Thursday, July 31, 2025

মৃত্যু উপত্যকা গাজা ও একটি কার্টুন

গাজা এখন এক মৃত্যুকূপ। খাদ্যের অভাবে এমনিতেই মানুষ মরছে। তার ওপর ত্রাণ দেয়ার নাম করে গাজাবাসীর ওপর সরাসরি গুলি করছে ইসরাইলি সেনারা। এতেও মৃত্যু ঘটছে ভাগ্যবিড়ম্বিত গাজাবাসীর। দেখা দিয়েছে ভয়াবহ পুষ্টিহীনতা। রোগে ভুগে হাড্ডিসার মানুষ। এমন অবস্থায় চাপ বাড়ছে নেতানিয়াহুর ওপর। ফ্রান্স জানিয়ে দিয়েছে তারা ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেবে। শেষ পর্যন্ত বৃটেনও কিছু শর্ত দিয়ে বলেছে, ইসরাইল সেগুলো না মানলে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেবে বৃটেন। বৃটিশ পার্লামেন্টের সদস্যদের তরফ থেকে প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট কলাম লিখে জানিয়েছেন গাজায় গণহত্যা চলছে। যুদ্ধাপরাধ করছে ইসরাইল। জাতিসংঘও একই কথা বলছে। ফিলিস্তিনে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক প্রধান লাজারিনি বলেছেন, গাজায় যুদ্ধাপরাধ হচ্ছে। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিলেও তিনি মানুষের অধিকারের পক্ষে অব্যাহতভাবে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন। ইসরাইলি হত্যামিশনের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবাদ উঠেছে বিশ্বের বিবেকবান দেশগুলো থেকে। এমন পরিস্থিতিতে লন্ডনের দ্য গার্ডিয়ান একটি কার্টুন চিত্র প্রকাশ করেছে। তাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প, বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার সহ নেতাদের দেখা যাচ্ছে। তাদের সামনে গ্রিলের ওপাশ থেকে নিষ্পেষিত গাজাবাসী শূন্য খাবার পাত্র এগিয়ে ধরেছেন। তাদেরকে নানা রকম শান্তনার বাণী শোনাচ্ছেন নেতারা। কার্টুনটির শিরোনাম দেয়া হয়েছে- পেইং লিপ সার্ভিস। কার্টুনটি এঁকেছেন শিল্পী ইলা ব্যারন। 
mzamin

গাজায় ইসরায়েলে আগ্রাসন: ইসরায়েলের ওপর নিষেধাজ্ঞা চান দেশটির ৩১ বিশিষ্ট নাগরিক

গাজায় চলমান নৃশংসতা বন্ধ না করলে ইসরায়েলের ওপর ‘কঠোর নিষেধাজ্ঞা’ দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ইসরায়েলের ৩১ জন বিশিষ্ট নাগরিক। স্থানীয় সময় গত মঙ্গলবার ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ানকে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে এ আহ্বান জানান তাঁরা। বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন শিল্পী, কবি, শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী, সাংবাদিক ও অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র নির্মাতা।

গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর নির্বিচার হামলায় ২২ মাসে ৬০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি অবরুদ্ধ উপত্যকাটিতে ত্রাণ প্রবেশ করতে দিচ্ছে না ইসরায়েল। এতে সেখানে দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অনাহারে–অর্ধাহারে দিন কাটছে গাজার বেশির ভাগ বাসিন্দার। এমন পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের ৩১ বিশিষ্ট নাগরিক দেশটির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার এই আহ্বান জানালেন।

বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন অস্কারজয়ী ইসরায়েলি চলচ্চিত্র নির্মাতা ইউভাল আব্রাহাম, ইসরায়েলের সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মাইকেল বেন–ইয়ার, ইসরায়েলের পার্লামেন্টের সাবেক স্পিকার আব্রাহাম বার্গ। এ ছাড়া ইসরায়েলের সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রের সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার ‘ইসরায়েল প্রাইজ’ পাওয়া বেশ কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তিও এতে স্বাক্ষর করেছেন।

বিবৃতিতে ইসরায়েলের এসব বিশিষ্ট নাগরিক বলেছেন, ‘গাজার বাসিন্দাদের অনাহারে রেখে মেরে ফেলতে চাইছে ইসরায়েল। পাশাপাশি উপত্যকাটির লাখ লাখ ফিলিস্তিনিকে জোর করে গাজা থেকে সরিয়ে দেওয়ার কথা ভাবছে। গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর এই নৃশংসতা বন্ধ না হলে এবং একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর না করলে ইসরায়েলের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবশ্যই কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিতে হবে।’

ইসরায়েলের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা চেয়ে দেশটির বিশিষ্ট নাগরিকদের এ ধরনের একটি যৌথ বিবৃতি নানা কারণে তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথমত, ইসরায়েলের সরকারের খোলামেলা সমালোচনা ও নিষেধাজ্ঞা চেয়ে দেশটির নাগরিকদের এ ধরনের বিবৃতি দেওয়ার ঘটনা বিরল। এ ছাড়া ইসরায়েল এমন একটি দেশ যেখানে এ ধরনের আহ্বান কেউ জানালে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আইন ও বিধিবিধান রয়েছে।

যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে আরও রয়েছেন ইসরায়েলি চিত্রশিল্পী মাইকেল না’আমান; আন্তর্জাতিক পুরস্কারজয়ী দেশটির তথ্যচিত্রনির্মাতা রা’আনান আলেক্সান্দ্রোভিচ, গোল্ডেন লায়ন পুরস্কারজয়ী চলচ্চিত্র লেবানন-এর পরিচালক স্যামুয়েল মাওজ, ইসরায়েলি কবি আহারোন শাবতাই ও কোরিওগ্রাফার ইনবাল পিন্টো প্রমুখ।

জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থা ও দেশের সমালোচনার মধ্যেও গাজায় ইসরায়েলে বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ থামছে না। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া হিসাব বলছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের নির্বিচার হামলা শুরুর পর গাজায় প্রতিদিন গড়ে ৯০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

এর মধ্যে কয়েক মাস ধরে গাজায় ত্রাণ প্রবেশ করতে দিচ্ছে না ইসরায়েল। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনের (জিএইচএফ) মাধ্যমে গাজায় স্বল্প পরিসরে ত্রাণ দেওয়া শুরু হয়। কিন্তু ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত জিএইচএফের ত্রাণবিতরণকেন্দ্রে ত্রাণ নিতে গিয়ে প্রতিদিনই ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে কয়েক ডজন করে ফিলিস্তিনি নিহত হচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে গাজায় ইসরায়েলের হামলা বন্ধের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে চাপ বাড়ছে ইসরায়েলের ওপর। এমনকি ইসরায়েলের অভ্যন্তর থেকেও নানাভাবে চাপ আসছে।

এর আগে গত সোমবার ইসরায়েলের দুই শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা বেতসেলেম এবং ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস ইসরায়েল প্রথমবারের মতো একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বলেছে, গাজার ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চলছে। ইসরায়েলের দুই মানবাধিকার সংস্থার পক্ষ থেকেও এ ধরনের বিবৃতি দেওয়ার ঘটনা বিরল।

যুক্তরাষ্ট্রে থাকা ইহুদিদের সংগঠন রিফর্ম মুভমেন্ট গত রোববার এক বিবৃতিতে গাজায় দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়ার জন্য ইসরায়েলের সরকারকে দোষারোপ করে। সংগঠনটি বলেছে, ‘খাবার, পানি, ওষুধ ও বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেওয়া অমার্জনীয় অপরাধ। ইসরায়েলের প্রতি ভালোবাসা যেন আমাদের দুর্বলদের কান্না অনুধাবনে অন্ধ করে না দেয়। আসুন, এ মুহূর্তের নৈতিক এই চ্যালেঞ্জের জবাব দিতে আমরা সোচ্চার হই।’

ইসরায়েলের হামলায় আহত এক ফিলিস্তিনি শিশুকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে
ইসরায়েলের হামলায় আহত এক ফিলিস্তিনি শিশুকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ছবি: এএফপি

Wednesday, July 30, 2025

ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ও মানবিক বিপর্যয় গাজায়: নিহত ৬০,০০০ ছাড়িয়েছে

গাজার অনাহারী মানুষের ওপর হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরাইল। ফলে সেখানে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ হচ্ছে। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাঁচার আকুতি জানিয়ে গাজাবাসী সাহায্যের আহ্বান জানাচ্ছেন। অনেক মাকে দেখা গেছে তার অনাহারী সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে ইউটিউব শর্টস, ফেসবুক রিলে এসে আহাজারী করছেন। তার ওপর ইসরাইলি আগ্রাসনে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার পর্যন্ত মোট ৬০,০৩৪ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। মৃত্যুর এই মাইলফলক সামনে আসছে এমন এক সময়ে, যখন গাজার অভ্যন্তরে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, মানবিক অবরোধ এবং অব্যাহত বোমাবর্ষণের মধ্যে খাদ্য সহায়তার খোঁজে বের হওয়া অসহায় জনগণের ওপরও হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরাইলি বাহিনী।

গ্লোবাল হাঙ্গার পর্যবেক্ষণ সংস্থা আইপিসি জানিয়েছে, গাজার বেশির ভাগ এলাকায় খাদ্যগ্রহণের ক্ষেত্রে দুর্ভিক্ষের মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। গাজা সিটির অভ্যন্তরে তীব্র অপুষ্টির হার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। জুলাইয়ের প্রথমার্ধেই ২০,০০০-এরও বেশি শিশু অপুষ্টিজনিত কারণে চিকিৎসা গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে ৩০০০ শিশু মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছে। গাজার নাসের হাসপাতালের শিশু ও প্রসূতি বিভাগের প্রধান ডা. আহমেদ আল-ফাররা বলেন, শিশুরা আসছে হাড় আর চামড়ার অবয়বে ঢাকা শরীর নিয়ে। তাতে মাংস নেই, চর্বি নেই। শুধু খালি দেহ। এটা শুধু তীব্র অপুষ্টি নয়, এটা ধ্বংস। তিনি বলেন, অপুষ্টির কারণে শিশুর স্নায়ুবিক বিকাশ ব্যাহত হয়, ফলে ভবিষ্যতে লেখাপড়ার সমস্যা, বিষণ্নতা ও উদ্বেগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে।

আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস’-এর প্রতিনিধি ডাক্তার তানিয়া হাজ হাসান বলেন, খাদ্য এলেই সমস্যার সমাধান হয় না। অপুষ্টি দেহের প্রতিটি অঙ্গকে প্রভাবিত করে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, অপুষ্টির ফলে অন্ত্রে কোষ মারা যায়। ফলে পুষ্টি শোষণে সমস্যা হয়। হৃদযন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে এবং পুনরায় খাদ্য গ্রহণ শুরু করলেও হৃদপিণ্ড ব্যর্থ হয়। এতে শিশুর মৃত্যু হতে পারে। দখলদার ইসরাইলি বাহিনী গাজার বিতর্কিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনের (জিএইচএফ) খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রের আশপাশে সহায়তা নিতে যাওয়া মানুষের ওপর গুলি চালাচ্ছে বলে জানিয়েছেন আল-জাজিরার সাংবাদিক হিন্দ খৌদারি। একইদিনে গাজায় প্রথমবারের মতো আকাশপথে সাহায্য পাঠায় বৃটেন। এর মূল্য প্রায় পাঁচ লাখ পাউন্ড।

বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার বলেছেন, সেপ্টেম্বরের মধ্যে ইসরাইল যদি যুদ্ধ বন্ধ না করে ও শান্তির অগ্রগতি না ঘটায়, তবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেবে বৃটেন। ফ্রান্সও জর্ডানের সঙ্গে সমন্বয়ে ৪০ টন সহায়তা গাজায় ফেলার ঘোষণা দিয়েছে। তবে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা সতর্ক করেছে, আকাশপথে সহায়তা পাঠানো কার্যকর বা নিরাপদ নয়, বরং স্থলপথে বাণিজ্যিক ও মানবিক প্রবাহ পুনরায় চালু করাই জরুরি। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস জিএইচএফের তথ্যের ভিত্তিতে বলেন, গাজাবাসী এক মহাবিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। এটা কোনো আশঙ্কা নয়, এটা চোখের সামনে ঘটে যাওয়া বাস্তবতা। তিনি বলেন খাদ্য, পানি, ওষুধ এবং জ্বালানি সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো আসতে হবে- বাধাহীনভাবে। এই দুঃস্বপ্নের অবসান চাই। গুতেরেস একটি তৎক্ষণাৎ ও স্থায়ী মানবিক যুদ্ধবিরতি, সব বন্দির মুক্তি এবং সমগ্র গাজা ভূখণ্ডে মানবিক সংস্থাগুলোর পূর্ণ প্রবেশাধিকারের দাবি জানিয়েছেন।

স্থানীয় সূত্রের বরাতে আল-জাজিরা জানায়, ইসরাইল দিয়ের আল-বালাহে ট্যাংক, ড্রোন ও ফাঁদ পাতা রোবট ব্যবহার করেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে রক্তাক্ত রাত বলে বর্ণনা করা হচ্ছে। এর মধ্যেই বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ইসরাইলের এই যুদ্ধকে ‘গণহত্যা’ আখ্যা দিয়েছে এবং পূর্ব জেরুজালেমসহ দখলকৃত অঞ্চল থেকে ফিলিস্তিনি জনগণের সম্পূর্ণ মুক্তির আহ্বান জানিয়েছে।

দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান বাস্তবায়নে বৈশ্বিক সমর্থনের ডাক রিয়াদ ও প্যারিসের
সৌদি আরব ও ফ্রান্স যৌথভাবে এক ঘোষণার মাধ্যমে বিশ্ব সম্প্রদায়কে ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতের অবসান ও দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পথে স্পষ্ট, সময়সীমাবদ্ধ এবং অপরিবর্তনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে। ঘোষণার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ২১ মাস ধরে চলা গাজা যুদ্ধের অবসানকে প্রধান শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতির পরপরই গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের অধীনে একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসনিক কমিটি গঠন করতে হবে, যা অবিলম্বে কার্যক্রম শুরু করবে। ঘোষণায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ম্যান্ডেটভিত্তিক একটি অস্থায়ী আন্তর্জাতিক শান্তি-স্থিতিশীলতা মিশন মোতায়েনের আহ্বান জানানো হয়েছে এবং কিছু সদস্য রাষ্ট্রের সেনা পাঠানোর প্রস্তুতির প্রশংসা করা হয়েছে।

এছাড়া ইসরাইলি নেতৃত্বকে স্পষ্টভাবে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান মেনে নেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে, যেখানে একটি সার্বভৌম ও কার্যকর ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের স্বীকৃতি অন্তর্ভুক্ত থাকবে। একই সঙ্গে দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড, বিশেষ করে পূর্ব জেরুজালেমে, ভূমি দখল ও সংযুক্তিকরণ কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করার দাবি জানানো হয়েছে। ঘোষণায় আরও বলা হয়, গাজায় যুদ্ধের অবসান, সব বন্দিকে মুক্তি, দখলদারিত্বের অবসান, সহিংসতা ও সন্ত্রাস প্রত্যাখ্যান, একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও গণতান্ত্রিক ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, আরব ভূমির দখলমুক্তকরণ এবং ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের জন্য দৃঢ় নিরাপত্তা নিশ্চয়তা প্রদান- এই শর্তগুলো পূরণ হলেই কেবল অঞ্চলের জনগণ ও রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্ক ও সহাবস্থান সম্ভব হবে।

একই দিনে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারের ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়ার পরিকল্পনার তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, স্টারমার হামাসের নৃশংস সন্ত্রাসকে পুরস্কৃত করছেন এবং ভুক্তভোগীদের শাস্তি দিচ্ছেন। নেতানিয়াহু আরও দাবি করেন, ইসরাইলের সীমান্তে একটি জিহাদি রাষ্ট্র গঠন হলে তা বৃটেনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প জানান, স্কটল্যান্ড সফর শেষে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার পথে সাংবাদিকদের তিনি বলেন যে, কিয়ের স্টারমারের সঙ্গে বৈঠকে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র স্বীকৃতির পরিকল্পনা নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। ট্রাম্প ইসরাইলের মতোই মন্তব্য করে বলেন, আমি মনে করি না তাদের (ফিলিস্তিনিদের) পুরস্কৃত করা উচিত। ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়া মূলত হামাসকে পুরস্কৃত করার সমান। তবে তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র গাজার ফিলিস্তিনিদের জন্য ৬০ মিলিয়ন ডলারের খাদ্য সহায়তা পাঠিয়েছে এবং তিনি নিশ্চিত করতে চান যে, এই সাহায্য যথাযথভাবে ও সঠিকভাবে ব্যয় হয় এবং খাদ্য যথাযথভাবে বিতরণ করা হয়।
mzamin

স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রত্যয়: জাতিসংঘে ‘নিউইয়র্ক ডিক্লারেশন’ গৃহীত by কাউসার মুমিন

নিউ ইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে অনুষ্ঠিত তিনদিন ব্যাপী উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলন শেষ হয়েছে। সম্মেলন শেষে একটি ৭ পৃষ্ঠার যৌথ ঘোষণা গ্রহণ করা হয়েছে যেখানে গাজায় যুদ্ধের অবিলম্বে সমাপ্তি এবং ইসরাইল-ফিলিস্তিনি সংঘাতের জন্য দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান বাস্তবায়নের একটি বিস্তৃত আন্তর্জাতিক রোডম্যাপ গ্রহণ করা হয়েছে। গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসন বন্ধ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ‘দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান’কে ‘একমাত্র কার্যকর পথ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘোষণায় জোর দিয়ে বলা হয়েছে, ইসরাইলি দখল শেষ করা এবং ‘দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান’ বাস্তবায়নই হচ্ছে ফিলিস্তিনি ও ইসরাইলিদের বৈধ আকাঙ্ক্ষা পূরণের একমাত্র উপায়। এতে অংশগ্রহণকারী দেশগুলো একটি নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে এবং অপরিবর্তনীয় শান্তিপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণে অঙ্গীকার করেছে- যার মধ্যে গাজায় যুদ্ধবিরতি ও ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

‘নিউ ইয়র্ক ডিক্লারেশন অন দ্য পিসফুল সেটেলমেন্ট অব দ্য কোয়েশ্চন অফ প্যালেস্টাইন’ নামে পরিচিত এই ঘোষণাকে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বিশ্বব্যাপী অভূতপূর্ব ঐক্যমত্যের নিদর্শন হিসেবে বর্ণনা করেছে সম্মেলনের যৌথ আয়োজক ফ্রান্স ও সৌদি আরব। উল্লেখ্য, জাতিসংঘের ফিলিস্তিন বিষয়ক এই উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলন শুরু থেকেই বয়কট করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল।

