Wednesday, July 15, 2026
মণিপুর–নাগাল্যান্ডে নাগা-কুকি সংঘর্ষে জটিল হচ্ছে পরিস্থিতি, তিন সেনাসদস্য নিহত by শুভজিৎ বাগচী
দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘর্ষের পাশাপাশি আক্রমণ হচ্ছে উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রধান নিরাপত্তা বাহিনী আসাম রাইফেলসের ওপর। গত সাত দিনে দুটি আক্রমণে আসাম রাইফেলসের অন্তত তিনজন সেনা নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন। দুই সম্প্রদায়ের সংঘাতের জেরেই নিরাপত্তারক্ষীদের মৃত্যু হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নিহত নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মী
স্থানীয় প্রশাসন বলছে, সর্বশেষ আক্রমণের ঘটনাটি ঘটেছে গতকাল মঙ্গলবার রাত ৯টার দিকে। মণিপুরের সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, উত্তর মণিপুরের সেনাপতি শহরে সশস্ত্র উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযানে বাধা দেওয়া হয়েছে। আসাম রাইফেলস যাতে উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে না পারে, সেই লক্ষ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর একটি শিবিরে মঙ্গলবার দিবাগত রাতে হামলা চালিয়েছে ‘মব’ বা উত্তেজিত জনতা। তারা আসাম রাইফেলসের ক্যাম্পে পাথর ছোড়ে, ভাঙচুর করে ও আগুন দেয়।
উত্তেজিত জনতা সেনাবাহিনীর বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করে এবং অন্তত দুটি ট্রাক উল্টে দেয়। আক্রান্ত হন স্থানীয় বাসিন্দারাও। আসাম রাইফেলস, ভারতের সেনাবাহিনী এবং রাজ্য প্রশাসন বিষয়টিকে ‘রাষ্ট্রের ওপর হামলা’ হিসেবে দেখছে।
সেনাপতি জেলায় নাগা সম্প্রদায়ের একটি গোষ্ঠী লিয়াংমাই নাগাদের গ্রাম ওক্লং। আসামের প্রধান বিদ্রোহী সংগঠন ন্যাশনাল সোসালিস্ট কাউন্সিল অব নাগাল্যান্ড-আইজাক-মুইভার (এনএসসিএন-আইএম) সংগঠন ওই অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে।
স্থানীয় প্রশাসনের ভাষ্যমতে, মঙ্গলবার রাতে এনএসসিএন-আইএমের ক্যাম্পের কাছে তাদের সশস্ত্র ক্যাডারদের উপস্থিতি সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে আসে। আসাম রাইফেলস সেখানে তল্লাশি অভিযান চালানোর চেষ্টা করে। আসাম রাইফেলসের দলটি ওক্লং গ্রামের দিকে এগোনোর সময় নারীসহ বহু মানুষ তাদের আটকায়। অবশ্য তাঁদের কেউ সশস্ত্র ছিলেন না। এ কারণে আসাম রাইফেলস গুলি চালায়নি। আসাম রাইফেলস তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করে নিলেও উত্তেজিত জনতা বড় ধরনের হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের চেষ্টা চালায়।
নাগাল্যান্ডে আসাম রাইফেলসের সেনাসদস্যের মৃত্যু
এ ঘটনার ২৪ ঘণ্টা আগে অজ্ঞাতপরিচয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় নাগাল্যান্ডে প্রাণ হারান আসাম রাইফেলসের এক সেনাসদস্য। গত সোমবার দুপুরের নাগাদ নাগাল্যান্ডের পশ্চিম অংশে চুমৌকেডিমা ‘এ’ জেলায় আসাম রাইফেলসের প্রশিক্ষণকেন্দ্রের কাছে সন্দেহভাজন এক বিস্ফোরণে আসাম রাইফেলসের অন্তত এক সদস্য নিহত হন। একজন বেসামরিক নাগরিকসহ আরও অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
পুলিশ সূত্রের খবর, আসাম রাইফেলসের কর্মীরা একটি খোলা গাড়িতে করে রাজধানী ডিমাপুরের দিকে যাওয়ার পথে বেলা দুইটা নাগাদ বিস্ফোরণ ঘটে। প্রাথমিক তদন্তে অনুমান করা হচ্ছে, রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি অটোরিকশার ভেতরে বিস্ফোরক রাখা ছিল, যা দূর নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয়। বিষয়টি নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্বেগের। কারণ, এটিকে একটি আন্তর্জাতিক মানের নাশকতা বলে মনে করা হচ্ছে, যা দীর্ঘ সময় নাগাল্যান্ডে দেখা যায়নি। বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে অটোরিকশাটি দুমড়েমুচড়ে যায়। দুর্ঘটনাস্থলে কেবল দুমড়ানো ধাতব অংশ ও ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে, যা বিস্ফোরণের ভয়াবহতার ইঙ্গিত।
মুখ্যমন্ত্রী নেইফিউ রিও, রাজ্যপাল নন্দকিশোর যাদব এবং বিদ্রোহীদের সঙ্গে সরকারের আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করা নাগাল্যান্ডের নাগরিক সংগঠন ‘নাগাল্যান্ড পিস সেন্টার’ এই হামলার নিন্দা করেছে।
গত সপ্তাহের হামলা
তবে উত্তর-পূর্ব ভারতে আসাম রাইফেলসের ওপর সাম্প্রতিক সময়ে এগুলোই একমাত্র আক্রমণ নয়। সোমবার দুপুরের আক্রমণের এক সপ্তাহ আগে ৬ জুলাই মণিপুরের উখুরুল জেলায় সন্দেহভাজন উগ্রপন্থীরা আসাম রাইফেলসের এক গাড়িবহরে অতর্কিত হামলা চালায়। এ ঘটনায় আসাম রাইফেলসের ৪০ ব্যাটালিয়নের অন্তত দুই কর্মী নিহত হন। ঘটনাস্থলে উভয় পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি চলে। পরে ওই এলাকায় বড় আকারের তল্লাশি অভিযান চালায় নিরাপত্তা বাহিনী।
মণিপুরের এক সাংবাদিক এই হামলার বর্ণনা দিতে গিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, যেভাবে হামলা চালানো হয়ে, তা অবিশ্বাস্য। আসাম রাইফেলসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠী পাল্টাহামলা চালায়। সবচেয়ে বড় কথা, তারা দীর্ঘক্ষণ লড়াই চালিয়েছে। তাদের কাছে অস্ত্রের যে বিপুল সম্ভার ছিল, তা অভাবনীয়।
সংঘর্ষে মৃতের সংখ্যা বাড়ছে
নাগাল্যান্ড ও মণিপুরে পুলিশের বিবৃতি এবং স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মণিপুরে নাগা এবং কুকি-জোদ সম্প্রদায়ের মধ্যে চার-পাঁচ মাস ধরে চলা সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ১৫ জন কুকি-জো সমাজের মানুষ, ১১ জন নাগা গোষ্ঠীর। বাকিরা অন্য সম্প্রদায়ের এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য।
পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, কুকি-জো এবং নাগা সম্প্রদায়ই গোটা উত্তর-পূর্ব ভারতে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে রয়েছে। তাই ওই অঞ্চলের বিভিন্ন অংশে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। দুপক্ষের এই লড়াইয়ে স্বাভাবিকভাবেই নিরাপত্তা বাহিনী জড়িয়ে পড়ছে এবং হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে। উত্তর–পূর্ব ভারতে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আসাম রাইফেলসের সদস্যদেরও মৃত্যু হচ্ছে।
এ ছাড়া দুপক্ষের লড়াইয়ের জেরে নাগাল্যান্ডের রাজধানী ডিমাপুরের সঙ্গে মণিপুরের রাজধানী ইম্ফলের সংযোগকারী ২ নম্বর জাতীয় সড়কের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ ৮৭ দিন ধরে অবরুদ্ধ রয়েছে।
নাগা-কুকি সংঘর্ষের পটভূমি
মণিপুরের উখুরুল জেলায় গত ফেব্রুয়ারিতে মদ্যপানকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া ঝগড়াঝাঁটি থেকে নাগা-কুকি সংঘাতের সূত্রপাত হয়, যা পরবর্তী সময়ে ভয়াবহ রূপ নেয়। গত ১৩ মে কুকিরা নাগা সম্প্রদায়ের ছয়জনকে অপহরণ করে বলে অভিযোগ। পরে ১১ জুন তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
ওই ঘটনার প্রতিবাদে মণিপুরে নাগাদের শীর্ষ সংগঠন ইউনাইটেড নাগা কাউন্সিল (ইউএনসি) গত ১৭ মে থেকে সেনাপতি জেলার ওপর দিয়ে যাওয়া ২ নম্বর মহাসড়কে ‘অর্থনৈতিক অবরোধ’ শুরু করে। ফলে কুকি–প্রধান কাংপোকপি জেলায় জরুরি পণ্যের সরবরাহব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। কাংপোকপি জেলায় এক পাশে মেইতেই-প্রধান ইম্ফল পশ্চিম এবং অন্য পাশে সেনাপতি জেলা অবস্থিত। এই অবরোধ স্বাভাবিকভাবেই দুই জনগোষ্ঠীর সম্পর্ককে আরও নাজুক করে তুলেছে।
কুকিদের শীর্ষ সংগঠন কুকি ইনপি মণিপুর (কেআইএম) জানিয়েছে, কাংপোকপিতে ইতিমধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সরকারের কাছে বারবার আবেদন করেও কোনো সমাধান সূত্র মেলেনি। কেআইএম জানিয়েছে, খাদ্য সরবরাহ না থাকায় বহু গ্রামবাসী বুনো ও স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত শাকসবজি, মিষ্টি কুমড়া, ভুট্টা এবং শিকড় খেতে বাধ্য হচ্ছেন। নাগা-কুকিদের মধ্যে চলা এই নতুন ‘সংঘাত’ বাংলাদেশ ও মিয়ানমার লাগোয়া উত্তর-পূর্ব ভারতের এই অঞ্চলে চরম অস্থিরতা তৈরি করছে।
মণিপুরের সংখ্যাগরিষ্ঠ মেইতেই সম্প্রদায়ও নাগাদের এই আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে যৌথ প্রতিবাদ শুরু করেছে। তারা নাগা হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার, কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে চুক্তি বাতিল এবং কুকি সম্প্রদায়ের উপমুখ্যমন্ত্রী নেমচা কিপজেনের পদত্যাগ দাবি করেছে।
পাশাপাশি, ২০২৩ সাল থেকে চলা মেইতেই-কুকি সংঘাতের স্থায়ী সমাধানের জন্য মেইতেই গোষ্ঠীগুলো ১৯৫১ সালকে ভিত্তি বছর ধরে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) বাস্তবায়নের দাবিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন জানিয়েছে।
২০২৩ সালের মে মাস থেকে মেইতেই এবং কুকি-জো সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে ২৬০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং ৬০ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
![]() |
| ভারতের মণিপুর রাজ্যে নাগা গ্রুপের অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের প্রতিবাদে কুকি সম্প্রদায়ে নারী–পুরুষ ন্যাশনাল হাইওয়ে–২–এ অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। ৯ জুলাই ২০২৬, কাংপোকপি। ছবি: এএনআই |
Monday, March 30, 2026
দক্ষিণ এশিয়ায় কেন ‘খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের’ গুঞ্জন by আলতাফ পারভেজ
প্রায় ২ লাখ বর্গকিলোমিটারের বিশাল বলয়!
দক্ষিণ এশিয়ায় খ্রিষ্টান ধর্মের প্রচার ও প্রসার শুরু কেরালা, তামিলনাড়ুর দিকে। কেউ কেউ এ ক্ষেত্রে তক্ষশীলার কথাও বলে। পুরোনো তক্ষশীলা এখন পড়েছে পাকিস্তানের পাঞ্জাবে। এর মধ্যে কেরালায় এখন প্রায় ২০ শতাংশ জনসংখ্যা খ্রিষ্টান। তামিলনাড়ুতে সেটা ৬ শতাংশের মতো। পাকিস্তানে ১ শতাংশের কম।
খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের গুঞ্জনটা অবশ্য এসব পরিসংখ্যান থেকে তৈরি হয়নি। এ গুঞ্জনের ভরকেন্দ্র দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় জনপদগুলো। মিয়ানমারের সন্নিহিত অঞ্চলও তাতে যুক্ত হয়েছে। উত্তর–পূর্ব জনপদগুলোর মধ্যে মেঘালয় (৭১ শতাংশ), মিজোরাম (৮৭ শতাংশ) এবং নাগাল্যান্ডে (৮৮ শতাংশ) খ্রিষ্টানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ।
এই তিন জনপদ যে লাগোয়া, তা নয়, তবে কাছাকাছি। মিয়ানমারের চিন এস্টেট এদের কাছের জনপদ। চিন এলাকায় ৯৬ শতাংশ মানুষ একই ধর্মাবলম্বী।
দক্ষিণ এশিয়ায় চারটি জায়গা হলো খ্রিষ্টানপ্রধান। চারটি জায়গাতেই খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী রাজনীতিবিদদের রাজ্য চালানোর অভিজ্ঞতা আছে। তবে জনপদগুলো আয়তনে ও লোকসংখ্যায় ছোট।
এই চারটি এলাকার পাশাপাশি মণিপুর ও অরুণাচলকেও যদি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক খ্রিষ্টান জনসংখ্যার (৪১ ও ৩০ শতাংশ) কারণে কাছে টানা হয়, তাহলে বেশ বড় একটা বলয় তৈরি হয়। আয়তনে যা দুই লাখ বর্গকিলোমিটারও ছাড়িয়ে যায়।
ভিন্ন ভিন্ন নামে কাছাকাছি থাকা বেশ বড় একটি এলাকার জনবিন্যাসের এ রকম প্রবণতা নিশ্চিতভাবে চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান তিন ধর্ম হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ ‘মুরব্বিদের’ এটা ভালোভাবে নজরে পড়েছে। মিজোরাম ও চিনসংলগ্ন বাংলাদেশের বান্দরবানের সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলোয় (রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি) খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতির কারণে বিষয়টা ঢাকায়ও মনোযোগের বিষয় হয়েছে। বান্দরবানে খ্রিষ্টান জনসংখ্যা ১০ শতাংশের মতো।
গুঞ্জনের বহু কারণ
দক্ষিণ এশিয়ায় খ্রিষ্টান রাজ্যের গুঞ্জন কেবল এই বিশ্বাসীদের সংখ্যাগত বৃদ্ধির কারণে নয়; উল্লিখিত এলাকাগুলোর অনেক বৈশিষ্ট্যও এ বিষয়ে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, চিন, মণিপুর, বান্দরবানের একাংশ এবং অরুণাচলের মধ্যে অনেক এলাকায় নানা ধরনের দাবিতে নিরস্ত্র-সশস্ত্র ব্যাপক আন্দোলন-সংগ্রাম চলছে।
কোথাও কোথাও সশস্ত্রতার ধরন অনেক ব্যাপক ও গভীর, কোথাও তা মৃদু, কিন্তু অগ্রাহ্য করার মতো নয়। এসব সশস্ত্রতার আবার প্রধান একটা ধরন দেখা যাচ্ছে, এ অঞ্চলের ‘রাষ্ট্র’গুলোর পরিচালকদের প্রতি আস্থার গভীর এক সংকট। এ রকম অনাস্থার পটভূমি তৈরি করেছে উপরিউক্ত প্রতিটি এলাকার উন্নয়ন-প্রান্তিকতা। ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পর থেকে এ রকম প্রতিটি জনপদের মানুষ নিজেদের ক্রমে সংকুচিত ও সীমিত গণ্ডিতে আবিষ্কার করছে। ফলে তাদের মধ্যে একধরনের আত্মরক্ষার বোধ বাড়ছে।
এসব জনপদের মানুষ জানে তারা কোনো দেশের কেন্দ্রীয় সরকারের নীতিসিদ্ধান্তকে খুব একটা প্রভাবিত করতে পারবে না। যেমন ৫৪৩ আসনের ভারতীয় লোকসভায় অরুণাচল-মণিপুর-মেঘালয়-মিজোরাম-নাগাল্যান্ড মিলে আসন ৯টি। অথচ সেখানে শুধু উত্তর প্রদেশের জন্য আসন ৮০টি। মিয়ানমারের পার্লামেন্টের (দুই কক্ষ মিলে) ৬৬৪ আসনে চিন এস্টেটের জন্য আসন আছে ২১টি। বাংলাদেশে ৩০০ আসনের পার্লামেন্টে বান্দরবানের জন্য আসন ১টি। যেহেতু আসন বণ্টিত হয় জনসংখ্যার হিস্যায়, তাই এই বাস্তবতাটা শিগগিরই বদলাবেও না। ফলে এসব জনপদের মানুষ জানে, নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় তাদের উপস্থিতি সীমিত থাকতে বাধ্য।
অতীতে বিশেষ করে ঔপনিবেশিক শাসনামলের আগে ও তার মধ্যে এসব জায়গার জাতিসত্তাগুলো সমতলের মানুষদের থেকে দূরে পাহাড়ি এলাকায় যে রকম ট্রাইবাল স্বশাসন ভোগ করেছে, তার ঘাটতিও তাদের মধ্যে একধরনের হতাশার বোধ তৈরি করে।
এখন নিজেদের চারপাশে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধদের সংখ্যাবৃদ্ধির মুখে তারা স্বধর্ম রক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে শুরু করেছেন। দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে বিভিন্ন সময় চার্চগুলোয় আক্রমণ এবং এই ধর্মবিশ্বাসীদের ওপর হামলার ঘটনাও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় জনপদের মানুষদের আত্মরক্ষার বোধে একটা ধর্মীয় ধরন যুক্ত করেছে। একেই ভারত, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মূলধারার অনেক মানুষ খ্রিষ্টবলয় তৈরির চেষ্টা আকারে ভাবেন। এ রকম ভাবনার কারণ এটাও যে ওপরের এলাকাগুলোয় খ্রিষ্টান রাজনীতিবিদদের সঙ্গে চার্চের সম্পর্কও বেশ নিবিড়।
আবার কিছু কিছু এলাকায় খ্রিষ্টান জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি এবং তার অতি প্রচারও কথিত গুঞ্জনের একটা উপাদান হয়েছে। তবে এরপরও ভারতে খ্রিষ্টান জনসংখ্যা ৩ শতাংশেরও কম। কিন্তু বিষয়টি আরএসএস পরিবারের কাছে এত স্পর্শকাতর যে খ্রিষ্টানমুখী ধর্মান্তরকরণ ঠেকাতে অন্তত ৯টি রাজ্যে ধর্মান্তরকরণবিরোধী আইন করা হয়েছে। সেখানে আরএসএস-বিজেপি পরিবারের অন্যতম সাংস্কৃতিক প্রতিপক্ষ হলো গির্জামণ্ডলী।
তবে ধর্মান্তরকরণ ও খ্রিষ্টান জনসংখ্যা বাড়ার প্রচার দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে অনেক সময় একপেশে চেহারাও নেয়। যেমন বাংলাদেশে অনেকে বান্দরবানের খ্রিষ্টান জনসংখ্যার বৃদ্ধি নিয়ে বলেন। কিন্তু শুমারির তথ্যে দেখা যায়, সেখানে ৯-১০ শতাংশ খ্রিষ্টানের বিপরীতে মুসলমান জনসংখ্যা প্রায় ৫৩ শতাংশ এবং সর্বশেষ দুটি শুমারির মধ্যে শেষোক্তরা প্রায় ৮ শতাংশ বেড়েছে। অথচ একই সময়ে খ্রিষ্টান জনসংখ্যা ১ শতাংশও বাড়েনি সেখানে।
কিন্তু খ্রিষ্টানরা কি নতুন দেশ চাইছে?
প্রশ্ন হলো, এত কিছুর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার খ্রিষ্টান সমাজ বা উল্লিখিত জনপদগুলো কি কখনো ধর্মভিত্তিক নতুন কোনো রাষ্ট্রের দাবি তুলেছে? এর জন্য কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন আছে? এ রকম দাবির সপক্ষে খ্রিষ্টান সমাজের বা গির্জামণ্ডলীর কোনো ইশতেহার আছে? সচরাচর এসব প্রশ্নের বিশ্বাসযোগ্য উত্তর পাওয়া যায় না।
তারপরও ক্রমাগত এ রকম দাবি ও গুঞ্জন উঠছে। সেটা ঘটছে মুখ্যত অখ্রিষ্টানদের তরফ থেকে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশে বিশেষ বিশেষ মতাদর্শের বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে মাঝেমধ্যেই বিষয়টি সক্রিয় হয়ে ওঠে। ভারতে ‘স্বরাজমার্গ’ নামে হিন্দুত্ববাদী একটা বিখ্যাত মিডিয়া এই ইস্যুতে বেশ এগিয়ে।
কৌতূহলোদ্দীপক হলো, ভারতের হিন্দুত্ববাদীদের মতো আশপাশের অন্যান্য দেশের বৌদ্ধ ও ইসলামপন্থী অনেক মহলও এ প্রচারণায় উৎসাহী। বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গির সংস্থাগুলোর এ রকম একই ধরনের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায় সামাজিক আর কোনো বিষয়ে তেমন দেখা যায় না। ভারতসহ সর্বত্র ভোট এলে দেখা যায়, খ্রিষ্টানরা প্রধানত মধ্যপন্থী কংগ্রেস বা মধ্য-বাম আঞ্চলিক দলগুলোকে ভোট দিচ্ছে। এটাও তাদের প্রতি ডানপন্থী প্রচারণা বাড়িয়ে দিয়ে থাকতে পারে।
খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের গুঞ্জনকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে কথিত ওই রাষ্ট্রের জন্য ইউরোপ-আমেরিকার আগ্রহের কথাও বলা হয় প্রচারে। কিন্তু তার সপক্ষে কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না এখনো। কিন্তু এ রকম প্রচার খ্রিষ্টানদের জন্য নানাভাবে বিব্রত অবস্থা তৈরি করছে।
বাংলাদেশ খ্রিষ্টান অ্যাসোসিয়েশনের নেতা অ্যালবার্ট ডি কস্টা কয়েক মাস আগে এ বিষয়ে এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের প্রচার তাদের সঙ্গে অন্যান্য সম্প্রদায়ের দূরত্ব সৃষ্টির ঝুঁকি তৈরি করছে।
তারপরও যে এ রকম একটা প্রচারের পালে সম্প্রতি আরও বাতাস লেগেছে, তার কারণ মণিপুর ও চিন প্রদেশের ঘটনাবলি। মাসের পর মাস ধরে চলমান মণিপুর দাঙ্গায় হিন্দু মৈইতৈইদের হাতে খ্রিষ্টান কুকিরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পার্শ্ববর্তী মিজোরামে তাদের প্রতি সহানুভূতির নীরব এক ঢেউ তৈরি হয়েছে। সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধরত মিয়ানমারের চিন প্রদেশের স্থানীয়দের প্রতিও মিজোরামের অনুরূপ সহানুভূতি রয়েছে।
এই তিন জায়গার মানুষই ‘জো’ জাতির শাখা-উপশাখা। বান্দরবানের বম খ্রিষ্টানরাও একই জাতিসত্তার দূরবর্তী অংশীদার। উত্তর-পূর্বাঞ্চলজুড়ে জো সমাজের এ রকম ঘটনাবলিতে এতদঞ্চলে খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের গুঞ্জন তীব্রতা পেলেও কার্যত এ ধারণা বাস্তবসম্মত না হওয়ার কারণ একই জনপদগুলোয় নাগাদের উপস্থিতি।
নাগারাও খ্রিষ্টান, কিন্তু জোদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক খুব বেশি প্রীতিকর নয়। ফলে নাগাল্যান্ড, মণিপুরসহ আশপাশে কেবল খ্রিষ্টান ধর্মীয় বিশ্বাস সামনে রেখে নাগা ও কুকিরা (জো) একটা রাষ্ট্র গড়তে চাইবে বা পারবেন সেটা খুব কম রাজনৈতিক ভাষ্যকারের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়।
এমনকি কেবল জো–অধ্যুষিত অঞ্চলগুলো নিয়ে কোনো রাষ্ট্রের ধারণাও মিজো নেতা জোরামথাংঙা কিছুদিন আগে (২১ জুন) প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নাকচ করেছেন। তাঁর মতে, দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ‘জো’দের বিভক্তি অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও এটা এখন এক বাস্তবতা। কারণ, তিনটি পৃথক রাষ্ট্রের সীমান্তে আছে তারা।
মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ইন্ধন দিচ্ছে
মিয়ানমারের চলতি গৃহযুদ্ধ এবং তার সম্ভাব্য পরিণতিও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের গুঞ্জনে একধরনের উসকানি হিসেবে কাজ করছে বলা যায়। এই গৃহযুদ্ধে সবচেয়ে সক্রিয় তিনটি প্রান্তিক অঞ্চল হলো দক্ষিণ-পূর্বের কারেন, উত্তরের কাচিন এবং পশ্চিমের চিন অঞ্চল। এই তিন এলাকায় গেরিলা যুদ্ধ সবচেয়ে বেশি সুসংগঠিত এবং এই তিন অঞ্চলে খ্রিষ্টান ধর্মবিশ্বাসের মানুষও অনেক।
এ রকম মনে করা হয় যে দেশটির কেন্দ্রীয় অঞ্চলে গণতন্ত্রপন্থীদের সশস্ত্র সংগ্রাম যদি বিজয়ী হয় তাহলে প্রান্তিক এলাকা যে বাড়তি স্বায়ত্তশাসন ভোগ করবে, সেটা অনেকটা স্বাধীন রাষ্ট্রের চেহারা নিতে পারে। আবার গণতন্ত্রপন্থীদের সংগ্রাম অনিশ্চিতভাবে দীর্ঘায়িত হলেও গেরিলা-দৃঢ়তা এ তিন অঞ্চলকে অনুরূপ চেহারা দিতে পারে।
মিয়ানমারের এ রকম সম্ভাবনায় ভারত উদ্বিগ্ন। সে কারণে তারা ওই দেশের সঙ্গে তার সীমান্ত অনেকটাই বন্ধ করে দিতে চায় বলে খবর বেরিয়েছে। সীমান্ত এলাকার ট্রাইবালরা অবশ্য এর ঘোর বিরোধী। কারণ, এতে তারা জাতিগতভাবে চিরস্থায়ীভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ার শঙ্কায় পড়েছে।
উল্লেখ্য, ১৯৫০-এর এক চুক্তির বলে সীমান্তবর্তী ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী পাসপোর্ট-ভিসাবিহীন একধরনের সাধারণ ভ্রমণ পাস নিয়ে অপর দেশের ১৬ কিলোমিটার ভেতর পর্যন্ত আসা-যাওয়া করতে পারে। শুরুতে চুক্তি অনুযায়ী ৪০ কিলোমিটার ভেতর পর্যন্ত এই সুবিধা ছিল। পরে কমিয়ে ১৬ কিলোমিটার করা হয় সেটা।
মিজোরাম, মণিপুর, নাগাল্যান্ড ও অরুণাচলের ১ হাজার ৬৪৩ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে এ সুবিধা রয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বলছে, তারা এ সুবিধা আর রাখতে চায় না। কারণ, এটা তাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
অন্যদিকে এ ঘোষণার পর জো সংগঠনগুলো বলছে, এটা করার আগে ভারত-মিয়ানমার-বাংলাদেশে বিভক্ত হয়ে থাকা তাদের জাতির মানুষদের একত্র করে দেওয়া হোক। তা না হলে তারা এ রকম পদক্ষেপের বিরোধিতা করবে। জো-রিইউনিফিকেশন অর্গানাইজেশন (জো-রো) নামের একটা সংগঠন দেশ-বিদেশে এ বিষয়ে কথা বলছে। দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের গুঞ্জন বাড়ার এটাও এক কারণ।
তবে এ রকম যাবতীয় গুঞ্জন অতিক্রম করে সরেজমিনে আরও গভীরে মনোযোগ দিলে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রায় সব পাহাড়ি উপত্যকায় ধর্মের বদলে একধরনের অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্বের আকুতিই বেশি শোনা যায়। কিন্তু মূলধারার রাজনীতি তার স্বার্থেই যেন কেবল খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের গুঞ্জনে বেশি আগ্রহী, সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক সুশাসন বা স্বশাসনে নয়।
● আলতাফ পারভেজ, দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ে গবেষক

