Sunday, August 26, 2018

‘আমি চাই না রোহিঙ্গারা ফিরে আসুক’

মোহাম্মদ হোসেন একজন রোহিঙ্গা। মিয়ানমারে নির্যাতিত হয়ে পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছেন বাংলাদেশে। তিনি জানেন মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সঙ্গে কোন ব্যক্তি তাদের গ্রামে হানা দিয়েছিল। কে ওই গ্রামের মানুষদের কেটে কেটে টুকরো টুকরো করেছিল। তিনি বলেন, দু’বছর আগে ওই একই ব্যক্তি তাকে এক অন্ধকূপে আটকে রেখেছিল। উত্তপ্ত ধাতব রড দিয়ে তার পা পুড়িয়ে দিয়েছিল। আঙ্গুলের নখের ভিতর দিয়ে সূচ ফুটিয়ে দিয়েছিল। ওই একই ব্যক্তি মোস্তাফা খাতুনকে কয়েকদিন ধরে পর্যায়ক্রমে ধর্ষণ করেছে। তারপর সেনারা যখন ওই তার গ্রামে হানা দেয় তখন ওই একই ব্যক্তি মোস্তাফা খাতুনের স্বামীর গলা কেটে ফেলে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক মাইকেল শয়ার্টজকে দেয়া সাক্ষাতকারে দুই ডজনের মতো মুসলিম রোহিঙ্গা শরণার্থী যেসব কথা বলেছেন তা প্রায় অভিন্ন। এসব সাক্ষাতকারে উঠে এসেছে কিভাবে রোহিঙ্গাদের ওপর দিনের পর দিন, বছরের পর বছর নিষ্পেষণ চালানো হয়েছে। কিভাবে মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। গত বছর ২৭ শে আগস্ট মিয়ানমারে ছুট পাইন গ্রামে কিভাবে গণহারে মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। তারা সবাই বলেছেন, এর জন্য দায়ী একজন ব্যক্তি। রোহিঙ্গারা জানেন ওই ব্যক্তি কোথায় বসবাস করে এবং তারা তার মোবাইল নম্বর পর্যন্ত জানেন। তার নাম হলো অং থেইন মাইয়া। ছুট পাইন গ্রাম সহ বেশ কতগুলো গ্রামের প্রশাসনিক দায়িত্বে রয়েছে সে। তাকে যে বিচারের আওতায় আনা হবে তেমন কোন লক্ষণই নেই।
এক বছর পেরিয়ে গেছে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর নৃশংসতার। তারা রোহিঙ্গা জাতিকে নির্মূল করার মিশনে নেমেছিল। গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছে। হত্যা করেছে হাজার হাজার মানুষকে। ধর্ষণ করেছে নারীদের। এতে বাধ্য হয়ে বন্যার পানির মতো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। এ ঘটনার এক বছর পেরিয়ে গেলেও এর জন্য যারা দায়ী তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি নেই।
এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যে প্রচেষ্টা নিয়েছে তা বড় অর্থে হোঁচট খেয়েছে। তারা দৃষ্টি দিয়েছে দেশটির নেতৃত্বের দিকে। এর মধ্যে রয়েছে জেনারেলরা ও মিয়ানমারের বেসামরিক নেত্রী অং সান সুচি। এর মধ্যে সুচি ওই নৃশংসতা বন্ধে ব্যর্থ হওয়ায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তিনি তীব্র সমালোচিত হয়েছেন। নিন্দিত হয়েছেন। তার অনেক সম্মানসূচক পদক কেড়ে নেয়া হয়েছে।
নির্যাতনকারীদের মধ্যে অং থেইন মাইয়া কোনো সেনা সদস্য নয়। সে একজন বেসামরিক প্রশাসক। সেনাবাহিনী ও নিজেদের বামার বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠদের দিয়ে সে রোহিঙ্গাদের ওপর দীর্ঘদিন নিষ্পেষণ চালিয়েছে। এসব অভিযোগ নিয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করে নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক। জবাবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে অং থেইন মাইয়া। সে দাবি করে, ওই গণহত্যার সময় সে সেখানে উপস্থিত পর্যন্ত ছিল না। কিন্তু তার এই বক্তব্য এক ডজনেরও বেশি প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যের বিপরীত। ছুট পাইন গ্রামের অধিবাসীরা যে বক্তব্য দিয়েছেন নির্যাতনের সেই একই রকম বক্তব্য এসেছে রাখাইনের অন্য গ্রামগুলো থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মুখ থেকে। ফলে তারা এখন শান্তিপূর্ণ উপায়ে রাখাইনে ফিরে যেতে পারবেন কিনা তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক কর্মকর্তারা উদ্বিগ্ন।
