Monday, January 18, 2016

বিশ্বের অর্ধেক লোকের সমান সম্পদ ৬২ জনের হাতে

পৃথিবীর মাত্র ৬২ জন ধনকুবেরের হাতে যে পরিমাণ অর্থ ও সম্পদ আছে, তা পৃথিবীর অর্ধেক জনসংখ্যার সম্মিলিত ধনসম্পদের সমান – জানিয়েছে আন্তর্জাতিক ত্রাণ ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা অক্সফ্যাম।
সুইটজারল্যান্ডের ডাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বৈঠকের ঠিক আগে প্রকাশ করা এক রিপোর্টে অক্সফ্যাম আরো বলেছে, বিশ্বের ‘সুপাররিচ’রা ধনী থেকে আরও ধনী হচ্ছেন – অথচ গরিবরা আরও বেশি দারিদ্রে ডুবে যাচ্ছেন।
যেমন, পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ৬২ জন ধনকুবেরের মোট সম্পদের পরিমাণ ২০১০ সালের তুলনায় বেড়েছে ৪৪ শতাংশ।
সেই জায়গায়, পৃথিবীর অর্ধেক জনসংখ্যা – যার মধ্যে আছে প্রায় সাড়ে ৩০০ কোটি লোক, তাদের ধনসম্পত্তির পরিমাণ একই সময়ের মধ্যে কমেছে ৪১ শতাংশ।
বিশ্বের এই ৬২ জন সুপাররিচের প্রায় অর্ধেকই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা, ১৭ জন আবার ইউরোপিয়ান। বাকি ধনকুবেরদের বেশির ভাগই চীন, মেক্সিকো, জাপান, সৌদি আরব বা ব্রাজিলের লোক।
অক্সফ্যাম এই পরিসংখ্যান দিয়ে দাবি করেছে, পৃথিবীতে যে ক্রমেই আরো অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ছে এই রিপোর্ট তারই প্রমাণ।
অক্সফ্যাম ইন্টারন্যাশনালের নির্বাহী অধিকর্তা উইনি বায়ানিমা বলছেন, ‘এই বৈষম্যর ফলে যে সঙ্কট তৈরি হচ্ছে বিশ্বনেতারা তার জন্য উদ্বিগ্ন ঠিকই, কিন্তু এখনও তাদের কাছ থেকে এর মোকাবিলায় কোনও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ কিন্তু আমরা পাইনি।’
পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষকে অভুক্ত রেখে সমাজের একটা মুষ্টিমেয় অংশ পৃথিবীর সব ধনসম্পদ শুষে নেবে – এটা কিছুতেই হতে দেওয়া যায় না বলেও অক্সফ্যাম মন্তব্য করেছে।
যেমন অর্থনীতিবিদ গ্যাব্রিয়েল জুকমানের তথ্যকে উদ্ধৃত করে তারা আরও জানিয়েছে, গোটা আফ্রিকা মহাদেশের আর্থিক সম্পদের ৩০ শতাংশই পৃথিবীর বিভিন্ন অফশোর ট্যাক্স হাভেনে গচ্ছিত রাখা আছে।
এর ফলে আফ্রিকা প্রতি বছর ১৪০০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ কর রাজস্ব হারাচ্ছে।
অথচ আফ্রিকা এই অর্থটা পেলে ওই মহাদেশে প্রতি বছর ৪০ লক্ষ শিশুকে সঠিক স্বাস্থ্য পরিষেবা দিয়ে তাদের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হত।
শুধু তাই নয়, ওই অর্থ দিয়ে আফ্রিকায় যথেষ্ট পরিমাণে শিক্ষকও নিয়োগ করা যেত, যাতে মহাদেশের প্রতিটি শিশুরই স্কুলে যাওয়ার স্বপ্ন পূর্ণ করা যেত। সূত্র : বিবিসি

ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অবৈধ, শিগগিরই ব্যবস্থা: এরশাদ

রওশন এরশাদকে জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করা সম্পূর্ণ অবৈধ বলে মন্তব্য করেছেন দলটির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ। তিনি বলেছেন, যাঁরা এই কাজটি করেছেন, দলের শৃঙ্খলা ভেঙেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে শিগগিরই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তাঁর স্ত্রী রওশন এরশাদকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করার পরিপ্রেক্ষিতে আজ রাতে রংপুরে একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে এরশাদ এ কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আমি দলের চেয়ারম্যান। আমি সভা ডাকব। আমার অনুপস্থিতিতে সভা ডেকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করাটা সম্পূর্ণ অবৈধ।’
এরশাদ তাঁর ভাই জি এম কাদেরকে জাতীয় পার্টির (জাপা) কো-চেয়ারম্যান ঘোষণা করার এক দিনের মাথায় আজ সোমবার রাতে দলের একটি অংশ এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদকে পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণা করে।
এরশাদ বলেন, ‘তিনি (রওশন এরশাদ) বিরোধীদলীয় নেত্রী। তিনি পার্টির বিষয়ে এই মুহূর্তে কিছু করতে পারেন না। আমি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সেটি সঠিক। দলের বিরুদ্ধে যে একটা ষড়যন্ত্র চলছে, সেটাতো তোমরা সবাই বুঝতে পারছ।’
আজ রাতে গুলশানে রওশনের বাসায় একটি বৈঠক শেষে জাপার মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ বাবলু সাংবাদিকদের বলেন, রওশন এরশাদ এখন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। এর আগে গতকাল রোববার সন্ধ্যায় রংপুরে এরশাদ তাঁর ভাই কাদেরকে দলের কো-চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন।
সংবাদ সম্মেলনে এরশাদ বলেন, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চেয়ারম্যানের অনুমতি না নিয়ে প্রেসিডিয়ামের কোনো সভা কেউ ডাকতে পারে না। এটা অবৈধ। গঠনতন্ত্রের পরিপন্থী যাঁরাই এই ষড়যন্ত্রমূলক কাজটি করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই মুহূর্তে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি ভাবছি। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী খুব শিগগিরই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত সদ্য ঘোষিত দলের কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেন, ‘গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চেয়ারম্যানের বাইরে জাতীয় পার্টির কেউ কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। চেয়ারম্যান আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছেন, আমি সেই দায়িত্ব পালন করব। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আমাদের দলকে নিয়ে একটি ষড়যন্ত্র চলছে। দলকে বিভক্ত করার চেষ্টা চলছে। আমরা শক্ত হাতে বিষয়টি মোকাবিলা করব।’

পিটার কাস্টার্সকে নাগরিকত্ব দেওয়ার দাবি

পিটার কাস্টার্স
ইউরোপে বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে পরিচিত প্রয়াত পিটার কাস্টার্সকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বিশিষ্টজনরা। মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য বিদেশি বন্ধুদের যেভাবে সম্মাননা দেওয়া হয়েছে সেভাবে পিটার কাস্টার্সকে সম্মানিত করা দাবিও তুলে ধরা হয়।
আজ সোমবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে পিটার কাস্টার্স স্মরণ সভায় এ দাবি জানানো হয়। এর আয়োজক ‘বাংলাদেশের বন্ধু ড. পিটার কাস্টার্স স্মরণ কমিটি’।
ডাচ গবেষক ও সাংবাদিক পিটার কাস্টার্স গত বছরের ৩ সেপ্টেম্বর হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে নেদারল্যান্ডসের লেইডেনে মারা যান। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় সাংবাদিক হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। পরে বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে ইউরোপসহ পৃথিবীজুড়ে জনমত তৈরিতে ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি।
স্মরণসভায় স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে রাজনীতির সঙ্গে পিটারের যুক্ত হওয়া, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর গ্রেপ্তার হওয়াসহ নানা বিষয় তুলে ধরেন বক্তারা। পাশাপাশি বাংলাদেশের নারী শ্রম ও পুঁজির পুঞ্জিভবন, তৈরি পোশাক শ্রমিক, মাওলানা ভাসানী, কাজী নজরুল ইসলাম ও লালনের ওপর গবেষণার কথাও উঠে আসে। বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক সম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহার এবং অস্ত্র বাণিজ্যের নেতিবাচক দিক নিয়েও পিটারের অবস্থানের কথাও তুলে ধরা হয়।
স্মরণসভার সভাপতি লেখক ও প্রাবন্ধিক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, বিদেশি হলেও পিটার কাস্টার্স ছিলেন একজন পরিপূর্ণ বাঙালি, যা আমরা দেশে জন্ম নিয়েও হতে পারিনি। তাঁর জীবনের বেশির ভাগ সময়ই তিনি বাংলাদেশে কাটিয়েছেন, বাংলাদেশকে নিয়ে ভেবেছেন। প্রচারবিমুখ এ মানুষটির প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর আগেই তাঁকে নিয়ে একটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশের কথা জানান সৈয়দ আবুল মকসুদ।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টা মঞ্জুরুল আহসান খানও পিটার কাস্টার্সকে একজন সত্যিকারের বাঙালি হিসেবে তুলে ধরেন।
পিটার কাস্টার্সের ঘনিষ্ট বন্ধু নরওয়ে প্রবাসী খোরশেদ আহমেদ পিটার কাস্টার্সের জীবনের নানা দিক তুলে ধরেন। দীর্ঘ ৪০ বছরের বন্ধুত্বের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রতি এ ডাচ গবেষকের মমত্ব ও ভালবাসা ছিল অপরিসীম। মুত্যুর পর শেষকৃত্য শেষে তাঁর দেহভস্ম নেদারল্যান্ডসে রাখা হয়েছে জানিয়ে খোরশেদ আহমেদ বলেন, পিটারের ইচ্ছে অনুযায়ী তাঁর দেহভস্ম তিন ভাগ করা হবে। এর একভাগ নিজ জন্মভূমি নেদারল্যান্ডস, একভাগ ভারতে ও বাকি একভাগ বাংলাদেশে সংরক্ষণ করা হবে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য হায়দার আকবর খান রনো, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের নেতা আব্দুস সাত্তার, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু, প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক সোহরাব হাসান, বাসদ নেতা বজলুর রশীদ ফিরোজ, প্রকৌশলী ইনামুল হক, নারীনেত্রী বহ্নিশিখা জামালী প্রমুখ।

ব্র্যাকের আইনের শাসনসূচক ও বাস্তবতা by মিজানুর রহমান খান

কোনো দেশের আইনের শাসনের তল মাপতে জাতিসংঘ যতগুলো সূচক ব্যবহার করে, তার মধ্যে পুলিশ এবং অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সততা ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা অন্যতম। অনেকে প্রশ্ন তুলছেন যে, কম গণতন্ত্র বেশি উন্নয়নের মধ্যে সংঘাত কতটা?
বেশ কিছুদিন ধরে আমরা আইএস বা জঙ্গিবাদ আছে কি নেই বা থাকলেও সে জন্য কে কতটা দায়ী কিংবা সত্যিই কতখানি আছে, তা নিয়ে বিরাট একটা তর্কাতর্কির মধ্যে আছি। কিন্তু এর আড়ালে সাধারণভাবে সামাজিক অপরাধ বেশ উদ্বেগজনকভাবে যে বেড়ে চলছে, সেটা নতুন করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন গবেষণাপত্র।
ইদানীং যখন জানছি যে, আমাদের গড় আয়ুষ্কাল ৭০ বছর ছাড়িয়ে গেছে, তখন বেশ একটা গর্ববোধ হলো যে, আমরা অনেক উন্নত দেশের মতো এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু দ্য স্টেট অব গভর্ন্যান্স ইন বাংলাদেশ ২০১৪-১৫: ইনস্টিটিউশন্স আউটকামস অ্যাকাউন্টিবিলিটি প্রতিবেদন দেখিয়েছে, দেশে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। জিনিসপত্রের দাম একবার বাড়লে আর কমে না। জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়লে আর কমে না। সেভাবে দিন যত গড়াবে, ততই কি এ দেশে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে? এর হার কখনো কমবে না? পদ্মা সেতু, পাতালরেল, বর্ধিষ্ণু জিডিপি ইত্যাদি দিয়ে আমরা বিএনপির শাসনামলের সঙ্গে আওয়ামী লীগের শাসন তফাত করতে পারি, কিন্তু হত্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যান যদি বাড়তেই থাকে, তাহলে মানুষের জীবনে নিরাপত্তাবোধ বেড়েছে, সেটা আমরা কী করে দাবি করব? এমনটা নিশ্চয় কোনো যুক্তির কথা নয় যে, বিভিন্ন ধরনের অপরাধের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে চলাটা একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক প্রবণতা।
২০০২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সময়ের অপরাধচিত্র তুলে ধরে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বলেছে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও র্যা বের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও গত ১২ বছরে বাংলাদেশে অপরাধ বাড়ছেই। ২০০২–এ ছিল ১ লাখ ২৭ হাজার অপরাধ, সেটা এখন বেড়ে ১ লাখ ৮৩ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। গত ১২ বছরে সব থেকে কম অপরাধের মামলা রেকর্ডভুক্ত হয়েছিল ২০০৪ সালে। মামলার সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১৯ হাজার। পুলিশের সংস্কার বা নির্দলীয়করণ নিয়ে কথা বলায় এখন ক্লান্তিকাল চলছে। অথচ ঘটনাগুলো এমন ঘটছে যে, গুম (২০১৪ সালে ৮৮টি) নামের একটি মহা আতঙ্ক বাসা বেঁধেছে, যা আগে ছিল না। ২০০৫ সালে যেখানে নির্যাতনের ঘটনা ছিল ২৬টি, ২০০৯ সালে তা ৮৯টিতে উন্নীত হয়েছে।
সর্বোচ্চ অপরাধের মামলা রেকর্ড হয়েছে একতরফা নির্বাচনের বছর হিসেবে খ্যাত ২০১৪ সালে। ওই প্রতিবেদন আরও বলেছে, ‘নরহত্যা বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। বছরে তিন হাজার নরহত্যা একটি স্থায়ী প্রবণতায় রূপ নিয়েছে। ২০১৪ সালে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৫১৪টি নরহত্যার ঘটনা ঘটেছে।’ পুলিশ বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী এই হিসাব। বাস্তবে এটা নিশ্চয় আরও বেশি। ইদানীং আমরা ৩০ লাখ মামলা বিচারাধীন থাকার একটি পরিসংখ্যান উচ্চারিত হতে দেখি। কিন্তু সব থেকে জঘন্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত নরহত্যার মামলাগুলোর কতগুলো নিষ্পত্তি হলো, কতগুলো বিচারাধীন থাকল, সে বিষয়ে নির্দিষ্টভাবে জানতে পারি না। পুলিশ বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে এ বিষয়ে পরিসংখ্যানগত একটা আদান–প্রদান চালু করা দরকার। বর্তমানে এ ধরনের তথ্যগত কোনো বিনিময় এই দুই বিভাগের মধ্যে ঘটে না।
ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে তুলনা করে দেখি, ভারতে হত্যা আমাদের থেকে বেশি। মিয়ানমারে অনেক কম। ২০০০ সালে জনসংখ্যার প্রতি এক লাখে হত্যা ছিল ভারত, মিয়ানমার ও বাংলাদেশে যথাক্রমে সাড়ে চার, দুই ও আড়াই জন। ২০১২ সালে এসে এটা বদলে গেছে। ভারতে একজন কমে গেছে। মিয়ানমারে হত্যা বেড়ে বাংলাদেশের সমান হয়েছে। যাঁরা যুক্তি দিতে চাইবেন যে, নরহত্যা হলো এমন একটি বিষয়, যা কোনো রাষ্ট্রে ধীরে ধীরে বাড়তেই থাকবে। এটা বাড়বে, কখনো কমবে না। আশা করি, তাঁরা দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের উদাহরণ বিবেচনায় নেবেন। আন্তর্জাতিক সমীক্ষা ও গবেষণা সংস্থা ‘নিমা’র তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে আমরা আরও একটি তুলনা করেছি। কারণ, অনেক সময় আমাদের মন্ত্রীগণ উদাহরণ হিসেবে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে সংঘটিত অপরাধের তথ্য হাজির করেন। তাঁরা বলেন, উন্নত রাষ্ট্রে যদি বড় ধরনের অপরাধ ঘটে, তাতে যদি শাসনব্যবস্থার সবলতা-দুর্বলতা প্রসঙ্গ না আসে, তাহলে বাংলাদেশে আসবে কেন?
আমরা যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের নরহত্যা–সংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনা করে দেখি, এই দুটি উন্নত রাষ্ট্রেও নরহত্যা ক্রমবর্ধমান নয়। দুই প্রতিবেশীর মতো এই দুই উন্নত রাষ্ট্রেও নরহত্যার পরিসংখ্যানের মধ্যে ওঠানামা আছে। কিন্তু বাংলাদেশে কেবলই বাড়ে। ব্র্যাক প্রতিবেদনের ৫৪ পৃষ্ঠায় সরকারি তথ্যসূত্রের বরাতে হত্যা বিষয়ে একটি লেখচিত্র আছে। তাতে দেখানো হয়েছে, ২০০৪ সালে বছরে তিন হাজার নরহত্যা দিয়ে যে ধারা শুরু হয়েছে, তার আর থামাথামি নেই। ২০০৯ থেকে ২০১২—এই চার বছরের প্রতিবছরে চার হাজার নরহত্যা ঘটেছে। আর সেটা ২০১৪ সালে সাড়ে চার হাজার ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু এটাও আমরা বিবেচনায় নেব যে, এই বর্ধিত হারও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে কম। সেখানে ২০০৯ সালে প্রতি লাখে প্রায় পাঁচটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। কিন্তু ২০১২ পর্যন্ত সেটা ক্রমাগত কমেছে। আর ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এক ধাপে প্রতি লাখে চারটি নরহত্যার নিচে নেমে এসেছে। নিমার লেখচিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই সময়ে (২০০৯-২০১২) বাংলাদেশ প্রতি লাখে গড়ে আড়াই জনের বেশি নরহত্যা প্রত্যক্ষ করেছে। উন্নত রাষ্ট্র হলেই নরহত্যা বেশি ঘটবে, তা-ও কিন্তু ঠিক নয়। যুক্তরাজ্য তার উদাহরণ। ওই চার বছরে যুক্তরাজ্যে প্রতি লাখে মাত্র একটি নরহত্যা ঘটেছে। ২০১৩ সালে সেই পরিসংখ্যান আরও নিম্নমুখী হয়েছে। অথচ ২০০২ সালে প্রতি লাখে দুটি নরহত্যার ঘটনা ঘটেছিল।
আমরা জেনেছি, আমাদের পুলিশ নরহত্যার চেয়ে ডাকাতিতে বেশি বিচলিত হয়। এর কারণ, স্বামী-স্ত্রী বা জমিসংক্রান্ত বিরোধে খুনোখুনি করলে পুলিশের কী করার আছে। তাদের ওপর দায় চাপে যখন নাকি সংঘটিত গোষ্ঠীর হাতে হত্যাকাণ্ড ঘটে। নরহত্যা বৃদ্ধির জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে শতভাগ নিশ্চয় দায়ী করা যাবে না। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, নরহত্যা ক্রমাগত বাড়ছে। ব্র্যাক গবেষকেরা বাংলাদেশ পুলিশের ওয়েবসাইট থেকেই তথ্য নিয়েছে। কিন্তু পুলিশের ওয়েবসাইটে ধর্ষণ–বিষয়ক তথ্য পরিষ্কারভাবে পাওয়ার সুযোগ নেই। ‘নারী ও শিশু নির্যাতন’-এর নিচে সব তথ্য দেওয়া হয়েছে। এভাবে গুলিয়ে ফেলায় না বোঝা যাবে নারী নির্যাতন, না বোঝা যাবে শিশু নির্যাতনের হ্রাস-বৃদ্ধি। তদুপরি একটা প্রশ্ন খুব স্বাভাবিক যে, গত ১২ বছরের ব্যবধানে ২০০৩ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা বছরে ২০ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার পরে পরের তিন বছরে ক্রমাগত কমিয়ে এটা ১১ হাজারে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু ২০০৩ সালের পরে ২০১১ সালে প্রথমবারের মতো ২০ হাজারের সংখ্যা ছাড়িয়েছে। আর পরের তিন বছরের যা প্রবণতা তাতে ধারণা করি, বাংলাদেশ বছরে কমপক্ষে ২০ হাজার নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা সংঘটিত হওয়া দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে। উপরন্তু এসব ঘটনায় দোষীদের সাজা পাওয়ার হার এখনো ২ শতাংশের নিচে। সরকারের পক্ষে যাঁরা বিদেশি খুনখারাবির উদাহরণ দেন তাঁরা একচোখা, কারণ তাঁরা সেসব দেশের খুন বা সন্ত্রাসী কাণ্ডের দ্রুত ও সার্থক বিচারের পরিসংখ্যান বিবেচনায় নেন না। ২০১৪ সালে ওই যে সাড়ে চার হাজার নরহত্যা, তাতে একজন করে খুনি থাকলে আমরা সাড়ে চার হাজার খুনি পেয়েছি। কিন্তু এটা অনুমেয় যে দোষীর শাস্তি পাওয়ার হার ১০ শতাংশের কম।
২০০৫ ও ২০০৬ সালে সর্বোচ্চসংখ্যক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড (যথাক্রমে ৩৯৬ ও ৩৫৫) ঘটেছিল। কিন্তু এরপর এটা ক্রমাগত হ্রাস পেয়ে ২০১২ সালে ১০০–র নিচে আসে। কিন্তু লম্বা বিরতির পর ২০১৩ সালে বিচারের বাইরের খুনখারাবি আবার সোয়া তিন শ অতিক্রম করেছে। অথচ ২০০১ সালে মাত্র ৪৪টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল। সব থেকে লক্ষণীয়, এর কোনো দায় রাষ্ট্র বা সরকার নিতে রাজি নয়। এমনকি বিএনপি-জামায়াতের জোট আমলের সাড়ে চার শর বেশি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের একটির তদন্ত চালাতে চাইছে না বর্তমান সরকার। এটা কী নির্দেশ করে? আইনের শাসনের উঠতি না পড়তি? ২০০২-০৩ সালে অপারেশন ক্লিন হার্টে ৫০ জনের বেশি ‘হার্ট অ্যাটাকে’ মারা যান। এই পর্বের একটি দায়মুক্তি আইনকে অসাংবিধানিক বলে বাতিল করে দেওয়া হাইকোর্টের রায়ের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ শিগগিরই আশা করছেন ড. শাহদীন মালিক। তিনি জানালেন, ‘ভুক্তভোগী পরিবার ক্ষতিপূরণ পাবে, তবে দরখাস্ত হাতে তাদের আদালতে আসতে হবে।’
ব্র্যাক গবেষণাপত্র সীমিতভাবে আইনের শাসনের একটি সূচক তৈরি করেছে। বিচারবহির্ভূত খুন, নিরাপত্তা হেফাজতে খুন, নির্যাতন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং আপিল বিভাগ, হাইকোর্ট ও অধস্তন আদালতে মামলা নিষ্পত্তির ভিত্তিতে তারা একটি ঋণাত্মক সূচক (দশমিক ৮৯) স্থির করেছে। ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্ট ২০১৫ সালে বাংলাদেশে আইনের শাসনের বিষয়ে যে গভীর নিম্নমুখী সূচক (১০২টি দেশের মধ্যে ৯৩তম) দিয়েছিল, তার সঙ্গে এর অমিল পাওয়া গেল না। তাতে বাংলাদেশের অবস্থান পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের চেয়ে ভালো, কিন্তু সিয়েরা লিওন ও লাইবেরিয়ার চেয়ে নিচে।
মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চেতনা ছিল আইনের শাসন। দেশে সে রকম একটা ন্যূনতম অনুকূল পরিবেশ থাকুক, ওই হার্ট অ্যাটাকে নিহত ব্যক্তিদের স্বজনেরা, যাঁরা যদিও জানেন ম্যাজিস্ট্রেটরা তদন্ত করে ‘হৃদ্রোগে মৃত্যুর’ পাকা রিপোর্ট দিয়েছেন, প্রতিকারের জন্য তাঁরাও নতুন করে আশায় বুক বাঁধবেন। নতুন খ্রিষ্টীয় বছরের সূচনায় সম্ভবত আমাদের সবারই দ্বিধা কাটিয়ে তেমন আশা করা উচিত!
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জুমার নামাজে নারী ইমাম

ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো একজন নারীকে যুক্তরাজ্যে জুমার নামাজের ইমাম হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ইন্ডিপেডেন্ট ইউকের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, স্থানীয় সময় শুক্রবার ১০০ লোকের জামাতে রাহেল রাজা নামের এক কানাডিয়ান লেখিকা এ ইমামতি করেন। এই জামাতের আয়োজক ড. তাজ হারজির মতে, জামায়াতে নারী ও পুরুষের একসঙ্গে প্রার্থনা করা উচিত। যেখানে ইমামতি করবেন একজন নারী। এরকম হলে নারী-পুরুষের বৈষম্য কমে আসবে।
এ ইমামতির ব্যাপারটি ইসলামের ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতে অন্যান্য নারীদের অংশগ্রহণ উৎসাহিত করবে বলেও মনে করেন তিনি। এদিকে একটি যৌথ জামাতে ইমামতি করতে পেরে গর্বিত রাহেল রাজা। তিনি বলেন, এটি তার জীবনের একটি গভীর অভিজ্ঞতা। এর আগে ২০০৮ সালে আমেরিকায় আমিনা ওয়াদুদ নামের একজন নারী জামাতে নামাজ পড়ানোর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি ৪০ জনেরও কম লোকের একটি জামায়াতে নামাজ পড়ান। তবে এই প্রথম কোনো নারী ইমামতি শুরু করলেন তার চাকরি হিসেবে। প্রসঙ্গত, ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী কোনো নারী নামাজে ইমামতি করতে পারেন না। কোরআন-হাদিসের দৃষ্টিতে ইমামতি করার পূর্বশর্ত হচ্ছে পুরুষ হওয়া।

ইরানের সামনে পাহাড় সমান বাধা

ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ঘিরে ১৩ বছরের সংকটের পর বিশ্বের নিরাপত্তাবিষয়ক মাথাব্যথা কমেছে। জাতিসংঘের পরমাণু ওয়াচ ডগ আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে, গত জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত পরমাণু চুক্তির আলোকে ইরান তার বাধ্যবাধকতা পূরণ করেছে। দেশটি তার ১৪ হাজার পরমাণু সেন্ট্রিফিউজ (মোট সক্ষমতার দুই-তৃতীয়াংশ) অকেজো করেছে এবং সেগুলো আইএইএ’র তত্ত্বাবধানে বন্ধ করে দিয়েছে। সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ৯৮ শতাংশই বাইরে হস্তান্তর করেছে। এছাড়া তেহরান তার আরাক জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রও (প্লুটোনিয়ামের প্রধান উৎস) আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে আনা হয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট অবিশ্বাস্য দ্রুততায় এগুলো বাস্তবায়ন করেছেন। যেগুলো থাকলে এক সপ্তাহের মধ্যেই পারমাণবিক বোমা বানাতে পারত ইরান। কিন্তু এখন এক বছরেও আর তৈরি করতে সক্ষম হবে না। ইরান পরমাণু ক্ষমতাধর হলে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের যে উত্তেজনা ছড়াতে পারত তা থেকে আপাতত নিশ্চিন্ত হচ্ছে বিশ্ব। এত কিছু করে ইরানের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নিতে চেয়েছেন দেশটির নেতারা। শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে অবরোধ তুলে নেয়ার ঘোষণাও এসেছে। কিন্তু সব বাধা কি এখানেই শেষ হয়ে যাবে? রোববার গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক অবরোধ উঠলেও পরামাণু সংশ্লিষ্টতাহীন অন্যান্য নিষেধাজ্ঞা ও মানবাধিকার সম্পর্কিত অবরোধ উঠছে না। ইরানের সামরিক বাহিনী ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন ও পরীক্ষা থেকে নিবৃত হচ্ছে না। এটাকে জাতিসংঘ রেজ্যুলেশনের লংঘন বলে সমালোচনা করে আসছে পশ্চিমা বিশ্ব। কিছুদিন আগে ইরানের ক্ষেপনাস্ত্র পরীক্ষাকে সরাসরি পরমাণুচুক্তির বিরোধী বলেও আক্রমণ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে রিপাবলিকান আধিপত্য থাকায় প্রয়োজনমতো সুবিধা পাবে না ইরান। আগামীতে রিপাবলিকানরা ক্ষমতায় এলে এই চুক্তি বাতিলেরও হুমকি দিয়েছিল। সম্প্র্রতি এক কংগ্রেসের এক আইনে বলা হয়েছে, ইরানের কাউকে মার্কিন ভিসা পেতে হলে তৃতীয় একটি দেশের নাগরিকের সুপারিশ লাগবে, যার তেহরান সফরের অভিজ্ঞতা রয়েছে। এমনকি ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কেও নানা নজরদারি থাকবে। অন্যদিকে ইরানে এই চুক্তিকে নতুন অধ্যায় অভিহিত করে প্রেসিডেন্ট রুহানিকে ‘সফল রাজনীতিবিদ’ তকমা দেয়া হচ্ছে। তবে ফেব্র“য়ারির পার্লামেন্ট নির্বাচনে রুহানির বিরোধিরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে পরিস্থিতি অন্যরকম হতে পারে। আবার রুহানি থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রে রিপাবলিকান ক্ষমতায় এসে চুক্তির বিরোধিতা করলে চাপের মুখে পড়বে ইরান সরকার। ‘এখন কী হল’ প্রশ্ন তুলে ক্ষুব্ধ হবে ইরানিরা। সম্প্রতি বিরোধী মত ঠেকাতে ইরানের গার্ডিয়ান কাউন্সিল (১২ সদস্যবিশিষ্ট সিনিয়র শরিয়া কমিটি) দুই তৃতীয়াংশ মজলিস (পার্লামেন্ট) প্রার্থীকে অযোগ্য ঘোষণা করেছে। ২০১৩ সালে ক্ষমতায় আসা রুহানি ২০১৭ সালে নির্বাচনের মুখোমুখি হবেন। এই মুহূর্তে ইরানের লাভ হচ্ছে অবরোধ উঠে যাওয়ার ফলে দেশটি এখন আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রিতে সক্ষম হবে। দেশটির পুরনো এয়ারলাইনারগুলো আপডেট করতে পারবে। প্রতিরক্ষা খাতে ইরানের বিমানবাহী রণতরীগুলো একেবারেই পুরনো যা বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেগুলো আপডেট করাসহ অনেক যুদ্ধবিমান কিনতে হবে। তাৎক্ষণিকভাবে দেশটি তার বিদেশে জব্দ ৩ হাজার কোটি ডলার ফেরত পাবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের ৭ কোটি ৯০ লাখ জনগণ এখন সুদিনের অপেক্ষা করছেন। কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়ন কতটা হবে এবং কত তাড়াতাড়ি হবে- তার ওপর নির্ভর করছে পরমাণু চুক্তির সফলতা।

