Monday, September 21, 2015

অটোওলা এখন পাইলট

আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখত ছেলেটা। স্বপ্ন দেখত, ঘুড়ির মতো উড়ে বেড়াবে নীল আকাশের বুকে। একদিন সে পাইলট হবে। সে স্বপ্ন দেখার স্পর্ধা লাগে। কারণ, তার কাছে সেটা ছিল, ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখার মতো অলীক, আকাশকুসুম। বা, বামুন হয়ে চাঁদে হাত বাড়ানোর মতো অসাধ্যকে স্পর্শের আকুলি। শেষ অবধি কিন্তু স্বপ্নকে ছুঁয়েছে সে। আজ সে পাইলট।
নাগপুরের শ্রীকান্ত পান্তাওয়ানেকে একসময় পাড়ার লোকে দেখেছে অটো চালাতে। বাবা সিকিওরিটি গার্ড। আয় সামান্যই। তাতে সংসারে দু-মুঠো ভাত জোগাবেন, নাকি সন্তানের পড়াশোনার খরচ! তাই অল্পবয়সেই সংসারের জোয়াল ধরতে হয় শ্রীকান্তকে। তখনও অটো চালানোর হাতেখড়ি হয়নি। পড়ার ফাঁকে ডেলিভারি বয়ের কাজ করেন। মাসশেষে যা আসে, সবটাই তুলে দেন মায়ের হাতে। তারপর একদিন অটো শিখে, রাস্তায়।
কিন্তু, দিনের শেষে ব্যালেন্স বজায় রাখতে জানতেন শ্রীকান্ত। জীবনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে গেলে, এই ভারসাম্যটা জরুরি। ডেলিভারি বয় বা অটোচালক, যখন যে ভূমিকাতেই তাঁকে দেখা যাক, পড়াশোনায় ফাঁকিবাজি ছিল না কখনও। কারণ, শ্রীকান্ত জানতেন লক্ষ্য ছুঁতে গেলে, শিক্ষার সোপান বেয়েই তাঁকে ধাপে ধাপে উঠতে হবে। তিন চাকার সেই ছেলেবেলার প্রেম তাঁকে ভূমি থেকে টেনে নিয়ে গেছে আকাশে। অটোর চালক শ্রীকান্ত আজ বসেন বিমানের স্টিয়ারিংয়ে।
শ্রীকান্ত আজ যা হয়েছেন, তা রূপকথার গল্পের মতোই। কঠোর পরিশ্রম, লেগে থাকার মানসিকতা আর কিছুটা ভাগ্য। এই তিনের ত্রিবেণী সংগমেই লক্ষ্য ছুঁয়েছেন নাগপুরের সেই দারিদ্রপীড়িত ছেলেটি।
একবার পার্সেল দিতে এয়ারপোর্টে যেতে হয়েছিল তাঁকে। সেখানেই এক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর আলাপ। তাঁর কাছেই জানতে পারেন, ইন্ডিয়ান এয়ারফোর্সে যোগ না দিয়েও পাইলট হওয়া যায়। সেই বিমানবন্দরে বাইরে এক চা বিক্রেতার কাছে শোনেন, ডিজিসিএ’র পাইলট স্কলারশিপ প্রোগ্রামের কথা। এটুকু জানার পর আর কেউ তাঁকে থামাতে পারেনি। নীরবে চলে প্রস্তুতি।
বারো ক্লাসের পরীক্ষার পরপরই পাইলট স্কলারশিপের জন্য তৈরি হতে থাকেন। এরপর রেজাল্ট বেরোতেই চলে যান মধ্যপ্রদেশের ফ্লাইট স্কুলে। কিন্তু, বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় ইংরেজি। কিন্তু, শ্রীকান্তর মতো পরিশ্রমী ছেলের কাছে, সেটা খুব বেশদিন সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়নি। বন্ধুদের সহযোগিতায় চটপট সেই দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠেন। পাশ করে কমার্শিয়াল লাইসেন্স পান শ্রীকান্ত। কিন্তু, প্রথমেই পাইলটের চাকরি জোটেনি। পারিবারিক আর্থিক দৈন্যতায় বেশিদিন অপেক্ষা করাও সম্ভব ছিল না। শুরুটা তাই করতে হয় কর্পোরেট এগজিকিউটিভ হিসেবে। তবে, আশা ছিল, ঠিক একদিন পাইলট হবেনই।
ঠিক হাতে গুনে দু-মাস। ইন্ডিগো এয়ারলাইন্স থেকে ডাক আসে। তার পর শুধুই উড়ে চলা স্বপ্নের বুকে।

