Saturday, November 28, 2015

পার্বত্য অঞ্চলের পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক : সন্তু লারমা

সরকার শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া বন্ধ রেখেছে অভিযোগ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) বলেছেন, পার্বত্য অঞ্চলের সামগ্রিক পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়েছে।
চুক্তির অষ্টাদশ বার্ষিকী উপলক্ষে আজ শনিবার রাজধানীর সুন্দরবন হোটেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়নের দাবিতে আগামী ২ ডিসেম্বর সকাল ১০টায় রাঙামাটি জিমনেসিয়াম প্রাঙ্গণে গণসমাবেশের কর্মসূচির ঘোষণা দেয়া হয়।
চুক্তির দুই-তৃতীয়াংশ ধারা বাস্তবায়িত হয়নি দাবি করে সন্তু লারমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা একটি জাতীয় ও রাজনৈতিক সমস্যা। দেশের সামগ্রিক স্বার্থেই পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। তাই অবিলম্বে এ চুক্তি বাস্তবায়ন অপরিহার্য।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ, ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেসবাহ কামাল, জনসংহতি সমিতির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক মঙ্গল কুমার চাকমা, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং প্রমুখ।

ত্বকের সোরিয়াসিস রোগ by ডা: দিদারুল আহসান

সোরিয়াসিস একটি দীর্ঘস্থায়ী দুরারোগ্য চর্মরোগ। এই রোগ নারী-পুরুষ সবারই হতে দেখা যায়। এখনো পর্যন্ত এই রোগের সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। লিখেছেন ডা: দিদারুল আহসান
সোরিয়াসিস একটি দীর্ঘস্থায়ী দুরারোগ্য চর্মরোগ। এই রোগ নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই হতে দেখা যায়। এখনো পর্যন্ত এই রোগের সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। এ ক্ষেত্রে ত্বকে প্রথমে প্রদাহের সৃষ্টি হয় এবং সে স্থানে লালচে ভাব দেখা যায়। একই সাথে ছোট ছোট গুটি যা চামড়া থেকে সামান্য উঁচুতে থাকে। ধীরে ধীরে এগুলো বড় হতে পারে। মাছের আঁশের মতো উজ্জ্বল সাদা শুকনো চটলা দ্বারা গুটিগুলো আচ্ছাদিত থাকে। এই আঁশগুলো ঘষে ঘষে তুললে আঁশের নিচের চামড়ায় লালচে ভাব দেখা যায় এবং তা থেকে রস-কষ ঝরতে পারে এবং সেখান থেকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রক্তক্ষরণও হতে থাকে। সাধারণভাবে একজন সোরিয়াসিসের রোগীকে দেখলে অন্যরা ভয় পেয়ে যান এবং অনেকেরই ধারণা এটা বুঝি ছোঁয়াচে। আসলে এটা কোনোক্রমেই ছোঁয়াচে রোগ নয়। এটা কোনো জীবাণুজনিত রোগও নয়। তাই তার থেকে অন্য কারো হওয়ার কোনো ঝুঁকি নেই। এটা তেমন বড় কোনো শারীরিক সমস্যার সৃষ্টিও সাধারণত করে না।
কাদের হয় : নারী-পুরুষ উভয় ক্ষেত্রেই সমহারে হতে দেখা যায়। যেকোনো বয়সেই হতে পারে। তবে ১৫ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে বেশি হতে দেখা যায়। তবে এর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। এ ক্ষেত্রে জেনেটিক বা পারিবারিক প্রভাব অবশ্যই আছে বলে প্রমাণিত হয়েছে এবং অনেক কিছুরই প্রভাবে এটা বাড়তে দেখা গেছে। যেমন আঘাত, ইনফেকশন, দুশ্চিন্তা, আবহাওয়ার পরিবর্তন, নানাকরম ওষুধ যেমন- কোনো ম্যালেরিয়ার ওষুধ, ব্লাড প্রেসারের ওষুধ, হরমোন এবং কর্টিসেল জাতীয় ওষুধ সেবনে প্রাথমিকভাবে উপকার পেলেও পরে বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
উপসর্গ : সোরিয়াসিসের উপসর্গ ত্বকের যেকোনো স্থানেই দেখা দিতে পারে। ত্বক ছাড়া নখেও দেখা দিতে পারে। ত্বকের যেসব এলাকা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়, তা হলো কনুই, হাঁটু, মাথার চামড়া, কোমড়ের নিচের মধ্যখানের স্থানে ইত্যাদি। তবে এটা শরীরের যেকোনো স্থানের যেকোনো চামড়ায়ই হতে পারে। সাধারণত এ রোগে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য উপাসর্গই থাকে না। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সামান্য চুলকানিভাব থাকতে পারে। তবে যাদের এ রোগ হয় তারা লোকসমাজে যেতে ইতস্তত করেন, যাদের কাছে যান তারাও দেখলে ছোঁয়াচে ভেবে ভয়ে দূরে থাকতে চান। কারণ চামড়া উঠতে উঠতে এমন এক ভয়ঙ্কর অবস্থার সৃষ্টি হয় যা কি না রোগীর জন্য এক বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি করে। আসলে কিন্তু এ রোগটি কোনো অবস্থাতেই ছোঁয়াচে নয়। প্রথমে ত্বকে প্রদাহের সৃষ্টি হয়, তারপর লালচে ভাব ধারণ করে, সেখানে ছোট ছোট গুটি দেখা দেয়, ওপরের ত্বকে চলটার আকারে মাছের আঁশের মতো শুকনো চামড়া দেখা দেয় যা কি না টানলে চলটাসহ উঠে আসে। খুঁটে বা টেনে এই চামড়া তুললে নিচে লালচে চামড়া দেখা যায়। যা থেকে রস ঝরে এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রক্তক্ষরণ দেখা যায়। সোরিয়াসিসের ক্ষেত্রে ত্বকের উপসর্গের বাইরে সাধারণত কোনো শারীরিক উপসর্গ থাকে না। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। যেমন হাত ও পায়ের গিরায় গিরায় বাতব্যথার মতো ব্যথা দেখা দিতে পারে, যাকে বলা হয় সোরিয়াটিক আর্থোপ্যাথি। এ ছাড়া হাত ও পায়ের তালুতে পুঁজ ভর্তি দানা দেখা দিতে পারে, যাকে বলা হয় প্যাস্টুলার সোরিয়াসিস। আবার ছোট ছোট দানার আকারে লালচে আঁশযুক্ত সোরিয়াসিস যা সারা দেহসহ হাত-পা পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে, যাকে বলা হয় গাটেট সোরিয়াসিস। সোরিয়াসিসে নখও আক্রান্ত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে নখের রঙ হলদে হতে পারে এবং নখের গায়ে ছোট ছোট দানার আকারে দেখা যায়। নখ পুরো হতে যেতে পারে, নখের গায়ে ফাটা ফাটা দাগ দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া সোরিয়াসিসে আর একটি জটিলতা দেখা দিতে পারে যাকে বলা হয় সোরিয়াটিক এরিথ্রোডারমা, যাতে সারা শরীরের ত্বকে প্রদাহ দেখা দেয় এবং সারা শরীরের ত্বক লালচে হয়ে ফুলে ওঠে। তার সারা শরীর থেকে শুকনো আঁশ ঝরে ঝরে পড়তে থাকে। এ অবস্থায় রোগীর জীবন আশঙ্কাযুক্ত হয়ে পড়ে এবং তাকে হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। সোরিয়াসিস যখন মাথায় দেখা দেয় তখন তাকে বলা হয় স্কালপ সোরিয়াসিস। আমাদের দেশে কেন, পৃথিবীজুড়েই এটা ব্যাপক আকারে দেখা যায়। তবে অনেকেই এটাকে মাথার ত্বকের ছত্রাকজনিত চর্মরোগ (টিনিয়া ক্যাপিটিস) ভেবে ভুল করে থাকেন। এ ক্ষত্রে মাথার ত্বক থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি আঁশ উঠতে থাকে এবং আঁশের নিচের ত্বকে লালচে প্রদাহজনিতভাব দেখা যায়। তবে মাথায় তেমন কোনো চুলকানি থাকে না। অল্প সামান্য থাকলেও অনেকে আবার খুশকি ভেবেও ভুল করে থাকেন।
চিকিৎসা : চিকিৎসায় এটি সম্পূর্ণরূপে সেরে যাবে এ কথা বলা সঙ্গত হবে না। তবে বর্তমানে কিছু কিছু চিকিৎসাপদ্ধতি বেরিয়েছে যা প্রচুর সাফল্য আনতে সক্ষম হয়েছে। এর মধ্যে puva থেরাপি অন্যতম। মলমের মধ্যে ক্যালসিপট্রিয়ল ও ক্লোরেটাসল প্রপায়নেট অন্যতম।
লেখক : চর্ম, অ্যালার্জি ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ, আলরাজী হাসপাতাল, ১২ ফার্মগেট, ঢাকা।
ফোন : ০১৮১৯-২১৮৩৭৮

প্যারিস হামলা ও সিরিয়া সঙ্কট by মিরিয়াম ফ্রাঁসোয়া-কেরা

মিরিয়াম ফ্রাঁসোয়া-কেরা ফরাসি-ব্রিটিশ সাংবাদিক, ব্রডকাস্টার, লেখক ও নিউ স্টেটসম্যান পত্রিকার কলামিস্ট। গার্ডিয়ান ও হাফিংটন পোস্টেও তিনি লেখেন। ফ্রান্স ও মধ্যপ্রাচ্যের সমসাময়িক ঘটনাবলি নিয়ে লেখালেখি করেন। অক্সফোর্ট ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচ ডি করা মিরিয়াম ফ্রাঁসোয়া হার্ভার্ট ইউনিভার্সিটিসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গেস্ট লেকচারার হিসেবে কাজ করেন। স্র্রেব্রেনিকার গণহত্যার ব্যাপারে বিবিসির করা সিরিজ ডকুমেন্টারির উপস্থাপিকা ছিলেন মিরিয়াম। এখন আল জাজিরার ‘হেড টু হেড’ অনুষ্ঠানের ফ্রিল্যান্স উপস্থাপিকা হিসেবে কাজ করছেন। ১২ বছর বয়সে নায়িকা হিসেবে কাজ শুরু করা মিরিয়াম ২০০৩ সালে ক্যামব্রিজ থেকে গ্রাজুয়েশন করার পর ২১ বছর বয়সে ইসলাম গ্রহণ করেন। আগে তিনি রোমান ক্যাথলিক ছিলেন। তার লেখাটি অনুবাদ করেছেন তানজিলা তাশিন
প্যারিস হামলার পর ইউরোপীয় নেতারা একটি কথা স্পষ্ট বুঝতে পেরেছেন। আর তা হলো, সিরীয়দের সাথে তাদের ভাগ্য ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দায়েশের (ইসলামিক স্টেট বা আইএসের স্থানীয় নাম) এই হামলাকে কি কলামিস্ট আইয়ান মার্টিনের ভাগ্য অনুযায়ী ‘পশ্চিমা সভ্যতার’ ওপর হামলা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়? বা রাফিয়া জাকারিয়ার মতো ‘মজার জন্য যুদ্ধ’ (ওয়ার অন ফান)? আইএসের সাম্প্রতিক হামলাকে কী বলা যেতে পারে তা নিয়ে গবেষণায় বহু কালি খরচ হয়ে গেছে। ‘তারা আমাদের ঘৃণা করে কেন?’ এমন প্রশ্নের জবাব সুবিধাজনক দ্বিমুখী মতামতে পূর্ণ। যেখানে সহিংসতার উৎসমূলকে দেখান হয় অধরা হিসেবে। যেন বাস্তব পৃথিবীর সাথে এগুলোর কোনো যোগসূত্র নেই। বাস্তবতা হলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো তৎপর থাকে। বাইরে দিয়ে তারা আদর্শের প্যাকেজ প্রদর্শন করলেও ভেতর ভেতর সাংস্কৃতিক সঙ্ঘাত বা আদর্শগত আধিপত্যের কোনো বিষয় নেই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর দায়েশের হামলার জন্য ‘আমরা’ দায়ী কি না এ প্রশ্ন না তুলে জানতে চাওয়া উচিত এ ধরনের সহিংসতার মাধ্যমে দায়েশ কী অর্জন করতে চাইছে? শূন্যস্থানের মাঝের বিন্দুগুলো পূরণ করা এ কারণেই গুরুত্বপূর্ণ।
মিসরের সিনাইয়ে বোমা বিস্ফোরণে রুশ বিমান বিধ্বস্ত করা, বৈরুতের উপকণ্ঠে হামলা, আঙ্কারার শান্তিমিছিলে হামলা, বাগদাদের শেষকৃত্যে আত্মঘাতী বোমা হামলা এবং গত শুক্রবার প্যারিসে সমন্বিত হামলা- এই সবক’টি হামলার মধ্যে মিল কোথায়?
এর জবাব একটাই, ইরাক ও সিরিয়ায় দায়েশ সামরিকভাবে যে ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে তারই উত্তর এগুলো। ফ্রান্স ও রাশিয়াকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র জোটের ক্রমবর্ধমান বোমা হামলায় ভূমি হারাচ্ছে দায়েশ। হিজবুল্লাহ সিরিয়ায় যে লড়াই চালাচ্ছে, তারই প্রতিক্রিয়া হলো গত সপ্তাহে লেবাননে জোড়া বোমা হামলা। এই হামলায় ৪১ জন নিহত হয়। সিরিয়ায় এক কমান্ডারকে হারানোর পর গত কয়েক মাসে লড়াই আরো জোরদার করেছে হিজবুল্লাহ।
দায়েশবিরোধী লড়াইয়ে এক ইরাকি শিয়া যোদ্ধা নিহত হয়। বাগদাদে তারই জানাজায় হামলা চালায় জঙ্গি গ্রুপটি। নিহত হয় ২৬ জন। এ মাসে রাশিয়ার যাত্রীবাহী বিমান বিধ্বস্ত করার ঘটনায় দায়েশ জড়িত ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর আগে সিরিয়ায় লাগাতার বোমা ফেলে রাশিয়া (সিরিয়ারবিরোধী গোষ্ঠীর সাথে জোট বাহিনীর যোগাযোগ আছে এমন কথাও শোনা যায়)। এক অনলাইন ভিডিওতে দায়েশ সিরিয়ায় এর (রাশিয়ার) বিমান হামলার প্রতিশোধ নেয়া হবে বলে হুমকি দেয়। এতে বলা হয়, ক্রেমলিন সরকারকে টেনে নামানো হবে।
ফ্রান্স গত সেপ্টেম্বরে ঘোষণা দেয়, সিরিয়ায় দায়েশকে লক্ষ্য করে বোমা হামলা চালাবে তারা। ফরাসি বিমান হামলায় সিরিয়ার রাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় ফোরাত নদী তীরের এই শহরটিকে দায়েশ এর খিলাফতের রাজধানী হিসেবে বিবেচনা করে। ফরাসি বিমান দায়েশের তেলের কূপগুলোতেও হামলা চালায়। জঙ্গি সংগঠনটির অর্থের অন্যতম উৎস এই কূপগুলো। ইরাকের দায়েশ ঘাঁটিগুলোতেও হামলা চালানো হয়। মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপ পর্যন্ত এই গ্রুপটি সম্প্রতি যে হামলা চালাচ্ছিল তারই পরিপ্রেক্ষিতে দায়েশের স্বার্থে এসব হামলা চালানো হয়।
গ্রুপটির ওপর যারাই বিমান হামলা চালিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেয়ার হুমকি দিয়ে ভিডিও অনলাইনে ছাড়ে দায়েশ। এটা থেকেই হামলার উদ্দেশ্য আরো স্পষ্ট হয়ে যায়। প্যারিসভিত্তিক প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণা সংস্থা ফাউন্ডেশন অব স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চের পরিচালক ক্যামিলা গ্র্যান্ডের বরাত দিয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, ‘ইসলামিক স্টেট ক্রমেই রক্ষণাত্মক হয়ে উঠছে। এ কারণেই সন্ত্রাসী তৎপরতার দিকে এগোচ্ছে তারা।’
হামলার জন্য ক্যাফে, কনসার্ট হল, ফুটবল মাঠের মতো ‘দুর্বল লক্ষ্য’ বেছে নেয়া হচ্ছে। সমালোচনা করা হচ্ছে সংস্কৃতির কিন্তু ভয় দেখানোর জন্য তেমন কোনো লক্ষ্য বেছে নেয়া হচ্ছে না। আমাদের ‘নৈতিকতাবোধ’ নিয়ে কথা বলা হচ্ছে। আমাদের ‘জীবনযাপনের ধরন’ ধসিয়ে দেয়া হচ্ছে। দায়েশের বৈদেশিক প্রচারবিষয়ক শাখা আল-হায়াত মিডিয়া সেন্টারের এক ভিডিওতে বলা হয়, জোটবাহিনী তাদের ওপর যেভাবে হামলা চালাচ্ছে তাতে তারাও (পশ্চিমা দেশগুলো) ‘কখনো নিরাপদ’ থাকতে পারবে না। এই সন্ত্রাসীদের কৌশলই হয়ে দাঁড়ায়, জনবহুল এলাকাগুলো বেছে নেয়া। শিক্ষবিদ মার্ক জুয়েরগানসমেয়ার তার বই টেরর ইন দ্য মাইন্ড অব গড : দ্য গ্লোবাল রাইস অব রিলিজিয়াস ভায়োলেন্স-এ বলেছেন, ‘সন্ত্রাসী তৎপরতা শুধু রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছে না। বরং তা আরো বড় ধরনের আধ্যাত্মিক সঙ্ঘাতও ডেকে আনছে।’
দায়েশ সিরিয়া ও ইরাকে একটি আলাদা রাজ্য প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। শুরুতে পশ্চিমা লক্ষ্যের ওপর হামলার বিরোধী ছিল তারা। তাদের আদর্শগত সমকক্ষ আলকায়েদার মধ্যে অবশ্য এই নীতি শুরু থেকেই ছিল। তবে সাম্প্রতিক প্যারিসসহ অন্যান্য হামলা এবং বছরের গোড়ার দিকে ব্যঙ্গাত্মক সাময়িকী শার্লি এবদোকে আলকায়েদাকে সাথে নিয়ে হামলা চালানো থেকেই একটি বিষয় স্পষ্ট যে, দুটি গোষ্ঠীর মধ্যে এই পার্থক্যটুকুও মিটে গেছে।
ফ্রান্সের মুক্ত, সাম্যবাদী মতামতের জন্য দেশটির ওপর হামলা চালানো হয়েছে বিষয়টি এমন নয়। যদিও দায়েশ আদর্শগতভাবে গণতন্ত্রে বিশ্বাসী নয়। তাদের দৃষ্টিতে এটি ‘মানুষের তৈরি আইন’। ‘ঘৃণা ও বিকৃতির রাজধানী’ হিসেবে অভিহিত করলেও ফ্রান্সের বিষয়ে খুব একটা মাথাব্যথা ছিল না তাদের। ফ্রান্স তাদের ওপর বিমান হামলা চালানোর পরই তাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। ফ্রান্সের বিরুদ্ধে তাদের ‘যুদ্ধ’ শুরুর এটাই কারণ। পরে এলিসি প্রাসাদ থেকেও একই শব্দের প্রতিধ্বনি শোনা যায়।
দায়েশ প্রচারণারও খুব সহজ লক্ষ্য ফ্রান্স। দেশটিতে ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। তাদের এক ভিডিওতে মুসলিম নারীদের নেকাব পরার ওপর দেশটি নিষেধাজ্ঞা জারির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলা হয়, এমন দেশে মুসলমানেরা বসবাস করতে পারে না, যেখানে ধর্মচর্চার ওপর রাজনৈতিকভাবে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
ফ্রান্স এ বছর এর আগেও ছোট ছোট কয়েকটি হামলার মুখে পড়ে। গত জানুয়ারিতে এক মুদির দোকানে হামলা চালায় আমেদি কৌলিবালি নামে এক লোক। হামলার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘তোমরা খিলাফতে হামলা চালিয়েছ অথবা তোমরা দায়েশের ওপর হামলা চালিয়েছ। আমরা তোমাদের ওপরও হামলা চালাব।’ আত্মঘাতী ওই হামলায় তার মৃত্যুর পর প্রচারিত এক ভিডিও থেকে পাওয়া যায় এ বক্তব্য। এর সাথে শার্লি এবদোর দফতরের হামলারও একটা যোগসূত্র রয়েছে। এই হামলায় কয়েকজন কার্টুনিস্টসহ ১৮ জন নিহত হয়। এর মধ্যে থালিস-এ যাত্রীভর্তি ট্রেন থেকে এক বন্দুকধারীকে আটক করা হয়। দক্ষিণ ফ্রান্সে শিরñেদের একটি ঘটনা ঘটে। মনে করা হয়, সিরিয়া যেতে অপারগ ফ্রান্সে বসবাসকারী দায়েশের সমর্থকেরা এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। দায়েশও তাদের প্রতি একই ধরনের আহ্বান জানায়। ২০১৪ সালে ছাড়া এক ভিডিওতে এককভাবে সন্ত্রাসী তৎপরতা চালানোর আহ্বান জানানো হয়। তবে গত শুক্রবারের হামলার পর একটি বার্তা স্পষ্ট। দায়েশের সম্প্রসারণকে যারাই চ্যালেঞ্জ করবে তাদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করা হবে।
সম্মুখ লড়াইয়ে হয়তো এই গোষ্ঠীর মোকাবেলা করতে হবে। পাশাপাশি ইউরোপের মুসলমানদের মধ্যে খুব স্বল্পসংখ্যক হলেও কিছু লোক কী করে চরম কট্টরপন্থী হয়ে গেল তারও কারণ খুঁজে বের করতে হবে। এগোনোর রাস্তা এটাই। বিশ্বের আন্তঃযোগাযোগের বিষয়টি কখনোই আজকের পর্যায়ে এতটা প্রবল ছিল না। শরণার্থী সঙ্কট এবং দায়েশের হুমকি- দুই-ই ইউরোপকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে তাদের তৈরি করা পরিস্থিতিরই প্রতিক্রিয়া এটি। এখন সিরিয়া সঙ্কটের সমাধান খুঁজে বের করার মধ্যেই ইউরোপের নিরাপত্তা নিহিত- বিষয়টি বুঝতে পারছে তারা।

