Thursday, December 12, 2013

৩৬৫ দিনই হরতাল-অবরোধ ডাকুন! by এ কে এম শাহ নাওয়াজ

নন্দিত লেখক হুমায়ূন আহমেদ ক্রোধ কমানোর উপায় হিসেবে কাচের গ্লাস ছুড়ে ভেঙে ফেলার একটি টিপস দিয়েছিলেন তার নাটকে। অনেক বছর আগে দেখা হানিফ সংকেতের জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদির একটি এপিসোডের কথা মনে পড়ছে। আমাদের দেশে সংঘবদ্ধ শক্তির ক্ষোভ প্রকাশের প্রধান মাধ্যম বা প্রতিবাদের প্রধান মাধ্যম গাড়ি ভাংচুর। ইত্যাদি অনুষ্ঠানের একটি সিকোয়েন্সে মর্মান্তিক রসিকতার মাধ্যমে ‘ভাঙ গাড়ি’ স্লোগানটি দর্শকের মনে বেশ দাগ কেটেছিল। পারিবারিক, সামাজিক বা রাজনৈতিক ছোট-বড় সংকট, মান অভিমান, ঝগড়া হল, তো তার খেসারত ‘ভাঙ গাড়ি’। আমার ছাত্র রনি- এখন আমার সহকর্মী, মনে করিয়ে দিল নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে এরশাদের পতনের পর মানুষ মজা করে বলত গণতন্ত্র ফিরে পেয়েছি তাই ‘ভাঙ গাড়ি’। বিষয়টি এখন আর ব্যঙ্গাÍক কোনো শ্লেষ নয়- বাংলাদেশের জন্য এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য হয়ে গেছে। রাজনৈতিক আন্দোলনে গাড়ি ভাঙা-আগুন দেয়া এদেশের জন্য একটি পুরনো সংস্কৃতি। তবে এর ক্রমবিবর্তন হচ্ছে। আগে গাড়ি ভাঙার বিপ্লবীরা গাড়ি থামিয়ে, যাত্রীদের নামিয়ে গাড়ি ভাঙত। আগুন দিত। যেহেতু সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন তাই সরকারি গাড়ির ওপরই ক্ষোভ ছিল বেশি। এখন সময় পাল্টেছে। প্রতিবাদের বহিঃপ্রকাশ আরও প্রবল হয়েছে। তাই প্রতিবাদকারীদের ‘অ্যাকশন পার্টি’ শতভাগ সাফল্যের আশায় যাত্রীসহ গাড়ি ভাঙে আর পেট্রল বোমা ছুড়ে যাত্রীসহ যানবাহন পোড়ায়। এখন বাছবিচারও নেই। নিরপরাধ সাধারণ নাগরিকের প্রাইভেট কার, দরিদ্র সিএনজি অটোচালকের জীবিকার অবলম্বন, ধান বোঝাই ট্রাক, যাত্রীবাহী বাস, জনগণের টাকায় সদ্য কেনা কোটি কোটি টাকার দোতলা বাস, রফতানিকারকের কাভার্ড ভ্যান, রেলের বগি সবই জ্বলছে আগুনে। পত্রিকার খবরে জানা যায়, এমন সাহসিকতার জন্য সহিংসতার ওজন অনুযায়ী অ্যাকশনে থাকা বীরদের আন্দোলনকারী দলগুলো পুরস্কৃত করে। বড় অদ্ভুত এজন্য যে, এসব অপকীর্তির জন্য কোনো জবাবদিহিতার প্রয়োজন নেই। যারা অবরোধ-হরতাল ডাকেন তারা এ নিয়ে সামান্য দুঃখ প্রকাশও করেন না। এভাবে সাধারণ মানুষের বুকে ছুরি চালিয়ে আবার এই বিপন্ন মানুষের ভোট আশা করেন। নির্লজ্জের মতো ভোট ভিক্ষার হাত বাড়িয়ে দেন হিংসার আগুনে ঝলসে দেয়া সাধারণ মানুষের দিকেই।
এদেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষ বুঝে পায় না তাদের অপরাধ কী! ঝগড়া আঠারো দলের সঙ্গে মহাজোটের। অথবা ছোট করে বললে বিএনপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের। আরও ছোট করে বললে খালেদা জিয়ার সঙ্গে শেখ হাসিনার। তাহলে প্রতিদিন সাধারণ মানুষকে শাস্তি দিচ্ছেন কেন? এভাবে আন্দোলনের নামে যখন দেশবাসীর ওপর সহিংসতা চাপিয়ে দেয়া হয়, তখন এর দায়টি প্রধানত পড়ে হরতাল-অবরোধ ডাকিয়ে দলের ওপর। অর্থাৎ বিরোধী দলের ওপর। আর আচার-আচরণ, বক্তৃতা-বিবৃতিতে বিরোধী দল তো সততার সঙ্গে জানিয়েই দিয়েছে যে, জনগণের ওপর তাদের আস্থা নেই। যা কিছু করবে পেশিশক্তি দিয়েই করবে। যখন বিএনপি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচন করবে না বলে জানাচ্ছিল, তখন আওয়ামী লীগ প্রস্তুতি নিচ্ছিল দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের। এরপর একটু সরে এসে বহুদলীয় নামের একটি সরকার গঠন করে। আওয়ামী লীগের অনড় অবস্থা দেখে বিএনপি নেত্রী, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব থেকে শুরু করে অন্য নেতারা মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলতেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচন হবে না, হতে দেয়া হবে না।’ দ্বিতীয় লাইনটি যদি বলতেন, ‘জনগণ হতে দেবে না’, তাহলে একরকম মেনে নেয়া যেত। কিন্তু যখন বলা হয়, ‘হতে দেয়া হবে না’ তখন এর মধ্যে একটি বলপ্রয়োগের ইঙ্গিত থাকে। অর্থাৎ জনগণের শক্তির প্রতি আমাদের নেতানেত্রীর আস্থা নেই। তারা পেশিশক্তিরই সাধনা করছেন।
এখন সে হুমকিরই বাস্তবায়ন করছেন বিএনপি-জামায়াত নেতারা। আওয়ামী লীগের দলীয় বা বহুদলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে দেবেন না বিধায় এখন শক্তি প্রয়োগে পথে নেমেছেন। রণসাজে মাঠে নামিয়েছেন জামায়াত-শিবিরের জঙ্গি ক্যাডারদের। ছাত্রদল-যুবদলের কর্মীদের। নেতারা আত্মগোপনে থেকে জেহাদি প্রেরণা দিচ্ছেন আর মাঠের কর্মী-শিষ্যরা বোমা-ককটেল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। যদিও এরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বা অন্য মন্ত্রীদের টিকি ছুঁতে পারছেন না। সরকারি দলের রাজনীতিক এবং মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের গাড়িতে পেট্রল বোমা মারতে পারছেন না। তাই সব রাগ এসে পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। সরকার কেন বিএনপির প্রস্তাব মানল না, তাই প্রতিবাদে বাসে ছুড়ে দেয়া হয় পেট্রল বোমা। তাতে ঝলসে যাচ্ছে নিরীহ মানুষ। ঋণ নিয়ে কেনা অটোরিকশা বা ট্রাক চালকসহ পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। অনিশ্চিত অন্ধকারে ঠেলে দেয়া হচ্ছে পরিবারগুলোকে। প্রাইমারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত স্থবির হয়ে যাচ্ছে শিক্ষা পরিবেশ। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য থমকে গেছে। অর্থনীতির মেরুদণ্ডে পড়ছে আঘাত। কর্মহীন হয়ে পড়ছেন খেটে খাওয়া মানুষ। মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে ঝলসে যাওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। বোমার আঘাত থেকে শিশু রক্ষা পাচ্ছে না। এসব দেখে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে, সরকারের আচরণে ক্ষুব্ধ বিএনপি-জামায়াত সাধারণ মানুষের ওপর প্রতিশোধ নিচ্ছে। তাহলে কি আমাদের বিরোধী শিবিরের আঠারো দলের নেতারা বলতে চাচ্ছেন- এদেশের ষোল কোটি মানুষের অধিকাংশ আওয়ামী লীগের পক্ষে? তাই আওয়ামী লীগকে শিক্ষা দিতে সাধারণ মানুষের ওপর চালানো হচ্ছে সন্ত্রাসী আক্রমণ!
সাধারণ মানুষের ওপর প্রাণঘাতী আঘাত হানার জন্য এখন প্রতিদিন আদেশ জারি হচ্ছে বহু ঘণ্টার অবরোধ-হরতালের। কখনও কর্মসূচিকে জোরালো করার জন্য নানা উপলক্ষ এনে অবরোধের ওপর আরেকটি হরতালও চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। দুর্ভাগ্য এই, আমাদের রাজনীতিকরা জনগণের কথা বলে রাজনীতি করেন আবার জনগণের বুকেই ধরেন তীক্ষè ছুরি। ৭২ ঘণ্টা অবরোধের ডাক দিয়ে মাঝপথে টেনে দেন পুরো সপ্তাহ পর্যন্ত। খেলাচ্ছলেই যেন অবরোধের পরিধি বাড়িয়ে করেন ১৪৪ ঘণ্টা। ভিডিও টেপে ঘোষণা দিলেই হল। এরপর নিরাপদ আশ্রয়ে নেতারা। আর খুচরো কর্মী এবং টাকার বিনিময়ে মাঠে নামানো টোকাইরা গ্রেফতার, পুলিশি ঠেঙানি আর বুলেট হজম করে মানুষ খুনে মত্ত হয়। আহত করে নিজ স্বজনদেরই। পুড়িয়ে দেয় রাষ্ট্রের সম্পত্তি। নিজেদেরই অর্থনীতিতে আঘাত হানে। আর নেতারা গুনতে থাকেন কতটা অরাজকতা করে লক্ষ্য পূরণের কাছাকাছি যেতে পেরেছেন। এভাবে প্রতারণার রাজনীতিতে নাভিশ্বাস উঠছে মানুষের। সাধারণ মানুষকে শাস্তি দেয়ার ছলের অভাব নেই আমাদের রাজনীতিকদের। বিরোধী দল যেন নিশ্চিত হয়েছে এদেশের সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন করলে, অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিলে দুর্বল হয়ে যাবে সরকার। সরকার পক্ষও ভাবছে, দৃঢ়তার সঙ্গে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে হবে। যতক্ষণ ঢাল হিসেবে সাধারণ মানুষ আছে ততক্ষণ তাদের গায়ে কোনো আঁচড় লাগবে না। এভাবে বিরোধী দল সাধারণ মানুষের জীবন সংহার করতে করতে একসময় নির্জীব হয়ে যাবে। সাধারণ মানুষ এদের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হবে। আর সেই ফাঁক গলে পুনরুজ্জীবন ঘটবে সরকারের।
এখন তো বিরোধী দলের যেন নেশা চেপে গেছে হরতাল-অবরোধের রেকর্ড গড়তে। কারণটি কতটা যৌক্তিক তা নিয়ে আর ভাবছেন না নেতানেত্রীরা। এখন অবরোধের ভেতরেই জাতীয় হরতাল, আঞ্চলিক হরতাল হরদম হচ্ছে। আর উপলক্ষ? তা পেতেও সমস্যা নেই। বড় নেতারা গ্রেফতার হলে জাতীয় বা আঞ্চলিক হরতাল আর ছোটখাটোরা ধরা পড়লে বা অন্তর্ঘাতে নিহত হলে যার যার জেলায় বা উপজেলায় হরতাল। ভোটার লিস্টে তারেক জিয়ার নাম নেই কেন, সেজন্য বগুড়ায় ৩৬ ঘণ্টা হরতাল আর মানিকগঞ্জে একদিনের হরতাল। বিচারিক সব কার্যক্রম নিয়মমাফিক শেষ হয়েছে। আপিল পর্যন্ত আইনি লড়াই করেছে আসামি পক্ষ। রায় হয়েছে জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার ফাঁসি। আমরা ছোট থেকে জেনে এসেছি হাকিম নড়ে তো হুকুম নড়ে না। এখন হুকুম নড়ানোর জন্যই কি হরতাল ডাকা হয়? নিয়মমতো তো কাদের মোল্লার মৃত্যু পরোয়ানা জেলখানায় যাবে। কিন্তু জামায়াত নেতাদের প্রশ্ন- কেন যাবে? সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধেই যেন দু’দিনের জামায়াতি হরতাল চাপিয়ে দেয়া হল সাধারণ মানুষের ঘাড়ে। ভিন্ন কোনো আইনি ব্যাখ্যা থাকলে তার জন্য আইনের পথে লড়াই হতে পারে। মানুষকে জিম্মি করা কেন! সাধারণ মানুষ কি কাদের মোল্লাকে ফাঁসি দিয়েছে? হ্যাঁ, একটি অপরাধ