পথে পথে চাঁদাবাজি

পথে পথে ওত পেতে বসে আছে চাঁদাবাজরা। গরুবোঝাই ট্রাক দেখলেই তারা হামলে পড়ছে। নিচ্ছে চাঁদা। কখনও কখনও ছিনিয়ে নিচ্ছে পুরো ট্রাক। এ অবস্থায় গরু ব্যবসায়ী, খামারিদের মধ্যে বিরাজ করছে আতঙ্ক। অন্যদিকে ঈদকে সামনে রেখে মিয়ানমারের পর ভারত থেকেও সীমান্ত পেরিয়ে আসছে অসংখ্য গরু। ইতিমধ্যে রাজধানীর পশুরহাটে গরু উঠতে শুরু করেছে। তবে বিক্রি হচ্ছে কম। গরু ব্যবসায়ীরা জানান, এখন দেখে যাচ্ছেন ক্রেতারা। পরে এসে কিনবেন। এছাড়া, গরু বাজারকে ঘিরে জাল টাকার কারবারিরাও সক্রিয়। মলম পার্টির সদস্যরাও বসে নেই। গরু ব্যবসায়ীদের টার্গেট করে তারা নেমেছে মাঠে। ইতিমধ্যে গরুর হাটকে কেন্দ্র করে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। পুলিশ চালাচ্ছে বিশেষ অভিযান। সরজমিন দেখা গেছে, দুইদিন আগ থেকে হাটে গরু-ছাগল আসা শুরু করলেও গতকাল থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে জমতে শুরু করেছে রাজধানীর ২২টি কোরবানির পশুরহাট। বিভিন্ন পশুরহাটে ক্রেতাদের কিছুটা উপস্থিতি দেখা গেছে। তবে বিক্রি ছিল না তেমন। বাজার পরিস্থিতি দেখতে গেছেন অনেকেই। ওদিকে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত পথে গরু আসা শুরু হয়েছে বেশ জোরেশোরে। মিয়ানমার, নেপাল, ভুটান থেকে গরু আসা দেখে অবশেষে ভারতীয় ব্যবসায়ীরাও গরু ছাড়তে শুরু করেছে। ফলে দেশের সকল সীমান্ত পথ এবং হাটবাজার গরু ব্যবসায়ীদের তৎপরতায় সরগরম। তবে পথে পথে চাঁদাবাজি এবং ছিনতাই ব্যবসায়ীদের আতঙ্কিত করে তুলেছে। পুলিশের নানা তৎপরতার পরও খোদ রাজধানীতে শুক্রবার রাতে ১৫টি গরুসহ ট্রাক ছিনতাইয়ের ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। রাজধানীতে এবার ২২টি পশুরহাট বসছে। এগুলোর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ব্যবস্থাপনায় ১০টি ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ব্যবস্থাপনায় ছয়টি। ঢাকা জেলা প্রশাসনের আয়োজনে থাকছে আরও ছয়টি হাট। হাটগুলোকে বর্ণিল সাজে সাজানো হয়েছে। নানা রঙের তোরণ, ব্যানার ও ফেস্টুন দিয়ে সাজানো হয়েছে হাটের প্রবেশপথ। পোস্টার ছাপিয়ে ও মাইকে ক্রেতা-বিক্রেতাদের নানা সুযোগ-সুবিধার কথা জানানো হচ্ছে। অন্যান্য বছর ঈদের আগের তিনদিন হাট বসানোর নিয়ম ছিল। তবে এবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অনুরোধে সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসন সাত দিন হাট বসানোর অনুমতি দিয়েছে।
ওদিকে রাজধানীর একমাত্র স্থায়ী ও দেশের সবচেয়ে বড় পশুরহাট গাবতলীতে গিয়ে দেখা যায়, ট্রাক-পিকআপে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে গরু-মহিষ ও ছাগল আসছে। তবে ক্রেতার উপস্থিতি খুবই কম। গোশত ব্যবসায়ীরাই কেবল গরু-ছাগল কিনছেন। এছাড়া কুমিল্লা, সিলেটসহ বাইরের জেলার ব্যবসায়ীরাও এ হাট থেকে গরু কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। তবে পুরো হাটে দেশী গরুর আধিপত্য। বাংলাদেশ গোশত ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব রবিউল আলম জানান, দেশে প্রতি বছর এক কোটি ২৫ লাখের মতো গরু জবাই হয়। এর মধ্যে ৬৫ লাখ কোরবানির সময়। আর বাকি ৬০ লাখ জবাই হয় সারা বছরে। এছাড়া কোরবানির সময় ৫০ লাখের মতো ছাগল জবাই হয়ে থাকে। তিনি বলেন, দেশে ভারতীয় গরুর কোন প্রয়োজন নেই। বিকল্প হিসেবে মিয়ানমার, নেপাল ও ভুটান থেকে গরু আসছে। তাছাড়া, দেশেই গরু উৎপাদন বাড়িয়ে চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে। এদিকে ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন পশুরহাট ও আশপাশ এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান শুরু হবে আগামীকাল থেকে। হাটের পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনা দেখার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিও দেখবেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা। ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (গণমাধ্যম) মুনতাসিরুল ইসলাম জানান, ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ ও জেলা প্রশাসনের নির্ধারিত ২২টি পশুরহাটে সাতজন ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া, সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকেও মনিটরিং সেল কাজ করবে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। 
পথে পথে চাঁদাবাজি
চাহিদা বেশি থাকায় সীমান্তবর্তী হাট লালমনিরহাটের দুড়াকুঠি, দইখাওয়াহাট, চাপারহাট, রসুলগঞ্জহাট ও বড়খাতা হাটে উঠতে শুরু করেছে বিনা করিডোরে আনা গরুগুলো। সরকারিভাবে প্রতিটি গরু করিডোর করতে লাগে ৫০০ করে টাকা। যে হারে গরু আসছে তাতে করে করিডোর করলে সরকারি কোষাগারে যেতো বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। জেলার সীমান্তের প্রধান রুট মোঘলহাট ও দুর্গাপুর দিয়ে নদীপথে গরু আসছে ভারত থেকে। সীমান্তে ২৬৮ কিলোমিটার কাঁটাতারের বেড়া পথ আর ২৪ কিলোমিটার নদী কাঁটাতারবিহীন নৌপথ ব্যবহার করে করিডোরবিহীন গরুগুলো রাতের আঁধারেও আসছে। লালমনিরহাটের মোঘলহাট, দুর্গাপুর ও বুড়িমারীর চোরাচালানিরা চালাচ্ছে এ কারবার। প্রতিদিন সীমান্ত পেরিয়ে আসছে ৭ থেকে ৮ হাজার গরু। স্থানীয় হাটে বিক্রির পর ওই সব গরু ট্রাকযোগে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। প্রতিদিন রাতে সীমান্ত পেরিয়ে আসা গরুগুলো সীমান্তবর্তী ইউনিয়নের মেম্বার-চেয়ারম্যানরা ২০০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা গরুপ্রতি নিয়ে বাংলাদেশী গরুর সার্টিফিকেট দিয়ে ক্রয়-বিক্রয় চলছে হাটগুলোতে। লালমনিরহাট জেলার মোঘলহাট, কুলাঘাট, বুড়িমারী, পাটগ্রাম, দইখাওয়া সীমান্ত দিয়ে করিডোরবিহীন গরু অবাধে আসায় হাটবাজারে ভাল মূল্য পাচ্ছে না দেশী ডেইরি ফার্ম মালিকরা। সীমান্তবর্তী জেলা লালমনিরহাটের শতাধিক ডেইরি ফার্ম মালিক ব্যাংক ঋণ নিয়ে ডেইরি ফার্ম গড়ে তুললেও পড়েছে লোকসানের মুখে। একেকটি গরুর পেছনে ডেইরি ফার্ম মালিকরা ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা ব্যয় করলেও বর্তমানে ভারতীয় করিডোরবিহীন গরুগুলোর কারণে প্রতি গরুতে লোকসান খাচ্ছে ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা। ব্যাংক ঋণ নিয়ে তারা বিপাকে পড়েছে। সীমান্তে করিডোরবিহীন গরু আনার ব্যাপারে কঠোরভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে একদিকে সরকার হারাবে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব অন্যদিকে ঋণ নিয়ে গড়ে ওঠা ডেইরি ফার্ম মালিকরা পড়বে লোকসানের মুখে। গরু পরিবহনে পথে পথে হচ্ছে ব্যাপক হারে চাঁদাবাজি। জেলায় প্রতিটি হাটে চাঁদাবাজির কারণে ঘটছে গরু ব্যবসায়ীর টাকা ছিনতাই। গরু প্রতি ট্রাকে ১২ স্থানে দিতে হয় চাঁদার টাকা। প্রতি ট্রাকে ৩ হাজার টাকা থেকে ৪ হাজার টাকা দিতে হয় চাঁদার টাকা। ট্রাকচালক রসুল মিয়া জানান, দুড়াকুঠি হাটে গরু নিয়ে আসার সময় হাটের বাইরে ৭০০ টাকা, তিস্তা সেতু এলাকায় ৩০০ টাকাসহ পথে পথে চাঁদার টাকা না দিলে ট্রাক আটক করে। পুলিশ সুপার টিএম মোজাহিদুল ইসলাম জানান, চাঁদাবাজি রোধে গরুর হাটগুলোয় কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সতর্ক রাখা হয়েছে পুলিশ বাহিনীকে।
রংপুর থেকে ঢাকা ১৯ স্পটে চাঁদাবাজি
কোরবানি ঈদের পশুকে ঘিরে চাঁদাবাজরা তৎপর হয়ে উঠেছে। রংপুর থেকে ঢাকায় এক ট্রাক গরু-ছাগল পাঠাতে পুলিশ ও ক্ষমতাসীন চাঁদাবাজদের ১৯ ঘাটে চাঁদা দিতে হচ্ছে ব্যবসায়ী ও ট্রাক ড্রাইভারদের। এতে করে এক ট্রাক গরু পাঠাতে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা চাঁদাবাজদের দিতে হয়। রংপুর নগরীর লালবাগ হাটের গরু ব্যাপারী আব্দুল জব্বার মিয়া, মজিবর মিয়াসহ অন্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কোরবানি ঈদ উপলক্ষে রংপুর বিভাগের প্রায় ৮ শতাধিক পশুরহাট থেকে প্রতিদিন শতাধিক গরু ও ছাগল বোঝাই ট্রাক ঢাকা ও চট্টগ্রামে যায়। প্রতিটি ট্রাকে ২০-২২টি গরু থাকে। রংপুর থেকে ঢাকার ট্রাক ভাড়া স্থানভেদে ২৫-৩৫ হাজার টাকা ও চট্টগ্রামের ভাড়া ৩৫-৫০ হাজার টাকা। ঢাকা যেতে গরু প্রতি চাঁদা দিতে হয় ১৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত। তারা জানায়, এসব টাকা তারা গরু বিক্রির সময় মূল্য হিসেবে তুলে নেয়। ব্যবসায়ীরা আরও জানান, হাট এলাকায় রসিদ লেখা বাদেও গরুপ্রতি দেড় থেকে ২০০ টাকা, নগরীর রংপুর- লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, চৌরাস্তা সাতমাথা এলাকায় প্রতি ট্রাকে ১০০ টাকা এর অদূরেই মডার্ন মোড় পার হয়ে ৫০ টাকা, মিঠাপুকুর মহাসড়কে ১০০ টাকা, শঠিবাড়ী ৫০ টাকা, পীরগঞ্জ ৫০ টাকা, এরপর গাইবান্ধা-গোবিন্দগঞ্জ মহাসড়কে ১০০ টাকা, বগুড়ার চৌরাস্তার মোড় থেকে ধাপে ধাপে ২০০ টাকা দিতে হয়। এছাড়া বিভিন্ন সড়কেও সন্ত্রাসী মাস্তানরা গরুর ট্রাক আটক করে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করছে বলে তারা জানায়। সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয় টাঙ্গাইলে। সেখানে ২টি স্পটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের ব্যানারে চাঁদা দিতে হয় ১ থেকে দেড় হাজার টাকা। কথামতো টাকা না দিতে পারলে রাস্তার পাশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রাক দাঁড় করে রাখা হয় বলে অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ীরা। ঢাকাগামী ট্রাক ড্রাইভার আমিন হোসেন ও চট্টগ্রামগামী ট্রাক ড্রাইভার আশেক আলী বলেন, ঢাকায় গরুর ট্রাক নিয়ে যেতে হলে ১৯ স্থানে চাঁদা দিতে হয়। চাঁদা না দিলে তারা হয়রানির কবলে পড়েন। এব্যাপারে রংপুরের এক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, চাঁদা আদায়ের বিষয় এখন পর্যন্ত কেউ অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে। অভিযোগ না করার বিষয়ে গরু ব্যবসায়ী সাইফুল, আবদুল হামিদসহ অন্যদের সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, অভিযোগ করতে গেলেই অনেক ঝুটঝামেলা পোহাতে হয়। তাই আমরা চাহিদা মতো চাঁদা দিয়ে দ্রুত গন্তব্যে চলে যাই।
কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে আসছে গরু
ঈদকে সামনে রেখে কুড়িগ্রাম জেলার বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন আসছে হাজার হাজার গরু। তবে ঘাটে ঘাটে চাঁদাবাজি হওয়ায় বাজারে গরুর দাম চড়া। হাটেই গরুপ্রতি গুনতে হয় ১০৫০ টাকা আর প্রতি গরুর ট্রাক সিরাজগঞ্জ পৌঁছা পর্যন্ত অতিরিক্ত চাঁদা গুনতে হয় ১১৫০ টাকা। ফলে অতিরিক্ত চাঁদাবাজির খেসারত গুনতে হয় ভোক্তাদের। ঈদের বাজারে কোরবানির পশুর দাম ক্রমেই বাড়ছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, গরু সীমান্ত পার করার পর করিডোর ৫৫০ টাকা, দালাল ১০০ টাকা, ইজারাদার ৩০০ টাকা, বিট ১০০ টাকা সীমান্তবর্তী হাটে পৌঁছলেই দিতে হয়। এরপর হাটে ট্রাকে গরু লোড দিলে ট্রাক মালিক ও শ্রমিক সংগঠনকে দিতে হয় ৬০০ টাকা। দালাল চক্রকে  ১৫০ টাকা, ট্রাক শ্রমিকদের সাহায্যে ১০০ টাকা, কুড়িগ্রাম পৌরসভার টোল ১০০ টাকা, বগুড়ায় চাঁদা ২০০ টাকা এবং সিরাজগঞ্জে চাঁদা দিতে হয় ২০০ টাকা। গরু ব্যবসায়ী জহুর আলী ও আসাদুল জানান, একটি গরু ভারত থেকে বাংলাদেশে আনলে করিডোরে দিতে হয় ৫৫০ টাকা। অথচ সরকারি নিয়মে করিডোরের মূল্য ৫০০ টাকা। হাটে দালাল চক্রকে ১০০ টাকা, ইজারাদার ১৮০ টাকার স্থলে নেয় ৩০০ টাকা, খোয়াড়ে (বিট) ১০০ টাকা দিতে হয়। অতিরিক্ত খরচের কারণে লাভই থাকছে না ব্যবসায়ীর ঘরে। ব্যবসায়ীরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে ঘাটে ঘাটে চাঁদাবাজির কারণে। ট্রাক ড্রাইভার আবদুর রহিম জানান, যাত্রাপুর হাটে প্রতি ট্রাকে দিতে হয় ৮০০ টাকা। এছাড়া, গরুর ট্রাক ঢাকা পর্যন্ত যেতে তিনটি ব্রিজের টোল দিতে হয়। কুড়িগ্রাম পৌরসভার ১০০ টাকা টোল এবং বগুড়া ও সিরাজগঞ্জে দিতে হয় অতিরিক্ত ৪০০ টাকা চাঁদা। যাত্রাপুর হাটের ইজারাদার আবদুল গফুর হাটে অতিরিক্ত টাকা নেয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, কোটি টাকা দিয়ে হাট ইজারা নেয়া হয়েছে এক বছরের জন্য। সরকারের হাটের কোন জায়গা নেই। ভাড়া জায়গায় হাট চালাতে হয়। তাই ১২০ টাকা অতিরিক্ত নেয়া হয়।
জেলা ট্রাক-ট্যাংকলরি ও কাভার্ডভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মোহাম্মদ আলী জানান, যাত্রাপুর ট্রাকস্ট্যান্ডে প্রতি ট্রাকে মালিক সমিতির ৫০ টাকা ও শ্রমিক ইউনিয়নের জন্য নেয়া হয় ২০০ টাকা। ধরলা ব্রিজের পশ্চিম প্রান্তে শ্রমিকদের সাহায্যের জন্য নেয়া হয় ১০০ টাকা।
খুলনার পথে পথে হয়রানি
কোরবানির পশুর হাটে গরু আনতে পথে পথে হয়রানির  শিকার হচ্ছে ব্যাপারীরা। মহাসড়কের মোড়ে মোড়ে পুলিশ ও যুবলীগ-ছাত্রলীগের কতিপয় নেতারা ট্রাক ও পিকআপ থামিয়ে চাঁদা আদায় করছে বলে ব্যাপারীরা অভিযোগ করেছেন। নৌপথেও এ ধরনের ঘটনা ঘটছে অহরহ। ফলে খুলনার হাটগুলোতে গরু আনতে মারাত্মক সমস্যায় পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, পুলিশ হাটগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করলেও পথে পথে নানা ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে তাদের। এদিকে খুলনা জেলার  ৯ উপজেলায় ৫০ শতাংশ কোরবানির পশুর হাট সরকারি অনুমোদনবিহীন। এসব হাটগুলো সরকারি দলের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলে গ্রাম থেকে আসা গরু এক প্রকার জোর করেই এসব অনুমোদনহীন হাটগুলোতে ঢোকানো হচ্ছে। অর্থাৎ একটি ট্রাকভর্তি গরু খুলনার জোড়াগেট হাটের উদ্দেশে রওনা হলে তা পথে থামিয়ে অবৈধ হাটগুলোতে জোরপূর্বক ঢোকানো হচ্ছে।
জেলা বিশেষ পুলিশ সুপার চলতি সপ্তাহে ঢাকা সদর দপ্তরের স্পেশাল ব্রাঞ্চের বিশেষ পুলিশ সুপারের কাছে অননুমোদিত ১৪টি হাটের তালিকা পাঠিয়েছেন। জেলায় মোট হাটের সংখ্যা ২৭টি। গতকাল নগরীর জোড়াগেট এলাকায় সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়নে পশুরহাট শুরু হয়েছে। খুলনার জোড়াগেট পশুরহাটে আসা ব্যাপারী মনির বলেন, গরুর ট্রাক থামিয়ে বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশি হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। পুলিশ ও স্থানীয় রাজনৈতিক ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের পরিচয়ে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। চাঁদার টাকা না দিলে বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। ডুমুরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এম মশিউর রহমান জানান, আঠারো মাইল, খর্নিয়া, শাহপুর অনুমোদিত হাট ছাড়া অন্য কোন স্থানে গরুর বিকিকিনি বন্ধ করা হবে। তিনি জানান, মহাসড়কের ওপর হাট বসতে দেয়া হবে না। পুলিশি হয়রানির বিষয়টি তার জানা নেই।
দিঘলিয়া উপজেলার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রবিউল হোসেন জানান, অননুমোদিত হাটের বিকিকিনি সরকারি নীতিমালার পরিপন্থি। হাট থেকে আদায়কৃত রাজস্ব বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেখভাল করেন। নিরাপত্তার বিষয়টি পুলিশের হাতে। অননুমোদিত চুকনগর হাটের পরিচালনাকারী নজরুল ইসলাম স্থানীয় ইউনিয়ন কৃষক লীগের সাবেক আহ্বায়ক বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, জনগণের কেনাকাটার সুবিধার্থে হাট বসানো হয়েছে। শুক্রবার কেনাবেচা হয়েছে। হাট অনুমোদনের জন্য মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর সুপারিশ নিয়ে জেলা প্রশাসনে আবেদন করা হয়েছে। দিঘলিয়ার মোল্লা জালাল উদ্দিন কলেজের হাট পরিচালনাকারী ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শামীম হোসেন জানান, সাবেক সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগ নেতা মোল্যা জালাল উদ্দিনের পরামর্শে এ হাট পরিচালনা করা হয়। গরুর হাটের জন্য সরকারি অনুমোদন নেই বলে তিনি স্বীকার করেছেন। কলেজ পরিচালনা পর্ষদ হাট দেখভাল করেন। হাট থেকে অর্জিত অর্থ কলেজের কাজে ব্যয় করা হয়। এ কলেজটি এমপিওভুক্ত হয়নি।
পশুর ট্রাকে চাঁদাবাজি বরদাশত করা হবে না: ভারপ্রাপ্ত আইজিপি
ঈদুল আজহা উপলক্ষে মহাসড়কে পশুবাহী ট্রাকে পুলিশ চাঁদাবাজি করলে তা বরদাশত করা হবে না বলে নিজ সংস্থার সদস্যদের হুঁশিয়ারি করেছেন বাংলাদেশ পুলিশের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিদর্শক (আইজি) মো. মোখলেসুর রহমান। ভারপ্রাপ্ত আইজিপি বলেন, দুই একজন পুলিশ সদস্যের জন্য সমগ্র পুলিশ বাহিনীকে কলঙ্কিত হতে দেয়া হবে না। যদি কোন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে পশুর ট্রাক থেকে চাঁদা নেয়ার নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে তাহলে সাময়িক বরখাস্ত, বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি নিয়মিত আইনে ব্যবস্থা নেয়া হবে। পুলিশের এ ধরনের কর্মকাণ্ড নজরদারি করতে ইন্টেলিজেন্স এবং ফিল্ড কমান্ডাররা নিয়োজিত রয়েছেন। তারা এসব বিষয় পর্যবেক্ষণ করছেন। এ ক্ষেত্রে আমরা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছি।

