Thursday, April 30, 2015

নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থার সুযোগ থাকল না -বিশিষ্টজনদের অভিমত by ফয়েজ উল্লাহ ভূঁইয়া ও গোলাম রব্বানী

দেশের বিশিষ্টজনেরা বলেছেন, কেন্দ্র দখল, ভোট ডাকাতিসহ ব্যাপক জালিয়াতি ও ভীতিকর পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত তিনটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন প্রমাণ করেছে, দেশের নির্বাচনব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থা রাখার আর কোনো সুযোগ থাকল না। এখন নির্বাচন কমিশন নিজেই একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশ ‘ম্যানেজড’ নির্বাচনের যুগে প্রবেশ করল এবং অদূর ভবিষ্যতে যত নির্বাচন হবে সবই এ ধরনের ‘ম্যানেজড’ নির্বাচন হবে। মানুষ এই ‘ম্যানেজড’ নির্বাচনে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশিষ্টজনেরা মনে করছেন, এ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি কঠিন হয়ে উঠল। এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে পরিষ্কার হয়ে গেল দেশে আর গণতন্ত্র থাকল না। সিটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানের যে ক্ষীণ আশা দেখা দিয়েছিল, তা দূরীভূত হয়ে গেছে। গণরায়ের সুযোগ থাকলে রাজনীতিবিদেরাও বুঝতে পারতেন আসলে দেশের মানুষ কী চিন্তা করছে। সেই গণরায়ের সুযোগ না হওয়ায় এখন রাজনৈতিক সঙ্কট আরো সঙ্ঘাত-সহিংসতা ও অনিয়মতান্ত্রিকতার দিকেই ধাবিত হবে। দেশে উগ্রবাদী ও অনিয়মতান্ত্রিক শক্তির উদ্ভব ঘটতে পারে অথবা বাংলাদেশে ল্যাটিন আমেরিকা বা মধ্যপ্রাচ্যের মতো অত্যন্ত কঠিন ও দীর্ঘস্থায়ী ফ্যাসিস্ট শক্তি কায়েম হতে পারে।
মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দণি এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর গতকাল বুধবার নির্বাচনের ব্যাপারে নয়া দিগন্তের পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সংবিধান ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞসহ বিশিষ্টজনেরা এ ধরনের মতামত ব্যক্ত করেন।
এম হাফিজ উদ্দিন খান : সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সভাপতি টিআইবির ট্রাস্টি সদস্য এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্র বলতে মানুষ যেটি মনে করতেন, সেটি হচ্ছে ইলেকশন। কিন্তু সেই ইলেকশন তো আর হলো না। এই সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে পরিষ্কার হয়ে গেল দেশে আর গণতন্ত্র থাকল না। ২০১৪ সাল থেকে দেশে আর ইলেকশন নেই। তিনি বলেন, জাতীয় জীবন ও রাজনীতিতে অবশ্যই এর প্রভাব পড়বে। তবে কিভাবে কতটুকু পড়বে, সেটি ভবিষ্যৎই বলে দেবে।
খন্দকার মাহবুব হোসেন : বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, সরকার সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে একটি নাটক খেলেছে জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য। যেহেতু বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মী জেলে, তাই আওয়ামী লীগ আশা করেছিল দলটি হয়তো নির্বাচনে অংশ নেবে না। কিন্তু ২০ দলীয় জোটনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া অত্যন্ত রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দেখিয়ে এ নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ২০ দল আশা করেছিল এ নির্বাচন সুষ্ঠু হলে দেশে একটি সুষ্ঠু পরিবেশ আসবে। ফলে আগামীতে হয়তো সরকার ও বিরোধী দল একটি অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচনের জন্য সমঝোতায় আসতে পারবে। কিন্তু খুবই দুঃখের বিষয় যে, সরকার নির্বাচনটাকে একই পদ্ধতিতে তাদের সন্ত্রাসী দিয়ে তছনছ করে দিয়েছে। এটি দেশবাসী দেখেছেন, বিশ্ববাসী দেখেছেন।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র এই আইনজীবী আরো বলেন, এ নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রের কবর রচনা করেছে। বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় রেখে এ দেশে ভবিষ্যতে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না। এ সমস্যা সমাধান করতে হলে জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। দেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তাই একটি সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচনের জন্য এ মুহূর্তে সর্বদলীয়ভাবে একটি সরকার গঠন করে সেই সরকারের অধীনে একটি অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচন প্রয়োজন। এটি যদি অতিসত্বর না হয়, ভোট দিতে না পারায় বাংলাদেশের মানুষের মনে যে হতাশা সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকে দেশে যেকোনো সময় একটি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি কারো জন্য শুভ হবে না।
ড. বদিউল আলম মজুমদার : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মানুষ তাদের ক্ষোভ, অভিযোগ, অসন্তোষ প্রভৃতি নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় প্রকাশ করার একটি সুযোগ পায়। কিন্তু সিটি নির্বাচনে মানুষ সেই সুযোগ পেল না। নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় মানুষ তার ক্ষোভ-অসন্তুষ্টি প্রকাশ করার সুযোগ না পেলে ভবিষ্যতে তা অনিয়মতান্ত্রিক পন্থায় প্রকাশ পেতে পারে। তার কোনো অনিয়মতান্ত্রিক পরিণতি হতে পারে; যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তিনি বলেন, সিটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানের যে ক্ষীণ আশা দেখা দিয়েছিল, তা দূরীভূত হয়ে গেছে। গণরায়ের সুযোগ থাকলে রাজনীতিবিদেরাও বুঝতে পারতেন আসলে দেশের মানুষ কী চিন্তা করছে। সেই গণরায়ের সুযোগ না হওয়ায় এখন রাজনৈতিক সঙ্কট আরো সঙ্ঘাত, সহিংসতা ও অনিয়মতান্ত্রিকতার দিকেই ধাবিত হবে।
এই স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ বলেন, নির্বাচন কমিশন নিজেই একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা সুষ্ঠু নির্বাচন করতে ব্যর্থ হয়েছে। নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য করার ক্ষেত্রে যেসব বাধা ছিল সেগুলো তারা দূর করতে পারেনি। নির্বাচন কমিশনের প্রতি মানুষের চরম আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়েছে।
ড. তোফায়েল : স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, এ নির্বাচন নিয়ে আর কী বলব। কী হয়েছে তা তো সবার কাছেই পরিষ্কার। দেশে আর কোন ব্যবস্থাই আছে যে তার ওপর এর প্রভাব পড়বে। দেশে আর কী ব্যবস্থা আছে? সব ব্যবস্থায়ই তো বলা যায় শেষ হয়ে গেল। জাতীয় ও রাজনৈতিক জীবনে যে সঙ্কট ছিল তা থেকেই গেল। তার কোনো সমাধান আর হলো না। সঙ্কট যে আরো ঘনীভূত হবে তাতো আর বলার প্রয়োজন পড়ে না।
তিনি বলেন, জাতীয় রাজনৈতিক কৌশলের কাছে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা চাপা পড়ে গেল। নির্বাচন কমিশনের ওপর এখন আর মানুষের কোনো আস্থা নেই। কমিশন এই নির্বাচনে যে ভূমিকা রেখেছে তার ওপর আস্থা রাখার আর কোনো সুযোগ থাকল না।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) এম সাখাওয়াত হোসেন : সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, যা ঘটেছে, যা পড়েছি, দেখেছি, উপলব্দি করেছি তাতে এটা পরিষ্কার যে, নির্বাচন নিয়ে যা ঘটেছে তা মোটেও ভালো হয়নি। জাতীয় নির্বাচন নিয়ে যে কথা এসেছিল, এই নির্বাচনের পর তা নিয়ে একটা কিছু হবে মনে করা হয়েছিল। যদিও তা হতো কি না পরিষ্কার ছিল না। এখন নির্বাচনে কী হয়েছে আন্তর্জাতিক মহলসহ সবাই দেখেছে। এর প্রভাব জাতীয় জীবনে, রাজনীতিতে এবং নির্বাচনী ব্যবস্থায় পড়বে। এই থেকে পরিষ্কার নির্বাচনব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। রাজনীতি ভঙ্গুর অবস্থানে চলে গেছে। এর পরিণাম মোটেও শুভ হবে না। এই নির্বাচন থেকে সরকার লাভবান হয়েছে বলে মনে হয় না। কেউই লাভবান হয়েছে বলে মনে হয় না। সবারই ক্ষতি হয়েছে। তিনি আরো বলেন, সিটি নির্বাচন যেভাবে বর্জন করতে দেখলাম এমন বর্জন আগে দেখিনি, বর্জনটা এতো সকালে কেন তাও বোধগম্য নয়।
ড. দিলারা চৌধুরী : বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক প্রফেসর ড. দিলারা চৌধুরী বলেছেন, ক্ষমতাসীনেরা দেশে একটা কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা কায়েম করেছে। কর্তৃত্ববাদীরা নির্বাচন বা সব ধরনের আনুষ্ঠানিকতাই করে, কিন্তু তা ম্যানিপুলেট করে নিজেদের উদ্দেশ্য সাধন করে থাকে। আমাদের সংসদের কথাই বলা যায়, এর কোনো ভূমিকা তো নেই। নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান। নির্বাচন কমিশন নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান। তিনি আরো বলেন, অনেকে বলার চেষ্টা করেনÑ ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে না গিয়ে বিএনপি ভুল করেছে। আমি মনে করিÑ বেগম জিয়া কোনো ভুল করেননি। সে নির্বাচনেও একই ফলাফল হতো। তিনি আরো বলেন, দেশের জন্য আশঙ্কা হচ্ছে যে, এখানে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও সহিংসতা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকবে।
ড. শাহদীন মালিক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, আমরা একটা খারাপ অবস্থার মধ্যে আছি। একটা খারাপ অবস্থার মধ্যে প্রবেশ করেছি। আমরা এক ধরনের ‘ম্যানেজড’ নির্বাচনের যুগে প্রবেশ করেছি। সেই ধরনের একটি নির্বাচনই হয়ে গেছে। নিকট ভবিষ্যতে যত নির্বাচন হবে এ ধরনের ‘ম্যানেজড’ নির্বাচনই হবে। এখন জাতি এই ‘ম্যানেজড’ নির্বাচনেই অভ্যস্ত হয়ে যাবে। বিশেষ করে যারা ২০১০ সালের পর নতুন ভোটার হয়েছে তাদের কাছে এ ধরনের নির্বাচন তো স্বাভাবিক মনে হবে। কারণ তারা তো এর আগের ভালো নির্বাচন দেখেনি। তিনি বলেন, এটা দেশের জন্য নিঃসন্দেহে ভালো নয়।
ড. শাহদীন মালিক বলেন, সরকার ও নির্বাচন কমিশন যে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলে দাবি করছে এটাকে ভুল প্রমাণ করার মতো যুক্তি, প্রমাণ এবং সামর্থ্য এই মুহূর্তে বিএনপির আছে বলে মনে হয় না। বিশেষ করে সরকারের দমননীতির কারণে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কারণে এই নির্বাচনের ব্যাপারে সরকারের অবস্থান ভুল প্রমাণ করা কঠিন হবে।
ড. আসিফ নজরুল : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রফেসর ড. আসিফ নজরুল বলেন, সিটি নির্বাচনে প্রকাশ্যে কারচুপি ও কেন্দ্র দখল হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন যেভাবে কাজ করেছে তার ফলে এই নির্বাচনের আর কোনো গ্রহণযোগ্যতাই নেই। সবচেয়ে ভয়ানক দিক হলোÑ এই নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার যে নির্বাচনীব্যবস্থা দেশে কায়েম করল তা হাস্যকর। তিনি আরো বলেন, নির্বাচন পদ্ধতিতে নিজেদের প্রতিনিধি নির্ধারণে জনগণের যে অধিকার, তা অন্যতম সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার। এই অধিকার আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মৌলভিত্তি। এই অধিকারের প্রতি সরকার যে নিষ্ঠুর অবজ্ঞা দেখিয়েছে, তাতে ভবিষ্যতে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জনগণের প্রতিনিধি নির্বাচনের আশাবাদ নিশ্চিহ্ন করেছে সরকার।
ড. আসিফ আরো বলেন, অনেকে বলতে চাচ্ছেন- বিএনপির এজেন্টরা ভোটকেন্দ্রগুলোতে ছিল না। কিন্তু দেখা গেছে, এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়েছে, গ্রেফতার করা হয়েছে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে এই দেশে বিরোধী দলের হয়ে রাজনীতি করাটা বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ যে ক্রমান্বয়ে একটি ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থায় পরিণত হয়েছেÑ এই নির্বাচন তারই প্রতিফলন। এত অনিয়ম, কারচুপি, প্রচারণায় বাধা এবং বর্জনের পরও বিএনপি যে ভোট পেয়েছে, তাতেই প্রমাণ হয়, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে বিএনপি সব সিটিতেই জয়ী হতো। তিনি আরো বলেন, এই নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি কঠিন হয়ে উঠল। আমার আশঙ্কা হচ্ছেÑ এর ফলে দেশে উগ্রবাদী ও অনিয়মতান্ত্রিক শক্তির উদ্ভব ঘটতে পারে। অথবা বাংলাদেশে ল্যাটিন আমেরিকা বা মধ্যপ্রাচ্যের মতো অত্যন্ত কঠিন ও দীর্ঘস্থায়ী ফ্যাসিস্ট শক্তি কায়েম হবে।
অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান : সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান বলেন, ঢাকা উত্তর ও দণি সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সুষ্ঠু, নিরপে, অর্থবহ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করার প্রকৃত পরিবেশ তৈরির সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে বর্তমান নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। নির্বাচনকেন্দ্রিক নানা অনিয়ম, ভোটকেন্দ্র দখল, জাল ভোট, পোলিং এজেন্টদের প্রবেশে বাধা প্রদান, মারধর ও কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া, সংবাদকর্মীদের বাধা প্রদান, ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, ভোটকেন্দ্রের সামনে জটলা, শো-ডাউন করে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা ও পপাতমূলক আচরণসহ নানা অভিযোগ আমলে না নেয়া এবং প্রতিকারের ব্যবস্থা না করায় বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ওপর দেশের জনগণ ও সব রাজনৈতিক দল আস্থা হারিয়েছে। সেনাবাহিনী মোতায়েনের সুযোগ থাকলেও তাদের সহযোগিতা না নেয়ায় তাদের প্রতি জনগণের আস্থাহীনতা আরো পাকাপোক্ত হলো। তিনি আরো বলেন, ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনটি শুধু পপাতদুষ্ট, ভোটারবিহীন প্রহসনের নির্বাচনই নয়; এই নির্বাচনে এটাও প্রমাণিত হয় যে, বর্তমান সরকার ও তার আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশনের কাছে এ দেশের জনগণের ভোটাধিকার আর সুরতি নয়। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে চলমান রাজনৈতিক সঙ্কটের যে সমাধান জনগণের প্রত্যাশিত ছিল, তা সম্পূর্ণরূপে ভূলুণ্ঠিত হয়েছে এবং চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট আরো দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