বাংলাদেশেও কি শান্তিরক্ষী বাহিনী প্রয়োজন হবে! by মামুন রশীদ

কী হবে, ভাই? নির্বাচন কি হবে? আজকাল শহরাঞ্চলে প্রত্যেক ব্যক্তির মুখে একই প্রশ্ন। দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলো বাংলাদেশকে কিছুই যে দেয়নি, তাও শুনতে পাবেন এসব আলোচনায়। আপনার কিছু পাগলাটে স্বভাবের প্রিয় বন্ধু বাংলাদেশে গণতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলবে। গণতন্ত্র যে বাংলাদেশকে কিছুই দেয়নি তারও অনেক প্রমাণ দেখাবেন তারা। কিছু উগ্র পুরুষবাদী ব্যক্তি আবার হাসতে হাসতে বলবেন, এই দুই নারী না যাওয়া পর্যন্ত দেশের কিছুই হবে না। বর্তমান সময়ে টেলিভিশনের কোনো জনপ্রিয় টকশোর বুদ্ধিজীবীরা হয়তো ইঙ্গিত করবেন রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে গণতন্ত্র চর্চার অভাব অথবা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যর্থতা কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার প্রতি। কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেল রাস্তায়, বাণিজ্যিক অঞ্চলে অথবা গণপরিবহনে জনমত জরিপ চালাচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব জরিপ বা সমীক্ষায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের দ্রুত পরিবর্তনের ভয়াবহ দৃশ্য প্রতীয়মান হচ্ছে। দেশের জ্যেষ্ঠ নাগরিকরা, উন্নয়ন সহযোগী বা আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিচক্ষণ সদস্যরাও রাজনৈতিক উত্তেজনা, সম্পদের ক্ষতি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপরায়ণতা এবং ক্রমবর্ধমান গুমের ঘটনায় উদ্বিগ্ন। এমনকি কেউ কেউ এমন ইঙ্গিতও দিচ্ছেন যে, দেশে গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনা রয়েছে। কোনো সংঘবদ্ধ শক্তি যে করেই হোক নৈরাজ্য ও বিশৃংখলা সৃষ্টি করতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিচ্ছেন তারা।
অথচ বিশ্বব্যাপী শান্তিরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে সুনাম অর্জন করেছে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী এবং পুলিশ সদস্যরা। পুলিশসহ আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা পাশ্চাত্য, উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, এমনকি দু’-একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে এবং এশিয়ার অনেক দেশে শান্তি স্থাপনে সাফল্যের স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হয়েছেন। বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে ও অঞ্চলে জাতিসংঘের সমর্থনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জেনারেলদের ফোর্সেস কমান্ডার হিসেবেও নিযুক্ত করা হয়েছে। শুধু আমাদের সৈন্যরা ভালো প্রশিক্ষণপ্রাপ্তই নন, তারা এসব অঞ্চলে যুদ্ধ বন্ধ এবং শান্তি ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন এবং নিজেদের জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দিয়েছেন। শুধু বাংলাদেশই নয়, ভারত-পাকিস্তানসহ অনেক উন্নয়নশীল দেশই শান্তিরক্ষী মিশনে অংশগ্রহণ করছে এবং রাজনৈতিক পরিবর্তন আর গৃহযুদ্ধের সময় সফলভাবে শান্তি নিশ্চিত করে বিশ্বশান্তির মডেল স্থাপন করেছে।
আমি উদ্বিগ্ন, বাংলাদেশে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা যেন এমন খারাপ পর্যায়ে পৌঁছে না যায়, যাতে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপে এদেশে ‘শান্তিরক্ষী বাহিনীর’ মোতায়েন অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা ও হানাহানির পরিপ্রেক্ষিতে কোনো ভালোই এখন আর দেখতে পাচ্ছি না। মসৃণ বা আধা মসৃণ রাজনৈতিক পরিবর্তনে মানুষের সন্দেহ বাড়ছে। আমাদের রাজনৈতিক গুরু ও তাদের সঙ্গী-সাথীরা একটি দুর্বল নির্বাচন কমিশন, বিচারব্যবস্থা, আদুরে বেসামরিক-সামরিক আমলাতন্ত্র এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, একটি অদক্ষ আইন-শৃংখলা বাহিনীর সহযোগিতায় এগোচ্ছে। তাদের বেশিরভাগ সময় ও মেধা ব্যয় হচ্ছে বিরোধী দলকে দমনের কাজে। কোনো সন্দেহ নেই, বাংলাদেশে আজ গণতন্ত্র ঝুঁকির মুখে। দেশের মানুষ এখন ‘বাংলাদেশের মতো গণতন্ত্র’ চায় না। এরকম ছেড়ে দেয়া ভাব আরও কয়েক মাস অব্যাহত থাকলে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে বলেও ভাবছেন কেউ কেউ।
রাজনৈতিক দল, সুশীল-সামরিক আমলা, সাংবাদিক, এমনকি জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের মধ্যেও একটি গুরুতর আস্থাহীনতার জায়গা তৈরি হয়েছে। যেখানে চেইন অব কমান্ড কাজ করার কথা, সেখানে তা করছে না। মর্যাদাপূর্ণ জায়গায় রাজনৈতিক বিবেচনায় কনিষ্ঠরা জ্যেষ্ঠদের ওপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে। নীতি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া এডহক সিস্টেমে হচ্ছে।

চলমান সংকট : বিদেশী হস্তক্ষেপ এবং সমঝোতার প্রত্যাশা by ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী

দু’সপ্তাহ আগে ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং বাংলাদেশে এসেছিলেন। বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সাংঘর্ষিক পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ভারতের কাম্য।’ বাংলাদেশে এখন যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে তাতে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের উদ্বেগ অতি স্বাভাবিক। বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা বিনষ্ট হলে তা গোটা অঞ্চলকেই অস্থিতিশীল করে তুলবে। তাতে ভারতেরও ক্ষতি ছাড়া লাভ নেই। এটা ভারতীয় কর্তৃপক্ষ উপলব্ধি করছে, তাতে আশার আলো দেখছি। তবে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট ও দৃশ্যমান নৈরাজ্যের জন্য ভারত সরকারের বাংলাদেশ নীতিও কি কিছুটা হলেও দায়ী নয়? ভারত আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী। বলা যায় একমাত্র প্রতিবেশী। দক্ষিণে এক চিলতে জায়গা ছাড়া আমাদের স্থলসীমান্ত সবটুকুই ভারতের সঙ্গে। ভারত আমাদের মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও অমূল্য সহায়তা দিয়েছে। ভারতের সেই শুভেচ্ছা অব্যাহত থাকা আমাদের রাষ্ট্রীয় সুস্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। দুর্ভাগ্যবশত ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে আমাদের নানা টানাপোড়েন যেন লেগেই আছে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, অভিন্ন নদীর পানি প্রবাহ উন্নয়ন ও বণ্টনসহ বলতে গেলে কোনো ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের প্রতি ভারতের মনোভাবে এ দেশের সাধারণ মানুষ খুশি হতে পারছে না।
ভারত বড় দেশ। ‘বড়র পিরিতি বালির বাঁধ’। ভারতের প্রতি তার সব প্রতিবেশী রাষ্ট্রেরই অভিজ্ঞতা প্রায় অভিন্ন। ভারত তার আধিপত্য এবং নানাবিধ স্বার্থ বিবেচনায় প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতে নিজস্ব প্রভাব বলয় নির্মাণে নানাবিধ উদ্যোগ নিয়ে থাকে। বাংলাদেশ তার ব্যতিক্রম নয়।
কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডে এটি নতুন কিছু নয়। আধিপত্য বিস্তারে আগ্রহী সব বড় দেশই এ কাজ করে থাকে। কিন্তু এতে হিতে বিপরীত ঘটার সম্ভাবনাও থেকে যায়। কারণ, এর ফলে ক্ষুদ্রতর প্রতিবেশী দেশ তার বড় প্রতিবেশীকে সন্দেহের চোখে দেখতে থাকে। অনেক সময় যা অহেতুক সন্দেহ বাতিকের পর্যায়ে চলে যায়। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এ বিষয়টি লক্ষণীয়রূপে বিরাজমান।
ভারত সরকারের পক্ষ থেকে প্রায়শ বলা হয়, তারা বাংলাদেশের কোনো বিশেষ দলের সঙ্গে নয়, জনগণের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতেই আগ্রহী। কিন্তু বাংলাদেশকে ঘিরে ভারতের এযাবৎকালের কূটনীতি ও নানা পদক্ষেপ তা প্রমাণ করে না। ভারত নিশ্চিতরূপেই এ দেশে বিশেষ বিশেষ দল বা গোষ্ঠীকে বরাবর পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে এসেছে। এখনও যা অব্যাহত আছে। বিশেষ করে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। ভারতীয় রাজনীতিকরা যেন অতীতের বৃত্ত থেকে কিছুতেই বের হয়ে আসতে পারেন না। এর কিছু ঐতিহাসিক কারণ থাকলেও সময়ের বিবর্তনে এবং বর্তমানের বাস্তবতায় এই বৃত্ত ভেঙে নতুনভাবে পথ চলার উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। দুর্ভাগ্যবশত ভারত এখন বিশ্ব পরাশক্তি হওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। এতদঞ্চলে সর্বময় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় ভারতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এতই আত্মনিমগ্ন যে, প্রতিবেশী দেশগুলোর কল্যাণ-অকল্যাণ কিংবা সেসব দেশের জনমতের দিকে দৃষ্টি দেয়ার সময়ও তাদের আছে বলে মনে হয় না।
২.
যাই হোক, আমাদের দুর্দিনে শ্রীমতী সুজাতা সিং ঢাকায় এসেছেন। মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসেছিলেন কয়েকদিন আগে। জাতিসংঘ মহাসচিবের দূত মি. তারানকো এসেছেন। বাংলাদেশ এখন বিদেশী হাইপ্রোফাইল মেহমানদের পদচারণায় মুখর। তারা সবাই উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, সমঝোতার তাগিদ দিচ্ছেন। মি. তারানকো তো দিন-রাত ছুটে বেড়াচ্ছেন। সেজন্য তাদের ধন্যবাদ।
কিন্তু তাদের কিছু কিছু মন্তব্য ও কর্মকাণ্ড কি কূটনৈতিক শালীনতার সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছে না? শ্রীমতী সিং জাপা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে দেখা করে নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য তাকে চাপ দিয়েছেন বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। জনাব এরশাদকে নির্বাচনে যোগ দেয়ার জন্য ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব চাপ প্রদান করার বিষয়টি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। একে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপের শামিল মনে করা কি অযৌক্তিক হবে?
একইভাবে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূতগণও প্রায়শ আমাদের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক করে প্রকাশ্যেই নানা শলাপরামর্শ দিয়ে চলেছেন। সম্প্রতি একজন রাষ্ট্রদূত আমাদের একজন মন্ত্রীর সঙ্গে পাশাপাশি বসে যৌথ সংবাদ সম্মেলনও করেছেন। এ এক ব্যতিক্রমী ঘটনা। তাদের নিজ নিজ দেশে অন্য কোনো দেশের একজন রাষ্ট্রদূত কি এ ধরনের সুযোগ পেতে পারেন?
নানা কারণে বাংলাদেশ এখন আঞ্চলিক ও বিশ্ব রাজনীতির দাবার ঘুঁটি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আমাদের দুই বড় দলের রাজনৈতিক সংঘাতের সুযোগ নিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারে আসছেন অনেকে। দেশের শীর্ষ রাজনীতিকরা দেশের মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে মর্যাদা দেয়ার বদলে বিদেশী শক্তির অনুকম্পা ও সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে দিন-রাত কূটনীতিকপাড়ায় ধরনা দিচ্ছেন। কেবল দেশের ভেতরেই নয়, বিদেশের মাটিতেও তারা পরস্পরের ‘বস্ত্রহরণে’ লিপ্ত হয়ে দেশের মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত করছেন। ক্ষুদ্র দলীয় স্বার্থে তাদের অনেকে বাংলাদেশের রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ বিশেষ বিশেষ বিদেশী শক্তির হাতে তুলে দিতেও কুণ্ঠিত নন বলে অনেকের আশংকা।
বাংলাদেশ ১৬ কোটি মানুষের দেশ। একটি সফল মুক্তি সংগ্রাম ও রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে লাখো প্রাণের বিনিময়ে আমরা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছি। এই স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে এ দেশের মানুষ কখনও আপস করতে পারে না। এই প্রশ্নে সামান্যতম আপসকামী রাজনৈতিক দলকেও জনগণ কিভাবে প্রত্যাখ্যান করে, তা স্বাধীনতা-উত্তর আওয়ামী লীগের বিড়ম্বনা ও বিপর্যয়ের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে। বঙ্গবন্ধুর আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তাও যা ঠেকাতে পারেনি।
এ বাস্তবতা আমাদের বিদেশী বন্ধুদেরও মনে রাখতে হবে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিবাদ-বিসংবাদ যত তীব্রই হোক না কেন, এই দেশকে কেউ যদি আফ্রিকা বা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো কোনো দেশের মতো বিবেচনা করেন এবং বেশি বেশি হস্তক্ষেপ করতে অভিলাষী হন, তাহলে তাদের হাত নিশ্চিতরূপেই পুড়বে।
আমাদের সমস্যা আমাদেরই সমাধান করতে দিতে হবে। এ ধরনের রাজনৈতিক সংঘাত এ দেশে নতুন কিছু নয়। অতীতেও এ ধরনের সংঘাতে বিদেশী হস্তক্ষেপের চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু তাতে কাজ হয়নি। শেষ পর্যন্ত নিজেরাই আমরা পথ খুঁজে পেয়েছি। স্যার নিনিয়ানের মধ্যস্থতায় যে সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি, তারও সমাধান হয়েছে। আপস-সমঝোতা না হলেও নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে আমরা নিজেরাই একটা সমাধানে পৌঁছতে পেরেছি।
আমাদের বিদেশী বন্ধুরা, যারা আমাদের এই সংকটের দ্রুত সমাধান কামনা করছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েই বলা যায়, এবারেও শেষ পর্যন্ত একটা সমাধান বের হয়ে আসবে। গ্রাম-বাংলায় প্রবাদ আছে- ‘বাছুর কুঁদে খুঁটির জোরে’। তাই বাইরের হস্তক্ষেপ না থাকলে বিবদমান পক্ষগুলো নিজ নিজ স্বার্থেই আলোচনার টেবিলে বসে দ্রুত মীমাংসায় পৌঁছতে বাধ্য হবে।
৩.
কিছু বিদেশী মিডিয়া বর্তমান পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর আশু হস্তক্ষেপের সম্ভাবনার কথা বলছে। আমাদের সশস্ত্র বাহিনী দুনিয়ার দেশে দেশে শান্তি রক্ষায় নিয়োজিত। ভয়ংকর গৃহযুদ্ধে নিমগ্ন দেশে নির্বাচন করে ক্ষমতা হস্তান্তরের দায়িত্ব সম্পন্ন করে তারা প্রশংসিত হয়েছে। নামিবিয়ার সাম্প্রতিক নির্বাচন জাতিসংঘ শান্তি মিশনের তত্ত্বাবধানে সুসম্পন্ন হয়েছে। আর সেই মিশনের নেতৃত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশেরই একজন সাবেক আইজিপি।
২০০৭ সালে এমনই এক বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতার আওতায় ‘জরুরি আইন’ জারি হয় এবং সেনাবাহিনী দেশের আইন-শৃংখলা রক্ষায় প্রশাসনকে সহায়তা প্রদান করে। মনে রাখা দরকার, জরুরি আইন আর ‘সামরিক শাসন’ এক কথা নয়। অনেকে এই দুই ব্যবস্থাকে এক করে ফেলেন। জরুরি আইন একটি সাময়িক সাংবিধানিক পদক্ষেপ। রাষ্ট্রপতি প্রয়োজনবোধে দেশের কোনো অংশে বা সারা দেশে তা জারি করতে পারেন। অন্যদিকে সামরিক শাসন একটি অসাংবিধানিক পদক্ষেপ, যা দেশের সংবিধান বিলুপ্ত বা স্থগিত না করে কার্যকর করার কোনো সুযোগ নেই।
দেশে এখন যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তার প্রেক্ষিতে অনেকে ইতিমধ্যেই জরুরি আইন জারির সপক্ষে কথা বলছেন। আমাদের রাজনীতিকরা, বিশেষ করে দুই বড় দল, সজাগ ও তৎপর হয়ে পরিস্থিতির লাগাম টেনে ধরলে তেমন পরিস্থিতি এড়ানো এখনও সম্ভব।
৪.
নির্বাচন সামনে রেখে চলমান রাজনৈতিক সংঘাত-সংঘর্ষের প্রেক্ষাপটে ইতিপূর্বেকার জাতীয় নির্বাচন থেকে আমরা চারটি ‘মডেল’ বিবেচনায় নিতে পারি।
১৯৮৬ সালে গোপন সমঝোতার নির্বাচন
১৯৮৬’র নির্বাচনে তৎকালীন ‘স্বৈরাচার’-এর বিরুদ্ধে আন্দোলনরত দলগুলোর অন্যতম আওয়ামী লীগ রাতারাতি ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ নিয়ে নির্বাচনে যোগ দিলে বিএনপিসহ আন্দোলনকারী দলগুলো বেকায়দায় পড়ে যায়। আন্দোলন বিপর্যস্ত হয়ে নির্বিঘেœ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু এই সংসদ ২ বছরও টিকে থাকতে পারেনি।
১৯৮৮ সালে ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ নিয়ে নির্বাচন দুই বছর পর ১৯৮৮ সালে ‘স্বৈরাচার’-এর অধীনে আরেকটি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এবারে আওয়ামী লীগ আর নির্বাচনে যোগ দেয়নি। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারি উদ্যোগে গঠিত হয় ৭২ দলের একটি জোট। যাকে ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে। বলা হয়, সেই নির্বাচনে প্রকৃত ভোটার উপস্থিতি ছিল ৩ শতাংশ মাত্র। তারপরও ৩০০ আসনে যথারীতি ফলাফল ঘোষিত হয়। ২ বছরের মধ্যে সেই সংসদও ভেঙে দিতে হয়।
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্র“য়ারির ‘৩ মাস মেয়াদি’ নির্বাচন ১৯৯৬তে বিরোধী দলের আন্দোলনের মুখে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’-এর দাবি ক্ষমতাসীন বিএনপি নীতিগতভাবে মেনে নেয়। কিন্তু সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সন্নিবেশিত করার জন্য সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের দরকার। ১৪৪ জন সদস্য পদত্যাগ করার কারণে তখনকার সংসদে সেই সংখ্যক সদস্য ছিল না। অতএব শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাস করার জন্যই একটি স্বল্পমেয়াদি সংসদ নির্বাচন দিতে হয়। সেটাই ছিল ১৯৯৬-এর ১৫ ফেব্র“য়ারির নির্বাচন। আওয়ামী লীগসহ বিরোধী দলগুলো এ নির্বাচনে অংশ না নিলেও তা যথারীতি সম্পন্ন হতে দিয়েছে। বিএনপি নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হয়। তবে দলটি প্রতিশ্র“তি মোতাবেক ৩ মাসের মধ্যে নতুন নির্বাচন দেয়ার প্রশ্নে গড়িমসি করতে থাকলে তীব্র গণআন্দোলন গড়ে ওঠে। চাপের মুখে সরকারকে পদত্যাগ করতে হয়। ১২ জুন নতুন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় চলে আসে। বর্তমান অবস্থায় সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য অনুরূপ একটি ‘স্বল্পমেয়াদি’ পার্লামেন্ট গঠন করার সম্ভাব্যতা যাচাই করে দেখা যেতে পারে।
২০০৮ সালে ‘জরুরি আইনে’ নির্বাচন ২০০৭-এর ২২ জানুয়ারি নির্বাচনের তারিখ ছিল। তখন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায়। আওয়ামী লীগ নির্বাচন বর্জন করে তা প্রতিহত করার ঘোষণা দেয়। আন্দোলন সহিংস রূপ নেয়। স্পষ্টতই দেশ এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের দিকে এগিয়ে চলেছিল। এ অবস্থায় রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমদ ‘জরুরি আইন’ জারি করেন। দেশের জনগণ সেই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্গঠিত হয়। কিন্তু এ প্রক্রিয়ায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ৩ মাসের সাংবিধানিক মেয়াদ পার হয়ে যায়। তবে ‘জাতীয় প্রয়োজন’ (ফড়পঃৎরহব ড়ভ হবপবংংরঃু) বিবেচনায় তা সবাই মেনে নেয়। অতঃপর প্রায় ২ বছর পর ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে আবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
এই ৪টি মডেলের নির্বাচন সামনে রেখে আমরা বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করতে পারি।
বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রথমে ১৯৮৬ মডেলে বিএনপিকে বাদ দিয়ে একদিকে বিভিন্ন বামপন্থী দল এবং অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ছাড়া অন্যান্য ইসলামী দলকে নির্বাচনে আনার চেষ্টা হয়েছে। এমনকি ‘হেফাজতে ইসলাম’কে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। কিন্তু এই প্রয়াস ফলপ্রসূ হয়নি। অতঃপর ১৯৮৮ স্টাইলে একটি ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ দাঁড় করিয়ে ‘ভোটারবিহীন নির্বাচন’ করার চেষ্টা হয়েছে। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, এবারে এরশাদ সাহেব স্বয়ং সেই ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ গড়ার দায়িত্ব নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন। তার পরিণতি এখন আমরা চোখের সামনে দেখছি।
অবশিষ্ট আছে অপর দুই মডেল-১৯৯৬ (ফেব্র“য়ারি) ও ২০০৮।
বর্তমান সরকার যে কোনো প্রকারে নির্বাচন সম্পন্ন করতে আগ্রহী। বলা হচ্ছে, ঘোষিত তফসিল আর বদলানো যাবে না। নির্বাচন পেছাতে হলে বড়জোর ৮/১০ দিন পেছানো সম্ভব; তার বেশি নয়। এ অবস্থায় ১৯৯৬ সালের ফেব্র“য়ারির মতো নির্বাচন করতে হলে প্রথমত সরকারি দলকে সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা দিতে হবে যে, এই নির্বাচন কেবল সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার নির্বাচন এবং পূর্বাহ্নেই এর মেয়াদ সর্বাধিক তিন মাস নির্দিষ্ট করে ঘোষণা দিতে হবে। তাহলে সব পক্ষের সমঝোতার ভিত্তিতে ‘দশম’ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ৩ মাসের মাথায় ‘একাদশ’ জাতীয় সংসদের জন্য আরেকটি নির্বাচন হতে হবে। ’৯৬-এর ১৫ ফেব্র“য়ারির নির্বাচনের পর যেভাবে ১২ জুনের নির্বাচন হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে সেই নির্বাচনকালীন সময়ে সরকারের রূপরেখাসহ অন্য কিছু বিষয় সমঝোতার ভিত্তিতে পার্লামেন্টে প্রয়োজনীয় বিল পাস করিয়ে নিতে হবে। এই মডেল বাস্তবায়নের আরেকটি পথ হতে পারে নবগঠিত মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়ে বর্তমান সংসদের সদস্যদের মধ্যে যারা আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন না তেমন ১০ জনকে নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রিসভা গঠন করা। এতে সরকারের ইচ্ছা অনুযায়ী সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা অটুট থাকবে। অপরদিকে বিরুদ্ধ পক্ষের দাবিও বহুলাংশে মিটে যাবে।
সবশেষে ২০০৮ সালের নির্বাচনকে মডেল হিসেবে নিতে হলে অবধারিতরূপে ২০০৭ সালের ১/১১, অর্থাৎ ‘জরুরি আইন’ জারির পথে যেতে হয়। সেটা সর্বশেষ পন্থা। আমাদের সংবিধানে জরুরি আইন জারির বিধান রয়েছে। কিন্তু তার অবশ্যম্ভাবী নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার অভিজ্ঞতাও আমাদের সামনে রয়েছে। যার সবকিছু সুখকর না হলেও এটাই সংকট নিরসনের সর্বশেষ পন্থা।
সমঝোতার এত পথ খোলা থাকলেও আমরা নিজেরা আলোচনায় বসে সংকট নিরসন করতে পারছি না, বিদেশী মধ্যস্থতাকারী ডেকে আনতে হচ্ছে, আমাদের গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের জন্য তা সুখকর নয়।
ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী : রাজনীতিক, ভূ-রাজনীতি ও উন্নয়ন গবেষক

