Thursday, July 28, 2022
আহমদ ছফার অবিনয় by তৌহিদ ইমাম
![]() |
| ২৮ জুলাই আহমদ ছফার মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণে |
আহমদ ছফা অস্বীকার করেছেন সমস্ত প্রতিষ্ঠা, প্রতিষ্ঠান আর শক্তিমানকে। তিনি জানতেন, এসবই পরিপূর্ণ বিকাশের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক। প্রতিষ্ঠা, প্রতিষ্ঠান আর শক্তিমান একেকটা পাথুরে দেয়াল। আহমদ ছফার সাধনা ছিল দেয়ালগুলো ভেঙে দিয়ে সৃষ্টিশীল বায়ুর অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা। আহমদ ছফা তাঁর দিনপঞ্জিকার একটি অংশে (৪ মার্চ, ১৯৭৩) লিখেছেন, ‘সমস্ত শক্তি জড়ো করে সামনে যদি পথ না হাঁটি আমার দম বন্ধ হয়ে আসবে। আমি নিজের ভেতরেই পচে উঠব। সুযোগ, সুবিধা, লোভ কিছুর কাছেই নতি স্বীকার করতে পারব না। নতি স্বীকার করা আর আমার মরে যাওয়া একই কথা।’ কোনো দুর্বল মুহূর্তে নিজের একান্ত মনোভাবনার প্রকাশ নয় এটি, বরং সারা জীবনের অবিচলিত সংকল্প। এজন্য অবশ্য আহমদ ছফাকে কম নিগ্রহের সম্মুখীন হতে হয়নি।
সেটিই স্বাভাবিক ছিল। প্রতিষ্ঠা, প্রতিষ্ঠান আর শক্তিমান চায় ক্ষণ ভঙ্গুর মেরুদণ্ডহীন মানুষ। যে মানুষ কেবলই তাদের স্তব, স্তুতি করবে; অনুগত সারমেয়র মতো পদলেহী হবে। বিনিময়ে নানা রকম সুযোগ-সুবিধার প্রসাদ পেয়ে চেটেপুটে খাবে। কিন্তু আহমদ ছফা ছিলেন সিংহাসন উল্টে দেওয়া সংগ্রামী গণমানুষের প্রতিনিধি। যে মানুষই সভ্যতা গড়ে, সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
আহমদ ছফার জন্ম ১৯৪৩ সালের ৩০ জুন চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার হারিশপুর ইউনিয়নের গাছবাড়িয়া গ্রামে। আহমদ ছফা খুব গর্বভরে নিজের পরিচয় দিতেন ‘কিষানের ছাওয়াল’ বলে। মুসলমান কৃষক সম্প্রদায়ের প্রতি ছিল তাঁর অপার মমতা। যেহেতু তিনি উঠে এসেছেন সেই শ্রেণির ভেতর থেকে। কিন্তু ছিলেন প্রবল অসাম্প্রদায়িক। এই অসাম্প্রদায়িক চেতনার পাঠ তিনি নিয়েছেন নজরুলের জীবন ও রচনাবলি থেকে।
শুধু নজরুল নয়, আহমদ ছফার চেতনা ও সৃষ্টিশীলতায় অনেকেরই প্রভাব ছিল; বিশেষভাবে গ্যেটে, রাসেল এবং রবীন্দ্রনাথ। এই তিন মনীষী শুধু যে তাঁর মনোগঠনে ভূমিকা রেখেছেন তা নয়, সৃষ্টিশীলতার দুরূহ দুর্গম পথের পথিক হতেও সৎসাহস জুগিয়েছেন। ইংরেজ মনীষী বার্ট্রান্ড রাসেল ও বাঙালি মনীষী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে আহমদ ছফা অসাধারণ দুটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। প্রবন্ধ দুটি ১৯৮১ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ বইয়ে সংকলিত হয়েছে। প্রবন্ধ দুটি পড়লে বিস্মিত হতে হয়; রাসেল ও রবীন্দ্রনাথকে আহমদ ছফা যে দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করেছেন; সেটি একেবারেই ব্যতিক্রম, এর আগে কেউই সেভাবে ব্যাখ্যা করেননি। প্রবন্ধ দুটিতে চকিত একবার দৃষ্টি দেওয়া যাক।
বার্ট্রান্ড রাসেলকে নিয়ে লিখিত প্রবন্ধটির শিরোনাম ‘বার্ট্রান্ড রাসেল’। ১৯৭০ সালের দিকে অধুনালুপ্ত ‘মুখপত্র’ পত্রিকায় লেখাটি প্রকাশিত হয়। আহমদ ছফা রচনাটি লিখেছিলেন ছাত্রাবস্থায় ও ড. আহমদ শরীফের বাড়িতে একটি সাপ্তাহিক পাঠচক্রের সভায় পাঠের উদ্দেশ্যে। আহমদ ছফা প্রবন্ধটি শুরু করেছেন এভাবে—‘বার্ট্রান্ড রাসেলের দর্শন ও মনীষার এক অংশ মাত্র সাধারণের চোখে পড়েছে। অপর অংশ চাঁদের অপর পিঠের মতো লোকলোচনের অন্তরালে রয়ে গেছে।’ এরপর পুরো প্রবন্ধের পরতে পরতে আহমদ ছফা যে ভাষায় ও ভঙ্গির তির্যকতায় রাসেলের ব্যক্তিজীবন ও কর্মের ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা অনবদ্য। প্রবন্ধটির শেষ প্যারার কথা কটির ভেতর দিয়ে প্রায় অলৌকিক ও পৌরাণিক ভাবমূর্তি ভেঙে লৌকিক রাসেল বেরিয়ে এসেছেন। আহমদ ছফা প্রবন্ধটি শেষ করেছেন এভাবে—‘প্রথম যৌবনে তিনি খ্যাতি, প্রতিপত্তি কিছু কামনা করেননি। শুধু চেয়েছিলেন সন্তানের জনক হতে। একেবারে আদিম কামনা। জুলু হটেন্টটের সঙ্গে কোনো প্রভেদ নেই। প্রথম সন্তানের জনক হওয়ার সংবাদে এমন বিভোর আনন্দ পরিবেশন করেছেন নেহায়েত জৈবকর্মে বিরক্ত মানুষের মনেও একঝলক দখিনা হাওয়া সমীরিত হয়। এই মানুষী আবেগটিই রাসেলের অমরত্বের কারণ। তিনি বিশাল পুরুষ, বিখ্যাত মানুষ। কণ্ঠস্বর আটলান্টিক, প্রশান্ত মহাসাগর পেরিয়ে পাঁচ মহাদেশের কানে কানাকানি করে। এমন বিখ্যাত মানুষের আনন্দিত হওয়ার জন্য সুগায়কের গানের একটি কলি, জাতশিল্পীর ছবির একটু দর্শন, সবুজ বনানীর একটু অন্তরঙ্গ ছোঁয়া এই-ই যথেষ্ট। হাসি পাওয়ার মতো সাধারণ। সমস্ত অসাধারণেরাই অতিবেশি সাধারণ, কথাটি বোধ করি সত্য।’ কী অনন্যসাধারণ উপলব্ধি! বার্ট্রান্ড রাসেলের প্রতি এই মুগ্ধতা আহমদ ছফাকে দিয়ে রাসেলের Sceptical Essays-এর অনুবাদ করিয়ে নিয়েছে; ‘সংশয়ী রচনা’ শিরোনামের অনুবাদগ্রন্থটি ১৯৮২ সালে প্রকাশিত হয়।
- আহমদ ছফাকে পড়তে হলে বসতে হবে সমস্ত মনোযোগ ও মনন নিয়ে। সেই সঙ্গে থাকতে হবে ইতিহাস ও সমাজতত্ত্ব পাঠের অভিজ্ঞতা। কোনো অপ্রস্তুত পাঠকের পক্ষে আহমদ ছফার রচনা হজম করা কঠিন।