Tuesday, January 13, 2026
কুকিদের অশান্তিময় এক বছর ও ইতিহাসের নতুন অধ্যায় by আলতাফ পারভেজ
‘কুকিদের’ সম্পর্কে বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু মানুষ সামান্যই অবহিত ছিল। এর মধ্যে পরপর চারটি ঘটনা ঘটল। প্রায় এক বছর আগে মণিপুরে মেইতেই-কুকি সংঘাত বাধল। একই সময়ে মিয়ানমারের চিন প্রদেশে বেগবান হলো বামারদের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের প্রতিরোধযুদ্ধ। পরপরই বান্দরবানে কুকিরা নজর কাড়ল কিছু দাবিদাওয়া তুলে ধরে।
মণিপুর, চিন, বান্দরবানের ঘটনাবলির খবরাখবর গেল মিজোরামে। সব সহজাতির সঙ্গে সংহতি দেখিয়ে সেখানেও কিছু মিটিং-মিছিল হলো। এভাবেই গত এক বছরে কুকি-দুনিয়া বিশেষ মনোযোগ পেল অকুকিদের। সেই সূত্রেই অনেকের আগ্রহ এখন জাতিসত্তাটি নিয়ে। তবে এই আগ্রহের আগে-পরে কুকি অঞ্চলগুলোতে সহিংসতাও চলেছে। যুগের পর যুগ আশপাশের সংখ্যাগুরুর সাংস্কৃতিক দাপট ও নানানমুখী চাপে কুকি সমাজ ক্লান্ত ও বিপন্ন।
বুক চিতিয়ে না দাঁড়ালে কোনো সংখ্যাগুরু কোনো দিন তাঁদের কথা শোনেননি। ফিরেও তাকাননি। আবার সশস্ত্রতা এবং সন্ত্রাসও তাঁদের শান্তি ও স্বস্তির অতীত ফিরিয়ে আনতে পারেনি। পাশাপাশি কল্পনার স্বাধীন ভূমি ‘জালেন-গামে’র কথাও ভুলতে পারে না তাদের ইতিহাস।
মূলত তাঁরা ‘জো’ এবং শান্তিতে নেই
‘কুকি’ শব্দের সঙ্গে চলে আসে ‘চিন’ শব্দ। ‘চিন’ কুকি পরিবারের আরেক ট্রাইবমণ্ডলী। একই পরিবারের সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয় মিজো, বম, খিয়াং, লুসাইদেরও। সবাই তাঁরা বৃহত্তর ‘জো’ জাতির মানুষ। যেহেতু এসব জাতিসত্তার মানুষ দু-তিনটি রাষ্ট্রের সীমানায় বহু রাজ্যে বিভক্ত এবং এ রকম সব রাষ্ট্রে তাঁদের অবস্থান বেশ প্রান্তিক, সে কারণে তাঁদের সঠিক সংখ্যা বলতে পারে না কেউ।
কেবল অনুমান করা হয়, সবচেয়ে বেশি জো আছে মিজোরামে। ১০ লাখ অধিবাসীর রাজ্যটিতে জোরা হবে ৮ লাখ। ৩৬ লাখ মানুষের মণিপুরে ১৫-২০ শতাংশ হলো জো। রাজধানী ইম্ফলে তাঁদের সংখ্যা ৬-৭ শতাংশ ছিল। এখন অনেকটাই নেই।
■ কুকি-চিন-বম-মিজোরা দু-তিনটি রাষ্ট্রের সীমানায় বহু রাজ্যে বিভক্ত এবং এ রকম সব রাষ্ট্রে তাঁদের অবস্থান বেশ প্রান্তিক।
■ মণিপুরে কুকি-মেইতেই সংঘাতের মধ্যেই বান্দরবানের জো অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে অশান্তি ও অস্থিরতা শুরু হয়।
■ জোরা এখন মিজোরাম ও বান্দরবানের সঙ্গে স্বতন্ত্রভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যও করতে চাইছেন। বিষয়টি কোনো কোনো দেশের জন্য অস্বস্তিকর।
চিন প্রদেশে জো আছেন চার-পাঁচ লাখ। সেখানে তাঁরাই সংখ্যায় বেশি। তবে প্রায় ৫০টি ট্রাইবে বিভক্ত। নাগাল্যান্ড ও বান্দরবানেও জোরা আছেন যথাক্রমে ৩০ ও ১৫ হাজারের মতো। ফলে অনুমাননির্ভর হিসাব বলে, দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া মিলে জো জাতির মানুষ আছেন আনুমানিক ২০ লাখ।
এর মধ্যে আবার কুকি-চিন-মিজো সমাজের ছোট একটি অংশ নিজেদের ‘বেনে মেনাশে’ নামে ইহুদি ঐতিহ্যের হারিয়ে যাওয়া একটি গোত্র হিসেবেও মনে করে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রায় পাঁচ হাজার কিলোমিটার দূরে কীভাবে তারা এল, এ নিয়ে নানা মত আছে। এ রকম দাবিদার প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ আছেন মণিপুরে। যাঁদের অনেকে অবশ্য মেইতেইয়ের তাড়া খেয়ে এখন মিজোরামে শরণার্থী। ছোট এই ট্রাইবসহ গত এক বছরে মণিপুর থেকে চিন-বান্দরবান—সর্বত্র জোরা অশান্তিময় এক জীবনে আছে।
যে আগুন থামেনি এক বছরেও
সমকালীন ইতিহাসে জো গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় আঘাতে এসেছে মণিপুরে। এক বছর ধরে সেখানে সহিংসতা চলছে। রাজ্যের বড় জাতি মেইতেইদের ‘শিডিউল ট্রাইব’ সুবিধা দেওয়ার প্রতিবাদ জানাতে আয়োজিত কুকি সমাবেশ থেকে ওই সংঘাতের শুরু।
প্রথম দিকে ক্ষয়ক্ষতি সমানে সমান হলেও ক্রমে ‘দাঙ্গা’ একপক্ষীয় চেহারা নিয়েছে বলে অভিযোগ আছে। কুকিদের ইম্ফল থেকে এখন অনেকটাই সরে যেতে হয়েছে। জোদের ক্ষোভের আগুন সেখানে এত বিস্তৃত যে ভারতের চলতি জাতীয় নির্বাচনও বর্জন করেছে তারা।
মণিপুরে লোকসভার দুটি আসন। ‘আউটার মণিপুরের’ আসনটিতে সচরাচর কুকিরা দাঁড়ান এবং জেতেন। এটা ‘শিডিউল ট্রাইবদের’ জন্য সংরক্ষিত। কুকিরা নির্বাচনে না থাকায় হয়তো কোনো নাগা এই আসনে জিতে আসবেন, যাঁরা এ মুহূর্তে কুকিদের আরেক জাতিগত প্রতিপক্ষ।
রাজনৈতিক বিবেচনায় মণিপুরজুড়ে কুকিদের এখন চূড়ান্ত প্রান্তিক অবস্থা। কেউ যেন তাদের কথা শোনার জায়গায় নেই। বিশেষ করে রাজ্যের রাজধানী ইম্ফলে। বিধানসভার কুকি এমএলএরাও সেখানে যান না বা যেতে পারেন না। ৬০ সদস্যবিশিষ্ট বিধানসভায় কুকি প্রতিনিধিদের মধ্যে যাঁরা বিজেপির মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন, তাঁরাও ইম্ফলে নিরাপত্তাসংকটে ভোগেন।
রাজধানীতে অভিগম্যতা না থাকায় কুকিরা বিচারব্যবস্থার সুবিধা থেকেও বঞ্চিতও হচ্ছেন। এ অবস্থায় রাজ্যের এখনকার ২২ হাজার বর্গকিলোমিটার থেকে ১৩ হাজার বর্গকিলোমিটার কেটে তাঁদের জন্য আলাদা রাজ্য চাইছেন কুকিরা। এই দাবিতে যুক্ত হয়েছেন রাজ্য মন্ত্রিসভার দুই কুকি সদস্যও। বলা বাহুল্য, মেইতেইরা তার বিরুদ্ধে। কুকিদের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসে’র অভিযোগ আছে তাঁদেরও।
অস্থিরতার ঢেউ বান্দরবানেও
মণিপুরে কুকি-মেইতেই সংঘাতের মধ্যেই বান্দরবানের জো অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে অশান্তি ও অস্থিরতা শুরু হয়। যার একরকম পরিণতি হিসেবে সর্বশেষ এপ্রিলে একদিকে ‘ব্যাংক ডাকাতি’, অন্যদিকে অনেক মানুষ গ্রেপ্তার হলেন। দ্য নিউএজ ৯ এপ্রিল বিভিন্ন প্রশাসনিক সূত্রের বরাতে ৫৪ ব্যক্তির আটকের খবর দিয়েছিল। যাঁদের মধ্যে ১৮ জন জো নারীও আছেন। নিরাপত্তা প্রশ্নে নারীদের আটকের ঘটনা এদিকে অতীতে কমই ঘটেছে। ব্যাংক ডাকাতির মতো ত্রাসও বিরল।
বান্দরবানের চলতি অবস্থার শেষ কোথায়, সেটা কেউ জানে না। বমদের অনেক গ্রাম এখন মানুষশূন্য। কোথায় চলে গেলেন এসব মানুষ, তার কোনো হদিসও পাওয়া গেল না সংবাদমাধ্যমে। কেবল বলা হচ্ছে, সেখানে জনজীবন আগের মতো স্বাভাবিক নেই। ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থাও খারাপ।
এর মধ্যে স্থানীয় ত্রিপুরারা জানাচ্ছেন, কুকি-চিন বলে অনেক ত্রিপুরাকেও আটক করা হয়েছে। সত্য হলে, এসব নিশ্চয়ই পাহাড়ি সমাজে জটিলতা বাড়াচ্ছে। বরাবরই দক্ষিণ এশিয়ায় জাতিগত সংঘাতের ইতিহাস একধরনের অন্ধকারাচ্ছন্ন একমুখী সড়কের মতো। সংখ্যাগুরু সমাজের আন্তরিক ও সুচিন্তিত চেষ্টা ছাড়া যার নিদান নেই।
স্বায়ত্তশাসনচর্চায় ‘চিনল্যান্ড’
মণিপুর ও বান্দরবানের তুলনায় চিন প্রদেশের জোরা ভিন্ন ধাঁচের এক সময় পার করছে। পাহাড়ি প্রদেশটির কুকি-চিনরা বহুকাল প্রকৃত স্বায়ত্তশাসনের জন্য সংগ্রাম করছে। দেশটির প্রধান জাতিসত্তা বামারদের সঙ্গে পেরে উঠছিল না তারা। ২০২১ থেকে যখন গণতন্ত্রের প্রশ্নে মিয়ানমারে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধের সুযোগ নেয় কুকি-চিনদের বড় একাংশ। চিন প্রদেশের অনেকখানি মুক্তাঞ্চলও বানিয়েছে তারা।
ভারত সীমান্তবর্তী স্থলবন্দরগুলো অনেকটাই এখন সশস্ত্র চিনদের দখলে। সংবিধান, প্রশাসন, বিচার ও শিক্ষাব্যবস্থাও গড়ে তুলেছে নিজেদের ভাবনাচিন্তায়। চিন প্রদেশ এভাবে দ্রুত ‘চিনল্যান্ড’ হয়ে যাচ্ছে। গত ডিসেম্বরে ‘চিনল্যান্ডে’র প্রথম রাজনৈতিক সম্মেলন হলো ঐতিহাসিক শহর ক্যাম্প ভিক্টোরিয়ায়।
মিয়ানমারে জান্তার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ‘জাতীয় ঐক্য সরকার’ (এনইউজি)–এর নেতারাও বেশির ভাগ চিনল্যান্ডে থাকেন এখন। চিনল্যান্ড ন্যাশনাল ফ্রন্ট (চিএনএফ) এবং এনইউজি রীতিমতো চুক্তি করে রাজনৈতিক সম্পর্ক পাতিয়েছে।
সংখ্যাগুরু জাতির সঙ্গে সংখ্যালঘু জাতির প্রতিনিধিদের এ রকম চুক্তি এ অঞ্চলে এই প্রথম। এতে তাঁরা উভয়েই লাভবান হচ্ছেন। মিয়ানমারে গণতন্ত্রের সংগ্রাম বিজয়ী হলে চিন-বামার ওই চুক্তির চূড়ান্ত সুফল দেখা যাবে। চিনের রাজনীতিবিদ এল এইচ সেখং এনইউজির হয়ে পুরো মিয়ানমারের জন্য নতুন সংবিধান লিখছেন।
চিনে জো জাতির ভেতর বেশ কটি উপশাখা রয়েছে। ৪০টির মতো ভাষায় কথা বলেন এখানকার পাহাড়ের মানুষ। স্থানীয় নানান বিষয়ে এদের দ্বন্দ্ব-বিবাদও আছে এবং সব জো চিনল্যান্ড কাউন্সিলে যুক্তও হননি। কিন্তু এই মুহূর্তে সাধারণভাবে তাঁরা সবাই বেশ স্বায়ত্তশাসন ভোগ করছেন।
এই জোরা এখন মিজোরাম ও বান্দরবানের সঙ্গে স্বতন্ত্রভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যও করতে চাইছেন। বিষয়টি আশপাশের কোনো কোনো দেশের জন্য অস্বস্তিকর। কারণ, চিন-মিজোরাম-বান্দরবানজুড়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের ভিন্ন রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় তাৎপর্যও আছে। অর্থনীতি যে অনেক সময় রাজনীতি ও ধর্মকেও তার বিকাশে সঙ্গে নেয়, সেটি অসত্য নয়।
জোদের নেতৃত্বে মিজোরাম
চিএনএফ এবং মিজোরামের এমএনএফ (মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্ট) হলো পুরো কুকি জগতের দুটি প্রধান জাতীয়তাবাদী সংগঠন। মণিপুরের কুকিদেরও একটি সশস্ত্র সংগঠন আছে কেএনও বা কুকি ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন নামে। চিএনএফ ও কেএনও গঠিত হয়েছিল একই বছর, ১৯৮৮ সালে।
চিএনএফ এখনো প্রবলভাবে সশস্ত্র ধরনের হলেও মিজোদের এমএনএফ নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে চলে এসেছে। মণিপুর দাঙ্গার পর কেএনও কর্মীরা আবারও অস্ত্র ব্যবহার করছেন বলে খবর আছে। দাঙ্গার আগপর্যন্ত তাঁরা ভারত সরকারের সঙ্গে অস্ত্রবিরতিতে ছিল।
সীমান্তের ওদিকের এ রকম অস্থিরতার মধ্যেই পার্শ্ববর্তী বান্দরবানে একই রকম আরেক সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট নিয়ে আলোচনা উঠেছে। জো জগতের আলোচ্য চারটি সংগঠনের মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সেই বিতর্ক এ মুহূর্তে যতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, ততটাই আড়ালে পড়ে আছে, কী ধরনের আর্থসামাজিক পরিবেশে বিভিন্ন দেশে বিভক্ত হয়ে থাকা জো সমাজে সশস্ত্রতার ব্যাপারগুলো দানা বাঁধল।
দেশি-বিদেশি গবেষকদের সূত্রে দেখা যায়, একদা জো সমাজে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বঞ্চনা এবং প্রান্তিকতার আরেক পার্শ্বফল হিসেবে খ্রিষ্টধর্মের বিকাশ শুরু হয়েছিল।
মিয়ানমারের চলমান গৃহযুদ্ধে গণতন্ত্রপন্থীদের সঙ্গে পশ্চিমের নাগরিক সমাজের যোগাযোগ মূলত চিনল্যান্ড ও মিজোরামের যাজকদের মাধ্যমে। তবে জো বা কুকিদের সমস্যা ‘খ্রিষ্টত্ব বনাম হিন্দুত্ব’র কিংবা ‘খ্রিষ্টত্ব বনাম বৌদ্ধধর্মীয়’ সমস্যা নয়। এ হলো যার যার জনপদে প্রত্যাশিত প্রশাসনিক অংশীদারত্বের ঘাটতি ও দারিদ্র্যজনিত সমস্যা।
ধর্ম ও স্বায়ত্তশাসন বিতর্ক
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি জো সমাজকে বেশ কটি দেশে বিভক্ত করে যে ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটিয়ে গেছে, তার মৃদু কিছু ক্ষতিপূরণ হতে পারত এলাকার প্রশাসনে এসব মানুষের কার্যকর সামাজিক-অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ ঘটলে। আইজল, ইম্ফল কিংবা ক্যাম্প ভিক্টোরিয়া—সর্বত্র জো নেতাদের ও রকম মত। সেটি হয়তো ধীরে ধীরে হবে।
তবে প্রতিটি দেশে সংখ্যালঘুর শাসনতান্ত্রিক অধিকারের দাবি সংখ্যাগরিষ্ঠের কাছে অতি স্পর্শকাতর প্রসঙ্গ। বরং আঞ্চলিক অনেক শক্তি এ রকমও ভাবে, কুকি অঞ্চলে ‘ভারসাম্য’ আনতে অন্যান্য ধর্মের প্রভাব বাড়াতে হবে। এই সূত্রেই একদা মণিপুরে মেইতেইদের সঙ্গে আরএসএসের মৈত্রী বেড়েছিল। আবার কুকিদের কেএনও’ও সেখানে একদা বিজেপিকেই রাজনৈতিক সমর্থন দেয়। এই সবই ‘স্বার্থের সম্পর্ক’ এবং প্রতিনিয়ত তার ধরন বদলাচ্ছে সীমান্তের এদিকে-ওদিকে।
মণিপুরে আরএসএসের মনোযোগ বাড়ার একটা ফল হলো ২০১২ সালেও যে মণিপুরে বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি কোনো আসন পায়নি, তারাই পরের নির্বাচনে ২১টি আসন পায় এবং ক্রমে এখন সেখানে সরকার চালাচ্ছে।
অপর দিকে একই সময়ে ৬০ আসনের বিধানসভায় কংগ্রেসের শক্তি কমতে কমতে ৪২ থেকে ৫–এ এসে দাঁড়িয়েছে। তবে আরএসএস মণিপুরে হিন্দু মেইতেইদের প্রতি বেশি পক্ষপাত দেখাতে গিয়ে পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে ইতিমধ্যে এবং এভাবে পুরো কুকি জগতেও প্রবল ঝাঁকুনি তৈরি হয়েছে।
সব মিলে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় হিন্দিভাষী, বাংলাভাষী এবং বার্মিজদের ত্রিমুখী সংখ্যাগরিষ্ঠতার মুখে থাকা কুকি-চিন-মিজো-বমদের শান্তি ও স্বস্তির নিরিবিলি পুরোনো দিনে ফিরে যাওয়া আগামী দিনে কতটা সম্ভব হবে, সে বিষয়ে অনেক অনিশ্চয়তা।
তবে এর মধ্যে মণিপুরে শান্তি ফেরাতে কুকিদের এলাকায় তাদের দাবিমতো যদি নতুন একটা ‘রাজ্য’ হয়, তাহলে চিন ও মিজোরামের পাশাপাশি জোদের তৃতীয় আরেক ঠিকানা হবে। এ ঘটনার আঞ্চলিক তাৎপর্যও থাকবে অবশ্যই। অনেকেই একে জো সাহিত্য-সংস্কৃতির অধরা ‘জালেন-গাম’ ধারণা দিয়েও ব্যাখ্যা করতে চাইবেন।
গত ১২ মাসে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কুকি-বিশ্ব প্রকৃতই ইতিহাসের নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করল। দেখার ব্যাপার, অশান্তির সময় পেরিয়ে সামনে তারা ঐক্য ও অর্জনের পরিসর বাড়াতে পারে কি না?
● আলতাফ পারভেজ, দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসবিষয়ক গবেষক

