Friday, July 2, 2010

অন্য রকম আম উৎসব by আদনান মুকিত

সন্তানদের নিয়ে বাবা-মায়েরা সব সময় চিন্তার মধ্যে থাকেন। সন্তান কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে—এসব নিয়ে তাঁদের চিন্তার শেষ নেই। ইদানীং এ ভাবনা পেয়েছে নতুন মাত্রা। ছেলেমেয়েরা ‘টেক্সটবুক’ বাদ দিয়ে সারা দিন ‘ফেসবুক’ নিয়ে মেতে আছে। ফেসবুক জিনিসটা কী, জিজ্ঞেস করলে সন্তান গম্ভীর মুখে বলে, এটা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগের একটা ওয়েবসাইট। বাবা-মা আবার চিন্তায় পড়েন। সারা দিন সামাজিক যোগাযোগ রক্ষা করার পরও ছেলে সামাজিক বিজ্ঞানে ৩৩-এর বেশি পায় না কেন? এর ওপর নানা জায়গা থেকে তথ্য আসে—ফেসবুকে ছেলেমেয়েরা সময় নষ্ট করছে, বিপথে চলে যাচ্ছে আরও কত কী! কিসের সামাজিক যোগাযোগ? ফেসবুক তরুণসমাজকে নষ্ট করে দিচ্ছে—এ বক্তব্যের সঙ্গে তাঁরাও একমত। অতএব, ফেসবুক বন্ধ। কিন্তু ফেসবুকের মাধ্যমেও যে অনেক ভালো কিছু হয়, হচ্ছে এবং আরও হওয়া সম্ভব, তা সবাই ভুলে বসে আছে। ফেসবুকে অনেক গ্রুপ আছে, যারা সামাজিক কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। ‘আমরা খাঁটি গরিব...’ তেমনই একটি গ্রুপ। মজা করার জন্য খোলা হলেও শুধু মজাতেই গ্রুপটি আটকে থাকেনি। গত জানুয়ারির তীব্র শীতে এই গ্রুপের সদস্যরা ফেসবুকের মাধ্যমে ত্রাণ সংগ্রহ করে কুড়িগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে দিয়ে এসেছেন। জানুয়ারির সেই মিশনের পর ২৬ জুন পথশিশুদের আম বিতরণ করে তাঁরা সফলভাবে শেষ করেছেন তাঁদের দ্বিতীয় মিশন।
ফেসবুকের মাধ্যমে তাঁরা শিশুদের আম দিলেন কীভাবে—অনেকেই করেন এ প্রশ্নটা। উত্তর খুবই সোজা। ‘আমরা খাঁটি গরিব...’ গ্রুপের সদস্য প্রায় দুই হাজার ৪০০ জন। পথশিশুদের আম খাওয়ানো হবে—এ ঘোষণা শুনে অনেকেই এগিয়ে এসেছেন। কিন্তু কীভাবে খাওয়ানো হবে? আলোচনায় ঠিক হয়, অপরাজেয় বাংলা নামের একটি সংগঠন ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় শ্রমজীবী বা পথশিশুদের জন্য স্কুল পরিচালনা করে; যাকে বলে স্ট্রিট স্কুল। সেই স্কুলের শিশুদের দেওয়া হবে আম। গ্রুপের সদস্যদের সবারই অনলাইনে পরিচয়, কিন্তু দেখে তা বোঝার উপায় নেই। সবাই মিলে টাকা সংগ্রহ করে জমা দেন গ্রুপের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে। সেই টাকা দিয়ে কেনা হয় ৩৫০ কেজি আম। ভাড়া করা হয় পিকআপ। তারপর ২৬ জুন সকালে প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে শুরু হয় যাত্রা। গ্রুপের তরুণ সদস্যদের আগ্রহের সীমা নেই। ছাদ খোলা পিকআপে বৃষ্টিতে ভিজে গরিব গ্রুপের সদস্যরা গাইতে গাইতে যখন যাচ্ছিলেন, আশপাশের লোকজন অবাক না হয়ে পারেনি। পিকআপ প্রথমে থামল গাবতলী বাস টার্মিনালের একটি স্কুলে। তারপর একে একে মোহাম্মদপুর টাউন হল, কমলাপুর রেলস্টেশন, বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম, হাইকোর্ট মাজার, চন্দ্রিমা উদ্যানের স্কুলগুলোর শিক্ষার্থী এবং রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ, বছিলা বস্তি এবং ধানমন্ডির পথশিশুদের আম দেওয়া হয়। এক একটা স্কুলে পিকআপ থামে, আর শুরু হয় স্কুলের শিক্ষার্থীদের উল্লাস। তাদের উল্লাস দেখে মনে হচ্ছিল তারা আম না, ঈদের চাঁদ দেখছে। অবশ্য পাকা আম তাদের কাছে ঈদের চাঁদের মতোই। বছরে দুবার চাঁদ দেখা গেলেও দুবার আম খাওয়া তাদের অনেকেরই ভাগ্যে নেই। ‘নেই’ শব্দটা এই শিশুদের সঙ্গে আঠার মতো লেগে আছে। তাদের গায়ে কাপড় নেই, স্কুলে আলাদা কক্ষ, বেঞ্চ, বই-খাতা-কলম কিছুই নেই। এমনকি অনেকের বাবা-মাও নেই। মোহাম্মদপুরের ছোট্ট মেয়ে সুরমা দুই হাতে দুটি আম নিয়ে দাঁত বের করে হাসছিল। আম দুটি সে খাবে না, বাড়িতে তার মা আর বৃদ্ধ নানি আছেন, তাঁদের জন্য নিয়ে যাবে। আর বাবা? ‘বাবা নাইগা, আরেকটা বিয়া কইরা ভাগসে।’ এত কষ্টের পরও সে স্কুলে আসছে, সবার সঙ্গে গলা মিলিয়ে পড়ছে—আ-তে আম। কিন্তু ওই পড়া পর্যন্তই, আম আর তাদের খাওয়া হয় না। তার পরও বছরের প্রথম আম পেয়ে একা না খেয়ে নিয়ে যাচ্ছে মা আর নানির জন্য!
এদের মধ্যে কোনো জড়তাও নেই। দেখে মনে হচ্ছিল আম দিতে আসা ভাইয়া-আপুদের তারা খুব ভালো করে চেনে। কী চমৎকার করে বলে—‘ভাইয়া, আমার একটা ছবি তুলে দ্যান তো।’ সেই ছবি দেখানোর পর আরও সুন্দর করে বলে, ‘ছবি ভালো আসেনি, আবার তোলেন।’ চন্দ্রিমা উদ্যানের মামুন আম দেওয়ার সময় গাছে উঠে বসে আছে। সবাই আম নিয়েছে, সে নেবে না, গাছ থেকেও নামবে না। তার মন খারাপ। আম দিতে আসা এক ভাইয়া তাকে গাছ থেকে নামিয়ে হাতে আম তুলে দিতেই তার মন ভালো হয়ে গেল। শুধু ভালোই না, খুশিতে তার চোখে পানি চলে এল। হাসি-কান্না দুটোই একসঙ্গে। কী সুন্দর দৃশ্য!
রায়েরবাজারে পিকআপে ব্যানার দেখে একজন প্রশ্ন করলেন, ‘এই ফেসবুক জায়গাটা কোথায়?’ সব খুলে বলার পর তিনি বললেন, ‘সবই বুঝছি, কিন্তু আপনাদের উদ্দেশ্যটা কী?’ উদ্দেশ্য একটাই। হাসি দেখা। মাত্র দুটি আম পেয়েই দরিদ্র শিশুগুলোর মুখে যে হাসি ফুটেছে, তা কয়জন দেখতে পারে? আম পেয়ে শিশুরা সবাই মিলে গলা ফাটিয়ে বলছিল ‘থ্যাংক ইউ!’ গ্রুপের সদস্যরা এই শব্দটা জীবনে অনেকবার শুনেছেন; কিন্তু কখনোই এতটা ভালো লাগেনি।

‘ইভ টিজিং’ আসলে যৌন হয়রানি-নির্যাতন -নারী ও সংস্কৃতি by মনজুর রশীদ খান

সম্প্রতি বখাটেদের জ্বালাতনে অসহ্য হয়ে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে কয়েকজন কিশোরী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। নির্যাতন-নিপীড়নে বাধ্য হয়ে নারীদের আত্মহননের খবর আসছে প্রায়ই। এসিড নিক্ষেপ, বিয়ের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় গায়ে পেট্রল ঢেলে আগুনে পোড়ানো, অপহরণ, ধর্ষণ ও খুনের মতো ভয়াবহ খবর তো আছেই। ইভ টিজিং নামক উপদ্রবও বেড়ে চলছে। গণমাধ্যম ও বিভিন্ন ফোরামে বিশিষ্ট নাগরিক ও সামাজিক সংগঠন এই অপতৎপরতায় উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। তারা সরকার তথা প্রশাসনকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরে প্রতিরোধ ও প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
মেয়েদের উত্ত্যক্তকারী বখাটেদের অপকর্মকে ইভ টিজিং বলা হলেও আসলে এটি যৌন হয়রানি এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্যাতন। উত্যক্তকারীদের বড় অংশ উঠতি বয়সী হলেও বেশি বয়সীও যে থাকে না তা নয়। কালক্রমে এদের কেউ কেউ যে মাদকসেবী, ধর্ষণকারী, সন্ত্রাসী বা খুনি হয়ে উঠতে পারে। ‘ইভ টিজিং’ শব্দবন্ধটির উৎপত্তি এই উপমহাদেশে। ইংরেজি ভাষাভাষী দেশের অভিধানে শব্দটি নেই। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও পশ্চিমা উন্নত দেশগুলোতে এমন অপরাধ যৌন হয়রানির আওতায় পড়ে। সুতরাং ইভ টিজিং নাম দিয়ে উত্ত্যক্তকারীদের বখাটেপনা, যা আসলে যৌন হয়রানি, তাকে হালকা করে দেখার কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয়।
উত্ত্যক্তকারী তা অল্প বয়সী হোক বা অধিক বয়সী হোক, তাদের বিচরণ সর্বত্র। স্কুল-কলেজ, কল-কারখানা, সরকারি-বেসরকারি অফিস, যানবাহন, বিপণিবিতান এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও এমন হয়রানির অভিযোগ উঠছে। সম্প্রতি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বিরুদ্ধেও যৌন হয়রানির খবর পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ভারতের সমাজবিজ্ঞানী ও গবেষকদের মতে, মুম্বাই সিনেমা জগৎ ইভ টিজিংয়ের মতো অপকর্মের উৎপত্তিস্থল। হিন্দি সিনেমায় মূল আকর্ষণ হলো ফাইটিং ও ফ্লার্টিং (চটুল আচরণ)। ইভ টিজিং এর মাধ্যমে সেখানে নায়কেরা নায়িকাদের মন জয়ের চেষ্টা করে। নায়কের অসংযত, প্রশ্রয়পূর্ণ হাসিঠাট্টামূলক আচরণকে বাহবা দিয়ে উপভোগ করা হয়। তরুণ বয়সী ছেলেমেয়েরা এসব দেখে নায়ক-নায়িকাদের মতো হতে চায়, তাঁদের মতো পোশাক পরা ও আচরণ করতে চায়। বখাটে রোমিওরা জুলিয়েট খোঁজে নিজ অবস্থানের আশপাশে। হয়তো কাছে পায় নিরীহ স্কুলগামী একটি ছাত্রী। চলে রাস্তাঘাটে হয়রানি, জ্বালাতন, ঠাট্টা-মশকরা ও উত্ত্যক্ত করা। মধ্য ও নিম্নবিত্তদেরই এই জ্বালাতন বেশি সহ্য করতে হয়। আজকাল স্কুলগামী ছাত্রী, কর্মজীবী মহিলা ও নানা কাজের জন্য বের হওয়া নারীর সংখ্যা বাড়ছে। নারী নির্যাতন ও হয়রানিও বাড়ছে। ভারতীয় ওয়েবসাইট ঘেঁটে জানা যায়, এই দুষ্কর্মের বিস্তৃতি সেখানের গ্রামগঞ্জে সর্বত্র, বিশেষ করে শহর ও শহরতলিতে। সারা ভারতেই নারী যৌন হয়রানির শিকার। গবেষকদের মতে, টিভি চ্যানেলের নানা অনুষ্ঠান, নাটক, বিজ্ঞাপন ও হিন্দি সিনেমার নেতিবাচক প্রভাবে সেখানে যৌন হয়রানি ও নির্যাতন মহামারির রূপ নিতে যাচ্ছে। ভারতের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর মতে, সে দেশে নারীর বিরুদ্ধে হিংস্রতাজনিত অপরাধ সবচেয়ে দ্রুত বাড়ছে। ২০০৭ সালের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, যৌন হয়রানি বাড়ার হার ১০ শতাংশ; সে বছর প্রায় দুই লাখ নারী সহিংসতার শিকার হয়েছে। আমাদের দেশে এ বিষয়ে সমীক্ষা বা পরিসংখ্যান জানা থাকলে বোঝা যেত আমাদের অবস্থা কী। তবে আন্দাজ করা যায়, তা কমের দিকে নয়।
যৌন হয়রানি ও অপরাধ বিষয়ে ভারতের সঙ্গে আমাদের অনেক মিল। এখানে ভারতের অনেক কিছুরই অন্ধ অনুকরণ চলে, ইভ টিজিং তারই একটি। স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলগুলো আমাদের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিচ্ছে হিন্দি গান, সিনেমা, সিরিয়ালসহ বিচিত্র সব বিনোদন। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর এ আগ্রাসনে অনেকেই উদ্বিগ্ন। এর সঙ্গে আছে বিজ্ঞাপনের ছড়াছড়ি। ভারতের টিভি চ্যানেলগুলোর কিছু বিজ্ঞাপন অতি অরুচিকর। এ দেশের টিভি চ্যানেলগুলোও এর অনুকরণের চেষ্টায় পিছিয়ে নেই। শালীনতার সীমা ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা যে চলছে, তা একটু লক্ষ করলেই বোঝা যায়। বিজ্ঞাপন বাণিজ্য এখন সারা বিশ্বেই রমরমা। পণ্যকে বাজারজাত করায় গুণগত মান নয়, বিজ্ঞাপনে নারীর আকর্ষণীয় উপস্থাপনাই কৌশল।
অন্যান্য শিল্পপণ্যের সঙ্গে এ দেশেও বেড়ে উঠছে ফ্যাশন ডিজাইন, ফ্যাশন শো, পোশাকব্যবসা, যার বাজারজাতের প্রধান মাধ্যম চটকদারি ও যৌন আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন। উন্নত বিশ্বের সমাজবিজ্ঞানীরা স্বীকার করছেন ফ্যাশন-শিল্প এবং বিজ্ঞাপনের অসাধারণ ও ভয়ংকর শক্তির কথা। ফ্যাশনশিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত পোশাকব্যবসার প্রধান টার্গেট হলো নারী, ছোট ছেলেমেয়ে ও তরুণ-তরুণীরা। তাদের জন্য তৈরি হয় অতি আকর্ষণীয় জামাকাপড়।
সব মিলিয়ে তরুণীরা বিশেষ করে অল্প বয়সীরা বেশি নাজুক। উচ্চ ও মধ্যবিত্ত ঘরের তরুণ-তরুণীদের একটি অংশের চিত্তবিনোদনসহ আধুনিকতার উপকরণ পেতে হয়তো অসুবিধা হয় না। কিন্তু অন্যদের উপায় কী? নিম্নবিত্ত বা নিম্ন বা অল্প আয়ের পরিবারের তরুণদের কথা ভাবুন, যাদের সংখ্যা লাখ লাখ। তাদের কেউ ছাত্র, কেউ বেকার ভবঘুরে, করার কিছু নেই। কিছুদিন আগেও দেশে রক্ষণশীল বা মধ্যমপন্থী মনোভাবেরই প্রাধান্য ছিল। তা এখন আধুনিক প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রবাহের উপকরণসমৃদ্ধ আধুনিকায়ন, বিশ্বায়ন ও মুক্তবাণিজের সঙ্গে মুক্ত সমাজ নামের ঢেউয়ের তোড়ে বিলীন হতে চলছে। এসবের সঠিক ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ না হলে সমাজকে চরম মূল্য দিতে হবে। পরিবেশ দূষণের মতো সাংস্কৃতিক দূষণের ফলও কিন্তু মারাত্মক।
নারী নির্যাতন-নিপীড়ন নামক সামাজিক ব্যাধি থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? যে উপকরণ-উপাদান একজন উঠতি বয়সী ছেলেকে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া মেয়েটিকে উত্ত্যক্ত করতে প্রলুব্ধ করছে সেগুলো দূর করতে হবে। বিশ্বায়নের যুগে ব্যবসার লক্ষ্যে আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও মনমানসিকতা বদলানোর যে আগ্রাসন চালাচ্ছে তার প্রধান লক্ষ্য তরুণ-তরুণীরা। দেশি-বিদেশি অনেক ব্যবসায়ী উদ্যোক্তাদের কাছে দেশপ্রেম, নৈতিকতা, ধর্মীয় বোধ দেশের অর্থনীতির ক্ষয়ক্ষতি ইত্যাদি বিবেচ্য নয়। তাঁদের বিবেচ্য নয় নারীর মর্যাদা, নারীর নিরাপত্তা বা পারিবারিক ও সামাজিক শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা। নারীর স্বাধীনতা, নারীর ক্ষমতায়নের নামে উসকে দেওয়া হচ্ছে এমন কিছু উপাদান, যা আমাদের দেশ, সমাজ ধর্ম ও সংস্কৃতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
সমাজকে ইভ টিজিং নামেই হোক বা যৌন নির্যাতন-নিপীড়নই হোক, তা থেকে রক্ষা করতে হলে আমাদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে, দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে। আইনি ব্যবস্থা যেমন যথেষ্ট নয়, তেমনি প্রয়োগ করাও সহজ নয়। কাজেই বিশ্বায়ন ও আধুনিকায়নের সঙ্গে যে ধ্বংসাত্মক নেতিবাচক দিকগুলো আসছে, তা বয়কট-বর্জন করতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সঙ্গে অতি রক্ষণশীলতা ও অতি উদারতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষায় বিবেচনায় রাখতে হবে আমাদের ভাষা সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধকে। আশা করি এ ক্ষেত্রেও আমাদের গণমাধ্যম যথাযথ ভূমিকায় নামতে বিলম্ব করবে না।
মেজর জেনারেল (অব.) মনজুর রশীদ খান: অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা।
mnzr23¦gmail.com

