Thursday, June 7, 2018

সিঙ্গাপুর প্রবাসী শ্রমিকদের মনে শান্তি নেই

সাত বছর আগের কথা। তখনই প্রথম সিঙ্গাপুরের মাটিতে পা রাখেন বাংলাদেশের মোহাম্মদ আবদুল কাদির। উন্নত ভবিষ্যতের জন্য সিঙ্গাপুরে পাড়ি জমালেও প্রথম রাতগুলো তার কেটেছে কেঁদে কেঁদে। তখন কাদিরের বয়স ২৬ বছর। যুবক মানুষ। দেশে ফেলে এসেছেন স্ত্রী, সন্তান, পরিবার। রাতেই তাদেরকে ফোন করেন। কিন্তু নিজের ভিতরে যে ক্ষত, কষ্ট তা কারো কাছে প্রকাশ করেন নি তিনি। সেই ফোনকল যখনই শেষ হয় তখনই কাদিরেরর গণ্ড বেয়ে অঝোরে ঝরতে থাকে অশ্রু। তখন নিজের কাছে নিজেই প্রশ্ন করতে থাকেন- কেন আমি সিঙ্গাপুরে এসেছি? সিঙ্গাপুরে রয়েছেন হাজার হাজার অভিবাসী শ্রমিক। প্রতি বছর নতুন নতুন শ্রমিক যোগ হচ্ছেন তাদের সঙ্গে। কিন্তু নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের কাজকে যতটা স্বাচ্ছন্দ্যময় বলে মনে করেছিলেন তিনি বা তারা আসলে তা নয়। কাদির যখন দেশ ছেড়ে যান তখন তার বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়রা তাকে এক স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। তারা বলেছিলেন, সিঙ্গাপুর এমন একটি দেশ যা চকচকে পরিষ্কার। মানুষগুলো বন্ধুপ্রতীম। সবাই আইন মেনে চলে। সর্বোপরি তারা ভালো বেতন দেয়। তা দিয়ে উন্নত জীবন যাপন করা যায়। এসব কথার অনেকটাই সত্যি। তবে ব্যত্যয় রয়েছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে। কাদির বলেছেন, সিঙ্গাপুর আসলেই এক স্বপ্নের দেশ। কিন্তু শ্রমিকদের জন্য তা কঠিন। শ্রমিকরা ভোর ৬টায় ঘুম থেকে ওঠেন কাজে যাওয়ার জন্য। আর ফিরে আসেন রাত ১১টায়। তারপর গোসল করে নামাজ আদায়, খাবার খেতে খেতে মধ্যরাত। এর অর্থ হলো বিশ্রামের জন্য সময় ৬ ঘণ্টা। এ জন্যই আমরা স্বপ্নের ছোঁয়া পাচ্ছি না- বললেন কাদির। দীর্ঘ সময় কাজ করে ক্লান্ত হয়ে যান কাদির। তিনি ইসলামিক স্টাডিজে অর্জন করেছেন মাস্টার্স ডিগ্রি। তবু তাকে এই কাজ বেছে নিতে হয়েছে। তিনি এখন কাজে যেতে ভয় পান। কারণ, অনেক সুপারভাইজারের কথা ঠিকমতো বুঝতে পারেন না। ফলে তারা তার ওপর ক্ষেপে যান। তাদের কথা ঠিকমতো বুঝতে পারেন না কাদির। তিনি নিজেই বলেন, এর আগে আমি যেখানে কাজ করেছি তা ছিল একটি চীনা কোম্পানি। আমি ইংরেজি এবং বাংলায় কথা বলেছি। কিন্তু তারা আমার কথা বুঝতে পারে না। আবার তারা যখন চীনা ভাষায় কথা বলেন, তখন আমি তাদের কথা বুঝতে পারি না। এতে সুপারভাইজাররা মাঝেমাঝেই রেগে আগুন হয়ে যান। তাই আমার জীবন হয়ে ওঠে মারাত্মক কঠিন। নতুন যেসব শ্রমিক আসেন সিঙ্গাপুরে তাদের সবারই এই ভাষাগত সমস্যায় পড়তে হয়। এমন এক কঠিন পরিস্থিতিতে পড়ে কাদির সিদ্ধান্ত নেন বাড়ি চলে আসবেন। যদিও তিনি বুঝতে পারেন এটা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। কাদিরের বাড়ি কুমিল্লা। সেখানে কৃষিকাজ করতেন। ফার্ম করতেন। তা থেকে যা আয় হতো তা পরিবার চালানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। তাই তাকে ঋণের ওপর থাকতে হতো। এমন অবস্থায় কাদিরের মতো যেসব শ্রমিক সিঙ্গাপুরে গিয়েছেন তারা সবই বাংলাদেশের লোক নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হতে হয়েছে। এক একজন শ্রমিক সিঙ্গাপুরে পাঠাতে এসব প্রতিষ্ঠান ৫০০০ থেকে ১০ হাজার ডলার পর্যন্ত হাতিয়ে নেয়। এই অর্থ শোধ করতে বিদেশগমনেচ্ছু শ্রমিকদেরকে ব্যাংকের কাছ থেকে বা আত্মীয়দের কাছ থেকে বড় অঙ্কের অর্থ ধার করতে হয়। ফলে সিঙ্গাপুরে পৌঁছানোর পরের এক বা দু’বছরের বেতন যায় ওই ঋণ শোধে। কর্মক্ষেত্রে ভাষাগত সমস্যা যখন বড় হয়ে দেখা দেয় তখন একদিন একজন ম্যানেজারের কাছে যান কাদির। ওই ম্যানেজার ভালো ইংরেজি জানেন। তার কাছে কাদির বলেন- এখানে ভাষা বোঝা আমার জন্য খুব সমস্যার। কিভাবে মান্দারিন বলতে হয় আমাকে শিখিয়ে দেবেন। তারপর আমি তা অন্য শ্রমিকদের বুঝিয়ে দেবো। কাদির এরই মধ্যে আস্থা অর্জন করে নিয়েছেন। তিনি কর্মদক্ষ। তার ওপর ম্যানেজার ও সহকর্মীরা খুব আস্থাশীল। ফলে তিনি পদোন্নতি পেতে থাকেন। বর্তমানে তিনি সেখানে একজন সিনিয়র শ্রমিকের মর্যাদা পেয়েছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তার বুকজুড়ে আছে দেশে ফেলে যাওয়া পরিবারের কথা। ২০১২ সালে দেশ ছেড়ে গিয়েছেন কাদির। রেখে গেছেন তিন বছর বয়সী এক ছেলে ও এক বছর বয়সী এক মেয়ে। তিনি সিঙ্গাপুরে পাড়ি জমানোর ৬ মাস পরে জন্ম হয়েছে তার তৃতীয় সন্তান। বর্তমানে তার তিন সন্তানের বয়স যথাক্রমে ১০, ৮ ও ৬ বছর। প্রতিদিন তাদের খবর নিতে বাড়ি ফোন করেন। তখন সবকিছু ছেড়ে বাড়ি চলে আসতে ইচ্ছে করে। বিশেষ করে পবিত্র রমজানে এমনটা বেশি মনে হয়। এখন থেকে ৬ বছর আগে তিনি পরিবারের সঙ্গে শেষ রোজা পালন করেছেন। আবার সামনে পবিত্র ইদুল ফিতর। এবারও পরিবার ছেড়ে তাকে থাকতে হবে সিঙ্গাপুরে। স্ত্রী ও সন্তানদের থেকে অনেক দূরে। এজন্য কান্নায় বুক ভেঙে আসে। সেই কষ্ট চাপা দিয়ে প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত জীবনের সঙ্গে লড়াই করতে হয় তাকে। একবার সন্তানের মুখ দেখার আকুতি বুকে চেপে চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। বুকের ভিতরে কষ্ট লালন করে তিনি সামনে তাকান। অনেক কাজ বাকি। সব শেষ করতে হবে। ঈদে বাড়ির সবার জন্য টাকা পাঠাতে হবে। সেজন্য অনেক তাড়া তার।

