Saturday, February 7, 2015

হুকুম দিয়ে গেলাম, দায়দায়িত্ব সব আমার: ঢাকার ডিআইজি

(গাজীপুর পুলিশ লাইনে জেলা পুলিশ আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় আজ শনিবার প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি এস এম মাহফুজুল হক নূরুজ্জামান। ছবি: মাসুদ রানা) ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি এস এম মাহফুজুল হক নূরুজ্জামান পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘যারা নাশকতা করবে, মানুষ হত্যাসহ এ ধরনের কাজ করবে, তাদের বিরুদ্ধে যা যা করার সব করবেন। শুধু গুলি করা নয়, নাশকতাকারীদের বংশধর পর্যন্ত ধ্বংস করে দিতে হবে। আমি হুকুম দিয়ে গেলাম, দায়দায়িত্ব সব আমার।’ আজ শনিবার বিকালে গাজীপুর পুলিশ লাইনে জেলা পুলিশ আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডিআইজি মাহফুজুল হক এসব কথা বলেন। পুলিশ সদ্যদের উদ্দেশে ডিআইজি বলেন, ‘আমাদের অস্ত্র দেওয়া হয়েছে জনগণের জানমালের নিরাপত্তার জন্য, আপনাদের সম্পদ, দেশের সম্পদ রক্ষা করার জন্য। আপনাদের যদি কেউ হত্যা করে, আমরা কি বসে বসে আঙুল চুষব?’ তিনি আরও বলেন, ‘৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে যে দেশের স্বাধীনতা অর্জন করেছি, সে স্বাধীনতা কয়েকজন লোকের স্বার্থে, বিদেশি প্রভুদের স্বার্থের কারণে আমরা আমাদের দেশ ধ্বংস করে দেব, তা হতে পারে না। দেশের মাটি ও মানুষকে বাঁচাতে হবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধীরা দেশে একটি গৃহযুদ্ধ বাধাতে চেষ্টা করছে। দেশের স্বাধীনতা নস্যাৎ করার চেষ্টা করছে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এ কুলাঙ্গার, মোনাফেক, কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করব। এদের হাত থেকে দেশের মানুষকে নিরাপদে রাখতে হবে।’ গাজীপুরের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ হারুন অর রশীদের সভাপতিত্বে ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. দেলোয়ার হোসেনের সঞ্চালনায় মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজমত উল্লাহ খান, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার কাজী মোজাম্মেল হক, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সহসম্পাদক আফজাল হোসেন সরকার প্রমুখ।
নাশকতাকারীদের বংশধরও ধ্বংস করে দিতে হবে : ডিআইজি নুরুজ্জামান >>নয়া দিগন্ত
মোহাম্মদ আলী ঝিলন, গাজীপুর
ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি এস এম মাহফুজুল হক নুরুজ্জামান বলেছেন, ওরা দেশে একটা গৃহযুদ্ধ বাঁধানোর চেষ্টা করছে, দেশকে ধ্বংস করার চেষ্টা করছে। দেশকে রক্ষার জন্য দ্বিতীয়বার মুক্তিযুদ্ধ করতে হলে আমরা করব। কিন্তু এদেশ ও দেশের মানুষকে বাঁচাতে হবে। আমাদের অস্ত্র দেয়া হয়েছে কি জন্য? আপনাদের ও দেশের মানুষের জানমাল, নিরাপত্তা এবং দেশের সম্পদ রকষার জন্য আমাদের অস্ত্র দেয়া হয়েছে। কেউ যদি দেশের সম্পদ  ধ্বংস এবং আপনাকে হত্যা করার চেষ্টা করে, তা হলে কি আমরা বসে বসে আঙুল চুষব? তিনি পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, যারা নাশকতা করবে, মানুষ হত্যাসহ এ ধরণের কাজ করবে তাদের বিরুদ্ধে যা যা করা দরকার সব কিছুই করবেন। শুধু গুলি করা নয়, ওদের বংশধর পর্যন্ত ধ্বংস করতে হবে। শনিবার বিকালে তিনি গাজীপুর পুলিশ লাইনে জেলা পুলিশ আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে এসব কথা বলেন।
সভায় তিনি পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে আরো বলেন, নাশকতার মাধ্যমে যারা মানুষ হত্যা করে এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নষ্ট করে তাদের যেখানে যে অবস্থায় পাবেন হাতে নাতে ধরতে পারলে যা যা করার তাই করবেন। যাতে শুধু গাজীপুরেই নয়, দেশের কোথাও যেন এ শ্রেণীর মানুষ খুঁেজ পাওয়া না যায়। আমি হুকুম দিলাম আপনারা করবেন। এর দায় দায়িত্ব আমার।
তিনি বলেন, ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে যে দেশের স্বাধীনতা অর্জন করেছি সে স্বাধীনতা কয়েকজন লোকের স্বার্থে বিদেশী প্রভুদের স্বার্থের কারণে আমরা আমাদের দেশ ধ্বংস করে দেব তা হতে পারে না। দেশের মাটি ও মানুষকে বাঁচাতে হবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধীরা দেশে একটি গৃহযুদ্ধ বাঁধাতে চেষ্টা করছে। দেশের স্বাধীনতা নস্যাৎ করার চেষ্টা করছে। জনগণকে সাথে নিয়ে এ কুলাঙ্গার, মোনাফেক কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবো। এদের হাত থেকে দেশের মানুষকে নিরাপদ রাখতে হবে।
গাজীপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদের সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় আরো বক্তব্য রাখেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট আজমত উল্লাহ খান, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার সাবেক এমপি কাজী মোজাম্মেল হক, আওয়ামী লীগ নেতা কাজী আলিম উদ্দিন বুদ্দিন, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ কমিটির সহসম্পাদক আফজাল হোসেন সরকার রিপন, মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি মাসুদ রানা এরশাদ, সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম দীপ প্রমুখ।

‘বোমা হামলাকারিরা অক্ষত নিরাপদ থাকার রহস্য কি?’ -জামায়াত

সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ তদন্তের মাধ্যমে গাইবান্ধা, বরিশাল  ও কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পেট্রোল বোমা হামলায় জড়িতদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার আহবান জানিয়েছে জামায়াত। দলের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারী জেনারেল ডাঃ শফিকুর রহমান আজ এক বিবৃতিতে এই আহবান জানান। তিনি বলেন,  আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রহরায় যানবাহনে পেট্রোল বোমা হামলা চালিয়ে দুর্বৃত্তরা নির্বিঘ্নে সরে পড়ায় প্রতীয়মান হচ্ছে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় দলীয় ক্যাডাররাই এ হামলা চালাচ্ছে। আমরা ইতিপূর্বে প্রত্যেকটি হামলা ও হত্যাকা-ের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে এ সব ঘটনার সুষ্ঠু এবং বস্তুনিষ্ঠ তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আহবান জানিয়েছি। জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে তদন্ত করারও আহবান জানিয়েছিলাম। কিন্তু সরকার যেহেতু নিজেই এ হামলা ও হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত তাই তারা কোন ধরনের তদন্ত ব্যতিরেকেই শুধুমাত্র রাজনৈতিক হয়রানির হাতিয়ার হিসেবে এ সব ঘটনাকে ব্যবহার করছে। তিনি বলেন, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি প্রহরায় মানুষের ওপর হামলা কি করে সংঘটিত হচ্ছে? যেখানে বিরোধীদলের নেতা-কর্মীরা মিছিল সমাবেশ করতে পারছে না, একত্রে সমবেত হতে পারছে না, দেখামত্রাই তাদের ওপর গুলি চালানো হচ্ছে। সেখানে পুলিশ প্রহরায় বোমা হামলাকারীরা অক্ষত নিরাপদ দূরত্বে চলে যাওয়ার রহস্য কোথায়? ডাঃ শফিক বলেন, বিভিন্ন স্থানে পেট্রোল বোমা বানাতে গিয়ে ও বোমা মারতে গিয়ে ছাত্রলীগ এবং যুবলীগের ক্যাডার আহত হওয়ার খবর প্রচারিত হয়েছে। অনেক জায়গায় দলীয় ক্যাডারদের ধরা পড়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। হাতেনাতে ধরা পড়া সত্ত্বেও আওয়ামী দলীয় বোমাবাজদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে। আমরা পেট্রোল বোমা মেরে নৃশংসভাবে মানুষ হত্যা বন্ধ করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহবান জানাচ্ছি।

বাংলাদেশে সম্মান চুরমার হয়ে যাচ্ছে বলে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে জানাবেন কাদের সিদ্দিকী

কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী বলেছেন, তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করার চিন্তা করছেন বলে জানান। এবং তিনি তাকে ফোন করে জানাবেন যে, বাংলাদেশে যা হচ্ছে তাতে আপনার (ভারতের) সম্মান চুরমার হয়ে যাচ্ছে। দেশে (বাংলাদেশ) শান্তি নেই।
কাদের সিদ্দিকী আরো জানান, তিনি কয়েক দিনের মধ্যেই এ ব্যাপারে বাংলাদেশের সবাইকে অবহিত করবেন।
এদিকে তিনি আরো জানান তার স্ত্রী তাকে (কাদের সিদ্দিকী) জিজ্ঞাসা না করে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীর সাথে দুই একদিন আগে কথা বলেছেন । এ ব্যাপারে তিনি সরকারকে খোঁজখবর নিতেও বলেছেন।
কাদের সিদ্দিকী প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে করে বলেন, দেশের অবস্থা ভালো না। দারোগা পুলিশের ভরসায় থাকবেন না। যেই দিকে সূর্য উঠে সেদিকেই ঝুঁকে পড়ে। তিনি প্রশ্ন করে বলেন, ’প্রধানমন্ত্রী ইন্ডিয়ার জোরে নাচেন? আপনি আর পারবেন না।” তিনি বলেন, পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে ভারতের দাসত্ব করতে স্বাধীন হয়নি। আমরা ভারতের বন্ধুত্ব চাই, দাসত্ব নয়।
আজ কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের ১৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী এসব কথা বলেন। এতে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বিকল্পধারা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ.কিউ.এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডাঃ জাফরউল্লাহ চৌধুরী এবং সাবেক পরররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী।

সরকারের পতন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র : বিএনপি

সরকারের পতন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমেদ। ২০ দলীয় জোটের পক্ষে আজ শনিবার সন্ধ্যায় গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি এ মন্তব্য করেন। বিবৃতিতে তিনি বলেন, যে রাজনৈতিক সমস্যা পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে জন্ম দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী, সেই সংশোধনী বাতিল করে সমস্যার সমাধান তাকেই করতে হবে। গণআন্দোলনের তীব্রতা দেখে সরকার অতিমাত্রায় ভীত হয়ে গুম, খুন, অপহরণ, দমন-পীড়ন, হামলা-মামলা এবং গ্রেফতার নির্যাতন চালিয়ে শেষ রক্ষা পেতে চায়। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী দেয়-জনতার ন্যায্য আন্দোলনের মুখে স্বৈরাচারী সরকারের পতন হয়েছে যুগে যুগে দেশে দেশে। এই স্বৈরাচারী আওয়ামী সরকারের পতনও এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বিনা ভোটের অবৈধ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হুকুমে দলবাজ র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবির কতিপয় সেবাদাস কর্তা ব্যক্তিরা আন্দোলনরত বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের বিভিন্ন নৃশংস কায়দায় ক্রসফায়ারের মাধ্যমে হত্যা করে সমগ্র দেশকে বধ্যভুমিতে পরিণত করেছে। ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে রাজধানী ঢাকা পর্যন্ত সর্বত্র ওই সব দলবাজ পিশাচ কর্মকর্তা কর্মচারিদের তালিকা প্রনয়ন করছে। দেশ আজ ভয়ঙ্কর পুলিশী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। জাতিকে সেই পুলিশী রিমান্ড থেকে মুক্ত করার জন্য অবিরাম সংগ্রামের কোনো বিকল্প নাই।
তিনি বলেন, ৫ জানুয়ারির প্রহসনের নির্বাচন অনুষ্ঠান করে আওয়ামী লীগই রাজনৈতিক ভুল করেছে এবং সেই ভুলের খেসারত আওয়ামী লীগ ও তার দোসরদেরকেই দিতে হবে, সেই দায় জনগণ নিবে না। বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোট ও অন্যান্য সব গণতান্ত্রিক দল সেই প্রহসনের নির্বাচন বর্জন করে ঐতিহাসিক সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
সাংবিধানিক, গণতান্ত্রিক ও নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আন্দোলনের সব দরজা বন্ধ করে দিয়ে সরকারই জনগণকে বাধ্য করেছে রাজপথে অবিরাম সংগ্রামে লিপ্ত হতে। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে অঘোষিত কারাগারে রুদ্ধ করে সরকারের গদি রক্ষার স্বপ্ন কোনোদিনই পূরণ হবে না। গণআন্দোলনের বিজয়ের মধ্য দিয়েই জনগণ তাদের প্রাণপ্রিয় নেত্রীকে মুক্ত করবেই ইনশাআল্লাহ।
বিবৃতিতে সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, গতরাতে গাইবান্ধার তুলশীঘাটে যাত্রীবাহী বাসে বর্বরোচিত পেট্রলবোমা হামলার ঘটনায় ২০ দলীয় জোট নেতা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে তীব্র নিন্দা, প্রতিবাদ ও ধিক্কার জানাচ্ছি এবং সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের গ্রেফতার করে বিচারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি। পেট্রলবোমা হামলায় নিহত বাসযাত্রীদের রুহের মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। আহতদের সুস্থতা কামনা করছি।
তিনি বলেন, বিএনপি ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট বরারবই বলে আসছে যে, এধরণের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে তারা আদৌ জড়িত নয়। বরং ২০ দলীয় জোটের গণতন্ত্র মুক্তি আন্দোলনকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে সরকারই এ ধরণের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে বিরোধী দলের ওপর দায় চাপানো এবং নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমে তা প্রচার ও প্রকাশের অপচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। এসব ঘটনায় সরকারের সংশ্লিষ্টতার তথ্য প্রমাণ গতকালের বিবৃতিতে ষ্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিএনপি নেতা বলেন, আওয়ামী রাজনীতির স্বৈরতান্ত্রিকতা ও একনায়কতান্ত্রিকতার ঐতিহ্যে লালিত সজীব ওয়াজেদ জয় গতকাল অস্ত্রের ভাষায় কথা বলে মুজিব বংশীয় রক্তের প্রতিধ্বণি করেছেন। রাজনীতির পাঠশালায় বাল্য শিক্ষা শ্রেণী অতিক্রম না করার আগেই ভাষণ দেয়া শুভ লক্ষণ নয়।
তিনি বলেন, যে রাজনৈতিক সমস্যা পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে জন্ম দিয়েছেন শেখ হাসিনা, সেই সংশোধনী বাতিল করে সমস্যার সমাধান তাকেই করতে হবে। গণআন্দোলনের তীব্রতা দেখে সরকার অতিমাত্রায় ভীত হয়ে গুম, খুন, অপহরণ, দমন-পীড়ন, হামলা-মামলা এবং গ্রেফতার নির্যাতন চালিয়ে শেষ রক্ষা পেতে চায়। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী দেয়-জনতার ন্যায্য আন্দোলনের মুখে স্বৈরাচারী সরকারের পতন হয়েছে যুগে যুগে দেশে দেশে। এই স্বৈরাচারী আওয়ামী সরকারের পতনও এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
বিবৃতিতে সালাহ উদ্দিন আহমেদ বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে গণতন্ত্র মুক্তি আন্দোলনের বিজয় না হওয়া পর্যন্ত চলমান অনির্দিষ্টকালের শান্তিপূর্ণ অবরোধ কর্মসূচির পাশাপাশি আগামীকাল রোববার সকাল ৬টা থেকে বুধবার সকাল ৬টা পর্যন্ত দেশব্যাপী ৭২ ঘণ্টার সর্বাত্মক হরতাল শান্তিপূর্ণভাবে পালন করতে বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের সব পর্যায়ের নেতা-কর্মীসহ দেশবাসীকে আহবান জানান।
তিনি বলেন, বিগত ২৪ ঘণ্টায় চলমান অবরোধ কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে পুলিশের তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত ২০ দলীয় জোটের তিনজন নেতাকর্মীসহ দুর্বৃত্তদের পেট্রলবোমা নিক্ষেপে যে সব নিরীহ মানুষ নিহত হয়েছেন, খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে তাদের রুহুর মাগফিরাত এবং আহতদের সুস্থতা কামনা করছি। গণআন্দোলনে বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও গ্রেফতারকৃতদের নি:শর্ত মুক্তি দাবি করছি। পাশাপাশি জনগণের সেবক হয়ে জনগণের বিপক্ষ শক্তিতে পরিণত না হওয়ার জন্য আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি জোর আহবান জানাচ্ছি।

