Saturday, November 7, 2009

বাংলাদেশের সাফ প্রস্তুতিতে আসছে উলসান হুন্দাই

নিজেদের প্রাক-মৌসুম প্রস্তুতি নিতে বরাবরের মতো বিদেশে যাওয়ার জন্য তারা তৈরি হচ্ছিল। এমন সময়ই বাফুফের আমন্ত্রণ গেল তাদের কাছে, আর ওটা পেয়েই রাজি হয়ে গেছে দক্ষিণ কোরিয়ার উলসান হুন্দাই ক্লাবটি। সাফ ফুটবলের আগে বাংলাদেশ দলকে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলার সুযোগ করে দিতে দলটি নিজেদের খরচে ঢাকায় আসছে, থাকবেও নিজেদের খরচে। আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের আগে শক্তিশালী দলের সঙ্গে ম্যাচ খেলতে না পারার আক্ষেপটা এবার কিছুটা দূর হচ্ছে বাংলাদেশ দলের।
সফরে দুটি ম্যাচ খেলবে উলসান হুন্দাই। জাতীয় দলের সঙ্গে অবশ্য একটি ম্যাচ রাখছে বাফুফে। দুটি ম্যাচ খেললে নাকি জাতীয় দলের ওপর চাপ পড়বে! ঠিক হয়েছে, ২৪ নভেম্বর বাফুফে একাদশ ও ২৫ নভেম্বর জাতীয় দল খেলবে হুন্দাইয়ের সঙ্গে। দুটি ম্যাচই হবে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে।
এফএফসি ক্লাব কাপে উলসান হুন্দাইয়ের সঙ্গে খেলেছে মোহামেডান এবং হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে দুই ম্যাচেই হেরেছে বিশাল ব্যবধানে। বছর তিনেক আগে হুন্দাইয়ের জুনিয়র দল ঢাকায় বাংলাদেশের অলিম্পিক দলকে হারিয়ে গেছে ৩-২ গোলে।
সাফ ফুটবলের জন্য বাংলাদেশ দলের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যাচ্ছে আগামী রবি-সোমবার নাগাদ। কোচ ডিডো কাল ২৩ জন খেলোয়াড়ের নাম জমা দিয়েছেন বাফুফের কাছে। ১০ নভেম্বর থেকে অনুশীলন শুরু করার পরিকল্পনা তাঁর। তবে বাফুফের জাতীয় দল ব্যবস্থাপনা কমিটি অনুশীলন শুরু করতে চায় ৮ তারিখ থেকেই। এ নিয়ে মতভেদ থাকলেও আগের পরিকল্পনা থেকে সরে ঢাকার পরিবর্তে বিকেএসপিতে ক্যাম্প করতে সম্মত হয়েছেন ডিডো।

আর্জেন্টিনা-জার্মানিও ঝরে পড়ল

ব্রাজিলের পর অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিল আর্জেন্টিনাও। পরশু দ্বিতীয় রাউন্ডে তারা ২-৩ গোলে হেরেছে দক্ষিণ আমেরিকার প্রতিবেশী কলম্বিয়ার কাছে। এই পরাজয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে ব্যর্থ হলো আর্জেন্টিনা। অথচ ম্যাচের ৮৭ মিনিট পর্যন্ত এগিয়ে ছিল তারাই।
তিন মিনিটে আর্জেন্টিনাকে দুই গোল করে কান্নায় ভাসিয়েছে কলম্বিয়া। অথচ গঞ্জালেজ পিরেজ ও সার্জিও আরাওজোর গোলে ৫৭ মিনিটের মধ্যেই ২-০-তে এগিয়ে গিয়েছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তিন মিনিটের মধ্যে কলম্বিয়ার জা ব্লাঙ্কো ও হেক্টর কুইননসের দুটি গোল শেষ করে দেয় অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রথম শিরোপার স্বপ্ন। ৬৩ মিনিটে কলম্বিয়ার প্রথম গোলটি করেছেন জেইসন মুরিল্লো।
অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপের শিরোপা স্বাদ এখনো পাওয়া হয়নি আরেক ফুটবল পরাশক্তি জার্মানিরও। এবারও খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে তাদের শেষ ষোলোতে সুইজারল্যান্ডের কাছে ৪-৩ ব্যবধানে হেরে। দিনের অন্য দুটি ম্যাচে তুরস্ক ২-০ গোলে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে এবং ইতালি ২-১ গোলে যুক্তরাষ্ট্রকে হারিয়ে উঠে গেছে শেষ আটে।

কলকাতা নাইট রাইডার্সের অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলি, কোচ ডেভ হোয়াটমোর

ভারতের সাবেক অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলি আবারও কোলকাতা নাইট রাইডার্সের অধিনায়ক হয়েছেন। তিনি নিউজিল্যান্ডের ম্যাককালামের স্থলাভিষিক্ত হলেন। ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) তৃতীয় আসরে গাঙ্গুলি কোলকাতা নাইট রাইডার্সকে নেতৃত্ব দিবেন। আইপিএলের প্রথম ও দ্বিতীয় আসরে ব্যর্থতার পর নাইট রাইডার্সের দল ব্যবস্থাপকের পক্ষে আজ শুক্রবার এ ঘোষণা দেওয়া হয়। টাইমস অব ইন্ডিয়া।
কোচ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের সাবেক কোচ ডেভ হোয়াটমোরকে। তার সহকারি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন রঞ্জি ট্রফির দিল্লির কোচ বিজয় দাহিয়া। আর দলের পরামর্শদাতা হয়েছেন লিজেন্ড ফাস্ট বোলার পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক ওয়াসিম আকরাম।

আফগানিস্তান থেকে নিজেদের কর্মী সরিয়ে নিচ্ছে জাতিসংঘ

জাতিসংঘ যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান থেকে তাদের কয়েক শ কর্মী সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জরুরি নয়—এমন কর্মীদের দ্রুত প্রত্যাহার করে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সংস্থাটি। আফগানিস্তানে সম্প্রতি জাতিসংঘের একটি অতিথিশালায় তালেবান জঙ্গিদের ভয়াবহ হামলার পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। জাতিসংঘের একজন মুখপাত্র গতকাল বৃহস্পতিবার এ কথা জানিয়েছেন।
মুখপাত্র ড্যান ম্যাকনর্টন বলেছেন, প্রায় ৬০০ বিদেশি কর্মীকে সাময়িকভাবে আফগানিস্তান থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে। একমাত্র জরুরি কর্মীরাই সেখানে অবস্থান করবেন। আফগানিস্তানে কর্মরত কর্মীদের নিরাপত্তার স্বার্থে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। শিগগিরই এ অপসারণ-প্রক্রিয়া শুরু হবে। এদের একটি অংশকে আফগানিস্তানের ভেতরে তুলনামূলক নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হবে।
ম্যাকনর্টন বলেন, কর্মী অপসারণের বিষয়টি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে। তবে কয়েক সপ্তাহের জন্য এ সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকবে। একই সঙ্গে আফগানিস্তানে নিরাপত্তাব্যবস্থাও জোরদার করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
গত ২৮ অক্টোবর তালেবানের বন্দুকধারীরা জাতিসংঘের ব্যবহূত কাবুলের একটি অতিথিশালায় হামলা চালায়। এতে জাতিসংঘের পাঁচজন কর্মীসহ ১০ জন নিহত হয়।
এ হামলার পরপরই জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন কাবুলের নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। গত সোমবার অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকের পর বান কি মুন বলেছেন, তালেবানের হিংসাত্মক কর্মকাণ্ডের পরও জাতিসংঘ তার লক্ষ্য থেকে পিছপা হবে না। আফগানিস্তানে কাজ চালিয়ে যাবে সংস্থাটি। আফগানিস্তানে পাঁচ হাজার ৬০০ কর্মী রয়েছে জাতিসংঘের। তাঁদের বেশির ভাগই আফগান।