সৌদি অবরোধ যেন কাতারের জন্য ‘শাপে বর’ by মাহমুদ ফেরদৌস

ধরুন, আপনার দেশ শক্তিশালী প্রতিবেশী দেশসমূহের হুমকির সম্মুখীন। বাণিজ্য অবরোধে টালমাটাল। আকাশসীমা ব্যবহারের ওপরও বিধিনিষেধ। এই পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হবে- এমনটা প্রত্যাশা নিশ্চয়ই আপনার মাথায়ও আসবে না। কিন্তু অন্তত একটি ক্ষেত্রে তীব্র অবরোধের এমন অদ্ভুত ফলাফলই দেখা গেছে।
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ক্ষুদ্র দেশ কাতারের ওপর বৃহৎ প্রতিবেশী সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সর্বমুখী অবরোধের এক বছর ঘনিয়ে আসছে। কিন্তু একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, অবরোধের ফলে কাতারের অর্থনীতির ওপর যেই বিপজ্জনক ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছিল, তা শুধু এড়াতেই সক্ষম হয়নি দেশটি; বরং, দেশটির মানবাধিকার পরিস্থিতি ও ভূরাজনৈতিক অবস্থান আরো শক্তিশালী হয়েছে।
মিশর, সৌদি আরব, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতৃত্বে আরোপিত ভূ, আকাশ ও সমুদ্র অবরোধকে একত্রে বলা হয় কাতার সংকট। পুরো অবরোধের উদ্দেশ্য ছিল কাতারের অর্থনীতিকে ভেঙে দেয়া। পাশাপাশি, কাতারের আমীরকে সৌদি আরবের একগুচ্ছ দাবি মেনে নিতে বাধ্য করা। এই দাবিসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল, উপসাগরীয় অঞ্চলে সৌদি নেতৃত্ব মেনে চলা, প্রভাবশালী টিভি স্টেশন আল জাজিরা বন্ধ করা এবং সৌদি আরবের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করা। তবে মাত্র ২৫ লাখ জনসংখ্যার এই ক্ষুদ্র দেশটি একটি দাবিও মানতে রাজি হয়নি। সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের (৩২) চাপের মুখে কাতারের ৩৭ বছর বয়সী আমীর শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি নতি স্বীকার করেননি।
এই সংকটকে অনেকেই বলেছেন উপসাগরীয় যুদ্ধের পর আরব বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিভেদ। অবরোধের একেবারে শুরুর দিকে কাতারিরা তড়িঘড়ি করে সুপার মার্কেটে হানা দিতে থাকেন। তাদের আশঙ্কা ছিল, প্রতিবেশী দেশগুলোর অবরোধের কারণে খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে। এছাড়াও কাতারের পুঁজি বাজারে ধস নামে।
এমনকি সৌদি সামরিক হামলার আশঙ্কাও জোরদার হতে থাকে। যদিও কাতারে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকায় সৌদি হামলার সম্ভাবনা বেশ কমই ছিল। এক পর্যায়ে সংকট সমাধানে তুরস্কের দ্বারস্থ হয় দোহা। তুরস্ক কাতারে সেনা পাঠায়। ইরান ও তুরস্ক মিলে দেশটিতে বিপুল পরিমাণ খাদ্য সামগ্রী পাঠায়। শুরুর কয়েক মাসে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে আকাশসীমা লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে। উত্তাল ওই পরিস্থিতিতে কাতারের রাজপরিবারের এক শেখের নিখোঁজ হওয়া, কাতারকে স্রেফ দ্বীপে পরিণত করা, কাতার সীমান্তকে সামরিক অঞ্চল ও পারমাণবিক বর্জ্য অপসারণস্থলে পরিণত করার সৌদি পরিকল্পনার কথাও খবরে এসেছে। প্রথম কয়েক  সপ্তাহে, পূর্বের বছরের তুলনায় কাতারের আমদানি ৪০ শতাংশ হ্রাস পায়। কিন্তু এই এক বছর পর দেখা যাচ্ছে, আমদানি পরিস্থিতি একেবারেই স্বাভাবিক অবস্থায় পৌঁছেছে।
সংকট শুরু হলে বিশ্বের তরলীকৃত গ্যাসের সর্ববৃহৎ রপ্তানিকারক কাতার নতুন বাণিজ্য পথ খোঁজার কাজ হাতে নেয়। পুঁজিবাজার ও আর্থিক ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন ব্যাংকে রাষ্ট্রীয়ভাবে অর্থ সরবরাহ করা হয়। স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে ঘরোয়া বিভিন্ন চাহিদা পূরণ করতে পারে, সেজন্য সহায়তা দেয়া হয় সরকারের পক্ষ থেকে। শুধু তা-ই নয়। পারস্য উপসাগরে ইরান ও কাতারের যেই যৌথ গ্যাসক্ষেত্র আছে, সেটি বিশ্বের বৃহত্তম। সেই গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নের কাজও ত্বরান্বিত করতে থাকে কাতার।
মার্চে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথমদিককার সংকট সামলে উঠেছে কাতারের ব্যাংকিং সিস্টেম। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে ২.৬ শতাংশ, যা ২০১৭ সালের চেয়েও বেশি! এমনকি দেশের রাজস্ব ঘাটতিও কমে জিডিপির ৬ শতাংশে নেমে আসবে। অথচ, ২০১৬ সালেও এই ঘাটতি ছিল ৯.২ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি দূরে থাক, উল্টো উন্নতি হয়েছে।
মার্কিন ব্যবসা-বাণিজ্য বিষয়ক সংবাদ মাধ্যম ফোর্বস বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম আর্থিক প্রতিষ্ঠান এইচএসবিসি’র বরাতে লিখেছে, কাতারের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ ২৯০ কোটি থেকে ১৭৭০ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। এইচএসবিসি লিখেছে, কাতারের এই শক্তিশালী অবস্থানের আংশিক কারণ হলো, দেশটি বাণিজ্য ভারসাম্যের দিক থেকে ধারাবাহিকভাবেই ভালো করছে।
কাতারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার ইস্যুতে সমালোচনা জারি রয়েছে। বিশেষ করে, দেশটির বিদেশি শ্রমিক নিয়োগের নীতিমালা, তথা কাফালা সিস্টেমের কারণে বিদেশি শ্রমিকরা ভীষণ বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এই সিস্টেমকে অনেকেই আধুনিক যুগের দাসত্ব ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এ কারণে মানবাধিকার গোষ্ঠীসমূহ অনেক দিন ধরেই কাতারে অনুষ্ঠেয় ২০২২ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ বয়কটের দাবি জানিয়ে আসছে। কারণ, এই বিশ্বকাপ আয়োজনে নতুন যেসব স্টেডিয়াম নির্মাণ করছিল কাতার, সেখানে কাজ করেছে বহুসংখ্যক বিদেশি শ্রমিক। আর এসব স্থাপনা নির্মাণে শ্রমিক মৃত্যুর হার ছিল অনেক বেশি। ২০১৭ সালে আন্তর্জাতিক ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশনের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন স্টেডিয়াম নির্মাণে কাজ করতে গিয়ে প্রায় ১২০০ শ্রমিক মারা গেছেন।
এছাড়া কাতারের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী রাজপরিবারভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা ও সীমিত নাগরিক স্বাধীনতা নিয়েও অনেকে সোচ্চার ছিলেন। তবে এসব ক্ষেত্রে উন্নতি হয়েছে দেশটির। ২০১৯ সালে দেশটির পার্লামেন্ট নির্বাচনে উন্মুক্তভাবে ভোট দিতে পারবেন নারী ও পুরুষ ভোটাররা, যদিও পার্লামেন্টের তেমন ক্ষমতা নেই।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ নিজেদের ওয়ার্ল্ড রিপোর্ট ২০১৮-এ কাতারের অগ্রগতির প্রশংসা করেছে। ২০১৭ সাল জুড়ে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বাস্তবায়ন করায় কাতারকে কৃতিত্ব দেয়া হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। বলা হয়েছে, এসব সংস্কার পুরোদমে বাস্তবায়িত হলে কাতারের মানবাধিকারের মানদণ্ড হবে উপসাগরীয় অঞ্চলে সবচেয়ে প্রগতিশীল।
এই সংস্কারের মধ্যে রয়েছে অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য নতুন মানদণ্ড, গৃহকর্মী আইন, পিতা বিদেশি হলেও কাতারি মায়েদের সন্তানদেরকে স্থায়ী বাসিন্দা সুবিধা প্রদান করা, বিদেশি কিছু বাসিন্দাকেও স্থায়ী বাসিন্দা সনদপত্র দেয়ার বিধান, ইত্যাদি।
বিশ্বের সবচেয়ে বিনিয়োগ হওয়া দেশগুলোর একটি কাতার। আয়তনে দেশটি এত ছোট। অথচ বিশ্ব রাজনীতিতে দেশটির রয়েছে ব্যাপক প্রভাব। এর বড় কারণ হলো, জ্বালানি খাত থেকে যে বিপুল হাজার হাজার কোটি ডলার রয়েছে দেশটির, তা বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে দেশটির জাতীয় তহবিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বৈশ্বিক রিয়েল এস্টেট খাত ও বৃহৎ কিছু কোম্পানিতে এসব অর্থ বিনিয়োগ করা। লন্ডনে এমনকি কাতারি কোয়ার্টারও রয়েছে।
পশ্চিমা দেশগুলোতে বিনিয়োগের বিপরীতে এখন প্রতিদান চায় কাতার। দেশটি আর্থিক কিছু সংস্কারও এনেছে। যেমন, কাতারে কার্যক্রম রয়েছে এমন কোম্পানিগুলোতে এতদিন কাতারি মালিকানা কিছুটা হলেও থাকতে হতো। এখন পূর্ণ বিদেশি মালিকানাও মেনে নেয়া হবে। সৌদি আরব সম্প্রতি যেই সীমিত সংস্কার এনেছে, সেই তুলনায় একে বেশ উদারই বলা চলে। এছাড়া বিদেশি বিনিয়োগকারীদেরকে আমদানি-রপ্তানি শুল্ক, এমনকি আয়কর থেকেও অব্যাহতি দেয়ার কথা বলা হচ্ছে। দেশের অর্থনীতিকে আরো উন্মুক্ত করার প্রয়াসের অংশ এই পদক্ষেপ।
সৌদি-আমিরাত অবরোধের বিরুদ্ধে কাতারের প্রতিরোধের আরেকটি কৌশল ছিল পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে লোভনীয় অস্ত্র চুক্তি সম্পাদন করা। নিজেদের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে, নব্বইয়ের দশকে আমেরিকার আল উদেইদ বিমান ঘাঁটি নির্মাণে প্রায় ১০০ কোটি ডলার দিয়েছিল কাতার। এই ঘাঁটি থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড পরিচালিত হয়। এখানে বৃটিশ রাজকীয় বিমান বাহিনীও সক্রিয়।
সৌদি আরব যখন প্রথম অবরোধ আরোপের ঘোষণা দেয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তাতে সমর্থন জানান। তিনি টুইটারে লিখেন, কাতার বেশ উঁচু পর্যায়ে সন্ত্রাসের পৃষ্ঠপোষক। তার এই বক্তব্যে খোদ মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চমকে উঠে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তখন উত্তেজনা হ্রাসের চেষ্টা করছিল।
তবে ওই সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১২০০ কোটি ডলারের যুদ্ধবিমান ক্রয়ের চুক্তি করে কাতার। এমনকি দুইটি মার্কিন রণতরী কাতারের সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়ায় অংশ নিতে উপস্থিত হয়। আরো কয়েক মাস পর, অর্থাৎ ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে কাতার ১২০০ বিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে ফ্রান্সের কাছ থেকে যুদ্ধবিমান ও সাঁজোয়া যান ক্রয়ের ঘোষণা দেয়।
এছাড়া প্রায় এক বছর ধরে ওয়াশিংটনে নিজের ইমেজ বৃদ্ধির কাজে মনোযোগী হয়েছে কাতার। এমনকি ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মালিকানাধীন ডানপন্থি সংবাদমাধ্যম নিউজম্যাক্স কিনতেও আলোচনা শুরু করে কাতার।
তবে সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন ও হামাসের সঙ্গে কাতারের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক থাকার বিষয়টি একেবারেই যে মিইয়ে গেছে, তা নয়। তবে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে এই ধরনের অভিযোগ এত তীব্র যে, কাতারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তেমন কিছুই নয়।
কাতার সংকট শিগগিরই দ্বিতীয় বছরে পদার্পণ করতে যাচ্ছে। তবে এই সংকট শিগগিরই সমাধা হবে, এমন সম্ভাবনা কম। তা সত্ত্বেও, কাতারের অর্থনীতি ও দেশটির বাসিন্দাদের নাগরিক অধিকারের অগ্রগতিতে এই সংকট তেমন প্রতিবন্ধকতা তো সৃষ্টি করতে পারেইনি, বরং দৃশ্যত ইতিবাচক ভূমিকাই রেখেছে।

ভাঙা গড়ার জীবন by মিলাদ জয়নুল

সুুরমা নদীর পাড় ঘেঁষে বাড়ি আব্দুল মতিনের। নদীর পাড় ভাঙতে শুরু করেছে। ঝুঁকি জেনেও ঘরের ভেতরে ছিলেন হতদরিদ্র মতিন। হঠাৎ হুড়মড়িয়ে বাড়িটি নদীতে চলে যায়। ঘরের সঙ্গে তিনিও নদীতে পড়ে যান। স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করেন। তবে মেরুদণ্ডে আঘাত পেয়ে কয়েকদিন শয্যাশায়ী ছিলেন রায়খাইল গ্রামের বাসিন্দা মতিন। রায়খাইল বিয়ানীবাজার উপজেলার আলীনগর ইউনিয়নের মধ্যে পড়েছে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বাস এ গ্রামে। স্থানীয় ইউপি সদস্য আফতাব উদ্দিন বলেন, আব্দুল মতিনসহ গত এক সপ্তাহে গ্রামের সাতজনের বাড়িঘর নদীতে বিলীন হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত অন্য ছয়জন হলেন আব্দুল সাত্তার, আব্দুল আহাদ, আব্দুল বাছেত, আমজাদ হোসেন, পারভেজ আহমদ, খলিল উদ্দিন ও জসিম উদ্দিন। গত ১৪ই মে সরজমিন দেখা যায়, রায়খাইল গ্রামের পাশ দিয়েই অনেকের আধভাঙা বসতঘর। গ্রামে রয়েছে প্রায় ২৫০টি বসতঘর। এর মধ্যে ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে আরো প্রায় ২০টি বাড়ি। নদীভাঙন নিয়ে গ্রামবাসীর মধ্যে রীতিমতো আতঙ্ক বিরাজ করছে। নদীভাঙনের শিকার আব্দুল সাত্তার বলেন, ‘প্রতিনিয়ত ভাঙছে নদীর পাড়। ভাঙনে আমার বাড়ির আসবাবসহ প্রায় ৪-৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। বর্তমানে আমি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি।’ নদীভাঙনের শিকার ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক বছর ধরেই এখানে সুরমার পাড়ে ভাঙন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এর প্রতিকার চেয়ে একাধিকবার বিভিন্ন মহলে যোগাযোগ করেছেন গ্রামবাসী। কিন্তু কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি। নদীভাঙনে বাড়িঘর ভেসে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা সেখান থেকে সরে গিয়ে অন্য জায়গায় বাড়ি নির্মাণ করেন। এভাবেই ভাঙা-গড়ার মধ্যেই জীবন চলছে। গ্রামের বাসিন্দা হামিদুর রহমান সুরমা নদীর একটি অংশ দেখিয়ে বলেন, আগে ওই স্থানে গ্রামের মসজিদ ছিল। নদীর ভাঙনে সেটিও বিলীন হয়ে গেছে। পরে নতুন করে একটি মসজিদ তৈরি করা হয়েছে। আলীনগর ইউপি চেয়ারম্যান মামুনুর রশীদ মামুন বলেন, ‘প্রায় দুই বছর ধরে রায়খাইল গ্রামের নদী ভাঙন রোধ করতে এবং এর থেকে উত্তরণের জন্য বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করেছি। কিন্তু কোনো সুফল পাওয়া যায়নি। রায়খাইল গ্রামের মূল সড়ক ঘেঁষে বয়ে গেছে সুরমা নদী। গ্রামবাসী বলছেন, বর্ষা মৌমুমে নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে সড়কে উঠে যায়। মূল সড়কটিও যদি ভাঙনের মুখে পড়ে, তাহলে পুরো গ্রাম তলিয়ে যাবে। সেই সঙ্গে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে ফসল। সিলেট পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি আমাদের অনেকেই অবহিত করেছেন। আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রকল্প তৈরি করার উদ্যোগ নিয়েছি। তবে কবে নাগাদ প্রকল্প নেয়া হবে কিংবা অনুমোদন হবে, সেটি বলা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশের গণতন্ত্র ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু by স্টিভ সিমা

