Tuesday, June 9, 2026
নৌপ্রযুক্তিতে মুসলিম সভ্যতার অবদান by মোহাম্মদ মোশাররফ হুসাইন
মধ্যযুগে মুসলিম সভ্যতা নৌপ্রযুক্তিকে এমন এক উচ্চতায় পৌঁছে দেয়, যা পরবর্তীকালে ইউরোপীয় সামুদ্রিক শক্তির বিকাশেও গভীর প্রভাব ফেলে। বিশেষত আরব ও পারস্যের মুসলিম নাবিক, ভূগোলবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা জাহাজ নির্মাণ, সমুদ্রপথ নির্ধারণ, দিকনির্ণয় এবং মানচিত্রবিদ্যায় অসাধারণ অবদান রাখেন। তাদের উদ্ভাবিত বা উন্নতকৃত বিভিন্ন নৌযন্ত্র, যেমন চৌম্বকীয় কম্পাস, অ্যাস্ট্রোলেব ও সামুদ্রিক মানচিত্র দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রাকে নিরাপদ ও কার্যকর করে তোলে।
সমুদ্রপথে মুসলিমদের আধিপত্য
সপ্তম থেকে পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত মুসলিম বিশ্ব ভারত মহাসাগর, আরব সাগর, লোহিত সাগর এবং ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে শক্তিশালী সামুদ্রিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। মুসলিম নাবিকরা পূর্ব আফ্রিকা, ভারত, মালয় উপদ্বীপ এবং চীন পর্যন্ত বিস্তৃত সমুদ্রপথে নিয়মিত যাতায়াত করতেন। তাদের এই সাফল্যের পেছনে ছিল উন্নত নৌ-জ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞানভিত্তিক দিকনির্ণয় পদ্ধতি এবং দক্ষ জাহাজ নির্মাণ প্রযুক্তি। ইতিহাসবিদ George F. Hourani তার ‘Arab Seafaring in the Indian Ocean’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন— ‘আরব নাবিকরা উন্নত নৌদক্ষতা ও দিকনির্ণয় জ্ঞানের মাধ্যমে শতাব্দীর পর শতাব্দী ভারত মহাসাগরের বাণিজ্যপথ নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন।’
মুসলিম সভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল উন্নত জাহাজ নির্মাণ শিল্প। আরবরা ‘ধাও’ (Dhow) নামক বিশেষ পালতোলা জাহাজ নির্মাণ করেছিল, যা দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার জন্য অত্যন্ত উপযোগী ছিল। এই জাহাজে ব্যবহৃত ত্রিভুজাকার ‘লাতিন পাল’ (Lateen Sail) জাহাজকে বাতাসের বিপরীত দিকেও চলতে সক্ষম করত। ফলে মুসলিম নাবিকরা সহজেই দীর্ঘ সমুদ্রপথ অতিক্রম করতে পারতেন। পরবর্তীকালে ইউরোপীয় জাহাজ প্রযুক্তিতেও এই পাল ব্যবস্থার গভীর প্রভাব পড়ে। ঐতিহাসিক লিন Lynn White Jr. বলেন— ‘আরবদের উন্নত লাতিন পাল ভূমধ্যসাগরীয় নৌচালনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল।’
নৌ-দিকনির্ণয়ের ক্ষেত্রেও মুসলিমদের অবদান ছিল অসামান্য। মুসলিম নাবিকরা চৌম্বকীয় কম্পাস, নক্ষত্র মানচিত্র, অ্যাস্ট্রোলেব এবং সামুদ্রিক চার্ট ব্যবহার করে সমুদ্রপথ নির্ধারণ করতেন। বিশেষত অ্যাস্ট্রোলেবের উন্নয়নে মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই যন্ত্রের মাধ্যমে সূর্য ও নক্ষত্রের অবস্থান নির্ণয় করে সমুদ্রযাত্রার দিক নির্ধারণ করা সম্ভব হতো। মুসলিম নাবিকরা রাতের আকাশ পর্যবেক্ষণ করে অক্ষাংশ নির্ধারণে দক্ষতা অর্জন করেছিলেন, যা সে সময়ের জন্য অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
মানচিত্রবিদ্যা ও ভূগোলচর্চা
মুসলিম ভূগোলবিদ ও মানচিত্রবিদদের অবদানও নৌপ্রযুক্তির ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল-ইদ্রিসি, ইবনে মাজিদ, আল-বিরুনি এবং ইয়াকুত আল-হামাভির মতো মুসলিম পণ্ডিতরা সমুদ্রপথ, উপকূলীয় অঞ্চল, দ্বীপ, বন্দর ও বাণিজ্যিক রুটসমূহের বিস্তারিত বিবরণ-সংবলিত মানচিত্র ও দিকনির্দেশিকা তৈরি করেছিলেন। তাদের রচিত গ্রন্থসমূহ শুধু ভৌগোলিক তথ্যের ভান্ডারই ছিল না; বরং তা নাবিকদের জন্য কার্যকর নৌ-নির্দেশিকা হিসেবেও ব্যবহৃত হতো।
