Monday, September 14, 2026

গাজার যুদ্ধ যেভাবে বদলে দিয়েছে ফিলিস্তিনি পুরুষদের জীবন

দ্য গার্ডিয়ানঃ গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধ ফিলিস্তিনি পুরুষদের শুধু ঘরবাড়ি, জীবিকা ও স্বজন হারানোর অভিজ্ঞতার মধ্যেই আটকে রাখেনি; তাদের আত্মপরিচয়, পারিবারিক সম্পর্ক, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং মানসিক অবস্থাকেও গভীরভাবে বদলে দিয়েছে। চার ফিলিস্তিনি পুরুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে যুদ্ধের এই কম আলোচিত প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে।

৩৯ বছর বয়সী আহমেদ যুদ্ধের আগে পিএইচডি করছিলেন এবং একই সঙ্গে রেডিও উপস্থাপক, স্থানীয় ফ্যাক্টচেকিং ওয়েবসাইটের সম্পাদক ও গবেষক হিসেবে কাজ করতেন। তিনি বলেন, যুদ্ধ তার জীবন সম্পূর্ণ ওলটপালট করে দিয়েছে। আগে যেখানে গবেষণা ও কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন, এখন তাকে পানি সংগ্রহ বা শৌচাগার ব্যবহারের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয়। নিজের কাজ ও অর্জনের মধ্য দিয়ে যে আত্মমর্যাদা তিনি অনুভব করতেন, যুদ্ধের পর তা অনেকটাই হারিয়ে গেছে।

২০২৪ সালের মে মাসে আহমেদ ও তার পরিবারের সদস্যরা বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হন। এরপর থেকে তারা তাঁবুতে বসবাস করছেন। ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অভাব স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কেও প্রভাব ফেলেছে। পরিবারের অন্য সদস্যরা শুনতে পারে—এই আশঙ্কায় অনেক সময় স্বামী-স্ত্রী নিজেদের আবেগ ও সমস্যাগুলো নিয়ে আগের মতো কথা বলতে পারেন না। সন্তানদের সামনে সব ঠিক আছে এমন আশ্বাস দেওয়ার চেষ্টা করলেও নিজের ভেতরের উদ্বেগ তিনি প্রকাশ করতে পারেন না।

৪০ বছর বয়সী নিদাল যুদ্ধের আগে গাজা সিটিতে মোবাইল ফোন ও গৃহস্থালি সামগ্রীর ছোট ব্যবসা করতেন। কিন্তু ইসরায়েলি হামলায় তার পরিবারের সদস্যরা বাস্তুচ্যুত হন এবং তার এক আত্মীয় নিহত হন। পরে তারা যে স্কুলে আশ্রয় নিয়েছিল, সেখানে বিমান হামলায় তার মেয়ে মালেক নিহত হয়। শেষ পর্যন্ত নিদাল ধ্বংসস্তূপের পাশে তাঁবু গড়ে বসবাস শুরু করেন। তিনি বলেন, যুদ্ধ তার সন্তান, বাড়ি ও অর্থ—সবকিছু কেড়ে নিয়েছে।

নিদাল এখন নিজেকে বেকার বলতেও চান না। তার ভাষায়, তিনি শারীরিকভাবে অক্ষম নন, কিন্তু পরিবারের জন্য আগের মতো উপার্জন করতে না পারায় নিজেকে অসহায় মনে করেন। অধিকাংশ সময় তিনি তাঁবুর পাশে একা থাকেন, মানুষের সঙ্গে কথা বলার আগ্রহও কমে গেছে।

২৪ বছর বয়সী হুসেইন যুদ্ধের আগে প্রযুক্তি নিয়ে পড়াশোনা করতেন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে কর্মশালা পরিচালনা করতেন। যুদ্ধের শুরুতে তার বাড়িতে বোমা হামলা হয়। পরিবারের বাড়ি হারানোর পর তাকে শূন্য থেকে জীবন শুরু করতে হয়েছে। প্রথমে মোবাইল চার্জ ও মেরামতের কাজ, পরে ফোন কেনাবেচা এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার মাধ্যমে জীবিকা চালানোর চেষ্টা করেন তিনি। যুদ্ধ তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও বদলে দিয়েছে।

