Showing posts with label আলোচনা মতামত. Show all posts
Showing posts with label আলোচনা মতামত. Show all posts

Friday, September 16, 2011

মুদ্রাস্ফীতি বনাম মূল্যস্ফীতি by ফারুক মঈনউদ্দীন

দেশের সার্বিক অর্থনীতি বিষয়ে সাধারণ শিক্ষিত মানুষ, অর্থনীতিবিদ, ভোক্তাসাধারণ—সবার আলোচনায় যে কথাগুলো ঘুরেফিরে আসে, তা হচ্ছে মুদ্রাস্ফীতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি বা মূল্যস্ফীতি ইত্যাদি। এই দুটি ধারণার সাধারণীকৃত ব্যবহারের মধ্যে রয়েছে সামান্য বিভ্রান্তি। আমরা যখন মুদ্রাস্ফীতি কথাটা ব্যবহার করি, তার সঙ্গে মূল্যস্ফীতির ধারণাকে এক করে ফেলি। অবশ্য এই বিভ্রান্তির কারণও আছে। মুদ্রাস্ফীতি বলতে অর্থনীতিতে মুদ্রার সরবরাহ বৃদ্ধিকেই বোঝানো হয়। অর্থনীতিতে মুদ্রার সরবরাহ বেড়ে গেলে এবং পণ্য ও সেবার সরবরাহ অপরিবর্তিত থাকলে মূল্যস্ফীতি ঘটে। কারণ অনেক বেশি টাকা সীমিত পণ্য ও সেবার পেছনে ধাওয়া করে। এতে চাহিদা ও মূল্যস্তর—দুটিই বেড়ে যায়। শাস্ত্রীয় ও আভিধানিক অর্থেও মুদ্রাস্ফীতির অর্থ সব ধরনের পণ্য ও সেবামূল্যের ক্রমাগত বৃদ্ধি, যা সাধারণত ঘটে অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহের কারণে, যাতে অর্থের মূল্য হ্রাস পায়। বলা হয়, ‘মুদ্রাস্ফীতিতে সবকিছু মহার্ঘ হয়ে যায় কেবলমাত্র অর্থের মূল্য ছাড়া।’ সাধারণ অর্থে মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে মূল্যস্ফীতির এটিই সহজবোধ্য সম্পর্ক এবং মুদ্রাস্ফীতির স্বাভাবিক ধর্মটিও এ রকম। কিন্তু একে সব সময় সঠিক সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য করা যায় না।
প্রকৃতপক্ষে মূল্যস্তর কমলেও মুদ্রাস্ফীতি বিরাজ করতে পারে; আবার মুদ্রাস্ফীতি না থাকলেও মূল্যস্তর বাড়তে পারে। এককথায়, মুদ্রার সরবরাহ বৃদ্ধি পেলে অর্থনীতিতে এর একটা প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় এবং এর প্রবণতা কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করে একাধিক নিয়ামকের ওপর। যেমন, বর্তমান যুগে প্রযুক্তির উৎ কর্ষের সঙ্গে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক সামগ্রী কিংবা মোবাইল ফোন সেটের দাম কমে আসছে এবং সেটা ঘটতে পারে মুদ্রাস্ফীতি বিরাজমান অর্থনীতিতেও। আবার একটা মন্দাক্রান্ত অর্থনীতিতে কোনো বিশেষ পণ্য বা সেবার মূল্য বাড়তে পারে, যদি এর চাহিদা কারণবশত হঠাৎ বেড়ে যায়। যেমন আমাদের দেশে মুদ্রাস্ফীতির বিপরীত অবস্থা অর্থাৎ মন্দাভাবও যদি বিরাজ করে, তবু ভূসম্পত্তি কিংবা অ্যাপার্টমেন্টের মূল্যস্ফীতি থেমে থাকবে না। কারণ, এর রয়েছে বিশাল চাহিদা, সীমিত সরবরাহ এবং অর্থায়ন প্রাপ্তির সুবিধা।
মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে আরেকটি বিষয় গুলিয়ে ফেলা হয়। সেটা হচ্ছে ভোক্তা মূল্যসূচক। এটি মূলত মূল্যহার পরিবর্তনের হিসাব, যা দিয়ে মুদ্রাস্ফীতি পরিমাপ করা হয়। এই হিসাবের জন্য কোনো একটি নির্দিষ্ট বছরকে ভিত্তি বছর হিসেবে ধরা হয়। তারপর সেই ভিত্তি বছরকে বিবেচনায় রেখে একটা নির্দিষ্ট সময় অন্তর কিছু নির্দিষ্ট পণ্যের মূল্যস্তর পর্যবেক্ষণ করে রেকর্ড রাখা হয়। ধরা যাক, মুদ্রাস্ফীতির হার নির্ণয়ের জন্য কেবল একটি পণ্যের মূল্যের ওপর ভোক্তা মূল্যসূচক নির্ধারণ করা হয়। এবং ভিত্তি বছর ২০০০ সালে সেই পণ্যটির দাম ছিল এক টাকা এবং এর মূল্যসূচক ১০০। পরের বছর (২০০১) সেই পণ্যটির দাম যদি বেড়ে দাঁড়ায় এক টাকা ২০ পয়সায়, তাহলে মূল্যসূচক হবে ১২০। এখন আমরা ২০০১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত যদি মুদ্রাস্ফীতি নির্ণয় করতে চাই এবং ২০১১ সালে সেই পণ্যটির মূল্যসূচক যদি হয় ১৫০, তাহলে এই ১০ বছরে মুদ্রাস্ফীতির হার হবে (১৫০-১২০)—১২০ = ০.২৫, অর্থাৎ শতকরা হিসাবে ২৫ শতাংশ। এ রকম কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ভোক্তা মূল্যসূচক ব্যবহার করে মুদ্রাস্ফীতির হার নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট বা একক পণ্যের তুলনামূলক মূল্যবৃদ্ধিকে মুদ্রাস্ফীতি বলা যায় না, যদিও একে সাধারণ মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে এক করে দেখা হয়। কোনো একক পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঘটে সেই পণ্যের বাড়তি চাহিদা কিংবা সরবরাহ ঘাটতির কারণে। অথচ সাধারণ মূল্যস্ফীতি তথা মুদ্রাস্ফীতি চাহিদা সরবরাহের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। এটি নির্ভর করে অর্থনীতির ভাষায় ‘সামগ্রিক চাহিদা’র ওপর। সামগ্রিক চাহিদা বলতে বোঝায়, একটি অর্থনীতিতে পণ্য ও সেবার ওপর সব ভোক্তার মোট ব্যয়, মোট বিনিয়োগ ব্যয়, মোট সরকারি ব্যয় এবং নিট রপ্তানি আয় (আমদানি ব্যয় বাদ দিয়ে)—সবকিছুর সমষ্টি। আর এই সামগ্রিক চাহিদা প্রভাবিত হয় মুদ্রা সরবরাহ দ্বারা। অতএব, মুদ্রাস্ফীতি হচ্ছে একটি মুদ্রানৈতিক বিষয় এবং এর পেছনে কোনো একক পণ্যের সরবরাহ ঘাটতির কোনো সম্পর্ক নেই। বরং সেই পণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধির পরও মূল্যস্ফীতি না ঘটে মুদ্রাস্ফীতি বিরাজ করতে পারে কিংবা উভয়ই ঘটতে পারে। যেমন, কয়েক বছর ধরে আমাদের দেশে ব্যাপক হারে বেড়েছে মুরগি ও ডিমের উৎ পাদন। কিন্তু এতে কি মূল্য কমেছে? নাকি বেড়েছে? সুতরাং, কোনো একক পণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি করে মূল্যস্ফীতি কিংবা মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। সঠিক সংজ্ঞার মুদ্রাস্ফীতিই কেবল সঠিক মুদ্রানীতি দিয়ে নিয়ন্ত্রণযোগ্য এবং সেটি যদি হয় চাহিদাজাত মূল্যস্ফীতি। তাহলে মুদ্রাস্ফীতি ও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে আরেকটি প্রসঙ্গ স্বাভাবিকভাবেই চলে আসছে। সেটি হচ্ছে দেশের মুদ্রানীতি, যা নিয়ন্ত্রণ করে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মুদ্রানীতি হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে অর্থনীতির গতি ও প্রবৃদ্ধিকে ঠিক পথে চালানোর জন্য মুদ্রা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা হয়, যা মূলত করা হয় অর্থ সরবরাহ এবং সুদের হারের মাধ্যমে।
অন্যভাবে বলতে গেলে, মুদ্রানীতি দিয়ে অর্থনীতির মোট চাহিদার হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটিয়ে চাহিদাজাত মুদ্রাস্ফীতিকে বাগে আনার চেষ্টা করা যায়। চাহিদা ব্যবস্থাপনার এই প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মূল্যস্তর ও বিনিয়োগ স্থিতিশীল রাখা। মুদ্রানীতির এই কৌশল প্রয়োগ করা হয় সুদের হার এবং অর্থ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সামগ্রিক চাহিদাকে বশে রাখার জন্য। অর্থ সরবরাহ এবং ঋণ নিয়ন্ত্রণ করলে মুদ্রাবাজারে স্বল্প মেয়াদে সুদ বেড়ে যায় এবং ব্যাংকের বাড়তি তহবিল সংগ্রহের কারণে দীর্ঘ মেয়াদে আমানত এবং ঋণের ওপর সুদ বেড়ে যায়। এতে বিনিয়োগ কমে যায়। আর এ কারণে অর্থনীতিতে হ্রাস পায় সামগ্রিক চাহিদা। হ্রাসকৃত বিনিয়োগের জন্য মানুষের ভোগও কমে যায়, যা আবার প্রভাব ফেলে সামগ্রিক চাহিদার ওপর। এতে দেখা যায়, ঋণ সংকোচন করে বিনিয়োগ, মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমানো যায়, যে প্রক্রিয়ায় একসময় বশে আসে মুদ্রাস্ফীতি।
তবে আজকাল মুদ্রানীতির এই উদ্দেশ্য নিয়ে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংকাররা নতুনভাবে আলোকপাত করছেন। ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ওয়াই ভি রেড্ডি লেখেন, ‘মুদ্রানীতির উদ্দেশ্য এখন আর মূল্যস্তর স্থিতিশীল রাখায় সীমাবদ্ধ নেই...। এর উদ্দেশ্য এখন আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা পর্যন্ত বিস্তৃত।’
আটলান্টা ফেডারেল রিজার্ভের প্রেসিডেন্ট ডেনিস লকহার্ট বলেন, ‘মুদ্রাস্ফীতি সবকিছুর মূল্য বাড়ায়। এটা কোনো একক পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি কিংবা কোনো বিশেষ শ্রেণীর পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নয়।’
তাঁর মতে, নির্দিষ্ট বাজারে পণ্যমূল্যকে নিয়মানুগভাবে প্রভাবিত করতে অক্ষম মুদ্রানীতি একটা ভোঁতা অস্ত্র। তাঁর মতে, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওঠানামা এবং কোনো একক পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে অক্ষম। আমরা তেল উৎ পাদন করি না। খাদ্যও ফলাই না। কিংবা দিই না স্বাস্থ্যসেবা। যেসব ঘটনা কোনো কোনো পণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং আপনাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণ ঘটায়। যেমন, তেলের অনাগত ধাক্কা কিংবা খরা অথবা ধর্মঘট—এসব আমরা ঠেকাতে পারি না।’
‘অতএব বাজারধর্মে ঘটা পণ্যের তুলনামূলক মূল্য সংশোধন ঠেকানো মুদ্রানীতির কাজ নয়। এর কাজ হচ্ছে অর্থনীতিতে সব মূল্য পরিবর্তনের সামগ্রিক লক্ষ্য ও গতিকে নিয়ন্ত্রণ করা।’ সে কারণেই আমরা দেখতে পাই, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন সুদের হার কিংবা ব্যাংকগুলোর নগদ জমা ও তারল্য হার বাড়ায়, সেটা বাজারের কোনো পণ্যের দাম কমাতে পারে না। তাহলে প্রশ্ন করা যায়, মুদ্রানীতি যদি জীবনযাত্রার ব্যয়কে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তাহলে এই নীতির দরকার কী? লকহার্ট এই প্রশ্নের জবাবে বলেন, দরকারটি হচ্ছে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্থিরতা আনা, যা সম্ভব আর্থবাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষার মাধ্যমে।
আমাদের দেশেও যখন ষাণ্মাষিক মুদ্রানীতি ঘোষিত হয়, তখন বিভিন্ন মহল থেকে আশা করা হয়, এটি দিয়ে অর্থনীতির সব সমস্যা, যেমন শেয়ারবাজার থেকে শুরু করে দ্রব্যমূল্য, বিদেশি বিনিয়োগ থেকে শুরু করে টাকার সঙ্গে ডলারের বিনিময়মূল্য—সবকিছুর সমাধান করে ফেলা যাবে। মুদ্রানীতির কর্মক্ষেত্র যেহেতু চাহিদা ব্যবস্থাপনা, এটি অর্থনীতির সরবরাহ ক্ষমতার ওপর কার্যকর নয়। এটি দিয়ে সামগ্রিক চাহিদাকে প্রভাবিত করে এর হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটানো যায়, আর এটি করা হয় সুদের হারের তারতম্য ঘটিয়ে।
এই সত্য থেকে যে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় তা হচ্ছে, কেবল চাহিদাজাত মূল্যস্ফীতিকে মুদ্রানীতি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিন্তু যে মূল্যস্ফীতি ব্যয়বৃদ্ধিজনিত, সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে মুদ্রানীতি অক্ষম। যেমন আমাদের অর্থনীতিতে খাদ্যমূল্যস্ফীতি কিংবা মুদ্রাস্ফীতি—যা-ই বলা হোক না কেন, ঘটে বিশ্ববাজারে খাদ্যশস্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে, কখনোই চাহিদা বৃদ্ধির কারণে নয়, যদিও জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে চাহিদা প্রতিবছর বেড়েই চলেছে। সুতরাং মুদ্রানীতি দিয়ে চাহিদা ব্যবস্থাপনা করে খাদ্য কিংবা কোনো একক পণ্যমূল্য কমানো সম্ভব নয়। এর আরও একটি কারণ হচ্ছে, খাদ্যের অস্থিতিস্থাপক চাহিদা। অর্থাৎ খাদ্যের দাম যা-ই হোক না কেন, মানুষকে তার মৌলিক চাহিদার প্রধানতমটি, অর্থাৎ খাদ্যচাহিদা মেটাতে হবে। কিন্তু খাদ্য ছাড়া অন্য পণ্যের মূল্যস্ফীতি কম থাকলেও সার্বিক মূল্যস্ফীতি নির্ভর করে খাদ্যমূল্যের ওপর। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যমূল্যের প্রবণতার ওপর নির্ভর করবে অভ্যন্তরীণ খাদ্যমূল্য এবং তা ঊর্ধ্বমুখী থাকার সম্ভাবনাই বেশি। আমাদের দেশে কিংবা ভারতে বিগত বছরগুলোতে মুদ্রাস্ফীতি বাগে রাখার জন্য ক্রমাগত সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হলেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এর কোনো সুফল পাওয়া যায়নি, যা প্রমাণ করে যে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।
তাহলে শেষ পর্যন্ত যে কথাটি বোঝা যাচ্ছে, দেশের মুদ্রানীতি যা-ই হোক না কেন, খাদ্যপণ্যের অভ্যন্তরীণ মূল্য নির্ধারিত হবে আন্তর্জাতিক বাজারের দাম ও চাহিদার স্থিতিস্থাপকতার ওপর, অভ্যন্তরীণ চাহিদার ওপর নয়। অতএব, মূল্যসূচক নির্ধারণের জন্য খাদ্যপণ্য প্রধানতম সামগ্রী হলেও এর মূল্য দিয়ে মুদ্রাস্ফীতি নির্ণয় করলে এ ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক।
ফারুক মঈনউদ্দীন: লেখক ও ব্যাংকার।
fmainuddin@hotmail.com

Monday, August 22, 2011

মসজিদে ইতিকাফের গুরুত্ব ও ফজিলত by মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

মাহে রমজানের শেষ দশ দিন মসজিদে অবস্থান বা ইতিকাফ করা সুন্নতে মুয়াক্কাদায়ে কিফায়া। আরবি ইতিকাফ শব্দের আভিধানিক অর্থ অবস্থান করা, স্থির থাকা, কোনো স্থানে আটকে পড়া বা আবদ্ধ হয়ে থাকা। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় রমজান মাসের শেষ দশ দিন অথবা অন্য কোনো দিন জাগতিক কাজকর্ম ও পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ইবাদতের নিয়তে মসজিদে বা ঘরে নামাজের স্থানে অবস্থান করা ও স্থির থাকাকে ইতিকাফ বলে। ইতিকাফ করার মূল উদ্দেশ্য হলো—মসজিদে বসে আল্লাহর আনুগত্য করা। সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহ লাভের আশা করা, সওয়াব অর্জনের আশা করা এবং লাইলাতুল কদর লাভের আশা করা।
প্রতিবছর রমজান মাসের শেষ দশ দিন রাসুলুল্লাহ (সা.) নিয়মিতভাবে মসজিদে ইতিকাফ করতেন এবং সাহাবায়ে কিরামও ইতিকাফ করতেন। নবী করিম (সা.) ইতিকাফের এত বেশি গুরুত্ব দিতেন যে কখনো তা ছুটে গেলে ঈদের মাসে আদায় করতেন। উম্মুল মুমিনীন হজরত আয়েশা (রা.)-এর হাদিস সূত্রে জানা যায়, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতি রমজানের শেষ দশ দিন (মসজিদে) ইতিকাফ করতেন। এ আমল তাঁর ইন্তেকাল পর্যন্ত কায়েম ছিল। নবী করিম (সা.)-এর ওফাতের পর তাঁর বিবিগণও এ নিয়ম পালন করেন।’ (বুখারি ও মুসলিম)
ইতিকাফের বিধিসম্মত সময় মাহে রমজানের ২০ তারিখ সূর্য অস্ত যাওয়ার কিছু আগে থেকে শুরু হয় এবং ঈদের চাঁদ দেখার সঙ্গে সঙ্গেই তা শেষ হয়ে যায়। ইতিকাফকারী পুরুষ রমজান মাসের ২০ তারিখ আসরের নামাজের পর সূর্যাস্তের আগে মসজিদে পৌঁছাবেন এবং মসজিদের কোণে একটি ঘরের মতো পর্দা দিয়ে ঘেরাও করে অবস্থান নেবেন। ঘেরাওকৃত কক্ষে পর্দা এমনভাবে স্থাপন করবেন, যেন প্রয়োজনে জামাতের সময় তা খুলে মুসল্লিদের জন্য নামাজের ব্যবস্থা করা যায়। এ স্থানে পানাহার ও শয়ন করবেন এবং নিষ্প্রয়োজনে এখান থেকে বের হবেন না। তবে প্রাকৃতিক প্রয়োজনে অথবা ফরজ গোসল প্রভৃতি কাজে অথবা শরিয়তের প্রয়োজনে যেমন জুমার নামাজ প্রভৃতির জন্য বের হওয়া জায়েজ। কিন্তু প্রয়োজন পূরণের সঙ্গে সঙ্গেই ইতিকাফের স্থানে ফিরে যেতে হবে। ঈদের চাঁদ দেখা গেলে মসজিদ থেকে বেরিয়ে আসবেন।
পার্থিব কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে মহান আল্লাহর ইবাদতে আত্মনিয়োগের জন্য পুরুষদের মসজিদে এবং নারীদের জন্য গৃহে অবস্থ্থান করাই ইতিকাফ। স্ত্রীলোকের মসজিদে ইতিকাফ করা মাকরুহ। ঘরের নির্দিষ্ট স্থানে, যেখানে তিনি নামাজ আদায় করেন, সেখানেই ইতিকাফ করবেন। বাড়ির নির্দিষ্ট স্থান না থাকলে যেকোনো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন স্থানে ইতিকাফ করবেন এবং ঈদের চাঁদ উদয় না হওয়া পর্যন্ত ইতিকাফের স্থান ত্যাগ করবেন না। এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে যে কেউ ইতিকাফ করলে সুন্নতে কিফায়া আদায় হয়ে যাবে। কিন্তু গ্রামের বা পাড়া-মহল্লার কেউ ইতিকাফ না করলে সবাই গুনাহগার হবে।
ইতিকাফকারী একাগ্রচিত্তে ইবাদত-বন্দেগির ফলে তার অন্তরে আল্লাহর ভয় বা তাকওয়া গভীরভাবে রেখাপাত করে। এ সময় দুনিয়ার চাকচিক্য তাকে আল্লাহর জিকির থেকে দূরে সরাতে পারে না। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা স্ত্রীদের সঙ্গে মিলিত হবে না, যখন তোমরা মসজিদে ইতিকাফে থাকবে।’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১৮৭)
ইতিকাফ পালনকালে যেকোনো ধরনের পার্থিব বিষয় থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকতে হবে। হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘ইতিকাফকারী রোগী দেখতে যাবে না, জানাজায় উপস্থিত হবে না, স্ত্রী স্পর্শ করবে না। বিশেষ জরুরি কাজ ব্যতীত বাইরে যাবে না।’ (বুখারি, মুসলিম ও আবু দাউদ) হজরত আয়েশা (রা.) বলেছেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন ইতিকাফ করতেন, মসজিদে বসে আমার দিকে মাথা বাড়িয়ে দিতেন এবং আমি তাঁর কেশবিন্যাস করে দিতাম।’ অপর একটি হাদিসে বর্ণিত আছে, ‘নবী করিম (সা.) ইতিকাফের সময় পীড়িতকে দেখতে যেতেন এবং নিজ ইচ্ছামতো চলতেন, কিন্তু কারও সঙ্গে কথা বলতেন না।’
শুধু প্রাকৃতিক প্রয়োজনে ও অজু ব্যতীত ইতিকাফের স্থান ত্যাগ করে বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ। অবশ্য এসব কারণ ছাড়াও প্রয়োজনের তাগিদে কারও জীবন রক্ষার্থে বাইরে যাওয়া যেতে পারে। তবে এ জন্য ইতিকাফের কাজা আদায় করতে হবে। হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) এক বছর ইতিকাফ করতে পারেননি, পরবর্তী বছর তিনি ২০ রাত ইতিকাফ করেন।’ (তিরমিজি) হজরত্রআবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, ‘নবী করিম (সা.) প্রতি রমজান মাসের শেষ ১০ দিন ইতিফাক করতেন। তারপর যে বছর তিনি ইন্তেকাল করেন, সে বছর ২০ দিন ইতিফাক করেন।’ (বুখারি)
রমজান মাসের শেষ দশ দিন ইতিকাফ করা সুন্নত এবং এর ফজিলত অপরিসীম। নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমজানের শেষ দশ দিন ইতিকাফ করবে, তার জন্য দুই হজ ও দুই ওমরার সওয়াব রয়েছে।’ (বায়হাকি) ইতিকাফের ফজিলত সম্পর্কে অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একদিনের ইতিকাফ করল, আল্লাহ পাক তার ও দোজখের মধ্যখানে এমন তিনটি পরিখা তৈরি করে দেবেন, যার একটি থেকে অপরটির দূরত্ব হবে পূর্ব ও পশ্চিমেরও বেশি।’ (তিরমিজি ও বায়হাকি)
যে ব্যক্তি ইবাদত মনে করে সওয়াবের নিয়তে ইতিকাফ করে, তার সব সগিরা গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। নবী করিম (সা.) ফরমান, ‘ইতিকাফকারী ব্যক্তি যাবতীয় পাপ থেকে মুক্ত থাকে আর ইতিকাফে লিপ্ত থাকার জন্য কোনো ব্যক্তি বাইরের কোনো নেক কাজ করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকলেও ওই নেক কাজসমূহের পূর্ণ নেকি সে লাভ করবে।’ (ইবনে মাজা) হজরত্র ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসুলে করিম (সা.) বলেছেন, ‘ইতিকাফকারী মূলত গুনাহ থেকে দূরে থাকে এবং তাকে ইতিকাফের বিনিময়ে এত বেশি নেকি দেওয়া হবে যেন সে সব নেকি অর্জনকারী।’ (ইবনে মাজা)
ইতিকাফের সর্বনিম্ন সময়সীমা এক রাত বলে হাদিস শরিফে উল্লেখ আছে। তবে ইতিকাফ দীর্ঘ সময় ধরে করা উত্তম, বিশেষত মাহে রমজানের শেষ ১০ দিন ইতিকাফ অবস্থায় থাকায় ‘লাইলাতুল কদর’ বা হাজার মাসের শ্রেষ্ঠতম ভাগ্যের রজনী লাভের সৌভাগ্য হতে পারে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে পবিত্র মাহে রমজানে মসজিদে ইতিকাফ করার মাধ্যমে গুনাহের পাপরাশি থেকে বেঁচে থেকে অশেষ নেকি লাভের মোক্ষম সুযোগ দান করুন!
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও কলাম লেখক।
dr.munimkhan@yahoo.com