সম্মেলনে জাতীয় অভিজ্ঞতার আলোকে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের তাৎক্ষণিক বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন জাতিসংঘের এই উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান আমাদেরকে ‘অত্যাচারের শিকার মানুষের পাশে দাঁড়াতে এবং জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার সমর্থনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করে।’ তিনি আরও বলেন, আমাদের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে গত বছরের জুলাই ও আগস্টের গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত বাংলাদেশের মানুষ সবসময়ই আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জনের চেষ্টা করেছে। আমাদের এই ঐতিহ্য ‘ফিলিস্তিনি জনগণের স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের ন্যায়সঙ্গত আকাঙ্ক্ষার প্রতি আমাদের সহমর্মিতা ও স্থায়ী সংহতি গড়ে তুলেছে’ উল্লেখ করে তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘দ্বিরাষ্ট্র ভিত্তিক সমাধানের বাস্তবায়ন এখনই শুরু করতে হবে।’  তিনি স্বীকার করেন যে, ‘শুধু কথায় ফিলিস্তিনি জনগণের যন্ত্রণা উপশম হবে না।’ তাই তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে গাজায় অবিলম্বে ও নিঃশর্ত যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন এবং খাদ্য ও জরুরি সেবার নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘এই সম্মেলন থেকে আমরা আর আগের অবস্থানে ফিরে যেতে পারি না।’

যৌথ ঘোষণায় মিশর, কাতার ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ধাপে ধাপে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো হয়েছে, যা শত্রুতা অবিলম্বে বন্ধ, বন্দিদের মুক্তি নিশ্চিতকরণ এবং গাজা থেকে ইসরাইলি বাহিনীর প্রত্যাহার নিশ্চিত করবে। এছাড়া, গাজা ও পশ্চিম তীরকে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে পুনঃএকত্রীকরণের প্রস্তাব রয়েছে এবং হামাসকে গাজায় ক্ষমতা ছাড়তে ও অস্ত্র সমর্পণের আহ্বান জানানো হয়েছে। ঘোষণায় ১৯৬৭ সালের সীমানার ভিত্তিতে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের জন্য বৈশ্বিক সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে, যেখানে পূর্ব জেরুজালেম ভবিষ্যতের ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের রাজধানী হবে। এতে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, ‘শুধুমাত্র রাজনৈতিক সমাধানই শান্তি বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।’
ঘোষণায় ইসরাইলকে সমস্ত বসতি নির্মাণ কার্যক্রম বন্ধ করতে, বসতি-দাসত্ব বিরোধী সহিংসতা থামাতে এবং দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানে প্রকাশ্য পুনঃপ্রতিশ্রুতি দিতে আহ্বান জানানো হয়েছে। এতে সতর্ক করা হয়েছে যে, উভয় পক্ষের একতরফা পদক্ষেপ শান্তির পথে স্থায়ী প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে, এবং এমন কার্যক্রম ‘শেষ বাঁচা শান্তির পথ ধ্বংসের হুমকি’ দেয়। ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তাব ও শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি, গণতান্ত্রিক সংস্কার এবং উন্নত শাসনের পরিকল্পনাগুলোকে এই ঘোষণায় স্বাগত জানানো হয়েছে। ঘোষণায় একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হিসেবে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গঠনের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে, যা আসিয়ান বা ইউরোপীয় নিরাপত্তা ও সহযোগিতা সংস্থার মতো হবে। ভবিষ্যতে একটি ‘শান্তি দিবস’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও দেয়া হয়েছে, যা সংঘাতের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি এবং আঞ্চলিক অর্থনীতি, শক্তি ও অবকাঠামো সমন্বয়ের সূচনা হিসেবে পালন করা হবে।

সম্মেলনের যৌথ সভাপতি সৌদি আরব ও ফ্রান্স আগামী সেপ্টেম্বর মাসে ৮০তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ঘোষণার অগ্রগতি প্রতিবেদন উপস্থাপন করবে এবং দ্বিরাষ্ট্রিক সমাধান বাস্তবায়নের জন্য গ্লোবাল অ্যালায়েন্সের আওতায় একটি অনুসরণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কাজ করবে বলে জানানো হয়েছে। ঘোষণার শেষদিকে বলা হয়েছে, ‘এটি একটি ঐতিহাসিক সুযোগ, সংঘাত শেষ করার, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার এবং উভয় জনগোষ্ঠীর জন্য শান্তি ও মর্যাদা নিশ্চিত করার জন্য এখনই সময়।’ এ প্রসঙ্গে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল-সৌদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমরা আপনাদের অনুরোধ করছি, ৭৯তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শেষ হওয়ার আগে নিউ ইয়র্কে সৌদি আরব ও ফ্রান্সের মিশনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে এই ঘোষণাকে সমর্থন করুন।’ এ উদ্যোগের মাধ্যমে সৌদি আরব ও ফ্রান্স বিশ্ব সম্প্রদায়কে একটি নতুন কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সূচনা করার আহ্বান জানিয়েছে, যা বিশ্বের দীর্ঘতম এই সংঘর্ষের একটি স্থায়ী সমাধানের পথ তৈরি করবে।

এদিকে মার্কিন কংগ্রেসে জর্জিয়া অঙ্গরাজ্য থেকে নির্বাচিত কংগ্রেসওম্যান মার্জোরি টেইলর গ্রিন প্রথম রিপাবলিকান হিসেবে গাজার পরিস্থিতিকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে নিজ দলের অবস্থান থেকে স্পষ্টভাবে সরে দাঁড়িয়েছেন। তিনি বলেন, ‘৭ অক্টোবরের হামলা ছিল ভয়াবহ এবং সকল জিম্মিকে অবশ্যই মুক্ত করতে হবে, কিন্তু গাজায় যে গণহত্যা, মানবিক সংকট ও অনাহার চলছে সেটাও সত্য।’ তাঁর এই মন্তব্য রিপাবলিকান দলে ইসরাইলপন্থী অবস্থানের বিপরীতে ডানপন্থীদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সংশয়ের ইঙ্গিত দেয়। অপরদিকে, বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার ঘোষণা দিয়েছেন, যদি ইসরাইল শান্তির পথে বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়- যেমন গাজায় তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি, পশ্চিম তীরে দখল বন্ধ এবং দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানে প্রতিশ্রুতি- তাহলে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেবে বৃটেন। তিনি জানান, এই স্বীকৃতি কেবল প্রতীকী নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তি রোডম্যাপের অংশ হবে- যা আগের বৃটিশ নীতির তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।

mzamin

ক্যাম্প ডেভিড বৈঠকের ২৫ বছর, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি কতদূর! by জোনাথন লেসওয়্যার

পঁচিশ বছর আগে ২০০০ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডের বনের মাঝে অবস্থিত তখনকার প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের ক্যাম্প ডেভিড রিট্রিটে বসেছিল ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মধ্যপ্রাচ্য শান্তি বৈঠক। তৎকালীন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক এবং ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত চূড়ান্ত শান্তি চুক্তির আশায় মুখোমুখি হন। ১৪ দিনব্যাপী আলোচনার পর ২৫শে জুলাই ক্লিনটন দুঃখভরে ঘোষণা করেন, কোনো সমঝোতা সম্ভব হয়নি। পরে ইসরাইল ও মার্কিন সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হয়, আরাফাত নাকি উদার ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিরা ও আলোচনায় যুক্ত কূটনীতিকরা বলেন, ইসরাইল আসলে কিছুই বাস্তবসম্মত দেয়নি। প্রস্তাবিত মানচিত্রে দেখা যায়, পশ্চিম তীরের মাত্র ৮০-৮৫ ভাগ এবং গাজার ওপর সীমিত নিয়ন্ত্রণ, আর ইসরাইল পূর্ব জেরুজালেম ও বড় বসতিগুলোর দখল রাখতে চেয়েছিল। শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে কোনো অগ্রগতি ছিল না।

জেরুজালেম ছিল সবচেয়ে বড় বাধা

ফিলিস্তিনিরা পূর্ব জেরুজালেমকে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে পূর্ণ সার্বভৌমত্ব দাবি করলেও, ইসরাইল কেবল হারাম আল-শরীফ (আল-আকসা মসজিদ এলাকা) নিয়ে সীমিত ‘কাস্টডিয়ানশিপ’ প্রস্তাব দেয়। যুক্তরাষ্ট্রও শুরু থেকেই ইসরাইলি অবস্থানকেই সমর্থন করে, যা ফিলিস্তিনিদের কাছে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ওয়াশিংটনের বিশ্বাসযোগ্যতাকে নষ্ট করে। আলোচনায় কোনো লিখিত খসড়া তৈরি না হওয়ায়, আনুষ্ঠানিকভাবে কিছুই হয়নি। মার্কিন আলোচক রবার্ট ম্যালি পরে বলেন, এহুদ বারাকের পদ্ধতির কারণে আসলে কোনো আনুষ্ঠানিক ইসরাইলি প্রস্তাব ছিল না।

অসলো প্রক্রিয়ার ব্যর্থতা ও সন্দেহ

১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তির পর ফিলিস্তিনিরা আশা করে দখলদারিত্ব কমবে। কিন্তু ২০০০ সালের মধ্যে পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি বাড়ে, সামরিক দমননীতি তীব্র হয়, আর শান্তি প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে যায়। ফলে আরাফাত বিশ্বাস করেন, ক্যাম্প ডেভিড ছিল ফাঁদ- যেখানে তাকে অতিরিক্ত ছাড় দিতে বাধ্য করা হবে। ফিলিস্তিনি পরামর্শক আক্রাম হানিয়েহ তার ‘ক্যাম্প ডেভিড পেপারস’-এ লিখেছেন, ‘এই বৈঠক তাড়াহুড়ো করে ডাকা হয়; ফিলিস্তিনিরা বারবার সতর্ক করে পরিস্থিতি এখনো উপযুক্ত নয়।’

ভুল প্রস্তুতি ও ব্যর্থতার পরিণতি

মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক ইওসি মেকেলবার্গ বলেন, সম্মেলনটির জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতি নেয়া হয়নি। বড় সমঝোতা করার আগে ছোট ছোট বিষয়ে পূর্বসম্মতি প্রয়োজন ছিল। মার্কিন আলোচক অ্যারন ডেভিড মিলারও পরে লিখেছেন, ক্যাম্প ডেভিড সম্মেলন আদৌ হওয়া উচিত ছিল না। মার্কিন দলও বহু ভুল করেছে, যা যেকোনো সমঝোতাকে আটকে দেয়। ক্যাম্প ডেভিডের ব্যর্থতার পরও ২০০০ সালের শেষ দিকে কিছু অগ্রগতি হয়। ক্লিনটন প্যারামিটার নামে পরিচিত এক কাঠামোয় উভয় পক্ষ সম্মত হয় (সংরক্ষণসহ), যা জানুয়ারি ২০০১-এর তাবা সম্মেলনে এগোয়। কিন্তু ইসরাইলি নির্বাচন ও যুক্তরাষ্ট্রে তখনকার প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের ক্ষমতায় আসা প্রক্রিয়াটিকে থামিয়ে দেয়। পরবর্তী চার বছর তীব্র দ্বিতীয় ইন্তিফাদা চলে।

আজকের শিক্ষণীয় বিষয়

ফিলিস্তিনি-আমেরিকান লেখক রামজি বারুদ বলেন, ক্যাম্প ডেভিড ছিল মূলত ব্যর্থ হওয়ার জন্য সাজানো। অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ, দমননীতি ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অবজ্ঞা- সব মিলিয়ে এটি ছিল একপক্ষীয় আলোচনার মঞ্চ। তার মতে, গাজায় চলমান যুদ্ধ ও ভবিষ্যৎ শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য শিক্ষা হলো- আন্তর্জাতিক ও মানবিক আইনের ভিত্তিতে শক্তিশালী কাঠামো ছাড়া, ইসরাইল বা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ভরসা করে টেকসই শান্তি সম্ভব নয়। আগামী দিনে জাতিসংঘে সৌদি আরব ও ফ্রান্সের যৌথ উদ্যোগে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান নিয়ে নতুন আলোচনা হতে যাচ্ছে। হয়তো এই উদ্যোগই সেই আন্তর্জাতিক কাঠামো গড়তে সাহায্য করতে পারে, যা জুলাই ২০০০-এ অনুপস্থিত ছিল।
(অনলাইন আরব নিউজ থেকে সংক্ষিপ্ত অনুবাদ) 

২৭ জুলাই ২০২৫ অব্যাহত বোমা হামলা। সরাসরি গুলি। ক্ষুধা। হাহাকার। আর লাশের স্তূপ গাজায়। অনাহারে ধুঁকে ধুঁকে মরছে নিরীহ মানুষ। এর অর্থ গাজায় দুর্ভিক্ষ চলছে। গত বছরের আগস্ট-সেপ্টেম্বর থেকে সতর্ক করা হয়েছে, গাজা দুর্ভিক্ষের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এখনও সেটাই বলা হচ্ছে। কিন্তু আসলে পরিস্থিতি যা বলে, তাতে গাজায় চরম আকারে দুর্ভিক্ষ চলছে। অসংখ্য মানুষ আছেন দুই তিনদিন ধরে কিছু খান না। কারণ, খাবার পাচ্ছেন না। শিশুরা অনাহারে থাকতে থাকতে, তাদের গায়ের চামড়া হাড়ের সঙ্গে লেগে গেছে। তাদের জন্য নেই কোনো খাদ্য, শিশুখাদ্য। মায়েদের বুকের দুধ শুকিয়ে গেছে। তারাই মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। কোথাও কিছু নেই। চারদিকে শুধু হাহাকার। একে দুর্ভিক্ষ ছাড়া কি বলা যায়! তারপরও সেখানে অব্যাহতভাবে বোমা হামলা করছে ইসরাইল। ওদিকে, গাজায় খাদ্য সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, মে মাসে বিতর্কিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ) চালু হওয়ার পর থেকে ইসরাইলি বাহিনী ও মার্কিন ভাড়াটে সেনাদের হাতে এক হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তারা খাদ্য সংগ্রহে গিয়েছিলেন। কেবল শনিবারই খাদ্যের জন্য লাইন ধরার সময় ৪২ জন নিহত হন। গাজাবাসীর দিকে ইসরাইলি সেনারা এমনভাবে গুলি ছুড়ছে, দেখে মনে হতে পারে তারা পাখি শিকার করছে। কিন্তু তারা এ কাজ করে উল্টো সুরে কথা বলছে। তারা বলছে, যারা নিহত হয়েছেন তারা খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রের বাইরে মারা গেছেন।

চারুশিল্প- রশীদ আমিনের রং-রাগ by শামসেত তাবরেজী

এখন শ্রাবণ মাস। শিল্পী রশীদ আমিন এই শ্রাবণের সাক্ষীস্বরূপ গানের গলা না ভেঁজে রঙের সুর তুলেছেন নানা মাত্রার কাগজের ওপর—জলরঙে ও ছাপচিত্র মাধ্যমে। তাঁর চিত্ররাগের নামও হয়েছে ‘মেঘমল্লার’। রশীদ আমিনের এই ভীমসেন জোসি বাজছে ৩ আগস্ট থেকে, চলবে ১৬ আগস্ট, প্রতিদিন ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত শিল্পাঙ্গন গ্যালারিতে। কিন্তু এই রাগ কানে না শুনে চোখ দিয়ে শুনতে হবে। শ্রাবণ শব্দটির মধ্যেই রয়েছে শ্রবণের প্রসঙ্গ। এখন শ্রুতি ও নজরের সম্মিলনে যে লাবণ্যসুন্দর বাংলার বর্ষা তিনি এঁকেছেন, একটু খেয়াল করলেই চোখে পড়বে আমিনের জলরঙে আঁকা বর্ষার মেঘ ঠিক কবি কালিদাসের মতো ব্যস্ত ডাকপিয়ন নয়। বরং শ্রাবণমেঘ জলভারানত গম্ভীর গর্ভিণীর মতো। সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় প্রায় সন্নিকটে, চোখেমুখে তারই এক রাহস্যিকতা খেলে বেড়াচ্ছে আর মোটা তুলিতে ধোঁয়া ছড়িয়ে যাওয়া রং বা পীতাভ পানির সুর চোখ ছাপিয়ে শ্রুতি পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে।

সাধারণত আমরা যখন গ্যালারিতে ছবি দেখি, আমাদের চোখের ডগায় মগজ বেঁধে নিতে হয়, কিছুটা বুদ্ধি খরচের ক্লেশ হয়, যদিও তার স্বাদ আরেক মাত্রার। আমিনের ‘মেঘমল্লার’ শিরোনামের এই সিরিজের ছবিগুলোতে বুদ্ধি-ব্যায়াম না করে শুধু নজরভ্রমণ করেই বর্ষাযাত্রার আনন্দ উপভোগ করা যায়। তবে মেঘমল্লার রাগের মিড়, ঘাটগুলো মনের অজানায় চালান করে দেওয়ার জন্য একটু দাঁড়িয়ে থাকার দাবি রাখে। ছবিগুলো যেমন শান্ত, তেমনি দর্শকও যদি শান্ত হয়ে ছবিগুলো দেখেন, তা আরও বেশি উপভোগ্য হবে।

আমি যতবার ছবিগুলো দেখেছি, ততবারই তীব্র এক নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হয়েছি। জলরঙের ছবিগুলোর উৎসভূমি আমিনের জীবনেরই অংশ—টাঙ্গাইলে তাঁর বাড়িটি। এ বাড়ির সঙ্গে সংগত কারণে আমার পরিচয় রয়েছে। ঘন বাঁশবন, ভেতর দিয়ে নানা মাত্রার জ্যামিতি করা বোঝা যায়, বোঝা যায় না এমতো ফাঁকফোকর, অথচ পটভূমির অধিকাংশ জায়গাজুড়েই ঘনবদ্ধ পীতাভ সবুজ, কখনো আবার হঠাৎ হলুদ লাগা নরম আলো, নীল ঢেউয়ের সহজ গতির উচ্ছ্বাস।

আরেকটি ব্যাপার লক্ষণীয়, আর্দ্রতাঘন জমিনের সারল্যকে সহজ রেখা দিয়ে বিভেদরঞ্জিত করেছেন আমিন। ছবির জমিনের ওপর মূল রেখাগুলোর বেশির ভাগ রেখাই এঁকেছেন উল্লম্ব। এতে বর্ষার প্রকৃতি আরও গাঢ় হয়ে ধরা পড়েছে। যখন আমরা দেখি এই উল্লম্বতা ভেঙে ছবিকে ছন্দ দিতে এবং দৃশ্যব্যঞ্জনাময় করার তাগিদে মোটা তুলিতে দৈগন্তিক রেখা টেনে ছবির জ্যামিতিকে সুবিন্যস্ত করেছেন, তখন আনন্দ আরও বিশেষ হয়ে ওঠে। বৃষ্টিসিক্ত বাংলার এই প্রকৃতিরূপ দেখার সৌভাগ্য হলো অনেক দিন পর।