মিয়ানমারে নৃশংসতার শিকার হয়ে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। এতে সৃষ্টি হয়েছে চলমান এক মানবিক সংকট। এই সংকট নিয়ে লড়াই করার কারণে বাংলাদেশের দিকে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংগঠন ও অন্যান্য দেশ এই সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকারকে সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তারা দেশের ভেতর ক্রমবর্ধমান অকার্যকর গণতন্ত্রের দিকে নজর দিচ্ছে কমই। বাংলাদেশ একটি ঐতিহাসিক বহুদলীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতির দেশ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে গণতন্ত্র উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে। নির্বাচনের পথে প্রবেশ করেছে এ দেশ। নতুন মেরুকৃত বহুদলীয় প্রতিযোগিতা ও একদলীয় শাসনের মধ্যে এই নির্বাচন হতে পারে একটি ‘টিপিং পয়েন্ট’। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকটের দিকে যেমন নজর দেয়া উচিত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের, ঠিক তেমনইভাবে বাংলাদেশের অবনমনশীল গণতান্ত্রিক চরিত্রের বিষয়েও চাপ দেয়া উচিত। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি মানবাধিকার বিষয়ক রিপোর্ট দিয়েছে। এতে দেখা যায়, ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ অব্যাহতভাবে কঠোর থেকে কঠোরতর রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বন করেছেন। মিডিয়ার ওপর আক্রমণ চালিয়ে, বিচার বিভাগে প্রাধান্য বিস্তার করে এবং বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের জেলে ঢুকানোর মতো নিষ্পেষণমূলক পদক্ষেপ নিয়ে সমালোচকদের কণ্ঠ স্তব্ধ করে দিচ্ছে আওয়ামী লীগ এমন অভিযোগ আছে দলটির বিরুদ্ধে। ২০১৩-২০১৪র নির্বাচন বর্জনের মধ্য দিয়ে ব্যাপক আকারে সহিংসতার আশ্রয় নিয়েছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং এই সহিংসতায় অনেক মানুষ নিহত হয়েছেন।
রাজনৈতিক এই বৈরিতার ফলে নির্বাচনে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতাকে খর্ব করা হয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগে এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের জেল দেয়া হয়েছে। একে রাজনৈতিক বলে দাবি করছে বিএনপি। দেশের সংবিধান অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি যদি দুই বছরের বেশি কারাদণ্ড পেয়ে থাকেন তাহলে তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অযোগ্য। সেই হিসেবে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে খালেদা জিয়াকে নির্বাচনের বাইরে রাখাও হতে পারে। এর ফলে ২০১৯ সালের জানুয়ারির আগেই যে নির্বাচন হওয়ার কথা তা বর্জন করতে পারে বিএনপি, যেমনটা তারা পাঁচ বছর আগে করেছিল।
এর বাইরেও বাংলাদেশের গণতন্ত্রে আরো অনেক চাপ রয়েছে। এগুলো হলো দুর্নীতি, দুর্বল শাসন ব্যবস্থা, দারিদ্র্য, জনসংখ্যাতত্ত্ব, পরিবেশগত বিপর্যয় ও ইসলামপন্থি উগ্রবাদ। ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই) পরিচালিত এক জনমত জরিপ অনুযায়ী, দেশে অর্থনৈতিক অগ্রগতি সত্ত্বেও কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি বাংলাদেশিরা। দেশটির নাগরিকরা অভিযোগ করছেন যে, সেখানে উচ্চ মাত্রায় বেকারত্ব, পণ্যমূল্য বৃদ্ধিসহ আরো নানা রকম অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তারা বলছেন, ঘুষ ও অন্যান্য দুর্নীতির কারণে চাকরি পাওয়া, আইনের শাসন পাওয়া, স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া, শিক্ষা ও সরকারি অন্যন্য পণ্য পাওয়ার সুযোগ সীমিত।
উপরন্তু ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রয়েছে নাজুক অবস্থায়। বিশেষ করে বাংলাদেশি নারীরা বসবাস করছেন যৌন হয়রানির এক আশঙ্কা নিয়ে, যার বিচার পাওয়া দুরূহ। নাগরিকদের মূল ক্ষোভ রয়েছে দুর্নীতি, রাজনৈতিক সহিংসতা ও অস্বচ্ছ নির্বাচন নিয়ে। নিজ দেশের গণতন্ত্রের মান, রাজনৈতিক দলগুলো নিয়ে তাদের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থাকলেও বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্রকে একটি ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে থাকেন।
আসন্ন নির্বাচনকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য, অধিকতর কার্যকর, দায়িত্বশীল হওয়া, প্রতিক্রিয়াশীল সরকার ও বিরোধী দল হওয়ার জন্য একটি সুযোগ হিসেবে নিতে পারে। এটা করতে হলে দলগুলোকে তাদের অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে এবং গড়ে তুলতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র তাদের সহায়তা করতে পারে। ডেমোক্রেসি অ্যাসিসট্যান্ট হলো একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়নমূলক উদ্যোগ। এখান থেকে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করা অন্য নতুন গণতন্ত্রপন্থিদের জন্য এবং গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামরতদের জন্য সহায়তা দিয়ে থাকে। বাংলাদেশে এমন কিছু সংগঠনের মধ্যে অন্যতম হলো আইআরআই। তারা বছরের পর বছর গণতান্ত্রিক সহযোগিতা দিয়ে আসছে। এই উদ্যোগগুলো একবার এখানে দেখে নেয়া যেতে পারে। যেমন:
ফলপ্রসূ রাজনৈতিক আলোচনার ক্ষেত্র সৃষ্টি করা: ২০১৭ সালে আইআরআই এর চালানো এক জরিপ অনুযায়ী, শতকরা ৬৬ ভাগ বাংলাদেশি চান আওয়ামী লীগ অন্য দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করুক। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থা গড়ে তোলার জন্য বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে সংলাপ আয়োজন করতে থাকে আইআরআই। সেখানে রাজনৈতিক মূল বিষয় ও নিরাপত্তামূলক ইস্যুগুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শত্রুতাপূর্ণ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও দলের সিনিয়র পর্যায়ের নেতারা এমন বৈঠককে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে সমর্থন করেছিলেন।
পক্ষপাতহীন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুবকদের সংযুক্ত করুন: আগামী বছরে আইআরআই তরুণ, যুবকদের মধ্যে রাজনৈতিক সংলাপমূলক কর্মসূচি বিস্তৃত করবে। এক্ষেত্রে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে সেমিনার আয়োজন করবে। সেখানে পক্ষপাতহীন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও গঠনমূলক ক্যারিয়ার নিয়ে আলোচনা করা হবে। যুবকদের উদ্বুদ্ধ করা হবে।
নির্বাচনী কর্মকাণ্ডের সততায় সমর্থন: গত নির্বাচনগুলোর সময়ে আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষক, প্রশিক্ষক, গণতান্ত্রিক নির্বাচনে পর্যবেক্ষকদের সমর্থনসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সহযোগিতা দিয়ে এসেছে। আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ পর্যবেক্ষকরা পর্যবেক্ষণে নির্বাচনে প্রতারণা বা সহিংসতার বিষয়ে ধরা পড়ে।
নাগরিক সমাজ ও মিডিয়ার সক্ষমতা বাড়ানো: অতীতে নাগরিক সমাজ ও মিডিয়ার সঙ্গে কাজ করেছে আইআরআই। তাদেরকে শক্তিশালী করা হয়েছে নজরদারি করতে। জনগণকে রাজনৈতিক সচেতনতা ও নির্বাচনে দুর্নীতি সম্পর্কে সচেতন করা হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে: একটি অকার্যকর অথবা দলীয় নিরাপত্তা খাত এবং নির্বাচন কমিশন নির্বাচন নিয়ে আস্থাকে খর্ব করতে পারেন। নির্বাচনী সহিংসতা ছড়িয়ে দিতে পারেন। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজ করতে পারেন আন্তর্জাতিক অ্যাক্টররা। প্রশিক্ষিণ দিতে পারেন। সর্বোচ্চ সেবা দেয়ার জন্য পরামর্শ দিতে পারেন।
সর্বোতভাবে দেশের অবনমনশীল গণতন্ত্রকে মেরামত করতে পারেন বাংলাদেশিরা নিজেরাই। নির্বাচনের মাত্র ছয় মাস আগে শুধু আন্তর্জাতিক দাতারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষিত এবং নির্বাচনী ব্যবস্থাকে বদলে দিতে পারেন না। কিন্তু যদি যথাযথভাবে টার্গেট করা হয় এবং অর্থায়ন হয় তাহলে তারা নাগরিক, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গুরুতর ইস্যু নিয়ে বিতর্কের আয়োজন করতে পারে, যা দেশের ওপর প্রভাব ফেলবে। এটা হবে অগ্রগতিমূলক। 
(বাংলাদেশ অ্যান্ড শ্রীলঙ্কা অ্যান্ড জিওফ্রে ম্যাকডোনাল্ড-এর আবাসিক প্রোগ্রাম পরিচালক স্টিভ সিমা। ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের গণতন্ত্র ও সুশাসন বিষয়ক প্রিন্সিপাল গবেষকও তিনি। গতকাল অনলাইন কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন-এ প্রকাশিত তার লেখার অনুবাদ)