Monday, November 3, 2025
মণিপুরে আশ্রয়শিবির বন্ধে সরকারের পরিকল্পনায় দুশ্চিন্তায় গৃহহীন মানুষ
২০২৩ সালের মে মাসে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু মেইতেই ও আদিবাদী খ্রিষ্টান কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যে এই সংঘাত শুরু হয়। এটি ছিল গত কয়েক দশকের মধ্যে এই অঞ্চলে সবচেয়ে বড় সহিংসতার ঘটনা।
মেইতেই সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি লাভের দাবি নিয়ে ঘটনার সূত্রপাত। এতে তারা কুকিদের মতো কোটাসহ বেশ কিছু বাড়তি সুবিধা লাভ করবে। অন্যদিকে মেইতেই সম্প্রদায়ের এ দাবির জোরালো বিরোধিতা করে বিক্ষোভ করে কুকি সম্প্রদায়। ওই বিক্ষোভ থেকেই সহিংসতা দানা বাঁধে। এতে দুই বছরে প্রায় ২৬০ জন নিহত এবং প্রায় ৬০ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাস করতে বাধ্য হন।
গত দুই বছরে সরকার বারবার গৃহহীনদের পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে বাস্তবে এই প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি বললেই চলে। ঘর এবং স্থায়ী আয় না থাকায় বেশির ভাগ মানুষের জীবন এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
জুলাই মাসে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে, যখন রাজ্যের তখনকার চিফ সেক্রেটারি প্রশান্ত সিং ঘোষণা করেন, ডিসেম্বরের মধ্যে সব আশ্রয়শিবির বন্ধ করা হবে এবং বাসিন্দাদের পুনর্বাসন করা হবে। যারা নিজ বাড়িতে ফিরতে পারবে না, তাদের জন্য ঘর নির্মাণ করা হবে।
সংঘাত শুরুর পর সেপ্টেম্বরে প্রথমবারের মতো ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মণিপুর সফরে যান। তিনি ঘোষণা করেন, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের জন্য উপযুক্ত স্থানে সাত হাজার নতুন ঘর নির্মাণ করা হবে। তবে তিনি এর বেশি বিস্তারিত তথ্য দেননি।
তবে মণিপুরে জাতিগত বিভাজন এখনো তীব্র। মেইতেই সম্প্রদায়ের লোকেরা ইম্ফল ভ্যালিতে বসবাস করছে, আর কুকিরা পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায়। নিরাপত্তা বাহিনী দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বাফার জোনে টহল চালাচ্ছে। এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা বললেন, তাঁর কাজ হলো মেইতেই ও কুকিদের আলাদা রাখা এবং মিশতে না দেওয়া।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গৃহহীন মানুষকে তাদের নিজেদের এলাকায় পুনর্বাসন করা অপরিহার্য, যাতে হিংসার কারণে মণিপুরের সামাজিক মানচিত্র বদলে না যায়।
মণিপুর গভর্নরের সচিব আর কে নিমাই সিং বলেন, ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক ভারতের জন্য এটি ভালো নয়। মানুষকে তাদের নিজ বাড়িতে পুনর্বাসন করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
নিমাই সিং আরও বলেন, অনেক গৃহহীন মানুষের আশঙ্কা, একবার আশ্রয়শিবির ছেড়ে অস্থায়ী বাড়িতে গেলে তারা হয়তো আর কখনোই নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারবে না।
হাটনু হাওকিপের জন্য এটি একটি ভয়ানক চিন্তার বিষয়। ২২ বছর বয়সী এই কুকি তরুণী চুড়া চাঁদপুর অঞ্চলের আশ্রয়শিবিরে বসবাস করছেন। তিনি বলেন, তাঁর কাছে বাড়ি মানে ইম্ফল, আর কিছু না। তবে তাঁর গ্রাম এখনো মেইতেই সম্প্রদায়ের লোকেদের দখলে। কুকি সম্প্রদায়ের নেতাদের একটি আলাদা কেন্দ্রশাসিত এলাকা প্রতিষ্ঠার স্বাধীনতা দিলে তিনি হয়তো আরও নিরাপদ বোধ করতেন।
অনেক কুকি বাসিন্দা একই অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। তাঁরা তাঁদের এলাকায় ফিরে যেতে ভয় পাচ্ছেন। অন্যদিকে বিবিসির সঙ্গে কথা বলার সময় বেশির ভাগ মেইতেই জানিয়েছেন, তাঁরাও বাড়ি ফিরতে চান।
নতুন বাড়িগুলো কোথায় তৈরি হবে—এ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সাধারণ মানুষের অস্বস্তি ক্রমেই বাড়ছে। এর ফলে সন্দেহ দেখা দিয়েছে, সরকার আদৌ ডিসেম্বরের মধ্যে সব আশ্রয়শিবির বন্ধ করতে পারবে কি না।
গত বছর মণিপুরে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পর বহু পরিবার নিজেদের গ্রাম ও শহর ছেড়ে আশ্রয়শিবিরে ঠাঁই নেয়। এসব শিবিরে এখনো হাজার হাজার গৃহহীন মানুষ অস্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। আবাসন প্রকল্পে বিলম্ব, জমি অধিগ্রহণ নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে পুনর্বাসনপ্রক্রিয়া মন্থর হয়ে পড়েছে।
তবু সরকারি কর্মকর্তারা দাবি করছেন, ‘পুনর্বাসন পরিকল্পনা এখনো সঠিক পথে আছে এবং ধীরে ধীরে তা এগোচ্ছে।’ মণিপুরের এক জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা বলেন, প্রথমে প্রায় ২৯০টি আশ্রয়শিবির ছিল। এখন আমরা সংখ্যাটা কমিয়ে প্রায় ২৬০টিতে আনতে পেরেছি। আমাদের লক্ষ্য ধীরে ধীরে এই সংখ্যাকে শূন্যে নামিয়ে আনা।’
দীর্ঘদিন ধরে গৃহহীন থাকা এবং তীব্র অনিশ্চয়তা আশ্রয়শিবিরে বসবাসরত বহু মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যেও প্রভাব ফেলছে। শিবিরে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া যাচ্ছে না।
২৫ বছর বয়সী সালাম মনিকা বলেন, ‘আমার চাচা গত বছর আত্মহত্যা করেছেন। কারণ, উপার্জন না থাকায় তিনি হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর পরিবার যথাযথ চিকিৎসার সুযোগও পাননি।’
![]() |
| ভারতের মণিপুরে সহিংসতায় গৃহহীনদের আশ্রয়শিবির। ছবি: রয়টার্স |
Tuesday, June 10, 2025
আবার উত্তাল মণিপুর, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চাপে প্রশাসন by শুভজিৎ বাগচী
রাজ্য পুলিশ আজ সোমবার জানিয়েছে, গত রাত থেকে চলা সহিংসতায় সরকারি ভবনে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। যার মধ্যে ইম্ফল পশ্চিম জেলার সাব-ডিভিশনাল কালেক্টর বা উপ-মহকুমা শাসকের অফিসও রয়েছে। ফলে উপ-মহকুমা শাসকের ওই অফিসের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র পুড়ে গেছে। ভবনটিও আংশিকভাবে পুড়ে গেছে।
রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ মেইতেই সম্প্রদায়ের সশস্ত্র সংগঠন আরাম্বাই টেঙ্গলের এক শীর্ষ নেতা অসেম কানন সিংসহ আরও চারজনকে অতীতের সহিংসতার অভিযোগে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ভারতের একটি কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে, কয়েকজনকে ইম্ফল বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু ঠিক কতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তা নির্দিষ্টভাবে এখনো জানানো হয়নি। এই গ্রেপ্তারের ঘটনার পর গত শনিবার রাতে সর্বশেষ এই সহিংসতা শুরু হয়।
কাদের গ্রেপ্তার করা হলো
কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি আজ সোমবার নিশ্চিত করেছে মণিপুর পুলিশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেরিফায়েড পেজে এক বিবৃতিতে মণিপুর পুলিশ বলেছে, দুই কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই) এবং ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির (এনএসএ) বিবৃতি থেকে জানা গেছে, ৪৬ বছর বয়সী অসেম কানন সিংকে নানা অপরাধমূলক কাজকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, কানন সিং মণিপুর পুলিশের সদস্য ছিলেন। অস্ত্র পাচারের অভিযোগে গত মার্চের গোড়ায় তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। তাঁকে গ্রেপ্তারের পরই ৭ জুন থেকে ইম্ফল উপত্যকা উত্তাল হয়ে ওঠে। এ ছাড়া ৬ ও ৭ জুন নিরাপত্তা বাহিনী মধ্য মণিপুরের থৌবাল জেলার অধীনে লেইশাংথেম বাজারে সশস্ত্র মাওবাদী সংগঠন কাংলেইপাক কমিউনিস্ট পার্টির (জনযুদ্ধ গোষ্ঠী) আরও দুই সক্রিয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁরা হলেন লেইশাংথেম আমুজাও সিং (৩১) ও ইলাংবাম উমা রানী দেবী (৩২)। তাঁরা থৌবাল জেলায় চাঁদাবাজি করছিলেন।
কাংলেইপাক কমিউনিস্ট পার্টির (জনযুদ্ধ গোষ্ঠী) আরেক সক্রিয় সদস্য ৩৫ বছরের ওয়াহেংবম নাওটন মেইতেইকেও ওই সময় ইম্ফল পূর্ব জেলার অন্তর্গত সাওমবুং ওয়াইরি এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি এলাকার সাধারণ মানুষকে পার্টির নির্দেশিত নৈতিক–সামাজিক (মরাল পলিসিং) আচরণ বজায় রাখতে নানাভাবে হুমকি দিয়েছিলেন। একজন সাধারণ মানুষ সামাজিক নৈতিকতাবিষয়ক নির্দেশ দিতে পারেন না বলে স্থানীয় প্রশাসন জানায়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের অনেকেই আরাম্বাই টেঙ্গলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
এসব ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের জেরে শনিবার থেকে অশান্ত হয়ে ওঠে মণিপুর। গতকাল রোববার সহিংসতা ব্যাপক মাত্রায় বেড়ে যায়। বিক্ষোভকারীরা রোববার দুপুর থেকে বিভিন্ন জায়গায় জড়ো হতে শুরু করেন। তাঁরা মাটি দিয়ে রাস্তার ওপরে বিশাল প্রাচীর তৈরি করেন, যাতে পুলিশ বা সামরিক বাহিনীর গাড়ি যেতে না পারে।
মূলত পশ্চিম ইম্ফলে প্রথম এ ধরনের প্রাচীর তৈরি করা হয়। এরপর সর্বত্র গাড়ির টায়ার জ্বালানো শুরু হয়। পশ্চিম ইম্ফলের সেকমাই, কইরেঙ্গাইসহ কয়েকটি এলাকায় এ ধরনের মাটির প্রাচীর বানানোর পাশাপাশি গাড়ির টায়ার জ্বলানো হয়। একইভাবে পূর্ব ইম্ফল জেলার ওয়াংখেই, ইয়াইরিপোক, খুরাই প্রভৃতি অঞ্চলে টায়ার জ্বালিয়ে পুলিশ ও যৌথ বাহিনীর বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়া হয়।
রাজ্য পুলিশ জানায়, বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে নিরাপত্তা বাহিনীকে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করতে হয়। পূর্ব ও পশ্চিম ইম্ফলের আরও অসংখ্য জায়গায় বিভিন্ন ভবন ও সম্পত্তিতে অগ্নিসংযোগ করা হয় বলেও স্থানীয় প্রচার মাধ্যম জানিয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশ জায়গাতেই নিরাপত্তা বাহিনী পৌঁছাতে পারেনি।
আরাম্বাই টেঙ্গল ১০ দিনের জন্য রাজ্যজুড়ে, বিশেষত তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় ধর্মঘট ডেকেছে। জরুরি পরিষেবা ছাড়া সবকিছুই এই ধর্মঘটের আওতা থাকবে।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, নির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বিদ্রোহীদের গ্রেপ্তার করতে রাজধানী ও সংলগ্ন এলাকার বিভিন্ন অঞ্চলে চিরুনি অভিযান চালানো হচ্ছে।
আদিবাসীদেরও গ্রেপ্তার
অন্যদিকে আদিবাসী কুকি-জো সমাজের তিন ব্যক্তিকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ২০২৪ সালে পুলিশের ওপর প্রাণঘাতী হামলার অভিযোগে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।
আসামের শিলচর থেকে গত ১৯ মে আটক করা হয় কুকি-ইনপি টেংনোপাল বিদ্রোহী গোষ্ঠীর থাংমিনলেন মেটকে নামের এক ব্যক্তিকে।
এ ছাড়া কুকি ন্যাশনাল আর্মির সদস্য কামগিনথাং গ্যাংটে এবং চুড়াচাঁদপুর জেলার গ্রাম স্বেচ্ছাসেবক গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হেন্টিনথাং কিপগেন ওরফে থাংনিও কিপগেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে হামলা চালিয়ে দুই পুলিশ সদস্যকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে।
ইম্ফল উপত্যকার মতো পাহাড়ে কুকি-জো জনজাতি অধ্যুষিত এলাকায় গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ শুরু হয় ৬ জুন। সেখানে তিন দিন প্রতিবাদ চলে এবং সেখানেও উত্তেজনা রয়েছে। তবে ইম্ফলের তুলনায় পাহাড়ে পরিস্থিতি অপেক্ষাকৃত নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
রাজ্য প্রশাসনের পদক্ষেপ
পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, অনেকগুলো এলাকায় বন্ধ করে দেওয়া রাস্তা খোলা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম বিমানবন্দরে যাতায়াতের প্রধান সড়ক টিডিম রোড। তবে এখনো অসংখ্য রাস্তা, সংলগ্ন সরু গলি বা বিভিন্ন মহল্লার সরু রাস্তা বাঁশ দিয়ে বন্ধ করে রাখা হয়েছে বলে স্বীকার করছে রাজ্য পুলিশ। মেইতেই সমাজের বিভিন্ন নারী সংগঠনও প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে। গতকাল রোববার সারা রাত তাঁরা মশালমিছিল করেছেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নিরাপত্তা বাহিনী এবং রাজ্য প্রশাসনের তরফে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রথমত, বিভিন্ন সরকারি ভবনে যে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে, সেসব ঘটনা তদন্তের পাশাপাশি সরকারি ভবনগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ইম্ফল পশ্চিম, ইম্ফল পূর্ব, থৌবাল, বিষ্ণুপুর ও কাকচিং জেলায় বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞামূলক আদেশ জারি করা হয়েছে। যেমন এলাকায় একাধিক ব্যক্তির সমাবেশ বা কোনো ধরনের সাধারণ জিনিস, যেমন লাঠি নিয়ে অঞ্চলে ঘোরাঘুরির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ
শনিবার থেকে সহিংসতার জেরে ইম্ফল ও সংলগ্ন অঞ্চলে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ভার্চ্যুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক বা ভিপিএনও রয়েছে। ভিপিএনের সাহায্যে ইন্টারনেট পরিষেবা ব্যবহার করা হলে গ্রাহকের ইন্টারনেট ঠিকানা বোঝা সম্ভব হয় না। ফলে তিনি কোথা থেকে ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন, সেটাও নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা যায় না।
ভারতে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন রাজ্যে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয় বিভিন্ন ধরনের উত্তেজনা ও সংঘাতের কারণে। ডিজিটাল অধিকার সংস্থা ‘অ্যাকসেস নাও’–এর পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০২৪ সালে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ৮৪ বার ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। তবে তার আগের বছর; অর্থাৎ ২০২৩ সালে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ১১৬ বার ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে ‘অ্যাকসেস নাও’।
রাজ্যপালের বৈঠক
মণিপুরের রাজ্যপাল এবং ভারতের সাবেক স্বরাষ্ট্রসচিব অজয় কুমার ভাল্লা পরিস্থিতি পর্যালোচনায় ইতিমধ্যে কয়েক দফায় প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। গতকাল রোববার বহুদলীয় বিধায়কদের ২৫ সদস্যের একটি দল ভাল্লার সঙ্গে দেখা করে।
রাজ্যসভার সংসদ সদস্য লেইশেম্বা সানাজাওবাও ওই দলে ছিলেন। তাঁরা রাজ্যপালের কাছে জানতে চান, কীভাবে পরিস্থিতি এত দ্রুত হাতের বাইরে চলে গেল। গত ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির পর এত বড় ধরনের সহিংসতার ঘটনা রাজধানী এবং সংলগ্ন এলাকায় ঘটেনি।
২০২৩ সালের মে মাস থেকে ধারাবাহিকভাবে চলা সহিংসতায় মণিপুরে অন্তত ২৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে, গৃহহীন হয়েছেন ৬০ হাজারের বেশি মানুষ। সেখানে এখনো শান্তি ফেরেনি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত দুই বছরে মণিপুর সফর করেননি। এ নিয়ে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস তাঁর সমালোচনা করছে।
রাজ্য বিধানসভা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করে রাখা হয়েছে। সর্বভারতীয় প্রচারমাধ্যম ইতিমধ্যে বিভিন্ন সূত্রকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর কুকি-জো আদিবাসীদের সঙ্গে কথাবার্তা শুরুর উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সরকার যখন দিল্লিতে এ ব্যবস্থা নিচ্ছে, ঠিক তখনই আবার রাজ্যে নতুন করে সহিংসতা শুরু হয়েছে।
![]() |
| ভারতের মণিপুর রাজ্যে সড়ক অবরোধ। ১ জুন, কাংচুক এলাকা। ছবি: এএনআই |
Tuesday, April 8, 2025
ওয়াকফ বিল পাসের বিরুদ্ধে উত্তাল মণিপুর, বিজেপি নেতার বাড়িতে আগুন
এতে বলা হয়, পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে পড়লে পরে সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত হন এবং পরিবেশ শান্ত করেন। এছাড়া সেখানে এখনও আধাসামরিক ও অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। নিরাপত্তা বাহিনীর কড়া পাহারায় ওই সমাবেশটি আলিয়া মাদ্রাসা এলাকার লিলং হাওরেইবি পর্যন্ত এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি পেয়েছিল। এখানে বলে রাখা ভালো লিলং একটি মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা।
আসরের নামাজের পর ওয়াকফ বিলের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু করেন স্থানীয় মুসলমানরা। তারা বিলটির বিরোধীতা করে সেখানে বিভিন্ন স্লোগান দেন। এসময় তারা বিভিন্ন ফেস্টুন প্রদর্শন করেন। এই ঘটনার পর সোমবার ভোর পর্যন্ত অন্যান্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলোতেও কড়া নিরাপত্তায় ছিলেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। স্থানীয় মুসলিম নেতারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিকে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের লড়াইকে খর্ব করার অভিযোগ করেছেন। বলেছেন, ভারতে মুসলমানদের মনোবল ভেঙে দিতেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের লেলিয়ে দিয়েছে বিজেপি সরকার।
কিছু কিছু যায়গায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। থৌবালের ইরোং চেসাবাতে, সকালে নিরাপত্তা বাহিনী এবং বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বিক্ষোভকারী একটি সমাবেশে বাধা দিলে ওই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে। তবে এখনও কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
সমাজকর্মী এবং মুসলিম নেতা সাকির আহমেদ সমাবেশে অংশগ্রহণ করে বলেন, ওয়াকফ সংশোধনী বিল ভারতীয় সংবিধানের নীতিমালার পরিপন্থী, কারণ এটি মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে সম্পূর্ণরূপে অগ্রহণযোগ্য। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেও ওয়াকফ বিল পাসের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

