোটগতভাবে ২১৬টি আসন পেয়েছিল। এবারের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়েই বিএনপি সরকার গঠন করতে যাচ্ছে।

তবে এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর বড় উত্থান হয়েছে। এককভাবে ৬৮টি এবং জোটগতভাবে ৭৬টি আসনে বিজয়ী হয়েছে দলটি। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, নির্বাচনের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জামায়াত হাইপ তুলতে সক্ষম হয় যে এবারের নির্বাচনে একানব্বইয়ের নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি হতে পারে। ফলাফল ঘোষণার পরও সেই টান টান উত্তেজনা তারা জিইয়ে রাখতে পারে।

একানব্বইয়ের নির্বাচনে সব জরিপ ও বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস ছিল সেবার আওয়ামী লীগ জিততে চলেছে। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সেই নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত বিএনপিই জিতেছিল। এর আগে বিএনপির সঙ্গে জোটগত নির্বাচন করে জামায়াত ২০০১ সালে ১৫টি ও ২০০৮ সালে ২টি আসন পেয়েছিল। ১৯৯৬ সালে এককভাবে নির্বাচন করেছিল জামায়াত, সেবারে দলটি আসন পেয়েছিল ৩টি। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামায়াত ১৮টি আসন পেয়েছিল। রাজনৈতিক মহলে এই আলাপ আছে যে সেই নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে ভেতরে ভেতরে তাদের একটি রাজনৈতিক সমঝোতা হয়েছিল।

তিন.

বাংলাদেশে যে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির একটা উত্থান ঘটেছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতেই তার পরিষ্কার বার্তা পাওয়া যাচ্ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে মাজার ভাঙা, বাউলদের ওপর আক্রমণ থেকে শুরু করে নারী, সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাগামছাড়া ঘৃণাচর্চা হয়েছে। তবে ২০০৮ সালের পর গ্রহণযোগ্য কোনো নির্বাচন না হওয়ায় দক্ষিণপন্থী রাজনীতির প্রকৃত চিত্র জানা যাচ্ছিল না। যদিও নির্বাচন দিয়েই দক্ষিণপন্থী রাজনীতির প্রকৃত চিত্র বোঝাটা কঠিন। কেননা, এর একটি অংশ প্রকাশ্যেই গণতন্ত্র ও নির্বাচনবিরোধী। বাস্তবে এই অতি দক্ষিণপন্থী অংশ সমাজে কতটা, সেই চিত্র অধরাই থেকে যাচ্ছে।

নির্বাচনের আগে থেকেই আসিফ মোহাম্মদ শাহানের মতো পর্যবেক্ষকেরা ধারণা দিয়েছিলেন, উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গে ভালো করবে জামায়াত। ফলাফলেও দেখা গেল খুলনা, রংপুর ও রাজশাহী বিভাগে জামায়াত পরিষ্কারভাবে ভালো ফল করেছে। সবচেয়ে ভালো করেছে খুলনায়। ৩৬টি আসনের মধ্যে ২৫টি জিতেছে তারা। রংপুরের ৩৩টির মধ্যে ১৬টি এবং রাজশাহীর ৩৯টির মধ্যে ১১টি আসন জিতেছে। জামায়াতের জয় পাওয়া আসনগুলোর বেশির ভাগই ভারতীয় সীমান্তের কাছাকাছি। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই অঞ্চলগুলোতে সাতচল্লিশের দেশভাগের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের অন্য অঞ্চল থেকে মাইগ্রেট করে আসা জনগোষ্ঠীর ভোট এ ক্ষেত্রে একটা ভূমিকা পালন করে থাকতে পারে।

উত্তরবঙ্গে বিশেষ করে রংপুর বিভাগের ক্ষেত্রে এটা স্পষ্ট যে ঐতিহ্যগত জাতীয় পার্টির ভোটারদের একটি বড় অংশ এবার জামায়াতের দিকে ঝুঁকেছে। এর একটা বড় কারণ হলো, জাতীয় পার্টি যে ডানপন্থার মিশেলে জাতীয়তাবাদী রাজনীতি করে, তার সঙ্গে জামায়াতের রাজনীতি অনেকটা মিলে যায়। প্রতিষ্ঠার পর এবারই প্রথম জাতীয় পার্টি একটি আসনও পায়নি। রংপুরের আসনগুলোতেও তারা বড় ব্যবধানে হেরেছে এবং অনেক আসনে তৃতীয় হয়েছে। দলটির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যু এবং গত ১৭ বছরে আওয়ামী লীগের বি–টিম হওয়ার রাজনীতি জাতীয় পার্টিকে রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক করে তুলেছে।

দক্ষিণবঙ্গ ও রাজশাহীর যেসব আসনে বিএনপি পরাজিত হয়েছে, তার অনেকগুলোই দলটির ঐতিহ্যবাহী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এসব আসনে হারার পেছনে বড় একটি কারণ হতে পারে বিএনপি তার প্রথাগত সমর্থকদের একটি অংশকে হারিয়েছে। কিছু আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরাও জয়-পরাজয় নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছে। কোথাও কোথাও দুর্বল ও নিষ্ক্রিয় নেতাকে প্রার্থী করায় তারা হেরেছে। কিন্তু এটাই সবটা কারণ নয়। এখানকার অনেক আসনে প্রথাগত আওয়ামী লীগের যেসব ভোটার এবার ভোট দিয়েছেন, তাঁদের একটা অংশ জামায়াতকে ভোট দিয়ে থাকতে পারেন।

এর পেছনে বিএনপির স্থানীয় নেতা–কর্মীদের চাঁদাবাজি ও মামলাবাজিও একটা ভূমিকা রেখেছে। দক্ষিণবঙ্গের অন্তত দুটি আসনের কয়েকজন ভোটারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোথাও পাড়া, কোথাও গ্রাম ধরে আওয়ামী লীগের প্রথাগত ভোটাররা জামায়াতের প্রতি সমর্থন দিয়েছেন। গ্রামগুলোতে যে গোত্রভিত্তিক বিরোধ থাকে, সেখানে বিভাজনটা অনেকটাই আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপি। মোটাদাগে এই সূত্রই এখানে কাজ করেছে

চার.

ঢাকা মহানগরের আসনগুলোতে জামায়াতের উত্থান সবচেয়ে বিস্ময়ের। অতীতে কখনোই জামায়াত ঢাকার কোনো আসন পায়নি। ঢাকার ভোটারদের মধ্যে জামায়াতের গ্রহণযোগ্যতাও খুব বেশি দেখা যায়নি। এবারের নির্বাচনে ঢাকা মহানগরের ১৫টি আসনের মধ্যে ৬টিতেই জামায়াত জোট জিতেছে। হেরে যাওয়া আসনগুলোর কয়েকটিতে ভোট ব্যবধান খুব সামান্য। এনসিপির সঙ্গে জোট করায় তরুণ ভোটারদের একটা বড় সমর্থন জামায়াত পেয়ে থাকতে পারে।

গত দেড় বছরে বিএনপির বিরুদ্ধে ওঠা চাঁদাবাজির অভিযোগও ভোটারদের একটা অংশকে জামায়াতের দিকে ঝুঁকিয়েছে। বলা হয়ে থাকে ঢাকা যার দখলে পুরো দেশের রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ সেই দলের হাতে। ঢাকা দখলের জন্য জামায়াত যে দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি নিয়েছে, সেটা ফলাফলই বলে দিচ্ছে। কিছু আসনে ভোটার স্থানান্তরের কৌশল কাজ করেছে। ভোটের অনেক আগে থেকেই, রিকশাচালক, সিএনজিচালক, ফুটপাতের দোকানিদের একটা অংশ জামায়াতের পক্ষে সরব প্রচারণা চালিয়েছেন।

পাঁচ.

জাতীয় পার্টির অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়াসহ এই নির্বাচন আরও কিছু ইঙ্গিত দিচ্ছে। একানব্বইয়ের নির্বাচনের পর আর কোনো নির্বাচনেই বামপন্থীরা এককভাবে নির্বাচন করে জিততে পারেনি। বরিশাল-৫ আসনে বাসদের প্রার্থী মনীষা চক্রবর্তী ছাড়া বামপন্থীদের কোনো আলোচিত প্রার্থী ছিলেন না। নির্বাচনে তিনি ২২ হাজার ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন। তিনি ছাড়া উল্লেখ করার মতো কেউই ভোট পাননি। এবারের সংসদে বামপন্থীদের কোনো প্রতিনিধি থাকছে না।

নারী ও সংখ্যালঘু জনপ্রতিনিধিও এবারের সংসদে অনেক কম। বিএনপি থেকে ছয়জন ও স্বতন্ত্র হিসেবে রুমিন ফারহানা এবার জিতেছেন। জাতিগত সংখ্যালঘু ২ জন ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু ২ জন প্রতিনিধি এবার এমপি হয়েছেন। এর পেছনেও সাম্প্রতিক বছরগুলো, বিশেষ করে গত ১৮ মাসের নারীবিদ্বেষী প্রচার ও ডানপন্থী জোয়ার কাজ করেছে। ফলে ৭ জন নারী আর ৪ জন সংখ্যালঘু সংসদ সদস্য নিয়ে কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক সংসদ হতে চলেছে, সেটা নিয়ে বড় প্রশ্নই থেকে যাবে।  

নির্বাচনে বিএনপি তার ইতিহাসে সবচেয়ে ভালো ফলাফলে জিতলেও জামায়াতের বড় উত্থান ঘটেছে। ভোট দেওয়া ভোটারদের মধ্যে প্রায় ৩২ শতাংশ সমর্থন দিয়েছে জামায়াতকে। বিএনপি প্রতি সমর্থন দিয়েছে ৪৯ দশমিক ৬০ শতাংশ ভোটার। নারীদের, বিশেষ করে শহর অঞ্চলের ও কর্মজীবী নারী ভোটার এবং গত দেড় বছরে নানাভাবে আক্রান্ত জাতিগত, ধর্মীয় ও সম্প্রদায়গত সংখ্যালঘুদের ভোট বিএনপিকে অনেক আসনে জিততে সহায়তা করেছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দক্ষিণপন্থার উত্থানের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধ প্রকল্প, ভারতের শাসক দল বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি এবং আওয়ামী লীগের দমনমূলক শাসনের প্রতিক্রিয়া সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশ শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, সামাজিক মেরুকরণের দিক থেকেও সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একটি পরিচ্ছন্ন ভোট বাংলাদেশের মুমূর্ষু গণতন্ত্রকে আপাতত বাঁচিয়ে দিয়েছে, কিন্তু মূল চ্যালেঞ্জের শুরুটা এখন থেকেই।

* মনোজ দে, প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী
- মতামত লেখকের নিজস্ব

এবারের নির্বাচনে ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো ফলাফল করেছে জামায়াতে ইসলামি
এবারের নির্বাচনে ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো ফলাফল করেছে জামায়াতে ইসলামি। ছবি : প্রথম আলো

Saturday, February 21, 2026

শুরুটা আরও সুন্দর হতে পারত by টিপু সুলতান

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান শুধু একটি স্বৈরশাসনের পতন ঘটায়নি; জন্ম দিয়েছিল এক নতুন প্রত্যাশার। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর দেশ পেল একটি শান্তিপূর্ণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। গতকাল মঙ্গলবার ছিল নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের এবং নতুন মন্ত্রিসভার শপথ। সব মিলিয়ে দিনটি হওয়ার কথা ছিল নতুন রাজনৈতিক সূচনার প্রতীক, গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তনের এক বড় আনুষ্ঠানিক উদ্‌যাপন।

