Friday, September 20, 2024

সাক্ষাৎকার: প্রথম অগ্রাধিকার হবে ইসি গঠন আইনের সংশোধন by কাজল ঘোষ

ইংরেজিতে একটি কথা আছে, ‘মাদার অফ অল ইভিলস’। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সকল অনিষ্টের গোড়ায় ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন। প্রশ্ন হলো- এই সংকটের কি ইতি নেই? বাংলাদেশে রাজনৈতিক ইতিহাসে ডজনখানেক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে তিন থেকে চারটি নির্বাচন ছিল বিতর্কমুক্ত, অংশগ্রহণমূলক। এর সবগুলোই হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়। যে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার চেয়ে মাঠ তাতিয়েছে,  আন্দোলন করেছে তারাই এই ব্যবস্থা বাতিল করেছে। বিচারপতি খায়রুল হক জালিয়াতির রায় দিয়ে বিতর্ক আরও পোক্ত করেছেন। ২০১৪, ২০১৮, ২০২৪ ভোটারবিহীন নির্বাচনে সরকার চলেছে। এক অস্বাভাবিক কায়দায় ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার বিদায় নিয়েছে ৫ই আগস্ট। ড. ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার ৬টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সংস্কারে কমিশন করে দিয়েছেন। এরমধ্যে অন্যতম নির্বাচন কমিশন সংস্কার। মানবজমিন মুখোমুখি হয়েছে এই কমিশনের প্রধান সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার-এর। সাক্ষাৎকারে কমিশনের অগ্রাধিকার, সংকটের নেপথ্যে কী ছিল আর তা থেকে উত্তরণে কী ধরনের সুপারিশ থাকবে তা তুলে ধরেছেন। বিস্তারিত পাঠকের জন্য- 

প্রশ্ন: নির্বাচন কমিশন সংস্কারে গঠিত কমিশনের প্রধান হিসেবে আপনার নাম ঘোষণায় প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া কি ছিল?
আমি অত্যন্ত আনন্দিত ও সম্মানিত বোধ করেছি। প্রধান উপদেষ্টা মহোদয় আমিসহ পাঁচজনের নাম সংস্কারে গঠিত কমিশনগুলোর প্রধান হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এটা শুধু সম্মানের নয়, বহুদিন ধরে বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে সোচ্চার কণ্ঠ ছিলাম। আমি ছাড়াও আমাদের অনেক সহযোগী, স্বেচ্ছাব্রতীরাও এ কাজের সহযোদ্ধা ছিলেন। তাদের সকলের কাজেরই এটা স্বীকৃতি। সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে আমাদের গণতন্ত্রকে কার্যকর করার এটা একটি বড় সুযোগ। সাম্প্রতিককালে আমাদের দেশে যে ধরনের রাজনৈতিক সংকটের সৃষ্টি হয়েছে তা সুষ্ঠু নির্বাচন না হওয়ার কারণে, একতরফা নির্বাচন হওয়ার ফলে। আমরা যদি একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন করতে পারি তাহলে যে ধরনের মর্মান্তিকতা ঘটেছে, ব্যাপক জনবিস্ফোরণ ঘটেছে, হাজারও মানুষের প্রাণহানি, হতাহতের ঘটনা, এতো মানুষের আত্মত্যাগে যে সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে এটার প্রথম পদক্ষেপ হবে একটি সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন। এটা বিরাট সুযোগ এবং একইসঙ্গে গুরুদায়িত্ব।

প্রশ্ন: টেবিলের ওপাশ আর এপাশ। দীর্ঘদিন আপনি ছিলেন বিরোধী আসনে এবার আপনিও চালক। জনগণ অপেক্ষায় আপনার কী ধরনের সংস্কার পদক্ষেপ নেবেন তা দেখার?
আমি এবং আমার একদল সহকর্মী আশাবাদী এই যে, আকাশচুম্বী সুযোগ আমরা পেয়েছি তা যেন কাজে লাগাতে পারি। আমরা যেন একটি সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথ সুগম করতে পারি। আমরা কিছু আইন-কানুন, বিধি-বিধান এবং প্রক্রিয়া অবলম্বনে সেই পথটা সুগম করতে পারি।

প্রশ্ন: নির্বাচনী ব্যবস্থায় কী ধরনের সংস্কার আপনারা আনতে চান?
সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে আমাদের অনেকগুলো বাধা। বড় বাধা হচ্ছে- নির্বাচনে যারা অংশীজন তারা সঠিক ভূমিকা পালন করে না। নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিকভাবে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। সংবিধানের ১৮ অনুচ্ছেদে স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের কথা বলা হয়েছে এবং তাদের সুরক্ষাও নিশ্চিত করা হয়েছে যেন তাদেরকে পদচ্যুতি না করতে পারে। নির্বাচন কমিশন নিয়ে অনেক বিতর্ক, অনেক অভিযোগ। তারা সবচেয়ে বড় অংশীজন হয়েও সঠিক দায়িত্ব পালন করছে না। তারপর সরকারের অঙ্গ হিসেবে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। যারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করে না। এরপরই আসে রাজনৈতিক দলের কথা। তারা যদি সঠিকভাবে সহযোগিতা করে, ছলেবলে কৌশলে নির্বাচনী বৈতরণী পার না হতে চায় এবং গণমাধ্যম যদি নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে, সত্য তুলে ধরে, নাগরিক সমাজও নজরদারির যে ভূমিকা পালন করা দরকার তা গুরুত্ব দিয়ে পালন করে তাহলে সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব। এই সকল অংশীজনের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন কমিশন। দুঃখজনক হলেও সত্য বিগত তিনটি নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়েই ব্যাপক বিতর্ক ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ রয়েছে। ২০২২ সালে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে একটি আইন প্রণয়ন হয়েছে যা অগ্রহণযোগ্য। এই আইনের ফলেই সরকারের যারা অনুগত, খয়ের খাঁ তারা কমিশনে নিয়োগ পেয়ে থাকেন। এই আইনের মধ্যেই একটি বিধান আছে সার্চ কমিটি গঠনের মাধ্যমে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনের। কিন্তু বর্তমান বিধানের আওতায় কয়েকটি সাংবিধানিক বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিরা এই অনুসন্ধান কমিটির সদস্য হন। এসব ব্যক্তির নিয়োগই দেয়া হয় তারা যেন সরকারের প্রতি অনুগত থাকে। এই বিধানে আছে অন্তত দু’জন ব্যক্তিকে সরকারের পক্ষ থেকে নিয়োগ দেয়া। আর সরকারের পক্ষ থেকে তাদের অনুগতদেরই নিয়োগ দেয়া হয়ে থাকে। তারা যাকে চায় তাকেই নিয়োগ দিতে পারে এই সার্চ কমিটিতে। গত তিনটি কমিশন এভাবেই গঠিত হয়েছে। এটা হয়ে থাকে কখনও প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কখনও আইনের মাধ্যমে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আমরা তো আর আম গাছ থেকে জাম পাবো না। আবারও যদি পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচন কমিশন হয়, মেরুদণ্ডহীন নির্বাচন কমিশন হয়, অযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে কমিশন গঠিত হয় তাহলে তো সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন পাবো না।

প্রশ্ন: কমিশন গঠন প্রক্রিয়ায় সংস্কার আনা আপনাদের প্রায়োরিটির মধ্যে আছে?

তাদেরই দায় সুষ্ঠু নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা। কাজেই প্রথম কাজ হবে নির্বাচন কমিশন গঠনের আইনি কাঠামোতে সংস্কার নিয়ে আসা। আমরা আইনটি সংস্কার করবো যাতে নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে গঠন করা যায়। কমিশন যেন কোনো দলের অভিপ্রায়ের ভিত্তিতে গঠিত না হয়। প্রাথমিক চিন্তায় আছে, প্রধানমন্ত্রীর একজন প্রতিনিধি, প্রধান বিরোধী দলের একজন প্রতিনিধি, তৃতীয় প্রধান দলের পক্ষ থেকে একজন প্রতিনিধি, নাগরিক সমাজের একজন প্রতিনিধি, গণমাধ্যমের একজন প্রতিনিধি থাকবে সার্চ কমিটিতে যাতে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করা যায়। অনুসন্ধান কমিটি যেন সকলের মতের ভিত্তিতে এবং স্বচ্ছতার ভিত্তিতে হয় তা আমাদের সংস্কারে অগ্রাধিকার পাবে। সার্চ কমিটি যাদের নাম প্রাথমিক বিবেচনায় নেবে তা জনসম্মুখে প্রকাশ করা এবং তাদের নিয়ে গণশুনানির আয়োজন করা। এতে যারা পরিচ্ছন্ন নয়, তারা এ প্রক্রিয়া থেকে দূরে থাকবে। এর মাধ্যমে যোগ্যদের নিয়োগ পাওয়ার সম্ভাবনার দ্বার উন্মেচিত হবে।

প্রশ্ন: নির্বাচন কমিশন সচিব সরকারের নিয়োগকৃত থাকে বলে একটি টানাপড়েন রয়েই যায়? তার সুরাহা কীভাবে হবে?
২০০৭ সালে হুদা কমিশন গঠনের আগে এবং পরেও নির্বাচন কমিশনে কিছু কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। কথা হচ্ছে- এরাই নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালন করে থাকেন, তাদের মধ্য থেকে যদি সচিব নিয়োগ দেয়া হয়, নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব জনবল থেকে যদি সচিব নিয়োগ দেয়া হয় তাহলে এ সমস্যা দূরীভূত হবে। সচিব পদমর্যদার বা উচ্চপদে আসীন ব্যক্তিরা যদি সরকারের পছন্দের লোক না হয় তাহলে নির্বাচনকালীন সংকটের নিরসন হবে। আগামী নির্বাচন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে হবে তাই এ নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না বলেই মনে করি। আমি নিশ্চিত করেই বলতে চাই, আগামী নির্বাচন প্রভাবিত করবে সে রকম অপচেষ্টা অন্তর্বর্তী সরকার করবে না। আগামী নির্বাচন যদি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে হয় তাহলে পরবর্তী সরকার যারা গঠন করবে তখন নিয়োগকৃত সিনিয়র কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে সচিব নেয়া সম্ভব হবে বলে মনে করি।   

প্রশ্ন: অন্তর্বর্তী সরকার বলে আপনি আশাবাদী কিন্তু এ সরকার তো সবসময় থাকবে না?
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখি আমাদের এ যাবৎকালে ১২টির মতো নির্বাচন হয়েছে। চারটি নির্বাচন হয়েছে তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। এরমধ্যে তিনটি নির্বাচন সকলের কাছে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। এই নির্বাচনগুলোতে পূর্ববর্তী সরকার জনগণের ভোটের মাধ্যমে বিদায় হয়েছে। রাজনৈতিক ঐকমত্য বা পলিটিক্যাল সেটেলমেন্টের ভিত্তিতেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। আওয়ামী লীগ এই দাবিতে আন্দোলন করেছিল বিএনপি প্রথমদিকে এটি না মানলেও পরে তারা সংবিধানে এটি অন্তর্ভুক্ত করে পদত্যাগ করে।  ২০১১ সালে একতরফা এবং বিতর্কিতভাবে আদালতের নির্দেশ লঙ্ঘন করে সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে এবং যার মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে নির্বাচনকালীন একটি নিরপেক্ষ সরকার থাকা দরকার তা তত্ত্বাবধায়ক বা অন্য যে কোনো নামেই হোক।   

প্রশ্ন: আপনাদের সংস্কার প্রস্তাবনায় জাতীয় নির্বাচনগুলো নিরপেক্ষ বডি দিয়ে করার সুপারিশ থাকবে কিনা?
আমরা হয়তো সুপারিশ করতে পারবো। এটা কার্যকর করার জন্য আমাদের সংবিধান সংশোধন করতে হবে। তবে আশার কথা আমাদের পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের জন্য একটি রিট দায়ের করা হয়েছে। আমিসহ চারজন এই রিট করেছি শুধু এটি নয়, ত্রয়োদশ সংশোধনী নিয়ে খায়রুল হকের যে রায় তা রিভিউয়ের জন্যও আমরা আবেদন করেছি। রায়গুলো আমাদের পক্ষে এলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আবার ফিরে আসবে। আমাদের সংবিধান সংস্কারে গঠিত কমিশন নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারে যে ধরনের পরিবর্তন আনা দরকার তারা তা করবে।

প্রশ্ন: প্রেক্ষাপট বদলেছে, আদালতেও ভিন্ন পরিস্থিতি। এ অবস্থায় রিটে রায় পাবেন বলে আশাবাদী?
আমরা অত্যন্ত আশাবাদী। আমাদের অকাট্য যুক্তি আছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে সংবিধান লঙ্ঘন করে অযৌক্তিকভাবে। এ নিয়ে ভয়ানক বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে রায় বাতিল করা হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ছিল একটি রাজনৈতিক বিষয়। রাজনীতিকরা পলিটিক্যাল সেটেলমেন্টের অংশ হিসেবে এই ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছেন। রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে আদালতের হস্তক্ষেপ করা সমীচীন নয়। একেবারেই অগ্রহণযোগ্য যুক্তিতে তারা রায়টি বাতিল করেছেন যা ছিল ভুল। সংবিধানে কতগুলো বিষয় অলঙ্ঘনীয়। গণতন্ত্র, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এমন মৌলিক বিষয়গুলো সংশোধন কালেও বাতিল করা যাবে না। যারা রায় বাতিল করেছেন তাদের যুক্তি ছিল তিনমাসের অনির্বাচিত সরকার সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। অথচ এর বিপরীতে এটি না থাকলেও আমাদের গণতন্ত্রে পাতানো নির্বাচনের খেলা চলে আসছে। খায়রুল হক তড়িঘড়ি করে অবসরে যাওয়ার আগে এই রায় দিয়েছিলেন যা নিয়ে প্রশ্ন আছে। আর দু’টি বেঞ্চেই এই রায়টি ছিল বিভক্ত। অ্যমিকাস কিউরিদের আটজনের মধ্যে সাতজনই তত্ত্বাবধায়ক সরকার রেখেই রায় দেয়ার কথা বলেছিলেন। এমনকি রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তাও তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাখার পক্ষে ছিলেন। যদিও আপিল বিভাগের মেজরিটির রায়ে এটি চূড়ান্ত হয়। খায়রুল হক ১০ই মে ২০১১ তারিখে সংক্ষিপ্ত আদেশে বলেছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ভবিষ্যতের জন্য অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হলো। রাষ্ট্র এবং জনগণের নিরাপত্তা বিবেচনায় ক্রান্তিকালীন ব্যবস্থা হিসেবে পরবর্তী দুই টার্ম তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। সংসদ চাইলে বিচারপতিদের বাদ দেয়ার জন্য ত্রয়োদশ সংশোধনীর রায়ে সংশোধন আনতে পারে। লক্ষ্যণীয় তিনি এটাকে সংশোধনের কথা বলেছেন এবং দুইবারের পর তা বাতিলের কথা বলেছেন। কিন্তু আমাদের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এই রায় নিয়ে বলেছেন, আমি তত্ত্ব্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করিনি, আদালত বাতিল করেছে। তত্ত্ববধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হলে সংসদের অনুমোদন লাগবে। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর, সত্যের অপলাপ। খায়রুল হকের রায়ও ছিল স্বার্থ প্রণোদিত। রায়ে উল্লিখিত দুইটি নির্বাচন যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতো তাহলে খায়রুল হক হতেন প্রধান উপদেষ্টা। তিন- চার লাইনের দেয়া শর্ট অর্ডার। শর্ট অর্ডারই চূড়ান্ত রায়। এটাই মূল সিদ্ধান্ত। আর বিস্তারিত রায় দেন ষোল মাস পরে। পরবর্তীতে বিস্তারিত রায়ে প্রধানমন্ত্রী যেভাবে বলেছেন তিনি তাই লিখে দিয়েছেন। এরমধ্যে ২০১৪ সালের নির্বাচন হয়ে যাওয়ায় খায়রুল হকের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার সুযোগ নষ্ট হয়ে যায়। সেজন্য প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকেই তিনি ফলো করেছেন আর এটা করতে গিয়ে তিনি আদালতের সঙ্গে জালিয়াতি করেছেন।  তিনি পুনরায় শুনানি না করে, সকলের মত না নিয়ে রায় পাল্টে দিয়েছিলেন। খায়রুল হক নির্বাচনী ব্যবস্থার কবর দিয়েছিলেন। এর ফলেই ২০১৪, ২০১৮, ২০২৪ সালে পরপর তিনবার জালিয়াতির আর একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার থাকলে ভোটারবিহীন জালিয়াতির নির্বাচন করা সম্ভব হতো না। পঞ্চদশ সংশোধনী পাসের উদ্দ্যেশ্যই ছিল ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করা।

প্রশ্ন: সুজনের দেয়া সংস্কার প্রস্তাবের একটি হচ্ছে, কমিশন গঠনে রাজনৈতিক ভারসাম্য নিশ্চিত করা।
কমিশন গঠন অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমেই হবে। অনুসন্ধান কমিটি এমনভাবে গঠিত হবে তা যেন সরকারের অনুগত না হয়। সরকার যাকে চাইবে তাকে যেন নিয়োগ না দেয়া হয়। পাতানো নির্বাচন কমিশন যাতে গঠিত না হয়। আগেই বলেছি, অনুসন্ধান কমিটিতে সরকার পক্ষের একজন, প্রধান বিরোধীদলের একজন, তৃতীয় প্রধান দলের একজন থাকবেন আর ইসি নিয়োগে তাদের একমত হতে হবে। এভাবেই আমরা রাজনৈতিক ভারসাম্য নিশ্চিতের কথা বলছি।

প্রশ্ন: সুষ্ঠুু নির্বাচন আয়োজনে প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ব্যক্তির সদ্বিচ্ছাও গুরুত্বপূর্ণ কিনা? নিকট অতীতে ভারতে দেখা গেছে টিএন সেশন কমিশন আলোচনায় এসেছে ব্যক্তির কারণে।
ব্যক্তিও গুরুত্বপূর্ণ একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো যদি সহযোগিতা না করে বিশেষ করে সরকারের প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খবাহিনী যদি অসদাচরণ করে, পক্ষপাতদুষ্ট থাকে এবং গণমাধ্যম যদি একতরফা প্রচার-প্রচারণা চালায়, নাগরিক সমাজ যদি নজরদারির ভূমিকা পালন করতে না পারে- তাহলে মেরুদণ্ডসম্পন্ন নির্বাচন কমিশনের পক্ষেও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব হবে না। যে নির্বাচন আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য ইতিবাচক নয়, সেই নির্বাচন আমাদের সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর জন্য সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বিদায়ী নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, তাদের কাজ হচ্ছে নির্বাচন করা। কিন্তু আমি বলবো, তারা সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। তারা পোস্ট অফিস নয়। তারা শপথ নিয়ে সংবিধান রক্ষার। অথচ তারা সংবিধানকে পদদলিত করেছে।

প্রশ্ন: আপনার একটি বক্তব্য আলোচনায়, আপনি বলেছেন- আওয়ামী লীগ অংশ না নিলে নির্বাচন অগ্রহণযোগ্য হবে না। প্রশ্ন থাকে, তাহলে তা কি সকলের অংশগ্রহণমূলক হবে?
নির্বাচন মানেই একটি প্রতিযোগিতা। বিকল্পের মধ্য থেকে বেছে নেয়া। নির্বাচনে বিকল্প থাকতে হবে। বিকল্প হতে হবে বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প। প্রশ্নটি ছিল হাইপোথ্যাটিক্যাল। উত্তরটি খণ্ডিতভাবে প্রচারিত হয়েছে। বক্তব্যটি ছিল, আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে। এই নির্বাচনে অন্তর্বর্তী সরকার কাউকেই বাধা দেবে না। বর্তমানে আওয়ামী লীগের অনেকেই পলাতক, অনেকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আছে। তারা যদি সংগঠিত হতে না পারে এবং নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে তাহলে নির্বাচন তো আটকে রাখা যাবে না। আমি আশা করি সবার অংশগ্রহণে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হবে।

প্রশ্ন: তিন মাসের মধ্যে কি আপনার প্রস্তাবনা দেয়া সম্ভব হবে?
সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। সব সংস্কার হবে না। সবগুলো দিক হয়তো আমরা গভীরভাবে পর্যালোচনা করার সময়ও পাবো না। তবুও আমরা সর্বশক্তি নিয়োগ করবো যেন এই তিন মাসের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য সুপারিশমালা পেশ করতে পারি।

mzamin

মেয়াদ শেষ, কোন আইনের বলে ভারতে থাকবেন শেখ হাসিনা?

