Saturday, January 18, 2014

ছয় স্থানে শিশু বৃদ্ধসহ ১০ জনের মৃত্যু

(ফরিদপুর :কয়েকদিনের শৈত্যপ্রবাহে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত শিশুদের ভিড় বাড়ছে হাসপাতালে) কয়েক দিনের তীব্র শীত ও ঘন কুয়াশায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ঘন কুয়াশার কারণে সড়ক ও নৌপথে যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বোরো ও মৌসুমি সবজির ক্ষেত। এদিকে হাসপাতালগুলোতে শীতজনিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। গত দু'দিনে শিশু, বৃদ্ধসহ মারা গেছেন ১০ জন। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
কুড়িগ্রাম : জেলায় শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালগুলোতে ভর্তি শিশুর সংখ্যা বেড়েছে। সদর হাসপাতালে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নাগেশ্বরী উপজেলার মাছুরখামার এলাকার আবদুল হাইয়ের ৪ মাস বয়সী শিশুকন্যা হাবিবা মারা গেছে।
ফরিদপুর : এক সপ্তাহ ধরে জেলার ওপর দিয়ে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। শীতজনিত রোগে শিশুমৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। বৃহস্পতিবার ফরিদপুরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১০ দশমিক ছয় ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ তাপমাত্রা আগামী কয়েকদিনে আরও হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানান আবহাওয়া কর্মকর্তা সুরজুল আমিন। এদিকে তীব্র শীতে ফরিদপুরে ঠাণ্ডাজনিত বিভিন্ন রোগে শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এক সপ্তাহে ফরিদপুরের দুটি হাসপাতালে মারা গেছে ১১ শিশু।
দামুড়হুদা (চুয়াডাঙ্গা) : দামুড়হুদায় শীতের তীব্রতায় মলি্লক শাহ নামের এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে কোল্ড স্ট্রোকে তিনি মারা করেন। সাঘাটা (গাইবান্ধা) : তিন দিন ধরে সকালে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মতো কুয়াশা পড়ার সঙ্গে কনকনে শীতে উপজেলার মানুষের জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। বিকেল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শীতের তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বৃদ্ধ ও শিশুরা কোল্ড ডায়রিয়া, নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
জিয়ানগর (পিরোজপুর) :তীব্র শীতে বৃহস্পতিবার উপজেলার হোগলাবুনিয়া এলাকায় শীতে আক্রান্ত হয়ে ঠাণ্ডাজনিত কারণে ইছাহাক আলী হাওলাদার ও সেউতিবাড়িয়ার আলী আকবর মলি্লক মারা গেছেন। অন্যদিকে শৈত্যপ্রবাহের কারণে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বৃদ্ধ ও শিশুরা ঠাণ্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিতে ভিড় জমিয়েছে।
বাউফল (পটুয়াখালী) :বাউফলের পল্লীতে বৃহস্পতিবার রাতে আজিমুন নেছা নামের এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। তিনি একই গ্রামের মৃত সৈয়দ আলী বেপারীর স্ত্রী। কোল্ড স্ট্রোকে তার মৃত্যু হয়েছে।
উলিপুর (কুড়িগ্রাম) :উপজেলার বেগমগঞ্জ ইসলামপুর গ্রামের আজিজ মোল্লার শিশুপুত্র রিয়াজ রহমান এবং তিস্তা নদীর তীরবর্তী বজরা কাশিমবাজার গ্রামের আরজ আলীর শিশুপুত্র আলমাস মিয়া শীতজনিত রোগে মারা গেছে।
কেশবপুর (যশোর) :বৃহস্পতিবার রাতে কোল্ড স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে উপজেলার সাগরদাঁড়ী ইউনিয়নের ঝিকরা গ্রামের হোসেন আলী মোড়ল ও শীতজনিত রোগে হিজলতলা গ্রামের জেহের আলী মোড়ল এবং ধর্মপুর গ্রামের অমলা দাসী মারা গেছেন।

এ ক্ষেত্রেও তদন্তে ব্যর্থতা!

(পুলিশের বিরুদ্ধে সহিংসতা) শুক্রবার সমকালের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের শিরোনাম ছিল : 'পুলিশ হত্যার তদন্তে পুলিশই ব্যর্থ, একটি মামলারও চার্জশিট হয়নি'। পুলিশের আইজি যদিও বলেছেন, 'যারা পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা করেছে, তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে। তদন্ত কাজ চলছে। তদন্ত শেষ হলে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।' তার এ আশাবাদ পুলিশ বাহিনীর হাজার হাজার সদস্য এবং দুর্ভাগ্যের শিকার পরিবারগুলোকে কি সন্তুষ্ট করতে পারবে? সমকালের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১১ মাসে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন থানায় দায়ের করা পুলিশ হত্যা মামলার একটিও অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়নি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মামলার আসামিকেও গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। আবার যাদের গ্রেফতার দেখানো হয়েছে, তাদের সবাই প্রকৃত অপরাধী কি-না সেটা নিয়ে কিন্তু সংশয় থেকেই যায়। এ সময়ে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপি জোটের সহিংসতায় মৃত্যু হয়েছে ১৫ জন পুলিশ সদস্যের। বিজিবির দু'জন সদস্যও এ ধরনের হামলায় নিহত হয়েছেন। রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে অতিমাত্রায় ব্যস্ততার কারণে মামলার তদন্ত কাজ বিঘি্নত হচ্ছে, পুলিশের এ ব্যাখ্যা একেবারে অমূলক বলা যাবে না। কিন্তু বিষয়টিকে অন্যভাবেও দেখা যেতে পারে_ যদি দ্রুত তদন্ত কাজ সম্পন্ন করে প্রকৃত দোষীদের কঠোর দণ্ড প্রদান করা যেত, তাহলে হয়তো আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হতো। একইভাবে আমরা দেখি, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর ও অন্যান্য সম্পত্তি এবং তাদের মন্দিরগুলোয় দেশের নানা স্থানে হামলার অনেক ঘটনা ঘটলেও একটি ক্ষেত্রেও এখন পর্যন্ত দায়ী কাউকে শাস্তি প্রদান করা হয়নি। সর্বত্র এ ধরনের ঘটনার নিন্দা ও ধিক্কার জানানো হচ্ছে। পুলিশ ও অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি সহিংসতাও কোনোভাবেই কেউ মেনে নিতে পারছে না। কিন্তু তারপরও কেন এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি লালিত হচ্ছে? অনেক ঘটনা ঘটেছে প্রকাশ্যে। টেলিভিশন ক্যামেরায় ধরা আছে ভিডিওচিত্র। তারপরও প্রকৃত অপরাধীরা কেন ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যেতে পারছে? নিরপরাধ কেউ গ্রেফতার এবং বিচারে শাস্তি হোক, এটা কাম্য নয়। কিন্তু এতগুলো ঘটনার দায়ে প্রায় এক বছরের মধ্যে কাউকে কাঠগড়ায় তুলতে পুলিশের ব্যর্থতা কীভাবে মেনে নেব?

এ ক্ষেত্রেও তদন্তে ব্যর্থতা!

(পুলিশের বিরুদ্ধে সহিংসতা) শুক্রবার সমকালের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের শিরোনাম ছিল : 'পুলিশ হত্যার তদন্তে পুলিশই ব্যর্থ, একটি মামলারও চার্জশিট হয়নি'। পুলিশের আইজি যদিও বলেছেন, 'যারা পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা করেছে, তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে। তদন্ত কাজ চলছে। তদন্ত শেষ হলে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।' তার এ আশাবাদ পুলিশ বাহিনীর হাজার হাজার সদস্য এবং দুর্ভাগ্যের শিকার পরিবারগুলোকে কি সন্তুষ্ট করতে পারবে? সমকালের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১১ মাসে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন থানায় দায়ের করা পুলিশ হত্যা মামলার একটিও অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়নি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মামলার আসামিকেও গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। আবার যাদের গ্রেফতার দেখানো হয়েছে, তাদের সবাই প্রকৃত অপরাধী কি-না সেটা নিয়ে কিন্তু সংশয় থেকেই যায়। এ সময়ে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপি জোটের সহিংসতায় মৃত্যু হয়েছে ১৫ জন পুলিশ সদস্যের। বিজিবির দু'জন সদস্যও এ ধরনের হামলায় নিহত হয়েছেন। রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে অতিমাত্রায় ব্যস্ততার কারণে মামলার তদন্ত কাজ বিঘি্নত হচ্ছে, পুলিশের এ ব্যাখ্যা একেবারে অমূলক বলা যাবে না। কিন্তু বিষয়টিকে অন্যভাবেও দেখা যেতে পারে_ যদি দ্রুত তদন্ত কাজ সম্পন্ন করে প্রকৃত দোষীদের কঠোর দণ্ড প্রদান করা যেত, তাহলে হয়তো আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হতো। একইভাবে আমরা দেখি, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর ও অন্যান্য সম্পত্তি এবং তাদের মন্দিরগুলোয় দেশের নানা স্থানে হামলার অনেক ঘটনা ঘটলেও একটি ক্ষেত্রেও এখন পর্যন্ত দায়ী কাউকে শাস্তি প্রদান করা হয়নি। সর্বত্র এ ধরনের ঘটনার নিন্দা ও ধিক্কার জানানো হচ্ছে। পুলিশ ও অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি সহিংসতাও কোনোভাবেই কেউ মেনে নিতে পারছে না। কিন্তু তারপরও কেন এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি লালিত হচ্ছে? অনেক ঘটনা ঘটেছে প্রকাশ্যে। টেলিভিশন ক্যামেরায় ধরা আছে ভিডিওচিত্র। তারপরও প্রকৃত অপরাধীরা কেন ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যেতে পারছে? নিরপরাধ কেউ গ্রেফতার এবং বিচারে শাস্তি হোক, এটা কাম্য নয়। কিন্তু এতগুলো ঘটনার দায়ে প্রায় এক বছরের মধ্যে কাউকে কাঠগড়ায় তুলতে পুলিশের ব্যর্থতা কীভাবে মেনে নেব?

মহানায়িকার বিদায়

ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী সুচিত্রা সেনের মৃত্যুতে আমরা গভীর শোকাহত। তার মৃত্যুতে বাংলা তথা ভারতীয় উপমহাদেশের অভিনয়ের ইতিহাসে এক সোনালি অধ্যায়ের অবসান হলো। আরেক অভিনয় কিংবদন্তি অমিতাভ বচ্চন যথার্থই বলেছেন যে, 'আরও এক ইন্দ্রপতন।' আমরা জানি, তার শূন্যস্থান সহসা পূরণ হওয়ার নয়। তবে তার অভিনয়প্রতিভা, সহজিয়া সৌন্দর্য, সুবিস্তৃত সাফল্য নতুন প্রজন্মের অভিনেত্রী এমনকি অভিনেতাদেরও ভাবীকালে অনুপ্রাণিত করে যাবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। নিজের সময়ে পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্র শিল্পে তার একচ্ছত্র আধিপত্যের কথা আলাদা করে বলতে হবে। রূপালি পর্দায় শ্রেষ্ঠ জুটি হিসেবে উত্তম-সুচিত্রা যদিও একসঙ্গে উচ্চারিত হয়; যদিও 'মহানায়ক' উত্তমের সূত্রেই তাকে 'মহানায়িকা' আখ্যা দেওয়া হয়; এ তথ্যও আমাদের জানা যে সে সময়ে তিনি উত্তমের তুলনায় দ্বিগুণ পারিশ্রমিক পেয়েছেন। সুচিত্রা যদিও মূলত টালিউডে নির্মিত বাংলা ছায়াছবিতে এবং কর্মজীবনের শেষ দিকে ঢালিউডের কয়েকটি হিন্দি সিনেমায় অভিনয় করেছেন, তার জনপ্রিয়তা কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সীমানায় আটকে থাকেনি। এপার বাংলা ওপার বাংলাসহ গোটা বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর কাছে তিনি ছিলেন স্বপ্নের রাজকুমারী। চলচ্চিত্রের বাইরে বৃহত্তর বাঙালি নারীর সাংস্কৃতিক রুচি নির্মাণেও তার রয়েছে অসামান্য অবদান। রবীন্দ্রনাথের বুদ্ধিবৃত্তিক কর্ম এবং ঠাকুর পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে বাঙালি নারীর আলঙ্কারিক অবয়ব সম্পর্কে যে ধারণা প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল, সুচিত্রার চলচ্চিত্রে তা মূর্ত হয়ে উঠেছে। ষাট ও সত্তরের দশকের আধুনিক বাঙালি তরুণীর পোশাক-পরিচ্ছদ ও সাজসজ্জা সুচিত্রার প্রভাবে মগ্ন থেকেছে। বাংলাদেশের সঙ্গে তার সম্পর্ক আরও নিবিড়। দেশ বিভাগের পর পারিবারিকসূত্রে পশ্চিমবঙ্গে স্থায়ী হলেও সুচিত্রা তথা রমা দাশগুপ্তের জন্ম পাবনায়। গঙ্গাতীরের নগরীতে পেশাগত প্রতিষ্ঠা পেলেও তার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে, শিক্ষাজীবনের প্রাথমিক ভিত্তি রচিত হয়েছে যমুনা তীরের শহরটিতেই। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, তিনি ঢালিউড চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সময় ও সুযোগ পাননি। এর একটি কারণ হতে পারে দেশ বিভাগের পর পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীর দুই বাংলার সাংস্কৃতিক অভিন্নতা বিরোধী অবস্থান। এমনকি রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ করার মতো অবিমৃষ্যকারিতাও তখন আমরা দেখেছি। পরে যখন পাকিস্তানের নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছে, ততদিনে সুচিত্রা সেন নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করেছেন। তাতে করে অবশ্য আমাদের সুচিত্রা-মগ্নতায় বিঘ্ন ঘটেনি। তিনি অভিনয় থেকে অবসর নিলেও তার অভিনীত চলচ্চিত্র বাংলাদেশের ঘরে ঘরে আলো ছড়িয়েছে। যে কারণে তার অবসর-পরবর্তী প্রজন্মের কাছেও তিনি মুগ্ধতার নামান্তর হয়ে থেকেছেন। সীমান্তের ওপারে থেকেও তিনি ছিলেন এ দেশের আপামর জনসাধারণের কাছের মানুষ। বস্তুত সুচিত্রার মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের শোকবার্তার মধ্য দিয়ে গোটা জাতির বেদনা ও ঘনিষ্ঠতাই প্রতিফলিত হয়েছে। একই সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটিও আমরা প্রসঙ্গ করতে চাই। পাবনায় সুচিত্রা সেনের পৈতৃক বাড়ি সাম্প্রদায়িক শক্তির বেদখলে রয়েছে। আমরা চাইব, পাবনায় বেদখলে থাকা সুচিত্রা সেনের পৈতৃক বাড়িটি দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হোক। সেখানে জনসম্পৃক্ত ও কল্যাণমূলক উদ্যোগ গড়ে তোলা গেলে তার স্মৃতি ও কর্মের প্রতি যথার্থ সম্মান দেখানো হবে। এই মহীয়সী নারীর জীবন ও কর্মের প্রতি আমরা গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন এবং তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি।

অপেক্ষায় বাংলাদেশ

(মঙ্গলে যাওয়ার মার্স ওয়ান মিশনে ৪০ জনের একজন হওয়ার সম্ভাবনার দ্বারে দাঁড়িয়ে আছেন বাংলাদেশের দু'জন নারী। এভাবেই তারা মঙ্গলে নামবেন। ঊষরভূমিতে গড়ে তুলবেন দ্বিতীয় পৃথিবী) ২০২৩ সালে মহাকাশে উপনিবেশ স্থাপনের ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য নেদারল্যান্ডসভিত্তিক বেসরকারি মহাকাশ প্রতিষ্ঠান মার্স ওয়ান ঘোষণা দেয় গত বছর। ঘোষণার পাঁচ মাসের মধ্যেই মার্স ওয়ান মিশনে যেতে ১৪০টি দেশের দুই লক্ষাধিক আবেদনপত্র জমা পড়ে। এর মধ্যে ১৮ বাংলাদেশিও ছিলেন। সম্প্রতি দ্বিতীয় রাউন্ডে মাত্র ১০৫৮ জনকে নির্বাচিত করা হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের দু'জন নারীও আছেন। লিখেছেন যোয়েল কর্মকার মহাকাশই হবে আমাদের পরবর্তী ঠিকানা, আগামীর সীমান্ত। এমন সুদূরপ্রসারী স্বপ্ন দেখা এতদিন কল্পবিজ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এখন নেদারল্যান্ডসভিত্তিক বেসরকারি মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান মার্স ওয়ান ২০২৩ সাল থেকে মঙ্গল গ্রহে মনুষ্য বসতি স্থাপনের কার্যক্রম পরিচালনার সূচনা করে ইতিমধ্যে সব মহলের নজর কেড়েছে। আক্ষরিক অর্থে এই অভিযান মানব ইতিহাসের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত হলেও মানুষের অদম্য অভিযাত্রার নেশা কোনোভাবেই এ অগস্ত্য যাত্রাকে রোধ করতে পারেনি, বরং আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম ঘোষণার পাঁচ মাসের মধ্যেই মার্স ওয়ান মিশনের জন্য ১৪০টি দেশের ২ লাখ ২ হাজার ৫৮৬টি আবেদনপত্র জমা পড়েছিল। এই অন্তিম যাত্রার জন্য আবেদন করেছিলেন ১৮ জন বাংলাদেশিও। প্রথম রাউন্ডের প্রক্রিয়াটি শেষ হয়ে যায় ২০১৩ এর ৩১ আগস্ট।
সম্প্রতি এই আবেদনকারীর মধ্য থেকে দ্বিতীয় রাউন্ডের জন্য মাত্র ১ হাজার ৫৮ জনকে নির্বাচিত করা হয়েছে। তাদের মধ্য থেকেই পরবর্তী যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতে মঙ্গল গ্রহ অভিযাত্রীদের চূড়ান্ত করা হবে। আমাদের জন্য অত্যন্ত সুখপ্রদ সংবাদ হলো, এই সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পেয়েছেন দুই বাংলাদেশিও। তারা হলেন_ সালমা মেহের ঐশী (২৭) ও ডা. শারমিন জাহান (২৫)। মার্স ওয়ান কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই নির্বাচিত প্রত্যেকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। এক অভিনন্দন বার্তায় তাদের এই কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে প্রাধান্য দেওয়ার পাশাপাশি পরবর্তী নির্দেশনা দেওয়া হয়। তাদের আগামী মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই চিকিৎসকের কাছ থেকে সুস্বাস্থ্যের প্রত্যয়নপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে। একইসঙ্গে প্রার্থীদের নির্বাচন কমিটির সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হবে এবং এর মধ্য দিয়েই পরবর্তী রাউন্ডের জন্য যোগ্য প্রার্থী বাছাই করা হবে। তবে বাছাইয়ে ব্যক্তিগত পর্যায়ে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে এ কার্যক্রম ও প্রকল্পের জন্য যথাসাধ্য প্রচারণার দক্ষতাকেও বিবেচনায় আনা হবে বলে জানিয়েছেন মার্স ওয়ান কর্তৃপক্ষ। নির্বাচিত প্রার্থীদের পরিবার ও বন্ধুবান্ধবদের কাছে এ বিষয়ে সহায়তা নিতে বলা হয়েছে, কারণ বিপদসংকুল এ মহাকাশ অভিযাত্রায় প্রিয়জনদের কাছে কখনও ফিরে আসা সম্ভব হবে না, এ যাত্রা হবে শুধুই একমুখী।
সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পাওয়া বাংলাদেশি দুই সৌভাগ্যবতী প্রার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে এ বিষয়ে তাদের অনুভূতি জানাতে গিয়ে উচ্ছ্্বসিত হয়ে পড়েন, এ যেন হঠাৎ নাগাল পাওয়া ঘোরলাগা স্বপ্নের বাস্তবচিত্র। আহসানউল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা সালমা মেহের ঐশী মার্স ওয়ান মিশনে অংশ নেওয়ার পেছনে তার মতামত জানিয়ে বলেন, 'স্কুলজীবনে যখন থেকে আমি মহাকাশ নিয়ে নানারকম পড়াশোনা করতে শুরু করেছি তখন থেকেই একটা সুখস্বপ্ন ছিল মহাকাশচারী হওয়ার। ভারতের নারী মহাকাশচারী কল্পনা চাওলাকে নিজের আদর্শ ভাবতে ভালো লাগত। সায়েন্স ফিকশনের বই, মহাকাশ নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন পড়া আমার প্রিয় বিষয়। মার্স মিশন আমার সেই সুখস্বপ্ন পূরণের একটা বড় প্ল্যাটফর্ম, যেখানে অংশ নিতে পারার সুযোগ পাওয়াই আমার কাছে অনেক বড় পাওয়া। প্রতিকূল পরিবেশে ভালোভাবে টিকে থাকার জন্য যে মানসিক শক্তির প্রয়োজন তা আমার আছে। সুযোগ পেলে আর প্রশিক্ষণ পেলে নিজেকে মার্স মিশনের জন্য যোগ্য করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। নিঃসন্দেহে মার্স মিশন মানব সভ্যতার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ইতিহাসের একটা মাইলফলক। আজ হোক কাল হোক, মানুষকে হয়তো একদিন পৃথিবীর বাইরের অনন্ত নক্ষত্রবীথির দিকে পাড়ি দিতেই হবে। মার্স মিশন কতটুকু সফল হবে সেটা সময়ই বলে দেবে। মানুষ অনেক অসম্ভবকেই সম্ভব করেছে, আমিও মার্স মিশনের সফলতার বিষয়ে যথেষ্ট আশাবাদী।' অপর প্রার্থী শারমিন জাহান বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। তিনি ঢাকা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিবিএস কোর্স সম্পন্ন করে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে রেজিস্টার্ড চিকিৎসক হওয়ার জন্য অস্ট্রেলিয়ান মেডিকেল কাউন্সিল পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। নিজের পেশাগত দায়িত্ব পালনের দায়বদ্ধতা থেকেই মঙ্গল মিশনে নাম লিখিয়েছেন তিনি।
২০২৩ সালে মঙ্গল গ্রহে মানুষের প্রথম পদচারণার ইতিহাস গড়ায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ শেষ পর্যন্ত থাকবে কি-না সে বিষয়ে আগাম কোনো নিশ্চয়তা না থাকলেও অদম্য দুঃসাহসিকতায় আমরাও যে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য জ্ঞানচর্চার পরিবেশ ও প্রযুক্তি বিকাশের পথকে সুগম করতে ত্যাগের মানসিকতা ধারণ করতে পারি তা সুনিশ্চিত।

