Saturday, December 27, 2014

অকারণে নগ্ন এমা ওয়াটসন!

হলিউডের সুন্দরী অভিনেত্রী এমা ওয়াটসন অভিনয় জীবনে প্রথমবারের মতো ক্যামেরার সামনে টপলেস হয়েছেন। আর সেটা নাকি অকারণে! আলেহান্ড্রো আমেনাবার পরিচালিত রিগ্রেশন সিনেমায় এমা ওয়াটসনকে নগ্ন দৃশ্যে দেখা যাবে। বিষয়টি নিয়ে বেশ আলোচনাও শুরু হয়েছে হলিউডে। জানা গেছে, মুক্তির আগে সিনেমাটি সেন্সরের জন্য পাঠানো হয়েছিল। আর সিনেমাটির প্রাক প্রদর্শনী দেখে বোদ্ধারা জানিয়েছেন, ‘সিনেমাটিতে অকারণে নগ্ন হয়েছেন এমা। যে দৃশ্যের জন্য তাকে নগ্ন করা হয়েছে তার কোনো প্রয়োজনই ছিল না।’ সিনেমাটির গল্প এক বাবা ও তার মেয়েকে কেন্দ্র করে। যেখানে মেয়েকে যৌন নিগ্রহের দায়ে গ্রেফতার হন বাবা। সিনেমাটিতে মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন এমা। এমা ছাড়াও এই সিনেমায় অভিনয় করতে দেখা যাবে মেরিল স্ট্রিপ, ইথান হক, ডেভিড থিউলিস, ডেভিড ডেনসিক প্রমুখকে। রিগ্রেশন মুক্তি পাবে নতুন বছরের ২৮ আগস্ট।

অভিযান সমাপ্তির পর পাইপেই মিলল জিহাদের লাশ

উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণার অল্পক্ষণের মধ্যেই পাইপে সন্ধান পাওয়া গেলো শিশু জিহাদের। একজন সাধারণ নাগরিক সুতার তৈরি নেট ফেলে শিশুটিকে নিচ থেকে তুলে আনেন। একটি সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে জিহাদের অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পরই বিকাল তিনটায় ওই নেটের মাধ্যমে শিশুটির দেহ উপরে তোলা হয়। এরপর একটি গাড়িতে করে শিশুটিকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে। সেখানে দেহ পরীক্ষা করে চিকিৎসক নিয়াজ মোর্শেদ শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন। এদিকে উদ্ধার অভিযান স্থগিত ঘোষণার পর শিশুটিতে উদ্ধারে উপস্থিত হাজারো মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন। তারা সরকার সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের স্লোগান দেন। বেলা আড়াইটায় ফায়ার সার্ভিসের মহা পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমদ খান ঘটনাস্থলে সংবাদ সম্মেলন করে উদ্ধার অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করে বলেন, পরবর্তীতে এ ঘটনায় অনুসন্ধান কাজে ফায়ার সার্ভিস সহযোগিতা করবে। তবে এ পর্যন্ত সব পরীক্ষা নীরিক্ষায় পাইপে কোন শিশুর অস্থিত্ব খোঁজে পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, বুয়েটের বিশেষজ্ঞ, ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীরা এবং স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় আমরা উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেছি। উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ক্যামেরা পাঠিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে। একপর্যায় আমরা শক্ত একটি স্তরে পৌঁছে গেছি। ওই শক্ত লেয়ারটি ভাঙ্গার চেষ্টা করেছি। আমরা মনে করছি পাইপের মধ্যে শিশু জিহাদ নেই। তাই উদ্ধার অভিযানের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করা হল।

‘খালেদা দেশের কোথাও সমাবেশ করতে পারবেন না’ -হানিফ, সোমবার সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল -২০ দলীয় জোট

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেয়া বক্তব্যের জন্য ক্ষমা না চাইলে গাজীপুরের মতো আগামীতে খালেদা জিয়া দেশের অন্য কোথাও সমাবেশ করতে পারবেন না বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ। শনিবার সন্ধ্যায় আওয়ামী লীগ সভাপতির ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে হানিফ এসব কথা বলেন। আগামী ৫ই জানুয়ারি আওয়ামী লীগের ‘গনতন্ত্রের বিজয় দিবস’ উদযাপন ও ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে যুবলীগ নেতাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের যৌথ সভা শেষে সংবাদ সম্মেলন করা হয়।
হানিফ বলেন, কটূক্তি ও ইতিহাস বিকৃতির জন্য ক্ষমা না চাইলে জনগন গাজীপুরের মতো আগামীতে দেশের অন্য কোথাও খালেদা জিয়াকে সমাবেশ করতে দিবে কি না তা ভাবার সময় এসেছে। তারেক রহমান ও বিএনপির নেতারা মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যেভাবে কটূক্তি করেছে, তা আওয়ামী লীগ বরদাশত করবে না। তাদের মিথ্যাচারের জন্য জনগন তাদের গাজীপুরে সমাবেশ করতে দেয় নি। এ জন্য আওয়ামী লীগ দায়ী নয়- বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া ও তার পুত্রকে জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে এ দাবি শুধু ছাত্রলীগের নয়, এ দাবি বাংলার জনগণের। বিএনপির সোমবারের হরতালের বিষয়ে হানিফ বলেন, অতীতেও জনগণ তাদের হরতালে সাড়া দেয় নি। ভবিষ্যতেও সাড়া দিবে না। বিএনপির সোমবারের হরতালও ব্যর্থ হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, বিএনপি গণতন্ত্রের সুযোগ নিয়ে বোমা মেরে মানুষ হত্যা করেছে, অন্যের সম্পত্তি নষ্ট করেছে, অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর করেছে। তাদের কাছে গণতন্ত্র মানে নৈরাজ্য করা। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা ডা. দীপু মনি, আবদুল মতিন খসরু, ড. আবদুস সোবহান গোলাপ, মৃণাল কান্তি দাস, এস এম কামাল হোসেন, এ কে এম এনামুল হক শামীম, যুবলীগ নেতা ওমর ফারুক চৌধরী, হারুনুর রশিদ প্রমুখ।
সোমবার সকাল-সন্ধ্যা হরতাল
গাজীপুরে ২০ দলীয় জোটের সমাবেশে নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ ও সকল রাজবন্দির মুক্তির দাবিতে সোমবার সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল আহবান করেছে ২০ দলীয় জোট। আজ বিকালে জোটের শরিক দলগুলোর মহাসচিব পর্যায়ের বৈঠক শেষে এ ঘোষণা দেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সন্ধ্যা বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার গুলশানের কার্যালয়ে এ বৈঠক হয়। শনিবার ২০ দলের পূর্ব নির্ধারিত সমাবেশের দিনে ছাত্রলীগ পাল্টা সমাবেশ ডাকায় স্থানীয় প্রশাসন গাজীপুর ভাওয়াল বদরে আলম কলেজ ও আশপাশের এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে। এর প্রতিবাদে আজ গাজীপুরে হরতাল পালন করেছে স্থানীয় ২০দল। একইসঙ্গে সারাদেশে বিক্ষোভও করে প্রধান বিরোধী জোট।

যেভাবে উদ্ধার জিহাদ

প্রায় ২৩ ঘণ্টা পর উদ্ধার হয়েছে শিশু জিহাদের নিথর দেহ। শ্বাসরুদ্ধকর উদ্ধার অভিযান। সব ‘চেষ্টা ব্যার্থ’ হওয়ার পর ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক সংবাদ সম্মেলন করে উদ্ধার তৎপরতার সমাপ্তি ঘোষণা করলেন। কিন্তু তখনো হাল ছাড়েনি সাধারণ মানুষ। পেশাগত দায়িত্ব নয়, একান্ত মানবিক অনুভূতি থেকে যারা গতকাল থেকে জিহাদকে উদ্ধারে কাজ করছিলেন তাদের চেষ্টাই গভীর পাইপের তল থেকে উঠে আসে শিশু জিহাদের নিথর দেহ। নিজস্ব উদ্ভাবনী শক্তি আর মানবতার মহান ব্রত নিয়ে কয়েক সঙ্গী নিয়ে জিহাদ উদ্ধারে নামেন আবু বকর। বেলা তিনটার দিকে  রাজধানীর মিরপুর থেকে ঘটনাস্থলে আসা আবু বকর সিদ্দিকের বানানো খাঁচার সাহায্যেই জিহাদকে উদ্ধার করা হয়। আবু বকর সিদ্দিক সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, গণমাধ্যমে শিশুটিকে উদ্ধার করা যাচ্ছে না দেখে গতকাল শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টায় তিনি ঘটনাস্থলে লোহার খাঁচা নিয়ে যান। রাতে একবার খাঁচাটি ভেতরে ঢুকিয়ে উদ্ধারের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তখন উদ্ধার করা যায়নি। খাঁচাটি কিছুটা ভেঙে যাওয়ায় সারা রাত ধরে তিনি এটি মেরামত করেন। পরে আরও কয়েকজনকে নিয়ে আবু বকর সিদ্দিক দুটি খাঁচা ভেতরে ঢোকান। এরপর তারা দেখেন, খাঁচায় কিছু একটা আটকে গেছে। ধীরে ধীরে খাঁচাটি টেনে তোলা হয়। এভাবে উদ্ধার হয় জিহাদ। ৩টার দিকে জিহাদকে বের করে আনার পর সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে সাড়ে ৩টায় পৌঁছনোর পর জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আবু বকরদের তৈরি যন্ত্রটির সঙ্গে সিসি ক্যামেরাও পাঠানো হয়েছিল পাইপের ভেতর। ওই ক্যামেরা থেকে পাইপের তলদেশে জিহাদের অবস্থান নিশ্চিত হওয়া যায়। যে যন্ত্রটির মাধ্যমে জিহাদের দেহ উদ্ধার করা হয় লোহার তৈরি ওই যন্ত্রটির নিচের দিকে তিনটি হুক এবং সুতার তৈরি একটি জাল ছিল। হুক ও জালের মাধ্যমে জিহাদের দেহ খাঁচায় ধরে রেখে উপরে তোলা হয়। এর আগে শুক্রবার বিকালে রেলওয়ের পরিত্যক্ত পানির পাম্পের কয়েক শ’ ফুট দীর্ঘ গভীর পাইপের ভেতরে পড়ে যায় জিহাদ। এরপরে শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। একের পর এক যন্ত্র আর কৌশল খাটিয়ে চলতে থাকে উদ্ধার অভিযান। চলতে থাকে বুয়েটের বিশেষজ্ঞ, ফায়ার সার্ভিসের কর্মী আর সাধারণ মানুষের একের পর এক চেষ্টা। উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ক্যামেরা আর ভারি যন্ত্রপাতি ব্যাবহার করে আজ দুপুর পর্যন্ত যখন জিহাদের কোন হদিস পাওয়া যায়নি তখন অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক। তিনি যখন সংবাদ সম্মেলন করে নিজেদের গুটিয়ে নেয়ার ঘোষণা দেন টিক সেই মুহূর্তে খবর আসে স্থানীয়দের চেষ্টা জিহাদকে উদ্ধারের। জিহাদকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তবে ঠিক কখন জিহাদ মারা যায় পোস্টমর্টেম রিপোর্ট থেকে তা জানা যাবে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকায়, খালেদার সঙ্গে বৈঠক কাল

ঢাকা-বেইজিং বিদ্যমান সম্পর্ককে আরও বিস্তৃৃত করার প্রয়াসে ৪৪ ঘণ্টার সফরে বাংলাদেশে এসেছেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়েং আই। আজ সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে বাংলাদেশ বিমানের একটি নিয়মিত ফ্লাইটে  কাঠমান্ডু থেকে ঢাকায় আসেন তিনি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী চীনা মন্ত্রীকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্বাগত জানান। এ সময় ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাসের কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ রজনীগন্ধায় দুই মন্ত্রী শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক আজ: সফরের প্রথম দিনে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর শুভেচ্ছা বিনিময় ছাড়া তার তেমন কর্মসূচি নেই বলে জানিয়েছে ঢাকার পররাষ্ট্র দপ্তর। কর্মকতারা জানান, আগামীকাল থেকে তার সফরের মূল কর্মসূচি শুরু হবে। সকাল ১০টায় তিনি যাবেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। সেখানে মন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসবেন। দিনের শেষে ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে তার গুলশানের বাসভবনে যাবেন। বিএনপি সূত্র সাক্ষাতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। রাত ৮টা নাগাদ বৈঠকটি শুরু হতে পারে।
এদিকে সফরকালে চীনামন্ত্রী প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মন্ত্রিপরিষদের একাধিক সদস্য, বিরোধী রাজনীতিক ও ব্যবসায়ী  নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠক করবেন। সোমবার দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে ঢাকা ত্যাগ করবেন তিনি। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ-চীন কূটনৈতিক সম্পর্কের ৪০ বছর পূর্তি উদযাপিত হবে। এ উপলক্ষে বেশ কিছু কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে- আগামী বছরে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি খ্যছিয়াংয়ের ঢাকা সফর। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত জুনে চীন সফরকালে তাকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফরে প্রস্তাবিত সব কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হবে বলে একাধিক কূটনৈতিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। চীনা প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা সফরের সম্ভাব্য তারিখ নিয়েও আলোচনা হতে পারে বলে আভাস মিলেছে। এছাড়া আঞ্চলিক যোগাযোগের বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে। আলোচনায় স্থান পেতে পারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেইজিং সফরে বাংলাদেশ প্রস্তাবিত চীনের উন্নয়ন সহযোগিতার বিষয়েও।