হুসেইন বলেন, তাঁবুতে বসবাসের বর্তমান অবস্থায় ভবিষ্যৎ স্ত্রীকে নিয়ে সংসার করার কথা তিনি কল্পনাও করতে পারেন না। তবু তিনি বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার আশা ধরে রেখেছেন। তার বিশ্বাস, তরুণ প্রজন্মই একদিন গাজাকে পুনর্গঠন করবে।

২২ বছর বয়সী হামজা যুদ্ধ শুরুর সময় মেডিকেল শিক্ষার্থী ছিলেন। পরে উত্তর গাজায় জরুরি চিকিৎসাসেবায় স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ শুরু করেন। সীমিত চিকিৎসক ও বিপুলসংখ্যক আহত মানুষের মধ্যে কাজ করতে গিয়ে যুদ্ধ তার কাছে পরিবার ও সম্পর্কের গুরুত্ব নতুনভাবে তুলে ধরে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একই জায়গায় ঘুমানো, ক্ষুধা ও মৃত্যুর আশঙ্কা একসঙ্গে মোকাবিলা করা তাদের পারিবারিক বন্ধন আরও শক্ত করেছে বলে তিনি জানান।

যুদ্ধের আগে হামজা বিদেশে গিয়ে নিউরোসার্জারি পড়ার এবং ভবিষ্যৎ স্ত্রীকে ভালো জীবন দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু যুদ্ধ ও স্বজন হারানোর অভিজ্ঞতা তাকে দ্রুত পরিবার গঠনের দিকে ভাবতে বাধ্য করেছে। তার মতে, যখন মানুষ নিজের অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার আশঙ্কা অনুভব করে, তখন পরিবার ও সন্তান ধারণের আকাঙ্ক্ষা আরো তীব্র হয়ে উঠতে পারে।

এসব অভিজ্ঞতা দেখায়, গাজার যুদ্ধের প্রভাব কেবল নিহত, আহত ও বাস্তুচ্যুত মানুষের পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝা যায় না। যুদ্ধ পুরুষদের উপার্জনকারী ও পরিবারের আশ্রয়দাতা হিসেবে প্রচলিত ভূমিকা দুর্বল করেছে, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও দাম্পত্য সম্পর্ক সংকুচিত করেছে এবং বহু মানুষের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বদলে দিয়েছে। একই সঙ্গে চরম বিপর্যয়ের মধ্যেও পরিবার, পারস্পরিক নির্ভরতা ও পুনর্গঠনের আকাঙ্ক্ষা তাদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

গাজার যুদ্ধ যেভাবে বদলে দিয়েছে ফিলিস্তিনি পুরুষদের জীবন

হুতিদের অগ্রযাত্রায় কারও লাভ, কারও ক্ষতি

আল–জাজিরাঃ ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের পুরোটা এখন দেশটির হুতি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে। গত সপ্তাহান্তে তারা বন্দরনগর মোখা দখল করে। একই সঙ্গে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মায়ুন (পেরিম) দ্বীপের নিয়ন্ত্রণও নেয়।

এখন আফ্রিকার উপকূল থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে হুতি বাহিনী। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালির ওপরও তাদের কার্যত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের জন্য এই প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইয়েমেনের বাইরে হুতিরা কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করবে—এমন কোনো ইঙ্গিত এখনো নেই। তবে এই যুদ্ধের প্রভাব ইতিমধ্যে আফ্রিকা মহাদেশেও পড়তে শুরু করেছে।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) গতকাল রোববার জানিয়েছে, বিগত ২৪ ঘণ্টায় ইয়েমেন থেকে ২ হাজারের বেশি মানুষ আফ্রিকার দেশ জিবুতিতে পালিয়ে গেছেন।

ইয়েমেনের উপকূল থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে জিবুতির শহর ওবকে ইয়েমেনিরা পৌঁছাচ্ছেন। সেখানে তাঁদের খাবার ও পানি দেওয়া হচ্ছে। তবে আইওএম সতর্ক করে বলেছে, আরও সহায়তা প্রয়োজন।