ফিলিস্তিনে আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হবেন না আব্বাস

ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস আগামী জানুয়ারিতে আবার নির্বাচন করবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছেন। স্থানীয় টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে তিনি বলেন, ইসরায়েলের সঙ্গে পুনরায় শান্তি আলোচনা নিয়ে যে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতেই তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তবে আগামী নির্বাচন স্থগিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কেননা হামাস বলেছে, তারা গাজায় কোনো নির্বাচন হতে দেবে না। অবশ্য ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এখনো শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন আব্বাসের সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়ে বলেন, তিনি আশা করেন, ভবিষ্যতে আব্বাস যে অবস্থানেই থাকেন না কেন, তিনি তাঁর সঙ্গে কাজ করবেন। তিনি গত শনিবার মধ্যপ্রাচ্য সফরের সময় আব্বাসের সঙ্গে আলোচনার বিষয়টি স্মরণ করে বলেন, আব্বাস এবং তাঁর নেতৃত্বের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের যথেষ্ট শ্রদ্ধা রয়েছে।
ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সমস্যার সমাধানে তাঁর অঙ্গীকারের বিষয়টি উল্লেখ করে হিলারি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট আব্বাস যে অবস্থানে থাকেন না কেন, এ লক্ষ্য অর্জনে আমি ভবিষ্যতে তাঁর সেঙ্গ কাজ করার অপেক্ষায় আছি।’ ইতিমধ্যে হোয়াইট হাউস আব্বাসকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সত্যিকারের অংশীদার’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

ডেনমার্ক না ভারতে হামলা—এই নিয়ে বিভক্ত লস্কর

লস্কর-ই-তাইয়েবা ভারতে মুম্বাই হামলার মতো আরেকটি হামলা চালানোর পরিকল্পনা করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক লস্কর-ই-তাইয়েবার দুই সদস্য ডেভিড কোলম্যান হেডলি ওরফে দাউদ গিলানি ও তাহায়ুর হোসেইন রানাকে ইলিনয়ের ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে হাজির করে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (এফবিআই) এমন তথ্যই উপস্থাপন করেছে।
এফবিআইয়ের ভাষ্যমতে, ভারতে হামলার ব্যাপারে লস্কর-ই-তাইয়েবার নেতৃত্বের সঙ্গে হেডলি ওরফে দাউদ ও রানার মতানৈক্য দেখা দেয়। যার ফলে ভারতে মুম্বাই হামলার মতো আরেকটি হামলার ঘটনা ঘটতে পারেনি। এফবিআই সংগঠনটির এক সদস্যকে ‘এ’ নামে চিহ্নিত করে আদালতে বলে, ওই সদস্য এই দুজনকে ভারতে হামলার ব্যাপারে উত্সাহিত করেন। কিন্তু হেডলি ওরফে দাউদ ও রানা ২০০৫ সালে হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর ব্যঙ্গ কার্টুন এঁকে বিশ্বব্যাপী সমালোচনার ঝড় তোলা ডেনমার্কের পত্রিকাটির কার্যালয়ে হামলা চালাতে বেশি আগ্রহী ছিলেন। এফবিআই তাদের তদন্তে দেখেছে, তাঁরা দুজন হুজির কমান্ডার ইলিয়াস কাশ্মীরির সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক লস্কর-ই-তাইয়েবার সন্ত্রাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন।
এফবিআই আরও জানায়, এক সময় লস্কর-ই-তাইয়েবা ডেনিশ ওই পত্রিকার কার্যালয়ে হামলা চালানোর বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। কিন্তু পরে তারা সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে ভারতে হামলা চালানোর বিষয়টি তাদের অগ্রাধিকার তালিকায় রাখে। এতে হতাশ হন হেডলি ওরফে দাউদ ও রানা; তবে তাঁরা ডেনিশ পত্রিকার কার্যালয়ে হামলা চালানোর পরিকল্পনা থেকে পিছপা হননি।
এফবিআইয়ের বিশেষ এজেন্ট লরেঞ্জো বেনেডিক্ট ইলিনয়ের আদালতে বলেন, ২০০৯ সালের জুলাই ও আগস্টে হেডলি ওরফে দাউদ লস্কর-ই-তাইয়েবার সদস্য ‘এ’-এর সঙ্গে অনেকগুলো ই-মেইল আদান-প্রদান করেন। যেখানে ‘এ’ হেডলি ওরফে দাউদকে জানান, ডেনিশ প্রকল্পটি স্থগিত করা হয়েছে। ‘এ’ তাঁকে ভারতে গিয়ে সম্ভাব্য হামলার স্থানগুলো দেখে আসার নির্দেশ দেন। এসব ই-মেইলই প্রমাণ করে, ‘এ’ হেডলি ওরফে দাউদকে ডেনমার্কের পত্রিকার কার্যালয়ের চেয়ে ভারতে হামলা চালানোর কাজে ব্যবহার করার ব্যাপারে বেশি আগ্রহী ছিলেন।
‘এ’-এর এই মনোভাব পরিবর্তনের বিষয়টি তাঁকে জুলাইয়ের ১৬ তারিখে হেডলি ওরফে দাউদের পাঠানো এক ই-মেইলেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ওই ই-মেইলে হেডলি ওরফে দাউদ বলেন, ‘আমাকে আপনার কত দিনের জন্য দরকার? মানে ভারতীয় প্রকল্প শেষ করার জন্য কত দিন সময় দেওয়া হবে আমাকে? এটা (ভারতে হামলা) কি আসলেই বেশি জরুরি? আমার মনে হয়, এটার চেয়ে ডেনিশ প্রকল্প অনেক বেশি জরুরি।’
এফবিআই জানায়, তবে ‘এ’-এর এমন মনোভাবে সন্তুষ্ট হতে পারেননি হেডলি ওরফে দাউদ। তিনি কোপেনহেগেনে যান এবং রানার সহায়তায় ইউরোপের অন্যান্য জায়গাও পরিদর্শন করেন। এ ছাড়া আগস্টের ১১ তারিখে ‘এ’ হেডলি ওরফে দাউদকে লেখেন, ‘এ হামলা (ভারতে হামলা) সফল করতে তোমার গায়ের রং আমাকে অনেক বেশি সহায়তা করবে। আমারটা এ ব্যাপারে আমাকে ততটা সহায়তা করবে না...।

