Saturday, July 6, 2024
মুক্তিযুদ্ধের গল্প- খুকী by আন্দালিব রাশদী
![]() |
| অলংকরণ: মাসুক হেলাল |
খুব নোংরা একটা কথা হজম করতে হলো মাকে। এমন ধিঙ্গি মেয়েটাকে ছাতার মাথা কী পড়াচ্ছ—মেয়ে কবে জজ-ব্যারিস্টার হবে তারপর ভাড়ার টাকা শোধ করবে! ধিঙ্গিটার পেছনে যে টাকা খরচ করো, সেটা বন্ধ রাখলেও এক মাসের ভাড়া শোধ করতে পারতে। বরং রাস্তায় নামিয়ে দাও, প্রতি রাতে পাঁচ-দশ টাকা তো কামাবে। এ রকম মেয়ের রেট ভালো।
এমন চাপের মুখে আমার মায়ের চোখ ছলছল করতে থাকে।
আমিই এগিয়ে গিয়ে বলি, খালাম্মা, দু-এক দিনের মধ্যে টাকা দিয়ে দেব, বাবা আমাদের গ্রামের একটা জমি বেচতে গেছেন।
আমার কথায় তিনি আরও চটে গিয়ে বললেন, পাছার নাই ছাল, কোন জমিদারের...(কথাটা ছালের সঙ্গে মিল দিয়ে বলা, কিন্তু লেখা যাবে না, সমস্যা আছে)!
তিনি দাঁত কিড়মিড় করে বললেন, নামের কী বাহার। জান্নাতুল ফেরদৌস। এমন পাইলা-কালা গায়ের রঙের মেয়ে তো জাহান্নামেও খুঁজে পাওয়া যাবে না—তার নাম জান্নাতুল ফেরদৌস। আবার গানও গায়। গত মাসেই তো বলেছি, প্যাঁ-পো করার যন্ত্রটা বেচে দিলেও ভাড়ার টাকা শোধ করা যায়। নাকি ভুল বললাম?
তিনি আমাদের উঠানে একদলা থুতু ফেলে আঙুল উঁচিয়ে বললেন, ৩১ তারিখের মধ্যে ভাড়া শোধ না করতে পারলে তোদের সবার নেংটি খুলে রাস্তায় বের করে দেব।
তাঁর ক্ষোভ আমার প্যাঁ-পো করার যন্ত্র হারমোনিয়ামটার ওপর। তেজগাঁও পলিটেকনিক স্কুলের পরিমল স্যারের এক কাঁধে ঝোলা সব সময়ই থাকত, পায়ে জুতো-স্যান্ডেল কেউ দেখেনি, ভারী হারমোনিয়ামটা অন্য কাঁধে নিয়ে আমাদের বাসায় এলেন। বাসা মানে ভাড়া বাসাটা—রাজাবাজার মসজিদ থেকে খানিকটা উত্তরে গিয়ে একটা পাকা কবরের পাশ দিয়ে পশ্চিমে।
পরিমল স্যার বললেন, তোর গানের গলা ভালো। এটা দিলাম। আমি যে এনেছি, আমার টাকাপয়সা লাগেনি। এক ছাত্রীর বাড়িতে দেখলাম যন্ত্রটা ধুলোতে ঢাকা পড়ে আছে। বললাম, নিই। ছাত্রীর মা বলল, আচ্ছা।
আমি সত্তরে সেকেন্ড ডিভিশনে স্কুল ফাইনাল পাস করেছি, পাঁচ শ আশি। ফিফটি এইট পার্সেন্ট। আমরা বলি হায়ার সেকেন্ড ক্লাস। স্কুলের নাম নাজনীন হাইস্কুল, আমি ছিলাম মর্নিং শিফটে।
হেসেখেলে ইডেন কলেজে ভর্তি হয়ে গেলাম। কিন্তু ক্লাসের দেখা নেই। একটা কিছু চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত ক্লাস হওয়ার সম্ভাবনা নেই। চূড়ান্ত মানে—ক্ষমতা যাবে শেখ সাহেবের হাতে।
মা বাবাকে বললেন, অবশ্য খুকীর গায়ের যে রং, কে বিয়ে করবে? আর আপনারও তো এমন কোনো রাজত্ব নেই জামাইকে অর্ধেক রাজত্বের জায়গিরদার বানিয়ে রাখবেন। ঘরে একটা বাড়তি রুমও নেই যে ঘরজামাই করবেন।
বাবা বলেন, সবুর করো, টিয়া। যার পাঁজরের হাড় দিয়ে আমার খুকী তৈরি হয়েছে, তাকে তো আসতে হবে। আদমের হাড়ে হাওয়া। আমার হাড়ে টিয়া।
আপনার পাঁজরে কয়টা হাড়? আমার বোন ময়নাকে দিলেন, আমি পেলাম। আমাকেও জিনের আছরের কথা বলে পাগল বানিয়ে বাড়িছাড়া করবেন? আধা হাত লম্বা ঝামা লোহার গজাল গনগনে আগুনে লাল করে আপনার চোখের মণি বরাবর ঢুকিয়ে দেব।
আমার মায়ের নাম ময়না, তার গায়ের রং ছিল কালো। তিনি আমার বাবা শহিদুল্লাহ মিয়ার প্রথম স্ত্রী। আমি মায়ের গায়ের রংটা পেয়েছি। আমার বয়স দুই ছোঁয়ার আগেই আমার মায়ের ওপর জিনের আছর হয়। মাথার কাপড় ফেলে গলা ছেড়ে গান ধরে। মাথায় আউলা লেগে যায়, স্বামীর গালে চড় মারে, ইমাম সাহেবের পড়া-পানি ফেলে দেয়, ব্লাউজ খুলে শাড়ি ছেড়ে দেয়। হুজুরের পরামর্শে জং ধরা শিকলে মাকে বেঁধে রাখা হয়। শিকল নিয়েও মা গান ধরে: ‘নিসাধামাপানিসারেগা/গারে পাখি গা/সোনার খাঁচা দেব, সোনার শেকল দেব সোনায় ভরিয়ে দেব গা।’
মাথাটা যখন আরও আউলে যায়, অমাবস্যার রাতে সবার অলক্ষ্যে আমার মা শিকলসহ ঘর ছাড়ে। অনেক খোঁজখবর করা হয়েছে, ভালোমন্দ কোনো সংবাদই আসেনি।
কালো মেয়ে গছিয়ে দিয়ে শহিদুল্লাহকে ঠকানো হয়েছে, এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ফরসা মেয়ে টিয়াকে তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়। সেই টিয়াও তিন ছেলে এক মেয়ের মা।
স্কুলের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আমি একবার গেয়েছিলাম লতা মঙ্গেশকরের গাওয়া একটি গান: ‘আকাশ প্রদীপ জ্বলে দূরের তারার পানে চেয়ে/আমার নয়ন দুটি শুধুই তোমারে চাহে/ব্যথার বাদলে যায় ছেয়ে...।’
হারমোনিয়াম বাজিয়েছিলেন লুবনা ম্যাডাম। গান শেষ হতেই যখন ওয়ান মোর ওয়ান মোর রব উঠেছিল, তখন গেয়েছিলাম রেডিওতে শোনা গান: ‘আকাশের ওই মিটিমিটি তারার সাথে কইব কথা/নাই বা তুমি এলে...।’
পরিমল স্যারও নিশ্চয়ই আমার গান শুনেছিলেন। অনুষ্ঠানের শেষে আমাকে ডেকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, বাড়িতে হারমোনিয়াম আছে? বাজাতে পারো?