আল জাজিরার রিপোর্ট- বাংলাদেশে গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করছে

চারদিকে উত্তেজনা। মানুষ উদ্বিগ্ন। পরিস্থিতি দেখে মনে হয় বাংলাদেশে ছোট আকারে গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। অনলাইন আল জাজিরার এক খবরে এ কথা বলা হয়েছে। আজ সুপ্রিম কোর্ট আবদুল কাদের মোল্লার রিভিউ আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন।
এর অর্থ হলো স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সংঘটিত নৃশংসতার অভিযোগে প্রথম মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে যাচ্ছে কাদের মোল্লার। তার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, তার মক্কেলকে ২১ থেকে ২৮ দিনের মধ্যে ফাঁসি দেয়া হতে পারে। তবে কাদের মোল্লা ও তার আত্মীয়রা প্রেসিডেন্টের কাছে প্রাণভিক্ষা চাইতে পারেন। খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, তার মক্কেল সুবিচার পান নি। কিন্তু তা সত্ত্বেও যেহেতু সর্বোচ্চ আদালত থেকে এ রায় দেয়া হয়েছে এখন আমাদের আর কিছু বলার নেই। কাদের মোল্লার এই মামলাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কয়েক মাস ধরে চলছে উত্তেজনা। এখন জাতীয় নির্বাচন একেবারে সন্নিকটে। এ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে তারা বিরোধী দল বিএনপির আন্দোলনে মূল ভূমিকা রাখছে।

‘বাক-স্বাধীনতার ওপর নিয়ন্ত্রণ চলছে’

সরকার গণমাধ্যমসহ বাক-স্বাধীনতার ওপর পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছেন বিশিষ্টজনরা। জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ অভিযোগ করা হয়। এতে মুল বক্তব্য উপস্থাপন করেন প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মূসা।
এতে তিনি বলেন, টেলিভিশন টকশোতে যারা সরকারের সমালোচনা করেন টিভি কর্র্তৃপক্ষের ওপর চাপ প্রয়োগ করে তাদের আলোচনায় আনতে বাধা দেয়া হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারের পছন্দের আলোচকদের আমন্ত্রণ জানানোর জন্য চাপ দেয়া হচ্ছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীসহ শীর্ষ ব্যক্তিগণ টকশো নিয়ে বিরাগ-বিরক্তি ও অশোভন মন্তব্য প্রকাশ করেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় টকশো নিয়ন্ত্রণের যে চেষ্টা চালানো হচ্ছে তাকে আমরা অগণতান্ত্রিক ও অসাংবিধানিক বলে মনে করি। এতে বলা হয়, সরকারের সমালোচনা ও বাকস্বাধীনতা সাংবিধানিক অধিকার। এবিএম মূসার এ লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন মাহমুদুর রহমান মান্না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুলের উপস্থাপনায় অনুষ্ঠানে সিনিয়র সাংবাদিক রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ, মতিউর রহমান চৌধুরী, নাইমুল ইসলাম খান, নূরুল কবির, অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন, পিয়াস করিম, দিলারা চৌধুরী, আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক, ড. তুহিন মালিক প্রমুখ অংশ নেন। এবিএম মূসা তার সূচনা বক্তব্যে বলেন, দেশে প্রথম যখন মার্শাল ল জারি করা হয়েছিল তখন সাংবাদিকদের পেটানো হত। এখনও এমন আঘাত আসবে। আসলে তা প্রতিহত করতে হবে। দেশের রাজনীতিতে বিদেশীরা হস্তক্ষেপ করছেন-এ নিয়ে কেউ কেউ সমালোচনা করেন উল্লেখ করে মূসা বলেন, বিদেশীরা নাক না গলালে বাংলাদেশ স্বাধীনই হতো না। তিনি বলেন, শান্তিরক্ষা মিশনে আমাদের অনেক সেনা আছে। দেশে যদি শান্তি না থাকে তাহলে একদিন এই সৈন্যরা প্রশ্নের মুখে পড়বে যে তোমাদের দেশেই শান্তি নাই, তোমরা কিসের শান্তি রক্ষা করবে? রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশে বর্তমানে যে অবস্থা চলছে তা বাকশালপূর্ব সময়ের মতোই। এ অবস্থা চলতে পারে না।

সব মনোনয়নপত্র বাতিল করতে ইসিকে এরশাদের চিঠি

জাতীয় পার্টির নামে কোন প্রার্থীকে লাঙল প্রতীক বরাদ্দ না দেয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছেন দলটির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। একই সঙ্গে দলের পক্ষ থেকে প্রার্থীদের জমা দেয়া সব মনোনয়নপত্র বাতিলের জন্য চিঠিতে বলা হয়েছে।
আজ এরশাদের বিশেষ উপদেষ্টা ববি হাজ্জাজ ইসি সচিব মোহাম্মদ সাদিকের কাছে এই আবেদনপত্র জমা দেন। চিঠিতে এরশাদ বলেন, আমাদের পার্টির সিদ্ধান্ত হয়েছে, নির্বাচন কমিশন ঘোষিত বর্তমান তফসিল অনুযায়ী জাতীয় পার্টি এ নির্বাচন থেকে বিরত থাকবে এবং ইতোমধ্যে পার্টি প্রদত্ত সব মনোনয়ন বাতিল করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ  নির্বাচনে ‘লাঙ্গল’ প্রতীক কাউকে বরাদ্দ না দেয়ারও অনুরোধ জানিয়েছেন এরশাদ। এদিকে দুপুরে জাতীয় পার্টির মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার এরশাদের প্রেসিডেন্ট পার্কের নিচে সাংবাদিকদের বলেন, এরশাদ দলীয় সিদ্ধান্তে অনড় আছেন। সব প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পার্টির চেয়ারম্যানের প্রত্যাহারের আবেদনও গ্রহন করা হয়েছে।