কূটনৈতিক পাসপোর্টের বদৌলতে ভারতে থাকার যে বৈধতা ছিল বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তা শেষ হতে চলেছে। অর্থাৎ তিনি তার কূটনৈতিক পাসপোর্টের মাধ্যমে ভারতে ৪৫ দিন থাকার যে অনুমতি পেয়েছিলেন সে মেয়াদের শেষ দিন হচ্ছে বৃহস্পতিবার। ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে, শুক্রবার থেকে শেখ হাসিনা কোন আইনের বলে ভারতে থাকবেন। মঙ্গলবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, কূটনৈতিক পাসপোর্টের বদৌলতে শেখ হাসিনার ভারতে থাকার মেয়াদ শেষ হলেও তাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেয়ার সম্ভাবনা নেই। তাহলে কোন বলে ভারতে থাকবেন শেখ হাসিনা? কোনো কোনো মহলের যুক্তি, হয়তো তিব্বতী ধর্মগুরু দালাই লামার মতো ‘সাময়িকভাবে’ রাজনৈতিক আশ্রয় দেয়া হতে পারে। এ খবর দিয়েছে ভারতীয় গণমাধ্যম জি নিউজ। এতে বলা হয়, গণঅভ্যুত্থানের পর গত ৫ই আগস্ট দেশ ত্যাগ করে ভারতে চলে যান শেখ হাসিনা। তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিল করেছে বাংলাদেশ সরকার। ফলে ভারতে থাকার বিষয়টি এখন ভারতের সিদ্ধান্তের উপরেই নির্ভর করছে। শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পরই বিএনপি-সহ  অন্যান্য রাজনৈতিক দল দাবি তুলেছে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে তার বিচার করতে হবে। হসিনার বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই খুনের মামলা হয়েছে। এখন ভারত শেখ হাসিনাকে ফেরত দিতে না চাইলে কী করবে বাংলাদেশ, সেটিও বড় প্রশ্ন। এনিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মঙ্গলবার বলেছেন- কোন আইনে শেখ হাসিনা ভারতে রয়েছেন তা তারা জানেন না। ভারতের কাছে কিছু জানতে চায়নি ঢাকা। তবে ভারত চাইলে শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক আশ্রয়ে ভারতে রাখতে পারে।
mzamin

সাইফুজ্জামানের বৃটেনেই ৩৬০ বাড়ি -আল-জাজিরার অনুসন্ধান

সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদ-এর এত্ত সম্পদ। হিসাব কষলে চোখ কপালে উঠে যায়। তবে তার এ সম্পদের বেশির ভাগই বিদেশে। সেখানে তিনি নিজের মতো করে বিশাল সম্পদের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। শুধু বৃটেনেই আছে তার ৩৬০টি বাড়ি। বেশির ভাগই কিনেছেন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বার্কলি গ্রুপের মতো গ্রুপের কাছ থেকে। আল- জাজিরার এক অনুসন্ধানে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এতে হিসাব কষে দেখা গেছে, বর্তমানে ওইসব বাড়ির বাজারমূল্য ৩২ কোটি ডলার। বাংলাদেশি টাকায় এর পরিমাণ ৩৮২৪ কোটি টাকারও বেশি। এর বাইরে যুক্তরাষ্ট্র ও দুবাইয়ে আছে তার ভূরি ভূরি সম্পদ। বুধবার রাতে ‘দ্য মিনিস্টার্স মিলিয়নস’ শিরোনামের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে আল-জাজিরা। অনুসন্ধান করেছে আল-জাজিরার অনুসন্ধানী দল ‘আই ইউনিট’। এতে বলা হয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান লন্ডনের বাইরে দুবাইয়ে ২০২০ সালের মধ্যে অন্তত ৫৪টি সম্পদের মালিক হন। যুক্তরাষ্ট্রেও তার সম্পত্তি আছে। সেখানে তিনি নয়টি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট কিনেছেন। এর মধ্যে পাঁচটি ম্যানহাটানসহ নিউ ইয়র্কের প্রধান এলাকায় এবং চারটি নদীর ওপারে নিউ জার্সিতে। অথচ নিজের নির্বাচনী হলফনামা ও ট্যাক্স ফাইলে এসব সম্পদের কথা গোপন করেছেন তিনি।

আল-জাজিরা অনুসন্ধানে বলছে, লন্ডনে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর হয়ে সব সম্পদ দেখাশোনা করেন চট্টগ্রামের রিপন মাহমুদ। সাইফুজ্জামান সিঙ্গাপুরের ব্যাংক ডিবিএস থেকে ঋণ নিয়েছেন। ওই ব্যাংকের কর্মী রাহুল মার্টের বর্ণনায়ও সাইফুজ্জামানের সম্পদের বর্ণনা উঠে এসেছে। কীভাবে তিনি বিদেশে এত সম্পদ গড়েছেন, সেই ধারণাও পাওয়া গেছে। এ ছাড়া সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বর্ণনায়ও তার সম্পদ ও ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেছে। শেখ হাসিনা দেশের বাইরে তার ব্যবসার কথা জানতেন উল্লেখ করে সাইফুজ্জামান আল-জাজিরার অনুসন্ধানী দলকে বলেছেন, ‘আমার এখানে ব্যবসা আছে, সেটা তিনি জানতেন।’ প্রতিবেদনে বলা হয়, সাইফুজ্জামান ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার খুবই কাছের ও বিশ্বস্ত। তিনি ২০১৪ সালে সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী হন। ২০১৯ সালে শেখ হাসিনা তাকে পদোন্নতি দিয়ে ভূমিমন্ত্রী করেন। সাইফুজ্জামানও আল- জাজিরাকে বলেছেন, ‘আমার বাবা প্রধানমন্ত্রীর খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। সত্যি বলতে আমিও।’

আল-জাজিরার অনুসন্ধানী দলের কাছে বাংলাদেশের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান তার বিলাসী জীবনের গল্পও করেছেন। সেখানে নিজের জুতার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা টেইলর-মেডের জুতা। আমি হেরডসেও কাস্টম মেড (নির্দিষ্ট গ্রাহকের জন্য বিশেষভাবে তৈরি) জুতা অর্ডার দিয়েছি। এটি তৈরি হতে চার মাস সময় লাগে। আমি কিনেছি প্রতিটি তিন হাজার পাউন্ডের বেশি দিয়ে।’ এই বিশেষ জুতা তৈরির বিষয়ে সাইফুজ্জামান বলেন, এগুলো উটপাখি ও কুমীরের বুকের চামড়া দিয়ে তৈরি জুতা। সম্পূর্ণ বুকের চামড়া দিয়ে তৈরি জুতাগুলোর দাম ছয় হাজার পাউন্ড। আর অর্ধেক কুমিরের বুকের চামড়া ও বাছুরের চামড়ার অর্ধেক দিয়ে তৈরি জুতার দাম তিন হাজার পাউন্ড। স্যুট পছন্দ করেন জানিয়ে সাইফুজ্জামান বলেন, প্রতিবার তিনি লন্ডনে গেলে দু’/তিন হাজার পাউন্ড স্যুট কিনতে ব্যয় করেন। সুপার ২০০, সুপার ১৮০ এগুলো কেনা হয়। সুপার ২০০-এর দাম ছয় হাজার পাউন্ড। কেনালি বন্ড স্ট্রিটে গিয়ে কেনেন তিনি। এরপর তারাই বাসায় পৌঁছে দেয়।

চমকে ওঠার মতো সম্পদের সন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগে থেকে সাইফুজ্জামান চৌধুরীকে অনুসরণ করছিল তাদের অনুসন্ধানী দল। তার বেতন (বার্ষিক) ছিল ১৩ হাজার ডলার। অথচ তিনি বৃটেনে বিপুল সম্পদের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। আই ইউনিট মন্ত্রীর বৈশ্বিক সম্পদের অনুসন্ধানে নেমে চমকে ওঠার মতো সম্পদের সন্ধান পায়। বাংলাদেশে সাইফুজ্জামানের সম্পদের উৎস তার ব্যবসা ও ইউসিবি ব্যাংকের শেয়ার। বাংলাদেশর মুদ্রানীতি অনুযায়ী, দেশের নাগরিকেরা বছরে ১২ হাজার ডলারের বেশি বিদেশে নিতে পারেন না। এই মুদ্রানীতি হয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতির সুরক্ষার জন্য। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, ‘আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যপকহারে কমে গেছে। কেউ বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ছাড়া বিদেশে টাকা নিয়ে গেলে সেটা মানিলন্ডারিং আইনে অপরাধ।’
লন্ডনে বাড়িগুলো তৈরির বিষয়ে আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, সাইফুজ্জামান ডেভেলপারদের কাছ থেকে বাড়ি কেনার জন্য বেশ কিছু কোম্পানি তৈরি করেন। ২০১৬ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে তিনি বৃটেনে ২৬৫টি বাড়ি কেনেন। তার বাড়িগুলোর বেশির ভাগই বার্কলি গ্রুপের মতো শীর্ষ ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে কেনা। সাইফুজ্জামানের কেনাকাটা সেখানেই থেমে থাকেনি। ২০২১ সালে ১ কোটি ৬০ লাখ ডলারে লন্ডনে আরও সম্পদ কেনেন তিনি। তার বেশির ভাগ সম্পদই ভাড়া দিয়ে থাকেন। ২০২০ সালে আরও ৮৯টি বাড়ি কিনলে মোট বাড়ির সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৬০টি, যার বাজারমূল্য ৩২ কোটি ডলার।

প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিকভাবে পরিচিত ব্যক্তিদের যুক্তরাজ্যে কঠোর যাচাইয়ের মুখোমুখি হওয়ার কথা। সেখানে সাইফুজ্জামান চৌধুরী কীভাবে এই যাচাই প্রক্রিয়া অতিক্রম করেছিলেন, তা যাচাইয়ে তার একটি সম্পত্তি দেখতে যায় আল- জাজিরার অনুসন্ধানী দল। সেখানে রিপন মাহমুদ বলেন, ‘আমাদের গ্রাহকের (সাইফুজ্জামানের) লন্ডনে ৩০০টি বাড়ি আছে। তিনি লন্ডনে আসেন, কয়েকটি বাড়ি কেনেন, আবার চলে যান। লকডাউনের সময় যুক্তরাজ্যে নতুন বাড়ি কেনার জন্য ২০ কোটি পাউন্ড ব্যয় করেন।’ এই রিপন মাহমুদ সম্পর্কে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বক্তব্য হলো- লন্ডন ও যুক্তরাজ্যের সব সম্পত্তি রিপনের মাধ্যমেই তিনি কিনেছেন। রিপন তার প্রধান লোক। তিনি তার ভাই।

যেভাবে দেখা করেন আল-জাজিরার সাংবাদিকরা: আল-জাজিরার অনুসন্ধানী দলের সদস্যরা চীন থেকে ১০ কোটি ডলার যুক্তরাজ্যের বাজারে স্থানান্তর করতে চান, এ কথা বলে  সাইফুজ্জামানের ঘনিষ্ঠ রিপনের সঙ্গে কথা এগোতে থাকে। তারা ধনী বিদেশি বিনিয়োগকারী হিসেবে অভিনয় করে সাইফুজ্জামানের সম্পদের গোপন তথ্য বের করেন। লন্ডনের একটি হোটেলে রিপন আল-জাজিরার অনুসন্ধানী দলের সঙ্গে দেখা করতে যান। সেখানে আলাপচারিতায় তার বিষয়ে বোঝানোর জন্য সাইফুজ্জামান চৌধুরীর প্রসঙ্গ টানেন। তখন রিপন বলেন, ‘আমার ভালো বন্ধু সাইফুজ্জামান। আপনি যেটা আমার কাছে চাচ্ছেন, সেটাই আমি তার (সাইফুজ্জামান) জন্য করেছি।’ তার পরিচয় সম্পর্কে রিপন বলেন, ‘তিনি একজন ক্ষমতাধর মন্ত্রী। তিনি বুদ্ধিমান। তিনি বড় প্রকল্পে যান না। যখন আপনি বড় প্রকল্পে যান, কর্তৃপক্ষ সতর্ক হয়ে যায়। বড় টাকা, বড় সংখ্যা সবাইকে সতর্ক করে দেয়। আপনি বুঝতেই পারছেন কী বলছি। তিনি এক কোটি আনেন এবং বলেন, আমি নগদে কিনিনি। ব্যাংক আমাকে টাকা দিয়েছে।’ লন্ডনে অনুসন্ধানের মধ্যেই আল-জাজিরা জানতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রেও সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সম্পত্তি আছে। সেখানে তিনি নয়টি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট কিনেছেন। পাঁচটি ম্যানহাটানসহ নিউ ইয়র্কের প্রধান এলাকায় এবং চারটি নদীর ওপারে নিউ জার্সিতে।

আরও কয়েক দফা সাক্ষাতের পর রিপন স্বীকার করেন, তার সবচেয়ে বড় গ্রাহক সাইফুজ্জামান চৌধুরী। তিনি বাংলাদেশ থেকে আসছেন। চার বছর আগে তার জন্য সবকিছু ঠিক করেছেন। প্রতিবছর তিনি (সাইফুজ্জামান) তার মাধ্যমে ১০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করেন। সাইফুজ্জামান চৌধুরী বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার আগে তার সঙ্গে দেখা করে আল-জাজিরার অনুসন্ধানী দল। তার আগে রিপনের পরামর্শে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর পরামর্শকদের সঙ্গে দেখা করেন। প্রথমেই সাইফুজ্জামানের আইনজীবীর সঙ্গে দেখা করে অনুসন্ধানী দল। ওই আইনজীবী একটি কোম্পানির মানিলন্ডারিং রিপোর্টিং কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেন। যার কাজ হচ্ছে কোম্পানি পরিচালনায় যুক্তরাজ্যের নিয়ম-নীতি মেনে চলাটা নিশ্চিত করা। ২০২১ সাল থেকে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর প্রতিষ্ঠানের ১০০টির বেশি ঋণের আইনি কাজগুলো করেছেন তিনি।
 

এরপর রিপন পরিচয় করিয়ে দেন এশিয়ার বৃহত্তম ব্যাংক ডিবিএসের রাহুল মার্টের সঙ্গে, যিনি ব্যক্তিগত সম্পদ ব্যবস্থাপকদের একজন। রিপন বলেন, সাইফুজ্জামান চৌধুরীকে ব্যাংকের গ্রাহক করতে গিয়ে রাহুল কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছিলেন। সিঙ্গাপুরের ব্যাংকটিতে অত্যন্ত কড়াকড়ি থাকায় তার স্ত্রীকে এর গ্রাহক করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের জানুয়ারির মধ্যে ডিবিএস সাইফুজ্জামান চৌধুরীর কোম্পানিগুলোকে ২০টি ঋণ দিয়েছিল, যা তার সাম্রাজ্যকে অর্থায়নে সহায়তা করেছিল। অবশেষে রিপন অনুসন্ধানী দলকে মার্কেট ফাইন্যান্সিয়াল সলিউশনের সিইও পারেশ রাজার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি সাইফুজ্জামানের জন্য শত শত ঋণের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। সাইফুজ্জামান চৌধুরী তার মোট সম্পত্তির এক-চতুর্থাংশ, ৮০টির বেশি যুক্তরাজ্যের শীর্ষ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বার্কলি হোমস থেকে কিনেছেন। বার্কলি হোমসের একটি বিপণন অনুষ্ঠানে আল-জাজিরার একজনকে রিপন বলেন, তার ৩০০-এর বেশি বাড়ি আছে। তিনি দুবাইয়ে এগুলো তার (সাইফুজ্জামান) জন্য কিনেছেন। দুবাইয়ের সূত্র অনুসরণ করে নতুন আরও অনেক সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়। দুবাইয়ে ২০২০ সালের মধ্যে অন্তত ৫৪টি সম্পদের তালিকাভুক্ত মালিক হন সাইফুজ্জামান চৌধুরী।