আমার দুটো জবাবই না।
পরদিনই এক কাঁধে উঠিয়ে হারমোনিয়ামটা আমাকে দিয়ে গিয়েছিলেন।
-----২.-----
গ্রামের বাড়ি থেকে বাবা খালি হাতে ফিরে এসেছেন। জমি বেচতে পারেননি, মানুষের হাতে তেমন পয়সাকড়ি নেই। তিনি নিজেও চাকরিতে নেই তিন মাস ধরে। সাসপেন্ডেড। তাঁকেও অপেক্ষা করতে হচ্ছে কবে শেখ সাহেব টেক-ওভার করবেন, তার আগে ন্যায়বিচার পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
বাড়িওয়ালার স্ত্রী শাসিয়ে গেলেন বাবাকে, বেশ্যা মেয়েটাকে আমার মহসিনের পেছন লেলিয়ে দিয়েছেন নাকি?
বাড়িভাড়া বকেয়া না থাকলে আমিই কথা শুনিয়ে দিতাম। মহসিন তো মেট্রিকই পাস করেনি। অশিক্ষিত গুন্ডা। তেজগাঁও থানায় তার বিরুদ্ধে চুরি-রাহাজানির মামলাও আছে। তার চেহারাও যেমন, বাম চোখটা ট্যারা, গালে চাপাতির কোপের দাগ।
একদিন বাইরে থেকে জানালার পর্দা উঠিয়ে মহসিন বলল, গলা তো ভালোই। কুসুম গরম পানিতে খাঁটি মধু মিশাইয়া খাইবা।
আমি থ হয়ে গুন্ডাটার দিকে তাকিয়ে থাকি। এত কিছু জানে!
গুন্ডা বলে, কেউ কিছু কইলে আমারে জানাইবা, তার মায়রে বাপ, মাছ মার্কা চাক্কু দিয়া পেট ফাসাইয়া দিমু।
পরদিন জানালার পর্দা সরিয়ে আধসেরি বোতলের এক বোতল মধু টেবিলের ওপর রেখে বলে, খাঁটি মধু, সর্ষে ফুলের।
একদিন গুন্ডাটা নাজনীন স্কুলের সামনে আমাকে আটকে হাতে একটা ছোট খাম ধরিয়ে দিলে কাঁপতে থাকে আমার হাত-পা। আমি জানি ভেতরে নোংরা চিঠি আছে, ও তো আজেবাজে কথা বলে, মেয়েদের শরীরের গোপন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ছবিও এঁকেছে নিশ্চয়ই। ছেলেরা বদমাশই হয়।
সম্বোধনহীন একটা চিঠি:
মাকে ঠান্ডা করতে ২০০ টাকা দিলাম। তিন মাসের ১৮০ টাকা দিয়ো। ২০ টাকা তোমার। তোমার মা-বাবাকে বলবে, পরিমল স্যার দিয়েছেন। এক গ্লাস কুসুম গরম পানিতে তিন চামচ মধু, প্রতিদিন খাবে।
আমি বাবার হাতে পুরো ২০০-ই দিই, পরিমল স্যার দিয়েছেন। আত্মসম্মানে লাগলেও বাড়িওয়ালার স্ত্রীর চেহারা মনে করে টাকাটা হাতে নিয়ে বাবা বললেন, পরিমলবাবুকে বলিস মাস দুয়েক পর দিয়ে দেব।
পঁচিশের রাতে অবিরাম গোলাগুলি ও গনগনে আগুনে ঢাকা শহরের চেহারা বদলে গেল। মানুষ পালাচ্ছে। যুবকেরা গুলিবিদ্ধ হচ্ছে, তরুণী শিকার হচ্ছে ধর্ষণের।
মার্চের ২৭ তারিখে যখন কারফিউ শিথিল হলো, বাবা সবাইকে গ্রামে রেখে আসতে চাইলেন। আমি গো ধরি, যাব না।
আমি বলি, আমার মতো এমন কালো মেয়েকে কেউ ছুঁয়েও দেখবে না, পাকিস্তানি আর্মিও না।
আমার গোঁয়ার্তুমির কাছে বাবা পরাস্ত হলেন। গ্রামে তাঁর একটা ভিটে ছাড়া আর কিছুই নেই, জমিজমাও না। বেঁচে থাকতে হলে তো কিছুই কামাই লাগবে, গ্রামে কে খাওয়াবে?
গুন্ডাটা বাবাকে শোনায় আশার বাণী: কার কত বড় বুকের পাটা, মহসিনের বাড়িতে এসে মেয়েমানুষের গায়ে হাত দেয়! হাত কাইটা পেটের ভেতর ঢুকাইয়া দিমু।
২৮ মার্চ মতিঝিলের আল্লাওয়ালা বিল্ডিংয়ে ভীরু পায়ে নিজের অফিসে ঢুকে বাবা শোনেন অবাঙালি বস গতকালই তাঁকে মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন, বকেয়া বেতন দেওয়ার আদেশ হয়েছে।
থমথমে ঢাকা শহরে খালি পায়ে হাঁটা পরিমলবাবুকে সামনে পেয়ে বাবা বললেন, মে মাসে আপনার টাকাটা শোধ করে দেব।
বিদঘুটে শব্দ করে তিনি বললেন, কিসের টাকা?
কথা না বাড়িয়ে বাবা বাড়ি ফিরে এলেন।
-----৩.-----
জানালার পর্দা তুলে ট্যারা মহসিন একবার বলল, সময় খারাপ। সময় ভালো হইলে এই গানটা গাইবা, বুঝলা—এই গানটা আমার। একটা চিরকুট ছুড়ে দিয়ে গুন্ডাটা চলে যায়।
আমি ভাঁজ খুলে একটি পুরো গানই পাই। গানের মুখটা এমন: ‘তুমি সুন্দর যদি নাহি হও/বলো কি বা তাতে যায় আসে/প্রিয়ার কি রূপ সেই জানে/ওগো যে কখনো ভালোবাসে।’
আমার শরীরের সব প্রাণশক্তি শুষে নেয় ওই ট্যারা মহসিন গুন্ডা। আমি ‘না’ বলতে পারি না, মাথা তুলে পারি না দাঁড়াতে, তার ইশারার দাসানুদাস হয়ে পড়ি।
শেষ পর্যন্ত গুন্ডাটার সঙ্গে আমি এক রিকশায়। সোজা লালবাগ—কাজি অফিস।
কাজি সাহেব আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, কত টাকার কাবিন সাব্যস্ত?
বিড়বিড় করে বললাম, আমি কাবিনের টাকা চাই না।
আহাম্মক আওরাত! অন্তত ১০ হাজার টাকা তো বলবে।
মহসিন বলল, কিসের ১০ হাজার? লিখখ্যা দেন এক লক্ষ এক টাকা।
এর নামই না মর্দ, আলহামদুলিল্লাহ।
ফেরার পথে হুড ওঠানো রিকশায় আমার হাত ধরে রাখে গুন্ডাটা। বাসা থেকে খানিকটা দূরে যখন রিকশা থেকে নামি, আমার হাতে একমুঠো টাকা গুঁজে দেয় মহসিন। মিষ্টি করে শুদ্ধ ভাষায় বলে, এখন থেকে তোমার ভরণপোষণের সব দায়িত্ব আমার।
কায়েদে আজমের ছবিওয়ালা বড় নোট। এক দুই তিন...আঠারো। এত টাকা!