প্রিন্ট মাধ্যমটি মনে হয় এই আর্দ্রতাস্বভাবকে খুব গ্রাহ্য করে না, কিন্তু শিল্পীর দক্ষতায় সবুজের সঙ্গে মিল খাওয়া অন্যান্য রং বা রঙের স্তরপরম্পরার এই ছবিগুলোও বর্ষাকে ধারণ করে রোমান্টিকতায়, যদিও তা অত পেলব নয়, বরং দার্ঢ্য, যেন বেশ কয়েক দিন বিরামহীন বৃষ্টির পর সামান্য সময়ের বিরতি পেয়েছে। জলরঙের ছবিগুলো ঠিক যে কথা বলতে চায়, প্রিন্টগুলো ঠিক তা-ই বলে না। ফলে, আমরা বর্ষার বৈচিত্র্য বা দ্বন্দ্বও খানিকটা ছুঁয়ে ফেলতে পারি। এই দ্বন্দ্ব ঠিক বিরোধ নয়, বরং সহোদরার মতো, দুই বোনের চেহারা নিজ নিজ বৈশিষ্ট্যে আলাদা। এখন এই বিষয়টা নির্ভর করবে গ্যালারিতে একাধিক মাধ্যমের ছবিগুলো কীভাবে দর্শকের সামনে উপস্থাপিত হবে বা হয়েছে, তার ওপর।

আমিন তাঁর ছবিতে বহুবিচিত্র রং ব্যবহার করেননি। গাঢ় বঙ্গীয় সবুজ, কদম-আভাষিত হলুদ, নরম রোদের কমলা, স্মৃতিকাতর নীল—মোটামুটি এই তাঁর রংবাহার। সেসব রং প্রযুক্ত হয়েছে খুব যে নিপুণ ড্রয়িংয়ে, তা নয়, আমার বিবেচনায় বর্ষার শুদ্ধ মূর্ততাকে তিনি হাজির করেননি ইচ্ছা করেই। বরং রোমান্টিক থরথরতা, বিনয়ী অপটুতা বরং ছবিগুলোকে এবং বর্ষাকে অধিকতর প্রকাশসম্ভব করে তুলেছেন এক বিরল বিমূর্ত শর্তে। দরকার শুধু দর্শকের চিদ্‌মুহূর্তের জন্য ছবির সামনে দাঁড়িয়ে সামান্য সময় দেওয়া। অনেকটা আলোকচিত্রী কার্তিয়ার ব্রেসঁ যেমন বলেন ‘নির্ধারক মুহূর্ত’, তার জন্য অপেক্ষা করা। কেননা, নিবিড় সময়-বিরতিই রতিসংক্রমণের মুহূর্তটি এনে দেয়, যেহেতু আমিনের ছবি শুধু দেখার নয়, শোনারও। যেন ভীমসেন জোসির কম্বুকণ্ঠে মেঘমল্লারের সুর: গরজে ঘটা ঘন কারে রি...।
‘মেঘমল্লার ১’,শিল্পী: রশীদ আমিন

দ্বিরাষ্ট্রিক সমাধানে গুরুত্বারোপ: ফিলিস্তিন প্রশ্নে জাতিসংঘের উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলন শুরু by কাউসার মুমিন

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করেছেন যে, ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাত এখন ‘ব্রেকিং পয়েন্টে’ পৌঁছে গেছে এবং এটি একটি এক-রাষ্ট্র বাস্তবতায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে-যেখানে স্থায়ী দখলদারিত্ব ও কাঠামোগত বৈষম্য বিদ্যমান থাকবে। তিনি বলেন, এমতাবস্থায় টেকসই শান্তির একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ হচ্ছে দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান, এবং তা বাস্তবায়নের জন্য আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের উচিত অবিলম্বে ও অপরিবর্তনীয় পদক্ষেপ নেয়া।

ফ্রান্স ও সৌদি আরবের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘ফিলিস্তিন প্রশ্নের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি ও দুই-রাষ্ট্র সমাধান বাস্তবায়ন’ বিষয়ক তিন দিনব্যাপী উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে গতকাল গুতেরেস বলেন, “দশকের পর দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্য কূটনীতি প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যস্ত থেকেছে, কিন্তু শান্তি অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে। শব্দ, বক্তৃতা, ঘোষণার বাস্তব জীবনে কোনো অর্থ নেই- কারণ মানুষ এগুলো বহুবার শুনেছে, কিন্তু একইসঙ্গে দেখেছে ধ্বংস ও দখলদারিত্ব এগিয়ে চলছে।”

তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, দুইটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র- ইসরাইল ও ফিলিস্তিন পারস্পরিক শান্তি ও নিরাপত্তার মধ্যে পাশাপাশি অবস্থান করবে, যার রাজধানী হবে জেরুজালেম এবং যা ১৯৬৭-র আগের সীমানা ও আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের প্রস্তাব অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।

দুই-রাষ্ট্র সমাধানের বিরোধীদের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে গুতেরেস প্রশ্ন করেন, “বিকল্প কী? এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থা যেখানে ফিলিস্তিনিদের সমান অধিকার অস্বীকার করা হবে এবং তারা স্থায়ী দখলের অধীনে বাস করতে বাধ্য হবে? এটাই কি শান্তি? এটাই কি ন্যায়বিচার? এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”

তিন দিনব্যাপী এই সম্মেলনের শুরুতেই গুতেরেস বলেন, এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট কূটনীতি, আন্তর্জাতিক আইন ও অসংখ্য প্রস্তাবকে উপেক্ষা করে টিকে আছে, তবে এটিকে নিরসন করা সম্ভব। এটি অনিবার্য নয়। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সাহসী নেতৃত্বের মাধ্যমে এটি সমাধানযোগ্য।

তিনি আহ্বান জানান, এই সম্মেলন যেন কেবল কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব পদক্ষেপের সূচনা করে, দখলদারিত্ব শেষ করে দুই-রাষ্ট্র সমাধান বাস্তবায়নের পথ প্রশস্ত করে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের গৃহীত দুটি প্রস্তাব অনুযায়ী এই তিন দিনব্যাপী সম্মেলনে সদস্য রাষ্ট্র, পর্যবেক্ষক ও আঞ্চলিক অংশীদাররা অংশ নিচ্ছেন। এতে প্লিনারি অধিবেশন ও বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক গোলটেবিল বৈঠকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা, মানবিক সহায়তা, পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

গাজায় মানবিক সংকট নিয়ে গুতেরেস বলেন, ৭ই অক্টোবর ২০২৩-এ হামাসের হামলাকে তিনি তীব্রভাবে নিন্দা করলেও, ইসরাইলের প্রতিক্রিয়ায় যে ব্যাপক ধ্বংস ঘটেছে, তা নজিরবিহীন। “গাজা একের পর এক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে গেছে। হাজার হাজার মানুষ নিহত, প্রায় পুরো জনসংখ্যা বারবার বাস্তুচ্যুত এবং অনাহারের ছায়া সকলের উপর ভর করে আছে।”

তিনি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি, অবৈধভাবে আটক সকল ব্যক্তির নিঃশর্ত মুক্তি এবং মানবিক সহায়তার পূর্ণ প্রবেশাধিকার দাবি করেন। তিনি বলেন, “এসব শান্তির পূর্বশর্ত নয়-এসবই শান্তির ভিত্তি।”

শেষ বক্তব্যে গুতেরেস বলেন, “এই সংঘাত আর পরিচালনা করে রাখা যাবে না-এটি সমাধান করতে হবে। আমরা পারফেক্ট পরিস্থিতির জন্য অপেক্ষা করতে পারি না, আমাদের সেই পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে হবে। শান্তি স্বপ্ন নয়, বাস্তব হোক- ফিলিস্তিনিদের জন্য, ইসরাইলিদের জন্য, মধ্যপ্রাচ্যের জন্য, বিশ্বের জন্য।”

উদ্বোধনী অধিবেশনে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ফিলেমন ইয়াংও গাজা যুদ্ধ এবং বৃহত্তর সংকট নিয়ে উদ্বেগ জানান। তিনি বলেন, “এইভাবে আর চলতে পারে না। এখনই সাহসী সিদ্ধান্ত নেয়ার সময়, আর কোনো বিলম্ব বা অজুহাত চলবে না।”
এদিকে ফ্রান্স আগামী সেপ্টেম্বর মাসে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছে, ফলে চীন ও রাশিয়ার পর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের মধ্যে তারা তৃতীয় দেশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নিচ্ছে। এরফলে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য হবে একমাত্র দুটি স্থায়ী সদস্য যারা এখনো ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি, যা এই ইস্যুতে তাদের আরও একঘরে করে তুলবে।

যদিও এই সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আনবে না, তবে এটি বৈশ্বিক শক্তিগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান বিভাজনকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রনের সিদ্ধান্তকে উড়িয়ে দিয়ে বলেন, “ওর কথার কোনো গুরুত্ব নেই। এতে কিছুই বদলাবে না।”

অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার গাজার মানবিক সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, তবে তিনি ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতির বিষয়টি একটি যুদ্ধবিরতির সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তিনি বলেন, “রাষ্ট্রত্ব ফিলিস্তিনিদের একটি অখণ্ড অধিকার। একটি যুদ্ধবিরতি আমাদের ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি ও দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।”

mzamin

গাজায় ইসরায়েলি হামলায় নিহত ৬০ হাজার ছাড়াল

ইসরায়েলের হামলায় গাজায় নিহতের সংখ্যা ৬০ হাজার ছাড়িয়েছে। উপত্যকাটিতে প্রায় ২২ মাস ধরে চলা সংঘাতের সময় হত্যা করা হয়েছে এই ফিলিস্তিনিদের। নৃশংস হামলার পাশাপাশি গাজা অবরোধ করে তীব্র খাদ্যসংকট সৃষ্টি করেছে ইসরায়েল। এর জেরে মৃত্যু হয়েছে দেড় শতাধিক মানুষের। তাঁদের বেশির ভাগই শিশু।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় নির্বিচার হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। আজ মঙ্গলবার উপত্যকাটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর ৬৬২ দিনে ৬০ হাজার ৩৪ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। সে হিসাবে প্রতিদিন নিহত হয়েছেন ৯০ জনের বেশি। হামলা শুরুর পর থেকে আহত হয়েছেন ১ লাখ ৪৫ হাজার ৮৭০ ফিলিস্তিনি।

আজও গাজাজুড়ে তীব্র হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। এদিন সকাল থেকে শুরু করে বিকেল সাড়ে ছয়টায় প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত অন্তত ৬২ জন নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ত্রাণ সংগ্রহ করতে গিয়ে ইসরায়েলি সেনাদের হামলায় নিহত হয়েছেন ১৯ জন। আর আগের ২৪ ঘণ্টায় আহত হয়েছেন মোট ৬৩৭ জন ফিলিস্তিনি। গাজার মোট জনসংখ্যা ২১ লাখ।

গাজায় নিজেদের অভিযানের লক্ষ্য হামাসকে নির্মূল করা বলে দাবি ইসরায়েলের। তবে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় নিহত প্রায় সবাই নারী, শিশুসহ বেসামরিক ফিলিস্তিনি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে উপত্যকাটিতে ইসরায়েল গণহত্যা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করে আসছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা। সোমবার ইসরায়েলভিত্তিক দুটি মানবাধিকার সংস্থাও একই কথা বলেছে।

গাজায় যাচ্ছে না প্রয়োজনীয় ত্রাণ

আন্তর্জাতিক চাপের মুখে গাজায় ত্রাণ প্রবেশের ওপর বিধিনিষেধ আগের তুলনায় শিথিল করেছে ইসরায়েল। উপত্যকাটির কিছু এলাকায় প্রতিদিন ১০ ঘণ্টা করে হামলা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে দেশটি। এ ছাড়া উড়োজাহাজ থেকে ত্রাণ ফেলছে কয়েকটি দেশ। তবে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য সংস্থার (ডব্লিউএফপি) অভিযোগ, গাজায় প্রয়োজনীয় পরিমাণ ত্রাণ যাচ্ছে না।

ডব্লিউএফপির পূর্ব ও মধ্য আফ্রিকা আঞ্চলিক ব্যুরোর জ্যেষ্ঠ আঞ্চলিক প্রকল্প উপদেষ্টা রস স্মিথ বলেন, ‘আমরা যে পরিমাণ ত্রাণের জন্য অনুমতি চেয়েছিলাম, তা পাইনি। এই শতাব্দীতে এর আগে এমন কিছু দেখা যায়নি।’ ডব্লিউএফপির তথ্য অনুযায়ী, গাজার প্রায় ৪ লাখ ৭০ হাজার মানুষ দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতিতে রয়েছেন। অপুষ্টিতে ভোগা ৯০ হাজার নারী-শিশুর বিশেষ চিকিৎসা প্রয়োজন।

ডব্লিউএফপির মতো একই ভাষ্য ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশনের (আইপিসি)। তারা বলছে, গাজায় প্রতি মাসে ৬২ হাজার টন খাবার প্রয়োজন। তবে ইসরায়েলের ত্রাণ সমন্বয়কারী সংস্থা সিওজিএটির তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে উপত্যকাটিতে মাত্র ১৯ হাজার ৯০০ টন খাবার প্রবেশ করেছে। আর জুনে করেছে ৩৭ হাজার ৮০০ টন।

এমন পরিস্থিতিতে গাজায় প্রতিদিনই অনাহারে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। স্থানীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, গত মার্চ মাসে ইসরায়েলের গাজা অবরোধ শুরুর পর থেকে অনাহারে অন্তত ১৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৮৮ জনই শিশু। বেশির ভাগ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে বিগত কয়েক সপ্তাহে।

‘দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের বিকল্প নেই’

গাজায় ইসরায়েলের নৃশংসতার মধ্যে গতকাল সোমবার ফিলিস্তিন-ইসরায়েল দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের লক্ষ্যে জাতিসংঘের সম্মেলন শুরু হয়েছে। এই সম্মেলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে ফ্রান্স ও সৌদি আরব। সম্মেলনে ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ নোয়েল-ব্যারট বলেছেন, ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলিদের শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে বেঁচে থাকার যে বৈধ আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, তাতে সহায়তা করতে পারে দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান।

সম্মেলনে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, গাজায় ইসরায়েল যে নির্বিচার ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে, তা অসহনীয়। এ ছাড়া ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড থেকে অবৈধভাবে পশ্চিম তীরকে বিচ্ছিন্ন করছে দেশটি। ইসরায়েলে এই দুই পদক্ষেপই বন্ধ করতে হবে।

এরই মধ্যে সোমবার এক চিঠিতে নেদার‌ল্যান্ডস সরকার জানিয়েছে, গাজা পরিস্থিতির নিন্দা জানাতে দেশটিতে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূতকে তলব করা হবে। এ ছাড়া ইসরায়েলি মন্ত্রী বেন-গভির ও বেজালাল স্মতরিচের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে দেশটি।

ইসরায়েলের হামলায় নিহত ফিলিস্তিনিদের মরদেহ দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আজ মঙ্গলবার গাজা নগরীতে
ইসরায়েলের হামলায় নিহত ফিলিস্তিনিদের মরদেহ দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আজ মঙ্গলবার গাজা নগরীতে। ছবি: এএফপি

Tuesday, July 29, 2025

গাজায় কেউ না খেয়ে নেই—দাবি নেতানিয়াহুর, দ্বিমত ট্রাম্পের

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, গাজায় কেউ অনাহারে নেই। তাঁর দাবি, ‘গাজায় অনাহারে রাখার কোনো নীতি (আমাদের) নেই এবং গাজায় কেউ না খেয়েও নেই। যুদ্ধ চলার পুরো সময় আমরা সেখানে মানবিক সহায়তা প্রবেশ করতে দিয়েছি। না হলে গাজায় এখন কোনো মানুষই থাকত না।’

তবে গাজায় কেউ অনাহারে না থাকার নেতানিয়াহুর এ দাবির সঙ্গে একমত হতে পারেননি তাঁর ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। উপত্যকাটির অস্থিচর্মসার মানুষের যেসব ছবি প্রকাশ পাচ্ছে সেগুলোর কথা উল্লেখ করে গতকাল সোমবার তিনি বলেন, ‘ওই শিশুদের খুবই ক্ষুধার্ত দেখাচ্ছে।’

আন্তর্জাতিক চাপের মুখে গাজায় ফিলিস্তিনিদের জন্য ত্রাণসহায়তা প্রবেশের সুযোগ করে দিতে ইসরায়েল এ সপ্তাহান্তে সেখানে মানবিক বিরতি ঘোষণা করেছে। আকাশ থেকে ত্রাণ ফেলা ও অন্যান্য উদ্যোগের ঘোষণাও এসেছে।

কিন্তু বাস্তবে সেখানে পরিস্থিতির খুবই সামান্য বা একেবারেই পরিবর্তন হয়নি বলে জানাচ্ছেন গাজার বাসিন্দারা।

জাতিসংঘ বলেছে, ত্রাণসহায়তা বৃদ্ধির এ উদ্যোগ এক সপ্তাহ ধরে চলবে। তবে ইসরায়েল এখনো তাদের এ ব্যবস্থা কত দিন জারি থাকবে সে বিষয়ে কিছু জানায়নি।

ইসরায়েল আকাশ থেকে গাজায় ত্রাণ ফেলেছে—এমন একটি স্থানে উপস্থিত ছিলেন হাসান আল-জালান। তিনি বলেন, ‘এভাবে ত্রাণ দেওয়া ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য অবমাননাকর।’ যেখানে ত্রাণ ফেলা হচ্ছে সেখানে মানুষ ত্রাণের জন্য লড়াই করছে। ওপর থেকে ছোলাভর্তি ক্যানগুলো মাটিতে পড়ে ভেঙে ভেতরের সব ছড়িয়ে–ছিটিয়ে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।

ইসরায়েলের দাবি, হামাসের কারণে গাজায় ফিলিস্তিনিদের কাছে ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে না। তাদের অভিযোগ, হামাস সদস্যরা ত্রাণ লুট করে নিজেদের কাছে নিয়ে নিচ্ছেন এবং গাজায় নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সেগুলো ব্যবহার করছেন।

অবশ্য বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ইসরায়েলের এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে। জাতিসংঘও গাজায় পরিকল্পিতভাবে ত্রাণ লুট হওয়ার ইসরায়েলি অভিযোগ অস্বীকার করেছে। বরং জাতিসংঘ বলেছে, গাজায় যথেষ্ট পরিমাণে ত্রাণ প্রবেশ করতে দিলে লুটপাট কমে যাবে বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।