‘হামার ছোলোক আনি দ্যাও’ by শাহাবুল শাহীন তোতা

(ছবি:-১ গাইবান্ধায় যাত্রীবাহী বাসে পেট্রলবোমা হামলায় নিহত সুমন মিয়ার বাবা শাহজাহান আলী। ছবি:-২ নিহত সুমনের মা মজিদা বেগম। ছবি: শাহাবুল শাহীন) ‘ছোলট্যা কামাই করব্যার জন্নে ঢাকাত যাবার ধরচিলো। কেটা হামার ছোলট্যাক মারি ফেলালো। হামরা একন ক্যামন করি চলমো। তোমরা হামার ছোলোক আনি দ্যাও। ’
আজ শনিবার দুপুরে এভাবেই আহাজারি করছিলেন পেট্রলবোমা হামলায় নিহত গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার চণ্ডীপুর গ্রামের সুমন মিয়ার (২২) মা মজিদা বেগম। এ সময় সুমনের বাবা শাহজাহান আলী নির্বাক দাঁড়িয়েছিলেন।
গতকাল রাত ১১টার দিকে গাইবান্ধা শহরের অদূরে তুলসীঘাট এলাকায় গাইবান্ধা-পলাশবাড়ী সড়কে যাত্রীবাহী বাসে পেট্রলবোমা হামলার ঘটনায় শিশুসহ ছয়জন প্রাণ হারায়। দগ্ধ হয় আরও ৪০ জন। নিহত লোকজনের সবার বাড়ি জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায়।
আজ সুন্দরগঞ্জের চণ্ডীপুর, দক্ষিণ কালির খামার, মধ্যপাড়া খামার, পশ্চিম সীচা গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে নিহত লোকজনের পরিবারে মাতম চলছে।
নিহত সুমন ঢাকায় রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। তিনি দুই সপ্তাহ আগে গ্রামের বাড়িতে এসেছিলেন। গতকাল নাপু পরিবহনের একটি বাসে ঢাকা যাওয়ার পথে দুর্বৃত্তদের ছোড়া পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয়ে তিনি মারা যান। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুই ভাই, এক বোনের মধ্যে সুমন সবার বড়। পাঁচ সদস্যের সংসারে একমাত্র অর্থ উপার্জনকারী ব্যক্তি ছিলেন তিনি।
এ ঘটনায় নিহত দক্ষিণ কালির খামার গ্রামের দিনমজুর সৈয়দ আলীর (৪২) বৃদ্ধা মা সাবানা বেগম ভাঙা কণ্ঠে বলেন, ‘হামার ছোলট্যা কি করচিলো বাবা। মানষে তাক মারি ফেলালো।’ এ পরিবারেরও একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি ছিলেন আলী। তাঁর দুই মেয়ে এক ছেলে। বড় মেয়ে শরিফা খাতুন দশম শ্রেণি, ছোট মেয়ে শান্তি আকতার ষষ্ঠ শ্রেণি ও ছোট ছেলে ইমরান প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। কাজের সন্ধানে তিনি মুন্সিগঞ্জ যাচ্ছিলেন।
নিহত শিশু শিল্পী রাণীর (৬) বাবা উপজেলার পশ্চিম চণ্ডীপুর গ্রামের বলরাম দাস ও মা সাধনা রাণী দিনমজুরের কাজ করেন। তাঁরাও কাজের সন্ধানে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে মুন্সিগঞ্জ যাচ্ছিলেন। পেট্রলবোমা হামলায় মেয়েকে হারিয়েছেন, তাঁরা দুজনও দগ্ধ হয়েছেন। এঁদের মধ্যে মা সাধনা রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ও বাবা বলরাম গাইবান্ধা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বলরাম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘পেটের দায়ে রোজগারের জন্নে যাচ্ছিলাম বাবা। হামরা সবি হারানো। হামরা গরিব মানুষ, আজনিতি বুঝিনে। কামলার কাম করি খাই। হামরা কি অপরাদ করচিনো, হামার ছোলট্যাক কারি নিলো। ’
একই উপজেলার পশ্চিম সীচা গ্রামের দগ্ধ হালিমা বেগমের (৪০) বাড়িতে চলছিল মাতম। তাঁর মেয়ে শামসুন নাহার বলেন, ‘হামার মা পেটের জন্নে ঢাকাত যাবার ধরি মরি গেলো। তাঈ কী দোষ করচিলো। হামরা একন কাকে নিয়া বাঁচমো।’ ঢাকার একটি বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করতেন হালিমা। তাঁর বড় ছেলে সামছুল হক বিয়ে করে আলাদা থাকেন। একমাত্র মেয়ে শামসুন নাহারের বিয়ে হয়েছে। এক মাস আগে ছুটি নিয়ে বাড়ি এসেছিলেন। গতকাল রাতে নাতি সাজু মিয়াকে (২৫) সঙ্গে নিয়ে ঢাকা যাওয়ার পথে তিনি পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয়ে মারা যান। নাতি সাজু দগ্ধ হয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসাধীন।

শান্তির জন্য পদত্যাগ করুন: বি.চৌধুরী

দেশের শান্তির জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়েছেন বিকল্পধারা বাংলাদেশের সভাপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা(বি চৌধুরী)। আজ শনিবার বিকেলে মতিঝিলে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে দলটির ১৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সমাবেশে বি. চৌধুরী এ আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রীকে শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে বি চৌধুরী বলেন, ‘দেশে এখন প্রায় গৃহযুদ্ধ অবস্থা। তবে গৃহযুদ্ধের পর্যায়ে যায়নি। যদি গৃহযুদ্ধ হয়, তাহলে আমরা যাব কোথায়? আপনি প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসায়, সবার দায়িত্ব আপনার। আপনাকেই বিশৃঙ্খলা দূর করতে হবে। আমরা দেশে শান্তি চাই। জনগণের শান্তির জন্য প্রয়োজনে আপনি পদত্যাগ করুন।’
বি চৌধুরী বলেন, ‘৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে খালেদা জিয়ার সাড়া না দেওয়া মস্তবড় ভুল ছিল। প্রধানমন্ত্রী, আপনি তখন পেরেছিলেন, এখন কেন পারবেন না? আপনি কি সন্তু লারমার সঙ্গে আলোচনা করেননি? ঘরে ঘরে মানুষ পুড়ছে, প্রধানমন্ত্রী কেন চুপ? আলাপ তো আপনাকে করতেই হবে। যদি দেশের চাপে না হয়, তাহলে বিদেশের চাপে। যদি তাদের চাপে করেন, তাহলে আমরা লজ্জা পাব। আমাদের রাস্তায় পড়ে থাকা আপনার ভালো লাগে, না?’
প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠনের আহ্বান জানিয়ে বি চৌধুরী আরও বলেন, ‘পেট্রলবোমা ও ককটেল নিয়ে যারা ধরে পড়েছে, তারা সরকারি নাকি বিরোধী দলের, তার একটা পরিসংখ্যান দেন। তাদের যাচাই করার জন্য একটা অনুসন্ধান কমিটি গঠন করেন। এগুলো কারা করছে, এটা নিয়ে উই আর কনফিউজড (আমরা সন্দিহান)।’
কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম বলেন, ‘মাইট্যা মন্ত্রীরা বলে যে, যারা আলোচনার কথা বলে, তারা দেশের শত্রু। আমি তো বেগম জিয়ার সঙ্গে আলোচনার কথা বলিনি। আমি বলেছি, প্রয়োজনে আপনাকে চাড়ালের সাথেও আলোচনা করা লাগতে পারে। কারণ আপনি প্রধানমন্ত্রী।’ তিনি বলেন, ‘আপনি মাইট্যা পুলিশ পাঠাবেন না। আমি নামাজ পড়তে গেছি আর আমার তাঁবু, বসবার চৌকি সব পুলিশ নিয়ে গেছে। এ রকম জালিম সিমারও ছিল না। আফামণি, পারলে আমারে নিয়া যাইতেন। ভয় দেখাবেন না। আমার সব ভয় কেটে গেছে।’
কাদের সিদ্দিকী আরও বলেন, ‘এই যে গাড়িতে পেট্রলবোমা মারা হয়, তা বিএনপি-আওয়ামী লীগ। সরকারের লোক গোপনে বোমা মেরে বিএনপির দোষ চাপায়। আর সঠিক নেতৃত্ব নাই বইল্যা বিএনপির লোকজন গাড়িতে বোমা মারে, গাড়িতে আগুন দেয়। মনে করে এটা করে তারা জিতব।’
কাদের সিদ্দিকী বলেন, ‘ইনু ভাই কথা বললে শরীরটা চিড় চিড় করে। তার গণবাহিনী ছিল মানুষ মারা বাহিনী। ওই বাহিনীর নেতা যদি আইনশৃঙ্খলার কথা বলে, তাহলে মানুষ মানব?’ তিনি বলেন, ‘আল্লাহর কাছে যখন যা কিছু চেয়েছি, পেয়েছি। আজকে আল্লাহর কাছে দেশে শান্তি চাই। আমার মেয়েকে না দেখে থাকতে পারি না। তাঁকেও ১১ দিন দেখতে পারিনি। তার পরও বইন (প্রধানমন্ত্রী) আমার কথা শুনবেন না?’
শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে কাদের সিদ্দিকী বলেন, ‘আপনি ভারতের জোরে নাচেন? আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বলতে চাই, পাকিস্তান থেকে মুক্ত হয়ে আমরা ভারতের দাসত্ব চাই না। আমরা ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব চাই, দাসত্ব চাই না।’ তিনি বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে আমারও কিছু সম্পর্ক আছে। চিন্তা করতেছি, কালকে থেকে বাংলাদেশে যা হইতেছে তা নিয়ে ভারতের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলব। বলব, বাংলাদেশে তো আপনাদের সম্মান চুরমার হয়ে যাচ্ছে। কী কথা হয়েছে তিন/চার দিন পরে সেটা জানাব।’
‘এখন কোনো সংলাপ হবে না’ সজীব ওয়াজেদ জয়ের এমন মন্তব্যের বিষয়ে কাদের সিদ্দিকী বলেন, ‘মামাগো তোমাকে কত কোলে নিছি। তোমার মাকে সৎ পরামর্শ দাও।’
তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে কাদের সিদ্দিকী বলেন, ‘ভাইসতা, তোমার বাবা বড় ভালো মানুষ ছিলেন। লন্ডনে থাইক্যা বাবা তুমি এমন কথা বোলো না। আমরা মুক্তিযোদ্ধা হইয়া মতিঝিলে চিটপট্যাং হইয়া শুইয়া রইছি। আর তুমি বঙ্গবন্ধুকে বলো রাজাকার। সে যদি রাজাকার হয়, তাহলে তোমার বাবা মহারাজাকার। যা বলে লাভ নাই, তা বলে ক্ষতি কইরো না। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের বন্ধু, বাংলাদেশের বন্ধু, বিশ্বেরও বন্ধু ছিল।’
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের শওকত হোসেন নিলু, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান প্রমুখ।

বাঁচানোর জন্যই ধ্বংস করতে হয়েছিল গ্রামটি by জাফর সোবহান

দুই পক্ষের কাছেই দেশটাকে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়াই হলো যুদ্ধজয়ের গ্রহণযোগ্য প্রতিদান।
ভিয়েতনামের মেকং দ্বীপের বেন ট্রি নামের এক অখ্যাত নগরী, হঠাৎই সংবাদ সংস্থা এপিতে মার্কিন সাংবাদিক পিটার আরনেটের করা এক প্রতিবেদনের কারণে বিখ্যাত হয়ে যায়।
তখন ভিয়েতনাম যুদ্ধ চলছিল, যুক্তরাষ্ট্রের অজ্ঞাতনামা এক সেনা সদস্যের সাক্ষাতকার নিয়েছিলেন বার্তাসংস্থা এপির প্রতিনিধি পিটার। ওই সময় মার্কিন বিমানবাহিনীর হামলায় ধ্বংস হয়েছিল শহরটি। ১৯৬৮ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ হওয়া সাক্ষাতকারটি থেকে একটি উদ্ধৃতি পরে মুখে মুখে রটে যায়। এখনও জনপ্রিয় সেই কথাটি হচ্ছে, শহরটাকে বাঁচানোর জন্যই শহরটিকে ধ্বংস করতে হয়েছিল।
লোকের মুখে মুখে বদলে যাওয়া কথাটি থেকেই এই লেখার শিরোনাম। যুদ্ধের বোকামির একটি ক্ল্যাসিক উদাহরণ হয়ে থাকা কথাটিই বুঝিয়ে দেয় যে মানুষের মুর্খতা কত গভীরে ডুবে যেতে পারে। যে অজ্ঞতা সবসময় আমাদের বিশ্বাস করাবে যে আমিই ঠিক পক্ষে আছি, বাকিরা সব ভুল দিকে।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, বাংলাদেশের প্রধান দুই দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ, ও এই দলের নেতানেত্রীরা এই মতবাদটার গ্রাহক হয়ে বসে আছেন। তারা উভয়েই মনেপ্রাণে দেশটাকে বাঁচাতে গিয়ে ধ্বংস করে ফেলতে চান। তারা প্রত্যেকেই মনে করেন, অপরপক্ষকে উড়িয়ে দেওয়ার জন্য যে মূল্য দিতে হয়, তা অতি সামান্য!
বিএনপিকে দিয়েই শুরু করা যাক। ধরে নেওয়া যাক, ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরাই এই সমস্ত বিচ্ছিন্ন নাশকতার ঘটনা ঘটাচ্ছে। কিন্তু এটা বিশ্বাস করা খুব শক্ত যে, বিএনপি বা তাদের জোটের কেউ এই সহিংসতার পেছনে নেই।
এই আন্দোলনের মূলকথা বা যৌক্তিকতা হচ্ছে, তারা কৌশলগত কারণেই দেশটাকে জ্বালিয়ে দেবে। এ ছাড়া আর কিভাবেই বা তারা সরকারকে সংলাপ বা সমঝোতার দিকে চালিত করতে পারে? অথবা, এ ধরনের ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করে সেনা হস্তক্ষেপ অবশ্যম্ভাবী করে তুলবে, নইলে দেশটাকে অচল করে সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব নিতে বাধ্য করার প্রয়োজন আর কী হতে পারে?
এ ছাড়া আর কোনও কৌশল বা পরিকল্পনা তাদের নেই। ফলে, সাম্প্রতিক সহিংসতার পেছনে তাদের হাত নেই, এই দাবি কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য হয় না।
বিএনপি ২০১৩ সালের শেষ কয়েক মাস এই ধরনের সহিংসতা চালিয়েছে, হাজার হাজার মানুষের দুর্ভোগের কারণ হয়েছে, মৃত্যুর কারণ হয়েছে। অনেকে পঙ্গু হয়ে গেছে, জীবন তাদের জন্য হয়ে গেছে বোঝার মত। অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে দেশের অর্থনীতির। বাইরের দুনিয়ায় দুর্নাম হয়েছে আমাদের দেশের। এই পুরো বিষয়টি ঘটেছে দেশকে আওয়ামী লীগের শাসন থেকে মুক্ত করার জন্য। যা আমাদের এনে দিয়েছে পুনরায় আওয়ামী লীগ সরকার।
আমাদের প্রশ্ন করা দরকার, এই দুঃসহ সময় বিএনপিকে কী দিয়েছে? একদা সুখ্যাত এই রাজনৈতিক দল, যে দল তিনবার দেশের ক্ষমতায় গেছে, আমাদের শাসন করেছে, যে দল চায় যে কোনও মূল্যে ক্ষমতা থেকে আওয়ামী লীগের পতন?
কারণ খুঁজে বের করা কঠিন নয়- কারণ, আওয়ামী লীগ ঠিক এমনটাই চায়। আওয়ামী লীগই সেই দল যে বিএনপিকে নিংড়ে দলটির জীবনীশক্তি শুষে নিয়েছে, একটি রাজনৈতিক দল সুষ্ঠুভাবে চলার মতো কোনও পরিস্থিতি বা পরিসর কোনটাই দেয়নি। আওয়ামী লীগই ৫ জানুয়ারির লজ্জাজনক নির্বাচনটি করেছে। আওয়ামী লীগই বিএনপিকে পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য নিজেদের উৎসর্গ করে দিয়েছে।
বিএনপি যদি ফাঁদে পড়ে কোণঠাসা হয়ে যাওয়া বন্য জন্তুর মত হিংস্র আচরণ করে, তবে মনে রাখতে হবে, কে বা কারা তাদের সেখানে ঠেলে দিয়েছে। তবে এখন সরকার বলতে পারে, জঙ্গিবাদকে কোনভাবেই জায়েজ করা যায় না, বিএনপি যা করছে তাকে কোনও অজুহাতেই যৌক্তিক বলা যায় না- সেটাও পুরোপুরি হক কথা।
কিন্তু আওয়ামী লীগ চাইলেই নিজের হাত থেকে রক্তের দাগ মুছে ফেলতে পারবে না। তারাও জানে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অস্বীকার করে, একতরফা নির্বাচন করে, বিএনপিকে রাজনৈতিক দলের মর্যাদা না দিয়ে, পিছু হটতে, আত্মগোপন করতে বাধ্য করে, তারাই এই পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।
কিন্তু আওয়ামী লীগও কি ঠিক এমনটাই চায় না? বিএনপির ভাবমূর্তির যে কোনও ক্ষতি আওয়ামী লীগের পক্ষে যায়- আর আওয়ামী লীগের কৌশলও তাই। আওয়ামী লীগ ফাঁদ পেতেছে, বিএনপি তাতে ধরা দিয়েছে।
উপরন্তু, বিএনপির প্রত্যেকটি পোড়ানো বাস, বাসের মধ্যে পুড়ে মরা সাধারণ নিরীহ নাগরিকের মৃতদেহ, সরকারের ক্ষমতার হাতকে আরও একটু শক্তিশালী করে। আইন-শৃঙ্খলা জোরদার করাসহ নাশকতা নিরোধে নেওয়া সরকারের প্রত্যেকটি পদক্ষেপ আওয়ামী লীগকে তাদের গন্তব্যের দিকে আরও একটু এগিয়ে দেয়। তারা যেভাবে দেশ চালাতে চায়, সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী একমাত্র রাজনৈতিক দল হয়ে, আওয়ামী লীগের সেই স্বপ্ন সত্যি হতে সাহায্য করে।
দুই পক্ষের কাছেই দেশটাকে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়াই হলো যুদ্ধজয়ের গ্রহণযোগ্য প্রতিদান। আমাদের দেশ যদি পোড়া বাস আর অঙ্গার হয়ে যাওয়া শবের দেশ হয়ে যায়, জনগণ জানে, এর জন্য কে বা কারা দায়ী থাকবে।
এমন যদি সত্যিই ঘটে, ক্ষমতার দ্বৈরথে জিতে যাওয়া একটি দল যখন ক্ষমতার ঝাণ্ডা হাতে একদা সুন্দর বাংলাদেশের ধ্বংসপ্রায় ভূমিতে দাঁড়িয়ে থাকেন; আর আমাদের বাকি সবার মনে তখন একটাই প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসবে- গ্রামটিকে বাঁচানোর জন্য ধ্বংস করা কি সত্যি জরুরি ছিল?
জাফর সোবহান: সম্পাদক, ঢাকা ট্রিবিউন
সুত্র- বাংলা ট্রিবিউন