‘আপসহীন’ নেত্রীর তালিকায় হাসিনা তৃতীয়, খালেদা চতুর্থ by তানজির আহমেদ রাসেল

বিশ্বের ‘আপসহীন’ ১০ মুসলিম নেত্রীর তালিকায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তৃতীয় এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া চতুর্থ স্থানে রয়েছেন। যুক্তরাজ্যভিত্তিক ব্রাউন গার্ল ম্যাগাজিন কর্তৃক প্রকাশিত এক তালিকায় এই তথ্য উঠে এসেছে। তালিকায় প্রথম স্থানে আছেন পাকিস্তানের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো। ওই তালিকা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে হাফিংটন পোস্ট।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমগ্র বিশ্বে মুসলিম নারীকে নির্যাতিত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অথচ এর মধ্যে কিছু মুসলিম নেত্রী আছেন যারা নিজ গুণে সারা বিশ্বের আলোকবর্তিকা হয়েছেন। নিজের যোগ্যতায় শত প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে রাষ্ট্র পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। ব্রাউন গার্ল ম্যাগাজিনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্পর্কে বলা হয়েছে, তিনি বাংলাদেশের বর্তমান দশম জাতীয় সংসদের সরকারদলীয় প্রধান এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা। তিন বার তিনি দেশের  প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। বর্তমানে দেশ শাসন করে চলেছেন শক্ত হাতে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রী সম্পন্ন করেছেন।
বেগম খালেদা জিয়া সম্পর্কে বলা হয়েছে, তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির চেয়ারপারসন। জন্মগ্রহণ করেছেন ১৯৪৫ সালে। তিনি তিনবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম ও মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী। স্বামী প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর দলের হাল ধরেন তিনি।
তালিকায় শীর্ষস্থানে থাকা ‘ডটার অব ইস্ট’ খ্যাত পাকিস্তানের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো ১৯৫৩ সালের ২১শে জুন করাচিতে জন্মগ্রহণ করেন। মুসলিম বিশ্বের প্রথম ও পাকিস্তানের একমাত্র নারী প্রধানমন্ত্রী তিনি। তিনি দুই বার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। বাবা সাবেক প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর মৃত্যুর পর পকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) হাল ধরেন তিনি। ২০০৭ সালের ২৭শে ডিসেম্বরে রাওয়ালপিন্ডিতে এক জনসভায় ভাষণদানকালে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। তিনি হার্ভার্ড ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনীতির ওপর পড়াশোনা করেন। তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন ইন্দোনেশিয়ার পঞ্চম প্রেসিডেন্ট মেঘবতী সুকর্ণপুত্রী। দেশটির প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি ২০০১ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ইন্দোনেশিয়ার প্রজাতান্ত্রিক দল পিডিআই-এর চেয়ারম্যান তিনি। তালিকায় ৫ম স্থানে রয়েছেন কসোভোর বর্তমান প্রেসিডেন্ট আতিফিতে জাহজাগা। তিনি ২০১১ সালে কসোভোর প্রথম নির্বাচিত নারী প্রেসিডেন্ট শপথ গ্রহণ করেন তিনি । ৬ষ্ঠ স্থানে থাকা তানসু সিলার তুরস্কের প্রথম ও একমাত্র নারী প্রধানমন্ত্রী । ১৯৯৩ সালে তুরস্কের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তুরস্কের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। এর পর রয়েছেন সেনেগালের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী মামে মাদিওর বোয়ে। তিনি ২০০১ মার্চ থেকে ২০০২ নভেম্বর পর্যন্ত দেশটির প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তালিকার ৮ম স্থানে সেনেগালের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী আমিনাতা তৌরে আর নবম স্থানে রয়েছেন আফ্রিকার দেশ মালির মুসলিম নারী প্রধানমন্ত্রী সিসে মরিয়ম কাইদামা সিদিবি। তালিকার সর্বশেষ হচ্ছেন ভারত মহাসাগরের দ্বীপ মরিশাসের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট খ্যাতিমান জীববিজ্ঞানী আমিনা গারিব ফাকিম। গত জুনে মরিসাসের ষষ্ঠ প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন ৫৬ বছর বয়সী আমিনা। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সারে ও ইউনিভার্সিটি অব এক্সটার থেকে পড়শোনা করা আমিনা মরিশাস বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগেরও চেয়ারপারসন।