কিন্তু শুরুতেই দেখা দিল অনাকাঙ্ক্ষিত টানাপোড়েন।

সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণকে কেন্দ্র করে তৈরি হলো প্রথম জটিলতা। বিএনপি আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিল, সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে এ ধরনের শপথের উল্লেখ নেই। শপথ অনুষ্ঠানের শুরুতেই তারা জানিয়ে দেয়, তারা সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেবে না। তাদের যুক্তি—সংবিধানে যেহেতু এর ভিত্তি নেই।

বিএনপির এই অবস্থান রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। সকালে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি জানায়, বিএনপি যদি সংস্কার পরিষদের শপথ না নেয়, তবে তারা সংসদ সদস্য ও সংস্কার পরিষদের শপথ না–ও নিতে পারে। এতে দিনের প্রথম ভাগে সাময়িক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা দুটি শপথই নেন। তবে দল দুটির কেউ বিকেলে নতুন মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নেননি, যা অনেকের কাছে রাজনৈতিক দূরত্বের সূক্ষ্ম ইঙ্গিত হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে।

জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের মাধ্যমে সংবিধানের ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের পক্ষে জনরায় এসেছে। সেই রায় কার্যকর করার জন্যই সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা। আদেশ অনুযায়ী, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের একই অনুষ্ঠানে পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেওয়ার বিধান ছিল এবং ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংস্কার সম্পন্ন করার সময়সীমা নির্ধারিত। সূচনালগ্নেই এই প্রক্রিয়া প্রশ্নের মুখে পড়ার কারণে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য বেড়ে গেছে।

১২ ফেব্রুয়ারি যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো, এটা কেবল সরকার পরিবর্তন বা নতুন সরকার গঠন নয়; এটা ছিল রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশার নির্বাচন। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের রক্তঝরা পটভূমিতে দেশের তরুণেরা নতুন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেখার আশা জুগিয়েছিল—সংলাপ, সমঝোতা ও সহযোগিতার সংস্কৃতি। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের বিদায়ী ভাষণে বলা হয়েছিল, এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নতুন অভিযাত্রার সূচনা।

নির্বাচনের পর জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকা রাখতে চায়। বিএনপি জাতীয় ঐক্য, সম্প্রীতি ও প্রতিহিংসামুক্ত রাজনীতির কথা বলছে জোরেশোরে।

কিন্তু শপথের দিনেই যে দৃশ্য দেখা গেল, তা সেই প্রত্যাশার সঙ্গে অনেকটাই বেমানান।

গণতন্ত্রে মতভেদ অস্বাভাবিক নয়; বরং সেটিই তার প্রাণশক্তি। তবে সূচনালগ্নে প্রতীকী ঐক্যের গুরুত্বও কম নয়। নতুন সরকারের প্রথম দিনটি যদি আরও দৃশ্যমান ঐক্যের বার্তা দিতে পারত, তবে সেটা হতো গণ-অভ্যুত্থানের আত্মত্যাগের প্রতি গভীরতর শ্রদ্ধা।

এখন দেখার বিষয়, এই প্রাথমিক টানাপোড়েন বৃহত্তর রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নেয়, নাকি সংলাপের মধ্য দিয়ে পথ খুঁজে নেয় নতুন বাংলাদেশ। সব মিলিয়ে বলা যায়, এত ত্যাগের পর যে নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা গড়ে উঠেছে, তার আনুষ্ঠানিক শুরুটা আরও সুন্দর হতে পারত।

* টিপু সুলতান: সাংবাদিক

বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা মঙ্গলবার বেলা পৌনে ১১টার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনের শপথগ্রহণ কক্ষে শপথবাক্য পাঠ করেন
বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা মঙ্গলবার বেলা পৌনে ১১টার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনের শপথগ্রহণ কক্ষে শপথবাক্য পাঠ করেন। ছবি: বাসস থেকে নেওয়া

Thursday, February 19, 2026

যে কারণে সাতকানিয়া–লোহাগাড়ায় জামায়াত বারবার জেতে by গাজী ফিরোজ

চট্টগ্রাম–১৫ (সাতকানিয়া–লোহাগাড়া) আসনে জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক অবস্থা সব সময় শক্ত ছিল। এই আসনে নির্বাচনের এক বছর আগেই জামায়াতে ইসলামী নিজেদের প্রার্থী ঘোষণা করে। তিন তিনবার জামায়াতের প্রার্থী এখানে জয়লাভ করেন। অপর দিকে বিএনপি প্রার্থী ঘোষণা করে নির্বাচনের এক মাস আগে। থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বিএনপির কোনো কমিটি নেই। সাংগঠনিকভাবে জামায়াতের শক্তিশালী প্রার্থীর বিপরীতে বিএনপির প্রার্থী ছিল নতুন।

স্থানীয় বাসিন্দা ও দুই দলের নেতা–কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা, নতুন প্রার্থী ও প্রচারণার জন্য শুধু এক মাস সময় পাওয়ায় জামায়াতের সঙ্গে পেরে ওঠেনি। তবে মাত্র ৪৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে জামায়াতের প্রার্থীর কাছে হেরে যান বিএনপির প্রার্থী। নেতা–কর্মীরা বলছেন, বিএনপি আগে থেকে প্রার্থী নির্ধারণ করলে, থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটিগুলো সক্রিয় থাকলে এই ব্যবধান কাটিয়ে উঠতে পারত।

গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর শাহজাহান চৌধুরী ১ লাখ ৭২ হাজার ৬১ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী নাজমুল মোস্তফা আমিন ১ লাখ ২৭ হাজার ২৫ ভোট পেয়েছেন।

বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের যুগপৎ আন্দোলনের মাধ্যমে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। সে কারণে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী জোটবদ্ধ নির্বাচন করলে সাতকানিয়া–লোহাগাড়া আসনটি জামায়াতের শাহজাহান চৌধুরীকে ছেড়ে দেওয়া হতে পারে বিষয়টি আলোচনায় ছিল।

জোটের আলোচনা থাকলেও জামায়াতে ইসলামী এই আসনে শাহজাহান চৌধুরীকে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে তাদের প্রার্থী ঘোষণা করে। তিনি এলাকায় নিয়মিত প্রচারণা শুরু করেন। এর আগে এই আসনে নির্বাচন করায় এলাকার প্রার্থী হিসেবেও পরিচিত তিনি। তাঁকে নতুন করে পরিচিত হতে হয়নি। শাহজাহান চৌধুরী ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রার্থী অলি আহমদের কাছে পরাজিত হন। ২০০১ সালে তাঁর দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপি জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করলেও চট্টগ্রাম–১৪ আসনে উভয় দল পৃথকভাবে নির্বাচন করে এবং তাতে শাহজাহান চৌধুরী বিজয়ী হন। ২০০৮ সালে এই আসনে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির আ ন ম শামসুল ইসলাম নির্বাচিত হন।

১৯৯১ সালের পর থেকে তিনবার জামায়াতের প্রার্থীরা নির্বাচিত হওয়ার কারণে এই আসনে দলটির সাংগঠনিক অবস্থা অন্য যেকোনো দলের চেয়ে ভালো। বিএনপি থেকে অলি আহমদ নির্বাচন করলেও তিনি ২০০৬ সালে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) নামের নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন। নেতৃত্ব হারা হয়ে যায় সাতকানিয়া–লোহাগাড়া বিএনপি। বিএনপির কিছু নেতা–কর্মী অলির সঙ্গে যুক্ত হন। আর কিছু জামায়াতে ভিড়ে যান। বাকি যাঁরা ছিলেন, তাঁরা নিষ্ক্রিয় হয়ে যান।

২০০৮ সালের নির্বাচনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে সাতকানিয়া–লোহাগাড়ায় বিএনপি আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। আসনে নিজেদের কোনো প্রার্থী না থাকায় নেতা–কর্মীরা ছিলেন দোদুল্যমান। আসনটি কখনো জামায়াত, আবার কখনো এলডিপিকে ছেড়ে দেওয়া হতে পারে, সেই শঙ্কায় থাকতেন নেতা–কর্মীরা।

অপর দিকে আওয়ামী লীগের বাধার মুখে প্রকাশ্যে ও গোপনে সাংগঠনিক তৎপরতা চালিয়ে গেছে জামায়াতে ইসলামী। এমনকি ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধের মামলায় জামায়াতের দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ফাঁসি দেওয়ার ঘটনায় সাতকানিয়া–লোহাগাড়ায় ব্যাপক সহিংসতা হয়। কিন্তু আন্দোলন–সংগ্রামে সেখানে বিএনপির কোনো ভূমিকা ছিল না।

এদিকে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম ও জিএস এস এম ফরহাদের গ্রামের বাড়ি সাতকানিয়া–লোহাগাড়া আসনে। তাঁরাও শাহজাহানের জন্য প্রচারণায় নেমেছিলেন। পক্ষান্তরে বিএনপির প্রার্থী কে হবেন, তা–ও স্পষ্ট ছিল না। উল্টো আসনটি বিএনপি তার জোটের শরিকদের ছেড়ে দিতে পারে, এমন আলোচনাও ছিল।

তবে এলাকাবাসী পাশে ছিলেন বলে নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন, এমনটাই মনে করেন জামায়াতের শাহজাহান চৌধুরী। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘১৯৯১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে সাতকানিয়া–লোহাগাড়াবাসীর সুখে–দুঃখে আছি আমি। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের ১৭ বছরও জুলুম–নির্যাতনের শিকার লোকজনের পাশে ছিলাম। ৫ আগস্টের পর থেকে সশরীর তাদের পাশে ছিলাম। তাই লোকজন আমাকে বেছে নিয়েছেন। ভবিষ্যতেও আমি তাদের জন্য নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে করে যাব।’

জামায়াতে ইসলামীর আসন হিসেবে পরিচিত সাতকানিয়া–লোহাগাড়ায় ১ লাখ ২৭ হাজার ২৫ ভোট পেয়ে বিএনপি কিছুটা স্বস্তিতে রয়েছে। জানতে চাইলে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্যসচিব হেলাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সাতকানিয়া–লোহাগাড়ায় বিএনপির কমিটি নেই। আমাদের প্রার্থী নির্ধারণও হয়েছিল এক মাস আগে। এটি জোটকে দেওয়া হতে পারে, এমন ধারণা ছিল সবার। এরপরও জামায়াতের শক্তিশালী প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ১ লাখ ২৭ হাজার ভোট পাওয়া কম নয়।’

হেলাল উদ্দিন আরও বলেন, ‘সাতকানিয়া–লোহাগাড়া বিএনপিকে শক্তিশালী করতে সাংগঠনিকভাবে যা যা করা দরকার, আমরা সব করব। এবারের নির্বাচন থেকে আমরা ঘাটতিগুলো কাটিয়ে উঠব।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-02-15%2Fa12qqfj8%2FWhatsApp-Image-2026-02-15-at-16.34.13.jpeg?rect=0%2C0%2C621%2C414&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
শাহজাহান চৌধুরী। ছবি: সংগৃহীত

Wednesday, February 18, 2026

নির্বাচনে জামায়াতের উত্থান ও বিএনপির চ্যালেঞ্জ by ইফতেখারুজ্জামান

শত অনিশ্চয়তা ও প্রতিকূলতা কাটিয়ে বহুল প্রত্যাশিত ঐতিহাসিক ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন মোটামুটি শান্তিপূর্ণ হয়েছে। ভোটের হারও মোটামুটি ভালো ছিল। তবে ভোট দিলেও আসলে কতটা বাস্তব পরিবর্তন বা লাভ পাওয়া যাবে, তা নিয়ে অতীত অভিজ্ঞতার কারণে অনেকের মনে সন্দেহ রয়ে গেছে। এই আস্থার ঘাটতির কারণেই হয়তো ভোটের হার আরও বেশি হয়নি। তবে মোটের ওপর নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে।