মাদক ছেড়ে তাঁরা আলোর পথে

সাভার মডেল থানার সামনে সেলাইযন্ত্র পাওয়া
সাভারের বেদেপল্লির নারীরা l ছবি: প্রথম আলো
পোশাক কারখানায় চাকরি করে সংসার চালাতেন সাভারের পোড়াবাড়ির সোহাগ মিয়া। পরিবারের সব চাহিদা পূরণ করতে না পারলেও অভাব ছিল না। সর্বনাশা মাদকের ছোবলে সেই পরিবারটিই একসময় অভাব-অনটনে পড়ে। চাকরি ছেড়ে নেশা আর সংসারের খরচ জোগাতে সোহাগ জড়িয়ে পড়েন মাদক ব্যবসায়।
মাদকের টানে সোহাগের মতোই সর্বনাশের পথে পা বাড়িয়েছিলেন ওই এলাকার শতাধিক যুবক ও তরুণ। ঢাকা জেলা পুলিশ প্রশাসনের সহায়তায় তাঁরা এখন নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। অন্ধকার থেকে আলোর পথে আনতে তাঁদের নানা প্রতিষ্ঠানে চাকরির ব্যবস্থা করার পাশাপাশি অর্ধশত মাদকাসক্ত ও দরিদ্র পরিবারের নারীদের মাঝে বিতরণ করা হয় সেলাই যন্ত্র। আর এসব যন্ত্র ক্রয়ে সহায়তা করে কুয়েতের একটি প্রতিষ্ঠান।
গতকাল বুধবার সাভার মডেল থানায় আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের হাতে সেলাই মেশিন তুলে দেন পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান। এর আগে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহায়তায় তাঁদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। পর্যায়ক্রমে আরও ১০০ পরিবারকে এই সহায়তা দেওয়া হবে।
প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, সাভার পৌরসভার অপরপুর, কাঞ্চনপুর ও পোড়াবাড়ি এলাকায় বেদে সম্প্রদায়ের অন্তত ২০ হাজার পরিবারের বসবাস। কয়েক বছর ধরে তাদের অনেকেই জড়িয়ে পড়ে মাদক ব্যবসায়। ধীরে ধীরে ওই এলাকা পরিচিত পায় মাদক পিল্ল হিসেবে। এলাকাকে মাদকমুক্ত করতে কয়েকজন যুবক ও তরুণ মিলে গড়ে তোলেন ‘পোড়াবাড়ি সমাজ কল্যাণ সংঘ’। ওই সংঘের সদস্যরা মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। উল্টো মাদক ব্যবসায়ীদের রোষানলে পড়ে নানা হয়রানির শিকার হন তাঁরা। প্রথম আলোর পক্ষ থেকে এসব নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর টনক নড়ে পুলিশ প্রশাসনের। তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে নেওয়া হয় পুনর্বাসনের উদ্যোগ।
পোড়াবাড়ি সমাজ কল্যাণ সংঘের সাধারণ সম্পাদক রমজান আহমেদ বলেন, ‘পুলিশের অন্য রকম সহযোগিতায় আমরা আলোর পথ দেখতে শুরু করেছি।’
সেলাই যন্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠানে পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান বলেন, ‘পেশাগত কাজ করতে গিয়ে সাভারের পোড়াবাড়ি, অপরপুর ও কাঞ্চনপুর এলাকায় মাদকের আস্তানা খুঁজে পাই। পিছিয়ে পড়া এই জনগোষ্ঠীকে আলোর পথ দেখাতে আইন প্রয়োগের পরিবর্তে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিই। এতে সাড়া পাওয়া যায়।’

নিরুত্তাপ নিয়ন্ত্রণকক্ষের আট ঘণ্টা by মাসুদ মিলাদ ও সুজন ঘোষ

সন্ধ্যা থেকে এম এ আজিজ স্টেডিয়ামে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রধান নিয়ন্ত্রণকক্ষের চারপাশে থমথমে পরিবেশ। ফলাফল জানতে উৎসুক মানুষের জটলা নেই। সন্ধ্যা সাতটার পর বিভিন্ন কেন্দ্রের ফলাফল আসতে থাকে। প্রথমে শুরু হয় কেন্দ্রভিত্তিক মেয়র প্রার্থীদের ফলাফল ঘোষণা।
এম এ আজিজ স্টেডিয়ামের প্যাভেলিয়নের তিনতলায় স্থাপন করা হয়েছে ঘোষণাকেন্দ্র। সেখানে বিকেল থেকে সাংবাদিকদের ভিড় বাড়তে থাকে। বিকেলে নিয়ন্ত্রণকক্ষে অবস্থান নেন রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আবদুল বাতেন। এরপর আসেন আ জ ম নাছির উদ্দিনের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট মোসলেম উদ্দিন আহমেদসহ আওয়ামী লীগ নেতারা। মাইকে ফলাফল ঘোষণা করতে থাকেন মো. আবদুল বাতেন। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে নাগরিক কমিটির প্রার্থী আ জ ম নাছির উদ্দিন নিয়ন্ত্রণকক্ষে আসেন। কিছুক্ষণ সময় অবস্থান করে তিনি চলে যান।
একটানা প্রায় তিন ঘণ্টা ফলাফল ঘোষণার পর বিরতি নেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। বিরতির ফাঁকে নিয়ন্ত্রণকক্ষে সাংবাদিকদের মধ্যে আলোচনা চলছিল, বহিরাগতদের দিয়ে ভোটকেন্দ্র দখল, সাংবাদিক আহত হওয়ার ঘটনা, প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়াসহ অনেক কিছুই। ভোট বর্জনের পরও মোহাম্মদ মনজুুর আলমের প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা দেখে অবাক হন অনেকে। কারণ মনজুর আলমের ভোট পড়েছে প্রথম তিন ঘণ্টায়। এর পরও এত ভোট? ফলাফল ঘোষণার ফাঁকে ফাঁকে সাংবাদিকদের এমন আলোচনায় ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে।
রাত বাড়তে থাকায় আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেকে নিয়ন্ত্রণকক্ষ ত্যাগ করেন। তবে মোসলেম উদ্দিনসহ কয়েকজন ছিলেন। এভাবে প্রায় আট ঘণ্টা পর রাত তিনটা ২৬ মিনিটে মেয়র প্রার্থীর ফলাফল ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। আ জ ম নাছির উদ্দিনকে বেসরকারিভাবে বিজয়ী ঘোষণা দেওয়ার পর নিয়ন্ত্রণকক্ষে থাকা দলীয় নেতাকর্মীরা হাততালি দেন। সাংবাদিকদের প্রতিক্রিয়া জানান মোসলেম উদ্দিন আহমেদ।
বিরতির সময় রিটার্নিং কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, ‘ নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু ভোট হয়েছে। বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি ঘটনা ঘটলেও বড় কোনো সহিংসতা হয়নি। নির্বাচন কমিশন তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছে।’
মেয়র প্রার্থীদের ফলাফল ঘোষণার ফাঁকে রাত দুইটার পর কাউন্সিলর প্রার্থীদের ফলাফল ঘোষণা শুরু হয়। তবে ফলাফল ঘোষণার সময় বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে কাউন্সিলর প্রার্থীরা নানা অভিযোগ নিয়ে আসতে থাকেন। উত্তর পাহাড়তলী নয় নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী এরশাদ মামুনের পক্ষে একজন অভিযোগ নিয়ে আসেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বিরুদ্ধে। ভোট কেন্দ্রে বোমাবাজি, ভাঙচুর ও কেন্দ্র দখলের অভিযোগ আনেন তিনি। এদিকে জাল ভোট দেওয়ার অভিযোগ এনে আস্ত ব্যালট পেপারই নিয়ে আসেন ৯ নম্বর সংরক্ষিত মহিলা ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী রেহানা বেগম। একটু পরে ফলাফল পাল্টে দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে আসেন রামপুর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী আবদুস সবুর। এ প্রার্থীর অভিযোগ, প্রতিদ্বন্দ্বী এস এম এরশাদ উল্লাহ একটি কেন্দ্রে ৬১ ভোট পেলেও প্রিসাইডিং অফিসারকে আটকে রেখে তা পাল্টে ৩৮১ ভোট বানিয়ে আরেকটি ফলাফল তৈরি করেন। সেটিই পাঠানো হয় প্রধান নিয়ন্ত্রণকক্ষে। ফলাফল ঘোষণার শেষে রিটার্নিং কর্মকর্তা আবদুল বাতেন এই ওয়ার্ডের ফলাফল স্থগিত করেন।
গত মঙ্গলবার রাতে ঘোষণা হয়ে গেছে ফলাফল। গতকাল সকাল থেকে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের প্রধান নির্বাচনী কার্যালয় মোমিন রোডের প্রিয়া কমিউনিটি সেন্টারে ভিড় বাড়তে থাকে কর্মী–সমর্থকদের। বেলা সাড়ে ১১ টায় আ জ ম নাছির কার্যালয়ে এলে তাঁকে হাত­ির সালামে অভিবাদন জানানো হয় l জুয়েল শীল
২০০৫ সালের ৯ মে ফলাফল ঘোষণার সময় এই এম এ আজিজ স্টেডিয়ামের জিমনেসিয়ামের সামনে এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর লোকজন রাত জেগে পাহারা দিয়েছিলেন। মহিউদ্দিন চৌধুরীর পক্ষে ভোটের রায় যাতে তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকার পাল্টাতে না পারে সেজন্যই ছিল এ ব্যবস্থা। ২০১০ সালেও ছিল মোহাম্মদ মনজুর আলমের সমর্থকদের ভিড়। সে সময় কমিশনের ফলাফল ঘোষণায় দেরি দেখে তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীরা ভিড় জমান এ স্টেডিয়ামের চারপাশে। দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে বেঁধেছিল সংঘর্ষও। এবার ভোটকেন্দ্র দখলের অভিযোগে চট্টগ্রাম উন্নয়ন আন্দোলনের প্রার্থী মোহাম্মদ মনজুর আলম সকালেই ভোট বর্জন করায় নিয়ন্ত্রণকক্ষ মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল না।

‘উন্নয়ন শোভাযাত্রা’র নামে মহড়া

বগুড়ার উন্নয়ন ভাবনায় আট দফা দাবিতে জেলা আওয়ামী লীগের
সভাপতি মমতাজ উদ্দিন (বাঁয়ে) ও সাধারণ সম্পাদক মজিবর
রহমানে
র নেতৃত্বে কয়েক হাজার মোটরসাইকেল নিয়ে শোভাযাত্রা
বের করা হয়। এতে শহরের প্রায় সব কটি সড়কে যান চলাচল
দুই ঘণ্টা বন্ধ থাকে। গতকাল দুপুরে শহরের ব্যস্ততম
সাতমাথা এলাকা থেকে তোলা ছবি l প্রথম আলো
উদ্দেশ্যে ছিল সরকারের কাছে বগুড়ার আট দফা ‘উন্নয়ন দাবি’ তুলে ধরা। সেই দাবি তুলে ধরতে গতকাল বুধবার কয়েক হাজার মোটরসাইকেল নিয়ে বগুড়া শহর দাপিয়ে বেড়িয়েছেন সরকারি দল আওয়ামী লীগের সমর্থক ও নেতা-কর্মীরা।
কর্মসূচিকে দলের পক্ষ থেকে আট দফা দাবি তুলে ধরার ‘উন্নয়ন শোভাযাত্রা’ বলা হলেও এই মহড়ার কারণে শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। এতে নগরবাসীকে প্রায় দুই ঘণ্টা চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
গতকাল দুপুরের দিকে শহরের আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠ থেকে এই মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা বের হয়। এর আগে বিভিন্ন উপজেলা থেকে কয়েক শ মোটরসাইকেল নিয়ে নেতা-কর্মীরা খেলার মাঠে জড়ো হন।
বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মমতাজ উদ্দিনের ঘোষিত উন্নয়নের আট দফা দাবির মধ্যে রয়েছে বগুড়া পৌরসভাকে সিটি করপোরেশন ঘোষণা, একটি স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, একটি ফুটবল স্টেডিয়াম নির্মাণ, বালক ও বালিকাদের জন্য আলাদা আরও দুটি সরকারি উচ্চবিদ্যালয় স্থাপন, পরিকল্পিত শিল্পায়নে শিল্পপার্ক স্থাপন, সাংবাদিকদের উন্নয়নে প্রেসক্লাব ভবন নির্মাণ, শহরের যানজট নিরসনে রেললাইন সমস্যার সমাধান এবং বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জের জামথৈল হয়ে ঢাকা পর্যন্ত নতুন রেলপথ নির্মাণ। গত মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলন ও শহরের একটি কমিউনিটি সেন্টারে প্রীতিভোজ আয়োজনের মাধ্যমে তিনি এসব দাবি তুলে ধরেন।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, গতকাল বেলা ১১টা থেকেই বিভিন্ন উপজেলার আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা মোটরসাইকেল নিয়ে শহরের আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে জড়ো হন। মোটরসাইকেলের মহড়ার কারণে কার্যত বেলা ১১টা থেকেই শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। শহরের সাতমাথা, রেলগেট, বড়গোলা, দত্তবাড়ি, ইয়াকুবিয়া মোড়সহ বিভিন্ন স্থানে বড় ধরনের যানজটের সৃষ্টি হয়। এরপর বেলা একটার দিকে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মমতাজ উদ্দিনের নেতৃত্বে আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠ থেকে শোভাযাত্রা বের হয়। শোভাযাত্রা শুরুর আগে তিনি নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন। পরে শোভাযাত্রার পথনির্দেশনাসহ তিনি বগুড়ার উন্নয়নে আট দফা দাবির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। শোভাযাত্রায় জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মজিবর রহমান, যুগ্ম সম্পাদক টি জামান নিকেতা, জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আসাদুর রহমান এবং সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন প্রমুখ অংশ নেন।
শোভাযাত্রাটি শেরপুর সড়ক হয়ে মাটিডালি মোড়, দ্বিতীয় বাইপাস সড়ক হয়ে বনানী মোড়, তিনমাথা ও চারমাথা হয়ে নূরানী মোড়, সেউজগাড়ি হয়ে কারমাইকেল সড়ক এবং শহীদ চাঁন্দু স্টেডিয়ামের সামনে থেকে গোহাইল সড়ক হয়ে পুনরায় আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে গিয়ে শেষ হয়।
জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাশরাফি হিরো দাবি করেন, শোভাযাত্রায় পাঁচ হাজারের বেশি মোটরসাইকেল ছিল। শোভাযাত্রা শেষে নেতা-কর্মীদের দুপুরের খাবার হিসেবে ভুনাখিচুড়ির প্যাকেট দেওয়া হয়।
শহরের ট্রাফিক পুলিশ ও পথচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সকাল ১১টা থেকে বিভিন্ন উপজেলার নেতা-কর্মীরা মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা নিয়ে আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে আসতে থাকায় শহরজুড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এরপর মূল শোভাযাত্রাটি বের হলে শহরের দৃশ্যপটই পাল্টে যায়। যানজটে নাকাল পথচারীদের অবর্ণনীয় ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
শহরের জলেশ্বরতলার একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী শামিম হোসেন বলেন, ‘ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়ার জন্য দুপুর ১২টার দিকে ইয়াকুবিয়া মোড় থেকে রিকশা নিয়ে বড়গোলার দিকে যাচ্ছিলাম। অন্যদিন যেখানে পাঁচ মিনিটেই পৌঁছানো যেত সেখানে তীব্র যানজটে আধঘণ্টাতেও পৌঁছাতে পারিনি।’ রিকশাচালক মোকামতলার আলমগীর হোসেন বলেন, ‘অন্যদিন বেলা গড়াতে না গড়াতেই ৩৫০ থ্যাকে ৪০০ টেকা কামাই হচ্চিল। অ্যাজক্যার জ্যামে হামাকেরে কপাল পুড়িচে। বেলা চারডা বাজে যাচ্চে ১৫০ টেকাই কামাই হয়নি।’
বগুড়া পৌরসভার মেয়র এ কে এম মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘যে আট দফা দাবির কথা বলা হচ্ছে তার সবই বগুড়াবাসীর প্রাণের দাবি। এসব দাবির প্রতি সবারই সমর্থন আছে। এই দাবি এত দিন পূরণ না হওয়া আওয়ামী লীগেরই ব্যর্থতা। সেই ব্যর্থতা ঢাকতে আওয়ামী লীগ নেতাদের মোটরসাইকেল শোভাযাত্রার কৌশল অভিনবই বটে। আট দফার সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম চালুসহ অন্য দাবিও পূরণ করা দরকার।’
বগুড়ার পুলিশ সুপার মোজাম্মেল হক বলেন, বগুড়ার উন্নয়নে আট দফা দাবিতে ‘উন্নয়ন শোভাযাত্রা’ বের করা হবে বলে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আগেই জানানো হয়েছিল। শোভাযাত্রার কারণে যেন কোনো প্রকার যানজটের সৃষ্টি না হয় সে জন্য ট্রাফিক পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মজিবর রহমান বলেন, ‘আট দফা দাবির পাশাপাশি বর্তমান সরকারের ছয় বছরে বগুড়াসহ দেশজুড়ে উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় অভিনন্দন এবং তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের বিজয়ে এই শোভাযাত্রা বের করা হয়।’