সংলাপকে কেন সরকার ভয় পায়? by সোহরাব হাসান

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে সংলাপ কথাটি যতবার উচ্চারিত হয়েছে, তার চেয়ে বেশি ঝংকার তুলেছে সংঘাত। এবং প্রায়ই সেই সংঘাত রাজনৈতিক নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে। বারবার রক্তাক্ত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশ। তাই ৫ জানুয়ারির সমাবেশে এক পক্ষের সংলাপ আহ্বানের সঙ্গে সঙ্গে অন্য পক্ষের নাকচ করে দেওয়ার ঘটনায় অবাক হইনি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এটাই স্বাভাবিক। এখানে সংলাপ, নির্বাচন কিংবা গণতন্ত্র সবকিছুই পরিমাপ করা হয় দলীয় লাভ-ক্ষতির নিক্তিতে। দেশের মানুষের লাভ-ক্ষতি বিবেচনার সময় কোথায় তাদের? এখন নিক্তিটি আওয়ামী লীগের দিকে ভারী বলে তারা বিরোধী দলের সবকিছু অবলীলায় নাকচ করে দিচ্ছে। নিক্তিটি বিএনপি বা বিরোধী দলের দিকে ভারী হলে সংলাপের প্রস্তাব এবং তার প্রতিক্রিয়া নিঃসন্দেহে ভিন্ন হতো।
২০০১-২০০৬ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট যখন ক্ষমতায় তখন নির্বাচন কমিশন ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোট বহুবার সরকারের প্রতি আলোচনার প্রস্তাব দিলেও ক্ষমতাসীনদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। এমনকি ২০০৬ সালে ক্ষমতা হস্তান্তরের শেষ মুহূর্তে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল ও বিএনপির মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার মধ্যে অনুষ্ঠিত বহুল আলোচিত বৈঠকটিও ব্যর্থ হয় তৎকালীন সরকারের একগুঁয়েমির কারণে। পরবর্তীকালে বিএনপির মহাসচিব স্বীকার করেছিলেন যে দলীয় প্রধান চাননি বলেই দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয়নি। বিএনপি প্রধান সমঝোতা চাইলে কিংবা জোর করে ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা না করলে হয়তো এক–এগারোসহ দেশের অনেক অঘটন, অনেক প্রাণহানি এড়ানো যেত। সেই সময় বিএনপি যতটা বলবান ছিল, আওয়ামী লীগ এখন নিজেকে তার চেয়ে অনেক বেশি বলবান মনে করছে বলেই বিরোধী দলের সংলাপ প্রস্তাবটি সরাসরি উপেক্ষা করছে।
আওয়ামী লীগের একজন নেতা বলেছেন, ‘দেশে এখন কোনো সংকট নেই। তাই বিএনপির সঙ্গে সংলাপে বসারও প্রয়োজন নেই।’ ক্ষমতার চশমায় চোখ ঢাকা থাকলে কোনো কিছুকেই সংকট বলে মনে হয় না। নির্বাচনের কথা বাদ দিলেও ২০১৫ সাল জুড়ে যে একের পর এক ব্লগার-লেখক-প্রকাশক হত্যার ঘটনা ঘটল, এ দেশে দায়িত্ব পালন করতে এসে দুজন বিদেশি নাগরিক খুন হলেন, তাজিয়া মিছিলে ও শিয়া মসজিদে হামলা চালিয়ে মানুষ হত্যা করা হলো, বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের মন্দির ও গির্জা আক্রান্ত হলো, এগুলো সংকট না হলে আওয়ামী লীগ নেতারা কাকে সংকট বলবেন? আসলে রোগের উপসর্গ আওয়ামী লীগ বা বিএনপি নয়, রোগের উপসর্গ হলো ক্ষমতা। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে যখন সারা দেশে জঙ্গিবাদী হামলা চলছিল এবং তাদের হাতে বিচারক-পুলিশ-আইনজীবীসহ নিরীহ সাধারণ মানুষ মারা যাচ্ছিল, তখনো বিএনপি বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতাদের ভাষাতেই কথা বলতেন। তৎকালীন সরকারের মন্ত্রীরা ‘দেশে জঙ্গি নেই, সব মিডিয়ার সৃষ্টি বলেও দায় এড়িয়েছেন, কেউ কেউ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জঙ্গিদের মদদও দিয়েছেন। এখন সময় পাল্টেছে। ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে। তাই বিএনপি জঙ্গিবাদ রুখতে এবং সবার কাছে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে সংলাপ চাইছে, আর আওয়ামী লীগ তুড়ি মেরে সেই প্রস্তাব উড়িয়ে দিচ্ছে। ‘জঙ্গিবাদের তোষণকারী বিএনপির’ নেতারা যখন জঙ্গিবাদ রুখতে সর্বদলীয় ঐক্যের আহ্বান জানান, তখন জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণাকারী আওয়ামী লীগ নেতারা সেটি নাকচ করে দেন? তাঁরা যদি মনে করেন বিএনপিই জঙ্গিবাদকে প্রশ্রয় দিচ্ছে, সেটি বন্ধ করতেও তো এ ধরনের প্রস্তাবকে লুফে নেওয়া উচিত, যদি সরকার সত্যি সত্যি দেশকে জঙ্গিমুক্ত করতে চায়।
আওয়ামী লীগের তরফে বলা হয়, বিএনপি রাজনীতিতে ভুল চাল দিয়ে, ভুল সঙ্গী বেছে নিয়ে হেরে গেছে। মানলাম। সেই সঙ্গে এ কথাও বলতে হবে যে বিএনপির হেরে যাওয়াই কিন্তু আওয়ামী লীগের বিজয় বলে ধরে নেওয়া যায় না। গণতন্ত্রে কতগুলো শাশ্বত বিষয় থাকে, যেগুলো কোনো দেশে, কোনো সরকারের আমলে পরিবর্তনের সুযোগ নেই। যেমন ভোটের মাধ্যমে পছন্দসই প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার সুযোগ। এখন দেখার বিষয় বিএনপিকে হারিয়ে ক্ষমতার মসনদে বসা আওয়ামী লীগের আমলে সেই সুযোগ নিশ্চিত হয়েছে কিনা? জনগণ একটি ভালো নির্বাচন পেল কি না? তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে আওয়ামী লীগ নেতারা বলতেন, তাঁদের আমলে সাড়ে পাঁচ হাজার স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয়েছে। কোথাও কারচুপি বা অনিয়ম হয়নি। তিন সিটি করপোরেশন এবং সর্বশেষ পৌর নির্বাচনের পর সেই কথাটি বলার সুযোগ আছে কি?
যদি পৌরসভা নির্বাচনটি বিএনপি সরকারের অধীনে হতো এবং সন্দ্বীপে বিএনপির মেয়র প্রার্থীর ২০ হাজার ৬৯০ ভোটের বিপরীতে আওয়ামী লীগ মেয়র প্রার্থীর ৪৬৪ ভোট পাওয়াকে তাঁরা কীভাবে নিতেন? সামরিক শাসনামলে স্বৈরশাসকেরা যে ধরনের নির্বাচন দেশবাসীর ওপর চাপিয়ে দিতেন, গণতান্ত্রিক আওয়ামী লীগের আমলে সেটি কেন হবে? ধরে নিলাম, বিএনপির চেয়ে আওয়ামী লীগ সন্দ্বীপে কিংবা সারা দেশে অনেক বেশি জনপ্রিয়। তাই বলে ৪৪ ভাগের এক ভাগ ভোটও পাবেন না বিএনপির প্রার্থী? তিন মাসের ধ্বংসাত্মক কর্মসূচির কারণে বিএনপির জনপ্রিয়তায় ধস নামলে গত এপ্রিলে অনুষ্ঠিত তিন সিটি নির্বাচনে মাঝ পথে সরে দাঁড়ানো বিএনপির প্রার্থীরা এত ভোট কীভাবে পেলেন?
অস্বীকার করা যাবে না যে গত বছর জানুয়ারি থেকে মার্চ—বিএনপির এই তিন মাসের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড কিংবা নির্বাচনের আগে ও পরে তাদের নাশকতায় বহু মানুষ মারা গেছে, দেশের বহু ক্ষতি হয়েছে। বিএনপি নেতৃত্ব সেই ভুল বুঝতে পেরে যখন নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে এল তখন আওয়ামী লীগের কি উচিত নয়, তাকে স্বাগত জানানো? কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতাদের হাবভাব দেখে মনে হয় না তাঁরা বিএনপির কোনো কাজকে উদারভাবে দেখতে চান। বিএনপি আন্দোলন করে সরকারকে ফেলে দিতে না পারুক, হরতাল-অবরোধ ডেকে দেশকে অস্থিতিশীল করে রাখতে পারে। সেটি দেশ ও সরকার কারও জন্যই ভালো হবে না। নয় মাস ধরে বিএনপির জ্বালাও–পোড়াও না থাকলেও জনজীবনে স্বস্তি ফিরে এসেছে সে কথা জোর দিয়ে বলা যাবে না। গত বছরটিতে বিরোধী দলের হরতাল-অবরোধে যেমন বহু মানুষ মারা গেছে, তেমনি বহু মানুষ ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারকেরা নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন যে, আইনের শাসন ও বিচারবহির্ভূত হত্যা একসঙ্গে চলে না। রাজনৈতিক কৌশলে প্রতিপক্ষকে হারিয়ে দেওয়া এবং সুষ্ঠু নির্বাচনও সমার্থক শব্দ নয়। বছর শেষে ধারাবাহিক জঙ্গি উৎপাতেরও কোনো কিনারা করতে না পারা সরকারের বড় ব্যর্থতা হিসেবেই চিহ্নিত থাকবে।
এ কথা ঠিক যে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অনেকটা বেকায়দায় পড়েই আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের কথা বলেছেন। একই সঙ্গে তিনি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন, সদ্য সমাপ্ত পৌরসভা নির্বাচন, তার আগে অনুষ্ঠিত তিন সিটি করপোরেশন এবং নির্বাচন কমিশন নিয়েও প্রশ্ন করেছেন। সেনাবাহিনী, সিভিল প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিয়েও তাঁর কড়া মন্তব্য ছিল। সেসব প্রশ্ন ও মন্তব্যের জবাব না দিয়ে আওয়ামী লীগের নেতারা যেভাবে তাঁর সংলাপ প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন, তাতে মনে হবে তিনি বোধ হয় তাঁর বক্তৃতায় ওই একটিই না-হক কথা বলেছেন। কিন্তু আমাদের বিবেচনায় ওই একটি কথাই হক বলেছেন। হতে পারে আওয়ামী লীগ তাঁর প্রস্তাবে সাড়া দেবে না জেনেই খালেদা জিয়া বারবার সংলাপ ও সহনশীলতার কথা বলছেন। এর মাধ্যমে দেশের মানুষকে ও বিদেশের বন্ধুদের বোঝাতে চাইছেন, বিএনপি শান্তির পক্ষে আর আওয়ামী লীগ অশান্তি করছে। আওয়ামী লীগ নেতারা যেভাবে খালেদা জিয়ার প্রস্তাবে ক্ষিপ্র প্রতিক্রিয়া দেখালেন তাতে মনে হয়, সংলাপে বসতে রাজি হলেই আওয়ামী লীগ বোধ হয় রাজনৈতিকভাবে পরাজিত হয়ে যাবে। এই মানসিকতা কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক নয়।
আর সংকট থাকলেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে সংলাপ হয়, রাষ্ট্রবিজ্ঞান সে কথা বলে না। সংকট ও সম্ভাবনা দুটো নিয়েই রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে আলোচনা হতে পারে, হওয়া উচিত। বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে দেশে কোনো সংকট দেখেনি বলেই তারা মারাত্মক গাড্ডায় পড়েছিল, যা থেকে এখনো বেরিয়ে আসতে পারেনি। আজ আওয়ামী লীগও যদি অব্যাহত জঙ্গি হানা সত্ত্বেও দেশে কোনো সংকট না দেখে, তাহলেও তাদেরও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। সাত বছর ধরে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখানোর পর জঙ্গিদের উৎপাত বেড়ে যাওয়া প্রমাণ করে যে হয় তারা সমস্যাটির গভীরতা বুঝতে পারেনি অথবা সেটি মোকাবিলা করার সক্ষমতা তাদের নেই। জঙ্গিবাদ নিছক আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা নয়, সেটি শক্তিধর আমেরিকা বুঝলেও বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনেরা বুঝতে পারছেন না। নির্বাচন তাঁদের কাছে অনেক দূরের বাদ্য। অতএব, সে নিয়ে এখন তাঁরা মাথা ঘামাতে চাইছেন না। ভালো কথা। কিন্তু জঙ্গিবাদের ছুরি যে বাংলাদেশকে রক্তাক্ত করে চলেছে, সেটি দেখে না দেখার ভান কি বোকামি নয়? কথার তূণে একে অপরকে ঘায়েল না করে জঙ্গিবাদের ছোবল ঠেকান। অন্তত একটি বিষয়ে আপনারা একমত হন।
সরকার মুখে স্বীকার না করলেও জঙ্গিবাদ জনগণের মধ্যেই কেবল ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেনি, সরকারের মনেও ভয় পাইয়ে দিয়েছে। সেই ভয়কে জয় করার উপায় কী? সংলাপ, সংলাপ এবং সংলাপ। সেটি কেবল সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে নয়, জনগণের সঙ্গে সরকারের সফল ও অর্থবহ সংলাপ হওয়া চাই। পৌর নির্বাচন সেটি দিতে পারেনি। আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন পারবে কি?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

নতুন ভূ-অর্থনীতির সন্ধানে by জোসেফ ই স্টিগলিৎস

গত বছরটা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য স্মরণীয় বছর ছিল। সেটা শুধু এই কারণে নয় যে অর্থনীতির সূচক নিম্নমুখী ছিল। গত বছর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় গভীর পরিবর্তন এসেছে, তার গতি যেমন ভালোর দিকে ছিল, তেমনি খারাপের দিকেও ছিল।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল গত মাসে প্যারিসে স্বাক্ষরিত জলবায়ু-বিষয়ক চুক্তি। চুক্তির ধারা অনুসারে এটি বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার প্রাক্-শিল্প যুগের তুলনায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যেই রাখার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু এই চুক্তি একটি ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছে, তা হলো পৃথিবী অপ্রতিরোধ্যভাবে সবুজ অর্থনীতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। সেদিন খুব দূরে নয়, যখন জীবাশ্ম জ্বালানি প্রধানত অতীতের বিষয়ে পরিণত হবে। ফলে যাঁরা কয়লায় বিনিয়োগ করছেন, তাঁরা নিজেদের ঝুঁকিতেই তা করছেন। আর সবুজ জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, আমরা আশা করতে পারি, এই খাতের বিনিয়োগকারীরা কয়লাশিল্পে বিনিয়োগকারী লবির শক্তিশালী বিরোধিতার মুখোমুখি হবেন, যাঁরা নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থে পৃথিবীকে ঝুঁকির মুখে ফেলছেন।
উচ্চ কার্বন নিঃসরণকারী অর্থনীতি থেকে এই সরে আসা বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে কয়েকটি বড়সড় পরিবর্তনের একটি হিসেবে চিহ্নিত হবে। চীনের উৎপাদনের পরিমাণ এবং তার বাজারের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে অন্য পরিবর্তনগুলোও অবশ্যম্ভাবী। নতুন উন্নয়ন ব্যাংক ব্রিকস (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা) গত বছরই চালু হয়েছে। এটি দুনিয়ার প্রথম বড় আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যার নেতৃত্বে রয়েছে উন্নয়নশীল দেশগুলো। আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার বাধা সত্ত্বেও গত বছর চীনের নেতৃত্বে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যার কার্যক্রম এ মাসেই শুরু হওয়ার কথা। মুদ্রাবাজারে যেখানে চীনের মুদ্রার প্রসঙ্গ এসেছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র বেশ প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মজুত সম্পদে চীনের মুদ্রা রেনমিনবি (ইউয়ান) যুক্ত হলেও যুক্তরাষ্ট্র তাতে বাদ সাধেনি। এর পাশাপাশি ওবামা প্রশাসন পাঁচ বছর আগে আইএমএফে চীনসহ অন্যান্য উদীয়মান দেশের ভোটাধিকারের প্রশ্নে যে কিঞ্চিৎ পরিবর্তন আনার ব্যাপারে সম্মত হয়েছিল, মার্কিন কংগ্রেস গত বছর সেটা অনুমোদন করেছে। এটা অর্থনীতির নতুন বাস্তবতাকে একরকম মেনে নেওয়া।
গত বছরের ভূ-অর্থনীতিতে সবচেয়ে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত হয়েছে বাণিজ্যক্ষেত্রে। অনেক বছর ধরে উদ্দেশ্যহীন আলোচনার পর বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার দোহা ডেভেলপমেন্ট রাউন্ডকে নীরবে সমাধিস্থ করা হয়েছে। এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বাণিজ্য চুক্তির ভারসাম্যহীনতা দূর করার জন্য, যেসব চুক্তিতে উন্নত দেশগুলোকে বেশি সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ভণ্ডামি দোহা রাউন্ডের পথে এক অনতিক্রম্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে মুক্তবাণিজ্যের কথা বললেও সুতাসহ অন্যান্য কৃষিজাত পণ্যের ওপর ভর্তুকি উঠিয়ে নিতে রাজি নয়। বৈশ্বিক বাণিজ্য নিয়ে আলোচনার বদলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ বাণিজ্য চুক্তি ও ব্লকগুলোকে টপকে ‘ভাগ করো ও দখল করো’ নীতি গ্রহণ করেছে। ফলে দেখা গেল, যেখানে বৈশ্বিক পরিসরে মুক্তবাণিজ্যের জগৎ সৃষ্টি হওয়ার কথা ছিল, সেখানে এক বিসদৃশ ও নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্য জগৎ সৃষ্টি হলো। প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগরের উভয় পাশের অধিকাংশ বাণিজ্যই এখন এই চুক্তির ভিত্তিতে পরিচালিত হবে, পণ্যের জটিল উৎসবিধি নিয়ে হাজার হাজার পাতা লেখা হবে, যেটা দক্ষতার মৌলিক নীতি ও পণ্যের অবাধ প্রবাহের বিরোধী।
যুক্তরাষ্ট্র এই দশকের সবচেয়ে বাজে বাণিজ্য চুক্তি ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (টিপিপি) করতে গোপনে নানা আলোচনা চালিয়েছে। অবশ্য এই চুক্তি নিয়ে দেশটিতে গৃহবিবাদ শুরু হয়েছে; ডেমোক্র্যাট দলের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ও রিপাবলিকান দলের অনেকেই এর বিরোধিতা করছেন, ফলে ওবামা প্রশাসনের পক্ষে কংগ্রেসে এটার অনুসমর্থন পাওয়া সহজ হবে না। সমস্যাটা চুক্তির বাণিজ্যের ধারা নিয়ে নয়, ‘বিনিয়োগ’ ধারা নিয়ে। এসব ধারা মারাত্মকভাবে পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাবিধির পরিপন্থী। এমনকি আর্থিক নিয়ন্ত্রণবিধির সঙ্গেও টিপিপি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সুনির্দিষ্টভাবে বললে, ওই ধারায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের এই অধিকার দেওয়া হয়েছে যে সরকারের কোনো বিধান টিপিপির (ছয় হাজার পাতারও বেশি পরিসরে তা লেখা আছে) পরিপন্থী হলে তারা সংশ্লিষ্ট সরকারের বিরুদ্ধে বেসরকারিভাবে গঠিত আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে মামলা করতে পারবে। অতীতে এই ধরনের ট্রাইব্যুনাল সরকারি আইন বিলোপ করার ভিত্তি হিসেবে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বাধ্যবাধকতাকে ‘ন্যায্য ও যথাযথ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। এমনকি সেই আইন যদি বৈষম্যমূলক নাও হয় এবং জনগণকে শুধু নতুন নতুন ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য প্রণীত হয়ে থাকে, তাহলেও।
এই চুক্তির ভাষা জটিল। এমনকি পৃথিবীকে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ থেকে রক্ষা করার জন্য যে আইন আছে, তাও এর সামনে ঠুনকো হয়ে যায়। শুধু সিগারেট-সংক্রান্ত আইনই নিরাপদ মনে হয় (সিগারেটের মোড়কে এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে নরম কথা লেখার জন্য উরুগুয়ে ও অস্ট্রেলিয়া সরকার যে বিধান করেছিল, তার বিরুদ্ধে করপোরেশন মামলা করেছিল। এটা বেশ নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল)। কিন্তু আরও অনেক ক্ষেত্রে মামলা করার সম্ভাবনা নিয়ে বহু প্রশ্নের উদয় হয়েছে। তা ছাড়া, ‘সবচেয়ে আনুকূল্যপ্রাপ্ত রাষ্ট্রের’ যে বিধান রয়েছে, তাতে করপোরেশনগুলো দাবি করতে পারে, সংশ্লিষ্ট দেশের চুক্তিতে যে সর্বাধিক সুবিধা পাওয়ার বিধান রয়েছে, তাদের সেটা দিতে হবে। এতে মান অবনমনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যেতে পারে, যদিও প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ঠিক এর উল্টোটাই চান।
এমনকি ওবামা যেভাবে এই বাণিজ্য চুক্তির পক্ষে কথা বলেন, তাতে বোঝা যায়, তাঁর প্রশাসন উদীয়মান বৈশ্বিক অর্থনীতি থেকে কতটা দূরে। তিনি বারবার বলেছেন, টিপিপির মাধ্যমে ঠিক হবে, ২১ শতকের বাণিজ্যবিধি কে লিখবে, যুক্তরাষ্ট্র না চীন। কিন্তু সঠিক পদ্ধতিটি হচ্ছে, স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্মিলিতভাবে এমন বিধান প্রণয়ন করা, যেখানে সবার কথাই থাকবে। ওবামা পুরোনো রীতিকেই চিরস্থায়ী করার চেষ্টা করেছেন, যেখানে মার্কিন করপোরেশন তার নিজের স্বার্থেই বৈশ্বিক বাণিজ্যবিধি প্রণয়ন করে। যাঁরা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে আস্থা রাখেন, তাঁদের কাছে এটা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়।
জোসেফ ই স্টিগলিৎস
যাঁরা পৃথিবীর অর্থনীতির অঙ্গীভূতকরণের কথা বলেন, তাঁদের ঘাড়ে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা সংস্কারের বিশেষ দায়িত্ব বর্তেছে। অভ্যন্তরীণ নীতি প্রণয়নের দায়িত্ব যদি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যায়, তাহলে ওসব নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে বিশেষভাবে গণতান্ত্রিক হতে হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ২০১৫ সালে ব্যাপারটা সে রকম ছিল না। ২০১৬ সালে আমাদের আশা করা উচিত, টিপিপির পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাণিজ্য চুক্তির এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে, যেখানে শক্তিশালীরা পুরস্কৃত হবে না, দুর্বলেরা শাস্তি পাবে না। প্যারিস সম্মেলন এই চেতনা ও মনোভাবের অগ্রদূত হোক, সত্যিকার অর্থে বৈশ্বিক সহযোগিতা টিকিয়ে রাখার জন্য যার প্রয়োজন রয়েছে।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
জোসেফ ই স্টিগলিৎস: নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত মার্কিন অর্থনীতিবিদ।