কর্তৃত্বপরায়ণ ক্লিপ্টোক্রেসি বা তস্করতন্ত্রের পরাজয়ের পর অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম ও ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করে। এতে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ হারায়। ফলে দেশে-বিদেশে অনেকেই এ নির্বাচন কতটুকু অন্তর্ভুক্তিমূলক হলো, সে প্রশ্ন তুলতে পারেন। তবে মনে রাখতে হবে, জুলাই অভ্যুত্থান ও অন্তর্বর্তী সরকারকে অবৈধ ও ষড়যন্ত্রমূলক ঘোষণার অবস্থানে আওয়ামী লীগ অবিচল থেকেছে। তারা নির্বাচনকেও অবৈধ ও প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছে। এ লক্ষ্যে তারা নির্বাচনকালে সক্রিয় ছিল। অতএব নির্বাচন ও নির্বাচনী পরিবেশে আওয়ামী লীগের নেতিবাচক ও সক্রিয় ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই।

তবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন প্রতিহত করার অবস্থান সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী-সমর্থকেরা নির্বাচনে ভোটার হিসেবে অংশ নিয়েছেন। এমনকি কারাগারে থাকা দলটির উচ্চপর্যায়ের নেতারাও ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। দলটির সমর্থকদের একাংশ ভোট বর্জন করে থাকতে পারেন, কিন্তু সেটি তো সাধারণ ভোটারদের ক্ষেত্রেও কমবেশি প্রযোজ্য।

মাঠপর্যায়ে আওয়ামী লীগের ভোট টানার জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলের অনেকেই, বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াত জোট এবং জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন দল ও প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হয়েছে। এতে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাও সাড়া দিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা নির্বাচনে সরাসরি অংশগ্রহণকারী কোনো কোনো দলে যোগদান করেছেন ও প্রচারণাসহ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণও করেছেন।

ফলে আওয়ামী লীগ একদিকে দল হিসেবে নির্বাচনে আনুষ্ঠানিকভাবে নেতিবাচক ভূমিকা রেখেছে; অন‍্যদিকে অনানুষ্ঠানিকভাবে দলটির নেতা-কর্মী-সমর্থকেরা ভোট দেওয়াসহ তাঁদের রাজনৈতিক অধিকার প্রয়োগ করেছেন। তাই নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়নি—এমন অবস্থানের পক্ষে গ্রহণযোগ্য যুক্তি খুঁজে পাওয়া কঠিন।

বাস্তবতার নিরিখে সব ভোটার সম-অধিকারের ভিত্তিতে ভোট দিতে পেরেছেন, এমনও বলা যাবে না। বাস্তবতা হলো, সব ভোটার সমানভাবে ভোট দিতে পারেননি। এখানে ধনসম্পদ ও পেশিশক্তির প্রভাব বড় ভূমিকা রেখেছে। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী পরিবেশে ধর্মান্ধতা, ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা, পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব এবং সংখ্যাগরিষ্ঠদের চাপও ছিল। এই কারণে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারী, সংখ্যালঘু, প্রতিবন্ধী এবং প্রান্তিক ভোটারদের জন্য পরিবেশ বিভ্রান্তিকর হয়ে উঠেছে। অনেক সময় এটা কঠিন বা ভয়ংকরও হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তারপরও, এবার নির্বাচন জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং জনগণের রায়ে নতুন সংসদ ও সরকার গঠিত হতে যাচ্ছে। সংসদে বিএনপি জোটের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে, যা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি, এই ধরনের সংখ্যাগরিষ্ঠতার নেতিবাচক প্রভাব কত বড় হতে পারে—এ অভিজ্ঞতা আছে জনগণের এবং বর্তমান সব রাজনৈতিক দলেরও।

এই শিক্ষা মাথায় রেখে আশা করা যায় যে নতুন সংসদ ও সরকার দায়িত্বশীলভাবে কাজ করবে এবং ‘এবার আমাদের পালা’ মনোভাব পরিহার করবে। এটি দেশের সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা।

বিএনপির বড় বিজয়ের ঝুঁকির দিক থাকলেও, এবার দেশের ভোটাররা এমন একটি পরিস্থিতি ঠেকাতে পেরেছেন, যা আরও ভয়ংকর হতে পারত। এই গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে ধর্মান্ধ বা ধর্মের ভুল ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে আগ্রাসীভাবে কোনো শক্তির বিস্তারের চেষ্টা সীমিত হয়েছে, অন্তত সাময়িকভাবে।

ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার রোধ করাই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের অন্যতম চাওয়া। সেই বিবেচনায় এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের এক-চতুর্থাংশের বেশি আসন পাওয়া হতাশাজনক। কিন্তু এটাই বাস্তবতা। একে শুধু জুলাই আন্দোলনের ফল হিসেবে দেখলে হবে না। স্বাধীনতা–পরবর্তী সময়ে ক্ষমতার রাজনীতিতে রাজনৈতিক দলগুলো ধর্মীয় প্রভাব বাড়ানোর জন্য একধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকায় এই ধরনের শক্তি গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এর ধারাবাহিকতায় নব্বইয়ের পর থেকে দেশের দুই বড় রাজনৈতিক দল একে অপরের ওপর ‘উইনার টেকস অল’ বা ‘বিজয়ীরা সব নিয়ে যাবে’ মানসিকতায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা চালাচ্ছে। এই প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে ধর্মভিত্তিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে কোনো সীমাবদ্ধতা বা নিয়ম ছিল না। এবারের নির্বাচনের কিছু ঘটনার মধ্যেও এর নমুনা দেখা গেছে।

এ শক্তি শুধু কর্তৃত্ববাদবিরোধী গণ-আন্দোলনের অংশ ছিল না; বরং কর্তৃত্ববাদ পতনের পরে অতি ক্ষমতাপ্রবণ অবস্থায় নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেছে। নারী কমিশনের প্রতিবেদন নিয়ে বা মাজার ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর এই ধর্মীয় চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর আক্রমণাত্মক কর্মকাণ্ডের সময় অন্তর্বর্তী সরকারের
নীরব ও আত্মসমর্পণমূলক আচরণ এ শক্তিকে আরও ক্ষমতাবান করেছে।

অন্যদিকে ইসলামের প্রতি পশ্চিমা বিশ্বের ক্রমবর্ধমান নেতিবাচক মনোভাব এবং পার্শ্ববর্তী দেশের উগ্র হিন্দুত্ববাদী সরকারের ইসলামবিরোধী প্রচারণার কারণে একধরনের হুমকির অনুভূতি তৈরি হয়। এসব ঘটনা বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিকাশের পথ আরও প্রশস্ত করেছে।

তা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি কৌশলভিত্তিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে জামায়াত সাংগঠনিক সক্ষমতা বাড়িয়েছে। পাশাপাশি তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, প্রশাসন, সিভিল-মিলিটারি আমলাতন্ত্র, ব্যাংক, আর্থিক খাতসহ রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ইকোসিস্টেমে নিজেদের ভিত্তি শক্তিশালী করতে পেরেছে। দেশের মূলধারার রাজনীতি ধারাবাহিকভাবে দেশের জনপ্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ‘বিকল্প’ হিসেবে নিজেদের উপস্থাপনের সুযোগ পেয়েছে।

অতএব টেকসই ভিত্তির ওপর বিকশিত জামায়াতের এ নির্বাচনী উত্থান সাময়িক কোনো বিষয় নয়। একই সঙ্গে তাদের এ অভূতপূর্ব অর্জন পরবর্তী সময়ে আরও কত বিকশিত হবে, তা নির্ভর করবে বড় জয় নিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার পর বিএনপি কীভাবে দেশ পরিচালনা করবে তার ওপর।

বিএনপি ‘রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফা’, এবারের নির্বাচনের ইশতেহার এবং জুলাই সনদে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তার ভিত্তিতে তারা নতুন সরকারে এসে কীভাবে দায়িত্ব পালন করবে, কতটা সফল হবে এবং তার সুবিধা জনগণ কখন, কতটা ও কীভাবে পাবে—এগুলো গুরুত্বপূর্ণ। নতুন সরকার এসব ক্ষেত্রে সফল হতে না পারলে তা জামায়াতকে আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ দেবে।

বিশেষ করে রক্তের বিনিময়ে অর্জিত রাষ্ট্র সংস্কারের মূল লক্ষ্য হলো সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবে। এই উদ্দেশ্য পূরণের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব থাকলেও বিএনপি সেগুলোতে ‘সরকারের হাত-পা বাঁধা যাবে না’ বলে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। এই প্রস্তাবগুলো বর্তমান পরিস্থিতিতে কতটা যৌক্তিক আর বাস্তবে এগুলো কতটা বিপর্যয় বা বুমেরাং হিসেবে কাজ করতে পারে, তা দলকে নতুন করে বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে।

অর্থাৎ বিএনপিকে ভাবতে হবে, এগুলো সরকারের কার্যক্রমে কী প্রভাব ফেলতে পারে এবং কীভাবে এগুলো জনগণ বা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। সর্বোপরি রাজনৈতিক, জনপ্রতিনিধিত্ব ও সরকারি অবস্থানকে ক্ষমতার অপব্যবহারের লাইসেন্স হিসেবে বিবেচনা করার যে চর্চা দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে, তা থেকে মুক্তির জন্য আত্মশুদ্ধির পথ অবলম্বন করা ছাড়া বিকল্প নেই।

মনে রাখতে হবে, যেসব কারণে এবার জনগণের রায় জামায়াতকে আরও বেশি পথ যেতে দিল না, সেসব কারণ শনাক্ত করা এবং কীভাবে নিজেদের জনগণের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করা যায়, তার বিশ্লেষণে দলটি হয়তো অবিলম্বেই ‘ড্রয়িং বোর্ডে’ ফিরে যাবে। এই বিশ্লেষণের জন্য তারা হয়তো নতুন পরিকল্পনা বা কৌশল সাজাতে মনোযোগী হবে।

* ইফতেখারুজ্জামান, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

মোটের ওপর নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে।
মোটের ওপর নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে। ছবি : প্রথম আলো

জামায়াত আমীরের সঙ্গে বিক্রম মিশ্রির সাক্ষাৎ: বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের জনগণকেন্দ্রিক সম্পর্ক পুনর্ব্যক্ত

বাংলাদেশে নতুন সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা এবং জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের আমীর ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি। নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান উপলক্ষে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ খবর দিয়েছে অনলাইন দ্য হিন্দু। বৈঠকে ডা. শফিকুর রহমানকে শুভেচ্ছা জানান বিক্রম মিশ্রি এবং বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের জনগণকেন্দ্রিক সম্পর্ক পুনর্ব্যক্ত করেন। জবাবে জামায়াতের আমীর বলেন, দুই দেশ ‘গভীর সভ্যতাগত বন্ধনে’ আবদ্ধ এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদারের আশা প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশন এক্সে এক পোস্টে জানায়, ‘ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি নতুন সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের ফাঁকে বাংলাদেশের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের আমীর ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।’ পোস্টে আরও বলা হয়, ‘পররাষ্ট্র সচিব তার নতুন দায়িত্বের জন্য ডা. রহমানকে শুভেচ্ছা জানান এবং জনগণকেন্দ্রিক সম্পর্কের ওপর জোর দিয়ে বাংলাদেশের প্রতি ভারতের অব্যাহত সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। ডা. শফিকুর রহমান দুই দেশের গভীর সভ্যতাগত বন্ধনের কথা উল্লেখ করে শক্তিশালী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আশাবাদ ব্যক্ত করেন।’
এদিকে, একই দিনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিরলা। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনে ভারত সর্বাত্মক সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শুভেচ্ছা বার্তা পৌঁছে দেন ওম বিরলা এবং ভারত সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র হস্তান্তর করেন। তিনি মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট, ভুটানের প্রধানমন্ত্রীসহ অন্যান্য নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করেন।