নব্বই বছরে আমাদের স্বপ্নযাত্রা by হারুন-অর-রশিদ

বঙ্গভঙ্গ রদের প্রেক্ষাপটে ১৯২০ সালের ১৮ মার্চ ‘দ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট’ পাস হয়। ১৯২১ সালের ১ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু। স্যার পি জে হার্টগ ছিলেন এর প্রথম ভাইস চ্যান্সেলর। প্রায় ৬০০ একর জমি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরুতে ছিল মাত্র দুজন ছাত্রীসহ ৮৭৭ জন শিক্ষার্থী, ৬০ জন শিক্ষক, তিনটি অনুষদ (কলা, বিজ্ঞান ও আইন), ১২টি বিভাগ, তিনটি হল (জগন্নাথ হল, ঢাকা হল ও মুসলিম হল) । বর্তমানে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৩৩ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থী (ছাত্রী প্রায় ৩৫ শতাংশ), শিক্ষক এক হাজার ৬৫৫ (নারী শিক্ষক ৩০ শতাংশ), ১০টি অনুষদ, ৬৭টি বিভাগ, ১৭টি হল, তিনটি ছাত্রাবাস। এর সঙ্গে আরও যুক্ত হয়েছে, আটটি ইনস্টিটিউট, ৩৮টি গবেষণাকেন্দ্র এবং ২৩৫টি ট্রাস্ট ফান্ড। বিশ্বের ৫৯টি বিশ্ববিদ্যালয়/প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা বিনিময় সম্পর্ক রয়েছে। ছাত্রীদের জন্য এক হাজার আসনবিশিষ্ট আরও একটি হল নির্মাণাধীন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কলকাতার পত্রপত্রিকার আশঙ্কা ছিল এটি ধর্মীয় শিক্ষাসর্বস্ব একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। কিন্তু তাদের আশঙ্কা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বরং একটি সেক্যুলার, গণতান্ত্রিক ও সর্বজনীন প্রতিষ্ঠান হিসেবেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশে বিদেশে খ্যাতি লাভ করেছে। পাশ্চাত্যের অনেক দেশে একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে সেখানে শহর গড়ে ওঠার বহু নজির রয়েছে। যেমন, ব্রিটেনে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে সেখানকার শহর গড়ে ওঠা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থানও অনেকটা তাই। এর সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত বাঙালি জাতি ও তার রাষ্ট্র, বাংলাদেশের সংগ্রামের ইতিহাস। ’৪৮ ও ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের সূতিকাগারও ছিল এ বিশ্ববিদ্যালয় । এখানকান শিক্ষার্থীরাই তাতে নেতৃত্ব দেয়, বাঙালি তরণের রক্তে রচিত হয় একুশে ফেব্রুয়ারি (১৯৫২) , জাতীয় মুক্তির সোপান।
১৯৭১ সালের ২ মার্চ এই বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরেই প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত হয়। স্বাধীনতার জন্য ছাত্রদের পাশাপাশি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০ জন প্রথিতযশা শিক্ষক জীবন দেন। এ হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও অবস্থান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এক সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতি ছিল Oxford of the East বা প্রাচ্যের অক্সফোর্ড হিসেবে। শুরুতে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে আবাসিক ও শিক্ষাদানকারী (অনাবাসিক ও অধিভুক্তকারী নয়) প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটি প্রতিষ্ঠিত হলেও সময়ের ব্যবধানে তার বহুমাত্রিক সমপ্রসারণ ঘটেছে। বর্তমানে বিভিন্ন অনুষদ, বিভাগ, ইনস্টিটিউট, গবেষণাকেন্দ্র থেকে প্রকাশিত জার্নালের সংখ্যা প্রায় ১০০। আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের কজন শিক্ষকেরই গবেষণা-প্রবন্ধ ও পুস্তক বিদেশের বিখ্যাত জার্নালে ছাপা বা প্রকাশনা সংস্থা কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছে? বর্তমানে এর সংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি হয়েছে। এ ছাড়া স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে প্রতিনিয়ত অধিকতর সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমে করপোরেট সেক্টরের সহায়তা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে, যা আগে প্রায় অনুপস্থিত ছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল উদ্দেশ্য শুধু পঠন-পাঠন নয়। বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে জ্ঞানের সৃষ্টি, জ্ঞান অর্জন ও তা বিতরণের কেন্দ্র। এ জন্য আবশ্যক, শিক্ষার পাশাপাশি গবেষণার ওপর গুরুত্বারোপ। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক সত্যেন বোস বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের সঙ্গে যৌথভাবে ‘কোয়ান্টম স্টাটিস্টিকস তত্ত্ব’ রচনা করেন (১৯২৪)। সমপ্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত আমাদের দেশের বিজ্ঞানী অধ্যাপক মাকসুদুল আলমের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিভাগের অধ্যাপক হাসিনা খান ও তাঁদের সহযোগীরা (যাঁদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিভাগ এবং জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও বায়োটেকনোলজি বিভাগের একদল তরুণ শিক্ষার্থী রয়েছে) পাটের জন্মতত্ত্ব (জিনম সিকোয়েন্সিং) আবিষ্কার করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। এই আবিষ্কার আমাদের জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। অন্যান্য ক্ষেত্রেও বিশ্ববিদ্যালয় মৌলিক গবেষণাকর্মে শিক্ষকদের উৎসাহিত ও পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া প্রয়োজন।
বিশ্বায়নের এই যুগে ভৌগোলিক সীমায় দৃষ্টি আবদ্ধ করে রাখলে চলবে না। আমাদের শিক্ষা-গবেষণা হতে হবে বিশ্বমানের। সৃষ্টি করতে হবে বিশ্বমানের গ্রাজুয়েটস। এ জন্য থাকা চাই আধুনিক ও পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা। সমগ্র বিশ্ববিদ্যালয়কে তথ্যপ্রযুক্তি নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। হলে হলে সাইবার সেন্টার প্রতিষ্ঠাসহ ছাত্রছাত্রীদের প্রতিটি কক্ষে ইন্টারনেট সুযোগ থাকতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিকে সম্পূর্ণ অটোমেশন ও ডিজিটাইজেশনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। ই-বই, ই-জার্নালের প্রাপ্যতা পর্যাপ্ত করতে হবে। শ্রেণীকক্ষগুলোকে ইন্টারনেট, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর ইত্যাদি দ্বারা সজ্জিত করতে হবে। গবেষণাগারে আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য গবেষণা সামগ্রী ও উপকরণ নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেস ও প্রকাশনা সংস্থাকে আধুনিক মানের করতে হবে। চিকিৎসাকেন্দ্রকে অন্তত ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক হাসপাতালে রূপান্তরিত করে চিকিৎসা অনুষদের অধীনে ন্যস্ত করতে হবে। ট্রাস্ট ফান্ডগুলোকে নিয়মিত ও কার্যকর করতে হবে। বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শুধু সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরই যথেষ্ট নয়, তা যাতে কার্যকর হয় সেটি বিশেষভাবে দেখতে হবে। বিদেশি ছাত্রদের আকৃষ্ট করতে হবে। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি স্বতন্ত্র ‘ফরেন অফিস’ প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। হল ও কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের নির্বাচন নিয়মিত অনুষ্ঠিত হতে হবে। যথাসময়ে পরীক্ষা ও এর ফলাফল প্রকাশ করতে হবে। সিন্ডিকেট, একাডেমিক কাউন্সিল, বোর্ড অব অ্যাডভান্সড স্টাডিজ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসব বডির সভা নির্দিষ্ট দিনে অনুষ্ঠিত হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভোকেশনের নির্দিষ্ট তারিখ একাডেমিক ক্যালেন্ডারে দেওয়া থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয় হবে সম্পূর্ণ সেশনজটমুক্ত।
২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ পূর্তি হবে। তার আগে ২০২০ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিখী পালিত হবে। ইতিহাসের পথ ধরে এই তিন মাইল ফলক ঘটনা এক বৃন্তে এসে মিশেছে। আমাদের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অচিরেই গুণে-মানে-সৃষ্টিতে সত্যিকার অর্থে একটি শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে। এই প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-শিক্ষকেরা জ্ঞান আর গবেষণাকর্মে নিবেদিত থাকবেন। বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়ন-সমৃদ্ধি অর্জনে এ বিশ্ববিদ্যালয় অতীতের মত ভবিষ্যতেও অগ্রনী ভূমিকা করবে, ৮৯তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
ড. হারুন-অর-রশিদ: সহ-উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ফুটবলে কী ঘটে by ফারুক ওয়াসিফ

ফুটবল যতটা খেলা ততটাই লীলা, জীবনের মতোই। জীবনের গোলপোস্টের সামনেও আমাদের নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। মাঠে খেলছে নানান খেলোয়াড়, তাদের পায়ে পায়ে ছুটছে আপনার জয়-পরাজয়। কেবল অপেক্ষা, কখন আপনার ভাগ্যকে লাথি দিতে দিতে প্রতিপক্ষ ছুটে আসবে। সব বাধা ডিঙিয়ে আসবেই তারা নিয়তির মতো। আর আপনি জালের খাঁচার সামনে মহাকাব্যের বীরের মতো দাঁড়িয়ে আছেন—একা। যেন দাঁড়িয়ে আছেন ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে।
জীবনে অনেকের অবদানই গোলকিপারের মতো স্কোরহীন। আপনার দুঃসাধ্য গোল ঠেকানো সবাই ভুলে যাবে, গোলদাতাই হবেন হিরো। রেফারিও স্বৈরাচারীর মতো অন্যের দোষে আপনাকেই ‘ফ্রি কিক’-এর সামনে দাঁড় করিয়ে দেবে কিংবা দেবে পেনাল্টি। অথচ সাফল্য-ব্যর্থতা একা কারও নয়। কিন্তু টিভিতে দেখায়, দলের চেয়ে ব্যক্তি খেলোয়াড়ই বড়, সব কৃতিত্ব স্ট্রাইকারের। ক্লোজ-আপে, স্লো-মোশনে বারবার দেখিয়ে দর্শকের মনে তাঁর দেবোপম ছবি গেঁথে দেওয়া হয়। আর গোল যেন দীর্ঘ প্রেমের শেষে চরম পুলক, আধুনিক জীবনের মতো আধুনিক ফুটবলেও যা বিরল।
ফুটবল জীবনের মতোই ঘটন-অঘটনে ভরা। কখন কোথায় কোন তালপাতার সৈনিক বীর হয়ে উঠবে আর কোন বীরের পতন ঘটবে, কখন কোন পরাশক্তি গৌণ দলের কাছে হেরে যাবে, তা কেউ বলতে পারে না। ফুটবলের বড় আকর্ষণ এই নাটকীয় অনিশ্চয়তা—যা কখনো কখনো ট্র্যাজেডি হয়ে যায়। এ জন্যই ক্রিকেটের বিশ্লেষণ ও কৌশল ঠিক করায় কম্পিউটার যতই জারিজুরি করুক, ফুটবল এখনো কম্পুযন্ত্রের আসরমুক্ত। ফুটবল এখনো মানবিক। এখনো পথের ছেলে পেলে বা ম্যারাডোনা বা রোনালদোর পক্ষে জনগণের রাজপুত্র হওয়া সম্ভব। এক মনোরোগ চিকিৎসকের মতে, বিষণ্ন ও হতাশ মানুষের উপযুক্ত চিকিৎসা হলো ফুটবল খেলা। দলবদ্ধ খেলা দেয় প্রাণশক্তি, দেয় আত্মবিশ্বাস। শেখায় নিজেকে ভালোবাসতে। যে মানুষটি এমনিতে আনস্মার্ট ও লাজুক, ফুটবলের আলোচনায় তিনিও মুখর। এই খেলা বৃদ্ধের মনে আনে কিশোরের উচ্ছ্বাস আর কিশোরকে করে ইঁচড়ে পাকা ক্রীড়া বিশ্লেষক। এমন জাদুকরী প্রভাবের জন্যই বলা হয়, ফুটবল হলো জনগণের জন্য আফিম। দরিদ্রদের জন্য প্রতিদিনকার একঘেঁয়েমি আর জীবনযন্ত্রণা সাময়িকভাবে ভুলে থাকার মহৌষধ হলো এই খেলা।
বুদ্ধিজীবী আর সাধারণ মানুষের মধ্যে পার্থক্যও কিন্তু ফুটবল। ঈশ্বরে বিশ্বাস আর ফুটবল-ভক্তি বিষয়ে উভয়ের একমত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। বৈশ্বিক টেলিভিশনের কল্যাণে ফুটবল খেলা হয়ে উঠেছে আধুনিক ধর্ম। ফিফার প্রেসিডেন্ট হলেন তার পোপ। পেলে ও ম্যারাডোনারা হলেন আর দেবতা। রুদ খুলিত, জিদান, রোনালদো, মেসি, কাকা, দ্রগবারা হলেন দেবতাদের অবতার। স্টেডিয়ামের সবুজ মাঠ হলো দেবতা আর অবতারদের লীলাতীর্থ। কোটি কোটি ভক্তের বিশ্বাস, ম্যারাডোনার দক্ষতা অতি মানবিক। এই বীরপূজায় আমির-ফকির, সাদা-কালো, নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ—সবারই অধিকার। ভ্যাটিকানে সোনার যিশু আর আমাদের মধুপুরের আদিবাসীদের কাঠের যিশু যেমন একই ভক্তি পান, তেমনি শত-কোটি ডলারে তৈরি স্টেডিয়াম কিংবা ধান-কাটা মাঠের এবড়োখেবড়ো জমি—সবখানেই ফুটবল স্বমহিমায় বিরাজমান। ফুটবল সর্বজনীন, সর্বগম্য ও অপ্রতিরোধ্য এবং ফুটবল বিপ্লবী।
আদিতে ফুটবল অভিজাত ও ঔপনিবেশিক শাসকদের খেলা হলেও তাদের হাত থেকে এটি চলে আসে সাধারণ মানুষের পায়ে পায়ে। সেজন্যই ব্রিটিশ সাহিত্যিক রুডইয়ার্ড কিপলিং ১৯০২ সালে বলেছিলেন, ফুটবল হলো গেঁয়ো ভূতদের কাদামাখানো খেলা। কারণ, তত দিনে ফুটবলে তাঁদের দাপট শেষ। প্রথম ফুটবল ক্লাব গঠন করেছিলেন রেলশ্রমিক ও জাহাজঘাটার কুলিরা। ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপজয়ী প্যারাগুয়েতেও একসময় খেলাটি অভিজাতদের কুক্ষিগত ছিল। ১৯১৫ সালে তাদের প্রকাশিত স্পোর্টস পত্রিকা লেখে, ‘আমরা যারা সমাজে উঁচু আসনের মানুষ, তাদের শ্রমিকদের সঙ্গে খেলতে বাধ্য করা যাবে না...আজকাল খেলাধুলা যন্ত্রণা আর ত্যাগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
ফুটবল সাধারণ মানুষের পায়ে আসার পর শুরু হয় পাল্টা খেলা। এরই চমৎকার উদাহরণ ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ। মাঠে ব্রিটেনকে হারিয়ে ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধে পরাজয়ের শোধ নেয় আর্জেন্টিনা। ২০০৪ সালে ইতিহাসে প্রথম কোনো আরব দল ইসরায়েলের জাতীয় লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়। ২০০০ সালে বিদ্রোহী চেচনিয়া রাশিয়াকে হারায়। ২০০৪ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাক অলিম্পিকের সেমিফাইনালে উঠে জানান দেয়, তারা হারিয়ে যায়নি।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়, ১৯১৫ সালের ক্রিসমাসের দিনে অবিষ্মরণীয় এক খেলা খেলেছিল জার্মানি আর ইংল্যান্ড। দুই পারে দুই পক্ষের সৈন্যরা। মাঝখানে ‘নো-ম্যানস ল্যান্ড’। হঠাৎ কোত্থেকে সেখানে একটি ফুটবল এসে পড়ে। নিমেষেই যুদ্ধের ময়দান হয়ে যায় খেলার ময়দান। অস্ত্র ফেলে সৈন্যরা মাতে খেলায়। দু’পক্ষের অফিসারদের সেদিন অনেক কষ্টে সৈন্যদের বোঝাতে হয়েছিল, তোমরা বন্ধুর মতো খেলতে পারো না, তোমাদের উচিত পরস্পরকে ঘৃণা করা।
ফুটবলেরও শ্রেণীচরিত্র আছে। যেকোনো হালকা গোলাকার বস্তুকেই গরিবরা ফুটবল বানিয়ে খেলতে পারে, কিন্তু বিশ্বকাপে চলে বহুজাতিক কোম্পানি অ্যাডিডাসের দামি বল। ইতালিতে ১২টি বৃহৎ শিল্প খাতের মধ্যে ফুটবল একটি। একমাত্র স্পেনের ভুবনবিখ্যাত বার্সেলোনা ছাড়া আর সব নামীদামি ক্লাবের মালিকানা ধনকুবেরদের হাতে। খেলোয়াড়দের তাঁরা কেনাবেচা করেন। পেশাদারির নামে প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের বানানো হয় সেসব ক্লাবের ‘কর্মচারী’। ফিফার প্রেসিডেন্ট সেপ ব্ল্যাটারকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তাঁর সাফ জবাব, ‘ফিফা খেলোয়াড়দের সঙ্গে কারবার করে না, খেলোয়াড়েরা হলো ক্লাবের কর্মচারী।’ এভাবে বিপুল টাকার বিনিময়ে ‘জনগণের দেবতা’ বিক্রি হয়ে যান। পায়ের দামে তাঁরা আত্মা বিক্রি করে দেন এবং হারান স্বাধীনতা। পেশাদার ব্যবসায়ী বললে যেমন মুনাফার জন্য মরিয়াপনাকে বুঝি, পেশাদার সৈনিক বলতে যেমন নির্বিকার হত্যার পারদর্শিতা বোঝায়, তেমনি পেশাদার ফুটবলার কি কোনা হূদয়হীন গোলমেশিন? খেলোয়াড়ের নিজস্ব শৈলী কিছু নয়, যান্ত্রিক কৌশলই বড়?
বিশ্বকাপ একই সঙ্গে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক, একই সঙ্গে আনন্দ আর বাণিজ্যের মেলা। বিশ্বকাপের মাঠে একই সঙ্গে চলে এই আনন্দ আর টানাপোড়েন। যাঁরা গত চার বছর ছিলেন আর্সেনাল, রিয়াল মাদ্রিদ বা এসি মিলানের ‘পেইড কর্মচারী’, বিশ্বকাপে তাঁরাই হাজির হন জাতীয় জার্সি গায়ে জাতীয় পরিচয়ে—দেশপ্রেমের জয়গান গেয়ে। খেলোয়াড়েরা যখন এ রকম জাতীয় হয়ে ওঠেন, তখন আমাদের মতো ‘বিজাতীয়’ ভক্তরা হঠাৎ অতি আন্তর্জাতিকতাবাদী হয়ে উঠি। বাংলাদেশের অগণিত ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা-সমর্থক যে পতাকা ওড়ায়, তা কোনো দেশের রাজনৈতিক পতাকা নয়, তা ভালোবাসার পতাকা। দেশ দুটিকে তারা তখন পৃথিবীর মানচিত্র থেকে উঠিয়ে মনের জমিনে বসায়। এই উদ্যম, এই সংগ্রাম, এই ভক্তি আর ভালোবাসার তলে-তলে চলে খেলোয়াড়দের বাজার যাচাই, চলে বিজ্ঞাপন কোম্পানি, টেলিভিশন চ্যানেল, স্পোর্টস ইন্ডাস্ট্রি, পর্যটনসহ বহুপক্ষীয় রমরমা বাণিজ্য। বিশ্বকাপ শেষ হলে সফল খেলোয়াড়েরা আবার জাতীয় জার্সি খুলে ক্লাবের জার্সি পরবেন, আবার জনশক্তির মতো রপ্তানি হয়ে পদশক্তি বিক্রিতে নামবেন। দেবতারা তখন আবার মানুষ হবেন।
পেলের সময় এই পেশাদারি ছিল না। তখন খেলা হতো খেলার আনন্দে। আজ ফুটবল বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের মামলা। এই তথাকথিত পেশাদারিই আজ খেলোয়াড়দের স্বাধীনতাকে, খেলার স্টাইলকে নিয়ন্ত্রণ করছে। তারপরও কোনো খেলোয়াড় যখন অবিস্মরণীয় কৌশলে গোল দেন, তখন অগণিত দর্শকের চিৎকার মনে করিয়ে দেয়, প্রতিভার আসল পৃষ্ঠপোষক ক্লাব মালিক, স্পোর্ট ইন্ডাস্ট্রি, টিভি চ্যানেল, বিজ্ঞাপনদাতা ও নির্মাতারা কিংবা ফিফাও নয়; বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীই এর প্রাণ। এই কয়েক শ কোটি জনসাধারণের উচ্ছ্বাসই খেলা চলার ৯০ মিনিটকে করে তোলে বিশ্বজনীন। ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণী-জাতিনির্বিশেষে মানুষ যখন আফ্রিকান বীণা ভুভুজেলার মতো এক তালে বেজে ওঠে, তখনই জন্ম হয় এক বৈশ্বিক মুহূর্তের। এত কিছু সত্ত্বেও ফুটবল এখনো পুরুষদেরই খেলা। কার্যত বহু দেশে নারীরা ফুটবল খেলতে পারে না।
এই বীণার আবহেই মানবীয় খেলোয়াড়েরা ‘দেবতা’র মতো লোকাতীত দক্ষতা দেখাবেন। কিন্তু একজন এসেছেন যিনি আর কখনো খেলবেন না, কিন্তু এবার তাঁকে জিততেই হবে। অনেক ভক্ত তাঁকে দেবতার মতো ভালোবাসে। এবং দেবতাদের মতো তাঁরও পতন হয়েছিল। নেশা ও বিশৃঙ্খল জীবন তাঁকে প্রায় ধ্বংস করে দেয়। কিন্তু ফিদেল কাস্ত্রোর প্রেরণায় সেই মানুষটিই আবার উঠে দাঁড়িয়েছেন। এবারের বিশ্বকাপে মানুষের বেশে তিনি এসেছেন দেবতা হিসেবে পুনরুত্থানের লক্ষ্য নিয়ে। তাঁর দেশও জাতীয় দলের কোচ করে সেই সুযোগ তাঁকে দিয়েছে। তাঁর নাম ডিয়েগো, মানে গড—বিশ্ব যাঁকে জানে ম্যারাডোনা বলে। আর্জেন্টিনার রোসারিও শহরে তাঁকে উৎসর্গ করা একটি গির্জা আছে। গির্জাটির নাম ‘দ্য হ্যান্ড অব গড’—ভক্তরাও তাঁকে ‘ঈশ্বরের হাত’ বলেই ডাকে।
জীবনের খেলা আসলে ফুটবলের মতোই, কেবল মাঠটা এখানে অনেক বড় এবং গোলপোস্টটা অদৃশ্য।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক।
farukwasif@yahoo.com