কিন্তু বার্ট্রান্ড রাসেল ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চেয়েও যে মনীষী আহমদ ছফার চেতনালোককে অধিকতর আলোড়িত করেছেন বলে মনে করি, তিনি জার্মান কবি ও নাট্যকার যোহান ভন গ্যেটে। এই মনীষীর বৈভবময় জীবন ও বিপুল সৃষ্টি ছফাকে সূর্যাভিমুখী পুষ্পের মতো প্রস্ফুটিত করেছে। গ্যেটের অমর কাব্য ‘ফাউস্ট’, যেটি তিনি দীর্ঘ তেইশ বছর ধরে রচনা করেছেন, সেই বৃহদায়তন রচনাটি অনুবাদের যে সৎসাহসিক উদ্যোগ আহমদ ছফা নিয়েছিলেন, তাই তাকে বাংলা সাহিত্যে চির অমর করে দিয়ে গেছে। এই কর্মটিই প্রমাণ করে আহমদ ছফা গ্যেটে দ্বারা কী ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত ছিলেন।
কিন্তু এসবই কি আহমদ ছফার অবিনয়? আমার তো তাই মনে হয়। ব্যক্তিজীবনে ও সৃষ্টিশীলতায় আহমদ ছফা যে পথ বেছে নিয়েছিলেন, সেটি একেবারেই অপ্রথাগত। তিনি জীবনযাপনে ছিলেন উদ্দাম, বাঁধনহারা, সৃষ্টিশীলতায় ছিলেন বিচিত্রাভিসারী। তিনি যে সাহিত্যের নতুন কোনো ফর্ম নিয়ে কাজ করেছেন, তা নয়। তিনি কবিতা লিখেছেন, লিখেছেন গল্প-উপন্যাস, লিখেছেন প্রবন্ধ-স্মৃতিকথা-দিনলিপি, করেছেন অনুবাদ; অর্থাৎ একেবারেই প্রচলিত ধারা ও ফর্মে। কিন্তু আহমদ ছফার বিশেষত্ব ও অসাধারণত্ব সেসবের ভেতর দিয়েই হীরের দ্যুতির মতো ঠিকরে বেরিয়ে এসেছে। আহমদ ছফার লেখা পাঠ কোনো আরামদায়ক অভিজ্ঞতা নয়, বরং যথেষ্ট অস্বস্তিদায়ক। এমনকি উপন্যাসগুলো পর্যন্ত এতটা সুখপাঠ্য নয় যে, বালিশে আলতো হেলান দিয়ে পড়া যাবে। আহমদ ছফাকে পড়তে হলে বসতে হবে সমস্ত মনোযোগ ও মনন নিয়ে। সেই সঙ্গে থাকতে হবে ইতিহাস ও সমাজতত্ত্ব পাঠের অভিজ্ঞতা। কোনো অপ্রস্তুত পাঠকের পক্ষে আহমদ ছফার রচনা হজম করা কঠিন।
সব কিছু নিয়েই আহমদ ছফার ছিল নিজস্ব পর্যবেক্ষণ। তাঁর দেখার চোখ ছিল একেবারেই অন্যরকম। কোনো সামাজিক ঘটনা বা প্রপঞ্চ ব্যাখ্যাতেও থাকত তাঁর নিজস্বতার ছাপ। এমনকি সাহিত্যের কোনো সংঘটন কিংবা উপন্যাসের কোনো চরিত্র নিয়ে যখন তিনি আলোচনা করেছেন, সেখানেও পাওয়া গেছে নব আলোকের উদ্ভাস। উদাহরণ হিসেবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বহুল পঠিত উপন্যাস ‘পদ্মা নদীর মাঝি’র একটি চরিত্র হোসেন মিয়ার কথা বলা যেতে পারে। এই চরিত্রটিকে আহমদ ছফা যে দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন, আহমদ ছফার আগে কিংবা পরে কারও পক্ষেই এমন অভিনব ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব হয়নি। হোসেন মিয়াকে তিনি দেবরাজ জিউসের মতো সর্বইচ্ছা শক্তিসম্পন্ন চরিত্র হিসেবে দেখিয়েছেন। দেখিয়েছেন কলম্বাস, ক্যাপ্টেন কুকের বঙ্গীয় সংস্করণ হিসেবে। অথবা ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ প্রবন্ধে তাঁর যে ব্যাখ্যাসমূহ, সেগুলো বিস্ময়েরই উদ্রেক করে। লেখক হতে হলে কতটা অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন, কতটা মননদীপ্ত, কতটা বৈপ্লবিক হতে হয় আহমদ ছফা তাঁর সেরা দৃষ্টান্তগুলোর একজন।
অন্যদিকে জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাককে নিয়ে তাঁর যে অবিসংবাদিত স্মৃতিগ্রন্থ ‘যদ্যপি আমার গুরু’, সেটি পড়লে যে আহমদ ছফাকে আমরা পাই, সেই আহমদ ছফা অত্যন্ত সংবেদনশীল, প্রচণ্ড পড়ুয়া ও অস্থির অনুসন্ধিৎসু। এবং অবশ্যই স্মৃতিধর।
আহমদ ছফার পরিচয়ের বহুমুখিতা এখানেই শেষ নয়; তিনি যে কতটা বহুমাত্রিক মানুষ ছিলেন, সেটি তাঁর জীবনযাপনই প্রমাণ করে। আহমদ ছফার কুসুমকোমল অন্তঃকরণের পরিচয় পাই অনুজ-তরুণ লেখকদের প্রতি প্রগাঢ় স্নেহশীলতায়। আজকে খ্যাতিমান, লব্ধপ্রতিষ্ঠ অনেক লেখকেরই সেদিন ছিলেন সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক, মহত্তম উৎসাহদাতা। সে সময়কার বহু তরুণের প্রথম বই আহমদ ছফার অর্থায়নে প্রকাশিত হয়েছে। এরই উল্টোদিকে আছে আহমদ ছফার রাগী, অনমনীয়, অনাপসী, সংকল্পদৃঢ় চরিত্র। জীবনে কোনো দিন কোনো অন্যায়ের কাছে নতি স্বীকার করেননি তিনি। শুধু নিজের সঙ্গে অন্যায় নয়, যখন দেখেছেন অন্যের সঙ্গে অন্যায় করা হচ্ছে, তখনও রুখে দাঁড়িয়েছেন। এস এম সুলতানের মতো একজন বিশ্বমানের চিত্রশিল্পী যখন শহুরেজনের নিরন্তর অবজ্ঞা-অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছিলেন লোকচক্ষুর অন্তরালে, আহমদ ছফা তখন প্রতিজ্ঞা করে বসেন—যে করেই হোক সুলতানকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান ফিরিয়ে দেবেন। কয়েক বছর পড়াশোনার পর তিনি লিখেন ‘বাঙালির চিত্র-ঐতিহ্য : এস এম সুলতানের সাধনা’ নামের দীর্ঘ একটি প্রবন্ধ। সেই সময় প্রবন্ধটি শিক্ষাভিমানী শহরবাসীর ভেতরে প্রবল উত্তেজনা তৈরি করে। এ দেশের তথাকথিত শিল্পগুরুরা খড়গহস্ত হন সুলতানকে পৃথিবীর সেরা চিত্রশিল্পীদের একজন বলে দাবি করায়। কিন্তু কোনো বিরোধিতাই সুলতানের প্রোজ্জ্বল ভাবমূর্তিকে আর নিষ্প্রভ করতে পারেনি। এসবই সম্ভব হয়েছিল আহমদ ছফার ইস্পাতদৃঢ় ব্যক্তিত্বের কারণে। আহমদ ছফা সেদিন অবিনয়ী ছিলেন বলেই কমটেম্পরারি গ্রেট মাস্টার্স পিকাসো, ডালি, মাতিস, পল ক্লে, মিকেল্যাঞ্জেলোদের কাতারে আমাদের সুলতানের আসন চিরস্থায়ী হয়ে যায়।