সৌদি যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী

 ওআইসি’র মন্ত্রী পর্যায়ের একটি বৈঠকে অংশ নিতে চলতি সপ্তাহে সৌদি আরব যেতে পারেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এমপি। তার সফরটি দু’দিনের হতে পারে। জেদ্দা সফরকালে ওআইসি মহাসচিব আইয়াদ আমিন মাদানি ছাড়াও বিভিন্ন মুসলিম বিশ্বের প্রতিনিধির সঙ্গে মন্ত্রীর সাক্ষাৎ, বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। উল্লেখ্য সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন ৩৪ রাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী জোট নিয়ে আলোচনায় জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে রিয়াদ সফর করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সেখানে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে ফেরার পথে তিনি জেদ্দায় একদিন কাটান। সেই সময়ে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর জোট ওআইসি মহাসচিব আইয়াদ আমিন মাদানি সঙ্গে বৈঠক হয় তার। ওই বৈঠকে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ দেন মন্ত্রী। এছাড়া তারা মুসলিম উম্মার অভিন্ন স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয় এবং চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে আলোচনা করেন বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।

বুরকিনা ফাসোয় জঙ্গি হামলা, নিহত ২৭

রাজধানী ওউয়াগাদোউগুর স্প্লেনডিড হোটেলে জঙ্গি হামলার পর
বাইরে সতর্ক অবস্থানে ফরাসি বিশেষ বাহিনীর সদস্যরা। এএফপি
পশ্চিম আফ্রিকার দেশ বুরকিনা ফাসোয় গতকাল শনিবার জঙ্গিগোষ্ঠী আল-কায়েদার আঞ্চলিক শাখার হামলায় ১৮টি দেশের অন্তত ২৭ জন নাগরিক নিহত হয়েছেন। জঙ্গিরা রাজধানী ওউয়াগাদোউগুর দুটি হোটেল ও একটি রেস্তোরাঁয় হামলা চালিয়ে অবরোধ করে রাখে। পরে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা একটি হোটেল ও রেস্তোরাঁয় কয়েক ঘণ্টার অভিযান চালিয়ে ১৫০ জন জিম্মিকে উদ্ধার করেন। খবর এএফপি ও বিবিসির। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে দুই ফরাসি নাগরিক আছেন। এ ঘটনায় তিন দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করেছে বুরকিনা ফাসো সরকার। রাজধানী ওউয়াগাদোউগুর ‘স্প্লেনডিড হোটেলে’ গত শুক্রবার রাতে হামলা চালায় জঙ্গিরা। আল-কায়েদা ইন দ্য ইসলামিক মাগরেব (একিউআইএম‍) এ হামলার দায় স্বীকার করেছে। অনলাইনে জঙ্গিদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণকারী যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান সাইটে প্রকাশিত একিউআইএমের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ফ্রান্স এবং অবিশ্বাসী পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতেই এ হামলা।’ সেখানে আরও বলা হয়, বন্দুকধারীরা আলজেরিয়ার কুখ্যাত জঙ্গি মোখতার বেলমোখতারের নেতৃত্বাধীন আল-মুরাবিতাওন গোষ্ঠীর সদস্য। জঙ্গিরা ওই হোটেলের পাশে কাপুচিনো নামের আরেকটি রেস্তোরাঁয়ও হামলা চালায়।
জঙ্গিদের কবল থেকে একপর্যায়ে স্প্লেনডিড হোটেল ও কাপুচিনো রেস্তোরাঁ মুক্ত হলেও বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ইয়াইবি নামের আরেক অবরুদ্ধ হোটেলে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান চলছিল। বুরকিনা ফাসোর নিরাপত্তা-বিষয়ক মন্ত্রী সিমোঁ কুঁপাওঘে বলেন, ‘হোটেল ও কাপুচিনো রেস্তোরাঁয় আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী ও ফরাসি নিরাপত্তা বাহিনীর যৌথ অভিযান শেষ হয়েছে। উদ্ধার হওয়া ১৫০ জিম্মির মধ্যে ৩৩ জন আহত হয়েছেন।’ আহত ব্যক্তিদের মধ্যে দেশের গণপূর্তমন্ত্রী ক্লেমঁ সাওয়াদোগোও রয়েছেন বলে জানান তিনি। নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে অন্তত চার জঙ্গি নিহত হয়। এদের মধ্যে দুজন নারী বলে জানা গেছে। নিহত জঙ্গিদের মধ্যে একজন আরব ও দুজন আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ। আরেকজনের পরিচয় জানা যায়নি। সাবেক ফরাসি উপনিবেশ বুরকিনা ফাসোয় এ হামলাকে ‘ঘৃণ্য’ আখ্যায়িত করে এর নিন্দা জানিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ। বন্দুকধারীরা স্প্লেনডিড হোটেল ও কাপুচিনো রেস্তোরাঁয় কয়েকটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। হোটেল থেকে উদ্ধার হওয়া কয়েকজন জানান, জঙ্গিরা প্রত্যেক জিম্মির কাছে যায়। তাঁদের শরীর স্পর্শ করে। কেউ নড়াচড়া করলে তাঁদের খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়। হোটেলে হামলা শুরু হওয়ার পরপরই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা পুরো হোটেল এলাকা ঘিরে ফেলেন। শনিবার ভোররাত থেকে তাঁরা উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। উদ্ধার হওয়া বুরকিনা ফাসোর নাগরিক ইয়ানিক সাওয়াদোগো সিএনএনকে বলেন, হামলার পর সবাই ভয়ে মেঝেতে শুয়ে পড়েন। হোটেলের সর্বত্র রক্ত ছড়িয়ে আছে।
ওউয়াগাদোউগু নগরে থাকা পশ্চিমা, বিশেষ করে ফরাসি নাগরিকদের কাছে এ দুটি স্থানই বেশ প্রিয়। দুটি স্থানে দেশটিতে থাকা জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তাদের যাতায়াত রয়েছে। প্রথম দফার অভিযান শেষ হওয়ার সময়ই খবর পাওয়া যায়, কয়েকজন হামলাকারী পাশের আরেক হোটেল ইয়াইবিতে অবস্থান নিয়েছে। এরপর নিরাপত্তা বাহিনী সেখানে অভিযান চালায়। চতুর্থ জঙ্গি সেখানেই মারা যায়। এর আগে বুরকিনা ফাসোর যোগাযোগমন্ত্রী রেমি দাদজিনু বলেন, ছয় থেকে সাতজন বন্দুকধারী স্প্লেনডিড হোটেল আক্রমণ করেছে। হামলাকারীরা কয়েক দিন ধরেই হোটেলে অতিথি হিসেবে থাকছিল। আল-কায়েদার সঙ্গে যুক্ত একিউআইএম গত বছরের নভেম্বরে আফ্রিকার দেশ মালির রাজধানী বামাকোতে হামলা চালিয়ে ১৯ জনকে হত্যা করে। স্প্লেনডিড হোটেল মুক্ত হওয়ার পর বুরকিনা ফাসোর সদ্য নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হোক মার্ক ক্রিশ্চিয়ান ক্যাবোরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। গত বছর এক সামরিক অভ্যুত্থানে দেশটিতে ২৭ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট ব্লেজ কুঁপাওঘে উৎখাত হন। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক সিনথিয়া ওহায়িওন হামলার পর বলেন, দেশটিতে এখনো একধরনের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা চলছে। ঠিক এই সময়ে এমন হামলা ইঙ্গিতবাহী।

ইরানের বিরুদ্ধে অবরোধ প্রত্যাহার হচ্ছে?

জন কেরি ও জাভেদ জারিফ
অবশেষে ইরানের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক অবরোধ প্রত্যাহারের সব প্রতিবন্ধকতা সরে যাচ্ছে। গতকাল শনিবারই জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কাছ থেকে এ-সংক্রান্ত ইঙ্গিত আসার প্রত্যাশা করা হচ্ছিল। খবর বিবিসি ও এএফপির। গত বছর বিশ্বশক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পাদিত ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তিটি ইরান মেনে চলছে বলে ভিয়েনায় গতকালই ঘোষণা দেওয়ার কথা ছিল জাতিসংঘের আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ)। তার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) যৌথভাবে ঘোষণা দেওয়ার কথা যে চুক্তিটি এখন থেকেই কার্যকর। এসব ঘোষণার অর্থ, অবরোধ প্রত্যাহারে আর কোনো বাধা নেই। তেহরানের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতার লক্ষ্যে টানা তিন বছর ধরে আলোচনার পর গত জুলাই মাসে ইরান ও ছয় জাতির (জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য এবং জার্মানি) মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় ‘যৌথ সার্বিক কর্মপরিকল্পনা’ চুক্তি। এই চুক্তির আওতায় ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনতে সম্মত হয়। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইইউসহ পাশ্চাত্য তেহরানের ওপর আরোপিত অবরোধগুলো ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করে নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়। চুক্তির শর্তগুলো ইরান মেনে চলছে এবং অর্থনৈতিকসহ বিভিন্ন প্রকার অবরোধ প্রত্যাহার এখন আসন্ন বলে ব্যাপক জল্পনা চলছে। চুক্তি বাস্তবায়নের প্রকৃত অবস্থা যাচাই করার দায়িত্ব আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা আইএইএর।
ফেদারিকা মঘেরিনি
সংস্থাটির গতকাল যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার কথা তাতে ইরান চুক্তি অমান্য করেনি বলেই ঘোষণা আসার প্রত্যাশা করা হচ্ছিল। বিভিন্ন সূত্রের বরাতে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর মোতাবেক, প্রতিবেদনে বলা হবে, ইরান চুক্তি মেনে তার পারমাণবিক কর্মসূচি নাটকীয়ভাবে কমিয়ে এনেছে বলে দেখা গেছে। তবে আইএইএর ওই প্রতিবেদন প্রকাশের আগেই মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক বিবৃতিতে বলা হয়, পারমাণবিক চুক্তিটি বাস্তবায়নের পথে সব পক্ষই অব্যাহতভাবে অগ্রগতি সাধন করে চলেছে। এটা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ‘একান্তই শান্তিপূর্ণ ধরন’ নিশ্চিত করবে। এমন প্রেক্ষাপটেই গতকাল ভিয়েনায় বৈঠকে বসে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ইইউ। চুক্তিটির বাস্তবায়ন যে আসন্ন, গতকালের ভিয়েনা বৈঠক ছিল তারই ইঙ্গিত। বৈঠকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি, ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জারিফ ও ইইউর পররাষ্ট্রনীতি প্রধান ফেদারিকা মঘেরিনির অংশ নেওয়ার কথা ছিল। ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী গতকালই তেহরানের ওপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহারের ঘোষণা আশা করছিলেন। বৈঠকের জন্য ভিয়েনা পৌঁছে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আজকের দিনটা ইরানি জনগণের জন্য একটা শুভ দিন। কারণ, আজই অবরোধগুলো তুলে নেওয়া হবে।’ আইএইএর সবুজসংকেতের অর্থ, ইরানের ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ ও জাতিসংঘের অবরোধগুলো তুলে নেওয়া যাবে। এরপর ইরান আবার বিদেশে তেল রপ্তানি শুরু করতে পারবে। আট কোটি জনসংখ্যার দেশটির বৈদেশিক বাণিজ্যের সব দরজা খুলে যাবে। 