কোন ঝুঁকি নিতে যাননি ম্যাজিস্ট্রেটরা

ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তাৎক্ষণিক বিচারের কাজে নিয়োজিত ৪৭৪ জন ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন নিশ্চুপ। কেন্দ্র দখলের পর কোন ম্যাজিস্ট্রেট তাৎক্ষণিক বিচার করতে ভোট কেন্দ্রে যাননি। স্ট্রাইকিং ফোর্সের সঙ্গে কেন্দ্রের বাইরে যাওয়া-আসা করেই সময় পার করেছেন। সরকার সমর্থিত মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের ইশারা অনুযায়ী কাজ করেছেন। নিজেদের চাকরির চিন্তায় কোন ধরনের ঝুঁকি নিতে চাননি। গতকাল নির্বাচনী দায়িত্ব শেষ করে নিজ নিজ কর্মস্থলে যোগদান করেছেন ম্যাজিস্ট্রেটরা। বিষয়টি সম্পর্কে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এটিএম শামসুল হুদা জানান, তিন সিটি নির্বাচনে অনেক এক্সিকিউটিভ ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা হলেও তাদের তৎপরতা চোখে পড়েনি। তাৎক্ষণিক ট্রায়ালের কোন ব্যবস্থা দেখিনি। তাহলে ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবরা করলেন কি? শুধু পুলিশের সামান্য তৎপরতা দেখলাম। এটাও প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। নির্বাচনের দায়িত্ব পালনকারী কয়েক জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে নিযুক্ত র‌্যাব ও বর্ডার গার্ডের সঙ্গে দায়িত্ব ছিল তাদের। তাই কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা প্রিজাইডিং অফিসার না ডাকা পর্যন্ত তারা স্বপ্রণোদিত হয়ে কেন্দ্রে যেতে পারেননি। নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের জন্য তাদেরকে প্রয়োজনীয় গাড়ি সরবরাহ করা হয়নি। প্রতি তিনজন ম্যাজিস্ট্রেটের জন্য একটি গাড়ি দেয়া হয়। মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য পেশকার, আনুষঙ্গিক কাগজপত্র দেয়া হয়নি। এ ছাড়া ম্যাজিস্ট্রেটদের দায়িত্বও নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়নি। এসব সমস্যার কারণে তাদের দায়িত্ব পালন করতে কষ্ট হয়েছে। ইচ্ছা থাকলেও তারা ঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২২শে এপ্রিল ঢাকায় ৩০৭ জন এবং চট্টগ্রামে ১৩৪ জনসহ মোট ৪৪১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ-সংক্রান্ত  প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এর মধ্যে ঢাকা উত্তরের জন্য ১৪৩ ও দক্ষিণে ১৬৪ জনকে নিয়োগ দেয়া হয়। আইন ও বিচার বিভাগ আলাদাভাবে ৩৩ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে নির্বাচনী দায়িত্ব দেয়। সিটি নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী একজন ম্যাজিস্ট্রেট জানালেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে এক প্লাটুন বিজিবির সঙ্গে ৩ জন করে ম্যাজিস্ট্রেট দেয়া হয়। কিন্তু গাড়ি দেয়া হয় মাত্র একটি। ফলে কষ্ট করে দায়িত্ব পালন করেছেন। ঢাকার কাছাকাছি একটি উপজেলার ইউএনও পদে কর্মরত এক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জানালেন, আমাদের  মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করার দায়িত্ব দেয়া হলেও কোন পেশকার, ডিসিআর বইসহ সাপোর্টিং  পেপারস দেয়া হয়নি। কিভাবে দায়িত্ব পালন করবো। এটা যেন ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দারের মতো অবস্থা। 

ঢাকার নবনির্বাচিত দুই মেয়র প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করলেন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ঢাকার হাস্যোজ্জ্বল দুই মেয়র সাঈদ খোকন (বাঁয়ে) ও আনিসুল হক। গতকাল রাতে তাঁরা গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে যান l বাসস
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নবনির্বাচিত দুই মেয়র আনিসুল হক ও সাঈদ খোকন গতকাল বুধবার রাতে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এ সময় দুই সিটি করপোরেশনের বিজয়ী আওয়ামী লীগ-সমর্থিত কাউন্সিলররাও ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী নবনির্বাচিত দুই মেয়র ও কাউন্সিলরদের অভিনন্দন জানান। এ সময় প্রধানমন্ত্রী সিটি করপোরেশন নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে দাবি করে জালিয়াতির অভিযোগকারীদের ভোটের হারের দিকে দৃষ্টি দিতে বলেন। তিনি তিন সিটি করপোরেশনে ৪৪ শতাংশ ভোট পড়ার চিত্র তুলে ধরে বলেন, কারচুপি হলে এত কম ভোট হবে কেন? দলীয় নেতাদের মধ্যে এ সময় সেখানে ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, মাহবুব উল আলম হানিফ প্রমুখ।

সিটি নির্বাচনে উপস্থিতি কম, তবু ৪৫% ভোট!

ঢাকা উত্তর ৩৭.২৯%, ঢাকা দক্ষিণ ৪৮.৫৭%, চট্টগ্রাম ৪৭.৮৯%, তিন সিটিতে বাতিল ভোট ১,২১,০০৩
তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতি কম থাকলেও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) হিসাবে ৪৫ শতাংশ ভোট পড়েছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষকসহ পরাজিত মেয়র প্রার্থীরা এত বেশি ভোট পড়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এমনকি ভোট বর্জনের পরও বিএনপি-সমর্থিত তিন মেয়র প্রার্থীর বিপুলসংখ্যক ভোট পাওয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের অনেকেই বলছেন, ক্ষমতাসীন দল-সমর্থিত মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকেরা কেন্দ্র দখল করে দেদার সিল মারার কারণেই ভোটের পরিমাণ এত বেড়েছে। তাঁদের ধারণা, প্রকৃতভাবে ১৫ থেকে ২০ শতাংশের বেশি ভোটার কেন্দ্রে আসেননি।
কমিশন সচিবালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বাতিল ভোটের পরিমাণ ১ লাখ ২১ হাজার ৩। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণে ৪০ হাজার ১৩০, উত্তরে ৩৩ হাজার ৫৮১ এবং চট্টগ্রামে ৪৭ হাজার ২৯২ ভোট।
ইসি সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের কেউ কেউ মনে করেন, কেন্দ্র দখল করে ব্যালটে সিল মারার কারণে এবার তিন সিটিতে বাতিল ভোটের পরিমাণ অস্বাভাবিক বেশি।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ঢাকা দক্ষিণে ৪৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ, ঢাকা উত্তরে ৩৭ দশমিক ২৯ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৪৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ ভোট পড়েছে। গড়ে ভোট পড়েছে ৪৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ। সরকার-সমর্থিত বিজয়ী তিন মেয়র প্রার্থী ও নির্বাচন কমিশন এটিকে স্বাভাবিক বলছে।
গত মঙ্গলবার ভোটের দিন প্রথম আলোর ১৩ জন প্রতিবেদক সারা দিন দক্ষিণে এবং ১৪ জন প্রতিবেদক উত্তরে ঘুরেছেন। মোট ২৭৯টি কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, সকালের দিকে কোথাও কোথাও ভোটার থাকলেও দুপুরের পর ভোটারশূন্য হয়ে পড়ে বেশির ভাগ কেন্দ্র। একই অবস্থা ছিল চট্টগ্রামেও।
তার পরও এত ভোট পড়ার কারণ জানতে চাইলে ভোট গ্রহণের সঙ্গে জড়িত অন্তত ১৫ জন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেছেন, তাঁরাও ভোটের হার নিয়ে বিব্রত। ক্ষমতাসীন দলের লোকজন ব্যালট নিয়ে জোর করে সিল মারায় এসব ঘটনা ঘটেছে।
নির্বাচন কমিশন, পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকজনকে এই অনিয়মের বিষয়ে বারবার জানানো হলেও সাহায্য পাওয়া যায়নি। পরে তাঁরা অসহায় হয়ে পড়েন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের আইডিয়াল কলেজের একটি কেন্দ্রে সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত ভোটারদের উপস্থিতি ছিল একেবারেই কম। কিন্তু ইসির তথ্য অনুযায়ী, এই কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ৬৮ শতাংশ। ওই কেন্দ্রের একজন ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেছেন, এই কেন্দ্রে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ ভোটার এসেছিলেন। বাকিটা ক্ষমতাসীন দলের লোকজন সিল মেরে নিয়েছে।
একই ওয়ার্ডের আরেকটি কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, দুপুরের দিকে ক্ষমতাসীন দলের লোকজন সব ব্যালট নিয়ে যেতে থাকে। অবস্থা বেগতিক বুঝতে পেরে তিনি ব্যালটের সাতটা বান্ডিল (৭০০ ব্যালট) লুকিয়ে ফেলেন। কারণ, তাঁর ভয় হচ্ছিল তারা যেভাবে ভোট দিচ্ছে তাতে এক শ শতাংশ ভোট পড়ে যাবে। তখন তিনি বিপদে পড়বেন। এই কর্মকর্তার অভিযোগ, ভোট গণনার সময়ও সরকার-সমর্থক লোকজন তাঁদের ঘিরে রেখেছিল। এত সিল মেরে ৬০ শতাংশ ভোট পড়ার পরেও তারা বলছিল, এই কেন্দ্রে ৯০ ভাগ ভোট কেন পড়ল না? অথচ এখানে ২০ শতাংশের মতো ভোটার আসলে ভোট দিয়েছেন।
ঢাকা দক্ষিণের ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের একজন ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর কেন্দ্রে স্বাভাবিকভাবে ভোট পড়েছে ২০ শতাংশ। কিন্তু জোর করে সিল মারায় এটি প্রায় ৭০ শতাংশ হয়ে যায়।উত্তরের একটি কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা বলেন, বাইরের লোকজন যখন জোর করে ব্যালট নিয়ে গেল, তখন পুলিশকে বাধা দিতে অনুরোধ জানানো হয়। কিন্তু পুলিশ কিছুই করেনি। ওই ঘটনার পর থেকে এখনো তিনি স্বাভাবিক হতে পারছেন না।
ঢাকা দক্ষিণের মোট ভোটার ১৮ লাখ ৭০ হাজার ৭৭৮ জন। ভোট পড়েছে ৮ লাখ ৬৫ হাজার ৩৫৪। এর মধ্যে সাঈদ খোকন ৫ লাখ ৩৫ হাজার ২৯৬ পেয়ে বিজয়ী হন। প্রতিদ্বন্দ্বী মির্জা আব্বাস পান ২ লাখ ৯৪ হাজার ২৯১ ভোট।
মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে প্রায় ৪৯ শতাংশ ভোট গ্রহণ দেখানো হয়েছে। এটা অবিশ্বাস্য। আমি যেসব কেন্দ্রে গিয়েছি, সেখানে ১১টা পর্যন্ত ১৫ শতাংশের বেশি ভোট পড়েনি। আর বিএনপি ভোট বর্জনের পর তো ভোটাররা কেন্দ্রেই যাননি। তাহলে ৪৯ শতাংশ ভোট কোত্থেকে আসে?’
ঢাকা উত্তরে মোট ভোটার ২৩ লাখ ৪৪ হাজার ৯০০ জন। ভোট পড়েছে ৮ লাখ ৪১ হাজার। আওয়ামী লীগ-সমর্থিত বিজয়ী মেয়র প্রার্থী আনিসুল হক ৪ লাখ ৬০ হাজার ১১৭ ভোট এবং প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি-সমর্থিত তাবিথ আউয়াল ৩ লাখ ২৫ হাজার ৮০ ভোট পেয়েছেন।
তাবিথ আউয়াল প্রথম আলোকে বলেন, ‘সকাল সাড়ে ১০টার পর ভোট দেওয়ার মতো পরিস্থিতি ছিল না। এর আগ পর্যন্ত ১৫ থেকে ২০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েনি। দুপুরের পর সরকার-সমর্থিত প্রার্থীরা এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছিলেন, যা দেখে ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে আর যাননি। এর পরও কীভাবে ৩৭ শতাংশ ভোট গ্রহণ হলো, সেটা বিস্ময়ের বিষয়। আসলে সরকার-সমর্থিতরা অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মতো বুথে ঢুকে ভোট দিয়েছে। তাতেই হয়তো এত ভোট।’
চট্টগ্রাম সিটিতে মোট ভোটার ১৮ লাখ ১৩ হাজার ৬০০। এর মধ্যে বৈধ ভোট পড়েছে ৮ লাখ ৬৮ হাজার ৬৬৩। আওয়ামী লীগ-সমর্থিত বিজয়ী মেয়র প্রার্থী আ জ ম নাছির পেয়েছেন ৪ লাখ ৭৫ হাজার ৩৬১ ভোট। আর প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি-সমর্থিত মেয়র প্রার্থী মনজুর আলম পেয়েছেন ৩ লাখ ৪ হাজার ৮৩৭ ভোট। মনজুর আলমও নিজে এত ভোট পাওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের পরিচালক আবদুল আলীম প্রথম আলোকে বলেছেন, তিনি ঢাকায় বেশ কয়েকটি কেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাতে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত ভোটারের উপস্থিতি ২৫ শতাংশ মনে হয়েছে।
রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় ও পেশিশক্তির প্রয়োগে ব্যাপক অনিয়ম হওয়ায় সিটি নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বলে মনে করে টিআইবি। বেসরকারি নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং অ্যালায়েন্স (ফেমা) বলেছে, দুপুর ১২টা পর্যন্ত কেন্দ্রগুলোতে ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রত্যাশার চেয়ে লক্ষণীয়ভাবে কম।
দুপুর ১২টায় বিএনপি ভোট বর্জনের পর সাধারণ মানুষের ভোট নিয়ে আগ্রহ ছিল না। কিন্তু এর পরও এত বেশি ভোট কীভাবে পড়েছে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিব সিরাজুল ইসলাম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি মনে করি না ফ্রি-স্টাইলে ভোট হয়েছে। সেটি হলে ভোট গ্রহণের হার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ হতো। কাজেই তিন সিটিতে গড়ে ৪৪ শতাংশ ভোট অস্বাভাবিক কিছু নয়।’