ছুট পাইন ও অন্য গ্রামের বৌদ্ধ রাখাইন ও মুসলিম রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন অস্বস্তিকরভাবে পাশাপাশি বসবাস করছেন। তারা মাঠের ধানক্ষেতের অধিকার নিয়ে প্রতিযোগিতা করেন।
পুকুরের মাছ কে ধরবে তা নিয়ে দ্বন্দ্ব আছে। কোথায় গবাদিপশু চড়ানো যাবে তা নিয়ে তাদের মধ্যে বিভেদ আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই তাদের মধ্যে এই অনাস্থার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ওই যুদ্ধে রাখাইনরা যে পক্ষকে সমর্থন করতো, রোহিঙ্গারা তার বিরোধী পক্ষকে সমর্থন করতেন। বৌদ্ধরা সমর্থন করতো জাপানকে। মুসলিমরা সহযোগিতা করতেন বৃটেনকে।
মিয়ানমারে সাম্প্রতিক দশকগুলোতে রাজনীতিতে প্রাধান্য বিস্তার করেন জেনারেলরা। তাদের অধীনে অং থেইন মাইয়ার মতো বৌদ্ধরা রাজ্যের বড় বড় ক্ষমতা পেয়ে যায়। রোহিঙ্গাদের ওপর মাতব্বরি চালানোর বিশাল ক্ষমতা আসে তাদের হাতে।
জুলাই মাসে মানবাধিকার বিষয়ক গ্রুপ ফোরটিফাই রাইটস একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। এতে বর্ণনা করা হয়েছে কিভাবে স্থানীয় বৌদ্ধদের সহযোগিতা নিয়ে সেনাবাহিনী নির্মমভাবে গণহত্যা ও মানবতা বিরোধী অন্য অপরাধগুলো ঘটানোর পরিকল্পনা করেছিল। অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার হতে পারে এমন জিনিসগুলো জব্দ করা হয়। রোহিঙ্গাদের বাড়ির চারপাশে যে বেড়া নির্মাণ করা হয়েছিল তা ভেঙে ফেলে তারা। হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল রাখাইন রাজ্যে।
অনেক বছর ধরে অং থেইন মাইয়া রোহিঙ্গাদেরকে তার অধীনে সন্ত্রাসী এক অবস্থার মধ্যে রেখেছিল। সে তাদের সবকিছু চুরি করে নেয়। গবাদি পশু চড়ানো থেকে শুরু করে বিয়ের প্রস্তাব সবকিছুতে সে অতিরিক্ত ফি নির্ধারণ করে।
আবদুল্লাহ নামে একজন রোহিঙ্গা তার নাম উচ্চারিত হতেই ক্ষোভে জ্বলে উঠলেন। তিনি বলেছেন, অং থেইন মাইয়া আমাদেরকে এতটাই নির্যাতন করেছে যে, আমার মনে হয় তাকে পেলে কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলতাম।
ছুট পাইন গ্রামে নির্যাতনের অভিন্ন ডকুমেন্ট উপস্থাপন করেছেন মানবাধিকার বিষয়ক গ্রুপগুলোর তদন্তকারীরা। জুনে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। তাতে প্রত্যক্ষদর্শীদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, অং থেইন মাইয়া তাদের ওপর দীর্ঘদিন নির্যাতন চালিয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে অং থেইন মাইয়া। এখনও সে দায়িত্বে আছে। বলেছে, রোহিঙ্গা প্রতিবেশীদের সঙ্গে তার রয়েছে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক। তবে সে রোহিঙ্গাদেরকে বাঙালি হিসেবে অভিহিত করেছে। বলেছে, বাঙালিরা মিথ্যে অভিযোগ করেছে। তারা আসলে মিয়ানমারের নাগরিক নয়। তারা বাংলাদেশী অবৈধ অভিবাসী। তার অভিযোগ, রোহিঙ্গারা নিজেরাই নিজেদের বাড়িঘরে আগুন দিয়েছে। কি কারণে তারা পালিয়েছে সে বিষয়টি অং থেইন মাইয়ার কাছে অজানা। তার দাবি, রোহিঙ্গারা চলে যাওয়ায় তার ও তার প্রতিবেশীদের জীবন উন্নত হয়েছে। সাক্ষাতকারে সে বলেছে, আমি চাই না এসব রোহিঙ্গা আর ফিরে আসুক। বাঙালিদের বাদ দিয়ে আমাদের গ্রাম শান্তিপূর্ণ রয়েছে।