‘পুলিশ ক্ষমতার অপব্যবহার করে গুলি চালিয়েছে’

টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে গত শুক্রবার পুলিশের গুলিতে ৪ জন নিহতের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে জাতীয় মানাবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড.মিজানুর রহমান বলেছেন, আমি যদি কালিহাতীর জনগণ হতাম তাহলে তাদের সাথে আমিও প্রতিবাদ সভায় অংশ নিতাম। পুলিশ তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে গুলি চালিয়েছে। যা কোন ভাবেই উচিৎ হয়নি। পুলিশের উচিৎ কাউকে রক্ষা না করে ফৌজদারি বিধি অনুযায়ী মামলা দায়ের করে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।  এ ঘটনায় যে সব পুলিশ জড়িত তাদেরকে শুধু প্রত্যাহার করলে চলবে না। তাদের আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে। সোমবার দুপুরে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজে হাসপাতালে কালিহাতীর ঘটনায় নির্যাতনের শিকার মা ও ছেলেকে দেখতে গিয়ে এসব কথা বলেন ড. মিজানুর রহমান। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন, জেলা প্রশাসক মো. মাহবুব হোসেন, ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার সঞ্জয় সরকার। পরে তিনি পুলিশের গুলিতে নিহতদের বাড়ীতে যান এবং তাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।
‘গুলি চালান দায়িত্ব আমার’
টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে বিক্ষুব্ধ জনতার ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণ নিয়ে ব্যাপক আলোচনার মধ্যে অপরাধ দমনে সরাসরি গুলি ছুড়তে বাহিনীর সদস্যদের নির্দেশ দিয়েছেন পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের প্রধান। উপ-মহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) এস এম মাহফুজুল হক নূরুজ্জামান গতকাল ফরিদপুরে এক সভায় পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, “একটি কথা মনে রাখতে হবে- যারা জনগণের জানমাল নিয়ে ছিনিমিনি খেলে কিংবা সরকারি সম্পদ ধ্বংসের চেষ্টা করে, তাদের প্রতিহত করতে যা যা করা দরকার সবই করবেন। “প্রয়োজন হলে সরাসরি গুলি করুন। দায়-দায়িত্ব সব আমি নেব।”
শুক্রবার কালিহাতীতে বিক্ষুব্ধ জনতার উপর পুলিশের গুলিবর্ষণে মোট চারজন নিহত হন। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। ডিআইজি নূরুজ্জামান শনিবার কালিহাতী গিয়ে গুলিবর্ষণকারী পুলিশ সদস্যদের প্রত্যাহারের নির্দেশও দিয়ে আসেন। এরপর তিন এসআই ও চার কনস্টেবলকে বরখাস্তও করা হয়।
এর একদিন বাদেই ঢাকা রেঞ্জের পুলিশ প্রধান ফরিদপুরের সালথা উপজেলার নবকাম পল্লী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ প্রাঙ্গণে কমিউনিটি পুলিশিং ও আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক মতবিনিময় সভায় গুলির নির্দেশ দেন। আসন্ন ঈদ উপলক্ষে রাস্তাঘাটে চাঁদাবাজদের কোন ধরনের ছাড় না দিতে বাহিনীর সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে গুলির নির্দেশ দেন তিনি। “জনগণের টাকায় আপনাদের বেতন হয়। তাদের টাকায় আপনাদের অস্ত্র কেনা হয়। তাদের জানমালের নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব আপনাদের,” বলেন নূরুজ্জামান।  বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আচরণ নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনা রয়েছে। একই অভিযোগ তুলে বিএনপি বরাবরই বলে আসছে, বিরোধী দল দমনে পুলিশকে ব্যবহার করছে সরকার। ডিআইজি নূরুজ্জামান হেফাজতে ইসলামীর সন্ত্রাস ঠেকাতে পুলিশের পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে বলেন, “হেফাজত ঢাকা অবরোধের সময় ব্যাংক লুট  ও সচিবালয়ে নাশকতা করতে চেয়েছিল। পুলিশ   সে অপতৎপরতা ব্যর্থ করে দেয়।” রাষ্ট্রীয় বাহিনীর কর্মকর্তা নূরুজ্জামান আগের সরকারগুলোর প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে সভায় বলেন, “আমি মুক্তিযোদ্ধা ও গোপালগঞ্জের লোক হওয়ায় যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও আমাকে পদোন্নতি দেয়া হয়নি। যথা সময়ে আমাকে পদোন্নতি দিলে আমি এখন আইজি থাকতাম।” ফরিদপুর  জলা পুলিশ সুপার মো. জামিল হাসানের সভাপতিত্বে এই সভায় রাজবাড়ীর পুলিশ সুপার জিহাদুল কবির, গোপালগঞ্জের ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার জাহিদ হাসানও বক্তব্য রাখেন।

‘কোনো মুসলিমকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বানানো উচিৎ নয়’

ইসলাম যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে কোনো মুসলিমকে নির্বাচিত করা উচিৎ হবে না। এ মন্তব্য করেছেন আসন্ন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান দল থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী বেন কারসন। এ খবর দিয়েছে আল জাজিরা। রবিবার এনবিসি চ্যানেলের ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে কারসন বলেন, আমেরিকার দায়িত্ব একজন মুসলিম পাক, এ বক্তব্যের পক্ষে কথা বলবো না আমি। আমি একেবারেই এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত নই। ধর্মপ্রান খ্রিস্টান ও কৃষ্ণাঙ্গ এ প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জানান, তিনি মনে করেন একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের ধর্মবিশ্বাস সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ন হতে হবে। কিন্তু তিনি নির্দিষ্ট করে বলেননি ঠিক কোন জায়গায় ইসলামের সঙ্গে সাংবিধানিক নীতির বিরোধ রয়েছে। কারসনের এ বক্তব্যের নিন্দা জানিয়েছে আমেরিকার সর্ববৃহৎ মুসলিম নাগরিক অধিকার গোষ্ঠী কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশন্স। সংগঠনটির মুখপাত্র ইব্রাহিম হুপার বলেন, এ বক্তব্যের কারণে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীতার ক্ষেত্রে কারসনকে অযোগ্য ঘোষণা করা উচিৎ। কেননা, আমেরিকান সংবিধানে সরকারী কোনো পদে বসার জন্য ধর্মীয় বাছবিচার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ইব্রাহিম আরও বলেন, কারসনের উচিৎ তার প্রার্থীতা প্রত্যাহার করা।
রিপাবলিকান দল থেকে এবার ১৬ জন ব্যাক্তি প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন প্রত্যাশী। এর মধ্যে কারসন বলতে গেলে ভালো অবস্থানেই রয়েছেন। অবশ্য রবিবার সর্বশেষ সিএনএন/ওআরসি মতামত জরিপে তিনি দ্বিতীয় অবস্থান থেকে তৃতীয় স্থানে নেমে গেছেন। বর্তমানে তাকে ১৪ শতাংশ রিপাবলিকান সমর্থন করে। এর আগে প্রথম স্থানে থাকা ডোনাল্ড ট্রা¤পও মুসলিম ইস্যুতে বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন। সম্প্রতি এক জনসভায় এক সমর্থকের করা মুসলিম-বিরোধী বক্তব্য চ্যালেঞ্জ না করে এক প্রকার সম্মতি দিতেই দেখা গেছে ডোনাল্ড ট্রা¤পকে। সিএনএন/ওআরসি জরিপ অনুযায়ী এখনও রিপাবলিকান দলের প্রার্থীতার লড়াইয়ে শীর্ষে রয়েছে রিয়েল এস্টেট মুঘল ট্রা¤প। তার পক্ষে রিপাবলিকান দলের নিবন্ধনকৃত ভোটারদের ২৪ শতাংশের সমর্থন রয়েছে। অবশ্য এর আগের মতামত জরিপেও তার পক্ষে ৩২ শতাংশ ভোটারের সমর্থন ছিল। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এইচপি’র সাবেক প্রধান নির্বাহী কার্লি ফিওরিনা ১৫ শতাংশ সমর্থন নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন।
কারসনের ওই মুসলিম-বিরোধী বক্তব্যের সমালোচনা এসেছে তার রিপাবলিকান দল থেকেও। আরেক প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম বলেন, আমি মনে করে ডা. কারসনের ক্ষমা চাওয়া উচিৎ। কেননা, এ বক্তব্য বিশেষ করে মুসলিম মার্কিন সেনাদের জন্যও আপত্তিকর। কিন্তু অন্যান্য রিপাবলিকান প্রার্থীরা এ ইস্যুতে বেশ নরম আচরন করছেন। কেননা, কারসনের বক্তব্য রিপাবলিকান দলের বেশিরভাগ ভোটারের মনোভাবের প্রতিফলন ঘটায়। যেমন, কেন্টাকির সিনেটর ও আরেক প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী র‌্যান্ড পল সিবিএস টিভি’র ফেইস দ্য নেশন অনুষ্ঠানে বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের ধর্ম বড় বিষয় হওয়া উচিৎ নয়। কিন্তু তিনি বলেন, আমি এ ইসলামবিরোধী মনোভাব বৃদ্ধির বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারি। কেননা, আমরা যাদের দ্বারা আক্রান্ত হই, তারা সবাই মুসলিম। জানুয়ারিতে মার্কিন অঙ্গরাজ্য আইওয়াতে ব্লুমবার্গ/আ দেস মোইনেস রেজিস্টারের করা একটি মতামত জরিপে দেখা গেছে, সেখানকার ৩৯ শতাংশ রিপাবলিকান ভোটার ইসলাম ধর্মকে মজ্জাগতভাবে সহিংস বলে মনে করে। ডেমোক্রেট দলের ১৩ শতাংশের মধ্যে এ দৃষ্টিভঙ্গি দেখা গেছে। এই আইওয়াতেই রিপাবলিকান দলের চূড়ান্ত প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী নির্বাচনে প্রথম ভোটাভুটি আয়োজিত হবে।