সাইফুজ্জামান চৌধুরী যা বললেন-
এরপর রিপনকে সঙ্গে নিয়ে একদিন সাইফুজ্জামানের সঙ্গে তার লন্ডনের বাড়িতে সাক্ষাৎ করে অনুসন্ধানী দল। সেখানে সাইফুজ্জামান জানান, তিনি ব্যবসা থেকে তার সব লাভ দুবাই ও লন্ডনে বিনিয়োগ করেছেন। তিনি বলেন, ‘দুবাইয়ের ডাউনটাউনে আমি সেরা সম্পত্তি পেয়েছি। দুবাই মলের কাছে অপেরা এলাকায় আমার খুব সুন্দর একটি পেন্ট হাউস আছে। আমি একটি ভিলাও কিনেছি, যার একটায় ব্যক্তিগত হ্রদ আছে। সবকিছু আছে। সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় বাড়ি আছে। ম্যানহাটানে (যুক্তরাষ্ট্র) আমার খুব সুন্দর সম্পত্তি আছে।’ বাংলাদেশ থেকে এত টাকা কীভাবে আনলেন, এ প্রশ্নের জবাবে সাইফুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘আমার দুবাইয়ে রিয়েল স্টেট কেনাবেচার ব্যবসা আছে। দুবাই থেকে এখানে টাকা আনি। তারপর এখান থেকে একটা ঋণ নেই।’
আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ সমপ্রতি সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলোতে লেনদেন স্থগিতের নির্দেশ দিয়েছে। সাইফুজ্জামানের বর্তমান অবস্থান অজানা। তবে বাংলাদেশ ছেড়েছেন বলে সামপ্রতিক একটি কথোপকথনে তিনি উল্লেখ করেছেন।

mzamin

প্রেসিডেন্ট হিসেবে কমালাকে সমর্থন করলেন রিপাবলিকান প্রশাসনের সাবেক শতাধিক কর্মকর্তা

আসন্ন মার্কিন নির্বাচনে শতাধিক সাবেক রিপাবলিকান জাতীয় নিরাপত্তা এবং পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক কর্মকর্তা প্রেসিডেন্ট হিসেবে কমালা হ্যারিসকে সমর্থন জানিয়েছেন। দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বপালনে ডনাল্ড ট্রাম্পকে অযোগ্য বলে মনে করেন তারা। বুধবার এক চিঠির মাধ্যমে কমালার পক্ষে সমর্থন ব্যক্ত করেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ওই কর্মকর্তারা। এ খবর দিয়েছে অনলাইন দ্য গার্ডিয়ান। এতে বলা হয়, সাবেক রিপাবলিকান নেতা রোনাল্ড রিগান, জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ, জর্জ ডব্লিউ বুশ এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক অনেক কর্মকর্তারা ডেমোক্র্যাটিক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী কমালাকে সমর্থনের কথা জানিয়েছেন। এছাড়া কংগ্রেসের সাবেক কিছু নেতাও কমালাকে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে সমর্থন করেছেন। কমালাকে সমর্থন করা প্রকাশিত চিঠিতে তারা বলেছেন, আমরা বিশ্বাস করি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে অবশ্যই একজন নীতিবান এবং গুরুত্বপূর্ণ নেতা নির্বাচন করতে হবে। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ট্রাম্পের চেয়ে কমালাকে বেশি যোগ্য বলে মনে করছেন তারা।

চিঠিতে বলা হয়েছে, আমরা দেশি এবং বিদেশী নীতির ক্ষেত্রে কমালা হ্যারিসের সাথে একমত হওয়ার আশা রাখি। আমরা এও বিশ্বাস করি যে, কমালা প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করার জন্য ট্রাম্পের চেয়ে অধিক গুণাবলী সম্পন্ন নেতা। চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে ছিলেন, সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী উইলিয়াম কোহেন এবং চাক হেগেল। তারা ক্লিনটন এবং বারাক ওবামা প্রশাসনের সাথে কাজ করেছিলেন। অন্যান্যদের মধ্যে উইলিয়াম ওয়েবস্টার, রিগ্যান এবং প্রথম বুশ প্রশাসনের অধীনে কাজ করা সাবেক সিআইএ এবং এফবিআই এর শীর্ষ কর্মকর্তা কমালাকে সমর্থন জানিয়ে চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন।

চিঠিতে বলা হয়েছে, আমরা দৃঢ়ভাবে ডনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনের বিরোধিতা করছি। প্রেসিডেন্ট হিসাবে, তিনি প্রতিদিন বিশৃঙ্খল মতবাদ প্রচার করছেন, আমাদের শত্রুদের প্রশংসা করেছেন এবং আমাদের মিত্রদের অবমূল্যায়ন করেছেন। সামরিক বাহিনী এবং আমাদের প্রবীণ সৈনিকদের অপমান করেছেন, মার্কিন স্বার্থের উপরে তার ব্যক্তিগত স্বার্থকে প্রাধান্য দিচ্ছেন এবং আমাদের মূল্যবোধ, গণতন্ত্র এবং এই দেশ প্রতিষ্ঠার দলিলের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটলে ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারীর বিদ্রোহে ট্রাম্পের জড়িত থাকার দিকে ইঙ্গিত করে চিঠিতে বলা হয়েছে, জনগণ মনে করে ট্রাম্প পুনরায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার অযোগ্য। কেননা তিনি তার কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন এবং চীনের শি জিংপিয়য়ের মতো কর্তৃত্ববাদী শাসকদের যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কথা বলার সুযোগ তৈরী করে দিচ্ছেন। সাবেক কর্মকর্তারা ন্যাটো এবং ইসরাইলের প্রতি কমালা হ্যারিসের সমর্থন করেছেন। পাশাপাশি রিপাবলিকানদের অবরুদ্ধ দ্বিদলীয় সীমান্ত সুরক্ষা প্যাকেজ স্বাক্ষর করার প্রতিশ্রুতির নিন্দা জানিয়েছেন। চিঠিতে স্বাক্ষরকারী ট্রাম্পের বেশ কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তার মধ্যে রয়েছেন প্রেসিডেন্টের সাবেক বিশেষ সহকারী মার্ক হার্ভে এবং হোমল্যান্ড সিকিউরিটির সাবেক সহকারী সচিব এলিজাবেথ নিউম্যান।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রিপাবলিকান অনেক কর্মকর্তারা ট্রাম্পের বিপক্ষে কমালা হ্যারিসকে সমর্থন জানিয়েছেন। ২০২০ সালের নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পরও ট্রাম্প যেভাবে তা অস্বীকার করছিলেন তা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি মনে করেন কমালাকে সমর্থন করা এসব কর্মকর্তারা। অন্যান্য রিপাবলিকান যারা হ্যারিসকে সমর্থন করেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন আলবার্তো গঞ্জালেস, যিনি এর আগে ডব্লিউ বুশ প্রশাসনের অধীনে কাজ করেছিলেন। ইলিনয়ের সাবেক প্রতিনিধি অ্যাডাম কিনজিঙ্গার, সেইসাথে ট্রাম্পের সাবেক প্রেস সেক্রেটারি স্টেফানি গ্রিশাম এবং যোগাযোগ বিষয়ক সহকারী অ্যান্থনি স্কারমুচিও কমালাকে সমর্থক করেছেন।

mzamin

অবুঝ দুই শিশু খুঁজে বেড়াচ্ছে বাবাকে by শুভ্র দেব

কবির হোসেন (৬০) তার দুই ছেলেকে নিয়ে ঢাকার কাজলা এলাকার একটি বাসায় থাকতেন। নিজে অটো চালাতেন আর দুই ছেলে মো. হাসান ও মো. বাবলু যাত্রাবাড়ীতে সবজির আড়তে দৈনিক মজুরিভিত্তিতে কাজ করতেন। হাসান (৩০) বিবাহিত। তার স্ত্রী, দুই সন্তান ও মা ইয়ানুর বেগম ভোলা জেলার লালমোহন থানা এলাকার গ্রামের বাড়িতে বসবাস করেন। কবির ও তার দুই ছেলের আয়ে মোটামুটি ভালোই চলছিল যৌথ পরিবারটি। কিন্তু ৫ই আগস্ট সরকার পতনের ৪দিন পুলিশের গুলিতে তছনছ হয়ে যায় তাদের পরিবার। ওইদিন যাত্রাবাড়ি এলাকায় ছাত্র-জনতার সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন হাসান। আন্দোলনের একপর্যায়ে পুলিশ তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে। সাতটি গুলি তার শরীরে লাগে। গুলি লাগার পরে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়া হয়। হাসপাতালে ১৯ দিন তিনি মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেন। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। ২৩শে আগস্ট তিনি না ফেরার দেশে চলে যান। বড় ছেলে হাসানকে হারিয়ে বাবা-মা যেমন স্তব্ধ হয়ে আছেন, ঠিক তেমনি তার স্ত্রীও স্বামীর এমন অকালে চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছেন না। আর তার সাত বছর ও আড়াই বছর বয়সী অবুঝ সন্তানেরা বাবা মারা যাওয়ার বিষয়টি বুঝতে না পারলেও দিন-রাতের অধিকাংশ সময় তারা বাবাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। সারাক্ষণ শুধু তারা বাবা-বাবা বলে ডাকছে।

গতকাল হাসানের বাবা কবির হোসেন ছেলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। মানবজমিনকে বলেন, অনেক বছর ধরেই আমরা ঢাকায় কাজ করি। মাঝেমধ্যে বাড়ি চলে যেতাম আবার এসে কাজ করতাম। আমি কাজলা, যাত্রাবাড়ি, ডেমরাসহ আশপাশের এলাকায় অটোরিকশা চালাতাম। আর দুই ছেলে সবজির আড়তে কাজ করতো। ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আমরা ঘুম থেকে উঠি। তখন দুই ছেলেকেই বলেছি অবস্থা ভালো না। তাই কোথাও বের হওয়ার দরকার নাই। কিছুক্ষণ পর হাসান বাসা থেকে বের হয়ে কাজলা মেইন রোডের দিকে ঘুরে আবার বাসায় আসে। কেন ওদিকে গিয়েছিল জানতে চাইলে বলে, আন্দোলনের কি অবস্থা সেটি খোঁজ নিতে গিয়েছি। তখন আমি তাকে বলেছিলাম শুনেছি আজকে পরিস্থিতি খারাপ হবে। প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করতে পারেন। এ ছাড়া সেনাপ্রধান ভাষণও দিবেন। আমার কথা শোনার পর বাসায়ই ছিল। কিন্তু দুপুরের দিকে সে বাসা থেকে বের হয়ে আন্দোলনে চলে যায়। কেউ হয়তো তাকে ফোন দিয়েছিল। ফোন পেয়েই বের হয়ে যায়। দুপুরের খাবার খেয়েছে কিনা সেটাও জানতে পারিনি। সে বের হওয়ার কিছুক্ষণ পর আমিও কাজলা হয়ে যাত্রাবাড়ির দিকে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি কয়েকটি লাশ নিয়ে যাচ্ছে। পুলিশ গুলি করেছে। এসব দেখে আমি বিবির বাগিচার দিকে চলে যাই। প্রায় ৪টার দিকে আমার মোবাইলে একটি ফোন আসে। অপরিচিত ব্যক্তি আমাকে বলেন, হাসানের গুলি লেগেছে তাড়াতাড়ি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চলে আসেন। এ কথা শোনার পর আমার আর হুঁশ ছিল না। কী করবো, না করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। তখন আমার ছোট ছেলে বাবলুকে ফোন দিয়ে বলি তার ভাইয়ের গুলি লেগেছে। তখন সায়েদাবাদ এলাকায় সে আসার পর দুজন মিলে হেঁটে হেঁটে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাই। সেখানে যাওয়ার পর ওই অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে দেখা হয়। তিনি আমাদের ছেলের কাছে নিয়ে যান। আমাদেরকে তিনি বলেছেন, গুলি লাগার পর অনেক সময় মাটিতে পড়েছিল হাসান। কেউ সাহস করে ধরতে আসেনি। পরে আমি তাকে উদ্ধার করতে যাই। পরে আরও অনেকে আসে। ঘটনাস্থলে তার শরীর থেকে চারটি গুলি টেনে বের করা হয়। হাসপাতালে আসার পর চিকিৎসকরা আরও তিনটি গুলি বের করেন। তিনি আমাদেরকে বলেন, তিনি চেষ্টা করেছেন এতক্ষণ। এখন আমরা যাতে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করি। পরে তিনি আমাদেরকে কিছু টাকা দেন।

কবির বলেন, বিকাল থেকে ভোর পর্যন্ত জরুরি বিভাগেই তার চিকিৎসা চলে। ভোর ৪ টার দিকে তাকে আইসিইউতে নেয়া হয়। চিকিৎসকরা আমাদেরকে জানান, অনেকগুলো গুলি তার শরীরে লেগেছে। শ্বাসনালি, মেরুদণ্ড, মাথা সবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৭ দিন আইসিইউতে তাকে রাখা হয়। পরে দেয়া হয় এইচডিইউতে। কিন্তু এইচডিইউতে আনার পরপরই তার শরীর খারাপ হয়ে যায়। তখন আমরা আবার চিকিৎসকদের বিষয়টি জানাই। পরে আবার তাকে আইসিইউতে নেয়া হয়। কিন্তু তাকে আর বাঁচানো যায়নি।

হাসানের বাবা কবির বলেন, ছেলের মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকে তার মায়ের শারীরিক অবস্থা খারাপ। ছেলেকে তিনি কিছুতেই ভুলতে পারছেন না। সবসময়  ছেলের জন্য মন খারাপ করে থাকেন। রাতে ঘুম হয় না। খাবার খেতে চান না। কিছুতেই তাকে সান্ত্ব্তনা দেয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া হাসানের স্ত্রী মালা বেগম স্বামীর মৃত্যু মেনে নিতে পারছে না। একদিকে তার নিজের কষ্ট। অন্যদিকে হাসানের দুই সন্তান সারাক্ষণ বাবাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। বড় ছেলে হাবিবের বয়স সাত বছর আর ছোট ছেলে হাসিবের বয়স আড়াই বছর। দু’জনই অবুঝ। অনেক কিছু  বোঝার ক্ষমতা নাই। তারা জানেও না, বুঝেও না, তাদের বাবা মারা গেছেন। বড় হয়ে হয়তো একদিন জানতে পারবে তাদের বাবা আন্দোলনে শহীদ হয়েছে।

mzamin

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অধ্যাদেশ অনুমোদন: ৩১শে ডিসেম্বরের মধ্যে সংস্কারের সুপারিশ দেবে কমিশন

‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অধ্যাদেশ, ২০২৪’ এর নীতিগত সিদ্ধান্ত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এ ছাড়াও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা এবং সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গের আয় ও সম্পদ বিবরণী প্রকাশের নীতিমালা, ২০২৪-এর খসড়ার অনুমোদনও দেয়া হয়। গতকাল উপদেষ্টা পরিষদের এক বৈঠকে এ অনুমোদন দেয়া হয়। অন্যদিকে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ছয় সংস্কার কমিশনের প্রধানরা। বৈঠকে পহেলা অক্টোবর থেকে সংস্কার কমিশনের কাজ শুরু করা ও ৩১শে ডিসেম্বরের মধ্যে সংস্কার প্রস্তাবের সুপারিশ রিপোর্ট আকারে সরকারের কাছে উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। রিপোর্টটি জনসাধারণের জন্যও উন্মুক্ত থাকবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠক শেষে ফরেন সার্ভিস একাডেমি মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে এমনটাই  জানিয়েছেন আইন উপদেষ্টা প্রফেসর ড. আসিফ নজরুল। প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে সরকার ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অধ্যাদেশ, ২০২৪’ এর খসড়ার নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে বলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। এতে বলা হয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক ব্যাপক দমনপীড়ন ও গণহত্যা চালানোর ফলে পুরো দেশে দলমত নির্বিশেষে ছাত্র-জনতা উত্তাল গণবিক্ষোভ করে। আন্দোলনের একপর্যায়ে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের দাবিতে সরকার পতনের একদফা দাবিতে ঐক্যবদ্ধ ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী গত ৫ই আগস্ট প্রেসিডেন্টের কাছে পদত্যাগ করে দেশত্যাগ করেন। প্রেসিডেন্ট গত ৬ই আগস্ট দ্বাদশ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সাংবিধানিক সংকট মোকাবিলা, জনস্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা রক্ষা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সচল রাখা এবং রাষ্ট্রের নির্বাহী কার্যপরিচালনার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন বিষয়ে জনগুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট সুপ্রিম কোর্টের মতামত চান। সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদে দেয়া উপদেষ্টামূলক এখতিয়ার প্রয়োগ করে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ৮ই আগস্ট মতামত প্রদান করেছেন যে, রাষ্ট্রের সাংবিধানিক শূন্যতা পূরণে জরুরি প্রয়োজনে প্রসিডেন্ট রাষ্ট্রের নির্বাহী কার্যপরিচালনার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে প্রধান উপদেষ্টা এবং অন্য উপদেষ্টা নিযুক্ত করতে পারবেন। প্রেসিডেন্ট এভাবে নিযুক্ত প্রধান উপদেষ্টা এবং অন্য উপদেষ্টাদের শপথ পাঠ করাতে পারবেন। এতে আরও বলা হয়, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ডকট্রিন অব নেসেসিটি অনুসারে সাংবিধানিক সংকট মোকাবিলায় সর্বস্তরের জনগণের ঐকান্তিক ইচ্ছা ও পরম অভিপ্রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে, গণঅভ্যুত্থানকারী ছাত্র-জনতার প্রতিনিধিদের প্রস্তাবের ভিত্তিতে এবং ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের রাষ্ট্র সংস্কার আকাঙ্ক্ষা পূরণের ও রাষ্ট্রের নির্বাহী কার্যপরিচালনার জন্য রাষ্ট্রপতি ৮ই আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করেন। গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্ষমতা ও দায়িত্ব, প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টাদের পদমর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা, পদত্যাগ এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য বিষয়ে বিধান করা জরুরি। এই প্রেক্ষাপটে ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অধ্যাদেশ, ২০২৪’ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। অন্যদিকে বৈঠকে ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা এবং সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গের আয় ও সম্পদ বিবরণী প্রকাশের নীতিমালা, ২০২৪’ এর খসড়ার অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা এবং সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গের আয় ও সম্পদ বিবরণী প্রকাশের নীতিমালার খসড়া প্রণয়ন করে উপদেষ্টা পরিষদ বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা এবং সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ যারা সরকার বা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত, তারা প্রতি বছর আয়কর জমা দেয়ার সর্বশেষ তারিখের পরবর্তী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে নীতিমালায় সংযুক্ত ছকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টার কাছে তাদের আয় ও সম্পদ বিবরণী জমা দেবেন। এ বিধান রেখে খসড়া আয় ও সম্পদ বিবরণী প্রকাশের নীতিমালা উপদেষ্টা পরিষদ বৈঠকে অনুমোদিত হয় বলে জানিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এরই মধ্যে সরকারি সব কর্মচারীর সম্পদের হিসাব দিতে হবে বলে জানিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এজন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি কাজ করছে।

সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলনে উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, ৬টি প্রস্তাবিত কমিশনের প্রধানদের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বৈঠক হয়েছে। যেখানে উপদেষ্টাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আসিফ নজরুল, আলী ইমাম মজুমদার, ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং আদিলুর রহমান। এ ছাড়াও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজ আলমও উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, আমরা প্রধানত আলোচনা করেছি সংস্কার ভাবনা, সংস্কার কমিশনগুলো কীভাবে কাজ করতে চায়, সদস্য বাছাই প্রক্রিয়া কী হবে, কবে নাগাদ সংস্কার রিপোর্ট দেয়া হবে, রাজনৈতিক দল ও পেশাজীবী সংগঠনের সম্পর্ক কী হবে- এসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আইন উপদেষ্টা বলেন, ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হয় যে কমিটি পহেলা অক্টোবর থেকে কাজ শুরু করবে আর ৩১শে ডিসেম্বরের মধ্যে সংস্কার রিপোর্ট প্রদান করবে। এটি হচ্ছে প্রথম ধাপ। রিপোর্টের ভিত্তিতে দ্বিতীয় ধাপে আমাদের প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে উপদেষ্টারা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংস্কার ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু করবেন। এরপর সমাজের সর্বস্তরের মানুষের প্রতিনিধিত্বে এটা নিয়ে বিশদাকারে কনসালটেশন হবে। সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট পাওয়ার পর সেগুলো অনলাইনে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। সবার মতামতকে গুরুত্ব দেয়ার চেষ্টা করা হবে। তিনি বলেন, ছাত্র-জনতার বিপ্লবের প্রত্যাশা কেবল নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সেটা ছিল রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্ন এবং প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন। এবং বাংলাদেশে যেন কোনোভাবেই আর কোনোদিন ফ্যাসিবাদী শাসন জেঁকে বসতে না পারে সে সম্ভাবনা রোধ করার লক্ষ্যে কী কী সংস্কার করা প্রয়োজন সে ধরনের চিন্তা ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্যদিয়ে প্রতিফলিত হয়েছিল। সেটার লক্ষ্যে এ সংস্কার কমিশনগুলো প্রাথমিক স্তরে কাজ শুরু করেছে।
এ সময় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজ আলম বলেন, সংস্কার কমিশনগুলো গঠনের উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন ফ্যাসিবাদী শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট ছিল সেখান থেকে মুক্তি দেয়া। এখানে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মধ্যদিয়ে সবার অংশগ্রহণের মধ্যদিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয় যেমন আছে। তেমনই তার আগে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে গঠিত সরকারের কাছে একটা দায়িত্ব আছে। সেটি হচ্ছে যে, প্রতিষ্ঠানগুলো গত ১৫ বছরে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে যেগুলো জনগণের স্বার্থে কাজ করতে পারছে না সেগুলোকে ঢেলে সাজানো। যার উদ্দেশ্যে সংস্কার কমিশন গঠিত হয়েছে। কমিশন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করবে। এ কমিশনগুলো আগামী তিন মাসের মধ্যে তাদের প্রস্তাবনা উপস্থাপন করবে। সেটার ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে। জনগণের বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এ কমিশনগুলো কাজ করবে। তারা যথেষ্ট রকম স্বাধীন থাকবে। কোনো রকম রাজনৈতিক চাপ যেন না থাকে সে বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়াও তাদের কার্যপরিধি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। শিগগিরই জানানো হবে কোন কোন ক্ষেত্রগুলোতে তারা কাজ করবেন এবং কারা কারা এ কমিশনগুলোতে থাকবেন।
নির্বাচন কমিশন বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আমরা কর্তৃত্ববাদী সরকারের অধীনে ছিলাম। বহুক্ষেত্রে আমরা বঞ্চনার মধ্যে ছিলাম। বিশেষ করে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে না পারা। এ বিষয়গুলোর যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে সে জন্যই কতোগুলো পরিবর্তন আনতে হবে। কার্যপরিধি কী হবে, কীভাবে কাজ করবে, রিপোর্ট কবে নাগাদ দিতে হবে, কী কী বিষয় থাকতে হবে- এসব বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
এদিকে এক প্রশ্নের জবাবে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেন, কোনোরকম মব জাস্টিস, আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া, গণপিটুনি দেয়ার মতো ঘটনা গ্রহণ করা হবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইজন নিহতের ঘটনায় খুবই মর্মাহত আমরা। এটা আমাদের খুবই কষ্ট দিয়েছে। ইতিমধ্যে ব্যবস্থা নিয়েছি। তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা এড়ানোর জন্য আমরা যত রকমের পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজন, তত রকম পদক্ষেপ নেবো। তিনি বলেন, বিচারবহির্ভূত কোনো হত্যাকাণ্ড একসেপ্ট করা হবে না। আমরা একটা জিনিস নিশ্চিত করছি, আমাদের সরকার আইনিভাবে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেবে। তদন্ত ও বিচার সাপেক্ষে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।

mzamin

তিন মাস ধরে ১৪০০ চা শ্রমিকের মজুরি বন্ধ

মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার ফুলতলা চা বাগানে প্রায় তিন মাস ধরে ১৪শ চা শ্রমিকের মজুরি ও রেশন বন্ধ রয়েছে। এ কারণে তাদের দুর্ভোগের শেষ নেই। শ্রমিকদের অভিযোগ, দ্য নিউ সিলেট টি এস্টেটস লিমিটেডের মালিকানাধীন ওই বাগান কর্তৃপক্ষ নিয়মিত মজুরি না দিয়ে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। মজুরির দাবিতে শ্রমিকরা কর্মবিরতি-মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে আসছিলেন। স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধির আশ্বাসে কাজ করে যাচ্ছেন তারা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাগান মালিক নানা অজুহাত দেখিয়ে শ্রমিকদের মজুরি বন্ধ রেখেছেন। শোনা যায়, তিনি দেশের বাইরে চলে গেছেন। এরপর থেকে বাগানে অচলাবস্থা বিরাজ করছে। পাতা উত্তোলনের ভরা মৌসুমে শ্রমিকরা কাজ না করলে উৎপাদনে বড় ক্ষতির শঙ্কা দেখা দিতে পারে, যে কারণে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের হস্তক্ষেপে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা চলছে।

বাগানের শ্রমিক পরিবারের রাম ভোজন কালবেলাকে বলেন, জেলার সীমান্তবর্তী ফুলতলা চা বাগান ভালো মানের বাগান। হঠাৎ মালিকপক্ষের অসহযোগিতায় প্রায় তিন মাস ধরে শ্রমিকদের রেশন ও মজুরি বন্ধ হয়ে যায়। এতে বিপাকে পড়েন দিনমজুর শ্রমিকরা। শ্রমিকরা দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম শুরু করেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষের কোনো কর্ণপাত নেই।

বাগান পঞ্চায়েতের সাধারণ সম্পাদক দিপচান গোয়ালা কালবেলাকে বলেন, আমাদের বাগানে ১৪শ শ্রমিক রয়েছেন। মালিকপক্ষ দেশের বর্তমান পরিস্থিতি ও বন্যার অজুহাত দেখিয়ে ১১ সপ্তাহ ধরে রেশন ও মজুরি বন্ধ করে রেখেছেন। এ নিয়ে আমরা বারবার যোগাযোগ করলেও কোনো সুরাহা হয়নি। বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের জানানো হলে তারা উদ্যোগ নিয়েও সমাধান করতে পারেননি। তাদের প্রচেষ্টায় মাত্র এক সপ্তাহের মজুরি প্রতি জনে ১ হাজার ২০ টাকা পেয়েছেন।

কিন্তু রেশন দেওয়া হয়নি। এ টাকা দিয়ে শ্রমিকরা ঋণ পরিশোধ করবেন, না সংসারের খরচ চালাবেন। এ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন শ্রমিকরা। ধারাবাহিকভাবে মজুরি প্রদান না করলে শ্রমিকরা অনাহারে-অর্ধাহারে থাকবেন। শ্রমিকরা বাগান রক্ষার স্বার্থে এবং চা পাতা উত্তোলনের ভরা মৌসুম থাকায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

জুড়ী উপজেলার ফুলতলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল আলীম শেলু কালবেলাকে বলেন, বাগানের অবস্থা ভালো নয়। বিষয়টি স্থানীয় ও ঊর্ধ্বতন প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। বাগান চালু রাখার জন্য এক সপ্তাহের মজুরি প্রদান করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাগান ম্যানেজারকে পাওয়া যায়নি। তার মোবাইল ফোন বন্ধ রয়েছে। জুড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বাবলু সুত্রধর কালবেলাকে বলেন, এখানে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ এসে পরিদর্শন করেছেন। শ্রমিকদের এক সপ্তাহের মজুরি প্রদান করা হয়েছে। মজুরি প্রদান অব্যাহত থাকবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা চেষ্টা করব।

শ্রমিকরা বাগান রক্ষার স্বার্থে এবং চা পাতা উত্তোলনের ভরা মৌসুম থাকায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ছবি : কালবেলা
শ্রমিকরা বাগান রক্ষার স্বার্থে এবং চা পাতা উত্তোলনের ভরা মৌসুম থাকায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ছবি : কালবেলা



বছরের শুরুতেই খুশি আসছে বড় পর্দায়

প্রয়াত কিংবদন্তি অভিনেত্রী শ্রীদেবী ও প্রযোজক বনি কাপুরের মেয়ে খুশি কাপুর। এরই মধ্যে ছোট পর্দায় অভিষেক হয়েছে তার। এবার বড় পর্দায় অভিষেকের অপেক্ষায় তিনি। ২০২৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পেতে যাচ্ছে তার নতুন সিনেমা।

বছরের শুরুতেই বলিউড সুপারস্টার আমির খানের ছেলে জুনায়েদ খানের সঙ্গে তার জুটি বাঁধার বিষয়টি আলোচনায় আসে।

রোমান্টিক কমেডি ধাঁচের গল্পে নির্মিত হবে সিনেমাটি। এটি নির্মাণ করবেন সিক্রেট সুপারস্টার ও লাল সিং চাড্ডার মতো ব্লকমাস্টার সিনেমা নির্মাতা অদ্বৈত চন্দন। তবে সিনেমার নাম এখনো ঠিক হয়নি। বলিউডভিত্তিক গণমাধ্যম বলিউড হাঙ্গামার তথ্যমতে, সিনেমার শুটিং এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। সিনেমা প্রযোজনার সঙ্গে যুক্ত একটি সূত্র জানিয়েছে, মুম্বাইয়ে শুটিংয়ের প্রথম ধাপ শেষ হয়েছে এবং এখন এ জুটি দিল্লিতে শুটিং করছে। দিল্লিতে অভিনেতা জুনায়েদ ও খুশির মধ্যকার রোমান্টিক দৃশ্যগুলো নিয়েই কাজ চলছে। আগামী ১০-১২ দিন সেখানেই তারা অবস্থান করবেন। সিনেমায় বেশিরভাগই দিনের বেলার দৃশ্য রয়েছে। তাই রাতের শুটিং নিয়ে কোনো পরিকল্পনা করা হয়নি। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই ইনডোর ও আউটডোর শুটিংয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সিনেমাটি প্রযোজনা করছে ফ্যান্টম স্টুডিওস।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে সিনেমার মুক্তির তারিখ ঘোষণা করে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানটি জানায়, সবাই প্রস্তুত হয়ে যান, বছরের শুরুতেই ভালোবাসার গল্প নিয়ে আসছে খুশি-জুনায়েদ।’

সিনেমাটি ২০২২ সালের তামিল সুপারহিট সিনেমা ‘লাভ টুডে’র রিমেক। লাভ টুডে প্রদীপ রঙ্গনাথন পরিচালিত ও অভিনীত সিনেমা। 

বছরের শুরুতেই খুশি আসছে বড় পর্দায়
বছরের শুরুতেই খুশি আসছে বড় পর্দায়

বিচ্ছেদের পর সিঁদুর পরা নিয়ে মুখ খুললেন মধুমিতা

‘বোঝে না সে বোঝে না’ সিরিয়ালে ‘পাখি’ চরিত্রে অভিনয় করে দুই বাংলার মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন মধুমিতা সরকার। ভারতীয় এই অভিনেত্রী বর্তমানে চলচ্চিত্র ও ওয়েব সিরিজে নিয়মিত অভিনয় করছেন।

সৌরভ চক্রবর্তী এবং মধুমিতা সরকার ‘সবিনয় নিবেদন’ সিরিয়ালে অভিনয় করে দর্শকের মনে জায়গা করে নেন। ২০১১ সালের দিকে তাদের প্রেমের শুরু। রিল লাইফ সম্পর্ক ক্রমশ পরিণতি পায় রিয়েল লাইফ বিয়েতে। ধারণা করা হয় ২০১৫ সালেই করে নিয়েছিলেন এই জুটি।

কিন্তু সংসারে দুঃখ বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। ২০১৯ সালে সৌরভের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে মধুমিতার। ইদানীং প্রায়ই সিঁথিতে সিঁদুর পরিহিত অবস্থায় দেখা যায় অভিনেত্রীকে। সিঁদুর পরে তোলা ছবি নিয়মিত সোশ্যাল মিডিয়ায়ও পোস্ট করতে দেখা যায় মধুমিতাকে।

এদিকে নেটিজেনদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন— সৌরভের সঙ্গে কি এখনো বিবাহবিচ্ছেদ ঘটেনি? নাকি গোপনে ফের বিয়ে করেছেন মধুমিতা?

অভিনেত্রী বলেন, ‘প্রথমেই জানিয়ে দিই, আমি কিন্তু সৌরভ চক্রবর্তীর নামে সিঁদুর পরছি না। আমি ঈশ্বরে বিশ্বাসী, শিবের ভক্ত। কোনো মন্দিরে পূজা দিতে গেলে আমি সিঁথিতে সিঁদুর পরি। দেব বিগ্রহে ছোঁয়ানো সিঁদুর, খুব সহজভাবেই সেটা পরি।’

তাকে প্রশ্ন করা হয় হিন্দু ধর্মে বিবাহিত নারীদের মাঝে সিঁদুর পরার প্রচলন রয়েছে। সেক্ষেত্রে কি কোনো চলতি প্রথা ভাঙতে চাইছেন? এ ব্যাপারে মধুমিতা বলেন, ‘আমি আমার ধর্মে বিশ্বাসী। কোনো প্রথা ভাঙতে চাই না। আমি মনে করি, সিঁদুর কোনো ছেলে খেলার জিনিস না। বিবাহিত নারীদেরই কেবল সিঁদুর পরা উচিত। আমি সেটার সম্মানও করি।’

সিরিয়ালের গণ্ডি পেরিয়ে ক্যারিয়ারে ‘লাভ আজকাল’, ‘চেন্নাই’, ‘দিলখুশ’সহ ১১টি সিনেমায় অভিনয় করেছেন মধুমিতা সরকার। এছাড়া ‘উত্তরণ’, ‘শ্রীকান্ত’ ও ‘জাতিস্মর’ নামে তিনটি ওয়েব সিরিজেও কাজ করেছেন এই সুন্দরী।

বিচ্ছেদের পর সিঁদুর পরা নিয়ে মুখ খুললেন মধুমিতা 
বিচ্ছেদের পর সিঁদুর পরা নিয়ে মুখ খুললেন মধুমিতা



বিটকয়েনে বার্গারের দাম পরিশোধ করলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিউইয়র্কের একটি বারে গিয়ে তার সমর্থকদের বার্গার খাওয়ান। সেই বার্গারের দাম পরিশোধ করেন ক্রিপ্টোকারেন্সি বিটকয়েন ব্যবহার করে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করা প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ট্রাম্প বিটকয়েনে লেনদেন করলেন।

বুধবার (১৮ সেপ্টেম্বর) ৭৮ বছর বয়সী ট্রাম্প এ কাণ্ড ঘটান। ওই দিন তিনি নির্বাচনী প্রচার সমাবেশের আগে বারটিতে যান। সেখানে তিনি উপস্থিত তার সমর্থক ও পাবকি এর পৃষ্ঠপোষকদের জন্য কেনা বার্গার এবং বিয়ারের অর্থ প্রদানের জন্য ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করেন। বিষয়টি উপস্থিত সবাই স্বাগত জানান এবং আনন্দ ধ্বনি দেন।

ট্রাম্প যখন মোবাইল ফোন ও ট্যাবলেট ব্যবহার করে বিটকয়েন ট্রান্সফার করছিলেন তখন চারপাশ থেকে স্লোগান উঠে। অনেকে বলতে থাকেন ‘মেক বিটকয়েন গ্রেইট এগেইন’। এ সময় ট্রাম্প ক্রিপ্টোকারেন্সির সমর্থকদের উল্লাসে যোগ দিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি প্রথমবারের মতো বিটকয়েনে লেনদেন করলাম।’

ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা বা ক্রিপ্টোকারেন্সির পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় এর আগেও ট্রাম্প আলোচনায় এসেছিলেন। সমালোচকরা বলছেন, ট্রাম্প নিজের ভোটব্যাংক ও জনপ্রিয়তা বাড়াতে ক্রিপ্টো নিয়ে উম্মাদনা ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারণাকালে মে মাসে ক্রিপ্টোতে অনুদান গ্রহণ করা শুরু করেন। একই মাসে তিনি নিজেকে ‘ক্রিপ্টো প্রার্থী’ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে পৃথিবীর ক্রিপ্টোকারেন্সির রাজধানীতে পরিণত করতে চান তিনি। দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে তিনি এ বিষয়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবেন। ভবিষ্যতের আমেরিকা সম্পর্কে তার যে দৃষ্টিভঙ্গি, তার জন্য ক্রিপ্টো অপরিহার্য। 

বিটকয়েনে বার্গারের মূল্য পরিশোধের সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : সংগৃহীত
বিটকয়েনে বার্গারের মূল্য পরিশোধের সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : সংগৃহীত

দুই প্রতিবন্ধীকে নিয়ে বৃদ্ধা জোবেদার মানবেতর জীবনযাপন

স্বামীর মৃত্যুর পর জোর করে সব সম্পত্তি লিখে নেন ছেলেরা। বিয়ে দেওয়ার পরে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে বাপের বাড়ি ফিরে আসেন এক মেয়ে। আরেক মেয়ের এক সন্তান মানসিক প্রতিবন্ধী। সেই প্রতিবন্ধী সন্তানকে ফেলে গেছেন বৃদ্ধা মায়ের কাছে।

মানসিক ভারসাম্যহীন মেয়ে ও শারীরিক প্রতিবন্ধী নাতনিকে নিয়ে এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন বৃদ্ধা জোবেদা খাতুন।