ছাড়াছাড়ির দ্বারপ্রান্তে ওবামা-মিশেল!

স্বামী প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে অবিশ্বস্ত বলে সন্দেহ করছেন ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা। এ কারণে ২০১৬ সালে ওবামার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আলাদা হয়ে যাবেন তারা। মার্কিন সাময়িকী ন্যাশনাল এনকোয়েরার এ তথ্য জানায় বলে খবর প্রকাশ করেছে মেইল অনলাইন। 'ওবামা ডিভোর্স বোম্বশেল!!!' শিরোনামের ওই খবরে সাময়িকীটি জানায়, ওবামা ও মিশেল তাদের ২১ বছরের দাম্পত্য জীবনের ইতি টানতে যাচ্ছেন। তবে এ খবরের কোনো বিশ্বস্ত সূত্রের বরাত দেয়নি এনকোয়েরার। হোয়াইট হাউসও কোনো মন্তব্য করেনি। খবরে বলা হয়, গত বছর দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার শেষকৃত্যে যোগ দেওয়ার পরই তাদের মধ্যে কলহ তীব্র রূপ নেয়। ওই অনুষ্ঠানে ডেনিস নারী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নিজ মোবাইলে উচ্ছ্বসিত ওবামাকে ছবি তুলতে দেখা যায়। এর চেয়েও বড় কারণ হচ্ছে, মিশেল সম্প্রতি আবিস্কার করেছেন, ওবামার বিশেষ দেহরক্ষীরা তার অসততার বিষয়টি গোপন রাখার চেষ্টা করছে। সাময়িকীটি জানায়, ২০১৬ সালে হোয়াইট হাউসে মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে ওবামা চলে যাবেন নিজের শৈশবের হাওয়াইয়ে। আর মেয়েদের নিয়ে মিশেল থেকে যাবেন ওয়াশিংটন।

ছাড়াছাড়ির দ্বারপ্রান্তে ওবামা-মিশেল!

স্বামী প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে অবিশ্বস্ত বলে সন্দেহ করছেন ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা। এ কারণে ২০১৬ সালে ওবামার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আলাদা হয়ে যাবেন তারা। মার্কিন সাময়িকী ন্যাশনাল এনকোয়েরার এ তথ্য জানায় বলে খবর প্রকাশ করেছে মেইল অনলাইন। 'ওবামা ডিভোর্স বোম্বশেল!!!' শিরোনামের ওই খবরে সাময়িকীটি জানায়, ওবামা ও মিশেল তাদের ২১ বছরের দাম্পত্য জীবনের ইতি টানতে যাচ্ছেন। তবে এ খবরের কোনো বিশ্বস্ত সূত্রের বরাত দেয়নি এনকোয়েরার। হোয়াইট হাউসও কোনো মন্তব্য করেনি। খবরে বলা হয়, গত বছর দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার শেষকৃত্যে যোগ দেওয়ার পরই তাদের মধ্যে কলহ তীব্র রূপ নেয়। ওই অনুষ্ঠানে ডেনিস নারী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নিজ মোবাইলে উচ্ছ্বসিত ওবামাকে ছবি তুলতে দেখা যায়। এর চেয়েও বড় কারণ হচ্ছে, মিশেল সম্প্রতি আবিস্কার করেছেন, ওবামার বিশেষ দেহরক্ষীরা তার অসততার বিষয়টি গোপন রাখার চেষ্টা করছে। সাময়িকীটি জানায়, ২০১৬ সালে হোয়াইট হাউসে মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে ওবামা চলে যাবেন নিজের শৈশবের হাওয়াইয়ে। আর মেয়েদের নিয়ে মিশেল থেকে যাবেন ওয়াশিংটন।

ফোনে আড়িপাতার অবসান ঘটাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অন্তত ২০ কোটি ক্ষুদে বার্তা প্রতিদিন সংগ্রহ করে মার্কিন জাতীয় সংস্থা এনএসএ। বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষের এ ক্ষুদে বার্তা থেকে তথ্য, উপাত্ত সংগ্রহ করে নিজেদের কাজে ব্যবহার করতে সংস্থাটি এগুলো সংরক্ষণ করে রাখে। এমনকি তারা ব্রিটিশ যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপরও কড়া নজরদারি করে আসছে। সাবেক সিআইএ কর্মকর্তা এডওয়ার্ড স্নোডেনের ফাঁসকৃত তথ্যের বরাত দিয়ে এ খবর জানিয়েছে গার্ডিয়ান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যখন এ বিষয়ে একটি বড় ধরনের নীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছেন, ঠিক সে সময় এ প্রতিবেদন প্রকাশিত হলো। গতকাল শুক্রবারই প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার এনএসএর নজরদারি কার্যক্রমে বেশকিছু পরিবর্তন ও গোয়েন্দাগিরির যৌক্তিকতা তুলে ধরার কথা। একটি সূত্র জানায়, ফোনে আড়িপাতা কর্মসূচি বন্ধের ঘোষণা দিতে পারেন ওবামা। তবে এ জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন লাগবে। খবর গার্ডিয়ান ও বিবিসি অনলাইনের। সর্বশেষ ফাঁস করা এনএসএ কর্তৃক ২০ কোটি ক্ষুদে বার্তা চুরির এ খবর প্রকাশে হৈচৈ পড়ে গেছে। খবরে বলা হয়, মুঠোফোনে চালাচালি হওয়া এসএমএস সংগ্রহ করে এনএসএ তা সংরক্ষণ করে থাকে। প্রতিবেদনে জানানো হয়, যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দাদের এসব তথ্যের কিছুটা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে এনএসএ বিবিসিকে জানিয়েছে, তারা আইনসম্মত উপায়ে ক্ষুদে বার্তা সংগ্রহ করেছে। তবে তাদের বিরুদ্ধে যে অবাধ ক্ষুদে বার্তা সংগ্রহের অভিযোগ তোলা হয়েছে, সেটা সঠিক নয়। এদিকে প্রসিডেন্ট বারাক ওবামা স্থানীয় সময় শুক্রবার এনএসএর নজরদারি কর্মসূচি নীতিমালার যৌক্তিকতা তুলে ধরার কথা রয়েছে।

কাবুলে রেস্তোরাঁয় আত্মঘাতী বোমা-গুলিতে নিহত ২১

(হামলার পর শনিবার সকালে ঘটনাস্থল ঘুরে দেখেন আফগান বিশেষ বাহিনীর সদস্যরা।) আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের জনাকীর্ণ একটি রেস্তোরাঁয় আত্মঘাতী বোমা হামলা ও গুলিতে অন্তত ২১ জন নিহত হয়েছে। শনিবার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে বিবিসি অনলাইন। নিহতদের মধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও জাতিসংঘের চার কর্মী রয়েছেন। তালেবান এই হামলার দায় স্বীকার করে জানিয়েছে, আফগানিস্তানে অবস্থানরত বিদেশি কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করেই পরিকল্পিত এই হামলা চালানো হযেছে। আফগানিস্তানের উপ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ আইয়ুব সালাঙ্গি জানান, শুক্রবার রাতে জনাকীর্ণ ওই রেস্তোরাঁর ফটকের বাইরে একজন আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী তার সঙ্গে থাকা বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এর ঠিক পরপরই দু’জন বন্দুকধারী রেস্তোরাঁর ভেতরে প্রবেশ করে এলোপাথারি গুলি ছুড়তে শুরু করে। কাবুলের পুলিশ প্রধান মোহাম্মদ জহির বার্তাসংস্থা এএফপিকে বলেন, "শুক্রবারের ওই হামলার ঘটনায় শনিবার সকাল পর্যন্ত ১৩ বিদেশিসহ অন্তত ২১ জন নিহত হয়েছে বলে আমরা নিশ্চিত হয়েছি। নিহতদের মধ্যে পাঁচজন নারীও রয়েছেন।" এছাড়া শুক্রবারের ওই ঘটনায় আরও পাঁচজন আহত হয়েছেন বলেও জানান জহির। প্রসঙ্গত, কাবুলের ওয়াজির আকবর খান এলাকায় অবস্থিত ওই রেস্তোরাঁটি বিদেশি নাগরিক ও কূটনৈতিকসহ আফগানিস্তানে কর্মরত বিভিন্ন দাতা সংস্থার কর্মীদের কাছে বেশ জনপ্রিয়।

পটিয়ায় মাদ্রাসার বার্ষিক সভায় প্রতিমন্ত্রী জাবেদ নাজেহাল

চট্টগ্রামের পটিয়ায় হেফাজতপন্থি একটি মাদ্রাসায় নাজেহাল হয়েছেন ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ। গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজের পর আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া আরাবিয়াতুল জিরি মাদ্রাসার বার্ষিক সম্মেলনে সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দিতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের মুখে পড়েন জাবেদ। একপর্যায়ে বক্তব্য বন্ধ করে পুলিশ প্রহরায় দ্রুত অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন তিনি।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া পটিয়ার জিরি মাদ্রাসার দু'দিনব্যাপী বার্ষিক সভার শেষ দিন ছিল গতকাল শুক্রবার। জুমার নামাজের পর শুরু হওয়া শেষ দিনের অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় অধিবেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত হয়ে যান চট্টগ্রামের আনোয়ারা আসনের সাংসদ ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ। বিকেল ৩টায় বক্তব্য দেওয়ার সময় সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড তুলে ধরে সরকারের গুণগান করেন তিনি। 'বর্তমান সরকার ইসলামবিরোধী নয়, প্রধানমন্ত্রী নিজেও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন'_ এভাবে গুণগান করায় তার ওপর খেপে যায় কিছু মাদ্রাসা শিক্ষার্থী। উচ্ছৃঙ্খল শিক্ষার্থীদের একটি অংশ তাকে নাস্তিক আখ্যায়িত করে 'নাস্তিকের দালালেরা, হুঁশিয়ার সাবধান'সহ নানা ধরনের উসকানিমূলক ও আপত্তিকর স্লোগান দেওয়ার পাশাপাশি হৈচৈ করতে থাকে। একপর্যায়ে প্রতিমন্ত্রী বক্তব্য বন্ধ করে দেন। এরপর তিনি দ্রুত অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন। জানতে চাইলে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান জাবেদ সমকালকে বলেন, 'এটি তেমন কিছু নয়। হুজুরের (আল্লামা শাহ মো. তৈয়ব) অনুরোধে আমি মাদ্রাসায় গিয়েছিলাম। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় কিছু শিক্ষার্থী উচ্ছৃঙ্খল আচরণের মাধ্যমে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকলে আমি সবার কাছে দোয়া চেয়ে বিদায় নিয়েছি।'
তবে মাদ্রাসার ভাইস প্রিন্সিপাল মাওলানা খোয়াইব বলেন, 'প্রতিমন্ত্রী বক্তব্য দেওয়ার সময় কিছু লোক হৈচৈ করেছে। এর বেশি কিছু ঘটেনি।' যোগাযোগ করা হলে এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি পটিয়া থানার ওসি মফিজউদ্দিন। তবে অনুষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করা থানার এসআই আনোয়ার হোসেন সমকালকে বলেন, 'প্রতিমন্ত্রী বক্তব্য দেওয়ার সময় অনুষ্ঠানে উপস্থিতদের একটি অংশ তাকে উদ্দেশ করে স্লোগান দিতে থাকলে তিনি সবার কাছে দোয়া চেয়ে বিদায় নেন।'
মাদ্রাসার মহতামিম মুহতামিম আল্লামা শাহ মো. তৈয়বের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন পটিয়ার হেফাজতপন্থি আরেক মাদ্রাসা আল জামিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসার মহাপরিচালক মুফতি আবদুল হালিম বোখারি।

দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার দাবি

(সাম্প্রদায়িক হামলা) নির্বাচন-পরবর্তী দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক হামলায় দলমতের ঊধর্ে্ব উঠে দোষীদের চিহ্নিত করার মাধ্যমে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে বিভিন্ন সংগঠন। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচিতে এ দাবি জানানো হয়। এ ছাড়া এসব প্রতিবাদ বিক্ষোভে ওঠে এসেছে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি এবং হামলা প্রতিরোধের আহ্বানও।
হিন্দু মহাজোট :সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান ধর্মঘট ও প্রতিবাদী মানববন্ধন করে বাংলাদেশ হিন্দু মহাজোট। অবস্থান ধর্মঘট-পরবর্তী পথসভায় অ্যাডভোকেট দীনবন্ধু রায়ের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন জোটের প্রধান উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) জয়ন্ত কুমার সেন, মহাসচিব অ্যাডভোকেট গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক, মুখপাত্র পলাশ কান্তি দে, যুগ্ম-মহাসচিব অধ্যাপক আনন্দ বিশ্বাস, মানিক চন্দ্র সরকার, ডা. এমকে রায়, শশাঙ্ক রায়, গোপাল মিস্ত্রি প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, কোনো সরকারই হিন্দু সম্প্রদায়ের জীবন ও সম্পদ রক্ষার কার্যকর ভূমিকা রাখেনি; বরং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করেছে। সে কারণে ভোট দেওয়া না দেওয়াকে কেন্দ্র করে হিন্দুদের ওপর হামলা হচ্ছে।
নারীমুক্তি কেন্দ্র :সারাদেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও নারীর ওপর নির্যাতনের বিরুদ্ধে গতকাল বিক্ষোভ করেছে বাংলাদেশ নারীমুক্তি কেন্দ্র। বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশে বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সভাপতি সীমা দত্ত, অর্থ

সম্পাদক বিউটি আক্তার, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আফসানা বেগম লুনা, ঢাকা মহানগর কমিটির সদস্য সুস্মিতা রায় সুপ্তি প্রমুখ।
সর্বধর্মীয় সম্প্রীতি সভা :সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, দোকান-পাট ও উপাসনালয়ে হামলার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে সর্বধর্মীয় সম্প্রীতি সভা। গতকাল সংগঠনের আহ্বায়ক বিচারপতি আবদুর রউফ, যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. তপন ডি রোজারিও, অধ্যাপক সুকোমল বড়ূয়া ও সাংবাদিক সঞ্জীব চৌধুরী এক যৌথ বিবৃতিতে এ দাবি জানান।
মাইনরিটি সংগ্রাম পরিষদ :সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে বাংলাদেশ মাইনরিটি সংগ্রাম পরিষদ। মানববন্ধনে পরিষদ সভাপতি অধ্যক্ষ অশোক তরুর সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন সাধারণ সম্পাদক অশোক কুমার ঘোষ, সাংগঠনিক সম্পাদক এসকে বাদল, কোষাধ্যক্ষ হরেন্দ্র নাথ মজুমদার, ডা. মোহন লাল হাওলাদার প্রমুখ। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, সন্ত্রাসী যে দলেরই হোক না কেন তাদের অনতিবিলম্বে গ্রেফতার করে দ্রুত বিচার আইনে শাস্তি দিতে হবে।
নতুনধারা বাংলাদেশ :সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে নতুনধারা বাংলাদেশের জাতীয় কাউন্সিলে বক্তারা বলেছেন, বাংলাদেশকে কখনোই ধ্বংস হতে দেওয়া হবে না। সাম্প্রদায়িক-সম্প্রীতির দেশে সবাই মিলেমিশে স্বাধীনতার পক্ষে বাংলাদেশকে গড়ে তোলা হবে। সংগঠনের আহ্বায়ক মোমিন মেহেদীর সভাপতিত্বে কাউন্সিলে বক্তব্য রাখেন সোনাগাজী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জেডএম কামরুল আনাম, সংগঠনের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী মাসুদ আহমেদ, ফজলুল হক, ডা. আবুল কাশেম ভঁূইয়া, মাস্টার এমএ জলিল প্রমুখ।
যশোর জেলা সমিতি, ঢাকা :সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে যশোরের অভয়নগরের মালোপাড়ায় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিচার দাবিতে মানববন্ধন করেছে যশোর জেলা সমিতি, ঢাকা। সমিতির আহ্বায়ক জাহানারা সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে মানববন্ধনে সদস্য সচিব মনোয়ার হোসেন, বিএফইউজের একাংশের সভাপতি রুহুল আমিন গাজী, যশোরের মনিরামপুরের ইউপি চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মজিবুর রহমান, প্রকৌশলী বাচ্চু মিয়া প্রমুখ।

