Thursday, July 28, 2022

আহমদ ছফার অবিনয় by তৌহিদ ইমাম

২৮ জুলাই আহমদ ছফার মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণে
আমরা আটকে আছি ভীষণ ক্ষতিকর একটি প্রথাগত বিশ্বাসে—বিনয়ই সৌজন্য, ভদ্রতা; বিনয়ই সর্ব উদ্দেশ্য সাধনের উপায়। আমাদের ধারণা, শ্রদ্ধা ও সম্মান একই বস্তু। তাই আমরা যত পারি বিনয়ী হই, বিনয়ে মাথা নোয়াই। এই সুযোগটাই নেয় ক্ষমতাসীন শক্তিমান; আমাদের নোয়ানো মাথা আর তুলতে দেয় না। আমরা তাদের পায়ের কাছে ঘাড় গোঁজ করে পড়ে থাকি। আর প্রতিষ্ঠা, প্রতিষ্ঠান, শক্তিমান আমাদের মাথায় হাত বুলিয়ে বুলিয়ে পোষ মানিয়ে রাখে।

আহমদ ছফা অস্বীকার করেছেন সমস্ত প্রতিষ্ঠা, প্রতিষ্ঠান আর শক্তিমানকে। তিনি জানতেন, এসবই পরিপূর্ণ বিকাশের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক। প্রতিষ্ঠা, প্রতিষ্ঠান আর শক্তিমান একেকটা পাথুরে দেয়াল। আহমদ ছফার সাধনা ছিল দেয়ালগুলো ভেঙে দিয়ে সৃষ্টিশীল বায়ুর অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা। আহমদ ছফা তাঁর দিনপঞ্জিকার একটি অংশে (৪ মার্চ, ১৯৭৩) লিখেছেন, ‘সমস্ত শক্তি জড়ো করে সামনে যদি পথ না হাঁটি আমার দম বন্ধ হয়ে আসবে। আমি নিজের ভেতরেই পচে উঠব। সুযোগ, সুবিধা, লোভ কিছুর কাছেই নতি স্বীকার করতে পারব না। নতি স্বীকার করা আর আমার মরে যাওয়া একই কথা।’ কোনো দুর্বল মুহূর্তে নিজের একান্ত মনোভাবনার প্রকাশ নয় এটি, বরং সারা জীবনের অবিচলিত সংকল্প। এজন্য অবশ্য আহমদ ছফাকে কম নিগ্রহের সম্মুখীন হতে হয়নি।

সেটিই স্বাভাবিক ছিল। প্রতিষ্ঠা, প্রতিষ্ঠান আর শক্তিমান চায় ক্ষণ ভঙ্গুর মেরুদণ্ডহীন মানুষ। যে মানুষ কেবলই তাদের স্তব, স্তুতি করবে; অনুগত সারমেয়র মতো পদলেহী হবে। বিনিময়ে নানা রকম সুযোগ-সুবিধার প্রসাদ পেয়ে চেটেপুটে খাবে। কিন্তু আহমদ ছফা ছিলেন সিংহাসন উল্টে দেওয়া সংগ্রামী গণমানুষের প্রতিনিধি। যে মানুষই সভ্যতা গড়ে, সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

আহমদ ছফার জন্ম ১৯৪৩ সালের ৩০ জুন চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার হারিশপুর ইউনিয়নের গাছবাড়িয়া গ্রামে। আহমদ ছফা খুব গর্বভরে নিজের পরিচয় দিতেন ‘কিষানের ছাওয়াল’ বলে। মুসলমান কৃষক সম্প্রদায়ের প্রতি ছিল তাঁর অপার মমতা। যেহেতু তিনি উঠে এসেছেন সেই শ্রেণির ভেতর থেকে। কিন্তু ছিলেন প্রবল অসাম্প্রদায়িক। এই অসাম্প্রদায়িক চেতনার পাঠ তিনি নিয়েছেন নজরুলের জীবন ও রচনাবলি থেকে।

শুধু নজরুল নয়, আহমদ ছফার চেতনা ও সৃষ্টিশীলতায় অনেকেরই প্রভাব ছিল; বিশেষভাবে গ্যেটে, রাসেল এবং রবীন্দ্রনাথ। এই তিন মনীষী শুধু যে তাঁর মনোগঠনে ভূমিকা রেখেছেন তা নয়, সৃষ্টিশীলতার দুরূহ দুর্গম পথের পথিক হতেও সৎসাহস জুগিয়েছেন। ইংরেজ মনীষী বার্ট্রান্ড রাসেল ও বাঙালি মনীষী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে আহমদ ছফা অসাধারণ দুটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। প্রবন্ধ দুটি ১৯৮১ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ বইয়ে সংকলিত হয়েছে। প্রবন্ধ দুটি পড়লে বিস্মিত হতে হয়; রাসেল ও রবীন্দ্রনাথকে আহমদ ছফা যে দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করেছেন; সেটি একেবারেই ব্যতিক্রম, এর আগে কেউই সেভাবে ব্যাখ্যা করেননি। প্রবন্ধ দুটিতে চকিত একবার দৃষ্টি দেওয়া যাক।

বার্ট্রান্ড রাসেলকে নিয়ে লিখিত প্রবন্ধটির শিরোনাম ‘বার্ট্রান্ড রাসেল’। ১৯৭০ সালের দিকে অধুনালুপ্ত ‘মুখপত্র’ পত্রিকায় লেখাটি প্রকাশিত হয়। আহমদ ছফা রচনাটি লিখেছিলেন ছাত্রাবস্থায় ও ড. আহমদ শরীফের বাড়িতে একটি সাপ্তাহিক পাঠচক্রের সভায় পাঠের উদ্দেশ্যে। আহমদ ছফা প্রবন্ধটি শুরু করেছেন এভাবে—‘বার্ট্রান্ড রাসেলের দর্শন ও মনীষার এক অংশ মাত্র সাধারণের চোখে পড়েছে। অপর অংশ চাঁদের অপর পিঠের মতো লোকলোচনের অন্তরালে রয়ে গেছে।’ এরপর পুরো প্রবন্ধের পরতে পরতে আহমদ ছফা যে ভাষায় ও ভঙ্গির তির্যকতায় রাসেলের ব্যক্তিজীবন ও কর্মের ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা অনবদ্য। প্রবন্ধটির শেষ প্যারার কথা কটির ভেতর দিয়ে প্রায় অলৌকিক ও পৌরাণিক ভাবমূর্তি ভেঙে লৌকিক রাসেল বেরিয়ে এসেছেন। আহমদ ছফা প্রবন্ধটি শেষ করেছেন এভাবে—‘প্রথম যৌবনে তিনি খ্যাতি, প্রতিপত্তি কিছু কামনা করেননি। শুধু চেয়েছিলেন সন্তানের জনক হতে। একেবারে আদিম কামনা। জুলু হটেন্টটের সঙ্গে কোনো প্রভেদ নেই। প্রথম সন্তানের জনক হওয়ার সংবাদে এমন বিভোর আনন্দ পরিবেশন করেছেন নেহায়েত জৈবকর্মে বিরক্ত মানুষের মনেও একঝলক দখিনা হাওয়া সমীরিত হয়। এই মানুষী আবেগটিই রাসেলের অমরত্বের কারণ। তিনি বিশাল পুরুষ, বিখ্যাত মানুষ। কণ্ঠস্বর আটলান্টিক, প্রশান্ত মহাসাগর পেরিয়ে পাঁচ মহাদেশের কানে কানাকানি করে। এমন বিখ্যাত মানুষের আনন্দিত হওয়ার জন্য সুগায়কের গানের একটি কলি, জাতশিল্পীর ছবির একটু দর্শন, সবুজ বনানীর একটু অন্তরঙ্গ ছোঁয়া এই-ই যথেষ্ট। হাসি পাওয়ার মতো সাধারণ। সমস্ত অসাধারণেরাই অতিবেশি সাধারণ, কথাটি বোধ করি সত্য।’ কী অনন্যসাধারণ উপলব্ধি! বার্ট্রান্ড রাসেলের প্রতি এই মুগ্ধতা আহমদ ছফাকে দিয়ে রাসেলের Sceptical Essays-এর অনুবাদ করিয়ে নিয়েছে; ‘সংশয়ী রচনা’ শিরোনামের অনুবাদগ্রন্থটি ১৯৮২ সালে প্রকাশিত হয়।
  • আহমদ ছফাকে পড়তে হলে বসতে হবে সমস্ত মনোযোগ ও মনন নিয়ে। সেই সঙ্গে থাকতে হবে ইতিহাস ও সমাজতত্ত্ব পাঠের অভিজ্ঞতা। কোনো অপ্রস্তুত পাঠকের পক্ষে আহমদ ছফার রচনা হজম করা কঠিন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে আহমদ ছফা যে প্রবন্ধটি লিখেছিলেন, সেটি লিখিত হয়েছিল সেই সময়, যখন পাকিস্তানের গভর্নর আইয়ুব খানের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন রেডিও-টিভিতে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার বন্ধ করার ঘোষণা দেয়। আহমদ ছফার উদ্যোগে রবীন্দ্রনাথবিষয়ক প্রবন্ধের একটি সংকলনগ্রন্থ প্রকাশিত হয়, যার সম্পাদক ছিলেন ড. আনিসুজ্জামান। ‘রবীন্দ্রনাথের সংস্কৃতি-সাধনা’ শীর্ষক রচনাটি সেই সংকলনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। ভীষণ কাব্যিক এই প্রবন্ধটি রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘ জীবনের শিল্পসাধনার সারাৎসার। রবীন্দ্রনাথ কাদের সৃষ্টিশীলতা ও চৈতন্যকে আত্তীকরণ করেছেন, তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আহমদ ছফা প্রবন্ধের এক জায়গায় লিখেছেন—‘য়ুরোপের অহমিকা তাকে আহত করেছে, কিন্তু গরিমাও মুগ্ধ করেছে। শেক্সপিয়রের মানবোপলব্ধি, মিল্টনের কল্পসাঁতার, শেলির মুক্ত প্রমিথিউস, বায়রনের উদ্দামতা, কিটসের তন্ময়তা, ব্রাউনিঙের অধ্যাত্মোপলব্ধি, গ্যয়টের মানবীয়তা, রাসকিনের প্রগাঢ়তা, টলস্টয়ের ব্যাপ্তি এবং ফরাসি সাহিত্যিকদের বাগবৈদগ্ধ তাকে স্বাভাবিকভাবেই আকর্ষণ করেছে। তাছাড়া আরো নানা প্রাণের স্পর্শ প্রাণে এসে অবশ্যই লেগেছে।’ রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আহমদ ছফা পরেও লিখেছেন, কিন্তু এই গদ্যটিই রবীন্দ্রনাথের ওপর আহমদ ছফা লিখিত সেরা রচনা বলে মনে করি।