৭ই জুন স্বাধীনতার পটভূমি রচনা করে by নূরে আলম সিদ্দিকী

মুজিব ভাই আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে বেরিয়ে এসে রেসকোর্সে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, “মনু মিয়া আমার আলমের কাছে বলে গেছে, সে ৬ দফার জন্য রক্ত দিয়ে গেছে, বাংলার মুক্তির জন্য রক্ত দিয়ে গেছে। আমি এই জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে শপথ নিয়ে গেলাম- তার রক্তের সঙ্গে শেখ মুজিব কখনো বেঈমানী করবে না।”
৬৫-এর যুদ্ধে ভারতের কাছে চরম মূল্য দিয়ে আইয়ুব খানকে তাসখন্দ চুক্তির ভিত্তিতে রক্ষা পেতে হয়। এই অবস্থার প্রেক্ষাপটে পিডিএম একটি সর্বদলীয় গোলটেবিল বৈঠক আহ্বান করে। মুজিব ভাই (তখন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক) ওই বৈঠকে পূর্ব-পাকিস্তানের অস্তিত্ব রক্ষার আঙ্গিকে ৬ দফা প্রস্তাবটি পেশ করেন। আহমদ ফজলুর রহমান, রুহুল কুদ্দুস, শামসুর রহমান খান (জনসন ভাই) ও রেহমান সোবহান ৬ দফা কর্মসূচিটি প্রণয়ন করে মুজিব ভাইয়ের হাতে তুলে দেন। গোলটেবিল বৈঠকে যোগদানকারী সকল দলই এটিকে আন্দোলনের কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করতে অক্ষমতা প্রকাশ তো করলোই, বরং তারস্বরে অপপ্রচার শুরু করলো- শেখ মুজিব ৬ দফা কর্মসূচি প্রদান করে সর্ব-পাকিস্তানি আইয়ুব উৎখাতের আন্দোলনকে পিছিয়ে দিল। মুজিব ভাই (তখন তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ) পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ফিরে এসে ৬ দফাকে দলীয় কর্মসূচি হিসেবে অনুমোদন লাভের জন্য দলের বর্ধিত সভায় পেশ করেন। দুঃখজনক হলেও বাস্তব, ওই বর্ধিত সভায়ও সেটা অনুমোদিত হয়নি।
এ অবস্থায় ছাত্রলীগের তদানীন্তন সভাপতি সৈয়দ মাযহারুল হক বাকী ও সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাককে ডেকে তাদের হাতে ৬ দফার একটি খসড়া তুলে দিয়ে মুজিব ভাই বললেন, এটি মূলত জাতির মুক্তিসনদ। আমি ছাত্রলীগের হাতে এই মুক্তিসনদটি তুলে দিলাম। সেদিন অকুতোভয়ে ছাত্রলীগ নেতৃত্ব এই কর্মসূচিকে বাস্তবায়িত করার দায়িত্ব গ্রহণ না করলে ৬ দফা আঁতুড়ঘরেই মৃত্যুবরণ করতো, আলোর মুখ আর দেখতো না। ছাত্রলীগ নেতৃত্ব এই কর্মসূচিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নিরলস প্রচেষ্টায় ছাত্রলীগকে সংগঠিত করতে থাকে। ৬ দফা প্রদানের পরপরই মুজিব ভাই আওয়ামী লীগের কাউন্সিল ডাকেন। কাউন্সিলে ৬ দফা অনুমোদিত হয় এবং সর্বসম্মতিক্রমে মুজিব ভাই সভাপতি নির্বাচিত হন। তবুও ৬ দফাকে বাংলার মানুষের মননশীলতায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেয়ার মূল শক্তি ও প্রতীতির জায়গা ছিল ছাত্রলীগ। কিন্তু মুজিব ভাই বাংলাদেশের প্রতিটি মহকুমায় সফর করার সিদ্ধান্ত নেন; সেটিও সফল করার দায়িত্ব নেয় ছাত্রলীগ। কয়েকটি মহকুমা শহরে সভা করার পর জেলাভিত্তিক সভা করার পরই যশোরে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হলো। জামিন পেলে আবার খুলনায় গ্রেপ্তার করা হলো, আবার মুক্তি পেলেন। এভাবে গ্রেপ্তার ও জামিনে আলো-আঁধারের খেলা চলতে চলতে সরকার সিদ্ধান্ত নিল, ডিফেন্স অব পাকিস্তান রুলস্‌-এ তাঁকে কারারুদ্ধ করার, যেখানে জামিনের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। মুজিব ভাই ও তাঁর সহকর্মীসহ রাজবন্দীদের মুক্তি এবং ৬ দফাকে জাতীয় কর্মসূচিতে রূপদানের আঙ্গিকে ৭ জুন পূর্ব-পাকিস্তানব্যাপী পূর্ণদিবস হরতাল আহ্বান করা হয়। মূল নেতৃত্বের একটি অংশ ৬ দফাকে সমর্থন না করা এবং একটি অংশ কারাগারে থাকায় জনাব মিজানুর রহমান চৌধুরী ও আমেনা বেগম আওয়ামী লীগকে সংগঠন হিসেবে কোনোরকমে টিকিয়ে রেখেছিলেন। ইতোমধ্যে মানিক ভাইও ৬ দফার প্রতি তাঁর সমর্থন ও প্রতীতি ঘোষণা করেন (এই সমর্থন আদায়ে শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন ও সৈয়দ মাযহারুল হক বাকী’র অদম্য প্রচেষ্টার সঙ্গে আমিও সম্পৃক্ত ছিলাম)। একদিকে ইত্তেফাক, অন্যদিকে ছাত্রলীগ (তখনও আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতৃত্বের মধ্যে ৬ দফার পক্ষে প্রতীতি ও প্রত্যয়ের জন্ম হয়নি) ৭ জুনের হরতালের পক্ষে সুদৃঢ় অবস্থান নেয়। ছাত্রলীগের প্রাক্তন নেতৃত্বের মধ্যে শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খানসহ ছাত্রলীগের অসংখ্য প্রাক্তন নেতৃত্ব ৭ জুন সফল করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে এসে অবস্থান নেন। তখন আমাদের সামনে ঘনঘোর অমানিশা। এনএসএফ থেকে শুরু করে ছাত্র ইউনিয়নসহ ডান-বাম সকল সংগঠনই ৬ দফাকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের ঘোরতর বিরোধী। আমরা যখন বাঙালির মননশীলতার আঙ্গিকে ৬ দফার মাধ্যমে স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর তখন ডানপন্থিরা তো বটেই, বামপন্থিরাও তারস্বরে চিৎকার করছেন, শেখ মুজিব দেশদ্রোহী, সিআইএ’র দালাল, ভারতের অনুচর। তার মৃত্যুদণ্ডই তাদের প্রচারণার মুখ্য বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে।
তখনও শ্রমিক লীগের জন্ম হয়নি। কিন্তু শ্রমিকদেরকে এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করতে না পারলে ৭ জুন হরতাল পালন অসম্ভব ও অবাস্তব ছিল। সর্বজনাব খালেদ মোহাম্মদ আলী, কামরুজ্জামান টুকু, ফিরোজ নূন ও আমার উপর দায়িত্ব পড়ে তেজগাঁও এলাকাকে হরতালের পক্ষে সংগঠিত করার। তেজগাঁও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি রহমত উল্লাহ আমাদের সঙ্গে যোগ দেন। আমাদের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ স্থানীয় প্রভাবশালী শ্রমিক নেতা রুহুল আমিন ভূঁইয়া’র (তাঁর বাড়ি নোয়াখালী) সমর্থন কিছুটা আদায় করতে সক্ষম হন। উনি পরোক্ষ সমর্থন দিলেও প্রত্যক্ষভাবে আমাদের সঙ্গে কোনো মিটিং বা মিছিলে কখনো আসেননি।
৩ জুনে তেজগাঁ’র একটি ময়দানে বিশাল (!) জনসমাবেশে কামরুজ্জামান টুকু সাহেব ও আমাকে পাঠানো হয় বক্তৃতা করার জন্য। যথাসময়ে পৌঁছে দেখলাম, সেখানে বিশাল তো দূরে থাক, জনাপাঁচেক লোকও উপস্থিত নেই। হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছি, হঠাৎ একজন যুবক এসে পরিচয় দিলো- “আমার নাম শহীদুল্লাহ, আমি তেজগাঁও থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।” আমার সমস্ত শরীর তখন রাগে, ক্ষোভে কাঁপছে। তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিলাম ৪/৫ কেজি লজেন্স কিনতে হবে। পথশিশু-কিশোরদের যতটা সম্ভব জড়ো করে একটি খণ্ড মিছিল করে হলেও ৭ জুন হরতালের বিষয়টি জানান দিতে হবে। প্রথমে ১৫/২০ জন ছেলে সমবেত হলো। তারমধ্যে একটি চটপটে ছেলেকে দায়িত্ব দেয়া হলো। সে লজেন্স বিলি করবে এবং যতটা সম্ভব পথপার্শ্ব এবং মহল্লার ছেলেদের মিছিলে সম্পৃক্ত করবে। আমি আশ্চর্যান্বিত হয়েছিলাম তেজগাঁও স্টেশন এলাকায় যখন সভার জন্য দাঁড়ালাম ততক্ষণে প্রায় দুই আড়াইহাজার লোক সেই মিছিলে যুক্ত হয়ে গেছে। একটা হ্যান্ডমাইকও কোথা থেকে যেন জোগাড় হয়ে গেল। একঘণ্টারও বেশি সময় ধরে আমি প্রবল উত্তেজনা নিয়ে বক্তৃতা করলাম। সেদিনের সেই সভায় আমি নিজে কেঁদেছিলাম, উপস্থিত জাগ্রত জনতাকেও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে দেখেছিলাম। ৬ জুন রাতে আমরা দায়িত্ব ভাগ করে দিয়ে তেজগাঁও’র শ্রমিকদের মেসগুলোতে গিয়ে অনুরোধ-উপরোধ করতে থাকলাম। ৩ তারিখ থেকে ৭ তারিখ সকাল পর্যন্ত প্রায় তিন-চারশ’ লোক প্রতিশ্রুতি দিলেন তারা সর্বাত্মক সহায়তা করবেন। আমরা তখন মনু মিয়াকে চিনতাম না। ৭ জুন ভোর থেকে শত চেষ্টা করেও একটা কার্যকর মিছিল বের করা সম্ভব হয়নি। যেটুকু হয়েছিল সেটাকে ঝটিকা মিছিল বলাই বাঞ্ছনীয়। প্রকাশ্যে মিছিল করতে ব্যর্থ হয়ে আমরা কয়েকজন সিদ্ধান্ত নিলাম যে, আমরা ৭ই জুন সকালে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামমুখী এক্সপ্রেস ট্রেনটির গতি রোধ করে দেবো। তখন আমার নিজের মধ্যে একটা নেশা ধরেছিল, যেকোনো উপায়ে একটা প্রতিরোধ গড়ে তুলতেই হবে। সংখ্যায় আমরা ২৫/৩০ জন হব। প্রচণ্ড আবেগে আমরা রেললাইনের উপর শুয়ে পড়ে রেলের গতিরোধ করার সিদ্ধান্ত নিলাম। সেই আঙ্গিকে আমি অপেক্ষাকৃত একটু উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে অন্য দু’জনের কাঁধে ভর দিয়ে উত্তেজক বক্তৃতা করছিলাম। সে খবর কোনোভাবে পুলিশের কাছে পৌঁছেছিল বিধায় তারা স্বতন্ত্র একটি ট্রেনের ইঞ্জিন নিয়ে ১০/১৫ জন পুলিশ পাইলটিং করে আগলে নিয়ে এগোচ্ছিল ওই এলাকাটি পার করে দেয়ার জন্য। আমাদের কাছাকাছি এসে পুলিশভর্তি ইঞ্জিনটি থেকে একজন গুলি ছুঁড়ে (সেদিন নারায়ণগঞ্জ ও সদরঘাটেও গুলি হয়েছিল)। যে দু’জনের ঘাড়ে ভর দিয়ে আমি বক্তৃতা করছিলাম তাদের একজন মাটিতে পড়ে গেলেন; তিনিই মনু মিয়া। তাকে সঙ্গে সঙ্গে তেজগাঁওর একটি ক্লিনিকে নিয়ে গেলাম। তখনও তিনি জীবিত এবং জ্ঞান রয়েছে। বিন্দুমাত্র চিকিৎসা তার শুরু হয়নি, আমার কোলে মাথা রেখে মনু মিয়া বিড়বিড় করে বললেন, “মুজিব ভাই’র সঙ্গে দেখা হলে বলবেন, আমি ৬ দফার জন্য জীবন দিয়ে গেলাম।” তেজগাঁও রেলগেটের কাছে পুলিশ আমাদের কাছ থেকে লাশ ছিনিয়ে নিয়ে গেল। ধস্তাধস্তিতে আমার শার্ট ছিড়ে গেছে, মনু মিয়া’র রক্তে আমার শরীর ভিজে গেছে। মনু মিয়া’র রক্তাক্ত গেঞ্জিটি আমি হাতছাড়া হতে দেইনি।
ওই গেঞ্জিটি একটি লাঠির মাথায় বেঁধে সেটিকে উড্ডীয়মান রেখে জঙ্গি মিছিল করে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে এগোতে থাকলাম। পুলিশ লাঠিচার্জ করলে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যেত, আবার মুহূর্তেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়া লোকগুলো একত্রিত হয়ে উদ্বেলিত চিত্তে স্লোগান দিয়ে এগোতে থাকতো। মনু মিয়া’র মৃত্যুর পর আশ্চর্যজনকভাবে সমগ্র তেজগাঁও এলাকায় চরম উত্তেজনা ও মারাত্মক উন্মাদনা সৃষ্টি হয়। পথের পাশের দোকানগুলো ঝটপট তাদের ঝাঁপ বন্ধ করতে থাকে। মিছিল কর্তৃক আক্রান্ত হয়ে দোকান লুটপাটের আশঙ্কায় নয়, সেটি আমি নিশ্চিত। কারণ, আমি দেখেছি দোকান বন্ধ করে তারা সটকে পড়েনি, নীরবে নিভৃতে আত্মরক্ষার চেষ্টা করেনি। বরং অকুতোভয়ে দৃপ্ত পদে মিছিলে অংশ নিয়েছিল। গগণবিদারী কণ্ঠে স্ল্লোগান দিয়ে সমগ্র মিছিলটিকে একটি অদ্ভুত উত্তেজনায় তারা মাতিয়ে তুলেছিল। সে দৃশ্য অবর্ণনীয়। আজকের প্রেক্ষাপটে অকল্পনীয়ও বটে। আজকে পুলিশের গুলিতে অথবা হিংস্র পাশবিক কোন সন্ত্রাসীর গুলিতে পিচঢালা পথে রক্তাক্ত লাশ পড়ে থাকলে মানুষ নির্বিকার চিত্তে হেঁটে চলে যায়। মিছিল করে বজ্রনির্ঘোষে গগণবিদারী স্লোগান দেয়া তো দূরে থাক, কোনরকমে আত্মরক্ষায় অথবা প্রাণ বাঁচাতে দ্রুত পদে তারা যে যার মতো সটকে পড়ে। এর পেছনের বাস্তবতাটি হলো, সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের যত উষ্মা-ক্ষোভই থাকুক না কেন, বিরোধী দলের প্রতি আস্থা ও প্রতীতি তাদের নাই। কারণ, আজকের প্রধান বিরোধী দল- তাদের শাসনের আমলের অত্যাচার নির্যাতন-নিগ্রহ মানুষের স্মৃতিতে আজও ভাস্বর।
সে যাই হোক, পথিপার্শ্ব মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে মিছিলটির কলেবর বেশ বৃদ্ধি পায়। মিছিলটি যখন শাহবাগের মোড়ে, তখন দেখি, ইত্তেফাকের বার্তা সম্পাদক শহীদ সিরাজুদ্দীন হোসেন তাঁর সন্তান শাহীন রেজা নূরের হাত ধরে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে গর্বিত চিত্তে হাত নেড়ে মিছিলটিকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন। এই দৃশ্যটি দেখে আমাদের- বিশেষ করে আমার উত্তেজনা এতই বৃদ্ধি পেলো যে, শাহবাগ চত্বরের পাদপীঠে দাঁড়িয়ে আমি প্রচণ্ড জ্বালাময়ী ভাষণ দিতে শুরু করলাম। ভাষণের ফাঁকে ফাঁকে স্ল্লোগান দিচ্ছিলাম- ‘মনু মিয়ার রক্তে স্বাধীন হলো বাংলাদেশ’, ‘পিণ্ডি না ঢাকা? ঢাকা ঢাকা’, ‘আইয়ুব না মুজিব? মুজিব মুজিব’। মিছিলটি নিয়ে যখন কার্জন হলে পৌঁছালাম, তখন দেখলাম, মনি ভাই, সিরাজ ভাই ( সিরাজুল আলম খান), বাকী ভাই, রাজ্জাক ভাই, সাচ্চু ভাই, শহীদুল হক মুন্সী ভাই, আসমত আলী শিকদার ভাই, বাশার ভাইসহ ছাত্রলীগের অনেক বিদায়ী জ্যেষ্ঠ নেতা আমাদের জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছেন। হয়তো তারা ইতোমধ্যেই আমাদের মিছিল সম্পর্কে অবগত হয়েছিলেন। মনু মিয়ার রক্তভেজা গেঞ্জি নিয়ে সেই মিছিলটি শুধু রাতারাতি আমাকে ভিন্নমাত্রায় উপস্থাপিত করেনি, ১৯৬৬ সালের ৭ জুনের ঐতিহাসিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রেক্ষাপটে এই জীবনসায়াহ্নে এসে আজও আমি পুলকিত বোধ করি। গর্ব, আনন্দ আজও আমার সমগ্র সত্তাকে প্রচণ্ডভাবে নাড়া দেয়।
আমাদের জ্যেষ্ঠ নেতারা তো বটেই, জেলখানা থেকে চিরকুট পাঠিয়ে মুজিব ভাইও অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। ৭ জুনের কয়েকদিন পর আমি ডিপিআর আইনে গ্রেপ্তার হয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে গেলে সৌভাগ্যক্রমে মুজিব ভাইয়ের পাশের সেলেই আমাকে রাখা হয়। প্রথম সুযোগেই মৃত্যুপথযাত্রী মনু মিয়া’র কথাগুলো মুজিব ভাইকে আমি গভীর আবেগতাড়িত হৃদয়ে বর্ণনা করেছিলাম। তারই বহিঃপ্রকাশ মুজিব ভাই করেছিলেন রেসকোর্স ময়দানে। মঞ্চে বসা অবস্থায় আমি আবার ডুকরে কেঁদে উঠেছিলাম।