Sunday, August 21, 2011

চিকিৎসকেরা ভুল করেন না, অবহেলা তো নয়ই! by মশিউল আলম

বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোতে ভুল চিকিৎসায় ও চিকিৎসকদের অবহেলায় প্রতিবছর কত মানুষের মৃত্যু হয়? অঙ্গহানি ঘটে কতজনের? এ রকম জিজ্ঞাসার উদয় হতে পারে তাঁদের কারও কারও মনে, যাঁদের কোনো স্বজন এভাবে মারা যায়। কিন্তু এ প্রশ্নের উত্তর মেলে না। কারণ, এই দেশে এ বিষয়ে কোনো পরিসংখ্যান নেই। চিকিৎসা-প্রতিষ্ঠানগুলো বা চিকিৎসকেরা কেউই স্বীকার করেন না যে তাঁদের ভুল হয়, কর্তব্যপালনে অবহেলা ঘটে এবং তার ফলে রোগী মারা যায়। স্বীকার না করলে এ সম্পর্কে কোনো নথিপত্র তৈরি বা সংরক্ষণ করারও প্রশ্ন আসে না। তাই ভুল চিকিৎসায় বা চিকিৎসাক্ষেত্রে অবহেলার কারণে রোগীর মৃত্যু বলে যে একটা ব্যাপার আছে, বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে তার অস্তিত্ব নেই। তা হলে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে এ রকম: বাংলাদেশে চিকিৎসকেরা ভুল করেন না, অবহেলা তো নয়ই!
প্রসঙ্গটি উঠল একজন প্রতিভাবান মানুষকে অপ্রত্যাশিতভাবে হারানোর কারণে। তিনি সংগীতশিল্পী, সংগীত-গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত ও নাট্যকলা বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মৃদুলকান্তি চক্রবর্তী। চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও সিনেমাটোগ্রাফার-সাংবাদিক মিশুক মুনীরকে হারিয়ে জাতি যখন শোকগ্রস্ত, সংবাদমাধ্যমের প্রায়-সমস্ত মনোযোগই যখন তাঁদের ঘিরে দেশের সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার বেহাল দশার প্রতি, তখন মাত্র দুই দিন ডায়রিয়ায় ভুগে মারা গেলেন মৃদুলকান্তি চক্রবর্তী। আক্রান্ত অবস্থায় তাঁকে রাজধানীর অন্যতম বেসরকারি হাসপাতাল ল্যাবএইডে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেখানে তিনি সুস্থ হননি, প্রাণ হারিয়েছেন। তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, ভুল চিকিৎসায় ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে তিনি মারা গেছেন। কিন্তু ল্যাবএইড কর্তৃপক্ষ তাদের চিকিৎসকদের ভুল বা চিকিৎসায় দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ স্বীকার করেনি।
অধ্যাপক মৃদুলকান্তি চক্রবর্তী সাধারণ কেউ হলে এ ঘটনা হয়তো সংবাদমাধ্যমে স্থান পেত না। তাঁর আত্মীয়স্বজনের শত বিলাপ, শত অভিযোগ নিষ্ফলভাবে মিলিয়ে যেত বাতাসে। মৃদুলকান্তি চক্রবর্তীর এই আকস্মিক, অপ্রত্যাশিত মৃত্যুতে তাঁর পরিবারসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা প্রচণ্ড বিক্ষোভে ফেটে পড়েন; তাঁরা এই মৃত্যুর জন্য দায়ী চিকিৎসকদের নাম প্রকাশ, ল্যাবএইড হাসপাতাল থেকে তাঁদের বহিষ্কারের দাবি জানান। তাঁরা আরও দাবি করেন, ল্যাবএইড কর্তৃপক্ষকে গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে জাতির কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে এবং মৃদুলকান্তি চক্রবর্তীর পরিবারকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। বিষয়টি হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়ায়; এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ল্যাবএইড হাসপাতালের চেয়ারম্যান, সব পরিচালক, প্রধান কনসালন্ট্যান্ট ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে তলব করেন। ২৩ আগস্ট আদালতে হাজির হয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে আনা চিকিৎসায় অবহেলার বা দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে হবে। এসব চাপের মুখে ল্যাবএইড কর্তৃপক্ষ মৃদুলকান্তি চক্রবর্তীর পরিবারকে ৫০ লাখ টাকা দিয়েছে, কিন্তু তারা বলছে, ভুল চিকিৎসা বা চিকিৎসায় অবহেলার কারণে রোগীর মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ হিসেবে তারা এ টাকা দেয়নি, দিয়েছে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার তহবিল থেকে ‘সহায়তা’ হিসেবে। অর্থাৎ, ল্যাবএইড কর্তৃপক্ষ তার আগের অবস্থানেই অটল রয়েছে—মৃদুলকান্তি চক্রবর্তীর চিকিৎসায় তাদের কোনো ভুল বা অবহেলাজনিত কালক্ষেপণ/ দীর্ঘসূত্রতা ছিল না।
ডায়রিয়া-আক্রান্ত মৃদুলকান্তি চক্রবর্তীকে সোমবার সকাল পৌনে ১০টায় ল্যাবএইড হাসপাতালে নেওয়া থেকে বেলা সাড়ে ১১টায় তাঁকে মৃত ঘোষণা করা পর্যন্ত ঘটনার বিবরণ দুই পক্ষে দুই রকম। তবে তাঁর চিকিৎসা-প্রক্রিয়া ও মৃত্যু সম্পর্কে ল্যাবএইড কর্তৃপক্ষ যে বক্তব্য সংবাদমাধ্যমে দিয়েছে, সেখানে এক জায়গায় বলা হয়েছে, ‘তাঁকে (মৃদুলকান্তি চক্রবর্তী) আইসিইউতে ভর্তি হতে বলা হলেও পারিবারিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে কিছুটা বিলম্ব হয়।’ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত, পানিশূন্যতায় মুমূর্ষু একজন রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানকার চিকিৎসক ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপকদের দায়িত্ব তাঁকে বাঁচানোর জন্য যা করা দরকার, তা-ই করা। ভর্তিসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতায় কালক্ষেপণের ফলে রোগীর মৃত্যু হলে ইমার্জেন্সি বা জরুরি চিকিৎসার থাকল কী? এ রকম আনুষ্ঠানিকতা শুধু ল্যাবএইড কেন, পুরো দেশের চিকিৎসাব্যবস্থাতেই এক বিরাট সমস্যা। কোনো কোনো বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক আগে টাকা নেয়, তারপর রোগীর দিকে তাকায়। প্রচুর অর্থ ব্যয় করে বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোতে চিকিৎসা নিতে গিয়ে মানুষ চিকিৎসক ও সেবক-সেবিকাদের অবহেলা-অমনোযোগের শিকার হয়। এ সম্পর্কে তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের সবারই কমবেশি আছে; সংবাদকর্মীদের লেখায় সে বিবরণ যথেষ্ট হবে না। সাধারণ মানুষ অসহায়, অসাধারণ যাঁরা, তাঁরাও যে ভুল চিকিৎসায় স্বজনের মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ পান, তা নয়।
কিন্তু মাঝেমধ্যে এমন ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যা সতর্ক হওয়ার সুযোগ এনে দেয়। ল্যাবএইডের এ ঘটনা বাংলাদেশের সব চিকিৎসা-প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসক ও ব্যবস্থাপকদের জন্য সেই সুযোগ এনে দিয়েছে। সতর্ক হতেই হবে, রোগীদের প্রতি মনোযোগ দিতেই হবে। চিকিৎসক বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কেউই রোগীর মৃত্যু কামনা করে না বটে, কিন্তু রোগীর প্রতি মনোযোগের অভাব বা অবহেলা থাকলে এমন ভুলত্রুটি ঘটে যেতে পারে, যা রোগীর মৃত্যু ডেকে আনে। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর ব্যবস্থাপক ও চিকিৎসকেরা যদি মনে করেন চিকিৎসা শুধু ব্যবসা, ঠিক আছে, সেই ব্যবসাটাই আপনারা ভালোভাবে করুন, সৎভাবে করুন। মানুষ মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে আপনাদের কাছে চিকিৎসা কিনতে যায়, বিনা পয়সায় সেবা নিতে যায় না। মানুষ জানে এবং মানে, আপনারা চ্যারিটেবল ডিসপেনসারি খুলে বসেননি, টাকা বানাতে নেমেছেন। তো টাকা আপনারা বানান, কিন্তু সে টাকার বিনিময়ে রোগীকে মানসম্মত চিকিৎসা দেবেন না কেন? কেন রোগীর প্রতি অমনোযোগ? কেন অবহেলা?
আর চিকিৎসা-ব্যবসাটা যদি আপনারা ভালোভাবে করতে চান, ভুলত্রুটি হলে স্বীকার করুন, বিশ্লেষণ করে দেখুন কী কী ভুল হয়েছে। এ দেশে ওষুধের বেঠিক ব্যবহার, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, একাধিক ওষুধের মধ্যে মিথস্ক্রিয়ার বিরূপ প্রভাব ইত্যাদি নিরূপণের চর্চা নেই। ডায়রিয়া-আক্রান্ত মৃদুলকান্তি চক্রবর্তী ল্যাবএইড হাসপাতালে যখন পৌঁছান, তখন তাঁর শারীরিক অবস্থা এমন ছিল যে তিনি হাঁটতে পারছিলেন। সেই রোগীই মাত্র দেড় ঘণ্টা পরে কেন মারা গেলেন—এটা কি পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয় নয়? কিন্তু সে রকম উদ্যোগ কি নেওয়া হবে? সংবাদপত্রে প্রকাশিত ল্যাবএইডের দেওয়া চিকিৎসার বিবরণ পড়ে একজন চিকিৎসক টেলিফোনে মন্তব্য করলেন: ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা আন্তক্রিয়ার (ড্রাগ ইন্টার-অ্যাকশন) ফলে মৃদুলকান্তি চক্রবর্তীর মৃত্যু ঘটে থাকতে পারে। তাঁরা বলছেন, রোগীর হাইপার ক্যালিমিয়া ছিল, অর্থাৎ রোগীর কিডনি সঠিকভাবে কাজ করছিল না; ফলে অন্যান্য উপসর্গের পাশাপাশি হঠাৎ হূদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে রোগী মারা গেছেন। কিন্তু রোগীর কিডনির কাজ ব্যাহত হচ্ছিল কখন থেকে? তাঁকে ওষুধ দেওয়ার পরই তাঁর অবস্থার অবনতি ঘটে। ডায়রিয়া রোগীর পটাশিয়ামের মাত্রা যেখানে কমে যায়, সেখানে তাঁর বেড়ে গিয়েছিল কেন—এই বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা দরকার। যেসব দেশ চিকিৎসাবিজ্ঞানে ও চিকিৎসাব্যবস্থায় উন্নতি করেছে, তারা নিয়মিতভাবে এ রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে থাকে। ভুল চিকিৎসার নথিপত্র তারা সংরক্ষণ করে, বিশ্লেষণ করে। মৃত রোগীদের রোগের বিবরণ, ব্যবহূত ওষুধপত্রের উল্লেখসহ চিকিৎসার পুরো বিবরণ তারা নথিভুক্ত করে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা সেগুলো কেস স্টাডি হিসেবে পাঠ করেন, তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন।
মৃদুলকান্তি চক্রবর্তীর প্রাণের বিনিময়ে যদি আমাদের হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকদের মধ্যে এই বোধোদয় ঘটে যে তাঁদের কাজ বা ব্যবসা মানুষের প্রাণ ও স্বাস্থ্য নিয়ে, যদি তাঁদের মনে এই উপলব্ধি জাগে যে মানুষের প্রাণের মূল্য ৫০ লাখ কেন, কোনো অঙ্কের টাকাই হতে পারে না, তবেই মঙ্গল। এই বাবদে আমাদের সরকার বাহাদুরেরও টনক নড়া উচিত: বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো মনিটর করা সরকারেরই দায়িত্ব। নজরদারি ও জবাবদিহির সম্পূর্ণ ঊর্ধ্বে থেকে কোনো ব্যবস্থাকেই চলতে দেওয়া উচিত নয়; চিকিৎসাব্যবস্থার মতো জরুরি ব্যবস্থাকে তো নয়ই।
মশিউল আলম: সাংবাদিক।
mashiul.alam@gmail.com

বড় গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ মানেই সিন্ডিকেট নয় by মোহাম্মদ হেলাল

রমজান মাস এলেই নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ে পত্রপত্রিকায় প্রচুর লেখালেখি হয়। কারণ একটাই। বাজারে এসবের দাম চড়া। চাহিদা বাড়লে দাম বাড়বে—এ কথা বোধ হয় কেউ মানতে চায় না। বরং সবার বক্তব্য, চাহিদা বাড়বে, তা তো ব্যবসায়ীদের অজানা নয়। তাহলে চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরবরাহ বাড়ছে না কেন?
এটা ঠিক যে রমজান মাস উপলক্ষে প্রচুর পণ্য আমদানি হয়েছে। এতে বাজারে সরবরাহ বেড়েছে। তার পরও দাম বাড়তে থাকায় এটাকে বাজারে প্রতিযোগিতার অভাব বলে চিহ্নিত করছে কেউ কেউ। যেমন, প্রথম আলোর ১ আগস্ট সংখ্যায় ‘নিত্যপণ্যের বাজার পাঁচ শিল্প গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। এর মূল বক্তব্য ছিল এ রকম—দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজার পাঁচ বড় ব্যবসায়ী গ্রুপের হাতে চলে গেছে। তারাই সবচেয়ে বেশি পণ্য আমদানি ও বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। তাই বাজারে প্রতিযোগিতাও কমে গেছে।
বাজারের চাহিদার সিংহভাগ এই পাঁচ গ্রুপ মেটাচ্ছে, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এ কারণে বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ার উপসংহারটা মেনে নেওয়া কঠিন। বরং প্রতিযোগিতা বাড়ার ফলে অপেক্ষাকৃত ছোট ও কম দক্ষতাসম্পন্ন ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ব্যবসা বন্ধ করে দিয়ে চলে গেছেন। আর তাই বাজারের সিংহভাগ চাহিদা এই গ্রুপগুলো মেটাচ্ছে বা মেটাতে পারছে, এটাই বেশি যুক্তিসংগত মনে হয়।
একসময় অর্থনীতির শাস্ত্রে অল্প কয়েকজনের হাতে বাজারের চাহিদার সিংহভাগ পূরণ হওয়াকে প্রতিযোগিতার অভাব হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। এখন কিন্তু প্রতিযোগিতার অভাব উপসংহারে এত সহজে পৌঁছানো যায় না। বরং বাজারের নিয়ন্ত্রণ অল্প সংখ্যা হাতে যাওয়ার কারণকে প্রথমে অনুসন্ধান করা হয়। অল্প কজনের শক্তিশালী উপস্থিতি যখন খরচ সাশ্রয়ের কারণে হয়, তখন কিন্তু প্রতিযোগিতার অভাব হিসেবে একে দেখা হয় না। সরকারের কোনো নীতিনির্ধারণী বাধা কিংবা শক্তিশালী কোনো ব্যবসায়ী বা ব্যবসায়ী গ্রুপের কৌশলী বাধার কারণে অল্প কজন থাকলে তাকে প্রতিযোগিতার অভাব হিসেবে দেখা হয়।
তবে বাজারে অল্প কজনের উপস্থিতি এবং খরচ সাশ্রয় নির্ভর করে প্রযুক্তির ধরনের ওপর। অনেক সময় বড় আকারের উৎপাদন কিংবা বাণিজ্যিক কার্যক্রমে গড় খরচ অপেক্ষাকৃত কম পড়ে। ফলে অপেক্ষাকৃত ছোটরা ঝরে যায়। আবার মোট দেশজ চাহিদার পরিমাণ কম হলে অল্পসংখ্যক উৎপাদনকারীই বড় আকারের কার্যক্রম নিয়ে টিকে থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আসলে তা-ই ঘটেছে। আমরা যদি বিষয়টি বাংলাদেশের ভোজ্যতেলের ব্যবসায়ী/ পরিশোধনকারী/আমদানিকারকদের দিয়ে ব্যাখ্যা করি, তাহলে বুঝতে অনেক সহজ হবে।
আশির দশকের শেষ দিকে বাংলাদেশে ৬০-৭০টি ভোজ্যতেল শোধনাগার ছিল ২০-২৫ জন ব্যবসায়ীর মালিকানায়। এই শোধনাগারগুলোর প্রতিটির দৈনিক পরিশোধনক্ষমতা ছিল ৩০ থেকে ৫০ টন। বর্তমানে এগুলো প্রায় সবই বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যদিকে বড় আকারের নতুন নতুন শোধনাগার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমানে ২০টির মতো শোধনাগার রয়েছে ৮-১০ জনের বা গ্রুপের মালিকানায়। এগুলোর দৈনিক পরিশোধনক্ষমতা ১৫০ থেকে এক হাজার টন। এই যে পরিবর্তন, তা এসেছে প্রযুক্তির ধরন পাল্টানোর কারণে। আর প্রযুক্তির ধরন পাল্টেছে খরচ সাশ্রয়ের জন্য।
অপরিশোধিত ভোজ্যতেল পরিশোধন করার সময় সাধারণত ৩ থেকে ৬ শতাংশ পর্যন্ত অপচয় হয়। এই অপচয় বা বিনষ্ট হওয়ার পরিমাণ কমে আসে যদি ভালো বড় শোধনাগারে তা পরিশোধন করা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের খরচেরও সাশ্রয় হয় বড় শোধনাগারে।
অন্যদিকে বড় শোধনাগারের জন্য অনেক বেশি পরিমাণে অপরিশোধিত তেল আমদানির ক্ষেত্রেও খরচ সাশ্রয় হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে দৈনিক হাজার টনের ক্ষমতাসম্পন্ন শোধনাগার রয়েছে অন্তত দুটি। দেশে বর্তমানে ১২ থেকে ১৪ লাখ টন ভোজ্যতেলের চাহিদা মেটানোর জন্য আমাদের এ রকম বড় আকারের চার-পাঁচটি শোধনাগার থাকলেই চলে। এখন যদি বড় আকারের অনেকগুলো শোধনাগার থাকে, তাহলে প্রতিটিই তার ক্ষমতার চেয়ে অনেক কম ব্যবহূত হবে। এতে করে প্রতিটি শোধনাগারে পরিশোধন ব্যয় বেড়ে যাবে। সে ক্ষেত্রে ৮-১০টি ব্যবসায়ী গ্রুপও ভবিষ্যতে সক্রিয় না-ও থাকতে পারে।
ফলে এ কথাই আসলে মানা উচিত যে অল্প কয়েকটি শিল্প গ্রুপের হাতে ভোজ্যতেলের আমদানি-পরিশোধন চলে যাওয়াটা কোনো কারসাজির ব্যাপার নয়, বরং নেহাতই দক্ষতাপ্রসূত ভারসাম্যের ফল। শুধু ভোজ্যতেল নয়; চিনিসহ অন্যান্য অনেক নিত্যপণ্যের ক্ষেত্রে এ দক্ষতার বিষয়টি সত্য।
আরেকটি প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি, তা হলো, এই পাঁচ গ্রুপের প্রতিটিই মোটামুটিভাবে সব নিত্যপণ্যের সঙ্গে জড়িত। সেটা কেন? এ ক্ষেত্রেও খরচ সাশ্রয়ই মূল কারণ। নিত্যপণ্যের উৎপাদন কিংবা পরিশোধনের ক্ষেত্রে কিছু উপকরণের একই সঙ্গে বিভিন্ন পণ্যের ব্যবহারের ফলে খরচ কমে আসে। অনেকগুলো পণ্য একসঙ্গে বিপণনের ক্ষেত্রেও খরচ সাশ্রয় হয়। কিছুদিন আগে আমার একটা গ্রুপের শিল্প স্থাপনা ঘুরে দেখার সুযোগ হয়। দেখলাম, ওই গ্রুপ একসঙ্গে অনেক পণ্য উৎপাদন করার জন্য নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন প্ল্যান্ট বসিয়েছে। আর এই পাওয়ার প্ল্যান্টের স্টিম ব্যবহার করছে ভোজ্যতেল পরিশোধনের জন্য। এ ব্যবস্থাপনা অবশ্যই খরচ-সাশ্রয়ী।
এখন কেউ প্রশ্ন করতেই পারেন, এই খরচ সাশ্রয়ের ফল আমরা পাচ্ছি কি না। নাকি তারা একত্র হয়ে সিন্ডিকেট করে দাম বাড়াচ্ছে। এর উত্তর পেতে আমাদের বিশ্ববাজারের গতিবিধির সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বাজারের পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে তাদের দাম-নির্ধারণী প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করতে হবে। অপ্রতুল তথ্য-উপাত্ত হাতে নিয়ে চট করে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসা যাবে না। তবে এটুকু বলা যায়, প্রযুক্তির ধরন, উৎপাদন-দক্ষতা এবং সময়ের দাবিতেই এই পাঁচ গ্রুপের হাতে নিত্যপণ্যের বাজারের নিয়ন্ত্রণ এসেছে।
কিন্তু এ সুবিধা ব্যবহার করে নিজেরা যোগসাজশের মাধ্যমে বাজারকে অস্থিতিশীল করছে কি না, তা জানতে হলে আরও নিবিড় পর্যালোচনা প্রয়োজন, প্রয়োজন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ। সরকার যদি কম দামে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে চায়, তাহলে কম খরচে উৎপাদন উৎসাহিত করতে হবে। অর্থাৎ প্রযুক্তির ধরনের কারণে অল্পসংখ্যক উৎপাদককে দিয়ে উৎপাদন কার্যক্রম চালাতে হবে। তারপর প্রয়োজন হলে খরচের কাছাকাছি দাম রাখার জন্য নিয়ন্ত্রণমূলক বা রেগুলেটরি পদক্ষেপ নিতে পারে। তাই কোনো ধরনের বিচার-বিবেচনা ছাড়া বাজারের দাম নিয়ন্ত্রণ করার আরোপিত চেষ্টা দীর্ঘ মেয়াদে সুফল বয়ে আনবে না।
মোহাম্মদ হেলাল: সহকারী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
helalum@yahoo.com