কিন্তু বার্ট্রান্ড রাসেল ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চেয়েও যে মনীষী আহমদ ছফার চেতনালোককে অধিকতর আলোড়িত করেছেন বলে মনে করি, তিনি জার্মান কবি ও নাট্যকার যোহান ভন গ্যেটে। এই মনীষীর বৈভবময় জীবন ও বিপুল সৃষ্টি ছফাকে সূর্যাভিমুখী পুষ্পের মতো প্রস্ফুটিত করেছে। গ্যেটের অমর কাব্য ‘ফাউস্ট’, যেটি তিনি দীর্ঘ তেইশ বছর ধরে রচনা করেছেন, সেই বৃহদায়তন রচনাটি অনুবাদের যে সৎসাহসিক উদ্যোগ আহমদ ছফা নিয়েছিলেন, তাই তাকে বাংলা সাহিত্যে চির অমর করে দিয়ে গেছে। এই কর্মটিই প্রমাণ করে আহমদ ছফা গ্যেটে দ্বারা কী ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত ছিলেন।

কিন্তু এসবই কি আহমদ ছফার অবিনয়? আমার তো তাই মনে হয়। ব্যক্তিজীবনে ও সৃষ্টিশীলতায় আহমদ ছফা যে পথ বেছে নিয়েছিলেন, সেটি একেবারেই অপ্রথাগত। তিনি জীবনযাপনে ছিলেন উদ্দাম, বাঁধনহারা, সৃষ্টিশীলতায় ছিলেন বিচিত্রাভিসারী। তিনি যে সাহিত্যের নতুন কোনো ফর্ম নিয়ে কাজ করেছেন, তা নয়। তিনি কবিতা লিখেছেন, লিখেছেন গল্প-উপন্যাস, লিখেছেন প্রবন্ধ-স্মৃতিকথা-দিনলিপি, করেছেন অনুবাদ; অর্থাৎ একেবারেই প্রচলিত ধারা ও ফর্মে। কিন্তু আহমদ ছফার বিশেষত্ব ও অসাধারণত্ব সেসবের ভেতর দিয়েই হীরের দ্যুতির মতো ঠিকরে বেরিয়ে এসেছে। আহমদ ছফার লেখা পাঠ কোনো আরামদায়ক অভিজ্ঞতা নয়, বরং যথেষ্ট অস্বস্তিদায়ক। এমনকি উপন্যাসগুলো পর্যন্ত এতটা সুখপাঠ্য নয় যে, বালিশে আলতো হেলান দিয়ে পড়া যাবে। আহমদ ছফাকে পড়তে হলে বসতে হবে সমস্ত মনোযোগ ও মনন নিয়ে। সেই সঙ্গে থাকতে হবে ইতিহাস ও সমাজতত্ত্ব পাঠের অভিজ্ঞতা। কোনো অপ্রস্তুত পাঠকের পক্ষে আহমদ ছফার রচনা হজম করা কঠিন।

সব কিছু নিয়েই আহমদ ছফার ছিল নিজস্ব পর্যবেক্ষণ। তাঁর দেখার চোখ ছিল একেবারেই অন্যরকম। কোনো সামাজিক ঘটনা বা প্রপঞ্চ ব্যাখ্যাতেও থাকত তাঁর নিজস্বতার ছাপ। এমনকি সাহিত্যের কোনো সংঘটন কিংবা উপন্যাসের কোনো চরিত্র নিয়ে যখন তিনি আলোচনা করেছেন, সেখানেও পাওয়া গেছে নব আলোকের উদ্ভাস। উদাহরণ হিসেবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বহুল পঠিত উপন্যাস ‘পদ্মা নদীর মাঝি’র একটি চরিত্র হোসেন মিয়ার কথা বলা যেতে পারে। এই চরিত্রটিকে আহমদ ছফা যে দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন, আহমদ ছফার আগে কিংবা পরে কারও পক্ষেই এমন অভিনব ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব হয়নি। হোসেন মিয়াকে তিনি দেবরাজ জিউসের মতো সর্বইচ্ছা শক্তিসম্পন্ন চরিত্র হিসেবে দেখিয়েছেন। দেখিয়েছেন কলম্বাস, ক্যাপ্টেন কুকের বঙ্গীয় সংস্করণ হিসেবে। অথবা ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ প্রবন্ধে তাঁর যে ব্যাখ্যাসমূহ, সেগুলো বিস্ময়েরই উদ্রেক করে। লেখক হতে হলে কতটা অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন, কতটা মননদীপ্ত, কতটা বৈপ্লবিক হতে হয় আহমদ ছফা তাঁর সেরা দৃষ্টান্তগুলোর একজন।

অন্যদিকে জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাককে নিয়ে তাঁর যে অবিসংবাদিত স্মৃতিগ্রন্থ ‘যদ্যপি আমার গুরু’, সেটি পড়লে যে আহমদ ছফাকে আমরা পাই, সেই আহমদ ছফা অত্যন্ত সংবেদনশীল, প্রচণ্ড পড়ুয়া ও অস্থির অনুসন্ধিৎসু। এবং অবশ্যই স্মৃতিধর।

আহমদ ছফার পরিচয়ের বহুমুখিতা এখানেই শেষ নয়; তিনি যে কতটা বহুমাত্রিক মানুষ ছিলেন, সেটি তাঁর জীবনযাপনই প্রমাণ করে। আহমদ ছফার কুসুমকোমল অন্তঃকরণের পরিচয় পাই অনুজ-তরুণ লেখকদের প্রতি প্রগাঢ় স্নেহশীলতায়। আজকে খ্যাতিমান, লব্ধপ্রতিষ্ঠ অনেক লেখকেরই সেদিন ছিলেন সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক, মহত্তম উৎসাহদাতা। সে সময়কার বহু তরুণের প্রথম বই আহমদ ছফার অর্থায়নে প্রকাশিত হয়েছে। এরই উল্টোদিকে আছে আহমদ ছফার রাগী, অনমনীয়, অনাপসী, সংকল্পদৃঢ় চরিত্র। জীবনে কোনো দিন কোনো অন্যায়ের কাছে নতি স্বীকার করেননি তিনি। শুধু নিজের সঙ্গে অন্যায় নয়, যখন দেখেছেন অন্যের সঙ্গে অন্যায় করা হচ্ছে, তখনও রুখে দাঁড়িয়েছেন। এস এম সুলতানের মতো একজন বিশ্বমানের চিত্রশিল্পী যখন শহুরেজনের নিরন্তর অবজ্ঞা-অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছিলেন লোকচক্ষুর অন্তরালে, আহমদ ছফা তখন প্রতিজ্ঞা করে বসেন—যে করেই হোক সুলতানকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান ফিরিয়ে দেবেন। কয়েক বছর পড়াশোনার পর তিনি লিখেন ‘বাঙালির চিত্র-ঐতিহ্য : এস এম সুলতানের সাধনা’ নামের দীর্ঘ একটি প্রবন্ধ। সেই সময় প্রবন্ধটি শিক্ষাভিমানী শহরবাসীর ভেতরে প্রবল উত্তেজনা তৈরি করে। এ দেশের তথাকথিত শিল্পগুরুরা খড়গহস্ত হন সুলতানকে পৃথিবীর সেরা চিত্রশিল্পীদের একজন বলে দাবি করায়। কিন্তু কোনো বিরোধিতাই সুলতানের প্রোজ্জ্বল ভাবমূর্তিকে আর নিষ্প্রভ করতে পারেনি। এসবই সম্ভব হয়েছিল আহমদ ছফার ইস্পাতদৃঢ় ব্যক্তিত্বের কারণে। আহমদ ছফা সেদিন অবিনয়ী ছিলেন বলেই কমটেম্পরারি গ্রেট মাস্টার্স পিকাসো, ডালি, মাতিস, পল ক্লে, মিকেল্যাঞ্জেলোদের কাতারে আমাদের সুলতানের আসন চিরস্থায়ী হয়ে যায়।

ড. আহমদ শরীফ একবার ‘বেয়াদবি জিন্দাবাদ’ নামের একটি প্রবন্ধ লিখে ‘বেয়াদব’দের (?) স্তবগান গেয়েছিলেন। কারা এই বেয়াদব? তারাই, যারা অস্বীকার করে সমস্ত প্রথা, প্রতিষ্ঠা, প্রতিষ্ঠান আর শক্তিমানদের। নিজস্ব বিচার-বিবেচনা দিয়ে যারা সৃষ্টিশীলতাকেই মেনে নিয়েছে সর্বেশ্বর হিসেবে। অন্তরের আলোই যাদের চলার পথের পাথেয়। লোভ-লালসা যেমন এদের সম্মোহিত করতে পারে না, ভয়ের রক্তচক্ষুও টলাতে পারে না নিজের সংকল্প থেকে। আহমদ ছফার চরিত্রে না ছিল লোভ, না ছিল কোনো কিছুকে ভয়। ফলে জীবনের অনেক সংকটজনক পরিস্থিতিতে আহমদ ছফা এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, কোনো গড়পড়তা মানুষের পক্ষে সেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব ছিল না।

সাহিত্যিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, চিন্তাবিদ, মনীষী আহমদ ছফা ২০০১ সালের ২৮ জুলাই মারা যান। ১৯৪৩ থেকে ২০০১ সাল—আহমদ ছফার প্রায় ছয় দশকের জীবনযাপন আমাদের সামনে স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যক্তিত্বের এমন একজনকে তুলে ধরে, যিনি ছিলেন পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য উন্মুখ। পরিপূর্ণ বিকাশ শুধু তাঁর পক্ষেই সম্ভব, যিনি হতে পারেন স্বতঃসিদ্ধ স্বয়ংপুরুষ। আহমদ ছফার অভিজ্ঞতায় সাতচল্লিশের দেশভাগ অস্পষ্ট হলেও পাকিস্তানের সামরিক শাসন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন বাংলাদেশে সামরিক শাসন, ছদ্মগণতন্ত্র—আহমদ ছফার চিন্তাচেতনায় স্পষ্ট ছাপ ফেলেছে। সেইসঙ্গে নতুন নতুন কর্মোদ্যমে নিয়োজিত করেছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের পরে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রথম বইটি আহমদ ছফারই রচিত। মুক্তিযুদ্ধের পরে দেশের অরাজকতা ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন আহমদ ছফাকে এতটাই ক্রুদ্ধ ও বেদনাহত করেছিল যে, তাকে তিনি আখ্যায়িত করেন ‘বেহাত বিপ্লব’ বলে। তবু আহমদ ছফা অফুরান আনন্দ, উৎসাহ আর কর্মোৎসাহের প্রেরণা হয়ে থাকবেন আমাদের কাছে। আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ তার যে কীর্তিমান সন্তানগুলোর জন্য গর্ববোধ করবে, আহমদ ছফা হবেন তাঁদের ভেতরে উজ্জ্বলতরদের একজন।