অনাহারে মৃত্যু বাড়ছে

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) রোববার বলেছে, এ মাসে গাজায় অনাহারে ভুগে ৬৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী ২৪ শিশু রয়েছে। এ বছরের প্রথম ৬ মাসে উপত্যকাটিতে অনাহারে ১১ জন মারা গেছেন। সে তুলনায় এক মাসে ৬৩ জনের মৃত্যু উদ্বেগজনক রকম বেশি।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অনাহারে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি বলে উল্লেখ করেছে। তারা বলেছে, এ মাসে গাজায় অনাহার ও অপুষ্টিতে ভুগে ৮২ জন মারা গেছেন। তাঁদের মধ্যে ২৪টি শিশু ও ৫৮ জন প্রাপ্তবয়স্ক।

গতকাল গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে আরও বলা হয়, বিগত ২৪ ঘণ্টায় অনাহারে ১৪ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস পরিচালিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে সেখানে যুদ্ধের মধ্যে হতাহতের প্রকৃত তথ্য পাওয়ার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস বলে বিবেচনা করে জাতিসংঘ।

দ্য পেশেন্টস ফ্রেন্ডস হাসপাতাল গাজার উত্তরাঞ্চলে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের জন্য প্রধান জরুরি কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। হাসপাতালটি থেকে বলা হয়েছে, এ মাসে তারা প্রথমবারের মতো অনাহারে এমন শিশুদের মৃত্যু দেখছে, যারা আগে অসুস্থ ছিল না।

অনাহারে মারা যাওয়া কয়েকজন বয়স্ক ব্যক্তি ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ বা কিডনির রোগে ভুগছিলেন। দীর্ঘদিন অনাহারে থাকার কারণে তাঁদের অসুস্থতা আরও গুরুতর হয়ে উঠেছিল বলে জানান গাজার চিকিৎসা কর্মকর্তারা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বলেছে, উত্তর গাজায় অনাহারে চরম অপুষ্টির মাত্রা তিন গুণ বেড়েছে। সেখানে পাঁচ বছরের নিচে প্রতি পাঁচ শিশুর মধ্যে প্রায় একজন তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। মধ্য ও দক্ষিণ গাজায়ও অপুষ্টির মাত্রা দ্বিগুণ হয়েছে।

গাজায় মাত্র চারটি বিশেষায়িত কেন্দ্র রয়েছে; যেখানে অপুষ্টির চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। জাতিসংঘ বলেছে, সেগুলোতে ভিড় উপচে পড়ছে।

খাদ্যসংকট নিয়ে কাজ করা শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন’ কয়েক মাস ধরে গাজায় দুর্ভিক্ষের সতর্কতা দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ইসরায়েল প্রবেশাধিকার সীমিত রাখায় সেখান থেকে পর্যাপ্ত তথ্য সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। তাই এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করা যাচ্ছে না।

গাজায় অপুষ্টি উদ্বেগজনক পর্যায়ে, সতর্ক করল ডব্লিউএইচও

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সতর্ক করে বলেছে, ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় অপুষ্টির মাত্রা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা বিপজ্জনক গতিপথে রয়েছে।

দীর্ঘ বিরতির পর গাজায় উড়োজাহাজ থেকে ত্রাণসামগ্রী ফেলার কার্যক্রম আবার শুরুর পর ডব্লিউএইচওর কাছ থেকে এ সতর্কবার্তা এল।

গতকাল রোববার জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত গাজায় উড়োজাহাজ থেকে ত্রাণসামগ্রী ফেলে। এর আগে ইসরায়েল জানায়, তারা গাজার কিছু অংশে প্রতিদিন ১০ ঘণ্টা করে যুদ্ধ বন্ধ রাখবে। যাকে তারা বলছে, ‘কৌশলগত বিরতি’। এ বিরতির আওতায় জাতিসংঘের ত্রাণবহরের জন্য করিডর তৈরি করে দেওয়ার কথাও জানায় তারা।

ইসরায়েলের দাবি, গাজাবাসীকে ইচ্ছাকৃতভাবে অনাহারে রাখার যে ‘মিথ্যা অভিযোগ’ উঠেছে, তা খণ্ডন করতেই এ বিশেষ ব্যবস্থাগুলো নেওয়া হয়েছে। ইসরায়েলের ভাষ্য, হামাস ইচ্ছাকৃতভাবে এমন অভিযোগ তুলে বিশ্বের সামনে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছে।

জর্ডানের সামরিক বাহিনী বলেছে, গাজাবাসীর জন্য ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দিতে তারা সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে কাজ করছে। ইতিমধ্যে তারা উড়োজাহাজ দিয়ে তিন দফায় গাজায় ২৫ টন ত্রাণসামগ্রী ফেলেছে। এ ছাড়া মিসর হয়ে ত্রাণবাহী লরির একটি বহর গাজায় প্রবেশ করেছে। আরেকটি বহর ঢোকার কথা রয়েছে জর্ডান থেকে।

তবে গাজার মধ্যাঞ্চলে একটি ত্রাণবহর যে পথে অগ্রসর হচ্ছিল, তার পাশেই ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে অন্তত ৯ জন নিহত ও ৫৪ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। এমনকি গত শনিবার যুদ্ধ সাময়িক বন্ধের বিষয়টি কার্যকরের এক ঘণ্টার মাথায় গাজার একটি আবাসিক এলাকায় বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল।

স্থানীয় সূত্রগুলো বিবিসিকে জানিয়েছে, গাজার মধ্যাঞ্চলের নেতজারিন করিডরের সালাহ আল-দিন সড়কে জাতিসংঘের ত্রাণবহরের অপেক্ষায় বহু মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। সেখানেই গুলির ঘটনা ঘটে। হতাহত ব্যক্তিদের নুসাইরাতের আল-আওদা হাসপাতালে নেওয়া হয় বলে জানান হাসপাতালটির একজন চিকিৎসা কর্মকর্তা।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বলেছে, তাদের সেনাদের দিকে কিছু সন্দেহভাজন ব্যক্তি এগিয়ে আসছিলেন। তাই সেনারা সতর্কবার্তা হিসেবে গুলি ছোড়েন। তবে এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়েছেন কি না, সে বিষয়ে তারা কিছু জানে না।

অবরুদ্ধ গাজায় ত্রাণসহায়তা প্রবেশ করতে না দেওয়া নিয়ে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তীব্র আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ে ইসরায়েল। এর মধ্যে গাজায় চরম খাদ্যসংকট ও অনাহারের ঘটনা নিয়ে একের পর এক প্রতিবেদন প্রকাশিত হতে থাকে। এ চাপে পড়ে ইসরায়েল এখন কিছুটা নমনীয় হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) বলেছে, গাজার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ কয়েক দিন ধরে না খেয়ে দিন পার করছে। আর প্রতি চারজনের একজন দুর্ভিক্ষসদৃশ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে।

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি বলেছেন, উড়োজাহাজ থেকে ত্রাণ ফেলা চরম দুর্ভোগ লাঘবে সহায়ক হবে। তবে গাজায় ত্রাণসহায়তা পাঠানোর একমাত্র কার্যকর ও টেকসই উপায় হলো স্থলপথ।

গাজায় যুদ্ধ বন্ধে আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক। তিনি বলেছেন, প্রতিদিন গাজায় আরও ধ্বংস, আরও হত্যাকাণ্ড ও ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে আরও অমানবিকতা চলছে।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তাঁর প্রশাসন গাজায় আরও ত্রাণ পাঠাবে। তবে তিনি এ কথাও বলেন, এটি একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা, যুক্তরাষ্ট্রের সমস্যা নয়।

 গাজায় তীব্র অপুষ্টিতে ভোগা একটি শিশু। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
গাজায় তীব্র অপুষ্টিতে ভোগা একটি শিশু। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ফাইল। ছবি: এএফপি ও রয়টার্স

ফ্রান্স কেন ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিচ্ছে, আসল কারণ কী by মুহাম্মদ জুলফিকার রাহমাত

ফ্রান্সের ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ইন্দোনেশিয়া ‘শান্তির পথে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ’ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে। ভাসা ভাসাভাবে দেখতে গেলে, এই কূটনৈতিক সমর্থন ফিলিস্তিনের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের পক্ষে ইন্দোনেশিয়ার দীর্ঘদিনের অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু ফ্রান্সের এই ইঙ্গিতের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর ও বিপজ্জনক হিসাব–নিকাশ, যা কেবল বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে না, বরং সেটিকে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।

ফ্রান্স যে প্রস্তাব দিয়েছে, সেটা মোটেই ন্যায়বিচার নয়। এটি স্বাধীনতাও নয়। এটি সেই পুরোনো বিভ্রমেরই আধুনিক সংস্করণ, যা দশকের পর দশক ধরে ফিলিস্তিনিদের বন্দী ও ভূমিহীন করে রেখেছে। সেই তথাকথিত দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান।

জাকার্তার সরকারি বিবৃতিতে ফ্রান্সের পদক্ষেপকে স্বাগত জানানো হয়েছে তার কারণ হলো একটি ‘সার্বভৌম ও স্বাধীন’ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে সমর্থন করা হয়েছে। এর ভিত্তি হবে ১৯৬৭ সালের সীমানা এবং যার রাজধানী হবে পূর্ব জেরুজালেম। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তিনি কেমন ধরনের রাষ্ট্রের কথা চিন্তা করছেন। একটি সম্পূর্ণভাবে নিরস্ত্রীকৃত ফিলিস্তিন, ইসরায়েলের স্বীকৃতি যেখানে থাকবে। মাখোঁর কল্পিত রাষ্ট্রে বসতি উচ্ছেদের কথা নেই, দখলকৃত ভূমিতে পুনর্বাসনের কথা নেই। এমনকি গাজায় যুদ্ধাপরাধের জন্য জবাবদিহির কোনো বালাই নেই। শুধু একটি কূটনৈতিক তকমার বিনিময়ে একপেশে আত্মসমর্পণ।

এটি শান্তির পথে কোনো পদক্ষেপ নয়—এটি স্থায়ী দাসত্বের ছক।

ফ্রান্সের অবস্থান শুধু পক্ষপাতদুষ্টই নয়, এটিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। ম্যাখোঁ ‘হামাসের নিরস্ত্রীকরণের’ আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে গাজা পুনর্গঠন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু এর বিপরীতে ইসরায়েলের নিরস্ত্রীকরণ কোনো দাবি নেই, বেসামরিক মানুষ হত্যার জন্য কোনো জবাবদিহি নেই, আর ফিলিস্তিনিদের প্রকৃত সার্বভৌমত্বের কোনো নিশ্চয়তাও নেই। বরং ফিলিস্তিনিদের বলা হচ্ছে প্রতিরোধ ত্যাগ করতে, অথচ দখলদার রাষ্ট্রটির ওপর দখল শেষ করার কোনো চাপই নেই।

ইন্দোনেশিয়া যদি কোনো শর্ত ছাড়াই এই চুক্তিকে প্রশংসা করে, তবে সেটি এমন একটি কাঠামোকে সমর্থন করা হয়, যা কূটনীতির ভাষায় ফিলিস্তিনিদের অধিকার বিসর্জন দেওয়ার পথ খুলে দেয়। এভাবে, ইন্দোনেশিয়াও এমন এক প্রক্রিয়ার অংশ হচ্ছে, যা ইসরায়েলকে তার দীর্ঘস্থায়ী দখল ও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা চালিয়ে যেতে সহায়তা করে।

কারণ, আমরা গাজায় যা দেখছি, তা শুধু যুদ্ধ নয়—এটি একটি জাতিকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার একটি প্রক্রিয়া।

ইসরায়েলের নেতারা সংযমের কোনো ভান করছেন না। দেশটির অর্থমন্ত্রী বেজালেল বেজালেল স্মোট্রিচ ঘোষণা দিয়েছেন যে গাজাকে ‘পুরোপুরি ধুলার সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া’ উচিত। ইসরায়েলের আইনসভা নেসেটের সদস্যরা এবং শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা এই ভূখণ্ডকে ‘সমূলে উৎপাটন’ করার আহ্বান জানিয়েছেন। অনাহার, অবরোধ ও বোমাবর্ষণ কোনোটিই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এর পেছনে সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য আছে। লক্ষ্য শুধু শাস্তি দেওয়া নয়, বরং গাজাকে জনশূন্য করে ফেলা।

আর এই গণহত্যার আকাঙ্ক্ষাটা নতুন কিছু নয়। এটি ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থীদের দীর্ঘদিনের একটি নীলনকশার অংশ, যেটি ‘মহান ইসরায়েল’ প্রকল্প নামে পরিচিত। এই নীলনকশায় কেবল জর্ডান নদী থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখল করাটাই উদ্দেশ্য নয়, এর বিস্তৃতি আরও বেশি। একটি বিশাল ভূখণ্ডে কেবল একটি জাতির নিয়ন্ত্রণে থাকার স্বপ্ন এখানে রয়েছে। এই মডেলে ফিলিস্তিনিরা নাগরিক বা প্রতিবেশী নয়, তারা এমন এক পথের কাঁটা, যাদেরকে তুলে ফেলতে হবে।

এই প্রেক্ষাপট থেকেই ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের প্রতি ফ্রান্সের স্বীকৃতিকে বুঝতে হবে। এটি কোনো নীতিগত সাহসী সিদ্ধান্ত নয়, বরং বিশ্বজুড়ে সমালোচনার মুখে একটি বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখার কূটনৈতিক কৌশল। সচেতনভাবে হোক আর অসচেতনভাবে হোক, এটি গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে ইন্দোনেশিয়া, ইসরায়েলি শাসকদের নৈতিক মনোবল সেটিকে গ্রহণ করে, সেই শাসনব্যবস্থার জন্য একটি নৈতিক বৈধতা তৈরি করে দিচ্ছে।

এত দুর্ভোগের মুখে, অগ্রগতির যেকোনো ইঙ্গিতকে স্বাগত জানানো প্রলুব্ধকর হতে পারে। কিন্তু কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া প্রতীকী স্বীকৃতি কেবল বিদ্যমান বৈষম্যকেই আরও শক্তিশালী করে। একটিকে যদি বলা হয় ‘রাষ্ট্র’, অথচ সেটি থাকবে ইসরায়েলি চেকপোস্টে ঘেরা, কোনো প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থাকবে না, থাকবে না ফেরার অধিকার—তাহলে তা প্রকৃতপক্ষে কোনো রাষ্ট্র নয়, বরং একটি খোলা আকাশের নিচের কারাগার, যার হাতে শুধু একটি পতাকা তুলে দেওয়া হয়েছে।

গাজাবাসী যে সীমাহীন দুর্ভোগের মধ্যে আছে, তাতে কোনো অগ্রগতির আভাসকে স্বাগত জানানো যায় না। কিন্তু কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া কোনো প্রতীকী স্বীকৃতি বিদ্যমান বাস্তবতাকেই আরও শক্তিশালী করবে। সামরিক বাহিনীহীন ফিলিস্তিন! এর মানে হচ্ছে, ইসরায়েলি চেকপোস্টে ঘেরা একটি জায়গা, যাদের কোনো প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থাকবে না, থাকবে না সেখানে ফেরার অধিকার। এটি কোনো রাষ্ট্র নয়, এটি এমন এক খোলা কারাগার, যেখানে শুধু একটা পতাকা থাকবে।

এখন কূটনৈতিক নাটকের জন্য করতালি দেওয়ার দরকার নেই। এখন প্রয়োজন মিথ্যা সমাধানকে প্রত্যাখ্যান করা। এখন যে দ্বিরাষ্ট্র কাঠামোর কথা বলা হচ্ছে, সেটা ন্যায়বিচারের পথ নয়। এটি এমন একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার, যা কিনা উপনিবেশবাদকে সক্ষম করে তোলে।

* মুহাম্মদ জুলফিকার রাহমাত, সেন্টার ফর ইকোনমিকের ইন্দোনেশিয়া-মেনা ডেস্কের পরিচালক
- মিডলইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

গাজায় গণহত্যার বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ বাড়ছেই
গাজায় গণহত্যার বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ বাড়ছেই। ছবি : রয়টার্স

গাজায় দুর্ভিক্ষ, অনাহার, লাশের স্তূপ by মোহাম্মদ আবুল হোসেন

অব্যাহত বোমা হামলা। সরাসরি গুলি। ক্ষুধা। হাহাকার। আর লাশের স্তূপ গাজায়। অনাহারে ধুঁকে ধুঁকে মরছে নিরীহ মানুষ। এর অর্থ গাজায় দুর্ভিক্ষ চলছে। গত বছরের আগস্ট-সেপ্টেম্বর থেকে সতর্ক করা হয়েছে, গাজা দুর্ভিক্ষের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এখনও সেটাই বলা হচ্ছে। কিন্তু আসলে পরিস্থিতি যা বলে, তাতে গাজায় চরম আকারে দুর্ভিক্ষ চলছে। অসংখ্য মানুষ আছেন দুই তিনদিন ধরে কিছু খান না। কারণ, খাবার পাচ্ছেন না। শিশুরা অনাহারে থাকতে থাকতে, তাদের গায়ের চামড়া হাড়ের সঙ্গে লেগে গেছে। তাদের জন্য নেই কোনো খাদ্য, শিশুখাদ্য। মায়েদের বুকের দুধ শুকিয়ে গেছে। তারাই মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। কোথাও কিছু নেই। চারদিকে শুধু হাহাকার। একে দুর্ভিক্ষ ছাড়া কি বলা যায়! তারপরও সেখানে অব্যাহতভাবে বোমা হামলা করছে ইসরাইল। তারা আসলে গাজাবাসীকে চাপে ফেলে গাজা থেকে উৎখাত করতে চায়। এরপরই গাজায় তাদের কথিত ‘ভূমধ্যসাগরের রিভেরা’ বা রিসোর্ট গড়ে তুলতে পারবে। এরই মধ্যে এমন আয়োজন শুরু হয়েছে।

গাজাবাসীকে পশ্চিমতীরে ধ্বংসস্তূপের ওপর নির্মিত মানবিক শহরে আটকে রাখার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে ইসরাইল। সেখানে একবার তাদেরকে ঢোকাতে পারলে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে। কারণ, ইসরাইলি সেনারা তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করবে। তারা সেই মানবিক সিটির বাইরে যেতে পারবেন না। তাদের নড়াচড়ার কোনো অধিকার থাকবে না। ঠিক পশ্চিমা দেশে অবৈধ অভিবাসীদের যেভাবে আটকে রাখা হয়, সেই একই পরিণতি হবে তাদের। এ অবস্থায় গাজাকে আসলে কী বলা যায়, তা মাথায় ঠাহর হচ্ছে না।

বৃটেনসহ ইউরোপের অনেক দেশ এ পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। গাজায় অবরোধ তুলে নেয়ার জন্য জোর দাবি জানানো হচ্ছে। জাতিসংঘ কথা বলছে। ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার দাবি বৃটিশ পার্লামেন্টারিয়ানদের মধ্যে তীব্র হয়েছে। তারা প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারকে এ জন্য খোলা চিঠি দিয়েছেন।

গাজাকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্স। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়্যিপ এরদোগান ও মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসির সঙ্গে আলোচনা করেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন। সব মানুষ গাজায় হত্যাযজ্ঞ, অনাহারে মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়ার বিরুদ্ধে কথা বলছে। কিন্তু হায়, মুসলিম বিশ্ব! তাদের মধ্যে এ নিয়ে তেমন কোনো সাড়া নেই। মুসলিম বিশ্বের একীভূত কোনো উদ্যোগ নেই। হয়তো এ কারণে গাজাবাসীকে ক্রমশ নিষ্পেষণ করে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়ার সাহস দেখাচ্ছে ইসরাইল।

ওদিকে ফ্লোটিলা হানাদা ত্রাণ নিয়ে অগ্রসর হয়েছিল গাজার দিকে। তাতে ২১ জন ক্রু ছিলেন। তাদের সবাইকে আটক করেছে ইসরাইল। তাদের পরিণতিও হয়তো ফ্লোটিলা মেডেলিনের গ্রেটা থানবার্গদের মতো হতে পারে। হানদালা নৌযানে ১০টি দেশের ১৯ জন কর্মী ও আল জাজিরার দু’জন সাংবাদিক আছেন। কর্মীদের মধ্যে আছেন ফরাসি-সুইডিশ ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য এমা ফুরো, ফরাসি সংসদ সদস্য গ্যাব্রিয়েল ক্যাথালা, ফিলিস্তিনি-মার্কিন মানবাধিকার আইনজীবী হুয়াইদা আরাফ, ইহুদি-আমেরিকান কর্মী জ্যাকব বার্গে, তিউনিসীয় ট্রেড ইউনিয়নিস্ট হাতেম আওইনি, ৭০ বছর বয়সী নরওয়েজীয় কর্মী ভিগডিস বিওরভ্যান্ড এবং অস্ট্রেলীয় সাংবাদিক তানিয়া সাফি প্রমুখ।

ওদিকে, গাজায় খাদ্য সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, মে মাসে বিতর্কিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ) চালু হওয়ার পর থেকে ইসরাইলি বাহিনী ও মার্কিন ভাড়াটে সেনাদের হাতে এক হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তারা খাদ্য সংগ্রহে গিয়েছিলেন। কেবল শনিবারই খাদ্যের জন্য লাইন ধরার সময় ৪২ জন নিহত হন। গাজাবাসীর দিকে ইসরাইলি সেনারা এমনভাবে গুলি ছুড়ছে, দেখে মনে হতে পারে তারা পাখি শিকার করছে। কিন্তু তারা এ কাজ করে উল্টো সুরে কথা বলছে। তারা বলছে, যারা নিহত হয়েছেন তারা খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রের বাইরে মারা গেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক সিনেটর কোরি বুকার গাজায় মানবিক পরিস্থিতিকে ‘বিধ্বংসী ও হৃদয়বিদারক’ আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে ব্যাপক ত্রাণ সরবরাহের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রতিটি মুহূর্ত দেরি মানে শিশুরা, গর্ভবতী নারীসহ অসংখ্য মানুষের মৃত্যু ও তা এক স্থায়ী ক্ষতি।

অন্যদিকে, ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাঁ-নোয়েল ব্যারো জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে নিউইয়র্কে জাতিসংঘে প্রথমবারের মতো হামাসকে নিন্দা জানাবে আরব দেশগুলো এবং এর নিরস্ত্রীকরণের দাবি তুলবে। এর মাধ্যমে ইউরোপের আরও দেশকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার পথে আনা হবে।

এদিকে বৃটেনে স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি (এসএনপি) হুঁশিয়ারি দিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতির বিরোধিতা অব্যাহত রাখলে তারা সেপ্টেম্বর মাসে সংসদে ‘প্যালেস্টাইন রিকগনিশন বিল’ উত্থাপন করে ভোটে বাধ্য করবে। ইতিমধ্যে ২২০ জনের বেশি বৃটিশ এমপি, যার মধ্যে স্টারমারের লেবার পার্টির বহু সদস্য আছেন, বৃটেনকে ফ্রান্সের মতো ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিতে আহ্বান জানিয়েছেন। গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কমপক্ষে ৫৯,৭৩৩ ফিলিস্তিনি নিহত ও ১,৪৪,৪৭৭ জন আহত হয়েছেন। গাজায় দুর্ভিক্ষ নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনার মুখে ইসরাইল আকাশপথে কিছু ত্রাণ ফেলার অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু এই ত্রাণ চাহিদার তুলনায় খুবই অপ্রতুল। আকাশ থেকে ফেলা ত্রাণ সংগ্রহ করতে গিয়ে হুড়োহুড়িতে, সংঘর্ষে মানুষ আহত হচ্ছেন।

জাতিসংঘের ফিলিস্তিন বিষয়ক কমিশনার জেনারেল ফিলিপ্পে লাজারিনি এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগের কথা বলার কারণে এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। কিন্তু নির্যাতিত, নিপীড়িত মানুষের সেবা থেকে তিনি সরে যাবেন না বলে অঙ্গীকার করেছেন।

দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের লক্ষ্যে জাতিসংঘে সম্মেলন শুরু আজ: গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে ইসরায়েল -দুই মানবাধিকার সংস্থা

ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের আলোচনা পুনরায় চালুর লক্ষ্যে জাতিসংঘে সম্মেলন শুরু হচ্ছে। আজ সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে তিন দিনব্যাপী এ সম্মেলন শুরু হবে। সম্মেলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে ফ্রান্স ও সৌদি আরব। সম্প্রতি ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে প্যারিস।

১৯৪৭ সালে জাতিসংঘে ফিলিস্তিন বিভক্ত করার প্রস্তাব তোলা হয়। পরে ইহুদিদের জন্য ইসরায়েল এবং আরবদের জন্য ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়। সে অনুযায়ী ১৯৪৮ সালে ইসরায়েলকে রাষ্ট্র ঘোষণা করা হয়। দশকের পর দশক ধরে জাতিসংঘের অধিকাংশ সদস্য ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের সমর্থন জানিয়ে আসছে। তবে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র কখনো আলোর মুখ দেখেনি।

এএফপির তথ্য অনুযায়ী, জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্যদেশের মধ্যে ফ্রান্সসহ ১৪২টিই ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এ তালিকায় যুক্তরাজ্যও যোগ দেবে বলে আশা ফ্রান্সের। কারণ, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়ে সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে চিঠি দিয়েছেন ২২১ ব্রিটিশ আইনপ্রণেতা। জবাবে স্টারমার বলেছেন, এই স্বীকৃতি অবশ্যই বৃহৎ পরিকল্পনার অংশ হতে হবে।

জাতিসংঘের সম্মেলনে ইউরোপের আরও দেশ যে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিতে পারে, তার ইঙ্গিত দিয়েছেন ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ নোয়েল ব্যারটও। এ বিষয়ে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের গবেষক রিচার্ড গোয়ান বলেন, দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের বিষয় গুরুত্বহীন হয়ে পড়ার পথে ছিল। তবে ফিলিস্তিনকে ফ্রান্সের স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণার পর জাতিসংঘের এ সম্মেলনে প্রাণসঞ্চার হবে।

তবে ফিলিস্তিনের গাজায় ২১ মাস ধরে চলা ইসরায়েলের হামলা, দখলকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের নতুন নতুন বসতি স্থাপন এবং দখল করা এলাকাগুলো ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত করার যে পরিকল্পনা কথা দেশটির কর্মকর্তারা তুলে ধরছেন, তাতে দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান শেষ পর্যন্ত ভৌগলিকভাবে সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

‘গাজায় অপুষ্টি উদ্বেগজনক পর্যায়ে’

জাতিসংঘের সম্মেলন যখন শুরু হয়েছে, তখনো গাজায় নৃশংসতা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। উপত্যকাটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ইসরায়েলের হামলায় অন্তত ৫৯ হাজার ৭৩৩ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এ সময় আহত হয়েছেন ১ লাখ ৪৪ হাজারের বেশি মানুষ। হতাহত ব্যক্তিদের অধিকাংশই নারী ও শিশু।

ইসরায়েলের অবরোধের কারণে গাজায় চরম আকার ধারণ করেছে খাদ্যসংকট। তবে রোববার থেকে অবরোধ কিছুটা শিথিল করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। গাজার কিছু অংশে প্রতিদিন ১০ ঘণ্টা করে হামলা স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছে তারা। জাতিসংঘের ত্রাণবহরের জন্য করিডর তৈরি করে দেওয়ার কথাও জানিয়েছে। উড়োজাহাজে করে গাজায় ত্রাণসামগ্রী ফেলেছে জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।

তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় অপুষ্টির মাত্রা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। না খেতে পেয়ে আজও ১৪ ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের একজন শিশু।

গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে ইসরায়েল: বলছে ইসরায়েলভিত্তিক দুই মানবাধিকার সংস্থা

ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েল গণহত্যা চালাচ্ছে বলে উল্লেখ করেছে ইসরায়েলভিত্তিক শীর্ষস্থানীয় দুটি মানবাধিকার সংস্থা—বতসেলেম ও ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস। সংস্থা দুটি বলেছে, ইসরায়েলকে থামানো দেশটির পশ্চিমা মিত্রদের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব।

আজ সোমবার মানবাধিকার সংস্থা দুটির প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজায় বেসামরিক লোকজনের পরিচয় ফিলিস্তিনি হওয়ার কারণেই কেবল প্রায় দুই বছর ধরে তাঁদের নিশানা করছে ইসরায়েল। এর ফলে ফিলিস্তিনি সমাজে মারাত্মক—কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় নৃশংসতা চালাচ্ছে ইসরায়েল। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক ও ফিলিস্তিনি সংস্থা একে গণহত্যা বলে বর্ণনা করেছে। এবার ইসরায়েলের সবচেয়ে প্রভাবশালী দুটি মানবাধিকার সংস্থা এ প্রতিবেদন দেওয়ার পর দেশটির ওপর চাপ আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রতিবেদনে গাজায় ইসরায়েলের অপরাধের বিস্তারিত বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হাজার হাজার নারী, শিশু ও বৃদ্ধ ফিলিস্তিনিকে হত্যা; গণহারে বাস্তুচ্যুত করা এবং মানুষকে অনাহারে রাখা। এ ছাড়া ইসরায়েলের হামলায় ঘরবাড়িসহ বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংসের ফলে ফিলিস্তিনিরা স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাসহ বিভিন্ন মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

বতসেলেমের পরিচালক ইউলি নোভাক বলেন, ‘আমরা যা দেখতে পাচ্ছি তা স্পষ্ট—একটি গোষ্ঠীকে ধ্বংস করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক লোকজনের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে।’ জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, সবাইকে নিজেদের জিজ্ঞাসা করতে হবে—গণহত্যার মুখে আপনি কী করবেন?’

ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস তাদের প্রতিবেদনে গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর ইসরায়েলের হামলা ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। অনেক হামলার তথ্য বিস্তারিত আকারে সংগ্রহ করে নথিবদ্ধ করেছে সংস্থাটির নিজস্ব দল। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর সংঘাত শুরুর আগে গাজায় নিয়মিত কার্যক্রম চালাত সংস্থাটি।

ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটসের পরিচালক গায় শালেভ বলেন, গণহত্যাবিষয়ক কনভেনশনের ২(সি) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী শুধু স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চালানো ধ্বংসযজ্ঞই এই ‘যুদ্ধকে’ গণহত্যায় পরিণত করেছে। কোনো কিছুকে গণহত্যা বলার জন্য সনদের পাঁচটি অনুচ্ছেদের—সবকটি পূরণ করার প্রয়োজন নেই।

নিজেদের প্রতিবেদনে দুটি মানবাধিকার সংস্থাই বলেছে, ইসরায়েলের পশ্চিমা মিত্ররা দেশটির গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে সহায়তা করেছে। গাজায় মানুষের দুর্ভোগের জন্য তারাও যৌথভাবে দায়ী। ইউলি নোভাক বলেন, ‘পশ্চিমা বিশ্বের সহায়তা ছাড়া এটি (গণহত্যা) সম্ভব হতো না। কোনো নেতাই এটি থামানোর জন্য নিজেদের সাধ্য অনুযায়ী পদক্ষেপ নিচ্ছেন না।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলো এত দিন পর্যন্ত যা করেছে, তার চেয়ে এখন তাদের জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার আইনি দায়িত্ব রয়েছে বলে মনে করেন গায় শালেভ। তিনি বলেন, ‘নিজেদের হাতে থাকা সব কৌশল কাজে লাগাতে হবে। নিজেদের চিন্তাভাবনা থেকে আমরা এই কথা বলছি না। এই আহ্বান গণহত্যা কনভেনশনেই জানানো হয়েছে।’

দাতব্য রান্নাঘরের সরবরাহ করা খাবার সংগ্রহ করতে ফিলিস্তিনিদের ভিড়। আজ সোমবার গাজা নগরীতে
দাতব্য রান্নাঘরের সরবরাহ করা খাবার সংগ্রহ করতে ফিলিস্তিনিদের ভিড়। আজ সোমবার গাজা নগরীতে। ছবি: রয়টার্স

Monday, July 28, 2025

ইসরায়েল বলছে তারা গাজায় ত্রাণ দিচ্ছে, তাহলে ফিলিস্তিনিরা না খেয়ে মরছে কেন

আল–জাজিরার এক্সপ্লেইনারঃ গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, উপত্যকাটিতে ইসরায়েলের অবরোধের কারণে এখন পর্যন্ত ১২৭ জন মারা গেছেন, যার মধ্যে ৮৫ জনই শিশু। ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে এসব মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

গত মার্চে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজায় সব ধরনের ত্রাণ সরবরাহের সুযোগ বন্ধ করে দেন। তিনি বলেন, এতে যুদ্ধবিরতি মেনে নেওয়ার জন্য হামাসের ওপর চাপ বাড়বে। কিন্তু সে মাসের শেষদিকে ইসরায়েল নিজেরাই একতরফাভাবে যুদ্ধবিরতি ভেঙে দেয়।

চলতি সপ্তাহে ইসরায়েল সরকার গাজার পরিস্থিতির জন্য জাতিসংঘকে দায়ী করেছে। এমনকি তারা অভিযোগ করেছে, হামাসের সঙ্গে মিলে জাতিসংঘের ত্রাণ সংস্থা মানুষের কাছে খাবার পৌঁছাতে বাধা দিচ্ছে।

তবে এবারই প্রথম নয়, ইসরায়েল আগেও গাজায় ত্রাণ ঢুকতে বাধা দিয়েছে। ২০২৪ সালের মার্চে ইসরায়েল জাতিসংঘের ত্রাণবাহী গাড়িবহর গাজায় ঢুকতে দেয়নি। তখন তাদের উদ্দেশ্য ছিল, মানুষকে অনাহারে রেখে এলাকা ছেড়ে পালাতে বাধ্য করা। এরপর সেপ্টেম্বর মাসে ১৫টি আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থা জানায়, ইসরায়েল গাজার ৮৩ শতাংশ ত্রাণ আটকে দিচ্ছে।

দুবারই ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা ত্রাণ আটকে দেয়নি। গাজায় ত্রাণ না পৌঁছানোর কারণ হিসেবে তারা জাতিসংঘের অদক্ষতা ও হামাসকে দায়ী করেছে। অথচ যেসব স্থানে ত্রাণ যাচ্ছে না, সেগুলো অনেক দিন ধরেই নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা বলে দাবি করে আসছে ইসরায়েল।

তাহলে ইসরায়েল কী বলেছে? তারা কি স্বীকার করছে যে গাজায় একটি মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ চলছে?—প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে দেখা যাক।

এখন কি গাজায় ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে না

গাজায় দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর ইসরায়েল আন্তর্জাতিকভাবে অনেক সমালোচনার মুখে পড়ে। এরপর মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় তারা জিএইচএফ নামে একটি নতুন ত্রাণ ব্যবস্থা চালু করে। জাতিসংঘ ও অন্য ত্রাণ সংস্থাগুলোর জায়গা নেওয়াই এই জিএইচএফ চালু করার মূল উদ্দেশ্য ছিল।

আগে গাজায় প্রায় ৪০০টি ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র ছিল। এখন জিএইচএফ চালায় মাত্র চারটি কেন্দ্র। শুধু গাজার মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলে এগুলোর অবস্থান। তা-ও সেগুলো নিয়মিত পরিচালিত হয় না।

মে মাস থেকে এখন পর্যন্ত, এ কেন্দ্রগুলোর কাছে খাবার নিতে আসা সাধারণ মানুষের ওপর ইসরায়েলি সেনা ও কিছু বিদেশি ঠিকাদার হামলা চালিয়ে হাজারের বেশি মানুষকে মেরে ফেলেছে।

জাতিসংঘ এখনো সীমিত পরিসরে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম চালাচ্ছে। তবে এত বেশি বিধিনিষেধের মধ্যে কাজ চালাতে হয় যে এর কার্যকারিতা টের পাওয়া যায় না।

ইসরায়েল কি স্বীকার করছে যে গাজায় মানুষ অনাহারে মরছে

না, ইসরায়েল সেটা স্বীকার করছে না।

গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েল সরকারের কার্যক্রম সমন্বয়কারী সংস্থা সিওজিএটি বলেছে, ‘গাজা উপত্যকায় কোনো দুর্ভিক্ষ নেই।’ তবে তারা এও বলেছে, গাজার কিছু কিছু জায়গায় খাবার পাওয়া নিয়ে সমস্যা দেখা গেছে।

ইসরায়েল কি বলছে যে গাজায় পর্যাপ্ত ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে

তা নয়। ইসরায়েলের দাবি, জাতিসংঘ ঠিকমতো বিতরণ না করায় অনেক ত্রাণ রোদে থেকে থেকে নষ্ট হচ্ছে।

সম্প্রতি ইসরায়েলের সামরিক রেডিও কান-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নষ্ট হওয়ায় কিংবা মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়ায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী প্রায় এক হাজার ট্রাক ত্রাণসামগ্রী জ্বালিয়ে দিয়েছে বা মাটিচাপা দিয়েছে।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর দপ্তরের মুখপাত্র ডেভিড মেনসার গত শুক্রবার বিবিসিকে বলেন, ‘গাজায় জাতিসংঘ শত কোটি ডলারের ঠকবাজি করছে।’ তিনি অভিযোগ করেন, জাতিসংঘ হামাসের সঙ্গে মিলে ইচ্ছা করে গাজার মানুষকে ত্রাণ পেতে বাধা দিচ্ছে।

তবে মেনসার এ অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি। আর জাতিসংঘ কেন এমনটা করবে, সে ব্যাখ্যাও তিনি দেননি।