শুরুতেই গতি চাই by মাহফুজুর রহমান মানিক

প্রথম থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত আমাদের শিক্ষাবর্ষের হিসাব ইংরেজি বছরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বছর শুরু ও শেষ হওয়ার সঙ্গে বিদ্যালয়ে শিক্ষাবষের্র শুরু ও শেষ হয়। জানুয়ারির শুরুতেই তাই সরকারের তরফ থেকে বই দেওয়া হয় এবং নতুন বছরে নতুন ক্লাসও শুরু হয়। ডিসেম্বরে বার্ষিক পরীক্ষার মাধ্যমে যার সমাপ্তি। গোটা বছরে ক্লান্ত শিক্ষার্থী নতুন করে প্রাণ পায় জানুয়ারিতে। নতুন বছরের চেয়েও নতুন ক্লাসের আমেজে প্রত্যেকেই প্রাণচঞ্চল থাকে। তার ওপর নতুন বই ও নতুন নতুন সহপাঠী শিক্ষার্থীর সে হৃদয়কে আরেকটু উদ্দীপ্ত করে বৈকি। শিক্ষার্থীরা এ সময় চাপমুক্ত থাকে। তাই এ সময়ে পড়াশোনায় শিক্ষার্থীর অর্জন ভালো হওয়াই স্বাভাবিক। ফলে কাজে লাগানোর জন্য এ সময়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সাধারণত দেখা যায় শিক্ষাবর্ষের শুরুর দিকে, বিশেষ করে জানুয়ারি মাসজুড়ে ক্লাস অনেক কম হয়। অনেক জায়গায় ২-৩টি ক্লাস করেই ছুটি হয়ে যায়। অথচ প্রশাসন-শিক্ষকরা চাইলেই আরও বেশি ক্লাস নিতে পারেন কিংবা স্বাভাবিক সময়ের মতো পূর্ণোদ্যমে পড়াশোনা শুরু করতে পারেন। তা না করায় অনেক সময় দেখা যায় নির্দিষ্ট সিলেবাস শেষ হয় না এবং পরীক্ষার আগ মুহূর্তে তড়িঘড়ি করে শিক্ষার্থীর ওপর চাপিয়ে তা শেষ করার চেষ্টা করেন। বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ প্রয়োগের কথা বলা হচ্ছে না কিংবা শুরুতেই সিলেবাস শেষ করতে হবে, তাও নয়। এটা ঠিক যে, নতুন ক্লাসের অনেক বই-ই শিক্ষার্থীর কাছে কঠিন হতে পারে। সেটা শিক্ষকরা ভালোভাবে বুঝিয়ে দেবেন; যতটা পারা যায় শিক্ষার্থীদের ওপর কঠোর না হয়ে সহজে বোঝাবেন। তা শিক্ষাবর্ষের শুরু থেকেই প্রয়োজন। এটা একদিকে যেমন নির্দিষ্ট সিলেবাস স্বাভাবিক নিয়মে শেষ করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ তার চেয়ে বেশি জরুরি আমাদের রাজনৈতিক অবস্থার জন্য। গত বছরের অভিজ্ঞতা কারও অজানা নয়। রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে হরতাল-অবরোধের কারণে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। অনেকে ঠিকমতো সিলেবাস শেষ করতে পারেনি; পরীক্ষা নিতে হয়েছে নানা ভোগান্তির মধ্যে। এভাবে হয়তো শিক্ষাবর্ষ পার হয়েছে কিন্তু শিক্ষার্থীর কতটা অর্জন হলো তা নিশ্চয়ই ভাবার বিষয়। যদিও রাজনৈতিক অস্থিরতার দায় কোনোভাবেই শিক্ষার্থী-শিক্ষা ব্যবস্থা নিতে পারে না। কিন্তু আমাদের জন্য দুর্ভাগ্য যে, শিক্ষা ব্যবস্থা সরাসরি এর জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এমনকি স্কুল পোড়ানোর মতো ন্যক্কারজনক ঘটনাও দেখতে হয়েছে। অথচ এটা সবারই জানা, সব ক্ষতিই পোষানো যায় কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষতি অপূরণীয়।
রাজনৈতিক অচলাবস্থা আমরা চাই না। রাজনীতির প্রভাব শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর পড়ূক তাও কেউ মেনে নেবে না। তারপরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। এ জন্য বছরের শুরু থেকেই যথাযথভাবে প্রত্যেকটি শিক্ষাঘণ্টা কাজে লাগানোর বিকল্প নেই। পূর্ণোদ্যমে শিক্ষাবর্ষ শুরু হলে মাঝপথের অপ্রত্যাশিত অবস্থার মোকাবেলা কিছুটা হলেও সম্ভব। বলার অপেক্ষা রাখে না, বছরের শুরুতে ঢিলেঢালা ক্লাসের বিষয়টা অনেক আগ থেকেই চলে আসছে। আগে হয়তো একটা বাস্তবতাও ছিল। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের হাতে সব বই পেঁৗছতে পেঁৗছতে গোটা জানুয়ারি লেগে যেত। তখন ইচ্ছা থাকলেও শিক্ষকদের ক্লাস নেওয়া সম্ভব ছিল না। এখন জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই শিক্ষার্থীরা সব বই পেয়ে যাচ্ছে। ফলে শিক্ষাবর্ষের শুরু থেকেই পুরোপুরি ক্লাস হওয়া সমস্যা নয়। নতুন বইয়ের গন্ধ আর নতুন শ্রেণীতে শিক্ষার্থীর প্রাণচাঞ্চল্য থাকতে থাকতেই শুরু হোক না পূর্ণোদ্যমে পড়াশোনা।
mahfuz.manik@gmail.com

সংখ্যালঘু নয় নাগরিক by আইরিন সুলতানা

বারোয়ারি চ্যানেলের ভিড়ে বিটিভি এখন হয়তো সবার দেখা হয় না। তথাপি বিটিভি নস্টালজিয়া জাগানিয়া। বিটিভির ৫০ বছর পূর্তি একটি ইতিহাস তাই। ইন্টারনেটহীন আমলে বিটিভিই ছিল বিনোদন, জানা-অজানাকে চেনার ভুবন। টেলিভিশন বাক্সটায় একমাত্র চ্যানেল বিটিভি ছিল অঞ্জন দত্তের গানের মতো, 'একটুখানি চৌকো ছবি আঁকড়ে ধরে থাকি... আমার জানালা দিয়ে আমার পৃথিবী।'
এই লেখার অবতারণা বিটিভি স্মৃতিচারণে নয়, বরং অসাম্প্রদায়িক চেতনার রাষ্ট্রে সাম্প্রদায়িক আগ্রাসনে আমাদের দায় খুঁজতে। যদিও সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নিয়ে সব শ্রেণী-পেশাজীবী জনতার প্রতিবাদে মুখরিত জনপদ, তবু হৃদকোণে উদ্বেগ কাটে না। যেমনটা হিন্দু, বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী সিঁদুরে মেঘের ছটা দেখে উপাসনালয়ে, ভিটেবাড়িতে আগুন লাগল ভেবে আঁতকে উঠছে। ১৯৭১ সালে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান জনগোষ্ঠী আক্রান্ত হয়েছিল পাকবাহিনী আর রাজাকার দ্বারা। 'সংখ্যালঘু'রূপে চিহ্নিত জনগোষ্ঠী আজকের দিনেও রাজনৈতিক স্বার্থ ও ধর্মের বলি হচ্ছে। স্থানীয় প্রভাবশালীদের হিন্দু সম্পত্তি দখলের গ্রাম্য রাজনীতিও উদ্বাস্তু করছে হিন্দুদের। বিভিন্ন পত্রিকায় সম্প্রতি প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হিন্দু জনগোষ্ঠী হ্রাস পাচ্ছে। বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান জনগোষ্ঠী '৭১-পরবর্তীকালে বৃদ্ধি পায়নি। ১৯৭৫-পরবর্তী থেকে আজ পর্যন্ত এই সম্প্রদায়গুলো একটি স্বাধীন দেশে 'সংখ্যাগরিষ্ঠ'দের করুণায় অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। নিয়ম রক্ষার মানববন্ধন, রোডমার্চ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানদের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করেনি, বরং 'সংখ্যালঘু' শব্দটিকে নিয়ত কষ্টিপাথরে খোদাই করেছে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আর নির্বাচনকে ঘিরে সৃষ্ট রাজনৈতিক সহিংসতার জের হিসেবে বৌদ্ধ আর হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা মিডিয়া কাভারেজ পেয়েছে বড় মাত্রায়। টক শো থেকে রোড শো, সবখানেই সচেতন প্রতিবাদ। প্রতিবাদ উঠেছে অনলাইনেও। শঙ্কা হচ্ছে, এরপরও যদি এমন আরেকটা লজ্জাকর ঘটনা ঘটে? রাষ্ট্রের ব্যর্থতা হলো, এখন পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়নি, আইনি পদক্ষেপ হয়নি। সরকার জনগণের নিরাপত্তার স্বার্থেই কঠোর হয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়ে সব সাম্প্রদায়িক ঘটনায় জড়িতদের শাস্তি বিধান নিশ্চিত করলে সব ধর্মাবলম্বীই স্বস্তি পাবে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো থেকে প্রতীয়মান হয়, আমরা একাত্তরের চেতনার ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ব্যবস্থা থেকে বিচ্যুত হচ্ছি ক্রমাগত। সংখ্যাগরিষ্ঠ আর সংখ্যালঘু_ এই দুইয়ের মুহুর্মুহু উচ্চারণ আস্থা নয়, শঙ্কার উদ্রেক ঘটায়। গুটিকয়েক ব্যক্তি ধর্মীয় উস্কানি দেয়, আর সবাই আমরা শান্তিকামী, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সহাবস্থানে বিশ্বাসী হলেও 'সংখ্যালঘু' জনগোষ্ঠী এ দেশে তাদের অধিকারবোধকে প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। প্রকৃতপক্ষে একটি জনগোষ্ঠীকে ক্রমাগত 'সংখ্যালঘু' আখ্যায়িত করে তাদের মানসিক, সামাজিক অবস্থানকে দুর্বল করে দিচ্ছি আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠরা। হিন্দু-বৌদ্ধরা এ দেশের নাগরিক। নিরাপত্তা, নির্বিঘ্নে ধর্ম পালন তাদের সংখ্যালঘু অধিকার নয়, সুনির্দিষ্ট নাগরিক অধিকার। সংখ্যাগরিষ্ঠ আর সংখ্যালঘু শব্দচর্চা বলে দেয় সংখ্যালঘুরা বাস করে সংখ্যাগরিষ্ঠের কৃপায়। সংখ্যাগরিষ্ঠের এই অদ্ভুত আধিপত্যে 'সংখ্যালঘু'রা কি আদৌ এ দেশের নাগরিক হতে পেরেছে?
বিটিভির স্বর্ণযুগে প্রতিদিন একেক ধর্মের প্রার্থনা দিয়ে অনুষ্ঠান কার্যক্রম শুরু হতো। ধর্মীয় সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত ছিল সেকালে বিটিভির অনুষ্ঠানসূচি প্রারম্ভের এই ধর্মীয় বাণী পর্বটি। বড়রা ছাড়াও শিশুরাও এ সময় টিভির সামনে থাকত, কারণ ধর্মীয় বাণী শেষে কার্টুন। কার্টুনের লোভে বসে থাকা এই শিশুরা নিজের অজান্তেই সব ধর্মের শান্তির বাণী আয়ত্ত করে নিত। 'বুদ্ধং শরনাং গচ্ছামি' কিংবা 'জগতের সব প্রাণী সুখী হোক, সব প্রাণী মঙ্গল লাভ করুক'_ এ বাণী রাষ্ট্রে সব ধর্মের মানুষের কাছে জানান দিত, এ রাষ্ট্র সংখ্যাগুরু কিংবা সংখ্যালঘুতে বিভাজনের রাষ্ট্র নয়, এ রাষ্ট্র হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান-মুসলমান তথা নাগরিকের রাষ্ট্র।
বিটিভির কাছে কৃতজ্ঞতা। দুঃখ হলো, হালে অগুনতি চ্যানেল সত্ত্বেও সব চ্যানেলে কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মের অনুসারীদের জন্য নিয়মিতভাবে আবশ্যিক অনুষ্ঠান থাকে। বাণিজ্যিক চ্যানেলের টিআরপি রক্ষার দৌড়ে 'সংখ্যালঘু'দের ধর্ম নিয়ে অনুষ্ঠান কি অলাভজনক? পত্রিকাতেও কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্ম নিয়ে নিয়মিত ফিচার পাতার বরাদ্দ থাকে। হয় কেবল ধর্ম নিয়ে একটি ফিচার পাতা হতে পারে, যেখানে সব ধর্মীয় নিবন্ধ থাকবে। অথবা প্রতিটি ধর্মের জন্য আলাদা করেই সমগুরুত্বের ফিচার পাতা হতে পারে। বলতে দ্বিধা নেই যে সমাজে, যে মানবাধিকারে, যে চিন্তায়, যে বিবেকে, যে চেতনায়, যে আইনে, যে রাষ্ট্রে 'অমুসলিম' এবং 'বিধর্মী' শব্দ দুটির আভিধানিক, ব্যবহারিক চর্চা ও প্রয়োগ আছে, সেখানে রামু, অভয়নগর এলাকাগুলো কখনোই সুরক্ষিত নয়। আমরা সংখ্যাগুরুরা কি অহিন্দু কিংবা অবৌদ্ধ পরিচয়ে পরিচিত হই? সহিংস রাজনীতি, স্বার্থান্বেষী মহল, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতাকে চিহ্নিত করলেই সমাধান হবে না। সংখ্যাগুরু আধিপত্যে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান জনগোষ্ঠী নিজেদের প্রকৃত নাগরিক অধিকারবোধ বিস্মৃত হয়ে সংখ্যালঘু থেকে বিলুপ্তপ্রায় জনগোষ্ঠী হয়ে ওঠার আগেই আমাদের ভেতরের সুপ্ত সাম্প্রদায়িকতাকে নিশ্চিহ্ন করতে হবে। বলতে হবে সবাই নাগরিক। আসুন, হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান একত্রে সাম্প্রদায়িকতা হটানোর পদযাত্রায় শামিল হই নাগরিক অধিকারে।
আইরিন সুলতানা :ব্লগার