Friday, July 22, 2022

রক্তশূন্যতা দূর হয় পালং শাক খেলে

প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি ছাড়াও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট রয়েছে পালং শাকে। এক কাপ তাজা পালং শাক থেকে ৩০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ২৪ গ্রাম ম্যাগনেশিয়াম ও ১৬৭ মিলিগ্রাম পটাসিয়াম ছাড়াও প্রোটিন এবং আয়রন পাওয়া যায় প্রচুর পরিমাণে।
  • *পালং শাকে প্রচুর ভিটামিন সি এবং বিটা ক্যারোটিন থাকে যা কোলনের কোষগুলোকে রক্ষা করে।
  • *পালং শাকে থাকা আয়রন রক্তশূন্যতা দূর করে।
  • *বাতের ব্যথা, অস্টিওপোরোসিস,  মাথাব্যথা দূর করতে প্রদাহনাশক হিসেবে কাজ করে পালং শাক।
  • *স্মৃতিশক্তি এবং মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধিতে খুবই কার্যকর এই শাক।
  • *পেট পরিষ্কার রাখে এই শাক। তাছাড়া রক্ত তৈরিতে সাহায্য করে, দৃষ্টিশক্তিও বাড়ায়।
  • *কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।
  • *পালং শাকে ১৩ প্রকার ফাভোনয়েডস আছে যা ক্যানসার প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি প্রোস্টেট ক্যানসার প্রতিরোধে খুবই কার্যকর।
  • *পালং শাক দাঁত ও হাড়ের ক্ষয়রোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
>>>তথ্য: নিউজ এইটিন

Wednesday, July 20, 2022

চাঁদে যাওয়া নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকার লড়াই চলে যেভাবে

সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধানমন্ত্রী নিকিতা ক্রুশ্চেভ ১৯৫৯ সালের ১৫ই সেপ্টেম্বর ঐতিহাসিক এক সফরে ওয়াশিংটনে গিয়েছিলেন।
হোয়াইট হাউজে তিনি দেখা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট আইজেনাওয়ারের সাথে। সেসময় তিনি তাকে গোলকাকৃতি একটি বস্তু উপহার দেন যাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতীক খোদাই করা ছিল।
লুনা ২ মিশনে ঠিক এরকমই একটি গোলাকার যান চাঁদে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এটিই ছিল প্রথম মহাকাশ যান যা চাঁদের পৃষ্ঠ স্পর্শ করেছিল, এবং এই উপহারটি দেওয়া হয়েছিল এই ঐতিহাসিক ঘটনার মাত্র একদিন আগে।
চাঁদে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় রাশিয়া এরপর আরো দু'বার আমেরিকাকে পরাজিত করে। কিন্তু তার পরেই মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা চাঁদে পাঠিয়েছিল এপোলো ১১ যা প্রথমবারের মতো সেখানে মানুষ নিয়ে গিয়েছিল।
সেটা ১৯৬৯ সালের ২০শে জুলাই এর ঘটনা।

মহাকাশে প্রতিযোগিতা

পৃথিবীর বাইরে মহাকাশে পৌঁছানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল ১৯৫৭ সালে যখন রাশিয়া তার কৃত্রিম উপগ্রহ স্পুটনিক উৎক্ষেপণ করেছিল।
প্রথম চাঁদে পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে এই দৌড়ে এগিয়ে যায় রাশিয়া।
এর পরে রাশিয়ার লুনা ৯ মহাকাশ যান ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আরো একবার চাঁদে সফ্ট ল্যান্ডিং (সফল অবতরণ) করেছিল। সেসময় ওই যান থেকে প্রথমবারের মতো চাঁদের উপরি-পৃষ্ঠের একটি ছবি তোলাও সম্ভব হয়েছিল।
হোয়াইট হাউজে ১৯৫৯ সালে নিক্সন, আইজেনআওয়ার এবং ক্রুশ্চেভ।
এর দু'মাস পর লুনা ১০ নামে আরো একটি মিশন পাঠায় রাশিয়া। এটিই ছিল প্রথম কোন মহাকাশ যান যা চাঁদের কক্ষপথে স্থাপন করা সম্ভব হয়েছিল।
চাঁদের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে গবেষণায় সহায়ক হয়েছিল ওই মিশন।
নাসার একজন প্রকৌশলী জন হবোল্ট ১৯৬১ সালে লুনার অরবিট রঁদেভু বা এলওআর নামের একটি মিশনের প্রস্তাব করেন। বলা হয় ওই মিশনে থাকবে একটি মাদার শিপ (বড় যান) যা চাঁদের কক্ষপথে অবস্থান করবে এবং তার ভেতর থেকে ছোট একটি মহাকাশ যান বের হয়ে সেটি চাঁদে গিয়ে অবতরণ করবে।
হবোল্ট বলেছিলেন, এই এলওআর মিশনের মাধ্যমে সময় ও জ্বালানী দুটোরই সাশ্রয় ঘটবে, মহাকাশ অভিযানের বহু জটিল স্তর সহজ হয়ে যাবে। এসবের মধ্যে রয়েছে - যান তৈরি, পরীক্ষা, উৎক্ষেপণ, ক্ষণ-গণনা এবং ফ্লাইট পরিচালনা।
এসব বিজ্ঞান ব্যবহার করেই আমেরিকা চাঁদে পৌঁছাতে পেরেছিল। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৬৬ সালে পৃথিবীর এই উপগ্রহটি জয় করার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল।
লুনা ২ মিশনের একটি মডেল।
"একজন মানুষের চাঁদে নামার আগে সেখানে একটি যান বা রোবটকে অবতরণ করাতে হবে। কিন্তু আমরা যেন সবাই সোভিয়েত ইউনিয়নের এসব সাফল্যকে ভুলে যেতে চাই," বলেন লন্ডনে বিজ্ঞান যাদুঘরের কিউরেটর ডগ মিলার্ড।

লুনা ২

সোভিয়েত ইউনিয়নের গোলকাকৃতি মহাকাশযানটি উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল ১৯৫৯ সালের ১২ই সেপ্টেম্বর।
সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ সেসময় আরো একটি অস্বাভাবিক কাজ করেছিল। এই মিশনের যথেষ্ট গোপনীয়তা সত্ত্বেও তারা এর গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্য ব্রিটিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী বার্নার্ড লোভেলের সাথে শেয়ার করেছিল। এমনকি এর গতিপথ সম্পর্কেও তাকে জানানো হয়েছিল।
এই বেরনার্ড লোভেলই বিশ্বের সব পর্যবেক্ষকদের এই মিশনের সাফল্য সম্পর্কে নিশ্চিত করেছিলেন। এমনকি আমেরিকানদেরকেও, যারা প্রথমে সোভিয়েতের দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল।
লুনা ২ চন্দ্রপৃষ্ঠে যখন আছড়ে পড়ে - তখন তার গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ১২,০০০ কিলোমিটার। মস্কোর স্থানীয় সময় হিসেবে তখন ১৪ই সেপ্টেম্বর মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে।
চাঁদের পৃষ্ঠের প্রথম ছবি, ১৯৬৬ সালে তোলা
এটা প্রায় নিশ্চিত করেই বলা চলে যে এত দ্রুত গতিতে চাঁদের পিঠে নামার কারণে এই যানটি নিশ্চয়ই অক্ষত ছিল না।
কিন্তু এই মিশনটিই শীতল যুদ্ধের উত্তাপ আরো বাড়িয়ে দিয়েছিল।
লুনা ২ বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা চালিয়েছিল। যেমন: চাঁদে দেখা যায় কিম্বা অনুভব করা যায় এরকম পরিমাপযোগ্য চৌম্বকীয় ক্ষেত্র বা ম্যাগনেটিক ফিল্ড নেই, এই মিশনে চাঁদে রেডিয়েশন বেল্টের কোন প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
"উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এই মিশন বিজ্ঞানীদেরকে চাঁদের ভূতত্ত্ব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ধারণা দিয়েছে," - বলেন যুক্তরাজ্যের পদার্থবিজ্ঞানী লিবি জ্যাকসন। ব্রিটিশ মহাকাশ সংস্থার হিউম্যান এক্সপ্লোরেশন প্রোগ্রামেরও ম্যানেজার তিনি।

লুনা ৯

সাত বছর পর পাঠানো হয় লুনা ৯ নামের আরো একটি মহাকাশ যান - যা আসলে এপোলো প্রোগ্রামকে সাহায্য করেছিল।
লুনা ২ মিশনের একটি নমুনা যা সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী মার্কিন প্রেসিডেন্টকে উপহার দিয়েছিলেন।
এটি চাঁদে অবতরণ করার আগে সোভিয়েত ও আমেরিকার বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন চন্দ্রপৃষ্ঠ এই যানটির জন্য খুব নরম হবে। এমন আতঙ্কও ছিলো যে চাঁদের পিঠে হয়তো ধুলোবালি দিয়ে ঢাকা - যার ভেতরে যেকোনো ল্যান্ডার নামামাত্রই মাটিতে ডুবে যেতে পারে।
কিন্তু সোভিয়েত যানটি প্রথমবারের মতো দেখিয়েছে যে চাঁদের পৃষ্ঠ শক্ত এবং এই তথ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
"বিজ্ঞানের জগতে এটা ঐতিহাসিক এক আবিষ্কার যা ভবিষ্যতের মিশনে সাহায্য করেছে," বলেছেন জ্যাকসন।