‘ঢাকা আইসিইউ’র রোগীর মতো’

‘নগর ঢাকায় যানজট: উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় খোদ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক মেগা এই সিটিকে আইসিইউ রোগীর সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেছেন, বর্তমানে ঢাকা শহরের অবস্থা হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউতে) থাকা রোগীর মতো। এর ডাক্তার হচ্ছেন মেয়র, যিনি কখনও ডাক্তারি পড়েননি।
গতকাল শরতের বর্ষণসিক্ত সকালে নগরীর রাস্তাগুলো যখন তলিয়ে ছিল, যানজটে আটকা পড়েছিল হাজার হাজার গাড়ি, ঠিক তখন বনানীর হোটেল সেরিনায় ‘নগর ঢাকায় যানজট: উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এই গোলটেবিল বৈঠক চলছিল। বৈঠকে  প্রধান অতিথি ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। আলোচনায় অংশ নেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা, ঢাকার দুই মেয়র আনিসুল হক এবং মো. সাঈদ খোকন, মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার গোলাম ফারুক এবং চার নগর বিশেষজ্ঞ। 
বৈঠকে মেয়র আনিসুল হক বলেন, রোগীকে বাঁচাতে হবে। রোগী মরে যাচ্ছে, আমরা শুধু গবেষণা করছি, তা হবে না। ঢাকাকে বাঁচাতে জরুরি কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। সমস্যার ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ কমাতে হবে। তিনি বলেন, সবাই বলে ফুটপাথ থেকে হকার তুলে দেন। রাস্তা দখলমুক্ত করেন। কিন্তু বলা যত সহজ, করা  তত সহজ নয়। কারণ তারা টাকা দিয়ে বসেছেন। তাদের পেছনে অনেক শক্ত হাত আছে। উত্তর সিটি মেয়র বলেন, সমস্যার মধ্যেই আমরা কাজ শুরু করেছি। নগরীর বিত্তবানরাও আমাদের ডাকে সাড়া দিচ্ছেন। তারা বলছেন, উদ্যোগ নিতে, ফান্ডের  সমস্যা হবে না। এ সময় তিনি বিভিন্ন সড়কে ইউলুপ নির্মাণ করার জন্য কিছু জমি চান সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর কাছে। সেতুমন্ত্রী তৎক্ষণাৎ জমি দেয়ার আশ্বাসও দেন। যানজট ও জলজটকে রাজধানীর প্রধান দুই সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, এ সব নিয়ে আমরা প্রায়ই আলোচনা করি। এখন অ্যাকশন দেখাতে চাই। কিছু কাজ দেখাতে  চাই। তিনি বলেন, যানজট নিরসনের দায়িত্ব ডিএমপি’র। তবে সিটি করপোরেশন এতে নেতৃত্ব দিতে চায়, ভূমিকা রাখতে চায়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার  গোলাম ফারুক বলেন, অপরিকল্পিত রাস্তা নির্মাণ, রাস্তা ভাঙা, উন্নয়নকাজে রাস্তা বন্ধ থাকা, বিপরীত থেকে আসা গাড়ির কারণে যানজট কমছে না। আলোচনায় অংশ নিয়ে ঢাকার দুই মেয়রের উদ্দেশে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, এক ঝুড়িতে এত ডিম রাখলে হবে না। আপনারা আগে ছোট পরিকল্পনা নিন, বাস্তবায়ন করেন। রাস্তা দখলমুক্ত করেন। সবাই ভালো ভালো কথা বলে। কিন্তু অ্যাকশন নেই। বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট, ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ, বাংলাদেশ প্ল্যানার্স ইনস্টিটিউটের সহযোগিতায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে।  এতে যানজট সমস্যা  সমাধানে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা  তুলে চারটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। প্রদর্শনীতে ঢাকার যানজটের কারণ, উত্তরণের উপায়, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে। তথ্যচিত্রে জানানো হয়, ২০১৩ সালে মোট যানবাহনের মধ্যে ঢাকায় চলাচলকারী মানুষের মাত্র ছয় শতাংশ ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করেন। অথচ এই গাড়িগুলো সড়কের ৮০ শতাংশ জায়গা জুড়ে থাকে। বৈঠকে নগর বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল আলম, তানভীর নেওয়াজ, অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন, স্থপতি ইকবাল হাবীব, উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিএম এনামুল হক বক্তব্য রাখেন।

ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণে জাতীয় ঐকমত্য গড়ার আহ্বান