আমরা কি হেরে যাচ্ছি? by হাসান ফেরদৌস

আবারও চলন্ত গাড়িতে বোমা। আবারও নিহত নিরীহ মানুষ। তাঁদের কেউ ঘরে ফিরছিলেন স্বজনের কাছে, কেউ স্বজনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ঘর ছেড়ে ঢাকায় আসছিলেন জরুরি কাজে। দিনদুপুরে গাড়ি-বাসে চলা নিরাপদ নয়, সে কথা জেনে ভেবেচিন্তে তাঁরা মধ্যরাতের পরিবহন বাসে ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁরা জানতেন না ভয়াবহ ঘাতক ওত পেতে বসে ছিল তাঁদেরই জন্য। পেট্রলবোমায় পুড়ে গেল তাদের দেহ, ঝলসে গেল অসম্পূর্ণ জীবন। এর জবাবে আমরা কী করছি? সরকার বাহাদুর বিরোধী দলের ওপর দোষ চাপিয়ে নিজের দায়িত্ব পালন শেষ করছে। বুদ্ধিজীবীরা কলাম লিখে আহাজারি করছেন। কেউ কেউ আবার বোমাবাজদের কাছে বিনীত অনুরোধ রাখছেন, ‘প্লিজ, বাসের ওপর পেট্রলবোমা ফেলবেন না। নিরীহ বাসের কী দোষ?’ রাজনৈতিকভাবে খুব প্রণোদিত যাঁরা, দল বেঁধে শহীদ মিনারে এসে তাঁরা মিনমিনে গলায় স্লোগান ধরছেন। সম্ভবত গানও।
সত্যি কি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আমরা হেরে গেছি? বিনীত অনুরোধ অথবা মিনমিনে গলায় ‘প্লিজ, বোমা ছুড়বেন না’ বলে অনুরোধ ছাড়া আমাদের করার আর কিছুই নেই?
নিউইয়র্কে বাস করেন শিল্পী তাজুল ইমাম। দেশজুড়ে অব্যাহত সন্ত্রাসের জবাবে তিনি নিজের রংতুলি হাতে তুলে নিয়েছেন। একের পর এক ছবি এঁকে এই নিষ্ঠুর ও বর্বর সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মানচিত্র নির্মাণ করে চলেছেন। প্রতিটি ছবিতেই দেখি হতাহত, অগ্নিদগ্ধ মানুষ, তাদের বুকফাটা ক্রন্দন। তাঁকে আমি জিজ্ঞেস করি, এই ছবি কি আসলে আমাদের পরাজয়ের বিবরণ? ওরা পেট্রলবোমা ছুড়বে, আর আমরা হতাহত ব্যক্তিদের বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদব। ব্যস, এই পর্যন্তই?
তাজুল ভাই দ্বিমত প্রকাশ করে বলেন, চোখে কান্না, কিন্তু সেই কান্নার পেছনে আছে ক্রোধের আগুন। বুক ভেঙে আসছে বেদনায়, কিন্তু সে একই সঙ্গে ফুঁসছে বিদ্রোহে।
আমার মন সাড়া দেয় না। যদি বুকে থাকে সেই বিদ্রোহের আগুন, তার প্রকাশ কই? আমাদের সম্মিলিত প্রত্যাখ্যানের পরেও এমন নির্বিচারে বোমাবাজি চলে কীভাবে? যাঁরা বোমাবাজির পক্ষে সাফাই গান, তাঁরাই বা কীভাবে এমন অনায়াসে নিজেদের সমাজের সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে জায়গা দখল করে থাকেন? কীভাবে বিবিসি সংলাপে সদম্ভে প্রশ্ন করেন, ‘এখন আবার কিসের পরীক্ষা?’ সেখানে সম্মেলনে কি এমন একজনও ছিলেন যিনি লজ্জায় সে কক্ষ ত্যাগ করেছেন?
যাঁরা আজকের সন্ত্রাসের পেছনে মদদ জোগাচ্ছেন, তাঁদের ন্যায্য রাজনৈতিক দাবিদাওয়া নেই, এ কথা আমি বলি না। কিন্তু রাজনৈতিক দাবি আদায় করতে হয় রাজনৈতিকভাবে, সন্ত্রাসের মাধ্যমে নয়। মানুষের কল্যাণের স্বার্থেই তো রাজনীতি।
তাহলে এ কেমন রাজনীতি, যার ফলে বলি হয় নিরীহ মানুষ? ভাড়াটে খুনি দিয়ে হয়তো নিরীহ মানুষ হত্যা করা যায়, কিন্তু রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জিত হয় না। যাঁরা এই সন্ত্রাসের রাজনীতিকে নিজেদের সঠিক রণকৌশল ভেবে আত্মতুষ্ট, তাঁদের কাছে প্রশ্ন, কবরের ওপর কোন মিনার আপনারা নির্মাণ করবেন?
দিনের পর দিন একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। ব্যাপারটা এখন এত নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে পড়েছে যে সম্ভবত একধরনের ক্লান্তি এসে গেছে আমাদের। সংবাদপত্রে শিরোনাম পড়েই অন্য খবরে মন দিই। টেলিভিশনে অগ্নিদগ্ধ মানুষের ছবি দেখলে চ্যানেল বদলাই। এক বুদ্ধিমান বন্ধু বললেন, এ হচ্ছে ‘হরতাল ফ্যাটিগ’, হরতালজনিত শ্রান্তি বা অবসাদ।
আসলে নিজেদের ‘ভিকটিম’ বা ঘটনার শিকার হিসেবে দেখে আমরা বরাবর তৃপ্ত। আমাদের প্রতিটি প্রতিবাদের গান অথবা বিদ্রোহের কবিতার বিষয়বস্তু শহীদের প্রতি স্তবগাথা। ‘আম্মা, এই নামটি বলে আর কেউ ডাকবে না’—এমন কথা বলে আমরা নিজেদের বেদনার ক্ষতে প্রলেপ দিই। তারপর একসময় সব ভুলে যাই। আমরা যদি সত্যিই এই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, তাহলে ঢাকার রাস্তায় লাখো লোকের হরতালবিরোধী মিছিল নেই কেন? প্রতিটি পেট্রলবোমা নিক্ষেপকারীকে হাতেনাতে ধরে ফেলার জন্য কেন অপেক্ষায় নেই ১০ জন স্বেচ্ছাসেবক, যাঁরা রাত জেগে সড়ক পাহারা দেবেন? এই গ্রাম ও জনপদ আমার, সন্ত্রাসীর কবল থেকে তাকে তো ছিনিয়ে আনতে হবে আমাকেই।
আজকের যে লড়াই, তা বাংলাদেশের আত্মার লড়াই। এর আগে কখনো এমন স্পষ্টভাবে শুভ ও অশুভের লড়াই প্রকাশিত হয়নি। এ হয়তো মুক্তিযুদ্ধ নয়, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অর্জনের বিরুদ্ধে এ যে প্রবল আক্রমণের চেষ্টা, তাতেও কোনো ভুল নেই। এতে যাদের জিত হবে, তারাই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ ও বাঙালির আত্মপরিচয়। এখন সময় এসেছে প্রশ্ন করার, এই লড়াইয়ে আপনার অবস্থান কী?
সরকার বা বিরোধী দল আমরা বুঝি না। যাঁরা রাজনীতি করেন, তাঁদের প্রত্যেকের কাছে আমাদের দাবি, আপনারা সুস্পষ্ট ভাষায় হত্যার রাজনীতির বিপক্ষে আপনাদের অবস্থানের কথা জানান। আপনাদের কেউ না কেউ ভাড়াটে খুনি লাগিয়েছেন। স্পষ্টভাবে সেসব খুনির উদ্দেশে বলুন, এই হত্যার রাজনীতি আপনারা চান না। তা করতে ব্যর্থ হলে আপনাদেরই আমরা প্রতিটি খুনের জন্য দায়ী করব।
একাত্তরে বঙ্গবন্ধু ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ার কথা বলেছিলেন। ঘরে ঘরে নয়, আজ চাই পাড়ায় পাড়ায় সেই দুর্গ। এই ঘর, এই পাড়া, এই শহর আমার। তার ওপর নজরদারির দায়িত্ব আমার। যারা জামার নিচে বা কাগজের পুঁটলিতে পেট্রলবোমা লুকিয়ে রাখে, সে বোমা ছোড়ার আগেই তাকে আমরা ধরে ফেলব। না, সে শুধু একজন দুষ্কৃতকারী নয়। তার নাম-ধাম আছে, তার পেছনে ছাতা ধরে থাকা নেতা আছেন। তাঁদের পরিচয় উদ্ঘাটন আমরাই করব।
না, আমরা পরাজয় মানব না।
হাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

আইএসের বিরুদ্ধে জর্ডানের ব্যাপক বিমান হামলা শুরু

(আইএসের হাতে নিহত জর্ডানের পাইলট মাজ আল-কাসাবের স্মৃতিতে গতকাল জুমার নামাজের পর রাজধানী আম্মানে কয়েক হাজার মানুষ বিক্ষোভ করে। এতে অংশ নেন দেশটির রানি রানিয়াও। তাঁর হাতে ছিল কাসাবের ছবিওয়ালা প্ল্যাকার্ড l ছবি: এএফপি) ইরাকে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) অবস্থানের বিরুদ্ধে গত বৃহস্পতিবার থেকে বড় পরিসরে বিমান হামলা শুরু করেছে জর্ডান। দেশটির একজন পাইলটকে আইএস আগুনে পুড়িয়ে নির্মমভাবে হত্যা করার পর এ পদক্ষেপ এল। জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘প্রতিশোধ নেওয়া কেবল শুরু।’ খবর বিবিসি ও আল-জাজিরার। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আইএসবিরোধী আন্তর্জাতিক জোটের অন্যতম সদস্য জর্ডান। জোট গঠনের পর থেকেই দেশটি আইএসবিরোধী বিমান হামলায় অংশ নিয়ে আসছে। এতদিন তা কেবল সিরিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী নাসের জুদাহ বলছেন, বিমান হামলা এখন ইরাকেও সম্প্রসারিত হলো। সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, জর্ডান ‘যা কিছু আছে, তার সব নিয়ে’ আইএসের পিছু নেবে।
জর্ডানের একটি যুদ্ধবিমান গত ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে সিরিয়ায় আইএসের অবস্থানে বোমাবর্ষণ করতে গিয়ে বিধ্বস্ত হয়। পাইলট মোয়াজ আল-কাসাবে আইএস জঙ্গিদের হাতে ধরা পড়েন। জঙ্গি সংগঠনটি গত ৩ ফেব্রুয়ারি একটি ভিডিও প্রকাশ করে, যাতে আল-কাসাবেকে পুড়িয়ে মারার দৃশ্য দেখানো হয়।
বৃহস্পতিবার ইরাকে আইএসের অবস্থানগুলোতে বোমা ফেলে ফিরে আসার পর জর্ডানের যুদ্ধবিমানগুলোকে আল-কাসাবের গ্রামের বাড়ির ওপর চক্কর দিতে দেখা যায়। কাকতালীয়ভাবে একই সময়ে কাসাবের বাড়িতে গিয়েছিলেন জর্ডানের বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ। তিনি আল-কাসাবের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বাদশাহ আগেই ঘোষণা দিয়েছেন, আল-কাসাবে হত্যার শোধ নিতে তিনি আইএসবিরোধী অভিযান জোরদার করবেন।
পৃথক আরেক সাক্ষাৎকারে জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নাসের জুদাহ বলেন, ‘আমরা বলেছি, আমরা বিষয়টাকে সর্বাত্মকভাবে নিতে যাচ্ছি। তারা (আইএস) যেখানেই থাকুক, আমরা তাদের পিছু নিতে যাচ্ছি। আমরা তা-ই করছি।’ মন্ত্রী জানান, নতুন বিমান হামলাগুলোর লক্ষ্যবস্তু ছিল আইএসের প্রশিক্ষণশিবির ও অস্ত্রভান্ডার। ইরাকের পাশাপাশি সিরিয়ায় বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতেও আঘাত হানা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিমান হামলার বিষয়ে জর্ডানের সেনাবাহিনী একটি বিবৃতি দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান’ এই অভিযানে অংশ নিয়েছে। সেনাবাহিনীও জানায়, আইএসের যেসব লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে, তার মধ্যে ছিল বিভিন্ন প্রশিক্ষণশিবির ও অস্ত্রের ভান্ডার।
এদিকে বৃহস্পতিবার জর্ডান সরকার একজন জঙ্গিনেতাকে মুক্তি দিয়েছে। আবু মোহাম্মদ আল-মাকদিসি নামের ওই ব্যক্তি লেখালেখির মাধ্যমে ইরাকি আল-কায়েদার সদস্যদের অনুপ্রাণিত করেছিলেন। অতীতে আইএসকে ‘পথভ্রষ্ট সংগঠন’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন মাকদিসি। অনলাইনে জিহাদি মতবাদ ছড়ানোর অভিযোগে ২০১৪ সালে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বাংলাদেশে নির্যাতনের ঘটনায় চুপ থাকতে পারে না বিশ্ব- সহিংসতা অবসানের আহ্বান

বাংলাদেশে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য-প্রণোদিত সহিংসতা ও অন্যান্য নির্যাতনের ঘটনা অবসানের কোন লক্ষণ নেই। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারের উচিত সকলের অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা এবং বিচারবহির্ভূতভাবে শক্তি প্রয়োগ, গুম এবং গ্রেপ্তার বন্ধের বিষয়টি নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে সমর্থকরা যাতে বেআইনিভাবে সহিংসতার আশ্রয় না নেয়, তা নিশ্চিতে সব রাজনৈতিক দলের স্পষ্ট বিবৃতি প্রদান করা উচিত। অপরাধমূলক কর্মকান্ডের ধারাবাহিকতা অবসানে সব পক্ষকে সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। আজ যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) এক বিবৃতিতে এসব কথা বলা হয়েছে। এইচআরডব্লিউ’র এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বলেছেন, সহিংস অপরাধের ধারাবাহিকতা বন্ধে ও সব ধরনের অপরাধ কর্মকান্ডের জন্য দায়ীদের খুঁজে বের করে তাদের গ্রেপ্তার ও বিচার নিশ্চিতে সব পক্ষের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া উচিত। তিনি বলেন, বিরোধী দলের কয়েকজন সদস্যের সহিংস অপরাধ কর্মকা- সরকার পক্ষের হত্যাকা-, জখম ও অনৈতিক গ্রেপ্তারের ঘটনাসমূহকে ন্যায্যতা প্রদান করে না। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে নির্যাতনের ঘটনা বিশ্ব আর উপেক্ষা করতে পারে না।
গত মাসে দেশজুড়ে প্রায় ৬০ জন নিহত হয়েছেন, শ’ শ’ মানুষ আহত হয়েছেন ও হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ওই বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সমর্থকরা যাতে বেআইনিভাবে সহিংসতার আশ্রয় না নেয়, তা নিশ্চিতে সব রাজনৈতিক দলের নেতাদের উচিত স্পষ্ট বিবৃতি দেয়া। ব্র্যাড অ্যাডামস বলেন, আইন-শৃঙ্খলা আরোপ এবং দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তাবিধানের দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু, নিরাপত্তা বাহিনীসমূহের জানা উচিত যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য তাদের জবাবদিহি করতে হবে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেনসহ কয়েকটি রাষ্ট্র সহিংসতা অবসানের আহ্বান জানিয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলসমূহের কাছে ভারতের মতামত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেশী দেশটিরও উচিত বাংলাদেশে নির্যাতন বন্ধে তাদের আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করা।

ঐক্য প্রক্রিয়ার গোলটেবিল, সংলাপের জন্য প্রস্তাবনা পেশ

দুই পক্ষ অনড় থাকলেও চলমান সঙ্কট সমাধানে সংলাপই একমাত্র বিকল্প বলে মনে করছেন দেশের বিশিষ্টজনরা। তারা বলেছেন, স্বাধীন দেশে সঙ্কট সমাধানে সংলাপের কোন বিকল্প নেই। চলমান সহিংসতা বন্ধ ও সরকার ইতিবাচক মনোভাব দেখালেই সংলাপের আবহ তৈরি হতে পারে। তবে এমন পরিস্থিতি না হলেও বিকল্প প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে ঐক্য প্রক্রিয়া আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠক থেকে। বলা হয়েছে সবার কাছে গ্রহনযোগ্য তিন থেকে পাঁচজন নাগরিকের কমিটি করে দুই পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সংলাপের প্রক্রিয়া শুরু করা যেতে পারে। এটি সম্ভব না হলে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনা করে সংলাপ উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। আজ সকালে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন এর সেমিনার হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেশের বিশিষ্ট নাগরিক, পেশাজীবী ও রাজনৈতিক দলের নেতারা অংশ নেন। সঙ্কট সমাধানে চলমান প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
গোলটেবিল বৈঠকে বিশিষ্টজনরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশে সংলাপ ছাড়া সঙ্কট নিরসনের কোন বিকল্প নেই। এছাড়া সংলাপ হতে হবে দেশের সকল সক্রিয় রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের কার্যকর অংশগ্রহণের মাধ্যমে। ‘জাতীয় সঙ্কট নিরসনে জাতীয় সংলাপ’ শীর্ষক আলোচনায় অংশ নেন, সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ড. কামাল হোসেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলী খান, এম হাফিজ উদ্দিন, সি এম শফী সামি, রাশেদা কে চৌধুরী, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এটিএম শামসুল হুদা, সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব, বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ, নাগরিক ঐক্যের আহবায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস প্রমুখ।