লুনা ১০

প্রচারণার দিক থেকে এটাও ছিল আমেরিকানদের বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিজয়।
"আমাদের মনে রাখতে হবে ভূ-রাজনৈতিক কারণেই এই মহাকাশ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে," বলেন এই পদার্থবিজ্ঞানী।
লুনা ১০ মিশনে চাঁদের মাটি কী ধরনের উপাদান দিয়ে তৈরি হয়েছে সেবিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ধারণা পাওয়া গেছে। মহাকাশে পাথরের ছোট ছোট যেসব কণা (মাইক্রোমেটেরয়েড) অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ছুটে বেড়াচ্ছে সেগুলো সম্পর্কেও তথ্য পাওয়া গেছে এই মিশনের মাধ্যমে।
এপোলো ৮-এ নভোচারী।
মহাকাশে ছুটন্ত পাথরের ছোট ছোট এসব কণার কারণে যেকোনো মহাকাশ অভিযান হুমকির মুখে পড়তে পারে। এমনকি চাঁদের বুকে অবতরণ করার পর বিপন্ন হতে পারে যেকোনো নভোচারীর জীবনও।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, চাঁদে বায়ুমণ্ডল না থাকার কারণে ছোট ছোট এসব কণা উপগ্রহটির পৃষ্ঠে পৃথিবীর চেয়েও বিপদজনকভাবে পড়তে পারে।
"সোভিয়েতরা ভেবেছিল তারা এই মহাকাশ প্রতিযোগিতায় জয়ী হবে। কারণ তারা শুরুতে সেখানে একের পর এক মিশন পাঠিয়েছিল। তার মধ্যে রয়েছে ১৯৬১ সালে মহাকাশে প্রথম মানুষ পাঠানো এবং ১৯৬৫ সালে প্রথম স্পেস-ওয়াকের মতো ঘটনাও," বলেন মহাকাশ ইতিহাসবিদ আসিফ সিদ্দিকী।
সোভিয়েত ইউনিয়ন তার ভস্তক ১ যানে করে নভোচারী ইউরি গ্যাগারিনকে প্রথম মহাকাশে পাঠিয়েছিল।
আর ১৯৬৫ সালে মহাকাশে প্রথমবারের মতো স্পেস-ওয়াক করতে সক্ষম হয়েছিলেন অ্যালেক্সেই লিওনোভ। ওই স্পেস-ওয়াক স্থায়ী হয়েছিল ১২ মিনিট।
কিন্তু এর পর ১৯৬৮ সালে বড় একটি ঘটনা ঘটায় যুক্তরাষ্ট্র। মহাকাশে তারা পাঠায় এপোলো ৮ মিশন। ওই মিশনে তারা মানুষ বহনকারী একটি যান চাঁদে পাঠাতে সক্ষম হয়। সেটি চাঁদের কক্ষপথে ঘুরে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে আসে।
তারও এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে পাঠানো হয় এপোলো ১১ যা চাঁদের পিঠে অবতরণ করে।
চাঁদে পৌঁছানোর লক্ষ্যে এপোলো ৮ মিশনে মানুষ পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তার জবাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন এরকম পাল্টা কিছু করেনি। কিন্তু কেন?
আলেক্সেই লিওনোভ ১৯৬৫ সালে প্রথম স্পেস-ওয়াক করেছিলেন।
"আমি কোত্থেকে শুরু করবো? তাদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যথেষ্ট ছিল না। তাদের সেরকম অর্থও ছিল না, ছিল না সাংগঠনিক কাঠামোও," বলেন নাসার সাবেক একজন ঐতিহাসিক রজার লনিয়াস।
মোদ্দা কথা বলা যায়, সোভিয়েত ইউনিয়ন চাঁদে মিশন পাঠানোর বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেছিল ঠিকই কিন্তু সেখানে মানুষ পাঠানোর মতো যথেষ্ট অগ্রগতি ঘটাতে পারেনি।
সর্বোপরি তাদের কাছে এমন শক্তিশালী রকেট ছিল না যা দিয়ে তারা চাঁদ পর্যন্ত কোন মানুষ বহনকারী কোন যান পাঠাতে পারতো।
কিন্তু আমেরিকার ছিল শক্তিশালী স্যাটার্ন ফাইভ রকেট। চাঁদের অভিমুখে তাদের সব মনুষ্য অভিযানে এই রকেট ব্যবহার করা হয়েছে।
এর কাছাকাছি সোভিয়েত ইউনিয়নের যে রকেট ছিল সেটা হলো এন ওয়ান। এর চারটি পরীক্ষামূলক ফ্লাইটের সবকটিই ব্যর্থ হয়েছে।
এছাড়াও, দুর্বল ও বিশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার কারণে সোভিয়েত ইউনিয়নের মহাকাশ কর্মসূচি বিঘ্নিত হয়েছে। তার পাশাপাশি ছিল আমলাতন্ত্র, ক্ষমতার লড়াই। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে আমেরিকার মহাকাশ কর্মসূচি অনেক এগিয়ে ছিল।

রাজনৈতিক সংগ্রাম

মহাকাশ প্রতিযোগিতার একেবারে শুরুর দিকেই আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়েই লুনার অরবিট রঁদেভু বা এলওআর সফল হওয়ার কৌশল খুঁজে পেয়েছিল।
তারা জানতো তাদের এমন একটি উপায় খুঁজে বের করতে হবে যাতে তারা তাদের যান চাঁদের বুকে অবতরণ করাতে পারে।
সোভিয়েত মহাকাশ কর্মসূচিকে প্রতিযোগিতা করতে হতো সামরিক বাহিনীর সাথে।
আমেরিকা ১৯৬৬ সালের মধ্যেই এটা সফলভাবে সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছিল কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নকে এই দক্ষতা অর্জন করতে ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত সময় লেগে গিয়েছিল।
এছাড়াও সোভিয়েত মহাকাশ কর্মসূচিতে সর্বদা কমিউনিস্ট নেতৃত্বের সাথে লড়াই করতে হয়েছে। অর্থ ও সম্পদের জন্যেও মহাকাশ কর্মসূচিতে প্রতিযোগিতা করতে হতো সামরিক বাহিনীর সাথে।
কিন্তু সোভিয়েত নেতৃত্ব সামরিক বাহিনীকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে যাদের লক্ষ্য ছিল তাদের পরমাণু কর্মসূচির অংশ হিসেবে আন্তঃ মহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা।
মহাকাশে প্রতিযোগিতা নিয়ে একটি বই লিখেছেন আসিফ সিদ্দিকী। তার নাম: 'চ্যালেঞ্জিং টু এপোলো: দ্যা সোভিয়েত ইউনিয়ন এন্ড দ্যা স্পেস রেস ১৯৪৫-১৯৭৪।'
এই বইটিতে মি. সিদ্দিকী লিখেছেন, "চাঁদে মানুষ পাঠানোর ব্যাপারে সোভিয়েত ইউনিয়ন গুরুত্বের সাথে পরিকল্পনা করতে শুরু করে ১৯৬৪ সাল থেকে। আমেরিকার কয়েক বছর পর।"
"সোভিয়েত ইউনিয়নের মহাকাশ কর্মসূচির বিষয়ে অনেক গোপনীয়তা রক্ষা করা হতো। আর একারণে তাদের প্রথম স্পেস-ওয়াককে বিস্ময়কর মনে হয়েছিল। কিন্তু সত্যিকার অর্থে তাদের সেরকম সক্ষমতা ছিল না।"
সোভিয়েত ইউনিয়নের কর্মসূচির সাথে যারা জড়িত ছিল পরে তারাও এধরনের মন্তব্য করেছেন।
সোভিয়েত ইউনিয়নের এন ওয়ান রকেট।
"পশ্চিমে যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের মহাকাশ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হতো, তাতে কিছু ভ্রান্ত ধারণা ছিল। মনে করা হতো এটা ছিল মস্কোর হাতে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত এক কর্মসূচি। কিন্তু বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ কর্মসূচির ওপর ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণ তার চাইতেও বেশি ছিল," বলেন সের্গেই ক্রশ্চেভ, সোভিয়েত ইউনিয়নের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ছেলে।
মস্কোর মহাকাশ কর্মসূচির পেছনে প্রধান শক্তি হিসেবে কাজ করতেন প্রকৌশলী সের্গেই করোলেভ। আকস্মিকভাবে তিনি মারা যান ১৯৬৬ সালের জানুয়ারি মাসে। এর পর পরিস্থিতি আরো খারাপ রূপ নেয়।

শেষ চেষ্টা

সোভিয়েতরা যখন বুঝতে পারলেন যে চাঁদে মানুষ পাঠানোর দৌড়ে তারা হেরে গেছেন, তখন তারা খুব দ্রুত কিছু উদ্যোগ নিতে শুরু করলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের এপোলো ১১ মিশনের আগে তারা চাঁদ থেকে মাটির নমুনা সংগ্রহ করে আনার জন্যে একটি যান পাঠালেন।
এপোলো ১১ মিশনের তিনদিন আগে ১৯৬৯ সালের ১৩ জুলাই সোভিয়েতরা মহাকাশে পাঠায় লুনা ১৫।
এর চারদিন পরে, এপোলো ১১ এর ৭২ ঘণ্টা আগে, এটি চাঁদের কক্ষপথে প্রবেশ করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটি চাঁদের মাটিতে আছড়ে পড়ে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
এর কয়েক মাইল দূরেই নীল আর্মস্ট্রং এবং অলড্রিন চাঁদে নেমে চাঁদে নেমে সেখান থেকে পৃথিবীতে ফিরে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
"আমরা বিশ্বাস করতাম যে আমেরিকার আগেই আমরা চাঁদে মানুষ পাঠাতে পারবো। এই চাওয়া এক জিনিস আর সেটা করা অন্য জিনিস," বলেন ভাসিলি মিশিন, যিনি সের্গেই কোরোলেভের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের মহাকাশ কর্মসূচির দায়িত্ব নিয়েছিলেন।
চাঁদের বুকে দাঁড়িয়ে আছেন নীল আর্মস্ট্রং, ১৯৬৯ সালে।