কাতারকে বাঁচিয়েছে নগদ অর্থ ও গরু

মরুভূমির মধ্যে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এক গোয়ালঘরে একটির পর একটি গরু তোলা হচ্ছে মেশিনে দুধ দোয়ানোর জন্য। এক বছর আগে কাতারের কোনো ডেইরি শিল্প ছিল না। দুগ্ধজাত পণ্যের জন্য দেশটি পুরোপুরি সৌদি আরবের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এখন বালাদনা ফার্মে দশ হাজার গরু আছে, যাদের বেশির ভাগই এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ভালো জাতের গাভী থেকে। এক বছর আগে সৌদি আরবের নেতৃত্বে গালফ দেশগুলো কাতারের সঙ্গে সমপর্ক ছিন্ন করার এক মাস পর কাতার এয়ারওয়েজে করে প্রথম গরুটি আনা হয়েছিল দেশে। সেই বয়কটের কারণে ছোট্ট দেশটি সেসময় বেশ বড় সংকটে পড়েছিল। এরপরই দেশটি সিদ্ধান্ত নেয় স্বনির্ভর হওয়ার।
ফার্মের মালিক পিটার ওয়েল্টেভরেডেন বলছিলেন, “আমাদের লক্ষ্য ছিল, এক বছরের মধ্যে আমরা ফ্রেশ দুধে নিজেরা স্বাবলম্বী হবো। সবাই বলেছিল এটা হবে না, কিন্তু আমরা করে দেখিয়েছি।” গত বছর ৫ই জুন সৌদি আরব, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, আর মিশর কাতারের সঙ্গে সব ধরনের কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং পরিবহন সংযোগ ছিন্ন করে। কাতারের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে মদত দেয়ার অভিযোগ আনে দেশগুলো। কাতার সে অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে। প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর সমপর্ক ছিন্ন করাকে কাতার নিজের সার্বভৌমত্বের প্রতি একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখে। নিজেদের বিপুল খনিজ সমপদ গ্যাস বিক্রির পয়সা কাজে লাগিয়ে কীভাবে সংকট দূর করা যায়, সে চেষ্টা চালিয়ে যায়। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান আল থানি বলছেন, ‘যারা অবরোধ দিয়েছে আমাদের ওপর, তারা ক্ষমতা প্রদর্শন করতে চেয়েছিল। তাদের চেয়ে যারাই আলাদা, তাদেরই সন্ত্রাসী হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করে তারা।’
পুরনো শত্রুতা
এই সংকটের শুরু হয়েছিল, ২০১৭ সালের ২৪শে মে কাতারের সরকারি বার্তা সংস্থা কিউএনএ’র ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক সংবাদ থেকে যাতে বলা হয় কাতারের আমীর শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি ইসলামপন্থি গ্রুপ হামাস, হেজবুল্লাহ ও মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রশংসা করে বক্তব্য দিয়েছেন। এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রামপ বেশি দিন টিকবেন না। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সংকটের শিকড় আরো গভীরে প্রোথিত। ওয়াশিংটনভিত্তিক অ্যারাবিয়া ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা আলি শিহাবি জানিয়েছেন, কুড়ি বছর ধরে চাপা থাকা একটি বিষয় এই বিরোধের মূল কারণ। ২০১১ সালে লিবীয় নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর প্রকাশিত এক টেপে দেখা যায়, কাতারের কর্তমান আমীরের বাবা সৌদি রাজ পরিবারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন। মি. শিহাবি বলছেন, কাতার অন্য আরব দেশগুলোতে থাকা বিদ্রোহীদের অর্থ না দেয়ার একটি চুক্তি থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয় এবং আল জাজিরাতে তাদের বক্তব্য প্রচারের সুযোগ করে দেয়। ‘এটা অনেকটা ছোট ভাই বড় ভাইদের সঙ্গে লড়তে যাওয়া। সে তো সব সময় উল্টো ফল দেবে, আর সমস্যা বাড়াবে।’
ইরানের দিকে ঝুঁকে পড়া
বর্তমানে চারদিকে স্থলসীমায় অবরোধ থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজছে কাতার। এরই মধ্যে দেশটি সাতশ’ কোটি ডলার খরচ করে গাল্‌ফ উপকূলে নতুন একটি বন্দর খুলেছে। এর মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার ধাক্কা কিছুটা হলেও সামাল দিচ্ছে দেশটি। এই বন্দর দিয়ে এখন ২০২২ সালে বিশ্বকাপ ফুটবল স্টেডিয়াম বানানোর নির্মাণ সামগ্রী আসছে। সামপ্রতিক সময়ে কাতার ইরানের সঙ্গে উপকূলবর্তী একটি সীমান্ত এবং সবচেয়ে বড় গ্যাস ফিল্ডে ভাগাভাগি করছে। কাতারের বিমান এখন ইরানের আকাশসীমা ব্যবহার করছে। আর শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে সমর্থন দিলেও, সমপ্রতি ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার জন্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর ঐক্যের কথা বলছে। এছাড়া কাতারে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় বিমান ঘাঁটি রয়েছে।
দেশপ্রেমিক উদাসীনতা
দেশটির ঐতিহাসিক বাজার সৌক ওয়াকিফে সাধারণ কাতারিরা অপেক্ষা করছে, কবে এই অবরোধ শেষ হবে। একজন বলছিলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর বন্ধন অচ্ছেদ্য। এই ব্যক্তির স্ত্রী সৌদি আরবের নাগরিক এবং তার মা রিয়াদে থাকেন। অবরোধের কারণে তিনি পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে পারছেন না। তিনি খুবই বিরক্ত। তবে ভিন্নমতও আছে। বাজারে ছোট ছোট শিশুরা তরুণ আমীর শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানির ছবি সংবলিত বেলুন নিয়ে ছোটাছুটি করছিল। গাড়ির জন্য বানানো স্টিকার, মগ, টিশার্ট এবং বড় বড় ভবনে আমীরের ছবি দেখে বোঝা যায় তিনি বেশ জনপ্রিয়। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছিলেন, তারা আগের চেয়ে অনেক ভালো আছেন।

কারাগারে আলোচিত ‘হকার নেতা’ রকিব by ওয়েছ খছরু

মামলা দায়েরের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গ্রেপ্তার হলো সিলেটের আলোচিত হকার শ্রমিক নেতা রকিব আলী ওরফে আব্দুর রকিবকে। এই মুহূর্তে সিলেটের মেয়র ও ব্যবসায়ীদের সব ক্ষোভ তার উপর। রকিবের নেতৃত্বে চলছিলো সিলেটের ফুটপাথ ও রাস্তায় ব্যবসা। অস্থায়ী ভিত্তিতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বসিয়ে কারবার চালাচ্ছিলেন হকারের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় নি। তবে- রকিবসহ শতাধিক হকারদের বিরুদ্ধে মামলা ও রকিবকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে গতকাল সিলেটে বিক্ষোভ করেছে হকাররা। তারা অভিযোগ করেছে- ভোটকে সামনে রেখে মেয়র আরিফ পুরো ঘটনাটি সাজিয়ে মঞ্চায়ন করেছেন। আরিফ নিজেও হকারদের একটি অংশকে গোপনে শেল্টার দিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তারা। সিলেট নগর ভবনের চত্বরে সোমবারের ঘটনার পর পাল্টাপাল্টি অবস্থান ছিল সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী ও হকার শ্রমিক নেতা আব্দুর রকিবের। অপ্রীতিকর এ ঘটনার পরপরই রাতে আরিফুল হক চৌধুরী হকারদের বিরুদ্ধে ‘অলআউট’ অ্যাকশনে যেতে নিজের অনুসারী ব্যবসায়ী ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে তিনি সিলেটের হকার শ্রমিক নেতা আব্দুর রকীবকে গ্রেপ্তারের দাবিতে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেন সিলেটের প্রশাসনকে। এই আলটিমেটামের পরপর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সিলেটের কোতোয়ালি থানায় হকার শ্রমিক নেতা আব্দুর রকীব সহ শতাধিক হকারের বিরুদ্ধে মামলা করেন সিলেট সিটি করপোরেশনের আইন সহকারী শ্যামল রঞ্জন দেব। এদিকে- থানায় হকারদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আইনে মামলা দায়েরের পর বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন তারা। তারা তাৎক্ষণকি এ মামলার প্রতিবাদ জানায়। সিলেট হকার নেতা শাহজাহান জানিয়েছেন- ওই নগর মেয়র সহ সিটি করপোরেশনের কর্মচারীরা রকীব সহ অন্য হকারদের ডেকে নিয়ে নিজ হাতে নগর ভবনের ভেতরে পিঠিয়েছেন। এসব ছবি ও ভিডিও ফুটেজ আছে। এরপরও উল্টো হকারদের বিরুদ্ধে মারধর ও হামলার ঘটনায় মামলার বিষয়টি ন্যক্কারজনক বলে দাবি করেন তিনি। মামলা দায়েরের পর রাত পৌনে একটার দিকে হকার কল্যাণ সমিতির নেতাদের নিয়ে নগরী বন্দরবাজার এলাকায় অবস্থান করছিলেন হকার্স শ্রমিক নেতা আব্দুর রকিব। এ সময় সিলেটের কোতোয়ালি থানা পুলিশের একটি দল তাকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যায়। গ্রেপ্তারের পরপরই সিলেটের কোতোয়ালি থানার ওসি গৌসুল হোসেন জানিয়েছেন- সিলেট সিটি করপোরেশনে হামলা ও ভাংচুরের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় রকিবকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে নগরীর বন্দরবাজার এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানান তিনি। এদিকে- গতকাল দুপুরে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কোতোয়ালি থানা পুলিশ রকিবকে আদালতে হাজির করলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠিয়ে দিয়েছেন। এদিকে- থানা থেকে আদালতে নেয়ার পথে হকার শ্রমিক নেতা আব্দুর রকিব সাংবাদিকদের বলেন- মেয়রসহ সিলেট সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাকে ও হকারদের মারধর করে আহত করেছে। এরপর তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। এখন গ্রেপ্তার করিয়েছে। তিনি বলেন- মেয়র নিজেই ফুটপাথ উচ্ছেদ চায় না। চাইলে হকারদের পুনর্বাসনের মার্কেট বিক্রি করে দিতো না। তিনি বলেন- তিনি মেয়রের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার স্বীকার। রকিবকে গ্রেপ্তার করলেও রাতে সিলেটের ফুটপাথ ও রাস্তা হকারদের দখলেই ছিল। তবে- গতকাল দুপুর পর্যন্ত কোনো হকারকে রাস্তায় দেখা যায়নি। তবে ভ্যানে করে থাকা ভাসমান ফল ও সবজি বিক্রেতারা রাস্তায় দাঁড়িয়ে ব্যবসা করতে দেখা যায়। সিলেটে এখন কাপড় ব্যবসায়ী হকারদের তেমন দাপট নেই। যারা ফল, সবজি সহ নানা পণ্যের বিক্রেতারা তাদের দেখা যায় বেশি। এদিকে- রকিবকে গ্রেপ্তারের পরপরই তার মুক্তির দাবিতে রাতেই সিলেটে বিক্ষোভ করেছে হকাররা। এ সময় তারা রকিবের মুক্তি দাবি জানান। মিছিলটি নগরীর কোর্ট পয়েন্ট থেকে শুরু হয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সভায় হকারদের মালামাল লুট ও হকার্স কল্যাণ সমিতির সভাপতি মো. রকিবের উপর হামলাকারীদের গ্রেপ্তার ও উপযুক্ত শাস্তি প্রদানের জোর দাবি জানানো হয়। মহানগর হকার্স লীগের সাধারণ সম্পাদক আতিয়ার রহমানের সভাপতিত্বে ও হকার্স কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক খোকন ইসলামের পরিচালনায় বক্তব্য রাখেন কোষাধ্যক্ষ আব্দুর রহিম, হকার্স লীগের সহসভাপতি মতিন, সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল বাশার, সহসাংগঠনিক সম্পাদক রোমন আহমদ, হকার্স দলের সভাপতি আব্দুর রহিম, লোকমান আহমদ প্রমুখ। কয়েক মাস আগে সিলেটে আদালতে জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ফলে আদালতে হাজির হলে কারান্তরীণ হয়েছিলেন হকার শ্রমিক লীগ নেতা আব্দুর রকিব। তবে- রকিব কারাগারে গেলেও হকারদের দৌরাত্ম্য কমেনি। এরপর পরিবহন শ্রমিক নেতা, হকার নেতাদের আরো কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছিল। এরপরও সিলেটের ফুটপাথের ব্যবসা কমেনি। হকাররা আগের মতোই তাদের ব্যবসা চালিয়ে যান। অবস্থান কোনো পরিবর্তন না হওয়ায় নগরবাসীও হতবাক হয়েছে। নতুন করে গত তিন মাস ধরে সিলেটের ফুটপাথে হকারদের দাপট বেড়েছে। এ নিয়ে স্থানীয় হাসান মার্কেট, মধুবন সুপার মার্কেট, করিম উল্লাহ মার্কেটের ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ থাকলেও সিলেট সিটি করপোরেশনের কর্তারা ছিলেন ঘুমে। রমজানের শুরুতেও এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি করপোরেশন। এ কারণে সিলেটের মেয়র আরিফের উপর ক্ষুব্ধ ছিলেন সিলেটের ব্যবসায়ীরা। অবশেষে আরিফ ব্যবসায়ীদের চাপের মুখে হকার উচ্ছেদ করতে এই ‘অলআউট’ অ্যাকশনে নামলেন। এতে সফল হয়েছেন তিনি।
কে এই রকিব : সিলেটের হকার শ্রমিক নেতা রকিব সিলেটের এক পরিচিত নাম। রকিবের বাড়ি সিলেটের বাইরে। নগরীতে নিজেই হকার রকিব। ফেরি করে বিক্রি করতো বিক্রি করতো। আর তাকে ঘিরেই নগরীর রেজিস্ট্রারি মাঠে কাপড় ব্যবসা জমজমাট হয়ে উঠেছিলেন। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর রকিবের উত্থান শুরু হয়। এখন সে হকার্স শ্রমিক লীগ নেতাও। সিলেটের শ্রমিকলীগের শক্তিধর অবস্থান হয়েছে রকীবে। মেয়র হওয়ার পর থেকে আরিফের চক্ষুশূল আব্দুর রকিব। কিন্তু কোতোয়ালি থানা ও বন্দরবাজার ফাঁড়ি পুলিশের শেল্টার নিয়ে রকিব ছিলেন মহা দাপটবাজ। রকিব এখন সিলেট নগরীর শেখঘাট এলাকার বাসিন্দা। তার সঙ্গে রয়েছে সিলেটের কয়েক হাজার হকার। এ কারণে সিলেটে হকার ইস্যু নিয়ে যখনই কথা শুরু হয় তখন সবার আগে আসে রকিবের নাম। এই রকিবকে মঙ্গলবার রাতে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এখন প্রশ্ন হলো রকিব তো গ্রেপ্তার- আদৌ কী উচ্ছেদ হবে সিলেটের হকাররা।