একজন মিকেলার চোখে বাংলাদেশ by তাহমিনা ইয়াসমিন শশী

ইতালিয়ান ইমিগ্রেশন অফিসের এক রুটিন সভায় বসে আছি। পেছন থেকে কেউ একজন সালাম দিলেন। উচ্চারণ শুনেই বুঝতে পারলাম সালাম দাতা নিশ্চই একজন ইতালীয়। আমার আন্দাজ ভুল হলো না। ঘাড় ফিরিয়ে দেখি সহকর্মী মিকেলা বসকলো ফিওরে (Michela Boscolo Fiore)। মিকেলা বসকলো ভেনিসের ইমিগ্রেশন অফিসের সহযোগী পরিচালক। কাজের সুবাদেই তার সঙ্গে পরিচয়।
সদা হাস্যোজ্বল সুন্দরী ইতালীয় যুবতী মিকেলা। কথা বলে কোনোভাবেই বোঝার উপায় নেই তিনি ইমিগ্রেশন অফিসের এতবড় দায়িত্বে আছেন। সবার সঙ্গে একেবারে সাদা-মাটাভাবে মিশেন। এতটুকু বস বস ভাব নেই। তিনি মনে করেন, সহকর্মীদের মধ্যে বন্ধুত্ব না থাকলে সঠিক কাজ সহজভাবে করা যায় না।
ঘাড় ফেরানোর আগে বুঝতে পারিনি আমার জন্য আরো কিছু বিস্ময় অপেক্ষা করছে। গালভরা হাসি নিয়ে মিকেলা বললেন, ভালো আছ কি? আমি মুহূর্তের জন্যে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। কী উত্তর দেবো? কীভাবে উত্তর দেবো? ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এমন পরিস্থিতিতে আমি আগেও পড়েছি। কোনো বিদেশির মুখ থেকে হঠাৎ বাংলা শুনলে আমি এতবেশি আবেগি হয়ে যাই যে, মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরুতে চায় না। দীর্ঘদিন ইতালিতে থেকে সারাক্ষণ ইতালীয় কলিগদের সঙ্গে তাদের ভাষায় বক-বক করতে এবং শুনতে কান অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তাই হঠাৎ কারো মুখে দুই-একটি বাংলা শব্দ শুনলে আমি ভাষা হারিয়ে ফেলি। কি বলবো সব গুলিয়ে ফেলি। মিকেলার বেলাও তাই হলো। জানতে চাই- আপনি বাংলা জানেন?
মিকেলা ইতালিয়ান ঢংয়ে বললেন, হ্যাঁ, আমি বাংলা বলতে পারি। বাংলাদেশেও গিয়েছি। তার কথা শুনে আমার কৌতূহল আরও বেড়ে গেল। আমার আগ্রহ মিকেলার বুঝতে বাকি রইলো না। তিনি বললেন, আমি অনেক আগে থেকে অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করি। এ কাজ করতে গিয়ে অনেক ভাষাভাষী, জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে মেশার সুযোগ হয়। বাংলাদেশিদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ধীরে ধীরে কৌতূহলী হয়ে উঠি। ইতালিতে অভিবাসী বাংলাদেশিদের (সকলের না) ভাষাগত দুর্বলতা তো আছেই, পাশাপাশি আর একটা বিষয় খেয়াল করি একেক জনের চিন্তার ধরন একেক রকম। কারও সঙ্গে কারও মৌলিক কোনো মিল নেই। অন্যান্য দেশের অভিবাসীরাও ভিন্ন ভিন্ন চিন্তা করে। কিন্তু তাদের চিন্তায় মিল আছে। যা বাংলাদেশিদের মধ্যে খুঁজে পাই না। আমি বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভৌগোলিক, মানসিক অবস্থান জানতে চেষ্টা করি। এ থেকেই মূলত বাংলাভাষা শেখা এবং বাংলাদেশে যাওয়ার আগ্রহ সৃষ্টি হয়।