ধর্ষিতার কান্না by মহিউদ্দিন অদুল

জীবনের নাম যন্ত্রণা। ধর্ষিতার কান্নার যেন শেষ নেই। বিচার চাইতে এসেও পদে পদে যন্ত্রণাময় ভোগান্তি পোহাতে হয় তাদের। মামলা দায়ের, থানা পুলিশ, হাসপাতাল আর আদালত কোথায়ও নিস্তার নেই ধর্ষিতা নারীর। বছরের পর বছর বিচার না পেয়ে ডুকরে কাঁদছে হাজারও ধর্ষিতা। আদালতের বারান্দা হয়ে গেছে তাদের চেনা জায়গা। মামলার মারপ্যাঁচ, আর প্রভাবশালীদের কৌশলের কাছে মার খাচ্ছে ধর্ষিতার বিচার পাওয়ার বাসনা। এমনই একজন মিরপুরের এক ধর্ষিতা। যখন ধর্ষিত হয়েছিল তখন সে ছিল শিশু। তার বয়স ছিল তিন বছর। এখন সে কৈশোরে পা দিয়েছে। সেই ১৯৯৯ সালের ৪ঠা মার্চের কথা। রাজধানীর মিরপুরে ৩ বছরের এই শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। এ নিয়ে পরদিন মিরপুর থানায় সারোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। একই বছরের ২৩শে জুলাই তাকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দেন তদন্ত কর্মকর্তা। ২০০১ সালের ২৪শে জুন তার বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ গঠন হয়। ২০০৩ সালে মামলাটি ঢাকা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৫-এ স্থানান্তর হয়। ১৯৯৯ সাল থেকে ২০১৫। দীর্ঘ ১৬ বছরেও মামলাটির বিচারকাজ শেষ হয়নি। ঘটনার পর গ্রেপ্তারও হয়েছিল সারোয়ার। জামিনে বেরিয়ে পালিয়ে যায়। এখনও সে লাপাত্তা। এ ঘটনার এক মাস আগে ১৪ই ফেব্রুয়ারি ৫ বছরের আরও এক শিশুকে ধর্ষণ করেছিল এই সারোয়ার। এ ঘটনায় ওই দিনই মিরপুর থানায় মামলা হয়। একই বছরের ৩১শে মার্চ তার বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়া হয়। অভিযোগ গঠন হয় পরের বছর ১১ই মার্চ। এ মামলাটিও ওই ট্রাইব্যুনালে যায়। দুটি ধর্ষণ ঘটনা দেশব্যাপী আলোড়ন তুলেছিল। কিন্তু বছরের পর বছর গেলেও বিচার পায়নি ধর্ষিতারা। বরং নানা ভোগান্তি পোহাচ্ছে ধর্ষিতা ও তাদের  পরিবার। শুধু ধর্ষক সারোয়ারের মামলা নয়, ২০০০ সালের ৮ই এপ্রিল মিরপুরেই কাজে যাওয়ার সময় ১৭ বছরের এক গার্মেন্ট শ্রমিককে অপহরণ করে আটকে রেখে ধর্ষণ করা হয়। এ ব্যাপারে ধর্ষিতার পিতা বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলায় জয়নাল আকবর ও কামাল হোসেনকে আসামি করা হয়। একই বছরের ২৪শে অক্টোবর তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন তদন্ত কর্মকর্তা। দীর্ঘ ১৫ বছরেও ধর্ষিতার পরিবার বিচার পাননি। কবে পাবেন তাও জানেন না তারা। আরেক ঘটনা, ২০১১ সালের ১৪ই এপ্রিল সাভারের আশুলিয়া সিকদার মেডিক্যাল সেন্টারে প্রকাশ্য দিবালোকে ১৭ বছরের এক কিশোরীকে ধর্ষণ করা হয়। নানা নাটকীয়তার পর ২৬শে এপ্রিল আশুলিয়া থানায় মামলা হয়। একই বছরের ৩রা নভেম্বর আদালতে আসাদুজ্জামান রনির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়া হয়। এর ১১ দিন পরই মামলাটি ঢাকা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এ গেছে। ওই আদালতে মামলাটির বিচারকাজ শুরু হলেও এ পর্যন্ত ৭ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ১ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে। বাকি সাক্ষীদের এখনও উপস্থিত করতে পারেনি। দুর্ভোগ লাঘবে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ১৮০ কার্যদিবসে এসব মামলার নিষ্পত্তির বিধানও করা হয়। তারপরও থমকে আছে সবকিছু।
এ কারণেই মামলার পাহাড় জমছে ট্রাইব্যুনালে। সূত্র জানায়, বর্তমানে ঢাকার ৫টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ১২ হাজার ৭৮৩টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে মতিঝিল, পল্টন, কাফরুল, কদমতলী, শ্যামপুর, সাভার, আশুলিয়া, কেরানীগঞ্জ, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ ও শাহজাহানপুর থানার ২ হাজার ৭৪৫টি মামলার বিচারকাজ চলছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ এ। ট্রাইব্যুনাল-২-এ গুলশান, ধানমন্ডি, কলাবাগান, উত্তরা, তুরাগ, নিউমার্কেট, লালবাগ, চকবাজার, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, দক্ষিণখান ও ভাটারা থানার ২ হাজার ৪৯২টি মামলা থাকলেও আদালতটি কয়েক মাস ধরে বিচারকশূন্য। অন্যদিকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৩-এ রমনা, কোতোয়ালি, সূত্রাপুর, শাহবাগ, পল্লবী, বংশাল, গেণ্ডারিয়া, ধামরাই, রূপনগর ও ওয়ারী থানায় ২ হাজার ৩০০টি মামলা রয়েছে। ট্রাইব্যুনাল-৪-এ পরিচালিত হয় মোহাম্মদপুর, আদাবর, শেরেবাংলা নগর, তেজগাঁও, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ক্যান্টনমেন্ট, বাড্ডা, খিলগাঁও, খিলক্ষেত, নবাবগঞ্জ, কামরাঙ্গীরচর ও রামপুর থানার মামলা। এ আদালতে সবচেয়ে বেশি ৩ হাজার ৩০৮টি মামলা আছে। ট্রাইব্যুনাল-৫ এ মিরপুর, শাহআলী, দারুসসালাম, হাজারীবাগ, বিমানবন্দর, সবুজবাগ, মুগদা, দোহার ও ঢাকা রেলওয়ে থানার মামলার বিচারকাজ চলছে। ওই ট্রাইব্যুনালে ১ হাজার ৯৩৮টি মামলার বিচারকাজ চলছে। ঢাকা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৩ এর বিশেষ পিপি মাহমুদা আক্তার মানবজমিনকে বলেন, বিচার চাইতে গিয়ে ধর্ষিতার ভোগান্তির কথা অস্বীকারের সুযোগ নেই। ধর্ষণকারীর বিরুদ্ধে আইনে যাবজ্জীবনের মতো কঠিন শাস্তির বিধান থাকলেও, সেই বিচার পেতে ধর্ষিতাকে যেন আরও বেশি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। হাসপাতাল ও থানা-পুলিশের ঝামেলার পর বিচারপ্রার্থীকে পড়তে হয় আদালতের দীর্ঘসূত্রতায়। সরকারি দায়িত্ব পালনকারী আইনজীবীকেও তাদের টাকা দিতে হয়। আমার কাছে ১৯৯৮ সালের ধর্ষণ মামলাও রয়েছে। ভিকটিম ও তাদের স্বজনরা যথাসময়ে সাক্ষ্য প্রদান করলেও মামলার অপর সাক্ষী, তদন্ত কর্মকর্তা, চিকিৎসকের সাক্ষ্যের অভাবে যুগ যুগ ধরে ঝুলে যাচ্ছে মামলার বিচার। অথচ যথাযথ তদারকি থাকলে ট্রাইব্যুনালের পক্ষে নির্ধারিত ১৮০ কার্যবিদসে রায় দেয়া সম্ভব। নারী ও শিশু  নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৫ এর স্পেশাল পিপি আলী আসগর স্বপন বলেন, ভোগান্তি ও দীর্ঘসূত্রতা হ্রাসে আমরা আন্তরিকভাবে কাজ করছি।
এ ব্যাপারে মানবাধিকার সংস্থা বা নারী সংগঠনগুলো বলছে বিচারে দীর্ঘসূত্রতার কারণেই এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান মানবজমিনকে বলেন, কোন নারী বা শিশু ধর্ষণের শিকার হয়ে বিচার চাইতে গেলে তাকে পদে পদে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। হাসপাতাল, ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি), থানা পুলিশ, আদালতসহ সব জায়গাতেই তাদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ধর্ষণের পর পর ধর্ষিতার চিকিৎসা ও মামলার কার্যক্রম একই সঙ্গে চালাতে হয়। কিন্তু চিকিৎসক ও পুলিশের সমান্তরাল এবং যথাযথ ভূমিকার অভাবে তা হচ্ছে না। ফলে ধর্ষণের আলামত সংরক্ষণ, মামলা দায়ের ও প্রমাণের প্রায় সব স্তরে অবহেলা, অদক্ষতা, দীর্ঘসূত্রতা ও ভোগান্তি লেগেই রয়েছে। এতে বিচার বঞ্চিত হচ্ছে নারী ও শিশু। লঙ্ঘিত হচ্ছে মানবাধিকার। সমাজে ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। 
ভুক্তভোগী, হাসপাতাল ও পুলিশ সূত্র জানায়, পরিবার, সমাজ ও কর্মক্ষেত্রে যখন তখন ধর্ষণের শিকার হচ্ছে নারী ও শিশুরা। নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এ যৌন অত্যাচারে তারা আহত হচ্ছেন। পালাক্রমের ধর্ষণের ঘটনায় মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলছেন কেউ কেউ। ঘটছে মৃত্যুর ঘটনাও। ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর প্রথমে চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও অনেক নিম্ন এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা জানাজানি ও লোকলজ্জার ভয়ে হাসপাতালেই নিতে চান না। এছাড়া প্রভাবশালী ধর্ষক ও তাদের স্বজনদের চাপে ঘটনা চাপা দিতে গিয়ে চিকিৎসা না দিয়ে দুর্বিষহ ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে বহু ধর্ষিতার জীবন।
একাধিক চিকিৎসক বলেন, ধর্ষিতাকে হাসপাতালে নেয়া হলে ভোগান্তির শুরু সেখান থেকেই। অনেক চিকিৎসক পুলিশি মামলার অজুহাতে থানা পুলিশকে আগে জানানোর পরামর্শ দিয়ে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেন না। সংগ্রহ করেন না ধর্ষণের আলামতও। জরুরি বিভাগ থেকে তৎক্ষণাত ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) পাঠানোর নিয়ম থাকলেও তা হচ্ছে না। দায়িত্ব থাকলেও ওসিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজ উদ্যোগে হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে ধর্ষিতাদের খুঁজে বের করে ওসিসিতে সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা নেয় না। আবার জরুরি বিভাগও বিলম্বে ওসিসিতে পাঠায়। এতে ধর্ষণের আলামত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া ওসিসিতে কর্মরতদের অদক্ষতা ও যথাযথ গুরুত্বের অভাবে চিকিৎসা ও থানায় মামলা দায়েরে বিলম্ব হচ্ছে। মামলায় অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ আইনি ধারাও সংযোজন করা হয় না।
অনেক আইনজীবী বলেন, ধর্ষিতা আগে থানায় গেলে ঘটনাস্থলে তদন্ত ও সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহের নামে দেরি করা হচ্ছে। এতে মামলার আলামত নষ্ট হয়। দেরি করলে বিবাহিত নারীর ক্ষেত্রে আলামত দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। অন্যদিকে কুমারি মেয়েরা আলামত রক্ষা করতে না জানায় তাদের ধর্ষণের আলামতও দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। ফলে ধর্ষণের শিকার হয়েও অনেক ঘটনা প্রমাণ করাই কঠিন হয়ে পড়ছে। ঘটনা সত্য হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা প্রমাণ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। মেডিক্যাল সনদ সংগ্রহে ঘুষও দিতে হচ্ছে। এমনকি মৃত্যুপথযাত্রী ধর্ষিতার জবানবন্দিও যথাসময়ে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয় না। এক্ষেত্রে অজ্ঞতাও কাজ করছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। ফলে ধর্ষণে মৃত্যুর ঘটনায়ও রেহাই পেয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা।
আইনজীবীরা বলেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ধর্ষকরা সামাজিকভাবে প্রভাবশালী হয়। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ধর্ষণের শিকার হচ্ছে অপেক্ষাকৃত গরিব ও অবহেলিত শ্রেণীর নারী-শিশুরা। তারা তদন্ত প্রভাবিত করছে। অভিযোগপত্রের পরিবর্তে মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদায় করে নিচ্ছে। আর বাধ্য হয়ে অভিযোগপত্র দিলেও তাতে দীর্ঘ কালক্ষেপণ করে ধর্ষিতার পরিবারকে হয়রানি করা হচ্ছে। নিম্ন আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়া হলেও প্রায় প্রতি মাসে ধর্ষিতা ও তার পরিবারকে দৌড়াতে হয় আদালতে। আইনজীবীদের ফি দিতে দিতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন অনেকে। এ পর্বে চলে ধর্ষক পক্ষের মামলা তুলে নেয়ার হুমকি। অভিযোগ গঠনে চলে যায় আরও কয়েক মাস বা বছর। এরপর মামলা সংশ্লিষ্ট নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে গেলেও দীর্ঘসূত্রতা থেকে রেহাই মেলে না। পুলিশ ও রাষ্ট্রপক্ষের যথাসময়ে সাক্ষী হাজির না করা, তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য প্রদানে বিলম্ব, আসামি গ্রেপ্তার করতে না পারা ইত্যাদি নানা কারণে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালেও মামলা নিষ্পত্তিতে অতিরিক্ত কালক্ষেপণ হচ্ছে। এ বিশেষ ট্রাইব্যুনালে নির্ধারিত ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা শেষ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাতে শেষ না হলে আরও ৩০ কার্যদিবস সময় বাড়ানোর সুযোগ আছে। কিন্তু ওই সময় পার হলে করণীয় কী আইনে তা উল্লেখ নেই। এই সুযোগেই বছর পেরিয়ে যুগ পার করছে একের পর এক মামলা। দিনে দিনে জমছে মামলার পাহাড়।

বগুড়ার ঘটনায় আইএস-এর দায় স্বীকার, মোটরসাইকেলে এসেছিল ৩ হামলাকারী by জিয়া শাহীন ও এম ছামছুল হক