Tuesday, March 11, 2025
নরকে পরিণত হয়েছে মনিপুর by লিমা সুলতানা
উল্লেখ্য, ভুলবশত এক গোষ্ঠীর মানুষ অন্য গোষ্ঠীর সীমানায় প্রবেশ করা নিয়ে ২২ মাসে মণিপুরে কয়েকটি সংঘাত হয়েছে। এদিকে কিছুদিন ধরে দেশ ভাগের আভাস দিয়ে আসছে মণিপুর। যেখানে কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিরাপত্তায় বাফার জোনের দাবি তোলা হয়। সম্প্রতি মণিপুর জুড়ে ফ্রি মুভমেন্টের ডাক দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। যা ৮ই মার্চ থেকে শুরু হয়। এটিকে দেশভাগের আভাসের পরিকল্পনা পাল্টে দেয়ার চেষ্টা হিসেবে গণ্য করা হয়। অমিত শাহের ডাকার ফ্রি মুভমেন্টে সরকারের পক্ষ থেকে বাস সরবরাহ করা হয়। ওই সব বাস কেন্দ্রীয় বাহিনীর পাহারায় পাহাড় ও উপত্যকার মধ্য দিয়ে চলে যায়। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পরিকল্পনা ফলপ্রসূ হয়নি। ফ্রি মুভমেন্টের প্রথম দিনেই এক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। এতেই পরিস্থিতির ভঙ্গুরতা বোঝা যায়। ওই হত্যার মাধ্যমে চার মাসে প্রথমবারের মতো হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এতে নড়ে চড়ে বসে মণিপুরের জনগণ। তারা বুঝতে পারে নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেদেরকেই নিতে হবে। উল্লেখ্য, এনইচ-২ ও এনএইচ-৩৭ নামের হাইওয়ে দুটিকে মণিপুরের লাইফলাইন বলা হয়ে থাকে। ওই হাইওয়ে দুটি দিয়ে পাহাড় ও উপত্যকায় কর্মী ও পণ্য সরবরাহ করা হয়। এরই মধ্যে আলাদা প্রশাসনের দাবি তোলে কুকি গোষ্ঠী। তাদের দাবি আদায়ের আন্দোলনের অংশ হিসেবে ওই দুটি হাইওয়ে দিয়ে পণ্য সরবরাহে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে কুকিরা। এতে করে সৃষ্টি হয় খাদ্য সংকট, মুদ্রাস্ফীতি। ব্যাঘাত ঘটে ব্যবসায়। অনুরূপভাবে মেইতেই গ্রুপও পাহাড়ে যাওয়ার পথে পণ্যবাহী ট্রাকগুলোর ওপর হামলা চালায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মণিপুুরে দুই গ্রুপের সমস্যা সমাধানের উদ্দেশে ৮ই মার্চের কর্মসূচির পরিকল্পনা করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ই¤ফল থেকে চুরাচান্দপুরে একটি বাস সফলভাবে যাত্রা করে। তবে ব্যাপক সংখ্যক আন্দোলনকারীর বাধার সম্মুখীন হয় কাংপোকপি জেলার মধ্য দিয়ে যাওয়া আরেকটি বাস। ফলে এটি আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে মণিপুরে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসতে এখনো অনেক দেরি।
এদিকে ইম্ফলের পশ্চিমের জেলার মারাক অঞ্চল থেকে নিষিদ্ধ কাংলেইপাক কমিউনিস্ট পার্টির দুই জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এছাড়া নিষিদ্ধ গোষ্ঠী পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) কাছ থেকে দুই বালিকাকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। তাদেরকে কাকচিং জেলার কাকচিং বাজার থেকে উদ্ধার করা হয়। একই দিনে পুলিশ কাকচিং বাজার থেকে পিএলএ’র দুই ক্যাডারকে গ্রেপ্তার করে। তারা হলো মোইরামথেম রোমেন সিং (২৩) ও নংমাইথেম মহেন্দ্রো সিং (৫৪)। ইতিমধ্যে নিষিদ্ধ গোষ্ঠী কাংলেইপাক কমিউনিস্ট পার্টির দুই জঙ্গী গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে চারটি গ্রেনেড উদ্ধার করা হয়।