মানুষের সাহায্য সহযোগিতায় কোনো রকমে দিন কাটছে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার দেশিগ্রাম ইউনিয়নের ভোগোলমান গ্রামের জোবেদা খাতুনের (৮০)।

জানা গেছে, বৃদ্ধার স্বামী ওয়াহেদ আলী ছিলেন অনেক সম্পদের মালিক। ২০০১ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর ছেলেরা সব সম্পত্তি লিখে নিয়ে মায়ের আর খোঁজ রাখেনি। এরপরই অন্ধকার নেমে আসে বৃদ্ধা জোবেদার ঘরে। মানসিক ভারসাম্যহীন মেয়ে শ্বশুর বাড়ি থেকে ফিরে আসলে শুরু হয় নতুন সংগ্রাম। বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করিয়ে ফলাফল না পেয়ে মেয়েকে ঘরে শিকলবন্দি করে রাখেন। এদিকে আরেক মেয়ের সন্তান প্রতিবন্ধী হওয়ায় তাকেও রেখে গেছে জোবেদা খাতুনের কাছে। যেখানে অনাহারে নিজের টিকে থাকায় দায় সেখানে বাড়তি দুই প্রতিবন্ধী নিয়ে অকূল পাথারে পড়েছেন আশি বছরের এ বৃদ্ধা। কেউ সাহায্য করলে জোটে খাবার, নইলে থাকতে হয় অনাহারে।

এ দিকে জোবেদা খাতুনের এক ছেলে মো. শাজাহান আলী গত দুই বছর হলে মারা গেছেন। তার আরেক ছেলে মো. আলম সরকার কোনো খোঁজখবর নেন না। জোবেদা খাতুনের নিজস্ব কোনো জায়গা জমিও নেই। যে ঘরটিতে থাকেন তাও বৃষ্টি হলে হয়ে পড়ে থাকার অনুপযোগী।

জোবেদা খাতুন বলেন, বাবারে আমি আর পারছি না। নিজেই চলতে পারছি না। সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিবন্ধী ভাতা পাই। সে ভাতার টাকায় সংসারের খরচ চলে না। ওই টাকায় মাসের ২০ থেকে ২২ দিন চলে। বাকি দিনগুলো গ্রামের অন্যান্য লোকদের কাছ থেকে চেয়ে খেয়ে না খেয়ে পার করতে হয়।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুইচিং মং মারমা বলেন, আমি চেষ্টা করব যেন তারা দ্রুত আর্থিক সহায়তা পান।

নিজ ঘরের সামনে বৃদ্ধা জোবেদা খাতুন। ছবি : কালবেলা
নিজ ঘরের সামনে বৃদ্ধা জোবেদা খাতুন। ছবি : কালবেলা


ক্যাম্পাসে নৃশংসতায় কারা? সাবেক ছাত্রলীগ নেতাসহ ৪ জন আটক

পর পর দু’টি ঘটনা। দু’টিই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। দু’জনকে পিটিয়ে বর্বর কায়দায় হত্যা করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন মানসিক ভারসাম্যহীন এক যুবক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতাকে। এই দুই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তোলপাড় চলছে দেশ জুড়ে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এমন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কাঠগড়ায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। যদিও দু’টি ঘটনায় দ্রুতই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদ ও দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্রআন্দোলনের নেতারা। এ ছাড়া বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনও ঘটনা দু’টির প্রতিবাদ এবং দায়ীদের বিচার দাবি করেছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানিয়েছেন আইন কারও হাতে তুলে নেয়ার সুযোগ নেই। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকের পর আইন বিচার, সংসদ বিষয়ক এবং প্রবাসী কল্যাণ ও সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল জানিয়েছেন, বিচারবিহর্ভূত কোনো হত্যাকাণ্ড গ্রহণযোগ্য হবে না। যারা জড়িত তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলের একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হলটির শিক্ষার্থীদের মধ্যে আন্তঃবিভাগ খেলা চলছিল। বুধবার ক্রিকেট খেলার সময় একটি ব্যাগে থাকা ৬টি মোবাইল হারিয়ে যায়। এ নিয়ে দিনভর উত্তপ্ত ছিল হলের পরিবেশ। হলের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সতর্ক করে দেন শিক্ষার্থীরা। এরপর রাত ৮টার দিকে ফুটবল খেলা চলছিল। সে সময় বহিরাগত তোফাজ্জল হলের ভেতরে ঘোরাফেরা করছিলেন। এ দেখে শিক্ষার্থীদের সন্দেহ হয়। তিনি বিভিন্ন জায়গায় হাঁটাচলা করতে থাকেন। তার বেশভূষা দেখে সন্দেহ হয় প্রথম বর্ষের কিছু শিক্ষার্থীর। তারা একটি কক্ষে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, আমরা রুমে নিয়ে ফোনের বিষয়ে জানতে চাই, সার্চ করি। কিজন্য এসেছে এখানে সেটাও জানতে চাই। তিনি অযাচিত কথা বলছিলেন। আমরা ভেবেছিলাম নেশাগ্রস্ত। তাকে হালকা চড় থাপ্পড় দেয়া হয়। তাকে মারলেও খুব একটা রিঅ্যাকশন দেখাতো না। নাম্বার চাইলে পরিবারের কয়েকজনের নাম্বার মুখস্ত বলেন তিনি। সেই নম্বরে কল দিয়ে জানতে পারি মানসিক ভারসাম্যহীন। একাধিক শিক্ষার্থী বলেন, একটা পর্যায়ে তোফাজ্জল বলতে শুরু করেন খিদা লাগছে ভাত খাবো। তখন তাকে ক্যান্টিনে নিয়ে যাওয়া হয়।
ক্যান্টিনে নিয়ে যাওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থীর মধ্যে ছিলেন আসিফ হাসান। তিনি বলেন, ক্যান্টিনে নিয়ে তাকে খেতে দিতে বলি। এরপর মুরগি ও সবজি দিতে বলি। তিনি এমনভাবে খাচ্ছিলেন দেখে মনে হচ্ছিল না খুব একটা ক্ষুধার্থ। এরপর নিজের থেকে মাছ খেতে চায়। তার জন্য শোল মাছ অর্ডার করা হয়। খাওয়ার সময় খুব নিশ্চিত মনে কথা না বলে খাচ্ছিলেন। তাকে যে চুরির দায় দেয়া হচ্ছে এনিয়ে কোনো চিন্তাই যেন নেই তার। সুন্দরমতো ভাত খেলেন।
প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, খাওয়া শেষে চুপ করে চেয়েছিলেন তোফাজ্জল। এই খাওয়ার সময়েই হলের নিজস্ব গ্রুপে ছড়িয়ে পড়ে মোবাইল চোর ধরা পড়েছে। ততক্ষণে ক্যান্টিনে বড় ভাইয়েরা চলে আসে। তাকে নিয়ে যাওয়া হয় হলের আরেকটি কক্ষে। এরপর সেখানে ২৫ থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থী ছিলেন। আর প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা রুমের বাইরে ছিলেন। মারার সময় খুব বারবার চুরি করেনি বলে মাপ চেয়েছিল। আর নির্যাতন করার সময় খুব একটা চিৎকার, কান্না না করায় আরও বেশি মারা হয়েছে। তিনি বলেন, একপর্যায়ে তার হাতের উপর লাঠি রেখে দুপাশে কয়েকজন করে দাঁড়িয়ে নির্যাতন করে। হাতের ও পায়ের আঙ্গুলগুলো থেতলে যেতে থাকে। বারবার বলা হচ্ছিল- বল তুই চুরি করেছিস? ফোনগুলো কোথায়? তিনি বারবার বলছিলেন- আমি মোবাইল চুরি করি নাই।
আরেক শিক্ষার্থী বলেন, মারধরের সময় পরিবারের বেশ কয়েকজনের ফোন নম্বর দিয়েছিলেন। ধারাবাহিক নির্যাতনের মধ্যেই হত্যাকাণ্ডে জড়িত শিক্ষার্থীরা কথা বলেন তার মামার সঙ্গে। তার মাধ্যমে মানসিক ভারসাম্যহীন জানার পরেও তাকে ছাড়েননি অভিযুক্ত শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম, সিনিয়র শিক্ষার্থীরা তাদের নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে জানান, তোফাজ্জলকে সবচেয়ে বেশি মারধর করেছেন ছাত্রলীগের সদ্য পদত্যাগ করা উপ-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক ও পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী জালাল আহমেদ, মৃত্তিকা পানি ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ সুমন, উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের ফিরোজ, পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের আব্দুস সামাদ, ফার্মেসি বিভাগের মোহাম্মদ ইয়ামুজ জামান এবং পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনিস্টিউটের মোত্তাকিন সাকিন। নির্যাতন করা শিক্ষার্থীদের সবাই ফজলুল হক মুসলিম হলের শিক্ষার্থী।
প্রাণীবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী সুলতান প্রথমে চোর সন্দেহে তাকে ধরে গেস্টরুমে নিয়ে আসেন। সূত্রটির তথ্যমতে, মারধরে জড়িত ছিলেন- মৃত্তিকা পানি ও পরিবেশ বিভাগের রাশেদ কামাল অনিক, গণিত বিভাগের রাব্বি এবং সমুদ্র বিজ্ঞান বিভাগের ওয়াজিবুল। তারা সবাই ওই হলের আবাসিক শিক্ষার্থী।
হলের প্রত্যক্ষদর্শী একজন শিক্ষার্থী ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, আমি হল গ্রুপে ৮টার সময় দেখি হলে চোর ধরা পড়েছে। হলের গেস্ট রুমে, গিয়ে দেখি চোর বসা। রুমে তখন প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা ছিলেন। গেস্টরুমে তাকে বেশি মারা হয়নি। ওখানে হালকা মারার পরে ক্যান্টিনে নিয়ে আসে খাওয়ানোর জন্য। তারপর শুনি তাকে এক্সটেনশন বিল্ডিং’র গেস্টরুমে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমি তখন ওখানে গিয়ে দেখি ২০-২১, ২১-২২ ও ২২-২৩ সেশনের ব্যাচ। সব মিলিয়ে প্রায় ৩০ জন। প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা ছিল, ওরা মারে নাই। ২০-২১ আর ২১-২২ সেশনের ওরা খুব বেশি মেরেছে। নির্যাতনের একপর্যায়ে তার মামাকে ফোন দিয়ে জানানো হয় ৩৫ হাজার টাকা পাঠাতে। তার মামা অপারগতা শিকার করলে আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন পেটানোর নেতৃত্ব দেয়া তিন চারজন। তারা বলেন, ও নাকি মানসিক ভারসাম্যহীন। তাহলে এতগুলো নম্বর মুখস্ত থাকে কীভাবে। আবার আরেকটি ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে শোনা যায় দুই লাখ টাকা দাবি করা হয়েছিল।
তিনি আরও জানান, দুই-তিনজন মিলেই ওরে ওখানে মেরে ফেলছে। এরা হলেন- মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের ২০-২১ সেশনের মোহাম্মদ সুমন, ওয়াজিবুল, ফিরোজ ও জালাল। এদের মধ্যে সুমন, ফিরোজ এবং জালাল সবচেয়ে বেশি মেরেছে। গেস্টরুমে হাত বেঁধেছে জালাল। সুমন চোখ বন্ধ করে মেরেছে, মারতে মারতে পড়ে যায়। এরপরে পানি এনে তাকে পানি খাওয়ানো হলে সে উঠে বসে। এরপর আবার শুরু হয় পেটানো। এই দফায়ও সবচেয়ে বেশি মেরেছে ফিরোজ। পরে পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের ১৮-১৯ সেশনের জালাল আসে। জালাল এসে আরও মারতে উৎসাহ দেয়। বলে ‘মার, ইচ্ছামতো মার; মাইরা ফেলিস না একবারে’। এ সময় গ্যাস লাইট দিয়ে পায়ে আগুনও ধরিয়ে দেয়। পরে সুমন এসে তোফাজ্জলের ভ্রু ও চুল কেটে দেয়।
ওই শিক্ষার্থী আরও বলেন, পরে ওখানে স্যার (হলের আবাসিক শিক্ষক) আসেন। আমি ওদেরকে অনেক ফেরানোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু ওরা মানেনি। এক্সটেনশন বিল্ডিং এর গেস্টরুম থেকে যখন তাকে বের করা হয় তখন স্যার এসে পড়েছেন। মারধরে তোফাজ্জলের ডান হাত এবং বাম পায়ের মাংসের কিছুটা অংশ খুলে পড়ে যায়। অনেকে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছে। আমি বলি কাপড় আনো, ওর পা বেঁধে দেই। কারণ ব্লিডিং হইলে তো সেন্সলেস হয়ে যাবে। পরে কাপড় এনে একটা জুনিয়র পা বেঁধে দেয়।
একপর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে শিক্ষার্থীরাই ঢাকা মেডিকেলে কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এর পরপরই লাশ রেখে শিক্ষার্থীরা হাসপাতাল থেকে যে যার মতো চলে যান।
সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জালাল অভিযোগের বিষয়ে বলেন, আমি স্যারের সঙ্গে ছিলাম। প্রথম ও দ্বিতীয় টার্মে পেটানোর বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। তৃতীয় টার্মে যখন যাই একটা স্টাম্প টেনে নেই। কিন্তু ভিডিওতে মনে হচ্ছে আমি পিটাইছি। আমি যদি পেটাতাম তাহলে আমি পালিয়ে যেতাম, ইন্টারভিউও দিতাম না।
জানা যায়, তোফাজ্জল হোসেন, বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কাঁঠালতলী ইউনিয়নের বাসিন্দা। সড়ক দুর্ঘটনায় বাবা-মা হারিয়েছেন আট বছর আগে। পরে প্রেমসংক্রান্ত বিষয়ে আঘাত পেয়ে হয়ে পড়েছিলেন মানসিক ভারসাম্যহীন। পুরো ঘটনা কয়েক ঘণ্টাব্যাপী চললেও ঘটনাস্থলে যাননি হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক শাহ মোহাম্মদ মাসুম। তাকে বারবার ফোন দিয়েও ঘটনার সময় পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরও প্রভোস্টকে ফোনে পাননি। যদিও রাতে ‘ঘুমিয়েছিলেন’ বলে  সকালে গণমাধ্যমকর্মীদের জানান। সদ্য নিয়োগ পাওয়া প্রভোস্টের নির্লিপ্ততার সমালোচনা করছেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা। তিনি প্রথমেই শক্তভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করলে এমন মর্মান্তিক ঘটনা এড়ানো যেতো বলে তাদের অভিমত।
এই ঘটনায় মধ্যরাতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বিক্ষোভ মিছিল করেছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ঘটনার বিচার চেয়ে মিছিল, প্রতিবাদ ও স্লোগান ও সমাবেশে গতকাল সারা দিন উত্তাল ছিল ঢাবি। এ ঘটনায় গতকাল সকাল থেকে তৎপর ছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলেন- মো. জালাল মিয়া, সুমন মিয়া, মো. মোত্তাকিন সাকিন, আল হুসাইন সাজ্জাদ ও আহসানউল্লাহ। জালাল মিয়া হল শাখা ছাত্রলীগের সাবেক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপ-সম্পাদক। কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে তিনি ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলেন।
ঢাবি প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমেদ বলেন, তোফাজ্জল হোসেনের মৃত্যুর ঘটনায় মামলা করে ঢাবি প্রশাসন। মামলায় অজ্ঞাতদের আসামি করা হয়েছে। শাহবাগ থানার ওসি শাহাবুদ্দিন শাহীন মামলা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমেদ আটক ও মামলার বিষয় নিশ্চিত করে বলেন, ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার নিশ্চিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করছে।
যা ঘটেছিল জাহাঙ্গীরনগরে: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫ই জুলাই রাতে ভিসি’র বাসভবনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে শাখা ছাত্রলীগের সাবেক নেতা শামীম আহমেদ ওরফে শামীম মোল্লাকে গণধোলাই দিয়ে পুলিশের হাতে সোপর্দ করেন শিক্ষার্থীরা। পরে তিনি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।
বুধবার বিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রান্তিক গেট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। গণধোলাইয়ের পর তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডির হাতে তুলে দেয় শিক্ষার্থীরা। সেখানে তালা ভেঙে তাকে মারধর করা হয়। পরে তাকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, বিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রান্তিক গেট সংলগ্ন একটি দোকানে অবস্থান করছিলেন শামীম মোল্লা। তার অবস্থানের খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী সেখানে গিয়ে তাকে আটক করে গণধোলাই দেয়। পরে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম উপস্থিত হয়। একপর্যায়ে নিরাপত্তাকর্মীদের সহায়তায় তাকে নিরাপত্তা শাখায় নিয়ে আসা হয়। সেখানেও ছাত্রদলের একটি টিম কেচিগেইটের তালা ভেঙে তাকে বেধড়ক মারধর করে। ফলে শামীম মোল্লা মারা যেতে পারে বলে ধারণা করছে সংশ্লিষ্টরা।
এ ঘটনায় একটি ভিডিও থেকে প্রাথমিকভাবে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কয়েকজনকে শনাক্ত করা গেছে। তারা হলেন- সাঈদ হোসেন ভূঁইয়া, রাজু আহমেদ এবং রাজন হাসান, হামিদুল্লাহ সালমান এবং এমএন সোহাগ, ইংরেজি বিভাগের ৫০ ব্যাচের মাহমুদুল হাসান রায়হান, ইতিহাস বিভাগের ৪২ ব্যাচের জোবায়ের।
তবে প্রান্তিক গেইটের ঘটনায় আহসান লাবিব ও আতিক নামে দু’জন জড়িত। তবে তারা নিরাপত্তা শাখায় শামীম মোল্লাকে তুলে দেয়। পরে একদল ছাত্রদলকর্মী তালা ভেঙে তাকে মারধর করেন। সাঈদ হোসেন ভূঁইয়া ৩৩তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। এছাড়া রাজু আহমেদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ৪৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ও রাজন হাসান ৪৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থী, হামিদুল্লাহ সালমান ইংরেজি ৪৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ও এমএন সোহাগ কম্পিউটার সায়েন্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৪৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। নিরাপত্তা কার্যালয়ের ভেতরে চেক শার্ট পরিহিত অবস্থায় শামীমকে পেটায় আরেকজন। এ সময় তার হাতে গাছের ডাল দেখা গেছে। এ দিয়েই পিটিয়েছেন তিনি। তাকে রাজু আহমেদ বলে শনাক্ত করা গেছে।
মারধরের সম্পৃক্ততার বিষয়ে সাঈদ বলেন, কেউই হত্যার উদ্দেশ্যে তাকে মারধর করেনি। একজন সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে আমি দেখতে গিয়েছিলাম। আর একজন মানুষ যিনি হেঁটে পুলিশের গাড়িতে গেছে আর কিছুক্ষণের মধ্যে মারা গেছেন এর রহস্য উদ্‌ঘাটন করা জরুরি।
এ বিষয়ে রাজু আহমেদ বলেন, আমি সাধারণ শিক্ষার্থীদের থেকে শোনার পর সেখানে গেছিলাম। সেখানে গিয়ে আমি শামীমকে ধমক দিই, তাকে মারধর করিনি। রাজন হাসান বলেন, আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম কিন্তু মারার জন্য সেখানে যায়নি। যারা তালা ভাঙার চেষ্টা করছিল তাদের আমি নিষেধ করেছিলাম। হামিদুল্লাহ সালমান বলেন, আমি সন্ধ্যায় হলে ছিলাম। পরে খবর পেয়ে প্রক্টর অফিসে যাই কিন্তু শামীম মোল্লাকে মারধর করিনি। সোহাগ বলেন, আমি টিউশন থেকে ফেরার পথে হইচই দেখে সেখানে গিয়েছিলাম কিন্তু মারধর করিনি।
শিক্ষার্থীরা জানায়, শামীম মোল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রলীগের জুয়েল-চঞ্চল কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক। শামীম বিশ্ববিদ্যালয় ও এর আশেপাশের এলাকায় মাদক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, জমিদখল, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত। এছাড়া তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও রয়েছে। গত ১৫ই জুলাই রাতে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় সে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে।
এ ঘটনার পর প্রক্টরিয়াল টিমের খবরে আশুলিয়া থানা পুলিশের একটি দল নিরাপত্তা শাখায় আসে। এ সময় পুলিশ ও প্রক্টরিয়াল টিম শামীমকে ১৫ই জুলাই রাতে ভিসি’র বাসভবনে হামলার ঘটনার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। এ সময় শামীম মোল্লা হামলার ঘটনায় নিজের অংশগ্রহণ ও ঘটনাস্থলে হামলাকারীদের সঙ্গে ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষক মেহেদী ইকবাল উপস্থিত থাকার কথা স্বীকার করে।
শামীম মোল্লা জানান, ১৫ই জুলাই রাতে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা এলাকা থেকে হামলা করতে নিয়ে যাওয়া হয়। তারেক ও মিজান নামে সাবেক দুই ছাত্রলীগ নেতা তাকে বঙ্গবন্ধু হলে নিয়ে যায়। সেখানে ছাত্রলীগ সভাপতি সোহেলের নেতৃত্বে পেট্রোল বোমা তৈরি করা হচ্ছিল এবং হামলার জন্য দেশীয় ও আগ্নেয়াস্ত্র প্রস্তুত করা হচ্ছিল। প্রস্তুতি শেষে ভিসি’র বাসভবনে হামলা করতে যাওয়া হয়। হামলার সময় তারেক এক রাউন্ড গুলি ছোড়ে বলে জানায়।
এদিকে, সন্ধ্যা ৭টায় প্রক্টর অফিসে আসেন ভিসি অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান। তিনি উত্তেজিত শিক্ষার্থীদের শান্ত করার চেষ্টা করেন ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তার শাস্তি নিশ্চিতের আশ্বাস দেন। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক একেএম রাশিদুল আলম বলেন, ১৫ই জুলাই ভিসি’র বাসভবনে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগে সাবেক এক ছাত্রলীগ নেতাকে শিক্ষার্থীরা আটক করে প্রক্টরিয়াল বডির হাতে তুলে দেয়। আমরা আশুলিয়া থানায় অবহিত করলে পুলিশের একটি টিম আসে। ওই ছাত্রলীগ নেতার নামে আগেও বেশ কয়েকটি মামলা আছে। তাকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়েছে।
তবে তিনি গণধোলাইয়ে মৃত্যুর বিষয়টিকে অস্বাভাবিক উল্লেখ করে বলেন, তাকে শিক্ষার্থীরা আটকের পর মারধর করে প্রক্টরিয়াল বডির হাতে তুলে দেয়। পরে আমরা আশুলিয়া থানায় অবহিত করলে পুলিশের একটি টিম এসে তাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। এরপর পুলিশে সোপর্দ করলে তিনি নিজে হেঁটে পুলিশের গাড়িতে ওঠেন। তখন তাকে দেখে আশঙ্কাজনক মনে হয়নি। পরবর্তীতে পুলিশের গাড়িতে মৃত্যুর বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। বিষয়টি ভালোভাবে না জেনে মন্তব্য করতে পারছি না। 