হাবিব ব্যাংকে একটা অ্যাকাউন্ট করে ফেল।
টাকা লাগবে না। দরকার হলে আমি চেয়েই নেব।
আবারও মহসিনের গলা, দেশের অবস্থা তো দেখছই, কে কোথায় ছিটকে পড়বে কেউ জানে না। তোমার অ্যাকাউন্টে আমিও কিছু টাকা রাখব। সামনে খরচ বাড়বে না—বাচ্চাকাচ্চার পেছনে অনেক খরচ।
আমি মুচকি হাসি, স্ত্রীর হাত ধরে রিকশায় কিছুক্ষণ বসে থাকলেই কারও স্ত্রী প্রেগন্যান্ট হয় নাকি। আমি গার্হস্থ্যবিজ্ঞানও পড়েছি, অনেক কিছুই আমি জানি। গুন্ডাপান্ডারা কি মেয়েদের কিডন্যাপ করে শুধু হাত ধরে বসে থাকে নাকি?
আমি জিজ্ঞেস করি, টাকা পেলেন কোথায়?
পরিমল স্যার দিয়েছেন।
ধ্যাত! আমি খুকী, তবে কচি খুকী নই।
ট্যারা মহসিন সেদিন লালবাগ কাজি অফিসে যাওয়ার পথে আমার হাতে একটা ভারী আংটিও দিয়েছিল। বলেছে, পরার দরকার নেই, কোথাও লুকিয়ে রেখো। আরও অলংকার আছে, পরে পাবে।
-----৪.-----
তেজগাঁও থানার পুলিশ মধ্যরাতে বাড়িওয়ালার বাসাটা ঘিরে ফেলল। কাজ হলো না, সে রাতে মহসিন বাড়িতেই ফেরেনি। শুনলাম অবাঙালি মালিকের প্লাটিনাম জুয়েলার্স লুট হয়েছে। সেই লুটতরাজে মহসিনও ছিল।
আংটিটা তাহলে প্লাটিনাম জুয়েলার্স থেকে লুট করা।
মহসিনকে পায়নি পুলিশ, তন্ন তন্ন করে খুঁজে পায়নি একরত্তি স্বর্ণালংকারও। পরে বাড়িওয়ালাকে ধরে নিয়ে গিয়ে মারধর করেছে।
নিরুদ্দিষ্ট মহসিন গুন্ডার একটি চিঠি, লেখা হয়েছে ১৯৭১-এর ১১ মে। আর আমার হাতে চিঠিটি এসে পৌঁছেছে ২২ জুন, ১৯৭১। ডাকেই এসেছে।
আজ বর্ডার পার হচ্ছি। মুক্তিতে যোগ দেব। পুলিশের বাচ্চারা বাড়িতে এক তোলা অলংকারও খুঁজে পাবে না। ফিরে এসে তোমাকে দেব। একটা ভুল করে ফেলেছি—আসার আগে যেভাবে হোক তোমার কাছে আমার একটা বাচ্চার বীজ রেখে আসলে পারতাম। ফিরে এসে দেখতাম বাচ্চাটা খিলখিল করে হাসছে। হাবিব ব্যাংকে তোমার অ্যাকাউন্টে আরও তেরো শ টাকা জমা রেখে এসেছি। পরের চিঠিতে ঠিকানা জানাব।
এটুকুই। ভালোবাসা জেনো, আমার চুমু রইল—এ রকম একটা কথাও নেই। কাকে লিখছে, কে লিখছে, চিঠি পড়ে বোঝার উপায় নেই। কেবল খামের ওপর জান্নাতুল ফেরদৌস খুকী। পোস্ট অফিসের সিল এমনই লেপ্টে গেছে যে বোঝার উপায় নেই কোত্থেকে পোস্ট করা।
সেদিন রাতেই রাজাবাজারে ঢোকে আর্মি। আমবাগানে একটা তাঁবুও ফেলে। পরদিন বাবা সব ব্যবস্থা করে তবেই বাসায় এসেছেন। সন্ধ্যার দিকে একটা পুরোনো উইলি জিপে চাপাচাপি করে বসি আমরা। সঙ্গে আরও একটি পরিবার। রাস্তায় মিলিটারি টহল। রাত ১০টা নাগাদ পার হই ডেমরা ফেরি, তারপর কিছুটা হেঁটে, কিছুটা রিকশায়, কিছুটা পথ নৌকায়—প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর গ্রামের বাড়িতে।
আমি আমার মহসিন গুন্ডার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। শুরু হয় আমাদের এ গ্রাম থেকে ও গ্রামে ছোটাছুটি। কখনো শুনতে পাই, মিলিটারি আসছে, আগুন লাগিয়ে দিয়েছে, গুলি করে মেরেছে, বেইজ্জতি করেছে। রাতের বেলা রেডিওতে শুনি: ভোমা ভোমা খান সেনারা মুক্তিবাহিনীর গাব্বুর মাইরে যেখানে-সেখানে প্যান্ট নষ্ট করে ফেলাইতাছে।
মহসিন গুন্ডা কী লিখেছিল? চিঠিটা আমি আনতে ভুল করিনি। ছি ছি ছি। এ কথাটা তো চুমোর চেয়েও বেশি লজ্জার। আমার কাছে মহসিন গুন্ডা একটা বাচ্চার বীজ রেখে যেতে চেয়েছে। কেমন করে?
বারবার এই একটি পঙ্ক্তি পড়তে পড়তে আমি আবিষ্কার করি, আমার পিরিয়ড বন্ধ হয়ে গেছে, বমি ধরে রাখতে পারছি না, সবার কাছে ধরা পড়ে যাচ্ছি আমি। আমার পেট ফুলে উঠছে, গুন্ডার বাচ্চা আমার পেটে হাত-পা ছুড়ছে, দ্রুত বেরিয়ে আসতে চাইছে।
সীমান্তে প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ। শব্দ এতই ভয়ংকর যে মনে হয় আকাশ ভেঙে পড়ছে। আমি নিজেকে বোঝাই, বাচ্চা এত দ্রুত বেড়ে ওঠে না। সময় লাগে, অন্তত নয় মাস।
আমি মেনে নিই—আচ্ছা, ঠিক আছে। নয় মাসই।
পেটের ভেতর গুন্ডার বাচ্চা পুষতে পুষতে দেশটা স্বাধীন হয়ে গেল। আমার আর দেরি সইছে না। বাচ্চাটা এখনই হোক, নতুবা সে তো ফিরে এসে খিলখিল করে হাসতে থাকা বাচ্চার দেখা পাবে না।
আমার নিজের ভেতরের একজন ডাক্তার বলে, খুকী, এখনই না। তাহলে বেবিটা প্রিম্যাচিউর হবে।
------৫.------
ডিসেম্বরের ২১ তারিখ আমরা ঢাকা শহরে ফিরে আসি। বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধারা ফিরে আসছে। আমাদের বাসা লুট হয়েছে। পরিমল স্যারের হারমোনিয়ামটা নেই। গত অক্টোবরে বাড়িওয়ালাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল, নভেম্বরের তিন তারিখে তাঁর মৃতদেহ ফিরিয়ে দেওয়ার সময় বলে গেছে, তোমাদের ভাগ্য ভালো তাই ফিরিয়ে দিলাম।
২১, ২২, ২৩...৩১ ডিসেম্বর পেরিয়ে গেল। মহসিন গুন্ডার ফেরার নাম নেই। বাহাত্তরের প্রথম দিকে গুন্ডার মা আচম্বিতে আমাকে আক্রমণ করে বসলেন, চুল ধরে টেনে মেঝেতে ফেলে দিলেন, বল হারামজাদি, মহসিন কোথায়?