থাকার দেশ না টাকার দেশ বাংলাদেশ? by ফারুক ওয়াসিফ

ভূমিকম্পে মাটি কাঁপে কিন্তু ব্যবস্থা কাঁপে না,
বাসযোগ্যতা বাড়ে না দেশের
ধানমন্ডিবাসী খুবই অসন্তুষ্ট, এলাকাটি আর আবাসিক থাকছে না। একই অসন্তোষ হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের ১৬ হাজার চা-শ্রমিকের। শতবর্ষ পুরোনো আবাদি জমি আর তাঁদের থাকবে না, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরিতে যাবে। প্রশ্নটা কিন্তু আরও বড়, ঢাকা শহর মায় বাংলাদেশটাই কি আবাসিক থাকছে? অভিজাতপাড়ার দুঃখটা সমগ্র ঢাকারও। ঢাকা বাসযোগ্য নেই, বৈশ্বিক জরিপ চোখে আঙুল দিচ্ছে। আমরা চোখটাই ঢাকছি, সমস্যাটা দেখছি না।
বসবাসের জায়গা আর কারবারের জায়গা আলাদা থাকছে না বাংলাদেশে। সব দেশে ও নগরে ভাগ করা থাকে এবং থাকার ও অর্থনৈতিক কারবারের জন্য ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশ ও পরিসর সৃষ্টি করা থাকে। আমাদের এমন পরিকল্পনা থাকলেও এখন কাগজের সঙ্গে বাস্তবের দারুণ অমিল। ঢাকার পরিকল্পিত আবাসিক এলাকার মধ্যে ধানমন্ডি পুরোনো। এর বাইরে গুলশান-বনানী-মোহাম্মদপুর ও উত্তরাকে আবাসিক রাখার কথা ছিল। কিন্ত কথা রাখা হচ্ছে না। বৃহত্তর ঢাকা-চট্টগ্রাম-নারায়ণগঞ্জে আগে আবাসিক এলাকায় পোশাক কারখানা চলত, এখন কারখানার মাঝে মাঝে আবাসিক এলাকা। এই মডেলই ছড়িয়ে যাচ্ছে দেশময়। এই পরিবেশ জীবনযাপনের বিপক্ষে যাচ্ছে। সামাজিক মেলামেশা ও অন্তরঙ্গতার সুযোগ কমছে। ফ্ল্যাট-রাস্তা-বাজার-টিভি ছাড়া করার কিছু থাকছে না। নির্ভার নির্মল বিচরণের জায়গাগুলোর দখল নিচ্ছে বাজারি কারবার। বাণিজ্যের শক্তির চাপে প্রতিদিন পিছু হটছে সামাজিক সমবায়।
প্রাণ ও প্রকৃতির স্পর্শহীন যে জীবন, সে জীবন সুস্থ থাকতে পারে না। মানুষের মধ্যে অস্থিরতা, হতাশা, নিঃসঙ্গতা আর হিংস্রতা বাড়ছে। অনেককেই তাই বলতে শুনি, ‘দেশটা আর দেশ নাই’। দেশের আরেক অর্থ ঘর। ইংরেজিতে বলে ‘অ্যাট হোম ফিল’ করা। যদি নিজ নিবাসে আপনি ঘরোয়া শান্তি না পান, তাহলে দেশে আছেন বলা যাবে না।
দেশ মানে আপন পরিবেশে শান্তিতে থাকার জায়গা। কে থাকবে? থাকবে আপন সন্তান-পরিজন, থাকবে যে জনগোষ্ঠীর অংশ আমরা, তারা। অর্থ থাকলে পৃথিবীর যেকোনো জায়গাতেই এই নিরাপত্তা ও শান্তি কিনে থাকা সম্ভব। কিন্তু কোনো আবাসিক জায়গাকে দেশ বানাতে কয়েক প্রজন্মের বসবাসের দরকার হয়। দেশের ধারণা তাই অনেক বড়। দেশ মানে সুদূর ভবিষ্যৎ পর্যন্ত আপন প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে হুমকিহীন বসবাসের ভরসা। দেশ মানে চারপাশের সঙ্গে সুন্দর-সাবলীল সম্পর্ক। প্রকৃতি ও মানুষের সঙ্গে বন্ধনের সম্পর্ক ছাড়া তাই দেশ ও ঘর কোনোটাই হয় না। জায়গা বদলানো যত সহজ, দেশ বদলানো ততই কঠিন। দেশ তাই এমন এক আশ্বাস, ভবিষ্যতেও তা যাতে থাকে তার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
ইতিহাস দেখায়, যেই শাসন করেছে, দেশটাকে বাসযোগ্য রাখার চিন্তা করেনি। ইংরেজরা আড়াই শ বছর থেকেও ভারতভূমিকে দেশ ভাবতে পারেনি। জমিদার ও পাঞ্জাবিরা কলকাতা–করাচি গড়েছে, বাংলাদেশ গড়েনি। অথচ কয়েক প্রজন্ম বিদেশে থেকেও নাড়ির টান টনটন করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মনে। জীবনের অনেকটা সময় বিদেশে পার করে শেষ বয়সে দেশে চলে আসেন অনেকেই। জনগণের ৯৯ শতাংশেরও জন্মভূমিতে থাকার ইচ্ছা ও সম্ভাবনা প্রবল। সুতরাং, দেশকে দেশের মতো রাখার ও তেমন করে গড়বার প্রয়োজনই হওয়া উচিত উন্নয়নের লক্ষ্য। তার জন্য এমনভাবে উন্নয়ন ও বাণিজ্য হতে হবে, যাতে দেশের আবাসিকতা এবং পরিবেশগত ও সামাজিক নিরাপত্তা ঠিক থাকে। তা না হলে থাকার জায়গাকে দেশ বলব কীভাবে?
এ কারণেই ধানমন্ডিবাসীর উদ্বেগটা বৈধ। যেমন বৈধ নদী-জলাশয়, অরণ্য-পাহাড় বাঁচানোর দাবি। নদী বাঁচছে না, অরণ্য-পাহাড় ধ্বংসের গতি থামছে না। নদী ছাড়া, অরণ্যের দান সজীব জলবায়ু ছাড়া দেশের বাসযোগ্যতা রাখা যাবে—এমন চিন্তা অযৌক্তিক, অবৈজ্ঞানিক ও অমানবিক। কাজেই আড়িয়ল বিলে নতুন বিমানবন্দর করার বিরুদ্ধে আন্দোলন, ওসমানী উদ্যান বাঁচাও আন্দোলন বৈধ ছিল। এ কারণেই ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লাখনি করা, সুন্দরবনে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গ্যাসক্ষেত্র করা, হবিগঞ্জের চুনারুঘাটসহ কৃষিজমিতে বাণিজ্যিক কারবার বসানো ঠিক না।
কিন্তু দেশের মানুষের রুটি-রুজি মর্যাদার উন্নতিও তো দরকার। উন্নয়ন শব্দটা বিতর্কিত, উন্নতিই সবকিছুর আসল কথা। মূলত পরাধীনতার কারণে পিছিয়ে পড়া দেশগুলোকে এগিয়ে আনার দোহাইয়ে উন্নয়ন ধারণার জন্ম হয়। এই ধারণার রূপায়ণ ও বাস্তবায়নের সর্দার তাঁরাই হন, যাঁরা নাকি কিছুদিন আগেও এসব দেশকে ঔপনিবেশিক কায়দায় শোষণ-শাসন করেছেন।
একসময় তাঁদের ধ্যানধারণা স্থানীয় শাসকেরাও গ্রহণ করেন। কারণ, এমন ধারার উন্নয়নে একটি-দুটি শ্রেণিকে খুশি করে অধিকাংশ জনগণকে দাবিয়ে রাখা যায়। উন্নয়ন তাই হয়ে দাঁড়ায় অল্প কিছু মানুষের উন্নতির মন্ত্র। বাংলাদেশটা যা এগিয়েছে তা দেশে ও প্রবাসে খাটুনি করা শ্রমিকদের দ্বারা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রের উদ্যোক্তাদের কারণে।
জাপান ও জার্মানির মতো উন্নত দেশ আবাসিক এলাকার কাছে ঝুঁকিপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্প রাখছে না। ঘনতম বসতির দেশে আমরা রূপপুর বা রামপালের মেতা ঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্প গ্রহণের সাহস করছি কেন? বাড়তি ভয় ভূমিকম্পের। ভূমিকম্পসহ আবাসন নিরাপদ আবাসনের শর্ত। অথচ মাটি-ভবন কাঁপল আমাদের নীতিনির্ধারকেরা অকম্পিতভাবে বলে চললেন, ঢাকার কোনো ক্ষতি হবে না!
উন্নতি কার না দরকার? শিল্পায়ন লাগবে, বিদ্যুৎ লাগবে। এর জন্য কিছু কিছু অঞ্চলের মানুষকে জমি ছাড়তে হবেও। তার মানে, আজ এখানে, কাল ওখানে খাবলা দিয়ে উচ্ছেদ করা নয়। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এসব করতে হবে। সেই পরিকল্পনায় আবাসিকতা আর উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্য মানতে হবে। সবার স্বার্থে উন্নয়নের নীতি ও পরিকল্পনা কী হবে তা-ই হওয়া উচিত মূল প্রশ্ন। সারা দেশে প্রায়ই যে উন্নয়নের পরিকল্পনার সঙ্গে স্থানীয় জনগণের স্বার্থের বিরোধ হয়, তা কি ওই সব পরিকল্পনারও দোষ নয়? নীতি-কৌশল আর বাস্তবতার মধ্যে এসব সংঘাত পরিকল্পনার দুর্বলতাই দেখায়। যেমন হাতিরঝিল প্রকল্পের কথা বলা যায়। সুন্দর প্রকল্প। কিন্তু প্রতিদিন একে সচল ও পরিষ্কার রাখার ব্যবস্থাপনা দুর্বল। অন্যদিকে আশপাশের সড়ক, পানি, পয়োব্যবস্থা ঠিক না হলে এখানে আলাদা করে সুন্দর টিকবে না।
সামষ্টিক উন্নয়ন পরিকল্পনার বাধা দুটি: অ্যাডহকইজম বা অস্থায়ী পদক্ষেপ এবং ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থ। উদ্ভূত কোনো সমস্যা মেটাতে আগপাছ চিন্তা না করে অস্থায়ীভিত্তিক সমাধান করতে গেলে তা বুমেরাং হয়। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রের কাছাকাছি থাকা ব্যক্তিবর্গ ও গোষ্ঠীর দিকে পরিকল্পনাকে বাঁক নেওয়ানো যাবে না। শিল্পায়নের জমির সমস্যা মিটে যায়, যদি প্রতাপশালী দখলদারদের উচ্ছেদ করা যায়। খাসজমিগুলোকে উদ্ধার করা যায়। তা না করে খাদ্য জোগান দেওয়া জমি নষ্ট করা কেন? কেন গরিব মানুষের আশ্রয় কেড়ে নেওয়ার বন্দোবস্ত?
অনুমতি ছাড়াই যে কেউ যেকোনো জায়গায় যেকোনো কায়দার বাড়ি-দোকান-দপ্তর স্থাপন করতে পারে না। অজস্র ক্ষুদ্র দোকান-কারখানা-ওয়ার্কশপ ও ভবনই বলে দেয় পরিকল্পনাহীন নৈরাজ্যের কথা। এসবের সম্মিলিত অবদান হলো দেশের বাস-অযোগ্যতা। এভাবেই চলছে, চলবে? সুবিধাভোগীরা হয়তো দেশটাকে তাঁদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আবাসভূমি মনে করেন না। তাঁদের বিদেশমুখিতাও আর লুকোছাপা নেই। বাংলাদেশ থেকে ২০১৩ সালে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ ২০১৪-১৫ সালের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ব্যয়ের সমান। ভাবা যায়? এক বছরের জাতীয় উন্নয়ন ব্যয়ের সমান অর্থ বিদেশেই চলে গেছে। এই তথ্যই প্রমাণ করে, উন্নয়নের কান্ডারিদের অনেকেরই পরিবার ও সম্পদের ঠিকানা বিদেশ। দেশটা তাঁদের থাকার জায়গা নয়, টাকা বানানোর খনি।
বাণিজ্যের শক্তি আর আবাসনের শক্তির এই বিরোধ বাংলাদেশের মৌলিক বিরোধগুলোর একটি। দেশটাকে আবাসভূমি হিসেবে টিকিয়ে রাখতে গেলে সমাজশক্তিকে ব্যবসাশক্তির ওপরে স্থান দিতে হবে। এটা আপনাআপনি হওয়ার নয়। দেশটাকে সবার বাসযোগ্য রাখতে হলে সমাজকেই দাবি নিয়ে দাঁড়াতে হবে। নিরাপদ সুস্থ আবাসনের দাবি জনপ্রিয় হলেও, বড় দলগুলো এ নিয়ে ভাবিত না। চাইলেই শহরগুলোতে ‘নিরাপদ আবাসন, দেশবাসীর উন্নয়ন’ স্লোগান জনপ্রিয় করা যায়। এটুকু উন্নতির জন্য বিপ্লবী হওয়ার দরকার নেই, সুষম-বৈজ্ঞানিক ও দূরদর্শী গণতান্ত্রিক নীতি ও তা বাস্তবায়নের কর্তৃপক্ষই কেবল প্রয়োজন।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে বিব্রত সরকার by জাকির হোসেন লিটন

পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে বিব্রত হচ্ছে সরকার। নিজ বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ক্রসফায়ার ও মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়, মামলা তদন্তে ঘুষ দাবি, ছিনতাই-ডাকাতি ও মাদক বেচাকেনাসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগে ুব্ধ পুলিশের হাইকমান্ডও। এসব অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো কোনো সময় ব্যবস্থা নেয়া হলেও বিতর্কিত কর্মকাণ্ড যেনো থামছেই না। এতে সংস্থার পাশাপাশি সরকারের ইমেজ ক্ষুণ্ণ হওয়ায় চরম ক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকেরা। দলের একাধিক নেতা আলাপকালে তাদের এ মনোভাবের কথা জানিয়েছেন।
তবে পুলিশের আইজি এ কে এম শহীদুল হক গতকাল সাংবাদিকদের বলেছেন, অপরাধ করলে পুলিশের প্রতিও কোনো অনুকম্পা দেখানো হবে না। সাধারণ পাবলিক যে অপরাধ করে, পুলিশ যদি সে অপরাধ করে তাহলে তার চেয়ে বেশি শাস্তি আমরা দেই। অতীতে যত ঘটনাই ঘটেছে তাদের শাস্তি ও চার্জশিট দেয়া হয়েছে। সাজাও হয়েছে।
সম্প্রতি পুলিশের হাতে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তা এবং সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তাকে নির্যাতন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অতীতেও এ ধরনের বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ একটি বিরাট বাহিনী। নানা ধরনের লোক এখানে আছে। কারো মেজাজ গরম কারো ঠাণ্ডা থাকে। এ দু’টি ঘটনায় পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
গত ৯ জানুয়ারি রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে পাঁচ লাখ টাকার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তা গোলাম রব্বানীকে ৫ ঘণ্টা আটকে রেখে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে এক এসআই এর বিরুদ্ধে। এ ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ নানা মাধ্যমে অনেকেই পুলিশি আচরণের তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এমন প্রেক্ষাপটে গতকাল অভিযুক্ত এসআই মাসুদ শিকদারকে সাময়িক বরখাস্ত করে পুলিশ।
এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে শুক্রবার যাত্রাবাড়ী এলাকায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এক পরিদর্শককে নির্যাতনের অভিযোগ উঠে পুলিশের বিরুদ্ধে। ঘটনার শিকার বিকাশচন্দ্র দাসকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
শনিবার বরিশালের আগৈলঝাড়ায় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আসাদুজ্জামান বাদল ওরফে সেরনিয়াবাতকে থানার ওসির নেতৃত্বে পুলিশের দুই দফা নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। গুরুতর অবস্থায় তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। এসব ঘটনায় আবারো তোলপাড় শুরু হয়। পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিভিন্ন রাজনৈতিক ও মানবাধিকার সংগঠনের নেতারা। শুধু তাই নয়, পুলিশের একের পর এক অপরাধে বিব্রত বোধ করছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতাসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর একজন প্রভাবশালী সদস্য এ প্রতিবেদককে বলেন, সরকার বিএনপি-জামায়াতের তাণ্ডব খুব শক্ত হাতে দমন করে দেশে শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছে। সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার মতো এখন কোনো ইস্যু নেই। কিন্তু পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সদস্যদের নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে দেশের মানুষ ক্ষুব্ধ হচ্ছে। এতে সরকার বারবার বিব্রত বোধ করছে। সে জন্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার বিকল্প নেই।
দলের একজন সাংগঠনিক সম্পাদক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দেশের পরিস্থিতি যখন শান্ত ও স্বাভাবিক তখন পুলিশ সদস্যরা কেন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে তা খতিয়ে দেখার বিষয়। কারণ, বিএনপি-জামায়াত আন্দোলনের মাঠ ত্যাগ করলেও সরকারকে নানাভাবে বিপদে ফেলতে তৎপর রয়েছে। আর এসব পুলিশ সদস্য তাদের সেই এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে কি না তা তদন্ত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে পুলিশের শৃঙ্খলা ধরে রাখতে বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া পুলিশ সদস্যদের উপর নজরদারি করার পক্ষে মত দেন এই নেতা।
সম্পাদকমণ্ডলীর একজন সদস্য বলেন, পুলিশ এখন আর কোনো কিছু মানছে না। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে তারা মাদরাসাছাত্রকে গুলি করে হত্যা, ব্যাংক কর্মকর্তাকে নির্যাতন, সিটি করপোরেশনের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পরিদর্শককে নির্যাতন এবং সর্বশেষ সরকারদলীয় নেতাকে নির্যাতন করেছে। আসলে এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা কার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে তা আমাদের বোধগম্য নয়।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের কার্যনির্বাহী সংসদের একজন নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আসলে বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের দমন করতে গিয়ে পুলিশ এখন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তাদের ধারণা বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম দমন করে তারাই এ সরকারকে টিকিয়ে রেখেছে। সে জন্য তারা কোনো কিছু মানছে না। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত। না হলে তারা আরো বেপরোয়া হয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের ওপর আরো চড়াও হবে।
পুলিশের হাতে নির্যাতনের শিকার বিকাশচন্দ্র দাসকে শনিবার হাসপাতালে দেখতে গিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। এ সময় তিনি বলেন, পুলিশের এসব বর্বর আচরণে জনমনে ক্ষোভ বিরাজ করছে। নগরের মানুষ তাদের ওপর ক্ষুব্ধ। তাই যারা এসব করছে তাদের কঠিন শাস্তি হওয়া উচিত। এ ছাড়া পুলিশ বাহিনীতে অবিলম্বে শুদ্ধি অভিযান চালানো উচিত।
এ সময় বিকাশের পরিবারের সদস্যরা পুলিশের নির্যাতনের পর এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে মেয়রকে জানান।
পরে বিকাশচন্দ্রকে দেখতে গিয়ে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমানও ক্ষোভ ও নিন্দা জানান। এ সময় তিনি বলেন, ‘মাছের রাজা ইলিশ আর দেশের রাজা পুলিশ’ এ ধরনের উক্তি চরম ভয়ঙ্কর। মানুষের জানমালের নিরপত্তায় যে বাহিনী নিয়োজিত তাদের মুখে এমন কথা জনগণের জন্য হুমকিস্বরূপ। পুলিশ বাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে অবিলম্বে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
এ দিকে পুলিশের কোনো সদস্যের ব্যক্তিগত অপরাধের দায় বাহিনী নেবে না জানিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার মনিরুল ইসলাম শনিবার বলেছেন, এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়াতে পুলিশকে ব্রিফিং দেয়ার পাশাপাশি কাউন্সিলিংও করা হচ্ছে। দু’টি ঘটনার তদন্তে অভিযুক্ত ছাড়াও ওসি বা সংশ্লিষ্ট কারো গাফিলতির প্রমাণ পেলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও ঢাকা দণি সিটি করপোরেশনের দুই কর্মকর্তাকে পেটানোর ঘটনায় ডিএমপি আলাদা তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। পাশাপাশি পুলিশ সদর দফতর থেকেও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। দ্রুততম সময়ে তারা প্রতিবেদন দেবেন। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে পুলিশ। এরই মধ্যে মোহাম্মদপুর থানার এসআই মাসুদ শিকদারকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