আমার বন্ধু মিশুক by ম. তামিম

যে কজন মানুষের সান্নিধ্যে আমার আজকের ‘আমি’র বুনিয়াদ বা ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, আশফাক মুনীর মিশুক ছিল তার অন্যতম। আজ থেকে ৪৬ বছর আগে ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলে প্রথম শ্রেণীতে আমাদের জীবনের যাত্রা শুরু। আজ এই ২০১১ সালে এসে মিশুকের মৃত্যুতে আমার পরিণত এই দেহ ও মনের একটি গাঁথুনি যেন ভেঙে পড়ে গেল!
ছোটবেলার টুকরো টুকরো বেশ কিছু স্মৃতি হঠাৎ মনের কোণে উঁকি দিয়ে যায়—খেলার কথা, ক্লাস পালিয়ে মুহসীন হলের লিফটে ওঠানামা করা, নাটক, কবিতা, দেয়ালপত্রিকার প্রকাশনা ইত্যাদি। একটু বড় হওয়ার পর থেকেই ওর ছবি তোলা এবং ক্যামেরার প্রতি ঝোঁক মোটামুটি ওর পরিচয়ে পরিণত হয়। প্রথম থেকেই প্রথাগত লেখাপড়ার প্রতি ওর একটা অনাগ্রহ ছিল, যে কারণে ক্লাসের ভালো ছাত্র ওকে কখনোই বলা যেত না। কিন্তু তার পরও ওর সহজাত সৃষ্টিশীল প্রতিভাকে অস্বীকার করার উপায় ছিল না। ভালো ছাত্র না হয়েও বন্ধু ও শিক্ষকদের কাছে মিশুক ছিল অত্যন্ত প্রিয়। ওর সঙ্গের ছোটবেলার কোনো ঘটনা বা স্মৃতির বিস্তারিত বর্ণনা আমার মনে নেই, কিন্তু যেটি রক্তে-মাংসে-অস্থিতে প্রোথিত হয়ে আছে, সেটি হলো ওর ব্যক্তিত্ব; আর সেই সঙ্গে একটা প্রচণ্ড ভালো লাগার, ভালোবাসার ও বন্ধুতার অনুভূতি।
পৃথিবীতে সত্যিকার অর্থে চোখ ও মনখোলা উদারচিত্তের মানুষের খুবই অভাব। আর আমাদের দেশে তো সে রকম মানুষ পাওয়া এককথায় বিরল। মিশুক ছিল এ দেশের সেই সব বিরল মানুষের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সদা হাস্য, জ্ঞান, বুদ্ধি, প্রতিভায় উদ্ভাসিত মিশুককে কখনো রাগ করতে দেখিনি। নিরহংকার, সহজ ও সত্যভাষী ছেলেটি প্রতিটি মানুষকে মানুষ হিসেবে প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা দিয়ে কথা বলত—তার সামাজিক অবস্থান বা পদ দেখে নয়। যে কারণে মুহূর্তেই সবাই তাকে বন্ধু হিসেবে বরণ করে নিত। ওর নামের সার্থকতা জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত সবাইকে বুঝিয়ে দিয়ে গেছে।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র। ওর বাবা শহীদ মুনীর চৌধুরীকে আমরা বন্ধুর বাবা হিসেবেই দেখেছি। তাঁর মৃত্যুতে কিশোর মিশুকের মানসিক যন্ত্রণা, পারিবারিক সংগ্রাম—আমরা কিছুই বুঝতে পারিনি। শুধু ওর পছন্দের কাজের একাগ্রতাকে আরও শাণিত হতে দেখেছি। স্কুল-কলেজ পেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে যখন ভর্তি হলো, তখন ওর জীবনের দিকনির্দেশনা ঠিক হয়ে গেছে। সেই ছোটবেলায় ক্যামেরা খুলে দেখার মধ্যে কারিগরি অনুসন্ধিৎসার যে অঙ্কুরের জন্ম, সেটা ধীরে ধীরে প্রস্ফুটিত হয়েছে গণমাধ্যমে প্রযুক্তির ব্যবহারের ব্যুৎপত্তি লাভের মধ্য দিয়ে। এই প্রযুক্তির জ্ঞান কিন্তু ওর স্বশিক্ষা আর অন্বেষার ফল; কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সাহায্য ছাড়াই। সাত বছর জাতীয় জাদুঘরে আর ১০ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পর ওর সব অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান প্রয়োগের সুযোগ আসে একুশে টেলিভিশনের সংবাদ বিভাগের দায়িত্ব লাভের মাধ্যমে। প্রচারবিমুখ ক্যামেরার পেছনের মানুষটি শুরু করে নতুন প্রজন্মের ক্যামেরার সামনের সৈনিক তৈরিতে।
মিশুক ২০০১ সালে ব্যক্তিগত কারণে কানাডায় পাড়ি দেয়। ১০ বছর পর গত বছর এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব নিয়ে ঘরের ছেলে আবার ঘরে ফিরে আসে। প্রায় ১০ বছর পর, এই বছরের শুরুতে মুন্নী সাহার অফিসে ওর সঙ্গে আমার আবার দেখা। চলন, বলন, আচরণ, হূদ্যতা, আন্তরিকতা, বুদ্ধির দীপ্তিতে আমি ফিরে পেলাম আমার সেই বালকবেলার মিশুককে। আনন্দ-উচ্ছ্বাসে দুজনই উদ্বেলিত হলাম। দেখলাম, আরও পরিণত, দায়িত্বশীল, অভিজ্ঞ এবং সর্বোপরি কাজ-পাগল, কিছুটা নতুন মিশুককে। ১৫ মিনিটের কথা বলে টানা দুই ঘণ্টা আড্ডা চলল। এর মাঝেই দেখলাম টেকনিশিয়ান, ক্যামেরাম্যান, রিপোর্টার ও আইটির ছেলেমেয়েদের একের পর এক নতুন ধারণা, প্রযুক্তি, পদ্ধতি শেখানোর ত্বরিত তৎপরতা। মনে হলো, ওর হাতে বোধ হয় একদমই সময় নেই। শিশুর মতো উচ্ছ্বাস ও আগ্রহ।
আমার সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছে মাস দেড়েক আগে আমাদের স্কুলের বান্ধবী ইয়াসমিনের বাসায়। সেদিন আমার স্ত্রী ও বড় কন্যাসহ আমরা তিন বন্ধু ওকে একরকম জোর করেই অফিস থেকে পাকড়াও করে ঘণ্টা চারেক আড্ডা দিয়েছি। কিছু পুরোনো স্মৃতি ছাড়া প্রায় পুরো সময়ই আমরা ওর অভিজ্ঞতা আর স্বপ্নের কথা শুনেছি। সেই স্বপ্ন ছিল বাংলার মানুষের সত্যিকারের মুক্তি ও সম্ভাবনার স্বপ্ন। মনে হয়েছে, এক জনমে ওর কাজ শেষ হবে না। এই প্রথমবারের মতো একাত্তর-পরবর্তী ওর ব্যক্তিগত সংগ্রামের অনেক কথা সেদিন আমাদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছে। গভীর রাত হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করছিল না। মনে মনে ভাবছিলাম, আহ্! আমার কথা বলার বন্ধুটি ফিরে এসেছে; নানা না পাওয়ার মাঝে ঢাকায় থাকাটা আরেকটু আনন্দময়, অর্থময় হয়ে উঠবে। কিন্তু আলোকবাহী মিশুক আমাদের সবার জীবন আরেকটু অন্ধকার করে দিয়ে চলে গেল; কিছুতেই মানতে পারছি না!
ম. তামিম : মিশুকের বন্ধু ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী।

আত্মনিয়ন্ত্রণ ও পরিশুদ্ধি অর্জনে রোজা by মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

আল্লাহ পাক তাঁর অসীম দয়া, ক্ষমা ও পরিত্রাণপ্রাপ্তির জন্য মাসব্যাপী রোজা নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, যেন সংযমের মাধ্যমে বান্দারা আত্মনিয়ন্ত্রণ ও পরিশুদ্ধি অর্জন করেন। প্রকৃত রোজাদারেরা এতে অবগাহন করে ১১ মাসের পুঞ্জীভূত পাপ-পঙ্কিলতা ও কলুষ-কালিমা থেকে পরিশুদ্ধ ও পূতপবিত্র হয়ে যান। যাঁরা সতর্ক ও জ্ঞানী, তাঁরা এ সুবর্ণ সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে একনিষ্ঠভাবে ও আন্তরিকতাসহকারে কায়মনোবাক্যে আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করেন, দয়াময় আল্লাহ তাঁদের বঞ্চিত করেন না। হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে যে ‘রমজান মাসের শুরু থেকে একজন আহ্বানকারী ঘোষণা দিতে থাকেন, হে পুণ্যের অন্বেষণকারী! সামনে অগ্রসর হও এবং হে মন্দের অন্বেষণকারী! থেমে যাও। আল্লাহ তাআলা এ মাসে অনেককেই দোজখের আগুন থেকে মুক্তি দেন। আর এটা প্রতি রাতেই সংঘটিত হয়।’
রোজার উদ্দেশ্য হচ্ছে আত্মসংযম, আত্মসংশোধন ও কৃচ্ছ্র সাধন। মানবজীবনকে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও পরিশুদ্ধ করে গড়ে তোলার একটি অত্যন্ত কার্যকরী দৈহিক ইবাদত রোজা। শারীরিক রোজার মূল ভিত্তি হচ্ছে অন্তরের রোজা। তাই রোজার জন্য নিজেদের মনমানসিকতা, চিন্তা-ভাবনা, ধ্যান-ধারণা ও প্রবৃত্তিকে দমন ও কলুষমুক্ত হতে হবে। সৎ নিয়ত, স্বচ্ছ চিন্তা-পরিকল্পনা, একনিষ্ঠতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও পরিশুদ্ধতা তথা ইখলাস হচ্ছে অন্তরের মূল কথা। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘সাবধান! দেহের মধ্যে এক টুকরো গোশত আছে, যখন এটি সুস্থ থাকে, তখন পুরো দেহটি সুস্থ থাকে, আর যখন এটি অসুস্থ থাকে বা দূষিত হয়, তখন পুরো দেহই অসুস্থ হয়ে পড়ে। সাবধান! এটি হচ্ছে অন্তঃকরণ।’ (বুখারি ও মুসলিম)
অন্তরের রোজা হচ্ছে অন্তঃকরণকে শিরক, কুফর, বিদআত থেকে মুক্ত এবং যাবতীয় খারাপ, নিকৃষ্ট মনোভাব ও নিয়ত থেকে পরিশুদ্ধ রাখা। মনকে গর্ব-অহংকার থেকে মুক্ত ও পরিচ্ছন্ন করে লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ ও লোক দেখানোর মনোবৃত্তি থেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত। কেননা তা নেক আমলকে ধ্বংস করে ও জ্বালিয়ে দেয়। মনকে সব খারাপ কাজ থেকে পরিশুদ্ধ রাখতে পারলেই অন্তরের রোজা হয়ে যায়। মানুষের দেহে অন্তঃকরণ এমন একটি অংশ, যার ওপর পুরো দেহকেই নির্ভর করতে হয়। দেহের পরিচালক হচ্ছে তার মন বা অন্তঃকরণ। অন্তরের শান্তির সঙ্গে দেহের প্রশান্তি বা সুস্থতা, পরিশুদ্ধতা এবং অন্তরের কষ্টের সঙ্গে দেহের কষ্ট বা অসুস্থতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই মানবদেহের এ মহামূল্যবান রত্নকে সব সময় সুস্থ ও পরিশুদ্ধ তথা কলুষমুক্ত রাখতে সচেষ্ট থাকতে হবে। কারণ, অন্তর সুস্থ থাকলে সবকিছুই সুস্থ ও সঠিক থাকবে। আর অন্তর অসুস্থ ও বিপথগামী হয়ে পড়লে অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও অসুস্থ ও দিশেহারা হয়ে পড়বে।
রোজাদার সব ধরনের গুনাহের কাজ থেকে নিজেকে বিরত রেখে মহান আল্লাহর নির্দেশিত বিশুদ্ধ পথে চলার এক বিরাট সুযোগ লাভ করেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘কেউ কোনো মন্দ কাজ করে বা নিজের প্রতি জুলুম করে পরে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলে আল্লাহকে সে ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু পাবে।’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত-১১০)
সাধারণত মানুষ ন্যায়-অন্যায় উভয় পন্থা অবলম্বনের মাধ্যমে উপার্জন করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। কিন্তু রমজান মাসে যে ব্যক্তি বৈধ উপায়ে ও সৎভাবে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করতে পারে, তার আত্মাই আল্লাহর ইবাদতের যোগ্যতা লাভ করতে সক্ষম, আর ওই শ্রেণীর রোজাদার লোকের ইবাদত আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে রোজাদার মানুষের ধ্যান-ধারণা, চিন্তাভাবনা ও আত্মবিশ্বাস যদি খারাপ হয়ে পড়ে, তাহলে নিশ্চিতভাবে তাঁর কর্মতৎপরতা খারাপ হয়ে পড়বে। সুতরাং অন্তঃকরণ পরিশুদ্ধ হলে দেহমনও ঠিক থাকবে। আর অন্তঃকরণ দূষিত হলে পুরো দেহই মূল্যহীন হয়ে পড়বে। তাই হাদিস শরিফে রোজাকে দেহের জাকাত বলা হয়েছে। জাকাত আদায় করলে যেমন সব সম্পদ পবিত্র হয়ে যায়, তেমনি মাহে রমজানে রোজা রাখলে পুরো দেহ ও মন পূতপবিত্র হয়ে যায়।
রোজা মানুষকে আত্মনিয়ন্ত্রণ লাভের শিক্ষা দেয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেহির খাওয়া, ইফতার করা, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা, জামাতে খতমে তারাবি পড়া প্রভৃতি ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে নিয়মানুবর্তিতাও শেখায়। মাহে রমজানে ইফতার থেকে সেহির পর্যন্ত যে রুটিন অনুযায়ী দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম ধর্মীয় কার্যক্রম পালন করতে হয়, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ। নফসকে নিয়ন্ত্রিত রাখার মাধ্যমেই মানুষ মানবিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত হতে পারে এবং আল্লাহর প্রিয় বান্দায় উন্নীত হতে পারে। আল্লাহ পাক ঘোষণা করেন, ‘শপথ মানুষের এবং তাঁর, যিনি তাকে সুঠাম করেছেন, অতঃপর তাকে তার অসৎ কর্ম ও সৎ কর্মের জ্ঞান দান করেছেন। সেই সফলকাম হবে, যে নিজেকে পবিত্র করবে। আর সে ব্যর্থ হবে, যে নিজেকে কলুষিত করে।’ (সূরা আশ-শামস, আয়াত: ৭-১০)
মাহে রমজান মানুষকে সৎ, নির্লোভ ও আত্মসংযমী হতে শেখায়; কাজকর্মে, ব্যবসা-বাণিজ্যে, সর্বোপরি এমন এক আলোকিত মানুষ হতে শেখায়, যিনি ঘুষ-দুর্নীতি ও অপকর্ম থেকে মুক্ত। কাম, ক্রোধ, লোভ-মোহ, পরচর্চা, মিথ্যাচার, যেকোনো ধরনের অনিষ্টকর ও পাপ কাজ ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রোজাদার ব্যক্তি তাঁর জাগতিক লোভ-লালসার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও প্রবণতার সব খারাপ দিককে দূরে সরিয়ে রাখেন এবং নির্ধারিত পদ্ধতিতে কৃচ্ছ্র সাধন করে নিজেকে সর্বোত্তম মানুষে রূপান্তরিত হওয়ার এ সুবর্ণ সুযোগকে কাজে লাগান। ফলে তিনি নম্রতা, সংযম, উদারতা, শিষ্টতা ইত্যাদি সৎ গুণ চর্চার মাধ্যমে আল্লাহর প্রতিনিধিরূপে নিজেকে পরিপূর্ণতা দিতে পারেন। মানুষের জন্য তাই সিয়াম সাধনা একটি উৎকৃষ্ট আত্মশুদ্ধির কর্মকৌশল, যে কৌশল অবলম্ব্বনে একদল পরিশুদ্ধ মানুষ সব কলুষতার ঊর্ধ্বে উঠে, পূতপবিত্র পরিশীলিত মন নিয়ে নিজেকে মানবসেবায় উৎসর্গ করতে পারে।
রোজার মধ্যে এমন একটি অপ্রতিরোধ্য চেতনা আছে, এমন দয়া, করুণা ও কল্যাণময় উপাদান আছে, যা মানুষকে সব রকমের পাপাচার, অনাচার থেকে ঢালস্বরূপ রক্ষা করে, তেমনি তাকে করে তোলে পাপের কালিমামুক্ত এক পরিশুদ্ধ খাঁটি মানুষ; য্রে মানুষ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর প্রিয় বান্দা ও তাঁর নৈকট্য লাভে সৌভাগ্যবান একজন খাঁটি মুত্তাকি। মাহে রমজানে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও পরিশুদ্ধি অর্জনের প্রশিক্ষণ গ্রহণের মাধ্যমে যাতে বছরের বাকি ১১ মাস তথা সারা জীবন আল্লাহর নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থেকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রদর্শিত পথে নিজেদের জীবন তাকওয়াভিত্তিক পরিচালনা করে আদর্শ সুশীল সমাজ গঠন করা যায়, এ জন্য সবাইকে ঈমানের দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্লেষণে সচেষ্ট হতে হবে।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও কলাম লেখক।
dr.munimkhan@yahoo.com