পরকীয়ার কারণে স্বামীর পুরুষাঙ্গ দু’বার কর্তন স্ত্রীর

চীনের শ্যাংকিউ শহরে ঘটে গেলো উদ্ভট ও বর্বরোচিত এক ঘটনা। ২১ বছর বয়সী এক তরুণী ঝ্যাং হাংয়ের সঙ্গে পরকীয়ায় লিপ্ত হওয়ায় ক্ষুব্ধ এক স্ত্রী তার স্বামীর পুরুষাঙ্গ একবার নয়, দু’বার কর্তন করেছেন। ৩০ বছর বয়সী ফেংকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং এখন শ্রীঘরেই ঠাঁই হয়েছে তার। ৩২ বছর বয়সী স্বামী ফ্যাং লাং ও ফেং ৫ সন্তানের পিতামাতা। স্ত্রীর মোবাইল ফোন ব্যবহার করে প্রেমিকা ঝ্যাংকে ছবি পাঠাতেন ফ্যাং। এরকম কটি ছবি হাতে পড়ায়, হিতাহিত জ্ঞানশূন্য স্ত্রী কাঁচি নিয়ে ঘুমন্ত স্বামীর ঘরে যান এবং তার ওপর বর্বর হামলা চালান। এ খবর দিয়েছে অনলাইন মিড-ডে। গুরুতর আহত ফ্যাংকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং জরুরি অস্ত্রোপচার করা হয়। কিন্তু, এতে ক্ষান্ত হননি স্ত্রী ফেং। তিনি হাসপাতালেও যমদূতের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে দ্বিতীয়বার একই কা- ঘটান। এবার পুরো যৌনাঙ্গ কর্তন করে ছুঁড়ে ফেলে দেন জানালার বাইরে এবং সেটি হারিয়ে যায়। হাসপাতালের এক মুখপাত্র জানান, হাসপাতালের অভ্যর্থনা কক্ষে একজন এসে জানান যে হাসপাতালের বাইরে বিবস্ত্র এক ব্যক্তি এক নারীকে বেদম মারধর করছেন। সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে পৌঁছান হাসপাতালের কর্মচারীরা। তারা গিয়ে দেখেন, বিবস্ত্র এক পুরুষের পা দিয়ে ভীষণভাবে রক্ত ঝরছে এবং তিনি এক নারীকে প্রচ- মারধর করছেন। ফ্যাংকে থামানোর পর তার স্ত্রীকে নিয়ে যাওয়া হয় চিকিৎসার জন্য। তখন তারা লক্ষ্য করেন, ফ্যাংয়ের ওপর দ্বিতীয়বার হামলা চালিয়েছেন তার স্ত্রী। ওই মুখপাত্র আরও জানান, ফ্যাংয়ের অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়েছিল এবং তাকে জরুরি অস্ত্রোপচারের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। এখন তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। তবে মানসিকভাবে ভীষণ বিক্ষিপ্ত ও বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছেন তিনি। এদিকে এ ঘটনার পর তরুণী প্রেমিকাও তাকে দেখতে হাসপাতালে গেছেন। ঝ্যাং বলেছেন, ফ্যাংয়ের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পরিকল্পনা করছেন তিনি এবং তার সঙ্গী পুরুষের পুরুষত্ব হারানোর বিষয়টি তার কাছে মোটেই মুখ্য নয়।

শাসন তবে ‘সসম্মানে’ : পোপ

সন্তান শাসন করতে গিয়ে একটু মারধর করা যেতেই পারে তবে পাশাপাশি দেখতে হবে এতে যেন তাদের কোনো সম্মানহানি না হয়৷ বৃহস্পতিবার রাতে ভ্যাটিকান সিটিতে সাপ্তাহিক জমায়েতে সন্তানপালনে বাবাদের ভূমিকা প্রসঙ্গে এই পরামর্শ দিয়েছেন পোপ ফ্রান্সিস৷
ফ্রান্সিসের মতে, যিনি আদর্শ পিতা, তিনি অবাধ্য শিশুকে যেমন দৃঢ়ভাবে শাসন করবেন তেমনই সে ভুল স্বীকার করলে ক্ষমাশীলও হবেন৷ এমনই এক উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘দম্পতিদের এক সমাবেশে এক বাবা জানান তিনি তার ছেলে-মেয়েদের সময় বিশেষে প্রহার করলেও তাদের মুখমণ্ডলে কখনো আঘাত করেন না৷ এটা করলে তারা অপমানিত বোধ করত।’
সেই বাবার প্রশংসা করে পোপ বলেন, ‘কী অপূব, তাই না! তার মর্যাদাবোধ এতটাই প্রখর যে সন্তানকে যতটুকু শাস্তি দেয়া দরকার ঠিক ততটাই দিয়েছেন, শাসনের গণ্ডি ছাড়িয়ে যাননি।’
পোপের এই মন্তব্যের জেরে, বিতর্ক এড়াতে ভ্যাটিকানের পক্ষে রেভারেন্ড টমাস রোসিকা বলেন, ‘শিশুদের দৈহিক শাস্তিকে সমর্থন করা পোপের উদ্দেশ্য ছিল না৷ তিনি বলতে চেয়েছিলেন কী ভাবে শিশুরা পরিণত হয়ে ওঠে।’
রোসিকা আরো বলেন, ‘আমাদের মধ্যে এমন কেউ আছেন কি যিনি বড় হওয়ার সময় মা-বাবার কাছে অল্পবিস্তর চড়-থাপ্পড় খাননি? পোপ শিশুদের সঙ্গে কী সহজভাবে মেশেন আপনারা দেখেননি? মনে রাখবেন, এই পোপ প্রথম থেকেই মন খুলে কথা বলার পক্ষপাতী৷ তাই আমার অনুরোধ, তার সহজ কথার জটিল অর্থ খুঁজতে যাবেন না।’
এই সাফাইয়ে কাজ হয়নি৷ পোপের মন্তব্যের নিন্দা করে গ্লোবাল অ্যালায়েন্স টু অ্যান্ড কর্পোরাল পানিশমেন্ট ফর চিলড্রেন সংস্থার কোঅর্ডিনেটর পিটার নিওয়েল বলেছেন, ‘পোপের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তি কী করে এমন হতাশাজনক মন্তব্য করলেন ভেবেই অবাক লাগছে৷ এখনো পর্যন্ত ৪৪টি দেশ বাড়িতে এবং বিদ্যালয়ে শিশুদের দৈহিক শাস্তি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে৷ এদের মধ্যে রয়েছে সুইডেন, জার্মানি ও তুর্কমেনিস্তান৷ আরও ৪৫টি দেশ এই প্রস্তাবে রাজি হয়েছে।’
আমেরিকাতেও, যতক্ষণ মাত্রা ছাড়াচ্ছে না, মা-বাবাদের সন্তানদের উত্তম মধ্যম দেয়ায় কোনো বাধা নেই৷ আমেরিকার ১৯টি প্রদেশের স্কুলে, ছাত্রদের বেত মারায় কোনো আইনি বাধা নেই৷
গত বছর জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার রক্ষা কমিটি শিশুদের দৈহিক শাস্তি সম্পর্কে ক্যাথলিক চার্চের দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করে৷ তারা বলে, বহু ক্যাথলিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, বিশেষ করে আয়ারল্যান্ডে, এই পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

ফিলিস্তিনিদের ৪০০ বাড়ি ভেঙে দিতে নেতানিয়াহুর নির্দেশ

ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে নতুন নির্মিত ৪০০ বাড়ি ভেঙে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
এসব ঘর-বাড়ি তৈরি করার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন অর্থের যোগান দিয়েছিল বলে ব্রিটিশ পত্রিকা ডেইলি মেইলে খবর বের হওয়ার পর নেতানিয়াহু এ নির্দেশ দিলেন। ইসরাইল বলছে, এসব ঘর-বাড়ি নির্মাণের আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচিত ছিল তেল আবিবের কাছ থেকে অনুমতি নেয়া।
গতকাল (শুক্রবার) ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক মুখপাত্র অর্থ যোগান দেয়ার বিষয়টি সমর্থন করে বক্তব্য দিয়েছেন।
এর আগে, বৃহস্পতিবার পশ্চিম তীরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধির কার্যালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা শাদি উসমান ডেইলি মেইলকে জানিয়েছিলেন, ভবিষ্যত ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে ইইউ এসব ঘর-বাড়ি নির্মাণে অর্থ যোগান দিয়েছে। সে সময় তিনি আরো বলেছেন, ফিলিস্তিনিদের বসবাসের যেমন অধিকার রয়েছে তেমনি সেখানে স্কুল তৈরি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের অধিকারও রয়েছে।
সূত্র : রেডিও তেহরান।

প্রধান দু’দলকে মতপার্থক্য দূর করতে বলেছে জাতিসংঘ

বাংলাদেশের অবনতিশীল পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। এখনও ঘটেনি এমন বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করেও প্রকাশ করা হয়েছে উদ্বেগ। রাজনৈতিক মতপার্থক্য মিটিয়ে সমস্যার সমাধানে অব্যাহতভাবে প্রধান দু’দলের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে জাতিসংঘ। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ  সমাবেশ করার অনুমতি দিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ব জাতিগোষ্ঠীর সর্বোচ্চ এ সংস্থা। ৫ই ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের ডেপুটি মুখপাত্র ফারহান হক নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এ কথা বলেন। এক সাংবাদিক তার কাছে জানতে চান- বাংলাদেশ ও গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গো নিয়ে আমার প্রশ্ন আছে। বাংলাদেশে পরিস্থিতি দৃশ্যত ক্রমশ অবনতি হচ্ছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অগ্নিসংযোগের অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বিরোধী দলের নেত্রীর কার্যালয়ের বিদ্যুত সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে বিরোধী আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রয়োগ করছে সরকার । তাই এ বিষয়ে মহাসচিবের প্রতিক্রিয়া কি তা জানতে আমি উদগ্রিব। এ পরিস্থিতিতে ডিপার্টমেন্ট অব পলিটিক্যাল অ্যাফেয়ার্স অথবা জাতিসংঘ অন্য কোনভাবে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করছে কিনা? বেসামরিক লোকজনের বিষয়ে কি করবেন সে বিষয়ে বিবৃতি দিচ্ছেন সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তারা। জাতিসংঘে শান্তিরক্ষী মিশনে অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশে এতে কি প্রভাব পড়তে পারে?
এ প্রশ্নের জবাবে মুখপাত্র ফারহান হক বলেন, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে আলাদা এবং এ মিশনের সঙ্গে রাজনীতির কোন সম্পর্ক নেই। শান্তিরক্ষী মিশন নিয়ন্ত্রণ করে এ সংক্রান্ত মিশন। আপনারা জানেন যে, বাংলাদেশ পরিস্থিতিতে আমরা উদ্বেগ জানিয়েছি। আমাদের ডিপার্টমেন্ট ফর পলিটিক্যাল অ্যাফেয়ার্স-এর সিনিয়র কর্মকর্তা সহ অন্য কর্মকর্তারা বার বার বাংলাদেশ সফর করেছেন। তারা বাংলাদেশের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করেছেন এবং শান্তিপূর্ণভাবে কিভাবে সঙ্কটের সমাধান করা যায় তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছেন। আপনারা আরও জানেন যে, এখনও ঘটেনি এমন বিষয়ে আমরা অব্যাহতভাবে আমাদের উদ্বেগের কথা জানিয়ে আসছি। আমরা উদ্বেগ জানিয়েছি সহিংসতার বিষয়ে। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ সমাবেশ করতে দিতে আমরা সরকারকে উৎসাহী করছি এবং অব্যাহতভাবে তা করে যাচ্ছি। এছাড়াও প্রধান দু’দল যাতে তাদের মতপার্থক্য মিটিয়ে ফেলতে পারে তা নিশ্চিত করতে আমরা তাদের নেতাদের সঙ্গে অব্যাহতভাবে যোগাযোগ রেখে যাব।

পরীক্ষা দিতে পারল না হৃদয়

(ফেনীতে ককটেল হামলায় আহত এসএসসি পরীক্ষার্থী হৃদয়ের চিকিৎ​সা চলছে আগারগাঁওয়ের জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে। পাশে তার মা। গতকাল তোলা ছবি l প্রথম আলো ) হাসপাতালের বিছানায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে বিভিন্ন সনদ। বিজ্ঞান মেলায় প্রথম পুরস্কার পাওয়া থেকে শুরু করে আলোকচিত্র প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া, কী নেই তাতে! সবই শাহরিয়ার হৃদয়ের। বিছানার এক পাশে আধশোয়া অবস্থায় স্মার্টফোনে নিজের জীবনের ভিডিও ডকুমেন্টারি তৈরি করছে হৃদয়। তার ডান চোখ থেকে পানি ঝরছে। কিছুক্ষণ পর পর চোখ মুছতে হচ্ছে তাকে। এখন আর সে ডান চোখে কিছু দেখতে পায় না।
আগারগাঁওয়ের জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের শয্যায় গতকাল শুক্রবার রাত নয়টায় হৃদয় যখন ভিডিও ডকুমেন্টারি তৈরি করছিল তখন তার বন্ধুদের ব্যস্ততা ছিল এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে। এর আগে সকালে বাংলা প্রথম পত্রের পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে তারা। ফেনী সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্র হৃদয়েরও তাদের মতোই বাসায় বসে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার কথা ছিল।
গত ৫ জানুয়ারি বিকেলে প্রাইভেট পড়া শেষে রিকশায় করে বাসায় ফেরার পথে ফেনী শহরের ট্রাংক রোডের খেজুর চত্বর এলাকায় ককটেল হামলায় গুরুতর আহত হয় দুই বন্ধু হৃদয় ও অনীক। হৃদয়ের ডান চোখ আর অনীকের বাঁ চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুজনের চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছেন। অনীককে উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতে পাঠানো হয়েছে। হৃদয়কেও শিগগিরই পাঠানো হবে ভারতে।
ফেনী সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হোসনে আরা বেগম বলেন, বিদ্যালয়ের দুজন মেধাবী শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারায় তাদেরও খারাপ লাগছে।
গতকাল সন্ধ্যায় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে কথা হয় হৃদয় ও তাঁর মা রোজি রওশন আক্তারের সঙ্গে। হৃদয়ের মা জানান, এসএসসি পরীক্ষা দিতে যাওয়ার আগে গতকাল সকালে হৃদয়ের বন্ধুরা তাঁকে ফোন করেছিল। কেউই হৃদয়ের সঙ্গে কথা বলেনি কেঁদে ফেলবে এই ভয়ে। শিক্ষকেরা ফোন করেছেন। কথা বলতে বলতেই বিছানায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সনদগুলো দেখাতে থাকেন তিনি। ‘এই যে দ্যাখেন ও আরও দুই বন্ধুর সঙ্গে রোবট বানাইছে। ট্রেনের ইঞ্জিন বানাইছে। ড্রোন বানানোর কাজ করতাছে।’
মায়ের কথা শেষ না হতেই হৃদয় বলে ওঠে, ‘দ্যাখেন এই রোবটটা মাটির তলায় কোনো দুর্ঘটনা হইলে উদ্ধারকাজে সাহায্য করতে পারবে...ওইটা রেডিও সিগন্যাল দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।’
বিছানায় তখন প্রথম আলো গণিত অলিম্পিয়াড, চাইল্ড পার্লামেন্ট, স্পেস ক্যাম্প, জাতীয় পর্যায়ের বিজ্ঞান মেলাসহ স্কুল ও জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন অর্জনের সনদ।
হৃদয়ের মা জানালেন, গত বছর শিশু একাডেমী আয়োজিত ১২তম চাইল্ড পার্লামেন্টে যোগ দিতে ফেনী থেকে ঢাকা এসেছিল হৃদয়। চাইল্ড পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকারও নির্বাচিত হয়েছে। মায়ের কথা শেষ না হতেই হৃদয় জানায়, গত বছরই জাতীয় পর্যায়ের বিজ্ঞান মেলায় দুটি রোবট আর ট্রেন ইঞ্জিন নিয়ে অংশ নিয়েছিল তারা তিনজন। রাশিয়ান দূতাবাস আয়োজিত স্পেস ক্যাম্পেও অংশ নেয় তারা।
বিছানায় থাকা হৃদয়ের একটি খাতার পাতা উল্টাতেই দেখা গেল পাতায় পাতায় সার্কিটের ডায়াগ্রাম, ড্রোনের কাঠামোর নকশা। হৃদয় জানাল, এসএসসি পরীক্ষার পরই তারা ড্রোন তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছিল। নকশাও চূড়ান্ত করেছে। খসড়া কাঠামোও দাঁড় করানো হয়ে গেছে। হৃদয় বলে ওঠে, ‘কিন্তু দেখেন, পরীক্ষাটাই দিতে পারলাম না। সবাই পরীক্ষা দিয়ে কলেজে চলে যাবে। আর আমাকে স্কুলের ছোট ভাইদের সঙ্গে পরীক্ষা দিতে হবে।’
ছেলের কথা শুনে কেঁদে ফেলেন মা। তিনি বলেন, ‘ছেলেটা আমার এক মিনিটও স্থির থাকে না। এখন সারা দিন বিছানায় শুয়ে থাকে। দ্যাখেন ওর মামা একটা ফোন আইনা দিছে। তাই নিয়া কত কী যে করা শুরু করছে বিছানায় শুইয়া শুইয়াই।’
ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত মা। তবে প্রধানমন্ত্রী তাঁর দায়িত্ব নেওয়ায় আশা জেগেছে পরিবারটির মধ্যে। রোজি রওশন আক্তার বলেন, হৃদয়ের বাবা আবুল খায়ের চার বছর আগে কুয়েত থেকে নিঃস্ব অবস্থায় দেশে ফেরেন। কোনোরকমে তিন সন্তান নিয়ে সংসার চলছে। হৃদয় পঞ্চম, অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পেয়েছে। নিজের পড়াশোনার খরচ নানা বৃত্তি আর পুরস্কারের টাকা দিয়ে চালাচ্ছিল হৃদয়।