মিকেলা ২০০৫ সালে বাংলাদেশ সফর করেন। সে অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে বলেন, আমার বাংলাদেশ সফরের গোড়াতেই গলদ ছিল। আমার সঙ্গে ইতালি থেকে একজন বাংলাদেশি দোভাষী যাওয়ার কথা ছিল। তার উপর নির্ভর করে যখন বাংলাদেশ সফরের সব ঠিক করি তখন আর তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। খানিকটা হোঁচট খেলেও আমি দমে যাইনি। বাংলাদেশ সফর বাতিল করিনি।
মিকেলা বলেন, আমি ভালো ইংরেজি জানি, তারপরেও বাংলাদেশে গিয়ে ভাষাগত সমস্যা টের পাই। অনেক কষ্টে দূতাবাসের মাধ্যমে একজন মহিলা অনুবাদকের সন্ধান পাই। কিন্তু তিনি আমাকে ঢাকায় সময় দিতে রাজি হলেও ঢাকার বাইরে যেতে অপারগতা জানান। অগত্যা কী আর করা, আমি একাই রওনা দিলাম শরীয়তপুরের উদ্দেশে। আমি প্রশ্ন করলাম, বাংলাদেশের এত জায়গা রেখে শরীয়তপুর কেন? মিকেলা হেসে উত্তর দেন, কারণ দু’টি। প্রথমত, আমি পড়াশোনা করে জেনেছি, বাংলাদেশ দেখতে হলে, বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি জানতে হলে, মানুষের চিন্তা-চেতনার ধরন বুঝতে হলে মাটির কাছে যেতে হবে, অর্থাৎ গ্রামে যেতে হবে। শহুরে কোলাহলে বাংলাদেশের রূপ-লাবণ্য বোঝা যাবে না। দ্বিতীয় কারণ হলো ভেনিসের বাংলাদেশি কমিউনিটির অধিকাংশ মানুষ শরীয়তপুর থেকে এসেছেন। শরীয়তপুরের অনেকের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে, বন্ধুত্ব আছে। ইতালিতে বসে এত বেশি শরীয়তপুরের গল্প শুনেছি যে শরীয়তপুর বাদ দিয়ে আমি বাংলাদেশ ভাবতেই পারি না।
মিকেলার চোখে-মুখে মুগ্ধতার আলো ঝলমল করছে। তিনি বলতে থাকেন, আমি শুধু শরীয়তপুর দেখিনি, গোটা বাংলাদেশ দেখেছি। বাংলাদেশের রূপ-বৈচিত্রে মুগ্ধ হয়েছি। মানুষ আর প্রকৃতির নিবিড় বন্ধন দেখেছি। মাটি আর মানুষের ভালোবাসা দেখেছি। গ্রাম বাংলার সরল জীবন দেখেছি। বাংলাদেশের মানুষের আতিথেয়তা আমি কোনোদিন ভুলতে পারবো না। তারা মানুষকে ভালোবাসতে জানে, বুক পেতে আপন করে নিতে জানে। সেখানে প্রকৃতির মতো উদারতা আছে। নেই কোনো অকৃতিম অভিনয়।
কথার ফাঁকে মিকেলা গেয়ে উঠলেন, ‘ও আমার দেশের মাটি তোমার উপর ঠেকাই মাথা...।’ আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো মিকেলার দিকে তাকিয়ে থাকি। তাঁর চোখের আয়নায় বাংলাদেশকে দেখি। এক সময় আমার দুই চোখ ভিজে যায়। তা দেখে মিকেলা হেসে ফেলে বলেন, তোমরা এত আবেগি কেন? এত আবেগ বুকে নিয়ে তোমরা বাঁচো কি করে? আমি মিকেলার কথার কোনো উত্তর দিতে পারি না। তিনি আমার দিকে একটা বই বাড়িয়ে দেন। বুঝতে পারি, প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে ভারি হয়ে ওঠা পরিবেশ মিকেলা হালকা করতে চাচ্ছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে যাওয়ার আরও একটা কারণ ছিল, ভেনিস বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতিতত্ত্ব বিভাগের জন্য একটি থিসিস লেখা। আমি বাংলাদেশ থেকে ফিরে সে কাজটি করেছি। আমার দেখা এবং অনুভব করা বাংলাদেশের খুঁটিনাটি সব বিষয় নিয়ে একটা প্রবন্ধ লিখেছি। যা বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে।
মিকেলা তার বই সম্পর্কে বলেন, আমি বাংলাদেশের মানুষকে আমার বইতে তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি। মিকেলার বইয়ের পাতা উল্টাতে শুরু করি। বাংলাদেশের ইতিহাস, ভৌগলিক অবস্থা, অর্থনৈতিক অবস্থা, সমাজ-সংস্কৃতি, শরীয়তপুর-নড়িয়ার সব বিষয় তুলে ধরেছেন। বইতে সাধারণ মানুষের কাজ, পর্দা, লজ্জা, বিয়ে, তালাক, যৌতুক, প্রেম-ভালোবাসা, ধর্মচর্চা কি নেই?