আফগানিস্তান সমস্যা -সময়ের আবর্তে by ফারুক চৌধুরী

যুক্তরাষ্ট্রে দুই মাস অবস্থানের পর ফিরে এসেই জানলাম, আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র তথা ন্যাটো বাহিনীর কমান্ডার জেনারেল ম্যাকক্রিস্টেলকে বরখাস্ত করা হয়েছে। সংগত কারণেই তাঁকে বরখাস্ত করা ছাড়া উপায় ছিল না প্রেসিডেন্ট ওবামার। একজন কর্তব্যরত উর্দিপরা সামরিক কর্মকর্তা হয়ে জেনারেল ম্যাকক্রিস্টেল প্রকাশ্যে প্রেসিডেন্ট ওবামা, ভাইস প্রেসিডেন্ট বাইডেন ও তাঁদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছেন। এই অবস্থা একটি গণতান্ত্রিক কাঠামোতে গ্রহণযোগ্য নয়। গুরু পাপেই গুরু দণ্ড হয়েছে তাঁর।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকার বলেছে, ঘটনাটি আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের রণনীতির ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না। আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের রণনীতিটি কী? মূলত জেনারেল ম্যাকক্রিস্টেলের উদ্যোগে গৃহীত সুপারিশেই আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র তথা ন্যাটোর সেনাসংখ্যা এক লাখ ৩০ হাজারে বাড়ানো হয়েছে। আফগানিস্তানের হেলমান্দ প্রদেশের মারজায় বড় আকারের তালেবানবিরোধী অভিযান চালানো হয়েছে। কান্দাহারের চারপাশে সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে। তালেবানবিরোধী সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বাহিনীর হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে অনেক। আমার যুক্তরাষ্ট্র অবস্থানকালেই দেখলাম, প্রেসিডেন্ট কারজাই জনাবিশেক পাত্র-মিত্র নিয়ে ওয়াশিংটন সফর করলেন, দেখা করলেন প্রেসিডেন্ট ওবামাসমেত যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও সামরিক বাহিনীর হোমরাচোমরাদের সঙ্গে। আপাতদৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্রের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে নববলে বলিয়ান কারজাই কাবুলে ফিরলেন। এসবের মধ্যে জেনারেল ম্যাকক্রিস্টেলের প্রকাশ্যে তাঁর রাজনৈতিক নেতাদের সমালোচনা অপরিণামদর্শিতা বলে অভিহিত করাটা বাস্তবধর্মী হবে না। জেনেশুনেই জেনারেল ম্যাকক্রিস্টেল বিষপান করেছেন বলে আমার বিশ্বাস। খুদে তালপাতার সিপাহি নন তিনি। আফগানিস্তানে হালে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো সেনাদের সংখ্যা বাড়ানোর ছকটি তিনি এবং তাঁর নবনিযুক্ত উত্তরসূরি ইরাক যুদ্ধখ্যাত জেনারেল পেট্রিয়াস যুগ্মভাবেই প্রণয়ন করেছিলেন—তাঁদের সহযোগিতা করেছিলেন আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত জেনারেল অ্যাকেনবেরি। প্রেসিডেন্ট ওবামা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই পরিকল্পনার চুলচেরা বিচার করেছিলেন। অনুমোদনের পরই সরেজমিনে তার বাস্তবায়নের ভার দেওয়া হয়েছিল জেনারেল ম্যাকক্রিস্টেলকে। তাহলে বিরোধটি কোথায় এবং জেনারেল ম্যাকক্রিস্টেল হঠাৎ সমালোচনায় মেতে উঠলেন কেন?
এক কথায় তার উত্তর হলো আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের রণনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে গোত্রীয় কোন্দল, আঞ্চলিক ও স্থানীয় রাজনীতি মিশে আছে; মিশে আছে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কলাকৌশল—আর বিরোধের উৎপত্তি সেখানেই।
প্রথম সমস্যাই হলো আফগানিস্তানে রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকাণ্ডে প্রেসিডেন্ট কারজাইয়ের অবস্থান নিয়ে। ঢাল নেই, তলোয়ার নেই; নিধিরাম সর্দার তিনি। তবে এও সত্য, আফগানিস্তান মানচিত্রে চিহ্নিত একটি দেশ এবং মহাকারচুপি করে হলেও কারজাই এর নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি। তাঁর গুরুত্ব রয়েছে বলেও তিনি মনে করেন। একবার তো কারজাই রেগেমেগে বলেই ফেলেছিলেন, অবহেলা করলে তিনি তালেবানদের সঙ্গেই যোগ দেবেন। এই কারজাইকে নিয়েই দ্বিমত রয়েছে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের হোমরাচোমরাদের মধ্যে। রাষ্ট্রদূত অ্যাকেনবেরি মনে করেন, কারজাই এমন কোনো কাজের মানুষ নন যে তাঁকে অর্থবহ দায়িত্ব অর্পণ করা যেতে পারে। তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত তালেবানবিরোধী সংঘাতের বিকেন্দ্রীকরণ। অর্থাৎ তাঁর মতে, বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় কোন্দল এবং অবস্থাদৃষ্টেই যুক্তরাষ্ট্র পদক্ষেপ নেবে, কেন্দ্রনির্ভর সিদ্ধান্ত সেখানে অপ্রয়োজনীয় ও অবান্তর। অন্যদিকে জেনারেল ম্যাকক্রিস্টেল ছিলেন কারজাইকে সঙ্গে নিয়েই পথচলার পক্ষপাতী। দুজনের মধ্যে বিরোধের উৎপত্তি ছিল সেখানে এবং তা সর্বজনবিদিত।
অতএব, জেনারেল ম্যাকক্রিস্টেলের প্রস্থানে যে ওবামা সত্যিকার অর্থে ব্যথিত, তা বলা যাবে না; যদিও ওবামা বারবারই বলেছেন, কারজাইকে যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন বাঞ্ছনীয়। তবে ম্যাকক্রিস্টেলের উত্তরসূরি পেট্রিয়াস জেনারেল হয়েও যে আঞ্চলিক ও স্থানীয় রাজনীতির মারপ্যাঁচ বোঝেন, তার প্রমাণ তিনি ইরাকে রেখেছেন। তবে ইরাক আর আফগানিস্তানের আর্থসামাজিক, আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক অবস্থান একেবারেই ভিন্ন। ইরাকে যে স্ট্র্যাটেজি কাজ করছে অথবা করেছে, তা যে আফগানিস্তানে করবে এমন কোনো কথা নেই।
আফগানিস্তানের সমস্যা আঞ্চলিক। বর্তমান পশ্চিম পাকিস্তানের একটি বৃহৎ অংশ এতে জড়িয়ে রয়েছে। তালেবানদের একটি অংশের প্রতি পাকিস্তানের সহানুভূতি রয়েছে। এদিকে কারজাই রয়েছেন ভারতের নেক নজরে। কারজাইয়ের মাধ্যমে আফগানিস্তানে ভারতের প্রভাব বিস্তার পাকিস্তান মেনে নেবে না। অতীতে আফগানিস্তান সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে আমি সেই দেশে ভারত আর পাকিস্তানের ভিন্নমুখী ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছি এ জন্য যে ভারত-পাকিস্তান সমঝোতা এবং সহযোগিতা ছাড়া সেই অঞ্চলে সার্বিকভাবে তালেবান তথা সন্ত্রাস দমন করা সম্ভব হবে না। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বর্তমানে ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যে পররাষ্ট্রসচিব এবং অতঃপর দুই দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের ফলে সম্প্রীতির যে হাওয়া বইতে শুরু করেছে, তা আঞ্চলিক ক্ষেত্রে প্রাথমিক হলেও একটি কাঙ্ক্ষিত পদক্ষেপ।
প্রেসিডেন্ট ওবামা বলেছেন, ২০১১ সালের জুলাই থেকে তিনি আফগানিস্তান হতে সেনা প্রত্যাহার শুরু করবেন। ওয়াশিংটন ‘থিংক ট্যাংক’-এর প্রভাবশালী একজন সদস্য, টেইজি শেফার আমাকে বলেছেন, আফগানিস্তানে প্রেসিডেন্ট ওবামার ভূমিকার সার্থকতা ও মূল্যায়ন যুক্তরাষ্ট্রের আগামী নির্বাচনকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবান্বিত করবে। ওবামার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ধারিত হবে আফগানিস্তানে। ২০১১ সালের জুলাই মাস খুব দূরে নয়, যে সময় থেকে আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করার অঙ্গীকার ওবামা করেছেন। তাই তালেবান তথা আঞ্চলিক সন্ত্রাসের সমস্যা সমাধানে প্রেসিডেন্ট ওবামা কি প্রকাশ্যে ভারত আর পাকিস্তানকে নিয়ে কোনো আঞ্চলিক উদ্যোগ গ্রহণ করবেন? সেই প্রশ্ন এখন অনেকেরই মনে।
ফারুক চৌধুরী: সাবেক পররাষ্ট্র সচিব। কলাম লেখক।

সমস্যার আবর্তে ঢাকা চিড়িয়াখানা -অযত্ন-অবহেলার অবসান চাই

ঢাকা চিড়িয়াখানা দেশের প্রধানতম চিড়িয়াখানা। গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানটি যে কতটা অযত্ন আর অবহেলার শিকার, তা ফুটে উঠেছে গত মঙ্গলবারের প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিবেদনে। সেখানের দুই হাজার ৮২টি প্রাণীর বেশির ভাগই রুগ্ণ ও অসুস্থ। চিড়িয়াখানার জীবন্ত প্রাণীগুলোর স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ প্রতিদিনের। কিন্তু ঢাকা চিড়িয়াখানায় এটা যে কোনো চ্যালেঞ্জই নয়, সেটা বোঝা গেল চিড়িয়াখানার একমাত্র পশুচিকিৎসক (ভেটেরিনারি সার্জন) ছুটিতে যাওয়ার পর প্রাণী বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে চিকিৎসার কাজও চালিয়ে যাওয়ার ঘটনায়।
আধুনিক চিড়িয়াখানাগুলো পশুচিকিৎসায় ন্যূনতম কতগুলো মানদণ্ড মেনে চলে। চিড়িয়াখানায় প্রযুক্তিগত দক্ষতাসম্পন্ন পর্যাপ্ত পশুচিকিৎসক, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পশুরোগ প্রযুক্তিবিদ ও সহায়ক কর্মী থাকার পাশাপাশি এমন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং চিকিৎসাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ-প্রক্রিয়া থাকতে হয়, যেখানে পশুর স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট দায়দায়িত্ব পশুচিকিৎসকদের ওপর বর্তায়। আর তাঁদের সহযোগিতা করেন রক্ষক, কিউরেটর, পুষ্টিবিদ ও অন্য কর্মীরা। অথচ অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের চিড়িয়াখানাগুলোতে এখনো পশুচিকিৎসার ন্যূনতম মান নিশ্চিত করা যায়নি। ঢাকা চিড়িয়াখানায় পর্যাপ্ত লোকবল, রোগ নির্ণয়ের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, নমুনা পরীক্ষার ব্যবস্থা এবং ওষুধ মজুদের মতো জরুরি বিষয়েরও অভাব রয়ে গেছে। এতে প্রাণীর চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে, অনেক প্রাণী মারাও যাচ্ছে।
সারা দুনিয়ার চিড়িয়াখানাগুলো বদলে গেছে এবং ক্রমাগত বদলাচ্ছে। এককালের বিচিত্র কতগুলো প্রাণীর নিছক সংগ্রহশালা হিসেবে না থেকে চিড়িয়াখানা হয়ে উঠছে প্রাণিবিজ্ঞান, প্রাণীর রোগজীবাণু, চিকিৎসা ও প্রতিষেধকের বিষয়ে গবেষণার একেকটি কেন্দ্র। বিরল ও বিপন্নপ্রায় প্রাণীগুলোর সংরক্ষণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। চিড়িয়াখানার ধারণার ক্ষেত্রে এমন বদল আধুনিক সমাজে চিড়িয়াখানা থাকার ন্যায্যতা দিতেও বড় ভূমিকা রাখছে। অথচ আমাদের চিড়িয়াখানাগুলো যেন এক জায়গায়ই আটকে আছে। এগুলোতে যে অবস্থা বিরাজ করছে, তাতে দর্শনার্থীরা কিছু বিনোদনের খোরাক পায় আর প্রাণীর জীবন শুধু বিপন্নই হতে থাকে।
চিড়িয়াখানা বিষয়ে দীর্ঘদিন সরকার মনোযোগী না হওয়াতেই এমন দুরবস্থা তৈরি হয়েছে। বন্দিত্বের মধ্যে থাকা জীবজন্তুর শারীরিক ও মানসিক চাহিদা সম্পর্কে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের আরও সচেতন হওয়া দরকার। মানসম্পন্ন চিড়িয়াখানা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য এই অযত্ন আর অবহেলার অবসান ঘটাতে হবে। পাশাপাশি সমাজে চিড়িয়াখানা কী ভূমিকা পালন করবে, সে বিষয়েও নতুন করে ভাবা দরকার।

অবৈধ আবাসন প্রকল্প -আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিন

রাজউক যে কাজটি সম্প্রতি শুরু করল, সেটি আরও আগে শুরু করলে রাজধানীর নাগরিক জীবন অনেক স্বস্তি লাভ করত। ঢাকা ও এর আশপাশে ছোট-বড় যে ২০০টি আবাসন প্রকল্প রয়েছে, তার মধ্যে শতকরা মাত্র ১৩ ভাগ, অর্থাৎ ২৬টি অনুমোদিত, বাকি ১৭৪টি প্রকল্প অননুমোদিত; সোজা ভাষায় অবৈধ। এ তথ্য রাজউক সূত্রেই পাওয়া গেছে। মঙ্গলবার প্রথম আলোয় তা ছাপা হয়েছে। এত দিন এই হিসাব রাজউকের খাতা-কলমে সুপ্ত অবস্থায় ছিল। এখন তারা অননুমোদিত প্রকল্পগুলোকে সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি দিতে শুরু করেছে। ৫৬টি প্রকল্পকে দেওয়া হয়েছে, বাকিগুলোকে পর্যায়ক্রমে দেওয়া হবে। এ উদ্দেশ্যে রাজউকের অনুসন্ধান চলছে।
প্রশ্ন হলো, এই অবৈধ প্রকল্পের কাজ কি রাজউকের জানার বাইরে ঘটেছে? আইন অনুযায়ী যথাসময়ে কঠোর অবস্থান না নেওয়ায় অশুভ ব্যবসায়িক স্বার্থ সুযোগ পেয়েছে। রাজউক বলেছে যে তারা বিভিন্ন সময় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে অবৈধ প্রকল্পের কাজ বন্ধ রাখার কথা বলেছে। কিন্তু সেটা কি যথেষ্ট? কোনো আবাসিক প্রকল্প যদি আইন না মেনে অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যায়, তাহলে রাজউকের দায়িত্ব হলো তা যথাসময়ে বন্ধ করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা, যেন সাধারণ মানুষ প্রতারিত না হয়। এখন পরিষ্কারভাবে বলা উচিত, কেন তারা নিজেদের কাজ সুচারুরূপে পালন করতে পারেনি।
রাজউকের একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে যোগসাজশের যেসব অভিযোগ বিভিন্ন সময় উঠেছে, তার সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রতিকারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। কারণ, প্রতিষ্ঠান নিষ্কলুষ না হলে আজকের রাজউক যত কঠোর অবস্থানই গ্রহণ করুক না কেন, দুদিন পর দেখা যাবে আগের মতোই হয়তো তাদের মুখ বন্ধ হয়ে গেছে। কারণ, যারা অবৈধ আবাসন প্রকল্পের মাধ্যমে টাকার পাহাড় বানিয়েছে, তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তির কাছে দুর্বল কর্মকর্তা-কর্মচারীর মাথা উঁচু করে চলা কঠিন হতে পারে।
কোন প্রকল্পটি বৈধ আর কোনটি নয়, তার একটি তালিকা প্রথম আলোয় ছাপানো হয়েছে। মানুষ এখন জমি বা বাড়ি কেনার ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয় থেকে মহানগর ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) গেজেট আকারে ছাপানো হয়েছে। মঙ্গলবার বাংলাদেশ হেরিটেজ ফাউন্ডেশন আয়োজিত সেমিনারে ড্যাপের তীব্র সমালোচনা ও এর ১৮টি ত্রুটি উল্লেখ করে একটি বক্তব্য বিতরণ করা হয়েছে। কারও যুক্তিগ্রাহ্য আপত্তি থাকলে তা বিবেচনার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় নিয়ে গঠিত কমিটিতে পাঠানোর সুযোগ রয়েছে। এরপর সার্বিক বিবেচনায় অবৈধ প্রকল্পগুলোর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা থাকার কথা নয়।
অননুমোদিত কয়েকটি প্রকল্পের মালিক তাঁদের প্লট-ফ্ল্যাট বিক্রি শুরু করেননি। তাঁরা প্রশংসাযোগ্য কাজ করেছেন। কিন্তু যাঁরা অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও বিক্রি করেছেন, তাঁদের বেলায় দেখতে হবে যেন প্রকল্প বাতিল হওয়ার কারণে সাধারণ ক্রেতারা ক্ষতিগ্রস্ত না হন। তাঁরা যে টাকায় জমি বা বাড়ি কিনেছিলেন, এখন ক্ষতিপূরণসহ তাঁদের মূল টাকা ফেরত পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারের অনমনীয় অবস্থান কাম্য। আবাসন ব্যবসায়ীদের অবৈধ প্রকল্পের খেসারত যেন সাধারণ মানুষকে দিতে না হয়।