দুই হাতে আমার পেট চেপে ধরি। আমাকে যা ইচ্ছে করুক, আমার গুন্ডার বাচ্চাটার যেন কোনো ক্ষতি না হয়।
হঠাৎ তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। এরপর একদিন এক মুক্তি এসে জানিয়ে গেল, কসবার যুদ্ধে মহসিন নিহত। কেল্লাপাথরে অনেককে সমাহিত করা সম্ভব হলেও মহসিনের লাশটি রয়ে যায় আর্মির দখলে। মহসিনসহ আরও দুজন নিষ্প্রাণ তরুণকে সালদা নদীতে ফেলে দেয় তারা।
সে রাতে গর্ভের সন্তানকে দেখি আমি—ওই গুন্ডাটার মতোই দেখতে, গালে লম্বা একটা দাগ, বাঁ চোখটা একটু ট্যারা। পেটের ভেতর বাচ্চার এখন কয় মাস? স্ফীত পেট নিয়ে চলতে আমার কষ্ট হয়। বাচ্চা ক্রমেই বেড়ে উঠছে। আমি চিৎকার করে কাঁদছি, আমার গর্ভের পানি ভেঙে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি ডেলিভারি করাও। কেউ আমার কথা শোনে না। বছরের পর বছর একটা বাচ্চা পেটের ভেতর বয়ে বেড়াই আমি। আমার বাচ্চা আর খালাস হয় না।
-----৬.-----
কিন্তু খুকী প্রেগন্যান্ট কখন হলো?
ওই যে লালবাগ কাজি অফিসের পথে, রিকশায়।
ধ্যাত, ও তো শুধু হাত ধরে বসেছিল।
তা হোক, গুন্ডাপান্ডাদের বিশ্বাস নেই।
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
বৃষ্টিতে শিলিগুড়ি টু গ্যাংটক by ওয়ালিউল বিশ্বাস
| শিলিগুড়ি থেকে গ্যাংটকের পথে |
র্যাম্পো হলো সিকিম রাজ্যের দূতাবাসের মতো। সেখান থেকেই সিকিমে যাওয়ার অনুমতি নিতে হয়। পাসপোর্টে আগমন ও বহির্গমনের সময়সহ সিল মারা হয়। বিদেশিদের জন্য এটি বাধ্যতামূলক।
দেরির কারণে প্রধান যে সমস্যা হবে তা হলো, সিকিমের রাজধানী গ্যাংটকে নামার পর রাত নেমে আসবে। তখন কোনও হোটেল ভাড়া পাওয়া যাবে না। এসব কথা আমরা বিশ্বাস করার ভঙ্গি দেখিয়েছি। তাদের কথাতেই একপ্রকার সায় দিতে হয়েছে। কারণ সেখানকার জিপ চালকরা বেশ একতাবদ্ধ। আর জিপে সময়ও কম লাগে।
আরেকটি ভয়াবহ বিষয় হলো, দেড়শ কিলোমিটারের এই দীর্ঘ পথে বাংলাদেশি, নেপালি ও বিদেশিদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম। এসব দেশের পর্যটকরা কোনোভাবেই জিপে ভারতীয়দের সঙ্গে ভাগাভাগি করে যেতে পারবেন না। এমনকি বাংলাদেশি বা বিদেশিদের স্ব স্ব দেশের নাগরিকদের সঙ্গেই যেতে হবে। আর সর্বনিম্ন দুই জন হতে হবে। তাই আমরা দু’জন হওয়ায় বিপদ যেন বেড়ে গেলো। কারণ আটজনের জিপের ভাড়া দু’জনে দিতে হবে। আর সেটা ২০০০-২৫০০ রুপি!
| শিলিগুড়ি থেকে গ্যাংটকের পথে |
চ্যাংড়াবান্ধা থেকে শিলিগুড়ি আসার সময়ের ঘটনা। সীমান্ত পেরিয়ে সরাসরি মহাসড়ক। সেখান থেকে বাস অহরহ শিলিগুড়ি যায়। এমন একটা বাসে উঠে বসেছি। হঠাৎ দেখি আকাশ কালো হয়ে গেলো। আমি ও সহযাত্রী আশিক মুস্তাফা একেবারে পেছনের আসনে বসা। পাশেই সৌম্য চেহারার শুভ্র চুলের একজন ভদ্রলোক। জানালায় চোখ মেলে রেখেছেন। নতুন এলাকা, তাই খুচরো আলাপ জমানোর চেষ্টা করলাম। হালকা স্বরে বললাম, দাদা এদিকে কি নিয়মিতই বৃষ্টি হয়? ভদ্রলোক একবার আমাকে দেখে মুখটা হাসি হাসি করে মেঘের দিকে তাকালেন। বললেন, ‘এখন তো দাদা বৃষ্টিরই সময়। পাশে নদী-পাহাড়। বৃষ্টি তো হবেই!’
আবহাওয়া তাহলে ঠাণ্ডাই থাকে?
-তা তো বটেই। মেঘ দেখছেন না? এ মেঘে শিলাবৃষ্টি নামে।
আপনি দাদা কোথায় যাবেন?
-সামনের স্টপেজেই।
এখানেই বাড়ি আপনার?
-না।
-তাহলে কোথায়?
লালমনিরহাট!
| শিলিগুড়ি থেকে গ্যাংটকের পথে |
শিলিগুড়িতেও যখন ভাড়ামতো জিপ পাচ্ছিলাম না, তখন সেই সৌম্য চেহারার আত্মবিশ্বাসী ভদ্রলোকের কথা মনে পড়ে গেলো। এতে কাজও হলো। বেশ আত্মবিশ্বাস নিয়ে সহযাত্রী আশিক ও আমি এক ড্রাইভারকে প্রস্তাব দিলাম, ছয় আসনের জিপে আমি ও আশিক থাকবো। আর যাত্রাপথে দু’একজন যা পাবেন নিয়ে নেবেন। কোনও সমস্যা নাই। তবে শর্ত একটাই। গাড়ি দাঁড় করিয়ে যাত্রী খোঁজা যাবে না! ভাড়া পাবেন ১৩০০ রুপি!