ড. আহমদ শরীফ একবার ‘বেয়াদবি জিন্দাবাদ’ নামের একটি প্রবন্ধ লিখে ‘বেয়াদব’দের (?) স্তবগান গেয়েছিলেন। কারা এই বেয়াদব? তারাই, যারা অস্বীকার করে সমস্ত প্রথা, প্রতিষ্ঠা, প্রতিষ্ঠান আর শক্তিমানদের। নিজস্ব বিচার-বিবেচনা দিয়ে যারা সৃষ্টিশীলতাকেই মেনে নিয়েছে সর্বেশ্বর হিসেবে। অন্তরের আলোই যাদের চলার পথের পাথেয়। লোভ-লালসা যেমন এদের সম্মোহিত করতে পারে না, ভয়ের রক্তচক্ষুও টলাতে পারে না নিজের সংকল্প থেকে। আহমদ ছফার চরিত্রে না ছিল লোভ, না ছিল কোনো কিছুকে ভয়। ফলে জীবনের অনেক সংকটজনক পরিস্থিতিতে আহমদ ছফা এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, কোনো গড়পড়তা মানুষের পক্ষে সেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব ছিল না।
সাহিত্যিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, চিন্তাবিদ, মনীষী আহমদ ছফা ২০০১ সালের ২৮ জুলাই মারা যান। ১৯৪৩ থেকে ২০০১ সাল—আহমদ ছফার প্রায় ছয় দশকের জীবনযাপন আমাদের সামনে স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যক্তিত্বের এমন একজনকে তুলে ধরে, যিনি ছিলেন পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য উন্মুখ। পরিপূর্ণ বিকাশ শুধু তাঁর পক্ষেই সম্ভব, যিনি হতে পারেন স্বতঃসিদ্ধ স্বয়ংপুরুষ। আহমদ ছফার অভিজ্ঞতায় সাতচল্লিশের দেশভাগ অস্পষ্ট হলেও পাকিস্তানের সামরিক শাসন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন বাংলাদেশে সামরিক শাসন, ছদ্মগণতন্ত্র—আহমদ ছফার চিন্তাচেতনায় স্পষ্ট ছাপ ফেলেছে। সেইসঙ্গে নতুন নতুন কর্মোদ্যমে নিয়োজিত করেছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের পরে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রথম বইটি আহমদ ছফারই রচিত। মুক্তিযুদ্ধের পরে দেশের অরাজকতা ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন আহমদ ছফাকে এতটাই ক্রুদ্ধ ও বেদনাহত করেছিল যে, তাকে তিনি আখ্যায়িত করেন ‘বেহাত বিপ্লব’ বলে। তবু আহমদ ছফা অফুরান আনন্দ, উৎসাহ আর কর্মোৎসাহের প্রেরণা হয়ে থাকবেন আমাদের কাছে। আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ তার যে কীর্তিমান সন্তানগুলোর জন্য গর্ববোধ করবে, আহমদ ছফা হবেন তাঁদের ভেতরে উজ্জ্বলতরদের একজন।
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Friday, July 22, 2022
রক্তশূন্যতা দূর হয় পালং শাক খেলে

- *পালং শাকে প্রচুর ভিটামিন সি এবং বিটা ক্যারোটিন থাকে যা কোলনের কোষগুলোকে রক্ষা করে।
- *পালং শাকে থাকা আয়রন রক্তশূন্যতা দূর করে।
- *বাতের ব্যথা, অস্টিওপোরোসিস, মাথাব্যথা দূর করতে প্রদাহনাশক হিসেবে কাজ করে পালং শাক।
- *স্মৃতিশক্তি এবং মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধিতে খুবই কার্যকর এই শাক।
- *পেট পরিষ্কার রাখে এই শাক। তাছাড়া রক্ত তৈরিতে সাহায্য করে, দৃষ্টিশক্তিও বাড়ায়।
- *কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।
- *পালং শাকে ১৩ প্রকার ফাভোনয়েডস আছে যা ক্যানসার প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি প্রোস্টেট ক্যানসার প্রতিরোধে খুবই কার্যকর।
- *পালং শাক দাঁত ও হাড়ের ক্ষয়রোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Wednesday, July 20, 2022
চাঁদে যাওয়া নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকার লড়াই চলে যেভাবে
মহাকাশে প্রতিযোগিতা
![]() |
| হোয়াইট হাউজে ১৯৫৯ সালে নিক্সন, আইজেনআওয়ার এবং ক্রুশ্চেভ। |
![]() |
| লুনা ২ মিশনের একটি মডেল। |
লুনা ২
![]() |
| চাঁদের পৃষ্ঠের প্রথম ছবি, ১৯৬৬ সালে তোলা |
লুনা ৯
![]() |
| লুনা ২ মিশনের একটি নমুনা যা সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী মার্কিন প্রেসিডেন্টকে উপহার দিয়েছিলেন। |
লুনা ১০
![]() |
| এপোলো ৮-এ নভোচারী। |
![]() |
| আলেক্সেই লিওনোভ ১৯৬৫ সালে প্রথম স্পেস-ওয়াক করেছিলেন। |
রাজনৈতিক সংগ্রাম
![]() |
| সোভিয়েত মহাকাশ কর্মসূচিকে প্রতিযোগিতা করতে হতো সামরিক বাহিনীর সাথে। |
![]() |
| সোভিয়েত ইউনিয়নের এন ওয়ান রকেট। |
শেষ চেষ্টা
![]() |
| চাঁদের বুকে দাঁড়িয়ে আছেন নীল আর্মস্ট্রং, ১৯৬৯ সালে। |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Friday, July 15, 2022
বাংলাদেশের আধুনিক স্থাপত্যের পথিকৃৎ by রবিউল হুসাইন
![]() |
| মাজহারুল ইসলাম |