ক্ষমতার পৃথকীকরণের সাংবিধানিক অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও আইন বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের ক্ষমতা প্রয়োগের ভারসাম্য প্রায়শই বিঘ্নিত হচ্ছে। তাই তিনটি বিভাগের ক্ষমতা ও কাজের ভারসাম্য আনা জরুরি বলে মনে করছেন উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ। এ লক্ষ্যে গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার করে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের দাবি জানিয়েছেন তারা। রোববার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠক থেকে তারা এ দাবি জানান। পূর্ণ ও কার্যকর গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য, সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের জন্য উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজের ব্যানারে দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা ধারাবাহিক গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করছেন। গত মাসে প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার ওপর তারা একটি বৈঠকের আয়োজন করে। এরই ধারাবাহিকতায় গতকালের বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের সঞ্চালক সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ড. এটিএম শামসুল হুদা বলেন, নাগরিকদের বৈঠকে আলোচিত বিষয়বস্তু পরবর্তীকালে ভলিউম আকারে প্রকাশ করা হবে। নাগরিকরা দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক সমস্যার একটি দীর্ঘস্থায়ী সমাধান চান। এ বছরের শুরুতে দেশব্যাপী শুরু হওয়া সংঘাতের ফলে ব্যাপক জানমালের ক্ষতি হয়। সে পরিপেক্ষিতে ‘উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ’ গঠিত হয়। আমরা দেখেছি যে, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো শুধু নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু সুষ্ঠু নির্বাচনের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে আমাদের সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার আনয়ন করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের কথা হচ্ছে নির্বাচনী গণতন্ত্র। এটা প্রমাণিত হয়েছে ওই ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। ১৯৯১ সাল থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতিতে নির্বাচন হয়ে আসছে। কিন্তু এরপরও আরও কিছু করা দরকার। নির্বাচনে কেউ হারলে তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে। তাই শান্তি, শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে সঠিকভাবে গড়ে তুলতে হবে। আমলাতন্ত্র, বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন, দুদক যদি সঠিকভাবে কাজ করে তাহলে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে কোন প্রশ্ন থাকে না। আমরা এই বিষয়টার দিকে নজর দেই না। উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ আজ ১২টা বিষয় চিহ্নিত করেছে। আমরা এসব বিষয়ে সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করতে বলছি। কিন্তু কাজ করতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকে। এ প্রসঙ্গে ভারতের রাজনৈতিক দলগুলোর উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, তাদের মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব প্রকট থাকলেও মৌলিক বিষয়ে তারা ঐক্যবদ্ধ। তাই সকল সংস্কারে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হয়। উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন মহলের সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, আমরা সমালোচনার জবাব দেই না। কারণ, এর প্রয়োজন মনে করি না। নাগরিক সমাজের সদস্যরা রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে কাজ করেছেন। নিজেরা যেচে কারও কাছে তারা পদ চায়নি। আমাদের ডেকে পদ দেয়া হয়েছে। এখানে কারও স্বার্থের বিষয় নেই। আমরা ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে যে স্বাধীনতা পেয়েছি তা সমুন্নত রাখা আমাদের উদ্দেশ্য। বৈঠকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এমএম শওকত আলী বলেন, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এর বাইরে কোনভাবেই সম্ভব না। কোন কোন জায়গায় সংস্কার করা উচিত, করলে ভাল হবে, সুশাসনের জন্য সহায়ক হবে তা নাগরিকরা সুপারিশ করতে পারে। তিনি বলেন, একক রাষ্ট্রে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করে খুব বেশি দূর নিয়ে যাওয়া যায় না। সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলা হয়েছে। এ বিষয়ে কোন দ্বিমত নেই। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বিকেন্দ্রীকরণ হয়নি। প্রাইভেটাইজেশন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা করলেই যে সুফল পাওয়া যাবে তা ঠিক না। রেগুলেটরি অথরিটিকে সঠিকভাবে কাজ করতে হবে। সকল সেক্টরে এ রকম অথরিটি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রধান বিচারপতির একটি পর্যবেক্ষণের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, আজকাল নতুন নতুন যেসব আইন হচ্ছে সেগুলো বিচার নিষ্পত্তিতে বাধা সৃষ্টি করছে কি না গবেষণা হওয়া দরকার। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, প্রকৃতপক্ষে একটা দেশে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ হয় না যদি সেখানে অর্থের একটা স্বয়ংক্রিয় বণ্টন ব্যবস্থা না থাকে। এটা ভারতে আছে এবং ছয় দফা আন্দোলনে অন্যতম বিষয় ছিল যে আমাদের সম্পদ আমরা পাবো কি না। বাংলাদেশে এটা আলোচনায় আসে না। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ হলেও অর্থের বণ্টন সঠিকভাবে না হলে কোন লাভ হবে না। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে আমরা এটা দেখতে পাই। পুলিশের কথা তো বলাই যাবে না। কারণ, এটা রাজনৈতিক হাতিয়ার। আর্থিক ক্ষমতাই হচ্ছে আসল ক্ষমতা। অর্থকে যদি কেন্দ্র থেকে বের করে আনা না যায় তবে ক্ষমতাকে বের করা যাবে না। জনসংখ্যার অনুপাত অনুযায়ী উন্নয়ন কাজে অর্থ বরাদ্দের জন্য অর্থ কমিশন গঠন করার আহ্বান জানান তিনি। স্থানীয় সরকারে অসাংবিধানিক হস্তক্ষেপ হচ্ছে কি না তা ক্ষতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, স্থানীয় সরকারে এমপি সাহেবরা বসতে পারেন কি না এ নিয়ে হাইকোর্টে রিট হওয়া দরকার। কোন অধিকার বলে তারা সেখানে বসবেন তার বৈধতা জানা দরকার। হাইকোর্টে থাকলে আমাদের আপিল বিভাগে যাওয়া উচিত। কারণ হিসেবে, জনগণ এই বিষয়ে তাদের কোন সাংবিধানিক অধিকার দেয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন। বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ। প্রবন্ধে বিকেন্দ্রায়নের যৌক্তিকতায় বলা হয় ক্ষমতার ভারসাম্য, অধিকতর গণতন্ত্র, সমতা ও জনমুখী সেবা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা, জনসম্পৃক্ততা, সমতায়ন, গণক্ষমতায়ন, স্বশাসন, সুশাসন এবং প্রশাসনিক ও অর্থব্যবস্থার দক্ষতার জন্য বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি। ক্ষমতার অতিকেন্দ্রীকতার কুফল উল্লেখ করে প্রবন্ধে বলা হয়, বোকারা ক্ষমতাকে ভাগাভাগি ও বিকশিত না করে মুষ্টিবদ্ধ করতে গিয়ে নিজেরাই নিজেদের ক্ষমতার কারাগারে বন্দি হয়ে যান। ক্ষমতা একটি যন্ত্রণাময় জাল। এখানে বেশি জড়িয়ে গেলে বের হওয়ার পথ সঙ্কুচিত হয়। অতি ক্ষমতা মানুষকে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে। ক্ষমতার প্রতি মাদকতা ও উন্মাদনায় কিছু কিছু মানুষ পাগল হয়ে যায়। গ্রিক পৌরাণিক সাহিত্যে কিং মিডাসের স্বর্ণ অনুরাগের মতো। শেষ পর্যন্ত তাকে দেবতার স্পর্শমাত্র স্বর্ণ রূপান্তরের বর শাপে পরিণত হয়। ইতিহাসের অনেক মহানায়কের করুণ পরিণতি ক্ষমতার প্রতি অনুরাগ থেকেই সৃষ্ট। প্রবন্ধে বাংলাদেশের বিকেন্দ্রীকরণের কিছু দিক নির্দেশনা তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়, সরকারের তিনটি বিভাগ বা অঙ্গকে ধরেই একটি বিকেন্দ্রায়ন নীতি রচিত হতে পারে। এক্ষেত্রে আইন, শাসন, ও বিচার বিভাগকে মূল কেন্দ্র নির্ধারণ করে কোথায়, কতটুকু, কার কাছে কিভাবে বিকেন্দ্রায়ন প্রয়োজন তা নির্ধারণ জরুরি। সংসদের ভেতরে ও বাইরে ক্ষমতা ও দায়িত্ব ভাগাভাগির প্রশ্ন থাকে। এ বিষয়ে বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়। সুপারিশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- সংসদের উচ্চ কক্ষ ও নিম্ন কক্ষ, দুটি কক্ষের সৃষ্টি এবং আইনবিভাগের অভ্যন্তরে ভারসাম্য আনয়ন, নির্দিষ্ট বা ন্যূনতম গণস্বাক্ষরে উত্থাপিত কোন বিষয় বিল আকারে সংসদে উত্থাপন, গুরুত্বপূর্ণ বিল সংসদে পেশের পূর্বে জনমত যাচাই, সংবিধানের মৌলিক বিষয় সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোট গ্রহণ, সংসদীয় কমিটি ব্যবস্থাকে অধিক কার্যকর করা। নির্বাহী বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়ে বলা হয়, এর একাধিক স্তর ও বিন্যাস ভেবে দেখতে হবে। এ ব্যাপারে অনেক সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ প্রয়োজন হবে। প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ, বিভিন্ন দপ্তরের মন্ত্রী এবং আঞ্চলিক ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের ক্ষমতা, কার্যক্রমের নবতর বিন্যাস নিয়ে বিশ্লেষণ করতে হবে। সচিবের কর্তৃত্বের একটি সুনির্দিষ্ট বলয় ও সীমারেখা থাকতে হবে। সচিব কখনও মন্ত্রীর কর্তৃত্বে বিলীন হয়ে যাবে না। বিচারব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণের প্রসঙ্গে প্রবন্ধে বলা হয়, দেশের কিছু গুরুত্বপূর্ণ শহরে হাইকোর্টের বিশেষ কোন বেঞ্চ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া যায় কি না সেটি বিবেচনার দাবি রাখে। দেওয়ানি ও ফৌজদারি উভয় ক্ষেত্রে নিম্ন আদালত উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সম্প্রসারণ সময়ের দাবি। প্রবন্ধে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সংস্কার ও অধিক দায়িত্ব ক্ষমতা অর্পণের জন্য কিছু সুপারিশ করা হয়। সুপারিশে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইনিপন্থায় ক্ষমতা চর্চা ও প্রয়োগে হস্তক্ষেপ না করা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে সরকারি দপ্তর, জনবল এবং অর্থসম্পদ হস্তান্তরের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে স্থানীয় সরকার উন্নয়ন পরিকল্পনা, সেবা ব্যবস্থা প্রশাসনিক জবাবদিহি স্বচ্ছ করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়।  সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এটিএম শামসুল হুদার সঞ্চালনায় বৈঠকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খানসহ বেশ কয়েকটি উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অংশ নেন।