সমুদ্রপথের গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ পথ

বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ বাব আল-মানদেব দিয়ে পরিচালিত হয়। সমুদ্রপথে পরিবহন করা তেলের প্রায় ১১ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ৮ শতাংশও এই পথ দিয়ে যায়।

অন্যদিকে হুতিদের মিত্র ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর একধরনের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা শুরু করে। এ যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে যেত।

হুতিদের রাজনৈতিক শাখার সদস্য হাজেম আল-আসাদ বলেন, লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেবে নৌ চলাচলসহ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল রয়েছে।

ইরান বলে আসছে, ইয়েমেনে তাদের মিত্র হুতিরা একটি স্বাধীন গোষ্ঠী।

তবে ইয়েমেনের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে বিশ্বের বড় জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

সমুদ্রপথের নিরাপত্তাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও সাবেক নৌ কর্মকর্তা আলেক্সান্দ্রু ক্রিস্তিয়ান হুদিস্তেয়ানু আল-জাজিরাকে বলেন, বাব আল-মানদেব প্রণালি হরমুজ প্রণালির চেয়ে সরু।

হুদিস্তেয়ানু বলেন, হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি তাদের সামগ্রিক সক্ষমতায় মৌলিক কোনো পরিবর্তন আনেনি। তবে এর ফলে আগের তুলনায় জাহাজ নিশানা করা তাদের জন্য সহজ হয়েছে।

এর একটি উদাহরণ হলো, সম্প্রতি একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। এতে উপকূলে থাকা এক হুতি কমান্ডারকে বলতে শোনা যায়, ওই এলাকায় কামান বসিয়ে ইয়েমেনের উপকূলের কাছের জলসীমায় থাকা লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো সম্ভব।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পোর্টওয়াচের তথ্য বলছে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে লোহিত সাগর দিয়ে জাহাজ চলাচলের পরিমাণ ও পরিবহন করা পণ্যের পরিমাণ ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ কমেছে। এই সময়ে জাহাজে হুতিদের হামলার পর লোহিত সাগরে উত্তেজনা আবার বেড়ে গিয়েছিল।

বড় জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো কেপ অব গুড হোপ ঘুরে জাহাজ চালাচ্ছে। এতে একটি যাত্রায় ২০ দিনের বেশি সময় বাড়ছে। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়ে যাচ্ছে।

লোহিত সাগরে সমুদ্রপথের নিরাপত্তায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন ‘অপারেশন আটালান্টা’ টাস্কফোর্স কাজ করছে। তবে লোহিত সাগরে আবার জাহাজে হামলা শুরু হলে নির্ধারিত দায়িত্বের সীমাবদ্ধতার কারণে এই বাহিনীর পক্ষেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হতে পারে।

হুদিস্তেয়ানু বলেন, এই অঞ্চলে নৌবহরের রসদসহ অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে অনেক দেশের নৌবাহিনী জিবুতিকে বন্দর হিসেবে ব্যবহার করে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ আরও কয়েকটি দেশ রয়েছে। তবে অপারেশন আটালান্টার মতো চলমান অভিযানের আওতায় থাকা জাহাজগুলোর নির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে। প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সেই দায়িত্বের বাইরে গিয়ে কাজ করা কঠিন।

হুদিস্তেয়ানু আরও বলেন, ‘তবে আমি বলব না যে এসব জাহাজ শুধু নিজেদের নিরাপত্তার জন্য সেখানে রয়েছে।...হুমকির জবাব দিতে দেরি করলে বা নিষ্ক্রিয় থাকলে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের কাছে ভুল বার্তা যেতে পারে।’

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলাকালে নৌবাহিনীর জাহাজগুলোকে বাব আল-মানদেব ও হরমুজ প্রণালির দিকে বেশি পাঠানো হয়েছিল। এর ফলে হর্ন অব আফ্রিকার উপকূলের কাছে নিরাপত্তার কিছু ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়েছে সংগঠিত সামুদ্রিক অপরাধী চক্রগুলো।

হুদিস্তেয়ানু সতর্ক করে বলেন, ‘আমরা বিশেষ করে সোমালিয়ার উপকূলজুড়ে জলদস্যুতার পুনরুত্থান দেখতে পাচ্ছি। বহুস্তরীয় এই সংকটের সময় আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীর নজর হরমুজ ও বাব আল-মানদেব প্রণালির দিকে সরে যাওয়ার সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।’