Wednesday, November 20, 2024
মণিপুরে ‘অল আউট অ্যাকশনে'যেতে চায় মোদি সরকার
সূত্রের খবর, কেন্দ্রের তরফে আধাসেনাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে অল আউট অভিযানে নামার। যে সব বিদ্রোহীরা এখানে সক্রিয় তাঁদের প্রত্যেককে আটক করার এমনকি প্রয়োজনে নিকেশ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সশস্ত্র বিদ্রোহীদের কাছে কী কী অস্ত্র রয়েছে, তাদের ঠিকানা কোথায় সে সব তথ্য জানতে গোয়েন্দা বিভাগ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
মায়ানমার সীমান্তের পাশাপাশি জায়গায় জায়গায় তল্লাশি অভিযান চালাবে নিরাপত্তাবাহিনী। কড়া হাতে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে আধাসেনাকে। প্রয়োজনে নিরাপত্তা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা কর্মীদের সংখ্যা বাড়ানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। গত ৭ নভেম্বর থেকে নতুন করে ফের একবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে মণিপুর। বিশেষ করে এই অঞ্চলের জিরিবাম জেলা। এখনও পর্যন্ত প্রায় ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে এখানে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে গত ১৪ নভেম্বর, নতুন করে লাগু হয়েছে আফস্পা। এমনকি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে ইন্টারনেট পরিষেবা। এখানে ২০ কোম্পানি আধাসেনা আগে থেকেই মোতায়েন করেছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক। এবার আরও ৫০ কোম্পানি আধাসেনা অর্থাৎ, ৫ হাজার সিআরপিএফ মোতায়েন করা হল এই রাজ্যে।
মণিপুরের পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসন ব্যর্থ এমন অভিযোগ তুলে রবিবার বীরেন সিং সরকারের উপর থেকে সমর্থন তুলে নেয় মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমার দল ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি)। মণিপুরের পরিস্থিতি নিয়ে ঘরে-বাইরে চাপের মুখে সে রাজ্যের বিজেপি সরকার। সোমবার সন্ধ্যা ৬টায় সচিবালয়ে বৈঠকের ডাক দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী বীরেন সিং। মণিপুর প্রশাসনের একটি সূত্র মারফত জানা গিয়েছে, মূলত দু’টি বিষয় নিয়ে বৈঠক উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সিংহভাগ বিধায়ক কুকি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার আর্জি জানান। এর পাশাপাশি মেইতেই অধ্যুষিত ইম্ফল উপত্যকার ছ’টি থানায় সেনাবাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা ‘আফস্পা’ প্রত্যাহারের আর্জি জানান ওই বিধায়কেরা। প্রস্তাব আকারে নিজেদের এই দুই দাবি তুলে ধরার পর এনডিএ-র বিধায়কেরা হুঁশিয়ারির সুরে জানান, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কেন্দ্র তাদের কথা মেনে না-নিলে জনগণের পরামর্শ নিয়ে তারা ভবিষ্যতের কর্মপন্থা স্থির করবেন।
সূত্র : দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