ক্রসফায়ার- ২৪ ঘণ্টায় ৩, ৭ দিনে ১২ জন বিচারবহির্ভূত হত্যা

গাণিতিক নয়, বিচারবহির্ভূত হত্যা বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও কেউ শিকার হচ্ছেন ক্রসফায়ারের। বেশির ভাগই রাজনৈতিক কর্মী। আবার কারও কারও রাজনীতির সঙ্গে কোন যোগ নেই। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন তিনজন। রাজশাহীতে পুলিশের কথিত বন্দুকযুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা শিবিরের তথ্যবিষয়ক সম্পাদক শাহাবুদ্দিন (২৪) নিহত হয়েছেন। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে নিহত হয়েছেন উপজেলা শিবিরের সভাপতি সাহাব পাটোয়ারী (২৪)। আর যশোরে নিহত হয়েছেন শহীদুল ইসলাম নামে এক জামায়াতকর্মী। গত সাতদিনে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন অন্তত এক ডজন ব্যক্তি। এর মধ্যে সরাসরি ক্রসফায়ারের শিকার হয়েছেন অন্তত ৮ জন। বাকি চার জনের মধ্যে দু’জনের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আর দু’জন পুলিশের গাড়ি থেকে পালাতে গিয়ে ট্রাকচাপায় নিহত হয়েছে বলে দাবি করছে পুলিশ। যদিও তাদের পরিবারের দাবি আগেই গ্রেপ্তার করা হয়েছিল তাদের।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হিসাব অনুযায়ী, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০দলীয় জোটের ডাকা টানা অবরোধে গত ৫ই জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত ঢাকাসহ সারা দেশে বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছেন ১৬ জন। যদিও মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের হিসাব অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ১৭ জন। এর বাইরে চলতি মাসে আরও অন্তত ১০ জন বিচারবহির্ভূত  হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র বলছে, ৫ই জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত অন্তত ২২ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।
মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বলেন, এক বাক্যে বলতে গেলে বলতে হবে এই পরিস্থিতিটা মানবাধিকার বা গণতন্ত্রের দৃষ্টিকোন থেকে বাদ দিয়ে আদিম যুগের হিসাবে বিবেচনা করলেও গ্রহণযোগ্য হতো না। তিনি বলেন, গত কিছুদিন ধরে কিছু মানুষের বক্তব্য-বিবৃতি যা শুনছি তা মুক্তিযুদ্ধের সময়ের সামরিক জান্তাদের কথার প্রতিধ্বনি। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত এই মানবাধিকারকর্মী বলেন, আমার দুর্ভাগ্য যে এ ধরনের ‘কমেন্ট’স করতে আমি বাধ্য হচ্ছি। একদিকে যেমন পেট্রলবোমা দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মারা হচ্ছে। তেমনি তা দমনে নির্বিচারে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চলছে।
সাবেক আইজিপি মোহাম্মদ নূরুল হুদা বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে সন্দেহ করা যেতে পারে তবে নিশ্চিত করে বলা যাবে না যে এগুলো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। কারণ, কেউ একজন অস্ত্রধারী যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালায় তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলি করা ছাড়া উপায় থাকে না। তা না হলে তাকেই মরতে হবে। তিনি বলেন, দেশে উত্তপ্ত অবস্থায় এরকম ঘটনা ঘটে। তবে এসব ঘটনার অনুসন্ধান জরুরি। সরকারি বা বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব ঘটনার অনুসন্ধান করে দেখতে পারে।
রাজশাহী থেকে স্টাফ রিপোর্টার জানিয়েছেন, পুলিশের গুলিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক শাহাবুদ্দিন নিহত হওয়ার পাশাপাশি সংগঠনের আরও দুই নেতা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে কাটাখালির সমসাদীপুরে এ ঘটনা ঘটে। নিহত শিবির নেতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর শ্রেণীর শিক্ষার্থী ও নাটোর জেলার ছাতনী এলাকার রফিকুল্লাহর ছেলে। অপর দুই নেতা- হলেন বিনোদপুর আবাসিক এলাকার সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের স্নাতকোত্তর শ্রেণীর শিক্ষার্থী মফিজুর রহমান এবং হবিবুর রহমান হল শাখা শিবিরের সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত গণিত বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী হাবিবুর রহমান। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাদের পুলিশ হেফাজতে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। রামেক’র পুলিশ বক্সের দায়িত্বে থাকা উপ-পরিদর্শক (এসআই) বদিউজ্জামান জানান, বৃহস্পতিবার রাত দেড়টার দিকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তিনজনকে কে বা কারা মেডিক্যালে নিয়ে আসে।  পরে চিকিৎসক শাহাবুদ্দিনকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত অপর দুই জনের মধ্যে মফিজুরের দুই পায়ে এবং হাবিবুরের ডান পায়ে হাঁটুর নিচে গুলি লেগেছে। তাদেরকে পুলিশি হেফাজতে রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে ব্যক্তিগত কাজ শেষ করে কাটাখালি বাজার দিয়ে ফেরার পথে পুলিশ তাদেরকে আটক করে অজ্ঞাতস্থানে নিয়ে যায়। পরে পরিবারের সদস্যসহ বন্ধু-বান্ধবরা বারবার তাদের অবস্থান জানতে চাইলে পুলিশ আটক করার কথা অস্বীকার করে। রাত ১টার দিকে খবর আসে রাজশাহী মেডিক্যাল  কলেজ হাসপাতালে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাদের ভর্তি করা হয়েছে এবং শাহাবুদ্দিন মারা গেছে। সকালে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে স্বজনরা তার গুলিবিদ্ধ লাশ পায়। পুলিশ পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ নিহতের পরিবারের। স্বজনরা বলেন, ভেবেছিলাম আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আমাদের সন্তানরা নিরাপদেই আছে। কারণ আমাদের জানা মতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাউকে হত্যা নয় বরং অভিযুক্তকে আইনের হাতে তুলে দেয়। পুলিশ যে নৃশংস অমানবিক হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে, তাতে আমরা বাকরুদ্ধ। আইনের রক্ষকেরা যদি বেআইনিভাবে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালায় তাহলে সাধারণ নাগরিকরা যাবে কোথায়? আমরা এ হত্যার উপযুক্ত বিচার চাই। যাতে আর কোন মা-বাবার বুক এভাবে খালি না হয়।
এদিকে মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলমগীর হোসেন দাবি করেছেন, কাটাখালি পৌরসভার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় সেখানে দায়িত্বরত পুলিশের উপর তারা ককটেল নিক্ষেপ করে। এ সময় মাহবুব নামের এক কনস্টেবলকে পেছন থেকে রড দিয়ে আঘাত করে। দুর্বৃত্ত বুঝতে পেরে পুলিশ তৎক্ষণাত গুলি করে। তখন একজন সেখানে মারা যায়, আর বাকি দুজন গুলিবিদ্ধ হয়। তাদেরকে রামেকে ভর্তি করা হয়েছে। তারা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং ক্যাম্পাসের আশপাশের অনেক নাশকতার সঙ্গে জড়িত।
কুমিল্লা থেকে স্টাফ রিপোর্টার জানান, কুমিল্লায় পুলিশের সঙ্গে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ চৌদ্দগ্রাম উপজেলা শিবিরের সভাপতি শাহাব উদ্দিন পাটোয়ারী নিহত হয়েছেন। ঘটনাস্থল থেকে অস্ত্র, গুলি ও পেট্রলবোমা উদ্ধার করার দাবি করেছে পুলিশ। কুমিল্লার পুলিশ সুপার টুটুল চক্রবর্তী সাংবাদিকদের জানান, পুলিশের উপর হামলার পর পাল্টা গুলিতে শিবির নেতা নিহত হয়। চৌদ্দগ্রাম থানার ওসি উত্তম কুমার চক্রবর্তী জানান, এ ঘটনায় হত্যা ও অস্ত্র আইনে পৃথক ২টি মামলা হয়েছে। নিহত শাহাব উদ্দিনের বিরুদ্ধে হত্যা, সন্ত্রাসবিরোধী আইনসহ বিভিন্ন অপরাধে ২০টি মামলার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। এদিকে হাসপাতালের মর্গে আসা নিহত শাহাব উদ্দিন পাটোয়ারীর বোন ফারজানা আক্তার সাংবাদিকদের জানান, বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টার দিকে চৌদ্দগ্রাম পৌর এলাকার চান্দিশকরা গ্রামের নিজ বাড়ির সামনে থেকে পুলিশ পরিচয়ে সাদা পোশাকধারী একদল লোক আমার ভাইকে ধরে নিয়ে যায়। পরে জানতে পেরে আজ (শুক্রবার) মর্গে এসে আমার ভাইয়ের লাশ দেখতে পাই। নিহত শাহাব উদ্দিন চৌদ্দগ্রাম পৌরসভা এলাকার চান্দিশকরা গ্রামের মাওলানা জয়নাল আবেদীন পাটোয়ারীর পুত্র এবং তিনি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অনার্স ৪র্থ বর্ষের ছাত্র ছিলেন।
যশোর থেকে স্টাফ রিপোর্টার জানান, যশোর সদর উপজেলার রামনগর পিকনিক কর্নারে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে শহিদুল ইসলাম নামে এক জামায়াত নেতা নিহত হন। গত রাত ৩টার দিকে এই ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটে বলে যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরিফুল হক জানিয়েছেন। নিহত শহিদুল ইসলামের বাড়ি সাতক্ষীরা সদরে। যশোরের পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান জানান, গত বুধবার শার্শা থেকে শহিদুল ইসলাম ও আবদুল মজিদ নামে ২ জনকে আটক করে পুলিশ। আটক দু’জনই সাতক্ষীরার বাসিন্দা। আবদুল মজিদ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল সাতক্ষীরা পৌর শাখার সাবেক সভাপতি। বর্তমানে তিনি জেলা বিএনপির সদস্য। আর শহিদুল ইসলাম। বর্তমানে তিনি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যুক্ত। শহিদুল ইসলাম সাতক্ষীরা ও কলারোয়া থানায় হত্যা, নাশকতাসহ পাঁচটি মামলার আসামি। এসপি আরও জানান, যেহেতু যশোরের কোন থানায় এই দু’জনের বিরুদ্ধে মামলা নেই, তাই পুলিশ এদের দণ্ডবিধির ৫৪ ধারায় আটক দেখিয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে আদালতে নিয়ে যাচ্ছিল। পথে ঝিকরগাছার গাজীর দরগাহ এলাকা থেকে এরা পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যায়। আসামি পালানোর ঘটনায় তিন পুলিশকে লাইনে ক্লোজ করা হয়। এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় মামলাও করে পুলিশ। এদিকে পুলিশ হেফাজত থেকে পালিয়ে যাওয়া আসামিকে ধরতে গতকাল বিকাল থেকে যশোরের পুলিশ সাঁড়াশি অভিযান শুরু করে। পরে রাত ৩টার দিকে পুলিশ জানতে পারে শহিদুল ইসলাম রামনগরে তার এক আত্মীয়ের বাড়িতে অবস্থান করছে। খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে অভিযান চালায়। পুলিশ শহিদুল ইসলামকে আটক করে ফেরার পথে রামনগর পিকনিক কর্নারের কাছে পৌঁছালে স্থানীয় জামায়াত শিবিরের ক্যাডাররা পুলিশের ওপর আক্রমণ করে। এ সময় পুলিশও পাল্টা আক্রমণে যায়। এই সংঘর্ষ চলাকালে শহিদুল ইসলাম ফের পালানের চেষ্টা করলে পুলিশের ক্রসফায়ারে তার মৃত্যু হয়। সকালে নিহত শহিদুল ইসলামের মৃতদেহ উদ্ধার করে যশোর জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে কোতোয়ালি পুলিশ।
নোয়াখালী থেকে স্টাফ রিপোর্টার জানান, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের লক্ষ্মীনারায়ণপুর গ্রামে পিচ্চি সোহেলের (৩০) গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ৮টার দিকে ইউনিয়নের লক্ষ্মীনারায়ণপুরের ৭নং ওয়ার্ডের আবু তাহের মেম্বার বাড়ির পার্শ্ববর্তী দিঘির পাশ থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহত পিচ্চি সোহেল উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের লক্ষ্মীনারায়ণপুর গ্রামের মেকার বাড়ির হাবিব উল্লার ছেলে। লক্ষ্মীনারায়ণপুরের ৭নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য রহমত উল্লা বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, নিহত সোহেল স্থানীয় বিএনপির একজন সক্রিয় কর্মী। স্থানীয়রা জানায়, বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ৮টার দিকে লক্ষ্মীনারায়ণপুরের আবু তাহের মেম্বার বাড়ির পার্শ্ববর্তী দিঘির পাশে পরপর কয়েকটি গুলির শব্দ শুনতে পায় এলাকার লোকজন। পরে তারা কিছুক্ষণ পর ঘটনাস্থলে গিয়ে পিচ্চি সোহলকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে সেখান থেকে উদ্ধার করে স্থানীয় লাইফ কেয়ার হসপিটালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। বেগমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আইনুল হক জানান, নিহতের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নোয়াখালী আবদুল মালেক উকিল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত সাত দিনে সারা দেশে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে অন্তত এক ডজন ব্যক্তি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। রাজশাহী, কুমিল্লা, যশোর ও নোয়াখালীতে চার জন নিহত হওয়া ছাড়াও বুধবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে কাজীপাড়া এলাকায় অজ্ঞাত এক যুবক পুলিশের কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। এর একিদন আগেই মঙ্গলবার রাতে যাত্রাবাড়ীর মাতুইয়ালে র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় মুজাহিদুল ইসলাম জিহাদ ও সাখাওয়াত হোসেন রাহাত নামে দুই যুবক নিহত হয়। নিহত দু’জনই গত মাসের ২১শে জানুয়ারি থেকে নিখোঁজ ছিলেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানিযেছে। দু’জনের গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুর জেলায়। একই দিন রাজধানীর ভাষানটেক বালুর মাঠ থেকে আলামীন (৩০) নামে এক যুবকের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ভাই বিল্লাল হোসেন জানান, আলামীন ৭ দিন আগে গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের সদর থানা টিলাবাড়ির এলাকা থেকে নিখোঁজ হয়।
গত ৩১শে জানুয়ারি শনিবার রাত সোয়া ১১টায় রাজধানীর রূপনগর এলাকার বেড়িবাঁধ এলাকায় পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে এমদাদ উল্লাহ ওরফে জুনায়েদ (২২) নামে এক শিবির নেতা নিহত হন। তিনি ৯৮ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি ছিলেন। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, মেস থেকে মেধাবী এই ছাত্রকে সন্দেহমূলকভাবে আটক করে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এর একদিন আগে ৩০শে জানুয়ারি শুক্রবার সকাল ১১টায় রূপনগর থানাধীন বেড়িবাঁধের চটবাড়ি এলাকায় এক যুবকের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে জানা যায়, ওই যুবকের নাম আরিফুল ইসলাম মুকুল। তিনি তেজগাঁও থানার জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কর্মী ছিলেন। নিহতের মামা তৌহিদুল ইসলাম জানান, আরিফুলকে গত ২৯শে জানুয়ারি বিকালে সদরঘাটে লঞ্চ থেকে ডিবি পুলিশের পরিচয় দিয়ে তাকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়। পুলিশ তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে বলে তিনি দাবি করেছেন। গত ২৭শে জানুয়ারি ভোরে রাজশাহীতে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন স্থানীয় জামায়াত নেতা অধ্যাপক নূরুল ইসলাম শাহীন। পরিবারের অভিযোগ, তাকে আটক করার পর ‘পরিকল্পিতভাবে হত্যা’ করেছে ডিবি পুলিশ। নিহত নূরুল ইসলাম শাহীন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিনোদপুর এলাকার ইসলামীয়া কলেজের ইসলাম শিক্ষা বিষয়ের অধ্যাপক ছিলেন। একই সময়ে সাতক্ষীরার পাটকেল ঘাটায় পুলিশের সঙ্গে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ রফিকুল ইসলাম নামে অপর এক ব্যক্তি নিহত হন। পুলিশের দাবি, পাটকেলঘাটা থানার কুমিরা ইউনিয়নের অভয়তলায় একদল ডাকাত ডাকাতির প্রস্তুতি নিচ্ছে এমন খবর পেয়ে ভোরে পুলিশ সেখানে যায়। এ সময় ডাকাতরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে। পুলিশও পাল্টা গুলি চালালে গুলিবিদ্ধ হন রফিকুল। তবে নিহত রফিকুলের স্ত্রী অভিযোগ করেছেন, তার স্বামীকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নাটক সাজিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। গত ২৬শে জানুয়ারি রাজধানীর রামপুরায় র‌্যাবের সঙ্গে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ আবুল কালাম ও সুলতান নামে দুই যুবক নিহত হন। ২৩শে  জানুয়ারি কুমিল্লার দাউদকান্দিতে র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন লক্ষ্মীপুরের সাবেক ছাত্রদল নেতা সোলাইমান উদ্দিন জিসান (২৮)। ২০শে জানুয়ারি রাজধানীতে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সঙ্গে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন খিলগাঁও থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান ওরফে জনি। কারাগারে আটক ছোট ভাইকে দেখা করতে গেলে সেখান থেকে সোমবার ডিবি তাকে আটক করে। পরদিন জোড়াপুকুরপাড় এলাকায় তাকে নিয়ে অভিযান চালানোর সময় সহযোগীরা পুলিশের ওপর হামলা চালায় বলে দাবি করা হয়। এ সময় সহযোগীদের গুলিতেই জনি নিহত হন বলে দাবি করেন পুলিশ কর্মকর্তারা। নূরুজ্জামান জনির স্ত্রী মুনিয়া পারভীন মনীষা অভিযোগ করেন, ছাত্রদলের খিলগাঁও থানার সম্পাদকের দায়িত্বে থাকার কারণেই তাকে ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করা হয়েছে। ১৯শে জানুয়ারি মতিঝিলের এজিবি কলোনিতে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন নড়াইল পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ইমরুল কায়েস। তিনি জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তিনি এক সপ্তাহ আগে ঢাকায় যান। নিহত হওয়ার চার দিন আগে থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। তাদের অভিযোগ, ডিবি থেকে তাকে আটক করে বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যা করেছে। এছাড়া গত ১৬ই জানুয়ারি যৌথবাহিনীর অভিযানের মধ্যে র‌্যাবের হাতে আটকের পর চাঁপাই নবাবগঞ্জের কানসাটে কথিত বন্দুকযুদ্ধে ছাত্রদল নেতা মতিউর রহমান নিহত হন। নিহত মতিউর রহমান শিবগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সহসভাপতি ছিলেন। মতিউরকে নিয়েও মধ্যরাতে অভিযানে গিয়েছিল র‌্যাব। এ সময় মতিউরের সহযোগীরা র‌্যাবের ওপর গুলি ছুড়লে র‌্যাবও পাল্টা গুলি ছুড়ে। এতেই মতিউর গুলিবিদ্ধ হয় বলে র‌্যাবের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।
এর বাইরে গত ২৭শে জানুয়ারি র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তারের পর এক শিবির নেতা ও গত সোমবার রাতে পুলিশের হাতে আটকের পর দুই বিএনপি সমর্থক মারা গেছেন। র‌্যাব ও পুলিশের দাবি, পালাতে গিয়ে ট্রাক চাপায় নিহত হয়েছেন তারা। যদিও নিহতদের পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছেন, তাদের মারধর করে পরে ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া ঢাকার মিরপুর রূপনগর বেড়িবাঁধ থেকে আরেক ছাত্রদল নেতার গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। স্বজনদের ধারণা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাই তাকে হত্যার পর লাশ ফেলে এসেছে।