স্থপতি মাজহারুল ইসলামের সম্পন্ন করা সরকারের বহু স্থাপত্যকর্মের মধ্যে উপরিউল্লিখিত দুটি প্রকল্প ছাড়া অন্য প্রকল্পগুলো সরকারি লাল ফিতার কারণে কোনো দিন বাস্তবায়িত হয়নি। এ নিয়ে সরকারের সঙ্গে তাঁর মনোমালিন্য শুরু হয়। এবং এই কারণে ১৯৫৮ সালে তিনি চাকরি থেকে ছাড়পত্র নিতে আবেদন করেন, কিন্তু সেই পত্র তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান খান কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়। অতঃপর স্থাপত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করার জন্য সরকারি বৃত্তি নিয়ে আমেরিকার ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে যান এবং ১৯৬১ সালে ফিরে এসে আবার সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। এই সময়ে ব্যক্তিগত পর্যায়ে ড. কুদরত-ই-খুদার প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ১৯৬২ সালে সায়েন্স ল্যাবরেটরি (বিসিএসআইআর) প্রকল্প প্রণয়ন করেন। তদানীন্তন শাসকগোষ্ঠীর একতরফা অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা লাভের কারণে এদেশে তখন তেমন উল্লেখযোগ্য নির্মাণকার্য চলছিল না। এই অবস্থায় স্থপতি মাজহারুল ইসলাম প্রায় এককভাবে সরকারি স্থাপত্য নির্দেশনামা প্রবর্তনের জন্য চেষ্টা করেন কিন্তু সরকারিভাবে তা অনুমোদিত হয়নি। এ নিয়ে সরকারের সঙ্গে আবার বিরোধ বাধে এবং ১৯৬৭ সালে তিনি সরকারি স্থপতির পদ থেকে সম্পূর্ণরূপে পদত্যাগ করেন। পরে এ সময়ই প্রখ্যাত প্রকৌশলী শেখ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সঙ্গে মিলে বাস্তুকলাবিদ নামে একটি স্থাপত্য উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠান গঠিত করে স্থাপত্য চর্চা শুরু করেন। এই বাস্তুকলাবিদই এদেশের প্রথম স্থপতি পরিচালিত পেশাভিত্তিক স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান। কিছুদিনের মধ্যে স্থপতি ইসলামের পরিচালনায় এই প্রতিষ্ঠানটি তদানীন্তন সমগ্র পাকিস্তানে উন্নত স্থাপত্য শিল্পকর্মচর্চার প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং এদেশে স্থাপত্যচর্চ ও পেশাকে একটি সম্মানজনক শৈল্পিক পেশা হিসেবে তাঁর প্রখর ব্যক্তিত্য, রুচি, দেশপ্রেম, কাজের প্রতি প্রগাঢ় নিষ্ঠা, পরিপূর্ণ সততা, শৃঙ্খলা, নান্দনিক বিন্যাস ইত্যাদিসহকারে প্রতিষ্ঠিত করেন।
ইতিমধ্যে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্য অনুষদে প্রাতিষ্ঠানিক স্থাপত্য শিক্ষা শুরু হয়েছে এবং সবে স্নাতক ডিগ্রিপ্রাপ্ত অনেক নবীন স্থপতি হাতে-কলমে কাজ শেখার জন্য স্থপতি ইসলামের বাস্তুকলাবিদ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত হন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই আজ স্বনামধন্য স্থপতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছেন। বাস্তুকলাবিদ প্রতিষ্ঠার পর অনুপম স্থাপত্যগুণ সংবলিত বহু ভবনের নকশা করেন তিনি। তখন ১৯৬৪-৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্টস বিভাগের উত্তরে নিপা ভবন, ১৯৫৫ সালে মতিঝিলে কৃষি ভবন, ১৯৬৫-৬৮ সালে জীবনবীমা ভবন (টাওয়ার বাদে), ১৯৬৬ সালে মিরপুরের রোড রিসার্চ ল্যাবরেটরি প্রকল্পের ভবনসমূহ এবং অসংখ্য বসবাস গৃহের পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। স্থপতি ইসলাম ও তাঁর বন্ধু বিখ্যাত আমেরিকার স্থপতি টাইগারম্যানের যৌথ উদ্যোগে ১৯৬৫ সালে বাংলাদেশের পাঁচটি শহর যথা বরিশাল, পাবনা, রংপুর, সিলেট ও বগুড়াতে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট প্রকল্পের ভবনসমূহের নকশা করেন। তিনি ১৯৬৪-৬৮ সালে নতুন প্রস্তাবিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৯৬৯-৭০ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্প দুটির মহাপরিকল্পনা ও বিভিন্ন নকশা প্রণয়ন করেন যা তাঁর স্থাপত্য জীবনের অন্যতম প্রধান উল্লেখযোগ্য কীর্তি বলে বিবেচিত। যদিও বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই দুটি বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ করে জাহাঙ্গীরনগরের কাজ থেকে তাঁকে অজ্ঞাত কারণে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এ ছাড়া যৌথভাবে স্থপতি আলমগীর ও ইয়াফেস ওসমানের সঙ্গে জয়পুরহাট চুনাপাথর প্রকল্পের আবাসিক ভবনের নকশাও স্থপতি ইসলাম প্রণয়ন করেন যা বাংলাদেশ আমলে বাস্তবায়ন হয়।
এখন ভাবলে অবাক লাগে, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে যে স্থপতি এত ব্যস্তভাবে কাজ করে গেছেন, এ সময় তাঁর হাতে কোনো কাজ নেই। প্রশ্ন জাগে, এর কারণ কী? তৃতীয় বিশ্বের সংবেদনশীল বুদ্ধিজীবীরা বাস্তব জীবনে একটু সফল হলেই তাঁরা এই অভাগা দেশের অবহেলিত জনগণের মৌলিক চাহিদার দাবিতে খুব সংগত কারণেই বিবেকের তাড়নায় সোচ্চার হন, যা আবার শাসকগোষ্ঠীর পছন্দ নয় এবং এই শাসকগোষ্ঠী আবার জনগণের পছন্দ নয়। তাই স্বাভাবিকভাবেই জনগণ-সমর্থিত শিল্পী-স্থপতিরা সরকারের কাজ পান না এবং এভাবে তাঁরা নিজেদের পেশাচর্চার ক্ষতি করেন। অন্যান্য উন্নত দেশে এ ধরনের স্থপতিদের কোনো দৈনিক দায়বদ্ধতা থাকে না। উপরন্তু তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন জাতীয় বুর্জোয়ারা। তাই তাঁদের কোনো অসুবিধা হয় না। সরকারের পাশাপাশি আরও একটি বেসরকারি জনগণ সমর্থিত ধারা বয়ে যায় যার প্রচলন হওয়া আমাদের দেশে অচিন্তনীয় এবং অসম্ভব, যেহেতু এরাও শাসক সমর্থক, তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই মাজহারুল ইসলামের মতো স্থপতিরা কর্মহীন থাকেন, যা আমাদেরদেশ ও জাতির জন্য দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কিছু নয়।