পঁচাত্তরের নভেম্বর -কর্নেল তাহের: এক অমীমাংসিত চরিত্র by শাহাদুজ্জামান

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অমীমাংসিত একটি চরিত্র কর্নেল তাহের। তাঁকে ঘিরে অস্পষ্টতা আছে, আছে বিতর্ক, বর্ণাঢ্যতাও। একটি মুহূর্ত তৈরি হয়েছিল যখন বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ এসে বসেছিল কর্নেল তাহেরের হাতের মুঠোয়। কিন্তু ইতিহাসের এক আপতিক মোচড়ে তাঁর মুঠো থেকে ফসকে গেছে সে মুহূর্তটি। তারপর সেই পতিত ইতিহাস নিয়ে অবিরাম জন্ম দেওয়া হয়েছে ধোঁয়াচ্ছনতা। ফলে বাংলাদেশের ইতিহাসের তাত্পর্যপূর্ণ এ চরিত্রটি কখন থাকেন সম্পূর্ণ উহ্য, কখনো বা উপস্থাপিত হন পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে। আর রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে একটা উপেক্ষার চাদর বরাবরই ঢেকে রাখে তাঁকে। দুঃসাহসিক এক অভিযানের মধ্য দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের ক্যান্টনমেন্ট থেকে পালিয়ে যোগ দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে, যুদ্ধক্ষেত্রের দুর্ধর্ষ এক অপারেশনে হারিয়েছেন একটি পা, ক্রাচে ভর দিয়ে তারপর নেতৃত্ব দিয়েছেন বিরল এক সিপাহি অভ্যুত্থানের এবং সর্বোপরি কিংবদন্তি সেই ক্ষুদিরামের পর শিকার হয়েছেন উপমহাদেশের দ্বিতীয় রাজনৈতিক ফাঁসির। একটি আদর্শকে তাড়া করতে গিয়ে একজন মানুষ যতটুকু দিতে পারেন, দিয়েছেন সবটুকুই। যদিও সে আদর্শ প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। কিন্তু তথাকথিত বহু সাফল্যের চেয়ে কোনো কোনো ব্যর্থতাও হয়ে উঠতে পারে উজ্জ্বল।
একজন লেখক হিসেবে এবং বাংলাদেশের রাজনীতির একজন কৌতূহলী পর্যবেক্ষক হিসেবে এই ব্যতিক্রমী মানুষটিকে নিয়ে একটি সাহিত্যিক মোকাবিলার সিদ্ধান্ত নিই, যার ফল আমার সম্প্রতি প্রকাশিত বই ক্রাচের কর্নেল। লক্ষ করি কর্নেল তাহের কারও কাছে একটি অস্বস্তিকর প্রসঙ্গ, কারও কাছে লাল সালামের আনুষ্ঠানিকতায় বন্দী, কারও কাছে বা তিনি নেহাত পেটি বুর্জয়া এক রোমান্টিক বিপ্লবী। রাজনীতিতে মারাত্মকভাবে বিভক্ত এই জনপদে তাহেরকে ঘিরে থাকা নানা কুয়াশা সরিয়ে তাঁর সঠিক ঐতিহাসিক বয়ানটি অনুসন্ধান দুরূহ ব্যাপার। দীর্ঘ গবেষণায় তাহেরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অসংখ্য মানুষের সঙ্গে আলাপচারিতা, সীমিত এবং বিক্ষিপ্ত দলিল আর লেখাপত্রের মধ্য দিয়ে তাহেরের রক্ত-মাংসের অবয়ব এবং তাঁর যাত্রাপথটিকে বোঝার চেষ্টা করি।
লক্ষ করি আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের বিভিন্ন স্টেশনে বেড়ে ওঠা একজন স্টেশন মাস্টারের ছেলে আবু তাহের একদিন যে ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে আবৃত্তি করছেন ‘জন্মেছি মৃত্যুকে পরাজিত করবও বলে’, তা কোনো কাকতালীয় ব্যাপার নয়। তাহেরের এই কৌতূহলোদ্দীপক পথপরিক্রমাটি লক্ষ করলে দেখতে পাই, ব্যতিক্রমের বীজ তাঁর পরিবারটির ভেতরই। বিশেষ করে নজর কাড়েন তাহেরের মা আশরাফুন্নেসা। কর্নেল তাহেরের ভাইবোনের সঙ্গে, তাঁদের বাড়ি শ্যামগঞ্জের কাজলা গ্রামের অধিবাসীদের সঙ্গে যখন আলাপ করেছি, তখন তাঁদের টুকরো টুকরো স্মৃতিচারনায় যে নারীর অবয়ব ফুটে উঠেছে, তার সঙ্গে আবেগবিহ্বল, অশ্রুসজল বাঙালি মায়ের রূপের কোনো মিল নেই। কড়া শাসনে ১০ সন্তানের বিশাল পরিবারটি যূথবদ্ধভাবে একটি প্রতিষ্ঠানের মতো করে গড়ে তুলেছেন তাহেরের মা আশরাফুন্নেসা। ছেলেমেয়েদের কঠিন কায়িক শ্রমে বাধ্য করেছেন, পাঠিয়েছেন নানা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে, অবিরাম অন্যের উপকার করার একটা স্পৃহা জাগিয়েছেন তাঁদের মধ্যে, পাঠ্যবইয়ের বাইরের বই পড়তে অনুপ্রাণিত করেছেন। ফলে পুরো পরিবারটিরই তৈরি হয়েছে এক ব্যতিক্রমী যৌথ ব্যক্তিত্ব। স্মরণ করা যেতে পারে, কর্নেল তাহেরের সব ভাইবোন মুক্তিযুদ্ধে তাঁর নেতৃত্বে ১১ নং সেক্টরে যৌথভাবে যুদ্ধ করেছেন। সাতই নভেম্বরের অভ্যুত্থানে তাঁর প্রত্যেক ভাই ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। বন্দী তাহেরকে মুক্ত করতে ভারতীয় হাইকমিশনারকে জিম্মি করার সুইসাইডাল স্কোয়াডের যে নাটকীয়তা ঘটেছিল, তার দুজন সদস্যই ছিলেন তাহেরের ভাই, যার একজন নিহত হন সেদিনের অপারেশনে। যুদ্ধ আর বিপ্লবকে এ রকম একটি পারিবারিক ব্যাপারে পরিণত করার দ্বিতীয় উদাহরণ বাংলাদেশে আছে বলে আমার জানা নেই।