বাংলাদেশেও দরকার আম জনতার দল by ম. ইনামুল হক

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ৪২ বছর পর দেশের যে অবস্থা দাঁড়িয়েছে তাতে সারাদেশের মানুষ এখন স্পষ্টতই দুটি শ্রেণীতে ভাগ হয়ে গেছে। যেন রাজা আর প্রজা। বাংলাদেশে ক্ষমতায় আসীন থেকে বা ক্ষমতার সঙ্গে সংযুক্ত থেকে অথবা সর্বগ্রাসী দুর্নীতির সুবিধা পেয়ে যারা কোটি কোটি টাকার মালিক হচ্ছেন তারাই রাজা, বাকি সবাই প্রজা। অথচ সাম্য ও স্বাধীনতার স্বপ্ন নিয়ে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা বাংলার পাহাড় ও সমতলে 'বাংলাদেশ' নামের স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। দক্ষিণ এশিয়ার এই বাংলাদেশে হাজার হাজার বছরের ইতিহাস এবং ঐতিহ্য রয়েছে, যার ধারাবাহিকতা এই স্বাধীন রাষ্ট্রের জনগণ আমরা বহন ও লালন করে আসছি। এই বাংলার সব জাতির অধিবাসী তথা বাঙালি, চাকমা, সাঁওতাল, গারো, ত্রিপুরী, মারমা, কোচ ও নানা জাতির মানুষ মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ছিল ঔপনিবেশিক, সামন্তবাদী, ধনতান্ত্রিক ইত্যাদি সব ধরনের শোষণ থেকে মুক্ত জনগণের একটি দেশ প্রতিষ্ঠা করা। আমাদের লক্ষ্য ছিল জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ ইত্যাদির নামে সমাজে সৃষ্ট বিভেদ, বৈষম্য, অনাচার ইত্যাদি থেকে মুক্ত একটি আধুনিক দেশ গড়ে তোলা।
আমাদের তাই বিশ্বের ঘটনাপ্রবাহ থেকে শিক্ষা নিতে হবে ও কাজে নামতে হবে। রাজনীতি রাজাদের কবল থেকে মুক্ত করে ৯৯ শতাংশ মানুষের হাতে আনতে হবে। বাংলাদেশে রাজাদের 'রাজনীতি'র পরিবর্তে 'জননীতি' চর্চা করতে হবে। 'গণপ্রজান্ত্রিক' নয় 'জনগণতান্ত্রিক' বাংলাদেশ করতে হবে। নাগরিকদের অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তাসহ কল্যাণকর রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্যে আম জনতার জন্য কাজ করতে হবে। বাংলাদেশের সব বিবেকবান এবং প্রতারিত ও নিপীড়িত সব নাগরিকের এই লক্ষ্যে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ৪২ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও এ দেশের সাধারণ মানুষ আজও শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তি পায়নি। মহান মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ নারী-পুরুষের আত্মবলিদান সত্ত্বেও বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের মৌলিক অধিকারের কিছুই আজও বাস্তবায়ন হয়নি।
স্মরণ রাখতে হবে যে, আমাদের লক্ষ্য ছিল সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সব নাগরিকের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে সরকার গঠন করে দেশ পরিচালনা করা। কিন্তু নির্বাচনের নাটক সাজিয়ে, জনগণের ম্যান্ডেটের কথা বলে, স্বাধীনতার পর এ যাবৎ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত সব দলের রাজনৈতিক নেতৃত্ব কেবল দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দলপ্রীতি, দখল আর শোষণই করে গেছে।
বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থায় ক্ষমতায় যাওয়া রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কালো টাকার হোলিখেলা বানিয়ে জনগণকে ভোটের নামে জিম্মি করে রেখেছে। দীর্ঘ ৪২ বছরের অপশাসনে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জনসেবামূলক সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়ে জনবিরোধী রূপ নিয়েছে। তাই বাংলাদেশের সচেতন নাগরিকরা মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা ও দায়িত্ববোধের তাড়নায় সব ধরনের অপশাসন, অনাচার ও দুর্নীতি থেকে মুক্ত করে বাংলাদেশকে একটি কল্যাণকর রাষ্ট্র করার অঙ্গীকার নিয়ে আম জনতার রাজনীতি তথা জননীতি করার জন্য এগিয়ে আসতে হবে।
বাংলাদেশ যে এখনও রাজাদের দেশ তার প্রমাণ ডেপুটি কমিশনারদের 'জেলা প্রশাসক' পদবি। বাংলাদেশে জনগণের শাসন নিশ্চিত করার জন্য সরকারি দফতর প্রধানদের পদবি পরিবর্তন করতে হবে। ডেপুটি কমিশনার হবেন 'জেলা জনসেবক (আইন)', জেলা জজ হবেন 'জেলা জনসেবক (বিচার)', পুলিশ সুপার হবেন 'জেলা জনসেবক (নিরাপত্তা)', সিভিল সার্জন হবেন 'জেলা জনসেবক (স্বাস্থ্য)', নির্বাহী প্রকৌশলী (পূর্ত) হবেন 'জেলা জনসেবক (পূর্ত)', জেলা কৃষি অফিসার হবেন 'জেলা জনসেবক (কৃষি)' ইত্যাদি। উপজেলা পর্যায়ের অন্য কর্মকর্তাদের পদবি অনুরূপভাবে পরিবর্তন করতে হবে। জনসেবকদের দুর্নীতির বিচার তথা নাগরিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য 'জন-ন্যায়পাল' থাকবেন।
বাংলাদেশকে সাধারণ জনগণ তথা আম জনতার রাষ্ট্র করতে হলে দলগুলোর কেবল জননীতি চর্চাই নয়, বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক অধিকার অধ্যায়ে নাগরিকদের অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তা প্রদানের বিষয়গুলো রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে লিখতে হবে। একটি শোষণহীন সমাজে প্রত্যেক ব্যক্তির প্রয়োজনীয় আহার ও সুপেয় পানির জোগানের দায়িত্ব রাষ্ট্র অবশ্যই বহন করবে। প্রতিটি নাগরিক তার মানসম্ভ্রম বজায় রাখার জন্য পর্যাপ্ত পরিধেয় বস্ত্র পাবে, যার ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের আবশ্যকীয় দায়িত্ব হবে। আয়-বৈষম্য নির্বিশেষে প্রতিটি পরিবার একটি পরিচ্ছন্ন আবাসস্থল পাওয়ার অধিকারী হবে, যা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র দায়বদ্ধ থাকবে। এছাড়া প্রতিটি নাগরিককে প্রাথমিক শিক্ষাসহ কারিগরি শিক্ষা দেওয়াসহ উপার্জনমূলক পেশায় দক্ষ করার ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে।
বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় আনতে হবে আমূল পরিবর্তন। জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রচারের জন্য কালো টাকা ব্যয়ের সুযোগ না দিয়ে জামানতের খরচ ব্যতীত সব ব্যয় নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে করতে হবে। আর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি বা কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কোনোক্রমেই কোনো সরকারি বা আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা বোর্ডে থাকতে পারবেন না। স্থানীয় সরকারগুলোর কাছে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। সংসদ সদস্যরা জাতীয় সংসদে কেবল আইন অনুমোদন ব্যতীত কোনো ক্ষমতা রাখবেন না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সংসদীয় এলাকায় একটি তৃণমূল সংসদ থাকবে। জাতীয় সংসদে উত্থাপিত সব আইন এই তৃণমূল সংসদে আলোচিত হবে। সংসদ সদস্যরা সরকার পতন ব্যতীত স্বাধীনভাবে ভোট দেবেন। তৃণমূল সংসদে রায়ের ভিত্তিতে জাতীয় সংসদ সদস্যরা আইনের পক্ষে-বিপক্ষে ভোট দেবেন। আমরা অহরহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যদি সত্যিই আমাদের মনে কাজ করে, তা হলে দেশটা আম জনতার হলো কিনা সেটাই হবে আমাদের প্রধান বিবেচ্য। এ জন্য প্রয়োজন আমজনতার রাজনীতি অর্থাৎ 'জননীতি'। বাংলাদেশের ডান, বাম সব ধরনের রাজনৈতিক দলগুলোকে এদিকে ঘুরে তাকাতে হবে।
প্রকৌশলী; সাবেক মহাপরিচালক পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা

ঢাকায় 'কায়রো গেম' সফল হলো না by আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ২০১৪ সালে যে বিষয়টি অর্জন করেছে, তা '৭১ সালের বিজয়ের চেয়ে গৌরবময় নয়, কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ। একাত্তর সালের যুদ্ধ দেশকে স্বাধীনতা দিয়েছে, ২০১৪ সালের যুদ্ধ সেই স্বাধীনতার গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিকে রক্ষা করেছে। এবার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি শত চক্রান্তের মুখে জয়ী হতে না পারলে দেশ একাত্তর সালের পূর্বাবস্থায় ফিরে যেত। অঘোষিত পূর্ব পাকিস্তান হতো। চাই কি মধ্যযুগীয় তালেবান রাষ্ট্র হওয়ার সূচনা হতে পারত। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট অথবা ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত যাই বলুন, এই পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি প্রভাবশালী মার্কিন সাময়িকীর মন্তব্য অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য। সাময়িকীটি লিখেছে, 'বাংলাদেশে গণতন্ত্র বিপন্ন হয়েছে বলে যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তা সঠিক নয়। বাংলাদেশে বিপন্ন হয়েছিল সেক্যুলারিজম। এই সেক্যুলারিজম ছাড়া বাংলাদেশের অস্তিত্ব অর্থহীন। একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ অর্থহীন। এই সেক্যুলারিজমকে রক্ষার জন্য হাসিনা সরকারকে যা করতে হয়েছে তা হয়তো সর্বতোভাবে ট্রাডিশনাল গণতন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কিন্তু এই পন্থা গ্রহণ ছাড়া হাসিনা সরকারের সামনে দ্বিতীয় পথ খোলা ছিল না। বাংলাদেশে সেক্যুলারিজম রক্ষা না পেলে গণতন্ত্রও রক্ষা পেত না।'
হাতের কাছে মার্কিন ম্যাগাজিনটি নেই বলে তার ভাষ্যকারের বাংলাদেশ সম্পর্কিত মন্তব্যটি হুবহু তুলে দিতে পারলাম না। কিন্তু তার সারাংশ তুলে ধরতে পেরেছি। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ গণতন্ত্র বা সেক্যুলারিজমের খাঁটি প্রতিনিধি তা আমি বলি না। আওয়ামী লীগ একটি শ্রেণী সংগঠন নয়, একটি ব্রড বেইজড মাস অর্গানাইজেশন। তার ভেতর গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রমনা মানুষ যেমন আছেন, তেমনি আছে সাম্প্রদায়িকতাবাদী, আপসবাদী, সুবিধাবাদী গোষ্ঠীও। কিন্তু সামগ্রিকভাবে দলটি বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার নিবুনিবু প্রদীপ এখনও জ্বালিয়ে রেখেছে।
২০১৪ সালে শেখ হাসিনা কিছু ডান ও বামের গণতান্ত্রিক দল নিয়ে চতুর্দিকের চক্রান্ত ও হামলা যে কোনো উপায়েই হোক প্রতিহত করতে না পারলে বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার নিবুনিবু প্রদীপ দুটিও নিভে যেত। তার প্রতিক্রিয়া গড়াত শুধু ভারতে নয়, সারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। ভারতেও কংগ্রেস দল এখন পর্যন্ত তার সব দুর্বলতা, দুর্নীতি ও অপশাসন সত্ত্বেও গণতন্ত্র ও সেক্যুলারিজমের বাতিটি ঝড়ো হাওয়া থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে। নইলে একটি শক্তিশালী সর্বভারতীয় বাম গণতান্ত্রিক দলের অনুপস্থিতিতে কংগ্রেসের বিপর্যয় এই বিরাট দেশটিতে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করবে_ এই আশঙ্কায় নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেনসহ দেশটির সচেতন মানুষ ও বুদ্ধিজীবীরা এখনও কংগ্রেসের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেননি।
বাংলাদেশেও ভারতের মতো অনুরূপ অবস্থা চলছে। কংগ্রেসের মতোই আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অপশাসনের অভিযোগ রয়েছে। 'গত পাঁচ বছরে আওয়ামী লীগ সরকার দেশের যত উন্নয়ন ঘটিয়েছে, গত ৪০ বছরেও তা কেউ করতে পারেনি'_ এ কথাটা সবাই বলেন। কিন্তু উন্নয়নের পাশাপাশি দেশকে সুশাসন উপহার দিতে না পারাটাই আওয়ামী সরকারের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ এবং সরকারের জনপ্রিয়তা হ্রাসের কারণ। তা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন এ জন্যই দরকার ছিল যে, দলটির হাতে এখনও গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার নিবুনিবু প্রদীপ। এই দলের অনুপস্থিতিতে এই নিবুনিবু প্রদীপও রক্ষা করার কোনো শক্তিশালী বাম গণতান্ত্রিক দল নেই। এই অবস্থায় আওয়ামী লীগের বিপর্যয়ের অর্থ বাংলাদেশের আবার মধ্যযুগীয় ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের কবলে গিয়ে পড়া।
মার্কিন ম্যাগাজিনটি সঠিক কথাই বলেছে, 'বাংলাদেশে এবার গণতন্ত্র বিপন্ন হয়নি, বিপন্ন হয়েছিল সেক্যুলারিজম।' এই সেক্যুলারিজমকে হিংস্র মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা এবং 'সুশীল সমাজ' নামক একটি আত্মবিক্রীত ও আত্মঘাতী গোষ্ঠীর সম্মিলিত হামলা (তার পেছনে আবার বিদেশি পৃষ্ঠপোষকতা) থেকে রক্ষা করার জন্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটি হয়তো সর্বত্র সঠিকভাবে অনুসৃত হয়নি। তাতে ক্ষতি নেই। সেক্যুলারিজম রক্ষা পেলে গণতন্ত্রেরও সুরক্ষা পেতে দেরি হবে না।
ভারতের নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেন ও সচেতন বুদ্ধিজীবীদের মতো আমাদের অর্ধ নোবেলজয়ী এবং 'সুশীল সমাজে'র বুদ্ধিজীবীরা কেন ওপরে বর্ণিত সত্যটি বুঝতে পারেননি এবং এখনও পারছেন না তা আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধির অগম্য। বাজারে গুজব, আমেরিকা, সৌদি আরব, পাকিস্তানের সমর্থন ও অর্থপুষ্ট জামায়াত দু'হাতে পেট্রো ডলার ছড়িয়ে গরিব বাংলাদেশের জাগ্রত বিবেকের অর্ধেকেরও বেশি কিনে নিয়েছে। তারই প্রতিফলন ঘটেছে এক শ্রেণীর প্রিন্টিং মিডিয়ায়, টিভি টক শোতে, সেমিনারে, গোলটেবিল বৈঠকে।
আমি আবারও মিসরের পরিস্থিতির সঙ্গে বাংলাদেশের পরিস্থিতির তুলনা টানছি। মিসরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসের লৌহকঠিন হাতে তার সেক্যুলার আরব জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা দ্বারা বাংলাদেশের জামায়াতের অনুরূপ সন্ত্রাসী মৌলবাদী গোষ্ঠী মুসলিম ব্রাদারহুডকে দান করেছিলেন। বাংলাদেশে জামায়াত নেতা গোলাম আযমকে তার স্বদেশদ্রোহিতার জন্য ফাঁসি দেওয়া হয়নি। কিন্তু মিসরের প্রেসিডেন্ট নাসের মুসলিম ব্রাদারহুড নেতা সাইয়িদ কুতুবকে প্রাণদণ্ড দিয়েছিলেন।
নাসেরের আরব জাতীয়তাবাদ চরিত্রে শুধু সেক্যুলার ছিল না, ছিল ঘোরতর পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী। আমেরিকা তাই এই জাতীয়তাবাদ উচ্ছেদের চক্রান্ত শুরু করে। নাসেরের মৃত্যুর পর সাদাত প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ওয়াশিংটন তাকে কব্জা করে ফেলে। একদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে মিসরের তথাকথিত শান্তিচুক্তি ঘটায় এবং অন্যদিকে নাসেরপন্থিদের দমন করে মৌলবাদীদের প্রতি নমনীয় নীতি গ্রহণে প্ররোচিত করে। দুই নৌকায় পা রাখতে গিয়ে সাদাত মৌলবাদী বা মুসলিম ব্রাদারহুডের সন্ত্রাসীদের হাতেই প্রাণ হারান।
সাদাতের পর মার্কিন তাঁবেদার প্রেসিডেন্ট মোবারকের আমলে মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতি তোষণনীতি বেড়ে যায়। মুসলিম ব্রাদারহুড সেই সুযোগে বাংলাদেশের জামায়াতের মতো মসজিদ-মাদ্রাসায় শক্ত ঘাঁটি গড়ে তোলে। মোবারকের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে যখন মিসরের সেক্যুলার ও জাতীয়তাবাদী শিবিরের অভ্যুত্থান ঘটে, মুসলিম ব্রাদারহুড তার ভেতরে অনুপ্রবেশ করে। ওয়াশিংটন সুযোগ পায়। গণতন্ত্রের নামে মিসরের সুশীল সমাজের একাংশ দ্বারা প্রোপাগান্ডা চালিয়ে অনুগত সামরিক বাহিনীকে নিষ্ক্রিয় রেখে মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতা মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতা দখলে সহায়তা দেয়। অবশ্য নির্বাচনের মাধ্যমেই।
মুরসি ক্ষমতায় বসেই নিজমূর্তি ধারণ করেন। তিনি নির্বাচন প্রতিশ্রুতি ভেঙে নারী স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেন। ধর্মের নামে বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করেন। প্রশাসন দলীয়করণ শুরু করেন এবং মিসরের বহু শতাব্দীর সেক্যুলার কালচার ধ্বংসের উদ্যোগ নেন। সেক্যুলার শিবিরের নেতারা এবার আর ঘরে বসে থাকতে পারেননি। তারা মুরসি সরকারের বিরুদ্ধে আবার সেক্যুলার মিসর রক্ষার জন্য রাস্তায় নেমে আসেন। কিন্তু তাদের আগের শক্তি তখন খর্ব। একার শক্তিতে মুরসি সরকারের কঠোর দমননীতি মোকাবেলা করার পরিস্থিতি নেই। ওয়াশিংটন এবার তার নতুন খেলায় নেমে আসে।
সামরিক বাহিনী সেক্যুলার শিবিরের পক্ষাবলম্বন করার ভান করে। সেক্যুলার শিবির এবং গণআন্দোলন প্রতারিত হয়। সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখন করে। নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত ও বন্দি করা হয়। স্বৈরাচারী পতিত ডিক্টেটর মোবারককে বিভিন্ন অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়ে তার কারামুক্তির ব্যবস্থা করা হয়। মিসরের যে 'সুশীল সমাজের' ও মিডিয়ার একটা অংশ আগে গণতন্ত্রের নামে মুসলিম ব্রাদারহুডের নির্বাচন জয়ে সমর্থন ও সাহায্য জুগিয়েছিল, পরবর্তীকালে তারা সেক্যুলারিজমের নামে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলে সমর্থন জোগায়। ওয়াশিংটন প্রথমদিকে ভাব দেখিয়েছিল, মিসরে নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতাচ্যুতিতে তারা সন্তুষ্ট নয়। কিন্তু পরে দেখা গেল, সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখল ও মোবারককে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে না পারলেও মিসরে মোবারক যুগ ফিরিয়ে আনার পেছনে ওয়াশিংটনের পরোক্ষ মদদ রয়েছে।
ওয়াশিংটন বহুদিনের সাধনায় এক গুলিতে দুই পাখি বধ করার সুযোগ লাভ করে। তা হলো, সাদাতের আমলে মৌলবাদীদের খেলিয়ে সেক্যুলার আরব জাতীয়তাবাদ উৎখাতের চেষ্টা সফল করা। অতঃপর মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে সেক্যুলারিস্টদের খেলিয়ে সামরিক বাহিনীর সহায়তায় মৌলবাদীদের ক্ষমতা থেকে উৎখাত এবং শাসন ব্যবস্থায় সাদাত-মোবারক যুগ আবার ফিরিয়ে আনা। দুটি খেলাতেই ওয়াশিংটনের মদদপুষ্ট সুশীল সমাজের এবং মিডিয়ার একটি অংশ কখনও গণতন্ত্রের অনুসারী, কখনও সেক্যুলারিজমের ভক্ত সেজে সাম্রাজ্যবাদী অভিসন্ধি পূরণে সহায়তা জুগিয়েছে।
বাংলাদেশেও মার্কিন কূটনীতির চিত্রটি মিসরের প্রায় অনুরূপ। শেখ মুজিবের বাঙালি জাতীয়তাবাদ চরিত্রে শুধু সেক্যুলার নয়, সাম্রাজ্যবাদবিরোধীও। ফলে শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগ ও তার শাসনের প্রতি আমেরিকা কখনোই প্রকৃত অনুকূল মনোভাব দেখায়নি। মাঝে মধ্যে যেটুকু দেখিয়েছে, তা তার নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধির জন্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরুদ্ধে '৭১ সালে আমেরিকার যে ভূমিকা ছিল, ২০১৪ সালে বিএনপি-জামায়াতের প্রচণ্ড সন্ত্রাসী তৎপরতা সত্ত্বেও সেই সন্ত্রাস দমন দ্বারা বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও সেক্যুলারিজম রক্ষায় আওয়ামী সরকারকে সহযোগিতা না দিয়ে তার বিরোধিতায় ওয়াশিংটন '৭১-এর মতোই একই ভূমিকা নিয়েছে।
মিসরে মুসলিম ব্রাদারহুডের উত্থানের মতো বাংলাদেশে জামায়াতের অভ্যুত্থানে মদদ জুগিয়েছে আমেরিকা। সন্ত্রাসের রাজনীতি এবং যুদ্ধাপরাধের জন্য অভিযুক্ত জামায়াতকে আমেরিকা 'মডারেট মুসলিম গণতান্ত্রিক দল' বলে সার্টিফিকেট দেয়। অনেকের মতো আমার ধারণা, এবার উদ্দেশ্য ছিল বিএনপি ও জামায়াতকে খেলিয়ে বাংলাদেশে সেক্যুলার বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্রের ভিত্তিকে ধ্বংস করা। আওয়ামী লীগকে হটিয়ে বিএনপি-জামায়াতকে ক্ষমতায় বসানো। তারপর সেক্যুলারিজম রক্ষার নামে মৌলবাদী জোটকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে তথাকথিত সুশীল সমাজের প্রতিনিধি স্থানীয় ড. ইউনূস বা ড. কামাল হোসেনের মতো ব্যক্তিদের দ্বারা বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার নামে আফগানিস্তানের কারজাই মার্কা একটি অনির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠা করা। এই সরকার ভারত মহাসাগরে মার্কিন অর্থনৈতিক ও সামরিক আধিপত্যকে সুরক্ষা দেবে।
এই উদ্দেশ্যে ২০০১ সালের মতো ২০১৪ সালেও আমেরিকা ও তাদের মিত্র কতিপয় ইউরোপীয় দেশ বাংলাদেশে তাদের অনুগত সুশীল সমাজ, বিগ এনজিও ও তথাকথিত একশ্রেণীর 'নিরপেক্ষ' মিডিয়াকে গণতন্ত্রের নামে আওয়ামী সরকারের নির্বাচন সংক্রান্ত সর্বপ্রকার কার্যক্রমের বিরোধিতায় ব্যবহার করেছে। তাতে বিএনপি (আড়ালে জামায়াত) ক্ষমতায় এলে তাদের আপত্তি ছিল না। পরবর্তী পর্যায়ে মিসরের মতো এই সুশীল সমাজকেই সেক্যুলারিজম রক্ষার ভূমিকায় নামিয়ে একটি অনির্বাচিত বিগ এনজিও সমর্থিত সরকার প্রতিষ্ঠাই হয়তো লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াত। বাংলাদেশের নবপ্রজন্মের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে ধন্যবাদ। তারা এবার এই ট্র্যাপে পা দেয়নি।
কিন্তু ষড়যন্ত্র এখনও শেষ হয়নি। একটি বড় এবং সম্মিলিত ষড়যন্ত্র কেবল ব্যর্থ হয়েছে। মনে হয় গোটা দক্ষিণ এশিয়াতেই একটি নতুন স্নায়ুযুদ্ধের মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। এই যুদ্ধে মার্কিন নেতৃত্বে সম্ভবত থাকবে ইউরোপীয় কতিপয় দেশ, পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং মধ্যপ্রাচ্যের আরও দু'একটি দেশ। অন্যদিকে থাকবে ভারত, চীন, রাশিয়া, ব্রাজিল এবং আরও ছোট-বড় দু'একটি দেশ। বাংলাদেশের ওপরই এই ঝড়ের প্রথম ঝাপটা আঘাত হানতে পারে। এবারের হাসিনা সরকারকে তাই অনেক বেশি সতর্ক ও সজাগ থাকতে হবে। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তি যেমন বাড়াতে হবে, তেমনি দেশের ডান ও বামের সব গণতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। একমাত্র ঐক্যবদ্ধ গণপ্রতিরোধই একটি গণতান্ত্রিক দেশকে আসল সুরক্ষা দিতে পারে। এ কথাটি রেটোরিকের মতো শোনালেও এ যুগে এর চেয়ে বড় সত্য আর কিছু নেই। শেখ হাসিনা কঠোর হোন। দেশের ভেতরে-বাইরের শত্রু ও মিত্রদের বাছাই করে মিত্রদের পাশে শক্তভাবে দাঁড়ান। ১৯৭১ সালের মতোই বাংলাদেশের স্বাধীনতার দেশি ও বিদেশি শত্রুরা আবার পরাজিত হবে বলে আমার দৃঢ়বিশ্বাস। ২০১৪ সালের নির্বাচনটি তারই সূচনা হোক।
পুনশ্চ :লেখাটি শেষ করে এনেছি এমন সময় খবর পেলাম, উপমহাদেশের চলচ্চিত্র জগতের কিংবদন্তি নায়িকা সুচিত্রা সেন দীর্ঘ রোগভোগের পর প্রয়াত হয়েছেন। তাকে বলা হতো এশিয়ার স্ক্রিনের গ্রেটা গার্বো। এই মহানায়িকা ও একজন শ্রেষ্ঠ শিল্পীর প্রয়াণে তার প্রতি একজন ভক্ত হিসেবে শ্রদ্ধা জানাই।
লন্ডন, ১৭ জানুয়ারি শুক্রবার, ২০১৪