‘বাংলাদেশে গণতন্ত্র নির্বাসিত’ -খালেদা জিয়া

বাংলাদেশে কোন গণতন্ত্র নেই উল্লেখ করে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, বাংলাদেশে এখন গণতন্ত্র নির্বাসিত, গণতান্ত্রিক প্রথা ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। কাজেই কোন শ্রেণী-পেশার মানুষের অধিকারই আজ আর নিশ্চিত নয়। এই অবস্থার অবসানের জন্য সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক একটি গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে অংশ নেয়ার জন্য এই মহান মে দিবসে আমি  দেশের শ্রমজীবী ভাই-বোনদের প্রতি আহবান জানাচ্ছি। বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, একটি গণতান্ত্রিক সমাজ ছাড়া শ্রমজীবীসহ কোন শ্রেণী-পেশার মানুষের ন্যায়সঙ্গত অধিকার আদায় ও প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। আর তাই সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন স্বাভাবিকভাবেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সঙ্গে একাকার হয়ে যায়। সাবেক এ প্রধানমন্ত্রী বলেন, মহান মে দিবস উপলক্ষে আমি দেশ-বিদেশে কমর্রত সকল বাংলাদেশী শ্রমিক-কর্মচারী এবং বাংলাদেশসহ বিশ্বের সকল শ্রমজীবী খেটে খাওয়া মানুষকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই এবং তাদের উত্তরোত্তর সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি ও সাফল্য কামনা করি। তিনি আরও বলেন, এ দিনটি শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ১৮৮৬ সালে মে’ মাসে শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার আদায় করতে গিয়ে আমেরিকার শিকাগো শহরে ‘হে মার্কেটে’ জীবনদানকারী এবং অন্যায় বিচারে ফাঁসি দিয়ে যাদের হত্যা করা হয়েছে সেইসব প্রতিবাদী শ্রমিকদের স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। খালেদা জিয়া বলেন, আজকের এই দিনে রানা প্লাজা ও তাজরীন ফ্যাশনে শোচনীয়ভাবে নিহত ভাই-বোনদের কথাও আমি গভীর বেদনার সঙ্গে স্মরণ করছি। মহান মে দিবস শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিকভাবে একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। আমরা বিস্মৃত হইনি যে, শ্রমজীবী মানুষের রক্তঝরা ঘামেই বিশ্ব সভ্যতার বিকাশ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নতুন দিগন্ত উম্মোচিত হয়। তাদের অবদানের ফলেই বিশ্ব অর্থনীতি চাঙ্গা হয়। অথচ গভীর পরিতাপের বিষয় আজও বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে নিপীড়িত শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির প্রতি সম্মান ও শ্রমের মর্যাদা সম্পর্কে সব সময় ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায় এবং তা রক্ষায় আমরা আমাদের প্রতিশ্রুতি পালনে কখেনোই পিছপা হইনি। বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান নিজেকে সবসময় একজন শ্রমিক হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ব ও স্বাচ্ছন্দবোধ করতেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, শ্রমিকদের দুটো হাতকে তিনি (জিয়াউর রহমান) উন্নয়নের চাবিকাঠি ভাবতেন। এদেশের শ্রমজীবী ও পরিশ্রমী মানুষের কল্যাণে তিনি যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। আমাদের দলের পতাকায়ও তার স্বীকৃতি রয়েছে। খালেদা জিয়া বলেন, শ্রমজীবী মানুষের সার্বিক কল্যাণের লক্ষ্যে আমাদের এই প্রচেষ্টা আগামীতেও অব্যাহত রাখার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করছি। তাদের গণতান্ত্রিক ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার, ন্যায্য মজুরি এবং স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ অর্জনসহ সকল ন্যায়সঙ্গত দাবি আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রামে আমাদের সমর্থন অব্যাহত থাকবে ইনশাআল্লাহ।

এত ভোট দেখে আশ্চর্য হয়েছি -প্রথম আলোকে মনজুর আলম by রাহীদ এজাজ ও একরামুল হক

ভোট গ্রহণ শুরু হওয়ার সোয়া তিন ঘণ্টা পরই সিটি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন চট্টগ্রামে বিএনপি-সমর্থিত মেয়র পদপ্রার্থী মোহাম্মদ মনজুর আলম। শুধু ভোট নয়, রাজনীতিকেও বিদায় জানান চট্টগ্রামের সদ্য বিদায়ী এই মেয়র। কিন্তু গত মঙ্গলবার গভীর রাতে নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত ফলে দেখা যায় তিনি পেয়েছেন ৩ লাখ ৪ হাজার ৮৩৭ ভোট। ভোটের এই ফলে মনজুর আলম নিজেও অবাক।
নির্বাচনের দিন অনেকটা আকস্মিকভাবে রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিলেও এই সিদ্ধান্তটা হুট করে নেওয়া নয় বলেও প্রথম আলোকে জানান মনজুর আলম। সাবেক এই মেয়রের ভাষায়, তাঁর বয়স বেড়েছে, তাই রাজনীতি থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়াকেই তাঁর কাছে ভালো মনে হয়েছে। অবনতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশও তাঁকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। তাই মেয়র নির্বাচিত হলেও রাজনীতি ছাড়তেনই—এটা জোর দিয়ে বলেছেন তিনি।
গতকাল বুধবার দুপুরে নগরের সিটি গেট এলাকার বাসায় প্রথম আলোর সঙ্গে নির্বাচন ও রাজনীতি নিয়ে একান্তে কথা বলেন মনজুর আলম। ৩০ মিনিটের আলাপচারিতায় বেশ কিছু প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিলেও কয়েকটি প্রশ্ন উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে যান।
মঙ্গলবার দুপুরে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেওয়ার পর মনজুর আলম এতটাই বিমর্ষ ছিলেন যে ওই দিন আপনজন ছাড়া কারও সঙ্গে কথা বলেননি। কাল দুপুরে তাঁর বাসায় গিয়ে অবশ্য আগের দিনের মনজুরকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। বাসায় দিনভর নেতা-কর্মীর সঙ্গে বেশ খোশমেজাজেই আলাপ করেছেন।
সকাল আটটায় ভোট শুরু হওয়ার পর সোয়া ১১টায় নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর পরও তিন লাখ ভোট পেলেন। নির্বাচন থেকে না সরলে জিততেন িক না, এ প্রশ্নের জবাবে মনজুর আলম দাবি করেন, নির্বাচনী প্রচারণার সময় তাঁর প্রতি মানুষের সাড়া দেখে জয় সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত ছিলেন। কিন্তু ভোট শুরু হতে না-হতেই বিভিন্ন কেন্দ্রে তাঁর পোলিং এজেন্টদের প্রবেশ করতে না দেওয়া, কোনো কোনো কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া, এজেন্ট নিয়ে আপত্তি, হামলা ও কেন্দ্র দখলের খবর পাচ্ছিলেন।
মনজুর আলম বলেন, ‘চারদিক থেকে একের পর এক বিশৃঙ্খলার খবর শুনে ভেঙে পড়ি। আমি একজন শান্তিপ্রিয় মানুষ। আমার জন্য লোকজন বিপদে পড়ুক এটা চাইনি। যেখানে সুষ্ঠু পরিবেশ নেই সেখানে জেতার সুযোগ কোথায়! তবে আজ যখন এত ভোট দেখছি, এতে আশ্চর্য হয়েছি। অবাক হয়েছি এত মানুষের সমর্থন দেখে।’
মনজুর আলম জানান, ৭১৯টি কেন্দ্রে ৬ হাজার ৪০০ পোলিং এজেন্ট নিয়োগ করা হয়েছিল। তবে প্রতিটি কেন্দ্র ও বুথ পরিদর্শনের মতো অবস্থা তাঁর দলের ছিল না। নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধরপাকড়ে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। তবে ভোটের ফল দেখে নেতা-কর্মীরাই শুধু নন, অনেক সাধারণ ভোটারও আফসোস করেছেন বলে তিনি জানান।
মনজুর আলম বলেন, ‘অনেকে আমার সিদ্ধান্তটাকে ভুল হিসেবে অভিহিত করেছেন। প্রয়োজনে তাঁরা আরও কিছু সময় অপেক্ষার কথা বলেন। আপনি যে প্রশ্ন করেছেন—তিন ঘণ্টা, পাঁচ ঘণ্টা সে হিসেবে দুই পক্ষের ভোটের ব্যবধানে বলা যায়, ভোটে থাকলে আমি অবশ্যই ইনশা আল্লাহ জিততে পারতাম।’
মানুষের কথায় এখন কী মনে হচ্ছে সিদ্ধান্তটা ভুল ছিল এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে মনজুর আলম বলেন, ‘ভোটের পরিবেশ দেখে আমি ভোটে থাকতে চাইনি। আমার কারণে একজন কর্মী, সাধারণ একজন মানুষ কেন কষ্ট করবে?’
সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তটা নিজের নাকি দল থেকে চাপিয়ে দেওয়া, এ প্রশ্নের উত্তরে মনজুর আলম বলেন, ‘ওপর থেকে কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না। আমার দেওয়ানহাটের দপ্তরে বসে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমানের সঙ্গে প্রথম এ নিয়ে কথা বলি। পরে নগর বিএনপি সভাপতি আমীর খসরুর সঙ্গেও এ নিয়ে কথা হয়। পরে সবাই মিলে একমত হয়ে এ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করি।’
নির্বাচন থেকে সরলেও রাজনীতি থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া কি আবেগ, হতাশা না কি অন্য কোনো কারণ রয়েছে—উত্তরে মনজুর আলম জানান, আবেগ নয়, এর সঙ্গে বয়সও তাঁর বিবেচনায় ছিল। তিনি জানান, সমাজসেবা থেকেই রাজনীতিতে এসেছেন। তাঁর বাবাও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
সাবেক এই মেয়রের বয়সের ৬৩ বছর। এই বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়ে মনজুর আলমকে প্রশ্ন করা হয়, রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না। জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে চাইছি না। তবে দেশের জন্য রাজনীতি প্রয়োজন। রাজনীতি ছাড়া দেশ চলতে পারে না। রাজনীতির কারণেই দেশ পেয়েছি। দেশ যত দিন থাকবে রাজনীতি তত দিন থাকবে। তবে সুস্থ রাজনীতির প্রয়োজন। আদর্শিক ও সুস্থ রাজনীতির একটু অভাব আছে। সবাই সুস্থ রাজনীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলে মানুষের আগ্রহ বাড়বে।’
রাজনীতি থেকে সরে গিয়ে কর্মীদের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিলেন কি না, এমন প্রশ্নে মনজুর আলম জানান, দলের সঙ্গে তিনি থাকলেও সক্রিয়ভাবে বা গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদে ছিলেন না। তাঁর সরে যাওয়াটা কাউকে বিপদে ফেলবে বলেও তিনি মনে করেন না।

৮২ ঘণ্টা পর ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত উদ্ধার

‘মধ্যাহ্নভোজ সেরে সবেমাত্র উপরে গিয়েছিলাম। হঠাৎ চারপাশটা নড়ে উঠল। পা-টা আটকে গেল ভাঙা দেওয়ালের ফাঁকে। ভেবেছিলাম এভাবেই মরে যাব।’ ভূমিকম্পের ৮২ ঘণ্টা পর যখন তাকে উদ্ধার করা হল তখন এমনটাই বললেন ২৭ বছরের ঋষি খানাল। মঙ্গলবার তাকে উদ্ধার করা হয়েছে কাঠমান্ডুর এক হোটেলের ধ্বংসস্তূপ থেকে। তিনি জানিয়েছেন, তিন দিন কেটে যাওয়ার পরও কেউ আসেনি উদ্ধার করতে। তার নখ সাদা হয়ে যাচ্ছিল।
তার ঠোঁট ফেটে যাচ্ছিল। তিনি ভাবছিলেন তাকে উদ্ধার করতে আর বোধহয় কেউ আসবে না। তিনি ভাবতে শুরু করেছিলেন, এইভাবেই মৃত্যু হবে তার। তার চারপাশে পড়েছিল মৃতদেহের সারি আর তার বীভৎস গন্ধ। তিনি বলেন, খাবার, পানি কিছুই ছিল না। জীবন বাঁচাতে নিজের মূত্র পান করেছি।’ আচমকা একটি ফরাসি উদ্ধারকারী দল পৌঁছায়। বেশ কয়েক ঘণ্টা উদ্ধারকাজ চালানোর পর তাকে বের করে আনা সম্ভব হয়। সেখান থেকে বের করে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। আহত ঋষিকে পরীক্ষাকারী চিকিৎসক অখিলেশ শ্রেষ্ঠা বলেছেন, ‘মনে হচ্ছে তীব্র ইচ্ছাশক্তির জোরেই সে বেঁচে আছে।’ এনডিটিভি।