হরিপুরের শিয়া মসজিদে হামলাকারী এসেছিল নিখুঁত নিশানা নিয়ে। হামলার বেশ কিছুক্ষণ আগেই তিন যুবক একটি মোটরসাইকেলে করে ওই এলাকায় যায়। তারা মসজিদ থেকে কিছু দূরে একটি পরিত্যক্ত ইটভাটায় অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। সুযোগ বুঝে হামলা চালায় নামাজরত মুসল্লিদের ওপর। ঝটিকা হামলার পর তারা খোলা মাঠ দিয়ে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায়। ঘটনার আগে ও পরে ওই এলাকায় অবস্থান করা একাধিক ব্যক্তি মানবজমিনকে এমন তথ্য জানিয়েছেন। গতকাল ওই এলাকায় সরজমিন পরিদর্শনের সময় তারা জানিয়েছেন, হামলার পর মনে হয়েছে হামলাকারীরা পরিকল্পিতভাবে এ হামলা চালিয়েছে। এ কারণে তারা নির্বিঘ্নে পালিয়ে যেতে পেরেছে। মসজিদ থেকে অল্প একটু দূূরেই সাবিনা বেগমের বাড়ি। তিনি জানান, আসরের নামাজ পর মসজিদ থেকে একটু দূরে পরিত্যক্ত ইটভাটার পাশেই সবজি তুলতে যাই। সেখানে দেখতে পাই একটি মোটরসাইকেলে করে ৩ যুবক আসে। প্রত্যেকের পরনে প্যান্ট ও শার্ট পরা। তারা মোটরসাইকেল রেখে ইটভাটায় ঘোরাফেরা করতে থাকে। তাদের এক জনের পিছনে ব্যাগ ঝুলানো ছিল।
ওই তিন জন মসজিদের দিকে আসে সন্ধ্যায়। সন্ধ্যার পর ওই তিন যুবক মসজিদের দিক থেকে মাঠের মধ্যে দিয়ে যখন যাচ্ছিল, তখন তাদের দুইজনকে মুখোশ পরা দেখেছেন বলে জানান সাবিনা। তারা ইটভাটার দিকে চলে যায়।
এদিকে ঘটনার পর থেকে আতঙ্কে রয়েছে বগুড়ার শিবগঞ্জের হরিপুরের শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষ। শোকের ছায়া নেমেছে শিয়া-সুন্নিসহ সব মহলেই। হঠাৎ কেনইবা গুলির ঘটনা ঘটল। কি কারণে গুলি করে নামাজরত মানুষকে  হত্যা  করা হলো তা ভেবে কূল-কিনারা পাচ্ছে না এলাকার লোকজন। গুলির ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার রাতেই শিবগঞ্জ থানায় মামলা হয়েছে। এদিকে ওই  ঘটনায় পুলিশ জিজ্ঞসাবাদের জন্য দুজনকে আটক করেছে। তারা হলেন, শিবগঞ্জের মাঝি হট্ট ইউনিয়নের সৈয়দ দামগড়া গ্রামের মৃত তোফাজ্জল হোসেনের ছেলে আনোয়ার হোসেন ও  কিচক ইউনিয়নের হরিপুর গ্রামের আবদুল মান্নানের ছেলে জুয়েল। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ৮টি গুলির খোসা উদ্ধার করেছে। অন্য দিকে, নিহত মোয়াজ্জেম হোসেনের লাশ ময়নাতদন্ত শেষে বাড়ি আনা হলে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। সমবেদনা জানাতে মোয়াজ্জেম হোসেনের বাড়িতে শত শত মানুষ সকাল থেকেই ভিড় জমান। আহত আফতাব হোসেন চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরলেও ইমাম শাহীনুর ও আবু তাহের শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সরজমিন দেখা গেছে, মসজিদের পশ্চিম দিকে ফাঁকা মাঠ। সেখানে কোন জনবসতি নেই। একটু অদূরেই পরিত্যক্ত একটি ইটভাটা। মাত্র অল্প দূরে উত্তর পাশে বগুড়া-জয়পুরহাট সড়ক। মসজিদের দক্ষিণ পাশ দিয়ে একটি পাকা রাস্তা বেয়ে গেছে। মসজিদের দুপাশেই শিয়া-সুন্নি মতাদর্শের লোকের বসবাস। শুক্রবার ভোর থেকেই এলাকার লোকজন ঘটনাস্থল আল-ই-মোস্তফা মসজিদে ভিড় জমান। মসজিদের ভেতরে রক্তের ছোপ ছোপ চি?হ্ন দেখা যায় গতকালও। মসজিদের স্তম্ভে গুলির দাগ এখনও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। চারদিকে পুলিশ-র‌্যাবসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য অবস্থান করছেন।
গুলিতে আহত আফতাব হোসেন বলেন, প্রায় ১৫-১৬  জন নামাজ আদায় করছিলাম। নামাজ আদায় শেষে  দোয়া পড়ছিলাম, এসময় হঠাৎ করে পর পর গুলির শব্দে দিশাহারা হয়ে মসজিদের মধ্যে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করতে থাকি। গুলিতে কয়েক জন মসজিদের মধ্যে লুটিয়ে পড়লে অনেকেই মসজিদের বিভিন্ন স্থানে ভয়ে ও আতঙ্কে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শী মুসল্লি পাশের চল্লিশছত্র গ্রামের আবদুল মজিদ বলেন, মসজিদের দরজা দিয়ে দুর্বৃত্তরা প্রবেশ করে পেছন থেকে গুলি চালায়। পর পর গুলি করে তারা মসজিদের নির্মাণাধীন প্রাচীর টপকে মাঠের মধ্যে দিয়ে পশ্চিম দিকে দিয়ে পালিয়ে যায়। দৌড়ে বের হয়ে এসে বুঝতে পারি দুর্বৃত্তরা মসজিদের ভিতরে এসে  মূল গেটে তালা ঝুলিয়ে দেয়। (হরিপুর) বাংলাদেশ ইমামীয়া জনকল্যাণ ফাউন্ডেশনের সেক্রেটারি মো. মোজাফ্‌ফর হোসেন জানান, তিনি ইরানের আল মোস্তফা ইউনিভার্সিটিতে কোরআনিক সায়েন্স বিভাগে আট বছর পড়াশোনা করেছেন। ইরান বিপ্লবের পরেই এই এলাকায় শিয়া মতাদর্শের দিকে লোকজন ঝুঁকতে থাকে। এলাকায় শিয়া -সুন্নি কোন দ্বন্দ্ব নেই। শিয়া সম্প্রদায় মসজিদটি নির্মাণ করলেও ওই মসজিদে শিয়া-সুন্নি দুই মতাদর্শের লোকজন নামাজ আদায় করে। কখনও কোন বিরোধ দেখা দেয়নি।
হরিপুর গ্রামের শিয়া মতাদর্শের আবদুর রশিদ জানান, হরিপুর চল্লিশছত্র, আলাদিপুর, গোপিনাথপুর, রামকান্দি ও বেলাইল এ গ্রামগুলোতে শিয়া সম্প্রদায়ের লোকজনের বাস। এই আল মোস্তফা মসজিদে তারা নামাজ আদায় করে।  এ ছাড়াও পাশের গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার পানিতলা, কানদিয়া, বড়িপাড়া, খড়পা এলাকায়  শিয়া সম্প্রদায় রয়েছে। তারা জিয়ারতের সময় এখানে আসে। তিনি আরও জানান, আমার আপন জ্যাঠাতো ভাই ইদ্রিস আলী সুন্নি আর আমি শিয়া। পাশাপাশি ঘর। কখনও ধর্মীয় বিষয় নিয়ে আমাদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয় না। আমরা মিলে মিশে থাকি। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার মসজিদে গুলির ঘটনার পর শুক্রবার সকালে আতঙ্কে নামাজ পড়তে এসেছিল মাত্র ২/৩ জন।
হরিপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ আবু জাফর বলেন, ’৮২ সালে ঢাকায় ইরানি দূতাবাসে গিয়ে তাদের  কিছু বই নেই। আমি কমিউনিজমে বিশ্বাসী ছিলাম। ওই সব বই নিয়ে পড়ে রুশ ফরাসি বিপ্লবের সঙ্গে ইরানের বিপ্লব মিলানোর চেষ্টা করি। আমিই প্রথম এলাকায় শিয়া মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হই। পরে এলাকায় ইসলামীয়া স্টাডি সার্কেল নামে একটি পাঠাগার গঠন করি।  সেখানে নারী-পুরুষদের মধ্যে বই বিতরণ এবং আলোচনা শুরু করি। আস্তে  আস্তে লোকজন শিয়া মতাদর্শের দিকে আসতে শুরু করে। মসজিদের মুয়াজ্জিনকে প্রতিমাসে যে এক হাজার টাকা দেয়া হতো সে টাকা প্রদান করতেন ইরানে বসবাসকারী আমার পীর সাহেব আয়াতুল্লা শাহ রফি। এ ছাড়াও আমরা নিজেরা কিছু টাকা দিতাম।  ওই এলাকার সুন্নি মতাদর্শের হায়দার আলীসহ অনেকেই জানান, এলাকায় কখনও শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব, বিবাদ ছিল না। ওই মসজিদে শিয়া-সুন্নি দুই মতাদর্শের মানুষই নামাজ পড়তো। আমাদের মধ্যে খুবই সম্পর্ক ভাল।
শিবগঞ্জ থানার ওসি আহসান হাবিব বলেন, গতকাল  ভোরে আনোয়ার হোসেন ও জুয়েল নামে দুজনকে  জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে আসা হয়েছে। ঘটনার রাতেই মসজিদের কোষাধ্যক্ষ সোনা মিয়া বাদী হয়ে  অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করে মামলা করেছে। ঘটনার পর ঘটনাস্থল থেকে আটটি গুলিল খোসা উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনাস্থলে পুলিশ র‌্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন মোতায়েন করা হয়েছে। বগুড়া পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, যারা শিয়া বিদ্বেষী তারা এ ঘটনা ঘটাতে পারে। তার পরেও এ বিষয়টির পাশাপাশি অন্যান্য বিষয় মাথায় রেখে আমরা তদন্ত করে দেখছি। সাম্প্রতিককালে বেশ কিছু ঘটনার পর দেখা যায় আইএস দায় স্বীকার করে। কিন্তু প্রতিটি ঘটনাই উদঘাটিত হয়েছে। তার সঙ্গে আইএস’র কোন সম্পৃক্ততা নেই। এ ঘটনায় আইএস’র দায় স্বীকার করার কোন ভিত্তি খুঁজে পাই না। বগুড়া শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. রেজাউল করিম ময়নাতদন্ত শেষে বলেন, মোয়াজ্জেরমর চোখে ও হাতে দুটি গুলির ক্ষত রয়েছে। বাম হাত থেকে একটি গুলি বের করা হয়েছে। এদিকে গতকাল নিহত মোয়াজ্জেম হোসেনের লাশ শিয়া মসজিদ সংলগ্ন স্থানে দাফন করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার মাগরিবের নামাজ পর মসজিদের ভিতরে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তদের গুলিতে মসজিদের ইমাম শাহীনুর রহমান, মুয়াজ্জিন  মোয়াজ্জেম হোসেন, মুসল্লি আবু তাহের ও আফতাব উদ্দিন আহত হন। আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে মসজিদের মুয়াজ্জিন মোয়াজ্জেম হোসেন মারা যান।
শিয়া মসজিদে হামলায় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের নিন্দা
বগুড়ায় শিয়া মসজিদে হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শিয়া ব্লুম বার্নিকাট ও বৃটিশ হাইকমিশনার রবার্ট গিবসন মসজিদে হামলার তীব্র নিন্দা জানান। একইসঙ্গে তারা হামলার শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত এক বিবৃতিতে বলেন, একটি শিয়া মসজিদে বাংলাদেশীরা নামাজ আদায় করার সময় হামলার ঘটনায় আমি অত্যন্ত হৃদয়ভারাক্রান্ত। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং সহিষ্ণুতার দীর্ঘ দিনের ঐতিহ্যকে শ্রদ্ধার চোখে দেখে উল্লেখ করে বার্নিকাট বলেন, এমন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের পাশে আছে তার দেশ।
এদিকে, এক বিবৃতিতে বৃটিশ হাইকমিশনার গিবসন বলেন, বগুড়ার কাছে একটি মসজিদে নামাজের সময় ইবাদতকারীদের ওপর বর্বর হামলায় আমি মর্মাহত। নিজেদের ধর্মবিশ্বাস চর্চারত মানুষের ওপর এমন হামলার যথার্থতা কোন কিছুই দিতে পারে না। ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান গিবসন। গিবসন আরও বলেন, বাংলাদেশে সহিংস সন্ত্রাসী সিরিজ হামলার সব থেকে সাম্প্রতিক হামলা এটি। প্যারিস, মালি ও বৈরুতসহ সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় প্রতীয়মান হয় যে, কোন দেশই এমন হামলা থেকে নিরাপদ নয়। আর এটা এসব সন্ত্রাসবাদের আসন্ন ঝুঁকি ও মূল কারণগুলো মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালোভাবে উপস্থাপন করে। উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার শিবগঞ্জ উপজেলার হরিপুর গ্রামে শিয়া মসজিদে বন্দুকধারীদের হামলায় মসজিদের মুয়াজ্জিন নিহত হন। আহত হন তিন জন মুসল্লি।
শিয়া মসজিদে হামলার দায় স্বীকার আইএস-এর
বগুড়ায় শিয়া মুসলিমদের একটি মসজিদে বন্দুকধারীদের হামলার দায় স্বীকার করেছে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস। নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে এসব বলা হয়েছে। খবরে বলা হয়েছে, আইএস-এর সঙ্গে সমপর্কিত একটি টুইটার অ্যাকাউন্টে দায় স্বীকার করে বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে বৃহসপতিবারের হামলার দায় স্বীকার করে বলা হয়েছে, ‘খেলাফতের যোদ্ধারা’ প্রার্থনারতদের মেশিনগান দিয়ে হামলা চালিয়েছে। সাইট ইন্টিলিজেন্সের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই বিবৃতিতে আইএস শিয়া মুসলিমদের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছে, ‘আল্লাহর অনুমতি নিয়ে, বাংলাদেশের রাফিধা ইরানিয়ান স্বার্থের ওপর অভিযান অব্যাহত থাকবে’। ওই হামলায় নিহত হয়েছে এক ব্যক্তি, আহত হয়েছে তিন জন। গত মাসেও শিয়া সমপ্রদায়ের একটি মিছিলে বোমা হামলা চালানো হয়। বৃহসপতিবারের হামলায় শিয়া মসজিদের মুয়াজ্জিন মোয়াজ্জেম হোসেন মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে পরে হাসপাতালে মারা যান। মসজিদের ৩৫ বছর বয়সী ইমামসহ আরও তিনজনকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানান বগুড়ার শিবগঞ্জ পুলিশের কর্মকর্তা আহসান হাবিব।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের ১৬ কোটি জনসংখ্যায় শিয়া জনগোষ্ঠী খুব ছোট একটি সংখ্যালঘু গোষ্ঠী। এর আগে বাংলাদেশে কখনই সামপ্রদায়িক সহিংসতা হয়নি। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক শামিম মোহাম্মদ আফজাল বলেন, এ ধরনের হামলার প্রকৃতি ও সময় খুব উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, আমরা বাংলাদেশের ইতিহাসে কোন মসজিদে এ ধরনের হামলা দেখিনি। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ হামলাটি আরও একটি ইঙ্গিত যে আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদী সংগঠনগুলো বাংলাদেশের চরমপন্থী নেটওয়ার্কসমূহের সঙ্গে সমপর্ক গড়ে তুলছে।
পুলিশ কর্মকর্তা আহসান হাবিব বলেন, আমি এ ধরনের তথ্য শুনিনি বা পাইনি যে, শিয়া সমপ্রদায়ের সঙ্গে কারও দ্বন্দ্ব বা শত্রুতা ছিল। এ হামলাটি আমাকে কেবল বিস্মিত করেছে। ওই অঞ্চলের শিয়া নেতা মোজাফফর হোসেন (৩৫), যিনি বাংলাদেশ ইমামিয়া ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনে’র মহাসচিব, বলেন, বন্দুকধারীরা নিজেদের সঙ্গে তালা নিয়ে এসেছিল। এ তালা দিয়ে তারা মসজিদ প্রাঙ্গণের গেইট আটকে দেয়। এরপরই তারা মসজিদে প্রবেশ করে গুলি ছুড়তে থাকে। তিনি বলেন, বুধবারও তিনি নিজে ওই মসজিদে নামাজ আদায় করেছিলেন।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আইএস-এর সঙ্গে সমপর্কিত বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া বহু হামলার দায় স্বীকার করা হয়েছে। এসব হামলার মধ্যে শিয়া মিছিলে হামলা ছাড়াও, বাংলাদেশে বসবাসরত দুই বিদেশীকে গুলি করে হত্যা, পুলিশ চেকপয়েন্টে ছুরিকাঘাত ও রোম্যান ক্যাথলিক মিশনে এ মাসে গোলাগুলির ঘটনা রয়েছে।

আইএসকে হারাতেই হবে by-রজার কোহেন

ইসলামিক স্টেট প্যারিসে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের দায় স্বীকার করেছে, যেটাকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ ‘যুদ্ধ’ বলে ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে নর্থ আটলান্টিক ট্রিটির ৫ নম্বর ধারা অনুসারে ন্যাটোর সব সদস্যদেশকেই এখন একযোগে মাঠে নামতে হবে, ‘ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার কোনো সদস্যদেশের ওপর হামলা হলে সেটা সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে।’
জোটের নেতারা ইতিমধ্যে আলোচনা শুরু করেছেন, কীভাবে এই ঘটনার প্রতিক্রিয়া জানানো যায়। ওলাঁদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে কথা বলেছেন। জার্মানিসহ অন্যান্য ন্যাটোভুক্ত দেশ সংহতি প্রকাশ করেছে, ক্ষোভ ও নিষ্ঠুরতা কখনো যৌক্তিক হলেও তা যথেষ্ট নয়।
প্যারিসে এই ১২৯ জন মানুষকে হত্যা করার পরিপ্রেক্ষিতে একমাত্র যথাযথ পদক্ষেপ হচ্ছে সামরিক আক্রমণ। বিদ্যমান হুমকির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ লক্ষ্য হচ্ছে আইএসকে ধ্বংস করে দেওয়া, সিরিয়া ও ইরাকে অবস্থিত আইএসের শক্তিশালী ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেওয়া। এই বর্বর সন্ত্রাসীরা সামাজিক মাধ্যমগুলোতে রক্তপাত নিয়ে উল্লাস করছে, ফলে তাদের আর ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতে দেওয়া যাবে না, যেখানে বসে তারা হামলার পরিকল্পনা ও অর্থায়ন করতে পারে, বর্বরতা চালাতে পারে।
ওলাঁদের মনে সেই সন্দেহ নেই যে এই হামলার পরিকল্পনা ‘বিদেশের মাটিতে হয়েছে, হামলাকারীরা সংগঠিতও হয়েছে সেখানে, তবে এই হামলার সঙ্গে দেশের ভেতরের কোনো গোষ্ঠী জড়িত।’ আইএস বা তার কোনো সহযোগী সংগঠন সম্প্রতি রুশ যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত করার দায় স্বীকার করেছে, যে দুর্ঘটনায় ২২৪ জন মানুষ মারা গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন বিশ্বাস করে, এই দাবির বিশ্বাসযোগ্যতা আছে।
আইএসকে আঞ্চলিক হুমকি হিসেবে খারিজ করে দেওয়াটা ভুল হবে, তার হুমকি বৈশ্বিক প্রকৃতির। যথেষ্ট হয়েছে। একটি অশুভ গোষ্ঠীকে ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতে দেওয়া যায় না, যেখানে তারা বংশবিস্তার করতে পারে। পোপ ফ্রান্সিস ঘোষণা দিয়েছেন, প্যারিস হামলা ‘মানুষের কাজ নয়’, এক অর্থে পোপ ঠিকই বলেছেন। কিন্তু ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়, মানুষ অপরিমেয় অশুভ কাজ করতে পারে। সামাল না দিলে সে আরও বড় হয়।
ইরাক ও সিরিয়ায় আইএসকে পরাজিত করতে হলে ন্যাটোর সেনাদের ভূমিতে আক্রমণ চালাতে হবে। ইরাক ও আফগানিস্তানে দীর্ঘ ও অনিশ্চায়ক হস্তক্ষেপের পর এই প্রশ্ন করা সংগত, সেটা ভুল হবে কি না। আবার সামরিক আক্রমণ চালানো হলে আইএসের সদস্যসংখ্যা আরও বেড়ে যাবে কি না, সেটাও ভেবে দেখতে হবে। কারণ, সামরিক আক্রমণ চালানো হলে বহু মানুষ মারা যাবে, বহু সম্পদ বিনষ্ট হবে। আর সন্ত্রাসবাদকে আসলে পুরোপুরি পরাজিত করা যাবে না।
এই হত্যাকাণ্ড এমন এক সময়ে হলো, যখন সিরিয়ার হাজার হাজার মুসলিম শরণার্থী স্রোতের মতো ইউরোপে ঢুকছে। এখন তাদের ওপর হামলে পড়া যাবে না, বরং তাদের সহায়তা করতে হবে। এমনকি তার জন্য যদি চরম সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়, তাহলেও সেটা করতে হবে। তারাও তো আইএসের কারণেই নিজেদের ভূখণ্ড থেকে পালাচ্ছে
এমন যুক্তি-তর্ক প্রলুব্ধকর, কিন্তু সেটাকে প্রতিহত করতে হবে। আইএসের বিরুদ্ধে বিমান যুদ্ধ পরিচালনা করা হলে কাজ শেষ হয়ে যাবে না। কারণ, প্যারিস হামলাটা এমন এক সময়ে হলো, যখন সিরিয়ায় ভালোভাবেই এক বোমা হামলা চলছিল, যার কোনো মাথামুণ্ডু আমরা বুঝি না। চীন ও রাশিয়ার মতো পরাশক্তিগুলো প্যারিস হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। জাতিসংঘে যদি সিরিয়া ও ইরাক থেকে আইএস হটাতে সামরিক হামলা চালানোর প্রস্তাব পেশ হয়, তাহলে তাদের সেটার বিরুদ্ধে যাওয়া উচিত হবে না। আঞ্চলিক শক্তি, বিশেষ করে সৌদি আরবও এই দানবকে শেষ করতে চায়, যদিও এদের উত্থানে তাদের ভূমিকা ছিল। আইএস যে খিলাফতের স্বপ্ন দেখে, সেই খিলাফত তাদের ধ্বংস করে দেবে।
আইএস খুব দক্ষ ও কার্যকর। এদের সুনিয়ন্ত্রিত প্রচারণাযন্ত্র রয়েছে আর মোহভঙ্গ মুসলিম যুবকদের তাড়িত করার মতো আদর্শ রয়েছে, যাদের মনে এই প্রত্যয় সৃষ্টি করা হয়েছে যে পশ্চিম বিশ্বাসঘাতক। একদিকে মধ্যযুগের সাহিত্য, অন্যদিকে প্রযুক্তিগত শক্তি—এ দুইয়ে মিলে এক সীমানাবিহীন অতি গোঁড়া সেনাবাহিনী তৈরি হয়েছে। কিন্তু আইএস সামরিক শক্তিতে অত্যন্ত বলীয়ান, পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন তাদের নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করছে।
ওবামা প্রশাসন এত দিন বলে এসেছে যে আইএস পরাজিত হবে, কিন্তু সেটা বলাটা যথেষ্ট নয়। সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিকল্পনা ছাড়া এই শব্দের মানে হয় না। সময়ের চাপ রয়েছে, কারণ নতুন হামলা চালানোর জন্য খুব নিপুণভাবে সময় ব্যবহার করা হয়। প্রতিটি হামলার সঙ্গে ক্ষতবিক্ষত ইউরোপীয় সমাজে ধর্মীয় ও গোষ্ঠীগত সহিংসতার আশঙ্কা বেড়ে যায়। মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা বাড়ছে বলেই মনে হয়। যে লা বাতাক্লঁ কনসার্ট হলে হামলা হলো, সেখানে নাকি বিভিন্ন ইহুদি সংগঠন প্রতিনিয়তই বসত, ফরাসি ম্যাগাজিন লা পয়েন্ট এ তথ্য দিয়েছে।
এই হত্যাকাণ্ড এমন এক সময়ে হলো, যখন সিরিয়ার হাজার হাজার মুসলিম শরণার্থী স্রোতের মতো ইউরোপে ঢুকছে। এখন তাদের ওপর হামলে পড়া যাবে না, বরং তাদের সহায়তা করতে হবে। এমনকি তার জন্য যদি চরম সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়, তাহলেও সেটা করতে হবে। তারাও তো আইএসের কারণেই নিজেদের ভূখণ্ড থেকে পালাচ্ছে, আবার বাশার আল-আসাদের নির্বিচার সহিংসতার কারণেও তারা দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। সিরিয়াতে হস্তক্ষেপ না করার ফল হিসেবে আমরা দেখছি, ইউরোপ রক্তপাতে ডুবতে বসেছে, বিপদে জেরবার হচ্ছে।
লড়াইটা দীর্ঘই হবে। ইসলাম এক আবেগের সংকটে পড়েছে, শিয়া ও সুন্নিদের (পড়ুন ইরান ও সৌদি আরব) মধ্যকার আঞ্চলিক সংঘাতে সে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে, পশ্চিমবিরোধী আদর্শ ও ওয়াহাবি মৌলবাদে পীড়িত হচ্ছে। এটা মহাবিপদ, যাকে ইসলামের ভেতর থেকেই মোকাবিলা করা উচিত। কোটি কোটি শান্তিপ্রিয় মুসলমানের, যারা প্যারিসের এই হামলায় অন্য যেকোনো মানুষের মতো ব্যথিত হয়েছে, এই কাজটা করতে হবে। তাদের দ্ব্যর্থহীনভাবে একত্র হয়ে কণ্ঠ ছাড়তে হবে, এই একতা বহু দিন টিকিয়ে রাখতে হবে।
সিরিয়া ও ইরাকে আইএসকে শেষ করে দিলেই জিহাদি সন্ত্রাসবাদের অবসান ঘটবে না। কিন্তু চুপচাপ বসে থাকলে তো ব্যর্থ হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। সময় এসেছে, মানবতার খাতিরে প্রত্যয় নিয়ে ইসলামিক স্টেটের মতো দুষ্টক্ষতের বিরুদ্ধে লড়তে হবে। একতার অভাব ও বিভ্রান্তির কারণে অতীতে জিহাদিদের বিরুদ্ধে লড়াই সফল হয়নি। এখন একত্র হওয়া সম্ভব, সেই সঙ্গে সম্ভব বিজয়লাভ।
নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
রজার কোহেন: নিউইয়র্ক টাইমসের বিদেশ-বিষয়ক সম্পাদক।