পেট্রলবোমায় অঙ্গার হলো আরও আটজন

বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের অবরোধ কর্মসূচির মধ্যে গাইবান্ধা সদর উপজেলা ও বরিশালের গৌরনদী উপজেলায় পেট্রলবোমা হামলায় আটজন নিহত হয়েছেন। জোটের অবরোধ কর্মসূচির ৩৩তম দিন আজ শনিবার। এই কর্মসূচিতে সহিংসতায় এখন পর্যন্ত নিহত হয়েছেন ৭৭ জন। আহত সহস্রাধিক।
গাইবান্ধা: সদর উপজেলায় পুলিশি পাহারার মধ্যে যাত্রীবাহী একটি বাসে পেট্রলবোমা হামলা হয়। এতে দুই শিশুসহ পাঁচ যাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। দগ্ধ হয়েছেন অন্তত ২৯ জন। এ ঘটনায় ১১ জনকে আটক করেছে পুলিশ। গতকাল শুক্রবার রাত ১১টার দিকে শহরের অদূরে তুলসীঘাট এলাকায় গাইবান্ধা-পলাশবাড়ী সড়কে যাত্রীবাহী বাসে হামলার ঘটনাটি ঘটে।
পেট্রলবোমার আগুনে পুড়ে ঘটনাস্থলে মারা যান চারজন যাত্রী। তাঁরা হলেন সৈয়দ আলী (৪২), হালিমা বেগম (৪০), সুমন মিয়া (২২) ও শিল্পী রানী (১০)। চারজনের মরদেহ গাইবান্ধা সদর হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। দগ্ধ যাত্রীদের মধ্যে সুজন (১৩) নামের এক শিশু আজ শনিবার সকাল সাতটার দিকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যায়। নিহতদের সবার বাড়ি জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায়।
গাইবান্ধা সদর থানার পুলিশ ও দগ্ধ যাত্রীদের কাছ থেকে জানা যায়, সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সীচা বাজার থেকে গতকাল রাত নয়টার দিকে নাপু পরিবহনের একটি বাস ৪০-৫০ জন যাত্রী নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়। বাসটি গাইবান্ধা শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে আসার পর সেখান থেকে পুলিশ পাহারায় অন্তত ২৫-৩০টি যানবাহনের সঙ্গে আবার ঢাকার পথে রওনা দেয়। রাত সোয়া ১১টার দিকে তুলসীঘাট এলাকায় বাসটিতে পেট্রলবোমা ছোড়ে দুর্বৃত্তরা। এতে বাসটিতে আগুন ধরে যায়। আগুনে এ পর্যন্ত পাঁচ যাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। দগ্ধদের মধ্যে ২০ জনকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। পেট্রলবোমা হামলার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ। গাইবান্ধা ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিটও সেখানে যায়। পরে বাসের আগুন নেভানো হয়।
গাইবান্ধার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোশাররফ হোসেন বলেন, পুলিশ পাহারার পরও দুর্বৃত্তরা এই হামলা চালায়। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের ধরতে অভিযান চলছে।
সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাজিউর রহমান জানান, এখন পর্যন্ত ১১ জনকে আটক করা হয়েছে।
বরিশাল: গৌরনদী উপজেলার দক্ষিণ মাহিলারা এলাকায় একটি ট্রাকে পেট্রলবোমা হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। এতে তিনজন নিহত হয়েছেন। আজ ভোররাত পৌনে চারটার দিকে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে এ ঘটনা ঘটে। ঢাকা মেট্রো ট-১৬-৯৩২৫ নম্বরের ট্রাকটি ফরিদপুর থেকে পোলট্রি ফিড বোঝাই করে বরিশালে ফিরছিল। পেট্রলবোমা হামলায় ট্রাকের সামনের অংশ পুড়ে গেছে।
নিহত ব্যক্তিরা হলেন ট্রাকচালক ইজাজুল (৪২), চালকের সহকারী মুন্নু (৩২) ও চালকের শ্বশুর। আনুমানিক ৬০ বছর বয়সী এই ব্যক্তির নাম জানা যায়নি। তাঁদের সবার বাড়ি ফরিদপুরে বলে জানিয়েছেন ট্রাকের মালিক মো. রিপন মিয়া। তিনজনের লাশ উদ্ধার করে গৌরনদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেছে পুলিশ।
বরিশাল-১ আসনের সাংসদ আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, বরিশালের পুলিশ সুপার এ কে এম এহসান উল্লাহ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। গৌরনদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাজ্জাদ হোসেন এই হামলার তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
গত বছরের ৫ জানুয়ারির ‘একতরফা’ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগের দাবিতে এ বছরের ৬ জানুয়ারি থেকে টানা অবরোধ কর্মসূচি চালিয়ে আসছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোট। এর দুই দিন আগে সহিংসতা শুরু হয়।

বরিশালে ট্রাকে পেট্রলবোমায় চালকসহ নিহত ৩

বরিশালের গৌরনদীতে পোল্ট্রি খাবারবাহী ট্রাকে দুর্বৃত্তদের ছোড়া পেট্রলবোমায় তিনজন নিহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন- ট্রাকের চালক, হেলপার ও একজন লেবার। এদের মধ্যে একজনের নাম ওয়াজেদ আলী। শনিবার ভোর সোয়া ৫টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। সাবেক চিফ হুইপ আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। গৌরনদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাজ্জাদ হোসেন জানান, মাদারীপুর থেকে পোল্ট্রি ফিড নিয়ে নিয়ে বরিশালে আসছিল ট্রাকটি (ঢাকা মেট্রো-ট-১৫৯৩২৬)। পথে গৌরনদীর বাটাজোর বাজারের দক্ষিণ পাশে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে পৌঁছালে দুর্বৃত্তরা ট্রাকে পেট্রলবোমা  ছোড়ে। এতে তিনজন দড়্ধ হয়ে মারা যান। নিহতদের মরদেহ স্থানীয় আশকাঠি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আনা হয়েছে।

‘সন্ত্রাসের কাছে মাথানত করবো না’ -প্রধানমন্ত্রী

সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের কাছে মাথানত করবেন না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শনিবার সকালে রোটারি ইন্টারন্যাশনালের আন্তর্জাতিক রোটারি শান্তি সম্মেলন উদ্বোধনকালে তিনি এ মন্তব্য করেন। এসময় তিনি আরও বলেন, বিএনপি-জামায়াতের পেট্রলবোমা মেরে মানুষ হত্যা ও নাশকতার আন্দোলনে এ পর্যন্ত অর্ধশতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন, আহত হয়ে হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন আরও কয়েক শতাধিক মানুষ। তিনি বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোট যেন দেশের মানুষের বিরুদ্ধেই ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা করেছে। ঠিক একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে এ ধরনের ঘটনা আমরা দেখেছিলাম। একই কায়দায় এবারও হত্যা করা হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। সন্ত্রাসের কাছে মাথানত করবো না, জঙ্গিবাদের কাছে আমরা মাথানত করবো না। ইনশাল্লা আমরা এ কাজে সফল হবো। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন সময়ের তথ্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সে সময়ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলো বিএনপি-জামায়াত। মহাসড়কের গাছ কেটে ফেলেছিল তারা। পুলিশ-বিজিবিসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ২০ সদস্য তাদের হামলায় নিহত হয়েছিল। আবার তারা একই কায়দায় ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করেছে।

'সরকার নিরাপত্তা দিতে পারছে না' -ড. মিজানুর

মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেছেন, চলমান সহিংস পরিস্থিতিতে সরকার নাগরিকদের কাঙ্খিত নিরাপত্তা দিতে পারছে না।
শনিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচার ঢাকা রিপোটার্স ইউনিটিতে 'সংঘাত নয়- সমঝোতা, সহিংসতা নয়- শান্তি' শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এ মন্তব্য করেন।
ড. মিজান বলেন, 'মানুষের চলার স্বাধীনতার জন্য কোনো লাইসেন্স লাগে না। কিন্তু চলমান সহিংস পরিস্থিতিতে সরকার নাগরিকদের কাঙ্খিত নিরাপত্তা দিনে পারছে না। সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে সরকারকে তার গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ দিতে হবে।'
তিনি আরো বলেন, 'অগণতান্ত্রিক পন্থায় গণতন্ত্র অর্জন সম্ভব নয়। গণতন্ত্র উদ্ধারের নামে সে সহিংসতা হচ্ছে তা অর্থহীন। যারা সন্ত্রাস করছে তাদের অপরাধ রাষ্ট্রদোহিতার শামিল। নেতাদের বুলেটপ্রুফ গাড়ি আছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ অটোরিকশায় চলে। সাধারণ মানুষ তাদের নিরাপত্তা চায়। ধনীর সন্তানের পাশাপাশি কৃষক-শ্রমিকদের সন্তানকে পরীক্ষা দেয়ার অধিকার দিতে হবে।'
অনুষ্ঠানে সাবেক সেনাপ্রধান লে. জেনারেল (অব.) নূরউদ্দিন খান প্রশ্ন তোলেন, 'আমরা সরকার নির্বাচন করেছি নিরাপত্তার জন্য। সরকারকে কি বলে বুঝিয়ে দিতে হবে, আমাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব তাদের!'
মানবাধিকার কর্মীদের উদ্দেশে নূরউদ্দিন খান বলেন,'আপনারা সমস্যা সমাধানে কিছু সুপারিশ তৈরি করে তা নিয়ে দুই নেত্রীর কাছে জমা দেন। তাতে কাজ না হলে রাষ্ট্রপতির কাছে যান।'দেশের মানবাধিকার সংস্থার জোট 'ফেডারেশন অব বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস অর্গানাইজেশন' (এফবিএইচআরও) এই গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে। সংগঠনের আহ্বায়ক ড. মো. শাহজাহানের সঞ্চালনায় এতে আরো বক্তব্য রাখেন বিচারপতি সৈয়দ আবু কায়সার মো. দাবিরুশ্বান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান, সাবেক আইজিপি ড. এনামুল হক, সাবেক সাংসদ গোলাম মাওলা রনি, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ড. শহীদুল ইসলাম প্রমুখ।
লিখিত বক্তব্যে সংগঠনের সভাপতি মো. শাহজাহান বলেন, 'রাজনীতির নামে সাধারণ মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে। ৩২ দিনে ৭১ জনের প্রাণহানী হয়েছে। এর মধ্যে পেট্রোলবোমায় ৪০ জন, ক্রসফায়ারে ১৪ জন ও সংঘাতে১৭ জনের প্রাণ গেছে। রাজনৈতিক সহিংসতায় পোড়ানো হয়েছে ৯৫২টি যানবাহন।'

সকালে ছোটরা, বিকেলে বড়রা by মাসুম আলী

(বাংলা একাডেমিতে একুশে গ্রন্থমেলা গতকাল সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত ছিল শিশুদের জন্য। খুদে পড়ুয়াদের ভিড় ছিল লক্ষণীয় l ছবি: প্রথম আলো) অমর একুশের গ্রন্থমেলায় গতকাল শুক্রবার ছুটির দিনের শুরুটা ছিল ছোটদের জন্য। আনুষ্ঠানিকভাবে মেলা কমিটি এ সময়টিকে ঘোষণা করেছে ‘শিশু প্রহর’ হিসেবে। নামটা হয়েছে ষোলোআনা সার্থক। দিনের শুরুতে মেলা সত্যিই অন্য রকম ছিল খুদে পাঠকদের কারণে। বড়দের ভিড় ও ধাক্কাধাক্কি নেই। মা-বাবার হাত ধরে মনের খুশিতে শিশুদের ঘুরে বেড়ানো। বায়না ধরে দুই হাত ভর্তি করে বই কেনা। গতকাল ছিল শিশুদের জন্য বিশেষ দিনের প্রথম পর্ব। বেলা ১১টা থেকে দুইটা পর্যন্ত শিশুদের জন্য ছিল মেলায় প্রবেশের সুবন্দোবস্ত। অভিভাবকদের হাত ধরে নিশ্চিন্তে-নির্বিঘ্নে তারা মেলায় ঢুকেছে।
বিকেলে ঠিক উল্টো চিত্র। অবশ্য গ্রন্থমেলার ছুটির দিনগুলোতে যেমন বরাবর হয়, যা প্রত্যাশা থাকে, তার ব্যতিক্রম হয়নি। শাহবাগ থেকে দোয়েল চত্বর যান-জনতায় আকীর্ণ। বিকেল থেকে বাংলা একাডেমি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উভয় প্রান্তের দুটি করে আর্চওয়ের সামনে চারটি করে সারি। উদ্যানে কিংবা বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে আক্ষরিক অর্থেই ‘তিল ঠাঁই আর নাহিরে’ অবস্থা। সকালে ‘শিশু’, বিকেলে ‘ভিড়’ আর সন্ধ্যায় মেলা মঞ্চে ‘নাচ-গানে’র আয়োজন দিয়ে দারুণ একটি দিন কাটল গতকাল।
‘বড়দের ভিড়ের চাপে শিশুরা অনেক সময় মেলায় ঢুকতে পারে না। ঢুকলেও নিজেদের মতো করেঘুরে বেড়ানোর সুযোগ পায় না। মূলত শিশুদের মেলায় প্রবেশ সহজ করার জন্যই এই বিশেষ ব্যবস্থা’—বলছিলেন বাংলা একাডেমির জনসংযোগ বিভাগের উপপরিচালক মুর্শিদুদ্দিন আহম্মদ। তিনি জানান, আজ শনিবার এবং ১৩ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি শিশু প্রহর ঘোষণা করা হয়েছে। শিশু প্রহরের সময়কাল বেলা ১১টা থেকে বেলা দুইটা।
গতকাল প্রথম প্রহরে বই দেখা, কেনার পাশাপাশি ছিল নানা আয়োজন। সকাল সাড়ে আটটায় অমর একুশে উদ্যাপন উপলক্ষে বাংলা একাডেমি আয়োজন করে শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতায় ‘ইচ্ছেমতো আঁকা’ শীর্ষক ক বিভাগে ২৮৫ জন, ‘শহিদ মিনার’ শীর্ষক খ বিভাগে ২০৪ জন এবং ‘বাংলা একাডেমি’ শীর্ষক গ বিভাগে ১৭৪ জন প্রতিযোগী অংশ নেয়। প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করেন শিল্পী হাশেম খান।
গতকাল বই বিক্রি হয়েছে দেদার। শিশু একাডেমী ছাড়াও পাঞ্জেরি, ঝিঙেফুল, সেবা প্রকাশনী, বিশ্বসাহিত্য ভবন, ওয়ার্ল্ড অব চিলড্রেনস বুক, টোনাটুনি প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানে ছোটদের ভিড় বেশি দেখা গেছে। ছুটির দিনেও বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা থাকায় অনেক শিশুকে স্কুলের পোশাক গায়ে মেলায় দেখা গেছে। শিশু একাডেমীতে সকালে গান, নাচ, আঁকাজোকার ক্লাস করে লাল-সবুজ পোশাক গায়ে অনেক অগ্রসর খুদে পাঠকের দেখা মিলেছে।
নতুন বই এবং বইয়ের মোড়ক উন্মোচন: শৈশব পেরিয়ে মেলা তারুণ্যে পড়বে কয়দিন বাদেই। এই সময়টাকে নতুন বই নিয়ে আসার জন্য যথার্থ মনে করছেন প্রকাশকেরা। তাই গতকাল মেলায় অন্তত ৪০০টি নতুন বই প্রকাশ পেয়েছে। যদিও একাডেমির তথ্যকেন্দ্র এবং সমন্বয় ও জনসংযোগ উপবিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার মেলার ষষ্ঠ দিনে নতুন বই আসার সংখ্যা ২৯০। এর মধ্যে গল্প ৫৩, উপন্যাস ৫৯, প্রবন্ধ ২২, কবিতা ৫৮, গবেষণা ৬, ছড়া ১০, শিশুসাহিত্য ১৩, জীবনী ৮, নাটক ১, বিজ্ঞান ১৩, ভ্রমণ ২, ইতিহাস ৩, ধর্মীয় ১, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি ২, রম্য ৪, চিকিৎসা ৪, অভিধান ১ এবং অন্যান্য বিষয়ের ওপর ২৮টি নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে। এ হিসাবটা শুধু প্রকাশকদের তথ্যকেন্দ্রে সরবরাহ করা বইয়ের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। নতুন আসা সব বই প্রকাশকেরা তথ্যকেন্দ্রে দেন না।
তবে নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের সঠিক সংখ্যা মিলেছে সমন্বয় ও জনসংযোগ উপবিভাগ থেকে। গতকাল নজরুল মঞ্চে ৩১টি নতুন বইয়ের মোড়ক খোলা হয়। এর মধ্যে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ উন্মোচন করেন পাশা মোস্তফা কামালের রংধনু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক উন্মোচন করেন সাদিয়া আফরিনের ভ্রমণ, হাফিজুল ইসলামের মহাকালের প্রথম প্রহর ও খায়রুল ইসলামের স্বপ্ন।
নজরুল মঞ্চে মোড়ক উন্মোচনের এতটাই ভিড় ছিল যে বাধ্য হয়ে নীতিমালা লঙ্ঘন করে স্টলের সামনে নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করতে দেখা গেছে। বিকেলে অন্বেষা প্রকাশনের স্টলের সামনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী মাহবুবুল হক শাকিলের খেরোখাতার পাতা থেকে বইটির মোড়ক উন্মোচন করেন সাংবাদিক গোলাম সারওয়ার, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি, নাট্যজন পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ, কবি রফিক আজাদ, হাবিবুল্লাহ সিরাজী, গীতিকার আসিফ ইকবাল প্রমুখ।
আলোচনা ও নাচ-গান
সন্ধ্যার নাচ-গানে মুখরিত ছিল মেলা মঞ্চ। উল্লেখ করার মতো দর্শকও দেখা গেছে বর্ধমান হাউসের সামনে সবুজ চত্বরে। এতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অনীক বোসের পরিচালনায় নৃত্য পরিবেশন করে ‘স্পন্দন’। গান শোনান শিল্পী শাহীন সামাদ, ফেরদৌস আরা, সালাউদ্দিন আহমেদ, সুজিত মোস্তফা, শহীদ কবির, মফিজুর রহমান, ফারহানা ফেরদৌসী ও প্রিয়াংকা গোপ। এর আগে বিকেলে অনুষ্ঠিত হয় ‘রজনীকান্ত সার্ধশতজন্মবর্ষ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ পাঠ করেন নূরুল আনোয়ার। জামিল চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আলোচনা করেন অধ্যাপক আজিজুর রহমান ও শিখা আরেফিন।