গ্রামবাসী ও পারিবারিক স্মৃতিচারণায় কিশোর তাহেরকে দেখি অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়তা আর নানা চারণ বিপ্লবীপনায়। নামজাদা ডাকাতের মোকাবিলা করা, গহিন জঙ্গলে অভিযানে বেরিয়ে পড়া, পাকিস্তানি মন্ত্রী নুরুল আমিনের ট্রেনে দলবেঁধে ঢিল ছোড়া ইত্যাদি গল্প ছড়িয়ে আছে তাঁকে নিয়ে। তাহেরের স্কুল সহপাঠী কাজলার বৃদ্ধ স্কুলশিক্ষক আব্দুল হান্নান মাস্টার আমার সঙ্গে গল্প করেছেন, কী করে স্কুলে আরবির বদলে সংস্কৃত পড়ার জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তুলকালাম কাণ্ড করেছিলেন তাহের। জানতে পারি, রাজনীতির বৃহত্তর ছবিটি তাহের দেখতে পেয়েছিলেন চট্টগ্রামের প্রবর্তক স্কুলে পড়ার সময় তাঁর এক শিক্ষকের সাহচর্যে। সূর্য সেনের সঙ্গী এই শিক্ষক সশস্ত্র স্বদেশি আন্দোলনের ব্যাপারে আকৃষ্ট করে তুলেছিলেন তাহেরকে। পরবর্তী সময়ে সিলেটের এমসি কলেজে পড়ার সময় রাজনীতির বিস্তারিত পাঠ শুরু হয় তাহেরের। সে সময়কার আরও অনেক তরুণের মতো তাহের আকৃষ্ট হন মার্ক্সবাদে। পঞ্চাশ-ষাটের দশকে পৃথিবীর নানা দেশে বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের বহু তরুণের কাছে কমিউনিজম এক নিষিদ্ধ, রোমান্সকর স্বপ্ন। সেই স্বপ্নে তাড়িত হয়েছিলেন তাহের। কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো পড়ে উত্তেজিত হয়ে ভাই আনোয়ার হোসেনকে লিখেছিলেন, ‘দিস ইজ দ্য বেস্ট বুক দ্যাট আই হ্যাভ রিড সো ফার।’
তাহেরের জীবনের এই পর্বটির গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাই এমসি কলেজে তাহেরের দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু লন্ডন-প্রবাসী জনাব মঞ্জু এবং ঢাকা কৃষি মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষক জনাব মজুমদারের কাছে। তাঁদের স্মৃতিচারণায় আমার চোখের সামনে ফুটে ওঠে রাজনীতির ঘোর লাগা প্রাণবন্ত কলেজছাত্র তাহেরের ছবি। আমাকে তাঁরা দেখিয়েছেন সযত্নে রেখে দেওয়া তরুণ তাহেরের হাতে লেখা উষ্ণ চিঠি। লক্ষ করি, সমাজতন্ত্রের সামরিক দিকটির ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহ তাহেরের। পূর্ব পাকিস্তানে একটি সশস্ত্র বিপ্লবের আশঙ্কা নিয়ে তখন ভাবছেন তিনি। এ সময় তাহের একটি অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত নেন। বন্ধুদের বলেন, পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একটি আর্মস স্ট্রাগলের জন্য মিলিটারি ট্রেনিং নিতে আর্মিতে যোগ দেবেন তিনি। পুরো ভাবনাটি অদ্ভুত ঠেকে বন্ধুদের কাছে। কিন্তু তাহের তাঁর সংকল্পে স্থির থেকে পর পর দুবার পরীক্ষা দিয়ে তারপর আর্মিতে সুযোগ পান। বিপ্লবের প্রয়োজনে সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে সচেতনভাবে সেনাবাহিনীতে ঢোকার এমন নজির বিরল। আর্মিতে ঢুকে এরপর দ্রুত তাহের পরিণত হন প্রথম সারির অফিসারে। প্রথম বাঙালি অফিসার হিসেবে পাকিস্তান আর্মির কমান্ডো দলে অন্তর্ভুক্ত হন, নেতৃত্ব দেন প্যারাস্যুট জাম্পিংয়ে। যত রকম সামরিক প্রশিক্ষণ আছে, সেগুলো আত্মস্থ করার ব্যাপারে তত্পর থাকেন তিনি। পাকিস্তান আর্মির জানার কথা নয়, ‘তোমারে বধিবে যে গোকুলে বাড়িছে সে।’ কমান্ডো দলের জুনিয়র অফিসার মেজর আনোয়ার তাঁর হেল কমান্ডো বইয়ে তাহেরের পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জীবনের চমত্কার বর্ণনা দিয়েছেন।
এমসি কলেজে বন্ধুদের কাছে যে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, লক্ষ করি সেটা নেহাত ঠাট্টা নয়। আয়ুব খানের সামরিক শাসনের চাপে পাকিস্তানে কমিউনিস্ট আন্দোলনের অবস্থা তখন নাজেহাল। বিশ্বরাজনীতির প্রভাবে সেখানেও তখন চীন-রাশিয়া বিভেদ, কিন্তু দেখতে পাই পাকিস্তান আর্মির ভেতর থেকেও তাহের যোগাযোগ স্থাপন করেছেন পূর্ব পাকিস্তানের বাম রাজনীতির সবচেয়ে র্যাডিক্যাল একটি অংশের সঙ্গে, যারা নিজেদের তখন প্রস্তুত করছে সশন্ত্র সংগ্রামের জন্য। তরুণ প্রকৌশলী সিরাজ শিকদারের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই ছোট দলটির সঙ্গে তাহেরের যোগাযোগ হয় ছোট ভাই আনোয়ারের মারফত, সঙ্গে ছিলেন ভাই আবু সাঈদ ও আবু ইউসুফও। সেই ১৯৬৯ সালে সিরাজ শিকদারের সঙ্গে মিলে টেকনাফকে ঘাঁটি করে, তত্কালীন বার্মার কমিউনিস্ট পার্টির সহযোগিতায় একটি সশন্ত্র সংগ্রামের সিরিয়াস প্রস্তুতি নিয়েছিলেন তাহের। ছুটি নিয়ে গোপনে বহু তরুণকে তিনি আর্মস ট্রেনিং দিয়েছিলেন তখন। একটা ঘোর এবং গভীর প্রত্যয় ছাড়া পাকিস্তানি আর্মির একজন অফিসার হিসেবে এমন মারাত্মক ঝুঁকি নেওয়ার দুঃসাহস থাকার কথা নয়। বিপ্লরের নেশায় মত্ত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখায় ইস্তফা দিয়ে টেকনাফের গভীর অরণ্যে ঘাঁটি গাড়ার সেসব স্মৃাতি আমাকে বলেছেন আনোয়ার হোসেন। আরেক ভাই আবু সাঈদ জানিয়েছেন সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বার্মার কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যোগাযোগের রোমহর্ষক অভিজ্ঞতা। সিরাজ শিকাদারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ফজলুল হক রানা আমাকে বলছিলেন তাহের ও শিকদারের সেই গোপন বিপ্লবী প্রশিক্ষণের গল্প। মতদ্বৈধতার কারণে তাহের ও শিকদারের সেই যৌথ উদ্যোগ সে সময় অগ্রসর হয়নি বেশি দূর। কিন্তু এসব কর্মকাণ্ড থেকে স্পষ্ট হয় তাঁর ভাবনার গতিপথটি, তাঁর প্রস্তুতিটি। টের পাই কী করে ক্রমেই তাহের ধাবিত হচ্ছেন তাঁর পরিণতির দিকে। সেই ঊনসত্তরে ব্যর্থ বিপ্লবীর জীবনে আসে বসন্তের হাওয়া। এ সময়ই ঈশ্বরগঞ্জের ডা. খুরশীদুদ্দিনের মেয়ে লুত্ফার সঙ্গে বিয়ে হয় তাহেরের। সেনাবাহিনীর ট্রুপ দিয়ে বরযাত্রী সাজিয়ে ফাঁকা গুলি করতে করতে অভিনব কায়দায় বিয়ের আসরে গিয়েছিলেন তাহের।