ক্ষেপিয়ে দাও, তারা হারবে by আলমগীর মহিউদ্দিন

মানুষের জীবনের একটি বাস্তবতা হলো, আশঙ্কা। সে জানে না, পরমুহূর্তে কী হবে। এর মাঝে সবচেয়ে বড় হলো ভয়। এটা সারা বিশ্বের মানুষকে আদিকাল থেকে তাড়িয়ে আসছে। ভীত নয়, এমন কেউ নেই। যে বা যারা ভীতির সৃষ্টি করছে, তারাও ভীত। সম্প্রতি রাজনীতির অধ্যাপক মাইকেল ব্রেনার (পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়) ইসলামের ওপর লিখতে গিয়ে বলেছেন, ‘মার্কিনিরা এখন মৃগীরোগগ্রস্ত। একের পর এক অভিঘাত দিয়ে তাদের মানসিক ভারসাম্য ও চিন্তা-অনুভূতির বিকাশকে স্থবির করে দেয়া হয়েছে।’ তিনি বলেছেন, ‘মিথ্যা অপবাদ ও কুৎসা দিয়ে ইসলামকে একটি ভয়ানক নির্যাতনের বাহন হিসেবে চিত্রায়িত করে বিশ্বের সব সমস্যা, যুদ্ধবিগ্রহ, অন্যায়-অবিচারের জন্য দায়ী করা হচ্ছে। এখানে আসলে মূল খেলোয়াড় হলো রাজনীতি ও ক্ষমতা। যারা রাজনীতি করেন এবং ক্ষমতাকে দখল ও ব্যবহার করতে চান, তারা সামাজিক অশান্তির কোনো ছেদ হোক, তা চান না।’
তাই গবেষণার শেষ নেই। কোনো ভয় এবং তা সৃষ্টির জন্য কোন পদ্ধতি সহজ ও দীর্ঘস্থায়ী, তা নির্ণয়ের চেষ্টা চলছে অবিরত। আসলে ভীতি সৃষ্টি করা ক্ষমতাবানদের জন্য কোনো সমস্যা নয়। তাদের মিথ্যাচার-অন্যায়ের প্রতিবাদ কেউ করতে পারে না। তবুও চক্ষুলজ্জা বলে তো একটি কথা আছে। ক্ষমতাবানেরা কোনো অন্যায় করতে পারে না- এটা তারা প্রমাণ না করতে পারলেও প্রতিভাত করতে চায়। সে জন্য প্রচারের মাধ্যমের ওপর তাদের আগ্রহ ও সজাগ দৃষ্টি। গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল তাই মানুষকে ‘রাজনৈতিক জীব’ বলেছেন। অর্থাৎ এই ধর্মনিরপেক্ষ দার্শনিক ভাবতেন, মানুষ আসলে একটি পশু; কেননা তাদের উদ্ভব হয়েছিল পশু হিসেবে। কালের বিবর্তনে তারা মনুষ্যত্বের রূপ পায়। এরা অবশ্য ধর্মীয় বিশ্বাসের অনুকূলে কিছুই বলেন না। একদল পশুকে নিরীক্ষণ করে একজন দার্শনিক মন্তব্য করেছিলেন, তারা একে অন্যকে আক্রমণ করে পরাজিত হয়ে ভয়ের মধ্যে নীত হলেই শুধু শান্ত থাকে। তিনি বলেছেন, এটা মানুষের জন্যও প্রযোজ্য। যেমন শক্তিমান ও প্রভুত্বকামী পশুটি অযথাই অন্য পশুদের খোঁচায় কিংবা তাদের খাদ্য বা অবস্থানকে দখলের চেষ্টা করে। তখন অন্য পশুরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। আর তখন শুরু হয় যুদ্ধ এবং সে যুদ্ধে তারা শক্তিমানদের কাছে হেরে যায়।
এখন এটা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রধান উপাত্ত হয়ে পড়েছে। আর জন লেননের ভাষায় বলা যায়, ত্রাস সৃষ্টির উপাত্ত হলেই সবাই পদ্ধতির পুতুল হয়ে পড়ে। লেনন আরো স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘ক্ষমতা তোমাকে জ্বালাতন করবে, খোঁচাবে, বিরক্ত করবে যেমন তোমার দাড়ি ধরে টানবে, গালে টোকা দেবে যাতে তুমি ক্রুদ্ধ হয়ে যুদ্ধ করো; যাতে তুমি ক্ষেপে যাও। সরকার ঠিক এমনটিই চাইছে। কারণ, মানুষ ক্রুদ্ধ হয়ে গেলে সে লড়াই করবে তার অধিকারের জন্য এবং তখন সরকার তাকে কেমনভাবে পোষ মানাতে হয়, জানে।’ রাদারফোর্ড ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা ও আইনজ্ঞ জন ডব্লিউ হোয়াইটহেড এ সম্পর্কে তেরোটি অবস্থার বর্ণনা করে বলেছেন, সরকার এভাবে জনগণকে তাদের পুতুল বানায়- ক্ষমতার পুতুল। অবস্থাগুলো কী? (১) সরকার পুরোপুরি দুর্নীতিবাজ হয়; (২) নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে সব কিছুতে নাক গলায়; (৩) জনগণের ওপর নানভাবে অত্যাচার করে, যাতে সাধারণ মানুষ ভীত থাকে; (৪) খবরদারি, সরকারি বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি; (৫) সবাইকে অপরাধী গণ্য করে ধরপাকড়, হেনস্তা করা দৈনন্দিন বিষয় হওয়া এবং এমন কর্মকাণ্ডে শিশু-বৃদ্ধ-নারীদেরও অন্তর্ভুক্ত করা; (৬) রাজনীতিকে ঠাট্টার বিষয় হিসেবে পরিগণিত করা এবং সরকার কোনো জবাবদিহিতায় না যাওয়া ও জনগণের সব অধিকার সীমিত করা; (৭) জনগণের প্রতিনিধি হওয়ার পরিবর্তে জনগণের ওপর শাসন ও শোষণ করা, প্রতিবাদ-সমালোচনার অধিকার কেড়ে নেয়া, নির্বাচনকে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করা; (৮) আঘাতগ্রস্ত ও ক্ষতিগ্রস্তরা যেন কোনোক্রমে প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ না করতে পারে, তার ব্যবস্থা নেয়া; (৯) অভ্যন্তরীণ ও বাইরের সন্ত্রাস আখ্যা দিয়ে যে কাউকে অন্তরীণ, গুম বা খুন করা; (১০) জনগণের নামে ক্ষমতাবানদের সরকারি অর্থ খরচ করা এবং কৌশলে লুট করা; (১১) সরকারি কর্মকাণ্ডে সামগ্রিকভাবে জনগণের বিরক্তির চিহ্নকে প্রচার দিয়ে ঢেকে দেয়ার চেষ্টা; (১২) ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও স্বাধীনতার ওপর সরকারি নজরদারি; (১৩) সরকারের বহু অনাকাঙ্ক্ষিত আইন প্রণয়ন, যাতে বক্তব্যের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রিত এবং মানবাধিকার ক্ষুণ্ন হয়।
হোয়াইটহেড বলেছেন, এগুলোর ফলে জনগণ ক্ষুব্ধ ও ক্রুদ্ধ হতে বাধ্য এবং একসময়ে তারা ক্ষেপে যায়। এটাই সরকার চায়। কারণ, এই ছুতায় তারা চায় রাষ্ট্রের স্বাধীনতা, জনগণের অধিকার নিশ্চিত করার নামে তীব্র দমনক্রিয়া চালু রেখে ক্ষমতার ভিত পোক্ত করতে। আসলে এসব কর্মকাণ্ড ও অনাচারের মূলে একটি মাত্র বিষয় এবং তা হলো- প্রভু কে? দাস কে? জনগণ প্রভু, না সরকার প্রভু? ক্ষমতাবানেরা সরকার চালায় এবং তারা প্রভু থাকতে চায়। জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে তাদের দাস নয়, প্রভুই হতে চায়।
এই অবস্থা এখন প্রথম বিশ্ব থেকে তৃতীয় বিশ্বে বিশেষভাবে প্রচলিত হয়ে পড়েছে। ‘জনকল্যাণ, গণ-অধিকার এখন কোনো আলোচ্য বিষয় নয়।’ হোয়াইটহেডের সাথে সম্ভবত দ্বিমত পোষণ করবেন না। তিনি এ অবস্থাকে ‘প্রেসারকুকারের’ সাথে তুলনা করেছেন। প্রেসারকুকারের কিছু বাষ্প সময়মতো বেরিয়ে যেতে না দিলে যেমন এটাতে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে, তেমনি জনগণের ওপর নিবর্তনের চাপ ক্রমান্বয়ে চালু রাখলে বিস্ফোরণ ঘটে। ক্ষমতাবান এবং সরকার তা জানে। এ অবস্থাকে দার্শনিক আব্রাহাম কাপলান হাতুড়ি ও পেরেকের সম্পর্কের সাথে তুলনা করে বলেছেন, হাতুড়ি যেমন সব কিছুকেই পেরেক মনে করে আঘাত হানে, ঠিক তেমনি আজকের সরকারগুলো প্রত্যেক মানুষকে প্রতিপক্ষ ভেবে আঘাত হানতে চায়, নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। হাতুড়ি আঘাত করলে যেমন পেরেক থেকে স্ফুলিঙ্গ বের হয়, তেমনি সরকারি নিষ্পেষণ পরিণামে জনবিস্ফোরণ ঘটায়।
সাবেক মার্কিন অর্থমন্ত্রী ড. পল ক্রেইগ রবার্টস ‘পশ্চিমা সভ্যতায় আইনের শাসন’ শীর্ষক নিবন্ধে বলেছেন, ‘জনবিস্ফোরণ ঠেকাতে আইনের শাসন অত্যন্ত জরুরি। আইন যেমন জনকল্যাণকামী হওয়া প্রয়োজন, তেমনি কোর্টগুলোও নিরপেক্ষভাবে জনগণের সেবা করা প্রয়োজন। তিনি আইন ও কোর্টের কার্যক্রমের ওপর বিশদ আলোচনা করে বলেছেন, সেই আইন জনবিস্ফোরণ ঠেকায়, যা কল্যাণকামী। যদি আইন ক্ষমতাসীনদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য প্রণয়ন হয় এবং তা রাষ্ট্রশক্তি ব্যবহার করে প্রয়োগ করতে হয়, সে আইন জনবিরোধী হয়ে থাকে। এমন আইনের শাসনে ন্যায়ের অবস্থিতি থাকে না এবং জনপ্রতিরোধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। ক্ষমতালোভীরা এমন অবস্থাই কামনা করে। এমন অবস্থায় দেখা যায়, আইনের শাসনের নামে আইনভঙ্গ সরকারই করে থাকে। এর জন্য দায়ী করা হয় প্রতিবাদী প্রতিপক্ষকে। ফলে সামাজিক অশান্তি বিরাজ করে সব সময়। এতে জনগণের ক্ষতি বা কষ্ট হলেও সরকারের সুবিধা হয় বলে মন্তব্য করেছেন ড. রবার্টস। কারণ, এমন ক্ষেত্রে সরকারের অন্যায়কারীরা আইনের আশ্রয় পায় এবং জনগণ প্রতিপক্ষ হয়ে যায়। আর এমন অবস্থায় সত্যিকারের অপরাধীরা সরকারের সাথে লীন হয়ে তাদের কাজ এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, প্রতিদিনের সংবাদে ভয়াবহ মৃত্যু ও ধ্বংসের খবর এলেও তা সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। তখন পুলিশের অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে যায় এবং কেউ কেউ এই অবস্থাকে ‘পুলিশি রাজ্য’ বলে বর্ণনা করে থাকেন।
ড. রবার্টস লিখেছেন, ‘এমন পুলিশি রাষ্ট্র তখনই কায়েম হয় যখন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তিরা পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় শক্তির ওপর ভর করে ক্ষমতায় থাকেন। রাষ্ট্রশক্তির এই অংশের সদস্যদের ক্ষমতাবানেরা কখনো তাদের অপকর্মে বাধা দেন না বা বাধা দিলে তাদের ক্ষমতার সময় স্বল্প হয়ে যায়।’ তাই তিনি মন্তব্য করেছেন- ‘এমন পরিস্থিতিতে আইন জনগণের রক্ষাকবচ না হয়ে ক্ষমতাসীনদের অস্ত্রে পরিণত হয়।’
এখন সর্বত্র সন্ত্রাস নিয়ে আলোচনা। তবে তা দু’ভাগে ভাগ করা হচ্ছে। সন্ত্রাসে অভিযুক্তরা যদি মুসলমান হয়, তবে তা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। আর অন্যদের জন্য যুক্তি বের করার চেষ্টা হয় এই বলে যে, তাদের এমনটি করতে হয়েছে অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে। এই বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড মুসলিম দেশগুলোতেও পাওয়া যাচ্ছে। অমুসলিম শক্তিশালী দেশগুলোর জন্য এ স্লোগান অত্যন্ত যুৎসই। কারণ এ অপবাদের ধুয়া তুলে তারা কয়েক দশক ধরে মুসলিম দেশগুলোতে আগ্রাসন চালাচ্ছে এবং তাকে বৈধ করে নিচ্ছে। আর মুসলিম দেশগুলোতে এটা ব্যবহার করছে বিশেষ করে স্বৈরশাসকেরা, যারা পুরোপুরিভাবে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ওপর নির্ভর করে ক্ষমতায় টিকে আছে। এ ছাড়া তৃতীয় বিশ্বেও এর ব্যবহার কম নয়। হয়তো শিগগিরই সন্ত্রাসের বুলির নতুন শব্দ আসবে। যেমন মৌলবাদী শব্দটি এখন কম ব্যবহার হচ্ছে। ইকোনমিস্টের মতে, এটা ছিল মুসলমানদের নিন্দা করার জন্য ২০তম শব্দ।
হোয়াইটহেডের কথা দিয়ে এ উপসংহার টানা যায় যে, বাংলাদেশের পুরনো প্রবাদ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রবাদটি হলো- ‘শঠে শাঠ্যং সমাচারেৎ’- অর্থাৎ শঠের সাথে শঠতা করতে হবে। নতুবা সে কোনো কথা বোঝে না। এটা সত্যি। তবে তাতে পূর্ণ সফলতা নেই। সরকার ক্ষেপিয়ে দিয়ে তার ‘স্টিম রোলার চালাতে’ চায় সত্য, তবে সে রোলারের মানুষটি সে কর্মকাণ্ডটি নাও চাইতে পারে। কেবল ঐক্য ও কৌশলী পন্থাই শ্রেয়।