দ্বাদশ শতকে আল-ইদ্রিসি রচিত বিশ্বমানচিত্র (Tabula Rogeriana) সে সময়কার সবচেয়ে উন্নত ভূগোলভিত্তিক নৌমানচিত্রগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। সিসিলির রাজা দ্বিতীয় রজারের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত এই মানচিত্রে ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার বিস্তৃত অঞ্চল অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে চিত্রিত হয়েছিল। এতে সমুদ্রপথ, নদী, পর্বত, বন্দর ও বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোর যে নিখুঁত বর্ণনা পাওয়া যায়, তা মধ্যযুগীয় ভূগোলবিদ্যার এক অসাধারণ নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত।
সামরিক নৌশক্তি ও সমুদ্র নিয়ন্ত্রণ
মুসলিমদের নৌপ্রযুক্তিগত উৎকর্ষ শুধু বাণিজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং সামরিক ক্ষেত্রেও এর ব্যাপক প্রভাব ছিল। আব্বাসীয় ও ফাতেমীয় খিলাফতের সময়ে শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ে ওঠে, যা ভূমধ্যসাগরে বাইজেন্টাইন শক্তির মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মুসলিম নৌবাহিনী উন্নত যুদ্ধজাহাজ, অগ্নিনিক্ষেপকারী অস্ত্র এবং কৌশলগত সমুদ্রঘাঁটি ব্যবহার করত। ফলে বহু শতাব্দী ধরে মুসলিমরা সমুদ্রপথে শক্তিশালী আধিপত্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়।
বিশেষত উমাইয়া ও আব্বাসীয় যুগে মুসলিম নৌবাহিনী শুধু প্রতিরক্ষামূলক শক্তি হিসেবেই নয়, বরং সাম্রাজ্য বিস্তার ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে গড়ে ওঠে। সিরিয়া, মিসর ও উত্তর আফ্রিকার উপকূলে বৃহৎ নৌঘাঁটি নির্মাণ করা হয়, যেখানে যুদ্ধজাহাজ প্রস্তুত, অস্ত্র সংরক্ষণ এবং নৌসেনাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিল। মুসলিম শাসকরা বুঝতে পেরেছিলেন, সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি। তাই তারা নৌবাহিনীকে রাষ্ট্রশক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভে পরিণত করেন।
ইউরোপীয় নৌ-অভিযানে মুসলিম প্রভাব
ইউরোপীয় রেনেসাঁ ও সামুদ্রিক অভিযানের পেছনেও মুসলিম নৌপ্রযুক্তির গভীর প্রভাব ছিল। ক্রুসেড, আন্দালুসিয়া ও সিসিলির মাধ্যমে ইউরোপীয়রা মুসলিমদের কাছ থেকে জাহাজ নির্মাণ, মানচিত্রবিদ্যা, কম্পাস ব্যবহার এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানভিত্তিক নৌ-দিকনির্ণয় সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে। পরবর্তীকালে ভাস্কো দা গামা ও কলম্বাসের মতো ইউরোপীয় অভিযাত্রীরা যেসব প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিলেন, তার অনেকাংশই মুসলিম বিশ্বের মাধ্যমে ইউরোপে পৌঁছেছিল।
নৌপ্রযুক্তির ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, মুসলিম সভ্যতা শুধু সমুদ্রযাত্রায় দক্ষ ছিল না; বরং তারা নৌপ্রযুক্তিকে বৈজ্ঞানিক ও ব্যবহারিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছিল। জাহাজ নির্মাণ, চৌম্বকীয় কম্পাসের ব্যবহার, জ্যোতির্বিজ্ঞানভিত্তিক দিকনির্ণয়, মানচিত্রবিদ্যা এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যে মুসলিমদের অবদান ছিল যুগান্তকারী। তাদের উদ্ভাবিত ও উন্নতকৃত প্রযুক্তি দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা নিরাপদ, নির্ভুল ও কার্যকর করে তোলে। বিশেষত আরব ও পারস্যের নাবিকরা ভারত মহাসাগর, লোহিত সাগর ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে যে নৌ-জ্ঞান ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা মধ্যযুগীয় বিশ্বের সামুদ্রিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

eCoxs Special
BNM Archive
-
▼
2026
(1435)
-
▼
July
(238)
-
▼
Jul 30
(6)
- মা তুলে রেখেছিলেন সুপারম্যান কমিকসের কপি, বিক্রি হ...
- চীনের তৈরি যে আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র কিনছে ইরান
- ইউক্রেনে পাল্টা হামলার পরিকল্পনা করেছিল ইরান
- ইসরাইলে দুই নারী সেনার আত্মহত্যা, এক বছরে প্রাণ গে...
- ফিলিস্তিনের স্কুল ও বসতবাড়ি ভাঙার পথ খুলে দিল ইসরা...
- ফেই-ফেই লি কে, কীভাবে হয়ে উঠলেন ‘এআই গডমাদার’
-
▼
Jul 30
(6)
-
▼
July
(238)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...