ব্যস, চালকবেচারা খানিক যোগ-বিয়োগ করে হিন্দিতে কিছু একটা বললেন। যার অর্থ হলো, গাড়িতে উঠে পড়ুন দাদা। চলুন যাই। শুরু হলো আমাদের শিলিগুড়ি থেকে গ্যাংটকের ৫ ঘণ্টার যাত্রা। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি মাথায় নিয়ে জিপে চড়ে বসলাম। (চলবে)
>>>ছবি: লেখক
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
গল্প- সুরতারিণীর ধারণকৃত কণ্ঠস্বর by মঈনুস সুলতান

ঢাকাতে সরোজের কোন গতি হচ্ছিলো না, এক ধরনের ব্যর্থতাবোধ কাঁচা বাঁশে ঘুণের মতো তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিলো। ভিডিআইতে কাজ পাওয়ায় বেকার বদনাম যেমন ঘুচেছে, তেমনি প্রতি মাসে হাতে আসছে সামান্য কিছু উপার্জন। এতে দিনযাপনে সচ্ছলতা এসেছে বটে, তবে সহকর্মীদের সংস্থাভিত্তিক সংস্কৃতিতে সে নিজেকে মিশ খাওয়াতে পারছে না। তার দুর্বলমাপের লেখক পরিচিতি ও পাঠাভ্যাস আড়াল-আবডালে উপহাসের বিষয় হয়েছে। নিশিরাতে নিরিবিলিতে বসে ধ্রুপদী সঙ্গীত শোনার হবিও হয়েছে সহকর্মীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অন্তরায়।
এনজিওর পেশাগত কাজে সে প্রচুর দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে, কিন্তু সংস্থার এজেন্ডানুযায়ী চলতে পারেনি। আদিবাসী পাত্র সম্প্রদায়ের গ্রামে উন্নয়নমূলক কাজের সূচনায় খানা-জরিপের দায়িত্ব পড়েছিলো তার ওপর। জরিপ করতে গিয়ে সে ছোট্ট নৃগোষ্ঠী সম্পর্কে অতিমাত্রায় আগ্রহী হয়ে ওঠে। সিলেটের সংলগ্ন শহরতলি ছাড়িয়ে চা-বাগানগুলোর ফাঁকফোকরে টিলাশোভিত বনভূমির প্রান্ত-ছোঁয়া মাত্র কয়েকটি গ্রামে এ সম্প্রদায়ের বাস। জনসংখ্যার নিরিখে অত্যন্ত ক্ষুদ্র; তবে এদের ভাষা ও সংস্কৃতি মূলধারার হিন্দু-মুসলমানদের চেয়ে ভিন্ন। এদের সম্পর্কে বইপত্রে তেমন কোন উল্লেখযোগ্য তথ্য সরোজ খুঁজে পায়নি। তো এক পর্যায়ে সে নিজে থেকে তাদের ভাষা, খাদ্যাভ্যাস, ধর্মরীতি, বিবাহ প্রভৃতি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে এসবের ভিত্তিতে লিখেছে একটি প্রবন্ধ। রচনাটি ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি ম্যাগাজিনে ছাপা হয়। এতে বিরাগভাজন হন কর্মক্ষেত্রে তার সুপারভাইজার। উনার অভিমত হলো, সরোজের দায়িত্ব হচ্ছে পাত্র গ্রামে এনজিওর নির্দিষ্ট কর্মসূচি বাস্তবায়িত করা। কর্মসূচির সঙ্গে সম্পর্কহীন তথ্য সংগ্রহ সম্পর্কে তার আপত্তি। তিনি চাচ্ছেন না- সরোজ ব্যক্তিগত আগ্রহের জন্য সংস্থার সময় ব্যয় করুক। পাত্র গ্রামের কিছু পরিবারের সঙ্গে তার গড়ে উঠেছে সুন্দর সম্পর্ক; এ বিষয়টাও সুপারভাইজার পছন্দ করেননি। মাঠে অনেক বছর ধরে কাজ করা অত্যন্ত সিজনড্ ভদ্রলোক তাকে গ্রাম পর্যায়ে কেবলমাত্র পেশাদারি সম্পর্ক রক্ষা করতে পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু সরোজ চরিত্রের দিক থেকে গহন-বিচারি একজন প্যাশনেট প্রকৃতির পুরুষ। যা তার ভালো লাগে, যে বিষয়ে তার মধ্যে তৈরি হয় প্যাশন, তা অবজ্ঞা করে নৈর্ব্যক্তিক আচরণ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তো সে সুপারভাইজারের পরামর্শ উপেক্ষা করেছে। পরিণতিতে মাঠ পর্যায়ে দারুণ পরফরমেন্সের পরও বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট পায়নি সরোজ।
বালুকাময় পথে হোন্ডাটি ফটফটিয়ে থেমে যায়। ঠেলা-ধাক্কা করে সে বাহনটিকে নিয়ে আসে একটি পাখিয়ারা গাছের তলায়, কিন্তু স্টার্ট করতে পারে না। ভারি উদ্বেগ হয়, কলকব্জা কিছু যদি গড়বড় হয়, তাহলে যে সহকর্মীর কাছ থেকে বাইকটি ধার করে এনেছে, তার কাছে সে লজ্জা পাবে। এ বাইকের সহায়তা ছাড়া অফিস-কর্মের চাপের ভেতর এক ফাঁকে হুট করে পাত্র গ্রাম ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করা মুশকিল হয়ে পড়বে।
বেশ খানিকটা সময় বাইকটি সারাই করার ব্যর্থ চেষ্টা করে সে সিগ্রেট ধরায়। স্মোক করতে করতে দেখে, কাছের একটি আমগাছের তিডালার গোড়া থেকে বেরিয়ে এসেছে গোলাপিতে ছোপ ছোপ শুভ্রতা ছড়ানো আমকুড়ালির ফুল। সে ব্যাকপ্যাক থেকে ক্যামেরা বের করতে যায়। তখনই খেয়াল করে, আমকুড়ালির অর্কিড গুচ্ছটি ঘিরে উড়ে উড়ে সুচালো ঠোঁটে মধু চয়ন করছে অত্যন্ত ছোট্ট একটি মৌটুসি পাখি। দৃশ্যটি থেকে ছড়াচ্ছে এমন এক ধরনের মায়া, সে সম্মোহিত হয়ে তাকিয়ে থাকে। ক্যামেরার শাটার টিপতে তার আগ্রহ হয় না। এ অলিম্পিয়া ক্যামেরাটিও সরোজ ধার করে নিয়েছে ভিডিআইর একজন সহকর্মীর কাছ থেকে। বয়সের কারণে অলিম্পিয়া হালফিল তেমন একটা কার্যকর না। এতে ছবি ওঠে বটে, কিন্তু কীভাবে যেন ফিল্মের সর্বত্র আঁকা হয়ে যায় আলোর বেজায় উজ্জ্বল দাগ। এতে আলোকচিত্রের বিষয়বস্তুর ডিটেলস্ ঝাপসা হয়ে পড়ে।