মিকেলা বলেন, বাংলাদেশে গিয়ে অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। মানুষের জীবনের বৈচিত্র দেখেছি। যা কোনোভাবেই বইপত্র পড়ে, ইন্টারনেট ঘেঁটে জানা সম্ভব নয়। বাংলাদেশে এখনও যৌথ পরিবার আছে, যা আমার খুবই ভালো লেগেছে। কিন্তু সমস্যা হলো অনেক যৌথ পরিবারে একজনের আয়ের উপর ৫/৭ জন নির্ভর করে। একজন প্রবাসীর আয়ের উপর নির্ভর অনেক সংসার  চলে। তারা অপেক্ষা করে থাকে কখন প্রবাসী ছেলে বা স্বামী টাকা পাঠাবে? সেই টাকায় তারা সংসার চালাবে, নিত্য-প্রয়োজন মেটাবে, ছোট-বড় উৎসব করবে, আনন্দ ফূর্তি করবে। যা আমার কাছে সঠিক মনে হয়নি।
মিকেলা বলেন, হয়তো আমার বোঝায় অনেক ভুল থাকতে পারে। কিন্তু আমার কাছে বাস্তবতা এমনই মনে হয়ছে। অনেক অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, তাদের ছেলেকে বাড়ি, দোকান, জমি বিক্রি করে, বন্ধক রেখে বিদেশে পাঠিয়েছেন। ছেলে বিদেশে গিয়ে বৈধ হতে পারেনি। ভালো কাজ পায়নি। সংসারের চাহিদা মেটাতে পারছে না। বাবা, মা, স্ত্রীর মুখে হাসি ফোটাতে পারছে না। একদিকে ছেলে বিদেশে কষ্ট করছে, অন্যদিকে বাবা-মা-স্ত্রী সন্তানরা দেশে কষ্ট করছে। অনেক স্ত্রীকে দেখেছি তাদের কষ্টের কোনো সীমা নেই। তারা মুখ ফুটে কাউকে কিছু বলতেও পারে না। স্ত্রী বছরের পর বছর স্বামীকে কাছে পায় না, সন্তান কাছে পায় না তাদের বাবা কে। কেউ কেউ বছরে মাত্র একবার ৩/৪ সপ্তার জন্য তাদের প্রিয় মানুষকে কাছে পান, যাকে কোনো ভাবেই স্বাভাবিক জীবন বলা যায় না।

জীবন শঙ্কায় দশ লাখ রোহিঙ্গা by রুশনারা আলী

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অভিযানের কারণে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার বাংলাদেশে পালিয়ে আসার এক বছর এ মাসে পূর্ণ হয়েছে। একই সঙ্গে এ মাসে কক্সবাজারে ভরা বর্ষা মৌসুম শুরু হয়েছে। সেখানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবিরে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা বাস করছে। মিয়ানমারের সেনাদের ২০১৭ সালের অভিযানকে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনার জাতি নির্মূল অভিযানের উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। রাখাইনের সেনা অভিযানের বিষয়ে তিনি বলেছেন, সেখানে গণহত্যা সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। সবচেয়ে সুপরিকল্পিত ও বড় মাত্রায় হলেও অভিযানটি সর্বপ্রথম অভিযান ছিল না। এর আগে ২০১২ ও ২০১৬ সালের অভিযানে এক লাখেরও বেশি মানুষ দেশের অভ্যন্তরেই বাস্তুচ্যুত হয়। তারা খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, আশ্রয়ের দিক দিয়ে কার্যত বসবাস করছে বন্দি শিবিরে। এসব স্থানে সীমিত সুযোগ রয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক এজেন্সিগুলোর। রোহিঙ্গারা দশকের পর দশক ধরে ধারাবাহিক বৈষম্যের শিকার। তাদের রাখা হয়েছে রাষ্ট্রহীন অবস্থায়। তাদের জাতিগত স্বীকৃতি নেই। পরিচিতি নেই। এই স্বীকৃতি দেয়া হলে তাদের থাকতো সমঅধিকার।
২০১৩ ও ২০১৭ সালে অভ্যন্তরীণ আশ্রয় শিবিরগুলো পরিদর্শন করেছি। সেখানে পরিস্থিতি ভয়াবহ এবং কোনো কারণ ছাড়াই মানুষ মারা যায়। কারণ, তাদের চলাফেরায় নৃশংস বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। তাদের টিকে থাকার জন্য যে সহায়তা প্রয়োজন তার রয়েছে ভীষণ সংকট।
মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর সে দেশের সেনাবাহিনী যে ভয়াবহ নির্যাতন চালিয়েছে সে বিষয়ে আমি অনেক বছর প্রচারণা চালিয়েছি। এ নৃশংসতা অং সান সুচির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে ও পরে চালানো হয়েছে। সেখানে সেনাবাহিনী অব্যাহতভাবে দায়মুক্তির সুবিধা পাচ্ছে।
মিয়ানমার গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে যখন চারদিক থেকে সমর্থন আসছে তখন দ্রুততার সঙ্গে দেশটির ওপর থেকে বিভিন্ন অবরোধ তুলে নেয়া হয়। নাটকীয়ভাবে মিয়ানমার সরকারের ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ‘লিভারেজ’ কমিয়ে দেয়। উল্লেখ্য, মিয়ানমার এখনো রয়েছে সেনাবাহিনীর কব্জায়।