মালদ্বীপে মন্ত্রিসভার পদত্যাগের পর রাজনৈতিক অচলাবস্থা

প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিরোধী দলের মধ্যে দ্বন্দ্বে মালদ্বীপে রাজনৈতিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদের পদত্যাগের পর মূলত কার্যকর কোনো সরকার ছাড়াই গতকাল বুধবার অতিবাহিত করেছে দ্বীপরাষ্ট্রটি।
প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ ও বিরোধী দলের মধ্যে দ্বন্দ্বে মঙ্গলবার দেশটির ১৩ সদস্যের মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করে। ৭৭ আসনের পার্লামেন্ট মজলিশে প্রেসিডেন্ট নাশিদের দল মালদ্বীপের ডেমোক্রেটিক পার্টির (এমডিপি) ৩২টি আসন রয়েছে। বিরোধী দল মালদ্বীপের পিপলস পার্টির (ডিআরপি) আসন রয়েছে ৪০টিরও বেশি।
প্রেসিডেন্ট নাশিদের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘পার্লামেন্টে সমস্যার সমাধান না করে প্রেসিডেন্টের মন্ত্রিসভার নাম ঘোষণা করে কোনো লাভ নেই। আমরা রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে আছি।’
মন্ত্রিপরিষদের পদত্যাগের পর মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট নাশিদ বলেন, পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে বিরোধী দল সরকারের কাজে বাধা দিচ্ছে। বেসরকারিকরণ প্রকল্পসহ সরকারের অসংখ্য উদ্যোগে বাধা দিয়েছে তারা। তিনি আরও বলেন, মন্ত্রিসভার সদস্যদের কাজেও বাধা দেওয়া হয়েছে। বিরোধীদের এমন আচরণকে সংবিধান পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তবে ডিআরপির মুখপাত্র মোহাম্মদ শরিফ বলেন, ‘পার্লামেন্টে আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। পার্লামেন্টের মাধ্যমে দেশের জন্য ক্ষতিকর কোনো কিছুই আমরা হতে দেব না।’
মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির সরকারে প্রেসিডেন্টের সংসদ বিলুপ্ত করার ক্ষমতা নেই। আবার এই মুহূর্তে পার্লামেন্টে প্রেসিডেন্টকে ইমপিচমেন্ট করার মতো দুই তৃতীয়াংশ আসনও নেই বিরোধী দল ডিআরপির। এদিকে প্রেসিডেন্টের হাতে মন্ত্রী নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা থাকলেও পরে তা পার্লামেন্টে অনুমোদিত হতে হয়। পরে পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে মন্ত্রীকে অপসারণও করা যায়। বর্তমান পার্লামেন্টে বিরোধী দল সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার কারণে প্রেসিডেন্ট ও বিরোধী দলের মধ্যে দ্বন্দ্বের জের ধরেই দেশটিতে বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
বুধবার দেশটির শিক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে পার্লামেন্টে অনাস্থা প্রস্তাব আনার পরিকল্পনা করেছিল ডিআরপি। এই তৎপরতার আগেই মঙ্গলবার দেশটির মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করে।

তৃতীয় বিয়ে করলেন শশী থারুর

ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শশী থারুর (৫৪) এবার বিয়ে করলেন আইপিএল নিয়ে বিতর্কে জড়ানো তাঁর বান্ধবী সুনন্দা পুস্করকে। গত রোববার হিমাচল প্রদেশের শৈল শহর কসৌলিতে এ বিয়ের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এটি শশী থারুর তৃতীয় বিয়ে। কাশ্মীরের মেয়ে সুনন্দা এখন দুবাইতে থাকেন। সেখানে একটি স্পা চালান তিনি।
সুনন্দার সঙ্গে শশী থারুর প্রথম দেখা একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে। প্রথম দেখাতেই দুজনের প্রেম। শশী থারুর প্রথম বিয়ে করেছিলেন বাঙালি তনয়া তিলোত্তমা মুখোপাধ্যায়কে। কলকাতায় পড়াশোনার সময় শশীর সঙ্গে তিলোত্তমার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তারপর বিয়ে। সেই বিয়ে বেশি দিন স্থায়ী হয়নি।
এরপর জাতিসংঘে উচ্চপদে কাজ করার সময় কানাডীয় তরুণী ক্রিস্টা জাইলসের সঙ্গে শশীর প্রেম এবং পরে বিয়ে হয়। ক্রিস্টা তখন জাতিসংঘের নিরস্ত্রীকরণ-সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করতেন।

মেক্সিকোর সংগীতশিল্পী গুলিতে নিহত

নিজের মৃত্যুর খবর প্রত্যাখ্যান করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গুলিতে নিহত হলেন মেক্সিকোর সংগীতশিল্পী সার্গিও ভেগা।
এল শাকা নামে খ্যাত ৪০ বছর বয়স্ক সংগীতশিল্পী সার্গিও ভেগা শনিবার মেক্সিকোর উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশ সিনালোয় তাঁর লাল ক্যাডিলাক চালিয়ে একটি কনসার্টে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। পথে তিনি অজ্ঞাত বন্দুকধারীর গুলিতে নিহত হন।

তালেবানের বিরুদ্ধে বিরামহীন যুদ্ধ চলবে: পেট্রাউস

আফগানিস্তানে নবনিযুক্ত শীর্ষ মার্কিন সেনা কমান্ডার জেনারেল ডেভিড পেট্রাউস বলেছেন, সামনে আফগানিস্তানের যুদ্ধ পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। তিনি তালেবানের বিরুদ্ধে বিরামহীন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেন। গত মঙ্গলবার মার্কিন সিনেটের সশস্ত্র বাহিনীবিষয়ক কমিটির সামনে এক শুনানিতে তিনি এ কথা বলেন। এ কমিটি ওই পদে জেনারেল পেট্রাউসের নিয়োগের বিষয়টি ইতিমধ্যেই অনুমোদন করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা গত সপ্তাহে আফগানিস্তানে মোতায়েন করা মার্কিন বাহিনীর প্রধান জেনারেল স্ট্যানলি ম্যাকক্রিস্টালকে বরখাস্ত করে তাঁর জায়গায় জেনারেল পেট্রাউসকে নিয়োগ করেন।
সিনেট কমিটির সামনে শুনানিকালে পেট্রাউস বলেন, তাঁর মতে আফগানিস্তানে কঠিন লড়াই অব্যাহত থাকবে। এ যুদ্ধ আগামী কয়েক মাসে আরও বিস্তৃত হতে পারে, আরও প্রচণ্ড আকার ধারণা করতে পারে।
ন্যাটো ঘাঁটিতে হামলা
আফগানিস্তানে ন্যাটোর একটি সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে তালেবান জঙ্গিরা। গতকাল বুধবার জালালাবাদ শহরে ন্যাটোর একটি বিমানক্ষেত্রের বাইরে ওই হামলা চালানো হয়। এতে বেশ কয়েকজন জঙ্গি নিহত হয়েছে। তবে কোনো ন্যাটো সেনা হতাহত হয়েছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

কে অ্যান্ড কিউ বাংলাদেশের ৫% বোনাস শেয়ার অনুমোদন

কে অ্যান্ড কিউ (বাংলাদেশ) লিমিটেড শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ৫ শতাংশ বোনাস শেয়ার অনুমোদন করেছে।
ঢাকার একটি কনভেনশন সেন্টারে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত কোম্পানির ২৬তম বার্ষিক সাধারণ সভায় এই বোনাস শেয়ার অনুমোদন করা হয়।
কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাবিথ এম আউয়ালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভায় উপদেষ্টা আবদুর রব, পরিচালক এ কে এম রফিকুল ইসলাম, তাফসির এম আউয়াল ও মো. নুরুজ্জামান এবং কোম্পানি সচিব কর্নেল (অব.) এম এম জাহাঙ্গীর উপস্থিত ছিলেন।

বাটা সু কোম্পানির ২২০% লভ্যাংশ অনুমোদন

বাটা সু কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেডের ৩৮তম বার্ষিক সাধারণ সভা সম্প্রতি কোম্পানির চেয়ারম্যান ফার্নান্দো পার্সিয়ার সভাপতিত্বে ধামরাইতে অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় কোম্পানির ২০০৯ সালের শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ১০৫ শতাংশ লভ্যাংশ অনুমোদন করা হয়।
এর আগে কোম্পানি ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে ১১৫ শতাংশ অন্তর্বর্তীকালীন লভ্যাংশ প্রদান করে। ফলে কোম্পানির ২০০৯ সালের মোট লভ্যাংশের পরিমাণ দাঁড়ায় ২২০ শতাংশ।
ফার্নান্দো গার্সিয়া সভায় বলেন, সারা বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দা এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রভাব থাকা সত্ত্বেও ২০০৯ সালে কোম্পানির বিক্রয় ২০০৮ সালের তুলনায় আট শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
কোম্পানি ২০০৯ সালে ৪৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা মুনাফা অর্জন করেছে এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারে করপোরেট ট্যাক্স, ভ্যাট, কাস্টম ডিউটি ইত্যাদি বাবদ ১১৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা জমা দিয়েছে।
জনাব গার্সিয়া আরও জানান, ২০০৯ সালে সারা দেশে কোম্পানির নিজস্ব খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৫৭টি।
তা ছাড়া কোম্পানির ৩৭২টি রেজিস্টার্ড হোলসেল ডিলার ও ৫১৯টি ডিলার বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে।
সভায় কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাজীব গোপালাকৃষনানসহ অন্যান্য পরিচালক উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানির ৬০% বোনাস শেয়ার ঘোষণা

বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি লিমিটেড ২০০৯ সালের শেয়ারহোল্ডারদের জন্য লভ্যাংশ হিসেবে ৬০ শতাংশ বোনাস শেয়ার অনুমোদন করেছে।
গাজীপুরের কাশিমপুরে সারাবোর বেক্সিমকো শিল্পপার্কে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত কোম্পানির ৩৭তম বার্ষিক সাধারণ সভায় এই লভ্যাংশ অনুমোদন করা হয়।
সভায় কোম্পানির চেয়ারম্যান এ এস এফ রহমান সভাপতিত্ব করেন। এতে কোম্পানির ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান, পরিচালক ইকবাল আহমেদ, এম এ কাশেম, ও কে চৌধুরী, আবদুল আলিম ও এ বি সিদ্দিকুর রহমান, আইনি উপদেষ্টা রফিক-উল হক এবং নির্বাহী পরিচালক ও কোম্পানি সচিব মো. আসাদ উল্লাহ উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত হাট এ মাসেই চালু হচ্ছে

চলতি জুলাই মাসের মধ্যেই বহুল প্রতীক্ষিত ‘সীমান্ত হাট’ শুরু হচ্ছে। বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্তে এ হাট চালুর ব্যাপারে এখন শুধু আনুষ্ঠানিকতা বাকি।
জানা গেছে, হাটের বাংলাদেশ অংশে যতটুকু জায়গাজুড়ে বাজার থাকবে, ভারতের অংশেও থাকবে ঠিক ততটুকুই। হাটগুলো বসবে উভয় দেশের তুলনামূলক দুর্গম এলাকায় আর পণ্য কেনাবেচা হবে শুল্কমুক্তভাবে। এতে স্থায়ী কোনো অবকাঠামো থাকবে না। বাজারের আয়তন হবে কমপক্ষে ৭৫ বর্গমিটার।
ভারতের পক্ষ থেকে ২২টি হাটের প্রস্তাব থাকলেও আপাতত তিনটির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এগুলো হলো, সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার সোনারহাট ও ভারতের লিংখাট; সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার লাউয়ারঘর ও ভারতের কালিয়ার চর এবং কুড়িগ্রামের বাজিতপুর উপজেলার বালিয়াবাড়ি ও ভারতের নলিকাতা সীমান্ত।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে যে যৌথ ঘোষণা গৃহীত হয়েছে, তার ৩২ থেকে ৩৮ অনুচ্ছেদে সীমান্ত হাট চালুর কথা বলা হয়েছে।
সূত্র জানায়, যৌথ ঘোষণা বাস্তবায়নের জন্য কয়েক মাস ধরে উভয় দেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ও যুগ্ম সচিব পর্যায়ে একাধিক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেসব সভায় পরীক্ষামূলকভাবে তিনটি সীমান্ত হাট চালুর সিদ্ধান্ত হয়। এখন উভয় দেশের বাণিজ্যমন্ত্রী পর্যায়ে বৈঠকের মাধ্যমে চুক্তি করা হবে। জুলাই মাসের মধ্যেই এ চুক্তি হওয়ার কথা।
প্রসঙ্গত, ২০০৫ সালে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কার্যদলের ঢাকায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে ভারত বাংলাদেশকে প্রথম সীমান্ত হাটের প্রস্তাব দেয়। বাংলাদেশ তখন এ বিষয়ে ভারতকে একটি ধারণাপত্র দিতে অনুরোধ জানায়। ভারত ধারণাপত্রটি পাঠায় গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭ সালের ২৩ এপ্রিল। পরে এই ধারণাপত্রের ওপর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের মতামত চায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
তবে তখন হাট স্থাপনে ‘নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়ে আরও পরীক্ষার দরকার রয়েছে’ মন্তব্য করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, এনবিআর এবং ট্যারিফ কমিশন অবশ্য ওই ধারণাপত্রের কিছু সংশোধনসাপেক্ষে সীমান্ত হাট স্থাপনের পক্ষেই মতামত দেয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ দিকে ২০০৮ সালের ২৩ আগস্ট এসব মতামত নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় একটি আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক। সেই বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পাল্টা ধারণাপত্র তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয় বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটকে (বিএফটিআই)।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব গ্রহণের শুরুর দিক থেকেই বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে।
২০০৯ সালের জুলাই মাসে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, এনবিআর, বিএফটিআই এবং কলকাতায় নিযুক্ত বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রতিনিধি সমন্বয়ে গঠিত একটি দল ভারতের মেঘালয় রাজ্যের বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তসংলগ্ন বালাট নামক এলাকা পরিদর্শন করে। এ সময় ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও মেঘালয় রাজ্য সরকারের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পরিদর্শন শেষেও একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যাতে উল্লিখিত তিনটি স্থানেই সীমান্ত হাট স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এরপর বাংলাদেশ দল সীমান্ত হাটের সম্ভাব্যতা নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে, যাতে নিরাপত্তার বিষয়টিকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়। প্রতিনিধিদল খোঁজ নিয়ে দেখেছে, ২২টি সম্ভাব্য বাজারের মধ্যে ১০টিই হলো মেঘালয় রাজ্যের পূর্ব খাসি পার্বত্য জেলায়। বাকি ১২টি অন্য পাঁচ জেলার সীমান্তে।
জানা গেছে, সীমান্ত হাটে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা চানাচুর, চিপস, আলু, তৈরি পোশাক, মাছ, শুঁটকি, মুরগি, ডিম, সাবান, শিম, সবজি, গামছা ও তোয়ালে, কাঠের টেবিল ও চেয়ার, গৃহস্থালী কাজে ব্যবহূত লোহার তৈরি পণ্য নিয়ে বসবেন। আর ভারতীয়রা ওই হাটে নিয়ে আসবেন ফল, সবজি, মসলা, মরিচ, হলুদ, পান, সুপারি, আলু, মধু, বাঁশ ইত্যাদি পণ্য।
প্রসঙ্গত, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ভারত ২৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি করেছে আর বাংলাদেশে রপ্তানি করেছে ২৮৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার মূল্যের পণ্য।

দেশের মোট রপ্তানির ৩% সার্কে

চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে সমন্বিতভাবে সার্কজোটভুক্ত দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে বাংলাদেশ মাত্র ৩৪ কোটি ৮১ লাখ ডলারের পণ্যসামগ্রী রপ্তানি করেছে।
অথচ এই সময়কালে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির পরিমাণ ছিল এক হাজার ১১৫ কোটি ডলার।
তার মানে, বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের মাত্র তিন শতাংশ আসছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে। বার্তা সংস্থা ইউএনবি পরিবেশিত খবরে এ তথ্য দেওয়া হয়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর পরিসংখ্যান উদ্ধৃত করে এতে আরও বলা হয়েছে, সার্ক দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি রপ্তানি প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে বাংলাদেশ ভারতে ২৫ কোটি ৭৪ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। এই রপ্তানি সার্ক দেশগুলোয় মোট রপ্তানির প্রায ৭৪ শতাংশ।
আলোচ্য সময়কালে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানে ছয় কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করা হয়েছে। এই সময়কালে শ্রীলঙ্কা ও নেপালে পণ্য রপ্তানির বিপরীতে আয় হয়েছে যথাক্রমে এক কোটি ৮০ লাখ ডলার ও ৬৬ লাখ ডলার।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ২০০৯-১০ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে ভুটান, আফগানিস্তান ও মালদ্বীপে যথাক্রমে ১৮ লাখ, ১৯ লাখ ও সাড়ে চার লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে।
পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে সার্ক দেশগুলোয় বাংলাদেশের মোট রপ্তানি ছিল ৪৫ কোটি ৯৩ লাখ ডলার। এটিই কোনো অর্থবছরে সার্কে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি রপ্তানি। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে সার্কে মোট রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩৮ কোটি ৩৯ লাখ ডলার। আর ২০০৬-০৭ অর্থবছরে এই অঙ্ক ছিল ৩৬ কোটি ৮৫ লাখ ডলার।
এ ছাড়া সার্কভুক্ত দেশগুলোতে ২০০২-০৩ অর্থবছরে ১৪ কোটি ৯৫ লাখ ডলার, ২০০৩-০৪ অর্থবছরে ১৫ কোটি ৭৪ লাখ ডলার, ২০০৪-০৫ অর্থবছরে ২৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার ও ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ৩৪ কোটি ৭৪ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করা হয়েছে।
সার্ক দেশগুলোতে বাংলাদেশে কম রপ্তানি করলেও সার্কভুক্ত দেশগুলো থেকে আমদানি অনেক বেশি।
বিশেষ করে ভারত থেকে সবচেয়ে বেশি পণ্য আমদানি করা হয়। চীনের পর ভারতই বাংলাদেশের আমদানির দ্বিতীয় প্রধান উৎস।
সার্বিকভাবে সার্কের প্রায় সব দেশের সঙ্গেই পণ্য বাণিজ্যে বাংলাদেশের ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সংকলিত পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ২০০৮-০৯ অর্থবছরের সার্ক দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৮৬ কোটি ৮৬ লাখ ডলার।
এই অর্থবছরে সার্ক থেকে বাংলাদেশ মোট ৩২৫ কোটি ২৬ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করেছে।