খালেদা জিয়ার পুলিশ প্রটেকশন বহাল আছে

বিরোধীদলীয় নেতার পদ হারালেও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নিরাপত্তা ব্যবস্থায় তেমন কোনো পরিবর্তন করা হয়নি। 'রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি' বিবেচনায় তার পুলিশ প্রটেকশন ও প্রটোকল বহাল রাখা হয়েছে। তার বাসায় এবং চলাচলের সময়ে নিরাপত্তার ব্যবস্থা আগের মতোই রয়েছে। তবে নিরাপত্তা ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে মাঝেমধ্যে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যের সংখ্যা বাড়ানো বা কমানো হয়। সমকালের পক্ষ থেকে পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য মিলেছে। এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসনের নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা বলেছেন, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশের সংখ্যা কমানো হয়েছে। এ কারণে তারা নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছেন। পাশাপাশি নিরাপত্তার জন্য আনসার সদস্য চেয়ে সংস্থাটির সদর দফতরে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার চৌধুরী লুৎফুল কবীর সমকালকে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে বিএনপি চেয়ারপারসনের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো ত্রুটি রাখা হয়নি। তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা আগের মতোই রয়েছে। গুলশান থানার ওসি রফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, গুলশান ২ নম্বর সেকশনের ৭৯ নম্বর সড়কে খালেদা জিয়ার বাসায় ১৪ থেকে ১৫ জন পুলিশ সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন। বরাবর এই সংখ্যক পুলিশ সদস্যই সেখানে মোতায়েন ছিল। তবে মাঝে বিএনপি নেত্রীর নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকায় তার বাসার সামনে বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হয়। সময়মতো আবার তা সরিয়েও নেওয়া হয়।
পুলিশের প্রটোকল অ্যান্ড প্রটেকশন শাখার অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আবদুল্লাহ আল মামুন সমকালকে বলেন, বিরোধীদলীয় নেতার পদে না থাকলেও বিএনপি চেয়ারপারসনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আগের মতোই রয়েছে। তার প্রটেকশন বা প্রটোকল প্রত্যাহার করা হয়নি। তার বাসভবনের নিরাপত্তায় সেখানে আবাসিকভাবে পুলিশ সদস্যদের রাখা হয়েছে। পাশাপাশি তার চলাচলের সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও প্রটোকল রয়েছে। নিরাপত্তার দায়িত্বে বর্তমানে পুলিশের কতজন সদস্য রয়েছেন_ জানতে চাইলে অতিরিক্ত উপ-কমিশনার বলেন, এটা বিভিন্ন সময়ে কমবেশি হয়ে থাকে। নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি বিশ্লেষণ করে কখনও তা কমানো, আবার কখনও বাড়ানো হয়। তবে নিরাপত্তার স্বার্থেই সংখ্যাটি প্রকাশ না করা ভালো।
এদিকে, বিএনপি চেয়ারপারসনের নিরাপত্তা সমন্বয়ক লে. কর্নেল (অব.) আবদুল মজিদ সমকালকে বলেন, নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে। আগে ২৪ জন পুলিশ সার্বক্ষণিক বাসার সামনে নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত ছিল। বর্তমানে সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন ১২ জন পুলিশ সদস্য। এ ছাড়া খালেদা জিয়া বাসা থেকে কোথায়ও গেলে তার গাড়িবহরের সঙ্গে আগে দায়িত্ব পালন করত ১৬ জন পুলিশের একটি দল। বর্তমানে তা অর্ধেক করে আটজনে নামিয়ে আনা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দলের উদ্যোগে নিরাপত্তা জোরদারের জন্য আনসার সদস্য চাওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে আনসার সদর দফতরে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। কবে নাগাদ আনসার দেওয়া হবে, তা নিশ্চিত করে বলা হয়নি।
লে. কর্নেল (অব.) আবদুল মজিদ বলেন, ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী বাহিনীর সদস্যসংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। শিগগিরই এ বাহিনীতে নতুন সদস্য নেওয়া হবে। এর প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। বর্তমানে চেয়ারপারসনের নিরাপত্তারক্ষী বাহিনীর (সিএসএফ) সদস্যসংখ্যা ২৫ জন। সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও সৈনিকের সমন্বয়ে এই নিরাপত্তারক্ষী বাহিনী গড়ে তোলা হয়েছে। এ ছাড়া চেয়ারপারসনের গুলশানের বাসভবনের সামনের দিকে কয়েকটি ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা বসানো হয়েছে। বিএনপি সূত্র জানায়, এর কয়েকটি পুলিশের উদ্যোগে বসানো হলেও কিছু লাগানো হয়েছে দলীয় তত্ত্বাবধানে। দলীয় প্রধানের নিরাপত্তা জোরদারের জন্যই এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। গত ২৯ ডিসেম্বর খালেদা জিয়া 'গণতন্ত্রের অভিযাত্রা' কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার উদ্দেশে বাসা থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাকে বাধা দেয়। এর আগে থেকেই তার বাসার সামনে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও র‌্যাব সদস্য মোতায়েন করা হয়। এ ঘটনার পর তাকে 'অবরুদ্ধ' করে রাখা হয়েছে বলে দাবি করে বিএনপি। তবে এর মধ্যে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও বিএনপির কয়েকজন শীর্ষ নেতা তার সঙ্গে বৈঠক করেন। নির্বাচনের পর বাড়তি পুলিশ, জলকামান, বালুর ট্রাক ইত্যাদি সরিয়ে নেওয়া হয়।

সীতাকুণ্ডে শিবিরের আস্তানা থেকে বিপুল পরিমাণ বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার

সীতাকুণ্ডে শিবিরের আস্তানা থেকে গতকাল শুক্রবার সকালে বিপুল পরিমাণ বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ সময় বোমা তৈরির কারিগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাথী বলে জানিয়েছে পুলিশ। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে নাশকতা সৃষ্টির জন্য এ বোমা তৈরি করা হচ্ছিল।
পুলিশ জানায়, উপজেলার ভাটিয়ারী মাদামবিবিরহাট খাদেমপাড়া এলাকায় বাচা মিয়া চৌধুরীর ঘর ভাড়া নিয়ে জামায়াত-শিবির আস্তানা গড়ে তোলে। শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে পুলিশ জানতে পারে শিবিরের ৭-৮ জন প্রশিক্ষিত কারিগর সেখানে বোমা তৈরি করছে। এরপর সীতাকুণ্ড মডেল থানার এসআই শফিকুল ইসলাম ও নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে সেখানে অভিযান চালানো হয়। এ সময় ৫-৬ শিবির ক্যাডার পালিয়ে যায় এবং দু'জনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্য মতে, আস্তানা থেকে বোমা তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করে পুলিশ।
উদ্ধার করা সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে_ এক কেজি গান পাউডার, আধাকেজি পটাশিয়াম, ২শ' গ্রাম ফসফরাস, আধাকেজি ছোট সাইজের তারকাঁটা, লাল স্কচটেপ মোড়ানো বড় ৫টি ককটেল বোমা, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ৭টি মোবাইল সেট, ২০টি সিম, ১০টি স্কচটেপ, ১০টি পাথরের টুকরা, ৩৪টি জর্দার কৌটা, ২টি বড় কিরিচ (রামদা), লোহার পাইপ, ছোট-বড় ৫টি চাকু, ৩টি জ্যামিতি বক্স, প্যারারেট রকেট, ২টি কম্পিউটার, কাঁধে ঝোলানো ৬টি ব্যাগ, নিষিদ্ধ জিহাদি বই, কলেজের কয়েকটি আইডি কার্ড ইত্যাদি।
গ্রেফতার শিবির ক্যাডাররা হলো_ আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র ওয়ালি উল্লাহ। সে নওগাঁর মান্দা উপজেলার বালুবাজার চক কেশব মাস্টারবাড়ী এলাকার রুস্তম আলীর ছেলে। অপর জন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের ছাত্র জয়নাল আবেদীন। সে ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার সমবায় বাজার পালগিরি গ্রামের নুর আহমদের ছেলে।
সীতাকুণ্ড মডেল থানার ওসি ইফতেখার হাসান বলেন, মহাসড়কে বড় ধরনের নাশকতা সৃষ্টির লক্ষ্যে তারা ককটেল তৈরি করছিল।

পাঁচ বছরের অর্থনৈতিক কৌশলপত্র তৈরি হচ্ছে by আবু কাওসার

অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা ধরে রাখতে পাঁচ বছর মেয়াদি 'কৌশলপত্র' তৈরির কাজ শুরু করেছে নতুন সরকার। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এ কৌশলপত্র প্রণয়নের নির্দেশ দিয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়কে। নির্দেশ অনুযায়ী কাজ শুরু করেছেন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। শীর্ষ অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, রাজনৈতিক সহিংসতায় হুমকির মুখে পড়া 'অর্থনীতি পুনরুদ্ধার' করাই হবে নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। এর জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তারা। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পিআরইর নির্বাহী পরিচালক ও আইএমএফের সাবেক কর্মকর্তা ড. আহসান এইচ মনসুর সমকালকে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি পুুনরুদ্ধারে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে অর্থমন্ত্রীকে। স্বল্প মেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত বেসরকারি খাতকে উৎসাহ প্রদানের নীতি গ্রহণ এবং মধ্য মেয়াদে বড় বিনিয়োগ প্রকল্প নিয়ে তার যথাযথ বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি। একই মন্তব্য বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থা বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক ড. জায়েদ বখতেরও।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, ৫ বছর মেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশলপত্র তৈরির জন্য মন্ত্রণালয়ের তিন কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাদের এক সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছে। তাদের খসড়া কৌশলপত্র অর্থমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করা হবে। মন্ত্রী দেখার পর তা চূড়ান্ত করে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে। প্রাথমিকভাবে চারটি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে পাঁচ বছরের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন অর্থমন্ত্রী। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক ও প্রেক্ষিত পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কৌশলপত্র প্রণয়নের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। সে সঙ্গে নতুন সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ও বিগত মহাজোট সরকারের বাজেটের অর্জনগুলো বিবেচনা করে কৌশলপত্র তৈরির পরামর্শ দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারক এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, নতুন অর্থনৈতিক কৌশলপত্রে বিগত সময়ের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার সূচকগুলো তুলে ধরা হবে। এ ছাড়া আগের যেসব অঙ্গীকার পূরণ সম্ভব হয়নি, তা কেন সম্ভব হয়নি, তার কারণ ব্যাখ্যা করা হবে। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক ও প্রেক্ষিত পরিকল্পনায় জিডিপির প্রবৃদ্ধি উচ্চতর সোপানে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে বিনিয়োগ বাড়ানোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, দ্বিতীয় মেয়াদে শপথ নেওয়ার দিনই অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। ওই বৈঠকেই পরবর্তী পাঁচ বছরের অর্থনৈতিক কৌশলপত্র প্রণয়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। জানা গেছে, বৃহস্পতিবার অর্থ সচিব ফজলে কবিরের সভাপতিত্বে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে কৌশলপত্র প্রণয়নের লক্ষ্যে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। জিডিপি সংশোধন :রাজনৈতিক অস্থিরতার পরিপ্রেক্ষিতে চলতি অর্থবছরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা জিডিপির লক্ষ্যমাত্রা কমানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র বলেছে, বর্তমান বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে চলতি ২০১৩-১৪ অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ নির্ধারণ করা হবে। ফেব্রুয়ারি মাসে তা সংশোধন করা হবে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবি আগেই জানিয়ে দিয়েছে এ বছর কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জনের সম্ভাবনা নেই।

পাতানো নির্বাচন এবং একব্যক্তিক রাষ্ট্রের প্রশ্ন by মাহফুজ আনাম

১৯৪৯ সালে জন্মের পর থেকে আওয়ামী লীগ তার সব কর্মকাণ্ডে জনগণের ক্ষমতার ওপর নির্ভর করেছে। অথচ সেই দলটি নিষ্ঠুর, নির্দয় এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী সদ্য হয়ে যাওয়া নির্বাচন হাইজ্যাক করেছে এবং শুধু ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য জনগণের ভোটের অধিকারকে অস্বীকার করেছে।
এ নির্বাচনে তথাকথিত বিজয় ছিল পূর্বনির্ধারিত। কারণ, সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে- ৩০০টির মধ্যে ১৫৩ আসনে প্রার্থী জয়ী হওয়ার জন্য একটি ভোটেরও প্রয়োজন হয়নি। এটা যদি পূর্বনির্ধারিত না হয় তাহলে কি? এসব এ নির্বাচনকে পাতানো এবং ফলাফলকে বল প্রয়োগের বিজয়ের খেতাব এনে দিয়েছে। এরপর নতুন সরকার গঠনের বিষয়টি আসে, যা যে কোন নির্বাচনের মূল উদ্দেশ্যে। এ সরকারও গঠন হয়েছে ভোটারদের কোন ধরনের অংশগ্রহণ ছাড়া।

আব্রাহাম লিঙ্কনের সংজ্ঞা যদি আমরা বিশ্বাস করি তবে গণতন্ত্র হচ্ছে, জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা এবং জনগণের জন্য। তাহলে ৫ই জানুয়ারি তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার জনগণের সরকার নয়, জনগণের দ্বারা গঠিতও নয়। এ সরকার  জনগণের জন্য কিনা তাও কেবল ভবিষ্যতই বলতে পারবে।

শেখ হাসিনা যাই করুন না কেন, ৫ই জানুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করেননি। যদিও তিনি সব সময় দাবি করে থাকেন গণতন্ত্রের জন্য তিনি সংগ্রাম করছেন। সাংবিধানিক ধারাবাহিতকতার নামে তিনি এমন একটি নির্বাচনের আয়োজন করেছেন, অফিসিয়াল রেকর্ড অনুযায়ী যে নির্বাচনে ১৪৭ আসনে ভোট পড়েছে ৩৯ শতাংশ। যা গত নির্বাচনে ৩০০ আসনে পড়া ৮৭ শতাংশ ভোটের তুলনায় অনেক কম। এবারের নির্বাচনে ভোট পড়ার যে হারের কথা বলা হয়েছে তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ভোটের দিন ইলেকট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়ায় যে চিত্র দেখা গেছে তাতে ভোটের হার কিছুতেই ১৫ থেকে ২০ ভাগের বেশি হতে পারে না।

৫ই জানুয়ারি নির্বাচনের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে জনগণের বিশ্বাস ধ্বংস হয়ে যাওয়া। গত দুই যুগ ধরে তাদের যে বিশ্বাস জন্মেছিল যে, প্রতি ৫ বছর পর পর তারা কোন ধরনের হস্তক্ষেপ ছাড়াই তাদের মত প্রকাশ করতে পারবেন। এখন এ বিশ্বাস নষ্ট হয়ে গেছে। এটাও প্রমাণ হয়েছে, আমাদের দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের বৈশিষ্ট্যের কারণে তাদের অধীনে কোন অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। তা আওয়ামী লীগ হোক আর বিএনপি-ই হোক।

এখন আমরা একটি মৌলিক সাংবিধানিক প্রশ্ন উত্থাপন করতে বাধ্য হচ্ছি, ৫ই জানুয়ারি নির্বাচন কি এক ব্যক্তিক রাষ্ট্রের জন্ম দেয়নি। সমালোচক হিসেবে নয়, বরং গণতন্ত্রের বন্ধু হিসেবে আমরা প্রধানমন্ত্রীকে তার হাতে থাকা অসীম ক্ষমতার ব্যাপারে সতর্ক করছি। লর্ড অ্যাকটিন এ ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন, ক্ষমতা দুর্নীতির জন্ম দেয় এবং নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নিরঙ্কুশ দুর্নীতির জন্ম দেয়।