Thursday, July 7, 2011

ট্রানজিট নিয়ে তাড়াহুড়ো কেন? by আসজাদুল কিবরিয়া

প্রতিবেশী ভারতকে ট্রানজিট-সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে সরকারের ভেতরে বেশ তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নীতিনির্ধারক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তাঁরা ট্রানজিট দেওয়ার বিভিন্ন সুফলের কথা তুলে ধরছেন। বোঝাতে চাইছেন, ইতিমধ্যেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। স্বাধীনতার পর ৪০ বছর পেরিয়ে গেলেও অপেক্ষার পালা শেষ হয়নি। এতে করে বাংলাদেশই পিছিয়ে গেছে। কাজেই এখন এই অপেক্ষার পালা শেষ করতে হবে এবং তা খুব দ্রুত।
তবে এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতার আলোকে কতটা গ্রহণযোগ্য ও যুক্তিসংগত তা বিচার-বিশ্লেষণের দাবি রাখে। এ ক্ষেত্রে প্রথমেই একটা বিষয় স্পষ্ট করে নেওয়া দরকার, ভারতকে কিংবা নেপাল ও ভুটানকে ট্রানজিট বা ট্রানশিপমেন্ট-সুবিধা দেওয়ায় নীতিগতভাবে দ্বিমত করার কোনো অবকাশ নেই। কেননা, এর মাধ্যমে আঞ্চলিক সম্পৃক্ততা জোরদার হবে। দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতির মধ্যে যোগাযোগ বিস্তৃত হওয়ার পথ তৈরি হবে। শুধু সংকীর্ণ রাজনৈতিক বিবেচনায় বা ভারতবিরোধিতার নামে ট্রানজিটের তথা আঞ্চলিক সম্পৃক্ততার বিরোধিতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বরং এ ধরনের বিরোধিতা দীর্ঘ মেয়াদে লোকসান ছাড়া লাভ বয়ে আনবে না।
প্রশ্ন হলো, নীতিগতভাবে সম্মত হলেই কি সব কাজ শেষ হয়ে যায়? নিশ্চয়ই নয়। বরং নীতিগতভাবে সম্মত হওয়ার মধ্য দিয়ে কাজটি শুরু হলো। এরপর অনেক ধাপ পার করতে হয়। বাংলাদেশ এখনো সেই সব ধাপ পার করা তো দূরে থাক, ঠিকমতো সেই ধাপে পা-ই রাখেনি। আর এখন দেশে ট্রানজিট নিয়ে সরকার যেসব কাজ করছে, তাতে মনে হচ্ছে, ধাপে ধাপে পা রাখার বদলে দ্রুত লাফ দিয়ে ধাপগুলো পার হওয়াটাই বেশি কাঙ্ক্ষিত।
সামান্য পেছনে যাওয়া যাক। ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফর করেন। এই সফরে নয়াদিল্লিতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হয়। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই বৈঠকে যে যৌথ ঘোষণা গৃহীত হয়, তাতে বাংলাদেশ ভারতকে ট্রানজিট দিতে এবং চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের সুযোগ দিতে সম্মতি প্রকাশ করে। ভারতও নেপাল ও ভুটানকে তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশে আসতে দিতে বা বাংলাদেশের জন্য ট্রানজিট দিতে সম্মত হয়। অর্থাৎ, প্রথমে দ্বিপক্ষীয় এবং পরে একটি উপ-আঞ্চলিক কাঠামোয় ট্রানজিট দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ও ভারত সম্মত হয়েছে।
কিন্তু এরপর প্রায় ১০ মাস সময় নষ্ট করা হয়েছে ট্রানজিট নিয়ে সুপরিকল্পিতভাবে কোনো কাজ না করে। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকেরা কেন এ রকম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে গুরুত্বহীনভাবে চলতে দিয়েছেন, সেটাই বিস্ময়কর। বরং এই সময়কালের মধ্যে সরকারের একাধিক মন্ত্রণালয় ও সংস্থা বিচ্ছিন্নভাবে ট্রানজিট নিয়ে কাজ করতে গিয়েছে। তাতে প্রতীয়মান হয়েছে, সরকার ট্রানজিট নিয়ে একধরনের বিভ্রান্তির মধ্যে ছিল। শেষ পর্যন্ত অবশ্য গত বছরের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের আওতায় বিশেষজ্ঞদের নিয়ে সরকার একটি কোর কমিটি গঠন করে। কোর কমিটি স্বল্পতম সময়ে বেশ পরিশ্রম করেই ট্রানজিটের বিষয়ে একটি অবস্থানপত্রের খসড়া দাঁড় করায়। এই খসড়ায় অবকাঠামোগত অপ্রতুলতায় আগামী তিন বছরের মধ্যে রেল ও সড়কপথে ট্রানজিট দেওয়া সম্ভব নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিকল্প হিসেবে এই সময়কালে ট্রানশিপমেন্ট চালু করা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের পদক্ষেপ নিতে ৫০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। অবশ্য নৌপথে ট্রানজিট-সুবিধা চালু রয়েছে।
প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন, ভারতকে মূল ভূখণ্ড থেকে পণ্যসামগ্রী উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোয় যাওয়ার জন্য বাংলাদেশি ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি দেওয়াটা হলো মূলত করিডর-সুবিধা দেওয়া। একটু বৃহত্তরভাবে এটাকে ‘ভারত থেকে ভারতে ট্রানজিট’ বলা যেতে পারে। তবে ভারত যখন চট্টগ্রাম বা মংলা বন্দর ব্যবহার করে তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্য করবে, তখন এই বন্দরগুলো হবে ভারতের ট্রানজিট বন্দর। আর ব্যবহূত রেল বা সড়কপথটি হবে ট্রানজিট রুট। একইভাবে বাংলাদেশি পণ্য ভারত হয়ে নেপালে গেলে বা নেপালি পণ্য ভারত হয়ে বাংলাদেশে এলে তা হবে ভারত কর্তৃক বাংলাদেশ বা নেপালকে দেওয়া ট্রানজিট। ট্রানজিট ও করিডরের ক্ষেত্রে এই সুবিধা গ্রহণকারী দেশের যানবাহন সুবিধা প্রদানকারী দেশের ওপর দিয়ে চলাচলের অনুমতি পায়। অন্যদিকে ট্রানশিপমেন্ট হলো ভারতীয় পণ্যবাহী যান এক সীমান্তে সেই পণ্য নামিয়ে আবার বাংলাদেশি বাহনে তুলে দেবে। এরপর বাংলাদেশি বাহন আরেক সীমান্তে গিয়ে সেই পণ্য নামিয়ে আবার ভারতীয় বাহনে তুলে দেবে।
এখানে যৌক্তিক প্রশ্ন হলো, ট্রানজিট বা ট্রানশিপমেন্ট সুবিধা প্রদানের বিনিময়ে সুবিধা প্রদানকারী দেশ কী পাবে? বা কেন এই সুবিধা দেবে? সুবিধা দেবে এ জন্যই যে, এর বিনিময়ে প্রাথমিকভাবে কিছু আর্থিক প্রাপ্তিযোগ ঘটবে। আর দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিময়তা বাড়বে পরিবহনসহ নানামুখী ব্যবসার সম্প্রসারণ ঘটে। তবে পুরো বিষয়টিই অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেখতে হবে এবং সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর এই সিদ্ধান্ত নিতে গেলে সবার আগে ঠিক করা প্রয়োজন, ট্রানজিটের বিষয়ে বাংলাদেশের নীতি কী হবে। এ ছাড়া বিষয়টি অনেক বিস্তৃত এবং এর প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। তাই পর্যাপ্ত আলাপ-আলোচনা ও দরকষাকষি ছাড়া এ-সংক্রান্ত কোনো চুক্তি স্বাক্ষর করা বা কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। দুই দেশের মধ্যে কোনো বাণিজ্য চুক্তিই দরকষাকষি ছাড়া সম্পন্ন হয় না। এই দরকষাকষির আগে স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের যথেষ্ট প্রস্তুত করতে হয়। আর এই প্রস্তুতি দু-চার দিনে ও বিচ্ছিন্নভাবে নেওয়া যায় না।
ভারতকে ট্রানজিট দেওয়ার যে প্রক্রিয়াটি এখন অনুসৃত হচ্ছে, তাতে দরকষাকষির প্রস্তুতিতে ঘাটতি প্রতীয়মান হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, এখন পর্যন্ত ট্রানজিট ও ট্রানশিপমেন্ট নিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট ও সুচিন্তিত মৌলিক নীতি চূড়ান্ত হয়নি। অন্তত জনসম্মুখে তা প্রকাশ করা হয়নি। এত বড় একটা কাজ কীভাবে কোনো নীতি-পরিকল্পনা ছাড়া সম্পন্ন করা সম্ভব? ট্যারিফ কমিশন যে প্রতিবেদন তৈরি করেছে, সেটি মূলত এক ধরনের অবস্থানপত্র, যা থেকে কিছু দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়। তবে সেটা অনুসরণ করা না-করা সরকারের এখতিয়ার। সুতরাং, ট্রানজিট-বিষয়ক নীতি আগে চূড়ান্ত ও স্পষ্ট হওয়া দরকার।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আলোচনার তথা দরকষাকষির ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক ও যৌথ ঘোষণার পর দুই দেশের মধ্যে একটি রূপরেখা বা কর্মকাঠামো চুক্তি করার মধ্য দিয়ে সেই ক্ষেত্রটি প্রস্তুত করা সহজ হতো। সাধারণত ব্যাপক কোনো বিষয়ে দুই দেশ যখন বড় ধরনের চুক্তি করার কথা ভাবে, তখন শুরু হিসেবে এই রূপরেখা চুক্তি করা হয়। ট্রানজিট-বিষয়ক রূপরেখা চুক্তিতে মূলত আলোচনার বৃহত্তর পরিসীমা নির্ণয় করা যেত। যেমন: ট্রানজিটের জন্য মাশুল দিতে হবে। তবে কী হারে এবং কীভাবে মাশুল আরোপ ও আদায় হবে, তার বিস্তারিত ঠিক হতো পরের ধাপে। আর এই রূপরেখা চুক্তির আলোকে কয়েক দফা আলোচনায় বসার মধ্য দিয়ে দুই পক্ষের আগ্রহ, স্বার্থ ও প্রয়োজনের দিকগুলো স্পষ্ট হতো, সমস্যা চিহ্নিত করা সহজ হতো। যেমন: কোর কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রানজিটের ফলে বছরে এক কোটি ৭৪ লাখ মেট্রিক টন পণ্যের যান চলাচল করবে। এটি সম্ভাব্য কিছু অনুমানের ওপর ভিত্তি করে হিসাব করতে হয়েছে। সংগত কারণেই এসব অনুমান পুরোপুরি বাস্তবায়িত না-ও হতে পারে। সে জন্য দরকার যতটা সম্ভব বাস্তবানুগ অনুমান করে প্রাক্কলন করা। যদি রূপরেখার চুক্তির আলোকে আলোচনা অগ্রসর হতো, তাহলে সেই আলোচনা থেকে বেশ কিছু রসদ পাওয়া যেত, যা অনুমিতি নির্ধারণে অধিক সহায়ক হতো। সে ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ণয় করাও খানিকটা সহজ হতো। সর্বোপরি ট্রানজিট নিয়ে সরকার কীভাবে অগ্রসর হচ্ছে, তাতে বড় ধরনের স্বচ্ছতা আসত। এমনকি জাতীয় সংসদেও রূপরেখা চুক্তিটি নিয়ে আলোচনা হতে পারত।
দেখা যাচ্ছে, ট্রানজিট দেওয়ার নীতিগত সম্মতির পর প্রয়োজনীয় ধাপগুলো পূরণ না করে আমরা লাফ দিতে যাচ্ছি। এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, সেটা হলো ভারতের আগ্রহের দিকটি। সংবাদপত্রের খবর থেকে জানা যায়, ভারত তৃতীয় দেশের সঙ্গে বাণিজ্যের জন্য চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের অনুরোধ জানিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব দিয়েছে। এই প্রস্তাবে ১৫টি সড়ক ও রেলপথ ব্যবহারের কথাও বলা হয়েছে। একই সঙ্গে এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নে সাত বছর মেয়াদি একটি প্রটোকল স্বাক্ষরের অনুরোধ করেছে ভারত। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে ভারত সরকার এই প্রস্তাব বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করেছে। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে যৌথ ঘোষণার ১০ মাস পর কেন ভারত তাদের প্রস্তাবটি দিল, তা স্পষ্ট নয়। তবে এটা স্পষ্ট, ভারত নিজেদের প্রয়োজন ও স্বার্থ নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করে যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে তাদের প্রস্তাবটি পাঠিয়েছে। এবং এটা খুবই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের ভারতের কাছ থেকে বিষয়টি শেখা দরকার।
প্রশ্ন হলো, ভারতীয় প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ কত দূর অগ্রসর হবে? যেহেতু রূপরেখা চুক্তি হয়নি, যেহেতু ট্রানজিট-নীতি চূড়ান্ত হয়নি, সেহেতু ভারতীয় প্রস্তাবের ভিত্তিতে অগ্রসর হলে অনিবার্যভাবে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ উপেক্ষিত হবে। আর তাই এখন প্রয়োজন অসম্পূর্ণ ধাপগুলো সম্পন্ন করা। ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদন ও ভারতীয় প্রস্তাব যেহেতু হাতে আছে, সেহেতু কিছু কাজ সহজ হয়ে যাবে। বিশেষ করে মৌলিক নীতি চূড়ান্তকরণ ও রূপরেখা চুক্তি সম্পন্ন করার দিকেই এখন মনোযোগ দেওয়া অধিক যুক্তিসংগত হবে; বিস্তারিত কোনো চুক্তি বা প্রতিশ্রুতি নয়। ট্রানজিটের সুফল পেতে হলে ‘৪০ বছর সময়ক্ষেপণ’, ‘সংকীর্ণ মানসিকতা’ আর ‘অসভ্যতা’র দোহাই দিয়ে তাড়াহুড়ো করার কোনো যুক্তিই ধোপে টিকে না, টিকবে না।
আসজাদুল কিবরিয়া: লেখক ও সাংবাদিক।
asjadulk@gmail.com

Friday, June 10, 2011

উন্নয়নবান্ধব বাজেটের প্রত্যাশায় by মইনুল ইসলাম

বাজেট শুধুই সরকারের আগামী অর্থবছরের আয়-ব্যয়ের প্রাক্কলিত পরিমাণের দলিল হলে এ নিয়ে এত মাতামাতি হতো না। প্রকৃত প্রস্তাবে এতে সরকারের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক দর্শনেরও প্রতিফলন প্রত্যাশিত বলে বাজেট উপস্থাপনের আগে ও পরে বাজেট নিয়ে আলোচনা-বিশ্লেষণ-সমালোচনার ঝড় বয়ে যায় প্রতিবছর। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের প্রায় আড়াই বছরের মাথায় তৃতীয় বাজেট উপস্থাপন করা হবে কাল ৯ জুন। এই প্রেক্ষাপটে কিছু আলোচনা-বিশ্লেষণ উপস্থাপন করছি।
১. শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের মতো মানব উন্নয়নের মূল ক্ষেত্রগুলোতে বাজার ব্যর্থতার স্বীকৃত বিষয়টিকে ফোকাসে নিয়ে এই দুটি খাতে রাষ্ট্রের ভূমিকা ও ব্যয়কে বাজেট বরাদ্দের যৌক্তিক অনুপাতের ভিত্তিতে অগ্রাধিকার প্রদান;
২. জ্বালানি, বিদ্যুৎ, সড়ক-জনপথ, রেলপথ, নৌপথ, নদী খনন, স্যানিটেশন, পানীয় জল সরবরাহ ইত্যাকার ভৌত ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোর ঘাটতি নিরসনকে অগ্রাধিকার প্রদান;
৩. বাজারব্যবস্থা এবং ব্যক্তি খাতনির্ভর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কর্তৃক সৃষ্ট আয় ও সম্পদ বৈষম্য নিরসন এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কল্যাণকামী নিরাপত্তা জাল (Safety net) সম্প্রসারণ ও জোরদারকরণ;
৪. প্রতিরক্ষা, সিভিল প্রশাসন ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা খাতে সরকারি ব্যয় ক্রমান্বয়ে হ্রাস করে উন্নয়ন বাজেটে অভ্যন্তরীণ অর্থায়নের অনুপাত ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধির মাধ্যমে পাবলিক বিনিয়োগের আয়তন বৃদ্ধিকরণ ও বৈদেশিক খয়রাত নির্ভরতা হ্রাসকরণ;
৫. বাজেটের পরোক্ষ কর নির্ভরতা ক্রমান্বয়ে হ্রাস করে আয়কর ও সম্পদ করকে সরকার রাজস্ব আহরণের প্রধান সূত্রে রূপান্তরকরণ এবং
৬. সরকারি ভর্তুকি ব্যবস্থাকে সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে সমাজের পিছিয়ে পড়া উৎপাদনশীল কৃষক-শ্রমিকের কল্যাণে নিয়োজিত করা।
উল্লিখিত বিষয়গুলোর আলোকেই বলা যাবে, বাজেট সত্যিকার অর্থে উন্নয়নবান্ধব বাজেট হওয়ার পথে এগোচ্ছে, নাকি গতানুগতিকতার বৃত্তে আবদ্ধ থেকে যাচ্ছে। বর্তমান অবস্থাটা ওপরের মূল উন্নয়ন চাহিদাগুলোর আলোকে পর্যালোচনা করলে চিত্রটা হতাশাব্যঞ্জক মনে হবে।
১. শিক্ষা খাতে বাংলাদেশের সরকারি ব্যয় দক্ষিণ এশিয়ায় জিডিপির অনুপাত হিসেবে সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে। ২০০৪-০৫ অর্থবছরে এই অনুপাত ২.০৭ শতাংশে নামিয়ে ফেলেছিল বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। ২০১০-১১ অর্থবছরে এই হার ২.৫ শতাংশে উন্নীত হবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। কিন্তু UNESCO জাতিসংঘের সব সদস্যদেশকে আহ্বান জানিয়েছে এই হারকে ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ৮ শতাংশে উন্নীত করার জন্য। তাই আমাদের প্রথম দাবি, ২০১১-১২ সালের বাজেটে এই হারকে অন্তত ৪ শতাংশে পৌঁছানো হোক। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদেরও দাবি এটা। বর্তমান সরকারের সাফল্যের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হোক শিক্ষা সংস্কার। অতএব, শিক্ষার জন্য সরকারি ব্যয়কে জিডিপির ৪ শতাংশে উন্নীত করার ঘোষণাটা অর্থমন্ত্রী মহোদয়ের বাজেট বক্তৃতার সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘোষণা হোক, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
২. এ দেশের স্বাস্থ্য খাতের অবস্থাও বড়ই নাজুক। ব্যাঙের ছাতার মতো প্রাইভেট ক্লিনিকের প্রসার, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অমানবিক মুনাফাবাজি এবং সরকারি হাসপাতাল-ডিসপেনসারি-ক্লিনিকগুলোর বেসামাল অব্যবস্থা এ দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার বাজারীকরণের রক্তচোষা ঘোষণাকে ফুটিয়ে তুলছে। সম্প্রতি প্রকাশিত খসড়া স্বাস্থ্যনীতিতে এহেন বাজারীকরণের রাশ টেনে ধরার সুস্পষ্ট আলামত পাওয়া গেল না। তবু আমরা আশা করতে চাই, পল্লি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে আগামী বছরের মধ্যেই পুরোপুরি সচল ও কার্যকর করার জন্য বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দকে পর্যাপ্ত পরিমাণে বাড়ানো হবে। প্রতি জেলায় সরকারি হাসপাতালকে কেন্দ্র করে একটি করে পূর্ণাঙ্গ নার্সিং কলেজ স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা এবারের বাজেট বক্তৃতায় একটি আশা জাগানো ব্যাপার হতে পারে।
৩. ভৌত ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো খাতের সংকটজনক ঘাটতি ও বিপর্যয়কর অপ্রতুলতা বর্তমান পর্যায়ে এ দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে প্রচণ্ডভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। বিদ্যুৎ, গ্যাস এবং যোগাযোগ খাতের সংকট জনজীবনকে যেমনি বিপর্যস্ত করে দিয়েছে, তেমনি উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানগুলোরও দক্ষতাকে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করে চলেছে। স্বল্পমেয়াদি রেন্টাল বিদ্যুতের মাধ্যমে আগামী এক বছরে বিদ্যুতের মারাত্মক লোডশেডিং সহনশীল পর্যায়ে কমিয়ে আনার আশাবাদ সৃষ্টি হলেও মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেনি সরকার। কয়লানীতি নিয়ে টালবাহানা থামছে না। সংসদে খসড়া কয়লানীতি নিয়ে আলোচনা করতে বাধা কোথায়? গ্যাস আবিষ্কার ও উত্তোলনের পিএসসির শর্ত গোপন রাখার কী দরকার? এগুলো নিয়ে খোলামেলা জাতীয় সংলাপ সন্দেহ ও অবিশ্বাসের অবসান ঘটাতে সহায়ক হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিসম্পদ উন্নয়নে নানা পরিকল্পনার কথাই শুধু শোনা যাচ্ছে। সৌরবিদ্যুতের উৎপাদনকে বাজেটে ভর্তুকির আওতায় আনা হচ্ছে না কেন? কৃষি খাতে সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচপাম্প প্রতিষ্ঠার ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ নিয়ে ‘সৌর প্যানেল’ স্থাপনের ব্যয়ের ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশ সরকারি ভর্তুকি প্রদান করা হোক। বাকি ব্যয় সুবিধাভোগী ভূমিমালিক ও কৃষকেরা সমবায় সমিতির মাধ্যমে বহন করবেন, পাম্প পরিচালনার ব্যয়ও তাঁরা বহন করবেন। শুষ্ক মৌসুম ছাড়া বছরের বাকি নয় মাস যেহেতু বাড়িঘরের বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য সৌরবিদ্যুতের প্যানেলগুলোর বিকল্প ব্যবহার নামমাত্র বাড়তি খরচে করা সম্ভব হবে, তাই পল্লী বিদ্যুতায়নের জন্য সৌরবিদ্যুৎ দেশকে একটা দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দেবে। অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট ঘোষণা চাই। শহরাঞ্চলেও সৌর প্যানেল স্থাপনকে উৎসাহিত করতে সৌর প্যানেল উৎপাদনের যাবতীয় কাঁচামাল ও সরঞ্জাম আমদানিকে করমুক্ত ঘোষণা করা হোক। গৃহস্থালি ব্যবহারে গ্যাস সিলিন্ডারের যাবতীয় কাঁচামাল ও সরঞ্জামকে করমুক্ত আমদানি সুবিধা দেওয়া হোক।
৪. যোগাযোগব্যবস্থায় রেলওয়ে বর্তমান সরকারের আমলে আরও স্থবির হয়ে পড়েছে। রেলওয়েকে স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যস্ত করার প্রস্তাবটা কোথায় আটকে আছে? ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ ডাবল ওয়ে করা, ঢাকা-লাকসাম কর্ড লাইন স্থাপন, দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার-ঘুনধুম রেলপথ নির্মাণ, ঢাকা-চট্টগ্রাম ইলেকট্রিক ট্রেন চালু করা, ঢাকা-চট্টগ্রাম ননস্টপ আরও দুটি ট্রেন চালু করা—এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করার স্বার্থে আলাদা রেল মন্ত্রণালয় নিঃসন্দেহে সময়ের দাবি।
৫. বর্তমানে সরকারের রাজস্ব বাজেটের ৫৮ শতাংশ ব্যয় বরাদ্দ করা হচ্ছে সিভিল প্রশাসন, প্রতিরক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা খাতের মতো অনুৎপাদনশীল সরকারি খাতে। এই তিনটি প্রধান খাতের সরকারি ব্যয়ের রাশ টেনে ধরা না গেলে বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনার (ADP) বৈদেশিক ঋণ ও অনুদাননির্ভরতা সহজে কমানো যাবে না। সংসদে প্রতিরক্ষা নীতি ও প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনায় বাধা কোথায়? আমরা কি আগামী ১০ বছরে প্রতিরক্ষা বাহিনীর আকার-আয়তন এক-তৃতীয়াংশ হ্রাস করতে পারি না? উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পর তিন মাসের বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করে দেশে একটি প্রয়োজনীয় আকারের ‘রিজার্ভ সশস্ত্র বাহিনী’ কি গড়ে তোলা যায় না?
৬. ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ে তোলার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সরকার, ই-গভর্নেন্স যার একটি প্রস্তাবিত ডাইমেনশন। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির চলমান বিপ্লবকে ধারণ করে আগামী ১০ বছরে সিভিল প্রশাসনের আকার-আয়তন কি এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে ফেলা যায় না? ঔপনিবেশিক কাঠামোর প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারীর এত সব বাহিনীর আজও কী প্রয়োজন? কলম-পেশা কারণিকদের বস্তা বস্তা ফাইল আর নোটিং থেকে জাতির মুক্তি মিলবে না? ফাই-ফরমাশ খাটা আর চা-নাশতা খাওয়ানোর জন্য পিয়ন-আর্দালি ছাড়া সব আধুনিক দেশের প্রশাসন চলতে পারলে আমরা পারব না কেন? সরকারি প্রশাসন স্রেফ নাগরিকদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহূত হওয়ার কোনো যুক্তি নেই। কর্মসংস্থান করবে অর্থনীতির উৎপাদনশীল খাত ও প্রতিষ্ঠানগুলো—সরকারের ভূমিকা হবে প্রধানত নিয়ন্ত্রক ও রেফারির। আর রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্বই হচ্ছে আয় ও সম্পদ পুনর্বণ্টন এবং উৎপাদনের বাতাবরণকে নির্বিঘ্ন করা। অপ্রয়োজনীয় কর্মচারী ছাঁটাই এবং আমলাতান্ত্রিক শাখা বিস্তারকে কঠোরভাবে রাশ টেনে ধরা গেলে সিভিল প্রশাসন খাতে সরকারি রাজস্ব ব্যয় ক্রমান্বয়ে হ্রাস করে আগামী ১০ বছরে এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে ফেলা খুবই সম্ভব। এ দেশের আমলাতন্ত্র সম্পর্কে অর্থমন্ত্রীর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা প্রবাদপ্রতিম। অথচ ড. আকবর আলি খানের নেতৃত্বাধীন রেগুলেটরি রিফর্মস কমিশনকে বর্তমান সরকার গুটিয়ে ফেলতে মোটেও বিলম্ব করল না! দুঃখটা রাখি কোথায়?
৭. সরকারি প্রশাসনিক ব্যয়ের একটা বিশাল অংশ টিএ/ডিএ খাতে ব্যয় হয়, এটা ওয়াকিবহাল মহলের অজানা নয়। টিএ/ডিএসংক্রান্ত বিধিমালাকে সংস্কার করা যায় না? কোন জায়গায় যেতে খরচ কত হয়, তা কি সঠিকভাবে জানা অসম্ভব? জুনিয়র আমলাকেও সরকারি খরচে গাড়ি দৌড়াতে দেব কেন? রিকুইজিশন করা গাড়িতে আমলা-পরিবারের হাওয়া খাওয়ার সংস্কৃতি কবে বন্ধ হবে? সচিব মহোদয়দের সেডান কার দিয়ে ৪০ বছর কাজ চালানোর পর এখন পাজেরো জিপ লাগবে কেন? তাদের পাজেরো দিলে আরও কয়েক শ পাজেরোর ডিমান্ড নোট আসতে মোটেও দেরি হবে না? সশস্ত্র বাহিনীতে চাল-তেল-আটা-ময়দা-চিনির ভর্তুকি কি কিছুটা কমানো একেবারেই অসম্ভব? সরকারি ভর্তুকি ব্যবস্থাকে তেলা মাথায় তেল দেওয়ার কাজে আর কত দিন ব্যবহার করব?
৮. সরকারি রাজস্ব ব্যবস্থার প্রত্যক্ষ কর-নির্ভরতা বৃদ্ধি শ্লথ হয়ে গেল কেন? ২৮ লাখ TIN ধারী রয়েছে এ দেশে, অথচ আয়কর দিচ্ছে নাকি মাত্র সাড়ে আট লাখ করদাতা! তথ্যপ্রযুক্তি আয়কর প্রশাসনে পৌঁছাতে আর কত দিন লাগবে? জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বরটা আয়করদাতা বাড়ানোর জন্য ব্যবহার করা যায় না? ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে শুরু করে যাবতীয় আর্থিক লেনদেনে এই নম্বর ব্যবহার বাধ্যতামূলক করলে আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠায় তা বিরাট অবদান রাখবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবমতে এ দেশে ২৩ হাজার ২১২ জন কোটিপতি রয়েছেন বলে জানুয়ারি ২০১১-তে পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছিল। এই কোটিপতিদের কতজন তাঁদের প্রদেয় আয়কর দিচ্ছেন, সে তালিকাটা নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা যায় না? সরকারি রাজস্বের ৫০ শতাংশের বেশি যেদিন প্রত্যক্ষ কর থেকে আদায় করা হবে, সে দিনই হবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রের সত্যিকার গণমুখী রূপান্তরের অন্যতম প্রধান মাইলস্টোন অতিক্রম!
৯. বাজেটে মানি লন্ডারিং বা কালো টাকা সাদা করার অপসংস্কৃতি বন্ধ করুন। শেয়ারবাজারে গত দুই বছর সরকারই আমন্ত্রণ জানিয়েছিল কালো টাকাকে। আমরা প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম। এখন এই ভুল নীতির পরিণতি কী হয়েছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। পিপিপি বা পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ নিয়ে গতবারের বাজেট বক্তৃতায় এত আশাবাদ ব্যক্ত করা সত্ত্বেও ফলাফল ‘অশ্বডিম্ব’। ওই বিষয়টাতে আরেকটু মনোযোগ দিন।
পরিশেষে বলব ২০১০-১১ অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, সে অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে অযথা সময় ও শ্রম অপচয় একেবারেই বে-ফজুল। বাংলাদেশের অর্থনীতির স্বর্ণ সম্ভাবনার দ্বার খোলার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। একটা সত্যিকারের উন্নয়নবান্ধব বাজেট বাস্তবায়ন করে আগামী অর্থবছরে উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার রাজপথে শামিল হোন, এটাই আমাদের প্রত্যাশা সরকারের কাছে।
ড. মইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি।