ওম বিরলার সফরকে স্বাগত জানান ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ। তিনি এক্সে লিখেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এবং দুই দেশের জনগণের কল্যাণে জনগণকেন্দ্রিক সহযোগিতা এগিয়ে নেয়ার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একই দিনে তারেক রহমানকে সুবিধাজনক সময়ে ভারত সফরের উষ্ণ আমন্ত্রণ জানান। তার চিঠিতে তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও কন্যা জাইমাকেও সফরসঙ্গী হওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়। চিঠিতে মোদি বাংলাদেশের জনগণের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির জন্য শুভকামনা জানান।

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের জনগণকেন্দ্রিক সম্পর্ক পুনর্ব্যক্ত

বিএনপির ‘দুর্গ’ খুলনা-২ আসনে ‘হেভিওয়েট’ মঞ্জুর পরাজয়ের নেপথ্যে by উত্তম মণ্ডল

প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত খুলনা-২ (সদর-সোনাডাঙ্গা) আসনে এবার ব্যতিক্রমী ফল হয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে ধারাবাহিক সাফল্যের পর এবার জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর কাছে হেরেছেন বিএনপির প্রার্থী। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো খুলনা নগরের কোনো আসনে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনার ছয়টি আসনের মধ্যে খুলনা-২ ও খুলনা-৬ আসনে জয় পায় জামায়াত। খুলনা-৬ আসনে জয় নিয়ে আগে থেকেই আলোচনা থাকলেও খুলনা-২ আসনের ফল নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে।

এ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জু। সংগঠক ও মাঠের নেতা হিসেবে তাঁর পরিচিতি ছিল। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জামায়াতের মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক শেখ জাহাঙ্গীর হোসেন হেলাল, যিনি খুলনা সিটি করপোরেশনের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর। ভোটের আগে অনেক বিশ্লেষণেই মঞ্জুর জয়ের সম্ভাবনা দেখা হলেও শেষ পর্যন্ত তিনি অল্প ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন।

ইতিহাস বলছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে এ আসনে দীর্ঘদিন ধরেই শক্ত অবস্থানে ছিল বিএনপির। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে এখানে জয় পান সাবেক স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলী। ২০০১ সালে জয় পান বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ২০০৮ সালে জোটের ভরাডুবির মধ্যেও এ আসনে জয় পান নজরুল ইসলাম মঞ্জু। ১৯৯৬ সালের পর জামায়াত এ আসনে কখনো প্রার্থী দেয়নি। সেবার জামায়াতের আনসার উদ্দীন ৮ হাজার ৪২৬ ভোট পান।

বিএনপির অন্তত ২০ জন স্থানীয় নেতা-কর্মী, সমর্থক ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভোট কম পড়া, দলীয় সমন্বয়ের ঘাটতি ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল বিএনপির পরাজয়ের বড় কারণ।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খুলনা জেলার সাধারণ সম্পাদক কুদরত-ই-খুদা বলেন, এ আসনে তুলনামূলক কম ভোট পড়েছে, যা বিএনপির জন্য ক্ষতিকর হয়েছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের ভোটের সমন্বয়ও এখানে হয়নি।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে জামায়াত মাঠপর্যায়ে ব্যাপক প্রচারণা চালায়। ঘরে ঘরে যোগাযোগ, নারী ভোটারদের কেন্দ্রে আনা এবং দলীয় কোন্দল না থাকা—এসব বিষয় তাঁদের পক্ষে কাজ করেছে।

নির্বাচনী প্রচারের সঙ্গে জড়িত জামায়াতের একজন কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আসনটি আমাদের কাছে নিশ্চিত ছিল না। তবে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল আমাদের মাথায় ছিল। আমরা নির্বাচনের জন্য প্রচুর কাজ করেছি, ঘরে ঘরে গিয়েছি।’

অন্যদিকে বিএনপির নেতা-কর্মীদের একটি অংশের মতে, দলীয় অভ্যন্তরীণ বিভাজন, কর্মীদের নিষ্ক্রিয়তা, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং মাঠপর্যায়ে দুর্বল প্রচারণা পরাজয়ের কারণ হয়েছে। বিশেষ করে ভোটারদের ঘরে ঘরে পৌঁছাতে না পারা এবং নারী ভোটারদের সক্রিয়ভাবে কেন্দ্রে আনতে না পারা বড় দুর্বলতা ছিল।

নগরের বাগমারা এলাকার বিএনপির একজন সক্রিয় কর্মী বলেন, ‘আমাদের দেওয়া ভোটার স্লিপ সবার বাসায় পৌঁছেনি। বিএনপির নির্বাচনী প্রচার বাজার ও মূল সড়কে সীমাবদ্ধ ছিল। জামায়াত নারী কর্মীদের ব্যাপক কাজে লাগিয়েছে, আমরা সেভাবে পারিনি।’

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালে খুলনা মহানগর বিএনপির কমিটি ভেঙে দেওয়ার পর থেকে নজরুল ইসলাম মঞ্জুর সঙ্গে বর্তমান নেতা-কর্মীদের দূরত্ব বাড়তে থাকে। মহানগর বিএনপির থানা ও ওয়ার্ড কমিটি থেকেও বাদ দেওয়া হয় মঞ্জু অনুসারীদের। দলীয় পদ হারানোর পরও রাজনীতি থেকে সরে যাননি তিনি। বিভিন্ন ব্যানারে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন। এবারের নির্বাচনে মঞ্জুকে প্রার্থী ঘোষণা করা হলে নগর বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব, থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের অনেক নেতা এবং অনুসারীরা তা মেনে নিতে পারেননি।

এমনকি প্রাথমিক মনোনয়ন ঘোষণার পরও দুই পক্ষ আলাদা কেন্দ্রীয় কর্মসূচি পালন করে। মঞ্জুর প্রার্থিতা বাতিলের দাবিও জানান বর্তমান কমিটির নেতারা। একপর্যায়ে প্রকাশ্য বিরোধ মিটিয়ে দুই পক্ষের নেতারাই মঞ্জুর পক্ষে মাঠে নামেন। তবে ভেতরের পুরোনো কোন্দল ভেতরেই রয়ে গিয়েছিল।

ভোটের দুই দিন আগে খুলনা নগরে বিএনপির বর্তমান কমিটির এক নেতা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ধানের শীষে ভোট চাচ্ছি। তবে প্রার্থী ও তাঁর নিজের লোকদের কাছে সেভাবে মূল্যায়ন পাচ্ছি না। তিনি প্রার্থীকেন্দ্রিক রাজনীতি সাজিয়েছেন। ভেতরের ক্ষত আসলে পুরোটা উপশম হয়নি।’

খুলনা নগর বিএনপির সভাপতি শফিকুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখনো বুঝে উঠতে পারছি না এবার কেন হারলাম, হিসাব মিলছে না। আরও বিশ্লেষণ করার দরকার আছে।’

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রচারণায় খুলনা–২ আসনে বিএনপি প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু। সম্প্রতি নগরের সোনাডাঙ্গা এলাকায়
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রচারণায় খুলনা–২ আসনে বিএনপি প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু। সম্প্রতি নগরের সোনাডাঙ্গা এলাকায়। ছবি: প্রথম আলো

Monday, February 16, 2026

‘চার কারণে’ সাতক্ষীরার সব আসনে বিএনপির ভরাডুবি by কল্যাণ ব্যানার্জি

সাতক্ষীরার চারটি সংসদীয় আসনেই বিএনপি প্রার্থীদের পরাজিত করে জয় পেয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা। এর মধ্যে দুটি আসনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলেও বাকি দুটি আসনে কার্যত প্রতিযোগিতা গড়ে তুলতে পারেনি বিএনপি। বিশেষ করে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী হাবিবুল ইসলাম ও তরুণ প্রার্থী মো. মরিুজ্জামানের পরাজয় দলটির নেতা-কর্মীদের হতাশ করেছে। বিপরীতে বড় ব্যবধানে জয় পাওয়ায় জামায়াত নেতা-কর্মীদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা গেছে।

স্থানীয় নেতা-কর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বিএনপির এই ভরাডুবির পেছনে চারটি প্রধান কারণ উল্লেখ করেছেন। এগুলো হলো সাংগঠনিক দুর্বলতা ও অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ, প্রার্থী নির্বাচনে ভুল সিদ্ধান্ত ও বিদ্রোহী প্রার্থী, ৫ আগস্টের পর একটি সময় পর্যন্ত কিছু নেতা-কর্মীর চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট গঠন এবং নারী ভোটারদের নিজেদের পক্ষে নিতে না পারা।

রাজনৈতিকভাবে দীর্ঘদিন ধরে সাতক্ষীরাকে জামায়াতের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে ধরা হয়। চার বিজয়ীর মধ্যে সাতক্ষীরা-৪ আসনের গাজী নজরুল ইসলাম ছাড়া অন্য তিনজন এবারই প্রথম প্রার্থী হয়ে জয় পেয়েছেন। নতুনদের মধ্যে আছেন সাতক্ষীরা-১ (কলারোয়া-তালা) আসনে মো. ইজ্জত উল্লাহ, সাতক্ষীরা-২ (সদর-দেবহাটা) আসনে আব্দুল খালেক এবং সাতক্ষীরা-৩ (কালীগঞ্জ-আশাশুনি) আসনে মুহা. রবিউল বাশার।

সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া)
এই আসনে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ও হেভিওয়েট প্রার্থী হাবিবুল ইসলাম ২৩ হাজার ৭৭৭ ভোটে পরাজিত হয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৬৯ হাজার ৯৯৫ ভোট। অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী মো. ইজ্জত উল্লাহ পেয়েছেন ১ লাখ ৯৩ হাজার ৭৭২ ভোট।

স্থানীয় লোকজনের ধারণা ছিল, জেলার অন্য আসনে হারলেও এ আসনে জয় পাবে বিএনপি। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগ ও সংখ্যালঘু পরিবারের বাড়িঘর ও প্রতিষ্ঠানে হামলা-লুটপাটের অভিযোগ ওঠে, যার সঙ্গে বিএনপির কিছু নেতা-কর্মীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ছিল। এসব নিয়ন্ত্রণে হাবিবুল ইসলাম পুরোপুরি সফল হননি। পাশাপাশি নারী ভোটারদের মধ্যে জামায়াতের ধর্মীয় প্রচারণার কার্যকর পাল্টা যুক্তি তুলে ধরতে পারেনি দলটি।

সাতক্ষীরা-২ (সদর-দেবহাটা)

এ আসনে ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৬৬ ভোটের ব্যবধানে জয় পান জামায়াতের আব্দুল খালেক। প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি পেয়েছেন ২ লাখ ৬৬ হাজার ৯৫৯ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আব্দুল রউফ পেয়েছেন ১ লাখ ১৬ হাজার ২৯৩ ভোট।