আধুনিক রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভ- নির্বাহী বিভাগ, সংসদ এবং বিচার বিভাগ। আজকের দিনে শেখ হাসিনা প্রশ্নাতীতভাবে এবং কার্যকরভাবে দু’টি স্তম্ভ নিয়ন্ত্রণ করেন। সাধারণভাবে রীতি অনুযায়ীই আমাদের দেশে প্রধানমন্ত্রী নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। আইন প্রণয়নকারী বিভাগ-সংসদের নেতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর বিরাট প্রভাব রয়েছে। যদিও সর্বশেষ নির্বাচনের পর নতুন অগ্রগতিও হয়েছে। এমনকি এখন বিরোধী দলও প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বিরোধী দলের একটি অংশ মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছে, আরেকটি অংশ রয়েছে বিরোধী দলে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা এবারই প্রথম ঘটেছে। আমরা সবাই জানি, কিভাবে বিরোধীদলীয় নেতা তৈরি করা হয়েছে। এবং তথাকথিত বিরোধীদল কিভাবে সরকারের মন্ত্রিসভায় আরও স্থান পাওয়ার জন্য দরকষাকষি করছে। এই পরিস্থিতিতে সংসদের ওপরও প্রধানমন্ত্রীর পুরো নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়েছে। বাকি থাকে বিচার বিভাগ। ঐতিহ্যগতভাবেই বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগের প্রভাব থেকে থাকে। উচ্চ আদালতের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা রেখেও বলা যায়, বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগের প্রভাবের কথা কেউই অস্বীকার করতে পারেন না।

আমরা এখন এমন একটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মধ্যে আছি যেখানে সরকারের বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ক্ষেত্রে কোন ধরনের ভারসাম্য নেই। সারা দুনিয়ার অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে রাষ্ট্রের স্তম্ভগুলোর মধ্যে ক্ষমতার বিন্যাসের ওপরই সুশাসন নির্ভর করে। রাষ্ট্রের একটি স্তম্ভের হাতে বেশি ক্ষমতা চলে গেলে তা সরকার ব্যবস্থার জন্য বিপর্যয় ডেকে নিয়ে আসে। সরকার ব্যবস্থায় ভারসাম্য নীতির অভাব আরও অবক্ষয়ের কারণ হতে পারে।

সাধারণ পরিস্থিতিতে কোন দলের সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভ ভবিষ্যতের জন্য বিপর্যয়কর হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় দুই-তৃতীয়াংশের সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভিশাপের ইতিহাস রয়েছে। তিন-চতুর্থাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা, নিয়ন্ত্রণাধীন বিরোধী দল, ভারসাম্যহীন ক্ষমতার অধিকারী নেতার আবির্ভাব এবং এমন কোন প্রতিষ্ঠান না থাকা যা তাকে দায়বদ্ধ করতে পারে, এ অবস্থায় লর্ড অ্যাকটিনের ভবিষ্যৎ বাণী সত্য হওয়ার বড় ঝুঁকি রয়েছে। এটা রেকর্ডে থাক যে, সর্বপ্রথম সতর্কঘণ্টা আমরাই বাজিয়েছিলাম।

কার হাসি কে হাসে?

২০০১ সালের নির্বাচনের আগে দুটো প্রধান শিবিরই এরশাদের জাতীয় পার্টিকে নিজেদের জোটে নিতে সক্রিয় ছিল। এর আগে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পর তিনি আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় যেতে সমর্থন দেন। বিনিময়ে তাঁর পাঁচ বছরের বন্দিজীবনের আপাতসমাপ্তি ঘটে। তবে সে সরকারের মেয়াদকালেই জনতা টাওয়ার মামলায় দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত হন তিনি। তাই ২০০১ সালে অভিমানে আওয়ামী লীগের দিকে হাত বাড়াননি। আস্থা-অনাস্থার দোলাচলে যাননি সরাসরি অপর পক্ষের দিকেও। ভেবেছিলেন ঝুলন্ত সংসদ হবে। তাঁর দল হবে ক্ষমতার নির্ণায়ক। যেমন কিছুটা হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। সে প্রত্যাশায় ওই বছরে এককভাবেই প্রার্থী দেন। বারবার ঘোষণা করেন, শেষ হাসি তিনি হাসবেন। হাসতে পারেননি তিনি। সেই নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়েই চারদলীয় জোট সরকার গঠন করে। ২০০৭ সালের নির্ধারিত নির্বাচনের আগে মহাজোটের সঙ্গে করেন আঁতাত। সে নির্বাচনটি হয় ২০০৮ সালের শেষে। জানা যায়, মহাজোট নির্বাচিত হলে তাঁকে রাষ্ট্রপতি করাসহ আরও কিছু দাবি ছিল তাঁর। মহাজোটই বিজয়ী হয়েছিল। মহাজোটের ছিল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। তাই তারা এসব দাবি মেটানোর কোনো গরজই অনুভব করেনি।
সেবারেও তিনি তাঁর সে ঈপ্সিত হাসি হাসতে পারেননি। ক্ষুব্ধ ছিলেন বরাবর। সমঝোতা ও মোকাবিলা দুই ধরনের নিয়েই মহাজোটের সঙ্গে চলেছেন। বারবার নেতা-কর্মীদের বলেছেন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁর দল এককভাবে অংশ নিয়ে জয়লাভ করবে। গঠন করবে সরকার। ‘শেষ হাসির’ কথা উল্লেখ না করলেও বক্তব্যের সুর অনেকটা সে ধরনের ছিল। কিন্তু দশম সংসদ নির্বাচনের সময়সীমা ঘনিয়ে আসতেই তিনি ডিগবাজিতে নেমে পড়েন। তাঁর ডিগবাজির সঙ্গে দেশবাসীর পরিচয় দীর্ঘদিনের। উল্লেখ্য, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার সময় সেনাপ্রধান ছিলেন এরশাদ। খবর পেয়েই অসুস্থ উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাত্তারকে হাসপাতাল থেকে এনে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিতে মুখ্য ভূমিকা ছিল তাঁর। আরও ভূমিকা রেখেছিলেন, যাতে তিনি (বিচারপতি সাত্তার) দলের মনোনয়ন লাভ করেন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে। তা-ই ঘটেছিল। রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি সাত্তার। দ্রুত ভোল পাল্টে যায় এরশাদের। তিনি গণমাধ্যমে বিবৃতি দিতে থাকেন সামরিক বাহিনীকে ক্ষমতার অংশীদার করার দাবিতে। এক অন্ধকার রাতে বন্দুকের নলের মুখে নিজেই নিয়ে নেন রাষ্ট্রক্ষমতা। তবে সামরিক বাহিনীকে ক্ষমতার অংশীদার করেননি তিনি।
করেছিলেন তাঁর আস্থাভাজন কিছু সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তিকে। তখনো বহু নাটক দেখেছে দেশবাসী। তারা জানল, তাদের রাষ্ট্রপতি একজন কবি আর প্রেমিকও বটে। ‘কবি’ এরশাদ কবিতা লিখে পীড়িত করেছেন জাতিকে। ‘প্রেমিক’ হিসেবে ভেঙেছেন বেশ কিছু সুখের সংসার। পাশাপাশি দেশবাসীকে দিয়েছেন গণতন্ত্রের নতুন পাঠ। দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলকে বিপরীতমুখী রেখে ক্ষমতার বলয় টিকিয়ে রাখেন লম্বা সময়। কিন্তু একসময় অঘটন ঘটে যায়। অবশ্য অঘটন তাঁর জন্য। জাতির ঘটে রাহুমুক্তি। এর পরপর তাঁকে দীর্ঘ কারাবাস করতে হয়। মোকাবিলা করতে হয় অনেক মামলার। আবার প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের চরম বিপরীতমুখী অবস্থানের সুযোগ নিতে থাকেন তিনি। একবার এদিক, একবার সেদিক করে নিজের প্রয়োজনীয়তা ধরে রাখতে সফলও হন। আর সরকারপক্ষের দুর্বল প্রচেষ্টায় তিনি উভয় দলের সরকারের সময়ই বেশ কিছু মামলা থেকে মুক্তি পেয়ে যান। দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচনের বেশ আগে থেকেই বরাবরের মতো তিনি বিভিন্ন রকম অবস্থান নিতে থাকেন। কখনো মহাজোট ছাড়ার হুমকি আবার কখনোবা তাদের সঙ্গে চিরদিনের বন্ধনের কথাও বলতে থাকেন তিনি। তবে সর্বশেষ দুই মাসে মানুষ দেখেছে তাঁর নানা নাটক। একবার বললেন, সব দলসহ নির্বাচন না হলে তিনি তাতে যাবেন না। জনগণ থুতু দেবে। আবার কদিন বাদেই বলতে শুরু করেন, নির্বাচনে না গেলে জনগণ সব দলকেই থুতু দেবে। মহাজোট থেকে বেরিয়ে এসে দলীয় প্রার্থীদের মনোনয়ন দেন তিনি।
দাখিল করেন মনোনয়নপত্র। এমনকি নির্বাচনকালীন সরকারে নিজ দলের বেশ কয়েকজন সদস্যকে মন্ত্রী বা উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয় তাঁর সুপারিশে। হঠাৎ আবার নির্বাচন থেকে সরে আসার ঘোষণা দেন। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার আর নির্বাচনকালীন সরকার থেকে সরে আসার লোক দেখানো চেষ্টাও চলে। অবশ্য তাঁর কথায় বিশ্বাস রেখে বেশ কিছু প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। তবে মানুষ ধাঁধায় ছিল। একপর্যায়ে ১১ ডিসেম্বর রাতের বেলায় র‌্যাব তাঁকে সিএমএইচে ‘নিয়ে যায়’। বলা হয়, তিনি অসুস্থ। চিকিৎসার জন্য তাঁকে তথায় নেওয়া হয়েছে। সেখানেই ছিলেন ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত। সেখান থেকে তাঁর মাঝেমধ্যে গলফ খেলার খবরও আসত। আবার তাঁর একজন মুখপাত্র দাবি করতে থাকেন, এরশাদকে আটকে রাখা হয়েছে। তিনি নির্বাচনে অংশ না নিতে সংকল্পবদ্ধ। তাঁর দলীয় প্রতীক লাঙ্গল কাউকে বরাদ্দ না দিতে তিনি সিইসিকে একটি চিঠিও দেন। কিন্তু তাঁকেসহ তাঁর দলের সবাইকে সে প্রতীক দেওয়া হয় রওশন এরশাদের সুপারিশে। প্রধান বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ব্যতিরেকে নির্বাচনে যা হওয়ার, তা-ই হলো। নির্বাচনপর্ব শেষ হয় ৫ জানুয়ারি। এরশাদসহ তাঁর দল লাভ করল ৩৩টি আসন। এরশাদ তাঁর ভাষায় ‘বর্জন করা’ নির্বাচনে সাংসদ হলেন। দাখিল করা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের ‘আবেদনও করেছিলেন’ তিনি। তা সত্ত্বেও সাংসদ যখন হয়েই গেছেন,
তা টিকিয়ে রাখতে শপথ গ্রহণ করতে হয়। প্রথম দিন দলের সঙ্গে যাননি। দলটির সংসদীয় নেতা নির্বাচিত হলেন রওশন এরশাদ। সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুসারে স্পিকার তাঁকে বিরোধী দলের নেতা বলে বিজ্ঞপ্তিও জারি করেছেন। এগুলো কতটা এরশাদের ইচ্ছায় কিংবা দলের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহে, তা নিয়ে ভিন্নমত আছে। তবে অন্যদের শপথ দেওয়ার পরদিন জানা গেল, সিএমএইচ থেকে এরশাদ চুপিচুপি এসে সাংসদ হিসেবে শপথ নিয়ে আবার সেখানেই চলে যান। প্রশ্ন আসছে, চুপিচুপি শপথ নিতে হবে কেন? উত্তরটাও সবার জানা। গণমাধ্যমের নজর এড়াতে। তাদের নজরে এলেই হাজার প্রশ্ন হবে—নির্বাচন বর্জন, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার, দলীয় সদস্যদের নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নাটক আর বর্জন করা নির্বাচনে বিজয়ের জাদুর কাঠি নিয়ে। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসবে, তাঁঁর কথিত অসুস্থতা ও র‌্যাবের সহায়তায় সিএমএইচে যাওয়া নিয়েও। সুতরাং যতক্ষণ সম্ভব বা প্রয়োজন, ততক্ষণ তাদের নজর এড়িয়ে থাকতে পারলেই মঙ্গল। কিন্তু তারা নাছোড়বান্দা। তাঁর সঙ্গে দেখা হোক আর না-ই হোক, সংবাদ সংগ্রহ করে চলছে প্রতিযোগিতা করে। আর সেসব সংবাদ স্বাভাবিকভাবেই তাঁর ক্রমাগত ডিগবাজি খাওয়া অতীতকে সামনে নিয়ে আসছে। জাতীয় জীবনের স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করতে তিনি পছন্দ করেন। এতে জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও লাভবান হয়েছেন তিনি। যেমন সংবিধানে রাষ্ট্রধর্মের বিধান সংযোজন আর সরকারি ছুটির দিন পরিবর্তন।
পীর-দরবেশদের দরবারে আসা-যাওয়াও তিনি সুযোগ পেলেই করেন। উদ্দেশ্য একটিই—তাঁদের সমর্থন নিজের দিকে টেনে আনা। সম্প্রতি হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচির প্রতি নৈতিক ও বৈষয়িক সমর্থন দিয়েছেন। নিয়েছেন তাঁদের কারোর দোয়া আর কারও বা বদদোয়া। কিন্তু এখন সাংসদ হিসেবে সে কর্মসূচি গ্রহণের জন্য সংসদে কি তিনি একটি সিদ্ধান্ত প্রস্তাব আনবেন? তাঁর অতীত অন্তত বলে, তিনি তা করবেন না। আর যদি করেনই, তাঁর দলের সমর্থন পাবেন বলে মনে হয় না। বিশেষ করে দলটি সরকারের অংশ হওয়ায় এ ধরনের কর্মসূচির সমর্থন দেওয়ার সুযোগই নেই। পরিশেষে এল ১২ জানুয়ারি। বঙ্গভবনের দরবার হলে নতুন মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ। সে মন্ত্রিসভায় তাঁর দল থেকে একজন কেবিনেট মন্ত্রী ও দুজন প্রতিমন্ত্রী নেওয়া হয়। সেদিনই এক গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তিনি হন মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। ‘ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স’-এর বিধান অনুসারে তাঁর মানক্রম হবে মন্ত্রীর এক ধাপ নিচে। অবশ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি মানক্রমে মন্ত্রীর অনেক ওপরে। সুতরাং, নতুন নিয়োগ তাঁর মর্যাদা উন্নীত করেছে, এমনটি বলার সুযোগ নেই। বঙ্গভবনের জনাকীর্ণ দরবার হলে তিনি যখন প্রবেশ করেন, তখন তাঁর মুখ ছিল মলিন। প্রবেশের সময়ে কেউ দেয় করতালি, আর কেউবা হাসি। সে হাসি পরিহাস, কৌতুক কিংবা স্বাগতসূচক—যেকোনোটাই হতে পারে। যেটাই হোক, হেসেছেন অন্যরা। এবারেও তিনি হাসতে পারেননি।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার অধিকার

ইসলাম ধর্মে শাসকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেন কোনো অবস্থাতেই রাষ্ট্রের সংখ্যালঘু অমুসলিম নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা লাভের অধিকার বিঘ্নিত না হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রদত্ত জনকল্যাণময় নীতিমালার আলোকে যাতে অমুসলিমরাও ইহকালীন জীবনে শান্তি ও নিরাপত্তা লাভে ধন্য হতে পারে। কেননা সংখ্যালঘু অমুসলিমদের জানমাল মুসলমানদের নিজের জানমালের মতো পবিত্র আমানত ও নিরাপত্তাযোগ্য। কিন্তু যেখানে মানুষরূপী মানুষের কাছে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্ভ্রমের নিরাপত্তাহীনতা বোধ হয়, তাকে তো আর সভ্য মানুষ বলা যায় না! অথচ বিশ্বমানবতার মুক্তিদূত মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সুস্পষ্ট ভাষায় অমুসলিমদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিধানের জন্য সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছেন, ‘তাদের রক্ত আমাদের রক্তের মতো এবং তাদের ধনসম্পদ আমাদের ধনসম্পদের মতো।’
মদিনা সনদে যে উম্মাহর কথা বলা হয়েছে, তা শুধু মুসলমান সমন্বয়ে সংগঠিত নয়, বরং তা সর্বধর্মের সমন্বয়ে গঠিত। সনদের ২৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘বনু আউফের ইহুদিরা মুমিনদের সঙ্গে একই উম্মাহ। ইহুদিদের জন্য তাদের ধর্ম আর মুসলমানদের জন্য তাদের ধর্ম, তাদের মাওয়ালি বা আশ্রিত এবং তারা নিজেরাও। অবশ্য যে অন্যায় বা অপরাধ করবে সে নিজের এবং তার পরিবার-পরিজনের ক্ষতিই করবে।’ যেমনভাবে মহানবী (সা.) কে উদ্দেশ করে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘(বলুন!) তোমাদের ধর্ম তোমাদের এবং আমার ধর্ম আমার।’ (সূরা আল-কাফিরুন, আয়াত: ৭) মহানবী (সা.) ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের সঙ্গে যে মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষর করেন, এর মূল বিষয়বস্তু ছিল যথাক্রমে: ১. অমুসলিমরা শত্রু কর্তৃক আক্রান্ত হলে মুসলমানেরা তাদের রক্ষা করবে। ২. তাদের ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা হবে না। ৩. তাদের সকল প্রকার নিরাপত্তা দেওয়া হবে। ৪. তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য, সম্পত্তি ও অধিকারের নিরাপত্তা প্রদান করা হবে। ৫. তাদের ধর্ম, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও গির্জা বা উপাসনালয়ের কোনো ক্ষতি করা হবে না। ৬. তাদের কোনো অধিকার ক্ষুণ্ন করা হবে না। ৭. তাদের বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনী প্রেরণ করা হবে না। ৮. ধর্মীয় ও বিচারব্যবস্থায় তাদের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হবে।
মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে অমুসলিম পৌত্তলিক, ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা গোপনে বা প্রকাশ্যে শত্রুতা ও বিরোধিতা করতে শুরু করলেও তিনি অসহিষ্ণুতা প্রদর্শন করেননি। ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে তায়েফবাসীর প্রস্তরের আঘাতে নিজের গায়ের রক্ত ঝরালেন, উহুদের ময়দানে নিজের দাঁত মোবারক শহীদ হলো; কিন্তু তিনি ক্ষোভ প্রকাশ বা অভিশাপ না দিয়ে স্বজাতিকে মাফ করে দিলেন এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। যে বিধর্মী মক্কাবাসী একদা তাঁকে বিভিন্ন দিক দিয়ে নির্মম নির্যাতন করে মদিনায় হিজরত করতে বাধ্য করেছিল, মক্কা বিজয়ের পর তিনি সবার প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন। তাঁর সমগ্র জীবনে এমন অতুলনীয় ক্ষমা ও মহানুভবতার উদাহরণ ভরপুর। তিনি কখনো অমুসলিমদের সঙ্গে অসদাচরণ করেননি, বরং তাঁর সদ্ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে বহু অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তাই অমুসলিমদের সঙ্গে অসদাচরণ, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা-নির্যাতন, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ, জানমালের নিরাপত্তা বিনষ্টকরণ এবং সামাজিক দুর্বৃত্তায়ন, মানবিক বিপর্যয় ও অনিষ্ট সাধনকে সমাজে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করা দরকার। এ জন্য দেশের জনগণকে হতে হবে মানবাধিকার সচেতন। যেন মানুষ আর মনুষ্যত্ব না হারায়; বরং সবাই মনুষ্যত্ব অর্জনে হয়ে ওঠে তৎপর ও সচেষ্ট এবং হূদয়ে গর্জে তোলে মানবতার হাতিয়ার। আবালবৃদ্ধবনিতা, হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান, স্ত্রী-পুত্র-কন্যা, আত্মীয়স্বজন, পরিবার-পরিজন—সবাই সমবেত কণ্ঠে ঘোষণা করুক, ‘ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের কোনো ক্ষতিসাধন করবে না; বরং পারলে অন্যের উপকার করবে!’
কেননা অহেতুক অমুসলিমদের ওপর জোর-জবরদস্তি বা জুলুম-নির্যাতন করা মহাপাপ। এ জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) মুসলমানদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যদি কোনো অমুসলিমের প্রতি অন্যায় করে, তবে আমি কিয়ামতের দিন সেই মুসলমানের বিরুদ্ধে সাক্ষী হবো।’  আবু দাউদ)পৃথিবীতে ধর্মমতের পার্থক্যের কারণে মানুষ মানুষকে হত্যা করছে, ধনসম্পদ লুট করছে, এমনকি মা-বোনদের সম্ভ্রমহানিও পর্যন্ত করছে! একশ্রেণীর মানুষরূপী পশুর উন্মত্ত নাশকতায় নিরীহ সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর জানমালের নিরাপত্তা আজ বিপন্নপ্রায়। অথচ মানুষ যে জাতি-ধর্ম-বর্ণ ও দলমতের অনুসারী হোক না কেন, তাকে সাহায্য-সহযোগিতা করা, বিপদ-আপদ থেকে উদ্ধার করা শান্তিকামী মুসলমানের ইমানি দায়িত্ব ও কর্তব্য। যেহেতু মানবসমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা, সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি ও জাতি-গোষ্ঠীর মিলেমিশে একতাবদ্ধ থাকা নির্ভর করে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের সম্পর্কের ওপর, সেহেতু তাদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও পারস্পরিক সুসম্পর্ক যতটা সহনশীল ও সম্প্রীতিময় হবে, সমাজ-জীবনে ততটাই শান্তি-শৃঙ্খলা ও জানমালের নিরাপত্তা বিরাজ করবে।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, গবেষক ও কলাম লেখক।
dr.munimkhan@yahoo.com

শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ডাক

১৮-দলীয় জোটের প্রধান নেতা ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আর কোনো হরতাল-অবরোধের কর্মসূচি ঘোষণা করেননি। এ জন্য তাঁকে ধন্যবাদ দিতে হয়। কারণ, কয়েক মাস ধরে এই নেতিবাচক কর্মসূচির ফলে বাংলাদেশের জনগণ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে; আন্দোলনের নামে মানুষের প্রাণহানি, ধ্বংসযজ্ঞ, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অচলাবস্থা ও জনজীবনে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টির এই ধারা আর চলতে দেওয়া উচিত নয়। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নয় দিন পর গত বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়া নতুন সরকারকে ‘অবৈধ সরকার’ আখ্যা দিলেও এ সরকারের সঙ্গে সংলাপ ও সমঝোতার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন—এটাকেও আমরা ইতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করতে চাই। কারণ, সংলাপ-সমঝোতা ছাড়া চলমান রাজনৈতিক সমস্যা থেকে উত্তরণের কোনো বিকল্প নেই। সরকারের ‘বৈধতা’র প্রশ্নটির থেকে এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দুই পক্ষের মধ্যে কার্যকর রাজনৈতিক সম্পর্কের সূচনা ঘটানো।
শুধু সংলাপের মাধ্যমেই সেটির সূচনা ঘটানো সম্ভব, যেখানে সমঝোতার মানসিকতা অপরিহার্য। হরতাল-অবরোধের মতো সহিংস কর্মসূচির উল্লেখ না করে খালেদা জিয়া ‘গণতন্ত্রের জন্য শান্তিপূর্ণ আন্দোলন অব্যাহত’ রাখার যে ঘোষণা দিয়েছেন, তাতে আমাদের পরিপূর্ণ স্বস্তি বোধ হয় না। কারণ, তাঁর ভাষায় যে ‘শান্তিপূর্ণ আন্দোলন’ এত দিন চলে এসেছে, তা ‘অব্যাহত’ রাখা হলে জনজীবনে শান্তি ফিরে আসবে না। সবকিছুর আগে এই সহিংস ও ধ্বংসাত্মক আন্দোলনের ধারা বন্ধ করতে হবে। মুখে ‘শান্তিপূর্ণ’ আন্দোলনের কথা বলা আর কার্যত জবরদস্তিমূলক, সহিংস, আতঙ্ক সৃষ্টিকারী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়ে জনজীবনে অচলাবস্থা সৃষ্টি করা স্ববিরোধিতা। বিরোধী জোটের কর্মসূচিগুলোতে যেসব সহিংসতা ঘটেছে, সেগুলোর দায়দায়িত্ব সরকারের ওপর চাপিয়ে বিরোধী জোট দায়মুক্ত থাকতে পারে না। উপর্যুপরি সহিংস কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জনসাধারণের সঙ্গে বিরোধী জোটের যে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হয়েছে, তা দূর করতে বিরোধী জোটের এযাবৎকালের আন্দোলনের ধারা ‘অব্যাহত’ রাখার ভাবনাটি বাদ দিয়ে ‘শান্তিপূর্ণ আন্দোলন’ কথাটির প্রতি আন্তরিকতার প্রকাশ ঘটাতে হবে বাস্তব ক্ষেত্রে।
সরকারকেও দমন-পীড়নের কৌশল পরিত্যাগ করে বিরোধী দলগুলোর সংবিধানপ্রদত্ত অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অজুহাতে বিরোধী জোটকে গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো থেকে বঞ্চিত করা এবং তাদেরকে সম্পূর্ণ কোণঠাসা করে রাখার কৌশল বজায় রেখে সরকার সুষ্ঠুভাবে দেশ পরিচালনা করতে পারবে না। অর্ধেকের বেশি আসনে একেবারেই ভোট না হওয়া এবং অবশিষ্ট আসনগুলোতে প্রধান বিরোধী দলের অংশগ্রহণ না থাকায় নতুন সরকারের রাজনৈতিক বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তি দুর্বল। এই প্রেক্ষাপট স্বীকার করে নিয়ে সরকারকে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক সদাচরণের নীতি গ্রহণ করে সামগ্রিক সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রয়াস নিতে হবে; সর্বোপরি সমঝোতার মানসিকতা নিয়ে সংলাপ শুরু করতে হবে। বিরোধী জোটকে রাজনৈতিক আন্দোলনে বাধা না দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে তা পালনে সহযোগিতা করা সরকারের দায়িত্ব বৈকি।

অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য সমঝোতার তাগিদ

বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানে সমঝোতায় পেঁৗছানোর জন্য সব রাজনৈতিক দলকে আলোচনায় বসার তাগিদ দিয়েছে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট। বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমন্সে বাংলাদেশ নিয়ে এক নির্ধারিত বিতর্কে এমপিরা এ তাগিদ দেন। ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে সহিংসতায় তারা গভীর উদ্বেগ ও হতাশা প্রকাশ করেন। তারা আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান বের করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তারা বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের প্রতি জামায়াতকে সঙ্গে না রাখারও তাগিদ দেন। হাউস অব কমন্সের নিয়মিত অধিবেশনে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে আলোচনা হয়। আলোচনায় ১২ জন এমপি অংশ নেন। তারা বলেন, বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত নির্বাচন নিয়ে নানা অভিযোগ ও প্রশ্ন উঠেছে। দেশের স্বার্থে একটি অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপ চালিয়ে যাওয়া উচিত। তারা বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশটিকে খাদের কিনারায় নিয়ে যাচ্ছে।
সূচনা বক্তব্যে বাংলাদেশ বিষয়ক ব্রিটিশ অল পার্টি পার্লামেন্টারি গ্রুপের চেয়ারম্যান এন মেইন বলেন, ২০০৬ সালে বাংলাদেশে সংঘাতময় পরিস্থিতিতে সামরিক বাহিনী হস্তক্ষেপ করে। দুই বছর প্রধান দুটি দলের নেতাদের রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন বা দেশের বাইরে নির্বাসনে কাটাতে হয়। কিন্তু মনে হচ্ছে, তারা সেই দুরবস্থা থেকে কোনো শিক্ষা নেননি। এবারের নির্বাচনকে কেন্দ্র করেও একই রকম পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, দেশটিতে গণতন্ত্র টেকসই করতে ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া আর্থিক সহযোগিতা কোনো কাজে আসেনি। অবাধ, সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে ব্রিটিশ সরকারের বারবার সংলাপের অনুরোধে রাজনৈতিক নেতারা কর্ণপাত করেননি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বিলোপ বর্তমান সংঘাতের অন্যতম কারণ কি-না_ কনজারভেটিভ পার্টির এমপি রেহমান চিশতির এমন প্রশ্নের জবাবে এন মেইন বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। ২০০৬ সালে তৎকালীন বিরোধী দল (বর্তমানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ) তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে নানা অভিযোগ তুলে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়। সংখ্যালঘু নির্যাতন বিষয়ে এন মেইনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন লেবার পার্টির এমপি জেরেমি করবি। জবাবে এন মেইন বলেন, বাংলাদেশের প্রতিটি সরকারই সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এমপিরা বলেন, বাংলাদেশ ক্রমেই গণতন্ত্রের পথ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব ঘটেনি মন্তব্য করে তারা বলেন, এটি গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার নিন্দা করে অবিলম্বে তা বন্ধে দুই প্রধান দলকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেভিড লিডিংটন বাংলাদেশে নির্বাচন ও রাজনৈতিক সংকটের বিষয়ে ব্রিটিশ সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের বিষয়ে ব্রিটিশ সরকারের মতামত স্পষ্ট করেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং এ বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রয়েছে। এমপিরা বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং র‌্যাবের ভূমিকারও সমালোচনা করেন। র‌্যাবকে 'ঘাতক বাহিনী' অভিহিত করে তারা বিভিন্ন গুম ও খুনের ঘটনার জন্য র‌্যাবকে দায়ী করেন। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের একমাত্র বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এমপি রুশনারা আলি রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানান। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ যথাযথ ছিল বলে মন্তব্য করলেও অনেকেই রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে এটিকে চিহ্নিত করেন। তাদের অনেকেই এ বিচার প্রক্রিয়া ত্রুটিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন এবং মৃত্যুদ ের বিরোধিতা করেন। তারা অবশ্য বিচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত সাক্ষী ও আইনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করারও দাবি জানান। বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করা হলে তা দেশটিতে গোপন উগ্রপন্থার উত্থান ঘটাবে কি-না_ এমন প্রশ্ন করেন রেহমান চিশতি এমপি। জবাবে বাংলাদেশি অধ্যুষিত পপলার এলাকার এমপি জিম ফিটজপ্যাট্রিক বলেন, সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে সব দলের উচিত হবে, জামায়াতকে সঙ্গে না রাখা।

দু'কুলই হারাচ্ছে জামায়াত by রাজীব আহাম্মদ

দু'কুলই হারাতে বসেছে জামায়াতে ইসলামী। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত এক বছর যুদ্ধাপরাধের বিচার কেন্দ্র করে জামায়াত সারাদেশে ভয়াবহ সহিংসতা-নাশকতা চালিয়েছে। ফলে বিদেশিরাও মনে করছে, জামায়াত স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের মর্যাদা আর পেতে পারে না। সন্ত্রাসী দল হিসেবে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানাচ্ছেন তারা। এদিকে দেশের মধ্যে প্রধান মিত্র বিএনপিও জামায়াতের সঙ্গ ছাড়তে পারে বলে শোনা যাচ্ছে। ফলে নাশকতা-সহিংসতার দায়ে জামায়াত দু'কুলই হারাচ্ছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। দেশে-বিদেশে মিত্রহীন হয়ে পড়ছে দলটি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ গতকাল সমকালকে বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সহিংসতার দায়ে জামায়াতকে অভিযুক্ত করায় দলটি একা হয়ে পড়ছে। ইউরোপ যে প্রস্তাব পাস করেছে তাতে পরিষ্কার হয়ে গেছে জামায়াতের সঙ্গে তারা নেই। সহিংসতাকে কেউ সমর্থন করছে না। এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর বীরউত্তম শুক্রবার এক অনুষ্ঠানে বলেন, জামায়াত নিষিদ্ধ হলে আমরা বাঁচি। বিএনপিকে জামায়াত ছাড়ার শর্ত না দিয়ে দলটিকে নিষিদ্ধ করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, যুদ্ধাপরাধের বিচার বন্ধ করা এবং নির্দলীয় সরকারের দাবিতে চালানো সহিংসতায় অন্তত ৬০০ মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। এর জন্য অনেকটাই দায়ী জামায়াত। যানবাহনে অগি্নসংযোগ, ভাংচুর, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলাসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে দলটির বিরুদ্ধে। দলটির অনেকেই মনে করেন, সহিংস আন্দোলনে জামায়াতের অর্জনের চেয়ে ক্ষতিই হয়েছে বেশি। জঙ্গি আদলে হামলা-নাশকতা চালাতে গিয়ে জামায়াতেরও ক্ষতি কম হয়নি। জামায়াতের দাবি, তাদের প্রায় সাড়ে চারশ' নেতাকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। মামলা হয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে। কেন্দ্রীয় অধিকাংশ নেতা এখন জেলে আছেন।
গত বৃহস্পতিবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের পার্লামেন্টে বাংলাদেশ বিষয়ক প্রস্তাব পাস হয়। এতে কারও নাম বলা না হলেও চলমান সহিংসতার জন্য জামায়াতকেই দায়ী করা হয়। এ কারণে দলটিকে নিষিদ্ধ করারও আহ্বান জানানো হয়। সরকারের সঙ্গে সফল সংলাপের জন্য জামায়াতের সঙ্গ ছাড়তে বিএনপির প্রতি আহ্বান জানায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এ আহ্বানের পর বিএনপিও নতুন করে হিসাব করছে। জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করা ছাড়া সরকার তাদের সাথে সংলাপেও বসবে না। এটা সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে বিএনপি জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ছে_ এ রকম গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া একটি বিদেশি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, জামায়াতের সঙ্গে জোট স্থায়ী নয়। গত বুধবার সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়া পরিষ্কার করে না বললেও জামায়াতের সঙ্গত্যাগের ইঙ্গিত দেন। সরকারের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে মধ্যবর্তী নির্বাচনের জন্য ১৮ দল থেকে জামায়াতকে বাদ দিতে বিএনপির অভ্যন্তরেও জোরালো মত রয়েছে। জামায়াতের সঙ্গে জোট থাকলেও যুদ্ধাপরাধের ইস্যুতে বিএনপিসহ বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো জামায়াতের পাশে দাঁড়ায়নি। ধর্মভিত্তিক দলগুলো এ ইস্যুতে জামায়াতকে সমর্থন দেয়নি। সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপে বিএনপি এখন জোটও ভাঙতে পারে। জামায়াত নেতারা মনে করছেন, ঘরে-বাইরে মিত্রহীন কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন তারা।
বাংলাদেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বুদ্ধিজীবী মনে করছেন, জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার সময় এসেছে। এ বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ার বিষয়েও বিএনপির প্রতি চাপ বাড়ছে। টিভি টকশোতে এ বিষয়টি ব্যাপক আলোচিত হচ্ছে। সাবেক কূটনীতিক আশফাকুর রহমান গতকাল গণমাধ্যমকে বলেন, জামায়াত নিষিদ্ধ করতে সুপ্রিম কোর্টে সরকারের আবেদন থাকলেও নির্বাচনের আগে-পরে সহিংসতার কারণেই নির্বাহী আদেশে তাদের নিষিদ্ধ করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সহিংসতায় জড়িতদের নিষিদ্ধের যে আহ্বান জানায় তাকে বাস্তবসম্মত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে বিএনপি জোট ভাঙতে পারে এ আশঙ্কায় হতাশ জামায়াত। দলটির মজলিসে শূরার সদস্য রেজাউল করিম বলেন, 'সরকার সংলাপের ব্যাপারে নূ্যনতম আন্তরিক নয়। যদি আন্তরিক হতো তাহলে এমন অবাস্তব শর্ত দিত না। বিএনপি কার সঙ্গে জোট করবে বা করবে না, এটা বিএনপির বিষয়।' শিবিরের এ সাবেক সভাপতি বলেন, আওয়ামী লীগ ইংরেজদের মতো 'ভাগ করো ও শাসন করো' নীতি নিয়েছে। বিএনপি-জামায়াতকে আলাদা করে শাসন করার নীতি নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রেরও জামায়াতনীতি বদলে গেছে। গত দেড় দশকে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা বাংলাদেশ সফরে এলে জামায়াতের সঙ্গে বৈঠক ছিল অবধারিত। এখন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জামায়াতের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করছেন না। ২০১২ সালে ড্যান ডবি্লও মজীনার সঙ্গে জামায়াতের তিন দফা পূর্বনির্ধারিত বৈঠক বাতিল হয়। সর্বশেষ গত মে মাসে জামায়াত নেতাদের আইনজীবীদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেন মজীনা।
শুধু দূরত্ব বৃদ্ধি নয়, জামায়াতের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে গেছে। ২০০৩ সালের ৩০ এপ্রিল বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত হ্যারি কে টমাস জুনিয়র জামায়াতকে 'উদারপন্থি গণতান্ত্রিক ইসলামিক রাজনৈতিক দল' হিসেবে বর্ণনা করে। কিন্তু সেই যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে জামায়াত এখন 'ইসলামিক মৌলবাদী' দল। ২০১২ সালের ৬ মার্চ দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ বিষয়ক 'ব্যাকগ্রাউন্ড নোট'-এর সংস্করণে জামায়াতকে এভাবে বর্ণনা করা হয়। তুরস্ক, মিসর, তিউনিসিয়াসহ কয়েকটি দেশে জামায়াতের বন্ধুভাবাপন্ন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় ছিল। জামায়াতের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে এ সরকারগুলোর কার্যকর ভূমিকা ছিল। সূত্র জানায়, জামায়াতের এ শক্তিও হাতছাড়া হয়ে গেছে। এ সরকারগুলোর পতনে জামায়াত আন্তর্জাতিক মানচিত্রে পুরোপুরি একা হয়ে গেছে।
গত বছরের জুলাইয়ে মিসরের ইখওয়ানুল মুসলিমিন সমর্থিত প্রেসিডেন্ট মুহম্মদ মুরসিকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয় সেদেশের সেনাবাহিনী। ইখওয়ান জামায়াতেরই আন্তর্জাতিক সংস্করণ। সর্বশেষ তিউনিসিয়া থেকে এন্নাহাদা সরকারের পতন হয়েছে। জামায়াত নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মিসরে মুরসির পতন জামায়াতকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তুরস্কে জামায়াতের বন্ধুভাবাপন্ন প্রধানমন্ত্রী তাইয়েপ রিসেপ এরদোগানের ক্ষমতা টালমাটাল। দুর্নীতির দায়ে তার তিন মন্ত্রী বিদায় নিয়েছেন। সেনাবাহিনীর সঙ্গে দূরত্ব_ সব মিলিয়ে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত আছেন এরদোগান। বিদেশি সরকারপ্রধানদের একমাত্র তিনিই বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার বন্ধে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন। জামায়াত নেতাদের সাজা না দিতে বাংলাদেশকে চিঠি দেন। বাংলাদেশ সফরে এসেও শেখ হাসিনার কাছে একই দাবি তোলেন। তুরস্কের মতো শক্তিশালী দেশের প্রধানমন্ত্রী এরদোগান নিজেই বিপাকে থাকায় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জামায়াতের মিত্র আরও কমছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