mzamin

হ্যারোডসের নারী কর্মীদের ওপর যৌন নিপীড়ন চালাতেন মালিক আল ফায়েদ

যুক্তরাজ্যের অভিজাত বিপণিবিতান ‘হ্যারোডস’। একসময় দোকানটির মালিক ছিলেন ধনকুবের মোহামেদ আল ফায়েদ। ২০২৩ সালে ৯৪ বছর বয়সে মারা যান তিনি। এখন তাঁর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ এনেছেন হ্যারোডসের পাঁচ নারী কর্মী।

‘আল ফায়েদ: হ্যারোডসের শিকারি’ শিরোনামে সম্প্রতি একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রকাশিত হয়। তাতে তুলে ধরা হয়, হ্যারোডসের নারী কর্মীদের ওপর মালিক আল ফায়েদের যৌন নিপীড়নের নানা তথ্যপ্রমাণ। হ্যারোডসের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সে সময় ফায়েদের এসব কর্মকাণ্ডে কোনো হস্তক্ষেপ নেয়নি। বরং অভিযোগগুলো ধামাচাপা দেওয়ায় ভূমিকা রেখেছিল।

প্রামাণ্যচিত্রটি প্রকাশের পর থেকে হ্যারোডসের আরও অনেক সাবেক কর্মী বিবিসির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। আল ফায়েদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন তাঁরা। এমন ২০ নারী বিবিসিকে জানিয়েছেন, তাঁরা আল ফায়েদের হাতে যৌন নিপীড়ন বা ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন।

যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের এসব ঘটনা ঘটেছে যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডন, ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস ও সেন্ট ত্রোপেজ এলাকা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি শহরে। ভুক্তভোগী এই নারীদের হয়ে কাজ করা আইনজীবী ব্রুস ড্রামমন্ডের ভাষ্য, হ্যারোডসের ভেতরে দুর্নীতি ও নিপীড়নের যে জাল বোনা হয়েছিল, তা ছিল অবিশ্বাস্য ও খুবই অন্ধকার।

ভুক্তভোগী এমনই এক নারী হ্যারোডসের ‘অন্ধকার’ জগতের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, লন্ডনের পার্ক লেনের একটি বাসায় তাঁকে ধর্ষণ করেছিলেন আল ফায়েদ। এতে তাঁর কোনো সম্মতি ছিল না। সেটা ফায়েদকেও জানিয়েছিলেন। তবে কোনো কাজ হয়নি।

লন্ডনের মেফেয়ার এলাকার আরেক নারীও আল ফায়েদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ এনেছেন। ঘটনার সময় তিনি ছিলেন একজন কিশোরী। ওই নারী বলেন, মোহামেদ আল ফায়েদ একজন রাক্ষসের মতো ছিলেন। তিনি একজন যৌন নিপীড়নকারী। তাঁর মধ্যে কোনো নৈতিকতা ছিল না। হ্যারোডসের সব কর্মী তাঁর কাছে ‘খেলনার’ মতো ছিলেন।

ফেরিওয়ালা থেকে ধনকুবের

মোহামেদ আল ফায়েদের জীবনের শুরুর দিকটা অতটাও সহজ ছিল না। তাঁর পেশাজীবন শুরু হয়েছিল মিসরের আলেকজান্দ্রিয়ার রাস্তায়। পথচারীদের কাছে পানীয় ফেরি করে বিক্রি করতেন তিনি। পরে সৌদি আরবের একজন ধনী অস্ত্র ব্যবসায়ীর বোনকে বিয়ে করেন তিনি। তারপর নতুন দুনিয়ায় পা রাখেন ফায়েদ। ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য।

১৯৭৪ সালে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান আল ফায়েদ। ১৯৮৫ সালে যখন হ্যারোডস কিনে নেন, তত দিনে তিনি পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন। গত শতকের নব্বইয়ের দশক ও চলতি শতকের শুরুর দশকে বিভিন্ন টেলিভিশন টক শো ও বিনোদন অনুষ্ঠানে নিয়মিত দেখা যেত তাঁকে।

মোহামেদ আল ফায়েদের আরেকটি পরিচয় রয়েছে। তিনি দোদি ফায়েদের বাবা। ১৯৯৭ সালে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় দোদি ও প্রিন্সেস অব ওয়েলস ডায়ানা নিহত হন। সে সময় দুজনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্কের গুঞ্জন উঠেছিল। এ নিয়ে ‘দ্য ক্রাউন’ নামে নেটফ্লিক্সে সম্প্রতি একটি ধারাবাহিক প্রচারিত হয়েছে। ফলে নতুন প্রজন্মের কাছেও ডায়ানা-দোদি বেশ পরিচিত।

যাহোক, হ্যারোডস কিনে নেওয়ার পর নিয়মিত দোকানটির পণ্য বিক্রির সুবিশাল কক্ষগুলো পরিদর্শনে যেতেন আল ফায়েদ। প্রতিষ্ঠানটির সাবেক কর্মীরা বিবিসিকে জানিয়েছেন, এই পরিদর্শনের সময় কোনো তরুণী কর্মীকে চোখে লাগলে পদোন্নতি দিয়ে ওপরের তলায় নিজের অফিসে কাজ দিতেন তিনি।

তারপর ওই কর্মীর ওপর নিপীড়ন চালানো হতো। কখনো তা করা হতো হ্যারোডসের অফিসে, কখনো আল ফায়েদের লন্ডনের বাসায়, কখনো আবার বিদেশ সফরে গিয়ে। বিদেশে আল ফায়েদের নিপীড়নের কথা বলতে গেলে আসে প্যারিসের রিৎজ হোটেলের কথা। ওই হোটেলেরও মালিক তিনি। এ ছাড়া কাছেই তাঁর উইন্ডসোর ভিলাতেও চলত যৌন নিপীড়ন।

আল ফায়েদের নিপীড়নের বিষয়টি হ্যারোডসের সাবেক কর্মীরাও জানতেন। যেমন অ্যালিস (ছদ্মনাম) নামের এক কর্মী বলেন, ‘আমরা একে অপরের দিকে তাকাতাম আর ভাবতাম, “তুমি এক অভাগা মেয়ে। আজকের শিকার তুমি।” আর এটা থামাতে না পারার জন্য নিজেদের খুবই দুর্বল মনে হতো।’

‘তিনি আমাকে ধর্ষণ করেন’

নব্বইয়ের দশকে আল ফায়েদের ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করতেন র‍্যাচেল (ছদ্মনাম)। একদিন রাতে তাঁকে লন্ডনের পার্ক লেনে ফায়েদের বাসায় ডাকা হয়। সেখানে যাওয়ার পর নিজের বিছানায় তাঁকে বসান ফায়েদ। তাঁর পায়ে হাত রাখেন। তখন র‍্যাচেল বুঝতে পারেন, কী হতে চলেছে। তিনি বলেন, ‘তিনি আমাকে ধর্ষণ করেন।’

এই পার্ক লেনের বাসায় আল ফায়েদের যৌন নিপীড়নের শিকার ১৩ নারীর সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসি। তাঁদের মধ্যে র‍্যাচেলসহ চারজন ধর্ষণের অভিযোগ এনেছেন। যেমন সোফিয়া। তিনি বলেন, ‘এর (নিপীড়নের) বাইরে যাওয়ার সুযোগ ছিল না আমার। আমার কোনো পরিবার ছিল না। জানতাম, এর মধ্য দিয়েই আমাকে যেতে হবে। তবে এমনটা হোক তা চাইতাম না।’

গিমা নামের আরেক নারী ২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত আল ফায়েদের ব্যক্তিগত সহকারী ছিলেন। তিনি জানান, বিদেশ সফরে গিয়ে ফায়েদের আচরণ আরও ভয়ংকর হয়ে উঠত। প্যারিসের উইন্ডসোর ভিলায় তাঁকে ধর্ষণ করা হয়েছিল। তাঁর (গিমা) শোবার কক্ষে ঢুকেই ধর্ষণ করেছিলেন ফায়েদ। এরপর ডেটল দিয়ে শরীর ধুয়ে ফেলতে বলেছিলেন। কারণ, তিনি কোনো প্রমাণ রাখতে চাননি।

এ ছাড়া প্যারিসে আল ফায়েদের মালিকানাধীন বিভিন্ন সম্পত্তিতে যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার কথা বিবিসিকে জানিয়েছেন আরও আট নারী। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন এই নিপীড়নকে ‘ধর্ষণের চেষ্টা’ আখ্যায়িত করেছেন।

আল ফায়েদের এই কর্মকাণ্ডের বিষয়টি জানলেও মুখ খুলতেন না হ্যারোডসের অনেক কর্মী। যেমন টনি লেমিং। ১৯৯৪ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত হ্যারোডসের ডিপার্টমেন্টাল ম্যানেজার ছিলেন তিনি। লেমিং বলেন, নারী নিপীড়নের যেসব ঘটনা হ্যারোডসের ভেতরেই ঘটেছিল, সেগুলো সম্পর্কে তিনি জানতেন। এটা গোপন কিছু ছিল না। নিপীড়নের বিষয়টি সবাই জানতেন।

লেমিংয়ের মতোই সোজাসাপটা স্বীকারোক্তি দিয়েছেন আল ফায়েদের নিরাপত্তারক্ষী দলের সাবেক সদস্যরাও। ১৯৭৯ সালে হ্যারোডসে নিরাপত্তা রক্ষার কাজে যোগ দিয়েছিলেন ইমন কোইলি। পরে ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত নিরাপত্তা দলের উপপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। কোইলি বলেন, ‘আমরা জানতাম যে তরুণীদের প্রতি তাঁর (ফায়েদ) তুমুল আগ্রহ ছিল।’
ভয়ের সংস্কৃতি

বিবিসির সঙ্গে কথা বলা নারীরা জানিয়েছেন, তাঁরা হ্যারোডসে কাজ করার সময় ভয়ের মধ্যে থাকতেন। এ কারণে আল ফায়েদের বিরুদ্ধে মুখ খোলাটা তাঁদের জন্য কঠিন ছিল। সারাহ (ছদ্মনাম) নামের একজন বলেন, দোকানে একটি ভয়ের সংস্কৃতি চালু ছিল। সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা থেকে একেবারে নিচের স্তরের কর্মীরাও সব সময় ভয়ের মধ্যে থাকতেন।

হ্যারোডসের কর্মীদের ফোনকলে আড়ি পাতা হতো বলেও বিশ্বাস করতেন অনেকে। নারীরা আল ফায়েদের ‘অপকর্ম’ নিয়ে একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে ভয় পেতেন। কারণ, তাঁরা মনে করতেন, গোপন ক্যামেরা তাঁদের ওপর সব সময় নজর রাখছে।

হ্যারোডসের সাবেক নিরাপত্তা কর্মকর্তা ইমন কোইলি জানিয়েছেন, কীভাবে তিনি কর্মীদের কল রেকর্ডগুলো খতিয়ে দেখতেন। দোকানজুড়েই নাকি গোপন ক্যামেরা স্থাপন করা ছিল। এমনকি নির্বাহীদের কক্ষেও এ ধরনের ক্যামেরা রাখা ছিল। কোইলি বলেন, মন চাইলেই আল ফায়েদ যে কারও ওপর নজরদারি করতেন।

আল ফায়েদের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিবিসির সঙ্গে কথা বলেছে হ্যারোডসের বর্তমান কর্তৃপক্ষ। এক বিবৃতিতে তারা ওই কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে বলেছে, ১৯৮৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত হ্যারোডসের মালিক ছিলেন আল ফায়েদ। বর্তমান মালিকানায় এটি অনেক ভিন্ন একটি প্রতিষ্ঠান। এখন হ্যারোডস কর্মীদের কল্যাণে কাজ করে।

আল ফায়েদের নিপীড়নের ঘটনাগুলো আগেও সামনে এসেছে। ১৯৯৫ সালে এমনই এক চেষ্টা করেছিল মার্কিন সাময়িকী ‘ভ্যানিটি ফেয়ার’। ফায়েদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদ, কর্মীদের ওপর নজরদারি ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এনে প্রবন্ধ ছাপিয়েছিল। এ ছাড়া তাঁর যৌন নিপীড়ন নিয়ে ১৯৯৭, ২০১৭ ও ২০১৮ সালে বেশ কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছিল।

তবে আল ফায়েদের মৃত্যুর পর এই প্রথমবারের মতো ভুক্তভোগী অনেক নারী তাঁর যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে সরাসরি কথা বলার সাহস দেখালেন। যেমন ভুক্তভোগী নারী গিমা বলছিলেন, ‘আমি বহু বছর মুখ বন্ধ করে ছিলাম। কোনো কথা বলিনি। আমি মনে করি, এখন এটা নিয়ে কথা বললে কাজে আসবে। আমাদের সবাই এখন দীর্ঘদিনের এই বেদনা থেকে মুক্ত হতে পারব।’

মোহামেদ আল ফায়েদ
মোহামেদ আল ফায়েদফাইল ছবি: রয়টার্স

‘অনেকে আঙুল হারিয়েছেন, অনেকে চোখ’: বিস্ফোরণের পর কী ভাবছেন লেবাননের বাসিন্দারা

রাজধানী বৈরুতসহ লেবাননের বিভিন্ন অঞ্চলে গতকাল বুধবার দ্বিতীয় দিনের মতো ইলেকট্রনিক ডিভাইসে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এতে অনেক স্থানে আগুন ধরে গেছে। হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। গতকালের এই হামলার জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করা হচ্ছে।

লেবাননের জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, বুধবারের হামলায় ২০ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন সাড়ে চার শ জনের বেশি। আগের দিন মঙ্গলবার দেশটির সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহর ব্যবহৃত হাজার হাজার পেজারে (যোগাযোগের যন্ত্র) বিস্ফোরণ হয়। এতে ১২ জন নিহতসহ আহত হন প্রায় ৩ হাজার মানুষ।

এই দুটি হামলার ঘটনা এত কাছাকাছি সময়ে ঘটল যে লেবাননের অনেক বাসিন্দাই এখন তাঁদের ব্যবহার করা ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে শঙ্কার মধ্যে রয়েছেন। দেশের নিরাপত্তা কোন পর্যায়ে রয়েছে, তা নিয়েও মানুষের উদ্বেগ রয়েছে।