দিল্লি নির্বাচন- ধনী-গরিবের লড়াই! by বন্দিতা মিশ্র

দিলি্লর এবারের বিধানসভা নির্বাচনে ভোটারদের মধ্যে ভেদরেখাটা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সোজাসাপ্টাভাবে বলতে গেলে 'ধনী-গরিব'; 'নিম্নবিত্ত ও মধ্য-উচ্চবিত্ত'_ এভাবে ভোটারদের মধ্যে বিভক্তিটা দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। সর্বজনস্বীকৃতভাবে উচ্চাকাঙ্ক্ষী দিলি্লকে বিভিন্ন শ্রেণীবর্গে ভাগ করা সহজ নয়। তবে সাধারণভাবে বলতে গেলে দিলি্লর কেন্দ্রস্থল থেকে দূরে, সেখান থেকে যমুনার ওপার এবং তা থেকে দক্ষিণ দিলি্ল ঘুরে এলে এই বিভক্তিটা আরও স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। ভোটারদের মধ্যকার শ্রেণী-বিভক্তিই নির্বাচনী প্রচারণার শেষ মুহূর্তে এসে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে, একটা সুনির্দিষ্ট অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। যারা আম আদমি পার্টিকে ভোট দেবে বলছে তারা এবং বাদবাকিরা এভাবে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। দিলি্লর বাইরের অংশে সবসময় যেখানে ময়লা-আবর্জনাময় পানিতে সয়লাব থাকে, সেই মেহরুলিতে বসবাসকারী নিরাপত্তা প্রহরী অটল বাহাদুর সিং, যার বাসার গলি এত সরু যে অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত ঢুকতে পারে না, তার সঙ্গে যারা নাগরিক সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে, তাদের কোন দলের প্রার্থীকে ভোট দেবে তার একটা স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। দিলি্লর চাঁদনি চকের এমব্রয়ডারি কারুশিল্পী শফিকউদ্দিনের মাথার ওপর রয়েছে আড়াআড়িভাবে বিদ্যুৎ ও টেলিফোনের তার। বৃষ্টি এলে বিদ্যুতের তারে বিপজ্জনক স্পার্ক হয়। তার মতো লোকেদের এবং যারা অবিরাম সবকিছু চাইলেই হাতের কাছে পেয়ে যান, তাদের মধ্যে এবারের নির্বাচনে দল নির্বাচনের ক্ষেত্রে পার্থক্য নজরে আসছে।
আড়াই ঘণ্টা সাইকেল চালিয়ে দিলি্লতে কাজ করতে আসা এবং কাজ শেষে আড়াই ঘণ্টা সাইকেল চালিয়ে ঘরে ফেরা লোকেন্দ্র রানার সঙ্গে যাদের এতটা কষ্ট স্বীকার করতে হয় না তাদের মধ্যে ভোট কাকে দেবেন এ প্রশ্নে ভিন্ন মত রয়েছে। লোকেন্দ্রদের মতো লোকজনের অনেকের পছন্দ আম আদমি পার্টি।
রানা একজন পার্কিং তত্ত্বাবধানকারী। ২০ বছর আগে তিনি নেপাল থেকে দিলি্ল এসেছিলেন। এখন কাপসেরাতে ভাড়া বাসায় পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। তার কাছে অর্থনীতি মানে ক্রমবর্ধমান পানি ও বিদ্যুৎ বিল। যে কারণে তাকে দীর্ঘ পথ সাইকেলে পাড়ি দিয়ে কাজে আসতে হয়। কাজে আট ঘণ্টার সঙ্গে যাতায়াতের জন্য আরও ৫ ঘণ্টা সময় ও শক্তি ব্যয় করতে হয় তাকে। তার মতে, সে বাসে করে কর্মস্থলে আসতে পারে। কিন্তু বাসে আসা-যাওয়া বাবদ তার খরচ পড়বে ৭০ রুপি। এত অর্থ বাসভাড়া বাবদ খরচ করলে তার মাসিক ৮ হাজার রুপি বেতনে সংসার চলবে কী করে! আর তিন ছেলেমেয়েকে লেখাপড়াই-বা করাবেন কী করে! এদের মধ্যে আবার বড়টি এবার ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ছে।
রানা বলেছেন, কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টি পানি ও বিদ্যুৎ বিল হ্রাস করার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় সে ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত দিলি্ল বিধানসভা ও পরে অনুষ্ঠিত লোকসভা নির্বাচনেও ভোট দিয়েছিলেন। কেজরিওয়ালের দল যে ৪৯ দিন ক্ষমতায় ছিল সে সময়ে তাদের প্রতিশ্রুতি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে।
দিলি্লতে ছোট মলের কর্মচারী পাটনার লোক অজিত কুমার সিংয়ের মতে, তার মতো চতুর্থ শ্রেণীর আম আদমির জন্য কেজরিওয়ালই দিলি্লর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি। তিনি যদিও লোকসভা নির্বাচনের সময় মোদিকে পছন্দ করার কারণে বিজেপিকে ভোট দিয়েছিলেন। কিন্তু আম আদমি পার্টির দিলি্লর ৪৯ দিনের রাজ্যপাট চালানোর সময় দক্ষিণ দিলি্ল থেকে সঙ্গম বিহার পর্যন্ত পানির অবারিত প্রবাহ এবং অটোওয়ালা ও অন্যদের যখন পুলিশকে ঘুষ দিতে হয় না দেখেন, তখন তিনি এই দলের প্রতি আবেগতাড়িত হন। এই ৪৯ দিনে ৫শ'টি ঘর তৈরি হয়েছে। এসব ঘর তার মতো লোকেরাই নির্মাণ করেছে। তারা আগে আধা বৈধ-আধা অবৈধ কলোনিতে বাস করতেন, যেখানে সবসময় এই বুঝি তুলে দেবে_ এ ধরনের ভীতি কাজ করত এবং পুলিশকে নিয়মিত ঘুষ দিতে হতো।
সঙ্গম বিহারের অনাদিষ্ট বাসিন্দা চিত্রকর সুশীল গৌরের ঘরের কাছে একটি খোলা কুয়া ছিল। প্রধান এটি এক সময় দখল করে নেয়। সে প্রত্যেকের কাছ থেকে এখান থেকে পানি নেওয়া বাবদ প্রতি মাসে ৫০ টাকা করে আদায় করত। এই হার শেষ পর্যন্ত ৫শ' টাকায় পেঁৗছে। এরপর কেজরিওয়াল ক্ষমতায় এসে এই হার মাসিক একশ' টাকায় ধার্য করা হয়। সুশীল সে সময় তার ঘরের অতিরিক্ত তিন রুমের টিনের চালার একতলা বাড়িয়ে নিতে সক্ষম হন। অতীতে পুলিশ ঘুষ নেওয়ার জন্য এলেও কেজরিওয়ালের সময় তাদের দেখা যায়নি।
এমনকি ২০১৪ সালে যখন মোদির পক্ষে জনসমর্থনের জোয়ার বইছিল, তখন পরিবারের অন্যরা মোদির পক্ষে ভোট দিলেও তিনি একা আম আদমি পার্টিকে নীরবে ভোট দিয়ে এসেছিলেন। মলে যারা রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার কাজ করে তাদের মধ্যে অধিকাংশই আম আদমি পার্টিকে সমর্থন করে বলে স্বীকার করেছে। কেজরিওয়াল সরকারের কাছ থেকে বিদ্যুৎ, পানি ও দুর্নীতির ব্যাপারে সুফল পেয়েছিলেন বলে জানান তারা। কেজরিওয়ালকে সরকারের পদত্যাগের জন্য দায়ী করা হয় দেখে তারা হতাশা প্রকাশ করেন। তার এই পদত্যাগ বিজেপি ও কংগ্রেসের মাত্রাতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ ও মিডিয়ার বাড়াবাড়ি রকমের প্রচারণার ফল বলে তারা মনে করেন। বিপণি কেন্দ্রে এসবই অপ্রকাশিত বিভক্তি।
অন্যদিকে জরিপে দেখা গেছে, দোকান মালিকদের অধিকাংশই আবার মোদি-বিজেপি সমর্থক। বিশ্বে ভারতের নাম রওশন করা এবং মোদির ভিশন, অভিজ্ঞতা ও দৃঢ়তার জন্য তারা তাকে ও তার দলকে সমর্থন করেন। এদের অনেকে বলেছেন, তারা ২০১৪ সালের নির্বাচনে আম আদমি পার্টিকে ভোট দিয়েছিলেন। কিন্তু আর এ পার্টিকে ভোট দেবেন না বলে জানান। কারণ, তাদের মতে ট্যাক্স প্রদানকারীদের অর্থ নিয়ে কেজরিওয়াল লোকরঞ্জনকারী রাজনীতির খেলা খেলেন। তার সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে দক্ষতার অভাব রয়েছে। তিনি প্রমাণ করেছেন, আরব্ধ কাজ সমাপ্ত না করে চলে যেতে পারেন ও তিনি একজন অপরিপকস্ফ ব্যক্তি।
নিউ ফ্রেন্ডস কলোনিতে বসবাসকারী একতা গুপ্তা মনে করেন, তিনি একজন একনিষ্ঠ বিজেপি সমর্থক হওয়া সত্ত্বেও ২০১৩ সালে তিনি দিলি্লর বিধানসভা নির্বাচনে আম আদমি পার্টিকে ভোট দিয়েছিলেন। কারণ, তখন দলটির সঙ্গে তরুণ প্রজন্ম ছিল। কিন্তু দেখা গেল, কেজরিওয়াল একেবারেই অদক্ষ এবং বিদ্যুৎ বিল হ্রাস করে তিনি সীমিত সংখ্যক লোককে মাত্র উপকৃত করতে পেরেছিলেন। মোদি এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। তিনি বিদেশি সম্মানীয় ব্যক্তিবর্গ ও নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। ভারতের জাতীয় দিবসে ওবামা প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার ঘটনা একতা গুপ্তার মনে রেখাপাত করেছে। মোদির শৌচ ভারত অভিযান ও শিক্ষক দিবসের বক্তব্যেও তিনি আলোড়িত হয়েছেন।
২৯ বছর বয়স্কা এমএনসি পেশাজীবী শিল্পা শর্মা আম আদমি পার্টির সরকারকে 'অস্থিতিশীল পর্যায়' বলে অভিহিত করে প্রশ্ন রাখেন, একটা সন্ত্রাসবাদী হামলা হলে কী হতো তখন? তখনও কেজরিওয়াল যে এ নিয়েও দোষারোপের রাজনীতি করবে না, তার নিশ্চয়তা কি দেওয়া যায়? দোষারোপের ভঙ্গিতে তিনি বলেন, কেজরিওয়াল দিলি্লর মুখ্যমন্ত্রী পদে ইস্তফা দিয়েছিলেন দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আশায়। বারানসীতে যখন কেজরিওয়াল মোদির বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যান তখনই তিনি যে দিলি্লর মুখ্যমন্ত্রীর পরিবর্তে দেশের প্রধানমন্ত্রী বনতে চান, সেটা এখানে অনেকের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়।
যারা মনে করেন, মোদি পাকিস্তানের মুখোমুখি দাঁড়ানোর মতো সাহস রাখেন এবং যারা মনে করেন, দেশের হিন্দু চরিত্রকে অস্বীকার করা হচ্ছে তাকে আবার যথাস্থানে স্থাপন করতে হবে, তাদের পক্ষে পছন্দ বাছাই করা অনেকটা সহজ। তবে বিজেপির মূল উদ্বেগের সঙ্গে যারা সহমত পোষণ করেন না তাদের পক্ষে পছন্দ বাছাই করাটা সহজ নয়। নির্মাণ কোম্পানির কর্মী মনোজ সিং মনে করেন, বস্তিতে বসবাসকারী মানুষকে হয়তো সম্মোহিত করা যাবে। তবে কেজরিওয়াল কোনো সমাধান দিতে পারেন না, তিনি কেবল দৃষ্টি আকর্ষণের কৌশল দেখাতে পারেন ও ইউ-টার্ন মারতে পারেন। তিনি মুখ্যমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমে সাংবিধানিক নিয়মকানুনের প্রতি যে তার বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা নেই, তাই প্রমাণ করলেন। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কোম্পানিতে কর্মরত পঙ্কজ সহায় প্রশ্ন রাখেন, ভর্তুকি দেওয়ার অর্থ আসবে কোথা থেকে? তিনি বলেন, বিদ্যুৎ বিল যদি হ্রাস করা হয় ও পানি যদি বিনা অর্থে দেওয়া হয়, তাহলে এর অর্থ তো কাউকে না কাউকে পরিশোধ করতে হবে।
স্পষ্টভাবেই বিভেদ অলঙ্ঘনীয় কিছু নয়। তবে পার্টিগুলো যেখানে শ্রেণীর ভিত্তিতে ভোট কাটবে, তাদের কাছে এটা একটা চ্যালেঞ্জ বটে। এবারের নির্বাচনে আম আদমি পার্টি জিতুক আর বিজেপি জিতুক বিজয়ী দলকে যারা তাদের ভোট দিয়েছে এবং যারা ভোট দেয়নি তাদের সবার কাছে পেঁৗছাতে হবে। আম আদমি পার্টিকে অবশ্যই তার গরিব তুষ্টকারী নীতি টেকসই করার মতো অর্থনৈতিক নীতি নেই বলে যে ধারণা রয়েছে তা দূর করতে হবে। বিজেপি ধনীদের এবং ধনীদের জন্য পার্টি বলে যে ধারণা দিলি্লতে রয়েছে তাদেরও সেটা দূর করতে হবে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে ভাষান্তর সুভাষ সাহা
ভারতীয় কলাম লেখক

বিক্ষোভের দিনগুলিতে প্রেম by

বাঁশের শুকনো পাতা ঝরে পড়ে বাঁশতলা ছেয়ে আছে। বাবার কবরটার বাঁশের বেড়া পুরোনো হয়ে গেছে বেশ। কবরের ওপরেও ঝরা বাঁশপাতার পুরু স্তর। সে কবর জিয়ারত করে। দোয়া করে আল্লাহপাকের দরবারে, ‘হে আল্লাহ, আমার বাবাকে বেহেশত নসিব করো।’ বিকালে শওকত বের হয়। মাকে কিছু বাজার-সদাই করে দেওয়া দরকার। মার জন্য সে এবার কিছুই আনতে পারেনি। ইউনিভার্সিটি হঠাৎই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ক্লোজড সিনে ডাই। ‘এরশাদের ঘোষণা, ছাত্রসমাজ মানে না’ স্লোগান দিতে দিতে তারা চলে আসে বাসটার্মিনালে, রেলস্টেশনে। মার জন্য কিছু যে একটা কিনবে, উপায় ছিল না। বাবু মিয়ার দোকানে আসে শওকত। মুদির দোকান। বটগাছের নিচে। টংয়ে বসে আছে কয়েকজন যুবক। তারা শওকতকে দেখে বিড়ি লুকোনোর প্রয়াস পায়। শওকত কাছে যেতে তারা সালাম দেয়। একজন বলে, ‘ভাইজান, কখন আসলেন?’
‘এই তো সকালে।’ ‘ঢাকার সব স্কুল-কলেজ বন্ধ করিয়া দিছে, বাহে?’
‘হ্যাঁ।’ ‘কালকা কী হইবে?’ আরেকজন জিগ্যেস করে। কথার সঙ্গে সঙ্গে তার মুখ থেকে বেরিয়ে এল সিগারেটের ধোঁয়া। ‘কালকা তো ঢাকা অবরোধ। সারা দেশ থেকে মানুষ যাবে ঢাকা। আমাদেরকে তো হল থেকে বাইর করি দিল। আর ঢাকাত যাওয়ার রাস্তাঘাটও সব বন্ধ করি দিছে।’ ‘তাইলে কি অবরোধ হবে না?’ একজন জিগ্যেস করে। ‘ঢাকাতেই তো ৫০ লাখ মানুষ আছে। তারা বাইর হইলেই হবে,’ শওকত জবাব দেয়। ‘সরকার এত ভয় পাইছে ক্যান?’ আরেকজন প্রশ্ন করে। ‘মনে হয়, হাসিনা আর খালেদা মিটিং করাতেই এরশাদ ভয় পায়া গেছে,’ শওকত জবাব দেয়। শওকত রাজনীতির খোঁজ কখনোই নিত না। কিন্তু অকারণে পুলিশের পিটুনি খেয়ে পা ভাঙার পর থেকেই সে তীব্র এরশাদ-বিরোধী হয়ে পড়েছে। এখন খোঁজখবর নেয়। বিরোধীদের আন্দোলন দেখলেই সে আগ্রহ বোধ করে। তার মনের মধ্যে একটা প্রতিশোধস্পৃহা জেগে ওঠে। ‘দুই নেত্রী মিটিং করলে কী হয়?’ একজন যুবক দুই হাত একত্র করে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে শুধোয়। ‘শাহ মোয়াজ্জেম তো বলেই দিছে, দুই মহিলা মিলিত হলে কিছুই উৎপাদিত হয় না’—শওকত বলে। ছেলেরা হেসে ওঠে হো হো করে। শওকত চায়ের পাতা কেনে। মার জন্য কী কিনবে তা-ই ভাবতে থাকে। এই দোকানে মার জন্য কিছু পাওয়া যাবে না। মাইল খানেক দূরে একটা বাজার আছে, সেখানে যেতে হবে। মার জন্য একটা শাড়ি কেনাই ভালো। তাহলে বোধ হয় রংপুর যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। আপাতত সে মার জন্য কিছু জিলাপি কিনে নিলেই পারে। সে আরেকটু হেঁটে বাজারের জিলাপির দোকান পর্যন্ত যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বাঁশের খাঁচাড়িতে করে জিলাপি নিয়ে ফেরে শওকত। বাড়ির দাওয়ায় আসতে আসতে সন্ধ্যা নেমে আসে চরাচরে। গরুর পাল ফিরছে ধূলি উড়িয়ে, গোধূলি কথাটাকে সার্থক প্রমাণ করার জন্য। ছেলেপুলের দলও ধান উঠে যাওয়া খেতে ফুটবল খেলে এক হাঁটু ধুলা নিয়ে যার যার ঘরে ফিরছে হইচই করতে করতে। পশ্চিম আকাশে মেঘের রঙিন আস্তরণ। এই সময়টাকে বলা হয় কনে দেখা ক্ষণ। এই আলোটাকে বলা হয় কনে দেখা আলো। এই হলুদ আলোয় সবকিছুকে উজ্জ্বল বলে বোধ হয়!
এমনি কুহেলিময় এক প্রদোষে শওকত দেখে, তাদের বাড়ির দাওয়ায় একটা অপূর্ব নারীমূর্তি দাঁড়িয়ে। উজ্জ্বল কমলা রঙের শাড়ি, দিঘল কেশ, পিতলের মূর্তির মতো মুখশ্রী।
শওকতের বুকটা কেঁপে ওঠে।
তাকে দেখামাত্রই সেই নারীমূর্তি অন্তর্হিত হয় রান্নাঘরে।
শওকত এগিয়ে যায়।
ব্যাপার কী?
মেয়েটা কে?
শওকত আরেকটু এগোয়। বারান্দায় ওঠে। ইটের গাঁথুনি দেওয়া প্লিনথ। মেঝেতে মাটি। দেয়ালে ইট। প্লাস্টার আছে। চুনকাম করা হয়নি।
শওকত বারান্দার টেবিলে রাখে জিলাপির ঠোঙা।
মাকে ডাকে, ‘মা, মা।’
সেই নারীমূর্তি এগিয়ে আসে।
বলে, ‘চাচিআম্মা নামাজে বসছে।’
মার এ আবার কোন ভাইঝি? শওকত মনে মনে হিসাব কষে। হিসাবের কোনো ফল ফলছে না।
‘আপনি চা-পাতি আনছেন? দেন। চাচিআম্মা আপনাকে চা বানায়া দিতে বলছে।’ শওকত টেবিলের ওপরে রাখা জিলাপির ঠোঙার পাশ থেকে চায়ের পাতার প্যাকেট তুলে নিয়ে বলে, ‘এই যে চা-পাতি। জিলাপিও আছে।’ শওকত বারান্দার বেঞ্চে বসে। ঘরের দরজার গোড়ায় কেরোসিনের লন্ঠন জ্বালানো হয়েছে। তবে সলতে উসকে দেওয়া হয়নি। এখনো অন্ধকার প্রবল নয়। আলোই এখনো কর্তৃত্ব করছে অন্ধকারের ওপরে। কিন্তু কেরোসিনের গন্ধ ছড়িয়ে আছে বাতাসে। মা নামাজ পড়বেন অনেকক্ষণ ধরে। নামাজ শেষে পড়বেন দোয়াদরুদ। চায়ের গন্ধ আসছে রান্নাঘরের ভাঙা বেড়ার ফাঁক দিয়ে। শওকতের শরীর চায়ের জন্য উন্মুখ হয়ে ওঠে। কিন্তু তার মনটা কাঙ্ক্ষা করছে ওই কমলা শাড়ি নারীটিকে। হাতে চায়ের কাপ নিয়ে মেয়েটি আসে। আরেক হাতে জিলাপি। টেবিলে সেসব রেখে সে বলে, ‘আমি পানি আনতেছি এখনই।’ সে চলে যায় রান্নাঘরে। কাঁসার গেলাসে পানি ঢেলে ফিরে আসে চটপট। তার হাতে একগাছা সোনার চুড়ি!
মেয়েটি দরজার মুখ থেকে লন্ঠনটা তুলে আনে। আলোর তেজ বাড়িয়ে দেয় চাবি ঘুরিয়ে। তার মুখখানা আবারও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সে লন্ঠন রাখে টেবিলে।
শওকত বলে, ‘তোমার নাম কী?’
‘আমার নাম সোনিয়া।’
‘কোন বাড়ি তোমার?’
‘তালুকদার বাড়ি। আমি নুরুল বিএসসির মেয়ে।’
‘তুমি নুরুল স্যারের মেয়ে। নুরুল স্যারের কাছে অঙ্ক পড়ছিলাম। খুব ভালো বুঝাইতেন। স্যার কেমন আছেন?’
‘জি, ভালো আছেন।’
‘তুমি কী পড়ো?’
‘আমি বদরগঞ্জ কলেজে আইএসসি পড়ি।’
‘বাহ্।’
‘আমার স্ট্যাটিকস বুঝতে অসুবিধা হয়। আব্বা বলছেন, আপনি আসলে আপনার কাছ থেকে বুঝায়া নিতে।’ ‘তা তোমার আব্বা ভালোই বলছেন। আমাদের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়ায় তো খালি এই স্ট্যাটিকস।’ শওকতের মা আসেন। বলেন, ‘সোনিয়া, চা দিছ মা তোমার ভাইজানক?’
‘দিছি চাচিআম্মা। আপনার জন্য ভাইজান জিলাপি আনছে। নেন, খান।’
‘তুমি খাইছ?’
‘আপনি না খাইলে ক্যামন করি খাই, চাচি আম্মা’, সোনিয়া বলে। ‘যাও। তাইলে নিয়া আসো পাকঘর থাকিয়া।’ সোনিয়া রান্নাঘরের দিকে যায়। মা গলা উঁচিয়ে বলেন, ‘পাকঘরত ল্যাম্পোটা আছে। জ্বালেয়া ন্যাও, মা।’ তারপর ফিসফিস করে বলেন, ‘এই রকম মেয়ে আর হয় না। এই বাড়িতে আমি একলা একলা থাকি। এই মেয়েই আসিয়া আমার খোঁজখবর নেয়। নিজের বেটিও এই রকম খোঁজখবর করে না।’ এক হাতে ল্যাম্প আরেক হাতে জিলাপিভরা থালা নিয়ে সোনিয়া ফেরে। টেবিলে রেখে বলে, ‘চাচিআম্মা, নেন, খান।’ ‘তুমি খাও, মা।’ ‘আমি পরে খাব।’
‘কেন, পরে খাবা কেন?’
‘না, পরে খাব,’ বলে সে সামনে থেকে চলে যায়। মা বলেন, ‘দেখলা কী রকম আদব। তোমার সামনে খাবে না। তাই খাইল না।’ শওকতের মনে পড়ছে বহ্নির কথা। বহ্নি তার পায়ের ফোলা জায়গায় তর্জনী বুলিয়েছিল। রাত্রি পৌনে আটটা এই গ্রামে অনেক রাত। সবার খাওয়া হয়ে গেছে। শওকত বলে, ‘রেডিওটা কই আমাদের?’
মা বলেন, ‘তোর বাবা মরার পর তো সেইটার কোনো খোঁজখবর নাই।’ ‘আরে বিবিসি শোনা দরকার ছিল। কালকা ঢাকায় ঘেরাও। কী হয় না-হয় শুনি।’ ‘যা, তোর নুরুল বিএসসি স্যারের বাড়ি যা। অরা খুব খবর শোনে। সোনিয়ার সাথে যা। সোনিয়া, ও সোনিয়া। ভাইজানক বাড়িত নিয়া যাও। ভাইজান রেডিওতে খবর শুনিবে।’ ঝিঁঝি ডাকছে। জোনাকি জ্বলে উঠেছে এদিক-ওদিক। শেয়ালের ডাক আসছে কাশবনের দিক থেকে। গৃহস্থ বাড়িগুলো থেকে আসছে কুকুরের ঘেউ ঘেউ রব। সোনিয়ার হাতে একটা টর্চলাইট। তার পেছন পেছন হাঁটছে শওকত। সোনিয়ার গা থেকে একটা বুনো গন্ধ আসছে। শওকতের মাতাল মাতাল লাগছে। মাথার ওপরে বাঁশঝাড়। কী যেন নড়ে ওঠে বাঁশঝাড়ে। শওকতের বুক কাঁপে। সে সোনিয়ার নিকটবর্তী হয়। সোনিয়ার শরীর থেকে কেরোসিনের গন্ধ আসে। শওকতের কেমন যেন লাগে।

এক খামারেই দুধ বায়োগ্যাস, জৈব সার by প্রণব বল ও আবদুর রাজ্জাক

(ছবি:-১ পটিয়ার উত্তর চরলক্ষ্যা এলাকার একটি খামারে গরু পরিচর্যা করছেন কর্মীরা l ছবি: সৌরভ দাশ ছবি:-২ পটিয়ার পাঁচ শতাধিক দুধের খামারের মধ্যে অন্তত ৩৫০টিতে বায়োগ্যাস প্রকল্প করা হয়েছে। সেই গ্যাসে রান্না চলছে চরলক্ষ্যা এলাকার একটি বাড়িতে l ছবি: প্রথম আলো) শুরুটা হয়েছিল চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার চরফরিদ গ্রামের আবু তাহেরের হাত ধরে। অস্ট্রেলিয়ান (জার্সি) জাতের দুটি গাভি দিয়ে দুধের খামার শুরু করেছিলেন তিনি। সেই খামার ধীরে ধীরে বড় হয়েছে, গাভি বেড়েছে, বেড়েছে দুধের উৎপাদনও। তা দেখে আশপাশের অনেকেই দুধের খামার শুরু করলেন। এখন খামার থেকে দুধ পাওয়ার পাশাপাশি বায়োগ্যাস প্রকল্প করে গ্যাস ও জৈব সার উৎপাদন করা হচ্ছে। অর্থাৎ একটি খামার মানে একের ভেতরে তিন!
পটিয়ায় এখন পাঁচ শতাধিক দুধের খামারের মধ্যে অন্তত সাড়ে তিন শ খামারে বায়োগ্যাস প্রকল্প আছে। এসব খামার অনেক গ্রামের জীবনচিত্র পাল্টে দিয়েছে। শিক্ষিত যুবকেরাও এখন এমন খামার করতে এগিয়ে আসছেন। ফলে দিনে দিনে বাড়ছে খামারের সংখ্যা। কিছু সমস্যা থাকলেও খামার করে স্বাবলম্বী হওয়ার গল্প এখন পটিয়ার ঘরে ঘরে।
খামারের শুরু: ১৯৯১ সালের দিকে দুধের খামারের যাত্রা শুরু হয় পশ্চিম পটিয়া থেকে। যাঁর হাত ধরে শুরু, চরলক্ষ্যা ইউনিয়নের চরফরিদ গ্রামের সেই আবু তাহের জানালেন, তাঁর বাবা ছিলেন আদর্শ কৃষক। জমি চাষ ও দুধের জন্য তিনি ১৯৬৫-৬৬ সালের দিকেই ২০ থেকে ৩০টি দেশি গরু পালতেন। এইচএসসি পাস করে ১৯৭৭-৭৮ সালের দিকে আবু তাহের নিজেও কৃষিকাজ শুরু করেন। তাহের বলেন, ‘১৯৭৮ সালে নিজেদের গরুর চিকিৎসার জন্য একদিন চট্টগ্রাম পশুসম্পদ অফিসে গিয়েছিলাম। সেখানে ডাক্তার ঘোষ নামের একজন চিকিৎসকের সঙ্গে আলাপ হয়। তিনিই বিদেশি গাভি দিয়ে দুধের খামার করতে উৎসাহ দিলেন। তাঁর অনুপ্রেরণাতেই চট্টগ্রাম শেরশাহ কলোনির একটি খামার থেকে দুটি অস্ট্রেলিয়ান (জার্সি) জাতের গাভি কিনে খামার শুরু করি। সঙ্গে বাবার এতগুলো গরু পালনের অনুপ্রেরণা তো ছিলই।’ বললেন, ‘খামার করে আমি সফল হয়েছি। দুই ছেলে ও এক মেয়েকে পড়ালেখা করাচ্ছি।’
তাহেরের এই সাফল্য দেখেই মূলত দুধের খামার করার দিকে ঝুঁকে পড়েন অনেকে। পশ্চিম পটিয়ার চরলক্ষ্যা, চর পাথরঘাটা, বড় উঠান, শিকলবাহা এলাকায় খামারের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।
এল বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট: অনেকের মতোই লাভের কথা ভেবে দুধের খামার করেন জুলধা গ্রামের হাজি মো. ইব্রাহিম। বায়োগ্যাস প্রকল্প এল তাঁর হাত ধরেই। সেই গল্প শোনালেন তিনি, ‘২০০৫ সালের দিকে টেলিভিশনের একটি প্রতিবেদনে গরুর গোবর ও নানা ধরনের বর্জ্য দিয়ে বায়োগ্যাস প্রকল্প তৈরি করা দেখেছিলাম। সেটা দেখেই আমারও এমন প্রকল্প করার কথা মাথায় আসে। তখন খামারের পাশাপাশি প্রায় আড়াই লাখ টাকা খরচ করে বায়োগ্যাস প্রকল্প করি।’ হাজি ইব্রাহিম জানালেন, প্রথমে নিজের রান্নার কাজে এই গ্যাস ব্যবহার করতেন। পরে আশপাশের ২০টি পরিবারে গ্যাসের সংযোগ দেন। তা থেকে প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা আয় হয় তাঁর। এ ছাড়া প্রকল্পে ব্যবহার করা গোবর থেকে যে জৈব সার হয়, তা বিক্রি করে মাসে ১০ হাজার টাকার বেশি আয় হয়।
সফলদের কয়েকজন: চরলক্ষ্যা এলাকার যুবক মো. বেলাল এইচএসসি পাস করে ২০০৭ সালে লেগে যান খামার ব্যবসায়। চারটি গাভি কিনে শুরু করেছিলেন। এখন সব মিলিয়ে তাঁর গরুর সংখ্যা এক শর কাছাকাছি। প্রতিদিন প্রায় ৫০০ লিটার দুধ হয় বেলাল ডেইরি ফার্ম নামের খামারে। প্রতিদিন দুই বেলা দুধ সংগ্রহ করে নিয়ে যান গোয়ালারা।
দেড় বছর আগে খামারের গোবর ব্যবহার করে বেলাল গড়ে তোলেন বায়োগ্যাস প্রকল্প। সম্প্রতি একদিন বেলালের বাড়ি গিয়ে দেখা গেল, সেই বায়োগ্যাসে বেলালের ঘরে জ্বলছে বাতি, চলছে চুলা। গ্যাস উৎপাদন শেষে ওই প্রকল্পের গোবর জৈব সার হিসেবে বিক্রি করেন তিনি।
আরেকজন সফল খামারি নাজিম উদ্দিন হায়দার। জানালেন, ‘২০০৫ সালে ৪৫ হাজার টাকায় অস্ট্রেলিয়ান জাতের একটি গাভি কিনেছিলাম। সেই গাভি থেকে তখন ১৫ লিটার দুধ পেতাম। পর্যায়ক্রমে গাভির সংখ্যা বেড়ে ৫০টি পর্যন্ত হয়। ২০১১ সালে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে খামার করেছি। এখন শতাধিক অস্ট্রেলিয়ান গাভি আছে। প্রতিদিন প্রায় ৪০০ লিটার দুধ পাই।’ সবচেয়ে বড় বায়োগ্যাস প্রকল্পটি করছেন নাজিম উদ্দিনই। ওই প্রকল্প থেকে ১০০ পরিবার জ্বালানি গ্যাস পাবে।
শিক্ষিত তরুণেরাও এগিয়ে এসেছেন এ রকম খামার গড়তে। আট বছর আগে শিকলবাহার মো. ফোরকান কয়েকটি গরু নিয়ে শুরু করেন খামার। খামারের কাজ করতে করতেই স্নাতক পাস করেন। পাস করার পর আরও পুরোদমে ব্যবসায় নেমে পড়েন। তার এখন ১৫টি গাভি রয়েছে। পাশাপাশি একটি ভেটেরিনারি ওষুধের দোকানও গড়ে তুলেছেন তিনি। তবে সবকিছু ছাপিয়ে গেছে তাঁর কৃত্রিম প্রজননকেন্দ্রের আয়। ফোরকান বলেন, ‘আমি খামারের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে কৃত্রিম প্রজননকেন্দ্র গড়ে তুলেছি। এই কেন্দ্রের আয় আমার বড় অবলম্বন।’
কিছু সমস্যা: উৎপাদিত দুধের বেশির ভাগই যায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন মিষ্টির দোকানে। এর বাইরে পাঁচ হাজার লিটারের মতো যায় পটিয়ায় মিল্ক ভিটার দুগ্ধ শীতলীকরণ কেন্দ্রে। প্রতি লিটার দুধ ঘনত্বের তারতম্য অনুযায়ী ৪৬ থেকে ৫১ টাকায় বিক্রি হয়। তবে ঘণত্ব কম হলেও ওই দুধ লিটারপ্রতি ৩৫ টাকার বেশি বিক্রি হয়।
গ্রীষ্মকালে সমস্যায় পড়েন খামারিরা। ফলের মৌসুম হওয়ায় ওই সময় মিষ্টির চাহিদা কমে যায়। মিষ্টির দোকানগুলো ওই সময় দুধ কম কেনে। দুধের দাম পড়ে যায়। খামারিদের দাবি, ওই এলাকায় আরও কয়েকটি দুগ্ধ শীতলীকরণ কেন্দ্র করা হলে এ সমস্যার মুখে পড়তে হবে না তাঁদের। আরেকটি সমস্যা হলো, পর্যাপ্ত পশু চিকিৎসক নেই। তাই গরু রোগাক্রান্ত হলে ভোগান্তিতে পড়েন খামারিরা। চিকিৎসাসেবার অভাবে গরু মারাও যায়।
তাঁদের কথা: পটিয়া উপজেলা ভারপ্রাপ্ত প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা রাজীব চক্রবর্ত্তী চিকিৎসক সংকটের কথা স্বীকার করলেন। তিনি বললেন, ‘আমাদের হিসাবে চার শতাধিক খামার আছে। এসব খামারে দৈনিক গড়ে ৬০ হাজার লিটার দুধ হয়। ছোট খামারগুলো হয়তো আমাদের হিসাবে নেই।’ দুগ্ধ শীতলীকরণ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক ফরহাদুল আলম বলেন, ‘আমরা খামারিদের দুধ নেওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসাসেবাও দিয়ে আসছি।’
পশ্চিম পটিয়া কর্ণফুলী ডেইরি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘শুরুতে দু-একজন দেশের বাইরের গরু দিয়ে ঘরোয়াভাবে খামার করে। এখন প্রতিদিনই বাড়ছে খামারির সংখ্যা। পাঁচ শর বেশি খামার এখন রয়েছে। আশার কথা, শিক্ষিত যুবকেরা এখন এই খামারের দিকে ঝুঁকছে।’