এ ক্যামেরা দিয়ে কয়েক মাস আগে পাত্র সম্প্রদায়ের পূজা-পার্বণের দারুণ কিছু দৃশ্য ধারণ করেছিলো। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আলোকচিত্রগুলো এমনভাবে ঝাপসা হয়েছে যে, এগুলো কোন লেখার সাথে ব্যবহার করার কোন উপায়ই থাকেনি। পাত্রদের পূজার রীতি-রেওয়াজ মূলধারার হিন্দুদের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। হিন্দু দেব-দেবীর আরাধনা তারাও করে থাকে, তবে তাদের অর্চনায় কোন মূর্তি বা বিগ্রহের ব্যবহার নেই। মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে বহরগুল গ্রামের এক মহিলা- সুরতারিণীর সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। চার সন্তানের জননী বিধবা সুরতারিণী সরোজকে ভাই ডাকেন। গ্রামে গেলে তিনি তাকে তার দাওয়ায় বসিয়ে শসা খেতে দেন। সরোজও তার জন্য কখনো-সখনো নিয়ে যায় গ্লুকোজ বিস্কিটের প্যাকেট। পাত্ররা জংগলের অনেক পত্রলতা ও শিকড়-বাকড়ের রস জারিত করে তৈরি করে 'খর' নামে পরিচিত পানীয়। সুরতারিণী তার ঘরের পেছনে মাটির তলায় শিয়ালের গর্তের মতো সুড়ঙ্গ খুঁড়ে খর প্রক্রিয়াজাত করেন। মাঝেমধ্যে সরোজের ভাগেও জোটে যৎসামান্য ঝাঁঝালো পানীয়। বস্তুটি পান করে সে একবার অফিস ফিরলে, উৎকট গন্ধে তার সুপারভাইজার জোড়া ভুরু কুঁচকে বিরক্তি প্রকাশ করেছিলেন।
সুরতারিণী তাকে পূজার দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। মাস চারেক আগে চৈত্র মাসের অপরাহেপ্ত সরোজ বহরগুলে ক্যামেরা নিয়ে গিয়েছিলো। অই দিন সুরতারিণী খর পানে দারুণভাবে মাতেলা ছিলেন। তিনি ক্রমাগত নাসির বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে পাতানো ভাই সরোজকে নিয়ে গিয়েছিলেন পাকুড় গাছের তলায় পূজার থানে। পাত্রদের পূজা-পার্বণে পূজারি ব্রাহ্মণের কোন চল নেই। সুরতারিণীর জেঠা, বহরগুলের বয়োজ্যেষ্ঠ মুরুব্বি সুরেশ পাত্র পূজা পরিচালনা করছিলেন। লাঠি ভর দেয়া থুরথুরে মানুষটি প্রচুর পানে এমনভাবে বিভোর হয়েছিলেন যে, তিনি ক্যামেরা ব্যবহারে কোন আপত্তি তোলেননি। গাছের গোড়ায় ভারি স্নিগ্ধ চেহারার এক পাত্র-কিশোরী কুলায় করে নিয়ে এসেছিলো পান, সুপারি, নারিকেল, গুড়, কলা প্রভৃতি দিয়ে সাজানো উপাচার।
মেয়েটির নাম রত্নামণি। সে হাসি হাসি মুখে উপাচারের ডালাটি হাতে ছবির জন্য ক্যামেরার সামনে পোজ দিয়েছিলো। পূজাতে এক জোড়া কবুতর ও গজার মাছ বলি দেয়া হয়। রত্নামণি আধলা ইট দিয়ে বানানো খোলা চুলায় রান্না করে ভোগ। গ্রামবাসীর সাথে সরোজেরও জুটেছিলো কলাপাতায় প্রসাদ। এ ঘটনার সপ্তাহ খানেক পর বহরগুলে এসে সে ঝাপসা হয়ে ওঠা ফটোগ্রাফের একটি প্রিন্ট মেয়েটির হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলো। তাতে রত্নামণি এমন খুশি হয় যে, সে কেবলই সরোজকে জোড়-হাতে প্রণাম জানাতে থাকে।
আজ সুরতারিণীর তালাশে সরোজ বহরগুলে গিয়েছিলো। কিন্তু তিনি বাড়িতে ছিলেন না। প্রতিবেশীদের সাথে বাতচিত করে সে জানতে পারে, সকালবেলা সুরতারিণী গ্রামের দুটো ছেলের কান কাঁটা দিয়ে ফুঁড়ে দেন। কৈশোর অতিক্রান্ত পাত্র ছেলেদের মধ্যে কান ফোঁড়ার রেওয়াজ আছে। এ আচার সম্পাদন করতে গিয়ে সুরতারিণী নাকি পান করেছেন প্রচুর পরিমাণে খর। তারপর হেঁটে গেছেন পিচঢালা রাজসড়কের দিকে। সরোজ ভেবেছিলো, সুরতারিণীকে নিয়ে সে যাবে সুরেশ পাত্রের কাছে। তিনি 'সিটকই' বলে সমাজে পরিচিত, জোর করে পাত্র যুবতীদের অনভিপ্রেতভাবে বিবাহ করা সম্পর্কে কিছু তথ্য দিতে রাজি হয়েছিলেন। তো সুরতারিণীকে না পেয়ে সে একাই চলে গিয়েছিলো সুরেশ পাত্রের ঘরে।
সরোজ ভাবতেও পারেনি, সুরেশ পাত্রের স্বাস্থ্য ভেঙে গিয়ে এত দ্রুত তিনি মরণাপন্ন হয়ে উঠবেন! ঘরের দাওয়ায় বাতাবি লেবু গাছের ছায়াতলে তাকে চাটাইতে শুইয়ে রাখা হয়েছে। তার গলা দিয়ে বেরুচ্ছে ঘড়-ঘড়ে আওয়াজ। কোন ডাক্তার-কবিরাজের ব্যবস্থা নেই। পাশে বসে রত্নামণি বাটি থেকে কেরাইয়া পাতার রস ত্যানা দিয়ে তুলে লেপে দিচ্ছে মরণাপন্ন বৃদ্ধের কপালে। তাকে দেখতে পেয়ে চোখ নামিয়ে নেয় রত্নামণি। তার হলুদাভ আভা ছড়ানো ত্বক যেন জ্বলে-পুড়ে তামাটে হয়ে গেছে। রাহুগ্রাসে বিলুপ্ত হওয়া জ্যোৎস্নার মতো মেয়েটির অবয়ব থেকে মুছে গেছে স্নিগ্ধ শ্রী।
রত্নামণির হাতে ঝাপসা ফটোগ্রাফটি তুলে দেয়ার ঠিক চার দিন পর মেয়েটি কলসি কাঁখে পানি আনতে যায়। সেনানিবাসের সংলগ্ন হওয়ার কারণে এ অঞ্চলের জংলা ভূমিতে হামেশা সৈনিকদের মহড়া চলে। যতটা জানা যায়, জল নিয়ে ফেরার পথে দু'জন সৈনিক বিন্নাঝোপের আড়ালে তাকে টেনে নিয়ে গিয়ে ভায়োলেন্টভাবে ধর্ষণ করে। এতে তার জননেন্দ্রিয় জখম হয় মারাত্মকভাবে। ভিডিআইর এক মহিলা স্বাস্থ্যকর্মীর কাছ থেকে এ তথ্য পেয়ে সরোজ চেষ্টা করেছিলো রত্নামণির নাম উল্লেখ না করে স্থানীয় পত্রিকায় সংবাদটি ছাপানোর। কিন্তু দেশে চলছে জেনারেল এরশাদের কড়া মার্শাল-ল। যথেষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়া কোন পত্রিকা এ ধরনের সংবাদ ছাপতে রাজি হয় না।