সবাই ছুটছেন ওমরাহ হজে by দীন ইসলাম

সবাই ছুটছেন ওমরা হজে। এ তালিকায় রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও আমলাদের সংখ্যাই বেশি। পরিবার পরিজন ছাড়া অনেকেই এবার বন্ধুদের নিয়ে ওমরা হজ করতে সৌদি আরবে গেছেন। তবে কোরবানি ঈদের আগে ওমরা হজ বন্ধ ঘোষণায় অনেকের মাথায় বাজ পড়েছে। তারা প্রস্তুতি নিয়েও ভিসা না হওয়ায় পিছুটান দিয়েছেন। একাধিক হজ ওমরা এজেন্সি সূত্রে জানা গেছে, এবারের রমজানে রেকর্ডসংখ্যক বাংলাদেশি ওমরা হজ পালন করতে সৌদি আরবে গিয়েছেন। এর মধ্যে রাজনীতিবিদ ও আমলার সংখ্যাই বেশি। কয়েকটি এজেন্সির সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের অর্ধ শতাধিক সংসদ সদস্য, আগামীতে মনোনয়ন প্রত্যাশী রাজনীতিবিদ, বিএনপি’র সাবেক মন্ত্রী ও এমপি এবং রাজনৈতিক নেতারা ওমরা করতে গিয়েছেন।
এছাড়া সরকারের সচিব ও বিভিন্ন করপোরেশনের চেয়ারম্যানরাও ওমরা করতে গেছেন। এদিকে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে অনেকে ওমরা হজ পালন করতে গিয়ে ফেসবুকে ছবি পোস্ট করছেন। ওই পোস্ট করা ছবি তাদের নেতাকর্মীরা শেয়ার করছেন। কক্সবাজারের উখিয়ার সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদি’র ওমরা পালন ফেসবুকের ওয়াল ছেয়ে গেছে। প্রায় প্রতিদিনই বদির অনুসারীরা নামাজ, তাওয়াফ বা অন্য কোনো অনুষ্ঠানের ছবি পোস্ট করছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এরই মধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোজাম্মেল হক খান ও সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব ফরিদ উদ্দিন চৌধুরীসহ শতাধিক আমলা তাদের পরিবার নিয়ে ওমরা পালন করে এসেছেন। অনেক আমলা ওমরা হজের জন্য রমজান মাসকেই বেছে নিয়েছেন। তাই রোজায় সবচেয়ে বেশি আমলা ওমরা হজ করে এসেছেন। কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ওয়েবসাইট ঘাঁটলে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওমরা হজে যাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজনীতিবিদদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় এবার ওমরা হজ পালন করতে গেছেন। এ বছরই নির্বাচন এমন চিন্তায় ওমরা হজ করতে গেছেন কেউ কেউ।
বেশিরভাগ রাজনীতিবিদ ওমরা হজে গিয়ে নিজেদের ছবি পোস্ট করেন। হজ ও ওমরা এজেন্সি সূত্রে জানা গেছে, রোজার শেষ দিকে ওমরায় যাওয়ার জন্য বেশ চাপ তৈরি হয়। গত ২৫শে মে থেকে হঠাৎ করে সৌদি দূতাবাস ওমরা ভিসা বন্ধ করে দেয়। তাই ইচ্ছা থাকার পরও অনেকে ওমরা হজ করতে যেতে পারেননি। অনেকে ঈদুল আজহার পর ওমরা হজে যাওয়ার প্রস্তুতি এরই মধ্যে নিয়ে রেখেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

ইসরাইলের সঙ্গে প্রীতি ম্যাচ বাতিল করলো আর্জেন্টিনা

ইসরাইলে যাচ্ছেন না মেসিরা। রাজনৈতিক চাপের মুখে গতকাল প্রীতি ম্যাচটি বাতিল করেছে আর্জেন্টিনা। আগামী শনিবার বিরোধপূর্ণ জেরুজালেমের টেডি স্টেডিয়ামে ইসরাইল-আর্জেন্টিনার প্রীতি ম্যাচ আয়োজনের কথা ছিল। গতকাল বার্সেলোনার ট্রেনিং ক্যাম্পে আর্জেন্টিনার অনুশীলনে সমর্থকরা বাইরে থেকে প্রতিবাদ জানায়। আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জর্জ ফাউরি ইসরাইলের বিপক্ষে ম্যাচের ব্যাপারে আর্জেন্টাইন ফুটবলারদের অনাগ্রহের কথা জানান। সংবাদমাধ্যম ইএসপিএন’কে দেয়া সাক্ষাৎকারে ম্যাচ বাতিলের কথা জানান গঞ্জালো হিগুয়াইন। আর্জেন্টিনার এ তারকা স্ট্রাইকার বলেন, অবশেষে আর্জেন্টিনা সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর্জেন্টিনায় ইসরাইলি দূতাবাসও টুইট করে প্রীতি ম্যাচ বাতিলের ব্যাপারটি নিশ্চিত করে। আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যম জানায়, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট মাউরিসিও ম্যাক্রিকে অনুরোধ করে ম্যাচ বাঁচানোর চেষ্টা করেন। এদিকে ম্যাচ বাতিলের খবরে ফিলিস্তিনের গাজায় উৎসব ছড়িয়ে পড়ে। যেখানে সম্প্রতি ফিলিস্তিনিদের বিক্ষোভ দমনে ইসরাইলি বাহিনীর গুলিতে অন্তত ১২০ জন প্রাণ হারায়। ইসরাইলে খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ায় মেসি ও তার দলকে ধন্যবাদ জানিয়েছে ফিলিস্তিন ফুটবল ফেডারেশন। এক বিবৃতিতে ফেডারেশনের সভাপতি জিব্রিল রজব বলেন, ‘ম্যাচ বাতিলের মধ্য দিয়ে ইসরাইলের প্রতি লাল কার্ড দেখানো হয়েছে। নৈতিকতা ও খেলার জয় হয়েছে।’ এর আগে ম্যাচের বিরোধিতা করে জোরালো প্রচার চালান জিব্রিল রজব। ‘মেসি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রতীক। আরব ও মুসলিম দেশগুলোতে তার ১০ মিলিয়ন ভক্ত রয়েছে। ইসরাইলের বিপক্ষে খেলতে নেমে মেসি যেন মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধকে স্বীকৃতি না দেন আমরা সেই প্রত্যাশাই করি।’ মেসি ইসরাইলে খেলতে আসলে তার জার্সি ও ছবি পোড়ানোর হুমকিও দেন ফিলিস্তিন ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি। এই ম্যাচ ঘিরে শুরু থেকেই বিতর্কের ঝড় ওঠে। বছরের পর বছর ধরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলের নিপীড়ন এর মূল কারণ। পূর্ব জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনিরা সব সময়ই তাদের রাজধানী হিসেবে দাবি করে আসছে। বিপরীতে পুরো জেরুজালেম নগরীকেই নিজেদের দাবি করে ইসরাইল। গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ক্ষোভ উস্‌কে দেন। গত মাসে তেলআবিব থেকে জেরুজালেমে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস স্থানান্তর করা হয়। ফুটবলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আর্জেন্টিনা কোচ হোর্হে সাম্পাওলি আগেই ইসরাইলে না গিয়ে বার্সার মাঠে ম্যাচ খেলার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। বিশ্বকাপ সামনে রেখে মেসির ক্লাব বার্সেলোনায় অনুশীলন করছে আর্জেন্টিনা দল। রাশিয়ায় উড়াল দেয়ার আগে এখন সেখানে একটি প্রস্তুতি ম্যাচের প্রতিপক্ষ খুঁজছে আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ)। এর আগে বুয়েন্স আয়ার্সে প্রথম প্রস্তুতি ম্যাচে মেসির হ্যাটট্রিকে হাইতিকে ৪-০ গোলে হারায় আলবিসেলেস্তেরা। মস্কোতে আগামী ১৬ই জুন আইসল্যান্ড ম্যাচ দিয়ে এবারের বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু করবে গতবারের রানার্সআপ আর্জেন্টিনা। ‘ডি’ গ্রুপের অপর দুই দল ক্রোয়েশিয়া ও নাইজেরিয়া।

পররাষ্ট্র সচিব-বার্নিকাট বৈঠক: বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ না হওয়ায় উদ্বেগ

ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধে সরকারের তরফে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না থাকায় ফের গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা ব্লুম বার্নিকাট। পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হকের সঙ্গে গতকাল ঘণ্টাব্যাপী এক বৈঠকে এ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেন তিনি। সেখানে গত ৩০শে মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে বৈঠকে বার্নিকাট মাদকবিরোধী অভিযানে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনায় মৃত্যুতে যে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন সেই প্রসঙ্গও আসে। মানবাধিকার সংবেদনশীল রাষ্ট্র হিসেবে এ বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের বিস্তারিত তুলে ধরেন রাষ্ট্রদূত মার্শা ব্লুম বার্নিকাট। সেগুনবাগিচায় মধ্যাহ্নের ওই বৈঠকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমেরিকাস অনুবিভাগ এবং মার্কিন দূতাবাসের রাজনৈতিক বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক সূত্রমতে, সেখানে প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন কানাডা সফর এবং জি-সেভেন আউটরিচ এবং কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডুর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের বিষয়ে আলোচনা হয়। ওই বৈঠকে যোগ দিতে যাওয়ার আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক হওয়া না হওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়। চার দিনের সফরে প্রধানমন্ত্রী আজ কানাডা যাচ্ছেন। এ সফরে তিনি বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলোর সংগঠন জি-৭ এর শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেবেন এবং কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুুডোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। সেখানে রোহিঙ্গাদের দ্রুত ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী।
হত্যা কোনো সমাধান নয়: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনে করে বিচারবহির্ভূত হত্যা মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কার্যকর কোনো পন্থা নয়। এটি কোনো সমস্যার সমাধান হতে পারে না। মাদক অভিযানে মৃতের সংখ্যা নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন। সবার বিচার পাওয়ার অধিকার আছে বলে মনে করে দেশটি। সেগুনবাগিচার বৈঠকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত তার দেশের এ অবস্থানই তুলে ধরেছেন বলে জানিয়ােচে্ছ সূত্রটি। উল্লেখ্য, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট এমনটাই বলেছিলেন। সেদিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল অবশ্য মাদক অভিযানে মৃত্যুর বিষয়ে একটি ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন। মন্ত্রীর ভাষ্য মতে, বিচারবহির্ভূত হত্যা হচ্ছে না, মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে আত্মরক্ষার্থে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গুলি করতে বাধ্য হচ্ছে। মন্ত্রীর এ ব্যাখ্যার বিষয়ে মার্কিন দূত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে কোনো মন্তব্য না করলেও এ নিয়ে ফের উদ্বেগ প্রকাশের মধ্য দিয়ে তিনি দ্বিতীয় দফায় এটি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বানই জানালেন বলে মনে করেন কূটনীতিকরা। স্মরণ করা যায়- মাদক অভিযানে বন্দুকযুদ্ধ এবং মৃত্যুর ঘটনায় দেশ-বিদেশে উদ্বেগ বাড়ছে। পরিস্থিতির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছে জাতিসংঘ। চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে কথিত বন্দুকযুদ্ধে প্রতিটি মৃত্যুর ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চেয়েছে ঢাকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের মিশনগুলো। ইইউ জোটভুক্ত দেশগুলোর ঢাকাস্থ মিশন প্রধানদের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়- “আমরা আশা করি, কর্তৃপক্ষ যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সন্দেহভাজন অপরাধীদের ?মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করবে। ঢাকায় ইইউ দেশগুলোর মিশনপ্রধানদের সম্মতিতে ইইউ ডেলিগেশন প্রধানের তরফে ওই বিবৃতি দেয়া হয়। সেখানে বলা হয়, মাদক ও এর চোরাকারবার বিশ্বজুড়েই একটি বড় সমস্যা। বাংলাদেশে যে মাদকবিরোধী অভিযান চলছে, সেখানে মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে, এসব ঘটনায় নিহত হয়েছে ১২০ জনেরও বেশি মানুষ। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যাতে আইন ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে, সেই সঙ্গে তারা যাতে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ না করে- তা নিশ্চিত করার বিষয়ে বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতির কথা মনে করিয়ে দেয়া হয় বিবৃতিতে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, মৃত্যুর ঘটনাগুলো ঘটছে অভিযান চালানোর সময় মাদক চোরাকারবারিদের সঙ্গে গোলাগুলিতে কিংবা মাদক বিক্রেতাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে। তবে মানবাধিকারকর্মীরা বন্দুকযুদ্ধের মৃত্যুর ঘটনাগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলছেন, মাদকের উৎস বন্ধ না করে এভাবে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ ঘটিয়ে অভিযানের সফলতা আসবে না। এই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের অফিস অন ড্রাগস অ্যান্ড ক্রাইম (ইউএনওডিসি) গত ২রা জুন এক বিবৃতিতে জানায়, বাংলাদেশে চলমান মাদকবিরোধী অভিযান বিষয়ে তারা গভীরভাবে নজর রাখছে।

খালেদার আবেদন নিষ্পত্তিতে ম্যাজিস্ট্রেটের অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব: ‘আদালতের প্রক্রিয়া অপব্যবহারের শামিল’

মিথ্যা তথ্য দিয়ে জন্মদিন পালনের অভিযোগে দায়ের করা মানহানির মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার আবেদনের ব্যাপারে নিম্ন আদালত ভুলভাবে অগ্রসর হয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন হাইকোর্ট। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর জামিন আবেদন নিষ্পত্তি করে দেয়া আদেশে বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ পর্যবেক্ষণ দেন।
নিম্ন আদালতের আদেশের বিষয়টি উল্লেখ করে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে বলা হয় ‘ওপরের আদেশটি পড়ার পর এই বিবেচনায় উপনীত হতে আমাদের কোনো দ্বিধা নেই যে, বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট বিষয়টি নিয়ে ভুলভাবে অগ্রসর হয়েছেন। একটি অভিযোগ মামলায় অভিযুক্ত জামিন আবেদনের পাশাপাশি যেখানে নিজেই পিডব্লিউ (প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট) ইস্যু করার আবেদন দাখিল করে আদালতকে অবহিত করেছেন যে, তিনি অপর একটি মামলায় ইতোমধ্যে কারাগারে রয়েছেন, সেখানে তার বিরুদ্ধে ইস্যু করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিল হওয়ার প্রতিবেদনের অপেক্ষা করার কোন প্রয়োজনই নেই। কাজেই, বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট জামিন আবেদনের সঙ্গে পিডব্লিউ ইস্যুর আবেদন দাখিল হওয়ার পর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিলের প্রতিবেদনের জন্য ০৫/০৭/২০১৮ পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করে মারাত্মক ভুল করেছেন।
এই মামলার বিদ্যমান তথ্যপ্রমাণ ও প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে এটা স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় যে, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিলের প্রতিবেদন নেয়ার নামে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট অভিযুক্তের জামিন আবেদন প্রক্রিয়া অপ্রয়োজনীয়ভাবে প্রলম্বিত করেছেন যা আদালতের প্রক্রিয়া অপব্যবহারের শামিল।
মামলার তথ্য-প্রমাণ ও সার্বিক পরিস্থিতি এবং আইনি বিধানসমূহ বিবেচনায় নিয়ে আমরা মনে করছি, নিম্নোক্ত পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনার মাধ্যমে সর্বোত্তম উপায়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে।
অভিযুক্তের দাখিল করা পিডব্লিউ ইস্যু ও জামিন আবেদন দু’টির (যা নথিভুক্ত আছে) দ্রুত শুনানি করতে বিজ্ঞ মুখ্য মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট, ঢাকা/সংশ্লিষ্ট মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটকে নির্দেশনা দেয়া হলো।
সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটকে এটা মনে রাখা উচিত যে, এমন একটি নালিশি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিলের প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করার কোনো প্রয়োজন আদালতের নেই যেখানে অভিযুক্ত আদালতকে অবহিত করেছেন যে অপর একটি মামলায় তিনি ইতিমধ্যে কারান্তরীণ।’

কমলাপুরে টিকিটের জন্য লড়াই, ভোগান্তি by ফরিদ উদ্দিন আহমেদ

ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শেষ হয়েছে। এবার যাত্রার পালা সামনে। গতকাল দেয়া হয়েছিল ১৫ই জুনের অগ্রিম টিকিট। তবে রোজা ৩০টি হলে আগামী ১৬ই জুন বিশেষ ব্যবস্থায় ট্রেন চালু থাকবে বলে জানিয়েছেন কমলাপুর রেল স্টেশনের ম্যানেজার সিতাংশু চক্রবর্তী। তিনি বলেন, গতকাল ঈদের অগ্রিম টিকিট বিক্রির শেষ দিন ছিল। তবে রোজা যদি ৩০টি হয় অর্থাৎ ১৭ই জুন ঈদ হয়; তাহলে আগামী ১৬ই জুন বিশেষ ব্যবস্থায় ট্রেন চালু থাকবে। ১৫ তারিখ এ বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তবে কতটি ট্রেন চলবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে কয়েকটি বিশেষ ট্রেনের টিকিট শেষ হয়ে গেছে। যেমন তিস্তার টিকিট নেই। এর বিপরীতে দেওয়ানগঞ্জের বিশেষ ট্রেনের টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে। এদিকে বুধবার সকাল থেকেই রাজধানীর কমলাপুর স্টেশনে ঈদের অগ্রিম টিকিটের জন্য দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করছেন যাত্রীরা।
টিকিট কাউন্টারের সামনে থেকে শুরু করে মানুষের এই লাইন গিয়ে ঠেকেছে মূল সড়কের কাছাকাছি। রাত থেকে অপেক্ষমাণ টিকিট প্রত্যাশীদের পদচারণায় স্টেশন এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। স্টেশনে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। টিকিট কাউন্টার থেকে জানানো হয়, একজন যাত্রী সর্বোচ্চ ৪টি টিকিট সংগ্রহ করতে পারছেন। ঈদ উপলক্ষে বিক্রীত টিকিট ফেরতযোগ্য নয়। সুবর্ণ এক্সপ্রেস ও সোনার বাংলা ট্রেনে কোনো আসনবিহীন টিকিট ইস্যু করা হবে না। অন্যান্য ট্রেনের ক্ষেত্রে শুধু যাত্রীদের অনুরোধে যাত্রার দিন আসনবিহীন টিকিট ইস্যু করা হবে। এদিকে ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রিতে যেন কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে সে লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ রেলওয়ের নিজস্ব বাহিনী তৎপর রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্টেশন কর্তৃপক্ষ।
এদিকে অনলাইনে ঈদের অগ্রিম ট্রেনের টিকিট সংগ্রহের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন ফয়সাল আহমেদ। নির্ধারিত দুই দিনে আগামী ১৩ ও ১৪ই জুনের টিকিট অনলাইনে কাটতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। কিন্তু ঈদ উদযাপনে তো বাড়ি যেতেই হবে। তাই ভিন্ন পথ না পেয়ে বাধ্য হয়ে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে এসেছেন তিনি। কমলাপুরে সকাল ৮টা থেকে ২৬টি কাউন্টারে আগামী ১৫ই জুনের টিকিট বিক্রি হচ্ছিল। সেহরির পর থেকে রাজশাহীগামী ট্রেনের টিকিটের কাউন্টারের সামনে অপেক্ষা করছিলেন ফয়সাল। তিনি বলেন, দুইদিন একই অবস্থা হয়েছে। অনলাইনে টিকিট ইস্যু হওয়ার কথা সকাল ৮টায়। সেভাবেই আগে থেকে প্রস্তুতি নিয়ে বসে ছিলাম। ৮টা বাজার সঙ্গেই সঙ্গে চেষ্টা করতে থাকি, কিন্তু সাইটেই ঢুকতে পারছিলাম না। সার্ভার বিজির কারণে সেই সময় সাইটটি ব্যবহার করতে পারছিলাম না। কিন্তু পরবর্তীতে যখন ঠিক হলো, তখন টিকিট শেষ। পরপর দুইদিন একই রকম অবস্থার মধ্যে পড়েছি। তিনি বলেন, তাই বাধ্য হয়ে স্টেশনে এসেছেন। তিনি বলেন, অনলাইনে টিকিট বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও যদি সাধারণ মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে কিনতে না পারে, তাহলে অনলাইনে দিয়ে কী লাভ? যুগটাই এখন অনলাইনের, তাই অনলাইনের সেবা বৃদ্ধিসহ অনলাইনে টিকিটের সংখ্যা আরো বাড়ানোর সময় এসেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। আরেক টিকিট প্রত্যাশীও একই অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ঈদের অগ্রিম টিকিটের জন্য অনলাইনে আমার অনেক বন্ধুরাও চেষ্টা করেছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত পায়নি। অনলাইনে টিকিট না পাওয়া যাত্রীদের অভিযোগের বিষয়ে কমলাপুর স্টেশন ম্যানেজার সিতাংশু চক্রবর্তী বলেন, অনলাইনে টিকিট পাচ্ছে না-এ অভিযোগ ঠিক না। কারণ, যারা অনলাইনে টিকিট কাটেন, তারা সেই টিকিটটি প্রিন্ট করে মূল টিকিট সংগ্রহের জন্য আমাদের এখানে আসেন।
তো স্বাভাবিকভাবে তারা তো আসছেনই, তাহলে অবশ্যই অনলাইনে টিকিট সংগ্রহ করতে পারছেন। তিনি বলেন, এছাড়া অনলাইনে ২৫ শতাংশ আগ্রহীরা সার্ভারে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই টিকিট কাটতে চেষ্টা করেন। একই সময়ে অনেকজন একসঙ্গে সাইটে প্রবেশ করায় সার্ভার বিজি হয়ে যায়। আর টিকিটের প্রতি সবার চাহিদা থাকে, যে কারণে সবাই চেষ্টা করেন। এর মধ্যেই অনেকে পেয়ে যান। আর অনলাইনে টিকিট সংখ্যা নির্দিষ্ট, তাই সবাই টিকিট পান না। উল্লেখ্য, ১লা জুন থেকে শুরু করে ৬ই জুন ঈদ উপলক্ষে অগ্রিম ট্রেনের টিকিট বিক্রি শেষ করেছে রেল কর্তৃপক্ষ। প্রতিদিন বিক্রি করেছে ২৩ হাজার ৫১৪টি টিকিট। যারা ১লা জুন টিকিট সংগ্রহ করেছেন তারা আগামী ১০ই জুন ঈদ যাত্রা করবেন।