মিসরের দুশ্চিন্তা

লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হবে না বলে হুতিরা আশ্বস্ত করেছে। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সৌদি আরবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলো নিশানা করে হামলা চালিয়েছে সশস্ত্র গোষ্ঠীটি।

২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত হুতিরা লোহিত সাগরে ১০০টির বেশি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায়। হুতিদের দাবি ছিল, এসব জাহাজ ইসরায়েল বা দেশটির মিত্রদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

লোহিত সাগর দিয়ে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় মিসরের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস সুয়েজ খালের টোল।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মিসর প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার হারিয়েছে। এই অর্থ সুয়েজ খালের মোট আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ।

হুদিস্তেয়ানু বলেন, হুতিদের এই অভিযান ও এর পরবর্তী পরিস্থিতির কারণে যে ক্ষতি হয়েছে, তা সহজেই বোঝা যায়। লোহিত সাগর দিয়ে যেসব জাহাজ চলাচল করত, সেগুলোর বড় একটি অংশ একপর্যায়ে পুরোপুরি চলাচল বন্ধ করে দেয়। পরে হুতিরা জাহাজে হামলা বন্ধ করার কথা জানায়। কিন্তু অনেক কোম্পানি কেপ অব গুড হোপ ঘুরে জাহাজ চলাচল অব্যাহত রাখে। তারা আর আগের পথে ফিরে আসেনি।

আফ্রিকা অধ্যয়নের অধ্যাপক ও সংঘাত নিরসনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ বদর হাসান আল-শাফেই বলেন, এই সময়ে ক্ষতি সত্ত্বেও মিসর কৌশলগতভাবে সংযত অবস্থান নিয়েছিল।

আল-শাফেই আল-জাজিরাকে বলেন, ‘ইয়েমেনে যা ঘটছে, তাতে সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে দূরে থাকার নীতি অনুসরণ করে মিসর। ২০১৫ সালে উপসাগরীয় দেশগুলোর ইয়েমেনে হস্তক্ষেপের সময় থেকেই এটি মিসরের একটি স্থায়ী অবস্থান।’

আল-শাফেই আরও বলেন, বাব আল-মানদেব দিয়ে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল হুমকির মুখে পড়েছে। জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়া হয়েছে। ইসরায়েলের দিকে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। এসব সত্ত্বেও মিসর হস্তক্ষেপ করেনি। যদিও এতে দেশটি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে।

ইরিত্রিয়ার গুরুত্ব বেড়েছে

ইয়েমেনিরা এখন লোহিত সাগরে প্রবেশের পথে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় রয়েছে। এর ফলে ইয়েমেনের অপর পাশে বাব আল-মানদেবের কাছে অবস্থিত আফ্রিকার দেশ ইরিত্রিয়ার কৌশলগত গুরুত্ব বেড়েছে।

ইরিত্রিয়ার প্রেসিডেন্ট ইসাইয়াস আফওয়ার্কির শাসনামলে দেশটি স্বনির্ভরতার ওপর জোর দিয়েছে। এ কারণে বাইরের বিশ্বের সঙ্গে দেশটির যোগাযোগও সীমিত ছিল।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফওয়ার্কি লোহিত সাগরে ইরিত্রিয়ার কৌশলগত অবস্থান কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কাটানোর চেষ্টা করছেন। এর অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কও উন্নত করেছেন তিনি।

আল-শাফেই বলেন, ‘ইয়েমেনে যা ঘটছে, তা থেকে নিজেকে দূরে রাখার ভান করছেন আফওয়ার্কি। কিন্তু বাস্তবে লোহিত সাগরে যা ঘটছে, তা থেকে তিনি অনেক সুবিধা পাচ্ছেন।’

হেলিকপ্টার নিয়ে লোহিত সাগরে একটি জাহাজের পিছু নিয়েছে হুতিরা
হেলিকপ্টার নিয়ে লোহিত সাগরে একটি জাহাজের পিছু নিয়েছে হুতিরা। ফাইল ছবি: রয়টার্স