বার্সার লাতিনত্রয়ীর সেঞ্চুরি

বিশ্বের সেরা ফরোয়ার্ড লাইন নিয়ে বিতর্কের আর কোনো সুযোগ রাখলেন না মেসি, সুয়ারেজ ও নেইমার। সমর্থকরা যাদের ভালোবেসে ডাকেন ‘এমএসএন’। বার্সেলোনার আক্রমণভাগের লাতিন ত্রিফলা এক সঙ্গে জ্বলে উঠলে প্রতিপক্ষের কী দুর্দশা হয়, তা আরও একবার দেখল ফুটবলবিশ্ব। এমএসএন ঝড়ে খড়কুটোর মতো উড়ে গেল গেটাফে। মঙ্গলবার ন্যুক্যাম্পে গেটাফেকে ৬-০ গোলে চূর্ণ করে স্প্যানিশ লীগের শিরোপা দৌড়ে আরেক ধাপ এগিয়ে গেছে বার্সেলোনা। আর গোলের সেঞ্চুরি পূর্ণ করে ইতিহাসে ঢুকে গেছেন মেসি-সুয়ারেজ-নেইমারত্রয়ী। এ মৌসুমে তিনজন মিলে করেছেন মোট ১০২ গোল। এক মৌসুমে বার্সেলোনার ফরোয়ার্ড লাইনের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড এটি। ছয় গোল খেয়েও নিজেদের ভাগ্যবান ভাবতে পারে গেটাফে। কারণ, ৪৭ মিনিটেই স্কোরলাইন ৬-০ হয়ে গিয়েছিল! পাগুলে প্রথমার্ধে গোলে নেয়া সাত শটের পাঁচটিতেই লক্ষ্যভেদ করে বার্সেলোনা।
মেসি ও সুয়ারেজের জোড়া গোলের পাশাপাশি একটি করে গোল নেইমার ও জাভির। প্রথম ২৮ মিনিটেই স্কোরলাইনে নাম তুলে নিজেদের গোলের সেঞ্চুরি পূর্ণ করে ফেলেন- মেসি, সুয়ারেজ ও নেইমার। আরেকটি কীর্তি গড়েছেন এমএসএনত্রয়ী। এই প্রথম একই ম্যাচে তিনজন মিলে গোল করেছেন এবং করিয়েছেন। এ মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের বিবিসি (ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো, গ্যারেথ ও করিম বেনজেমা) ত্রয়ী যেখানে ৮৯ গোল করেছেন সেখানে বার্সার এমএসএনত্রয়ীর গোল ১০২টি। ব্যক্তিগত দ্বৈরথেও রোনাল্ডোকে প্রায় ধরে ফেলেছেন মেসি। লা লীগায় রোনাল্ডোর গোল ৩৯টি, মেসির ৩৮টি। সবমিলিয়েও রোনাল্ডোর (৫০) এক গোল পেছনে রয়েছেন মেসি। ৪৯ ম্যাচে করেছে ৪৯ গোল। ৪৩ ম্যাচে নেইমারের গোল ৩২টি আর ৩৭ ম্যাচে সুয়ারেজ করেছে ২১ গোল। নিজেদের এখন বার্সেলোনার ইতিহাসের সবচেয়ে আগ্রাসীত্রয়ী বলে দাবি করতে পারেন তারা। এক মৌসুমে বার্সেলোনার হয়ে সবচেয়ে বেশি গোল করার আগের রেকর্ডটি ছিল মেসি-সানচেজ-পেড্রোত্রয়ী। ২০১১-১২ মৌসুমে এই তিনজন মিলে করেছিলেন ১০১ গোল। এছাড়া ২০০৮-০৯ মৌসুমে ১০০ গোল করেছিলেন মেসি-ইতো-অঁরিত্রয়ী। ক্লাব রেকর্ড ভাঙার পর এবার ইউরোপিয়ান রেকর্ডের হাতছানি এমএসএনত্রয়ীর সামনে। ২০১১-১২ মৌসুমে ১১৮ গোল করেছিলেন রিয়াল মাদ্রিদের রোনাল্ডো-বেনজেমা-হিগুয়াইনত্রয়ী।
সেই রেকর্ড ভাঙার জন্য অন্তত আরও সাতটি ম্যাচ পাবেন মেসিরা। আগামী সপ্তাহে বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়ন্স লীগের সেমিফাইনাল। তারপরও আক্রমণভাগের ত্রিরতœকে বিশ্রাম দেয়ার ঝুঁকি নেননি বার্সা বস লুইস এনরিকে। কারণ মৌসুমের এই পর্যায়ে একবার পা হড়কালেই সর্বনাশ। আপাতত ৩৪ ম্যাচে ৮৪ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষেই আছে বার্সা। ৩৩ ম্যাচে রিয়ালের পয়েন্ট ৭৯। পরের ম্যাচে রিয়াল জিতলে ব্যবধান ফের দুই পয়েন্টে নেমে আসবে। ফলে শীর্ষে থাকলেও শিরোপা নিশ্চিত করতে বাকি চার ম্যাচের চারটিতেই জিততে হবে বার্সাকে। তবে লাতিনত্রয়ী যে ফর্মে আছেন তাতে বার্সার জন্য এটা বড় কোনো চ্যালেঞ্জ হওয়ার কথা নয়। এনরিকে তো বলেই দিয়েছেন, ‘এমন ছন্দে থাকলে ওদেরকে থামানো অসম্ভব। এক ম্যাচে এতগুলো দৃষ্টিনন্দন গোল আগে কখনও দেখিনি আমি।’ সতীর্থ জেরার্ড পিকের কণ্ঠেও অভিন্ন সুর, ‘সুয়ারেজ, নেইমার ও মেসির মধ্যে যে বোঝাপড়া এমন কিছু আগে কখনও দেখিনি আমি। ওদের রসায়ন সত্যিই দুর্দান্ত।’পরশু নয় মিনিটে ‘পানেনকা’ পেনাল্টিতে গোল উৎসবের সূচনা করা মেসিই ৪৭ মিনিটে আরেকটি চোখ ধাঁধানো গোলে গেটাফের কফিনে শেষ পেরেক ঠোকেন। সুয়ারেজ দু’গোল করেন ২৫ ও ৪০ মিনিটে। এই দুই গোলের মাঝে আরও দু’বার গেটাফের জাল কাঁপান নেইমার ও জাভি। শেষ দিকে হ্যাটট্রিকের সহজ দুটি সুযোগ নষ্ট করেন মেসি। এ নিয়ে অবশ্য আক্ষেপ থাকার কথা নয় বার্সা ভক্তদের। ওয়েবসাইট।
এমএসএনত্রয়ীর ‘সেঞ্চুরি’
ম্যাচ গোল
মেসি ৪৯ ৪৯
নেইমার ৪৩ ৩২
সুয়ারেজ ৩৭ ২১

জিয়াউর রহমানের মাজার ভাঙচুর

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মাজার ভাঙচুর করেছে দুর্বৃত্তরা। গতরাতে এ ঘটনা ঘটে। বিএনপি চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইং সদস্য শায়রুল কবির খান মানবজমিন অনলাইনকে জানান, বুধবার রাতে কোন এক সময় দুর্বৃত্তরা জিয়াউর রহমানের মাজার ভাঙচুর করেছে। সকালে গিয়ে দেখা যায়, জিয়াউর রহমানের সমাধিস্থলের পাশের গোল চত্বরের ৯টি মার্বেল পাথরের প্লেট ভেঙে ফেলা হয়েছে। এরমধ্যে ৪টি প্লেট দুর্বৃত্তরা নিয়ে  গেছে এবং ৫টি প্লেট ভেঙে  ফেলে রেখেছে।  মাজারের দায়িত্বে থাকা মিজানুর রহমান জানান, তিনি সকাল ৬টায় এসে দেখেন প্লেটগুলো ভাঙ্গা। রাতে কে বা কারা এ ঘটনা ঘটিয়েেেছ তা দেখেননি তিনি। উল্লেখ্য, ১৯৮১ সালের ৩০শে মে একদল বিপথগামী সেনা সদস্যের হাতে নিহত হন জিয়াউর রহমান। এরপর তার লাশ  চন্দ্রিমা উদ্যানে ি সমাহিত করা হয়। ২০০২ সালের ডিসেম্বরে এই উদ্যানে জিয়ার সমাধি কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়।
জিয়ার কবর ঘিরে থাকা নকশার ওপর পড়ে আছে ভাঙা টাইলস। ছবিটি বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটে তোলা। ছবি: সাজিদ হোসেনরাজধানীর চন্দ্রিমা উদ্যানে থাকা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মূল কবরকে ঘিরে তৈরি করা নকশায় থাকা কয়েকটি মার্বেল পাথর ভেঙে ফেলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। আজ বৃহস্পতিবার সকালে সেখানে মার্বেলের ভাঙা টাইলস পড়ে থাকতে দেখা যায়।
জিয়ার কবর ঘিরে থাকা নকশার ওপর পড়ে আছে ভাঙা টাইলস। ছবিটি বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটে তোলা। ছবি: সাজিদ হোসেনকবরের পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করতে বিএনপি থেকে মিজানুর রহমান নামের এক ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি সাংবাদিকদের জানান, সকালে গিয়ে তিনি কবরকে ঘিরে থাকা নকশার মার্বেল পাথরের ১১টি টাইলস ভাঙা অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন।
জিয়ার কবর ঘিরে থাকা নকশার ওপর পড়ে আছে ভাঙা টাইলস। ছবিটি বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটে তোলা। ছবি: সাজিদ হোসেনবিএনপির চেয়ারপারসনের প্রেস উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান প্রথম আলোকে বলেন, কে বা কারা কবরের নকশা ভেঙেছে, তাঁরা এখনো তা জানতে পারেননি।

মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়েছে নির্বাচন কমিশন

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, তিন সিটিতে সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রনির্ভর নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচন কমিশন এবং আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। অন্যদিকে একটি পক্ষের বিতর্কিতভাবে মাঝপথে নির্বাচন বর্জন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সুস্থ পরিবেশ প্রতিষ্ঠার পথে নতুন করে ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে।
এ অবস্থায় সব রাজনৈতিক দলকে সংযত, সহনশীল আচরণ ও গণতান্ত্রিক চর্চার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় ও পেশিশক্তির প্রয়োগে ব্যাপক অনিয়ম সংঘটিত হওয়ায় সদ্যসমাপ্ত তিনটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক একটি প্রতিষ্ঠান নির্বাচনী আইন প্রয়োগসহ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে। ব্যাপক কারচুপির নির্ভরযোগ্য তথ্য আর প্রমাণ থাকার পরও কমিশন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে অস্বীকৃতি ও মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়ে নিজেকে বিব্রত করেছে।
বুধবার এক বিবৃতিতে ড. ইফতেখারুজ্জামান এসব কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, যথাযথ দায়িত্ব পালনে নির্বাচন কমিশন শুধু যে ব্যর্থ হয়েছে তাই নয়, বরং কমিশন ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক পক্ষপাতমূলক আচরণ করায় সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি ও জনআস্থা ধূলিসাৎ হয়েছে। তিনি বলেন, সিটি নির্বাচনকে ঘিরে বাংলাদেশের সংঘাতময় রাজনীতি থেকে উত্তরণে ইতিবাচক সুযোগের সৃষ্টি হয়েছিল, কিন্তু সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনই সামগ্রিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতির ঝুঁকি পুনরায় সৃষ্টি হয়েছে।
বিভিন্ন দল ও সংগঠনের নিন্দা : এদিকে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের নামে সরকার জনগণের সঙ্গে প্রহসন করেছে বলে অভিযোগ করেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন। বুধবার পৃথক পৃথক বিবৃতিতে তারা দাবি করে, এবারের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ছিলও গত ৫ জানুয়ারির ধাপ্পাবাজির নির্বাচনেরই ধারাবাহিকতা।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি)-এর সভাপতি আ স ম আবদুর রব এবং সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন বলেন, সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন ৫ জানুয়ারির নির্বাচনী প্রহসনেরই নতুন সংস্করণ। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সবাই বর্জন করে এবং ৫ ভাগ ভোট নিয়ে আওয়ামী জোট নিজেদের বিজয়ী ঘোষণা করে। আর এবার তিনটি সিটিতেই সরকারি দল কেন্দ্র দখল করে সিল মেরে অধিকাংশ কেন্দ্রেই সকাল ১০টার মধ্যে বাক্সভর্তি করে নিজেদের বিজয়ী ঘোষণা করেছে।
জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সভাপতি বদরুদ্দীন উমর ও সম্পাদক ফয়জুল হাকিম বলেন, তিন সিটিতে নির্বাচনের নামে ভোট ডাকাতি হয়েছে। সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন অনির্বাচিত সরকার গণতন্ত্রের যে মুখোশ পরতে চেয়েছিল তা বিফলে গেছে। প্রমাণিত হয়েছে তিন সিটি নির্বাচন ছিল ৫ জানুয়ারির ধাপ্পাবাজির নির্বাচনেরই ধারাবাহিকতা।
বাসদের একাংশের সাধারণ সম্পাদক মুবিনুল হায়দার চৌধুরী বলেন, এ নির্বাচন আরেকবার প্রমাণ করল অবৈধ-অগণতান্ত্রিক সরকারের অধীনে কখনোই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, ফ্যাসিস্ট শাসনের ফলস্বরূপ গণধিকৃত মহাজোট সরকারের গ্রহণযোগ্যতার পুনরুদ্ধার ও গত ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে অবৈধ ক্ষমতা দখলকে বৈধতা দেয়ার চক্রান্তের অংশ হিসেবে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
তিন সিটি নির্বাচনকে তামাশা ও প্রহসন আখ্যা দিয়ে ন্যাপ চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি ও মহাসচিব এম গোলাম মোস্তফা ভুইয়া বলেন, প্রহসনের সিটি নির্বাচন ৫ জানুয়ারির কলংকজনক নির্বাচনকেও পরাজিত করেছে। ভোট কেন্দ্র দখল, ভোট কারচুপি ও ভোট ডাকাতির মহোৎসবের মাধ্যমে তিন সিটি কর্পোরেশনে নির্বাচনের নামে সরকার জনগণের সঙ্গে প্রহসন ও প্রতারণা করেছে।
লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান ও মহাসচিব হামদুল্লাহ আল মেহেদী বলেন, ডিজিটাল ভোট জালিয়াতির মহোৎসব বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছে।