স্থাপত্যকর্ম ছাড়াও স্থপতি মাজহারুল ইসলাম এদেশের উপযুক্ত স্থাপত্য শিক্ষার সঠিক প্রসার ও শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত স্থাপত্য পরিবেশ নির্মাণে এবং স্থাপত্য পেশার সুষ্ঠু আন্দোলন গঠনে সচেষ্ট হন। স্থাপত্য শিক্ষাকে একটি স্বাধীন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে বাস্তবায়ত করার জন্য স্থপতি ইসলামের উদ্যোগে ১৯৫৯ সালে ফোর্ড ফাউন্ডেশনের সাহায্যক্রমে জাতীয় শিক্ষা কমিশনের আমন্ত্রণে পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শক্তিশালী দল ঢাকায় উচ্চমানের স্থাপত্য শিক্ষার প্রচলনের সম্ভাবনা যাচাই করতে আসেন। কিন্তু তাঁর সে চেষ্টা সফল হয়নি। ১৯৬৬ থেকে ’৬৮ পর্যন্ত তিনি ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প উপদেষ্টা ছিলেন। তাঁর প্রস্তাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলনায়তন, একাডেমিক ভবন ও কিছু আবাসিক ভবন নকশা করার জন্য পৃথিবী বিখ্যাত আমেরিকান আধুনিক স্থপতি, তাঁর শিক্ষক এবং তৎকালীন ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য অনুষদের প্রধান পল রুডলফকে মনোনীত করা হয়। এই ভবনগুলো আমাদের দেশের আধুনিক স্থাপত্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
১৯৫৯ সালে পাকিস্তানের লাথিয়াগলিতে গভর্নর্স কনফারেন্স গৃহীত তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে দ্বিতীয় রাজধানী নির্মাণের যে প্রস্তাব আনা হয় তার বাস্তবায়নে ১৯৬৪ সালে তদানীন্তন কেন্দ্রীয় পূর্তমন্ত্রী মরহুম ফজলুল কাদেরচৌধুরী ইসলামাবাদে নিয়ে গিয়ে স্থপতি ইসলামকে সরাসরি ওই দ্বিতীয় রাজধানীর পরিকল্পনা ও নকশা করতে অনুরোধ জানান। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিজে না করে মন্ত্রীকে তিনি কোনো পৃথিবীখ্যাত স্থপতি দ্বারা পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করতে অনুরোধ জানান। মন্ত্রী সম্মতি প্রকাশ করেন এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতেই বর্তমানের শেরেবাংলা নগরের পরিকল্পনা বিশ্ববিখ্যাত আমেরিকান স্থপতি লুই কান দ্বারা সম্পন্ন হয় যা বিংশ শতাব্দীতে নির্মিত স্থাপত্যগুণ-সংবলিত বিশটি শ্রেষ্ঠ ভবনগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি বলে স্বীকৃত। প্রকৃতপক্ষে স্থপতি মাজহারুল ইসলাম এদেশের আধুনিক স্থাপত্যে বিদেশি শ্রেষ্ঠ স্থপতিকৃত সৃষ্টকর্ম বাস্তবায়নে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে সচেষ্ট হয়েছিলেন এই মনে করে যে তরুণ স্থপতিদের সম্মুখে ভবিষ্যতে এই ভবনগুলোর উন্নত উদাহরণ এবং চিরকালের জন্য তাদেরপ্রেরণা ও সুস্থ স্থাপত্যের মূল উৎস হয়ে থাকবে। তাঁর এই প্রচেষ্টার পরোক্ষ অবদান আমাদের নবীন স্থপতিদের মধ্যে অপরিসীম। স্থাপত্য সংগঠক হিসেবেও তিনি তার স্থাপত্য ধারণায় শক্তিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি যখন তদানীন্তন পাকিস্তানি স্থপতি ইনস্টিটিউটের সভাপতি ছিলেন সে সময় ১৯৬৮ সালে ঢাকায় প্রথমবারের মতো দেশের সব স্থপতি কর্তৃক একটি সেমিনার খুব সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়।দেশে প্রকৌশলী, পরিকল্পক ও স্থপতিদের সুস্থ ও সঠিক পেশাচর্চার দিকনির্দেশনা ও বিভিন্ন দিক নিয়ে সেখানে আলোচনা হয়। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সময়ে পৃথিবীর অন্যান্য উন্নত দেশের মতো স্থাপত্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় নামে একটি পৃথক মন্ত্রণালয় গঠনের জন্যও তিনি বহুদিন ধরে কাজ করেছেন এবং এই প্রস্তাবের গুরুত্ব স্থাপত্য জগতে অপরিসীম বলে বিবেচিত। যদি কোনো দিন কালক্রমে এটির বাস্তবায়ন হয় তবে তা স্থপতি ইসলামের স্বপ্ন ও দূরদৃষ্টির সার্থকতা প্রকাশ করবে।
স্থপতি মাজহারুল ইসলাম এদেশের একমাত্র আন্তুর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন স্থপতি ছাড়াও একজন স্থাপত্য বিচারকও। দেশি-বিদেশি বহু আন্তর্জাতিক স্থাপত্য প্রতিযোগিতার তিনি অন্যতম বিচারক হিসেবেও তাঁর বিচক্ষণতার প্রমাণ দিয়েছেন। ১৯৮০-৮১ সালে সৌদি আরব সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রধান ভবন এবং আগাখান শীর্ষক স্থাপত্য প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান বিচারকের ভূমিকা পালন করেন। আমাদের দেশের জাতীয় স্মৃতিসৌধের নকশা-নির্বাচনেও তিনি মুখ্য ভূমিকা রাখেন। স্থপতি ইসলাম শুধু স্থপতি শিক্ষা, পেশা, সংগঠন এবং আন্দোলনে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, তিনি নবীন ও উৎসাহী স্থপতি এবং ছাত্রদের নিয়ে সব শিল্পমাধ্যমের সৃষ্টিশীল শিল্পী, কবি, সাহিত্যিক, প্রত্নতাত্ত্বিক, ভূগোলবিদ, ইতিহাসবিদদের সমন্বয়ে ‘চেতনা’ নামে একটি পাঠচক্রও গঠন করার মূলে অবদান রেখেছেন। স্থাপত্য শিল্প ক্রমান্তর জটিল ও পরিবর্তনশীল। সামপ্রতিক স্থাপত্য বিশ্বে কী পরিবর্তন, উন্নয়ন এবং পরিবর্তন ঘটছে; বিষয়, দর্শন ও উপকরণ নিয়ে নিজের দেশের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য সম্বন্ধে জানা ইত্যাদি যাবতীয় বিষয়ে সম্যক ধারণালাভের উদ্দেশ্যেই এই পাঠচক্র। স্থপতি ইসলামের প্রেরণা, উৎসাহ ও নবীন স্থপতিদের অদম্য উদ্দীপনা, কার্যক্ষমতা ইতিমধ্যে সুধীমহলে ‘চেতনার’ কার্যক্রম বিশিষ্টতা