রত্নামণির প্রসঙ্গ মনে আসতেই তার মধ্যে বিচিত্র এক অনুভূতি হয়। কিশোরীটি সুদর্শনা; আকর্ষণ বলতে যা বোঝায়, সরোজ কখনো তা ফিল করেনি, বরং স্নেহটাই তার সংবেদনে প্রধান হয়ে উঠেছে। শরীরে নারীত্ব ফুটে ওঠার কারণে একটি মেয়েকে দৈহিকভাবে বিক্ষত হতে হবে, আঘাত ও অপমানের বোঝা জনমভর বয়ে বেড়াতে হবে- এ ব্যাপারটা সরোজ মেনে নিতে পারে না। কিন্তু বিহিত কিছু করার মতো সামাজিক শক্তিও তার নেই। এ অসহায়বোধ থেকে তার মধ্যে জন্ম নেয় ক্রোধ। সে তেড়িয়া হয়ে বাইকের স্টার্টারে কিক কষায়। স্রেফ কপালগুণে তা চালু হয়। বাহনটি ম্যানেজ করতে করতে ফের সে সুরেশ পাত্রের কথা ভাবে। কথাবার্তায় সরোজ জেনেছে যে, কিছু পাত্র মেয়ে শরীরীভাবে হয়রানির শিকার হয়েছে মূলধারার জনগোষ্ঠীর যুবকদের হাতে। পরিণতিতে কোন কোন যুবক জোর করে পাত্র মেয়েকে বিয়েও করেছে। এ বিষয়টা পাত্র ভাষায় 'সিটকই' বলে পরিচিত। সিটকই-এর শিকার মেয়েদের পাত্র সমাজে সহানুভূতির চোখে দেখা হয় না। সুরেশ বুড়ো তাকে নির্দিষ্ট কিছু তথ্য দেবেন বলে কথা দিয়েছিলেন। দোষ তারই, সময়মতো সে ফলোআপ করেনি। কারণ সুপারভাইজারের নির্দেশে প্রশিক্ষণ পরিচালনার জন্য তাকে যেতে হয়েছিলো কুষ্টিয়া, বরিশাল ও খুলনায় তিন-তিনটি ভিন্ন ভিন্ন ট্রিপে। কোনভাবেই সুরেশ পাত্রের ফের সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য সময় করে উঠতে পারছিলো না। ভাবতে ভাবতে সরোজের কেবলই মনে হতে থাকে, সুরেশ পাত্রের পরলোকপ্রাপ্তির ভেতর দিয়ে সামাজিকভাবে কিছু অন্যায় সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য হারিয়ে যাবে।
মলই পাড়ার কাছে বাঁক নিতে গিয়ে সে দেখে, গ্লাবেত বনের ঝোপটির আড়ালে বসে নকুল পাত্র কাঠ পুড়িয়ে তৈরি করছেন অঙ্গার। মনে হয়, শতাব্দীকাল থেকে পাত্র পুরুষরা অঙ্গার তৈরি করে তা চায়ের দোকান প্রভৃতিতে সরবরাহ করার ব্যবসা করে আসছেন। সরোজ বাইকের স্টার্ট চালু রেখে মাটিতে পা ঠেকিয়ে তা থামায়। সে নকুলের কাছে জানতে চায়- কোথায় সুরতারিণী দিদি? জবাবে জানা যায়- তার শরীর খারাপ, জ্বর-জারি ও কফ-কাশিতে কষ্ট পাচ্ছেন, তো তিনি সরোজের তালাশে তার অফিসের দিকে গিয়েছেন। শুনতে পেয়ে প্রমাদ গুনে ফের সে তোড়ে বাইক হাঁকায়। যেতে যেতে মন থেকে নকুল পাত্রের সম্প্রতি নিগৃহীত হওয়ার বিষয়টি এড়াতে পারে না। পাত্র পুরুষদের সনাতনী ব্যবসা অঙ্গার তৈরির জন্য কাঠ কুড়াতে গিয়ে তিনি বন বিভাগের কর্মীর হাতে ধৃত হয়েছিলেন মাস খানেক আগে। ফরেস্ট গার্ডরা তাকে গাছের সাথে বেঁধে লাঠি দিয়ে পেটায়। এতে তার পায়ে মারাত্মকভাবে জখম হয়। বর্তমানে নকুল খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছেন। ভিডিআই অফিসের কাছাকাছি এসে সরোজের কেবলই মনে হতে থাকে, হাল জামানার রিজার্ভ ফরেস্ট তো এক যুগে পাত্র সম্প্রদায়ের খাসভূমি ছিলো। ব্রিটিশ প্রশাসকরা জোর করে পত্তনি দিয়ে অনায্যভাবে রিজার্ভ ফরেস্ট গড়ে তোলে। তো নকুল- হলেনই বা তিনি বনতস্কর, তাই বলে তাকে বেঁধে পেটাবে? অন্যান্য আদিবাসী ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর মতো পাত্রদের একটি কল্যাণ সমিতি থাকলে এ বাবদে প্রতিবাদ করা যেত।
অফিসের বারান্দায় দেখা হয় সুপারভাইজারের সঙ্গে। অবাক হয় সরোজ! তিনি না সকালে ব্রাঞ্চ অফিস পরিদর্শন করতে গিয়েছিলেন! তার তো এত তাড়াতাড়ি ফেরার কথা না? প্রৌঢ় ভদ্রলোকের চুল উসকোখুসকো হয়ে আছে, কলপের কালিমালিপ্ত কেশগুচ্ছের তলা থেকে বেরিয়ে এসেছে ছোপ ছোপ ধূসরাভা। তিনি বিদ্রূপাত্মকভাবে বলেন, 'তোমার পাত্র রিলেটিভ বসে আছেন রিসেপশন লাউঞ্জে; যাও, মেহমানদারি করো।'
বেতের চেয়ারে বসে চুপচাপ ঝিমাচ্ছিলেন সুরতারিণী। রোদে পুড়ে তার চোখমুখ এত কালো হয়েছে যে; মনে হয়, মহিলা পোড়া অঙ্গার ছেনে এসেছেন। তার কাঁধ থেকে খসে পড়েছে আঁচল, চতুর্দিকে ছড়াচ্ছে খরের ঝাঁঝালো গন্ধ। সরোজকে দেখতে পেয়ে আধপোড়া বিড়িটি মুখে দিয়ে ফস করে দেশলাইয়ের কাঠি ঘষেন। বেশ কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে সরোজ বুঝতে পারে, তার দিদি ক্যাসেটটি ফেরত চাচ্ছেন। ঘটনা হলো, মাস দুয়েক আগে সরোজ অনানুষ্ঠানিকভাবে সুরতারিণীর সাক্ষাৎকার একটি ক্যাসেটে ধারণ করে। এতে টেপ করা আছে পাত্র সম্প্রদায়ের জন্ম, বিবাহ ও মৃত্যু সংক্রান্ত খুঁটিনাটি তথ্য। তিনি কেন ক্যাসেটটি ফেরত চাচ্ছেন- তা জানতে গিয়ে তার তাজ্জব হওয়ার দশা হয়! সুরতারিণীর জেঠা সুরেশ পাত্র মশাইয়ের জ্যোতিষ শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি আছে। তিনি গ্রহ-নক্ষত্র বিচরিয়ে অনেক দিন আগে নাকি বলেছিলেন, তার ভাই এর কন্যার মৃত্যু হবে তার মৃত্যুর ঠিক সাত দিন পর। গ্রহ-নক্ষত্রের ফের তো খণ্ডানোর কোন উপায় নেই। এখন সমস্যা হচ্ছে- পরলোকপ্রাপ্তির পরপরই মরদেহ দাহ করার বিধান, কিন্তু দেহটি ভস্ম হলেও তার ধারণকৃত বক্তব্য থেকে যাবে পৃথিবীতে। তো সুরতারিণী দেহে প্রাণ থাকাবস্থায় ক্যাসেটটি পুড়িয়ে ফেলতে চান। অনেক কথাবার্তা বলেও সরোজ ক্যাসেটটি না পোড়ানোর ব্যাপারে সুরতারিণীকে কনভিন্স করতে পারে না।