২.
বলছিলাম, ক্রাচের কর্নেল বইটিতে তাহেরের যাত্রাপথটিই অনুসরণ করার চেষ্টা করেছি আমি। সেখানে বরাবর একটি নাটকীয়তা লক্ষ করেছি, পাশাপাশি লক্ষ করেছি চিন্তার ধারাবাহিকতাও। নাটকীয়ভাবেই আর্মিতে ঢুকেছিলেন তিনি, কিন্তু কোনো জেনারেল হওয়ার আশায় নয়, বরং একটি আদর্শিক মিশন নিয়ে। সে কারণে সেই ঊনসত্তরেই আর্মি ছেড়ে দিয়ে সিরাজ শিকদারের গোপন বিপ্লবী দলে যোগ দেওয়ার সব রকম ঝুঁকি নিয়েছিলেন তাহের। সে কারণেই মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রথম সুযোগেই আর্মির চাকরিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পাকিস্তান ক্যান্টনমেন্ট থেকে পালিয়েছেন। মেজর জিয়াউদ্দীন, মেজর মঞ্জুর আর ক্যাপ্টেন পাটোয়ারীকে নিয়ে এবোটাবাদ থেকে দেবীগড় পালানোর দুঃসাহসিক অভিযানটির বর্ণনা নিজেই লিখে গেছেন তাহের। জনাব পাটোয়ারীর কাছ থেকে পরবর্তী সময়ে শুনছিলাম, কী করে তাহেরই পাকিস্তান পালানোর পুরো অভিযানটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম, শিয়ালকোটের ধানক্ষেতের কাদার ভেতর গভীর রাতে সন্তর্পণে পা ফেলে চলা সেই ছোট অভিযাত্রী দলটিকে।
বলা বাহুল্য, কোনো কনভেনশনাল যুদ্ধ করার জন্য তাহের পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসেননি। তিনি করোটিতে বহন করে এনেছিলেন তাঁর গোপন মিশনটিও। মুক্তিযুদ্ধ একটি স্বাধীকারের যুদ্ধ হলেও তিনি এর বাঁক ঘোরানোর চেষ্টা করছিলেন সমাজতান্ত্রিক জনযুদ্ধের দিকে। ১১ নম্বর সেক্টরে প্রচলিত ব্রিগেড গড়ার বদলে তিনি ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে থাকেন অপেশাদার গেরিলাদের ওপর। তাঁর সেক্টরের কোম্পানিগুলোতে পলিটিক্যাল কমিশনার হিসেবে তিনি নিয়োগ দেন বাম আদর্শে উদ্বুদ্ধ তরুণদের। এ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের কমান্ডার জেনারেল ওসমানীর সঙ্গে বিরোধ বাধে তাহেরের। তাহেরের সহযোদ্ধার সঙ্গে আলাপ করে জেনেছি, একটি গলফস্টিক হাতে ক্যাম্প থেকে ক্যাম্পে ঘুরে কী গভীর আন্তরিকতায় তিনি শোনাতেন হো চি মিনের পিপলস ওয়ারের গল্প। ১১ সেক্টরের যুদ্ধ সাংবাদিক হারুন হাবীব রণক্ষেত্রের প্রাণবন্ত তাহেরের বর্ণনা দিয়েছেন তাঁর বিভিন্ন লেখায়, জানিয়েছেন তাহেরের দেওয়া ইয়াশিকা ক্যামেরাটি দিয়েই তিনি তুলেছিলেন যুদ্ধের যাবতীয় ছবি।
তাহের ভেবেছিলেন, ময়মনসিংহ সীমান্তের কামালপুরে পাকিস্তানিদের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘাঁটিটির পতনের মধ্য দিয়েই তিনি ঢাকা দখলের পথ সুগম করবেন। দুর্ধর্ষ কামালপুর অপারেশনটি যেদিন তাহের করেছিলেন, সেদিন গুরুত্বপূর্ণ সব দায়িত্বে ছিলেন তাঁর ভাইবোনেরা। ভাই আনোয়ার ছিলেন তাঁর স্টাফ অফিসার, ছিলেন সাঈদ, ইউসুফ, বেলাল, বাহার, এমনকি কিশোরী বোন ডালিয়াও, যাঁকে তাহের ডাকতেন গেরিলী বলে। সেদিন ছিল ১৪ নভেম্বর, তাহেরের জন্মদিন। কথা ছিল, ভোর রাতের মধ্যে কামালপুর দখল করে সেখানে সহযোদ্ধা, ভাইবোনদের নিয়ে পালন করবেন জন্মদিন। তুরা ক্যাম্প থেকে এসে যোগ দেবেন স্ত্রী লুত্ফা আর বোন জুলিয়া। বড় ভাই আরিফ তখন মা-বাবাকে আগলে আছেন কাজলায়। একপর্যায়ে ধরা পড়েছেন পাকিস্তানিদের হাতে। কামালপুর অপারেশনে বিজয় প্রায় নিশ্চিত ছিল। উত্তেজনায় নিজের কমান্ড পোস্ট থেকে সরে গিয়ে তাহের চলে গিয়েছিলেন শত্রুব্যূহের একেবারে কাছে। সেদিন একটি শেল এসে উড়িয়ে দিয়েছিল তাহেরর পা। সেই মর্মান্তিক মুহূর্তের বর্ণনা শুনছিলাম তাঁর দুই হাত দূরে পজিশন নিয়ে থাকা ভাই ওয়ারেসাত হোসেন বেলালের কাছ থেকে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর সহায়তায় দ্রুত তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল গৌহাটি হাসপতালে। বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হচ্ছে, তাহের তখন পুনায় চিকিত্সাধীন। মুক্তিযুদ্ধের দ্রুত সমাপ্তিতে খুশি হননি তাহের। একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে ভিয়েতনামের মতো একটি সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটবে, এমনই প্রত্যাশা ছিল তাঁর।
মুক্ত বাংলাদেশে ক্রাচে ভর দিয়ে ফেরেন তাহের। কিন্তু তাঁর মিশন থাকে অব্যহত। লক্ষ করি, এবার তাঁর মনোযোগ ক্যান্টনমেন্টে। তিনি সেনাবাহিনীর খোলনলচে পালটে ফেলার চেষ্টা করেন। জনগণ ও সেনাবাহিনীর দূরত্ব ঘুচিয়ে তিনি পিপলস আর্মি গঠনের প্রস্তাব করেন। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে তিনি সিপাহিদের নামিয়ে দেন চাষাবাদে, গ্রাম উন্নয়নে। মেজর জিয়াউদ্দীন, যিনি কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে সে সময় ছিলেন তাহেরের অধীনস্থ অফিসার স্মরণ করছিলেন ক্যান্টনমেন্টে সন্ধ্যার পর সেসব সেশনের কথা, যখন তাহের তাঁর ক্রাচটি পাশে রেখে তরুণ অফিসারদের উদ্বুদ্ধ করতেন ঔপনিবেশিক ধাঁচের সেনাবাহিনীকে বদলে ফেলতে। জিয়াউদ্দীন পুরোপুরি তাহেরের ভক্ত হয়ে উঠলেও সাধারণভাবে আর্মির ভেতর তাহেরের এ ধরনের কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা ওঠে। তাঁর ব্রিগেডকে লাঙল ব্রিগেড বলে মশকরা করে অভিযোগ তোলা হয় যে তাহের আর্মির ভেতর কমিউনিস্ট চিন্তা ঢোকানোর চেষ্টা করছেন। তাহেরকে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের অ্যাকটিভ কমান্ড থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