Monday, November 18, 2024
ক্রমাগত সহিংসতায় উত্তপ্ত মণিপুর, চলছে ধরপাকড়
এতে বলা হয়, সহিংস এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাজ্যে বেশ কিছু এলাকার ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সম্প্রদায় দুটির মধ্যে গত মে থেকেই চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। ক্রমাগত এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত দুই শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন আর বাস্তুচ্যুত হয়েছেন কয়েক হাজার। শনিবার বিক্ষোভকারীরা রাজ্যের শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কয়েক ডজন আইন প্রণেতাদের বাড়ি এবং অফিসে অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুর চালিয়েছে। এখন পর্যন্ত ২৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এছাড়া অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করা হয়েছে।
মেইতেই অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি সেখানের ইম্ফল উপত্যকা এবং বিষ্ণুপুর জেলায় ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করেছে কর্তৃপক্ষ। এমন সহিংস পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্য সরকার শীর্ষ কর্মকর্তাদের জন্য নিরাপত্তা বৃদ্ধি করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ রোববার এই পরিস্থিতিতে উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি বৈঠক করেছেন বলে জানা গেছে। এ মাসে কুকি ও মেইতেই সম্প্রদায়ের সহিংসতায় কমপক্ষে ২০ জন নিহত হয়েছেন। গত ৭ই নভেম্বর রাজ্যের জিরিবাম জেলায় কুকি সম্প্রদায়ের এক নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠার পর গত কয়েক মাস ধরে চলা উত্তেজনা আরও তীব্র হয়। ওই নারীকে ধর্ষণের পর পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এর চারদিন পর ওই এলাকার একটি থানা এবং ত্রাণ ক্যাম্পে হামলা করে মেইতেই সম্প্রদায়ের লোকজন। তবে এই হামলার দায় কুকিদের ওপর চাপিয়েছে তারা। যার জের ধরেই ক্রমাগত সিহংসতায় জ্বলছে মণিপুর রাজ্য।