ক্যাসেটটি থেকে জরুরি উপাত্ত ট্রান্সক্রিপ্ট করে নোটবুকে টুকে ফেলা হয়নি। তো সরোজের করোটিতে একটি ধূর্ত আইডিয়া খেলে যায়। অন্য একটি ক্যাসেটে উপাত্ত রিরেকর্ড করে সুরতারিণীকে তা ফেরত দেয়া যেতে পারে। কিন্তু অফিসে এম্পটি কোন ক্যাসেট নেই। সিলেট শহরে গিয়ে এ মুহূর্তে তা কিনে আনারও কোন উপায় নেই। কারণ সামরিক সরকারের নির্দেশে ছাত্রমিছিলের ওপর ট্রাক তুলে দিয়ে হত্যা করার প্রতিবাদে হরতাল চলছে। তাই বাইক হাঁকিয়ে শহরে গিয়ে ক্যাসেট কিনে আনা অসম্ভব।
তো বিষয়টি আদ্যোপান্ত ভেবে সে সুরতারিণীর কাছে ক্যাসেট ফেরত দেয়ার জন্য তিন দিন সময় চেয়ে নেয়। মহিলা কিছুক্ষণ ফ্যাল ফ্যাল করে তার দিকে চেয়ে থেকে বিড়িতে দীর্ঘ দম দিয়ে আস্তে আস্তে অফিস থেকে বেরিয়ে যান। সরোজও তার সাথে বেরিয়ে এসে বারান্দায় দাঁড়ায়। বিদায় দিতে গিয়ে মনে হয়, মহিলা হচ্ছেন গবেষণার পরিভাষায় একজন ইনফরম্যান্ট। তিনি যে তথ্য সরবরাহ করেছেন, তার অধিকার আছে তা ফিরিয়ে নেয়ার। তবে কি সে ক্যাসেটটি ফেরত দেবে? কিন্তু এ উপাত্তকে ভিত্তি করে সে লিখতে চাচ্ছে আরেকটি গবেষণামূলক প্রবন্ধ। হামেশা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভোগার সমস্যা আছে তার। কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারে না। খুক-খুকিয়ে কাশতে কাশতে সুরতারিণী সিঁড়ির কাছে থুক করে এক দলা কাশ ফেলেন। তারপর তার পাতানো দিদিটি হেঁটে যান দূরের জংগলশোভিত পল্লীর দিকে। অফিসের কামরায় ফেরার আগে নোংরা থুথুর দিকে সরোজের চোখ পড়ে। ওখানে রক্তের ছিটা দেখতে পেয়ে ভারি উদ্বেগ হয়। কী করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। তার দারুণ অসহায় লাগে।
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
গল্প- হলুদ পাতার বিছানা by শরীফ খান
![]() |
| অলংকরণ: মাসুক হেলাল |
সাগর মা-বাবার সঙ্গে নানিবাড়িতে এসেছে এই সাত-আট দিন হলো। আসার পর থেকেই ওর দুরন্তপনা বেড়ে গেছে শতগুণে। ঢাকায় থাকে। দৌড়ঝাঁপের জায়গা নেই। মাথার ওপরে খোলা আকাশ নেই। চাঁদ-তারা-জোনাকির আলো নেই। ফুল-পাখি-প্রজাপতি নেই। তাই তো নানিবাড়িতে আসার পর থেকেই ও স্বাধীনতা পেয়ে গেছে। ঘরের সামনে মস্ত বড় উঠোন। সে উঠোনের চারপাশজুড়ে গাছপালা। সাদা-বাদামি আর কালো রঙের ছয়টা ছাগলছানা আছে নানির। ছানাগুলো কী সুন্দর যে লাফ-ঝাঁপ দেয়, তিড়িং বিড়িং করে। সাগরও ছোটে আর লাফায় ওদের পেছন পেছন। উঠোনে রাজহাঁস ঘুরে বেড়ায় চারটা। প্রথম প্রথম সাগরকে কাছে দেখলেই গলা তুলে ‘কোয়াঙ কোয়াঙ’ শব্দে ডাকত, ঠোকর দিতে চাইত। এখন অবশ্য ওরা বুঝে গেছে বোধ হয়—এ বাড়ির আদরের নাতি এটা! তাই অত্যাচার সহ্য করে। সাগর গলা ধরে টানে। পিঠে চড়ে বসতে চায়। নানির মুখে শোনা গল্পের মতো রাজহাঁসের পিঠে চড়ে পরির দেশে উড়ে যেতে চায়।
রোজ সকালে নানি যখন ছাগলের পাল নিয়ে মাঠের দিকে যান, সাগরও যায় পেছন পেছন। নানি ওকে বড় বড় খাসি ছাগলের পিঠে চড়িয়ে দেন। খুশি তখন দেখে কে সাগরের! নিজেকে মনে হয় রাজপুত্র। সারা দিন নানির সঙ্গেই কাটে। নানি ওকে পুকুরে নিয়ে গোসল করিয়ে দেন। ঝিঁঝি পোকার ডাক শোনান। পাখির বাসা দেখান। আমের বোলের গন্ধ বোঝান। নানি যেখানে, সাগর সেখানে। রান্নাঘরের পেছনেই পুকুর। এই চৈত্রে জল নেমে গেছে। সাগরের হাঁটুজল আছে। ওই হাঁটুজলে নেমে নানির হাত ধরে কতবার যে হেঁটে সে পুকুর পাড়ি দিল। নানি তাই ওর কোমরে বেঁধে দিয়েছেন ঘুঙুর।
নানি আজ এই একটু আগে দূরের রেলস্টেশনে গেছেন। সঙ্গে গেছেন সাগরের বাবা। সাগরের বড় খালা আসছেন বেড়াতে। আনতে গেছেন ওদের।
বেশ কিছুক্ষণ বাদে নানির মনে হলো—তাই তো! ঘুঙুরের শব্দ তো শোনা যাচ্ছে না! বাইরে এলেন তিনি। সঙ্গে সাগরের মা। সাগর কই! মা নাম ধরে ডাকাডাকি শুরু করলেন। নানি গেলেন পুকুর পাড়ে। তারপর শুরু করলেন চেঁচামেচি। পাড়া-প্রতিবেশীরা ছুটে এল। খবর শুনে একজন বলল, ‘ইদানীং ছেলেধরাদের কথা শোনা যাচ্ছে! ওরাই কী...!’ সাগরের মা এবার বুক চাপড়াতে চাপড়াতে মাটিতে বসে পড়লেন। এ সময় অন্য একজন বলল, ‘আবার অপহরণ-টরণ নাকি...!’ সাগরের নানি চিৎকার দিয়ে সবাইকে থামালেন। বললেন, ‘আমি জানি, কোথায় গেছে ও! আজ তো যেতে পারেনি নানির সঙ্গে!’
বাগানের শুড়িপথ ধরে অনেকটা দৌড়ে চললেন নানি। পেছনে অন্যরা। অনেকটা দূরে আসার পরে একটা আমড়াগাছের কাছে থামলেন নানি। এগিয়ে এল সবাই। দৃশ্য দেখে সবাই যেন অভিভূত হয়ে গেল। আমড়াগাছের ঝরে পড়া হলুদ পাতায় যেন পুরু পাতার বিছানা পাতা হয়ে গেছে মাটিতে। সেই বিছানায় একটি সাদা ছাগলছানার গলা জড়িয়ে ধরে কী নিশ্চিন্তে যে ঘুমোচ্ছে সাগর! পাশে শোয়া আরও দুটি ছাগলছানা। আমড়ার বোলের ঝরে পড়া পাপড়ি আর হলুদ ছোট ছোট পাতাগুলো ঝরছে চারটি প্রাণীর মুখ-মাথা-শরীরে!
সাগরের নানি এগিয়ে গিয়ে শুয়ে পড়লেন হলুদ পাতার বিছানার ওপরে। আদরের নাতিকে জড়িয়ে ধরলেন বুকে। বললেন, ‘খেলতে খেলতে ক্লান্ত হয়ে কী সুন্দর ঘুমিয়ে গেছে আমার ভাই! আমিও এমন সুখের ঘুম চাই।’
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1403)
- ► 2025 (3281)
- ▼ 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...