অর্থ অনর্থের মূল by আতাউর রহমান

আমরা বাল্যকালে বলাবলি করতাম, ‘পৃথিবীটা কার বশ?’ বলা বাহুল্য, এটা একটা ধাঁধা এবং ধাঁধার উত্তর প্রশ্নটির মধ্যেই নিহিত—পৃথিবী টাকার বশ। আর যৌবনকালে সিনেমায় গান শুনেছিলাম, ‘টাকা তুমি দেখতে গোল/ করো যত গন্ডগোল...’ ইত্যাদি। সেদিন সিনেমায় যিনি ‘লিপ-সিং’ করেছিলেন, সেই জলিল সাহেব এখন ধানমন্ডিতে আমার প্রতিবেশী। জীবদ্দশাতেই তিনি দেখতে পাচ্ছেন, এখনকার নিকেলে তৈরি গোলাকার এক টাকার মুদ্রার মান তখনকার তামার তৈরি এক পয়সার সমান হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অবশ্য টাকা-পয়সা ছাড়া আমাদের এক দিনও চলে না। অথচ কিছুদিন আগে পত্রিকায় পড়েছিলাম, এই ধারণা ভ্রান্ত বলে প্রমাণের জন্য মার্ক বয়েল নামের এক ইংলিশ যুবক ২০০৮ সালের নভেম্বর থেকে টাকা-পয়সা খরচ পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছেন—তিনি ব্রিস্টলের একটি কৃষি খামারের সন্নিকটে মুফতে পাওয়া এক ক্যারভানে বাস করেন, খামারে নিজের খাদ্য নিজেই ফলান ও তা রান্না করেন স্বয়ং সংগৃহীত লাকড়ির চুলোয়, বিদ্যুৎ পান একটি সৌর প্যানেল থেকে, টুথপেস্ট-সাবান ইত্যাদিও প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি করে থাকেন; আর তাঁর মোবাইল ফোনেও তিনি শুধু ইনকামিং কলের ব্যবস্থা রেখেছেন। তিনি এভাবে কত দিন চালিয়ে যেতে পারবেন, সেটাই আপাতত আমাদের ঔৎসুক্যের বিষয়।
সে যাক গে। কেউ যদি কেবলই টাকা-পয়সার পেছনে ছোটে, তাহলে তাকে আমরা বলি টাকাপাগল; যদি সে এটা জমিয়ে রাখে, তাহলে সে পুঁজিবাদী; যদি সে যথেচ্ছ খরচ করে, তাহলে সে অমিতব্যয়ী; যদি সে এটা না পায়, তাহলে সে নিষ্কর্মা; যদি সে এটা প্রাপ্তির প্রচেষ্টা প্রত্যাহার করে, তাহলে সে উচ্চাকাঙ্ক্ষাহীন; আর যদি সে কোনো পরিশ্রম ছাড়াই এটা পায়, তাহলে সে পরজীবী। এবং সে যদি সারা জীবন পরিশ্রম করে এটাকে পুঞ্জীভূত করে, লোকেরা যখন বলাবলি করতে থাকে যে সে একজন অপদার্থ, যে জীবন থেকে কিছুই পেল না। তবে হ্যাঁ, কৃপণদের সঙ্গে জীবনযাপন কষ্টকর হলেও পূর্বপুরুষ হিসেবে ওরা যে মহান, সেটা বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না।
বিশ্বের তাবৎ গুণী আর ধনী ব্যক্তি কিন্তু টাকা-পয়সা সম্পর্কে অনেক মজার কথা বলে গেছেন। সবাইকে উদ্ধৃত করতে গেলে সাতকাহন হয়ে যাবে; আপাতত গুটি কয়েকের মন্তব্য উপস্থাপন করছি। সর্বাগ্রে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ; তিনি বলেছেন, ‘টাকা যে মানুষ জমিয়েছে, অনেক পাপ জমিয়েছে সে তার সঙ্গে (সাধে কি আর বলা হয়, লাখকে মেরেই তবে লাখপতি)।’ অতঃপর অমর কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র; তিনি বলেছেন, ‘মানুষ খাঁটি কি-না চেনা যায় শুধু টাকার সম্পর্কে। এ জায়গায় নাকি ফাঁকি চলে না। তাই এখানেই মানুষের যথার্থ রূপ প্রকাশ পায়।’ মহামতি ভলটেয়ারও বলেছেন, ‘যখন প্রশ্নটা টাকা-পয়সার, সবার ধর্ম একই।’
কিন্তু এগুলো তো বেশ গুরুগম্ভীর কথা, হালকা মেজাজের কথার জন্য আমাদের যেতে হবে অন্যত্র। সমারসেট মম্ বলেছেন, ‘টাকা-পয়সা হচ্ছে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের মতো, ওটা ছাড়া অন্য পাঁচটা পূর্ণতা পায় না।’ ফ্রান্সিস বেকন বলেছেন, ‘টাকা-পয়সা হচ্ছে ভেজা গোবরের মতো, ছড়িয়ে না দিলে মোটেও সুখদ হয় না।’ আর ধনকুবের হেনরি ফোর্ড নাকি বলেছিলেন, ‘টাকা-পয়সাকে বাহু বা পায়ের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে—হয় এটাকে ব্যবহার করো, নয় এটা অকেজো বা নষ্ট হয়ে যাবে।’
ধর্মগ্রন্থ বাইবেল-এ বলা হয়েছে, ‘একজন ধনবান ব্যক্তির পক্ষে ঈশ্বরের রাজ্যে প্রবেশ করা একটি সুচের ছিদ্র দিয়ে উট প্রবেশ করার চেয়েও কঠিন।’ বাইবেল-এ আরও বলা হয়েছে, ‘অর্থের প্রতি ভালোবাসা সকল অনর্থের মূল।’ তো, জর্জ বার্নার্ড শ ছিলেন বিদ্রূপাত্মক রসিকতায় পারঙ্গম; এটা শুনে তিনি বললেন, ‘অর্থহীনতাই সকল অনর্থের মূল।’
এতক্ষণ মজার মন্তব্যগুলো তুলে ধরা হলো, এবারে মজার উপাখ্যানগুলোর দিকে দৃষ্টি ফেরানো যাক: এক সুইস ও এক ফরাসিতে কথাবার্তা হচ্ছিল। একপর্যায়ে ফরাসি ফোড়ন কাটল, ‘তোমরা সুইসরা সব সময় টাকার জন্য যুদ্ধ করো, আমরা ফরাসিরা করি সম্মানের জন্য—এটা কেন? প্রত্যুত্তরে সুইস বলে উঠল, ‘আমার মনে হয়, যার যেটা নেই, সে সেটার জন্য যুদ্ধ করে থাকে। দুই, এক সন্ত্রাসী জনৈক পথচারীর গায়ে পিস্তল ঠেকিয়ে বলেছিল, ‘হয় তোমার টাকা, না হয় তোমার জীবন।’ সঙ্গে সঙ্গে লোকটা বলল, ‘জীবনটাই নাও, আমি আমার বুড়ো বয়সের জন্য টাকা জমাচ্ছি।’ তিন, ছেলেদের ক্লাসে শিক্ষক বললেন, ‘কাগজ-কলম নাও এবং রচনা লিখো—আমি যদি কোটিপতি হতাম।’ সবাই তড়িঘড়ি করে লিখতে শুরু করে দিল; কিন্তু একজন চুপচাপ বসে আছে দেখে শিক্ষক প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি লিখছো না কেন?’
‘আমি আমার সেক্রেটারির জন্য অপেক্ষা করছি’—ছেলেটি চটপট জবাব দিল। তা সত্যিই তো, সবকিছু সম্পাদনের জন্য একজন সেক্রেটারি না থাকলে কোটিপতিকে মানায়?
আর হ্যাঁ, এটা অবশ্য সত্যি যে যার টাকা-পয়সা নেই, সে গরিব। তবে এর চেয়ে বড় সত্যি হচ্ছে এই যে যার কেবল টাকা আছে আর কিছুই নেই, সে অধিকতর গরিব। একসময় ছিল যখন বলা হতো, বোকাদের হাতে টাকা-পয়সা বেশিক্ষণ থাকে না; কিন্তু বর্তমানে সবার বেলায়ই এটা ঘটে থাকে। সাধে কি আর বলা হয়, এ দেশে আমরা দিন দিন অধিকতর বলবান হচ্ছি—২০ বছর আগে বাইশ শ টাকার কাঁচাবাজার বহন করতে অন্তত দুজন লোক লাগত, এখন একটা শিশুই সেটা বহন করে নিয়ে আসতে পারে। আর টাকা-পয়সার সঙ্গে বিদ্যা-বুদ্ধিরও অনেকটা সাদৃশ্য আছে—আপনার কত কম আছে, সেটা যদি আপনি প্রকাশ না করেন তাহলে লোকেরা আপনার সঙ্গে এমন ব্যবহার করবে যেন আপনার অনেক আছে। সর্বোপরি, আপনার ধর্ম আপনাকে শেখায়, সংসারে টাকা-পয়সাই সবকিছু নয়; কিন্তু আপনার সরকার আপনাকে বলতে থাকে, ওটাই সবকিছু। এ বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার কোনো উপায় কারও জানা আছে কি না, আমার জানা নেই।
পুনশ্চ: সম্প্রতি যৌন নির্যাতনের অভিযোগের মুখে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রধান দমিনিক স্ত্রস কান পদত্যাগ করেছেন। এর আগে নিউইয়র্কের একটি হোটেলে এক নারী কর্মীকে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ কর্তৃক গ্রেপ্তার হন। এটাও ‘অর্থই সকল অনর্থের মূল’ এ কারণে কি না, কে জানে।
আতাউর রহমান: রম্য লেখক। ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক।

Thursday, June 9, 2011

দুই নেত্রীর আপিল বিভাগ ও সংসদ অবমাননা by মিজানুর রহমান খান

আওয়ামী লীগ আপিল বিভাগের রায়ের অপব্যাখ্যা ব্যাখ্যা করেছে। বিরোধী দলও রায়ের সঠিক ব্যাখ্যা করেনি। তারা কেউ পূর্ণাঙ্গ রায়ের অপেক্ষায় থাকার দরকার মনে করেনি। বিশেষ কমিটিও নয়। উভয় দল পানি ঘোলা করছে। তবে যদি বলা হয়, ঠিক এই পর্বের দায় কার কাঁধে বেশি চাপবে, তাহলে সেটা সরকারি দলের কাঁধেই।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া অল্প সময়ের ব্যবধানে দুটি সংবাদ সম্মেলন করেছেন। দুটোতেই দুটি মুদ্রিত কপি ছিল, এর বাইরে ছিল প্রশ্নোত্তর। এই দুটো কপি দুটি অকাট্য প্রমাণ। মাত্রাভেদে এ দুটিতেই রয়েছে আপিল বিভাগ অবমাননার উপকরণ। দুটোতেই ত্রয়োদশ সংশোধনী-সংক্রান্ত আপিল বিভাগের রায়কে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে।
আপিল বিভাগের ছয় বিচারক বিভক্ত রায় দিয়েছেন। আমরা জানি না কতজন মিলে তাঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘু হয়েছেন। ছয় বিচারক স্বাক্ষরিত সংক্ষিপ্ত আদেশটি অবিকল এ রকম: ‘(১) সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের ভিত্তিতে বিনা খরচায় আপিলটি মঞ্জুর করা হইল। (২) সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী আইন ১৯৯৬ ভাবিসাপেক্ষে (প্রসপেক্টিভলি) বাতিল ও সংবিধানবহির্ভূত ঘোষণা করা হইল। (৩) দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচন সুপ্রাচীন নীতিসমূহ, যা অন্যবিধভাবে বৈধ নয়, প্রয়োজনের কারণে বৈধ, জনগণের নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ আইন, রাষ্ট্রের নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ আইন—এর ভিত্তিতে উল্লিখিত ত্রয়োদশ সংশোধনীর বিধানের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে পারে। যা হোক জাতীয় সংসদ অন্তর্বর্তীকালে বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি কিংবা আপিল বিভাগের বিচারপতিদের নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার বিধান বাদ দিয়ে স্বাধীনভাবে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনতে পারে। রায়ের বিস্তারিত বিবরণ অনুসরণীয়। সংশ্লিষ্ট সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপিল নং ৫৯৬/২০০৫ এতদ্দ্বারা নিষ্পত্তি করা হইল।’
১০ মে ওই রায় ঘোষণা করা হয়েছে। ছয়জন বিচারক ছয়টি বাক্যে সংক্ষিপ্ত আদেশ দিয়েছেন। এটা হলো রায়ের চুম্বক অংশ। ওই আদেশের তিনটি দফাকে বিচ্ছিন্নভাবে পড়া বা তেমনভাবে মূল্যায়নের কোনো সুযোগ নেই; বরং এ ধরনের দাবি করা প্রলাপের নামান্তর।
পূর্ণাঙ্গ রায়ের জন্য অপেক্ষা যে করতেই হবে, সে বিষয়টিও কিন্তু আপিল বিভাগ স্পষ্ট করেছেন। কিন্তু নেতা-নেত্রীরা কেউ পূর্ণাঙ্গ রায়ের জন্য অপেক্ষা করেননি। অথচ কয়েকটি বিষয় জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
আপিল বিভাগ ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করেছে মর্মে গণমাধ্যমে যেভাবে বড় শিরোনাম করেছিল, সেটা বিভ্রান্তিকর অন্তত সংক্ষিপ্ত আদেশের মতে। এর কারণ, আমাদের অনুমান সত্যি হলে বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম ‘ডকট্রিন অব প্রসপেক্টিভ ওভাররুলিং’ প্রয়োগ করে রায় লেখা হয়েছে। এর আগে সংবাদপত্রের রিপোর্টের ভিত্তিতে লিখেছিলাম, এটা দেখা গুরুত্বপূর্ণ যে মূল রায়ে কখন থেকে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল বলে গণ্য করা হবে বলা হয়। ভয়েড, মানে গোড়া থেকে বাতিল। আমাদের দেশে সামরিক শাসনসংশ্লিষ্ট পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনী এবং সংসদের করা অষ্টম সংশোধনীকে গোড়া থেকে বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু ত্রয়োদশ সংশোধনীর ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে প্রসপেক্টিভ অর্থাৎ ভবিষ্যৎ থেকে রহিত করা হয়েছে। এটা যে দেশের বিচার বিভাগে এই প্রথম, সেটুকু ব্যারিস্টার রফিক-উল হক রোববার আমাদের নিশ্চিত করেন। তবে এখনই হলফ করে কিছু বলব না। কারণ, সাম্প্রতিক কালে আমরা দেখেছি, রায় ঘোষণার দিনে যে ধরনের আশাবাদ সৃষ্টি হয়েছে, পরে পূর্ণাঙ্গ রায়ের পরে তা বিস্ময়করভাবে বদলে গেছে।
ভবিষ্যৎকালে সংবিধানের সংশোধনী বাতিলে আদালতের ক্ষমতাও আইনে লেখা নেই। এটা এক কল্পনাপ্রসূত লিগ্যাল ফিকশন। মৌলিক কাঠামোর মতো এই ডকট্রিনও একটা ফিকশন। বিশেষ কমিটির রিপোর্টে মৌলিক কাঠামোর উল্লেখ দেখে আমরা হতবাক। কোনো সংবিধানে এটা দেখিনি। যাক, কোনো আইন ভবিষ্যৎকালে বাতিলে অভিনবত্ব ও চমৎকারিত্ব দুই-ই আছে। এর প্রথম উন্মেষ ঘটে আমেরিকায়। ভারতের প্রধান বিচারপতি সুভা রায় ১৯৬৭তে ‘গোলকনাথ’ মামলায় এর প্রথম প্রয়োগ করেন। সাংবিধানিক পণ্ডিতদের মধ্যে এ নিয়ে মতভেদ প্রবল। কারণ, আদালতের এ ধরনের ‘কল্পনাপ্রসূতা’ চূড়ান্ত অর্থে সংসদের আইন প্রণয়নের ক্ষমতাকে সংকুচিত করতে পারে। ভারতে এ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা কম হয়নি। বিখ্যাত মণ্ডল মামলায় বিচারপতি জীবন রেড্ডি রায় দিয়েছিলেন যে, রায়ের কার্যকারিতা রায় ঘোষণার দিন থেকে আগামী পাঁচ বছর অতিবাহিত হওয়ার পর বলবৎ হবে।
আমরা তো কল্পনায় ভাসতে পারি না। নবম ও দশম সংসদের মেয়াদ শেষ হলে পরেই তবে বাতিল কথাটি কার্যকর হবে, সেটা পূর্ণাঙ্গ রায়ে থাকবে বা থাকবে না, তা ধরে নেওয়ার বিষয় নয়। অথচ বিশেষ কমিটি আদালতের দোহাই দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক-ব্যবস্থা বলি দিল। তাদের দুরভিসন্ধি না থাকলে রায়ের দোহাই দিত না।
অন্যদিকে আপিল বিভাগ যদি নিঃশর্তে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলই করবেন, তাহলে তারা কি দুই ও তিন নম্বর দফা যুক্ত করলেন বেহুদাই? বাতিল জিনিসের আবার প্রয়োজনীয় সংশোধনী কী। সে জন্য সংসদকে ‘লিবার্টি’ দেওয়ার মানে কী। এই লিবার্টি তো স্ট্যাচু অব লিবার্টি নয়।
তবে যা-ই ঘটুক না কেন, আদালতের সংক্ষিপ্ত আদেশ যেটি আমাদের হাতে রয়েছে, তার যে অপব্যাখ্যা করে বিশেষ কমিটি রিপোর্ট দিয়েছে ও ‘স্বতঃস্ফূর্ত’ হরতাল হয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই বললেই চলে।
আওয়ামী লীগের মন্ত্রীদের বক্তৃতা-বিবৃতি শুনে আইনবিদ্যায় যাঁদের অ আ ক খ জ্ঞান আছে, লজ্জায় তাঁরা হয়তো মাটিতে মিশে যাচ্ছেন। গত বছর সংসদ নেতার মোশনে বিশেষ কমিটি হয়। তারা দুই নেত্রীকে আমন্ত্রণ জানায়। এটা পকেট কমিটি ছিল না। এর রিপোর্ট যাবে সংসদে, যেকোনো সিদ্ধান্ত সংসদের ফ্লোরে হওয়ার কথা। কিন্তু তা হতে দেওয়া হলো না। এর মাধ্যমে স্পষ্টতই শুধু আদালত নয়, সংসদেরও অবমাননা ঘটেছে। আজ যদি সংসদের নেতা, প্রধানমন্ত্রী ও দলের সভাপতি তিনটি আলাদা মাথা থাকত, তাহলে হয়তো এমনটা ঘটত না।
প্রধানমন্ত্রী সাফ বলেছেন, আদালতে বাতিল হওয়ার কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের কোনো সুযোগ নেই। ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতা ডাহা মিথ্যাচার করছেন। হয়তো ‘মে’ শব্দটি থেকে ফায়দা নিচ্ছেন। তাঁরা বলছেন, দুই মেয়াদের নির্বাচন কথাটা নাকি অবিটার ডিকটা। লাতিন এ শব্দের মানে বাতকিবাত, পর্যবেক্ষণ। তবে এর কোনো দাম নেই—এটাও ডাহা মিথ্যা। যদি ধরেও নিই, এটা অবিটার ডিকটা। তাহলেও বলব, আওয়ামী লীগ অসত্য বলছে। ১৯৬০ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায় আছে, অবিটার ও পর্যবেক্ষণ সুপ্রিম কোর্টের হলে তা বাধ্যতামূলকই। ভারতের প্রধান বিচারপতি এ এম আহমেদির নেতৃত্বাধীন ছয় সদস্যের সুপ্রিম কোর্ট বেঞ্চ, যেখানে জে.এস. ভারমার (পরে প্রধান বিচারপতি) মতো বরেণ্য বিচারক ছিলেন; ১৯৯৫ সালে তাঁরা বলেন, অবিটার ডিকটার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং তা মেনে চলাটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। নেহাত শুনানিকালে মার্কিন প্রধান বিচারপতি ওয়েটারের একটা মামুলি উক্তি পরে একটি নন্দিত ডকট্রিনে পরিণত হয়েছিল।
আমাদের শাসকগোষ্ঠীকে এসব বলে লাভ নেই। আমরা পড়েছি মোগলের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে। বিরোধী দলের নেতা (অভ্যাসগত সংসদ অবমাননাকারী) বেগম খালেদা জিয়া তাঁর ৪ জুনের সংবাদ সম্মেলনে ১৭১৯ শব্দের একটি লিখিত বিবৃতি পাঠ করেন। বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের প্রতি তাঁর রাগ বোধগম্য। ওই বিবৃতিতে রায়সংক্রান্ত ৩৪৮ শব্দের একটি প্যারাগ্রাফ আছে। সেখানে আছে, ‘বিতর্কিত এ রায়টি আইন ও সংবিধানসম্মত নয়। পরস্পরবিরোধী, দুর্বল, যুক্তিহীন ও বিতর্কিত। সরকারের অনুগ্রহভাজন এই ধরনের বিচারপতির রায়ের ছুতা ধরেই আজ সংবিধান বদল করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার তুলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র ও অপচেষ্টা চলছে।’ অবশ্য এ কথাও আছে যে, ‘এই বিতর্কিত রায়ের একটি অংশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান আরও দুই মেয়াদ বহাল রাখা যাবে বলে যে মত দেওয়া হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকার এখন সেটিও এড়িয়ে যেতে চাইছে।’
পূর্ণাঙ্গ রায় পাঠে তাঁর আগ্রহ নেই। তাঁদের দরকার অস্থিতিশীলতার মসলা। ক্ষমতাসীনেরা চেয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক-ব্যবস্থা বাতিল করতে। এই আকাঙ্ক্ষা তাদের গোড়াতেই প্রকাশ পায়। সেটা তারা রায় অপব্যাখ্যা করে, কালবিলম্ব না করে উসুল করেছে। আর বিএনপি-জামায়াত চেয়েছিল ‘জনসমর্থিত’ জ্বালাও-পোড়াও কর্মসূচির ফিতাকাটা। এ উপলক্ষটি পেয়ে তারা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। সেটাও ওই রায়ের ছুতোয়, বিশেষ করে লাভবান হয় জামায়াত। তারা প্রথমবারের মতো ‘গণমুখী’ হরতাল ডাকতে সক্ষম হয়। বিএনপি নেত্রীর মলিন ভাবমূর্তির ছেলেদের জন্য হরতাল দিতে তাঁরা মওকা পায়নি। কদিন পরেই জামায়াতের নতুন পাখনা গজাবে। সাঈদী ও সাকা চৌধুরীর মতো ব্যক্তিদের বিচারের জন্য ৪৭ অনুচ্ছেদ শোধরানোর সুপারিশ এলেও ধর্মভিত্তিক দলগুলো তো বেঁচে গেল। জামায়াত নিষিদ্ধের রাজনীতি আওয়ামী লীগই নিষিদ্ধ করল।
আমরা আপিল বিভাগের কাছে অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ রায় আশা করি। দ্ব্যর্থক নয়, পষ্টাপষ্টি। বিশেষজ্ঞদের মধ্যে যারা ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ধরে নিয়েছেন এবং নির্বাচন কমিশন শক্তিশালীকরণসহ দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের উপায় বাতলাচ্ছেন, তাঁদের আশু করণীয় রায়ের সঠিক ব্যাখ্যার বিষয়ে কলম ধরা। ক্ষমতাসীনেরা সংবিধান ও আদালতের রায় কাকে বলে—যা কিছুই ঠিক করে দিচ্ছেন, সেটাই কোনো না কোনোভাবে কল্কে পাচ্ছে। সংবিধান পুনর্মুদ্রণ পর্বে আমরা অসহায় বোধ করেছি, বিশেষ করে আদালত যখন এই নীতি নেন যে তাঁরা রায় অপব্যাখ্যার বিষয়ে নীরব থাকবেন। যে যা বুঝে সারতে পারে। তবে ক্ষমতাসীনের বোঝাটাই সার।
পাদটীকা: ৫ জুন সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের মানবজমিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারটি স্ববিরোধী। আপিল বিভাগের ওই সংক্ষিপ্ত আদেশের সঙ্গেও তা সংগতিপূর্ণ নয়। ‘বিতর্ক এড়াতেই দুই মেয়াদে নির্বাচন রেখেছি’ বলার পরে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল হয়ে গেছে। এখন আর তা নেই’, এটা কীভাবে যৌক্তিক হতে পারে?’ পঞ্চম সংশোধনীর রায় অপব্যাখ্যার বিরুদ্ধে একটি রিট হয়েছে। গতকাল অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তর এক সপ্তাহ সময় নিয়েছে। ১৩ জুন শুনানি হবে। এ লড়াইটা চালাতে হবে। এটা এক নতুন লড়াইয়ের ক্ষেত্র। শুধু রাজনীতিকেরাই এর কুশীলব নন।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