গণজাগরণ মঞ্চের রোডমার্চে দফায় দফায় বোমা হামলা

শুক্রবার বিকেলে বগুড়ার সাতমাথায় গণজাগরণ মঞ্চ লক্ষ্য করে সন্ত্রাসীরা ককটেল বিস্ফোরণ করে
ঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁও অভিমুখে গণজাগরণ মঞ্চের সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসবিরোধী রোডমার্চের গাড়িবহরে দফায় দফায় হাতবোমা হামলা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে বগুড়ার শেরপুরের শেরুয়া বটতলা এলাকায় বোমা হামলায় ছাত্রমৈত্রীর সাধারণ সম্পাদক তানভীর রুসমতসহ তিনজন আহত হয়েছেন। পরে রাত ৮টা ২০ মিনিটের দিকে বগুড়ার বনানী এলাকায় রোডমার্চের গাড়িবহর লক্ষ্য করে আবারও হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এসব হামলায় অর্ধশত বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় দুর্বৃত্তরা। অন্যদিকে বিকেলে বগুড়ার সাতমাথায় রোডমার্চের সমাবেশস্থলের পাশে চারটি হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে।
সাম্প্রদায়িক সহিংসতা রুখে দেওয়ার প্রত্যয় নিয়ে গতকাল সকালে ঠাকুরগাঁও অভিমুখে শাহবাগের প্রজন্ম চত্বর থেকে গণজাগরণ মঞ্চের তিনদিনের রোডমার্চ শুরু হয়। পথে বিভিন্ন স্থানে পথসভা করেন মঞ্চের নেতাকর্মীরা। এ সময় পথসভায় বিভিন্ন এলাকার শত শত মানুষ অংশগ্রহণ করেন। বগুড়ার সমাবেশস্থলে বিকেলে হামলার বিষয়ে সিরাজগঞ্জের সমাবেশে মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার বলেন, বোমা মেরে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন থামানো যাবে না। আমরা সর্বশক্তি দিয়ে সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীকে প্রতিহত করব। বগুড়া ব্যুরো/শেরপুর প্রতিনিধি জানান, সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে শেরপুরের শেরুয়া বটতলা এলাকায় মঞ্চের গাড়িবহর লক্ষ্য করে হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটায় দুর্বৃত্তরা। তবে শেরপুর থানার ওসি আবু হাশেম বলেছেন, ককটেল নয়, ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে।
পরে রোডমার্চের গাড়িবহর রাত ৮টা ২০ মিনিটের দিকে বগুড়ার বনানী এলাকায় পেঁৗছলে আবারও হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটায় দুর্বৃত্তরা। এ সময় ২০/২৫টি হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। রাত ৮টা ৪০ মিনিটের দিকে রোডমার্চের গাড়িবহর বগুড়া পেঁৗছায়। পরে শহরের সাতমাথায় এক সমাবেশে গণজাগরণ মঞ্চকে বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ের মঞ্চ উল্লেখ করে ডা. ইমরান এইচ সরকার বলেন, বোমা মেরে, হামলা করে, হত্যা করে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন কখনও স্তব্ধ করা যাবে না। তিনি বলেন, হেফাজত আর জামায়াত ধুলোয় মিশে গেছে। গণজাগরণ মঞ্চ সেই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমরা যখন প্রতিবাদ করতে শিখেছি তখন দেশে আর অন্যায়, অবিচার ও সাম্প্রদায়িকতাও থাকবে না। গণজাগরণ মঞ্চের বগুড়ার সমন্বয়কারী মুক্তিযোদ্ধা মাসুদার রহমান হেলালের সভাপতিত্বে সমাবেশে লাকী আক্তারও বক্তৃতা করেন। ডা. ইমরান এইচ সরকার অভিযোগ করেন, বগুড়ায় পেঁৗছার আগে জেলার শেরপুর উপজেলার শেরুয়া বটতলা এবং শাজাহানপুর উপজেলার বনানী এলাকায় রোডমার্চের গাড়িবহর লক্ষ্য করে অর্ধশত ককটেল নিক্ষেপ করা হয়। সমাবেশ শেষে গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীরা রাতে বগুড়াতেই অবস্থান করেন এবং আজ শনিবার সকালে গাইবান্ধার উদ্দেশে রওনা হবেন। গণজাগরণ মঞ্চের সমাবেশ উপলক্ষে গতকাল শুক্রবার বিকেল থেকে সমাবেশস্থল সাতমাথার আশপাশের সব সড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দেয় পুলিশ। এ ছাড়া মোড়ে মোড়ে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পাশাপাশি গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীরাও নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তোলে।
এর আগে বিকেল পৌনে ৫টার দিকে বগুড়ায় সাতমাথায় গণজাগরণ মঞ্চের সমাবেশস্থলের দুটি প্রবেশমুখে চারটি হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এতে কেউ হতাহত না হলেও গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীদের গণপিটুনিতে ৪ যুবক আহত হয়েছে। তাদের মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৩ জনকে পুলিশ আটক করেছে। হামলাকারীরা অবস্থান করছে সন্দেহে সমাবেশস্থলের পাশে 'টিআর ট্রাভেলস্' নামে একটি পরিবহন কাউন্টারেও ভাংচুর করেন মঞ্চের কর্মীরা। বিক্ষোভ মিছিলে কর্মসূচি শুরু : রোডমার্চ শুরুর আগে শাহবাগ এলাকায় বিক্ষোভ করেন গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীরা। এর আগে মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার সাংবাদিকদের বলেন, গণজাগরণ মঞ্চ তিন দফা দাবিতে এ রোডমার্চ কর্মসূচি পালন করছে। দাবিগুলো হচ্ছে_ সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস রোধে আলাদা আইন করা, এ পর্যন্ত সংঘটিত ঘটনায় দায়ীদের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচার করা এবং আক্রান্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া।
তিনদিনের এ কর্মসূচিতে প্রথম দিনে শাহবাগ থেকে বের হয়ে আশুলিয়ায় ফ্যান্টাসি কিংডমের সামনে সকাল ১১টার দিকে প্রথম পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। এ পথসভায় ডা. ইমরান বলেন, 'উত্তরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি এলাকায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হয়েছে। তাই আমরা নিপীড়িত সেই মানুষের পাশে দাঁড়াতে সেখানে ছুটে যাচ্ছি। যে রাজনৈতিক গোষ্ঠী নির্বাচনকে বয়কট করেছে, নির্বাচন বর্জন করতে বলেছে, তারা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে এ সাম্প্রদায়িক হামলা চালিয়েছে এবং এখনও অব্যাহত রেখেছে।'
কালিয়াকৈর (গাজীপুর) প্রতিনিধি জানান, দুপুরে কালিয়াকৈরের চন্দ্রা ত্রিমোড়ে গণজাগরণ মঞ্চের রোডমার্চের পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। কালিয়াকৈর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার ডা. শাহাবুদ্দিন আহসানের সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য রাখেন ডা. ইমরান এইচ সরকার, কালিয়াকৈর হিন্দু কল্যাণ ট্রাস্টের সভাপতি অজিত কুমার সাহা, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি রেজাউল করিম রাসেল, গণজাগরণ মঞ্চের প্রধান সমন্বয়ক শহিদুল ইসলাম, আবুল কাশেম, এনায়েত হোসেন, রফিকুল ইসলাম, ঊষারঞ্জন কোচ, ইসমাইল হোসেন, আসাদুজ্জামান আসাদ প্রমুখ।
টাঙ্গাইল প্রতিনিধি জানান, ঠাকুরগাঁও অভিমুখে গণজাগরণ মঞ্চের রোডমার্চ বিকেল ৪টার দিকে টাঙ্গাইল অতিক্রম করে। গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার টাঙ্গাইলের জামুর্কি, রাবনা বাইপাস ও এলেঙ্গায় পথসভায় বক্তব্য রাখেন। এর আগে রোডমার্চের গাড়িবহর টাঙ্গাইল সদর উপজেলার রাবনা বাইপাসে এসে পেঁৗছলে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি সানিয়াত খান বাপ্পা, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এলেন মলি্লকসহ টাঙ্গাইল গণজাগরণ মঞ্চের নেতারা তাদের স্বাগত জানান। সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, গণজাগরণ মঞ্চের ঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁওমুখী রোডমার্চ বিকেল ৪টায় বঙ্গবন্ধু সেতু অতিক্রম করার পর সেতুর পশ্চিমপাড়ে রোডমার্চের গাড়িবহরকে স্বাগত জানায় এলাকাবাসী। পরে তাদের বহনকারী গাড়িবহর শহরের বাজার স্টেশন মুক্তির সোপান মঞ্চে উপস্থিত হয়। সেখানে ঘণ্টাব্যাপী সমাবেশ শেষে রোডমার্চ বগুড়ার উদ্দেশে সিরাজগঞ্জ ত্যাগ করে। সিরাজগঞ্জ গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বায়ক শেখ খালিদ সাইফুল্লাহ সাদির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে ডা. ইমরান এইচ সরকার ছাড়াও বক্তব্য দেন সিরাজগঞ্জ-২ আসনের সাংসদ হাবিবে মিল্লাত মুন্না, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আবু ইউসুফ সূর্য, কেএম হোসেন আলী হাসান, নাজমুল হাসান মুকুল, নবকুমার কর্মকার, আসাদ উদ্দিন পবলু, আশরাফুল ইসলাম জগলু চৌধুরী, জিহাদ আল ইসলাম, জাকির হোসেন প্রমুখ ।

উপজেলা নির্বাচনে যাবে বিএনপি by লোটন একরাম

জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করলেও উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে অংশ নেবে বিএনপি। কোনো অবস্থায় ক্ষমতাসীন দলকে 'খালি মাঠে' গোল করতে দেবে না তারা। মধ্যবর্তী সংসদ নির্বাচন হবে_ এমনটি ভেবেই মাঠ দখলে রাখতে উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিয়ে 'ওয়ার্মআপ' করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। নির্বাচনে সারাদেশের প্রতিটি উপজেলায় চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান পদে একক প্রার্থী দেবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট। শিগগির দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দলের বৃহৎ স্বার্থে প্রতিটি উপজেলায় একক প্রার্থী দেওয়ার ব্যাপারে মাঠ নেতাদের কাছে নির্দেশনা পাঠাবেন। সর্বশেষ পাঁচ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের মতো উপজেলা নির্বাচনেও বিপুল বিজয় অর্জনের লক্ষ্যে পরিকল্পিতভাবে ভোটযুদ্ধে লিপ্ত হতে চায় তারা। ইতিমধ্যে প্রাক-প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমও শুরু করেছে জোটটি। দশম সংসদ নির্বাচন প্রতিহত করতে না পেরে হতাশায় নিমজ্জিত নেতাকর্মীরা এ নির্বাচনকে সামনে রেখে নড়েচড়ে বসতে শুরু করেছেন। শিগগির কেন্দ্রীয় নেতারা জেলা সফরে গিয়ে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের আন্দোলনের পাশাপাশি উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে 'গ্রিন সিগন্যাল' দিয়ে আসবেন। একইসঙ্গে তফসিল ঘোষণার পরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে দলীয় অবস্থান জানাবে বিএনপি। অবশ্য কেন্দ্রীয়ভাবে বর্জনের কথা বলে নেপথ্যে মাঠ নেতাদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়ার কৌশল নিতে পারে দলটি। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান সমকালকে
বলেন, বিএনপি একটি নির্বাচনমুখী দল। তবে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করেছে। বিএনপির সঙ্গে একমত পোষণ করে জনগণও ভোটকেন্দ্রে যায়নি। মাঠপর্যায়ের রাজনীতির ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইতিমধ্যে সিটি করপোরেশন, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের মতো স্থানীয় সরকারের কয়েকটি নির্বাচনে বিএনপি নেতারা অংশ নিয়েছেন। বিপুল ভোটে বিজয়ীও হয়েছেন অনেকে। তবে তাদের মতে, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের 'আজ্ঞাবাহী' ভূমিকায় তাদের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে দলীয় ফোরামে আলোচনার মাধ্যমে সার্বিক বিষয় হিসাব-নিকাশ করে উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেওয়া ও না নেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হবে বলে জানা গেছে।
বিএনপির প্রচার সম্পাদক জয়নুল আবেদীন ফারুক সমকালকে বলেন, উপজেলা নির্বাচনের ব্যাপারে এখনও তফসিল ঘোষণা করা হয়নি। তফসিল ঘোষণা হওয়ার পর বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে দলীয় ফোরামে আলোচনা করে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানাবে।
আগামী রোববার নির্বাচন কমিশনের বৈঠকে উপজেলা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হবে। তবে সব উপজেলায় একসঙ্গে নির্বাচন হবে না। মেয়াদোত্তীর্ণ সর্বোচ্চ একশ' উপজেলায় একসঙ্গে নির্বাচন হবে। সারাদেশে ৪৮৭টি উপজেলা রয়েছে। এর আগে ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার গঠনের পর ২২ জানুয়ারি উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট সমর্থিত নেতারা নির্বাচনে অংশ নিলেও বেশিরভাগ উপজেলায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সমর্থিতরাই বিপুলভাবে বিজয়ী হন। তবে স্থানীয় সরকারের নির্বাচনের মধ্যে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় বিএনপি জোটের প্রার্থীরা বেশি বিজয়ী হন। বিশেষ করে রাজশাহী, বরিশাল, খুলনা, সিলেট ও গাজীপুরের সবগুলোতে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা বিজয়ী হন। এর আগে চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা সিটি নির্বাচনেও মেয়র পদে নির্বাচিত হন বিএনপি নেতারা। শুধু নারায়ণগঞ্জ ও রংপুরে আওয়ামী লীগ সমর্থিত নেতারা মেয়র পদে জয়ী হন। এ ছাড়া ঢাকা সিটি করপোরেশনকে ভাগ করে দুটি করা হলেও নির্বাচন হয়নি। প্রশাসক দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে করপোরেশন দুটির কার্যক্রম।
সূত্র জানায়, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া উপজেলা নির্বাচনকে খুব গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। ইতিমধ্যে বিষয়টি নিয়ে দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন তিনি। যে কোনো মূল্যে নির্বাচনে একক প্রার্থী দেওয়ার বিষয়টি সমন্বয় করতে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের নেতৃত্বে সমন্বয় ও মনিটরিং কমিটি গঠন করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। দলের যুগ্ম মহাসচিব ও বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকরা সমন্বয় কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করবেন। কোথাও বিদ্রোহী প্রার্থী থাকলে তাকে বুঝিয়ে প্রত্যাহারের অনুরোধ করা হবে। তারপরও প্রত্যাহার না করলে দলের হাইকমান্ড হস্তক্ষেপ করবে অথবা বহিষ্কারের মতো কঠোর সিদ্ধান্তও নেবে তারা। শিগগির দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য, ভাইস চেয়ারম্যান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা, যুগ্ম মহাসচিব ও সাংগঠনিক সম্পাদকদের সমন্বয়ে একাধিক কমিটি সারাদেশ সফর করবে।
বিএনপি হাইকমান্ড মনে করে, তারা বর্তমান সরকারকে 'অবৈধ' হিসেবে আখ্যায়িত করলেও সারাদেশে রাজনীতির মাঠ দখলে রাখতে নির্বাচনে অংশ নেবেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচন আর স্থানীয় সরকার নির্বাচন এক নয়। তাদের মতে, জাতীয় ইস্যুতে সংসদ নির্বাচন বর্জন করলেও উপজেলা নির্বাচন বর্জন করা সঠিক হবে না।
বিএনপি নেতারা জানান, বর্তমান আওয়ামী লীগের সমর্থন শূন্যের কোঠায়। এ পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন হলে প্রায় সব উপজেলায় বিএনপি সমর্থিত নেতারা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হবেন। আর বিএনপি সমর্থিতরা নির্বাচনে অংশ না নিলে সব জায়গায় সংসদ নির্বাচনের মতো একতরফাভাবে নির্বাচিত হবেন। আবার অনেক জায়গায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়ও নির্বাচিত হয়ে যাবেন। এতে ওই এলাকায় আরও কোণঠাসা হয়ে পড়বেন বিএনপি ও জোট নেতাকর্মীরা। তাই কোনোভাবেই আওয়ামী লীগকে খালি মাঠে গোল করতে না দেওয়ার ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে বিএনপি হাইকমান্ড।
সূত্র জানায়, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করতেও উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রয়োজন মনে করে বিএনপি হাইকমান্ড। তাদের মতে, হতাশ নেতাকর্মীদের নির্বাচনী যুদ্ধে নামিয়ে দিলে সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে আসবেন। দল সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী ও নেতাকর্মীরাও চাঙ্গা হয়ে উঠবেন। সম্ভাব্য একাধিক প্রার্থীর পক্ষে-বিপক্ষে গিয়ে নেতাকর্মীরা দ্বন্দ্ব-কোন্দলে লিপ্ত হয়ে পড়লে কেউ আর 'নিষ্ক্রিয়' থাকতে পারবেন না। নির্বাচনের আগে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং দলীয় নেতারা বিভিন্ন অঞ্চল সফরে নির্দলীয় সরকারের অধীনে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবির পাশাপাশি উপজেলা নির্বাচনের জন্য নেতাকর্মীদের কিছুটা চাঙ্গা করার চেষ্টা করবেন।