অর্জন করেছেন। বাংলাদেশের এই পথিকৃৎ স্থপতিকে যেমন কর্মবিহীন করে রাখা হয়েছে অথবা বলা যায় বর্তমানের অসুস্থ স্থাপত্য পেশা ও স্থপতি নির্বাচনের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর অপারগতায় অপরাধী করে রাখা হয়েছে, এদেশে পদক কিংবা স্বাধীনতা পদক বা সামাজিক কোনো সম্মানেও তাঁকে ভূষিত করা হয়নি, কিন্তু যা ভাবতে অবাকই লাগে। দেশের বাইরে সমপ্রতি স্থপতি মাজহারুল ইসলাম সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের স্থাপত্য চেতনা বিকাশে অপরিসীম অবদান রাখার জন্য ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টসের পশ্চিমবঙ্গ শাখা কর্তৃক বিশেষভাবে সম্মানিত হয়েছেন। সম্মাননাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে এই সম্মান তাঁকে দেওয়া হয়েছে আধুনিক স্থাপত্যের মূলধারার সঙ্গে দেশজ বা আঞ্চলিক রীতির মেলবন্ধনে, স্থাপত্যশিল্পে উপযোগিতা ব্যবহারিকতার সঙ্গে উপাদানরীতি উপকরণ কৌশলের সার্থক সমন্বয় সাধনে তাঁর নিরলস সংগ্রাম ও প্রচেষ্টার অপূর্ব অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে। এই প্রথমবারের মতো অন্যান্য দেশের পৃথিবীখ্যাত স্থপতিদের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো স্থপতি স্থাপত্য জগতের এ রকম একটি দুর্লভ ও আন্তর্জাতিক সম্মানে বিভূষিত হলেন। এই সম্মান স্থপতির জন্য তো বটেই, সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের মুখও সহস্র গুণ উজ্জ্বল করেছে।
বাংলাদেশের আধুনিক স্থাপত্যের পথিকৃৎ প্রবীণ স্থপতি মাজহারুল ইসলাম এদেশের স্থাপত্য জগতের ইতিহাসে তাঁর নীরব, দৃঢ় ও নান্দনিক ঐতিহ্যময় অবদানের জন্য চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
About: নিজাম কুতুবী
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Tuesday, July 12, 2022
অনেক গুণের থানকুনি পাতা by মেহনাজ বিনতে ওয়াহিদ
- ভিটামিনের অভাবে ঘা জাতীয় সমস্যা হয় আমাদের শরীরে। এ থেকে মুক্তি পেতে পান করুন থানকুনি পাতার রস।
- কাশি ও ঠাণ্ডা লাগার সমস্যা দূর করতে থানকুনি পাতার রসের সঙ্গে মধু মিশিয়ে খান।
- হজমের সমস্যা বা পেটের সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে পারে এই পাতা।
- থানকুনি পাতার সঙ্গে কাঁচাকলা ও পেঁপে দিয়ে পাতলা ঝোল করে খেতে পারেন। এটি পেট পরিষ্কার করে ও লিভার বা যকৃতের সমস্যা থেকে মুক্তি দেয়।
- থানকুনি পাতায় উপস্থিত অ্যামাইনো অ্যাসিড, বিটা ক্যারোটিন, ফ্যাটি অ্যাসিড এবং ফাইটোকেমিকাল ত্বকের পুষ্টির ঘাটতি দূর করে।
- খাবার এবং আরও নানাভাবে একাধিক ক্ষতিকর টক্সিন আমাদের শরীরে ও রক্তে প্রবেশ করে। প্রতিদিন সকালে অল্প পরিমাণ থানকুনি পাতার রসের সঙ্গে ১ চামচ মধু মিশিয়ে খেলে রক্তে উপস্থিত ক্ষতিকর উপাদানগুলি বেরিয়ে যায়।
![]() |
| থানকুনি পাতা |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Friday, July 1, 2022
ডায়াবেটিস রোগীর জন্য চিনির বিকল্প স্টেভিয়া

ইতিহাস: স্টেভিয়ার আদি নিবাস প্যারাগুয়ে। ১৯৬৪ সালে প্যারাগুয়েতে প্রথম বাণিজ্যিক চাষাবাদ শুরু। জাপানে শুরু হয় ১৯৬৮ সালে। তখন থেকে বিভিন্ন দেশে বিশেষত ব্রাজিল, কলম্বিয়া, পেরু, চীন, কোরিয়া, আমেরিকা, কানাডা, ইসরাইল, মেক্সিকো, থাইল্যান্ড, মালেশিয়াসহ প্রভৃতি দেশে এটি ফসল হিসেবে চাষাবাদ শুরু হয়। ১৮৮৭ সালে সুইজারল্যান্ডের উদ্ভিদ বিজ্ঞানী ড. এম এস বার্টনি স্টেভিয়াকে প্রথম পরিচয় করিয়ে দেন। খাবার মিষ্টি করতে জাপানে ৪০ বছর ধরে স্টেভিয়া ব্যবহার হচ্ছে। দক্ষিণ আমেরিকায়ও দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার হচ্ছে। ২০১১ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন স্টেভিয়া ব্যবহারের ছাড়পত্র দিয়েছে। প্যারাগুয়ের গুরানি ইন্ডিয়ান নামক উপজাতি একে বলে ‘কা-হি-হি’ অর্থাৎ ‘মধু গাছ’। আফ্রিকায় এটি ‘মধু পাতা’ বা ‘চিনি পাতা’ নামে পরিচিত। এছাড়া থাইল্যান্ডে ‘মিষ্টি ঘাস’, জাপানে ‘আমাহা সুটেবিয়া’ ও ভারতে ‘মধু পারানি’ নামে অভিহিত। সম্প্রতি বাংলাদেশে ব্র্যাক নার্সারি ‘ব্র্যাক ওষুধি-১১’ নামে এর টিস্যু কালচার চারা বাজারজাত করছে।
গুণাবলি: স্টেভিয়ায় অ্যাসপার্টেম, সেকারিন, সুক্রলস বা কৃত্রিম মিষ্টি জাতীয় কোন জিনিস নেই। স্টেভিয়ার মধ্যে কোন কার্বোহাইড্রেট কিংবা ক্যালরি নেই। তাই এটি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য চিনির সবচেয়ে ভালো প্রাকৃতিক বিকল্প। এছাড়া এরমধ্যে রয়েছে ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস বিনষ্টকারী প্রাকৃতিক রাসায়নিক উপাদান।