সাধারণের চেষ্টায় মৃত জিহাদ উদ্ধার

২৩ ঘণ্টা পর আজ শনিবার বেলা তিনটার দিকে সাধারণ মানুষের চেষ্টায় রাজধানীর শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনির মৈত্রী সংঘ মাঠের কাছে রেলওয়ের পানির পাম্পের পাইপের ভেতর থেকে শিশু জিহাদকে উদ্ধার করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকাজ স্থগিত ঘোষণা করার পাঁচ মিনিট পরই নাটকীয়ভাবে উদ্ধার হয় জিহাদ। শিশু জিহাদকে মৃত ঘোষণা করেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক কে এম নিয়াজ মোর্শেদ। বিকেল চারটার দিকে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগের আবাসিক সার্জন কে এম নিয়াজ মোর্শেদ সাংবাদিকদের জানান, অনেক আগেই জিহাদ মারা গেছে। বেলা সাড়ে তিনটার দিকে জিহাদকে ওই হাসপাতালে নেওয়া হয়। আধঘণ্টা তাকে পরীক্ষা করা হয়।
সাধারণ মানুষের চেষ্টায় উদ্ধার হলো জিহাদ
বেলা তিনটার দিকে শিশু জিহাদকে উদ্ধার করা হয়। এর ঠিক পাঁচ মিনিট আগে ফায়ার সার্ভিস উদ্ধারকাজ স্থগিত ঘোষণা করে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসা শাহ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ, শফিকুল ইসলাম ও রাহুল দাস দাবি করেন, তাঁদের বানানো বর্শার সাহায্যেই জিহাদকে উদ্ধার করা হয়েছে। শাহ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ প্রথম আলোকে জানান, তাঁর বাসা মেরাদিয়া এলাকায়। এফএম রেডিওতে জিহাদের খবর শোনেন তিনি। গতকাল রাতেই শফিকুল ও রাহুলকে নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। তাঁদের সঙ্গে তিনটি বর্শা ছিল। বর্শাগুলোতে আংটা লাগানো ছিল। দুটো বর্শা নড়াচড়া করার জন্য ও একটি বর্শা টেনে আনার কাজের উপযোগী করে বানানো হয়। বর্শাগুলোর মধ্যে ক্যামেরা লাগানো ছিল।
শাহ মোহাম্মদ আবদুল্লাহর দাবি, ফায়ার সার্ভিস উদ্ধারকাজ স্থগিত করার ঘোষণা দেওয়ার সময় তাঁরা দড়ি বেঁধে বর্শাগুলো পাইপের মধ্যে ফেলেন। একবার চেষ্টাতেই তাঁরা সফল হয়েছেন । প্রায় ২৩৫ থেকে ২৪০ ফুট ভেতরে যাওয়ার পরে বর্শাটি কোনোকিছুর সঙ্গে আটকে গেছে বলে তাঁরা টের পান। ধীরে ধীরে ওপরে তোলা হয়। ১০০ মিটারের মধ্যে যখন বর্শাটি আসে তখন ক্যামেরায় বোঝা যায় শিশুটি সেখানে আটকে আছে। তাঁর ভাষ্য, গতকাল রাত থেকেই বর্শা ফেলার সুযোগ খুঁজছিলেন। ফায়ার সার্ভিসের বড় বড় কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীরা থাকায় তাঁরা সেই সুযোগ পাননি। আগে ফেলতে পারলে রাতেই তাঁরা জিহাদকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করতে পারতেন। তাঁর ভাষ্য, শিশুটি হয়তো ওই পাইপ ধরে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছিল। যদি পাইপটি কেটে ফেলা না হতো তাহলে শিশুটিকে জীবিত উদ্ধার করা যেত। কাটার ফলে শিশুটি নিচে পানিতে পড়ে যায়। সেখানেই সে মারা গেছে বলে তাঁর ধারণা।
এর আগে রাজধানীর মিরপুর থেকে ঘটনাস্থলে আসা আবু বকর সিদ্দিক প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, তাঁর বানানো খাঁচার সাহায্যেই জিহাদকে উদ্ধার করা হয়। তাঁর ভাষ্য, গণমাধ্যমে শিশুটিকে উদ্ধার করা যাচ্ছে না দেখে গতকাল শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টায় তিনি ঘটনাস্থলে লোহার খাঁচা নিয়ে যান। রাতে একবার খাঁচাটি ভেতরে ঢুকিয়ে উদ্ধারের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তখন উদ্ধার করা যায়নি। খাঁচাটি কিছুটা ভেঙে যাওয়ায় সারা রাত ধরে তিনি এটি মেরামত করেন। পরে আরও কয়েকজনকে নিয়ে আবু বকর সিদ্দিক দুটি খাঁচা ভেতরে ঢোকান। এরপর তাঁরা দেখেন, খাঁচায় কিছু একটা আটকে গেছে। ধীরে ধীরে খাঁচাটি টেনে তোলা হয়। এভাবে উদ্ধার হয় জিহাদ।
আবু বকর সিদ্দিকের ভাষ্য, উদ্ধারের সময় জিহাদ অচেতন ছিল। তার চোখ বন্ধ ছিল। পরনে একটি প্যান্ট ছিল। শরীর কালো হয়ে গিয়েছিল। শিশুটির ওপর মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। সেখানে ধাক্কাধাক্কি ও হট্টগোল শুরু হয়। অনেকে মাটিতে গড়িয়ে কান্নাকাটি করতে থাকেন।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচার চাইলেন জিহাদের মা
শিশু জিহাদকে উদ্ধারের পরে তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মা খাদিজা আক্তার আহাজারি করছেন। তিনি বলেন, ‘স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীসহ যাঁরা জিহাদকে উদ্ধার করার নামে বিভিন্ন ধরনের কথা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমি তাঁদের বিচার চাই।’ তিনি বলেন, ‘তাঁরা যদি বিভিন্ন ধরনের কথা না বলতেন, যদি ভালোভাবে খুঁজে দেখতেন, তাহলে আমার বাচ্চাকে আমি কালকেই পেতাম।’
জিহাদের মা অভিযোগ করেন, গতকাল রাতে তাঁর স্বামী ও ভাইকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, বাচ্চাটাকে তাঁরা কোথাও লুকিয়ে রেখেছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে এসবের বিচার চান।
বিক্ষোভ, ভাঙচুর
পানির পাম্পের কাছে এক হাজারের মতো মানুষ বিক্ষোভ করছেন। তাঁরা পাম্পের কয়েকটি টিন শেডের ঘরে ভাঙচুর চালান। ‘ আমার ভাই জিহাদ মরল কেন’ বলে স্লোগান দিচ্ছেন তাঁরা। একপর্যায়ে তাঁরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট ছোড়েন। এ সময় পুলিশ তাঁদের হালকা লাঠিপেটা করে সরিয়ে দেয়। সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। যে পাইপে জিহাদ পড়ে যায় সেটি লোহার ঢাকানা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে।
উদ্ধারকাজ স্থগিত ঘোষণা ফায়ার সার্ভিসের
সকাল থেকে পাইপের ভেতর শিশুটির পড়ে যাওয়া ও তার অবস্থান নিয়ে সংশয় বাড়তে থাকে। পরে বেলা আড়াইটার দিকে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ খান সাংবাদিকদের জানান, ২৮০ ফুট গভীরে ক্যামেরা দিয়ে তল্লাশি চালানো হয়। সেখানে শক্ত স্তর থাকায় ক্যামেরা আর নামানো যায়নি বলে দাবি করে ফায়ার সার্ভিস। শিশুটির অস্তিত্ব না পাওয়ায় উদ্ধারকাজ স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয় ফায়ার সার্ভিস। তবে ওই স্তরের নিচে শিশুটি রয়েছে কি না, তা নিয়ে তাঁরা সন্দেহ প্রকাশ করেন।
ফায়ার সার্ভিসের ডিজি আলী আহমেদ খান আরও জানান, ক্যামেরায় পাওয়া ছবিতে শিশুটির কোনো অস্তিত্ব মেলেনি। তার পরও শিশুটির পরিবারের আকুতি ও স্থানীয় লোকজনের কথা বিবেচনা করে ফায়ার সার্ভিস উদ্ধারকাজ চালিয়ে যায়। পাইপের ২৮০ ফুট গভীরে ক্যামেরা যায়। এর পরের স্তর ভেঙে আর ক্যামেরা নামানো যায়নি। ক্যাচার (বিশেষ ধরনের খাঁচা) দিয়েও ওই স্তর ভাঙা যায়নি। ফায়ার সার্ভিস কূপটি রেলওয়ের কাছে হস্তান্তর করে দেবে বলে জানায়। রেলওয়ে ওই স্তরসহ পাইপটি তুলবে। প্রয়োজনে ফায়ার সার্ভিস তাঁদের সহযোগিতা করবে বলেও জানায়।
ডিজি আলী আহমেদ খান বলেন, এ ধরনের ঘটনা দেশে প্রথম। বলা চলে পৃথিবীতেও প্রথম। অভিজ্ঞতার ঘাটতির কারণে ভুল হতে পারে। তবে ভুল ইচ্ছাকৃত নয়। তিনি জানান, স্থানীয় লোকজনের কথা শুনে সকাল থেকেই দড়ি, খাঁচা দিয়ে উদ্ধারের চেষ্টা চালানো হয়েছে। এ সময় সাংবাদিকেরা জানতে চান, শিশুটিকে অনেকে জুস দেওয়ার কথা জানিয়েছিল। শিশুটির কথা শোনা গিয়েছিল বলেও জানা গিয়েছিল। এ সময় ডিজি জানান, পাইপটি গভীর হওয়ায় প্রতিধ্বনি শোনা যেতে পারে। জুস পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সাড়া পাওয়া যায়নি।
ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক (ডিএডি) আবদুল হালিম বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সাংবাদিকদের জানান, তাঁরা পাইপের ২৪৫ ফুট গভীর পর্যন্ত ক্যামেরা দিয়ে তল্লাশি চালিয়েছেন। সেখানে ভিকটিমের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। শিশুটি না থাকার সম্ভাবনাই বেশি। উদ্ধারকাজে পুলিশের মেকানিক্যাল টিমের একজন এসেছেন বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর দাবি, দেশীয় প্রযুক্তি দিয়ে অনেকে উদ্ধারকাজ চালাতে চাইছেন। ফায়ার সার্ভিস তাঁদের সহায়তা করছে।
সকালে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) মেজর শাকিল নেওয়াজ জানান, তাঁরা এখন পাইপের ভেতরে ময়লা পরিষ্কার করে ভেতরে কিছু আছে কি না, তা খুঁজে দেখার চেষ্টা করছেন। তাঁর ভাষ্য, পাইপের ভেতরে আবার দুই ইঞ্চি পাইপ ছিল। সেখান থেকে কিছু খুঁজে বের করা খুব কষ্টসাধ্য। সব ধরনের চেষ্টাই করা হচ্ছে। যতক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব অভিযান চলবে। নতুন আরেকটি যন্ত্রও ভেতরে ঢোকানো হচ্ছে বলে তিনি জানান।
শিশু জিহাদের বাড়ি ওই পানির পাম্পের পাশেই। এ/৪০ নম্বরের ওই বাড়ির দোতলায় সাবলেটে থাকে তারা। জিহাদরা তিন ভাইবোন। বড় মেয়ে স্বর্ণা (১৩), মেজো ছেলে ঈশান (৬) ও সবচেয়ে ছোট জিহাদ (৪)। প্রথম আলোকে দেওয়া মা খাদিজা আক্তারের ভাষ্য, গতকাল দুপুরে ভাত খেয়ে দুই পাশে দুই ছেলেকে নিয়ে তিনি ঘুমিয়েছিলেন। ঘরের দরজা খোলা ছিল। বিকেলে ঘুম থেকে উঠে দেখেন জিহাদ পাশে নেই।
রেলওয়ের ওই পানির পাম্পের পাইপের পাশে আরেক জায়গায় গর্ত খুঁড়ে পানির পাইপ বসানোর কাজ চলছে। বেলা ১১টার দিকে প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে সাড়ে ১১টার দিকে ঘটনাস্থলের পাশের বাড়ির বাসিন্দা ফাতেমা নামে এক কিশোরী জানায়, সে ব্যাডমিন্টন খেলছিল। খেলার একপর্যায়ে কর্ক পানির পাম্পের পাইপের পাশে পড়ে যায়। আনতে গেলে সে পাইপের ভেতরে কী যেন পড়ার শব্দ শোনে। সে শুনতে পেয়েছে, ‘বাঁচাও মা’। মতিঝিলে পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) আনোয়ার হোসেনের ভাষ্য, জিহাদের বাবা নাসির উদ্দিনকে নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশের হেফাজতে রাখা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) মেজর শাকিল নেওয়াজ বলেন, চার বছরের শিশু জিহাদ পড়ে যাওয়ার ঘটনার কোনো প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া যায়নি। ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়ার আগেই সেখানে উৎসুক মানুষের ভিড় জমে। শিশুটিকে উদ্ধারের জন্য তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ কাঠ, দড়ি নানা জিনিস ফেলেন।
পাইপটি কতটা গভীর, জানতে চাইলে শাকিল নেওয়াজ বলেন, এখন পর্যন্ত তাঁরা সঠিক গভীরতা জানেন না। পাইপটির গভীরতার ব্যাপারে ওয়াসাও কোনো সঠিক তথ্য দিতে পারেনি। ঘটনার পর আশপাশে থাকা ওয়াসার পাম্পের কর্মকর্তাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে তিনি দাবি করেন। তবে তাঁদের ক্যামেরার কেবল ৩০০ ফুট গভীর পর্যন্ত গিয়েছিল। এর মধ্যে কোনো কিছুর সন্ধান পাওয়া যায়নি।
গতকাল শুক্রবার বিকেল চারটার দিকে জিহাদের গভীর পাইপে পড়ে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে। খেলতে গিয়ে সে ওই পাইপে পড়ে যায়। ঘণ্টা খানেকের মধ্যে শুরু হয় শিশুটিকে উদ্ধারের তৎপরতা। এরপর প্রায় রাতভর চলে এই অভিযান।
সন্ধ্যা ছয়টার দিকে উদ্ধারকারী দলের একজন জানান, শিশুটি পাইপের ভেতর থেকে সাড়া দিচ্ছে। তার জন্য পাঠানো হয় খাবার ও পানি। পাইপের মধ্যে দেওয়া হয় অক্সিজেন। এরপর থেকে উদ্ধার তৎপরতা নিয়ে পাওয়া যায় একের পর এক বিভ্রান্তিকর তথ্য। রাত পৌনে তিনটার দিকে গর্তে পাঠানো ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ দেখে পাইপের মধ্যে আদৌ কোনো শিশু পড়েছে কি না, এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন উদ্ধারকর্মীরা। কেউ কেউ বলতে থাকেন, এটি গুজব। তবে অভিযান চলতে থাকে।
রাজনৈতিক উত্তাপসহ সব আলোচনা ছাপিয়ে প্রধান হয়ে ওঠে এ ঘটনা। দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে উৎকণ্ঠা। ঘটনাস্থলের আশপাশে জড়ো হওয়া শত শত মানুষ প্রার্থনা করতে থাকে শিশুটির জন্য।
রেলওয়ে পাম্প থেকে প্রায় ১০০ গজ দূরে রেলওয়ে কলোনির একটি বাড়ির দোতলার একটি কক্ষে পরিবারের সঙ্গে থাকত জিহাদ। তার বাবা নাসির উদ্দিন মতিঝিলের একটি বিদ্যালয়ের নিরাপত্তাকর্মী। দুই ভাই, এক বোনের মধ্যে জিহাদ সবার ছোট।
জিহাদের ময়না তদন্ত হবে কাল
জিহাদের মরদেহের ময়না তদন্ত আজ শনিবার হবে না। কাল রোববার তার ময়না তদন্ত হবে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যাম্প ইনজার্চ পরিদর্শক মোজাম্মেল হক প্রথম আলোকে এ কথা জানান।
‘উদ্ধার অভিযান পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়নি’ -স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল বলেছেন, ঢাকার শাজাহানপুরে পাইপের ভিতর থেকে শিশু জিহাদকে উদ্ধার অভিযান পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়নি। উদ্ধার অভিযান চলমান ছিল। যখন অভিযান সমাপ্ত করার চিন্তাভাবনা চলছিল ঠিক শেষ মুহুর্তে জিহাদকে উদ্ধার করা হয়। পাইপের ভিতরে আবর্জনা সরিয়ে নীচ থেকে তাকে উদ্ধার করা করা হয়। শনিবার বিকেলে ময়মনসিংহে ঈশ্বরগঞ্জের চরনিখলা উচ্চ বিদ্যালয়ের শতবর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে যোগদান শেষে তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, পাইপের ভিতরে শিশু নাই এটি বলা হয়নি। আপনারা ভুল শুনেছেন। আমরা বলেছিলাম অত্যাধুনিক ক্যামেরা দিয়ে আমরা শিশুটিকে দেখতে পাইনি। অভিযান অব্যাহত ছিল। যার কারণেই শিশুটি উদ্ধার সম্ভব হয়েছে। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থলে আসার পরপরই ঢাকায় শাহজাহানপুরে পাইপের ভিতর থেকে শিশুটিকে উদ্ধারের খবর পান। পরে দ্রুত তিনি ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। অনুষ্ঠানের আরও উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক সাবেক এমপি আব্দুছ ছাত্তার, পৌর মেয়র হাবিবুর রহমান, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্র্যট মল্লিকা খাতুন, পুলিশ সুপার মঈনুল হক, ইউএনও তাহমিনা আক্তার প্রমুখ।

‘দেশে গণতন্ত্রের জন্য আকুতি চলছে’ -ড. আকবর আলি খান

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান বলেছেন, দেশে গণতন্ত্রের জন্য আকুতি আন্দোলন চলছে। গণতন্ত্র ও উন্নয়নের মধ্যে কোন বৈপরীত্য নেই। গণতন্ত্র ছাড়া উন্নয়ন হয় না। আজ রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স মিলনায়তনে সু-শাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর ৫ম জাতীয় সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। দেশের বিদ্যমান সঙ্কট সমাধানে গণভোট অনুষ্ঠানের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, গণভোট এর ব্যবস্থা থাকলে হরতালের প্রয়োজন হত না। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা ভোটারদের বিষয়। গণভোটে ভোটারা যদি বলে এটা প্রয়োজন- আমরা মেনে নেব। সুজন সভাপতি এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, দেশে বর্তমানে দলীয়করণ চলছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পরমত সহিষ্ণুতা নেই। গাজীপুরের ব্যাপারে এটা আমরা দেখতে পেয়েছি। সম্মেলনে আরও বক্তব্য রাখেন, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবু হেনা, এটিএম সামসুল হুদা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর ড. এমাজউদ্দিন আহমেদ প্রমুখ।

অভিযান সমাপ্তের পর পাইপেই মিলল জিহাদের লাশ

উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণার অল্পক্ষণের মধ্যেই পাইপে সন্ধান পাওয়া গেলো শিশু জিহাদের। একজন সাধারণ নাগরিক সুতার তৈরি নেট ফেলে শিশুটিকে নিচ থেকে তুলে আনেন। একটি সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে জিহাদের অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পরই বিকাল তিনটায় ওই নেটের মাধ্যমে শিশুটির দেহ উপরে তোলা হয়। এরপর একটি গাড়িতে করে শিশুটিকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে। সেখানে দেহ পরীক্ষা করে চিকিৎসক নিয়াজ মোর্শেদ শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন। এদিকে উদ্ধার অভিযান স্থগিত ঘোষণার পর শিশুটিতে উদ্ধারে উপস্থিত হাজারো মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন। তারা সরকার সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের স্লোগান দেন। বেলা আড়াইটায় ফায়ার সার্ভিসের মহা পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমদ খান ঘটনাস্থলে সংবাদ সম্মেলন করে উদ্ধার অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করে বলেন, পরবর্তীতে এ ঘটনায় অনুসন্ধান কাজে ফায়ার সার্ভিস সহযোগিতা করবে। তবে এ পর্যন্ত সব পরীক্ষা নীরিক্ষায় পাইপে কোন শিশুর অস্থিত্ব খোঁজে পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, বুয়েটের বিশেষজ্ঞ, ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীরা এবং স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় আমরা উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেছি। উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ক্যামেরা পাঠিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে। একপর্যায় আমরা শক্ত একটি স্তরে পৌঁছে গেছি। ওই শক্ত লেয়ারটি ভাঙ্গার চেষ্টা করেছি। আমরা মনে করছি পাইপের মধ্যে শিশু জিহাদ নেই। তাই উদ্ধার অভিযানের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করা হল।

‘আমি আমার বাচ্চা ফেরত চাই’

‘আমার বাবা ছোড হাত দিয়া দড়ি ধইরা রাখতে পারে নাই। ও আবার পইড়া গ্যাছে। আমি কি আমার বাচ্চা লুকাই রাখছি? আমি আমার বাচ্চা চাই। জানের বদলে জান হইলেও আমি আমার বাবারে চাই।’
অস্পষ্টভাবে এভাবে বিলাপ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন খাদিজা। এরপর আর কোনো কথা নেই। এরপর আবার বুকফাটা বিলাপ, ‘বাবারে তুই কই গেলি রে।’
আজ শনিবার দুপুরে রাজধানীর শাহজাহানপুরের রেল কলোনির বাসায় গিয়ে এ চিত্র দেখা যায়।
ছোট শিশুটির নাম কেউ বলছে জিহাদ। অনেকে বলছে জিয়াদ। একজন জানালেন, এলাকার সবাই ওকে জিয়া নামেই ডাকত। শুক্রবার বিকেল থেকে সে নিখোঁজ। পরিবারের দাবি, বাসার কাছে পরিত্যক্ত গভীর পানির পাম্পে সে পড়ে গেছে। গণমাধ্যমে ছোট শিশুর সেই উদ্ধারচিত্র দেখে সকাল থেকেই অনেকে ছুটে এসেছেন শিশুটির মাকে একনজর দেখতে। খাদিজাকে একনজর দেখার জন্য ছোট তিন রুমের বাসাটিকে কেন্দ্র করে রীতিমতো ভিড় লেগে রয়েছে। লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে তারপর ভেতরে যাওয়ার সুযোগ মিলছে। একনজর দেখার পর যাতে লোকজন তাড়াতাড়ি বের হয়ে যান, তার জন্য অনুরোধ জানাতে হচ্ছে। গেন্ডারিয়া থেকে একজন বয়স্ক নারী এসেছেন। তিনি খাদিজার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। সেখানে দুজন পুলিশ নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে। পাম্প ঘিরেও প্রচুর ভিড়।
শিশুটির পানির পাম্পে পড়ে যাওয়ার বিষয়টি গুজব বলেও কথা উঠেছে। উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও শেষ পর্যন্ত পানির পাম্পের মধ্যে প্রাণের অস্তিত্ব না পেয়ে বিষয়টিকে গুজব বলেছেন। তবে এ কথা মানতে চাচ্ছেন না খাদিজা। তিনি বললেন, ‘আমি কি আমার বাচ্চারে লুকাই রাখছি?’
খাদিজার দূর সম্পর্কের ভাই আর কে জুয়েল প্রথম আলোকে বলেন, ‘ও যে পড়ছে, তা অন্যরাই বলছে। গণমাধ্যমেই খবর প্রকাশ করছে যে জিয়াদ পাম্পের মধ্যে বসেই জুস খাইছে। জুসের খালি প্যাকেট ভেতর থেকে বাইরে আনছে। তাইলে জুসটা খাইল কে?’
জিয়াদের বাবা মতিঝিল মডেল হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের দারোয়ান নাসির উদ্দিন গতকালের পর আর বাসায় ফেরেননি। পরিবারের লোকজন শুনেছেন, তাঁকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এ নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন আর কে জুয়েল। তিনি বলেন, ‘বাবাকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়ার কারণ কী, তা আমরা বুঝতে পারছি না।’
কলোনিটি রেলওয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য। তবে নাসির উদ্দিন রেলওয়ের কর্মচারী নন। তিনি পাঁচ হাজার টাকায় দোতালার তিনটি রুম ভাড়া নিয়েছেন। তারপর সেখান থেকে এক রুম সাবলেট দিয়েছেন। ঘরে আসবাবপত্র বলতে তেমন কিছু নেই। ড্রেসিং টেবিলের ওপরে হ্যাঙ্গারে ঝুলছে জিহাদের কয়েকটি কাপড়। ঘরে যে চৌকির ওপর খাদিজাকে ঘিরে কয়েকজন বসে ছিলেন, প্রতিবেদকের উপস্থিতিতেই সে চৌকি ভেঙে যায়। তারপর খাদিজাকে সিঁড়ির কাছে তোষকের ওপর নিয়ে বসানো হয়। সকাল থেকে খাদিজাকে কিছু খাওয়ানোর জন্য তোড়জোড় চলছিল। তবে খাদিজা কিছুই মুখে দিচ্ছিলেন না। খাবার মুখে নিয়েই আর্তনাদ করছেন। ঘরের মধ্যে প্রতিবেশীরা দুপুরের রান্নার আয়োজন করছেন।
খাদিজার বড় মেয়ে স্বর্ণা সপ্তম শ্রেণিতে পড়ছে। সে জানাল, সব সময় জিয়াদ একা বের হয়ে যেত। তবে পানির পাম্পের কাছে আগে কখনো যায়নি। ঘটনার দিন দুপুরে স্বর্ণা ও তার আরেক ভাই মায়ের সঙ্গে ঘুমিয়ে ছিল। সুযোগ পেয়ে ছোট ভাই একা একা বাইরে চলে যায়।

ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রণহীন? ফয়েজের দাবি, ছবিটা তাঁর নয়। তাঁর মতো দেখতে অন্য কারও

অস্ত্রধারী সেই ফয়েজ ধরাছোঁয়ার বাইরে। পুলিশ দেখেও না দেখার ভান করছে। গতকাল তাঁকে ফোনে পাওয়া গেছে। অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি করার সেই ছবিটি প্রসঙ্গে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখন তো আমি দাবি করব, ছবিটা আমার নয়। আমার মতো দেখতে অন্য কেউ থাকতে পারে না? তবে এখন বলে লাভ কী, আপনারা যা লেখার, তা তো লিখে দিয়েছেন। আর আজকের (শুক্রবার) রিপোর্টে তো আমি পুরাই হতাশ। আমারে যা ইচ্ছা বলা হইছে।’
ঢাকা কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক আবদুল আজিজ ফয়েজ বলেন, ‘আমি রাজনীতি করি। পেশাদার ক্যাডার না। ঢাকা কলেজের আশপাশের কোনো মার্কেটের কেউ বলতে পারবে না, আমি কোনো দিন চাঁদাবাজি করেছি।’
ঢাকা কলেজের ছাত্র আসাদুজ্জামান ফারুক হত্যার ২ নম্বর আসামি ফয়েজ। সেই মামলায় জামিন নিয়েছেন কি না, জানতে চাইলে ফয়েজ বলেন, ‘ভাই, ওটা তো একটা পলিটিক্যাল কেস। ফারুকের অভিভাবক থাকা সত্ত্বেও মামলা করেন ছাত্রলীগ নেতা সাকিব হাসান। বিষয়টা আপনারাই বোঝেন।’
বুধবারের সংঘর্ষের ঘটনায় বিএনপির নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়সহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও ছাত্রলীগ নেতা ফয়েজ বা এই পক্ষের অন্য কাউকে গ্রেপ্তারে পুলিশ কোনো তৎপরতা দেখায়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপির উপকমিশনার মাসুদুর রহমান বলেন, যদি এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ আসে এবং মামলাগুলোর তদন্তে যদি কারও যোগসাজশ পাওয়া যায়, তাহলে পুলিশ অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে।
পুলিশের একজন পদস্থ কর্মকর্তা বলেন, উচ্চপর্যায় থেকে সবুজ সংকেত পেলেই তাঁরা ছাত্রলীগের অভিযুক্ত নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীসহ সরকারি দলের নেতারা প্রকাশ্যে ছাত্রলীগের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় পুলিশেরও এখন কিছু করার নেই।
তবে পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে সরকারি দলের কয়েকজন নেতা প্রথম আলোকে বলেন, ছাত্রলীগের ‘অতি উৎসাহী’ নেতা-কর্মীরা নানা অঘটনে জড়িয়ে পড়ায় দল ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বিভিন্ন সময় নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার পর ছাত্রলীগের সংশ্লিষ্ট নেতা-কর্মীকে বহিষ্কার করার কথা বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হলেও প্রকৃতপক্ষে তাঁরা সংগঠনে সক্রিয় থাকেন। বকশীবাজারের সংঘর্ষেও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথিত ‘বহিষ্কৃত’ আবদুল আজিজ ফয়েজকে প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে গুলি ছুড়তে দেখা গেছে।
ছাত্রলীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা জানান, বিএনপির সমাবেশ প্রতিহত করার ব্যাপারে ছাত্রলীগের প্রতি দলের কোনো নির্দেশনা ছিল না। এক মাসের ব্যবধানে পর পর দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের অন্তঃকোন্দলে শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার জের ধরে চাপের মধ্যে আছে ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্ব। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তাপস সরকার নিহত হওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তঃকোন্দল মেটাতে কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু ৭ থেকে ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত ছাত্রলীগের সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামানের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের নেতারা চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে গিয়েছিলেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁরা যাননি। ১৪ ডিসেম্বর এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। এ কারণে প্রধানমন্ত্রীর কাছে যেতে পারছেন না ছাত্রলীগের নেতারা।
নেতাদের মতে, এই চাপ থেকে উত্তরণের জন্য হঠাৎ তাঁরা কিছু একটা করে দেখাতে চাইছেন। আওয়ামী লীগ নেতারাও এমনটাই মনে করছেন।
আওয়ামী লীগের দুজন জ্যেষ্ঠ নেতার মতে, আসলে ছাত্রলীগের ওপর আওয়ামী লীগের তেমন নিয়ন্ত্রণ নেই। ছাত্রলীগের কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে বেশ আগেই। অনেক দিন ধরেই ছাত্রলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠানের কথা শোনা যাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই এখন বর্তমান নেতৃত্বের বিদায়ের পালা। কিন্তু সম্মেলনও করা যাচ্ছে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের একজন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, সবকিছুই যে নিয়ন্ত্রণে, তা বলা যাবে না। সরকারের ভেতরেও সরকার আছে। দলের ভেতরেও দল আছে। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নূহ-উল-আলম লেনিন প্রথম আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগ একটি রাজনৈতিক দল। একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে একটি ছাত্রসংগঠনকে শতভাগ নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন। আর এ সংগঠনে যে অতি উৎসাহী নেতা-কর্মী নেই, তা-ও বলা যাবে না।

গাজীপুরে হরতাল ডেকে পিছু হটল বিএনপি- চলছে কড়া নিরাপত্তায় হরতাল

(ছবি:-১ গাজীপুরে আজকের হরতালে সড়কে যানবাহন চলাচল কিছুটা কম। ছবিটি সকাল সোয়া নয়টার দিকে চান্দনা চৌরাস্তা এলাকা থেকে তোলা। ছবি:-২ গাজীপুরে বিএনপির ডাকে আজ সকাল-সন্ধ্যা হরতাল চলছে। এ জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কঠোর অবস্থান। ছবিটি চান্দনা চৌরাস্তা থেকে তোলা। ছবি:-৩  গাজীপুরে ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজের প্রধান ফটকের সামনে গতকাল জলকামান নিয়ে বিপুলসংখ্যক পুলিশ অবস্থান নেয়। বিএনপি ও ছাত্রলীগ আজ শনিবার এই কলেজের মাঠে সমাবেশ ডাকায় ১৪৪ ধারা জারি করেছে প্রশাসন l ছবি: প্রথম আলো) গাজীপুরে বিএনপির ডাকা সকাল-সন্ধ্যা হরতাল চলছে। সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর অবস্থানে রয়েছে। হরতালে যান চলাচল সকাল সোয়া নয়টা পর্যন্ত কিছুটা কম ছিল। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত কোথাও কোনো পিকেটিংয়ের খবর পাওয়া যায়নি। গাজীপুরে সভা-সমাবেশের ওপর অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ১৪৪ ধারা জারির প্রতিবাদে আজ শনিবার জেলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে বিএনপি। একই সঙ্গে এর প্রতিবাদে সারা দেশে বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে।  গাজীপুর জেলায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। গাজীপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) নুরুল ইসলাম জানান, হরতালে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চার প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। আজ সকাল থেকে তারা টহল দিচ্ছে।
ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ মাঠে বিপুল পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সকাল থেকেই তারা সেখানে টহল দিচ্ছে। গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা, টঙ্গী, কালিয়াকৈরের চন্দ্রা, শ্রীপুরের মাওনাসহ বিভিন্ন জায়গায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। জয়দেবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার রেজাউল হাসান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, হরতালে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
টঙ্গী বিএনপি কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ
গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে গাজীপুরের টঙ্গীর বিএনপি কার্যালয়ে দুর্বৃত্তরা অগ্নিসংযোগ করে। আগুনে বিএনপি কার্যালয়ের আসবাবপত্র ও কাগজপত্র পুড়ে যায়। আধা ঘণ্টা পরে টঙ্গী দমকল বাহিনী আগুন নেভায়। টঙ্গী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী ইসমাইল হোসেনের ভাষ্য, রাত সাড়ে ১১টার দিকে কে বা কারা অগ্নিসংযোগ করে। এ সময় কার্যালয়ের ভেতরে কেউ ছিলেন না।
গাজীপুরে হরতাল ডেকে পিছু হটল বিএনপি
গাজীপুরে সভা-সমাবেশের ওপর অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ১৪৪ ধারা জারির প্রতিবাদে আজ শনিবার জেলায় সকাল-সন্ধ্যা  হরতাল ডেকেছে বিএনপি। একই সঙ্গে এর প্রতিবাদে সারা দেশে বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে। গতকাল শুক্রবার রাতে গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে গাজীপুরে হরতালের ঘোষণা দেন জেলা বিএনপির সভাপতি ফজলুল হক মিলন। আর দেশব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
এর আগে গতকাল সকালে মির্জা ফখরুল সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘গাজীপুরে জনসভা করার জন্য অবশ্যই আমরা যাব। সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে বিরোধী দলের শান্তিপূর্ণ সমাবেশকে নিশ্চিত করা।’ রাতের ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা ঘোষণা দিয়েছিলাম শনিবার গাজীপুর যাব। কিন্তু সরকার অনির্দিষ্টকালের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করেছে। বিএনপির জনসভা বানচাল করতে ছাত্রলীগকে ব্যবহার করেছে।’
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অভিযোগ করেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের জনসভা বানচাল করতেই পূর্বপরিকল্পনার অংশ হিসেবে ১৪৪ ধারা জারি করেছে সরকার। কয়েক দিন ধরে গাজীপুরে স্থানীয় প্রশাসন ও ছাত্রলীগ যা কিছু করছে, তা সাজানো নাটকের বিভিন্ন পর্ব ছিল। ছাত্রলীগ অন্যায়ভাবে বৃহস্পতিবার রাতেই জনসভাস্থল ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ মাঠ দখল করে নেয়। তাতে পুলিশ পুরোপুরি মদদ দিয়েছে।
নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে গাজীপুরে বিএনপির পূর্বঘোষিত আজকের জনসভা ছাত্রলীগ প্রতিহত করার ঘোষণা দেয়। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লন্ডনে তারেক রহমানের কটূক্তির প্রতিবাদে ছাত্রলীগ একই দিন, একই স্থানে পাল্টা সমাবেশের ঘোষণা দেয়। এ নিয়ে কয়েক দিন ধরে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। গাজীপুর জেলা প্রশাসন গতকাল শুক্রবার বেলা দুইটা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সেখানে সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। জেলা প্রশাসক নূরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপি ও ছাত্রলীগ—দুই পক্ষÿএকই স্থানে সমাবেশ ডাকায় এবং এটা নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়ায় ভাওয়াল বদরে আলম কলেজ মাঠ ও এর আশপাশের এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এ আদেশ বহাল থাকবে।
জেলা প্রশাসনের এই ঘোষণার পর রাত সোয়া আটটায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নিজ কার্যালয়ে দলের স্থায়ী কমিটি ও গাজীপুরের নেতাদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে রাত নয়টায় উপরিউক্ত কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
যেকোনো মূল্যে গাজীপুরে জনসভা করার ঘোষণা দিয়ে পিছু হটার কারণ জানতে চাইলে রাতে বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র জানায়, আগামী ৩ ও ৫ জানুয়ারি ঢাকায় জনসভার অনুমতির জন্য বিএনপির আবেদনের বিষয়ে এখনো কিছু জানানো হয়নি। ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত বিএনপি কোনো সহিংস পরিস্থিতিতে যেতে চাচ্ছে না। এ ছাড়া আজ চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকা সফরে আসার কথা। এ কারণে রাজধানীকে হরতালমুক্ত রাখতে কেবল গাজীপুরে হরতাল ডাকা হয়েছে।
এদিকে গাজীপুর জেলা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক দেলোয়ার হোসেন গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপি আজকের হরতালে সহিংসতা করার চেষ্টা করলে ছাত্রলীগ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে থেকে তা প্রতিহত করবে। তিনি বলেন, ১৪৪ ধারা জারি করায় আইনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁরা আজকের সমাবেশ কর্মসূচি প্রত্যাহার করেছেন। তবে বিএনপির হরতালের প্রতিবাদে ছাত্রলীগ আজ পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করবে। এ ছাড়া ২৮, ২৯ ও ৩০ ডিসেম্বর গাজীপুরে সমাবেশ করার জন্য প্রশাসনের অনুমতি চেয়ে ছাত্রলীগ আবেদন করে রেখেছে বলেও দেলোয়ার হোসেন জানান।
পুলিশের দখলে মাঠ: গতকাল বেলা দুইটায় ভাওয়াল বদরে আলম কলেজে গিয়ে দেখা যায়, তিনটি ফটকেই বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। আর মাঠের ভেতরে ও বাইরে ছাত্রলীগের ব্যানার-ফেস্টুন সাঁটানো। সেখানে দায়িত্বরত জয়দেবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার রেজাউল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, সমাবেশের মাঠ এখন পুরোপুরি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। দুই দলের কাউকেই এখানে আসতে দেওয়া হচ্ছে না।
গতকাল সকাল থেকেই জেলা শহর, জেলা শহরের রাজবাড়ী রোডে বিএনপির কার্যালয়ের সামনে, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মহাসড়কে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) জলকামান, রায়ট কার নিয়ে মহড়া দেয়। সকালে ছাত্রলীগের সমর্থনে শ্রমিক লীগের নেতা-কর্মীরা চান্দনা-চৌরাস্ত এলাকায় মিছিল করেন।
দুপুরে জনসভাস্থল পরিদর্শনে এসে গাজীপুরের পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা অনেকবার চেষ্টা করেছিলাম দুই পক্ষকে সমঝোতায় আনতে। যেহেতু তারা কোনো সমঝোতায় আসতে পারেনি, এ জন্য ২৭ ডিসেম্বর থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কলেজ মাঠসহ গাজীপুর জেলার কোথাও কোনো সভা-সমাবেশ করতে দেওয়া হবে না।’
নয়জন আটক: গাজীপুর পুলিশ বুধ ও বৃহস্পতিবার রাতে বিএনপি ও এর অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের বাসায় তল্লাশি চালায়। এ সময় নয়জনকে আটক করেছে পুলিশ। এর মধ্যে টঙ্গীতে জেলা যুবদলের সহসভাপতি প্রভাষক বশির উদ্দিনসহ তিনজনকে এবং জয়দেবপুর থানার বিভিন্ন এলাকা থেকে বিএনপির ছয় কর্মীকে আটক করা হয়েছে। পুলিশ জানায়, আটক হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা ছিল।