তাহলে কি জাতিসংঘ হামাসের সঙ্গে কাজ করছে

জাতিসংঘ বলছে, তারা এমন কিছু করছে না।

গত বুধবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন অভিযোগ করেন, জাতিসংঘের ত্রাণবিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার ও মানবিক সহায়তা সমন্বয়কারী দপ্তর (ওসিএইচএ) কোনো না কোনোভাবে হামাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তবে ড্যানন তাঁর অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ দেননি।

পরদিন লিখিত জবাবে টম ফ্লেচার বলেন, ‘ইসরায়েল সরকার যদি এমন কোনো প্রমাণ পেয়ে থাকে, তাহলে তারা যেন তা সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সামনে উপস্থাপন করে।’

এর আগেও, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ইসরায়েল জাতিসংঘ ত্রাণবিষয়ক সংস্থার (ইউএনআরডব্লিউএ) বিরুদ্ধে হামাসের সঙ্গে কাজ করার অভিযোগ তুলেছিল।

ইসরায়েলের ওই অভিযোগের বিরুদ্ধে একটি স্বাধীন তদন্ত হয়। ২০২৪ সালের এপ্রিলে সে স্বাধীন তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েল ওই অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি।

তাহলে কি হামাস ত্রাণ চুরি করছে

ইসরায়েলের সেনাবাহিনী ও তাদের প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্র—দুই পক্ষই বলছে, না।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে গতকাল শনিবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতিসংঘের ত্রাণ কার্যক্রম তুলনামূলক নির্ভরযোগ্য। এতে হামাসের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা কম। সংবাদপত্রটির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, হামাস যে জাতিসংঘের ত্রাণ চুরি করছে, এমন কোনো প্রমাণ নেই।

জুনের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডি তাদের এক অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে বলেছে, হামাস যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ত্রাণ পরিকল্পিতভাবে লুট করছে বলে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এখন পর্যন্ত যত তথ্য সামনে এসেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, যেসব ত্রাণ পরিকল্পিতভাবে লুট হচ্ছে, তার পেছনে মূলত কিছু অপরাধী চক্র জড়িত। আর এসব চক্র বর্তমানে ইসরায়েল ও জিএইচএফের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করছে।

গাজার মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে না কেন

জাতিসংঘ বলছে, মাসের পর মাস ইসরায়েলি অবরোধের কারণে গাজার সমাজব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। অনাহারে থাকা লোকজন এতটাই মরিয়া হয়ে গেছেন যে খাবারবাহী ট্রাক দেখলেই হুমড়ি খেয়ে পড়েন।

যেসব এলাকায় সবচেয়ে বেশি ত্রাণ প্রয়োজন, সেসব এলাকায় ত্রাণ পৌঁছাতে জাতিসংঘের প্রয়োজন ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সহায়তা।

তবে বুধবার জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক বলেন, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর কাছে তাঁরা ১৬টি জায়গায় খাবার বিতরণের অনুমতি চেয়েছিলেন। এর মধ্যে অর্ধেক আবেদনই প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

সাংবাদিকদের ডুজারিক বলেন, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের চাপিয়ে দেওয়া আমলাতান্ত্রিক ও পরিচালনাসংক্রান্ত অন্যান্য বাধা, গাজার ভেতরে চলমান সংঘর্ষ ও চলাচলের সীমাবদ্ধতা, লুটপাটের ঘটনা, ত্রাণ নামাতে জড়ো হওয়া মানুষের ওপর গুলি চালানোর মতো ঘটনায় ত্রাণ বিতরণ প্রচেষ্টা ব্যাহত হচ্ছে।

এর পরিণতি কী

অনাহার। ওপরে বলা হয়েছে, গাজায় এখন পর্যন্ত ১২৭ জন অনাহারে ভুগে মারা গেছেন, যাদের বেশির ভাগই শিশু।

ক্ষুধাজনিত মৃত্যু সাধারণত তিনটি পর্যায়ে ঘটে। প্রথম ধাপ শুরু হয় খাবার না খাওয়া থেকে। দ্বিতীয় ধাপে শরীর তার জমা চর্বি থেকে শক্তি নেয়। তৃতীয় ধাপে, সব চর্বি শেষ হলে শরীর পেশি আর হাড় ভেঙে শক্তি তৈরি করে, যা খুবই মারাত্মক ও অনেকটাই প্রাণঘাতী।

গাজার চিকিৎসক ওমর আবদেল মান্নান বলেন, এ মৃত্যুটা ধীরে হয় এবং তা খুব নির্মম।

কেন বয়স্কদের চেয়ে শিশুর মৃত্যু বেশি

কারণ শিশুদের শরীর খুব অল্প শক্তি দিয়ে অনেক কিছু করার চেষ্টা করে। ছোট শিশুদের শরীরে চর্বি ও পেশি কম থাকে। তাই না খেয়ে থাকলে তারা শরীর থেকে খুব বেশি শক্তি নিতে পারে না। আবার শরীর বেড়ে ওঠার কারণে তাদের মৌলিক বিপাকক্রিয়া বেশি তৎপর থাকে।

শিশুদের শরীরের সঞ্চিত শক্তি অনেক কম থাকায় খাবার না পেলে তারা দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে।গাজায় অনাহারে মারা যাচ্ছে শিশু ও বৃদ্ধরা, দুই দিনে ২৯ জনের মৃত্যু।

ইসরায়েলি অবরোধ শেষ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আছে

এখনই কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারছে না।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর জোট সরকার এ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বিরোধিতা বা দেশের ভেতরের ক্ষোভ—কোনোটিই গুরুত্ব দিচ্ছে না। গাজায় যুদ্ধাপরাধ ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তারা সরাসরি উড়িয়ে দিচ্ছে। তারা এসব অভিযোগকে ‘ইহুদিবিদ্বেষ’ ও ‘অপবাদ’ বলে উল্লেখ করেছে।

বেশির ভাগ বিশ্লেষকের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পই একমাত্র প্রভাবশালী ব্যক্তি, যিনি গাজা ও আশপাশের এলাকায় ইসরায়েলকে থামাতে পারেন।

তবে সমস্যা হলো, ট্রাম্প কী করবেন, সেটা আগে থেকে বোঝা খুব কঠিন। বিশ্লেষকদের মতে, তিনি এতটাই অনিশ্চিত আচরণ করেন যে তা আগে থেকে বলা প্রায় অসম্ভব।

ফিলিস্তিনি মা সামাহ মাতার অপুষ্টিজনিত অসুস্থতায় ভোগা ছেলে ইউসেফকে কোলে ধরে রেখেছেন
ফিলিস্তিনি মা সামাহ মাতার অপুষ্টিজনিত অসুস্থতায় ভোগা ছেলে ইউসেফকে কোলে ধরে রেখেছেন। ফাইল ছবি: রয়টার্স

থাই-কম্বোডিয়ার সামরিক শক্তি পরীক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র-চীন যেভাবে যুক্ত by ব্রাড লেনডন

থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া সীমান্তে যে প্রাণঘাতী সংঘাত চলছে, তাতে একপাশে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্র ও কয়েক দশকের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন থাইল্যান্ডের সামরিক বাহিনী। আর অপরপাশে রয়েছে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখা কম্বোডিয়ার তুলনামূলকভাবে কম অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সামরিক শক্তি।

ঔপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্স এক শতাব্দীরও আগে যখন তাদের সীমান্ত ভাগ করে দিয়েছিল, তখন থেকেই ব্যাংকক ও নমপেন নিজেদের সীমান্তে একটি বিতর্কিত ভূখণ্ড নিয়ে লড়াই করে আসছে।

গত বৃহস্পতিবার যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এক ডজনের বেশি মানুষ নিহত, কয়েক ডজন আহত এবং দেড় লাখেরও বেশি বেসামরিক নাগরিককে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই সংঘাতের পেছনে দুই পক্ষের সামরিক ইতিহাস ও সক্ষমতার দিকে নজর দেওয়া যাক।

সামরিক শক্তিতে থাইল্যান্ড

থাইল্যান্ডের সামরিক বাহিনী প্রতিবেশী কম্বোডিয়ার চেয়ে জনবল ও অস্ত্রশস্ত্রে অনেক বড়। থাইল্যান্ডের মোট ৩ লাখ ৬১ হাজার সক্রিয় সামরিক সদস্য রয়েছে, যা কম্বোডিয়ার তিন গুণ। আর এই সেনাদের হাতে এমন সব অস্ত্রশস্ত্র রয়েছে যা কম্বোডিয়ার সেনারা কেবল স্বপ্নই দেখতে পারে।

ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস) ২০২৫ সালে তাদের এক প্রতিবেদনে লিখেছে, ‘থাইল্যান্ডের বিপুল অর্থ বরাদ্দপ্রাপ্ত একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনী রয়েছে এবং এর বিমানবাহিনী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে সজ্জিত ও প্রশিক্ষিত বিমানবাহিনীগুলোর মধ্যে অন্যতম।’

অন্যদিকে, লোয়ি ইনস্টিটিউটের ২০২৪ সালের ২৭টি আঞ্চলিক দেশের সামরিক সক্ষমতার র‍্যাঙ্কিংয়ে থাইল্যান্ড ১৪তম স্থানে রয়েছে, যেখানে কম্বোডিয়া ২৩তম স্থানে। এই বৈষম্য হয়তো স্বাভাবিক, কারণ থাইল্যান্ডের জনসংখ্যা কম্বোডিয়ার চার গুণ এবং জিডিপি ১০ গুণেরও বেশি বড়। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে আঞ্চলিক যুদ্ধ যেভাবে কম্বোডিয়া, লাওস এবং ভিয়েতনামকে গ্রাস করেছিল, থাইল্যান্ড সেখান থেকে মুক্ত ছিল। এমনকি পূর্বের ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের ধ্বংসযজ্ঞ থেকেও রেহাই পেয়েছিল দেশটি।

সামগ্রিকভাবে সামরিক, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক ক্ষমতাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে লোয়ি এশিয়া পাওয়ার ইনডেক্সে থাইল্যান্ড ১০ম স্থানে রয়েছে, যেটি মধ্যম মানের শক্তি হিসেবে বিবেচিত, ইন্দোনেশিয়ার ঠিক পেছনে কিন্তু মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর চেয়ে এগিয়ে। লোয়ির র‍্যাঙ্কিংয়ে কম্বোডিয়াকে বিবেচনা করা হয়েছে এশিয়ায় একটি ক্ষুদ্র শক্তি হিসেবে। বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা এবং লাওসের মতো দেশগুলোর সঙ্গে একই গ্রুপে অবস্থান কম্বোডিয়ার।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে থাইল্যান্ডের শক্তিশালী সম্পর্ক

থাইল্যান্ডের সামরিক বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে দেশটির রাজনীতিতে একটি প্রধান ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশটির ওপর বহু বছর ধরে সামরিক বাহিনী, রাজতন্ত্র এবং অভিজাত ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে গঠিত একটি রক্ষণশীল শক্তিশালী গোষ্ঠী প্রভাব বিস্তার করে আছে।

সিআইএ ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুক অনুসারে, ১৯৩২ সাল থেকে জেনারেলরা ২০টি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেছে, প্রায়শই গণতান্ত্রিক সরকারগুলোকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে এবং সামরিক বাহিনী নিজেদের রাজতন্ত্রের একমাত্র রক্ষাকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর অনুসারে, একটি চুক্তির মাধ্যমে থাইল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ।

১৯৫৪ সালে দুই দেশের মধ্যে সেই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যেটি ম্যানিলা চুক্তি নামে পরিচিত। তখন থেকে দুই দেশের মধ্যে মিত্রতার সম্পর্ক। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় থাইল্যান্ড তাদের বিমান ঘাঁটিতে বি-৫২ বোমারু বিমানসহ মার্কিন বিমানবাহিনীর সরঞ্জামের জায়গা দিয়েছিল। হাজার হাজার থাই সেনা মার্কিন সমর্থিত দক্ষিণ ভিয়েতনামের পক্ষে যুদ্ধও করেছিল।

ওয়াশিংটন ও ব্যাংককের মধ্যে যে সম্পর্ক বজায় আছে, সেটি বেশ শক্তিশালী। থাইল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোর বাইরে প্রধানতম মিত্র হিসেবে দেখে। এর ফলে থাইল্যান্ড বিশেষ সুবিধা পায়, যেটির মাধ্যমে কয়েক দশক ধরে তাদের অস্ত্র কর্মসূচির জন্য মার্কিন সমর্থন পেয়ে আসছে।

থাইল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র মিলে কোবরা গোল্ড নামে একটি বাৎসরিক যৌথ সামরিক মহড়া চালিয়ে থাকে। ১৯৮২ সাল থেকে এ যৌথ মহড়া শুরু হয়েছিল, যদিও পরবর্তীতে আরও অনেকে এ মহড়ায় যুক্ত হয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী অনুসারে, এটি বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা আন্তর্জাতিক সামরিক মহড়া।

কোবরা গোল্ড ছাড়াও থাই এবং মার্কিন বাহিনী একসঙ্গে ৬০টিরও বেশি মহড়া পরিচালনা করে এবং প্রতি বছর ৯০০টিরও বেশি মার্কিন বিমান এবং ৪০টি নৌ জাহাজ থাইল্যান্ডে আসে বলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে দীর্ঘ সামরিক ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও, সম্প্রতি থাই সামরিক বাহিনী তাদের সামরিক নীতিতে আরও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার চেষ্টা করছে। গত দশকে তারা চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়েছে। মিলিটারি ব্যালেন্সের প্রতিবেদন অনুসারে, কোনো একটি দেশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে না থাকতে ইসরায়েল, ইতালি, রাশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও সুইডেনের মতো দেশগুলোর সাহায্যে একটি শক্তিশালী দেশীয় অস্ত্র শিল্পও গড়ে তুলেছে তারা।

কম্বোডিয়ার চীনা সমর্থন

কম্বোডিয়ার সামরিক বাহিনী থাইল্যান্ডের তুলনায় একেবারে নবীন। আইআইএসএস অনুসারে, ১৯৯৩ সালে কমিউনিস্ট সরকারের বাহিনীর সঙ্গে দুটি অ-কমিউনিস্ট প্রতিরোধ বাহিনীর একত্রিত হয়ে এই সেনাবাহিনী গঠিত হয়।

আইআইএসএস বলে, ‘আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষায় চীন ও ভিয়েতনামের সঙ্গে কম্বোডিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের জন্য রাশিয়ার ওপর ঐতিহ্যগতভাবে নির্ভরশীল হওয়া সত্ত্বেও, কম্বোডিয়ার প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের একটি প্রধান সরবরাহকারী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে চীন।’ বেইজিং কম্বোডিয়ায় একটি নৌঘাঁটিও তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, থাইল্যান্ড উপসাগরে অবস্থিত রিম নৌঘাঁটি চীনা বিমানবাহী রণতরীগুলোকে আশ্রয় দিতে সক্ষম হবে।

কম্বোডিয়া ও চীন মে মাসে গোল্ডেন ড্রাগন নামে তাদের বাৎসরিক যৌথ সামরিক মহড়া সপ্তমবারের মতো সম্পন্ন করেছে, যা এ যাবৎকালের বৃহত্তম মহড়া হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল এবং এতে তাজা গোলাবারুদ নিক্ষেপের প্রশিক্ষণও অন্তর্ভুক্ত ছিল। চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির ওয়েবসাইট অনুসারে, দুই দেশের মধ্যে এই প্রতিরক্ষাসম্পর্কটি এ বছর ‘একটি নতুন স্তরে পৌঁছাবে এবং একটি নতুন উন্নয়ন ঘটাবে’ বলে আশা করা হচ্ছে।

চীনা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সিনিয়র কর্নেল উ কিয়ান ফেব্রুয়ারিতে এক সংবাদ সম্মেলনে দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে বলেছিলেন, ‘চীন ও কম্বোডিয়ার বন্ধুত্ব লোহার মতো শক্তিশালী। তারা সর্বদা একে অপরকে সমর্থন করে। দুই সামরিক বাহিনীর মধ্যে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক এবং পাথরসম দৃঢ় ভ্রাতৃত্ব বিদ্যমান।’
কম্বোডিয়ার সামরিক বাহিনীর এই সমর্থন প্রয়োজন। আইআইএসএস রিপোর্ট অনুসারে, ‘কম্বোডিয়ার বর্তমানে তার সশস্ত্র বাহিনীর জন্য আধুনিক সরঞ্জাম তৈরি করার ক্ষমতা নেই।’

উভয় পক্ষের অস্ত্রশস্ত্র

কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে শক্তিশালী হয়ে রয়্যাল থাই এয়ার ফোর্স ভালোভাবে সজ্জিত। আইআইএসএস অনুসারে অন্তত ১১টি আধুনিক সুইডিশ গ্রিপেন যুদ্ধবিমান এবং কয়েক ডজন পুরোনো মার্কিন এফ-১৬ ও এফ-৫ যুদ্ধবিমান রয়েছে। অন্যদিকে কম্বোডিয়ার যুদ্ধ করতে সক্ষম কোনো বিমানবাহিনী নেই।

আর স্থলে থাইল্যান্ডের কয়েক শ মার্কিন ট্যাংক রয়েছে, যার মধ্যে ৬০টি আধুনিক। অন্যদিকে কম্বোডিয়ার প্রায় ২০০টি পুরোনো চীনা-ও সোভিয়েত নির্মিত ট্যাংক রয়েছে।
থাই সেনাবাহিনীর ৬০০টিরও বেশি আর্টিলারি রয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ৫৬টি শক্তিশালী ১৫৫ মি.মি যুদ্ধাস্ত্র এবং ৫৫০টিরও বেশি ১০৫ মি.মি টোয়েড গান রয়েছে। আইআইএসএস-এর তথ্য অনুসারে, কম্বোডিয়ার মাত্র এক ডজন ১৫৫ মি.মি যুদ্ধাস্ত্র রয়েছে, যার সঙ্গে প্রায় ৪০০টি ছোট টোয়েড আর্টিলারি রয়েছে।

থাইল্যান্ডের কাছে আছে মার্কিন কোবরা অ্যাটাক হেলিকপ্টার ও ১৮টি মার্কিন ব্ল্যাক হক যুদ্ধযান। কম্বোডিয়ার কাছে আছে মাত্র কয়েক ডজন পুরোনো সোভিয়েত এবং চীনা হেলিকপ্টার।

এরপর কী?