সাত খুনের বিচারপ্রার্থীদের ভীতি-সুষ্ঠু বিচার

মতামত বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

    দেশে সন্ত্রাসবাদ নতুন মাত্রা পেতে চলেছে

    দেশে সন্ত্রাসবাদ নতুন মাত্রা পেতে চলেছে

    প্রথম আলো: এই হামলাকে কীভাবে দেখছেন? মুনিরুজ্জামান: প্রতিনিয়ত আমরা হুমকি ও সহিংসতাকবলিত হচ্ছি। এটা একটা নতুন সমস্যা।

    কেমন হবে পৌরসভা নির্বাচন?

    আগামী ৩০ ডিসেম্বর ২৩৪টি পৌরসভায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। মেয়াদ শেষ হলে বাকি পৌরসভাগুলোতেও নির্বাচন। ঢাকার বাইরে
    আসমা, আমির, অলোকদের জন্য ভালোবাসা

    আসমা, আমির, অলোকদের জন্য ভালোবাসা

    অসহিষ্ণুতা নামের সংক্রমণ ব্যাধিটি মানুষের ভেতরে যে শুভবোধ, শুভচিন্তা ও মঙ্গলাকাঙ্ক্ষা থাকে, সেসব ধ্বংস করে দেয়।

    সিরিয়ার শান্তি–প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে কি?

    তুরস্কের বিমানবাহিনী যে রাশিয়ার এসইউ-২৪ যুদ্ধবিমান গুলি করে ভূপাতিত করল, তার ভুল-শুদ্ধ যা-ই হোক না কেন, এ রকম কিছু আসলে
    বগুড়ার শিয়া মসজিদে হামলা

    বগুড়ার শিয়া মসজিদে হামলা

    বগুড়ার শিবগঞ্জে মসজিদের অভ্যন্তরে হামলা চালিয়ে হত্যার ঘটনাকে আমরা ‘আরও একটি হামলার ঘটনা, কিংবা ‘আরও একটি হত্যাকাণ্ড’

পাঠকের মন্তব্য (০)

হামলার দায় স্বীকার আইএসের-অনলাইন ডেস্ক



সংবাদ: অনলাইনে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইএস দাবি করে, ‘বিস্ফোরক কোমরবন্ধনী পরে ও অস্ত্র হাতে নিয়ে আমাদের আট ভাই ফ্রান্সের বিরুদ্ধে সফল হামলা করেছে।’ এর আগে এ হামলার ঘটনায় আইএসকে দায়ী করেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ। তিনি বলেন, ‘স্বাধীন দেশ ফ্রান্সের ওপর সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট এ হামলা চালিয়েছে।’

এম রহমান মুকুল
এখন আইএসের মুরব্বি তুর্কি, সৌদি, মার্কিনরা কী বলে আর কী করে, তা দেখার পালা। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের জন্য সতর্কতা জারি করে; আর এই হামলা বিষয়ে কিছুই জানে না? নাকি সিরিয়াকে ভাগ করে নেওয়ার নতুন কোনো ফর্মুলা?

জহিরুল ইসলাম
নিরীহ মানুষগুলোর প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। তবে এই হামলার দায় ফ্রান্স ও পশ্চিমা বিশ্বের। তাদের দ্বিমুখী নীতির ফল এটা।

মিয়া মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক
আইএস যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এবং তাদের দ্বারাই পরিচালিত। সম্প্রতি রাশিয়ার আক্রমণের কারণে তাদের যে ক্ষতি হয়েছে, তার প্রতিশোধ নিতে এবং রাশিয়াকে বেকায়দায় ফেলার জন্যই এই হামলা। স্বয়ং আরবরাও জানে না কারা এই আইএস, কোত্থেকে তাদের উত্থান। এখানে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সেনাবাহিনী না পাঠিয়ে আইএস পাঠিয়েছে।

অয়ন
এখানে আসলে ধর্মের কোনো ভূমিকাই নেই। এটা ধর্মকে ব্যবহার করার রাজনীতি। কারা ট্রেনিং দিয়েছে, অস্ত্র দিয়েছে আইএসকে? কারা ওদের থেকে তেল কিনছে? কোন দেশ দিয়ে আইএসের রিক্রুটরা আসছে?

মো. শাহাদাত হোসাইন
যদি দেখি ইউরোপে অভিবাসীবিরোধী মনোভাব বাড়ছে, তবে বুঝতে হবে পশ্চিমারা ছক করে হামলা চালিয়েছে।

সৃজনশীল কি সৃজনশীল থাকছে? by- প্রতীক বর্ধন



দেশে এখন সৃজনশীল পদ্ধতিতে পাঠদান করা হচ্ছে, এ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ সৃষ্টি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবে এর উল্টোটাই ঘটছে। আবার এ পদ্ধতিতে গাইড বইয়ের ওপর নির্ভরশীলতা কমার কথা থাকলেও বৈপরীত্যমূলক ব্যাপার হচ্ছে, গাইডের ওপর নির্ভরশীলতা আরও বেড়েছে। এ ব্যাপারে অভিভাবকেরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে এই লেখায় হাত দেওয়া।
জাতিসংঘের ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অব হিউম্যান রাইটসের ২৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘সবারই শিক্ষা লাভের অধিকার আছে।’ মানবিক উন্নয়নের জন্য শিক্ষার বিকল্প নেই। আমাদের দেশে প্রাথমিক শিক্ষার ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটেছে, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু শিক্ষার মানোন্নয়ন করতে না পারলে আমরা বিশ্বায়িত পৃথিবীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারব না। এ লক্ষ্যেই সৃজনশীল পদ্ধতি প্রণয়ন করা হয়েছে।
সৃজনশীল পদ্ধতির মাজেজা হচ্ছে শিক্ষণ, পরীক্ষা নয়। এ পদ্ধতির লক্ষ্য হচ্ছে শিক্ষার্থীদের মুখস্থ করার মতো নিদারুণ ও নিষ্ফলা পরিশ্রমের হাত থেকে রেহাই দেওয়া। ফলে এ পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে জনপ্রিয় হওয়ার কথা, কিন্তু বাস্তবে সেটা তেমন জনপ্রিয় হচ্ছে না। তার কারণ হলো, সেটা করার জন্য আমাদের যে প্রস্তুতি প্রয়োজন, আমরা সেটা নিতে পারিনি। এই পদ্ধতিতে শ্রেণিকক্ষেই শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন হওয়ার কথা। কিন্তু সে ব্যবস্থা করা আমাদের দেশে কবে সম্ভব হবে, তা বলা মুশকিল। ফলে এখনো পাবলিক পরীক্ষার মাধ্যমেই শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
সৃজনশীল প্রশ্নকে চারটি অংশে ভাগ করা হয়েছে: জ্ঞান, অনুধাবন, প্রয়োগ ও উচ্চতর দক্ষতা। এই চারটি অংশের উত্তর থেকে ছাত্রছাত্রীদের স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাক্ষমতার বিভিন্ন স্তর যাচাই করা সম্ভব। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সাইয়ীদের মতে, ‘প্রশ্নের চতুর্থ অংশে যাচাই করে দেখা হয় ওই অংশের সঙ্গে সম্পর্কিত পাঠ্যবইয়ের জায়গাটুকু ও উদ্দীপকের ভেতরকার ভাবনাচিন্তা, অনুভূতি-কল্পনাশক্তি, গভীরতা-ব্যাপকতা ইত্যাদিকে ছাত্রছাত্রীরা তুলনা করে বুঝতে পারছে কি না; এদের সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য, উচিত-অনুচিত, ভালো-মন্দ ইত্যাদি বিচার-বিবেচনা করে তার নিজস্ব মতামত গড়ে তুলতে পারছে কি না।’
ইংরেজি আমাদের মাতৃভাষা নয়, বিদেশি ভাষা। প্রাথমিক স্তরে বিদেশি ভাষা শেখানোর প্রয়োজনীয়তা কতটুকু, সেটা নিয়েও প্রশ্ন আছে। ফলে ইংরেজির সৃজনশীল প্রশ্ন কেমন হবে, তা নিয়ে আমাদের বিস্তর চিন্তার অবকাশ আছে। কিন্তু সেটা না করে সমাপনীর নম্বর বিন্যাস করা হয়েছে এভাবে: সিন ৫০, আনসিন ৫০। ভাবখানা এমন, যেন ইংরেজি আমাদের মাতৃভাষা। রাজধানী বা বড় শহরের সচ্ছল বাবা-মায়ের সন্তানেরা ভালো স্কুলে পড়ে, সেখানে ভালো শিক্ষকও আছেন। আবার তাদের প্রাইভেট টিউটরও আছে। ফলে তারা হয়তো এই ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে, কিন্তু মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলের গরিব মানুষের সন্তানদের কী হবে, সেটা কি আমরা ভেবে দেখেছি? প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ভাষ্য হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের কাছে ইংরেজি আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে অনেক শিক্ষকই বলছেন, গণিত ও ইংরেজিকে সৃজনশীল পদ্ধতির বাইরে রাখা উচিত। কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার হলো, এত কিছুর পরও কিন্তু পরীক্ষার ফল খারাপ হচ্ছে না। তার মানে কি ভূতটা সর্ষেতেই আছে?
আবার কমিউনিকেটিভ ইংরেজির নামে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ব্যাকরণ পড়ানো হচ্ছে না, এমনকি সাহিত্যও নয়। সাহিত্য না পড়লে কি ভাষা শেখা সম্ভব?
প্রাথমিক শিক্ষার হার বেড়েছে—শুধু এ নিয়ে আমাদের এখন আর গর্ব করার অবকাশ নেই। সময় এসেছে, সামনে এগোতে হবে, শিক্ষার মানোন্নয়নে মনোযোগ দিতে হবে, শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি ও যুক্তিবোধ শাণিত করতে হবে

সমস্যা হচ্ছে, সৃজনশীল পদ্ধতি প্রয়োগ করার আগে আমাদের যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া দরকার ছিল, সেটা আমরা নিতে পারিনি। সব শিক্ষককে এখন পর্যন্ত প্রশিক্ষণের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। আবার যাঁরা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, তাঁরা যে প্রশিক্ষণলব্ধ শিক্ষা শ্রেণিকক্ষে প্রয়োগ করছেন, সেটাই বা কে দেখছে। আগের পদ্ধতির সঙ্গে যে এ পদ্ধতির মৌলিক তফাত রয়েছে, সেটা ভুলে গেলে চলবে না। সৃজনশীলের মূল কথা হচ্ছে শিক্ষণ। ফলে পুরো প্রস্তুতি না নিয়ে হুট করে এই পদ্ধতি চালু করে দেওয়া কতটা যৌক্তিক, সে প্রশ্ন তোলার সময় হয়েছে।
মোদ্দা কথা হলো, সৃজনশীল পদ্ধতিতে শিক্ষকদের সবচেয়ে বেশি সৃজনশীল হতে হবে। সেটা নিশ্চিত না করে এ ব্যবস্থা প্রবর্তন করলে তো হবে না। শিক্ষকেরা যাতে সৃজনশীল পদ্ধতির প্রশ্ন নিজে প্রণয়ন করতে পারেন, সে লক্ষ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করেছে। আবার শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করেছে, বাজার অথবা গাইড থেকে নমুনা প্রশ্ন নিয়ে পাবলিক কিংবা স্কুলের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার প্রশ্ন করা যাবে না। অথচ খোদ এসএসসি পরীক্ষাতেই গাইড বই থেকে হুবহু প্রশ্ন তুলে দেওয়া হয়েছে। প্রয়োগের এই ঘাটতির কারণে গাইড বই ও কোচিং সেন্টারের আরও বাড়বাড়ন্ত হয়েছে। তার চেয়েও বড় চিন্তার কারণ হচ্ছে প্রশ্নপত্র ফাঁস। অভিযোগ উঠেছে, এই ফাঁসের সঙ্গে কোচিং সেন্টারগুলো জড়িত। ওদিকে ভালো ছাত্রদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করার মতো সরকার তো কিছু করছেই না, উল্টো অষ্টম পে–স্কেলে সরকার শিক্ষকদের অবমূল্যায়ন করেছে।
আরেকটি ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। একদিকে আমরা শিক্ষণকে মূল মন্ত্র বলব, আরেক দিকে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের অযাচিত পরীক্ষার চাপে ফেলব, তা হতে পারে না। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার কথা ছিল না, কিন্তু আমরা তাতে কর্ণপাত না করে শিক্ষার্থীদের জীবনে আরেকটি পাবলিক পরীক্ষা যোগ করেছি, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সারা দিন দৌড়ের ওপর রাখার ব্যবস্থা করেছি। তবে এতে আর কেউ লাভবান না হলেও কোচিং সেন্টারগুলো লাভবান হচ্ছে; কারণ স্কুলে পড়াশোনা হয় না, তাই কোচিং সেন্টারে না গেলে পড়া হবে কী করে? অনেক বাবা-মায়েরই তো পড়ানোর সময় নেই। এই অযাচিত চাপে পড়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা যে চিড়ে চ্যাপ্টা হয়ে যাচ্ছে, সেটা কি আমরা ভেবে দেখছি? তবে আশার কথা হচ্ছে, শিক্ষামন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, ২০১৮ সাল থেকে প্রাথমিক সমাপণী পরীক্ষা থাকবে না। মন্ত্রীর এ বক্তব্য যেন কথার কথা না হয়।
প্রাথমিক শিক্ষার হার বেড়েছে—শুধু এ নিয়ে আমাদের এখন আর গর্ব করার অবকাশ নেই। সময় এসেছে, সামনে এগোতে হবে, শিক্ষার মানোন্নয়নে মনোযোগ দিতে হবে, শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি ও যুক্তিবোধ শাণিত করতে হবে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত আজ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সিইও সরবরাহকারী দেশ। অর্থাৎ পৃথিবীর বহুজাতিক কোম্পানিগুলোতে যাঁরা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও হিসেবে কাজ করছেন, তাঁদের সিংহভাগই ভারতীয়। আর আমরা এখনো বিদেশে শ্রমশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে শুধু সংখ্যা নিয়ে গর্ব করছি। আবার সেই শ্রমিকেরা ইংরেজি না জানার কারণে বিদেশে নানাভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন। এই হচ্ছে আমাদের শিক্ষার হাল!
তবে এত কিছু বলার মানে কিন্তু এই নয় যে সৃজনশীল পদ্ধতি বাদ দিতে হবে। কথা হচ্ছে, সৃজনশীল পদ্ধতিকে আরও কার্যকর করার জন্য আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে, স্ববিরোধগুলো দূর করতে হবে।
প্রতীক বর্ধন: অনুবাদক, সাংবাদিক।