বিশ্বব্যাংককে টিকে থাকতে হলে by জি. মুনীর

বিশ্বব্যাংক একটি আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান। উন্নয়নশীল দেশগুলোর বড় বড় কর্মসূচির জন্য ঋণ দেয়া এর কাজ। এর প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য দারিদ্র্যবিমোচন। এটি গড়ে উঠেছে দু’টি প্রতিষ্ঠান সহযোগে : ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংক অব রিকনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইবিআরডি) ও ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইডিএ)। বিশ্বব্যাংক হচ্ছে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গ্রুপের একটি উপাদান, যা ইউনাইটেড ন্যাশনস সিস্টেমের একটি অংশ।
আর্টিকলস অব অ্যাগ্রিমেন্ট অনুসারে বিশ্বব্যাংকের সব সিদ্ধান্ত চলবে বিদেশী বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উন্নয়ন এবং ক্যাপিটাল ইনভেস্টের সুযোগ সৃষ্টির প্রতি প্রতিশ্রুতি বজায় রেখে। আরো তিনটি প্রতিষ্ঠানের সাথে ব্রিটন উডস সম্মেলনে বিশ্বব্যাংক গড়ে তোলা হয় ১৯৪৮ সালে, যার মধ্যে আছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ। প্রথাগতভাবে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট হন একজন আমেরিকান। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ উভয়ই ওয়াশিংটন ডিসি-ভিত্তিক। এরা উভয়ে ঘনিষ্ঠভাবে একসাথে কাজ করে। যদিও ব্রিটন উডস সম্মেলনে অনেক দেশই যোগ দিয়েছিল, ইউএসএ ও ইউকেই ছিল সমঝোতা তৈরির ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশ।
কিন্তু সময়ের সাথে বিশ্বব্যাংক ও একই সাথে আইএমএফ বেশি থেকে বেশি সমালোচিত এগুলোর প্রায়োগিক ভূমিকা নিয়ে। সমালোচনা এ দু’টি প্রতিষ্ঠানের অবলম্বিত নীতি ও এর প্রশাসন পদ্ধতি নিয়ে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সংশ্লিষ্ট দেশের সমাজ, অর্থনীতি ও সমগ্র জনগোষ্ঠীর ওপর। এর জন্য বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফকে কোনো জবাবদিহি করতে হয় না সেসব দেশের কাছে, যেসব দেশ এই দুই প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেয়। এই দুই প্রতিষ্ঠান ঋণগ্রহীতা দেশের ওপর যেসব অযৌক্তিক শর্তারোপ করে সমালোচকেরা তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। এরা বলে, এগুলো ঋণগ্রহীতা দেশগুলোর ওপর শর্তারোপ করে ‘ওয়াশিংটন কনসেনসাসে’র ওপর ভিত্তি করে। এ কনসাসে আলোকপাত রয়েছে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থ খাতের উদারীকরণ, বিনিয়ন্ত্রণ ও জাতীয়করণ করা শিল্পের বিরাষ্ট্রীয়করণের ওপর। কিন্তু এরা যে শর্তাবলি আরোপ করে তা অনেক সময় ঋণগ্রহীতা দেশের পরিস্থিতির সাথে মোটেও খাপ খায় না। ফলে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের ঋণ অর্থনৈতিক সমস্যার কোনো সমাধান আনতে পারে না। আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, আইএমএফ প্যাকেজের আওতায় ঋণের শর্তাবলির পরিধি এমন সীমাও ছাড়িয়ে যায়, যেখানে সংশ্লিষ্ট দেশ এর নিজের অর্থনীতির ওপর কার্যত কর্তৃত্ব করার অধিকার পর্যন্ত হারিয়ে ফেলে। বিশ্বব্যাংক যেসব প্রকল্পে অর্থসহায়তা দেয়, সেসব প্রকল্প সে দেশের জন্য কতটুকু উপকার বয়ে আনবে, তা নিয়েও আছে উদ্বেগ। অনেক অবকাঠামো প্রকল্পে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গ্রুপ অর্থায়ন করে। সেখানেও দেখা যায়, এসব প্রকল্পের ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনগোষ্ঠীর ওপর নেতিবাচক সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব পড়ে। এ নিয়েও বিশ্বব্যাংকের সমালোচনা আছে। আর এসব অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকে বেশি জোর দেয়ার ফলে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ ব্যাপক কমে যায়।
বিশ্ব আবহাওয়া পরিবর্তনে বিশ্বব্যাংকের ভূমিকা ও অর্থায়নকাঠামো ব্যাপক বিতর্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন সুশীল সমাজগোষ্ঠী মনে করে, আবহাওয়া পরিবর্তন অর্থায়নে বিশ্বব্যাংক যোগ্যতার পরিচয় দিতে পারেনি। কারণ, এ ক্ষেত্রের ঋণের সাথে পরামর্শক সেবা ও নানা অযৌক্তিক শর্ত জুড়ে দেয়া হয়। ব্যাংকটির অগণতান্ত্রিক শাসনকাঠামোতে প্রাধান্য রয়েছে শিল্পায়িত দেশগুলার। এর বেশির ভাগ সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়ন নির্ধারণ করে শিল্পায়িত দেশগুলোর গোষ্ঠী জি-৭। এরা অগ্রাধিকার দেয় বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে। বিতর্ক আছে বিশ্বব্যাংকের ক্লাইমেট চেঞ্জ ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড নিয়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের সমঝোতা তৈরির মূল খেলোয়াড় হিসেবেও বিশ্বব্যাংকের উদ্যোগ সন্তোষজনক নয়। বিশ্বব্যাংক অর্থসহায়তা অব্যাহত রেখেছে সেই সব শিল্পে, যেগুলো অব্যাহতভাবে পরিবেশ দূষণ চালিয়ে যাচ্ছে কার্বন নিঃসরণের মাধ্যমে। যেমন কয়লাচালিত-বিদ্যুৎকেন্দ্র।
বিশ্বব্যাংক অগ্রাধিকার দেয় বেসরকারি খাতের সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করতে। এর ফলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে রাষ্ট্রের ভূমিকা অবদমনের, যেখানে রাষ্ট্রই হচ্ছে অপরিহার্য পণ্য ও সেবার প্রাথমিক সরবরাহকারী। যেমন রাষ্ট্রকেই নিশ্চিত করতে হয় স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাসেবা। বেসরকারি খাতকে রাষ্ট্রের চেয়ে অগ্রাধিকার দিলে এসব সেবায় ঘাটতি দেখা দেয়ার আশঙ্কা থাকে। সম্প্রতি লক্ষ করা গেছে, উন্নয়ন অর্থায়ন সরকারি খাত থেকে চলে যাচ্ছে বেসরকারি খাতের দিকে। বিশ্বব্যাংকের বেসরকারি খাতের ঋণদানে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশনও (আইএফসি) সমালেচনার মুখে পড়েছে এর বিজনেস মডেলের কারণে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ সমালোচিত উন্নয়ন অর্থনীতির ওপর তেমন জোরালো গবেষণা না থাকার কারণে।
আইএমএফের মতো বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে একটি সমালোচনা হলোÑ ব্যাংকটি আইএমএফের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে থেকে শুধু সেসব কর্মসূচিতেই ঋণ দেয়, যেগুলোকে কঠিন শর্তের আওতায় আনা যায়। অনেকের বিশ্বাস, এসব কর্মসূচি গরিবদের আরো দুর্ভোগের দিকে ঠেলে দেয়, আর বড় করপোরেশনগুলোকে আরো অর্থবিত্তের অধিকারী করে তোলে। এর বাইরে আরো অনেক অনন্য বিষয় আছে, যেগুলোর কারণে বিশ্বব্যাংক ক্রমেই অজনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বিশ্বব্যাংক প্রায়ই এমন সব প্রকল্প এড়িয়ে চলে, যেগুলো সামাজিক ও পরিবেশের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারত। যেমন, বিশ্বব্যাংক ব্রাজিলের অ্যামাজোনিয়ান স্টেট রন্ডোনিয়ায় ১৯৮১ সালে উদ্বোধন করা পলোনরোয়েস্টি উন্নয়ন কর্মসূচিতে অর্থসহায়তা জোগায়। এই কর্মসূচির মাধ্যমে বনের ভেতর দিয়ে মূল সড়ক নির্মাণ করা হয় ভূমিকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে। সেখানে যাওয়া বসবাসকারীদের দেয়া হয় ভূমি মালিকানার অধিকার। ফলে সেখানে গিয়ে বিপুল মানুষ স্থায়ী বসতি গড়ে তোলে। এর ফলে ব্যাপকভাবে বিনাশ হয় সেখানকার রেইন ফরেস্ট, যা পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।
বিশ্বব্যাংক ১৮৭৮ থেকে ১৯৯৩ সালের মধ্যে ভারতে তহবিল জোগান দিয়েছে নরমেদা নদী উপত্যকায় নরমেদা বাঁধ প্রকল্পে। বাঁধটি নির্মিত হওয়ার পর এ এলাকায় প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকে বাস করে আসা লোকজনের জমি ও বসতবাড়ি হারিয়ে যায় মানুষের তৈরি জলাধারের নিচে। ফলে সেখানে সৃষ্টি হয় এক অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশিক সমস্যা। এর জন্য প্রধানত দায়ী করা হয় বিশ্বব্যাংকেই। একইভাবে বিশ্বব্যাংক সমালোচিত চীনের ‘ওয়েস্টার্ন পোভার্টি রিডাকশন প্রজেক্ট’-এর জন্যও। চীনের নিয়ন্ত্রিত তিব্বতের তিব্বতিরা এর সমালোচনা করে বলছে, এর ফলে তিব্বতের ৩৭০০০ মানুষকে তাদের বসতবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে হবে। অতি সম্প্রতি বাকু-চিহান পাইপলাইন প্রকল্পও বিরোধিতার মুখে পড়েছে। এর সমালোচকেরা বলছেন, এটি সে এলাকায় ও বিশ্বব্যাপী পরিবেশদূষণ সৃষ্টি করবে অধিকতর ফসিল জ্বালানি ব্যবহারের ফলে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর তেলনির্ভরতা বেড়ে যাবে, বন উজাড় করবে, কমাবে এ অঞ্চলের পানি সরবরাহ। একই সাথে লঙ্ঘিত হবে মানবাধিকার। বিশ্বব্যাংক ও একই সাথে আইএমএফের বিরুদ্ধে আরেকটি সমালোচনা হচ্ছে- এগুলো উন্নয়নশীল দেশে ঋণের বোঝা বাড়িয়েই তুলছে। গত ২০ বছরে এসব দেশে ঋণের বোঝা এতই বেড়ে গেছে যে, কোনো কোনো দেশ সামাজিক খাতে যত খরচ করে, তার চেয়ে বেশি খরচ করে ঋণ-সার্ভিস খাতে। এ থেকে মুক্তি পেতে এরই মধ্যে জুবিলি মুভমেন্ট নামের এক আন্দোলনের জন্ম হয়েছে। আন্দোলনকারীরা বিশ্বব্যাংকের এই শোষণমূলক ব্যবস্থার অবসান চায়।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিট্জসহ এর সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তা প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছেন বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের। তাদের সমালোচনার ফলে সাধারণ সমালোচকেরা মনে করছেন, তাদের সমালোচনার পেছনে যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে।
যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে বিশ্বব্যাংক বিশ্ববাসীর আশার আলো হয়ে জন্ম নিয়েছিল, সে আলো যেন ক্রমেই ফ্যাকাশে হয়ে উঠছে। সেই সাথে বিশ্বব্যাংকও হয়ে উঠছে এক গুরুত্বহীন প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি সময়ের সাথে এর বিরুদ্ধে সমালোচনার তীব্রতাও বাড়ছে। একই সাথে যেন বেজে উঠছে এর মৃত্যুঘণ্টাও। কারণ এর গ্রাহক দেশগুলো এখন চলে যাচ্ছে অন্যান্য ঋণদাতার কাছে। এমনি প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বিশ্বব্যাংককে টিকে থাকতে হলে, এর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে এর ঋণদান প্রক্রিয়া ঢেলে সাজাতে হবে বৈকি! এর ঋণ অনুদান প্রক্রিয়াকে আরো উন্নততর করতে হবে এর প্রতিযোগীদের তুলনায়। ঋণগ্রহীতাকে শর্তের বেড়াজালে বন্দী করে রাখার পুরনো প্রবণতা থেকে বের করে আনতে হবে বিশ্বব্যাংককে।
আমরা তো একসময় দেখেছি, এই ব্যাংককে সহজেই নিজের করা আয়ের অর্থেই টিকে থাকতে। কিন্তু আজ এটি দ্রুত পরিণত হয়েছে একটি দাতব্যনির্ভর তথা ওয়েলফেয়ার ডিপেন্ডেন্ট প্রতিষ্ঠানে। ধনী দেশগুলোর কনট্রিবিউশন থেকে আসা অর্থ দিয়েই গরিব দেশগুলাকে দেয়া হচ্ছে ঋণ। কিন্তু ধনী দেশগুলোর এই কনট্রিবিউশন আর বাড়ানোর সম্ভাবনা খুবই কম। বরং এমন হতে পারে, কিছু ধনী দেশ এই কনট্রিবিউশন দেয়া বন্ধ করে দেবে। কারণ দাতাদের এখন বর্ধিত পরিমাণে তহবিল জোগাতে হচ্ছে শরণার্থী কর্মসূচিতে।
সমস্যা এটি নয় যে, বিকাশমান অর্থনীতির দেশগুলো এখন আর ঋণ নিতে চায় না। বরং এসব দেশের আবকাঠামো ও অন্যান্য খাতে বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন আরো বেশি বেশি তহবিল। কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে, বিশ্বব্যাংকের ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়াটা বড়ই ধীরগতির। এর ফলে বিশ্বব্যাংকের ঋণ নেয়ার বিষয়টিকে অনেক সম্ভাবনাময় ঋণগ্রহীতা দেশ ‘সর্বশেষ পছন্দে’র তালিকায় ফেলে। বাণিজ্যিক ঋণদাতারা একটি ঋণ আবেদন প্রক্রিয়া করে ঋণ সরবরাহ করতে সময় নেয় মাত্র তিন মাস। অপর দিকে বিশ্বব্যাংকের সে সময় লাগে দুই বছরেরও বেশি। এই সময় কমিয়ে আনতে ব্যাংকটি ২০১৩ সালে একটি উদ্যোগ নেয়। এর ফলে এই সময় কিছুটা কমিয়ে ২৮ মাস থেকে সাড়ে ২৫ মাসে নামিয়ে আনা হয়। তবে কেনো কোনো অঞ্চলের ক্ষেত্রে এই সময়পরিধি কার্যত আরো বেড়ে গেছে।
বিশ্বব্যাংকের এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক দেশের সরকার এই ব্যাংকের কম সুদের ঋণ না নিয়ে অন্য ব্যাংক থেকে আরো বেশি সুদে বাণিজ্যিক ঋণ নেয়। বিশ্বব্যাংক থেকে ২০ বছরমেয়াদি ঋণের জন্য সুদ দিতে হয় ৪ শতাংশ হারে। গরিব দেশগুলোর জন্য তা ১ শতাংশ (ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের লোন)। তা সত্ত্বেও অনেক দেশ আরো অনেক বেশি হারের বাণিজ্যিক সুদ নেয়াই পছন্দ করে। যেমন ঘানা সম্প্রতি এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি সুদহারের বন্ড ছেড়ে তহবিল সংগ্রহ করেছে।
এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, অনেক বিকাশমান অর্থনীতির দেশ খুশি হয়েছে ‘ব্রিকস (BRICS) দেশগুলোর নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং চীনের নেতৃত্বে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক প্রতিষ্ঠা লাভ করায়। এই উভয় ব্যাংকই দ্রুত ঋণ সরবরাহ স্পন্ন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
বিশ্বব্যাংককে টিকে থাকতে হলে এর ব্যবস্থাপনাকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে বের করে আনতে হবে। দূর করতে হবে এক দশক আগের পর্যালোচনায় চিহ্নিত ‘ফ্র্যাগমেন্টেশেন, ডুপ্লিকেশন অ্যান্ড ডিলে’ সমস্যা। একই সাথে এই প্রতিষ্ঠানটিকে চিহ্নিত করতে হবে এর অনন্য কিছু করণীয়, যা অন্যান্য ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান থেকে একে আলাদা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করে। ২০১৩ সালে ব্যাংকটি ঘোষণা করেছিল এর নতুন লক্ষ্য- ২০৩০ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্যবিমোচন করা। বিশ্বব্যাংকের বিশেষত্ব হলো- ১৮৮টি দেশ এটি প্রতিষ্ঠা করেছে এবং এটি এসব দেশের হয়ে কাজ করতে পারে দুয়েকটির হয়ে কাজ না করে। অধিকন্তু, এটি হতে পারে আর সব বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় আরো বেশি মাত্রায় স্বায়ত্তশাসিত, স্বনির্ভর ও কর্মে লেগে থাকায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এগুলো হতে পারে এর অনন্য বৈশিষ্ট্য।
কোনো কোনো দেশ দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থায় ঋণ দেয়। কিন্তু এই ঋণ কোন দেশ পাবে বা না পাবে, তা নির্ভর করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপর। দ্বিপক্ষীয় ঋণ হচ্ছে এইড ইন্ডাস্ট্রির খেয়াল-খুশি ও প্রবণতার বিষয়। কোনো কোনো সময় এ ঋণপ্রবাহ চলে বিশেষ কোনো খাতের দিকে কিংবা এই ঋণ সমর্থন জোগায় বিশেষ কোনো উদ্যোগের পেছনে। এর ফলে কোনো কোনো দেশ প্রয়োজনের চেয়েও বেশি ঋণ পায়। অপর দিকে অন্য দেশগুলো চাহিদামতো ঋণ পায় না। ব্রিটেনের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিভাগের মতে, ৩০টি দেশের মধ্যে মাত্র পাঁচটি দেশ সঠিক মাত্রার ঋণ পাওয়ার আশা করতে পারে।
মোদ্দা কথা হচ্ছে, বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্র্তৃপক্ষ ও সদস্য দেশগুলোকে একসাথে মিলে কাজ করে ব্যাংকটিকে একটি গতিশীল ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে। যদি তা সম্ভব না হয়, তবে বিশ্বব্যাংকের জন্য টিকে থাকা মুশকিল হয়ে পড়বে। বিশ্বব্যাংক নিয়ে বিভিন্ন দেশের বা মহলের অসন্তুষ্টি কোথায়, তা চিহ্নিত করে সে অসন্তুষ্টি দূর করার কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে এখনই কাজে নেমে পড়তে হবে। তবেই যদি টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয় এই প্রতিষ্ঠানকে। একই সাথে উন্নয়নশীল দেশগুলোর দারিদ্র্যবিমোচন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো নিশ্চিত করে, এমন সব কর্মসূচিতে তহবিল জোগান দেয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।