Friday, July 15, 2022

বাংলাদেশের আধুনিক স্থাপত্যের পথিকৃৎ by রবিউল হুসাইন

মাজহারুল ইসলাম
বাংলাদেশের যে স্থপতি সর্বপ্রথম এ দেশে আধুনিক স্থাপত্যের সূচনা করেন তাঁর প্রখর সৃষ্টিশীল মেধা ও দূরদৃষ্টি নিয়ে, তিনি হলেন স্থপতি মাজহারুল ইসলাম। তিনি এ দেশের স্থাপত্য পেশাচর্চার পথিকৃৎ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পশ্চিম দিকে, বর্তমানের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পাঠাগার এবং চারু ও কারুকলা ইনস্টিটিউটের এ দুটি ভবনই এ দেশের আধুনিক স্থাপত্যশিল্পের প্রথম উদাহরণ; এবং এ দুটি বিশিষ্ট স্থাপত্যকর্মের স্থপতি হচ্ছেন মাজহারুল ইসলাম। তখন তিনি সরকারি চাকরি করতেন। সরকারের অধীনেই ১৯৫৫ সালে নির্মিত এ ভবন দুটি খুব মনোযোগ দিয়ে দেখলে অবাকই হতে হয়। পরিসরের বিভাজন, উপযোগিতার সঙ্গে উপকরণের সমন্বয় সাধন এবং সর্বোপরি চারপাশে বিরাজমান নৈসর্গের সঙ্গে মেলবন্ধনে এ কাজ দুটি এ দেশের স্থাপত্য জগতের দৃষ্টান্তমূলক মাইলফলক। হয়তো পৃথিবীখ্যাত স্থপতিগুরু লে কর্বুজিয়ের, আলভার আলটুর পরোক্ষ প্রভাব এ কাজে দেখা যেতে পারে, তথাপিও বর্তমান স্থাপত্যশিল্পের যে অবস্থা, সেদিক দিয়ে বিচার করলে ওগুলোর মান উন্নত তো বটেই, বরং দেশের পরিপ্রেক্ষিতে তা একটি ধ্রুপদি উদাহরণ হিসেবে বিরাজ করছে।
স্থাপত্যশিল্পের বেশ কয়েকটি বিষয়ে স্থপতি মাজহারুল ইসলামের নাম সর্বাগ্রে উচ্চারিত হয়ে থাকে, যেমন: তিনি এ দেশের প্রথম আধুনিক স্থপতি ও প্রথম স্থাপত্য পেশাচর্চার পথিকৃৎ তো বটেই, তিনি এ দেশের সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন স্থপতি এবং স্থাপত্য প্রতিযোগিতার বিচারক। তিনি স্থপতি ইনস্টিটিউটের প্রথম সভাপতি। তিনি এ দেশের স্থাপত্যশিক্ষা, বিশেষ করে চর্চার জন্য নবীন স্থপতিদের সম্মুখে পৃথিবীর বিখ্যাত স্থপতিদের কাজের দৃষ্টান্ত রাখার জন্য তাঁদের দ্বারা ভবন নির্মাণের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে সাহায্য করেছিলেন। এই নীরব, আত্মপ্রচারবিমুখ, নিরঙ্কুশ স্থাপত্যশিল্পীর জন্ম ১৯২৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর। ১৯৪২ সালে বিএসসি পাস করে প্রথমে তিনি শিবপুরের রয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে পুরকৌশলে ১৯৪৬ সালে স্নাতক হন। এরপর তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের কনস্ট্রাকশন, বিল্ডিং অ্যান্ড ইরিগেশন বিভাগে প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন। এই বিভাগে কর্মরত অবস্থায় স্থাপত্য পেশায় নিয়োজিত হওয়ার জন্য ১৯৫০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারি বৃত্তি নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন এবং ১৯৫২ সালে স্থাপত্যে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫৩ সালে দেশে ফিরে জুনিয়র সহস্থপতি হিসেবে পুনরায় সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। এরপর ১৯৫৭ সালে লন্ডনের এ এন্ড এ স্কুল থেকে ট্রপিক্যাল স্থাপত্য বিষয় সম্বন্ধে ডিপ্লোমা নিয়ে আসেন। এরই মধ্যে দেশে তাঁর সেই দুটি পথিকৃৎ ভবন নির্মিত হয়েছে। সে সময় যেহেতু দেশে কোনো উপযুক্ত শিক্ষাপ্রাপ্ত স্থপতি ছিল না, সেহেতু সরকার বিদেশি স্থপতিদের নিযুক্ত করেছিল বিভিন্ন সরকারি ভবনের নকশা করার জন্য। কিন্তু তাঁদের কাজের মান নিম্নস্তরের হতো এবং তাতে আধুনিক স্থাপত্যের কোনো গুণাবলি থাকত না। এই বৈরী পরিবেশে স্থপতি মাজহারুল ইসলামকে একা সংগ্রাম করতে করতে এগোতে হয়েছে এবং ওই দুটি ভবন থেকেই সে সময়ের বিদেশি স্থাপত্যের প্রভাব এখানে অস্বাভাবিক কিছু নয়, কিন্তু পরবর্তী সময়ে অচিরেই তিনি এ প্রভাব কাটিয়ে নিজস্ব স্থাপত্য ধারা প্রয়োগ করে বিশিষ্টতা লাভ করেন; এবং এ দেশের কৃষ্টি, সভ্যতা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতির সঙ্গে আধুনিক স্থাপত্য ভাবধারা-সংবলিত নান্দনিকতা, ব্যবহারিকতা ও উপকরণের সার্থক সমন্বয় করতে সফলকাম হন। তিনিই এ দেশে ঐতিহ্যবাহী ইটকে লাইনবন্দী, সরাসরি, উন্মুক্ত পলেস্তারাহীন করে পুরোনো রীতিকে নবতররূপে উপস্থাপন করেন। এ ছাড়া স্থাপত্যে শিল্পকর্ম, যেমন: বিশ্ববিদ্যালয় পাঠাগারের দেয়ালে দেয়ালচিত্র সংযোজন করার প্রস্তাব এ দেশে তিনিই প্রথম বাস্তবায়ন করতে পরামর্শ দেন, যার ফলে আমরা নভেরা আহমেদ ও হামিদুর রহমানের দুটি কাজ সেখানে দেখতে পাই এবং এই শিল্পকর্মে স্থাপত্যশিল্পের সঙ্গে অন্যান্য শিল্পের সার্থক যোগাযোগের প্রথম প্রয়াস বলে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
স্থপতি মাজহারুল ইসলামের সম্পন্ন করা সরকারের বহু স্থাপত্যকর্মের মধ্যে উপরিউল্লিখিত দুটি প্রকল্প ছাড়া অন্য প্রকল্পগুলো সরকারি লাল ফিতার কারণে কোনো দিন বাস্তবায়িত হয়নি। এ নিয়ে সরকারের সঙ্গে তাঁর মনোমালিন্য শুরু হয়। এবং এই কারণে ১৯৫৮ সালে তিনি চাকরি থেকে ছাড়পত্র নিতে আবেদন করেন, কিন্তু সেই পত্র তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান খান কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়। অতঃপর স্থাপত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করার জন্য সরকারি বৃত্তি নিয়ে আমেরিকার ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে যান এবং ১৯৬১ সালে ফিরে এসে আবার সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। এই সময়ে ব্যক্তিগত পর্যায়ে ড. কুদরত-ই-খুদার প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ১৯৬২ সালে সায়েন্স ল্যাবরেটরি (বিসিএসআইআর) প্রকল্প প্রণয়ন করেন। তদানীন্তন শাসকগোষ্ঠীর একতরফা অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা লাভের কারণে এদেশে তখন তেমন উল্লেখযোগ্য নির্মাণকার্য চলছিল না। এই অবস্থায় স্থপতি মাজহারুল ইসলাম প্রায় এককভাবে সরকারি স্থাপত্য নির্দেশনামা প্রবর্তনের জন্য চেষ্টা করেন কিন্তু সরকারিভাবে তা অনুমোদিত হয়নি। এ নিয়ে সরকারের সঙ্গে আবার বিরোধ বাধে এবং ১৯৬৭ সালে তিনি সরকারি স্থপতির পদ থেকে সম্পূর্ণরূপে পদত্যাগ করেন। পরে এ সময়ই প্রখ্যাত প্রকৌশলী শেখ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সঙ্গে মিলে বাস্তুকলাবিদ নামে একটি স্থাপত্য উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠান গঠিত করে স্থাপত্য চর্চা শুরু করেন। এই বাস্তুকলাবিদই এদেশের প্রথম স্থপতি পরিচালিত পেশাভিত্তিক স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান। কিছুদিনের মধ্যে স্থপতি ইসলামের পরিচালনায় এই প্রতিষ্ঠানটি তদানীন্তন সমগ্র পাকিস্তানে উন্নত স্থাপত্য শিল্পকর্মচর্চার প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং এদেশে স্থাপত্যচর্চ ও পেশাকে একটি সম্মানজনক শৈল্পিক পেশা হিসেবে তাঁর প্রখর ব্যক্তিত্য, রুচি, দেশপ্রেম, কাজের প্রতি প্রগাঢ় নিষ্ঠা, পরিপূর্ণ সততা, শৃঙ্খলা, নান্দনিক বিন্যাস ইত্যাদিসহকারে প্রতিষ্ঠিত করেন।
ইতিমধ্যে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্য অনুষদে প্রাতিষ্ঠানিক স্থাপত্য শিক্ষা শুরু হয়েছে এবং সবে স্নাতক ডিগ্রিপ্রাপ্ত অনেক নবীন স্থপতি হাতে-কলমে কাজ শেখার জন্য স্থপতি ইসলামের বাস্তুকলাবিদ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত হন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই আজ স্বনামধন্য স্থপতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছেন। বাস্তুকলাবিদ প্রতিষ্ঠার পর অনুপম স্থাপত্যগুণ সংবলিত বহু ভবনের নকশা করেন তিনি। তখন ১৯৬৪-৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্টস বিভাগের উত্তরে নিপা ভবন, ১৯৫৫ সালে মতিঝিলে কৃষি ভবন, ১৯৬৫-৬৮ সালে জীবনবীমা ভবন (টাওয়ার বাদে), ১৯৬৬ সালে মিরপুরের রোড রিসার্চ ল্যাবরেটরি প্রকল্পের ভবনসমূহ এবং অসংখ্য বসবাস গৃহের পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। স্থপতি ইসলাম ও তাঁর বন্ধু বিখ্যাত আমেরিকার স্থপতি টাইগারম্যানের যৌথ উদ্যোগে ১৯৬৫ সালে বাংলাদেশের পাঁচটি শহর যথা বরিশাল, পাবনা, রংপুর, সিলেট ও বগুড়াতে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট প্রকল্পের ভবনসমূহের নকশা করেন। তিনি ১৯৬৪-৬৮ সালে নতুন প্রস্তাবিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৯৬৯-৭০ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্প দুটির মহাপরিকল্পনা ও বিভিন্ন নকশা প্রণয়ন করেন যা তাঁর স্থাপত্য জীবনের অন্যতম প্রধান উল্লেখযোগ্য কীর্তি বলে বিবেচিত। যদিও বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই দুটি বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ করে জাহাঙ্গীরনগরের কাজ থেকে তাঁকে অজ্ঞাত কারণে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এ ছাড়া যৌথভাবে স্থপতি আলমগীর ও ইয়াফেস ওসমানের সঙ্গে জয়পুরহাট চুনাপাথর প্রকল্পের আবাসিক ভবনের নকশাও স্থপতি ইসলাম প্রণয়ন করেন যা বাংলাদেশ আমলে বাস্তবায়ন হয়।