স্বপ্নকে ছাড়িয়ে যাওয়া একজন গোলাপ বানু by সুজয় মহাজন

(অভাবী নারীদের নিয়ে মুঠো মুঠো চাল জমিয়ে স্বপ্নের শুরু করেছিলেন তিনি। সেই সমিতির পুঁজি এখন ছাড়িয়ে গেছে শতকোটি টাকা। রাজধানীর ভাটারায় সমিতির নিজস্ব জমিতে গড়ে তোলা কার্যালয়ের সামনে শুরুর স্বপ্নকে ছাড়িয়ে যাওয়া গোলাপ বানু l প্রথম আলো) মানুষ তাঁর স্বপ্নের সমান বড়। কথাটা সব সময় বলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগর অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। চেষ্টা, কর্মস্পৃহা ও ইচ্ছাশক্তিই স্বপ্ন দেখা মানুষকে তাঁর স্বপ্নের কাছাকাছি নিয়ে যায়। তবে এ বছর বেগম রোকেয়া পদক বিজয়ী গোলাপ বানুর জীবনের গল্পটি যেন স্বপ্নকেও ছাড়িয়ে যাওয়া বাস্তব এক চরিত্র। জীবনযুদ্ধ করতে করতেই যেন তিনি হয়ে উঠেছেন স্বপ্নের চেয়েও বড়।
নারী উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় অসামান্য অবদানের জন্য স্বীকৃতি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৯ ডিসেম্বর গোলাপ বানুর গলায় পরিয়ে দিয়েছেন বেগম রোকেয়া পদক।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ছোঁয়া না পাওয়া গোলাপ বানু (৬০) এখন হাজারো নারীর স্বপ্ন দেখার চোখ। অনেকের কাছে প্রেরণাও। অভাবী নারীদের নিয়ে প্রতিদিনের রান্নার চাল থেকে জমানো মুঠো চাল দিয়ে সঞ্চয়ের শুরু। এরপর সমবায় সমিতি গড়ে তা শতকোটিতে নিয়ে যাওয়া। সত্যিই স্বপ্নকেও ছাড়িয়ে যাওয়া। গোলাপ বানুর সেই সমিতির নাম ‘বারিধারা মহিলা সমবায় সমিতি’।
সংগ্রামী জীবন: গরিব কৃষক বাবার ঘরে জন্ম গোলাপ বানুর। বাবা রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে বাজারে গিয়ে কৃষিপণ্য বেচতেন। মাথায় করে সেসব পণ্য বাজারে নিয়ে যেতেন গোলাপ বানুও। তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বলতে এক মাসের স্কুলযাত্রা আর ছয় মাসের বয়স্ক শিক্ষা। গোলাপ বানু বলেন, ‘বড় ভাই একদিন পড়াতে বসালেন। বহু চেষ্টার পরও “অ” উচ্চারণটা ঠিকভাবে করতে পারিনি। তাই খেপে গিয়ে থাপড় দিলেন। তখন বাবা বললেন, আমার মেয়ে তো বড় হয়ে জজ-ব্যারিস্টার হবে না। স্বামীর সংসারে গিয়ে কাজ করবে। তাই তার স্কুলে যাওয়ার দরকার নেই। এরপর আর স্কুলে যাওয়া হয়নি।’
মাত্র ১৪ বছর বয়সে বিয়ে হয় গোলাপ বানুর। অভাবকে সঙ্গী করে রাজমিস্ত্রি স্বামীর সঙ্গে শুরু করেন সংসার। বিয়ের চার বছরের মাথায় প্রথম মেয়ের জন্ম। তারপর স্বামী উধাও। মেয়েকে নিয়ে ফিরলেন বাবার সংসারে। বাবার সংসারে বোঝা হয়ে না থেকে একটি চটের কারখানায় চাকরি নিলেন। এক বছর পর স্বামীর খোঁজ পেলেন। বাবার অমতে স্বামীর কাছে চলে গেলেন। আবার শুরু করলেন কষ্টের সংসার। একপর্যায়ে মন গলে বাবারও। রাজধানীর ভাটারার নুরের চালায় নিজের জমিতে থাকার ব্যবস্থা করে দেন মেয়েকে। সংগ্রামের কথা স্মরণ করে গোলাপ বানু বলেন, ‘ছনের কুঁড়েঘরে বৃষ্টি হইলেই পানি পড়ত। মুরগি যেমন তার পালকের নিচে ছানা আগলে রাখে, আমিও ওপরে পলিথিন দিয়া ছোট ছোট চার ছেলেমেয়েরে আগলে রাখতাম, যাতে ভিইজ্যা না যায়।’
সমিতির জন্মকথা: ১৯৮৯ সালে নুরেরচালা এলাকার অভাবী পরিবারের শিশুদের পড়াশোনার উদ্যোগ নেয় একটি বেসরকারি সংস্থা। গোলাপ বানুর ছেলেও সেখানে যায়। সে সময় ওই সংস্থার তৎকালীন মাঠ কর্মকর্তা নিত্য অধিকারী (বর্তমানে বারিধারা মহিলা সমবায় সমিতির ব্যবস্থাপক) গোলাপ বানুর মতো অভাবী নারীদের জন্য বয়স্কশিক্ষার পাশাপাশি সমবায় সমিতি গঠনের প্রস্তাব দেন। প্রতি দলে ২০ জন করে পাঁচটি দলের ১০০ সদস্য নিয়ে ১৯৯২ সাল থেকে দলভিত্তিক সমবায় কার্যক্রম শুরু করেন গোলাপ বানুরা। ১৯৯৪ সালে তাঁদের নিয়ে গঠিত হয় ‘বারিধারা মহিলা সমবায় সমিতি’। শুরুতে প্রত্যেক সদস্য মাসে ৫০ টাকা করে জমা দেবেন বলে ঠিক হয়। কিন্তু এই ৫০ টাকা জোগাড় করাও তাঁদের জন্য কঠিন ছিল। পথ বাতলে দিলেন নিত্য অধিকারী। রান্নার চাল থেকে দু-এক মুঠো চাল আলাদা করে জমিয়ে তা বিক্রি করে টাকা জোগাড়ের পরামর্শ দেন। পরামর্শটি মনে ধরল অনেকেরই। টাকা জমাতে থাকলেন গোলাপ বানুরা। ১৯৯৭ সালে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাটি এলাকা ছেড়ে চলে যায়। তখন নতুনভাবে সমিতির কার্যক্রম শুরু হয়। গোলাপ বানু হন সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। নিত্য অধিকারী বলেন, ‘আমি যে সংস্থাটিতে কাজ করতাম সেটি এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার পরও গোলাপ বানু এবং অন্যরা মিলে আমাকে রেখে দেন। সেই থেকে আমি এ সমিতির ব্যবস্থাপক।’
সমিতি গড়ার শুরুতে অনেক কিছুই সহ্য করতে হয়েছে গোলাপ বানুকে। ‘সমিতি করতে গিয়া পাড়ার মানুষেরও কথা শুনছি। তবে যারা বাধা দিত, তারাই একসময় সমিতি থেকে ঋণ নেওয়া শুরু করে’, বললেন গোলাপ বানু। সমিতি ও তাঁর আজকের অবস্থানে উঠে আসার পেছনে নিত্য অধিকারীর অবদানের কথাটিও কৃতজ্ঞতা ভরে স্মরণ করলেন তিনি।
সমিতির কার্যক্রম: নুরের চালা এলাকায় ১০০ সদস্য আর পাঁচ হাজার টাকার মূলধন নিয়ে শুরু করা বারিধারা মহিলা সমবায় সমিতির এখন নিজস্ব জমিতে সাড়ে ছয়তলা ভবন। মূলধন ১৭০ কোটি টাকা। সদস্যসংখ্যা ৪৩ হাজারের বেশি। ব্যবস্থাপক নিত্য অধিকারী জানান, ১৭০ কোটি টাকার মূলধনের মধ্যে প্রায় ১৫০ কোটি টাকায় এখন ঋণ হিসেবে সদস্যদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। বাকি টাকা নগদ ও বিভিন্ন সম্পদে বিনিয়োগ রয়েছে।
সমিতির নামে গাজীপুরেও সাড়ে ১৬ বিঘা জমি রয়েছে। তার মধ্যে কিছু জায়গায় প্লট বানিয়ে সদস্যদের দেওয়া হয়েছে। রাজধানীর ভাটারা, বাড্ডা, গুলশান, উত্তরা, খিলক্ষেত ও ক্যান্টনমেন্টসহ ছয়টি থানায় সমিতি কাজ করছে। গাজীপুরেও সীমিত আকারে কাজ শুরু করেছে। সঞ্চয় ও ঋণ দেওয়া ছাড়াও রাজধানীতে ছয়টি বয়স্কশিক্ষার স্কুল পরিচালনাসহ ১১ ধরনের কাজ করছে সমিতি।
সমিতির সদস্যদের নির্বাচিত ১২ জন প্রতিনিধির মাধ্যমে চলে এর কার্যক্রম। সমিতিতে কর্মরত আছেন ৭১ জন। মাসে গড়ে লেনদেন হয় প্রায় ১০ কোটি টাকা।
গোলাপ বানুর চার ছেলেমেয়ে। বিয়ে হয়ে গেছে সবার। অভাবের কারণে ছেলেমেয়েদেরও খুব বেশি পড়াতে পারেননি। স্বামী হাবিবুর রহমান রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। এখন ধর্মপ্রচারে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। একমাত্র ছেলেটি বেকার।
প্রতিদিন সমিতির নানা কাজে যুক্ত থাকলেও মাসিক সম্মানী নেন না গোলাপ বানু। সমিতির কর্মকর্তারা জানালেন, সপ্তাহে মাত্র দুদিন ৫০০ টাকা করে মোট এক হাজার টাকা সম্মানী দেওয়া হয় তাঁকে। এর বাইরে সমিতির পরিচালনা পর্ষদের সভা হলে তাতে উপস্থিতির জন্য পান ৫০০ টাকা। আর ব্যক্তিগতভাবে মুঠোফোন ব্যবহার করেন না বলে যোগাযোগের জন্য তাঁর বাড়ির মুঠোফোনে ৫০০ টাকা দেওয়া হয়। গোলাপ বানু বলেন, ‘সমিতির টাকাগুলো অভাবী নারীদের সঞ্চয়। আমি তার হেফাজতকারী। বিশ্বাস ও সম্মান করে সদস্যরা আমাকে এ দায়িত্বে বসিয়েছেন। এ সম্মানের জন্য তো আমি কোনো অর্থ নিতে পারি না।’ তিনি জানালেন, সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে বাবার দেওয়া জায়গার ওপর তিনতলা বাড়ি করেছেন। ভাড়া দিয়ে তা থেকে মাসে ৩০ হাজার টাকার মতো পান। তা দিয়েই চলে সংসার।
সমিতিতেই নিজের ছেলেকে চাকরি দেওয়ার সুযোগ আছে গোলাপ বানুর। সেটি করছেন না কেন? জানতে চাইলে তাঁর সরল জবাব, ‘সেটি কখনোই করব না। আমি তো মা। ছেলেকে নিজের সমিতিতে চাকরি দেওয়ার পর ছেলে যদি কোনো অপরাধ করে, তাহলে তার বিচার করব কীভাবে? যদি ছেলের সঠিক বিচার করতে না পারি তাহলে আমার সম্পর্কে সদস্যদের ধারণা নষ্ট হবে, সমিতির ক্ষতি হবে। আমাকে যে সম্মান সদস্যরা দিয়েছেন, সেটির অমর্যাদা করতে চাই না।’
স্বীকৃতি: বারিধারা মহিলা সমবায় সমিতি ২০০২ ও ২০০৯ সালে সরকারিভাবে শ্রেষ্ঠ মহিলা সমবায় সমিতি নির্বাচিত হয়। আর গোলাপ বানু ২০১০ সালে জাতীয়ভাবে শ্রেষ্ঠ সমবায়ী নির্বাচিত হন। এ ছাড়া দেশ-বিদেশে একাধিক পুরস্কার পেয়েছে এই সমিতি।
নতুন স্বপ্ন: সমিতির সদস্যদের জন্য একটি বৃদ্ধাশ্রম আর সন্তানদের জন্য একটি স্কুল গড়ার স্বপ্ন দেখেন গোলাপ বানু। কিন্তু সমিতির আওতাভুক্ত এলাকায় এমন জায়গা পাওয়া কঠিন। তাই এই স্বপ্নের বাস্তবায়ন নিয়ে দুশ্চিন্তাও রয়েছে তাঁর। সরকারের সহায়তা চান কি না, জবাবে গোলাপ বানু বললেন, ‘সরকারের কাছে চাইলে হয়তো কিছু জমির ব্যবস্থা হবে। সে জন্য হয়তো কাউকে উচ্ছেদ করা হবে। আমি তো কারও কপালে লাথি মেরে আমার স্বপ্ন পূরণ করতে চাই না।’
গোলাপ বানুর জীবনের জয়গান প্রসঙ্গে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বললেন, শুধু স্বপ্ন দিয়ে তিনি আজকের অবস্থানে আসতে পারতেন না, যদি কাজ ও উদ্যমকে স্বপ্নের সঙ্গে যুক্ত করতে না পারতেন। কিন্তু গোলাপ বানু সেটি পেরেছেন, তাই তিনি বিজয়ী।

প্রতীক্ষার প্রহর যেন দীর্ঘ না হয় by সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক

আগামী বছরটি শুরু হবে যথাসম্ভব উত্তপ্ত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। এ বছরটি শেষ হচ্ছে নাতিশীতোষ্ণ বা অর্ধেক উত্তপ্ত অর্ধেক শীতল মাত্রার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দিয়ে। আজ ২৭ ডিসেম্বর, এ বছরের জন্য ২০ দলীয় জোটের সর্বশেষ রাজনৈতিক সভা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সভাটি হচ্ছে গাজীপুরে। গাজীপুরের সঙ্গে আমার কিছু স্মৃতি রয়েছে। ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ গাজীপুরের ভাওয়াল রাজার রাজবাড়িতে অবস্থিত দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অন্যতম সদস্য ছিলাম। বলতে গেলে বাঙালি অফিসারদের মধ্যে আমি ছিলাম কনিষ্ঠতম। দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্যদের মধ্যে শতকরা ৯৫ ভাগই ছিলাম বাঙালি। আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই যে সেনাদল বা সেনা সদস্যরা পাকিস্তানিদের আদেশ মান্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন এবং জনগণের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছিলেন, সেই সেনাদলের সদস্যরা ছিলেন দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অন্তর্গত। আজকের গাজীপুর জেলার সদর যেখানে অবস্থিত, তার কাছেই ছিল দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। ইতিহাস-খ্যাত ভাওয়াল রাজাদের প্রাসাদে অর্থাৎ রাজবাড়িতে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট থাকত। সেখানে আমার অনেক স্মৃতি-বিস্মৃতি রয়েছে। তাই ২০ দলীয় জোটের আজকের সভাটির সঙ্গে আমার অনেক আবেগ জড়িত।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেছিলাম ওই গাজীপুরে অবস্থিত ভাওয়াল রাজার রাজবাড়ি থেকে। অর্থাৎ দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে মহান আল্লাহর নামে অনিশ্চয়তার মুখে আনুষ্ঠানিকভাবে আমরা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি। দীর্ঘ নয় মাস এ অনিশ্চয়তা আমাদের তাড়া করেছিল। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় আসে। কিন্তু এ বিজয়টি যে ১৬ ডিসেম্বরেই আসবে, সেটা আমরা দু’দিন আগেও জানতাম না। তাই একটি অনিশ্চয়তার মধ্যেই আমরা যুদ্ধ চালিয়ে গেছি এবং বিজয় লাভ করেছি। মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গটি এখানে এজন্য আনলাম যে, যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাতময় পরিবেশে আজ আমরা দিন কাটাচ্ছি, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বা মুক্তিযুদ্ধ শেষে তেমন পরিস্থিতির কথা কখনও কল্পনা করেছিলাম? করিনি। ৪৩ বছর আগে মানুষ যা কল্পনা করেনি এখন তা হচ্ছে। ৪৩ বছর আগের কল্পনা, আশা-আকাক্সক্ষা সবকিছুই যে ঠিক থাকবে এটাও স্বাভাবিক নয়। পরিবর্তন হতেই পারে। তবে সে পরিবর্তনটি যদি ইতিবাচক বা গঠনমূলক হয়, তাহলে মানুষের মনে কোনো প্রশ্ন থাকে না।
২০১৫ সালের শুরুতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দুটি পরস্পরবিরোধী শিবিরের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব, সে দ্বন্দ্বটির বিস্তৃতি আরও ব্যাপক। একটি উদাহরণ দিই, তাহলে এই দ্বন্দ্বের ব্যাপকতা, গভীরতা সম্পর্কে পাঠক পরিষ্কার একটি ধারণা পাবেন।
স্বাধীনতার পর নয় মাসের মধ্যে যে সংবিধান রচনা করা হয়েছিল তা একটি পরিচ্ছন্ন সংবিধান ছিল এবং এত দ্রুততম সময়ে সংবিধান প্রণয়নের জন্য সংবিধান প্রণেতারা সবার পক্ষ থেকে অভিনন্দনও পেয়েছেন। কিন্তু মুদ্রার আরও একটি পিঠ রয়েছে। সেটি হল অতি দ্রুত সময়ে কাজটি করতে গিয়ে সংবিধান প্রণেতারা কি সব বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার সুযোগ পেয়েছিলেন? নাকি তারা পাকিস্তানের সংবিধান, ভারতের সংবিধান ও ব্রিটিশদের (অলিখিত) সংবিধান থেকে কিছু কিছু অংশ বেছে নিয়ে সংবিধানটি রচনা করেছিলেন? এটা অস্বাভাবিক নয়। গবেষণার কাজই হচ্ছে বিভিন্ন জায়গা থেকে তত্ত্ব ও তথ্য নিয়ে সমন্বয় করা। ১৯৭২ সালে যে সংবিধানটি করা হয়েছিল তা চারবার সংশোধন করা হয় সংবিধান প্রণয়নকারী সরকারের আমলেই। চতুর্থ সংশোধনীটি ছিল মারাÍক বিপর্যয় সৃষ্টিকারী। সেই সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে ‘বাকশাল’ এসেছিল। বাকশাল মানে ছিল একদলীয় শাসন এবং আজীবন ক্ষমতায় থাকার বন্দোবস্ত। যে বঙ্গবন্ধু সারা জীবন গণতন্ত্রের জন্য, মানুষের বাকস্বাধীনতার জন্য, মানুষের মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছিলেন, তিনি কী পরিস্থিতিতে এবং কেন একদলীয় শাসনের দিকে পা বাড়িয়েছিলেন আজকের রচনায় সেটা আলোচ্য বিষয় নয়। যা হোক, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তিনি সপরিবারে নিহত হন। এর পরের ইতিহাস সবার জানা। ’৭৫-এর পর থেকে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে ২০০৮ সালে সংবিধান একটি পর্যায়ে এসে দাঁড়ায়। যতটুকু শুনেছি, ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দিন সরকার সংবিধান সংশোধনের কাজে হাত দিতে চেয়েছিলেন। তারা নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমে নতুন একটি সংবিধান প্রণয়ন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি তাদের অনুকূলে না থাকায় তারা আর এগোতে পারেনি। ১৯৯৬ সালে সংবিধানে আওয়ামী লীগ কর্তৃক পরিচালিত আন্দোলনের ফলস্বরূপ, একটি বড় সংশোধনী আনা হয়। সংশোধনী এনেছিল বিএনপি সরকার। আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির দাবি তুলেছিল। আবার সেই একই তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতিকে প্রশ্নবিদ্ধও করেছে আওয়ামী লীগ এবং তাদের নেতৃত্বাধীন সরকার। আওয়ামী লীগ সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করার কারণ দেখিয়েছিল যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বহাল থাকলে অনির্বাচিত ব্যক্তিরা দেশ শাসন করবে। তাই এটা বাতিল করতে হবে। আমার মতে কারণটি এতই ঠুনকো যে এটি কোনো প্রকারের যুক্তি-তর্কেই টেকে না। কারণ এই মুহূর্তে আমরা বলতে বাধ্য যে, গত প্রায় ১২ মাস ধরে বাংলাদেশ শাসিত হচ্ছে অনির্বাচিত ব্যক্তিদের দ্বারা। বাংলাদেশের সংবিধান যদি অনির্বাচিত সরকারকে বৈধতা দিয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিতে পারে, তাহলে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে কেন একজন বা এক ডজন নিরপেক্ষ অনির্বাচিত ব্যক্তি সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নিতে পারবে না? এই প্রশ্নটির উত্তর আওয়ামী লীগ কর্তৃক কোথাও দেয়া হয়নি।
বর্তমানে আওয়ামী লীগ সরকার চাচ্ছে, তারা যেন ২০১৮ সালের শেষ পর্যন্ত এই সংসদ চালিয়ে নিতে পারে। এই সংসদ গঠনের সময়ই অনেক ভুলত্র“টি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনও ভুল করেছে। নির্বাচনী গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ব্যত্যয় ঘটানো হয়েছে মারাÍক রকমের। আমি ওই আলোচনায় যাচ্ছি না। শুধু এটুকু বলব, বর্তমান সংসদ অনির্বাচিত। ১৫৩ জন ব্যক্তি বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৫৩টি আসন অবশ্যই সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেয়। সাংবিধানিকভাবে একথা বলা যাবে যে, ৩০০টি আসনেও যদি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৩০০ জন নির্বাচিত হন, সেই সংসদও বৈধ। তাহলে আমরা ধরে নিতে পারি যে আমাদের বর্তমান সরকার অনির্বাচিত ব্যক্তিদের দ্বারা চলছে। শুধু তাই নয়, তাদের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার জন্য চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের বক্তব্য হল, তাদের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য, বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার জন্য তারা কাজ করে যাচ্ছেন এবং (তাদের মতে) এই কাজকে এগিয়ে নিতেই তারা ক্ষমতায় থাকতে চান। এটা আংশিকভাবে সত্য হলেও হতে পারে। কিন্তু এর বিপরীতে যে বড় বিষয়টি রয়েছে সেটি হচ্ছে দুর্নীতি-লুটপাট। সেই সঙ্গে তারা যে গণতন্ত্রকে হত্যার প্রক্রিয়া চালু করেছে সেটাকে অব্যাহত রাখা। কারণ গত সাত বছরে আওয়ামী লীগের প্রতি ছুড়ে দেয়া কোনো প্রশ্নের জবাব জনগণ পায়নি। এই প্রশ্নগুলোর জবাব এড়িয়ে যাওয়ারও কোনো অবকাশ নেই। কোনো না কোনো দিন, জনগণকে এই প্রশ্নের উত্তরগুলো দিতেই হবে। প্রশ্নগুলো হচ্ছে বড় বড় দুর্নীতি, বড় বড় গুম, হত্যার।
এখন আমাদের দেশে আপ্রাণ চেষ্টা করা হচ্ছে একটি সংলাপের জন্য। সংলাপটি হবে সরকারি অংশ এবং সরকারের বাইরের অংশের মধ্যে। কিন্তু এ ব্যাপারে সরকারি দলের উন্নাসিকতা, অহংবোধ এবং জেদ সংলাপের প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সর্বোপরি সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছারও যথেষ্ট অভাব রয়েছে। সংলাপে গেলে যুক্তিতে হেরে যাওয়ার এবং সেই সঙ্গে একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেয়ার ভয় রয়েছে। অতএব সংলাপ পরিহার করাই তাদের জন্য বাঞ্ছনীয় বলে তারা মনে করছে। বিষয়টি অনেকটা দুষ্ট শিশুদের মতো। যেমন- বাচ্চা যখন খেতে চায় না, মা তখন বলেন, তোমাকে খেতে হবে না, টেবিলে এসে বসো। তখন ওই বাচ্চাটি টেবিলের কাছে এসে আবার দৌড়ে চলে যায়। কারণ সে জানে, টেবিলে বসলেই খেতে হবে। তাই সে টেবিলে না বসাটাকেই শ্রেয় মনে করে।
অতি সাম্প্রতিক সময়ের কথায় আসি। আগামী ৫ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ গণতন্ত্র দিবস হিসেবে পালন করবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিরোধী শিবির ঘোষণা দিয়েছে ওই দিন গণতন্ত্রের কালো দিবস হিসেবে পালন করবে। মহাশূন্য যানে পৃথিবী থেকে ৪৫০ মাইল ওপরে যখন একজন ব্যক্তি বসে থাকেন, তখন সেখান থেকে পৃথিবীটাকে কেমন দেখেন? ওই ব্যক্তি পৃথিবীটার একটি অংশ আলোকিত এবং অপর অংশকে অন্ধকার দেখেন। ৫ জানুয়ারিকেও যে দর্শক বা পর্যবেক্ষক যে রকম দেখতে চান, তিনি সে রকম দেখতে পারেন। একটি ঘটনা স্মৃতিতে আনুন। বর্তমান সরকারের একজন সম্মানিত সদস্য এখন থেকে চার বছর আগে পিলখানার বিডিআর গেটের ভেতরে এক বস্তা টাকাসহ মধ্যরাতে ধরা পড়েন। কেউ ওই ব্যক্তির নাম নেন না, শুধু কালো বিড়াল বলে থাকেন। কেন কালো বিড়াল বলেন? কালো বিড়াল এজন্য বলেন যে, অন্ধকার রাতে কালো বিড়ালকে কেউ দেখতে পায় না। তদ্রুপ ৫ জানুয়ারির নাম নেয়ার প্রয়োজন নেই। ৫ জানুয়ারি কী হয়েছে সেসব দৃশ্য সেদিনকার টিভি চ্যানেলগুলো যারা দেখেছেন এবং ৬ জানুয়ারির পত্রপত্রিকাগুলো যারা পড়েছেন তাদের কাছে বেশ স্পষ্ট। আমি নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি, সব টিভি চ্যানেলের সাংবাদিক বা কর্মকর্তারা আওয়ামী-বিরোধী ছিলেন না যে, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে এরূপ সংবাদ রিপোর্ট ও প্রচার করেছে। তারা নিরপেক্ষভাবেই তাদের কাজ করে গেছেন। পত্র-পত্রিকার বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। সুতরাং ৫ জানুয়ারি কী হয়েছিল তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
২০১৪ যেমনই গেছে যাক। কিন্তু ২০১৫-তে আমাদের একটি শুভ ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সিদ্ধান্তের প্রথম অংশটি হতে হবে এই যে, রাজনৈতিক অঙ্গনে ভদ্রতা, শালীনতা বজায় রাখতে হবে। সিদ্ধান্তের দ্বিতীয় অংশটি হতে হবে এই যে, রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে যেন জনগণের দুর্ভোগ না হয় অথবা ইচ্ছাকৃত কোনো দুর্ভোগ ঘটানো না হয়। সিদ্ধান্তের তৃতীয় অংশটি হতে হবে এই যে, সব রাজনৈতিক কর্মে সাহস, স্বচ্ছতা ও সততা বজায় রাখতে হবে। সরকারকেও সহানুভূতিশীল হতে হবে। আমরা যারা বিরোধী শিবিরে, আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশের সংবিধানকে জনবান্ধব করা এবং বর্তমান সরকার কর্তৃক আনা সাংবিধানিক সংশোধনীকে পুনর্বিবেচনার মাধ্যমে জনবান্ধব করা।
অনেকে অভিযোগ করছেন, বর্তমান শাসক দল একদলীয় শাসনব্যবস্থার প্রতি এগিয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, না, সরকার বাংলাদেশকে উন্নয়নের চরম শিখরে নিয়ে যাচ্ছে। এখানে একটি কথা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, অনিশ্চয়তা কাউকেই শান্তি দেয় না, উন্নয়নও ঘটায় না। সুতরাং নিশ্চয়তা চাই। আমরা সে নিশ্চয়তার প্রতীক্ষায় রইলাম। তবে প্রতীক্ষার প্রহর যেন দীর্ঘ না হয়।
মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক : সভাপতি, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি

গণবিরোধী কর্মসূচি ও গণআন্দোলন by একেএম শাহনাওয়াজ

এপ্রিলে সপরিবারে দার্জিলিং গিয়েছিলাম। কলকাতায় গুমোট গরম। সেখান থেকেই ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে সব বন্দোবস্ত করে রওনা হলাম। জানতাম আট হাজার ফুট উপরের শৈল শহর দার্জিলিংয়ে এত গরম থাকবে না। সঙ্গে শীতবস্ত্র নেই। ঠিক করেছি দার্জিলিংয়ে গিয়ে কিনে নেব। পাহাড়ে উঠতে উঠতে গাড়ির ভেতরেই ক্রমে শীতের প্রচণ্ডতা বাড়ছিল। পড়ন্ত বিকেলে দার্জিলিং শহরে পৌঁছলাম। গাড়ি থেকে নামতেই সবার ঠাণ্ডায় দাঁতকপাটি লাগার দশা। সোজা হোটেলে কম্বলের নিচে। ম্যানেজারকে বললাম, এই মুহূর্তে আমাদের শীতবস্ত্র কেনা জরুরি। আমাদের প্রস্তুতিহীন অবস্থা দেখে তিনি ভীত হয়ে পড়লেন। বললেন, এক্ষুণি পাশের মার্কেটে চলে যান। কাল সুভাষ ঘিষিং বন্ধ ডেকেছেন। এতক্ষণে মার্কেট বুঝি বন্ধ হয়ে গেল। ম্যানেজারের কথার সব মর্মার্থ বুঝতে পারলাম না। তবে এ মুহূর্তের সংকট থেকে বাঁচতে পড়িমরি ছুটলাম। মার্কেটের অধিকাংশ দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। গরম পোশাকের একটি দোকান আধখোলা। বন্ধের প্রস্তুতি চলছে। সুতরাং পছন্দ-অপছন্দ নয়- দরকারি যা পেলাম, তাড়াতাড়ি কিনে নিলাম। হোটেলে এসে ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে মনের ধন্ধ কাটল।
সুভাষ ঘিষিং গোরখা ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্টের নেতা। ভীষণ জনপ্রিয়। তিনি দার্জিলিং গোরখা হিল কাউন্সিলের চেয়ারম্যান। ঘিষিং বন্ধ অর্থাৎ হরতালের ডাক দিলে তা কঠিনভাবে পালিত হয়। শুধু নির্দিষ্ট দিনেই পালিত হয় না, হরতালের আগের সন্ধ্যা থেকে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতালের প্রস্তুতি নিয়ে ফেলে। দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। সীমিত হয়ে যায় গাড়িঘোড়া চলা। ফুটপাথের ভ্রাম্যমাণ চায়ের দোকানও সন্ধ্যা থেকে পাওয়া যাবে না। কিন্তু রাস্তাঘাটে তেমন পুলিশি টহল নেই। মানুষের মনে ভীতি ছড়িয়ে হরতাল কার্যকর করার জন্য নাশকতা শুরু করেনি সুভাষ ঘিষিংয়ের কর্মীবাহিনী। হরতালের দিনেও একই চিত্র দেখলাম। কঠিনভাবে পালিত হচ্ছে হরতাল। নেতার ডাকে সব শ্রেণীপেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া। পিকেটিং নেই। গাড়ি ভাংচুর নেই। কোনো ককটেল-বোমার শব্দও শুনতে পেলাম না। নেতার ডাকে মানুষের হাতে প্রশাসন যেন জিম্মি হয়ে গেছে। আমাদের নেতানেত্রীরা যেমন জিম্মি করে ফেলেন সাধারণ মানুষকে।
স্মৃতিটি মনে ভেসে উঠল ২১ ডিসেম্বর যুগান্তর পড়তে পড়তে। জানলাম, কথিত আন্দোলন সফল করতে এবার রাজপথ দখলে নামবে বিএনপি। নিকট অতীতেও এ ধরনের কর্মসূচি দেয়া হয়েছে। তবে সরকারি প্রতিরোধ, বিএনপি নেতানেত্রী আর কর্মীবাহিনীর আড়মোড়া না ভাঙা এবং গণসমর্থনের অভাবে সেসব কর্মসূচি ফ্লপ করেছে। আজকাল দেখা যাচ্ছে প্রতিবাদের একটি মাত্র হাতিয়ারকে ধারণ করছে বিরোধী দলগুলো। আর তা হচ্ছে হরতাল। এ অস্ত্রটি অপ্রয়োজনে বহু ব্যবহারে ভোঁতা হয়ে যাওয়ার পরও নানা ছুতানাতায় মুড়িমুড়কির মতো আবারও ব্যবহার করা হচ্ছে।
মহাত্মা গান্ধী ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে হরতাল চালু করেছিলেন। পরে এর সহিংস রূপ দেখে পিছিয়েও এসেছিলেন। কিন্তু ভালো কিছু অনুকরণ করতে না পারলেও আমরা মন্দের পেছনে ঠিকই ছুটি। তাই হরতাল আমাদের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের হাতিয়ার হয়ে গেল। পাকিস্তান আমলে দেখেছি, সরকারকে চাপে ফেলতে হরতাল ছিল শেষ অস্ত্র। আর জনমত প্রস্তুত করেই সে হরতাল ডাকা হতো। স্বাধীনতার পরেও অনেক হরতাল ডেকেছে সব সরকারবিরোধী পক্ষ। তবে বরাবর হরতাল ডাকা হতো ঘটনা ঘটার প্রতিক্রিয়ায়। একদিন, দুদিন বা লাগাতার। এখন তো দেখছি অগ্রিম বুকিং দেয়া হচ্ছে হরতালের। বিএনপি ৫ জানুয়ারি ঢাকায় বড় ধরনের সমাবেশ করতে চায়। সরকার পক্ষ যদি এ কর্মসূচিতে বাধা দেয় তবে তিন দিনের লাগাতার হরতাল দেয়ার অগ্রিম হুমকি দেয়া হয়েছে। এই তিন দিনে দেশের বা সাধারণ মানুষের কতটা ক্ষতি হবে, তা বিবেচনায় নেয়া হয়নি।
বিএনপির তো ঝগড়া সরকার তথা আওয়ামী লীগের সঙ্গে। সমাবেশ না করতে দেয়ার অপরাধে সরকার বা আওয়ামী লীগ শাস্তি পেতে পারে। প্রাচীন ব্যাবিলনের রাজা হাম্মুরাবির আইনে প্রভাবিত হয়ে তারা বড়জোর প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে। যেমন সরকারকে শাস্তি দিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অবরুদ্ধ করে দেয়ার কর্মসূচি নিতে পারে। ঘেরাও করতে পারে সচিবালয়। আর আওয়ামী লীগকে শাস্তি দিতে হলে বঙ্গবন্ধু রোডে আওয়ামী লীগ অফিস ঘেরাও করতে পারে। তা না করে দেশের কোটি কোটি নিরপরাধ মানুষকে শাস্তি দেয়া কেন? বিএনপিকে সমাবেশ করতে না দেয়ার কোনো দায় কি সাধারণ মানুষের রয়েছে? বিএনপিই তো বলেছে, ৫ জানুয়ারি ভোটারবিহীন নির্বাচন হয়েছে। তাহলে মানতে হবে, মানুষ সেই নির্বাচন বর্জন করেছে। ফলে ৫ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠানে মানুষের দায় না থাকলে বিএনপি সাধারণ মানুষকে হরতালের শাস্তি দিতে চাচ্ছে কেন? নাকি বিএনপি বিশ্বাস করে, এ দেশের সাধারণ মানুষ আওয়ামী লীগের পক্ষে। তাই মানুষকে শাস্তি দিলে আওয়ামী লীগ বা সরকারকে শাস্তি দেয়া হবে। দলটির নেতারা তো বিএনপিকে গণতান্ত্রিক দল বলে প্রচার করছেন। জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে মূল্য না দিয়ে জনস্বার্থবিরোধী হরতাল চাপিয়ে দেয়ার মধ্যে কি কোনো গণতান্ত্রিক আচরণ খুঁজে পাওয়া যাবে?
হরতাল এতই সস্তা বিষয় হয়ে গেছে যে, যে কোনো ঘটনায় প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে হরতালের ডাক আসবে- এটি মানুষকে যেন নিয়তি হিসেবেই মেনে নিতে হচ্ছে। এখন তো জামায়াত আর বিএনপির স্বতন্ত্র রাজনীতি নেই। একে অন্যের পরিপূরক। কোন পক্ষের প্রভাব কার ওপর বেশি তা গবেষণার বিষয়। তবে বিএনপির ডাকা আন্দোলনে নাশকতা ছড়াতে আর বিএনপি নেত্রীর জনসভায় জনতা সরবরাহে জামায়াতের সদম্ভ অবস্থান দেখিয়ে জামায়াত যেন বলতে চায়, দাপটে আমরাই এগিয়ে আছি। দুকদম পেছনে হাঁটছে বিএনপি। এভাবে বন্ধুত্বের শক্তি সঞ্চয় করে জামায়াত নিজের অবস্থান জানান দিতে মানবতাবিরোধী অপরাধী নিজ দলীয় নেতাদের শাস্তির রায় ঘোষিত হলেই সাধারণ মানুষের ওপর অবধারিতভাবে হরতাল চাপিয়ে দেয়াকে এখন রেওয়াজে পরিণত করেছে। পৃথিবীতে আর কোনো দেশ আছে কি-না জানা নেই, যেখানে আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে হরতাল হয়। কিন্তু এসব চাপিয়ে দেয়া হরতালে দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি, সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের নানা ক্ষতির দায়ও কেউ নেয় না- মানুষের পাশে এসেও কোনো প্রতিষ্ঠান দাঁড়ায় না। আবার হরতাল ডাকিয়ে এসব দল গলা উঁচিয়ে বলে তারা গণতান্ত্রিক।
হরতাল ডেকে বিএনপি সরকারকে চাপে ফেলে কী অর্জন করতে চায়? যত ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে বলি লক্ষ্য একটিই- সিংহাসনের দখল নেয়া। অতীতে বিরোধী দলে থাকা আওয়ামী লীগের লক্ষ্যও অভিন্ন ছিল। ক্ষমতায় গিয়ে তারা দেশ-জাতির কতটা কী উদ্ধার করেছে তার জন্য তো অণুবীক্ষণ যন্ত্রের প্রয়োজন পড়ে। আজ বিএনপি আন্দোলনের ডাক দিয়ে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে, এর দায় কি শুধু দলটির সাংগঠনিক দুর্বলতা? কোনো এক মায়ার বলয়ে বন্দি না থাকলে বিএনপি নেতৃত্ব ঠিকই বুঝতে পারতেন কোন যুক্তিতে দলান্ধ বিএনপির কর্মী-সমর্থক ছাড়া সাধারণ মানুষ বিএনপির আন্দোলন সফল করতে এগিয়ে আসবে? তাদের আমলের অপশাসন কি মানুষ ভুলে গেছে? যৌক্তিক কারণেই আজ বেগম জিয়া ছাত্রলীগকে গুণ্ডালীগ বলছেন; কিন্তু ছাত্রদল-যুবদলের সন্ত্রাস কি মুছে গেছে মানুষের মন থেকে? বর্তমান আমলের চেয়ে কত শতাংশ কম দুর্নীতি হয়েছে বিএনপির আমলে, আমাদের অসুস্থ প্রতিযোগিতার রাজনীতিতে বিএনপি হয়তো সে হিসাব করতে পারে। তবে বিএনপি নেতাদের দুর্নীতির ফিরিস্তি নিশ্চয়ই মুছে যায়নি মানুষের মন থেকে। এর সঙ্গে প্রবলভাবে যুক্ত হয়েছে যুদ্ধাপরাধী বাংলাদেশ-বিরোধী জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধা। জামায়াতের সব অপকর্মের সহযোগী হওয়া। আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনের মহাত্মনরা সাধারণ মানুষকে যতটা বোধহীন মূর্খ ভাবেন, মানুষ ততটা মূর্খ নয়। তাই নষ্ট রাজনীতির পক্ষে আন্দোলনে তাদের ঝাঁপিয়ে পড়ার কোনো কারণ নেই।
এ বাস্তবতায় মানুষ চাপিয়ে দেয়া হরতালের খক্ষ হজম করবে কেন? নেতারা একবারও কি ভাবেন একটি দিনের হরতালে খেটে খাওয়া মানুষের জীবনে কতটা অর্থনৈতিক বিপর্যয় নেমে আসে? মানুষের ও দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের কতটা ক্ষতি হয়? শিক্ষা কার্যক্রমে কতটা ধস নামে? গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক অনুষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অসুস্থ রোগীর জীবন বিপন্ন হয়। হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় যানবাহন। জানমালের ভয়ংকর ক্ষতি সাধিত হয়। আর এসবের ফলে মানুষ এক দুর্বৃত্তায়িত শাসনের বদলে আরেক দুর্বৃত্তায়িত শাসন প্রতিষ্ঠার ক্রীড়নক হয়।
তারপরও আমাদের প্রতাপশালী রাজনীতিকরা নিজেদের গোষ্ঠীস্বার্থের অনুকূলে গণবিরোধী কর্মসূচি চাপিয়ে দিচ্ছেন। আজ আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকার দশা। এটা নিশ্চিত, এই অসুস্থ রাজনীতির মহাত্মনরা সাধারণ মানুষকে রক্ষায় এগিয়ে আসবেন না। তারা কেবল জনগণকে নিয়ে বিরোধী আন্দোলন প্রতিহত করবেন অথবা জনগণকে নিয়ে সরকার-বিরোধী আন্দোলন সফল করবেন। প্রকৃত জনগণের ভাগ্যে জুটবে লবডঙ্কা। তাই এ সময়ের বাস্তবতায় জনগণকেই আত্মরক্ষার প্রস্তুতি নিতে হবে। দরকার গণজাগরণের প্রস্তুতি। অশুভ বা অন্যায়কারী শক্তি সব সময়ই মনস্তাত্ত্বিকভাবে দুর্বল। আজ সময় এসেছে এসব অন্যায় গণবিরোধী কর্মসূচি প্রতিহত করার। এজন্য সবাইকে যার যার অবস্থানে থেকে সক্রিয় হতে হবে। গণশক্তির প্রকাশ কিন্তু ইতিমধ্যে লক্ষ্য করা গেছে। বিগত বেশ কটি হরতাল জনজীবনে তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি। যেহেতু সব পক্ষই হরতাল অস্ত্র ব্যবহার করতে চায়, তাই কেউ আইন করে হরতাল বন্ধ করবে না। এ কারণে জনগণের ঐক্যবদ্ধ শক্তি ছাড়া নিবর্তনমূলক কর্মসূচির হাত থেকে পরিত্রাণের উপায় নেই।
সুভাষ ঘিষিংয়ের মতো নেতাদের মধ্যে ক্ষমতা বিলাস আর স্বার্থপরতা ছিল না বলেই মানুষ জীবন দিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। একই বাস্তবতা এলে এ দেশের মানুষও আন্দোলন সফল করতে পথে নেমে আসবে। আমাদের রাজনীতিকরা একটি চ্যালেঞ্জ কি গ্রহণ করতে পারবেন : কোনো একটি ইস্যুতে হরতাল ডাকবে বিরোধী দল। এই হরতাল সফল করতে আগের রাত থেকে কোনো ভীতি ছড়ানো হবে না। পিকেটিংয়ের নামে ভাঙচুর হবে না। ককটেল ছোড়া হবে না। পুলিশি টহলের দরকার পড়বে না। তারপর দেখুন জনগণ সে হরতাল সফল করে কিনা!
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