তেল রফতানি বাজারে আমেরিকানদের প্রবেশ ঠেকানো by গৌতম দাস

ব্যাপারটা শেষ বিচারে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি তেলের দাম নামিয়ে ফেলার প্রতিযোগিতা। খবরটা আমাদের এ দিকের মিডিয়ায় নজরেই আসে নি। সেই খবরটা হলো, আমেরিকা এখন তেল রফতানিকারক দেশ। অনেকে অবশ্য খেয়াল করেননি আগে বা নিশ্চিত ছিলেন না যে আমেরিকা কি তেল রফতানিকারক দেশ ছিল না আগে! জবাব হচ্ছে হ্যাঁ, ছিল না। তবে কথাটা ভেঙে বলতে হবে- ছিল না মানে কী? রফতানি করার মতো তেল ছিল না নাকি, তেল ছিল কিন্তু আইন করে রোধ বা নিষেধাজ্ঞা দেয়া ছিল? অর্থাৎ আমেরিকার রফতানি করার মতো তেল থাকা সত্ত্বেও আইন করে নিষেধাজ্ঞা দেয়া ছিল, যাতে রফতানি করা না যায়।
কবে থেকে এবং কেন?
কারণের বিস্তারে যাওয়া যাবে না এখন, সে অন্য প্রসঙ্গ তাই। তবে সংক্ষেপে বললে, আরব জাতীয়তাবাদী হয়ে ১৯৭৩ সালে তৃতীয় ও শেষবার ইসরাইলের বিরুদ্ধে আরব-ইসরাইলের যুদ্ধ হয়েছিল। যুদ্ধে আরবেরা খুব খারাপভাবে হেরে যায়। কিন্তু এতে এর চেয়ে বড় ব্যাপার হয়ে ওঠে সবাই আরব জাতীয়তাবাদের ঝাণ্ডা ফেলে নিজ নিজ রাষ্ট্রবাদী জাতীয়তাবাদ আঁকড়ে ধরা; আরব জাতিয়তাবাদের ঝাণ্ডা আর কেউ বইতে রাজি না হওয়া। যেমনÑ আরব জাতীয়তাবাদী জামাল নাসেরের মিসর এর পর থেকে হয়ে যায় মিসরীয় জাতীয়তাবাদে। এখানে বলে রাখা ভালো, বাক্যগুলোকে এভাবে লেখা হচ্ছে এটা ‘আরব জাতীয়তাবাদ’ হারানোর শোক থেকে একেবারেই নয়। বরং কথাগুলোকে আরব জোটবদ্ধতা হারানোর শোক হিসেবে দেখতে হবে। সেভাবেই লেখা। আরব জোটবদ্ধ যেটা ইসরাইলের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য খুবই জরুরি পূর্বশর্ত। কিন্তু যুদ্ধে হেরে আরবদের দিক থেকে রাগের মাথায় একটা খুব বাজে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ‘তেল অবরোধ’ নামে পরিচিত সেই সিদ্ধান্ত। জ্বালানি তেলে সমৃদ্ধ আরবেরা পশ্চিমকে আর তেল বেচবে না। এই ছিল সিদ্ধান্তের সারকথা। মনে করা হয়েছিল এই সিদ্ধান্ত নিয়ে পশ্চিমকে খুব বড় বিপদে ফেলা যাবে। কারণ পশ্চিমা সভ্যতাÑ এর অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে ফসিল ফুয়েল বা মাটির নিচের জ্বালানির ওপরে। দুনিয়াতে এই জ্বালানির বিরাট এক অংশ মধ্যপ্রাচ্যে আরবদের কাছে। ফলে পশ্চিমারা বিরাট অসুবিধায় পড়বে। কথা সত্য কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু রিলেশনাল, মানে পশ্চিমের সাথে সম্পর্কিত হয়ে থাকার দিকটা কেউ ভালো করে দেখেনি। তেল না বেচলে ক্রেতার কী দশা হবে এটা যত বেশি নজর করা হয়েছিল, এর কণামাত্র নজর দেয়া হয়নি এতে বিক্রেতার কী দশা হবে। এতে ধরে নেয়া হয়ে গিয়েছিল যেন তেল বিক্রি করা বিক্রেতার একটা ঐচ্ছিক ব্যাপারÑ খেয়াল বা শখ। তেল বিক্রি যেন বিক্রেতারও গভীর প্রয়োজনের বিষয় নয়। অথচ ব্যাপারটা ছিল ঠিক এর উল্টো। প্রতিটি আরব রাষ্ট্রের অর্থনীতি বিশেষ করে বাজেটের রাজস্ব আয়ের একমাত্র উৎস ছিল ফসিল ফুয়েল বিক্রি। ফলে তেল বিক্রি না করলে পশ্চিমা শক্তি বিশাল বিপদে পড়বে সন্দেহ নেই; কিন্তু তেল বিক্রেতা দেশের অর্থনীতি চলবে কীভাবে? এ দিকটাতে এত গুরুত্ব দেয়া হয়নি। এই সিদ্ধান্তের ফলাফল শেষ বিচারে আত্মঘাতী হিসেবে হাজির হয়েছিল। আরব জাতীয়তাবাদ থেকে মিসরীয় জাতীয়তাবাদ অথবা সিরীয় জাতীয়তাবাদ হয়ে যাওয়ার পেছনে এই ফ্যাক্টরগুলোও কাজ করেছিল। শেষ বিচারে তেল অবরোধ হয়ে ওঠে আরবদের জন্যই বুমেরাং, কাউন্টার প্রোডাকটিভ। এ ছাড়া যুদ্ধ মানেই আয়বিহীন একটি রাষ্ট্রের ব্যয়ে জড়িয়ে পড়া। সব আরব রাষ্ট্রের দশা ছিল তাই। যখন দরকার আরো আয় যাতে ওই আয়বিহীন একটি ব্যয়ে ভারসাম্য ফেরে। ফলে তেল অবরোধ না টেকার পেছনে এটাও একটি কারণ।
তবে তেল অবরোধ নামে তৎপরতাটাই, তা সে যত কম দিন কার্যকর থাকুকÑ তা পশ্চিমকে ভয় পাইয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট হয়েছিল। এরই প্রমাণ হলো ১৯৭৫ সালে উদ্বৃত্ত হোক আর না হোক, আমেরিকান তেল কোনো ব্যবসায়ী রফতানি করতে পারবে না বলে আইন পাস হয়েছিল। আইনটা পাসের উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছিল, ‘আমেরিকার নিজের মজুদ তেল সংরক্ষণের (মানে এই তেল একমাত্র শেষ হতে হবে কেবল নিজেরা ভোগ করে, বিক্রি নয়) জন্য রফতানিকে নিরুৎসাহিত করতে এই বিল আনা দরকার’, তাই। ‘সংরক্ষণের’ এ কথা থেকে বোঝা যায় তাদের ভয়ের মাত্রা সম্পর্কে।
চল্লিশ বছর পরে এখন সেই আইন সংশোধন করে নেয়া হলো। এখন থেকে আমেরিকান তেল রফতানি করা যাবে। নিউ ইয়র্ক টাইমস বলছে, মূলত রিপাবলিকানদের উৎসাহ ও তাদেরই আনা বিল এবং তেল ব্যবসায়ী লবি যারা গত দু’বছর ধরে চেষ্টা করছিল এদেরই মিলিত আগ্রহে বিলটা আসে। আর ডেমোক্র্যাটরা যারা সংখ্যালঘু, এখন তারা অন্য একটি কিছু পাওয়ার আসায় সেই বিনিময়ে আনা এই আইনকে পাস হতে সম্মতি দিয়েছে। সব মিলিয়ে আইনটি পাস হয়েছে ১৮ ডিসেম্বর ২০১৫। প্রায় এক মাস আগে। এই অর্থে এটা কোনো একটা দলের একক নয়, বাই-পার্টিজান বা আমেরিকান দুই পার্টি মিলে নেয়া যৌথ সিদ্ধান্ত। আমেরিকান পুঁজিবাজারবিষয়ক মুখ্য পত্রিকা ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ মন্তব্য করে লিখেছে, চল্লিশ বছর নিষিদ্ধ থাকার পরে ‘এই সিদ্ধান্ত ঐতিহাসিক’ এবং ‘এতে আমেরিকান তেল উৎপাদনকারীদের বাজারে চাপে ও তোড়ের মুখে পড়ে আমেরিকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পটবদল’ প্রতিফলিত। এসব বক্তব্য থেকে বোঝা গেল চল্লিশ বছর নিষিদ্ধ থাকার ঘটনা এটা। কিন্তু ‘তেল উৎপাদনকারীদের বাজারে চাপে ও তোড়ে’ ঘটা ঘটনাটা কী? মানে ঠিক এখনই কেন তেল রফতানির অবরোধ তুলে নেয়া?
নতুন ধরনের এক তেলের উৎস একালে চালু হয়েছে- শেল অয়েল। চালু হয়েছে কথাটা টেকনোলজির দিক থেকে- টেকনোলজি চালু হওয়াতে শক্ত শ্লেট থেকে তেল উৎপাদন করা যাচ্ছে। শ্লেট-পেন্সিলে লেখার শ্লেটের মতো দেখতে স্তরের ওপর স্তর পড়া শক্ত মাটির শ্লেট- মাটির নিচে এর ওপর উচ্চ চাপ ও তাপের পানি পাঠিয়ে তা থেকে তেল ও গ্যাস সংগ্রহ করার টেকনোলজি ব্যবহার করে এই তেল উৎপাদন করা হয়। এটাও আরেক ধরনের জীবাশ্ম, যেটা থেকে তেল বের করার কার্যকর টেকনোলজি ছিল না বলে এর ব্যবহার আগে ছিল না। এখন এই টেকনোলজির পর্যাপ্ত উপস্থিতি ও খরচ পোষায় মনে করাতে শেল অয়েলের ব্যবসায় একটা উচ্ছ্বাস চলছে। এভাবে তেল বের করার এই টেকনোলজিটাকে বলা হয় ফ্রেকিং। তাই অনেকে এটাকে ফ্রেকিং অয়েলও বলে। অথবা শ্লেট জাতীয় উপাদান বা কাঁচামাল থেকে এই তেল বের করা হয় বলে একে শেল অয়েলও বলা হয়। এ ছাড়া এই টেকনোলজিতে প্রচুর পানি ব্যবহার করতে হয় বলে এবং এর প্রক্রিয়ায় প্রচুর অব্যবহৃত তাপ উদ্ভব হয়, যেখানে দুনিয়ার তাপমাত্রা কমানোটাই এখন ইস্যু সেখানে পরিবেশগত দিক থেকে পরিবেশ বিনষ্ট আরো বাড়িয়ে তোলে এই টেকনোলজি। ফলে অনেকে একে নোংরা তেল বা ডার্টি অয়েল নামেও ডাকে। মাটির নিচে এর মজুদ শ্লেটের দিক থেকে শীর্ষে থাকা দেশ হলো আমেরিকা, জর্ডান, কানাডা ইত্যাদি। বলা হচ্ছে, আমেরিকান মজুদের পরিমাণ এত বেশি যে, তা দিয়ে আমেরিকান জ্বালানি চাহিদা মেটানো তো বটেই তা মিটিয়েও আমেরিকা শেল অয়েল রফতানি করতে পারে। গত কয়েক বছর ধরে আমেরিকায় এই শেল অয়েল উৎপাদনের জোয়ার উঠেছে। ফলে গত তিন বছর ধরে এই জোয়ার ওঠাতে আমেরিকান মিডিয়ায় শেল অয়েলের বিরুদ্ধে নেগেটিভ দিক যেগুলো আছে তা খুব কমই ছাপা হয়। এই টেকনোলজির আরেক বড় নেগেটিভ দিক হলো এই টেকনোলজি ব্যবহারের তুলনামূলক খরচ অনেক বেশি। বলা হয়েছিল বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৭০ ডলারের বেশি হলে বেশ আয়েশে এই ব্যবসা করা যায়। সারকথায় তরল জীবাশ্ম তেল উৎপাদনের চেয়ে এর খরচ বেশি। সেটা যাই হোক, আমেরিকার এই শেল অয়েল বা ফ্রেকিং অয়েল উৎপাদন দ্বিগুণ হয়েছে বলেই এই তেল উৎপাদনকারীদের লবি চাপ ইত্যাদিতে পরে এখন চল্লিশ বছর পরে আমেরিকা থেকে তেল রফতানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়।
আর ঠিক এখানেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। তেল উৎপাদকদের (মূলত মধ্যপ্রাচ্যের) এক কার্টেল জোট হলো ওপেক। ওপেকের সাথে পশ্চিমের স্বার্থবিরোধ অনেক পুরনো। আমেরিকান রফতানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া উপলক্ষে লন্ডনের সাপ্তাহিক ইকোনমিস্ট গত মাসে ১৮ ডিসেম্বর এক রিপোর্ট বের করেছে। ওই রিপোর্টের প্রথম বাক্যটা অনুবাদ করলে হয় এরকম : “যুগ যুগ ধরে ‘বাজার’ শব্দটা বিশ্বব্যাপী তেলবাণিজ্যে এক আনফিট শব্দ হয়ে আছে। তেল উৎপাদনকারীদের আন্তর্জাতিক কার্টেল ওপেক শুধু তেলের বাজারে ইচ্ছামতো হস্তক্ষেপ করেছেই শুধু নয়, নিজের জন্য নানা মাত্রার সফলতাও বের করে নিয়ে গেছে।” এই বাক্য থেকে ওপেকের সাথে আমেরিকার স্বার্থবিরোধের তীব্রতা টের পাওয়া যায়। সারা দুনিয়ায় যে তেল উৎপাদন হয় এর এক-তৃতীয়াংশ করে ওপেক সদস্যরা। আর ওপেকে উৎপাদনেরও এক তৃতীয়াংশের কিছু বেশি একাই উৎপাদন করে সৌদি আরব- এটা প্রতিদিন মোটামুটি ১০ মিলিয়ন ব্যারেল, যেখানে দুনিয়ায় মোট উৎপাদন ৮০ মিলিয়ন ব্যারেলের বেশি। ফলে ওপেকের কোনো সিদ্ধান্তে সৌদি আরবের প্রভাব প্রায় একচেটিয়া। ফলে তেলের বাজারে আমেরিকার শেল অয়েল নিয়ে প্রবেশ ঠেকাতে সৌদি আরব লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ কাজে সে সহজেই ওপেককে নিজের পেছনে দাঁড় করিয়ে নিতে পেরেছে। এখানে শেল অয়েলকে ঠেকানোর সৌদি কৌশল হলো- শেল অয়েলের উৎপাদন খরচ তুলনামূলক বেশি, এটাকে কাজে লাগানো। এ কারণে এক দিকে সৌদি আরব ক্রমান্বয়ে তেলের দাম ফেলে দিচ্ছে। আবার একই সাথে ওপেকে জোটবদ্ধ হয়ে উৎপাদন না কমিয়ে (তেলের দাম বেড়ে যাবে বলে) বরং বাড়িয়ে চলেছে। এভাবে তেলের দাম ফেলে দিয়ে ২০০৩ সালের সমান ২৭ ডলারে নামিয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বীদের বাজার থেকে হটানোর মতো ফল এতে পেয়েছে। যেমন ব্রিটিশ বিপিসহ বহু তেল কোম্পানি ইতোমধ্যে প্রায় আড়াই লাখ কর্মী ছাঁটাই করেছে, নতুন বিনিয়োগ বন্ধ করে রেখেছে, নতুন করে রিগ বসানোর যত পরিকল্পনা তেল তোলা কোম্পানির ছিল, সব স্থগিত হয়ে গেছে। এতে ক্ষতি সৌদি আরবের কম হয়নি। বলা হয়, প্রতিদিন নাকি সৌদি আয় ৫০০ মিলিয়ন ডলার মানে হাফ বিলিয়ন ডলার কম হচ্ছে। আইএমএফ হিসাব করে বলছে, এ বছরে মধ্যপ্রাচ্য মোট ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় হারাবে। আইএমএফ সৌদি আরবকে সাবধান করেছে এভাবে সীমাহীন তেল উৎপাদন বাড়ানোর বিপদ স্মরণ করিয়ে দিয়ে।
সৌদিদের এই লড়াইয়ে জেতার কৌশল সহজ। তারা মনে করে, দীর্ঘ দিন ২০ ডলার বা কম দামে তেল বিক্রি করে লোকসান সহ্য করার ক্ষমতা একমাত্র তারই আছে। সুতরাং প্রতিদ্বন্দ্বীদের আগে দেউলিয়া বানানোর পরেই সে বাজারের লাগাম টেনে ধরবে, উৎপাদন কমিয়ে তেলের দাম বাড়াবে। এ ব্যাপারে সৌদিদের অনুমিত সময়কাল এক বছর। অর্থাৎ আগামী বছর থেকে বাজার ঘুরে দাঁড়াবে বা সৌদিরা দাঁড় করানোর সুযোগ পাবে। এ বছরের জুন মাসের পর থেকে এসব ব্যাপারে আলামত ফুটতে শুরু করবে সৌদি আরবের বিশ্বাস। এ কাজে তার প্রধান টার্গেট প্রতিদ্বন্দ্বী প্রথমত আমেরিকান শেল অয়েল। আর এর পরের টার্গেট আবার বাজারে ফিরে আসা ইরান। দেখা যাক কার নার্ভ কত শক্ত, কে কতক্ষণ টেকে!
goutamdas1958@hotmail.com

শিশুদের জন্য ডিজিটাল শিক্ষা by মেহেদী হাসান

পুরোপুরি ডিজিটাল শিক্ষা ব্যবস্থায় শিশু আনন্দের সঙ্গেই
শিখতে পারে। মডেল: আরোহী, ​ছবি: খালেদ সরকার
সারি সারি ডেস্কে পেটমোটা সব কম্পিউটার। সামনে বসে আছে একদল শিশু। ভাবভঙ্গি গুরুগম্ভীর হলেও উত্তেজনায় চোখ চকচক করছে। আজ নতুন কিছু শিখবে তারা, মজার কিছু। গত শতকের আশির দশকের ঘটনা এটি। তা-ও আবার মার্কিন মুলুকে। স্টিভ জবসের অ্যাপল কম্পিউটার সবে পরিচিতি পেতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে তিনি একবাক্যে ঘোষণা দিলেন, ‘কিডস কান্ট ওয়েট’। গোটা দুনিয়া কম্পিউটার হাতে এগিয়ে যাবে আর শিশুদের বেলায় বলা হবে ‘আগে বড় হও’, তা চলবে না! ১০-১১ বছরে প্রথম কম্পিউটার দেখেছেন স্টিভ জবস। প্রথম দেখায় প্রেম। আর তাই শিশুশিক্ষায় কম্পিউটারের অন্তর্ভুক্তি ছিল অ্যাপলের অগ্রাধিকার। শিশুদের জন্য মজার মজার সব কম্পিউটার সফটওয়্যার তৈরি করেছে তারা, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কম্পিউটার সরবরাহে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। মোটকথা, শিক্ষা যেন অ্যাপলের ‘ডিএনএ’তেই ছিল।
শনিবার বেসিস সভাকক্ষে আনন্দ কম্পিউটার্সের প্রধান নির্বাহী মোস্তাফা জব্বার পুরোনো স্মৃতি এভাবেই রোমন্থন করছিলেন। সে সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে অ্যাপল কম্পিউটার ইনকরপোরেটেডের সেই উদ্যোগ দেখে অনুপ্রাণিত হন। নিজ দেশে এমন কিছু শুরুর কথা ভাবেন। অ্যাপলের কিছু সফটওয়্যার কিনে আনেন তিনি। বাংলায় রূপান্তরের চেষ্টা করেন। তবে সেই চেষ্টায় সফলতার মুখ দেখে যখন নিজেরা নতুন করে অ্যানিমেশন ও শব্দ সংযোজনার মাধ্যমে এমন সফটওয়্যার তৈরির উদ্যোগ নেন। মূলত সেটাই ছিল বিজয় শিশুশিক্ষা তৈরির ইতিকথা।
এরপর ১৯৯৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর গাজীপুরে আনন্দ মাল্টিমিডিয়া স্কুল স্থাপন করা হয় পরীক্ষামূলক ভিত্তিতে। ধীরে ধীরে সারা দেশেই স্কুলের নতুন নতুন শাখা খোলা হয়। এই স্কুলগুলোতে বিজয় শিশুশিক্ষার মাধ্যমে কম্পিউটারভিত্তিক শিক্ষার হাতেখড়ি দেওয়া হয় শিশুদের। এদিকে চলতে থাকে বিজয় শিশুশিক্ষার উন্নয়ন। ২০১১ সাল নাগাদ প্রাক–প্রাথমিক পর্যায়ের শিশুদের জন্য পূর্ণাঙ্গ সফটওয়্যার তৈরি হয়। মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘এরপর আমার স্বপ্ন ছিল স্কুলের বাচ্চাদের হাতে কম্পিউটার পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু ৪০-৫০ হাজার টাকার কম্পিউটার তো আর দেওয়া সম্ভব না। কম খরচের কম্পিউটারের খোঁজে লেগে পড়ি। এদিকে আমাদের সফটওয়্যারের উন্নয়ন চলছেই। প্রিস্কুল পর্বের কাজ হলো, পাঠ্যবই ধরে প্রথম-দ্বিতীয় শ্রেণিও হলো। কিন্তু আমরা চাইছিলাম সফটওয়্যারটি শুধু শ্রেণিকক্ষে না, শিশুদের হাতে পৌঁছে দিতে।’এর মধ্যে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় নেত্রকোনার পূর্বধলার এক স্কুলের অধ্যক্ষের সঙ্গে। সৈয়দ আরিফুজ্জামান নামের সেই অধ্যক্ষের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করেন তাঁরা। এরপর গত বছরের শেষে এই প্রচেষ্টার উদ্বোধন করা হয়। মোস্তাফা জব্বার জানান সারা দেশে এই শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়াই এখন আমাদের পরিকল্পনা। এ বছর পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বিষয়বস্তু (কনটেন্ট) তৈরি করব আমরা।
পূর্বধলার স্কুলে ডিজিটাল শিক্ষা
নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার আরবান একাডেমির অধ্যক্ষ সৈয়দ আরিফুজ্জামানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিদ্যালয়টির ডিজিটাল শিক্ষা কার্যক্রম সম্পর্কে জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রথমে বিজয় শিশুশিক্ষার প্রাক্-বিদ্যালয় বিষয়বস্তুগুলো শ্রেণিকক্ষে বড় পর্দায় দেখানো শুরু করি। এতে বেশ ভালো ফল পাওয়া যায়। শিক্ষার্থীরা আগ্রহের সঙ্গে পড়াশোনা করে।’ এরপর তিনি ভেবে দেখেন, যদি প্রতিটি শিশুর হাতে তা পৌঁছে দেওয়া যায়, তবে আরও ভালো হয়। এর মধ্যে বিজয় শিশুশিক্ষা দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা উপকরণ তৈরি করে ফেলে। এগিয়ে আসে বেসরকারি সংস্থা ডিনেট। ওদিকে মোস্তাফা জব্বার সরকারি-বেসরকারি সব পর্যায়ে চেষ্টা চালিয়ে যান স্বল্পমূল্যে ট্যাবলেট কম্পিউটারের খোঁজে। অবশেষে সব ব্যবস্থা হয়ে গেলে গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর আরবান অ্যাকাডেমির প্রথম শ্রেণিতে পড়ুয়া ৪০ শিক্ষার্থীর হাতে কি-বোর্ডযুক্ত ট্যাবলেট কম্পিউটার তুলে দেওয়া হয়। ‘স্বদেশ’ নামের এই ট্যাবলেট কম্পিউটার বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে শিশুদের পাঠদানের উপযোগী করে। প্রতিটি ট্যাবলেটে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের প্রথম শ্রেণির সিলেবাস অনুসরণ করে তৈরি করা বিজয় প্রাথমিক শিক্ষা-১ সফটওয়্যার ইনস্টল করা আছে৷ উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমে চলা এসব কম্পিউটার ও ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষের কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে বিজয় ডিজিটাল৷ সৈয়দ আরিফুজ্জামান ২০১৮ সালের মধ্যে প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীর হাতে এই ট্যাবলেট কম্পিউটার পৌঁছে দেওয়ার আশা ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘খুব দ্রুত এই শিক্ষার্থীরা ট্যাবলেট কম্পিউটারের ব্যবহার আয়ত্ত করে ফেলেছে। শিখছেও দ্রুত। এই মাধ্যমে শিক্ষা খুব কার্যকর হচ্ছে।’
আশির দশকে যুক্তরাষ্ট্রে যে বিপ্লবের সূচনা হয়েছে, আমাদের দেশে তা হচ্ছে এত দিন পর। তবু তো চাকা গড়াল! সে জন্যও উদ্যোক্তারা একটা ধন্যবাদ তো পেতেই পারেন। তথ্যপ্রযুক্তির হাত ধরে একদিন জ্যোতির্ময় বাংলাদেশ গড়ে উঠবে এমনটাই সবার প্রত্যাশা।