গাছ ফেলে ১২ কিলোমিটার মহাসড়ক অবরোধ উত্তরের ৮ জেলা বিচ্ছিন্ন

জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর করার ঘোষণার পর থেকে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা। তারা মঙ্গলবার রাত ৮টায় দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে রংপুরের মিঠাপুকুরের শঠিবাড়ী এলাকা থেকে পায়রাবন্দ রোকেয়া সরণি পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার এলাকা দখলে নেয়।
এ সময় রাস্তার দুই ধারের শ’ শ’ গাছ কেটে অবরোধ করে ফেলে ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক। ফলে মঙ্গলবার রাত থেকেই দেশের সঙ্গে রংপুর বিভাগের ৮ জেলার সব প্রকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এতে করে রংপুরের সর্বত্রই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশ ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে নাশকতা প্রতিরোধে অবস্থান নেয়। জামায়াত-শিবিরের মহাসড়ক অবরোধের কারণে ঢাকা থেকে প্রকাশিত কোন জাতীয় পত্রিকা রংপুরে না আসায় গ্রাহকরা পড়তে পারেনি তাদের কাঙিক্ষত পত্রিকা। রংপুর সংবাদপত্র এজেন্ট এসোসিয়েশনের সভাপতি তোহাম্মেল হোসেন মজনু বলেন, শিবিরের তাণ্ডব ও সড়ক অবরোধের কারণে বেলা ৩টা পর্যন্ত সংবাদপত্রবাহী গাড়ি এ বিভাগের কোন জেলায় ঢুকতে পারেনি। মিঠাপুকুর থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, মঙ্গলবার বিকাল থেকেই জামায়াত-শিবিরকর্মীরা ভাঙচুর-তাণ্ডব শুরু করে। এতে করে আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বেঁধে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ারশেল ও ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এতে পরিস্থিতি কিছুক্ষণ শান্ত হলেও রাতে নতুন করে জামায়াত-শিবির একত্রিত হয়ে ১২ কিলোমিটার রাস্তায় গাছ কেটে ফেলে দিয়ে দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এ রিপোর্র্ট লেখা পর্যন্ত তিনি জানান, গাছ অপসারণ করে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক করা হচ্ছে। পুলিশ নাশকতার অভিযোগে ৩ বিএনপি-শিবির কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে।

‘হক আদায় করতে পারিনি ক্ষমা করে দিও’ by আহমেদ জামাল

‘সাংগঠনিক কাজে বেশির ভাগ সময় ব্যস্ত থাকায় তোমার হক সঠিকভাবে আদায় করতে পারিনি, তোমাকে সময় দিতে পারিনি, ক্ষমা করে দিও।’ মঙ্গলবার রাতে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেম সেলে স্ত্রী সানোয়ারা জাহানের কাছ থেকে এভাবেই শেষ বিদায় নিয়েছিলেন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লা। পুত্র হাসান জামিলসহ পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমি তোমাদের অভিভাবক ছিলাম।

মোল্লার চিঠি, সমালোচনা এবং রনির জবাব by গোলাম মাওলা রনি

এই শতাব্দীর সেরা পন্ডিত শ্রী নিরোদ চন্দ্র চৌধুরী বহু বছর আগে লিখেছিলেন বাঙ্গালী জীবনে রমনী নামের এক অকাট্য প্রামান্য দলিল। নিরোদ বাবু চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছেন যে- অবহমান বাংলার গ্রাম গঞ্জে নারী পুরুষ কিভাবে অবাধ এবং নীতিহীন যৌনাচারে মেতে ওঠে এবং সমাজ সংসারকে ফাঁকি দিয়ে একের পর এক জারজ সন্তান পয়দা করে। প্রায় ষাট বছর হতে চললো - কিন্তু আজ অবধি নিরোদ বাবুর বইকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে কোন বাঙ্গালী লেখক কোন বই রচনা করেননি।

মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত, কথা বলতে চান আইনজীবীদের সঙ্গে

জামায়াতের সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা তার সঙ্গে শেষ দেখা করে কিছুক্ষণ আগে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বের হয়েছেন।

শত্রুর সঙ্গে করমর্দন করে বিপাকে ওবামা

যুক্তরাষ্ট্রের শত্র“ দেশ কিউবার প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর সঙ্গে করমর্দন করে সমালোচনার মুখে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। তবে তার পক্ষ সমর্থন করে দেয়া এক বিবৃতিতে হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, এটি কোনো পূর্ব পরিকল্পিত বিষয় ছিল না, ঘটনাক্রমে হয়ে গেছে। মঙ্গলবার দক্ষিণ আফ্রিকার প্রয়াত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলারে স্মরণসভায় অংশ নেয়ার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা সমাজতান্ত্রিক নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রোর ভাই রাউল কাস্ত্রোর সঙ্গে হাত মেলান। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন, এটি পূর্ব পরিকল্পিত ছিল না। তিনি আরও বলেন, ‘(মঙ্গলবার) ছিল নেলসন ম্যান্ডেলার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর দিন। তাই প্রেসিডেন্টের পুরোমনোযোগ ছিল স্মরণসভার দিকে।’ ওবামার উপদেষ্টা বেন রোদেস বিরল এ করমর্দন সম্পর্কে সাংবাদিকদের বলেন, প্রেসিডেন্ট পরিকল্পনা মাফিক এটি করেননি এবং তিনি তার (রাউল ক্যাস্ট্রো) সঙ্গে বাক বিনিময়ও করেননি। তাই এ নিয়ে সমালোচনার কিছু নেই।
ম্যান্ডেলার স্মরণানুষ্ঠানে কিছুটা বিলম্বে পৌঁছেছিলেন ওবামা। বক্তৃতা দিতে মঞ্চের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় তিনি বিশ্ব নেতাদের সঙ্গে একে একে করমর্দন করছিলেন। এ সময় তার সামনে পড়েন প্রেসিডেন্ট ক্যাস্ট্রো। শত্র“ দেশের নেতা বলে তার কাছ থেকে হাত ফিরিয়ে নেয়া ওবামার পক্ষে সম্ভব হয়নি। তিনি তার সঙ্গেও হাতে হাত মেলান এবং মৃদু হাসি বিনিময় করেন। আর এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে। রিপাবলিকান সিনেটর জন ম্যাককেইন ওবামা-ক্যাস্ট্রের করমর্দনকে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী নেভাল চ্যাম্বারলিন এবং নাজি নেতা হিটলারের মধ্যকার করমর্দনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি ওবামার সমালোচনা করে আরও বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমেরিকানদের জেলবন্দি করে রেখেছেন তার সঙ্গে কেন হাত মেলাতে হবে?’ ১৯৫৯ সালে কিউবা বিপ্লবের পর কেবলমাত্র ২০০০ সালেই জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়েছিলেন কিউবার সে সময়ের নেতা ফিদেল কাস্ত্রো। মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট ওবামা জিম্বাবুয়ের প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবের সঙ্গেও করমর্দন করেন। এছাড়া সম্প্রতি মার্কিন নিরাপত্তা সংস্থার ফোনে আড়িপাতার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্রাজিলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা তৈরি হওয়াসত্ত্বেও ওবামা প্রেসিডেন্ট ডিলমা রৌসেফের গালে চুমু খান। এর আগে ২০০৯ সালে তিনি মার্কিন পুঁজিবাদী ও আগ্রাসী নীতির কড়া সমালোচক হিসেবে স্বীকৃত ভেনিজুয়েলার প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজের সঙ্গে করমর্দন করেছিলেন। এ ঘটনায় তখন ব্যাপক সমালোচনা সইতে হয়েছিল প্রেসিডেন্ট ওবামাকে। বিবিসি, এনবিসি।

বিশ্বে নিবন্ধনহীন শিশুর সংখ্যা ২৩ কোটি

বিশ্বের পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ২৩ কোটির কখনোই জন্ম নিবন্ধন করা হয় না। ফলে নিবন্ধনহীন এসব শিশুর আগামীতে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশংকা রয়েছে। বুধবার জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। বুধবার ইউনিসেফের ৬৭তম বার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের পাঁচ বছরের নিচে শিশুদের মধ্যে প্রতি তিনজনের একজনের জন্ম নিবন্ধন নেই। আর গত বছর বিশ্বে জন্ম নেয়া শিশুদের কেবল মাত্র ৬০ ভাগের জন্ম নিবন্ধন করা হয়েছিল।
বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়া এবং সাব সাহারিয় অঞ্চলের দেশগুলোতে জন্ম নিবন্ধনের হার সবচেয়ে কম বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এ সম্পর্কে জাতিসংঘের উপ-পরিচালক গিতা রাও গুপ্তা বলেন, ‘জন্ম নিবন্ধন কেবল শিশুদের পরিচিতি আর অস্তিত্বই তুলে ধরে না। বরং এ বিষয়টি নিশ্চিত করে, তাদের দেশের অগ্রগতিতে শিশুদের কথা ভুলে যাওয়া হয়নি এবং তাদের অধিকারগুলোকে অগ্রাহ্য করা হয়নি।’ জন্ম নিবন্ধন ও জন্ম সনদকে শিশু অধিকারের রক্ষাকবচ।

প্রেসিডেন্ট ভবনে মাদিবা

দক্ষিণ আফ্রিকার সদ্য প্রয়াত কিংবদন্তি নেতা নেলসন ম্যান্ডেলাকে সমাহিতের পূর্বে ভালোভাবে দেখে নিতে চায় বিশ্ববাসী। সে কারণেই মঙ্গলবার ম্যান্ডেলার জন্য জাতীয়ভাবে স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হওয়ার পরদিনই মাদিবার মরদেহ নিয়ে আসা হল প্রিটোরিয়ায় প্রেসিডেন্ট ভবনে। প্রিটোরিয়ার প্রেসিডেন্ট ভবন ‘ইউনিয়ন বিল্ডিংয়ে’ ১১ থেকে ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাখা হবে এই মহানায়ককে। মহারথীকে এ সময় সম্মান জানাতে প্রিটোরিয়ার রাস্তায় নামবেন হাজারও আফ্রিকান।
সাদা কালোর ভেদাভেদ ভুলে সবাই শেষ দর্শন করবেন বর্ণবাদ বিরোধী এ নেতার।দক্ষিণ আফ্রিকা সরকারের কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে বিবিসি জানায়, ইউনিয়ন ভবনে বুধবার থেকে শুক্রবার নেলসন ম্যান্ডেলার মরদেহ রাখা হবে। প্রতিদিন সকালে কাচের কফিনে পুরোশহর প্রদক্ষিণ করবেন ম্যান্ডেলা। এ সময় ‘গার্ড অফ অনার’ জানাবে মাদিবার ভক্তরা। সরকারি এ ইউনিয়ন ভবনে নেলসন ম্যান্ডেলার জীবনের অনেক স্মৃতি রয়েছে। তবে ম্যান্ডেলার প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথের স্মৃতিই হয়ত কাঁদাবে তার ভক্ত আর অনুসারীদের।
এক নজরে গৃহীত কর্মসূচি
* স্মরণানুষ্ঠানের পর ১১ থেকে ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রিটোরিয়ায় প্রেসিডেন্টের বাসভবন ‘ইউনিয়ন বিল্ডিংয়ে’ রাখা হবে ম্যান্ডেলার মরদেহ। এই তিন দিন বিশ্ব সম্প্রদায়ের নেতা ও আগত ভিআইপি অতিথিরা ম্যান্ডেলার মরদেহ পরিদর্শন করতে পারবেন।
* ১১ ডিসেম্বর দুপুর ১২টা থেকে বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত এবং ১২ ও ১৩ ডিসেম্বর সকাল ৮টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত এ ম্যান্ডেলার মরদেহ পরিদর্শনের সুযোগ পাবেন সাধারণ জনগণ।
* ১৪ ডিসেম্বর শনিবার প্রিটোরিয়ার ওয়াটারক্লুপ বিমান বাহিনীর ঘাঁটি থেকে বিমানে চড়িয়ে পূর্বাঞ্চলীয় ক্যাপে প্রদেশের কুনু গ্রামে নিয়ে যাওয়া হবে ম্যান্ডেলার মরদেহ। সেখানে রাষ্ট্রীয় ও ঐতিহ্যবাহী শেষকৃত্য শেষে পারিবারিক সমাধিস্থলে চির সমাহিত করা হবে ম্যান্ডেলাকে। তথ্যসূত্র : এবিসি।