কেন নায়ক হতে চান না খায়রুল বাসার

পড়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগে। ক্যারিয়ারের শুরুটা গান দিয়ে। হওয়ার কথা ছিল গায়ক। কিন্তু গায়ক না হয়ে তিনি হয়েছেন ভক্তদের কাছে নায়ক। যদিও তিনি সব সময় বলেন, ‘আমি নায়ক হতে চাই না।’ বলছি সময়ের জনপ্রিয় মুখ খায়রুল বাসারের কথা। ১ ডিসেম্বর ২০২৫ এই অভিনেতার জন্মদিন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পর থেকেই চেয়েছিলেন অভিনয়ে নাম লেখাবেন। সেই প্রস্তুতি শুরু হয় ২০১২ সাল থেকে। পরে তিনি প্রথম নাটকে নাম লেখান ২০১৭ সালে। এর কারণ, তিনি পছন্দমতো চরিত্র পেতেন না। আবার প্রধান চরিত্রেও তাঁকে ডাকা হতো না। অভিমান করে তিনি এর আগে বলছিলেন, ‘আমাদের নাটকে কেন্দ্রীয় চরিত্র ছাড়া বাকি চরিত্রের প্রতি মনোযোগ ও গুরুত্ব কম থাকে। এসব চরিত্র কখনো গল্পে প্রয়োজন নেই বললেও চলে। কিন্তু আমি মনে করি নাটকে প্রতিটা চরিত্রই গুরুত্বপূর্ণ।’

দীর্ঘ সময় এই অভিনেতাকে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করতে হয়েছে। এভাবেই খায়রুল বাসার একটু একটু করে ক্যারিয়ার এগিয়ে নিয়েছেন। একসময় তিনি ব্যস্ত হয়ে যান নাটকে। তাঁর ক্যারিয়ারের টার্নিং ‘পুনরাবৃত্তি’। এটি পরিচালনা করেন সালেহ সোবহান অনীম। এর পর আর পেছনে তাকিয়ে থাকতে হয়নি। একে একে তিনি কাজ করে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন।

‘অস্থির সময়ে স্বস্তির গল্প’ প্রকল্পে ‘কথা হবে তো’, ‘ক্লোজআপ কাছে আসার গল্প’ দিয়ে দর্শকদের ভালোবাসা পান। এ ছাড়া ‘ইতি তোমারই ঢাকা’, ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’, ‘মাকড়সা’, ‘ডার্ক সাইড অব ঢাকা’, ‘বিলাপ’, ‘মহানগর’, কাজলরেখাসহ অনেক কাজ খায়রুল বাসারকে স্থায়ীভাবে জায়গা করে দিয়েছে। তিনি হয়ে উঠেছেন দর্শক–পছন্দের অভিনয়শিল্পী।

তবে নায়ক নন, খায়রুল বাসার স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন অভিনয় শব্দে। এর আগে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমি ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নায়ক হওয়ার চিন্তা করিনি। আমি কখনোই নায়ক হতে চাইনি। এখনো চাই না। অভিনেতা হতে চেয়েছি সব সময়। সেভাবেই আমি পথ চলছি। যে কারণে গল্পনির্ভর কাজ করার চেষ্টা করি।’

যে কারণে পার্শ্বচরিত্র হলেও কাজে কখনোই বাধা তৈরি করে না। সিনেমার পার্শ্বচরিত্র অভিনয় নিয়ে খায়রুল বাসার এর আগে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আসলে আমি সিনেমায় অভিনয় করতে ভালোবাসি। গল্প, চরিত্র, প্রেক্ষাপট আমার কাছে প্রাধান্য পায়। চরিত্র পছন্দ হলে ছাড়তে চাই না।’

বাসার মনে করেন, এই সময়ের অনেক মেধাবীকে প্রশংসা করা হচ্ছে, কিন্তু মেধাকে মূল্যায়ন সেই অর্থে করা হয় না। আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি বলেছিলেন, ‘এই প্রশংসা দিয়ে জীবন চলে না। তাঁদের নিয়ে যথাযথ কোনো প্ল্যান, কোনো প্ল্যাটফর্মেই হয়নি, হচ্ছেও না। এভাবে মেধাবীরা ছিটকে পড়েন। সবাই স্বপ্ন নিয়ে এসে বঞ্চিত হন।’