‘প্রতিদিনই ওদের স্মরণ করি’

‘আমি প্রতিদিনই ওদের স্মরণ করি।’
(সুনামির এক দশক পূর্তি উপলক্ষে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে সাগরে গোলাপ ফুল ভাসিয়ে দিচ্ছে থাইল্যান্ডের শিশুরা। ছবিটি আজ ফাং এনগা প্রদেশের বান নাম খেম সুনামি পার্কের কাছ থেকে তোলা। ছবি: এএফপি) বেদনা ভরা হৃদয়ে এ কথা বলেন থাইল্যান্ডের এক মা। সমজাই সমবুন তাঁর নাম। বয়স ৪০ বছর। আজ থেকে ঠিক ১০ বছর আগে, ২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর ভয়াল এক দানব এসে তাঁর বুক থেকে কেড়ে নিয়ে গেছে দুই ছেলেকে। তাদের স্মৃতি এখন তাঁর চিরকালের দহন। যে দানবটার কথা বলা হলো, তা ছিল ভারত মহাসাগরের প্রলয়ংকরী সুনামি। ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিমে সাগরের তলদেশে ৯ দশমকি ৩ তীব্রতার ভূমিকম্পের আঘাতে দেখা দেয় এই সুনামি। পাহাড়প্রমাণ উন্মত্ত ঢেউ এসে প্রচণ্ড বেগে হামলে পড়ে ভারত মহাসাগরের উপকূলীয় দেশগুলোতে। লন্ডভন্ড করে দিয়ে যায় অনেক জনপদ। কেড়ে নেয় দুই লাখ ২০ হাজার লোকের প্রাণ। সেই সুনামির ১০ বছর পূর্তিতে সুনামির আঘাত সওয়া দেশগুলোতে আজ গভীর বেদনা নিয়ে স্মরণ করা হচ্ছে হারিয়ে যাওয়া মানুষদের।
ভারত, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা ও সোমালিয়াসহ ১৪টি দেশে আঘাত হানে সুনামি। সাগরের মাতাল ঢেউয়ের সেই ধ্বংসযজ্ঞের রেশ কেটে গেছে, কিন্তু ধাক্কা সয়ে টিকে থাকা মানুষজনের সেই আতঙ্ক কাটেনি এখনো। মসজিদ, মন্দির ও গির্জায় গিয়ে তাঁরা এখন প্রার্থনায় মগ্ন। যাঁরা ঝরে গেছেন, তাঁদের আত্মা যেন শান্তি পায়। আর কখনো যেন এমন ভয়াল ঢেউ এসে আঘাত না হানে।
আজ বার্তা সংস্থা এএফপি খবরে জানানো হয়, আজ সকালে ইন্দোনেশিয়ার বান্দা আচেহ এলাকার ২০-একর পার্কে দেশটির জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে স্মরণ অনুষ্ঠান শুরু হয়। সেখানে দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জুসাফ কাল্লাসহ হাজারো মানুষ উপস্থিত হয়েছেন। সুনামির সময় এখানেই ১১৫ ফুট উঁচু থেকে আছড়ে পড়েছিল জলোচ্ছ্বাস। আর সুনামির আঘাতে মোট নিহতের মধ্যে ইন্দোনেশিয়ায় নিহত হয় এক লাখ ৭০ হাজার মানুষ।
জুসাফ কাল্লা বলেন, ‘এই মাঠে হাজারো মানুষের লাশ পড়ে ছিল। তখন অনেক মানুষের অশ্রু ঝরেছে...দ্বিধা ছিল, বেদনা ছিল, ছিল দুঃখ, ভয় আর দুর্ভোগের অনুভূতি।’ সব মানুষের সহায়তায় কীভাবে সেই দুর্যোগ কাটিয়ে আবার দাঁড়াতে পেরেছে এখানকার মানুষ, সে কথা বর্ণনা করেন তিনি। এ সময় অনেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন।
থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে প্রলয়ংকরী সুনামির আঘাতে নিহত হয়েছিল পাঁচ হাজার ৩০০ মানুষ। এঁদের মধ্যে অর্ধেক ছিলেন বিদেশি পর্যটক। তাঁদের স্মরণে আজ বান নাম খেম গ্রামের মেমোরিয়াল পার্কে সমবেত হয়েছেন শত শত মানুষ। এতে অংশ নেন সেই বিপর্যয় থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষ ও উদ্ধারকর্মীরাও।
সুনামির সময় থাইল্যান্ডে ছিলেন সুইস নাগরিক রেমন্ড মুর। স্মৃতি আওড়ে তিনি বলেন, সেদিন সকালে স্ত্রীর সঙ্গে বসে নাশতা করছিলেন। হঠাৎ দেখেন দিগন্ত থেকে সবেগে ধেয়ে আসছে বিশাল ঢেউ। তিনি তাঁর স্ত্রীকে দৌড়ে পালানোর পরামর্শ দেন। তাঁর ভাষ্য, ‘ওটা কোনো ঢেউ ছিল না। ছিল একটি কালো দেয়াল।’
আন্তর্জাতিক স্মরণ অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে এই দিনটি পালন করছে সুইডেনও। এই সুনামি সে দেশের ৫৪৩ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। আজ দুপুরে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে আপসালা গির্জায় প্রার্থনায় অংশ নেবে দেশটির রাজপরিবারসহ সেই বিপর্যয়ে নিহতদের স্বজন ও বেঁচে যাওয়া মানুষেরা। সুনামিতে সুইডেনে প্রায় ১০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল।
শ্রীলঙ্কার রেলস্টেশনে যাত্রীবাহী একটি ট্রেনের ওপর আছড়ে পড়েছিল সুনামি। ওই ট্রেনে থাকা যাত্রীদের মধ্যে এক হাজার ৫০০ জন যাত্রী মারা গিয়েছিলেন সেদিন। এ ছাড়া প্রায় ৩১ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। আজ ওই রেলস্টেশনে নিখোঁজ ও মৃত ব্যক্তিদের স্মরণে সমবেত হবে মানুষ।

ভয়াবহ সুনামির দশ বছর- শোক ও প্রার্থনায় স্মরণ

(প্রলয়ংকরী সুনামি কেড়ে নিয়েছিল এক প্রিয়জনকে। এই সাগরের বুক থেকেই ধেয়ে এসেছিল সেই সুনামি। শোকাবহ ঘটনাটির ১০ বছর পূর্তিতে গতকাল সাগরের তীরে কিছুটা সময় কাটিয়ে হারানো আপনজনকে স্মরণ করে পরিবারটি। শ্রীলঙ্কার পেরেলিয়া এলাকা থেকে গতকাল তোলা ছবি l রয়টার্স) ভারত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে মৃত্যু আর ধ্বংসযজ্ঞ বয়ে আনা ভয়াবহ সুনামির দশকপূর্তি হয়েছে গতকাল শুক্রবার। ওই প্রলয়ংকরী দুর্যোগ থেকে বেঁচে যাওয়া লোকজন এবং প্রাণ হারানো দুই লাখ ২০ হাজার মানুষের স্বজনেরা বিভিন্ন স্থানে সমবেত হয়ে শোক পালন করেন। পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে অনুষ্ঠিত হয় প্রার্থনা। খবর রয়টার্স, এএফপি ও বিবিসির।
এশিয়া মহাদেশের বিভিন্ন উপকূল এবং আফ্রিকার উপকূলের বেশ কয়েকটি স্থানে ২০০৪ সালে ২৬ ডিসেম্বর ওই সুনামি (ভূমিকম্পজনিত সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস) আঘাত হেনেছিল। ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম প্রান্তে ৯ দশমিক ৩ মাত্রার প্রচণ্ড ভূমিকম্পই ছিল এর কারণ। এর প্রভাবে একের পর এক সুবিশাল সামুদ্রিক ঢেউ ১৪টি দেশের উপকূলে আঘাত হানে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা ও আফ্রিকা উপকূলের দেশ সোমালিয়া। নিহত মানুষের মধ্যে অনেকেই ছিল বড়দিন উদ্যাপনরত বিদেশি পর্যটক। মিয়ানমার, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, কেনিয়া ও তানজানিয়াও ওই সুনামিতে কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত আচেহ প্রদেশের বান্দা আচেহ শহরে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় গতকালের স্মরণানুষ্ঠান। ভাইস প্রেসিডেন্ট জুসুফ কালা ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থলের কাছাকাছি ওই এলাকায় সুনামির সময় ১১৫ ফুট পর্যন্ত উঁচু ঢেউ আঘাত হেনেছিল। স্থানীয় বিভিন্ন মসজিদেও গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়। সুনামিতে ইন্দোনেশিয়ায় মৃতের মোট সংখ্যা ছিল এক লাখ ৭০ হাজার।
থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে মোট পাঁচ হাজার ৩০০ জন প্রাণ হারিয়েছিল। তাদের মধ্যে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা ছিল প্রায় অর্ধেক। সেখানকার জেলেদের গ্রাম বান নাম খেমে আয়োজন করা হয় এক স্মরণ অনুষ্ঠানের। ওই গ্রামের প্রায় তিন হাজার মানুষের খোঁজ মেলেনি।
থাইল্যান্ডে হতাহত মানুষের ৮০ শতাংশই ছিল ফ্যাং ন্গা প্রদেশের। সেখানে ৩৯টি দেশ থেকে বিশেষজ্ঞরা গিয়েছিলেন লাশ শনাক্ত করার কাজে। এটি ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফরেনসিক তদন্তের ঘটনা। সুনামিতে সুইডেনের ৫৪৩ জন পর্যটক প্রাণ হারিয়েছিল। তাদের স্মরণে দেশটির উপসালা ক্যাথেড্রালে গতকাল এক অনুষ্ঠানে স্বজনদের পাশাপাশি রাজপরিবারের সদস্যরাও যোগ দেন।
শ্রীলঙ্কায় মৃত্যু হয়েছিল ৩১ হাজার মানুষের। সেখানে যাত্রীবাহী একটি ট্রেনে সুনামির আঘাতে প্রায় এক হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল। রাজধানী কলম্বোয় গতকাল ওই বিপর্যয়ের দশকপূর্তিতে স্মরণানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় তামিলনাড়ু রাজ্যে প্রাণ হারায় প্রায় ছয় হাজার মানুষ।
আকস্মিক ওই দুর্যোগে আক্রান্ত দেশগুলোয় উদ্ধার তৎপরতা চালানো এবং ত্রাণ সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। তবে পরবর্তী কয়েক মাস ধরে সারা বিশ্ব থেকে অন্তত এক হাজার ৩৫০ কোটি মার্কিন ডলারের আর্থিক সহায়তায় বিপর্যয়-পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়।
ভয়াবহ ওই দুর্যোগের পর সুনামি সতর্কতা ব্যবস্থা নিয়ে অনেক কথাবার্তা হয়। ভারতের প্রত্যন্ত উপকূলীয় অঞ্চলের অধিবাসীদের দুর্যোগের পূর্বাভাস জানানোর একটি নতুন প্রযুক্তি চালু করার চেষ্টা করা হলেও তা বেশি দূর এগোয়নি। থাইল্যান্ডের দুর্যোগ সতর্কতাকেন্দ্র বলছে, তাদের কাছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি থাকলেও সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণের সুযোগ সীমিত।
২০১১ সালে ভারত মহাসাগরজুড়ে একটি সুনামি সতর্কতা ব্যবস্থা চালু করা হয়। এটি সমুদ্রের পানির বিভিন্ন পরিমাপ, ভাসমান বস্তু বা বয়া এবং ভূমিকম্প পর্যবেক্ষক যন্ত্রের সমন্বয়ে তৈরি একটি যোগাযোগব্যবস্থা। পাশাপাশি কয়েকটি দেশও দুর্যোগপূর্ব প্রস্তুতির লক্ষ্যে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে। এ খাতে গত এক দশকে উপকূলীয় ২৮টি দেশ মোট ৪০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় করেছে। তবে ১০ বছর আগের সেই সুনামির ভয়াবহতা ভুলে যাওয়ার ফলে নতুন কোনো দুর্যোগে আবারও একই ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, উপকূলীয় লাখ লাখ গ্রাম এখনো অরক্ষিত রয়েছে।

পরীক্ষা হোক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম by মোঃ সিদ্দিকুর রহমান

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মুহম্মদ জাফর ইকবালের ব্যথিত মনে লেখা ‘দোহাই আমাদের শিশুদের ক্রিমিনাল বানাবেন না’ কলামটি পড়ে অনেকটা আশান্বিত হয়েছি। সমাপনী পরীক্ষার চ্যালেঞ্জ নিয়ে প্রতিবছর লিখে আসছি। সংশ্লিষ্টরা বাস্তবতা অনুধাবন না করে নিজের মতো করে সমাপনী পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন। মনে হয়েছিল, ছোট্ট সোনামণিদের পরীক্ষা নিয়ে বাস্তবতা এবং প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে মুহম্মদ জাফর ইকবালের দুটি কলাম কর্তৃপক্ষকে অনুপ্রাণিত করবে। বৃথা প্রত্যাশা। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানানো হলেও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বাস্তবতা অস্বীকার করা হয়। তাদের কার্যক্রম নেতিবাচক। পরীক্ষা নিয়ে পরামর্শ গ্রহণ অরণ্যে রোদনে পরিণত হয়েছে।
জাতীয় শিক্ষানীতি কমিটির অন্যতম সদস্য হিসেবে তিনি শিক্ষানীতিবহির্ভূত শিশুদের এ পরীক্ষাকে কর্তাব্যক্তিদের উর্বর মস্তিষ্কের ফসল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আমি এর সঙ্গে যোগ করতে চাই, পরীক্ষা কিছু আর্থিক লাভবান হওয়ার সুযোগও বটে। কারণ এ পরীক্ষা সর্বস্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের টিএ, ডিএ সম্মানী হিসেবে বিপুল অর্থের জোগান দিয়ে থাকে। যেখানে অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা বিদ্যালয়ে পরীক্ষা খরচ বাবদ নেয়া হয় সামান্য টাকা, সেখানে দেশের তৃণমূল পর্যায়ে খেটে খাওয়া মানুষের সন্তানদের কাছ থেকে নেয়া হয় ষাট টাকা। অনেক ক্ষেত্রে গরিব ও অসচ্ছল অভিভাবকদের টাকা শিক্ষকরা বহন করে। শিক্ষাব্যবস্থা অবৈতনিক, কিন্তু পরীক্ষা ব্যবস্থায় টাকা প্রয়োজন। বিষয়টি পরস্পরবিরোধী নয় কি?
পরীক্ষা ব্যবস্থায় আরও গলদ রয়েছে। পরীক্ষা খাতার গোপনীয়তা রক্ষার জন্য খাতা প্রতি ১ টাকা করে সর্বমোট ব্যয় হয় প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অথচ বাংলা পরীক্ষায় অনেকটা সুকৌশলে ফরম পূরণে নাম লিখতে দিয়ে গোপনীয়তা রক্ষার চেষ্টাকে ভ্রান্ত প্রমাণ করা হয়েছে। এভাবে একটি স্বার্থান্বেষী চক্রকে দুর্নীতি করার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। এছাড়া সমাপনী পরীক্ষার জন্য শিশু শ্রেণী থেকে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কারণ আগস্ট-ডিসেম্বর পর্যন্ত শিক্ষকরা সমাপনীর কাজে দলবদ্ধ হয়ে কাজ করেন।
সমাপনী পরীক্ষার প্রস্তুতিসহ আরও নানা কাজে ব্যস্ততার দরুন অন্যান্য শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তকের শেষাংশ খুব ভালো করে সম্পন্ন করা সম্ভব হয় না। শিক্ষকরা পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর খাতা দেখা, নিরীক্ষণ ও অন্যান্য কার্যক্রম শেষ করতে না করতেই বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হয়ে যায়। ফলে শিক্ষার্থীদের কাক্সিক্ষত যোগ্যতা অর্জন সম্ভব হয় না। নিচের ক্লাসের শিক্ষার্থীদের জ্ঞান পরিপূর্ণ না করে, তাদের দুর্বল রেখে শিক্ষক, অভিভাবক সবাই ছোটে ভালো ফলের জন্য। গোড়া কেটে আগায় পানি ঢালার মতো অবস্থা আর কী!
২০১৩ সালেও প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। তবে এবারের মতো এত ব্যাপক নয়। সংশ্লিষ্টদের অবহেলায় ২০১৪ সালে প্রশ্নপত্র ফাঁস অনেকটা মহামারী আকার ধারণ করে। বেশিরভাগ পরীক্ষার হলে শিক্ষার্থীদের মাঝে আনন্দের বন্যা বয়ে গেছে। ২০১৩ সালের মার্কিং স্কিমে বানান কাটা নিয়ে লিখেছিলাম। তবে মার্কিং স্কিমে এবার শুধু বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়, প্রাথমিক বিজ্ঞান এবং ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়ে বানান ভুলের জন্য নম্বর না কাটার নির্দেশনা আছে। বাংলা ও ইংরেজি বিষয়ে ৫টি বানান ভুলের জন্য ১ নম্বর কাটার নির্দেশনা এসেছে। প্রশ্নপত্রের উত্তরমালা এতই সংক্ষিপ্ত যে, ৫টি ভুল বানান খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। রচনা Short Composition প্রশ্নের উত্তর লেখা বা সঠিক লেখার মধ্যে মানের কোনো তারতম্য নেই। এতে দুর্বল ও মেধাবী ছাত্রদের মূল্যায়ন ব্যবস্থাকে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়ে হয়তো সংশ্লিষ্টরা অধিকতর সতর্ক পদ্ধতি অবলম্বন করলে সফল হবেন। আজকাল অধিকতর সুনাম বা বাহবা কুড়ানোর জন্য আমরা সবাই ছুটছি ভালো ফলের জন্য। আমরা কি ভাবছি এ ভালো ফল আমাদের কতটুকু শেখাচ্ছে? এ থেকে আমরা কতটুকু জ্ঞান  অর্জন করছি? শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য পরীক্ষায় ভালো ফল নয়, সঠিক জ্ঞান অর্জন করা। এ লক্ষ্য সামনে রেখে পরীক্ষা ব্যবস্থায় আশু পরিবর্তন জরুরি।
বর্তমানে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত সব পাবলিক পরীক্ষা বন্ধ করেও শিক্ষার কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। আমাদের সময়ে শিক্ষকরা পড়া শিখিয়ে বিদ্যালয় ত্যাগ করতে দিত। এখনও শিক্ষকরা এ ধরনের পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারে। বর্তমানে বইয়ের অধ্যায়ভিত্তিক অনুশীলনীগুলো পরীক্ষা পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। শিক্ষার্থীদের বইয়ের বোঝা না বাড়িয়ে প্রতিটি অধ্যায়ে কাক্সিক্ষত যোগ্যতা অর্জনে অধ্যায়ভিত্তিক প্রশ্নপুস্তিকা স্কুলে স্কুলে সরবরাহ করা যেতে পারে। শিক্ষকরা সে মোতাবেক অধ্যায় শেষ করে পরীক্ষা নিতে পারে। সে প্রশ্নপুস্তিকা হবে পাঠ্যবইয়ের আলোকে, যাতে শিক্ষার্থীকে নোট বা গাইডবই পড়তে না হয়।
অধ্যায়ভিত্তিক প্রশ্নপত্র পরীক্ষার আগে শিক্ষার্থীদের দেয়া হলে তারা পরিপূর্ণভাবে পাঠের অংশটি আয়ত্ত করতে পারবে। এই পরীক্ষার উদ্দেশ্য হবে ভালো ফল বা ফেল করানো নয়, জ্ঞান অর্জন করা। যে শিক্ষার্থী কাক্সিক্ষত জ্ঞান অর্জন করেনি, তাদের বিশেষ পাঠ বা বিশেষ ব্যবস্থাপনায় পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ দেয়া যেতে পারে। এজন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত শিক্ষক, শিক্ষকদের মানসম্মত জীবনযাপনের ব্যবস্থা করা। সর্বাগ্রে জাতীয় বাজেটে শিক্ষার জন্য কৃপণতা পরিহার করতে হবে। ৫ম ও ৮ম শ্রেণীর তথাকথিত পরীক্ষার নামে অপব্যয় বন্ধ করে সরকার বিরাট বরাদ্দ বাঁচাতে পারে। হয়তো আমরা অনেকে টিএ, ডিএ বা সম্মানী থেকে বঞ্চিত হব। বিনিময়ে শিশু শিক্ষার্থীরা গড়ে উঠবে যোগ্যতাসম্পন্ন ভবিষ্যৎ নাগরিক হিসেবে। বিনিময়টা মন্দ হবে না। আশা করি সংশ্লিষ্টরা তা অনুধাবন করতে পারবেন।
মোঃ সিদ্দিকুর রহমান : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি

২০১৪: আত্ম-অনিশ্চয়তার বছর

(ইউক্রেনের গোলযোগপূর্ণ দনেতস্ক নগরে নতুন বছরের ছুটি কাটাতে জড়ো হয়েছে লোকজন। ছবিটি বৃহস্পতিবার তোলা। ২০১৪ সাল মোটেও ভালো কাটেনি তাদের। ছবি: এএফপি) যাই যাই করছে ২০১৪। সংকট, সন্ত্রাস, অঘটন, দুর্ঘটনা, ব্যাধিসহ নানা কারণে বছরটি আলোচিত। শেষ বেলায় এসে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলতে হয়, অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে কাটল বছরটি। বছরজুড়ে বিশ্ব রাজনীতি টালমাটাল ছিল ইউক্রেন-সংকট নিয়ে। এই সুবাদে আরেকবার স্নায়ুযুদ্ধের ছায়া দেখেছে বিশ্ববাসী। অঞ্চলটিতে মালয়েশিয়ার বিমান ভূপতিত হয়ে ২৯৮ আরোহী নিহত হলে সংকট রূপ নেয় শোকে। তবু ইউক্রেন অশান্ত। বছর পেরিয়ে আগামীতেও এই সংকটের রেশ রয়ে যাবে।
মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনসের এমএইচ৩৭০ বিমানটি নিখোঁজ হয় ৮ মার্চ। বিমানে ছিলেন ২৩৯ জন আরোহী। বিমানটি নিখোঁজ হওয়া নিয়ে রহস্য ঘনীভূত হয়েছে। অনেক তত্ত্ব-তালাশের পরও সেই রহস্যের কিনারা হয়নি। নিখোঁজ আরোহীদের জন্য এখনো অপেক্ষায় তাঁদের স্বজনেরা।
সন্ত্রাসবাদে এ বছর ব্যাপক রক্ত ঝরেছে। ইরাক ও সিরিয়ায় ভয়ংকর জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) উত্থান দেখেছে বিশ্ব। তারা রীতিমতো ‘খেলাফত’ পর্যন্ত ঘোষণা করেছে। অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা, গণহত্যা, নির্যাতন, বিদেশিদের শিরশ্ছেদসহ নানা ধরনের নৃশংস কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সবাইকে হতবাক করে দিয়েছে আইএস। গোষ্ঠীটিকে দমনে হিমশিম খাচ্ছে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট। আইএস নিয়ে উদ্বেগ রয়েই গেল।
আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদা, নাইজেরিয়ার বোকো হারাম, সোমালিয়ার আল শাবাব, আফগান তালেবান, পাকিস্তান তালেবান সারা বছরই খবরে ছিল। একের পর এক হামলা চালিয়ে নিরীহ মানুষের প্রাণ নিয়েছে তারা। সর্বশেষ ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের পেশোয়ারে সেনাবাহিনী পরিচালিত স্কুলে তালেবান হামলায় ১৩২ স্কুলশিশুসহ প্রায় দেড় শ মানুষ নিহত হয়।
জাতিগত ও বর্ণবাদী বিদ্বেষে কাতর ছিল বিশ্ব। কৃষ্ণাঙ্গ-শ্বেতাঙ্গ বিদ্বেষের চরম রূপ দেখে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে বেশ কয়েকজন কৃষ্ণাঙ্গের করুণ মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে বিক্ষোভে উত্তাল ছিল যুক্তরাষ্ট্র। তা ছাড়া দেশটির বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গুলিতে প্রাণহানির ঘটনা ছিল হৃদয়বিদারক। অন্যান্য দেশ থেকেও এ ধরনের সহিংসতার খবর এসেছে।
সারা বছরই ইবোলা ভাইরাসে তটস্থ ছিল পুরো বিশ্ব। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সাড়ে সাত হাজার মানুষের প্রাণ গেছে এই মরণঘাতী ভাইরাসের ছোবলে।
স্কটল্যান্ড, স্পেনের কাটালোনিয়া, হংকং প্রভৃতি স্থান থেকে স্বাধীনতার জন্য হাহাকার শোনা গেছে। এ বিদ্যমান শাসনকাঠামোয় বেড়েছে অস্থিরতা।
বিখ্যাত টাইম সাময়িকী ২০১৪ সালকে ‘সেলফি’ বছর হিসেবে অ্যাখ্যায়িত করেছে। বিবিসির আন্তর্জাতিক বিষয়াবলির সম্পাদক জন সিম্পসনের মূল্যায়নে এ ছিল এক উত্কণ্ঠার, অস্থিরতার বছর। ২০১৪ সালের সত্যিকারের সেলফি হলো—‘আত্ম-অনিশ্চয়তা’।

বিরোধী রাজনীতির নতুন চ্যালেঞ্জ by ফরহাদ মজহার

জানুয়ারির ৫ তারিখকে কেন্দ্র করে রাজনীতিতে সহিংসতা অনিবার্য হয়ে উঠেছে। ইতিমধ্যে বকশিবাজারের ঘটনা আমরা দেখেছি। গাজীপুরে বদরে আলম কলেজ মাঠে বিএনপির সভা ২৭ তারিখে, এদিন এই লেখাটি প্রকাশিত হওয়ার কথা। গতকাল সেখানে লাঠিমিছিল করেছে যুবলীগ ও ছাত্রলীগ। তারা ঘোষণা দিয়েছে, যে কোনো মূল্যে তারা এই সভা প্রতিহত করবে। একই দিনে একই জায়গায় তারা তাদের সমাবেশ করবে। বিএনপি আগেই অনুমতি চেয়েছে বলে মেয়র জানিয়েছেন, কারণ তাদের সভা হওয়ার কথা ছিল ২৩ তারিখ, সেদিন শেখ হাসিনা কাশিমপুর জেলের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন বলে তারিখ বদল করা হয়েছিল ২৭ ডিসেম্বর। তার জন্য অনুমতিও পেয়েছে। বিএনপি বলেছে, তারা যে কোনো মূল্যে ২৭ তারিখে গাজীপুরে সভা করবে। খালেদা জিয়া অবশ্য এর আগে স্পষ্ট বলেছেন, তার রাজনীতি হবে শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক। পত্রিকা থেকে জেনেছি, সাতাশ তারিখ সকালে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গুলশানের বাসা থেকে গাজীপুরে জনসভার উদ্দেশে রওনা হবেন। তার সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতারাসহ ঢাকা মহানগর বিএনপির কয়েক হাজার নেতাকর্মীও সঙ্গী হবেন। যেখানে বাধা আসবে, সেখানেই তারা সমাবেশ করবেন।
দলীয় নেতাকর্মীদের এই দিকনির্দেশনা মেনে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ক্ষমতাসীনদের সশস্ত্র হামলার মোকাবেলা বিএনপি কীভাবে করবে সেটাই এখন দেখার বিষয়।
ক্ষমতাসীনদের জন্য রাজনীতির এই পর্যায়ে বিএনপির কর্মসূচি সশস্ত্রভাবে মোকাবেলা ঝুঁকিপূর্ণ। বকশিবাজারের ঘটনা যারা ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন তারা জানেন যে বিএনপির দিক থেকে পাল্টা আক্রমণ হলে সাধারণ মানুষ বিএনপির পক্ষে জড়িয়ে পড়ত। একে সামাল দেয়া ক্ষমতাসীনদের পক্ষে সম্ভব হতো কিনা সন্দেহ। ক্ষমতাসীনদের দমন-পীড়ন, সহিংসতা ও রক্তপাত মানুষ পছন্দ করছে না। বিএনপি শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করে এটা মানুষ যেমন বিশ্বাস করে না, তেমনি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন-সংগ্রাম করে শেখ হাসিনার পতন ঘটানো যাবে, সেটাও মনে করে না। অভিজ্ঞতা সেটা বলে না। ফলে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা বিএনপি বর্তমান শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে দেশ ও দেশের মানুষকে মুক্তি দিক।
অথচ ক্ষমতাসীনরাও জানে বিএনপি শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করতে এখন বাধ্য। এর সুযোগও পুরা মাত্রায় তারা নেবে। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরাশক্তি বারবারই যে পরামর্শ তাদের স্বার্থের অনুকূল দলগুলোকে দিয়ে থাকে সেটা হল, আন্দোলন ক্ষমতাসীন বা ক্ষমতাবহির্ভূত যাদেরই হোক, রাজনীতি ও ক্ষমতা সাম্রাজ্যবাদের আশীর্বাদপুষ্ট দলগুলোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই থাকতে হবে। সাম্রাজ্যবাদের আশীর্বাদপুষ্ট রাজনৈতিক দলের বাইরে আন্দোলন উপচে পড়ুক এটা কোনো পরাশক্তি চাইবে না, তাদের নিজেদের মধ্যে আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব থাকলেও। উপচে পড়লে বাংলাদেশে বিরাট কিছু ঘটে যাবে, তা না। সাম্রাজ্যবাদের আশীর্বাদপুষ্ট দলগুলোর নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাজনৈতিক পরিমণ্ডল ও ক্ষমতার ভারসাম্যে যে অনিশ্চয়তা সেটা কোনো পরাশক্তিই নতুন করে মোকাবেলা করতে চায় না। তাছাড়া হাজার হোক ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাবহির্ভূত উভয় পক্ষেই তাদের দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ রয়েছে। অতএব আন্দোলন যেন কখনোই নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায় সেটা তারা কূটনৈতিকভাবে নিশ্চিত করতে সব সময়ই আগ্রহী। বিএনপির নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের উত্থান-পতন এই কূটনৈতিক চাপের দ্বারাই নির্ধারিত। এই দিকটি বোঝার দরকার আছে।
সারমর্মে কূটনৈতিক ফর্মুলা হচ্ছে, ক্ষমতাবহির্ভূত রাজনৈতিক আন্দোলন যেন নিছকই ক্ষমতা হস্তান্তরের আন্দোলনে সীমিত থাকে। ক্ষমতার চরিত্রে কোনো সংস্কার বা রূপান্তর দূরে থাকুক- কোনোভাবেই বর্তমান চরিত্রে কোনো হেরফের যেন না হয় সেটা নিশ্চিত করতেই সব পরাশক্তি আগ্রহী। যে কারণে পঞ্চদশ সংশোধনী সম্পর্কে তাদের কোনো অবস্থান নেই। আন্দোলন করতে গিয়ে মৌলিক পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম কোনো রাজনীতির জন্ম যেন না ঘটে। ফ্যাসিস্ট ক্ষমতার সংস্কার করে তাকে উদার গণতান্ত্রিক ক্ষমতায় রূপান্তরও বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এক বিশাল বৈপ্লবিক কাজ। প্রশ্ন হচ্ছে, এটা কি বিএনপির পক্ষে সম্ভব? উদার গণতন্ত্রকে গণশক্তিতে রূপান্তর তো আরও কঠিন ও দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামের ব্যাপার। কিন্তু সেটা তো পরের কথা। সহনশীল গণতান্ত্রিক পরিবেশ ছাড়া নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণভাবে জনগণের পক্ষে ইতিবাচক কিছু অর্জন অসম্ভব।
কূটনৈতিক পাড়ার অসম ফর্মুলা মেনে বিএনপি আন্দোলন করলে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির অবক্ষয় নিশ্চিত। ক্ষমতাসীনদের ক্যাডাররা বিএনপিকে শুধু সশস্ত্রভাবেই মোকাবেলা করছে না, তাদের হাতে প্রশাসন, পুলিশ, এমনকি বিচার বিভাগ রয়েছে বললেও অত্যুক্তি হবে না। এই পরিপ্রেক্ষিতে আন্দোলনে বিএনপি কি শুধু পাল্টা মার খেয়ে যাবে, নাকি নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম হবে সেটা আগাম বলা যাচ্ছে না।
বলাবাহুল্য, বল প্রয়োগ অবশ্যই রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য বিষয়। বিশুদ্ধ আহাম্মক ছাড়া এটা কেউই অবিশ্বাস করে না। এগুলো রাষ্ট্র গঠন ও রাজনীতির গোড়ার কথা। গণতান্ত্রিক কন্সটিটিউশন ও তার ওপর দাঁড়ানো একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন করা গেলে আইনের শাসন (অর্থাৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আইন ও বিচারব্যবস্থার শাসন), নিয়মতান্ত্রিকতা (অর্থাৎ নাগরিকদের গণতান্ত্রিক বিধিবিধান মেনে চলা), শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ইত্যাদি অর্থপূর্ণ হতে পারে। কারণ গণতন্ত্র কায়েম থাকা অবস্থায় নিয়ম না মানা বা সরকার ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বল প্রয়োগের অর্থ হচ্ছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও তার বিধিবিধানের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। কিন্তু যেখানে রাষ্ট্র নাগরিক অধিকার রক্ষার নীতি ও বিধানের ওপর দাঁড়ায় না, নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশকে লাঠি-গুলি দিয়ে দমন করে, বাক ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রুদ্ধ করে হত্যা-গুম-খুন যেখানে নিত্যদিনের কারবার, সেখানে রাজনীতি নির্ধারণ করতে সক্ষম যে কোনো পাল্টা বল প্রয়োগ গাঠনিক (constitutive) অর্থাৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য অবশ্যই দরকার। এটা বিএনপি করুক বা না করুক, যারা সমাজ, রাজনীতি, আইন, ইতিহাস ইত্যাদি বিজ্ঞান হিসেবে পাঠ করেন, তাদের কাছে পরিষ্কার। এখন বিএনপি কী করবে বা কী করতে সক্ষম সেটা তাদের ব্যাপার। খালেদা জিয়ার নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে আমরা কৌশলগত নাকি নীতিগত অবস্থান হিসেবে পাঠ করব সেটা আগামী দিনে বিএনপির রাজনীতি দেখেই আমরা বুঝব।
বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা থেকে যারা উত্তরণ চান তাদের কাছে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জটা পরিষ্কার। বৈপ্লবিক চিন্তা-ভাবনার আলোকে উদার গণতান্ত্রিক রাজনীতির পরিমণ্ডলে বাংলাদেশে সম্ভাব্য রাজনৈতিক সংস্কার কোথায়, কীভাবে করতে হবে এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক শক্তির পরিমণ্ডলে নিজের অবস্থান বোঝাতে কীভাবে আমরা সক্ষম হব সেই পথের সন্ধানই সঠিক পথ। বাংলাদেশের বৈপ্লবিক রূপান্তরের স্বপ্ন আমাদের দেখতে হবে। তরুণদের তো অবশ্যই। এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু বিপ্লবের নামে কোনো অবাস্তব ও গণবিচ্ছিন্ন রাজনীতির দিবাস্বপ্ন আমাদের কোথাও নেবে না। কুয়ার মধ্যে পড়া ছাড়া। নজর মাটির দিকেই রাখতে হবে, আকাশে না। যে রাজনীতি বা যে চিন্তা বাস্তবায়নের বাস্তব পদক্ষেপ আমাদের জানা নেই বা আমরা ভাবতে সক্ষম না, সেই চিন্তা শিশুর হাতে বেলুন দিয়ে সুতা ধরে রাখার কোনো অর্থ নেই। এটা ফাটবেই। একে ছেড়ে দিন, উড়ে যাক। যে চিন্তার সঙ্গে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সম্পর্ক রচনা কঠিন বা অসম্ভব তেমন বিমূর্ত বাসনাকে চেনা ও পরিহার করাই এখনকার কাজ।
বৈপ্লবিক চিন্তা-ভাবনা এবং বাস্তব অবস্থায় বাস্তবিক পদক্ষেপ হিসেবে তাকে প্রয়োগের শিক্ষা আমাদের দরকার। সেই পদক্ষেপ সংস্কারমূলক বা বিপ্লবী কিনা সেটা হাওয়াই স্লোগান দিয়ে বোঝা যাবে না। কংক্রিট বাস্তব চিন্তা ও পদক্ষেপ দেখেই সাধারণ মানুষ চিনবে। কিন্তু বাস্তব চিন্তা ও কর্মসূচি বইপুস্তকে পাওয়া যাবে না। বাস্তবতার বিচার করেই তা নির্ণয় করতে হবে। শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের সমস্যা সমাধানের জন্য ছয় দফা দিয়েছিলেন। এটা তো কোনো বিপ্লবী দাবি ছিল না। অথচ সেটাই সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের রূপ নিয়েছে। কী করে উদার ও সংস্কারবাদী দাবিও বৈপ্লবিক হয়ে ওঠে তার শিক্ষা নিজেদের ইতিহাস থেকেই আমাদের গ্রহণ করতে হবে।
দুই
শেখ মুজিবুর পাকিস্তান ভাঙতে চাননি; এ কথা বহু বছর আগে বলে আমি নিন্দিত হয়েছি। তিনি মুসলিম লীগ করেছেন, পাকিস্তানের জন্য লড়েছেন। অথচ সেই মুজিবুরই স্বাধীন পাকিস্তানে বাঙালি হওয়ার জন্য লড়েছেন, ইসলাম বা মুসলমান হিসেবে তার ইতিহাস ও পরিচয় ভুলে গিয়ে নয়। এটাও জানতেন কলকাতার উচ্চ বর্ণের বাঙালির কাছে মুসলমানরা বাঙালি বলে স্বীকৃত ছিল না। ইতিহাসের বিচিত্র প্রহসন যে মুসলমানকে রক্ত দিয়ে বাঙালি হতে হয়েছে। জন্মসূত্রে তারা এই রাজনৈতিক পরিচয় লাভ করতে পারেনি। তার অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়ে আরও অনেক কিছুই অনেকে এখন বুঝতে শিখছেন। শেখ মুজিবুর রহমান তাজউদ্দীনের রাজনীতি করেননি। তাজউদ্দীন তাকে জোর করলেও তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। সবচেয়ে দূরদর্শিতা দেখিয়েছেন, নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির বিধিবিধান মেনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে স্বেচ্ছায় ধরা দিয়ে। আমি সব সময়ই তার এই দূরদর্শিতার প্রশংসা করেছি। নিজেকে তিনি লেনিন, মাও সে তুং বা হো চি মিন মনে করেননি। মুসলিম লীগ করা ও সোহরাওয়ার্দীর কাছে পার্লামেন্টারি রাজনীতির শিক্ষা পাওয়া শেখ মুজিবই মনে করেছিলেন। ধরা দেয়ার সময়ও তার চিন্তা ও রাজনীতি নিজের চিন্তা-ভাবনার বাইরে যায়নি। শাসক হিসেবেই তার চিন্তার সীমাবদ্ধতা ধরা পড়তে শুরু করে। বাকশালী মুজিবের ইতিহাস ভিন্ন ইতিহাস।
তো আমাদের শিখতে হবে নিজেদের ইতিহাস থেকেই। শেখ মুজিবুর রহমান ভারতের জনগণের সমর্থন ও সহায়তা চেয়েছেন, কিন্তু দিল্লির দাসত্ব মেনে নেননি। শেখ হাসিনা তার পিতার রক্ত বহন করতে পারেন, কিন্তু তার রাজনীতির উত্তরাধিকারী নন। তিনি দিল্লির দাসত্ব মেনে ক্ষমতায় আছেন এবং মতাদর্শিকভাবে তাজউদ্দীনের পেটি বুর্জোয়া সমাজতন্ত্রী, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্রের রাজনীতি করছেন। যে কারণে তার মন্ত্রিসভায় শেখ মুজিবুরের অনুসারীদের চেয়েও তথাকথিত পেটি বুর্জোয়া বামপন্থীদেরই দৌরাত্ম্য বেশি। তিনি নিজেকে নিজে লজ্জায় ফেলে দিয়েছেন।
বৈপ্লবিক চিন্তা-ভাবনার আলোকে উদার গণতান্ত্রিক রাজনীতির পরিমণ্ডলে বাংলাদেশে সম্ভাব্য রাজনৈতিক সংস্কার ও কর্মসূচি কী হতে পারে সে ব্যাপারে ব্যাপক আলাপ-আলোচনাই এখনকার কাজ। সেই রাজনীতি অন্বেষণই ফ্যাসিবাদবিরোধী সবার কর্তব্য। শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের ইতিহাস যারা জানেন তারা সবাই শেখ হাসিনার হাতে গড়া বর্তমান ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থাকে মেনে নিয়েছেন, এটা আমি মনে করি না। কিন্তু তারা আওয়ামী লীগের সমর্থক বলে প্রকাশ্যে কিছু বলছেন না। অন্যদিকে বিএনপি এমন কোনো নীতি বা কর্মসূচি হাজির করেনি যাতে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে সব নাগরিক ঐক্যবদ্ধ হতে পারে বা বিরোধী রাজনীতির পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থন গড়ে ওঠে। সোজা কথায় ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিএনপির ছয় দফা-জাতীয় কোনো সংস্কারমূলক কর্মসূচি নেই। এখানেই বিএনপির বিশাল বিপদের জায়গা।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সহিংসতা নতুন কোনো ঘটনা নয়। বোঝা দরকার, সশস্ত্র রাজনীতি বা সহিংসভাবে প্রতিপক্ষের সহিংসতা মোকাবেলায় বিশ্বাসী রাজনৈতিক কোনো দল নিয়ে আমরা কথা বলছি না। আমরা কথা বলছি সেই দলটিকে নিয়ে যারা গণতন্ত্রের কথা বলে। বাংলাদেশে গণতন্ত্র সাংবিধানিক, রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে পারেনি। কেন পারেনি? সেটা কি কোনো তথাকথিত অগণতান্ত্রিক রাজনীতি বা শক্তির কারণে? মোটেও না। তাদের কারণেই গণতন্ত্র আজও সোনার হরিণ, যারা গণতন্ত্রের কথা বলতে গিয়ে মুখে ফেনা তুলে ফেলে। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে তারা বাকশাল কায়েম করে, একদলীয় শাসন কায়েম করতে গিয়ে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে দেশের সংবিধানকে নিজ দলের দলিলে পরিণত করে। পঞ্চদশ সংশোধনী এ অবিশ্বাস্য উদাহরণ। গণবিরোধী, গণতন্ত্রবিরোধী ও সশস্ত্র আওয়ামী লীগ তাদের কব্জায় থাকা রাষ্ট্রের সমূহ সশস্ত্র শক্তি ব্যবহার করে ক্ষান্ত থাকে না; রামদা, লগিবৈঠা, পিস্তল, কাটাবন্দুক মায় স্টেনগানসহ রাস্তায় সবার চোখের সামনে সশস্ত্রভাবে প্রতিপক্ষকে মোকাবেলা করে। রক্ত ঝরায় এবং প্রকাশ্যে রাস্তায় লাশ ফেলতে দ্বিধা করে না। ফলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ যদি বলে যে তারা বিরোধী দলকে যেভাবেই হোক প্রতিহত করবে, তারা লগিবৈঠা, লাঠি-বন্দুক যেভাবেই হোক করবেই, তখন তারা ভয় দেখানোর জন্য বলে না। শেখ হাসিনার সামনে সশস্ত্রভাবে বিরোধী দলকে মোকাবেলা করা ছাড়া সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই। তিনি রাজনীতিকে বারুদ, রক্তপাত ও লাশের স্তরে নিয়ে এসেছেন। এই পথ থেকে তার ফিরে যাওয়ার কোনো পথ দেখা যাচ্ছে না। অন্তত আমি দেখছি না। শেখ হাসিনা জানেন একটি দুর্বল বিরোধিতাও তাকে যে কোনো মুহূর্তে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে। তিনি বিরোধীদলীয় কোনো কর্মকাণ্ডই তাই করতে দেবেন না। বাধ্য না হলে।
এই পরিস্থিতিতে বিএনপি কী করে, বা কী করতে সক্ষম সেটাই এখন দেখার বিষয়।