Wednesday, June 8, 2011

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে রোডম্যাপ প্রয়োজন by এম তামিম

বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ক্ষেত্রে কোনো প্রকল্পই স্বল্প মেয়াদে করা সম্ভব নয়। এখানে সবই দীর্ঘমেয়াদি। তাই অন্য যেকোনো খাতের চেয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির বাজেট বেশ ব্যতিক্রমধর্মী। অবকাঠামোগত অন্য অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, স্বল্প সময়েই একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব। যেমন ধরা যাক, একটি সেতু তৈরি হবে। এখন সেতু তৈরির জন্য আমাদের কী কী লাগবে? পাথর, সিমেন্ট, রড ইত্যাদি। অর্থাৎ, সবকিছুই চাইলে আমরা পেয়ে যাব, হাতের নাগালে। কিন্তু বিদ্যুৎ বা জ্বালানির উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিষয়টি এমন নয়। ধরুন, একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এখন এ কাজের জন্য যা যা লাগবে, চাইলেই তার সবকিছু হাতের নাগালে পাওয়া যাবে না। আর বিদুৎকেন্দ্র নির্মাণ বা উৎপাদন যেহেতু অনেক ব্যয়বহুল একটি বিষয়, তাই এ ক্ষেত্রে প্রকল্পের জন্য অর্থের সংস্থান করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য লাগবে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক জ্বালানি, সেটারও নিশ্চয়তা থাকতে হবে বা তার ব্যবস্থা করতে হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি যেহেতু দীর্ঘমেয়াদি, তাই বিদ্যুৎ ও জ্বালানির বাজেটের ক্ষেত্রেও এই বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। কোনো রকম পরিকল্পনাহীন বাজেট দিয়ে আর যা-ই হোক, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের কার্যকর উন্নয়ন সম্ভব নয়। আগের বাজেটগুলোর মতো এবারও এর ব্যতিক্রম হবে বলে মনে হচ্ছে না।
বাজেটের আগে অবশ্যই পরিকল্পনা জরুরি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি হলেও কমপক্ষে পাঁচ বছরের কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। আর দীর্ঘমেয়াদি হলে সর্বোচ্চ ১০ বছর। আপনি কী ধরনের বিদ্যুৎ উৎপাদন করবেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের অর্থ আসবে কোত্থেকে কিংবা প্রাথমিক জ্বালানিটাই বা কী হবে—এ বিষয়গুলো অবশ্যই আগে ভেবে রাখতে হবে।
এবারের বাজেটে আগামী চার বছরের বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এবং তারই ভিত্তিতে ঘোষণা করা হচ্ছে এবারের বিদ্যুৎ-জ্বালানির বাজেট। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ২০১৫ সালের মধ্যে তেল ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে দুই হাজার ২২০ মেগাওয়াট, কয়লাভিত্তিক প্রায় দুই হাজার ৬০০ মেগাওয়াট, চার হাজার মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক এবং সৌরশক্তিভিত্তিক এক হাজার মেগাওয়াট। পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে, কিন্তু বড় প্রশ্ন হলো—এই উৎপাদনের জন্য জ্বালানি আসবে কোত্থেকে? এখানেই বড় দুর্বলতা। ধরা যাক গ্যাসের কথা। যদি তা আমদানি করা হয়, তবে বিশাল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন। এ ব্যাপারে বিদ্যুৎ বিভাগ যে পরিকল্পনা দিয়েছে, তার কোনো রকম বাস্তবতা খুঁজে পাওয়া কঠিন।
যদি ধরে নিই, সরকারের পক্ষে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব, সে ক্ষেত্রে যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দেবে তা হলো, অর্থের জোগান আসবে কোথা থেকে। এই বিষয়টি সবার আগে ঠিক করা জরুরি। হিসাব করলে দেখা যায়, যে পরিমাণ গ্যাস আমদানি করতে হবে, তার দাম পড়বে গড়ে ১৫ বিলিয়ন ডলার। আগামী চার বছরের মধ্যে এর সংস্থান আমরা কী করে করব? তাই পরিকল্পনা করার আগে সবকিছু সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা চাই। পরিকল্পনা ও সামর্থ্যের সমন্বয় করতে না পারলে সবকিছুই বিফল। তাই প্রথমেই বলেছি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিক্ষেত্রের বাজেট একদম ব্যতিক্রমী। এখানে সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া সুফল পাওয়া অসম্ভব।
বাজেটের আগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের একটি নির্দিষ্ট রোডম্যাপ থাকা প্রয়োজন। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ভালো অনুশীলনও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনই তো শেষ কথা নয়, এটার সুষ্ঠু বিতরণও অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হিসাব করলে দেখা যায়, আগামী চার বছরের জন্য যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে, তা বিতরণের জন্যও আরও ১০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। মানে মোটমাট আমাদের দরকার ২৫ বিলিয়ন ডলার!
এ ছাড়া বেসরকারি খাতকে যদি আমরা যুক্ত করতে চাই, তাহলে কী প্রয়োজন? প্রয়োজন পরিকল্পনার সঠিক বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা। কিন্তু অতীতে যেমনটা দেখা গেছে, এবারও তেমন অনিশ্চিত বাস্তবতা সামনে। সুতরাং এ ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা কী করবেন? নিশ্চয়ই উৎসাহ দেখাবেন না! তাই বিনিয়োগকারীদের ব্যাপারেও ধারণা রাখা প্রয়োজন।
এর আগে দেখা গেছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ক্ষেত্রে বরাদ্দ করা অর্থ ফেরত গেছে, অন্যান্য ক্ষেত্রেও অবশ্য এমনটা ঘটেছে। এটাও গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। ভর্তুকির বিষয়ে বললে, ভর্তুকি বেড়ে গেলে উৎপাদন-খরচ বাড়বেই। বাজেটে ভর্তুকির বড় প্রভাব আছে। এখন বাজারে ফার্নেস তেলের দাম বেড়েছে, তাই ফার্নেসভিত্তিক বিদ্যুতের দামও বেড়ে যাবে নিঃসন্দেহে।
এ বছর বার্ষিক ভর্তুকির ব্যাপারটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এর থেকে বের হওয়ার উপায় হলো সর্বজনীন ভর্তুকি বন্ধ করে দেওয়া। যেসব ক্ষেত্র বা যারা ভর্তুকি পাওয়ার যোগ্য, তাদেরই ভর্তুকি দিলে সমস্যা কমে যায়। সরাসরি ভর্তুকিটাও গ্রহণযোগ্য। এটা ধীরে ধীরে করতে হবে। উৎপাদনমূল্যের চেয়ে ক্রয়মূল্য বেশি হলে সমস্যা বাড়বে, এটা সবাই জানেন। ভর্তুকি কী পরিমাণ এবং কত দিন দেওয়া হবে, তা-ও ঠিক করতে হবে।
সব সময় দেখা যায়, বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনেই বেশি বাজেট বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা তো এখানে নয়, প্রাথমিক জ্বালানির স্বল্পতাই সমস্যার কারণ। এখান থেকে সমাধান খুঁজতে চাইলে আমাদের গ্যাস অনুসন্ধান করতে হবে। কয়লা উত্তোলনের দিকে নজর দিতে হবে। মোট কথা, এখন যেটা চলছে, সেটাকে ঠ্যাক দিয়ে কাজ চালানো বলা যায়। এক কথায় উচ্চমূল্যে আমরা সময় কিনছি! স্থায়ী সমস্যা সমাধানের জন্য গ্যাস ও কয়লা অনুসন্ধান জরুরি। আর উচ্চমূল্যে যদি প্রাথমিক জ্বালানি আমদানি করতেই হয়, তার আগে আমাদের অর্থনীতির ভিত আরও শক্ত করতে হবে।
ড. এম তামিম: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ); অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)।

Friday, May 20, 2011

দুর্নীতি, ভূমি ও মাওবাদী আন্দোলন by সোহরাব হাসান

এই মুহূর্তে ভারতের সামনে তিনটি প্রধান সমস্যা হলো—দুর্নীতি, ভূমি ও মাওবাদী আন্দোলন। আপাতদৃষ্টিতে তিনটি পৃথক সমস্যা হলেও পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। দুর্নীতি বৈষম্য বাড়ায় আর সেই বৈষম্যের বঞ্চনা নিপীড়িত জনগোষ্ঠীকে অস্ত্র হাতে নিতে বাধ্য করে। উন্নয়নের নামে গরিবের ভূমি জবরদখল হয়ে যায়।
দিল্লির রাজদরবারে এখন রাজনৈতিক দুর্নীতির বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। বাংলাদেশের সঙ্গে পার্থক্য হলো, এখানে ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের কেউ দুর্নীতির কথা স্বীকার করেন না। অতীত নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেন। ভারতে দুর্নীতিবাজদের হাতেনাতে ধরা হচ্ছে, দুর্নীতির দায়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেল খাটছেন, ক্ষমতাসীন দলের সাংসদকে গুরুত্বপূর্ণ পদ হারাতে হচ্ছে। দুর্নীতি নিয়ে লোকসভায় বিতর্ক হচ্ছে, বিরোধী দল বেশ কিছুদিনের জন্য সংসদ অচল করে রেখেছিল। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংও অকপটে ব্যর্থতা স্বীকার করেছেন। দুর্নীতির কথা স্বীকার করলেই এর বিরুদ্ধে লড়াই করার তাগিদ অনুভূত হয়।
ভারতে দুর্নীতির চালচিত্র ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সাবেক আমলা এবং দেশটির তিন প্রধানমন্ত্রীর অধীনে মন্ত্রিপরিষদ-সচিবের দায়িত্ব পালনকারী টি এস আর সুব্রামনিয়াম বলেছেন, ‘দুর্নীতির রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতা প্রশাসনে শিকড় গেড়েছে। তিন দশক আগে নিম্নপর্যায়ে ছোটখাটো দুর্নীতি ছিল। এখন তা সহজেই উচ্চপর্যায়ে চোখে পড়বে। একইভাবে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো এখন জানে কীভাবে চুক্তি ভাগিয়ে নিতে হয়।’
কথাগুলো বাংলাদেশের জন্য আরও বেশি সত্য।
ভারতে রাষ্ট্রীয় প্রকল্পে যে মাত্রাতিরিক্ত দুর্নীতি হয়, তার প্রমাণ কমনওয়েলথ ভিলেজ নির্মাণ, টেলিকম খাত কিংবা মহারাষ্ট্রের আবাসন প্রকল্প। তবে দিল্লির একজন প্রবীণ কূটনীতিক এ লেখককে বলেছেন, ‘ধনতান্ত্রিক অর্থনীতি এবং উন্নয়নের অনিবার্য উপসর্গ হয়ে আসে দুর্নীতি। প্রশ্ন হলো এর মাত্রা নিয়ে। যদি সহনীয় মাত্রায় থাকে, এ নিয়ে হইচই হয় না। কিন্তু যখন প্রকল্পের পুরো টাকাই হজম করার চেষ্টা হয়, তখনই গোলমাল দেখা দেয়।’
প্রধান বিরোধী দল বিজেপি বা এনডিএ জোট এখন দুর্নীতি নিয়ে সোচ্চার হলেও তাদের আমলে দুর্নীতি রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পেয়েছে—জানালেন আরেক কূটনীতিক। সে ক্ষেত্রে দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের আন্দোলন বিশ্বাসযোগ্যতা পায় না। এখনো যেসব রাজ্যে বিজেপি সরকার আছে, সেসব রাজ্যে দুর্নীতি বেশি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সম্প্রতি গান্ধীবাদী নেতা ও সমাজসেবক আন্না হাজারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে অহিংস আন্দোলন জনগণের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। শেষ পর্যন্ত সরকার দাবি মেনে নেওয়ায় তিনি অনশন ভঙ্গ করেছেন। তাঁর দাবি, দুর্নীতি বন্ধে স্বাধীন ন্যায়পাল গঠন করতে হবে, যার কাছে সবাই জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবেন।

২.
দিল্লিতে এখন কারা ক্ষমতায় আছে, তা দলীয় অফিসে লোকসমাগম এবং গাড়ির সংখ্যা দেখে আন্দাজ করা কঠিন নয়। আকবর রোডে কংগ্রেস অফিস। ১০ মে বিকেল চারটায় পৌঁছে দেখি, ফুটপাতে অনেক গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। দেয়ালজুড়ে জওহরলাল নেহরু, ইন্দিরা গান্ধী ও সোনিয়া গান্ধীর ছবি। পাশে হকার বিক্রি করছেন দলীয় ঘোষণাপত্র, প্রতীক ও নেতা-নেত্রীদের ছবি। আগেই কথা হয়েছিল দলের অন্যতম মুখপাত্র মনীষ তেওয়ারির সঙ্গে। অভ্যর্থনাকক্ষে তাঁর নাম বললাম। এরপর দর্শনার্থী বইতে নাম-ঠিকানা লিখে মনীষ তেওয়ারির কক্ষে গিয়ে জানলাম, তিনি কিছুক্ষণ আগে বেরিয়ে গেছেন। তাঁকে টেলিফোন করতেই পরদিন আসতে বললেন। পরদিন অবশ্য ঝুঁকি না নিয়ে দৈনিক মিরর টুডের সাংবাদিক কে বেনেডিক্টকে সঙ্গে নিলাম। কংগ্রেসের বিট করেন বলে নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা আছে। চারটায় দলের সংবাদ সম্মেলন।
সেদিন দলের আরেক মুখপাত্র ও রাজ্যসভার সদস্য জয়ন্তী নটরাজন সংবাদ সম্মেলন ডেকেছিলেন বিজেপির নেতা মুরালি মনোহর যোশীর একটি বিবৃতি নিয়ে। তিনি সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি। কমনওয়েলথ ভিলেজের দুর্নীতি নিয়ে গঠিত কমিটি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মন্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দিলেও তা ১১-১০ ভোটে নাকচ হয়ে যায়। যোশীর অভিযোগ, মন্ত্রী ও কংগ্রেসের ক্ষমতাধর নেতারা সদস্যদের প্রভাবিত করেছেন। কংগ্রেসের মুখপাত্র যোশীর বিবৃতির নিন্দা করে বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের মতামত অগ্রাহ্য করে তিনি মনগড়া কোনো বিবৃতি দিতে পারেন না। এটি সংসদীয় রীতির বরখেলাপ।
সংবাদ সম্মেলন থেকে বেরিয়ে আমরা দলের অন্যতম সম্পাদক টম ভেডাক্কানের কক্ষে গেলাম। কথা হলো দিল্লির রাজনীতি নিয়ে। তিনি মনে করেন, অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে দলের অবস্থান শক্ত। ২০০৯ সালের নির্বাচনে বিজেপি বা এনডিএ জোটের যে বিপর্যয় ঘটে, এখনো তারা তা কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
আগের দিন বিজেপির মুখপাত্র নির্মলা সীতারাম অবশ্য এই অভিযোগ স্বীকার করলেন না। তাঁর মতে, ‘গত দুই বছরে দল অনেক গুছিয়ে নিয়েছে। সাংগঠনিক শক্তি সুদৃঢ় হয়েছে। সরকারের ব্যর্থতা ও দুর্বলতাগুলো আমরা জনগণের সামনে তুলে ধরছি। একসময় যাঁরা দল ছেড়ে গিয়েছিলেন, তাঁরা আবার ফিরে আসছেন—যশবন্ত সিং, উমা ভারতী প্রমুখ।’ কিন্তু বিজেপির যে দুর্বলতার কথাটি নির্মলা বলেননি তা হলো, তরুণ প্রজন্মকে কাছে টানতে না পারা।
৯ মে লোদি স্ট্রিটে সিডিএনএসের কার্যালয়ে কথা হয় বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার মুচকুন্দ দুবের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘এই মুহূর্তে ভারতের প্রধান সমস্যা মাওবাদী বা নকশাল আন্দোলন। সরকারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাতের বেলা দেশের এক-তৃতীয়াংশ নকশালদের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তবে সমস্যাটি রাজনৈতিক। যেসব কারণে এসব এলাকার মানুষ অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে, সেসব কারণ দূর করতে না পারলে কেবল অস্ত্র দিয়ে মাওবাদীদের দমন করা যাবে না। অথচ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এটিকে দেখছেন আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা হিসেবে।’ ভারতে ব্যাপক উন্নয়ন হলেও তার সুবিধা গরিষ্ঠসংখ্যক মানুষ পাচ্ছে না। সরকার কৃষির প্রতি নজর না দিয়ে বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে কেবল শিল্পকারখানা গড়ে তুলছে। ফলে কৃষিজমির ওপর আগ্রাসন বাড়ছে। ব্যাংকঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে, খাদ্যের জোগান না দিতে পেরে কৃষক আত্মহত্যা করছেন। এটি সুস্থ অর্থনীতির লক্ষণ নয়।
দিল্লিতে ভারতীয় মার্ক্সবাদী কমিউনিস্ট পার্টি সিপিএমের অফিসটি বেশ সাজানো-গোছানো। কথা হলো সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য নীলোৎপল বসুর সঙ্গে। ইউপিএ সরকার সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বললেন, তারা প্রায় সব ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। দুর্নীতি সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েছে। সিপিএম যখন কংগ্রেসের সঙ্গে ছিল, দুর্নীতি এতটা বাড়তে পারেনি। ইউপিএ সরকারের ওপর থেকে বামদের সমর্থন প্রত্যাহার কি সঠিক হয়েছে? তিনি বললেন, ‘সরকার সবকিছু করছে যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশে। আমরা তো যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশমতো চলতে পারি না।’ রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, তাদের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। অন্তত বামদের স্বার্থেই ইউপিএ সরকারের সঙ্গে থাকা উচিত ছিল। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের পর এখন বামদের অস্তিত্ব রক্ষাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