দ্বিতীয় দফায় বিজয়ীদের পুরস্কার তুলে দেওয়া হলো

এবারকার বিশ্বকাপে প্রথম আলো পাঠকদের জন্য নানা মাত্রিক কুইজের আয়োজন করেছে। এর মধ্যে আছে দেশের ২৮টি জেলায় প্রথম আলো অফিসে কুইজে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে প্রতিদিন পুরস্কার জেতার সুযোগ, সাতটি বিভাগীয় শহরে প্রতিদিনের আলাদা কুইজ আয়োজন, এসএমএস, অনলাইন, সাপ্তাহিক ও পর্বভিত্তিক কুইজ। ‘এসকেএফ-প্রথম আলো প্রতিদিনের কুইজ’-এর পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে ড্রয়ের পরদিনই। এভাবেই ‘ট্রান্সটেক-প্রথম আলো বিশ্বকাপ কুইজ’-এর পুরস্কারও বিভাগীয় শহরের প্রথম আলো অফিস থেকে দেওয়া হচ্ছে। এই কুইজে তিন দিন বিজয়ীদের বিশেষ পুরস্কার হিসেবে সাত বিভাগীয় শহরে তিনটি করে মোট ২১টি এসি দেওয়া হয়। ইতিমধ্যে বিভাগীয় শহরগুলোয় এই বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে গত মঙ্গলবার তৃতীয় দফায় ২৭ জুনের কুইজের ঢাকার বিজয়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী মুহাম্মদ আবদুল হামিদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয় প্রথম আলোর ঢাকা অফিসে। একই সময় পুরস্কার তুলে দেওয়া হয় ২৬ জুনের বিজয়ী ডেমরার মাহবুবের হাতেও। তিনি পেয়েছেন একটি টেবিল ফ্যান।
‘এসার-প্রথম আলো বিশ্বকাপ এসএমএস কুইজ’-এর দ্বিতীয় দফায় ১৮ থেকে ২৭ জুন পর্যন্ত ১০ দিনের ১০ জন ল্যাপটপ বিজয়ীর হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। প্রথম আলোতে এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন এক্সিকিউটিভ টেকনোলজিস লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশনস) আবু তোয়াব মো. সানাউল্লাহ, প্রথম আলোর উপসম্পাদক আনিসুল হক ও বন্ধুসভার সাধারণ সম্পাদক সাইদুজ্জামান রওশন। ল্যাপটপ পেয়েছেন খুলনার মৃণাল কান্তি দাস, ফেনীর মৃণাল দাশগুপ্ত, ঢাকার সানজিদা হক রীমা, মানিকগঞ্জের শরিফুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ের শিক্ষার্থী হিমাদ্রি শেখর দাস, গোপালগঞ্জের জাহিদুল ইসলাম, ময়মনসিংহের আহসান কবীর, সিলেটের অনাদি কুমার ভট্টাচার্য, কমিল্লার সাগরিকা দাস ও নরসিংদীর তারিকুল ইসলাম মণ্ডল।
‘নাভানা ইন্টারলিঙ্কস-প্রথম আলো ফুটবল কুইজ’-এ এসএমএসে ১৮ থেকে ২৭ জুন পর্যন্ত ১০ দিনের ১০ জন বিজয়ীর প্রত্যেকেই পেয়েছেন এবারের বিশ্বকাপের অফিশিয়াল অ্যাডিডাসের জাবুলানি ফুটবল। ১৫ হাজার টাকা দামের এই বল পেয়েছেন ঢাকার পুরানা পল্টনের তানভির সিকদার, চট্টগ্রামের ফারহান মুহতাসিম সাবাব, রাজশাহীর রাজপাড়ার মো. আদিল হোসেন, ঢাকার মোহাম্মদী হাউজিং লিমিটেডের ওয়াসিম হীরা, ঢাকার দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এ এন এম আলী নেওয়াজ চৌধুরী, আইসিএমএবির শিক্ষার্থী ফরহাদ রেজা, মিরপুরের খোন্দকার এরফান আলী, সিরাজগঞ্জের মো. রাহিদ হাসান, নটর ডেম কলেজের মনোয়ারুল ইসলাম ও নোয়াখালীর মো. জাহাঙ্গীর আলম।
বরিশালে পুরস্কার বিতরণ
ট্রান্সটেক-প্রথম আলো কুইজে বিজয়ী মো. আরিফুর রহমান ও মো. জিয়াউর রহমানের হাতে পুরস্কার এয়ারকন্ডিশনার তুলে দেওয়া হয়েছে। গত মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টায় প্রথম আলোর বরিশাল কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এ পুরস্কার দেওয়া হয়। পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ট্রান্সকম ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড অ্যাপ্লায়েন্স ডিস্ট্রিবিউশনের হেড অব বিজনেস মো. আবদুস ছালাম, সেলস ম্যানেজার মনজুর হোসেন, প্রতিনিধি শেখ মাহবুবুর রহমান, আশিক ইমতিয়াজ বারী, স্থানীয় পরিবেশক মো. শাহজাহান খান।

বিশ্বকাপ কুইজে বিজয়ী যারা

বিশ্বকাপজুড়ে প্রথম আলো পাঠকদের জন্য নানামাত্রিক কুইজের আয়োজন করছে। যেদিন খেলা, সেদিনই পুরস্কার জেতার সুযোগ থাকছে ২৮ জেলার প্রথম আলোর কার্যালয়ে। সাত বিভাগীয় শহরেও আছে প্রতিদিনকার আলাদা আয়োজন। সারা দেশের পাঠকেরা অংশ নিতে পারেন এসএমএস কুইজে। থাকছে সাপ্তাহিক, পর্বভিত্তিক ও অনলাইন কুইজ। মাসজুড়ে ১২টি কুইজে অংশ নিয়ে বিশ্বকাপ শেষে থাকছে মেগা পুরস্কার জিতে নেওয়ার সুযোগ। ১৮তম দিনের কুইজের ফলাফল ছাপা হলো আজ।
এসার-প্রথম আলো বিশ্বকাপ এসএমএস কুইজ
এসার-প্রথম আলো বিশ্বকাপ কুইজে প্রতিদিনের ল্যাপটপ পুরস্কারের ১৮তম দিনের বিজয়ী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. আজম ইকবাল। ৩০ জুন প্রথম আলো কার্যালয়ে ২৯ জুনের কুপনের ড্র অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন বাংলাদেশের সাবেক কৃতী ফুটবলার খন্দকার ওয়াসিম ইকবাল। তিনি নিজে ফোন করে বিজয়ীকে লটারি জেতার সুখবরটি জানান।
ট্রান্সটেক-প্রথম আলো বিশ্বকাপ কুইজ
২৯ জুনের কুপনগুলোর ড্র হয় ৩০ জুন। সেদিনের বিজয়ীদের তালিকা ও সাত বিভাগীয় শহরে প্রথম আলো কার্যালয়ে ড্র অনুষ্ঠানের খবর নিচে দেওয়া হলো। সাত বিভাগীয় শহরের বিজয়ীরা পাবেন একটি করে ডিভিডি প্লেয়ার। পুরস্কার সংগ্রহের জন্য প্রথম আলোর সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে।
ঢাকা: সাউদ রহমান, ইন্দিরা রোড, তেজগাঁও, ঢাকা।
চট্টগ্রাম: আবদুল কাদের, জামালখান।
খুলনা: সোমাইয়া ইসলাম, মুজগুন্নি।
বরিশাল: শামসুন্নাহার পান্না, আগরপুর রোড।
রাজশাহী: নূর আলম, ভাটাপাড়া, লক্ষ্মীপুর।
সিলেট : রায়হান আহমদ, শাহী ঈদগাহ।
রংপুর : মনি, নূরপুর।
নাভানা ইন্টারলিঙ্কস-প্রথম আলো ফুটবল কুইজ
নাভানা ইন্টারলিঙ্কস-প্রথম আলো ফুটবল কুইজে এসএমএস করে লটারির মাধ্যমে বিশ্বকাপের অফিশিয়াল ফুটবল ‘জাবুলানি ফুটবল’ জিতে নিয়েছেন বগুড়ার জয়পুরার আবদুুল হামিদ। পেশায় তিনি ব্যবসায়ী।
এসকেএফ-প্রথম আলো প্রতিদিনের কুইজ
গত ১৫ জুনের কুপনগুলোর ড্র হয় ১৬ জুন। সেদিনের বিজয়ীদের তালিকা ও ২৮ জেলা শহরে প্রথম আলো কার্যালয়ে ড্র অনুষ্ঠানের খবর নিচে দেওয়া হলো। এই তালিকার সব বিজয়ীকে পুরস্কার সংগ্রহের জন্য প্রথম আলোর সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে।
ঢাকা: প্রথম: ফিরোজা, ১১ই এভি ১/এ/১ মিরপুর; দ্বিতীয়: নাজমুল কবির ফারুক, কাড়িকান্দি বাজার, তিতাস, কুমিল্লা; তৃতীয়: কায়সার মাহমুদ, ৬৯৫ পূর্ব ক্ষনিকদী, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এবং চতুর্থ: মো. মঞ্জুরুল হাসান, ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়।
চট্টগ্রাম: প্রথম: এনায়েত উল্ল্যা, দেওয়ান বাজার; দ্বিতীয়: মো. তাজুল ইসলাম, কদমতলী; তৃতীয়: মোহাম্মদ জাবেদ, নন্দনকানন ১ নম্বর গলি এবং চতুর্থ: মোহাম্মদ খোরশেদ, আসদগঞ্জ।
খুলনা: প্রথম: ফাইরুজ মালিহা, খালিশপুর; দ্বিতীয়: ফারজানা রহমান, বাগমারা; তৃতীয়: তাসলিমা, পশ্চিম বানিয়াখামার এবং চতুর্থ: আমিরুল, নিরালা। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাবেক কৃতী খেলোয়াড় এবং সরকারি বিএল কলেজের দর্শন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাধব চন্দ্র রুদ্র।
বরিশাল: প্রথম: মো. মুনির হোসেন, চরকরঞ্জী; দ্বিতীয়: মো. রেজাউল, আমতলা; তৃতীয়: স্মরণ রায়, দ্বীনবন্ধু সেন রোড এবং চতুর্থ: মো. খান শাকিল।
রাজশাহী: প্রথম: মো. রাজিবুল হাসান, সাহেব বাজার; দ্বিতীয়: মো. নিশাল আলী, নতুন বিলশিমলা; তৃতীয়: উত্তম কুমার, রানীবাজার এবং চতুর্থ: মো. রাজু আহম্মেদ, রাজশাহী কলেজ হোস্টেল। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ বেতার রাজশাহীর উপ-আঞ্চলিক পরিচালক হাসান আক্তার।
সিলেট: প্রথম: আজম, স্টেশন রোড; দ্বিতীয়: সিন্টু রঞ্জন চন্দ, কাজিরবাজার; তৃতীয়: বিজয় চন্দ, কাজিরবাজার এবং চতুর্থ: মো. ছাদিকুর রহমান, দাড়িয়াপাড়া। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কবি তুষার কর ও সুরঞ্জিত তালুকদার।
রংপুর: প্রথম: নূরুজ্জামান হোসেন, কেরানীপাড়া; দ্বিতীয়: সায়দা সায়মা আজগারী, মুন্সিপাড়া; তৃতীয়: মো. ফারজুন, কাচারিবাজার এবং চতুর্থ: মেফতাহুল জান্নাত সুপ্তি, সাতগাড়া। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাবেক কৃতী খেলোয়াড় তৌহিদুল ইসলাম।
দিনাজপুর: প্রথম: দিনা সুলতানা, ৯/১০ উপশহর; দ্বিতীয়: আনু, পার্বতীপুর; তৃতীয়: মকবুল হোসেন, ৪ নম্বর উপশহর এবং চতুর্থ: ইফতেখার আহমেদ, ৭ নম্বর উপশহর। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট ক্রীড়াবিদ উলফত উর রহমান।
ময়মনসিংহ: প্রথম: কাজল, সি কে ঘোষ রোড; দ্বিতীয়: মো. লুৎফর রহমান, আকুয়া মাদ্রাসা কোয়ার্টার; তৃতীয়: লাভলী, কলেজ রোড এবং চতুর্থ: মো. ইয়াছিউর আমিন, পুলিশ লাইন ।
যশোর: প্রথম: আফরোজা আকতার, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ; দ্বিতীয়: এশা, চুড়িপট্টি; তৃতীয়: তিথি, ঘোপ এবং চতুর্থ: শামীম আকতার, হাইকোর্ট মোড়। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যশোর ইনস্টিটিউটের সাধারণ সম্পাদক শেখ রবিউল আলম।
ফরিদপুর: প্রথম: ওয়ারলেসপাড়া এলাকার নিলয় নন্দী; দ্বিতীয়: শীতল বণিক, সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ; তৃতীয়: মানিক মোড়ল, নিলটুলি এবং চতুর্থ: আরিফুল ইসলাম, আ. করিম মিয়া সড়ক ।
কুমিল্লা: প্রথম: মো. নুরে আলম, কান্দিরপাড়; দ্বিতীয়: মো. মাছুম, মনোহরপুর; তৃতীয়: জাবেদ খন্দকার, চাঁপাপুর এবং চতুর্থ: মো. ফয়েজ আহমদ, উজিরদিঘীর পাড়। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় দলের ফুটবল খেলোয়াড় ও কুমিল্লার কৃতী সন্তান এনামুল হক শরীফ।
পাবনা: প্রথম: বদরুন নাহার, মকছেদপুর; দ্বিতীয়: নুসরাত জাহান প্রমা, কালাচাঁদপাড়া; তৃতীয়: আল খালিদ, মোল্লা ছাত্রাবাস এবং চতুর্থ: মো. আশরাফুল ইসলাম, আলেয়া ছাত্রাবাস। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ক্রীড়া সংগঠক ও পাবনা মেডিকেল কলেজের প্রভাষক মো. রাহেনুল ইসলাম।
বগুড়া: প্রথম: আবদুর রশিদ, খান্দার; দ্বিতীয়: মঞ্জুরুল মোর্শেদ, মালতীনগর; তৃতীয়: আসাদুজ্জামান শামীম, ঠেঙ্গামারা এবং চতুর্থ: মনিরুল আলম, গণ্ডগ্রাম। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বগুড়া আইনজীবী সমিতির সদস্য আবদুল লতিফ।
কক্সবাজার: প্রথম: ইব্রাহিম খলিল, জামে মসজিদ সড়ক; দ্বিতীয়: টিটু দাশ, খুরুশকুল; তৃতীয়: মো. ফারুক, ঝাউতলা এবং চতুর্থ: মো. আকতার হোসেন, লাইট হাউসপাড়া । ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ফুটবল খেলোয়াড় নুরুল আবছার ও শিক্ষক আবদুল আমিন।
রাঙামাটি: প্রথম: ত্রিজীবন চাকমা, পাবলিক হেলথ এলাকা; দ্বিতীয়: ম্যাকলি চাকমা, তবলছড়ি; তৃতীয়: অন্তর চাকমা, বনরুপা এবং চতুর্থ: সুজল দেওয়ান, রিজার্ভ বাজার। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাঙামাটি জজ আদালতের সহকারী সরকারি কৌঁসুলি ভবতোষ দেওয়ান।
নোয়াখালী: প্রথম: আবু নাসের মঞ্জু, নোয়াখালী প্রেসক্লাব; দ্বিতীয়: বাহার, মাইজদী; তৃতীয়: তাসলিম আহমেদ, দত্তেরহাট এবং চতুর্থ: তানজিদা নূর, মাইজদী কোর্ট। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সেনবাগ প্রেসক্লাবের সভাপতি খোরশেদ আলম।
ফেনী: প্রথম: হাসান, এসএসকে রোড; দ্বিতীয়: মনোয়ার হোসেন স্বপন, আইনজীবী মার্কেট; তৃতীয়: নুসায়বা, উত্তর ডাক্তারপাড়া এবং চতুর্থ: স্বপন কুমার সূত্রধর, চৌদ্দগ্রাম। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজাপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. মমিনুল হক।
কুষ্টিয়া: প্রথম: তুহিন ইকবাল, আড়ুয়াপাড়া; দ্বিতীয়: রাসেল, থানাপাড়া; তৃতীয়: আবদুুল্লাহ ইবনে আসাদ, হাউজিং এ-ব্লক এবং চতুর্থ: বাপ্পী, রথখোলা মোড়। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জেলা ফুটবল দলের কোচ আলমগীর কবীর হেলাল।
কিশোরগঞ্জ: প্রথম: মো. আসাদুল হাসান আসাদ, নগুয়া; দ্বিতীয়: এসনাহার, বগাদিয়া; তৃতীয়: মো. রোমান হোসেন, নূরানী সড়ক এবং চতুর্থ: মো. মুসলেহ উদ্দিন, কানিকাটা। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল সরকারি কলেজের উপাধ্যক্ষ মো. ফজলুল হক সাগর।
কুড়িগ্রাম: প্রথম: মো. রিয়াজ আহাম্মেদ নাগেশ্বরী; দ্বিতীয়: মো. সামছুল আলম সুমন, কুড়িগ্রাম ক্লিনিক হাসপাতাল রোড; তৃতীয়: মোখলেছুর রহমান, ঘোষপাড়া এবং চতুর্থ: আবদুুল্ল্যাহ আল মামুন, ঘোষপাড়া।
সিরাজগঞ্জ: প্রথম: মো. আবদুর রহমান, নান্দিলা; দ্বিতীয়: রুহুল আমিন, মুক্তি ছাত্রাবাস; তৃতীয়: আবুল হাসেম, জোহা হল এবং চতুর্থ: বিউটি সাহা, শাহজাদপুর। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জেলা নাট্য সমন্বয় পরিষদের সভাপতি শিল্পকলা একাডেমীর যুগ্ম সম্পাদক, বিশিষ্ট নাট্যকার ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব প্রণব কুমার চৌধুরী।
বরগুনা: প্রথম: হাদিসুর রহমান, মাইঠা; দ্বিতীয়: রফিক, ক্রোক; তৃতীয়: তাপসী রাবেয়া, নজরুল ইসলাম রোড এবং চতুর্থ: গোলাম রসুল, ডিকেপি রোড।
ভৈরব: প্রথম: আর এ রোমান, কালিপুর; দ্বিতীয়: সবুজ মিয়া, বন্ধু টেলিকম; তৃতীয়: আরিফুল ইসলাম, রসুলপুর এবং চতুর্থ: মনিষা পাল, রানীবাজার। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন চাঁদের হাট আশুগঞ্জ শাখার আহ্বায়ক সেলিম পারভেজ।
পটুয়াখালী: প্রথম: নেছার আহমেদ, পুরান বাজার; দ্বিতীয়: আতিকুর রহমান, শ্রীরামপুর; তৃতীয়: মিন্টু কান্তি, সবুজবাগ এবং চতুর্থ: আদনান হাবিব, চরপাড়া। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পটুয়াখালীর একেএম কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক অশোক দাস।
টাঙ্গাইল: প্রথম: শফিকুল ইসলাম, রেজিস্ট্রিপাড়া; দ্বিতীয়: মারিয়া, কলেজপাড়া; তৃতীয়: পিংকি, নিরালার মোড় এবং চতুর্থ: সোলায়মান, কলেজপাড়া। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রঞ্জন সাহা পার্থ।
সাতক্ষীরা: প্রথম: নাহিদ হাসান, আবদুুর রহমান মেস; দ্বিতীয়: মৃনাল কান্তি বৈরাগী, কাছারিপাড়া; তৃতীয়: ফাতিমাতুজ জোহারা সেতু, উত্তর পলাশপোল এবং চতুর্থ: মো. আসাদ, মধুমোল্যার ডাঙ্গী। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাবেক ফুটবল খেলোয়াড় মাধব দত্ত।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ: প্রথম: বিপ্লব, শিবতলা; দ্বিতীয়: মিনহাজ, পুরাতন জেলখানা রোড; তৃতীয়: শচীন কুমার পাল, রাজারামপুর এবং চতুর্থ: আমিরুল ইসলাম, নামো শংকর বাতি। ড্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাদা মনের মানুষ কানাই চন্দ্র দাস।