শিশুটির সন্ধান মেলেনি, চলছে অভিযান

রাজধানীর শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনির মৈত্রী সংঘ মাঠের কাছে রেলওয়ের পানির পাম্পের পাইপের মধ্যে শিশুর পড়ে যাওয়া নিয়ে সংশয় আরও বেড়েছে। রাতভর অভিযানের পর আজ শনিবার সকালেও চলছে উদ্ধার অভিযান। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, উদ্ধার অভিযান চলবে। তবে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত শিশুটির সন্ধান মেলেনি।ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) মেজর শাকিল নেওয়াজের ভাষ্য, তাঁরা এখন পাইপের ভেতরে ময়লা পরিষ্কার করে ভেতরে কিছু আছে কি না, তা খুঁজে দেখার চেষ্টা করছেন। তাঁর ভাষ্য, পাইপের ভেতরে আবার দুই ইঞ্চি পাইপ ছিল। সেখান থেকে কিছু খুঁজে বের করা খুব কষ্টসাধ্য। সব ধরনের চেষ্টাই করা হচ্ছে। যতক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব অভিযান চলবে। নতুন আরেকটি যন্ত্রও ভেতরে ঢোকানো হচ্ছে বলে তিনি জানান।
শিশু জিহাদের বাড়ি ওই পানির পাম্পের পাশেই। এ/৪০ নম্বরের ওই বাড়ির দোতলায় সাবলেটে থাকে তারা। জিহাদরা তিন ভাইবোন। বড় মেয়ে স্বর্ণা (১৩), মেজো ছেলে ঈশান (৬) ও সবচেয়ে ছোট জিহাদ (৪)। প্রথম আলোকে দেওয়া মা খাদিজা আক্তারের ভাষ্য, গতকাল দুপুরে ভাত খেয়ে দুই পাশে দুই ছেলেকে নিয়ে তিনি ঘুমিয়েছিলেন। ঘরের দরজা খোলা ছিল। বিকেলে ঘুম থেকে উঠে দেখেন জিহাদ পাশে নেই। ছেলের শোকে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন তিনি।
রেলওয়ের ওই পানির পাম্পের পাইপের পাশে আরেক জায়গায় গর্ত খুঁড়ে পানির পাইপ বসানোর কাজ চলছে। বেলা ১১টার দিকে প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে সাড়ে ১১টার দিকে ঘটনাস্থলের পাশের বাড়ির বাসিন্দা ফাতেমা নামে এক কিশোরী জানায়, সে ব্যাডমিন্টন খেলছিল। খেলার একপর্যায়ে কর্ক পানির পাম্পের পাইপের পাশে পড়ে যায়। আনতে গেলে সে পাইপের ভেতরে কী যেন পড়ার শব্দ শোনে। সে শুনতে পেয়েছে, ‘বাঁচাও মা’। মতিঝিলে পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) আনোয়ার হোসেনের ভাষ্য, জিহাদের বাবা নাসির উদ্দিনকে নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশের হেফাজতে রাখা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) মেজর শাকিল নেওয়াজ বলেন, চার বছরের শিশু জিহাদ পড়ে যাওয়ার ঘটনার কোনো প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া যায়নি। ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়ার আগেই সেখানে উৎসুক মানুষের ভিড় জমে। শিশুটিকে উদ্ধারের জন্য তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ কাঠ, দড়ি নানা জিনিস ফেলেন।
পাইপটি কতটা গভীর জানতে চাইলে শাকিল নেওয়াজ বলেন, এখন পর্যন্ত তাঁরা সঠিক গভীরতা জানেন না। পাইপটির গভীরতার ব্যাপারে ওয়াসাও কোনো সঠিক তথ্য দিতে পারেনি। ঘটনার পর আশপাশে থাকা ওয়াসার পাম্পের কর্মকর্তাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে তিনি দাবি করেন। তবে তাঁদের ক্যামেরার কেব্‌ল ৩০০ ফুট গভীর পর্যন্ত গিয়েছিল। এর মধ্যে কোনো কিছুর সন্ধান পাওয়া যায়নি।
ফায়ার সার্ভিসের উপ সহকারী পরিচালক (ডিএডি) আব্দুল হালিম বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সাংবাদিকদের জানান, তাঁরা পাইপের ২৪৫ ফুট গভীর পর্যন্ত ক্যামেরা দিয়ে তল্লশি চালিয়েছেন। সেখানে ভিকটিমের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। শিশুটি না থাকার সম্ভাবনাই বেশি। উদ্ধারকাজে পুলিশের মেকানিক্যাল টিমের একজন এসেছেন বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর দাবি, দেশিয় প্রযুক্তি দিয়ে অনেকে উদ্ধারকাজ চালাতে চাইছে। ফায়ার সার্ভিস তাদের সহায়তা করছে।
গতকাল শুক্রবার বিকেল চারটার দিকে জিহাদের গভীর পাইপে পড়ে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে। খেলতে গিয়ে সে ওই পাইপে পড়ে যায়। ঘণ্টা খানেকের মধ্যে শুরু হয় শিশুটিকে উদ্ধারের তৎপরতা। এরপর প্রায় রাতভর চলে এই অভিযান।
সন্ধ্যা ছয়টার দিকে উদ্ধারকারী দলের একজন জানান, শিশুটি পাইপের ভেতর থেকে সাড়া দিচ্ছে। তার জন্য পাঠানো হয় খাবার ও পানি। পাইপের মধ্যে দেওয়া হয় অক্সিজেন। এরপর থেকে উদ্ধার তৎপরতা নিয়ে পাওয়া যায় একের পর এক বিভ্রান্তিকর তথ্য। রাত পৌনে তিনটার দিকে গর্তে পাঠানো ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ দেখে পাইপের মধ্যে আদৌ কোনো শিশু পড়েছে কি না, এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন উদ্ধারকর্মীরা। কেউ কেউ বলতে থাকেন, এটি গুজব। তবে অভিযান চলতে থাকে। রাজনৈতিক উত্তাপসহ সব আলোচনা ছাপিয়ে প্রধান হয়ে ওঠে এ ঘটনা। দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে উৎকণ্ঠা। ঘটনাস্থলের আশপাশে জড়ো হওয়া শত শত মানুষ প্রার্থনা করতে থাকে শিশুটির জন্য। রেলওয়ে পাম্প থেকে প্রায় ১০০ গজ দূরে রেলওয়ে কলোনির একটি বাড়ির দোতলার একটি কক্ষে পরিবারের সঙ্গে থাকে জিহাদ। তার বাবা নাসির উদ্দিন মতিঝিলের একটি বিদ্যালয়ের নিরাপত্তাকর্মী। দুই ভাই, এক বোনের মধ্যে জিহাদ সবার ছোট।

লাল মসজিদের খতিবের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা- নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত পেশোয়ার হামলার সংগঠক

পাকিস্তানের পেশোয়ারে সেনাবাহিনী পরিচালিত স্কুলে ভয়াবহ হামলার সংগঠক জঙ্গি কমান্ডার নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন। এদিকে ওই হামলার পর সুশীল সমাজের করা এক মামলার প্রেক্ষাপটে আলোচিত লাল মসজিদের খতিব মাওলানা আবদুল আজিজের বিরুদ্ধে গতকাল শুক্রবার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। খবর ডনের। নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে নিহত জঙ্গি কমান্ডারের নাম সাদ্দাম। তিনিই পেশোয়ারের আর্মি পাবলিক স্কুলে ভয়াবহ হামলায় অংশ নেওয়া সাত জঙ্গিকে সংগঠিত করেছিলেন। জঙ্গিগোষ্ঠী তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) এই গুরুত্বপূর্ণ নেতা বৃহস্পতিবার খাইবার এলাকায় এক অভিযানে নিহত হন। খাইবারের কর্মকর্তারা গতকাল শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, টিটিপি কমান্ডার সাদ্দাম বৃহস্পতিবার রাতে খাইবারের জামরুদ শহরে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত হয়। ঘটনার সময় তাঁর একজন সহযোগীকে আহত অবস্থায় পাকড়াও করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, সাদ্দাম ২০১৩ সালে খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে পোলিও টিকা কর্মী দলের ওপর হামলা, স্কাউটের আট সদস্য এবং অনেক উপজাতি নেতার হত্যার ঘটনায় মূল পরিকল্পনা বা কোনোভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন।
এদিকে আদালত সুশীল সমাজের আবেদন মঞ্জুর করে গতকাল ইসলামাবাদের লাল মসজিদের খতিব আবদুল আজিজের বিরুদ্ধে জামিন-অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। খতিব পেশোয়ারের স্কুলে জঙ্গি হামলার ঘটনার নিন্দা জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সেনা অভিযানকে তিনি অনৈসলামিক আখ্যাও দিয়েছেন। সুশীল সমাজের কর্মীরা মসজিদটির বাইরে বিক্ষোভ করেছিলেন। পরে তাঁরা খতিবের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ঘটনার তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতের কাছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করে। তবে গ্রেপ্তার প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছেন লাল মসজিদ শুহাদা ফাউন্ডেশনের মুখপাত্র হাফিজ এহতিশাম। তিনি বলেন, বিভিন্ন ঘটনায় রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলেও তাঁদের তো ধরা হচ্ছে না। তাই এ ধরনের পদক্ষেপ প্রতিহত করবেন মাওলানা আজিজ।
প্রধানমন্ত্রীর কমিটি গঠন: সন্ত্রাস দমনের জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে গতকাল একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছেন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ। এক বৈঠকের পর তিনি বলেন, বড় নগরগুলোতে জঙ্গিবিরোধী আরেকটি অভিযান শুরু করা হবে। পাশাপাশি ইসলামাবাদে বুধবার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের যৌথ বৈঠকে গৃহীত সন্ত্রাসবাদবিরোধী ২০ দফা জাতীয় কর্মপরিকল্পনার আওতায় কাজ শুরু করে দিয়েছে সেনাবাহিনী।

গুরু ‘চুমু বাবা’ গ্রেপ্তার!

ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের কডাপ্পা জেলায় ‘চুমু বাবা’ বলে পরিচিত এক গুরুকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত বৃহস্পতিবার রাতে কডাপ্পা জেলার আয়াপ্পা মন্দিরের পেছনে একটি ঘর থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই সঙ্গে সুভাষ রেড্ডি নামে তাঁর এক সহযোগীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মন্দিরের পেছনের ওই ঘরে বসেই তিনি ভক্তদের জড়িয়ে ধরে চুমু দিয়ে আশীর্বাদ করতেন। গতকাল শুক্রবার চুমু বাবাকে আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাঁকে বিচার বিভাগীয় হেফাজতে রেখে মানসিক চিকিৎসা করানোর সুপারিশ করেছেন।
পুলিশ জানায়, ভক্তদের যেকোনো সমস্যায় চুমু বাবাকে ভক্তদের পাশে পাওয়া যেত। কোনো রোগ বা অন্য কোনো সমস্যা নিয়ে কোনো নারী তাঁর কাছে গেলে তিনি তাঁকে জড়িয়ে ধরে চুমু দিতেন। আর এই চুমুতেই সেই রোগ বা সমস্যার সমাধান হবে বলে দাবি করতেন তিনি। কিন্তু পুরুষদের বেলায় ছিল তাঁর ভিন্ন পদ্ধতি। নারীদের জড়িয়ে ধরে চুমু দিলেও পুরুষদের সমস্যায় শুধু একটি লেবু দিয়েই তাঁদের বিদায় করে দিতেন। আর তাঁর এসব কাজের প্রচার করতেন সুভাষ রেড্ডি। চুমু বাবার এই ভণ্ডামি নিয়ে স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করার পর একটি টেলিভিশন চ্যানেলে নারী ভক্তদের জড়িয়ে ধরা ও চুমু দেওয়ার দৃশ্য প্রচার করা হয়। এরপরই অভিযান চালিয়ে ওই ভণ্ড চুমু বাবাকে গ্রেপ্তার করা হয়।