বলা বাহুল্য, একটি কমিউনিস্ট ধাঁচের আর্মির কথাই ভাবছিলেন তাহের। কিন্তু পুরো রাষ্ট্রকাঠামোর সঙ্গে সেটি ছিল বেমানান। কর্নেল তাহের তাঁর চিন্তাভাবনা নিয়ে সে সময় বেশ কয়েকবার আলাপ করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সঙ্গে। শেখ মুজিব তাহেরকে উত্সাহিত করেছিলেন এবং বলেছিলেন, এ নিয়ে বিস্তারিত আলাপ করবেন। কিন্তু সে সুযোগ আর হয়ে ওঠেনি। শেখ মুজিব বাম ধারার রাজনীতিবিদ না হলেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর প্রবল প্রভাবের কথা ভেবেই তাঁর ওপর আস্থা রাখছিলেন তাহের। কিন্তু অচিরেই টের পেয়েছিলেন, সে সময়কার বিশ্বরাজনীতি আর অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জটিল জটাজালকে ব্যক্তিগত কারিশমা দিয়ে সামাল দেওয়া বঙ্গবন্ধুর পক্ষে হবে দুরূহ। তাহের সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করে এবার সরাসরি বিকল্প রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পদত্যাগপত্রে তাহের লিখেছিলেন, তিনি আঁচ করছেন, একটি গভীর বিপদ ধেয়ে আসছে বাংলাদেশের মানুষের দিকে। সেটা ১৯৭২ সাল। তাহেরের আশঙ্কা সত্য প্রমাণ করে গভীর বিপদ বাস্তবিকই আঘাত হেনেছিল বাংলাদেশকে অচিরেই।
তাহের তাঁর করোটির মিশনটি এবার একটি দলীয় কাঠামোর ভেতর স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন। পাকিস্তান আমলেও একবার চেষ্টা করেছিলেন সিরাজ শিকদারের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে, সফল হননি। স্বাধীন বাংলাদেশে তাহের খুঁজতে থাকেন তাঁর জন্য যথার্থ একটি বাম রাজনৈতিক দল। প্রধান বাম দল ন্যাপ এবং সিপিবি তখন আওয়ামী লীগের সঙ্গে একীভূত, ফলে তালিকা থেকে তারা বাদ যায়। তাহের বরং এক এক করে দেখা করেন ভাসানী, আবুল বাশার, মোহাম্মদ তোয়াহা, সিরাজুল হোসেন খান প্রমুখ প্রবীণ বাম নেতাদের সঙ্গে। বদরুদ্দীন উমর আমাকে বলছিলেন, কীভাবে তাহের ক্রাচে ভর দিয়ে সিঁড়ি ভেঙে তাঁর শান্তিনগরের বাসায় এসে গভীর উদ্বিগ্নতায় আলাপ করতেন দেশে একটি যথার্থ সমাজতান্ত্রিক সংগ্রামের সম্ভাবনা নিয়ে। কারও সঙ্গে মেলেনি তাহেরের। এককালীন সহযোগী সিরাজ শিকদার সে সময় সর্বহারা পার্টির মাধ্যমে যে সন্ত্রাসী প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন, তাঁকেও সমর্থন করেননি তাহের। এ সময় বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ডাক দিয়ে আবির্ভূত হয় জাসদ। তাঁর তাত্ত্বিক নেতা সিরাজুল আলম খানের সঙ্গে বিস্তারিত আলাপ করেন তাহের। হাসানুল হক ইনু, সে সময়ের তরুণ জাসদ নেতা আমাকে জানিয়েছেন রাতের পর রাত ধরে তাহেরের নারায়ণগঞ্জের বাড়িতে তর্ক-বিতর্ক করার স্মৃতি। একপর্যায়ে নিজের নাম গোপন রেখে জাসদে যোগ দেন তাহের।
একদিকে গণ-আন্দোলন, অন্যদিকে সম্ভাব্য অভ্যুত্থানের জন্য সমান্তরাল একটি সশস্ত্র গণবাহিনী তৈরি করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে জাসদ। তাহের হন গণবাহিনীর প্রধান। সে সময়কার দেশের উদ্ভ্রান্ত পরিস্থিতিতে তুমুলভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে জাসদ। একটি সুদূরপ্রয়াসী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল জাসদ। কিন্তু পঁচাত্তরের বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু ওলট-পালট করে দেয় সব হিসাব। শেখ মুজিবকে উত্খাতকারী ঘটনার নায়কেরা আওয়ামী লীগবিরোধী হিসেবে জাসদকে তাদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা চালিয়েছিল। কিন্তু ১৫ অগাস্টের ভোরেই তাহের ক্রাচে ভর দিয়ে ভাই আনোয়ার ও জাসদ নেতা ইনুকে নিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন শাহবাগ রেডিও স্টেশনে। ঘটনার কুশীলব মোশতাক ও মেজর রশীদকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর অবস্থন। বলেছিলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন তিনি চাইছিলেন ঠিকই, কিন্তু এমন কাপুরুষ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নয়। খন্দকার মোশতাককে শাসিয়ে দিয়েছিলেন আর কোনো ষড়যন্ত্রের পথে না গিয়ে দ্রুত নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে। কিন্তু তখন ঝড়ের বেগে বদলে যাচ্ছে সব। বলা যায়, প্রতিদিনই তখন তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশের ইতিহাস। ১৫ অগাস্টে শেখ মুজিব হত্যা, ২ নভেম্বরে খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থান, ৩ নভেম্বরে জেলহত্যা ইত্যাদি মিলিয়ে পুরো রাজনীতি এসে তখন কেন্দ্রীভূত হয়েছে সামরিক বাহিনী ও ক্যান্টনমেন্টে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জাসদ বদলে ফেলে তাদের আন্দোলনের কৌশল, সক্রিয় করে তোলে গণবাহিনীকে, প্রস্তুতি নেয় পাল্টা অভ্যুত্থানের। গণবাহিনীর প্রধান হিসেবে এবং সেনাবাহিনীর অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে কর্নেল তাহেরই তখন হয়ে ওঠেন জাসদ রাজনীতির পুরোধা।
বাকি অংশ আগামীকাল
শাহাদুজ্জামান: কথাসাহিত্যিক।