গত মাসে আমি বাংলাদেশের কক্সবাজারে শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেছি। সেখানে পৌঁছেই এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল যে, মাত্র ৫ বর্গ মাইল এলাকায় বসবাস করছেন কয়েক লাখ মানুষ। তার, পুলিন ও বাঁশ দিয়ে একটির সঙ্গে একটি লাগানো অবস্থায় এসব আশ্রয় শিবির তৈরি করা হয়েছে। যতদূর চোখ যায় ততদূর শুধু এগুলোই দেখা যায়। কিছু কিছু এনজিও কক্সবাজারকে বাংলাদেশের চতুর্থ বৃহৎ শহর হিসেবে আখ্যায়িত করা শুরু করেছে।
ভারি বর্ষণের ফলে পাহাড়ি খাড়া পথগুলো অবিশ্বাস্য রকম পিচ্ছিল হয়ে পড়েছে এবং তাতে পা রাখা খুবই কঠিন। মাটি একেবারে ভেজা। বাঁশের তৈরি সাঁকো থেকে পা পিছলে মানুষ নিচে পড়ে যাওয়ার কথা শুনেছি আমি। শুনেছি এ কারণে অন্তঃসত্ত্বা নারীরা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে যেতে পারেন না। আমরা যখন হেঁটে যাচ্ছিলাম। তখন একটি নগ্ন শিশু পানি ও হলুদ কাদায় পড়ে যায়। তাকে তুলে আনে তার বন্ধুরা।
ভূমিধসের গুরুতর আশঙ্কার মুখে রয়েছে প্রায় ৩০ হাজার শরণার্থী। তাদের পুনর্বাসন জরুরি। এখন পর্যন্ত মাত্র ১৫ হাজার শরণার্থীকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। আগের দিনগুলোতে এই শরণার্থী শিবিরে যাওয়ার মূল পথটি চলাচলের জন্য অনুপযুক্ত ছিল ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ফলে শরণার্থীদের কাছে ত্রাণ সুবিধা পৌঁছাতে পারেনি এনজিওগুলো। এর ওপর আরো বৃষ্টি হলে তাতে পরিস্থিতির আরো অবনতি হবে। আর সামনেই আসছে ঘূর্ণিঝড়ের সময়।
আমার সঙ্গে যেসব মা কথা বলেছেন তারা জানিয়েছেন, মিয়ানমারে তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিচ্ছিল হামলাকারীরা। এ সময় তারা যখন পালাচ্ছিলেন তখন তাদের মেয়েদের তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হয়েছে। তাদেরকে ধর্ষণ করা হয়েছে। হত্যা করা হয়েছে। তাদেরকে পরিবার থেকে আলাদা করা হয়েছে। একজন পিতা বেদনার সঙ্গে বলেছেন, কিভাবে তার ছেলেকে তার সামনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। আমি যখন সেখান থেকে সরে আসছিলাম তখন একজন বললেন, আমরা ন্যায়বিচার চাই।
এসব শরণার্থীর ফিরে যাওয়া নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। কিন্তু তাদের নিরাপত্তা ও নাগরিকত্বের অধিকারের নিশ্চয়তা ছাড়া এই পুনর্বাসন হতে পারে না। অন্যথা হলে, যেসব মানুষ তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা চালিয়েছিল তাদের নিয়ন্ত্রণে কার্যত একটি বন্দিশিবিরে বসবাস করতে হবে নিন্দনীয়ভাবে।
মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের। সেনাবাহিনীকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে নেয়ার কথায় সমর্থন দিয়েছে কানাডা। একই সঙ্গে মিয়ানমারে যে হায়েনার মতো অপরাধ ঘটানো হয়েছে সে বিষয়ে প্রমাণ সংরক্ষণে পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানানো হয়েছে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নতুন করে অবরোধ দেয়ার একটি প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে পাস করেছে কানাডার পার্লামেন্ট।
কিন্তু এ ক্ষেত্রে বৃটেনকে আরো অনেক কিছু অবশ্যই করতে হবে। গত নভেম্বরে অধিকতর পদক্ষেপ বা অ্যাকশন নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তেরেসা মে। তিনি বলেছেন, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ, বিশেষ করে সেনাবাহিনী যে মানবিক সংকট সৃষ্টি করেছে এ জন্য তাদেরকে অবশ্যই পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব নিতে হবে।
তিনি আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একত্রিত করতে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা রাখবে বৃটেন। এরমধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে চালানো অমানবিকতা ও ভয়াবহতা বন্ধে সম্ভাব্য সব কিছু করা হবে।
কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো আমাদের সরকার দৃঢ়তার সঙ্গে মানবিক সহায়তা দিয়ে গেলেও, মিয়ানমার সরকার, সেনাবাহিনীর প্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের ওপর বাস্তবে কোনো চাপ দেয়ার মতো অবস্থায় আসেনি।
তেরেসা মে যদি এটা বুঝিয়ে থাকেন মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে পাঠানোকে সমর্থন করবে বৃটেন, তাহলে বিশ্বকে অবশ্যই ভুলে গেলে চলবে না বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা কি দুর্দশার শিকার। জাতিসংঘ তাদের জন্য যে তহবিলের আহ্বান জানিয়েছে তার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ পূরণ হয়েছে। রোহিঙ্গাদের জীবন নিরাপদ করে গড়ে তুলতে একটি পথ অবশ্যই জরুরি ভিত্তিতে বের করে আনতে হবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে।
(বৃটেনের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বৃটিশ এমপি রুশনারা আলির লেখার অনুবাদ)

রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগের শেষ নেই

সেনাবাহিনী ও তাদের দোসরদের নৃশংস নির্যাতনের শিকার হয়ে স্রোতের মতো বাংলাদেশে প্রবেশ করতে থাকে মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা। এক বছর হতে চলেছে তারা এভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। কিন্তু তাদের দুর্ভোগের শেষ হয়নি। এমন কি মিয়ানমারও তাদেরকে গ্রহণ করতে এখন পর্যন্ত আন্তরিকতা দেখায়নি। উল্টো রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন বিলম্ব হওয়ার জন্য সে দেশের নেত্রী অং সান সুচি দায় চাপিয়েছেন বাংলাদেশের ওপর। মিয়ানমার থেকে দলে দলে পালিয়ে আসার পর বাংলাদেশে গাদাগাদি করে অবস্থান করছেন এসব রোহিঙ্গা। সেখানে দেখা দিয়েছে নানা সামাজিক সমস্যা। গত বছর ২৫শে আগস্ট আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি (আরসা) মিয়ানমারের নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের ওপর হামলা চালায়। এতে কয়েকজন নিরাপত্তারক্ষী নিহত হন। এর পরই রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংস নির্যাতন শুরু করে দেশটির সেনাবাহিনী ও তার দোসররা। তারা নির্বিচারে গণধর্ষণ করে বালিকা, যুবতী ও নারীদের। গুলি করে হত্যা করে অসংখ্য মানুষকে। আগুন ধরিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেয় গ্রামের পর গ্রাম। এরপর সেসব গ্রামের ওপর তারা নির্মাণ করে সেনাবাহিনীর অবকাঠামো। এসব বিষয় প্রামাণ্য আকারে উপস্থাপন করেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা। রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে মিয়ানমারের ওপর আছে আন্তর্জাতিক চাপ। তবে জাতিসংঘে এ বিষয়ে উত্থাপিত একটি প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে চীন ও রাশিয়া। ফলে মিয়ানমারের ওপর জাতিসংঘের চাপ প্রয়োগের বিষয়টি ঠুনকো বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখনো মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা আসার প্রবণতা রয়েছে। প্রায় দুই মাস আগে স্বামী, দুই বছরের একটি ছেলে ও তিন মাস বয়সী একটি বাচ্চাকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন হামিদা বেগম। পালিয়ে আসার আগে তার স্বামী ঠিকমতো ঘুমাতে পারেননি। কারণ, সারাক্ষণই তার মধ্যে গ্রেপ্তার হওয়ার ভয় কাজ করতো। ১৮ বছর বয়সী হামিদা বলেন, রাত হলে তার স্বামী কোনো গাছের মগডালে উঠে যেতেন। সারা রাত সেখানেই বসে থাকতেন। প্রচণ্ড বৃষ্টি হলেও সেখানে বসে থাকতেন। তিনি এখন বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ শরণার্থী শিবিরের একপাশে অবস্থান নিয়েছেন।