আইনি বাধা নেই তফসিল পুনর্বিন্যাসে

নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল মোতাবেক আগামী দশম সংসদ নির্বাচনের দিনক্ষণ হচ্ছে ৫ জানুয়ারি ২০১৪। তফসিল ঘোষণার মাত্র এক দিন আগে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছিলেন, প্রধান বিরোধী দলকে আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করাতে সরকার যে প্রচেষ্টা চালাচ্ছিল, তারই পরিপ্রেক্ষিতে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করে তফসিল ঘোষিত হবে। সমগ্র জাতির চোখ ছিল তখন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের গোপন আলোচনা নাটকে। দেশবাসী ধরে নিয়েছিলেন, হয়তো দুই বছর ধরে দুই প্রধান জোটের মধ্যে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, তার সুরাহা হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু ছেদ পড়ল নির্বাচন কমিশনের তফসিল ঘোষণার সিদ্ধান্তে। যদিও বর্তমান সংবিধান মোতাবেক ২৪ জানুয়ারি ২০১৪ সালের মধ্যেই সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১২৩(ক) মোতাবেক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তফসিল মোতাবেক মাত্র সাত দিনের সময় দেওয়া হয়েছিল মনোনয়নপত্র দাখিলের এবং প্রায় ১১ দিন দেওয়া হয়েছে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের জন্য।
তার মানে এখনো দুই দিন সময় রয়েছে। ১৩ ডিসেম্বর থেকে শুরু হবে প্রচার-প্রচারণা। প্রচার-প্রচারণার সময় দেওয়া হয়েছে প্রায় তিন সপ্তাহ। আইন মোতাবেক ন্যূনতম ১৫ দিন সময় দেওয়া যেতে পারে। বিরোধী জোট পূর্ব ঘোষণা মোতাবেক তাদের দাবি ‘তত্ত্বাবধায়ক’ সরকারের পুনর্বহাল না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার যে প্রত্যয় নিয়েছে, সেখান থেকে এখনো সরে আসেনি। নির্বাচনের তফসিল বাতিলের দাবিতে তারা আন্দোলন চালাচ্ছে। এই আন্দোলনের সহিংসতায় বহু প্রাণনাশ, ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারি দল নির্বাচনে একলা চলো নীতিতে এখনো অটল। এমতাবস্থায় নির্বাচন নিয়ে গভীর সংকটে রয়েছে দেশ। অন্যদিকে অব্যাহত রয়েছে সরকারি দল ও জোটের সংশোধিত সংবিধানের ধারা ১২৩(৩) এবং ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী নির্বাচনের প্রস্তুতি। ইতিমধ্যেই মনোনয়ন বাছাইয়ের পর সাতজন প্রার্থীকে, যাঁদের মধ্যে বর্তমান মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীই বেশি, একক মনোনয়নদাতা হিসেবে রিটার্নিং কর্মকর্তারা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ১৯(১) অনুযায়ী বেসরকারিভাবে নির্বাচিত ঘোষণা করেছে। তথ্যে প্রকাশ, আরও ৩৩ জন প্রার্থী কমিশনের আপিল শুনানির পর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত বলে বিবেচিত হতে পারে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। ইতিমধ্যেই জাতীয় পার্টি নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তে মন্ত্রিসভা থেকে ইস্তফা এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণার পর সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
জাতীয় পার্টি যদি দলীয় প্রার্থীদের প্রত্যাহার করে নেয়, তবে সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ এবং জোটভুক্ত কয়েকটি ছোট দল ছাড়া নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দলসহ সিংহভাগ দল অংশগ্রহণ করছে না। নির্বাচন হবে একতরফা। এরই আবর্তে সৃষ্ট গভীর সংকট নিরসনে দেশ-বিদেশের যত তৎপরতা। এমন তৎপরতা দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। নির্বাচন নিয়ে এত বড় ধরনের সংকট ইতিপূর্বে দেখা যায়নি। এমনকি ২০০৬ সালের সংকট থেকেও জটিল। এমতাবস্থায় দুই প্রধান জোটের মধ্যে সমঝোতার মধ্যস্থতায় বেশ কয়েক মাস ধরে গৃহীত দেশি-বিদেশি কূটনৈতিক উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে। অবশেষে জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো মধ্যস্থতার উদ্যোগ নিতে তৃতীয়বারের মতো বাংলাদেশ সফরে রয়েছেন। উভয় জোট, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী, সুশীল সমাজ এবং নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে তিনি একাধিকবার বৈঠক করেছেন সমাধানের খোঁজে। অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের একপর্যায়ে নির্বাচন পেছানোর অনুরোধ জানালে প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারভুক্ত বলে মন্তব্য করেন। তদনুযায়ী মি. তারানকো প্রধান নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে এ বিষয়ে একাধিকবার আলোচনাও করেন। তথ্যমতে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জানিয়েছেন, সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে কিছু জটিলতা থাকলেও বিষয়টি সম্ভব হতে পারে, তবে তা এমনভাবে করতে হবে যাতে ২৪ জানুয়ারি ২০১৪-এর মধ্যেই হতে হবে। ইতিপূর্বে জাতীয় পার্টিও মনোনয়ন দাখিলের শেষ দিন তফসিল ১০ দিন পেছানোর অনুরোধ রাখলেও নির্বাচন কমিশন গুরুত্ব দেয়নি। সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে জাতীয় পার্টি নির্বাচনে যাবে না বলে জানিয়েছেন এইচ এম এরশাদ। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, নির্বাচনের তফসিলে রদবদলই এখন মুখ্য আলোচ্য বিষয়। 
অবশ্য এই রদবদলেও প্রধান বিরোধী দল নির্বাচনমুখী হবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে, এ পর্যায়ে নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনে তফসিল পরিবর্তন করতে পারে কি না? দ্বিতীয় প্রশ্ন উঠেছে, যদি সব দল অংশগ্রহণে রাজি হয় এবং তফসিল পুনর্নির্ধারিত হয়, তবে যাঁরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এখনই নির্বাচিত বলে ঘোষিত হয়েছেন, তাঁদের আইনগত অবস্থান কী হতে পারে? আর যদি এ ধরনের সমঝোতা ১৩ ডিসেম্বরের পরে হয় এবং তত দিনে জাতীয় পার্টির অবস্থানে পরিবর্তন না আনলে হয়তো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতের সংখ্যা দুই গুণ বা ততোধিক বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে এত বেশিসংখ্যক বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতদের আইনি অবস্থান কী হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর নির্বাচন কমিশনের দেওয়ার কথা, যদিও সেখানেও দ্বিমত রয়েছে বলে খবরে প্রকাশ। যা-ই হোক, অভিজ্ঞতার এবং বিদ্যমান গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২-এর আওতায় আমি এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছি। প্রথমত, নির্বাচন কমিশন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ বা আরপিও ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ১১(১) অনুযায়ী ৩০০ আসনে একই দিনে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে। ওই অনুচ্ছেদ বা আরপিও ১৯৭২-এর অন্য কোথাও ঘোষিত তফসিল পুনর্নির্ধারণকরণ বারিত করা হয়নি। এরই আলোকে তফসিল, সংগত কারণে পুনর্নির্ধারণ করার এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের রয়েছে। তবে পুনঃ তফসিলে ভোট গ্রহণের দিন সংবিধানে উল্লেখ্য সময়ের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হতে হবে, যদি না পরিস্থিতি অন্য কোনো দিকে মোড় নেয়।
যেমন ১১ জানুয়ারি ২০০৭ সালের জরুরি অবস্থা ঘোষণার মাধ্যমে ২২ জানুয়ারি ২০০৭ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন রহিত করা হয়েছিল। ওই নির্বাচন প্রায় দুই বছর পর পুনঃ তফসিলের আওতায় অনুষ্ঠিত হয় ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮ সালে। ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগেও বর্তমান বিরোধী দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে তিনবার তফসিল পুনর্নির্ধারণ করতে হয়েছিল। ওই সময় জরুরি অবস্থার প্রেক্ষাপটে সংবিধানে নির্ধারিত নির্বাচনের সময়ের বাধ্যবাধকতা না থাকলেও তৎকালীন নির্বাচন কমিশন ঘোষিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত ও গৃহীত সময়সীমা ৩১ ডিসেম্বর ২০০৮ সালের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করার একধরনের নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে ছিল। ওই সময় ২ নভেম্বর ২০০৮ সালে প্রথমবার তফসিল ঘোষণা করে প্রথমে ১৮ ডিসেম্বর, পরে দুবার পিছিয়ে ২৪ ডিসেম্বর ও ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮-এ ভোট গ্রহণের দিন পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে এসব পরিবর্তন মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময়ের মধ্যেই করা হয়েছিল বলে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়নি। অনস্বীকার্য যে বর্তমান পরিস্থিতি আরও জটিল, তবে সমাধান নির্বাচন কমিশন ও আইনের আওতাতেই রয়েছে। ২০০৮ সালের আগেও নির্বাচনী তফসিলে কয়েকবার পরিবর্তন আনার নজির রয়েছে। দ্বিতীয় যে প্রশ্নটি অনেকেই উত্থাপন করেছেন বলে প্রকাশ তা হলো,
ইতিমধ্যে যাঁদের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়েছে, তাঁদের অবস্থান তফসিল পুনর্নির্ধারিত হলে কী হবে? যেমনটা আগেই বলেছি, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৩ সালের পরে জাতীয় পার্টির বর্তমান অবস্থান অপরিবর্তিত থাকলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতের সংখ্যা অতীত রেকর্ড ছাড়াবে। সে ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সমাধান সাপেক্ষে তফসিল পুনর্নির্ধারিত হলে আইনি জটিলতা হবে কি না? এর সোজাসাপটা উত্তর হলো, ওই অবস্থায় পুনঃ তফসিল হলে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় থেকে ভোট গ্রহণের দিন পর্যন্ত পরিবর্তন করতে হবে। সে ক্ষেত্রে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যাঁরা বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন বা হবেন, তাঁদের পক্ষে জারি করা গণবিজ্ঞপ্তিও কার্যকারিতা হারাবে। এখানে উল্লেখ্য, আরপিওর অনুচ্ছেদ ৩৯(৪) অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন কর্তৃক গেজেট প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত একজন সংসদ সদস্য সরকারিভাবে নির্বাচিত বলে বিবেচিত হবেন না। উল্লেখ্য, সরকারি গেজেট প্রকাশের পর সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪৮(২)(ক) অনুযায়ী তিন দিনের মধ্যে নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথপাঠের মধ্য দিয়েই পূর্ণাঙ্গ সংসদ সদস্য হিসেবে বিবেচিত হবেন। কাজেই গেজেট প্রকাশনা এবং শপথের বিষয়টিও এ ক্ষেত্রে বিবেচনায় থাকে। আরও উল্লেখ্য, ৫ জানুয়ারি ২০১৩ সালে এককভাবে নির্বাচন সম্পন্ন হলেও উল্লিখিত সংবিধানের ধারার বাধ্যবাধকতার কারণে ২৪ জানুয়ারি ২০১৪ সালের পর সরকারি গেজেট প্রকাশ করতে হবে। একজন সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর কত দিনের মধ্যে গেজেট প্রকাশ করতে হবে,
তেমন বাধ্যবাধকতা আইনের দ্বারা নির্বাচন কমিশনের ওপর অর্পিত নেই। এমনই পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি বাতিল হয়ে যাওয়া নির্বাচনকালেও। ওই সময় ১৭ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হলেও পুরো নির্বাচন সম্পন্ন না হওয়ায় আইনগত কারণে গেজেট করা হয়নি, যা পরে তফসিল বাতিলের মাধ্যমে ওই সব সদস্যপদের বেসরকারি ঘোষণাও বাতিল করা হয়েছিল। যা-ই হোক, ওপরের আলোচনা থেকে প্রতীয়মান যে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে এবং সংবিধানের ১২৩(৩)(ক)-এর অনুচ্ছেদের আওতায় পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে সংবিধানে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন হলেও তফসিল পুনর্নির্ধারণ করার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারে। সম্ভাব্য সমঝোতার প্রেক্ষাপটে পরিবর্তিত ক্ষেত্রে যদি ১২৩(৩)(খ) অনুচ্ছেদের আওতায় সর্বদলীয় নির্বাচন হয়, সে ক্ষেত্রে বর্তমান তফসিল বাতিল করে পুনঃ তফসিল ঘোষণা করতে হবে। ওই পরিস্থিতিতে মনোনয়নপত্র নতুনভাবে দাখিল করতে হবে। এর প্রধান কারণ হবে, সংসদ বিলুপ্ত হলে বর্তমান সাংসদদের সদস্যপদের মেয়াদও উত্তীর্ণ হবে। অন্যদিকে বর্তমান তফসিল বহাল রেখে শুধু পুনঃ তফসিল হলে বাছাইয়ে উত্তীর্ণ হওয়া প্রার্থীর প্রার্থিতা বহাল থাকতে পারে, যদি না সম্ভাব্য প্রার্থীর দল পরিবর্তন আনতে ইচ্ছা প্রকাশ করে। সংগত কারণে বর্তমান তফসিলের পরিবর্তন এবং ওই তফসিলে এখন পর্যন্ত ঘটে যাওয়া বিষয়গুলোর পুনর্বিবেচনার এখতিয়ার সম্পূর্ণভাবে নির্বাচন কমিশনের বিবেচ্য বিষয় এবং কমিশনের সিদ্ধান্তে সংবিধান ও আইনের আওতায় সিদ্ধ বলে বিবেচিত হবে।
এম সাখাওয়াত হোসেন (অব.): অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক।
hhintlbd@yahoo.com