সবার জন্য আর্থিক পরিষেবা টাকার চেয়েও বেশি by-ম্যাক্সিমা থরেইগিতা সেরুতি

জাতিসংঘ মহাসচিবের ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স ফর ডেভেলপমেন্ট-বিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে এখন বাংলাদেশ সফরে রয়েছেন নেদারল্যান্ডসের রানি ম্যাক্সিমা। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, আর্থিক পরিষেবা সম্প্রসারণ বিষয়ে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভূমিকা নিয়ে তাঁর নিবন্ধটি ইংরেজি থেকে অনুবাদ করে প্রথম আলোর পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো
সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে আমি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন সম্মেলনে যোগদানের জন্য নিউইয়র্ক যাই। সেখানে বাংলাদেশ এবং আমার নিজের দেশ, কিংডম অব নেদারল্যান্ডসসহ ১৯৩টি দেশ কর্তৃক একটি সুদূরপ্রসারী নতুন বিশ্বজনীন কর্মসূচি গৃহীত হয়েছিল। এই পরিকল্পনাটি পরবর্তী ১৫ বছরের জন্য উন্নয়নমূলক প্রচেষ্টাগুলোর একটি পরিকল্পনা হিসেবে কাজ করবে। এটা দারিদ্র্য, ক্ষুধা, লিঙ্গবৈষম্য দূরীকরণসহ সুদূরপ্রসারী উদ্বেগগুলোর প্রতি মনোযোগ দেবে; সুস্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে এবং সব ধরনের জটিলতার মধ্যে স্বাভাবিক পৃথিবীকে সুরক্ষা প্রদান করবে।
এসব নতুন টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যসমূহ উচ্চাভিলাষী, তবে আমি এর আশা ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে জাতিসংঘে একটি সুগভীর বোধ আশাবাদ দেখেছি। আমি এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য আর্থিক অন্তর্ভুক্তির প্রতি বিশ্বনেতাদের অঙ্গীকার জোরদার হওয়ার কথা শুনেছিলাম। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়টিকে তাঁরা এসব লক্ষ্য অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে দেখেছেন। তাকেই চূড়ান্ত মনে করেননি, বরং চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছানোর একটি শক্তিশালী মাধ্যম মনে করেছেন।
আর্থিক অন্তর্ভুক্তি শুধু অর্থের বিষয় নয়, এটি হলো সুযোগের দ্বার অবারিত করার বিষয়। দরিদ্র মানুষকে তাদের অসচ্ছলতা থেকে সুরক্ষা দিতে, ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ করতে এবং চাহিদা অনুযায়ী জীবন গঠন করতে তাদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হলে সেগুলো সবার জন্য কার্যকর একটি দীর্ঘস্থায়ী পৃথিবী গঠন করতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে।
জাতিসংঘ মহাসচিবের স্পেশাল অ্যাডভোকেট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স ফর ডেভেলপমেন্ট হিসেবে আমি বহু বছর ধরে আর্থিক পরিষেবায় দরিদ্র মানুষের প্রবেশাধিকার সম্প্রসারিত করার জন্য কাজ করছি। এবং এটা খুবই আনন্দদায়ক যে বাংলাদেশের সরকারসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নেতারা বিষয়টিকে আরও স্থিরসংকল্পের সঙ্গে নিয়েছেন।
নেতারা এখন কেন এই উদ্দেশ্যে বিনিয়োগ করছেন? বিশ্বের প্রাপ্তবয়স্কদের চল্লিশ শতাংশ ২০০ কোটি মানুষ প্রাথমিক আর্থিক পরিষেবাসমূহ ছাড়া বেঁচে থাকার সংগ্রাম করছে। তবে বর্তমানে, প্রবেশাধিকার সম্প্রসারিত করতে আমাদের রয়েছে এক অভূতপূর্ব সুযোগ, ডিজিটাল ও মোবাইল প্রযুক্তির মতো নানাবিধ উদ্ভাবনী।
আর্থিক পরিষেবাসমূহ ইতিমধ্যেই বাংলাদেশে বিভিন্নভাবে মানুষের জীবনে পরিবর্তন নিয়ে আসছে। ঢাকায় কাজ করেন এমন একজন গার্মেন্টস শ্রমিক যখন নগদ অর্থের পরিবর্তে তাঁর পে-চেকটি সরাসরি একটি ডিজিটাল অ্যাকাউন্টে গ্রহণ করেন, তখন তিনি তাঁর পুরো পারিশ্রমিক পাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হন এবং সন্তানের শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন মেটাতে নিরাপদে অর্থ আলাদা করে রাখতে পারেন। সাতক্ষীরা জেলার একজন কৃষক যখন তাঁর শস্যের বিমা গ্রহণ করেন, তখন বন্যা বা অন্য কোনো দুর্যোগ তাঁর ফসলের খেত নষ্ট করে ফেললেও তিনি তাঁর পরিবারের মঙ্গলের বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেন। দুবাইয়ে কর্মরত একজন নির্মাণশ্রমিক যখন মাত্রাতিরিক্ত ফি প্রদান ব্যতিরেকেই একটি ডিজিটাল অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে কালাইয়ে তাঁর পরিবারের কাছে নিরাপদে অর্থ প্রেরণ করেন, তখন তাঁর কষ্টার্জিত বেতনটি আরও বেশি খাবার, পোশাক-আশাক এবং তাঁর স্বজনের পেছনে ব্যয় করতে পারেন।
আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে বাংলাদেশের নবধারা প্রবর্তনের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য আছে। আধুনিক ক্ষুদ্রঋণের সূতিকাগার হিসেবে বাংলাদেশ যথার্থ ধারণাটি আবিষ্কার করতে সহায়তা করেছিল। বর্তমানে এটি নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে, বিশেষ করে ডিজিটাল আর্থিক পরিষেবাসমূহের মাধ্যমে। গ্রাহকেরা ভরসা রাখেন এবং তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করেন, এমন একটি দরিদ্রবান্ধব আর্থিক ব্যবস্থা কীভাবে তৈরি এবং বণ্টন করতে হয়, তারই একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো সফল মোবাইল আর্থিক পরিষেবা প্রদানকারী, বিকাশ।
তবে আর্থিক পরিষেবাসমূহে প্রবেশাধিকার সম্প্রসারিত করতে বাংলাদেশ আরও কাজ করতে পারে, বিশেষ করে মহিলাদের জন্য। কোনো একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ৩৩ শতাংশ পুরুষের অ্যাকাউন্টের বিপরীতে মাত্র ২৫ শতাংশ মহিলার অ্যাকাউন্ট রয়েছে, যে বৈষম্যটি বিশ্বব্যাপী চ্যালেঞ্জের প্রতিফলন ঘটায়। এই পার্থক্যটুকু কমাতে পারলে তা অবশ্যই লিঙ্গ সমতা অর্জনে সাহায্য করবে, যা হলো দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নের লক্ষ্যগুলোর মধ্যে একটি। তবে, এটি পরিবারের কল্যাণেও সাহায্য করবে। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, যখন কোনো মহিলা গৃহস্থালির আয় নিয়ন্ত্রণ করেন, তখন তিনি এই আয়ের বেশির ভাগ অংশ খাদ্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো পারিবারিক প্রয়োজনে ব্যবহার করে থাকেন।
আমি সানন্দে বলছি যে বাংলাদেশ সরকার আর্থিক অন্তর্ভুক্তির চ্যালেঞ্জসমূহকে সরাসরি মোকাবিলা করছে এবং এমন পরিকল্পনা প্রস্তুত করছে, যা দেশটিকে দরিদ্র মানুষের জন্য আর্থিক প্রবেশাধিকার উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত করার সুযোগ করে দেবে। বর্তমানে দেশটি জাতীয় ব্যাংক মূলনীতির খসড়া প্রস্তুত করছে, যা মোবাইল আর্থিক পরিষেবাগুলোর বাজারকে সুবিন্যস্ত করবে।
জাতীয় আর্থিক অন্তর্ভুক্তির কার্যকৌশল তৈরির বিষয়েও গভীরভাবে ভাবনাচিন্তা করা হচ্ছে। একটি বিধিবদ্ধ কার্যকৌশল তৈরি করা হলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন সম্ভব হয়। বাংলাদেশের একাধিক সরকারি দপ্তর এবং বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার হতে পারে, একটি সুসমন্বিত পরিকল্পনা তৈরি এবং তা বাস্তবায়নে যৌথ প্রতিশ্রুতি আর্থিক অন্তর্ভুক্তির জটিল কাজে বাড়তি গতি সঞ্চার করতে পারে।
পৃথিবীব্যাপী আর্থিক অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্য যে নাগালের মধ্যে রয়েছে তাতে আমার কোনো সন্দেহ নেই। গত তিন বছরে ৭০ কোটি মানুষ আর্থিক প্রবেশাধিকার পেয়েছে, যা হলো ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। এখনো বাইরে থাকা ২০০ কোটি মানুষের কাছে আমরা যেহেতু পৌঁছাতে চাই, তাই বাংলাদেশকে একটি প্রধান দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যেখানে অগ্রগতি একটি বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এখানে যা ঘটবে সেটাই অন্যত্র এই কার্যক্রমের গতিধারা ঠিক করবে।
টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যসমূহ গ্রহণ করার মাধ্যমে সমতা ও স্থায়িত্বের দূরদৃষ্টির প্রতি বিশ্ব নিজেই অঙ্গীকার করেছে, যার জন্য প্রয়োজন হবে কঠোর পরিশ্রম, সহযোগিতা ও অধ্যবসায়। তবে এই লক্ষ্যসমূহ অর্জন করতে হলে আমাদের অগ্রগতির জন্য প্রয়োজন এমন ভিত্তিসমূহকে দ্রুততার সঙ্গে গঠন করতে হবে। ওই সব ভিত্তির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণটি হলো আর্থিক অন্তর্ভুক্তি।
এটি দেখতে পাওয়া খুবই উৎসাহব্যঞ্জক যে বাংলাদেশ এই চ্যালেঞ্জে সাড়া দিয়েছে এবং দরিদ্র মানুষের জন্য আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়টিকে আরও গভীর করে তুলতে পদক্ষেপ নিচ্ছে। তবে জাতিসংঘে ১৯৩টি দেশ উপলব্ধি করেছে যে এভাবেই দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন সাধিত হয়—লক্ষ্য থেকে লক্ষ্যে, ধাপে ধাপে। লাখ লাখ বাংলাদেশির প্রভূত উপকার হতে পারে।

অযোগ্যতাই সংলাপে বসার যোগ্যতা! by- মিজানুর রহমান খান

সংলাপে বসতে বিরোধী দলের প্রস্তাব এবং সরকারি তরফে নাকচ হওয়ায় তেমন বিস্ময় নেই। কারণ, বাংলাদেশের রাজনীতির সংস্কৃতির সঙ্গে এটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু সারা দেশে নাশকতাপূর্ণ জঙ্গিবাদী তৎপরতার প্রেক্ষাপটে বিএনপি চেয়ারপারসনের সর্বশেষ সংলাপের প্রস্তাবের প্রেক্ষাপটে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৮ নভেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সংলাপে বসার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বিএনপি পরিষ্কার করতে পারে যে তারা আগাম নির্বাচন নয়, জঙ্গিবাদ নিয়ে সংলাপ ও জাতীয় ঐক্য চাইছে। সরকারেরও উচিত বিএনপির প্রস্তাবকে ‘টোটাল রাবিশ’ না বলে কেবল জঙ্গিবাদ মোকাবিলার জায়গায় এনে একটা আলাপ-আলোচনার দরজা খোলার সম্ভাব্যতা যাচাই করা। আত্মঘাতী বোমা হামলার উপদ্রব আবার ফিরে এসেছে। লেবাননে আত্মঘাতী বোমা হামলায় ৪৩ ব্যক্তি নিহত হওয়ার পরপরই প্যারিসে সন্ত্রাসী ও আত্মঘাতী বোমা হামলায় প্রাণ হারায় ১৩২ জন। বাংলাদেশে কথিত আইএসের অস্তিত্বের বিষয়টিকে যঁারা মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে এর কার্যক্রম নেই বলে অবিশ্বাস করেছিলেন, প্যারিসের ঘটনা নিশ্চয়ই তঁাদের ভুল ভেঙে দিয়েছে। লেবাননে দুই ও প্যারিসে আটজন আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী নিহত হয়েছে। বাংলাদেশ এর আগে আত্মঘাতী বোমা হামলা প্রত্যক্ষ করেছে। জেএমবির আত্মঘাতী স্কোয়াডের এক ডজনের বেশি সদস্য ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছে। আদালত চত্বরে দুই বিচারক নিহত হয়েছিলেন আত্মঘাতী বোমা হামলাকারীর হামলায়।
এ প্রসঙ্গে গত বছরের বসন্তে পরিচালিত ওয়াশিংটনভিত্তিক পিউ ফাউন্ডেশনের জরিপ স্মরণে আনতে চাই। তারা বলেছে, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার চেয়ে বেশিসংখ্যক বাংলাদেশি (৬৯ ভাগ) ‘ইসলামি জঙ্গিবাদের’ উত্থানে শঙ্কিত। আবার ওই তিন দেশের তুলনায় আল-কায়েদা ও হিজবুল্লাহ বা হামাসের প্রতি সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি (যথাক্রমে ২৩ ও ২৮/২৯ ভাগ) সহানুভূতিশীল। এমনকি আত্মঘাতী বোমা হামলার প্রতি ওই তিনটি দেশসহ মিসর ও লেবাননের মানুষের চেয়েও সর্বাধিক বাংলাদেশি সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। ১৪ ভাগ বাংলাদেশি উত্তরদাতা মনে করেন, আত্মঘাতী হামলার বিষয়টি নিয়মিতই গ্রহণযোগ্য। অন্যদিকে ৩৩ ভাগ মনে করেন, এই পথ মাঝেমধ্যে গ্রহণযোগ্য। এই পরিসংখ্যান অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। যাঁরা এটা নাকচ করবেন, তাঁদের যুক্তি নাকচ না করেও বলব, আমাদের সতর্ক হলে ক্ষতি কী। যখনই এ ধরনের ঘটনা দৃশ্যপটে আসে, তখন আমাদের বিশেষজ্ঞদের মধ্যে একদল স্মরণ করেন যে এসব নাশকতা আসলে পাশ্চাত্যের সৃষ্টি, তারাই দায়ী। তাদের যুক্তির জোর অনেকে হয়তো উড়িয়ে দেবেন না। কিন্তু সবচেয়ে বেশি জোর দিয়ে যা বলব তা হলো, আমাদের যা করণীয় তা আমরা করছি কি না। কারণ, আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র আমরা সব সময় নস্যাৎ কিংবা প্রতিহত করতে পারি না। যেটা পারি এবং অবশ্যই করা উচিত, সেটা হলো নিজেদের সাবধান রাখা।
জঙ্গিবাদ কখনো এ মাটিতে শিকড় গাড়তে পারবে না, ঘন ঘন এই অপরীক্ষিত আপ্তবাক্য উচ্চারণ করলেই জাতীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা মজবুত হওয়ার কথা নয়। যাঁরা বলেন, একমাত্র নতুন সাধারণ নির্বাচন দেওয়ার মধ্যেই এর প্রতিকার, তাঁরা সঠিক নন। যাঁরা বলেন, কেবল অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচন ঠেকিয়ে রাখা বা প্রলম্বিত করার কৌশল গ্রহণটাই সঠিক, তঁারাও সঠিক নন। গণতন্ত্র, রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় জীবনে রাজনৈতিক সমঝোতা যে সংবিধানের মতো লিখিত দলিলের চেয়ে কত বড় ও কার্যকর, বিশ্বের বুকে তার আরেকটি অবিস্মরণীয় নজির স্থাপন করতে যাচ্ছে প্রতিবেশী মিয়ানমার। দেশটির সামরিক নেতারা ও অং সান সু চির মধ্যে বোঝাপড়াটাই সবচেয়ে উজ্জ্বলতম দিক। জেনারেল ইয়াহিয়ার এলএফওর চেয়ে অনেক খারাপ এলএফওর অধীনে সু চি নির্বাচনে গেছেন। এর কারণ বঙ্গবন্ধুর মতো ব্যালটের জোরের ওপর সু চি বেশি নির্ভর করেছিলেন।
সু চি কত বেশি ভোট পেয়ে তাঁর সামরিক প্রতিপক্ষকে নাস্তানাবুদ করতে পারছেন, সেটা গণতন্ত্রের খোলস, আত্মা নয়। যদিও আমাদের সংস্কৃতি অনুযায়ী আমরা কিন্তু গণতন্ত্র কন্যার ভূমিধস বিজয়টাকে বড় করে দেখতে এবং দেখানোর কসরত করছি। আমাদের সঠিক পথ হলো জঙ্গিবাদ নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার মুহূর্তে রাজনৈতিক সমঝোতার প্রয়োজনীয়তাকে স্বীকার করা। অহিংস পন্থায় ধীরেসুস্থে অগ্রসর হওয়া। প্রতিপক্ষের হিংসাশ্রয়ী কর্মসূচির উত্তর হিংসা দিয়েই দেওয়ার যে মহড়া বাংলাদেশে চলছে, তা নিরীহ ও সচেতন মানুষের রক্তক্ষরণকে তীব্র করছে। রাজনৈতিক সমঝোতার কোনো লক্ষণ বাংলাদেশে নেই। এ থেকে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নকে আলাদা করা যাবে না। কিন্তু রাতের অন্ধকারে চোরাগোপ্তা পথে প্রতিপক্ষকে দমন কিংবা আপস কিংবা হালুয়া–রুটি বিতরণ করে মুখ বন্ধ রাখার কিছু লক্ষণ অন্তত আমরা দুঃখ ও হতাশার সঙ্গে অনুধাবন বা অনুমান করতে পারি।
কার্যকর সংলাপ টেবিলে বসে হতেই পারে না, যদি আগেভাগে এর প্রয়োজনীয়তা ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও দলের অভ্যন্তরে স্বীকার করা না হয়। অন্যথায় গতানুগতিকভাবে বিএনপি মনে করতে পারে আওয়ামী লীগ এমনই দল, যার সঙ্গে সংলাপ চলে না। আর আওয়ামী লীগও মনে করতে পারে, বিএনপির সঙ্গে বসা যায় না। এমনকি দুই দলের সমর্থক নাগরিক সমাজও বসতে পারে না। আমাদের মনে হয়, এটা ভাবার সময় এসেছে যে এভাবে হঠাৎ করে কোনো সংলাপ হয় না। আশা করাও হয়তো অসমীচীন। সমাজে এর একটা পরিবেশ থাকতে হয়। উভয় পক্ষ একটি সত্যি উচ্চারণ করেছে, সেটা হলো পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। পরিবেশ গঠন ছাড়াই আমরা কী করে রাষ্ট্রীয় জীবনকে সামনে এগিয়ে নিতে পারি এবং অদূর ভবিষ্যতে এর ফলাফল কী হতে পারে? অনেক বিদগ্ধ জনের মতো সংলাপ ও সমঝোতা বলতে আমি নির্বাচন ও ক্ষমতার পালাবদলকে বুঝতে চাই না।
আইএসের নামে প্যারিসে যে নিন্দনীয় ও বিয়োগান্ত ঘটনা ঘটে গেল, সে বিষয়ে সামনের দিনগুলোতে আমাদের মসজিদ ও মাদ্রাসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আলেম-ওলামাদের সবাই কি গঠনমূলক ধর্মীয় ব্যাখ্যা উপস্থাপন করবেন? আমরা কি মাদ্রাসাশিক্ষা যুগোপযোগী করতে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছি? জিডিপির তুলনায় অন্যান্য সব মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন খরচ যে অনুপাতে বাড়ে, সে তুলনায় ধর্ম মন্ত্রণালয়ে বাড়ে না। বরং সবচেয়ে কম বাড়ে। আন্তধর্ম সংলাপ বিষয়ে একটি নতুন প্রকল্প চালু করা হয়েছিল, কিন্তু তা এক বছর পরে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এখন এটা বোঝার সময় এসেছে যে রাষ্ট্রের এই অপারগতা ও পলায়নপরতা রাজনৈতিক বোঝাপড়ার ঘাটতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। কেউ ঝুঁকি নিতে নারাজ। ‘ইসলামি শক্তি’কে যে যার মতো করে ব্যবহার করতে কারও কোনো অনীহা নেই। রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া মাদ্রাসাশিক্ষার সংস্কার–বিষয়ক সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। ইসলামের শান্তির বাণী যথাযথভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার পথে যত বাধা, তা অপসারণে একটা বৃহত্তর বোঝাপড়া লাগবে। এই মুহূর্তে এটাই সবচেয়ে জরুরি। সরকার এবং বিএনপি-জামায়াত এ বিষয়ে লিখিত খসড়া রূপরেখা দিতে পারে।
লন্ডনে অবস্থানরত খালেদা জিয়া বাংলাদেশে ‘ক্রান্তিকাল’ চলছে দাবি করে ‘দেশ ও জাতির স্বার্থে’ সংকট উত্তরণে সরকার ‘কর্তৃত্ববাদী মনোভাব’ থেকে সরে এসে ‘জাতীয় সংলাপ’ সূচনার পরিবেশ তৈরি করবে বলে এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন। এর অর্থ তিনি কেবলই নির্বাচন চান? সেতুমন্ত্রী সংলাপ-সেতুর নীতিগত ভিত পরোক্ষভাবে হলেও স্বীকার করেছেন। বলেছেন, ‘জাতীয় সংলাপ করতে হলে পরিবেশ দরকার। সেই পরিবেশ কারা নষ্ট করছে?’ এ পর্যন্ত যুক্তিসংগত। কিন্তু এরপরের অংশ গোলমেলে, মেঠো রাজনীতির ভাষা। সেতুমন্ত্রী বলেছেন, ‘তারা লেখক, প্রকাশক, বিদেশি নাগরিক ও পুলিশের ওপর হামলা করছে। তারা রাজনীতিকদের, লেখকদের টার্গেট করেছে। এই পরিবেশ কি সংলাপের পরিবেশ?’ প্রধানমন্ত্রী কিন্তু যোগ্যতার যে শর্ত দিয়েছেন তা সেতুমন্ত্রীর চেয়ে ভিন্ন। প্রধানমন্ত্রী শর্ত সাপেক্ষে প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘কোনো খুনির সঙ্গে সংলাপে বসার ইচ্ছা নেই। তবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে সমর্থন দিলে সংলাপের বিষয়টি তিনি ভেবে দেখবেন।’
তাহলে প্রশ্ন উঠবে, একদিন যখন এই বিচারপর্ব শেষ হবে, এর প্রতি সমর্থন দেওয়া না দেওয়া প্রসঙ্গ হারাবে, সেদিন
কি সংলাপ হবে? এর উত্তর হ্যাঁ ধরে নিতে পারলে আশ্বস্ত হতাম। সংলাপ মানে নতুন নির্বাচন, আর নির্বাচন মানেই বিরোধী দলের সম্পূর্ণ জয়, এই অনুমানও সংলাপ হওয়ার পথে অন্তরায়। সংলাপ না করেই ৫ জানুয়ারির নির্বাচন করা গেছে। এ রকম আরও একটি নির্বাচন করার চেষ্টা হলে তা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণকে আরও শিথিল করে দিতে পারে। আর তখন তা আরও বেশি অবনতিশীলভাবে জঙ্গিবাদকে উসকে দিতে পারে। এখন জঙ্গিবাদকেই মনে হচ্ছে সাংবিধানিক শাসনের পথে বড় হুমকি হয়ে উঠছে।
উদীচী, রমনা বটমূল, ২১ আগস্ট ও ৬৪ জেলায় যখন বোমা ফাটানোর ঘটনা ঘটে, তখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি ছিল না। হোসেনি দালানে হামলার ঘটনা গোষ্ঠীগত সহিংসতা (সেক্টেরিয়ান ভায়োলেন্স) সৃষ্টিরই ইঙ্গিতবহ। শ্রেণি হিসেবে এর আগে বিচারক হত্যার পর এবার পুলিশ হত্যা ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা দেখছি। এখন সরকার যদি সত্যি সন্দেহ করে যে এসবই বিএনপির কাজ, কৌশলগত, তাহলে কিন্তু বিএনপির সঙ্গে এই ইস্যুতে সংলাপে বসার আহ্বান নাকচ করার যুক্তি থাকে না। বরং উল্টোটা হওয়ার কথা, সরকার সংলাপে বসতে চাইছে, ‘জঙ্গি’ বিএনপি নাকচ করছে। উভয়ে উভয়ের প্রতি উচ্চারিত সংজ্ঞায় যোগ্যতা-অযোগ্যতা আমরা খণ্ডন করতে যাব না। কিন্তু এমন একটি প্রশ্ন তো তোলাই যেতে পারে; সরকার যে কারণে বিএনপিকে সংলাপে বসার জন্য ‘অযোগ্য’ বলে মনে করছে, সেই অযোগ্যতাই আসলে তাদের সঙ্গে সংলাপে বসার যোগ্যতা।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷

পাল্টে যাচ্ছে নানা সমীকরণ by- সরাফ আহমেদ

ঐক্য, সহযোগিতা আর শান্তির প্রয়াসে অগ্রগণ্য ভূমিকা রাখার জন্য ২০১২ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন শান্তিতে যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিল, তা নিয়ে নানা ভিন্নমত ছিল। তবে এ মুহূর্তে শান্তির প্রয়াস দূরে থাক, পুরো ইউরোপ মহাদেশ কেমন যেন নেতৃত্ব সংকটে ভুগছে। প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলা সেই নেতৃত্ব সংকটকে আরও প্রকট করেছে। সন্ত্রাসের বদলা নিতে আরও পেশিশক্তি, আরও সন্ত্রাস ও আরও আস্ফালনকেই রক্ষাকবচ হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। ঘটনার পর থেকেই ফ্রান্সের জঙ্গি বিমানগুলো সিিরয়ার রাকাতে উপর্যুপরি বোমা হামলায় মত্ত হয়েছে আর ফ্রান্সের বিমানবাহী রণতরি চ্যালস দ্য গল পূর্ব ভূমধ্যসাগরের দিকে রওনা করেছে।
প্যারিসের সন্ত্রাসী হামলার রেশ এখন ইউরোপজুড়ে, চারদিকে একটা থমথমে ভাব। নানা দেশের সরকারপ্রধানেরা জরুরি সভা করেছেন এবং আপাতকরণীয় বিষয় নিয়ে ভাবছেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ নিজ দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণাসহ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধাবস্থা আর পোপ ফ্রান্সিস বলছেন, এই হামলা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আলামত। কিন্তু কী পন্থায় এই সন্ত্রাসী হামলা রোধ করা যায়, তা নিয়ে দ্বিধায় পড়েছেন ইউরোপীয় রাজনীতিকেরা। এই বৈশ্বিক সংকটের উদ্ভব ও উত্তরণের আসল কথা ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্ষমতাশালী নেতাদের কারও মুখ থেকেই আসছে না বরং কিছু ক্ষমতালোভী ও জনপ্রিয়তানির্ভর রাজনীতিক এই হামলা এবং ইউরোপে আগত শরণার্থীদের নিয়ে ধান্দাবাজির রাজনীতিতে লিপ্ত হয়েছেন। পোল্যান্ডের সদ্য নির্বাচিত রক্ষণশীল সরকার ১৬ নভেম্বর শপথ নিয়েই শরণার্থীদের না গ্রহণ করার ঘোষণাসহ জার্মান সরকারের শরণার্থী নীতির সমালোচনা করেছে।
যে দেশটিকে ঘিরে আপাতসমস্যা, সেই সিরিয়ার সমস্যার মোকাবিলারও একটি রোডম্যাপ তৈরির লক্ষ্যে অনেক আগে থেকেই ১৪ নভেম্বর ভিয়েনাতে জাতিসংঘের উদ্যোগে দ্বিতীয় সিরিয়া সম্মেলনের কথা ছিল। কিন্তু তার আগের দিনই প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলা সম্মেলনে আসা প্রতিনিধিদের এই সমস্যা আরও দ্রুত সমাধানের তাগাদা দিয়ে যায়। ১৭টি দেশ ও সংস্থার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে এবারের সম্মেলনে সিরিয়ায় শান্তি প্রচেষ্টার লক্ষ্যে একটি রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে। মূল লক্ষ্য জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ২০১৬ সালের মাঝামাঝি সরকার ও পশ্চিমা সমর্থনপুষ্ট বিদ্রোহীদের সমন্বয়ে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন এবং তারপর ১৮ মাসের মাথায় একটি নির্বাচনের আয়োজন। তবে এ উদ্যোগের পাশাপাশি আইএস বা ইসলামিক স্টেটের জঙ্গি ও আল নুসরা ফ্রন্টের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযান চলতে থাকবে।
এবার নিয়ে দ্বিতীয়বারের সিরীয় সম্মেলনের নতুন দিক হলো এর আগে জেনেভা সম্মেলনে সিরিয়ার নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বাশার সরকারকে বাইরে রেখে যে শান্তি প্রচেষ্টার কথা ভাবা হয়েছিল, তা থেকে সরে এসে তার সরকারকে নিয়েই সমাধানের পথ খোঁজা হচ্ছে। ধারণা করা হয়, সম্প্রতি সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে বাশার সরকারের পক্ষে রাশিয়ার অংশগ্রহণ করার পর থেকেই জাতিসংঘ এবং পশ্চিমা জোট তাদের বাশারবিরোধী কট্টর নীতি থেকে সরে এসেছে। ভাবার বিষয়, ২০১১ সালে সিরিয়া সরকারের বিরুদ্ধে যখন আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছিল, তখন থেকেই বাশার সরকারকে সরাতে সিরিয়ার বিরোধী দলগুলো ও পশ্চিমারা যদি রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ বিবাদে না জড়িয়ে পড়ত, তাহলে গত প্রায় পাঁচ বছরে সিরিয়ায় আড়াই লাখ মানুষের প্রাণহানি, ৩০ লাখ মানুষকে শরণার্থীর জীবন বরণ করতে হতো না।
ফ্রান্সে আপাতসংকট হয়তো শিগগিরই কাটবে, তবে আগামী ডিসেম্বরে সেখানে অনুষ্ঠেয় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এই সন্ত্রাসী ঘটনার ফায়দা লুটবে অতি জাতীয়তাবাদী বিদেশিবিদ্বেষী মারিন লো পেনের ন্যাশনাল ফ্রন্ট
ভিয়েনার ইম্পরিয়াল হোটেলে সিরিয়ায় শান্তি উদ্যোগের এই আলোচনা যখন চলছিল, তখন সারা বিশ্বের দৃষ্টি প্যারিসের সন্ত্রাসী হামলার দিকে আর ইউরোপের নানা দেশ সন্ত্রাস ঠেকানোর কৌশল নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়েছে। এবারের সন্ত্রাসী হামলার তাণ্ডব দেখে ইউরোপে অনেকেই হতবিহ্বল হয়ে পড়েছেন, নিজেদের অনিরাপদ ভাবছেন। ফ্রান্সের বা অন্যান্য দেশের সরকারগুলো যে এই ধরনের হামলা ঠেকাতে অক্ষম বা হিমশিম খাচ্ছে, তা অনেকেই বুঝতে পারছেন এবং নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। ফ্রান্স, জার্মানি ও ব্রিটেনের মুসলমানদের সংগঠনগুলো প্যারিসের সন্ত্রাসী ঘটনার সঙ্গে ইসলাম ধর্মের কোনো সংস্রব নেই বলে বিবৃতি দিয়েছে এবং বলেছে ইসলামিক স্টেট নামের সংগঠনটি ইসলামের নাম ভাঙিয়ে যে হত্যালীলা চালাচ্ছে, তা ইসলাম ধর্মের পরিপন্থী।
মধ্য জুন থেকে ইউরোপে বিশালসংখ্যক শরণার্থীর আগমনকে কেন্দ্র করে যখন ইউরোপের কিছু রক্ষণশীল দল আর কিছু দেশ তিক্ততা ছড়াচ্ছিল, তখন প্যারিসের ঘটনা তাদের পালে আরও দোলা দিল। জার্মানির ইসলামবিরোধী পেগিডা আন্দোলন বা ফ্রান্সের কট্টরবাদী জ্যঁ পেনের মেয়ে মারিন লো পেনের ন্যাশনাল ফ্রন্ট, সুইডেন ডেমোক্রেটিক পার্টির সভাপতি জিমি আকেশন, বেলজিয়ামের ভ্লামস ব্লকের ফিলিপ ডেভেন্টার, অস্ট্রিয়ার ফ্রিডম পার্টির নেতা হাইনজ ক্রিস্টিয়ান স্টার্খে ও ইতালির লিগা নর্দ দলের উমবের্তো বসি, ব্রিটিশ ন্যাশনাল পার্টি, হাঙ্গেরির জবিক পার্টি ও জার্মানির ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি, যারা সব সময় অভিবাসী বা বিশেষত ইউরোপে বসবাসরত মুসলমান জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কথা বলে, তাদের জন্য প্যারিসের সন্ত্রাসী ঘটনা নতুন সংযোজন।
তবে মূলধারার ইউরোপীয় রাজনীতির বেশ কিছু ব্যক্তিত্ব এর ব্যতিক্রম। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সভাপতি মার্টিন সুলজ এক বিশেষ আবেদনে বলেছেন, প্যারিসের সন্ত্রাসী ঘটনা নিয়ে ইউরোপে বসবাসরত মুসলমান বা সদ্য আগত শরণার্থীদের বা কোনো ধর্ম সম্প্রদায়কে দায়ী করার কোনো সুযোগ নেই। পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, ফ্রান্সে আপাতসংকট হয়তো শিগগিরই কাটবে, তবে আগামী ডিসেম্বরে সেখানে অনুষ্ঠেয় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এই সন্ত্রাসী ঘটনার ফায়দা লুটবে অতি জাতীয়তাবাদী বিদেশিবিদ্বেষী মারিন লো পেনের ন্যাশনাল ফ্রন্ট। আর জার্মানি বা ইউরোপের নানা দেশে যেখানে বিপুলসংখ্যক মুসলমান শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছে, সেসব দেশেও শরণার্থীদের ব্যাপারে কড়াকড়ি আইন ও নজরদারি বাড়বে। ইতিমধ্যে পোল্যান্ড জানিয়েছে, তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রস্তাবমতো শরণার্থী গ্রহণ করবে না আর ইউরোপের সবচেয়ে বেশি শরণার্থী গ্রহণ করা দেশ জার্মানিতে ক্ষমতাসীন জোট সরকারের বেশ কিছু নেতা শরণার্থী বিষয়ে কড়াকড়ি আইন করার কথা বলছেন।
প্যারিসের হামলা ইউরোপীয় রাজনীতির অনেক সমীকরণকে পাল্টে দিচ্ছে, সামনে বিষয়গুলো আরও পরিষ্কার হবে।
সরাফ আহমেদ: প্রথম আলোর জার্মানি প্রতিনিধি।

সন্ত্রাসের চক্রে জড়িয়ে পড়া কার স্বার্থে? by-আবুল মোমেন

একটি সন্ত্রাসী হামলা পাল্টা সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কাই তৈরি করে। প্রতিটি সন্ত্রাসের ঘটনা নৃশংসতার প্রবণতা আরও বাড়িয়ে দেয়। সন্ত্রাস আরও সন্ত্রাস, নৃশংসতা আরও নৃশংসতার জন্ম দেয়। প্যারিসে গত শুক্রবার রাতের নৃশংস সন্ত্রাসের পরপর ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় ‘নৃশংস প্রতিশোধের’ প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, আগামী ডিসেম্বরে অনুষ্ঠেয় ফ্রান্সের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এই হামলা থেকে রাজনৈতিক ফায়দা লুটবে উগ্র জাতীয়তাবাদী বিদেশিবিদ্বেষী মারিন লো পেনের ন্যাশনাল ফ্রন্ট। প্রতিশোধেরই প্রতিজ্ঞা থেকে আইএস আত্মঘাতের মাধ্যমে পশ্চিমের সাংস্কৃতিক রাজধানী প্যারিসে হামলা চালিয়েছে। প্রতিশোধ ও জিঘাংসা প্রতিশোধ ও জিঘাংসারই জন্ম দিয়েছে। যুদ্ধের মাধ্যমে যুদ্ধ থামানো যায় না—এই উপলব্ধি থেকেই দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সমাপ্তির পর বিজ্ঞানী আইনস্টাইন বলেছিলেন, যুদ্ধকে জয় করা গেছে, শান্তিকে নয়। তাঁর বাণী সত্য হয়েছে। বলা হয়ে থাকে, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরবর্তী ৫০ বছরে সারা বিশ্বে ছোটখাটো যুদ্ধে মহাযুদ্ধের চেয়েও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে।
তারপরও এ কথা মনে রাখতে হবে, হিংসা বা সন্ত্রাস কখনো ঐক্যের ভিত্তি হতে পারে না। ফলে মুসলিম বিশ্ব, বিশেষত আরবের দেশগুলো তাদের অনৈক্য ও বিভেদের পথেই চলবে। কিন্তু আক্রান্তরা মতপার্থক্য ভুলে সব সময়ই দ্রুত ঐক্যবদ্ধ হয়। বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না, পশ্চিম দ্রুত বৃহত্তর কার্যকর ঐক্য গড়ে তুলবে এবং প্রতিপক্ষের ওপর দ্বিগুণ শক্তিতে ঝাঁপিয়ে পড়বে। প্রশ্ন হলো, তখন তাদের বিশ্বস্ত বান্ধব সৌদি রাজতন্ত্র কি পক্ষ বদল করবে? উত্তরটা আমাদের জানা আছে।
বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, সমাজে হানাহানি, বিভ্রান্তি ও অশান্তি যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে চলতে থাকে, তখনই শান্তির বাণী নিয়ে নানান ধর্মের আবির্ভাব ও বিভিন্ন ভাবান্দোলনের সূচনা হয়েছে। ইসলাম এ রকমই এক অরাজক অবস্থায় নাজিল হয়েছে—এ কথা বিশেষভাবে বলা হয়ে থাকে। ধর্মের তাৎপর্য এবং সাফল্য নির্ভর করে মানুষের মধ্যে শান্তি, সমঝোতা ও সম্প্রীতির বাতাবরণ তৈরির সামর্থ্যের ওপর। দুর্ভাগ্যের বিষয়, ধর্মের নামেই পৃথিবীতে হানাহানি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। ঐতিহাসিকেরা বলেন, রাজ্য জয় বা রাজনৈতিক কারণে যত যুদ্ধ ও প্রাণহানি ঘটেছে, তার চেয়ে বেশি হয়েছে ধর্মের নামে। কেন এমনটা ঘটেছে বা ঘটে থাকে, তা ঘটনাগুলো তলিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে।
বিশ্বের বড় সব ধর্মই বিস্তার লাভ করেছে শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে। ইসলামের প্রথম যুগে মুসলিম সমাজে খলিফাই ছিলেন শাসক। আদি খ্রিষ্টান সমাজে কিছুকাল রাজা ও ধর্মগুরু একই ব্যক্তি হলেও, রাজার পাশাপাশি পোপ এবং শক্তিশালী যাজক সম্প্রদায়ের উত্থান হলেও ফরাসি বিপ্লবের পরে রাষ্ট্র ও চার্চ পৃথক হয়ে যায়। কিন্তু কেবল রাজ্য বিস্তারের মাধ্যমেই তো ধর্মের বিস্তার ঘটেনি, খ্রিষ্টানদের যেমন মিশনারি, মুসলমানদের তেমনি পীর-দরবেশ, জ্ঞানী-গুণী, ফকির-সাধুদের মাধ্যমে ধর্ম নতুন নতুন দেশ ও সমাজে বিস্তৃতি লাভ করেছে। এটি শাসকদের জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছিল। আব্বাসীয় খলিফাদের আমল পর্যন্ত বৃহত্তর পারস্য সাম্রাজ্য, ভারতবর্ষ, উত্তর আফ্রিকা ও স্পেনে ইসলামের বিস্তার ঘটেছে। এ সময়ে আরবি ও ফারসি ভাষার মাধ্যমে ইসলামি মনীষার ব্যাপক প্রসার ঘটেছিল। আন্দালুসিয়ার মুসলিম মনীষীরা ল্যাটিন ও গ্রিক ভাষা শিখেছিলেন এবং প্রাচীন গ্রিক ও রোমান জ্ঞানভান্ডার থেকে বহু মূল্যবান বই অনুবাদ করেছিলেন। মুসলিম দার্শনিক, বিজ্ঞানী, কবি-সাহিত্যিক ও শিল্পীদের তখন বিশ্বজয়ী অবস্থান।
প্রাচীন গ্রিক, রোমান ও পারস্যের সমৃদ্ধ সভ্যতা ও সংস্কৃতির মূল্যবান অনেক কিছুই আত্তীকরণের মাধ্যমে মুসলিম সভ্যতার অবিস্মরণীয় অগ্রগতি ঘটেছিল। এর ফলে সমঝোতা, সমন্বয় ও গভীর প্রজ্ঞার পথ খুলে গিয়েছিল। মনে রাখা দরকার, প্রাচীন পারস্য সভ্যতা কেবল বর্তমান ইরানে সীমাবদ্ধ ছিল না, তার বিস্তার ছিল মধ্য এশিয়া পর্যন্ত, প্রভাব ছিল আরও ব্যাপক। ইসলামের প্রভাব এই সভ্যতা ও সংস্কৃতির ভেতর থেকে কেবল মরমি সুফিবাদ নয়, জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখায় অসামান্য সব অবদান সৃষ্টি করেছে। পারস্য থেকে মরক্কো হয়ে স্পেন অবধি বিস্তৃত ছিল সম্পন্ন মুসলিম সভ্যতা, যার অবদানই ইউরোপীয় রেনেসাঁস ও এনলাইটেনমেন্ট বা আলোকায়নের পেছনে বড় ভূমিকা পালন করেছে।
মুসলিমদের এই সমৃদ্ধ সভ্যতা ও সংস্কৃতিকেই মধ্য এশিয়া থেকে মোগলরা ভারতবর্ষে নিয়ে এসেছিল এবং এর প্রভাবে সমৃদ্ধ প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতায় ও সংস্কৃতিতে স্থায়ী রূপান্তর ঘটেছে। এই অবদান ও এই সত্য কেউই অস্বীকার করতে পারবে না। নরেন্দ্র মোদি বা তাঁর দলবল যতই ‘ঘর ওয়াপসির’ ধুয়া তুলুক, তাতে ভারতীয় সংস্কৃতি থেকে মুসলিম প্রভাব মুছে ফেলা যাবে না।
বিশুদ্ধতাবাদীরা আদি ইসলামের কথা বলে ইতিহাসকে—অর্থাৎ ইসলামের অগ্রযাত্রার ইতিহাসকেই—অস্বীকার করতে চাইছেন। ইতিহাসের যাত্রাপথ একরৈখিক নয়, মসৃণ নয়। বারবার কঠিন সব চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়েছে, সেসব মোকাবিলা করে তবেই এগোতে হয়। লক্ষ করব, শাসকদের দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতার সহযোগিতায় ইসলামি বিশ্বের—তীর্থ ঠিক থাকলেও—রাজধানী বা জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র বদল হয়েছে। মদিনা, দামেস্ক, বাগদাদ, কর্দোভায় তা স্থানান্তরিত হয়েছে। অটোমান সাম্রাজ্যে ইস্তাম্বুলই ছিল কেন্দ্র, যদিও তখন বৃহত্তর পারস্যে অনেক উপকেন্দ্র ছাড়াও ভারতবর্ষে মুসলিম সমাজের সমৃদ্ধি ও অবদান বাড়ছিল। এসবই তো মুসলমানদের কীর্তি, এসবকে অস্বীকার করলে কি মুসলিম সভ্যতার ইতিহাসই অস্বীকার করা হয় না? কিংবা তাতে মুসলমানদের গৌরব বাড়ে, না দৈন্য বাড়ে?
নিরস্ত্র মানুষকে গলায় ছুরি চালিয়ে হত্যা করা যেমন, তেমনি ড্রোন হামলা চালিয়ে বাছবিচারহীন হত্যাকাণ্ডও নিকৃষ্ট অপরাধ। কিন্তু আরব জনগণ কি নিজেদের দেশে পশ্চিমের তাঁবেদার শাসকদের টিকিয়ে রেখে তাদের সহযোগিতা করছে না?
দীনতার অহংকারের দাপটের কথা রবীন্দ্রনাথ বলেছেন। চিত্তের দৈন্য যেমন, আত্মিক দৈন্যও তেমনি ভয়াবহ—ভয়ংকর এর পরিণতি, কারণ এটা প্রায়ই আত্মঘাতী পরিণতির তোয়াক্কা করে না। আত্মঘাতী হওয়াটা ইসলামসম্মত নয় জেনেও যাঁরা তরুণদের আত্মঘাতী হওয়ার প্রেরণা দিচ্ছেন, তাঁরা কাদের অস্বীকার করছেন? আল্লামা রুমি, আবদুল কাদের জিলানি (রা.), খাজা মঈনুদ্দীন চিশতি (রা.) কিংবা ইবনে সিনা, ইবনে খালদুন, আল বিরুনি—এসব দার্শনিক, সুফিসাধক ও বিজ্ঞানীদের কি অস্বীকার করতে হবে? হাফিজ, ফেরদৌসী, খৈয়ামের মতো মহাকবিদের? কিংবা নজরুলকে? একেই বলে অন্ধতা, ধর্মান্ধতা।
পশ্চিমের স্বার্থবুদ্ধির কূটচালগুলো যেমন মতান্ধবিলাসী শাসকেরা—যেমন সৌদি বাদশাহ—বুঝতে অপারগ, তেমনি বুঝতে পারে না ধর্মান্ধ আত্মঘাতী মানুষ, যেমন আইএস। অথচ পশ্চিম বারবার প্রাচ্য ও আফ্রিকাকে পর্যুদস্ত করতে পারছে, তার কারণ ক্রুসেড যুদ্ধে পরাজয়ের পর মুসলমানরা যখন দিশেহারা, তখন তাদেরই মনীষীদের চর্চিত জ্ঞান ও বিজ্ঞানের সহায়তায় পশ্চিম এগিয়ে গেছে। প্রাচীন ভারতের হিন্দু জ্ঞান ও বিজ্ঞান একসময় সবচেয়ে এগিয়ে ছিল, তাদের গতি থামার পেছনে ধর্মান্ধতা বড় কারণ। তারপর চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত মুসলিম মনীষীরা জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় সবচেয়ে অগ্রসর ছিলেন, কিন্তু তারও যে গতি রুদ্ধ হলো, তার পেছনে যত কারণই থাক, তা কাটিয়ে উঠতে না পারার কারণ কিন্তু ধর্মান্ধতা।
ধর্ম কি পিছুটান হয়েই থাকবে? পেছনে যাওয়ার প্রেরণা দেবে, না সামনে এগিয়ে চলার? আত্মঘাতী হয়ে সামনে এগোনো যায় না, হয়তো প্রতিশোধ নেওয়া যায়, জিঘাংসা চরিতার্থ করা যায়। কিন্তু তাতে জড়িয়ে পড়তে হয় হিংসা-সন্ত্রাসের ক্রমবর্ধমান বিষাক্ত এক চক্রে। এই পরিণতিকে সুফল বলব না বলব হিংসার খেসারত?
আরব বিশ্বের প্রতি পশ্চিম অবশ্যই অবিচার করছে। নিরস্ত্র মানুষকে গলায় ছুরি চালিয়ে হত্যা করা যেমন, তেমনি ড্রোন হামলা চালিয়ে বাছবিচারহীন হত্যাকাণ্ডও নিকৃষ্ট অপরাধ। কিন্তু আরব জনগণ কি নিজেদের দেশে পশ্চিমের তাঁবেদার শাসকদের টিকিয়ে রেখে তাদের সহযোগিতা করছে না? অথবা অন্য কথায়, নিজেদের প্রতি একই অবিচার করছে না? নিজের দুর্বলতা রেখে কোনো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেই বিজয়ী হওয়া যায় না। নিজেদের দেশে দেশে শক্তিশালী বিভীষণদের ক্ষমতায় বসিয়ে রেখে প্যারিস বা বার্লিনে, নিউইয়র্ক বা ক্যানবেরায় রক্তবন্যা বইয়ে দেওয়া যাবে, কিন্তু তাতে পরিস্থিতি পাল্টাবে না। দেশে দেশে মুসলিম সমাজ আরও বিভ্রান্ত হবে, হয়তো হানাহানিতে, ভ্রাতৃঘাতী ও আত্মঘাতী সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে। এ মর্মান্তিক পরিণতি হয়তো পশ্চিমের জন্য তামাশার বেশি হবে না।
ইসলামের গৌরব অনুভব করতে হবে, গৌরবময় ইতিহাস উপলব্ধি করতে হবে। তেমনি ধর্ম-বর্ণ-অঞ্চলনির্বিশেষে মানবসভ্যতার অর্জনগুলোর উত্তরাধিকার স্বীকার করতে হবে। সত্যকে বাস্তব থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখলে বাস্তবকে পাল্টানোর কাজে সফল হওয়া যায় না। অন্ধতা সত্য ও বাস্তব, দুটিরই উপলব্ধির পথ বন্ধ করে দেয়, অনুভূতি দেয় ভোঁতা করে, এবং মানুষের মানবিক সত্তাকে দুর্বল করে দেয়। অমানবিকতা নয়, মনুষ্যত্বের পথ ধর্মের। এ নিয়ে বিভ্রান্ত হওয়া কি মানুষের শোভা পায়?
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।