মিয়ানমার বারবার বলছে, তারা রোহিঙ্গাদের গ্রহণ করতে প্রস্তুত। কিন্তু এখনো হামিদা ও তার পরিবারের মতো অনেক মানুষ পালিয়ে আসায় মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সমস্যা সমাধানে অগ্রগতিতে ঘাটতির বিষয়টিকেই ফুটিয়ে তোলে। রোহিঙ্গাদের এই দলে দলে দেশ ত্যাগ সেখানকার গণতান্ত্রিক পালাবদলে একটি উত্তেজনাকর অবস্থার সৃষ্টি করে এবং বিশ্বের কাছে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অং সান সুচির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। মিয়ানমারে নিয়োজিত জাতিসংঘের সাবেক কূটনীতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক রিচার্ড হরসি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট বিশ্বের কাছে মিয়ানমারের ভাবমূর্তি ভয়াবহভাবে ক্ষতি করেছে। সেনাবাহিনী বা নিরাপত্তারক্ষাকারীদের বিরুদ্ধে নৃশংসতার যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা প্রত্যাখ্যান করেছে অং সান সুচির সরকার। তারা ফেরত যাওয়া রোহিঙ্গাদের গ্রহণ করতে রাখাইনে নির্মাণ করেছে ট্রানজিট ক্যাম্প। এ বছরের শুরু থেকে আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ১৩ হাজার রোহিঙ্গা এসেছে বাংলাদেশে। এতে পরিষ্কার বোঝা যায়, এক বছর আগে যে সংকট শুরু হয়েছিল তা দ্বিতীয় বছরে প্রবেশ করেছে এবং এ সংকট সমাধান বহু দূরের বিষয়। নতুন আসা প্রায় অর্ধডজন শরণার্থী বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা বলেছেন, পুড়িয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া বাড়িঘর ও ফাঁকা গ্রামগুলোতে টিকে থাকার লড়াই করছিলেন তারা। কিন্তু নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা তাদের গ্রেপ্তার করে হয়রানি করতে পারে এমন আতঙ্কে সব ছেড়ে আসতে বাধ্য হয়েছেন তারা। আরো বলেছেন, তাদের এক রকম গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছিল। অনাহারে মারা যাওয়ার অবস্থায় তাদের ঠেলে দেয়া হয়েছিল। তাদের কোনো কাজে, মার্কেটে, পুকুরে মাছ ধরতে যেতে দেয়া হতো না। মসজিদে যেতে পারতেন না নামাজ আদায় করতে। মিয়ানমার বলেছে, তারা সংকটে উস্কানি দেয়নি। উল্টো সেনাবাহিনী সন্ত্রাসবিরোধী একটি অপারেশন চালিয়েছে।

ইয়েমেনি শিশুদের করুণ অবস্থা

ইয়েমেনের একটি হাসপাতাল। সেখানে অত্যাচারিত শিশুদের কান্নায় বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। অনাহারে থাকা এসব শিশুর মুখের চামড়া লেগে আছে হাড়ের সঙ্গে। সেখানে এসেছে প্রায় তিন মাস বয়সী একটি শিশু মোহাম্মদ। কিন্তু তাকে দেখতে মনে হয় একটি অপ্রাপ্ত বয়স্ক নবজাতকের মতো। ক্ষুধার কারণে তার ক্ষুদ্র শরীরটা আরো ছোট হয়ে এসেছে। মাথাটির আকৃতি ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র হয়েছে। সব কিছু যেন চরম এক অনাহারে থাকার কাহিনী বলে দিচ্ছে। ইয়েমেনের দক্ষিণে মুকাল্লার একটি হাসপাতালে পৌঁছেছে মোহাম্মদ। তার আগে তাকে নিয়ে তাদের হাজার গ্রাম থেকে উত্তপ্ত গ্রীষ্মে ভয়াবহ এক সফর করে তার মা পৌঁছেছেন ওই হাসপাতালে। মোহাম্মদের মায়ের সঙ্গে এসেছেন আরো ৫ নারী। তাদের সঙ্গেও যেসব শিশু রয়েছে তারাও হাড্ডিসার। চিকিৎসা পাওয়ার আশায় বসে ছিলেন হাসপাতালে।
ইয়েমেনে যুদ্ধের কারণে জীবন নিয়ে লড়াই করছে অসংখ্য শিশু। তার মধ্যে ৫ বছরের কম বয়সী শিশু, যারা ভয়াবহভাবে অপুষ্টিতে ভুগছে তাদের সংখ্যা ৫ লাখ। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের তথ্যমনে আরো ১৮ লাখ শিশু আছে, যারা অনাহারে ভুগছে। ফলে ইয়েমেনে প্রতিদিনই বাড়ছে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর সংখ্যা। হানান নামে তিন সন্তানের মা বলেন, আমার স্বামীর কোনো কাজ নেই। সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে তিনি দিনের পর দিন ছুটে বেড়ান কাজের সন্ধানে। নিয়মিত কাজ পান না। ওই হাসপাতালের পরিচালক আভা আবদাল্লাহ বলেন, উপসাগরীয় সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী ২০১৬ সালে মুকাল্লা থেকে আল কায়েদাকে উৎখাত করার পর ডায়রিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। ওই এলাকার অর্থনৈতিক অবস্থা একেবারেই খারাপ। ফলে নির্ধারিতভাবেই অনাহারে থাকতে হচ্ছে মানুষকে। এখানে নারী ও শিশুদের চিকিৎসার জন্য এই হাসপাতালটিই প্রধান অবলম্বন। এখানে রয়েছে মাত্র ৬টি বেড। ফলে প্রতিদিন রোগীতে সয়লাব হয়ে যাচ্ছে ওই হাসপাতাল। উপসাগরীয় অঞ্চলে ইয়েমেন হলো সবচেয়ে দরিদ্র দেশ। ২০১৫ সাল থেকে সেখানে বিধ্বংসী এক গৃহযুদ্ধ চলছে। ওই সময় সৌদি আরব ও তার মিত্ররা বোমা হামলা শুরু করে।