এশিয়ার সর্ববৃহৎ পাইকারি বাজার গাউছিয়ায় টার্গেট ৫০০ কোটি টাকা by জয়নাল আবেদীন জয়

ঢাকার পূর্ব প্রবেশদ্বার রূপগঞ্জ উপজেলার ভুলতার গাউসিয়া হাটে অভাবনীয় বাণিজ্যেক লেনদেন চলছে। প্রতি মঙ্গলবার সারা দেশের কাপড় ব্যবসায়ীদের বিপণন-তীর্থ হয়ে ওঠে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশের এই মোকাম। তিন যুগের কিংবদন্তি হয়ে ওঠা এই বস্ত্র-হাটের অলিগলিতে আলো-আঁধারিতে হাজার হাজার দোকানের বিস্ময় হাজারো ক্রেতার ভিড়ে পা ফেলা দায়। ব্যবসায়ীদের জন্য এখানে দিন-রাতের ফারাক থাকে না। ফুরসত মেলে না নাওয়া-খাওয়া-ঘুমের। সপ্তাহের একদিন বিক্রি-বাট্টা হয় অবিশ্বাস্য অঙ্কে। শুধু মঙ্গলবার দিনেই বিক্রি হয় প্রায় ৪০ কোটি টাকা। আর এ হাটের ক্রেতার সিংগভাগই নারী। এ হাটকে ঘিরে সারা দেশের ৩০ হাজার নারীর ভাগ্যের চাকা সচল হয়ে উঠেছে। আর যাকাতের কাপড়ের জন্য প্রসিদ্ধ এ হাটে এবারের ঈদ মৌসুমে অন্তত ৫০০ কোটি টাকার যাকাতের কাপড় বিক্রি করার আশা করছেন হাটের ব্যবসায়ীরা। ঈদ উপলক্ষে প্রতিদিন বসছে হাট। বিক্রিবাট্টাও হচ্ছে অভাবনীয়।  প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে ক্রেতাদের উপচে পরা ভিড়। রাতের নিস্তব্ধতা যখন চারদিকে নিথর থাকে আসে তখন শুরু হয় গাউসিয়া কাপড়ের বাজারের হাঁক-ডাক। দরদামের কোলাহল, কুলিদের ব্যস্ততা। মার্কেটের সামনে ভ্যানের দীর্ঘ সারি। হাটের গা-ঘেঁষে সড়কে ট্রাকের বহর। কাপড়ের বিশাল গাঁট উঠছে, নামছে। লোড নিয়ে চলেছে দূরদূরান্তের গন্তব্যে। সেই ১৯৭৯ সাল থেকে আজ অব্দি ব্যবসায়ের কৌলিন্য এই হাটকে ইতিমধ্যে ‘প্রাচ্যের ম্যানচেষ্টার’ উপাধি দেওয়া হয়েছে।
গাউছিয়া মার্কেটের থান কাপড়ের ভাঁজে ভাঁজে রঙের গন্ধ। বেশি ক্রেতা, বেশি বিক্রি। এর বাইরে আর কোন দৃশ্য নেই এখানে। একসময় কেবল শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা ও চাদরের জন্য যে গাউছিয়া হাটের সুখ্যাতি ছিল তার বর্ণাঢ্য এখন প্রশস্ত হয়েছে। বর্তমানে এই হাটটি দেশের বড় তাতবস্ত্র বিপণন কেন্দ্র। রুমাল থেকে জামদানি শাড়ি, মাথার টুপি থেকে পাঞ্জাবি সব মিলে এই হাটে। ছাপা কাপড়, থান কাপড়, সুতি কাপড়, থ্রি-পিস, ওড়না, শার্ট-প্যান্ট কি নেই এখানে। রমজানের ঈদে বাড়তি যোগ হয় যাকাতের কাপড় আর লুঙ্গি। এবারের ঈদে সাড়ে ৭ হাজার পাইকারি কাপড়ের মোকাম থেকে অন্তত ৫০০ কোটি টাকার যাকাতের কাপড় কেনাবেচা হবে বলে আশা করছেন দোকান মালিক সমিতির সদস্যরা। বিভাগীয় শহরসহ দেশের সব প্রান্তের পাইকারি ক্রেতাদের ভিড়ে মুখর গাউছিয়া হাট। ব্যবসায়ীদের কোন টোল জমা, খাজনা বা চাঁদা দিতে হয় না। টোল-খাজনা না থাকায় গাউছিয়া হাটই ব্যবসায়ীদের প্রথম পছন্দ। তাছাড়া চোর-বাটপাড় কিংবা ছিনতাইকারীর কোনো ভয় নেই এই হাটে। এ কারণে নিশ্চিতে পসরা সাজিয়ে বসেন বণিক আর ক্রেতারাও নির্ভাবনায় খরিদ করেন তা। অভিশপ্ত দরিদ্রতাকে জয় করতে জীবনযুদ্ধ আর জীবিকা নির্বাহের সংগ্রামে নামা নারী নামের অগ্রনায়িকা প্রতি মঙ্গলবারের হাটে ভিড় করেন এইখানে। এটাই তাদের তীর্থস্থান। অল্প অল্প কাপড় কিনে এরা নিজেদের এলাকায় বিক্রি করে আবার হাটবারে ছুটে আসেন গাউছিয়ায়। এভাবেই দেশের আনুমানিক ৩০ হাজার ভাগ্য বিতাড়িত নারী আজ সংগ্রামী জীবনে স্বাবলম্বী হওয়ায় গল্প শোনায়। শুধু মঙ্গলবারে পাইকারি কাপড় বিক্রি হয় প্রায় ৪০ কোটি টাকার। ঈদে যাকাতের কাপড়ের জন্য দেশের প্রায় সকল জেলার লোকজন ভিড় করায় এ হিসাব দিনের বেচাকেনায় চলে আসে। এবারের ঈদ মৌসুমে অন্তত ৫০০ কোটি টাকার শুধু যাকাতের কাপড় বিক্রি হওয়ার আশা করছেন গাউছিয়া মার্কেটের বণিক সমিতি।
মার্কেট কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, রাজধানী ঢাকা থেকে ২৪ কিলোমিটার পূর্বে ভুলতা এলাকার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশ ঘেঁষে গড়ে ওঠেছে গাউছিয়া মার্কেট। ১৯৭৯ সালে ছোট পরিসরে বেচাকেনা শুরু হয়। পরে ১৯৮৫ সালের ৪ঠা জানুয়ারি গাউছিয়া মার্কেটের প্রথম ভবন গড়ে ওঠে। পরে ধীরে ধীরে ১২০ বিঘা জমির উপড় মার্কেট সম্প্রসারিত হয়। বর্তমানে গাউছিয়া-১ ও গাউছিয়া-২ মার্কেটে পাইকারি কাপড়, শাড়ি, ওড়না, লুঙ্গি, গামছাসহ সকল বস্ত্রই বিক্রি হয়। গাউছিয়া মার্কেটের দোকান মালিকরা জানান, গাউছিয়া মার্কেটে পাইকারি কাপড়ের দোকান রয়েছে সাড়ে ৭ হাজারের উপড়ে। তবে এসব দোকান সবগুলো খোলা থাকে মঙ্গলবার। আর ঈদুর ফিতরে রোজার ১৫ দিন আগে থেকে প্রতিদিনই সকল দোকান খোলা থাকে। এছাড়া বছরের অন্যদিনগুলোতে কিছু দোকান বন্ধ থাকে। মঙ্গলবারে একেকটি দোকানে বিক্রি হয় কমপক্ষে এক থেকে দেড় লাখ টাকা। আবার কোনো কোনো দোকান ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা বিক্রি করে। আর যাকাতের কাপড়ের দোকানের বিক্রি বাট্টা হয় অবিশ্বাস্য অঙ্কে। কেউ কেউ অর্ধকোটি কোটি টাকার বেচাকেনা করে ফেলেন ভাগ্য সহায় হলে কেনো কোনো দিন। রহিম শাড়ি-কাপড় বিতানের মালিক আব্দুর রহিম বলেন, ভাই ব্যবসা ভালোই।
তয় দেশের পরিস্থিতি খারাপ অইলে ব্যবসা মন্দা হয়। আমাগো কাস্টমার বেশির ভাগ মহিলা। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেইক্যা আহে। তাই পরিস্থিতি খারাপ অইলে মনডা খারাপ অইয়া যায় গা। আগে বেচবার পারতাম দেড়-দুই লাখ টাকা। সিটি প্রিন্ট শাড়ির মালিক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, এবারের সিজনে যাকাতের কাপড়ের বেশ ভালো কেনাবেচা হচ্ছে, বিশেষ করে চট্রগ্রাম আর সিলেট অঞ্চলের লোকজন প্রতিদিনই যাকাতের কাপড় কিনে গাড়ি ভর্তি করে নিয়ে যাচ্ছেন। এ কারনে তিনি শোকরিয়া আদায় করেন। প্রতি মঙ্গলবারে সাড়ে ৭ হাজার পাইকারি দোকানদার ১ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকার বেচাকেনা করে। সে হিসাবে প্রায় মঙ্গলবারে ৪০ কোটি টাকার বেচাকেনা হয়। গাউছিয়া দোকান মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুল মালেক বলেন, মার্কেটে সারাদেশ থেকে হাটবারে প্রায় ৩০ হাজার নারী ক্রেতারা আসে এটা ভাগ্যের বিষয়। তাই নারী ক্রেতাদের কথা চিন্তা করে নিরাপত্তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। যেন ছিনতাই, চুরি কিংবা ডাকাতির ঘটনা না ঘটে। মার্কেটের উপড়েই রয়েছে পুলিশ ফাড়ি। তাছাড়া রয়েছে নিরাপত্তাপ্রহরী।
সাধারন সম্পাদক হাজী ইলিয়াছ হোসেন বলেন, রমজান মাসটা এখানকার ব্যবসায়ীদের জন্য সত্যি খোদার  বিশেষ রহমত। যাকাতের কাপড় কিনতে কোটি কোটি টাকা নিয়ে লোকজন আসে। আল্লাহর রহমতে কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি আজ পর্যন্ত। তবে ফ্লাইওভার নির্মাণের কারণে যানজট হচ্ছে প্রতিদিন। এ কারণে বিক্রিবাট্টা একটু কম। রাস্তা মেরামত থাকলে এবারের ঈদে আগের সকল রেকর্ড ভেঙে কেনাবেচা হতো। তবু আল্লাহর রহমকে বেচাকেনা  ভালো। এ অবস্থা চলমান থাকলে অন্তত ৫০০ কোটি টাকা আমদানি হওয়ার  আশা করছি।
এ মার্কেটের মালিক ও গাউছিয়া কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু বলেন, গাউছিয়া মার্কেটের ৮০ ভাগ ক্রেতাই মহিলা। ঢাকার বাইরে থেকে যেসব নারী কাপড় কিনতে আসেন তাদের অনেক কষ্ট হয়। সেই বিবেচনা মাথায় নিয়ে পরিকল্পনা করেছি গাউছিয়ায় একটি মহিলা রেষ্ট হাউস তৈরি করবো। কম খরচে মহিলারা এখানে রাতযাপন করতে পারবে। আর ব্যবসায়ীদের কথা চিন্তা করে মার্কেটের পাশেই তৈরী করা হবে এ্যাপার্টমেন্ট। তাছাড়া গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য আগামী বিশাল একটি টার্মিনাল করা  হচ্ছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথা মাথায় রেখে মার্কেটের নিজস্ব জায়গায় আমরা একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের পাশাপাশি প্রায় দুইশ নিরাপত্তা কর্মী নিযুক্ত করেছি। এখানে ন্যায্যমূল্যে মানুষ কিনতে পারে আর পর্যাপ্ত নিরাপত্তা পায় বলেই সারা বছর ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় থাকে।