বিএনপির নেতা-কর্মীদের মতে, আগে থেকেই এ আসনে তাঁদের সাংগঠনিক দুর্বলতা ছিল। প্রার্থী হিসেবে আব্দুল রউফকে মনোনয়ন দেওয়ায় দলের ভেতরে অসন্তোষ তৈরি হয়। আব্দুল আলিম ও তাজকিন আহমেদ মনোনয়ন দাবি করে আন্দোলন করেন। শেষ পর্যন্ত প্রকাশ্যে একসঙ্গে কাজ করলেও ভেতরে বিরোধ ছিল। এ ছাড়া কুলিয়া এলাকার চিংড়ি রেণু সিন্ডিকেট নিয়েও বিতর্ক ভোটে প্রভাব ফেলেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সাতক্ষীরা-৩ (কালীগঞ্জ-আশাশুনি)
আসনটিতে ৭৮ হাজার ৮৫৪ ভোটের ব্যবধানে স্বতন্ত্র (বিএনপি বিদ্রোহী) প্রার্থীকে হারিয়ে জয় পান জামায়াতের রবিউল বাশার। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৮৪ হাজার ২৩৩ ভোট। স্বতন্ত্র প্রার্থী শহিদুল আলম পেয়েছেন ১ লাখ ৫ হাজার ৩৭৯ ভোট এবং বিএনপি প্রার্থী কাজী আলাউদ্দীন পেয়েছেন ৫৬ হাজার ৮১৯ ভোট।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শহিদুল আলম দীর্ঘদিন এলাকায় সক্রিয় থাকলেও দলীয় মনোনয়ন পান কাজী আলাউদ্দীন। এতে বিএনপি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবিতে টানা আন্দোলন হয়। শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন না বদলানোয় শহিদুল আলম স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। পরে তাঁর পক্ষে কাজ করার অভিযোগে বিএনপির ৬৭ জন নেতাকে দলীয় সদস্যপদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীই এ আসনে বিএনপির পরাজয়ের বড় কারণ।

সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর)
এ আসনে ২১ হাজার ৪৮৭ ভোটের ব্যবধানে জয় পান জামায়াতের সাবেক সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৬ হাজার ৯১৩ ভোট। বিএনপির মো. মনিরুজ্জামান পেয়েছেন ৮৫ হাজার ৪২৬ ভোট।

স্থানীয় বিএনপি নেতা-কর্মীদের দাবি, আগে থেকেই এ আসনে দলীয় কোন্দল ছিল। মনিরুজ্জামানকে প্রার্থী করায় দলের একটি অংশ অসন্তুষ্ট ছিল। তাঁরা প্রকাশ্যে বিরোধিতা না করলেও ভেতরে ভেতরে নিষ্ক্রিয় ছিল বলে অভিযোগ আছে। এ ছাড়া সংখ্যালঘু ভোটারদের মধ্যে বিএনপির বিরুদ্ধে গোপনে প্রচার চালানোর অভিযোগও আছে। পাশাপাশি বালু সিন্ডিকেটের প্রভাবও নির্বাচনে ভূমিকা রেখেছে বলে দাবি স্থানীয়দের।

বিএনপির নেতা–কর্মীরা আরও বলেন, নারী ভোটারদের মধ্যে জামায়াতের ধর্মীয় প্রচারণার বিরুদ্ধে বিকল্প হিসেবে শক্ত কোনো যুক্তি দাঁড় করাতেও পারেননি। এ ছাড়া শ্যামনগরের বালি সিন্ডিকেটের প্রভাব প্রতিপত্তিও প্রভাব ফেলেছে।

বিএনপির প্রতিক্রিয়া
এ বিষয়ে জেলা বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা কথা বলতে চাননি। জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আবু জাহিদ মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ৫ আগস্টের পর জামায়াত সংগঠন গোছাতে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছে এবং তাঁদের মধ্যে প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে কোনো বিরোধ ছিল না। তাঁরা বিভিন্ন কৌশলে নারী ভোটারদের নিজেদের পক্ষে টানতে পেরেছেন।

আবু জাহিদের ভাষ্য, বিএনপি প্রার্থী মনোনয়ন দিতে দেরি করেছে। ৩ ডিসেম্বর মনোনয়ন দেওয়া শুরু হলেও ২৭ ডিসেম্বর চূড়ান্ত হয়। এতে সময় নষ্ট হয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ সমস্যা মেটাতে সময় লেগেছে। প্রার্থী নির্বাচনেও কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল বলে তিনি স্বীকার করেন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-02-13%2F9k2nniyz%2FWhatsApp-Image-2026-02-13-at-9.01.45-AM.jpeg?rect=0%2C0%2C1599%2C1066&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের বিজয়ী প্রার্থী ইজ্জত উল্লাহ, মুহাদ্দিস আবদুল খালেক, মুহা. রবিউল বাসার ও গাজী নজরুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

২৮ আসনে জয়-পরাজয়ে যেভাবে প্রভাব রেখেছেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা by আসিফ হাওলাদার

বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল ৭৮টি আসনে। এর মধ্যে ২১টি আসনে জিতেছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থীরা। আর বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন সাতটি আসনে। সব মিলিয়ে ২৮টি আসনে জয়-পরাজয়ে প্রভাব রেখেছেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা।

যেসব আসনে বিদ্রোহীদের কাছে বিএনপি বা দলটির সমর্থিত প্রার্থীরা হেরেছেন, সেগুলো হলো ময়মনসিংহ-১, দিনাজপুর-৫, কুমিল্লা-৭, কিশোরগঞ্জ-৫, টাঙ্গাইল-৩, চাঁদপুর-৪ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২।

বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে হেরেছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ। ময়মনসিংহ-১ আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ১ হাজার ৯২৬ ভোট। তাঁর চেয়ে ৬ হাজার ৩৩৯ ভোট বেশি পেয়ে জয়ী হয়েছেন বিদ্রোহী প্রার্থী মোহাম্মদ সালমান ওমর।

বিদ্রোহীতে ধরাশায়ী বিএনপির জোটসঙ্গীরা

ঢাকা-১২ আসনে বিএনপির সমর্থনে নির্বাচন করেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। ৩০ হাজার ৯৬৩ ভোট পেয়ে তিনি দ্বিতীয় হয়েছেন। এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী সাইফুল আলম (নীরব) পেয়েছেন ২৯ হাজার ৮৬৯ ভোট। দুজনের সম্মিলিত ভোট ৬০ হাজার ৮৩২ ভোট।

বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যে ভোট ‘ভাগ’ হয়ে যাওয়ায় এই আসনে জয় পেয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন। তিনি পেয়েছেন ৫৩ হাজার ৭৭৩ ভোট।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে বিএনপির সমর্থনে নির্বাচন করেন জোটসঙ্গী জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী জুনায়েদ আল হাবিব। ৩৭ হাজার ৫৬৮ ভোটের ব্যবধানে তাঁকে পরাজিত করেছেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রুমিন ফারহানা।

সিলেট-৫ আসনে বিএনপির সমর্থনে নির্বাচন করেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি উবায়দুল্লাহ ফারুক। তিনি পেয়েছেন ৬৯ হাজার ৭৭৪ ভোট। এই আসনে জয়ী হয়েছেন জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী খেলাফত মজলিসের আবুল হাসান। দেয়ালঘড়ি প্রতীক নিয়ে তিনি পেয়েছেন ৭৯ হাজার ৩৫৫ ভোট। এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মামুনুর রশিদ পেয়েছেন ৫৬ হাজার ৩৬৯ ভোট।

নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী মনির হোসেন কাসেমীকে সমর্থন দিয়েছিল বিএনপি। তিনি হেরেছেন জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলের প্রার্থী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আব্দুল্লাহ আল আমিনের কাছে। কাসেমী পেয়েছেন ৮০ হাজার ৬১৯ ভোট। জয়ী হওয়া আব্দুল্লাহ আল আমিন পেয়েছেন ১ লাখ ৬ হাজার ১৭১ ভোট।

এই আসনে বিএনপির দুজন বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন। তাঁরা হলেন মো. শাহ আলম ও মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন। শাহ আলম ৩৯ হাজার ৫৮৯ ভোট আর গিয়াস পেয়েছেন ৪ হাজার ৭৭৯ ভোট। অর্থাৎ ভোট ‘ভাগ’ না হলে কাসেমীর জয় নিশ্চিত ছিল।

ধানের শীষ পেতে দলত্যাগ, তবু হার

লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) মহাসচিবের পদ ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে কুমিল্লা-৭ আসনে নির্বাচন করেছেন রেদোয়ান আহমেদ। তাঁকে ৪৩ হাজার ১৮১ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী আতিকুল আলম (শাওন)।

ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ বিএনপিতে যোগ দিয়ে নড়াইল-২ আসনে প্রার্থী হন। ভোটে তিনি তৃতীয় হয়েছেন। তাঁর প্রাপ্ত ভোট ৪৫ হাজার ৪৬৩। তাঁকে ৭২ হাজার ৬৭৯ ভোটে পরাজিত করেছেন জামায়াতের প্রার্থী আতাউর রহমান। এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মনিরুল ইসলাম ৭৮ হাজার ৪৫৭ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন।

ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করার জন্য গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের পদ ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন মো. রাশেদ খান। ঝিনাইদহ-৪ আসনে নির্বাচন করে তিনি ৫৬ হাজার ২২৪ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন। এই আসনে জিতেছেন জামায়াতের প্রার্থী আবু তালিব। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৫ হাজার ৯৯ ভোট। এখানে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মো. সাইফুল ইসলাম ফিরোজ পেয়েছেন ৭৭ হাজার ১০৪ ভোট।

বিএনপিতে বিদ্রোহী থাকায় যেসব আসনে সুবিধা পেল জামায়াত

বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় যে ২১টি আসনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলের প্রার্থীরা সুবিধা পেয়েছেন, সেগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম-১৬ আসন অন্যতম।

বাঁশখালী উপজেলা নিয়ে গঠিত চট্টগ্রামের এই আসনে ১০ হাজার ৬২ ভোটের ব্যবধানে বিএনপির প্রার্থী মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরীকে পরাজিত করেছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম। এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মোহাম্মদ লেয়াকত আলী ৫৫ হাজার ৪৯২ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন।

পাবনা-৪ আসনটির কথাও আলাদা করে উল্লেখ করার মতো। এই আসনে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫৭৫ ভোট পেয়ে জিতেছেন জামায়াতের প্রার্থী আবু তালেব মণ্ডল। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী হাবিবুর রহমান পেয়েছেন ১ লাখ ৩৩ হাজার ৮৭৪ ভোট। দুজনের ভোটের পার্থক্য ৩ হাজার ৭০১।

এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী জাকারিয়া পিন্টু পেয়েছেন ২৭ হাজার ৯৭০ ভোট। অর্থাৎ বিদ্রোহী প্রার্থীর সঙ্গে ভোট ভাগাভাগি হয়ে যাওয়ায় অল্প ব্যবধানে হারতে হয়েছে হাবিবকে।

বাগেরহাট-১ আসনে ৩ হাজার ২০৪ ভোটের ব্যবধানে বিএনপির প্রার্থী কপিল কৃষ্ণ মণ্ডলকে পরাজিত করেছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মশিউর রহমান খান। এই আসনে বিএনপির দুজন বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন। তাঁদের মধ্যে মো. শেখ মাছুদ রানা পেয়েছেন ৬ হাজার ৪৬৭ ভোট এবং এম এ এইচ সেলিম পেয়েছেন ৫ হাজার ২৮৩ ভোট। দুজনের মোট ভোট ১১ হাজার ৭৫০। অর্থাৎ এই দুই নেতা বিদ্রোহী না হলে বিএনপি প্রার্থী কপিলের সুবিধা হতে পারত।