মায়ের সম্মান কোথায়? by মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন

নারীর সম্মানের জন্য যুগ যুগ ধরে সংগ্রাম চলছে। বাঙালি জীবনে নওয়াব ফয়জুন্নেছা ও বেগম রোকেয়া যে অনবদ্য অবদান রেখে গেছেন তা আজো জ্বল জ্বল করছে আমাদের হৃদয়ে। তাদের দেখানো পথে একটু একটু হেটে আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। নারীর উপস্থিতি আজ সর্বত্র। নারীর কন্ঠও সর্বত্র। কিন্তু নারীর সম্মান কোথায়? পৈশাচিক আক্রমণ দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। এর শেষ কোথায়?
বৃটিশরা এদেশের নারীর সম্ভ্রমহানী করেছে। আমরা সাহসী হয়ে সংঘবদ্ধভাবে তাড়িয়েছি। কিন্তু স্বৈরতান্ত্রিক পাকিস্তানকে তাড়াতে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন সময়ে এদেশের নারীদের উপর যে পৈশাচিক আঘাত নেমে এসেছিল তার ভয়ঙ্কর আর্তনাদ এখনো হৃদয়ের গভীরে ভেসে ওঠে। ফলে সেসব আমাদের স্বাধীনতার স্বার্থকতার জয়গান গেয়ে চলেছে। কিন্তু স্বাধীন দেশে একের পর এক নারী যখন লাঞ্ছণার শিকার হয়, তখন কাকে দোষ দেব? আর প্রতিকার কার কাছে চাইবো?
১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ নরপশুদের আক্রমণে সন্তানের সামনেই নগ্ন হতে হলো টাঙ্গাইলের কালিহাতীর এক মাকে। প্রতিবাদে উত্তাল কালিহাতী উপজেলার প্রতিটি গ্রামের মানুষ। দৈনন্দিন কাজ ফেলে নারী-পুরুষ-শিশু ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজপথে প্রতিবাদ মূখর। দাবী একটাই বঙ্গবন্ধুর ডাকে যে জাতি জীবন বিলিয়ে দিয়ে স্বাধীন করেছে সে দেশে এমন ঘটনা কেন ঘটবে? ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য-যারা অপরাধীকে ধরে এনে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবে এবং ভোক্তভোগীদের স্বাভাবিক জীবনের পথ দেখাবে, তারাই অপরাধীদের রক্ষা করতে আত্ম-মর্যাদাশীল কালিহাতীর সাধারণ জনগণের উপর যাঁপিয়ে পড়েছে এবং হত্যা করেছে তিনটি তাজা প্রাণ এবং অর্ধশত মানুষকে পাঠিয়েছে হাতপাতালে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে বিভিন্ন সংবাদে প্রকাশিত খবরে উঠে আসে প্রতিবাদ মিছিলে প্রথমে পুলিশ বাধা দেয়, পরে বিক্ষুব্ধ মানুষের উপর বলপ্রয়োগ করতে চাইলে উত্তেজিত জনগণ ইটপাটকেল ছুঁড়ে মারলেন এবং পুলিশ নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করলো নিরীহ মানুষগুলোকে। অপরাধ কার, কালিহাতী মানুষের না পুলিশের? যে নারীর ইজ্জত হরণের জন্য আর্ন্তজাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করে যদি নরপিশাচদের ফাঁসি দিতে পারি, তবে এসব পৈশাচিক নরঘাতক পুরুষদের বিরুদ্ধে আমরা এত উদার কেন? এসব পুলিশ কেন অপারাধীদের পক্ষে অবস্থান নিল? ্এরা কি তবে পাকিস্তানি পৈশাচিক মনোভাবকে আবারো প্রতিষ্ঠিত করতে চায়? যদি তা না হয়, তবে এদেরকে কি বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার করা হবে? না, শত কন্ঠে আওয়াজ তুলবো ত্রিশ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা শুধুই মিথ্যা স্বপ্ন, কেননা সে স্বাধীনতা এসেছে কেবল দুষ্টের লালন আর শিষ্টের দমন করেতে? এর সঠিক বিচার ব্যর্থ হলে পুরো দায়ভার ক্ষমতাসীন দলের।
নিহত প্রতিটি পরিবারকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দেয়ার ঘোষণা এসেছে, আবং সে সময়ে দায়িত্বরত সব পুলিশ সদস্যকে প্রতাহারের সিদ্ধান্ত এসেছে। কী চমৎকার বিচার? আর আমাদের বিবেক? যদি স্বাধীনতা বিরোধী কোন নর খাদক আবেদন করে প্রতিটি নারীর সম্ভ্রমহানীর জন্য দশ হাজার টাকা দেবে  (সে সময়ের টাকার মূল্য ধরে) এবং রাজনীতি ছেড়ে অন্যত্র চলে যাবে, তবে কি দেশ তাদের ক্ষমা করবে? যদি ক্ষমা না করে, তবে স্বাধীন দেশে এমন ঘটনার পরেও, বিচার ব্যবস্থার ভূমিকা কী হওয়া উচিৎ ছিল? গণমাধ্যমে দেখেছি গুলি করে হত্যা করে এবং আহতদের শরীরের উপর পুলিশের জুতার আঘাতের দৃশ। কী মানবিকতা এদের?
একই দিনে ‘দৈনিক যুগান্তরে’ “জোরপূর্বক গৃহকর্মীর কিডনি নিলেন অতিরিক্ত সচিব” নামে একটি অনুসন্ধানী রির্পোট পড়ে হতবিহ্বল হবার উপায়ও নেই। কেননা, এখানেও পুলিশের প্রত্যক্ষ সহায়তায় জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার আয়রন নেছার কিডনি নিয়ে যান সাবেক (ঘটনার সময় চাকুরিরত) অতিরিক্ত সচিব সৈয়দ আমিনুর রহমান। হতবিহ্বল হতে পারছিনা, পাছে ভয় পুলিশ এসে ডা-া মেরে কোন ডাস্টবিনে ফেলে দেয়।
এদেশে শতশত নারীবাদী সংগঠন রয়েছে। কিন্তু তাদের ভূমিকা বরাবরের মতই প্রশ্নবিদ্ধ। সরকার যখন শিক্ষার উপর ভ্যাট বসিয়ে শিক্ষা ব্যাবস্থাকে স্তম্ভিতকরে দিয়েছিল এবং লক্ষ শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবনকে অনিশ্চয়তার দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখনো সুলতানা কামালের সুস্পষ্ট অবস্থান ছিল এসব শিক্ষার্থীদের বিপক্ষে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেই বলেন, “জন দুর্ভোগ তৈরি করে এসব শিক্ষার্থীরা কি অর্জন করবে?” তখন নিজের মনে প্রশ্ন জেগেছিল আন্দলনরত শিক্ষার্থীরা কি তবে জনগণের অর্ন্তভূক্ত নয়? তাদের জীবনের অনিশ্চয়তা কি দূর্ভোগ নয়? তিনিও বুর্জোয়া শ্রেণির স্বার্থ রক্ষায় সচেষ্ট। ফলে এঘটনার পর সুলতানা কামাল গংদের ভূমিকা যে কেবল লোক দেখানেই হবে এটা নিশ্চিত। কেননা এক জাহানারা ইমামের অনঢ় ও সাহসী আন্দোলনে এদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হতে বাধ্য হয়েছে এদেশে, কিন্তু সুলতানা কামালদের মিউ মিউ আওয়াজে বৈশাখী উৎসবে টিএসসিতে এবং কলিহাতীতে নারীর সম্ভ্রম রক্ষা হয়নি। বরং তাদের ভূমিকা রোমান্টিক টিউনের মত নরপিশাচদের উজ্জীবীত করেই চলেছে। ফলে এদেশে নারীর প্রতি যে আক্রমণ দিনে দিনে বেড়েই চলছে, এর শেষ কোথায়?
বঙ্গবীর টাঙ্গাইলের মানুষ। তবু তার প্রতি ভরসা রাখাও অসম্ভব। কেননা, তিনিও মাঝে ক্ষমতার শীতল বাতাসে অনুপ্রবেশের ইচ্ছায় বিসর্জন দিয়ে থাকেন সত্য-মিথ্যা এবং হতাশ করে চলেছেন আমাদের মত তরুণ সমাজকে। আর শাহরিয়ার কবির ও মুনতাসির মামুনেরা স্বাধীনতা যুদ্ধে যারা সম্ভ্রম হারিয়েছে তাদের জীবনের দুঃখ-কষ্ঠ-লাঞ্ছণা অসংখ্য গবেষণা করেছেন, কিন্তু স্বাধীনতার পরে নারীর সম্ভ্রম হানী কারা করে চলেছে, কেন করছে এবং এর প্রতিকার কী এনিয়ে কেন একটি শব্দও বলছেন না?
নারী অবলা নয়। তারা অসহায় মানবরূপী নরপশুদের হিং¯্রতার কাছে। ফলে আমরা দেখি কালিহাতীতে এক মায়ের সম্ভ্রমহানীতে প্রতিবাদী হয়ে ওঠেছে হিন্দু-মুসলিম, নারী-শিশু-পুরুষ একসাথে। এ বিবেক ছড়িয়ে পড়–ক সবার মাঝে। জেগে উঠে ধ্বংস করি সব নরপশুদের এবং তাদের দোসরদের। যে পুলিশ আমার স্বাধীনতাকে, পতাকাকে এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নকে কলঙ্কিত করছে, তাদের কি শাস্তি হওয়া উচিৎ?
মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন
প্রভাষক, ইংরেজি বিভাগ
নর্দান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ

ইন্দিরা গান্ধী এপ্রিলেই ঢাকা দখলের নির্দেশ দিয়েছিলেন by ওয়ালিউল হক

মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে অর্থাৎ ‘৭১-এর এপ্রিলের প্রথমেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস গান্ধী ঢাকা দখলের জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন কিন্তু ভারতীয় সেনা কর্তৃপক্ষ ঢাকা দখলে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেই বলে অপারগতা প্রকাশ করলে মিসেস গান্ধী ক্ষুব্ধ হন এবং ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফকেই ঢাকা দখলের নির্দেশ দেন। ওপরের তথ্যটি পাকিস্তানি কোনো সেনা কর্মকর্তার দেয়া তথ্য বলে মনে হলেও আসলে এ তথ্যটি প্রকাশ করেছেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের চিফ অব স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল জে এফ আর জ্যাকব তার লেখা 'Surrender at Dacca : Birth of a Nation' বইয়ে। কলকাতায় জন্মগ্রহণকারী ও ইহুদি ধর্মাবলম্বী জেনারেল জ্যাকব যুদ্ধের সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের বিষয়টি তদারক করেন।
আমরা যারা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ, তারা বহু বছর ধরে জেনে আসছিলাম, বাংলাদেশে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পরিচালিত হত্যাযজ্ঞ অব্যাহত থাকার প্রেক্ষাপটে ভারতে প্রায় এক কোটি মানুষ আশ্রয় নেয়। যার ফলে ভারতকে বাধ্য হয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হয় এবং ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করার পর ভারত পাল্টা আক্রমণ অভিযান শুরু করে এবং ১৬ ডিসেম্বর ঢাকা দখল করে।
মজার ব্যাপার হলো, ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী ঢাকা দখলের জন্য সেনাবাহিনীকে যে নির্দেশ দিয়েছিলেন সেটা অনেকের জানা থাকলেও বিএসএফকে যে ঢাকা দখলের নির্দেশ দিয়েছিলেন সেটা অনেকেরই জানা নেই। যেমন- পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তৎকালীন জনসংযোগ কর্মকর্তা সিদ্দিক সালিক তার Witness to Surrender বইয়ে মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই ভারতের বিভিন্ন রকম সাহায্য-সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে নিজেই প্রশ্ন উত্থাপন করেন এই বলে যে, ভারত যখন ঘটনার সাথে এতটাই জড়িত, তখন তারা মার্চের শেষে বা এপ্রিলের শুরুতে সামরিক অভিযান চালিয়ে সমস্যার সমাধান করে ফেলল না কেন? কারণ সে সময়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অবস্থা ছিল শোচনীয়। অবশ্য প্রশ্ন উত্থাপন করার সাথে সাথে ভারতের মেজর জেনারেল ডি কে পালিতের বরাত দিয়ে তিনি প্রশ্নের উত্তরও জানিয়ে দিয়েছেন। ডি কে পালিতের মতে, পাঁচ হাজার কোটি রুপির প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা বাস্তবায়নাধীন থাকায় এবং সেই সাথে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে আরো শক্তিশালী করে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু ব্যবস্থা নেয়া তখনো বাকি থাকায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর পক্ষে যুদ্ধে যাওয়া সম্ভব ছিল না (পৃ-৯৮)।
জেনারেল জ্যাকব তার বইয়ে লিখেছেন, এপ্রিলের শুরুর দিকে সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল এস এইচ এফ জে মানেক শ’ টেলিফোনে জানান যে, সরকার চাইছে ইস্টার্ন কমান্ড অবিলম্বে পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশ করুক। আমি প্রতিবাদ করে বললাম, ‘এটা অবাস্তব। কারণ আমাদের হাতে আছে শুধু পার্বত্য এলাকায় অভিযান পরিচালনার উপযোগী মাউন্টেন ডিভিশন। তাদের কাছে ব্রিজ তৈরির কোনো ধরনের সাজ-সরঞ্জাম নেই এবং সমতলে চলাচলের উপযোগী যানবাহনের পরিমাণও তাদের খুবই কম। কলকাতা থেকে ঢাকার মধ্যে বেশ কয়েকটি বড় ও চওড়া স্রোতস্বিনী নদী আছে। আবার বাংলাদেশের অপর পাশে আগরতলার প্রতিরোধব্যবস্থাও ভঙ্গুর। প্রতিরক্ষার জন্য সেখানে শুধু এক গ্যারিসন ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটালিয়ন আছে। দুরূহ যোগাযোগব্যবস্থার কারণে শক্তি বৃদ্ধি করতে যথেষ্ট সময়ের প্রয়োজন। আমাদের মাউন্টেন ডিভিশনগুলোকে উপযুক্ত সরঞ্জামে সজ্জিত করে নদীবহুল অঞ্চলে যুদ্ধের জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিতেও বেশ সময় লেগে যাবে। আসন্ন বর্ষাকালে নিমজ্জিত ধানক্ষেতের কারণে সেতুবিহীন নদীগুলো পার হওয়া খুব কঠিন হয়ে যাবে। সেই মুহূর্তে রওয়ানা দিলেও আমরা বড়জোর পদ্মা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারব। এ ছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবির পক্ষে বিশ্বজনমত তখনো পর্যন্ত সংগঠিত হয়নি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও পূর্ব পাকিস্তানের নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞের ব্যাপারে ততটা ওয়াকিবহাল ছিল না।’
জেনারেল মানেক শ’ জানতে চাইলেন, কবে নাগাদ আমরা তৈরি হতে পারব। আমি জানালাম, ‘আমাদের পর্যাপ্ত পরিমাণে উপযুক্ত অস্ত্রশস্ত্র ও সাজ-সরঞ্জাম দেয়া হলে ১৫ নভেম্বরের মধ্যে আমরা তৈরি হতে পারব। এর মধ্যে বর্ষার পানি সরে গিয়ে রাস্তাঘাটও চলাচলের উপযোগী হয়ে উঠবে।’ হতাশ বিরক্ত মানেক শ’ বললেন, এ বিষয়ে পরে তিনি আমার সাথে কথা বলবেন।
পরদিন জেনারেল মানেক শ’ আবার ফোন করে যখন বললেন, উচ্চপর্যায়ের সরকারি আমলারা সেনাবাহিনীকে ‘কাপুরুষ না হলেও অতি-সাবধানী’ বলে অভিহিত করেছেন। তার কণ্ঠস্বর ছিল তখন স্পষ্টতই ক্ষুব্ধ। তিনি বললেন, বিষয়টি আমাদের পুনর্বিবেচনা করা উচিত। আমার দৃষ্টিভঙ্গিতে অবিচল থেকে আমি বললাম যে, তিনি ইচ্ছে করলে সরকারকে জানিয়ে দিতে পারেন, ইস্টার্ন কমান্ডই টালবাহানা করছে এবং তারাই এই দেরির জন্য দায়ী। এই কথার ফলে তীব্র অভিযোগের মুখোমুখি হওয়ার একটা আশঙ্কা আমরা সৃষ্টি করলাম। তার পরেও এটা জেনারেল মানেক শ’র কৃতিত্ব ও সাহসিকতা যে, তিনি প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে আমাদের অবস্থান পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন।
এর অব্যবহিত পরে আমার সাথে সাক্ষাতের জন্য বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) ডিরেক্টর জেনারেল কে রুস্তমজীর নেতৃত্বে এক প্রতিনিধিদল ফোর্ট উইলিয়ামে আমার বাসায় আসেন। তার সাথে ছিলেন ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল গোলক মজুমদার ও মেজর জেনারেল নরিন্দর সিং। তারা প্রত্যেকেই ছিলেন খুব উত্তেজিত। রুস্তমজী বললেন, হাতে বেশি সময় নেই, অথচ করণীয় কাজ প্রচুর। আমি জানতে চাইলাম, তিনি কিসের কথা বলছেন। তিনি বললেন, ‘পাকিস্তানিদের পূর্ব পাকিস্তান থেকে তাড়ানোর কাজটা ইস্টার্ন কমান্ড করতে রাজি না হওয়ায় সরকার বিএসএফের ওপর এই কাজের দায়িত্ব দিয়েছে।’ তিনি রসিকতা করছেন মনে করে আমি হেসে উঠলাম। কিন্তু গম্ভীর স্বরে তিনি বললেন, আগামী দু-তিন সপ্তাহ পরে ঢাকায় যে বিজয়ী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা তিনি নিয়েছেন, তাতে অংশ নেয়ার লক্ষ্যে একটা দল পাঠানোর জন্য ইস্টার্ন কমান্ডকে আমন্ত্রণ জানাতেই তার এখানে আসা। এর মধ্যে নদীর ওপারে একটা অক্সিজেন প্লান্টে হঠাৎ বিস্ফোরণের আলোয় আকাশ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। আমি বর্তমানে ফিরে এলাম। আমি অনুধাবন করলাম যে, তারা সত্যিই সিরিয়াস এবং তারা বিশ্বাস করেন যে, সেনাবাহিনী তার সব শক্তি ও সংস্থান দিয়েও যা করতে পারবে না বলে এই মুহূর্তে মনে করছে, সেটা করার ক্ষমতা তাদের আছে।
যখন আমি রাজস্থানে ১২ ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনের কমান্ডে ছিলাম, তখন থেকেই রুস্তমজীকে আমি চিনি। তাকে আমি বললাম, সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে তার বাহিনীকে ফিরে আসতে হবে। তিনি যদি তার বাহিনীকে সবচেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগাতে চান, তাহলে তার উচিত হবে সুন্দরবনের জলাভূমিতে অথবা চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলে ঘাঁটি স্থাপন করা। এর ফলে তিনি ভবিষ্যতে সুবিধাজনকভাবে অপারেশন পরিচালনা করতে পারবেন।
বিএসএফের পূর্ব পাকিস্তান আক্রমণের বিস্তারিত বিবরণ দেয়ার ইচ্ছে আমার নেই। কিন্তু একটা ঘটনার উল্লেখ করলে সেখান থেকেই অনেক কিছু বোঝা যাবে বলে আমার ধারণা। সপ্তাহ দুয়েক পরে যশোর রোডের বনগাঁ সীমান্ত পোস্টে নিয়োজিত বিএসএফের কমান্ডিং অফিসারের একটা ফোন পেলাম যে, পূর্ব পাকিস্তানের কয়েক মাইল ভেতরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাদের ঘেরাও করে ফেলেছে এবং পাকিস্তানি ট্যাংক তাদের আক্রমণ করতে উদ্যত। আমি জানতাম, ওই এলাকায় কোনো পাকিস্তানি ট্যাংক নেই। এই ফোনের আসল উদ্দেশ্য ছিল লড়াইয়ের মধ্যে আমাদের আগেই জড়িয়ে ফেলা। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তাদের উদ্ধারের জন্য উদ্ধারকারী সেনাদল সেখানে পৌঁছাতে পারবে কি না। তিনি বললেন, পারবে। আমি তখন বললাম, যে পথ দিয়ে উদ্ধারকারী সেনাদল পৌঁছাতে পারবে, সেই একই পথ দিয়ে তাদেরও বেরিয়ে আসতে পারা উচিত। শেষ পর্যন্ত যদি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট অথবা ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের কোনো অংশকে সাথে পাওয়া যায়, তাহলে তাদেরও আমি সাথে নিয়ে নিতে বললাম। সীমান্তের এপার থেকে আমরা তাদের কাভার করব। তার পরে আমরা একটি ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটালিয়ন বর্ডার পোস্টে পাঠাই তাদের কাভার করার জন্য এবং এভাবেই বিএসএফের প্রত্যর্পণ শেষ হয়। প্রকাশিত পাকিস্তানি সূত্র অনুযায়ী, বিএসএফের ছয়জন সদস্যকে বন্দী করা হয় এবং পাকিস্তানিরা পরবর্তী সময়ে ঢাকায় তাদের প্যারেড করায়। এটাই ছিল ঢাকায় বিএসএফের বিজয়ী কুচকাওয়াজ! আনিসুর রহমান শাহমুদ অনূদিত, (পৃ: ২১-২৩)
পরবর্তী প্যারায় জেনারেল জ্যাকব বিএসএফ প্রধান রুস্তমজী সম্পর্কে লেখেন, ‘রুস্তমজীকে আমি একজন দক্ষ ও বাস্তব-বুদ্ধিসম্পন্ন অফিসার হিসেবে জানতাম। আমি জানি না, কেন তিনি পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রশস্ত্র ছাড়া এরকম একটি অভিযানে তার সৈন্যদের নিয়োজিত করলেন। হয়তো প্রচণ্ড চাপের মুখে তিনি এটা করেছেন অথবা তিনি চেয়েছিলেন, তার পরিশ্রমে গড়ে তোলা বিএসএফের জন্য এই সাফল্য বাড়তি প্রেরণা ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করবে কিংবা এটাও হতে পারে যে, পাকিস্তানিদের প্রতিরোধের অতিরঞ্জিত বর্ণনা তাকে প্রভাবিত করেছিল। নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখলে এটা স্বীকার করতেই হবে যে, বিএসএফের ওপর অর্পিত দায়িত্বগুলো তারা তাদের সাধ্য অনুযায়ী পালন করার ক্ষেত্রে আন্তরিকতা ও দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিএসএফ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে এবং অপরিসীম অবদান রেখেছে। প্রাথমিক ব্যর্থতা সত্ত্বেও রুস্তমজী ও তার বাহিনী পরবর্তী সময়ে যে সাফল্য লাভ করেছেন, সেই কৃতিত্ব অবশ্যই তাদের প্রাপ্য’ (পৃ:-২৩)।
ইন্দিরা গান্ধী যে বিএসএফকে ঢাকা দখলের নির্দেশ দিয়েছিলেন তার স্বীকৃতি পাওয়া যায় বিএসএফের প্রধান জেনারেল রুস্তমজীর নোটের ওপর ভিত্তি করে লেখা ‘বাংলাদেশের মুক্তি’ শীর্ষক গ্রন্থে। ড. মোহাম্মদ আবদুর রশিদ ওই বইয়ে লিখেছেন, ১৯৭১ সালের ৩১ আগস্ট ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী শিলিগুড়িতে অবস্থিত সেনাসদরে যান এবং পরদিন কুচবিহারে অবস্থিত একটি উদ্বাস্তু শিবির পরিদর্শন করেন। উদ্বাস্তু শিবির পরিদর্শনের পর বিএসএফের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল গোলক মজুমদারকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি এমতাবস্থায় কখন ঢাকা যাওয়ার প্রত্যাশা করছেন?’ গোলক বললেন, ‘কখনো না- যতক্ষণ না আপনার সেনাবাহিনী এগিয়ে আসছে।’ ‘কেনো? আমি বিএসএফকে একাই কাজ করার কথা বলেছি।’ ‘বিএসএফ এ কাজ একা করতে পারবে না। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ট্যাংকবহর, কামান ও বিমানবাহিনীর বিরুদ্ধে আমাদের লড়তে হবে। সেজন্য আমাদের সেনাবাহিনী ও বিমান বাহিনীরও সংযুক্ত হওয়ার দরকার আছে’ (পৃ:৫৪)। উপরিউক্ত কথোপকথন থেকে বোঝা যায়, ইন্দিরা গান্ধী আসলেই বিএসএফকে ঢাকা দখলের নির্দেশ দিয়েছিলেন।