এখন ভাবলে অবাক লাগে, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে যে স্থপতি এত ব্যস্তভাবে কাজ করে গেছেন, এ সময় তাঁর হাতে কোনো কাজ নেই। প্রশ্ন জাগে, এর কারণ কী? তৃতীয় বিশ্বের সংবেদনশীল বুদ্ধিজীবীরা বাস্তব জীবনে একটু সফল হলেই তাঁরা এই অভাগা দেশের অবহেলিত জনগণের মৌলিক চাহিদার দাবিতে খুব সংগত কারণেই বিবেকের তাড়নায় সোচ্চার হন, যা আবার শাসকগোষ্ঠীর পছন্দ নয় এবং এই শাসকগোষ্ঠী আবার জনগণের পছন্দ নয়। তাই স্বাভাবিকভাবেই জনগণ-সমর্থিত শিল্পী-স্থপতিরা সরকারের কাজ পান না এবং এভাবে তাঁরা নিজেদের পেশাচর্চার ক্ষতি করেন। অন্যান্য উন্নত দেশে এ ধরনের স্থপতিদের কোনো দৈনিক দায়বদ্ধতা থাকে না। উপরন্তু তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন জাতীয় বুর্জোয়ারা। তাই তাঁদের কোনো অসুবিধা হয় না। সরকারের পাশাপাশি আরও একটি বেসরকারি জনগণ সমর্থিত ধারা বয়ে যায় যার প্রচলন হওয়া আমাদের দেশে অচিন্তনীয় এবং অসম্ভব, যেহেতু এরাও শাসক সমর্থক, তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই মাজহারুল ইসলামের মতো স্থপতিরা কর্মহীন থাকেন, যা আমাদেরদেশ ও জাতির জন্য দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কিছু নয়।
স্থাপত্যকর্ম ছাড়াও স্থপতি মাজহারুল ইসলাম এদেশের উপযুক্ত স্থাপত্য শিক্ষার সঠিক প্রসার ও শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত স্থাপত্য পরিবেশ নির্মাণে এবং স্থাপত্য পেশার সুষ্ঠু আন্দোলন গঠনে সচেষ্ট হন। স্থাপত্য শিক্ষাকে একটি স্বাধীন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে বাস্তবায়ত করার জন্য স্থপতি ইসলামের উদ্যোগে ১৯৫৯ সালে ফোর্ড ফাউন্ডেশনের সাহায্যক্রমে জাতীয় শিক্ষা কমিশনের আমন্ত্রণে পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শক্তিশালী দল ঢাকায় উচ্চমানের স্থাপত্য শিক্ষার প্রচলনের সম্ভাবনা যাচাই করতে আসেন। কিন্তু তাঁর সে চেষ্টা সফল হয়নি। ১৯৬৬ থেকে ’৬৮ পর্যন্ত তিনি ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প উপদেষ্টা ছিলেন। তাঁর প্রস্তাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলনায়তন, একাডেমিক ভবন ও কিছু আবাসিক ভবন নকশা করার জন্য পৃথিবী বিখ্যাত আমেরিকান আধুনিক স্থপতি, তাঁর শিক্ষক এবং তৎকালীন ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য অনুষদের প্রধান পল রুডলফকে মনোনীত করা হয়। এই ভবনগুলো আমাদের দেশের আধুনিক স্থাপত্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
১৯৫৯ সালে পাকিস্তানের লাথিয়াগলিতে গভর্নর্স কনফারেন্স গৃহীত তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে দ্বিতীয় রাজধানী নির্মাণের যে প্রস্তাব আনা হয় তার বাস্তবায়নে ১৯৬৪ সালে তদানীন্তন কেন্দ্রীয় পূর্তমন্ত্রী মরহুম ফজলুল কাদেরচৌধুরী ইসলামাবাদে নিয়ে গিয়ে স্থপতি ইসলামকে সরাসরি ওই দ্বিতীয় রাজধানীর পরিকল্পনা ও নকশা করতে অনুরোধ জানান। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিজে না করে মন্ত্রীকে তিনি কোনো পৃথিবীখ্যাত স্থপতি দ্বারা পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করতে অনুরোধ জানান। মন্ত্রী সম্মতি প্রকাশ করেন এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতেই বর্তমানের শেরেবাংলা নগরের পরিকল্পনা বিশ্ববিখ্যাত আমেরিকান স্থপতি লুই কান দ্বারা সম্পন্ন হয় যা বিংশ শতাব্দীতে নির্মিত স্থাপত্যগুণ-সংবলিত বিশটি শ্রেষ্ঠ ভবনগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি বলে স্বীকৃত। প্রকৃতপক্ষে স্থপতি মাজহারুল ইসলাম এদেশের আধুনিক স্থাপত্যে বিদেশি শ্রেষ্ঠ স্থপতিকৃত সৃষ্টকর্ম বাস্তবায়নে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে সচেষ্ট হয়েছিলেন এই মনে করে যে তরুণ স্থপতিদের সম্মুখে ভবিষ্যতে এই ভবনগুলোর উন্নত উদাহরণ এবং চিরকালের জন্য তাদেরপ্রেরণা ও সুস্থ স্থাপত্যের মূল উৎস হয়ে থাকবে। তাঁর এই প্রচেষ্টার পরোক্ষ অবদান আমাদের নবীন স্থপতিদের মধ্যে অপরিসীম। স্থাপত্য সংগঠক হিসেবেও তিনি তার স্থাপত্য ধারণায় শক্তিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি যখন তদানীন্তন পাকিস্তানি স্থপতি ইনস্টিটিউটের সভাপতি ছিলেন সে সময় ১৯৬৮ সালে ঢাকায় প্রথমবারের মতো দেশের সব স্থপতি কর্তৃক একটি সেমিনার খুব সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়।দেশে প্রকৌশলী, পরিকল্পক ও স্থপতিদের সুস্থ ও সঠিক পেশাচর্চার দিকনির্দেশনা ও বিভিন্ন দিক নিয়ে সেখানে আলোচনা হয়। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সময়ে পৃথিবীর অন্যান্য উন্নত দেশের মতো স্থাপত্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় নামে একটি পৃথক মন্ত্রণালয় গঠনের জন্যও তিনি বহুদিন ধরে কাজ করেছেন এবং এই প্রস্তাবের গুরুত্ব স্থাপত্য জগতে অপরিসীম বলে বিবেচিত। যদি কোনো দিন কালক্রমে এটির বাস্তবায়ন হয় তবে তা স্থপতি ইসলামের স্বপ্ন ও দূরদৃষ্টির সার্থকতা প্রকাশ করবে।
স্থপতি মাজহারুল ইসলাম এদেশের একমাত্র আন্তুর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন স্থপতি ছাড়াও একজন স্থাপত্য বিচারকও। দেশি-বিদেশি বহু আন্তর্জাতিক স্থাপত্য প্রতিযোগিতার তিনি অন্যতম বিচারক হিসেবেও তাঁর বিচক্ষণতার প্রমাণ দিয়েছেন। ১৯৮০-৮১ সালে সৌদি আরব সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রধান ভবন এবং আগাখান শীর্ষক স্থাপত্য প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান বিচারকের ভূমিকা পালন করেন। আমাদের দেশের জাতীয় স্মৃতিসৌধের নকশা-নির্বাচনেও তিনি মুখ্য ভূমিকা রাখেন। স্থপতি ইসলাম শুধু স্থপতি শিক্ষা, পেশা, সংগঠন এবং আন্দোলনে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, তিনি নবীন ও উৎসাহী স্থপতি এবং ছাত্রদের নিয়ে সব শিল্পমাধ্যমের সৃষ্টিশীল শিল্পী, কবি, সাহিত্যিক, প্রত্নতাত্ত্বিক, ভূগোলবিদ, ইতিহাসবিদদের সমন্বয়ে ‘চেতনা’ নামে একটি পাঠচক্রও গঠন করার মূলে অবদান রেখেছেন। স্থাপত্য শিল্প ক্রমান্তর জটিল ও পরিবর্তনশীল। সামপ্রতিক স্থাপত্য বিশ্বে কী পরিবর্তন, উন্নয়ন এবং পরিবর্তন ঘটছে; বিষয়, দর্শন ও উপকরণ নিয়ে নিজের দেশের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য সম্বন্ধে জানা ইত্যাদি যাবতীয় বিষয়ে সম্যক ধারণালাভের উদ্দেশ্যেই এই পাঠচক্র। স্থপতি ইসলামের প্রেরণা, উৎসাহ ও নবীন স্থপতিদের অদম্য উদ্দীপনা, কার্যক্ষমতা ইতিমধ্যে সুধীমহলে ‘চেতনার’ কার্যক্রম বিশিষ্টতা অর্জন করেছেন। বাংলাদেশের এই পথিকৃৎ স্থপতিকে যেমন কর্মবিহীন করে রাখা হয়েছে অথবা বলা যায় বর্তমানের অসুস্থ স্থাপত্য পেশা ও স্থপতি নির্বাচনের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর অপারগতায় অপরাধী করে রাখা হয়েছে, এদেশে পদক কিংবা স্বাধীনতা পদক বা সামাজিক কোনো সম্মানেও তাঁকে ভূষিত করা হয়নি, কিন্তু যা ভাবতে অবাকই লাগে। দেশের বাইরে সমপ্রতি স্থপতি মাজহারুল ইসলাম সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের স্থাপত্য চেতনা বিকাশে অপরিসীম অবদান রাখার জন্য ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টসের পশ্চিমবঙ্গ শাখা কর্তৃক বিশেষভাবে সম্মানিত হয়েছেন। সম্মাননাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে এই সম্মান তাঁকে দেওয়া হয়েছে আধুনিক স্থাপত্যের মূলধারার সঙ্গে দেশজ বা আঞ্চলিক রীতির মেলবন্ধনে, স্থাপত্যশিল্পে উপযোগিতা ব্যবহারিকতার সঙ্গে উপাদানরীতি উপকরণ কৌশলের সার্থক সমন্বয় সাধনে তাঁর নিরলস সংগ্রাম ও প্রচেষ্টার অপূর্ব অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে। এই প্রথমবারের মতো অন্যান্য দেশের পৃথিবীখ্যাত স্থপতিদের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো স্থপতি স্থাপত্য জগতের এ রকম একটি দুর্লভ ও আন্তর্জাতিক সম্মানে বিভূষিত হলেন। এই সম্মান স্থপতির জন্য তো বটেই, সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের মুখও সহস্র গুণ উজ্জ্বল করেছে।
বাংলাদেশের আধুনিক স্থাপত্যের পথিকৃৎ প্রবীণ স্থপতি মাজহারুল ইসলাম এদেশের স্থাপত্য জগতের ইতিহাসে তাঁর নীরব, দৃঢ় ও নান্দনিক ঐতিহ্যময় অবদানের জন্য চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