এই বঞ্চিত হওয়া নিয়ে প্রথম আলোর এক সাক্ষাৎকারে বাসার বলেছিলেন, ‘খুব কম শিল্পীই রয়েছেন, শুধু নাটক করার জন্য এখানে আসেন। বেশির ভাগ চান বড় পরিসরে কাজ করতে। যখন পারেন না, তখন জীবিকার প্রয়োজনে দিনের পর দিন একই রকম গল্প, চরিত্রে, ভাঁড়ামির কাজ করতে থাকেন। এটা কি তাঁর দোষ? এটা না হলে অনেক অভিনয়শিল্পীকে বেকার বসে থাকতে হবে। ভালো কাজের অপেক্ষায় থেকে থেকে আমাদের মতো শিল্পীদের ছিটকে পড়তে হবে। আর যখন কেউ ছিটকে পড়বেন, দুই দিন পরে তাঁকেও সমালোচনা করবেন। বলে বসবেন, সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে গেল। তাঁদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলবেন। শিল্পীদের তৈরি করতে হয়।’

এই সময় বাসার আরও বলেছিলেন, ‘এখন যৌবনে ডাকছেন না, তাহলে কি বয়স্ক হলে ডাকবেন? ১৮ বছর বয়সে কেন তরুণেরা ডাক পাবেন না, নিয়মিত ভালো কাজ করতে পারবেন না। ১৮ বছর বয়স থেকে শাকিব খান অভিনয় করে যাচ্ছেন কিন্তু, ভালো ভালো সুযোগ তিনি কখন পেয়েছেন? তাঁকে আরও আগেই ভালো কাজের সুযোগ দিলে অনেক বেশি উজ্জ্বল করতে পারত। এরপরও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা তাঁকে অনন্য করে তুলেছে। তিনি সব সময়ই এগিয়েছেন। এমন সুযোগ আরও অনেকেরই পাওয়ার কথা নয়? একটা ইন্ডাস্ট্রির কর্তাব্যক্তিদের দায়িত্ব আছে। শিল্পীদের হতাশ নয়, মেক করতে হয়। এ ব্যাপারে সচেতন হলে আমাদের ইন্ডাস্ট্রি ক্রমাগতই এগিয়ে যাবে।’

অভিনেতা খায়রুল বাসারের ব্যক্তিগত জীবনও সাধারণ। তিনি নিজেও কোনো জটিলতা পছন্দ করেন না। সিন্ডিকেট নিয়েও কোনো কিছু ভাবেন না। নিজের মতো করেই চলেন। ‘যে গল্প পড়ে মনে হয় এই কাজ করা দরকার সেটাই আমি করি। যে মন টানে না সেটা করি না। সিন্ডিকেট বলতে কিছুতে ধার-ধারতে চাই না, শুধু কাজটা বুঝতে চাই। আমি অভিনয় বুঝতে চাই, বিশ্লেষণ করতে চাই।’

খায়রুল বাসারের জীবনযাপন অন্যদের চেয়ে একটু আলাদা। তিনি সাধারণভাবেই চলতে, বলতে ও জীবনযাপন করতে পছন্দ করেন। এই নিয়ে পরিচালক মিজানুর রহমান একবার এই অভিনেতাকে নিয়ে লিখেছিলেন, ‘দুধ-কলা-ভাত খায়রুলের সবচেয়ে প্রিয় খাবার। কোন ব্র্যান্ডের পারফিউম ভালো, কোন ব্র্যান্ডের ঘড়ি সুন্দর—কিছুই সে তেমন জানে না। এই ব্র্যান্ড না চেনা সাদামাটা ছেলেটা বাংলা কনটেন্টের ব্র্যান্ড হয়ে উঠুক।’

খায়রুল বাসার। ছবি: প্রথম আলো
খায়রুল বাসার। ছবি: প্রথম আলো

গাজার জনগণের বিরুদ্ধে ইসরাইলের নীরব অস্ত্র ক্ষুধা

গাজায় অবস্থিত ফিলিস্তিনি সরকারের তথ্য দফতর এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইসরাইল ‘নীরবে জনগণকে অনাহারে রাখার’ নীতি গ্রহণ করেছে এবং এই অঞ্চলের প্রয়োজনীয় খাদ্যের ৬৫ শতাংশ প্রবেশে বাধা দিচ্ছে।

বিবৃতিতে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, গাজার ৯০ শতাংশেরও বেশি মানুষ খাদ্য কেনার সামর্থ্য রাখে না এবং সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল, কিন্তু ইসরাইল এই সাহায্য প্রবেশে বাধা দিচ্ছে।

গত তিন বছরে গাজার জনগণের বিরুদ্ধে নজিরবিহীনভাবে সব ধরনের অপরাধ সংঘটনকারী ইসরাইল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাত্মক সমর্থনের ছত্রছায়ায় এই অপরাধগুলো চালিয়ে যাচ্ছে। ইসরাইল আপাতত গাজায় বোমা হামলা বন্ধ রেখেছে, এই ভূখণ্ডের জনগণের ওপর সম্মিলিত শাস্তি আরোপের পথ অনুসরণ করছে।

ইসরাইল গাজাকে সম্পূর্ণভাবে অবরুদ্ধ করে (পানি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে এবং খাদ্য সরবরাহ কঠোরভাবে সীমিত করে) উদ্দেশ্যমূলকভাবে বেসামরিক নাগরিকদের জীবনের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে। এক্ষেত্রে ইসরাইল শুধু সাহায্য পৌঁছানোই বাধা দিচ্ছে না, বরং উৎপাদন পরিকাঠামো ধ্বংস করে এবং একইসাথে সাহায্যের আগমন রোধ করে একটি পরিকল্পিত মানবিক সঙ্কটও তৈরি করছে।

গাজার জনগণের বিরুদ্ধে অনাহার নীতি বাস্তবায়নে ইসরাইল দু’টি প্রধান লক্ষ্য অনুসরণ করছে। প্রথম লক্ষ্য হলো গাজায় বসবাসের অযোগ্য পরিস্থিতি তৈরি করা, যাতে মানুষ তাদের বাড়ি ও খামার ছেড়ে যেতে বাধ্য হয় অর্থাৎ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি। ইসরাইল এখন পর্যন্ত বোমা হামলা চালিয়ে এবং এই ভূখণ্ডকে বসবাসের অযোগ্য করে গাজার জনগণের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছে, যাতে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি ঘটানো যায় এবং গাজা উপত্যকার সম্পূর্ণ দখলের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা যায়, কিন্তু তারা এখনো এই লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। তাই, তারা অতীতের চেয়ে আরো তীব্রভাবে গাজার জনগণকে অনাহারে রাখার নীতি অনুসরণ করছে।

এই নীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো জনগণ ও ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের মধ্যে একটি দূরত্ব তৈরি করা। অন্য কথায়, ইসরাইলি পরিবারগুলোর জীবিকার ওপর আঘাত হেনে অভ্যন্তরীণ সামাজিক চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে, যাতে জনগণের ক্ষোভ দখলদারদের পরিবর্তে প্রতিরোধকারী গোষ্ঠীগুলোর দিকে পরিচালিত হয়। তবে তথ্য-উপাত্ত থেকে দেখা যায় যে বাস্তবে এই কৌশলের ফল হয়েছে বিপরীত।

আইনগতভাবে জেনেভা কনভেনশনের অতিরিক্ত প্রোটোকল অনুসারে, যুদ্ধের একটি উপায় হিসেবে বেসামরিক নাগরিকদের অনাহারে রাখা নিষিদ্ধ। সংঘাতের পক্ষগুলো বেসামরিক নাগরিকদের কাছে খাদ্য ও ওষুধের মতো মানবিক সহায়তা দ্রুত এবং নির্বিঘ্নে পৌঁছানোর অনুমতি দিতেও বাধ্য।

তথাপি, ইসরাইল গাজার জনগণের বিরুদ্ধে এই অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে। কারণ আমেরিকার ভেটো ক্ষমতা এবং তেল আবিবের প্রতি ওয়াশিংটনের সর্বাত্মক সমর্থনের ছত্রছায়ায় বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই ইসরাইলের অপরাধ বন্ধ বা সীমিত করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে অক্ষম।