ঝুঁকি নিতে চায়নি ক্ষমতাসীনরা

তিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে দুই ধরনের মত রয়েছে। একটি পক্ষ মনে করছেন, বিজয়ের ব্যপারে ক্ষমতাসীনরা নিশ্চিত হতে চেয়েছে। তারা ঝুঁকি নিতে চাননি। অপরপক্ষের মত, ভোটের যে অবস্থা ছিল তাতে তিনটির মধ্যে চট্টগ্রামসহ দুটিতে আওয়ামী লীগ নিশ্চিতভাবে জয়ী হতো।
সরকারি একটি সংস্থার জরিপ প্রসঙ্গ টেনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের এক উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য বুধবার সকালে যুগান্তরকে বলেন, ওই জরিপে উত্তরে ভালো অবস্থানের কথা বলা হলেও ভোটের পর মনে হচ্ছে আমরা দক্ষিণেই ভালো করতাম। তাই বাড়তি কিছু করার প্রয়োজন ছিল না।
উপদেষ্টা পরিষদের ওই সদস্য ছাড়াও একজন সাংগঠনিক সম্পাদক ও কার্যনির্বাহী সংসদের এক সদস্যের সঙ্গে কথা বললে তারা দুই ধরনের মত দেন। প্রথম পক্ষটি মনে করেন, ঝুঁকি না নিলে আগের সিটি নির্বাচনের পুনরাবৃত্তিও হতে পারত। তাহলে বিশ্ববাসীর কাছে কী বার্তা যেত? পেট্রলবোমা ও আগুনে পুড়িয়ে মানুষ মেরেও জয়ী হয়েছে বিএনপি। তাহলে আমরা যে অভিযোগ করে আসছি, তা কীভাবে নিত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়? এ প্রশ্ন করেন ওই নেতা।
ওই তিন নেতার সঙ্গে কথা বললে তাদের দুজন দাবি করেন নির্বাচনে ভোট জালিয়াতির বিষয়ে আওয়ামী লীগ হাইকমান্ড কিছুই জানে না। এ ব্যাপারে তাদের কোনো নির্দেশ ছিল না। আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগ-যুবলীগের অতি উৎসাহী নেতাকর্মীরা ফাঁকা মাঠ পেয়ে কিছু বাড়াবাড়ি করেছে। তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল ওপর মহলের আস্কারা না পেলে এ ধরনের কাজ করার সাহস কি কেউ পায়? জবাবে ওই দুই নেতা বলেন, ২ হাজার ৭শ ভোট কেন্দ্রের সব কটাতে কি বাড়াবাড়ি হয়েছে? না, মাত্র কয়েকটি কেন্দ্রে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। যা মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার করা হয়েছে, তা ভোটের সার্বিক চিত্র নয়। কিছু গণমাধ্যম এটাকে বৃহৎ আকার দেয়ার চেষ্টা করছে।
তবে উপদেষ্টা পরিষদের ওই সদস্যের কণ্ঠে ছিল স্পষ্ট ক্ষোভ। তার মতে, কম হোক বেশি হোক- ভোট ডাকাতি বা জালিয়াতি এবং ভোট কেন্দ্র দখলের যে অভিযোগগুলো আমাদের বিরুদ্ধে এসেছে তা সচেতনভাবে পরিহার করা যেত। কারণ আওয়ামী লীগের ইতিহাসে জোর- জবরদস্তির কোনো ঘটনা নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিটি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সমর্থিত এক মেয়র প্রার্থী যুগান্তরকে বলেন, তার জানামতে কোনো নেতাকর্মীকে জোর-জবরদস্তি করার জন্য বলা হয়নি। হলে সেটা তিনি জানতেন। তাকে প্রশ্ন করা হয়, এ ধরনের ঘটনা তো ঘটেছে। যে জন্য বিএনপি নির্বাচন বর্জন করল? জবাবে তিনি বলেন, আমি বলব না একেবারেই কিছু হয়নি। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে। তবে বিএনপি পূর্বপরিকল্পিতভাবেই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন বর্জন করেছে। বিচ্ছিন্ন ঘটনা না থাকলেও তারা এটা করত।
ভোটে কারচুপি বা জালিয়াতির অভিযোগ খণ্ডন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুধবার এক অনুষ্ঠানে বলেন, ঢাকা ও চট্টগ্রামের মানুষ তাদের (বিএনপি) প্রত্যাখ্যান করেছে। তার প্রত্যাশা দেশবাসীও বিএনপিকে প্রত্যাখ্যান করবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে বহু নির্বাচন হয়েছে। সাংবাদিকরা নিশ্চয় স্বীকার করবেন, এর আগে পাঁচটি নির্বাচন হয়েছে। সেবারেও যতটুকু ঘটনা ঘটেছে, এবার তাও ঘটেনি। এবারেও নির্বাচন সব থেকে শান্তিপূর্ণ হয়েছে।
এর আগে মঙ্গলবার আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেছিলেন, নিশ্চিত পরাজয় জেনেই বিএনপি পূর্বপরিকল্পিতভাবে আন্দোলনের ইস্যু তৈরি করতে ভোট বর্জন করেছে। তিনি অনিয়মের সব অভিযোগ অস্বীকার করেন।

বর্জনেও অর্জন দেখছে বিএনপি by হাবিবুর রহমান খান

নিতান্ত বাধ্য হয়েই ভোট চলাকালে তিন সিটি নির্বাচন বর্জন করলেও এরমধ্যে অনেক অর্জন দেখছে বিএনপি। প্রথমত, নির্দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বিএনপি জোট এতদিন ধরে যে আন্দোলন করে আসছিল তার যৌক্তিকতা জনগণের কাছে প্রমাণিত হয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগ সরকার ও বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে যে আদৌ নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়, তা মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত সিটি নির্বাচনে প্রমাণিত হয়েছে। ভোট কেন্দ্র দখলসহ ব্যাপক কারচুপির ভয়াবহ চিত্র গণমাধ্যমে দেখাসহ সরাসরি প্রত্যক্ষ করেই সাধারণ জনগণের অনেকের কাছে পুরো বিষয়টি এখন স্পষ্ট হয়ে গেছে- এমনটি মনে করছেন বিএনপির নীতিনির্ধারক মহল। তিন সিটি নির্বাচন বর্জন করে বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের কী অর্জন হয়েছে- এমন প্রশ্নের জবাবে তারা যুগান্তরের কাছে এই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।
অপরদিকে বিএনপির কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা জানিয়েছেন, তিন সিটি নির্বাচনে অংশ নেয়ার মধ্য দিয়ে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে গতি যেমন সঞ্চারিত হয়েছে, তেমনি নেতৃত্বের ধাপে ধাপে কিছু দুর্বল দিকও বেরিয়ে এসেছে। এ বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে তারা এখন দলের সাংগঠনিক শক্তিকে সত্যিকারার্থে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ পাবেন।
এদিকে দলীয় সূত্র জানায়, নির্বাচন বর্জন নিয়ে দলের মধ্যে কিছু মিশ্র প্রতিক্রিয়াও সৃষ্টি হয়েছে। বর্জনের পরও তিন সিটিতে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থীদের প্রাপ্ত ভোট দেখে অনেকেই মনে করছেন, বর্জনের সিদ্ধান্তটি সঠিক হয়নি। বর্জনের পেছনে সরকারের সঙ্গে আঁতাতের গন্ধও খুঁজছেন কেউ কেউ। তবে দলটির নীতিনির্ধারক ও চেয়ারপারসনের ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, দল সমর্থিত মেয়র প্রার্থীদের মতামত নিয়ে খালেদা জিয়া নিজেই ভোট বর্জনের সিদ্ধান্ত নেন। খালেদা জিয়ার নির্দেশেই ঢাকা ও চট্টগ্রামের তিন মেয়র প্রার্থী ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন।
ভোট বর্জন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ যুগান্তরকে বলেন, দল সমর্থিত দুই মেয়র প্রার্থীর মতামতের ওপর ভিত্তি করে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পরামর্শেই ভোট বর্জনের ঘোষণা দেয়া হয়। কারও ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় এই সিদ্ধান্ত হয়নি। তিনি বলেন, কারচুপির যেসব অভিযোগে তারা ভোট বর্জন করেছেন তা যে সঠিক ছিল তা আজ (বুধবার) প্রত্যেকটি গণমাধ্যম বিশেষ করে জাতীয় পত্রিকায় খবর দেখলেই তো স্পষ্টভাবে বুঝা যায়।
বর্জনের মধ্য দিয়ে কি অর্জন হল- জানতে চাইলে মওদুদ বলেন, ‘আমরা ভোটাধিকার রক্ষার জন্য আন্দোলন করছি। আওয়ামী লীগ ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় এটা বারবার বলে আসছি। মঙ্গলবারের সিটি নির্বাচনে সেটাই প্রমাণিত হয়েছে। সিটি নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির ফলে সরকারই এখন প্রশ্নের মুখে পড়েছে।’ বর্জনের পরও তিন সিটিতে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থীদের এত ভোট পাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটাও সরকারের নীলনকশার অংশ। তারা যে ভোট ডাকাতি করেনি বা বিএনপির ভোট বর্জনের সিদ্ধান্ত পূর্বপরিকল্পিত তা প্রমাণ করার জন্যই সরকার পরিকল্পিতভাবে এই কাজ করেছে।’
তিন সিটিতে ভোট বর্জন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের সমন্বয়ক ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আসম হান্নান শাহ যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচন বর্জনের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করতে পেরেছি আওয়ামী লীগ সরকার এবং এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। আমরা আরও প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি, বর্তমান প্রশাসন সরকারের আজ্ঞাবহ। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে দীর্ঘদিন যে দাবিতে আমরা আন্দোলন করছি তাও সঠিক।
নির্বাচন বর্জন প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, সকাল নয়টার মধ্যেই তার কাছে বিভিন্ন মাধ্যমে খবর আসে দক্ষিণের প্রায় সব কেন্দ্র থেকে তাদের পোলিং এজেন্টদের বের করে দিয়েছে। ক্ষমতাসীনরা ইচ্ছামতো ব্যালটে সিল মারছে। সাড়ে নয়টার দিকে দক্ষিণের মেয়র প্রার্থী মির্জা আব্বাস আমাকে ফোন করে জানান, ‘হান্নান ভাই দয়া করে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। এই নির্বাচনে থেকে কোনো লাভ হবে না।’ পরে বিষয়টি দলের চেয়ারপারসনকে অবহিত করি। চেয়ারপারসনের পরামর্শেই আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে ভোট বর্জনের ঘোষণা দিই।
হান্নান শাহ বলেন, এই নির্বাচনে থেকে আমরা সরকারের ভোট ডাকাতির বৈধতা দিতে চাইনি। তাই সরে আসার সিদ্ধান্ত নিই। তিনি বলেন, ভোটে কারচুপি করে সরকারের আসল চেহারা প্রকাশ পেয়েছে। এই কারণে তারা বিএনপির ওপর দায় চাপাতে নানা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।
উত্তরের বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল যুগান্তরকে বলেন, ভোট গ্রহণের কিছু সময় পরেই স্পষ্ট হয়ে যায়, সরকার নীলনকশার নির্বাচন করছে। বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে তার কাছে অসংখ্য অভিযোগ আসতে থাকে। তিনি নিজেও অনেক কেন্দ্রে গিয়ে প্রকাশ্যে সিল মারতে দেখেন। প্রার্থী হওয়ার পরও তাকে কোনো কোনো কেন্দ্রে প্রবেশ করতে বাধা দেয়া হয়। ভোট কেন্দ্রের এমন অবস্থা বিএনপির হাইকমান্ডকে অবহিত করি। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচনে থাকা ঠিক হবে কিনা সে ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে অনুরোধও জানাই।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এগারটার পরই আনুষ্ঠানিকভাবে ভোট বর্জনের সিদ্ধান্ত হয়। কারও ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা প্রভাবে নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত হয়নি। ভোট বর্জনের সিদ্ধান্ত যে সঠিক ছিল তা গণমাধ্যমের খবর দেখলেই তো বোঝা যায়। এই নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো দুঃখজনক।
জানা গেছে, ভোট বর্জনের পর এখন লাভ-ক্ষতির হিসাব কষছেন বিএনপি নেতারা। দলের অধিকাংশ নেতাকর্মীই মনে করেন, ভোট বর্জনের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। নির্দলীয় সরকারের দাবিতে দীর্ঘদিনের আন্দোলনের যৌক্তিকতা আরও পোক্ত হয়েছে। এই সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন যে সম্ভব নয় তা আবারও প্রমাণিত হয়েছে। এ ছাড়া সিটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এটাও প্রমাণিত হয়েছে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ না নেয়ার বিষয়ে বিএনপির সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। তবে জয়-পরাজয় দুটোতেই লাভ হতে পারে, এমন রোডম্যাপকে সামনে রেখে বিএনপি সিটি নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তৃণমূলের কয়েকজন নেতা বলেন, সিটি নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিএনপি কিছুই হারায়নি। বরং প্রকাশ্যে এভাবে ভোট ডাকাতি করে দেশ-বিদেশে প্রশ্নের মুখে পড়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগই।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, সকাল থেকেই গুলশানের বাসায় বসে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেন খালেদা জিয়া। একই সঙ্গে মির্জা আব্বাস, তাবিথ আউয়াল ছাড়াও বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে একটি মনিটরিং টিম কাজ করে। নির্বাচনের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করতে দলীয় নেতাকর্মী ছাড়াও বিভিন্ন পেশাজীবীর সমন্বয়ে প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে বিশেষ টিমও রাখা হয়। কিন্তু সকালেই বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে মনিটরিং সেলে খবর আসতে থাকে যে, একে একে সব কেন্দ্র দখল হয়ে যাচ্ছে। বেশিরভাগ কেন্দ্রে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর পোলিং এজেন্টদের বের করে দেয়া হচ্ছে। অনেক কেন্দ্রে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। সকালে দক্ষিণের মেয়র প্রার্থী মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাস কেন্দ্র পরিদর্শন ও ভোট দিতে গিয়ে নিজেই এসব অভিযোগের চিত্র দেখতে পান। কয়েকটি কেন্দ্র ঘুরে উত্তরের মেয়র প্রার্থী তাবিথও একই চিত্র দেখেন। গোপনে কেন্দ্রে কেন্দ্রে পর্যবেক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্তরাও ভোট কারচুপির বিভিন্ন তথ্য জানাতে থাকেন। এ ছাড়া বেশ কিছু কেন্দ্রে নির্বাচন শুরু হওয়ার এক/দেড় ঘণ্টা পর ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডারদের প্রকাশ্যে সিল মারার ঘটনা বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে প্রথমে দক্ষিণের মেয়র প্রার্থী মির্জা আব্বাস ভোট বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। সকাল সাড়ে নয়টায় তিনি সরাসরি দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে বিষয়টি অবহিত করেন। এরপর একই অনুভূতি জানিয়ে দলীয় চেয়ারপারসনকে ফোন করেন দক্ষিণের সমন্বয়কের দায়িত্বে থাকা দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আসম হান্নান শাহ।
উত্তরের মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়ালের পিতা আবদুল আউয়াল মিন্টুও দলের চেয়ারপারসনকে ফোন করে জানান, ভোট ডাকাতির এই নির্বাচনে থেকে কোনো লাভ হবে না। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়া উচিত। সকাল ১০টার কিছু পরে খালেদা জিয়া ফোন করেন আদর্শ ঢাকা আন্দোলনের সদস্য সচিব শওকত মাহমুদকে। নির্বাচন সম্পর্কে তার মতামতও জানতে চান তিনি। শওকত মাহমুদ স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘ম্যাডাম নির্বাচনে থাকা ঠিক হবে না। সরকার নীলনকশার নির্বাচন করছে। প্রায় সবগুলো কেন্দ্রই ক্ষমতাসীনরা দখলে নিয়ে নিয়েছে।’
এরপর খালেদা জিয়া কথা বলেন দুই সিটির সমন্বয়কের দায়িত্বে থাকা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও আসম হান্নান শাহর সঙ্গে। সবার পরামর্শ নিয়ে সবশেষে খালেদা জিয়া ভোট বর্জনের সিদ্ধান্ত নেন। ঢাকার দুই প্রার্থী ও আদর্শ ঢাকা আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে নিয়ে দলের নয়া পল্টন কার্যালয়ে গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ভোট বর্জনের ঘোষণা দিতে নির্দেশ দেন। খালেদা জিয়ার এমন সিদ্ধান্তের কথা সকাল সাড়ে এগারটায় ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও হান্নান শাহকে জানিয়ে দেয়া হয়। খালেদা জিয়ার নির্দেশনা পাওয়ার পর উত্তরের মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়ালকে ফোন করেন মওদুদ আহমদ। মওদুদের সঙ্গে কথা বলার পর তাবিথ ফোন করেন তার বাবা আবদুল আউয়াল মিন্টুকে। এদিকে খালেদা জিয়ার বরাত দিয়ে তার বিশেষ সহকারী অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদকে ফোন করে ভোট বর্জনের সিদ্ধান্ত দ্রুত গণমাধ্যমকে জানাতে বলেন। এ সময় মওদুদ আহমদ পরবর্তী কর্মসূচির বিষয়েও জানতে চান। জবাবে শিমুল বিশ্বাস বলেন, এখন শুধু ভোট বর্জনের সিদ্ধান্ত জানাতে বলেছেন ম্যাডাম। কর্মসূচির বিষয়ে পরে সিদ্ধান্ত হবে। নয়াপল্টনে সংবাদ সম্মেলন করার সিদ্ধান্ত নেন মওদুদ, আসম হান্নান শাহ, তাবিথ আউয়াল ও আফরোজা আব্বাস। প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমদকে ফোন করে দ্রুত নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আসতে বলেন মওদুদ। আধাঘণ্টার মধ্যে তারা নয়াপল্টনে চলে আসেন। তবে গাড়ি সংকটের কারণে হান্নান শাহ সময়মতো আসতে পারেননি। সোয়া বারোটার দিকে দুই প্রার্থী ও আদর্শ ঢাকা আন্দোলনের নেতাদের উপস্থিতিতে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন মওদুদ আহমদ।
এদিকে সবাই চট্টগ্রাম থেকে ফোন করে প্রতিটি কেন্দ্র দখলের কথা খালেদা জিয়াকে জানায়। চট্টগ্রামের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদেরও ফোনে ভোট বর্জনের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দেয়া হয়। কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত জানার পরই চট্টগ্রাম বিএনপি নেতারা আনুষ্ঠানিকভাবে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন।