স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে সরকারে অস্থিরতা by- সোহরাব হাসান

স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোর নির্বাচন নিয়ে সাম্প্রতিককালে সরকার যেভাবে পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তাতে বিষয়টি নিয়ে সরকারের মধ্যে বেশ অস্থিরতা লক্ষ করা যাচ্ছে।
মাস খানেক আগে কথা নেই, বার্তা নেই সরকার হঠাৎ করেই ধনুর্ভঙ্গ পণ করে দেশবাসীকে জানিয়ে দিল, এখন থেকে সব স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচন দলীয়ভাবে হবে। এ ব্যাপারে তারা বিশেষজ্ঞ, সাংসদ, রাজনৈতিক দল—কারও সঙ্গেই আলোচনার প্রয়োজন বোধ করল না। আর সব বিষয়ে যেমনটি হয়ে থাকে, ওয়েস্টমিনস্টার সিস্টেমের দোহাই পাড়তে গিয়ে নীতিনির্ধারকেরা ভারতের ও যুক্তরাজ্যের উদাহরণ দিলেন। সেখানে দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচন হতে পারলে বাংলাদেশে হতে দোষ কী?
না, দোষ নেই। কিন্তু এ রকম একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন ছিল। দলীয়ভাবে নির্বাচন করতে হলে কী কী সমস্যায় পড়তে হতে পারে, সেগুলো আমলে নেওয়া জরুরি ছিল। কিন্তু সেসব না করে একদিন সকালে সরকার দেশবাসীকে জানিয়ে দিল, এখন থেকে সব স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচন দলীয়ভাবে হবে। যথা আজ্ঞা। এমনকি সরকার জাতীয় সংসদের অধিবেশন পর্যন্ত অপেক্ষা না করে রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে একটি অধ্যাদেশও জারি করিয়ে নিল।
আর অমাদের ‘জি হুজুর মার্কা’ নির্বাচন কমিশন সোৎসাহে বলে উঠল, কোনো অসুবিধা নেই। সরকার চাইলে তারা দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচন সুসম্পন্ন করতে প্রস্তুত আছে। আমাদের এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি এতই স্বাধীন যে, সরকারের আইন মন্ত্রণালয় যেখানে বলেছে স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচনে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী কিংবা তাঁদের পদমর্যাদার কেউ প্রচারে অংশ নেওয়া ঠিক হবে না, তারা বলে দিল অসুবিধা নেই। একে বলে ‘পোপের চেয়েও বেশি খ্রিষ্টান’। নির্বাচন কমিশন এখনো বলে যাচ্ছে, কুচ পরোয়া নেই। সরকার চাইলেই দলীয়ভাবে পৌরসভা নির্বাচনটি তারা করে দিতে পারবে এবং ডিসেম্বরেই। তবে তারা যে কথাটি বলেনি তা হলো, সেই নির্বাচনটি ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনের মতো হবে, না ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মতো। দুটোই করেছে নির্বাচন কমিশন।
দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচন করা দোষের কিছু নয়। কিন্তু সে জন্য কিছুটা প্রস্তুতির প্রয়োজন। এখন দেখা যাচ্ছে, ক্ষমতাসীনেরা যে দলীয় নেতা-কর্মীদের কথা মাথায় রেখে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে করার সিদ্ধান্ত নিল, তাঁরাই এতে সায় দিতে পারছেন না। আলোচনাকালে একটি বৃহৎ পৌরসভার বর্তমান মেয়র, যিনি আওয়ামী লীগের, তিনি জানান, গত পাঁচ বছর পৌরবাসীর জন্য কাজ করেছি। নির্দলীয় নির্বাচন হলে দলমত-নির্বিশেষে সবার ভোট পেতাম। কিন্তু এখন আর সেটি পাওয়া যাবে না। ক্ষমতাসীন দলের জন্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে করার প্রধান সমস্যা হলো, দলের সব বদনাম ও ব্যর্থতার দায়ভারও সরকার-সমর্থক প্রার্থীকে নিতে হবে। শত ভালো প্রার্থী হলেও তাঁকে জিতিয়ে আনা কঠিন হবে।
কিন্তু সাংসদেরা চান না, দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হোক। কারণ, তাঁরা চান না, তাঁদের ওপর কেউ খবরদারি করুক। তাঁরা যেহেতু দলীয়ভাবে নির্বাচিত হয়ে প্রশাসনের ওপর এককভাবে ছড়ি ঘোরাচ্ছেন, অন্য কাউকে সেই সুযোগ দিতে চান না।
সাংসদদের আপত্তির মুখে সরকার বলল, ভয় নেই। এই ব্যবস্থা কেবল পৌরসভা নির্বাচনের জন্য। অন্যান্য স্থানীয় সরকার সংস্থা নিয়ে সিদ্ধান্ত পরে হবে। একপর্যায়ে সাংসদদের চাপে প্রস্তাবিত আইনটি থেকে জেলা পরিষদ বাদ দেওয়া হলো। স্বাধীনতার পর সামরিক-বেসামরিক কোনো সরকারই জেলা পরিষদের নির্বাচন করেনি। বর্তমান সরকার অনির্বাচিত দলীয় লোকদের প্রশাসক নিয়োগ করে জেলা পরিষদ চালাচ্ছে। এ ব্যাপারে সাংসদদের ভয় হলো, একটি জেলায় ২ থেকে ১২-১৪টি সংসদীয় নির্বাচনী এলাকা আছে। নির্বাচিত জেলা পরিষদ সাংসদদের ওপর কর্তৃত্ব করবে।
সাংসদ জেলা ও উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা হলেও পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনে এ রকম কোনো বিধান নেই। আইনগতভাবে তারা সাংসদের খবরদারিমুক্ত। তদুপরি দলীয়ভাবে নির্বাচিত হলে তাদের কর্তৃত্ব আরও কমে যাবে। দুজনেই দলের টিকিট পাওয়া, কেউ কারও অধীনতা মানবেন না।
সরকার দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচন করে যে বাড়তি সুবিধা নিতে চেয়েছিল, এখন মনে হচ্ছে সেটি বুমেরাং হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
প্রথম আলোর খবর থেকে আমরা জানতে পারি, গত ১২ অক্টোবর মন্ত্রিসভা ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, উপজেলা ও জেলা পরিষদের নির্বাচন দলীয় প্রতীকে করার প্রস্তাব অনুমোদন করে। পৌরসভা নির্বাচন আসন্ন বিধায় এর আইনটি সংশোধন করে অধ্যাদেশ আকারে জারির সিদ্ধান্ত হয়। তিন সপ্তাহ ধরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও আইন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম শেষে ২ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি ওই অধ্যাদেশ অনুমোদন করেন । এত কিছুর পর সরকার হঠাৎ নতুন করে সিদ্ধান্ত নেয়, পৌরসভা অধ্যাদেশ নয়, আইন হবে। সেই অনুযায়ী স্থানীয় সরকারের বাকি চারটি সংশোধিত আইনের সঙ্গে পৌর আইনটি বিল আকারে সংসদে উত্থাপন করা হয়। পৌরসভা নির্বাচন আসন্ন হওয়ায় আইনের বদলে অধ্যাদেশ করার বিষয়ে মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত নিয়ে তা রাষ্ট্রপতির অনুমোদন নেওয়ার পর সেখান থেকে পিছিয়ে আসার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত আইনের খসড়ায় স্থানীয় সরকারের সব স্তরে দলীয়ভাবে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার কথা বলা হয়। এর এক মাসের মাথায় সেখান থেকে পিছিয়ে আসে সরকার। এখন কিছুটা দলীয়, কিছুটা নির্দলীয় পন্থায় নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়ায় তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
একই পরিষদে কিছুটা দলীয়, কিছুটা নির্দলীয় ব্যবস্থা সোনার পাথরবাটির মতো। এই দোদুল্যমানতা থেকে বেরিয়ে এসে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আসলে তারা স্থানীয় সরকার সংস্থার স্বতন্ত্র অবস্থান চায় কি না। এই প্রশ্নের উত্তর ‘হ্যাঁ’ হলে স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোর ওপর সাংসদদের খবরদারি কমাতেই হবে। আর ‘না’ হলে ভবিষ্যতে স্থানীয় সরকার বলে ‘কাজির গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই’ অবস্থা হবে। সেটি কেবল জনগণের ক্ষমতায়নের বিরোধী নয়, বাংলাদেশের সংবিধানেরও পরিপন্থী।

না দেখার, না শোনার, না বলার বিপদ! by-শিশির ভট্টাচার্য্য

গর্তে পড়া এক শিয়ালের রক্ত শুষে খাচ্ছিল শত শত জোঁক। জোঁকগুলো সরিয়ে দিতে গেলে শিয়াল উপচিকীর্ষু ব্যক্তিকে বাধা দিয়ে বলেছিল: ‘দোহাই, এই অপকারটুকু আমার করবেন না! পেট ভরে গেছে বলে জোঁকগুলো আর নতুন করে রক্ত পান করছে না। এগুলোকে সরিয়ে দিলে নতুন সব জোঁক এসে আমার বাকি রক্ত শুষে নেবে!’ ‘আরব বসন্ত নামে পরিচিত মার্কিন-ইউরোপীয় প্রকল্পে সাদ্দাম-গাদ্দাফি উৎখাত হওয়ার পর থেকে ইশপের গল্পের এই শিয়ালের দুরবস্থায় পড়েছে ইরাক-লিবিয়ার অসহায় জনগণ।
ইরাকে ‘শান্তি’ স্থাপনের পর মার্কিন বাহিনী যখন স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে, তখন বহু অস্ত্রশস্ত্র, যন্ত্রপাতি, গাড়িবহর তারা নাকি ইরাকে ফেলে আসে ইচ্ছা করেই, যাতে আইএস সেগুলো ব্যবহার করতে পারে। কীভাবে, কার অঙ্গুলি হেলনে শত শত মুসলিম তরুণ ইউরোপ-আমেরিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে জঙ্গি হয়ে গিয়েছিল? এই প্রশ্নগুলো উঠছে। মার্কিন গণমাধ্যমে ইদানীং আর এ নিয়ে কোনো ঢাক ঢাক গুড় গুড় নেই। প্রকাশ্যে বলা হচ্ছে, তালেবান আর আইএস মার্কিন সরকারের সৃষ্টি। লাখ লাখ ÿঅসহায়, নিরপরাধ মানুষকে হত্যা এবং বহু শতকোটি ডলারের সম্পদ ধ্বংসের পর ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারও সম্প্রতি স্বীকার করেছেন: ‘ইরাক আক্রমণ ভুল ছিল।’
পাশ্চাত্য বিদেশনীতির সর্বশেষ মানসপুত্র আইএসকে খতম করতে ইঙ্গো-মার্কিন-ফরাসি সরকার বদ্ধপরিকর। সাদ্দাম-তালেবান কাহিনির করুণ পুনরাবৃত্তি: প্রথমে নিজের স্বার্থে ব্যবহার, প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে সংহার। তালেবান সংহার চলছে আড়াই দশক ধরে। আগামী ৩০ বছরেও নাকি আইএস সংহার সমাপ্ত হবে না। সিরিয়া-ইরাক-আফগানিস্তানে যখন জঙ্গি নিধনের উদ্দেশ্যে বিমান থেকে বোমা নিক্ষেপ করা হয়, তখন নিরপরাধ নাগরিকেরা কি রক্ষা পায়? পাশ্চাত্যের বেশির ভাগ বুদ্ধিজীবী এ প্রশ্নের উত্তর জানতে আগ্রহী বলে মনে হয় না। সুতরাং আরও অনেক দিন তথাকথিত সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ চলবে সেই ইঙ্গো-মার্কিন-ফরাসি দেশের নিরপরাধ জনগণের ট্যাক্সের টাকায়, যাদের মাথা বহু দিন ধরে সন্ত্রাসের গিলোটিনের নিচে আটকে আছে।
ধর্ম নয়, যুদ্ধ বা সন্ত্রাসের প্রকৃত নিয়ামক রাজনীতির রাংতায় মোড়ানো অর্থনীতি। পুঁজিবাদী অর্থনীতি কিছুদিন পরপর মন্দার কবলে পড়ে। এর অন্যতম চটজলদি সমাধান, বিশ্বের কোথাও, কোনো অজুহাতে যুদ্ধ লাগিয়ে দেওয়া। যুদ্ধ একবার শুরু হলে অস্ত্র, পোশাক, খাবার, ওষুধ থেকে শুরু করে টয়লেট পেপার পর্যন্ত বহু বিচিত্র জিনিস সরবরাহ করতে হয় হাজার হাজার সেনার জন্য। ফলে কর্মসংস্থান হয়, পুঁজির পরিমাণ ও বিনিয়োগ বেড়ে গিয়ে অর্থনীতির মন্দাভাব কেটে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আণবিক বোমায় বিধ্বস্ত জাপানের অর্থনীতি কোরিয়ার যুদ্ধের রসদ সরবরাহ করে এক দশকের মধ্যেই ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যে একের পর এক যুদ্ধের কারণেই মার্কিন ডলার আর ইউরোর দাম কমবেশি স্থির রয়েছে। বাংলাদেশের কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করার পেছনে ডলার-ইউরোর দামের একটা ভূমিকা আছে।
হাতির দুটি মাত্র দাঁত বাইরে থেকে দেখা যায়। বাকি সব দাঁত ভেতরে থাকে এবং চিবানোর মূল কাজটা সেখানেই হয়। আশির দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে যখন ইরানের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ চলছিল, তখন রিগান সরকার গোপনে ইরানের কাছে অস্ত্র বিক্রি করেছিল। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন সম্প্রতি বলেছেন, কমবেশি ৪০টি দেশের সঙ্গে আইএসের লেনদেন রয়েছে। শুধু প্রত্নসম্পদ, জ্বালানি তেল বিক্রি করেই আইএসের দৈনিক আয় নাকি কয়েক মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
আলেক্সান্ডার, নেপোলিয়ন, ক্রুসেড যোদ্ধাদের একসময় কষ্ট করে আরব দেশে আসতে হয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যের সম্পদ লুট করার জন্য। এখন আরবরা নিজেরাই নিজেদের সম্পদ লুট করে তুলে দিচ্ছে পাশ্চাত্যের হাতে। শুধু কি পশ্চিমারা? প্রতিদিন আইএসের কাছ থেকে তেল কিনছে না আসাদের সরকার? আফগানিস্তানে তালেবানরা কিসের বিনিময়ে আধুনিক অস্ত্র সংগ্রহ করত? ড্রাগ আর প্রত্নসম্পদ ছাড়া মূল্যবান কীই-বা ছিল আফগানিস্তানে? সেই ড্রাগ ইউরোপ-আমেরিকায় পাচার হয়ে সেখানকার তরুণদের অধঃপতন ও মৃত্যুর কারণ হয়েছে। পাচার করা প্রত্নসম্পদ কোনো একদিন প্রদর্শিত হবে পাশ্চাত্যের মিউজিয়ামে। আরব-আফগানদের উত্তর-পুরুষেরা নিজেদের গাঁটের পয়সা খরচ করে সেগুলো দেখতে যাবে।
প্যারিসের সাম্প্রতিক ভয়াবহ সন্ত্রাস, ইরাক-সিরিয়ার ধ্বংসযজ্ঞের মতো পৌনঃপুনিক অপঘাত থেকে সাধারণ মানুষ কি তাহলে কখনোই মুক্তি পাবে না? ফরাসি রাষ্ট্রচিন্তাবিদ মোঁতেস্কিও বলেছিলেন: ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার হলো জনগণের কাছে গচ্ছিত রাখা বন্ধকি মাল। সরকার পৃথিবীর তাবৎ জিনিসের মতোই। সরকারকে যদি আগলে রাখতে চাও, তবে প্রথমে সরকারকে ভালোবাসতে হবে।’ সরকারকে আমরা অবশ্যই ভালোবাসব, ভালোবেসে ট্যাক্সও দেব তার হাতখরচের জন্য, কিন্তু এতেই সরকারের প্রতি জনগণের কর্তব্য শেষ হয়ে যাবে না। জনগণকে প্রতিনিয়ত খেয়াল রাখতে হবে, সরকার ঐশীর মতো বখে যাচ্ছে কি না।
বাবা-মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন হলে, হাতে অফুরন্ত কাঁচা পয়সা পেলে সন্তান বখে যায়। জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন হলে, হাতে অবাধ কাঁচা ক্ষমতা পেলে বখে যায় সরকার। সাদ্দাম-গাদ্দাফির মতো স্বৈরাচারী শাসকেরা যদি জনবিচ্ছিন্ন না হয়ে পড়তেন, ক্ষমতার অপব্যবহার না করতেন, তবে তাঁদের নিজেদের, দেশের জনগণের ভবিতব্য অন্য রকম হতে পারত। ইঙ্গো-মার্কিন-ফরাসি-সৌদি জনগণ যদি তাদের সরকারের বিদেশনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারত, নিজ নিজ সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারত, তবে সাম্প্রতিক কালের অধিকাংশ বিপর্যয়, লোকক্ষয় সম্ভবত এড়ানো যেত।
মহাত্মা গান্ধীর তিন বানরের মতো ‘কিছু না দেখার, না বলার, না শোনার’ (অথবা, ভাড়াটে বুদ্ধিজীবীদের ক্ষেত্রে, সবকিছুকেই আরোপিত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার) এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক অপসংস্কৃতির সৃষ্টি হয়েছে গত কয়েক দশকে, এ দেশে এবং বিদেশে। ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর কখনো নির্লিপ্ত, কখনো ধান্দাবাজ আচরণের পেছনে আছে হয় শঙ্কা, নয়তো লোভ অথবা একসঙ্গে দুটোই। এই আচরণ ও অপসংস্কৃতি ইদানীংকালের বেশির ভাগ মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয়ের অন্যতম অনুঘটক কি না, তা ভেবে দেখার সময় এসেছে।
শিশির ভট্টাচার্য্য: অধ্যাপক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ক্ষমা করবেন, আনিস স্যার’by- সোহরাব হাসান

ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান আমাদের, আমাদের আগের ও পরের কয়েক প্রজন্মের শিক্ষক। তিনি এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেন। যদি না-ও নিতেন, তিনি শিক্ষকই থাকতেন। তিনি কেবল শিক্ষার্থীদের শিক্ষক নন, শিক্ষার্থীদের যাঁরা শিক্ষক, তাঁদেরও শিক্ষক। বাংলাদেশে যাঁরা শুভবোধ ও চিন্তাকে এগিয়ে নেন, যাঁরা সত্যিকার শিক্ষা, জ্ঞান ও রুচির সাধনা করেন, তাঁদের সবার প্রিয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। শিক্ষা ও কর্মজীবনে যাঁরা এই মহান শিক্ষকের সান্নিধ্যে এসেছেন, তাঁর কাছ থেকে তাঁরা কিছু না কিছু পেয়েছেন। যে নির্মোহ ও উদার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তিনি বাংলাদেশের সমাজকে পর্যবেক্ষণ করেছেন, এখনো করছেন, তার সমান্তরাল উদাহরণ নেই বললেই চলে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক হয়েও তিনি বেশি কাজ করেছেন বাংলাদেশের সমাজ নিয়ে।
মাত্র ২২ বছর বয়সে লেখা আনিসুজ্জামানের প্রথম বই মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য গবেষণা সাহিত্যে অনন্য উদাহরণ হয়ে আছে। তাঁর আরেকটি মূল্যবান গ্রন্থ পুরোনো বাংলা গদ্য। এর আগে ভাবা হতো, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির হাত ধরে বাংলা গদ্যের উদ্ভব। কিন্তু তিনি ব্রিটিশ লাইব্রেরির দলিল-দস্তাবেজ ঘেঁটে প্রমাণ করেন যে ঔপনিবেশিক শক্তি এ দেশে আসার অনেক আগেই বাংলা গদ্য চালু ছিল। পরবর্তী সময়েও দেখেছি, ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক ভেদ পেছনে ফেলে কীভাবে বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারে, সেটাই তাঁর গবেষণা ও সাধনার কেন্দ্রবিন্দু।
আমাদের সমাজটি যখন নানা স্বার্থ ও দ্বন্দ্বে বিভাজিত, রাজনীতিতে যখন এক পক্ষ আরেক পক্ষকে ঘৃণা ও বিদ্বেষে নিয়ত রক্তাক্ত করছে, তখন যে গুটি কয়েক মানুষ প্রীতি ও ঔদার্যের সঙ্গে সবাইকে কাছে টানেন, তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য আনিসুজ্জামান। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপ্রিয় শিক্ষক, পরিশ্রমী গবেষক—এসব তথ্য যতটা আমাদের আন্দোলিত করে, তার চেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা জাগায় মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি তাঁর দৃঢ় অবস্থান। তিনি মৃদুভাষী, বিনয়ী কিন্তু সত্য উচ্চারণে দ্বিধাহীন; এমনকি সেই সত্য যদি সহযাত্রী কিংবা সহমতের মানুষদের বিরুদ্ধেও যায়। আমাদের অধিকাংশ লেখক-বুদ্ধিজীবী যখন দল ও গোষ্ঠীর বিচারে শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করেন, আনিসুজ্জামান তখন নির্মোহ দৃষ্টিতে সমাজ ও মানুষকে বোঝার চেষ্টা করেন। শুভবোধ জাগ্রত করার সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন।
মনে আছে, ১৯৯২ সালে শহীদজননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গোলাম আযমের বিচারের দাবিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যে গণ-আদালত গঠিত হয়েছিল, সেই আদালতে আসামির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ পেশ করেছিলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। এই গণ-আদালতকে কেন্দ্র করে তৎকালীন বিএনপি সরকার যে ২৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করেছিল, তাঁদেরও একজন ছিলেন তিনি। আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দর্শন বিভাগের রেফারেন্স থেকে পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর নেতা মাওলানা আবুল আলা মওদুদীর বই সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিলে পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে আনিসুজ্জামান তার প্রতিবাদ করেছিলেন। তাঁর যুক্তি, মওদুদীর দর্শন যে এ যুগে অচল, সেটি শিক্ষার্থীদের জানতে দেওয়া উচিত। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের তৎকালীন অধ্যাপক আফতাব আহমদের শেষের দিকের রাজনৈতিক পথ ও মতের বিপরীতে ছিল তাঁর অবস্থান। ধর্মাশ্রয়ী জাতীয়তাবাদের সমর্থক আফতাব যখন জাতীয় সংগীত নিয়ে প্রশ্ন তুললেন, আরও অনেকের সঙ্গে আনিসুজ্জামানও প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করেছিলেন। কিন্তু এই অভিযোগে একদল ছাত্র আফতাব আহমদের কক্ষে আগুন দিলে তিনি সেটি মানতে পারেননি। তখন সংবাদ-এ ‘ড. আফতাবের অপরাধ কতটা গুরুতর?’ শিরোনামে আমি একটি লেখা লিখলে তিনি লিখিত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন, আমরা আফতাবের মতের বিরোধিতা করতে পারি, কিন্তু তাঁর কক্ষে আগুন দিতে পারি না।’
১৯৯৯ সালে বিবিসির জরিপে ২০ জন শ্রেষ্ঠ বাঙালির তালিকার এক নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং দুই নম্বরে রবীন্দ্রনাথকে স্থান দেওয়া হয়েছিল। তখন আনিসুজ্জামান তাঁর ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথের স্থান এক নম্বরে দেখতে পেলেই তিনি খুশি হতেন। সে সময় এ বক্তব্য নিয়ে তাঁকে অনেক বিরূপ মন্তব্য শুনতে হয়েছে, হয়তো এখনো হচ্ছে। কিন্তু তিনি তাঁর অবস্থানে অনড়।
কারা হত্যার হুমকি দিচ্ছে, কেন দিচ্ছে, তার চেয়েও গভীর উদ্বেগের বিষয় হলো, ক্রমাগত এই হুমকি ও হামলার বিরুদ্ধে রাষ্ট্র কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। জনগণের মধ্য থেকেও তেমন জোরালো প্রতিবাদ লক্ষ করছি না

২০১৩ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার প্রথম রায় প্রকাশের পর অনেকে প্রতিবাদে ফেটে পড়লেন সর্বোচ্চ শাস্তি না পাওয়ায়। হয়তো তাঁদের সেই প্রতিবাদ যথার্থ ছিল। কিন্তু অধ্যাপক আনিসুজ্জামান সেদিন বেশ জোর দিয়ে বলেছিলেন, ‘বিচার চেয়েছি, বিচার পেয়েছি। আবার যখন আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার প্রয়োজন হলো, তিনি পিছপা হননি।
মুক্তচিন্তার মানুষ হয়েও দলবিশেষের প্রতি অন্ধ আনুগত্য না দেখানো এবং অপ্রিয় সত্য কথা বলার কারণে আনিসুজ্জামানকে পেশাগত জীবনে একাধিকবার বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়েছে। স্বাধীনতার আগে ১৯৬৯ সালে বাংলা বিভাগে রিডারের পদে তিনি সবচেয়ে উপযুক্ত প্রার্থী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর স্থলে অন্য একজন শিক্ষককে নেওয়া হয়। ফলে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নবীনতর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে স্বাধীনতার প্রস্তুতি পর্বে তাঁর ও সহকর্মীদের ভূমিকার কিছু বিবরণ আমরা পাই তাঁর আমার একাত্তর-এ। মুক্তিযুদ্ধের সময় শিক্ষক নেতা হিসেবে তিনি সারা ভারতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার পাশাপাশি মুজিবনগর সরকার গঠিত পরিকল্পনা সেলের (পরবর্তীকালে পরিকল্পনা কমিশন) সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপকের একটি পদ শূন্য হলে অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের আগ্রহে তিনি আবেদন করেন। কিন্তু ক্ষমতার আশীর্বাদপুষ্ট ব্যক্তিরা চাইছিলেন না আনিসুজ্জামান ঢাকায় আসুন। সে সময় এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় নানা রকম লেখালেখি হলে আনিসুজ্জামান নিজেই প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি এলেন আরও প্রায় দেড় দশক পরে। ইঁদুর দৌড়ে অভ্যস্ত সমাজে এই ঔদার্য সবার থাকে না।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালে অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে, যা আমাদের ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। আমরা জানি, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানটি বাংলায় রচিত। কিন্তু এটি প্রথম ইংরেজি ভাষায় লেখা হয়েছিল। ড. কামাল হোসেন তখন আইন ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী। তিনি ইংরেজিতে সংবিধানের খসড়া করেন, আর আনিসুজ্জামান সেটি বাংলা ভাষায় রূপ দেন। দ্বিতীয়ত, ড. কুদরাত-এ-খুদার নেতৃত্বে গঠিত বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষা কমিশনের অন্যতম সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
বাংলাদেশের বিদ্বৎসমাজের যে কজন মানুষকে বহির্বিশ্ব জানে বা চেনে, নিঃসন্দেহে আনিসুজ্জামান তাঁদের অগ্রগণ্য। ভারতের রাষ্ট্রীয় পদক পদ্মভূষণ তাঁকেই কেবল সম্মানিত করেনি, গৌরবান্বিত করেছে বাংলাদেশকেও। ইউরোপ-আমেরিকায়ও তাঁর গবেষণা সমাদৃত। পুব-পশ্চিমের লেখক–বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে কীভাবে তাঁর সংযোগ তৈরি হয়, সেসবের কিছু বিবরণ আমরা পাই তাঁর আত্মজীবনীমূলক বই বিপুলা পৃথিবী ও কাল নিরবধিতে। দুটিই প্রথম আলোয় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল।
কিন্তু আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছি যে এই সর্বজনশ্রদ্ধেয় শিক্ষকও আমাদের এই সমাজে নিরাপদ নন। সম্প্রতি টেলিফোনের খুদে বার্তায় তাঁকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। এর আগেও অনেক লেখক-বুদ্ধিজীবী হামলা ও হুমকির শিকার হয়েছেন। শুনেছি তালিকা দীর্ঘতর হচ্ছে। কে কখন এই তালিকাভুক্ত হবেন, বলা কঠিন।
কারা হত্যার হুমকি দিচ্ছে, কেন দিচ্ছে, তার চেয়েও গভীর উদ্বেগের বিষয় হলো, ক্রমাগত এই হুমকি ও হামলার বিরুদ্ধে রাষ্ট্র কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। জনগণের মধ্য থেকেও তেমন জোরালো প্রতিবাদ লক্ষ করছি না। এ কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক, যিনি আনিসুজ্জামানের ছাত্র ও সহকর্মী, সন্ত্রাসীদের হাতে সন্তান নিহত হওয়ার পর তাঁকে খেদের সঙ্গে বলতে শোনা যায়, ‘আমি বিচার চাই না। মানুষের শুভবুদ্ধির উদয় হোক।’ শুভবুদ্ধির উদয় যে হয়নি, তার প্রমাণ কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হককেও হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। আর কত হামলা ও হুমকির শিকার হবে বাংলাদেশ?
যারা প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপনকে হত্যা করেছে, যারা অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ও কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হককে হত্যার হুমকি দিচ্ছে, তারা অন্ধকারের জীব। কিন্তু এই অপশক্তিকে রুখে দেওয়ার জন্য যে বলিষ্ঠ উচ্চারণ, আইনের শাসনে বলবান রাষ্ট্রযন্ত্র প্রয়োজন, তার উপস্থিতি লক্ষ করছি না কোথাও। আমরা সবাই পাশ কাটিয়ে যাচ্ছি। ভাবছি, আঘাতটি তো আমার ওপর আসেনি। আমার ওপর আঘাত এলে দেখা যাবে।
একের পর এক অঘটন ঘটছে, বেঘোরে মানুষ মারা যাচ্ছে, কিন্তু প্রতিকার পাচ্ছে না। কোথাও আশা দেখছে না। সবশেষে আশার স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠেছিল গণজাগরণ মঞ্চে। কিন্তু আমরা সেটিও নানা কৌশলে নির্বাপিত করে দিয়েছি। যে যার মতো কাজে লাগিয়েছি।
সংকীর্ণতা দিয়ে মহত্ত্ব অর্জন করা যায় না। বুকে হিংসা পুষে হিংসার বিরুদ্ধে লড়াই করা যায় না। এ জন্য চাই সমাজের ও রাজনীতির সর্বস্তরে শুভবোধের জাগরণ। সেই সুদিনের অপেক্ষায়।
ক্ষমা করবেন, আনিস স্যার।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।

উপেক্ষিত চরাঞ্চল

সম্পূর্ণ ফেরত গেছে চরাঞ্চল উন্নয়নে বরাদ্দ ৫০ কোটি টাকা। এমনিতেই চরাঞ্চলের উন্নয়নে বরাদ্দ কম। কিন্তু সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতায় সেই বরাদ্দটুকুও ব্যয় হয়নি। কোন মন্ত্রণালয়ের অধীনে এই অর্থ খরচ হবে, তা ঠিক না করেই বরাদ্দ করে বসেছে অর্থ মন্ত্রণালয়! এই হলো সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি কাজের ধরন।
বঞ্চিতদের মধ্যে বঞ্চিত হলো চরাঞ্চল। অনেক অঞ্চলের চরবাসী যে শ্রেণির মানুষই হোন, স্বাভাবিকভাবে সহজলভ্য অধিকার ও সুবিধাগুলো তাঁরা পান না। বিদ্যুৎ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নাগরিক পরিষেবা, নিরাপত্তা ও সামাজিকতার সুযোগ ছাড়া একবিংশ শতাব্দীতে কোনো সমাজ চলতে পারে না। দেশের অনেক চর ও হাওরাঞ্চলে তাই সভ্যতার আলো পৌঁছাতে পারে না। এসব এলাকায় দরকার বিশেষ বরাদ্দ এবং তা জনকল্যাণে ব্যয়ের জন্য প্রশাসনিক অবকাঠামো। কিন্তু সরকার বোধ হয় সেসবের ব্যবস্থায় মন দিতে পারেনি।
এই অর্থ যখন বরাদ্দ হয়, তখনই ভাবা প্রয়োজন ছিল কাদের মাধ্যমে তা ব্যয়িত হবে। তার চেয়েও বড় কথা, দীর্ঘ সময়জুড়ে সমস্যাটা ঝুলে ছিল, বরাদ্দ ফেরত নেওয়ার আগে যথেষ্ট সুযোগও ছিল সমাধানের। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় সময় পায়নি। বাস্তবে এর নাম অবহেলা, দায়িত্বহীনতা এবং অদক্ষতা। অথচ সরকার যখন অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দের কিংবা সাফল্যের খতিয়ান দেয়, তখন এই সব অবহেলা ও অদক্ষতা চেপে যাওয়া হয়।
রাজধানীর খুব কাছে সোনারগাঁ-মুন্সিগঞ্জে মেঘনা নদীতে বেশ কিছু চর রয়েছে। এসব এলাকা থেকে নৌকা ছাড়া চলাচলের আর কোনো ব্যবস্থা নেই। বেশ কয়টিতে বিদ্যুৎ নেই, কমিউনিটি চিকিৎসাকেন্দ্র ও থানা-পুলিশ নেই। বালু দস্যুরা এসব চর কেটে নিয়ে যায়, চরবাসীরা নদীতে চলাচলের সময় ডাকাতের কবলে পড়েন, শিক্ষার্থীদের দূরদূরান্তে গিয়ে পড়ালেখা করতে হয়। একদিকে এ রকম লাখো মানুষের জীবনের দুর্ভোগ অন্যদিকে সরকারি অবহেলা পাশাপাশি রাখলে বোঝা যায়, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে প্রান্তিক জনগণ কতটা উপেক্ষিত!