৩.
আমরা যখন দিল্লিতে, তখনই বাবরি মসজিদ ও রামমন্দির মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায় ঘোষিত হয়। আলতাফ আলম ও আর এম লোথার বেঞ্চ এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায় স্থগিত ঘোষণা করেন। তাঁরা বিস্ময় প্রকাশ করেন, হাইকোর্টের কাছে কোনো পক্ষ ভূমির মালিকানা দাবি না করলেও তাঁরা কী করে তিন পক্ষকে ভাগ করে দিলেন? একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট সেখানে স্থিতাবস্থা রক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন। বিজেপিসহ হিন্দুবাদী দলগুলো রায়কে স্বাগত জানিয়েছে। কংগ্রেস ও সিপিআইএম কোনো মন্তব্য করেনি। হাইকোর্টের রায় রাজনৈতিক হলেও বিবদমান তিন পক্ষই তাতে সন্তুষ্ট ছিল। সুপ্রিম কোর্টের রায় নতুন করে অনিশ্চয়তা ও উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের ভূমি পশ্চিমবঙ্গ বামফ্রন্টকে ডুবিয়েছে। মায়াবতী উত্তর প্রদেশে উন্নয়নের নামে একই কাজ করেছেন। নডায় শিল্পায়নের নামে কয়েকটি গ্রাম অধিগ্রহণ করা হলে কৃষকেরা আন্দোলনে নামেন। তাঁদের দাবি, ভূমির ন্যায্য দাম ও উন্নয়নের হিস্যা দিতে হবে। সেই আন্দোলনে বিরোধী দল অংশ নিলে পুলিশ নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করে। সংঘর্ষে দুই পুলিশ ও একজন কৃষক মারা যান। এর পরদিন রাহুল গান্ধী এক দলীয় কর্মীর মোটরসাইকেলে চড়ে ১৪৪ ধারা ভেঙে ঘটনাস্থলে গিয়ে আন্দোলনরত কৃষকদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন। পরে উত্তর রাজ্য পুলিশ তাঁকে থানায় নিয়ে গিয়ে কয়েক ঘণ্টা আটকে রাখে। রাহুল গান্ধী ক্ষমতাসীন দলের অন্যতম সাধারণ সম্পাদক ও লোকসভার সদস্য।
বাংলাদেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে আগুন জ্বলে যেত। উত্তর প্রদেশ সরকার বরখাস্ত হতো এবং মুখ্যমন্ত্রীকে জেল খাটতে হতো। কংগ্রেস রাহুলের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ করলেও উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতীর বিরুদ্ধে কিছু বলেনি; বরং মায়াবতী কংগ্রেসের এ তৎপরতাকে তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে প্রচার চালাচ্ছেন।
রাহুল গান্ধীর গণমুখী রাজনীতির এটাই একমাত্র উদাহরণ নয়। তিনি গ্রামীণ ব্যাংকের আমন্ত্রণে যখন ঢাকায় এসেছিলেন, তখনো সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে মিশেছেন, তাদের সঙ্গে খেয়েছেন। বনেদি পরিবারের সন্তান রাহুল জনগণের কাতারে চলে এলেও আমাদের দেশে প্রথম প্রজন্মে গ্রাম থেকে ঢাকায় আসা রাজনীতিকেরা সব সময় স্যুটেট-বুটেট থাকতে পছন্দ করেন। একজন সাবেক স্পিকারকে দেখলাম, মে মাসের প্রচণ্ড গরমে বিমানবন্দরে ঠা-ঠা রোদে দলীয় নেত্রীকে বিদায় জানাচ্ছেন থ্রিপিস ও টাই পরে। এটাই হলো ভারত ও বাংলাদেশের রাজনীতিকদের পার্থক্য।

৪.
ভারতের সবচেয়ে বড় ও ঐতিহ্যবাহী দল কংগ্রেস একক কারও নেতৃত্বে পরিচালিত হয় না। সরকার ও দলে আছেন তিন সুপ্রিমো। সরকার চালান ড. মনমোহন সিং। দল ও ইউপিএ জোটের নেতৃত্ব দেন সোনিয়া গান্ধী। কিন্তু ভেতরে ও বাইরের রাজনীতিটা সামাল দেন প্রণব মুখার্জি। দিল্লির দরবারে তিনি ক্রাইসিস ম্যানেজার বা সংকট মোচনকারী হিসেবে পরিচিত। বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র হয়ে এখন তিনি ১২০ কোটি মানুষের দেশটির অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। দিল্লির রাজনৈতিক মহলে তাঁকে বিকল্প প্রধানমন্ত্রী ভাবা হয়। মনমোহন সিং প্রশাসনের বাইরে কিছু দেখেন না। তাঁর আনুগত্য সোনিয়া গান্ধীর প্রতি, যিনি তাঁকে প্রধানমন্ত্রী করেছেন। বাঙালি নেতা জ্যোতি বসু প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি সিপিআইএমের গোঁয়ার্তুমির জন্য। আর প্রণব মুখার্জির ভাগ্যে প্রধানমন্ত্রীর শিকা ছিঁড়ছে না—সম্ভবত দলীয় সভানেত্রীর আস্থার অভাবে।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

Thursday, April 7, 2011

ডব্লিউটিওর বিধানের অপব্যাখ্যা কেন? by আসজাদুল কিবরিয়া

প্রতিবেশী ভারতকে ট্রানজিট বা ট্রানশিপমেন্ট-সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশে বরাবরই স্পর্শকাতর একটি বিষয়। অর্থনৈতিক সুবিধাসহ সার্বিক প্রাপ্তিযোগের বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন ব্যতিরেকে প্রায় সব সময়ই ট্রানজিটকে রাজনৈতিকভাবে দেখা হয়েছে। তার পরও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে ভারত সফর করেন, তখন ট্রানজিটের বিষয়টি নিয়ে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
কিন্তু ট্রানজিট-সুবিধা দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের দিক থেকে যেসব প্রস্তুতি নেওয়ার প্রয়োজন, গত এক বছরেও তার প্রায় কোনোটিই সম্পন্ন করা যায়নি। মন্ত্রীসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের নীতিনির্ধারকেরা শুধু বলেছেন যে ট্রানজিট দিলে কোটি কোটি ডলার আয় হবে। কিসের ভিত্তিতে তাঁরা এসব বলেছেন, তাঁরাই ভালো জানেন। তবে এক বছরেও ট্রানজিট-বিষয়ক নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়নি। মূলত গত বছরের একেবারে শেষভাগে এসে ট্রানজিট নীতিমালা প্রণয়নের সিদ্ধান্ত হয়। ট্যারিফ কমিশনের নেতৃত্বে সে কাজ এখনো চলছে।
এ রকম একটি অবস্থায় এসে ট্রানজিট-কেন্দ্রিক বিতর্ককে আবারও উসকে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা মসিউর রহমান। সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, সম্প্রতি তিনি এক সেমিনারে বলেছেন যে বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে কোনো ট্রানজিট ফি বা মাশুল নেবে না। কেননা, এটি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বিধিবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাঁর ভাষায়: ‘যদি বাংলাদেশ একটি অসভ্য দেশ হতো এবং বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকেরা যদি অসভ্য ও অশিক্ষিত হতো, তাহলে বলত, আমরা ডব্লিউটিও মানি না। তার নীতি মানি না। আমরা এখানে টাকা-পয়সা আদায় করব।’ (সমকাল, ১ এপ্রিল, ২০১১; পৃ.-২)। ত্রিপুরার পালটানায় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য আশুগঞ্জ বন্দর ব্যবহার করে সড়কপথে আখাউড়া হয়ে ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে যাওয়া শুরু করেছে ভারত। এ জন্য কোনো মাশুল বা শুল্ক দিচ্ছে কি না, জানতে চাইলে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বাভাবিকভাবেই তাহলে এখন প্রশ্ন আসে যে ডব্লিউটিওর বিধিবিধানে ট্রানজিট সম্পর্কে কী বলা আছে? জেনারেল এগ্রিমেন্ট অন ট্যারিফস অ্যান্ড ট্রেড (গ্যাট) দলিলের পঞ্চম ধারায় (আর্টিকেল-৫) ‘ট্রানজিটের স্বাধীনতা’ বিষয়টি সম্পর্কে নীতি-বিধান উল্লেখ করা হয়েছে, যা কিনা ডব্লিউটিওর সদস্য সব দেশের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। এই ধারার তৃতীয় অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে এক দেশ অন্য দেশকে ট্রানজিট-সুবিধা দিলে কী কী শুল্ক ও মাশুল আরোপ করতে পারবে ও পারবে না, তার উল্লেখ আছে। এই ধারার সারকথাটি হলো এ রকম: কোনো দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে আরেক দেশ ট্রানজিট-সুবিধা নিয়ে পণ্য পরিবহন করলে এ কাজে অপ্রয়োজনীয়ভাবে কোনো বাধা সৃষ্টি বা বিলম্ব করা যাবে না এবং এই পণ্য আনা-নেওয়ার শুল্ক বা ট্রানজিট শুল্ক বা ট্রানজিট-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মাশুলের আওতামুক্ত থাকবে, তবে পরিবহনসংশ্লিষ্ট মাশুল বা ট্রানজিটের জন্য প্রশাসনিক ব্যয় বা প্রদেয় সেবার জন্য মাশুল ব্যতিক্রম বিবেচিত হবে।
অর্থাৎ তৃতীয় অনুচ্ছেদে এটা স্পষ্ট, যেকোনো শুল্ক আদায় করা যাবে না, কিন্তু ট্রানজিট-সুবিধা প্রদানের বিনিময়ে সেবামাশুল আদায় করা যাবে। আর তা হবে পরিবহনসংশ্লিষ্ট ও প্রশাসনিক ব্যয় নির্বাহকারী।
চতুর্থ অনুচ্ছেদে আরও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে আরোপিত যাবতীয় মাশুল ও নিয়ন্ত্রণ বিদ্যমান যাতায়াত অবস্থা সাপেক্ষে যৌক্তিক হতে হবে। এর মানে হলো, ট্রানজিট-সুবিধা প্রদানকারী দেশ যখন সেবামাশুল আরোপ করবে, তখন তা যেন চড়া বা এমন না হয়, যা কিনা ট্রানজিট-সুবিধা গ্রহণের উদ্দেশ্যকে অর্থাৎ পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় সাশ্রয়কে ব্যাহত করে।
আবার পঞ্চম অনুচ্ছেদে যা বলা হয়েছে তার সারকথা হলো, প্রথম দেশ দ্বিতীয় দেশকে যেভাবে ট্রানজিট-সুবিধা দেবে, সেই সুবিধা সমভাবে তৃতীয় যেকোনো দেশের জন্য প্রযোজ্য হবে। ডব্লিউটিওর পরিভাষায় এটি বৈষম্যহীন (নন-ডিসক্রিমিনিটরি) চর্চা হিসেবে পরিচিত।
সুতরাং গ্যাটের পঞ্চম ধারার তৃতীয় থেকে পঞ্চম অনুচ্ছেদেই এ-সংক্রান্ত সুস্পষ্ট নীতিনির্দেশনা দেওয়া আছে। এর মূল কথা হলো: ট্রানজিট-সুবিধা দিয়ে এটাকে রাজস্ব আয়ের কোনো উৎস বানানো যাবে না। সে কারণেই কোনো ধরনের শুল্কারোপে বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে। তবে ট্রানজিটের জন্য প্রশাসনিক ব্যয় ও প্রয়োজনীয় সেবামাশুল আরোপ ও আদায়ে কোনো আইনগত বাধা নেই। কাজেই যাঁরা বলছেন ভারতকে ট্রানজিট দেওয়ার বিপরীতে সেবামাশুল আদায় করা হলে তা ডব্লিউটিওর বিধি লঙ্ঘন বা অমান্য করা হবে, তাঁরা সঠিক কথা বলছেন না। বরং তাঁরা ডব্লিউটিওর বিধির বা নিয়মের অপব্যাখ্যা করছেন। আর এখানে সভ্য ও শিক্ষিত হওয়ার প্রসঙ্গ টেনে আনা নিতান্তই অযৌক্তিক।
বস্তুত, গত বছরের শেষভাগে এই ট্রানজিট মাশুল নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মসিউর রহমানই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে ভারতীয় নৌযান চলাচলের জন্য কোনো ট্রানজিট শুল্ক বা মাশুল আদায় বন্ধ রাখার জন্য বলেছিলেন। সেই চিঠিতে তিনি বলেছিলেন, যেহেতু ভারতকে বিনা শুল্কে বা বিনা মাশুলে ট্রানজিট দেওয়ার বিষয়টি সরকরের বিবেচনাধীন, সেহেতু এটা স্থগিত রাখতে হবে। তাঁর চিঠির সূত্র ধরেই ভারতীয় হাইকমিশন ট্রানজিট মাশুল না নেওয়ার জন্য দেনদরবার করে। শেষ পর্যন্ত কোনো মাশুল আদায় স্থগিত রাখা হয়। এরপর ট্রানজিট-বিষয়ক একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা তৈরির জন্য ট্যারিফ কমিশনের নেতৃত্বে কাজ শুরু হয়।
তাহলে এখন এ প্রশ্নও উঠতে পারে, ট্রানজিট নীতিমালা চূড়ান্ত করার আগেই উপদেষ্টা কেন ও কিসের ভিত্তিতে এ ঘোষণা দিচ্ছেন যে বাংলাদেশ কোনো ট্রানজিট ফি আদায় করবে না? সরকার কি এটাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে? দেখা যাচ্ছে, ট্রানজিটকে ঘিরে সরকার আবারও এক ধরনের বিভ্রান্তি ও বিতর্ক সৃষ্টি করছে। এভাবে ডামাডোল তুলে মূল বিষয়টিকে দৃষ্টির আড়ালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
বস্তুত, ডব্লিউটিওর নীতি-বিধি অনুসারে বাংলাদেশ একতরফাভাবে ভারতকে ট্রানজিট বা ট্রানশিপমেন্ট-সুবিধা দিতে বাধ্য নয়। বরং বাংলাদেশ ও ভারত উভয়ই উভয়কে তৃতীয় দেশের জন্য ট্রানজিট-সুবিধা দিতে পারে। তা ছাড়া ট্রানজিট, করিডর ও ট্রানশিপমেন্ট নিয়ে ধারণাগত কিছুটা গোলমালও রয়ে গেছে।
উদাহরণসহ সহজ ভাষায় বললে, বাংলাদেশি পণ্যবাহী যান যখন ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে নেপাল বা ভুটানে যায়, তখন তা হলো ভারত কর্তৃক বাংলাদেশকে ট্রানজিট-সুবিধা প্রদান। আর আন্তর্জাতিক ট্রানজিট পরিচালনার জন্য নীতি-বিধি অনুসৃত হয় বার্সেলোনা ট্রানজিট কনভেনশন-১৯২১ ও নিউইয়র্ক ট্রানজিট কনভেনশন-১৯৬৫ মেনে। আবার বাংলাদেশ যখন ভারতীয় পণ্যবাহী যানকে কলকাতা থেকে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে আগরতলায় যাওয়ার সুযোগ দেয়, তখন তা হয় করিডর-সুবিধা। অর্থাৎ এখানে তৃতীয় কোনো দেশের সম্পৃক্ততা নেই। বর্তমানে ভারতকে ট্রানজিট-সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি আসলে এই করিডর-সুবিধা দেওয়া। অন্যদিকে ট্রানশিপমেন্ট হলো এক যান থেকে আরেক যানে পণ্য স্থানান্তর। যেমন: ভারতীয় পণ্যবাহী ট্রাক বাংলাদেশের বেনাপোল স্থলবন্দরে প্রবেশ করে পণ্য খালাস করল। এরপর খালাসকৃত ওই পণ্য আবার আরেকটি বাংলাদেশি ট্রাকে তুলে নিয়ে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্তসংলগ্ন তামাবিল স্থলবন্দরে গিয়ে খালাস করা হলো। সেখান থেকে তা আবার ভারতীয় ট্রাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো। এই তিনটি পদ্ধতির মধ্যে ট্রানশিপমেন্ট তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ বিবেচিত হয়।
আসলে ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে ভারতকে ট্রানজিট বা করিডর-সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অসুবিধা হওয়ার কোনো কথা নয়। তবে তা সুপরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি বিবেচনাপ্রসূত হতে হবে। এ সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে বাংলাদেশের প্রাপ্তিযোগ কতটা হবে, তা সঠিকভাবে প্রাক্কলন করতে হবে। এই প্রাপ্তিযোগ সেবামাশুল থেকে শুরু করে অন্যান্য বিষয়ও হতে পারে। তবে তা ভারতের সঙ্গে দক্ষতার সঙ্গে দরকষাকষির মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে। এটি ভারত-বিরোধিতা বা ভারত-বিদ্বেষের কোনো বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থবহ লাভের বিষয়। আন্তর্জাতিক রীতি-বিধির আলোকেই এই লাভ নিশ্চিত করা যায়, অযাচিত কোনো ছাড় দিয়ে নয়।
আসজাদুল কিবরিয়া: সাংবাদিক ও লেখক।
asjadulk@gmail.com

Tuesday, March 8, 2011

সাম্প্রতিক বিতর্ক ও উত্তরণের উপায় by মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম

জাতীয় সংসদের কাছে বিচার বিভাগের জবাবদিহি সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আলোচিত বিষয়। এটি আলোচনায় আসে যখন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা গত ৩ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত সুপ্রিম কোর্টের একটি পূর্ণাঙ্গ সভায় সংসদের কাছে বিচার বিভাগের জবাবদিহি করার বিপক্ষে মত দেন এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বিচার বিভাগের কোনো কর্মকর্তাকে ডেকে পাঠানোকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের শামিল বলে অভিহিত করেন। এরই ধারাবাহিকতায় প্রধান বিচারপতি গত ১৫ জানুয়ারি বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত একটি বই প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বলেন, সংসদ, বিচার বিভাগ এবং নির্বাহী বিভাগ—কেউ কারও কাছে জবাবদিহি করবে না; জবাবদিহি থাকবে কেবল জনগণের কাছে। জাতীয় সংসদের কাছে জবাবদিহি না করার বিচার বিভাগের এ অবস্থানের সূত্রপাত হয় মূলত আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি কর্তৃক সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারকে (সুপ্রিম কোর্টের প্রতিনিধি হিসেবে) ডেকে পাঠানোকে কেন্দ্র করে।
জবাবদিহি ছাড়া ক্ষমতার প্রয়োগ যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে স্বেচ্ছাচারী করে তুলতে পারে। তাই বিচার বিভাগও জবাবদিহির ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না। এখন দেখা দরকার, এই জবাবদিহি নিশ্চিতকরণে সংসদ সাংবিধানিকভাবে আদৌ কোনো ভূমিকা রাখতে পারে কি না। দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানের ভাষ্য হচ্ছে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে’ [অনুচ্ছেদ ৭(১), বাংলাদেশ সংবিধান]। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হয় জাতীয় সংসদ। সংবিধানের বিধানাবলি সাপেক্ষে প্রজাতন্ত্রের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা এই সংসদের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে এবং এ ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে সংসদ ও সাংসদদেরকে যেকোনো কোর্টের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে [অনুচ্ছেদ ৬৫(১) এবং অনুচ্ছেদ ৭৮(১), বাংলাদেশ সংবিধান]। অন্যদিকে, বিচারকার্য সম্পাদনের ক্ষমতা বিচার বিভাগের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে এবং এ ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিগণ স্বাধীন থাকবেন [অনুচ্ছেদ ৯৫(৪), বাংলাদেশ সংবিধান]। তাঁরা রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত হবেন এবং নিযুক্ত হবার পর সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের প্রক্রিয়া ব্যতিরেকে কোনো বিচারককে স্বীয় পদ থেকে অপসারণ করা যাবে না। অতএব, বিচারকার্য সম্পাদনের ক্ষেত্রে অথবা বিচারক নিয়োগে বা অপসারণে বিচার বিভাগের ওপর সংসদের আপাত সাংবিধানিক কোনো কর্তত্ব নেই। এমনকি, সংসদীয় কমিটি কর্তৃক অনুসন্ধান ও সাক্ষ্য গ্রহণ কেবল সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, বিচার বিভাগের ক্ষেত্রে নয়। এ ক্ষেত্রে সংসদ যা করতে পারে তা হলো, সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণে আইন প্রণয়ন করা। যেমন—সম্প্রতি (২৯ নভেম্বর ২০১০) ভারতের লোকসভায় ‘জুডিশিয়াল স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিবিলিটি বিল, ২০১০’ নামে একটি বিল উত্থাপন করা হয়েছে। বিলে কর্মস্থলে যোগদানের ৩০ দিনের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিসহ অন্য বিচারপতিদের সম্পত্তি ও দায়দেনা (assets and liabilities) সম্পর্কে ঘোষণা করে তা সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রদর্শনের কথা বলা হয়েছে। সাবেক একজন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে ‘ন্যাশনাল জুডিশিয়াল ওভারসাইট কমিটি’ (National Judicial Oversight Committee) এবং কমিটির কাজে সহায়তার জন্য যাচাই-বাছাই (scrutiny) কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। ওভারসাইট কমিটি গুরুতর অসদাচরণে অভিযুক্ত যেকোনো বিচারককে পদ থেকে সরে দাঁড়াতে বলবে। অভিযুক্ত কোনো বিচারক এ নির্দেশনা পালনে ব্যর্থ হলে তাঁকে অপসারণের জন্য সংসদীয় প্রক্রিয়া শুরু করতে কমিটি রাষ্ট্রপতিকে সুপারিশ করবে। বিলে সাধারণ জনগণকেও বিচারকদের অসদাচরণ সম্পর্কে অভিযোগ দায়েরের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের একটি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে পারে।
আদালত অবমাননার বর্তমান আইনটি (The Contempt of Court Act, 1926) অনেকটা নিবর্তনমূলক। এ আইনে আদালতের কার্যক্রম সম্পর্কে মন্তব্য, বিচারকের ব্যক্তিগত আচরণ এবং রায়ের সমালোচনাকে আদালত অবমাননা হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে এবং অভিযুক্তকে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এর ফলে আদালত সম্পর্কে এমনকি যুক্তিসংগত সমালোচনা করা থেকে সবাই বিরত থাকে। একুশ শতকের অবাধ তথ্যপ্রবাহের এ যুগে ১৯২৬ সালের আইনের প্রাসঙ্গিকতা কতটুকু রয়েছে, তা পর্যালোচনা করা দরকার। তাই আইজিএস আদালত অবমাননার একটি নতুন আইন প্রণয়নের সুপারিশ করেছে, যেটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং বিচার বিভাগের সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করবে। নতুন আইনে আদালত অবমাননার একটি বৃহত্তর সংজ্ঞা থাকবে, যাতে করে গণমাধ্যম আদালতের কার্যক্রম সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করার সুযোগ পাবে।
বিচারকদের আচরণবিধি যথাযথভাবে অনুসৃত হয় কি না, তা দেখভাল করার জন্য সুপ্রিম কোর্টে একটি সেল হতে পারে। বর্তমান ব্যবস্থায় কোনো বিচারকের দক্ষতা ও আচরণ সম্পর্কে অভিযোগ জানানোর কোনো সুযোগ নেই। এ শূন্যতা পূরণে আইজিএস সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতির তত্ত্বাবধানে একটি গ্রিভেন্স সেল হতে পারে।
তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্ট তথ্য অধিকার আইনের আওতায় পড়ে। সুপ্রিম কোর্টে এ আইনের বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে কোর্টের আদেশ ও রায়সমূহ সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে নিয়মিত প্রকাশ করতে পারে।
অধস্তন আদালতে বিচারকদের কার্যসম্পাদন মূল্যায়নপদ্ধতির আধুনিকায়ন দরকার। কারণ বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন বা এসিআরের মাধ্যমে অধস্তন আদালতে বিচারকদের কার্যসম্পাদন মূল্যায়নের যে পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে, তা বিচারকদের মধ্যে জবাবদিহির অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশে সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত কমিটি বিচারক নিয়োগের জন্য প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি কমিশন/কলেজিয়ামকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব করতে পারে।
গণতান্ত্রিক সমাজে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব হলো জনগণের সার্বভৌমত্ব। তাই জনগণের প্রয়োজনে আমাদের আইন বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ সংবিধানে অর্পিত দায়িত্ব সততা, নিষ্ঠা, দক্ষতা ও জবাবদিহির সঙ্গে পালন করবে। জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নিতে হবে। যেমন—আইন বিভাগ একটি যুগোপযোগী আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রক্রিয়াকে সুগম করতে পারে।
মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম: গবেষণা সহযোগী/প্রভাষক, ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স স্টাডিজ (আইজিএস), ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।
i.sirajul@yahoo.com