বাতিল ভোটের রেকর্ড by সিরাজুস সালেকিন

তিন সিটি করপোরেশনের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে ভোট বাতিল হয়েছে রেকর্ডসংখ্যক। নির্বাচন কমিশনের ধারণাতেই বাতিল ভোটের এ হার আগে কখনও হয়নি। নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, বাতিল ভোটের পরিমাণ ভোটে অনিয়মের অনেকটা প্রমাণ বহন করে। ভোটের প্রাপ্ত ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা, দ্বিতীয় স্থানে বিএনপি এবং তৃতীয় অবস্থানে বাতিল ভোট। তিন সিটিতে ভোট পড়েছে ৪৩ দশমিক ৯ শতাংশ। এর মধ্যে ৪ দশমিক ৫৬ শতাংশ ভোট বাতিল হয়ে গেছে। অতীতের যে কোন নির্বাচনের চেয়ে যা অস্বাভাবিক রকমের বেশি। এ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের (ইসি) নির্বাচন পরিচালনা শাখার উপ-সচিব শামসুল আলম বলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভোট বাতিল হয় ভোটারদের অসচেতনতার কারণে। অতীতের নির্বাচনগুলোতেও ১ থেকে ২ শতাংশ ভোট বাতিল হতে দেখা গেছে। ভোট বাতিল হওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, সাধারণত ব্যালট পেপারে একাধিক প্রতীকে বা নির্ধারিত ঘরের বাইরে সিল মারা হলে, ব্যালট পেপারে কিছু লেখা বা ছেঁড়া হলে, ভাঁজ যথাযথ না হলে এবং কালি ছড়িয়ে পড়ার মতো বেশ কিছু কারণে ভোট বাতিল হতে পারে। ভোট কেন্দ্রে অরাজকতার কারণে ভোট শুরুর চার ঘণ্টার মাথায় দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা নির্বাচন বর্জন করে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ভোটের প্রকৃত চিত্র উঠে আসে। আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণার পর বাতিল ভোটের সংখ্যা নির্বাচনকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এমনকি ভোটের হিসাব বদলে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে নির্বাচন বর্জনকারী প্রার্থীদের পক্ষ থেকে। ঢাকা উত্তরে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল মানবজমিনকে বলেন, জনরায় আমাদের দিকেই ছিল। কিন্তু সরকার অনিয়ম ও কারচুপি করে ভোটের হিসাব বদলে দিয়েছে। নির্বাচন বর্জন করার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, দিনের শেষে একটি ভোট বেশি দেখিয়ে হলেও সরকার সমর্থিত প্রার্থীকে জয়ী ঘোষণা করা হতো। তাই আমরা নির্বাচন থেকে সরে আসি। আগামীর ঢাকা মঞ্চের মেয়র প্রার্থী জোনায়েদ সাকি গতকাল সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করেন, তার বহু কর্মী-সমর্থক-শুভানুধ্যায়ীরা সকালে ভোট দিয়ে আসার পর কৌতূহলবশত সন্ধ্যায় ভোট কেন্দ্রে গিয়ে জেনেছেন সেখানে টেলিস্কোপ মার্কায় কোন ভোটই নাকি পড়েনি। অন্যদিকে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা সকালের দিকেই ভোট বর্জন করলেও তাদের বাক্সে বিপুল পরিমাণ ভোট দেখানো হয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন দেখানোর জন্য। তিনি আরও অভিযোগ করেন, অনেকটা মাগুরা নির্বাচনের মতোই ইচ্ছামতো ভোট বরাদ্দের প্রক্রিয়া এখানে স্পষ্ট। এর মাধ্যমে একদিকে সরকারি দল এক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হিসাবে দেখাবার আয়োজন করেছে। কেন্দ্রে সাধারণ মানুষদের না যেতে পারা ও জালভোটের কারণে ভোট দিতে ব্যর্থ হবার পরও যারা টেলিস্কোপ মার্কায় ভোট দিয়ে আমাদেরকে সামনাসামনি বলেছেন, টেলিফোনে জানিয়েছেন, ফেসবুকে মেসেজ দিয়েছেন, তাদের ভোটগুলোও গণনা করা হয়নি। বরং নির্বাচন কমিশন সরকারের হুকুম অনুযায়ী বানানো সব সংখ্যাকে ঘোষণা করেছে।
ইসি সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, এবার মেয়র পদে ভোট পড়েছে প্রায় ৪৪ শতাংশ। এ নিয়ে আমাদের সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টির বিষয় নেই। আমরা পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছি, ভোটার-নির্বাচন কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টরা এ নিয়ে মত দেবেন। সরকারিভাবে ঘোষিত ফল অনুসারে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আনিসুল হক। ১০৯৩ কেন্দ্রের ঘোষিত ফলে টেবিল ঘড়ি প্রতীকে আনিসুল পেয়েছেন ৪ লাখ ৬০ হাজার ১১৭ ভোট। তার নিকট প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি সমর্থিত তাবিথ আউয়াল বাস প্রতীকে পেয়েছেন ৩ লাখ ২৫ হাজার ৮০ ভোট। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মোট কেন্দ্রের সংখ্যা ১০৯৩টি। অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও কোন কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ স্থগিত হয়নি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী সাঈদ খোকন। ৮৮৯টির মধ্যে ৮৮৬টি কেন্দ্রের ঘোষিত ফলে ইলিশ প্রতীকের সাঈদ খোকন পেয়েছেন ৫ লাখ ৩৫ হাজার ২৯৬ ভোট। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মির্জা আব্বাস মগ প্রতীকে পেয়েছেন ২ লাখ ৯৪ হাজার ২৯১ ভোট। গোলযোগের কারণে তিনটিতে ভোটগ্রহণ স্থগিত হলেও ওই সব কেন্দ্রের ভোটের যোগফল দুই প্রার্থীর ব্যবধানের চেয়ে কম হওয়ায় রিটার্নিং অফিসার মিহির সারওয়ার মোর্শেদ আওয়ামী লীগ সমর্থিত সাঈদ খোকনকে বিজয়ী ঘোষণা করেন। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে জয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আ জ ম নাছির উদ্দিন। মোট ৭১৯টি কেন্দ্রের সবগুলোর ঘোষিত বেসরকারি ফলাফলে হাতি প্রতীক নিয়ে নাছির পেয়েছেন ৪ লাখ ৭৫ হাজার ৩৬১ ভোট। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী নির্বাচন বর্জন করা বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী এম মনজুর আলম কমলা লেবু প্রতীকে পেয়েছেন ৩ লাখ ৪ হাজার ৮৩৭ ভোট। মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত তিন সিটিতে করপোরেশনে ভোট গ্রহণ হয়। মোট ভোটার ছিলেন ৬০ লাখ ২৯ হাজার ৫৭৬  জন। রিটার্নিং অফিসাররা বুধবার ভোরে ভোটের যে ফল প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যায় তিন সিটিতে মোট ভোট পড়েছে ২৬ লাখ ৪৮ হাজার ২০৫টি। এই হিসাবে ভোট পড়ার হার ৪৩ দশমিক ৯ শতাংশ। এর মধ্যে ৪.৫৬ শতাংশ ভোটই বাতিল হয়ে গেছে ঠিকমতো সিল না মারাসহ বিভিন্ন কারণে। বিভিন্ন অসঙ্গতির কারণে এর মধ্যে ১ লাখ ২১ হাজার ৩টি ভোট বাতিল করেছেন নির্বাচনী কর্মকর্তারা। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১০৯৩টি কেন্দ্রে মোট ভোটার ছিল ২৩ লাখ ৪৫ হাজার ৩৭৪ জন। সব ক’টি কেন্দ্রের প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যায়, এখানে ৮ লাখ ৭৪ হাজার ৫৮ জনের ভোট বাক্সে পড়েছে। যা মোট ভোটের ৩৭ দশমিক ৩ শতাংশ। এই সিটিতে বাতিল হয়েছে ৩৩ হাজার ৫৮১ ভোট। ঢাকা দক্ষিণে মোট ভোটার ছিলেন ১৮ লাখ ৭০ হাজার ৭৫৩ জন। ৮৮৯ কেন্দ্রের মধ্যে ৮৮৬ কেন্দ্রের বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। গোলযোগের কারণে তিনটি কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। ঘোষিত কেন্দ্রের ফলাফলে দেখা যায়, মোট ভোট পড়েছে নয় লাখ পাঁচ হাজার ৪৮৪টি। যা মোট ভোট সংখ্যার ৪৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ। এর মধ্যে ৪০ হাজার ১৩০টি ভোট বাতিল হয়েছে। বৈধ হয়েছে ৮ লাখ ৬৫ হাজার ৩৫৪টি ভোট। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৭১৯টি কেন্দ্রের মধ্যে সব ক’টির ফলাফল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। ১৮ লাখ ১৩ হাজার ৪৪৯টি ভোটের মধ্যে ৮ লাখ ৬৮ হাজার ৬৬৩টি ভোট বাক্সে পড়েছে। ভোট পড়ার হার ৪৭ দশমিক ৯ শতাংশ। চট্টগ্রামে বাতিল হয়েছে ৪৭ হাজার ২৯২টি ভোট। আর আট লাখ ২১ হাজার ৩৭১টি ভোট বৈধতা পেয়েছে। এবার ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণে আগের নির্বাচনের চেয়ে ভোটের হার বাড়লেও চট্টগ্রামে কমেছে। ২০০২ সালের ২৫শে এপ্রিল অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৩৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ ভোট পড়ে। ২০১০ সালের ১৭ই জুন চট্টগ্রাম সিটির নির্বাচনে পড়ে ৫৪ দশমিক ৫০ শতাংশ ভোট।