উপকারিতা: ক্যালরিমুক্ত এ মিষ্টি ডায়াবেটিস রোগী সেবন করলে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ পরিবর্তন হয় না। উচ্চরক্তচাপ প্রতিরোধ করে। যকৃত, অগ্ন্যাশয় ও প্লীহায় পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে। স্টেভিওসাইড অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন নিঃসরণে সহায়তা করে। ত্বকের ক্ষত নিরাময় ও দাঁতের ক্ষয় রোধ করে। ই.কলিসহ বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া দমন করে। খাদ্য হজমে সহায়তা করে। স্টেভিয়ায় কোন ক্যালরি না থাকায় স্থূলতা রোধ করে। শরীরের ওজন কমাতে সহায়তা করে। মিষ্টি জাতীয় খাবারে চিনির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায়। খাবারের গুণাগুণ বাড়ায় ও সুগন্ধ আনে। সুস্থতা ও সতেজতাবোধ সৃষ্টি করে। ব্যাকটেরিয়া সাইডাল এজেন্ট হিসেবে কাজ করে। স্কিন কেয়ার হিসেবে কাজ করে, বিধায় ত্বকের কোমলতা এবং লাবণ্য বাড়ায়। স্বাদ বৃদ্ধিকারক হিসেবে কাজ করে।
ব্যবহার: এটি চা, কফি, মিষ্টি, দই, বেকড ফুড, আইসক্রিম, কোমল পানীয় ইত্যাদি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এটি ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। স্টেভিয়ার সবুজ ও শুকনো পাতা সরাসরি চিবিয়ে কিংবা চায়ের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়া যায়। পাতা শুকিয়ে গুঁড়ো করে বোতলে সংরক্ষণ করা যায়। পাতার গুঁড়ো দিয়ে মিষ্টান্ন তৈরি করে ডায়াবেটিস রোগীরা খেতে পারেন। দীর্ঘদিন ব্যবহৃত এ ওষুধি গাছের কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া জানা যায়নি। জাপানে হালকা পানীয় কোকাকোলায় ব্যবহার করা হয়। এছাড়া কনফেকশনারি, ক্যান্ডিসহ বিভিন্ন খাবারে চিনির বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়। চা-কফিতে স্টেভিয়ার ব্যবহার বিশ্বব্যাপী।

পরিবেশ: বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু স্টেভিয়া চাষের জন্য খুবই উপযোগী। এদেশে সারা বছরই স্টেভিয়া চাষ করা সম্ভব। সুনিষ্কাশিত ও জৈব পদার্থযুক্ত উঁচু বেলে দো-আঁশ মাটি চাষের জন্য ভালো। মাটির পিএইচ ৬.৫-৭.৫ থাকা ভালো। বছরের যে কোন সময় চাষ করা যায়। তবে জানুয়ারি-মার্চ (মধ্য পৌষ-মধ্য চৈত্র) মাসে চাষ করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। জমি খুব ভালোভাবে চাষ ও মই দিয়ে তৈরি করতে হয়। জমির অবস্থা ও মাটির প্রকারভেদে ৪-৬টি চাষ এবং মই দিয়ে মাটি ভালোভাবে ঝুরঝুরা করে চাষ করতে হয়। চাষের মাঠ প্রয়োজনে মাঝে কিছুটা উঁচু করে তৈরি করলে ভালো। যাতে বৃষ্টির পানি সহজেই নিচের দিকে গড়িয়ে যেতে পারে। অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা থাকা ভালো। পৃথিবীতে স্টেভিয়ার প্রায় ৯০টির মতো জাত আছে। এর বিভিন্ন জাত বিভিন্ন আবহাওয়ার জন্য উপযোগী। স্টেভিয়ার গুণাগুণ নির্ভর করে এর পাতায় বিদ্যমান স্টেভিওসাইডের (মিষ্টি উপাদান) ওপর। পাতায় স্টেভিওসাইড উৎপাদন একই সঙ্গে গাছের বয়স, জাত ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। স্টেভিয়ার বাণিজ্যিক জাতের পাতায় কমপক্ষে ১০ ভাগ স্টেভিওসাইড থাকতে হয়।
চাষাবাদ: স্টেভিয়া বাণিজ্যিকভাবে সাধারণত বেডে চাষ করতে হয়। বেডের উচ্চতা হতে হবে কমপক্ষে ৬ ইঞ্চি। বেডে সারি থেকে সারি দূরত্ব হবে এক ফুট এবং সারিতে গাছ হতে গাছের দূরত্ব হবে ৬ ইঞ্চি। ৫ থেকে ৬টি চাষ দিয়ে জমিকে ভালোভাবে তৈরি করতে হবে। মই দিয়ে জমির ওপরের ঢেলা ভেঙে মিহি করে নিতে হবে। স্টেভিয়াকে টিস্যু কালচার পদ্ধতি, স্টেম কাটিং পদ্ধতি এবং বীজের মাধ্যমে বংশ বাড়ানো যায়। তবে টিস্যু কালচার সবচেয়ে ভালো ও লাভজনক পদ্ধতি। কারণ স্টেম কাটিংয়ে সফলতার হার খুবই কম এবং কাটিংয়ে শিকড় গজাতে অনেক বেশি সময় লাগে। বীজ থেকে চারা গজালেও অঙ্কুরোদগমনের হার থাকে খুবই কম। জমিতে গাছের সংখ্যানির্ভর করে মাটি ও আবহাওয়ার ওপর। তবে লাভজনকভাবে চাষের জন্য একর প্রতি ৪০ হাজার গাছ বা হেক্টরপ্রতি এক লাখ গাছ লাগানো উত্তম। স্টেভিয়ার সফলতা নির্ভর করে জমিতে বিদ্যমান পুষ্টি উপাদানের ওপর।
সার: স্টেভিয়া গাছে খুব কম পরিমাণ সার প্রয়োজন হয়। মাটি পরীক্ষার পর প্রয়োজন মতো সার প্রয়োগ করা ভালো। তবে অনুমোদিত গড় সারের মাত্রা হেক্টর প্রতি ১৪০ কেজি ইউরিয়া, ৪২ কেজি টিএসপি এবং ৩৫ কেজি এমপি (বিঘা প্রতি ২০ কেজি ইউরিয়া, ৬ কেজি টিএসপি, ৫ কেজি এমপি)। জমি চাষের সময় সমুদয় টিএসপি সার প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া ও এমপি সার তিন বারে উপরি প্রয়োগ করতে হবে। চারা লাগানোর ১ মাস পর থেকে প্রতি মাসে ইউরিয়া ও এমপি সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে। স্টেভিয়া চাষের জন্য জৈব সারই সর্বোত্কৃষ্ট।
সেচ: সারা বছরই মাটিতে পরিমিত আর্দ্রতা থাকতে হবে। তবে গাছ অতিরিক্ত আর্দ্রতা সহ্য করতে পারে না। সাধারণত শীতকালে একবার এবং গ্রীষ্মকালে ২-৩ বার ঝাঁঝরির সাহায্যে হালকা সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। মাসে একবার বেডের আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। তবে মালচিং (ছায়াযুক্ত পরিবেশ) করলে একই সঙ্গে আগাছা দমন হয়। আবার আর্দ্রতাও সংরক্ষণ হয়। খড়-কুটো, কচুরিপানা বা কম্পোস্ট দিয়ে মালচিং করা যায়, যা গাছের শিকড়কে মাটির সঙ্গে সুসংহত করে। স্টেভিয়ায় পোকামাকড়ের আক্রমণ ও রোগবালাই কম হয়ে থাকে। কখনো কখনো সেপটোরিয়া ও স্কেলেরোটিনিয়াজনিত গোড়া পচা রোগ দেখা যায়। চারা অবস্থায় অনেক সময় গাছের গোড়া কেটে দেয়। এছাড়া অনেক সময় এপিড ও সাদামাছির আক্রমণও লক্ষ্য করা যায়। নিম ওয়েল স্প্রে করে অর্গানিক উপায়ে একই সঙ্গে পোকামাকড় ও রোগ-জীবাণু দমন করা যায়। এজন্য ৩০ মি.লি নিম ওয়েল বা লিটার পানি- হারে স্প্রে করতে হবে।