একই রকম বা কাছাকাছি ঘটনা ঘটেছে যশোর-৫, মাদারীপুর-১, ঢাকা-১৪, সাতক্ষীরা-৩, পাবনা-৩, শেরপুর-১, গাইবান্ধা-৫, বাগেরহাট-২ এবং বাগেরহাট-৪ সংসদীয় আসনে।

ময়মনসিংহ-৬ সংসদীয় আসনে বিএনপি ও জামায়াত দুই দলেরই বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল। এখানে জিতেছেন জামায়াতের প্রার্থী কামরুল হাসান। তিনি পেয়েছেন ৭৭ হাজার ৩২৫ ভোট। এই আসনে জামায়াতের বিদ্রোহী প্রার্থী মো. জসিম উদ্দিন পেয়েছেন ৫১ হাজার ৯৭০ ভোট।

এই আসনে বিএনপির প্রার্থী আখতারুল আলম পেয়েছেন ৪৯ হাজার ৪৭৬ ভোট পান। আর বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী আখতার সুলতানা পেয়েছেন ৫৩ হাজার ৩৩১ ভোট।

ঢাকা-১২ আসনে জয়ী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাইফুল আলম খান
ঢাকা-১২ আসনে জয়ী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাইফুল আলম খান। ফাইল ছবি: প্রথম আলো

তারেক-শফিকুর বৈঠক: এ ধরনের ‘নতুন সংস্কৃতি’ নিজেদের ভেতরে একটা গুণগত পরিবর্তন -তাহের

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের সৌজন্য সাক্ষাৎকে স্বাগত জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির নায়েবে আমির আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, এ ধরনের ‘নতুন সংস্কৃতি’ নিজেদের ভেতরে একটা গুণগত পরিবর্তন।

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান আজ রোববার সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটের দিকে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় জামায়াতের আমিরের বাসায় যান। দুই নেতার ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক শেষে জামায়াতের নায়েবে আমির আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।

দুই নেতার সাক্ষাতের বিষয়ে জামায়াতের নায়েবে আমির বলেন, ‘এটাকে আমরা ওয়েলকাম করি (স্বাগত জানাই)। আমি মনে করি, এ ধরনের নিউ কালচার (নতুন সংস্কৃতি) নিজেদের ভেতরে থাকাটা একটা গুণগত পরিবর্তন।’

আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে আলোচনা হয়েছে। এ সময় স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে একসঙ্গে থাকার প্রসঙ্গ তুলে ভবিষ্যতেও রাষ্ট্র পরিচালনায় সম্মিলিতভাবে কাজের আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রসঙ্গ তুলে জামায়াতের নায়েবে আমির বলেন, নিজেদের ভেতর আলোচনা-সমালোচনার মাধ্যমে যেকোনো বিষয়ে ইতিবাচক সমাধানের বিষয়ে বিএনপি ও জামায়াত মৌলিকভাবে একমত হয়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় জয় পেয়ে সরকার গঠন করতে যাওয়া বিএনপিকে অগ্রাধিকার নির্ধারণেও পরামর্শ দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। এ প্রসঙ্গে আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, ‘প্রথম কথা হচ্ছে ল অ্যান্ড অর্ডার সিচুয়েশন (আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি), মানুষের সিকিউরিটি (নিরাপত্তা)...এ বিষয়ে যেন সরকার অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে।’

এ ছাড়া মানুষের জীবনের মৌলিক পরিবর্তনে বিএনপির গঠিত সরকার যেন কাজ করে, সে বিষয়েও জামায়াতের পক্ষ থেকে তারেক রহমানের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে বলে জানান জামায়াতের এই নায়েবে আমির।

জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের বাসায় গেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের বাসায় গেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। রোববার সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটে বিএনপির চেয়ারম্যান রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় জামায়াতের আমিরের বাসায় প্রবেশ করেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে বিএনপি। এ নির্বাচনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসনে জয় পায় বিএনপির একসময়ের জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামী। মূলত সৌজন্য সাক্ষাৎ করতেই জামায়াতের আমিরের বাসায় গেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান। সেখানে কুশলাদি বিনিময় ছাড়াও সমসাময়িক বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে বলে দলগুলোর নেতারা জানিয়েছেন। সাক্ষাৎ শেষে রাত ৭টা ৫৮ মিনিটের দিকে তারেক রহমানকে বহনকারী গাড়িটিকে জামায়াতের আমিরের বাসভবন ছেড়ে যেতে দেখা যায়।

বিএনপির চেয়ারম্যান নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা রোধে আশ্বস্ত করেছেন: জামায়াত আমির

নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা রোধে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান আশ্বস্ত করেছেন বলে জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। আজ রোববার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ কথা বলেন।

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান আজ রোববার সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটের দিকে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় জামায়াতের আমিরের বাসায় যান। এর ঠিক আধা ঘণ্টা পর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এ পোস্ট দেন শফিকুর রহমান।

সেখানে জামায়াতের আমির লেখেন, ‘আমাদের আলোচনায় তিনি (তারেক রহমান) আশ্বস্ত করেছেন যে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা এবং বিরোধী দলের কর্মী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর যেকোনো হামলা রোধে তিনি কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন। আমি এ আশ্বাসকে সাধুবাদ জানাই। আমাদের প্রত্যাশা, কোনো নাগরিকই যেন ভয়ভীতি বা নিরাপত্তাহীনতার শিকার না হয়।’

জাতীয় স্বার্থের বিষয়ে নির্বাচিত সরকারকে জামায়াত পূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করবে উল্লেখ করে পোস্টে শফিকুর রহমান লেখেন, ‘তবে একটি আদর্শিক বিরোধী দল হিসেবে আমাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে আমরা আপসহীন থাকব। সরকারের জনকল্যাণমূলক কাজে আমাদের সমর্থন থাকবে, কিন্তু যেখানেই জবাবদিহির প্রয়োজন হবে, সেখানে আমরা সোচ্চার থাকব।’

জামায়াতের আমির লেখেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য সংঘাত নয়; বরং সংশোধন, বাধা দেওয়া নয়; বরং পর্যবেক্ষণ। দেশের মানুষ এমন একটি সংসদ প্রত্যাশা করে, যা ন্যায়বিচার ও নাগরিক অধিকার রক্ষা করবে এবং স্থিতিশীলতার সঙ্গে রাষ্ট্রকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।’

শফিকুর রহমান আরও লেখেন, ‘বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অগ্রিম অভিনন্দন জানাচ্ছি। তিনি আজ আমার আবাসিক কার্যালয়ে এসেছিলেন। তাঁর এই আগমন আমাদের জাতীয় রাজনীতির জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। আমি তাঁর এই আগমনকে স্বাগত জানাই এবং প্রত্যাশা রাখি, সংলাপ ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে এটি রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার এক নতুন অধ্যায় সূচনা করবে।’

ফেসবুক পোস্টে জামায়াতের আমির বলেন, ‘আমি এমন এক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখি, যা হবে ফ্যাসিবাদমুক্ত, সার্বভৌম এবং ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের ওপর প্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ১১-দলীয় জোটের সঙ্গে মিলে একটি সমৃদ্ধ, স্থিতিশীল ও আধুনিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং সাংবিধানিক শাসনের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হবে।’

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। ঢাকা, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। ঢাকা, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ছবি: জামায়াতের ফেসবুক পেজ থেকে

জাতীয় পার্টি নিয়ে মানুষের আর ‘ওই আবেগ নাই’ by জহির রায়হান

রংপুর বিভাগের ৩৩ আসনঃ রংপুর নগরের কেরামতিয়া জামে মসজিদ। গত শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর সামনের চা-দোকানে গল্পে মেতেছিলেন মুন্সিপাড়ার সবুজ আলী, মকবুল হোসেন, আহম্মদ মিয়ারা। আলোচনার মূল বিষয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল।

ভোটের ফলাফলে বিস্মিত সবুজ আলী বলেন, ‘ভোটের আগে মনে হচ্ছিল এবার রংপুরে জাতীয় পার্টি হারবে। কিন্তু এ রকম শোচনীয়ভাবে হারবে, এটা চিন্তা ছিল না।’

কথার ফাঁকে সত্তরোর্ধ্ব সবুজ আলী নিজেকে জাতীয় পার্টির একজন কর্মী পরিচয় দেন। বলেন, ‘এরশাদ যখন জেলে, সেই ’৯১ সালে, তখন থেকে লাঙ্গলকে ভোট দেই। এবারও দিছি। কিন্তু জাতীয় পার্টিক নিয়া রংপুরের মানুষের আর ওই আবেগ নাই। মানুষ এবার মুখ ফিরি দিছে।’

সবুজ আলীর এই বক্তব্যের প্রতিফলন দেখা যায় গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে। জাতীয় পার্টির ‘ঘাঁটি’ হিসেবে পরিচিত রংপুর বিভাগে কোনো আসন পায়নি জাতীয় পার্টি। এমনকি রংপুর-৩ (সিটি করপোরেশন ও সদর) আসনেও দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের হেরেছেন।

বিভাগের ৮ জেলায় সংসদীয় আসন ৩৩টি। এর মধ্যে ১৮টি আসনে নির্বাচিত হয়েছেন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থীরা। জামায়াতের প্রার্থীরা ১৬টিতে এবং ২টিতে জয় পেয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থীরা। বিএনপি পেয়েছে ১৪টি আসন। একটি আসনে জয় পেয়েছেন স্বতন্ত্র (বিএনপির বিদ্রোহী) প্রার্থী।

জাপার প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রংপুরের মানুষ। শহরে তাঁর পুরোনো বাড়ি রয়েছে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে তিনি জেল থেকে প্রার্থী হয়ে পাঁচটি আসনে দাঁড়িয়ে সব কটিতেই জিতেছিলেন। সেই নির্বাচনে রংপুর বিভাগে ১৭টি আসন জিতে জাপা। ১৯৯১ সালের পর আরও তিনটি নির্বাচনে রংপুর বিভাগে ভালো ফল করে জাপা। ১৯৯৬ সালে ২১টি, ২০০১ সালে ১৪টি এবং ২০০৮ সালে ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৩টি আসন পেয়েছিল জাপা।

রংপুর-৪ আসনের জয় পাওয়া এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, রংপুরের ৬টি আসনে শাপলা কলি ও দাঁড়িপাল্লার বিজয়ের মধ্য দিয়ে যেমন আওয়ামী লীগ নাই হয়ে গেছে, তেমনি জাতীয় পার্টিকেও রংপুরের মানুষ প্রত্যাখান করেছেন।

জামায়াতের এমন বিজয়ে বিস্ময়

এবার বিভাগে সর্বোচ্চ আসন পাওয়া জামায়াতের আগে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে মাত্র একটিতে করে জয়লাভ করেছিল। ২০০১ সালে বিভাগে জামায়াতের আসন বেড়ে চারটি হলেও ২০০৮ সালে এসে একটি আসনও পায়নি জামায়াত। ১৮ বছর পর এই অঞ্চলে জামায়াতের এমন বিজয়ে বিস্ময় সৃষ্টি করেছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রংপুর জেলা কমিটির সভাপতি ফখরুল আনাম প্রথম আলোকে বলেন, জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক নেতৃত্বের বিকাশ নেই। তারা কী করতে চায়, তার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার নেই। তারা রংপুর অঞ্চলের মানুষের ইমোশন (আবেগ) নিয়ে রাজনীতি করেছে। কিন্তু মানুষ এবার ‘হামার ছওয়াল ইমোশনে’ সাড়া দেয়নি। জাতীয় পার্টিকে প্রত্যাখান করা ‘সংক্ষুব্ধ’ ভোটারদের জামায়াত কাজে লাগাতে পেরেছে বলেই মনে করেন তিনি।