সূত্র : পার্সটুডে

খাবার সংগ্রহ করছে গাজার শিশুরা
খাবার সংগ্রহ করছে গাজার শিশুরা। সংগৃহীত

অঞ্জন স্মরণে ‘শব্দে-নৈঃশব্দ্যে’

চলচ্চিত্রকার জাহিদুর রহিম অঞ্জনের ৬২তম জন্মদিন ২৭ নভেম্বর ২০২৫, বৃহস্পতিবার। এ উপলক্ষে ঢাকার লালমাটিয়ার কলাকেন্দ্রে আয়োজন করা হয় স্মরণ অনুষ্ঠান ‘শব্দে-নৈঃশব্দ্যে’। ২ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সেখানে চলে অঞ্জন নির্মিত ও অনুপ্রাণিত চলচ্চিত্র প্রদর্শনী এবং ভিডিও ইনস্টলেশন।

বিকেল ৫টায় শুরু হয় আয়োজন। অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে ছিলেন প্রাবন্ধিক মফিদুল হক ও চলচ্চিত্রকার মানজারে হাসীন মুরাদ। প্রদর্শিত হয় জাহিদুর রহিম নির্মিত চলচ্চিত্র ‘মেঘমল্লার’ ও ‘মর্নিং’।

খবরটি জানিয়ে নির্মাতার দাম্পত্যসঙ্গী সাহিত্যিক শাহীন আখতার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘বছর গড়াতে লাগল। মৃত্যুর ৯ মাস ৩ দিন পর, অঞ্জনের জন্মদিন ২৭ নভেম্বর। জন্মদিন তো উৎসব ও তা উদ্‌যাপনের। এই উদ্‌যাপন খুব পছন্দ করত অঞ্জন। সাড়ম্বর দিনটি পালন করে আনন্দ পেত। গত বছর ভারতীয় শহর বেঙ্গালুরুতে ওর জন্মদিন হাজির হয়, যখন লিভার ট্রান্সপ্লান্টের অনিশ্চয়তায় আমরা জেরবার হচ্ছি। অঞ্জনের ভীষণ মন খারাপ—এমন বাজে জন্মদিন ওর কখনো হয়নি। “পরেরবার হবে,” আমি জোর দিয়ে বলেছিলাম। “পরেরবার দারুণ একটা জন্মদিন হবে, নতুন জীবন ফিরে পাওয়া একজন রোগমুক্ত সুস্থ মানুষের জন্মদিন।” অঞ্জন নতুন জীবন ফিরে পায়নি। আমার প্রতিশ্রুতি মিথ্যা প্রমাণ করতেই যেন ও চলে গেল।

এবার আমি, আমার ও অঞ্জনের বন্ধুদের হাত ধরে জন্মদিনটা ঘরের বাইরে নিয়ে এসেছি। অঞ্জন মুখর ও মৌন এখানে। যেমন করে ঘুমে ও নির্ঘুমে শব্দে-নৈঃশব্দ্যে, আলো-আঁধারে ও আসে, তেমনি তার সৃষ্টিশীলতা, উচ্ছলতা, ভালোবাসা, বিমর্ষতা, রোগ–যন্ত্রণা ও শেষ যাত্রা নিয়ে হাজির হয়েছে এখানে। একটি শোকাকুল পরিবেশেও জন্মদিন উদ্‌যাপন হয়তো অর্থবহ হতে পারে।’

জাহিদুর রহিমের জন্ম ১৯৬৪ সালের ২৭ নভেম্বর খুলনায়। গ্র্যাজুয়েশনের পর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ভারতের পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন। সেখানে ১৯৯০ সালে আন্তন চেখভের গল্প অবলম্বনে নির্মাণ করেন স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মর্নিং। ২০১৪ সালে অঞ্জন নির্মাণ করেন প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মেঘমল্লার।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘রেইনকোট’ গল্প অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রটির জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ পরিচালকসহ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের একাধিক শাখায় সম্মাননা অর্জন করেন।

ভারতের বেঙ্গালুরুতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২৪ ফেব্রুয়ারি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন অঞ্জন। তাঁর সর্বশেষ ছবি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত চাঁদের অমাবস্যা মুক্তির অপেক্ষায় আছে।

 জাহিদুর রহিম অঞ্জন
জাহিদুর রহিম অঞ্জন। কোলাজ