Saturday, February 5, 2011

ভীত ও রক্তাক্ত কায়রোর রাজপথ by রবার্ট ফিস্ক

যেন পাথর পড়ছে আকাশ থেকে। লড়াইটা এত ভয়াবহ, চারপাশে রক্তের গন্ধ পাচ্ছিলাম।
‘প্রেসিডেন্ট’ মোবারকের প্রতিবিপ্লব এবার ঝাঁপিয়ে পড়ল প্রতিপক্ষের ওপর। ঝাঁপিয়ে পড়ল সেই শহরের বুকের ঠিক মাঝখানে, তিনি নাকি যার শাসক। উভয় পক্ষেই হাজার হাজার তরুণ। উভয় পক্ষই ওড়াচ্ছে মিসরের পতাকা। এই সংঘর্ষ ছিল ভয়াবহ, নৃশংস ও সুপরিকল্পিত। মোবারককে ঘৃণা করার চূড়ান্ত ন্যায্যতা এই ঘটনা। এই ঘটনা ওবামা-ক্লিনটন গংদের বিরুদ্ধে ন্যক্কারজনক ভূমিকারও প্রমাণ, তাঁরা আমেরিকা ও ইসরায়েলের বশংবদ শাসককে অস্বীকার করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
তাহরির স্কয়ারে তখন রক্তের ঘ্রাণ। যে নারী ও পুরুষেরা মোবারকের ৩০ বছরের স্বৈরচারীর অবসান চাইছে, ঘুরে দাঁড়িয়েছিল তারাও। পাথর-বৃষ্টির মধ্যে অসীম সাহসে তারাও চালাচ্ছিল পাল্টা লড়াই। পরে এই সাহসই পরিণত হয় ভয়াবহ নিষ্ঠুরতায়। কয়েকজন মোবারকের এক পুলিশকে টেনেহিঁচড়ে চত্বরের মাঝখানে এনে ফেলে পেটাতে থাকে, যতক্ষণ না পুলিশটির মাথা ফেটে রক্তে তাদের পোশাক ভিজে যায়। মিসরের থার্ড আর্মি ১৯৭৩ সালে সুয়েজ খাল পেরোনোর জন্য কিংবদন্তি হয়ে আছে, তারাও পারেনি বা চায়নি আহত ব্যক্তিটিকে সাহায্য করতে।
হাজার মানুষের চিৎকার। রোমান সেনাদের মতো করে দুদল মিসরীয় পরস্পরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। যেন মিসর পা রাখল গৃহযুদ্ধের চৌকাঠে। আক্রমণের মুখে দেওয়া ট্যাংক ও সাঁজোয়া যানের আড়ালে আশ্রয় নেওয়া জনতার ঢলে বিহ্বল হয়ে পড়ে চত্বর পাহারা দেওয়া প্রহরীরাও।
আমার থেকে ২০ ফুট দূরের একটি মার্কিন আব্রামস ট্যাংকের কমান্ডার ঝাঁপিয়ে লুকালেন ট্যাংকটির ভেতর। মোবারকপন্থীরা এবার ট্যাংকটির ওপর উঠে বিক্ষুব্ধ তরুণদের ওপর পাথর বর্ষণ করতে থাকল। হামলা শুরু করে তারাই এবং যুদ্ধে যা হয়, উভয় পক্ষের কিছু আচরণ লড়াইকে আরও তীব্র করে। দিনশেষে তিনজনের মৃত্যুর খবর আসে। খবর পাই মোবারকপন্থীরা এবার বিদেশি সাংবাদিকদের ওপরও হামলা করতে শুরু করেছে।
এতক্ষণে আমি দুই দলের মাঝখানে গিয়ে পৌঁছালাম। উভয় পক্ষ চিৎকার করছে, ঘৃণা মেশানো হাসিতে উপহাস করছে পরস্পরকে। তাদের মুখ ভেসে যাচ্ছে রক্তে। একসময় জনতা মোবারকপন্থীদের হামলা সামলে ওঠে, তাদের তাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়।
এই লড়াই মিসরীয়দের বিরুদ্ধে মিসরীয়দের। কিন্তু এই হামলাকারীদের আমরা কী নাম দেব? মোবারকপন্থী? ‘প্রতিবাদকারী’ অথবা ‘প্রতিরোধকারী’? মোবারককে যারা গদিছাড়া করতে চায়, তারাও তো নিজেদের বলছে প্রতিরোধকারী?
এ রকম এক প্রতিরোধকারী আমাকে বলল, ‘এটা মোবারকের কাজ, এরা মোবারকের ভাড়াটে লোক। মাত্র আরও নয় মাস ক্ষমতায় থাকার জন্য সে মিসরীয়দের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিচ্ছে মিসরীয়দের! সে পাগল হয়ে গেছে। আর তোমরা যারা পাশ্চাত্য থেকে এসেছ, তোমরাও কি পাগল?’ মনে নেই, কী উত্তর তাকে দিয়েছিলাম। কিন্তু কীভাবে ভুলি, কিছুক্ষণ আগেই তথাকথিত মধ্যপ্রাচ্য ‘বিশেষজ্ঞ’, যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের গভর্নর মিট রমনে বলেছেন, ‘মোবারক স্বৈরশাসক নন, রাজকীয় ধরনের শাসক।’ মোবারক কেমন লোক, তার উত্তরে টেলিভিশনে তিনি এই কথা বলেন।
এই রাজার বিরাট বিরাট ছবি বিতরণ করছে মোবারকের দল ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এনডিপি) কর্মকর্তারা। ব্যারিকেডগুলোর জন্য এটা নিঃসন্দেহে উসকানি। অথচ গত শুক্রবারই জনতা এই দলের সদর দপ্তর গুঁড়িয়ে দিয়েছে। মাইকে তারা বাজাচ্ছে ‘অমর’ মোবারকের গান। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি তো অমরই হতে চান। তাঁর ভাড়াটে গুন্ডারা টহল দিচ্ছে নতুন কেনা মোটরসাইকেলে।
বেতার ভবন পার হওয়ার সময় দেখলাম, শহরতলি থেকে কয়েক হাজার তরুণ আসছে। ছিল মেয়েরাও, বেশির ভাগই সনাতন কালো পোশাকের ওপর সাদা ওড়না পরা, তাদের সঙ্গে রয়েছে কিছু শিশুও। তারা বলছিল, তাদেরও অধিকার রয়েছে তাহরির স্কয়ারের ওপর। ঠিকই, প্রিয় প্রেসিডেন্ট যেখানে সবচেয়ে অপমানিত হয়েছেন, সেখানে গিয়েই তাঁকে ভালোবাসা জানানোর অধিকার তো তাদের রয়েছে।
এনডিপি বিভিন্ন জায়গায় তাদের দলের ক্যাডারদের জড়ো করেছে, যারা নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ করে এবং রাজপথে যারা বিক্ষোভকারীদের হামলা করে। এমনকি উটের পিঠে চড়া তাদেরই একজন চিৎকার করে বলছে, ‘যে মোবারককে চেনে না, সে আল্লাহকেও চেনে না।’
এরাই গিয়ে আবার হামলা চালায় তাহরির স্কয়ারে। আবারও আকাশ ঢেকে যায় ছুড়ে দেওয়া পাথরে। ছয় ইঞ্চি ব্যাসের এক একটি পাথর যেন মর্টার শেলের মতো। মোবারকবিরোধীরাও সেটাই ছুড়ছে। জনতার ধাওয়া খেয়ে তারা আবারও পালাল। ঝাঁকে ঝাঁকে পাথর আসছে। একেকবারে শত শত। কিছু পরই আমার পাশে দেখলাম শত শত মোবারকবিরোধীকে। কিন্তু এখন তাদের স্লোগান বদলে গেছে। আর তারা ‘মোবারক নিপাত যাও’ বলছে না। বলছে, ‘আল্লাহ আকবর’। দিনমান বারবারই আমি এটা শুনলাম। একদলের ধ্বনি ‘মোবারক’, অন্য দলের ধ্বনি ‘আল্লাহ’। ২৪ ঘণ্টা আগেও পরিস্থিতি এমন ছিল না।
নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে ছুটতে গিয়ে একেবারে মোবারকপন্থীদের মাঝখানে পড়ে গেলাম। সত্য যে, আকাশ কালো করে পাথর পড়ছে বললে বেশি বলা হয়। কিন্তু একসঙ্গে শত শত পাথর এসে একটা ট্রাককে দুমড়ে দিল। মানুষগুলো ঘামছে, তাদের মাথায় লাল পট্টি, গলায় ঘৃণার গর্জন। অনেকেরই ক্ষতস্থানে সাদা কাপড় বাঁধা। অনেকেই রক্ত ঝরাতে ঝরাতে সরকারি দালালদের ধাওয়া করতে করতে আমাকে পেরিয়ে গেল।
ক্রমশই ইসলামপন্থীদের সংখ্যা বাড়তে দেখছি। তারা সমস্ত শক্তি দিয়ে নিচ্ছে আল্লাহর নাম। এ রকমটা হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু মোবারকই এই পরিস্থিতি তৈরি করেছেন। রাজনৈতিক শত্রুদের মাঠে নামানোর পাশাপাশি এদেরও টেনে এনেছেন তিনি। সুযোগ করে দিয়েছেন। বারবার এমন কিছু তরুণ জনতার হাতে ধরা পড়েছে, যাদের পোশাকের চিহ্ন থেকে বোঝা যায়, তারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের লোক। সেক্যুলার প্রতিরোধকর্মীরা এসব বন্দীকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু ইসলামপন্থীরা তাদের সব ক্রোধ ঢেলে দিচ্ছে দালালদের ওপর। এরই মধ্যে দুজন দশাসই মানুষ এসে এ রকম এক হতভাগাকে কাঁধে করে নিয়ে চলে গেল। এভাবেই বেঁচে গেছে মোহাম্মদ আবদুল আজিব মাবুরুক। পুলিশ সদস্য নম্বর-২১০২০৭৪।
এ সবকিছুর মধ্যে পরিহাসও ছিল। মধ্যদুপুরে মোবারকপন্থীরা তাহরির স্কয়ারের ভিড়ের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল চার অশ্বারোহীসহ এক উট-আরোহীকে। জনতা তাদের টেনেহিঁচড়ে নামায়। তিন ঘণ্টা পরে ঘোড়াগুলোকে একটি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। অন্যদিকে দেখি দুটো বালক-বালিকা। তাদের দুজনের হাতে দুটি দস্তরখান। মেয়েটির দস্তরখানে সিগারেট আর ছেলেটির দস্তরখান পাথর।
এবং এই ঘৃণা আর রক্তপাতের নাটকে কি ছিল পাশ্চাত্যের ভূমিকা? প্রতিদিন এই লজ্জার বিবরণ পাঠাতে পাঠাতে আমার আর তা পড়তে পড়তে আপনাদের হয়তো অনিদ্রায় পেয়ে বসে। গত বুধবার বেলা তিনটার দিকে, দেখলাম ব্রিটেনের লর্ড ব্লেয়ার সাহেব সিএনএন টেলিভিশনে খুব পেরেশানি নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ‘পরিবর্তন-প্রক্রিয়ায় পাশ্চাত্যের অংশীদারির’ কথা বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। বলছেন, কেন আমাদের সবচেয়ে চরমপন্থীদের তৈরি ‘নৈরাজ্য’ পরিহার করা দরকার। এবং বললেন, ‘যে সরকার আমাদের সমর্থিত গণতান্ত্রিকব্যবস্থার মাধ্যমে নির্বাচিত নয়’ তার কথা। এটাই তাঁর মুখ থেকে শোনা সেরা কথা। বেশ, আমরা জানি, কোন ধরনের ‘গণতন্ত্রের’ কথা তিনি বলছেন এবং সেই গণতন্ত্র কেমন শাসক উপহার দেয়। হোসনি মোবারক ৩০ বছর ধরে তেমন গণতন্ত্র চালাচ্ছেন মিসরে।
রাস্তায় গুজব রয়েছে যে মোবারক—মিট রমনের বলা ‘রাজা প্রকৃতির শাসক’—শুক্রবারে মিসর ছেড়ে পালাতে পারেন। আমি নিশ্চিত নই; যেমন নিশ্চিত নই আসলে বুধবারে তাহরির স্কয়ারে আসলে কে জিতেছে। তাহলেও বেশি দিন এ রকম অচলাবস্থা চলবে না, বিজয়ীর চেহারা ঠিকই দেখা যাবে শিগগিরই। সন্ধ্যাবেলায়ও রাস্তায় পাথর গড়াগড়ি করছিল, পড়ছিল মানুষের ওপর। কিছু পরই এক ঝাঁক পাখি উড়ে যেতে দেখে আমি ভয়ে মাথা লুকালাম।
আরও কিছু ঘটনা
বুধবারের সংঘর্ষে কায়রোতে তিনজন নিহত এবং আহত এক হাজার ৫০০ জন, বিদেশি সাংবাদিকেরাও আক্রমণের শিকার।
মোহাম্মদ এলবারাদি সংঘাতকে দোষারোপ করেছেন ‘অপরাধীদের শাসনের অপরাধমূলক কাজ’ বলে।
জাতিসংঘের মহাসচিব বলেছেন, সরকারি তরফের সহিংসতা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।
মুসলিম ব্রাদারহুড জনগণকে ‘পরিবর্তনের জন্য চাপ প্রয়োগ করে যাওয়ার’ আহ্বান জানিয়েছে।
লন্ডনের দি ইনডিপেন্ডেন্ট থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ: ফারুক ওয়াসিফ
রবার্ট ফিস্ক: দি ইনডিপেন্ডেন্টের মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি এবং আরব বিশেষজ্ঞ।

Saturday, December 11, 2010

মুজিবকে নিয়ে সিরাজের একমাত্র লেখা by সেলিম রেজা নূর

আমি নিউইয়র্কে থাকি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন আর্কাইভস ঘেঁটে সিরাজুদ্দীন হোসেনের অনেক লেখা সংগ্রহ করেছি। সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর, কাশ্মীর সমস্যা, পশ্চিমবঙ্গের বাংলা বইবিষয়ক সমস্যা, ভাষা আন্দোলন, পাট সমস্যা ইত্যাদি নিয়ে তাঁর স্বনামে প্রকাশিত লেখাগুলো আগ্রহোদ্দীপক। ‘অনামী’ ছদ্মনামে সিরাজুদ্দীন হোসেনের ‘মঞ্চে-নেপথ্যে’ কলামগুলোও সংগ্রহ করতে পেরেছি। অপেক্ষা করছি, একদিন সিরাজুদ্দীন হোসেনের সত্যিকার অবদান সম্পর্কে গবেষণা হবে এবং তিনি পাবেন তাঁর যোগ্য আসন। ইসলামিয়া কলেজে পড়ার সময় সিরাজুদ্দীন হোসেন থাকতেন বেকার হোস্টেলে। তাঁর সহপাঠীদের মধ্যে ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান, খন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস, কাজী গোলাম মাহবুব, আসফউদ্দৌলা রেজা, শামসুদ্দীন মোল্লা প্রমুখ। শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তখন থেকেই সখ্য ছিল সিরাজের। বন্ধু শেখ মুজিবকে ইত্তেফাক-এর মাধ্যমে জনগণের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার রূপকারদের মধ্যে সিরাজ ছিলেন অন্যতম। শুধু একাত্তরের মার্চ মাসে প্রকাশিত ইত্তেফাক-এর শিরোনামগুলোর দিকে নজর দিলেই আমরা তার প্রমাণ পাব। এই ফিচারে আমরা সিরাজুদ্দীন হোসেনের লেখা একটি অবতরণিকা নিয়ে আসব। ১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধু আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্ত হওয়ার পর যে ভাষণগুলো দিয়েছিলেন, তারই একটি সংকলন করেছিলেন আমিনুল হক বাদশা। এটি প্রকাশিত হয়েছিল কুষ্টিয়া ছাত্রলীগের সম্মেলন উপলক্ষে। বাদশার অনুরোধে বন্ধু মুজিবকে নিয়ে অবতরণিকাটি লিখে দিয়েছিলেন সিরাজুদ্দীন হোসেন। সরাসরি শেখ মুজিবকে নিয়ে এটাই তাঁর একমাত্র লেখা। লেখাটি তিনি লিখেছিলেন ১৯৬৯ সালের ২৩ জুন। শেখ মুজিবের মধ্যে একজন সত্যিকার নেতার দেখা পেয়েছিলেন তিনি। লেখাটা এ রকম:
‘বাংলার মানস-সন্তান। অগ্নিপুরুষ শেখ মুজিবুর রহমান। দেশ ও জাতির জন্য সংগ্রামী পথে পা বাড়িয়ে জীবনে বহু নিগ্রহ তিনি ভোগ করেছেন, কিন্তু দেশ ও জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা তিনি করেননি কখনো। অত্যাচারী, অবিবেকী আইয়ুব-মোনেম সরকার দেশের বুকে কবরের শান্তি কায়েম করে যখন স্বস্তিতে রাজত্ব করতে চেয়েছিলেন, দেশ ও জাতির দুর্দিনের কথা চিন্তা করে এই একটি কণ্ঠ সেদিন ভীম গর্জনে গর্জে উঠেছিল। ভয়-ভীতির জড়তা কাটিয়ে সারা বাংলার মানুষ সেদিন জেগে উঠেছিল, কাতার বেঁধেছিল এই অকুতোভয় মধ্যবয়সী নেতার পেছনে। পদ্মা, মেঘনা, যমুনার উত্তাল তরঙ্গে যখন মোনেমশাহির তখতে তাউস সয়লাব হতে চলেছে, ঠিক তখনই তাঁকে দেশরক্ষা আইনে আটক করা হলো কারাগারে। কিন্তু সে আইনও যখন তাঁকে আটকে রাখার পক্ষে অপর্যাপ্ত বিবেচিত হলো, তখনই বিশেষ আইন প্রণয়ন করে তাঁকে প্রধান আসামি করা হলো তথাকথিত এক ষড়যন্ত্র মামলার। একপর্যায়ে দেশব্যাপী প্রচণ্ড গণবিস্ফোরণের মুখে ষড়যন্ত্র মামলার ভিত ধসে পড়ল। শেখ মুজিব বেরিয়ে এলেন, সারা দেশ তাঁকে লুফে নিল বিজয়ী বীরের বেশে। সত্য বলতে কি, শিশু কচি-কাঁচাদের মুখেও ধ্বনিত হলো, “জেলের তালা ভেঙ্গেছি, শেখ মুজিবকে এনেছি”।
শেখ মুজিবের নেতৃত্বের মাহাত্ম্য এখানেই। বাংলার ঘরে ঘরে শিশু, কিশোর, আবালবৃদ্ধবনিতার আজ সে নয়নমণি। দীর্ঘ কারানিগ্রহ ভোগের পর মুক্ত বিহঙ্গের মতো যখন তিনি এ দেশের লাখো কোটি মানুষের মাঝে এসে দাঁড়ালেন, তারই প্রথম কটি দিনে জাতির উদ্দেশে তিনি যা কিছু বলেছেন, ‘পাঠচক্রে’র পক্ষ থেকে তার এই সংকলন বের করায় গ্রন্থকারকে আমার অভিনন্দন। কেননা, দেশজোড়া যে সমস্যা, তার সমাধানের জন্য আজ নেতৃত্বের এ শূন্যতার রাজ্যে নির্ভীক, গতিশীল, প্রাণধর্মী যে গণমুখী নেতৃত্বের প্রয়োজন, তা কেবল শেখ মুজিবেরই সম্ভব। তাই তাঁর যা বক্তব্য, জাতির তা মূল্যবান সম্পদ।
শেখ মুজিবকে আমি চিনি। কলেজ জীবনে পাকিস্তান আন্দোলনেও আমি তাঁকে দেখেছি। নিজেদের আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার প্রাক্কালে প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ময়দানে তিনি ছিলেন মরহুম হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সর্বাপেক্ষা বিশ্বস্ত ও প্রিয় সৈনিক। সংগ্রামী পুরুষ শহীদ সাহেবের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বলতে ছিলেন দুজন—ইত্তেফাক সম্পাদক জনাব তফাজ্জল হোসেন ও শেখ মুজিব। শহীদের চরিত্রের একটা অপূর্ব প্রতিচ্ছায়া দেখেছি তাঁদের দুজনের মধ্যে। শহীদ সাহেব ও জনাব তফাজ্জল হোসেন আজ আর আমাদের মাঝে নেই। তবে তাঁদের চারিত্রিক দৃঢ়তায় এ দেশের ১২ কোটি মানুষের কল্যাণব্রতে দীক্ষা নিয়ে আজও খাড়া গর্দানে আমাদের মধ্যে বিরাজ করছেন মুক্তির বরপুত্র শেখ মুজিব। নিজেদের প্রয়োজনে দেশের বৃহত্তর স্বার্থের টুঁটি টিপে হত্যার জন্য তাঁর নেতৃত্বের যিনি যত অপব্যাখ্যাই করুন না কেন, পাকিস্তানের ১২ কোটি মানুষের মুক্তির প্রকৃত দিশারি যে তিনি, আমার মনে সে সম্পর্কে কোনো সন্দেহ নেই। আমার দেশের তরুণ সংগ্রামী ছাত্র-জনতার জন্য শেখ মুজিবের নেতৃত্ব আদর্শ হোক, তাঁদের যাত্রাপথ কুসুমাস্তীর্ণ হোক, দেশবাসীর মুখে হাসি ফুটুক—এই আমার অন্তরের কামনা।’
বঙ্গবন্ধুর এককালীন প্রেস সচিব আমিনুল হক বাদশার কাছ থেকে লেখাটি সম্প্রতি সংগ্রহ করা হয়েছে। ক্ষুদ্র এ লেখাটিতে সিরাজ উঠিয়ে এনেছেন শেখ মুজিবের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। সিরাজুদ্দীন হোসেনকে পাকিস্তানি বাহিনী ও আলবদররা হত্যা করল ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর। ৮ জানুয়ারি, ১৯৭২ লন্ডন থেকে ঢাকার বঙ্গভবনে টেলিফোন আলাপ-আলোচনার একপর্যায়ে বঙ্গবন্ধু অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির গণসংযোগ কর্মকর্তা সৈয়দ শাহজাহানকে জিজ্ঞেস করেন, ‘সিরাজকে কি সত্যিই ওরা মেরে ফেলেছে?’
উত্তরে বলা হয়, হ্যাঁ।
বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আহা!’