স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, গাইবান্ধার পলাশবাড়ি, সুন্দরগঞ্জ, রংপুরের মিঠাপুকুরসহ বিভিন্ন পার্শ্ববর্তী জেলা ও উপজেলায় ভেতরে ভেতরে সংগঠিত হয়ে আসছিল জামায়াত। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর এসব আসনে ঘিরে জোরালো তৎপরতা শুরু করে দলটি। ভোঠের মাঠে তাদের এমন সাংগঠনিক দক্ষতা ও কৌশল এবার ফলাফল নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছে।

এ বিষয়ে রংপুর মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমির এ টি এম আজম খান প্রথম আলোকে বলেন, এর আগে এই এলাকায় জামায়াত-বিএনপির প্রভাব ছিল না। যার কারণে মানুষ নতুনটাকে বেছে নিয়েছে।

আগামী দিনে ভালো করতে চায় বিএনপি

অতীতের তুলনায় এবার রংপুরে বিএনপির আসনও বেড়েছে। ১৯৯১ সালে বিভাগের ৩৩টি আসনের মধ্যে মাত্র ১টি ও ১৯৯৬ সালে ৩টি আসন পায় বিএনপি। ২০০১ সালে বিএনপি ৯টি আসন পেলেও ২০০৮ সালের নির্বাচনে দলটিকে খালি হাতে ফিরতে হয়েছিল।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফলাফলে দেখা গেছে, বিএনপি দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও লালমনিহাটের ১৪টি আসন পায়। দিনাজপুর-৫ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীসহ ধরলে এই ৪ জেলার ১৫টি আসনেই তাদের দখলে। কিন্তু বিভাগীয় শহর রংপুরসহ কুড়িগ্রাম, নীলফামারীতে কোনো আসন পায়নি বিএনপি। গাইবান্ধার ৫টি আসনের মধ্যে শুধু গাইবান্ধা-৪ (গোবিন্দগঞ্জ) আসনে বিএনপির প্রার্থী শামীম কায়সার জয়লাভ করেন।

বিএনপি রংপুর, কুড়িগ্রাম ও নীলফামারী জেলার কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে রংপুর বিভাগে বিএনপির আরও ভালো করার সুযোগ ছিল। কিন্তু নেতাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, তৃণমূল কর্মীদের অবম্যূল্যায়ন না করার কারণে সেই সুযোগ ঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়নি।
রংপুরের একজন বিএনপি নেতা প্রথম আলোকে বলেন, রংপুর বিভাগীয় শহর হলেও বিএনপি কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে রংপুরকে নেতৃত্ব দেওয়ার লোক নগন্য। আবার যাঁরা আছেন, তাঁরাও রংপুর থেকে ভোট করেননি। স্থানীয় নেতাদের ওপর ভোটারদের আস্থার সংকট ছিল। যে সংকট ঠাকুরগাঁও বা লালমনিরহাটে ছিল না।

তবে বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক (রংপুর বিভাগ) আবদুল খালেক প্রথম আলো বলেন, ‘প্রতিটি জায়গায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে। অনেক জায়গায় বিএনপি-জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা ভোট কাটাকাটি করেছেন, মাঝখান দিয়ে জামায়াত প্রার্থী জয়লাভ করেছেন। তবে বিএনপির যাঁরা হেরেছেন, খুব অল্প ভোটে হেরেছেন। এটা কোনো সমস্যা নয়। সাংগঠনিকভাবে কাজ করলে আগামী দিনে এগুলো ভালো হবে।’

ভুলত্রুটি খুঁজছে জাতীয় পার্টি

রংপুর বিভাগে নীলফামারী সদর আসন বাদ দিয়ে ৩২ আসনে প্রার্থী দিয়েছিল জাতীয় পার্টি। কোনোটিতে জাতীয় পার্টি জিতেনি। দলের সাধারণ সম্পাদক গাইবান্ধার দুটি আসনে ভোট করলেও একটিতে তৃতীয় হয়েছেন, আরেকটিতে জামানত হারান।
রংপুরে জাপা নেতা-কর্মীদের ধারণা ছিল, দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের অন্তত তাঁর আসনে জিতবেন। কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর মাহবুবুর রহমান দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের কাছে তিনি পরাজিত হয়েছেন। দীর্ঘদিন এ আসন ধরে রাখার জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের ৪৩ হাজার ৩৮৫ ভোট পেয়ে তৃতীয় অবস্থানে। এর পর থেকে রংপুরের মানুষের আলোচনায় জি এম কাদের।

জাপা নেতারা অবশ্য দলের চেয়ারম্যানের হারকে মেনে নিতে পারছেন না। তাঁরা এটিকে ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ হিসেবে দেখছেন। জেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক আজমল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা গণসংযোগ করেছি। প্রতিটা বাড়ি বাড়ি গিয়েছি। সবাই স্বতঃস্ফূর্ত জাতীয় পার্টির পক্ষে সাড়া দিছে। এখানে জাতীয় পার্টির এই ধরনের রেজাল্ট হওয়ার কথা না। এটা “সূক্ষ্ম কারচুপি” ছাড়া আর কিছু হয়নি।’

জাপা চেয়ারম্যানের গতকাল ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন ও সাংবাদিকদের বিফ্রিং করার কথা থাকলেও করেননি। সারা দিন তাঁর রংপুরের বাসভবন দ্য স্কাই ভিউতে ছিলেন।
জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিলন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, আজ সকাল থেকে জাতীয় পার্টি রংপুর, গাইবান্ধা, নীলফামারীসহ বিভিন্ন এলাকার নেতা–কর্মীরা তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। বেলা দুইটার পর তিনি ঢাকার উদ্দেশে চলে যান। জি এম কাদের ভোট নিয়ে কোনো মন্তব্য করেছেন কি না, তা জানতে চাইলে মিলন চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের বলেছেন, সবাই মিলে সংগঠন ঠিক করো। ভুলক্রটি কোথায়, কী কারণে এমন হলো। 

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-02-13%2Fsit6cfbn%2FRANGPURDH049420260212IMG6061.JPG.JPG?rect=88%2C0%2C3207%2C2138&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ভোট দিচ্ছেন একজন ভোটার। গত বৃহস্পতিবার সকালে রংপুর নগরের কেল্লাবন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে। ছবি: মঈনুল ইসলাম

Sunday, February 15, 2026

হামলার প্রতিবাদে আগামীকাল বিক্ষোভ করবে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য

নির্বাচনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে কর্মী ও সমর্থকদের ওপর হামলা এবং দেশজুড়ে সহিংসতার ঘটনা ঘটছে বলে জানিয়েছে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য। প্রতিবাদে আগামীকাল সোমবার বিকেল সাড়ে ৪টায় বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে ১১ দলীয় ঐক্য।

আজ রোববার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সাক্ষাতের পর এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এই কর্মসূচির কথা জানান ১১-দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ।

হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘নির্বাচন–পরবর্তী এই সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমরা এটার প্রতিবাদ করতে চাই।’ সহিংসতা না থামলে তাঁরা রাজপথে আরও কর্মসূচি দেবেন বলেও হুঁশিয়ারি দেন।

দেশজুড়ে ৩২টি আসনে ফলাফল গণনায় কারচুপি হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি বলেন, ‘আমাদের জোটের ৩২ প্রার্থীদের হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রার্থীরা এমন বক্তব্য দিয়েছেন। কিছু কেন্দ্রে অস্বাভাবিক ভোট কাস্টিং দেখানো হয়েছে। কোথাও কোথাও ভোট গণনায় সুষ্ঠু পরিবেশ ছিল না। অনেক জায়গায় ফলাফল শিটে কাটছাঁট, পেনসিলে লেখা, কোথাও ভুয়া পোলিং এজেন্টের স্বাক্ষর এবং কোথাও এজেন্টের স্বাক্ষর ছাড়াই ফল প্রকাশ করা হয়েছে।’

৩২ আসনে ফলাফল কারচুপির অভিযোগ তুলেছে ১১ দলীয় ঐক্য। এগুলোর ফলাফল পুনরায় গণনা নিয়ে আইনের দারস্থ হবেন বলেও জানান হামিদুর রহমান আযাদ।

ভোট গ্রহণের সময় তুলনামূলক সুষ্ঠু পরিবেশ থাকলেও অনেক জায়গায় ভয়ের পরিবেশ ছিল বলে অভিযোগ করেন হামিদুর রহমান আযাদ। ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, এখানে জাল ভোট হয়েছে প্রচুর, কালো টাকার ছড়াছড়ি হয়েছে। কোথাও কোথাও হুমকি, সন্ত্রাস, মারামারি অথবা হামলার ঘটনা ঘটেছে।

ব্রিফিংয়ে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
১১-দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বিক্ষোভ কর্মসূচির কথা জানান। আজ রোববার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে
১১-দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বিক্ষোভ কর্মসূচির কথা জানান। আজ রোববার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে। ছবি: প্রথম আলো

সংস্কারের ওপর যে গণভোট হয়েছে, এটার পুরোটাই মানতে হবে: জামায়াত আমির

জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘সংস্কারের ওপর যে গণভোট হয়েছে, এটার পুরোটাই মানতে হবে। এর কোনো খণ্ডিত অংশ আমরা বাস্তবায়ন দেখতে চাই না।’

আজ রোববার দুপুরে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের বালিখলা ফেরিঘাটে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি এ কথা বলেন।

সড়ক দুর্ঘটনা ও অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়া দলের দুই কর্মীর স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে কিশোরগঞ্জে এসেছিলেন জামায়াতের আমির।

শফিকুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘দেশটা তো সংসদ থেকেই পরিচালিত হবে ইনশা আল্লাহ। সংসদে একটা দল সরকারি দল হিসেবে, আরেকটা দল বিরোধী দল হিসেবে থাকবে। সমাজে এক চাকায় কোনো গাড়ি চলে না, মিনিমাম দুই চাকা লাগে। সরকারি দল যদি ইতিবাচক কার্যক্রম পরিচালনা করে, আমাদের সহযোগিতা থাকবে। জনস্বার্থ বিঘ্নিত হলে আমরা তো জনগণের পক্ষে অবস্থান নেব। আমাদের অবস্থান হবে ক্লিয়ার।’

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে জামায়াতের আমির বলেন, ‘তারেক সাহেব কী নিয়ে আলাপ করবেন, এটা উনার মনের ব্যাপার। আমি তো উনার মনের ব্যাপার বলতে পারব না। উনি যদি আমার সঙ্গে আলাপ করেন, দেশ এবং জাতীয় স্বার্থ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ইনশা আল্লাহ আমরা আলাপ করব।’

শফিকুর রহমান বলেন, ‘সংসদ চলতে হলে তো সরকারি দল ও বিরোধী দল লাগবে। সরকারি দল, বিরোধী দল হাতে হাত রেখে চলবে, যদি দেশ সঠিক পথে চলে। যদি বেঠিক পথে চলে, তাহলে ওই চাকা চালাব না।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জাতীয় পার্টি তো এখন ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। এরা তো এখন ভূগোলে নাই। কেন নাই? তারা (জাতীয় পার্টি) তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছিল। এখন তারা শুধু ভোটের জগৎ থেকে যায়নি, জনগণের মন থেকেও উঠে গেছে। এটা ওই কারণে—তারা জনগণের স্বার্থ রক্ষা করেনি। জামায়াতে ইসলামী ওই ভুল করবে না।’