ইউএস প্যাসিফিক কমান্ডের সাবেক ডিরেক্টর ও হাওয়াই-ভিত্তিক সামরিক বিশ্লেষক কার্ল শুস্টার বলেছেন, পরিসংখ্যান ও মানের দিক থেকে সামরিকভাবে থাইল্যান্ড এগিয়ে থাকলেও কম্বোডিয়া অন্তত একটি দিক থেকে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে, সেটি হচ্ছে বিতর্কিত সীমান্ত এলাকায় তাদের ভূগত অবস্থান। শুস্টার সিএনএনকে বলেছেন, কম্বোডিয়ার দিক থেকে বিতর্কিত সীমান্ত এলাকায় প্রবেশে সুবিধা বেশি।

তিনি আরও বলেন, কম্বোডিয়ার বাহিনী বিতর্কিত সীমান্ত এলাকায় ল্যান্ডমাইন ও বিভিন্ন ফাঁদ স্থাপন করায় থাইল্যান্ডকে দূরপাল্লার অস্ত্রের ওপর নির্ভর করতে হবে। শুস্টার বলেছেন, ‘থাইল্যান্ডের বিমানবাহিনী বেশ শক্তিশালী এবং তাদের বিশেষ ফোর্সটি লড়াইয়ে শ্রেষ্ঠ। আমি মনে করি থাইরা সংঘাতে বিমান শক্তি এবং দূর-পাল্লার অস্ত্রের ওপর জোর দিতে পছন্দ করবে।’

* ব্রাড লেনডন, দক্ষিণ কোরিয়াভিত্তিক সাংবাদিক। সিএনএন ইন্টারন্যাশনালের সিনিয়র নিউজ ডেস্ক রিপোর্টার
- সিএনএন থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ মহড়ায় থাই সামরিক বাহিনী।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ মহড়ায় থাই সামরিক বাহিনী। ফাইল ছবি: এএফপি

Sunday, July 27, 2025

গাজার শিশুদের মধ্যে মারাত্মক অপুষ্টি তিনগুণ বেড়েছে

গাজার অবরুদ্ধ এলাকায় ক্ষুধার সংকট ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। মেডিসিন সান ফ্রন্টিয়ার্স (এমএসএফ) জানিয়েছে, গাজা সিটিতে তাদের ক্লিনিকে ৫ বছরের নিচের শিশুদের মধ্যে মারাত্মক অপুষ্টির হার গত দুই সপ্তাহে তিনগুণ বেড়েছে। প্রতিদিন ক্ষুধার কারণে মানুষের মৃত্যু ঘটছে। কারণ ইসরাইল মাত্র সামান্য পরিমাণে ত্রাণ ঢুকতে দিচ্ছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন গার্ডিয়ান। এমএসএফ জানায়, গাজা সিটিতে তাদের ক্লিনিকে মে মাস থেকে অপুষ্টির চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের সংখ্যা চারগুণ বেড়েছে। গত সপ্তাহে তারা যে শিশু ও গর্ভবতী বা দুগ্ধদানকারী নারীদের পরীক্ষা করেছে, তাদের এক-চতুর্থাংশই অপুষ্টিতে ভুগছিল। সংগঠনটির ১,০০০-এরও বেশি কর্মী গাজায় মাতৃসেবা থেকে শুরু করে জরুরি সার্জারি পর্যন্ত বিভিন্ন চিকিৎসা দিচ্ছে। এমএসএফ ইসরাইলের বিরুদ্ধে ‘ক্ষুধাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার’ করার অভিযোগ তুলেছে। শতাধিক ত্রাণ সংস্থা বলছে, ইসরাইল গাজায় অধিকাংশ ত্রাণ ঢুকতে দিচ্ছে না। সংস্থাটি বলেছে, ক্ষুধাকে যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ইসরাইলের ব্যবহার নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মীরাও এখন বাঁচার জন্য লড়ছে।

গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কমপক্ষে ১২২ জন ক্ষুধায় মারা গেছে। ২৪ ঘণ্টায় আরও ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি বলেছে, গাজার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ দিনের পর দিন কিছু খেতে পারছে না। আর ৯০,০০০ নারী ও শিশুর জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন। গাজার স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ নাজি আল-কুরাশালি বলেন, প্রকৃত পরিস্থিতি সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়ে অনেক ভয়াবহ। তিনি অনুমান করেন, প্রতিদিন তিনি যে শত শত গর্ভবতী নারীকে দেখেন, তাদের অর্ধেক অপুষ্টিতে ভুগছেন।

তিনি বলেন, এত ভয়াবহ অবস্থা আমি আমার চিকিৎসা জীবনে কল্পনাও করিনি। গর্ভপাতের ঘটনা বেড়ে গেছে, আর জন্ম নেওয়া শিশুরা অধিকাংশই ওজন কম, অকালে জন্ম নিচ্ছে বা জন্মগত বিকৃতিতে আক্রান্ত হচ্ছে। তিনি আরও জানান, পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম নেই, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ব্যবহার করতে হচ্ছে, এমনকি নোংরা গ্লাভস দিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। একজন অসহায় চিকিৎসক হিসেবে এটা সহ্য করা যায় না। অনেক সময় হাসপাতালে দৌড়ে বের হয়ে যাই কারণ রোগীদের ন্যূনতম চাহিদাও পূরণ করতে পারি না।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, গণক্ষুধার ঘটনায় সবচেয়ে আগে মারা যায় শিশুরা ও গর্ভবতী নারীরা। তবে ইসরাইল ক্ষুধা সংকটের দায় অস্বীকার করেছে। তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একে ‘ইসরাইলের বিরুদ্ধে বিদেশি ষড়যন্ত্র’ বলে উল্লেখ করেছে এবং দায় দিয়েছে জাতিসংঘকে, যারা ইসরাইলি বিধিনিষেধের কারণে গাজায় ৪০০টি বিতরণকেন্দ্র ব্যবহার করতে পারছে না।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এটা শুধু মানবিক সংকট নয়, নৈতিক সংকটও, যা বিশ্বের বিবেককে চ্যালেঞ্জ করছে। শুক্রবার বৃটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির নেতারা এক বিবৃতিতে বলেন, গাজার মানবিক বিপর্যয় এখনই শেষ হওয়া উচিত এবং ইসরাইলকে ত্রাণে বিধিনিষেধ শিথিল করার আহ্বান জানান।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন বৃহস্পতিবার ঘোষণা করেন, সেপ্টেম্বরের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ফ্রান্স ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারের ওপরও একই চাপ বাড়ছে।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ম্যাক্রনের ঘোষণাকে গুরুত্বহীন বলে উড়িয়ে দেন। ইসরাইলি সেনাবাহিনী ঘোষণা করেছে, তারা জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে গাজায় বিমান থেকে ত্রাণ ফেলতে দেবে, যদিও এটি ব্যয়বহুল এবং লরি দিয়ে আনা ত্রাণের তুলনায় কম সরবরাহ বহন করতে পারে। হামাস একে ‘রাজনৈতিক নাটক’ হিসেবে অভিহিত করেছে। গাজায় গর্ভবতী ৩১ বছর বয়সী আমাল মাসরি বলেন, খাবার পাওয়া প্রায় অসম্ভব। অধিকাংশ সময় আমি ভীষণ দুর্বল বোধ করি, রক্তচাপ খুব কম থাকে, মনে হয় দম বন্ধ হয়ে আসছে, যেন মৃত্যু আসন্ন। তার স্বামী মার্কিন-সমর্থিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনের (জিএইচএফ) বিতরণ কেন্দ্র থেকে খাবার পেতে ব্যর্থ হচ্ছেন এবং অনেক সময় আহত হয়ে ফিরছেন। ১,০০০-রও বেশি মানুষ এসব বিতরণকেন্দ্রের কাছে খাবার সংগ্রহের চেষ্টায় গুলি খেয়ে মারা গেছে, যদিও জিএইচএফ এ দায় অস্বীকার করেছে।

এদিকে, যুদ্ধবিরতি আলোচনাও ভেস্তে গেছে। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র কাতার থেকে নিজেদের আলোচক ফিরিয়ে নিয়েছে। ট্রাম্প হামাসকে দোষারোপ করে বলেছেন, ওরা সমঝোতা চায় না, আর ওদের নেতাদের শিকার করা হবে। হামাস অভিযোগ করেছে, সমঝোতা ভেস্তে যাওয়ার জন্য ইসরাইল দায়ী। হামাস কর্মকর্তা বাসেম নাঈম বলেন, আমরা যে প্রস্তাব দিয়েছি তা পরিস্থিতির জটিলতা বিবেচনায় যথেষ্ট কার্যকর, যদি শত্রুপক্ষ সমঝোতায় ইচ্ছুক হতো।

mzamin

ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিতে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীকে ক্যাবিনেট মন্ত্রী ও এক-তৃতীয়াংশ এমপির চাপ

গাজার ক্ষুধার্ত বেসামরিকদের কাছে ত্রাণ আটকে রাখার ইসরাইলি পদক্ষেপের জেরে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারের ওপর চাপ বাড়ছে। তার ক্যাবিনেটের শীর্ষস্থানীয় মন্ত্রী এবং এক-তৃতীয়াংশের বেশি এমপি দ্রুত ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার দাবি তুলেছেন। ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেইনার এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপারসহ একাধিক মন্ত্রী মনে করেন, সরকারকে ফ্রান্সের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন গার্ডিয়ান।

আন্তর্জাতিক মহলে ইসরাইলের কর্মকাণ্ড নিয়ে ক্ষোভ বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে গাজা সিটিতে ৫ বছরের নিচের শিশুদের মারাত্মক অপুষ্টির ঘটনা গত দুই সপ্তাহে তিনগুণ বেড়ে যাওয়ার পর উদ্বেগ, ক্ষোভ আরও বেড়েছে। বৃটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি শুক্রবার এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, গাজার মানবিক বিপর্যয় এখনই শেষ হওয়া উচিত এবং ইসরাইলকে ত্রাণ প্রবাহে সব ধরনের বাধা সরিয়ে দিতে হবে। তারা আরও যোগ করেছে, বেসামরিক জনগণকে জরুরি মানবিক সাহায্য থেকে বঞ্চিত করা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন ও জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেৎসের সঙ্গে বৈঠকের পর স্টারমার বলেন, জিম্মিদের বন্দি অব্যাহত থাকা, ফিলিস্তিনি জনগণকে অনাহারে রাখা, ত্রাণ অস্বীকার, চরমপন্থী বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বৃদ্ধি এবং গাজায় ইসরাইলের অসামঞ্জস্যপূর্ণ সামরিক তৎপরতা- এসব কিছুই অগ্রহণযোগ্য। স্টারমার বলেন, তিনি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়ার পক্ষে স্পষ্ট সমর্থন দেন, তবে এটি একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হতে হবে যা দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পথে নিয়ে যাবে এবং ফিলিস্তিনি ও ইসরাইলি উভয়ের জন্য স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। এর ফলে যারা ভোগান্তিতে আছে তাদের জীবনের উন্নতি ঘটাতে স্বীকৃতিটি সর্বাধিক কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠবে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার স্কটল্যান্ডে চার দিনের সফরে পৌঁছান, সেখানে সোমবার তার স্টারমারের সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা। এর আগে ম্যাক্রন ঘোষণা করেন, ফ্রান্স সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে। ম্যাক্রনের পদক্ষেপকে গুরুত্বহীন বলে উড়িয়ে দেন ট্রাম্প এবং বলেন, এটা কিছুই পরিবর্তন করবে না। বৃটেনের নীতি অনুযায়ী, তারা ফিলিস্তিনকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেবে কেবল শান্তি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এবং অন্যান্য পশ্চিমা দেশের সঙ্গে সমন্বয়ে, সর্বোচ্চ প্রভাব সৃষ্টির উপযুক্ত সময়ে।

রেইনার ও কুপারসহ অন্তত সাতজন ক্যাবিনেট মন্ত্রী জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং, আইনমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ এবং নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড বিষয়ক মন্ত্রী হিলারি বেন সাম্প্রতিক বৈঠকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র স্বীকৃতির পক্ষে কথা বলেছেন। স্কটল্যান্ড মন্ত্রী ইয়ান মারে ও ওয়েলস মন্ত্রী জো স্টিভেন্সও বিষয়টি তুলেছেন। সংস্কৃতি মন্ত্রী লিসা ন্যান্ডি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামিও ডাউনিং স্ট্রিটকে আরও দৃঢ় অবস্থান নিতে চাপ দিচ্ছেন বলে জানা গেছে।

এক সরকারি সূত্র বলছে, এখন অবস্থা দাঁড়িয়েছে প্রায় সবাই বনাম ১০ নম্বর (ডাউনিং স্ট্রিট) অবস্থান করছে। গত মাসে রেইনার বলেন, গাজার ক্ষেত্রে পশ্চিমা বিশ্বকে অতীতের ভুল এড়াতে হবে। সেন্ট পলস ক্যাথেড্রালে স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যার ৩০তম বার্ষিকীতে তিনি বলেন, ১৯৯০-এর দশকে পশ্চিমা বিশ্ব দেরিতে পদক্ষেপ নিয়েছিল। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে হবে এবং নিষ্ক্রিয়তার পরিণতি এড়াতে হবে। শুক্রবার নয়টি দলের ২২১ জন এমপি জাতিসংঘের নিউ ইয়র্ক সম্মেলনের আগে বৃটিশ স্বীকৃতির আহ্বান জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ল্যামিকে চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে বলা হয়েছে, বৃৃটেনের এককভাবে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ক্ষমতা নেই। কিন্তু ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা ও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হওয়ায় বৃটিশ স্বীকৃতি বিশেষ প্রভাব ফেলবে। ১৯৮০ সাল থেকে আমরা দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানকে সমর্থন করেছি। স্বীকৃতি সেই অবস্থানকে বাস্তব রূপ দেবে।

চিঠির স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন লেবার পার্টির একাধিক কমিটির চেয়ারম্যান এমিলি থর্নবেরি (বিদেশ বিষয়ক), সারা চ্যাম্পিয়ন (আন্তর্জাতিক উন্নয়ন) এবং তানমানজিত সিং ধেসি (প্রতিরক্ষা)।

এছাড়া সই করেছেন লিবারেল ডেমোক্র্যাট নেতা এড ডেভি, গ্রিন পার্টির যৌথ নেতা কার্লা ডেনিয়ার ও অ্যাড্রিয়ান র‌্যামসি, স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির ওয়েস্টমিনস্টার নেতা স্টিফেন ফ্লিন, এবং কনজারভেটিভ এমপি কিট মালথাউস ও এডওয়ার্ড লি। মোট সমর্থনকারী লেবার এমপিদের সংখ্যা আরও বেশি। এক লেবার এমপি বলেন, আমাদের আরও কিছু করতে হবে। ইসরাইল ভয়াবহ যুদ্ধাপরাধ করছে। প্রায় ৬০ জন লেবার এমপি এর আগে ল্যামিকে দেওয়া এক চিঠিতে একই আহ্বান জানান।

mzamin

গাজায় প্রতি তিনজনে একজন না খেয়ে দিন পার করছেন: জাতিসংঘ

জাতিসংঘের খাদ্যসহায়তা কর্মসূচি সতর্ক করে বলেছে, ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় প্রতি তিনজনের একজন না খেয়ে দিন পার করছেন।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘(গাজায়) পুষ্টিহীনতা বাড়ছে। ৯০ হাজার নারী ও শিশুর জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।’

গাজায় অনাহার নিয়ে সতর্কতা এ সপ্তাহে আরও তীব্র হয়েছে। সেখানকার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল শুক্রবার অপুষ্টিতে গাজায় আরও নয়জন মারা গেছেন। এর মধ্য দিয়ে ইসরায়েলের গাজা যুদ্ধ শুরুর পর ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে উপত্যকাটিতে মৃত মানুষের সংখ্যা দাঁড়াল ১২২।

অবরুদ্ধ গাজায় সব রকম পণ্য সরবরাহের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করে ইসরায়েল। দেশটি দাবি করছে, গাজায় ত্রাণসহায়তা প্রবেশে এখন কোনো বাধা নেই। সেখানে সব অপুষ্টিজনিত সমস্যার জন্য হামাসকে দায়ী করছে তারা।

একজন ইসরায়েলি নিরাপত্তা কর্মকর্তা গতকাল বলেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে গাজায় উড়োজাহাজ থেকে ত্রাণসামগ্রী ফেলার অনুমোদন দেওয়া হতে পারে। যদিও বিভিন্ন সাহায্য সংস্থা এটিকে গাজায় ত্রাণ পৌঁছানোর জন্য অকার্যকর উপায় বলে সতর্ক করেছে।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডান নতুন করে বিমান থেকে ত্রাণ ফেলার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে জর্ডানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিবিসিকে জানিয়েছেন, ইসরায়েলের কাছ থেকে এখনো তাঁদের সেনাবাহিনী এ–সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় অনুমতি পায়নি।

গাজায় ত্রাণসহায়তা প্রবেশের ওপর থেকে অবিলম্বে বিধিনিষেধ তুলে নিতে গতকাল ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য। এ তিন দেশ এক যৌথ বিবৃতিতে অবিলম্বে গাজায় চলমান ‘মানবিক বিপর্যয় ও যুদ্ধ’ বন্ধের আহ্বানও জানায়। দেশগুলো বলেছে, ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন মেনে চলা উচিত।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদাসীনতা ও নিষ্ক্রিয়তা ব্যাখ্যা করার মতো না। কোনো করুণা নেই, সত্য নেই, নেই কোনো মানবতা।’

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বৈশ্বিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে গুতেরেস বলেন, ২৭ মে থেকে এ পর্যন্ত খাদ্য সংগ্রহের চেষ্টা করতে গিয়ে ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ওই সময় থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-সমর্থিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন জাতিসংঘের বিকল্প হিসেবে গাজায় ত্রাণ বিতরণ শুরু করে।

এদিকে যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি মুক্তি নিয়ে ইসরায়েল–হামাস নতুন চুক্তির সম্ভাবনা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কাতার থেকে তাদের আলোচনার জন্য পাঠানো দল প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, হামাস ‘আসলে কোনো চুক্তি করতে চায় না।’ তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, তারা মরতে চায়।’

তবে হামাস যুক্তরাষ্ট্রের এমন মন্তব্যে বিস্ময় প্রকাশ করেছে। হামাসের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বিবিসির গাজা প্রতিনিধি‍কে বলেন, মধ্যস্থতাকারীরা তাঁদের জানিয়েছেন, আলোচনা এখনো ভেস্তে যায়নি। আগামী সপ্তাহে ইসরায়েলি প্রতিনিধিদলের দোহায় ফেরার কথা রয়েছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় দক্ষিণ ইসরায়েলে প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত ও ২৫১ জন জিম্মি হওয়ার পর ইসরায়েল গাজায় তাণ্ডব শুরু করেছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় ওই সময় থেকে এ পর্যন্ত গাজায় ৫৯ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।

গাজার একটি ত্রাণকেন্দ্রে খাবারের জন্য ফিলিস্তিনিদের ভিড়
গাজার একটি ত্রাণকেন্দ্রে খাবারের জন্য ফিলিস্তিনিদের ভিড়। ছবি: রয়টার্স

গাজা নিয়ে ‘গণহত্যামূলক সাংবাদিকতা’ করছে নিউইয়র্ক টাইমস

ইসরায়েল প্রায় দুই বছর ধরে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড গাজায় শতাব্দীর ভয়াবহ গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে। এ গণহত্যার বিরুদ্ধে বড় বড় বিক্ষোভ হচ্ছে পশ্চিমা দুনিয়ায়, আবার সেখানেই অনেকে এ গণহত্যাকে গণহত্যা বলতে চান না। ২২ জুলাই নিউইয়র্ক টাইমস ইসরায়েলের এ গণহত্যাকে অস্বীকার করে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। সেটির বিপরীতে পরদিন নিউইয়র্ক টাইমস–এর সমালোচনা করে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে কাতারভিত্তিক আল–জাজিরা। প্রথম আলোর পাঠকদের জন্য নিবন্ধ দুটির সংক্ষিপ্ত অনুবাদ একসঙ্গে প্রকাশ করা হলো।

না, ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে না by ব্রেট স্টিফেন্স

এটা কঠোর শোনাতে পারে, কিন্তু গাজায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে একটা বড় রকমের অসামঞ্জস্য আছে। ধরুন, যদি ইসরায়েলের উদ্দেশ্য ও কাজ সত্যিই গণহত্যামূলক হয়; অর্থাৎ তারা যদি গাজাবাসীকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য এতটাই নিষ্ঠুর হয়ে থাকে, তাহলে তারা আরও বেশি পরিকল্পিত এবং অনেক বেশি প্রাণঘাতী কেন হয়নি?