তেভেজের চোখে ট্রফির ছবি

মাঠের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে বিদ্যুৎ চমকের মতো দৌড়ে যান তিনি। দলের প্রয়োজনে খেলা তৈরি করেন, আবার বিপক্ষের রক্ষণকে স্রেফ চুরমার করে দেন। এমনকি প্রয়োজন হলে দু-একটা গোলও করে ফেলতে পারেন।
শৈশবে দারিদ্র্য, হানাহানি দেখে বড় হয়ে ওঠা এই ফুটবলারটির মধ্যে কোথায় যেন একটা বাড়তি আকর্ষণ লুকানো আছে। যে কারণে লিওনেল মেসি, গঞ্জালো হিগুয়েইন, সার্জিও আগুয়েরোদের ছাপিয়ে আর্জেন্টিনার জনপ্রিয়তম ফুটবলার হয়ে ওঠেন কার্লোস তেভেজ।
তেভেজের জনপ্রিয়তা, তাঁকে দলে খেলানোর জন্য মানুষের চাপ দেখে বিস্মিত ডিয়েগো ম্যারাডোনা ঘোষণা করেছেন, তেভেজ ‘জনগণের খেলোয়াড়’! ঘোষণাটা শুনে যারপরনাই আপ্লুত ম্যানচেস্টার সিটির স্ট্রাইকারটি।
কোচ কিংবদন্তি ম্যারাডোনার কাছ থেকে এই খেতাব পেয়ে নিজেকে যেন নতুন করে বুঝতে পারছেন তেভেজ, ‘আমি খুবই খুশি হয়েছি। আমি যেভাবে খেলি, যেভাবে প্রতিটি বলের জন্য, প্রতিটি চ্যালেঞ্জের জন্য নিজের সবটুকু উজাড় করে দিই; সেটা লোকেরা বুঝতে পেরেছে বলেই আমাকে এটা বলা হয়। আশা করি, বাকি সবার সঙ্গে মিলে আমাদের দেশের মানুষের জন্য সত্যিকার একটা উৎসবের উপলক্ষ নিয়ে আসব।’
নিজের বর্তমান ফর্ম দিয়ে, বিশেষ করে, সর্বশেষ ম্যাচটায় মেক্সিকোর বিপক্ষে যা খেলেছেন, তাতে এমন আশা করতেই পারেন ‘এল অ্যাপাচি’। জোড়া গোল করা ওই ম্যাচটার আনন্দ এখনো ভুলছেন না তেভেজ, ‘আন্তর্জাতিক খেলোয়াড় হিসেবে এটাই আমার সেরা ম্যাচ। কারণ, আমি দুই গোল করেছি এবং সেটা বিশ্বকাপের একটা ম্যাচে করেছি। কিন্তু এই নিয়ে আমি সন্তুষ্ট হতে পারছি না। আমি দলের জন্য আরও অনেক কিছু করতে চাচ্ছি।’
সেই ‘অনেক কিছু’টা কী, তা নিয়ে কোনো রাখঢাক নেই তেভেজের মুখে। এখন প্রতিরাতে নাকি একটাই স্বপ্ন দেখছেন তেভেজ—বিশ্বকাপ ট্রফির স্বপ্ন, ‘প্রতিরাতে আমি স্বপ্ন দেখি মাথার ওপর ট্রফিটা উঁচু করে ধরেছি, আমার কাছ থেকে কেউ সেটা নিতে পারছে না। কিন্তু কি জানেন, এই বিশ্বকাপে আগে আমরা ছাড়া আমাদের নিয়ে এই স্বপ্ন কেউ দেখেনি। আর এখন? সবাই, বিশেষ করে, হেভিওয়েট দলগুলো পর্যন্ত বলছে, আমরাই নাকি ফেবারিট!’
কিন্তু তেভেজের এই স্বপ্ন বাস্তব করতে গেলে যে জার্মানির বাধাটা আগে পার হতে হবে! গতবার তেভেজ নিজেই তো এই জার্মানির কাছে টাইব্রেকারে হেরে ফেরার সাক্ষী হয়ে আছেন। আরেকবার সেই কষ্টে পুড়তে হবে না তো?
তেভেজ এই কথা শুনতে রাজি নন, ‘আমি কেন ভাবব না, আমি বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হব? ট্রফি ছাড়া অন্য সবকিছুই হবে আমার জন্য প্রচণ্ড কষ্টের হবে। শনিবার যদি কোনো কারণে হেরে যাই, সে কষ্ট আমি সহ্য করতে পারব না।’

সুন্দরের পাশে অসুন্দরও

কখনো চোখ জুড়াল, কখনো চোখ কচলাতে হলো। পরশু রাতের স্পেন দিয়ে গেল দুরকম অনুভূতিই।
সুন্দর ফুটবলের পূজারি হয়ে ওঠা ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নদের চেনা গেল দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকে। তখনই তাদের অন্যরকম লাগছিল। ছন্দ পেয়ে টগবগ করেছে গোটা দল। ‘স্পেন সুন্দর ফুটবল খেলে’—সার্টিফিকেট পাওয়ার যোগ্যতাটা এই অর্ধেই তারা প্রমাণ করল।
বল পজেশন, দ্রুত প্রান্ত বদল করা, প্রতিপক্ষ রক্ষণ এলোমেলো করে দেওয়া, এগুলো সবই ছিল। ওয়ান টু ওয়ান টু করে একবার ডানে, আবার বাঁয়ে—দেখতে অসম্ভব ভালো লেগেছে। বলের ওপর স্প্যানিয়ার্ডদের নিয়ন্ত্রণ কত সুন্দর, বোঝা গেল তখনই।
কিন্তু গোলে শট ছিল খুবই কম। একটা কারণ হতে পারে, একশ ভাগ নিশ্চিত না হয়ে মারতে চায়নি তারা। সে কারণে বল চালাচালি করে কোনো ফল আসেনি। এটা বিরক্তিকর লেগেছে। কিন্তু যতই ভালো খেলুক, গোলে তো শট নেওয়া চাই। ইনিয়েস্তা-জাভিরা শট নেয়নি কেন, বোধগম্য নয়। ভিয়া আবারও ব্যতিক্রম। সে-ই দেখলাম গোলে শট নেওয়ার চেষ্টা করছে। গোলও পেল ওই ভিয়াই।
পর্তুগালের রক্ষণ অসাধারণ। টানা অনেক ম্যাচে গোল না খাওয়া, দারুণ গোলকিপিং, গোলরক্ষকের সঙ্গে ডিফেন্ডারদের বোঝাপড়া, ব্লকিং মিলে দলটির রক্ষণ দুর্ভেদ্য এক দেয়ালে পরিণত হয়েছিল। রক্ষণে ফাঁক বের হলেও প্রস্তুত ছিল গোলকিপার। স্পেনের গোটা তিনেক নিশ্চিত সুযোগ নস্যাৎ করেছে সে। রক্ষণ আর গোলরক্ষকের বদৌলতেই পর্তুগাল এত দূর এসেছে—এটা বললে বোধহয় ভুল হবে না।
তাহলে রোনালদো? তার কথা না বলাই ভালো। পৃথিবীর সবচেয়ে দামি ফুটবলারটি কোনো অবদানই রাখতে পারল না দলের জন্য। নিষ্প্রভ এক রোনালদো ছিল মাঠে, যে শুধু ফ্রি-কিক নিচ্ছে। এ ছাড়া আর করবেই-বা কী! জোনাল মার্কিংয়ে পড়ে রোনালদো যে বোতলবন্দী। জায়গা পরিবর্তনের চেষ্টা করেছে সে, কিন্তু আগাগোড়া কড়া মার্কিংয়ে থেকে সেই চেষ্টা বিফল।
প্রথম ১০-১৫ মিনিট স্পেন স্পেনের মতো খেলল না, যা অবাক করেছে আমাকে এবং খুবই ‘অসুন্দর’ লাগছিল স্পেনকে। শুরু থেকেই একটু লম্বা খেলার চেষ্টা করল, পর্তুগালও তা-ই। দুদলের সৌজন্যেই তখন প্রচুর মিস পাস। ফ্লাংকের দিকে বেশি গিয়েছে দুদলই। পর্তুগাল বাঁ দিকের ফ্লাংকটা বেশি ব্যবহার করেছে। এই করতে করতে প্রথম ২২-২৩ মিনিট খেলাটা একদমই ভালো লাগল না।
আগের ম্যাচগুলো দেখে জাপানের ব্যাপারে বাড়তি প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেটি তারা নিজেরাই শেষ করে দিল। বাতাসে বলের দখলে জাপান জেতেনি। গতিতেও হার। ভালো খেলেনি প্যারাগুয়েও। দুদলই খেলল ছন্নছাড়া ফুটবল। উদ্দেশ্যবিহীন লাথালাথি আরকি!
তিনটি পাস একসঙ্গে কারওই ঠিকমতো হয়নি। লাতিন দল হিসেবে প্যারাগুয়ের খেলায় সেই বল পজেশন, বল নিয়ন্ত্রণ—এসব তো ছিলই না। বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে এমন ম্যাচ!

বিদায় রোনালদো

টেলিভিশন ধারাভাষ্যকার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করে জনপ্রিয় অভিনেতা, সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন রোনাল্ড রিগ্যান। দারুণ বর্ণময় এই মানুষটি দুনিয়ার আরও অনেক মানুষের মতো প্রভাবিত করেছিলেন পর্তুগালের এক মালি হোসে ডিনিস অ্যাভেইরোকে।
রিগ্যানের নামেই ডিনিস তাঁর ছেলের নাম রাখলেন ‘রোনাল্ডো’। ২০০৪ সালে দুনিয়ার সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট রিগ্যান যখন মারা গেলেন, ইংল্যান্ডে বসে তখন ‘রাজত্ব’ শুরু করেছেন তাঁর নামের সেই ছেলেটি। সেই ‘রাজত্ব’ এত বড় হলো যে অনেকেই আলোচনা শুরু করে দিলেন—এই ছেলেটিই বর্তমান সময়ের সেরা ফুটবলার।
সেই ছেলেটির নাম ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। বর্তমান সময়ের সেরা ফুটবলার রোনালদো কি না, এ নিয়ে তর্ক চলতে পারে। কিন্তু নিজেকে তর্কাতীত করে ফেলার একটা সুযোগ এসেছিল রোনালদোর সামনে।
সে সুযোগ নিতে পারলেন না রোনালদো। নিজের পারফরম্যান্স মাঝারি মানেরই রইল, দল বিদায় নিল দ্বিতীয় পর্ব থেকে। সব মিলিয়ে হতাশায়, ক্ষোভে ভেঙে পড়লেন রোনালদো। সেই হতাশার বহিঃপ্রকাশও ঘটল। স্পেনের বিপক্ষে হারের পর সাংবাদিকেরা রোনালদোকে ঘিরে ধরেছিলেন। সাবেক বিশ্বসেরা ফুটবলারের কাছ থেকে সবাই হারের ব্যাখ্যা চাচ্ছিলেন। কিন্তু চটে উঠলেন রোনালদো। মিক্সড জোনে দাঁড়িয়ে বলে উঠলেন, ‘আমি কী করে পর্তুগালের বিদায়ের ব্যাখ্যা দেব? যান, কার্লোস কুইরোজের সঙ্গে কথা বলুন।’
রোনালদোর ফেটে পড়ার কারণটা বোঝা যায়। অনেক অনেক প্রত্যাশার চাপ নিয়ে বিশ্বকাপে খেলতে এসেছিলেন। চাপ ছিল ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সেরও। ২০০৮ সালের ফিফা বর্ষসেরা ও ২০০৯ সালের দ্বিতীয় সেরা রোনালদোকে লড়তে হচ্ছিল নিজের সঙ্গেই।
২০০৭-০৮ মৌসুমে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে সব মিলিয়ে ৪৯ ম্যাচে ৪২ গোল করেছিলেন। পরের মৌসুমে ম্যানইউতেই নিজেকে একটু হারিয়ে খুঁজছিলেন। গত মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদে এসে আবার খুঁজে পেলেন ফর্মটা। ফলে বিশ্বকাপে নিজেকে প্রমাণের চাপও গেল বেড়ে।
কৈশোরে বাবাকে মদে চুর হয়ে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেতে দেখেছেন। ফুটবল থেকে টাকা আয় করে বাড়ি পাঠিয়েছেন বাবার চিকিৎসার জন্য, বাবা সেই টাকা দিয়ে আরও মদ খেয়েছেন। শেষ পর্যন্ত বাবার অকাল মৃত্যু দেখেছেন। এমন সব ধাক্কা সামলানো রোনালদোর ওপর আরও চাপ হয়ে এসেছিল পর্তুগালের দীর্ঘদিনের অপূর্ণ স্বপ্ন। ইউসেবিও পারেননি, পারেনি পর্তুগালের সোনালি প্রজন্ম। তাই পর্তুগিজরা যেন হামলে পড়েছিল রোনালদোর ওপর—‘আমাদের কিছু একটা এনে দিতে হবে।’
চাপটা কি ভেঙে ফেলল রোনালদোকে? এক কথায় উত্তর দেওয়া কঠিন। ফিফার ওয়েবসাইট বলছে, বিদায়ের আগ পর্যন্ত দারুণ খেলেছেন এই পর্তুগিজ উইঙ্গার। গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচেই ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়েছেন। কিন্তু যাঁরা খেলা দেখেছেন, এই তথ্যের সঙ্গে একমত হওয়ার লোক হয়তো খুব বেশি পাওয়া যাবে না।
অন্তত ম্যানইউতেই ডিফেন্স ভেঙেচুরে বিদ্যুৎ চমকের মতো যাঁরা রোনালদোকে ছুটতে দেখেছেন, তাঁরা এই রোনালদোকে কেন ‘সেরা’ বলে মানবেন! এটা ঠিক যে কিছু গোল তৈরি করে দিয়েছেন, নিজে একটা গোল করেছেন, দু-একটা ঝলকও দেখিয়েছেন; কিন্তু সেই রোনালদোকে যে দেখা যায়নি!
রোনালদোকে দেখা গেল না শেষ ম্যাচেও। নিজেই বিশ্বকাপ থেকে এমন বর্ণহীন বিদায় মেনে নিতে পারছিলেন না। সে জন্যই কি অমন চটে উঠলেন সাংবাদিকদের ওপর? রোনালদো অবশ্য অন্য ব্যাখ্যা দিলেন, ‘একটু পর কার্লোস কুইরোজের সংবাদ সম্মেলন ছিল বলেই আমি কোচকে জিজ্ঞেস করতে বলেছিলাম। কারণ, ওই সময়ে আমি কোনো ব্যাখ্যা দেওয়ার মতো অবস্থায় ছিলাম না। আমি কখনো কল্পনাই করিনি, আমার এই নিরীহ বাক্যগুলো এত বিতর্ক তৈরি করবে। আমি আপনাদের অনুরোধ করি, সব জায়গায় ভুত খুঁজে বের করার চেষ্টা করবেন না।’
তবে শেষ বেলায় নিজের হতাশাটা আর গোপন করতে পারলেন না, ‘আমি খুবই কষ্ট পাচ্ছি। আমার তো একা একা কষ্ট পাওয়ার অধিকারটা অন্তত আছে। আমি একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে গেছি, পুরোপুরি বিধ্বস্ত।’

এসিসির সভাপতি হলেন মোস্তফা কামাল

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) সভাপতি আ হ ম মোস্তফা কামাল এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলেরও (এসিসি) সভাপতির দায়িত্ব পেলেন। কাল সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত এসিসির সভায় পিসিবি সভাপতি ইজাজ বাটের কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝে নেন তিনি।
এশিয়ার চারটি টেস্ট খেলুড়ে দেশ থেকে পালাক্রমে মনোনীত করা হয় এসিসি সভাপতি। গত দুই বছর যেমন ছিলেন ইজাজ বাট। মোস্তফা কামালও দুই বছরের জন্য সভাপতি হয়েছেন। এসিসির ২১তম সভাপতি মনোনীত হওয়ার পর এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, ‘আমি মনে করি বাংলাদেশের জন্য এটা অনেক বড় একটা সম্মান। এশিয়ার ক্রিকেটকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে আমি এসিসির সব সদস্য দেশের সাহায্য কামনা করছি।’
এসিসির নতুন সভাপতিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন বিসিবির সব পরিচালক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