ফলন: মাঠে চাষ করলে আষাঢ়-শ্রাবণ মাস থেকে শুরু করে ভাদ্র-আশ্বিন মাস পর্যন্ত স্টেভিয়া গাছ থেকে পাতা সংগ্রহ করা যায়। মাটির টবে লাগানো গাছ বড় হওয়ার পর সারা বছরই পাতা সংগ্রহ করা যায়। একটি মাটির টবে লাগানো গাছ থেকে ৩০-৪০ গ্রাম সবুজ পাতা সংগ্রহ করা হয়, যা থেকে ৭-১০ গ্রাম শুকনো পাতার গুড়া পাওয়া যায়। মাঠে চাষ করলে গাছে ফুলের কুঁড়ি আসার পূর্বে এবং ফুলের কুঁড়ি দেখা দেওয়ার সাথে সাথে পাতা সংগ্রহ শুরু করতে হয়। সাধারণত মাটি থেকে ১০-১৫ সে.মি উপরে প্রুনিং (অতিরিক্ত ডাল-পালা ছাটাই) করে ডালসহ পাতা সংগ্রহ করা হয়। সকাল বেলা পাতা সংগ্রহ করলে মিষ্টতা বেশি পাওয়া যায়। গাছের সমস্ত পাতা দুই-তিন বারে সংগ্রহ করা হয়। বিঘা প্রতি ৪৫০-৫৫০ কেজি সবুজ পাতা পাওয়া যায়। প্রতি বিঘা জমি থেকে ১৫৫-১৯০ কেজি শুকনা গুড়া পাওয়া সম্ভব। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আবহাওয়াতে জন্মানো স্টেভিয়া পাতায় ১৫-২০ ভাগ স্টেভিওসাইড থাকে, যা বিশ্বের অন্যত্র জন্মানো গাছের থেকে ১.৫-২.০ গুণ বেশি। এজন্য এগুলোর বাজারমূল্য বেশি।
পাতা শুকানো: স্টেভিয়া পাতা সংগ্রহের পর সূর্যালোকে বা ড্রায়ারের মাধ্যমে পাতা শুকাতে হবে। পাতা শুকানোর জন্য কমপক্ষে ১২ ঘণ্টার সূর্যালোক প্রয়োজন হয়। পাতা শুকানোর পর ক্রাশ করে পাউডারে পরিণত করা হয়। এক্ষেত্রে কফি গ্রাইন্ডার কিংবা ব্লেন্ডার মেশিন ব্যবহার করা যেতে পারে। গরম পানিতে এক চতুর্থাংশ পাউডার মিশিয়ে ভালোভাবে ব্লেন্ড করে স্টেভিয়া সিরাপ তৈরি করা যায়। এ সিরাপ ফ্রিজে সংরক্ষণ করতে হয়।
টবে চাষ: বাসা-বাড়িতে টবে বা পটে সহজেই স্টেভিয়া চাষ করা যায়। তবে গাছের টব রোদযুক্ত বারান্দায় বা ছাদে রাখতে হবে। টিস্যু কালচারের মাধ্যমে উৎপাদিত স্টেভিয়ার ছোট চারা নিষ্কাশনযুক্ত দো-আঁশ মাটিতে অথবা দো-আঁশ ও জৈব সার মিশ্রিত ৮-১০ ইঞ্চি মাটির টবে সারা বছর রোপণ করা যায়। এ গাছের চারা রোপণের ২৫-৩০ দিন পর পাতা সংগ্রহ করা যায়। গাছে ফুল আসার ২৫-৩০ দিন পর থেকে উপরের অংশ ধীরে ধীরে শুকিয়ে যায়। পরে গাছের গোড়া থেকে একসঙ্গে অনেক চারা বের হতে থাকে এবং ২০-২৫ দিন পর পুনরায় পাতা সংগ্রহ করা যায়।
সম্ভাবনা: স্টেভিয়ার গাছের ছোট চারা কেজিপ্রতি ৫০ টাকা এবং বড়গুলো ১০০ টাকা বিক্রি হয়। পাউডার প্রায় ৪,০০০ টাকা কেজি। স্টেভিয়া চাষ করে হেক্টরপ্রতি বছরে ৬-৮ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব। ভারতে বিভিন্ন কোম্পানি চুক্তিভিত্তিক চাষিদের চারা সরবরাহ করে থাকে এবং তাদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে স্টেভিয়া পাতা কিনে নেয়। আমাদের দেশে উত্তরাঞ্চলের বৃহত্তর রংপুরে একই পদ্ধতিতে তামাক চাষ করা হয়। এসব অঞ্চলে ক্ষতিকর তামাক চাষের পরিবর্তে স্টেভিয়া চাষ হতে পারে একটি লাগসই বিকল্প। বিশ্বব্যাপী ব্যাপক চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে স্টেভিয়া চাষ করে প্রচুর পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের ফসল উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বল্প পরিসরে শিক্ষা ও গবেষণার জন্য স্টেভিয়ার চাষ করা হচ্ছে। এটি ওষুধিগুণ সম্পন্ন একটি উদ্ভিদ, যা চিনির চেয়ে অনেকগুণ মিষ্টি। ডায়বেটিসসহ বিভিন্ন রোগে এবং চিনির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। বাজার সৃষ্টি না হওয়ায় কৃষকরা লাভবান হচ্ছে না। কর্তৃপক্ষ যথাযথ পদক্ষেপ নিলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।’
প্রাপ্তিস্থান: ২০১৮ সালের জুন মাসে গাজীপুরস্থ বাংলাদেশ ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএসআরআই) ‘বিএসআরআই স্টেভিয়া-১’ নামে একটি প্রজাতি বাজারে ছেড়েছে। ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মো. আমজাদ হোসাইন বলেন, ‘আমাদের একজন গবেষক ২০১৩ সালে থাইল্যান্ড থেকে গাছ সংগ্রহ করে দেশে নিয়ে আসে। পরবর্তীতে ইনস্টিটিউটের বায়োটেকনোলজি ল্যাবে এটাকে টিস্যু কালচার করা হয়। বর্তমানে স্টেভিয়া কাটিং, টিস্যু কালচার ও বীজের মাধ্যমে উৎপাদন করা যাচ্ছে।’
ড. মো. আমজাদ হোসাইন আরও বলেন, ‘আমাদের দেশ স্টেভিয়া চাষের জন্য উপযুক্ত। রোগবালাই তেমন হয় না। প্রতি শতক জমি থেকে দুই কেজি পাউডার উৎপাদন সম্ভব। প্রতিকেজির পাউডারের বাজারমূল্য প্রায় ৪ হাজার টাকা। কৃষকের দ্বোরগোড়ায় না পৌঁছা এবং বাজার সৃষ্টি না হওয়ায় আমাদের দেশে এটি এখনো জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। কেউ স্টেভিয়া চাষ বা কিনতে চাইলে বিএসআরআইয়ের বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে সংগ্রহ করতে পারবেন।’

About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1331)
- ► 2025 (3280)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...