বুধবার বিস্ফোরিত হওয়া ডিভাইসগুলোর মধ্যে ছিল মুঠোফোন, ল্যাপটপ, সৌর বিদ্যুতের ব্যাটারি ও ওয়াকিটকি। সেগুলো প্রায় পাঁচ মাস আগে একই সময়ে কেনা হয়েছিল। মঙ্গলবার বিস্ফোরিত হওয়া পেজারগুলোও সেই সময়ে কেনা। এই ডিভাইস বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে বৈরুত ও এর দক্ষিণ উপকণ্ঠে এবং হেরমেল, বালবেক, সাইদা, নাবাতিয়েহ, তিরে, নাকৌরা ও মারজাইয়োউন শহরে।

‘আমরা আসলেই জানি না’

লেবাননের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা সন্দেহজনক ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলো বুধবার সন্ধ্যায় ধ্বংস করছিলেন দেশটির কর্মকর্তারা। এদিন বিস্ফোরিত হওয়া ডিভাইসগুলো বেশ ‘আধুনিক’ ও দেশটিতে ব্যাপক হারে ব্যবহার করা হয়। এ কারণেই সেগুলো লেবাননের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

লেবাননে বিয়েসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা ও আয়োজন করে থাকেন মারিয়া বোস্তানি। এ ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজনে দলের সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ওয়াকিটকি ব্যবহার করেন তাঁরা। বুধবারের বিস্ফোরণের পর নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভেবে দলের সবাইকে ওয়াকিটকি ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন মারিয়া।

মারিয়া বলেন, তাঁদের ব্যবহার করা ওয়াকিটকি এবং বিস্ফোরিত হওয়া ওয়াকিটকিগুলো একই প্রতিষ্ঠানের তৈরি নয়। তবে তাঁরা জানেন না আসলেই কী ঘটছে। এ কারণে যোগাযোগের জন্য দলের সদস্যদের মুঠোফোনে বার্তা আদান–প্রদানের অ্যাপ হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করতে বলেছেন। তাঁর ভাষ্য, ‘নিরাপদে থাকাটাই ভালো।’

অনেকেই আঙুল ও চোখ হারিয়েছেন

মঙ্গলবার পেজার বিস্ফোরণে যাঁরা আহত হয়েছেন, তাঁদের অনেকেই ভর্তি আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব বৈরুত মেডিকেল সেন্টারে (এইউবিএমসি)। গতকাল হাসপাতালটির বাইরে তাঁদের অনেকের আত্মীয় ও বন্ধুদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। আহতদের বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছিলেন তাঁরা।

হাসপাতালের ভেতরে আরেক চিত্র। রক্ত দান করতে আসা অনেককে ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন নার্সরা। লোকজনকে তাঁরা বলছিলেন, মঙ্গলবার অনেকেই রক্ত দিতে এসেছেন। তাই বুধবার আর রক্তের প্রয়োজন নেই।

এইউবিএমসির প্রধান মেডিকেল অফিসার সালাহ জেইনেলদিনে বলছিলেন, এই হাসপাতালে এখনো ১৪০ জন রোগী ভর্তি। অনেকের আঘাত গুরুতর, তবে আশঙ্কাজনক নয়। অনেকে আঙুল ও চোখ হারিয়েছেন। আহত অনেককে এখনো অস্ত্রোপচারের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

‘আমাদের মনে ভয় বলে কিছু নেই’

বুধবার যাঁরা এইউবিএমসির সামনে অবস্থান করছিলেন, তাঁদের অনেকেই গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে চান না। কাছাকাছি অবস্থান করা ৪০ বছর বয়সী আলী বললেন, হাসপাতালে তিনি আহত একজনের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। তবে তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক কী, তা জানালেন না।

আলী বললেন, এক দিন আগে তিনি বৈরুতের দক্ষিণ উপকণ্ঠে অবস্থান করছিলেন। তখন ধারাবাহিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনেন। প্রতি ৫ থেকে ১০ সেকেন্ড পরপর বিস্ফোরণ হচ্ছিল। মঙ্গলবারের এই হামলাকে ‘বোকামি’ বলে মনে করেন আলী। তিনি বলেন, ‘(লেবাননের) মানুষ অনেক শক্ত। আমাদের মনে ভয় বলে কিছু নেই।’

মঙ্গলবারের হামলার পর চিকিৎসকদের কাজে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে বৈরুতের মাউন্ট লেবানন হাসপাতালে যান একজন চিকিৎসক। তিনি বলেন, হাসপাতালটি রোগীতে ভর্তি। তিনতলার প্রতি তলাতে অন্তত ২০ জন করে রোগী রয়েছেন। কার কী ধরনের চিকিৎসা প্রয়োজন, তা তিনিসহ অন্য চিকিৎসকেরা খতিয়ে দেখছেন।

মাউন্ট লেবানন হাসপাতালের এই চিকিৎসক বলেন, আহত সবাই পুরুষ। তাঁদের বয়স ত্রিশের কোঠায়। বেশির ভাগেরই মুখমণ্ডল ও হাতে আঘাত লেগেছে। তিনি বলেন, ‘তাঁদের আঘাতগুলো ভয় ধরিয়ে দেওয়ার মতো। তবে তাঁরা স্বাভাবিক রয়েছেন। ভীত বা শঙ্কিত নন। যেন বলতে চাচ্ছেন—“আমাকে ছেড়ে দিন। ঠিক হয়ে উঠব।”’

কী ঘটতে যাচ্ছে

দুই দিনের হামলার পর লেবাননের অনেক বাসিন্দার মনে প্রশ্ন—কী ঘটতে যাচ্ছে? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই বিতর্ক উঠেছে যে এই হামলাগুলো সুনির্দিষ্ট কাউকে লক্ষ্য করে বা নির্বিচার চালানো হয়েছে কি না? এতে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হয়েছে বলেও মনে করছেন অনেকে।

গত বছরের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর প্রায় প্রতিদিনই লেবানন সীমান্তে পাল্টাপাল্টি হামলা চালাচ্ছে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েল। হিজবুল্লাহ বলছে, ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাসের সমর্থনে তাদের এ লড়াই। গাজায় যুদ্ধবিরতি হলেই তারা থামবে। অপর দিকে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধের মাত্রা বাড়াতে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল।

মঙ্গলবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দেশটির যুদ্ধের লক্ষমাত্রা বাড়ানোর ঘোষণা দেন। এই লক্ষ্যমাত্রায় তিনি উত্তর ইসরায়েলে ফিরে যাওয়া দেশটির বাসিন্দাদেরও যুক্ত করতে বলেন। হিজবুল্লাহর হামলার মুখে লেবানন সীমান্তবর্তী এই অঞ্চল থেকে চলে গিয়েছিলেন তাঁরা। ইসরায়েলিদের অনেকেই মনে করেন, হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধের মাধ্যমেই কেবল এর সমাধান সম্ভব।

এদিকে ইসরায়েলি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, লেবাননে সম্ভাব্য অভিযান চালাতে তদবির করছেন ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর নর্দান কমান্ডের শীর্ষ জেনারেল। আর দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট বুধবার বলেছেন, যুদ্ধ ‘নতুন মাত্রায়’ প্রবেশ করেছে।

তবে ইসরায়েল কোনো হামলা চালালে জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে হিজবুল্লাহ। গোষ্ঠীটির নির্বাহী কাউন্সিলের প্রধান হাশেম সাফিয়েদ্দিন বলেন, ইসরায়েলের মঙ্গলবারের হামলার জবাব দেওয়া হবে। আর সেটি হবে ‘বিশেষ একটি সাজা’।

লেবাননের বালবেক শহরে গতকাল বুধবার বিস্ফোরিত হওয়া একটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস
লেবাননের বালবেক শহরে গতকাল বুধবার বিস্ফোরিত হওয়া একটি ইলেকট্রনিক ডিভাইসছবি: এএফপি
জাপানি প্রতিষ্ঠান আইকমের এই ওয়াকিটকিগুলো বিস্ফোরিত হয়েছে বুধবার
জাপানি প্রতিষ্ঠান আইকমের এই ওয়াকিটকিগুলো বিস্ফোরিত হয়েছে বুধবারছবি: এএফপি

 


ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর: দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে দুজনকে পিটিয়ে হত্যা, তীব্র ক্ষোভ

ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে একই দিনে দুজনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম (এফ এইচ) হলে চোর সন্দেহে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করেন একদল শিক্ষার্থী। আর জাহাঙ্গীরনগরে ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতাকে কয়েক দফা মারধর করে হত্যা করা হয়। এ দুটি ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গতকাল বৃহস্পতিবার শাহবাগ থানায় মামলা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় জড়িত অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়টির ছয় শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁদের একজন ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগী নেতা, অন্যদের রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক সমন্বয়ক ও ছাত্রদলের চার নেতা-কর্মীসহ কিছু শিক্ষার্থী জড়িত বলে জানা গেছে। এর মধ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আহসান লাবিবকে সংগঠন থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। গতকাল এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আট শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে এবং ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

এদিকে খাগড়াছড়িতে মোটরসাইকেল চুরির অভিযোগে মোহাম্মদ মামুন নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। বুধবার ভোরের এ ঘটনার জের ধরে গতকাল দীঘিনালায় পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

এর আগে ৭ সেপ্টেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আবদুল্লাহ আল মাসুদকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিভিন্ন জায়গায় ‘মব জাস্টিস’ (উচ্ছৃঙ্খল জনগোষ্ঠীর বিচার) চলতে দেখা যাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান জানানো হলেও এ ধরনের ঘটনা ঘটে চলেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যাকাণ্ড

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত বুধবার দুপুরে এফ এইচ হলের মাঠে শিক্ষার্থীদের খেলা চলাকালে কয়েকজনের মুঠোফোন ও মানিব্যাগ চুরি হয়। পরে রাত আটটার দিকে তোফাজ্জল হোসেন নামের এক যুবক মাঠে ঢুকলে তাঁকে চোর সন্দেহে ধরে হলের অতিথিকক্ষে নিয়ে যান শিক্ষার্থীরা। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে শুরু হয় মারধর। পরে ওই যুবককে হলের ক্যানটিনে রাতের খাবার খাওয়ানো হয়। এরপর আবার আরেকটি অতিথিকক্ষে নিয়ে পেটানো হয়। মারধরের ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।

মারধরের খবর পেয়ে হলের আবাসিক শিক্ষকেরা রাত ১০টার দিকে ঘটনাস্থলে গেলেও তোফাজ্জলকে উদ্ধার করতে পারেননি। গুরুতর আহত অবস্থায় রাত ১২টার পর তোফাজ্জলকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান কয়েকজন শিক্ষার্থী। রাত পৌনে একটার দিকে ওই যুবককে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।

গতকাল বিকেলে ছয় শিক্ষার্থীকে এফ এইচ হল থেকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তাঁরা হলেন জালাল মিয়া, মোহাম্মদ সুমন, মোত্তাকিন সাকিন, আল হোসাইন সাজ্জাদ, আহসানউল্লাহ ও ওয়াজিবুল আলম। তাঁরা সবাই এফ এইচ হলের আবাসিক শিক্ষার্থী। জালাল মিয়া হল শাখা ছাত্রলীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপসম্পাদক ছিলেন। কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে তিনি ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগে করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচিতে সক্রিয় হন।

গ্রেপ্তারের আগে জালাল মিয়া প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, জুনিয়র কিছু শিক্ষার্থী সন্দেহের বশে ওই যুবককে হলের অতিথিকক্ষে ধরে এনে স্টাম্প দিয়ে মারধর করেন। শিক্ষকেরা ডাকলে তিনি সেখানে যান। তবে তিনি কাউকে মারধর করেননি। তিনি জুনিয়রদের বোঝানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।

ঘটনা তদন্তে এফ এইচ হলের আবাসিক শিক্ষক আলমগীর কবিরকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের কমিটি করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমেদ গতকাল সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, ইতিমধ্যে এফ এইচ হলের চার শিক্ষার্থীকে শাহবাগ থানায় সোপর্দ করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি শুক্রবার সকালে প্রতিবেদন দেবে।

জানা গেছে, নিহত তোফাজ্জলের (৩২) গ্রামের বাড়ি বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কাঁঠালতলী ইউনিয়নে। তাঁর আসল নাম মাসুদ কামাল। একসময় কাঁঠালতলী ইউনিয়ন শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন তিনি। তোফাজ্জলের ভাবি শরীফা আক্তার প্রথম আলোর পাথরঘাটা প্রতিনিধিকে বলেন, বাবা, মা ও একমাত্র বড় ভাইয়ের মৃত্যুর পর তোফাজ্জল মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন।

বিক্ষোভ, প্রতিবাদ

তোফাজ্জলের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বুধবার রাতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। গতকাল ভোরে টিএসসির রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে বিক্ষোভ করেন কিছু শিক্ষার্থী। সকালে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়কে বিক্ষোভ মিছিলের পর এফ এইচ হলের প্রাধ্যক্ষের কার্যালয়ের সামনেও বিক্ষোভ করেন ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্র ফেডারেশনসহ বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের কিছু নেতা-কর্মী। বিকেলের দিকে ‘গণতন্ত্রকামী শিক্ষার্থীবৃন্দ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’–এর ব্যানারে ক্যাম্পাসে আরেকটি বিক্ষোভ কর্মসূচি হয়। এসব কর্মসূচি থেকে যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাকে ‘মব জাস্টিস’ আখ্যা দিয়ে বিচারবহির্ভূত এ হত্যাকাণ্ডের নিন্দা-প্রতিবাদ ও বিচার দাবি করা হয়।

জাহাঙ্গীরনগরে হত্যা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পিটুনিতে নিহত শামীম আহমেদ ওরফে শামীম মোল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গত বুধবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের জয় বাংলা ফটকের একটি সেলুনের সামনে পরিচিত একজনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন শামীম। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থী সেখানে শামীমকে মারধর শুরু করেন। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা তাঁকে টেনে ক্যাম্পাসের ভেতরে নিয়ে আরও কয়েকজন মিলে মারধর করেন।

সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম এবং নিরাপত্তা শাখার কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে যান। তাঁরা শামীমকে প্রক্টর কার্যালয়ের নিরাপত্তা শাখার করিডরে নিয়ে যান। কিছুক্ষণ পর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা–কর্মী সেখানে গিয়ে শামীমকে আবার মারধর করেন।

প্রক্টরিয়াল টিম তাঁকে উদ্ধার করে নিরাপত্তা শাখার করিডরে রেখে ফটকে তালা দেয়। এরপর ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা–কর্মী তালা ভেঙে শামীমকে বেধড়ক মারধর করেন।

বুধবার রাত সোয়া আটটার দিকে প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্যরা গুরুতর আহত শামীমকে আশুলিয়া থানা–পুলিশের কাছে সোপর্দ করলে পুলিশ রাত নয়টার দিকে সাভারের গণ স্বাস্থ্য মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক শামীমকে মৃত ঘোষণা করেন।

আশুলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কামাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ময়নাতদন্ত শেষে শামীম মোল্লার মরদেহ পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেউ অভিযোগ করলে আইন অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, গত ১৫ জুলাই রাতে ছাত্র আন্দোলনের সময় শামীমসহ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের কিছু নেতা-কর্মী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালান। এই অভিযোগে বুধবার তাঁকে মারধর করা হয়। শামীমের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা ও তুচ্ছ ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মারধরের অভিযোগও ছিল।

মারধরে জড়িত যাঁরা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৯তম ব্যাচের ইতিহাস বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী শামীম মোল্লার মৃত্যুর ঘটনার প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী অভিযুক্ত আট শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে।

বহিষ্কৃত শিক্ষার্থীরা হলেন সরকার ও রাজনীতি বিভাগের মোহাম্মদ রাজন মিয়া, একই বিভাগের রাজু আহমেদ, ইংরেজি বিভাগের হামিদুল্লাহ সালমান, একই বিভাগের মাহমুদুল হাসান রায়হান, ইতিহাস বিভাগের জুবায়ের আহমেদ, ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের আতিকুজ্জামান, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সোহাগ মিয়া এবং বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের আহসান লাবিব।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে আহসান লাবিব বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন জাহাঙ্গীরনগর শাখার সমন্বয়ক। রাজু, রাজন ও হামিদুল্লাহ ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এ ছাড়া জাহাঙ্গীরনগর শাখা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু সাঈদ ভুঁইয়াও এ ঘটনায় জড়িত বলে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়কদের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সুষ্ঠু তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত লাবিবের অব্যাহতি বহাল থাকবে। তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ কামরুল আহসান সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, যে ঘটনা ঘটেছে, তা ন্যক্কারজনক। একটি তদন্ত কমিটি করার প্রস্তুতি শেষের দিকে। তাৎক্ষণিকভাবে উপাচার্যের যতটুকু এখতিয়ার, তা করা হয়েছে। ভিডিও ফুটেজ দেখে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের সাময়িক বহিষ্কার এবং তদন্ত সাপেক্ষে পরে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দিনভর বিক্ষোভ

শামীম মোল্লার মৃত্যুর ঘটনাকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড উল্লেখ করে দিনভর বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বুধবার দিবাগত রাত দুইটার দিকে বিক্ষোভ করেন একদল শিক্ষার্থী। গতকাল বেলা ১১টার দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। পরে দুপুরে শিক্ষার্থীদের আরেকটি দলও একই দাবিতে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেন। ঘটনার বিচার নিশ্চিতসহ চার দফা দাবি জানিয়ে বিবৃতি দেয় প্রগতিশীল শিক্ষকদের একটি দল।

[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন প্রতিবেদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রতিনিধি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও নিজস্ব প্রতিবেদক, সাভার]

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ ও বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেন নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীরা। গতকাল দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ ও বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেন নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীরা। গতকাল দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

শেখ হাসিনা কোথায় -ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন

শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থানে গত মাসে বাংলাদেশের স্বৈরাচারী নেতা দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হন। এর পর থেকে নয়াদিল্লির নৈশভোজগুলোর একটি আলোচ্য বিষয়: শেখ হাসিনা কোথায়?