সহিংসতায় জ্বলছে মনিপুর ‘মোদি শুধু চেয়ার রক্ষার কথাই ভাবেন’
সাম্প্রতিক সময়ে মনিপুরে সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি ৬ জন ব্যক্তি নিখোঁজ হন। তারপর তাদের তিনজনের মৃতদেহ উদ্ধার হয় একটি নদী থেকে। এর ফলে ভয়াবহ প্রতিবাদ বিক্ষোভ হয় সেখানে। বিক্ষুব্ধ জনতা রাজ্যের তিনজন মন্ত্রীর বাসভবনে হামলা করে শনিবার। হামলা হয় ৬ জন এমএলএ’র বাড়িতে। এর ফলে অনির্দিষ্টকালের জন্য ৫টি জেলায় কারফিউ জারি করে সরকার। রাজ্যের বিভিন্ন অংশে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়। বিক্ষুব্ধরা বেশ কিছু আইনপ্রণেতার বাড়ি তছনছ করে দেয় ইম্ফলে। এর মধ্যে আছে মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিংয়ের জামাই। বাড়িঘরে থাকা সহায় সম্পত্তিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। বিক্ষুব্ধ জনতাকে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয় নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা।

Sunday, November 17, 2024
মণিপুরে আবারও কারফিউ জারি, ইন্টারনেট সেবা বন্ধ
ধারণা করা হচ্ছে মরদেহগুলো মেইতেই সম্প্রদায়ের। গত সপ্তাহে জিরিবাম জেলায় মণিপুর পুলিশ ও কুকি বিদ্রোহীদের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধ হয়। ওই ঘটনার পর থেকে তাঁরা নিখোঁজ ছিলেন।
মণিপুরের স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, গতকাল শুক্রবার জিরিবামের একটি নদী থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। অন্য তিনজনের মরদেহ আজ পাওয়া গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সেনাবাহিনীর একটি সূত্র এএফপিকে জানিয়েছে, মরদেহগুলো উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ জনতা বেশ কয়েকজন স্থানীয় রাজনীতিকের বাড়িতে হামলা চালিয়েছেন। তবে এতে সামান্যই ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
শনিবার বিক্ষোভকারীরা টায়ার জ্বালিয়ে রাজধানী ইম্ফলের সড়ক অবরোধ করেন। এরপর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় শহরে কারফিউ জারির ঘোষণা দেয় মণিপুর সরকার।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দুই দিনের জন্য মণিপুরের ব্রডব্যান্ড ও মোবাইল ইন্টারনেট সেবা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে রাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সহিংসতার কারণে গত বছর কয়েক মাস মণিপুরে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখা হয়েছিল। ওই সময় অন্তত ৬০ হাজার মানুষ গৃহহীন হন।
ওই ঘটনার পর থেকে কয়েক হাজার বাসিন্দা জরুরি আশ্রয়শিবিরে বসবাস করছেন। চলমান বিরোধের কারণে তাঁরা এখনো নিজের বাড়িতে ফিরতে পারছেন না।
সরকারি চাকরি ও জমি নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণে মেইতেই ও কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য স্থানীয় নেতারা জাতিগত বিভাজন বাড়াচ্ছেন।
![]() |
| সহিসংতার প্রতিবাদে মণিপুরের নারীরা সমাবেশ করেন। ইম্ফল, মণিপুর, ভারত, ১৬ নভেম্বর। ছবি: এএনআই |
Tuesday, November 12, 2024
মণিপুরে কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপর হামলা, সিআরপিএফের গুলিতে ১১ কুকি বিদ্রোহী নিহত

Monday, November 11, 2024
মণিপুরে কুকি নারী হত্যার জেরে এক মেইতেই নারীকে হত্যা
এ ঘটনাকে বৃহস্পতিবারের ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় পাল্টা হামলা বলে ধারণা করা হচ্ছে। আসামঘেঁষা পশ্চিম মণিপুরের জিরিবাম জেলায় এক নারীকে গত বৃহস্পতিবার রাতে ধর্ষণ করে জীবন্ত অবস্থায় পুড়িয়ে মারা হয়। তিনিও তিন সন্তানের মা ছিলেন।
জিরিবাম জেলার ওই নারী ছিলেন হামর গোষ্ঠীভুক্ত। হামর, জোমি ও কুকি—এই তিন আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীকে সম্মিলিতভাবে ‘জো’ বলে চিহ্নিত করা হয়। অনেক সময় এই তিন গোষ্ঠীসহ অন্য আরও ছোট গোষ্ঠীকে মিলিয়ে শুধু আদিবাসী বা কুকি বলে চিহ্নিত করা হয়। মণিপুরে আদিবাসীদের মধ্যে কুকিরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ।
পশ্চিম মণিপুরের জিরিবাম জেলায় বৃহস্পতিবার ওই নারীকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার পর গত শুক্রবার থেকে মণিপুরের মধ্য ও দক্ষিণ অঞ্চলে নতুন করে প্রবল উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। জিরিবামে নিহত নারীর পরিবারের জন্য বিচার চেয়ে শনিবার কুকি-অধ্যুষিত কাংপোকপি ও চূড়াচাঁদপুর জেলায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে শনিবার বিকেলে মধ্য মণিপুরের বিষ্ণুপুর জেলার সাইতন এলাকায় মেইতেই সম্প্রদায়ের এক কৃষক নারীকে গুলি করে হত্যা করা হলো।
সাইতনসহ মণিপুরের নিচু উপত্যকা অঞ্চলের বেশির ভাগ গ্রাম এখনো পর্যন্ত রয়েছে কুকিসহ অন্যান্য আদিবাসী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে। ফলে মেইতেই অঞ্চলে কাউকে হত্যা করা হলে কুকি অঞ্চলে প্রতিহিংসার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে এবং দুই ক্ষেত্রেই মারা যাচ্ছেন গ্রামের একেবারে সাধারণ মানুষ। দুই গোষ্ঠীর সদস্যদের কাছেই রয়েছে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র। দুই পক্ষই তৈরি করেছে গ্রাম প্রতিরক্ষা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী, যারা এই আগ্নেয়াস্ত্র নিজেদের আত্মরক্ষার দাবি তুলে পরস্পরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে।
ভারতের সংঘাতবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের বড় অংশ মনে করছে, পরিস্থিতি সরকারের এবং দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এ বিষয়ে এক সাক্ষাৎকারে কিছুদিন আগে উত্তর-পূর্ব ভারত বিশেষজ্ঞ প্রদীপ ফানজৌবাম প্রথম আলোকে বলেছিলেন, অবিলম্বে যাবতীয় অস্ত্র সরকার নিজের হাতে নিয়ে আসতে না পারলে মণিপুরে শান্তি ফেরানো অসম্ভব। কিন্তু বারবার আবেদন করেও লুট হওয়া অস্ত্র সরকারের হাতে ফেরত আসেনি। সে কারণেই ধারাবাহিকভাবে হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চলছে মণিপুরে। বিষ্ণুপুরের মেইতেই নারী হত্যার পর পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, রোববার মেইতেই গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছে।
২০২৩ সালের মে মাস থেকে ধারাবাহিক সংঘাতে মণিপুরে এখনো পর্যন্ত সরকারি হিসাবে প্রায় ২৫০ জন মারা গেছে। এখনো গৃহহীন প্রায় ৬০ হাজার মানুষ।
![]() |
| ভারতের মণিপুর রাজ্যের বিষ্ণুপুর জেলায় রকেট হামলার স্থান পরিদর্শন করছে মোবাইল ফরেনসিক ইউনিট, ৬ সেপ্টেম্বর। ছবি: এএনআই |
Saturday, November 9, 2024
অশান্ত মণিপুর: জিরিবামে ছয়টি বাড়িতে আগুন, নারীকে গুলি করে পুড়িয়ে মারার অভিযোগ
সূত্র : দা হিন্দু