নিরক্ষরতা দূরীকরণে ইসলাম by মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে সৃজন করেছেন। সেই মহান স্রষ্টাকে জানতে, বুঝতে এবং খাঁটি মুসলমান হওয়ার জন্য শিক্ষার্জনের বিকল্প নেই। মানবজীবনে অক্ষরজ্ঞানহীন অবস্থাই হলো নিরক্ষরতা। কোনো বয়স্ক নিরক্ষর ব্যক্তির পক্ষে প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যাশিক্ষা বা জ্ঞানার্জন করা সম্ভব নয়। শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। আর শিক্ষার পূর্বশর্ত হলো অক্ষরজ্ঞান। তাই নিরক্ষর মানুষকে অক্ষরজ্ঞানসমৃদ্ধ করার জন্য ইসলামে জোরালো তাগিদ দেওয়া হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘পড়ো! তোমার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন।’ (সূরা আল-আলাক, আয়াত: ১)
মানব-ইতিহাসের সূচনালগ্ন থেকে শিক্ষার একটি কল্যাণময় দিক রয়েছে। বিদ্যাশিক্ষার উত্পত্তি পৃথিবীর আদিমানব সর্বপ্রথম নবী হজরত আদম (আ.), যিনি মানবজাতির শিক্ষাগুরু। তিনি যে উত্স থেকে জ্ঞান লাভ করেন তা হচ্ছে ওহি বা ঐশীবাণী। পরিশেষে প্রাক-ইসলামি যুগের অমানিশার ঘোর অন্ধকার ভেদ করে জন্ম নিলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম আদর্শ মহাপুরুষ মানবজাতির মহান শিক্ষক, শ্রেষ্ঠ দার্শনিক হজরত মুহাম্মদ (সা.)। তাঁর কাছে যে ওহি আসত তা থেকে মানুষের জন্য যা শিক্ষণীয়, ইসলামের অনুসারীকে তা শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে। শিক্ষার প্রতি গভীর অনুরাগ, শিক্ষা-কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান প্রমাণ করে যে, তিনি ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ জ্ঞান-গবেষক এবং নিরক্ষরতা দূরীকরণে তাঁর গৃহীত নীতি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষাদর্শন। পবিত্র কোরআন ও হাদিস থেকে শিক্ষার যে গুরুত্ব বা তাগাদা তার মর্যাদা অপরিসীম। রাসূলুল্লাহ (সা.) বাণী প্রদান করেছেন, ‘বিদ্যাচর্চা বা শিক্ষার্জন করা প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর জন্য ফরজ বা অবশ্যকর্তব্য।’ (ইবনে মাজা)
ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধে (৬২৪ খ্রি.) প্রতিপক্ষের নেতৃস্থানীয় ৭০ জন লোক নিহত ও ৭০ জন লোক মুসলমানদের হাতে বন্দী হয়। ইসলামের ইতিহাসে বদর যুদ্ধে বন্দীদের মধ্যে যারা মুক্তিপণ দিতে অসমর্থ হয়, তাদের মদিনার মানুষকে লেখাপড়া শিখিয়ে দেওয়ার শর্তে মুক্তি দেওয়া হয়। সেদিন তাদের কাছ থেকে রক্তের বদলা না দিয়ে বরং মুক্তিপণ হিসেবে ১০ জন নিরক্ষরকে অক্ষরজ্ঞান দান করা নির্ধারণ করে লেখাপড়া শিক্ষা দেওয়ার বিনিময়ে তাদের মুক্তি নিশ্চিত করা হয়। নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে জাতিকে মুক্ত করার প্রত্যয়ে জীবনের চরম শত্রুকে নবী করিম (সা.) শিক্ষকের মর্যাদা দিয়ে মদিনায় প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার দ্বার উন্মোচন করলেন। পবিত্র কোরআনের বাণীকে জাতির সামনে তুলে ধরে নিরক্ষরতার মূলে আঘাত হেনে শিক্ষাগ্রহণের বিষয়টি হূদয়গ্রাহী করে তুললেন। আল্লাহর বাণী উদ্ধৃত করে তিনি মানুষকে সুসংবাদ জানালেন, ‘যাকে জ্ঞান-প্রজ্ঞায় সমৃদ্ধ করা হয়েছে তাকে মহাকল্যাণে ভূষিত করা হয়েছে।’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৬৯)
নিরক্ষরতা দূরীকরণে শিক্ষার্জনের অনুপ্রেরণার পাশাপাশি রাসূলুল্লাহ (সা.) কিছু বাস্তবমুখী ফলপ্রসূ কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন। ঐতিহাসিক সাফা পর্বতের পাদদেশে ‘দারুল আরকাম’ নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষাকার্যক্রম তিনি নিজেই সরাসরি তত্ত্বাবধান করেন। বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এটিই ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম শিক্ষালয়। এভাবে মদিনায় হজরত আবু উসামা বিন যুবায়ের (রা.) বাড়িতে একটি শিক্ষালয় প্রতিষ্ঠা করেন। হজরত মুসআব বিন উমায়ের (রা.)কে নবী করিম (সা.) এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নিযুক্ত করেন। মদিনায় প্রতিষ্ঠিত এটিই সর্বপ্রথম শিক্ষালয়। আর দ্বিতীয় শিক্ষালয়টি হচ্ছে হজরত আবু আইউব আনসারী (রা.)-এর ব্যক্তিগত বাসভবন যেখানে রাসূলুল্লাহ (সা.) দীর্ঘ আট মাস শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা করেন। শিক্ষার আলো মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে রাসূলে করিম (সা.) এভাবে আলোকিত মানুষকে নিয়ে সুশীল সমাজ গড়ার দৃপ্ত শপথ নেন।
নিরক্ষর ও শিক্ষাবঞ্চিত লোকদের শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে নবী করিম (সা.) মসজিদভিত্তিক বিশেষ শিক্ষাগারে আবাসিক শিক্ষাকার্যক্রম হাতে নেন। সাহল ও সুহাইল নামের দুই সহোদর সাহাবির কাছ থেকে ক্রয়কৃত জমিতে নিরক্ষরতা দূরীকরণের জন্য প্রতিষ্ঠিত মসজিদভিত্তিক এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ‘আসহাবে সুফ্ফা’ বলা হতো। বিশিষ্ট সাহাবি হজরত সাইয়েদ ইবনুল আস (রা.) এ প্রতিষ্ঠানের আবাসিক শিক্ষক হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। হিজরি দ্বিতীয় সালে নবীজি ‘দারুল কোবরা’ নামে আরও একটি আবাসিক প্রতিষ্ঠান গড়ার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে রেখে শিক্ষার্থীদের মেধা ও মনন তৈরিতে অশেষ অবদান রাখেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি জ্ঞান রাখে আর যে জ্ঞান রাখে না তারা উভয় কি সমান হতে পারে?’ (সূরা আল-যুমার, আয়াত: ৯)
আরবে লেখাপড়ার প্রচলন খুব অল্পই ছিল। কিন্তু যখন ইসলামের আগমন ঘটল, তখন যেন লিখনপদ্ধতিও নিয়ে এল। আল-কোরআন লিপিবদ্ধ ও সুসংহত করার প্রয়োজন ছিল সর্বাধিক। এ কারণে রাসূলুল্লাহ (সা.) লিখনপদ্ধতি প্রচলনের প্রতি মনোযোগ দিয়ে বলেছেন, ‘আল্লাহ যাকে কল্যাণ করতে চান, তিনি তাকে দীনের সঠিক জ্ঞান দান করেন। আর অবশ্যই আমি (জ্ঞান) বণ্টনকারী এবং আল্লাহই তা দান করেন।’ (বুখারি ও মুসলিম)
রাসূলুল্লাহ (সা.) শিক্ষকসুলভ আচরণের মাধ্যমে আরবদের মধ্যে লুকায়িত সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত করে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করার কর্মসূচিতে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছিলেন। তিনি জ্ঞান অন্বেষণে যুক্ত হতে মানুষকে এত বেশি অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন যে তাঁর বাণী শিক্ষাদর্শনের কালোত্তীর্ণ উপমারূপে গণ্য হয়েছে।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক একাডেমি, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়।
dr.munimkhan@yahoo.com