অনন্য নেলসন ম্যান্ডেলা

নেলসন ম্যান্ডেলা
সিডও সনদের সঙ্গে নেলসন ম্যান্ডেলার সম্পৃক্ততার একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা রয়েছে, যাতে আমার ছিল অনুঘটকের ভূমিকা। জাতিসংঘের নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ, যা সংক্ষেপে ‘সিডও’ সনদ নামে পরিচিত, এযাবৎ ১৮৭টি দেশ এটিকে অনুসমর্থন করেছে এবং যে সনদ বাস্তবায়নে দক্ষিণ আফ্রিকা উল্লেখ্য অগ্রগামী দেশ হিসেবে পরিচিত। প্রথাগতভাবে অধিকাংশ সনদ গ্রহণকারী দেশ প্রথম পর্যায়ে সনদটিতে শুধু স্বাক্ষর করে থাকে, যা জাতিসংঘের পরিভাষায় নীতিগত অনুমোদনকে বোঝায় এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আংশিক সংরক্ষণসহ বা বিনা সংরক্ষণে সনদে অনুসমর্থন প্রদান করে থাকে এবং তখনই সনদের ধারাসমূহ কার্যকর ও বাস্তবায়ন করা রাষ্ট্রপক্ষের চুক্তিবদ্ধ দায় হিসেবে বিবেচিত হয়। উল্লেখ্য,
বেশ কিছু দেশ প্রাথমিক স্বাক্ষর না দিয়ে একবারেই সনদে অনুসমর্থন প্রদান করে থাকে, বাংলাদেশ যার মধ্যে একটি। দক্ষিণ আফ্রিকা ১৯৯৩ সালের জানুয়ারিতে সিডও সনদে নীতিগতভাবে স্বাক্ষর করে এবং প্রায় তিন বছর পর ১৯৯৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর সনদ অনুসমর্থন করে কার্যকর করার দায়ভার নেয়। স্মরণ করা যেতে পারে, বৈশ্বিক পর্যায়ে নারীর ক্ষমতায়নে ১৯৯৫ সালের ৪ থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলন ছিল এযাবৎ অনুষ্ঠিত বৃহত্তম বিশ্ব সম্মেলন, যাতে ১৮৯ দেশের সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে প্রায় ১৭ হাজার প্রতিনিধি যোগদান করেন। জাতিসংঘের পক্ষ থেকে ওই সম্মেলনের মহাসচিব হিসেবে মিদ গারট্রুড মঙ্গেলাকে মূল দায়িত্ব দেওয়া হলেও জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব বুট্রোস বুট্রোস ঘালি সিডও কমিটির সঙ্গে একটি সভায় আশু সম্মেলনের বিভিন্ন দিক আলোচনা করে সিডও কমিটিকে বিশেষ দায়িত্ব প্রদান করেন, সম্মেলনটি যাতে প্রকৃত অর্থে বৈশ্বিক পর্যায়ে সর্বস্তরের ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর নারীর অংশগ্রহণে সামুদয়িক রূপ লাভ করে এবং নারীজীবনের বহুমাত্রিক সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়। তখন সিডও কমিটির চেয়ারপারসন ছিলেন ইতালির বিখ্যাত বর্ষীয়ান নারী আন্দোলনকর্মী ইভাস্কা কর্টি এবং আমি প্রথম মেয়াদে নির্বাচিত কমিটির সদস্য। আলোচনায় উঠে আসে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে একটি শক্তিশালী প্রতিনিধিদলের সম্মেলনে যোগদান নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা, যাতে করে বিশেষভাবে বর্ণবাদের শিকার নারীর সমস্যাসমূহ চিহ্নিতকরণ এবং তা মোকাবিলার বিষয়সমূহ আলোচ্যসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পায়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সিডও কমিটি দক্ষিণ আফ্রিকার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের মিশন-প্রধানকে একটি চিঠি লেখে। কিন্তু প্রতিনিধি কমিটিকে অবহিত করেন, বর্তমানে দেশটি স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রশাসনিক, পুনর্বাসন ও আন্তরাষ্ট্রীয় বিভিন্ন জরুরি ইস্যু নিয়ে এত ব্যস্ত যে তাদের পক্ষে সিডও সনদ অনুসমর্থনের জন্য তা পার্লামেন্টে উত্থাপন সম্ভব নয় এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতে চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনে অফিশিয়াল প্রতিনিধিদল পাঠানোর দায়বদ্ধতা নেই। দক্ষিণ আফ্রিকার নিউইয়র্ক মিশন থেকে প্রস্তাব নাকচ হওয়ার পর ইভাস্কা কর্টি আমাকে বললেন,
আমার স্বামী হাবিব উল্লাহ খান যেহেতু দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে কর্মরত, সেহেতু তাঁর মাধ্যমে আমরা প্রেসিডেন্ট ম্যান্ডেলাকে এ ব্যাপারে আবেদন করতে পারি কি না। ইভাস্কা কর্টি আমাকে সিডও কমিটির বিশেষ ‘দূত’ নিয়োগে প্রেসিডেন্ট ম্যান্ডেলার উদ্দেশে একটি চিঠি দিলেন, যাতে ১৯৯৫ সালের সেপ্টেম্বরের আগে সিডও সনদে অনুসমর্থন প্রদান ও চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনে দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষ থেকে একটি শক্তিশালী প্রতিনিধিদল প্রেরণের আবেদন জানানো হয়। আমি নিউইয়র্ক থেকে দক্ষিণ আফ্রিকায় এসে বাংলাদেশ রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আজিজ পাহাদের সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করলাম, যাতে তাঁর মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ম্যান্ডেলাকে সিডও সনদ অনুসমর্থনের ত্বরিত ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করা যায়। দুই দিনের মধ্যেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমাকে সময় দিলেন। সিডিও কমিটির পক্ষ থেকে আমি তাঁকে আমাদের অনুরোধপত্র হস্তান্তর করলাম এবং তিনি আমাকে কথা দিলেন, যত দ্রুত সম্ভব তিনি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এ ব্যাপারে আলোচনা করে তাঁর সিদ্ধান্ত আমাকে জানাবেন। সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানালেন, সিডও কমিটির আবেদন প্রেসিডেন্ট ম্যান্ডেলা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছেন এবং সনদ স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হিসেবে তিনি একটি শক্তিশালী প্রতিনিধিদল বেইজিং সম্মেলনে পাঠোনোর নির্দেশ দেবেন। বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সিডও কমিটিকে চিঠির মাধ্যমে জানাল। প্রকৃতই দক্ষিণ আফ্রিকার একটি শক্তিশালী দল বেইজিংয়ে যোগ দেয়। পরবর্তী সময়ে ওই বছরেরই ১৫ ডিসেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকা সিডও সনদে অনুসমর্থন প্রদান করে। সুদীর্ঘ বর্ণবাদ, জাতিগত বিভক্তি, দারিদ্র্য ও অনুন্নয়নের সমস্যা মোকাবিলায় সরকারের কর্মকাণ্ড ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট ম্যান্ডেলা সিডও কমিটির অনুরোধ রক্ষার জন্য কমিটি তাঁকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানায়। কিছুদিন পর একটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা হওয়ায় আমি যখন তাঁকে ধন্যবাদ জানালাম, তখন ভীষণ আনন্দিত বোধ করলাম যে তিনি আমাকে চিনতে পেরেছেন। তাঁর ছিল অসাধারণ স্মৃতিশক্তি, সেই সঙ্গে বাংলাদেশিদের জন্য একধরনের প্রশংসিত মূল্যায়ন।
এর মূল কারণ, তখন দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারি হাসপাতালগুলোয় তিন শর অধিক বাংলাদেশি চিকিৎসক কর্মরত ছিলেন, যাঁদের অধিকাংশের পোস্টিং ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার গ্রামাঞ্চলে। বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রদূত হিসেবে যখন আমার স্বামীর পরিচয়পত্র প্রদান অনুষ্ঠানে যোগ দিই, তখন প্রথাগত আনুষ্ঠানিকতা পেরিয়ে তিনি রাষ্ট্রদূতকে ‘বন্ধু’ বলে সম্বোধন করে বলেছিলেন, তাঁর নিজের গ্রামের হাসপাতালেও একজন বাংলাদেশি চিকিৎসক কর্মরত, যিনি গ্রামবাসীর কাছে প্রিয় মানুষ। ম্যান্ডেলা যেমন তিনি নিজের দেশবাসীর, তেমনি বাইরের মানুষকে অবলীলায় আপন করে নিতে পারতেন। প্রথাগতভাবে কূটনীতিকদের ‘এক্সেলেন্সি’র পরিবর্তে তিনি ‘মাই ফ্রেন্ড’ হিসেবে সম্বোধন করতেন। ১৯৯৭ সালে যখন তিনি রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে ঢাকায় আসেন, তখন বঙ্গভবনে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আমাকে চিনতে পারবেন কি না ভেবে সংকুচিত চিত্তে ভিড় ঠেলে এগোচ্ছি। তিনি হঠাৎ আমার হাত ধরে বললেন, ‘কেমন আছেন, আমার বন্ধু কোথায়?’ আমি তখন ভিড় ঠেলে হাবিবুল্লাহ খানকে ডেকে আনলে তিনি এত আন্তরিকতার সঙ্গে কুশল বিনিময় করলেন, যা শুধু তাঁর মতো একজন বিশাল হূদয়ের বিশ্বমানবতাবোধসম্পন্ন মানুষের পক্ষেই সম্ভব; যিনি একই সঙ্গে অন্যায় ও মানবিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে আপসহীন এক যোদ্ধা, আবার ব্যক্তিপর্যায়ে প্রত্যেক মানুষকে গভীর আবেগে ও আন্তরিকতায় সিক্ত করতে পারেন। আমরা গর্বিত যে তিনি তাঁর বিখ্যাত আত্মজীবনী লং ওয়াক টু ফ্রিডম বইটিতে ‘টু হাবিব উল্লাহ খান, কমপ্লিমেন্ট অ্যান্ড বেস্ট উইমেন টু অ্যা হাইলি ইমপ্রেসিভ ডিপ্লোম্যাট নেলসন ম্যান্ডেলা, ২৩.৫.৯৫’ লিখে উপহার দিয়েছেন।
সালমা খান: অর্থনীতিবিদ, নারীনেত্রী।