কেন মৃতের সংখ্যা লক্ষাধিক নয়। কেন মৃতের সংখ্যা ৬০ হাজারে সীমাবদ্ধ? আর এই সংখ্যা এসেছে হামাস-নিয়ন্ত্রিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে। আর এই সংখ্যাটি এসেছে হামাস-নিয়ন্ত্রিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে, যারা যোদ্ধা আর সাধারণ মানুষের মধ্যে পার্থক্য করে না।

ইসরায়েলের পক্ষে আরও বেশি ধ্বংস চালানো সম্ভব ছিল না, এমন নয়। তারা অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি। হিজবুল্লাহকে ধ্বংস করার পর এবং ইরানকে দুর্বল করে আরও শক্তিশালী হয়েছে। তারা চাইলে কোনো পূর্বসতর্কতা ছাড়াই বোমা ফেলতে পারত, কিন্তু সাধারণত গাজাবাসীকে আগেই জানানো হয় কোন এলাকায় হামলা হবে। তারা এমনও করতে পারত যে নিজেদের সেনাদের, যাঁদের অনেকেই যুদ্ধে নিহত হয়েছেন, ঝুঁকিতে না ফেলে কেবল আকাশপথে আক্রমণ চালাত।

এমনও নয় যে গাজায় ইসরায়েলের জিম্মিরা থাকায় তারা হামলা থেকে বিরত থেকেছে। ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা বেশ ভালোভাবেই জানে, কোথায় এসব জিম্মিকে রাখা হয়েছে, আর এটাই একটি কারণ যে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া জিম্মিদের খুব বেশি মারা যায়নি। এবং এটা তারা জানে যে হামাস জিম্মিদের জীবিত রাখার পক্ষেই আগ্রহী।

কূটনৈতিক সমর্থনের দিক থেকেও ইসরায়েলের ঘাটতি নেই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছেন, গাজার সবাইকে এলাকা ছাড়তে হবে এবং বারবার হুঁশিয়ার করেছেন যে হামাস জিম্মিদের ছেড়ে না দিলে গাজায় ‘নরক নেমে আসবে’।

তাই প্রশ্ন আসে, যাঁরা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ তুলছেন, তাঁদের আগে বলা উচিত—মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি কেন নয়? উত্তর খুব সহজ: কারণ, ইসরায়েল গণহত্যা চালাচ্ছে না।

‘গণহত্যা’ শব্দটির একটি নির্দিষ্ট আইনগত এবং নৈতিক ব্যাখ্যা আছে, যা জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী হলো কোনো জাতীয়, জাতিগত, বর্ণগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার ইচ্ছা।

এখানে ‘ইচ্ছা’ এবং ‘গোষ্ঠী হিসেবে’—এই শব্দ দুটি গুরুত্বপূর্ণ। গণহত্যা মানে কেবল অনেক বেসামরিক মানুষ মারা যাওয়া নয়। বরং এটি মানে কেবল কোনো গোষ্ঠীর সদস্য হওয়ার কারণে তাদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার চেষ্টা—যেমন হিটলার ও নাৎসিরা কেবল ইহুদি হওয়ার কারণে ইহুদিদের হত্যা করেছে, কিংবা রুয়ান্ডার গণহত্যায় হুতুরা তুতসিদের মেরেছে।

অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির হামবুর্গ ও ড্রেসডেন শহরে বোমা হামলায় লাখ লাখ বেসামরিক মানুষ মারা গেলেও তাঁরা যুদ্ধের শিকার হয়েছেন। তাঁরা গণহত্যার শিকার নন। কারণ, মিত্রশক্তির লক্ষ্য ছিল জার্মান জাতিকে ধ্বংস করা নয়, বরং নাৎসিদের পরাজিত করা।

ইসরায়েলের সমালোচকেরা গাজায় যে ব্যাপক ধ্বংস হয়েছে, তা তুলে ধরেন। তাঁরা কিছু ইসরায়েলি রাজনীতিকের উসকানিমূলক বক্তব্যও তুলে ধরেন, যেগুলোয় গাজাবাসীকে অমানবিকভাবে চিত্রিত করা হয়।

কিন্তু ৭ অক্টোবরের হামাসের ভয়ংকর হামলার পর এসব ক্ষুব্ধ মন্তব্যকে নাৎসি গণহত্যার পরিকল্পনার (যেমন ওয়ানসি সম্মেলন) সঙ্গে তুলনা করা যায় না। এবং আমি এমন কোনো প্রমাণ জানি না, যাতে বলা যায় যে ইসরায়েল পরিকল্পিতভাবে গাজাবাসীকে হত্যা করছে।

তবে এটা সত্য যে গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ অনেক বেশি। ইসরায়েল যেসব কৌশল অবলম্বন করছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে—বিশেষত খাবার সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে, যেখানে তারা চেয়েছে হামাসের হাত থেকে খাবারের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নিতে। ইতিহাসে খুব কম সামরিক বাহিনীই এমন আছে, যাদের কোনো না কোনো যুদ্ধে কেউ না কেউ যুদ্ধাপরাধ করেনি। এই তালিকায় ইসরায়েলও পড়ে।

কিন্তু ত্রাণ বিতরণে ভুল, অতি সংবেদনশীল সেনা, ভুল টার্গেট কিংবা প্রতিহিংসাপরায়ণ রাজনীতিকদের বক্তব্য—এসব দিয়ে ‘গণহত্যা’ প্রমাণ করা যায় না। এগুলো যুদ্ধের স্বাভাবিক ট্র্যাজেডির অংশ।

গাজাকে ঘিরে যে বিষয়টি বিশেষ, তা হলো হামাস যেভাবে যুদ্ধ করছে, তা একেবারেই অপরাধমূলক এবং ঠান্ডা মাথার হিসাব-কিতাব। যেমন ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার সময় সাধারণ মানুষ বাংকারে আশ্রয় নেন, আর সেনারা ওপরে থেকে লড়াই করেন। কিন্তু গাজায় এর উল্টোটা। সেখানে হামাস নিজেদের সুরক্ষিত রাখে টানেলের ভেতর আর সাধারণ মানুষ ওপরে থাকেন।

এখানে একটা বিষয় ভেবে দেখা দরকার: একই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র কী করত? ২০১৬-১৭ সালে ওবামা ও ট্রাম্পের অধীন যুক্তরাষ্ট্র ইরাক সরকারকে সাহায্য করেছিল মসুল শহর দখলমুক্ত করতে। শহরটি তিন বছর ধরে আইএসের নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং টানেলে ভরা এক দুর্গে পরিণত হয়েছিল।

নিউইয়র্ক টাইমস–এই প্রকাশিত এক বর্ণনায় বলা হয়েছিল, মার্কিন বিমান হামলায় কখনো কখনো পুরো ব্লক ধ্বংস হয়ে যেত। মসুলের জিদিদেহ এলাকায় এমন এক হামলায় ২০০ জন বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। আইএস তখন বেসামরিক মানুষদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করত এবং বেপরোয়া স্নাইপার ও মর্টার হামলা চালাত। ৯ মাস ধরে চলা এই যুদ্ধ ছিল দুই দলেরই সমর্থনপুষ্ট—রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক পার্টি উভয়ের। অনেকে বলেন, এতে প্রায় ১১ হাজার বেসামরিক মানুষ মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় বিক্ষোভ হয়েছিল বলে মনে পড়ে না।

কিছু পাঠক বলতে পারেন—যদিও এই যুদ্ধ গণহত্যা না হয়, তা–ও এটা অনেক দীর্ঘ হয়ে গেছে এবং এর এখনই শেষ হওয়া দরকার। এটা যৌক্তিক দাবি এবং বেশির ভাগ ইসরায়েলিও তা বিশ্বাস করেন। কিন্তু তাহলে ‘গণহত্যা’ শব্দটি নিয়ে এত বিতর্ক কেন? বিতর্ক দুটি কারণে।

প্রথমত, অনেক চিন্তাবিদ হয়তো আন্তরিকভাবে ‘গণহত্যা’ শব্দটি ব্যবহার করেন। কিন্তু কিছু লোক এই শব্দ ব্যবহার করেন ইচ্ছাকৃতভাবে ইসরায়েলকে নাৎসি জার্মানির সঙ্গে তুলনা করার জন্য। এতে শুধু ইসরায়েল সরকার নয়, বরং যেকোনো ইহুদি (যিনি ইসরায়েলকে সমর্থন করেন), তাঁকেও গণহত্যার পক্ষে দাঁড়ানো ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। বহু বছর ধরেই ইসরায়েলবিরোধীরা বিভিন্ন মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত অভিযোগ তোলে। ‘গণহত্যা’ শব্দটি এখন সেই একই কৌশলের আরও ভয়ংকর রূপ।

দ্বিতীয়ত, ‘গণহত্যা’ শব্দটি ১৯৪০-এর দশকে তৈরি হয়েছিল এবং এটি এককভাবে ভয়াবহ অপরাধ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। এই শব্দকে যদি আমরা প্রতিটি অপছন্দের সামরিক সংঘাতে ব্যবহার করি, তাহলে ভবিষ্যতের আসল গণহত্যার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলব।

ব্রেট স্টিফেন্স, নিউইয়র্ক টাইমস–এর কলাম লেখক

‘গণহত্যামূলক সাংবাদিকতা’ করছে নিউইয়র্ক টাইমস by বেলেন ফার্নান্দেজ

ইসরায়েলিরা নিশ্চয়ই ব্রেট স্টিফেন্সকে একটা বড় ধন্যবাদ দিতে পারেন। নিউইয়র্ক টাইমস-এর এই মতামত লেখক পত্রিকাটির পাতায় একটি লেখায় ভয়ংকর একটি যুক্তি তুলে ধরেছেন। লেখাটির শিরোনাম, ‘না, গাজায় ইসরায়েল গণহত্যা চালাচ্ছে না’।

এই লেখায় স্টিফেন্স একপ্রকার জোর করেই বোঝাতে চেষ্টা করেছেন, ইসরায়েল গাজায় যা করছে, তা গণহত্যা নয়।

অথচ জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা থেকে শুরু করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল পর্যন্ত অনেক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বলেছে, ইসরায়েল আসলেই গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে। এসব সংস্থা হালকা চালে ‘গণহত্যা’ শব্দটি ব্যবহার করে না। কিন্তু স্টিফেন্স নিজেকে তাদের চেয়ে বেশি জ্ঞানী মনে করেন আর তাই তিনি ব্যাখ্যা দিতে এগিয়ে এসেছেন।

স্টিফেন্স লেখার শুরুতেই প্রশ্ন করেন, ‘যদি ইসরায়েলি সরকারের কাজকর্ম সত্যিই গণহত্যামূলক হয়, যদি তারা গাজাবাসীকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়, তাহলে তারা সংগঠিত ও ব্যাপকভাবে কেন আক্রমণ করছে না?’

কিন্তু বাস্তবতা হলো গাজা উপত্যকার প্রায় পুরো অংশই যেভাবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়েছে, বাড়িঘর, হাসপাতাল, স্কুল—সবই বোমায় উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তা তো যথেষ্ট ‘পদ্ধতিগত’ মনে হয়। আর যাঁরা বলছেন, এই আক্রমণে ‘প্রচুর’ মানুষ মারা যায়নি, তাঁদের উদ্দেশে স্টিফেন্স বলেন, প্রায় ৬০ হাজার ফিলিস্তিনির মৃত্যুই যদি ঘটে থাকে, তাহলে ‘লাখ লাখ মানুষ কেন মারা যায়নি?’ স্টিফেন্স মনে করছেন, ‘যারা ইসরায়েলকে গণহত্যাকারী বলছে, তাদের আগে বলা উচিত মৃত্যুর সংখ্যা এত কম কেন?’

কিন্তু এখানে প্রশ্ন আসে, ৬০ হাজার মানুষের মৃত্যুকে তিনি কীভাবে ছোট ব্যাপার হিসেবে দেখছেন? ২০২৪ সালের নভেম্বর পর্যন্ত গাজায় অন্তত ১৭ হাজার ৪০০ শিশু মারা গেছে—তবু এটা তার কাছে ‘পর্যাপ্ত নিষ্ঠুরতা’ নয়। মেডিকেল জার্নাল দ্য ল্যানচেট-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, আসলে মৃত মানুষের সংখ্যা হয়তো ১ লাখ ৮৬ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

যাঁরা বলছেন ইসরায়েল গণহত্যা করছে, তাঁদের কথা না শুনেই স্টিফেন্স নিজেই বলেন, ‘ইসরায়েল স্পষ্টতই গণহত্যা চালাচ্ছে না।’

জাতিসংঘের গণহত্যাসংক্রান্ত সংজ্ঞা দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি এমন কোনো প্রমাণ জানি না, যাতে বলা যায় ইসরায়েল পরিকল্পনা করে গাজাবাসীকে হত্যা করছে।’

কিন্তু বাস্তবতা হলো, আপনি ১৩ মাসে ১৭ হাজার ৪০০ শিশু ‘ভুল করে’ হত্যা করেননি। আর আপনি যদি বারবার হাসপাতাল ও অ্যাম্বুলেন্সে বোমা ফেলেন, তাহলে সেটা স্পষ্টতই বেসামরিক মানুষকে টার্গেট করেই করা।

বিষয়টা শুধু বোমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ‘বাধ্যতামূলক ক্ষুধার্ত করে রাখা’—এটাও গণহত্যার মধ্যে পড়ে। এখন প্রশ্ন আসে, দুই মিলিয়ন মানুষের খাবার ও পানি বন্ধ করে দেওয়া কি কোনো জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা নয়? শুধু গতকালই (২২ জুলাই ২০২৫) গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানায়, সেখানে অন্তত ১৫ জন মারা গেছেন না খেয়ে। এর মধ্যে চারটি শিশু।

২০২৫ সালের মে মাসের শেষ দিক থেকে এখন পর্যন্ত আরও এক হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন খাবারের জন্য গাজার তথাকথিত হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনে (জিএইচএফ) যাওয়ার সময়। সংস্থাটি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় পরিচালিত। এখানে ইচ্ছাকৃতভাবে বহু মানুষকে এক জায়গায় জড়ো করে সহজেই ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে হত্যা করা হয়। এভাবে তারা বেঁচে যাওয়া ফিলিস্তিনিদের জোর করে স্থানচ্যুত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।

স্টিফেন্স যদিও ‘গাজায় বিশৃঙ্খল ত্রাণ বিতরণব্যবস্থা’র কথা স্বীকার করেন, তবে তিনি মনে করেন, ‘ত্রাণব্যবস্থার ব্যর্থতা, অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়াশীল সেনা, ভুল টার্গেটের ওপর হামলা কিংবা প্রতিহিংসাপরায়ণ রাজনীতিকদের বক্তব্য—এসব দিয়েও গণহত্যা প্রমাণিত হয় না।’

তবে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ‘গণহত্যা’ শব্দটি ব্যবহারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে স্টিফেন্স এ সত্যও অস্বীকার করেন যে ইসরায়েল রাষ্ট্রটি শুরু থেকেই ছিল একধরনের গণহত্যার প্রকল্প।

ইহুদি জায়নবাদীরা ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র তৈরির আগে থেকেই জানতেন, ফিলিস্তিনের স্থানীয় জনগণকে সরিয়ে ফেলতেই হবে। সেই প্রক্রিয়ায় বহু গ্রাম ধ্বংস করা হয় এবং প্রায় সাড়ে সাত লাখ মানুষকে শরণার্থী বানানো হয়।

এর পর থেকে ইসরায়েল বরাবরই সেই গণহত্যামূলক পদক্ষেপেই এগিয়ে গেছে। ফিলিস্তিনিদের শুধু শারীরিকভাবে নয়, তাদের অস্তিত্বকেও মুছে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। যেমন ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গোলদা মেইয়র একসময় বলেছিলেন, ফিলিস্তিনিদের আসলে অস্তিত্বই থাকতে পারে না।

অর্থাৎ ইসরায়েল নামক রাষ্ট্রটি নিজেই গড়ে উঠেছে সেই ধরনের ‘ইচ্ছাকৃতভাবে জাতিগত নিধন’ নীতির ওপর ভিত্তি করে।

বহুদিন ধরেই ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ও নিউইয়র্ক টাইমসসহ অন্যান্য মার্কিন করপোরেট মিডিয়ার মধ্যে একধরনের গোপন আঁতাত আছে। তারা ইসরায়েলের বর্বরতাকে ‘আত্মরক্ষা’ বলে চালিয়ে দেয়।

কিন্তু আজ যখন ইসরায়েল গাজায় সত্যিকার অর্থে এক ভয়াবহ অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে এবং তার পাশে বিশ্বশক্তি যুক্তরাষ্ট্র রয়েছে, তখন ব্রেট স্টিফেন্সের এই ‘গণহত্যামূলক সাংবাদিকতা’ও একধরনের ভয়ংকর অপরাধে পরিণত হয়েছে।

বেলেন ফার্নান্দেজ, আল–জাজিরার কলাম লেখক
নিউইয়র্ক টাইমসের নিবন্ধের বিপরীতে একটি সমালোচনামূলক নিবন্ধ প্রকাশ করে কাতারভিত্তিক আল–জাজিরা। ২৩ জুলাই, ২০২৫
নিউইয়র্ক টাইমসের নিবন্ধের বিপরীতে একটি সমালোচনামূলক নিবন্ধ প্রকাশ করে কাতারভিত্তিক আল–জাজিরা। ২৩ জুলাই, ২০২৫