এর আগে রোববার সকালে কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার শিমুলবাক দক্ষিণহাটি এলাকায় জামায়াত সমর্থক শাহ আলমের স্মরণসভায় তিনি বলেন, ‘সাধারণ মানুষকে সম্মান করা আমার ইমানি দায়িত্ব। কৃষক-শ্রমিকেরা কঠোর পরিশ্রম করে হালাল রুজি উপার্জন করেন। তাঁদের ঘামের গন্ধ আমার কাছে আতরের মতো মনে হয়। অনেক সময় দেখি কেউ কেউ গরিব মানুষের সঙ্গে হাত মেলানোর পর আড়ালে গিয়ে হাত মুছে ফেলেন। কিন্তু আমি তাঁদের সেই ঘামকে সম্মানের চোখে দেখি, ভালোবাসার সঙ্গে গ্রহণ করি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি দুই শ্রেণির মানুষের সান্নিধ্যে বিশেষ আনন্দ পাই। একদল হলো নিষ্পাপ শিশু, যাদের কাছে গেলে ফেরেশতার সান্নিধ্যে থাকার অনুভূতি হয়। আরেক দল হলো দিনমজুর ও শ্রমজীবী মানুষ, যারা রক্ত-ঘাম ঝরিয়ে পরিবারের মুখে হালাল খাবার তুলে দেন।’

জামায়াতের আমির বলেন, ‘আমি কোনো ধনী পরিবারে জন্ম নেইনি। আল্লাহর রহমতে আমি একজন কৃষক পরিবারের সন্তান। তাই কৃষক-শ্রমিকদের সম্মান না করলে তা আমার বাবাকে অপমান করার শামিল হবে।’ স্মরণসভায় তিনি শাহ আলমের পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দেন।

প্রসঙ্গত, ৮ ফেব্রুয়ারি ইটনা মিনি স্টেডিয়ামে আয়োজিত নির্বাচনী সমাবেশে যাওয়ার পথে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে জামায়াতের সমর্থক শাহ আলম (৫০) মারা যান।
ইটনার স্মরণসভা শেষে জামায়াতের আমির সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত জামায়াত কর্মী আব্দুস ছালামের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে নিকলী উপজেলার ছাতিরচরে যান। এর আগে সকাল ৮টার দিকে তিনি সড়কপথে কিশোরগঞ্জ শহরে পৌঁছান।

৩ ফেব্রুয়ারি কটিয়াদী সরকারি কলেজ মাঠে আয়োজিত নির্বাচনী জনসভা শেষে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় জামায়াত কর্মী আব্দুস ছালাম (৬০) নিহত হন।
জামায়াতের আমিরের কিশোরগঞ্জ সফরের সময় তাঁর সঙ্গে দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সেক্রেটারি সামিউল হক ফারুকী, জেলা জামায়াতের আমির মো. রমজান আলী, জেলা জামায়াতের সাবেক নায়েবে আমির মোসাদ্দেক ভূঞা, কাপাসিয়ার নবনির্বাচিত এমপি সালাউদ্দিন আইয়ুবী, ঢাকা উত্তর মহানগর জামায়াতের মজলিশে শুরা সদস্য রোকন রেজা শেখ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

স্মরণসভায় জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। রোববার কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার শিমুলবাক দক্ষিণহাটি এলাকায়
স্মরণসভায় জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। রোববার কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার শিমুলবাক দক্ষিণহাটি এলাকায়। ছবি: সংগৃহীত

গণভোটে দেওয়া জনরায় উপেক্ষা করলে দায়ভার বিএনপিকে নিতে হবে: ১১–দলীয় ঐক্য

সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনে জুলাই সনদ অনুসরণ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য। একই সঙ্গে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটে দেওয়া জনরায় উপেক্ষা করলে দায়ভার বিএনপিকে নিতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন এ জোটের নেতারা।

শনিবার রাত সাড়ে আটটায় রাজধানীর মগবাজার জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে এই হুঁশিয়ারি দেন ১১–দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ।

উল্লেখ্য, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিপুল ব্যবধানে জয় পেয়েছে। ফলে সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। জুলাই সনদে আইনসভা বা সংসদকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট করা এবং উচ্চকক্ষে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে গঠন করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

তবে উচ্চকক্ষ গঠনে পিআর পদ্ধতির অনুসরণ করা হবে কি না, ব্রিফিংয়ে সেটি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন ১১–দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি বলেন, ঐকমত্য কমিশনে সংসদের উচ্চকক্ষ পিআর পদ্ধতি নিয়ে বিএনপি ‘নোট অব ডিসেন্ট (দ্বিমত)’ দিয়েছিল। আবার গণভোটে যাতে ‘না’ জয়যুক্ত হয়, সে জন্য দলটি বিভিন্নভাবে ক্যাম্পেইন করেছে। কিন্তু যেহেতু ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হয়েছে, এখন দলটি উচ্চকক্ষ গঠনে জুলাই জাতীয় সনদ অনুসরণ না–ও করতে পারে।

তবে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ার পরে সব ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বাতিল হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি বলেন, নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারেই সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন করতে হবে।

হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে ১১–দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হওয়ার পরে জনগণকে উপেক্ষা করে কিছু করলে সেই দায়ভার বিএনপিকে নিতে হবে। জনগণ সেই সিদ্ধান্ত মানবে না।

প্রেস ব্রিফিংয়ের আগে ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটি বৈঠক করে। বৈঠকের বিষয়ে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, তাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, দেশের সামগ্রিক স্বার্থে যখন যে ভূমিকা রাখা উচিত, ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য সংসদে ও সংসদের বাইরে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সেই ভূমিকা পালন করবে।

নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণায় জালিয়াতির অভিযোগের বিষয়ে ১১–দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক বলেন, তাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যেহেতু নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশ করেছে, পরে অভিযোগ থাকা আসনের বিষয়ে তাঁরা আইনের আশ্রয় নেবেন।

এ সময় নির্বাচনের আগে ও পরে বিভিন্ন স্থানে অনেক নারীকে আহত করা হয়েছে উল্লেখ করে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, আহত হয়ে অনেকে হাসপাতালে ভর্তি আছেন। এভাবে চলতে থাকলে দেশে নৈরাজ্য আবার তৈরি হয় কি না, সেই প্রশ্ন এখন জনমনে তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘পুরোনো রাজনীতির অপসংস্কৃতি থেকে আমরা বেরোতে না পারলে নতুন বাংলাদেশের আশা স্তিমিত হয়ে যাবে।’

ব্রিফিংয়ে বক্তব্য দেন ১১–দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ। মগবাজার, ঢাকা; ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ব্রিফিংয়ে বক্তব্য দেন ১১–দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ। মগবাজার, ঢাকা; ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ছবি: প্রথম আলো

৩০টি আসনে ভোট গণনায় জালিয়াতির অভিযোগ জামায়াতের

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০টি আসনে ভোট গণনায় জালিয়াতির অভিযোগ তুলেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। আজ শনিবার বিকেলে রাজধানীর মগবাজারে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে দলটির মিডিয়া ও প্রচার বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জোবায়ের এ অভিযোগ করেন।

দলটির অভিযোগ, জালিয়াতির অংশ হিসেবে বিভিন্ন আসনে ভোট গণনায় অতিরিক্ত দেরি, পোলিং এজেন্টের স্বাক্ষর ছাড়া ফলাফল প্রকাশ, ভুয়া পোলিং এজেন্টের স্বাক্ষর, এমনকি পেনসিল দিয়ে ফলাফল লেখাসহ বিভিন্ন অনিয়ম করা হয়েছে।

এহসানুল মাহবুব বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমরা প্রায় ৩০টি আসনে এ ধরনের চরম অব্যবস্থাপনা দেখেছি; যেখানে ভোট জালিয়াতি হয়েছে, কারচুপি হয়েছে।’

জামায়াতে ইসলামীর এই নেতা বলেন, এই ৩০ আসনে ভোট আবার গণনার জন্য তাঁরা নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেছেন। কিন্তু কমিশন অভিযোগ আমলে না নিয়ে ফল প্রকাশ করেছে।

দেশের আরও বেশ কিছু আসনে কারচুপি হওয়ার অভিযোগ তুলে এহসানুল মাহবুব বলেন, তাঁরা যাচাই-বাছাই করে সেই আসনগুলো নিয়েও পরবর্তী সময়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলবেন।

জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়, যেসব আসনে দলটি অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে, সেগুলোতে ভোটের ব্যবধান ১ হাজার থেকে ১০ হাজার। এসব আসনের মধ্যে রয়েছে পঞ্চগড়-১, ঠাকুরগাঁও-২, দিনাজপুর-৩ ও ৫, লালমনিরহাট-১ ও ২, গাইবান্ধা-৪, বগুড়া-৩, সিরাজগঞ্জ-১, যশোর-৩, খুলনা-৩ ও ৫, বরগুনা-১ ও ২, ঝালকাঠি-১, পিরোজপুর-২, ময়মনসিংহ-১, ৪ ও ১০, কিশোরগঞ্জ-৩, ঢাকা-৭, ৮, ১০, ১ ও ১৭, গোপালগঞ্জ-২, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫, চাঁদপুর-৪, চট্টগ্রাম-১৪ ও কক্সবাজার-৪।

বিভিন্ন জায়গায় হামলার অভিযোগ

নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকে জামায়াত ও ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মীদের ওপর বিএনপির নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা হামলা করছে বলেও অভিযোগ করেন এহসানুল মাহবুব। তিনি বলেন, ‘বিশেষত উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে বিভিন্ন এলাকায় আমরা মারাত্মক ধরনের আক্রমণের শিকার হচ্ছি। সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিসেবে আমাদের সমর্থক, প্রার্থীর এজেন্ট, ক্ষেত্রবিশেষে নারীদের ওপরও হামলা করা হচ্ছে। শতাধিক ঘটনা ইতিমধ্যে আমরা জেনেছি।’

ফ্যাসিবাদের পতনের পর এমন হামলা কাম্য নয় উল্লেখ করে জামায়াতের এই নেতা বলেন, ‘আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চেয়েছিলাম, যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ থাকবে।’

ব্রিফিংয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোয়াজ্জেম হোসেন হেলাল বলেন, অভিযোগ করা আসনগুলোতে জামায়াত ও ঐক্যে থাকা দলগুলো নিশ্চিত জয় পেত। তাই তাঁরা নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ করেছেন। প্রতিকার না পেলে তাঁরা আদালতের দ্বারস্থ হবেন।

এ সময় ঢাকা-৬ আসনে ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য সমর্থিত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী আবদুল মান্নান অভিযোগ করেন, তাঁর আসনে কয়েকটি কেন্দ্রের ফলাফল শিটে পোলিং এজেন্টের স্বাক্ষর ছিল না। বিভিন্ন জায়গায় ভুয়া পোলিং এজেন্টের স্বাক্ষর দিয়ে ফলাফল তৈরি করা হয়। কোথাও পেনসিল দিয়ে ফলাফল লেখা হয়।

এসব ঘটনায় নির্বাচন কমিশনকে তাৎক্ষণিক অভিযোগ করা হলেও কমিশন কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে ফলাফল ঘোষণা করে বলেও অভিযোগ করেন ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের এই প্রার্থী।

প্রেস ব্রিফিংয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর মিডিয়া ও প্রচার বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জোবায়ের। মগবাজার, ঢাকা, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রেস ব্রিফিংয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর মিডিয়া ও প্রচার বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জোবায়ের। মগবাজার, ঢাকা, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ছবি: প্রথম আলো