গত ৫ আগস্ট বিক্ষোভকারীরা ঢাকায় হাসিনার বাসভবন অভিমুখে অগ্রসর হলে তিনি পদত্যাগ করেন। তিনি বাংলাদেশের একটি সামরিক উড়োজাহাজে করে ভারতের গাজিয়াবাদের কাছে ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটি ঘাঁটিতে আসেন।

নরেন্দ্র মোদির সরকার তখন থেকে নিশ্চিত করে আসছে যে হাসিনা ভারতেই আছেন। এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে তারা অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। তবে বিষয়টি নিয়ে মানুষের আলোচনা থেমে নেই।

বিশ্বাসযোগ্যতার ক্ষেত্রে হেরফের আছে। তবে ভারতের একটি শিক্ষিত শ্রেণির সদস্যরা ব্যক্তিগতভাবে কথাবার্তায় বলছেন, ক্ষমতাচ্যুত শক্তিশালী এই নারীনেত্রী ভারত সরকারের একটি নিরাপদ আবাসে (সেফ হাউস) আছেন, গত ফেব্রুয়ারিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দিল্লিভিত্তিক আঞ্চলিক পরিচালকের দায়িত্ব নেওয়া মেয়ে সায়মা ওয়াজেদের সঙ্গে থাকছেন, অথবা তাঁকে তাঁর সঙ্গীদের সঙ্গে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির অন্যতম সেরা পার্ক লোধি গার্ডেনে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে।

হাসিনার দল আওয়ামী লীগ যখন বাংলাদেশের ক্ষমতায়, তখন তাঁর প্রধান বিদেশি সমর্থক ছিল মোদি সরকার। তাঁর অবস্থানের বিষয়ে মোদি সরকার নীরবতা বজায় রেখে চলছে।

দিল্লির দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলোর বেশির ভাগই এমনটা ভাবা বন্ধ করে দিয়েছে যে তারা হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তাঁর প্রথম সাক্ষাৎকারটি পাবে।

এর কয়েকটি কারণ রয়েছে। হাসিনার পতনের পর ক্ষমতা গ্রহণ করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। আন্দোলনকালে শত শত হত্যার জন্য হাসিনাকে দায়ী করেছে এই সরকার।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। ২০১৩ সালে হাসিনার সরকারই চুক্তিটি করেছিল। তত্ত্বগতভাবে এই চুক্তিকে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যেতে পারে, যদি বাংলাদেশের নতুন সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করতে চায়।

ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেছেন, ‘ভারতের সঙ্গে থাকা প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী, আমরা তাঁকে (হাসিনা) বাংলাদেশের কাছে প্রত্যর্পণের দাবি জানাতে পারি।’

আসিফ নজরুল আরও বলেছেন, ‘আপাতত আমরা আশা করি, ভারত তাঁকে (হাসিনা) বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা উসকে দিতে দেবে না। তিনি মিথ্যা ও অপতথ্য ছড়িয়ে এমনটা করার চেষ্টা করছেন।’

হাসিনার উদ্ধৃতি হিসেবে উল্লেখ করা বিতর্কিত মন্তব্যের ভিত্তিতে গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের পর ইউনূস নিজেই বলেছেন, ‘বাংলাদেশ তাঁকে ফেরত না চাওয়া পর্যন্ত ভারত যদি তাঁকে রাখতে চায়, তাহলে শর্ত হবে, তাঁকে চুপ থাকতে হবে।’ (এমন কিছু শব্দ ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কিছু লোককে চটিয়েছে)

নিজ দেশ থেকে পালানো আঞ্চলিক নেতাদের আশ্রয় দেওয়ার ইতিহাস রয়েছে ভারতের। চীনা অভিযানের মুখে ১৯৫৯ সালে পালিয়ে ভারতে এসে থাকতে শুরু করেন তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামা।

দালাই লামা ভারতভিত্তিক তিব্বতের নির্বাসিত বেসামরিক প্রশাসনের কাছে রাজনৈতিক দায়িত্বগুলো হস্তান্তর করেছেন। তবে তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতা সম্প্রতি মার্কিন কংগ্রেসের একটি প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানান। এই পদক্ষেপ বেইজিংকে ক্ষুব্ধ করে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, মোদি সরকারের সম্মতি ছাড়া এমনটা হয়নি।

আফগান নেতা মোহাম্মদ নাজিবুল্লাহর পরিবার ১৯৯২ সালে ভারতে পালিয়ে যায়। সেখানে তাঁর স্ত্রী ফাতানা নাজিব ও সন্তানেরা এখনো বেশির ভাগ সময় কাটান বলে জানা যায়। (তাঁরা জনসাধারণের দৃষ্টির আড়ালে থাকছেন। নাজিবুল্লাহ পালানো থেকে বিরত ছিলেন। তিনি কয়েক বছর ধরে তাঁর দেশে জাতিসংঘের একটি কম্পাউন্ডে আশ্রয়ে নিয়ে অবস্থান করছিলেন। ১৯৯৬ সালে তালেবান কাবুলে প্রবেশ করে তাঁকে হত্যা করে। তাঁর লাশ একটি ট্রাফিক লাইটের খুঁটিতে ঝুলিয়ে রাখে।)

১৯৭৫ সালে শেখ হাসিনার বাবা শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হত্যা করা হয়। ১৯৭৫ সালের পর শেখ হাসিনা ও তাঁর বোন শেখ রেহানা বেশ কয়েক বছর ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

ভারতের মনমোহন সিং সরকারের পররাষ্ট্রসচিব ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন শিবশঙ্কর মেনন। তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশ থেকে নেতাদের ভারতে আসার অনেক নজির আছে।

শিবশঙ্কর মেনন আরও বলেন, ‘আমরা সব সময় তাঁদের থাকার অনুমতি দিয়েছি। এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাঁরা আমাদের ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে রাজনৈতিক কার্যকলাপ থেকে দূরে থেকেছেন।’

ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে হাসিনার ব্যাপক সমর্থন আছে। ভারতে তাঁকে ইসলামপন্থী চরমপন্থার বিরুদ্ধে একটি প্রাচীর হিসেবে দেখা হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর প্রয়াত পিতার অগ্রণী ভূমিকা শ্রদ্ধার সঙ্গে ভারতে স্মরণ করা হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশকে সমর্থন দিয়েছিল ভারতের তৎকালীন ইন্দিরা গান্ধী সরকার। এ জন্য ভারতকে বড় মানবিক মূল্য দিতে হয়।

হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হওয়া ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ইউনূসের অধিষ্ঠিত হওয়া নিয়ে প্রচলিত তত্ত্ব হলো—‘রঙিন বিপ্লব’ বা যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন, যে দেশটি (যুক্তরাষ্ট্র) ১৯৭১ সালে পাকিস্তানকে সমর্থন করেছিল। মোদিপন্থী লোকজনের বাইরেও ভারতে এই ধারণা প্রবল।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভারতে হাসিনার অবস্থানের যে সংবেদনশীলতা, তার অর্থ হলো, সতর্কতার একটি চাদর আপাতত তাঁর অবস্থানকে ঘিরে থাকতে পারে। এবং এ-সংক্রান্ত পরিকল্পনা নয়াদিল্লিরই করা।

ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শিবশঙ্কর মেনন বলেন, ‘এগুলো ঘনিষ্ঠতার সমস্যা। আর যখন আমাদের প্রতিবেশীদের প্রসঙ্গ আসে, তখন বিষয়গুলো সংবেদনশীল হয়। আমরা বিশ্বের অন্য প্রান্তের দেশগুলোর সঙ্গে যেভাবে কাজ করি, এটা তেমন নয়।’

শেখ হাসিনা

প্রথম বিদেশ সফর: যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছেন প্রধান উপদেষ্টা by মিজানুর রহমান

ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রথম বিদেশ সফর চূড়ান্ত হয়েছে। ৫ই আগস্ট স্বৈরশাসনের কবল থেকে মুক্ত হয় বাংলাদেশ। ৮ই আগস্ট নতুন সরকার দায়িত্ব নেন। এরপর প্রায় দেড় মাস কেটে গেছে। এই সময়ে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার তথা দেশ পুনর্গঠনে জরুরি কিছু উদ্যোগ নিতে হয়েছে প্রধান উপদেষ্টাকে। অবশ্য চলতি মাসের শুরুতে তার প্রথম বিদেশ সফরে থাইল্যান্ড যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যাংককে বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনটি স্থগিত হয়ে যায়। তবে এবার সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২৪শে সেপ্টেম্বর প্রধান উপদেষ্টা প্রথম বিদেশ সফরে যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছেন। উদ্দেশ্য- জাতিসংঘ সাধারণ পরিষেদের অধিবেশনে অংশগ্রহণ। নিরাপত্তারক্ষী ছাড়া অল্পসংখ্যক সফরসঙ্গী নিয়ে ২৪-২৮শে সেপ্টেম্বর হবে সেই সফর। শিডিউল অনুযায়ী আগামী ২৭শে সেপ্টেম্বর সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ দেবেন তিনি।

সেগুনবাগিচা বলছে, নিউ ইয়র্কে একাধিক দেশের সরকারপ্রধানের সঙ্গে ড. ইউনূসের আনুষ্ঠানিক বৈঠক হবে। ডাচ্ প্রধানমন্ত্রী ডিক শফ, বাহরাইনের যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী সালমান বিন হামাদ বিন ঈসা আল খলিফা, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ  শেহবাজ শরীফ, নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি, মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন এবং বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গার সঙ্গে বৈঠক প্রায় চূড়ান্ত। পাশাপাশি জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরাঁ, জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক, জাতিসংঘ শরণার্থী-বিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্র্যান্ডিসহ জাতিসংঘের বেশ কয়েকটি সংস্থার প্রধানের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা রয়েছে। তবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকের বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত। সফরকালে প্রধান উপদেষ্টা সিএনএন ও এনএইচকেতে সাক্ষাৎকার  দেবেন। ফোর্বস ও নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর পৃথক ইভেন্টে অংশ নেবেন। তাছাড়া ভয়েস অব আমেরিকার সঙ্গেও তিনি কথা বলতে পারেন। সিনেটর ডিক ডারবিন, কেরি কেনেডি এবং বিল অ্যান্ড মিলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের সিইও প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করবেন বলে জানা গেছে। সূচি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের দেয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন ড. ইউনূস।

নিউ ইয়র্কে ইউনূস-মোদি বৈঠক এখনো চূড়ান্ত হয়নি: ভারতের পররাষ্ট্র সচিব

এদিকে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি বৃহস্পতিবার বলেছেন, নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠকের বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তিনি বলেন- অনেক রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সম্ভাবনা আছে। তা নিয়ে আলোচনা চলছে। সবকিছু নির্ভর করছে উপযুক্ত সময়ে নেতাদের উপস্থিতির উপর। কার কার সঙ্গে বৈঠক হবে, তা চূড়ান্ত হলেই বলা যাবে। 

যুক্তরাষ্ট্রে ড. ইউনূসের সঙ্গে মোদির বৈঠকের সম্ভাবনা কম -হিন্দুস্তান টাইমস

জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠকের সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছে ভারতীয় গণমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে বুধবার এই তথ্য দিয়েছে গণমাধ্যমটি। এতে বলা হয়, এ মাসের শুরুর দিকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ফাঁকে একটি বৈঠকের আনুষ্ঠানিক অনুরোধ করেছিল বাংলাদেশ। যেখানে ড. ইউনূস ও মোদি উভয়েই উপস্থিত থাকবেন। তবে এই আনুষ্ঠানিক বৈঠকটির সম্ভাবনা নেই। ঘনিষ্ঠ সূত্র হিন্দুস্তান টাইমসকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। সূত্র জানিয়েছে, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে ঢাকা-দিল্লির দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল তা লাঘবে এ বৈঠকে আগ্রহ দেখিয়েছে ঢাকা। তবে এ ধরনের বৈঠক ভারতের এজেন্ডা নয়। এ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রে মোদির ৩ দিনের একটি সফরের পূর্ণাঙ্গ সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি ২১শে সেপ্টেম্বর ডেলাওয়ার উইলমিংটন কোয়াড লিডারস সামিটে যোগ দেবেন। ২৩শে সেপ্টেম্বর মোদি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেবেন। তাদের একজন বলেন, প্রধানমন্ত্রী মোদি নিউ ইয়র্কে সাধারণ পরিষদের সাইডলাইনে কিছু দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। তবে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার প্রধানের সঙ্গে বৈঠক তার সময়সূচিতে নেই। এ সকল বিষয় ছাড়াও সমপ্রতি একটি সাক্ষাৎকারে ভারত-বাংলাদেশ ইস্যুতে ড. ইউনূসের মন্তব্য ঢাকার অন্তর্বর্তী সরকারের সদস্যদের প্রতিদিনের মন্তব্য দিল্লি ভালোভাবে নেয়নি বলে মন্তব্য করেছেন ওই কূটনৈতিক সূত্র। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গেও দেখা করার কথা রয়েছে নরেন্দ্র মোদির। তবে তাদের সাক্ষাৎ কোথায় বা কখন হবে সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য নেই।

mzamin

৩১ দফা নিয়ে মতামত নিচ্ছে বিএনপি by কিরণ শেখ

ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর নতুন পরিস্থিতিতে ৩১ দফায় কিছু সংযোজন ও বিয়োজন করতে চায় বিএনপি। নতুন এই রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নটি সামনে আসার পর নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে ৩১ দফা নিয়ে তৃণমূলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। ইতিমধ্যে সংস্কারের কাজও শুরু করেছে। সুশীল সমাজ এবং যুগপৎ আন্দোলনে থাকা দল এবং জোটগুলোরও মতামত নেয়া হচ্ছে। এসব কিছু রেকর্ড করে রাখছে দলটি। সংস্কারের কাজ শেষে চূড়ান্ত রূপরেখা সেমিনার কিংবা ইভেন্ট করে জাতির সামনে আবারো তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সংস্কারের কাজ কবে নাগাদ শেষ হবে তা এখনো বলা যাচ্ছে না। বিএনপি বলছে, সংস্কার চলমান প্রক্রিয়া। এটা বিএনপি’র কাছে নতুন কিছু নয়। যারা বলছেন, তাদের কাছে নতুন হতে পারে। আর বিএনপি ঘোষিত রূপরেখায় তেমন কিছু সংযোজন করার প্রয়োজন নেই। দীর্ঘ ৬ মাস কাজ করে এই রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। আর বিএনপি রূপরেখা তো ঘোষণা করেছে। সুতরা নতুন করে ঘোষণা করার কিছু নেই।

৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের প্রত্যয় ব্যক্ত নিয়ে শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের যাত্রা শুরু হয়। এই সংস্কারের অংশ হিসেবে পৃথক ৬টি কমিশনও গঠন করেছে সরকার। এ ছাড়া রাষ্ট্র পুনর্গঠনের লক্ষ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের উদ্যোগে জাতীয় নাগরিক কমিটি গঠিত হয়েছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে বিশিষ্টজনরাও রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে বিএনপি বলছে, রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়গুলো নতুন কিছু নয়। গত বছরের জুলাইয়ে বিএনপিসহ সব বিরোধী দল মিলে রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে ৩১ দফা ঘোষণা করেছিল। রাষ্ট্রের যত ধরনের সংস্কার প্রয়োজন, বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে কথা বলে ওই দফাগুলো প্রণয়ন করা হয়। রূপরেখা ঘোষণার পর এর ওপর এক বছর বিভিন্ন সেমিনার এবং ওয়ার্কশপও করেছে দলটি।

বিএনপি’র নেতারা বলছেন, বিএনপি ঘোষিত ৩১ দফা রূপরেখার মধ্যে রাষ্ট্রের প্রায় সব সংস্কারের কথা বলা আছে। এরপরও যদি এখানে দুই-একটা সংযোজন করতে হয়, সেগুলো বিএনপি আলোচনার মাধ্যমে সংযোজন ও বিয়োজন করবে। এজন্য দল থেকে এই ৩১ দফা নিয়ে তৃণমূলের যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এটা নিয়ে জনগণের সঙ্গে কথা বলা হবে।

বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, বিএনপি ঘোষিত ৩১ দফায় যা আছে, এতে যোগ করার মতো বেশি কিছু নেই। এটা নিয়ে বিএনপি দীর্ঘ ৬ মাস কাজ করেছে। সুশীল সমাজ এবং যুগপৎ আন্দোলনের রাজনৈতিক দলসহ সবার সঙ্গে কথা ও আলোচনার মধ্যদিয়েই এই রূপরেখা তৈরি করা হয়। সুতরাং রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয় নতুন না। এখন যারা সংস্কারের কথা বলছেন তাদের কাছে নতুন হতে পারে। কিন্তু আমাদের কাছে নতুন না। আর ৩১ দফায় কিছু সংযোজন ও বিয়োজন বিষয়ে কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, ৩১ দফা সংস্কার চলমান রয়েছে। সবার কাছ থেকে প্রস্তাবও নেয়া হচ্ছে। সেগুলো রেকর্ডও রাখা হচ্ছে। আর সংস্কার করার পর সেমিনার কিংবা ইভেন্টের আয়োজন করে এটা আবারো জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে। বিএনপি’র যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স মানবজমিনকে বলেন, ৩১ দফায় সংযোজন ও বিয়োজনের বিষয়ে কাজ চলছে। এজন্য বিভিন্ন মহলের মতামতও নেয়া হচ্ছে।

ওদিকে সম্প্রতি যুগপৎ আন্দোলনের দল ও জোটের সঙ্গে বৈঠক করেছে বিএনপি। এসব বৈঠকে ৩১ দফা রূপরেখা সংস্কারের বিষয়ে গুরুত্বারোপ হয়। সূত্র জানায়, ৩১ দফা রূপরেখা বাস্তবায়নে তৃণমূলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো। এটা বাস্তবায়নে জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন আছে বলে মনে করছে দলগুলোর নেতারা। তারা বলছেন, এই ঐক্য বিনষ্ট করা যাবে না। যদি ৩১ দফাতে আরও কিছু পরিবর্তন আনার প্রয়োজন হয়, সেটাও করবে। জনগণ যদি মনে করে আরও কিছু পরিবর্তন করার প্রয়োজন রয়েছে- সেটাও তারা জনগণের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করবে।
গণফোরাম সভাপতি মোস্তফা মোহসীন মন্টু বলেন, আমাদের সবচেয়ে বেশি যেটা প্রয়োজন, সেটা হচ্ছে জাতীয় ঐক্য। ৩১ দফা আমাদের সকলের মতামত। জাতীয় প্রয়োজনে পরিবর্তন করা যাবে।

প্রসঙ্গত, ২০২৩ সালে ১৩ই জুলাই সংবিধান, রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কার এবং অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে ৩১ দফা রূপরেখা ঘোষণা করে বিএনপি। গণতন্ত্র মঞ্চ এবং বিএনপি এই রূপরেখা একইসঙ্গে ঘোষণা করার কথা ছিল। পরে পৃথক পৃথকভাবে ৩১ দফা রূপরেখা ঘোষণা করে তারা।

mzamin