উসকানি ও সহিংসতা কাম্য নয়, সব পক্ষকে সংযত থাকতে হবে

মঙ্গলবার দুপুর ১২টার পরপরই বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীরা সরে দাঁড়ানোর পর নির্বাচনোত্তর রাজনীতিতে শুভ প্রাপ্তির সম্ভাবনা উজ্বল হওয়ার বদলে অনিশ্চয়তা আরও বাড়ল। তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীদের এজেন্টদের কেন্দ্রে ঢুকতে বাধা, তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের ও গ্রেপ্তারের ভয়ভীতি দেখানো, বেশ কিছু কেন্দ্র দখল করে সরকারি দল-সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে জাল ভোট, সহিংস সংঘর্ষ, পুলিশের বাড়াবাড়ি ও পক্ষপাতিত্বসহ বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে, যার কোনো গ্রহণযোগ্য উত্তর নির্বাচন কমিশন (ইসি), প্রশাসন বা সরকার দিতে পারেনি।
নির্বাচন কমিশন ও সরকারপক্ষের এই ভূমিকা নিন্দনীয়। অনিয়ম ও অভিযোগগুলোর বিষয়ে নির্বাচন কমিশন বা রিটার্নিং কর্মকর্তাদের তাৎক্ষণিক দৃশ্যমান হস্তক্ষেপ না থাকায় পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি ঘটে। পরিণতিতে ঘোষিত ফলে আওয়ামী লীগের সমর্থিত প্রার্থীরা জয়লাভ করলেও সেটা অনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের জন্য স্বস্তিদায়ক হয়নি।
কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও এবং বর্জনের পরও বিএনপি-সমর্থিত মেয়র প্রার্থীরা যে পরিমাণ ভোট পেয়েছেন, তা অভাবিত। তিনটি নির্বাচনেই বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীরা তিন থেকে সোয়া তিন লাখ ও আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থীরা সাড়ে চার থেকে সোয়া পাঁচ লাখ ভোট পেয়েছেন। তাঁরা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকলে ফলটা অন্য রকম হতো কিনা তা বলা মুশকিল। এটা প্রকৃতপক্ষে পুলিশ, প্রশাসন ও সরকারি দলের বাড়াবাড়ির প্রতিফলন। এই বাস্তবতা উপলব্ধি না করলে সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করায় রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছিল। একটানা অবরোধ, হরতাল, পেট্রলবোমা-ককটেলের সহিংস রাজনীতির কানাগলি থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। এখন নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতিতে যেন আবার রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে না ওঠে, সে বিষয়ে উভয় পক্ষকে প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে হবে। আর মামলা-গ্রেপ্তার নয়, পুলিশি ভয়ভীতি-হয়রানি নয় এবং অবরোধ-হরতাল-সহিংস রাজনীতিও আর নয়। দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থকে সর্বোচ্চ মূল্য দিতে হবে। ধৈর্য ও শান্তি এখন সবার জন্য প্রয়োজন।

৪২ প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত

বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী ছাড়া বাকি ৪২ জনের জামানত বাজেয়াপ্ত হচ্ছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা ৮ লাখ ৭৪ হাজার ৫৮টি। এর এক অষ্টমাংশ হচ্ছে ১ লাখ ৯ হাজার ২৫৭টি ভোট। মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে তাবিথ আউয়াল ও আনিসুল হক ছাড়া কোন প্রার্থীই ২০ হাজারের বেশি ভোট পাননি। তাদের ভোটসংখ্যা মাহী বি. চৌধুরী (ঈগল) ১৩৪০৭, জোনায়েদ সাকি (টেলিস্কোপ) ৭৩৭০, ক্বাফী (হাতি) ২৪৭৫, বাহাউদ্দিন আহমেদ বাবুল (চরকা) ২৯৫০, নাদের চৌধুরী (ময়ূর) ১৪১২, এ ওয়াই এম কামরুল ইসলাম (ক্রিকেট ব্যাট) ১২১৬, কাজী মো. শহীদুল্লাহ (ইলিশ) ২৯৬৮, শেখ মো. ফজলে বারী মাসউদ (কমলালেবু) ১৮০৫০, শামছুল আলম চৌধুরী (চিতাবাঘ) ৯৮২, মোয়াজ্জেম হোসেন খান মজলিশ (ফ্লাক্স) ১০৯৫, চৌধুরী ইরাদ আহম্মদ সিদ্দিকী (লাউ) ৯১৫, মো. আনিসুজ্জামান খোকন (ডিশ এন্টেনা) ৯০০, মো. জামান ভূঞা (টেবিল) ১১৪০ এবং শেখ শহিদুজ্জামান (দিয়াশলাই) ৯২৩ ভোট পেয়েছেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা ৯ লাখ ৫ হাজার ৪৮৪টি। এর এক অষ্টমাংশ হচ্ছে ১ লাখ ১৩ হাজার ১৮৫ ভোট। কিন্তু দক্ষিণে মেয়র পদে ২০ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর মধ্যে মির্জা আব্বাস ও সাঈদ খোকন ছাড়া কোন প্রার্থীই লাখের ঘর অতিক্রম করতে পারেননি। ফলে অবশিষ্ট ১৮ প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হচ্ছে। দক্ষিণে প্রার্থীদের ভোট সংখ্যা- ফ্লাস্ক প্রতীকে আব্দুর রহমান ১৪,৭৮৪ ভোট, সোফা প্রতীকে জাতীয় পার্টির সাইফুদ্দিন মিলন ৪৫১৯ ভোট, চরকা প্রতীকে আবু নাছের মোহাম্মদ মাসুদ হোসাইন ২,১৯৭ ভোট, টেবিল ঘড়ি প্রতীকে রেজাউল করিম চৌধুরী ২,১৭৩ ভোট, জাহাজ প্রতীকে শাহীন খান ২,০৭৪ ভোট, আংটি প্রতীকে গোলাম মাওলা রনি ১,৮৮৭ ভোট, বাস প্রতীকে শহীদুল ইসলাম ১,২৩৯ ভোট ও টেবিল প্রতীকে সিপিবি-বাসদের বজলুর রশীদ ফিরোজ ১,০২৯ ভোট পেয়েছেন। ল্যাপটপ প্রতীকে জাহিদুর রহমান ৯৮৮ ভোট, কমলালেবু প্রতীকে বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপন ৯২৮ ভোট, ক্রিকেট ব্যাট প্রতীকে এএসএম আকরাম ৬৮২ ভোট, হাতি প্রতীকে দিলীপ ভদ্র ৬৬৯ ভোট, কেক প্রতীকে আব্দুল খালেক ৫৫০ ভোট, ময়ূর প্রতীকে শফিউল্লাহ চৌধুরী ৫১২ ভোট, চিতাবাঘ প্রতীকে মশিউর রহমান ৫০৮, লাউ প্রতীকে মো. আকতারুজ্জামান ওরফে আয়াতুল্লাহ ৩৬২ ভোট, ঈগল প্রতীকে আয়ুব হোসেন ৩৫৪ ভোট এবং শার্ট প্রতীকে বাহরানে সুলতান বাহার ৩১৩ ভোট পেয়েছেন। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা ৮ লাখ ৬৮ হাজার ৬৬৩টি। এর এক অষ্টমাংশ হচ্ছে ১ লাখ ৮ হাজার ৫৮৩ ভোট। কিন্তু এ নির্বাচনে আ. জ. ম নাছির উদ্দিন ও মোহাম্মদ মনজুর আলম ছাড়া বাকি ১০ প্রার্থীর কোন প্রার্থী প্রদত্ত ভোটের এক অষ্টমাংশ ভোট পাননি। চট্টগ্রামে আ. জ. ম নাসির এবং মনজুরের বাইরে অন্য প্রার্থীদের মধ্যে চরকা প্রতীকে ইসলামী ফ্রন্টের এমএ মতিন ১১,৬৫৫ ভোট, টেবিল ঘড়ি প্রতীকে ওয়ায়েজ হোসেন ভূঁইয়া ৯,৬৬৮ ভোট, ডিশ অ্যান্টেনা প্রতীকে জাতীয় পার্টি সমর্থিত মেয়রপ্রার্থী সোলায়মান আলম শেঠ ৬,১৩১ ভোট, ময়ূর প্রতীকে ইসলামিক ফ্রন্টের হোসাইন মোহাম্মদ মুজিবুল হক শুক্কুর ৪,২১৫ ভোট, ফ্লাক্স প্রতীকে সাইফুদ্দিন আহমেদ রবি ২,৬৬১ ভোট এবং টেলিস্কোপ প্রতীকে গাজী মো. আলাউদ্দিন ২,১৪৯ ভোট পেয়েছেন। বাস প্রতীকে বিএনএফের ?আরিফ মঈনুদ্দিন ১,৭৭৪ ভোট, দিয়াশলাই প্রতীকে আবুল কালাম আজাদ ১,৩৮৫ ভোট, ক্রিকেট ব্যাট প্রতীকে সৈয়দ সাজ্জাদ জোহা ৮৪৫ এবং মাছ প্রতীকে শফিউল আলম ইলিশ ৬৮০ ভোট পেয়েছেন। নির্বাচন বিধিমালা অনুযায়ী, কোন সিটি করপোরেশনে ভোটার সংখ্যা ২০ লাখের কম হলে মেয়র প্রার্থীদের ৫০ হাজার টাকা এবং ২০ লাখের বেশি ভোটার হলে ১ লাখ টাকা জামানত দিতে হয়। এক্ষেত্রে উত্তরের ১৪ প্রার্থীকে ১ লাখ টাকা করে বাজেয়াপ্ত হবে। এছাড়া চসিক ও ঢাকা দক্ষিণের ২৮ প্রার্থীদের ৫০ হাজার টাকা বাজেয়াপ্ত হবে।

ওমরাহ্‌ ভিসা বন্ধ, সৌদিতে ব্ল্যাকলিস্টে বাংলাদেশ by ওয়েছ খছরু

আদম পাচারের অভিযোগে সৌদি আরবে ব্ল্যাকলিস্টে উঠেছে বাংলাদেশ। এজন্য সৌদি সরকার প্রায় এক মাস ধরে বাংলাদেশী ওমরাহ্‌ হজ যাত্রীদের কোন ভিসা দিচ্ছে না। কবে নাগাদ-ভিসা পুনরায় চালু হবে সেটিও অনিশ্চিত! বিভিন্ন সূত্রে রিয়াদ যে অভিযোগ তুলছে তা হলো- ওমরা ভিসা নিয়ে সৌদি যাওয়া হাজারও বাংলাদেশী অবৈধভাবে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। এদের চিহ্নিত করতে পারছে না সৌদি সরকার। অভিযোগে প্রকাশ- ঢাকা ও চট্টগ্রামের কয়েকটি ট্রাভেল এজেন্সি ওমরা ভিসার নামে সৌদি আরবে আদম পাচার করছে। সিলেটেরও কিছু সংখ্যক এজেন্সি রয়েছে এই তালিকায়। গত ডিসেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত যারা ওমরাহ পালন করতে সৌদি গিয়েছিলেন তাদের একটি অংশ দেশে ফিরে আসেনি। আর বিষয়টি সৌদি সরকারের নজরে আসা মাত্র তারা বাংলাদেশকে ব্ল্যাকলিস্টেট করেছে। জানা গেছে, সৌদি আরবের মিনিস্ট্রি অব ফরেন এফেয়ার্সের বেঁধে দেয়া নতুন নিয়মে বাংলাদেশ থেকে ওমরা হজযাত্রীদের দেশটিতে পাঠানো হয়েছে। এ নিয়মে রয়েছে যারা ওমরা ভিসায় সৌদি যাবেন তাদেরকে নির্ধারিত এজেন্ট বা কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে। প্রতি মাসে এর সঠিক হিসাব সৌদি সরকারের কাছে প্রদান করতে হবে। ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ৪০-৫০ হাজার হাজী ওমরা পালন করতে গেছেন। তাদের ১৪ থেকে ২৮ দিন মেয়াদের ভিসা ছিল। এদের বেশির ভাগ দেশে ফিরে এলেও ৪-৫ ভাগ ফিরেননি। তারা অবৈধভাবে এখনও দেশটিতে রয়েছেন। সেই সংখ্যা প্রায় দেড় হাজারের মতো হবে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশীদের না ফেরার বিষয়টি জানার পর সৌদি সরকার গত ২২শে মার্চ থেকে পুরোপুরি ভাবে ওমরা ভিসা প্রদান বন্ধ করে দিয়েছে। অ্যাসোসিয়েশন এজেন্সি হজ বাংলাদেশ-হাব নেতারা জানিয়েছেন, এক ভাগের নিচে যাত্রীরা অবৈধ হলে সেটি সৌদি সরকার মার্জনা করে। কিন্তু এবার অতিরিক্ত ওমরা যাত্রী দেশটিতে রয়ে গেছেন। এজন্য সৌদি সরকার বাংলাদেশকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে। এখন নিষেধাজ্ঞা তুলতে হলে অবৈধ হওয়া ওমরা যাত্রীদের চিহ্নিত করে ফেরত আনতে হবে। আর সেটি করাও খুবই কষ্টকর। সৌদি সরকার ইমিগ্রেশনে তালিকা চেয়েছে। সেটিও দ্রুত করা যাচ্ছে না। এ কারণে আগামী রমজান মাস নিয়ে দুশ্চিন্তা বেশি। তারা বলেন, কেবলমাত্র রমজান মাসেই বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২০ হাজার মানুষ ওমরাহ পালনে সৌদি আরবে যান। পবিত্র হজের পরে রমজানই হচ্ছে ওমরাহ মওসুম। আর এই সময়ে বাংলাদেশ কোন ভিসা পাবে না। ওই সময় সিলেট থেকেও ৭ থেকে ৮ হাজার মানুষ ওমরাহ পালনে সৌদি আরবে যান। এতে করে যেমনি বাংলাদেশের ওমরাহ পালনকারীরা হতাশ হবেন তেমনি লোকসানে পড়বেন ট্রাভেলস এজেন্সি মালিকরা। আর বর্তমানে কয়েক হাজার ওমরা ভিসা প্রাপ্তির জন্য জমা পড়ে আছে। সে ভিসাগুলো দেয়া যাবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে সৌদি দূতাবাস। অ্যাসোসিয়েশন ট্রাভেলস এজেন্সি অব বাংলাদেশ-আটাব এর সিলেট জেলার সভাপতি আবদুল জব্বার জলিল জানিয়েছেন, সৌদি সরকার যখনই দেখবে ওভার স্ট্রের (অবস্থানরত) সংখ্যা ১ ভাগের নিচে চলে এসেছে তখন তারা পুনরায় ওমরা ভিসা চালু করবে। অন্যথায় তাদের নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে। হাব-এর সিলেট জেলা শাখার সাবেক সভাপতি আজহারুল ইসলাম সাজু জানিয়েছেন, কবে নাগাদ এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হবে সেটি বলা যাচ্ছে না। এদিকে, হঠাৎ করে ওমরা ভিসা বন্ধ হয়ে পড়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ট্রাভেলস মালিকরা। তারা জানান, এবার ওমরাহ হাজীদের পাঠানোর আগেই হোটেল বুকিং করে রাখা হতো। এ জন্য সিলেট থেকে এজেন্সি মালিকরা হোটেল ভাড়া করে রেখেছিলেন। এখন ওমরা হাজীরা যেতে না পারার কারণে তাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। লোকসান কয়েক কোটি টাকায় দাঁড়াবে। পাশাপাশি যাদের ভিসা হচ্ছে না তাদেরও টাকা ফেরত দিতে হচ্ছে।