দিনে সাড়ে ১২ কোটি শ্রেণী-ঘণ্টা!

হরতাল-অবরোধ ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা এলেই শুধু অর্থনীতির বাহ্যিক দিক নিয়ে এর ক্ষতি পরিমাপ করার চেষ্টা হয়। দৈনিক কত টাকার আলু-পটোল নষ্ট হলো, কত টাকার মাল রপ্তানি হতে পারত, শেয়ারবাজারের কী হলো—এ দিয়েই কি হরতাল-অবরোধের ক্ষতি বোঝায়? লেখাপড়ার ক্ষতি বলতে শুধু পরীক্ষা না হওয়ার ক্ষতিও বোঝায় না। এক দিন দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রাখা মানে সাড়ে ১২ কোটি শ্রেণী-ঘণ্টা পাঠ থেকে জাতিকে বঞ্চিত করা!! প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি সমাপনী প্রায় ৩০ লাখ পরীক্ষার্থীর ধর্ম পরীক্ষা ৩০ নভেম্বর শনিবার অবরোধের আওতায় পড়েছে। এর আগেও একবার পিছিয়েছে। এবার পরীক্ষাটি আরও সাত দিন পিছিয়ে পরের শুক্রবার অর্থাৎ ৬ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়। যারা প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা দিচ্ছে, তাদের গড় বয়স ১১ বছর। পরীক্ষার্থীদের অনেকে বলেছে: পরীক্ষা দেওয়ার ধৈর্য হারিয়ে ফেলছে তারা। এই অভিযোগের উত্তর কি দেওয়া যাবে? সব ঠিক থাকলে ২০ নভেম্বর শুরু হয়ে ২৮ নভেম্বর তাদের পরীক্ষা শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা হয়নি। কিছুদিন আগে হরতাল, অবরোধের মধ্যে পড়ে কোনোমতে শেষ হলো জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষা।
আগামী বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হবে সেকেন্ডারি স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও দাখিল পরীক্ষা। সময়সূচিও ঘোষিত হয়েছে। তাদের হাতে আছে আর মাত্র দুই মাস সময়। এসএসসির পরপরই শুরু হবে এইচএসসি পরীক্ষা। তা ছাড়া বিদ্যালয়গুলোতে এখন অনুষ্ঠিত হচ্ছে শ্রেণী পরিবর্তনের জন্য বার্ষিক পরীক্ষা। অর্থাৎ পরীক্ষার মৌসুম এখন। এটি ছাত্রজীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়। যারা পাবলিক পরীক্ষা (পঞ্চম, অষ্টম, দশম, দ্বাদশ শ্রেণীতে) দেয়, তাদের জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সময় পাবলিক পরীক্ষাগুলোর নম্বর বিশেষ গুরুত্ব পায়। আমাদের দেশে কতজন বিদ্যার্থী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গমন করে—এর নির্দিষ্ট সংখ্যা কারও হাতেই নেই। অনেকে বলেন, চার কোটি। পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা বিশ্লেষণ করে বলা যায়: এ সংখ্যা সোয়া তিন কোটির মতো। যেমন: প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি সমাপনী পরীক্ষার্থী প্রায় ৩০ লাখ। প্রাক্-প্রাথমিক, এনজিও পরিচালিত বিশেষ বিদ্যালয় ইত্যাদি ধরলে প্রাথমিক পর্যায়ে দেশে বিদ্যার্থীর সংখ্যা প্রায় এক কোটি ৮০ হাজার। জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট পরীক্ষার্থী ২০ লাখ। ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম—এ তিন শ্রেণীতে সারা দেশে নিশ্চয়ই এর সংখ্যা ৬০ লাখ।
দেশের আটটি সাধারণ বোর্ড, একটি কারিগরি বোর্ড, একটি মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে মাধ্যমিক অর্থাৎ সেকেন্ডারি স্কুল সার্টিফিকেট, দাখিল ও এসএসসি ভোকেশনাল পরীক্ষার্থী প্রায় ১৪ লাখ। নবম শ্রেণীকে ধরে এর সংখ্যা প্রায় ২৮ লাখ। উচ্চমাধ্যমিক অর্থাৎ হায়ার সেকেন্ডারি সার্টিফিকেট (এইচএসসি), আলিম ইত্যাদি পরীক্ষায় প্রায় ১০ লাখ পরীক্ষার্থী। একাদশ-দ্বাদশ মিলে এর সংখ্যা ২০ লাখ। এই গেল প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত দেশের মোট বিদ্যার্থীর সংখ্যা: আনুমানিক দুই কোটি ৮৮ লাখ। এরপর উচ্চশিক্ষায় সাধারণত পাঁচটি বর্ষ এবং এখানে প্রতি বর্ষে গড়ে দেশে পাঠরত থাকে কমপক্ষে পাঁচ লাখ ছাত্রছাত্রী। তাহলে দেশে উচ্চশিক্ষায় রত আছে অন্তত ২৫ লাখ বিদ্যার্থী। আগের দুই কোটি ৮৮ লাখের সঙ্গে এই ২৫ লাখ যোগ করলে দাঁড়ায় তিন কোটি ১৩ লাখ। সারা দেশে এ বিপুলসংখ্যক বিদ্যার্থী শ্রেণীকক্ষভিত্তিক অধ্যয়ন করে থাকে। এ সংখ্যার বাইরে আরও আছে দূরশিক্ষণ, নৈশশিক্ষণ, বিভিন্ন ডিপ্লোমা, প্রশিক্ষণ কোর্স ইত্যাদির অগণিত ছাত্রছাত্রী। আমরা আপাতত তিন কোটি ১৩ লাখ নিয়মিত বিদ্যার্থীর কথাই চিন্তা করি এবং ধরে নিই, তারা তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দৈনিক গড়ে চারটি শ্রেণী-ঘণ্টা শিক্ষকদের কাছে পাঠ গ্রহণ করে। তাহলে কিন্তু এ বিপুলসংখ্যক বিদ্যার্থী দৈনিক সাড়ে ১২ কোটি শ্রেণী-ঘণ্টা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠ গ্রহণ করে থাকে।
দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেরই নিজস্ব সময়সূচি ও পরিকল্পনা থাকে বিদ্যার্থীদের পাঠদান ও সিলেবাস সমাপ্ত করে বিদ্যার্থীকে পরীক্ষার্থীতে পরিণত করার। শীতকালীন ছুটি, গ্রীষ্মাবকাশ বা উৎসবের ছুটিগুলো এ পাঠপরিকল্পনার মধ্যেই থাকে। এর বাইরে অনির্ধারিতভাবে এক দিন প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা মানেই পুরো পরিকল্পনার ওপর নেতিবাচক প্রভাব! এ নেতিবাচক প্রভাবটি জাতীয় মহাক্ষতি হিসেবে দেখা দেয়, যখন দিনের পর দিন দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্ধারিতভাবে বন্ধ থাকে এবং বিদ্যার্থীরা শ্রেণীপাঠ থেকে বঞ্চিত হয়। সবাইকে ভাবতে হবে, হরতাল, অবরোধসহ অন্য যেকোনো কারণেই হোক, এক দিন অপরিকল্পিতভাবে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ মানেই শিক্ষা খাতে ক্ষতি দৈনিক সাড়ে ১২ কোটি শ্রেণী-ঘণ্টা! শিক্ষার্থী বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই শ্রেণী-ঘণ্টাও বাড়বে। হরতাল, অবরোধের ক্ষতি শুধু আলু-পটোলের ক্ষতি দিয়ে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। আমাদের ভাবতে হবে এটাও, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্ধারিতভাবে বন্ধ থাকায় প্রতিদিন সাড়ে ১২ কোটি শিক্ষা-ঘণ্টা বঞ্চিত হয়ে বাঙালি জাতির তরুণ প্রজন্ম মনোগতভাবে যে শুকিয়ে যাচ্ছে, এ শুষ্কতার বিরূপ প্রভাব পড়বে ভবিষ্যৎ জাতিগঠনে। এর ফলে বাঙালি চিন্তাপ্রবণ এবং সরস জাতির বদলে হয়ে উঠবে শুষ্ক ও বিকলাঙ্গ। এ সন্তানেরা আপাতত আপনার, আমার হলেও বৃহত্তর অর্থে জাতিরই সম্পদ। তাদের জ্ঞানহীনতার তমসায় ধাবিত করে রাজনীতিবিদেরা নিশ্চয়ই অন্ধকারময় বাংলাদেশ কামনা করবেন না!
ড. সৌমিত্র শেখর: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
scpcdu@gmail.com