Tuesday, July 12, 2022

অনেক গুণের থানকুনি পাতা by মেহনাজ বিনতে ওয়াহিদ

গরম ভাতের সঙ্গে থানকুনি পাতার ঝাল ঝাল ভর্তা থেকে খুবই মুখরোচক। শরবত বা সালাদেও ভিন্ন স্বাদ নিয়ে আসে এটি। কেবল খেতেই সুস্বাদু নয়, পুষ্টিগুণের দিক থেকেও অনন্য এই পাতা। দৈনন্দিন জীবনের একাধিক সমস্যার হাত থেকে মুক্তি পেতে নিয়মিত খেতে পারেন থানকুনি পাতা। জেনে নিন এর উপকারিতাগুলো।
  • ভিটামিনের অভাবে ঘা জাতীয় সমস্যা হয় আমাদের শরীরে। এ থেকে মুক্তি পেতে পান করুন থানকুনি পাতার রস।
  • কাশি ও ঠাণ্ডা লাগার সমস্যা দূর করতে থানকুনি পাতার রসের সঙ্গে মধু মিশিয়ে খান।
  • হজমের সমস্যা বা পেটের সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে পারে এই পাতা।
  • থানকুনি পাতার সঙ্গে কাঁচাকলা ও পেঁপে দিয়ে পাতলা ঝোল করে খেতে পারেন। এটি পেট পরিষ্কার করে ও লিভার বা যকৃতের সমস্যা থেকে মুক্তি দেয়।
  • থানকুনি পাতায় উপস্থিত অ্যামাইনো অ্যাসিড, বিটা ক্যারোটিন, ফ্যাটি অ্যাসিড এবং ফাইটোকেমিকাল ত্বকের পুষ্টির ঘাটতি দূর করে।
  • খাবার এবং আরও নানাভাবে একাধিক ক্ষতিকর টক্সিন আমাদের শরীরে ও রক্তে প্রবেশ করে। প্রতিদিন সকালে অল্প পরিমাণ থানকুনি পাতার রসের সঙ্গে ১ চামচ মধু মিশিয়ে খেলে রক্তে উপস্থিত ক্ষতিকর উপাদানগুলি বেরিয়ে যায়।
>>>তথ্য: নিউজ এইটিন 
থানকুনি পাতা

Friday, July 1, 2022

ডায়াবেটিস রোগীর জন্য চিনির বিকল্প স্টেভিয়া

স্টেভিয়া মিষ্টি গুল্ম জাতীয় ভেষজ গাছ। এটি কষ্টসহিষ্ণু বহু বর্ষজীবী এবং ৬০-৭৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। পাতা বর্ষাকৃতি, ফুল সাদা এবং বীজ ক্ষুদ্রাকৃতি। পাতাগুলো বিপরীত দিকে অবস্থিত, খাজকাটা, আঁশালো ও গাঢ় সবুজ। ফুলগুলো সাদা, নলাকৃতি এবং উভয়লিঙ্গ। পৃথিবীতে ২৪০টির মতো প্রজাতি এবং ৯০টির মতো জাত আছে। গাছটির অনেক শাখা-প্রশাখা হয়। মোটা মূল মাটির নিচের দিকে যায় এবং চিকন মূলগুলো মাটির উপরে থাকে। গাছগুলো সুগন্ধ ছড়ায় না কিন্তু পাতাগুলো মিষ্টি। স্টেভিয়ার পাতা চিনি অপেক্ষা ৩০-৪০ গুণ এবং পাতার স্টেভিয়াসাইড চিনি অপেক্ষা ৩০০ গুণ বেশি মিষ্টি। এটি স্বল্পদীর্ঘ দিবস উদ্ভিদ। স্টেভিয়ার গাছ সহজে চাষ করা যায়। চিনির বিকল্প হিসেবে জিরো ক্যালরি স্টেভিয়ার পাতা ব্যবহার করা যায়।
ইতিহাস: স্টেভিয়ার আদি নিবাস প্যারাগুয়ে। ১৯৬৪ সালে প্যারাগুয়েতে প্রথম বাণিজ্যিক চাষাবাদ শুরু। জাপানে শুরু হয় ১৯৬৮ সালে। তখন থেকে বিভিন্ন দেশে বিশেষত ব্রাজিল, কলম্বিয়া, পেরু, চীন, কোরিয়া, আমেরিকা, কানাডা, ইসরাইল, মেক্সিকো, থাইল্যান্ড, মালেশিয়াসহ প্রভৃতি দেশে এটি ফসল হিসেবে চাষাবাদ শুরু হয়। ১৮৮৭ সালে সুইজারল্যান্ডের উদ্ভিদ বিজ্ঞানী ড. এম এস বার্টনি স্টেভিয়াকে প্রথম পরিচয় করিয়ে দেন। খাবার মিষ্টি করতে জাপানে ৪০ বছর ধরে স্টেভিয়া ব্যবহার হচ্ছে। দক্ষিণ আমেরিকায়ও দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার হচ্ছে। ২০১১ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন স্টেভিয়া ব্যবহারের ছাড়পত্র দিয়েছে। প্যারাগুয়ের গুরানি ইন্ডিয়ান নামক উপজাতি একে বলে ‘কা-হি-হি’ অর্থাৎ ‘মধু গাছ’। আফ্রিকায় এটি ‘মধু পাতা’ বা ‘চিনি পাতা’ নামে পরিচিত। এছাড়া থাইল্যান্ডে ‘মিষ্টি ঘাস’, জাপানে ‘আমাহা সুটেবিয়া’ ও ভারতে ‘মধু পারানি’ নামে অভিহিত। সম্প্রতি বাংলাদেশে ব্র্যাক নার্সারি ‘ব্র্যাক ওষুধি-১১’ নামে এর টিস্যু কালচার চারা বাজারজাত করছে।
গুণাবলি: স্টেভিয়ায় অ্যাসপার্টেম, সেকারিন, সুক্রলস বা কৃত্রিম মিষ্টি জাতীয় কোন জিনিস নেই। স্টেভিয়ার মধ্যে কোন কার্বোহাইড্রেট কিংবা ক্যালরি নেই। তাই এটি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য চিনির সবচেয়ে ভালো প্রাকৃতিক বিকল্প। এছাড়া এরমধ্যে রয়েছে ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস বিনষ্টকারী প্রাকৃতিক রাসায়নিক উপাদান।
উপকারিতা: ক্যালরিমুক্ত এ মিষ্টি ডায়াবেটিস রোগী সেবন করলে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ পরিবর্তন হয় না। উচ্চরক্তচাপ প্রতিরোধ করে। যকৃত, অগ্ন্যাশয় ও প্লীহায় পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে। স্টেভিওসাইড অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন নিঃসরণে সহায়তা করে। ত্বকের ক্ষত নিরাময় ও দাঁতের ক্ষয় রোধ করে। ই.কলিসহ বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া দমন করে। খাদ্য হজমে সহায়তা করে। স্টেভিয়ায় কোন ক্যালরি না থাকায় স্থূলতা রোধ করে। শরীরের ওজন কমাতে সহায়তা করে। মিষ্টি জাতীয় খাবারে চিনির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায়। খাবারের গুণাগুণ বাড়ায় ও সুগন্ধ আনে। সুস্থতা ও সতেজতাবোধ সৃষ্টি করে। ব্যাকটেরিয়া সাইডাল এজেন্ট হিসেবে কাজ করে। স্কিন কেয়ার হিসেবে কাজ করে, বিধায় ত্বকের কোমলতা এবং লাবণ্য বাড়ায়। স্বাদ বৃদ্ধিকারক হিসেবে কাজ করে।
ব্যবহার: এটি চা, কফি, মিষ্টি, দই, বেকড ফুড, আইসক্রিম, কোমল পানীয় ইত্যাদি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এটি ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। স্টেভিয়ার সবুজ ও শুকনো পাতা সরাসরি চিবিয়ে কিংবা চায়ের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়া যায়। পাতা শুকিয়ে গুঁড়ো করে বোতলে সংরক্ষণ করা যায়। পাতার গুঁড়ো দিয়ে মিষ্টান্ন তৈরি করে ডায়াবেটিস রোগীরা খেতে পারেন। দীর্ঘদিন ব্যবহৃত এ ওষুধি গাছের কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া জানা যায়নি। জাপানে হালকা পানীয় কোকাকোলায় ব্যবহার করা হয়। এছাড়া কনফেকশনারি, ক্যান্ডিসহ বিভিন্ন খাবারে চিনির বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়। চা-কফিতে স্টেভিয়ার ব্যবহার বিশ্বব্যাপী।