Sunday, September 22, 2024
‘ব্যানানা রিপাবলিকে’ পরিণত মণিপুর
ভারতের সংবাদ সংস্থা পিটিআই একটি সাক্ষাৎকারের সূত্রে আকৌজামের কাছে জানতে চেয়েছিল, মণিপুর ধীরে ধীরে আরেকটি আফগানিস্তানে পরিণত হচ্ছে কি না? জবাবে আকৌজাম বলেন, ‘মণিপুরে যা হচ্ছে, ভারত সরকার তা হতে দিচ্ছে। অতএব মণিপুর আফগানিস্তানের পথে যাচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন না করে আমাদের জিজ্ঞাসা করা উচিত, কেন ভারত সরকার মণিপুরকে আফগানিস্তানের মতো একটি “ব্যানানা রিপাবলিকে” পরিণত হতে দিচ্ছে।’ আকৌজামের অভিযোগ, মণিপুরকে সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃতভাবে অস্থিতিশীল করে তোলার ষড়যন্ত্র চলছে। তাঁর মতে, ‘কেউ এই গোটা পরিকল্পনা অন্য একদল লোকের সঙ্গে মিলিতভাবে করছে। এদের উদ্দেশ্য, রাজ্যটাকে টুকরা টুকরা করা।’
উত্তর প্রদেশ, বিহার, রাজস্থান বা মধ্যপ্রদেশে যদি এমনটা ঘটত, তাহলে কি এই ঘটনা এভাবে চলতে দেওয়া হতো? বেশির ভাগ মানুষই বলবেন না, তা হতো না, বলেন আকৌজাম। মণিপুরে ৬০ হাজার নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন করা হয়েছে। এত সংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী নিশ্চিতভাবেই অনেক আগে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পারতেন। কিন্তু সেটা করা হচ্ছে না বলে মনে করেন অধ্যাপক আকৌজাম।
মণিপুরে গত দেড় বছরের সহিংসতায় অন্তত আড়াই শ জনের মৃত্যু হয়েছে, গৃহহীন হয়েছেন ৫০ হাজারের বেশি মানুষ। সহিংসতা শুরু হওয়ার পরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখনো মণিপুর সফর করেননি।
গতকাল শনিবার মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী নিরাপত্তা উপদেষ্টা কুলদীপ সিং ভারতের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা বিভাগের প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার থেকে অন্তত ৯০০ কুকি জঙ্গি মণিপুরে প্রবেশ করেছে এবং তারা আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে বড় ধরনের জঙ্গি হামলা চালানোর চেষ্টা করছে। তাঁর এই মন্তব্যে রাজ্যে এবং উত্তর-পূর্ব ভারতে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে।
আকৌজাম বলেন, মণিপুরে যে সহিংসতা দেখা গেছে, তা উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারতে নজিরবিহীন। এটিকে অত্যাধুনিক অস্ত্র এবং সামরিকশৈলীর অভিযান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একধরনের গৃহযুদ্ধও বলা যেতে পারে বলে মনে করেন আকৌজাম।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর থেকে মানুষের আস্থা চলে যাওয়ার প্রসঙ্গেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন আকৌজাম। তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন পুলিশসহ নিরাপত্তা বাহিনীর ওপরে মানুষের আস্থা হারানোর প্রশ্নে।ভারত সরকার মণিপুরকে ক্রমে ‘আফগানিস্তানে’র মতো একটি ‘ব্যানানা রিপাবলিকে’ অর্থাৎ রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল এবং আইনশৃঙ্খলাহীন রাজ্যে পরিণত করার চেষ্টা করছে। এ মন্তব্য করেছেন মণিপুরের কংগ্রেস এমপি, চিত্রপরিচালক ও জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ বিমল আকৌজাম।
ভারতের সংবাদ সংস্থা পিটিআই একটি সাক্ষাৎকারের সূত্রে আকৌজামের কাছে জানতে চেয়েছিল, মণিপুর ধীরে ধীরে আরেকটি আফগানিস্তানে পরিণত হচ্ছে কি না? জবাবে আকৌজাম বলেন, ‘মণিপুরে যা হচ্ছে, ভারত সরকার তা হতে দিচ্ছে। অতএব মণিপুর আফগানিস্তানের পথে যাচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন না করে আমাদের জিজ্ঞাসা করা উচিত, কেন ভারত সরকার মণিপুরকে আফগানিস্তানের মতো একটি “ব্যানানা রিপাবলিকে” পরিণত হতে দিচ্ছে।’ আকৌজামের অভিযোগ, মণিপুরকে সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃতভাবে অস্থিতিশীল করে তোলার ষড়যন্ত্র চলছে। তাঁর মতে, ‘কেউ এই গোটা পরিকল্পনা অন্য একদল লোকের সঙ্গে মিলিতভাবে করছে। এদের উদ্দেশ্য, রাজ্যটাকে টুকরা টুকরা করা।’
উত্তর প্রদেশ, বিহার, রাজস্থান বা মধ্যপ্রদেশে যদি এমনটা ঘটত, তাহলে কি এই ঘটনা এভাবে চলতে দেওয়া হতো? বেশির ভাগ মানুষই বলবেন না, তা হতো না, বলেন আকৌজাম। মণিপুরে ৬০ হাজার নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন করা হয়েছে। এত সংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী নিশ্চিতভাবেই অনেক আগে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পারতেন। কিন্তু সেটা করা হচ্ছে না বলে মনে করেন অধ্যাপক আকৌজাম।
মণিপুরে গত দেড় বছরের সহিংসতায় অন্তত আড়াই শ জনের মৃত্যু হয়েছে, গৃহহীন হয়েছেন ৫০ হাজারের বেশি মানুষ। সহিংসতা শুরু হওয়ার পরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখনো মণিপুর সফর করেননি।
গতকাল শনিবার মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী নিরাপত্তা উপদেষ্টা কুলদীপ সিং ভারতের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা বিভাগের প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার থেকে অন্তত ৯০০ কুকি জঙ্গি মণিপুরে প্রবেশ করেছে এবং তারা আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে বড় ধরনের জঙ্গি হামলা চালানোর চেষ্টা করছে। তাঁর এই মন্তব্যে রাজ্যে এবং উত্তর-পূর্ব ভারতে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে।
আকৌজাম বলেন, মণিপুরে যে সহিংসতা দেখা গেছে, তা উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারতে নজিরবিহীন। এটিকে অত্যাধুনিক অস্ত্র এবং সামরিকশৈলীর অভিযান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একধরনের গৃহযুদ্ধও বলা যেতে পারে বলে মনে করেন আকৌজাম।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর থেকে মানুষের আস্থা চলে যাওয়ার প্রসঙ্গেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন আকৌজাম। তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন পুলিশসহ নিরাপত্তা বাহিনীর ওপরে মানুষের আস্থা হারানোর প্রশ্নে।

Wednesday, September 18, 2024
'মনিপুরে শান্তি ফেরাতে মরিয়া মোদি সরকার, শুরু হয়েছে আলোচনা': অমিত শাহ by সেবন্তী ভট্টাচার্য্য

Monday, September 16, 2024
অশান্ত মণিপুর: মন্ত্রীর বাসভবনে বোমা বিস্ফোরণ by সেবন্তী ভট্টাচার্য

Thursday, September 12, 2024
অশান্ত মণিপুর, কারফিউ উপেক্ষা সংঘর্ষ, সমালোচনায় কংগ্রেস
ওদিকে মঙ্গলবার স্থানীয় সময় বিকাল ৬টার দিকে শিক্ষার্থী এবং নারীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন মণিপুর গভর্নর লক্ষ্মণ প্রসাদ আচার্য। তিনি শান্তির আহ্বান জানিয়েছেন। রাজভবন থেকে ইস্যু করা এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, হঠাৎ করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন গভর্নর। এতে আরও বলা হয়, মণিপুরের প্রত্যেকের উচিত চলমান সহিংসতা কাটিয়ে ওঠার উপায় বের করা এবং এতে অবদান রাখা। কারণ, সহিংসতা কোনো সমস্যার সমাধান দিতে পারে না। আরও বলা হয়েছে, অব্যাহতভাবে সরকারি পর্যায়ের নেতা, ছাত্র এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে আলোচনা করছেন গভর্নর।
কংগ্রেস সরকার ১৫ বছরে যা করতে পারেনি তা ১৫ মাসে করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তার এই প্রতিশ্রুতির পর মণিপুরের উত্তেজনা নিয়ে মোদির সমালোচনা করেছেন বিরোধী দল কংগ্রেসের সিনিয়র নেতা জয়রাম রমেশ। তিনি বলেন, প্রকৃতপক্ষে মণিপুরের সব শ্রেণির মানুষের সুনির্দিষ্ট ১৫ মাসের ম্যান্ডেটে তিনি (মোদি) রাজ্যের সহিংসতাকে বৃদ্ধি পাওয়া অনুমোদন দিয়েছেন। যে আগুন এখনো জ্বলছে, তা প্রশমিত হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। জয়রাম রমেশ আরও বলেন, সুপ্রিম কোর্ট ঘোষণা করেছে রাজ্যটিতে সাংবিধানিক মেশিনারি ভেঙে পড়েছে। কিন্তু মোদির এখনো নড়নচড়ন নেই। তিনি বিশ্ব জুড়ে ভ্রমণ করছেন। কিন্তু ২০২৩ সালের ৩রা মে এই রাজ্যে বিয়োগান্তক ঘটনা শুরু হওয়ার পর তিনি এখানে সফরে আসার সময় পাননি অথবা সফরে অনীহা দেখিয়েছেন।
উল্লেখ্য, গত ১৬ মাসে মণিপুরে কুকি- জো এবং মেইতি জনগণের মধ্যে জাতিগত দাঙ্গায় কমপক্ষে ২৩০ জন নিহত হয়েছেন। চার মাস পরিস্থিতি একটা শান্ত থাকার পর ১লা সেপ্টেম্বর সহিংসতা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এর পর দু’জন নারী সহ নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ১১ জন। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ২০ জন। কর্মকর্তারা বলছেন, উগ্রপন্থিরা এখন ড্রোন ব্যবহার করে বোমা হামলা করছে এবং দীর্ঘ পাল্লার রকেট হামলা করছে। এর ফলে পরিস্থিতির গুরুতর অবনতি হয়েছে। ইম্ফল উপত্যকায় কয়েকদিনে ড্রোন হামলায় ‘ফরেন এলিমেন্টস’ জড়িত থাকার কথা নিশ্চিত করেছেন আইজিপি আইকে মুইভাহ।

Wednesday, September 11, 2024
মণিপুরে কারফিউ জারি, ইন্টারনেট বন্ধ
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, মণিপুরে নতুন করে সহিংসতার মধ্যে রাজ্যের ইম্ফল পশ্চিম, ইম্ফল পূর্ব এবং মণিপুরের থাউবাল জেলায় মঙ্গলবার (১০ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টা থেকে সর্বাত্মক কারফিউ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, পিএইচইডি, প্রেস এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং আদালতের মতো প্রয়োজনীয় পরিষেবার সঙ্গে জড়িতরা কারফিউয়ের আওতামুক্ত থাকবেন। এ ছাড়া পৌরসভার কর্মকর্তা, বিদ্যুৎ কর্মী, পেট্রোল পাম্পের কর্মী, ফ্লাইটের যাত্রী এবং মিডিয়া কর্মীরাও নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবেন।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, পাঁচ দিনের জন্য মণিপুরে মোবাইল ইন্টারনেট, ব্রডব্যান্ড ও ভিপিএন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নতুন করে শুরু হওয়া সহিংসতার কারণে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে হেইট স্পিচ ও হেইচ ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হতে পারে, এমন শঙ্কা থেকে রাজ্য সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই আদেশ দিয়েছে।

Tuesday, September 10, 2024
অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠছে মনিপুর
সোমবার রক্তের মধ্যে পড়ে থাকতে দেখা যায় তার মৃতদেহ। কুকিদের একটি সংগঠন বলেছে, তিনি সেনাবাহিনীর সাবেক একজন সদস্য। কয়েক বছর আগে হারিয়েছেন স্ত্রীকে। তারপর থেকে নিজের ছেলের সঙ্গে বসবাস করছিলেন তিনি। তবে তার মৃত্যু নিয়ে পুলিশ কোনো তথ্য দেয়নি। মেইতি অধ্যুষিত ইম্ফল উপত্যকা সোমবার শিক্ষার্থীদের ব্যাপক প্রতিবাদ বিক্ষোভ প্রত্যক্ষ করেছে। ১লা সেপ্টেম্বর থেকে কুকিদের বিরুদ্ধে যে নতুন করে সহিংসতা শুরু হয়েছে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানায় তারা। তবে ইম্ফলে রাজভবন লক্ষ্য করে শিক্ষার্থীরা ইটপাথর নিক্ষেপকালে তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ছুড়েছে পুলিশ।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, থুবালে ডেপুটি কমিশনারের অফিস কম্পাউন্ড থেকে ভারতের জাতীয় পতাকা নামিয়ে ফেলছে একদল বিক্ষোভকারী। তারা মনিপুরের অখণ্ডতা রক্ষার পক্ষে স্লোগান দিচ্ছিল। একই সঙ্গে কুকিদের আলাদা প্রশাসনের দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছে তারা। উত্তেজনা প্রকট আকার ধারণ করায় ইম্ফলে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিং। রাজ্যে শান্তি ফেরানোর জন্য ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন তিনি। রাজ্যে ক্ষমতায় বিজেপি সরকার। তাদের ওপর চাপ বৃদ্ধির জন্য ইম্ফল উপত্যকায় ‘পাবলিক শাটডাউন’ ঘোষণা করেছে মেইতি সংগঠনগুলো। তবে এর প্রেক্ষিতে সোমবার ও মঙ্গলবার সব স্কুল বন্ধ এবং আন্ডারগ্রাজুয়েট, পোস্টগ্রাজুয়েট পরীক্ষা স্থগিত করেছে প্রশাসন।

BNM Special
BNM Archive
- ▼ 2026 (1544)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...