আবার ইংল্যান্ডে গেল বাংলাদেশ দল

এশিয়া কাপের জন্য দুই ভাগ হয়ে গিয়েছিল সিরিজটা। মে-জুনে ইংল্যান্ডে দুই টেস্টের সিরিজ খেলে আসা বাংলাদেশ দল তাই কাল ভোরে আবার ইংল্যান্ড গেল তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ খেলতে। ইংল্যান্ড থেকে মাশরাফি বিন মুর্তজার দল যাবে আয়ারল্যান্ড ও স্কটল্যান্ড।
৩ ও ৫ জুলাই সাসেক্স আর মিডলসেক্সের সঙ্গে দুটি প্রস্তুতি ম্যাচ শেষে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশ প্রথম ওয়ানডে খেলবে ৮ জুলাই। ১২ জুলাই ইংল্যান্ড সিরিজ শেষে আয়ারল্যান্ডে দুটি ওয়ানডে খেলতে যাবে তারা। এরপর আছে স্কটল্যান্ডে স্বাগতিক স্কটল্যান্ড ও হল্যান্ডের বিপক্ষে আরও দুটি ওয়ানডে।
দলের সঙ্গে কালই ইংল্যান্ডের বিমানে ওঠেননি সহ-অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। ভিসা-প্রক্রিয়া দেরিতে শুরু করায় যেতে পারেননি পেসার নাজমুল হোসেনও। ফিল্ডিং কোচ মিজানুর রহমানের সঙ্গে নাজমুল ইংল্যান্ড যাবেন আজ, কাল যাবেন সাকিব।
ইংল্যান্ডে বাংলাদেশ দলের সঙ্গে কাজ করবেন অস্ট্রেলিয়ান বোলিং কোচ জোসেফ স্কুডেরি। বিসিবি সূত্র জানিয়েছে, সিরিজ শুরুর আগে সাবেক ভারতীয় অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলীও বাংলাদেশ ব্যাটসম্যানদের কিছু টিপস দিতে পারেন।

ফিকশ্চার
ম্যাচ প্রতিপক্ষ ভেন্যু
৩ জুলাই প্রস্তুতি ম্যাচ সাসেক্স হোভ
৫ জুলাই প্রস্তুতি ম্যাচ মিডলসেক্স ট্রেন্ট ব্রিজ
৮ জুলাই ১ম ওয়ানডে ইংল্যান্ড ট্রেন্ট ব্রিজ
১০ জুলাই ২য় ওয়ানডে ইংল্যান্ড ব্রিস্টল
১২ জুলাই ৩য় ওয়ানডে ইংল্যান্ড এজবাস্টন
১৫ জুলাই ১ম ওয়ানডে আয়ারল্যান্ড বেলফাস্ট
১৯ জুলাই ওয়ানডে স্কটল্যান্ড গ্লাসগো
২০ জুলাই ওয়ানডে হল্যান্ড গ্লাসগো

লোর ‘ফেবারিট’ আর্জেন্টিনা

কী বলবেন একে? অক্টোপাসের দেশপ্রেম! নাকি সত্যি সত্যিই ত্রিকালদর্শী ক্ষমতা আছে ওটার? প্রমাণ হয়ে যাবে আগামী পরশু। কোয়ার্টার ফাইনালে যদি আর্জেন্টিনা জেতে, বোঝা যাবে, পল নামের এরই মধ্যে বিখ্যাত হয়ে ওঠা ওই অক্টোপাস আসলে ‘নুন খাই যার, গুণ গাই তার’ নীতিতে বিশ্বাসী। আর জার্মানি জিতলে বোঝা যাবে, গুণিন অক্টোপাসের ক্ষমতা আছে বটে! ওয়েবসাইট।
জার্মানির অক্টোপাস পল এখন পর্যন্ত নাকি ভবিষ্যদ্বাণীর ক্ষেত্রে শতভাগ নির্ভুল। এমনকি জার্মানি যে সার্বিয়ার কাছে হারবে তারও আগাম বার্তা দিয়ে রেখেছিল আট-পেয়ো জন্তুটা। আর্জেন্টিনা-জার্মানি ম্যাচ নিয়ে পলের ভবিষ্যদ্বাণী, ম্যাচটা জিতবে জার্মানরাই!
জ্যোতিষী অক্টোপাস নয়, জার্মান কোচ জোয়াকিম লোর আস্থা তাঁর তরুণ তুর্কিদের ওপর। জার্মানির এই দলটার গড় বয়স ২৪-এর মতো। বেশির ভাগ ফুটবলারই গত বছর অনূর্ধ্ব-২১ দলের হয়ে জিতেছে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ। ইনজুরির কারণে দলের অভিজ্ঞদের বাধ্য হয়েই বাদ দিতে হয়েছে লোকে। এখন তো দেখা যাচ্ছে ইনজুরি জার্মানদের জন্য শাপেবর হয়েই এসেছে। গত ম্যাচে তারকাবহুল ইংল্যান্ড দলটাকে নিয়ে রীতিমতো ছেলেখেলা করল জার্মানির ছেলেরা!
লো তাই বলছেন, ‘দলের মধ্যে বেশ ইতিবাচক একটা আবহ বিরাজ করছে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয় থেকে আমরা অনেক আত্মবিশ্বাসও অর্জন করেছি। দলের অনেক ফুটবলারই অনূর্ধ্ব-২১ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন দলটিতে ছিল। ফলে এ ধরনের টুর্নামেন্টে খেলার জন্য প্রয়োজনীয় আত্মবিশ্বাস ওদের মধ্যে আছে।’
তা-ই তো দেখা যাচ্ছে! অনেকেই ভেবেছিল, তারুণ্যের জয়গান গেয়ে প্রথম রাউন্ড পেরোনো যায়, কিন্তু নকআউট পর্ব শুরু হলে প্রয়োজন পড়ে অভিজ্ঞতার। স্নায়ুর লড়াইও যে এখানে কখনো কখনো ফল নিয়ন্তা হয়ে দাঁড়ায়! জার্মানরা তাই দ্বিতীয় রাউন্ডেই ছিটকে পড়বে। কিন্তু পলের মতো ভবিষ্যদ্বাণী কজনই বা করতে পারে?
দ্বিতীয় রাউন্ড পেরিয়ে জার্মানি এখন কোয়ার্টার ফাইনালে। যেখানে প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনা, টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি গোল করেছে যারা। স্বাভাবিকভাবেই লো খানিকটা বিচলিত। তবে এ নিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকা তো চলে না। আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ডদের রুখে দেওয়ার কৌশলও নাকি বের করে ফেলেছেন তিনি। শিষ্যদের পেনাল্টি শ্যুটআউট অনুশীলন করাচ্ছেন। কে জানে, গত বিশ্বকাপের মতো এবারও হয়তো টাইব্রেকেই গড়াবে ম্যাচ। আর টাইব্রেক মানেই তো জার্মানির জয়!
ম্যারাডোনার দলকে যে যথেষ্ট সমীহ করছেন, সেটি লুকোনোর কোনো চেষ্টাই করেননি লো, ‘ওদের দুর্দান্ত সব খেলোয়াড়। আমার চোখে ওরা টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেবারিট। শুধু লিওনেল মেসি আছে বলেই নয়, ওদের ফরোয়ার্ডরা সবাই ভয়ংকর। আমরা অবশ্য ওদের দুর্বলতাও খুঁজে বের করেছি। সেটি কী, সেই তথ্য আপাতত আমার খেলোয়াড়দের জন্যই তোলা থাক।’
আর্জেন্টিনাকে লো ফেবারিট মানছেন আরেকটি কারণে, ‘এই দলের কোচ হচ্ছেন ম্যারাডোনা, যিনি পুরো দলের জন্য প্রেরণা। দলের সবার হিরো। তাঁর দলও তাই অনেক আত্মবিশ্বাস আর আত্মগৌরবের জন্য খেলে। এদের হারানো কঠিন।’
কোচ যখন প্রতিপক্ষ সম্পর্কে ভালো ভালো বাক্য আউড়ে যাচ্ছেন, জার্মান মিডফিল্ডার বাস্তিয়ান শোয়েনস্টাইগার কিন্তু কথার তোপই দাগালেন। গত বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল শেষে এই দুই দলের মধ্যে হাতাহাতি লেগে গিয়েছিল প্রায়। সেই প্রসঙ্গ টেনে এনে বললেন, আর্জেন্টিনা দলটি প্রতিপক্ষকে প্রাপ্য সম্মান দিতে জানে না।

ইংল্যান্ডের সামনে অস্ট্রেলিয়ার চ্যালেঞ্জ

২১, ১৩, ৩—ইংল্যান্ডের বিপক্ষে গত তিনটি ওয়ানডেতে রিকি পন্টিংয়ের ব্যাট একটুও হাসেনি। টানা তিন ম্যাচ হেরে পাঁচ ম্যাচের সিরিজও হাতছাড়া হয়ে গেছে অস্ট্রেলীয় অধিনায়কের। তবে কাল তিনি রান পেলেন, ৮ রানের জন্য সেঞ্চুরি মিস করলেও একটা চ্যালেঞ্জিং স্কোরই ছুড়ে দিয়েছেন ইংল্যান্ডকে। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কেনিংটনে ৫০ ওভারে ৫ উইকেটে ২৯০ রান তুলেছে অস্ট্রেলিয়া। পন্টিং ছাড়াও তাতে বড় অবদান মাইকেল ক্লার্কের। তৃতীয় উইকেটে ১৫৫ রানের জুটি গড়েন দুজন। যদিও ক্যারিয়ারের পঞ্চম সেঞ্চুরিটি অল্পের জন্য পাননি ক্লার্ক, ১০৬ বলে ৯৯ রানে অপরাজিত ছিলেন তিনি। ওপেনার শেন ওয়াটসন করেছেন ৪১ রান।

‘দৃশ্যত ফুরিয়ে গেছেন’ রোনালদো

বিশ্বকাপ শেষ হয়ে গেছে তাঁর। কিন্তু ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা এত সহজে শেষ হওয়ার নয়। মিক্সড জোনে সাংবাদিকদের কাছে, কোচ কার্লোস কুইরোজ সম্পর্কে রাগান্বিত প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন। এবার শোনা যাচ্ছে, মাঠ ছেড়ে বের হওয়ার সময় নাকি থুথু ছিটিয়ে দিয়েছিলেন তাঁকে অনুসরণ করতে থাকা টেলিভিশন ক্যামেরাম্যানের দিকে!
ক্যামেরাম্যানের দিকে আক্রমণাত্মক ভঙ্গি করে মাঠ ছেড়েছিলেন ওয়েইন রুনিও। এবার রোনালদো সেই একই কাজ নাকি করেছেন স্পেনের কাছে হেরে মাঠ ছাড়ার সময়। রুনি পরে ক্ষমা চেয়েছিলেন। রোনালদো ক্ষমা চাইবেন কিনা পরের কথা।
তবে ক্ষমা চাইলেও রোনালদো বোধহয় পার পাচ্ছেন না দেশের সংবাদমাধ্যমের কাছে। পর্তুগালের বিদায় এবং রোনালদোর নিষ্প্রভ পারফরম্যান্সে খুব চটেছে পর্তুগিজ সংবাদমাধ্যম। পর্তুগালের এই ‘করুণ’ পরিণতির দায় পুরোটাই এখন চাপছে রোনালদোর কাঁধে।
কোরেইয়ো দা মানহা পত্রিকা লিখেছে, ‘রোনালদো জাতীয় দলের হয়ে তার জীবনের জঘন্যতম ম্যাচটা খেললেন।’ পাবলিকো পত্রিকায় লেখা হয়েছে, ‘এই বিশ্বকাপ রোনালদোকে পরিষ্কার মিস করল। মরিনহো (রিয়াল মাদ্রিদের পর্তুগিজ কোচ) বলেছিলেন, রোনালদো ঘণ্টায় ১০০০ কিলোমিটার গতিতে ছুটলেও পর্তুগাল বিশ্বকাপ জিতবে না। কিন্তু সে তো ক্রুজ শিপের গতিতেও ছুটতে পারল না!’
দিয়ারিও দে নতিসিয়াস (ডিএন) পত্রিকার সম্পাদক লিখেছেন, সাবেক ম্যানইউ তারকা রোনালদো ‘দৃশ্যত ফুরিয়ে গেছেন’। ক্রীড়া দৈনিক আ বোলা প্রায় একই ভাষায় লিখেছে, ‘কোনো ছাপ না রেখেই বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলেন রোনালদো।’ রেকর্ড পত্রিকা তাদের প্রথম পাতায় হতাশ রোনালদোর বিরাট একটা ছবি ছাপিয়ে হেডিং করেছে, ‘সেরা সময়েই আমাদের ছেঁটে ফেলা হলো।’
তবে সবাই যে দায়টা পুরোপুরি রোনালদোর ওপর চাপাচ্ছেন, তা নয়। কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমের বলি হচ্ছেন আবার কোচ কার্লোস কুইরোজ। ডিএন শিরোনাম করেছে, ‘কুইরোজের ভুলে পর্তুগালের বিদায়।’ তারা ভুল বলতে মূলত স্ট্রাইকার হুগো আলমেইদাকে তুলে নেওয়ার কথাই বলছে। পত্রিকাটি কুইরোজকে বলেছে, ‘উচ্চাকাঙ্ক্ষাহীন কোচ’।
আলমেইদাকে তুলে নেওয়ায় কুইরোজের সমালোচনা করেছে কোরেইয়ো দা মানহাও। তারা লিখেছে, ‘৫৮ মিনিটে হুগো আলমেইদাকে তুলে নিয়ে স্পেনের বিপক্ষে পরাজয়ের দুয়ার খুলে দেওয়া হয়েছে।’
তবে কোচ-অধিনায়কের কপালে নিন্দা জুটলেও প্রশংসা পেয়েছেন গোলরক্ষক এদুয়ার্দো। ডিএন লিখেছে, ‘এদুয়ার্দো দৈত্য হয়ে না দাঁড়ালে পরাজয়টা আরও বড় হতে পারত।’ কোরেইয়ো দা মানহা লিখেছে, ‘খুবই নিশ্চিত করে বলা যায়, এদুয়ার্দোর এই পরাজয় প্রাপ্য না।

হাওয়ার্ডের ইচ্ছা অপূর্ণই থাকল

এই যাত্রায় আইসিসির সভাপতি হওয়া হলো না অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী জন হাওয়ার্ডের। গতকাল সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত আইসিসির নির্বাহী কমিটির সভায় বাতিল হয়ে গেছে হাওয়ার্ডকে আইসিসির সহসভাপতি করতে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের যৌথ প্রস্তাব। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডকে ৩১ আগস্টের মধ্যে দিতে বলা হয়েছে তাদের নতুন প্রার্থীর নাম। এবার সহসভাপতি হলে শারদ পাওয়ারের দুই বছরের মেয়াদ শেষে ২০১২ সালে আইসিসির সভাপতি হতেন হাওয়ার্ড।
সহসভাপতি হতে হলে আইসিসির পূর্ণ সদস্য ১০টি দেশের মধ্যে অন্তত সাতটির সমর্থন পেতে হতো হাওয়ার্ডকে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ছাড়া তাঁর পাশে ছিল কেবল ইংল্যান্ড। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও দক্ষিণ আফ্রিকা হাওয়ার্ডের মনোনয়নের বিপক্ষে যৌথ বিবৃতি দিলে ভোটাভুটি ছাড়াই বাতিল হয়ে যায় হাওয়ার্ডের প্রার্থিতা। ভারত শুরুতে হাওয়ার্ডের পক্ষে কথা বললেও শেষ পর্যন্ত সরে এসেছে সে অবস্থান থেকে।
বিবৃতিতে স্বাক্ষর না করলেও জিম্বাবুয়ের অবস্থানও হাওয়ার্ডের বিপক্ষেই ছিল। থাকাটা স্বাভাবিকও। ২০০৭ সালে জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট দলের অস্ট্রেলিয়া সফরের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারিতে হাওয়ার্ডের ভূমিকা ছিল। রবার্ট মুগাবের সরকারেরও একজন কট্টর সমালোচক তিনি।

জাপান-কোরিয়ায় উৎসব

প্যারাগুয়ের কাছে টাইব্রেকারে হেরে দ্বিতীয় রাউন্ড থেকেই বিশ্বকাপ-বিদায় হয়ে গেছে জাপানের। প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার ইতিহাস গড়ার আনন্দে প্যারাগুয়েতে চলছে উৎসব। লোকজন ঢাকঢোল নিয়ে নেমে এসেছে রাস্তায়। উৎসবের রংটা একটু এদিক-সেদিক হতে পারে, তবে রাস্তায় নেমে উৎসবে মেতেছে জাপানিরাও!
জাপানিরা বৃষ্টি পর্যন্ত মানেনি! রাতে খেলা দেখার পর সাতসকালে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যেই হাজারখানেক সমর্থক রাস্তায়। জাপানের ‘নীল জার্সি’ পরে নেচেগেয়ে উৎসব করেছে তারা। প্যারাগুয়ের বিপক্ষে দলের প্রাণপণ লড়াইয়ে খুশি জাপানি প্রধানমন্ত্রী নাওতো কানও। ম্যাচ শেষে উল্লসিত কণ্ঠে বলেছেন, ‘একটি দল হিসেবে খেলে তারা (খেলোয়াড়েরা) বিশ্বকে জাপানি ফুটবলের সম্ভাবনাটা দেখিয়ে দিয়েছে। আমি এই চেষ্টার জন্য তাদের অভিনন্দন জানাই।’
শুধু জাপানিরাই কেন? দলের পারফরম্যান্স উদ্যাপনে উৎসব করেছে এশিয়ার অন্য দুই দল উত্তর এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মানুষও। বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়ে গত পরশু দেশে ফিরে দুই দলের ফুটবলাররাই বিমানবন্দরে অভিনন্দন পেয়েছেন পরিবার-পরিজন আর দেশবাসীর।
দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠা দক্ষিণ কোরিয়া দলকে বরণ করতে বিমানবন্দরে ছুটে গিয়েছিল প্রায় ১৫ হাজার মানুষ। তাদের অনেকের হাতেই ছিল খেলোয়াড়দের নাম লেখা ব্যানার। পার্ক জি-সুং এবং তাঁর দল পেল উষ্ণ সংবর্ধনাই। ব্যতিক্রম হয়নি উত্তর কোরিয়ার বেলায়ও। ৪৪ বছর আগের বিশ্বকাপের স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে পারেনি, তিন ম্যাচের তিনটিতেই হার। তার পরও জং তায়ে-সেদের বরণ করে নিতে বিমানবন্দরে শুভাকাঙ্ক্ষীদের কমতি ছিল না।
এত গেল অভিনন্দন আর শুভেচ্ছা জানানোর কথা। গ্রিস, নাইজেরিয়ার মতো দলকে পেছনে ঠেলে দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠার পুরস্কার হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ার খেলোয়াড়েরা প্রত্যেকে পেতে পারেন ১ লাখ ৪৩ হাজার ডলার করে।