পরিবেশ: বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু স্টেভিয়া চাষের জন্য খুবই উপযোগী। এদেশে সারা বছরই স্টেভিয়া চাষ করা সম্ভব। সুনিষ্কাশিত ও জৈব পদার্থযুক্ত উঁচু বেলে দো-আঁশ মাটি চাষের জন্য ভালো। মাটির পিএইচ ৬.৫-৭.৫ থাকা ভালো। বছরের যে কোন সময় চাষ করা যায়। তবে জানুয়ারি-মার্চ (মধ্য পৌষ-মধ্য চৈত্র) মাসে চাষ করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। জমি খুব ভালোভাবে চাষ ও মই দিয়ে তৈরি করতে হয়। জমির অবস্থা ও মাটির প্রকারভেদে ৪-৬টি চাষ এবং মই দিয়ে মাটি ভালোভাবে ঝুরঝুরা করে চাষ করতে হয়। চাষের মাঠ প্রয়োজনে মাঝে কিছুটা উঁচু করে তৈরি করলে ভালো। যাতে বৃষ্টির পানি সহজেই নিচের দিকে গড়িয়ে যেতে পারে। অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা থাকা ভালো। পৃথিবীতে স্টেভিয়ার প্রায় ৯০টির মতো জাত আছে। এর বিভিন্ন জাত বিভিন্ন আবহাওয়ার জন্য উপযোগী। স্টেভিয়ার গুণাগুণ নির্ভর করে এর পাতায় বিদ্যমান স্টেভিওসাইডের (মিষ্টি উপাদান) ওপর। পাতায় স্টেভিওসাইড উৎপাদন একই সঙ্গে গাছের বয়স, জাত ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। স্টেভিয়ার বাণিজ্যিক জাতের পাতায় কমপক্ষে ১০ ভাগ স্টেভিওসাইড থাকতে হয়।
চাষাবাদ: স্টেভিয়া বাণিজ্যিকভাবে সাধারণত বেডে চাষ করতে হয়। বেডের উচ্চতা হতে হবে কমপক্ষে ৬ ইঞ্চি। বেডে সারি থেকে সারি দূরত্ব হবে এক ফুট এবং সারিতে গাছ হতে গাছের দূরত্ব হবে ৬ ইঞ্চি। ৫ থেকে ৬টি চাষ দিয়ে জমিকে ভালোভাবে তৈরি করতে হবে। মই দিয়ে জমির ওপরের ঢেলা ভেঙে মিহি করে নিতে হবে। স্টেভিয়াকে টিস্যু কালচার পদ্ধতি, স্টেম কাটিং পদ্ধতি এবং বীজের মাধ্যমে বংশ বাড়ানো যায়। তবে টিস্যু কালচার সবচেয়ে ভালো ও লাভজনক পদ্ধতি। কারণ স্টেম কাটিংয়ে সফলতার হার খুবই কম এবং কাটিংয়ে শিকড় গজাতে অনেক বেশি সময় লাগে। বীজ থেকে চারা গজালেও অঙ্কুরোদগমনের হার থাকে খুবই কম। জমিতে গাছের সংখ্যানির্ভর করে মাটি ও আবহাওয়ার ওপর। তবে লাভজনকভাবে চাষের জন্য একর প্রতি ৪০ হাজার গাছ বা হেক্টরপ্রতি এক লাখ গাছ লাগানো উত্তম। স্টেভিয়ার সফলতা নির্ভর করে জমিতে বিদ্যমান পুষ্টি উপাদানের ওপর।
সার: স্টেভিয়া গাছে খুব কম পরিমাণ সার প্রয়োজন হয়। মাটি পরীক্ষার পর প্রয়োজন মতো সার প্রয়োগ করা ভালো। তবে অনুমোদিত গড় সারের মাত্রা হেক্টর প্রতি ১৪০ কেজি ইউরিয়া, ৪২ কেজি টিএসপি এবং ৩৫ কেজি এমপি (বিঘা প্রতি ২০ কেজি ইউরিয়া, ৬ কেজি টিএসপি, ৫ কেজি এমপি)। জমি চাষের সময় সমুদয় টিএসপি সার প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া ও এমপি সার তিন বারে উপরি প্রয়োগ করতে হবে। চারা লাগানোর ১ মাস পর থেকে প্রতি মাসে ইউরিয়া ও এমপি সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে। স্টেভিয়া চাষের জন্য জৈব সারই সর্বোত্কৃষ্ট।
সেচ: সারা বছরই মাটিতে পরিমিত আর্দ্রতা থাকতে হবে। তবে গাছ অতিরিক্ত আর্দ্রতা সহ্য করতে পারে না। সাধারণত শীতকালে একবার এবং গ্রীষ্মকালে ২-৩ বার ঝাঁঝরির সাহায্যে হালকা সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। মাসে একবার বেডের আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। তবে মালচিং (ছায়াযুক্ত পরিবেশ) করলে একই সঙ্গে আগাছা দমন হয়। আবার আর্দ্রতাও সংরক্ষণ হয়। খড়-কুটো, কচুরিপানা বা কম্পোস্ট দিয়ে মালচিং করা যায়, যা গাছের শিকড়কে মাটির সঙ্গে সুসংহত করে। স্টেভিয়ায় পোকামাকড়ের আক্রমণ ও রোগবালাই কম হয়ে থাকে। কখনো কখনো সেপটোরিয়া ও স্কেলেরোটিনিয়াজনিত গোড়া পচা রোগ দেখা যায়। চারা অবস্থায় অনেক সময় গাছের গোড়া কেটে দেয়। এছাড়া অনেক সময় এপিড ও সাদামাছির আক্রমণও লক্ষ্য করা যায়। নিম ওয়েল স্প্রে করে অর্গানিক উপায়ে একই সঙ্গে পোকামাকড় ও রোগ-জীবাণু দমন করা যায়। এজন্য ৩০ মি.লি নিম ওয়েল বা লিটার পানি- হারে স্প্রে করতে হবে।

ফলন: মাঠে চাষ করলে আষাঢ়-শ্রাবণ মাস থেকে শুরু করে ভাদ্র-আশ্বিন মাস পর্যন্ত স্টেভিয়া গাছ থেকে পাতা সংগ্রহ করা যায়। মাটির টবে লাগানো গাছ বড় হওয়ার পর সারা বছরই পাতা সংগ্রহ করা যায়। একটি মাটির টবে লাগানো গাছ থেকে ৩০-৪০ গ্রাম সবুজ পাতা সংগ্রহ করা হয়, যা থেকে ৭-১০ গ্রাম শুকনো পাতার গুড়া পাওয়া যায়। মাঠে চাষ করলে গাছে ফুলের কুঁড়ি আসার পূর্বে এবং ফুলের কুঁড়ি দেখা দেওয়ার সাথে সাথে পাতা সংগ্রহ শুরু করতে হয়। সাধারণত মাটি থেকে ১০-১৫ সে.মি উপরে প্রুনিং (অতিরিক্ত ডাল-পালা ছাটাই) করে ডালসহ পাতা সংগ্রহ করা হয়। সকাল বেলা পাতা সংগ্রহ করলে মিষ্টতা বেশি পাওয়া যায়। গাছের সমস্ত পাতা দুই-তিন বারে সংগ্রহ করা হয়। বিঘা প্রতি ৪৫০-৫৫০ কেজি সবুজ পাতা পাওয়া যায়। প্রতি বিঘা জমি থেকে ১৫৫-১৯০ কেজি শুকনা গুড়া পাওয়া সম্ভব। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আবহাওয়াতে জন্মানো স্টেভিয়া পাতায় ১৫-২০ ভাগ স্টেভিওসাইড থাকে, যা বিশ্বের অন্যত্র জন্মানো গাছের থেকে ১.৫-২.০ গুণ বেশি। এজন্য এগুলোর বাজারমূল্য বেশি।
পাতা শুকানো: স্টেভিয়া পাতা সংগ্রহের পর সূর্যালোকে বা ড্রায়ারের মাধ্যমে পাতা শুকাতে হবে। পাতা শুকানোর জন্য কমপক্ষে ১২ ঘণ্টার সূর্যালোক প্রয়োজন হয়। পাতা শুকানোর পর ক্রাশ করে পাউডারে পরিণত করা হয়। এক্ষেত্রে কফি গ্রাইন্ডার কিংবা ব্লেন্ডার মেশিন ব্যবহার করা যেতে পারে। গরম পানিতে এক চতুর্থাংশ পাউডার মিশিয়ে ভালোভাবে ব্লেন্ড করে স্টেভিয়া সিরাপ তৈরি করা যায়। এ সিরাপ ফ্রিজে সংরক্ষণ করতে হয়।
টবে চাষ: বাসা-বাড়িতে টবে বা পটে সহজেই স্টেভিয়া চাষ করা যায়। তবে গাছের টব রোদযুক্ত বারান্দায় বা ছাদে রাখতে হবে। টিস্যু কালচারের মাধ্যমে উৎপাদিত স্টেভিয়ার ছোট চারা নিষ্কাশনযুক্ত দো-আঁশ মাটিতে অথবা দো-আঁশ ও জৈব সার মিশ্রিত ৮-১০ ইঞ্চি মাটির টবে সারা বছর রোপণ করা যায়। এ গাছের চারা রোপণের ২৫-৩০ দিন পর পাতা সংগ্রহ করা যায়। গাছে ফুল আসার ২৫-৩০ দিন পর থেকে উপরের অংশ ধীরে ধীরে শুকিয়ে যায়। পরে গাছের গোড়া থেকে একসঙ্গে অনেক চারা বের হতে থাকে এবং ২০-২৫ দিন পর পুনরায় পাতা সংগ্রহ করা যায়।
সম্ভাবনা: স্টেভিয়ার গাছের ছোট চারা কেজিপ্রতি ৫০ টাকা এবং বড়গুলো ১০০ টাকা বিক্রি হয়। পাউডার প্রায় ৪,০০০ টাকা কেজি। স্টেভিয়া চাষ করে হেক্টরপ্রতি বছরে ৬-৮ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব। ভারতে বিভিন্ন কোম্পানি চুক্তিভিত্তিক চাষিদের চারা সরবরাহ করে থাকে এবং তাদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে স্টেভিয়া পাতা কিনে নেয়। আমাদের দেশে উত্তরাঞ্চলের বৃহত্তর রংপুরে একই পদ্ধতিতে তামাক চাষ করা হয়। এসব অঞ্চলে ক্ষতিকর তামাক চাষের পরিবর্তে স্টেভিয়া চাষ হতে পারে একটি লাগসই বিকল্প। বিশ্বব্যাপী ব্যাপক চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে স্টেভিয়া চাষ করে প্রচুর পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের ফসল উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বল্প পরিসরে শিক্ষা ও গবেষণার জন্য স্টেভিয়ার চাষ করা হচ্ছে। এটি ওষুধিগুণ সম্পন্ন একটি উদ্ভিদ, যা চিনির চেয়ে অনেকগুণ মিষ্টি। ডায়বেটিসসহ বিভিন্ন রোগে এবং চিনির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। বাজার সৃষ্টি না হওয়ায় কৃষকরা লাভবান হচ্ছে না। কর্তৃপক্ষ যথাযথ পদক্ষেপ নিলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।’
প্রাপ্তিস্থান: ২০১৮ সালের জুন মাসে গাজীপুরস্থ বাংলাদেশ ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএসআরআই) ‘বিএসআরআই স্টেভিয়া-১’ নামে একটি প্রজাতি বাজারে ছেড়েছে। ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মো. আমজাদ হোসাইন বলেন, ‘আমাদের একজন গবেষক ২০১৩ সালে থাইল্যান্ড থেকে গাছ সংগ্রহ করে দেশে নিয়ে আসে। পরবর্তীতে ইনস্টিটিউটের বায়োটেকনোলজি ল্যাবে এটাকে টিস্যু কালচার করা হয়। বর্তমানে স্টেভিয়া কাটিং, টিস্যু কালচার ও বীজের মাধ্যমে উৎপাদন করা যাচ্ছে।’
ড. মো. আমজাদ হোসাইন আরও বলেন, ‘আমাদের দেশ স্টেভিয়া চাষের জন্য উপযুক্ত। রোগবালাই তেমন হয় না। প্রতি শতক জমি থেকে দুই কেজি পাউডার উৎপাদন সম্ভব। প্রতিকেজির পাউডারের বাজারমূল্য প্রায় ৪ হাজার টাকা। কৃষকের দ্বোরগোড়ায় না পৌঁছা এবং বাজার সৃষ্টি না হওয়ায় আমাদের দেশে এটি এখনো জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। কেউ স্টেভিয়া চাষ বা কিনতে চাইলে বিএসআরআইয়ের বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে সংগ্রহ করতে পারবেন।’