খেলার মাঠে দোকান -আর্থিক বিবেচনা নয়, শিশুদের বিকাশ অগ্রাধিকার পাক

শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে পার্ক, উদ্যান ও খেলার মাঠের মতো উন্মুক্ত স্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু রাজধানী ঢাকাসহ আমাদের বিভিন্ন শহরে এসব সুবিধা দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও মানুষের অর্থলোলুপতার কারণে খেলার মাঠ এখন হাতে গোনা। গ্রামাঞ্চলেও খেলার মাঠের সংখ্যা কমে আসছে। বিদ্যালয় থেকে বাড়ি ফিরে মাঠের অভাবে অধিকাংশ শিশু খেলাধুলার সুযোগ পায় না। তাই বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ থাকার গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু এ দিকটি বরাবরই উপেক্ষিত হয়ে এসেছে।
এ উপেক্ষার আরও এক নজির দেখা গেছে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার ছোনকা উচ্চবিদ্যালয়ে। গত বুধবারের প্রথম আলোর এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিদ্যালয়টির খেলার মাঠের কিছু অংশ স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে ইজারা দিয়েছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। আশপাশের দশ গ্রামের ছেলেরা এ মাঠে ফুটবল ও ক্রিকেট খেলে। দোকান নির্মিত হলে শিশু-কিশোরেরা খেলাধুলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে, তাদের বিকাশ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে।
শিশুদের সামাজিকায়ন ঘটানোর ক্ষেত্রে খেলাধুলার বড় ভূমিকা থাকে। এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত শিশুরা বেড়ে উঠবে একলা, এক ধরনের গৃহবন্দিত্বের মধ্যে। যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়াই তারা ঢুকে পড়ছে বড়দের দুনিয়ায়।
আমাদের দেশে শিশুদের চিত্তবিনোদনের সুযোগ কম। অথচ অন্য সব মৌলিক চাহিদার মতো এ সুযোগও সবার জন্য অবারিত করা উচিত। অতএব পার্ক, উদ্যান ও খেলার মাঠ সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন উন্মুক্ত স্থান গড়ে তোলা আবশ্যক। খেলার মাঠ সংরক্ষণে আইন আছে, সেই আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে না পারলে সবার ব্যবহারের জায়গাগুলো আর আমাদের থাকবে না। আর উপেক্ষার সময় নেই, এক সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য খেলার মাঠ সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সচেতন প্রয়াস দেখতে পাব বলে আশা করি।

অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ -আইনটি নিয়ে আরও আলোচনা হোক

অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন (সংশোধন) ২০০৯ মন্ত্রিসভার চূড়ান্ত অনুমোদন পেল—এটা একটা ভালো খবর। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বহু পরিবারের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক, বহু বছর ধরে চলমান এ সমস্যাটি সমাধানের ব্যাপারে যে বর্তমান সরকারের মনোযোগ আছে, মন্ত্রিসভার অনুমোদন তারই স্পষ্ট আভাস।
২০০১ সালে প্রণীত আইনটি কার্যকর হতে পারেনি ২০০২ সালে একটি ধারা সংশোধনীর কারণে; প্রথমটিতে নির্দেশনা ছিল, আইন পাসের ১৮০ দিনের মধ্যে অর্পিত সম্পত্তির সরকারি তালিকা প্রকাশ করতে হবে। ২০০২ সালের সংশোধনীতে তালিকা প্রকাশের সময়সীমা তুলে দিয়ে অনির্দিষ্টকাল করে দেওয়া হলে বস্তুত আইনটির কার্যকারিতা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। দীর্ঘ সাত বছর পর ২০০৯ সালের প্রস্তাবিত সংশোধনীতে প্রত্যর্পণযোগ্য অর্পিত সম্পত্তির সরকারি তালিকা আইন পাসের ২১০ দিনের মধ্যে প্রকাশের নির্দেশনা সরকারের সদিচ্ছার প্রকাশ। তালিকা প্রকাশের পরই আইনের কার্যকারিতা শুরু হবে।
পাকিস্তান আমলে ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের পর ডিফেন্স অব পাকিস্তান রুলস নামের এক অন্যায় বিধান করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিপুলসংখ্যক দেশত্যাগী মানুষের ভূমির অধিকার হরণ করে সে-সময়ের সরকার। তাদের পরিত্যক্ত সম্পত্তিকে শত্রুসম্পত্তি আখ্যা দিয়ে দখল করা হয়। এটাকে বলা চলে রাষ্ট্র কর্তৃক ভূমিগ্রাস। স্বাধীনতার পরপরই এই অন্যায়ের প্রতিকার করা উচিত ছিল; কিন্তু সেটা হয়নি। ২০০১ সালে আইন প্রণীত হলেও সে আইনের কার্যকারিতা ঝুলে আছে আট বছর ধরে। এখন এর অবসান ঘটিয়ে অর্পিত ভূ-সম্পত্তি বৈধ মালিক ও তাদের বৈধ উত্তরসূরিদের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে ইতিহাসের এক বড় কলঙ্ক মোচন করা দরকার।
আইনটির বর্তমান প্রস্তাবিত সংশোধনীর সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো নিয়ে আরও বিশদ পর্যালোচনা ও বিচার-বিবেচনা প্রয়োজন। আইনের মধ্যে কোনো জটিলতা, অস্বচ্ছতা, অনির্দিষ্টতা থাকা উচিত নয়, যার ফলে এর প্রয়োগ কঠিন হতে পারে, দীর্ঘ কালক্ষেপণ ঘটতে পারে। সরকারের কাছে অর্পিত সম্পত্তির হিসাব ও তালিকা রয়েছে, সেগুলোর বৈধ মালিকদের কোনো তালিকা নেই। মূল সমস্যা এখানেই: বৈধ মালিক বা তাদের উত্তরাধিকারীদের এখন দাবি জানিয়ে সত্যাসত্য প্রমাণ করে সম্পত্তি ফিরে পেতে হবে। আরও সমস্যা হলো, প্রায় সাড়ে ছয় লাখ একর মোট অর্পিত সম্পত্তির মধ্যে বর্তমানে সরকারের দখলে আছে দুই লাখ একরের কাছাকাছি, বাকি প্রায় সাড়ে চার লাখ একরই রয়েছে বেসরকারি বা ব্যক্তিগত দখলে। ব্যক্তিগত দখলে থাকা ভূ-সম্পত্তি নিয়েই জটিলতা হবে বেশি। এ জন্য উপজেলা, জেলা ও মহানগর—এই তিন পর্যায়ে যাচাই-বাছাই কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকদের নেতৃত্বে গঠিত হবে এসব কমিটি, যেখানে সংশ্লিষ্ট এলাকার সাংসদদের ভূমিকা হবে উপদেষ্টার। সম্পত্তির দাবিদারদের আবেদনের পর সেসব কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী দাবিকৃত সম্পত্তি অবমুক্ত করা হবে—এমন বিধানের প্রস্তাব নিয়ে আরও আলোচনা হওয়া উচিত। যেসব তালিকাভুক্ত অর্পিত সম্পত্তি সরকারের দখলে নেই, তা প্রথমে সরকারের দখলে নেওয়া এবং তারপর বৈধ মালিক বা তাদের উত্তরাধিকারীদের প্রত্যর্পণ করার প্রক্রিয়া অধিকতর সমীচীন মনে হয়।
জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের পর আইনটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা-পর্যালোচনা হোক। সেই সঙ্গে প্রস্তাবিত খসড়াটি ওয়েবসাইটে ও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করে নাগরিক সমাজের মতামত আহ্বান করা প্রয়োজন। সংসদে পাসের আগে অভিজ্ঞ আইনজ্ঞ, সাবেক বিচারপতিসহ ওয়াকিবহাল মহলের মতামতের ভিত্তিতে সংশোধনীটির ধারাগুলো আরও সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট করার সুযোগ রয়েছে এবং সেটাই করা উচিত।