তাঁদের বোঝাপড়া

কাকার চোখের ভাষা সবচেয়ে ভালো পড়তে পারেন কে? ক্যারোলিন নাকি লুইস ফ্যাবিয়ানো!
জীবনসঙ্গিনী ক্যারোলিন শুনে মন খারাপ করতে পারেন, তবে আপাতত মনে হচ্ছে, কাকার চোখের ভাষা সবচেয়ে ভালো পড়তে পারছেন সতীর্থ ফ্যাবিয়ানোই। এক পলক চাহনি, ছোট্ট একটা পাস এবং গোল—এরই মধ্যে ফ্যাবিয়ানোর দুটো গোল দেখা গেছে এই দৃশ্য।
‘আমাদের দুজনের মধ্যে অদ্ভুত একটা যোগসূত্র আছে। আমরা দুজন দুজনকে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছি। আমাকে শুধু ঠিক পজিশনটা নিতে হয়। জানি, কাকা ঠিকই আমার কাছে বল বাড়িয়ে দেবে’—দুজনের বোঝাপড়া এভাবেই ব্যাখ্যা করেছেন ফ্যাবিয়ানো।
আইভরিকোস্টের বিপক্ষে ব্রাজিলের ৩-১ গোলের জয়ে কাকার থ্রু পাসে চমৎকার একটি গোল করেন ফ্যাবিয়ানো। দ্বিতীয় রাউন্ডে চিলির বিপক্ষেও কাকার ওয়ান-টাচ পাস থেকে বল পেয়ে জালে ঠেলে দেন।
দুজনের জার্সির নম্বর যেমন পাশাপাশি, তেমনই মাঠেও পাশাপাশি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে কাকা-ফ্যাবিয়ানোকে। দুজন দুজনের খেলার ধরনটা ভালো করে জানেন বলেই বোঝাপড়াটাও ভালো হচ্ছে বলে মন্তব্য কাকার, ‘আমরা দুজনই দীর্ঘ সময় সাও পাওলোতে খেলেছি। একবার তাকালেই আমরা বুঝে যাই, কী করতে হবে। আশা করি, বিশ্বকাপের বাকিটা সময়ও ওকে আরও অনেক গোল বানিয়ে দিতে পারব। আশা করি, ও টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হবে।’
কাকা তো সাও পাওলোরই আবিষ্কার। ব্রাজিলের এই ক্লাবটির যুবদলের হয়ে খেলেছেন ১৯৯৪ থেকে ২০০০ পর্যন্ত। পেশাদার ফুটবলে অভিষেক ২০০১ সালে। ওই বছরেই ফ্যাবিয়ানো যোগ দেন সাও পাওলোতে। ২০০৩ সালে কাকা চলে যান এসি মিলানে। ২০০৯ পর্যন্ত মিলানের হয়েই তাঁর মহাতারকা হয়ে ওঠা। এর পর রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে এখন স্প্যানিশ লিগে। ফ্যাবিয়ানোও খেলেন লা লিগাতেই। ২০০৫ সালে যোগ দিয়েছেন সেভিয়াতে। স্পেনে আসার আগে একটা মৌসুম কাটিয়ে এসেছেন পোর্তোয়।
ব্রাজিলের জার্সি গায়ে ফ্যাবিয়ানোর দুর্ধর্ষ ফর্মের নেপথ্য কারিগর কাকাই। এবারও কাকার আড়ালেই থাকছেন তিনি। কাকার মতো তারকার কি অন্যের উজ্জ্বলতায় ম্লান থাকা মানায়! এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে তিনটি গোলে অবদান রাখা কাকা কিন্তু বলেছেন, তিনি গোল করিয়েই খুশি, ‘বিশ্বকাপে গোল করতে কে না চায় বলুন! তবে সত্যি বলতে কী, গোল যে পাচ্ছি না, এটা নিয়ে আমি মোটেও উদ্বিগ্ন নই। সতীর্থদের গোল করিয়ে, দলের জয়ে অবদান রেখেই আমি খুশি।’
কাকা গোল পাচ্ছেন না এটা নিয়ে তিনি নিজে উদ্বিগ্ন হোন আর না-ই হোন দুঙ্গাকে নিশ্চয়ই ভাবাচ্ছে। কাকা যেন ‘মেসিন্ড্রোমে’ আক্রান্ত। মেসির মতোই গত ম্যাচে দুর্দান্ত শট নিয়েও গোলের দেখা পাননি। কাকার হলুদ কার্ড দেখা নিয়েও দুশ্চিন্তায় আছে দল। বরাবরই মাথা ঠান্ডা রেখে খেলার সুখ্যাতি ছিল যাঁর, সেই কাকা এরই মধ্যে তিনটি হলুদ কার্ড দেখেছেন। এর মধ্যে একটা ম্যাচে তো বসে থাকলেন মাঠের বাইরে।
দ্বিতীয় রাউন্ডেও হলুদ কার্ড দেখেছেন। ফলে কোয়ার্টার ফাইনালে উনিশ-বিশ হয়ে গেলে শেষ পর্যন্ত দল উঠলেও কাকার সেমিফাইনাল খেলা হবে না। এই প্লে-মেকার নিজেও সতর্ক, ‘আমি এখন থেকে অনেক বেশি সতর্ক থাকার চেষ্টা করব। বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল মিস করার মতো বোকামি আমি করতে চাই না।’

আজ কোনো খেলা নেই, আজ জাপানের জন্য শোক

এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলের দ্বিতীয় রাউন্ডের খেলাগুলো নিয়ে আমার প্রতিটি (উরুগুয়ের কাছে টাইব্রেকারে জাপানের হেরে যাওয়া ছাড়া) ভবিষ্যদ্বাণী ফলে যাওয়ায় আমি নিজেই কিছুটা অবাক, কিছুটা বিস্মিত, কিছুটা লজ্জিত এবং কিছুটা দুঃখিত হয়েছি। পরাজয়ের বেদনা নিয়ে খেলোয়াড় ও গ্যালারি মাতানো পরাজিত দলের সমর্থকদের মাথা নিচু করে মাঠ ত্যাগ করতে দেখে আমার মনে হয়েছে, কী জানি আমার ভবিষ্যদ্বাণীকে সত্য প্রমাণ করার জন্যই ফুটবলের ঈশ্বর ইংল্যান্ড, আমেরিকা, দ. কোরিয়া, স্লোভাকিয়া, পর্তুগাল, মেক্সিকো এবং আমার প্রিয় কবি পাবলো নেরুদার দেশ চিলিকে তাদের নিজ নিজ প্রতিপক্ষের কাছে হারিয়ে দিলেন না তো? ফুটবলের ঈশ্বর বলে আকাশে কোনো দেবতা আছেন, এমন প্রমাণ যেমন কারও কাছে নেই, ফুটবলের ঈশ্বর বলে কেউ নেই, এমন কথাও প্রমাণিত নয়। এ রকম বিশ্ব কাঁপানো একটা বিষয় দেখাশোনা করার জন্য একজন দেবতা তো থাকতেও পারেন। তিনি হয়তো কোনো অজানা কারণে, ফুটবল-পাগল কবিদের পছন্দ করেন। বাস্তবতা ব্যাখ্যার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সম্যক ধারণা প্রদানের ক্ষেত্রে তাদের সঠিক পথে পরিচালনাও করেন।
জাপানকে নিয়ে আমার একটু আশা ছিল। সেটা সত্যি বলতে কী—যতটা যুক্তিনির্ভর ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল আবেগনির্ভর। জাপানে আমি দুবার গিয়েছি। জাপানকে নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ (আমার নিজের ধারণা) ভ্রমণ কাহিনি আমি লিখেছি। বহির্বিশ্বে একমাত্র জাপানেই আমার কবিতার বই বেরিয়েছে। ইয়োকো নোয়া নামে একজন সুন্দরী বিদ্যাবতী জাপানি ভাষায় আমার ও শামসুর রাহমানের অনেকগুলো কবিতা অনুবাদ করেছেন। আমার আরেকজন প্রিয় জাপানি বান্ধবী জাপান-বাংলা স্কুলের প্রিন্সিপাল ইয়াসুকু হাকামাদা আমাকে কবিতা লেখায় অনুপ্রাণিত করেছেন। সঙ্গ দিয়েছেন, নানাভাবে সাহায্য করেছেন। আমার কয়েকটি কবিতার চমৎকার অনুবাদও করেছেন। ফলে চলতি বিশ্বকাপে লাতিন আমেরিকান ফুটবলের জয়জয়কার হবে বুঝে খুশি হলেও, প্যারাগুয়ের বিরুদ্ধে জাপানের জয়টা দেখতে চেয়েছিলাম। ফুটবলের ঈশ্বরকে বলেও ছিলাম, আফ্রিকার ঘানাকে যেমন দিয়েছ, তেমনি করে এশিয়ার কোটায় তুমি জাপানকে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার গৌরব দান করো, প্রভু। দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে দুবারের বিশ্বকাপজয়ী বলে উরুগুয়ের মান রেখেছ, ভালো কথা। তাই বলে প্যারাগুয়ের সম্মান রক্ষার দায় তুমি নেবে কেন? ফুটবল-শক্তি বিচারে, জাপানও যা, প্যারাগুয়েও প্রায় তাই। কিন্তু হলো না। ফুটবলের ঈশ্বর লাতিন আমেরিকার ফুটবল-বিপ্লবের বিজয়ধ্বজাটাকে আরও দৃষ্টিগ্রাহ্য করার জন্যই জাপানকে দুঃখসমুদ্রে নিক্ষেপ করে প্যারাগুয়েকে শেষ আটের ভেলায় তুলে দিলেন। খেলাটি যখন এবারের বিশ্বকাপের প্রথম টাইব্রেকারে গড়িয়েছিল, তখনই আমি আমার বুকের ভেতরে জাপানের পরাজয়ের আগাম বার্তা পেয়ে গিয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত জাপান যে পারেনি, আমি মনে করি তার দায় জাপানের নয়, এশিয়ার। প্যারাগুয়ে যে পেরেছে, তার পেছনে রয়েছে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা আর উরুগুয়ের বিজয়ছায়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের গ্লানি সইতে না পেরে অভিমানী জাপানিরা যেভাবে দলবেঁধে আত্মহত্যা করেছিল—আমি শঙ্কিত বোধ করছি, জাপানে এবারও না তার পুনরাবৃত্তি ঘটে! জাপান, আমরা তোমার পাশে আছি।
এবারের আগে চার-চারটি লাতিন দেশ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইন্যালে খেলার গৌরব অর্জন করেনি। করেছে কি? আর প্যারাগুয়ে সম্ভবত এবারই প্রথম বিশ্বশ্রেষ্ঠ ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সঙ্গে কোয়ার্টার ফাইনালের শেষ-অষ্টকে নাম লেখালো। এখন বাকি থাকলো চার লাতিন দলের পরবর্তী কুরুক্ষেত্রজয়ের নাটক-দর্শন। ফুটবলের ঈশ্বর যে কোনো ইউরোপিয়ান নন, তিনি যে একজন লাতিন আমেরিকার আদিবাসী—, ঊনিশতম বিশ্বকাপ ফুটবল যেন সেই সত্য-প্রতিষ্ঠার পথেই ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছে। পাঠক, আপনারা কি তা বুঝতে পারছেন? যদি পারেন তো কোনো কথা নাই, যদি না পারেন তবে একখান কথা আছে।
মেক্সিকো বিশ্বকাপ ফুটবল চলাকালে, ১৯৮৬ সালে একটি কবিতা লিখেছিলাম। কবিতার নাম ‘আজ কোনো খেলা নেই’। কোয়ার্টার ফাইনাল শুরু হওয়ার আগের দু’দিনের বিরতির ভিতর ঐ কবিতাটি রচিত হয়েছিলো। প্রাসঙ্গিক বিচেনায়, কবিতাটির শেষাংশ উদ্ধৃত করে আজকের লেখা শেষ করছি।
‘আজ গোল নেই, পেনাল্টি নেই, কর্নার নেই, অফসাইড নেই—
কোনো টাফ-ট্যাকলিং নেই-; আজ সারা পৃথিবীর ছুটি।
হাভাল্যাঞ্জ এখন ঘুমাচ্ছেন—। ম্যারাডোনা, রুমানিগে,
প্লাটিনি, সক্রেটিস আজ আকাশে উধাও।
টিভির পর্দাকে আজ মনে হল মৃত ইলিশের চোখের মতন স্থির,
চঞ্চলতাহীন, স্বচ্ছ-শূন্য কাচ। আজ এই মধ্যরাতে
টিভির পর্দায় হঠাৎ আবিষ্কৃত হলো আমার হূদয়।’
(দ্রঃ আজ কোনো খেলা নেই / দুঃখ করো না, বাঁচো / ১৯৮৭)
কামরাঙ্গীর চর
৩০ জুন, ২০১০

এখনই সেমি ফাইনালের চিন্তায় উরুগুয়ে

বহুদিন পর যেন জেগে উঠেছে উরুগুয়ের ফুটবল। দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে ৪০ বছর পর আবার সেমিফাইনালে ওঠার সুযোগ এসেছে উরুগুয়ের সামনে। দীর্ঘদিন পর দলটিকে নিয়ে আশায় বুক বেঁধেছে লাখো-কোটি উরুগুয়েন। আক্রমণভাগে ডিয়েগো ফোরলান-লুইস সুয়ারেজ জুটি আর অধিনায়ক ডিয়েগো লুগানোর নেতৃত্বে দুর্ভেদ্য রক্ষণভাগ নিয়ে এখন পর্যন্ত উরুগুয়ে যে অসাধারণ সাফল্য দেখিয়েছে, তাতে উরুগুয়ের সেমিফাইনাল স্বপ্ন এখন অনেকটাই হাতের মুঠোয় মনে হচ্ছে। সেমিফাইনালে ওঠার ব্যাপারে বেশ আত্মবিশ্বাসী উরুগুয়ের তারকা স্ট্রাইকার ডিয়েগো ফোরলান। ফোরলান বলেছেন, ‘আমরা কোচ তাবারেজের নির্দেশনা খুব ভালোভাবেই অনুসরণ করছি। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, আমরা সেমিফাইনালে পৌঁছতে পারব।’
এখন পর্যন্ত চারটি ম্যাচে মাত্র একটি গোল হজম করেছে উরুগুয়ে। এ থেকেই উরুগুয়ের রক্ষণভাগের শক্তি সম্পর্কে বেশ ভালো অনুমান করা যায়। আর ডিয়েগো ফোরলান-লুইস সুয়ারেজরা প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের জন্য ক্রমেই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছেন।
কোয়ার্টার ফাইনালে উরুগুয়ের প্রতিপক্ষ আফ্রিকার ঘানা। তবে উরুগুয়ের সমর্থকদের জন্য একটা ছোট দুঃসংবাদ হলো উরুগুয়ে রক্ষণভাগের অন্যতম যোদ্ধা ডিয়েগো গোডিন ইনজুরির কারণে খেলতে পারবেন না ঘানার বিপক্ষে। গোডিনের পরিবর্তে মোরিসিও ভিক্টোরিনোকে মাঠে নামাবেন কোচ অস্কার তাবারেজ।
৪০ বছর পর বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল কী খুব দূরের মনে হচ্ছে উরুগুয়ের? উত্তর জানা যাবে শুক্রবার রাতেই।

রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কবলে নাইজেরিয়ান ফুটবল

বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর সমর্থকদের দুয়োধ্বনি, সংবাদমাধ্যমের সমালোচনার পাশাপাশি এবার সরকারের রোষাণলের শিকারও হতে হচ্ছে নাইজেরিয়ান ফুটবল দলকে। দুই বছরের জন্য আন্তর্জাতিক যে কোন প্রতিযোগিতায় নাইজেরিয়ার অংশগ্রহণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন সে দেশের প্রেসিডেন্ট গুডলাক জনাথন। প্রেসিডেন্টের যোগাযোগ বিষয়ক উপদেষ্টা ইমা নিবোরো সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘আগামী দুই বছর যে কোন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নাইজেরিয়ার অংশগ্রহণের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন প্রেসিডেন্ট। আর এটা করা হয়েছে নাইজেরিয়ান ফুটবলকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর জন্য।’
কিছুদিন আগে বিশ্বকাপ ব্যর্থতার কারণ খোঁজার জন্য ফ্রান্স সরকারও কোচ রেমন্ড ডমেনেখকে বিশেষ সংসদীয় কমিশনে তলব করেছিল। ফিফা প্রেসিডেন্ট সেপ ব্লাটার ফ্রান্স সরকারকে কড়াভাবে নিষেধ করে দিয়েছিলেন ফুটবল সংক্রান্ত ব্যাপারে সরকারী হস্তক্ষেপ না করার জন্য। এখন নাইজেরিয়ার সরকার প্রধানের এই সিদ্ধান্তের বিপক্ষেও হয়তো সেপ ব্লাটারকে আবার সরব হতে দেখা যাবে ।

জরিপে গোললাইন প্রযুক্তির পক্ষে মত

বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ সব খেলার মোড় ঘুরে যাচ্ছে রেফারির ভুলে। ইংল্যান্ড-জার্মানি ম্যাচে ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ডের শট গোলপোস্টে লেগে গোললাইন অতিক্রম করলেও এটাকে গোলের স্বীকৃতি দেন নি রেফারি। ৪-১ গোলে হেরে যাওয়ার বড় কারণ হিসেবে এখন এই গোল না পাওয়াকে দায়ী করছেন অনেকেই। আর্জেন্টিনা-মেক্সিকো ম্যাচে কার্লোস তেভেজ আর্জেন্টিনার পক্ষে প্রথম গোলটি করেন পুরোপুরি অফসাইড থেকে। এ নিয়ে শোরগোলও কম হচ্ছে না। এসব বিতর্ক এড়াতে ক্রিকেট-টেনিসের মতো ফুটবলেও কেন প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হবে না- এই প্রশ্ন এখন বেশ জোরেসোরেই উঠেছে। একসময় বিরোধিতা করলেও এখন গোললাইন প্রযুক্তি চালু করার পক্ষে মত দিচ্ছেন অনেকেই। সম্প্রতি নিউ ইয়র্ক ভিত্তিক কোম্পানি নিলসেন গোললাইন প্রযুক্তি চালু করা হবে কি না- এ নিয়ে একটি জরিপ চালায়। ৫৫ টি দেশের ২৭,০০০ মানুষের ওপর পরিচালিত এ গবেষণায় দেখা যায় , দুই-তৃতীয়াংশ মানুষই চায় ফুটবলে গোললাইন প্রযুক্তি চালু হোক। ফুটবলে প্রযুক্তি চালুর ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি সমর্থন পাওয়া গেছে লাতিন দেশগুলোতে। সেখানকার ৭৯ শতাংশ মানুষই এর পক্ষে মত দিয়েছেন।

গোললাইন প্রযুক্তির পক্ষে সবচয়ে বেশি সোচ্চার আয়ারল্যান্ডের জনগণ। রেফারির চোখ এড়িয়ে যাওয়া এক ভুলেই বিশ্বকাপ খেলা হয়নি তাদের। বাছাইপর্বের প্লে-অফ ম্যাচে থিয়েরি অঁরির হাত দিয়ে করা এক গোলেই কপাল পুড়েছিল আইরিশ দলের। সেই ক্ষোভ এখনো কমেনি আয়ারল্যান্ডের মানুষের।
ফিফা সভাপতি সেপ ব্ল্যাটারের প্রথমদিকে গোললাইন প্রযুক্তি নিয়ে নির্লিপ্ত থাকলেও এবারের বিশ্বকাপে রেফারিদের ভুল দেখতে দেখতে বিব্রত ফিফা সভাপতিও ঘোষণা দিয়েছেন, গোললাইন প্রযুক্তি নিয়ে নতুন করে ভাবার।
ফিফা সভাপতি নিজেই জানিয়েছেন, গোললাইন প্রযুক্তি নিয়ে বিশ্বকাপের পরপরই নতুন করে চিন্তা-ভাবনা শুরু করবে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা।